হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা

হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা
গৌতম দাস
১২ সেপ্টেম্বর  ২০১৬, সোমবার ০০ঃ০১

http://wp.me/p1sCvy-1R1

ভারতের জন্মের শুরু থেকেই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে বিস্তর চড়াই-উতরাই আছে। কখনো তা চরম তুঙ্গে, আবার কখনো তুলনামূলক শীতল। কিন্তু এবারের চরম অবস্থা নিজগুণেই যেন তুলনাহীন। টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৭ আগস্ট কাশ্মীর নিয়ে রিপোর্টে জানাচ্ছে, কাশ্মিরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া চলমান কারফিউ ২৭ আগস্টে পঞ্চাশতম দিন পূর্ণ করেছে। কিন্তু পুরা ঘটনার বেজ-ফ্যাক্টস মানে, কী থেকে ঘটনা স্ফুলিঙ্গে রূপ নিল সেটা কী? সেটা ভারত সরকারের ভাষায় বলা যাক। ভারতের এনডিটিভির খবর অনুবাদ করে আমাদের বাংলা ট্রিবিউন কী ছেপেছে সেটা দেখে নেয়া যেতে পারে।  সেই ভাষ্যটা হল,  হিজবুল মুজাহিদিন নামে ‘সন্ত্রাসবাদী’ সংগঠনের নেতা বুরহান ওয়ানী গত ৯ জুলাই ২০১৬ ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। তার ওই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়া রাজনৈতিক গণ-অসন্তোষ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত কারফিউ অমান্য করেছিল জনগণ এবং জানাজায় অংশ নেয়া থেকে অসন্তোষ ও এর তীব্রতা শুরু। আর তা এবার ৫০ দিন পূর্ণ করল। ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শব্দটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত দিয়ে তৈরি। এই শব্দ দিয়ে আমরা অনেক কিছু ঘটনা বুঝে ফেলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই আমাদের পরিচিত এই বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে ব্যাপারটা বুঝানো হল। যদিও টাইমস অব ইন্ডিয়া সুনির্দিষ্ট করে ‘এনকাউন্টার’ শব্দ ব্যবহার করেছে। এটা ভারতীয় গণমাধ্যমের শব্দ। অপর দিকে যে শহরে ৫০ দিন টানা কারফিউ দিয়ে রাখতে হয়, সেখানকার জনজীবনের অবস্থা কী, মানুষের আয়-ইনকাম দিন এনে খায়, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সরকার সবসময় যথেচ্ছাচার বলপ্রয়োগে দাবড়ে সমাধান করে এসেছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। কিন্তু এবার বুরহান এনকাউন্টারের পরের পরিস্থিতি যে এমন অগ্নিরূপ ধারণ করবে, কারফিউ দিলেও যে তা ভেঙ্গে মানুষ বুরহানের জানাজায় অংশগ্রহণ করে বসবে এগুলো তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। কাশ্মীরের রাজ্য সরকারে উপরে কেন্দ্রের নিরাপত্তা বাহিনীর রুস্তমি চলে থাকে। এজন্য আইনগত ভাবেই সামরিক বাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া আছে। বিগত ১৯৫৮ সালের এক আইনে (ওটা প্রথম আইন আসামের নাগাদের জন্য ছিল। পরে ঐ আইনের আদলে ১৯৯০ সালে বিশেষ করে কাশ্মীরের জন্য এক আইন প্রনয়ন করা হয়) যার নাম Armed Forces (Special Powers) Acts (AFSPA)। ফলে বলা যায় এই বাহিনীই এই প্রথম কার্যত পর্যদুস্ত হয়েছে। কলকাতার আনন্দবাজার এই বিষয়ে একটা রিপোর্ট লিখেছে যার শিরোনাম, “কোন পথে উপত্যকায় শান্তি আসতে পারে, হাতড়ে বেড়াচ্ছে নয়াদিল্লি”।  যেখানে ভারতের গোয়েন্দা-নিরাপত্তা মহলের হারু ও পর্যদুস্ত মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। আনন্দবাজার সেখানে লিখছে,  “প্রাথমিক ভাবে পরিস্থিতি সামলাতে না পারার জন্য গোয়েন্দা ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছে কেন্দ্র। এক জন জঙ্গির মৃত্যুর প্রতিবাদে কাশ্মীরে যে এত বড় মাপের অশান্তি হতে পারে, সে বিষয়ে কোনও ধারণাই ছিল না গোয়েন্দাদের। এমনকী দিল্লিতে বসে শীর্ষ গোয়েন্দাকর্তারা দাবি করেছিলেন,বিক্ষোভ সাময়িক। দশ দিনেই থেমে যাবে। তা যে কবে থামবে,সে ধারণাও নেই কারও! উপত্যকার অশান্তি সেটাই!”।খুব সহজে কাতর হন না এমন ভারতীয় বুদ্ধিজীবীর গায়েও আঁচ লেগেছে। আর চুপ থাকা যায়নি এবং আনন্দবাজারের রিপোর্ট তা ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বলা যায়। এসব পরিমাপের দিক থেকে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও কাশ্মিরের এবারের ঘটনায় আর চুপ থাকতে পারেননি। আনন্দবাজারের ভাষ্যটাই তুলে আনছি, এক টিভি সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য সেন বলেছেন,

“সরকার এতটাই খারাপভাবে কাশ্মির-পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে যে এটাকে ভারতীয় গণতন্ত্রের ওপরে সবচেয়ে বড় দাগ হিসেবেই দেখছে গোটা বিশ্ব”। চার দিক থেকে সবাই বিষয়টিকে সরকারের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে নাড়াচাড়ার ত্রুটি হিসেবেই দেখছে তাতে সন্দেহ নেই। সেটা এখানে তুলে ধরতে একটু বড় এক উদ্ধৃতি আনন্দবাজার থেকে আনছি। লিখেছে “সমালোচনা হচ্ছিলই। কাশ্মিরের উত্তপ্ত পরিস্থিতির জন্য মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দুষছিল মোদি সরকারকে। আরএসএস নেতাদের একাংশও মনে করছেন, কাশ্মিরের পরিস্থিতি ঠিকভাবে সামলানো হচ্ছে না। কিন্তু নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও এভাবে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে মুখর হওয়ায় চাপ আরো বাড়ল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার সরকারের ওপরে। কাশ্মিরিদের মধ্যে যে দেশের বাকি অংশ সম্পর্কে নানা রকম মত রয়েছে, সে কথাও অবশ্য উল্লেখ করেছেন অমর্ত্য। কিন্তু সেই বাস্তবতার নিরিখেও সরকার যে ভূমিকা নিচ্ছে, অমর্ত্যরে মতে সেটা বড় রকমের ভুল। এই সূত্রে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, কাশ্মিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা জরুরি। তবে সেটাই কাশ্মিরিদের মূল সমস্যা বলে ধরে নেয়াটা ভুল। …অমর্ত্য সেনের এই সমালোচনার জবাবে সরকারের তরফে কেউ মুখ খোলেননি তাৎক্ষণিকভাবে। এবং ভূস্বর্গে অব্যাহতই রয়েছে অশান্তি। দক্ষিণ কারের কাজিগুন্দে নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে গুরুতর জখম আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে আজ। এই নিয়ে ১১ দিনে উপত্যকায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে হলো ৪৪। তবে গুলি চালনার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী।”

আনন্দবাজারের এই রিপোর্ট গত ২০ জুলাইয়ের। ফলে নিহতের সংখ্যা এটা সর্বশেষ সংখ্যা নয়। কারফিউর ৫০তম দিনে মৃতের মোট সংখ্যা ছিল ৬৯ জন।
এক কথায় বললে মোদি সরকার এবারের কাশ্মির ইস্যুটি নিয়ে বড়ই পেরেশান আর বেকায়দায় আছে। বেকায়দায় পড়লে মানুষ আরো উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে। এখানেও তাই হয়েছে। আর সেটাই এখানে  আমাদের এই রচনার মুল প্রসঙ্গ।

তবে ঘটনাস্থল এবার ঠিক কাশ্মীর নয়। কাশ্মীর থেকে ব্যাঙ্গালোরে, যদিও ইস্যু সেই একই কাশ্মীর। ব্যাঙ্গালোরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের’ (এআই) শাখা অফিস কাশ্মিরে মানবাধিকার ইস্যুতে এক সেমিনারের আয়োজন করেছিল।
কিন্তু বিজেপির ছাত্রসংগঠন ‘অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের’ (এভিবিপি) অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে যে, তাদের আয়োজিত ঐ কাশ্মির বিষয়ক সেমিনারে ভারতের বিরুদ্ধে ও ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে লাগাতার স্লোগান দেয়া হয়েছে। তাই অ্যামনেস্টি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে এর পরের দু-তিন দিন ধরেই ব্যাঙ্গালুরুতে তীব্র বিক্ষোভ দেখাচ্ছে বিজেপির ছাত্র শাখা। যদিও জবাবে অ্যামনেস্টি দাবি করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনার কোনো ভিত্তিই থাকতে পারে না।
ঘটনার সূত্রপাত সেমিনারের একজন বক্তা, কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিত নেতা আর কে মাট্টু দাবি করেছিলেন “ভারতীয় সেনার মতো সুশৃঙ্খল বাহিনী দুনিয়াতে কমই আছে”। এই তথ্যগুলো নিয়েছি ভারতীয় বিবিসির ১৬ আগস্টের এক রিপোর্ট থেকে। ব্যাঙ্গালুরুতে ঐ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছিল এর আগের শনিবার, মানে ১৩ আগস্ট। ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন কিছু কাশ্মীরি ছাত্র, যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র হিসেবে ব্যাঙ্গালুরুতে বসবাস করেন। ফলে হিন্দু পণ্ডিত নেতা মাট্টুর ওই বক্তব্যের পর সভায় উপস্থিত কাশ্মীরি যুবকেরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন, তাঁরা কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে স্লোগান দিতে শুরু করেন। আসলে ঐ সভায় হিন্দু নেতা আর কে মাট্টুসহ কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের উপস্থিতিও গণ্ডগোল লাগানোর দিক থেকে পরিকল্পিত বলা যায়। দাওয়াতি না হয়েও তারা গণ্ডগোল পাকানোর উদ্দেশ্যে সভায় শুরুতে দলবেঁধে ওই সভায় প্রবেশ করেন। এরপর উসকানিমূলকভাবে কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর তৎপরতার পক্ষে উগ্র ও কড়া সাফাই বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলেছিলেন। পরিকল্পিতভাবে অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করে দিয়েছিল তারা।
কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের পর ঘটনা পরিকল্পনায় মঞ্চে হাজির হয় এভিবিপি। পরের দিন গুলোতে  বিজেপির ছাত্র শাখা এভিবিপি, তারা ঐ অনুষ্ঠানে স্লোগানের ভিডিও প্রচার করে এবং শহরে অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে মিছিল করে জনমত খেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছিল। একপর্যায়ে তাঁরা ব্যাঙ্গালুরু অ্যামনেস্টির অফিসে হামলা করেছিল। পরে পুলিশ উপস্থিত হলে পুলিশের ওপর উলটা চাপ সৃষ্টি করে অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা’ করে।
এ বিষয়ে বিবিসি তাদের রিপোর্টে লিখেছে, অনেকটা তাদের চাপের মুখেই ব্যাঙ্গালুরুর পুলিশ ‘অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার’ বিরুদ্ধে দেশদ্রোহসহ আরো নানা অভিযোগে এফআইআর দাখিল করে। এ ছাড়া বিবিসি আরো লিখেছে, বিদ্যার্থী পরিষদের নেতা সাকেত বহুগুনা বলছেন, “অ্যামনেস্টি ও তাদের মতো আরো কিছু এনজিও বারবার এটাই বলে চলেছে কাশ্মিরে সব সমস্যার মূলে আছে ভারতীয় সেনা। তারা এমন একটা ন্যারেটিভ তৈরি করতে চাইছে যে, কাশ্মিরের মুসলিমরা সেনাদের হাতে নির্যাতিত। তাদের অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে, এখন বলুন কোন দেশ এটা সহ্য করবে যে, তাদেরই একটা অংশকে আলাদা করে ফেলতে প্রকাশ্যে উসকানি দেয়া হচ্ছে?’।
কাশ্মির ইস্যুতে সাধারণভাবে বিজেপির অবস্থান হল, যেভাবে সাকেত বহুগুনার বক্তব্যে দেখা গেছে, মোটা দাগে সেটাই। কাশ্মিরের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ উঠলেই সেটাকে তারা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ’ বলে অভিযোগ আনে। সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে তারা জনমনে জায়গা করে নিতে চেষ্টা করে থাকে।
উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগিরে অনেকে বিভ্রান্ত হতে পারেন যে কাশ্মিরের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ উঠালে তা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ’ হতেও পারে। কিন্তু না, এটা রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ নয়। এটা আমার কথা নয়, এ নিয়ে বহু রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার বক্তব্য ও ঐ ধরণের বহু মামলায় বেকসুর খালাসের রায় আছে। আশির দশকে পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট প্রথম এমন রায় দিয়েছিলেন। যা পরে অন্যান্য অনেক ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলা হিসেবে কোর্টের সামনে আনা হয়েছিল। এখানে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার সীমা টেনে দেয়া লাইন হচ্ছে, ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের স্লোগান – সেটা কাশ্মিরের স্বাধীনতা চাই অথবা পাঞ্জাবের স্বাধীনতা চাই; যা-ই তোলা হোক এগুলো ‘রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ’ ঘটে এমন কাজ নয়। স্বাধীনতার দাবি করে স্লোগান দিলে তা রাষ্ট্রদ্রোহ হবে না। তা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অথবা সেনাবাহিনী যার বিরুদ্ধেই স্লোগান হোক না কেন। তবে একমাত্র কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে স্লোগান দিলে বা সশস্ত্র সাংগঠনিক তৎপরতা চালালে বা সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন চালালে তা অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহ হবে।
বিজেপি এই রায়ের কথা জানে। তবুও সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের মোড়কে হাজির করে আবেগ থেকে ফায়দা নিতে চাওয়া তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কৌশল। তারা বলছে, ‘কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে। এখন বলুন, কোন দেশ এটা সহ্য করবে?’ – হ্যাঁ, ভারত রাষ্ট্রই এটা সহ্য করবে, নিরস্ত্র হলেই করবে। করতে হবে এটাই সুপ্রিম কোর্টের রায়। সেনাবাহিনী অন্যায় করলেও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যাবে, যদি তা নিরস্ত্র হয় এবং তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে না।

ওদিকে ব্যাঙ্গালুরুর ঘটনার আরেক তামাশার দিক আছে। কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালুরু (পুরানা নাম ব্যাঙ্গালোর)। এর রাজ্য সরকার বা প্রাদেশিক সরকার হল কংগ্রেস দলের ফলে এর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেসি। বিবিসি তাদের ওই রিপোর্টে বলছে, “কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া আবার যুক্তি দিচ্ছেন, একটা সভায় দেশবিরোধী স্লোগান ওঠার পরও সরকার হাত গুটিয়ে থাকতে পারে না। তাই বিষয়টি নিয়ে তার পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে”। অর্থাৎ একজন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী তিনিও বিজেপির রাজনীতি অনুসরণ করে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন, পছন্দ করছেন। কেন? তিনি তো বিজেপি করেন না, কংগ্রেস দল করেন ও সেই দলের মুখ্যমন্ত্রী! তাতে কী? তিনিও বিজেপির সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে জনমনে বিভ্রান্তি জাগানোর বিরুদ্ধে দাড়াতে, সত্য বলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ বিজেপি হিন্দুত্বের জিগিরের এমনই এক আবহাওয়া তৈরি করে ফেলেছে। ফলে তিনি কিছুতেই ঐ  হিন্দুত্বের সেন্টিমেন্টের জোয়ারের সামনে দাড়াতে চাচ্ছেন না, এতে তিনি অজনপ্রিয় হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ হিন্দুত্বের সেন্টিমেন্টের জোয়ার তুলে এর সামনে ভয় দেখিয়ে কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রীকেও বিজেপির রাজনীতি করতে বাধ্য করেছে বিজেপি। অথচ সব দলই জানে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা বা অভিযোগ কোনো হাইকোর্ট আমল করবেন না, বেকসুর খালাস দিয়ে দেবেন। কিছু দিন আগে দিল্লীতে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা কাহানাইয়ার মামলাতেই একই ঘটনা হয়েছিল। মামলা চলে নাই। কাহানাইয়া এখন মুক্ত কিন্তু কয়েক মাস তাকে জেলে থাকা সহ বিশাল হয়রানী পোহাইতেই হয়। অর্থাৎ আদালত পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে মানুষকে হয়রানি করার সুযোগ নিতে, হয়রানির রাজনীতি করতে কংগ্রেস বিজেপির থেকে প্রতিযোগিতায় পেছনে পড়ে থাকতে চায় না। এই হলো হিন্দুত্বের রাজনীতি, এই তার মহিমা।
হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা এতই যে, বিবিসি লিখেছে, ‘কর্ণাটকের রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দিলেও দিল্লিতে দলের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি বলছেন, “একটা প্রতিষ্ঠানকে এভাবে কাঠগড়ায় তোলা যায় কি না তা নিয়ে তার সন্দেহ আছে”।
মি. সিংভির বক্তব্য, ‘ভারতবিরোধী ভাবাবেগে উসকানি দেয়ার জন্য একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর হতেই পারে, কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা বোধ হয় সমীচীন নয়।’ ‘কোনো ব্যক্তি হয়তো তার বাকস্বাধীনতার সীমা ছাড়িয়ে গেছেন, কিন্তু তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটা সংস্থাকে এভাবে অভিযুক্ত করা ভুল বলেই আমার ধারণা।’ অর্থাৎ কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি জানেন বুঝেন নিজেই এটাকে ‘ভারতবিরোধী ভাবাবেগে উসকানি’ দিয়ে নাচা বলছেন। এর পরও হিন্দুত্বের রাজনীতি করার লোভ না ছেড়ে বরং চিকনে মেরে ‘কর্ণাটকের রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই’ বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা ছাড়তে চাচ্ছে না। যাতে এ-ও হয় সে-ও হয়, এমন একটা ঝাপসা অবস্থান থাকে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

লেখাটা এর আগে গত ২৮ আগষ্ট দৈনিক নয়াদিগন্তে অনলাইনে (প্রিন্টে ২৯ আগষ্ট) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে আপডেট ভার্সান হিসাবে এখানে আবার ছাপা হল।

 

 

Advertisements

হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে

হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে
গৌতম দাস
০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬,রবিবার

http://wp.me/p1sCvy-1KF

ভারত রাষ্ট্রের ভিত্তি মূলত হিন্দুত্ব। এটা বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েরই অবস্থান; এটা তারা সঠিক মনে করেন, মেনে চলেন। বরং এর কোনো বিচ্যুতি ঘটছে মনে হলে একে অপরকে দোষারোপ করে। কেন করেন? কারণ তাদের মনে হয়, প্রায় ২৯টা ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন ধরনের ভিন্নতার মানুষের এত বিশাল জনসংখ্যার মানুষকে কী দিয়ে একত্রে ধরে রাখা হবে বা যাবে? তবে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা ও বাছবিচার ছাড়াই তাদের ধারণা ‘হিন্দুত্ব’ – এটাই সেই সুপার গ্লু যা তাদের সব আশঙ্কার সমাধান।

আসলেই কী রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে এমন একটা সুপার গ্লু – হিন্দুত্ত্বের বা কমন ধর্মীয়  ভিত্তি অথবা কমন ভাষার ভিত্তি  ইত্যাদি একটা না একটা ‘আইডেনটিটি’ এরকম একটা কিছু লাগেই? এমন ভাবনা থেকেই দুনিয়াতে আইডেনটিটির রাজনীতি শুরু হয়ে আছে। । ‘আইডেনটিটির রাজনীতি’ ছাড়া কী রাষ্ট্রগঠন অসম্ভব?  আমরা নিশ্চিত রাষ্ট্রচিন্তায় এদিকটা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করা হয় নাই। অথচ আবার এই হিন্দুত্ত্বের ভিত্তির ভারত রাষ্ট্রের মূল কারিগর কংগ্রেস ও অন্যান্য ‘প্রগতিশীলদের’ চোখে পাকিস্তান – ইসলামের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন করে খুব খারাপ কাজ করেছে বলে তাদের অভিযোগ। অথচ সারকথা করে বললে, বাংলা ভাষার ভিত্তিতে আইন্ডেন্টিটি পলিটিক্সের উপর রাষ্ট্র গড়ে তুললে সেটা ভাল বা আদর্শ, ধর্মের (হিন্দুত্ত্ব বা মুসলমানিত্বের ভিত্তিতে আইন্ডেন্টিটি পলিটিক্সের উপর রাষ্ট্র গড়ে তুললে সেটা খুব খারাপ বা অগ্রহণযোগ্য এটা বলা বা ভাববার সুযোগ নাই।

সে যাক, ভারতের প্রধান দুই সর্বভারতীয় দল দল কংগ্রেস ও বিজেপি এরা এ জায়গায় ঐকমত্য। অন্যদের মধ্যে ‘বাস্তববাদীতার দোহাই দেয়া’ সিপিএম সেও ঐ দুই দলের মতো করে ভাবে ও মান্য করে যে ধন্বন্তরি ওষুধ বা সুপার গ্লু-এর নাম হিন্দুত্ব। কিন্তু কোনো দল প্রকাশ্যে মানে ফরমালি তা স্বীকার করে না। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলে, স্বীকার করে যুক্তি দেয়। তবে বলা না বলা, সেটাঅন্য জিনিস। ফলে এখান থেকেই আরো দুই খান কথা বলে তাদের বিভক্তি শুরু হতে দেখি আমরা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিন্দুত্ব- কংগ্রেস ও বিজেপির এ ব্যাপারে একমত হয়ে এটা মেনে নেয়ার পরও প্রত্যক্ষভাবে হিন্দুত্ব ভিত্তির ভারত রাষ্ট্রের কথা বাইরে প্রকাশ বা স্বীকার করা ঠিক হবে কি না- এই প্রশ্নে কংগ্রেস ও বিজেপির ভিন্নতা শুরু। কংগ্রেস মনে করে, কৌশলী হওয়ার দরকার আছে। কথাটা সেকুলারিজমের ভেক ধরে বলতে হবে। বুঝতে বুঝাতে হবে হিন্দুত্ব কিন্তু মুখে বলতে হবে ‘সেকুলারিজম’। উপরে সেকুলারিজমের জামা গায়ে দিয়ে এর আড়ালে বসে মুখে সেকুলারিজম বললে হিন্দুত্বের এফেক্ট পাওয়া যাবে, আনা যাবে। এই হল কৌশল। এর বিপরীতে বিজেপি মনে করে, সেকুলারিজম- এটার আবার কী দরকার? হিন্দুত্বকে রাষ্ট্রভিত্তি হিসেবে মানতে পারলে বলতে পারব না কেন? বরং ‘বোকা’ হয়ে লাভ নেই। হিন্দুত্বের গর্বকে বুক উঁচা করে সামনে আনলে এই ‘আইডেন্টিটির রাজনীতি’ কংগ্রেসের ওপরে তাদেরকে একটা বাড়তি মাইলেজ দিবে। কারণ হিন্দু কনস্টিটুয়েন্সিতে এটা খুবই ফলদায়কভাবে মানুষের মনে সুড়সুড়ি লাগানোর ক্ষমতা রাখে। ভারতের সেকুলারিজম সত্যিই এমন এক তামাশার নাম।

২০১৪ সালের নির্বাচনে মোদির বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপির মূল দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের (আরএসএস)  গৃহীত ও নির্ধারিত এক কর্মসূচি ‘ঘর ওয়াপসি’ চালু করেছে। এমন কর্মসূচির পক্ষে লজিকটি হল, ভারতে হিন্দু ছাড়া অন্য ধর্মের যারাই আছে, তারা কোনো না কোনো সময়ে হিন্দু থেকেই ধর্মান্তরিত। অতএব, এই যুক্তিতে আরএসএস-বিজেপি তাদের ‘ওয়াপাস’- মানে ফিরিয়ে আনার প্রচার-প্রপাগান্ডার কর্মসূচি নিতে পারে, ফোর্স করতে পারে, বিজেপি সরকারের প্রটেকশনের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের হয়রানি করতে পারে, পাবলিক নুইসেন্স করতে পারে, সব পারে। আর এতে এক কামে সব কাম হবে। হিন্দুত্বের জয়জয়কার হবে, ভোটের বাক্সও ভরে উঠবে। বাড়তি লাভ হল কংগ্রেসও ভয়ে সিটিয়ে কেঁচো হয়ে থাকবে। কারণ এতে কংগ্রেসকে বিজেপি খুব সহজে উভয় সঙ্কটের ক্যাচালে ফেলতে পেরেছে। কংগ্রেস ভেবে ভীত যে, ‘ঘর ওয়াপসির’ বিরোধিতা করতে গেলে কংগ্রেসঈ হিন্দুরা হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সির প্রভাবে বিগড়ে গিয়ে যদি কংগ্রেসকে ভোট না দেয়! এই ভয়ে কিছু না বলে দলটি চুপ থাকে।
আসলে বিজেপি এ জায়গায় স্মার্ট ও ‘সৎ’। সে হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চায়, হিন্দুত্বের রাজনীতি করে এবং প্রকাশ্যে তা বলেও। আর স্মার্ট এ জন্য যে, সে বুঝে গেছে কংগ্রেসকে এভাবে উভয় সঙ্কটে ফেলে জব্দ করা সহজ। এর পরও মূল বিষয় এখানে কন্সটিটুয়েন্সি। কন্সটিটুয়েন্সি মানে- ভোটারদের ক্যাটেগরি বা গ্রুপ অথবা ভোটার এলাকা; যারা কোন কথা, কোন দাবি অথবা কোন ইস্যুর পক্ষের ভোটার- এক কথায় কোন ক্যাটেগরির ভোটদাতা, কোন ভোটারদের গ্রুপে একে ফেলা যায় এই অর্থে ‘ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি’। আগেই বলেছি- কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়েই একমত যে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র থাকুক এবং থাকতেই হবে। এর পক্ষে তাদের কমন যুক্তি হল, এটা না হলে ভারতকে এক রাখা, একভাবে ধরে রাখার আর কোনো উপাদান বা আঠা-গ্লু নেই। কারণ রাষ্ট্র বলতে তারা একমাত্র এই আইডেন্টিটি-ভিত্তিক রাষ্ট্রই কল্পনা করতে সক্ষম। অন্য কোনো রাষ্ট্র হওয়া আদৌ সম্ভব কি না নেহরুর জমানা থেকেই এই পর্যন্ত এটা নিয়ে তাদের হোমওয়ার্ক বা পড়াশোনা আছে বলে জানা যায় না। এর বাইরে তাদের কল্পনা আগায় না, ভোঁতা করে রেখে দেয়া থাকে, তাই কাজ করে না। বরং আইডেন্টিটি-ভিত্তিক হিন্দুত্ব চিন্তার সুড়সুড়ি জাগানোর ক্ষমতা সীমাহীন। তাই সেটার প্রতি লোভে সবার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। সারকথা দাঁড়াল ওপরের সেকুলার পর্দা সরিয়ে ফেললে কংগ্রেস ও বিজেপির ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি আসলে একই। আর এটাই হল সমস্যার গোড়া। কেন? কোন রাজ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে অথবা সাধারণভাবে বিজেপি যখন ‘ঘর ওয়াপসি’ ধরনের কর্মসূচি চালাতে নেমে পড়ে তখন কংগ্রেস এর কোনো বিরোধিতা করতে পারে না। কারণ ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচি তো ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণার’ সাথে সামঞ্জস্যের দিক থেকে সবচেয়ে পারফেক্ট। আসলে কংগ্রেস মনে করেছিল বা বলা ভাল, নিজের সেকুলারিজম স্ট্রাটেজিতে নিজেকে সাজিয়েছিল এই মনে করে যে, যেকোনো হিন্দু বিশেষত শিক্ষিত হিন্দু বুঝবে তার হিন্দুত্ব সেকুলারিজমের মোড়কে ‘ব্রান্ড করে’ প্রকাশ করাই সবচেয়ে লাভের। কারণ এতে সরাসরি হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিকে তো পাওয়াই যাবে। সেই সাথে সেকুলারিজমের জামা পরা ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি আর অহিন্দু (মুসলমান বা ক্রিশ্চানসহ সবটা) ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিকেও কাভার করা যাবে- কংগ্রেস অনেক আগে থেকেই এসব অনুমানের ওপর সাজানো দল। কিন্তু বিজেপির ঘর ‘ওয়াপসি কর্মসূচি’র সামনে কিছু বলতে না পারায়, মুখ বন্ধ রাখতে হওয়ায় কংগ্রেসের কাম্য, তিন ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিই কংগ্রেসের ওপর বেজার হচ্ছে। তারা কংগ্রেসকে অকেজো মনে করছে। কারণ এই তিনের প্রথমটা, সরাসরি হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি- এরা মনে করে কংগ্রেসের তুলনায় বিজেপিই ভালো ও সঠিক। সেকুলারিজমের জামা পরা ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিতে যারা পড়ে, এদের মধ্যে পশ্চিমা জীবনকে আদর্শ মানা আধুনিক ভোটাররা এমনিতেই গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, এরা নিজের ‘ক্লাস সচেতনতার’ কারণেও নিজেই আলাদা ও বিশেষ হয়ে থাকতে চায়। এরা ঘর ‘ওয়াপসি’র মতো কর্মসূচির সামনে নিজেই অসহায় মার্জিনালাইজড বোধ করে। আর তৃতীয়, অহিন্দু (মুসলমান বা ক্রিশ্চানসহ সবটা) ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি- ঘর ওয়াপসি দেখে এরা হতাশ হয়ে কংগ্রেসকেই অভিশাপ দিতে থাকে যে, কংগ্রেস ‘সেকুলারিজমে’ সিরিয়াস না। এবার  গত মে মাসে সদ্যসমাপ্ত আসামের নির্বাচনের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, হিন্দুত্বের ভোটাররা কংগ্রেস ছেড়ে কিভাবে বিজেপিমুখী হয়েছে।
তবে এর ব্যতিক্রম কী হতে পারে তা বোঝার জন্য কাছাকাছি সবচেয়ে ভালো উদাহরণ সম্ভবত মমতা বা তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস। বিশেষত ঐ একই সময় গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচনে তাঁর দলের বিশাল বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে। যদি খোজ করা হয় যে, ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণা’র প্রশ্নে মমতার অবস্থান কী? মমতা তত্ত্ব জানেন না, তত্ত্ব করেন না, তত্ত্বের বড়াইও তাঁর নেই। মমতাকে সম্ভবত মাঠ অথবা  ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট’ দেখার ভিত্তিতে চলা পপুলার রাজনীতিক বলা সঠিক হবে। ফলে তাকে বুঝতে হবে তার বাস্তব তৎপরতা দিয়ে। প্রথমত, তিনিই দেখালেন সেকুলারিজম নামের ছলনা না করেও প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিরও নেতা হওয়া সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গে মোট মুসলমান ভোটার মোট ভোটারের প্রায় ৩০%। ৩-৪% বাদ এরা সবাই আজ মমতার পিছনে। এমনকি মুসলীম লীগ অথবা সিপিএমে যারা মুসলমান নেতা ছিলেন তাঁরা গত নির্বাচনে মমতার দলের টিকিটে ভোটে দাড়িয়েছেন এবং জিতেছেন। তবু মমতা আজ পর্যন্ত কোথাও বলেননি যা তিনি করছেন তিনি সেটাকে সেকুলারিজম নাম দেয়ার কোনো ইচ্ছা করেন অথবা একাজকে সেকুলার বলে ডাকার দরকার আছে। গত রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন নিজ দল আবার বিজয়ী হয়েছে জানার পরে মিডিয়া মন্তব্যের কোথাও এই বিজয়কে তিনি সেকুলারিজমের জয় বলার দরকার মনে করেননি। বরং বলেছেন, বিজেপি হিন্দুত্বের কথা তুলে সব কিছুকে ভাগ-বিভক্ত করে এটা তার অপছন্দ। আবার বিগত ২০১৪ সালে বর্ধমানে কথিত জঙ্গি বোমা ইস্যুতে মুসলমানবিদ্বেষী ও তৃণমূল বিরোধী যে মিথ্যা জঙ্গী-আবহাওয়া তৈরি করা হয়েছিল, বিজেপির অমিত শাহ তা করেছিলেন আর লজ্জার মাথা খেয়ে কংগ্রেস ও সিপিএম এতে তাল দিয়ে নিজের রুটি সেঁকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় লাভ করেও ফলাফল প্রকাশের দিন তবুও তৃণমূল দল অথবা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি সংযত আচরণ করেছে। বলেনি যে, মুসলমানেরা ‘এবার দেখিয়ে দিয়েছে’। ‘বর্ধমান ঘটনার প্রতিশোধ নিয়েছে’- এ ধরনের কোন ইঙ্গিতও প্রকাশ করেনি। মমতার দল ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতি বছর ২১ জুলাই দলের ১২ কর্মী হত্যার বিরুদ্ধে ‘শহীদ দিবস’ পালন করে থাকে। এবারের ২১ জুলাই দলীয় কর্মসূচিতে জনসভায় দেয়া মমতার বক্তৃতাকে মিডিয়া শিরোনাম দিয়েছিল, ‘ছাগল মুরগি খেলে দোষ নেই। গরু খেলেই দোষ!”। ” কেউ নিরামিষ খান। তাই বলে যারা আমিষ খান, তাদের আক্রমণ করবেন?”। ” শাড়ি-ধুতিতে দোষ নেই। যত অপরাধ সালোয়ার-কামিজ আর লুঙ্গিতে?” এ ছাড়া নাম না ধরেই বিজেপির বিশেষায়িত দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক দলের (আরএসএস) সম্পর্কেও কথা বলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘ভারতবাসী কী পরবে, কী খাবে- সেগুলো ঠিক করে দেবে একদল লোক?”। এসব বক্তব্যের ভেতর দিয়ে ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণা’র বিরুদ্ধে মমতার আপত্তি বুঝে নেয়া যায়। তবে এটা মমতাকে আদর্শ বলে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে এমন মনে করলে ভুল হবে। মমতার রাজনৈতিক ঝোঁকের ভেতরে ‘রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে হতে হবে’ এমন চিন্তার বাইরে থাকার চেষ্টা আছে। এতটুকুই বলা হচ্ছে। তবে তা শেষে কোথায় যাবে তা এখনই বলতে চাওয়া ভুল হবে।
ইতোমধ্যে মোদির বিজেপি ‘ঘর ওয়াপাসির’ পরে – গরু খাওয়া, জবাই ইত্যাদি নিয়ে আরেক তুলকালাম ‘গোরক্ষা কর্মসূচি’ চালিয়ে যাচ্ছিল। এখনও পর্যন্ত গরু খাওয়া, জবাই করা যাবে না – এটা কেন্দ্র বা মোদি সরকারের কোনো আইন নয়। কেবল মহারাষ্ট্রসহ আরো কিছু রাজ্যের আইনে তা সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ এটা স্থানীয় আইন; বাকি আর রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য তা পালনীয় নয়। কিন্তু মোদি সরকার বা খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে তিনি বিএসএফকে ‘গোরক্ষার’ পক্ষে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন। যেসব রাজ্যে গোরক্ষার এমন আইন নেই, সেখানেও তা ঠেকাতে বিজেপি কর্মীরা মাঠে ‘গোরক্ষক’ সেজে নেমে জনগণকে নাজেহাল করছে। মধ্যপ্রদেশে দুই মহিলাকে তারা মাংস বহন করছিলেন এই অজুহাতে পুলিশের সামনেই তাদেরকে নির্যাতন-নাজেহাল করেছে। দিল্লির শহরতলির ভেতর চলাচলকারী ট্রেনে এমনকি ডিম – তা হাতে নিয়ে কোনো যাত্রী তা বহন করতে পারবেন কি না এটাও এখন ট্রেন কোম্পানি ও পুলিশের কাছে ইস্যু। তারা নজরদরি বসিয়েছে। অথচ ভারতের কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশন অথবা উচ্চ আদালতে এসব হিন্দুত্বের দলের বিরুদ্ধে তাদের সেক্টোরিয়ান আচরণ এবং সম্প্রদায়গত বিভেদ বিদ্বেষ ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে েকশন নিবার সুযোগ আছে তা করছে না, কেউ সেখানে অভিযোগ করারও সাহস দেখাচ্ছে না। মানে হিন্দুত্বভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র এতই সেকুলার যে, অভিযোগ করার কাউকে আমরা দেখি না। উলটা দিকে বিজেপিকে থামানোর কেউ নেই। এটা প্রমাণ করে ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি কত বেপরোয়া ও ডমিনেটিং। তাহলে?

হঠাৎ গত ৬ আগস্ট থেকে কিছু উল্টা হাওয়া বইতে দেখা গেছে। খোদ নরেন্দ্র মোদি এ দিন নিজেই নিজের দলীয় ‘গোরক্ষকের’ বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাদেরকে ‘সমাজবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘এরা বেআইনি কাজকারবারে জড়িত!’ “নিজেদের ‘কালো ধান্ধা’ ধামাচাপা দিতেই গোরক্ষকের মুখোশ পরে নতুন ব্যবসা শুরু করেছে।” মোদির কথায়, ‘এসব দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হয়।’ — অবাক করা হঠাৎ এই গেম চেঞ্জ? এটা কেন? ভারতের মিডিয়া আসন্ন উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনকে এর পেছনের কারণ বলে ব্যাখ্যা করছে। ওখানে ভারতের প্রকট জাতবর্ণের বিভক্তিতে ডুবে থাকা সমাজের দলিত- চর্মকার, ঋষি, কসাই, মাংস ব্যবসায়ী, গরু ব্যবসায়ী ইত্যাদিরা হল উত্তর প্রদেশের এক বড় সমাজ; আসন্ন ভোটে তাদের মন পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদের ভোট ছাড়া নির্বাচন বৈতরণী পার হওয়া যাবে না টের পেয়েই নাকি মোদীর এমন হার্ট বদল। উত্তর প্রদেশ রাজ্যের জনবিন্যাস ও গঠনপ্রকৃতির দিক থেকে (জাতপাতের ধরনসহ) সাথে লাগোয়া বিহার রাজ্যের অনেক মিল। আর গত বছরের শেষে নভেম্বর ২০১৫, বিহারের নির্বাচনের সময়ও একই ভাবে ‘গোরক্ষা’ ইস্যু বিজেপি তুলেছিল ও চলছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটে। বিগত ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় ধসের পরাজয় সেটা। ফলে সেই  আশঙ্কা মোদিকে স্পর্শ করেছে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই নির্বাচনে ভোট-রাজনীতিতে ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তিকে স্থায়ীভাবে না হলেও সাময়িকভা্েব দুর্বল কতে নির্বাচন করতে চাইছে বিজেপি। তবে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বিজেপির হার-জিত ভারতে বিজেপি শাসনের ভবিষ্যৎ নির্ধারক উপাদান হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকেই বলছেন, উত্তর প্রদেশের হার মোদির সরকারের আগামীতে ২০১৯ সালে পরেরবার সরকারে না আসার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখা এর আগে গত ১৪ আগষ্ট ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১৫ আগষ্ট প্রিন্টে) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্তন সংযোজন ও এডিট করে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]