হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা

হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা
গৌতম দাস
১২ সেপ্টেম্বর  ২০১৬, সোমবার ০০ঃ০১

http://wp.me/p1sCvy-1R1

ভারতের জন্মের শুরু থেকেই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে বিস্তর চড়াই-উতরাই আছে। কখনো তা চরম তুঙ্গে, আবার কখনো তুলনামূলক শীতল। কিন্তু এবারের চরম অবস্থা নিজগুণেই যেন তুলনাহীন। টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৭ আগস্ট কাশ্মীর নিয়ে রিপোর্টে জানাচ্ছে, কাশ্মিরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া চলমান কারফিউ ২৭ আগস্টে পঞ্চাশতম দিন পূর্ণ করেছে। কিন্তু পুরা ঘটনার বেজ-ফ্যাক্টস মানে, কী থেকে ঘটনা স্ফুলিঙ্গে রূপ নিল সেটা কী? সেটা ভারত সরকারের ভাষায় বলা যাক। ভারতের এনডিটিভির খবর অনুবাদ করে আমাদের বাংলা ট্রিবিউন কী ছেপেছে সেটা দেখে নেয়া যেতে পারে।  সেই ভাষ্যটা হল,  হিজবুল মুজাহিদিন নামে ‘সন্ত্রাসবাদী’ সংগঠনের নেতা বুরহান ওয়ানী গত ৯ জুলাই ২০১৬ ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। তার ওই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়া রাজনৈতিক গণ-অসন্তোষ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত কারফিউ অমান্য করেছিল জনগণ এবং জানাজায় অংশ নেয়া থেকে অসন্তোষ ও এর তীব্রতা শুরু। আর তা এবার ৫০ দিন পূর্ণ করল। ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শব্দটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত দিয়ে তৈরি। এই শব্দ দিয়ে আমরা অনেক কিছু ঘটনা বুঝে ফেলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই আমাদের পরিচিত এই বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে ব্যাপারটা বুঝানো হল। যদিও টাইমস অব ইন্ডিয়া সুনির্দিষ্ট করে ‘এনকাউন্টার’ শব্দ ব্যবহার করেছে। এটা ভারতীয় গণমাধ্যমের শব্দ। অপর দিকে যে শহরে ৫০ দিন টানা কারফিউ দিয়ে রাখতে হয়, সেখানকার জনজীবনের অবস্থা কী, মানুষের আয়-ইনকাম দিন এনে খায়, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সরকার সবসময় যথেচ্ছাচার বলপ্রয়োগে দাবড়ে সমাধান করে এসেছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। কিন্তু এবার বুরহান এনকাউন্টারের পরের পরিস্থিতি যে এমন অগ্নিরূপ ধারণ করবে, কারফিউ দিলেও যে তা ভেঙ্গে মানুষ বুরহানের জানাজায় অংশগ্রহণ করে বসবে এগুলো তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। কাশ্মীরের রাজ্য সরকারে উপরে কেন্দ্রের নিরাপত্তা বাহিনীর রুস্তমি চলে থাকে। এজন্য আইনগত ভাবেই সামরিক বাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া আছে। বিগত ১৯৫৮ সালের এক আইনে (ওটা প্রথম আইন আসামের নাগাদের জন্য ছিল। পরে ঐ আইনের আদলে ১৯৯০ সালে বিশেষ করে কাশ্মীরের জন্য এক আইন প্রনয়ন করা হয়) যার নাম Armed Forces (Special Powers) Acts (AFSPA)। ফলে বলা যায় এই বাহিনীই এই প্রথম কার্যত পর্যদুস্ত হয়েছে। কলকাতার আনন্দবাজার এই বিষয়ে একটা রিপোর্ট লিখেছে যার শিরোনাম, “কোন পথে উপত্যকায় শান্তি আসতে পারে, হাতড়ে বেড়াচ্ছে নয়াদিল্লি”।  যেখানে ভারতের গোয়েন্দা-নিরাপত্তা মহলের হারু ও পর্যদুস্ত মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। আনন্দবাজার সেখানে লিখছে,  “প্রাথমিক ভাবে পরিস্থিতি সামলাতে না পারার জন্য গোয়েন্দা ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছে কেন্দ্র। এক জন জঙ্গির মৃত্যুর প্রতিবাদে কাশ্মীরে যে এত বড় মাপের অশান্তি হতে পারে, সে বিষয়ে কোনও ধারণাই ছিল না গোয়েন্দাদের। এমনকী দিল্লিতে বসে শীর্ষ গোয়েন্দাকর্তারা দাবি করেছিলেন,বিক্ষোভ সাময়িক। দশ দিনেই থেমে যাবে। তা যে কবে থামবে,সে ধারণাও নেই কারও! উপত্যকার অশান্তি সেটাই!”।খুব সহজে কাতর হন না এমন ভারতীয় বুদ্ধিজীবীর গায়েও আঁচ লেগেছে। আর চুপ থাকা যায়নি এবং আনন্দবাজারের রিপোর্ট তা ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বলা যায়। এসব পরিমাপের দিক থেকে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও কাশ্মিরের এবারের ঘটনায় আর চুপ থাকতে পারেননি। আনন্দবাজারের ভাষ্যটাই তুলে আনছি, এক টিভি সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য সেন বলেছেন,

“সরকার এতটাই খারাপভাবে কাশ্মির-পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে যে এটাকে ভারতীয় গণতন্ত্রের ওপরে সবচেয়ে বড় দাগ হিসেবেই দেখছে গোটা বিশ্ব”। চার দিক থেকে সবাই বিষয়টিকে সরকারের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে নাড়াচাড়ার ত্রুটি হিসেবেই দেখছে তাতে সন্দেহ নেই। সেটা এখানে তুলে ধরতে একটু বড় এক উদ্ধৃতি আনন্দবাজার থেকে আনছি। লিখেছে “সমালোচনা হচ্ছিলই। কাশ্মিরের উত্তপ্ত পরিস্থিতির জন্য মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দুষছিল মোদি সরকারকে। আরএসএস নেতাদের একাংশও মনে করছেন, কাশ্মিরের পরিস্থিতি ঠিকভাবে সামলানো হচ্ছে না। কিন্তু নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও এভাবে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে মুখর হওয়ায় চাপ আরো বাড়ল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার সরকারের ওপরে। কাশ্মিরিদের মধ্যে যে দেশের বাকি অংশ সম্পর্কে নানা রকম মত রয়েছে, সে কথাও অবশ্য উল্লেখ করেছেন অমর্ত্য। কিন্তু সেই বাস্তবতার নিরিখেও সরকার যে ভূমিকা নিচ্ছে, অমর্ত্যরে মতে সেটা বড় রকমের ভুল। এই সূত্রে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, কাশ্মিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা জরুরি। তবে সেটাই কাশ্মিরিদের মূল সমস্যা বলে ধরে নেয়াটা ভুল। …অমর্ত্য সেনের এই সমালোচনার জবাবে সরকারের তরফে কেউ মুখ খোলেননি তাৎক্ষণিকভাবে। এবং ভূস্বর্গে অব্যাহতই রয়েছে অশান্তি। দক্ষিণ কারের কাজিগুন্দে নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে গুরুতর জখম আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে আজ। এই নিয়ে ১১ দিনে উপত্যকায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে হলো ৪৪। তবে গুলি চালনার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী।”

আনন্দবাজারের এই রিপোর্ট গত ২০ জুলাইয়ের। ফলে নিহতের সংখ্যা এটা সর্বশেষ সংখ্যা নয়। কারফিউর ৫০তম দিনে মৃতের মোট সংখ্যা ছিল ৬৯ জন।
এক কথায় বললে মোদি সরকার এবারের কাশ্মির ইস্যুটি নিয়ে বড়ই পেরেশান আর বেকায়দায় আছে। বেকায়দায় পড়লে মানুষ আরো উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে। এখানেও তাই হয়েছে। আর সেটাই এখানে  আমাদের এই রচনার মুল প্রসঙ্গ।

তবে ঘটনাস্থল এবার ঠিক কাশ্মীর নয়। কাশ্মীর থেকে ব্যাঙ্গালোরে, যদিও ইস্যু সেই একই কাশ্মীর। ব্যাঙ্গালোরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের’ (এআই) শাখা অফিস কাশ্মিরে মানবাধিকার ইস্যুতে এক সেমিনারের আয়োজন করেছিল।
কিন্তু বিজেপির ছাত্রসংগঠন ‘অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের’ (এভিবিপি) অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে যে, তাদের আয়োজিত ঐ কাশ্মির বিষয়ক সেমিনারে ভারতের বিরুদ্ধে ও ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে লাগাতার স্লোগান দেয়া হয়েছে। তাই অ্যামনেস্টি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে এর পরের দু-তিন দিন ধরেই ব্যাঙ্গালুরুতে তীব্র বিক্ষোভ দেখাচ্ছে বিজেপির ছাত্র শাখা। যদিও জবাবে অ্যামনেস্টি দাবি করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনার কোনো ভিত্তিই থাকতে পারে না।
ঘটনার সূত্রপাত সেমিনারের একজন বক্তা, কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিত নেতা আর কে মাট্টু দাবি করেছিলেন “ভারতীয় সেনার মতো সুশৃঙ্খল বাহিনী দুনিয়াতে কমই আছে”। এই তথ্যগুলো নিয়েছি ভারতীয় বিবিসির ১৬ আগস্টের এক রিপোর্ট থেকে। ব্যাঙ্গালুরুতে ঐ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছিল এর আগের শনিবার, মানে ১৩ আগস্ট। ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন কিছু কাশ্মীরি ছাত্র, যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র হিসেবে ব্যাঙ্গালুরুতে বসবাস করেন। ফলে হিন্দু পণ্ডিত নেতা মাট্টুর ওই বক্তব্যের পর সভায় উপস্থিত কাশ্মীরি যুবকেরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন, তাঁরা কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে স্লোগান দিতে শুরু করেন। আসলে ঐ সভায় হিন্দু নেতা আর কে মাট্টুসহ কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের উপস্থিতিও গণ্ডগোল লাগানোর দিক থেকে পরিকল্পিত বলা যায়। দাওয়াতি না হয়েও তারা গণ্ডগোল পাকানোর উদ্দেশ্যে সভায় শুরুতে দলবেঁধে ওই সভায় প্রবেশ করেন। এরপর উসকানিমূলকভাবে কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর তৎপরতার পক্ষে উগ্র ও কড়া সাফাই বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলেছিলেন। পরিকল্পিতভাবে অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করে দিয়েছিল তারা।
কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের পর ঘটনা পরিকল্পনায় মঞ্চে হাজির হয় এভিবিপি। পরের দিন গুলোতে  বিজেপির ছাত্র শাখা এভিবিপি, তারা ঐ অনুষ্ঠানে স্লোগানের ভিডিও প্রচার করে এবং শহরে অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে মিছিল করে জনমত খেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছিল। একপর্যায়ে তাঁরা ব্যাঙ্গালুরু অ্যামনেস্টির অফিসে হামলা করেছিল। পরে পুলিশ উপস্থিত হলে পুলিশের ওপর উলটা চাপ সৃষ্টি করে অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা’ করে।
এ বিষয়ে বিবিসি তাদের রিপোর্টে লিখেছে, অনেকটা তাদের চাপের মুখেই ব্যাঙ্গালুরুর পুলিশ ‘অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার’ বিরুদ্ধে দেশদ্রোহসহ আরো নানা অভিযোগে এফআইআর দাখিল করে। এ ছাড়া বিবিসি আরো লিখেছে, বিদ্যার্থী পরিষদের নেতা সাকেত বহুগুনা বলছেন, “অ্যামনেস্টি ও তাদের মতো আরো কিছু এনজিও বারবার এটাই বলে চলেছে কাশ্মিরে সব সমস্যার মূলে আছে ভারতীয় সেনা। তারা এমন একটা ন্যারেটিভ তৈরি করতে চাইছে যে, কাশ্মিরের মুসলিমরা সেনাদের হাতে নির্যাতিত। তাদের অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে, এখন বলুন কোন দেশ এটা সহ্য করবে যে, তাদেরই একটা অংশকে আলাদা করে ফেলতে প্রকাশ্যে উসকানি দেয়া হচ্ছে?’।
কাশ্মির ইস্যুতে সাধারণভাবে বিজেপির অবস্থান হল, যেভাবে সাকেত বহুগুনার বক্তব্যে দেখা গেছে, মোটা দাগে সেটাই। কাশ্মিরের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ উঠলেই সেটাকে তারা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ’ বলে অভিযোগ আনে। সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে তারা জনমনে জায়গা করে নিতে চেষ্টা করে থাকে।
উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগিরে অনেকে বিভ্রান্ত হতে পারেন যে কাশ্মিরের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ উঠালে তা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ’ হতেও পারে। কিন্তু না, এটা রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ নয়। এটা আমার কথা নয়, এ নিয়ে বহু রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার বক্তব্য ও ঐ ধরণের বহু মামলায় বেকসুর খালাসের রায় আছে। আশির দশকে পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট প্রথম এমন রায় দিয়েছিলেন। যা পরে অন্যান্য অনেক ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলা হিসেবে কোর্টের সামনে আনা হয়েছিল। এখানে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার সীমা টেনে দেয়া লাইন হচ্ছে, ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের স্লোগান – সেটা কাশ্মিরের স্বাধীনতা চাই অথবা পাঞ্জাবের স্বাধীনতা চাই; যা-ই তোলা হোক এগুলো ‘রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ’ ঘটে এমন কাজ নয়। স্বাধীনতার দাবি করে স্লোগান দিলে তা রাষ্ট্রদ্রোহ হবে না। তা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অথবা সেনাবাহিনী যার বিরুদ্ধেই স্লোগান হোক না কেন। তবে একমাত্র কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে স্লোগান দিলে বা সশস্ত্র সাংগঠনিক তৎপরতা চালালে বা সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন চালালে তা অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহ হবে।
বিজেপি এই রায়ের কথা জানে। তবুও সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের মোড়কে হাজির করে আবেগ থেকে ফায়দা নিতে চাওয়া তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কৌশল। তারা বলছে, ‘কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে। এখন বলুন, কোন দেশ এটা সহ্য করবে?’ – হ্যাঁ, ভারত রাষ্ট্রই এটা সহ্য করবে, নিরস্ত্র হলেই করবে। করতে হবে এটাই সুপ্রিম কোর্টের রায়। সেনাবাহিনী অন্যায় করলেও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যাবে, যদি তা নিরস্ত্র হয় এবং তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে না।

ওদিকে ব্যাঙ্গালুরুর ঘটনার আরেক তামাশার দিক আছে। কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালুরু (পুরানা নাম ব্যাঙ্গালোর)। এর রাজ্য সরকার বা প্রাদেশিক সরকার হল কংগ্রেস দলের ফলে এর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেসি। বিবিসি তাদের ওই রিপোর্টে বলছে, “কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া আবার যুক্তি দিচ্ছেন, একটা সভায় দেশবিরোধী স্লোগান ওঠার পরও সরকার হাত গুটিয়ে থাকতে পারে না। তাই বিষয়টি নিয়ে তার পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে”। অর্থাৎ একজন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী তিনিও বিজেপির রাজনীতি অনুসরণ করে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন, পছন্দ করছেন। কেন? তিনি তো বিজেপি করেন না, কংগ্রেস দল করেন ও সেই দলের মুখ্যমন্ত্রী! তাতে কী? তিনিও বিজেপির সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে জনমনে বিভ্রান্তি জাগানোর বিরুদ্ধে দাড়াতে, সত্য বলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ বিজেপি হিন্দুত্বের জিগিরের এমনই এক আবহাওয়া তৈরি করে ফেলেছে। ফলে তিনি কিছুতেই ঐ  হিন্দুত্বের সেন্টিমেন্টের জোয়ারের সামনে দাড়াতে চাচ্ছেন না, এতে তিনি অজনপ্রিয় হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ হিন্দুত্বের সেন্টিমেন্টের জোয়ার তুলে এর সামনে ভয় দেখিয়ে কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রীকেও বিজেপির রাজনীতি করতে বাধ্য করেছে বিজেপি। অথচ সব দলই জানে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা বা অভিযোগ কোনো হাইকোর্ট আমল করবেন না, বেকসুর খালাস দিয়ে দেবেন। কিছু দিন আগে দিল্লীতে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা কাহানাইয়ার মামলাতেই একই ঘটনা হয়েছিল। মামলা চলে নাই। কাহানাইয়া এখন মুক্ত কিন্তু কয়েক মাস তাকে জেলে থাকা সহ বিশাল হয়রানী পোহাইতেই হয়। অর্থাৎ আদালত পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে মানুষকে হয়রানি করার সুযোগ নিতে, হয়রানির রাজনীতি করতে কংগ্রেস বিজেপির থেকে প্রতিযোগিতায় পেছনে পড়ে থাকতে চায় না। এই হলো হিন্দুত্বের রাজনীতি, এই তার মহিমা।
হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা এতই যে, বিবিসি লিখেছে, ‘কর্ণাটকের রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দিলেও দিল্লিতে দলের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি বলছেন, “একটা প্রতিষ্ঠানকে এভাবে কাঠগড়ায় তোলা যায় কি না তা নিয়ে তার সন্দেহ আছে”।
মি. সিংভির বক্তব্য, ‘ভারতবিরোধী ভাবাবেগে উসকানি দেয়ার জন্য একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর হতেই পারে, কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা বোধ হয় সমীচীন নয়।’ ‘কোনো ব্যক্তি হয়তো তার বাকস্বাধীনতার সীমা ছাড়িয়ে গেছেন, কিন্তু তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটা সংস্থাকে এভাবে অভিযুক্ত করা ভুল বলেই আমার ধারণা।’ অর্থাৎ কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি জানেন বুঝেন নিজেই এটাকে ‘ভারতবিরোধী ভাবাবেগে উসকানি’ দিয়ে নাচা বলছেন। এর পরও হিন্দুত্বের রাজনীতি করার লোভ না ছেড়ে বরং চিকনে মেরে ‘কর্ণাটকের রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই’ বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা ছাড়তে চাচ্ছে না। যাতে এ-ও হয় সে-ও হয়, এমন একটা ঝাপসা অবস্থান থাকে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

লেখাটা এর আগে গত ২৮ আগষ্ট দৈনিক নয়াদিগন্তে অনলাইনে (প্রিন্টে ২৯ আগষ্ট) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে আপডেট ভার্সান হিসাবে এখানে আবার ছাপা হল।

 

 

Advertisements