ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ ফিরানোর খোয়াব

ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ সাদা শ্রেষ্ঠত্বফিরানোর খোয়াব

গৌতম দাস

১৮ মার্চ ২০১৯, সোমবার ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yu

The judge ruled images of the suspect in court must blur his face. Photo: Mark Mitchell-Pool/Getty Images,  from this link.

প্রায় লাগোয়া দুইটা দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশ নিউজিল্যান্ড। এর উত্তরের দ্বীপে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী শহর ওয়েলিংটন আর দক্ষিণের দ্বীপের সবচেয়ে বড় শহর ক্রাইস্টচার্চ [Christchurch]। এবার ১৫ মার্চ ২০১৯, সেই ক্রাইস্টচার্চ উঠে আসে বিশ্বজুড়ে মিডিয়া শিরোনামে – “মসজিদে বন্দুকধারীর হামলা”। শহরের মধ্যে গাড়ী চালিয়ে আসতে ১০ মিনিট লাগে এমন দুরত্বে দুটো মসজিদ আছে – আল নুর [Al Noor Mosque] আর লিনউড [Linwood mosque] মসজিদ। সেখানে শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় একের পরে অন্যটায় পরপর, হামলাকারী মারাত্মক ও বড় ধরণের সন্ত্রাসী হামলা চালায়।  মিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীর নাম ‘ব্রেনটন ট্যারান্ট’ [Brenton Tarrant]। সে মূলত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। তবে প্রায়ই পাশের নিউজিল্যান্ডে আসেন। চিন্তার দিক থেকে “খ্রিষ্টান এবং ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা চামড়ার লোকদের কথিত শ্রেষ্ঠত্বে” বিশ্বাসী। অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে ব্রেনটনের পরিচয় হল – ২৮ বছর বয়সী এই সাদাচামড়ার পুরুষ স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া পরিবারের [28-year-old white male from a low-income, working-class family]। আর সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলায় বেপরোয়া গুলিবর্ষণে ৪৯ জন ইতোমধ্যেই মৃত, আরো প্রায় ২০ জন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরার সামনে মিডিয়ায় বলছেন, ‘এটা খুবই পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা’ [“well-planned terrorist attack”]।

Jacinda Ardern, prime minister of New Zealand, described the shootings as a “well-planned terrorist attack”, and said this is one of the country’s “darkest days”..

অর্থাৎ আমরা দেখলাম তিনি এখানে “মুসলমানেরাই ভিকটিম” বলে এটাকে ‘টেররিজম’ বলবেন কি না এমন দ্বিধা দেখাননি। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এটাকে “সন্ত্রাসী হামলা’ [extremist terrorist attack] বলে নিন্দা জানিয়েছেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিবৃতিতে এটাকে “টেররিজম” বলা হয়েছে। এমনকি ভারতের বিদেশমন্ত্রী বা কানাডার সরকারও। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এটাকে “খুবই পরিকল্পিত” [well-planned] বলছেন কেন? আর একটা বিশেষ দিক হল, এই হামলার পুরো সময় ১৭ থেকে ২০ মিনিটের; যার ১৭ মিনিটেরই লাইভ শো ফেসবুকে অন-লাইনে দেখানো হয়েছে। আর তা এমন ভয়ডর-পরোয়াহীন তাণ্ডব যে, রাইফেলের মাথায় বসানো ক্যামেরা থেকে নেয়া অনলাইন লাইভ ছবি নামাজ পড়তে আসা অসহায় মুসল্লিদের প্রতি গুলি ছোড়ার লাইভ ছবি – সাথে সাথেই ফেসবুকে প্রচারিত হচ্ছিল। এ ছবিগুলো যে লাইভ সম্প্রচার হচ্ছিল তা এএফপি নিজেরা পরীক্ষা করে আমাদের নিশ্চিত করে [AFP determined the video was genuine] এই রিপোর্ট ছেপেছে।

হামলাকারী কে বা কারা? তাদের রাজনৈতিক বা চিন্তাগত পরিচয় কী? পুলিশ বলছে, হামলাকারীরা মোট চারজন, যার তিনজনই সম্ভাব্য সহযোগী। আর চতুর্থজন যে দৃশ্যমান হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্ট তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে হামলার পরই এবং মানুষ হত্যার মামলায় অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। অন্যদের নিয়ে তদন্ত চলছে। গত ২০১১ সালে প্রায় একই ধরনের ঘটনায় নরওয়েতে ৭৭ জন মানুষ হত্যা করেছিল এন্ডার্স ব্রেইভিক [Anders Breivik]। হামলাকারী ব্রেনটনের পছন্দের ব্যক্তিত্ব যারা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন বলে জানিয়েছে, এমন দুই ব্যক্তির একজন হলেন এই ব্রেইভিক আর অন্যজন হলেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ব্রেনটন এই দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের চিন্তা ও কাজের প্রশংসা করেছেন। অনুমান করা যায়, এর মূল কারণ এরা দু’জনই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট [white supremacist] চিন্তা ধারণ করেন।

White Supremacist কারা?
“দুনিয়ায় সাদাচামড়ার লোকেদের শাসন-কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে কারণ সেটা ছিল তাদের শ্রেষ্ঠ যুগ” – এই বক্তব্য বিশ্বাসে চলা পাশ্চাত্বের রাজনৈতিক-সামাজিক গ্রুপ এরা।  মূলত এরা ইনসাফ বা ন্যায়-অন্যায় মুল্যবোধ থেকে বিচার করে পথ চলে না, এমনই মানুষ। “আমি আর এক মানুষের সহায়-সম্পত্তি বা ওর পুরা দেশটাই দখল করে নিব – কারণ আমি সুপার – আমি ক্ষমতাবান, বলশালী” – এই সাফাই বয়ানের উপর দাঁড়ানো এসব হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। তারা বলতে চায় পশ্চিমের সাদা চামড়ার লোকেরা আমরা এটাই করে এসেছি, কলোনি দখল করেছি, দুনিয়া লুটে শাসন করেছি, দাবড়ায় রেখেছি – কাজেই আমরা শ্রেষ্ট। তাই আবার “সেদিন” ফেরত আনতে হবে। তাদের মুল বক্তব্য এটাই।  এক ধরণের ‘সাদাদের ক্ষমতা’ বা হোয়াইট পাওয়ারের [White Power] পুজারি তাঁরা।
এছাড়া এরা দাবি করে তারা মাইগ্রেন্টবিরোধী। মানে গরিব দেশ থেকে মানুষের (যুদ্ধের শরণার্থী হওয়াসহ) নানা কারণে পশ্চিমের দেশে বসবাস করতে আসাকে (ইকোনমিক মাইগ্রেন্ট) অনুমোদন দেয়ার এরা তীব্র বিরোধী।
কোন তথ্য-উপাত্তে প্রমাণ না থাকলেও এরা প্রচার প্রপাগান্ডা করতে ভালবাসেন যে মাইগ্রেন্টরা “নোংরা”, এরা তাদের শহর নোংরা করে থাকে আর শহরে সব অপরাধের জন্য দায়ী হল এই মাইগ্রেন্টরা। এককথায় যারা তাদের মত নয় এমন “অপর” [other] যেকোন মানুষই নিকৃষ্ট, খারাপ। তাদের আচার আচরণ কালচার সব খারাপ। শুধু তাই না।  এখানে  হোয়াইট-সুপ্রিমিস্টদের পরিচয়ের আর এক অর্থ আছে। তারা বিশ্বাস করে সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠিরা ছাড়া বাকি অন্যেরা বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। আর তাতে কোন সাদা চামড়ার দেশে এরা সহজেই তাদের ছাড়িয়ে জনসংখ্যায় বেশি হয়ে যায়। (মুসলমানদের সম্পর্কে ভারতের মোদীর বিজেপি-আরএসএস সংগঠন ও তাদের কর্মীদের বিশ্বাস ও ভাষ্যও প্রায় একই রকম মিল দেখতে পাওয়া যায়।) তাই, সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠি ছাড়া এমন “অপর” লোকেদেরকে বুঝাতে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা একটা শব্দ ব্যবহার করে থাকে – “ইনভেডর” [invader] – মানে অনুপ্রবেশকারি-দখলদার। হামলাকারি ব্রেনটন ও তাঁর বন্ধুরা কথিত অনুপ্রবেশকারিদেরকে হত্যা করা তাদের টার্গেট ও একাজ জায়েজ মনে করে থাকে। যদিও এরা সাধারণভাবে “ইনভেডর” বলে ডাকে কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তারা ইনভেডর বলতে মূলত কেবল মুসলমান জনগোষ্ঠিকেই বুঝিয়েছে। অনেকটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর  মত। আমরা মনে রাখতে পারি, তিনি ও তাঁর দল বাংলাদেশ থেকে ভারতে কথিত মাইগ্রেন্টদের “মুসলমান” এবং কখনো ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা “তেলাপোকা” ইত্যাদি মানুষের জন্য অমর্যাদাকর শব্দ ব্যবহার করে থাকেন।

হামলাকারি ব্রেনটন সম্পর্কে উপরের এতকিছু তথ্য জানার উপায় বা উতস কী? হামলা ঘটে যাবার পরে ব্রেনটন সম্পর্কে খোঁজ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং এএফপি [AFP] আমাদের জানাচ্ছে যে, এক মাস ধরে ফেসবুক ও টুইটারে ব্রেন্টন একটা গ্রুপ হিসেবে প্রকাশ্যেই সক্রিয় ছিল। [The Twitter profile had 63 tweets, 218 followers and was created last month.] ‘যে কেউ’ বা এনোনিমাস হিসেবে তারা একটা গ্রুপ চালিয়ে গেছে, যে গ্রুপের নাম ‘8chan’ ফোরাম [Politically Incorrect” forum on 8chan, a online discussion site ]। এই গ্রুপ যে খুলেছে, তার নাম হিসেবে দেখা যাচ্ছে, হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের নাম। একই ‘মালিক’ হিসেবে একই নামে এক টুইটার অ্যাকাউন্টও [@brentontarrant] আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই হামলার পুরো বর্ণনা এখান থেকেই প্রচারে দেয়া হয়েছে। কেন এই হামলা তা বিস্তারে বর্ণনা করতে তাদের ‘ম্যানিফেস্টো’ বলে ৭৪ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট এই সাইট থেকে নামিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঐ ডকুমেন্টের শিরোনাম হল- ‘The Great Replacement’ বলা হয়েছে, এই ম্যানিফেস্টো লিখতে প্রণোদনাদাতাদের নাম হল ‘হোয়াইট জেনোসাইড’। মানে এরা নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে ডাকছে। সাধারণত ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা’ নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে থাকে। এ ছাড়া, নিজেদের বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধী এবং সংশ্লিষ্ট আরও কিছু শব্দ ও ধারণা যেমন, ডাইভারসিটি (Diversity বা বহুমুখিতা) বা মাল্টিকালচারিজমের [Multi-culturalism বা সাংস্কৃতিক বহুমুখিতা] এসবের ঘোরতর বিরোধী বলে দাবি করে থাকে।

ডাইভারসিটি বা মাল্টিকালচারিজম ধারণার এখানে সারকথা হলটা – অনেক ধরণের দেশের ভুগোল ও সংস্কৃতির মানুষের একসাথে এক শহরে এই রাষ্ট্রে এসে বসবাস করা – একই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর ‘বৈষম্যহীন’ এক “নাগরিক সাম্য” বৈশিষ্ঠের কনষ্টিটিউশনের অধীনে।

এনিয়ে ইউরোপের তর্কবিতর্কের উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটেন রাষ্ট্রনীতি হিসেবে ‘মাল্টিকালচারিজম’ মেনে চলা তাদের জন্য সঠিক নীতি বলে মনে করে থাকে। কিন্তু ফ্রান্স ঘোষিতভাবেই মাল্টিকালচারিজম অপছন্দ করে থাকে। এর বদলে তাদের পছন্দ হল ‘এসিমিলিয়েশন’[assimilation] নীতি। যার বাংলা ও খুলে বলা অর্থ হল – ইংরেজি assimilate (বাংলায় সব-একই-ধরণ বা এককরণ করা) থেকে এসিমিলিয়েশন। এই এসিমিলিয়েশন শব্দের মূল বিষয়টা হল, ইউরোপের ব্রিটিশ-ফরাসিসহ সব কলোনি-দখলদারেরা আমাদের মত দেশকে এককালে কলোনি বানিয়ে, দখল করে লুটতে গিয়েছিল। পরবর্তিতে সেই সূত্রে আবার সস্তা শ্রম পাওয়ার লোভে তারা আমাদেরকে (কালো চামড়ার নেটিভদেরকে) কালক্রমে নিজ নিজ ইউরোপীয় দেশেও নিয়ে গিয়েছিল। “নেটিভরা” একসময়ে কলোনি মালিকের দেশেই তারা স্থায়ীভাবে পরিবারসহ  নাগরিক হিসাবে বসবাসও শুরু করেছিল। কারণ যেমন কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়াকে কার্যত মূল বৃটিশ ভুমিরই এক্সটেনশন মনে করা হত। কিন্তু একালে এসে ইউরোপের অর্থনীতি ঢলে পড়াতে ব্যবসা বানিজ্যের ভাটায় স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে এই নেটিভরাই তখন চক্ষুশুল হয়ে গেলে যা হয়, তাই। কলোনি মালিকের দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্তরা তাদের দেশে যাওয়া নেটিভদেরকেই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বি গণ্য করছে। এই ব্যাপারটা বৃটিশেরা যেমন সহনীয়ভাবে দেখে ফরাসীরা তেমন নয়। তাই ফরাসি নীতি হল, নেটিভদের সবাইকেই ফরাসি কালচারই অনুসরণ করতে হবে। নেটিভরা নিজ দেশ থেকে আনা সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্তন হতে হবে। তদুপরি, নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্ম পালনও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্তন হয়ে পালন করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই । ফরাসি দেশে বোরকা আইনত নিষিদ্ধ এ ‘যুক্তি’তেই। জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে,নেটিভেরা নিজ দেশ থেকে আনা শুধু সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্থন হতে হবে তাই না। নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্মপালনটাও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্থন হয়ে করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই assimilation নীতি। যেমন ফরাসি দেশে বোরখা পড়া আইনত নিষিদ্ধ, এই যুক্তিতেই। এটাকেই ফরাসি রাষ্ট্র তার “এসিমিলিয়েশন” এর নীতি বলে সাফাই দিয়ে চলে থাকে। এই দুই নীতির তুলনা নিয়ে গত ২০১৫ সালে আমার এক পুরানা লেখা এখানে সময় করে আবার পড়তে পারেন।

হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা হিটলারেরও ভক্ত। যেমন এরা হিটলার বা তার সংগঠন নাৎসি পার্টির নানান চিহ্ন বা প্রতীক ব্যবহার করে থাকে। হিটলারের বাণী নিজেরা পুনর্ব্যবহার করে। হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের রাইফেলের গায়ে এর ওপরে কমপক্ষে ছয়টা নাম ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আঁকা আছে। এর একটি হল, ‘ফরটিন ওয়ার্ডস’ (Fourteen Words) চৌদ্দ শব্দের এক বাণী। আর তা হল – আমাদেরকে অবশ্যই “আমাদের মানুষের” অস্তিত্ব ও আমাদের “সাদা সন্তানদের” ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে হবে। [“We must secure the existence of our people and a future for white children.”]।  এটাকে অনেকে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের একটা মূল ‘মন্ত্র’ বলে থাকে। এখানে ‘our people’ বা ‘white children’ বলে এরা বর্ণবিদ্বেষ জাগানোর চেষ্টা করে থাকে।

ব্রেন্টনের মত হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা বলতে চায় তারা মাইগ্রেশনবিরোধীকিন্তু আসলেই কি তাই?
আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ড এসব রাষ্ট্রের আদি বাসিন্দা কারা? আর কারা এর অবৈধ দখলদার? অথবা তাঁদের ভাষায় অনুপ্রবেশকারি-দখলদার? নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী [aborigine] হল ‘মাউরি’-রা [Māori]। ইউরোপ থেকে বিশেষত ডাচ বণিক ‘আবেল তাসমান’ [Abel Janszoon Tasman] প্রথম ইউরোপীয়, যিনি মাউরি সভ্যতা ও এর ভূমির সন্ধান পাওয়ায় (১৬৪২) পরবর্তী সময়ে ‘নিউজিল্যান্ড’ নাম দিয়ে দখল করে, কালক্রমে নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ডের কলোনি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। এখানে ইউরোপীয় সাদা চামড়ার লোকজনই কি অনুপ্রবেশকারী-দখলদার নয়? হামলাকারী ব্রেনটন নিজেই (বা তাঁর পূর্বপ্রজন্ম) অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের আসল অনুপ্রবেশকারী-দখলদার। অতএব, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের নিজেকে না বলে (মুসলমানসহ) অন্য কাউকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা প্রহসন মাত্র। ক্রাইস্টচার্চের মুসলমানদেরকে “হোয়াইট জেনোসাইডার” ব্রেনটন এর বিদেশি বা তথাকত্থিত “মাইগ্রেশনবিরোধীতার” তামাশা হল এটাই যে খোদ মাইগ্রেন্ট মাইগ্রেশনবিরোধীতার ভান করতে নেমে নির্বিচারে মানুষ খুন করছে।

তবে এখানে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে যে বুশ-ব্লেয়ারের “ওয়ার অন টেরর” আর হোয়াইট বা “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামার” উত্থান  – এদুটো একই ফেনোমেনা নয়। বরং একেবারেই আলাদা। তবে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামাকারিরা” ইচ্ছা করে ইনভেডর বা অনুপ্রবেশকারী-দখলদার বলতে কথাটা সংকীর্ণ করে কেবল “মুসলমান” বুঝাচ্ছে – যাতে তারা খ্রীশ্চান-পশ্চিমাবাসীদের দৃষ্টি-আকর্ষণ করা সহজ হয়।

সারকথা : আমাদের যথেষ্ট মাথা তুলে যেটা দেখতে হবে যে, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের উত্থান কেন এখন দেখা যাচ্ছে? তারা অটোমানদের সাম্রাজ্যের প্রতি ঘৃণা অথবা ইউরোপিয়ান খ্রিশ্চানিটির জেরুসালেম দখল চেষ্টার অতীত লড়াইগুলোকে এখন কেন রেফারেন্সে আনছে?

আমরা গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসকে মোটা দাগে তিনটা পর্বে ভাগ করে বুঝতে পারি। প্রথম পর্ব হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। যেটাকে “কলোনি অর্থনীতির যুগ” বলা যেতে পারে। দ্বিতীয় পর্ব হল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ থেকে গত শতাব্দী (বিশ শতক) পর্যন্ত, যেটা  আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্লোবাল অর্থনীতির যুগ”। আর তৃতীয় পর্বকে বলা যায়, চলতি শতকে আমেরিকান নেতাগিরির পতন আর ক্রমেই সেই জায়গা নিতে “চীনের উত্থিত গ্লোবাল নেতৃত্ব”।

পশ্চিমের, বিশেষত ইউরোপের অর্থনীতি ভালো চলছে কি না তা বুঝবার সহজ তরিকা বা নির্ণায়ক হল – মাইগ্রান্ট ইস্যু। অর্থনীতি ভাল চললে দেখা যাবে, তারা সবাই ভুলে যায় যে মাইগ্রান্ট তাদের একটি সমস্যা। কারণ, তখন পশ্চিমের বাড়তি শ্রম দরকার; ফলে মাইগ্রান্ট শ্রমিক খুব দরকারি। আবার অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলেই মাইগ্রান্ট বিষয়টিকে মানে, ওই বাড়তি শ্রমের বিষয়টিকে পাশ্চাত্য এক বিরাট সমস্যা মনে করে থাকে। তারা তাদের মধ্যবিত্তদেরকে মাইগ্রান্টদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে উঠায়। অথবা যেমন আমরা এখন ফ্রান্সে দেখছি। ফরাসি নেতা মেরিন লি পেনের National Front পার্টির উগ্র ন্যাশনালিস্টরা (হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট) তাদের মধ্যবিত্তকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন। কিন্তু এরপরেও তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরেছেন। তবে তারা আসলে “কী রাজনীতি” করছেন তা বুঝবার কিছু ইঙ্গিত দেয়া যাক। তার দলের দুই ভাইস-প্রেসিডেন্টের একজন ফিলিপো [Florian Philippot] সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। যা তিনি বলছেন বাধ্য করা হয়েছে। ফিলিপোর দাবি তাদের দলের আভ্যন্তরীণ বিতর্ক আসলে এখন এক সরে যাওয়া ইস্যু। “আমরা আগে আসলে দাবি করতাম এক অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ। যেটা এখন “মাইগ্রান্ট আর ফরাসি আইডেন্টিটি” – তার এই পুরানা ট্রাডিশনাল অবস্থানকেই মুল রানোইতিক ফোকাস বলে হাজির করেছে। এটা আসলে এক ভয়ঙ্কর পিছনের দিকে পিছলে পড়া”। [Philippot said the debate within the FN about a shift away from his focus on economic nationalism back to its traditional priorities of immigration and French identity were “a terrible backward slide”].
এই বক্তব্য থেকে আমরা “অর্থনৈতিক জাতীবাদ” থেকে মোদীর হিন্দুত্ববাদ কোথায় আলাদা তা বুঝে নিতে পারি।

গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্বে এসে আমেরিকার নেতৃত্বের হাতে ইউরোপ এর আগে নিজেদের কলোনি শাসনের অর্থনীতির সমাপ্তি সমর্পণের ঘোষণা দিতে হয়েছিল
এখন চীনা উত্থানের পর্বে এসে ইউরোপ বিশেষ করে ফ্রান্স আরেক দফা (তবে এবার আমেরিকাসহ) চীনেরও পেছনে থাকতে শুরু করতে যাচ্ছে। এরই প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে এই  সাদা চামড়ার আইডেনটিটি- ধরনের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। দাবি উঠছে তাদের আগের “কলোনি যুগ” সবচেয়ে ভালো ছিল। কারণ, সেটা ছিল শান-শওকতের যুগ। তাই কলোনি লুণ্ঠনের সেকালে ফিরে যেতে হবে”। ইউরোপের প্রবীণ প্রজন্ম এখন তরুণদের কাছে সাদা চামড়ার সুপ্রিমেসির গল্প শুনিয়ে উসকানি দিচ্ছে।

সময় কখনো পেছনে ফেরে না। যেমন আমরা চাইলেই এখন “দাস-প্রথা” আবার ফিরে দুনিয়াতে চালু করতে পারব না। একইভাবে কলোনি লুণ্ঠন একালে আবার বৈধ বলে দাবি করা, সাদা চামড়ার বর্ণবাদের শ্রেষ্ঠত্ব একালে আবার ন্যায্য বলে সাফাই গাওয়া- এসব অসম্ভব। দুনিয়ার অভিমুখ আর সেটা নয়। এগারো-বারো শতকের জেরুসালেম দখলের জোশ- ক্রুসেডের সেই উসকানি একালে আবার তৈরি করা, সেটাও অসম্ভব। মডার্ন রাষ্ট্র ও শাসন দুনিয়ায় এসে যাওয়ার পরে পুরনো ‘ক্রুসেড’ আর হবে না। যদি তাই হত তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে ব্রিটেন জেরুসালেম দখলের চেষ্টায় বারবার হেরে যাওয়ার শোধ তুলতে আবার ক্রুসেড লড়ে জেরুসালেমের দখল করতে চেষ্টা করত। “কামাল তুনে কামাল কিয়ার” তুরস্ক গড়ার পথে হাঁটত না। বরং আমরা দেখেছি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন সত্ত্বেও ‘মডার্ন রিপাবলিক’ ব্রিটিশ সরকার ‘ক্রুসেড’ শব্দটি মুখেও আনেনি।

আমরা এখন যেমন চাকরি, পড়াশোনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পশ্চিমমুখী হই। সামনের দিনে ইউরোপীয়দের অন্তত চাকরি বা অধিকতর সুযোগ-সুবিধার জন্য এশিয়ামুখী হয়ে ধাবমান হতে দেখা অসম্ভব নয়। এটাকেই তারা হার মনে করছে। পাশ্চ্যাতের সমাজে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনার” নামে অস্থিরতার কারণ এখানেই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ কি ফিরবে – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

‘জাতিরাষ্ট্র’ এক বিভ্রান্তিকর ধারণা

‘জাতিরাষ্ট্র’ এক বিভ্রান্তিকর ধারণা

গৌতম দাস

১৯ অক্টোবর ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2kt

 

 

আমাদের একজন সিনিয়র সিটিজেন ড. আকবর আলি খান। তার মূল যে পরিচয়, যে কারণে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত তা হল, তিনি একজন দক্ষ আমলা বা বুরোক্র্যাট। সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে তিনি পেশাজীবন শেষ করেছেন। একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে তিনি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক। গত ২৬ মার্চ ২০১৭ দৈনিক প্রথম আলোতে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। অনুমান করি, তার সর্বশেষ গ্রন্থ ‘অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ বইটির কথা মাথায় রেখে সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশের জন্য একটা কার্যকর ও দক্ষ প্রশাসন গড়তে কী কী করা উচিত, তা নিয়ে যারা কিছু চিন্তাভাবনা করেছেন, করেন অথবা কিছু প্রয়োগ করেছেন, বদলিয়েছেন ও উদ্যোগ নিয়েছেন – এমন কাজের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন আকবর আলি খান। তার সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ ও কৌতূহল এখান থেকেই। অবশ্য ওই সাক্ষাৎকার পড়ার পর থেকে আমরাই আবার বেশ খানিকটা যেন হতাশ হতে যাই।

ওই সাক্ষাৎকারে আকবর আলি খানের রাষ্ট্রবিষয়ক বিভিন্ন মন্তব্য আছে। সেগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করি, ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাকে তিনি এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন। ইংরাজি নেশন স্টেট (nation-state) শব্দের বাংলা আমরা করে নিয়েছি জাতিরাষ্ট্র। একথা  সত্য যে, অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে প্রবল প্রতাপে মডার্ন রাষ্ট্র মানেই তা জাতিরাষ্ট্র, এ ধারণা ছেয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে যেখানে নাগরিকেরা সবাই একই জনগোষ্ঠিগত বৈশিষ্টের একই ভাষা, একই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত এবং সম্ভবত একই ধর্ম বা মেজরিটির ধর্ম একই এমন একটা অবস্থা থাকে সেখানে জাতিরাষ্ট্র শব্দটার ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। আসলে একটা বহুল প্রচলিত শব্দ এখানে সাধারণত ব্যবহৃত হতে দেখা যায় যেটা আমরা ব্যবহার করিনি, সেটা হল ‘জাতি’, যা ইংরাজি নেশন শব্দের বাংলা। ভুখন্ডে বসবাসরত নাগরিক সকলকে বুঝাতে বহুল প্রচলিত শব্দ হল ‘জাতি’, যা এখানে ব্যবহার করা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আর তার বদলে এখানে আরও সাধারণ অর্থবোধক শব্দ ‘জনগোষ্ঠিগত’ দিয়ে তা বুঝানো হয়েছে। কী হলে জনগোষ্ঠি ‘জাতি’তে রূপান্তরিত হয়ে যায়? সে প্রশ্ন এখানে তুলব।

আবার একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করা গেলেই কী সেটাই কী জাতিরাষ্ট্র কায়েম হয়ে যাওয়া?  তাহলে রিপাবলিক রাষ্ট্র মাত্রই কী জাতিরাষ্ট্র?  সে প্রশ্নও তো আছেই।

তবে এই শতাব্দি এসে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে যায়। ধারণা ও উপলব্ধি ততদিনে থিতু হতে সময় পেয়ে যায় যে, না, জাতিরাষ্ট্র’ কথাটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ধারণা বা বিষয় নয়; বরং এক উটকো ধারণার অংশ।

আধুনিক রাষ্ট্রের ব্যাপারে সবার আগে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল ‘রিপাবলিক’। আর রিপাবলিক ধারণার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিক সাম্য, মানুষের মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়বিচার। কিন্তু রাষ্ট্র গঠন বা রাষ্ট্রধারণার বাস্তবায়নের কালে দেখা সব সংশ্লিষ্ট ধারণাকে তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয় জ্ঞান ও গণ্য করে সব কিছু পর্যবসিত হয়েছে শুধু ‘জাতিরাষ্ট্র’ শব্দ ও ধারণায়। রাষ্ট্রমাত্রই যেন জাতিরাষ্ট্র বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র। অথচ অষ্টাদশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী শব্দ ও ধারণা এখনো রিপাবলিক। সে তুলনার সাথে জাতিরাষ্ট্র বলে একটা ধারণা এসে যাওয়া যেন হাতছুট ঘটনা। কারণ সেই থেকে এখনো নেশন কী, নেশন মানে কী, এগুলো অস্পষ্ট। এখনো তা নিজেকে প্রোথিত করতে পারেনি।

আবার লক্ষ্য করলে দেখব সেকালেও মানে অন্তত বিংশ শতকের শুরুতেও সবাই জাতিরাষ্ট্র বলতে রিপাবলিক বোঝেনি। যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জন্ম নেয়া সোভিয়েত রিপাবলিক রাষ্ট্র (১৯১৭), মাওয়ের চীনের পিপলস রিপাবলিক রাষ্ট্র (১৯৪৯), এমনকি ইরানের ইসলামি রিপাবলিক (১৯৭৯)- এগুলোর একটিতেও জাতিরাষ্ট্র বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র বলতে যা সেকালে বুঝা হত, তা বুঝে এসব রাষ্ট্র ও বিপ্লব কায়েম করা হয়নি। ফলে এগুলো জাতিরাষ্ট্র হিসেবে কায়েম হয়েছে, এমন কোনো দাবি তাদের নেই; বরং প্রত্যেকে নিজ রাষ্ট্রের নামের সাথে গৌরবোজ্জ্বলভাবে রিপাবলিক শব্দ ও ধারণা বয়ে বেড়াতে পিছপা হচ্ছে না বা ভুল করেনি। একেবারে রাষ্ট্রের নামের মধ্যেই তা খোদাই করে দিয়েছিল।

আবার আধুনিক আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ১৭৭৬ সালের ইউএসএ পর্যন্ত নিজেকে কোনো জাতিরাষ্ট্র দাবি করে না। আবার লক্ষণীয় হল, ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে সব আধুনিক রাষ্ট্রই রিপাবলিক ধারণাকে মুখ্য রেখে তৈরি হয়েছে। এর প্রমাণ লেনিনের ইউএসএসআর (১৯১৭) রাষ্ট্রের নামের শেষের রিপাবলিক। মাওয়ের চীন পিআরসি (পিপলস রিপাবলিক অব চায়না, ১৯৪৯) আর ইরানের ইসলামি রিপাবলিক (১৯৭৯)। বিশ শতকের এই তিন রাষ্ট্র রিপাবলিক হয়ে আধুনিক রাষ্ট্র বলে নিজেদের দাবি করলেও কেউই জাতিরাষ্ট্র বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র নয়, সে দাবিও করেনি। এই উদাহরণগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলে আর রাষ্ট্রমাত্রই সেটা জাতিরাষ্ট্র, এমন ভুল বা পশ্চাৎপদ ধারণা আঁকড়ে থাকার কথা নয়। কিন্তু আকবর আলি খান জাতিরাষ্ট্র ধারণাকে আঁকড়ে এর ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন; দাবি করছেন- “জাতিরাষ্ট্র বিষয়টি আধুনিক ধারণা। ‘ …’ পৃথিবীর সবখানেই জাতিসত্তা পরে জন্ম নিয়েছে।”

সারকথায়, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র মাত্রই যে তাকে জাতিরাষ্ট্রও বলা ঠিক হবে না এটা ক্রমশ মানুষের মধ্যে সতর্কতা আসতে শুরু করেছিল। তবুও এরপরেও অনেকে এখনও একাকার করে দেখে থাকেন। আকবর আলি খান তাদের একজন থেকে গেছেন দেখা যাচ্ছে। আর সব নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্রের ধারণাধারী যে বিপদে পড়েন, তিনিও সে একই ‘বিপদে’ পড়েছেন। একই সূত্র অনুসারে ‘জাতিসত্তা’ বলে শব্দটি তিনিও এনেছেন। এতে যে বিপদের মুখোমুখি হতে হয় তা হল – ‘জাতি’ জিনিসটি কী তা ব্যাখ্যা করতে হবে তাদের। এখন , এই ‘জাতি’ মানে কী? সেটা কি ইংরেজি (race) রেস নাকি (ethnicity) এথনিসিটি? নাকি কমন কালচারাল কোন বৈশিষ্ট্য অর্থে এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক ধারণা? কোনটা? এরা সেটা পরিষ্কার করে বলেন না। তা সত্ত্বেও তারাই আবার জাতিসত্তা শব্দটি ব্যবহার করে আরও অস্পষ্টতা বাড়ান। আকবর আলি বলছেন, ‘কাজেই বাংলাদেশের উৎস প্রাচীন বা মধ্যযুগে খুঁজলে হবে না, বাংলাদেশের আদিসত্তার উৎস খুঁজতে হবে ঊনবিংশ থেকে বিংশ শতকে।’ আর প্রশ্নকর্তা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি বইয়ে আপনি লিখেছেন, …. সেদিক থেকে বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ধারণার উন্মেষ মধ্যযুগ থেকে।’

অর্থাৎ দু’জনেই খুঁজছেন বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ধারণার উন্মেষ কবে থেকে উত্থিত। কারণ এ ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তারা এরপর তাদের পছন্দের জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট ধারণাকে পোক্ত করবেন সম্ভবত। কিন্তু আসলে এই অনুমান অর্থহীন। কারণ মূল বিষয় জাতি কী, নেশন বলতে তারা কী বুঝাচ্ছেন তা তো অস্পষ্টই রয়ে গেছে। জাতি মানে কী – রেসিয়াল অথবা নৃতাত্ত্বিক ধারণা কী? অথবা অন্য কোনো ধারণা? তারা এদিকে খোঁড়াখুঁড়ি করেছেন বা করতে চান বলে মনে হয় না।
কিন্তু এই জট আমরা কী করে সহজে খুলতে পারি? একটি দিক লক্ষ করলেই সবাই এই জট খুলতে পারব।

রেসিয়াল অথবা এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক যে ধারণাই হোক, ব্যাপারটাকে একটা কমন বৈশিষ্ট্য হিসাবে অবশ্যই দেখা যায়। কিন্যেতু সবচেয়ে গুরুত্মবপুর্নণ যেটা  লক্ষ করলে দেখব, ‘জাতি’ বলতে যাই বুঝাতে চাই, তা আসলে এক ধরনের (given) গিভেন বৈশিষ্ট্য বা গিভেন ধারণা। তা কী অর্থে? মানে হল যে, “আগে থেকে দেয়া আছে”। যেমন দুনিয়ার কোনো জনগোষ্ঠী নিজেই নিজের রেসিয়াল (অথবা এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক) বৈশিষ্ট্য বেছে নিতে পারে না, সম্ভব নয় বলে। রেসিয়াল বৈশিষ্ট মানুষের পছন্দ করে বেছে নিবার জিনিষ না।  জন্মানোর আগে কেউ আল্লাহর সাথে চুক্তি করে, চয়েজে টিক দিয়ে বাঙালি হয় না, বিহারি হয় না; বরং বাঙালির ঘরে জন্মানোর পরে ওই ঘর মোতাবেক অর্থাৎ (given) গিভেন হিসেবে বাঙালি হয়। ফলে রেসিয়াল অথবা এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক ইত্যাদি যাই হোক না কেন, এগুলোর মূল পরিচয় আসলে গিভেন ধারণার অন্তর্গত। সোজা কথা হলো, আমি জাতে বাঙালি হতে চাইছি বলে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাঙালি হতে পারি না। হই নাই। এখন একটা কথা স্পষ্ট করতে হবে। এর মানে কি এই যে, এখন তাহলে যার যার (আল্লাহর দেয়া) বা গিভেন পরিচয় অনুসারে তাকে এখন ওই পরিচয়ের রাজনীতিই করতে হবে? মানে এথনিক বাঙালিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিই করতে হবে?

এর জবাব-ফয়সালা পেতে আমাদের শেষ বাক্যে মনোযোগ দিতে হবে। ওই বাক্যে দুইবার বাঙালি শব্দটি ব্যবহার করেছি- এথনিক বাঙালি আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী। অথচ লক্ষ করুন, এ দুই বাঙালি শব্দের অর্থ এক নয়। কেন? প্রথমে ব্যবহৃত বাঙালি শব্দটি গিভেন অর্থে বাঙালি। সেজন্য ওটা আমার গিভেন পরিচয় বা প্রাকৃতিক পরিচয়। তাহলে পরেরটা?

পরেরটা হল বেছে নিয়েছি, ইচ্ছামতো যেটা ভালো লেগেছে সেই রাজনীতি- নিজের রাজনৈতিক পরিচয়। স্বেচ্ছায় সচেতনে যেটা মানুষ করে কিংবা বেছে নেয়, সেটাকে রাজনৈতিক কাজ বা সিদ্ধান্ত বলে। এই পরিচয় বা রাজনীতি আবার শুধু আমার রাজনৈতিক পরিচয় নয়, এটা আমরা যতবার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা বদলাতেও পারি। যেমন ১৯৪৭ সালে আমরা একই জনগোষ্ঠী ‘ইসলামি জাতিবাদী’ হয়েছিলাম। সে পরিচয় নিয়েছিলাম। আবার আমরাই ১৯৭১ সালে নতুন পরিচয় ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ হয়েছিলাম। বাঙালি জাতীয়তাবাদী ছাড়াও আরো যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনীতি আমরা আগামীতে করতে পারি, বেছে নিতে পারি। একটার বদলে আরেকটা রাজনীতি করতে পারি। মূল কথা, এথনিক বাঙালি হয়েও আমি বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করতে পারি, না-ও করতে পারি। এর অর্থ, তাহলে এথনিক বাঙালি জনগোষ্ঠী এক আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে গেলে সেটা একটা জাতিরাষ্ট্রই হয়ে যাবে, বাঙালি জাতিবাদী (অথবা বাংলাদেশী জাতিবাদী) জাতিরাষ্ট্র হয়ে যাবেই- এমন ধারণা ভিত্তিহীন।

আকবর আলি খান এবং প্রশ্নকর্তা দু’জনই খুঁজছিলেন বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ধারণার উন্মেষ কবে হয়েছে, মধ্যযুগে কি না- এই খোঁজাখুঁজি অর্থহীন। কারণ এটা নৃতাত্ত্বিক বা থিনিক খোঁড়াখুঁড়ি গিভেন পরিচয়ের খোঁড়াখুঁড়ি। এর সাথে রাজনৈতিক পরিচয় মিলিয়ে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলা অর্থহীন। কারণ দুটো আলাদা জিনিস। রাজনীতি সচেতন হওয়া বা রাজনীতি মানে কী সেসব বোঝার বহু আগেই ‘গিভেন’ পরিচয় আমরা পেয়ে যাই। আমাদের জানা না থাকলে প্রাকৃতিক পরিচয় আর রাজনৈতিক পরিচয়- এ দুটোকে গুলিয়ে ফেলে কথা বলতে থাকি। শেখ মুজিব সর্বপ্রথম রাজনৈতিক বাঙালি বা বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি হাজির করেন। স্পষ্ট আকারে তা হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ছয় দফায়। অর্থাৎ এর সাথে গিভেন বাঙালি কবে থেকে শুরু হয়েছিল, এর কোনোই সম্পর্ক নেই। যেমন অনেকে ‘আবহমান বাঙালি’ বলে একটা শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। এই শব্দের সাথে বাঙালি জাতিবাদী ধারণার কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ আবহমান বাঙালি একটি এথনিক বা প্রাকৃতিক বা গিভেন পরিচয়ের ধারণা।
এই কারণে আকবর আলি খানের ওই সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর শব্দ ও ধারণা হলো ‘জাতি’। প্রথমত, ওটা অস্পষ্ট যে, তা গিভেন না পলিটিক্যাল। তাই এটা অস্পষ্ট রয়েছে বলে পুরো আলোচনাই সেখানে অর্থহীন হয়ে গেছে।

তিনি বলছেন, ‘বাঙালিদের জন্য পরিচয়ের ভুল ঠিকানা ছিল পাকিস্তান। পাকিস্তানের আবির্ভাব ছিল এক আকস্মিক ঘটনা। ভারতীয় উপমহাদেশে যত মুসলমান ছিল, তারা এক জাতি; হিন্দু যারা তারা আরেক জাতি- এমন ভাবনা থেকে এর সৃষ্টি। কার্যত মুসলমান বা হিন্দুদের সবাই এক ভাষা, এক জাতি, এক অঞ্চলের মানুষ ছিল না। … সেজন্য আমি মনে করি, আধুনিক ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়া ছিল অনিবার্য।’

তার এই বয়ানের পর্যালোচনা করে বলতে হয়- প্রথমত, মানতে হবে যে, দেশ ভাগ সবার জন্য খারাপ অভিজ্ঞতা। আসলে এ কথা বাস্তবে সত্যি ছিল না। যেমন পূর্ববঙ্গের প্রজাদের কাছে দেশ ভাগ ছিল অনিবার্য এবং তাদের খুবই কাম্য। তাই এককাতারে প্রজারা তাতে খুশি হয়েছিল। হিন্দু বাঙালিরা জমিদারির পক্ষ নিয়ে, তা আঁকড়ে থেকে এ থেকে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষমতার আধিপত্যের শেয়ার ভোগ করতে চাইল। জমিদারেরা এমন একক মোড়লিপনা চালিয়ে যেতে চাইলো প্রজাদের সাথে- দেশ ভাগ করা মানেই, প্রাকটিক্যালি জমিদারি উচ্ছেদ- এই পথে যেতে চাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

দ্বিতীয় কথা, দ্বিজাতির ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়নি। মুসলমান-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো নিয়ে আলাদা পাকিস্তান হওয়া আর মুসলমানেরা আলাদা জাতি বলে পাকিস্তান হওয়া এককথা নয়। যদিও দেশ ভাগের পর এমন সাফাই কেউ কেউ দিয়েছিলেন। আর কলকাতার জমিদারদের পক্ষের সাফাই হিসেবে অনেকে বলে- ‘মুসলমান যেহেতু জাতি নয়, একটা ধর্মের নাম; কাজেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতি- এটা হয় না। এটা করা ভুল।’ এটাকে বিরাট জ্ঞানগর্ভ আরগুমেন্ট মনে করে অনেকে খুশি হয়ে যায়। ধরা যাক, ইসলামি জাতিবাদ ধারণা ভুল। তাহলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ এটা সঠিক হয় কিভাবে?

বাস্তবে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ভারত রাষ্ট্র হয়েছে। তবে সেটা তারা অকপটে স্বীকার করেছে, না ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ শব্দের আড়াল নিয়েছে সে কথা আলাদা। কিন্তু হিন্দুত্বের ভিত্তিতেই ৫০০-এর বেশি করদরাজার রাজ্য গুঁড়িয়ে দিয়ে আর ২৯ রাজ্যকে একসাথে বেঁধে আজকের ভারত রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছে। আর একটি ফ্যাক্ট হলো, কংগ্রেস হিন্দু জাতিবাদী রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে দল হিসেবে খাড়া হয়ে ছিল। সে কারণেই এর ভেতর মুসলমানেরা নিজেদের খুঁজে না পেয়েই কংগ্রেস দল খোলার পর ২০ বছর অপেক্ষা করে শেষে মুসলিম লীগ গঠন করেছিল।
আসলে পুরো বিষয়ে মূল সমস্যা পরিচয়ের রাজনীতি বা আইডেন্টিটি পলিটিক্স। সব জাতীয়তাবাদ, সব জাতি ধারণাই একেকটা পরিচয়ের রাজনীতি; সেক্টেরিয়ান পলিটিক্স। সেটা কংগ্রেস হিন্দুত্বের জাতিবাদ করলেও যা, মুসলিম লীগের ইসলামি জাতীয়তাবাদ করলেও তা। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদ করলেও একই সমস্যা থেকেই যাবে। বাংলাদেশে কেউ বাঙালি জাতিবাদ করতে চাইলে আরেকজন বলবে তিনি ইসলামি জাতীয়তাবাদ করবেন। আপনি ভাষার জাতীয়তাবাদ চাইলে আর একজন ভুখণ্ডের জাতিবাদ চেয়ে বসবেন। জাতিবাদী রাজনীতি মানেই পরিচয়ের রাজনীতি, মানে বিভক্তির রাজনীতি। অথচ এর বাইরে আসতে হবে আমাদের।
অতএব ‘জাতি’ ধারণা, জাতিবাদী রাজনীতির ধারণা ইত্যাদি আগে স্বচ্ছ করে না নিলে প্রাসঙ্গিক আলোচনা অর্থহীন থেকে যাবে।

আকবার আলি খানের বক্তব্যে সবচেয়ে বিতর্কিত হলো তিনি বলছেন, জাতির পিতা স্বয়ং মনে করতেন আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের দু’টি উপাদান রয়েছে। একটি হলো ধর্ম, আরেকটি হলো ভাষা। তিনি যদি সত্যি সত্যিই মনে করে থাকেন, জাতির পিতার জাতীয়তাবাদের দু’টি উপাদানের একটা ধর্ম; তাহলে দ্বিজাতিতত্ত্বকে মানে ধর্মীয় পরিচয়কে সমালোচনা করার তো সুযোগ নেই। দেশ ভাগের ব্যাপারে কলকাতার বয়ানের পক্ষে দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে সমালোচনা করার সুযোগ কই? এটা তো স্ববিরোধিতা। ফলে ‘পাকিস্তান হওয়া এক দুর্ঘটনা আর বাংলাদেশ হওয়া এরই সংশোধন!’-কথাটা খুবই স্ববিরোধী বক্তব্য হয়ে যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ অক্টোবর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

গৌতম দাস

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

http://wp.me/p1sCvy-2hU

আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
“Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের আদি কথা

দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের আদি কথা

গৌতম দাস

মার্চ ২৪, ২০১৭ ভোর ছয়টা

http://wp.me/p1sCvy-2dU

 

 

জন্মের সময় থেকে ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক ভিত্তি হিন্দুত্ব। ভারত রাষ্ট্রের প্রদেশগুলো যেগুলোকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য বলে। এগুলাকে আমরা রাজ্য সরকার পরিচালিত প্রদেশ বলে চিনতে পারি। এমন সম্ভবত প্রায় ২৯টা রাজ্য নিয়েই এখনকার ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নামের রাষ্ট্র গঠিত। এই রাষ্ট্রের জন্ম বা গঠনের সময় এর সংগঠকেরা চিন্তাভাবনা করতেই পারেনি যে, এই রাজ্যগুলোকে একজায়গায় বেঁধে ভারত বানিয়ে রাখার সেই সুপার গ্লুটা ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে।  এককথায় বললে এটা হিন্দু (জাতীয়তা) আইডেনটিটির উপর দাঁড়ানো বা আইডেনটিটি পলিটিকসের উপর দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র হয়ে আছে। কোন সমাজের সকলে অন্তর্ভুক্ত কোন ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ এর এক সাম্যের রাষ্ট্র ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নয়। যদিও মুখে এতটুকু বলা হয়েছিল এটা রিপাবলিক বা হিন্দিতে ‘সাধারণতন্ত্র’ হবে। ফলে হিন্দুত্ব ছাড়া অন্য কোন কিছুর উপর তাদের নিজেদের কোন আস্থাই ছিল না। তাই বাস্তবে ও কাজে হিন্দুত্বের গ্লু-এর ভরসা ছাড়া অন্য কিছু বোঝেনি।

রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য- নাগরিক সাম্য ও মানবিক অধিকার, মর্যাদা অথবা এককথায় ইগালেটারিয়ান রাষ্ট্র গড়তে হবে। কিন্তু এসব বানাবার বিষয়গুলো রাষ্ট্র গঠনের কর্তারা পড়েছে হয়ত তবে তাত্ত্বিক কথার কথা হয়েই বইতে রয়ে গেছে। আর বাস্তব কাজে এরা ভরসা মেনেছে ‘হিন্দুত্ব’-এর জাতিবাদ। আর তত্ত্বকথার উপর ইমান কম বলে বাস্তবে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে বাড়তি এক কথা আনতে হয়েছিল তাদের। যদিও আরও অনেক পরে ‘সেকুলারিজম’ বলে বাড়তি আরও এক অর্থহীন কথা এনেছিল। দুটোই চাপাবাজির অর্থহীন শব্দ। রিপাবলিক রাষ্ট্রের তিন মৌলিক বৈশিষ্ঠের অর্থ তাতপর্য বুঝলে ও বাস্তবায়ন করলে তো আর এই দুই ফালতু শব্দের (‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘সেকুলারিজম’ ) দরকার দেখা যেত না। ইগালেটারিয়ান রাষ্ট্র নয় বলেই মুসলমানেরা হিন্দুদের মত সমান নয় বলেই মুসলমানদের সে প্রশ্ন চাপা দিতে বাড়তি এবং অর্থহীন ‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘সেকুলারিজম’ শব্দ দু্যটো আনা হয়েছে। এই হল হিন্দুত্বের ভারত। এই হিন্দুত্বের ভারতে আবার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও বিজেপি যাদের কারও হিন্দুত্ব নিয়ে কোনো আপত্তি বা সমস্যা নেই, বরং তারা কোনো সমস্যাই দেখে না। তবে ফারাক হল কংগ্রেস মনে করে ‘হিন্দুত্ব’ কথাটা বা এই পরিচয়টা লুকাতে সেকুলার জামার আড়াল নেওয়া উচিত। আর বিপরীতে বিজেপি মনে করে এই হিন্দুত্ব পরিচয়ের লুকোছাপার ‘দরকার কী’ । বরং বুক ফুলিয়ে বলতে পারলে ভিন্ন লাভ আছে, ভোট বেশি পাওয়া যাবে। এই ভাবেই চলে ভারতের রাজনীতি, চলে আসছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে মোদির বিজেপি প্রথম একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে। এর আগে ১৯৯৮-২০০৪ আমলে বিজেপির বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সেটা ছিল এক কোয়ালিশন, এনডিএ-এর সরকার। তাই বিজেপির প্রথম একক দলীয় সংখ্যাগরিষ্ট বা একার তৈরি সরকার হল ২০১৪ সালেরটা।  তবুও ২০১৪ সালের বিরাট এক মোদি-জ্বর সৃষ্টি করতে পারলেও মোদি নিশ্চিত ছিলেন না যে হিন্দুত্বকেই খোলাখুলি এবং একমাত্র নির্বাচনী বয়ান করা ঠিক হবে কিনা। মোদি সরকারের প্রায় তিন বছরের মাথায় উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী ফলাফল আসার পরে মোদি এই প্রথম এখন নিশ্চিত যে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ‘হিন্দুত্বই’ হবে বিজেপির একমাত্র মূল মন্ত্র। এখন কেন?

কারণ সদ্যসমাপ্ত ভারতের সবচেয়ে বড় আসনের রাজ্য উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির প্রায় ৭৮ ভাগ আসন (৩১২/৪০৩) পেয়ে জয়লাভ করেছে। এর সাথে অবশ্য অন্য চার রাজ্যের নির্বাচনও হয়েছে। আর সেগুলোর ফলাফলে এক পাঞ্জাব ছাড়া অন্য তিন রাজ্যে কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। উত্তর প্রদেশের ফলাফল বিজেপির বিপুল বিজয় এসেছে কথা সত্য; কিন্তু এর তাৎপর্য ছাপিয়ে আরও বড় বিষয় হলো বিজেপির টিকেটে বিজয়ী ওই ৩১২ রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের সবাইকে ফেলে, এক কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কে এই যোগী আদিত্যনাথ?

তার আসল নাম ছিল অজয় সিং বিসত। উত্তর প্রদেশের গোরক্ষনাথ জেলায় প্রাচীন নাথপন্থীদের এক মঠ-মন্দির আছে। কালক্রমে ব্রিটিশ আমলেই এটা ‘হিন্দু মহাসভার’ এক আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই মঠের প্রধান পুরোহিত ও হিন্দু মহাসভা নেতা ছিলেন মোহান্ত অবৈদ্যনাথ। এছাড়া বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে মন্দির নির্মাণ আন্দোলনের রাজনীতিতে ১৯৪৯ সালের নেতা হলেন এই মোহান্ত। অজয় সিং গুরু মোহান্তের শিষ্যত্ব নিয়ে তাকে পিতা ডাকেন আর নিজে এক নতুন নাম নেন – যোগী আদিত্যনাথ। হিন্দু মহাসভা হলো বিজেপিরও পেরেন্ট সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আগের নাম। সে সময় হিন্দু মহাসভা নামের সংগঠন একইসঙ্গে হিন্দু ধর্মতাত্ত্বিক সাংগঠনিক তৎপরতা আর হিন্দু রাজনৈতিক সাংগঠনিক তৎপরতা দুটাই একই নামে চালাত। পরে ধর্মতাত্ত্বিকসহ সব ততপরতার মূল সংগঠন হয় আরএসএস। আর ১৯৮০ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতার আলাদা সংগঠন হয়  বিজেপি। যদিও  হিন্দু মহাসভার গান্ধী হত্যায় দায় ঘাড়ে এসে পড়ায় গুরুত্বপুর্ব সদস্যরা ১৯৫১ সাল থেকেই হিন্দু মহাসভা ত্যাগ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। গত ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে এই মঠগুরু, আরএসএস ও বিজেপি ইত্যাকার সংশ্লিষ্ট সকলে ‘হিন্দু কর সেবক’ এই কমন নামে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তৎপরতায় সামিল হয়েছিলেন। যোগী আদিত্যনাথের গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ আগে হিন্দু মহাসভা থেকেই নির্বাচিত এমপি হতেন। সেবার ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে তিনি বিজেপি থেকে নির্বাচনে এমপি হয়েছিলেন। আর এরপর তিনি ১৯৯৪ সালেই তরুণ শিষ্য যোগী আদিত্যনাথকে আনুষ্ঠানিকভাবে গোরক্ষনাথ মঠের মোহান্ত বা প্রধান পুরোহিত হিসেবে নিজের স্থানে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যান। আর ১৯৯৮ সালের নির্বাচন থেকেই যোগী আদিত্যনাথ গুরুর আসন থেকে নির্বাচন করা শুরু করে এ পর্যন্ত পরপর পাঁচ বার কেন্দ্রীয় সংসদের এমপি নির্বাচিত হন। প্রথমবার তিনি এমপি হন মাত্র ২৬ বছর বয়সে। গত ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ মারা যান। এদিকে গুরু এবং শিষ্য, ১৯৯১ সাল থেকে বিজেপির টিকেটে নির্বাচন করা শুরু করলেও সবসময় বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে স্বাধীনই থাকতেন। সে অর্থে তাদের ব্যবহারিক নিজস্ব সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হতো খোদ গোরক্ষনাথ মঠ ও মঠের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত গোরক্ষনাথ কলেজ। এছাড়া এরপরে, ২০০২ সালে যোগী আদিত্যনাথ বিজেপির প্রভাবের বাইরে নিজস্ব সংগঠন হিসেবে কলেজের ছাত্রদের নিয়ে “হিন্দু যুব বাহিনী” গঠন করেন। তিন বছরের মাথায় ২০০৫ সালে একভয়াবহ দাঙ্গায় অংশ নেয়ার জন্য এই বাহিনীর সিনিয়র নেতারা অভিযুক্ত হয়েছিল।  এছাটা ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে মুম্বাই-গোরক্ষপুর গোধন এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন লাগানোর ঘটনা যেটার লেজ  ধরে পরে  গুজরাতের দাঙ্গা শুরু হয়েছিল, সেই মানুষ সহ ট্রেন পুরানা মামলাতেই এই সংগঠনের সদস্যরা সংশ্লিষ্টতায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। দক্ষিণ ভারতভিত্তিক ইংরেজি মিডিয়া ‘দি হিন্দু’ এই সংগঠনের পরিচয় বলেছে- ‘এক ভয়ঙ্কর যুব শক্তির সংগঠন যারা বহুবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণে অংশ নিয়েছে’।  আদিত্যনাথ ও তার বাহিনী প্রায়ই যে ভাষায় কথা বলে তা হলো- মুসলমানেরা ভারতে থাকতে পারবে না, পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবে। আদিত্যনাথের প্রকাশ্য জনসভায় বক্তৃতার ভাষা শুনা ও দেখার জন্য এই ইউটিউব ভিডিও ক্লিপ দেখতে পারেন যেখানে তিনি বলছেন,  “একজন হিন্দু খুন হলে পরে আগামি দিনে আমরা প্রশাসনের কাছে এফআরআই মামলা দর্জ করব না। বরং পালটা এমন দশ ব্যক্তিকে খুন করাব ……”। এছাড়া সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বাংলাদেশেকে জড়িয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন, বলছেন মুসলমান অনুপ্রবেশকারিরা ভারতে এসেছে এরকম সরাসরি উস্কানিমূলক বক্তব্য এখানে দেখতে পারেন।  এছাড়া নিয়মিতভাবে ‘লাভ জিহাদ’ বা ‘ঘর উয়াপসি’ বা গোমাংস খাওয়া বা বহন করা যাবে না ইত্যাদি কর্মসূচিতে নিয়মিত মুসলমানদের দাবড়িয়ে রাখা তার প্রতিদিনের রুটিন কাজ। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েই ৭৫ ঘন্টার মধ্যে কসাইখানা বন্ধের আর গরু চলাচলে তার ভাষায় উত্তরপ্রদেশে গরু পাচার করে আনা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব ঘটনাবলিতে হিন্দুত্ব ভিত্তিক কনষ্টিটিউশনে যেমন  “ভদ্র লোকেরা” কোন সমস্যা দেখে নাই, এখানেও তেমন কেউ অসুবিধা দেখে নাই। তবে নিরাপদ দুরত্বে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

যেমন প্রধানমন্ত্রী মোদির যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণার পর আনন্দবাজার পত্রিকা যোগীর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার রিপোর্টে লিখেছে – ২০০৫ সালের সংসদে যোগী বলেছেন, ‘উত্তরপ্রদেশসহ গোটা ভারতকে হিন্দু মহারাষ্ট্র না বানানো পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না।…’ দিন দিন তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। আর তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে ভোট বাক্সে। ২০০৭ সালে গোরক্ষপুর দাঙ্গায় তাঁকে প্রধান অভিযুক্ত করে প্রশাসন। তাঁকে গ্রেফতার করে ফৌজদারি মামলা রুজু করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় মামলা রয়েছে’।

আবার ২০০৭ সাল থেকেই প্রতিবার নির্বাচনের আগের মত তার বাহিনীর প্রার্থীকে বিজেপির টিকেট দেওয়া নিয়ে বিরোধ তিনি বিজেপিকে অস্বীকার করা পর্যন্ত গড়াত। যেটা একমাত্র মধ্যস্থতা করে দিতে আরএসএস পর্যায়ে যেতে হত। এবারের নির্বাচনেও যোগীর ‘বাহিনীর’ ১৬ জনকে বিজেপির প্রার্থী করার দাবি জানিয়েছিল; কিন্তু সভাপতি অমিত শাহ আপোস করেননি। এই নির্বাচনে জিতলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবে তা উহ্য রেখে নির্বাচন করেছিল মোদি।  ‘ফলে পরিচয়’ না করিয়ে মোদির নামে তাকে সামনে রেখে বিজেপি নির্বাচনে গিয়েছিল। নির্বাচনে বিপুল বিজয় দেখার পরে যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়। সাথে দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী করা হয় (দুজনই উত্তরপ্রদেশ বিজেপির নেতা, একজন উঁচু জাতের অন্যজন নিচু জাতের।) যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী বলে বিজেপির ঘোষণা আসায় সবচেয়ে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে মিডিয়ায়। ভারতের কনস্টিটিউশন আর রাজনীতির সবটা ‘হিন্দুত্বে’র হলেও তারা এতদিন অন্যকে সেকুলারিজমের সবক দিতে পারত। কিন্তু মোদি আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করায় মিডিয়ার অস্বস্তির কারণ অনুমান করা যায়। যেমন গতকাল আনন্দবাজার লিখছে, ‘ভোটে বিপুল জয়ের পরেই তাঁর (মোদির) আস্তিন থেকে বেরিয়ে এল হিন্দুত্বের আসল তাস। গেরুয়া বসনধারী যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরে মুখে যতই উন্নয়নের কথা বলুন না কেন, তাঁকে বাছাইয়ের পেছনে যে হিন্দুত্বের অঙ্কই কাজ করছে সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মোদী-অমিতরা’। অর্থাৎ আনন্দবাজারের চোখে ‘হিন্দুত্ব যদি আস্তিনের সাপই হয়’ তবে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার আগে কী মোদির আস্তিনে সাপ ছিল না? আনন্দবাজারই যোগী সম্পর্কে পুরাণ তথ্য এনে লিখছে, ওই বছরই (২০১৫ সালে) বারাণসীর একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেন, ‘যারা সূর্য নমস্কার করে না তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কিংবা সমুদ্রে ডুবিয়ে মারা উচিত। আর তা না হলে বাকি জীবনটা তাদের অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখা উচিত।’ অর্থাৎ যোগী যারা ভারতীয় মুসলমান বা খিস্ট্রান তাদের ধরে ধরে তিনি তাঁর ‘ঘর ওয়াপাসি’ মানে হিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে খায়েস করেন। তবে এবারের নির্বাচনের জনসভায় যোগীর আর এক মন্তব্য হলো- নির্বাচনী প্রচারে তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায় এলে শুধু কবরস্থানের উন্নতি হবে আর বিজেপি ক্ষমতায় এলে অনেক বেশি রামমন্দির হবে।’ সমাজবাদী পার্টি মানে যারা মূলত নীচু জাতের ‘যাদব’ আর মুসলমান কনস্টিটিউয়েন্সির রাজনৈতিক দল এবং এর আগে যারা সরকারে ছিল। তাদের উদ্দেশ্য করে বলছেন। কিন্তু কবরস্থানের সঙ্গে মন্দিরের তুলনা কী, কেমনে তা হয়? আর কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা শুধু মুসলমানের ব্যাপার তো নয়। সিটির একই মহল্লায় কবর দেওয়ার জায়গা না পেলে তা একই কমিউনিটিতে হওয়ার কারণে হিন্দু জীবন-যাপনকেও ব্যাহত করে। তাই নয় কী? ফলে এক কথায় যোগী গদ্গদে একটা ঘৃণা আছে বোঝা গেলেও তিনি এর সাফাইটা বলতে পারেননি।

এই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বিজেপির প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষক ছিলেন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী ভেঙ্কটেশ নাইডু। মুখ্যমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় তিনি বলেন, এটা নাকি এক বিজেপির জন্য এক ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’। ওয়াটারশেড কথার মানে হলো, যেখান থেকে সুনির্দিষ্ট করে চেনা যায় এমন পথ আলাদা হয়ে গেছে। তো নাইডু নিজে এর অর্থ করছেন এভাবে যে, এখন থেকে নাকি বিজেপি এই প্রথম ‘সাধারণ মানুষের দলে’ পরিণত হয়েছে। তারা উন্নয়নের পক্ষে এবং দুর্নীতি ও কালোটাকার বিরুদ্ধে পরিষ্কার রায় দিয়েছে’। কিন্তু কথা হলো আদিত্যনাথ এগুলো একটারও প্রতীক নন। তিনি হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক। এটা বিজেপিও জানে। বিজেপি আসলে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত উন্নয়ন পেছনে ফেলে হিন্দুত্বের রাজনীতি করে দাবড়াবে তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বা রায় হিসেবে দেখেছে নাইডুর বিজেপি।

ওদিকে আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় খুব দুঃখ ব্যাথা পেয়ে আছেন। তিনি এক সম্পাদকীয় লিখেছেন যার শিরোনাম হলো, ‘বহুত্ববাদী এই দেশের মেরুদণ্ডে হিমস্রোত এখন’। অর্থাৎ আগে যেন ভারত বহুত্ববাদি ছিল, এখন থেকে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার পর থেকে নেই। আমি যে এই প্রশ্নটা তুলেছি তা তিনি নিজে সাফাই দিয়ে বলছেন। যেমন পরে তিনি লিখছেন, ‘যোগী আদিত্যনাথ মানে বিতর্ক, অসহিষ্ণুতা ও মুসলিমবিদ্বেষ’ এই বক্তব্যটি তিনি নিজেও কোনো দিন খারিজ করেননি। বস্তুত এই ভাবমূর্তিটি সযত্নে লালন করে এসেছেন কয়েক দশক ধরে। এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন। এ বারের ভোটেও তাঁর কট্টর বক্তব্যের ঘোষণার ডেসিবেল বরং বাড়িয়েই গিয়েছেন এক পর্যায় থেকে আর এক পর্যায়ে। তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়ে পুরস্কার দিল দল’। অর্থাৎ তিনি নিজেই বলছেন, আদিত্যনাথ এগুলো অন্তত গত দশক ধরেই করে আসছেন। অঞ্জনই বলছেন, ‘এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন’। আসলে তিনি আদিত্যনাথের কাজগুলোকে ঠিক বন্ধ নয়, একটু ঢাকাঢুকা দিয়ে রাখতে চান এই আর কী? যাতে অস্বস্তি, মেরুদণ্ডে হিমশ্রোতের অস্বস্তিটা না লাগে! আসলে ভারতের কনস্টিটিউশনের প্রিএম্বেলের লেখার মতো সত্য সামনে আসতে দেওয়াই ভালো নয় কী!

গৌতম দাস : লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে

হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত-রাষ্ট্রকে বদলাবে কে
গৌতম দাস
০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬,রবিবার

http://wp.me/p1sCvy-1KF

ভারত রাষ্ট্রের ভিত্তি মূলত হিন্দুত্ব। এটা বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েরই অবস্থান; এটা তারা সঠিক মনে করেন, মেনে চলেন। বরং এর কোনো বিচ্যুতি ঘটছে মনে হলে একে অপরকে দোষারোপ করে। কেন করেন? কারণ তাদের মনে হয়, প্রায় ২৯টা ভিন্ন ভিন্ন রাজ্যের বিভিন্ন ধরনের ভিন্নতার মানুষের এত বিশাল জনসংখ্যার মানুষকে কী দিয়ে একত্রে ধরে রাখা হবে বা যাবে? তবে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা ও বাছবিচার ছাড়াই তাদের ধারণা ‘হিন্দুত্ব’ – এটাই সেই সুপার গ্লু যা তাদের সব আশঙ্কার সমাধান।

আসলেই কী রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে এমন একটা সুপার গ্লু – হিন্দুত্ত্বের বা কমন ধর্মীয়  ভিত্তি অথবা কমন ভাষার ভিত্তি  ইত্যাদি একটা না একটা ‘আইডেনটিটি’ এরকম একটা কিছু লাগেই? এমন ভাবনা থেকেই দুনিয়াতে আইডেনটিটির রাজনীতি শুরু হয়ে আছে। । ‘আইডেনটিটির রাজনীতি’ ছাড়া কী রাষ্ট্রগঠন অসম্ভব?  আমরা নিশ্চিত রাষ্ট্রচিন্তায় এদিকটা নিয়ে যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করা হয় নাই। অথচ আবার এই হিন্দুত্ত্বের ভিত্তির ভারত রাষ্ট্রের মূল কারিগর কংগ্রেস ও অন্যান্য ‘প্রগতিশীলদের’ চোখে পাকিস্তান – ইসলামের ভিত্তিতে রাষ্ট্রগঠন করে খুব খারাপ কাজ করেছে বলে তাদের অভিযোগ। অথচ সারকথা করে বললে, বাংলা ভাষার ভিত্তিতে আইন্ডেন্টিটি পলিটিক্সের উপর রাষ্ট্র গড়ে তুললে সেটা ভাল বা আদর্শ, ধর্মের (হিন্দুত্ত্ব বা মুসলমানিত্বের ভিত্তিতে আইন্ডেন্টিটি পলিটিক্সের উপর রাষ্ট্র গড়ে তুললে সেটা খুব খারাপ বা অগ্রহণযোগ্য এটা বলা বা ভাববার সুযোগ নাই।

সে যাক, ভারতের প্রধান দুই সর্বভারতীয় দল দল কংগ্রেস ও বিজেপি এরা এ জায়গায় ঐকমত্য। অন্যদের মধ্যে ‘বাস্তববাদীতার দোহাই দেয়া’ সিপিএম সেও ঐ দুই দলের মতো করে ভাবে ও মান্য করে যে ধন্বন্তরি ওষুধ বা সুপার গ্লু-এর নাম হিন্দুত্ব। কিন্তু কোনো দল প্রকাশ্যে মানে ফরমালি তা স্বীকার করে না। তবে অনানুষ্ঠানিকভাবে বলে, স্বীকার করে যুক্তি দেয়। তবে বলা না বলা, সেটাঅন্য জিনিস। ফলে এখান থেকেই আরো দুই খান কথা বলে তাদের বিভক্তি শুরু হতে দেখি আমরা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের ভিত্তি হিন্দুত্ব- কংগ্রেস ও বিজেপির এ ব্যাপারে একমত হয়ে এটা মেনে নেয়ার পরও প্রত্যক্ষভাবে হিন্দুত্ব ভিত্তির ভারত রাষ্ট্রের কথা বাইরে প্রকাশ বা স্বীকার করা ঠিক হবে কি না- এই প্রশ্নে কংগ্রেস ও বিজেপির ভিন্নতা শুরু। কংগ্রেস মনে করে, কৌশলী হওয়ার দরকার আছে। কথাটা সেকুলারিজমের ভেক ধরে বলতে হবে। বুঝতে বুঝাতে হবে হিন্দুত্ব কিন্তু মুখে বলতে হবে ‘সেকুলারিজম’। উপরে সেকুলারিজমের জামা গায়ে দিয়ে এর আড়ালে বসে মুখে সেকুলারিজম বললে হিন্দুত্বের এফেক্ট পাওয়া যাবে, আনা যাবে। এই হল কৌশল। এর বিপরীতে বিজেপি মনে করে, সেকুলারিজম- এটার আবার কী দরকার? হিন্দুত্বকে রাষ্ট্রভিত্তি হিসেবে মানতে পারলে বলতে পারব না কেন? বরং ‘বোকা’ হয়ে লাভ নেই। হিন্দুত্বের গর্বকে বুক উঁচা করে সামনে আনলে এই ‘আইডেন্টিটির রাজনীতি’ কংগ্রেসের ওপরে তাদেরকে একটা বাড়তি মাইলেজ দিবে। কারণ হিন্দু কনস্টিটুয়েন্সিতে এটা খুবই ফলদায়কভাবে মানুষের মনে সুড়সুড়ি লাগানোর ক্ষমতা রাখে। ভারতের সেকুলারিজম সত্যিই এমন এক তামাশার নাম।

২০১৪ সালের নির্বাচনে মোদির বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপির মূল দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের (আরএসএস)  গৃহীত ও নির্ধারিত এক কর্মসূচি ‘ঘর ওয়াপসি’ চালু করেছে। এমন কর্মসূচির পক্ষে লজিকটি হল, ভারতে হিন্দু ছাড়া অন্য ধর্মের যারাই আছে, তারা কোনো না কোনো সময়ে হিন্দু থেকেই ধর্মান্তরিত। অতএব, এই যুক্তিতে আরএসএস-বিজেপি তাদের ‘ওয়াপাস’- মানে ফিরিয়ে আনার প্রচার-প্রপাগান্ডার কর্মসূচি নিতে পারে, ফোর্স করতে পারে, বিজেপি সরকারের প্রটেকশনের আড়ালে দাঁড়িয়ে তাদের হয়রানি করতে পারে, পাবলিক নুইসেন্স করতে পারে, সব পারে। আর এতে এক কামে সব কাম হবে। হিন্দুত্বের জয়জয়কার হবে, ভোটের বাক্সও ভরে উঠবে। বাড়তি লাভ হল কংগ্রেসও ভয়ে সিটিয়ে কেঁচো হয়ে থাকবে। কারণ এতে কংগ্রেসকে বিজেপি খুব সহজে উভয় সঙ্কটের ক্যাচালে ফেলতে পেরেছে। কংগ্রেস ভেবে ভীত যে, ‘ঘর ওয়াপসির’ বিরোধিতা করতে গেলে কংগ্রেসঈ হিন্দুরা হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সির প্রভাবে বিগড়ে গিয়ে যদি কংগ্রেসকে ভোট না দেয়! এই ভয়ে কিছু না বলে দলটি চুপ থাকে।
আসলে বিজেপি এ জায়গায় স্মার্ট ও ‘সৎ’। সে হিন্দুত্বের রাষ্ট্র চায়, হিন্দুত্বের রাজনীতি করে এবং প্রকাশ্যে তা বলেও। আর স্মার্ট এ জন্য যে, সে বুঝে গেছে কংগ্রেসকে এভাবে উভয় সঙ্কটে ফেলে জব্দ করা সহজ। এর পরও মূল বিষয় এখানে কন্সটিটুয়েন্সি। কন্সটিটুয়েন্সি মানে- ভোটারদের ক্যাটেগরি বা গ্রুপ অথবা ভোটার এলাকা; যারা কোন কথা, কোন দাবি অথবা কোন ইস্যুর পক্ষের ভোটার- এক কথায় কোন ক্যাটেগরির ভোটদাতা, কোন ভোটারদের গ্রুপে একে ফেলা যায় এই অর্থে ‘ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি’। আগেই বলেছি- কংগ্রেস ও বিজেপি উভয়েই একমত যে, হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র থাকুক এবং থাকতেই হবে। এর পক্ষে তাদের কমন যুক্তি হল, এটা না হলে ভারতকে এক রাখা, একভাবে ধরে রাখার আর কোনো উপাদান বা আঠা-গ্লু নেই। কারণ রাষ্ট্র বলতে তারা একমাত্র এই আইডেন্টিটি-ভিত্তিক রাষ্ট্রই কল্পনা করতে সক্ষম। অন্য কোনো রাষ্ট্র হওয়া আদৌ সম্ভব কি না নেহরুর জমানা থেকেই এই পর্যন্ত এটা নিয়ে তাদের হোমওয়ার্ক বা পড়াশোনা আছে বলে জানা যায় না। এর বাইরে তাদের কল্পনা আগায় না, ভোঁতা করে রেখে দেয়া থাকে, তাই কাজ করে না। বরং আইডেন্টিটি-ভিত্তিক হিন্দুত্ব চিন্তার সুড়সুড়ি জাগানোর ক্ষমতা সীমাহীন। তাই সেটার প্রতি লোভে সবার চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। সারকথা দাঁড়াল ওপরের সেকুলার পর্দা সরিয়ে ফেললে কংগ্রেস ও বিজেপির ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি আসলে একই। আর এটাই হল সমস্যার গোড়া। কেন? কোন রাজ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে অথবা সাধারণভাবে বিজেপি যখন ‘ঘর ওয়াপসি’ ধরনের কর্মসূচি চালাতে নেমে পড়ে তখন কংগ্রেস এর কোনো বিরোধিতা করতে পারে না। কারণ ‘ঘর ওয়াপসি’ কর্মসূচি তো ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণার’ সাথে সামঞ্জস্যের দিক থেকে সবচেয়ে পারফেক্ট। আসলে কংগ্রেস মনে করেছিল বা বলা ভাল, নিজের সেকুলারিজম স্ট্রাটেজিতে নিজেকে সাজিয়েছিল এই মনে করে যে, যেকোনো হিন্দু বিশেষত শিক্ষিত হিন্দু বুঝবে তার হিন্দুত্ব সেকুলারিজমের মোড়কে ‘ব্রান্ড করে’ প্রকাশ করাই সবচেয়ে লাভের। কারণ এতে সরাসরি হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিকে তো পাওয়াই যাবে। সেই সাথে সেকুলারিজমের জামা পরা ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি আর অহিন্দু (মুসলমান বা ক্রিশ্চানসহ সবটা) ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিকেও কাভার করা যাবে- কংগ্রেস অনেক আগে থেকেই এসব অনুমানের ওপর সাজানো দল। কিন্তু বিজেপির ঘর ‘ওয়াপসি কর্মসূচি’র সামনে কিছু বলতে না পারায়, মুখ বন্ধ রাখতে হওয়ায় কংগ্রেসের কাম্য, তিন ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিই কংগ্রেসের ওপর বেজার হচ্ছে। তারা কংগ্রেসকে অকেজো মনে করছে। কারণ এই তিনের প্রথমটা, সরাসরি হিন্দুত্ব ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি- এরা মনে করে কংগ্রেসের তুলনায় বিজেপিই ভালো ও সঠিক। সেকুলারিজমের জামা পরা ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিতে যারা পড়ে, এদের মধ্যে পশ্চিমা জীবনকে আদর্শ মানা আধুনিক ভোটাররা এমনিতেই গণমানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, এরা নিজের ‘ক্লাস সচেতনতার’ কারণেও নিজেই আলাদা ও বিশেষ হয়ে থাকতে চায়। এরা ঘর ‘ওয়াপসি’র মতো কর্মসূচির সামনে নিজেই অসহায় মার্জিনালাইজড বোধ করে। আর তৃতীয়, অহিন্দু (মুসলমান বা ক্রিশ্চানসহ সবটা) ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি- ঘর ওয়াপসি দেখে এরা হতাশ হয়ে কংগ্রেসকেই অভিশাপ দিতে থাকে যে, কংগ্রেস ‘সেকুলারিজমে’ সিরিয়াস না। এবার  গত মে মাসে সদ্যসমাপ্ত আসামের নির্বাচনের এক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, হিন্দুত্বের ভোটাররা কংগ্রেস ছেড়ে কিভাবে বিজেপিমুখী হয়েছে।
তবে এর ব্যতিক্রম কী হতে পারে তা বোঝার জন্য কাছাকাছি সবচেয়ে ভালো উদাহরণ সম্ভবত মমতা বা তাঁর তৃণমূল কংগ্রেস। বিশেষত ঐ একই সময় গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচনে তাঁর দলের বিশাল বিজয়ের পরিপ্রেক্ষিতে। যদি খোজ করা হয় যে, ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণা’র প্রশ্নে মমতার অবস্থান কী? মমতা তত্ত্ব জানেন না, তত্ত্ব করেন না, তত্ত্বের বড়াইও তাঁর নেই। মমতাকে সম্ভবত মাঠ অথবা  ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট’ দেখার ভিত্তিতে চলা পপুলার রাজনীতিক বলা সঠিক হবে। ফলে তাকে বুঝতে হবে তার বাস্তব তৎপরতা দিয়ে। প্রথমত, তিনিই দেখালেন সেকুলারিজম নামের ছলনা না করেও প্রায় ৩০ শতাংশ মুসলমান ভোটার কন্সটিটুয়েন্সিরও নেতা হওয়া সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গে মোট মুসলমান ভোটার মোট ভোটারের প্রায় ৩০%। ৩-৪% বাদ এরা সবাই আজ মমতার পিছনে। এমনকি মুসলীম লীগ অথবা সিপিএমে যারা মুসলমান নেতা ছিলেন তাঁরা গত নির্বাচনে মমতার দলের টিকিটে ভোটে দাড়িয়েছেন এবং জিতেছেন। তবু মমতা আজ পর্যন্ত কোথাও বলেননি যা তিনি করছেন তিনি সেটাকে সেকুলারিজম নাম দেয়ার কোনো ইচ্ছা করেন অথবা একাজকে সেকুলার বলে ডাকার দরকার আছে। গত রাজ্য নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের দিন নিজ দল আবার বিজয়ী হয়েছে জানার পরে মিডিয়া মন্তব্যের কোথাও এই বিজয়কে তিনি সেকুলারিজমের জয় বলার দরকার মনে করেননি। বরং বলেছেন, বিজেপি হিন্দুত্বের কথা তুলে সব কিছুকে ভাগ-বিভক্ত করে এটা তার অপছন্দ। আবার বিগত ২০১৪ সালে বর্ধমানে কথিত জঙ্গি বোমা ইস্যুতে মুসলমানবিদ্বেষী ও তৃণমূল বিরোধী যে মিথ্যা জঙ্গী-আবহাওয়া তৈরি করা হয়েছিল, বিজেপির অমিত শাহ তা করেছিলেন আর লজ্জার মাথা খেয়ে কংগ্রেস ও সিপিএম এতে তাল দিয়ে নিজের রুটি সেঁকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ২০১৬ সালের রাজ্য নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় লাভ করেও ফলাফল প্রকাশের দিন তবুও তৃণমূল দল অথবা পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটার কন্সটিটুয়েন্সি সংযত আচরণ করেছে। বলেনি যে, মুসলমানেরা ‘এবার দেখিয়ে দিয়েছে’। ‘বর্ধমান ঘটনার প্রতিশোধ নিয়েছে’- এ ধরনের কোন ইঙ্গিতও প্রকাশ করেনি। মমতার দল ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতি বছর ২১ জুলাই দলের ১২ কর্মী হত্যার বিরুদ্ধে ‘শহীদ দিবস’ পালন করে থাকে। এবারের ২১ জুলাই দলীয় কর্মসূচিতে জনসভায় দেয়া মমতার বক্তৃতাকে মিডিয়া শিরোনাম দিয়েছিল, ‘ছাগল মুরগি খেলে দোষ নেই। গরু খেলেই দোষ!”। ” কেউ নিরামিষ খান। তাই বলে যারা আমিষ খান, তাদের আক্রমণ করবেন?”। ” শাড়ি-ধুতিতে দোষ নেই। যত অপরাধ সালোয়ার-কামিজ আর লুঙ্গিতে?” এ ছাড়া নাম না ধরেই বিজেপির বিশেষায়িত দল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক দলের (আরএসএস) সম্পর্কেও কথা বলেন মমতা। তিনি বলেন, ‘ভারতবাসী কী পরবে, কী খাবে- সেগুলো ঠিক করে দেবে একদল লোক?”। এসব বক্তব্যের ভেতর দিয়ে ‘হিন্দুত্ব ভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র ধারণা’র বিরুদ্ধে মমতার আপত্তি বুঝে নেয়া যায়। তবে এটা মমতাকে আদর্শ বলে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হচ্ছে এমন মনে করলে ভুল হবে। মমতার রাজনৈতিক ঝোঁকের ভেতরে ‘রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে হতে হবে’ এমন চিন্তার বাইরে থাকার চেষ্টা আছে। এতটুকুই বলা হচ্ছে। তবে তা শেষে কোথায় যাবে তা এখনই বলতে চাওয়া ভুল হবে।
ইতোমধ্যে মোদির বিজেপি ‘ঘর ওয়াপাসির’ পরে – গরু খাওয়া, জবাই ইত্যাদি নিয়ে আরেক তুলকালাম ‘গোরক্ষা কর্মসূচি’ চালিয়ে যাচ্ছিল। এখনও পর্যন্ত গরু খাওয়া, জবাই করা যাবে না – এটা কেন্দ্র বা মোদি সরকারের কোনো আইন নয়। কেবল মহারাষ্ট্রসহ আরো কিছু রাজ্যের আইনে তা সীমাবদ্ধ। অর্থাৎ এটা স্থানীয় আইন; বাকি আর রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য তা পালনীয় নয়। কিন্তু মোদি সরকার বা খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ব্যাপারে সক্রিয় হয়েছে। আমাদের বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে তিনি বিএসএফকে ‘গোরক্ষার’ পক্ষে উদ্বুদ্ধ করে গেছেন। যেসব রাজ্যে গোরক্ষার এমন আইন নেই, সেখানেও তা ঠেকাতে বিজেপি কর্মীরা মাঠে ‘গোরক্ষক’ সেজে নেমে জনগণকে নাজেহাল করছে। মধ্যপ্রদেশে দুই মহিলাকে তারা মাংস বহন করছিলেন এই অজুহাতে পুলিশের সামনেই তাদেরকে নির্যাতন-নাজেহাল করেছে। দিল্লির শহরতলির ভেতর চলাচলকারী ট্রেনে এমনকি ডিম – তা হাতে নিয়ে কোনো যাত্রী তা বহন করতে পারবেন কি না এটাও এখন ট্রেন কোম্পানি ও পুলিশের কাছে ইস্যু। তারা নজরদরি বসিয়েছে। অথচ ভারতের কেন্দ্রীয় মানবাধিকার কমিশন, নির্বাচন কমিশন অথবা উচ্চ আদালতে এসব হিন্দুত্বের দলের বিরুদ্ধে তাদের সেক্টোরিয়ান আচরণ এবং সম্প্রদায়গত বিভেদ বিদ্বেষ ঘৃণা ছড়ানোর বিরুদ্ধে েকশন নিবার সুযোগ আছে তা করছে না, কেউ সেখানে অভিযোগ করারও সাহস দেখাচ্ছে না। মানে হিন্দুত্বভিত্তিক ভারত রাষ্ট্র এতই সেকুলার যে, অভিযোগ করার কাউকে আমরা দেখি না। উলটা দিকে বিজেপিকে থামানোর কেউ নেই। এটা প্রমাণ করে ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি কত বেপরোয়া ও ডমিনেটিং। তাহলে?

হঠাৎ গত ৬ আগস্ট থেকে কিছু উল্টা হাওয়া বইতে দেখা গেছে। খোদ নরেন্দ্র মোদি এ দিন নিজেই নিজের দলীয় ‘গোরক্ষকের’ বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। তাদেরকে ‘সমাজবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘এরা বেআইনি কাজকারবারে জড়িত!’ “নিজেদের ‘কালো ধান্ধা’ ধামাচাপা দিতেই গোরক্ষকের মুখোশ পরে নতুন ব্যবসা শুরু করেছে।” মোদির কথায়, ‘এসব দেখে আমার প্রচণ্ড রাগ হয়।’ — অবাক করা হঠাৎ এই গেম চেঞ্জ? এটা কেন? ভারতের মিডিয়া আসন্ন উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনকে এর পেছনের কারণ বলে ব্যাখ্যা করছে। ওখানে ভারতের প্রকট জাতবর্ণের বিভক্তিতে ডুবে থাকা সমাজের দলিত- চর্মকার, ঋষি, কসাই, মাংস ব্যবসায়ী, গরু ব্যবসায়ী ইত্যাদিরা হল উত্তর প্রদেশের এক বড় সমাজ; আসন্ন ভোটে তাদের মন পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এদের ভোট ছাড়া নির্বাচন বৈতরণী পার হওয়া যাবে না টের পেয়েই নাকি মোদীর এমন হার্ট বদল। উত্তর প্রদেশ রাজ্যের জনবিন্যাস ও গঠনপ্রকৃতির দিক থেকে (জাতপাতের ধরনসহ) সাথে লাগোয়া বিহার রাজ্যের অনেক মিল। আর গত বছরের শেষে নভেম্বর ২০১৫, বিহারের নির্বাচনের সময়ও একই ভাবে ‘গোরক্ষা’ ইস্যু বিজেপি তুলেছিল ও চলছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনে বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটে। বিগত ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিজেপির জন্য সবচেয়ে বড় ধসের পরাজয় সেটা। ফলে সেই  আশঙ্কা মোদিকে স্পর্শ করেছে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে, এই নির্বাচনে ভোট-রাজনীতিতে ভারত রাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তিকে স্থায়ীভাবে না হলেও সাময়িকভা্েব দুর্বল কতে নির্বাচন করতে চাইছে বিজেপি। তবে আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে উত্তর প্রদেশের নির্বাচনে বিজেপির হার-জিত ভারতে বিজেপি শাসনের ভবিষ্যৎ নির্ধারক উপাদান হয়ে দাঁড়াতে পারে। অনেকেই বলছেন, উত্তর প্রদেশের হার মোদির সরকারের আগামীতে ২০১৯ সালে পরেরবার সরকারে না আসার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখা এর আগে গত ১৪ আগষ্ট ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (১৫ আগষ্ট প্রিন্টে) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও পরিবর্তন সংযোজন ও এডিট করে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]