জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবে

জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবে

গৌতম দাস

 ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2T2

সবার মাতৃভাষা রক্ষার পক্ষ নিতে হবে তবে, জাতিরাষ্ট্র ধারণা ত্যাগ করতে হবেঃ
গত শুক্রবার ছিল একুশে ফেব্রুয়ারি। প্রত্যেক জনগোষ্ঠীই নিজ উন্মেষ ও বিকাশের জন্য নিজ মাতৃভাষা চর্চার সুযোগ অবাধ ও  নিশ্চিত দেখতে চায়; এটা তাঁর অধিকার আর এই অধিকার রক্ষা করা তাই আমাদের সকলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একুশে ফেব্রুয়ারির সারকথা এটাই। এই দিনটা তাই আমাদের মাতৃভাষা চর্চার অধিকার রক্ষার প্রশ্নে এক স্মরণীয় দিন। উনিশ শ’ সাতচল্লিশ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র জন্ম হওয়ার প্রাক্কালে সে সময় থেকেই হবু পাকিস্তানে, মূলত পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের দিক থেক্‌ উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল। এতে পুবের ভাগ্য যে পশ্চিমের আধিপত্যের তলায় চাপা পড়ে যাবে – বুঝে না বুঝে  “মুসলিম জাতিবাদের” উচ্ছ্বাসে পড়ে সেটা আমল করতে অনেকের মধ্যেই  অনীহা দেখা দিতে শুরু করেছিল। আর তা থেকেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম বেসুরো হতে শুরু হয়েছিল। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে আমাদের মাতৃভাষা চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে টের পেয়ে আমাদের আপত্তি প্রতিবাদ লড়াইয়ের শুরু এখান থেকেই। আর এখান থেকেই আস্তে আস্তে এক ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের রাষ্ট্রের দিকে চলে যাই আমরা।

তবে একালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন ও স্মরণ করতে আমাদের দেশের সব ধরনের রাজনৈতিক ধারাকেই কম-বেশি এগিয়ে আসতে দেখা যায়। তবুও এর মধ্যে কোথাও জানি একটা ভাগাভাগি বজায় রয়েই গেছে টের পাওয়া যায়। যদিও সব পক্ষ বা ধারার মধ্যে কমন বুঝাবুঝি ঐক্য দেখা যায় তা হল – যেকোন জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চার ‘অধিকার’ সমুন্নত রাখতে হবে। পালনের এই ধারার বাইরে অন্য দিকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পালন ও স্মরণ অন্য আর ধারাটা হল, ভাষাভিত্তিক জাতিবাদের দিক থেকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে তুলে ধরার চেষ্টা।

কারো মাতৃভাষা চর্চার অধিকারকে বাধা দেয়া বা রুদ্ধ করা হয়ে যায়- এটা করে কারা? কেন আসে এরা – এটা বুঝা খুব গুরুত্বপুর্ণ। আসলে একই সমাজ বা রাষ্ট্রের মধ্যেকার এথনিক-বিভক্তির কারণে ভিন্নতা বা পড়শি জনগোষ্ঠির উপর আধিপত্য করার আগ্রহ বা সুযোগ নিতে চাওয়া থেকেই অন্যের মাতৃভাষা চর্চার অধিকারকে বাধা দেয়া বা রুদ্ধ করা শুরু হয়।  যদিও শুরুর দিকে “ঐক্য রক্ষার স্বার্থে” এই আধিপত্য বিস্তার করা হচ্ছে এমন কথায় অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে স্বেচ্ছায় না বুঝে এই আধিপত্য মেনে নেয়। যেমন আমাদের ভিতর অনেককেই পাওয়া যাবে যারা মনে করে দুনিয়ায় সব মুসলমানের ভাষা আরবী হওয়া উচিত বা না হলেও আরবীর অধীনে সবার আসা উচিত। অথবা এমন হলে খুব ভাল হত এমন মনে করে থাকে।  মানে, ভিন্ন রেস [race] অর্থে জাতি বা ভিন্ন এথনিক [ethnic] গোষ্ঠি অর্থেও জাতি – এমন নির্বিশেষে দুনিয়ার সব ভুগোলের মুসলমানকে আরবী ভাষা ও সংস্কৃতি গ্রহণ করতে হবে। একথা সত্য যে আরবী ভাষা-সংস্কৃতির অনেক কিছু থেকেই ইসলামকে আলাদা করা মুসকিল। তবু এমন দাবি বা ভাবনার প্রতি সমর্থন তৈরি হয় সাধারণত ইসলামের প্রতি ভালবাসা ও সৎ আবেগ থেকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় বাস্তবে এমন সম্ভবত দেখা যাবে না। বরং উলটা পরিস্থিতিই তৈরি করবে।  আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে ব্যাপারটা অনারব বা আরব নয় যারা তাদের উপর আরবী ভাষাভাষীদের এক দুর্বিষহ অত্যাচার, প্রবল এক আধিপত্য, সব সুযোগ-সুবিধা আগে আরবেরা পাবে ইত্যাদি এমন এক চরম অবস্থা তৈরি করে তা অপ্রয়োজনীয় শত্রুতা বা খুনোখুনিতে শেষ হবে। এর মানে কী আমি বলতে চাচ্ছি যে দুনিয়া সব ধারণের মানুষের মধ্যে নুন্যতম কোন ঐক্য রচনা করা বা কাছাকাছি আসা সম্ভবই না। অবশ্যই সম্ভব, তবে একটা পর্যায়ে যখন আমরা আমাদের অপরের রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠ রক্ষা করা, যেমন অন্যের মাতৃভাষা রক্ষা করার দায়কর্তব্য – আমি ভিন্ন রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠের হলেও বুঝে যাব এবং রক্ষা করব।  যদিও আর সবার আগে মনে রাখতে হবে কারও মাতৃভাষায় হাত দেওয়া যায় না, যাবে না। আসলে  কারও এথনিক বৈশিষ্টে হাত লাগানো বা চাপিয়ে রাখা সম্ভব নয়। আর এটা অপরাধ হবে সেদিকটা তো আছেই। তাই এই ভুল এড়িয়ে চলতে হবে। মাতৃভাষা মানে মা যে ভাষায় বাচ্চাকে প্রথম কথা শিখায়, কমিউনিকেশন করে। যা বলছিলাম এমন বুঝাবুঝি জাগা সম্ভব হয় এমন সহায়ক  সমাজ ও রাষ্ট্র যা আধিপত্যকে রুখে দেয় তা আগে হাজির থাকতে হবে। অবশ্য দুনিয়ার সব ভাষা আর রেস বা এথনিক অর্থে জাতি- বৈশিষ্ঠ সবই আল্লাহ সৃষ্টি – এভাবে থিওলজিক্যাল অর্থেও ব্যাপারটা বুঝতে পারি। ফলে একটা ভাষা অন্যটার চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা বা চাপিয়ে দেয়া একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।
এতসব দিক চিন্তা না করেই সরল মনে ও বিশ্বাসে আমরা অনেকেই এমন সমর্থন দিয়ে ফেলব কারণ তাতে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য বাড়বে এমন একটা কিছু চিন্তা করে। অনেকে এটাকে ‘উম্মার শুরু’ বলে ভুলে অতি উতসাহও দেখিয়ে ফেলতে পারে। কিন্তু সবকিছুই শেষে অন্যের আধিপত্য মোকাবিলাতেই আমাদের জীবন কাটবে এমন অবস্থাতেই পৌছাবে।
উপরে যেটাকে আধিপত্য বলছি এটাই অন্যের উপনিবেশ বা কলোনি দখলে পড়ে যাওয়া বলতে আমরা যা বুঝি সেই উপনিবেশ ধারণারই ছোট রূপ। মানে আমার উপর কারও বড় ও ব্যাপক আধিপত্য ছেয়ে বসা এটাই তার কলোনি বা উপনিবেশ হয়ে যাওয়া। যদিও শেষ বিচারে কারও আধিপত্যের তলে চাপা পড়ে যাওয়া এই পুরা ব্যাপারটাই ‘জাতি’ চিন্তার বা জাতিরাষ্ট্র চিন্তার সমস্যাজাত। সে কোন এক কল্পিত জাতির স্বার্থে আমার উপরে চেপে বসেছে  এমন সাফাই সেখানে থাকবেই।  যেমন মুসলিম জাতিবাদের স্বার্থে, ইসলামের স্বার্থে  – এই জাতীয় স্বার্থে আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের তলে চাপা পড়ে যাওয়া উচিত – এই ছিল পাকিস্তান জাতিরাষ্ট্র চিন্তার সপক্ষে সাফাই।  অর্থাৎ ব্যাপারটা আসলে ‘জাতিরাষ্ট্র’ চিন্তা যাকে অনেক আমরা ‘নেশন-স্টেট’ বলে বুঝি- এই বুঝ থেকে উদ্ভুত সমস্যা।

এই নেশন [nation] বা জাতি ধারণার সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটা হল এটা অপর জনগোষ্ঠীর ওপর নিজ আধিপত্য বিস্তার ও কায়েমের হাতিয়ার হয়ে যায়। এই আধিপত্য কায়েমের বড় ও প্রবল ধারণাটাই হল অন্য কারও ঘাড়ে উপনিবেশি-কর্তা হয়ে চড়ে বসা অথবা নিজের ঘাড়ে কারও উপনিবেশত্ব কায়েম হতে দেখা।

আধুনিক রাষ্ট্র এই ফেনোমেনার শুরু
আধুনিক রাষ্ট্রের জন্ম এই ফেনোমেনা দুনিয়ায় এসেছিল মোটাদাগে বললে ১৬৫০ সালের দিকে। আধুনিক রাষ্ট্র মানে, মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রের কথা বলছি। অর্থাৎ মনার্কি বা রাজতন্ত্রের শাসনের কবল থেকে বের হতে গিয়ে যে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা বা শাসন কাঠামো ও ব্যবস্থা দুনিয়ায় কায়েম হতে শুরু করেছিল। কারণ, রাজতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অগ্রহণযোগ্য দিক ছিল – রাজতন্ত্র বলতে পারে না কে তাকে ক্ষমতা দিয়েছে বা তার ক্ষমতার উৎস কী?
অনেকে অবশ্যই এসব প্রশ্নের অস্বস্তি কাটাতে সমাজের কিছু প্রভাবশালী এলিট তাদের পছন্দের বেছে নেওয়া শাসনকর্তা – এই অর্থে কোন রাজাকে গ্রহণীয় মনে করে বসে। মনকে প্রবোধ দেয়। এই প্রবোধ সম্ভবত স্বীকার করতে চায় না যে আসলে  এগুলোও আরেক ফ্যাকড়ার রাজতন্ত্র মাত্র। কোণ রাজতন্ত্রকে চিনবার সবচেয়ে সহজ চিহ্ন হল এগুলো সার্বজনীনের পছন্দ বা অনুমোদনে তৈরি হয় না, সমাজের সকলে তাকে নির্বাচিত করে না। একটা খুবই ক্ষুদ্র কিন্তু অবস্থাপন্ন প্রভাবশালী ক্ষমতাবান গোষ্ঠি এই ‘শাসনকর্তা’ খাড়া করে থাকে।  এছাড়া এই শাসনকর্তাকে যে নামেই ডাকা হোক না কেন এদের আরেক প্রধান লক্ষণ চিহ্ন হল কিছুদিনের মধ্যেই এটা একটা ডায়নেস্টি ব্যবস্থা হয়ে যাবে। ডায়নেস্টি – মানে রাজার (শাসকের) ছেলে রাজা হবে।

ফিরে যাই মুলকথায় – ক্ষমতার উতস কী? কে দিয়েছে ক্ষমতা? এখানে যদি মেনে নেই যে রাজতন্ত্রে শাসন ক্ষমতার উৎস ‘গায়ের জোর’ মানে, রাজার নিজের বলপ্রয়োগের সক্ষমতাই রাজার ক্ষমতার উৎস, সে ক্ষেত্রে এর অর্থ হবে তাহলে রাজাও অন্য কারও যে রাজার উপর আরও বেশি বলপ্রয়োগে সক্ষমতা রাখে তার হাতে ক্ষমতাচ্যুত হবে ও মারা পড়বে এবং এ কথাটাও গ্রহণযোগ্য হয়ে যাবে মানে, এটা জায়েজ তা মানতে হয়।   অর্থাৎ এখানে এসে দেখা যাচ্ছে  ক্ষমতাকে ন্যায়-অন্যায় বা ইনসাফের প্রশ্ন মোকাবেলার সামনে পড়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি সামলাতে সেকালে উপায় না দেখে রাজা জনসমর্থনকে  ক্ষমতার ন্যায়-অন্যায় ভিত্তি বলে খাড়া করতে চায়। যেন যে রাজার পক্ষে ‘জনসমর্থন’ আছে তার সেই ক্ষমতাটা জায়েজ মনে করা হবে। যদিও বেশির ভাগ রাজাই নিজ ক্ষমতার উতস ঐশ্বরিক বা আল্লাহ দিয়েছে ধরণের কথা নিম্নস্বরে বলে চালানোর চেষ্টা করেছে। তবে  ‘জনসমর্থন’ এর কথা যেটা বলছিলাম, এর যুগটা কম লম্বা নয়। আর এখান থেকে ইংরাজি করোনেশন [Coronation] বা বাংলায় রাজ্যভিষেক বা রাজার ক্ষমতার অভিষেক বা পাবলিক অনুমোদন এর ধারণা হাজির হয়েছিল দেখতে পাই।
কিন্তু সেখান থেকে  বিস্তারে আরও নতুন প্রশ্ন উঠেছিল যে, যদি গণসমর্থনই ক্ষমতার ন্যায্যতার ভিত্তি হয়ে থাকে তাহলে কে রাজা হবে বা কার শাসন-ক্ষমতাকে মেনে নেয়া হবে, অনুমোদিত হবে সেটার সবকিছু ‘পাবলিকই’ ঠিক করে দেক। আর এখান থেকেই রাষ্ট্রক্ষমতার উৎস জনগণ বা নাগরিক। জনগণ সব ক্ষমতার উৎস। এবং জনগণই সেই ক্ষমতা ডেলিগেট [delegate] করে দিবে। মানে, সাময়িক হস্তান্তরিত করতে এক শাসক নির্বাচন করে তার হাতে দিবে- এসব ধারণা বিস্তার লাভ করা শুরু হয়েছিল। যদিও সেটা আরো অনেক কিছুর পরে হয়েছিল। কিভাবে? না, রিপ্রেজেন্টেশন [Representation] বা জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে নির্বাচিতের হাতে সাময়িকভাবে (পরের নির্বাচন পর্যন্ত) তাঁর হাতে ক্ষমতা তুলে দেবে এসব দিকে ধারণা বিস্তার লাভ করেছিল। এই হল ক্ষমতার ন্যায়-অন্যায় ইনসাফের কার্যকারিতা দিয়ে পাওয়া ক্ষমতা ও এর বৈধতার সমাধান। এক কথায় এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্রক্ষমতা, বাংলায় আমরা বলি – গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ও এর ক্ষমতা ধারণা। ফলে স্বভাবতই এখানে রাষ্ট্রক্ষমতার আর কোনও চোরা-ক্ষমতা নয়, বরং এক সুবিন্যস্ত ও স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দেয়া ডিফাইনড [Defined] ক্ষমতা বা নিষ্কলঙ্ক ক্ষমতা। তবে এই অভিজ্ঞতাগুলো মূলত ইউরোপের ভূখণ্ডে বিকশিত বা পরবর্তিতে তা ফেডারেল রিপাবলিক (১৭৭৬) আমেরিকা্তেও। আর তা থেকে দুনিয়াব্যাপী ব্যাপক রাষ্ট্ররূপগুলোতে এটাই কম-বেশি অনুসরণ করতে দেখা যায়। যেমন নয়া চীনে এসে, চীনের ভাষায় এটা ‘পিউপিলস রিপাবলিক’ [People’s Republic]। এমনকি লেনিনের রাশিয়া তারা নিজেদের রাষ্ট্রকে ভিন্ন দাবি করলেও সোভিয়েত রাষ্ট্র নিজেকে এক ‘রিপাবলিক’ রাষ্ট্র বলেই মেনেছে।

কিন্তু তবু সব সমস্যা মিটে নাই। রিপাবলিক রাষ্ট্রের সাধারণ রেওয়াজ ও রিচুয়াল দাঁড়িয়ে গিয়েছিল যে নির্বাচনের দিন থেকে শপথের দিন পর্যন্ত এখানে  ‘গণক্ষমতা’ তৈরির এক প্রক্রিয়া চলে থাকে। এই লক্ষ্যে প্রতিনিধি নির্বাচন ও সাময়িক ক্ষমতা হস্তাস্তর সম্পন্ন করে ক্ষমতার অভিষেক ঘটিয়ে নেয়া অবধি- এই সময়কালটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু খেয়াল করেন আমরা এখন দাঁড়িয়ে গেছি নির্বাচনেরও আগের ‘এক নিশীথে’। আর চার দিকে হা-হুতাশে।

কলোনি দখল আর জাতিরাষ্ট্রের হাত ধরাধরিঃ
রাজতন্ত্র ভেঙে রিপাবলিক বা গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র ও ক্ষমতা তৈরির রেওয়াজ দুনিয়ায় মোটাদাগে চালু হতে দেখা গেছিল ১৬৫০ সালের দিকে; কিন্তু তাতে এর পরেও বড় বিপথগামিতা ঘটেছে, দেখা যায়। মানে চোরাবালিতে পা আটকে যাওয়া বা ভুল রাস্তায় চলে যাওয়া আছে আমরা দেখি। আর এরই নাম হল , নেশন-স্টেট বা জাতিরাষ্ট্র ধারণা। মূলত ‘জাতি’ ধারণাটাই সমস্যার, এটা এক নষ্টা ধারণা হিসেবে হাজির হয়েছিল। রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণার প্রতিশ্রুতি ছিল বা হওয়ার কথা ছিল যে জনগণের সব অংশকেই অন্তর্ভুক্ত করে এখানে এক ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি” নির্মাণ করা হবে। রাষ্ট্রগঠন বা Constitute শব্দের অরিজিনাল অর্থ ছিল এটাই। তাই এটাই আসল রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠন হওয়ার কথা। কিন্তু এটা বিপথে চলে যায়। গিয়ে হয়ে যায় জাতি নির্মাণ বা ‘জাতিগঠন’[Nation State]। আর এতে ‘রাজনৈতিক কমিউনিটি’ এভাবে রাষ্ট্র গঠনের ধারণাটাই হারিয়ে যায়।

খেয়াল রাখা দরকার ইউরোপে যখন রিপাবলিক রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা বাস্তবায়নের নানা উদ্যোগ কসরত চলছে ঠিক একই সময়ে প্যারালাল আর এক  ফেনোমেনার উত্থানের যুগ সেটা। কলোনি দখলের যুগ সেটা। তাই একই সাথে দুনিয়াতে ব্যাপকভাবে ‘কলোনি দখলের’ শুরু হয়েছিল সেকালে। এটা আরো সম্ভব হয়েছিল সূক্ষ্মমাত্রা [Precision] ও গুণাগুণের স্টিলের আবিষ্কার ও ব্যবহার আর সাথে বারুদ অস্ত্র কম্পাস এসব মিলিয়ে  ব্যাপারটা এক বড় যুদ্ধজাহাজ তৈরিতে বিনিয়োগ করার সুযোগ হিসাবে হাজির হয়েছিল। প্রধান বিনিয়োগের আকর্ষণ হয়ে উঠেছিল যুদ্ধজাহাজ ব্যবসা। যুদ্ধজাহাজ কথার আসল মানে,, পাল তুলে বেরিয়ে পড়া কলোনি দখল ও লুটের কাজে। একাজেরই  এক মডেল ধরণ হল – একেকটা “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি” খুলে বসা।  তবে ব্যাপারটা শুধু জাহাজ-বিজ্ঞানের উন্নতি বা বিনিয়োগ ব্যবসার স্বর্ণযুগের নয় বা শুধু তা দিয়ে ঘটেনি। এসবই হতে পেরেছিল এর সাথেই সবচেয়ে নির্ধারক ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল এক ভাবাদর্শ বা আইডিয়া। সেটি হলো “জাতি” ধারণা- এর যোগ ঘটা। ব্যাপারটা ইউরোপের যার যার দেশ-রাষ্ট্রের ব্যক্তিমালিক কোম্পানির জাহাজে বিনিয়োগের ব্যবসা হিসেবে তা সে ব্রিটিশ, ফরাসি বা ডাচ ইত্যাদি এরা নিজের একেকটা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুলেছিল। আর এশিয়া-আফ্রিকা-ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে কলোনি দখলে ঝাঁপিয়ে পড়া ধরনের হয়ে ঘটেছিলও। কিন্তু সাথে আরো কিছু ছিল- তা হলো কলোনি দখলে প্রতিযোগিতা। একে অপরের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া। কিন্তু এরই সাথে ঘটা আরেক বড় ঘটনা ছিল – কোম্পানিগুলো নিজস্ব একান্ত স্বার্থ আর লাভালাভের এই প্রতিযোগিতাকে যেন নিজেদের নিজ নিজ দেশ ও রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে মিথ্যা হলেও তা দেখাতে শুরু করেছিল। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলোনি দখল প্রতিযোগিতায় ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চেয়ে কতটা বেশি দখল সম্পন্ন করতে পেরেছে – যেন এটা হয়ে যায় কোম্পানিওগুলোর একান্ত বিনিয়োগ স্বার্থ নয়, তা নিজ নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ। এই মিথ্যা বয়ান ও তা উপস্থাপনটাই সব কিছু বদলে দিয়েছিল। আর তা করা গিয়েছিল এক ‘জাতি’ ধারণা দিয়ে, দেশ-রাষ্ট্রকে একটা জাতিরাষ্ট্র যেমন, তা এটা ‘জাতীয় স্বার্থ’ এ ধরনের বুলি দিয়ে। এভাবে কোম্পানির স্বার্থ হয়ে যায় কথিত ‘জাতীয় স্বার্থ’। এতে অন্যের দেশকে কলোনি দখলের কাজ এটা যেন আর কোম্পানিগুলোর স্বার্থ নয়- ব্রিটিশ বা ডাচ ‘জাতীয় স্বার্থ’ হয়ে উঠেছিল।
আর তা থেকেই কলোনি দখল আর কোনো ‘অন্যায়’ বা অপরাধ কাজ নয় বরং ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোর নিজ নিজ কথিত “জাতীয় স্বার্থ” হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তামাশার দিকটা হল, দেশের অভ্যন্তরে যে রাষ্ট্র নিজের জন্য একটা রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়াকে নিজের কাজকর্তব্য মনে করে, নিজ দেশের বাইরে সেই রাষ্ট্রই আবার অন্য দেশ-রাষ্ট্রকে কলোনি দখল করে নেয়াকে জায়েজ মনে করেছিল কিভাবে? এর জবাব কারো কাছে ছিল না। তবে এখান থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় যেন নিজেরা একেকটা জাতি, আর তাদের কথিত “জাতীয় স্বার্থ” হল অন্য দেশ-রাষ্ট্রকে কলোনি দখল করে নেয়া। এটা জায়েজ মনে করা হতে থাকার মূল কারণ নষ্টা জাতিরাষ্ট্রের ধারণা অথবা তা থেকে উপজাত আরও নষ্টা এক “জাত শ্রেষ্ঠত্বের” ধারণা। [আজকের দিনে যা এক সাদা শ্রেষ্ঠত্বের ধারণা হয়ে আবার হাজির হতে দেখা যাচ্ছে] ব্রিটিশরা ফরাসি বা ডাচদের চেয়ে ‘জাতশ্রেষ্ঠ’ শুধু তাই নয় বরং,  অন্য  মহাদেশের যেসব রাষ্ট্র এরা কলোনি-দখল করছিল এমন সবকাজের সপক্ষে সাফাইয়ে সার কত্থাটা হল  জাতিবাদ, জাত শ্রেষ্ঠত্ব অথবা যেমন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠত্বের গর্ব।

অথচ জাতি বা জাতিগঠন ধারণার সাথে মূল রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ার ধারণার কোনোই মিল বা সম্পর্ক নাই। একই কথা তো কখনো নয়, ছিল না। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছিল যেমন ব্রিটেনের বেলায়- ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজের ব্যক্তিস্বার্থটাকে কল্পিত এক ‘ব্রিটিশ জাতির’ স্বার্থ বা জাতিরাষ্ট্র স্বার্থ বলে বয়ান তৈরি করে হাজির করেছিল। আর এটাকেই যেন এক ব্রিটিশ রিপাবলিক রাষ্ট্র ও এর স্বার্থ বলে চালিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাই ‘জাতি’ ‘জাতিগঠন’ শব্দটাই আসলে কলোনি দখল, অন্য জনগোষ্ঠীর ওপর আধিপত্য বিস্তার করা – এধরনের কাজ সমার্থক হয়ে উঠেছিল। আর এভাবেই ব্রিটিশদের সেকালের ইন্ডিয়াকে কলোনি-দখল যেন ব্রিটিশ জাতিরাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে একটা কাজ! এভাবে পুরা ইউরোপই রাষ্ট্র গঠনকে কথিত ‘জাতি গঠন’ বুঝেই করে গিয়েছিল; কিন্তু কত দিন?

প্রায় তিনশ বছর, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কাল পর্যন্ত।  এই তিনশ বছর ধরে কলোনি দখল, লুটে খাওয়া আর উদ্বৃত সারপ্লাস পাচার এসবই চলেছিল। কিন্তু এর পরেও হুঁশ এসেছিল কি? হ্যাঁ, অবশ্যই কিন্তু বিশাল খেসারত দেয়ার পরে। জর্মান হিটলারের আগমন ও উত্থান ঘটেছিল সেই খেসারত হিসেবে।

কলোনি দখল যদি জায়েজ হয়, আর  নিজ জাতিরাষ্ট্রের জাতশ্রেষ্ঠত্ব দেখানো আর বড়াই করা যদি সব আকামের সাফাই হয় তাহলে, হিটলারের জার্মানিরও আরো চরম জাতশ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে ইউরোপের ব্রিটেন, ফ্রেঞ্চ দেশ-রাষ্ট্রসহ সবার কলোনিগুলা পাল্টা দখল করে নিলে সেটা নাজায়েজ হবে কেন? এভাবে ইউরোপের সব জাতিরাষ্ট্রই হিটলারের তাণ্ডবের ভেতর নিজ জাতশ্রেষ্ঠ বোধের পরিণতি দেখেছিল। এটাই জাতিবাদের পরিণতি, সবার প্রতিচ্ছবি- দ্বিতীয় বিশযুদ্ধের গ্রেটেস্ট তাৎপর্য। ‘জাতিরাষ্ট্র’ চিন্তার চরম পরিণতি ইউরোপের সবাইকে দেখিয়ে দিয়েছিল।

অবশ্য এতটুকুই ইউরোপের রাষ্টড়চিন্তায় বদল আসার একমাত্র কারণ না। এর সাথে আরও ভূমিকা রেখেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের (বৃটিশ-ফ্রেঞ্চসহ মিত্রশক্তির) আমেরিকান সামরিক-অর্থনৈতিক সাহায্য পাবার শর্ত যে, ইউরোপকে কলোনি-দখলের দিন শেষ করতে হবে। এটা নাজায়েজ ও অপরাধ মানতে হবে। রাষ্ট্রকে নাগরিক অধিকারের উপর দাঁড়াতে হবে। সার্বজনীন মানবাধিকার মানবার প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। ইত্যাদি। যুদ্ধ শেষে ঐ শর্ত মোতাবেক ইউরোপ এভাবে নিজেকে ব্যাপকভাবে বদলে নিয়েছিল।

কিন্তু তা সত্ত্বেও আরেক অদ্ভুত ঘটনা হল আমাদের এদিকে।, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা এই মহাদেশগুলোর ট্রেন্ড হল কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়া। কিন্তু কেমন স্বাধীন রাষ্ট্র? বাস্তবে এরা  রাষ্ট্র বলতে তখনও জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট বলেই বুঝেছিল। অর্থাৎ একদিক থেকে দেখলে সেযুগের অভিমুখ কলোনি মুক্তির হলেও আর এক দিক থেকে দেখলে সেযুগের অভিমুখ এই তিন মহাদেশে আসলে ছিল ‘জাতিরাষ্ট্র’ গড়ার দিকে। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের বুঝ তাদের আসেনি। এলোই না।

আর এর সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ হিসেবে হাজির হয়েছিল নেহরু-গান্ধীর ভারত। যেমন আজও কাশ্মীর ইস্যুতে, কাশ্মীর আসলে কে শাসন করবে এর একমাত্র নির্ধারক হল খোদ কাশ্মীরের বাসিন্দারা। কোনো রাজা নয়, রাজ যদি কাউকে একসেশন চুক্তি করে) কাশ্মীর দিয়েও দেয় তবুও সে রাষ্ট্রও নয়। এই হল বিশ্বযুদ্ধে শেষের শর্ত ও বুঝাবুঝির কনভেনশন হিসাবে পরের  দুনিয়ার নতুন নীতি। যে নীতি অনুসরণে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছিল আর সেখানে দেয়া প্রতিশ্রুতি পালন করতে গিয়ে ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে গিয়েছিল, নেহরু-গান্ধী একটা স্বাধীন ভারত পেয়েছিল। অথচ নেহরু আজীবন ছিল এ সম্পর্কে বেখবর। জবরদস্তিতে তিনি কাশ্মীর দখল করে রেখেছেন।

অন্য বড় বিপর্যয়টা হলো রাষ্ট্র বলতেই তা ‘জাতিরাষ্ট্র’ বলে বুঝা। বিশ্বযুদ্ধে ইউরোপের জাতিরাষ্ট্র ধারণা কী পরিণতি হয়েছিল, আর এতে ইউরোপে কী বদল এলো এসব নিয়ে নেহরু-গান্ধীর হুঁশ বা বুঝাবুঝি শূন্য থেকে যায়। তাই ভারত হয় একটা সেই জাতিরাষ্ট্রই। য়ার বলারই বাহুল্য ঘটনা সেখানেই থামে নাই, থামার কথাও না। তাই দেখা যায় ভারত জাতিরাষ্ট্র হয়ে হাজির হওয়ার একটা চেন-রিঅ্যাকশন আছে।

নেহরু-গান্ধীর তথা পুরা কংগ্রেসেরই রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝার সমস্যা হল, তারা আসলে একটা হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের কল্পনা করছেন বা এমন ধারণার লালন ও অনুসারি হচ্ছেন। আর এটা গ্রহণে মুসলমানদের মনে অস্বস্তি হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। এতে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে নাগরিক বৈষম্য তৈরি হবেই- এটাই হল সারকথা। জবরদস্তিতে তাই করতে যাওয়া হয়েছিল। যার সোজা মানে হল বেপরোয়া ভাবে মুসলমানদের আলাদা রাষ্ট্র গড়তে সেদিকে ঠেলে দেয়া। এর পরেও ১৯২৮ সালে জিন্নাহর ‘১৪ দফা প্রস্তাব একটা খুবই সুচিন্তিত প্রস্তাব ছিল [ইংরাজিতে পেতে এখানে]। কিন্তু এই সমাধানও আমলই করা হয় নাই। আর তা থেকে জিন্নাহ ফাইনালি কংগ্রেসের সম্ভাবনার হাত ছেড়ে  মুসলিম-জাতিরাষ্ট্রের পাকিস্তান গড়ার দিকে চলে যান। অথবা বলা যায় পরিস্থিতি এদিকে চলে যায়। যদিও তাতেও সমস্যার শেষ হয় না। পরবর্তিতে রাষ্ট্রভাষা উর্দু করতে হবে- বলাতে পূর্ব পাকিস্তান ভীত হয়ে পড়ে, বিপদ দেখতে পায় অসাম্যের যে পশ্চিমের আধিপত্যের নিচে সে চাপা পড়তে যাচ্ছে। তাই ক্রমে সেই আবার একই – রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝে এক ভাষাভিত্তিক জাতিবাদে পৌঁছায় স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু জাতিরাষ্ট্র বুঝ আমাদের কাউকে ছাড়ে নাই। একই প্রশ্ন, একই আধিপত্য কায়েমের অভিযোগ এবার পাহাড়িদের দিক থেকে উঠে। কিন্তু তাজ্জবের ব্যাপার হল, পাহাড়িদের চোখেও এর সমাধান হল আবার সেই রাষ্ট্র বলতেই জাতিরাষ্ট্র বুঝবার চিন্তা আর তা থেকে এক “জম্মু জাতিবাদ”! দেখাই যাচ্ছে এটা এক লম্বা চেন-রিঅ্যাকশন। কিন্তু দুনিয়ার অভিমুখ আঁচ করা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র চিন্তা আমাদের ছুঁতে পারেনি।

রামমোহন রায় ও তাঁর ব্রাহ্ম প্রকল্পঃ
এর ভিতরে পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে  ‘প্রগতিশীলেরা’। কারণ তারাও মূলত জাতিরাষ্ট্রবাদী। আর এরা আবার জাতি বলতে সেটা আবার ছুপা হিন্দু-জাতি বুঝ।
যার আদর্শ প্রমাণ রামমোহন রায় ও তার নতুন করে এক ব্রাহ্মধর্ম চালু করার প্রচেষ্টা। রামমোহনকে কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা ভারতে রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করেন। কিন্তু রেনেসাঁর গুরু তিনি নতুন ব্রাহ্ম ধর্ম চালু করেন কেন? অথচ এ নিয়ে আজ পর্যন্ত ‘প্রগতিশীলরা’ এতে আপত্তিকর কিছু দেখেনি। চেপে গেছেন। পরবর্তিতে ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করে যায়।
এ দিকে ব্রাহ্ম প্রকল্প ফেল করাতে এই ব্যর্থতাই আবার সাফাই হিসেবে হাজির হয় যে জাতি বলতে হিন্দু-জাতি বুঝি হবে। আর তা থেকে এবার এরা সবাই মিলে হিন্দু-জাতিরাষ্ট্রের ধারণার অনুসারী হয়ে যান। আর এমনটা তারা এতই অবলীলায় হয়ে যান যে জাতি বলতে যে তারা এক্সক্লুসিভ হিন্দু-জাতি বলে বুঝতেছেন এটাও আর অনুভব করেন না। তাই কোনো জিন্নাহ বা কোনো মুসলমান হিন্দু-জাতিরাষ্ট্র ধারণার বিরুদ্ধে প্রশ্ন বা আপত্তি তুললে উল্টা তাকেই ‘সাম্প্রদায়িক লোক’ অথবা ‘ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র চাওয়া লোক’ ইত্যাদি ট্যাগ লাগিয়ে ঘৃণাবিদ্বেষ ছড়ানো শুরু করেছেন তারা। একাজই তাদের প্রগতিশীলতার শুরু এখান থেকে। অথচ বাস্তবতা হল, সমস্যাটা রাষ্ট্র বলতে তা একমাত্র জাতিরাষ্ট্র বলে বুঝা থেকে শুরু।

অতএব একালের বড় শিক্ষা হল, সব জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা চর্চা সুযোগ থাকা বা রাখা এটা তার মৌলিক অধিকার বলে মানতে হবে। কিন্তু এরপর এ থেকে কোণভাবেই জাতিরাষ্ট্র চিন্তার অনুসারী হওয়ার পথে যাওয়া যাবে না। বরং, জাতিরাষ্ট্র এই চিন্তা বা ধারণাটাই আমাদের পরিত্যাগ করতে হবে। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র; সবার এক পরিচয়, সবাই নাগরিক এমন রাষ্ট্র গড়তে হবে। আর সেই সাথে তা হতে হবে- সবাই একই পরিচয় নাগরিক এবং বৈষম্যহীন সমান নাগরিক। সাম্য, মর্যাদা আর ইনসাফের এক বাংলাদেশ রাষ্ট্র।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

এই লেখাটা গত ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘মাতৃভাষার পক্ষ নিলে তা জাতিবাদ নয়”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

গৌতম দাস

০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2HR

Soldiers of the Swastika, Frontline, The Hindu, Jan 2015

হিন্দুত্ব মানে মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদই, তবে আরও কিছু চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্যেও সাথে থাকে। তাই হিন্দুধর্ম অনুসারী কোনো মানুষ মানেই তিনি “হিন্দুত্ব” এই আদর্শের কোনো হিন্দু নাগরিক হবেনই, এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। এখানে মূল কথা হল, দেখে কাছাকাছি বা একই অর্থের মনে হলেও ‘হিন্দু’ আর ‘হিন্দুত্ব’ শব্দ দুটো আলাদা, তাদের অর্থও আলাদা। হিন্দু শব্দ দিয়ে আপনি একটা ধর্মকে বা একটা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগত পরিচয়কে বা একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কোনো কিছুকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার করতে পারেন বা হতে দেখবেন। তবু এগুলো একটাও ‘হিন্দুত্ব’ নয়। এ ছাড়া বিশেষ করে দল বিজেপিকে আদর্শের যোগানো যে আরএসএস সংগঠন, এরা হিন্দুত্ব বলতে যা বুঝায় বা বুঝতে বলে সেই হিন্দুত্বের অর্থ একেবারেই আলাদা।

আরএসএস-এর হিন্দুত্ব এক প্রকারের মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তা সন্দেহ নাই; কিন্তু তাতেই শেষ নয়, আরো আছে। এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদ। কেমন উগ্র? হিটলারের মতো উগ্র ও রেসিজমের। তাহলে এরা নিশ্চয়ই সুপ্রিমিস্ট, মানে আমরাই শ্রেষ্ঠ, এমন শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান এদের আছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। এরা হল, হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী মানে নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান-নিধনের নায়ক যে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী; এদের মতই আরএসএস-বিজেপিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। তাই বলতে পারেন হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ+প্লাস।  “বর্ণবাদী [racist] জোনে” ঢুকে যাওয়া এক হিন্দুত্বের রাজনীতি। যেটা আর সাদামাটা কোন জাতীয়তাবাদ নয়।

ফলে স্বভাবতই হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়। তবে হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে যারা হিন্দুত্বের আইডিয়াকে রাজনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, প্রচার করে, বিশ্বাস ও বাস্তবায়ন করে, কেবল এমন হিন্দু নাগরিকেরাই হিন্দুত্ব-চিন্তার ব্যক্তিত্ব। এর সোজা মানে হিন্দুধর্মের অনুসারী হয়েও যারা হিন্দুত্ব-চিন্তাকে গ্রহণ করেনি – এমন হিন্দু নাগরিকও ভারতে প্রচুর আছে। যেমন গত নির্বাচনে (২০১৯ মে) যারা বিজেপি-মোদীকে ভোট দিয়েছে – ফলে তারা হিন্দুত্ব মেনেছে বলে যদি ধরে নেই, এই ভিত্তিতে বললে মাত্র ৩৭.৩৬ শতাংশ ভোটার হিন্দুত্বকে জেনে বা না জেনে বরণ করেছে। বাকিরা হিন্দু হয়েও মানেনি অথবা যারা অহিন্দু ভোটার। অর্থাৎ বাকিরা মানে হিন্দু হয়েও বা অহিন্দু ভোটাররা হল ৬৩ শতাংশ, যারা হিন্দু মানে হিন্দুত্ব, এ কথা মানেন না।

তবে একটা কথা আছে, হিন্দুত্বওয়ালারা সব সময় চেষ্টা করে থাকে যে কোনো হিন্দু নাগরিক মানেই সে হিন্দুত্বের অনুসারী নাগরিক, এমন দাবি করা। কথাটা একেবারেই সত্য না হলেও এই প্রপাগান্ডা তারা চালায়। এ’থেকে সাবধান হতে হবে। এতকথা দিয়ে হিন্দুত্বকে আলাদা করে চিনানোর উদ্দেশ্য এটাই।

এমনকি একালের বাংলাদেশের হিন্দুরা এদের বেশির ভাগই হিন্দুত্বের সমর্থক বলে নিজেদের দেখে থাকে। সম্ভবত অব্যাখ্যাত কোনো রাগ-ক্ষোভ থেকে এটা করে। এরা ফারাক করে না যে হিন্দু বলতে কেউ হিন্দুত্ব-চিন্তা বুঝে ফেললেও এরা অসুবিধা ও অস্বস্তিও বোধ করে না। যদিও খুব সম্ভবত ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে এসব সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি। যদিও আবার বলছি হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়, তাই এমন বুঝে নেয়া আমাদের হিন্দু-মুসলমান যে কারোই সেটা ভুল হবে।

কিন্তু ভারতে? এখানে মূল সমস্যা দু’টি। প্রথম সমস্যা হল, ভারতে হিন্দুত্বকে পাবলিকলি সমালোচনা করলে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। এমনই হিন্দুত্বের জোয়ার চলছে এখন সেখানে। আবার সবটাই জোয়ার ঠিক তা নয়, তবে জোয়ার দেখিয়ে হাজির করা হয়েছে। বিশেষত কাশ্মীর সরাসরি ভারতের বলে দাবি ও বাস্তবায়নে লেগে পরার পর থেকে মোদীরা ভীষণ ভীতিতে আছে। যে কখন কী থেকে জানি পরিস্থিতি হাতছুট হয়ে যায়। তাই সব কিছুতে আগাম আগ্রাসী মনোভাব দেখানো দাবড়ে বেড়ানো দেখানো, বিরোধিতা করলে মেরে ফেলব, কেটে ফেলব দেখানো – এসবই অনেকটা ভূতের ভয়ে রাস্তা পেরোনোর সময় উচ্চৈঃস্বরে গান ধরার মত। যা হোক, এই আগ্রাসন পরিস্থিতিতে তাই কেউ হিন্দুত্বের অনুসারী হতে পছন্দ না করলেও তা প্রকাশ্যে বলা বুদ্ধিমানের কাজ না এমন মনে করাই স্বাভাবিক। ডরে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে।

এমনকি কংগ্রেস বা তৃণমূল যারা বিজেপির বিরোধী রাজনীতি করে, তারাও খুব সাবধানে পা ফেলে এখন যেন বিজেপি তাদের হিন্দুস্বার্থববিরোধী হিসেবে পাবলিকের সামনে না চিনিয়ে দেয় বা খাড়া করে দেয়। অর্থাৎ এবারের বিজেপির জয়ের পর থেকে এক ব্যাপক হিন্দুত্বের জ্বর ও জোয়ার উঠেছে। ফলে হিন্দু ভোট পেতে চাইলে এই জোয়ারে হিন্দুত্বের সমালোচনা করা বোকামি হবে, বরং উল্টো গা ভাসিয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাপক হিন্দু নাগরিক হিন্দু-হিন্দুত্বের ফারাক উঠিয়ে ফেলে দিয়েছে। হিন্দুত্বের গর্বে বুক ফুলানোর সুযোগ তাদের কেউ কেউ আবার যেন হাতছাড়া করতে চাইছে না, এমন সেজেছে। যেমন কাশ্মীরে, এর ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দিয়ে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ করে নেয়া – এটাকে সমর্থন করা এটাই এক ব্যাপক দেশপ্রেমের প্রমাণ হয়ে দাড়িয়েছে। আসলে উলটা কেউ এটাকে সমর্থন না করলে এটা তার দেশপ্রেমের ঘাটতি – এই বয়ান বাজারে জারি করা হয়েছে।

A demonstration in Ahmedabad, India, in 2018, protesting mob lynchings.CreditCredit Amit Dave/Reuters. NYT Jun 2019

এমন এক ভয়ের অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যেন এই দেশপ্রেমের ডঙ্কার আড়ালে কেউ থাকলেই কেবল সে নিরাপদ। সমাজে এই আওয়াজ তুলে ফেলেছে আরএসএস-বিজেপি। এমনকি অবস্থা এমন, যারা আসলে আরএসএস-বিজেপির দাবি মানতে চান না অথবা আরো আগিয়ে বলতে চান, এটা কাশ্মীরিদের প্রতি অন্যায় হয়েছে তাহলে আপনি দেশপ্রেমে সমস্যা আছে বা আপনি দেশদ্রোহী, এই চাপও হাজির রাখা হয়েছে। যেমন একটা ভিডিও ক্লিপ দেখেছেন অনেকে যে খুবই বিখ্যাত এক অ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ, যিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থের লিটিগেশন মামলাগুলো নিজ উদ্যোগে করে থাকেন। আরএসএস-এর গণসংগঠনের কর্মী পরিচয়ে তিন ব্যক্তি তার অফিসে ঢুকে তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে লাঞ্ছিত করে গেছেন। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি সরকার থেকে ভিন্নমতে মন্তব্য করেছেন।  যদিও এটা কয়েক বছরে আগের ভিডিও ক্লিপ। কিন্তু এখনও পরিস্থিতিটা সেরকমই।  ভারতজুড়ে এই হলো হিন্দুত্বের জ্বর, এই অসুস্থতায় ভুগছে সারা ভারত।

অন্য দিকে টিভিতেও না কিন্তু প্রিন্ট বা ওয়েব মিডিয়ায় এই প্রথম কিছু লেখক কলামিস্টকে দেখা যাচ্ছে অন্তত একাদেমিক লেভেলে যারা হিন্দুত্বকে হিন্দুত্ব বলে স্বীকার করতে, চিনতে ও চেনাতে চাইছেন। যদিও সারা মিডিয়ায় এখনো একটা ভয় কাজ করছে যে এতে কোন খারাপ দিক তুলে ধরলে বা আপনাতেই প্রকাশ হয়ে পড়লে সরকার সেটা ঐ ব্যক্তির দেশপ্রেমের ঘাটতি বা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ হিসেবে প্রচারণা তুলে লাঞ্ছনার মুখোমুখি করে কি না। এমনিতেই ভারতের মিডিয়ার স্বাভাবিক ঝোঁক হল, কোনরকম ঝামেলায় না গিয়ে সরকারি অবস্থান সমর্থন করা ও এর পক্ষে জনমত তৈরি করা। বিশেষত এজাতীয় ইস্যু যেখানে পাকিস্তান কোনোভাবে এক সংশ্লিষ্ট পক্ষ, সেখানে চোখ বন্ধ করে সরকারের পক্ষে না থাকা মানে উনি দেশদ্রোহী বা দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে উনার অথবা উনি দেশের স্বার্থবিরোধী জজবা তুলে ফেলা – এই প্যাটার্ন গত সত্তর ধরেই।

এরই সাথে আর একটা জজবা তুলে রাখা হয়েছে যে আপনি হিন্দু হলে আপনাকে কাশ্মীর জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে নেয়া সমর্থন করতে হবে। অর্থাৎ মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত মানেই সেটা হিন্দুদের স্বার্থ, তাই এর বাইরে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ অথবা চিন্তা বিচার বিবেচনাবোধ বলে কিছু নাই। হিন্দু হলেই মোদীর সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। নইলে দেশদ্রোহী। এই হ্লল হিটলারিজম। পপুলার ফ্যাসিজম। অর্থাৎ পড়াশুনা, জ্ঞানবুদ্ধি চর্চা, স্কুল কলেজ ইউনি গবেষণা ইত্যাদি সবের যেন আর দরকার নাই। খালি মোদী কোনদিকে সেটা দেখে নিলেই হবে। আর ভারতের হিন্দুরা মোদীর সিদ্ধান্ত দেখলেই এর পক্ষে ঝাপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠির সদস্যকেও দেখা গেছে এই ভিত্তিতে তাঁরা মোদীর পক্ষে। অথচ ব্যাপারটা হল সিধা আপনি মুসলমান-হিন্দু যেই হন – বিচারের মূল মাপকাঠি হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ বোধের উপর দাঁড়িয়ে। এগুলো বিশেষত ফেসবুকের আমরা কোন চিন্তার স্তরে আছি এর একটা প্রকাশ বলা যেতে পারে।

দেখে মনে হচ্ছে মোদীবিরোধী, কিন্তু আসলে নয় এমন দুই বয়ানঃ
তবু অন্তত লেখার শিরোনাম দেখে মনে হয়, এটা একটা হিন্দুত্ববিরোধী লেখা, এমনই এক রচনা হল ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকার ভরত ভূষণের রচনা [Tectonic shift towards a very different India]। হিন্দুত্ব ও কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এই লেখার শিরোনামকে বাংলায় লিখলে হয় এরকম : “এক ভিন্ন ভারতের দিকে টেকটনিক ঘাড়-বদল ঘটেছে”। টেকটনিক কথাটা ভূমিকল্প সংশ্লিষ্ট – পৃথিবীর সারফেসের বহু নিচে পাথর-মাটির গঠনপ্রকৃতি বিষয়ক ধারণা প্রকাশে কাজে লাগে।  কোনো একটা ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলের, যে বিশাল ভূমিখণ্ডের স্তরের ওপর সে এত দিন দাঁড়িয়েছিল তা ভেঙে যাওয়াতে পাশের বা নিচের আরেক ভূমিস্তরের ওপর দাঁড়ানো অর্থে কাঁধবদল আর তার ঝাঁকুনি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। তো ভরত ভূষণ বলতে চাইছেন মোদীর সিদ্ধান্ত পদক্ষেপে কাজকারবার ভূমিকম্পের ঘাড়-বদলের মত, এতে ভারতের এক নতুন দিকে যাত্রা ঘটেছে। এই অর্থে মনে হ্তে পারে যে, তিনি ভালই ধরতে পারছেন মোদীর পদক্ষেপকে। কিন্তু সরি, এটা আসলে তা না। কারণ, লেখার ভেতরের বডিতে যা আরগুমেন্ট তা খুবই হতাশাজনক।

কোন নির্বাচনকে পাবলিক কিভাবে নিয়েছে, পপুলার ভোট কাউকে হাতখুলে কিভাবে জিতিয়েছে, এটা অবশ্যই পরে এতে নির্বাচিত সরকার পরে কোন দিকে যাবে তা বুঝার জন্য প্রাইমারি নির্দেশক চিহ্ন নয়, বরং সেকেন্ডারি। কারণ, জিতে যাওয়ার পর বিজয়ী দল ও গঠিত সরকার সেই পপুলার ভোট-সমর্থনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে কোন দিকে নিয়ে যাবে- তা দিয়েই নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র ও এর জনগণের ভাগ্য। জনগণ কী মনে করে ভোট দিয়েছিল, সেটা একেবারেই গৌণ বা পরের বিষয়। মুখ্য হলো বিজয়ী দল ও সরকারের “মনে” কী আছে।

ভরত ভূষণ দাবি করছেন, হিন্দি-বলয়ে [except in some states of the South] ভারতের গত ২০১৯ সালের ভোটে বিজেপির জয়লাভ এটা  মোদির একচেটিয়া উত্থানের পক্ষে রায় [2019 general election — the ringing endorsement of a single leader, Narendra Modi…।]। ভোটাররা নাকি এমন একজনকেও খুঁজছিল, যে তাদেরকে “নিরাপদ অনুভব করাবে” [Across the rest of India, the voters wanted someone who made them feel secure. ]। কিন্তু কী থেকে নিরাপদ? তা তিনি স্পষ্ট বলা এড়িয়ে গেছেন বা কোনো সাফাই-ব্যাখ্যা হাজির করেননি। বরং কংগ্রেসের কথা মনে রেখে বলতে চেয়েছেন,  নেহরু-গান্ধী থেকে একালের রাহুল গান্ধী এরা নাকি “একটা লিবারেল-ইজম করতে চেয়ে গেছিলেন সত্তর বছর ধরে [The structural origins of these fears can be traced to the less than robust liberal revolution that India experienced over the past seven decades]। আর এটাই নাকি পাবলিকের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ভয়ের উতস।  এটাকে এক ধরণের লিবারেল চাপাচাপি (তিনি ব্যবহার করেছেন “liberal push” ) বলে তিনি নাম দিয়েছেন। আর এবার বলছেন, “The liberal push in India led to a forced restructuring of society through an ever-expanding agitation for granting special rights not only to dalits, tribals, minorities and the other backward classes, but also to women, the disabled, gays and transgenders”।

দেখা যাচ্ছে খুবই ভয়ঙ্কর সাফাই তিনি তুলেছেন মোদীর উত্থানের পক্ষে। তিনি নাম করেছেন দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী এবং এ ছাড়াও নারী, প্রতিবন্ধী ও রঙধনু মানুষ এদের সবার [লক্ষ্যণীয় যে তিনি মুসলমানদের নাম নেননি যদিও মোদীগোষ্ঠীর সব কর্মসূচির মূল টার্গেট মুসলমান দাবড়ানো]। আর বলেছেন এদেরকে “বিশেষ অধিকার দেয়াতেই” [granting special rights] নাকি সমাজের কাঠামো ভেঙে গেছে, আর আপত্তি উঠেছে। কী সাংঘাতিক কথা! এসব ন্যায্যতা-সাফাই কথা তো আরএসএসও নিজেদের স্বপক্ষে বলতে সাহস করে নাই। এছাড়া দেখা যাচ্ছে ভরতভূষণ মারাত্মক সমাজ-কাঠামো যেন অটুট থাকে তা রাখার ক্ষেত্রে এক প্রিয়মুখ ব্যক্তিত্ব তিনি।  আর তাই তিনি বলছেন, এই কাঠামো ভেঙে যাওয়াতেই নাকি নিরাপদ বোধ করতে চাওয়া থেকেই তারা একক নাম ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে মোদীকে জিতিয়েছেন। এর মানে ভরত ভূষণ দাবি করছেন, যারা মোদীকে জিতিয়েছেন এরা বর্ণহিন্দু আর তাদের ভোটই বেশি? তাই কী?  এ ছাড়া “লিবারল পুশ” করার জন্য ভরত ভূষণ কেবল কংগ্রেস নয়, সব আঞ্চলিক দলকেও একই ব্র্যাকেটে রেখে তাদেরও দায়ী করেছেন।

এশিয়ান এজ আর এর লেখকও ‘প্রগতিশীল’ বলে মনে করা হয়। আর বলাই বাহুল্য, তাদের লিবারেল ধারণাও সব সময় এমনই অদ্ভুত, যা কখন কার দিকে যায় ঠিক নেই। যেমন এখানে ভরত ভূষণ তার কথিত “কংগ্রেসের লিবারল পুশ” করা- এই কাজকে নেগেটিভ বলে দেখিয়ে ফেলেছেন। অথবা এতে সামাজিক কাঠামো ভেঙে যাওয়াটা এর ফলাফলকে নেগেটিভ বলে দেখানো হয়েগেছে। তবে এতে আসল গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হল, ভরত ভূষণের এই ভাষ্য বিজেপি ও মোদীর হিন্দু রেসিজম ও এর উত্থানকেই ন্যায্য প্রমাণ করেছে। যদিও এটা ন্যায্য কি না তা দেখানো ভরত ভূষণের লক্ষ্য ছিল না হয়ত, লক্ষ্য ছিল মোদীর উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষমতা দেখানো। আসলে এদের মূল সমস্যা – ‘প্রগতিশীলতায়’ দাঁড়িয়ে ‘লিবারেল ধারণাটা’ কী, এর একটা বুঝ তৈরি করতে অক্ষমতা। চরত ভূষণ যদি মনে করেন এটা লিবারল পুশ তাহলে এর ফলাফল নেগেটিভ হচ্ছে কেন – এর কোন ব্যাখ্যা বা বিষয়টাকে আমল করছেন না তিনি।

ভরত ভূষণের বেলাতে তাহলে যা ঘটেছে তাতে কথাগুলো দাঁড়িয়ে গেছে তিনি যেন বলতে চাইছেন, ভারতের পাবলিক ‘লিবারেল পুশে’ এভাবে সমাজের পুনর্গঠন পছন্দ করেনি, তাই ভয় পেয়ে তারা মোদিকেই আঁকড়ে ধরেছে। যার অর্থ বিজেপি ও মোদির উত্থান জায়েজ আর ওই দিকে পাবলিকও যা করছে সব জায়েজ। কিন্তু তাতে সমাজে প্রগতিশীল ভরত ভূষণদের আর দরকার কী? সেটাই প্রমাণ হয়েছে!

অথচ যেটা এখানে মিসিং তা হল, ভারত-রাষ্ট্র এর নাগরিক সবাইকে সমান জ্ঞান করে দাঁড়ানোটা যে রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপুর্ণ সেতা কেউ আমল করছে না। এটাকে খামতি মনে করছে না কেউ। আর এটা কখনই গত সত্তর বছরে ভারত-রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি; কিন্তু এটা কারো কাছেই মুখ্য প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন হওয়া, সমান চোখে দেখা, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা ইত্যাদি এগুলো নিশ্চিত করা যেন রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য হওয়ার বিষয়ই নয়। বরং দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী ইত্যাদিকে যেন ‘বিশেষ অধিকার’ দিতে যাওয়াই বিরাট ভুল হয়েছে। এ থেকে মনে হচ্ছে, আসলে রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটা ‘প্রগতিশীলতার’ কাজ নয়। অথচ ভারত রাষ্ট্রের জন্মদোষ হল – এটা হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠন করা হয়েছে; নন-সেক্ট-আইডেন্টিটির নাগরিক ভিত্তিতে, নাগরিকদের মধ্যে অসমতা নাই এমন অধিকারের রাষ্ট্র নয়। তাই বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় এটা। এসব আমল করতে হলে মনে হচ্ছে, বরং অপ্রগতিশীল কোন এলেমদার হলেই ভালো হবে।

বক্তা: ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতা-র প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে অমর্ত্য সেন। ছবি – আনন্দবাজার, ২৮ আগষ্ট ২০১৯

ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের ঠেলায় এর বিপরীতে কলকাতায় উত্থান ঘটেছে আর এক প্রগতিশীল, ড. অমর্ত্য সেনের। যদিও তাঁর ফোকাস বা স্পেশালিটি হল কথিত বুঝদারদের বিরাট ভাবের কথা – সেকুলারিজম। তিনি সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন এক সভায় বক্তৃতা দিতে। আনন্দবাজার লিখছে [শিরোনাম –বাঙালি হওয়া কাকে বলে, বোঝালেন অমর্ত্য] – “ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতা’র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা করলেন অমর্ত্য সেন”। সেখানে নাকি আলোচনার বিষয়বস্তুই ছিল “বাঙালি হওয়া” মানে কী। বুঝা যাচ্ছে খুবই সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। কিন্তু এটা পুরোটাই অমর্ত্য সেনকে দিয়ে কিছু বলিয়ে নেয়া কাজ – অনুমান করি। সেটা মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থানকালে কিছু পাল্টা বয়ান হাজির করা; এই অর্থে অ্যারেঞ্জড। ফলে তা খারাপ কিছু না, হয়ত; কিন্তু পুরান পাপ কিছু হাজির হয়ে গেছে এর সাথে।

সবার আগে প্রশ্ন হল, এখানে “বাঙালি হওয়া” বলতে কী, আর কাদের “বাঙালি হওয়া” বোঝাবেন অমর্ত্য সেন?
আনন্দবাজার অমর্ত্য সেনের বক্তৃতায় খুবই আপ্লুত হয়ে গেছিল বোঝা যাচ্ছে। তাই, প্রবল প্রশংসা করে লিখেছে, “তাঁর বক্তব্যের মাঝপথেই পাশের শ্রোতার স্বগতোক্তি, পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালিকে ধরে এনে এই বক্তৃতাটা শোনানো উচিত! কেন, এক বাক্যে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে বলতে হয়, ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয়েরই বৈশিষ্ট্য এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই পরিচিতিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাঙা অসম্ভব, এই একটা কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন অধ্যাপক সেন”।
এর মানে – ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম… আবিষ্কার! এ তো দেখি বিরাট সাঙ্ঘাতিক কথা! আরো আছে।

লিখেছে, “ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতায় ষোড়শ শতাব্দীর চণ্ডীমঙ্গলের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক সেন মনে করিয়ে দিলেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমনে হিন্দুরা অসন্তুষ্ট হননি, বরং খুশি হয়েছিলেন, কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় বাঘের উৎপাত কমেছিল বহুলাংশে”।

এখানে অনেকের মনে হবে হয়তো বিরাট জ্ঞানের কথা বলেছেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কত মিল গভীর সম্পর্ক তাই তিনি এখানে আবার তুলে ধরেছেন; কিন্তু আসলেই কি তাই? এই গীত গেয়ে কি মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থান ঠেকাতে পারবেন অমর্ত্য সেন? সরি, অমর্ত্য সেন, মাফ করবেন! কোনো ভরসা, আস্থা রাখতে আমরা পারলাম না।

প্রথমত, প্রশ্ন রেখেছিলাম ‘বাঙালি হওয়া’ বলে কী আর কাদের ‘বাঙালি হওয়া’ বোঝাইবেন তিনি? কেন এমন প্রশ্ন? কারণ যে ব্রিটিশ জমানার কথা অমর্ত্য সেন তুলেছেন সেটা ছিল আসলে কারা বাঙালি, কী করলে কাউকে বাঙালি মানা হবে অথবা আধুনিক বাংলা ভাষা কোনটা ইত্যাদি এসবেরই প্রথম নির্ণয় নির্ধারিত ও স্বীকৃতি দেয়ার যুগ। অন্যভাবে বললে ব্রিটিশ কলোনি শাসনের অধীনে জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’ এর সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন।

কিন্তু মুসলমানেরা কি বাঙালি? এই প্রশ্নের মীমাংসা  কী তারা করেছিলেন? ইতিহাস বলে, না; মুসলমানেরা বাঙালি তো নয়ই, তাদেরকে আমল করে গোনায়ই ধরা হয়নি বাঙালিত্বের ধারণার মধ্যে।। কী, মিছা বলছি মনে হচ্ছে? চলতি আলাপের বাইরে অজস্র প্রমাণ আছে, তবু এখন বাইরে যাবো না, ঘরে থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেনের কথা থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেন বলছেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমন…। [লাল রঙ করে রাখা আমার] এর মানে কী?

অমর্ত্য সেন বুঝিয়েছেন যে, মুসলমানেরা বাংলার মানে ভারতের বাইরে থেকে এসেছে। তারা বাইরের থেকে এসেছে মানে তারা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের মতো না। একই রেস (race) নয়, রেসিয়াল [racial] জাত বৈশিষ্ট্য এক নয়। এটাই দাবি করছেন অমর্ত্য সেন। আর এ থেকে সেকালের মতোই অমর্ত্যর কথা থেকে সিদ্ধান্ত আসে- এই মুসলমানেরা বাঙালি নয়। অমর্ত্য সেন আসলে সেকালের বর্ণহিন্দু জমিদারের বয়ানটাই আবার উচ্চারণ করেছেন মাত্র। [মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক আলাদা করে একটু পরে করা যাবে। আপাতত অমর্ত্য সেনের মধ্যে থাকি।]

তাহলে আমরা দেখলাম- অমর্ত্য সেনের কথার সূত্র থেকে আসছে যে মুসলমানেরা বাঙালি নয়। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই বলছেন, উনিশ শতকের শুরু থেকেই জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে শুরুতেই জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’- এর ভাষা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য পরিচয় দাঁড় করানো সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন তাতে মুসলমানেরা ছিল এক্সক্লুডেড বা বাইরে রাখা হয়েছিল। মুসলমানেরা বাঙালি না – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত ও চর্চা।  জমিদারি ক্ষমতার চোখে দেখে এই ছিল তাদের ইসলামবিদ্বেষ। এই সত্যি কথাটাই অমর্ত্য সেন এখানে ভুল করে উচ্চারণ করে ফেলেছেন।

ভুল কেন? কারণ এখানে তিনি ‘বাঙালি হওয়া’ শিরোনাম নিয়ে বক্তৃতার বক্তা। তার এখনকার উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের কত মিল-মহব্বত ছিল তা থাকুক না থাকুক, সেটাই বড় করে তুলে ধরা। যাতে এ থেকে নাকি মোদী ঘায়েল হবে – এই ছিল আয়োজকদের অনুমান। কিন্তু  সমস্যাটা হল অমর্ত্য সেন তাঁর বিশ্বাস ও আজন্ম ছোট থেকে দেখে আসা বাস্তব চর্চা থেকে তিনি মনে করতে অভ্যস্ত যে, মুসলমানেরা বাঙালি না। তাই এ কথাটাই তিনি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন যে ‘বঙ্গে মুসলমানদের আগমন’… যেটা ছিল উনিশ শতকের বর্ণহিন্দু জমিদারদের নির্ণয়। এটাই পরে হয়েছিল কংগ্রেস বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বয়ান। বিজেপির মোদীর হিন্দুত্বের বয়ানও এই একই ইসলামবিদ্বেষের ওপর দাঁড়ানো।

তাহলে অমর্ত্য সেন তিনি কিভাবে নিজেরই হিন্দুত্বের বয়ান দিয়া মোদীর হিন্দুত্বকে ঠেকাবেন? হতে পারে মোদির হিন্দুত্ব অনেক বেশি রেসিজম পর্যায়ে চলে গেছে, হিটলারি উত্থান পর্বে সে ঢুকে গেছে। এতে অমর্ত্য সেন আপনারটা সফট হিন্দুত্ব দাবি করলেও সেটাও এক  হিন্দুত্বই। ফলে মূলত ইসলামবিদ্বেষী এবং গোপন করা ছুপানো।

তাই অমর্ত্য সেন এখন আপনিই ঠিক করেন আপনি ঠিক কী, কী হতে চান!

মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক :
মুসলমান কোনো রেসিয়াল ব্যাপার নয়। যেকোনো রেসের (race)  রেসিয়াল জনগোষ্ঠি ধর্মান্তরিত হয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যেতে পারে, এভাবেই মুসলমান হয়ে যায়। আর এতে তার আগের রেসিয়াল বৈশিষ্ট্য একই অটুট থেকে যায়। নৃতাত্ত্বিক বাঙালি এভাবেই মুসলমান হয়ে যাওয়ার পরও বাঙালি থাকে এবং ছিল। যদি না আপনি ইসলামবিদ্বেষী হয়ে তাদের বাঙালি মানতে অস্বীকার করে ফতোয়া দেন। আসলে যে জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে অত্যাচার শোষণ লুণ্ঠনে সামাজিকভাবে চরম প্রান্তিক অবস্থানে আর লম্বা বে-ইনসাফির স্বীকার এমন কোনো মতে বেঁচে থাকাদের – এদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে কিছু আছে বা ছিল কি না তা হয়তো সেকালে সাদা চোখে খুঁজে পাওয়া কঠিন। হয়তো গভীরে লুকিয়ে গেছে, যা বাইরে থেকে দেখতে পাওয়া সহজ না; কিন্তু তবু মুখের ভাষা! জন্মের পর মা সন্তানকে যে ভাষায় কথা শেখায়? সেটা তো কোনোভাবেই লুকানো যায় না, লুকানো থাকে না। এটাও কী তারা দেখতে পায় নাই? আমাদের মুখের ভাষা কি বাংলা ছাড়া অন্য কিছু ছিল! তাও সে আমলে বর্ণহিন্দু জমিদারদের জাতিভেদ প্রথার চোখে মুসলমানেরা ছিল নিচের নমঃশূদ্রদের থেকেও আরও দুই ধাপ নিচে। এই মুসলমানেরা বাঙালি ছিল না – এই ছিল তাদের বিদ্বেষী সিদ্ধান্ত।

আসলে কারও দেয়া স্বীকৃতির প্রমাণ, অথবা কারো কাছ থেকে আমাদের বাঙালি স্বীকৃতি নেয়া – এদুটোর কোনটার আমাদের দরকারই নাই। আর ১৯৭১ সালে কি আমরা দেখাইনি গায়ের রক্ত ঢেলে দেখাইনি কারা আসল বাঙালি! কারা আমরা! ফলে জমিদারি ক্ষমতার স্বার্থ দিয়ে নির্ধারিত কোনো স্বীকৃতি আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বিশেষত যেখানে জমিদারি উচ্ছেদে আমরাই ছিলাম প্রধান লড়াকু, প্রজা বাঙালি! সাথে আমাদের মুসলমান পরিচয়ও সব সময়ই ছিল গৌরবের। কারণ জমিদারি উচ্ছেদের প্রথম লড়াই শুরু করেছিলেন ১৮১৯ সালে আমাদের বীর নেতা হাজী শরীয়তুলাহ, তিনি তো আমাদেরই আসল পরিচয় নির্মাতা। কাজেই আমরা কি তা প্রতিষ্ঠা করতে আমরা নিজেরাই যথেষ্ট। অমর্ত্য সেন দূরে থাকেন, ভালো থাকেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ৩১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মজ্জাগত স্বভাব সহজে যায় না এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘জাতিরাষ্ট্র’ এক বিভ্রান্তিকর ধারণা

‘জাতিরাষ্ট্র’ এক বিভ্রান্তিকর ধারণা

গৌতম দাস

১৯ অক্টোবর ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2kt

 

 

আমাদের একজন সিনিয়র সিটিজেন ড. আকবর আলি খান। তার মূল যে পরিচয়, যে কারণে তিনি সবচেয়ে বেশি পরিচিত তা হল, তিনি একজন দক্ষ আমলা বা বুরোক্র্যাট। সরকারের মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে তিনি পেশাজীবন শেষ করেছেন। একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে তিনি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক। গত ২৬ মার্চ ২০১৭ দৈনিক প্রথম আলোতে তাঁর একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। অনুমান করি, তার সর্বশেষ গ্রন্থ ‘অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ বইটির কথা মাথায় রেখে সাক্ষাৎকারটি নেয়া হয়েছিল।

বাংলাদেশের জন্য একটা কার্যকর ও দক্ষ প্রশাসন গড়তে কী কী করা উচিত, তা নিয়ে যারা কিছু চিন্তাভাবনা করেছেন, করেন অথবা কিছু প্রয়োগ করেছেন, বদলিয়েছেন ও উদ্যোগ নিয়েছেন – এমন কাজের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন আকবর আলি খান। তার সম্পর্কে আমাদের আগ্রহ ও কৌতূহল এখান থেকেই। অবশ্য ওই সাক্ষাৎকার পড়ার পর থেকে আমরাই আবার বেশ খানিকটা যেন হতাশ হতে যাই।

ওই সাক্ষাৎকারে আকবর আলি খানের রাষ্ট্রবিষয়ক বিভিন্ন মন্তব্য আছে। সেগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করি, ‘জাতিরাষ্ট্র’ ধারণাকে তিনি এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন। ইংরাজি নেশন স্টেট (nation-state) শব্দের বাংলা আমরা করে নিয়েছি জাতিরাষ্ট্র। একথা  সত্য যে, অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে প্রবল প্রতাপে মডার্ন রাষ্ট্র মানেই তা জাতিরাষ্ট্র, এ ধারণা ছেয়ে গিয়েছিল। বিশেষ করে যেখানে নাগরিকেরা সবাই একই জনগোষ্ঠিগত বৈশিষ্টের একই ভাষা, একই সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত এবং সম্ভবত একই ধর্ম বা মেজরিটির ধর্ম একই এমন একটা অবস্থা থাকে সেখানে জাতিরাষ্ট্র শব্দটার ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। আসলে একটা বহুল প্রচলিত শব্দ এখানে সাধারণত ব্যবহৃত হতে দেখা যায় যেটা আমরা ব্যবহার করিনি, সেটা হল ‘জাতি’, যা ইংরাজি নেশন শব্দের বাংলা। ভুখন্ডে বসবাসরত নাগরিক সকলকে বুঝাতে বহুল প্রচলিত শব্দ হল ‘জাতি’, যা এখানে ব্যবহার করা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। আর তার বদলে এখানে আরও সাধারণ অর্থবোধক শব্দ ‘জনগোষ্ঠিগত’ দিয়ে তা বুঝানো হয়েছে। কী হলে জনগোষ্ঠি ‘জাতি’তে রূপান্তরিত হয়ে যায়? সে প্রশ্ন এখানে তুলব।

আবার একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র কায়েম করা গেলেই কী সেটাই কী জাতিরাষ্ট্র কায়েম হয়ে যাওয়া?  তাহলে রিপাবলিক রাষ্ট্র মাত্রই কী জাতিরাষ্ট্র?  সে প্রশ্নও তো আছেই।

তবে এই শতাব্দি এসে অনেক কিছুই স্পষ্ট হয়ে যায়। ধারণা ও উপলব্ধি ততদিনে থিতু হতে সময় পেয়ে যায় যে, না, জাতিরাষ্ট্র’ কথাটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ধারণা বা বিষয় নয়; বরং এক উটকো ধারণার অংশ।

আধুনিক রাষ্ট্রের ব্যাপারে সবার আগে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল ‘রিপাবলিক’। আর রিপাবলিক ধারণার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিক সাম্য, মানুষের মানবিক মর্যাদা আর ন্যায়বিচার। কিন্তু রাষ্ট্র গঠন বা রাষ্ট্রধারণার বাস্তবায়নের কালে দেখা সব সংশ্লিষ্ট ধারণাকে তুচ্ছ ও অপ্রয়োজনীয় জ্ঞান ও গণ্য করে সব কিছু পর্যবসিত হয়েছে শুধু ‘জাতিরাষ্ট্র’ শব্দ ও ধারণায়। রাষ্ট্রমাত্রই যেন জাতিরাষ্ট্র বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র। অথচ অষ্টাদশ শতাব্দীর সবচেয়ে প্রভাবশালী শব্দ ও ধারণা এখনো রিপাবলিক। সে তুলনার সাথে জাতিরাষ্ট্র বলে একটা ধারণা এসে যাওয়া যেন হাতছুট ঘটনা। কারণ সেই থেকে এখনো নেশন কী, নেশন মানে কী, এগুলো অস্পষ্ট। এখনো তা নিজেকে প্রোথিত করতে পারেনি।

আবার লক্ষ্য করলে দেখব সেকালেও মানে অন্তত বিংশ শতকের শুরুতেও সবাই জাতিরাষ্ট্র বলতে রিপাবলিক বোঝেনি। যেমন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জন্ম নেয়া সোভিয়েত রিপাবলিক রাষ্ট্র (১৯১৭), মাওয়ের চীনের পিপলস রিপাবলিক রাষ্ট্র (১৯৪৯), এমনকি ইরানের ইসলামি রিপাবলিক (১৯৭৯)- এগুলোর একটিতেও জাতিরাষ্ট্র বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র বলতে যা সেকালে বুঝা হত, তা বুঝে এসব রাষ্ট্র ও বিপ্লব কায়েম করা হয়নি। ফলে এগুলো জাতিরাষ্ট্র হিসেবে কায়েম হয়েছে, এমন কোনো দাবি তাদের নেই; বরং প্রত্যেকে নিজ রাষ্ট্রের নামের সাথে গৌরবোজ্জ্বলভাবে রিপাবলিক শব্দ ও ধারণা বয়ে বেড়াতে পিছপা হচ্ছে না বা ভুল করেনি। একেবারে রাষ্ট্রের নামের মধ্যেই তা খোদাই করে দিয়েছিল।

আবার আধুনিক আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, ১৭৭৬ সালের ইউএসএ পর্যন্ত নিজেকে কোনো জাতিরাষ্ট্র দাবি করে না। আবার লক্ষণীয় হল, ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে সব আধুনিক রাষ্ট্রই রিপাবলিক ধারণাকে মুখ্য রেখে তৈরি হয়েছে। এর প্রমাণ লেনিনের ইউএসএসআর (১৯১৭) রাষ্ট্রের নামের শেষের রিপাবলিক। মাওয়ের চীন পিআরসি (পিপলস রিপাবলিক অব চায়না, ১৯৪৯) আর ইরানের ইসলামি রিপাবলিক (১৯৭৯)। বিশ শতকের এই তিন রাষ্ট্র রিপাবলিক হয়ে আধুনিক রাষ্ট্র বলে নিজেদের দাবি করলেও কেউই জাতিরাষ্ট্র বা জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র নয়, সে দাবিও করেনি। এই উদাহরণগুলো মনোযোগ দিয়ে লক্ষ করলে আর রাষ্ট্রমাত্রই সেটা জাতিরাষ্ট্র, এমন ভুল বা পশ্চাৎপদ ধারণা আঁকড়ে থাকার কথা নয়। কিন্তু আকবর আলি খান জাতিরাষ্ট্র ধারণাকে আঁকড়ে এর ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলছেন; দাবি করছেন- “জাতিরাষ্ট্র বিষয়টি আধুনিক ধারণা। ‘ …’ পৃথিবীর সবখানেই জাতিসত্তা পরে জন্ম নিয়েছে।”

সারকথায়, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র মাত্রই যে তাকে জাতিরাষ্ট্রও বলা ঠিক হবে না এটা ক্রমশ মানুষের মধ্যে সতর্কতা আসতে শুরু করেছিল। তবুও এরপরেও অনেকে এখনও একাকার করে দেখে থাকেন। আকবর আলি খান তাদের একজন থেকে গেছেন দেখা যাচ্ছে। আর সব নেশন স্টেট বা জাতিরাষ্ট্রের ধারণাধারী যে বিপদে পড়েন, তিনিও সে একই ‘বিপদে’ পড়েছেন। একই সূত্র অনুসারে ‘জাতিসত্তা’ বলে শব্দটি তিনিও এনেছেন। এতে যে বিপদের মুখোমুখি হতে হয় তা হল – ‘জাতি’ জিনিসটি কী তা ব্যাখ্যা করতে হবে তাদের। এখন , এই ‘জাতি’ মানে কী? সেটা কি ইংরেজি (race) রেস নাকি (ethnicity) এথনিসিটি? নাকি কমন কালচারাল কোন বৈশিষ্ট্য অর্থে এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক ধারণা? কোনটা? এরা সেটা পরিষ্কার করে বলেন না। তা সত্ত্বেও তারাই আবার জাতিসত্তা শব্দটি ব্যবহার করে আরও অস্পষ্টতা বাড়ান। আকবর আলি বলছেন, ‘কাজেই বাংলাদেশের উৎস প্রাচীন বা মধ্যযুগে খুঁজলে হবে না, বাংলাদেশের আদিসত্তার উৎস খুঁজতে হবে ঊনবিংশ থেকে বিংশ শতকে।’ আর প্রশ্নকর্তা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ‘বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি বইয়ে আপনি লিখেছেন, …. সেদিক থেকে বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ধারণার উন্মেষ মধ্যযুগ থেকে।’

অর্থাৎ দু’জনেই খুঁজছেন বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ধারণার উন্মেষ কবে থেকে উত্থিত। কারণ এ ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তারা এরপর তাদের পছন্দের জাতিরাষ্ট্র বা নেশন স্টেট ধারণাকে পোক্ত করবেন সম্ভবত। কিন্তু আসলে এই অনুমান অর্থহীন। কারণ মূল বিষয় জাতি কী, নেশন বলতে তারা কী বুঝাচ্ছেন তা তো অস্পষ্টই রয়ে গেছে। জাতি মানে কী – রেসিয়াল অথবা নৃতাত্ত্বিক ধারণা কী? অথবা অন্য কোনো ধারণা? তারা এদিকে খোঁড়াখুঁড়ি করেছেন বা করতে চান বলে মনে হয় না।
কিন্তু এই জট আমরা কী করে সহজে খুলতে পারি? একটি দিক লক্ষ করলেই সবাই এই জট খুলতে পারব।

রেসিয়াল অথবা এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক যে ধারণাই হোক, ব্যাপারটাকে একটা কমন বৈশিষ্ট্য হিসাবে অবশ্যই দেখা যায়। কিন্যেতু সবচেয়ে গুরুত্মবপুর্নণ যেটা  লক্ষ করলে দেখব, ‘জাতি’ বলতে যাই বুঝাতে চাই, তা আসলে এক ধরনের (given) গিভেন বৈশিষ্ট্য বা গিভেন ধারণা। তা কী অর্থে? মানে হল যে, “আগে থেকে দেয়া আছে”। যেমন দুনিয়ার কোনো জনগোষ্ঠী নিজেই নিজের রেসিয়াল (অথবা এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক) বৈশিষ্ট্য বেছে নিতে পারে না, সম্ভব নয় বলে। রেসিয়াল বৈশিষ্ট মানুষের পছন্দ করে বেছে নিবার জিনিষ না।  জন্মানোর আগে কেউ আল্লাহর সাথে চুক্তি করে, চয়েজে টিক দিয়ে বাঙালি হয় না, বিহারি হয় না; বরং বাঙালির ঘরে জন্মানোর পরে ওই ঘর মোতাবেক অর্থাৎ (given) গিভেন হিসেবে বাঙালি হয়। ফলে রেসিয়াল অথবা এথনিক অথবা নৃতাত্ত্বিক ইত্যাদি যাই হোক না কেন, এগুলোর মূল পরিচয় আসলে গিভেন ধারণার অন্তর্গত। সোজা কথা হলো, আমি জাতে বাঙালি হতে চাইছি বলে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাঙালি হতে পারি না। হই নাই। এখন একটা কথা স্পষ্ট করতে হবে। এর মানে কি এই যে, এখন তাহলে যার যার (আল্লাহর দেয়া) বা গিভেন পরিচয় অনুসারে তাকে এখন ওই পরিচয়ের রাজনীতিই করতে হবে? মানে এথনিক বাঙালিকে বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিই করতে হবে?

এর জবাব-ফয়সালা পেতে আমাদের শেষ বাক্যে মনোযোগ দিতে হবে। ওই বাক্যে দুইবার বাঙালি শব্দটি ব্যবহার করেছি- এথনিক বাঙালি আর বাঙালি জাতীয়তাবাদী। অথচ লক্ষ করুন, এ দুই বাঙালি শব্দের অর্থ এক নয়। কেন? প্রথমে ব্যবহৃত বাঙালি শব্দটি গিভেন অর্থে বাঙালি। সেজন্য ওটা আমার গিভেন পরিচয় বা প্রাকৃতিক পরিচয়। তাহলে পরেরটা?

পরেরটা হল বেছে নিয়েছি, ইচ্ছামতো যেটা ভালো লেগেছে সেই রাজনীতি- নিজের রাজনৈতিক পরিচয়। স্বেচ্ছায় সচেতনে যেটা মানুষ করে কিংবা বেছে নেয়, সেটাকে রাজনৈতিক কাজ বা সিদ্ধান্ত বলে। এই পরিচয় বা রাজনীতি আবার শুধু আমার রাজনৈতিক পরিচয় নয়, এটা আমরা যতবার ইচ্ছা, যখন ইচ্ছা বদলাতেও পারি। যেমন ১৯৪৭ সালে আমরা একই জনগোষ্ঠী ‘ইসলামি জাতিবাদী’ হয়েছিলাম। সে পরিচয় নিয়েছিলাম। আবার আমরাই ১৯৭১ সালে নতুন পরিচয় ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ হয়েছিলাম। বাঙালি জাতীয়তাবাদী ছাড়াও আরো যেকোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনীতি আমরা আগামীতে করতে পারি, বেছে নিতে পারি। একটার বদলে আরেকটা রাজনীতি করতে পারি। মূল কথা, এথনিক বাঙালি হয়েও আমি বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি করতে পারি, না-ও করতে পারি। এর অর্থ, তাহলে এথনিক বাঙালি জনগোষ্ঠী এক আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়তে গেলে সেটা একটা জাতিরাষ্ট্রই হয়ে যাবে, বাঙালি জাতিবাদী (অথবা বাংলাদেশী জাতিবাদী) জাতিরাষ্ট্র হয়ে যাবেই- এমন ধারণা ভিত্তিহীন।

আকবর আলি খান এবং প্রশ্নকর্তা দু’জনই খুঁজছিলেন বাঙালি, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের ধারণার উন্মেষ কবে হয়েছে, মধ্যযুগে কি না- এই খোঁজাখুঁজি অর্থহীন। কারণ এটা নৃতাত্ত্বিক বা থিনিক খোঁড়াখুঁড়ি গিভেন পরিচয়ের খোঁড়াখুঁড়ি। এর সাথে রাজনৈতিক পরিচয় মিলিয়ে জগাখিচুড়ি পাকিয়ে ফেলা অর্থহীন। কারণ দুটো আলাদা জিনিস। রাজনীতি সচেতন হওয়া বা রাজনীতি মানে কী সেসব বোঝার বহু আগেই ‘গিভেন’ পরিচয় আমরা পেয়ে যাই। আমাদের জানা না থাকলে প্রাকৃতিক পরিচয় আর রাজনৈতিক পরিচয়- এ দুটোকে গুলিয়ে ফেলে কথা বলতে থাকি। শেখ মুজিব সর্বপ্রথম রাজনৈতিক বাঙালি বা বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনীতি হাজির করেন। স্পষ্ট আকারে তা হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ছয় দফায়। অর্থাৎ এর সাথে গিভেন বাঙালি কবে থেকে শুরু হয়েছিল, এর কোনোই সম্পর্ক নেই। যেমন অনেকে ‘আবহমান বাঙালি’ বলে একটা শব্দ ব্যবহার করে থাকেন। এই শব্দের সাথে বাঙালি জাতিবাদী ধারণার কোনো সম্পর্ক নেই। কারণ আবহমান বাঙালি একটি এথনিক বা প্রাকৃতিক বা গিভেন পরিচয়ের ধারণা।
এই কারণে আকবর আলি খানের ওই সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর শব্দ ও ধারণা হলো ‘জাতি’। প্রথমত, ওটা অস্পষ্ট যে, তা গিভেন না পলিটিক্যাল। তাই এটা অস্পষ্ট রয়েছে বলে পুরো আলোচনাই সেখানে অর্থহীন হয়ে গেছে।

তিনি বলছেন, ‘বাঙালিদের জন্য পরিচয়ের ভুল ঠিকানা ছিল পাকিস্তান। পাকিস্তানের আবির্ভাব ছিল এক আকস্মিক ঘটনা। ভারতীয় উপমহাদেশে যত মুসলমান ছিল, তারা এক জাতি; হিন্দু যারা তারা আরেক জাতি- এমন ভাবনা থেকে এর সৃষ্টি। কার্যত মুসলমান বা হিন্দুদের সবাই এক ভাষা, এক জাতি, এক অঞ্চলের মানুষ ছিল না। … সেজন্য আমি মনে করি, আধুনিক ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের স্বাধীন হওয়া ছিল অনিবার্য।’

তার এই বয়ানের পর্যালোচনা করে বলতে হয়- প্রথমত, মানতে হবে যে, দেশ ভাগ সবার জন্য খারাপ অভিজ্ঞতা। আসলে এ কথা বাস্তবে সত্যি ছিল না। যেমন পূর্ববঙ্গের প্রজাদের কাছে দেশ ভাগ ছিল অনিবার্য এবং তাদের খুবই কাম্য। তাই এককাতারে প্রজারা তাতে খুশি হয়েছিল। হিন্দু বাঙালিরা জমিদারির পক্ষ নিয়ে, তা আঁকড়ে থেকে এ থেকে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ক্ষমতার আধিপত্যের শেয়ার ভোগ করতে চাইল। জমিদারেরা এমন একক মোড়লিপনা চালিয়ে যেতে চাইলো প্রজাদের সাথে- দেশ ভাগ করা মানেই, প্রাকটিক্যালি জমিদারি উচ্ছেদ- এই পথে যেতে চাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না।

দ্বিতীয় কথা, দ্বিজাতির ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়নি। মুসলমান-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলো নিয়ে আলাদা পাকিস্তান হওয়া আর মুসলমানেরা আলাদা জাতি বলে পাকিস্তান হওয়া এককথা নয়। যদিও দেশ ভাগের পর এমন সাফাই কেউ কেউ দিয়েছিলেন। আর কলকাতার জমিদারদের পক্ষের সাফাই হিসেবে অনেকে বলে- ‘মুসলমান যেহেতু জাতি নয়, একটা ধর্মের নাম; কাজেই ধর্মের ভিত্তিতে জাতি- এটা হয় না। এটা করা ভুল।’ এটাকে বিরাট জ্ঞানগর্ভ আরগুমেন্ট মনে করে অনেকে খুশি হয়ে যায়। ধরা যাক, ইসলামি জাতিবাদ ধারণা ভুল। তাহলে হিন্দু জাতীয়তাবাদ এটা সঠিক হয় কিভাবে?

বাস্তবে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের ভারত রাষ্ট্র হয়েছে। তবে সেটা তারা অকপটে স্বীকার করেছে, না ‘ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ শব্দের আড়াল নিয়েছে সে কথা আলাদা। কিন্তু হিন্দুত্বের ভিত্তিতেই ৫০০-এর বেশি করদরাজার রাজ্য গুঁড়িয়ে দিয়ে আর ২৯ রাজ্যকে একসাথে বেঁধে আজকের ভারত রাষ্ট্র কায়েম করা হয়েছে। আর একটি ফ্যাক্ট হলো, কংগ্রেস হিন্দু জাতিবাদী রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে দল হিসেবে খাড়া হয়ে ছিল। সে কারণেই এর ভেতর মুসলমানেরা নিজেদের খুঁজে না পেয়েই কংগ্রেস দল খোলার পর ২০ বছর অপেক্ষা করে শেষে মুসলিম লীগ গঠন করেছিল।
আসলে পুরো বিষয়ে মূল সমস্যা পরিচয়ের রাজনীতি বা আইডেন্টিটি পলিটিক্স। সব জাতীয়তাবাদ, সব জাতি ধারণাই একেকটা পরিচয়ের রাজনীতি; সেক্টেরিয়ান পলিটিক্স। সেটা কংগ্রেস হিন্দুত্বের জাতিবাদ করলেও যা, মুসলিম লীগের ইসলামি জাতীয়তাবাদ করলেও তা। আর বাঙালি জাতীয়তাবাদ করলেও একই সমস্যা থেকেই যাবে। বাংলাদেশে কেউ বাঙালি জাতিবাদ করতে চাইলে আরেকজন বলবে তিনি ইসলামি জাতীয়তাবাদ করবেন। আপনি ভাষার জাতীয়তাবাদ চাইলে আর একজন ভুখণ্ডের জাতিবাদ চেয়ে বসবেন। জাতিবাদী রাজনীতি মানেই পরিচয়ের রাজনীতি, মানে বিভক্তির রাজনীতি। অথচ এর বাইরে আসতে হবে আমাদের।
অতএব ‘জাতি’ ধারণা, জাতিবাদী রাজনীতির ধারণা ইত্যাদি আগে স্বচ্ছ করে না নিলে প্রাসঙ্গিক আলোচনা অর্থহীন থেকে যাবে।

আকবার আলি খানের বক্তব্যে সবচেয়ে বিতর্কিত হলো তিনি বলছেন, জাতির পিতা স্বয়ং মনে করতেন আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদের দু’টি উপাদান রয়েছে। একটি হলো ধর্ম, আরেকটি হলো ভাষা। তিনি যদি সত্যি সত্যিই মনে করে থাকেন, জাতির পিতার জাতীয়তাবাদের দু’টি উপাদানের একটা ধর্ম; তাহলে দ্বিজাতিতত্ত্বকে মানে ধর্মীয় পরিচয়কে সমালোচনা করার তো সুযোগ নেই। দেশ ভাগের ব্যাপারে কলকাতার বয়ানের পক্ষে দ্বিজাতিতত্ত্ব নিয়ে সমালোচনা করার সুযোগ কই? এটা তো স্ববিরোধিতা। ফলে ‘পাকিস্তান হওয়া এক দুর্ঘটনা আর বাংলাদেশ হওয়া এরই সংশোধন!’-কথাটা খুবই স্ববিরোধী বক্তব্য হয়ে যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ অক্টোবর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]