ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

ভারতের “ইতি-জনসংখ্যা নেতি হয়ে যেতে পারে”

গৌতম দাস

২০ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2vW

 

 

এশিয়ায় চীন-ভারত দ্বন্দ্ব প্রতিযোগিতা সর্বত্র, এমনকি একাডেমিক পর্যায়েও। চীনের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে ভারত অথবা ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে চীনের একাডেমিক মূল্যায়ন বা পর্যালোচনা দেখা যায় না বললেই চলে। একাডেমিক মূল্যায়নের না থাকার কথা বলছি, যদিও প্রপাগান্ডার উদ্দেশ্য ছদ্ম-মূল্যায়ন প্রচুর আছে দেখা যায়। সম্প্রতি চীনের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের (FUDAN) গবেষক লিন মিনওয়াং ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অভিমুখ সম্পর্কে চীনেরই গ্লোবাল টাইমস পত্রিকায় পর্যালোচনামূলক লিখেছেন। (এখানে দেখুন) সে লেখার শিরোনাম হল – [Demographic dividend cannot guarantee India’s rise], বাংলায় “বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা থাকলেই কোনো দেশের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হয়ে যায় না”। [বাংলায় অনুবাদ এখানে পাবেন]।

হ্যাঁ  চীনা গবেষক এর কথাটা সঠিক। ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল অর্থনীতিতে দেখা গেছে, যেসব দেশ নিজেকে গ্লোবালি শীর্ষ অবস্থানে বা প্রথম দিকের এক-দুই নম্বরের অর্থনীতিতে সহজেই নিয়ে যেতে পেরেছে তার পেছনে, একটি কমন ফ্যাক্টর কাজ করেছে। তা হল, দেখা গেছে সাধারণত সেসব দেশ বিপুল জনসংখ্যার দেশ হয়ে থাকে। জনসংখ্যার পড়ে পাওয়া সুবিধা বা Demographic Dividend বলে। এ ছাড়া ঐ বিপুল জনসংখ্যার বড় অংশ যদি ৩০ বছরের নিচের বয়সের হয় তবে এর সুবিধা আরো বেশি পাওয়া যায়। ফলে এখান থেকে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে এক সর্বগ্রহণযোগ্য ধারণা দেখা যায় যে, বিপুল জনসংখ্যা দেশের অর্থনীতির জন্য খুবই ইতিবাচক উপাদান। চীনের এই গবেষক এই ইতিবাচক ধারণাটাকে ভারতের বেলায় প্রয়োগ করে, এর উপর ভিত্তি করে আরও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলছেন, ভারতের বিপুল জনসংখ্যার সুবিধা আছে কথা ঠিক। কিন্তু তা থাকলেই ভারতের অর্থনীতির উত্থান নিশ্চিতভাবে হবেই এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। কেন?

সে কথাই তিনি তার লেখায় তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে দুনিয়াতে চীন ও ভারতের উভয়েরই জনসংখ্যা শীর্ষে, ১০০ কোটির উপরে – একারণে তিনি চীনের অর্থনৈতিক উত্থান সম্পন্ন হওয়ার বেলায় কী ঘটেছে সে অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে তিনি ভারতের অর্থনীতিকে তুলনা করে নিজের মন্তব্য পেশ করেছেন।

প্রথমত গ্লোবাল অর্থনীতির আলাপে, কোনো বড় দেশ বলতে অর্থনীতির ভলিউম বা আকারের দিকে তাকিয়ে সেটাকে মূলত বড় দেশ বলা হয়ে থাকে। যদিও সাধারণত বড় দেশ বলতে আবার বড় জনসংখ্যার দেশ অর্থেও তা বলা হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে বড় দেশ মানে তাই সাধারণত বড় জনসংখ্যা এবং বড় অর্থনীতি দুটোই হাজির থাকতে দেখা যায়। আবার ব্যতিক্রমও আছে। যেমন বাংলাদেশ বড় জনসংখ্যা দেশ এবং তা বড় অর্থনীতির দেশ না হলেও এর জিডিপি বাড়ার হার বেশি এবং চড়া। তবু কোনো দেশের অর্থনীতি ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিপুল জনসংখ্যাকে ইতিবাচক এবং তা পড়ে পাওয়া এক সুবিধা মনে করার পেছনের মূল কারণ আরো গভীরে। বিপুল জনসংখ্যার দেশ বড় রফতানিকারক দেশ হতে গেলে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে একটা বাড়তি সুবিধা তার থাকে। তা হল, রফতানিতে উত্থান-পতন আছে কারণ, রফতানি মানেই নিজ দেশের বাইরের, যেখানে সবটা নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এ ছাড়া কোনো প্রাকৃতিক বা রাজনৈতিক দুর্যোগে সব এলোমেলো হয়ে যেতে পারে। যখন রফতানিতে ধস নামতে পারে।

এসব সম্ভাব্য খারাপ সময়ে কেবল বিপুল জনসংখ্যার দেশ হওয়ার কারণে এর টিকে যাওয়ার সক্ষমতা অন্যদের চেয়ে বেশি হবে। মূল কারণ, ওর নিজের একটা বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজারও আছে যেটা প্রায় স্থির। তাই রফতানি বন্ধ হয়ে গেলে বা কমে গেলেও এই চাপ সে সামলে নিতে পারে অভ্যন্তরীণ বাজারের যে আয় তা ভাগাভাগি করে নিয়ে অথবা রফতানি না হওয়া পণ্য অভ্যন্তরীণ বাজারে এর  বিক্রি বাড়িয়ে। আর এতে এই যে শ্বাস নেয়ার কিছু বাড়তি সুযোগ সে পেয়ে যায় এই সময়টাকে সে কাজে লাগায় দ্রুত বিকল্প বাজার খুঁজে বের করতে, নতুন চিন্তা-পরিকল্পনা করতে। সারকথায় বড় আভ্যন্তরীণ বাজার সবসময় ঐ দেশেরই কোন কারণে রপ্তানিতে মার খেয়ে গেলে তখন একটা কুশন হিশাবে কাজ করে। এ কারণে, শেষ বিচারে রফতানি-অর্থনীতিতে টিকে যাওয়ার লড়াইয়ে এই দেশ তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় হায়াত বেশি হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে হাজির থাকে। ত এই হলো বিপুল জনসংখ্যার রহস্য বা বাড়তি পড়ে পাওয়া সুবিধা।

কিন্তু চীনের এই গবেষক এসব কথা সব মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু এরপরেও প্রশ্ন তুলছেন যে বড় জনসংখ্যার দেশ হলেই তাতে নিজ অর্থনীতি বিকশিত হবেই, বড় হয়ে উঠবেই তাকী নিশ্চিত করে? তার জবাব হল না। বলছেন, বিপুল জনসংখ্যা থাকাটাই যথেষ্ট নয়, কারণ আরো বহু কিছু করণীয় বা ফ্যাক্টর বিবেচনায় নিবার আছে।

মোদির একটা অর্থনৈতিক কর্মসূচি আছে। যার নাম ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’। যার মূল কথা হল, ভারতে যে যা বেচতে চাও তা ভারতে এসে বানিয়ে এরপর বেচ। চীনা গবেষক বলছেন, “মেক ইন ইন্ডিয়া” এই পদক্ষেপ ইতিবাচক। এর উদ্দেশ্যে ছিল শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। যদিও বেশ কয়েক বছরের চেষ্টার পরও এই উদ্যোগ খুব একটা উন্নতি হয়নি বা সাফল্য পায়নি।

এর কারণ হিসেবে তার দু’টি পয়েন্ট আছে।
বলছেন প্রথমত, “ভারত বিশ্বায়নকে ধারণ করার সবচেয়ে ভালো সময়টা নিজের কাজে লাগাতে পারেনি”। তিনি বলছেন, “আশির দশকে চীন অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে হাত দেয় এবং শ্রমমুখী উৎপাদন খাত গড়ে তোলে। তাদের শ্রমশক্তির পুরোটা ব্যবহার করার চেষ্টা করে তারা। তুলনায় সে সময় ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ভারতের অর্থনীতি সার্ভিস সেক্টর মুখ্য করে গড়ে তোলেন এবং দেশটি যেন “বিশ্বের অফিস” সে হিসেবে গড়ে ওঠে। চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নের আসল পথ এখান থেকেই পরবর্তীতে আলাদা হয়ে যায়। মোদি সরকারের জন্য এখন আর এর কোন সংশোধনী আনাটা অতটা সহজ নয়”।

চীনা গবেষকের কথা সবটা না হলেও বহুলাংশে সত্য। তবে চীনের বেলায়, গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়নকে কাজে লাগানোর যে সফলতা ও সময়ের কথা বলা হচ্ছে ওর মধ্যে একটা কাকতলীয় দিক আছে। কারণ, আমেরিকা বা বিশ্বব্যাংক দুনিয়াব্যাপী বিশ্বায়নের লক্ষ্যে অর্থনীতির কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মোটামুটি আশির দশকের শুরু থেকেই। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে যেটার অর্থ এরশাদের আগমন বা এর প্রকাশ হিসেবে আমরা এরশাদের ক্ষমতা দখলকে দিয়ে বুঝতে পারি।

তবে চীনের আজকের পর্যায়ে উত্থানের পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঘটেছিল তিন পর্বে। এর প্রথমটা বলা যায় অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির পর্যায়ঃ তথাকথিত সাংস্কৃতিক বিপ্লবে ১৯৫৮ সালের পর থেকে এবার প্রায় পুরো ষাটের দশকজুড়ে, (১৯৫৮-৬৮) এই সময়কাল। এর পরের দ্বিতীয় পর্ব হল, ভিত্তি ঠিকঠাক করাঃ গ্লোবাল নেতা আমেরিকার সাথে রফা ও দেনা পাওনার ভিত্তি ঠিক করা এবং বোঝাবুঝির ভিত্তি তৈরির কাল। কী ভিত্তিতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম নিয়ম-শৃঙ্খলে চীন প্রবেশ করবে এবং চীনে বিদেশী পুঁজির আগমনে তা নিয়ে নতুন সম্পর্ক ও লেনদেন বাণিজ্য বিনিময়ের পথে যাত্রা করবে এর ভিত্তি স্থাপন করা। যেটা মোটামুটি (১৯৬৮- ১৯৭৭) সাল পর্যন্ত সময়কালে সম্পন্ন করা হয়েছে। এরপর তৃতীয় পর্যায় মানে মাঠে বাস্তবায়ন পর্ব শুরু হয়। সেটা ১৯৭৮ সালের পয়লা জানুয়ারি থেকে চীন-আমেরিকা পরস্পরকে কূটনৈতিক স্বীকৃতিদান করে পরস্পরের দেশে কূটনৈতিক অফিস খোলার মাধ্যমে শুরু হয়। বাইরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডারে চীনের প্রবেশ শুরু হয় বা পুঁজি চীনে প্রবেশ শুরু করে। ঘটনাচক্রে দুনিয়াজুড়ে গ্লোবালাইজেশনও যাত্রা শুরু করে ওই আশির দশক থেকে।

ফলে এ থেকে পড়ে পাওয়া সুবিধাও চীন উপযুক্ত সময়ে কাজে লাগিয়ে ফেলতে পেরেছিল। মূল কথা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবালাইজেশন যে একই সময়ে শুরু হয়েছে আর সেই একই সময়ে চীন নিজেকে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্ডার শৃঙ্খলে প্রবেশের জন্য প্রস্তুতি শেষ করতে পেরেছিল – এই দুই ঘটনার সমপাতিত হওয়া এক কাকতলীয় ঘটনা মাত্র। চীনের প্রস্তুতি সম্পন্ন একই সময়ে হওয়াটা পরিকল্পিত মনে করা  – এই ধারণার কোনো ভিত্তি নেই, এমন ধারণা ভুল হবে। অথবা চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করে দেয়াটাই আবার গ্লোবালাইজেশনও নয়।

গ্লোবাল কর্মসূচি গ্লোবালাইজেশন, এর শুরু আর চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার কাজ শেষ করা একই সময়ে ঘটেছে, এতটুকুই। ফলে এটা কাকতলীয়। এমনকি গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে হবে এমন টার্গেট করেই চীন নিজেকে উন্মুক্ত করেছে এ কথাও সত্য নয়। কারণ মনে রাখতে হবে, চীনের নিজেকে উন্মুক্ত করার মূল সিদ্ধান্ত মূলত ১৯৫৮ সালের; যখন দুনিয়াতে গ্লোবালাইজেশন এই গ্লোবাল কর্মসূচি বলে কোনো কিছু বাস্তবে ছিল না। এমনকি বাংলাদেশের বেলায়ও যেমন, ১৯৮২ সালে এরশাদের আগমন কেবল গ্লোবালাইজেশনের কারণে শুরু হচ্ছে বলে ঘটেছিল তা নয়। বিশ্বব্যাংকের দিক থেকে এরশাদের আগমন ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল দুটা কাজ করে ফেলা। সে সময়ের বাংলাদেশে তাদের দু’টি কর্মসূচি ছিল যা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের দিক থেকে কোনো সম্ভাব্য বাধা না আসতে দিয়ে বাস্তবায়ন করে ফেলা। সে কর্মসূচির একটা হল – রফতানিমুখী অর্থনীতি (এটাই গ্লোবালাইজেশন কর্মসূচি) করে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ঢেলে সাজানো। আর অন্যটা রাষ্ট্র-প্রশাসনিক সংস্কার (স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট বা Structural Adjustment)। এ দুটোকে আমরা যেন মিশিয়ে না ফেলি। কেবল  প্রশাসনিক সংস্কারের কর্মসুচির দিক থেকে জরুরি মনে করেছিল বিশ্বব্যাংক বলে জিয়ার বদলে এরশাদকে ক্ষমতায় আনা হয়েছিল।

তবে চীনা গবেষকের কথা সঠিক যে, ভারতের বেলায় বলা যায় গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা সে নিতে অনেক দেরি করেছে। গ্লোবালাইজেশনের মূল কথাই হল – ভিন দেশে রফতানি করব। এতে আপনা থেকেই এর আরেক যে সোজা মানে হয়ে গেল তা হল, অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিবো। আমাদের মতো দেশের বেলায়, অন্যকে প্রবেশ করতে দিলে তবেই আমার অন্যের বাজারে প্রবেশ পাওয়া যেতে পারে। ভারতে রাজীব গান্ধির আমলে (১৯৮৪-৮৯) গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা নিতে সংস্কারের কাজ নীতি-পলিসি বদলানো শুরু হলেও এটা তেমন কোন গতি পায়নি। সেটা কিছুটা পেয়েছিল পরের নরসীমা রাওয়ের আমলে (১৯৯১-০৬) মনমোহন সিং অর্থমন্ত্রী হলে। কিন্তু সেটাও বড় প্রভাবের ফলাফল আনতে পারেনি। কারণ শুরু থেকেই কোথায় কোথায় নিজেকে উন্মুক্ত করবে এর বাছবিচার সঠিকভাবে না করে বরং সব খাতেই বাইরের কাছে নিজেকে উন্মুক্ত করেছিল। চীনা গবেষকের ভাষায় যেটাকে তিনি আদতে নিজেকে “সার্ভিস সেক্টর করে হাজির করা” বলছেন। এই ব্যাপারটাকেই সার কথায় চীনের সাথে তুলনায় ভারত গ্লোবালাইজেশনের সুবিধার কিছুই নিতে পারেনি বলছেন। অবশ্য গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের দিক থেকে, এমনিতেই ভারত চীনের চেয়ে কমপক্ষে দশ বছরের লেট কামার।

তবে ভারত একবারই কিছু সুবিধা নিতে পেরেছিল ২০০৪-০৯ এই সময়কালে, মনমোহন সিংয়ের প্রধানমন্ত্রীত্বের প্রথম সরকারের আমলে। বিদেশী বিনিয়োগ এসেছিল ঠিকই। কিন্তু আগে বলে না দিয়ে পরে, পেছনের তারিখ থেকে ট্যাক্স দিতে হবে, বলে আইন বানিয়ে এবার ট্যাক্স দাবি করাতে বিদেশী বিনিয়োগ ভেগে যায়। আর আদালতে কেউ কেউ ট্যাক্স ইস্যুতে মামলা করলে সব মামলাতেই সরকার হেরে যায়। এভাবেই মোদির আগের সরকারগুলোর বাজে সব অভিজ্ঞতা। বরং পরবর্তীতে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা যতটুকু যা ভারত পেয়েছে তা নিজ সক্ষমতার জোরে নয়, আমেরিকার “চীন ঠেকানোর কর্মসূচিতে” ভারতের সাগরেদ-খেদমতগার হতে রাজি হওয়ার বিনিময়ে পাওয়া সব রফতানি সুবিধা সেগুলো। যেগুলো আবার ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার দিক থেকে সব কেড়ে নেয়া হয়েছে। এ কারণে আসলে গ্লোবালাইজেশনের সুবিধা পাওয়া বা নেয়ার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের অবস্থা তুলনীয়ই নয়। মানে সমতুল্য নয়।

তবে চীনা গবেষকও ‘শ্রমমুখী শিল্পের বিকাশ ঘটানো যাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান’ ঘটানোর যে ধারণাটা রেখেছেন সেটাও ভুয়া। অর্থাৎ শ্রমঘন মানে ইচ্ছা করে অনেক শ্রম লাগে এমন শিল্প গড়তে হবে বেশি বেশি করে – এই ধারণাটা অবাস্তব। কারণ, পরিকল্পনা করে চাইলেই বেশি শ্রম লাগানো যায় না। আসলে আপনি কেমন শ্রমঘন শিল্প করবেন সেটার মূল নির্ধারক শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কেমন এর ওপর।

যেমন ধরেন হাউজিং ব্যবসায় একটা বাড়ি বানাতে বেশি শ্রম লাগিয়ে বাড়ি বানাবেন নাকি তুলনায় কম-শ্রম (কিন্তু বেশি টেকনোলজি দিয়ে সেটা পূরণ) এভাবে বাড়িটা বানাবেন? এটা পুরোটাই নির্ভর করে ঐ দেশে সে সময় শ্রমের ন্যূনতম মূল্য কত- এর ওপর। যেমন, একটা হবু বাড়ির চারতালায় ইট ও কাঁচামাল ইত্যাদি বয়ে নিয়ে যেতে হবে। এখন এটা কী কপিকল যন্ত্র লাগিয়ে করবেন নাকি শ্রমিক মাথায় করে ইট বয়ে নিয়ে যাবে এভাবে করবেন – সেটা নির্ভর করে হাউজিং ব্যবসায়ী এখানে হিসাব করবেন কোনোটা সস্তা পড়বে সেই ভিত্তিতে। এই কাজে মেশিনের চেয়ে ম্যানুয়েল বা মানুষের শ্রম যদি সস্তা হয়, মানুষের শ্রম যতক্ষণ মেশিনের চেয়ে তুলনায় সস্তা প্রডাক্ট দেবে ততক্ষণ কপিকলের বদলে শ্রমিক মাথায় করে ইট বইবে। শ্রমঘন হবে! মানে হল, তথাকথিত ‘শ্রমঘন শিল্পের’ রাজত্ব ততক্ষণ চলবে। এমনকি এই ব্যাপারটা ঈঊ সময়ে টেকনোলজি পাওয়া না পাওয়ারও নয়। যেমন শ্রমের বিকল্প কোনো টেকনোলজি বাজারে পাওয়া গেলেও তা ব্যবহার হবে না, ব্যবহারকারী তা কিনবে না যদি ওর বিকল্প হিসেবে মানুষের শ্রমের প্রডাক্ট বা ফলাফল তখনও ওর চেয়ে সস্তা হয়।

ফলে শুরুর দিকে কোনো অর্থনীতি শ্রমঘন শিল্প করে গড়ার পরিকল্পনা করে করতে হয় – বেশি বেশি কাজ সৃষ্টির জন্য, বেকার কমানোর জন্য – এটাও একটা ভুয়া কথা। এগুলা পেটি-কমিউনিস্টদের অবাস্তব ও আবেগী কথা। তবে শুরুর দিকে শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন ওই সস্তা শ্রমের লোভে, মেশিনের চেয়ে ওই শ্রম সস্তা যত দিন থাকে তত দিন বেশি ‘শ্রমঘন শিল্প’ হতে দেখা যায়। ফলে চাইলেও শ্রমঘন শিল্পই আবার ধরে রাখা যায় না। যেমন- চীন এখন নিজের অভ্যন্তরীণ চাহিদার গার্মেন্ট আর নিজে না করে ফ্যাক্টরি উঠিয়ে দিচ্ছে, আমদানির দিকে ঝুঁকছে। কারণ, ন্যূনতম মজুরি অনেক উপরে উঠে গেছে। বাংলাদেশ থেকে আনলে এখন ওটা সস্তা।

শেষ কথাঃ বিপুল জনসংখ্যা অর্থনীতির জন্য একটা সম্পদ অবশ্যই। কিন্তু এটাই আবার বিরাট লায়াবিলিটি হয়ে যেতে পারে যদি অবকাঠামো বিনিয়োগ ও সরাসরি বিনিয়োগ আনা, কাজ সৃষ্টি, দক্ষ প্রশাসন, দক্ষ নীতি সুবিধা, সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সার্ভিস ব্যবস্থা ইত্যাদি দিকগুলোতে – এককথায় কাজ সৃষ্টিতে সরকারের বড় বড় গাফিলতি থাকে।  বিপুল জনসংখ্যা তখন অর্থনীতির জন্য একটা বিরাট দায়, একটা লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে পারে।

তাহলে চীনা গবেষক আসলে মনে করিয়ে দিয়েছেন ভারতের আসন্ন দুর্বল জায়গা কোনটা বাড়ছে। এটা বিরাট স্ট্র্যাটেজিক দুর্বলতা হয়ে উঠবে।  কারণ মোদির দলবাজি আর হিন্দুত্বের হাতে ভারতের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো ইদানিং ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। কারণ মোদী সেগুলো আমাদের রাষ্ট্রের মত সবখানের নির্বাহী হস্তক্ষেপ শুরু করছে – কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তদন্ত প্রতিষ্ঠানসহ সবখানে। ভারত কী হিন্দুত্বের রাজনীতি দিয়ে অথবা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দিয়ে – বিপুল সম্ভাবনার জনসংখ্যাকে সফলতায় রুপান্তরিত করতে পারবে; নাকি উলটা সব লেজে গোবরে করে বিপুল জনসংখ্যাই এক দায় হয়ে উঠবে? এসব বিষয়গুলোরই ফয়সালার হবে ভারতের আসন্ন নির্বাচনে। খুব সম্ভবত বিরাট সব হতাশা অপেক্ষা করছে ভারতের জন্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ইতি জনসংখ্যার নেতি হওয়া  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস কী তৃতীয়পক্ষের নাগালে

 

চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস কী তৃতীয়পক্ষের নাগালে

গৌতম দাস

১৫ অক্টোবর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2uW

ইমরান খান ও শি জিনপিং – ছবি : সংগ্রহ

পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কেমন? মানে সম্পর্ক বলতে ভেঙ্গে বললে, স্ট্রাটেজিক, ইকোনমিক বা পলিটিক্যাল সম্পর্ক কেমন, এই হল প্রশ্নটা। কোন দুই রাষ্ট্র তা ঘোষণা দিয়ে বললে  স্বভাবতই তা বুঝতে সহজ হয়। তবে না বললেও আন্দাজ অনুমান করে অনেক কিছুই প্রায় সঠিক জানা যায়। আসলে আমেরিকা এবং বিশেষ করে ভারতের সবচেয়ে গভীর আগ্রহ হল, স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী – তা জেনে ফেলার। ভারতের এই আগ্রহের তীব্রতা টের পাওয়া যায়, তাদের সব মিডিয়ায় ব্যবহৃত একটা শব্দ থেকে। সেটা হল, “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” (all weather friend); যেমন তারা খোঁচা দেওয়া মন্তব্য হিসাবে প্রায়ই লিখে থাকে যে – চীনের “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” পাকিস্তান ওমুকটা করতে যাচ্ছে……। তবে “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” লেখাটা যতটা না খোঁচা দিয়ে বলা এর চেয়ে বেশি এটা আসলে এক ঈর্ষামূলক আক্ষেপ। “অল-ওয়েদার ফ্রেন্ড” মানে যারা খারাপ বা ভাল যে কোন পরিস্থিতিতেই বন্ধুই থেকে যায়। এছাড়াও আর একটা বিষয় হল, সাধারণভাবে স্ট্রাটেজিক দিক থেকে পাকিস্তান ও চীনের সম্পর্ক কী তা জানাবুঝা নয়, বরং সুনির্দিষ্ট করে “চীন-পাকিস্তান করিডোর প্রকল্পের” [CPEC projects] পিছনে স্ট্রাটেজিক বিষয়াদি কী লুকানো আছেও তা জানতে ভারত ও আমেরিকা বিশেষভাবে আগ্রহী।

পাকিস্তানে ইমরান খানের সরকার এ’এক নতুন ধরনের ক্ষমতা। আমাদের আগের দেখা বা পুরনো অভিজ্ঞতায় যেসব ধারণা আছে তা থেকে এটা একেবারেই ভিন্ন। আমাদের মত রাষ্ট্র মাত্রই, আমরা সাধারণত দেখি এক বিশেষ কোটারি অথবা ব্যক্তিস্বার্থে রাষ্ট্রীয় সম্পদের লুটপাট ও দুর্নীতি সেখানে ঘটবেই। এটা গেল এক দিক আর অন্য দিকে থাকবে ঐ গোষ্ঠী নিজেদের কোটারি কোনো লাভালাভের লোভে বিদেশী কোনো স্বার্থের পক্ষে কাজ করবে। এগুলোই আমাদের মত প্রায় সব রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেই মুখস্তের মত আমরা দেখতে অভ্যস্ত। এই অবস্থায় পাকিস্তানের ইমরানের আগমন অন্তত এই অর্থে নতুন যে, এই ক্ষমতা আমাদের দেখা বা জানা থেকে একেবারেই ভিন্ন। এখানে অনেক কিছুই আমরা ভিন্ন দেখব, তা অনেকেই আশা করে।

কিন্তু কতটুকু নতুন বা ভিন্ন? সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে পাকিস্তানের বিশেষ বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে চোখ ফিরানো দরকার। সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হল, পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য কাজ বা পদক্ষেপ নিতে পারে না। অন্তত পারেনি। পাকিস্তান আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করে এসেছে সেই ১৯৭৯ সাল থেকে, যে ধরনের যুদ্ধকে আমরা ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ বলি। মানে অন্যের স্বার্থে তার যুদ্ধের দায় নিজের কাঁধে নিয়ে সেই যুদ্ধ করে দেওয়া বা নিজে ব্যবহৃত হয়ে যাওয়া। যেখানে সাধারণভাবে  প্রক্সি মানে হল, স্কুলের ক্লাসরুমে নাম ডাকার সময় অনুপস্থিত বন্ধুর হয়ে “উপস্থিত” বলার মত। আমেরিকার হয়ে পাকিস্তানের প্রক্সি যুদ্ধ খেটে দেওয়া – এবিষয়ে আদি গ্লোবাল ঐতিহাসিক ঘটনা বা শুরুর ঘটনাটা হল, ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হওয়া, আর তাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনস্ত মধ্য এশিয়ায় এই বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়তে পারে এই ভয় পেয়ে  সোভিয়েত ইউনিয়নের (বাফার গড়তে) আফগানিস্তান দখল করা; আর এবার তা ঠেকাতে বা উল্টে দিতে আমেরিকা, পাকিস্তানকে দিয়ে এর বিরুদ্ধে নিজের প্রক্সি যুদ্ধ শুরু করা – মানে মোজাহিদিন লড়াই শুরু করা – এটা ছিল প্রথম পর্ব। আর এরই লেজ ধরে দ্বিতীয় পর্বে, আলকায়েদা-তালেবান বনাম আমেরিকার ওয়ার-অন টেরর যুদ্ধে এরই ময়দান হিসেবে পাকিস্তানের ব্যবহৃত হওয়া, যুদ্ধে ঝাপায় পড়ার পাটাতন হিসাবে আমেরিকাকে পাকিস্তানের ভুমি ব্যবহার করতে দিয়ে নিজে আমেরিকার যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়া।

ফলে এই দুই ইস্যুতে গত ৩৮ বছর ধরে পাকিস্তান অন্যের হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে আছে। না এটা অবশ্যই পাকিস্তানের স্বেচ্ছায় করা কাজ নয়। এছাড়া এর মধ্যে তা যতটা না নিজ স্বার্থে এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি আমেরিকান স্বার্থে আর আমেরিকার চাপের বাধ্যবাধকতায় পাকিস্তান করেছে। এই অবস্থা বিবেচনায় নিলে বলতেই হবে যে পাকিস্তান আর আমাদের মত এক আম- রাষ্ট্রের মতো থাকেনি। এ এক বিরাট ব্যতিক্রমী, বিশেষ রাষ্ট্র হয়ে গেছে। যে নিজের স্বার্থ না থাকলেও আমেরকান স্বার্থে নিজেকে ব্যবহৃত হতে দিয়েই শেষ হয় নাই। এরপর আবার আমেরিকাই অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র। এই বিচারে পাকিস্তান আমাদের মত একই পাল্লায় তুলনাযোগ্য রাষ্ট্র কি না সেই প্রশ্ন অনেকে তুলতে পারেন। তবে এই আলোকেই সার কথাটা হল, গত ৩৮ বছরে পাকিস্তান পাকিস্তানের জন্য, নিজের জন্য রাষ্ট্র থাকেনি, কাজ করেনি।

কিন্তু ওদিকে আরেক সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাটা হল, পাকিস্তান নিয়ে যেকোনো আলোচনার সময় বেশির ভাগ মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্রের যেকোন সিদ্ধান্ত যে পাকিস্তানের নয় – এই প্রক্সি-খেটে বেড়ানো, বিশেষ করে আমেরিকান স্বার্থের দায়ের বাধ্যবাধকতায় চলে বেড়ানো, সে কথা মনে রাখে না। মনে রেখে কথা বলে না। পাকিস্তান যেন স্বাধীন – এই অনুমান ধরে নিয়ে এরপর পাকিস্তানের সমালোচনা ও মূল্যায়ন শুরু করেন। সবচেয়ে তামাশার কথা হল, বুশের আমল থেকে পরের সব আমেরিকান প্রশাসন পাকিস্তানের যেকোনো সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ যে আমেরিকারই স্বার্থে প্রক্সি পদক্ষেপ সে কথা স্বীকার না করে, দায় না নিয়ে উল্টো পাকিস্তানের সমালোচনা করে থাকেন।

তবু এগুলোও মূল বিষয় নয়, আরো দিক আছে। তা হল, প্রক্সি যুদ্ধের এই কালের  পাকিস্তানের অপর দুটা রাজনৈতিক দল,  নওয়াজ শরীফের পিএমএল (PML-N) আর ভুট্টো পরিবারের পিপিপির (PPP) ভূমিকা। তারা এই প্রক্সি যুদ্ধের পাকিস্তান পরিস্থিতিতে নিজেরা যে ন্যক্কারজনক ভূমিকা নিয়েছে তা হল – যেহেতু আমেরিকান ইচ্ছা, চাহিদা বা সিদ্ধা্নতের পক্ষে থাকা তাদের আমলের সরকারের পক্ষে এড়ানো বা ভিন্ন কিছু করা সম্ভব নয়, তাই ক্ষমতায় থেকে চুরি আর লুটপাটের বন্যা বইয়ে দেয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ – কারণ আমেরিকানদের খেদমতে খেটে যাবার করার কারণে ক্ষমতা তো নিশ্চিত! আর তাতে দায় দোষারোপ সব আমেরিকার ওপর দেয়া যাবে। এই দুই দল এখান থেকে পাকিস্তানকে দেখেছে – আর এটাই পাকিস্তানের দুরবস্থায় সবকিছুর উপরে দুর্ভাগ্যের দিক। এ কারণে আজ পাকিস্তানের ক্ষমতার করিডোরের আলাপে এক চালু হিসাব হল, নওয়াজ অর্থ লোপাট করে বিদেশে রেখেছে দুই বিলিয়ন ডলার, আর ভুট্টো পরিবার রেখেছে এক বিলিয়ন ডলার।

এভাবে পাকিস্তানের অর্থনীতি ফোকলা অবস্থায়। পাকিস্তানের নির্বাচনে ইমরান এবার ক্ষমতায় এসেছেন। লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট স্বাক্ষ্য দিয়ে, ডাটা ও গ্রাফ এঁকে দিয়ে বুঝিয়ে, বলছে পাকিস্তানের চরম খারাপ অর্থনৈতিক দুরাবস্থার জন্য ইমরান দায়ী নয়। আগের সরকার নওয়াজ শরীফ দায়ী। [The economy’s troubles are not Mr Khan’s fault.]   তবে বলা হচ্ছে, পাকিস্তানের দেউলিয়া এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে এখন ১৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। পাকিস্তান রুপির ডলার বিনিময় মূল্যমান গত এক বছরে ৯১ থেকে নেমে এখন ১৩৪ রুপিতে ঠেকেছে। কথাগুলো বলা হচ্ছে এ জন্য যে, ইমরানের ক্ষমতার শপথের পরের প্রথম মাস তার কেটেছে সৌদি, চীন নাকি আইএমএফ  – কার কাছ থেকে নুন্যতম ঋণ-মুক্তির অর্থ বা “বেল আউট”-এর অর্থ পেতে পারে সেই খোঁজাখুঁজিতে। সৌদিদের উপর প্রবল ভরসা করে ইমরান নিজেই প্রথম সফর হিসাবে সৌদি আরব গিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ঋণ দেওয়ার বদলে, CPEC projects এ বিনিয়োগের শেয়ার নিতে স্বেচ্ছায় এক পালটা প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ইমরানের বিবেচনায় সঠিকভাবেই এই প্রস্তাব কার্যকর করতে গেলে চীনের সাথে পাকিস্তানের  সম্পর্কে খামোখা নতুন জটিলতা দেখা দিতে পারে। কারণ সৌদি প্রস্তাবে একমত হতে চীনকেও বুঝাতে হবে, রাজি করাতে হবে ইত্যাদি অনেক ব্যাপার আছে। তাই সৌদি প্রস্তাব ফেলে রাখা ছাড়া ইমরান উপায় দেখেন নাই।  

ইতোমধ্যে সর্বশেষ খবর হল, শেষমেশে, ইমরানের সিদ্ধান্ত – পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে আইএমএফের কাছে সাত বিলিয়ন ডলারের বেল আউট ঋণ চেয়ে আবেদন পেশ করেছে। আনুষ্ঠানিক ভাষায়, এটা পাকিস্তানের “ব্যালেন্স অব পেমেন্টের ঘাটতি” মিটানোর ঋণ। 

গ্লোবাল অর্থনীতির (Global Economic Order) দিক বিচারে এশিয়ায় এখন এটা মূলত চীন-আমেরিকার লড়াইয়ের যুগ চলছে; অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পালাবদলে এটা আমেরিকার জায়গায় চীনের আগমন ও সেই স্থান দখলের কাল। এই লড়াইটা, আমেরিকার দিক থেকে এটা তার প্রভাব ও ক্ষমতার পতন যতদুর সম্ভব ঠেকানোর লড়াই। আর চীনের দিক থেকে নিজের প্রভাব ও ক্ষমতা বাড়িয়ে নিজে উত্থান নিশ্চিত করার লড়াই। এ দিকে এই মূল লড়াইয়ে ক্রমশ হারু পার্টি আমেরিকা, একাজে বাড়তি সুবিধা পেতে  ভারতকে নিজের পক্ষে রাখার চেষ্টা করছে দেখা যায়। যদিও সবসময় আবার তা নিজ অন্য স্বার্থের দিকে তাকিয়ে সম্ভব করে তুলতে পারে না, সেকথাও সত্য।

চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্প (China–Pakistan Economic Corridor বা CPEC projects) – মোট ৬২ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প যা উত্তর দক্ষিণ বরাবর পাকিস্তানের বুক চিড়ে করাচির গোয়াদরের গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের সীমানা পেরিয়ে একেবারে চীনের জিনঝিয়াং (Xinjiang Uyghur Autonomous Region) উইঘুর প্রদেশের কাশগড় পর্যন্ত এক হাইওয়ে তৈরি হচ্ছে। তাই এই প্রকল্পটা আসলে চীনকেই পাকিস্তানের করিডোর দেয়া। অর্থাৎ পুরোটাই কেবল পাকিস্তানের স্বার্থে নেয়া কোনো অবকাঠামো প্রকল্প নয়। চীনের উইঘুর প্রদেশ ল্যান্ডলকড অঞ্চল; ফলে এর বধ্যদশা ঘুচাতে, অঞ্চলটাকে সমুদ্রপথেও যোগাযোগ করিয়ে দিতে, রাজনৈতিকভাবে উইঘুর মুসলমানদের মন-জয় করতে, তাদের পিছিয়ে থাকা দশা থেকে মুক্ত করতে  – চীন এটা নিজের জন্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প মনে করে।

কিন্তু আমেরিকা (সাথে ভারতও) নিজেদের সন্দেহ ও স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থে চীন-পাকিস্তানের এই বাস্তব বৈষয়িক ঘনিষ্ঠতার চরমতম বিরোধিতা করে থাকে। পাকিস্তান আমেরিকার প্রভাবের হাত থেকে ছুটকারা পেয়ে যাচ্ছে এই প্রকল্পের মত তৎপরতার কারণে। ফলে এই প্রকল্প পুরোটাই আমেরিকান স্বার্থের বিরোধী বলে এরা দেখে। কিন্তু ওদিকে আমেরিকা ও ভারতের জন্য আর এক চরম অস্বস্তিকর একটা ফ্যাক্টস হল, করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের মূল চার প্রদেশকে এক সাথে এক জায়গায় এনেছে। এই প্রকল্প পাকিস্তানের সব প্রদেশের ওপর দিয়ে গেছে, তাই এটা কেবল কেন্দ্রের নয় পাকিস্তানের সব প্রাদেশিক সরকারও স্বাধীনভাবে নিজের স্বার্থের দিক থেকে এই প্রকল্পকে  অনুমোদন করে স্ব স্ব প্রাদেশিক পার্লামেন্টেও সিদ্ধান্ত পাশ করেছে। এমনকি বেলুচিস্তান যেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন আছে তাদেরও কোনো পক্ষই এই প্রকল্পের ঠিক বিরোধী নয়।

এসব কিছুর মূল কারণ সব প্রদেশের জনগণও এই প্রকল্পকে দেখে থাকে এক হাইওয়ে ধরে রপ্তানিতে গভীর সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর সুযোগ, এতে রপ্তানি বাণিজ্যে সক্রিয় হতে নিজ নিজ প্রাদেশিক স্বার্থেও বিকশিত হওয়ার জন্য এই প্রকল্পকে বিরাট নিয়ামতের মত মনে করে। ফলে চার প্রদেশ অন্তত একটা ইস্যুতে পুরো পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ করেছে। আবার চীনেরও স্বার্থে এই অবকাঠামো প্রকল্প ব্যবহৃত হবে বলে এর অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি নিশ্চিত করার দায়ভার এবং এর ঋণ পরিশোধের দায়ভার পাকিস্তানের সাথে চীনেরও। কিন্তু এসব বিষয়গুলো কিভাবে পারস্পরিক চুক্তিতে লেখা আছে – সেটা বিলিয়ন ডলারের এক কৌতূহল আমেরিকার (সাথে ভারতেরও) কাছে। তাদের গভীর অনুমান যে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে।

আসলে অর্থনৈতিক স্বার্থ মানেই সাথে জড়ানো থাকে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থঃ
এই প্রকল্পের শিরোনামেই বলা আছে এটা “অর্থনৈতিক” প্রকল্প। অর্থাৎ এটা কোন সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থে নেয়া যুদ্ধ করার প্রকল্প নয়। তবুও তাতে কিছু এসে যায় না। কারণ শতভাগ যেকোন অর্থনৈতিক প্রকল্পেও ওর নিরাপত্তার দিক থাকবেই; ফলে সেই সুত্রে ওর সামরিক-স্ট্রাটেজিক স্বার্থের দিকও থাকেই, তা আলাদা করা যায় না। এই ব্যাপারটা আমেরিকা বা ভারতের বেলায়ও সমান সত্য। যখন চীন অর্থনৈতিক ভাবে কেবল জাগতে শুরু করছে কেবল, সেই ২০০৮ সালের একটা ঘটনা হল – মার্কিন কংগ্রেসের ফরেন এফেয়ার হাউজ কমিটির সামনে এক মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর হায়ার করে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের আলোচনায় চীন উত্থানের প্রভাব কী এনিয়ে মুল্যায়ন রিপোর্ট করিয়ে নেয়া হয়েছিল। এরপর সেই প্রফেসরকে কংগ্রেস কমিটিতে শপথ করিয়ে যেমন জেরার শুনানি চলে তা চলেছিল। যেখানে প্রফেসর স্বাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল চীনের অর্থনীতিতে বাধা সৃষ্টি করে একে ডুবিয়ে দিবার উপায় কী। চীনে জ্বালানি তেল আনা আর রপ্তানি পণ্য পাঠানোর বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথে, চোকিং পয়েন্ট মানে ঠুটিই চিপে শ্বাস রুদ্ধ করে ধরা সম্ভব এমন এক চিকন হয়ে পড়া নৌচলাচল পথের অংশ আছে, (Strait of Malacca বা বাংলায় মালাক্কা প্রণালী নামে) মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়ার মাঝে। যা চিপে ধরলে মানে এই ৯০০ কিমি চিকন হয়ে থাকা নৌপথে – ইচ্ছা করে কোন জাহাজ ডুবিয়ে নৌচলাচল ব্লক করে দিলেই চীনের অর্থনীতি ডুবিয়ে দিতে আমেরিকাকে আর যুদ্ধ করতে লাগবে না। এই ছিল ঐ প্রফেসরের যুক্তি ও পরামর্শ। এখন আমেরিকান সিনেট যদি চীনের ক্ষতি  করতে এই আলাপ করতে পারে তাহলে চীন পালটা তার দুর্বল জায়গা – ঐ মালাক্কা প্রণালীর অনেক অনেক বিকল্প তৈরি করে রাখবে না কেন?  আর চীন তা করলেই, “চীন অর্থনীতির সাথে সামরিক স্ট্রাটেজিক স্বার্থ” মিলিয়ে ফেলছে –  আমেরিকা ও ভারতের এই ভুয়া চিৎকার অর্থহীন।  ফলে পাকিস্তানের গোয়াদর অথবা শ্রীলঙ্কার হাম্বানতোতায় [এমন কি হবু বাংলাদেশের সোনাদিয়ায়ও আর একটা ] গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে তা ব্যবহার করে – চীন মালাক্কা প্রনালীর বিকল্প ব্যবস্থায় বাণিজ্যিক পণ্য চলাচলের উপায় করে নিবে – এটাই কী সবচেয়ে স্বাভাবিক নয়? এই অবস্থায় চীন গভীর সমুদ্র বন্দর বানিয়ে কেবল “ভারতকে মুক্তা মালার মত ঘিরে ফেলতেছে”, তাই ভারতের হাসিনাকে চাপ দিয়ে  বাংলাদেশের সোনাদিয়ায় আর একটা বন্দর করা ঠেকিয়ে রাখতে হবে – এসব বক্তব্য কোন এক পেত্নির নাকি-কান্না ছাড়া আর কী? তাহলে সারকথা, কোন অর্থনৈতিক প্রকল্প যত বড় হবে তাতে উল্লেখ করা থাক আর না থাক, ওর সাথে সাথে এক সামরিক -স্ট্রাটেজিক স্বার্থ জড়িয়ে থাকা ততই বেশি সম্ভাবনা তৈরি হবে। সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে কোন (৫ থেকে ৬২ বিলিয়ন ডলারের) বড় বিনিয়োগ অর্থনৈতিক প্রকল্প কোন রাষ্ট্র কেন নিবে? বরং নিতেই পারে না।

কিন্তু প্রশ্ন এত দূরে কেন উঠছে? কারণ, পাকিস্তান ঋণের জন্য আইএমএফের কাছে আনুষ্ঠানিক আবেদনের পরে এখন আইএমএফ টিমের চলতি সপ্তাহেই পাকিস্তান সফর এবং মূল্যায়নে বসা নিয়ে তৎপরতা শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে খবর হল, পাকিস্তান সফর করছে এমন আইএমএফের টিম বলেছে, তাদেরকে CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে, পরিষ্কার ধারণা পেতে পারে যে পাকিস্তানকে ঋণ দেয়া আইএমএফের জন্য কতটা রিস্ক বা দায় নেয়া হয়ে উঠতে পারে। যদিও পাকিস্তান এই আবেদন প্রত্যাখান করেছে। কিন্তু ভারতের মিডিয়া প্রবল আগ্রহ তৈরি করেছে যে এইবার “আঙ্কেল স্যাম” তাদেরকে CPEC করিডোর চুক্তির হদিশ পাইয়ে দিবেই।

এখানেই হল আসল ইস্যু। আগেই বলেছি, আমেরিকার (সাথে ভারতও) কাছে তাদের অনুমান হল, চীন-পাকিস্তানের ওই প্রকল্পের চুক্তিতে চীন-পাকিস্তানের স্ট্র্যাটেজিক সামরিক বোঝাবুঝি কী আছে তা এই চুক্তির মধ্যে প্রতিফলিত থাকবে। তাই তাদের প্রবল কৌতূহল ওই চুক্তিতে কী আছে তা জানার।

এখন আইএমএফকে দিয়ে চুক্তির “স্টাটেজিক তথ্যের দিক হাতিয়ে”  আমেরিকা কি তার সেই প্রবল আগ্রহ আর কৌতূহল মিটিয়ে নিতে পারবে?
আমরা স্মরণ করতে পারি, ইমরান খান সরকারের শপথ নেয়ার মুহূর্তে পাকিস্তানের লোন প্রসঙ্গ উঠতেই আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেই হুঙ্কার দিয়ে বলে উঠেছিলেন, “আইএমএফ থেকে ঋণ নিয়ে চীনের ঋণের দায় শোধ করা যাবে না”। [Pompeo warns against IMF bailout that pays off Chinese lenders]। এটা অবশ্যই আমেরিকার কোন বুদ্ধিমান মন্তব্য ছিল না। ছিল, ডুবে যাচ্ছে এমন মরিয়া এক আমেরিকান আস্ফালন।

তাই মনে করার কারণ আছে যে, আইএমএফের প্রেসিডেন্ট লাগার্দের (Christine Lagarde) কথিত এখনকার মন্তব্য যে আমাদেরকে “CPEC করিডোর প্রকল্পও ক্ষতিয়ে দেখতে হবে” [যদিও কোন মিডিয়াই লাগার্ডে বা আইএমএফের কোন কর্ককর্তার সরাসরি বরাতে একথা বলতে পারে নাই। সবাই “সোর্স বলেছে” বলে লিখেছে। ] এটা আগের পম্পেই হুঙ্কারেরই নরম ও কারেক্ট ভার্সন। এখন দেখার বিষয় চীন-পাকিস্তান করিডোর চুক্তি পুরোটাই বা অংশ ওপেন না করেও পাকিস্তান আইএমএফের ঋণ হাসিল করতে পারে কি না!

তবে ভারত ও আমেরিকার দুটা মিথ্যা প্রপাগান্ডা এখানে আলাদা করা দরকার। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণ কী, চীনা CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ? এপর্যন্ত কোন দেশি বা বিদেশি মিডিয়া রিপোর্ট এই দাবি করেছে এমন দেখা যায় নাই। কিন্তু সকলেই এমন একটা অস্পষ্ট ইঙ্গিত করার চেষ্টা করে থাকে। ইমরানের পাকিস্তান সরকার এবিষয়ে নিজেই কিছু ফ্যাক্টস প্রকাশ করে এমন ইঙ্গিত ও প্রপাগান্ডাকে নস্যাতে উড়িয়ে দিয়েছে।  ইমরানের সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় – তারা বলেছে, “The CPEC deals are open and transparent,” said Noor Ahmad, a spokesman for the Ministry of Finance.

এছাড়া জানিয়েছে, পাকিস্তানের এপর্যন্ত প্রাপ্ত মোট বিদেশি ঋণ ৯৫ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে মাত্র ৬ বিলিয়ন বা ৬.৩% হল CPEC করিডোর প্রকল্পের ঋণ। [Pakistan has already brushed aside criticism on growing indebtedness of the country due to CPEC, saying the share of the CPEC loans was only $6 billion or 6.3% in total outstanding external debt of $95 billion as of end June this year.]  আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা হল, আইএমএফ এবারই প্নরথম নয় আগেও (২০১৪) করিডর প্রকল্পের এক মুল্যায়ন রিপোর্ট তৈরি করেছিল। করিডোর প্রকল্পের কোঅর্ডিনেটর এটা জানিয়েছেন। সেই রিপোর্ট অনুসা্রে, আইএমএফ লিখেছিল,  [The IMF report has then stated that the CPEC infrastructure and transport projects are financed by long-term concessional government borrowing from China.]  অর্থাৎ  এই প্রকল্প চীনের স্বল্প সুদে (concessional) দেয়া ঋণ” বলে মনে করেছে আইএমএফ। বিশ্বব্যাংকের ভাষায় “কনসেশনাল” ঋণ মানে হল  –  (১% এর কম,) ০.৭৫% বাৎসরিক সুদ, চল্লিশ বছরে শোধ করতে হবে তবে প্রথম দশ বছর কোন কিস্তি দিতে হবে না, মাফ পাবে। এখানে “কনসেশনাল” ঋণ মানে সুনির্দিষ্ট করে কী বুঝানো হয়েছে তা জানা যাচ্ছে না। এছাড়া ঐ রিপোর্টে আর একটা মন্তব্য আছে, CPEC-related outflows would peak at about $3.5 billion to $4.5 billion per annum by fiscal year 2024-25. – মানে ঋণ শোধের দায় সবচেয়ে চড়া হয়ে উঠবে ২০২৪-২৫ সালে, যখন বছরে প্রায় চার বিলিয়ন করে কিস্তি পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ তখন এটা পাকিস্তানের জন্য কঠিন হতে পারে। এই বিষয়গুলো পাকিস্তানের ট্রিবিউন পত্রিকার রিপোর্ট। কাজেই আমেরিকা ও ভারতের ভুয়া ক্যাম্পেইনের পাল্লায় পড়া থেকে এবার সকলে সাবধান। 

দুনিয়ার জন্য বর্তমানে এক ইউনিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। যখন চীনের উত্থান ঘটেইনি সেই পরিস্থিতি মানে, যখন দুনিয়াতে আমাদের মতো রাষ্ট্রের কোনো ঋণ পাওয়ার একমাত্র উৎস ছিল আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক। সেসব দিন পেরিয়ে, এখন চীন উত্থিত ও বিকল্প হিসেবে আবির্ভাবের একালে দুনিয়াকে নতুনভাবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককেও  আমল করতে হচ্ছে। কারণ এখন আর সে একক ঋণদাতা নয়। শুধু তাই নয়, আইএমএফ যদি প্রফেশনাল প্রতিষ্ঠানের মত না হয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির ভাঁড় হয়ে থাকতে চায়, ঐ বিদেশনীতি সরাসরি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হয়ে থাকতে চায় তবে এই আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানও একদিন আমেরিকার সাথে শুকিয়ে ছোট হয়ে যাবে – সেটাও আশা করি আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের আমল করে চলে, আমরা দেখতে পাব!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের হদিস জানা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

গৌতম দাস

১৪ জুন ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2sc

 

 

আগামি দুনিয়ার বহু কিছুর নির্ধারক হবে এমন, সিঙ্গাপুরের এক বিশেষ ঘটনার দিকে গত ১২ জুন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। ঘটনাটা হল, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন – এদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইকোনমিস্ট (৭ জুন ২০১৮) পত্রিকার ভাষায়, [WHEN a great power promises a smaller country a “win-win” deal, diplomats mordantly joke, that means the great power plans to win twice.]  কোনো ক্ষমতাধর পরাশক্তি যখন কোনো তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্রের সাথে বৈঠক থেকে ‘উইন-উইন’ (win-win) ফল আসবে বলে জানায়, মানে তাতে ‘উভয় পক্ষের জন্য জিত’ হবে বলে ঢোল পেটায়; তখন এটা নিয়ে কূটনীতিকেরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেন। কারণ, তাদের জানেন এসব ক্ষেত্রে ওই উইন-উইন কথার আসল অর্থ কী! আদতে সেখানে বিষয়টা দু’জনেরই লাভালাভ ধরণের কিছু নয়, বরং কেবল একজন, পরাশক্তি অংশটার একারই দুইবার বিজয়। এটাই উইন-উইন কথার আসল অর্থ। কিন্তু ইকোনমিস্ট সাবধান করে বলছে, এবারের ঘটনাটা হবে ব্যতিক্রম। কেন?

প্রথম কথা হল, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে কী পাওয়ার আশা করে? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন, ট্রাম্প এমন বৈঠকে বসতে রাজি হলেন কেন? তার তাগিদ কি অনেক? কী সেই তাগিদ বা দুর্বলতা?

এখানে ঘটনার পটভূমি খুবই পুরনো, সেই ১৯৫০-এর দশকের। অন্যভাবে বললে, সময়টা হল যখন থেকে সোভিয়েত কমিউনিস্টরা লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ ধারণা বা শব্দকে নিয়ে এবার আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে ডাকা বা গালি দেয়া শুরু করেছিল। কারণ এর আগে আমেরিকার হাতে দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কোনোটাই ছিল না, তাই। ছিল ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফ্রান্সের মতো কলোনি মাস্টারদের হাতে। অথবা এই বিচারে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চে যখন দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতার প্রথম এক পালাবদল মঞ্চস্থ হচ্ছিল, ইউরোপের কলোনি মাস্টারদের থেকে আমেরিকার হাতে। এরই ঠিক অপর পিঠের না হলেও অনুষঙ্গ ঘটনা হল, অবিভক্ত কোরিয়া আগে জাপানের কলোনি হয়ে ছিল আর সেবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানের হাত থেকে কোরিয়া মুক্ত হয়েও এক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, নাকি আবার ইউরোপের কারও অধীনে নতুন করে চলে যাবে; তার ফয়সালা আসতে দেরি হচ্ছিল।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্ন বা ইচ্ছা কোনোটাই ছিল না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়ায় কাউকে নিজের কলোনি করে রাখায় অথবা অন্য কাউকে কলোনি করতে দিতে। বরং “নিজস্বার্থে কলোনি ব্যবস্থা উতখাত” এই মূল নীতিতে তিনি বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকাকে পরিচালিত করেছিলেন। তাই ১৯৪৫ সালে সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তাঁর হঠাৎ মৃত্যুতে পরের রুজভেল্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট, রুজভেল্টের ভাবশিষ্য এবং পরবর্তি (প্রায় আট বছরের) প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের নীতিও ছিল রুজভেল্টের নীতি ও এরই ধারাবাহিকতা। কিন্তু তাঁরও পরের নির্বাচনে বিজয়ী হিসাবে ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে পরের প্রেসিডেন্টের শপথ নেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেনাপতি আইসেনহাওয়ার। আর এতেই ঝুলে থাকা ট্রুম্যানের আমেরিকান নীতি বাস্তবে এতদিন যে দ্বিধা ও লিম্ব হয়ে ছিল যে, কলোনি-উত্তর পরিস্থিতিতে কোরিয়া কি আমেরিকার কলোনি হবে নাকি কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে, এবার সেটা নির্ধারিত হয়ে যায়। নতুন পথে যাত্রা শুরু করে।
রাষ্ট্রসংঘ জন্মের পরেপরে এর উদ্যোক্তা নেতা ছিল আমেরিকা। তার তা ছিল দুনিয়ার যে কোন বিবাদে মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নেয়া ট্রুম্যানের আমেরিকা। এবার তা আইসেনহাওয়ার আমেরিকা হয়েই আর মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নয়, এবার নিজেই একটা পক্ষ হয়ে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সামরিক একশনে চলে যায়। আমেরিকা ১৯৫৩ সালে ‘কোরিয়া যুদ্ধ’ শুরু করেছিল। তবে এই যুদ্ধ লম্বা সময়ব্যাপী অমীমাংসিত হয়ে যেতে থাকায় শেষে এ থেকে বের হতে – কমিউনিস্ট কোরিয়া আর আমেরিকা প্রভাবিত কোরিয়া – এভাবে দুই রাষ্ট্রে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া হিসেবে এক আপসরফায় কোরিয়া ভাগ হয়ে যায়। সামনে উদাহরণও ছিল ১৯৪৯ সালে বিপ্লব করা মাওয়ের চীন।  চীনা বিপ্লবের শেষের দিকে সেখানেও মূল চীন থেকে দ্বীপাঞ্চল তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র বলে ভাগ করে বিপ্লব বা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি করা হয়েছিল।

আসলে পুরনো জাপানিজ কলোনি অবিভক্ত কোরিয়া মুক্ত হয়ে নতুন তর্কের মধ্যে পড়ে যে, এবার তা আমেরিকান প্রভাবমুক্ত কোরিয়া হবে, না কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে – এ বিষয়টিরই আপাত মীমাংসা মনে করা হয়েছিল কোরিয়া ভাগ করে দিয়ে। ফলে এটাকে বলা যায় সোভিয়েত-মার্কিন ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ শুরুর অন্যতম উদাহরণ। [আর এক উদাহরণ ইরান, নিজ তেল সম্পদের মালিকানা রক্ষার বিবাদ] আর সেই সময় থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকা নিজের স্থায়ীভাবে সেনা ব্যারাক বানিয়ে অবস্থান নিয়েছিল, যা এখনো বর্তমান। সেই থেকে আমেরিকাই এই দেশ দুটোর প্রতিরক্ষা দেখার কাজ স্বতপ্রবৃত্তভাবে নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছিল। আর তা থেকে এর পরে আরেক সমস্যার সৃষ্টি হয়।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান থেকে ঘাঁটি এসে আমেরিকা যেকোনো সময় উত্তর কোরিয়ায় হামলা করতে পারে, উত্তর কোরিয়ায় এই আশঙ্কা বাড়তে থাকে। আর এই চাপ থেকে মুক্ত হতে একমাত্র উপায় বা সমাধান হিসেবে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঝুঁকে যায় ও সফলতাও লাভ করেছিল। এতে চাপ এবার উল্টো আমেরিকার ওপর পড়ে। আমেরিকা বুঝে যে, উত্তরকে কোন রকম চিন্তাভাবনা না করে, যথেষ্ট না করে বা ভুলভাবে নাড়াচাড়া করলে দুনিয়ার সকলকেসহ ঐ এলাকার সবাইকে পারমাণবিক বোমার বিপর্যয় দেখতে ও ভুগতে হতে পারে।

তবে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়া প্রমাণ করেছিল, পারমাণবিক বোমা লাভ নিঃসন্দেহে দুনিয়ায় প্রাণ প্রকৃতি ও জীবন টিকে থাকার দিক থেকে খুবই বিপজ্জনক ও চরম আত্মধ্বংসী ও ক্ষতিকারক এক কাজ। তা হওয়া সত্ত্বেও অন্য আরেক দিক বিচারে পারমাণবিক বোমা অর্জন আর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবজ যেন প্রায় সমার্থক। বোমা নিজ নাগালে থাকলে আমেরিকার মত পরাশক্তির হাত থেকেও নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। আবার এটাও ঠিক, এই বোমা অর্জন মানে গরিব দেশের জনগোষ্ঠীর সীমিত সম্পদের উপর নতুন এক বিপুল পরিমাণ খরচ জোগানোর দায় চাপানো। জনগণের জীবনমান কমিয়ে ফেলা, কম্প্রোমাইজে ঠেলে দেওয়া। উত্তর কোরিয়া তবুও সব বিবেচনা শেষে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকেই প্রাধান্যে রেখে অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অপর দিকে এতে আমেরিকার দিক থেকেও কিছু সান্ত্বনা ছিল যে, উত্তর কোরিয়ার বোমা সরাসরি আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছানোর যোগ্য নয়। কারণ, কোরিয়া থেকে আমেরিকা হাজার পাঁচেক মাইল দূরে আরেক মহাদেশে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকান স্থাপনা বা বিনিয়োগ সহজেই উত্তর কোরিয়ান বোমা খাওয়ার নাগালে ছিল, এটাও কম ঝুঁকি বা বিপদের নয়। তবে সামগ্রিক ফলাফলে সেই থেকে কোরিয়া-জাপান-চীন এশিয়ার এই কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলের প্রায় সবার (আমেরিকাসহ) পকেটে পারমাণবিক বোমা আছে বলে কেউই আর যুদ্ধের ঝুঁকিতে যায়নি, এড়িয়ে চলতে পেরেছে। কিন্তু ভুলচুকে বা উত্তেজনায় কখনো সবাই বোমা খেয়ে মরতে হতে পারে, পারমাণবিক বোমার ভয়ে ভীতিকর সেই সম্ভাবনা ওই অঞ্চলে টিকটিক করে আছে।

ইতোমধ্যে ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বিশ্বব্যবস্থায় এই বিষয় সম্পর্কিত দুটা বড় ধরণের পরিবর্তনের বিষয় সামনে এসেছে।

প্রথমটা হল, চীনের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে নিশ্চিত উত্থান। আর সাথে  ঘটেছে সম্ভাব্য গ্লোবাল লিডার হিসেবে আমেরিকার জায়গা দখল করে নিতে যাচ্ছে চীন। এ ছাড়া, বিশ্বের উদ্বৃত্ত সম্পদ একুমুলেশন বা সঞ্চিত হওয়ার একমাত্র এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী গন্তব্য হয়েছে এখন চীন। ফলে ভিন্ন শব্দে বললে চীন এখন একমাত্র ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সক্ষমতার উদীয়মান সুর্য। ফলে এক নির্ধারক রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী এখন চীন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এক দিকে যত সম্পদ বাড়ে ততই সেটি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বেশি হতে থাকে। সম্পদ যত কম তা সুরক্ষার বালাই তত কম। তাই চীনের এই স্বার্থ,  বা ফলাফলে তার যেকোন কথার ওজনও অন্য সবার চেয়ে বেশি ভারী হয়ে ওঠে।

যদিও চীন খোদ নিজেই পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়েছিল সেই ১৯৬৪ সালে; তবুও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সাথে সাথে পারমাণবিক বোমা ঝুঁকিতে থাকা তার নিজের অঞ্চলকে মুক্ত দেখার এক তাগিদ চীনের ভেতর দেখা দেয়াই স্বাভাবিক। ফলে এ সম্পর্কে একটা নীতির কথা চীন বলা শুরু করে তখন থেকে। তা হল, কোরিয়া-জাপান-চীনের ওই পুরো অঞ্চলকেই পারমাণবিক বোমামুক্ত করা। এতেই সবার স্বার্থ সুরক্ষিত হতে পারে। আর একধাপ ভেঙে বললে, ওই অঞ্চলে আমেরিকান কোনো সেনাঘাঁটিতে অথবা তাকে আশ্রয় দেয়া কোরিয়া ও জাপানের হাতে অথবা চীনের হাতেও কিংবা সম্ভাব্য অন্য কারো হাতে বোমা মজুদ না রাখার এই নীতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে ঐকমত্যে আসা। যদিও সবচেয়ে বড় প্লেয়ার আমেরিকা কখনো চীনের এই প্রস্তাবের প্রতি গরজ দেখায়নি। অর্থাৎ এই প্রস্তাবের ভেতরে আমেরিকা নিজের তাৎক্ষণিক স্বার্থ দেখেনি; বরং পাল্টা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের ডালি খুলে বসে থেকেছে সব সময়। যদিও সেসব অভিযোগ আবার মিথ্যাও নয়। উত্তর কোরিয়াও আবার আমেরিকার বিরুদ্ধে নিজের নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে রাখার জন্য হাজারটা অভিযোগ তুলতে পারবে, সেগুলোও মিথ্যা নয়। তাতে প্রেসিডেন্ট বুশ উত্তর কোরিয়াকে ‘এক্সিস অব এভিল’ বলে ক্ষোভ ঝাড়লেও কিছু এসে-যায় না। উত্তর কোরিয়া পাকিস্তান বা ইরানকে বোমা সংগ্রহ ও অর্জনে সাহায্য করেছে, এ কথা মিথ্যা নয়। এক কথায় বললে ১৯৪৫ সালে জাপানে আমেরিকার পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ, অর্থাৎ ব্যবহার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর থেকে সোভিয়েত-মার্কিন এক সমঝোতা হয় যে, দুনিয়ায় আর সব রাষ্ট্রকে বোমা অর্জন থেকে দূরে রাখা তাদের উভয়েরই কমন স্বার্থ। এটাকে দুনিয়ায় পরমাণু অস্ত্রের আরও বিস্তার ঠেকানোর জন্য সমঝোতা বলে হাজির করারও সুযোগ ছিল। ফলে বলা যায়, এও সমঝোতার প্রতিক্রিয়া দুনিয়াতে এক উল্টো অপবস্থা তৈরি করে। তা হল, এখান থেকেই  সোভিয়েত-মার্কিন এ দুই রাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে টেকনোলজি শেয়ার ও বেচা-বিক্রির এক নতুন দুনিয়া শুরু হয়েছিল। তবে ওয়ার অন টেররের আমলে ব্যাপারটা আরও কিছু নতুন মাত্রা পেয়েছিল। তা আমেরিকার এই ভয় থেকে যে, র‍্যাডিক্যাল সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির ধারাগুলো যেন এই টেকনোলজি বা বোমা  হাতে না পেয়ে যায়। আর উত্তর কোরিয়া যেন এর সরবরাহকারী হিসেবে না হাজির হয়ে যায়। সেই সম্ভাবনা ঠেকানোর অভিপ্রায় থেকেই বুশ ‘এক্সিস অব এভিল’-এর তত্ত্ব হাজির করেছিলেন।

ইতোমধ্যে একালের উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় নতুন ঘটনা হলো উত্তর কোরিয়ার ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল অর্জন। মানে মহাদেশ টপকিয়ে মিসাইল ছুড়ে মারার যে সীমাবদ্ধতা উত্তর কোরিয়ার ছিল, তা সে কাটিয়ে তুলতে পেরেছে। এসবের ঘোষণাও প্রকাশ হয়ে পড়া থেকেই নতুন তোলপাড় শুরু হয় কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলে। চীনের পুরনো প্রস্তাব আবার আলো-বাতাস পায়।

কিন্তু এবার আমেরিকা এখন তার যৌবন হারিয়ে উত্থান রহিত শরীর ও ক্ষমতায়। বিশেষ করে যখন তার মুরব্বিয়ানা ঢলে পড়ার আমল এসে গেছে তখন এসব ঘটছে। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের ডালি খুলে লড়াই শুরু করেছিল তখন উত্তর কোরিয়ার নতুন সক্ষমতার কথা চাউর হয়েছে। ট্রাম্প যেন তাই লজ্জার মাথা খেয়ে হলেও চীনকে নিজের প্রভাব বিস্তার করে উত্তর কোরিয়াকে মানাতে কাজ করতে অনুরোধ করে। অর্থাৎ আমেরিকান প্রভাব এখানে ভোঁতা ও অকার্যকর, সেটাই যেন মেনে নিয়েছিল আমেরিকা। সবচেয়ে বড় কথা, অতি দ্রুততায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প চীনকে তাগিদ দিয়ে জানান, উত্তর কোরিয়াকে ডি-নিউক্লিয়ারাইজড অবস্থায় তিনি দেখতে চান। এর জন্য আমেরিকাকে কী কী করতে হবে সেসব শর্ত নিয়ে কথা শুরু করতে তিনি রাজি। এ অংশটির সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিয়েছিলেন কল্পনার চেয়েও দ্রুততায়। ফলে চীন মাঠে নেমে তৎপরতায় নিজের প্রভাব ব্যবহার করে কাজে নেমে যায়।

আগামী দিনে ইতিহাস লিখতে বসে ঐতিহাসিকেরা নিশ্চয়ই মৃদু তর্ক করতে পারেন যে, কবে থেকে অথবা কোন ঘটনা থেকে চীন আমেরিকাকে হটিয়ে সেই জায়গায় বসে দুনিয়াকে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিল, সেই প্রারম্ভিক ঘটনা কোনটি? সেই প্রারম্ভিক ঘটনাটি কী হবে, তাই যেন নির্ধারিত হতে যাচ্ছিল প্রায়। সেটি হত, সম্ভবত চীনা উদ্যোগে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা ঘটিয়ে দেয়া।
হত বলছি এ জন্য যে, এটা যত দ্রুত ঘটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাতে হঠাৎ ‘জন বোল্টন’ সিম্পটম দেখা দেয়ায় ঘটনায় ছেদ ঘটে যায়। ফলে তা থমকে দাঁড়িয়েছিল। মাস খানেকেরও বেশি আগে ঠিক হয়েছিল ১২ জুন চীনা উদ্যোগ কাজ শুরু করবে সিঙ্গাপুরে ট্রাম-কিম সরাসরি এক আলোচনা থেকে।

জন বোল্টন এখন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, একজন হকিস (hawkish) বা যুদ্ধবাজ। বুশের আমলে তিনি রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকান প্রতিনিধি ছিলেন, আজকের নিকি হ্যালি যে পদে আছেন। বোল্টনের বৈশিষ্ট্য হল, বল প্রয়োগ আর জবরদস্তিই সব কিছুর উপযুক্ত সমাধান বলে বিশ্বাসী তিনি। ট্রাম্পের গ্রিন সিগনালে চীনা উদ্যোগ পারমাণবিক সমঝোতার তৎপরতা যখন মাঠে কাজে নেমেছিল, সে সময় হঠাৎ করে সম্ভবত সেকেন্ড থট হিসেবে ট্রাম্প পিছটান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর এরই বাস্তবায়নে তিনি বোল্টনকে ভিলেন হিসাবে মাঠে ছেড়ে দেন বলে অনেকের অনুমান। আর তা থেকে অনেক লিখেন, TRUMP-KIM TALKS: THE ART OF NO DEAL অর্থাৎ ট্রাম্পের কৌশল ছিল, কী করে একটা হবু ডিল ভেঙ্গে দিতে হয়

লিবিয়ার গাদ্দাফির কথা আমাদের মনে আছে। তিনিও তার পারমাণবিক কর্মসূচি যা ছিল তা গুটিয়ে রেখে আমেরিকার সাথে ডিল করতে গিয়েছিলেন সেই ২০০৪ সালে, আমেরিকা কখনও লিবিয়ায় আক্রমণে যাবে না- এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে। কিন্তু মাঝখানে ওবামার আমলে আরব স্প্রিংয়ের উত্থানের কালে আমেরিকা বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে। পারমাণবিক কর্মসূচি-হারা গাদ্দাফি – তার ওই দুর্বলতার সুযোগে ওবামার আমেরিকা তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও নৃশংসভাবে পাবলিক লিঞ্চিংয়ে হত্যা করেছিল। জন বোল্টন এক টিভি কথোপকথনে উত্তর কোরিয়ায় ‘লিবিয়া মডেল’ প্রয়োগ করবেন বললে সেখান থেকেই এই সন্দেহের ঝড় উঠে আসে। যে তিনি সম্ভবত হুমকি দিচ্ছেন। আমেরিকা বিশ্বাঘাতক সেটাই তিনি যেন মনে করায় দিয়ে, এর মাধ্যমে বলপ্রয়োগের হুমকি বা চাপ তৈরি করে কাজ আদায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

গত ১৯৯২ সাল থেকেই আমেরিকা-উত্তর কোরিয়া বা দুই কোরিয়ার “শান্তি” আলোচনার উদ্যোগ চলে আসছে। ফলে এবারের দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রথম সাক্ষাত (যেখান থেকে পরিণতিতে আমেরিকা-উত্তর কোরিয়ার ১২ জুন বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছিল) যেটা ২৫ এপ্রিল শুরু হয়েছিল সেটা নতুন না হলেও, এবারেরটা একেবারে নতুন ছিল। কী অর্থে?

সবচেয়ে বড় কারণ দৃশ্যমানভাবে এবারের সমঝোতা আলোচনার উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হল রাইজিং চীন। এর তাতপর্য সুদুর প্রসারি। খুব সম্ভবত এটাই গ্লোবাল বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হিসাবে চীনের ভুমিকার প্রথম প্রয়াস হিসাবে চিহ্নিত হবে। এটাকেই এক এম্পায়ার রোল – দুনিয়ার এম্পায়ারের ভুমিকা  ও নেতৃত্ব নেয়া বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই ভুমিকা পালন করে আসছিল আমেরিকা। একারণের আলোকেই বলেছিলাম আগামি ইতিহাসবিদেরা সম্ভবত চীনের এম্পায়ার বা নেতা হওয়ার সুত্রপাতের ঘটনা বলে চিহ্নিত করবে। আবার মনে করিয়ে দেই এই ভুমিকাটা – উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী গ্লোবাল নেতার। ডিপ্লোমেসিরর ভাষায় “main powerbroker behind” বলা হয়। এদিকটা বুঝে এই অঞ্চলের মিডিয়া পলিটিক্যাল কমেন্টেটর BERTIL LINTNER এর ভুল হয় নাই। এই প্রসঙ্গে তার লেখা এখানে দেখা যেতে পারে।

উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এর চীন সফর দিয়ে এবারের চীনের উদ্যোগে পারমাণবিক সমঝোতার বল গড়ানো প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা যেতে পারে। এটাকে বলা যায় কী কৌশলে আগানো হবে এর কমন আন্ডারস্টাডিং ও ব্রিফিংয়ের সফর। এরপরে ২৫ এপ্রিল উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এবার দক্ষিণ কোরিয়া গিয়ে ওখানের প্রেসিডেন্ট মুনের সাথে বৈঠক করেন। কিন্তু এর আগে কিমের চীন সফর ছিল লিডিং ঘটনা। কেন?

এক. এবারের নেতা ও উদ্যোক্তা আর আগের প্রত্যেকটার মত (দুনিয়ার নেতা) আমেরিকা নয়, চীন। দুনিয়ার হবু নেতা এখন চীন।

দুই. কিম এবারও দক্ষিণ কোরিয়া যাবেন। কিন্তু আগের দক্ষিণ আর এবারেরটা এক নয়। আগের দক্ষিণ আমেরিকার এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র। আমেরিকার উপর নিজ নিরাপত্তার ব্যাপারে শতভাগ নির্ভরশীল রাষ্ট্র। আর এবার? এটা ট্রাম্পের আমেরিকা। একলা চল ‘আমেরিকা ফাস্ট’ এর আমেরিকা অর্থাৎ আমেরিকার আর এম্পায়ার নয়। গ্লোবাল বিরোধে কোন উদ্যোক্তা মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা ত্যাগী আমেরিকা। এন্টি গ্লোবালাইজেশনের আমেরিকা। ট্রাম্প নিজেই আগে থেকে বলে আসছে, এবারের কিমের সাথে আলোচনায় সেটা দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের স্বার্থকেও সাথে মনে রেখে কথা বলা সেটা প্রাধান্য নাও পেতে পারে। কারণ এটা ‘আমেরিকা ফাস্ট’।

তিন. ফলে এটা দক্ষিণ কোরিয়ার এক বাপ-মা হারা দশা। আর ঠিক এটাকেই ক্যাশ করতে এবারের কিম – দক্ষিণের প্রেসিডেন্ট মুনের (Moon Jae-In) সঙ্গে সাক্ষাতে অতিরিক্ত উদার, আলিঙ্গনের বডি ল্যাঙুয়েজে। ব্যাপারটা অনেক মিডিয়াও নজর করেছে।  কিম ইঙ্গিত দিয়ে বুঝাতে চাইছেন কাল দিন, এম্পায়ার আমেরিকার দিন শেষ। এখন আমরা আমরা আমাদের নিজেদের বিরোধ নিজেরাই সমাধান করতে আগায় আসতে পারি। এবং আমি কিম রাজি। যারা সাক্ষাতের ভিডিও ক্লিপটা দেখেছেন, তাদের আমার কথা বুঝতে সহজ হবে।

এককথায় বললে, চীনের নেতৃত্বে আসন্ন নতুন দুনিয়ায় এক নতুন উষালগ্নে কিম-মুন আলোচনা হচ্ছে – একথাটা যেন দক্ষিণের মুন এর পক্ষ বুঝে এটাই কিমের মুল বার্তা।

তবে ১২ জুনের বৈঠকের উপর মাঝে অনিশ্চিতর কালো ছায়া পড়েছিল প্রকাশ্য মূল যে বিবাদকে কেন্দ্র করে তা হল, যখন উত্তর ও দক্ষিণের প্রেসিডেন্টদ্বয় পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার কারণে ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ করে দক্ষিণ কোরিয়া আর আমেরিকা যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করে। আর তা থেকে উত্তর কোরিয়ার কিম সব যোগাযোগ-আলোচনা ভেঙে দেন।

প্রশ্ন হল, ট্রাম্প কেন সাময়িক পিছু হটে গিয়েছিলেন? বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া করে নেতি কালো ছায়া কেন ছুড়েছিলেন? খুব সম্ভবত খোদ আমেরিকা উত্তরের কিমের পারমানবিক বোমার নাগালে – এর যে নিরাপত্তা হুমকি তা ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে এক বিরাট বিষয়। অন্যদিকে চীনের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতায় যদি প্রমানুমুক্ত উত্তর কোরিয়া পাওয়া যায় তবে তা বুড়া সিংহ আমেরিকার জন্য অমুল্য। কারণ কোন যুদ্ধ ক্ষয়ক্ষতি, অর্থ প্রাণ কিছুই না হারিয়ে উলটা নিজ পারমানবিক বোমা থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত পাওয়া। কিন্তু এর মূল্য বা খেসারতও কী কম?

এঘটনার ভিতর দিয়ে চীন দুনিয়ার এম্পায়ার, গ্লোবাল বিরোধে  উদ্যোগ ও মধ্যস্থতাকারি হিসাবে স্বীকৃত হয়ে যাবে। শুধু তাই না এটা আমেরিকার নিজের হাতে দেয়া স্বীকৃতি হবে।

কিন্তু ইতোমধ্যে কিমও বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া দেখে প্রচন্ড হতাশ ও ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন।  তিনি দক্ষিণের প্রেসিডেন্টকে দায়ী করেন। এই বিরাট ঐতিহাসিক সুযোগ হেলায় হারানোর জন্য। তাই ঘটনার গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে মুনকে তিনি  ‘অজ্ঞ’ ও ‘অযোগ্য’ বলে অভিযুক্ত করেন। এছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ার ভিতরের নেপথ্যের সংবাদ হল, জেনারেলরা নিজ স্বার্থে ও আমেরিকান প্ররোচনায় এই কাজ করেছিল। ফলে উত্তর কোরিয়ার কিমের এই ঘোষণার ফলে ১২ জুনের বৈঠক অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরে এবার ট্রাম্পের দিক থেকে ২৫ মে ওই বৈঠক বাতিল উল্লেখ করে কিমকে চিঠি দেয়া হয়। ফলে সব আশা-ভরসা শেষ হয়ে যায়।

দোদুল্যমান ট্রাম্প প্রশাসন আসলে উভয় সঙ্কটে আছে। কিন্তু পারমানবিক বোমা খাওয়া থেকে নিজের নিরাপত্তা রক্ষার ইস্যু আবার প্রাধান্য পায়।  খুব সম্ভবত একারণেই  দোদুল্যমান ট্রাম্পেরআবার পিছু হটেন। নিজ নিরাপত্তার কথা ভেবে সেটাকেই প্রাধান্য দিতে এগিয়ে আসা। আবার সিদ্ধান্ত বদলান।

সুযোগ নেন এই বলে যে, আলোচনা ভঙ্গ হয়ে গেলে এতে চীন নিজে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছে। এবং আমেরিকাকে নিজের উদ্বিগ্নতার কথা জানিয়েছে।  কোরিয়া উপদ্বীপকে অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখলে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চীন। অতএব চীনের আবেদনে সাড়া দিতেই ট্রাম্প এটাকে আবার উদ্যোগ নেয়ার অছিলা হিসেবে নেন। আর এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হঠাৎ করে আবার উত্তরে সফরে যান। আর তাতেই আবার ১২ জুনের বৈঠক প্রাণ ফিরে পায়।
এতে ফলাফল কী আসবে, সেটি জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ ঘটনার শুরু থেকেই কোনো পশ্চিমা মিডিয়া বা একাডেমিক বা থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান- কেউ ট্রাম্পের কথা বা কাজের ওপর আস্থা রেখেছেন, এমন দেখা যায়নি। যেমন বোল্টনের মন্তব্যের সময় থেকেই মিডিয়ায় সব ধরনের ভাষ্যের সারকথা ছিল কোন ডিল কেমন করে না করতে হয়, ভেঙে দিতে হয়, এড়িয়ে যেতে হয়; ট্রাম্প তার ওস্তাদি আমাদের দেখাচ্ছেন এই ছিল তাদের মূল্যায়ন। অর্থাৎ সব কিছুর দায় এককভাবে পশ্চিমা সমাজ ট্রাম্পের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের একা চলার নীতি যেমন এই বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের স্বার্থের দিক থেকে কথা তুলবে না, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ট্রাম্প-কিম বৈঠক”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

এই রচনার উতসর্গঃ সাইফুল ইসলাম কে। আমার সব লেখার একনিষ্ঠ পাঠক। তাঁর নিরন্তর তাগিদ থেকে এলেখার জন্ম।

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

গৌতম দাস
২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lK

 

 

চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

সাইড লাইন
যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

গৌতম দাস
২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার
https://wp.me/p1sCvy-2lz

বার্মার রোহিঙ্গার পর এবার কম্বোডিয়া। তবে এবার গ্লোবাল রাজনীতির প্রসঙ্গে সেদিক থেকে কথা বলা হচ্ছে, গ্লোবাল অর্থনীতি নয়। সচরাচর চীন মানেই গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের  অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শীর্ষ উঠার কথা তুলে বলে থাকি। কিন্তু এবার নয়, সেটা যেন পাঠকের মনোযোগ ফস্কে না যায়, নজরে থাকে সেটা আশা করব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আমেরিকা দুনিয়ায় গ্লোবাল রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ক্রমশ নিজ সক্ষমতা দেখিয়ে দুনিয়াকে নিজের একক নেতৃত্বে নিয়েছিল। সেটা এখনও আছে, যদিও সময়ে এখন একটা ভাটার টান অনুভুত হওয়া শুরু হয়েছে। গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমানভাবে ঢিলা হতে শুরু হয়েছে অনেক আগেই, তুলনায় যদিও গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন একেবারেই নয়। এই পরিস্থিতিতে পাঠকের নজর টানব সত্তরের দশকের  কমিউনিস্ট বিপ্লবের ছোট দেশ কম্বোডিয়ার দিকে।

রাষ্ট্রের নাম কম্বোডিয়া, রাজধানী যার নম পেন। থাইল্যান্ড, লাওস ও ভিয়েতনামের পড়শি এই রাষ্ট্রের দেড় কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ সবাই খেমার (Khmer) নামে এক এথনিক জনগোষ্ঠীর, তাদের ভাষার নামও খেমার। দেশের সাইজ বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বড়, এর জনগোষ্ঠি মূলত বৌদ্ধ-ধর্মীয়। প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো এক রাজতন্ত্রে শাসিত ছিল খেমাররা। কিন্তু এরপর নানা হাত ঘুরে কলোনি দখলের যুগে এসে শেষে, ফরাসি কলোনি রাজ্যে পরিণত হয় ১৮৬৩ সালে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৫৩ সালে, কিন্তু থিতু হতে পারেনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের (১৯৪৫-৭৫) সাথে ভাগ্য ক্রমশ বাধা পড়ে যায়। ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হলে, কম্বোডিয়ান চীনাপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি খেমাররুজ (ফরাসি ভাষায় রুজ মানে লাল। অর্থাৎ কমিউনিস্ট লাল খেমার বা Khmer Rouge) নেতা পলপট কম্বোডিয়ায় ক্ষমতা দখল করেছিলেন। কিন্তু তার কুখ্যাত শাসনের তিন বছরে (১৯৭৫-৭৮) এই দল শ্রেণী-শত্রু হত্যা নৃশংসতার উদাহরণ হয়ে যায়; বলা হয় ঐ সময়কালে গ্রামে মালিকানা উচ্ছেদের নামে এরা ২০ লাখ লোককে গণহত্যা করেছিল।

প্রতিক্রিয়ায় এরপর অনেক ক্যু, পালটা ক্যু শেষ করে সেসব পেরিয়ে ১৯৯১ সালে সব বিবদমান পক্ষগুলোকে নিয়ে ‘প্যারিস শান্তিচুক্তিতে’ এক রাজনৈতিক আপোষনামা তৈরি হয়েছিল; এরও আরো পরে, কম্বোডিয়া থিতু হতে হতে ১৯৯৭ সাল লেগে যায়। আর সেসব প্রক্রিয়ারই আর এক অংশ, জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে ‘খেমাররুজের গণহত্যার’ বিচার এখনও চলছে। সেই থেকে সাজিয়ে রাখা মৃত মানুষের সাদা সাদা মাথায় খুলি হয়ে যায় কম্বোডিয়ার ব্যঙ্গপ্রতীক। তবে এই কম্বোডিয়া এখন এক কনষ্টিটিউশনাল রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র; অর্থাৎ এর নামকাওয়াস্তে রাজতন্ত্র বা এক রাজা আছে ঠিকই, তবে সব কিছুই জনগণ নির্বাচিত, এক কনস্টিটিউশনাল রিপাবলিক এটা। আর ১৯৮৫ সাল থেকে নানা কায়দা করে এর প্রধানমন্ত্রী হয়ে আছেন হুন সেন। একালে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের এক অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী কম্বোডিয়া ও এর শ্রম। চীনের বিপুল বিনিয়োগের এক গন্তব্য এখন কম্বোডিয়া। চলতি বছরেও টার্গেট দুই বিলিয়ন ডলার। থাইল্যান্ড এর পড়শি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-গঠনের দিক থেকে প্রায় একইরকম বলে ব্যাংককের মত ট্যুরিজমের আয় কম্বোডিয়ার এক বড় আয়ের খাত হয়ে উঠছে ক্রমেই। আর সমুদ্র সীমান্তে (অফসোরে) তেল গ্যাস পাওয়ায় তা অর্থনীতিতে এক বিশাল খাত হয়ে উঠছে। এই হল পুরনো দিক থেকে কম্বোডিয়ার বর্ণনা-পরিচিতি, এবার চলতি লেটেস্ট দিক থেকে আর এক পর্ব শুরু করা যাক।

আগামী বছর ২০১৮ সালে কম্বোডিয়ায় আবার সাধারণ নির্বাচন হবার কথা। আবার বলছি কারণ গত ২০১৩ সালের নির্বাচন ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে রাজনৈতিক অসন্তোষ দিয়ে তা শেষ হয়েছিল। স্বল্প ভোটে বিরোধী দল (কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টি, CNRP) হেরেছিল এভাবে দেখিয়ে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। আর চলতি প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের দলকে (কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টি, CPP) বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে ‘বিরোধীদের সংসদ বয়কট’ – আমাদের পরিচিত এই ফেনোমেনায় কম্বোডিয়ার বিরোধী দল বেশির ভাগ সময়টা সংসদের বাইরে কাটায়। ওদিকে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন, গুম, খুন করা, ইংরাজী দৈনিক পত্রিকা বন্ধ, রেডিও সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ এগুলো খুবই কমন। কিন্তু ওদিকে সরকারের সংসদে পাশ করা বড় অদ্ভুত কিছু আইন চালু আছে। যেমন একটা হল কুখ্যাত ‘কটূক্তি আইন’ (ডিফেমেশন ল), যা দিয়ে কোনো সরকারি কর্মচারী বা পদ ধারক কারও সমালোচনা করলে তাকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া সম্ভব। এরকম অদ্ভুত আরো কিছু আইন প্রচলিত আছে সেখানে। যেমন – সরকারের আইনি অধিকার আছে কোনো রাজনৈতিক দলকে সামান্য অজুহাতে নিষিদ্ধ করে দেয়ার। এই আইনে বর্তমান বিরোধীদলীয় প্রধান তিনি ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে স্টাটাস দিয়েছেন – এই অজুহাতে তাঁকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তিনি বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন। এর পরে ফেব্রুয়ারি থেকে যিনি দলের নেতা হয়ে আসেন তিনিও গত কয়েক মাস থেকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায়’ জেলে আছেন। আর উচ্চ আদালত এর পুরো বিচার শেষ নাই বটে, কিন্তু তা না করেই গত ৩১ অক্টোবর আদালত তাঁর জামিনের আবেদনে সাড়া না দিয়ে উলটা ডিটেনশন দিয়ে রেখেছে।

ঐ রায়ের বিচারক খিম পন তাঁর রায়ে লিখেছেন, ‘বিরোধীদলীয় এই নেতা কেম সোখাকে ডিটেনশন দেয়া হল, নতুন ক্রাইম ঠেকাতে আর যাতে জনশৃঙ্খলা রক্ষা আদালত গ্যারান্টি দিয়ে নিশ্চিত করতে পারে’ সেজন্য।  [The detention of Kem Sokha is to prevent new crimes and that the court can  guarantee public order, JUDGE KHIM PONN]  কম্বোডিয়ায় আরেকটা মজার আইন আছে। তা হল, রাজনৈতিক দলের প্রধানের নামে যদি আদালতে কোন ক্রিমিনাল অপরাধের অভিযোগ দায়ের করা হয় ও তা বিচারের শেষে আদালতের রায়ে যদি সাজা হয়, তবে এরপর পুরা ঐ দলকেই সরকার ‘বিলুপ্ত’ বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। কম্বোডিয়ার প্রধান বিরোধী দলের বেলায় ঠিক তাই ঘটেছে।  প্রধান বিরোধী দল CNRP এর সর্বশেষ অবস্থা হল, এই দলের আগের প্রধান যে ছিলেন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে সাজা হয়ে গেছে, তিনি বিদেশে পালিয়ে আছেন। আর দলের চলতি প্রধান ডিটেনশনে আছেন। অভিযোগ হল সেই ২০১৩ সালে তিনি আমেরিকান সরকারি লোকের সাথে  তিনি কথা বলছেন এমন এক ভিডিও দেখিয়ে, তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাই ডিটেনশন দেয়া হয়েছে। আর গত ৬ অক্টোবর, তাই এইবার খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদালতে  বিরোধী দলকেই বিলুপ্ত ঘোষণা করার আবেদন করেছিলেন। আর তাতে সুপ্রিম কোর্ট গত ১৬ নভেম্বর প্রধান বিরোধী দল কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে রায় দেন। ঐ রায়ের ফলে সেই সাথে ওই দলের ১১৮ জন সিনিয়র সদস্য ও রাজনীতিক নিষিদ্ধ হবেন এবং গত চার বছরে  যে ৪৮৯টি কমিউন (স্থানীয়) নির্বাচনে CNRP দলের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছিলেন তারাও সবাই পদ হারাবেন। ওদিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদের ৫৫টি আসনই হারাবেন।

এই অবস্থায় তাহলে আগামী বছরের সংসদ নির্বাচনে কী হতে যাচ্ছে? যেখানে প্রধান বিরোধী দলকে ছলেবলে কৌশলে অযোগ্য ঘোষণা করে দেয়া হল, এর অর্থ তাৎপর্য না বোঝার কিছু নেই। আমাদের দেশের বিনা নির্বাচনে বিজয়ের মতো কিছু একটা সেখানে এখন হবে তা বলাই বাহুল্য। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নাই। বিগত ২০১৩ সালের নির্বাচনে এই বিরোধীরা হুন সেনকে বহু পেরেসান করেছিল। এবার তাই তিনি কোনো রিস্ক রাখলেন না। আর ওই ৫৫টি আসন এখন (আমাদের এরশাদের মত) খুচরা বিরোধী দলগুলো যারা সবাই মিলে গত নির্বাচনে মোট ভোটের মাত্র ৭ শতাংশ পেয়েছিল এদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হবে। এসব ছোট দলের সদস্যদের মধ্যে তাই হুটোপুটি শুরু হয়েছে পদ-পদবি ও সুবিধাদি নেবার জন্য। আরো আছে। একই অভিযোগ এনে এখন আরো সম্ভাব্য ১০০ জন্য বিরোধী প্রার্থীকে নিষিদ্ধ করে রাখার তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

সাবেক খেমাররুজ নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হুন সেন ক্ষমতায় আছেন ১৯৮৫ সাল থেকে, একনাগাড়ে প্রায় ৩৩ বছর। সম্প্রতি তার দেশে এক বয়ান,  ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ এ কথা কয়টাক এক বিরাট ইস্যু বা অজুহাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এক পাবলিক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ আরো এক যুগ তাকে ক্ষমতায় থাকতে হবে।

তাহলে এখন থেকে যা বোঝার বুঝে নেন। কিন্তু কোথাকার এক কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা ইতিহাস নিয়ে আমি কেন আপনাদের শুনাতে এলাম? বাংলাদেশের সরকার আর বিরোধী দল আর ওদিকে আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আকার ইঙ্গিতে কিছু বলার জন্য কী? না একেবারেই নয়। এই অনুমান ভুল। বরং আসল উদ্দেশ্য এতক্ষণ উপরে কোথাও লেখাই হয়নি। কী সেটা?
কম্বোডিয়ার সর্বশেষ রাজনৈতিক দশা পরিস্থিতি নিয়ে ইষ্ট এশিয়ার মিডিয়াগুলোর অনেকেই নানা আর্টিকেল ছেপেছে। এমনি একটা হল, হংকংভিত্তিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। ‘মর্নিং পোস্টে’ একটি কলাম ছাপা হয়েছে, লেখক এডোয়ার্ড মরটন।

তিনি বলছেন, “হুন সেন চীনের সাথে গাঁটছাড়া বেঁধে আমেরিকাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে নেমেছেন। কিন্তু হুন সেনের এই হিসাব ‘যা নয় তাই বাড়িয়ে ধরা’ অনুমান বলে প্রমাণিত হবে।” কিছু বিশ্লেষক, কিছু রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও জার্নালিস্টদের বক্তব্যের রেফারেন্সে তিনি এসব কথা বলেছেন। তার এসব মন্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় হুন সেনের আরেক মন্তব্য থেকে। তিনি বলছেন, ‘আগামী বছরের নির্বাচনের ফলাফলে পশ্চিমাদের স্বীকৃতি জোগাড়ের প্রয়োজন হবে না।’ কিন্তু তবু এটাও আমার এই লেখার ফোকাস নয়। তবে এবার লিখছি ফোকাসটা কোথায় এবং তা কী? যা খুবই বিপজ্জনক ইঙ্গিত।

আলজাজিরা টিভি গত ১৭ নভেম্বর কম্বোডিয়া পরিস্থিতি নিয়ে ২৫ মিনিটের টকশোর মতো অনুষ্ঠান ‘ইনসাইড স্টোরি’ প্রচার করেছে। সেখানে তিন অতিথি ছিলেন ০১. মু সোচুয়া – তিনি সদ্য নিষিদ্ধ হওয়া বিরোধী দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট, পলাতক হয়ে প্যারিসে আশ্রয় নিয়ে আছেন। ০২, ভিকটর গাও – চায়না ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পরিচালক। তিনি আসলে আবার ‘চায়না এনার্জি সিকিউরিটি ইন্সটিটিউটের’ চেয়ারম্যান। তার আরেক পরিচয় হল, তিনি বিখ্যাত চীনা নেতা দেং জিয়াও পিংয়ের অনুবাদক হিসাবে কাজ করেছেন। আর ০৩. হোসেক লি ম্যাকিয়ামা – তিনি ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক। এই তিন প্যানেল বক্তার মধ্যে চীনা একাডেমিক মি: গাও – এর বক্তব্য আমার প্রসঙ্গ।

গাও তার পালা এলে তিনি স্পষ্ট করে হুন সেনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন। হুন সেনের সরকার, তার গৃহীত পদক্ষেপ সব সমর্থন করলেন। এটা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের জেনারেলদের পক্ষেও এত স্পষ্ট করে পাবলিক মিডিয়ায় চীন কথা বলেনি। ১৯৭০-এর দশকে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক পাকা হয়, আর সে সময়ে নিজেরা যার যার স্বার্থ বুঝাবুঝি, পারস্পরিক স্বীকৃতি বা দেনাপাওনাগুলো ঠিকঠাক হয়েছিল ১৯৭১-৭৮ সালের মধ্যে। আমেরিকান বিনিয়োগে চীনে এক ক্যাপিটালিজম জগত প্রবেশ করবে আর, এক নতুন অর্থনৈতিক পথে চীন যাবে সে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন থেকেই চীন নিজের জন্য আর একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এর ফলে ক্রমশ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব সক্ষমতা ক্রমশ বেড়ে চললেও এর প্রভাবে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়াদিতে নাক গলানোর বা গ্লোবাল প্রভাবের ভাগিদারি ভাগ পাওয়ার সুযোগ হাতে পেলেও চীন তাতে জড়িত হবে না। না এটা চীনের কোনো ভালো মানুষি নয়। বরং দুনিয়াজুড়ে আমেরিকান যে রাজনৈতিক প্রভাব বলয় তৈরি হয়ে আছে এর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের ভাগিদারি এই খাতে চীন নিজেকে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অথবা প্রভাবের শেয়ার নিতেও সে যাবে না। বরং চীন যদি এতে পুরো ছাড় আমেরিকাকে দিয়ে দিলে, দুনিয়ার সব কোনা থেকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক বিষয়াদির ভাগিদারি কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিনা বাধায় পেতে সহজ হবে। ফলে আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্ক অ-সাংঘর্ষিকভাবে বিকশিত হতে পারবে। চীন চেয়েছিল গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো ভাগ আমেরিকার কাছে সে চাচ্ছে না। অথবা চীন সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় এই বার্তা আমেরিকাকে  জানানো। আর সে কারণে সবার আগে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের উত্থান পর্বকে প্রায় বাধাহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। যেটা  আসলে সহজে চীন বাস্তবে অর্জন করেছিল।

যেমন – ২০১৪ সালে আমাদের নির্বাচন ইস্যুতে দেখা গিয়েছিল কোন রাজনৈতিক স্টেক বা কেমনভাবে নির্বাচন হতে হবে তা নিয়ে কোনো বক্তব্য চীনের ছিল না। কিন্তু সরকারে যেই থাক বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসায় চীনের যা স্বার্থ যা সে চায় তা নিয়ে যেন কেউ বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সে পশ্চিমা অবস্থানের পক্ষে নীরব সমর্থন দিয়ে তা নিশ্চিত করেছিল। রাজনৈতিক প্রভাবে ভাগিদার সাজতে না চাওয়া চীনের এই নীতি অবশ্যই বেশ লম্বা সময়ের জন্য, তবুও তা আবার এক অর্থে সাময়িক। যেমন, যত দিন চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পূর্ণতা নিয়ে হাজির হচ্ছে  ততদিন একই সাথে গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের দিকে হাত বাড়াতে চীন যাবে না। তবে এর পরে অবশ্যই যাবে। এরই সোজা অর্থ সম্ভবত এবার রাজনৈতিক ইস্যুতেও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীন দুনিয়ায় হাজির হতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চীন সরাসরি হুন সেনের পক্ষ দাঁড়িয়েছে শুধু তাই নয়, হুন সেন একটি ন্যূনতম ভাবে ফেয়ার নির্বাচিত সরকার হয়ে থাক সেটার দরকার নেই – এ কথায় এতদূর গিয়ে প্রবক্তা হয়েছে। মি. গাও বলেছেন. কম্বোডিয়ায় একটা ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গেলে যদি পুরনো অস্থিতিশীলতা আবার ফিরে এসে পড়ে’ তাই এর দরকার নেই। আর এতে অর্থ সম্পদও নষ্ট হতে পারে। তা ছাড়া ‘তথাকথিত গণতন্ত্র’ (তিনি তথাকথিত বা সোকল্ড শব্দটা ব্যবহার করেছেন) বাস্তবায়নকে দেখার অনেক ধরন আছে। অর্থাৎ হুন সেন বিরোধীদের মেরে ধরে গুম নির্যাতন করে, জবরদস্তি যদি নিজেকে ভুয়া নির্বাচিত হিসেবে দেখায় তবুও সেটা চীনের স্টাইলের নির্বাচন (গণতন্ত্রকে দেখার নানা পথ আছে) মনে করে এবং ‘স্থিতিশীলতার স্বার্থে’, ‘সম্পদ নষ্ট না করার স্বার্থে’ হুন সেনকেই নির্বাচিত মানতে হবে। চীনের নিজের রাজনৈতিক ব্যবস্থার রাষ্ট্রে নাগরিকের কোনো রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক অধিকার, মানবিক মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন- এগুলোকে সে নিজ করণীয় বলে মনে করে না। নিজে করেওনি। বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য অর্জন এগুলোই করণীয়। অর্থাৎ মানুষ বৈষয়িক বিষয়াদির ভোগকারি মাত্র। তার কোন স্পিরিচুয়াল ও রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা, করণীয়, দায়দায়িত্ব এসব কিছু নাই- এই হলো চীনা কল্পনায় দেখা মানুষ। মানুষ সম্পর্কে এই অনুমানের উপরে দাঁড়ানো আছে চীনের নেতৃত্ব।

তাহলে কী দাঁড়াল? চীন কী এখন থেকে আমেরিকার সাথে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক প্রভাব এর ভাগিদার বা পুরা কতৃত্ব নেয়ার জন্য এখন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া শুরু করবে? যার বাইরের দিকটা দেখে লাগবে কম্বোডিয়ায় মতই, কোনো বিরোধী দল সেখানে নেই অথবা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা থাকার দরকার আছে কিনা এই নিয়ে আমেরিকা ও চীনের লড়াই? নাকি কম্বোডিয়ার মত কিছু দেশের বেলায় (সব দেশের বেলায় নয়) চীন একক রাজনৈতিক প্রভাব হাসিলের জন্য এখন থেকে আমেরিকার সাথে লড়বে? এই দুইয়ের মধ্যে সেটা যেটাই হোক, চীন গোহারা হারবে সেটা আগেই বলে দেয়া যায়। কারণ মডার্নিটি পরবর্তী দুনিয়া ১৯৪৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইট চার্টার পর্যন্ত গিয়েছে। ওর অনেক খামতি আছে। কিন্তু তাই বলে সেটা ওর পেছনের সময়ে ফিরে যেতে পারে না। দুনিয়া এমনকি সত্তরের দশকে কমিউনিস্ট বুঝে আবার ফিরে যেতে পারে না।

অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে চীন যতই এগিয়ে যাক, চীনের রাজনৈতিক বুঝাবুঝিতে ব্যাপক ঘাটতি আছে। তবুও, আচ্ছা এটাই কী চীনের সদ্য সমাপ্ত দলীয় কংগ্রেসে উল্লেখিত ‘মডার্ন সমাজতন্ত্রের’ ব্যাখ্যা; আর এজন্য শি জিনপিংকে মাওয়ের সমতুল্য নেতা বলে দাঁড় করানো শুরু? সেটা যাই হোক, চীনের এই পদক্ষেপ খুবই বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী পথে যাওয়ার ইঙ্গিত!

সর্বশেষঃ
 রয়টার্স এজেন্সির খবর,  ১৭ নভেম্বর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেগুলার বিফ্রিংয়ে প্রশ্নের উত্তরে জানায়, কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরোধী দল ও নেতাদের নির্মুল ও শুন্য করা প্রসঙ্গে চীন বলছে, এটা “কম্বোডিয়ার নিজস্ব কায়দার উন্নয়নের রাস্তা অনুসরণ” করা বলে চীন মনে করে। [Cambodia in pursuing its own development path……)
আর এর পাল্টা আমেরিকা বলছিল, আমেরিকা নির্বাচন সম্পর্কিত সব ফান্ড প্রত্যাহার করে নিচ্ছে এবং আরও কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ [“concrete steps”] নিতে যাচ্ছে।  এর প্রতিক্রিয়ার হুন সেন গতকাল ১৯ নভেম্বর বলেছেন, তিনি  সমস্ত আমেরিকান এইড প্রত্যাহার করে নিতে স্বাগত জানায়। [“Hun Sen … welcomes and encourages the U.S. to cut all aid.”]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com   

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ধরতে পারবে

 

মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ফিরে ধরতে পারবে
গৌতম দাস
০৭ নভেম্বর ২০১৭, রাত ০০ঃ৪৩
https://wp.me/p1sCvy-2kC

আমেরিকা কি ফেল করা ট্রেন আবার ধরতে পারবে? কোন ট্রেন? বার্মা ট্রেন, নাকি মিয়ানমার ট্রেন? আসলে এসব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলে লাভ নেই; কথা হলো এটা রোহিঙ্গা-ট্রেন! অর্থাৎ আমেরিকা কি ফেল করা রোহিঙ্গা-ট্রেন আবার ফিরে ধরতে পারবে? আবার ধরার জন্য কতদুর সিরিয়াস যাবে? রোহিঙ্গা-ট্রেন  – একথারই বা মানে কী? কী বলতে চাওয়া হচ্ছে? রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার একটা খুবই ক্ষুদ্র অংশ, মাত্র চার পারসেন্ট। কিন্তু মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গা-মানুষের মর্যাদা এতই পর্যুদস্ত, এতই নিচে অমানুষের বা ঊন-মানুষের স্তরে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ নিয়ে গেছে যে, দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে গেছে রোহিঙ্গা পারসিকিউশন বা অত্যাচার নিষ্পেষণ। সেই সাথে বার্মিজ জেনারেলদের নাম নৃশংসতার ওস্তাদ হিসেবেও ছড়িয়ে পড়েছে। এরা নির্মূল ক্লিনজিংয়ে কত দক্ষ এর স্বাক্ষর-চিহ্ন ব্যাপক ছড়াছড়ির মুখে জাতিসঙ্ঘকে বলতেই হয়েছে যে, ‘দুনিয়ার সবচেয়ে পারসিকিউটেড বা নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা’। অতেব আমাদের সামনে এখন প্রশ্ন হল, আমেরিকা কি বর্মি জেনারেলদের একটা শিক্ষা দিতে পারবে? কতদুর পর্যন্ত সিরিয়াসলি যাবে?

আগে আমরা দেখছি, আমেরিকা ভুলে গিয়েছিল মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে, জেনোসাইড বা ক্লিনজিংয়ের বিষয়ে দুনিয়ার কাছে তার কমিটমেন্ট কী? দুনিয়ার কাছে কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে গ্লোবাল লিডার হয়েছিল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গ্লোবাল ইকনোমিক ব্যবস্থায় একটা অর্ডার বা নিয়ম শৃঙ্খলা কায়েম করেই আমেরিকা আজকের ওয়ার্ল্ড লিডার হয়েছিল। তবে  শুধু এতটুকু করেই হতে পারেনি। এটা সে হতে পেরেছিল কারণ সাথে কিছু পলিটিক্যাল কমিটমেন্টও তাকে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির প্রতিশ্রুতি। যদিও তাতে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। বিভিন্ন সময়ে আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার  বিষয়টাকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করেছে, নিজ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ‘রেজিম চেঞ্জের’ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নজির স্থাপন করেছে। এখনো এই সমস্যা দুনিয়াতে আছে যে, সুদানের বশির একটা গণহত্যা চালালেও চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ যদি উদ্ধার হয় তবে বলা হবে গণহত্যা হয়নি, বরং ‘গণহত্যার কাছাকাছি’ কিছু একটা হয়েছে। কারণ চীনের এ কথা না মানলে চীন ভেটো দিয়ে দিবে; একই উদাহরণ আমেরিকারও আছে। ফলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিচার বিবেচনা মুল্যায়নে একটা গণহত্যা ঘটেছে কি না তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে দুনিয়ায় এখনো বহু সীমাবদ্ধতা আছে। আসলে তাই দরকার আবার এক রুজভেল্টের, আবার এক নতুন প্রতিশ্রুতিতে নতুন করে জাতিসঙ্ঘ গড়া। অথচ আমেরিকা নিজেরই সেসব ইতিহাস ভুলে বসে আছে। আর বাস্তবে হারার আগেই মনে মনে হেরে গেছে।

এ কথা ঠিক যে, ২০০৭-০৮ সাল থেকেই এটা জানা গিয়েছিল যে, দুনিয়ার অন্তত অর্থনৈতিক পরাশক্তি ও লিডার অর্থে চীনের কাছে আমেরিকার কাঁধবদলের সময় হয়ে গেছে। আমেরিকার জায়গায় সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থিত হচ্ছে চীন। এ কথাও সত্যি যে, কারো অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে উত্থিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে এটা তখন থেকে কেবল সময়ের ব্যাপার যে, সেই রাষ্ট্র এখন ক্রমে ক্রমে সব অর্থেই গ্লোবাল পরাশক্তি হিসেবে হাজির হবে। কিন্তু তাই বলে একথাও ভুলে যাওয়া যাবে না যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আমেরিকা কেবল অর্থনৈতিক আর সামরিক শক্তির জোরে গ্লোবাল পরাশক্তি বা গ্লোবাল লিডার হয়নি। সাথে রাজনৈতিক শক্তি হতে হয়েছে আগে, কিছু গ্লোবাল রাজনৈতিক মুল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে আগে;  তবেই আমেরিকার গ্লোবাল লিডার হওয়া গেছে। এমনি এমনি আমেরিকা দুনিয়াকে নিজের এম্পায়ার বানাতে সক্ষম হয়নি। পলিটিক্যাল আইডিয়া, এর উপযোগী গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আর সর্বোপরি কমিটমেন্ট – এসব প্রতিটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণভাবে হাজির করাতে হয়েছিল আমেরিকাকে। আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি? সেটা বাইরে কাউকে না খোদ নিজের কাছে নিজেকে দিতে হয়েছিল যে – মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা কেবল আমেরিকাতে করলেই হবে না, সারা দুনিয়ার ব্যাপারেও অন্তত নীতি-অবস্থানগত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এতকিছু বলার পরেও এ কথাও সত্য যে, ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস চার্টার যেটা রচিত হয়েছিল বটে কিন্তু ওখানের ‘ইনডিভিজুয়ালিজম’ ধারণায় ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা আছে, তাই তা নিয়ে দুনিয়াকে আরো অনেক কাজ করতে হবে। সারকথা কোনো ‘রাজনৈতিক’ নীতি-অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া আমেরিকা গ্লোবাল লিডার হয়নি, হতে পারেনি। আজকের জায়গায় আমেরিকা এমনি এমনি উঠে আসেনি। তাই আগেই বলে দেয়া যায় এই নুন্যতম শর্তপুরণ ছাড়া  আগামিতে অন্য কেউও হতে পারবে না।

অথচ এই শতকে এসে  আমেরিকা সত্যি সত্যি হেরে যাওয়ার আগেই ২০০৮ সালে সব ছেড়েছুড়ে আগেই হার স্বীকার করে নিয়েছিল। এর আগে নানা সিরিয়াস হিউম্যান রাইটস ভঙ্গের কারণে ২০০৮ সালের আগের বার্মা ছিল আমেরিকান অবরোধে ডুবে থাকা, বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় একঘরে হয়ে থাকা এক বার্মা। অথচ চীনের দেখানো রাস্তায় সেই মতনই বার্মায় বিনিয়োগ ও ট্রেড আর ব্যবসার ভাগ পেতে মরিয়া লোভী হয়ে আমেরিকা চীনের পথ অনুসরণ করে বসেছিল। বর্মি জেনারেলদের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রেসিজমে নির্মূল ক্লিনজিং দেখেও না দেখার ভান করার দিন দুনিয়াতে যেন আবার ফিরে এসেছিল – চীনের দেখানো সর্টকাট রাস্তার লোভে পরে আমেরিকাও এই শর্টকাট পথ নেয়ার লোভে পড়েছিল। আমেরিকা মনে করে নিয়েছিল যেন দুনিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক নীতি অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া দুনিয়া এ পর্যন্ত আসতে পেরেছিল। আর আমেরিকা কোনো কমিটমেন্ট ছাড়াই বোধহয় সে এই দুনিয়ার নেতা হয়েছিল। ২০০৮ সালের বার্মার কনস্টিটিউশন চালুর পরেও সেই একই দানব ও কোটারি এক সামরিক রাষ্ট্রই ছিল বার্মা। অথচ বলা হচ্ছিল বার্মা নাকি ‘গণতন্ত্রের পথে’ যাত্রা শুরু করেছে, গণতন্ত্রের পথে নাকি ট্রানজিশনে বা অন্তর্বর্তি রাস্তায় আছে বার্মা। আর সু চি নাকি শান্তির নোবেল মানুষ ইত্যাদি। এসব ভুয়া সার্টিফিকেট বিতরণ করেছিল আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিম।  চলতি আগষ্টে বার্মায় ফিরে গণহত্যা শুরুর পরে সু চি তাঁর সাফাই ভাষণে গণহত্যার অভিযোগের জবাবে মিয়ানমারের ‘শিশু গণতন্ত্রের’ যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তা শুনে প্রখ্যাত মার্কিন জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ ড. গ্রেগরি এইচ স্ট্যানটন যথার্থই বলেছেন, “এটা গতানুগতিক অজুহাত। অভিযোগ প্রত্যাখ্যানকারীদের দিক থেকে এটা বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল। তারা বলে থাকেন, গণহত্যা বন্ধের দিকে নজর দেয়ার চেয়ে শান্তিপ্রক্রিয়া বজায় রাখাটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। অং সান সু চি তাই করেছেন”।

অথচ আমেরিকা ট্রেন মিস করেছিল। রাজনৈতিক কর্তব্য ভুলে সস্তা ব্যবসাব ও বৈষয়িকতার লোভের ফাঁদে বর্মি জেনারেলদের কাছে নিজেকে ধরা দিয়েছিল। নিজেকে সস্তা করে তুলে, সস্তায় বিক্রি করে দিয়েছিল। নিজের দাম নিজে বোঝেনি। যার দায় ওবামা প্রশাসনেরও কম নয়। চীনের কাছে দুনিয়ার নেতৃত্ব হারানোর আগেই আমেরিকা উলটো নিজেকে চীনের পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছিল।

আচ্ছা আমেরিকা কী কখনও খেয়ালই করেনি দুনিয়াতে কোথাও রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কমিউনিস্টদের কোনো রাজনৈতিক সিরিয়াস প্রতিশ্রুতিই নেই। এরা নিজ নিজ বিপ্লবের পরে রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ বলে একটা শব্দ রেখেছে, ইংরেজির একটা ‘আর’ অক্ষর সেখানে আছে বা ছিল। লুপ্ত হয়ে যাওয়া সোভিয়েত মানে ওর ‘ইউএসএসআর’ (USSR) নামে ‘আর’ অক্ষরটা ছিল। এখনও বর্তমান মাও এর চীনের নাম ‘পিআরসি’ (PRC) তেও ‘আর’ অক্ষরটা আছে। এই ‘আর’  এর অর্থ হল ‘রিপাবলিক’। রাজতন্ত্র উতখাত করে পিপলস রিপারলিক প্রতিষ্ঠা ছাড়াও মর্ডান রিপাবলিকের আরও অর্থ হল রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কমিউনিস্টদের কাছে  এসব কথার সাথে কোনো ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ অ্যাক্ট’ তৎপরতা তাদের কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের করণীয় নাই। সেখানে কনস্টিটিউশনের কোনো গুরুত্ব নেই, কী লেখা আছে সেখানে তাও তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা সেটা তো কোনো সিরিয়াস কিছু নয়। কারণ এসব কথার কথার নাকি নেহাতই ভোটের হিসাব; যেমন কোনো করপোরেট চেয়ারম্যানেরও এক ভোট, এক ফকিরেরও এক ভোট। তাই মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির কথাবার্তার কোন মুল্য কমিউনিস্টদের কাছে নাই। মৌলিক মানবাধিকার ইস্যুটা নাকি কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে আমেরিকার ষড়যন্ত্র। যদিও একথা সত্য রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা নয়। ফলে এটা যথেষ্ট নয়। কিন্তু তাই বলে এটা কোন অর্জনই নয়, এটা মারাত্মক ভুল ধারণা। ফলে মর্ডান রিপাবলিকে মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য  ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা কমিউনিস্টদের কাজই নয়, এর কোন গুরুত্ব নাই, এটা কারও কাজে লাগে না, এগুলো মানুষের কোন অর্জন নয় – এটা মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা শুধু না। খুবই নিম্ন বোধের – মানুষ কেবল জীব, এই অনুমানে বলা বক্তব্য। মানুষকে রিডিউসড নীচা গণ্য করা বক্তব্য।

তাই চীনের বুঝ হল, তারা যে দানব বর্মি জেনারেলদের পা-চুমে বিনিয়োগ ব্যবসা খাচ্ছে – এর পাশেই লাখ লাখ রোহিঙ্গা ঐ জেনারেলদের হাতেই কচুকাটা ক্লিন হয়ে গেলে তাতে চীনের কী দায়! তার কোনো দায় নেই। সেই, ১৯৭০-এর দশক থেকেই চীন নিজের কাছে পরিষ্কার যে, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের দুনিয়ায় সে যাচ্ছে বটে কিন্তু কোনো গ্লোবাল ইউনিভার্সাল রাজনৈতিক মুল্যবোধ প্রতিষ্ঠা হওয়া বা থাকা না থাকার দায়দায়িত্ব সে নেবে না। কেবল কোন ব্যবসাটা সে পাবে সেই ভাগ সে ঠিকই গ্লোবাল প্লেয়ারদের ভাগ থেকে নিজেরটা বুঝে নেবে। এই নীতিতেই চীনের বিদেশনীতির ডিপলোম্যাসি এত দিন চলে এসেছিল। আর প্রমাণ হয়েছে এটা অচল। রোহিঙ্গারা প্রমাণ করে দিয়েছে   এই চীন ব্যর্থ। এই চীন গড়ে তোলা অর্থহীন, খামোখা। মানুষ কেবল জীব নয়, সে কেবল একটা বৈষয়িক জীব-জীবন নয়। মানুষের জীবনের আরও অর্থ উদ্দেশ্য লক্ষ্য আছে; দায় কর্তব্য আছে। স্পিরিচুয়ালিটির দিক আছে। জীব জীবন ছাড়িয়ে মানুষের তাই আরও উন্মেষ দরকার হয়। সেকথাটাই আর ভাবে বললে হয়, মানুষের রাষ্ট্রের তাই রাজনৈতিক কমিটমেন্ট দরকার থাকে। মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক ইনসাফ, মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ার স্তরে তাই মানুষের নুন্যতম দায়। এসব পুরণের পথে নুন্যতম দায় কর্তব্যবোধ নাই চীনের। ফলে আগেই বলা যায় কোন গ্লোবাল নেতা হওয়ার খায়েশ চীনের পূরণ হবার সুযোগই নাই। আসলে সে ধরা খেয়েছে। কিভাবে?

আগেই বলেছি আমেরিকা লোভে পড়ে হুঁশ হারিয়েছিল। নিজের গৌরব নিজের অবদান ভুলতে বসেছিল। এমনকি এবারের আগষ্টের পর থেকে নবউদ্যোগে নির্মূল অভিযান শুরুর পরে, ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে বক্তব্যে বিষয়ে আমেরিকার উপমন্ত্রী মার্ফি সাহেবের কথাবার্তা লক্ষ্য করা যাক। তিনি তখনও কেবল সতর্ক কী বলতে কী বলে ফেললে আবার বর্মি জেনারেলদের মন উঠে যায়, অখুশি হয়ে যায় – সেদিকে খুবই সতর্ক থেকে ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে কথা বলছেন। জেনারেলদের মন জোগাতে মার্ফি বলার চেষ্টা করছিলেন যে এটা নাকি রোহিঙ্গা বা মুসলমান নির্মূল ক্লিনজিংয়ের ইস্যু নয়, এটা নাকি রাখাইন স্টেটের দুই জাতিগোষ্ঠীর ঝগড়া, অর্থাৎ বার্মা রাষ্ট্র বা মিলিটারির কোন ভূমিকা নেই। তার এই অবস্থা দেখে সিবিএস নিউজের সাংবাদিক সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করায় জবাবে মার্ফি সাহেব আবার সে কথা কনফার্ম করেছিলেন। কিন্তু এরপরেও সব চিতপট হয়ে যায়, সব কিছু ঘুরে যায়। গত ২ অক্টোবর মিয়ানমারে অবস্থিত ২০টি দেশের রাষ্ট্রদূত একসাথে রাখাইন প্রদেশ সরেজমিন সফর করে এসে এরপরে তা নিয়ে মিয়ানমারে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত যে বিবৃতি দেন তাতে পরিস্থিতি উলটে যায়। যার মূল কথা হল, বার্মার জেনারেলদেরকে অধিকার সংরক্ষণে রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বে স্মরণ করিয়ে দেয়া, আর বারে বারে চাপ দিয়ে বলা যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে, জাতিসঙ্ঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন আসতে দেয়া ইত্যাদি। এসব নিয়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

অর্থাৎ তখন থেকে আমেরিকা সুর পালটিয়ে ফেলেছিল। নিজ শক্তি, তুচ্ছ করে ফেলে রাখা হারানো গৌরবের কথা মনে পড়ে গেছিল। ফলে এরপর থেকে আর এটাকে ‘রাখাইন প্রদেশের জাতিগোষ্ঠীর নিজেদের ঝগড়া’ বলে আড়াল করতে চাইছে না। এটাকে বলা যায় আমেরিকান বার্মা নীতিতে মেজর শিফট পটপরিবর্রতন।  এরপরে ২৩ অক্টোবর এসে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতি – এটা একেবারে কঠোর অ্যাকশনের দলিল নির্দেশনামা যেন। সাথে আগের মতো যে দায়ী ইনভেস্টিগেট করো, তাকে ধরে নিয়ে আসো সেসব কথা তো আছেই। তবে মূল কথা হল, ২০০৮ সালের আগে আরোপিত আমেরিকার দেয়া যেসব অবরোধ উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল সেগুলো আবার কার্যকর করা হয়েছে বলে ঘোষণা করে দেওয়া। বিশেষত বর্তমান ও সাবেক সামরিক অফিসারদের ওপর ট্রাভেল ব্যান আবার বলবৎ করা, বার্মা থেকে রুবিসহ দামি পাথর আমেরিকায় পাঠানো ব্যবসার ওপর নিষেধাজ্ঞা ফিরে আরোপ, আর সামরিক বাহিনীর জন্য নেয়া আমেরিকার স্পন্সরড যেকোনো কর্মসূচি স্থগিত করে দেয়া। এক কথায় আমেরিকান রাষ্ট্রের সাথে বর্মি আর্মি সদস্যদের সব ধরনের যেকোনো সংশ্লিষ্টতা ও যৌথ তৎপরতা স্থগিত।
তবে এবারের সারকথায় গুরুত্বপুর্ণ দিক হল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতে দেখতে চায় আমেরিকা এই দাবিটা ছিল মুখ্য। আর, একথা শুনে জেনারেলদের কাপড় নষ্ট করে ফেলার জন্য যথেষ্ট। ভারতের মিডিয়া ভাষ্যকারদের মতে, ‘ভারত নাকি প্লট হারিয়ে চীনের কাছে হেরে হাত গুটিয়ে’ নিয়েছে। তাই বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া’ নিয়ে আলাপে বসতে আয়োজন করে দিয়েছে নাকি চীন। কিন্তু তাতে আমাদের মন্ত্রী দেশে ফিরতে-না-ফিরতেই যাকে বলে দু’জনে দুই মন্ত্রী দু’দিকে দুই ধরনের কথাতে হয়ে পড়েছেন একেবারে ‘ফল এপার্ট’। তাতে বোঝা গেল যে বর্মি জেনারেলদের শায়েস্তা করা চায়নিজ কূটনীতির কাজ নয়। এ ব্যাপারে চায়নিজরা চাইলে আমেরিকানদের কাছে মধ্যস্থতাকারীর কাজে কূটনৈতিক কিছু শিক্ষা নিতে পারে। আচ্ছা এটা কি জানা কথা না যে, পিছলা বার্মিজ জেনারেল ভাষ্য বদলে দেবে। অতএব আগে থেকেই চীনাদের ‘দুটা মানে হয়’ এমন সুযোগ যাতে না থাকে এমন শব্দ বা কথা না রাখা – সেই ফুটা বন্ধ করার ব্যাপারে চীনাদের সাবধান হওয়া দরকার ছিল!

কিন্তু এরও আগে যে কথা বলতে হবে, তা হলো- ১৯৭০-এর দশক থেকে নেয়া চীনাদের পলিটিক্যাল দায় বা সংশ্লিষ্টতা না নিয়ে গ্লোবাল পলিটিক্যাল-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে কেবল অর্থনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্টতায় থেকে মাখন খেয়ে যাবো খালি, চীনাদের এই বুদ্ধি অচল-অকেজো এটাই প্রমাণ হয়েছে। কারণ আমরা দেখছি, আমেরিকানদের সামান্য একটু নাড়াচাড়াতেই ভয় পেয়ে বর্মি জেনারেলদের কী করে চীন রক্ষা করবে তা নিয়ে চীনকে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। চীনাদের হাতে ভেটো ক্ষমতা থাক আর না থাক কিছু যায় আসে না তাতে। এথেকে চীন কী শিক্ষা নিয়েছে যে,  দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। অর্থনৈতিক শক্তি বা মুরোদ আপনার অঢেল থাকতে পারে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক শক্তির বিকল্প নয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক কমিটমেন্ট, নীতি-অবস্থান থাকতেই হবে, এসব দিক- তো আছেই। বাংলাদেশ-মিয়ানমারকে একসাথে বসানোর কাজে চীনাদের নামা প্রমাণ করেছে রাজনৈতিক সমাধানের পথ কী জিনিস। এটা রোহিঙ্গারা মরুক যা হোক, আর্মি জেনারেলদের কাছ থেকে বিনিয়োগ আর ব্যবসা বাগানোর কাজটা ভালো জানলেই চলবে – চীনের অনুমান যে মিথ্যা ছিল তা চীনকে বুঝিয়ে দিয়েছে। এই ধারণার যে ভিত্তি নেই, এটা মিথ্যা ও অচল তা বুঝিয়ে দিলেও কী চীন সে শিক্ষা নিয়েছে আমরা নিশ্চিত না। কারণ চীনকে ‘রাজনৈতিক কমিটমেন্ট নেগোসিয়েশন’ এর গুরুত্বের কথা মেনে নিতে হয়েছে। আর আসলে রোহিঙ্গারা সব অত্যাচার নিষ্পেশন সহ্য করতে হয়েছে কথা ঠিক কিন্তু তা করে  সারা দুনিয়াকে রোহিঙ্গা ইস্যু দেখিয়ে দিয়েছে যে দুনিয়া চলে দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। রাজনৈতিক কমিটমেন্ট তাতে লাগবেই। আর তা নাই বলে, চীনাদের দুনিয়ার গ্লোবাল নেতা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

উপরের এসব কথার উপর দাঁড়িয়ে আর একটা কথা বলে দেয়া যায়।  কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র দুনিয়াকে অ্যাম্পায়ার হিসেবে নিজের নেতৃত্বে চালাতে কখনই পারবে না, কখনোই সম্ভব হবে না। এর মূল কারণ রাজনৈতিক কমিটমেন্ট না দেখিয়ে, হিউম্যান রাইটসকে নিজের ইস্যু গণ্য না করে দুনিয়া চালানো অসম্ভব। রিপাবলিক রাষ্ট্র আর তাতে মানুষের  মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য ইনসাফ কায়েম ইত্যাদিতে মানবাধিকার সুরক্ষার ইস্যু আগামীতে আরো সিরিয়াস ইস্যু হয়ে উঠবে দুনিয়াতে। কমিউনিস্ট জগতে যার কোনো ন্যূনতম ধারণা বা আমলই নেই। কমিউনিস্টদের এখনো ধারণা, ‘তাদের বেইজ্জতি করতেই’ নাকি আমেরিকা এই ইস্যুটা হাজির রাখে। এর চেয়ে অজ্ঞতার আর কী হতে পারে! এর মানে কি কমিউনিস্ট বলতে চাইছে দুনিয়াতে গণহত্যা ক্লিনজিং রেসিজম – এগুলো চলবেই? তাই কি? তবে আমি শিউর মাফিয়া রাষ্ট্র রাশিয়ার পুতিন অথবা চীনে নতুন জেঁকে বসা শি জিনপিংয়ের ‘মডার্ন সমাজতন্ত্র’ নামে সোনার পাথরের বাটি ধারণার ভেতর এর কোনো জবাব পাওয়া যাবে না।

কিন্তু আমেরিকানরা কত দূর যাবে? রোহিঙ্গারা কি ঘরে ফিরবে? আমেরিকানরা কতটা সিরিয়াস? অর্থাৎ উপরে আমেরিকার সৎ পথে রওনা হবার অনেক ইঙ্গিত দিবার পরেও আমি সন্দেহ রাখছি যে  আমেরিকা শেষ মাথা পর্যন্ত যাবে কীনা? কতদুর যাবে?  বাংলাদেশের মানুষদের জন্য এসব মাপার দ্রুত একটা মাপকাঠি দেই।

‘এশিয়ায় আমেরিকান (নিরাপত্তা) স্বার্থ আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে’ এই নীতিতে ২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বুশ প্রশাসন চালু করে দিয়ে গেছে। এই কথার একটা ইম্পিকেশন অর্থে সারার্থ হল, সেই থেকে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক দিয়ে রেখে গেছিল। সেটা এখনও ওরকমই আছে। ট্রাম্প হয়ত ব্যাপারটা নিয়ে ভোকাল ততপর নয়। কিন্তু রুটিন প্রসাশনের গাইডিং প্রিন্সিপাল এখনও সেটাই। এখন এই সপ্তাহ ট্রাম্পসহ স্টেট ডিপার্টমেন্টের মন্ত্রী মুরুব্বিরা মানে রেক্স টিলারসন এবং আন্ডার সেক্রেটারিসহ এভাবে সবাই আমাদের দেশ বা পড়শি দেশে থাকবে। এগুলো যত যা-ই ঘটুক যতক্ষণ না আমেরিকা আমাদেরকে ভারতের কাছে দিয়ে রাখা  বন্ধকদশা থেকে ছুটিয়ে আমাদের সাথে সরাসরি ডিল না করবে, এই ব্যাপারে স্পষ্ট অবস্থান নিবে তত দিন অন্য যাই কিছু আমরা দেখি না কেন আমেরিকার ওপর আমাদের আস্থা রাখার কোনো কারণ সৃষ্টি হয়নি এটাই বুঝতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

গৌতম দাস

২২ আগস্ট ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০০ঃ১১

http://wp.me/p1sCvy-2hc

 

সম্প্রতিকালে সামগ্রিকভাবে চীনের সামরিক শক্তি বিশেষত নৌশক্তি চোখ টাটানোর মত বেড়েছে। আর তা নিয়ে আমেরিকার মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি করেছে। সাপ্তাহিক লন্ডন টাইমসের ভাষায়, চীনের শক্ত নেভি সক্ষমতা গড়ে তোলা আমেরিকার অফিসিয়ালদের উদ্বিগ্ন করেছে। “China’s naval build-up worries American officials”। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে ইকোনমিস্ট বলছে, আমেরিকার এতে উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে বরং স্বাগত জানানো উচিত। কেন?

ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল পরিসরে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র- এ তিন শক্তির মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা আছে। আবার সেই সাথে বন্ধুত্ব না হলেও কে কার কতটুকু কাজে আসে, আসছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতোমধ্যে চীনের পিএলএ মানে ‘পিপলস লিবারেশন আর্মির’ ৯০ বর্ষপূর্তি খুবই ঘটা করে পালিত হলো গত ৩০ জুলাই। এই পিএলএ (PLA) হল চীনের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর নাম। বিগত ১৯২৭ সাল থেকে ক্ষমতা দখলের জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গঠিত সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনই হল এই পিএলএ। জন্মের ২২ বছর পরে ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিজয়ের পরে ঐ সংগঠনই নয়াচীনের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী হিসেবে জায়গা নেয়। সেই পিএলএ’র ৯০তম বার্ষিকী এবার খুবই ঘটা করে পালন করা হল।

এর প্রধান উদ্দেশ্য, চীনের এতদিনের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হওয়ার পর সে ফলাফল ও সক্ষমতা ব্যবহার করে একটু একটু করে চীনের সামরিক সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছিল। কিন্তু এই নিজের সামরিক সক্ষমতা কী কী অর্জিত হয়েছে, এরই এক প্রদর্শনী করা হল। এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধবিমান বহনকারীর কোন যুদ্ধজাহাজ চীনের ছিল না, যেটা সে অর্জন করেছে। এরকম আরও বহু কিছু যেগুলো আগে আমেরিকার আছে দেখে নিজেদেরও একদিন হবে বলে চীনারা স্বপ্ন দেখেছিল।  আসলে পিএলএ এবারের ৯০তম বার্ষিকী জাঁকজমক করে পালন করে এটাই দেখাতে চেয়েছে যে, গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিল  এবং ইতোমধ্যেই তা অর্জিত হয়েছে। এবার সেই সামর্থ্য খরচ করে সামরিক শক্তি কতটুকু হয়েছে তাই প্রদর্শন করতে নেমেছে তারা।

গত ২৯ জুলাই লন্ডনের ইকোনমিস্ট সাময়িকী এসব বিষয় নিয়ে দুটো বিশেষ আর্টিকেল ছেপেছে।  যার প্রথমটা মূলত এই ইস্যুতে তবে চীন-আমেরিকা সম্পর্কে ফোকাস করে। আর পরেরটা চীন-রাশিয়ার সম্পর্কের দিক থেকে।  ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘ চীনা নেভির এই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমেরিকা উদ্বিগ্ন। কখনো কোনো একটা সপ্তাহ বাদ যায়নি যে, চীনাদের একটা না একটা সামরিক সক্ষমতার অগ্রগতির খবর সেখানে নেই। গত এপ্রিলে তারা স্থানীয়ভাবে তৈরী এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার যুদ্ধজাহাজ ভাসিয়েছে। আর জুনে আমেরিকার সমতুল্য ১০ হাজার টনের এক ডেস্ট্রয়ার ভাসিয়েছে। আর এ মাসে চীনা সৈন্য বোঝাই করে যুদ্ধজাহাজ সুদূর আফ্রিকার জিবুতি রওনা হয়েছে। জিবুতিতে জায়গাজমি লিজ নিয়ে এই প্রথম নিজ সীমানার বাইরে চীনা এক সামরিক ঘাঁটি চালু করা হল। আর এই সপ্তাহে রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে বাল্টিক সাগরে (সুইডেন, ডেনমার্ক বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যার উপকূলে) যৌথ সামরিক মহড়া করেছে চীন।’ ইকোনমিস্টের মতে, স্বভাবতই এটা চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির মহড়া প্রদর্শন। [নিচের এক প্যারা জিবুতি সম্পর্কে নোটটা বাড়তি আগ্রহিদের জন্য। যারা সময় বাঁচাতে চান তাদের না পড়লেও চলবে।]

[জিবুতি প্রসঙ্গে একটা ছোট নোট দিয়ে রাখা ভাল। জিবুতি (Djibouti) আফ্রিকা মহাদেশের অংশ। লোহিত সাগর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেকে ভাগ করেছে, মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। মধ্যপ্রাচ্য অংশে ইয়েমেন আর এপারে জিবুতি। আফ্রিকার অংশ সোমালিয়ার উপরের জিবুতির অবস্থান। প্রাচীন সোমালিয়ার আরব মুসলিম জনগোষ্ঠির অংশ ছিল জিবুতি, পরে ফরাসী উপনিবেশ হয়। আর তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৭৭ সালে। খুবই ছোট ভুখন্ড জিবুতির, বাংলাদেশের চারভাগের একভাগ।  আর জনসংখ্যা মাত্র নয় লাখ। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভুমির মত গরমের দেশ বলে দুপুরে সব কাজকর্ম ১২টা থেকে বিকেল চারটা বন্ধ রাখতে হয়, পরে আবার সব খুলে। গুরুত্বপুর্ণ যেটা তা হল এই জিবুতিতে একা চীনের ঘাঁটি নাই, বরং চীনের ঘাটিটাই সবার শেষে স্থাপিত হল। সবার বড় আর আগের ঘাটি যাদের তারা হল, আমেরিকার ও ফ্রান্সের। পরে একালে সৌদি আরবের আর শেষে চীনের। এককথায় বললে এই ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে চীনের উদ্দেশ্যে নিজের নৌ-চলাচল – এই বাণিজ্য স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।  তা নৌদস্যু বা জলদস্যু হতে পারে কিংবা অন্য রাষ্ট্র এসে চীনের নৌ-চলাচল পথ অবরোধ করতে চাইতে পারে। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে গেলে এসব সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন বাণিজ্য স্বার্থের অংশ হয়ে যায়। আমেরিকা জিবুতিতে তার ঘাঁটি রাখার জন্য জিবুতিকে  বছরে লিজের ভাড়া দেয় ৮০ মিলিয়ন ডলার, আর চীনারা একালে চুক্তি করেছে বলে সে দেয় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ওদিকে সোদিরা ইরানের ভয়ে ভীত হয়ে ঐ জিবুতিতে ছোট ঘাটি তৈরি করেছে একালে। ইয়েমেনের হুতিদের সাথে ইরানের যোগাযোগ স্থাপন সাথে রসদ এবং নানান টেক ইকুইপমেন্ট পাঠানো হচ্ছিল এই পথে তা রুখে দিতে সৌদি অবস্থান।  আর আমেরিকার ইরাক-আফগানিস্তানের যুদ্ধে অনেক যুদ্ধবিমান জিবুতি থেকে অপারেট করিয়েছিল। ওদিকে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া এক রাষ্ট্র ছিল ১৯৯৩ সালের আগে পর্যন্ত। প্রতিশ্রুতি অনুসারে ইথিওপিয়া আপোষে ইরিত্রিয়াকে আলাদা হতে দিলে তাদের দুইটা বন্দরই ইরিত্রিয়ার ভুখন্ড ভাগে পড়ে। ক্যাচালে না থাকতে চেয়ে ইথিওপিয়া দুইটা সমুদ্র বন্দরের দাবি ছেড়ে দেয়। আর জিবুতির বন্দর ব্যবহারের জন্য জিবুতি-ইথিওপিয়া  এক স্থায়ী চুক্তি করে। জিবুতি ইথিওপিয়াকে পেশাদার পোর্ট সার্ভিস দেওয়ার জন্য নিজের পোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে দুবাই পোর্ট অথরিটিকে ভাড়া করে এনেছে। সব মিলিয়ে এতে জিবুতির ভালই আয় হয়। এই হল সংক্ষেপে জিবুতি।]

কোল্ডওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা স্বদেশপ্রেম একালে অচল কেন?
সাধারণত আমাদের মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম কাজ করে, তা গড়ে উঠেছে গান্ধীবাদীদের ‘বিদেশী কাপড়ে আগুন লাগাও আর দেশী চরকায় সুতা কাটো’ এর অনুসরণে। অর্থাৎ মনে করা হয়, বিদেশী মানে খারাপ, দেশী মানেই ভালো বা কাম্য। কোন জটিল জিনিষ নয়, ব্যাপারটা সহজেই বুঝা যায়।  এই চিন্তা কাঠামোতেই কোল্ড ওয়ার যুগেও (১৯৫০-১৯৯২) জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম চর্চা হয়েছে। আর ওদিকে  কোল্ড ওয়ার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা এই দুই পরাশক্তির দুই ব্লকে ভাগ করে সব রাষ্ট্রকেই কোন না কোন ব্লকের সমর্থক হতে বাধ্য করা। আর এরপর পরস্পর ঠিক যুদ্ধ নয়, কিন্তু সব সময় একটা যুদ্ধের রেষারেষি জীবন্ত রেখে তারা চলত, ফলে তা এক ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ যেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে এই ব্লক পরিস্থিতির অবসান হয় এবং দুনিয়া আমেরিকার ‘একক’ পরাশক্তির কবলে চলে যায়। ফলে এর পর থেকে স্বজাতিবোধ ও দেশপ্রেম আর কোল্ড ওয়ারের পটভূমিতে তৈরি নয়, হয় নাই। আর তাতে আগে ও পরের জাতীয়তাবোধ, স্বদেশপ্রেম মধ্যে বহু ফারাক এসে গেছে।

যেমন- কোল্ড ওয়ারে কেউ যদি  শত্রুরাষ্ট্র হয়, এর মানে তার সাথে আর কোনো সম্পর্ক নাই; অর্থনৈতিক বাণিজ্যসহ কোনো ধরনের সামাজিক লেনদেন নেই। কোল্ড ওয়ারে দুনিয়া মূলত তা বিভক্ত হয়ে থাকত দুনিয়া ব্যাপী দু’টি আলাদা অর্থনীতির ব্লকে। কিন্তু যখন থেকে কোল্ড ওয়ার ভেঙ্গে গেছে, এমন দুনিয়ায় আমরা বাস করতে শুরু করেছি, তখন থেকে  অর্থনীতির দুই ব্লকও ভেঙ্গে গেছে। বদলে সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই  একই- ‘এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে’ অন্তর্ভুক্ত ও কানেকটেড হয়ে গেছে। ফলে সেই থেকে বাণিজ্য বিনিয়োগের কেনাবেচাসহ সব ধরনের লেনদেনের এক গ্লোবাল সমাজে আমরা ঢুকে গিয়েছি, বাস করছি। ফলে একালে অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগে খুব ভাল সম্পর্কের পাশাপাশি ঐ রাষ্ট্রের সাথে আবার যুদ্ধ লাগার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে বটে।

তবে সে ক্ষেত্রে স্বভাবতই যুদ্ধ বড় বাস্তবতা হয়ে উঠলে বাকি সব সম্পর্ক অন্তত সাময়িকভাবে স্থগিত ও চাপা পড়ে যাবে, সব বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ভবিষ্যতে যদি তা থিতু হলে আবার সব সম্পর্ক শুরু হতে পারে। আবার একালে কোনো যুদ্ধ লেগে যাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিলে ঐ সম্ভাব্য যুদ্ধকে  দেরি করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক একটা  ভুমিকা থাকতে পারে, উছিলা হিসাবে দাঁড়ায় যেতে পারে। এছাড়া যে দেশে বোমা ফেলা দরকার মনে করছি, সে দেশে আমার নিজেরই ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ থাকলে বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হবে। এসব সমস্যাগুলো কোল্ড ওয়ারের যুগে ছিল না। ফলে যুদ্ধ লড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া তখন সহজ ছিল। একালে যুদ্ধ লাগিয়ে দিব নাকি বাণিজ্য স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেখব, কোনটা আসলে নিজের জন্য উত্তম, এসব বিবেচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে একালে এবং স্বভাবতই তা জটিল কাজও; অনেক চিন্তাভাবনা করে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একালে নিজ দেশের স্বার্থ কোনটা তা ঠিক ঠিকভাবে বুঝতে পারা সহজ হয় না। অনেক চিন্তাভাবনা করার দরকার হয়। আমরা সবাই এখন এমন দুনিয়াতে বসবাস করি। ফলে পুরনো বোধ নিয়ে চলে দেশের ভাল করতে চেয়ে উল্টো খারাপ করে ফেলারও সম্ভাবনা আছে। তাই কোল্ড ওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম একালে অচল।

অতএব একালে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার সম্পর্ক এক দিকে বাণিজ্য বিনিয়োগের, একই সাথে তা সম্ভাব্য যুদ্ধেরও হতে পারে- এই আলোকে দেখতে ও বুঝতে হবে। এখানে একই সম্ভাব্য শত্রুর সাথে গভীর বাণিজ্য-স্বার্থের সম্পর্ক হয়, থাকতে পারে এবং থাকাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। ইকোনমিস্ট বলছে, চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু হল পশ্চিমা স্বার্থ, বিশেষ করে কমন শত্রু হল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা এখনও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পুরনো বা চলতি যে ব্যবস্থা, এর নেতা, তুলনায় চীন নতুন সাজানো হবে যে ব্যবস্থা ধীরে ধীরে জাগছে যে এর নেতা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জকারী হলো চীন ও তার সহযোগী রাশিয়া। তবে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুরোদ রাশিয়ার অর্থনীতির নিজের নয়, নেইও। তবে চীন বিজয়ী হলে তাতেই রাশিয়ারও লাভ, এই হলো সূত্র। ফলে এক ‘কমন এনিমি’র ধারণা। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের অবরোধ চলছে, তা জারি আছে; এখানে ইকোনমিস্ট সে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকার অভিযোগ, রাশিয়া জবরদস্তি করে ইউক্রেনের ভূমি দখল করে আছে। তাই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জগৎ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। অবশ্য এখানে ইউক্রেনের ভূমি বলতে তা সরাসরি ইউক্রেন নয়, এ ক্ষেত্রে আসলে ক্রিমিয়া বলে আলাদা প্রদেশের কথা বলা হচ্ছে। সোভিয়েত ভেঙে (১৯৯১) যাওয়ার পরে আপোষ আলোচনায় ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সাথে যোগ করে দেয়া হয়েছিল, যদিও সেটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ থাকবে বলা হয়। ফলে আইনি সম্পর্কের দিক থেকে ক্রিমিয়া ইউক্রেন রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। পরে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলেও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু পশ্চিমারা জোর দেয়, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া বাদে যে ১৪টি রাষ্ট্র হয়েছে, সেগুলোর ওপর রাশিয়ার প্রভাব শূন্য করে দিতে হবে। আমেরিকা ও ইউরোপের এই কৌশলগত অবস্থান সব জটিলতা তৈরি করেছে।  এই নীতির ফাঁদে ইউক্রেন ঝুঁকতে চাইলে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজের দখলে নিয়ে নেয়। আর রাশিয়া নিজের পক্ষে ক্রিমিয়ায় একটা কথিত গণভোট করিয়ে নেয়। ফলে সারকথায় অন্যের ভুমি দখল বলতে যা বুঝায় এটা তেমন কোন সোজাসাপ্টা ‘ইউক্রেনের ভূমি’ দখল নয়।

কিন্তু ইকোনমিস্ট বলছে, রাশিয়াকে পশ্চিমের অবরোধ আরোপ করে রাখার এক পালটা কাফফারার দিক আছে। এটাই রাশিয়াকে চীনের সাথে লেপ্টে থেকে যেতে বাধ্য করেছে। কারণ চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাশিয়ার গ্যাস-তেল চীনকে বিক্রি করা আর চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এভাবেই রাশিয়া সেই থেকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে আছে। কিন্তু ইকোনমিস্ট ‘ চীন কেন ইউক্রেন নিয়ে কথা বলে না’, অপর দিকে ‘রাশিয়া কেন দক্ষিণ চীন সাগর চীনা দখলে রাখার বিরুদ্ধে কথা বলে না’, এগুলো উল্লেখ করে  একটা ‘নৈতিকতা ভঙ্গ হয়েছে’ বলে পশ্চিমের স্বার্থের পক্ষে সাফাই দিতে চেয়েছে। ব্যাপারটাকে পুরান কমিউনিস্টদের উপরে ইকোনমিস্টের  পুরান রাগ-বিরাগ অথবা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব – এর বেশি অন্য কোনভাবে ব্যাখ্যা করার মত কিছু পাওয়া যায় না।

এভাবে ইকোনমিস্ট চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু সবশেষে আপাত উল্টো এক কথা বলেছে। বলছে, চীনের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে নেভির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তা প্রদর্শনে আমেরিকার ভীত হওয়া উচিত নয়। কেন? অনেকের কাছে ব্যাপারটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু ইকোনমিস্টের যুক্তি কী? আর কেনই বা এ কথা বলছে?

ইকোনমিস্ট নিজেই সাফাই দিয়ে বলছে, ‘রাশিয়া চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে কথা সত্য, কিন্তু একই ধরনের অস্ত্র চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকেও বিক্রি করে। আবার চীনা প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার ওপর পশ্চিমের আরোপিত অবরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়াকে সাহায্য, বাণিজ্য সম্পর্ক করে থাকেন। কিন্তু তা তিনি করেন কারণ চীনের পুরনো বড় পড়শি রাশিয়ার সাথে চীন একটা থিতু সম্পর্ক চায় বলে।  অতএব চীন কোন সুদূরে ইউরোপের বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার সাথে নৌ-মহড়া করেছে বলে তাতে ভয় না পেয়ে আমেরিকার বরং স্বাগত জানানো উচিত। চীনের যুদ্ধজাহাজ কোন সুদূরে গিয়ে অপারেট করলেো তা এক সম্পূর্ণ সঠিক কাজ। কারণ “গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ার” হিসেবে এটা চীনের এক বৃহত্তর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া; বাণিজ্যের নৌচলাচল পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে চীনেরও কিছু গ্লোবাল ভূমিকা ও দায় নেয়া উচিত। কারণ এই নিরাপত্তা প্রদানের ওপরই গ্লোবাল অর্থনীতি বাণিজ্য নির্ভর করছে।

ইকোনমিস্ট নিজেই আরও সাফাই দিয়ে বলছে যেমন – “চীন ইতোমধ্যেই জিবুতির ঘাঁটি থেকে জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এভাবে এডেন উপসাগরের আশপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে”। ইকোনমিস্ট তার লেখায় এই অংশের উপশিরোনাম দিয়েছে ‘দায়িত্ববোধের চর্চা’  বা (Exercising responsibility)। তবে সবশেষে ইকোনমিস্ট আমেরিকার এম্পায়ার ভূমিকার পক্ষে থেকেছে। বলেছে, “চীন  এখন এই সুদূরে নৌবহর নিয়ে এসেছে। ফলে এখন আমেরিকা কেন এশিয়ায় নৌ-উপস্থিতি রেখেছে বা রাখে, তা এখন চীনারা সহজে বুঝবে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিয়োগের বৃহত্তর দিক এই স্বার্থরক্ষার দায় তো নিতেই হবে”।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ইকোনমিস্ট আসলে কী বলতে চায় ? কথা খুব সহজ। প্রথমত, তারা আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে কথা বলছেন না।

আমাদের অনেকের কাছে ব্যাপারটা আজব লাগছে হয়ত। কারণ আমরা ধরে নিয়েছি, ইকোনমিস্ট ত আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থে কথা বলছে ও বলবে। না তা বলছে না।  তাহলে কার পক্ষে কথাগুলো বলছে?  ইকোনমিস্ট এখানে  দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কার্যকর ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে কথা বলছে। এটা সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। এ জন্য সে বারবার ‘বৃহত্তর’ বা ‘গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ারের লার্জার পার্টের’ ভূমিকার কথা টানছে।

একই ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ ভেতরে এখানে কাছাকাছি বা দেখতে একই মনে হয়, কিন্তু তা নয় এমন তিনটা  আলাদা স্বার্থ আছে। সেগুলো হল যেমন – রাষ্ট্রস্বার্থ (যেমন আমেরিকান রাষ্ট্র), কোনো সুনির্দিষ্ট করপোরেশন বা ব্যক্তি পুঁজি মালিকের স্বার্থ আর সাধারণভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এই ব্যবস্থার স্বার্থ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাধারণভাবে নিজস্ব অভিন্ন এই স্বার্থ, যেটা অনেকটাই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থের ভেতর দিতে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্টিটের গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থ সব সময় এক নয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের  নেতা বড় প্রভাবশালী কোম্পানী গোল্ডম্যান স্যাসে (Goldman Sachs) এর  পরামর্শেই চীন (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী) ব্রিক ব্যাংক (BRICS) চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল।

ওয়াল স্ট্রিট তাই আসলে আমেরিকায় অবস্থিত হলেও সে কোনো রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে নয়; এমনকি রাষ্ট্রস্বার্থ, সীমানা, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি সব উবে যাক যাতে পুঁজি অবাধ চলাচল করতে পারে – এটাই এর মনোভাব।

ইকোনমিস্ট ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার এই স্বার্থ, চীন পাহারা দিচ্ছে না আমেরিকা, তাতে তার কিছু আসে-যায় না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২১ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন-ভারত ডোকলামে মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

চীন-ভারত ডোকলাম মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

গৌতম দাস

০১ আগষ্ট ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2gF

 

ডোকলাম ভুটানের এক উপত্যকা। উপরে ছবিতে দেখুন নেপাল ও ভুটানের মাঝে কা্লো অংশ, যেটা আসলে সিকিম, যা এখন ভারতের অংশ। এই অর্থে নেপাল-ভুটানের মাঝে ভারত আছে। কিন্তু পুরাটাই ভারত নয়। এর কিছু অংশ আবার চীনের ভুখন্ড। চীনের ঐ ভুখন্ডের লাগোয়া এক অংশ হল ভুটানের ডোকলাম উপত্যকা। অর্থাৎ সারকথায় ডোকলাম ভুখন্ডের বিতর্ক মূলত ভুটান-চীনের মধ্যে সীমান্তের বিতর্ক। ভারতের কোন ভুখন্ড এটা নয়। এটা তাই কোনো মতেই চীন-ভারতের কোনো সীমান্ত-ভুখন্ডই নয়। চীন সেই সীমান্ত বরাবর থাকা কাঁচা রাস্তাকে ৪০ টন ভারবহনে সক্ষম এমন পাকা রাস্তায় উন্নীত করার কাজ শুরু করতে গেলে বিতর্ক শুরু হয়।

ভুটানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুসারে গত ১৬ জুন ২০১৭ ডোকলামের ডোকলা থেকে সীমান্তবর্তি যে রাস্তা যোমপেলরিতে ভুটানিজ আর্মি ক্যাম্পের দিকে গেছে, সীমান্তবর্তি সে রাস্তার পাশেই কাজ করতেই চীনারা এসেছিল। চীনা ভাষ্যও প্রায় এরকমই যে, সীমান্ত বরাবর ওই রাস্তাতেই চীনের পরবর্তী সীমান্ত ক্যাম্প পর্যন্ত রাস্তা তৈরি ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাদের সামনে কাজে বাধা সৃষ্টি করে বসে যায়।

তবে ভারতীয় সেনা কেন? সীমান্ত বিতর্ক তো ভুটান-চীনের মধ্যে। এ ব্যাপারে ভারতের যুক্তি হল, ভুটান স্বাধীন রাজার রাষ্ট্র (যা এখন কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র) বটে। কিন্তু ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার পর ১৯৪৯ সালে ভূমিবেষ্টিত ভুটানের বিদেশনীতির বিষয়াদি দেখার জন্য ভারত-ভুটান এক চুক্তি হয়েছে। এ ধরনের দাসখত চুক্তিগুলোর গালভরাভাবে নাম রাখা হয় ‘শান্তিচুক্তি’ বা ‘বন্ধুত্বচুক্তি’; এখানেও তাই হয়েছিল। এটা হল অন্যের ভূমিবেষ্টিত অবস্থার প্যাঁচে পড়াকে কেন্দ্র করে তার দুরবস্থার সুযোগ নেয়া। নেহেরুর ভারত ল্যান্ডলকড ভুটানের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে ঐ চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল।  ১৯৪৯ সালের ওই চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ভুটানের বিদেশনীতি ভারতের পরামর্শে গাইডেড হতে হবে। [“……Bhutan agrees to be guided by the advice of the Government of India in regard to its external relations.”]

যদিও ১৯৭৯ সালে ভুটানের রাজার এক সাক্ষাৎকারের রেফারেন্সে অনেকে দাবি করেন যে, ভুটানের রাজা মনে করেন ওই অনুচ্ছেদে বলা ভারতের পরামর্শ ভুটানের জন্য ‘অবশ্য পালনীয়’ এমন কথা লেখা নেই। [“India’s advice in the conduct of foreign affairs was welcome but “not binding” on Bhutan, he said.] তবে ডোকলাম ইস্যুতে ভারতীয়রা ওই চুক্তির অজুহাতে “ভুটানের অনুরোধে” সেখানে সেনা হাজির করেছে বলে জানায়। ফলে স্বভাবতই চীনারাও পরে সেখানে পাল্টা সেনা সমাবেশ ঘটায়। দুই সেনাবাহিনী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।   আর সেই থেকে ব্যাপারটা চীন-ভারত সম্ভাব্য সীমান্তযুদ্ধের টেনশন হয়ে হাজির হয়ে পড়েছে। স্বভাবতই চীনের দিক থেকে জানানো হয় তারা নিজ ভূখণ্ডেই তৎপরতা করছে; ফলে নিঃশর্তভাবে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করার দাবি করে চীনারা।

অবস্থা এখন এমনই যে ভারতেরই এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কূটনীতিক পি স্তবগান (P stobdan) লিখছেন, ভারতের ভুটান নীতি একটা কলোনিয়াল চিন্তা ভাবনা। ভারতের আসল সমস্যা তার ভুটান নীতি, ভুটানের সীমান্ত নয়।  নী  শিরোনামে একটা উপসম্পাদকীয় লিখে বলছেন,  ভারতের ভুটান নীতি কলোনিয়াল কাঠামো চিন্তা। এটা কাজ করবে না, টিকবে না, এটা বুদ্ধিমান বিদেশনীতির চিহ্ন নয়। (This approach was not sustainable; nor was it a sign of prudent foreign policy.) সে তুলনায় গত কয়েক বছরে চীন অনেক বেশি গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে ফেলেছে।

তবে এই প্রথম চীনের দিক থেকে এক তাৎপর্যপূর্ণ যুক্তিও দেয়া হয়। বলা হয়, চীন-ভুটান সীমানা বিতর্কে যদি ‘শান্তিচুক্তির’ অজুহাতে ভারত নাকগলায় তবে কাশ্মির ইস্যুতেও পাকিস্তানের পক্ষে তৃতীয় রাষ্ট্র (মানে ইঙ্গিতে চীনের কথা বলা হলো) নিজের সেনা নিয়ে হাজির হয়ে যেতে পারে। চীনের এই যুক্তিতে দম আছে বলতেই হয়। এই বয়ানে মধ্যে ভারতের জন্য বিপদের কথা বুঝে ভারত অন্য এক যুক্তির দিকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ভারত এবার যুক্তি তুলে যে শিলিগুড়ির নিজের ‘চিকেন-নেক’ এলাকার নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারত ঐ  রাস্তা পাকা করার কাজ করতে চীনকে বাধা দিয়েছে।

চিকেন-নেক সম্পর্কে সংক্ষেপে বলে নেয়া দরকারঃ ব্যাপারটা হল, ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান মানে আজকের বাংলাদেশ ভারত থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণে ধরা যাক কলকাতা থেকে কোনো ভারতীয় আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ইত্যাদি ভারতের উত্তর-পুর্ব অঞ্চলের রাজ্যে যেতে চাইলে তার আর (ভিন্ন রাষ্ট্র বলে) বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকল না। তাদের যেতে হবে পুরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত একটা চক্কর ঘুরে। যেন বেনাপোল থেকে যে কুমিল্লা যেতে চায় তাকে বেনাপোল থেকে দিনাজপুর তেঁতুলিয়া, রংপুর, সিলেট হয়ে এরপরে কুমিল্লা- এভাবে। সরাসরি বেনাপোল থেকে ঢাকা হয়ে কুমিল্লা নয়। শুধু তাই নয়, তাঁকে যেতে হবে ভারতীয় ভূখণ্ড ধরে যা পাহাড়ি দুর্গম শুধু নয় এরচেয়ে এক বড় বিপদ আছে।  কলকাতা থেকে সাত রাজ্যে যেতে যাত্রাপথে শিলিগুড়িতে সবচেয়ে চিকন (চওড়া মাত্র ১৮-২০ কিলোমিটার, যার একদিকে নেপাল অন্যদিকে বাংলাদেশ) এক অংশ পাড় হতে হয়। ওই অংশকেই চিকেন-নেক বলা হচ্ছে। কারণ কম চওড়া বলে ওই চিকন অংশ রুদ্ধ করে দেয়া গেলে (কয়েকটা নষ্ট গাড়ি বা ভারী কিছু ফেলে রাস্তাগুলো ব্লক করে দিলেই হল) ভারতের, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের সাথে সাত রাজ্য যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে যাবে। উপরে ছবিতে চিকেন নেককে  ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখন  এই ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ এর অজুহাত তুলে ডোকলাম ইস্যুতে ভারত বলতে চাচ্ছে, ডোকলাম ভারতের ভূখণ্ড না হলেও সে চীনকে রাস্তা তৈরিতে বাধা দিয়েছে নিজের ঐ ‘চিকেন-নেকের’ নিরাপত্তার কথা ভেবে। এটাও খুবই দুর্বল যুক্তি, প্রায় যুক্তিহীন ভাসাভাসা কথার মত। শিলিগুড়ির চিকেন-নেক ভারতের জন্য ষ্ট্রাটেজিক অর্থে দুর্বল জায়গা সে কথা বুঝা যায়। কিন্তু ওই রাস্তা তা ভুটানের বা চীনের যারই অংশ হোক না কেন, আর তা পাকা বা কাঁচা রাস্তা যাই থাকুক, ‘চিকেন-নেক’ অংশ ভারতের সবসময় জন্য দুর্বলতা। রাস্তাটা পাকা হয়ে যাওয়াতে এরপর ওটা ভারতের জন্য দুর্বলতা হয়ে দাড়ায় তা তো নয়।

আচ্ছা আরেকটা প্রশ্ন : ভারত কি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমেরিকার সাথে গলাগলি করে চীনে সমুদ্রপথে প্রবেশের পথের ‘চিকেন-নেক’ সিঙ্গাপুরের ‘মালাক্কা প্রণালি’ কোথায় আছে তা খুঁজে বের করেনি? এটা ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথ তুলনামূলক চিকন হয়ে আসা একটা অংশ। এই ইস্যুতে আমেরিকান সিনেটের শুনানিতে প্রফেসরদের সাক্ষ্য দিয়ে বলা পিডিএফ নোট এখনো নেটে যে কেউ পেতে পারে।  [ US CONGRESS HEARING ON INDIA-US RELATIONSHIP  – চোদ্দ পৃষ্ঠার এই ডকুমেন্টে ষষ্ঠ পৃষ্টায় ‘চিকেন-নেক’ ‘মালাক্কা প্রণালির’ ছবি দিয়ে চিনানো আছে।  এখানে কোনো জাহাজ ডুবিয়ে দিলেও এই সমুদ্রপথ (চীনে প্রবেশপথ) ব্লক হয়ে যেতে পারে। প্রণালি বা ইংরেজিতে strait মাত্রই সমুদ্রপথে এটা চিকন গলার সমস্যা। কিন্তু মালাক্কা প্রণালি ভারতের ত্রিসীমানার কোনো স্থান নয়। তবু আমেরিকার প্ররোচনায় ভারত কী আমেরিকার কৌশলগত পরিকল্পনায় শামিল হয়নি? গত ২০০৫ সাল থেকে ভারত আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ কাজে শামিল হয়েছে। তখন থেকেই কে কার চিকন গলা ধরতে পারে বা এর মজা কি সে কথা আমরা শুনে আসছি। কাজেই ‘কারো চিকন গলা চেপে ধরা কোন খারাপ কাজ না’- এমন নৈতিকতা বা আইন তো ভারতই মানে নাই। এমন পদক্ষেপ সে চীনের আগেই চীনের বিরুদ্ধে অভ্যাস নিয়ে ফেলেছে।  কাজেই চীন যদি ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরে চিকন গলা চেপে ধরে আসে সেটাকে অন্যায় বলার নৈতিকতা ভারতের নাই।  তবুও আমরা মনে করি এসব কাজ সবার ছেড়ে দেয়া উচিত। কোনো রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পণ্য চলাচলে অন্য রাষ্ট্রের বাধা তৈরি করা অন্যায়, নীতিগতভাবে সবার এই অবস্থান বাস্তবায়নে আসা উচিত।

ইতোমধ্যে এখানে আর এক মজার কাণ্ড ঘটে গেছে। ডোকলাম বিরোধ ঘটনার তিন সপ্তাহের মধ্যে খোদ ভারতেই মোদি সরকার নিজের সিদ্ধান্তের কারণে একঘরে হয়ে যায়। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ভারতের মিডিয়ার রিপোর্ট। এমন একটা রিপোর্ট হল, ১৫ জুলাইয়ের আনন্দবাজার পত্রিকা; যার শিরোনাম ‘ভুটানের আর্জিতে দুশ্চিন্তা, দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’। ওর সারকথা ছিল, ডোকলামে সৈন্য সমাবেশের দায়, সামরিক উত্তেজনা তৈরির দায় একা মোদি ও তার সরকারের বলে সব বিরোধী দল আর একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে এক বড় অংশ সবাই হাত ধুয়ে ফেলেছিল। মোদি সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন পরামর্শ নেয়ার জন্য সেখানকার ঘটনা এটা। অথবা বলা যায়, সম্মানজনক পশ্চাত-অপসারণের উপায় খুঁজতে সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন মোদি। ওই সভার সিদ্ধান্ত, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে সেখানে একটাই কথা, সৈন্য প্রত্যাহার করে কূটনীতির পথ হাতড়ানোতেই সমাধান।

কিন্তু সবাই বলতে চেয়েছে বিশেষ করে কংগ্রেস নেতা রাহুল  ও তৃণমুলের মমতা যে, মোদি উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করেছেন তিনি। কিছু সুনির্দিষ্ট শব্দ ও বাক্য নেয়া যাক ঐ রিপোর্ট থেকে। খোদ আনন্দবাজারই মোদির নীতিকে “দাদাগিরি” বলেছে। লিখেছে, “হিমালয়ের কোলের এই একমুঠো রাষ্ট্রকে তার তাঁবে থাকা দেশ বলেই মনে করে দিল্লি”। এতদিন এসব কথা আমরাই সবসময় আমাদের মূল্যায়নে বলে এসেছি, এখন আনন্দবাজারও বলছে বাধ্য হয়ে; এটা আমাদের মুল্যায়নকে স্বীকৃতি দেয়। আসলে, নেহরুর হাতে আকার পাওয়া, ভারতের আমলা-গোয়েন্দাদের চিন্তা কাঠামো মূলত কলোনিয়াল। ফলে ভিন্ন দুই জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রের মধ্যে কলোনি ধরনের অধীনতার বাইরে আর কোনো ধরনের সম্পর্কের কথা এরা চিন্তা করতে পারে না। এজন্য যেকোন বিদেশনীতি বিষয়ক চিন্তায় এটা প্রতিফলিত, প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

নেহরু নিজেকে একটা স্বাধীন রিপাবলিকের প্রধানমন্ত্রী এটা অনুভবের চেয়ে নিজেকে যেন কোন ব্রিটিশ ভাইসরয় ভাবতে বেশি পছন্দ করতেন। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ নেপাল বা ভুটানের সাথে ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের তথাকথিত ‘শান্তিচুক্তিগুলো’। এরই আলোকে একালে ভারত তার প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়ে এসেছে, এখনো করে যাচ্ছে। যার ফলাফলে ভারতের সব প্রতিবেশীর সাথে তার সম্পর্ক অন্তত আনন্দবাজার ভাষায় বললে, ‘দাদাগিরির’। আমাদের এই দাবির পক্ষে প্রমাণ হলো খোদ আনন্দবাজারেরই শিরোনাম- ‘দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’।

ওই একই রিপোর্টের ভেতরে আনন্দবাজার আরও লিখছে, ‘১৯৪৯ সালে ভুটানের সাথে শান্তিচুক্তি করেছিলেন জওয়াহের লাল নেহরু। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, বিদেশনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভুটান ভারতের পরামর্শ মতোই চলবে। ২০০৭ সালে ভুটান যখন পুরোদস্তুর রাজতন্ত্র থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে হাঁটে, তখন চুক্তিপত্র থেকে এই ধারাটি বাদ দেয়া হয়। যদিও কার্যক্ষেত্রে থিম্পুর ওপর দিল্লির প্রভাব খুব একটা খর্ব হয়নি। ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান। তার পরেও তার এই বেসুর সাউথ ব্লকের কানে বাজছে।’

এখানে দেয়া দুটো তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভুটান এখন এক কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, সেখানে আইন প্রণয়নের এখন জননির্বাচিত সংসদ আছে। কিন্তু আনন্দবাজারই সাক্ষ্য দিয়ে বলছে, ভুটান সংসদীয় সরকার হওয়ার পর ২০০৭-এর সংশোধিত চুক্তিপত্রে আগের মতো ভারতের ‘দাদাগিরির অনুচ্ছেদটা’ নেই। অথচ দাদাগিরি চলছে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, ‘ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান’। এখানে একটু ব্যাখ্যা করে বলা দরকার। ডিমার্শে হল কূটনৈতিক ইংরেজি শব্দ démarche; যার বাংলা অর্থ হল, আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোন আপত্তি অভিযোগ বা মনোভাব জানানো। ভুটান ডোকলাম ইস্যুতে চীনের কাছে আপত্তি জানিয়েছে ‘ভারতের চাপে পড়ে’, নিজে থেকে নয়। এটাই আনন্দবাজারের দাবি। তাই এখন খোদ ভুটান ভারতকেই সৈন্য প্রত্যাহার করতে বলাতে ভারত প্রমাদ গুনছে। এটাই আনন্দবাজারের রিপোর্ট। ওদিকে, ভারত সবার আগে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে; তাই চীন, সবার আগে ভারতের সেনা প্রত্যাহারের শর্ত রেখেছে। আর এ অবস্থায় ভারতের সব বিরোধী দল মোদির সাথে দূরত্ব তৈরি করেছে। মোদিকে উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করা লোক বলেছে। সুযোগ বুঝে কংগ্রেস নেতা রাহুল প্রশ্ন তুলেছে,  ভারতের বন্ধু অনেক রাষ্ট্র ছিল (সম্ভবত রাশিয়ার কথা বলতে চাইছেন) তারা কেন এখন দূরে- এই প্রশ্ন তুলেছে। তবে শেষে ‘সৈন্য প্রত্যাহার আর কূটনীতিক আলাপ’ এই সীমায় মোদি্র ফিরে আসার শর্তে সমর্থন জানিয়েছে। আর, সব মিডিয়া ‘কূটনীতি চাই’ বলে সম্পাদকীয় লিখেছে। যেমন আনন্দবাজারের ১৯ জুলাইয়ের রিপোর্টের শিরোনাম, ‘যুদ্ধ নয়, চাই কূটনীতি’। বেচারা!

মোদির অবস্থা একঘরে শুধু নয়, একেবারে বেইজ্জতি হওয়ার দশা। কারণ চীনের কঠোর অবস্থানে দাঁড়িয়ে দাবি করেছে আগে এককভাবে ভারতের সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। আর মোদির সরকার উঠেপড়ে লেগেছে যে, একসাথে প্রত্যাহার টাইপের একটা কথা যদি চীনের কাছ থেকে বের করা যায়। গত ২৭-২৮ জুলাই ছিল চীনে ব্রিকস রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা কাউন্সিল বা উপদেষ্টা স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক। ভারত চেষ্টা করছিল ওই সভার সাইড লাইনে চীনের প্রতিনিধি স্টেট কাউন্সিলরের (Chinese state councillor Yang Jiechi) সাথে যদি একটা বৈঠকের সুযোগ করে নিতে পারেন। মাত্র গত ২৯ জুলাই দুপুরে ভারতের কোনো কোনো মিডিয়া খবর দিচ্ছে যে, ওই মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কী কথা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো রিপোর্ট কোথাও ছাপা হয়নি।

ইতোমধ্যে রাশিয়ান ডিপ্লোম্যাট সূত্রে অনেক খবর আসছে, যেগুলোর ফরমাল ভার্সান এখনো রিলিজ হয়নি। সেখানে বলা হচ্ছে- ১. অন্তত দু’সপ্তাহ আগে চীন ভারতকে জানিয়েছিল যে তারা নতুন রাস্তা বানাতে নয়, রাস্তা আগে থেকেই যেটা ছিল সেটা চওড়া করতে যাচ্ছে। কিন্তু ভারত সে নোটিফিকেশন উপেক্ষা করেছে। ২. চীনারা যেখানে অবস্থান ও কাজ করছিল সেটা ইতোমধ্যে ভুটানের সাথে আলোচনায় বিবাদ নিরসিত হিসেবে চিহ্নিত চীনের অংশ। ৩. তাই চীন এখনো প্রমাণ চাচ্ছে ও দাবি করছে যে ভুটান কখনোই ভারতকে কোনো সামরিক অ্যাকশন নিতে অনুরোধ জানায়নি।

ভারতের কোনো কোনো জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তাই প্রস্তাব রেখেছেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের উচিত এখনই, আসলে কী ঘটেছে তার ঘটনাক্রম কী সে বিষয়ে ভারতে অবস্থিত সব কূটনীতিকদের কাছে ব্রিফিং দিয়ে ভারত অবস্থান পরিষ্কার করুক। এমন একজন হলেন ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাঈদ নকভি। তিনি দাবি করছেন, তার জানা মতে ভারতীয় সরকার এক আমেরিকান কূটনীতিক ছাড়া আর কাউকেই এখন পর্যন্ত আসলে কী ঘটেছে তা জানিয়ে কোনো ব্রিফিং কাউকেই দেননি।

চীন-ভারত সংঘাতে  সময়ে সময়ে আমরা বিভিন্ন ইস্যুতে তা হাজির হতে দেখি। তা সত্ত্বেও যদি বলা হয় এগুলোর মধ্যে খটর মটর লাগার সবচেয়ে অমসৃণ বিষয়টা কী? সে প্রসঙ্গে সংক্শেষেপে কিছু বলে শেষ করব।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেটেল হওয়া চলতি গ্লোবাল অর্ডার আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে চালু হয়েছিল। সেটা তার আয়ুর শেষ করতে যাচ্ছে। আর একই সাথে ধীরে ধীরে চীন উঠে আসছে সে জায়গা নিতে। গ্লোবাল পরিবর্তনের এই অভিমুখকে স্বীকার করে নিয়েও মানতে ইচ্ছা করে না দশা আমেরিকার। ফলে কম করে হলেও যতটা সম্ভব সে আসন্ন পরিবর্তনকে দেরি করিয়ে দেয়ার নীতি নিয়েছে আমেরিকা। তবে কম-বেশির ফারাক আছে। ওবামা  প্রশাসন যতটা এব্যাপারে এগ্রেসিভ হয়ে ততপর ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন ততটা চেয়ে বলা ভাল একই কৌশলে ততপর নয়। যদিও ঘটনা শুরু করে দিয়ে গিয়েছিল  সেকেন্ড টার্মের (2005-9) বুশ প্রশাসন। মূল ব্যাপারটা হল আমেরিকা ভারতকে প্রলুব্ধ করে, লোভে ফেলে নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থার নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন AIIB, BRICS, SCO ইত্যাদি) গড়ে উঠতে দেরি করিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। কারণ নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থাগুলো তৈরিতে চীন ভারতকে সাথে নিতে চায়, আর একাজে চীনের প্রধান সহযোগী পুতিনের রাশিয়া। কিন্তু ভারত গাছেরও খেতে চায় আবার তলার গুলোও কুড়িতে নিতে চায় – নীতি নিয়েছে। সে চীন, রাশিয়ার সাথে মিলে নতুন ব্যবস্থা গড়তে ভাল অবস্থানগুলো নিতে চায় আবার আমেরিকার দেয়া লোভের অফারগুলোও পেতে চায়। ভারতের এই দ্বৈততা, দ্বিমুখি ঝোঁক – এটাই সব সমস্যা সংকটের উতস এখানে।

এর ফলে ভারত তার যেসব বিরোধে কোন সংঘাত  তৈরি না করে সমাধান করার কথা তা মুখ্য সংঘাত বানিয়ে ফেলছে। আর যেখানে বড় সংঘাতই হবার কথা তা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্যই করছে না।  আর এর সাথে যুক্ত হয়েছে সস্তা জাতীয়তাবাদের চিন্তা। অথচ কমিউনিস্ট বা জাতীয়তাবাদীরা যাকে ‘জাতীয়তাবাদ’ বলে মনে করে আসছিল সেটা আসলে কোল্ড ওয়ার কালে বুঝের জাতীয়তাবাদ, যা একালে অচল। যেমন দেশের ব্যবহার্য সব পণ্য দেশেই বানাতে হবে এমন গোঁ ধরা জাতীয়তাবাদ কীনা নিজ জনগোষ্ঠির তাতে আসলে একালেও লাভ হয় কীনা ভেবে দেখতে হবে। নিজ মুদ্রার অবমুল্যায়ন একালে সময়ে ইতিবাচক হতে পারে। নাহলে আমেরিকার বিষয়টাকে  অভিযোগ আকারে আনত না যে চীন নিজের মুদ্রা অবমুল্যায়িত রেখেছে। ইত্যাদি।

আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ভারতের বর্তমান স্বার্থ হলে চীন-রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ভারতের ভবিষ্যত। ফলে ভারতের  বুদ্ধিমান অবস্থান হল, এদুইয়ের মধ্যে এক সুক্ষ হিসাব করা ভারসাম্য রচনা করে পা ফেলা। কিন্তু কথাটা ভারত প্রায়ই ইচ্ছা করে ভুলে যায়। অনেক বাচ্চা নিজ অভিভাবককে ব্লাকমেল করে পকেটমানি বাড়িয়ে নেয় – বাচ্চারা এভাবে অনেক সময় দায়িত্বজ্ঞানহীন  আচরণ করে সাময়িক সুবিধার মজা উপভোগ করতে চায়। ভারতের অবস্থা এরকম। কিন্তু বাস্তবে ভারত কোন বাচ্চাসন্তান নয়, আবার চীন বা রাশিয়া (নতুন ব্যবস্থার মূল উদ্যোক্তা কারিগরেরা) এরাও ভারতের অভিভাবক কেউ নয়। ফলে ভারতেরও উদ্যোক্তাদেরকে এমন জায়গায় ঠেলে দেওয়া উচিত না যে উদ্যোক্তারা ভারতের আশা ছেঁড়ে ভিন্ন পরিকল্পনা করে বসে। ভারতের উপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যায়।

চীনের গ্লোবাল টাইমস যেখানে চীনের সরকারি অবস্থান কড়া ভাষায় কিন্তু ইনফরমালি চীন প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়, সেখানে ডোকলাম ইস্যুটাকে শিরোনাম লিখা হয়েছে, ভারতের সাংহাই কর্পরেশন সংস্থার (SCO) সদস্যপদ পেয়ে পশ্চিম চীনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে চাইছে। (India’s SCO membership threatens West China security)। চীন শান্তিপুর্ণ অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করতে  শিকাগোর এক আমেরিকান প্রফেসরের তত্ত্ব যে, চীন নাকি ভারতকে মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলেছে, চীন ভারতের জন্য হুমকি  এইসব  তত্ত্ব আঊরায়।   আসলে মোটাদাগে বললে ভারতের চীন বিরোধী সংঘাত এটা আসলে আমেরিকার চীনা নীতির আলোকে সাজানো। ইন্ডিয়া শুধু আমেরিকার সাথে সামরিক অস্ত্রের চুক্তি করেছে তাই নয়, বরং চীন-ভারত সীমান্ত বরাবর সামরিক ঘাটি বানিয়েছে। (In fact, India’s confrontation with China is, by and large, backed by America’s China policy. India has not only sealed arms deals with the US, but also established strategic military bases along the China-India border. ) সে নিজ জনগণকে চীন বিরোধী প্রপাগান্ডায় সামিল করেছে।

এটাকে আমরা বলতে পারি চীনের  দুঃখ করে বলা (আবার হুমকিরও)  কথা যা খুব সম্ভবত রাশিয়াকে স্মরণ করিয়ে দিবার উছিলায় সবাইকে জানানো। কারণ রাশিয়ার উতসাহেই চীন ভারতকে এই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিষয়ক জোটে (পাকিস্তানসহ) ভারতকেও সদস্যপদ দিতে রাজি হয়েছে কয়েকমাস আগে।

ভারতের অজিত ডোভাল চীন থেকে ফিরেছেন, কিন্তু ভারতের মিডিয়ার গান সম্পুর্ণ ভিন্ন। এখানে কেবল কিছু শিরোনাম আনছি যার ভিতরে অনেক ইঙ্গিত আছে। চীনে ভারত কী শিক্ষা পেয়েছে  সম্ভবত এর ইঙ্গিত আছে এখানে। আনন্দবাজার পত্রিকা ২৯ জুলাই,  “বেজিংকে না চটাতে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী মোদীর”। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ২৯ জুলাই,  “Doklam is not about a road”।  অর্থাৎ ভারতের মিডিয়ার আর ডোকলাম অচলাবস্থার কারণ ডোকলামে না, বাইরে খুজতে শুরু করেছে। একটু দেরি হয়ে গেছে অবশ্য।  মনে হচ্ছে মোদি ভুলে মাটি খেয়ে ফেলেছেন বা মুখে মাটি গেছে। খুব সম্ভবত গাছের খাওয়া আর তলেরও কুড়ানোর দিন ভারতের জন্য শেষ হয়ে আসছে। কোন একটা বেছে নিতে হবে। এশিয়ায় পড়শিদের উপর ভারতের প্রভাব দাবরানি আর কূটচাল দিয়ে, কলোনি চিন্তা কাঠামো দিয়ে, বৃটিশ বাপ-দাদাদের ছিল ফলে একই স্টাইলে তা আমারও শাসনে থাকবে এই যুক্তিতে এখন টিকানো অসম্ভব, তাই সেগুলো সবই শেষ হয়ে আসছে, যাবে। সে জায়গায় চীনের যে প্রভাব বাড়ছে তা চীনা অর্থনীতির সক্ষমতার কারণে, এই অর্থে এটা অবজেকটিভ। চীনের সাবজেকটিভ ইচ্ছার কারণে এটা হয় নাই, হচ্ছে না এবং  হয় না। এই অর্থে আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে ভারতের বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এর মাসুলও দিতে হবে চড়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩০ জুলাই ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ৩১ জুলাই তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

চীনের দরকার ব্রেটন উডসের চেয়েও বেটার সিস্টেম

চীনের দরকার ব্রেটন উডসের চেয়েও বেটার সিস্টেম

গৌতম দাস

০৭ জুন ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2fX

 

চীন ২০১৪ সাল থেকে এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক গঠনের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছিল। এআইআইবি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য, তবে চীনা নেতৃত্বের অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক। গত ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে চালু হয়ে এটা কর্মতৎপরতা বাড়িয়েই চলেছে। এর সেই প্রস্তুতিকালে আমেরিকা তার প্রভাবাধীন এশিয়ার ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো যেন এই ব্যাংকে যোগ না দেয় তা নিয়ে তৎপরতা চালিয়েছিল। প্রকাশ্য বক্তব্যে যে আপত্তি সে তুলেছিল, তা মনে রাখার মতো। বলেছিল, আমেরিকার নেতৃত্ব বিশ্বব্যবস্থা গড়তে গিয়ে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে যে স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা সংগঠনে জন্ম দিয়েছে, তার সমমানের প্রতিষ্ঠান গড়তে চীন ব্যর্থ হবে বলেই আমেরিকা উদ্বিগ্ন। আর এই ‘কথা’ আমেরিকা তার এশিয়ান পার্টনার ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জানিয়েছিল- যেটাকে আমেরিকার নেতিবাচক প্রচারণা বলা হয়েছিল সে সময়। চীনের এআইআইবি ব্যাংকের উত্থান এই প্রচারণা দিয়ে আটকে দেয়া যায়নি। বরং শুরু থেকেই এই স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার বিষয়টাকে তারা ইতিবাচকভাবে এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। আজ ৭৭ রাষ্ট্রকে সদস্যপদ দান হাসিল করে এআইআইবি নিজ মহিমায় নিজের তৎপরতার বিস্তার ঘটিয়ে চলছে। কিন্তু তাসত্ত্বেও এখানকার মূল প্রসঙ্গ হল – গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি।
গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানেও একই কথা উঠেছিল। এই মেগা অবকাঠামো প্রকল্প ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের, যেখানে ৬৮ রাষ্ট্র সম্পৃক্ত হবে। ঐ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের যৌথ ঘোষণার এক অংশ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল ইউরোপের নেতা রাষ্ট্রগুলো যেমন জর্মান, ফরাসি এরা। তাদের সার কথা হল, অর্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ার কালে ওর মান, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি কী হবে? শেষ মুহূর্তে আমেরিকা প্রতিনিধি পাঠিয়ে এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ- এদের প্রধান নির্বাহী এবং প্রায় ৩০টি সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান এতে যোগ দিয়েছিলেন। ভারত ছাড়া প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির রাষ্ট্র সেখানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।
এখানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার স্ট্যান্ডার্ড কথাটা ভেঙে বললে দাঁড়ায়, বড় অর্থ বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে যে কথা বলছি আমরা, এর মালিক কিন্তু হবে আলাদা আলাদা এক একটা খোদ রাষ্ট্র মানে সে দেশের জনগণ। পাবলিক মানি, পাবলিক এসেট বা সম্পদ। ফলে প্রকল্পের মোট খরচ কত, তা ন্যায্য কিনা, প্রকল্পের খরচ অনুমোদনের পর তা কৌশলে দ্বিগুণ থেকে ছয় গুণ করে নেয়া হয়েছে কিনা, কাজের মান পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আদৌ ছিল কিনা, প্রকল্পে দুর্নীতিরোধের কোনো ‘সেলফ চেক’ ব্যবস্থা ছিল কিনা- এ সংক্রান্ত স্বচ্ছ তথ্য চাওয়ামাত্র তো বটেই, না চাইলেও জনগণের দেখতে দেয়ার ব্যবস্থা ছিল কিনা, ‘পরিবেশ ধ্বংস করা কোনো উপাদান এই প্রকল্পে নাই’, এমন আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড ও দেশী পরিবেশ ছাড়পত্র ছিল কিনা, কাজ প্রদানে সবস্তরে স্বচ্ছ টেন্ডার ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছিল কিনা ইত্যাদি পাবলিক মানি নাড়াচাড়া সংক্রান্ত  গুরুত্বপুর্ণ  সব কিছুকে বুঝানো হয়েছে।

দুইঃ
বিগত প্রায় পাঁচ শ’ বছরের বিশ্ব বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থাকে মোটা দাগে তিনটি স্তর বা পর্যায়ে ভাগ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিকে একটা ল্যান্ড মার্ক ধরে বলা যায়, এর আগের যুগ ছিল প্রথম পর্যায় – কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম। মানে আমাদের মতো দেশগুলোকে উপনিবেশীপন্থায় দখল করে কলোনি মালিক সাম্রাজ্যগুলা এক  গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা কায়েম করে রাখা হয়েছিল যাকে এখানে আমরা ‘কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম’ বলে নামকরণ করছি । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই ব্যবস্থাটাই ভেঙে যায়, আর কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা। আগের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম, সেটাতে কোন কেন্দ্র বা কোন গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতা ছিল না। অর্থাৎ সেটা কোনো গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। যে অর্থে দ্বিতীয় পর্যায়ে আমেরিকার নেতৃত্বের নতুন ব্যবস্থাটা গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অধীন করে সাজানো।
আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ১-২২ জুলাই; টানা ২২ দিন ধরে আমেরিকার হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলে ৭৩০ ডেলিগেটের সভা ও তর্ক-বিতর্ক নিগোশিয়েশনের ভেতর দিয়ে । তাই এদের ব্রেটনউড প্রতিষ্ঠানও বলে অনেকে। এখানে প্রথম পর্যায়ের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের পরের দ্বিতীয় পর্যায়কে ব্রেটনউড সিস্টেমের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বলে চেনাব, সংক্ষেপে ব্রেটনউড সিস্টেম বলব।

তাই বলা যায়, কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এ ধরনের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান ছিল না। এমনকি ‘কলোনি মাস্টার’ যেমন খোদ ব্রিটিশ রাষ্ট্রও খুব নিয়ন্ত্রণ করত না। বরং ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির মতো ট্রেডিং বা মেরিটাইম কোম্পানি, এদের নেতৃত্বে কর্তৃত্ব প্রভাবে  ম্যানুফ্যাকচারিং-সহ বাকি সব কোম্পানির এক সমাহার ছিল; রাষ্ট্র সেখানে ঠিক নিয়ন্ত্রক নয় সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। কথাগুলো বোঝা যাবে, যদি মনে রাখি একালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (রিজার্ভ ব্যাংক) ধারণাটা। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না। ব্রেটনউড সিস্টেমের সাথে আনা হয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণাটা।  ব্রেটনউড সিস্টেমের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। মানে রাষ্ট্র মোটা দাগে আগাম কিছু ষ্টাটুটারি আইনি কাঠামো তৈরি করে দিয়ে থাকে, আর সেগুলোর অধীনে ও সীমার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বশাসিত। সেই আইনি সীমার মধ্যে এই ব্যাংক স্বশাসিতই শুধু নয়, রাষ্ট্রের মধ্যে তৎপর অন্য সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সব কর্মতৎপরতার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সে। ব্যাংক ব্যবসা করার নীতি ঘোষণা করা, মনিটরিং এবং অবশ্য পালনীয় নির্দেশ দেয়ার প্রতিষ্ঠান এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্য দিকে সরকারের মুদ্রানীতি, ফিসক্যাল (অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থা) নীতি হাজির করা ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিষ্ঠানও এটা। মুদ্রা ছাপানোর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে এত কিছুর পরও এগুলো সবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ভূমিকা। এসবের বাইরে আইএমএফের নির্দেশ পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য বলা হয় আইএমএফের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো হয়ে থাকে যেন আইএমএফের ডানা বা এক্সটেন্ডেড উইং। ফলে পুরা দুনিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে আইএমএফ।  কোনো রাষ্ট্রের আইএমএফের সদস্যপদ পাওয়ার পূর্বশর্ত হল, ওই রাষ্ট্রের এর আগে একটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকতে হবে। তাই বেশির ভাগ রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্ম ১৯৪০ এর দশকে। ব্যতিক্রম কোথাও যদি থাকে তবে তা ভিন্ন কারণে। যেমন আমেরিকার ফেড বা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আমেরিকার উদীয়মান ও বিকাশমান সব রাজ্যে আগে আলাদা স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা ছিল। এক রাজ্যের ব্যাংক ভিন রাজ্যে ব্যবসা ততপরতা করতে পারত না। আবার একই রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংকের নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন ছাপা নোট ছিল। পরে (মানে অনুমান করি প্রতিটা রাজ্য নিজের পুঁজির স্ফীতিতে উপচে পড়লে বা স্যাচুরেটেড হয়ে গেলে অথবা বড় বড় প্রকল্পে এক সাথে বিনিয়োগের প্রয়োজনে) সব রাজ্য ব্যবস্থাগুলোর সমন্বয়ে এক অভিন্ন, ফেডারেল ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য (যেমন কমন কারেন্সি চালুর জন্য) ১৯১৩ সালে ফেডের জন্ম হয়েছিল। ওদিকে বৃটেনে তাকাই, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ১৬৯৪ সাল থেকেই ব্যক্তিগত শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন ব্যাংক। কিন্তু এই ব্যাংকই ব্রিটিশ সরকারের আয়-ব্যয়ের অ্যাকাউন্ট ধারণকারী ব্যাংক। একটা বড় করপোরেশনের মতোই ব্রিটিশ সরকার তার একটা ক্লায়েন্ট। আবার সরকারের অনুমতিধারী একমাত্র মুদ্রা ছাপানোর ব্যাংক এটাই। এভাবেই প্রাইভেট ব্যাংক হিসেবে চলার প্রায় তিনশ বছর পর ১৯৪৬ সালে এই ব্যাংকের জাতীয়করণ হয়, আর ব্রিটিশ সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ সম্পর্কে এত বিস্তারে বলছি আগের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এই ব্যাংক ছিল না, ফলে তুলনামূলক বিচার করে বুঝবার জন্য। এখন কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ ছিল না, একথার আর এক অর্থ  হল, মানে রাষ্ট্রের নিজের মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা বলে কিছু ছিল না। এই অর্থে বলা যায়, ওই ক্যাপিটালিজম ব্যবসায়ী এসোসিয়েশনের হাতে নিয়ন্ত্রিত হত। এ ছাড়া অনেকেই জানেন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার – এটাও প্রাইভেট ব্যাংক বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিদিন ঠিক করে দিত। এ কাজের একচেটিয়া কারবারি, ‘রথশিল্ড ব্যাংকিং পরিবারের’ কথা অনেকেই জানেন। আমাদের অনেকের ধারণা, স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা বাস্তবায়নের ব্যাপারটা সরকার ছাড়া হয় না, হবে না। এই ধারণাটা বাস্তব নয়। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগে স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থাটা দাঁড়িয়েছিল বেসরকারিভাবে, ব্যবসায়ীদের সমিতি ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণে এবং একটা স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতার মান নিশ্চিত করে। তবে সেকালে এক বিরাট বাড়তি সুবিধা ছিল। তা হল কোন কাগুজে মুদ্রা মানেই তা ছিল ‘গোল্ড ব্যাকড মানি’। মানে ঐ কাগুজে মুদ্রার সমমানের সোনা ব্যাঙ্কে আগে গচ্ছিত (রিজার্ভ) রেখে তবেই মুদ্রা ছাপানো হয়েছে। ফলে কাগুজে নোট যার হাতে আছে সে ব্যাংকে গিয়ে “চাহিবা মাত্র” ঐ সমতুল্য রক্ষিত সোনা ব্যাংক নোট হোল্ডারকে পরিশোধ করে দিত। এর কারণে প্রতিদিন আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ সহজ ছিল। পরে ১৯৭৩ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন মুদ্রাই আর  ‘গোল্ড ব্যাকড মানি’ নয়।
কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগ শেষে তা ভেঙে কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থা- এই প্রথম এমন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা যেখানে তা এক গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতার (আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের) অধীনে গড়া ও নিয়ন্ত্রিত এক ব্যবস্থা। আগেই বলেছি এটা পরিচালিত হয় সব সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক – আইএমএফের এই ‘ডানা’গুলোর মাধ্যমে। এই অর্থে ‘পড়ে পাওয়া’ সুবিধা হল রাষ্ট্র এরপর থেকে ব্যাংক ব্যবসার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণের যুগের সূচনা করেছিল।

আমেরিকাসহ ইউরোপ আজ স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা তুলছে। তা ব্রেটনউড সিস্টেমের প্রতিষ্ঠানে আসতে সময় লেগেছিল ৫৬ বছর, ২০০১ সালে। অর্থাৎ মাত্র চলতি শতকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে (স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তদারকি নিশ্চিত করতে) শক্তিশালী ও স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ  চালু করা হয়েছে। একজন ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে আলাদা এই বিভাগ সরাসরি কেবল বোর্ডের কাছে রিপোর্ট ও জবাবদিহি করতে বাধ্য। কোনো কান্ট্রি অফিসকে কিছু না জানিয়েই সে তার কাজ করতে পারে। তবে এসব কথা শুনে এই বিভাগ বা বিশ্বব্যাংককে ‘সততার দেবতা’ মনে করার কোনো কারণ নেই, তা ভুল হবে। রক্ত মাংসের ও স্বার্থের এই দুনিয়ায় মানুষ যে মানের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দেখাতে পেরেছে এর এক নমুনা বলা যায় এই বিভাগকে। তবে এরও আগে আর একটা কথা বলা দরকার। বিশ্বব্যাংকের কাজ দেয়ার টেন্ডার পদ্ধতি খারাপ নয়, এটা বলতেই হবে। এই অর্থে যে, কোনো প্রকল্পে বিশ্বব্যাংককে ফান্ডদাতা হয় যে দেশের সরকার; ধরা যাক, একটা প্রকল্পে এর অর্ধেকের বেশি ফান্ড জাপান সরকারের। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই প্রকল্প নির্মাণের কাজ জাপানের কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পায়নি। মানে কেউ ফান্ডদাতা হলে কাজ তাকেই দিতে হবে, এমন কোন কথা নেই। টেন্ডার আলাদা স্বাধীন পদ্ধতি ও ব্যবস্থা আছে। টেন্ডারে ঠিক হবে কে কাজ পাবে। যেমন যমুনা সেতুতে নদীশাসন কাজ পেয়েছিল নেদারল্যান্ড, দুই কানেকটিং রোড আর মূল ব্রিজ নির্মাণকাজ পেয়েছিল দুই কোরিয়ান কোম্পানি, আর কন্সালটেন্সি পেয়েছিল এক ব্রিটিশ কোম্পানি। তবে আবার বলে রাখি, টেন্ডার ব্যবস্থা চালু করতে পারার জন্য অথবা বিশ্বব্যাংকের ভেতরের প্রসেসিংয়ের তুলনামূলক স্বচ্ছ ব্যবস্থার জন্য তারা একেবারে ‘আদর্শের অবতার’, এমন বলা এখানে উদ্দেশ্য নয়। আবার যমুনা সেতু নির্মাণে কোনো দুর্নীতিই ছিল না, এমন অ্যাবসলিউট কোনো কথা বলা হচ্ছে না। তবে অন্তত তুলনামূলক অর্থে ফান্ডদাতা আর কাজ পাওয়াকে আলাদা করে ফেলতে পারা কম অগ্রগতি নয়। আর বিশ্বব্যাংক এটা ২০০১ সালে ইন্টিগ্রিটি বিভাগ খোলার আগেই চালু করতে পেরেছিল। আবার বিশ্বব্যাংকের বদনামের শেষ নাই। ফলে এটাও বলে রাখা ভাল, অর্থের অপচয় আর দুর্নীতির (মানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার অভাব) দিক থেকে সত্তরের দশকের বিশ্বব্যাংক ছিল সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ। সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্রেটনউডস সিস্টেম এতটুকু পেরেছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন হিসাবে খারাপ নয়।

পাঁচ শ’ বছরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়কে  মোটা দাগে চিহ্নিত করে তা চলতি শতক থেকে শুরু তা বলা যায়। আমেরিকার জায়গায় চীনের নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা আজ আর কোন অনুমান করে যা মনে চায় বলা এমন বিষয় নয়। খোদ আমেরিকার সরকারি স্টাডি ও নানা গবেষণাতেও এর স্বীকৃতি আছে। ব্রেটনউডস সিস্টেম বা দ্বিতীয় পর্যায়টা কায়েম হতে, একটা ওলটপালটের ভিতর দিয়ে তা আসতে একটা বিশ্বযুদ্ধের দরকার হয়েছিল। তাই তৃতীয় পর্যায়ে যেতেও একটা বিশ্বযুদ্ধ দরকার, অনেকে অনুমানে এমন কথা বলে থাকেন। কিন্তু এখনো তা স্পষ্ট হয়ে যায়নি। সর্বশেষ আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান; আর হম্বিতম্বিকে চীনের দিক থেকে একে একেবারে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা এবং আমেরিকার জন্য জায়গা (বাজার, কাজে ছাড় দেয়া) করে দেয়া কোন টেনশন বা যুদ্ধের শঙ্কাকে আপাতত নাকচ করেছে।

কিন্তু এই লেখার মূল প্রশ্ন, একালে তৃতীয় পর্যায়ে, চীনের তৈরি গ্লোবাল প্রভাব নিয়ে জন্ম নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- এআইআইবি, ব্রিক ব্যাংক, আরআইবি ইত্যাদির স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান কী হবে? এক কথায় বললে গ্লোবাল ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়ের স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠান হতে গেলে এগুলোকে অবশ্যই ব্রেটন উডস সিস্টেমের চেয়েও ভাল, মানে যেমন বিশ্বব্যাংকের চেয়েও আরও ভাল মান দেখাতেই হবে। তবে এ কথা ঠিক, চীনের উত্থানে রেষারেষি প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের স্বার্থটাকে মাখিয়ে তারা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার কথাটা উপস্থাপন করেছে। তাই আমেরিকা বা ইউরোপের স্ট্যান্ডার্ডের প্রসঙ্গ তুলে চীনকে যে অর্থে খোটা দিচ্ছে, নিজের প্রভাবকে বাড়িয়ে নিবার চেষ্টা করছ এর মধ্যে আমাদের মতো দেশের লাভ নেই। আমাদের স্বার্থ আমাদেরকে ভাবতে হবে। যেমন বাংলাদেশের সাথে চীনের রেল-রোড উদ্যোগসহ সব অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প আমাদের স্বার্থে তা খুবই দরকারি ও নির্ধারক। কিন্তু লক্ষণীয় যে, আমরা এখন টেন্ডার আহ্বানবিহীন সরকার, আর যেকোনো প্রকল্প ব্যয় দুই থেকে ছয় গুণ ব্যয় বাড়ানোর সরকারে পরিণত হয়েছি। এই বিষয়টা  বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বাদ রেখে বললেও এটা চীনের জন্য বিশেষ করে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান- এই বিচারে খুবই খারাপ উদাহরণ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার দিক থেকে এই ব্যবস্থা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এদিকটায় চীনেরও অবশ্যই  মনোযোগ দিতেই হবে। যদিও চীনের হয়ত পাল্টা বলার বিষয় হবে যে, বাংলাদেশের জনগণ যদি একটি অপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে, তাহলে সেটা ভালো না হওয়া পর্যন্ত চীন হাতগুটিয়ে বসে থাকলে এর সুবিধা চীনের প্রতিদ্বন্দ্বীরাই নেবে। তবুও এটা ভালো যুক্তি নয়। কারণ এর চেয়েও দুর্নীতিবাজ সরকারের সাথে গত চল্লিশ বছর ধরে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে কাজ করতে হয়েছে। তার পরও তাদের অর্জন খারাপ নয়। আমাদের মতো দেশে সরকারের কার্যকারিতা যতটুকু, এর দক্ষতা যতটুকু, তা তো আপন কোনো রাজনৈতিক সরকারের কারণে হয়নি, আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক শর্ত দিয়ে তাদের বাধ্য করেছে বলা হয়েছে। যদিও শর্তের খারাপ দিক আছে, তা মেনেও এ কথা বলা যায়। যেমন শেখ মুজিবের আমলের রেশনব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংকের শর্তের কারণে আগের ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন ঠিক রেশন নয়, তবে বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অন্যভাবে কার্যকর আনা আছে। চালের সরকারি মওজুদ আর আগের দরে বাজারে চাল ছেড়ে দিয়ে মুল্য নামানো – এটা খুবই কার্যকর ব্যবস্থা।
মোট কথা, আমরা ব্রেটনউডস সিস্টেমের যুগ পার হয়ে এসেছি- এ কথা চীনকে মনে রেখে আগাতে হবে। আমাদের নতুন আকাঙ্খা পূরণ না করে, আমাদের হতাশ করে চীনের তৃতীয় পর্যায় গড়ে তোলা বা এর নেতা হওয়া অসম্ভব। চীনই ফান্ডদাতা, আবার কোনো টেন্ডার সিস্টেম নেই, কাজ পাবে কেবল চীন– এই ‘জি টু জি’, লোকাল এজেন্টের নামে ঘুষের ব্যবস্থা, প্রকল্পের অর্থ ছয় গুণ বাড়িয়ে নেয়া- এসব অগ্রহণযোগ্য। খুবই খারাপ উদাহরণ। এটাই ‘অপারগ’ চীনের আপাতত স্বার্থ মনে করে চীন নিজ মনকে প্রবোধ দিতে পারে। কিন্তু সাবধান এর মূল্য একদিন চীনকে শোধ করতে হবে। এই একই ফর্মুলায় আমরা বেল্ট-রোড উদ্যোগে যুক্ত হতে না চাইলে না পারলে তা আত্মঘাতী – চীন ও বাংলাদেশের জন্যই।
গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের তৃতীয় পর্যায়ের নেতা হিসেবে চীনকে অবশ্যই স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দিক থেকে উন্নত মানের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হাজির করতে পারতে হবে। এমন কাজের নীতি অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। কোন অজুহাত এখানে অচল এবং আত্মধবংশী।

ভারত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন যোগ দেয় নাই। সেই সিদ্ধান্ত ভারতের স্বার্থে ন্যায্য হয়েছে সেই সাফাই যোগাড়ে মোদি সরকার কাহিল। কারণ এটা ফাঁপা আত্মম্ভরি সিদ্ধান্ত ফলে আত্মঘাতি তা স্পষ্ট। চোরে বাসন নিয়ে গেছে বলে কেউ অভিমানে মাটিতে ভাত রেখে খায় না।  তাই ভারতও এই সুযোগে যেন  ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’ অভাবের কারণে যোগ দেয় নাই, এমন ইঙ্গিত দিয়ে নিজের লাজ ঢাকতে চাইছে। তা সে চাইতেই পারে কারণ কেই বা  বেকুবির লজ্জায় নিজেকে রাঙা দেখাতে চায়। তবে এটা ফ্যাক্টস যে সম্মেলনের আগে ভারতের দেখানো যোগ না দেবার কারণগুলোর মধ্যে ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’ অভাব বলে কোন কারণ তালিকায় ছিল না।  কাজেই ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’  কথা তুলে সে আড়ালে সুযোগ সন্ধানীও কম নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ০৫ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন : চীন আরেক ধাপ আগালো

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত
চীন আরেক ধাপ আগালো

গৌতম দাস

মে ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2fm

চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ (Belt & Road Initiative)। এটা এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকা মহাদেশকে এক সাথে জুড়ে এমন এক যোগাযোগ অবকাঠামো প্রকল্প। যোফাযোগ সড়ক পথে ও সমুদ্র পথে এবং দুটাকে মিশিয়ে ব্যবহার করা হবে। এখানে তাই দুটা প্রকল্পের সমাহার। সড়ক প্রকল্পের নাম  Silk Road Economic Belt আর সমুদ্র পথ (যেটাতে জায়গায় জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের সুবিধা থাকবে আর ঐ বন্দরগুলো থেকে অন্তত ছয়টা সড়ক যোগাযোগের করিডোর বেল্ট রোডে গিয়ে যুক্ত হবে) এই প্রকল্পের নাম  Maritime Silk Road। এই দুই মেগা প্রকল্পকে একসাথে বেল্ট ও রোড উদ্যোগ নাম দেয়া হয়েছে।

চীনা উদ্যোগে ও বিনিয়োগে নেয়া এই প্রকল্প যেসব দেশের উপর দিয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট সেসব ৬৫ টা রাষ্ট্র এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে – এটা এমন এক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে এশিয়ার কোন রাষ্ট্রকে বাদ রাখা হয় নাই। তবে যদি না কেউ নিজে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, সেকথা আলাদা। বলা ভাল এখানে এশিয়ান রাষ্ট্রগুলোরই প্রাধান্য; তবে অবশ্যই সাথে ইউরোপ, সেন্ট্রাল এশিয়া আর আফ্রিকার কিছু দেশও অন্তর্ভুক্ত। এর ভৌগলিক ধারণাটা হল, বাংলাদেশ থেকেই যদি ধরি, এখান থেকে মূল হাইওয়ে সড়ক পথে (যেটাকে Silk Road Economic Belt বলা হচ্ছে)  চীন হয়ে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে, পুর্ব ইউরোপ হয়ে পশ্চিম ইউরোপে যাওয়া সম্ভব। এটাই মূল হাইওয়ে। আর পথের দুপাশের সব রাষ্ট্রকে এই অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নেয়া হবে। ওদিকে এই পথের শেষ হচ্ছে ইউরোপের রটারডাম (নেদারল্যান্ড) গিয়ে। সেখান থেকে আবার একই রোডে না ফিরে  ফিরতি সমুদ্র পথ নিবার সুযোগ আছে। সে হিসাবে এবার ইতালি হয়ে নৌপথে অথবা কখনও কোস্টাল সড়ক ঘুরে বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব। তবে ঐ মূল হাইওয়েতে সময়ে সময়ে করিডর হিসাবে অন্তত ছয় জায়গায় ছয়টা করিডর-সংযোগ সড়ক  থাকবে মূল হাইওয়ে সড়কে।  আর ঐ নৌপথের মধ্যে মধ্যে অন্তত দশটা জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের যোগাযোগ আছে/ থাকবে যেখান দিয়ে নৌপথ ছেড়ে কোন একটা করিডর ধরে মূল হাইওয়ে সড়কে উঠা সম্ভব।

২০১৩ সালের শেষের দিকে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নামে এই আইডিয়া প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিলেন চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাই এই প্রকল্পকে শি জিনপিং এর মাথা থেকে আসা প্রকল্পও বলে থাকেন অনেকে। গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ (আগের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’কে কেন্দ্র করে এই সম্মেলনের নাম এটা) এই মেগাপ্রকল্পের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ খবর মতে, মোট ৩০টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান এতে যোগদান করেছিলেন জানা গেল। এছাড়া মোট ১০০টারও বেশী রাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।  এদের মধ্যে ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধান বলতে রাশিয়ার পুতিন ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ অনেকে রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। আর দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যাদের এমন ওপর দিক থেকে সাতটা বড় রাষ্ট্র হিসেবে তাদের ক্লাব জি-৭ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রীই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তাই বলে ব্রিটেন, জার্মানি বা ফ্রান্স – ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই তিন মূল মাতবর এই সম্মেলন ঠিক বর্জন করছেন তা নয়, তবে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী হাজির ছিলেন।

আসলে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির চলতি দুনিয়ায় এবার নতুন করে চীনা নেতৃত্বে নতুন পোলারাইজেশনে ঢেলে সাজিয়ে খাড়া হতে চাচ্ছে; দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি এই শতকের শুরু থেকে সে দিকে। বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ সে পথে অগ্রসর হওয়ার দিক থেকে আর এক ধাপ উদ্যোগ বলা যায়। বিশেষ করে চীনের নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক যাকে বলা হয়, সেই এআইআইবি বা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) গঠনের সময় যেমন পশ্চিমের নেতি প্রতিক্রিয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এবার বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের সম্মেলন এর সময়ও অনেকটা সে মাত্রার না হলেও সেরকম কিছু নেতি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এবার ভারতের দিক থেকে। আর ওদিকে নেতি প্রতিক্রিয়ার নেতা খোদ আমেরিকা এবং এশিয়ায় আমেরিকার ঘনিষ্ঠ অংশীদার জাপান, এই দুই রাষ্ট্র বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর কথা সম্মেলনের আগে শুনা গেছিল।
তবে সম্মেলন শেষ পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে যাকিছু ছিল জল্পনাকল্পনা এখন সেসব সত্যি হয়েছে। আমেরিকান সরকারী  দলের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রেসিডেন্টের এডভাইজার (White House adviser Matt Pottinger)।  ভারতীয় মিডিয়া গত ১৩ মে থেকে প্রবলভাবে দাবি করছিল যে আমেরিকা ইউটার্ন নিয়েছে। সে এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছিল। আবার ব্যাপারটা একেবারে আকস্মিক বা হতেই পারে না তাও ছিল না। কারণ গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর থেকে ট্রাম্প শিবিরের এক্সপার্টরা বলতে শুরু করেছিলেন যে ওবামা এআইআইবি ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ এবং বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ এই দুটোর বিরোধিতা করে ঠিক করেননি।
ওদিকে ভারত অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কী নিয়েছে তা সম্মেলন শুরুর আগের সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পষ্ট জানা যায়নি। তবে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, ‘আমেরিকার ইউটার্ন ভারতের ওপর চাপ তৈরি করেছে’। কিন্তু ঠিক কী কারণে ভারত এই সম্মেলন বর্জন করছে এ বিষয়ে দুটো মিডিয়া দুই রকম জবাব দিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, ‘চীন বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প নিয়ে ভারতের জন্য যথেষ্ট আস্থার পরিবেশ তৈরি করেনি’ (…”China has not created an environment of trust to carry out the belt and road projects”.) তাই সে যাচ্ছে না। তবে ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসির কোন জুনিয়র প্রতিনিধি দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল। বিপরীতে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস লিখছিল, সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করে একটা মেসেজ দেয়া দরকার। কারণ তারা আমাদের সার্বভৌমত্ব ইস্যুকে হালকা করে দেখেছে। (India is set to skip China’s ambitious One Belt One Road summit over sovereignty issues related to the latter’s involvement in the China-Pakistan Economic Corridor (CPEC), news agency PTI reported. ) অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে ভারতের অংশগ্রহণ এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে সরকার ঠিক কী কারণ দেখাবে তা সম্ভবত এখনো অফিসিয়ালি সাব্যস্ত হয়নি। যার অর্থ দাড়ায়, সার্বভৌমত্বের অভিযোগটা নিয়ে ভারতই সিরিয়াস নয়। ব্যাপারটা আসলে এমনই এটা মনে করার কারণও আছে। কিন্তু ভারত অভিযোগটা উঠাল কোন সূত্রে?
পাকিস্তানের গোয়াদরে (আরব সাগরের মুখে, ইরানের সাথে সীমান্তে) গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের বুক চিরে দক্ষিণ থেকে উত্তর পেরিয়ে হাইওয়ে (চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর) সড়কপথ চালু করা হয়েছে। এটা পাকিস্তান পেরিয়ে চীনের ল্যান্ডলকড জিংজিয়ান প্রদেশের খাসগড়ে গিয়ে মিলেছে। তবে চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর এই করিডোর-সড়ক বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের মূল হাইওয়ে সড়ক আগে ক্রস করে নিয়েছে। অর্থাৎ গোয়াদর থেকে আসা সড়কই চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর। চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর। কিন্তু আবার পাকিস্তান পেরোনোর আগে এই সড়কের কিছুটা অংশে পাকিস্তানের আওতাধীন কাশ্মির পেরিয়ে এসেছে। আর এটাকেই ভারত ইস্যু করতে চাইছে। বাস্তবতা না থাকলেও ‘কাশ্মিরের পুরোটাই ভারতের অংশ’ বলে ভারতের এক অফিসিয়াল দাবি আছে। অতএব চীন পাকিস্তান-কাশ্মির ব্যবহার করে এই সড়ক তৈরি করে ভারতের সার্বভৌমত্ব হালকা করে দেখেছে -এই হল ভারতের উছিলা, ভারতের যুক্তি। অর্থাৎ এটা কোনোমতে মেলানো এক দাবি মাত্র। আগেই বলেছি ভারতের দুই মিডিয়ার দুই ধরনের বক্তব্য প্রমাণ করে ভারত সরকার নিজেই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে সিরিয়াস নয়। বরং চীন আরো কত তেল মারলে ভারত নিজেই এই সম্মেলনে যোগদান করবে যেন এরই অপেক্ষা। এ দিকটাতে তাকিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, “এবার এখনই সম্মেলনে প্রতিনিধি না পাঠালে ভারতের বস্তুগত লাভালাভের দিক থেকে ক্ষতি বৃদ্ধি নেই, কারণ ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প কোনো সদস্যপদভিত্তিক সংস্থা নয়’। অর্থাৎ আরো দেরি করে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে নিজের দাম আরো বাড়ে কি না তা পরখে নামতে চায় ভারত। তবে যোগদান না করার ব্যাপারে ভারত অবশ্যই বেপরোয়া নয়, কারণ এটা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং তা ফিজিক্যালিই গ্লোবাল। (There may not be any immediate material loss to India if it goes unrepresented because OBOR is not a membership-based organisation)। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় ভারত কখনোই চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সম্মেলনে যোগদান করবে না তা বলে নাই। অর্থাৎ আগেই একেবারে না করে দেয়নি। তবে এই প্রকল্পের প্রতি আমেরিকা নীতি অবস্থান, মতামত বদলে ছিল বলে নয়, এই সম্মেলন যে ইতোমধ্যে গ্লোবাল আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে এর আর এক ভালো প্রমাণ হল, এতে অংশগ্রহণ করছেন জাতিসঙ্ঘের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তেনিও গুতারেস এবং  বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের নির্বাহী প্রধানরা। এর অর্থ গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প একটা ফ্যাক্টর এর পক্ষে স্বীকৃতি এসেছে। আর তা হওয়ার কোন কারণ নাই। কারণ, পুরা প্রজেক্ট মানে ৬৫ টা রাষ্ট্রের তরফে সব বিনিয়োগ যোগ করলে শেষে সেটা ৯০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে এক অনুমিত হিসাব দেখিয়েছে।

তবে শুরুতে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে, তা ইতোমধ্যেই রেডী। এর জবাবে চীন বলছে ৪০ বিলিয়ন ডলার চীন নিজের উন্নয়ন ব্যাংক থেকে জোগান দেবে। আর তাতক্ষণিক বাকিটা আসবে সদ্য গঠিত এআইআইবি ব্যাংক থেকে। এ ছাড়া ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের ভেতরে যে আরো একটা অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক আছে (নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে, সম্প্রতি যেখানে বাংলাদেশসহ ১৫ এশিয়া দেশকে সদস্য করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে) সেখান থেকেও জোগানো হতে পারে। মোট ৬৫টি রাষ্ট্র এই প্রকল্পে যোগ দেয়া আর নিজের নিজের রাষ্ট্রকে মূল অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নিতে গেলেও প্রত্যেক রাষ্ট্রকেও কিছু সংযোগ-অবকাঠামো করে নিতে হবেই। আর সে কাজেও যা বিনিয়োগ লাগবে সে ঋণের বড় অংশ  চীন জোগান দিতে রাজি। আবার বিশ্বব্যাংকো কী বিনিয়োগের সুযোগ নিবে না? আর পশ্চিমা জগতের যেখান থেকে বিনিয়োগ আসুক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে বিনিয়োগের মুল উৎস হবে আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট। অতেওব আমেরিকাসহ সাড়া পশ্চিম এতে অংশগ্রহণে ঝাপিয়ে পড়বে এতাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা চীনা বিনিয়োগ পাব বেশ বড় অঙ্কে, সেটা অনেক বেশি পরিমাণ হবে। তাহলে ভারত কী দূরে গোসা ঘরে খিল লাগিয়ে বসে থাকবে, পারবে? নাকি পোষাবে?

কলকাতা থেকে বাংলাদেশ, মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং – যেটা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে বিসিআইএম (BCIM) প্রকল্প বলা হয়- সেই হাইওয়ে সড়ক কুনমিং চীন হয়ে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা, পরিকল্পনা মোতাবেক। এই সড়কের আর একটা অংশ হবু সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত থা্কার কথা। সোনাদিয়া-বিসিআইএমের মাধ্যমে এটাই আর একটা করিডোর হিসেবে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হবে। এই হল পরিকল্পনা। এখন ভারতের ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পে যোগ না দিতে ইচ্ছা জানানোর অর্থ হবে ভারত বিসিআইএম প্রকল্পে নেই। কলকাতা-বাংলাদেশ অংশটা নাই। এমন ইচ্ছা করতে ভারত চাইতেই পারে। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না এমন ইচ্ছার কাফফারাও আছে তা ভারতের অজানা নয়। তবু একটা কথা এবার স্পষ্ট যে এতদিন বিসিআইএম নিয়ে গড়িমসি করা, মিয়ানমারকে নিরাসক্ত করে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা, বাংলাদেশে বন্দরের স্থান নির্বাচন নিয়ে হাসিনার উপর অর্থহীন হস্তক্ষেপ ও সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি যা কিছুতে ভারত ভূমিকা রাখতে পেরেছিল, এবার সেসবের দিন শেষ। ভারতের পড়শি কোনো রাষ্ট্র এই সম্মেলনে যোগ দিতে বাকি নেই, মিয়ানমার নেপালসহ, ব্যতিক্রম শুধু ভুটান।এটা এখন সবার কাছে স্বচ্ছ যে ভারত, ভুটান আর ওদিকে জাপান ছাড়া এশিয়ার আর কোন রাষ্ট্র বাকী নাই। সবাই ভারতকে ছেড়ে চলে গেছে।
এক কথায় বললে ভারতের পক্ষে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী না সম্ভবত বলা যায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ভারতের পক্ষে অসম্ভব। যেমন সেক্ষেত্রে এর একটা অর্থ হবে, ৬৫টি রাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে বা একই পদক্ষেপে একই অবকাঠামো সুবিধায় যুক্ত হওয়া – যেকোন রাষ্ট্রের জন্য এ’এক বিরাট সুযোগ। এথেকে ভারত নিজেকে বাইরে রাখবে? যদি জিদ করে রাখেই (যদিও জিদ করে রাষ্ট্র চলে না) তবে সেটা হবে দেখার মত ঘটনা। কারণ সেটা হবে রীতিমত নিজেই নিজের ওপর অবরোধ ডাকার শামিল। সবার থেকে একঘরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ফলে ভারতের এমন সিদ্ধান্ত নেয়া অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, কিছুটা দেরি করতে পারে। কিন্তু তাতেও নিজের ক্ষতি, পিছিয়ে পড়ায় ঘটবে।

আগেই বলেছি  গ্লোবাল অর্থনীতির চীনের নতুন নেতা হওয়ার দিক থেকে বিচারে,  বিশ্বব্যাংকের সমান্তরালে এআইআইবি ব্যাংক চালু করে ফেলতে পারা – এটা যদি নতুন নেতা হবার পথে একটা অগ্রপদক্ষেপ হয়ে থাকে, তবে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ হবে প্রায় সমান্তরাল তবে বেশী গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় পদক্ষেপ। আর এক ধাপ আগানো। যদিও প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক থেকে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের ইমপ্যাক্ট হবে এআইআইবি ব্যাংকের চেয়ে বেশি। কারণ এটা অবকাঠামো, মানে ফিজিক্যাল পদক্ষেপ। আর এই ফিজিক্যাল পদক্ষেপের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকার কারণে গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের ওজন ও গুরুত্ব হবে আরো দৃশ্যমান এবং এটা হবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গ্লোবাল অর্থনীতিতে ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছর ডাবল ডিজিট গ্রোথের কাল মানা হয়, বর্তমানে যা তুলনামূলক শ্লথভাবে চলছে। মনে রাখতে হবে সে অর্থনীতিতে আবার এক গতির সঞ্চার করার সম্ভাবনা রাখে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ।
আজকের ভারত হল, সেই ডাবল ডিজিট গ্রোথের কালের এক অন্যতম বেনিফিশিয়ারি। আবার এআইআইবি ব্যাংক গড়ার কালে ভারত ছিল সঠিকভাবেই চীনের সমর্থক, প্রধান সাগরেদ। ওই ব্যাংকের মালিকানায় চীনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ, এরপরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারতের প্রায় ১০ শতাংশ, অন্যদের মধ্যে ৫ শতাংশর ওপরে কেউ নেই। আমেরিকার শত প্ররোচনাতেও ভারত চীনের ওই ব্যাংক উদ্যোগে সাথ ছাড়েনি।

তাহলে ভারত ঠিক কিসের বিরোধিতা করছে, কী পেতে সেটা করছে? আমরা আশা করি না এসব ক্ষেত্রে ভারতের কোনো সিদ্ধান্ত ঈর্ষাপ্রসূত, ভুল ভিত্তির এক্সপেকটেশন বা ওভার এস্টিমেশনের দোষে দুষ্ট হবে। দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম জেঁকে বসার পর থেকে দেখা গেছে এক এক কালে কোনো এক রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডে ওই কালের সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ভূমি হয়ে হাজির হয়েছে। যার অর্থ এরপরের নতুন বিনিয়োগ বা নতুন যেকোনো উদ্যোগ নেয়ার সুবিধা ওই রাষ্ট্র এককভাবে পেয়েছে। এখন সে সুবিধা ভোগের  দিন চলছে চীনের। এটা অবজেকটিভ, ফলে এর সাথে লড়ার বা একে মানতে না চাওয়ার কিছু নেই। কারণ এই সঞ্চিত উদ্বৃত্ত এটাই যেকোনো রাষ্ট্রের পরাশক্তি, রুস্তমি, প্রভাব বিস্তারসহ সব ধরনের ভূমিকায় হাজির হওয়ার আসল উৎস। এটা অবজেকটিভ বলে তা না মানাও মুশকিল। ফলে দুটি কথা ভারতকে মানতেই হবে। এক. আমেরিকা ভারতের ভবিষ্যৎ নয়। ভারতের পক্ষের শক্তি নয়, বড়জোর অস্ত্রের সরবরাহকারী হতে পারে। তা হোক, তাতে সমস্যা নেই। তবে গ্লোবাল অর্থনীতির আগামী নেতৃত্বের ভাগ অর্থে ভারতের পক্ষের শক্তি হল চীন। এটা শুনতে অনেকের ঈর্ষা মনে কটু লাগতে পারে কিন্তু এটা বাস্তবতা। ফলে চীনের সাথে সীমানা বিরোধসহ যা কিছু বিরোধ আছে তা নিগোসিয়েশনের সুযোগ নেয়া হবে ভারতের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।কিসের ভিত্তিতে ভারত ধরেই নিয়েছে চীনের সাথে তার য়াগামি দিন হবে সংঘাত ও বিরোধে? পিছন ফিরে বা আশেপাশে তাকালে এটা দেখতে পাওয়া মোটেই কঠিন নয় যে এই ধারণার উৎস ও সরবরাহকারি হল খো আমেরিকা। আর তার পরিচালিত নানান থিঙ্কট্যাংক-গুলো। আজকে এসব ঠিঙ্ক-ট্যাংকগুলো আমেরিকার প্রতিনিধি পাঠানোর এই ইউ-টার্ণ এর কী ব্যাখ্যা দিবে? চীন নাকি খালি ভারতকে ঘিরে ধরার মতলবে আছে? তাহলে সেই ভারতকে ফেলে আমেরিকা কোথায় ছুটছে? আসলে কারও প্ররোচিত বক্তব্যে, বুলিতে থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক হয়না। চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। আর এর প্রধান শর্ত অন্তত দেশীয় অর্থে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়।

এ ছাড়া এশিয়াতে কার ভূমিকা প্রধান হবে ভারতের না চীনের? এই তর্ক কী ভারতের ইচ্ছাধীন নাকি ভারতের অর্থনৈতিক সামর্থের উপর নির্ভরশীল? ভারতের সামর্থ এশিয়ায় চীনের চেয়ে বেশি হলে ভারত বাড়তি সুবিধা পাবে, নইলে নয়। তাই নয় কী?  এটা তো বাংলাদেশে একজন বসিয়ে, ল্যান্ডলক নেপালে ঐতিহ্যবাহী নিয়ন্ত্রণ আগের মতই বজায় থাকবে ধরে নিয়ে, শ্রীলঙ্কায় নতুন সরকার কায়েম করে চীনের প্রভাব কমাতে হবে ইত্যাদিতে যা কিছু করা হয়েছে তাতে কোনো কিছুই সামলানো যায়নি, যাবে না। এছাড়া এটা আর কলোনি সাম্রাজ্যের যুগ নয়। এ যুগে “চীনের সাথে ভারতের পড়শিরা সম্পর্ক রাখতে পারবে না” ভারত সবাইকে চীনমুক্ত দেখতে পাবে –  এটা ভারতের কোনো মুরোদের ওপর ভরসা করে নেয়া বিদেশনীতি? এর চেয়েও অবাক কাণ্ড এই বাস্তবতাহীন নীতিকে প্রশ্ন করার লোকজন ভারতে ক্রমশ  দুষ্প্রাপ্য হচ্ছে। যার মূল কারণ সম্ভবত এরা আমেরিকার পে-রোলে নাম লিখিয়েছে। অথচ খোদ আমেরিকাই পল্টি মেরেছে! তাই নয় কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। চীনে শীর্ষ সম্মেলন যা এই লেখার বিষয়বস্তু তা ছিল ১৪-১৫ মে। ফলে লেখাটা শেষ করা হয়েছিল সম্মেলন শুরুর আগে। আর এখানে এখন যখন আবার প্রকাশ করা হচ্ছে তখন ঐ সম্মেলন শেষ হয়ে গেছে। ফলে আপডেট করার মত বহু তথ্য এখন জমা হয়ে গেছে। তার বহু তথ্য এখানে যতটা সম্ভব আপডেট করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটা আগের লেখার থেকে বহুলাংশে সংযোজিত এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]