ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

ভিতরের হিন্দুত্ব সহজে লুকানো যায় না

গৌতম দাস

০২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2HR

Soldiers of the Swastika, Frontline, The Hindu, Jan 2015

হিন্দুত্ব মানে মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদই, তবে আরও কিছু চিহ্ন ও বৈশিষ্ট্যেও সাথে থাকে। তাই হিন্দুধর্ম অনুসারী কোনো মানুষ মানেই তিনি “হিন্দুত্ব” এই আদর্শের কোনো হিন্দু নাগরিক হবেনই, এটা ধরে নেয়া ভুল হবে। এখানে মূল কথা হল, দেখে কাছাকাছি বা একই অর্থের মনে হলেও ‘হিন্দু’ আর ‘হিন্দুত্ব’ শব্দ দুটো আলাদা, তাদের অর্থও আলাদা। হিন্দু শব্দ দিয়ে আপনি একটা ধর্মকে বা একটা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীগত পরিচয়কে বা একটা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের কোনো কিছুকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার করতে পারেন বা হতে দেখবেন। তবু এগুলো একটাও ‘হিন্দুত্ব’ নয়। এ ছাড়া বিশেষ করে দল বিজেপিকে আদর্শের যোগানো যে আরএসএস সংগঠন, এরা হিন্দুত্ব বলতে যা বুঝায় বা বুঝতে বলে সেই হিন্দুত্বের অর্থ একেবারেই আলাদা।

আরএসএস-এর হিন্দুত্ব এক প্রকারের মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী চিন্তা সন্দেহ নাই; কিন্তু তাতেই শেষ নয়, আরো আছে। এটা এক উগ্র জাতীয়তাবাদ। কেমন উগ্র? হিটলারের মতো উগ্র ও রেসিজমের। তাহলে এরা নিশ্চয়ই সুপ্রিমিস্ট, মানে আমরাই শ্রেষ্ঠ, এমন শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান এদের আছে? হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন। এরা হল, হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী মানে নরওয়ে বা নিউজিল্যান্ডের মুসলমান-নিধনের নায়ক যে হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী; এদের মতই আরএসএস-বিজেপিও হিন্দু শ্রেষ্ঠত্ববাদী। তাই বলতে পারেন হিন্দুত্ব মানে হিন্দু জাতীয়তাবাদ+প্লাস।  “বর্ণবাদী [racist] জোনে” ঢুকে যাওয়া এক হিন্দুত্বের রাজনীতি। যেটা আর সাদামাটা কোন জাতীয়তাবাদ নয়।

ফলে স্বভাবতই হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়। তবে হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে যারা হিন্দুত্বের আইডিয়াকে রাজনীতি হিসেবে গ্রহণ করে, প্রচার করে, বিশ্বাস ও বাস্তবায়ন করে, কেবল এমন হিন্দু নাগরিকেরাই হিন্দুত্ব-চিন্তার ব্যক্তিত্ব। এর সোজা মানে হিন্দুধর্মের অনুসারী হয়েও যারা হিন্দুত্ব-চিন্তাকে গ্রহণ করেনি – এমন হিন্দু নাগরিকও ভারতে প্রচুর আছে। যেমন গত নির্বাচনে (২০১৯ মে) যারা বিজেপি-মোদীকে ভোট দিয়েছে – ফলে তারা হিন্দুত্ব মেনেছে বলে যদি ধরে নেই, এই ভিত্তিতে বললে মাত্র ৩৭.৩৬ শতাংশ ভোটার হিন্দুত্বকে জেনে বা না জেনে বরণ করেছে। বাকিরা হিন্দু হয়েও মানেনি অথবা যারা অহিন্দু ভোটার। অর্থাৎ বাকিরা মানে হিন্দু হয়েও বা অহিন্দু ভোটাররা হল ৬৩ শতাংশ, যারা হিন্দু মানে হিন্দুত্ব, এ কথা মানেন না।

তবে একটা কথা আছে, হিন্দুত্বওয়ালারা সব সময় চেষ্টা করে থাকে যে কোনো হিন্দু নাগরিক মানেই সে হিন্দুত্বের অনুসারী নাগরিক, এমন দাবি করা। কথাটা একেবারেই সত্য না হলেও এই প্রপাগান্ডা তারা চালায়। এ’থেকে সাবধান হতে হবে। এতকথা দিয়ে হিন্দুত্বকে আলাদা করে চিনানোর উদ্দেশ্য এটাই।

এমনকি একালের বাংলাদেশের হিন্দুরা এদের বেশির ভাগই হিন্দুত্বের সমর্থক বলে নিজেদের দেখে থাকে। সম্ভবত অব্যাখ্যাত কোনো রাগ-ক্ষোভ থেকে এটা করে। এরা ফারাক করে না যে হিন্দু বলতে কেউ হিন্দুত্ব-চিন্তা বুঝে ফেললেও এরা অসুবিধা ও অস্বস্তিও বোধ করে না। যদিও খুব সম্ভবত ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে এসব সিদ্ধান্ত তারা নেয়নি। যদিও আবার বলছি হিন্দু মানেই হিন্দুত্ব নয়, তাই এমন বুঝে নেয়া আমাদের হিন্দু-মুসলমান যে কারোই সেটা ভুল হবে।

কিন্তু ভারতে? এখানে মূল সমস্যা দু’টি। প্রথম সমস্যা হল, ভারতে হিন্দুত্বকে পাবলিকলি সমালোচনা করলে আক্রমণের শিকার হতে পারেন। এমনই হিন্দুত্বের জোয়ার চলছে এখন সেখানে। আবার সবটাই জোয়ার ঠিক তা নয়, তবে জোয়ার দেখিয়ে হাজির করা হয়েছে। বিশেষত কাশ্মীর সরাসরি ভারতের বলে দাবি ও বাস্তবায়নে লেগে পরার পর থেকে মোদীরা ভীষণ ভীতিতে আছে। যে কখন কী থেকে জানি পরিস্থিতি হাতছুট হয়ে যায়। তাই সব কিছুতে আগাম আগ্রাসী মনোভাব দেখানো দাবড়ে বেড়ানো দেখানো, বিরোধিতা করলে মেরে ফেলব, কেটে ফেলব দেখানো – এসবই অনেকটা ভূতের ভয়ে রাস্তা পেরোনোর সময় উচ্চৈঃস্বরে গান ধরার মত। যা হোক, এই আগ্রাসন পরিস্থিতিতে তাই কেউ হিন্দুত্বের অনুসারী হতে পছন্দ না করলেও তা প্রকাশ্যে বলা বুদ্ধিমানের কাজ না এমন মনে করাই স্বাভাবিক। ডরে হেনস্তা হওয়ার ভয়ে।

এমনকি কংগ্রেস বা তৃণমূল যারা বিজেপির বিরোধী রাজনীতি করে, তারাও খুব সাবধানে পা ফেলে এখন যেন বিজেপি তাদের হিন্দুস্বার্থববিরোধী হিসেবে পাবলিকের সামনে না চিনিয়ে দেয় বা খাড়া করে দেয়। অর্থাৎ এবারের বিজেপির জয়ের পর থেকে এক ব্যাপক হিন্দুত্বের জ্বর ও জোয়ার উঠেছে। ফলে হিন্দু ভোট পেতে চাইলে এই জোয়ারে হিন্দুত্বের সমালোচনা করা বোকামি হবে, বরং উল্টো গা ভাসিয়েছে। এ ব্যাপারে ব্যাপক হিন্দু নাগরিক হিন্দু-হিন্দুত্বের ফারাক উঠিয়ে ফেলে দিয়েছে। হিন্দুত্বের গর্বে বুক ফুলানোর সুযোগ তাদের কেউ কেউ আবার যেন হাতছাড়া করতে চাইছে না, এমন সেজেছে। যেমন কাশ্মীরে, এর ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দিয়ে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ করে নেয়া – এটাকে সমর্থন করা এটাই এক ব্যাপক দেশপ্রেমের প্রমাণ হয়ে দাড়িয়েছে। আসলে উলটা কেউ এটাকে সমর্থন না করলে এটা তার দেশপ্রেমের ঘাটতি – এই বয়ান বাজারে জারি করা হয়েছে।

A demonstration in Ahmedabad, India, in 2018, protesting mob lynchings.CreditCredit Amit Dave/Reuters. NYT Jun 2019

এমন এক ভয়ের অবস্থা তৈরি করা হয়েছে যেন এই দেশপ্রেমের ডঙ্কার আড়ালে কেউ থাকলেই কেবল সে নিরাপদ। সমাজে এই আওয়াজ তুলে ফেলেছে আরএসএস-বিজেপি। এমনকি অবস্থা এমন, যারা আসলে আরএসএস-বিজেপির দাবি মানতে চান না অথবা আরো আগিয়ে বলতে চান, এটা কাশ্মীরিদের প্রতি অন্যায় হয়েছে তাহলে আপনি দেশপ্রেমে সমস্যা আছে বা আপনি দেশদ্রোহী, এই চাপও হাজির রাখা হয়েছে। যেমন একটা ভিডিও ক্লিপ দেখেছেন অনেকে যে খুবই বিখ্যাত এক অ্যাডভোকেট প্রশান্ত ভূষণ, যিনি ভারতের সুপ্রিম কোর্টে জনস্বার্থের লিটিগেশন মামলাগুলো নিজ উদ্যোগে করে থাকেন। আরএসএস-এর গণসংগঠনের কর্মী পরিচয়ে তিন ব্যক্তি তার অফিসে ঢুকে তাকে চড়-থাপ্পড় মেরে লাঞ্ছিত করে গেছেন। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে তিনি সরকার থেকে ভিন্নমতে মন্তব্য করেছেন।  যদিও এটা কয়েক বছরে আগের ভিডিও ক্লিপ। কিন্তু এখনও পরিস্থিতিটা সেরকমই।  ভারতজুড়ে এই হলো হিন্দুত্বের জ্বর, এই অসুস্থতায় ভুগছে সারা ভারত।

অন্য দিকে টিভিতেও না কিন্তু প্রিন্ট বা ওয়েব মিডিয়ায় এই প্রথম কিছু লেখক কলামিস্টকে দেখা যাচ্ছে অন্তত একাদেমিক লেভেলে যারা হিন্দুত্বকে হিন্দুত্ব বলে স্বীকার করতে, চিনতে ও চেনাতে চাইছেন। যদিও সারা মিডিয়ায় এখনো একটা ভয় কাজ করছে যে এতে কোন খারাপ দিক তুলে ধরলে বা আপনাতেই প্রকাশ হয়ে পড়লে সরকার সেটা ঐ ব্যক্তির দেশপ্রেমের ঘাটতি বা দেশের স্বার্থবিরোধী কাজ হিসেবে প্রচারণা তুলে লাঞ্ছনার মুখোমুখি করে কি না। এমনিতেই ভারতের মিডিয়ার স্বাভাবিক ঝোঁক হল, কোনরকম ঝামেলায় না গিয়ে সরকারি অবস্থান সমর্থন করা ও এর পক্ষে জনমত তৈরি করা। বিশেষত এজাতীয় ইস্যু যেখানে পাকিস্তান কোনোভাবে এক সংশ্লিষ্ট পক্ষ, সেখানে চোখ বন্ধ করে সরকারের পক্ষে না থাকা মানে উনি দেশদ্রোহী বা দেশপ্রেমের ঘাটতি আছে উনার অথবা উনি দেশের স্বার্থবিরোধী জজবা তুলে ফেলা – এই প্যাটার্ন গত সত্তর ধরেই।

এরই সাথে আর একটা জজবা তুলে রাখা হয়েছে যে আপনি হিন্দু হলে আপনাকে কাশ্মীর জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে নেয়া সমর্থন করতে হবে। অর্থাৎ মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত মানেই সেটা হিন্দুদের স্বার্থ, তাই এর বাইরে যাওয়া যাবে না। অর্থাৎ ন্যায়-অন্যায় ইনসাফ অথবা চিন্তা বিচার বিবেচনাবোধ বলে কিছু নাই। হিন্দু হলেই মোদীর সিদ্ধান্তের পক্ষে দাঁড়াতে হবে। নইলে দেশদ্রোহী। এই হ্লল হিটলারিজম। পপুলার ফ্যাসিজম। অর্থাৎ পড়াশুনা, জ্ঞানবুদ্ধি চর্চা, স্কুল কলেজ ইউনি গবেষণা ইত্যাদি সবের যেন আর দরকার নাই। খালি মোদী কোনদিকে সেটা দেখে নিলেই হবে। আর ভারতের হিন্দুরা মোদীর সিদ্ধান্ত দেখলেই এর পক্ষে ঝাপিয়ে পড়বে। বাংলাদেশের অনেক হিন্দু জনগোষ্ঠির সদস্যকেও দেখা গেছে এই ভিত্তিতে তাঁরা মোদীর পক্ষে। অথচ ব্যাপারটা হল সিধা আপনি মুসলমান-হিন্দু যেই হন – বিচারের মূল মাপকাঠি হতে হবে ধর্ম নির্বিশেষে ন্যায়-অন্যায়, ইনসাফ বোধের উপর দাঁড়িয়ে। এগুলো বিশেষত ফেসবুকের আমরা কোন চিন্তার স্তরে আছি এর একটা প্রকাশ বলা যেতে পারে।

দেখে মনে হচ্ছে মোদীবিরোধী, কিন্তু আসলে নয় এমন দুই বয়ানঃ
তবু অন্তত লেখার শিরোনাম দেখে মনে হয়, এটা একটা হিন্দুত্ববিরোধী লেখা, এমনই এক রচনা হল ভারতের এশিয়ান এজ পত্রিকার ভরত ভূষণের রচনা [Tectonic shift towards a very different India]। হিন্দুত্ব ও কাশ্মীর ইস্যুতে মোদীর সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে এই লেখার শিরোনামকে বাংলায় লিখলে হয় এরকম : “এক ভিন্ন ভারতের দিকে টেকটনিক ঘাড়-বদল ঘটেছে”। টেকটনিক কথাটা ভূমিকল্প সংশ্লিষ্ট – পৃথিবীর সারফেসের বহু নিচে পাথর-মাটির গঠনপ্রকৃতি বিষয়ক ধারণা প্রকাশে কাজে লাগে।  কোনো একটা ভূপ্রাকৃতিক অঞ্চলের, যে বিশাল ভূমিখণ্ডের স্তরের ওপর সে এত দিন দাঁড়িয়েছিল তা ভেঙে যাওয়াতে পাশের বা নিচের আরেক ভূমিস্তরের ওপর দাঁড়ানো অর্থে কাঁধবদল আর তার ঝাঁকুনি বোঝাতে ব্যবহার করা হয়। তো ভরত ভূষণ বলতে চাইছেন মোদীর সিদ্ধান্ত পদক্ষেপে কাজকারবার ভূমিকম্পের ঘাড়-বদলের মত, এতে ভারতের এক নতুন দিকে যাত্রা ঘটেছে। এই অর্থে মনে হ্তে পারে যে, তিনি ভালই ধরতে পারছেন মোদীর পদক্ষেপকে। কিন্তু সরি, এটা আসলে তা না। কারণ, লেখার ভেতরের বডিতে যা আরগুমেন্ট তা খুবই হতাশাজনক।

কোন নির্বাচনকে পাবলিক কিভাবে নিয়েছে, পপুলার ভোট কাউকে হাতখুলে কিভাবে জিতিয়েছে, এটা অবশ্যই পরে এতে নির্বাচিত সরকার পরে কোন দিকে যাবে তা বুঝার জন্য প্রাইমারি নির্দেশক চিহ্ন নয়, বরং সেকেন্ডারি। কারণ, জিতে যাওয়ার পর বিজয়ী দল ও গঠিত সরকার সেই পপুলার ভোট-সমর্থনকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে কোন দিকে নিয়ে যাবে- তা দিয়েই নির্ধারিত হবে রাষ্ট্র ও এর জনগণের ভাগ্য। জনগণ কী মনে করে ভোট দিয়েছিল, সেটা একেবারেই গৌণ বা পরের বিষয়। মুখ্য হলো বিজয়ী দল ও সরকারের “মনে” কী আছে।

ভরত ভূষণ দাবি করছেন, হিন্দি-বলয়ে [except in some states of the South] ভারতের গত ২০১৯ সালের ভোটে বিজেপির জয়লাভ এটা  মোদির একচেটিয়া উত্থানের পক্ষে রায় [2019 general election — the ringing endorsement of a single leader, Narendra Modi…।]। ভোটাররা নাকি এমন একজনকেও খুঁজছিল, যে তাদেরকে “নিরাপদ অনুভব করাবে” [Across the rest of India, the voters wanted someone who made them feel secure. ]। কিন্তু কী থেকে নিরাপদ? তা তিনি স্পষ্ট বলা এড়িয়ে গেছেন বা কোনো সাফাই-ব্যাখ্যা হাজির করেননি। বরং কংগ্রেসের কথা মনে রেখে বলতে চেয়েছেন,  নেহরু-গান্ধী থেকে একালের রাহুল গান্ধী এরা নাকি “একটা লিবারেল-ইজম করতে চেয়ে গেছিলেন সত্তর বছর ধরে [The structural origins of these fears can be traced to the less than robust liberal revolution that India experienced over the past seven decades]। আর এটাই নাকি পাবলিকের সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ভয়ের উতস।  এটাকে এক ধরণের লিবারেল চাপাচাপি (তিনি ব্যবহার করেছেন “liberal push” ) বলে তিনি নাম দিয়েছেন। আর এবার বলছেন, “The liberal push in India led to a forced restructuring of society through an ever-expanding agitation for granting special rights not only to dalits, tribals, minorities and the other backward classes, but also to women, the disabled, gays and transgenders”।

দেখা যাচ্ছে খুবই ভয়ঙ্কর সাফাই তিনি তুলেছেন মোদীর উত্থানের পক্ষে। তিনি নাম করেছেন দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী এবং এ ছাড়াও নারী, প্রতিবন্ধী ও রঙধনু মানুষ এদের সবার [লক্ষ্যণীয় যে তিনি মুসলমানদের নাম নেননি যদিও মোদীগোষ্ঠীর সব কর্মসূচির মূল টার্গেট মুসলমান দাবড়ানো]। আর বলেছেন এদেরকে “বিশেষ অধিকার দেয়াতেই” [granting special rights] নাকি সমাজের কাঠামো ভেঙে গেছে, আর আপত্তি উঠেছে। কী সাংঘাতিক কথা! এসব ন্যায্যতা-সাফাই কথা তো আরএসএসও নিজেদের স্বপক্ষে বলতে সাহস করে নাই। এছাড়া দেখা যাচ্ছে ভরতভূষণ মারাত্মক সমাজ-কাঠামো যেন অটুট থাকে তা রাখার ক্ষেত্রে এক প্রিয়মুখ ব্যক্তিত্ব তিনি।  আর তাই তিনি বলছেন, এই কাঠামো ভেঙে যাওয়াতেই নাকি নিরাপদ বোধ করতে চাওয়া থেকেই তারা একক নাম ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে মোদীকে জিতিয়েছেন। এর মানে ভরত ভূষণ দাবি করছেন, যারা মোদীকে জিতিয়েছেন এরা বর্ণহিন্দু আর তাদের ভোটই বেশি? তাই কী?  এ ছাড়া “লিবারল পুশ” করার জন্য ভরত ভূষণ কেবল কংগ্রেস নয়, সব আঞ্চলিক দলকেও একই ব্র্যাকেটে রেখে তাদেরও দায়ী করেছেন।

এশিয়ান এজ আর এর লেখকও ‘প্রগতিশীল’ বলে মনে করা হয়। আর বলাই বাহুল্য, তাদের লিবারেল ধারণাও সব সময় এমনই অদ্ভুত, যা কখন কার দিকে যায় ঠিক নেই। যেমন এখানে ভরত ভূষণ তার কথিত “কংগ্রেসের লিবারল পুশ” করা- এই কাজকে নেগেটিভ বলে দেখিয়ে ফেলেছেন। অথবা এতে সামাজিক কাঠামো ভেঙে যাওয়াটা এর ফলাফলকে নেগেটিভ বলে দেখানো হয়েগেছে। তবে এতে আসল গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হল, ভরত ভূষণের এই ভাষ্য বিজেপি ও মোদীর হিন্দু রেসিজম ও এর উত্থানকেই ন্যায্য প্রমাণ করেছে। যদিও এটা ন্যায্য কি না তা দেখানো ভরত ভূষণের লক্ষ্য ছিল না হয়ত, লক্ষ্য ছিল মোদীর উত্থানকে ব্যাখ্যা করতে সক্ষমতা দেখানো। আসলে এদের মূল সমস্যা – ‘প্রগতিশীলতায়’ দাঁড়িয়ে ‘লিবারেল ধারণাটা’ কী, এর একটা বুঝ তৈরি করতে অক্ষমতা। চরত ভূষণ যদি মনে করেন এটা লিবারল পুশ তাহলে এর ফলাফল নেগেটিভ হচ্ছে কেন – এর কোন ব্যাখ্যা বা বিষয়টাকে আমল করছেন না তিনি।

ভরত ভূষণের বেলাতে তাহলে যা ঘটেছে তাতে কথাগুলো দাঁড়িয়ে গেছে তিনি যেন বলতে চাইছেন, ভারতের পাবলিক ‘লিবারেল পুশে’ এভাবে সমাজের পুনর্গঠন পছন্দ করেনি, তাই ভয় পেয়ে তারা মোদিকেই আঁকড়ে ধরেছে। যার অর্থ বিজেপি ও মোদির উত্থান জায়েজ আর ওই দিকে পাবলিকও যা করছে সব জায়েজ। কিন্তু তাতে সমাজে প্রগতিশীল ভরত ভূষণদের আর দরকার কী? সেটাই প্রমাণ হয়েছে!

অথচ যেটা এখানে মিসিং তা হল, ভারত-রাষ্ট্র এর নাগরিক সবাইকে সমান জ্ঞান করে দাঁড়ানোটা যে রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপুর্ণ সেতা কেউ আমল করছে না। এটাকে খামতি মনে করছে না কেউ। আর এটা কখনই গত সত্তর বছরে ভারত-রাষ্ট্র নিশ্চিত করতে পারেনি; কিন্তু এটা কারো কাছেই মুখ্য প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রের বৈষম্যহীন হওয়া, সমান চোখে দেখা, মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করা ইত্যাদি এগুলো নিশ্চিত করা যেন রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য হওয়ার বিষয়ই নয়। বরং দলিত, ট্রাইবাল, সংখ্যালঘু ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া শ্রেণী ইত্যাদিকে যেন ‘বিশেষ অধিকার’ দিতে যাওয়াই বিরাট ভুল হয়েছে। এ থেকে মনে হচ্ছে, আসলে রাষ্ট্র বোঝাবুঝি এটা ‘প্রগতিশীলতার’ কাজ নয়। অথচ ভারত রাষ্ট্রের জন্মদোষ হল – এটা হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠন করা হয়েছে; নন-সেক্ট-আইডেন্টিটির নাগরিক ভিত্তিতে, নাগরিকদের মধ্যে অসমতা নাই এমন অধিকারের রাষ্ট্র নয়। তাই বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় এটা। এসব আমল করতে হলে মনে হচ্ছে, বরং অপ্রগতিশীল কোন এলেমদার হলেই ভালো হবে।

বক্তা: ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ়, কলকাতা-র প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে অমর্ত্য সেন। ছবি – আনন্দবাজার, ২৮ আগষ্ট ২০১৯

ওদিকে মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের ঠেলায় এর বিপরীতে কলকাতায় উত্থান ঘটেছে আর এক প্রগতিশীল, ড. অমর্ত্য সেনের। যদিও তাঁর ফোকাস বা স্পেশালিটি হল কথিত বুঝদারদের বিরাট ভাবের কথা – সেকুলারিজম। তিনি সম্প্রতি কলকাতায় এসেছিলেন এক সভায় বক্তৃতা দিতে। আনন্দবাজার লিখছে [শিরোনাম –বাঙালি হওয়া কাকে বলে, বোঝালেন অমর্ত্য] – “ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ, কলকাতা’র প্রতিষ্ঠা দিবস উপলক্ষে বক্তৃতা করলেন অমর্ত্য সেন”। সেখানে নাকি আলোচনার বিষয়বস্তুই ছিল “বাঙালি হওয়া” মানে কী। বুঝা যাচ্ছে খুবই সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার। কিন্তু এটা পুরোটাই অমর্ত্য সেনকে দিয়ে কিছু বলিয়ে নেয়া কাজ – অনুমান করি। সেটা মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থানকালে কিছু পাল্টা বয়ান হাজির করা; এই অর্থে অ্যারেঞ্জড। ফলে তা খারাপ কিছু না, হয়ত; কিন্তু পুরান পাপ কিছু হাজির হয়ে গেছে এর সাথে।

সবার আগে প্রশ্ন হল, এখানে “বাঙালি হওয়া” বলতে কী, আর কাদের “বাঙালি হওয়া” বোঝাবেন অমর্ত্য সেন?
আনন্দবাজার অমর্ত্য সেনের বক্তৃতায় খুবই আপ্লুত হয়ে গেছিল বোঝা যাচ্ছে। তাই, প্রবল প্রশংসা করে লিখেছে, “তাঁর বক্তব্যের মাঝপথেই পাশের শ্রোতার স্বগতোক্তি, পশ্চিমবঙ্গের সব বাঙালিকে ধরে এনে এই বক্তৃতাটা শোনানো উচিত! কেন, এক বাক্যে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে বলতে হয়, ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম উভয়েরই বৈশিষ্ট্য এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে, এই পরিচিতিকে ধর্মের ভিত্তিতে ভাঙা অসম্ভব, এই একটা কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বললেন অধ্যাপক সেন”।
এর মানে – ‘বাঙালি’ পরিচিতির তন্তুর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম… আবিষ্কার! এ তো দেখি বিরাট সাঙ্ঘাতিক কথা! আরো আছে।

লিখেছে, “ইংরেজিতে দেয়া বক্তৃতায় ষোড়শ শতাব্দীর চণ্ডীমঙ্গলের প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক সেন মনে করিয়ে দিলেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমনে হিন্দুরা অসন্তুষ্ট হননি, বরং খুশি হয়েছিলেন, কারণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ায় বাঘের উৎপাত কমেছিল বহুলাংশে”।

এখানে অনেকের মনে হবে হয়তো বিরাট জ্ঞানের কথা বলেছেন। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে কত মিল গভীর সম্পর্ক তাই তিনি এখানে আবার তুলে ধরেছেন; কিন্তু আসলেই কি তাই? এই গীত গেয়ে কি মোদীর হিন্দুত্বের রেসিজমের উত্থান ঠেকাতে পারবেন অমর্ত্য সেন? সরি, অমর্ত্য সেন, মাফ করবেন! কোনো ভরসা, আস্থা রাখতে আমরা পারলাম না।

প্রথমত, প্রশ্ন রেখেছিলাম ‘বাঙালি হওয়া’ বলে কী আর কাদের ‘বাঙালি হওয়া’ বোঝাইবেন তিনি? কেন এমন প্রশ্ন? কারণ যে ব্রিটিশ জমানার কথা অমর্ত্য সেন তুলেছেন সেটা ছিল আসলে কারা বাঙালি, কী করলে কাউকে বাঙালি মানা হবে অথবা আধুনিক বাংলা ভাষা কোনটা ইত্যাদি এসবেরই প্রথম নির্ণয় নির্ধারিত ও স্বীকৃতি দেয়ার যুগ। অন্যভাবে বললে ব্রিটিশ কলোনি শাসনের অধীনে জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’ এর সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন।

কিন্তু মুসলমানেরা কি বাঙালি? এই প্রশ্নের মীমাংসা  কী তারা করেছিলেন? ইতিহাস বলে, না; মুসলমানেরা বাঙালি তো নয়ই, তাদেরকে আমল করে গোনায়ই ধরা হয়নি বাঙালিত্বের ধারণার মধ্যে।। কী, মিছা বলছি মনে হচ্ছে? চলতি আলাপের বাইরে অজস্র প্রমাণ আছে, তবু এখন বাইরে যাবো না, ঘরে থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেনের কথা থেকেই প্রমাণ দিব। অমর্ত্য সেন বলছেন, বঙ্গে মুসলমানদের আগমন…। [লাল রঙ করে রাখা আমার] এর মানে কী?

অমর্ত্য সেন বুঝিয়েছেন যে, মুসলমানেরা বাংলার মানে ভারতের বাইরে থেকে এসেছে। তারা বাইরের থেকে এসেছে মানে তারা নৃতাত্ত্বিকভাবে বাঙালি হিন্দুদের মতো না। একই রেস (race) নয়, রেসিয়াল [racial] জাত বৈশিষ্ট্য এক নয়। এটাই দাবি করছেন অমর্ত্য সেন। আর এ থেকে সেকালের মতোই অমর্ত্যর কথা থেকে সিদ্ধান্ত আসে- এই মুসলমানেরা বাঙালি নয়। অমর্ত্য সেন আসলে সেকালের বর্ণহিন্দু জমিদারের বয়ানটাই আবার উচ্চারণ করেছেন মাত্র। [মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক আলাদা করে একটু পরে করা যাবে। আপাতত অমর্ত্য সেনের মধ্যে থাকি।]

তাহলে আমরা দেখলাম- অমর্ত্য সেনের কথার সূত্র থেকে আসছে যে মুসলমানেরা বাঙালি নয়। হ্যাঁ, তিনি ঠিকই বলছেন, উনিশ শতকের শুরু থেকেই জমিদারি সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোতে শুরুতেই জমিদারের নেতৃত্বে ‘বাঙালি কী’- এর ভাষা সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য পরিচয় দাঁড় করানো সব কিছুই নির্ধারিত হয়েছিল তখন তাতে মুসলমানেরা ছিল এক্সক্লুডেড বা বাইরে রাখা হয়েছিল। মুসলমানেরা বাঙালি না – এই ছিল তাদের সিদ্ধান্ত ও চর্চা।  জমিদারি ক্ষমতার চোখে দেখে এই ছিল তাদের ইসলামবিদ্বেষ। এই সত্যি কথাটাই অমর্ত্য সেন এখানে ভুল করে উচ্চারণ করে ফেলেছেন।

ভুল কেন? কারণ এখানে তিনি ‘বাঙালি হওয়া’ শিরোনাম নিয়ে বক্তৃতার বক্তা। তার এখনকার উদ্দেশ্য বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের কত মিল-মহব্বত ছিল তা থাকুক না থাকুক, সেটাই বড় করে তুলে ধরা। যাতে এ থেকে নাকি মোদী ঘায়েল হবে – এই ছিল আয়োজকদের অনুমান। কিন্তু  সমস্যাটা হল অমর্ত্য সেন তাঁর বিশ্বাস ও আজন্ম ছোট থেকে দেখে আসা বাস্তব চর্চা থেকে তিনি মনে করতে অভ্যস্ত যে, মুসলমানেরা বাঙালি না। তাই এ কথাটাই তিনি মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন যে ‘বঙ্গে মুসলমানদের আগমন’… যেটা ছিল উনিশ শতকের বর্ণহিন্দু জমিদারদের নির্ণয়। এটাই পরে হয়েছিল কংগ্রেস বা হিন্দু জাতীয়তাবাদের বয়ান। বিজেপির মোদীর হিন্দুত্বের বয়ানও এই একই ইসলামবিদ্বেষের ওপর দাঁড়ানো।

তাহলে অমর্ত্য সেন তিনি কিভাবে নিজেরই হিন্দুত্বের বয়ান দিয়া মোদীর হিন্দুত্বকে ঠেকাবেন? হতে পারে মোদির হিন্দুত্ব অনেক বেশি রেসিজম পর্যায়ে চলে গেছে, হিটলারি উত্থান পর্বে সে ঢুকে গেছে। এতে অমর্ত্য সেন আপনারটা সফট হিন্দুত্ব দাবি করলেও সেটাও এক  হিন্দুত্বই। ফলে মূলত ইসলামবিদ্বেষী এবং গোপন করা ছুপানো।

তাই অমর্ত্য সেন এখন আপনিই ঠিক করেন আপনি ঠিক কী, কী হতে চান!

মুসলমানেরা আসলেই বাঙালি কি না সে তর্ক :
মুসলমান কোনো রেসিয়াল ব্যাপার নয়। যেকোনো রেসের (race)  রেসিয়াল জনগোষ্ঠি ধর্মান্তরিত হয়ে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যেতে পারে, এভাবেই মুসলমান হয়ে যায়। আর এতে তার আগের রেসিয়াল বৈশিষ্ট্য একই অটুট থেকে যায়। নৃতাত্ত্বিক বাঙালি এভাবেই মুসলমান হয়ে যাওয়ার পরও বাঙালি থাকে এবং ছিল। যদি না আপনি ইসলামবিদ্বেষী হয়ে তাদের বাঙালি মানতে অস্বীকার করে ফতোয়া দেন। আসলে যে জনগোষ্ঠী যুগ যুগ ধরে অত্যাচার শোষণ লুণ্ঠনে সামাজিকভাবে চরম প্রান্তিক অবস্থানে আর লম্বা বে-ইনসাফির স্বীকার এমন কোনো মতে বেঁচে থাকাদের – এদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বলে কিছু আছে বা ছিল কি না তা হয়তো সেকালে সাদা চোখে খুঁজে পাওয়া কঠিন। হয়তো গভীরে লুকিয়ে গেছে, যা বাইরে থেকে দেখতে পাওয়া সহজ না; কিন্তু তবু মুখের ভাষা! জন্মের পর মা সন্তানকে যে ভাষায় কথা শেখায়? সেটা তো কোনোভাবেই লুকানো যায় না, লুকানো থাকে না। এটাও কী তারা দেখতে পায় নাই? আমাদের মুখের ভাষা কি বাংলা ছাড়া অন্য কিছু ছিল! তাও সে আমলে বর্ণহিন্দু জমিদারদের জাতিভেদ প্রথার চোখে মুসলমানেরা ছিল নিচের নমঃশূদ্রদের থেকেও আরও দুই ধাপ নিচে। এই মুসলমানেরা বাঙালি ছিল না – এই ছিল তাদের বিদ্বেষী সিদ্ধান্ত।

আসলে কারও দেয়া স্বীকৃতির প্রমাণ, অথবা কারো কাছ থেকে আমাদের বাঙালি স্বীকৃতি নেয়া – এদুটোর কোনটার আমাদের দরকারই নাই। আর ১৯৭১ সালে কি আমরা দেখাইনি গায়ের রক্ত ঢেলে দেখাইনি কারা আসল বাঙালি! কারা আমরা! ফলে জমিদারি ক্ষমতার স্বার্থ দিয়ে নির্ধারিত কোনো স্বীকৃতি আমাদের কোনো প্রয়োজন নেই। বিশেষত যেখানে জমিদারি উচ্ছেদে আমরাই ছিলাম প্রধান লড়াকু, প্রজা বাঙালি! সাথে আমাদের মুসলমান পরিচয়ও সব সময়ই ছিল গৌরবের। কারণ জমিদারি উচ্ছেদের প্রথম লড়াই শুরু করেছিলেন ১৮১৯ সালে আমাদের বীর নেতা হাজী শরীয়তুলাহ, তিনি তো আমাদেরই আসল পরিচয় নির্মাতা। কাজেই আমরা কি তা প্রতিষ্ঠা করতে আমরা নিজেরাই যথেষ্ট। অমর্ত্য সেন দূরে থাকেন, ভালো থাকেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ৩১ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মজ্জাগত স্বভাব সহজে যায় না এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

কোন মুসলমানকে কেউ নমিনেশন দেয় নাই কেন

বার্মার গত নির্বাচনে কোন মুসলমানকে কেউ নমিনেশন দেয় নাই কেন

গৌতম দাস

০৯ অক্টোবর ২০১৭,  মঙ্গলবার ০০:১৯

http://wp.me/p1sCvy-2iq

মায়ানমারে জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠী হল বার্মিজ; অনেকে এদেরকে বামার বা বর্মানও বলে থাকে। এরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০%। বিগত ১৮২৪ সালে বৃটিশ কলোনির বার্মা দখলেরও আগে থেকেই বার্মার সবচেয়ে বড় জনগোষ্ঠি বামার এবং এরাই নিজ জনগোষ্ঠির নামে দেশের নাম রেখেছিল বার্মা। বার্মিজ ছাড়া বার্মায় অন্যান্য আরও অসংখ্য জনগোষ্ঠি আছে; যেগুলোর মধ্যে একালে তালিকাভুক্ত বা ক্ষমতাসীন  সরকার স্বীকৃত এমন জনগোষ্ঠি হল ১৩৫ টা। এরপরেও রোহিঙ্গারা এই ১৩৫ জনগোষ্ঠির ভিতরের একজন কেউ নয়। অর্থাৎ আগামিতে স্বীকৃতি পেলে রোহিঙ্গারা হবে সম্ভবত ১৩৬তম জনগোষ্ঠি। তাই সারকথায় বললে, বার্মায় ৬০% বার্মিজদের বাইরের ৪০% হল এই ১৩৫+, এতগুলো জনগোষ্ঠি। আবার এই ৪০% জনগোষ্ঠি এরাও এক বড় রকমের সংখ্যা মানতেই হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও বৃটিশ শাসনমুক্ত হবার রাজনৈতিক আন্দোলন ও পরবর্তিতে স্বাধীন বার্মা কায়েম হবার পর ১৯৪৮ সাল থেকেই বার্মিজ জনগোষ্ঠির নেতারা সবচেয়ে ক্ষতিকর ও বিভেদমুলক যে রাজনৈতিক কাজ ঘটিয়েছিল তা হল, ঐ স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেওয়া  অ-বার্মিজ সব জনগোষ্ঠিকে সেনাবাহিনী থেকে পদচ্যুত করিয়ে দেয়া এবং রাজনৈতিক গুরুত্বপুর্ণ সব পদ থেকেও তাদের অপসারণ করে দেওয়া। এই দুই কাজ ঘটিয়ে বার্মার ক্ষমতা ও নেতৃত্ব থেকে সব অ-বার্মিজদের মুছে দেয়া হয়েছিল। যে কোন ‘অপর’ এর প্রতি এই মনোভাব, অ-বার্মিজদের প্রতি সে ট্রাডিশন ও চিন্তার চর্চা আজও মায়ানমারে সর্বত্র।  ফলে বার্মা স্বাধীন হবার পরও অন্যান্য জনগোষ্ঠির মুক্তি ও স্বায়ত্বশাসনের দাবি ও লড়াইকে শাসক বর্মী জাতিগোষ্ঠি নির্মমভাবে দমন নির্মুল – একমাত্র এই পথে মোকাবিলা করেছিল। এটা আরও নির্মম নিষ্ঠুর ভাবে ঘটেছিল ১৯৬২ সালে (আসলে ১৯৫৮ সাল থেকেই যখন তিনি সামরিক জেনারেল হওয়া সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন দুবছরের জন্য) জেনারেল নে উইনের হাতে, যা ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলেছিল। অ-বর্মিজদের সাথে কোন রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সম্পদ বা রিসোর্স শেয়ার না করার সিদ্ধান্ত – এটাই সব বার্মার সব সমস্যার গোড়া। বার্মার আদি সমস্যা এই ৪০% অ-বার্মীজ জনগোষ্ঠিকে দাবায় রাখা, নির্মুল করা্র চিন্তা থেকে জাত। আর এর মধ্যেকার মাত্র ৪% হল মুসলমান। তাও এরা সবাই কেবল বার্মার রাখাইন প্রদেশের মুসলমান বাসিন্দা  এমন নয়। বার্মার সব প্রদেশেই স্বল্প হলেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুসলমান জনগোষ্ঠি আছে। এদের সবাই আর সাথে রাখাইন প্রদেশের মুসলমান, এভাবে মিলিয়ে মোট জনগোষ্টির  ৪% হল মুসলমান।

গত ১৯৮৮ সালে নে উইনের পতনের পরে অ-বর্মিজ জনগোষ্ঠিকে দাবিয়ে রাখার  আর এক নতুন কৌশল চালু করা হয়েছিল। এই কৌশলটা হল মুলত আগের বর্মিজ-অবার্মিজ ভাগাভাগিটাই থাকবে কিন্তু সেটাকে আড়ালে পিছনে লুকিয়ে ফেলে রাখার কৌশল নিতে হবে।  জাতিগোষ্ঠির ভিত্তিতে, এদিক থেকে ভাগ করে দেখালে বার্মিজেরা মোট জনসংখ্যার ৬০ ভাগের বেশি হয় না। কিন্তু ভাগটা যদি করা হয় কতভাগ বৌদ্ধ এবং অ-বৌদ্ধ – এই ভিত্তিতে? এতে এক বিরাট লাভ হয়। কারণ তাতে এবার দাড়ায় ৮৮% বৌদ্ধ, ৬% খ্রীশ্চান, ৪% মুসলমান ইত্যাদি। এতে চোখে পড়ার মত মেজরিটি হয়ে যায় বৌদ্ধ। ফলে এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রাজনীতি চালু করে এই আড়ালে এর ভিতরে বর্মানদের পুরান একছত্র শাসনের রুস্তমি সহজে ঢেকে রাখার এক ভাল সম্ভাবনা দেখেছিল জেনারেলেরা। তাই জেনারেলরা সিদ্ধান্ত নেয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বর্মিজদের একছত্র শাসনকে তারা এরপর থেকে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন এই আড়াল থেকে চালু রাখবে। যেমন কাচিন বা শান জনগোষ্ঠি যারা নিজ প্রভাবাধীন প্রদেশের উপর নিজের নিয়ন্ত্রণের জন্য বর্মিজ দমন-শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতার রাজনৈতিক সংগ্রাম করছে এদের কাছে বার্মিজ শাসক জেনারেলেরা নিজেদেরকে তখন থেকে হাজির করেছিল এভাবে যেন শাসকেরা আর বার্মিজ নয়; বরং কাচিন বা শান জনগোষ্ঠির মতই শাসকেরাও একই বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির লোক। আর এই ভড়ং এর আড়ালে বার্মিজ দানব শাসকের দমনের চেহারাটা যতটা সম্ভব আড়ালে ফেলে রাখতে সুযোগ নেওয়া শুরু হয়েছিল সেই থেকে। এটা ছিল আসলে বার্মাকে নতুন করে কমন আকার দেয়া যেন এক “বৌদ্ধ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির” পরিচয়ে সে উঠে দাড়াতে চাইছে । অথচ যার আড়ালে ততপর থেকে আছে আগের মতই বর্মিজ একছত্র দানব। এই নতুন পরিচয়কে পোক্ত করতেই কমন এনিমি বা বৌদ্ধদের বিরুদ্ধে কমন শত্রু হিসাবে মুসলমানদের দেখানো শুরু হয়েছিল। সাধারণত দেখা যায় কমন এনিমি ব্যাপারটা যতই শানিত বা তাতানো রাখা যায় ততই তা দিয়ে আভ্যন্তরীণ দমণ অসন্তোষকে ভুলিয়ে রাখা যায়।

নে উইন উত্তরকালে নতুন করে দমননীতি আসায় আমেরিকাসহ পশ্চিমা দেশগুলোর মায়ানমারের উপর অর্থনৈতিক অবরোধসহ একে নানা ধরণের অবরোধের মধ্যে রেখেছিল সেই ১৯৯৩ সাল থেকেই। এর ভিতরেই বার্মিজ একচেটিয়া শাসন নিজেকে নতুন আড়ালে নিয়ে বৌদ্ধ রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির পরিচয়ের রাজনীতি হিসাবে হাজির হয়েছিল। তবে মুসলমানদেরকে উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের কমন শত্রু হিসাবে হাজির দেখানোর আর এক শেষ পর্যায়টা গড়াটা তখনও বাকি ছিল। যেটা সম্পন্ন করে নেয়া হয়েছিল ২০১১-১৫ সালের সরকারের শাসনকালে।

অর্থনৈতিক অবরোধে আটকে থাকা বার্মা  আমেরিকার ফ্রন্ট-রানার দুতয়াল হিসাবে ভারতকে হাজির পেয়েছিল ২০০৭ সাল থেকে। ফলে পশ্চিমের সাথে কী করলে তারা তাদের অবরোধ তুলে নিবে এর এক নিগোশিয়েশন  আলোচনা শুরু হয়েছিল। বার্মা পশ্চিমকে কোন কোন ব্যবসা-বিনিয়োগের সুযোগ দিবার বিনিময়ে আর কিছু কিছু কোন রাজনৈতিক সংস্কার করলে জেনারেলেরা পশ্চিমের সমাজে নিজ পণ্যসহ নিজেরা অবাধ গম্য হতে পারবে – এসব থাকত সেসব নিগোশিয়েশন  আলোচনার মুল প্রসঙ্গ। অন্যভাবে বললে রাজনৈতিক সংস্কার কথাটা যতই বড় শুনাক না কেন – একছত্র বার্মিজ সামরিক ক্ষমতাকে অটুট রেখে কেবল সুচিকে উপর দিয়ে একটা অলঙ্কার হিসাবে চড়িয়ে দেয়া – এই ছিল সেই সংস্কার। এতটুকুকেই বিরাট সংস্কার করা হয়েছে বলে বার্মিজ জেনারেলদের সার্টিফিকেট দিয়েছিল আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো; আর তাই থেকে এটাই মায়ানমারের আর এক সমস্যা এবং আজকের রোহিঙ্গা সংকটের আর এক উৎস হয়ে যায়। এই ফর্মুলায় বর্মিজ জেনারেলেরা নিজের একছত্র ক্ষমতা তাঁর কেবল নিজের, এই কথা লিখে নিয়েছিলেন যেখানে সেটাকেই ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশন বলে মেনে নেওয়া হয়েছিল। এরপর ২০১০ সালে এক সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। যার উদ্দেশ্য ছিল সু চির পার্টিকে অলঙ্কারিক হিসাবে মেনে নিয়ে ক্ষমতায় আনা হবে বটে তবে তা ২০১০ এর নির্বাচনে নয়; অর্থাৎ এর পরের ২০১৬ সালের নির্বাচনে। এরই পুর্ব- প্রস্তুতি ছিল ২০১০ সালের  তথাকথিত নির্বাচন ও ক্ষমতা। আর একাজের উদ্দেশ্যে সামরিক বাহিনী সেই বার নিজেই আগে একটা দল গঠন করে নিয়েছিল ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলবমেন্ট পার্টি (USDP)’ নামে। আর এই দলের নামেই তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা নিয়েছিল। অনুমান করা হয়, সু চির দল ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স বা এনএলডি আপোষে ২০১০ সালের নির্বাচন বর্জন করেছিল; আর ২০১৫ সালের নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।  আবার USDP আসলে ছিল মূলত সামরিক বাহিনীতে কর্মরত এবং প্রাক্তন অফিসার-সৈনিকদের রাজনৈতিক দল। যদিও এমনিতেই তখনও সংসদের ২৫ ভাগ আসন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কর্মরত সেনা অফিসারদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

আমাদের আলোচনার প্রাসঙ্গিক সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ সময়কাল হল এই ২০১০-১৫ সাল, যখন ক্ষমতায় আসীন এই USDP।

ঐ সময়কালে জেনারেলেরা বার্মার রাজনীতির অভিমুখ বেধে দেওয়ার কাজটা করে রেখেছিল। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, সু চি ভোটের রাজনীতির মাঠে নামার আগেই বার্মার রাজনীতির অভিমুখ বেধে দেওয়া; ইসলাম বিদ্বেষী এক “চরম উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” ছাড়া অন্য কোন রাজনীতি চলতে না দেওয়া এবং এই রাজনীতি করতেই সু চি সহ সবাইকে বাধ্য করা। এই কাজে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একটা বড় অংশকে সামরিক বাহিনী নিজে সংগঠিত করেছিল। এবং সামরিক বাহিনীর নিজ রাজনৈতিক দল USDP এর মাধ্যমে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের এই সংগঠনকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করত।

বুদ্ধিষ্ট ভিক্ষুদের এই সংগঠনের এক সাংগঠনিক নামও দেয়া হয়েছিল; প্রথমে সামাজিক সংগঠন হিসাবে এর নাম ছিল “কমিটি ফর প্রটেকশন অব ন্যাশনিলিটি এন্ড রিলিজিয়ন”। আঞ্চলিক ভাষার যার নাম “মা বা থা” পরে রাজনৈতিক দল হিসাবে এর রেজিষ্ট্রেশনও নেয়া হয়েছিল। যদিও প্রথম আত্মপ্রকাশের সময় এই সংগঠন দাবি করেছিল (টার্গেট করে মুসলমানদের বিরোধী) “রেস ও রিলিজিয়ন” সম্পর্কিত  চারটা আইনের খসড়া তারা তৈরি করবে, আর তা সংসদ থেকে পাশ করিয়ে আনতে প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করবে। এই আইনের পক্ষে প্রচার ও জনমত তৈরির জন্যই মা বা থা সংগঠনের জন্ম দেয়া হয়েছে।  ওদিকে সাবেক জেনারেল থেন সেনের হাত দিয়ে বর্মিজ কর্মরত জেনারেলেরা USDP নামে রাজনৈতিক দল খুলেছিল, দলের সভাপতিও ছিলেন থেন সেন। আবার ২০১০ সালের তথাকথিত নির্বাচনে USDP এর প্রার্থী হিসাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি; আর  সব রাজনৈতিক সংস্কারগুলোও হয়েছিল তার সরকারের হাত দিয়ে। তিনিই ‘মা বা থার’  প্রস্তাবিত চার আইন সংসদে পেশ করেছিলেন। আইনগুলো হল, ১. (মূলত মুসলমানদের দিকে তাকিয়ে তাদের নিগৃহিত করতে করা) ধর্ম বদল করতে হলে এই আইনে  আগে রেজিষ্ট্রেশন ও অনুমতি নিতে হবে। তা না হলে জেল ও জরিমানা করা হবে। ২. (একইভাবে মুসলমানদের কথা মনে রেখে তাদের জন্য করা) জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোন প্রদেশের সরকার যদি মনে করে যে তার কোন জনগোষ্ঠির জনসংখ্যা অন্য জনগোষ্ঠির সংখ্যার তুলনায় ভারসাম্য ছাড়িয়ে গেছে ফলে তুলনামূলক বেশি সামাজিক রিসোর্স ভোগ করছে তবে ব্যাপারটাতে সাম্য আনার জন্য প্রাদেশিক সরকার কেন্দ্রকে ব্যবস্থা নিতে বলবে এবং কেন্দ্র ব্যবস্থা নিবে।  (ভারতে বিজেপি-শিবসেনার মত এটা একই আর্গুমেন্ট যে মুসলমানেরা বেশি পয়দা করে, এর সাথে তুলনীয়।) ৩.  আন্তঃধর্মীয় বিয়ে নিষিদ্ধ করতে হবে। ৪। বহু বিবাহ নিষিদ্ধ করা হবে। এই চার আইনের পক্ষে প্রচার এটাই নতুন “রেস ও রিলিজিয়ন” এর রাজনীতি হাজির করেছিল বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। আসলে যেটা হল এক ইসলাম বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রাজনীতি; এরই দামামা।

এই চার আইনের মধ্যে প্রথম দুইটা ইতোমধ্যে সংসদে অনুমোদিত হয়ে গেছিল। তবে পরের দুটো প্রক্রিয়ায় কোথাও স্থগিত হয়ে আছে। কথিত আছে যে পুর্ব-এশিয়ার আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের সদস্যরা এব্যাপারে বিরূপ মনোভাব রাখাতে বাকি দুই আইনি প্রক্রিয়াকে আর সমাপ্ত করে নেওয়া হয় নাই। কিন্তু যেটা গুরুত্বপুর্ণ তা হলে আগেই বলেছি, এটা মূলত গেরুয়া কাপড়ধারী ভিক্ষুদের পরিচালিত এক সংগঠন, যারা সব প্রদেশব্যাপী ইসলাম-বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের পক্ষে ২০১৫ সালের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত প্রবল প্রচার চালিয়েছিল । সেটা কখনও ঐ চার আইনের পক্ষে প্রচার অথবা আইনগুলো পাশ হয়েছে সেই সাফল্যের প্রচার ইত্যাদি নামের আড়ালে। যেমন একটা তথ্য দিলে ব্যাপারটা আর একটু পরিস্কার হবে। গত ২০১৫ সালের নির্বাচনে সু চির এনএলডি এর প্রার্থী ছিল ১১৫১ জন। কিন্তু কোন মুসলমান সেই প্রার্থী তালিকায় ছিল না। অন্য কোন দলও কোন মুসলমান সদস্যকে নমিনেশন দেয় নাই। কারণ মুসলমান-বিরোধী প্রচারণাকে ‘মা বা থা’ এত উগ্রতায় ও তুঙ্গে নিয়ে গিয়েছিল যে ভোটে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে এই ভয়ে সু চি রাখাইন মুসলিম অঞ্চলেও কোন মুসলমানকে নমিনেশন দেন নাই।  ওদিকে ‘মা বা থার’ চরম উগ্র এক নেতা হলেন এক বৌদ্ধ ভিক্ষু ইউ উইরাথু (ভিন্ন উচ্চারণে ঐরাথু বা ভিরাথু, U Wirathu)। আমেরিকান টাইম ম্যাগাজিন ঐরাথুকে নিয়েই ২০১৩ সালের জুলাইয়ে এক কুখ্যাত প্রচ্ছদ স্টোরি করেছিল। শিরোনাম দিয়েছিল, “বুদ্ধিষ্ট সন্ত্রাসবাদের মুখচ্ছবি”। ঐরাথু খোলাখুলিই মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্য দিয়ে থাকেন। তিনি মনে করেন, “মুসলমানেরা দেশের জন্য, দেশের কালচারের জন্য হুমকি। তারা বেশি বাচ্চা পয়দা করে। তারা আমাদের নারীদেরকে রেপ করে। তারা আমাদের দেশ দখল করতে চায়, তাই আমাদেরকে বুদ্ধিষ্ট বার্মা রক্ষা করতে হবে”।  ইত্যাদি।

বাইরে থেকে দেখলে সেই ২০১৫ সালের নির্বাচনের আগে থেকেই ঐরাথু ও তার নানান সংগঠন  (মা বা থা, ৩৬৫ এধরণের নানান নামে ) সু চির দলের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে আসছে। গত নির্বাচনে ঐরাথু তাদের বিখ্যাত ‘ছয় প্রশ্ন’ তারা হাজির করেছিল। যেমন, ১. আপনি কী বুদ্ধিষ্ট? ২. আপনি ‘চার আইন’ সাপোর্ট করেন কি না? ৩. এই আইনগুলো রক্ষা করবেন কী না? ৪. আপনি ১৯৮২ সালের নাগরিক আইন বদলে ফেলবেন নাকি? ৫. কনষ্টিটিউশনের ৫৯ এফ বদলাবেন নাকি যে আইনে বিদেশি বিয়ে করেছে বলে সু চির প্রেসিডেন্ট হতে বাধা দেয়া আছে? ৬। “রেস ও রিলিজিয়ান” আন্দোলন সব সময় উর্ধে তুলে ধরতে প্রতিজ্ঞা করবেন কী না?

“They also urged people to ask six questions to candidates: whether they are Buddhist; do they support the four laws and would they protect them; will they try to change the 1982 Citizenship Law, used to restrict mainly Rohingya Muslims from becoming citizens; would they change section 59f of the constitution that in effect bars Daw Aung San Suu Kyi from the presidency; and would they promise to uphold “race and religion”.”

আজকে সু চির ক্ষমতারোহন ঘটে গেছে।  আর ইতোমধ্যে ৫ লাখ রোহিঙ্গা খেদানো আর হাজার পাচেক রোহিঙ্গা মেরে ফেলার পর সু চির সরকারের অবস্থান আর ভিক্ষু ঐরাথু-র অবস্থানের মাঝে আর কোন ফারাক নাই। অবশ্য বিবিসির মিশেল হুসেন ২০১৬ সালের এক সাক্ষাতকার নিবার সময় থেকে আমরা জানি ব্যক্তিগতভাবেও সু চি মুসলমান-বিদ্বেষে  ভুগছেন।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৮ অক্টোবর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া অনলাইন দুরবীন পত্রিকায় তা ছাপা হয়েছিল ০৯ অক্টোবর ২০১৭।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]