ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

গৌতম দাস

২ জুন ২০১৮, ০০:০৩, শনিবার

https://wp.me/p1sCvy-2rS

 

 


Illustration: Ajit Ninan, Times of India – মোদীও সওয়ার হওয়ার কথা ভাবছেন!

 

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের পয়লা টার্গেট ছিল চীন, তবে সেই সাথে দ্বিতীয় বা সহ-টার্গেট ছিল ভারতও। এই নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমেরিকা হয়ে পড়ে একা। অন্যদিকে, এই নতুন পরিস্থিতি চীন-ভারতকে কাছাকাছি এনে ফেলেছে। উল্টো করে বলা যায়, আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতির খেদমতে ও সমর্থনে ভারতেরও আর আমেরিকান ঐ নীতি পো-ধরে আগিয়ে চলার  বাস্তবতা লোপ পায়। ফলে মোদী ও ভারতের চীন নীতিও আমূল বদলে যাচ্ছে। আগে যতই উসকানিমূলক অবস্থান থাকুক না কেন, ভারত এবার থুক্কু বলে সব ভুলে চীনের সাথে সহযোগী সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবেই ২৭ এপ্রিল মোদির চীন যাত্রা ঘটেছিল। চীনে মাওয়ের অবসর যাপনের শহর য়ুহানে (Wuhan), চীন-ভারত “ইনফরমাল শীর্ষ সামিট” বা মোদী-জিনপিং এই দুই শীর্ষ রাষ্ট্র নির্বাহীর অনানুষ্ঠানিক কিন্তু ওজনদার ও গুরুত্বপূর্ণ আলাপের শুরু হয় সেখান থেকে।

ট্রাম্পের আমেরিকা হল এখন এক ‘একাকী আমেরিকা’ হতে রওনা দিয়েছে। এই অবস্থায় মানে “এন্টি গ্লোবাইজেশন” আর “সবার আগে আমেরিকা” এ দুই নীতিতে চলে যাওয়ার পর চাইলেও আর ভারতের পক্ষে আমেরিকার কোলে বসে আর কোনো কৌশলগত বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগের মতো চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া উদীয়মান ভারতের অর্থনীতির প্রবল ও বিপুল বিনিয়োগ চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও দেখা গেল, আমেরিকা এক্ষেত্রে ভারতের জন্য দরকারি কেউই না। অথচ চীন-ভারত সম্পর্ককে মোদী সংঘাতময় করে ফেলে রাখা সত্ত্বেও চীনই ছিল ভারতের জন্য একমাত্র উপযুক্ত বিনিয়োগদাতা। ফলে য়ুহান সম্মেলনে অন্তত ভারতের বিনিয়োগ সম্পর্কের দিক বা বিনিয়োগ প্রয়োজনের গুরুত্ব মোদি ভালোভাবেই বুঝেছিলেন।

গত ২৭ এপ্রিল ভারত ত্যাগের আগে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, এই সম্মেলন থেকে ‘চীন-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জোরদার করা’ তার বিশেষ লক্ষ্য। [“Modi stresses on strengthening economic ties]

আগামী বছর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা ক্ষমতার নির্বাচন। ফলে ক্ষমতার আকাঙ্খী বিরোধী অপর দল কংগ্রেসে এবার মা সোনিয়া গান্ধী ছেলে রাহুল গান্ধীকে দলের নতুন নেতা করে নামিয়েছেন। রাহুলও তৎপর হয়ে প্রায় প্রত্যেক ইস্যুতেই প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আক্রমণ ও সমালোচনা করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে চলেছেন। ফলে মোদীর য়ুহান যাত্রার আগেও ব্যতিক্রম করেননি। কিন্তু হায়! গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অভিমুখ সম্পর্কে রাহুল গান্ধীর মত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্ভবত যথেষ্ট সচেতন হন নাই, হোমওয়ার্ক করেন না – এমন আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করলেন রাহুল এক টুইট বার্তা দিয়ে। য়ুহান যাত্রার প্রাক্কালে তিনি মোদীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে লিখলেন – তিনি যেন “ডোকলাম ইস্যু” ও “চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তির” কথা তুলে ধরতে ভুলে না যান।

এর সোজা অর্থ মোদি-জিনপিং শীর্ষ বৈঠকের পিছনের কথা বা ব্যাকগ্রাউন্ড এবং গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে এই সম্মেলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং ভারতের অর্থনীতির জন্য তা কেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ আশীর্বাদ হয়ে আসবে সেসব সম্পর্কে একেবারেই বেখবর রাহুল। প্রথমত, মোদির কাছে বা ভারতের দিক থেকে এই সফর হল বিগত দুই বছরে চীন-ভারতের সম্পর্ক যে সঙ্ঘাত ও বৈরিতার পথে চলে গিয়েছিল, তা ছেড়ে পারস্পরিক সহযোগিতার পথে উঠে আসার জন্য ভারতের সুযোগ নেয়ার সফর। ফলে এই সফর থেকে ভুটানের ডোকলাম সীমান্ত নিয়ে নতুন করে সঙ্ঘাত তুলে আনা কোনোভাবেই মোদির বা ভারতের লক্ষ্য নয়। বরং ডোকলামের সঙ্ঘাত যা মূলত ডেড ইস্যু যা মোদী শেষে সফলভাবে চাপা দিতে পেরেছিল; চীনের সাথে কোনো বড় সঙ্ঘাতের দিকে তা চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল, এটাই মোদীর বিরাট অর্জন ছিল। ফলে ডোকলাম ভারতের কাছে, অন্তত মোদীর জন্য কোন অমীমাংসিত ইস্যু নয়, ভালভাবে ও কমপক্ষে আপাত হলেও মীমাংসিত ইস্যু। অথচ রাহুল মোদীকে ডোকলাম ইস্যুতে চীনের সাথে আলাপ তুলে পুরান ঘা খোঁচাখুচি করতে মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

[Congress president Rahul Gandhi said the PM looked tense in the live TV feed of the China visit. “Saw the live TV feed of your “No Agenda” China visit. You look tense! A quick reminder: 1. Doklam. 2. China Pakistan Economic Corridor passes through PoK. That’s Indian territory. India wants to hear you talk about these crucial issues. You have our support,” Rahul Gandhi said on Twitter.]

রাহুল দ্বিতীয় প্রসঙ্গ তুলছেন, চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তি নিয়ে। এই দাবিও অপ্রাসঙ্গিক। মোদী য়ুহান সামিটে যাচ্ছেন মূলত চীন-ভারত সামগ্রিক অর্থে অর্থনৈতিক ও বিশেষ করে বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে এর ভিত্তিমূলক আলাপ করতে। বোঝা যাচ্ছে, এর খবর রাহুলের কাছে নেই। মোদীর এই উদ্যোগ সরকার বিরোধী নেতা বলে রাহুলের তো তা ভন্ডুল করে দেয়া বা বেখবর থাকা কোন দায়ীত্ববান লোকের কাজ না।  অথচ তিনি ভেবেছেন যেন মোদী চীন যাচ্ছেন চীন-ভারত সীমান্ত বিতর্কে কোনো অমীমাংসিত ইস্যুতে ভারতের স্বার্থ আদায় করতে। দেখা যাচ্ছে রাহুল তো ইস্যুই বুঝেন নাই!

আসলে চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এক বিনিয়োগ প্রকল্প। এটা মূলত চীনের নিজের স্বার্থের অবকাঠামো প্রকল্প। পশ্চিম বা দক্ষিণ-পশ্চিম চীন যেটা পাহাড় পর্বতমালায় পুরোপুরি ল্যান্ডলক্ড অবস্থায়; সেই অঞ্চলকে  গভীর সমুদ্রবন্দরে প্রবেশসহ সব আবদ্ধতা ভেঙে ফেলে উন্মুক্ত করার অবকাঠামো প্রকল্প। এটা পাকিস্তানের উত্তর-দক্ষিণ বরাবর পুরা পাকিস্তানের বুকচিরে চলা এক হাইওয়ে যোগাযোগব্যবস্থা, যার একদিকে গভীর সমুদ্র বন্দর গোয়াদর আর অন্য প্রান্তে শেষে এটা চীনের অবরুদ্ধ পশ্চিম চীনের ভেতরে পর্যন্ত ঢুকে গেছে। এ ছাড়া এটাই চীনের ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিআরআই (BRI) এর অংশ; যা দুনিয়ার ৬৫টি রাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে এমন অবকাঠামো প্রকল্প।

ভারত এই প্রকল্পে অংশ নিতে চায় না – একথা বলে ভারত এখন নিজের দাম বাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টার মোডে আছে; এই স্তরে আছে। এরই অজুহাত হিসেবে ভারত এখন এক নন-সিরিয়াস অভিযোগ তুলে রেখেছে যে এই করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে গেছে। আর ভারতের চোখে কাশ্মীর এক বিতর্কিত ভূমি এবং দাবি যে কাশ্মীর পুরোটাই ভারতের। ফলে এই সুত্র এটা ভারতের সার্বভৌমত্বের রক্ষার প্রশ্ন। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এই আপত্তি তুলে রেখেছে সত্য কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার মনের আসল ইচ্ছা হল, ভারতকে বিআরআই (BRI) প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে চীন ভারতকে আরো কী কী ছাড় ও সুবিধা দেয় তার দরকষাকষি করা। এ ব্যাপারে চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন অশোক কান্থা; তিনি অবসরে যাওয়ার পরে গণমাধ্যমে নিজেই এক বয়ান দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্ষমতাবান ‘ক্রমবর্ধমান ধেয়ে আসা চীনের প্রভাব’ মোকাবেলা করাই হলো ‘ভারতের কূটনীতির জন্য আগামীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’। আর এই কাজে চীনকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দিতেই ভারত বিআরআই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত না হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। [……”how to deal with an increasingly assertive China… in an uncertain, fluid international environment, this is going to be possibly the biggest challenge in India’s foreign policy in years to come,” ]

তিনি মূলত বলেছিলেন BRI/OBOR প্রকল্পে যোগ দিলে ভারত চীনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে যাবে। তাই ভারতের যোগদানের সম্ভাবনা নাই। [……joining OBOR, which is going to have strategic agenda for China, as a junior partner is highly unlikely for India. It might work for smaller countries, but for India it is a difficult proposition,”]

এই কথাগুলো কান্থাসহ প্রো-আমেরিকান ধারার আমলারা যখন বলছিলেন, ভারত আমেরিকায় ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি নিজ ভর্তুকির পণ্য রফতানির সুযোগ তখনও বজায় ছিল। বিনিময়ে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতি নিজেরও নীতি, ভারতকে এটা আমল করে নিজ মুকুটে পালক হিসেবে লাগিয়ে রাখতে হয়েছিল। অশোক কান্থাসহ আমলাদের এই আমেরিকান ধারা এখন পরাজিত বলেই গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে চীন-ভারত য়ুহান সম্মেলন হতে পেরেছিল। বোঝা যাচ্ছে কংগ্রেসের রাহুল একেবারেই এতই নাদান যে বাস্তবের এসব ঘটনার কোনো ন্যূনতম তথ্যও তার কাছে নেই। তাই তিনি চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের সার্বভৌমত্বের আপত্তি নিয়ে কথা বলতে মোদীকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। যেন মোদী চীন সফরে যাচ্ছিলেন, পাকিস্তান অংশের কাশ্মীরে ভারতের নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই করতে।

ভারতের আরেক রাজনীতিক কাপিল সিবাল। তারও দল হল, সোনিয়া-রাহুলের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। মূলত তিনি দিল্লির চাঁদনী চক নির্বাচনী এলাকা থেকে সাধারণত নির্বাচনে দাঁড়ান। কিন্তু গত ২০১৪ সালের কেন্দ্র-নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে দাড়িয়ে হেরে গিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি ভারতীয় সংসদের দ্বিতীয় কক্ষ, রাজ্যসভার সদস্য। পেশাগতভাবে তার মূল পরিচয় মূলত তিনি হলেন দিল্লি সুপ্রিম কোর্টের উকিল, যিনি দিল্লি বার অ্যাসোসিয়েশনের তিনবারের সভাপতি। বিগত কংগ্রেস সরকারের দুই টার্মের তিনি অনেক মন্ত্রণালয়ের যেমন আইনমন্ত্রী, টেলিকমমন্ত্রী, মানবসম্পদমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। তাকে কংগ্রেসের সিনিয়র রাজনীতিবিদদের একজন মানা হয়।
কাপিল গত ২১ মে টাইমস অব ইন্ডিয়া নিজের এক মতামত ছেপেছেন। এটা ছিল টাইমস অব ইন্ডিয়ার ব্লগে কাপিল সিবালের লেখা। এই লেখাটাকে পড়া যেত হয়ত রাহুল গান্ধীর তথ্য ও চিন্তার খামতি পূরণের একটা উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু তা যায়নি এ জন্য যে, এটা কাপিল সিবালের ব্যক্তিগত মতামত বলে উল্লেখ করেই ছাপা হয়েছে।

কাপিলের এই লেখা বরং মোদিকে সার্টিফিকেট দেয়া বা এগিয়ে যেতে বাহবা দেয়া বলে মনে করা যায়। যেমন শিরোনামটাই তেমন বিনয়ের যদিও তা খোঁচা দেয়ারও। [Modi gets real on China: Wuhan summit demonstrated that a weak economy gives India few cards to deal]

এতদিন আমেরিকার কথায় নেচে ফাঁপা হামবড়া দেখানো যে ভুল ছিল কাপিল তা স্বীকার করছেন। কিন্তু স্বীকার করেও এর দায় কেবল মোদীর ওপর ফেলতে চাচ্ছেন। বাংলায় কাপিলের লেখার শিরোনামটা হল, “আসল চীনের সামনে মোদী এখন বুঝছেঃ য়ুহান সম্মেলন দেখাল নিজের দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে চীনকে মোকাবেলা করতে যাওয়া ভারতের হাতে কার্ড খুব কমই আছে”। মোদী এখন বুঝুক – টাইপের কাপিলের এই বয়ান পুরাপুরি অন্যায্য। যেন মোদী একাই আমেরিকার প্ররোচনায় চীনের সাথে মিথ্যা হামবড়া করে বা এমন হামবড়া দেখিয়ে চলেছিল। অথচ সোনিয়া-প্রণবের কংগ্রেসের আমলেও (২০০৪-১৪) চীন মোকাবেলার ক্ষেত্রে তারাও কি আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর উসকানিতে’ তাল দিয়ে একই মিথ্যা হামবড়া করে চলেনি? আর কাপিল কি সেই দুই টার্মের কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রী ছিলেন না? তাহলে একা মোদীকে দায় দেয়া কেন?

যা হোক কাপিল তার লেখায় এবার সোজা দেনা পাওনার আলাপে চলে এসেছেন। বলছেন, “বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, বার্মা, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা – এসব দেশে চীন প্রায় দেড় শ’ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভারতের অর্থনীতিতেও প্রধান সেক্টরগুলোতে চীন আমাদের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ করবে। আমাদের ১৮টা বড় শহরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে সব বিনিয়োগ চীনাদের”। ইত্যাদি সব কথাই আছে সেখানে।
কিন্তু এবার তিনি এক মজার আলাপ তুলেছেন।  চীনের বিরুদ্ধে কংগ্রেস সরকার যেসব অভিযোগ করত বা এখনো যেসব অভিযোগ, তিনি তার সব ফিরিয়ে নিচ্ছেন আর মোদীকেও তা ফিরিয়ে নিতে সুপারিশ করছেন। এটাই খুবই ইন্টারেস্টিং, স্রোত বদলের সরাসরি ইঙ্গিত।  “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে” – এই শিরোনাম দিয়ে তিনি এক তালিকা দিয়েছেন।

বলছেন, “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে”।
“চীন কখনো পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব ছাড়বে না। জাতিসঙ্ঘের উচ্চ আসনে চীনারা আমাদের প্রার্থিতা সমর্থন করবে না। [এই কাগুজে প্রার্থিতা  চীনের সমর্থন করার কোন কথা কোথায় হয় নাই। বুশ_ ওবামা দুজনের আশ্বাস দিয়েছিল। ] আবার নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে সদস্য হিসেবে ঐ সংগঠনে আমাদের অন্তর্ভুক্তি চীনারা মেনে নেবে না। আমাদের বাজারে চীনের প্রবেশাধিকার থাকলেও প্রতিদানে আইটি সেক্টরসহ তাদের বাজারে আমাদের তারা প্রতিদান দেবে না। যদিও চীনারা সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে আমাদের তৈরী ওষুধ চীনা বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। এরকম অনেক তালিকা আছে। কিন্তু এখানে মূল কথাটা হলো, নিজে মেনে নেয়া এবং সবাইকে মেনে নিতে সুপারিশ করা”।

আসলে ব্যাপার হল, এগুলো চীনের বিরুদ্ধে ঠিক ভারতের তোলা অভিযোগ নয়। বরং ভারতকে আমেরিকার দেয়া মিথ্যা আশ্বাসের তালিকা। যেমন জাতিসঙ্ঘ বা সাপ্লায়ার্স গ্রুপে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে দেবে, এই আলাপ ছিল ভারতকে দেয়া আমেরিকার মিথ্যা আশ্বাস।  আসলে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বও ছিল এতটাই নাদান যে, তারা এটা বিশ্বাস করেছিল। ধরে নিয়েছিল আ-মে-রি-কা; এই আমেরিকা চাইলে সবই যেন সে কাউকে দিতে পারে। তবে মূল কথা কাপিলের এসব বক্তব্য তাদের দলের নাদান সভাপতি রাহুলের বক্তব্যের চেয়ে অনেক বাস্তবে পা দিয়ে চলা – এমন কথা। অন্তত বক্তব্যের পটভূমি বুঝে তিনি কথা বলেছেন।

তবে এই প্রসঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশেষ করে আমাদের কাকাবাবু প্রণব মুখার্জির গ্লোবাল ইতিহাসবোধের উদাহরণ না তুলে ধরে পারছি না। বুশ এবং ওবামার আমলেও  (বিশেষ করে ২০০৯ সালে ওবামা ক্ষমতায় আসার পর) ভারতকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার সদস্যপদ ভারতকে এনে দেয়া হবে। আর প্রণব মুখার্জির মত নীতি নির্ধারকেরা তা বিশ্বাস করেছিল। এমনকী ভেটো ক্ষমতা পেলে সবার আগে পাবার সম্ভাবনা একালে মার্কেলের জার্মানী। সেই জর্মানি রাষ্ট্রও কেমন (P5+1) হয়ে ঝুলে আছে সেটাও লক্ষ্য করতে ভারত ভুলে গেছে। আর এর চেয়েও বড় কথা হল কেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে ভেটোক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাব করে, এর জন্ম দিতে হয়েছিল সে ইতিহাস জানলে যে কেউ বুঝবে কেন এখন পাঁচ ভেটো ক্ষমতাধর সদস্য একালে বাড়াতে যাবার সোজা মানে হল রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একক ক্ষমতাধর আমেরিকা এখন একালে আর  সেই ক্ষমতাধর নয় অথবা কখনই ফিরে আসবে না। ফলে রাষ্ট্রসংঘ পুনর্গঠনের মুরোদ আর আমেরিকার নাই। আগামিতে ঠিক কার বা কার কার এই মুরোদ হতে পারে সবটাই আবছা। এছাড়া “রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন” এর জন্য কী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটবার প্রয়োজনীয় পুর্বশর্তের মত এবারও একটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগবে, তাই কী! বিশেষত যখন আমেরিকার এক নম্বর ক্ষমতাধর জায়গা থেকে বিদায়ের আলামত চারিদিকে ফুটে উঠেছে। অথচ সেই ঢলে যাওয়া লোলচর্ম  আমেরিকার পকেটেই যেন গ্লোবাল ক্ষমতা ধরা আছে এই হল কাকাবাবুদের গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে রিডিং।

তবে আসল তামাশার কথা বলাটা এখনও বাকি। গত ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি শেষ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রথম ভারত সফর করেছিলেন। সেখানে হাসিনাকে দিয়ে পঞ্চাশেরও বেশি পয়েন্টে হাসিনাকে দিয়ে স্বাক্ষরিত এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল। ওর ৪৭ নম্বর দফা ছিল এরকমঃ

Responding to the Prime Minister of India, the Prime Minister of Bangladesh conveyed her country’s support in principle for India’s candidature for the permanent membership of the United Nations Security Council as and when the reform of the UN Security Council is achieved. Bangladesh conveyed its support to the Indian Candidature for a non-permanent seat in the UNSC for the term 2011-2012. India also conveyed its support to the Bangladesh’s candidature for a non-permanent seat in UNSC for the term 2016-2017.

অর্থাৎ ঐ ঘোষণার ৪৭ নম্বর পয়েন্ট ছিল এরকম, “বাংলাদেশ ভারতের ভেটো সদস্যপদের দাবি সমর্থন করছে”। মানে বাংলাদেশকে দিয়ে যা মনে চায় তাই স্বাক্ষর করে নেয়া যায় বলে কাকাবাবু এটাও ছাড়তে রাজি হয় নাই। তার কোন মুল্য থাক আর নাই থাক। যদি লাইগা যায়! আসল কথাটা হল রাষ্ট্রসংঘের ভেটো সদস্যপদ ভারত আমেরিকার কাছে আবদার করেছিল। অথচ এটা আমেরিকার কাছে আবদার করে পাবার জিনিষ নয়, আমেরিকাও তা একক ইচ্ছায় কাউকে দান করার কখনই কেউ নয়, কেউ ছিলও না। এটাই কাকাবাবুরা বুঝেন না!

এবার সবশেষে সুবীর ভৌমিকের দেয়া এক তথ্য। বিসিআইএম (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোর কথাটা গণমাধ্যমে অনেক দিন উচ্চারিত হয়নি। উচ্চারিত হওয়া বন্ধই হয়ে গিয়েছিল ভারতের আপত্তি, অনাগ্রহের কারণে। বিসিআইএম হল, বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার এই চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে লেখা নাম। এই নাম দেয়া হয়েছে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে এরপর বার্মার গুমদুম হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত এক অর্থনৈতিক করিডোর অবকাঠামো প্রকল্প, যার নাম বিসিআইএম (BCIM)। সুবীর বলছেন, “য়ুহানে মোদি-শি জিংপিংয়ের বৈঠকের একটা ইতিবাচক ফল মনে হচ্ছে আসন্ন হয়ে উঠেছে”। কলকাতায় চীনা দূতাবাসের এক কনসাল জেনারেল লেবেলের অফিস আছে। সেই কনসাল জেনারেল  (Ma Jhanwu ) মা ঝানয়ু-এর বরাত দিয়ে সুবীর জানাচ্ছেন, তিনি এক প্রেস কনফারেন্সে বলেছেন, বিসিআইএম প্রকল্প এখন শুরু হবে কারণ এ দুই শীর্ষ নেতা একমত হয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়া সামনে এগিয়ে নিতে হবে।’ [……”BCIM would take off now because the two leaders had agreed to take the process forward”. ]

খুবই তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি, যদিও খুবই কম তথ্য এটা সন্দেহ নেই। বিশেষ করে সড়ক ও রেল যোগাযোগের বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর ব্যবস্থা চালু হয়ত হয়ে যাবে কখনও। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর, যেটা ছিল বিসিআইএম প্রকল্পের সাথে সংযুক্ত, এক গভীর সমুদ্রবন্দর অবকাঠামো। এ ছাড়া আরেকটা দিক আছে। বন্দর সুবিধাসহ সব মিলিয়ে বিসিআইএম প্রকল্পও চীনা ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ একটা অংশ হওয়ার কথা। ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সুবিধা থাকার কথা, বিসিআইএম প্রকল্প তার একটি। তাহলে ভারত কি আস্তে ধীরে বেল্ট-রোড উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার পথে?

না এটা এখনই অতিরিক্ত আশা। যদিও তা কোনো দিন হবে হয়ত, এমন অনুমান করা অবাস্তব হবে না। তবে খুব সম্ভবত আমরা অনেক আগেই এবং বেশি দ্রুত তা অনুমান করছি। যদিও একটা বিষয় এখনই পরিষ্কার করে রাখা যায়।

য়ুহান সম্মেলনের কোনো ফলাফল যদি আসতে শুরু করে, তবে তা হবে সবার আগে শুরু হবে, ভারতের একান্ত নিজের জন্য নেয়া চীনা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো থেকে। চীন-ভারত সম্পর্ক সবার আগে এদিক দিয়ে উন্মুক্ত হবে। কিন্তু এর অর্থ বাংলাদেশেরও চীনা অবকাঠামো প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় বর্তমান যে আপত্তিগুলো আছে তা আপনাতেই সরে যাওয়া নয়। ভারতীয় কূটনীতিতে এ দুটো আলাদা বিষয়। বাংলাদেশে চীনা অবকাঠামো প্রকল্প ভারতের আপত্তি এখনও সক্রিয় আছে বলেই সম্ভবত এবার প্রধানমন্ত্রীর শান্তিনিকেতন সফরের সময়, কথিত ভারতের কাছ থেকে “প্রতিদান” পাওয়ার আলাপ উঠতে আমরা দেখেছি। সেই সাথে আমরা দেখেছি, কথিত “প্রতিদান” পাওয়ার জন্য সরকারের বেপরোয়া কাছাখোলা ও মরিয়া অবস্থা। যদিও এ ব্যাপারে আবার সরকারের সর্বশেষ অবস্থান হল, নিজের মরিয়া দুর্দশা সে আর বাইরে দেখাতে চাচ্ছে না। গত বুধবারের প্রেস কনফারেন্সে তাই বোধহয় একটু ইউ-টার্ণ। যদিও আগের দিন ২৮ মে সরকারি প্যানেল সাংবাদিক নেতাদের আলোচনা সভা ছিল অভুতপুর্ব, দেখার মত।  খুব সম্ভবত, প্রতিদান পাবার বেপরোয়া দেখালেও কোনো ফল আসবে না বা আসছে না, এমন হয়ত তাদের অনুমান।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩১ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিচ্ছে ভারত!”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

ভারতের ‘প্রিয়তম’ বদল

ভারতের ‘প্রিয়তম’ বদল

গৌতম দাস

২৯ মার্চ ২০১৮,  বৃহষ্পতিবার   ০০:০৩
updated 30 Mar 2018, 16:13

https://wp.me/p1sCvy-2qT

 

আশির দশকের শুরুতে গ্লোবালাইজেশনের মূল প্রবক্তা ও নেতা ছিল আমেরিকা। সে আমাদেরকে নিরন্তর চাপ দিত  আমাদের বাজারকে তাদের জন্য উদাম করে দেওয়ার জন্য। সেই আমেরিকা  নিজেই এখন উলটা অবস্থান নিয়েছে।  ট্রাম্পের আমেরিকা প্রটেকশনিস্ট (protectionist)। এখন কেবল নিজ বাজার রক্ষণশীলতা নিয়ে ব্যস্ত। শিল্পের দুই গুরুত্বপুর্ণ উপাদান স্টিল ও এল্যুমিনিয়াম। আমেরিকায় অন্য দেশের কোন  স্টিল ও এল্যুমিনিয়াম পণ্য প্রবেশ বা আমদানি করতে চাইলে এখন এর উপর অতিরিক্ত সোজা ২৫% শুল্ক দিতে হবে। ট্রাম্প ও তার প্রশাসনের অনুমান ভিনদেশের এই দুই পণ্য আমেরিকান পণ্য বিক্রিতে বাধা দিচ্ছে বা আমেরিকান শ্রমিকদের কাজ কেড়ে নিচ্ছে।  এই ভিনদেশীয় পণ্যের ভিনদেশ বলতে মূলত চীনা পণ্য। এবং সেই সাথে অনেক ভারতীয় পণ্যও আছে। আমেরিকার নিজের বাণিজ্যস্বার্থ দেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান সরকারি কর্তা হলেন U.S. Trade Representative (USTR)। তাঁর ভারতের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ হল,  আমেরিকায় রপ্তানিতে ভারত তার পণ্যমুল্যে ভর্তুকি দেয় আর এভাবে আমেরিকার চেয়ে ভারতের পণ্যমুল্য সস্তা পড়ে, এতে ভারতের পণ্যমূল্য প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা নিয়ে হাজির হয়, ভারতীয় পণ্যের বাজার বড় হয় আর আমেরিকান শ্রমিক কাজ হারায়। এই হল তার দাবি। তাই তিনি বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় (WTO) অভিযোগ দায়ের করেছেন।

এই বিষয়টা নিয়ে এক রিপোর্ট লিখেছে ভারতের লাইভমিন্ট পত্রিকা। ঐ রিপোর্টের শুরুর বাক্যটা এরকমঃ “The United States said Wednesday it was taking action at the World Trade Organization against Indian export subsidies as Washington’s intensifying trade offensive moved to encompass two of Asia’s largest economies. এতে শেষের শব্দ কয়টা বেশ তাতপর্যপুর্ণ। লিখেছে encompass two of Asia’s largest economies. মানে “এশিয়ার দুটা সবচেয়ে বড় অর্থনীতিকে ঘিরে এদের বিরুদ্ধে (আমেরিকান) পদক্ষেপ “।  অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্থ ভারত একা নিজের কথা বলছে না। চীনকে সাথে জড়িয়ে নিয়ে দল ভারি করে ‘এশিয়া সেন্টিমেন্ট’ তুলে কথাটা বলার চেষ্টা করছে। অথচ কমপক্ষে  গত তিন বছর ধরে লাগাতর ভারতের মিডিয়া চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়ে গিয়েছে। চীনের জন্মই যেন ভারতের ক্ষতি করার জন্য এমন আজন্ম শত্রুতার বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে সেই প্রচার চলেছে। আমেরিকার “চীন ঠেকানো” বিদেশনীতির এক নম্বর বাহকের ভুমিকা পালন করে গেছে ভারত। তাহলে হঠাত এই হার্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে কেন?

গত ২৩ মার্চ কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক শিরোনামও এমন আরও এক কাঠি চড়া।  ওই দিনের পত্রিকা শিরোনাম করেছে, ‘চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ, কাঁপছে বিশ্ব অর্থনীতি’। লক্ষ্যণীয় এখানে শিরোনামের বাক্যে ‘ভারত’ শব্দটাই নাই। আছে মূলত তিনটি শব্দ – চীন, আমেরিকা আর বিশ্ব অর্থনীতি। অর্থাৎ প্রকারান্তরে আনন্দবাজার স্বীকার করছে যে, বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘কাঁপানোর’ ঘটনা ঘটতে গেলে চীন-আমেরিকাই যথেষ্ট, ভারত এখনো ঘটনা হয়ে উঠতে পারেনি। যদিও পটেনশিয়াল অর্থে ভারতের সম্ভাবনা আছে, জ্বলে উঠার মত বারুদ আছে; কিন্তু পরিপক্ক হয়ে উঠেনি। বরং উল্টো তা ভুলভাবে নাড়াচাড়া করলে তাতে সব সম্ভাবনা নষ্টও হতে পারে। কিন্তু এখানে ঘটনাটা আসলে কী? বাণিজ্যযুদ্ধ নাকি সত্যিকার যুদ্ধ?

ঘটনার আসল নাম যদিও ‘বাণিজ্যযুদ্ধ’; কিন্তু আনন্দবাজার বারবার একে এ’থেকে পরিস্থিতি আসল যুদ্ধে চলে যাবে কি-না, সে ইঙ্গিত করে কথা বলেছে। যেমন লিখেছে – “বিশ্ব অর্থনীতির দুই মহাশক্তির এই যুদ্ধে তাই কাঁপুনি বাজার ও করপোরেট দুনিয়ায়। হবে না-ইবা কেন? ২০৩৬ সাল পর্যন্ত সাত হাজার বোয়িং বিমানের বরাত দিয়েছে তো শুধু চীনা সংস্থাই। পুরোদস্তুর যুদ্ধ বাধলে, তাই প্রভাব সর্বগ্রাসী হওয়ারই সম্ভাবনা। …কিন্তু তাতে কি যুদ্ধ আটকাবে? উত্তর ট্রাম্প ছাড়া আর একজনই জানেন। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং”।

এখানে একটা জিনিস স্পষ্ট, আনন্দবাজার চীন আর আমেরিকাকেই কেবল ‘মহাশক্তি’ বলছে, নিজ ভারতকে বলছে না। আর আনন্দবাজার সম্ভবত বলতে চাইছে, মোদি পোল বদলে আমেরিকাকে ছেড়ে চীনের পক্ষপুটে আগেই চলে গেছে। বাণিজ্যযুদ্ধ থেকে সত্যিকার যুদ্ধ যদি শুরু হয়ে যায় সেকথা ভেবে, এর আগেই!

ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ দেখে এক কথায় বললে, ভারত আসলে ভীষণ ভয় পেয়েছে, পাওয়ার কথাই। কারণ মুই কী হনু রে ভারতের যা কিছু সম্ভাবনা তা ট্রাম্পের ঘোষণার এক ঝটকায় শুণ্যে ঝুলবার দশায় পৌছে গিয়েছে। চলতি শতকের শুরু থেকেই ট্রাম্পের আগের প্রেসিডেন্টদের প্রশাসনগুলো “চীন ঠেকাও” নীতির কারণে ভারতকে কাছে টানতে, সব সময় তোয়াজ আর নানান বাড়তি সুবিধা দিয়ে গিয়েছিল। আর সেসব সুবিধা খেতে খেতে ভারত ধরে নিয়েছিল এভাবেই বুঝি আরামেই দিন কাটবে। যেন এই তোয়াজ আর ঘুষের সুবিধাদির বাইরে আর কোন বাস্তব দুনিয়া নাই। এই অর্থে ভারতের ঝটকা লেগেছে, ভয় পেয়েছে। সেই ঝটকাতে একেবারে বাস্তবতায় এসে গেছে।  আসলে ভর্তুকি দিয়ে রপ্তানিতে WTO নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্বেও,  ভারতকে “বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত রাষ্ট্র” হিসাবে ঘোষণা করে দিয়ে আমেরিকা ভারতকে নিজ দেশে (ভর্তুকির) রপ্তানি করতে দিত। যদিও ঐ শর্তে বলা ছিল ভারতের মাথা পিছু আয় এক হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেলে এই বিশেষ সুবিধা বন্ধ হয়ে যাবে। গত ২০১৫ সালে WTO জানিয়েছিল যে ভারত সে শর্ত পূরণ করে ফেলেছে। কিন্তু দেখেও না দেখায়, আদরের ভারতের জন্য আমেরিকায় রপ্তানি সুবিধা আগের মতই জারি ছিল। সেটাই এখন হঠাত একবারে অতিরিক্ত শুল্কারোপের মুখোমুখি হল। ফলে বাস্তবে এই রপ্তানি বন্ধ হতে হবে।

ভারত নিজেই পালটা WTO তে অভিযোগ করতে যাবে কেউ কেউ বলছে যদিও তারা সকলে পরিস্কার জানে এটা WTO তে বিচারে উঠামাত্র অভিযোগের রায় আমেরিকার পক্ষে  হয়ে যাবে। তবুও এবার তেলানোর ঢঙ একটা চালু আছে।  মিনমিনে গলায় বলা হচ্ছে আমাদের রপ্তানি তো খুবই কম, আমেরিকার মোট ইস্পাত ও এলুমিনিয়ামের মাত্র দু পার্সেন্ট। মানে তাদেরকে কোন এক অজুহাতে  যেন বিশেষ ছাড় আবার দেয়া হয়, সে চেষ্টাও আছে। যদিও সে সম্ভাবনা প্রায় নাই বললেই চলে।  ট্রাম্পের আগানোর নীতিটা হল, আগের আমেরিকান প্রশাসনগুলোর আমলে যেখানে আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের উপরে রাজনৈতিক কারণে সুবিধা দেয়া জারি রাখা হয়েছিল। সেখানে  ট্রাম্প এবার বাণিজ্য স্বার্থকে ফিরে আবার সবার উপরে স্থানে এনে রেখেছে। ফলে ট্রাম্প এবার আর কোন নীতি পরিবর্তন না করলে ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার বাণিজ্যস্বার্থই সবখানে সবার উপরে স্থান নিয়ে থাকবে, এটা বলে দেয়া যায়। তবে এটা ঠিক যেমন ভারতের সাথে আমেরিকার যেসব বিশেষ খায়খাতির বাড়তি সুবিধা দেয়া ছিল আগের রেওয়াজ অনুসারে সেগুলো সব বাতিল হয়ে গেছে সে কথা কোথাও ঘোষণা দিয়ে বলা হবে না। কিন্তু বাণিজ্যস্বার্থ প্রায়রিটিতে সবার উপরে এক নম্বরে হাজির থাকবে – এই নীতিতে পরিচালিত হবে। তবে এর মানেই ভারত-আমেরিকা সব বিশেষ সম্পর্ক বাতিল নয়, তবে অকেজো হয়ে যাবে। ভারত এই গভীর দিকটা দেখতে পেয়ে গেছে।  একারণে এই ঝটকায় সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সটান চীনের দিকে  ঝুঁকে গেছে। যদিও মন থেকে দুরাশা ক্ষীণ আলো হয়ত সব চলে যায় নাই, এই আশার বাতি জ্বালিয়ে রেখেছে।

যেমন ভারতের বাণিজ্য সচিব রীতা তিওতিয়া রিপোর্টারদের বলছেন, “আমেরিকা নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এই বাড়তি শুল্ক আরোপ করেছে। কিন্তু ভারত তো আমেরিকার স্ট্রাটেজিক পার্টনার ফলে আমরা নিশ্চয় আমেরিকার নিরাপত্তা হুমকি নই”।  [India’s commerce secretary Rita Teaotia told reporters last week: “The tariffs have been imposed on security grounds and some of the key trading partners have been excluded from that. “On the basis of India’s strategic partnership with the United States, we are certainly not a security threat to the United States, and an exemption for India on the same grounds should also be available.”]

আসলে কে যে কখন “নিরাপত্তার হুমকির” অজুহাত তুলে কথা বলে কিন্তু ভিন্ন কী বুঝায়, তা বুঝা মুসকিল। সেটা অবশ্য ভারতের বাণিজ্য সচিবের না জানা থাকার কথা না। আমরা জেনে আসছি দেখছি, “ভারতের নিরাপত্তার জন্য” নিয়মিত আমাদের বর্ডারে বিএসএফের হ্যাপী কিলিং চলছে। যদিও কোন কথিত জঙ্গীও কোন দিন কোন সীমান্তে ধরা পড়ল না বা গুলি খেল না।  ফলে নিরাপত্তার অজুহাতে ভারতই কী বলতে ঠিক কী বুঝায় “এটা বুঝা মুশকিল”। তবে রীতা কোন অজুহাতে আবার বিশেষ সুবিধা চাইছেন তাতে ভারতকে আমেরিকার ভুয়া টেররিজমের বরকন্দাজ হতে হলেও যে তার বিশেষ আপত্তি নাই – তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু সমস্যা হল, ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছে টেররিজম আর আমেরিকার প্রধান হুমকি নয়। মানে আমেরিকা আর বরকন্দাজ কিনবে না।

‘বাণিজ্যযুদ্ধ’
শুরুতে যেকথা বলছিলাম একদা গ্লোবালাইজেশনের মূল প্রবক্তা ও নেতা আমেরিকা নিজেই এখন উলটা –  ট্রাম্পের আমেরিকা প্রটেকশনিস্ট। এই বাণিজ্যযুদ্ধ মানে কী, কেন? বাণিজ্যযুদ্ধ মানে হল কোনো দেশের নিজ বাজারে অন্যের পণ্য প্রবেশে বাধা দিতে অনেক সময় বিশাল অতিরিক্ত আমদানিশুল্ক আরোপ করে দেয়া হয়, যাতে ঐ পণ্যের আমদানিমূল্য স্থানীয় উৎপাদকদের মূল্যের চেয়ে বেশি হয়ে যায়। এ থেকে দু’টি রাষ্ট্র একে অপরের পণ্য আমদানিতে অতিরিক্ত আমদানিশুল্ক আরোপের ক্ষতিকর প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে যেতে পারে। তবে পাঠকের জন্য একটা সাবধানবাণী হল, দ্রুত জাতিবাদী হয়ে যাওয়া ঠিক হবে না, ভুল হবে। কারণ বিষয়টা এমন সরল নয় যে, ‘জাতিবাদী বোধে নিজ বাজার সংরক্ষণ’ সবার কাম্য হওয়া উচিত, আর এতেই সব সমস্যার সমাধান হবে। ব্যাপারটা তা নয়।

যদিও আমাদের অনেকের ধারণা হতে পারে, ‘বাজার সংরক্ষণ’ করলেই সমাধান হয়। সবচেয়ে পুরনো বুদ্ধিটা হল, ‘বাজার সংরক্ষণ’। ‘বাজার সংরক্ষণ’ মানে হল দেশে নিজেরা যা কিছু ভোগ করব, তা সব নিজেরাই বানাব; অন্য দেশকে এখানে মাল বেচতে দেবো না। এই হল এর সারকথা। কথাটা শুনতে খুব ভালো লাগে, জাতিবাদী রক্ত শরীরের ভেতরে বয়ে যাচ্ছে বা দেশপ্রেমিক ভাবের গরম লাগছে টের পাওয়া যায়; কিন্তু এই ভাবনাটি একেবারেই অবাস্তব। কারণ আমাদের বটম লাইন মানে যার নিচে যেতে পারব না তা হল, অন্য দেশকে নিজ দেশে পণ্য রফতানি করতে না দেয়ার অর্থ বুঝতে হবে! এর সোজা মানে এতে নিজেও অন্য কোনো দেশে রফতানি করতে না পারা। কারণ, আমি কাউকে আমার দেশে আমদানি করতে না দিলে সেও তার দেশে আমাকে রফতানি করতে দেবে না। অর্থাৎ একারণে তাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থা হল, আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য-বিনিময়ের আমদানি-রফতানি চালিয়ে যাওয়া। আর এটি শখ নয়, প্রত্যেক রাষ্ট্রই এটি করতে বাধ্য। কারণ, অন্তত আমাদের শিল্পের কাঁচামাল ও মেশিনপত্র ইত্যাদি তো আমদানি করতে হবেই। আর সেগুলোই অন্য রাষ্ট্রের রফতানি পণ্য। একটি ছোট্ট উদাহরণ দেয়া যায়- আসলে আমাদের জন্য ‘বাজার সংরক্ষণ’ বলতে এর অর্থ ও পরিণাম কী- এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হবে গার্মেন্ট রফতানি বন্ধ হয়ে যাওয়া। অনেকটা আশির দশকের আগের বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ফিরে যাওয়ার মত। আমরা নিজ বাজার সংরক্ষণ করে কাউকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানি করতে না দিলে সেসব রাষ্ট্রও নিজ দেশে বাংলাদেশী পণ্য রফতানি করতে দেবে না। সেটাই স্বাভাবিক।

তবে একালে  ‘গ্লোবালাইজেশন’ শব্দটার বিপরীত হিসাবে ‘বাজার সংরক্ষণের’ কথাটা এসেছে । গ্লোবালাইজেশনের মূলনেতা আমেরিকা নিজেই এখন ট্রাম্পের আমলে এসে ‘বাজার সংরক্ষণবাদী’ হতে চাচ্ছে। এই গ্লোবালাইজেশনের দুনিয়ার বয়স বেশি নয়, ত্রিশের বেশি বা চল্লিশের কম বছর। বইয়ের ভাষায় আইডিয়া অর্থে গ্লোবালাইজেশন মানে হল, কোনো পণ্য সবচেয়ে দক্ষ (কম শ্রমে) আর ভালো মানের যারা বানাতে পারবে (ফলে কম দামে) সেসব রাষ্ট্র হবে ঐসব পণ্যের রফতানিকারণ,  আর বাদ বাকি সব রাষ্ট্র এদের পণ্য কিনবে।

এতে সবাইকেই কোন না কোন পণ্য উৎপাদনে দক্ষ ওস্তাদ হতে হবে আর সেই ওস্তাদি দেখিয়ে  গ্লোবাল বাজার নিজ নিজ শেয়ার বাড়িয়ে দখলে নিতে হবে। এতে সবার সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে – অদক্ষতা, খারাপ মানের পণ্যের দায় থেকে সবাই মুক্তি পাবে। আর নিজেও কোনো না কোনো পণ্য উৎপাদনের উচু দক্ষতার গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড মানে পৌঁছাতে পারবে। সবাইকেই কোনো না কোনো কিছুর মাথা হতে পারতে হবে। হাতির মাথা হতে না পারলে অন্তত মুরগির মাথা হতে হবে। তেমন মাথা হতে পারতে হবে। তবে আগেই বলেছি, এটা আইডিয়াল কথা। কারণ, বাস্তব সব রাষ্ট্রের অন্যের উপর চাপ সৃষ্টি বা প্রভাব সৃষ্টির ক্ষমতা বা ক্ষমতা দেখানোর ক্ষমতা সমান নয়। বাস্তব দুনিয়াটা আইডিয়ালও নয়। জিএসপির নামে আমেরিকা আমাদেরকে তার বাজারে প্রবেশে আটকে রাখতে পারে, অথচ আমরা কোনো আমেরিকান পণ্যের আমাদের দেশে প্রবেশের বাধা দিতে পারি না। এটা বাস্তবতা। ফলে ঠিক বাজার নয়, রাষ্ট্রক্ষমতা পরিস্থিতি বাজারকে নিজের নিজের পক্ষে নিয়ে যায়। এবার তত্ত্ব কথা শেষে বাস্তব অবস্থায় যাই।

ট্রাম্প গত ২২ মার্চ, ইস্পাত (২৫% হারে) ও অ্যালুমিনিয়াম (১০% হারে) এই দুই চীনা পণ্যের ওপর  মোট ষাট বিলিয়ন ডলার বাড়তি ট্যারিফ আরোপ করার ঘোষণা দেন। তিনি ট্যারিফ ছাড়াও আর দু’টি, মোট তিনটি শাস্তিমূলক পদক্ষেপের কথা বলেন। দ্বিতীয়টা হল আমেরিকায় ‘চীনা কোম্পানির ওপর বিনিয়োগসীমা’ আরোপ করা আর তৃতীয়টা হল, ডব্লিউটিওতে চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার নালিশি মামলা করা। এর পাল্টা চীনা প্রতিক্রিয়ায় হয় অবশ্য খুবই কড়া ও খারাপ। আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন “কেউ কঠোর হলে আমরাও কঠোর হয়েই খেলব”।

তবে প্রথম কথা হল, ভাবা হয় বটে কিন্তু ‘বাড়তি ট্যারিফ আরোপ’ খুব সুবিধার জিনিস না। কারণ শেষ বিচারে এখন আমেরিকান ভোক্তাদেরকেই এই বাড়তি ট্যারিফের অর্থ অপ্রয়োজনে শোধ করতে হবে। ভোক্তাদেরকে ঐ দুই পণ্য ব্যবহার করতে অতিরিক্ত যাট বিলিয়ন ডলার গুনতে হবে। এতে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজার এলোমেলো ও ছোট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। এ নিয়ে আমেরিকায় এ পর্যন্ত যতগুলো স্টাডি রিপোর্ট বের হয়েছে কোনোটাই ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক বলেনি। লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট বলছে, সম্ভবত চীন আমেরিকান কৃষিপণ্যের ওপর বিশেষ করে আমেরিকান সয়াবিনের ওপর পাল্টা প্রতিশোধের ট্যারিফ আরোপ করবে। ফলে ইকোনমিস্ট মনে করে ‘চীনের পাল্টাব্যবস্থার কারণে বরং বাজার পরিস্থিতি আরো খারাপ জায়গায় চলে যেতে পারে। এভাবে ‘পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপ এটাই বাণিজ্যযুদ্ধের ক্ষতিকারক লজিক’। [What would make matters much worse is Chinese retaliation. ] তবে ট্রাম্পের ঘোষণায়, বাজারে কাঁপাকাঁপি সত্যি সত্যি লেগেছে। দুনিয়াজুড়ে স্টক শেয়ারবাজার উথালপাতাল হয়ে গেছে। বাজার শেষে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা দেখে কিছু নিশ্চয়তা না দেখলে যা থিতু হবে না।

কিন্তু মজার বিষয় নিউ ইয়র্ক টাইমস, ইকোনমিস্টসহ থিংকট্যাংকগুলোর ভাষ্য যা প্রকাশিত হয়েছে তাতে কোথাও এই বাণিজ্যযুদ্ধ প্রকৃত যুদ্ধের দিকে চলে যেতে পারে এমন ইঙ্গিত এখনো দেয়া হয়নি কোথাও। তা সত্ত্বেও ভারতীয় মিডিয়ার ভাষ্যগুলোতে তারা যেন এই লড়াই বহুদূর যাবে, চাই কী আমেরিকান গ্লোবাল আধিপত্য যেন এই যুদ্ধের মধ্যে শেষ হবে এই জায়গা থেকে পরিস্থিতিকে দেখতে চাইছে। অন্তত মোদী  সরকার ও ভারতীয় মিডিয়া যেন নিশ্চিত হয়ে গেছে ট্রাম্পের আমেরিকা থেকে তাদের কিছু আর পাওয়ার নেই। অথচ আমাদের নিশ্চয় মনে আছে, এই ট্রাম্পের  নির্বাচনের জয়লাভের পর থেকে মোদী ও বিজেপির কর্মীরা আক্ষরিকভাবেই ট্রাম্পকে পূজা করেছে। কারণ, ট্রাম্প ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলমান ব্যাসিং দিয়ে তার প্রেসিডেন্টশিপ শুরু করেছিল। অথচ এখন লক্ষ করা যাচ্ছে, অনানুষ্ঠানিকভাবে (মানে কোনো ঘোষণা না দিয়ে) এবং বাস্তবত ভারত -আমেরিকার সম্পর্ক আপাতত শেষ।
এক কথায় বললে ভারত মেরু বদল করে ফেলেছে। আমেরিকা-ভরসার ভারত এখন চীনা বন্ধুত্বপ্রেমী ভারত হয়ে উঠতে চাইছে।

মূল কারণ, ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে যেমন ব্যবস্থা করেছে তেমনি তিনি দাবি করেছেন যে ভারত আমেরিকায় তার রফতানি খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। যাতে সে আমেরিকার নিজের পণ্যের চেয়ে নিজ পণ্য সস্তা হয় বলে বাজার পায়। এই অভিযোগে ট্রাম্প ডব্লিউটিও তে ফরমাল নালিশ করেছেন। ইতোমধ্যে আমেরিকার বাণিজ্যস্বার্থ দেখার প্রতিনিধি (USTR), রবার্ট লাইটহাইজার কংগ্রেসের শুনানিতে বলেছেন, তিনি আশঙ্কা করেন যে ভারত সম্ভবত পাল্টা (ট্যারিফ বসানো ধরনের) প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে।

তাই অনেক আগে থেকেওই মোদী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন।  গত মাসে ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি ভারতের নতুন পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলে চীন সফরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই নতুন এই পরিবর্তনের সূত্রপাত। হিন্দুস্তান টাইমস শিরোনামে বলেছে, এটা এক “low-key visit”  বা চুপচাপ সফর। এই ‘চুপচাপের’ অর্থ বুঝা যাবে যদি আমরা মনে রাখি যে গত চার বছর ধরে আমেরিকার “চীন ঠেকাও” খেদমতে লেগে থাকা ভারত চীনের বিরুদ্ধে সব সময় এই না সেই করে ফেলবে বলে এক উগ্র-জাতিবাদী মিডিয়া হম্বিতম্বি জারি রাখত। সেই হইচইয়ের বিপরীতে গোখলের এই সফর আসলেই ‘চুপচাপ’ সফর। আর ওই সফরের শেষে বহু কিছু পরিবর্তন হয়ে যায়। ভারতীয় বিদেশ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতি প্রকাশিত হয়। সেখানে বলা হয়েছে, উভয়পক্ষ এক সক্রিয় ‘ডায়লগ মেকানিজম’ খাড়া করার জন্য কাজ করবে। তারা উভয়পক্ষ তাদের যেসব অবস্থান ভিন্নতাগুলো আছে সেগুলোকে খুবই “সংবেদনশীলতার সাথে ও পারস্পরিক সম্মানের দিকে খেয়াল রেখে ঐকমত্যের অবস্থান গড়ে তোলার জন্য কাজ করবে”। এ ব্যাপারে হিন্দুস্তান টাইমসের ভাষ্য হল, শেষের এই কথাগুলো বলা হয়েছে, মালদ্বীপ নিয়ে চীন-ভারতের অবস্থানের ভিন্নতার দিকে তাকিয়ে। লিখেছে [Wang told the Indian foreign secretary in an apparent reference to a host of sensitive issues between India and China, including the current political crisis in the Maldives.]

তার মানে, ভারতের সাথে ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের মোকাবেলাটা ভারত ‘চীনের সাথে মিলে বা কাছে থেকে’ করতে চায়।  ভারত-চীন সম্পর্কের এমন নতুন সুবাতাস বইতেছে। এই মূল ম্যাসেজ ভারত আর লুকোছাপা না করে চার দিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। এ ধরনের আরো অনেক যা অগ্রগতি হয়েছে সেগুলো নিয়েও কথা বলা যায়; কিন্তু সেগুলোর একটা বললেই এখানে বাকি সবকিছু বলা হয়ে যাবে। যেমন, লাগাতার গত তিন বছর ধরে মোদি ও তার উপদেষ্টা দোভাল মিলে আমেরিকাকে খুশি করতে চীনের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়েছে, নিজ জঙ্গণকে উগ্র জাতীবাদীতায় তাতিয়ে গিয়েছে। আর  সেকাজে চীনকে কঠিন-সময় উপহার দিতে সবচেয়ে ভাল হাতিয়ার হিসাবে  তিব্বতের দালাইলামাকে নিয়ে প্রতি বছরে কয়েকটা করে অনুষ্ঠান করে গিয়েছিল। আর ভারতের মন্ত্রী আমলারা সব সময় ঘনিষ্ঠভাবে তাতে সম্পৃক্ত থেকেছে। বলা ভালো, এমন কোনো অনুষ্ঠান করা বাদ রাখেনি যাতে চীন খুবই অসন্তুষ্ট হয়। কিন্তু তাতে এবার এক বিরাট ছেদ পড়েছে। মোদি সরকার ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখছে, বিজয় গোখলের চীন সফরে যাওয়ার আগের দিন মোদীর ক্যাবিনেট সচিব পি এন সিনহাকে গোখলে এক নোট পাঠিয়েছিলেন। চার দিন পরে সেই নোটের ভিত্তিতে  সিনহা এক গোপন সার্কুলার ছাড়েন যাতে তিনি অ্যাড্রেস করেছিলেন – ‘সিনিয়র লিডারেরা’ ও ‘সরকারি ফাংশনারিজ’ বলে। সেখানে নির্দেশ দেয়া হয় আপনারা কেউ দালাইলামার কোন তৎপরতার সাথে যোগাযোগ সম্পর্ক রাখবেন না, অংশ নিবেন না, এটা ‘কাম্য নয়’। এই পরামর্শ মেনে চলবেন।

অর্থাৎ মোদি সরকার ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। বুঝা গেল ভারত আগের আমেরিকার মন জোগানোর মতো করে এখন চীনেরও মন জোগানোর চেষ্টায় রত হয়েছে। আসলে ভারত এখন জেনে গেছে চীন কী সে সেনসেটিভ! আর চীনের সেনসিটিভিটি নিয়ে ভারত আসলেই সিরিয়াস মনোযোগী!

ওদিকে সুবীর ভৌমিক ঘর পোড়ার মধ্যে আলু পোড়া দিয়ে খেতে চাইছেন। তিনি লিখছেন, “ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেওয়ায় প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের প্রয়োজন ভারতের বিশাল বাজারের। তবে চীন যদি তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করতে চায়, তবে তা দিল্লিকে ভূ-রাজনৈতিক সুবিধা দেবে”।

সুবীর আরও জানাচ্ছেন, “বিরোধী কংগ্রেস দলীয় আইনপ্রণেতা ও ভারতীয় পার্লামেন্টারি স্থায়ী কমিটির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির প্রধান শশী থারুর বলেছেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা উভয় দেশকেই ভারতের দিকে ধাবিত করবে”।  অর্থাৎ কংগ্রেসের শশীথারুরও অনুমান, চীন এখন নানান বাণিজ্য সুবিধার ডালি নিয়ে ভারতের দিকে আসবে। মোদি সম্ভাব্য সেসব সুবিধা খেতেই দালাইলামাকে বলিতে চড়িয়ে দিয়েছেন, মনে হচ্ছে!

সর্বশেষ আরও আছে। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রী এখন ভারত সফরে। ভারতে চীনের রপ্তানি ৬০ বিলিয়ন ডলারের আর ভারতের চীনে রপ্তানি মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলার। তাদের মূল আলোচ্য বিষয় বাণিজ্য ঘাটতি। চীনা বাণিজ্য মন্ত্রী Zhong Shan নিজেই বলছেন, এই বাণিজ্য ঘাটতি ফেলে রাখা যাবে না, এড্রেস করতে হবে। [Trade deficit with India unsustainable, needs to be addressed: China]। ফলে ভারত থেকে মূলত কৃষিপণ্য যেমন রাইসরিষা, তেলবীজ, বাসমতি বা নন-বাসমতি চাল ও চিনি রপ্তানি বিষয়ে কথা চলছে। ব্যাপারটা আমাদের মনযোগ দিয়ে বুঝবার দরকার আছে। ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য ঘাটতিও বিরাট। ফলে এই যুক্তিগুলো আমাদের কাজে লাগতে পারে।

তবে সারকথা হল, ভারতের প্রিয়তম কে হবে ! ভারত আপাতত সে জায়গা উঠিয়ে নিয়ে এসেছে চীনকে – তা পরিস্কার ভাবে বলে যায়। এর ছাপ প্রভাব বাংলাদেশে কী পড়বে তা বুঝবার আছে। কিন্তু আগে বাংলাদেশে ভারতীয় প্রভাবের অর্থ ও দাবি যেটা ছিল যে,   বাংলাদেশ চীনা বিনিয়োগ নিতে পারবে না ও বেল্ট-রোড উদ্যোগে অংশ নিতে পারবে না  – এর হাল এখন কী হবে? এখনও পর্যন্ত এটা যা ছিল তাই, ভিন্নতার কোন তথ্য নাই। খুব সম্ভবত চীন-ভারত নতুন মাত্রার সম্পর্কের পরেও এটা “এর বাইরের ইস্যু” হিসাবেই  আগের মত অবস্থায় থেকে যাবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ মার্চ ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে পোল বদল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

গৌতম দাস
১৯ ডিসেম্বর ২০১৭, রবিবার, ০০:২১

https://wp.me/p1sCvy-2oW

 

অবশেষে এখন এ’কথা বলা যায় যে, নেপাল এখন নিজ রাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কায়েম করতে পেরেছে এবং তা এগিয়ে যেতে পারবে। নেপালের প্রধান তিন দলের মধ্যকার দুটোই কমিউনিস্ট পার্টি। দুই কমিউনিস্ট পার্টি এবারের নির্বাচনে এক কমিউনিস্ট  জোট (‘লেফট অ্যালায়েন্স’) গড়ে নির্বাচনে লড়ে জিতেছে। অ্যালায়েন্স গঠনের ঘোষণা দেয়ার সময় এক কমিউনিস্ট, মাওবাদী দলের চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহাল বলেছিলেন, এই অ্যালায়েন্স তাঁরা করছেন নেপালের রাজনীতিকে স্থিতিশীলতা দেয়ার জন্য, স্থিতিশীল সরকার দেয়ার জন্য [grand Left alliance will “end Nepal’s elongated political instability” ]। নেপাল গত ৯ বছরে বিপুল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ভেতর দিয়ে গেছে। এখন দাহালের আকাঙ্খা ও অনুমান সঠিক প্রমাণ হল। নেপালের এই নির্বাচনে কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স সংসদে ৭১ শতাংশের মতো আসন লাভ করেছে।

গত ১৯৯৬ সাল থেকে যদি ধরি, সশস্ত্র রাজনৈতিক লাইনে চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহালের ‘মাওবাদী সেন্টার’ দল অথবা CPN (Maoist Centre)  প্রথম যখন রাজতন্ত্র উৎখাত ও ক্ষমতা দখলের লড়াই ঘোষণা দিয়ে শুরু করেছিল। সেই থেকে হিসাব কষতে বসলে গত ২০ বছরের বেশি সময়, এটা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে অবশ্যই নেপালের জনগণের এক বিরাট লম্বা পথপরিক্রমা। আর কে না জানে লক্ষ্যে পৌঁছানোতে পথ যত লম্বা হয়ে যায়, ততই সেখানে আরো বেশি অনিশ্চয়তা হাজির হয়ে যায়, আর তা বিপজ্জনক হয়। তবুও আজ প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম শেষে এক কথায় বললে নেপালের সাফল্য অনেক। আর এতে অন্তত তিনটি বড় অর্জন আছে।

এক. শত বছরেরও বেশি পুরনো নেপালি রাজতন্ত্রের শাসনকে উৎখাত ও অবসান ঘটানো। দুই. দুইবারের চেষ্টায় অনিশ্চয়তার সাত বছরের শেষে নেপালকে সর্বপ্রথম একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ রাজতান্ত্রিকতার বিপরীতে রিপাবলিক বা লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন সফল হয়। কনস্টিটিউশন রচনার কাজ সফলভাবে সমাপ্ত করা এবং এই কাজ শেষে প্রথম কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন – ২০১৫ ঘোষণা দিতে নেপাল সফল হয়। আর তিন. নতুন কনস্টিটিউশনের অধীনে প্রথমবার সাধারণ নির্বাচন বা সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। শুধু তাই নয়, ভোটের ফলাফলে নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের কিছু কম (গণনার প্রাথমিক পর্যায়ের ১৬৫ আসনের মধ্যে ৮০ আসন) পেয়েছে। এই দল হল, চেয়ারম্যান খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির কমিউনিস্ট পার্টি (CPN-UML)  । আর এরা অপর কমিউনিস্ট ‘মাওবাদী সেন্টার’ দলের সাথে মিলে প্রায় ৭১ শতাংশ আসন পেয়েছে। অর্থাৎ এই তৃতীয় অর্জন সম্পর্কে বলা যায়, এখন সহজেই একটি স্থিতিশীল সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির নেতৃত্বে নেপাল এক নতুন ও স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবে।

প্রায় ২০ বছর পরের নেপাল এই প্রথম স্থিতিশীলভাবেই পূর্ণ সময়কালের সরকার কায়েম করতে পারবে, আর সেই সরকার দৃঢ়তার সাথে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবে। এর পিছনের প্রধান কারণ হল, অপর কমিউনিস্ট পার্টি  ‘মাওবাদী সেন্টার’-এর সাথে ইতোমধ্যে গত অক্টোবরে এরা যে জোটটা গঠন করেছে, সেটা শুধু কোনো নির্বাচনী জোট নয়,  বরং একটা এক দলে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটা জোট। [The two parties also said they would work for their formal merger……]।   ফলে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঘাটতি মিটানো নয়, সরকারের নানান রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নীতি সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মতের অমিলগুলো সামলে এক সিদ্ধান্ত পৌছানোর সুযোগ এখানে বেশি থাকবে। এই নির্বাচনে মাওবাদীরা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনপ্রাপ্ত দল (১৬৫ আসনের মধ্যে ৩৬ আসন), আর তৃতীয় নেপালি কংগ্রেস (১৬৫ আসনের মধ্যে ২৩ আসন)। তবে নতুন গঠিত এই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্সে আরো একটা দল আছে। সেটা বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি পার্টি, এই দলের একা তিনি জিতেছেন। তিনি আসলে ছিলেন মাওবাদী দলের সাবেক দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা, রাজতন্ত্রের পরাজয়ের পর ২০১১ সালের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন, পরে দল ছেড়ে বের হয়ে যান। এখন জোটে ফিরে আসলেন। প্রথম কনষ্টিটিউশন গঠনকালীন সরকারের (২০০৮-২০১১) সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সরকার গঠন করে ছিল মাওবাদীরা। ফলে ঐ সময়ে ভারতের সাথে স্বার্থ বিরোধের বিষয়গুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংঘাতের মুখোমুখি হওয়া ও চাপ সামলানোর বিপদের ঝড়ঝাপ্টা গুলো সবচেয়ে তাদের উপর দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয়দের চাপের মুখে তা মোকাবিলা করতে গিয়ে বাবুরাম  “ভারতীয়দের সাথে পারা যাবে না” ফলে “নরম পথে আগাতে হবে” ধরণের অবস্থানের কারণে দাহালের সাথে বিরোধে, শেষে দল থেকে বিচ্ছিন্নই হয়ে যান। পরে আলাদা দল করেন, তিনি এবার জোটে ফিরে এসেছেন। তাহলে অল্পকথায় তিনটি গুরুত্বপুর্ণ অর্জন হলঃ রাজতন্ত্রের উৎখাত, নতুন লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা আর শেষে এক স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার গঠন পথে এসে পৌছানো।

নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো তিন স্তর বিশিষ্ট – ফেডারল (কেন্দ্র), প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকার – এভাবে এবং এভাবেই নতুন কনস্টিটিউশন অনুসারে গঠিত। বিশেষ দিকটা হল, তিন স্তরের নির্বাচন এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা এক বিরাট সাফল্য। কারণ গত বছরের এই সময়েও নেপালের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এত চরম অবস্থায় ছিল যে, এক বছর পরে সরকারের আয়ু শেষ হবার পরে এই সময়ে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অর্জন আজ এই উচ্চতায় উঠবে তা তখন বিশ্বাস করা যেত না।

আচ্ছা, গত ২০ বছরের পথপরিক্রমায় কারা নেপালের গণস্বার্থের দিক থেকে বিচারে এর রাজনীতিক-ভিলেন ছিল? এই প্রশ্নের জবাব হবে, ২০০৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বভাবতই সেই ভিলেন, তিনি ছিলেন নেপালের রাজা জ্ঞানেন্দ্র। তবে এরপর রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে  পাল্টা মাওবাদীসহ নেপালের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নিয়ে জোট বাঁধা ও এর উপরে ভারত ও আমেরিকার সমর্থন আনা ইত্যাদি – এই ঘটনাগুলো ঘটার সময় নির্ধারক ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল ভারত। হ্যা, ইতিবাচক। তা সত্ত্বেও নতুন সরকারের আমলে কনস্টিটিউশন গঠনের কাল থেকে ক্রমেই ভারত নেতিবাচক বিরাট ভিলেনের ভূমিকায় হাজির হতে থাকে। সেই থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বাজে এক ভিলেন হয়ে আছে ভারত। গানের ভাষায় বললে- ‘ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়’। ভারত চাইতেই জানে না। নেপালের কাছে ‘কিভাবে’ আর ‘কী’ চাইতে হয় – কী চাওয়া যায় না – তা জানে না। নেহরুর হাতে ভিত্তি পাওয়া ও গড়া স্বাধীন ভারত, আর এ থেকে সবচেয়ে বাজে ও ভুল শিক্ষা পাওয়া আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভারত, এরাই মূলত সেই ভিলেন। নেহরু ভেবেছিলেন কলোনি-উত্তর স্বাধীন ভারত, একালে ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া সুবিধাগুলো তিনি ব্রিটিশদের মতই নিজেও ব্যবহার করবেন। এটা তার প্রিরোগেটিভ (prerogative) বা পড়ে পাওয়া চারআনা বিশেষ সুবিধা, প্রাধিকার। তিনি বুঝতেই পারেননি যে, এর অর্থ হল, তাতে ভারত এক কলোনিয়াল ক্ষমতা বলে আগাম কল্পনা করে নিতে হবে বা করা হয়ে যায়। এর চেয়েও আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিক। তিনি সে সময়কে মানে এর তাতপর্যকেও বুঝতে পারেন নাই। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যে নতুন দুনিয়া গড়ে তোলা হচ্ছিল, সেটা আর যুদ্ধের আগের মত কলোনি-শাসিত দুনিয়া নয়, কোনো ইউরোপীয় কলোনি-শাসকের দুনিয়া নয়। বরং এক বিরাট ভিন্নতায় আমেরিকার  নেতৃত্বের এক নতুন দুনিয়া। মৌলিকভাবে এটা বরং খোদ পুরনো কলোনি-অর্থনৈতিক-সম্পর্কেরই অবসান। আর আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের-অর্থনীতিক-সম্পর্কের দুনিয়া। কলোনি শাসনমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ আমেরিকার গড়ে তোলা এটা নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি সম্পর্কের দুনিয়া। যেখানে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক জাতিসংঘ ও বিশ্ববাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান – ইত্যাদির মত বহুরাষ্ট্রীয় (মাল্টিলেটারাল) প্রতিষ্ঠান এবারের নতুন দুনিয়ায় আছে।

মূল কথায় এখানে অপর রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব ও সম্পর্ক রাখা এবং সুবিধা নেয়া ও কিছু দেয়ার তরিকাই আলাদা। এখানে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিনিময় সম্পর্ক আর পুরান কলোনিয়াল একেবারেই নয়, বরং আলাদা। নেহরু এর খবর নেন নাই বা রাখেননি। এ কথার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, নেহরুর করা ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’। যেটা আসলে এর আগে ব্রিটিশদের করা ‘নেপাল-ব্রিটেন চুক্তি ১৯২৩’ এর কার্বন কপি। এই চুক্তি থেকে এটা পরিষ্কার, নেহেরু ভারতকে কলোনি-শাসকের ভূমিকায় নামিয়েছিলেন, দেখেছিলেন। আগে ব্রিটিশ কলোনির এক ভেসেল রাষ্ট্র বা করদরাজ্য ছিল নেপাল। ব্রিটিশদের নেপালকে সরাসরি কলোনি না করে ভেসেল রাষ্ট্র করে সুবিধা দেয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। পরবর্তিতে যোগ হওয়া নতুন এক কারণ হল, সিপাহী বিদ্রোহ কালে নেপালের রাজাদের বৃটিশের পক্ষে গোর্খা সৈন্য নিয়ে অবস্থান নেওয়া। এই বিদ্রোহের আগে পুরো নেপাল ব্রিটিশরা দখলে নিয়েছিল। কিন্তু সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশদের পক্ষ নেয়াতে বিদ্রোহ পরাজিত করার শেষে এই ভেসেল রাষ্ট্রের জন্ম আরও পাকাপোক্ত হয়। তাই নেপাল-ব্রিটেন এর মধ্যে আগের অনেক চুক্তি ছিল, আমরা জানতে পাই। বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশরা তাতে নতুন নতুন অনেক ছাড় যোগ করেছিল। এমন সর্বশেষের চুক্তিটিই হল, ১৯২৩ সালের চুক্তি। কিন্তু নেপালের ল্যান্ডলকড অবস্থার সুযোগ নিয়ে, পুরান সেই চুক্তি অনুসরণ বা অনুকরণ করে একই দাসত্ব চুক্তি করেছিল নেহরুর ‘রিপাবলিক ভারত’। ওই চুক্তিটিই এখনো বহাল আছে। প্রশ্নটা আসলে, একালে কারও দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে দাস বানানোর সুযোগ পেলেও আপনি তা নেবেন কি না? নেহরু সেটা দাবির সাথে নিয়ে নিয়েছিলেন। কারণ নেহরুর মৌলিক আগাম অনুমান হল, “স্বাধীন ভারত সেটা বৃটিশ কলোনি ভারতেরই উত্তরসুরি ও ধারাবাহিকতা”। অর্থাৎ ভারত নিজে স্বাধীন তবে এটা এখন নিজেই এক কলোনি শাসক। ফলে কন্টিনিউয়েশন বা ধারাবাহিকতা।  তাই, এই কলোনি ওরিয়েন্টেশনে বা ধাঁচে নিজ নতুন আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভিত গড়েছিলেন নেহেরু। নেহেরুর সেট করে দেওয়া ‘সেই ট্রাডিশন’ এখনও চলছে।

গত অক্টোবরে কমিউনিস্টদের লেফট অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর তাদের যৌথ নির্বাচনী ম্যানুফেস্টো প্রকাশিত হয়। জাপান থেকে প্রকাশিত ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন ১ ডিসেম্বর বলছে, ঐ ম্যানুফেস্টোতে বলা হয়েছে – লেফট অ্যালায়েন্স নির্বাচনে জিতলে পরে তাদের দ্বারা গঠিত অ্যালায়েন্স সরকার এরপর ‘ইন্ডিয়া-নেপাল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি-১৯৫০’ বাতিল করবে এবং একটা নতুন চুক্তি করবে। এখন নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ওই আকাঙ্খা মত অ্যালায়েন্সের পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল এসেছে। ফলে এখন স্বভাবতই ঐ চুক্তি বাতিলের প্রসঙ্গ উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভারতের সাথে সংঘাতে আর এক পর্ব শুরু হবে, আর এক খাতা খোলা হবে।

এই নির্বাচনের শুরু থেকে নয়াদিল্লি খুবই অস্বস্তিতে ছিল। আর ফল প্রকাশের পর সেটা আরো বেশি হয়ে এখন উলটা অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে। এমনিতেই গত অক্টোবরে নেপালের দুই কমিউনিস্ট পার্টির অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর থেকে নয়াদিল্লি আসন্ন নির্বাচনে নিজের জন্য নানান বিপদ আসন্ন বলে আঁচ করতে শুরু করেছিল। যেমন সুবীর ভৌমিকের নেপালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ‘সাউথ এশিয়ান মনিটর’ অনলাইনে তার লেখা দিয়েছেন। সেই লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘নেপালের নির্বাচনকে ভারতের নিজের পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত!’  তবে সুবীরের এবারের লেখাটি ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে সান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে লেখা। তাই সম্ভবত ভারতের অনেক ভুলত্রুটি এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ভারতকে আমল না করে ২০১৫ সালের অক্টোবরে নেপালের কনস্টিটিউশন ঘোষণা করে দেওয়াতে টানা ছয় মাস ল্যান্ডলক নেপালে সকল ‘পণ্য  আমদানি অবরোধ’ করে রেখেছিল নয়াদিল্লি। নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নার গ্যাস থেকে যানবাহনের জ্বালানিসহ সব কিছু ছয়মাস বন্ধ রাখলে গরীব মানুষের জীবনে এর প্রভাব কী হতে পারে তা অনুমেয়। তাই বলা বাহুল্য ভারতের দিক থেকে এটা কাউন্টার-প্রডাকটিভ হয়েছে।  প্রচ্ছন্নে সুবীরের লেখায় ভারতের সিদ্ধান্ত ভুল এটা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ঐ ঘটনাই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষকে ভারতের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও কঠোরভাবে বিমুখ করে তোলে, যার প্রভাব এখনো প্রবল।  আর খুব সম্ভবত, এসব ভোটারদেরই নিজের ব্যাগে তুলে নিতে পেরেছে,  চরম ভারত-বিরোধিতার লাইনের চেয়ারম্যান অলির কমিউনিস্ট দল। মোট ১৬৫ এর মধ্যে ৮০ আসন – এভাবে বিপুল সংখ্যার আসন পেয়েছে এই নির্বাচনে।ওদিকে সুবীর তাঁর লেখায়, আবার শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচন ও এর পরবর্তী পরিস্থিতির সাথে নয়াদিল্লি এখন নেপালকে তুলনা করে দেখছে সে খবর জানিয়েছে। শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে তাদের এখনকার মূল্যায়ন নাকি – শেষ বিচারে শ্রীলঙ্কায় সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও অন্যান্য ইস্যুতে চীনকে আসলে ঠেকানো যায়নি। নেপালেও গেল না। তাই সুবীর যেন শিরোনামে বলছেন, হতাশ হয়েন না 

শ্রীলঙ্কার মত নেপালের বেলায় কোন সমুদ্রবন্দর নির্মাণ তার ইস্যু ছিল না। শ্রীলঙ্কার হাম্মনটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ২০১০ সালে শেষ হবার পরও তা ভারত চালু না করতে দিয়ে পাঁচ বছর আটকে রাখতে পেরেছিল, নির্বাচন রাজনীতিতে, সরকার গঠনে হাত ঢুকিয়ে। কিন্তু শেষ বিচারে বন্দর চালু হওয়া ভারত ঠেকাতে পারে নাই। ভারত ঘেঁষা চলতি সরকারই চীনের সাথে সংশোধিত চুক্তি করে বন্দর চালু করে ফেলেছে। তাই ভারত এখন এটাকে নিজের হার মনে করে, সেকথাই সুবীর তুলে এনেছে। তুলনায় নেপালে বন্দর না হলেও চীনের সাথে বাঁধ নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের আড়াই বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প আছে বা ছিল। যে সরকারের অধীনে চলতি নির্বাচন সমাপ্ত হল সেটা নেপালি কংগ্রেস দলের। তবে তা মাওবাদী দলের সমর্থনে গড়া এক কোয়ালিশন সরকার। নেপালে পানিবিদ্যুতের প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুবীর বলছেন, এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় মাত্র ৭৫৩ মেগাওয়াটের মত। ২০১৫ সালের শেষে কমিউনিস্ট অলির সরকারের আমলে চীনের সাথে তিনি ১২০০ মেগাওয়াটের ঐ বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি করেছিলেন, সেটাই আড়াই বিলিয়ন ডলারের চুক্তির। কিন্তু চলতি নেপালের প্রথমপর্যায়ের নির্বাচন শুরুর কয়েক দিন মা্ত্র আগে গত নভেম্বরে নেপালি কংগ্রেস সরকার ঐ চুক্তি বাতিল করে দেয়। তাই আইনত সেই চুক্তি ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে। অজুহাত উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক টেন্ডার করা হয় নাই। এতে নেপালকে ঘিরে চীন-ভারত রেষারেষি আরো সরাসরি নির্বাচনে হাজির হয়ে পড়ে তখন থেকেই। স্বভাবতই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স এখন নির্বাচনে বিজয় লাভ করাতে ওই প্রকল্প ও চুক্তি আবার জীবিত হবে বলে সবাই অনুমান করছেন। মজার কথা হচ্ছে, সুবীর ভৌমিক ওই চুক্তি জীবিত করার পক্ষে কথা বলেছেন। বলছেন এটাই নেপালের স্বার্থ। এই প্রকল্প চীনের চীনের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে অংশ বলে ঘোষণা করা ছিল। এমনকি তা সত্ত্বেও চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হয়ে আরো অবকাঠামো প্রকল্প নেপালের আনার পক্ষে তিনি কথা বলছেন।

নয়াদিল্লি ঘোরতরভাবে চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পের বিরোধী। এটা ভারতের প্রকাশ্য বিদেশ নীতি ও অবস্থান। ভারতের কোনো ‘বন্ধু’ বা পড়শি রাষ্ট্র বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত থাকুক এটা দেখতে বা সহ্য করতে সে একেবারেই রাজি নয় (ফলে বাংলাদেশের সাথেও এটা এক অনৈক্যের বিরাট ইস্যু)। কিন্তু নেপালের বেলায় সুবীর বলতে চাইছেন, নেপালের এখন দরকার বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত খাতে প্রচুর বিনিয়োগ। না হলে নেপালের অর্থনীতি দাঁড়াবে না। ইতোমধ্যে সদ্যগঠিত নেপালে জয়লাভ করা কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স, আগামী ১০ বছরের মধ্যে নেপালকে মাথাপিছু পাঁচ হাজার ডলার আয়ের অর্থনীতির দেশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে চীনের মতই ভারতকেও নেপাল কিছু বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করতে দিয়েছিল ২০১৫ সালের শুরুর দিকে। কিন্তু আজও সেসব প্রকল্পের কোনো কাজই শুরু হয়নি বলে সুবীর জানাচ্ছেন। অর্থাৎ একদিকে ভারতের সক্ষমতা দক্ষতা সামর্থ্য নেই, অন্য দিকে চীনের আছে, সুবীর এই তুলনা আনছেন। আবার চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতার তুলনায় ভারত যে কিছুই না, সেটা শ্রীলঙ্কাতেও দেখা গেছে। ফলে সুবীর ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের কাছে ‘স্মার্ট হতে’ পরামর্শ রেখেছেন। আসলে সুবীরেরই খুবই স্মার্ট পরামর্শ এটা। কারণ তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলছেন, প্রশাসনের উচিত চীন-নেপালের বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাধা না দিয়ে বরং সহযোগিতা করা। পরামর্শ খুবই অ-ভারতীয় অথবা অ-চিরাচরিত ভারতীয় পরামর্শ। কিন্তু সেক্ষেত্রে সুবীর বুদ্ধি দিচ্ছেন, এইবার যে বাড়তি বিদ্যুৎ তৈরি হবে তা যেন ভারত কিনে নেয়। আর এইবার ইঙ্গিত দিয়েছেন ওই বিদ্যুৎ বাংলাদেশ বিক্রি করে দিবার টাউটারি নিতে, নগদ লাভ এখানেই। অর্থাৎ ভারত যে উতপাদন আয়োজনে অক্ষম তা স্বীকার করে নিয়ে সুবীর টাউটারিতে নামতে বলছেন, তাই কী? তবে টাউট মারচেন্ডাইজ (tout merchandise ) খারাপ ব্যবসা নয়, ভারত যেটুকু ভাল পারে। এখানে আমাদের জানা থাকা ভাল যে, ভারত নেপালকে এমন ‘কলোনি-চুক্তির’ মধ্যে রেখেছে যে, ভারতের অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে নেপাল নিজ উতপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে না।

তবে আমাদের মতো দেশের বেলায় পাল্টা আরেকটা কথা সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চীনের নেয়া অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে (যেমন বাংলাদেশেও) এক বিরাট কালো দাগ আছে। কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজার যাচাই, কোনো ওপেন টেন্ডার হয় না। শুধু তাই না প্রকল্পের কোনো টেন্ডার করতে যাতে না হয়, বালাই যেন না থাকে, টেন্ডার করার আইনি বাধ্যবাধকতা যাতে এড়ানো যায়; তাই প্রকল্পগুলো জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট)-এর অধীনে সম্পন্ন করার চুক্তি করা হয়। আর এতে টেন্ডার ডাকার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যায় বলে স্বভাবতই প্রকল্প মূল্যের কোনো মা-বাপ থাকে না। এ ছাড়া লোকাল এজেন্টের নামে অর্থ সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা বা সুযোগও থাকে। বিশ্বব্যাংকের অনেক বদনাম আছে বা ছিল। তা সত্ত্বেও তুলনায় বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প অন্তত কোনো ওপেন আন্তর্জাতিক টেন্ডার ছাড়া সেক্ষেত্রে কো্ন প্রকল্প নিতে দেয়না।  বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে এটুকু অগ্রগতি তাদের ঝুলিতে আছে। এমনকি জাপান সরকার দাতা হলেও জাপানি ঠিকাদারকেই কাজ দেয়ার কোনোই বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই নীতি কার্যকর করার সক্ষমতা তাদের আছে, ইতোমধ্যেই সেটা দেখিয়েছে। চীনের বিশ্বব্যাংক AIIB গঠনের প্রাক্কালে একে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাবি করাতে এর বিরুদ্ধে মোক্ষম এই অভিযোগই তুলেছিল আমেরিকা। যদিও আমেরিকা নিজের বিরাট স্বার্থক্ষুন্ন হওয়ার কারণে নিয়মিতভাবে AIIB গঠনের বিরোধিতা করে গেছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও আমেরিকান অভিযোগ মিথ্যা ছিল না, তা বাস্তব।

তবে সেটা যাই হোক, সুবীরের লেখায় এই প্রথম ভারতের অভ্যন্তরীণ আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে নিজেদের দুর্বলতা ও সক্ষমতা-দক্ষতা সামর্থের অযোগ্যতা বা ঘাটতির দিকে নজর ফেরাতে তাগিদ দিতে দেখা গেল। সুবীরের এই লেখা থেকে মনে করার কারণ আছে যে, ভারতের প্রশাসন বিপদে আছে বলে অন্তত কেউ কেউ মনে করছেন, এ নিয়ে টনক নড়ারও কেউ কেউ আছে। আসলে ভারত বিপদ দেখছে; একের পর এক ভারতের পড়শি রাষ্ট্রে চীন প্রকল্প নিয়ে ঢুকে পড়ছে, আর ভারতের কিছু করার থাকছে না। এটা না দেখতে পাবার কারণ নাই, তবে স্বীকার করতে দেখা যায় না। সুবির তাই পরিস্কার করেই বলছে, ভারত এখন শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও আসলে শেষে কিছু ঠেকানো যায়নি বলে তারা মনে করে। অর্থাৎ ভারতের বিদেশ নীতিতে করণীয় – “শ্রীলঙ্কা মডেল বলেও কিছু দাড়ালো না।

কিন্তু আসলেই ব্যাপারটি এমন হওয়ার কথা নয় কি? ভারতের যদি সক্ষমতা-দক্ষতা-সামর্থ্য না থাকে, আর তা থেকে সৃষ্ট নানা দুর্বলতা তাকে ঘিরে রাখে, তবে এমনই কি হওয়ার কথা নয়। আসলে প্রথম প্রশ্ন করা উচিত যে, ভারত কেন অর্থনৈতিক বা বৈষয়িক সক্ষমতার দিক থেকে নিজেকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য বলে বিবেচনা করছে? কিসের ভিত্তিতে?

দেখা যাচ্ছে, ভিত্তিহীন সব অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসন পড়শিদের উপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে আর ধপাধপ পড়ছে – শ্রীলঙ্কা আর এরপর নেপাল…। সুবীর ভৌমিকই বলছেন, শ্রীলঙ্কার পর নেপালেও নাকি নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কার ভূত দেখতে পাচ্ছে। [But again, the ghosts of Sri Lanka may return to haunt Delhi…] তা হলে? এরপর কোথায়?

পাঠকের জন্য একটা সতর্কতা দিয়ে শেষ করব। বাইরের মিডিয়ার মত দেশেরও অনেক মিডিয়া – নেপালে একটা কমিউনিস্ট এলায়েন্স তৈরি হয়েছে আর চীন (মানে সেটাও তো কমিনিস্ট) – এভাবে সব মিলিয়ে বিষয়টাকে “চীনপন্থী”, বা “কমিউনিস্ট” ঘটনা বলে ইঙ্গিত হাজির করার চেষ্টা করছে। এই অনুমান ইঙ্গিত শতভাগ ভুল, ভিত্তিহীন। যে চিন্তা কাঠামোতে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলা হচ্ছে তা কোল্ড ওয়ারের যুগের; যেন ষাটের দশকের দুনিয়ায় আমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছি – এই ভিত্তিহীন অনুমানে বলা কথা। আমরা এখন একুশ শতকে, সকল রাষ্ট্র যখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে পরস্পরের সাথে গভীর বিনিময় সম্পর্কে লেপ্টে গেছি ও আছি। সবচেয়ে বড় কথা এই লেপ্টে যাওয়া আর কখনও  কোল্ড ওয়ারের মত আগের যুগে ফেরত যাবে না। তাই পুরানা চিন্তা কাঠামো আর বাস্তবতায় পুরানি টার্ম ব্যবহার করে কথা বলা আর সঠিক নয়। তাই এই ঘটনা কোনভাবেই আর “নেপালি কমিউনিস্ট আর চীনের” কোন বামপন্থা ততপরতা একেবারেই নয়। যেমন আগামিতে নেপালে দুই কমিউনিস্টকেই বাদ দিয়ে নেপালি কংগ্রেসের সাথে চীনের ঘনিষ্ট হওয়া খুবই সম্ভব। আসলে একালে ‘বামপন্থা’ বা ‘ডানপন্থা’ বলে কোন কিছুকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা অর্থহীন।

আর একটা তথ্যঃ নেপালের কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য নির্বাচন শেষ হয় নাই। মোট আসন ২৭৫ যার মধ্যে ১৬৫ আসন আসবে সরাসরি প্রত্যেক আসনের ভোট কাউন্টে, একজনকে নির্বাচিত ঘোষণা করে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে প্রাপ্ত ১৬৫ আসনের ফলাফলের ভিত্তিতে।  আর বাকি ১১০ আসনের ফলাফল পুরণ হবে দলগুলোর আনুপাতিক ভোট প্রাপ্তি থেকে। অর্থাৎ সব আসন মিলিয়ে একটা দল মোট ভোটারের কত পার্শেন্ট ভোট পেয়েছে সে অনুপাতে এই ১১০ আসন ভাগ করে দেয়া হবে। অর্থাৎ কোন দল একটা আসনেও সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জিততে না পারে যদি, তাহলেও এবার আনুপাতিক ১১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার সুযোগ আছে।  আনুপাতিক ১১০ আসনের গণনা এটা ঘরে বসে গণনা করে কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে দিবে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে ১৬৫ আসনের ভিত্তিতে বলে আনুপাতিক আসন এরপর যোগ হলে আনুপাতিক ভাবেই সব দলের আসন বাড়বে, তাই তেমন কোন হরফের হবে না। এভাবে নেপালের (ফেডারেল) সংসদে মোট আসন বা সংসদ সদস্য ২৭৫ জনেরই নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ‘নেপালে নির্বাচনের ফলাফল : শ্রীলঙ্কার ভূত দেখছে নয়াদিল্লি’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নেপালের চলতি সাধারণ নির্বাচনের তাতপর্য

নেপালের চলতি সাধারণ নির্বাচনের তাতপর্য

গৌতম দাস
০৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহষ্পতিবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lW

 

নতুন করে রাষ্ট্রগড়া বা একটা মর্ডান রিপাবলিক গঠন কালে এর গঠনসভা, একে ইংরাজিতে কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি (Constituent Assembly) বলা হয়; বাংলাদেশের বেলায় ১৯৭২ সালে ধারণাটাকে বাংলায়  “গণপরিষদ” – এই বাংলাটা নেয়া হয়েছিল। আম-ধারণা হিসাবে নির্বাচন বলতে বা ‘ভোট আসছে’ বলে আমরা যা বুঝি ও বুঝাই সেটাই “সাধারণ নির্বাচন”। আবার কোন নতুন রাষ্ট্র গঠনসভারও সদস্য কারা কিভাবে নির্বাচিত হবেন এর জন্যও একটা নির্বাচন হয়। তবে সেটাকে “সাধারণ নির্বাচন” নয় বরং একে “গঠনসভার সদস্য নির্বাচন” বলে। যদিও বাইরে থেকে দেখতে সেটা সাধারণ নির্বাচনের মতই মনে হতে পারে।

‘গঠনসভার নির্বাচন’ আর ‘সাধারণ নির্বাচন’ এর মধ্যে মৌলিক ফারাক হল –  উদ্দেশ্য। ‘গঠনসভার নির্বাচন’ এর উদ্দেশ্য হল ওখানে ঐ নির্বাচিত কমিটি একটা কনষ্টিটিউশন রচনা করতে বসে, সেকাজ শেষ হলে নিজেরা  অনুমোদন দেয়। পরে এক গণভোটে তা পাশ করিয়ে আনে। আর ফাইনালি  ‘নতুন কনষ্টিটিউশন চালু হল’ বলে এক প্রোক্লেমশন বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। মূলত এই কাজটাকেই আরেক ভাষায় বলে ‘রাষ্ট্রগঠন সম্পন্ন’ হল। আর গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হল ‘রাষ্ট্রগঠন সম্পন্ন’ হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরে নির্বাচিত ঐ গঠনসভার অস্তিত্ব ঐ পর্যন্তই, এরপরে সে নিজে নিজেই আপনাতেই ভেঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ধরা হয়। এইবার রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে গঠিত নতুন কনষ্টিটিউশন মোতাবেক। যার প্রথম পদক্ষেপ হল, কনষ্টিটিউশনে যেভাবে লেখা আছে সে মোতাবেক  কারা জাতীয় সংসদের সদস্য হবেন নির্বাচন কমিশন এর নির্বাচন আয়োজন করতে থাকে, প্রতি পাঁচ বছর পরপর। এই নির্বাচনকে ‘সাধারণ নির্বাচন’ বলা হয়। মনে রাখতে হবে “সাধারণ নির্বাচন” ঘটার ক্ষেত্রে সবসময় আগে থেকে একটা অনুমোদিত কনষ্টিটিউশন  থাকে আর সে মোতাবেক ঐ সাধারণ নির্বাচন আয়োজিত হয়ে থাকে।  ‘গঠনসভার নির্বাচন’ এর উদ্দেশ্য একটা কনষ্টিটিউশন লেখা আর এই নির্বাচন একবারই হয়; বিপরীতে সাধারণ নির্বাচনের বেলায় আগে থেকে থাকা একটা অনুমোদিত কনষ্টিটিউশন মোতাবেক সাধারণ নির্বাচন প্রতি পাঁচ বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়।

তবে কনষ্টিটুয়েন্সির দিক বিচারে এই দুই ধরণের নির্বাচনের কনষ্টিটুয়েন্সি অনেক রাষ্ট্রের বেলায় ভিন্ন দুরকম হয়, অনেক ক্ষেত্রে আবার একই থাকে। কনষ্টিটুয়েন্সি বা প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকা মানে হল কোন কোন প্রশাসনিক এলাকা অর্থাৎ কোন কোন ইউনিয়ন বা উপজেলার ভোটারদের নিয়ে একেকটা কনষ্টিটুয়েন্সি বা প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকা নির্ধারিত হবে। অনেক সময় এটাকে নির্বাচনী আসন এলাকাও বলতে দেখা যায়। যেমন বাংলাদেশে এমন কনষ্টিটুয়েন্সি মোট ৩০০ টা। তবে  অনেক দেশে ‘গঠনসভার নির্বাচন’ আর ‘সাধারণ নির্বাচন’ – দুই ক্ষেত্রে কনষ্টিটুয়েন্সি বা আসন এলাকা ভিন্ন ভিন্ন হতে দেখা যায়। সাধারণত দেখা যায়, ‘গঠনসভার নির্বাচনে’ আসন সংখ্যা বা নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা তুলনায় বেশি থাকে। যেমন নেপালে ‘গঠনসভার নির্বাচনে’ মোট আসন ছিল ৬০১, আর সাধারণ নির্বাচনে মোট আসন সংখ্যা হল ২৭৫। এছাড়া ‘গঠনসভার নির্বাচনের’ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষে প্রক্লেমেশন আর এরও পরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র থাকে ও পরিচালিত হয় এক অন্তর্বর্তিকালীন বা অস্থায়ী সরকারের অধীনে।  গঠনসভার নির্বাচিত সদস্যরাই ঐ অস্থায়ী সরকার গঠন করে থাকে। এই হল ভেঙ্গে বিস্তার করে বলা একটা নতুন রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়া অথবা পুরা কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস।

আমাদের পড়শি নেপাল তাদের প্রাচীন রাজতান্ত্রিক শাসন উতখাত শেষে (২০০৬ সালে),  দীর্ঘ প্রায় ১০ বছরে কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস সম্পন্ন করার পরে, এখন নেপালে এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন চলছে। কিন্তু প্রায় দশ বছর লাগল কেন? এটা তো বরং চার-পাঁচ বছর বা তারও আগে (বাংলাদেশ একবছরেরও কম সময়ে হয়েছিল) শেষ করে ফেলার কথা। আর কনস্টিটিউশন মেকিং শেষ করতে কোন জনগোষ্ঠি যত লম্বা সময় নিবে পুরা জনগোষ্ঠিকে ততদিন ভয়ঙ্কর সব বিপদের মধ্যে থাকতে হবে। এ যেন অন্যের হাতে ধর্ষিত হওয়ার বা খুবলে খাওয়ার বিপদে থাকা। আমরা রাজনৈতিক বিপ্লব করব, নতুন রাষ্ট্রগঠন করব ইত্যাদি অনেকের স্বপ্ন আমাদের থাকে। কিন্তু এর জন্য সবচেয়ে বিপদজনক অধ্যায় হল  একটা কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস শুরু করেও শেষ না করতে পারা বা প্রক্লেমশন না দিতে পারা। ব্যাপারটা অনেকটা যেন রোগীকে অপারেশন টেবিলে তোলা হয়েছে, পেট কাটা হয়েছে কিন্তু কিছুতেই এবার নানান জটিলতায় পরে সেলাই দিয়ে পেট আর বন্ধ করা যায় নাই। এমন বাজে অবস্থা আর কারও হয় না। স্বভাবতই সেক্ষেত্রে তখন রোগীর জীবন চলে যাওয়ার বিপদ মাথার উপর টিকটিক করবে। নেপাল হল সেই দুর্ভাগ্যের জনগোষ্ঠি যারা প্রথমবার  কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি গঠনসভা নির্বাচিত করেও (২৮ মে ২০০৮ থেকে, ২৮ মে ২০১২ সাল সময়কালের মধ্যে) ঐ নির্ধারিত চার বছরের মধ্যে কনস্টিটিউশন মেকিং শেষ করতে পারে নাই। এদিকে সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি নিজেই আয়ু শেষ করে ভেঙ্গে যায়। ফলে পুরা জনগোষ্ঠি দেশবাসী এক লিম্ব বা ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল। এরপর উপায়ন্ত না দেখে সব রাজনৈতিক দল মিলে সুপ্রীম কোর্টের কাছে আদালতকে সাক্ষী রেখে বিশেষ পরিস্থিতি ও বিবেচনার দোহাই দিয়ে আবেদন করেছিল আর একটা সুযোগ দিতে; আর নিজ জনগোষ্ঠির কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে এবার আর ব্যর্থ হবে না। এথেকেই আর একবার কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি গঠনসভা নির্বাচনের বৈধতার ভিত্তি তৈরি করেছিল নেপাল। এটা সৌভাগ্য যে নেপাল যে সুযোগ পেয়েছিল। ফলে দ্বিতীয়বার কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি নির্বাচন হয়েছিল নভেম্বর ২০১৩ সালে। পড়শি কারও হাতে ধর্ষিত হওয়ার বা খুবলে খাওয়ার বিপদ পেরিয়ে বড় কোন ক্ষতি ছাড়াই ঐ নির্বাচন শেষে নেপাল আবার নতুন করে রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার ফেরা ও কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি্তে কনষ্টিটিউশান রচনার কাজ  শুরু করার সুযোগ পেয়েছিল। তবে  নেপালি জনগোষ্ঠির জন্য এরচেয়েও বড় সৌভাগ্য হল এবার দ্বিতীয় সুযোগে শত বাধা সত্ত্বেও (বিশেষ করে ভারতের বাধা) ‘কনষ্টিটিশন গঠন কাজ শেষ’ হয়েছে বলে সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে তারা প্রক্লেমশন জারিতে সফল  হয়েছিল। আর তা সম্ভব হওয়ার পিছনে প্রধান কারণ ছিল নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল  (দাহালের মাওবাদী দল, আর বাকি দু দল হল,  আমাদের সিপিবির মত নির্বাচনমুখি কমিউনিস্ট দল ইউএমএল আর নেপালি কংগ্রেস) একজোটে পরস্পরের কাছে দেয়া প্রতিজ্ঞা যে তারা ভারতের কোন প্ররোচনায়  না পড়ে প্রথম সুযোগেই কনষ্টিটিউশনাল রচনার কাজ শেষ করবে। দুবছরের মধ্যে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তারা সক্ষম হয়েছিল, যদিও ভারত শেষ চেষ্টা করেছিল মাধোসি জনগোষ্ঠিকে উস্কে পরিস্থিতি নিজের পক্ষে নিতে, কনষ্টিটিউশনাল  প্রক্লেমশন জারিতে বাধা দিতে। কিন্তু সেসব কার্যকর করতে ভারত শেষে ব্যার্থ হয়। তবে নেপালে প্রদেশ কয়টা হবে, কিভাবে ৭৭টা জেলা কোন প্রদেশে কিভাবে  অন্তর্ভুক্ত হবে এটা অমীমাসিত রেখেই ঐ তিন দল কনষ্টিটিউশনাল  প্রক্লেমশন জারি করে দিয়েছিল। আর পরবর্তিতে ঐ অমীমাংসিত কাজ শেষ করা হয়েছিল।

এখন নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এর অর্থ গত দুবছরে সেসব জনগোষ্ঠিগত স্বার্থবিরোধ মিটিয়ে তারা অসমাপ্ত অংশগুলোও পুর্ণ করে ফেলেছে। এটাই নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যাওয়ার সফলতার আসল  তাতপর্য।

এটা সাধারণ নির্বাচন, এখানে ‘সাধারণ’ শব্দটা সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। কারণ এটা জানাচ্ছে  নেপালে কনষ্টিটিউশন রচনার কাজ পুরাটাই সমাপ্ত হয়েছে। তবে এই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুই পর্বে। কারণ এই শীতের সিজনে দুর্গম পাহাড়ে চলাচলের অসুবিধার কারণে মাঝে দুসপ্তাহের ফারাকে দুই আলাদা দিনে ভোট নেওয়া হচ্ছে।  দুই পর্বের ভোটগ্রহণের প্রথম পর্ব ২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে আর দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ৭ ডিসেম্বর।

সাধারণভাবে বললে, নেপাল সম্পর্কে ভারতের কল্পনা হল – এটা ‘নিজের বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ি’ বা তালুক যেন। ফলে সেখানে যা হবে তা ভারতকে তার ইচ্ছাকে অমান্য করে হতে পারবে না। এই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে এখন বাস্তব পুরোটাই উল্টেপাল্টে ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ভারতের বিদেশনীতির বিরাট পরাজয়ের আজ সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়েছে নেপাল। আর এতে  ভারতের রাজনীতিক ও বিশেষ করে তার আমলা-গোয়েন্দাগোষ্ঠি যেন খোদ ভারতের স্বার্থের শত্রু।

নেপালকে ভারত নিজের বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ি মনে করার পটভূমি হাজির হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া ছেড়ে ব্রিটিশ শাসকের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে। ১৯৪৭-পূর্ব যুগে একদিকে খোদ বৃটিশ-ইন্ডিয়া আর অন্যদিকে রাজতান্ত্রিক নেপাল – দুটোই ব্রিটিশ কলোনি ছিল, তবে দুই অর্থে। আর এতে বিরাট তফাতটা হল, ১৯৩৭ সালের পর থেকে ভারতে ধীরে ধীরে নেটিভরা অন্তত স্থানীয় বা প্রাদেশিক পর্যায়ের সরকার নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনে নিয়ে যেতে পেরেছিল। এর বিপরীতে নেপাল তখন নিজস্ব এক রাজতান্ত্রিক সরকার ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা ব্রিটিশ সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ এক করদরাজ্য। নেপালের সাথে বৃটিশদের “নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি ১৯২৩”, এটাই ছিল দ্বিতীয় ও শেষ চুক্তি, যার মেয়াদ উল্লেখ ছিল ১৯৫০ সাল পর্যন্ত। যদিও সেটা নেপালের রাজাদের স্বার্থের দিক থেকে খারাপ চলছিল না, কিন্তু ব্রিটিশ শাসকেরা ১৯৪৭ সালে ভারত ত্যাগ করে চলে যাওয়ায় নেহরুর-ভারত যেন ‘নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি ১৯২৩’-এর ব্রিটিশ অংশের উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠে। ফলে আগের ওই চুক্তিই এবার ১৯৫০ সালে নতুন করে, ব্রিটিশ সরকারের জায়গায় ভারতের নাম বসিয়ে ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’ নামে পুনর্লিখিত  করা হয়েছিল। সেই থেকে নেহরুর-ভারতের দৃষ্টিতে ও মনোভাবে রিপাবলিক ভারত যেন আসলে নতুন এক ‘কলোনি মাস্টার’।

সুনির্দিষ্ট করে নেপালের বেলায় বললে, নেহরুর-ভারত এমন ভাববার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। কারণ নেপাল ল্যান্ডলকড রাষ্ট্র। ভারতের ওপর দিয়ে ছাড়া তার বাইরে বের হওয়ার বা পণ্য আমদানি-রফতানির উপায় নেই। তিন দিকে ভারত আর উত্তরে চীন। কিন্তু চীনের দিকের অংশে তা আরো দুর্গম উঁচু পর্বতে ঢাকা ফলে পুরাটাই অগম্য এলাকা। কেবল একালে এসে রাইজিং চীন বিপুল বিনিয়োগ করে পাহাড় ডিঙিয়ে নেপালের সাথে স্থল যোগাযোগ (বিশেষ করে হাজারের দুয়েকের কিমি বেশি দীর্ঘ রেল লাইন পেতে) স্থাপনে রত হয়েছে। যদিও তা ঠিক নেপালের জন্য না, চীনের নিজের ঐ অঞ্চলও ল্যান্ডলকড, ওর বিকাশের জন্য।

রিপাবলিক ভারতরাষ্ট্র তার কোনো পড়শি বা বিদেশ-রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক করা মানেই সেটা ভারতের কলোনি বানানোর বা কলোনি-সম্পর্কের চেষ্টা করে যেতে হবে – নয়াদিল্লির এই মনোভাব, এই অনুমান ও বোধ স্বাধীন ভারত জন্ম হওয়ার সময় থেকেই। ভারতের এই অনুমান যে মারাত্মক ভুল, আত্মঘাতি, আর এর জন্য ভারতকে উলটা কাফফারা দিতে হবে, এটাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্রমান্বয়ে শিক্ষা পেয়ে চললেও তা থেকে কোনো শিক্ষা ভারত নিচ্ছে – এমন চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ভারতের পড়শি প্রায় সব রাষ্ট্রের সাথে একটা কলোনি সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করার যুগ যে এটা আর নয়, তা বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে- এই শিক্ষা পেলেও তা গ্রহণ করার অবস্থায় ভারত গিয়েছে তা এখনো জানা যায়নি।

তাই ২০০৬ সালের পর থেকে ক্রমেই রাজনৈতিক পরিক্রমায় নেপালে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয়ে গেলে এবং যদিও তাতে ভারত নির্ধারক ভূমিকায় নেপালকে ইতি-সহায়তা দিয়েছিল তা সত্ত্বেও নেপালের এই বিরাট পরিবর্তনের তাৎপর্য কী তা ভারত কখনো ধরতে পারেনি। কারণ ভারতের রাজনীতিক ও আমলা-গোয়েন্দা এই স্টাবলিশমেন্ট-চক্র আসলে, পড়শি রাষ্ট্র-সম্পর্ক বলতে কলোনি-সম্পর্ক ছাড়া আর কিছু হতে পারে তা এখনো কল্পনা করে না। তাই এক দিকে কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস শেষে নেপালের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে নিজেকে স্থিতিশীল রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হওয়া  – এটা নেপালের জন্য একটা বিরাট বিজয়। আর ভারত ততই অযথা নেপালের জন্য এক নম্বর ভিলেনের ভূমিকায় ক্রমান্বয়ে হাজির হওয়া – এটা ভারতের বিরাট পরাজয়। একালে অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব রাখার একমাত্র উপায়, ওর ওপর কলোনি সম্পর্ক চাপিয়ে দেয়া নয়, বরং এটা কাউন্টার প্রডাক্টিভ; মানে উল্টো ফল দেয়া কাজ। এটা ভারতের স্টাবলিশমেন্ট-চক্রের এন্টেনায় ধরা পড়া, হুশ  ও নতুন মুল্যায়নে আসার আগে পর্যন্ত, সে নিজেও শান্তি পাবে না, পড়শিদেরও শান্তি দিবে না।

ভিন রাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে কলোনি নয় বরং মর্যাদার সম্পর্ক হিসাবে দেখা আর একে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দেখে আগানো – এমন অবজেক্টিভ অ্যাপ্রোচ, এটাই অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব রাখার সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে এই বোধের  -পানি ভারতের কানে ঢোকা – দুরঅস্ত। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের ‘কলোনি অ্যাপ্রোচ’ যে তার আদি সমস্যা এটা ভারত এখনো উপলব্ধি করে না। আর এখন তো ভারতের এমন বেকুবিপনার নীতির পক্ষে আরো বড় সাফাই এসে গেছে। তা হচ্ছে রাইজিং অর্থনৈতিক প্রভাবের চীন। যেমন নেপালের ক্ষেত্রেও ভারত হয়তো সাফাই দিতে চাইবে, নেপালে ভারতের এমন দুর্দশা হয়েছে চীনের প্রভাব মোকাবেলার করতে গিয়ে – এসব বাজে কথার সাফাই গাইবে। যদিও ভারতও জানে, এটা ১০০ ভাগ মিথ্যা। নেপালের বেলায় চীনের প্রভাব বা চীনকে ভারতের বিকল্প হিসেবে নেপালের নেয়া এটা একেবারেই নতুন ‘ফেনোমেনা’, মাত্র ২০১৫ সাল বা এর পর থেকে। অথচ নেপাল যেন একটা নতুন কনস্টিটিউশনের ভেতর দিয়ে নতুন করে রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করে থিতু হতে না পারে, বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে এর সপক্ষে নেতিবাচক তৎপরতায় প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল ভারত। দু-দু’বার কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সভার নির্বাচন করতে হয়েছে নেপালকে, তবু ভারতের নেতিবাচক ভূমিকা শেষ হয়নি। অবশেষে দ্বিতীয়বারের (২০১৩) কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সভার নির্বাচনের পর নেপালের তিন প্রধান রাজনৈতিক দল এক হয়ে ভারতের বাধা মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে গেলে, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে রিপাবলিক নেপাল হিসেবে নতুন কনস্টিটিউশনের ঘোষণা দিতে নেপাল সক্ষম হয়। লজ্জার মাথা খেয়ে কূটনীতিতে পরাজিত ভারত ঐ ঘোষণারও বিরোধিতা করেছিল। এরপর ভারতের শেষ অবলম্বন হয়েছিল, নেপাল-ভারত সীমান্তের নেপাল অংশের সমতলভূমির বাসিন্দা মাধেসি জনগোষ্ঠীর ত্রাতা সাজার।

ভারতের মূল উদ্দেশ্য ছিল নেপালের সমতলি-পাহাড়ি স্বার্থবিরোধ যেন কোনো মীমাংসায় না পৌঁছায় – এভাবে কাজ করে গেছিল ভারত। নেপালকে কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্র বলে ২০১৫ সালে ঘোষণা দেয়া হলেও এর অভ্যন্তরে প্রদেশগুলো কিভাবে বিভক্ত করার কাজ অসমাপ্ত ছিল মানে, অভ্যন্তরীণ সীমানা টানার কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোও এতদিন আয়োজন করাও যায়নি। বিগত দুই বছরে প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারত বাধা দিয়ে একাজগুলো যেন শেষ না নয়, পাহাড়ি-সমতলি জনগোষ্ঠীগুলো যেন তাদের স্বার্থের ঝগড়ার ব্যাপারে আলোচনা করে কোন একটা মীমাংসায় না পৌঁছাতে পারে, এ ক্ষেত্রে নেপালকে ঠেকিয়ে রাখার সব চেষ্টা করা ছিল ভারতের কূটনৈতিক লক্ষ্য।

এই পটভূমিতে চলতি সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের তাৎপর্য হল, ভারতের সব প্রচেষ্টাকে নেপালের জনগণ পরাজিত করে বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা নিজেদের সব বিতর্ক-বিবাদ নিরসন করে নেপাল নিজেকে সাত প্রদেশে ভাগ করে  ও প্রদেশ গঠন সম্পন্ন করেছে। এটা একটা বিরাট অর্জন। বিগত ২০ বছর নেপালে কোথাও (আমাদের ইউপি ও উপজেলার মত) স্থানীয় নির্বাচন হয়নি। অনেকটা, সীমানা টানা বা চিহ্নিত করা হয়নি বলে আমাদের উপজেলার নির্বাচন না করতে পারলে যেমন হত তাই। এই বছরে এসে কনস্টিটিউশনের অসমাপ্ত এসব কাজ সমাপ্ত হয়েছে। আর সব কিছুই হয়েছে ইতিবাচকভাবে। তাই বলা হচ্ছে, ২০১৭ সাল ছিল নেপালের জন্য ‘নির্বাচনের বছর’; ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় এই তিন নির্বাচনই এবছর সম্পন্ন হয়েছে। অথচ এক বছর আগেও এটা আদৌ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে প্রায় সবার মনে সংশয় ছিল। কোনো আশার আলো কোথাও ছিল না। আমাদের অনুমান, নেপালের জনগণ এ জন্য সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট দেবে সম্ভবত নেপালি মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্ডকে। না, এটা তার রাজনৈতিক আদর্শ ভাল কি মন্দ তা বিচার করে বলা কোন কথা নয়। নেপালের সর্বশেষ সংসদে ৬০০ আসনের মধ্যে মাওবাদীদের ছিল মাত্র ৮০ আসন। আর ওদিকে নেপালি কংগ্রেসের ছিল ১৯৬ আসন আর কমিউনিস্ট নেতা অলির ইউএমএলের ১৭৫ আসন। ফলে নেপালের প্রধান তিন দলের কারোই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। তবে সব মিলিয়ে একসাথে মোট আসনের কমপক্ষে ৭৫ ভাগ আসন তাদের দখলে ছিল। ফলে গত পাঁচ বছরে তিনবার এই তিন দলের তিন ধরনের কম্বিনেশনে সরকার গঠিত হয়েছিল। তবে সেটা সব সময় আগাম আপস আলোচনাতেই সম্পন্ন হয়েছিল বলে কোনো অচলাবস্থার মধ্যে তাদের যেতে হয়নি। এ ক্ষেত্রে দাহালের কৃতিত্ব হল, তিনি ছিলেন সেই আশার আলো; প্রতিটি বিবাদের ইস্যুতে সমঝোতা টানার উদ্যোক্তা।  আর বাকি দুই দল – আমাদের সিপিবি দলের মতো নির্বাচনী কমিউনিস্ট দল ইউএমএল আর নেপালি কংগ্রেস এদের ভূমিকা ছিল যে এরা নিজেদের রাজনৈতিক বিবাদের সমাধানে নিজেরা উদ্যোক্তা হতে না পারলেও দাহালের প্রদত্ত সমাধান প্রস্তাবগুলোতে সমর্থন এবং ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে তা সফল করা। বিশেষ করে ভারতের কোনো প্ররোচনার ফাঁদে বা লোভে না পড়া। অবশ্য পুরো নেপালের জনগোষ্ঠী বিশেষ করে গরিব মানুষের কাছে ভারতের কোনো ইতিবাচক ইমেজ আর নেই। কারণ, ২০১৫ সালে ভারতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ার ‘শাস্তি’ হিসেবে ভারত একনাগাড়ে পাঁচ মাস ল্যান্ডলকড নেপালে ভারত থেকে যেকোনো পণ্য আমদানি ভারত বন্ধ করে রেখেছিল। বিশেষ করে সব ধরনের জ্বালানি আমদানি, যার ফলে কষ্ট সবচেয়ে বেশি পোহাতে হয়েছিল  নেপালের গরিব জনগণকে।

সমঝোতার সরকার হিসেবে বর্তমানে নেপালে শেষ বা তৃতীয় কোয়ালিশন চলছে  এটা নেপালি কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার, যার পার্টনার দাহালের মাওবাদী দল। এটাই শেষ ১১ মাসের সরকার, যার আগের ১১ মাসে দাহালের প্রধানমন্ত্রিত্বে সরকার ছিল। নেপালে সাত না আটটি প্রদেশ থাকবে, কোন কোন জেলা কোন প্রদেশে থাকবে- এ বিষয়টিকে মোটা দাগে বললে প্রদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণ ছিল স্বার্থবিরোধ বিবাদের সবচেয়ে জটিল ইস্যু। আর ভারত এই বিবাদে মাধেসিদের কান ভারী করে বিবাদ আরো বড় করে তা লাগিয়ে রেখেছিল যেন সমাধান না মেলে – এটাকেই ভারত নিজের কূটনৈতিক স্বার্থ বলে নির্ধারণ করে পথ রেখেছিল। গত ২২ মাসে নেপালের বিরাট অর্জন হল – প্রদেশ ইস্যুতে অমীমাংসিত বিরোধ মিটিয়ে এগুলোর সীমানা নির্ধারণ শেষ করা। এর পরপরই শুধু প্রাদেশিক নয়, স্থানীয় সরকারগুলোর নির্বাচন আয়োজনের সব বাধা খুলে যায়। ফলে ২০ বছর পরে এই প্রথম ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এরপর দুই পর্বে প্রাদেশিক (সরকার) ও ফেডারেল (কেন্দ্রীয় সরকার)- এ দুই ক্ষেত্রে নির্বাচন এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনে যা হবে তা হল, নেপাল মোট ৭৭টি জেলা আর সাতটি প্রদেশে আপোষে বিভক্ত হয়ে থাকবে।

চলতি সাধারণ নির্বাচনে নেপালে সারা দেশ থেকে মোট ২৭৫ জন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ (আমাদের ভাষায় কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য) নির্বাচিত হয়ে আসবেন। তারা একটি ফেডারেল সংসদ গঠন করবেন। এই সংসদের সংখ্যাগরিস্ট দলের সদস্যরা একটি কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকার গঠন করে নেবেন। এ ছাড়াও সাতটি প্রদেশে আলাদা আলাদা প্রাদেশিক সংসদ গঠনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেকাজে সাত প্রদেশে মোট প্রাদেশিক সদস্য নির্বাচিত হবেন ৫৫০ জন। নেপালের সাফল্য হল নেপাল রাষ্ট্রের ক্ষমতার তিন স্তর ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় এর অমীমাংসিত অংশগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা। আর সেই সাথে এ বছরই তিন স্তরের নির্বাচন সফলভাবে শেষ করা। ফলে এখন নেপাল দাবি করতে পারবে, সাংবিধানিক রাষ্ট্রগঠন পর্ব সফলভাবে শেষ করে সে এখন একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র। স্বভাবতই এটা নেপালের জনগণের জন্য যতটা সফলতা ও অর্জনের বিষয়, ঠিক ততটাই ভারতের সরকারের জন্য একধরনের পরাজয়ের বিষয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক অবস্থান নেয়ায় ভারতের নেপালনীতি আজ পরাজিত। নেপালের নির্বাচন কাভার করা ভারতের মিডিয়াগুলোর সম্পাদকীয় দেখলে বোঝা যায় যে, অন্তত তারা পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। আর নেপালের জনগণের কাছেও ভারত যে একটা প্রবল নেতি-শক্তি এবং নেপালের গরিব মানুষের জীবনকেও দুর্বিষহ, আরো কঠিন ও কষ্টকর করে দিতে পিছপা হয় না, তা প্রমাণিত করে গেছে। ১০ বছরেরও বেশি সময়জুড়ে নেপালের কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেসে ভারত এক বিরাট নেতিবাচক শক্তি হিসেবে হাজির হয়েছে, যা থেকে ভারতের জন্য পরাজয় আর নেপালি জনগণের ধিককার কুড়ানো ছাড়া কোনো অর্জন নেই। এর ফাঁকে ভারতের নেতি-রাজনীতির বিকল্প হিসেবে সুযোগ পাওয়ায় নেপালি জনগণের কাছে অনেকটা অপরিচিত চীন, আজ নেপালি জনজীবনের কষ্ট লাঘবে বহুল আকাঙ্খিত অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগকারী ‘ত্রাতা’ হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকেরা নির্বাচনের ফলাফলে কমিউনিস্টদেরকে আগিয়ে রাখছেন। এই নির্বাচন হচ্ছে মূলত দুই পক্ষের মধ্যে। এক পক্ষে মাওবাদী, অন্য পক্ষে কমিউনিস্ট ইউএমএল আর বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি। ভট্টরায়, তিনি রাজতন্ত্র উৎখাতের সময় মাওবাদী দলের সাথে দ্বিতীয় প্রধান হিসাবে ছিলেন। এ তিন কমিউনিস্ট দলের জোট বনাম নেপালি কংগ্রেস এবং এর সাথে ছোটখাটো দলের গণতন্ত্রী জোট। এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলকে যদি জনগণের মন-মেজাজের ইঙ্গিত বলে আমরা মানতে চাই তবে কমিউনিস্ট জোট বিপুল ভোটে জিতবে, বলা হচ্ছে। [Based on the results of Nepal’s recently concluded local level polls, there is a better chance that the left alliance of CPN-UML and CPN (Maoist Center) will gain a majority and form the government] এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে অবশ্য প্রকৃত ফলাফল জানা যাবে না। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সে পর্যন্ত।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে নির্বাচন আয়োজনে সফলতা’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

গৌতম দাস
২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lK

 

 

চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

সাইড লাইন
যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

সুষমার সফরে মতভেদ প্রকট হয়েছে

সুষমার সফরে মতভেদ প্রকট হয়েছে

গৌতম দাস

২৮ অক্টোবর ২০১৭, শনিবার

http://wp.me/p1sCvy-2kx

 

গত ২২-২৩ অক্টোবর ২০১৭ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। এক দিক থেকে দেখলে, এটা একটা বকেয়া সফর এই অর্থে যে, গত আগস্ট মাস থেকেই হবু এই সফর নিয়ে কথা হচ্ছিল; কিন্তু নানান কারণে হতে পারছিল না। অবশেষে অক্টোবর মাসে এসে এটা হতে পেরেছে। আর রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থানের ভিন্নতা যখন প্রকটভাবে স্পষ্ট কিন্তু এক দেখানোর চেষ্টাও সমান ততপর চলছে, সে পটভূমিতে এ সফর হয়েছে। তাই বলা যায়, সুষমা স্বরাজের এবারের সফর হলো ভারত ও বাংলাদেশের মতভিন্নতা রেকর্ড করে রাখার সফর।

ভারতের অবস্থান বার্মার রোহিঙ্গা নির্মূলের নীতি ও বর্বরোচিত তৎপরতার পক্ষে  এবং এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার। কিন্তু এর কারণ কী? এশিয়াতে ভারতের প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সাথেই চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্যভাবে। এই সম্পর্কগুলোকে ঠেকানো অসম্ভব। কারণ ভারতের পড়শি দেশগুলোতে দীর্ঘ দিন ধরে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ উপেক্ষিত হয়ে আছে। অবহেলায় এগুলোকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফেলে রাখায় এসব পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রে বিনিয়োগ পাওয়ার আকাঙ্খা উঠেছে চরমে। অন্য দিকে, একালের চীনের বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা এসব দেশের দোরগড়ায় হাজির। তাই, এই দুইয়ের মিলন ঠেকানো অসম্ভব। কিন্তু ভারত চাচ্ছে এসব দেশ বিকশিত না হয়ে ভারতের ক্ষুদ্র সামর্থ্য মোতাবেক এর সাথে তাল মিলিয়ে বামন হয়ে থাকুক; যেটা ভারতের সীমিত মাত্রার অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তুল্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্রই নিজ অর্থনীতিকে বামন করে রাখতে পারে না। ফলে ভারতের এহেন নীতির শেষ ফলাফল হচ্ছে – ওসব রাষ্ট্রে ভারতের ভাগে বড়জোর ছোট কোনো অবকাঠামো প্রকল্প ভাগে পাওয়া। বার্মাতে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতার ফলও তাই হয়েছে। কিন্তু বার্মিজ সেনাবাহিনী খুবই সাফল্যের সাথে চীন ও ভারত – এই দুই রাষ্ট্রকে রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে সমর্থক হিসেবে হাজির হতে বাধ্য করেছে। চীন ও ভারত উভয়েই প্রতিযোগিতা করে বার্মা সরকারের রোহিঙ্গাদেরকে নির্মূল করে ধুয়েমুছে সাফ করার কাজের স্বপক্ষে  সমর্থন নিয়ে হাজির হয়ে গেছে। ভারত ও চীন উভয়েরই রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে দাঁড়ানোর পেছনে খোঁড়া যুক্তি একটাই, ২৫ আগস্ট আরসা গোষ্ঠী নাকি ‘সন্ত্রাসবাদী’ আক্রমণ চালিয়েছে। তাই ভারত ও চীনের সরকার বার্মিজ সরকারের বিরুদ্ধে কথিত  ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা’কে সমর্থন করছে। এ থেকে স্পষ্ট, কথিত ‘আরসা আক্রমণ’ এই অজুহাত চীন, ভারত এবং বার্মার সরকার সবার জন্যই রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে খুবই প্রয়োজনীয় এক সাফাই দাতা। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কথিত আরসা (ARSA) আক্রমণ তাহলে আসলে কার পক্ষে সহায়তা করেছে, আরসা কী রোহিঙ্গাদের পক্ষের সংগঠন? নাকি এটা কাদের কাজে লাগছে? আরসা কাদের সংগঠন? নাকি আরসা বলে সক্ষম কোন সংগঠন কী আদৌও আছে?

এর আগে ২০১২ সালের রোহিঙ্গা নির্মূলের সময় ভারত বার্মিজ সরকারের কাছে ‘কৃতিত্ব’ জাহির করেছিল যে, ভারত বাংলাদেশের সরকারকে প্রভাবিত করেছে এমনভাবে যে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে সে দেশে আশ্রয় নিতে দেয়নি। বাংলাদেশ নিজ সীমান্ত রোহিঙ্গাদের জন্য খুলে দেয় নাই। ফলে রোহিঙ্গাদের সীমান্ত পার হয়ে প্রবেশ করতে দেয়নি এবং এ জন্য দুর্যোগের সেই পুরাটা সময় সীমান্ত বন্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছিল। একইভাবে ২০১৭ সাল এবারও শুরুর দিকে একই কৃতিত্ব নিতে পেরেছিল ভারত। আমাদের সরকারও প্রথম সপ্তাহে সীমান্ত বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু এরপর আর পারেনাই। আভ্যন্তরীণ নিজ জনমতের চাপে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে ছিল যে, সীমান্ত বন্ধ রাখার চাপ হয়ে গিয়েছিল সরকারের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য গণবিস্ফোরণের চাপ। সীমান্ত না খুলে দিলে বাংলাদেশ সরকার যেন হয়ে দাঁড়াত রোহিঙ্গাদের ওপর সব নির্যাতনের মূল হোতা। এই বাস্তবতা ভারত বা বার্মিজ সরকারের ইচ্ছামতো বয়ান দেয়া অসম্ভব করে তোলে। অথচ ২০১২ সালে এরাই “রোহিঙ্গারা জঙ্গী” এই বয়ানের সাফাই তুলে সীমান্ত বন্ধ রাখা সম্ভব করেছিল। কিন্তু এবার নিজের বয়ান নিজে গিলে খেয়ে ভুলে গিয়ে বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত খুলে দিয়েছিল শরণার্থীদের জন্য। উলটা “মানবাধিকার রক্ষাকর্তা মা” বলে ক্রেডিট দাবি করতে ছুটেছিল। অথচ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের অবস্থানের মৌলিক ভিন্নতা সেই থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ৬ সেপ্টেম্বর বার্মা সফরে গিয়ে সামরিক বাহিনীর রোহিঙ্গা নির্মূলকে ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা’র কাজ বলে বাহবা দিয়ে এসেছিলেন। বার্মার এই কথিত সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের কাজে মোদি গভীর উদ্বেগ দেখিয়ে এসেছিলেন। (Prime Minister Narendra Modi said on Wednesday that India shared Myanmar’s concern about “extremist violence” in its Rakhine state, …) এটাই হল রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের প্রকৃত অবস্থান।

অনেকে সুষমা স্বরাজের এবারের বাংলাদেশ সফর থেকে ‘আবিষ্কার’ করছেন, সুষমা তো এবার এই সফরে এসে ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ দাবি জানিয়েছেন। ফলে এটা ভারতের অবস্থানের বিরাট পরিবর্তন। যেমন ফলাও করে বিবিসি লিখছে, “……বিবৃতিতে সুষমা স্বরাজ রোহিঙ্গা শব্দটি উল্লেখ না করেই বলেন, ‘আমরা কোফি আনান কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে সেগুলোর বাস্তবায়নকেও সমর্থন করি’।” যেন এটা ভারতের এক বিরাট অগ্রগতির অবস্থান।

 

বাস্তবে মোটেও তা নয়। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ ইচ্ছা তো খোদ সু চিরও আছে বলে তিনি বহু আগেই জানাচ্ছেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সু চির কথায় সাথে একটা ‘যদি বা কিন্তু’ আছে। তা হল, যারা নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারবে তিনি কেবল তাদেরই ফেরত নেবেন বা কেবল তাদের বেলায় আনান কমিশনের রিপোর্ট ‘বাস্তবায়ন’ করবেন। সু চি ভাল করেই জানেন যে,  লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিজ নাগরিকত্বের প্রমাণ তো দিতে পারবেন না। ফলে সু চিকে ‘সাত মণ ঘিও ঢালার দরকার হবে না এবং রাধাও নাচবে না।’ অতএব ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ খায়েশ প্রচার করতে খোদ সু চি নিজের কোনই সমস্যা দেখেন নাই।

আর ঠিক একইভাবে সুষমা স্বরাজও বলেছেন, আমরাও ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন’ সমর্থন করি। এটা বলায় তারও কোনো সমস্যা নেই। কারণ তিনি জানেন, খোদ সু চি যে কথা বলেছেন, সে কথা বলতে সুষমার নিজের বলতেও কোনো অসুবিধা নেই। এ ব্যাপারে বরং ভারতের ‘নীতি’ খুবই সোজাসাপ্টা। খোদ বার্মা যে ভাষায় ও বয়ানে যা অবস্থান নেবে, ভারতও সেটা করবে। এটাই হলো ভারতের বাস্তব অবস্থান। বার্মা সরকার ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ ব্যবহার করে না, কেউ করুক তাও চায় না। ফলে সুষমা স্বরাজের সফরে ভারতের লিখিত ভাষ্য হল, ‘রাখাইন প্রদেশের ডিসপ্লেসড বা বাস্তুচ্যুত’ জনগোষ্ঠীকে ফেরত নিতে হবে। এক কথায় বললে, বার্মার অবস্থানই ভারতের অবস্থান। এটা বোঝাতে অস্পষ্টতা রাখেনি ভারত।
ভারত তার অবস্থান যে একচুল বদলায়নি রোহিঙ্গা ইস্যুতে এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, সুষমা স্বরাজের সফর উপলক্ষে ভারতের পররাষ্ট্র দফতর থেকে যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে সেখানে লেখা একটি পুরনো বাক্য হলো- ’I may add that India is deeply concerned at the spate of violence in Rakhine State of Myanmar. We have urged that the situation be handled with restraint, keeping in mind the welfare of the population’. এর প্রথম বাক্যটা পয়দা হয়েছিল গত ৬ সেপ্টেম্বর মোদির বার্মা সফরকালে, আর দ্বিতীয় বাক্যটা যোগ করা হয়েছিল মোদি সফর শেষ করে ভারতে ফিরে আসার পরে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার পরে।

আমরা বরং সুষমা স্বরাজের সফরকালে বলা, নতুন আর এক বাক্যের কথা মনে রাখতে পারি। সুষমা বলেছেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হলো, রাখাইন প্রদেশের ব্যাপক আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন যা ওই প্রদেশে বসবাসকারী সব কমিউনিটির জনজীবনে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে’। সুষমার এবারের সফরে নতুন যোগ হওয়া বাক্য এটা। কিন্তু ভারত যে রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সমাধান চায় না, বরং বার্মা সরকারের চোখেই দেখে সঙ্কটটিকে, এর প্রমাণ হচ্ছে এই বাক্যগুলো। রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের সমূলে নির্মূল করা হচ্ছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার এ কারণে হচ্ছে না যে, কোনো অসম সুযোগ-সুবিধা তাদের দেয়া হয়েছে। তারা অন্য জনগোষ্ঠীর চেয়ে কম অথবা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, সঙ্কট সে জন্য নয়। বরং আদৌ রোহিঙ্গারা বার্মার নাগরিক হিসেবে বসবাস করতে পারবে কি না, কোনো মুসলমান জনগোষ্ঠী বৌদ্ধদের পাশাপাশি রাখাইন প্রদেশে বাস করতে পারবে কি না, এবং নাগরিক হয়ে থাকতে পারবে কি না, এটাই মূল ইস্যু।
লক্ষণীয় যেটা বিষয় নয়, ইস্যু নয় সেসব কথা সুকৌশলে তুলে আনছেন সুষমা স্বরাজ। আর এভাবেই উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কে প্রশ্রয় দেয়া এবং এর বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষকে আড়াল করে দেয়ার চেষ্টা করছেন।

বাংলাদেশের দিক থেকে যেটা এখন অবশ্য করণীয় হয়ে গেছে তা হল, রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশের একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট  অবস্থান স্থির করা এবং সে অনুযায়ে অবস্থান নেয়া। যাতে একেবারে নিজের জাতীয় স্বার্থে এই অবস্থানের পক্ষে বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন এক সাথে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের স্বার্থ একমাত্র এভাবেই অটুট থাকতে পারে। এরপর দেশে-বিদেশে ও জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন ফোরামে এর পক্ষে তৎপরতা চালানো হতে পারে আমাদের সঠিক অবস্থান। একমাত্র সে ক্ষেত্রেই আমরা বার্মার সরকারের ওপর যে চাপ বাড়ছে এর সুবিধা নিতে পারব।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ অক্টোবর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের সাপ ও ওঝার কুটনীতি

ভারতের সাপ আর ওঝার কূটনীতি

গৌতম দাস

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১২ঃ৩৫

http://wp.me/p1sCvy-2i4

 

সাপ ও ওঝা কুটনীতি। .মানে সাপ হয়ে কাউকে কামড়ানোর পরে আবার ওঝা হয়ে সেই বিষ নামাতে আসার ভান করা। কিন্তু এটা কী কূটনীতি হতে পারে? কুটনীতির মধ্যে বুদ্ধি, শঠতা, দুরদর্শীতা, কাছে ও দুরের স্বার্থ ইত্যাদি সবই থাকে। কিন্তু অন্তত সকাল বিকাল মিছা বলে ধরা খাওয়া বেকুব কেউ হয় না।  অথচ ভারত তাই হয়েছে। এটা কে বলে কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব। আর এর সাগরেদ হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। আমাদের সরকার বলেছিল, বার্মার সাথে যৌথ ট্হল দিতে চাই যাতে রোহিঙ্গার বাপও না আসতে পারে। আবার এখন বলছে, ১৬ কোটি লোক খাওয়াতে পারলে ওদের খাওয়াতে পারব না কেন।  এরা সকলে ধরে নিয়েছে যে মানুষ এতই বোকা যে তারা কিছুই দেখবে না, বুঝতেও পারবে না? অথচ এটা অসম্ভব! এটা হয় না, হতে পারে না। তবু লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে অসহায় ভারত এই কাজই করেছে, বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে ডুবেছে।  সব হারিয়ে দুস্থ ভারত এখন সাপ-ওঝার কূটনীতিতে নেমে গেছে।

মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর বার্মার সেনাবাহিনী ও সরকারের নির্মুল অভিযান বহু পুরানা কাল সেই ১৯৭৭ সাল থেকেই চলে আসছে। কেবল কিছুদিন পর পর এই এথনিক ক্লিনজিং বা নির্মুল অভিযানের জোয়ার উঠতে দেখা যায়। এবারের পর্বে মায়ানমারে রোহিঙ্গা মারা ও খেদানো শুরু হয়েছিল ২৫ আগষ্ট রাত থেকে। প্রত্যেক বারের মত এবারও বার্মা সেনাবাহিনীকে এক নতুন অজুহাত দিতে দেখি আমরা। এবারের অজুহাত হল, আরসা নামে রোহিঙ্গাদের এক সামরিক সংগঠন বার্মার নিরাপত্তা বাহিনীর উপর নাকি কিছু আক্রমণ চালিয়েছে। কিন্তু তাতে পরিণতি বা ফলাফল কী হয়েছে? এখন আমরা দেখছি তাতে ফলাফল হল, বর্মীজ সামরিক বাহিনী এপর্যন্ত চার লাখের মত রাখাইন রোহিঙ্গাদের উপর নির্মুল অত্যাচার নিপীড়ন করেছে আর হাজার চারেক হত্যা করেছে। তাহলে কে কার পক্ষে কাজ করল? মায়ানমার তাদের উদ্বাস্তু করল কেন? ইন্টার নাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ অবশ্য একটা সাফাই টেনে উল্লেখ করেছে, আরসা সংগঠনের হামলার প্রতিক্রিয়ায় নাকি সেনাবাহিনী একটা “ক্লিয়ারেন্স অপারেশন” চালিয়েছে। [In response, the military is conducting “clearance operations” across ……] । কিন্তু আরসা সংগঠন হামলা চালালেই বর্মী সেনাবাহিনী কোন “ক্লিয়ারেন্স অপারেশন” কী  চালাতে পারে এই প্রশ্ন কেউ তুলছে না। কে কাকে কী ক্লিয়ার করল? মানুষ ক্লিয়ার করল মানে কী? ক্রাইসিস গ্রুপ এই রিপোর্ট কী আসলে সেনাবাহিনীর স্বীকার করে নেওয়া যে তারা রোহিঙ্গা নির্মুল করেছে! ক্লিনজিং!

আবার ২৭ আগষ্টের রয়টার্স পরিবেশিত খবরে দেখা যাচ্ছে বার্মা সেনাবাহিনীর এক বিবৃতি পাঠিয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে প্রায় “৮০০ বাঙালী টেররিস্ট” (রোহিঙ্গা উচ্চারণ না করে বর্মীজ সরকার তাদের বাঙালী বলে) কে তারা ‘মোকাবিলা’ করেছে। সেনাবাহিনীর ‘মোকাবিলা’ মানে বুঝতে হবে মেরে ধরে হত্যা নির্যাতন ধর্ষণ করে ঘরছাড়া উদ্বাস্তু করা। কিন্তু সেনাবাহিনী যে ৮০০ সংখ্যা উল্লেখ করে যতই আরসার (ARSA) কথিত হামলাকে অজুহাত হিসাবে দেখাক না কেন, বাস্তবে আমরা দেখছি, চার লাখের উপর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে উদ্বাস্তু করা আর প্রায় চার হাজারের মত হত্যা করা হয়েছে। ফলে ৮০০ সংখ্যার উল্লেখ এরপরেও এই অত্যাচারের ফিগারগুলোর পক্ষে ন্যায্যতা তৈরি করতে পারে না। ফ্যাক্টস হল, বরং এতে এখানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ঘটেছে তা প্রমাণিত হয়। আসলে শাহবাগী একটা যুক্তি আছে এখানে। যুক্তিটা ামরা শাহবাগের রমরমা যুগেও দেখেছি যে বলা হত, কোথাও হয়ত পুলিশের উপরও কিছু পালটা  হামলা হয়েছে। এইবার সেটাকে অজুহাত হিসাবে নিয়ে এরা সাফাই গাইত যে এজন্যই পুলিশ এবার নির্বিচারে হত্যা, বলপ্রয়োগ নির্যাতন, পায়ে গুলি করা ইত্যাদি সবই করেছে এবং পুলিশ এমন সবকিছু করতে পারে এবং এটা জায়েজ। অথচ ফ্যাক্টস ও আইনের কথা হল, এটাকে পুলিশী ভাষাতেই বলে ‘একসেস বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ বলে। অর্থাৎ পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে যখন কোন সিভিল গ্রুপ মুখোমুখি হয় বা মারামারি হয় তখন সেটা জমি নিয়ে দুপক্ষের লড়াই বা পাড়ার দুই পক্ষের পোলাপানের মারামারির মত না; যেখানে উভয় পক্ষই যথেচ্ছাচার অপরপক্ষের উপর যেকোন মাত্রায় বলপ্রয়োগ করতে পারে। কারণ আলোচ্য ক্ষেত্রে এখানে একপক্ষ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। তার কাজ কখনই অপরপক্ষকে নির্মুল বা ঘরছাড়া করা নয়; এবং এই লক্ষ্যে সে ইচ্ছামত মাত্রার বলপ্রয়োগ একেবারেই সে করতে পারে না। বরং যতটুকু বলপ্রয়োগ করলে সে অপরপক্ষকে কাবু করতে পারবে ঠিক ততটুকুই সে বলপ্রয়োগ বা  “ওভার-পাওয়ার” করবে। এর বেশি না। কোন প্রতিহিংসা তো নয়ই। আর এর বেশি হলে বরং ঐ নিরাপত্তা বাহিনী উলটা ফৌজদারি অপরাধ করেছে বলে গণ্য হবে। এটাকেই একসেস বা “অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ” এর অপরাধ বলে। আর এটাই হল যে কোন ফোর্সের ‘ফোর্স এনগেজমেন্ট রুল’, ‘বলপ্রয়োগে সংশ্লিষ্ট’ হবার পক্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর পালনীয় শর্ত। এতে পরিস্কার যে বর্মীজ বাহিনীর নিজেরই দেয়া তথ্য ও কথিত  যুক্তিকে সত্যি হিসাবে যদি ধরি তবুও নিরাপত্তা বাহিনী অবশ্যই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। ফলে এখানে স্পষ্টত সেনাবাহিনীই অপরাধ করেছে। মানবাধিকার বা হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন হয়েছে। ওদিকে গণতন্ত্রের নোবেল নেত্রী সু চি আবার দাবি করে বিবিসিকে বলেছেন, “রাখাইনে রোহিঙ্গা জঙ্গীরাই নাকি রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে”। এখন কার কথা আমরা বিশ্বাস করব এও আর এক মুসিবত!

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি বার্মা সফরে ছিলেন গত ৫-৭ সেপ্টেম্বর।  বিবিসি লিখেছিল, এই সফরে ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। আর “সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা” করা। অর্থাৎ নিজে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া অথবা কাউকে হারানোর জন্য কোন রাষ্ট্র কারও গণহত্যা ও নির্মূলকরণে সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল মোদির ভারত। সুচির সাথে মিডিয়ার সামনে সাক্ষাতে মোদি বলেছিলেন তিনি সুচির ‘পাশে আছেন’। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল, তিনিও বর্মী সেনাবাহিনীর উপর সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানান। আর সু চি সাথে তাল মিলিয়ে মনে করেন, এটা রোহিঙ্গাদের নির্যাতন বা নির্মুল করে ফেলার ইস্যু না বরং এটা হল,একটা “ইসলামি টেররিজমের” ইস্যু। ফলে মোদি তা সঠিক মনে করেন ও সু চি কে সমর্থন জানান। সুনির্দিষ্ট করে বললে এটা ছিল ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। অবশ্য মোদির এই সফর শুরুর আগের সপ্তাহে ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হঠাত করে বলা শুরু করেছিলেন ভারতে নাকি ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আছে (জাতিসংঘের উদ্বাস্তু কমিশনারের মতে ১৬ হাজার), এবং তাদের বের করে দেয়া হবে বলে প্রচার শুরু করেছিলেন। এটাও বার্মার সেনাবাহিনী ও সু চির মন পাবার জন্য ভারতের কাতর এক প্রচেষ্টা তা বলাই বাহুল্য।

কিন্তু মোদির এই সফর শেষে তিনদিন পরে ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক রিপোর্ট করেছে। রিপোর্টে শুরুতেই লিখছে যে মোদি তার সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুটাকে দেখেছেন চরম সন্ত্রাসবাদের ঘটনা হিসাবে এবং তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর উপরে হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অথচ রোহিঙ্গাদের উপর পরিচালিত ক্লিনজিং – নির্যাতন ও উদ্বাস্তু হবার দিকটা নিয়ে কিছুই বলেন নাই। অথচ ঐ সফর শেষে আচমকা ১০ সেপ্টেম্বর এই বিবৃতিতে বলেছেন, “আমরা আবেদন রাখব রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি ‘সামালে আর পরিপক্কতার’ সাথে যেন নাড়াচাড়া করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি ‘বেসামরিক নাগরিকের কল্যাণের’ দিকটাও যেন দেখা হয়”। বেশির ভাগ অন্যান্য পত্রিকা শুধু এতটুকুওই ছেপেছে, আর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এছাড়াও এক বাড়তি বাক্য ছেপেছে, ‘পিছনের কারণ’ বলে। তা হল, ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার তিনি নাকি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সাথে দেখা করার পরেই ভারত এই মত বদলিয়ে ফেলে। আসলে এটা হল ভারতের নিজের ইউ-টার্ণের পক্ষে এক সাফাই নিজ উদ্যোগে বাজারে ছেড়ে রাখা। আর এই উলটা মোড় যে কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব তা পরোক্ষে স্বীকার করে নেয়া। ব্যাপারটা হল, যদি বাংলাদেশের ঐ হাইকমিশনার এতই বুদ্ধিমান, কার্যকর ও করিতকর্মা হয়ে থাকেন আর ভারতের কূটনৈতিকদের কাজের ভুল সংশোধনের মূল ব্যক্তি হয়ে থাকেন তবে ভারতের উচিত তাকে স্থায়ীভাবে ভারতের কূটনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া, যাতে ভবিষ্যতে এমন বেকুবি আর দেউলিয়া সিদ্ধান্ত ভারত আর না নিয়ে বসতে হয়। তাই নয় কী!

ব্যাপারটা হল সকালে মোদি যাকে “রোহিঙ্গা টেরর” বলছেন বিকেলে তারই সুরক্ষার জন্য আবার সু চিকে “বেসামরিক নাগরিকের কল্যাণের দিকটা সামলাতে” বলছেন। নিঃসন্দেহে ভারতের কূটনীতিতে একইসঙ্গে সাপ আর ওঝার ভুমিকা পালনের এক ক্লাসিক উদাহরণ।

কিন্তু আসলেই কী ভারতের কূটনীতিকেরা এতই বেকুব যে তাঁরা নিজেদের এই স্ববিরোধিতাটা দেখতেই পায় নাই? না, বরং এটা আসলে জেনেশুনে নিজেকে বেকুব বলে হাজির করা এবং মনে করা যে এতে বেশি লাভ হবে। অনেক পত্রিকাতেই ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মন্তব্যে আরও একটা বাক্য আছে। তা হল, “এটা বুঝাই যাচ্ছে যে সহিংসতা শেষ হয়েছে, রাজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা দ্রুত ফিরে আসছে”।  অর্থাৎ ভারতের ফরেন অফিস বলতে চাইছে যে হা কথা সত্য, তাদের অফিস সকাল বিকেল  ভোল বদলিয়েছে। তবে বদলেছে কারণ রাখাইনে দাঙ্গা থেমে গেছে। কিন্তু এমন বাক্য ভারত লিখতে গেল কেন? সেপ্রসঙ্গের আগে বলতেই হয়, এটা খুবই অকূটনীতিক ভাষা। কারণ মায়ানমারে দাঙ্গা পরিস্থিতি ভাল বা উন্নতি হয়েছে কী না তা নিয়ে ভারত কথা বলার কে? এটা তার বলার কথা না, এক্তিয়ার নয়। এমনকি ভারত এটা জানলেও তা ওরবলা উচিত না বা বলার কথা না। কারণ তাতে ব্যাপারটা ভিন রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপের মত হয়ে যায়। তাই একমাত্র মায়ানমার বলতে পারে, আর এরপরেই সে ভাষ্য ভারত ব্যবহার করতে পারে মাত্র, এর আগে না। তাহলে ভারত এই কুটনীতিক রীতিভঙ্গ করল কেন?

কারণ, এবারে বার্মা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল কোন এক উছিলায় বাধ্য করে রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া, যাতে  প্রায় চার লাখের উপরে এরা এরপর থেকে শরনার্থী ষ্টাটাস পায়। তাতে বার্মার লাভ হল যে,  বার্মা দাবি করছিল এরা বার্মার নাগরিক নয়। কিন্তু ওরা দেশের ভিতরে বসবাস করছিল বলে সেই বার্মার সে দাবি হালে পানি পাচ্ছিল না। তাই এবার ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বার্মার অর্জন হল, মূল জনগোষ্ঠির রোহিঙ্গাদের বের করে দেয়া সফল হয়ে গেছে। যদিও এতে কিছু পকেটে কিছু রোহিঙ্গা এরপরেও থেকে যেতে পারে কিন্তু মুল অংশ বের করে দেয়া গেছে। সুতরাং লক্ষ্য অর্জিত। তাই, এখন ভারত অবস্থান বদলালে তেমন অসুবিধা নাই। তাই ভারত নিজ উদ্যোগে দাবি করছে ‘দাঙ্গা থেমে গেছে’, ফলে তাদের অবস্থান বদল। তাহলে মূল কথা, সু চিকে ভারতীয় সার্ভিস পুরা মাত্রায় দেয়া হয়ে গেছে বলে ভারত অবস্থান বদলিয়ে নিয়েছে, তাতে যতই কূটনীতিক বেইজ্জতিই ভারতের হোক না কেন! অতএব এখন সময় হাসিনা-সুষমা গলা জড়াজড়ি করা। ত্রাণ পাঠানোর ছবি তোলা, আর মহড়া করার।

কেউ কম যায় নাই। চীনের গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, বার্মার নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গীদের বিরুদ্ধে লড়ছে আর তাতে নিজের  উদ্বেগের কথা চীন জানিয়েছে। [backs Myanmar’s efforts to “safeguard peace and stability,”]। অথচ রোহিঙ্গাদের নির্মুল নির্যাতন ও উদ্বাস্তু হওয়াকে চীনের কাছে ইস্যু নয়। এর কোন উল্লেখ চীন করে নাই।  অর্থাৎ সবার রোগ একই। আর চীনের ঐ খবরের শিরোনাম হল, মায়ানমার নাকি “শান্তি আর স্থিতিশীলতা সুরক্ষা করছে” বলে চীন মনে করে। ফলে ভারতের মত চীনও পিছিয়ে না থেকে এখন ত্রাণ পাঠাতে ব্যস্ত।

আমেরিকাও তাই; সেও পিছিয়ে নাই। আমেরিকান উপ-সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্যাট্রিক মার্ফি গত ৮ সেপ্টেম্বর তিনিও নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। আর তিনি মনে করেন রাখাইনে রাজ্যে একা মুসলমানেরা নির্যাতিত নয়, মুসলমানদের হাতে অন্যেরাও নির্যাতিত। এটাই সু চির এর লাইন। সু চি চায় সবাই ‘এটা বিভিন্ন জনগোষ্ঠির মধ্যে জাতিগত দাঙ্গা’ এটা প্রচার করুক। আর সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা ক্লিনজিং বা সাফা করা আড়াল করুক।

 

গৌতম দাস

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

গৌতম দাস

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

http://wp.me/p1sCvy-2hU

আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
“Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

চীন-ভারত ডোকলামে মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

চীন-ভারত ডোকলাম মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

গৌতম দাস

০১ আগষ্ট ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2gF

 

ডোকলাম ভুটানের এক উপত্যকা। উপরে ছবিতে দেখুন নেপাল ও ভুটানের মাঝে কা্লো অংশ, যেটা আসলে সিকিম, যা এখন ভারতের অংশ। এই অর্থে নেপাল-ভুটানের মাঝে ভারত আছে। কিন্তু পুরাটাই ভারত নয়। এর কিছু অংশ আবার চীনের ভুখন্ড। চীনের ঐ ভুখন্ডের লাগোয়া এক অংশ হল ভুটানের ডোকলাম উপত্যকা। অর্থাৎ সারকথায় ডোকলাম ভুখন্ডের বিতর্ক মূলত ভুটান-চীনের মধ্যে সীমান্তের বিতর্ক। ভারতের কোন ভুখন্ড এটা নয়। এটা তাই কোনো মতেই চীন-ভারতের কোনো সীমান্ত-ভুখন্ডই নয়। চীন সেই সীমান্ত বরাবর থাকা কাঁচা রাস্তাকে ৪০ টন ভারবহনে সক্ষম এমন পাকা রাস্তায় উন্নীত করার কাজ শুরু করতে গেলে বিতর্ক শুরু হয়।

ভুটানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুসারে গত ১৬ জুন ২০১৭ ডোকলামের ডোকলা থেকে সীমান্তবর্তি যে রাস্তা যোমপেলরিতে ভুটানিজ আর্মি ক্যাম্পের দিকে গেছে, সীমান্তবর্তি সে রাস্তার পাশেই কাজ করতেই চীনারা এসেছিল। চীনা ভাষ্যও প্রায় এরকমই যে, সীমান্ত বরাবর ওই রাস্তাতেই চীনের পরবর্তী সীমান্ত ক্যাম্প পর্যন্ত রাস্তা তৈরি ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাদের সামনে কাজে বাধা সৃষ্টি করে বসে যায়।

তবে ভারতীয় সেনা কেন? সীমান্ত বিতর্ক তো ভুটান-চীনের মধ্যে। এ ব্যাপারে ভারতের যুক্তি হল, ভুটান স্বাধীন রাজার রাষ্ট্র (যা এখন কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র) বটে। কিন্তু ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার পর ১৯৪৯ সালে ভূমিবেষ্টিত ভুটানের বিদেশনীতির বিষয়াদি দেখার জন্য ভারত-ভুটান এক চুক্তি হয়েছে। এ ধরনের দাসখত চুক্তিগুলোর গালভরাভাবে নাম রাখা হয় ‘শান্তিচুক্তি’ বা ‘বন্ধুত্বচুক্তি’; এখানেও তাই হয়েছিল। এটা হল অন্যের ভূমিবেষ্টিত অবস্থার প্যাঁচে পড়াকে কেন্দ্র করে তার দুরবস্থার সুযোগ নেয়া। নেহেরুর ভারত ল্যান্ডলকড ভুটানের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে ঐ চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল।  ১৯৪৯ সালের ওই চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ভুটানের বিদেশনীতি ভারতের পরামর্শে গাইডেড হতে হবে। [“……Bhutan agrees to be guided by the advice of the Government of India in regard to its external relations.”]

যদিও ১৯৭৯ সালে ভুটানের রাজার এক সাক্ষাৎকারের রেফারেন্সে অনেকে দাবি করেন যে, ভুটানের রাজা মনে করেন ওই অনুচ্ছেদে বলা ভারতের পরামর্শ ভুটানের জন্য ‘অবশ্য পালনীয়’ এমন কথা লেখা নেই। [“India’s advice in the conduct of foreign affairs was welcome but “not binding” on Bhutan, he said.] তবে ডোকলাম ইস্যুতে ভারতীয়রা ওই চুক্তির অজুহাতে “ভুটানের অনুরোধে” সেখানে সেনা হাজির করেছে বলে জানায়। ফলে স্বভাবতই চীনারাও পরে সেখানে পাল্টা সেনা সমাবেশ ঘটায়। দুই সেনাবাহিনী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।   আর সেই থেকে ব্যাপারটা চীন-ভারত সম্ভাব্য সীমান্তযুদ্ধের টেনশন হয়ে হাজির হয়ে পড়েছে। স্বভাবতই চীনের দিক থেকে জানানো হয় তারা নিজ ভূখণ্ডেই তৎপরতা করছে; ফলে নিঃশর্তভাবে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করার দাবি করে চীনারা।

অবস্থা এখন এমনই যে ভারতেরই এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কূটনীতিক পি স্তবগান (P stobdan) লিখছেন, ভারতের ভুটান নীতি একটা কলোনিয়াল চিন্তা ভাবনা। ভারতের আসল সমস্যা তার ভুটান নীতি, ভুটানের সীমান্ত নয়।  নী  শিরোনামে একটা উপসম্পাদকীয় লিখে বলছেন,  ভারতের ভুটান নীতি কলোনিয়াল কাঠামো চিন্তা। এটা কাজ করবে না, টিকবে না, এটা বুদ্ধিমান বিদেশনীতির চিহ্ন নয়। (This approach was not sustainable; nor was it a sign of prudent foreign policy.) সে তুলনায় গত কয়েক বছরে চীন অনেক বেশি গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে ফেলেছে।

তবে এই প্রথম চীনের দিক থেকে এক তাৎপর্যপূর্ণ যুক্তিও দেয়া হয়। বলা হয়, চীন-ভুটান সীমানা বিতর্কে যদি ‘শান্তিচুক্তির’ অজুহাতে ভারত নাকগলায় তবে কাশ্মির ইস্যুতেও পাকিস্তানের পক্ষে তৃতীয় রাষ্ট্র (মানে ইঙ্গিতে চীনের কথা বলা হলো) নিজের সেনা নিয়ে হাজির হয়ে যেতে পারে। চীনের এই যুক্তিতে দম আছে বলতেই হয়। এই বয়ানে মধ্যে ভারতের জন্য বিপদের কথা বুঝে ভারত অন্য এক যুক্তির দিকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ভারত এবার যুক্তি তুলে যে শিলিগুড়ির নিজের ‘চিকেন-নেক’ এলাকার নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারত ঐ  রাস্তা পাকা করার কাজ করতে চীনকে বাধা দিয়েছে।

চিকেন-নেক সম্পর্কে সংক্ষেপে বলে নেয়া দরকারঃ ব্যাপারটা হল, ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান মানে আজকের বাংলাদেশ ভারত থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণে ধরা যাক কলকাতা থেকে কোনো ভারতীয় আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ইত্যাদি ভারতের উত্তর-পুর্ব অঞ্চলের রাজ্যে যেতে চাইলে তার আর (ভিন্ন রাষ্ট্র বলে) বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকল না। তাদের যেতে হবে পুরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত একটা চক্কর ঘুরে। যেন বেনাপোল থেকে যে কুমিল্লা যেতে চায় তাকে বেনাপোল থেকে দিনাজপুর তেঁতুলিয়া, রংপুর, সিলেট হয়ে এরপরে কুমিল্লা- এভাবে। সরাসরি বেনাপোল থেকে ঢাকা হয়ে কুমিল্লা নয়। শুধু তাই নয়, তাঁকে যেতে হবে ভারতীয় ভূখণ্ড ধরে যা পাহাড়ি দুর্গম শুধু নয় এরচেয়ে এক বড় বিপদ আছে।  কলকাতা থেকে সাত রাজ্যে যেতে যাত্রাপথে শিলিগুড়িতে সবচেয়ে চিকন (চওড়া মাত্র ১৮-২০ কিলোমিটার, যার একদিকে নেপাল অন্যদিকে বাংলাদেশ) এক অংশ পাড় হতে হয়। ওই অংশকেই চিকেন-নেক বলা হচ্ছে। কারণ কম চওড়া বলে ওই চিকন অংশ রুদ্ধ করে দেয়া গেলে (কয়েকটা নষ্ট গাড়ি বা ভারী কিছু ফেলে রাস্তাগুলো ব্লক করে দিলেই হল) ভারতের, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের সাথে সাত রাজ্য যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে যাবে। উপরে ছবিতে চিকেন নেককে  ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখন  এই ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ এর অজুহাত তুলে ডোকলাম ইস্যুতে ভারত বলতে চাচ্ছে, ডোকলাম ভারতের ভূখণ্ড না হলেও সে চীনকে রাস্তা তৈরিতে বাধা দিয়েছে নিজের ঐ ‘চিকেন-নেকের’ নিরাপত্তার কথা ভেবে। এটাও খুবই দুর্বল যুক্তি, প্রায় যুক্তিহীন ভাসাভাসা কথার মত। শিলিগুড়ির চিকেন-নেক ভারতের জন্য ষ্ট্রাটেজিক অর্থে দুর্বল জায়গা সে কথা বুঝা যায়। কিন্তু ওই রাস্তা তা ভুটানের বা চীনের যারই অংশ হোক না কেন, আর তা পাকা বা কাঁচা রাস্তা যাই থাকুক, ‘চিকেন-নেক’ অংশ ভারতের সবসময় জন্য দুর্বলতা। রাস্তাটা পাকা হয়ে যাওয়াতে এরপর ওটা ভারতের জন্য দুর্বলতা হয়ে দাড়ায় তা তো নয়।

আচ্ছা আরেকটা প্রশ্ন : ভারত কি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমেরিকার সাথে গলাগলি করে চীনে সমুদ্রপথে প্রবেশের পথের ‘চিকেন-নেক’ সিঙ্গাপুরের ‘মালাক্কা প্রণালি’ কোথায় আছে তা খুঁজে বের করেনি? এটা ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথ তুলনামূলক চিকন হয়ে আসা একটা অংশ। এই ইস্যুতে আমেরিকান সিনেটের শুনানিতে প্রফেসরদের সাক্ষ্য দিয়ে বলা পিডিএফ নোট এখনো নেটে যে কেউ পেতে পারে।  [ US CONGRESS HEARING ON INDIA-US RELATIONSHIP  – চোদ্দ পৃষ্ঠার এই ডকুমেন্টে ষষ্ঠ পৃষ্টায় ‘চিকেন-নেক’ ‘মালাক্কা প্রণালির’ ছবি দিয়ে চিনানো আছে।  এখানে কোনো জাহাজ ডুবিয়ে দিলেও এই সমুদ্রপথ (চীনে প্রবেশপথ) ব্লক হয়ে যেতে পারে। প্রণালি বা ইংরেজিতে strait মাত্রই সমুদ্রপথে এটা চিকন গলার সমস্যা। কিন্তু মালাক্কা প্রণালি ভারতের ত্রিসীমানার কোনো স্থান নয়। তবু আমেরিকার প্ররোচনায় ভারত কী আমেরিকার কৌশলগত পরিকল্পনায় শামিল হয়নি? গত ২০০৫ সাল থেকে ভারত আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ কাজে শামিল হয়েছে। তখন থেকেই কে কার চিকন গলা ধরতে পারে বা এর মজা কি সে কথা আমরা শুনে আসছি। কাজেই ‘কারো চিকন গলা চেপে ধরা কোন খারাপ কাজ না’- এমন নৈতিকতা বা আইন তো ভারতই মানে নাই। এমন পদক্ষেপ সে চীনের আগেই চীনের বিরুদ্ধে অভ্যাস নিয়ে ফেলেছে।  কাজেই চীন যদি ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরে চিকন গলা চেপে ধরে আসে সেটাকে অন্যায় বলার নৈতিকতা ভারতের নাই।  তবুও আমরা মনে করি এসব কাজ সবার ছেড়ে দেয়া উচিত। কোনো রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পণ্য চলাচলে অন্য রাষ্ট্রের বাধা তৈরি করা অন্যায়, নীতিগতভাবে সবার এই অবস্থান বাস্তবায়নে আসা উচিত।

ইতোমধ্যে এখানে আর এক মজার কাণ্ড ঘটে গেছে। ডোকলাম বিরোধ ঘটনার তিন সপ্তাহের মধ্যে খোদ ভারতেই মোদি সরকার নিজের সিদ্ধান্তের কারণে একঘরে হয়ে যায়। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ভারতের মিডিয়ার রিপোর্ট। এমন একটা রিপোর্ট হল, ১৫ জুলাইয়ের আনন্দবাজার পত্রিকা; যার শিরোনাম ‘ভুটানের আর্জিতে দুশ্চিন্তা, দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’। ওর সারকথা ছিল, ডোকলামে সৈন্য সমাবেশের দায়, সামরিক উত্তেজনা তৈরির দায় একা মোদি ও তার সরকারের বলে সব বিরোধী দল আর একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে এক বড় অংশ সবাই হাত ধুয়ে ফেলেছিল। মোদি সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন পরামর্শ নেয়ার জন্য সেখানকার ঘটনা এটা। অথবা বলা যায়, সম্মানজনক পশ্চাত-অপসারণের উপায় খুঁজতে সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন মোদি। ওই সভার সিদ্ধান্ত, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে সেখানে একটাই কথা, সৈন্য প্রত্যাহার করে কূটনীতির পথ হাতড়ানোতেই সমাধান।

কিন্তু সবাই বলতে চেয়েছে বিশেষ করে কংগ্রেস নেতা রাহুল  ও তৃণমুলের মমতা যে, মোদি উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করেছেন তিনি। কিছু সুনির্দিষ্ট শব্দ ও বাক্য নেয়া যাক ঐ রিপোর্ট থেকে। খোদ আনন্দবাজারই মোদির নীতিকে “দাদাগিরি” বলেছে। লিখেছে, “হিমালয়ের কোলের এই একমুঠো রাষ্ট্রকে তার তাঁবে থাকা দেশ বলেই মনে করে দিল্লি”। এতদিন এসব কথা আমরাই সবসময় আমাদের মূল্যায়নে বলে এসেছি, এখন আনন্দবাজারও বলছে বাধ্য হয়ে; এটা আমাদের মুল্যায়নকে স্বীকৃতি দেয়। আসলে, নেহরুর হাতে আকার পাওয়া, ভারতের আমলা-গোয়েন্দাদের চিন্তা কাঠামো মূলত কলোনিয়াল। ফলে ভিন্ন দুই জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রের মধ্যে কলোনি ধরনের অধীনতার বাইরে আর কোনো ধরনের সম্পর্কের কথা এরা চিন্তা করতে পারে না। এজন্য যেকোন বিদেশনীতি বিষয়ক চিন্তায় এটা প্রতিফলিত, প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

নেহরু নিজেকে একটা স্বাধীন রিপাবলিকের প্রধানমন্ত্রী এটা অনুভবের চেয়ে নিজেকে যেন কোন ব্রিটিশ ভাইসরয় ভাবতে বেশি পছন্দ করতেন। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ নেপাল বা ভুটানের সাথে ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের তথাকথিত ‘শান্তিচুক্তিগুলো’। এরই আলোকে একালে ভারত তার প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়ে এসেছে, এখনো করে যাচ্ছে। যার ফলাফলে ভারতের সব প্রতিবেশীর সাথে তার সম্পর্ক অন্তত আনন্দবাজার ভাষায় বললে, ‘দাদাগিরির’। আমাদের এই দাবির পক্ষে প্রমাণ হলো খোদ আনন্দবাজারেরই শিরোনাম- ‘দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’।

ওই একই রিপোর্টের ভেতরে আনন্দবাজার আরও লিখছে, ‘১৯৪৯ সালে ভুটানের সাথে শান্তিচুক্তি করেছিলেন জওয়াহের লাল নেহরু। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, বিদেশনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভুটান ভারতের পরামর্শ মতোই চলবে। ২০০৭ সালে ভুটান যখন পুরোদস্তুর রাজতন্ত্র থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে হাঁটে, তখন চুক্তিপত্র থেকে এই ধারাটি বাদ দেয়া হয়। যদিও কার্যক্ষেত্রে থিম্পুর ওপর দিল্লির প্রভাব খুব একটা খর্ব হয়নি। ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান। তার পরেও তার এই বেসুর সাউথ ব্লকের কানে বাজছে।’

এখানে দেয়া দুটো তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভুটান এখন এক কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, সেখানে আইন প্রণয়নের এখন জননির্বাচিত সংসদ আছে। কিন্তু আনন্দবাজারই সাক্ষ্য দিয়ে বলছে, ভুটান সংসদীয় সরকার হওয়ার পর ২০০৭-এর সংশোধিত চুক্তিপত্রে আগের মতো ভারতের ‘দাদাগিরির অনুচ্ছেদটা’ নেই। অথচ দাদাগিরি চলছে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, ‘ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান’। এখানে একটু ব্যাখ্যা করে বলা দরকার। ডিমার্শে হল কূটনৈতিক ইংরেজি শব্দ démarche; যার বাংলা অর্থ হল, আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোন আপত্তি অভিযোগ বা মনোভাব জানানো। ভুটান ডোকলাম ইস্যুতে চীনের কাছে আপত্তি জানিয়েছে ‘ভারতের চাপে পড়ে’, নিজে থেকে নয়। এটাই আনন্দবাজারের দাবি। তাই এখন খোদ ভুটান ভারতকেই সৈন্য প্রত্যাহার করতে বলাতে ভারত প্রমাদ গুনছে। এটাই আনন্দবাজারের রিপোর্ট। ওদিকে, ভারত সবার আগে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে; তাই চীন, সবার আগে ভারতের সেনা প্রত্যাহারের শর্ত রেখেছে। আর এ অবস্থায় ভারতের সব বিরোধী দল মোদির সাথে দূরত্ব তৈরি করেছে। মোদিকে উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করা লোক বলেছে। সুযোগ বুঝে কংগ্রেস নেতা রাহুল প্রশ্ন তুলেছে,  ভারতের বন্ধু অনেক রাষ্ট্র ছিল (সম্ভবত রাশিয়ার কথা বলতে চাইছেন) তারা কেন এখন দূরে- এই প্রশ্ন তুলেছে। তবে শেষে ‘সৈন্য প্রত্যাহার আর কূটনীতিক আলাপ’ এই সীমায় মোদি্র ফিরে আসার শর্তে সমর্থন জানিয়েছে। আর, সব মিডিয়া ‘কূটনীতি চাই’ বলে সম্পাদকীয় লিখেছে। যেমন আনন্দবাজারের ১৯ জুলাইয়ের রিপোর্টের শিরোনাম, ‘যুদ্ধ নয়, চাই কূটনীতি’। বেচারা!

মোদির অবস্থা একঘরে শুধু নয়, একেবারে বেইজ্জতি হওয়ার দশা। কারণ চীনের কঠোর অবস্থানে দাঁড়িয়ে দাবি করেছে আগে এককভাবে ভারতের সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। আর মোদির সরকার উঠেপড়ে লেগেছে যে, একসাথে প্রত্যাহার টাইপের একটা কথা যদি চীনের কাছ থেকে বের করা যায়। গত ২৭-২৮ জুলাই ছিল চীনে ব্রিকস রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা কাউন্সিল বা উপদেষ্টা স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক। ভারত চেষ্টা করছিল ওই সভার সাইড লাইনে চীনের প্রতিনিধি স্টেট কাউন্সিলরের (Chinese state councillor Yang Jiechi) সাথে যদি একটা বৈঠকের সুযোগ করে নিতে পারেন। মাত্র গত ২৯ জুলাই দুপুরে ভারতের কোনো কোনো মিডিয়া খবর দিচ্ছে যে, ওই মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কী কথা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো রিপোর্ট কোথাও ছাপা হয়নি।

ইতোমধ্যে রাশিয়ান ডিপ্লোম্যাট সূত্রে অনেক খবর আসছে, যেগুলোর ফরমাল ভার্সান এখনো রিলিজ হয়নি। সেখানে বলা হচ্ছে- ১. অন্তত দু’সপ্তাহ আগে চীন ভারতকে জানিয়েছিল যে তারা নতুন রাস্তা বানাতে নয়, রাস্তা আগে থেকেই যেটা ছিল সেটা চওড়া করতে যাচ্ছে। কিন্তু ভারত সে নোটিফিকেশন উপেক্ষা করেছে। ২. চীনারা যেখানে অবস্থান ও কাজ করছিল সেটা ইতোমধ্যে ভুটানের সাথে আলোচনায় বিবাদ নিরসিত হিসেবে চিহ্নিত চীনের অংশ। ৩. তাই চীন এখনো প্রমাণ চাচ্ছে ও দাবি করছে যে ভুটান কখনোই ভারতকে কোনো সামরিক অ্যাকশন নিতে অনুরোধ জানায়নি।

ভারতের কোনো কোনো জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তাই প্রস্তাব রেখেছেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের উচিত এখনই, আসলে কী ঘটেছে তার ঘটনাক্রম কী সে বিষয়ে ভারতে অবস্থিত সব কূটনীতিকদের কাছে ব্রিফিং দিয়ে ভারত অবস্থান পরিষ্কার করুক। এমন একজন হলেন ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাঈদ নকভি। তিনি দাবি করছেন, তার জানা মতে ভারতীয় সরকার এক আমেরিকান কূটনীতিক ছাড়া আর কাউকেই এখন পর্যন্ত আসলে কী ঘটেছে তা জানিয়ে কোনো ব্রিফিং কাউকেই দেননি।

চীন-ভারত সংঘাতে  সময়ে সময়ে আমরা বিভিন্ন ইস্যুতে তা হাজির হতে দেখি। তা সত্ত্বেও যদি বলা হয় এগুলোর মধ্যে খটর মটর লাগার সবচেয়ে অমসৃণ বিষয়টা কী? সে প্রসঙ্গে সংক্শেষেপে কিছু বলে শেষ করব।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেটেল হওয়া চলতি গ্লোবাল অর্ডার আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে চালু হয়েছিল। সেটা তার আয়ুর শেষ করতে যাচ্ছে। আর একই সাথে ধীরে ধীরে চীন উঠে আসছে সে জায়গা নিতে। গ্লোবাল পরিবর্তনের এই অভিমুখকে স্বীকার করে নিয়েও মানতে ইচ্ছা করে না দশা আমেরিকার। ফলে কম করে হলেও যতটা সম্ভব সে আসন্ন পরিবর্তনকে দেরি করিয়ে দেয়ার নীতি নিয়েছে আমেরিকা। তবে কম-বেশির ফারাক আছে। ওবামা  প্রশাসন যতটা এব্যাপারে এগ্রেসিভ হয়ে ততপর ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন ততটা চেয়ে বলা ভাল একই কৌশলে ততপর নয়। যদিও ঘটনা শুরু করে দিয়ে গিয়েছিল  সেকেন্ড টার্মের (2005-9) বুশ প্রশাসন। মূল ব্যাপারটা হল আমেরিকা ভারতকে প্রলুব্ধ করে, লোভে ফেলে নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থার নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন AIIB, BRICS, SCO ইত্যাদি) গড়ে উঠতে দেরি করিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। কারণ নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থাগুলো তৈরিতে চীন ভারতকে সাথে নিতে চায়, আর একাজে চীনের প্রধান সহযোগী পুতিনের রাশিয়া। কিন্তু ভারত গাছেরও খেতে চায় আবার তলার গুলোও কুড়িতে নিতে চায় – নীতি নিয়েছে। সে চীন, রাশিয়ার সাথে মিলে নতুন ব্যবস্থা গড়তে ভাল অবস্থানগুলো নিতে চায় আবার আমেরিকার দেয়া লোভের অফারগুলোও পেতে চায়। ভারতের এই দ্বৈততা, দ্বিমুখি ঝোঁক – এটাই সব সমস্যা সংকটের উতস এখানে।

এর ফলে ভারত তার যেসব বিরোধে কোন সংঘাত  তৈরি না করে সমাধান করার কথা তা মুখ্য সংঘাত বানিয়ে ফেলছে। আর যেখানে বড় সংঘাতই হবার কথা তা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্যই করছে না।  আর এর সাথে যুক্ত হয়েছে সস্তা জাতীয়তাবাদের চিন্তা। অথচ কমিউনিস্ট বা জাতীয়তাবাদীরা যাকে ‘জাতীয়তাবাদ’ বলে মনে করে আসছিল সেটা আসলে কোল্ড ওয়ার কালে বুঝের জাতীয়তাবাদ, যা একালে অচল। যেমন দেশের ব্যবহার্য সব পণ্য দেশেই বানাতে হবে এমন গোঁ ধরা জাতীয়তাবাদ কীনা নিজ জনগোষ্ঠির তাতে আসলে একালেও লাভ হয় কীনা ভেবে দেখতে হবে। নিজ মুদ্রার অবমুল্যায়ন একালে সময়ে ইতিবাচক হতে পারে। নাহলে আমেরিকার বিষয়টাকে  অভিযোগ আকারে আনত না যে চীন নিজের মুদ্রা অবমুল্যায়িত রেখেছে। ইত্যাদি।

আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ভারতের বর্তমান স্বার্থ হলে চীন-রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ভারতের ভবিষ্যত। ফলে ভারতের  বুদ্ধিমান অবস্থান হল, এদুইয়ের মধ্যে এক সুক্ষ হিসাব করা ভারসাম্য রচনা করে পা ফেলা। কিন্তু কথাটা ভারত প্রায়ই ইচ্ছা করে ভুলে যায়। অনেক বাচ্চা নিজ অভিভাবককে ব্লাকমেল করে পকেটমানি বাড়িয়ে নেয় – বাচ্চারা এভাবে অনেক সময় দায়িত্বজ্ঞানহীন  আচরণ করে সাময়িক সুবিধার মজা উপভোগ করতে চায়। ভারতের অবস্থা এরকম। কিন্তু বাস্তবে ভারত কোন বাচ্চাসন্তান নয়, আবার চীন বা রাশিয়া (নতুন ব্যবস্থার মূল উদ্যোক্তা কারিগরেরা) এরাও ভারতের অভিভাবক কেউ নয়। ফলে ভারতেরও উদ্যোক্তাদেরকে এমন জায়গায় ঠেলে দেওয়া উচিত না যে উদ্যোক্তারা ভারতের আশা ছেঁড়ে ভিন্ন পরিকল্পনা করে বসে। ভারতের উপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যায়।

চীনের গ্লোবাল টাইমস যেখানে চীনের সরকারি অবস্থান কড়া ভাষায় কিন্তু ইনফরমালি চীন প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়, সেখানে ডোকলাম ইস্যুটাকে শিরোনাম লিখা হয়েছে, ভারতের সাংহাই কর্পরেশন সংস্থার (SCO) সদস্যপদ পেয়ে পশ্চিম চীনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে চাইছে। (India’s SCO membership threatens West China security)। চীন শান্তিপুর্ণ অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করতে  শিকাগোর এক আমেরিকান প্রফেসরের তত্ত্ব যে, চীন নাকি ভারতকে মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলেছে, চীন ভারতের জন্য হুমকি  এইসব  তত্ত্ব আঊরায়।   আসলে মোটাদাগে বললে ভারতের চীন বিরোধী সংঘাত এটা আসলে আমেরিকার চীনা নীতির আলোকে সাজানো। ইন্ডিয়া শুধু আমেরিকার সাথে সামরিক অস্ত্রের চুক্তি করেছে তাই নয়, বরং চীন-ভারত সীমান্ত বরাবর সামরিক ঘাটি বানিয়েছে। (In fact, India’s confrontation with China is, by and large, backed by America’s China policy. India has not only sealed arms deals with the US, but also established strategic military bases along the China-India border. ) সে নিজ জনগণকে চীন বিরোধী প্রপাগান্ডায় সামিল করেছে।

এটাকে আমরা বলতে পারি চীনের  দুঃখ করে বলা (আবার হুমকিরও)  কথা যা খুব সম্ভবত রাশিয়াকে স্মরণ করিয়ে দিবার উছিলায় সবাইকে জানানো। কারণ রাশিয়ার উতসাহেই চীন ভারতকে এই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিষয়ক জোটে (পাকিস্তানসহ) ভারতকেও সদস্যপদ দিতে রাজি হয়েছে কয়েকমাস আগে।

ভারতের অজিত ডোভাল চীন থেকে ফিরেছেন, কিন্তু ভারতের মিডিয়ার গান সম্পুর্ণ ভিন্ন। এখানে কেবল কিছু শিরোনাম আনছি যার ভিতরে অনেক ইঙ্গিত আছে। চীনে ভারত কী শিক্ষা পেয়েছে  সম্ভবত এর ইঙ্গিত আছে এখানে। আনন্দবাজার পত্রিকা ২৯ জুলাই,  “বেজিংকে না চটাতে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী মোদীর”। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ২৯ জুলাই,  “Doklam is not about a road”।  অর্থাৎ ভারতের মিডিয়ার আর ডোকলাম অচলাবস্থার কারণ ডোকলামে না, বাইরে খুজতে শুরু করেছে। একটু দেরি হয়ে গেছে অবশ্য।  মনে হচ্ছে মোদি ভুলে মাটি খেয়ে ফেলেছেন বা মুখে মাটি গেছে। খুব সম্ভবত গাছের খাওয়া আর তলেরও কুড়ানোর দিন ভারতের জন্য শেষ হয়ে আসছে। কোন একটা বেছে নিতে হবে। এশিয়ায় পড়শিদের উপর ভারতের প্রভাব দাবরানি আর কূটচাল দিয়ে, কলোনি চিন্তা কাঠামো দিয়ে, বৃটিশ বাপ-দাদাদের ছিল ফলে একই স্টাইলে তা আমারও শাসনে থাকবে এই যুক্তিতে এখন টিকানো অসম্ভব, তাই সেগুলো সবই শেষ হয়ে আসছে, যাবে। সে জায়গায় চীনের যে প্রভাব বাড়ছে তা চীনা অর্থনীতির সক্ষমতার কারণে, এই অর্থে এটা অবজেকটিভ। চীনের সাবজেকটিভ ইচ্ছার কারণে এটা হয় নাই, হচ্ছে না এবং  হয় না। এই অর্থে আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে ভারতের বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এর মাসুলও দিতে হবে চড়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩০ জুলাই ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ৩১ জুলাই তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন : চীন আরেক ধাপ আগালো

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত
চীন আরেক ধাপ আগালো

গৌতম দাস

মে ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2fm

চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ (Belt & Road Initiative)। এটা এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকা মহাদেশকে এক সাথে জুড়ে এমন এক যোগাযোগ অবকাঠামো প্রকল্প। যোফাযোগ সড়ক পথে ও সমুদ্র পথে এবং দুটাকে মিশিয়ে ব্যবহার করা হবে। এখানে তাই দুটা প্রকল্পের সমাহার। সড়ক প্রকল্পের নাম  Silk Road Economic Belt আর সমুদ্র পথ (যেটাতে জায়গায় জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের সুবিধা থাকবে আর ঐ বন্দরগুলো থেকে অন্তত ছয়টা সড়ক যোগাযোগের করিডোর বেল্ট রোডে গিয়ে যুক্ত হবে) এই প্রকল্পের নাম  Maritime Silk Road। এই দুই মেগা প্রকল্পকে একসাথে বেল্ট ও রোড উদ্যোগ নাম দেয়া হয়েছে।

চীনা উদ্যোগে ও বিনিয়োগে নেয়া এই প্রকল্প যেসব দেশের উপর দিয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট সেসব ৬৫ টা রাষ্ট্র এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে – এটা এমন এক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে এশিয়ার কোন রাষ্ট্রকে বাদ রাখা হয় নাই। তবে যদি না কেউ নিজে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, সেকথা আলাদা। বলা ভাল এখানে এশিয়ান রাষ্ট্রগুলোরই প্রাধান্য; তবে অবশ্যই সাথে ইউরোপ, সেন্ট্রাল এশিয়া আর আফ্রিকার কিছু দেশও অন্তর্ভুক্ত। এর ভৌগলিক ধারণাটা হল, বাংলাদেশ থেকেই যদি ধরি, এখান থেকে মূল হাইওয়ে সড়ক পথে (যেটাকে Silk Road Economic Belt বলা হচ্ছে)  চীন হয়ে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে, পুর্ব ইউরোপ হয়ে পশ্চিম ইউরোপে যাওয়া সম্ভব। এটাই মূল হাইওয়ে। আর পথের দুপাশের সব রাষ্ট্রকে এই অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নেয়া হবে। ওদিকে এই পথের শেষ হচ্ছে ইউরোপের রটারডাম (নেদারল্যান্ড) গিয়ে। সেখান থেকে আবার একই রোডে না ফিরে  ফিরতি সমুদ্র পথ নিবার সুযোগ আছে। সে হিসাবে এবার ইতালি হয়ে নৌপথে অথবা কখনও কোস্টাল সড়ক ঘুরে বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব। তবে ঐ মূল হাইওয়েতে সময়ে সময়ে করিডর হিসাবে অন্তত ছয় জায়গায় ছয়টা করিডর-সংযোগ সড়ক  থাকবে মূল হাইওয়ে সড়কে।  আর ঐ নৌপথের মধ্যে মধ্যে অন্তত দশটা জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের যোগাযোগ আছে/ থাকবে যেখান দিয়ে নৌপথ ছেড়ে কোন একটা করিডর ধরে মূল হাইওয়ে সড়কে উঠা সম্ভব।

২০১৩ সালের শেষের দিকে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নামে এই আইডিয়া প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিলেন চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাই এই প্রকল্পকে শি জিনপিং এর মাথা থেকে আসা প্রকল্পও বলে থাকেন অনেকে। গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ (আগের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’কে কেন্দ্র করে এই সম্মেলনের নাম এটা) এই মেগাপ্রকল্পের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ খবর মতে, মোট ৩০টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান এতে যোগদান করেছিলেন জানা গেল। এছাড়া মোট ১০০টারও বেশী রাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।  এদের মধ্যে ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধান বলতে রাশিয়ার পুতিন ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ অনেকে রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। আর দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যাদের এমন ওপর দিক থেকে সাতটা বড় রাষ্ট্র হিসেবে তাদের ক্লাব জি-৭ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রীই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তাই বলে ব্রিটেন, জার্মানি বা ফ্রান্স – ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই তিন মূল মাতবর এই সম্মেলন ঠিক বর্জন করছেন তা নয়, তবে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী হাজির ছিলেন।

আসলে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির চলতি দুনিয়ায় এবার নতুন করে চীনা নেতৃত্বে নতুন পোলারাইজেশনে ঢেলে সাজিয়ে খাড়া হতে চাচ্ছে; দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি এই শতকের শুরু থেকে সে দিকে। বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ সে পথে অগ্রসর হওয়ার দিক থেকে আর এক ধাপ উদ্যোগ বলা যায়। বিশেষ করে চীনের নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক যাকে বলা হয়, সেই এআইআইবি বা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) গঠনের সময় যেমন পশ্চিমের নেতি প্রতিক্রিয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এবার বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের সম্মেলন এর সময়ও অনেকটা সে মাত্রার না হলেও সেরকম কিছু নেতি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এবার ভারতের দিক থেকে। আর ওদিকে নেতি প্রতিক্রিয়ার নেতা খোদ আমেরিকা এবং এশিয়ায় আমেরিকার ঘনিষ্ঠ অংশীদার জাপান, এই দুই রাষ্ট্র বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর কথা সম্মেলনের আগে শুনা গেছিল।
তবে সম্মেলন শেষ পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে যাকিছু ছিল জল্পনাকল্পনা এখন সেসব সত্যি হয়েছে। আমেরিকান সরকারী  দলের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রেসিডেন্টের এডভাইজার (White House adviser Matt Pottinger)।  ভারতীয় মিডিয়া গত ১৩ মে থেকে প্রবলভাবে দাবি করছিল যে আমেরিকা ইউটার্ন নিয়েছে। সে এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছিল। আবার ব্যাপারটা একেবারে আকস্মিক বা হতেই পারে না তাও ছিল না। কারণ গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর থেকে ট্রাম্প শিবিরের এক্সপার্টরা বলতে শুরু করেছিলেন যে ওবামা এআইআইবি ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ এবং বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ এই দুটোর বিরোধিতা করে ঠিক করেননি।
ওদিকে ভারত অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কী নিয়েছে তা সম্মেলন শুরুর আগের সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পষ্ট জানা যায়নি। তবে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, ‘আমেরিকার ইউটার্ন ভারতের ওপর চাপ তৈরি করেছে’। কিন্তু ঠিক কী কারণে ভারত এই সম্মেলন বর্জন করছে এ বিষয়ে দুটো মিডিয়া দুই রকম জবাব দিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, ‘চীন বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প নিয়ে ভারতের জন্য যথেষ্ট আস্থার পরিবেশ তৈরি করেনি’ (…”China has not created an environment of trust to carry out the belt and road projects”.) তাই সে যাচ্ছে না। তবে ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসির কোন জুনিয়র প্রতিনিধি দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল। বিপরীতে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস লিখছিল, সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করে একটা মেসেজ দেয়া দরকার। কারণ তারা আমাদের সার্বভৌমত্ব ইস্যুকে হালকা করে দেখেছে। (India is set to skip China’s ambitious One Belt One Road summit over sovereignty issues related to the latter’s involvement in the China-Pakistan Economic Corridor (CPEC), news agency PTI reported. ) অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে ভারতের অংশগ্রহণ এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে সরকার ঠিক কী কারণ দেখাবে তা সম্ভবত এখনো অফিসিয়ালি সাব্যস্ত হয়নি। যার অর্থ দাড়ায়, সার্বভৌমত্বের অভিযোগটা নিয়ে ভারতই সিরিয়াস নয়। ব্যাপারটা আসলে এমনই এটা মনে করার কারণও আছে। কিন্তু ভারত অভিযোগটা উঠাল কোন সূত্রে?
পাকিস্তানের গোয়াদরে (আরব সাগরের মুখে, ইরানের সাথে সীমান্তে) গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের বুক চিরে দক্ষিণ থেকে উত্তর পেরিয়ে হাইওয়ে (চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর) সড়কপথ চালু করা হয়েছে। এটা পাকিস্তান পেরিয়ে চীনের ল্যান্ডলকড জিংজিয়ান প্রদেশের খাসগড়ে গিয়ে মিলেছে। তবে চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর এই করিডোর-সড়ক বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের মূল হাইওয়ে সড়ক আগে ক্রস করে নিয়েছে। অর্থাৎ গোয়াদর থেকে আসা সড়কই চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর। চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর। কিন্তু আবার পাকিস্তান পেরোনোর আগে এই সড়কের কিছুটা অংশে পাকিস্তানের আওতাধীন কাশ্মির পেরিয়ে এসেছে। আর এটাকেই ভারত ইস্যু করতে চাইছে। বাস্তবতা না থাকলেও ‘কাশ্মিরের পুরোটাই ভারতের অংশ’ বলে ভারতের এক অফিসিয়াল দাবি আছে। অতএব চীন পাকিস্তান-কাশ্মির ব্যবহার করে এই সড়ক তৈরি করে ভারতের সার্বভৌমত্ব হালকা করে দেখেছে -এই হল ভারতের উছিলা, ভারতের যুক্তি। অর্থাৎ এটা কোনোমতে মেলানো এক দাবি মাত্র। আগেই বলেছি ভারতের দুই মিডিয়ার দুই ধরনের বক্তব্য প্রমাণ করে ভারত সরকার নিজেই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে সিরিয়াস নয়। বরং চীন আরো কত তেল মারলে ভারত নিজেই এই সম্মেলনে যোগদান করবে যেন এরই অপেক্ষা। এ দিকটাতে তাকিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, “এবার এখনই সম্মেলনে প্রতিনিধি না পাঠালে ভারতের বস্তুগত লাভালাভের দিক থেকে ক্ষতি বৃদ্ধি নেই, কারণ ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প কোনো সদস্যপদভিত্তিক সংস্থা নয়’। অর্থাৎ আরো দেরি করে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে নিজের দাম আরো বাড়ে কি না তা পরখে নামতে চায় ভারত। তবে যোগদান না করার ব্যাপারে ভারত অবশ্যই বেপরোয়া নয়, কারণ এটা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং তা ফিজিক্যালিই গ্লোবাল। (There may not be any immediate material loss to India if it goes unrepresented because OBOR is not a membership-based organisation)। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় ভারত কখনোই চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সম্মেলনে যোগদান করবে না তা বলে নাই। অর্থাৎ আগেই একেবারে না করে দেয়নি। তবে এই প্রকল্পের প্রতি আমেরিকা নীতি অবস্থান, মতামত বদলে ছিল বলে নয়, এই সম্মেলন যে ইতোমধ্যে গ্লোবাল আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে এর আর এক ভালো প্রমাণ হল, এতে অংশগ্রহণ করছেন জাতিসঙ্ঘের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তেনিও গুতারেস এবং  বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের নির্বাহী প্রধানরা। এর অর্থ গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প একটা ফ্যাক্টর এর পক্ষে স্বীকৃতি এসেছে। আর তা হওয়ার কোন কারণ নাই। কারণ, পুরা প্রজেক্ট মানে ৬৫ টা রাষ্ট্রের তরফে সব বিনিয়োগ যোগ করলে শেষে সেটা ৯০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে এক অনুমিত হিসাব দেখিয়েছে।

তবে শুরুতে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে, তা ইতোমধ্যেই রেডী। এর জবাবে চীন বলছে ৪০ বিলিয়ন ডলার চীন নিজের উন্নয়ন ব্যাংক থেকে জোগান দেবে। আর তাতক্ষণিক বাকিটা আসবে সদ্য গঠিত এআইআইবি ব্যাংক থেকে। এ ছাড়া ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের ভেতরে যে আরো একটা অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক আছে (নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে, সম্প্রতি যেখানে বাংলাদেশসহ ১৫ এশিয়া দেশকে সদস্য করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে) সেখান থেকেও জোগানো হতে পারে। মোট ৬৫টি রাষ্ট্র এই প্রকল্পে যোগ দেয়া আর নিজের নিজের রাষ্ট্রকে মূল অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নিতে গেলেও প্রত্যেক রাষ্ট্রকেও কিছু সংযোগ-অবকাঠামো করে নিতে হবেই। আর সে কাজেও যা বিনিয়োগ লাগবে সে ঋণের বড় অংশ  চীন জোগান দিতে রাজি। আবার বিশ্বব্যাংকো কী বিনিয়োগের সুযোগ নিবে না? আর পশ্চিমা জগতের যেখান থেকে বিনিয়োগ আসুক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে বিনিয়োগের মুল উৎস হবে আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট। অতেওব আমেরিকাসহ সাড়া পশ্চিম এতে অংশগ্রহণে ঝাপিয়ে পড়বে এতাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা চীনা বিনিয়োগ পাব বেশ বড় অঙ্কে, সেটা অনেক বেশি পরিমাণ হবে। তাহলে ভারত কী দূরে গোসা ঘরে খিল লাগিয়ে বসে থাকবে, পারবে? নাকি পোষাবে?

কলকাতা থেকে বাংলাদেশ, মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং – যেটা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে বিসিআইএম (BCIM) প্রকল্প বলা হয়- সেই হাইওয়ে সড়ক কুনমিং চীন হয়ে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা, পরিকল্পনা মোতাবেক। এই সড়কের আর একটা অংশ হবু সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত থা্কার কথা। সোনাদিয়া-বিসিআইএমের মাধ্যমে এটাই আর একটা করিডোর হিসেবে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হবে। এই হল পরিকল্পনা। এখন ভারতের ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পে যোগ না দিতে ইচ্ছা জানানোর অর্থ হবে ভারত বিসিআইএম প্রকল্পে নেই। কলকাতা-বাংলাদেশ অংশটা নাই। এমন ইচ্ছা করতে ভারত চাইতেই পারে। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না এমন ইচ্ছার কাফফারাও আছে তা ভারতের অজানা নয়। তবু একটা কথা এবার স্পষ্ট যে এতদিন বিসিআইএম নিয়ে গড়িমসি করা, মিয়ানমারকে নিরাসক্ত করে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা, বাংলাদেশে বন্দরের স্থান নির্বাচন নিয়ে হাসিনার উপর অর্থহীন হস্তক্ষেপ ও সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি যা কিছুতে ভারত ভূমিকা রাখতে পেরেছিল, এবার সেসবের দিন শেষ। ভারতের পড়শি কোনো রাষ্ট্র এই সম্মেলনে যোগ দিতে বাকি নেই, মিয়ানমার নেপালসহ, ব্যতিক্রম শুধু ভুটান।এটা এখন সবার কাছে স্বচ্ছ যে ভারত, ভুটান আর ওদিকে জাপান ছাড়া এশিয়ার আর কোন রাষ্ট্র বাকী নাই। সবাই ভারতকে ছেড়ে চলে গেছে।
এক কথায় বললে ভারতের পক্ষে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী না সম্ভবত বলা যায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ভারতের পক্ষে অসম্ভব। যেমন সেক্ষেত্রে এর একটা অর্থ হবে, ৬৫টি রাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে বা একই পদক্ষেপে একই অবকাঠামো সুবিধায় যুক্ত হওয়া – যেকোন রাষ্ট্রের জন্য এ’এক বিরাট সুযোগ। এথেকে ভারত নিজেকে বাইরে রাখবে? যদি জিদ করে রাখেই (যদিও জিদ করে রাষ্ট্র চলে না) তবে সেটা হবে দেখার মত ঘটনা। কারণ সেটা হবে রীতিমত নিজেই নিজের ওপর অবরোধ ডাকার শামিল। সবার থেকে একঘরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ফলে ভারতের এমন সিদ্ধান্ত নেয়া অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, কিছুটা দেরি করতে পারে। কিন্তু তাতেও নিজের ক্ষতি, পিছিয়ে পড়ায় ঘটবে।

আগেই বলেছি  গ্লোবাল অর্থনীতির চীনের নতুন নেতা হওয়ার দিক থেকে বিচারে,  বিশ্বব্যাংকের সমান্তরালে এআইআইবি ব্যাংক চালু করে ফেলতে পারা – এটা যদি নতুন নেতা হবার পথে একটা অগ্রপদক্ষেপ হয়ে থাকে, তবে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ হবে প্রায় সমান্তরাল তবে বেশী গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় পদক্ষেপ। আর এক ধাপ আগানো। যদিও প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক থেকে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের ইমপ্যাক্ট হবে এআইআইবি ব্যাংকের চেয়ে বেশি। কারণ এটা অবকাঠামো, মানে ফিজিক্যাল পদক্ষেপ। আর এই ফিজিক্যাল পদক্ষেপের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকার কারণে গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের ওজন ও গুরুত্ব হবে আরো দৃশ্যমান এবং এটা হবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গ্লোবাল অর্থনীতিতে ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছর ডাবল ডিজিট গ্রোথের কাল মানা হয়, বর্তমানে যা তুলনামূলক শ্লথভাবে চলছে। মনে রাখতে হবে সে অর্থনীতিতে আবার এক গতির সঞ্চার করার সম্ভাবনা রাখে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ।
আজকের ভারত হল, সেই ডাবল ডিজিট গ্রোথের কালের এক অন্যতম বেনিফিশিয়ারি। আবার এআইআইবি ব্যাংক গড়ার কালে ভারত ছিল সঠিকভাবেই চীনের সমর্থক, প্রধান সাগরেদ। ওই ব্যাংকের মালিকানায় চীনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ, এরপরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারতের প্রায় ১০ শতাংশ, অন্যদের মধ্যে ৫ শতাংশর ওপরে কেউ নেই। আমেরিকার শত প্ররোচনাতেও ভারত চীনের ওই ব্যাংক উদ্যোগে সাথ ছাড়েনি।

তাহলে ভারত ঠিক কিসের বিরোধিতা করছে, কী পেতে সেটা করছে? আমরা আশা করি না এসব ক্ষেত্রে ভারতের কোনো সিদ্ধান্ত ঈর্ষাপ্রসূত, ভুল ভিত্তির এক্সপেকটেশন বা ওভার এস্টিমেশনের দোষে দুষ্ট হবে। দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম জেঁকে বসার পর থেকে দেখা গেছে এক এক কালে কোনো এক রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডে ওই কালের সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ভূমি হয়ে হাজির হয়েছে। যার অর্থ এরপরের নতুন বিনিয়োগ বা নতুন যেকোনো উদ্যোগ নেয়ার সুবিধা ওই রাষ্ট্র এককভাবে পেয়েছে। এখন সে সুবিধা ভোগের  দিন চলছে চীনের। এটা অবজেকটিভ, ফলে এর সাথে লড়ার বা একে মানতে না চাওয়ার কিছু নেই। কারণ এই সঞ্চিত উদ্বৃত্ত এটাই যেকোনো রাষ্ট্রের পরাশক্তি, রুস্তমি, প্রভাব বিস্তারসহ সব ধরনের ভূমিকায় হাজির হওয়ার আসল উৎস। এটা অবজেকটিভ বলে তা না মানাও মুশকিল। ফলে দুটি কথা ভারতকে মানতেই হবে। এক. আমেরিকা ভারতের ভবিষ্যৎ নয়। ভারতের পক্ষের শক্তি নয়, বড়জোর অস্ত্রের সরবরাহকারী হতে পারে। তা হোক, তাতে সমস্যা নেই। তবে গ্লোবাল অর্থনীতির আগামী নেতৃত্বের ভাগ অর্থে ভারতের পক্ষের শক্তি হল চীন। এটা শুনতে অনেকের ঈর্ষা মনে কটু লাগতে পারে কিন্তু এটা বাস্তবতা। ফলে চীনের সাথে সীমানা বিরোধসহ যা কিছু বিরোধ আছে তা নিগোসিয়েশনের সুযোগ নেয়া হবে ভারতের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।কিসের ভিত্তিতে ভারত ধরেই নিয়েছে চীনের সাথে তার য়াগামি দিন হবে সংঘাত ও বিরোধে? পিছন ফিরে বা আশেপাশে তাকালে এটা দেখতে পাওয়া মোটেই কঠিন নয় যে এই ধারণার উৎস ও সরবরাহকারি হল খো আমেরিকা। আর তার পরিচালিত নানান থিঙ্কট্যাংক-গুলো। আজকে এসব ঠিঙ্ক-ট্যাংকগুলো আমেরিকার প্রতিনিধি পাঠানোর এই ইউ-টার্ণ এর কী ব্যাখ্যা দিবে? চীন নাকি খালি ভারতকে ঘিরে ধরার মতলবে আছে? তাহলে সেই ভারতকে ফেলে আমেরিকা কোথায় ছুটছে? আসলে কারও প্ররোচিত বক্তব্যে, বুলিতে থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক হয়না। চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। আর এর প্রধান শর্ত অন্তত দেশীয় অর্থে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়।

এ ছাড়া এশিয়াতে কার ভূমিকা প্রধান হবে ভারতের না চীনের? এই তর্ক কী ভারতের ইচ্ছাধীন নাকি ভারতের অর্থনৈতিক সামর্থের উপর নির্ভরশীল? ভারতের সামর্থ এশিয়ায় চীনের চেয়ে বেশি হলে ভারত বাড়তি সুবিধা পাবে, নইলে নয়। তাই নয় কী?  এটা তো বাংলাদেশে একজন বসিয়ে, ল্যান্ডলক নেপালে ঐতিহ্যবাহী নিয়ন্ত্রণ আগের মতই বজায় থাকবে ধরে নিয়ে, শ্রীলঙ্কায় নতুন সরকার কায়েম করে চীনের প্রভাব কমাতে হবে ইত্যাদিতে যা কিছু করা হয়েছে তাতে কোনো কিছুই সামলানো যায়নি, যাবে না। এছাড়া এটা আর কলোনি সাম্রাজ্যের যুগ নয়। এ যুগে “চীনের সাথে ভারতের পড়শিরা সম্পর্ক রাখতে পারবে না” ভারত সবাইকে চীনমুক্ত দেখতে পাবে –  এটা ভারতের কোনো মুরোদের ওপর ভরসা করে নেয়া বিদেশনীতি? এর চেয়েও অবাক কাণ্ড এই বাস্তবতাহীন নীতিকে প্রশ্ন করার লোকজন ভারতে ক্রমশ  দুষ্প্রাপ্য হচ্ছে। যার মূল কারণ সম্ভবত এরা আমেরিকার পে-রোলে নাম লিখিয়েছে। অথচ খোদ আমেরিকাই পল্টি মেরেছে! তাই নয় কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। চীনে শীর্ষ সম্মেলন যা এই লেখার বিষয়বস্তু তা ছিল ১৪-১৫ মে। ফলে লেখাটা শেষ করা হয়েছিল সম্মেলন শুরুর আগে। আর এখানে এখন যখন আবার প্রকাশ করা হচ্ছে তখন ঐ সম্মেলন শেষ হয়ে গেছে। ফলে আপডেট করার মত বহু তথ্য এখন জমা হয়ে গেছে। তার বহু তথ্য এখানে যতটা সম্ভব আপডেট করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটা আগের লেখার থেকে বহুলাংশে সংযোজিত এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]