চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

গৌতম দাস
২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lK

 

 

চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

সাইড লাইন
যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ট্রাম্পের পর ভারতও – ‘এক-চীন’ নীতিতেই

ট্রাম্পের পর ভারতও, ‘এক-চীন’ নীতিতেই

গৌতম দাস

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার

http://wp.me/p1sCvy-2d3

ভারতও এক-চীন নীতি মেনে চলতে চায় বা মেনে চলছে – পরোক্ষে সেকথাই ভারত চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। একচীন নীতি মানে হল, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এটা স্বীকার করা। ‘এক চীন নীতি’ মেনে নিয়ে গত ০৯ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপ করেছেন, সে খবর জেনে দুনিয়া হাঁফ ছেড়ে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়েছিল। কারণ চীন-আমেরিকার কোন স্বার্থ সংঘাত থেকে কোন সামরিক উত্তেজনা তৈরি করুক সেটার মুখোমুখি হতে দুনিয়ার বেশির ভাগ সংশ্লিষ্ট পক্ষ এখন চায় না।  কিন্তু এ খবর শুনে কেউ কেউ দুঃখে হতাশও হয়েছিল। সম্ভবত তেমন রাষ্ট্র হল ভারত। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে বিশেষ করে জয় লাভের পরে, আরও শক্ত করে ক্রমাগত চীনবিরোধী ‘রেঠরিক’ তুলে চলছিল। যেমন- আমেরিকায় চীনা পণ্যের প্রবেশের উপর ৪৫ শতাংশ ট্যাক্স বসাব, চীন কারেন্সি ম্যানিপুলেটর (মুদ্রা বিনিময় হারের উপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ করা), চীন আমেরিকানদের চাকরি নষ্ট করছে, পরিবেশবাদীদের পরিবেশ ক্ষতির আওয়াজ আসলে চীনা প্রচারণা, এক চীন নীতি মানতে আমরা বাধ্য নই ইত্যাদি আপত্তির বোলচাল হাজির করেছিল। এভাবে এক কথায় বললে ট্রাম্প যেন বিশাল এক ‘চীন-লড়ানি’ দিতে আসতেছেন বক্তব্যের এমন ভাব তৈরি করে ট্রাম্প দুনিয়াকে উদ্বিগ্নতায় অস্থির করে ফেলেছিলেন। বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্পের সেসব তৎপরতা ও বোলচালে সবচেয়ে বেশি আস্থা স্থাপন করেছিল ভারত। ট্রাম্প এভাবে  সামনে খাড়ায় গেলে তাঁকে আড়াল হিসেবে রেখে সে আড়ালকে ব্যবহার করার সুযোগ দেখেছিল ভারত। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ট্রাম্পের আমেরিকার ওপর ভারতের আস্থা রাখা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। মানুষ অন্যের মাথায় কাঁঠাল রেখে খায়, কথা সত্য। কিন্তু বুদ্ধিমানেরা কেবল এই সুবিধার দিকটাই দেখে না, সম্ভাব্য অনুষঙ্গি অসুবিধা বা ক্ষতির দিকেও চোখ রাখে। মনে হচ্ছে, ভারত সেটা রাখতে পারেনি।  দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প ‘পল্টি’ দিয়ে অবস্থান বদল করলে কী হবে, সেটা নিয়ে কমই ভেবেছিল ভারত। তাই ভারত তাইওয়ানের এক সরকারি প্রতিনিধিদলকে (তিনজন এমপিসহ ব্যবসায়ীরা) ভারতে তিন দিনের সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে সফরের আয়োজন করেছিল। ইতোমধ্যে সে সফর সম্পন্নও হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আফটার এফেক্ট বা পরবর্তি-প্রতিক্রিয়া রেখে গেছে।

বিগত ’৭০-এর দশক থেকেই এক চীন নীতি মেনে চলার আমেরিকান প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করে ট্রাম্প তা মানতে না চাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন- এই মাসল ফুলানো দেখে ভারত সেটাকে নিজের মাসল মনে করে বসেছিল। ভুলে গিয়েছিল যে ভারতও এক চীন নীতি মেনে এই শর্তেই চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ও সে সম্পর্কে আছে। ফলে স্বভাবতই ভারত তাইওয়ানকে স্বাধীন সরকার গণ্য করতে পারে না। অর্থাৎ তাইওয়ানের সাথে ভারতের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। কিন্তু ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে, যেটা চীন সরকারও আপত্তি করে না।
যেমন তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে ভারতের ‘কার্যত এক অ্যমবেসি’ আছে যেটার আনুষ্ঠানিক নাম হল ইন্ডিয়া-তাইপে সমিতি (ভারত-বাংলাদেশ সমিতির মত)। কারণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি সম্পর্ক নেই বলে তাইপে-তে ভারতীয় অ্যামবেসি খোলা সম্ভব নয়। তবে লক্ষ করার বিষয় রাষ্ট্র পরিচয়ে ইন্ডিয়া বলা হলেও এর সমান্তরালে ‘তাইওয়ান’ বলা হয়নি, ধরা হয়নি। তাইওয়ানকে রাষ্ট্র বিবেচনা করা হয়নি। (রাষ্ট্রের নামের জায়গায় রাজধানীর নাম) তাইপে বলা হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে এখানে নাম বলার লজিকে মিল নেই, ইচ্ছা করে রাখা হয়নি। কারণ বলতে হত হয় ইন্ডিয়া-তাইওয়ান, না হলে দিল্লি-তাইপে। এর কোনোটাই না হয়ে নাম রাখা হয়েছে ইন্ডিয়া-তাইপে অ্যাসোসিয়েশন (সমিতি)। আর এর বিপরীতে  দিল্লিতে তাইওয়ানের সমিতি অফিসের সমতুল্য হিসাবে তাইপে-তে অফিসটির নাম রাখা হয়েছে – ‘তাইপে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’, মাত্র ১৯৯৫ সালে যা প্রতিষ্ঠিত। চীনের সাথে অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক বিনিময়ের শর্ত হলো তাইওয়ান চীনের অংশ, এটা মানতে হবে। ফলে কোন রাষ্ট্র তাইওয়ানের সাথে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারবে না। তবে তাইওয়ানের সাথে ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’ সম্পর্ক রাখা যাবে। যেমন, তাইওয়ানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কও ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’। কোনো কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। আসলে এটাই কোনো রাষ্ট্রের একই সাথে তাইওয়ান ও চীনের সাথে সম্পর্ক রাখার একমাত্র উপায় – এই একটাই উপায়  চীন খুলে রেখেছে। আমেরিকা, ভারত বা বাংলাদেশসহ সবাই তাই এই পথের পথিক।

যেটা বলছিলাম ভারত ট্রাম্পের আড়ালে সুযোগ নিতে চেয়েছিল। তাইওয়ানের সংসদীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে তিন এমপিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এবং গত সপ্তাহে তাদের ভারত সফর সমাপ্ত হয়। এরপরই চীনা কড়া প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। প্রতিশ্রুত এক চীন নীতি থেকে ভারতের সরে যাওয়ার কথা চীন স্মরণ করিয়ে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কড়া’ আপত্তি জানায়। কূটনৈতিক ভাষায় এ ধরনের আপত্তি তোলাকে ‘সলেম রিপ্রেজেন্টেশন’ (solemn representation) বলে। অর্থ হল, যথেষ্ট ভাবনা চিন্তা করে শপথ করে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলার জন্য দেখা করা।  দু’টি উৎস থেকে চীনের এই আপত্তির খবর জানা যায়। এক. চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের প্রেস-ব্রিফিংয়ের প্রশ্ন-উত্তরে। আর দুই. চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা থেকে। এটা ‘বিশেষ’ এক সরকারি পত্রিকা। চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয় যেসব কথা, মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া বা মনোভাব যেটা তাদের মনের আসল কথা কিন্তু নানান জটিলতা এড়াতে আনুষ্ঠানিকভাবে তা বাইরে বলতে চায় না অথচ চীনা সরকারি অবস্থান কী, কী ভাবছে তারা এটা দেশে-বিদেশে সবাইকে জানাতে চায়, সেই প্রয়োজন আর এমন সব পাঠকের কথা চিন্তা করে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে। দেশী-বিদেশী মিডিয়া পাঠকেরা তাই এই চোখেই গ্লোবাল টাইমস পাঠ করে থাকে। বিশেষ করে এই পত্রিকার নিয়মিত সম্পাদকীয় এর মাধ্যমে চীনা সরকারি অবস্থান অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়। গ্লোবাল টাইমস ১২ ফেব্রুয়ারিতে লেখা এক সম্পাদকীয়তে তাইওয়ানিজ প্রতিনিধি দলের ভারত সফর সম্পর্কে চীনের বিস্তারিত মনোভাব ও আপত্তির দিক জানিয়েছে। এর শিরোনাম হল – “নয়াদিল্লি তাইওয়ান কার্ড খেললে হারার ক্ষতিতে ভুগবে”। (New Delhi will suffer losses if it plays Taiwan card)।

ইতোমধ্যে চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেছেন,  “We hope India would understand and respect China’s core concerns and stick to the One-China principle and prudently deal with Taiwan-related issues and maintain sound and steady development of India-China relations.”। বাংলা করে বললে, “আমরা আশা করি, এক চীন নীতি চীনের মুখ্য স্বার্থ এটা ভারত জানে। ফলে তা ভারতের বোঝা ও সম্মান করা উচিত। অতএব বুদ্ধিমানের মতো করে সে তাইওয়ান সম্পর্কিত ইস্যু নাড়াচাড়া করবে এবং চীন-ভারতের সম্পর্ককে নিস্তরঙ্গে ও ধারাবাহিকতায় বিকশিত করবে”। ওই মুখপাত্র এক চীন নীতিতে তাইওয়ান সম্পর্কিত ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমরা সব সময় (তাইওয়ানের সাথে) সরকারি যোগাযোগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক বা কোনো সরকারি প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ার বিরোধিতা করে এসেছি”। এ বিষয়টা মিডিয়ায় সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে এসেছে ভারতের হিন্দুস্তান টাইমসের বেইজিং প্রতিনিধি- সুতীর্থ পত্রনবীশের এক বিস্তারিত রিপোর্টে। যেটা হিন্দুস্তান টাইমসসহ অন্যান্য বিদেশী পত্রিকাতেও অনুমতি নিয়ে কপি ছাপা হয়েছে।

চীনা গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে লেখা প্রথম বাক্য হল – এক চীন নীতিতে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টে গেছেন তখন ভারত উসকানিদাতা (‘provocateur’) হতে চাচ্ছে। এ সফর আয়োজনে ভারতের মতলব কী ছিল, সে সম্পর্কে চীন কী মনে করে তা জানা যায় পরের প্যারা থেকে। এখানে তা অনুবাদ করে তুলে আনছি : ‘কিছু ভারতীয় তাইওয়ান প্রশ্নকে চীনের গোড়ালিতে কাঁটা মনে করে। এরা দীর্ঘ দিন ধরে তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর ও দালাই লামা ইস্যুকে চীনের বিরুদ্ধে দরকষাকষিতে ব্যবহার করতে চেয়ে আসছে। সাম্প্রতিককালে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর [এটা প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প; পাকিস্তানের গভীর সমুদ্রবন্দর Gwadar Port থেকে দক্ষিণ-উত্তর এভাবে সারা পাকিস্তানের বুক চিরে যে সড়ক চীনের ল্যান্ড লকড পশ্চিমাংশে প্রবেশ করেছে – এই ব্যাখ্যা আর্টিকেল লেখকের] প্রকল্পের অগ্রগতিতে চীনের বিরুদ্ধে ভারতের স্ট্রাটেজিক সন্দেহ বাতিকতা বাড়ছে। ভারত জেনেশুনে গোঁয়ারের মতো চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে, যেটা আসলে যেসব রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে যাবে তাদের সবাইকে সুবিধা দেবে- এমনকি ভারতকেও একইভাবে (যদি ভারত চায়)। ওই অর্থনৈতিক করিডোর যেহেতু পাকিস্তান কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে কিছু অংশ যাবে (কাশ্মিরের পাকিস্তান অংশ তুলনায় রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হলেও ভারতের চোখে যেহেতু পুরো কাশ্মিরই বিতর্কিত) ফলে সেটা বিতর্কিত ভারতের কিছু কূটবুদ্ধিদাতা এই যুক্তিতে মোদি সরকারকে তাইওয়ানিজ কার্ড খেলার পরামর্শ দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হল, ভারত চীনের এক চীন নীতি মেনে চীনের সাথে সম্পর্ক করেছে তাই এর বিনিময়ে (পুরো কাশ্মির ভারতের এই) ‘এক ভারত’-এর পক্ষে চীন সমর্থন চেয়ে বসুক। কিন্তু তাইওয়ান প্রশ্নে চীনকে চ্যালেঞ্জ করে ভারত আসলে আগুন নিয়ে খেলছে। এই দ্বীপ (তাইওয়ান) ভারতের কোনো কাজে আসবে না, না তাকে ব্যবসা বিনিয়োগের উন্নতিতে, না মেনল্যান্ড চীনকে ঠেকিয়ে দিতে। ওদিকে স্টিল, টেলিকম ও আইটি ব্যবসায় মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিতে তাইওয়ানিজ বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে মেনল্যান্ড-চীন ভারতের এক মেজর ট্রেডিং পার্টনার আর এই সম্পর্কের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধও কিছু পুরনো ঝগড়ার কারণে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সময়ে কঠিন হয়ে যায়”।

এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্প
এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্প

এত দূর বলে সম্পাদকীয় এবার দুটো বাক্যে – একটি সাবধান বাণী আরেকটিতে পরামর্শ রেখেছে। সাবধান বাণী হল, তাইওয়ান ও মেনল্যান্ড চীনের বিবাদে ভারত যেন ব্যবহৃত না হয়ে যায়, তাইওয়ানের এমন উদ্দেশ্য আছে। আর পরামর্শ হল – ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে [যেটা এশিয়া (পাকিস্তান) থেকে ইউরোপ পর্যন্ত এক সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা, যার বিভিন্ন স্থানে গভীর সমুদ্রবন্দরের কানেকশন থাকবে] যোগদানের সুবিধা নিয়ে ভারত চীন থেকে প্রচুর বিদেশী বিনিয়োগ আনতে পারে।
এ তো গেল চীনের প্রতিক্রিয়া। কিন্তু ট্রাম্পের পিছু হটার পর এবং ভারতের কেসে চীনের শক্ত আপত্তি তোলার পর ভারতের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? চীনের একটা শক্ত আপত্তির পয়েন্ট ছিল তাইওয়ান-ভারতের সম্পর্ককে কখনোই সরকারি ছাপ দেয়ার চেষ্টা বা সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা অতীতে করা হয়নি। এখন কেন ভারত দাওয়াত দিচ্ছে? এ প্রশ্নে বাস্তবতা কী তা সহজে সবচেয়ে ভালোভাবে আমরা জানতে পারি হিন্দুস্তান টাইমসের পত্রনবীশের লেখা রিপোর্ট থেকে। সবচেয়ে মুল্যবান রিপোর্ট সেটা। তিনি জানাচ্ছেন এই গত বছর মে মাসের কাহিনী, সময়টা ছিল এখনকার তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্টের নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের। তিনি ভারতকে সরকারি পর্যায়ে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু ভারত সেখানে কোনো প্রতিনিধি পাঠাতে রাজি হয়নি। এই উদ্ধৃতি দেয়ার পর পত্রনবীশ প্রশ্ন তুলে বলছেন, তাই এখন “তাইওয়ানিজ ডেলিগেশনকে দাওয়াত দেয়ার অর্থ ভারত তার নীতি থেকে সরে গেছে, বদল ঘটিয়েছে”। অর্থাৎ পত্রনবীশের চোখেও ভারতের আচরণ অস্বাভাবিক ও বেমিল।
ভারতের দিক থেকে চীনা অভিযোগের জবাবে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপের সাফাই বক্তব্য আছে। ভারতের লাইভমিন্ট পত্রিকা থেকে নিয়ে তা অনুবাদ করে বললে তা এ রকম : “ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে এমন বেসরকারি (ইনফরমাল) ভারত সফর এর আগেও হয়েছে। আমার জানা মতে তাঁরা এমন সফরে চীনেও যায়। তাই এই সফরের মধ্যে নতুন বা অস্বাভাবিক কিছু নেই। আর এর ভেতরে রাজনৈতিক মানে খোঁজারও কিছু নেই”।

কূটনীতির ভাষা হয় ক্যালকুলেটিভ, আগেভাগে হিসাব-কিতাব করে বলা কথা। বিকাশ স্বরূপ তাই করেছেন। তার বক্তব্যের মূল অর্থ বহনকারী শব্দগুলো হল – ‘ইনফরমাল’, ‘নতুন বা অস্বাভাবিক’, ‘রাজনৈতিক মানে’ ইত্যাদি। তিনি প্রথমেই সব কিছু ঠাণ্ডা করতে এই সফর বা দাওয়াত সরকারি নয়, ‘ইনফরমাল’- এই অস্ত্র চেলে দিয়েছেন। এভাবে সব অভিযোগ নাল ও ভয়েড করে দিয়েছেন তিনি।  যদিও ডেলিগেশনে ‘সংসদীয় প্রতিনিধি কেন’ এই প্রশ্নে তিনি কিছু বলতে না পারায় এটা তাঁর সাফাইকে একটু দুর্বল করেছে। তাই তিনজন ‘সংসদীয় এমপি’ এদের এই পরিচয়টি উহ্য রেখে আড়াল করে তিনি বলতে ছেয়েছেন – ওরা ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে ভারতে আসা লোকজন। এই বলে পরিচয়টি হালকা করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তাইওয়ানিজরা চীন সফরে যায় এ কথাও সত্য। এমনকি তারা চীনের বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য যে নতুন ব্যাংক (AIIB) হয়েছে, তারও আলাদা সদস্য হয়েছে তাইওয়ান। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ কথাগুলো সত্ত্বেও একটাই ফারাক যে, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টতা বা সফরের একটাও চীনের সরকারি পর্যায়ে দেয়া দাওয়াত নয়। চীনা নীতি হল রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক বা স্বীকৃতি না হলেই হল। মূলত ব্যবসায়ী যোগাযোগ, এটা করা জায়েজ। বিকাশ স্বরূপ তাই ব্যবসার কথা এনে সবশেষে তাইওয়ানিজদের সাথে এই যোগাযোগের কোনো ‘রাজনৈতিক মানে’ নেই দাবি করছেন। অর্থাৎ এটা রাজনৈতিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক নয়, তাই তিনি বলে সাফাই আনতে চাইছেন।

তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ মিডিয়ার অনেকে এটা ভারতের নীতি পরিবর্তন বলে ভারত সরকারকে অভিযোগ করেছে। আবার অনেকে এটাকে – চীনা দাবি ভারতের ‘উড়িয়ে দেয়া’ এমন বিশেষণ লাগিয়ে হাজির করেছেন। স্বভাবতই ‘উড়িয়ে দেয়া’ বিশেষণ এটা জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা। কিন্তু আসলেই কি এটা বিকাশ স্বরূপের চীনকে ‘উড়িয়ে দেয়া’?
অবশ্যই নয়। প্রথমত, ভারতের বক্তব্যের সারকথা হল, আমরা এক চীন নীতি ভাঙিনি, নীতির বাইরে যাইনি, নতুন কিছু করিনি। এটা আগের মতোই। এবং সর্বপরি, এটা ইনফরমাল” – এই কথাটা গুরুত্বপুর্ণ।  কথার সোজা অর্থ হলো ভারত এক চীন নীতিকে দেয়া প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে চায়, চলেছে এবং মেনে চলা দরকার মনে করে। অমান্য করতে চায় না। ভারতও এক-চীন নীতি মেনে চলতে চায় বা মেনে চলছে – পরোক্ষে সেকথাই ভারত চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে ভারত। ফলে তাইওয়ানের সাথে সরকারি যোগাযোগ ভারত করতে চায় না। অর্থাৎ আমি আইন মানা ভারত- এটাই বলতে চাওয়া। ভারত চীনকে চ্যালেঞ্জও করছে না। ট্রাম্পের মতো উড়িয়ে দেয়া নয় এটা।
অতএব এটা ট্রাম্পের মতো অবস্থান নয়। ভারত বলছে না এক চীন নীতি মানতে হবে কেন? অথবা মানব কি না তা নিয়ে দরকষাকষি করতে চাই; অথবা আমাকে অমুকটা দিলে তাহলে মানব- এমন অবস্থান এটা নয়। তাহলে এটা উড়িয়ে দেয়া হয় কী করে? এটা উড়িয়ে দেয়া নয়।
আরো স্পষ্ট করে বললে ভারত মনে করে, মেনল্যান্ড চীনের সাথে সম্পর্ক ভারতের কাছে তাইওয়ানের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ ভাবটাই ভারত প্রকাশ করেছে। ব্যাপারটা বাস্তবেও তাই।
আসলে ব্যাপার হল, চীনের সাথে কোন রাষ্ট্রের এক চীন নীতি মানতে না চাওয়ার মানে হল ওই রাষ্ট্র চীনের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলতে পরোয়া করে না। ক্ষেপাটে ট্রাম্প চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এমন অনেক কথা বলতেই পারেন। কারণ পরিণতি চিন্তা না করে তা বলা একেবারেই সহজ। কিন্তু সম্পর্ক ছিন্নের অর্থ চীনে আমেরিকার যেসব ছোট বা বড় ব্যবসায়ী, ওয়ালস্ট্রিট বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে ভালো বোঝেন। যারা  চীনে ব্যবসা করে টিকে আছেন, এখন তাদের সবাইকে চীনের সাথে সম্পর্কহীন হতে হবে। এটা কি সম্ভব? এটা কেউ কি রাজি হবেন? অর্থাৎ এই এখানে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেয়ার আসলে কেউই নন। আর ভারতের ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা কম-বেশি এমন নয়? বাস্তবতা হল চীনের বিনিয়োগ, ভারতে শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ভাইটাল। অবশ্যই চীনের কাছেও এই সম্পর্ক কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। ছয় মাস আগে ভারতের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল চীনা বিনিয়োগ আনতে চীন সফরে গিয়েছিল। চীনের সাথে ভারতের বিনিয়োগ আনার সম্পর্ক এটা রিয়েলিটি। আসলে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় উদ্বৃত্ত বিনিয়োগ পুঁজি, সক্ষমতা যে কালে যেখানে যে রাষ্ট্রে আছে, বিনিয়োগ সেখান থেকেই আসবে। সেদেশ সবচেয়ে অপছন্দের হলেও। এটাই স্বাভাবিক। তবুও ট্রাম্পের কোলে চড়ে কিছু যদি বাড়তি ভারতের হাতে লেগে যায়- এমন ব্যর্থ প্রচেষ্টার ব্যতিক্রমও আমরা দেখতে পাবো।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

চীনা প্রেসিডেন্টের সফরঃ গভীর সমুদ্রবন্দরের কী হবে

চীনা প্রেসিডেন্টের সফর

গভীর সমুদ্রবন্দরের কী হবে

গৌতম দাস

১৬ অক্টোবর ২০১৬, রবিবার
http://wp.me/p1sCvy-1RU

[লেখাটা গত ১৪ অক্টোবর শুক্রবার চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের দিনেই লেখা। তবে খুব সকালে বসে লেখা যখনও তিনি ঢাকায় অবতরণ করেন নাই। অর্থাৎ এটা চীনা প্রেসিডেন্টের সফর-পুর্ব সময়ে লেখা। কী আশা করা যেতে পারে, এই সফরে কী হতে পারে ইত্যাদি চিন্তা করে লেখা। সফর শেষের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন, কিছুটা যা অনুমান করা গিয়েছিল তাই। সেসব নিয়ে আর একটা লেখা লিখতে হবে। আজ এই সফর-পরবর্তি পরিস্থিতিতে বসে আপাতত সফর-পুর্বের লেখা মনে রেখে এ’লেখা পড়তে হবে।]

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সরকারের উৎসাহ ও প্রচার ছিল লক্ষণীয়। যার অন্তর্নিহিত বার্তা সম্ভবত এই যে ১. অনির্বাচিত ভাবে ক্ষমতায় থাকা বর্তমান সরকার দেখাতে চায় যে চীনা প্রেসিডেন্টের মত গুরুত্বপুর্ণ ও ক্ষমতাধর বাংলাদেশে এসেছে, অতএব আমার স্বীকৃতির প্রসঙ্গ এতে অনেকটাই কেটে গেছে।  আর ২. বর্তমান সরকার ভারত-নির্ভরশীল ও ভারতের গভীর সমর্থনের উপর দাঁড়ানো হলেও সরকার চীনের প্রেসিডেণ্টের এই সফরের গুরুত্ব বুঝেছে ও গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই কি? খুব সম্ভবত তা নয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় থেকে যেভাবে হঠাৎ করে গভীর সমুদ্রবন্দর ইস্যুতে সরকার থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল কারণ ভারত চাইছে সরকার দূরে থাকুক; সে থেকে ‘চীনকে দূরে রাখতে হবে’ বলে একধরনের ‘চীন-শীতলতা’ আমরা দেখে আসছিলাম, সে অবস্থান কী হিলেছে? নাই? হিসাব পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং তাও ভারতের কোন স্বার্থেই- তাই কী? এর স্পষ্ট চিত্র বুঝতে আর একটু অপেক্ষা করতে হবে। ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফর থেকে আমাদের সরকার বিশেষ আশাভরসা নিয়ে অপেক্ষা করছে, তা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তবে এটা সরকারের ভারত নির্ভরশীলতাকে ছাপিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টের সফরকে গুরুত্ব দেয়া হিসেবে পাঠ করার অবস্থায় যায়নি- এটা মনে করাই সম্ভবত সঠিক হবে। যেমন একটা প্রশ্ন করে আগানো যাক, প্রায় মৃত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প- সেটা সোনাদিয়া বা অন্য কোথাও যেখানেই হোক- তা কি এখনো জীবিত এবং এবারের সফরে বিনিয়োগ প্রকল্প স্বাক্ষরের তালিকায় আছে বা থাকবে কি? সোনাদিয়া হয়তো থাকবে না এটা আগাম ধরে নেয়াই যায়। তবে কী অন্য কিছু হতে পারে! আমাদের কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। যদিও সে প্রসঙ্গে কিছু কথা স্পষ্ট করে এখনই বলে দেয়া যায়। তা হল, আসলে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর এবারের বাংলাদেশ সফরে বন্দর প্রসঙ্গে যদি কিছু না হয় তবে এই সরকারের আমলে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর আর হচ্ছে না। বন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা – এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে কথাটা বুঝে বলা।  কারণ কথা হল, এমন সম্ভাব্য বন্দর নির্মাণ প্রকল্পে চীন সরকার জড়িয়ে থাকলে একমাত্র তবেই হবু বন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বজায় থাকবে, নইলে নয়। কারণ একা চীনই বড় ব্যবহারকারী হবে। দেশটি ল্যান্ড-লকড দক্ষিণ-পূর্ব দিককে সমুদ্র পর্যন্ত উন্মুক্ত করতে সড়ক ধরে এসে বন্দর ব্যবহারের জন্য  চীন খুবই আগ্রহী। আর তা করতে চীনের একারই এক গভীর সমুদ্রবন্দর দরকার। আর চীনের ব্যবহারের ভলিউম এতই বিরাট হবে যে, একা চীনই সে বন্দর ব্যবহার করে বিনিয়োগ তুলে আনার দেয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে। সে তুলনায় ব্যবহারকারী হিসেবে ভারতের থাকা না থাকাটা অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার দিক থেকে প্রভাবহীন ফলে অগুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত বড় কোনো ব্যবহারকারী নয়। ফলে ঠিক এই কারণে চীনকে ব্যবহারকারী হিসেবে বাইরে রাখা কথাটার সোজা অর্থ বাংলাদেশের কোন গভীর সমুদ্র বন্দর না হতে দেওয়া। অন্য ভাষায় চীন ছাড়া এক্সক্লুসিভ ভারতের ইচ্ছায় গভীর সমুদ্রবন্দর পায়রায় হওয়ারও সম্ভাবনা নাই। কারণ একক ব্যবহারকারি  যদি ভারত হয় সেক্ষেত্রে ঐ হবু বন্দরের বিনিয়োগ তুলে আনা অসম্ভব। ফলে এক্ষেত্রে আগ্রহী বিনিয়োগকারী খুঁজে পাওয়ার সমস্যাও দেখা দিবে। আর অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা দুর্বল হলে সেই সমস্যা আরো বেশি। সারকথায়, একা চীন ও বাংলাদেশ ব্যবহারকারী হলেই বাংলাদেশে কোন গভীর সমুদ্রবন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার (বন্দরের আয় থেকে বিনিয়োগ ফেরত আনা) জন্য তা যথেষ্ট হবে। কিন্তু একা ভারত ও বাংলাদেশ ব্যবহারকারী হলে তা যথেষ্ট হবে না। ওদিকে আবার বন্দর বিষয়ে ভারতের অবস্থান হল, সে চায় না চীন ব্যবহারকারী বা বিনিয়োগকারী কোনোটা হিসেবেই এই প্রকল্পে জড়িয়ে থাকুক। এই অবস্থায় মিডিয়ার অনুমিত ভাষ্য হল, এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী হাসিনার গত চীন সফরের সময় শেষ মুহূর্তে বন্দর বিষয়ে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। নিজ সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতের সমর্থন নির্ধারক বিবেচনা করে বলে অতএব ভারতের এই ইচ্ছা-স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়া এই সরকারের জরুরি। এই বিচারের জায়গায় বসে দেখলে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর এই সরকারের আমলে হওয়ার সম্ভাবনা নাই। যদি না ইতোমধ্যে নতুন কিছু ডেভেলপমেন্ট না থাকে। অর্থাৎ ওপরে যেটা বলেছি, ইতোমধ্যে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিডিয়ায় বক্তব্য এই অর্থে ‘নতুন কিছু ডেভেলপমেন্ট’ দেখা দিয়েছে কি না সে সন্দেহ রাখা যায়। আগামীকালের মধ্যে তা স্পষ্ট জানা যাবে আশা করা যায়। প্রথম আলো লিখেছে, প্রেসিডেন্ট শি এর সফরে নাকি ২৯টি বিনিয়োগ প্রকল্প আছে যার মোট পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলার – যা আলোচনার টেবিলে আছে। কিন্তু কী কী সেই প্রজেক্ট তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে তারা উল্লেখ করতে পারেনি।
এ ছাড়া আর একটা সম্ভাবনা আছে। প্রথম আলো লিখছে, “শি জিনপিংয়য়ের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ বা ওবোর নামে পরিচিত উন্নয়ন কৌশল ও রূপরেখায়” বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হতে সম্মতি জানালে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো গড়তে ‘চীনের সিল্করোড ফান্ড (এই উদ্যোগে যুক্ত দেশগুলোর জন্য চীনের সরকারি বিনিয়োগ তহবিল) থেকে স্বল্পসুদে ও সহজ শর্তে ঋণ’ পাবে। কিন্তু প্রথম আলো যা জানায়নি তা হল, কোনো গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিকল্পনা সাথে যদি সংযুক্ত না থাকে তাহলেও কি চীন ওই সিল্করোড ফান্ড উন্মুক্ত করবে? এটাই খুবই নির্ধারক প্রশ্ন? বাংলাদেশ মাতারবাড়ি বা অন্য কোথায় চীনকে গভীর সমুদ্রবন্দর করতে দিতে রাজি হলে বা উভয়ে একমত হলে তবেই বিড়ালের ভাগ্য এসব শিকা ছিঁড়বে, তা আগেই বলে দেয়া যায়।

কোল্ড ওয়ারের কালের (১৯৫০-৯২) গ্লোবাল অর্থনীতি থেকে এ কালের গ্লোবাল অর্থনীতি বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম মৌলিকভাবে আলাদা। যেমন, একালে একই চীনের সাথে ভারতের ব্যবসা বিনিয়োগ লেনদেনের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ গভীর ও ভালো বটে। কিন্তু আবার আগামীতে অন্য সম্ভাব্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে ভারতের যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি কার সাথে ভারত দেখে  – এই বিচারে সেই নামের তালিকায় এক নম্বরে আছে চীন। এটাই একালের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিশেষ আলাদা বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ভারতের মিডিয়া – তারা এই আলাদা বৈশিষ্ট্য আমল করার যোগ্য এর প্রমাণ রাখতে পারে নাই। ফলে চীনের সাথে ভারতের বৈরিতা, সম্ভাব্য যুদ্ধ বা শত্রু কেবল এই দিকগুলো প্রবলভাবে সবসময় তারা হাজির করে থাকে এবং কোল্ড ওয়ারের সময়ের চশমায় দেখা  -বিরোধ ভাবনা বা জাতীয়তাবাদ ভাবনা মাথায় রেখে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। যেন আমরা কোল্ড ওয়ার সময়ে বসবাস করছি।
ভারতের মিডিয়ায় বিষয়গুলো এতই প্রকট যে চীনের মিডিয়ারও তা নজর এড়ায় নাই। প্রেসিডেন্ট শি-এর সফর উপলক্ষে ভারতের মিডিয়াকে কিছু হেদায়েত করার কথা খেয়াল করে চীনের সরকারি এক মিডিয়া ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকায় গত ১২ অক্টোবর একটা কলাম ছাপা হয়েছে। ওর শিরোনাম হল, “India has nothing to fear from closer relationship between China and Bangladesh” – অর্থাৎ চীন-বাংলাদেশের কাছাকাছি আসা এই সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে ভারতের ভীত হবার কিছু নাই। আর এই উপসম্পাদকীয় বা কলাম নিয়ে ভারতের প্রায় সব দৈনিকে একটা করে রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। গ্লোবাল টাইমসের কলামের সার কথা হল, ভারতীয় মিডিয়ার খামোখা চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা আর কোল্ড ওয়ার যুগের সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদ যা একালে অকেজো- এসব প্রচারকে নাকচ করে এমন কিছু মৌলিক তথ্য সে হাজির করতে চায়। সেজন্য ওই কলামের প্রথম বাক্যের চতুর্থ শব্দ হল, ‘মিসকনসেপশন’ অর্থাৎ মিথ্যা ধারণা কাটানো। কিন্তু গ্লোবাল টাইমসের এই উদ্যোগ সত্ত্বেও ভারতের প্রত্যেকটা মিডিয়া তাদের রিপোর্টে এই শব্দটা বাদ দিয়ে আর সব শব্দ দিয়ে তাদের পুরনো মিথ্যা ধারণাগুলোকেই আবার পুষ্ট করেছে।
যেমন এনডিটিভি সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে ‘জেলাস’ (ইংরেজি জেলাস, বাংলায় ঈর্ষা) শব্দের ওপর। শব্দটা কলামের শেষ দুই প্যারায় ছিল। তবে তা কিছুটা তামাশা করে বা মজা করে লেখার স্বার্থে। ওই দুই প্যারা, সারকথায় বললে, বলছে, ‘বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা দেখে ভারতের ঈর্ষা করার কিছু নাই। কারণ এই সম্পর্ক বাড়লে এর অবকাঠামোগত সুবিধার ভাগ এই অঞ্চলের সবাই তথা ভারতও পাবে।’ ফলে “এ দিকটা আমল করে ভারত যদি চীনের সাথে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করতে নিজে চাপ অনুভব করে, সে আলোকে এই অঞ্চলে নিজের স্ট্র্যাটেজি পুনর্মূল্যায়ন করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে বিশেষ করে ভারতের গোয়ায় আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে”, তবে সেটা বাড়তি পাওনা হবে। অর্থাৎ ‘ঈর্ষা’ শব্দটা এখানে ঠিক নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হয় নাই। যেমন ‘ভারতের স্ট্র্যাটেজি বদলানো উচিত’ এভাবে বাক্যটা লেখা হয় নাই। বরং বলা হয়েছে ‘ it would not necessarily be a bad thing’,  – অর্থাৎ ‘হলে খারাপ হয় না’ অথবা ‘সেটা বাড়তি পাওনা হবে’- এমন কথা বুঝানো হয়েছে। আর আসলেই তো তাই। কারণ এই সফরে যে অবকাঠামো বিনিয়োগ ঋণচুক্তির কথা বলা হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের প্রস্তাব হল, নির্মীয়মান পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে নতুন যশোর-ঢাকা রেল যোগাযোগ প্রকল্প, এখানে চীনের কাছ থেকে সরকার বিনিয়োগ আশা করছে। আর এই যোগাযোগ করিডোর অবকাঠামো ভারতকে দেয়ার জন্যই। ফলে চীন-বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বিনিয়োগ সম্পর্কের সুবিধা তো ভারতের স্বার্থেই।
ওদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা এই সফর উপলক্ষে শিরোনাম করেছে স্বভাবসুলভ ‘জবরদস্তি করে পাকিস্তান বিরোধিতা দিয়ে’। তারা শিরোনাম লিখেছে, “ঢাকা সফরে আসছেন চিনা প্রেসিডেন্ট, মহা উদ্বেগে পাকিস্তান’।  বাংলাদেশে চীনের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ (বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয়, কম সুদের ঋণ চুক্তি) খুব বড় নয়। চার লেনের সড়ক অথবা বিদ্যুৎ উতপাদন ইত্যাদি যা আছে তা চীনের বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং ঠিকাদার কোম্পানী – এরাই বেশি। কিন্তু এসব নিয়ে পাকিস্তানের উদ্বেগ – এটা খুবই আজব কথা। অমিত বসুর ঐ পুরা লেখায় পাকিস্তানের উদ্বেগ কী তা নিয়ে কিছুই লেখা হয় নাই। পুরা ঘটনা কাশ্মীর নিয়ে। মানে ভারত-পাকিস্তানের কাশ্মীর ইস্যুতে। অযথা কাশ্মীরের কথা টেনে একবার লেখা হল,  “… আগুন কত দূর ছড়াবে স্পষ্ট নয়। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে ১৪ অক্টোবর দু’দিনের বাংলাদেশ সফর চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর”।  কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের টেনশন থাকতে পারে কিন্তু এর সাথে চীনের প্রেসিডেন্টের সফপ্রের সম্পর্ক কী? আর বাংলাদেশেরই বা কী? আবার চীনা প্রেসিডেন্ট তো কেবল বাংলাদেশেই আসছেন না। তিনি বাংলাদেশ সফর শেষে এখান থেকে ভারতের গোয়ায় যাচ্ছেন। মানে অমিত বসুর “মেরা ভারত মহান” – সেই ভারত সফরেই তো যাচ্ছেন। তো সেক্ষেত্রে কেবল বাংলাদেশ সফরকে খোচা দিয়ে বা বাকা চোখে তুলে ধরার অর্থ কী? চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশের সফর যদি ভারতের স্বার্থের বিরোধী হয় তাহলে ঐ একই চীনা প্রেসিডেন্টের খোদ ভারত সফর – এটাকেও কী চোখে দেখা হবে? এখানে সফরকে খোচা দিয়ে বা বাকা চোখে দেখা হবে না কেন? আর যদি না থাকে তাহলে চীন একই সাথে ভারতের বন্ধুও। তাহলে ভারতের বন্ধু বাংলাদেশে আসলে ভারতের চোখ টাটানোর কী আছে? বা থাকতে পারে? রাস্তার ধারের চা দোকানে বসে আমরা অনেককে বিরাট দিগগজের মত রাজাউজির মারতে দেখি। অমিত বসুর এসব আলাপ মানের দিক থেকে এর চেয়েও নিচে। চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে  “পাকিস্তানের উদ্বেগ” দেখেছিলেন অমিত বসু। লেখার ভিতর পাকিস্তানের উদ্বেগ কী নিয়ে এর কোন হদিশ না দিয়ে শেষ প্যারায় লিখছেন, “এই সব টানাপড়েনের মধ্যেই জিনপিংয়ের ঢাকা সফর নিয়ে কিন্তু ঘোর চিন্তায় পাকিস্তান। যে চিনকে দাদা বলে নিজের অপকর্ম চালিয়ে যেতে চাইছে পাকিস্তান, সেই চিন কিনা শত্রু বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে! ঢাকার সঙ্গে বেজিঙের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি মানেই তাদের ক্ষতি, এটা হাড়ে হাড়ে বোঝে ইসলামাবাদ। তাই উদ্বেগ তো হবেই”। আচ্ছা,  “ঢাকার সঙ্গে বেজিঙের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি মানেই তাদের ক্ষতি” – মানে পাকিস্তানের ক্ষতি কেন কোথায় কীভাবে? এটা আসলে ভারতের পাকিস্তানবিদ্বেষ, যেটা বাংলাদেশের ঘাড়েও জবরদস্তিতে আছে বলে দাবি করা ছাড়া আর কী? রাষ্ট্রীয় শত্রুতা বলতে যা বুঝায় তা পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু তাই বলে পাকিস্তান-বাংলাদেশের সম্পর্ক এটাও কী তাই? এখানে বিরোধ, মনোমালিন্য আছে,  ঘনিষ্টতা নাই – এটাই সত্য। ভিন রাষ্ট্র মাত্রই কমবেশি তা থাকে। যেমন চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে আসছেন। তো চীনের সাথে কী বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধ নাই? অবশ্যই আছে। দগদগে ভাবে আছে। সব রাষ্ট্রই নিজের আপন আপন স্বার্থের যায়গা থেকে অবস্থান নিবে। সেখানে কেবল যেখানে যেখানে স্বার্থ কমন হয়ে এবং সময়ে তা দেখা দিবে কেবল সে ইস্যুতে ঘনিষ্টতা। এর চেয়ে বেশি কেউ কারও স্বার্থের পক্ষের কেউ না।   কিন্তু পাকিস্তান-ভারতের মত পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় শত্রুতা বাংলাদেশের নাই। অমিত বসুর ধারণা তাঁর ন্যারো পেটি আর অহেতুক ইর্ষার চোখ দিয়ে সবাইকে মানে আমাদেরকেও সব দেখতে হবেই।

তো চীনা মিডিয়া জানে ভারতের মিডিয়া জুড়ে এসব অমিত বসুদের সংখ্যাই বেশি। সেকথা মনে রেখে গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা ‘চীন বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে ভারতের ভয় পাওয়ার কিছুই নাই’ শিরোনামে লেখা ছেপেছিল। এরপর প্রথম প্যারাতে বলা হয়েছে, ভারতের একটা মিসকনসেপশন আছে যে ‘ভারতের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে চীন অখুশি’। গ্লোবাল টাইমসে – মিসকনসেপশন বলে – এই ধারণাকে নাকচ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় প্যারায় বলা হয়েছে, ‘ভারতের অনেকের ধারণা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়েএর সফর যেন ভারতের কোল থেকে বাংলাদেশকে ছিনিয়ে নেয়ার সফর।’ বলা হয়েছে এমন ধারণাগুলোও ভিত্তিহীন। এমনকি, “চীনের ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পও যেন ভারতকে আটকে রেখে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা” – এটাও ভিত্তিহীন। “ওদের জানা উচিত এই প্রকল্প উদ্যোগটা কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার না। বরং সাড়ে চার বিলিয়ন জনসংখ্যাকে ছুঁয়ে এবং মোট ৬৫টি রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে এই প্রকল্পের সড়ক বিস্তৃত থাকবে”। আর সবচেয়ে বড় কথা “এতে যুক্ত হওয়া না হওয়া- এই রুটে পড়েছে এমন সংশ্লিষ্ট যে কোন রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছার ওপর তা নির্ভর করে”।
ফলে আসলেই এখানে জোড়াজুড়ির কিছু নাই। প্রভাবিত করার কিছু নাই। ভারতকে আটকে রেখে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রিত করার কিছু নাই। বলা হয়েছে, চীনের প্রতি কোনো রাষ্ট্রের এই ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে বড় করে আগ্রহ দেখালে তবেই একমাত্র চীন সেই রাষ্ট্রকে সিল্ক রুট ফান্ডে জড়িত করবে। যেমন কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে, বার্মা হয়ে চীন- এই পথে (বিসিআইএম ইকোনমিক করিডোর) ভারত যুক্ত হতে চাইলে সেটা তার ইচ্ছা, নইলে নাই। কিন্তু এটা তো গেল ভারতের যুক্ত হওয়ার স্বার্থ ও ইচ্ছা। বাংলাদেশের স্বার্থ ও ইচ্ছা বোধ করলে তবেই। এই প্রকল্পে ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী মিডিয়াতে তার আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন। তবে খোদ চীনের বেলায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের কোথাও যুক্ত করা যায় এমন কোনো একটা গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকলে এই পথে চীনের আগ্রহী হওয়ার কিছু নাই, এ কথাও সত্য। সে ক্ষেত্রে ভারতের কী ইচ্ছা এর আর কোনো অর্থ নাই। বাংলাদেশেরও সিল্ক রোডে যুক্ত হওয়ার ইরাদার কোনো অর্থ নাই। ফলে চীনকে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ থেকে রুখতে হবে, এ কাজে বাংলাদেশকে প্রভাবিত করতে হবে ভারতের এমন কাজ তৎপরতা আসলেই ভারতের পক্ষে যাবে কিনা তা ভারতকেই ভেবে চিনতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখানে ‘বাংলাদেশ যেন ভারতের, ফলে চীনকে দূরে রাখতে হবে’- এসব বাতুল অকেজো আলাপ দূরে রাখতেই হবে।

আজ রবিবার কিছু বাড়তি সংযোজন
চীনা প্রেসিডেন্টের সফর শেষ হয়েছে। তিনি ভারতের গোয়া রওনা দিয়েছেন সেখানে ব্রিকসের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিবার জন্য। এদিকে এই সফরে গভীর সমুদ্র বন্দর অথবা চীনের ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগদান – এমন কোনটাতেই কিছুই অগ্রগতি নাই। কোন ব্রেক থ্রু নাই। অবস্থা আগের মতই, যেখানে ছিল। এসবের সার কথা  গভীর সমুদ্র বন্দর এই সরকারের আমলে হচ্ছে না, কোন সম্ভাবনা নাই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ অক্টোবর দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে ১৫ অক্টোবর) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার কিছু এডিট ও সংযোজন করে আবার ছাপা হল।]