নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

গৌতম দাস

২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2sO

Indo-Nepal relations,India's neighbours,Foreign policyPrime Minister Narendra Modi with his Nepali counterpart KP Sharma Oli during delegation level talks in Kathmandu earlier this year(PTI)

তার নাম ব্রক্ষ্ম চেলানি (Brahma Chellaney)। রাষ্ট্র পরিচালনের মূলত নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা তার পেশা। আর গুছিয়ে বললে, তিনি স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক, বিশেষত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে তার বিশেষজ্ঞ খ্যাতি আছে বলে তিনি দাবি করেন। নয়াদিল্লির “সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ” নামে এক থিঙ্কট্যাঙ্ক পরিচালন করেন তিনি। পশ্চিমের বড় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সাথে তার যোগাযোগ সম্পর্কের কথাও তিনি আমাদের জানিয়ে থাকেন। স্বভাবতই তাকে প্রো-আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের একজন একাডেমিক বলা যায়। যদিও আবার, এক কথায় তার মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি এক পাঁড় জাতিবাদী ভারতীয়। তিনি ততটাই পাঁড় যতটা একজন একাডেমিকের জন্য বিপজ্জনক; ফলে যে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া অনুচিত; তবু ততটাই তিনি জাতিবাদী। একাডেমিকেরও চিন্তার সততার কিছু দায় থাকে। ইমোশনের আড়াল নিয়ে তিনি নিজেকে বেচে দিতে পারেন না বা উগ্র জাতিবাদী হয়ে যেতে পারেন না। তবে একাদেমিকের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট চিন্তাগত অবস্থান থাকবে, তা কারও সাথে মিলুক আর নাই মিলুক, তিনি নিজের কথাই বলে যাবেন। আইডিয়ালি এমনই হওয়ার কথা। যেমন এমনই এক সুনাম বা ক্রেডেন্সিয়ালের একাডেমিক তিনি! তিনি মনে করেন, নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার আন্দোলনে সাথ দিয়ে ভারত ভুল করেছে! আজিব ব্যাপারটা হল, এখন আপসোস করে  তিনি কী করে একালে এসে কোনো রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন? অথচ তিনি তাই করেছেন!

তার সাম্প্রতিক লেখা এক কলাম, যা গত ৬ জুলাই ভারতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিতে ভারতের অংশগ্রহণ ও ভুমিকা থাকায় এখন আপসোস করেছেন। ঐ লেখার শিরোনাম হল, “India’s mistakes have allowed China to make inroads into Nepal”। তিনি এখন দাবি করছেন, ভারতের ঐ ভুমিকা আসলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে।

কেন এই সময়ে তিনি এটা লিখলেন স্বভাবতই সে আপসোসের পটভূমি আছে। তা হল সবাই জানে, ল্যান্ডলক্ড নেপালের সমুদ্রপথে বের হওয়ার কোন যোগ-সুযোগ না ছিল না। আর এই ভৌগোলিক আবদ্ধতার ফলে নেপালের যে অর্থনৈতিক অসুবিধা – সেটাকেই ভারত নিজের সুবিধা হিসেবে এতদিন পুরোপুরি উসুলি নিয়ে গেছে। নেহরুর ভারত ১৯৫০ সাল থেকে নেপালকে এক দাসত্ব চুক্তিতে বেঁধে রেখে একে নিজের পক্ষের সুবিধা হাসিল করে গেছে। এতদিন ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া নেপালের পক্ষে কোন সমুদ্রের নাগাল পাওয়া তো নয়ই এমনকি সড়ক পথেও বাইরে কোনো দেশে  যাওয়া সম্ভব ছিল না। আর একচেটিয়াভাবে এর ফায়দা তুলে গিয়েছে ভারত-রাষ্ট্র ও এর ব্যবসায়ীরা। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা, নেপালে ব্যবসায়ের সুযোগ মানেই তা ভারতের সুযোগ। আর ওদিকে যেটা ভারতে তাদের যে সুযোগ তা তো কেবল ভারতীয়দের জন্য আছেই – এই নীতিতে। যেমন, এখনো ভারতের অনুমতি ছাড়া নেপাল বিদ্যুৎসহ তার কোনো উৎপন্ন পণ্য তৃতীয় দেশে (যেমন বাংলাদেশে) বিক্রি করতে পারে না। আর ভারত তাতে অনুমতি দেয় সাধারণত তা কেবল ভারতীয়দেরই বিনিয়োগ ও ব্যবসা হলে পরেই। অথচ বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া ভারতের ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিটকে দেখেন, এখানে ভারত তার কেন্দ্র দিল্লি অথবা কলকাতাসহ যেকোন প্রদেশ থেকে কোন কোন পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত ট্রানজিট হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারতে নিতে পারবে অথবা কোনটা পারবে না তা নিয়ে ভারত আমাদের থেকে কোনো অনুমতিই নেয় নাই। এসবের বালাই-ই নাই।

এবার ভারতের কাছে নেপালের সেই অসহায়, একক সমর্পণের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে যাচ্ছে। নেপাল এখন ভারত ছাড়াও আর একটা বিকল্প হিসেবে চীনকে পেতে যাচ্ছে। চীন নেপালকে নিজের ভূমি ব্যবহার করে এবং চীনের বন্দর বা সমুদ্রপথ ব্যবহারের অনুমতি বা ট্রানজিট দিতে সম্মত হয়েছে। এখন এর বিস্তারিত চুক্তি ও প্রটোকল প্রস্তুতের কাজ চলছে, কয়েক মাসের মধ্যে এই ‘ট্রানজিট চুক্তি’ চূড়ান্ত হবে।

ওদিকে, চীন সংলগ্ন নেপাল, অর্থাৎ নেপালের সারা উত্তরের সীমান্ত হল ওপাশে চীনের তিব্বত; এর উঁচু ও শক্ত প্লাটো, পুরাটাই পাহাড়ি উপত্যকা অঞ্চল। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সরাসরি পণ্যবাহী লং কনটেইনার ট্রেনে চীনের কোনো সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত নেপাল ট্রেন ট্রানজিট পেতে এখন তিব্বত-কাঠমান্ডু এই শেষের কয়েক শত কিলোমিটার রেললাইন পাতা হচ্ছে, যা বাকি আছে। এক কথায় বললে নেপালের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর একক নির্ভরশীলতার দিন এবার চিরতরে শেষ হতে চলেছে। এবার ১৯৫০ সালের দাসত্বের নিগড় চুক্তি থেকে বের হওয়ার বাস্তব শর্ত পূরণ হতে চলেছে, তা এখন কাঠমান্ডুর নাগালে আসতে চলেছে।
নেপাল ভারতের হাত ছুটে যাচ্ছে, আর এটাই মূলত ব্রক্ষ্ম চেলানির মতো অধ্যাপককে অস্থির ও চঞ্চল করে তুলেছে। তিনি দিকবিদিক ভুলে বলে বসেছেন নেপালের রাজতন্ত্র অর্থাৎ আগেকার ‘হিন্দু রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে নেপালের থেকে যাওয়া সেটা হলে সেটাই নাকি ভালো ছিল। সোজা বললে, হিন্দু-রাজতন্ত্র উতখাত করে, নেপালের নতুন করে প্রজাতান্ত্রিক নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র, ফেডারেল নেপাল- এই রাষ্ট্র হওয়া, এটা খুবই খারাপ কাজ হয়েছে বলে চেলানি আমাদের জানাচ্ছেন। তামশাটা হল, একালের নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা একজন থিঙ্কট্যাঙ্ক একাডেমিক এমন কথা বলছে! কেন? কারণ সেটাই নাকি “ভারতীয় জাতিবাদী” স্বার্থ।

তিনি যদি ‘একাদেমিক’ হিসাবে একালে নিজের পরিচয় বজায় রাখতে চান তবে তাকে কোন স্বঘোষিত রাজা নয়, গণমানুষের ক্ষমতার রাষ্ট্রের পক্ষে দাড়াতে হবে। ‘মানুষ কেবল নিজেই নিজের শাসক হতে পারে’ কোন স্বৈরাচার বা কোন রাজতন্ত্র নয় – চিন্তার এমন মৌলিক মুল্যবোধ ও নীতি অনুসরণ করে – একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষেই তাকে দাড়াতে হবে। অথচ তিনি এখানেই তাঁর একাদেমিক দায় ভুলে একে ছাপিয়ে উতখাত হয়ে যাওয়া রাজতন্ত্রের ভিতর ভারতের জাতিবাদী স্বার্থ খুজতেছেন!

শুধু তাই নয়, তিনি এখনকার নেপালের প্রধান দোষ হিসেবে মনে করেন, এই রাজতন্ত্র উতখাতের আন্দোলনের এবং এখনকার ক্ষমতাসীন নেতারা হলেন কমিউনিস্ট। নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি অলি, তার দলসহ প্রধান দুই বড় দল যারা দুটোই হচ্ছে কমিউনিস্ট। প্রধানমন্ত্রী অলি ছাড়া তার অপর দলটা আবার মাওবাদী কমিউনিস্ট, পুষ্পকমল দাহালের মাওবাদী সেন্টার দল। এছাড়া এই দুই দল আবার এক দল হতে, এক ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আর সবার উপরে ভারতের চক্ষুশূল আর এক ঘটনা আছে। তা হল, এই কমিউনিস্ট দুই দল ও অন্যান্য আঞ্চলিক মাধেসি দলসহ মিলিয়ে তাদের এক জোট – এখন ক্ষমতাসীন সরকার, যারা এখনই নেপালের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন তাদের দখলে আছে। আর ওদিকে মোট সাত প্রদেশে বিভক্ত নেপালের ছয়টাতেই প্রাদেশিক সরকারও তাদের এই জোটের। ফলে স্বভাবতই নেপালের এই কমিউনিস্টরা চেলানির খুবই খুবই অপছন্দের। তিনি অভিযোগ তুলে বলছেন, নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কমিউনিস্টদের হাতে পড়ে টিকবে কি না, এটা অনিশ্চিত। তিনি বিরাট নেপাল-দরদি হয়ে বলছেন, চারিদিকে এত কমিউনিস্ট এটাই নাকি “কালো অশুভ ছায়া” ফেলেছে।  “casts an ominous shadow over Nepal’s sputtering democratic transition.”।

তাঁর আরো আপত্তি হল গুরুত্বপুর্ণ সরকারি পোস্টের অনেকেই কমিউনিস্ট।  [From constitutional functionaries, such as the president and vice president, to key officials, including the chief of police services, are today card-carrying communists.]। আসলে তাঁর এই বক্তব্যগুলোওই খুবই ‘কালো’ এবং ভারতের “অশুভ ছায়াময়”।

অপছন্দ আর বিদ্বেষ দুটা পরিস্কার আলাদা জিনিষ। আপনি একটা চিন্তা – কমিউনিস্ট অথবা  ইসলামি – চিন্তাকে অবশ্যই অপছন্দ করতে পারেন। ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করতে পারেন না। এই পরেরটার পুরাপুরি দায় একান্তই আপনার। এমনকি ‘ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ’ করা, এটা অপরাধের সীমায় নিয়ে ফেলে আপনাকে।

তিনি মনে করছেন, “এটা স্পষ্ট, ভারতের নিরাপত্তার জন্য নেপাল হুমকি হয়ে উঠেছে”।  কেন এমন মনে হচ্ছে তাঁর? কারণ “কমিউনিস্টদের হাতে গণতন্ত্র টিকে কি না” তিনি  এটা অনিশ্চিত। বাহারে গণতন্ত্রী! [Whether democracy will survive under communist rule is uncertain. What is clear is that Nepal is impinging on Indian security.] আর এটাই নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি!

তার মানে রাজতন্ত্রী-নেপাল রাষ্ট্র যখন ছিল তখন ভারতীয় চেলানি ভারতের জন্য এটাকে নিরাপত্তার হুমকি মনে করেন নাই। এখন কমিউনিস্টরা নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করেছে এবং ক্ষমতায় আছে বলে তিনি হুমকি দেখছেন। বাহ রে বা! চেলানির কথার ধরনের ব্যাপারটা অনেকটা নেকড়ে-ভেড়ার গল্পের মতো যে, ভাটিতে থেকে তুই না হলে তোর দাদা উজানে আমার পানি ঘোলা করেছিস। অতএব আমি এখন তোর ঘাড় মটকাব…।

চেলানিকে আসলে এখানে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়। রাষ্ট্র গঠন বৈশিষ্ট ও নীতি হিসাবে একটা রাষ্ট্রকে কিভাবে বিচার করব – এর মাপকাঠি কী? এই আলোকে চেলানির চিন্তায় ঘাটতি আছে তা বলা যায়। হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রাষ্ট্র রিপাবলিক বৈশিষ্ট এনেছে, নিজেকে সাজিয়েছে। অন্যদিকে বিপরীতে, ভারত-রাষ্ট্র যে জন্ম-খুত নিয়ে সাতচল্লিশে জন্ম নিয়েছে আর এখনো প্রধান কারণ হিসাবে যা তাকে দগ্ধাচ্ছে তা হল, এর ফেডারল বৈশিষ্ট নাই বা অসম্পুর্ণ। বরং নেহেরু  এন্ড গংয়েরা সেকালে জোর দিয়েছিল, ভারতকে এক রাখবে কী করে সেটাকে সমস্যা হিসাবে দেখে। কতগুলো ফেডারল প্রদেশের ভারত রাষ্ট্র নয় বরং কী করে জবরদস্তি জোর খাটিয়ে ভারতের প্রদেশগুলোকে এক করে রাখা যায়; এই “জবরদস্তির ভারত” এটাই তাদের চোখে একমাত্র সমাধান মনে হয়েছিল। এখনও ভারতের কোন একাদেমিক ভারতের জন্য এক ফেডারল রাষ্ট্র ধারণা কেন গুরুত্বপুর্ণ তা নিয়ে একাদেমিক আলোচনা করেছেন তা দেখা যায় নাই। আবার রাজনীতিকেরা, নেহেরুর জমানা থেকেই ভারতের রাজনীতিকরা ফেডারল অর্থে রাষ্ট্র ধারণা বুঝেছেন (যেমন  আমেরিকার ফেডারল বৈশিষ্ট) এমনটা জানা যায় না। রাষ্ট্র কী করে এক জায়গায় সবাইকে ধরে রাখে, কোন জবরদস্তি ছাড়াই  রাখা যায় ও সম্ভব – এই প্রশ্নে তারা সবসময় একটা ‘আঠা’ বা গ্লু (glue) খুজে ফিরেছেন। আর সেই গ্লু হিসাবে পেয়েছে হিন্দুত্ব। চিন্তার এই মারাত্মক গলদ ও ঘাটতির কারণে ‘হিন্দুত্ব’  – একেই উপযুক্ত গ্লু মনে করে ভারতের সকল রাজনীতিবিদ। হিন্দুত্ব ছাড়া ভারত অচল, “এক ভারত” হয়ে ভারতকে ধরে রাখার বেকুবি মহামন্ত্র। এটা বিজেপি বলে প্রকাশ্যে আর অন্যেরা মন বাসনায় ও কাজে বলে থাকে; এই প্রশ্নে কংগ্রেস বিজেপি-কমিউনিস্টসহ সকলে এখানে এক।  নিশ্চিত করে বলা যায়, নেপালের ফেডারল বৈশিষ্ট ও হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রিপাবলিক বৈশিষ্ট – অন্তত এই দুই প্রশ্ন বর্তমান নেপাল ভারত-রাষ্ট্রের চেয়ে শতগুণে উন্নত, চিন্তায় পোক্ত। রাজতান্ত্রিক নেপাল-ই যার কাছে আপন সেই চেলানি আসলে কোন রাষ্ট্র-বৈশিষ্ট বিচার করার অযোগ্য – “রাজতান্ত্রিক নেপাল” কামনা করে এই প্রমাণ উনি নিজেই আমাদের জানিয়েছেন। আমাদের কিছু বলার নাই!

সামনে আরো যাওয়ার আগেই বলে নেয়া যায়, চেলানির লেখার মধ্যেই বিরাট বিরাট স্ববিরোধীতায় ভরা। যেমন, একদিকে তিনি বলছেন, নেপালের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আবার লেখার মধ্যে তিনি নিজেই লিখছেন, ভারতের জন্য যে চ্যালেঞ্জ নেপাল তৈরি করেছে সেটা আসলে ভারতেরই নিজ-সৃষ্ট। [Simply put, Nepal represents a critical challenge for India. But, to a significant extent, this is a self-created problem. ]। তাহলে কী দাঁড়াল? ঘটনা যদি ভারতেরই সেলফ ক্রিয়েটেড বা নিজ সৃষ্ট হয়ে থাকে, চেলানি তাই মনে করে থাকেন; আর ঘটনার বড় প্রভাবক যদি ভারত নিজেই হয়ে থাকে তবে আবার সেটার জন্য নেপালকে দায়ী করার সুযোগ কই? ব্রহ্ম চেলানির এই বক্তব্যই তো স্ববিরোধী। এ ছাড়া তিনি ওই রচনার শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে; লিখছেন, “ভারতের ভুলের কারণে তা চীনকে নেপালে জায়গা করে নিতে সুযোগ করে দিয়েছে”।

অর্থাৎ নিজেই যেচে ভারতের দায় স্বীকার করে নিচ্ছেন। ভারতের শাসকদের দায়ী করছেন। এরপর তিনি নিজেই পরের বাক্যে এবার এক তালিকা দিয়ে বলছেন, ভারতের তিনটা ভুল কী কী? বলছেন, ‘ভারতের তিনটা ব্লান্ডারের প্রথমটা হল, নেপালি রাজতন্ত্র অবসানের ক্ষেত্রে ভারতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টা হল, দাহালের দল মাওবাদীরা ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন সশস্ত্র দল। ভারত তাদের নেপালের রাজনীতিতে মধ্যমণি হতে দিয়েছে। আর তৃতীয়টা হল, নেপালের সমতলে বাস করা মাধেসি জনগোষ্ঠীকে ভারত উস্কানি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে হাত ছেড়ে দিয়েছে।

[Three Indian blunders since the mid-2000s have proved very costly for India — spearheading the abolition of Nepal’s constitutional monarchy; bringing the underground Maoists to the centre-stage of Nepali politics; and, more recently, aiding the plains people’s revolt against the new, 2015-drafted Nepali Constitution and then abandoning their movement and pressuring them (Madhesis) to participate in the 2017 elections, thus legitimising a Constitution it said was flawed.]

তৃতীয় ব্লান্ডারের বিস্তারিত দিকটা হল, গত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন বা ঘোষণা করে দেয়ার পরে ভারত প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানায়। তারা মাধেসিদেরকে বিদ্রোহী হয়ে ‘মানি না বলে’ উঠতে উসকানি দিয়েছিল। এটা চেলানিও স্বীকার করেই কথা বলছেন। নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্য সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর তারা শতভাগ নির্ভরশীল। আর এই উস্কানির অর্থ ছিল,  সেই ভারত থেকে নেপালে সব পণ্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেছিল ভারত, অজুহাত দিয়েছিল যে এটা মাধেসিদের বাধা। যা বাস্তবে ছিল নেপালে ভারতেরই পণ্য-অবরোধ। কিন্তু এতে নেপালের গরিব-ধনী নির্বিশেষে সকলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সব জনগোষ্ঠী চরমভাবে ভারতবিরোধী হয়ে যায়। সমতলের বাসিন্দা মাধেসিদেরকেও তারা ভারতের হাতের পুতুল হয়ে পড়ার জন্য দায়ী করে। প্রায় পাঁচ মাস পর এই পণ্য অবরোধ চরমে ওঠে। আর ফলাফল পরিস্থিতি চরমভাবে উলটো ভারতবিরোধী দিকে চলে যাওয়াতে, ভারত এবার সব দায় মাধেসিদের ওপর চাপিয়ে তাদের পরিত্যাগ করে। ফলে পরবর্তিতে, ২০১৭ সালের নির্বাচনে মাধেসিরা ভারতের সংশ্লিষ্টতা পুরো ত্যাগ করে মূল ধারার রাজনীতির মধ্যে ফিরে যায়। তারা, মূল ধারার রাজনীতিকদের সাথে একসাথে মিলে বিরোধ মিটিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, মাধেসিদের মূল বিরোধ বিতর্ক ছিল, মাধেসিদের প্রদেশ একটি নয় দুটি নিয়ে হতে হবে, আর এর সীমানাইবা কী হবে আর প্রদেশের ক্ষমতা কী হবে এসব ছিল বিতর্কের ইস্যু। এ প্রসঙ্গে সমস্ত বিরোধ তারা আপস মীমাংসায় মিটিয়ে ফেলে। এব্যাপারে সব ভুলে সবচেয়ে বড় হাত বাড়ানো ভূমিকা পালন করে কমিউনিস্ট দাহাল। ফলে আপসে বিরোধগুলোর মীমাংসা এরপর কনস্টিটিউশনে সংশোধনী লিখে পাস করে নেয় সবাই। আর সবশেষে এখন মাধেসিরা ক্ষমতাসীন সরকারের জোটের অংশ হয়ে আছে। মাধেসিদের উসকানি দিয়ে অবরোধের রাস্তায় নামিয়ে পরে তাদের হাত ছেড়ে পরিত্যাগ করা- ব্রহ্ম চেলানি নিজে এটাকেই ভারতের তৃতীয় ভুল বলছেন!

তাহলে ঘটনা হল, ভারতের সব অপরাধই চেলানি নিজেই তালিকা দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন। অথচ নেপালের কমিউনিস্টদের দায় দিচ্ছেন, অনাস্থা রাখছেন। আসলে এখানে ঘটনাটা হল, শকুনের বদদোয়ায় গ্রামের গরুগুলো কখনোই মারা যায় না। আর শকুন অভুক্ত শকুন হয়ে থাকলে তাই হয়ে থেকে যায়।

ভারতের পাপ বা অপরাধ এতই বিশাল ও দৃশ্যমান যে চেলানি তা লুকানোর চেষ্টা না করে বলছেন, ‘ভারতের উচিত অতীতে নেপালের জনগণের জন্য কষ্টদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য নেপালের জনগণের কাছে ভারতের উচিত হবে ক্ষমা চাওয়া। পরিস্থিতিটা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, আর এরই সুযোগ নিয়েছে চীন।’

[New Delhi indeed owes an apology to Nepal’s citizens for its past meddling, which, as if to underscore the law of unintended consequences, boomeranged on India’s own interests. India’s mistakes set in motion developments that seriously eroded its clout in Nepal and helped China to make major inroads.]

এই পুরো বিপর্যয় ঘটানোর জন্য তৎকালীন কংগ্রেসের মনমোহন সরকারকে চেলানি দায়ী করেন। কিন্তু এবার কথার ফাঁক সৃষ্টি করতে শুরু করেন তিনি। বলেন, “২৩৯ বছরের নেপালি রাজতন্ত্র ছিল নেপালের স্থিতিশীলতার প্রতীক। ভারত সরকার নেপালের রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছে আর মাওবাদীদের ক্ষমতার কেন্দ্রে এনেছে”। আসলে কী বলা যায় চেলানির রাজতন্ত্র প্রীতি দেখে – নেপালের প্রাক্তন রাজারাও লজ্জা পাবে। আসলে ব্যাপারটা হলো, রাজতন্ত্রের আমলে নেপালে ভারতের স্বার্থ যেভাবে রক্ষিত হচ্ছিল এখন আর তা রক্ষিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সে জন্য ভারতের কোনো একাডেমিক কি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন? অথবা এর দরকারই বা কী? অথচ চেলানি সেটাই করছেন!

ভারতের নিজের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা কী করে? সেটা একটা বিষয় অবশ্যই। কিন্তু সে জন্য কোনো একাদেমিক রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে যাবেন কেন? অর্থাৎ চিন্তার সততা নয়, চরম উগ্র জাতিবাদী এক ভারতীয়ই থাকতে চাইলেন ব্রহ্ম চেলানি বেছে নিলেন!

একালে যেটা চেলানির মতো একাডেমিকদের প্রো-আমেরিকান ভারতীয় ধারা, এই ধারার জন্ম ও শুরু করে দিয়ে গেছিলেন সাতচল্লিশের প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তার দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল এটা। যেমন, সাধারণভাবে নেহরু কলোনি শাসনকে খারাপ মনে করতেন না। ভারতের ওপর ব্রিটিশ কলোনির যে শাসনটা চড়ে ছিল সেটা মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে খারাপ ছিল না। এই ছিল তার অভিমত। তবে তা ভারতের ওপর চড়ে ছিল বলে একে খারাপ ভাবতেন তিনি। অর্থাৎ ব্রিটিশের ভারত ত্যাগে, ভারতের কলোনি মুক্তির পরে এবার ভারতই যদি নেপালকে কলোনি করার সুযোগ পায় তবে সেই সুযোগ নেয়ার চেষ্টাই ভারতের করা উচিত – এই ছিল নেহরুর কলোনি শাসন কী জিনিস সে সম্পর্কে বুঝ ও মনোভাব। তা বুঝার জন্য সবচেয়ে বড় তাতপর্যপুর্ণ হল ১৯৫০ সালের নেপাল চুক্তি। আর তাই নেপালের সাথে ভারতের তথাকথিত ঐ বন্ধুত্ব চুক্তি করে নেপালকে দাসত্বে বেঁধে ফেলা জায়েজ মনে করেই নেহরু ওই চুক্তি করেছিলেন। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দুনিয়ায় নতুন যে পরিবর্তন এসেছিল : ১. দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন উঠে যাওয়া এবং তা অন্যায্য মনে করার প্রতিশ্রুতি দুনিয়া পেয়ে যায়। ২. দুনিয়া কলোনি ইউরোপের শাসকদের নেতৃত্বের কবজা থেকে মুক্ত হয়ে এবার আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নিয়মে সাজানো হয়ে যায়।

এসব মৌলিক পরিবর্তনের তাৎপর্য ও গাঁথা নেহরুর চোখ-কান-মগজে ঢুকে ছিল এমন প্রমাণ দেখা যায় না, বরং তার কাজ দেখে বলা যায়, কোনো প্রভাবই পড়েনি। নেপালের সাথে নেহরুর করা ১৯৫০ সালের কলোনি চুক্তি এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ। নেহরু ধরে নিয়েছিলেন কলোনি শাসন ব্যাপারটা চিরন্তন। ওটাই দুনিয়ার নিয়ম। দুনিয়া ভাগ্য চিরকাল কলোনি শাসন দিয়েই লেখা হবে। তাই কথিত ‘সমাজতন্ত্রী নেহরু’ অবলীলায় পুরানা বৃটিশ-নেপাল চুক্তিতে (১৯২৩) ব্রিটিশের জায়গায় নেহরুর ভারতকে আসীন করে নেন। আর এভাবে নেপালে নেহরু-ভারতের কলোনি শাসন কায়েম করে নেন।
আর আজকের ব্রহ্ম চেলানি ওই নেহরু-ভারতের কলোনি শাসনই ফেরত দেখতে চাচ্ছেন। কারণ কলোনি হয়ে থাকা নেপালি অংশের অপর নাম হল নেপালি রাজতন্ত্র। চেলানি নেপালি রাজতন্ত্র এর পক্ষে সাফাই দিয়ে একালে বলছেন সেটাই নাকি ভারতের জন্য ভালো ছিল। নেপালে ভারতের স্বার্থ একমাত্র রাজতন্ত্রী নেপাল হলেই আদায় হবে – এই চিন্তাটাই একটা অযোগ্য, দেউলিয়া চিন্তা।

না ভুল বোঝা যাবে না। এখানে, ভারতের কোনো স্বার্থ থাকতে পারবে না বা ভারতকে স্বার্থ-ভোলা অবস্থান নিতে হবে- এমন কোনো সুপারিশ করা হচ্ছে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ঠিক যেমন বিশ্বযুদ্ধের কালে সারা দুনিয়াকে ইউরোপের কলোনি শাসনের অধীনে রাখার বিরুদ্ধে ১৯৪০-এর দশকের আগে থেকেই আমেরিকা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট  বাধ্য করেছিলেন কলোনি শাসন ত্যাগ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে। এবং তিনি তা আদায় করেছিলেন। কিন্তু তার মানে কী আমেরিকা নিঃস্বার্থ বা আত্মভোলা ছিল? মোটেও না। কলোনি শাসনের বদলে আমেরিকা নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল এবং তা করেছিল। যেটা কলোনি শাসনের চেয়ে তুলনায় ঢের গুণে অগ্রসর সেই ব্যবস্থা – নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে এর মাধ্যমে দুনিয়ার নেতা হয়ে আমেরিকা নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল। আমেরিকার কায়েম করা সেই  ব্যবস্হাটারই শেষ দিনগুলোতে আমরা এখন আছি।তুলনায় এটা অবশ্যই বৃটিশ কলোনি শাসনের চেয়ে অনেক ভাল এবং তুলনায় মুক্ত।

আবার এই বিচারে বলা যায়, আগামীতে আমেরিকার বদলে দুনিয়া চীনের অর্থনৈতিক নেতৃত্বে চলে গেলে সেটাও এখনকার আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর দুনিয়াই হবে।

বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেকালের দুনিয়ার গতি-প্রকৃতি যেমন নেহরুর চোখে ধরা পড়েনি, পুরনো কলোনি শাসনই তিনি অনুকরণীয় ভেবেছিলেন, আজো তেমনি ব্রহ্ম চেলানির চোখেও আমেরিকার নেতৃত্বটাই ভালো বোধ হচ্ছে অথচ সেটা তো এখন বিগতযৌবনা। অপসৃয়মান সেটা, ফলে চাইলেও এর সমাপ্তি চেলানি ঠেকাতে পারবেন না, ঠেকানো যাবে না।

ব্রহ্ম চেলানির চোখে ধরাই পড়ছে না যে চীন যেখানে নেপালকে শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে ট্রানজিট দিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে সেই মুরোদ গত সত্তর বছরে ভারতের হলো না কেন, ভারত চিন্তাও করতে পারেনি কেন?

কিন্তু সাবধান, এটা নেপালের জন্য চীন এক বড়ই মহান – এমন ঢোল পিটানির কথা মোটেও বলা হচ্ছে না। ব্যাপারটা হল, শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে নেপালকে ট্রানজিট দিলে তাতে চীনেরই লাভ বেশি। এই হলো নতুন বাস্তবতা। আর অবাধ ট্রানজিট দিলে তাতে নেপালে চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য স্বার্থ আরো ভালোভাবে রক্ষিত হয়। ঠিক যেমন দুনিয়ার বিশ্বযুদ্ধের সেকালে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি কলোনি বানিয়ে না রাখাতেই ছিল আমেরিকার স্বার্থ। বরং তারা কলোনি শাসন মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু আমেরিকান পণ্য বিনিয়োগ খাতক হলেই তাতেই সেকালে আমেরিকার স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষিত হয়েছিল। তাই আমেরিকাই দুনিয়ার নতুন নেতা ছিল।

আর কমিউনিস্টদের সম্পর্কে একটা কথা।  চেলানি হয় জানেন না অথবা স্বীকার করতে চান না যে সেকালে ভারত মাওবাদীদের পক্ষে এবং নেপালি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়েছিল, মূলত আমেরিকার পরামর্শে, ক্রিস্টিনা রাকার নেপাল সফর থেকে যার শুরু। [এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইতে আলোচনা করেছি, সেখানে দেখা যেতে পারে। ] এছাড়া, গত ২০০৫ সালে বুশ প্রশাসনের ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির মধ্যে ভারত গোনার ধরার মধ্যে নিজের জায়গা পেয়ে ভারত ভেবেছিল এটাই তার সর্বোচ্চ পাওয়া। সে বুঝতেই পারেনি যে, আমেরিকা একটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। যার হাত সে ধরতে যাচ্ছে। আমেরিকা ভারতের কাঁধে চড়ে চীনের আগমন ও উত্থান ঠেকিতে রাখতে এসেছে। সে নিজে জানে এই উত্থান নিশ্চিতভাবে ঠেকানো যাবে না। তাই যতদূর পারা যায় নিজের পতন দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছে সে কেবল।

তাই প্রো-আমেরিকান একাডেমিক মানে ডুবন্ত শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে যে কেবল সঙ্কীর্ণভাবেই নিজের স্বার্থ খুঁজতে অভ্যস্ত। আর সেটা যেনবা হিন্দুত্বেরই আর এক নাম।

তাই ব্রহ্ম চেলানি ভারতের শাসকদের দোষারোপ করেন আর নাই করেন;  নেপালি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই দেন বা না দেন – এখনকার বটম লাইনটা হল, নেপাল ভারতের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এখন এই নতুন নেপাল, এটা আগের চেয়ে তুলনামূলক মুক্ত এক নেপাল। এ’আর ফিরবে না। বাংলাদেশও এমন প্রথম সুযোগে বের হয়ে যাবেই। আমরা কেউ পিছনে ফিরে যাই না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়া ভারতের ভুল ছিল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

গৌতম দাস
২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lK

 

 

চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

সাইড লাইন
যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

গৌতম দাস
২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার
https://wp.me/p1sCvy-2lz

বার্মার রোহিঙ্গার পর এবার কম্বোডিয়া। তবে এবার গ্লোবাল রাজনীতির প্রসঙ্গে সেদিক থেকে কথা বলা হচ্ছে, গ্লোবাল অর্থনীতি নয়। সচরাচর চীন মানেই গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের  অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শীর্ষ উঠার কথা তুলে বলে থাকি। কিন্তু এবার নয়, সেটা যেন পাঠকের মনোযোগ ফস্কে না যায়, নজরে থাকে সেটা আশা করব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আমেরিকা দুনিয়ায় গ্লোবাল রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ক্রমশ নিজ সক্ষমতা দেখিয়ে দুনিয়াকে নিজের একক নেতৃত্বে নিয়েছিল। সেটা এখনও আছে, যদিও সময়ে এখন একটা ভাটার টান অনুভুত হওয়া শুরু হয়েছে। গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমানভাবে ঢিলা হতে শুরু হয়েছে অনেক আগেই, তুলনায় যদিও গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন একেবারেই নয়। এই পরিস্থিতিতে পাঠকের নজর টানব সত্তরের দশকের  কমিউনিস্ট বিপ্লবের ছোট দেশ কম্বোডিয়ার দিকে।

রাষ্ট্রের নাম কম্বোডিয়া, রাজধানী যার নম পেন। থাইল্যান্ড, লাওস ও ভিয়েতনামের পড়শি এই রাষ্ট্রের দেড় কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ সবাই খেমার (Khmer) নামে এক এথনিক জনগোষ্ঠীর, তাদের ভাষার নামও খেমার। দেশের সাইজ বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বড়, এর জনগোষ্ঠি মূলত বৌদ্ধ-ধর্মীয়। প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো এক রাজতন্ত্রে শাসিত ছিল খেমাররা। কিন্তু এরপর নানা হাত ঘুরে কলোনি দখলের যুগে এসে শেষে, ফরাসি কলোনি রাজ্যে পরিণত হয় ১৮৬৩ সালে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৫৩ সালে, কিন্তু থিতু হতে পারেনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের (১৯৪৫-৭৫) সাথে ভাগ্য ক্রমশ বাধা পড়ে যায়। ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হলে, কম্বোডিয়ান চীনাপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি খেমাররুজ (ফরাসি ভাষায় রুজ মানে লাল। অর্থাৎ কমিউনিস্ট লাল খেমার বা Khmer Rouge) নেতা পলপট কম্বোডিয়ায় ক্ষমতা দখল করেছিলেন। কিন্তু তার কুখ্যাত শাসনের তিন বছরে (১৯৭৫-৭৮) এই দল শ্রেণী-শত্রু হত্যা নৃশংসতার উদাহরণ হয়ে যায়; বলা হয় ঐ সময়কালে গ্রামে মালিকানা উচ্ছেদের নামে এরা ২০ লাখ লোককে গণহত্যা করেছিল।

প্রতিক্রিয়ায় এরপর অনেক ক্যু, পালটা ক্যু শেষ করে সেসব পেরিয়ে ১৯৯১ সালে সব বিবদমান পক্ষগুলোকে নিয়ে ‘প্যারিস শান্তিচুক্তিতে’ এক রাজনৈতিক আপোষনামা তৈরি হয়েছিল; এরও আরো পরে, কম্বোডিয়া থিতু হতে হতে ১৯৯৭ সাল লেগে যায়। আর সেসব প্রক্রিয়ারই আর এক অংশ, জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে ‘খেমাররুজের গণহত্যার’ বিচার এখনও চলছে। সেই থেকে সাজিয়ে রাখা মৃত মানুষের সাদা সাদা মাথায় খুলি হয়ে যায় কম্বোডিয়ার ব্যঙ্গপ্রতীক। তবে এই কম্বোডিয়া এখন এক কনষ্টিটিউশনাল রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র; অর্থাৎ এর নামকাওয়াস্তে রাজতন্ত্র বা এক রাজা আছে ঠিকই, তবে সব কিছুই জনগণ নির্বাচিত, এক কনস্টিটিউশনাল রিপাবলিক এটা। আর ১৯৮৫ সাল থেকে নানা কায়দা করে এর প্রধানমন্ত্রী হয়ে আছেন হুন সেন। একালে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের এক অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী কম্বোডিয়া ও এর শ্রম। চীনের বিপুল বিনিয়োগের এক গন্তব্য এখন কম্বোডিয়া। চলতি বছরেও টার্গেট দুই বিলিয়ন ডলার। থাইল্যান্ড এর পড়শি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-গঠনের দিক থেকে প্রায় একইরকম বলে ব্যাংককের মত ট্যুরিজমের আয় কম্বোডিয়ার এক বড় আয়ের খাত হয়ে উঠছে ক্রমেই। আর সমুদ্র সীমান্তে (অফসোরে) তেল গ্যাস পাওয়ায় তা অর্থনীতিতে এক বিশাল খাত হয়ে উঠছে। এই হল পুরনো দিক থেকে কম্বোডিয়ার বর্ণনা-পরিচিতি, এবার চলতি লেটেস্ট দিক থেকে আর এক পর্ব শুরু করা যাক।

আগামী বছর ২০১৮ সালে কম্বোডিয়ায় আবার সাধারণ নির্বাচন হবার কথা। আবার বলছি কারণ গত ২০১৩ সালের নির্বাচন ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে রাজনৈতিক অসন্তোষ দিয়ে তা শেষ হয়েছিল। স্বল্প ভোটে বিরোধী দল (কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টি, CNRP) হেরেছিল এভাবে দেখিয়ে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। আর চলতি প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের দলকে (কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টি, CPP) বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে ‘বিরোধীদের সংসদ বয়কট’ – আমাদের পরিচিত এই ফেনোমেনায় কম্বোডিয়ার বিরোধী দল বেশির ভাগ সময়টা সংসদের বাইরে কাটায়। ওদিকে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন, গুম, খুন করা, ইংরাজী দৈনিক পত্রিকা বন্ধ, রেডিও সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ এগুলো খুবই কমন। কিন্তু ওদিকে সরকারের সংসদে পাশ করা বড় অদ্ভুত কিছু আইন চালু আছে। যেমন একটা হল কুখ্যাত ‘কটূক্তি আইন’ (ডিফেমেশন ল), যা দিয়ে কোনো সরকারি কর্মচারী বা পদ ধারক কারও সমালোচনা করলে তাকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া সম্ভব। এরকম অদ্ভুত আরো কিছু আইন প্রচলিত আছে সেখানে। যেমন – সরকারের আইনি অধিকার আছে কোনো রাজনৈতিক দলকে সামান্য অজুহাতে নিষিদ্ধ করে দেয়ার। এই আইনে বর্তমান বিরোধীদলীয় প্রধান তিনি ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে স্টাটাস দিয়েছেন – এই অজুহাতে তাঁকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তিনি বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন। এর পরে ফেব্রুয়ারি থেকে যিনি দলের নেতা হয়ে আসেন তিনিও গত কয়েক মাস থেকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায়’ জেলে আছেন। আর উচ্চ আদালত এর পুরো বিচার শেষ নাই বটে, কিন্তু তা না করেই গত ৩১ অক্টোবর আদালত তাঁর জামিনের আবেদনে সাড়া না দিয়ে উলটা ডিটেনশন দিয়ে রেখেছে।

ঐ রায়ের বিচারক খিম পন তাঁর রায়ে লিখেছেন, ‘বিরোধীদলীয় এই নেতা কেম সোখাকে ডিটেনশন দেয়া হল, নতুন ক্রাইম ঠেকাতে আর যাতে জনশৃঙ্খলা রক্ষা আদালত গ্যারান্টি দিয়ে নিশ্চিত করতে পারে’ সেজন্য।  [The detention of Kem Sokha is to prevent new crimes and that the court can  guarantee public order, JUDGE KHIM PONN]  কম্বোডিয়ায় আরেকটা মজার আইন আছে। তা হল, রাজনৈতিক দলের প্রধানের নামে যদি আদালতে কোন ক্রিমিনাল অপরাধের অভিযোগ দায়ের করা হয় ও তা বিচারের শেষে আদালতের রায়ে যদি সাজা হয়, তবে এরপর পুরা ঐ দলকেই সরকার ‘বিলুপ্ত’ বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। কম্বোডিয়ার প্রধান বিরোধী দলের বেলায় ঠিক তাই ঘটেছে।  প্রধান বিরোধী দল CNRP এর সর্বশেষ অবস্থা হল, এই দলের আগের প্রধান যে ছিলেন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে সাজা হয়ে গেছে, তিনি বিদেশে পালিয়ে আছেন। আর দলের চলতি প্রধান ডিটেনশনে আছেন। অভিযোগ হল সেই ২০১৩ সালে তিনি আমেরিকান সরকারি লোকের সাথে  তিনি কথা বলছেন এমন এক ভিডিও দেখিয়ে, তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাই ডিটেনশন দেয়া হয়েছে। আর গত ৬ অক্টোবর, তাই এইবার খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদালতে  বিরোধী দলকেই বিলুপ্ত ঘোষণা করার আবেদন করেছিলেন। আর তাতে সুপ্রিম কোর্ট গত ১৬ নভেম্বর প্রধান বিরোধী দল কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে রায় দেন। ঐ রায়ের ফলে সেই সাথে ওই দলের ১১৮ জন সিনিয়র সদস্য ও রাজনীতিক নিষিদ্ধ হবেন এবং গত চার বছরে  যে ৪৮৯টি কমিউন (স্থানীয়) নির্বাচনে CNRP দলের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছিলেন তারাও সবাই পদ হারাবেন। ওদিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদের ৫৫টি আসনই হারাবেন।

এই অবস্থায় তাহলে আগামী বছরের সংসদ নির্বাচনে কী হতে যাচ্ছে? যেখানে প্রধান বিরোধী দলকে ছলেবলে কৌশলে অযোগ্য ঘোষণা করে দেয়া হল, এর অর্থ তাৎপর্য না বোঝার কিছু নেই। আমাদের দেশের বিনা নির্বাচনে বিজয়ের মতো কিছু একটা সেখানে এখন হবে তা বলাই বাহুল্য। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নাই। বিগত ২০১৩ সালের নির্বাচনে এই বিরোধীরা হুন সেনকে বহু পেরেসান করেছিল। এবার তাই তিনি কোনো রিস্ক রাখলেন না। আর ওই ৫৫টি আসন এখন (আমাদের এরশাদের মত) খুচরা বিরোধী দলগুলো যারা সবাই মিলে গত নির্বাচনে মোট ভোটের মাত্র ৭ শতাংশ পেয়েছিল এদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হবে। এসব ছোট দলের সদস্যদের মধ্যে তাই হুটোপুটি শুরু হয়েছে পদ-পদবি ও সুবিধাদি নেবার জন্য। আরো আছে। একই অভিযোগ এনে এখন আরো সম্ভাব্য ১০০ জন্য বিরোধী প্রার্থীকে নিষিদ্ধ করে রাখার তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

সাবেক খেমাররুজ নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হুন সেন ক্ষমতায় আছেন ১৯৮৫ সাল থেকে, একনাগাড়ে প্রায় ৩৩ বছর। সম্প্রতি তার দেশে এক বয়ান,  ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ এ কথা কয়টাক এক বিরাট ইস্যু বা অজুহাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এক পাবলিক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ আরো এক যুগ তাকে ক্ষমতায় থাকতে হবে।

তাহলে এখন থেকে যা বোঝার বুঝে নেন। কিন্তু কোথাকার এক কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা ইতিহাস নিয়ে আমি কেন আপনাদের শুনাতে এলাম? বাংলাদেশের সরকার আর বিরোধী দল আর ওদিকে আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আকার ইঙ্গিতে কিছু বলার জন্য কী? না একেবারেই নয়। এই অনুমান ভুল। বরং আসল উদ্দেশ্য এতক্ষণ উপরে কোথাও লেখাই হয়নি। কী সেটা?
কম্বোডিয়ার সর্বশেষ রাজনৈতিক দশা পরিস্থিতি নিয়ে ইষ্ট এশিয়ার মিডিয়াগুলোর অনেকেই নানা আর্টিকেল ছেপেছে। এমনি একটা হল, হংকংভিত্তিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। ‘মর্নিং পোস্টে’ একটি কলাম ছাপা হয়েছে, লেখক এডোয়ার্ড মরটন।

তিনি বলছেন, “হুন সেন চীনের সাথে গাঁটছাড়া বেঁধে আমেরিকাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে নেমেছেন। কিন্তু হুন সেনের এই হিসাব ‘যা নয় তাই বাড়িয়ে ধরা’ অনুমান বলে প্রমাণিত হবে।” কিছু বিশ্লেষক, কিছু রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও জার্নালিস্টদের বক্তব্যের রেফারেন্সে তিনি এসব কথা বলেছেন। তার এসব মন্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় হুন সেনের আরেক মন্তব্য থেকে। তিনি বলছেন, ‘আগামী বছরের নির্বাচনের ফলাফলে পশ্চিমাদের স্বীকৃতি জোগাড়ের প্রয়োজন হবে না।’ কিন্তু তবু এটাও আমার এই লেখার ফোকাস নয়। তবে এবার লিখছি ফোকাসটা কোথায় এবং তা কী? যা খুবই বিপজ্জনক ইঙ্গিত।

আলজাজিরা টিভি গত ১৭ নভেম্বর কম্বোডিয়া পরিস্থিতি নিয়ে ২৫ মিনিটের টকশোর মতো অনুষ্ঠান ‘ইনসাইড স্টোরি’ প্রচার করেছে। সেখানে তিন অতিথি ছিলেন ০১. মু সোচুয়া – তিনি সদ্য নিষিদ্ধ হওয়া বিরোধী দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট, পলাতক হয়ে প্যারিসে আশ্রয় নিয়ে আছেন। ০২, ভিকটর গাও – চায়না ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পরিচালক। তিনি আসলে আবার ‘চায়না এনার্জি সিকিউরিটি ইন্সটিটিউটের’ চেয়ারম্যান। তার আরেক পরিচয় হল, তিনি বিখ্যাত চীনা নেতা দেং জিয়াও পিংয়ের অনুবাদক হিসাবে কাজ করেছেন। আর ০৩. হোসেক লি ম্যাকিয়ামা – তিনি ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক। এই তিন প্যানেল বক্তার মধ্যে চীনা একাডেমিক মি: গাও – এর বক্তব্য আমার প্রসঙ্গ।

গাও তার পালা এলে তিনি স্পষ্ট করে হুন সেনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন। হুন সেনের সরকার, তার গৃহীত পদক্ষেপ সব সমর্থন করলেন। এটা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের জেনারেলদের পক্ষেও এত স্পষ্ট করে পাবলিক মিডিয়ায় চীন কথা বলেনি। ১৯৭০-এর দশকে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক পাকা হয়, আর সে সময়ে নিজেরা যার যার স্বার্থ বুঝাবুঝি, পারস্পরিক স্বীকৃতি বা দেনাপাওনাগুলো ঠিকঠাক হয়েছিল ১৯৭১-৭৮ সালের মধ্যে। আমেরিকান বিনিয়োগে চীনে এক ক্যাপিটালিজম জগত প্রবেশ করবে আর, এক নতুন অর্থনৈতিক পথে চীন যাবে সে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন থেকেই চীন নিজের জন্য আর একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এর ফলে ক্রমশ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব সক্ষমতা ক্রমশ বেড়ে চললেও এর প্রভাবে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়াদিতে নাক গলানোর বা গ্লোবাল প্রভাবের ভাগিদারি ভাগ পাওয়ার সুযোগ হাতে পেলেও চীন তাতে জড়িত হবে না। না এটা চীনের কোনো ভালো মানুষি নয়। বরং দুনিয়াজুড়ে আমেরিকান যে রাজনৈতিক প্রভাব বলয় তৈরি হয়ে আছে এর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের ভাগিদারি এই খাতে চীন নিজেকে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অথবা প্রভাবের শেয়ার নিতেও সে যাবে না। বরং চীন যদি এতে পুরো ছাড় আমেরিকাকে দিয়ে দিলে, দুনিয়ার সব কোনা থেকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক বিষয়াদির ভাগিদারি কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিনা বাধায় পেতে সহজ হবে। ফলে আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্ক অ-সাংঘর্ষিকভাবে বিকশিত হতে পারবে। চীন চেয়েছিল গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো ভাগ আমেরিকার কাছে সে চাচ্ছে না। অথবা চীন সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় এই বার্তা আমেরিকাকে  জানানো। আর সে কারণে সবার আগে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের উত্থান পর্বকে প্রায় বাধাহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। যেটা  আসলে সহজে চীন বাস্তবে অর্জন করেছিল।

যেমন – ২০১৪ সালে আমাদের নির্বাচন ইস্যুতে দেখা গিয়েছিল কোন রাজনৈতিক স্টেক বা কেমনভাবে নির্বাচন হতে হবে তা নিয়ে কোনো বক্তব্য চীনের ছিল না। কিন্তু সরকারে যেই থাক বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসায় চীনের যা স্বার্থ যা সে চায় তা নিয়ে যেন কেউ বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সে পশ্চিমা অবস্থানের পক্ষে নীরব সমর্থন দিয়ে তা নিশ্চিত করেছিল। রাজনৈতিক প্রভাবে ভাগিদার সাজতে না চাওয়া চীনের এই নীতি অবশ্যই বেশ লম্বা সময়ের জন্য, তবুও তা আবার এক অর্থে সাময়িক। যেমন, যত দিন চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পূর্ণতা নিয়ে হাজির হচ্ছে  ততদিন একই সাথে গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের দিকে হাত বাড়াতে চীন যাবে না। তবে এর পরে অবশ্যই যাবে। এরই সোজা অর্থ সম্ভবত এবার রাজনৈতিক ইস্যুতেও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীন দুনিয়ায় হাজির হতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চীন সরাসরি হুন সেনের পক্ষ দাঁড়িয়েছে শুধু তাই নয়, হুন সেন একটি ন্যূনতম ভাবে ফেয়ার নির্বাচিত সরকার হয়ে থাক সেটার দরকার নেই – এ কথায় এতদূর গিয়ে প্রবক্তা হয়েছে। মি. গাও বলেছেন. কম্বোডিয়ায় একটা ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গেলে যদি পুরনো অস্থিতিশীলতা আবার ফিরে এসে পড়ে’ তাই এর দরকার নেই। আর এতে অর্থ সম্পদও নষ্ট হতে পারে। তা ছাড়া ‘তথাকথিত গণতন্ত্র’ (তিনি তথাকথিত বা সোকল্ড শব্দটা ব্যবহার করেছেন) বাস্তবায়নকে দেখার অনেক ধরন আছে। অর্থাৎ হুন সেন বিরোধীদের মেরে ধরে গুম নির্যাতন করে, জবরদস্তি যদি নিজেকে ভুয়া নির্বাচিত হিসেবে দেখায় তবুও সেটা চীনের স্টাইলের নির্বাচন (গণতন্ত্রকে দেখার নানা পথ আছে) মনে করে এবং ‘স্থিতিশীলতার স্বার্থে’, ‘সম্পদ নষ্ট না করার স্বার্থে’ হুন সেনকেই নির্বাচিত মানতে হবে। চীনের নিজের রাজনৈতিক ব্যবস্থার রাষ্ট্রে নাগরিকের কোনো রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক অধিকার, মানবিক মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন- এগুলোকে সে নিজ করণীয় বলে মনে করে না। নিজে করেওনি। বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য অর্জন এগুলোই করণীয়। অর্থাৎ মানুষ বৈষয়িক বিষয়াদির ভোগকারি মাত্র। তার কোন স্পিরিচুয়াল ও রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা, করণীয়, দায়দায়িত্ব এসব কিছু নাই- এই হলো চীনা কল্পনায় দেখা মানুষ। মানুষ সম্পর্কে এই অনুমানের উপরে দাঁড়ানো আছে চীনের নেতৃত্ব।

তাহলে কী দাঁড়াল? চীন কী এখন থেকে আমেরিকার সাথে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক প্রভাব এর ভাগিদার বা পুরা কতৃত্ব নেয়ার জন্য এখন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া শুরু করবে? যার বাইরের দিকটা দেখে লাগবে কম্বোডিয়ায় মতই, কোনো বিরোধী দল সেখানে নেই অথবা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা থাকার দরকার আছে কিনা এই নিয়ে আমেরিকা ও চীনের লড়াই? নাকি কম্বোডিয়ার মত কিছু দেশের বেলায় (সব দেশের বেলায় নয়) চীন একক রাজনৈতিক প্রভাব হাসিলের জন্য এখন থেকে আমেরিকার সাথে লড়বে? এই দুইয়ের মধ্যে সেটা যেটাই হোক, চীন গোহারা হারবে সেটা আগেই বলে দেয়া যায়। কারণ মডার্নিটি পরবর্তী দুনিয়া ১৯৪৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইট চার্টার পর্যন্ত গিয়েছে। ওর অনেক খামতি আছে। কিন্তু তাই বলে সেটা ওর পেছনের সময়ে ফিরে যেতে পারে না। দুনিয়া এমনকি সত্তরের দশকে কমিউনিস্ট বুঝে আবার ফিরে যেতে পারে না।

অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে চীন যতই এগিয়ে যাক, চীনের রাজনৈতিক বুঝাবুঝিতে ব্যাপক ঘাটতি আছে। তবুও, আচ্ছা এটাই কী চীনের সদ্য সমাপ্ত দলীয় কংগ্রেসে উল্লেখিত ‘মডার্ন সমাজতন্ত্রের’ ব্যাখ্যা; আর এজন্য শি জিনপিংকে মাওয়ের সমতুল্য নেতা বলে দাঁড় করানো শুরু? সেটা যাই হোক, চীনের এই পদক্ষেপ খুবই বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী পথে যাওয়ার ইঙ্গিত!

সর্বশেষঃ
 রয়টার্স এজেন্সির খবর,  ১৭ নভেম্বর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেগুলার বিফ্রিংয়ে প্রশ্নের উত্তরে জানায়, কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরোধী দল ও নেতাদের নির্মুল ও শুন্য করা প্রসঙ্গে চীন বলছে, এটা “কম্বোডিয়ার নিজস্ব কায়দার উন্নয়নের রাস্তা অনুসরণ” করা বলে চীন মনে করে। [Cambodia in pursuing its own development path……)
আর এর পাল্টা আমেরিকা বলছিল, আমেরিকা নির্বাচন সম্পর্কিত সব ফান্ড প্রত্যাহার করে নিচ্ছে এবং আরও কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ [“concrete steps”] নিতে যাচ্ছে।  এর প্রতিক্রিয়ার হুন সেন গতকাল ১৯ নভেম্বর বলেছেন, তিনি  সমস্ত আমেরিকান এইড প্রত্যাহার করে নিতে স্বাগত জানায়। [“Hun Sen … welcomes and encourages the U.S. to cut all aid.”]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com   

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]