ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত!

ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত!

গৌতম দাস

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2tL

 

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী, ভারতের এক সাবেক কূটনীতিক, ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব; আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হল, ২০০৭ সালে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে তিনি বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন। বর্তমানে তিনি ভারতের একটা বেসরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো হিসেবে সক্রিয়। তাঁর বিশেষ গুরুত্বের দিকটা হল, বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের নীতিনির্ধারক যারা – ভাবেন, অবস্থান নেন এমন সবার সাথে, অন্য সব কূটনীতিকের চেয়ে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও আস্থার সাথে সংযুক্ত এমন এক ব্যক্তিত্ব তিনি। তাঁর সার্ভিস পিরিয়ড, ২০০৭-০৯ সময়পরিধিতে তাঁর বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনারের দায়িত্বে থাকাকালীন কিছু কাজ এর পিছনের সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করা হয়। না, এটা যথেষ্টভাবে বলা হলো না। তবে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে এই রচনা কী নিয়ে সেদিক আলোকপাত করে কিছু কথা বলা দরকার।

আসলে, বাংলাদেশ যে পিনাক রঞ্জনকে চিনত সে নয়; তা থেকে একেবারে ভিন্ন, ‘আনলাইক’ এক পিনাক রঞ্জনের এক প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে গত ৫ সেপ্টেম্বর ‘সাউথ এশিয়ান মনিটর’ পত্রিকায়। সে প্রবন্ধের ভাষ্য এমন যে এটা শেখ হাসিনা সরকারের উপর থেকে ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত হিসেবে তা পাঠ করার সুযোগ রেখে লেখা হয়েছে। [এটা বাংলা ও ইংরাজী দুই ভাষাতেই একই লেখা প্রকাশিত হয় এমন এক ওয়েব পত্রিকা, ফলে বাংলায় অনুদিত ও প্রকাশিত ভাষ্য পাঠকেরা পড়তে পারেন। ]

এক-এগারোর সরকারের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে এবং পরিণতিতে, আমেরিকা যদি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে হাওলা বা হস্তান্তর করে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করে থাকে; তবে ভারতের দিক থেকে এতে এক নম্বর পরামর্শদাতা এবং বাস্তবে তা রূপদানকারী ব্যক্তি হলেন কাকাবাবু প্রণব মুখার্জি। আর সে কাজেরই মাঠের বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী।

প্রকাশিত উইকিলিকস ফাইল থেকে জানা যায়, এক-এগারোর টেকওভার বা ক্ষমতা দখল এবং এর লক্ষ্য অনুযায়ী সাধিত কাজ শেষে এরপর এর এক্সিট রুট কী হবে, মানে কাকে ক্ষমতা দিয়ে তাঁরা তখন কেটে পড়বে, এটা নিয়ে শত প্রশ্ন ও অনুরোধ সত্ত্বেও ক্ষমতা দখলকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বিউটেনিসের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর জানতে পারেনি। উপায়ন্তরহীন সেই পরিস্থিতিতে অবস্থা দেখে মনে হয়, এ ব্যাপারে ক্ষমতা দখলকারীরা একটা নিজস্ব আবছা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। তা হল, লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ হওয়া শেষে তারা নিজেরাই এরশাদের মতো কোনো দল গঠন করে রাজনীতিতে নেমে পড়বে। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ২০০৭ সালের জুনের পর থেকে অক্টোবরের মধ্যে এটা ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে যে, আমেরিকা এ অঞ্চলের তার -ওয়ার অন টেররে – “টেররিজমের বিরুদ্ধে পাহারাদারের” ঠিকা ভারতকে দিচ্ছে। আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেমিনারে সাব্যস্ত হয় যে,  “ভারতের চোখ দিয়ে আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ায় তার নিরাপত্তা স্বার্থ” দেখবে ও বুঝে নেবে। এথেকে তাই মনে করা হয়, এরই নিট ফলাফলে বাংলাদেশ ভারতের ইচ্ছাধীনে চলে যায়। এর অন্য আরেকটি লুকানো দিক ছিল, আসলে এটা ছিল আমেরিকার ওয়ার অন টেররের নামে পদক্ষেপের আড়ালে ভারতকে নিজের নৌকায় অন বোর্ড করে নেওয়া। যার মানে হল, এটাই আমেরিকান স্বার্থে ‘চীন ঠেকাও’ বা ‘China containment’ এর কাজটা ভারতকে দিয়ে করিয়ে নিতে আমেরিকা তাকে রাজি করিয়ে নেয়, আর দেনা-পাওনাও ঠিক করে নেয়। বিনিময়ে এরই রাজভেট হল, “বাংলাদেশকে বলি দেওয়া” – আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের কাছে হস্তান্তর, ভারতের করিডোর লাভ থেকে শুরু করে লাভ আর লাভ ইত্যাদি।

কিন্তু বিউটেনিস নিজেদের এই নতুন সিদ্ধান্তের পক্ষে মইন-ফখরুদ্দীন ও তার সঙ্গীদেরকে রাজি করাতে পারছিল না। একারণে শেখ হাসিনার জামিন, দেশত্যাগ, স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে আলোচনা করতে দেয়া ও তাকে ক্ষমতায় আনা ইত্যাদিতে সহযোগিতা করতে তারা রাজি হচ্ছিল না। এ সময় পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী কিছু নির্ধারক কাজ করে, আর তাতে মইন ও তার সঙ্গীদেরকে বাধ্য হয়ে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আগমনের পরে ২০০৯ সালে পিনাক রঞ্জন তার ‘সফল’ অ্যাসাইনমেন্ট শেষে দেশে ফিরেছিলেন।

পিনাক রঞ্জনের বিশেষ প্রবন্ধ
পিনাক রঞ্জনের এই বিশেষ প্রবন্ধের শিরোনাম অবশ্যই সেটা পিনাক রঞ্জন-সুলভ ছিল না। যেমন লেখাটার বাংলা শিরোনাম হল- “বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের ছায়া, হাসিনা সরকারের দুর্নীতি, বিএনপিকে দমন”। আর ইংরাজিতে, “Shadow of India, Hasina government’s corruption, repression of BNP looms over Bangladesh polls.” অনুমান করা যায় লেখাটা ইংরাজীতে আর পরে তার অনুবাদ বাংলায় করা হয়েছে।

এখানে দেখা যাচ্ছে, এটা সত্যিই বেশ তামাশার যে “বিএনপির ওপর নিপীড়ন হচ্ছে” – এই কথা তুলে ভারতের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত তাঁর লেখায় এটাকে শিরোনাম করেছে। তবে এর চেয়েও আরো বিস্ময়কর হল, শিরোনামের কিছু বিশেষ ‘শব্দ’ পছন্দ করে নেওয়া। যেমন, বাংলাদেশে দুর্নীতি হচ্ছে কি না, শেখ হাসিনা সরকার সেই দুর্নীতি করছে কি না – এটা গত দশ বছরে ভারত বা পিনাক রঞ্জনের ভাষায় তা কখনও উঠে আসেনি। ভারতের মিডিয়া বা ইন্টেলেক্টরাও কখনও এসবকে তাদের লেখার বিষয়বস্তু করেনি। বরং হাসিনার শাসনে ভারত কত কিছু – না চাইতেই সব উপুড় করে পাচ্ছে, তাদের পছন্দে ও ভাষ্যে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দিচ্ছে – হাসিনা সরকারের এসব অবদান নিয়েই সবসময় তাঁরা বিগলিত থেকেছে। আসলে “দুর্নীতি” – এটি মূলত আমেরিকান ভাষা। ফলে অচানক এটা পিনাকের ভাষা হয়ে উঠা সত্যিই ‘তাতপর্যপুর্ণ’, তা বলতেই হয়।

এভাবে পিনাক রঞ্জনের পুরা লেখাতে যেসব বিস্ময়কর প্রসঙ্গ উঠে এসেছে তার একটি তালিকা এখানে আমরা দেখে নেই।

এক. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনঃ
অচিন্তনীয় ঘটনা হল, পিনাক রঞ্জন আওয়ামী লীগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার দায়ে সরাসরি অভিযুক্ত করেছেন। তিনি
লিখেছেন,

“আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পদক্ষেপকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং এর মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের নীলনকশা হিসেবে দেখা হয়েছে। অথচ নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, এই আওয়ামী লীগই নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার বিক্ষোভ করেছিল। এর জের ধরে বিএনপি সরকার সংবিধানে বিধিটি অন্তর্ভুক্ত করেছিল। সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার আয়োজিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে পার্লামেন্টে তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার পর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি বাতিল করে”।

দুই. কোটা আন্দোলন ও যানবাহন ইস্যুতে ছাত্রদের আন্দোলন সামলাতে ব্যর্থতা ও হার্ডলাইনে যাওয়াঃ
এটাও সত্যিই বিস্ময়কর যে, পিনাক রঞ্জনের মত ভারতের কোন কূটনীতিক হাসিনাকে “হার্ডলাইনে দমন করা” [যে হার্ড লাইন ছাড়া আর কোন লাইনে তিনি কখনও দাঁড়াতেই পারেন নাই।] আর ‘কাজ’ সামলাতে ‘ব্যর্থতার’ জন্য আঙুল তুলে অভিযোগ আনছে।  কিছুটা আমেরিকান বা পশ্চিমা কূটনীতিকের আদলে মানবাধিকারের কথা ব্যাকগ্রাউন্ডে মনে রেখে তারা যেভাবে কথা বলেন, যা বলাই বাহুল্য “পিনাক-সুলভ নয়” আর তা না হয়েও তিনি লিখেছেন –
“সরকারি চাকরির কোটার মতো ঘরোয়া ইস্যু এবং ঢাকার অবাধ্য ও বিশৃঙ্খল যানবাহন নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা আন্দোলন অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষমতা রাখে। বিভিন্ন ইস্যুতে হাসিনা সরকারের ছন্দপতন ঘটেছে, যথাযথভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল, ঢাকার অবাধ্য যানবাহন চালকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। এসব চালক দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে। দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ফলে দেশব্যাপী ছাত্রদের ক্রোধ উসকে দেয়া এবং এ ইস্যুতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নস্যাতের অভিযোগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক ফটোগ্রাফারকে গ্রেফতার ছিল বেপরোয়া সিদ্ধান্ত। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে, কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো ধরনের নমনীয়তা প্রদর্শন করেননি”।

অর্থাৎ এমনকি “আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক ফটোগ্রাফারকে গ্রেফতার” বলে শহিদুল আলমের কথাও তিনি উল্লেখ করে সে ড্রাম পিটানো ছদ্ম এক্টিভিস্ট সাজতে  তিনি এখানে দ্বিধা করছেন না, আর লিখেছেন – “এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে”।
মজার ব্যাপার হল, গত দশ বছরে ভারতের কোনো কূটনীতিক, কলামিস্ট, মিডিয়া রিপোর্ট কেউ শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো গুম-খুন, পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেয়া ইত্যাদি থেকে শুরু করে, ‘হার্ডলাইনে দমন করা’ আর কাজ সামলাতে ‘ব্যর্থতার’ জন্য আঙুল তুলছে আমরা এমন কখনও দেখিনি।

তিন. স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতিঃ
নিজ চোখে দেখলেও এটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ভারতীয় কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন “স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতির” অভিযোগ আনছেন। বিশেষত যখন, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় আনার কালে মাঠের এক কুশীলব ছিলেন তিনি নিজেই। তিনি লিখেছেন –
“হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতি। নির্বাচনী প্রচারণায় এসব ইস্যু ও ভারত ফ্যাক্টর প্রাধান্য পাবে। রাজনৈতিক বিরোধীদের অব্যাহতভাবে হয়রানি করার ফলে জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নীরব ক্ষোভ বেড়েই চলেছে এবং ব্যাপকভাবে এ ধারণার সৃষ্টি করেছে যে, আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে। ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। অনেক সমালোচক বিশ্বাস করেন, হাসিনা সরকার নির্বাচন ‘ম্যানেজ’ করবে। দক্ষিণ এশিয়ায় একে বলা হয় ‘নির্বাচনী জালিয়াতি’ “।

চার. মাদকবিরোধী অভিযান আসলে “গুলি করে হত্যার” নীতিঃ
কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন কি পরিচয় বদলে ‘মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট’ হয়ে যাচ্ছেন? সে এক বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন! যেমন তিনি লিখেছেন –
“মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি ‘গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবসিত হয় বলে মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্টরা জানিয়েছেন। এতে অনেক নিরপরাধ মারা যায়”।  আসলে বরং ফ্যাক্টস হল, গত দশ বছরে ভারতের ‘বাংলাদেশ নীতি’ কখনও হাসিনা সরকারের হিউম্যান রাইট মেনে চলার রিপোর্ট কার্ড রেকর্ড কেমন কখনও সেটাকে ইস্যু করে নাই, সবসময় এড়িয়ে চলেছে, মাতে নাই ফলে কোন অভিযোগও কখনও তুলে নাই। তাহলে পিনাক এখন এতবড় ব্যতিক্রম কেন?

পাঁচ. সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ও আওয়ামী লীগের হিন্দু দলন ইস্যুঃ
ভারতের কোনো সাবেক হাইকমিশনার শেখ হাসিনা ও তার দলকে “হিন্দু সংখ্যালঘুদের দলন, হয়রানি ও বৈষম্য করছে” বলে অভিযোগ করছে – এটা এর আগে কখনও চিন্তাও করা যায়নি। তাহলে, এটাই কি হাত ছেড়ে দেয়ার চূড়ান্ত ইঙ্গিত? সবাইকে অবাক করে পিনাক রঞ্জন এই অভিযোগ তুলে বলেছেন,
“হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য সুপ্রিম কোর্টের সাবেক এক প্রধান বিচারপতি সরকারের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পদত্যাগ করতে ও বিদেশে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। সাধারণভাবে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনসূচক থাকা হিন্দু সংখ্যালঘুরাও ক্ষুব্ধ। কারণ, আওয়ামী লীগ নেতারা দায়মুক্তির সাথে হিন্দু সম্পত্তি জবরদখল করেছে। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা ছাড়া ভারতের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্য করা হলেও কিছু বলবে না”।

ছয়. বিএনপির প্রতি সহানুভূতিঃ
পিনাক রঞ্জনের দু-দুটি প্যারাগ্রাফ ধরে বিএনপির প্রতি সহানুভূতিমূলক ভাষায়, “তারা হাসিনা সরকারের হাতে নির্যাতিত” এই পটভূমি তৈরি করে লিখেছেন,
“তবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে বিএনপি”। অর্থাৎ বিএনপির সম্ভাব্য আন্দোলনের প্রতিও তার সহানুভূতির ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। তিনি পরের প্যারাগ্রাফে আরো লিখেছেন, “কয়েক দিনের মধ্যেই আদালত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান উভয়কেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতে পারে। তা ঘটলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই ব্যাপক বিক্ষোভে ফেটে পড়বে”। পিনাক রঞ্জন এখানে গণক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার হয়ে উঠতে চাওয়া তাতপর্যপুর্ণ।
এখানে পাঠককে একটু সাবধান করার আছে যে, এখনই কোনো “সরল” সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ঝাপিয়ে পড়ার কিছু নেই। ওয়েট অ্যান্ড সি। বরং অবজারভ করেন মন দিয়ে। পিনাক রঞ্জনের ভাষা ও বক্তব্যের মধ্যে সত্যিই কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না এই বিচার্য বিষয়ে, এতটুকুতেই আপাতত থাকাই ভাল।

সাত. আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির ভেতরে কথিত ভাঙনের গুজব ছড়ানোর দায় আনাঃ
পিনাক রঞ্জন “আগে দেখা যায় নাই” এমন বেশ খোলাখুলিই লিখেছেন,
“বিএনপির প্রবীণ নেতারা তারেককে অপছন্দ করেন। তারা নেতা হিসেবে খালেদাকেই অগ্রাধিকার দেবেন। বিএনপির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা রয়েছে, এমন গুঞ্জনও রয়েছে যে ভাঙনের মাধ্যমে নতুন দলের আবির্ভাব ঘটতে পারে। সম্ভাব্য ভাঙনে আওয়ামী লীগের হাত আছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে”।
এই ভাষ্যে লক্ষণীয় বিষয়টা হল,  বিএনপি নিয়ে এত কথা পিনাক রঞ্জন লিখেছেন অথচ ২০০১-০৬ সালের বিএনপি সরকারের কোনো কাজ বা পদক্ষেপের কোনই সমালোচনা নেই। এমনকি, দশ ট্রাক অস্ত্র অথবা কথিত জঙ্গি বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দেয়ারও কোনো অভিযোগও তিনি তোলেননি। এটি কোন ভারতের কূটনীতিক ও সাবেক হাইকমিশনারের জন্য চরম সীমাহীন ব্যতিক্রম। বিশেষ করে ঠোঁট কাটা অ-কূটনীতিক-সুলভ মন্তব্যের জন্য যেই পিনাক রঞ্জন খারাপভাবে খ্যাত।

আট. নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অধস্তন করে রাখার অভিযোগঃ
এই অভিযোগটা তুলেছিল মূলত বিএনপি। কিন্তু পিনাক রঞ্জন সেই অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে তুলে এনেছেন। তবে অবশ্যই “নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অধস্তন করে রাখার” এই অভিযোগ যে কোন নির্বাহী সরকারের বিরুদ্ধে খুবই মারাত্মক। তিনি লিখেছেন,
“‘বিএনপির নির্বাচনী প্ল্যাটফর্মের মধ্যে রয়েছে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবি। দলটি অভিযোগ করছে, আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অধস্তন করে রেখেছে”।

পিনাক রঞ্জনের লেখায় মূল অভিযোগ মূলত এগুলোই। তবে কামাল হোসেনের যুক্তফ্রন্টকে নিয়ে হাসিনার ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ মন্তব্যেরও পিনাক সমালোচনা করেছেন। এ ছাড়া ‘ভারত ফ্যাক্টর’ বলে একটি শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন। ব্যাপারটা হল, অনেকটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় সব কিছুতেই ভারতের নিরন্তর দাদাগিরি ও হস্তক্ষেপ আর নিজের একক স্বার্থে মাখনটুকু নিয়ে যাওয়া ইত্যাদির গত দশ বছর ধরে এমন আচরণ – এসব কিছুকে ইঙ্গিত করে এটাকেই তিনি ‘ভারত ফ্যাক্টর’ বলে বুঝাতে চেয়েছেন, আর তা করেছেন অনেকটা ক্ষমা চেয়ে নেয়ার ভঙ্গিতে। যেমন নিজে থেকেই প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন,
“বাংলাদেশ ও ভারতে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে বিএনপির হাসিনাকে ভারতের প্রতি অতিরিক্ত নতজানু দেখানোর সম্ভাবনা থাকায় ভারত ফ্যাক্টর হবে বিপুল। প্রধান সমালোচনা হবে, হাসিনা ভারতকে খুব বেশি ছাড় দিয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছেন অতি সামান্য”।

অর্থাৎ পিনাক রঞ্জন এখানে নিজে থেকেই হাসিনার ভারতের সাথে ঘষাঘষি (মুল ইংরাজীটা ছিল kowtowing); যেমন বলেছিলেন “pillory Hasina of kowtowing to India” –  মানে ভারতের সাথে ঢলাঢলিতে গায়ে পড়া হয়ে সব দিয়ে দেওয়া্র দায়ে হাসিনাকে কাঠগড়ায় তোলা – এর সুযোগ আছে বলে পিনাক রঞ্জন নিজেই দেখতে পাচ্ছেন। তাই এই ভাষা বা অর্থ দিয়ে তা পিনাক রঞ্জন নিজে থেকে আঁকছেন।  খুব সম্ভবত এর কারণ সাধারণ মানুষের ক্ষভ প্রশমন ও তাদের সহানুভুতি সংগ্রহ। তাই পিনাকে এই অংশের “উপস্থাপন” সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ।

আবার ভারতের পানি না দেয়া ইস্যু নিজেই তুলে বলছেন, “নদীর পানিবণ্টন এখনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেলেও তা কাটিয়ে ওঠা যাবে না এমন নয়“।
এ ছাড়া, আসাম নাগরিকত্ব ইস্যুতে মিস্টি প্রস্তাবের সুরে বলেছেন, “…দীর্ঘ দিন ঝুলে থাকা অবৈধ অভিবাসী ইস্যুটি বাংলাদেশকে অব্যাহতভাবে উদ্বিগ্ন করবে। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এনআরসি থেকে সৃষ্ট অনিবার্য প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে”।

সোজা কথায় রাখঢাক না করে বললে ব্যাপারটা হল, গত ১০ বছরে ভারতের যত রুস্তমি, প্রভাব বিস্তার বা বর্ডার কিলিং থেকে শুরু করে তার যা দরকার তা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া, ভারতের স্বার্থ সবার উপরে এই নীতিতে এভাবে ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ যে চরমভাবে ক্ষুব্ধ, সে সম্পর্কে পিনাক রঞ্জন সচেতন – তাই জানা গেল। তবে এখানে তিনি ইঙ্গিতে যা বলতে চাইছেন, তা যদি আমরা বুঝে থাকি তা সম্ভবত এমন যে, তিনি বলতে চাইছেন, সম্ভাব্য নতুন সরকার এলে পুরানা সব ভুলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন যাত্রা করা যেতে পারে।
বলা বাহুল্য, মি. পিনাক রঞ্জন আসলে এখানে অনেক ফাস্ট। ফলে অনেক দূর আগেই কল্পনা করে ফেলেছেন। তাই দ্রুত অনেক আগে চলে গেছেন আর খুবই “সরল” আর প্রায় ‘খ্রীষ্টীয় ইনোসেন্ট’ ধরণের সব নানান ভাষ্য হাজির করেছেন। বাংলাদেশে গুম হওয়া কোনো মানুষ ভারতের মাটিতে পাওয়া যাওয়া কি আসলেই এতই সরল আর ইনোসেন্ট? পিনাক রঞ্জন নিজেকেই এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন! ফলে পিনাক রঞ্জন খুব গভীর সচেতন তা বলতে পারছি না। তবে তাকে অনেক গভীরে চিন্তা করতে হবে আর স্বভাবতই তাতে অনেক কাঠ এবং খড়ও পুড়বে।

সবশেষে পিনাকের রচনার শেষ প্যারাগ্রাফের চারটি বাক্য সম্পর্কেঃ
প্রথম বাক্যঃ
বাংলাদেশে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করুক এর বিরুদ্ধে ভারতের আপত্তি ঈর্ষামূলক ও ক্ষতিকর তা কি ভারত এখন বুঝেছে? মনে হয় না কারণ, আমরা কোথাও এমন কিছু দেখিনি। ফলে তার শেষ প্যারাগ্রাফের প্রথম বাক্য –
“বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পূর্ণ বিকশিত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে এবং পরিকাঠামোর আরো একীভূতকরণ, সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্র আরো আধুনিকায়ন, মোটরযান চুক্তি ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ভবিষ্যতে আরো জোরালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে”   – এই আশার কোনো ভিত্তি নেই। খামাখা ইউজলেস। নন স্টার্টার!

দ্বিতীয় বাক্যঃ
“ঢাকায় যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারত তার সাথে কাজ করবে”।
এই বাক্য থেকে আমরা হাসিনা সরকার যে দুর্বল দুস্ত অবস্থায় আছে, তাই সম্ভবত তিনি বুঝতে চাইছেন মনে করতে পারি। কিন্তু ২০১৩ সালে পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশ সফর, তাঁর মাতব্বরি ও নোংরা হাত ঢুকানোর সাথে এই বক্তব্যের কোন মিল খুঁজে পাই না। সুজাতা ফরমান জারির মত করে বলেছিলেন, “যারা নির্বাচনে আসবে তাদের নিয়েই নির্বাচন হবেই” আর এরশাদ যেন বিরোধী দলের জায়গা পূরণ করে। সেটা তাহলে কেন বলেছিলেন? কেন তখন বলতে পারেন নাই যে, ঢাকায় যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারত তার সাথে কাজ করবে? বাস্তবতা হল, তিনি তা পারেন নাই। তাহলে এখানে প্রশ্ন উঠবেই যে এখন কেন পিনাক রঞ্জন একথা বলছেন? এটার অর্থ কী এই যে ভারতের “বাংলাদেশ নীতি” বদল হয়ে গেছে? কিংবা পুরান প্রেম ও পছন্দের সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নিতে চাইছে – আর ভাল লাগছে না বলে, তাই কী? পিনাকের কথার অর্থ কোনটা করব? পিনাক নিজেকেই সবার আগে এসব বিভ্রান্তি খোলসা করতে হবে।

তৃতীয় বাক্যঃ
“তাই বলে কোনো হাসিনাবিরোধীকে ভারত বিকল্প মনে করছে, এমন কিছু ভাবা হবে কষ্টকর কল্পনা”। বোঝা গেল এটা পিনাকের ‘সংবিধি সতর্ককরণ’ বা একটা “ডিসক্লেমার” দিয়ে রাখা যে ভারত বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চাচ্ছে ব্যাপারটা এমন সরল না। নো প্রবলেম। আমাদেরও এমন তাড়া নাই!

চতুর্থ ও শেষ বাক্যঃ
“অবশ্য, হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তার প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়, ভারতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে”।
সরি মি. পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী; এটা এভাবে বলতেই হচ্ছে যে “ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়” – আসলে এটাই হল আপনাদের ঘুরিয়ে বলা যে কাজ ফুরিয়েছে, শেখ হাসিনা ক্রমেই এখন লায়াবিলিটি বলে অনুভূত হচ্ছেন, আপনাদের কাছে। বলাই বাহুল্য, আসলে এমনটাই হয়ে থাকে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত!  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

গৌতম দাস

২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2sO

Indo-Nepal relations,India's neighbours,Foreign policyPrime Minister Narendra Modi with his Nepali counterpart KP Sharma Oli during delegation level talks in Kathmandu earlier this year(PTI)

তার নাম ব্রক্ষ্ম চেলানি (Brahma Chellaney)। রাষ্ট্র পরিচালনের মূলত নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা তার পেশা। আর গুছিয়ে বললে, তিনি স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক, বিশেষত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে তার বিশেষজ্ঞ খ্যাতি আছে বলে তিনি দাবি করেন। নয়াদিল্লির “সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ” নামে এক থিঙ্কট্যাঙ্ক পরিচালন করেন তিনি। পশ্চিমের বড় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সাথে তার যোগাযোগ সম্পর্কের কথাও তিনি আমাদের জানিয়ে থাকেন। স্বভাবতই তাকে প্রো-আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের একজন একাডেমিক বলা যায়। যদিও আবার, এক কথায় তার মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি এক পাঁড় জাতিবাদী ভারতীয়। তিনি ততটাই পাঁড় যতটা একজন একাডেমিকের জন্য বিপজ্জনক; ফলে যে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া অনুচিত; তবু ততটাই তিনি জাতিবাদী। একাডেমিকেরও চিন্তার সততার কিছু দায় থাকে। ইমোশনের আড়াল নিয়ে তিনি নিজেকে বেচে দিতে পারেন না বা উগ্র জাতিবাদী হয়ে যেতে পারেন না। তবে একাদেমিকের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট চিন্তাগত অবস্থান থাকবে, তা কারও সাথে মিলুক আর নাই মিলুক, তিনি নিজের কথাই বলে যাবেন। আইডিয়ালি এমনই হওয়ার কথা। যেমন এমনই এক সুনাম বা ক্রেডেন্সিয়ালের একাডেমিক তিনি! তিনি মনে করেন, নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার আন্দোলনে সাথ দিয়ে ভারত ভুল করেছে! আজিব ব্যাপারটা হল, এখন আপসোস করে  তিনি কী করে একালে এসে কোনো রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন? অথচ তিনি তাই করেছেন!

তার সাম্প্রতিক লেখা এক কলাম, যা গত ৬ জুলাই ভারতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিতে ভারতের অংশগ্রহণ ও ভুমিকা থাকায় এখন আপসোস করেছেন। ঐ লেখার শিরোনাম হল, “India’s mistakes have allowed China to make inroads into Nepal”। তিনি এখন দাবি করছেন, ভারতের ঐ ভুমিকা আসলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে।

কেন এই সময়ে তিনি এটা লিখলেন স্বভাবতই সে আপসোসের পটভূমি আছে। তা হল সবাই জানে, ল্যান্ডলক্ড নেপালের সমুদ্রপথে বের হওয়ার কোন যোগ-সুযোগ না ছিল না। আর এই ভৌগোলিক আবদ্ধতার ফলে নেপালের যে অর্থনৈতিক অসুবিধা – সেটাকেই ভারত নিজের সুবিধা হিসেবে এতদিন পুরোপুরি উসুলি নিয়ে গেছে। নেহরুর ভারত ১৯৫০ সাল থেকে নেপালকে এক দাসত্ব চুক্তিতে বেঁধে রেখে একে নিজের পক্ষের সুবিধা হাসিল করে গেছে। এতদিন ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া নেপালের পক্ষে কোন সমুদ্রের নাগাল পাওয়া তো নয়ই এমনকি সড়ক পথেও বাইরে কোনো দেশে  যাওয়া সম্ভব ছিল না। আর একচেটিয়াভাবে এর ফায়দা তুলে গিয়েছে ভারত-রাষ্ট্র ও এর ব্যবসায়ীরা। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা, নেপালে ব্যবসায়ের সুযোগ মানেই তা ভারতের সুযোগ। আর ওদিকে যেটা ভারতে তাদের যে সুযোগ তা তো কেবল ভারতীয়দের জন্য আছেই – এই নীতিতে। যেমন, এখনো ভারতের অনুমতি ছাড়া নেপাল বিদ্যুৎসহ তার কোনো উৎপন্ন পণ্য তৃতীয় দেশে (যেমন বাংলাদেশে) বিক্রি করতে পারে না। আর ভারত তাতে অনুমতি দেয় সাধারণত তা কেবল ভারতীয়দেরই বিনিয়োগ ও ব্যবসা হলে পরেই। অথচ বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া ভারতের ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিটকে দেখেন, এখানে ভারত তার কেন্দ্র দিল্লি অথবা কলকাতাসহ যেকোন প্রদেশ থেকে কোন কোন পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত ট্রানজিট হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারতে নিতে পারবে অথবা কোনটা পারবে না তা নিয়ে ভারত আমাদের থেকে কোনো অনুমতিই নেয় নাই। এসবের বালাই-ই নাই।

এবার ভারতের কাছে নেপালের সেই অসহায়, একক সমর্পণের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে যাচ্ছে। নেপাল এখন ভারত ছাড়াও আর একটা বিকল্প হিসেবে চীনকে পেতে যাচ্ছে। চীন নেপালকে নিজের ভূমি ব্যবহার করে এবং চীনের বন্দর বা সমুদ্রপথ ব্যবহারের অনুমতি বা ট্রানজিট দিতে সম্মত হয়েছে। এখন এর বিস্তারিত চুক্তি ও প্রটোকল প্রস্তুতের কাজ চলছে, কয়েক মাসের মধ্যে এই ‘ট্রানজিট চুক্তি’ চূড়ান্ত হবে।

ওদিকে, চীন সংলগ্ন নেপাল, অর্থাৎ নেপালের সারা উত্তরের সীমান্ত হল ওপাশে চীনের তিব্বত; এর উঁচু ও শক্ত প্লাটো, পুরাটাই পাহাড়ি উপত্যকা অঞ্চল। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সরাসরি পণ্যবাহী লং কনটেইনার ট্রেনে চীনের কোনো সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত নেপাল ট্রেন ট্রানজিট পেতে এখন তিব্বত-কাঠমান্ডু এই শেষের কয়েক শত কিলোমিটার রেললাইন পাতা হচ্ছে, যা বাকি আছে। এক কথায় বললে নেপালের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর একক নির্ভরশীলতার দিন এবার চিরতরে শেষ হতে চলেছে। এবার ১৯৫০ সালের দাসত্বের নিগড় চুক্তি থেকে বের হওয়ার বাস্তব শর্ত পূরণ হতে চলেছে, তা এখন কাঠমান্ডুর নাগালে আসতে চলেছে।
নেপাল ভারতের হাত ছুটে যাচ্ছে, আর এটাই মূলত ব্রক্ষ্ম চেলানির মতো অধ্যাপককে অস্থির ও চঞ্চল করে তুলেছে। তিনি দিকবিদিক ভুলে বলে বসেছেন নেপালের রাজতন্ত্র অর্থাৎ আগেকার ‘হিন্দু রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে নেপালের থেকে যাওয়া সেটা হলে সেটাই নাকি ভালো ছিল। সোজা বললে, হিন্দু-রাজতন্ত্র উতখাত করে, নেপালের নতুন করে প্রজাতান্ত্রিক নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র, ফেডারেল নেপাল- এই রাষ্ট্র হওয়া, এটা খুবই খারাপ কাজ হয়েছে বলে চেলানি আমাদের জানাচ্ছেন। তামশাটা হল, একালের নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা একজন থিঙ্কট্যাঙ্ক একাডেমিক এমন কথা বলছে! কেন? কারণ সেটাই নাকি “ভারতীয় জাতিবাদী” স্বার্থ।

তিনি যদি ‘একাদেমিক’ হিসাবে একালে নিজের পরিচয় বজায় রাখতে চান তবে তাকে কোন স্বঘোষিত রাজা নয়, গণমানুষের ক্ষমতার রাষ্ট্রের পক্ষে দাড়াতে হবে। ‘মানুষ কেবল নিজেই নিজের শাসক হতে পারে’ কোন স্বৈরাচার বা কোন রাজতন্ত্র নয় – চিন্তার এমন মৌলিক মুল্যবোধ ও নীতি অনুসরণ করে – একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষেই তাকে দাড়াতে হবে। অথচ তিনি এখানেই তাঁর একাদেমিক দায় ভুলে একে ছাপিয়ে উতখাত হয়ে যাওয়া রাজতন্ত্রের ভিতর ভারতের জাতিবাদী স্বার্থ খুজতেছেন!

শুধু তাই নয়, তিনি এখনকার নেপালের প্রধান দোষ হিসেবে মনে করেন, এই রাজতন্ত্র উতখাতের আন্দোলনের এবং এখনকার ক্ষমতাসীন নেতারা হলেন কমিউনিস্ট। নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি অলি, তার দলসহ প্রধান দুই বড় দল যারা দুটোই হচ্ছে কমিউনিস্ট। প্রধানমন্ত্রী অলি ছাড়া তার অপর দলটা আবার মাওবাদী কমিউনিস্ট, পুষ্পকমল দাহালের মাওবাদী সেন্টার দল। এছাড়া এই দুই দল আবার এক দল হতে, এক ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আর সবার উপরে ভারতের চক্ষুশূল আর এক ঘটনা আছে। তা হল, এই কমিউনিস্ট দুই দল ও অন্যান্য আঞ্চলিক মাধেসি দলসহ মিলিয়ে তাদের এক জোট – এখন ক্ষমতাসীন সরকার, যারা এখনই নেপালের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন তাদের দখলে আছে। আর ওদিকে মোট সাত প্রদেশে বিভক্ত নেপালের ছয়টাতেই প্রাদেশিক সরকারও তাদের এই জোটের। ফলে স্বভাবতই নেপালের এই কমিউনিস্টরা চেলানির খুবই খুবই অপছন্দের। তিনি অভিযোগ তুলে বলছেন, নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কমিউনিস্টদের হাতে পড়ে টিকবে কি না, এটা অনিশ্চিত। তিনি বিরাট নেপাল-দরদি হয়ে বলছেন, চারিদিকে এত কমিউনিস্ট এটাই নাকি “কালো অশুভ ছায়া” ফেলেছে।  “casts an ominous shadow over Nepal’s sputtering democratic transition.”।

তাঁর আরো আপত্তি হল গুরুত্বপুর্ণ সরকারি পোস্টের অনেকেই কমিউনিস্ট।  [From constitutional functionaries, such as the president and vice president, to key officials, including the chief of police services, are today card-carrying communists.]। আসলে তাঁর এই বক্তব্যগুলোওই খুবই ‘কালো’ এবং ভারতের “অশুভ ছায়াময়”।

অপছন্দ আর বিদ্বেষ দুটা পরিস্কার আলাদা জিনিষ। আপনি একটা চিন্তা – কমিউনিস্ট অথবা  ইসলামি – চিন্তাকে অবশ্যই অপছন্দ করতে পারেন। ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করতে পারেন না। এই পরেরটার পুরাপুরি দায় একান্তই আপনার। এমনকি ‘ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ’ করা, এটা অপরাধের সীমায় নিয়ে ফেলে আপনাকে।

তিনি মনে করছেন, “এটা স্পষ্ট, ভারতের নিরাপত্তার জন্য নেপাল হুমকি হয়ে উঠেছে”।  কেন এমন মনে হচ্ছে তাঁর? কারণ “কমিউনিস্টদের হাতে গণতন্ত্র টিকে কি না” তিনি  এটা অনিশ্চিত। বাহারে গণতন্ত্রী! [Whether democracy will survive under communist rule is uncertain. What is clear is that Nepal is impinging on Indian security.] আর এটাই নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি!

তার মানে রাজতন্ত্রী-নেপাল রাষ্ট্র যখন ছিল তখন ভারতীয় চেলানি ভারতের জন্য এটাকে নিরাপত্তার হুমকি মনে করেন নাই। এখন কমিউনিস্টরা নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করেছে এবং ক্ষমতায় আছে বলে তিনি হুমকি দেখছেন। বাহ রে বা! চেলানির কথার ধরনের ব্যাপারটা অনেকটা নেকড়ে-ভেড়ার গল্পের মতো যে, ভাটিতে থেকে তুই না হলে তোর দাদা উজানে আমার পানি ঘোলা করেছিস। অতএব আমি এখন তোর ঘাড় মটকাব…।

চেলানিকে আসলে এখানে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়। রাষ্ট্র গঠন বৈশিষ্ট ও নীতি হিসাবে একটা রাষ্ট্রকে কিভাবে বিচার করব – এর মাপকাঠি কী? এই আলোকে চেলানির চিন্তায় ঘাটতি আছে তা বলা যায়। হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রাষ্ট্র রিপাবলিক বৈশিষ্ট এনেছে, নিজেকে সাজিয়েছে। অন্যদিকে বিপরীতে, ভারত-রাষ্ট্র যে জন্ম-খুত নিয়ে সাতচল্লিশে জন্ম নিয়েছে আর এখনো প্রধান কারণ হিসাবে যা তাকে দগ্ধাচ্ছে তা হল, এর ফেডারল বৈশিষ্ট নাই বা অসম্পুর্ণ। বরং নেহেরু  এন্ড গংয়েরা সেকালে জোর দিয়েছিল, ভারতকে এক রাখবে কী করে সেটাকে সমস্যা হিসাবে দেখে। কতগুলো ফেডারল প্রদেশের ভারত রাষ্ট্র নয় বরং কী করে জবরদস্তি জোর খাটিয়ে ভারতের প্রদেশগুলোকে এক করে রাখা যায়; এই “জবরদস্তির ভারত” এটাই তাদের চোখে একমাত্র সমাধান মনে হয়েছিল। এখনও ভারতের কোন একাদেমিক ভারতের জন্য এক ফেডারল রাষ্ট্র ধারণা কেন গুরুত্বপুর্ণ তা নিয়ে একাদেমিক আলোচনা করেছেন তা দেখা যায় নাই। আবার রাজনীতিকেরা, নেহেরুর জমানা থেকেই ভারতের রাজনীতিকরা ফেডারল অর্থে রাষ্ট্র ধারণা বুঝেছেন (যেমন  আমেরিকার ফেডারল বৈশিষ্ট) এমনটা জানা যায় না। রাষ্ট্র কী করে এক জায়গায় সবাইকে ধরে রাখে, কোন জবরদস্তি ছাড়াই  রাখা যায় ও সম্ভব – এই প্রশ্নে তারা সবসময় একটা ‘আঠা’ বা গ্লু (glue) খুজে ফিরেছেন। আর সেই গ্লু হিসাবে পেয়েছে হিন্দুত্ব। চিন্তার এই মারাত্মক গলদ ও ঘাটতির কারণে ‘হিন্দুত্ব’  – একেই উপযুক্ত গ্লু মনে করে ভারতের সকল রাজনীতিবিদ। হিন্দুত্ব ছাড়া ভারত অচল, “এক ভারত” হয়ে ভারতকে ধরে রাখার বেকুবি মহামন্ত্র। এটা বিজেপি বলে প্রকাশ্যে আর অন্যেরা মন বাসনায় ও কাজে বলে থাকে; এই প্রশ্নে কংগ্রেস বিজেপি-কমিউনিস্টসহ সকলে এখানে এক।  নিশ্চিত করে বলা যায়, নেপালের ফেডারল বৈশিষ্ট ও হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রিপাবলিক বৈশিষ্ট – অন্তত এই দুই প্রশ্ন বর্তমান নেপাল ভারত-রাষ্ট্রের চেয়ে শতগুণে উন্নত, চিন্তায় পোক্ত। রাজতান্ত্রিক নেপাল-ই যার কাছে আপন সেই চেলানি আসলে কোন রাষ্ট্র-বৈশিষ্ট বিচার করার অযোগ্য – “রাজতান্ত্রিক নেপাল” কামনা করে এই প্রমাণ উনি নিজেই আমাদের জানিয়েছেন। আমাদের কিছু বলার নাই!

সামনে আরো যাওয়ার আগেই বলে নেয়া যায়, চেলানির লেখার মধ্যেই বিরাট বিরাট স্ববিরোধীতায় ভরা। যেমন, একদিকে তিনি বলছেন, নেপালের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আবার লেখার মধ্যে তিনি নিজেই লিখছেন, ভারতের জন্য যে চ্যালেঞ্জ নেপাল তৈরি করেছে সেটা আসলে ভারতেরই নিজ-সৃষ্ট। [Simply put, Nepal represents a critical challenge for India. But, to a significant extent, this is a self-created problem. ]। তাহলে কী দাঁড়াল? ঘটনা যদি ভারতেরই সেলফ ক্রিয়েটেড বা নিজ সৃষ্ট হয়ে থাকে, চেলানি তাই মনে করে থাকেন; আর ঘটনার বড় প্রভাবক যদি ভারত নিজেই হয়ে থাকে তবে আবার সেটার জন্য নেপালকে দায়ী করার সুযোগ কই? ব্রহ্ম চেলানির এই বক্তব্যই তো স্ববিরোধী। এ ছাড়া তিনি ওই রচনার শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে; লিখছেন, “ভারতের ভুলের কারণে তা চীনকে নেপালে জায়গা করে নিতে সুযোগ করে দিয়েছে”।

অর্থাৎ নিজেই যেচে ভারতের দায় স্বীকার করে নিচ্ছেন। ভারতের শাসকদের দায়ী করছেন। এরপর তিনি নিজেই পরের বাক্যে এবার এক তালিকা দিয়ে বলছেন, ভারতের তিনটা ভুল কী কী? বলছেন, ‘ভারতের তিনটা ব্লান্ডারের প্রথমটা হল, নেপালি রাজতন্ত্র অবসানের ক্ষেত্রে ভারতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টা হল, দাহালের দল মাওবাদীরা ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন সশস্ত্র দল। ভারত তাদের নেপালের রাজনীতিতে মধ্যমণি হতে দিয়েছে। আর তৃতীয়টা হল, নেপালের সমতলে বাস করা মাধেসি জনগোষ্ঠীকে ভারত উস্কানি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে হাত ছেড়ে দিয়েছে।

[Three Indian blunders since the mid-2000s have proved very costly for India — spearheading the abolition of Nepal’s constitutional monarchy; bringing the underground Maoists to the centre-stage of Nepali politics; and, more recently, aiding the plains people’s revolt against the new, 2015-drafted Nepali Constitution and then abandoning their movement and pressuring them (Madhesis) to participate in the 2017 elections, thus legitimising a Constitution it said was flawed.]

তৃতীয় ব্লান্ডারের বিস্তারিত দিকটা হল, গত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন বা ঘোষণা করে দেয়ার পরে ভারত প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানায়। তারা মাধেসিদেরকে বিদ্রোহী হয়ে ‘মানি না বলে’ উঠতে উসকানি দিয়েছিল। এটা চেলানিও স্বীকার করেই কথা বলছেন। নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্য সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর তারা শতভাগ নির্ভরশীল। আর এই উস্কানির অর্থ ছিল,  সেই ভারত থেকে নেপালে সব পণ্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেছিল ভারত, অজুহাত দিয়েছিল যে এটা মাধেসিদের বাধা। যা বাস্তবে ছিল নেপালে ভারতেরই পণ্য-অবরোধ। কিন্তু এতে নেপালের গরিব-ধনী নির্বিশেষে সকলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সব জনগোষ্ঠী চরমভাবে ভারতবিরোধী হয়ে যায়। সমতলের বাসিন্দা মাধেসিদেরকেও তারা ভারতের হাতের পুতুল হয়ে পড়ার জন্য দায়ী করে। প্রায় পাঁচ মাস পর এই পণ্য অবরোধ চরমে ওঠে। আর ফলাফল পরিস্থিতি চরমভাবে উলটো ভারতবিরোধী দিকে চলে যাওয়াতে, ভারত এবার সব দায় মাধেসিদের ওপর চাপিয়ে তাদের পরিত্যাগ করে। ফলে পরবর্তিতে, ২০১৭ সালের নির্বাচনে মাধেসিরা ভারতের সংশ্লিষ্টতা পুরো ত্যাগ করে মূল ধারার রাজনীতির মধ্যে ফিরে যায়। তারা, মূল ধারার রাজনীতিকদের সাথে একসাথে মিলে বিরোধ মিটিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, মাধেসিদের মূল বিরোধ বিতর্ক ছিল, মাধেসিদের প্রদেশ একটি নয় দুটি নিয়ে হতে হবে, আর এর সীমানাইবা কী হবে আর প্রদেশের ক্ষমতা কী হবে এসব ছিল বিতর্কের ইস্যু। এ প্রসঙ্গে সমস্ত বিরোধ তারা আপস মীমাংসায় মিটিয়ে ফেলে। এব্যাপারে সব ভুলে সবচেয়ে বড় হাত বাড়ানো ভূমিকা পালন করে কমিউনিস্ট দাহাল। ফলে আপসে বিরোধগুলোর মীমাংসা এরপর কনস্টিটিউশনে সংশোধনী লিখে পাস করে নেয় সবাই। আর সবশেষে এখন মাধেসিরা ক্ষমতাসীন সরকারের জোটের অংশ হয়ে আছে। মাধেসিদের উসকানি দিয়ে অবরোধের রাস্তায় নামিয়ে পরে তাদের হাত ছেড়ে পরিত্যাগ করা- ব্রহ্ম চেলানি নিজে এটাকেই ভারতের তৃতীয় ভুল বলছেন!

তাহলে ঘটনা হল, ভারতের সব অপরাধই চেলানি নিজেই তালিকা দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন। অথচ নেপালের কমিউনিস্টদের দায় দিচ্ছেন, অনাস্থা রাখছেন। আসলে এখানে ঘটনাটা হল, শকুনের বদদোয়ায় গ্রামের গরুগুলো কখনোই মারা যায় না। আর শকুন অভুক্ত শকুন হয়ে থাকলে তাই হয়ে থেকে যায়।

ভারতের পাপ বা অপরাধ এতই বিশাল ও দৃশ্যমান যে চেলানি তা লুকানোর চেষ্টা না করে বলছেন, ‘ভারতের উচিত অতীতে নেপালের জনগণের জন্য কষ্টদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য নেপালের জনগণের কাছে ভারতের উচিত হবে ক্ষমা চাওয়া। পরিস্থিতিটা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, আর এরই সুযোগ নিয়েছে চীন।’

[New Delhi indeed owes an apology to Nepal’s citizens for its past meddling, which, as if to underscore the law of unintended consequences, boomeranged on India’s own interests. India’s mistakes set in motion developments that seriously eroded its clout in Nepal and helped China to make major inroads.]

এই পুরো বিপর্যয় ঘটানোর জন্য তৎকালীন কংগ্রেসের মনমোহন সরকারকে চেলানি দায়ী করেন। কিন্তু এবার কথার ফাঁক সৃষ্টি করতে শুরু করেন তিনি। বলেন, “২৩৯ বছরের নেপালি রাজতন্ত্র ছিল নেপালের স্থিতিশীলতার প্রতীক। ভারত সরকার নেপালের রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছে আর মাওবাদীদের ক্ষমতার কেন্দ্রে এনেছে”। আসলে কী বলা যায় চেলানির রাজতন্ত্র প্রীতি দেখে – নেপালের প্রাক্তন রাজারাও লজ্জা পাবে। আসলে ব্যাপারটা হলো, রাজতন্ত্রের আমলে নেপালে ভারতের স্বার্থ যেভাবে রক্ষিত হচ্ছিল এখন আর তা রক্ষিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সে জন্য ভারতের কোনো একাডেমিক কি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন? অথবা এর দরকারই বা কী? অথচ চেলানি সেটাই করছেন!

ভারতের নিজের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা কী করে? সেটা একটা বিষয় অবশ্যই। কিন্তু সে জন্য কোনো একাদেমিক রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে যাবেন কেন? অর্থাৎ চিন্তার সততা নয়, চরম উগ্র জাতিবাদী এক ভারতীয়ই থাকতে চাইলেন ব্রহ্ম চেলানি বেছে নিলেন!

একালে যেটা চেলানির মতো একাডেমিকদের প্রো-আমেরিকান ভারতীয় ধারা, এই ধারার জন্ম ও শুরু করে দিয়ে গেছিলেন সাতচল্লিশের প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তার দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল এটা। যেমন, সাধারণভাবে নেহরু কলোনি শাসনকে খারাপ মনে করতেন না। ভারতের ওপর ব্রিটিশ কলোনির যে শাসনটা চড়ে ছিল সেটা মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে খারাপ ছিল না। এই ছিল তার অভিমত। তবে তা ভারতের ওপর চড়ে ছিল বলে একে খারাপ ভাবতেন তিনি। অর্থাৎ ব্রিটিশের ভারত ত্যাগে, ভারতের কলোনি মুক্তির পরে এবার ভারতই যদি নেপালকে কলোনি করার সুযোগ পায় তবে সেই সুযোগ নেয়ার চেষ্টাই ভারতের করা উচিত – এই ছিল নেহরুর কলোনি শাসন কী জিনিস সে সম্পর্কে বুঝ ও মনোভাব। তা বুঝার জন্য সবচেয়ে বড় তাতপর্যপুর্ণ হল ১৯৫০ সালের নেপাল চুক্তি। আর তাই নেপালের সাথে ভারতের তথাকথিত ঐ বন্ধুত্ব চুক্তি করে নেপালকে দাসত্বে বেঁধে ফেলা জায়েজ মনে করেই নেহরু ওই চুক্তি করেছিলেন। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দুনিয়ায় নতুন যে পরিবর্তন এসেছিল : ১. দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন উঠে যাওয়া এবং তা অন্যায্য মনে করার প্রতিশ্রুতি দুনিয়া পেয়ে যায়। ২. দুনিয়া কলোনি ইউরোপের শাসকদের নেতৃত্বের কবজা থেকে মুক্ত হয়ে এবার আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নিয়মে সাজানো হয়ে যায়।

এসব মৌলিক পরিবর্তনের তাৎপর্য ও গাঁথা নেহরুর চোখ-কান-মগজে ঢুকে ছিল এমন প্রমাণ দেখা যায় না, বরং তার কাজ দেখে বলা যায়, কোনো প্রভাবই পড়েনি। নেপালের সাথে নেহরুর করা ১৯৫০ সালের কলোনি চুক্তি এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ। নেহরু ধরে নিয়েছিলেন কলোনি শাসন ব্যাপারটা চিরন্তন। ওটাই দুনিয়ার নিয়ম। দুনিয়া ভাগ্য চিরকাল কলোনি শাসন দিয়েই লেখা হবে। তাই কথিত ‘সমাজতন্ত্রী নেহরু’ অবলীলায় পুরানা বৃটিশ-নেপাল চুক্তিতে (১৯২৩) ব্রিটিশের জায়গায় নেহরুর ভারতকে আসীন করে নেন। আর এভাবে নেপালে নেহরু-ভারতের কলোনি শাসন কায়েম করে নেন।
আর আজকের ব্রহ্ম চেলানি ওই নেহরু-ভারতের কলোনি শাসনই ফেরত দেখতে চাচ্ছেন। কারণ কলোনি হয়ে থাকা নেপালি অংশের অপর নাম হল নেপালি রাজতন্ত্র। চেলানি নেপালি রাজতন্ত্র এর পক্ষে সাফাই দিয়ে একালে বলছেন সেটাই নাকি ভারতের জন্য ভালো ছিল। নেপালে ভারতের স্বার্থ একমাত্র রাজতন্ত্রী নেপাল হলেই আদায় হবে – এই চিন্তাটাই একটা অযোগ্য, দেউলিয়া চিন্তা।

না ভুল বোঝা যাবে না। এখানে, ভারতের কোনো স্বার্থ থাকতে পারবে না বা ভারতকে স্বার্থ-ভোলা অবস্থান নিতে হবে- এমন কোনো সুপারিশ করা হচ্ছে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ঠিক যেমন বিশ্বযুদ্ধের কালে সারা দুনিয়াকে ইউরোপের কলোনি শাসনের অধীনে রাখার বিরুদ্ধে ১৯৪০-এর দশকের আগে থেকেই আমেরিকা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট  বাধ্য করেছিলেন কলোনি শাসন ত্যাগ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে। এবং তিনি তা আদায় করেছিলেন। কিন্তু তার মানে কী আমেরিকা নিঃস্বার্থ বা আত্মভোলা ছিল? মোটেও না। কলোনি শাসনের বদলে আমেরিকা নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল এবং তা করেছিল। যেটা কলোনি শাসনের চেয়ে তুলনায় ঢের গুণে অগ্রসর সেই ব্যবস্থা – নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে এর মাধ্যমে দুনিয়ার নেতা হয়ে আমেরিকা নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল। আমেরিকার কায়েম করা সেই  ব্যবস্হাটারই শেষ দিনগুলোতে আমরা এখন আছি।তুলনায় এটা অবশ্যই বৃটিশ কলোনি শাসনের চেয়ে অনেক ভাল এবং তুলনায় মুক্ত।

আবার এই বিচারে বলা যায়, আগামীতে আমেরিকার বদলে দুনিয়া চীনের অর্থনৈতিক নেতৃত্বে চলে গেলে সেটাও এখনকার আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর দুনিয়াই হবে।

বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেকালের দুনিয়ার গতি-প্রকৃতি যেমন নেহরুর চোখে ধরা পড়েনি, পুরনো কলোনি শাসনই তিনি অনুকরণীয় ভেবেছিলেন, আজো তেমনি ব্রহ্ম চেলানির চোখেও আমেরিকার নেতৃত্বটাই ভালো বোধ হচ্ছে অথচ সেটা তো এখন বিগতযৌবনা। অপসৃয়মান সেটা, ফলে চাইলেও এর সমাপ্তি চেলানি ঠেকাতে পারবেন না, ঠেকানো যাবে না।

ব্রহ্ম চেলানির চোখে ধরাই পড়ছে না যে চীন যেখানে নেপালকে শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে ট্রানজিট দিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে সেই মুরোদ গত সত্তর বছরে ভারতের হলো না কেন, ভারত চিন্তাও করতে পারেনি কেন?

কিন্তু সাবধান, এটা নেপালের জন্য চীন এক বড়ই মহান – এমন ঢোল পিটানির কথা মোটেও বলা হচ্ছে না। ব্যাপারটা হল, শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে নেপালকে ট্রানজিট দিলে তাতে চীনেরই লাভ বেশি। এই হলো নতুন বাস্তবতা। আর অবাধ ট্রানজিট দিলে তাতে নেপালে চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য স্বার্থ আরো ভালোভাবে রক্ষিত হয়। ঠিক যেমন দুনিয়ার বিশ্বযুদ্ধের সেকালে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি কলোনি বানিয়ে না রাখাতেই ছিল আমেরিকার স্বার্থ। বরং তারা কলোনি শাসন মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু আমেরিকান পণ্য বিনিয়োগ খাতক হলেই তাতেই সেকালে আমেরিকার স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষিত হয়েছিল। তাই আমেরিকাই দুনিয়ার নতুন নেতা ছিল।

আর কমিউনিস্টদের সম্পর্কে একটা কথা।  চেলানি হয় জানেন না অথবা স্বীকার করতে চান না যে সেকালে ভারত মাওবাদীদের পক্ষে এবং নেপালি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়েছিল, মূলত আমেরিকার পরামর্শে, ক্রিস্টিনা রাকার নেপাল সফর থেকে যার শুরু। [এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইতে আলোচনা করেছি, সেখানে দেখা যেতে পারে। ] এছাড়া, গত ২০০৫ সালে বুশ প্রশাসনের ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির মধ্যে ভারত গোনার ধরার মধ্যে নিজের জায়গা পেয়ে ভারত ভেবেছিল এটাই তার সর্বোচ্চ পাওয়া। সে বুঝতেই পারেনি যে, আমেরিকা একটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। যার হাত সে ধরতে যাচ্ছে। আমেরিকা ভারতের কাঁধে চড়ে চীনের আগমন ও উত্থান ঠেকিতে রাখতে এসেছে। সে নিজে জানে এই উত্থান নিশ্চিতভাবে ঠেকানো যাবে না। তাই যতদূর পারা যায় নিজের পতন দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছে সে কেবল।

তাই প্রো-আমেরিকান একাডেমিক মানে ডুবন্ত শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে যে কেবল সঙ্কীর্ণভাবেই নিজের স্বার্থ খুঁজতে অভ্যস্ত। আর সেটা যেনবা হিন্দুত্বেরই আর এক নাম।

তাই ব্রহ্ম চেলানি ভারতের শাসকদের দোষারোপ করেন আর নাই করেন;  নেপালি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই দেন বা না দেন – এখনকার বটম লাইনটা হল, নেপাল ভারতের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এখন এই নতুন নেপাল, এটা আগের চেয়ে তুলনামূলক মুক্ত এক নেপাল। এ’আর ফিরবে না। বাংলাদেশও এমন প্রথম সুযোগে বের হয়ে যাবেই। আমরা কেউ পিছনে ফিরে যাই না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়া ভারতের ভুল ছিল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

গৌতম দাস

৩০ জুন ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2sr

 

থিংক ট্যাংক ধারণাটা আমেরিকান, ইউরোপীয় নয়। যে অর্থে আমেরিকা ইউরোপ নয় তবে ইউরোপেরই এক নবপ্রজন্ম, যাদের আবার ইউরোপকে আমেরিকার কলোনি শাসক হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা আছে এবং সশস্ত্রভাবে লড়ে ইউরোপকে পরাজিত করে নিজে কলোনিমুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এই অর্থে আমেরিকা এক নতুন ধারার পোস্ট-ইউরোপীয়ান প্রজন্ম। ফলে বহু নতুন নতুন আইডিয়ার জন্মদাতাও। যার বেশির ভাগটাই ঘটেছে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার নেতৃত্বে দুনিয়া পরিচালিত হওয়ার কালে। তবে থিংক ট্যাংক ধারণাটার আবার আমাদের অঞ্চলে একালে এক নতুন অর্থে হাজির করেছে সেই আমেরিকাই। কিন্তু কপাল খারাপ। টাইমিং প্রবলেম!

কোকিল কাকের ঘরে ডিম পেড়ে রেখে আসে, নিজের ডিম ফুটিয়ে নেয় কাককে দিয়ে। আমেরিকা সেই পদ্ধতি কপি করে নিজের থিংক ট্যাংকের ইন্ডিয়ান শাখা খুলে ইন্ডিয়ানদের দিয়ে ইন্ডিয়ায় বসে চালায়। এমনকি ছোট-বড় কিছু স্কলারশিপ অথবা হায়ার স্টাডি বা পিএইচডি করার সুযোগ অফার করে। আর সার বিচারে এতে এক বিরাটসংখ্যক আমেরিকার নীতি পলিসির বাহক ও চোখ-কান যেন এমন এক দঙ্গল ভারতীয় একাডেমিক পেয়ে যায় আমেরিকা। মানে নামে ইন্ডিয়ান কিন্তু ফলে ও কাজে আমেরিকান। আর ভারতীয় প্রশাসকরা ভাবল আমেরিকানদের ভালই ঠকিয়েছি। আমেরিকানদের ঘাড়ে চড়ে তাদের পয়সায় থিংক ট্যাংক খুলে নিয়েছি। কিন্তু এতে কে যে কাকে ঠকিয়েছে তা বুঝমান লায়েক না হলে বুঝা যাবে না! যাই হোক, মূল কথাটা হল, ঠিক যেমন বাংলাদেশে একটা “আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের” কিংবা আমেরিকান “হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের” শাখা খুললে সেটা আমেরিকান চোখ-কান খোলা এক আমেরিকান থিংক ট্যাংকই থাকে; বাংলাদেশের চোখ-কান হয়ে যাবে না।

যা হোক, প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংকের এরাই ভারতজুড়ে এবং বাইরে ছড়িয়ে আছে – তারা ভারতীয় কিন্তু আমেরিকান নীতি পলিসির পক্ষে প্রচারক। অর্থাৎ ভারতীয় কাকের ঘরে আমেরিকান কোকিলের ডিম। এভাবে গত তেরো-চোদ্দ বছর ধরে এদের জমানা চলে আসছিল, তাদের জন্য তা খারাপ চলছিল না। কিন্তু এখন হঠাৎ বিধি বাম! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। গত ষোলো বছর ধরে বুশ আর ওবামা প্রশাসনের মিলিত আমল ধরে ভারতে যে আমেরিকান থিংক ট্যাংক বিস্তার লাভ করেছিল তা এখন চরম দুর্দিনে। এর মূল কারণ হল, আমেরিকান চোখ, কান ও মন হিসেবে লোকাল ভারতীয় একাডেমিক তৈরি সবই ঠিক ছিল; কিন্তু সমস্যা হলো তাদের “প্রডাক্ট শো” করার সুযোগ আর নেই, বন্ধ হয়ে গেছে। ‘প্রডাক্ট শো’ মানে? থিংক ট্যাংক অ্যাকাডেমিকদের প্রডাক্ট মানে হলো ঘরোয়া সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি আয়োজন ও বয়ান প্রেজেন্টেশন এবং প্রচারণা। প্রো-আমেরিকান নীতি পলিসি চিন্তার পক্ষে প্রচারণা। ভারত সরকার এর আগে আমেরিকান প্রভাবিত এসব থিংক ট্যাংকগুলো খুলতে ও চলতে অনুমতি দিয়েছিল স্থায়ীভাবেই। কিন্তু প্রত্যেকবার তারা কোনো “প্রডাক্ট শো” করতে গেলে তাদের ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে আগাম একটা “নো অবজেকশন” লিখিত পত্র পেতে লাগত, যেটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ ধরা যাক, কোনো এক থিংক ট্যাংক চীনবিরোধী এক কড়া একাডেমিক বক্তব্য নিয়ে প্রচারে হাজির হয়ে গেলে, মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রচার হয়ে যেতে পারে ওই সভার বক্তব্য – অথচ ওই প্রসঙ্গে ভারতের চীননীতি হয়ত এত কড়া হতে চায় না। এই ভুল বুঝাবুঝি বা নিয়ন্ত্রণ-বিহীন প্রভাব ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় পছন্দ না করাটাই স্বাভাবিক। তাই এই ব্যবস্থা। যেমন, গত মার্চে টাইমস অব ইন্ডিয়ার  ডিপ্লোমেটিক এডিটর ইন্দ্রানি বাগচী জানিয়েছিল যে  থিংক ট্যাংক Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) এরকম এক বার্ষিক কনফারেন্স বিদেশ মন্ত্রণালয় অনুমতি না দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। যেখানে আলোচনার থিম ছিল “India-China: a new equilibrium”.

এতদিন প্রো-আমেরিকান ভারতীয় থিংক ট্যাংকগুলো আরামে আমেরিকার “চীন ঠেকাও” নীতির অধীনে চলত বলে তাদের সভা সেমিনার থেকে যা খুশি চীনবিরোধী বলে চলতে পারত। কিন্তু ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ চীন থেকে শুরু হয়ে এখন ভারত আর ইউরোপের বিরুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। দিনকে দিন অনেকের আশাকে ব্যর্থ করে দিয়ে চীনের সাথে কোনো রফা হয়ে যাওয়ার বদলে বিরোধ স্থায়ী রূপ নেয়ার দিকে যাচ্ছে। ফলে এই অবস্থায় ভারতের সাথে আমেরিকার আগের রফতানি বাণিজ্য সম্পর্কের অবস্থায় ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ ট্রাম্পের নীতির মূল কথা হল, সবার আগে আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি, (তাতে অবশ্য ট্রাম্প যেভাবে যেটাকে আমেরিকার “বাণিজ্য স্বার্থ বলে” বুঝবে সেটাই বুঝতে হবে)। ফলে আমেরিকার যে পুরান “চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত ভারত করত আর বিনিময়ে  আমেরিকায় রফতানি বাজার ভোগ করত, তা ট্রাম্প এবার বন্ধ করে দিয়েছে। আর তা স্থায়ীভাবেই বন্ধ হয়েছে এটাই ধরে নিতে হবে। এমনকি আগামী আড়াই বছর পরেই কেবল তখন আমেরিকার কোনো নতুন প্রেসিডেন্ট এলেও তখনকার হবু আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাণিজ্যের দিন আবার ফেরত না আসার সম্ভাবনা খুবই বেশি- সে এক অনিশ্চিত অবস্থা। অতএব মূল কথা আমেরিকার যে ‘চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত করার সুযোগ ভারতের ছিল বলেই সে কারণে, আমেরিকান থিংক ট্যাংক ভারতে বিস্তার লাভ করেছিল। এখন খেদমতের সুযোগ নেই, রফতানি বাণিজ্য নেই ফলে থিংক ট্যাংক তৎপরতা ও এর বিস্তারের সুযোগ নেই।

আমেরিকায় থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ফান্ডের সংস্থান হিসাবে চিন্তা করা হয়েছিল দাতব্য প্রতিষ্ঠান। ফলে এখনও এগুলো চলে প্রায় একচেটিয়াভাবে বিভিন্ন দাতব্য ফিলেন্থোপিক প্রতিষ্ঠানের অর্থে। আমেরিকানরা প্রতিষ্ঠান গড়তে জানে, প্রতিষ্ঠানের কদর বুঝে ফলে, করপোরেট হাউজগুলোর কাছ থেকে স্থায়ীভাবে নিয়মিত ফান্ড তারা পায়। এভাবে চলা অসংখ্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানও আছে। যদিও অভ্যন্তরে এরা আবার সেটা রিপাবলিকান না ডেমোক্র্যাট প্রতিষ্ঠান এমন সুপ্ত ভাগ রেষারেষিও আছে। কিন্তু এই বিভেদ কোনোভাবেই সুস্পষ্ট বা প্রকট নয়।
ভারত তার মাটিতে থিংক ট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলতে দেখেছিল আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ খেদমতের প্রোগ্রামে তৎপর প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ভারতের ট্রাডিশনাল থিংক ট্যাংক বলতে ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা যায় (যেমন (IDSA) ), যেগুলো সরকারি প্রতিরক্ষা ফান্ড শেয়ার করে চলে। ফলে সীমিত ফান্ডের এমন প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল এবং আছে। তবে এসবেরও বাইরে এক বড় ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠান হল, ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (ওআরএফ)। ব্যতিক্রম এজন্য কারণ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতীয় করপোরেট ব্যবসায়ী রিলায়েন্স গ্রুপের দাতব্যে দেয়া অর্থে। ওআরএফ (ORF), এটা এখন এক দাতব্য ট্রাস্ট সংগঠন। অর্থাৎ এটা সরকারিও না, আবার প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক নয়। আবার কোনো রাজনৈতিক দলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানও না। এসব অর্থে এটা বেশ ব্যতিক্রম। এখনো এর চলতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ বার্ষিক ফান্ডের জোগানদার রিলায়েন্স গ্রুপ। আর বাকিটা অন্যান্য দেশী-বিদেশী সবার কাছ থেকেই নিয়ে থাকে।

এটা স্বাভাবিক যে, কোনো থিংক ট্যাংকের পক্ষে সরকারি পলিসির সরাসরি ও প্রকাশ্য সমালোচনা করা সহজ কাজ নয়। এ ছাড়া তা ভালো ফল দেবেই সবসময় তা এমনও মনে করে নেওয়া যায় না। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সরকারি নীতি পলিসির সমালোচনা, মূল্যায়ন বা ভিন্নমত ইত্যাদি সেগুলো তো অবশ্যই চলবে, তবে এগুলো আলাদা বিষয়।
ওআরএফ নামের থিংক ট্যাংকের এক গুরুত্বপূর্ণ ফেলো হলেন মনোজ যোশী। তিনি মূলত দিল্লির জওহর লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি এবং ওআরএফে যোগ দেয়ার আগে প্রায় তিন দশক ধরে সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর অনেকগুলোতে রাজনৈতিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।

সম্প্রতি বিএনপির এক প্রতিনিধিদলের ভারতের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার কথা জানা যায়। তারা এই মনোজ যোশীর সাথেই সাক্ষাৎ করেছিলেন। ভারতের বাংলাদেশ নীতি কী হবে তাতে ভারতের স্বার্থের কী সম্ভাবনা ও বাধা এসব নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল মনোজ যোশীর একটা লেখা প্রকাশ হয়েছিল। শিরোনাম ছিল।  “Bangladesh polls pose a challenge to regional stability”। সেই সুত্রে মনে করা যায় ভারতের আমলা-গোয়েন্দা ও রাজনীতিবিদদের সাথে সরকারের নীতি পলিসি বিষয়ে কথাবার্তায় থিংক ট্যাংক ওআরএফের পক্ষ থেকে মনোজ যোশীই দেখে থাকেন। তাই সম্ভবত তার গুরুত্ব। যদিও ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ার তারেক জিয়া এবং ভারতের জন্যও এই বিপর্যয়কর অভিজ্ঞতা হয়ে শেষ হয়। কারণ মা খালেদা জিয়া তার “মুখপাত্রকে”  দিয়ে ঐ প্রতিনিধিদল কারা, তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকেই প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে দিয়েছেন।

সে যাই হোক আমাদের এখানে ইস্যু, মালদ্বীপ। দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগের ইস্যু হয়ে উঠেছে মালদ্বীপ। এটা নতুন শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হয়েছে। ব্যাপারটা হল,  ভারত তার পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে আপন বাড়ির পিছনে নিজেরই বাগানবাড়ির অংশ যেন এমনভাব করে চলেছে এতদিন। এই অভিযোগ অনেক পুরানা। ভারত সুযোগ পরিস্থিতিতে একটা শব্দ এখানে ব্যবহার করে – “area of influence। যার বাংলা করলে হবে সম্ভবত, “আমার প্রভাবাধীন এলাকা”। যার খাস মানে হল “আমার তালুক”। যদিও  বৃটিশ-বাপ অথবা ভারতের কোন শ্বশুর এই তালুক কিনেছিল কি না জানা যায় না। তো ব্যাপার হল দাবিকৃত সেই তালুকগিরি এখন নাই হতে লেগেছে।  তবে মনোজ যোশীর ভাষায় পড়শি দেশ যেমন “শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও এখন মালদ্বীপ” আর আগের মতো থাকছে না। ভারতের ছোট পড়শি ম্যানেজ করা কঠিন হয়ে গেছে। কারণ ক্রমাগত বিনিয়োগের অভাবে ধুকতে থাকা ভারতের পড়শি সকল্বর দরজায় এখন ব্যাপক উদ্বৃত্ব বিনিয়োগের অর্থ নিয়ে চীন  হাজির, সবার দরজায় নক করছে সে।
ব্রিটিশরা এশিয়া ত্যাগ করার পর ভারত সেই নেহরুর সময় থেকে সবসময় পড়শিদের সাথে ভাব করেছে যে, সে যেন এবার নতুন কলোনি মাস্টার, আর নেহরু যেন এর ভাইসরয়। সেখান থেকেই এই পড়শিদের নিজ বাগানবাড়ি মনে করার শুরু। ফলে এখান থেকে ভারতের পড়শিদেরও ভারত সম্পর্কে মূল্যায়ন নির্ভুল হতে আর কোনো অসুবিধা হয়নি। তবে সবাই আসলে অপেক্ষায় ছিল সঠিক সময়ের। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে হাজিরা স্বভাবতই ভারতের পড়শিদের সবাইকে এনে দিয়েছে  নিজেদের দিন ফেরার সুযোগ। এটাই স্বাভাবিক যে  ধুঁকে মরা এই পড়শিরা সবাই এখন তুলনামূলক বেশি স্বাধীন মুক্ত হওয়ার সুযোগ চাইবে। আর সেই সাথে আগের দুঃপ্রাপ্য বিনিয়োগ  এখন যদি সহজলভ্য হয়ে যায় তা তো অবশ্যই সোনায় সোহাগা। বিপরীতে তাদের সকলের স্মরণে আছে যে ভারতের ইতিহাস আছে অন্তত দুটো পড়শি রাষ্ট্রে (শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে) নিজ সৈন্য পাঠিয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করার।

চীনের উত্থানের আগে পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়া যে ভারতকে দেখেছে তা হল, সে কখনও নিজেরই তৈরি কোনো নীতি পলিসি মেনে চলে নাই। অর্থাৎ ভারত কী কী করতে পারে, আর কী কী সে করে না, করবে না, কখনত,তার করা উচিত হবে না মনে করে – এমন কোন গাইডলাইন, সেটা ভারতেরই নিজের জন্য সাব্যস্ত করা কোনো নীতিতে সে কখনও পরিচালিত হয়নি। অথচ ভারতের অপর মানে পড়শি; মানে আর একটা রাষ্ট্র। ফলে অন্তত সেখানে এক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আছে, যা ভারতের সম্মান করে চলা উচিত। এটা স্বাভাবিক ও নুন্যতম হওয়ার কথা। কোনো হস্তক্ষেপ করা থেকে ভারতের সাবধান থাকা উচিত। অথচ ভারত এখন বিশাল পরাশক্তির ভাব করে চলে। সে এখন বাংলাদেশের মানুষ নিজের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও সরকার গঠন করা সেটাই হতে না দেয়া এবং জনগণকে ভোট না দিতে দেয়াতে ভূমিকা রাখা – এটা ভারতের জন্য কতবড় মারাত্মক সুদূরপ্রসারি নেতি পদক্ষেপ তা ভারতের কেউ বুঝেছে বলে মনে হয় না। আর এই নীতি পলিসিহীন ছেচড়ামির ভারতই আমরা দেখে এসেছি, আসছি।

মনোজ যোশী মালদ্বীপ নিয়ে এক রচনা লিখেছেন,  ভারতীয় ইংরেজি স্ক্রোল ম্যাগাজিনে; যেটা আরো অনেক পত্রিকাও ছেপেছে। লেখার শিরোনামটাই ইন্টারেস্টিং “India is losing the plot in the Maldives – and New Delhi’s self-goals and inflated ego are to blame”। [রাঙানো আমার করা] এই লেখার বিশেষত্ব হল, এই প্রথম আমরা দেখতে পাচ্ছি, কড়া শব্দ ব্যবহার করে এখানে ভারতের নীতি পলিসির সমালোচনা করা হয়েছে। তাও একেবারে শিরোনামেই এই সমালোচনা করা হয়েছে। লেখার ওই শিরোনামের বাংলা করলে দাঁড়ায়, “মালদ্বীপে তাল-নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ভারত এবং নয়াদিল্লির আত্মগর্বে নির্ধারিত লক্ষ্য (self-goals) ও ফুলানো ফাঁপানো ইগো (inflated ego) এর জন্য দায়ী”। ইংরেজিটাও সাথে উল্লেখ করেছি, এমন শব্দ দুটাকে বেশ কড়া বললেও কম বলা হয়। সোজা বাংলায় বললে ব্যাপারটা হল শিরোনামটা বলতে চাইছে, “মুরোদহীন ভারতকে ফাঁপা ইগো সামলাতে হবে”।

মনোজ যোশী এই লেখায় মালদ্বীপে গত এক বছরের  নতুন সব যা ডেভেলপমেন্ট ঘটেছে তার সবের উল্লেখ আছে এবং তা আছে চীনকে কোন রকম দায়ী না করে, নৈর্ব্যক্তিকভাবে। এমনকি তিনি লিখছেন, “চীনারা সেখানে যৌথভাবে এই মহাসাগরে পর্যবেক্ষণ স্টেশন তৈরিতে সাহায্য করছে, (The Chinese are also helping build a Joint Ocean Observation Station)”। অর্থাৎ মনোজ, মালদ্বীপে কোনো সামরিক স্থাপনা চীন করছে এমন কোনো অভিযোগ তিনি করছেন না। বরং তিনিই লিখছেন, “এখনো পর্যন্ত ভারতের বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে চীনা তৎপরতার কোনো সামরিক অভিপ্রায়গগত দিক আছে’ (As of now, India has no reason to believe that the Chinese activities have military implications)”। বলা বাহুল্য, এটা দেখা যায় না এমন এক বিরাট সার্টিফিকেট।  তবে তিনি বলছেন, “চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং এই অঞ্চলে চীনের হাজিরা ভারতের জন্য কাজ কঠিন করে দিয়েছে”।  এবং সেটাই কী স্বাভাবিক নয়!
এছাড়া যেকথা উপরে বলা হচ্ছিল, ভারত এতদিন কোনো নীতি মেনে পড়শিদের সাথে চলেইনি। এর কিছু কিছু মূল্য এখন না চাইলেও ভারতকে দিতে তো হবেই। মনোজ লিখছেন, “ভারতের নিজ মুরোদে, পড়শিদের কাছে বেচার মতো কোনো অস্ত্র তার নিজের নেই। তাই সে চীনের সাথে পারছে না”। বলা বাহুল্য, এটা চীন বা ভারতের পড়শিদের কোনো অপরাধ অবশ্যই নয়।

তাহলে মনোজ কেন এই রচনা লিখলেন? তিনি আসলে ভারতকে চীনের সাথে স্বার্থবিরোধ অনুভব করতে গিয়ে “আত্মগরিমায়”, নিজ ক্ষমতাকে “ফুলায় ফাঁপায় দেখে” যেন আগের মতো  মালদ্বীপে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের কথা যেন চিন্তা না করে বসে এটাই বলতে চাইছেন। সাবধান করছেন।
তিনি লিখছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে খবর বেরিয়েছিল যে “চীনা নেভাল কমব্যাট ফোর্স ভারতের সম্ভাব্য মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে ভারত মহাসাগরে হাজির আছে”। আমরা স্মরণ করতে পারি সেসময়ের কথা।  সে কারণে সে সময় পররাষ্ট্র সচিব গোখলেকে যেচে চীনে গিয়ে জানিয়ে আসতে হয়েছিল যে ভারতের এমন কোনো হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা নেই। এক সিনিয়র গভর্মেন্ট অফিসিয়ালের বরাতে ২৮ মার্চ সকালে ‘Stepping back from Maldives, India tells China’- এই শিরোনামে খবরটা এসেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়।

তাহলে মনোজের শঙ্কাটা কী থেকে? কারণ ইতোমধ্যে কিছু খুচাখুচি ঘা বানানোর চেষ্টা দেখা গিয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও আমলা-গোয়েন্দারা তাদের inflated ego এর খাসলত এখনও যায় নাই। সেই ইগোর ঠেলায় তারা এবার আবার কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করেনি বটে কিন্তু এক খাউজানির কূটনৈতিক লবি করেছে।  আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টকে দিয়ে একটা বিবৃতি দেয়াইয়েছে যে “মালদ্বীপে মানবাধিকার লঙ্ঘন” চলছে। ঐ বিবৃতির শিরোনাম, [“Conviction of Maldives Supreme Court Justices and Former President”]।  ঐ বিবৃতিতে আমেরিকার দাবি হল – “মালদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, সাবেক প্রধান বিচারপতি ও অন্য একজন বিচারপতিকে সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে বিচারে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়নি। এতে ‘আইনের শাসনে ব্যত্যয় ঘটেছে এবং আগামী সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ‘নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার’ হওয়ার ক্ষেত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।” [This outcome casts serious doubt on the commitment of the Government of Maldives to the rule of law and calls into question its willingness to permit a free and fair presidential election in September that reflects the will of the Maldivian people”. ] আর আমেরিকার এই বিবৃতির পরে ভারতও এই একই লাইনে নিজে এক বিবৃতি দিয়েছে।

এখানে মজার বিষয়টা হল, আমরা এই বিবৃতি খুবই পছন্দ করেছি। আর দাবি করছি, এই একই বিবৃতি বাংলাদেশের বেলায় ভারত কেন দেবে না? জনগণের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও পছন্দের সরকার গঠনের অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ কী একই জায়গায় কেন নয়? কিন্তু ভারত কেন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলবে না? আমরা জানতে চাই।

আগেই বলেছি, ভারত তার পড়শির বেলায় কোনো নীতি পলিসি মেনে চলা রাষ্ট্র নয়। এক হাভাতে খাই খাই পেট নিয়ে চলে ভারত। ফলে পেট ভরানোর উপরে অন্য চিন্তার জগতে সে এখনও উঠতে পারে নাই। আর এখানে যোশীর সাবধানবাণীর কারণ সম্ভবত এই যে, ভারত যেন আমেরিকার কথায় না নাচে। কারণ কোনো সম্ভাব্য ও ন্যূনতম সামরিক সঙ্ঘাত পরিস্থিতিতে আমেরিকার ওপর ভারতের ভরসা করার সুযোগ নেই। ভারত পক্ষে আপাতত ওই এক বিবৃতি পাওয়া গেছে এটাই খুব। কারণ য়ামরা মনে রাখতে পারি যে ডোকলাম ইস্যুতে আমেরিকা ভারতের পক্ষে একটা বিবৃতিও দেয়নি। এটা তাদের সবার মনে আছে নিশ্চয়। ফলে ভারত যেন মালদ্বীপ ইস্যুতে কেবল কূটনৈতিক এপ্রোচের মধ্যে থাকে এবং আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করে – এটাই মনোজ যোশীর আবেদন।

ভারত সব হারাচ্ছে, আরো হারাবে। কারণ ভারত কোনো নীতিগত জায়গায় দাঁড়ায়ে তার পড়শি নীতি পলিসি মেনে চলে না, চলছে না। তবে সারকথাটা হল, মালদ্বীপ পরিস্থিতি আমাদের আশ্বস্ত করছে যে আগামীতে অন্তত আর কোনো পড়শি দেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ সম্ভাবনা নাই হয়ে গেল। কারণ, মালদ্বীপে চীন সেখানে এক বিরাট বাধা হিসেবে উপস্থিত ও হাজির হয়ে গেছে, এটা প্রায় এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে ও নেবে। কারণ মালদ্বীপের মতো ভারতের প্রত্যেক পড়শি রাষ্ট্রে চীনের বিনিয়োগ স্বার্থ বর্তমান এবং তা স্থায়ী।

সবশেষে, এই ইস্যুতে মনোজ যোশীর মত আর এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া মিডিয়ায় দেখা গেছে। এম কে ভদ্রকুমার ভারতের এক অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। এক কমিউনিস্ট পরিবারের সন্তান। ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিকরা বেশির ভাগই “ভারতে আমেরিকান থিংক ট্যাংক” এর খেপ ধরতে গিয়ে প্রো-আমেরিকান হয়ে জড়িয়ে পরেছেন। যে দুচারজন এমন পেটভরানো চক্রের এর বাইরে আছেন ভদ্রকুমার তাদের একজন। মালদ্বীপ ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” বিবৃতিতে তিনি প্রচন্ড ক্ষিপ্ত। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই সপ্তাহেই  ভারতের কাশ্মিরে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য খোদ জাতিসংঘ কাউন্সিল কঠোর সমালোচনা করেছে – তা কী ভারত ভুলে গেছে?  তিনি লিখেছেন,

Ironically, Delhi’s tough statement on the democracy deficit in Maldives coincides with an unprecedented report by the United Nations Human Rights Council condemning India’s track record in Kashmir. The UN report demands the constitution of an impartial international commission to investigate India’s alleged human rights violations in Kashmir.

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মালদ্বীপে ভারতের ইগো”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

গৌতম দাস

১২ মে ২০১৮, শনিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2rG

 

 

 

ভারতীয় থিংকট্যাংক (Think Tank or Policy Institute) প্রতিষ্ঠানগুলোর দশা হালহকিকত নিয়ে প্রায় সময়ই আমার লেখায় নানা মন্তব্য থাকে। সেখানে আমি সবসময় প্রশ্ন তুলেছি যে, কোন আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা (আমেরিকান ফান্ড চলা) ভারত রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষ থেকে পলিসি নিয়ে কাজ করা কঠিন, প্রায় অসম্ভব। ফলে শেষ বিচারে এগুলো আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের এক পলিসি প্রতিষ্ঠানই হবে। কারণ এটা  থিংকট্যাংক অর্থাৎ চিন্তা, আইডিয়া ও মতাদর্শ তৈরি করা বা করার প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রস্বার্থ জিনিষটা কোকিলের ঘরে কাকের বাসার গড়ার মত কাজ কারবারের না; সেটা এখানে চলতে পারে না। ফলে শুধু আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা নয়, এমনকি আমেরিকান (এনজিও) ফান্ডে চলে এমন স্থানীয় ভারতীয় থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই কারণে সেগুলোও ভারতের মাটিতে “আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পলিসি প্রতিষ্ঠানই” হবে।

বুশের আমল থেকে এভাবেই আমেরিকা ভারতের ঘাড়ে চড়ে আমেরিকার নিজের “চীন ঠেকাও নীতি” বাস্তবায়ন চালিয়ে গিয়েছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে এখানে কথাগুলোর মূল বিষয় সাধারণভাবে বিদেশি এনজিও প্রসঙ্গে নয়। ফলে সাধারণভাবে এনজিও এর মাধ্যমে আমেরিকান ফান্ড বিতরণ এর বিরুদ্ধে কথা বলা বলে বুঝলে ভুল হবে। যারা বস্তুগত, বা বিষয়আশয় বিতরণের দাতব্য বিদেশি এনজিও – তাদের ক্ষেত্রে এই কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু চিন্তা, মতামত ও পলিসি তৈরির প্রতিষ্ঠান বিদেশি ফান্ডে হলে এখানে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের সাথে স্বার্থ সংঘাত, সমস্যা হবেই। এটাই মূল কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এত চরম ন্যাশনালিজমের ভারতের রাজনীতি, অথচ থিংকট্যাংক প্রশ্নে ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংককে অবলীলায় ততপর করে রেখেছে।  আসলে আমেরিকায় ভারতের ভর্তুকির রপ্তানি পণ্য বিক্রি করতে দেওয়াতে রপ্তানি বাজারের এই লোভে সম্ভবত ভারতরাষ্ট্র নিজ দেশে আমেরিকান থিংকট্যাংকের প্রভাব প্রতিপত্তি চালু রাখতে দিয়েছে। এই অনুমান যদি সঠিক হয় তবে বুঝতে হবে এবার  ভারতে ততপর আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা অথবা অথবা আমেরিকান ফান্ডে চলা লোকাল থিংকট্যাংক এদের সবার ততপরতা ও প্রভাব প্রতিপত্তিতে এবার ঢিলা পড়ার প্রবল সম্ভাবনা। হাত গুটাতে হবে তাদের। এক ব্যাপক বদল আসন্ন হয়ে উঠছে। মূল কারণ আমেরিকান এশিয়া নীতিতে “চীন ঠেকানো” প্রায় স্থায়ী নীতি হয়ে ছিল বিগত প্রায় ষোল বছর – প্রেসিডেন্ট বুশের আট বছর আর পরে ওবামার আরও আট বছরে। এর ফলে এটা শুধু স্থায়ী নীতি হয়ে যাওয়া না, বরং “চীন ঠেকানো” ছিল আগের বুশ ও ওবামা প্রশাসনের পলিসিগুলোর মধ্যে টপ প্রায়োরিটি বা অগ্রাধিকার। কিন্তু এই প্রথম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। অন্তত প্রায়রিটি উলটে দিয়েছেন তিনি। আগের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল আমেরিকান রাষ্ট্র স্বার্থের টপ প্রায়রিটি। আর এর বদলে ট্রাম্পের প্রায়রিটি হল বাণিজ্যস্বার্থ এখন টপ প্রায়রিটি। অর্থাৎ চীন ঠেকানো ট্রাম্পের কাছে প্রায়রিটি নয়। চীনের কাছে হারিয়ে ফেলা বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধার ট্রাম্পের টপ প্রায়রিটি। এসবের ফলাফলে  ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংক ততপরতাগুলোর শুকিয়ে যাবার কথা। দেখা যাক কী হয়। বাস্তবে কী ঘটে তা দেখার জন্য আমাদেরকে কমপক্ষে এবছরটা অপেক্ষা করতে হবে।

তবে ভবিষ্যত অবস্থা যতই অনিশ্চিত হোক না কেন, ভারতের আমেরিকান থিংকট্যাংক ব্যাক্তিত্বরা এখনই হাল ছেড়ে দেন নাই।  তেমনই এক উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী থিংকট্যাংকার ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজা মোহন। বর্তমানে তিনি কার্ণিগি ইন্ডিয়ার (Carnegie India) প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর। কার্ণিগি মানে হল, আমেরিকার ওয়াশিংটনভিত্তিক এক ফরেন পলিসি – বিষয়ক থিংকট্যাংক যার নাম – কার্ণিগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারনাশনাল পিস (Carnegie Endowment for International Peace)। এই পুরো নামের সংক্ষিপ্ত রূপের নাম হল, কার্নোগি। আর এর ভারতীয় শাখা হল, কার্নোগি ইন্ডিয়া। রাজামোহন ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের লোক। তিনি নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে মাস্টার্স পাস করেছেন অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে। তবে পরে দিল্লির জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। এরপর অধ্যাপনা করেছেন অথবা নানান ধরণের একাডেমিক কাজে জড়িয়ে ছিলেন কখনও ভারতে, সিঙ্গাপুরে, অস্ট্রেলিয়ায় নয়তো আমেরিকায়। তবে তার মূল পরিচয় এখন “ফরেন পলিসি এনালিস্ট”, তার নিজের পরিচিতির ভাষায় তিনি “থিংকট্যাংকার”। আমেরিকায় থাকার সময় থেকে তিনি দক্ষিণ ভারতে তামিলনারুর প্রাচীন ইংরেজ জমানার ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দু পত্রিকার ওয়াশিংটন করসপন্ডেন্স ছিলেন। পরে ডিপ্লোমেটিক এডিটর বা কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন এই দ্য হিন্দু অথবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাতেও। বর্তমানে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় নিয়মিত সাপ্তাহিক কলাম লিখছেন। ভারত সরকারের নিরাপত্তাবিষয়ক অথবা থিংকট্যাংক সংশ্লিষ্ট যত প্রতিষ্ঠান বা নীতিনির্ধারক বোর্ড আছে তিনি প্রতি বছরই একাধিক এমন সব প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সদস্য থাকেন। তিনি এমনই প্রভাবশালী শিরোমণি। তার গুরুত্বপূর্ণ উত্থান ২০০৪ সালের আশেপাশের সময় থেকে। বিশেষ করে ওয়ার অন টেররের আমলে, জুলাই ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম ভারত সফর কাল থেকে। আমেরিকার ভারতনীতি কী হবে – তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে তখন থেকেই ‘আমেরিকার বন্ধু’ হিসেবে তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার প্রভাব ও নীতির বিচারে তিনি প্রভাবশালী এক বিরাট ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশও সফর করেছেন কয়েক বছর আগে; অনুমান করি সেটা ভারতের বাংলাদেশ নীতি সমন্বয়ের কাজে। সে সময়ে চ্যানেল আই টিভিতে জিল্লুর রহমানের টকশো অনুষ্ঠানের শ্লটে। কিন্তু রাজামোহন সেখানে এসেছিলেন একক বক্তা, বলা যায় সেটা ছিল ডায়ালগের বদলে এক মনোলগ অনুষ্ঠানে। বলা বাহুল্য, তিনি আমেরিকার এশিয়া নীতিতে ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ (বা চীন ঠেকাও) – এর প্রবক্তা। যার বাংলা কথাটা হল, এশিয়ার সবাই আমেরিকার পাশে থেকে চীন কোপাক, চীন ঠেকানোর কাজে লাগুক। আমেরিকার এই স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেক। যেটাতে রাজামোহন যেন একজন ন্যাশনালিস্ট ভারতীয়ের বক্তব্য দিচ্ছেন এমন মনে করানোর চেষ্টা থাকে। যদিও আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজের কাঁধে তুলে নিলে অথবা না নিলে সেটা ভারতের স্বার্থের পক্ষে যাবেই ব্যাপারটা এমন নয়। তবু এতদিন প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সব মিডিয়া এই একই ধারায় প্রপাগাণ্ডা করে গেছে। উইকিপিডিয়া পরিচিতি হিসেবে রাজামোহনের সম্পর্কে লিখা হয়েছে, তাঁর বিদেশনীতি বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি হলো “মোটা দাগে লিবারেল ও বাস্তববাদী, তবে তিনি আমেরিকার মতো গ্লোবাল প্লেয়ারদের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার” পক্ষে কথা বলে থাকেন।

আগেই বলেছে ট্রাম্প আমলে এসে, ভারতের এহেন থিংকট্যাংকদের দিনকাল ইদানীং খুবই খারাপ যাচ্ছে। ট্রাম্প ও তার নীতি ভারতের থিংকট্যাংকারদের তাদের কাজ তৎপরতাসহ সব এলোমেলো করে ডুবিয়ে দিয়েছে। মূল কারণ তারা অবিরত ভারতে আমেরিকার হয়ে জনমত তৈরি ও প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। অথচ ট্রাম্প বাড়তি ট্যারিফ আরোপ করে ভারতের আমেরিকাতে রপ্তানি ততপরতায় হাহাকার তুলে ফেলেছে।  আমেরিকায় ভর্তুকির ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করা বা বাড়তি ট্যারিফ বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প এদের সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে ফেরি করার দিন শেষ। এসবের আর মূল্য নেই। অথবা আমেরিকা প্রভাবিত থিংকট্যাংকগুলোর করা ভারতের মিডিয়া-প্রোপাগান্ডা সব মিথ্যা হয়ে যাওয়ার চেয়েও সেগুলো বাস্তবতা হারিয়ে অচল অসার বক্তব্য হয়ে গেছে। আর ওই দিকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও মোদির সরকার লজ্জার মাথা খেয়ে যেসব তৎপরতায় নেমেছে সেটাকে যদি চীনকে খুশি করার উদ্যোগ বলা এড়াতেও চাই তো বলতে হবে ‘চীন অখুশি হবে’ এমন সব কাজ পদক্ষেপ বন্ধ করে দিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় চোটটা গিয়ে পড়েছে তিব্বতের দালাইলামার ওপরে। এসব ব্যাপারে সর্বশেষ ঘটনা হল, মোদি ও শি জিনপিংয়ের দুই দিনের একান্ত ইনফরমাল সামিট। (বিস্তারিত এখানে)

রাজামোহন গত ১ মে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় তার নিয়মিত কলামে মোদি ও শি জিনপিংয়ের একান্ত ইনফরমাল সামিটকে নিজের লেখার প্রসঙ্গ করেছেন। কিন্তু সেখানে দেখা যায়, তিনি ভারতের প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংকারদের করুণ অবস্থা স্বীকার করতে এখনো রাজি হননি। বরং রাজামোহন লিখছেন, গত সপ্তাহে মোদি ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে চীনের য়ুহান (Wuhan) শহরে একান্ত ইনফরমাল সামিট হয়েছে, সেটা ভারতের চীনা নীতিকে রিসেট (reset) বা “ফিরসে শুরু” করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। কিন্তু খুব কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে বোঝা যায় এটা আসলে বরং চীন, যে এশিয়ার তার ‘প্রতিবেশী নীতি’ বদলিয়েছে। আর দিল্লি তাতে কেবল চিন্তাই করা যায় না এমন পাওয়া সুবিধা পেতে সাড়া দিয়েছে মাত্র। ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, চীনই তার আঞ্চলিক নীতি ‘ফির সে শুরু’ করে সাজিয়েছে কারণ সে ট্রাম্পের উজানে বাওয়া দেখে এর প্রতিক্রিয়ায় চীনকে এমনটা করতে হয়েছে। [Last week’s informal summit in Wuhan between Prime Minister Narendra Modi and President Xi Jinping was widely billed as India’s ‘reset’ of its China policy. A close look suggests it was Beijing that was really recasting its policy towards its Asian neighbours. Delhi was merely responding to an unexpected opportunity. A closer examination, however, suggests China’s reset of its regional policy was itself a response to the American upheaval under President Donald Trump.]

ইন্টেলকট বা একাদেমিক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ যাদের করতে হয় তাদের বক্তব্যের ধার বা পয়েন্ট যখন এমন হাল্কা তর্কে নামা খুবই খারাপ লক্ষণ। বুঝা যাচ্ছে, রাজামোহনের অবস্থা আসলে খুবই মরিয়া দশায়। পরের প্যারায় তিনি ট্রাম্পের প্রশংসা করে আরও লিখছেন, “গ্লোবাল ক্ষমতার ভারসাম্য আমেরিকা-চীন এই দুইয়ের মধ্যে চীনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে বলে যে ব্যাপক ধারণা তৈরি হয়ে গেছিল মাত্র ১৬ মাসে তা একা হাতে ট্রাম্প চ্যালেঞ্জ করে উল্টে দিতে পেরেছে।’ ট্রাম্প কেবল তার নিজের বিশেষ আজব ঢংয়ে বলে দিতে পেরেছে, ‘না, এত তাড়াতাড়ি সেটা ঘটবে না”। [“In a short span of 16 months, Trump has single-handedly challenged widespread perception that the balance of power between America and China was tilting in favour of the latter. Trump, in his own peculiar way, has said, ‘not so fast’”.

এই লেখা আসলে ডেসপারেট এক ট্রাম্পভক্তের; রাজামোহন সম্পর্কে এ ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ নেই। যেন এ’এক আমেরিকা প্রেমে মজে অন্ধ হয়ে যাওয়া। যেন দুই শিশু তুমুল তর্ক করছে যে, “কার বাবা বেশি বড়লোক”। কম করে বললে এমন তর্ক অশোভন, অন্তত একাডেমিক পর্যায়ের লোকদের তর্ক এটা নয়।

এটা আমেরিকা অথবা চায়নাকে ভাল বলে তাদের কারও পক্ষে ওকালতির ইস্যু না। ট্রাম্পের আমেরিকা ভাল না চায়না ভাল – এই স্টাইলে তর্ক  বলাই বাহুল্য খুবই নিম্নমানের। বরং একাডেমিকদের তর্ক হতে পারে যে, ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশনের নীতি ছেড়ে চলে যেতে পরোয়া করছে না কেন?  দুনিয়ায় গত সত্তর বছরেরও বেশি পুরনো আমেরিকার যে গ্লোবাল ভূমিকা ও এক এম্পায়ার (empire) ভূমিকা এবং দুনিয়ার নেতার ভূমিকা – সেসব ঢিলা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে তা আমরা মানলেও ট্রাম্পের আমেরিকা তা যেচে ত্যাগ করতে আর পরোয়া করছে না, কেন? আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের হাতে আকার পেয়েছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ – এখন সেই গর্বও ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি। কেন? একই সময়ে গত সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা ইউরোপের সাথে আমেরিকার প্রধান সহযোগী হিসাবে সম্পর্ক, সত্তর বছর পরে এসে আমেরিকা অবলীলায় এই প্রথম বেপরোয়াভাবে এই সম্পর্ককে ত্যাগ করছে। ন্যাটোসহ ইউরোপের সাথে মিলে যা কিছু যৌথ প্রতিষ্ঠান এতদিন  ধরে গড়ে তুলেছিল, ট্রাম্পের আমেরিকা এখন সব ভেঙে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। অথচ এগুলোই তো আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের মৌলিক ভূমিকা পালনের মুখ্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে আমেরিকাকে সুযোগ দিয়েছিল। অথচ এগুলোকেই ট্রাম্প স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে চাইছে, ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। তাহলে “চীনের বদলে আমেরিকার হাতেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থাকছে, এত তাড়াতাড়ি তা যাচ্ছে না” – রাজামোহনের এই কথা বলে ট্রাম্পকে বিরাট ত্রাতা বলে তোষামোদীর কারণ কী?  এছাড়া ওদিকে ট্রাম্প নিজেই তার কোনো উপদেষ্টার কোনো কথা রাখছেন না বা অবস্থান কমিটমেন্ট যেখানে যা কিছু বলে আসছেন ট্রাম্প তা রক্ষা করছেন না, মানছেন না। তিনি মূলত পরিচালিত হয়ে চলছেন অসংখ্য লবিস্ট (ব্যবসায়ী) তাকে যখন যেভাবে বলাচ্ছেন বেশির ভাগ সময় তিনি তাদের খপ্পরে। ট্রাম্পের প্রশাসনের এসব অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ট্রাম্পের আমলেই রেকর্ড পরিমাণ কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নিয়োগকৃত উপদেষ্টা বা প্রশাসনিক কর্তার বরখাস্ত হওয়া বা পদত্যাগ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। এথেকে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আন্দাজ পাওয়া যায়!

আর সবচেয়ে বড় কথা ট্রাম্পের প্রশংসা করে রাজামোহনের দাবি যদি সঠিকও হয় তাতে রাজামোহনের ভারতের কী লাভ এতে? মোদির সরকার প্রশাসন থেকে কী আমরা ইতোমধ্যেই জানি নাই যে, খোদ ট্রাম্প বা আমেরিকার কাছ থেকে বাণিজ্য ইস্যুতে ভারতের আর কিছুই পাওয়া নেই? এটা মোদির সরকার প্রশাসন প্রকাশ করেননি! ভারত আমেরিকায় তার রফতানি বাজারটাই হারিয়েছে, এটাই চরম বাস্তবতা। তাহলে রাজামোহন কার প্রতিনিধিত্ব করছেন? কার খুশিতে খুশি হচ্ছেন? কোন আমেরিকা? এই আমেরিকা কী কেবল শুধু ভারতের নয়, দুনিয়ার কারো জন্যই কেউ নয়, তাই নয়? তাহলে রাজামোহন কার স্বার্থের প্রতিনিধি? বটম অব দা হার্ড ফ্যাক্টস হল, ট্রাম্প আমেরিকার রাজনৈতিক স্বার্থের উপরে বাণিজ্যিক স্বার্থকে টপ প্রায়রিটিতে এনেছেন। আর আগের আমেরিকার “চীন ঠেকানো” – এটাকে রাজনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে দেখে ও প্রাধান্যে রাখাতে ভারতের পণ্য তা প্রতিযোগিতায় না পারলেও ভর্তুকিতে রপ্তানিযোগ্য করে তা আমেরিকায় রপ্তানি করতে দিয়েছিল। এই সত্যকে আড়াল করে ট্রাম্পকে রাজামোহন হিরো বানায় কী করে, এটা সত্যিই বিস্ময়! ্ট্রাম্প কার চোখে হিরো? কার জন্য হিরো?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এরা পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েছিল ও থেকেছিল। আর আমেরিকা ছিল তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাদাতা। ছিল বলছি কারণ ট্রাম্পের বাণিজ্য সংরক্ষণ  নীতির কারণে এর দিন শেষ। অথচ এসব ইঙ্গিত যেমন, চলতি দুই কোরিয়ার সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন এবং জাপানের গুরুত্বপূর্ণ মোচড় মনে হচ্ছে রাজামোহন দেখেও না দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পরিবর্তনের মধ্যে মূল ইঙ্গিতটা হল, পুর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো মনে করছে আমেরিকাকে সবসময় নিজ ভাবনার সাথে মিলিয়ে এক গণ্ডিতে সাথে রেখে চিন্তাভাবনা করার দিন ফুরিয়েছে। ভারতের এ্ক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের (O.P. Jindal Global University, in Sonipat, India) দুই প্রফেসর জাপানের নতুন ভাবনার পক্ষে বিভিন্ন ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। যেমন দেখুন, Trump Is Driving Xi Into Modi’s Arms

সেসব রচনার সার কথা হল, সাম্প্রতিককালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাপান সফরের পর থেকে বহু কিছু বদলে গেছে। জাপান এমনকি চীনের বেল্ট ও রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার সুযোগ কী তার জন্য আছে তা এক্সপ্লোর করতে শুরু করেছে। এমন একটা আর্টিকেলে লেখা হয়েছে, ভারতের জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা দরকার। [A lesson for India in Japan’s approach to China’s belt and road initiative] অপরদিকে দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ সামিট সম্প্রতি আমরা দেখেছি – যদিও এমন সামিট এর আগেও মানুষ দেখেছে। কিন্তু এবার নেতাদের যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বিশেষ ধরনের আলাদা। যেন দুই কোরিয়া একসাথে সামনে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা তারা এবার খুজে পেয়ে গেছে। প্রথম যেদিনে সীমান্তে দুই প্রেসিডেন্টের পরস্পর দেখা হয়, তখন থেকে। বিশেষ করে উত্তরের প্রেসিডেন্টের আন্তরিকতা দক্ষিণের প্রেসিডেন্টের কাছেও কাম্য অবশ্যই, তবে অদৃশ্যপূর্ব ঠেকেছে। এর পেছনের মূল কথাটা কী? সেটি হল, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ থেকে আমেরিকাকে দূরে রাখতে হবে, পরস্পরের প্রতি এই প্রতিশ্রুতি। তাই এটা এখনই বলে দেয়া যায় আগামী ইতিহাসে যখন খুঁজে দেখা হবে যে, কবে থেকে গ্লোবাল ক্ষমতার ভারকেন্দ্র আমেরিকা থেকে চীনের হাতে চলে এসেছিল? এক বাক্যে সেই ইতিহাস বলবে চীনের মধ্যস্থতায় দুই কোরিয়ার পরস্পরকে বিশ্বাসের সাথে পরস্পরের কাছে আসার শুরু থেকে। আর আমেরিকার ঐতিহ্যগত বন্ধু জাপান যখন আমেরিকা ছেড়ে চীনের ভেতরে বন্ধুত্ব খুঁজতে রওনা হয়েছিল আর চীন এর উপযুক্ত জায়গা খুঁজে দিতে পেরেছিল, তখন থেকে।

আসলে এসবের মূল কথাটা হল, যে আমেরিকা কেবল নিজের জন্য আমেরিকা – এটা কোন এম্পায়ার আমেরিকা নয়। বরং নিজেই নিজেকে দুনিয়ার নেতা – এম্পায়ার – এই অবস্থান থেকে নিজেই নিজেকে খারিজ করে দেয়া। এভাবে কোনো রাষ্ট্র যখন চরম রক্ষণশীল অবস্থান নেয় তখন কেউই আর সেই আমেরিকার কেউ থাকে না। এ যুগে এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান বলে নিজের কোনো অবস্থানের বাস্তবতা সম্ভব বলে মনে করা হলে এর সোজা অর্থ হল – সেই রাষ্ট্র আর তখন ইউরোপ, জাপান বা কোরিয়ার জন্য কেউই নয় হয়ে যায়। কেবল তখনও ট্রাম্পের আমেরিকার একমাত্র ভক্ত-বন্ধু থাকে সি রাজামোহন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের থিংকট্যাংক এখনো ট্রাম্পভক্ত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]