নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিয়ে ভারতের এখন আপসোস

গৌতম দাস

২২ জুলাই ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2sO

Indo-Nepal relations,India's neighbours,Foreign policyPrime Minister Narendra Modi with his Nepali counterpart KP Sharma Oli during delegation level talks in Kathmandu earlier this year(PTI)

তার নাম ব্রক্ষ্ম চেলানি (Brahma Chellaney)। রাষ্ট্র পরিচালনের মূলত নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা তার পেশা। আর গুছিয়ে বললে, তিনি স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের অধ্যাপক, বিশেষত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে তার বিশেষজ্ঞ খ্যাতি আছে বলে তিনি দাবি করেন। নয়াদিল্লির “সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ” নামে এক থিঙ্কট্যাঙ্ক পরিচালন করেন তিনি। পশ্চিমের বড় ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সাথে তার যোগাযোগ সম্পর্কের কথাও তিনি আমাদের জানিয়ে থাকেন। স্বভাবতই তাকে প্রো-আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের একজন একাডেমিক বলা যায়। যদিও আবার, এক কথায় তার মূল পরিচয় হবে সম্ভবত তিনি এক পাঁড় জাতিবাদী ভারতীয়। তিনি ততটাই পাঁড় যতটা একজন একাডেমিকের জন্য বিপজ্জনক; ফলে যে সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া অনুচিত; তবু ততটাই তিনি জাতিবাদী। একাডেমিকেরও চিন্তার সততার কিছু দায় থাকে। ইমোশনের আড়াল নিয়ে তিনি নিজেকে বেচে দিতে পারেন না বা উগ্র জাতিবাদী হয়ে যেতে পারেন না। তবে একাদেমিকের অবশ্যই সুনির্দিষ্ট চিন্তাগত অবস্থান থাকবে, তা কারও সাথে মিলুক আর নাই মিলুক, তিনি নিজের কথাই বলে যাবেন। আইডিয়ালি এমনই হওয়ার কথা। যেমন এমনই এক সুনাম বা ক্রেডেন্সিয়ালের একাডেমিক তিনি! তিনি মনে করেন, নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দেওয়ার আন্দোলনে সাথ দিয়ে ভারত ভুল করেছে! আজিব ব্যাপারটা হল, এখন আপসোস করে  তিনি কী করে একালে এসে কোনো রাজতন্ত্র টিকিয়ে রাখার পক্ষে যুক্তি দিতে পারেন? অথচ তিনি তাই করেছেন!

তার সাম্প্রতিক লেখা এক কলাম, যা গত ৬ জুলাই ভারতীয় দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসে ছাপা হয়েছে। সেখানে তিনি নেপালের রাজতন্ত্র ভেঙে দিতে ভারতের অংশগ্রহণ ও ভুমিকা থাকায় এখন আপসোস করেছেন। ঐ লেখার শিরোনাম হল, “India’s mistakes have allowed China to make inroads into Nepal”। তিনি এখন দাবি করছেন, ভারতের ঐ ভুমিকা আসলে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে।

কেন এই সময়ে তিনি এটা লিখলেন স্বভাবতই সে আপসোসের পটভূমি আছে। তা হল সবাই জানে, ল্যান্ডলক্ড নেপালের সমুদ্রপথে বের হওয়ার কোন যোগ-সুযোগ না ছিল না। আর এই ভৌগোলিক আবদ্ধতার ফলে নেপালের যে অর্থনৈতিক অসুবিধা – সেটাকেই ভারত নিজের সুবিধা হিসেবে এতদিন পুরোপুরি উসুলি নিয়ে গেছে। নেহরুর ভারত ১৯৫০ সাল থেকে নেপালকে এক দাসত্ব চুক্তিতে বেঁধে রেখে একে নিজের পক্ষের সুবিধা হাসিল করে গেছে। এতদিন ভারতের ভেতর দিয়ে ছাড়া নেপালের পক্ষে কোন সমুদ্রের নাগাল পাওয়া তো নয়ই এমনকি সড়ক পথেও বাইরে কোনো দেশে  যাওয়া সম্ভব ছিল না। আর একচেটিয়াভাবে এর ফায়দা তুলে গিয়েছে ভারত-রাষ্ট্র ও এর ব্যবসায়ীরা। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা, নেপালে ব্যবসায়ের সুযোগ মানেই তা ভারতের সুযোগ। আর ওদিকে যেটা ভারতে তাদের যে সুযোগ তা তো কেবল ভারতীয়দের জন্য আছেই – এই নীতিতে। যেমন, এখনো ভারতের অনুমতি ছাড়া নেপাল বিদ্যুৎসহ তার কোনো উৎপন্ন পণ্য তৃতীয় দেশে (যেমন বাংলাদেশে) বিক্রি করতে পারে না। আর ভারত তাতে অনুমতি দেয় সাধারণত তা কেবল ভারতীয়দেরই বিনিয়োগ ও ব্যবসা হলে পরেই। অথচ বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া ভারতের ভারত-বাংলাদেশ ট্রানজিটকে দেখেন, এখানে ভারত তার কেন্দ্র দিল্লি অথবা কলকাতাসহ যেকোন প্রদেশ থেকে কোন কোন পণ্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত ট্রানজিট হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারতে নিতে পারবে অথবা কোনটা পারবে না তা নিয়ে ভারত আমাদের থেকে কোনো অনুমতিই নেয় নাই। এসবের বালাই-ই নাই।

এবার ভারতের কাছে নেপালের সেই অসহায়, একক সমর্পণের দিন সম্ভবত শেষ হয়ে যাচ্ছে। নেপাল এখন ভারত ছাড়াও আর একটা বিকল্প হিসেবে চীনকে পেতে যাচ্ছে। চীন নেপালকে নিজের ভূমি ব্যবহার করে এবং চীনের বন্দর বা সমুদ্রপথ ব্যবহারের অনুমতি বা ট্রানজিট দিতে সম্মত হয়েছে। এখন এর বিস্তারিত চুক্তি ও প্রটোকল প্রস্তুতের কাজ চলছে, কয়েক মাসের মধ্যে এই ‘ট্রানজিট চুক্তি’ চূড়ান্ত হবে।

ওদিকে, চীন সংলগ্ন নেপাল, অর্থাৎ নেপালের সারা উত্তরের সীমান্ত হল ওপাশে চীনের তিব্বত; এর উঁচু ও শক্ত প্লাটো, পুরাটাই পাহাড়ি উপত্যকা অঞ্চল। রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে সরাসরি পণ্যবাহী লং কনটেইনার ট্রেনে চীনের কোনো সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত নেপাল ট্রেন ট্রানজিট পেতে এখন তিব্বত-কাঠমান্ডু এই শেষের কয়েক শত কিলোমিটার রেললাইন পাতা হচ্ছে, যা বাকি আছে। এক কথায় বললে নেপালের বাইরে বের হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর একক নির্ভরশীলতার দিন এবার চিরতরে শেষ হতে চলেছে। এবার ১৯৫০ সালের দাসত্বের নিগড় চুক্তি থেকে বের হওয়ার বাস্তব শর্ত পূরণ হতে চলেছে, তা এখন কাঠমান্ডুর নাগালে আসতে চলেছে।
নেপাল ভারতের হাত ছুটে যাচ্ছে, আর এটাই মূলত ব্রক্ষ্ম চেলানির মতো অধ্যাপককে অস্থির ও চঞ্চল করে তুলেছে। তিনি দিকবিদিক ভুলে বলে বসেছেন নেপালের রাজতন্ত্র অর্থাৎ আগেকার ‘হিন্দু রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ হিসেবে নেপালের থেকে যাওয়া সেটা হলে সেটাই নাকি ভালো ছিল। সোজা বললে, হিন্দু-রাজতন্ত্র উতখাত করে, নেপালের নতুন করে প্রজাতান্ত্রিক নাগরিক সাম্যের রাষ্ট্র, ফেডারেল নেপাল- এই রাষ্ট্র হওয়া, এটা খুবই খারাপ কাজ হয়েছে বলে চেলানি আমাদের জানাচ্ছেন। তামশাটা হল, একালের নীতি-পলিসি নিয়ে স্টাডি ও গবেষণা করা একজন থিঙ্কট্যাঙ্ক একাডেমিক এমন কথা বলছে! কেন? কারণ সেটাই নাকি “ভারতীয় জাতিবাদী” স্বার্থ।

তিনি যদি ‘একাদেমিক’ হিসাবে একালে নিজের পরিচয় বজায় রাখতে চান তবে তাকে কোন স্বঘোষিত রাজা নয়, গণমানুষের ক্ষমতার রাষ্ট্রের পক্ষে দাড়াতে হবে। ‘মানুষ কেবল নিজেই নিজের শাসক হতে পারে’ কোন স্বৈরাচার বা কোন রাজতন্ত্র নয় – চিন্তার এমন মৌলিক মুল্যবোধ ও নীতি অনুসরণ করে – একটা আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষেই তাকে দাড়াতে হবে। অথচ তিনি এখানেই তাঁর একাদেমিক দায় ভুলে একে ছাপিয়ে উতখাত হয়ে যাওয়া রাজতন্ত্রের ভিতর ভারতের জাতিবাদী স্বার্থ খুজতেছেন!

শুধু তাই নয়, তিনি এখনকার নেপালের প্রধান দোষ হিসেবে মনে করেন, এই রাজতন্ত্র উতখাতের আন্দোলনের এবং এখনকার ক্ষমতাসীন নেতারা হলেন কমিউনিস্ট। নেপালের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কে পি অলি, তার দলসহ প্রধান দুই বড় দল যারা দুটোই হচ্ছে কমিউনিস্ট। প্রধানমন্ত্রী অলি ছাড়া তার অপর দলটা আবার মাওবাদী কমিউনিস্ট, পুষ্পকমল দাহালের মাওবাদী সেন্টার দল। এছাড়া এই দুই দল আবার এক দল হতে, এক ঐক্য প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আর সবার উপরে ভারতের চক্ষুশূল আর এক ঘটনা আছে। তা হল, এই কমিউনিস্ট দুই দল ও অন্যান্য আঞ্চলিক মাধেসি দলসহ মিলিয়ে তাদের এক জোট – এখন ক্ষমতাসীন সরকার, যারা এখনই নেপালের সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ আসন তাদের দখলে আছে। আর ওদিকে মোট সাত প্রদেশে বিভক্ত নেপালের ছয়টাতেই প্রাদেশিক সরকারও তাদের এই জোটের। ফলে স্বভাবতই নেপালের এই কমিউনিস্টরা চেলানির খুবই খুবই অপছন্দের। তিনি অভিযোগ তুলে বলছেন, নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কমিউনিস্টদের হাতে পড়ে টিকবে কি না, এটা অনিশ্চিত। তিনি বিরাট নেপাল-দরদি হয়ে বলছেন, চারিদিকে এত কমিউনিস্ট এটাই নাকি “কালো অশুভ ছায়া” ফেলেছে।  “casts an ominous shadow over Nepal’s sputtering democratic transition.”।

তাঁর আরো আপত্তি হল গুরুত্বপুর্ণ সরকারি পোস্টের অনেকেই কমিউনিস্ট।  [From constitutional functionaries, such as the president and vice president, to key officials, including the chief of police services, are today card-carrying communists.]। আসলে তাঁর এই বক্তব্যগুলোওই খুবই ‘কালো’ এবং ভারতের “অশুভ ছায়াময়”।

অপছন্দ আর বিদ্বেষ দুটা পরিস্কার আলাদা জিনিষ। আপনি একটা চিন্তা – কমিউনিস্ট অথবা  ইসলামি – চিন্তাকে অবশ্যই অপছন্দ করতে পারেন। ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করতে পারেন না। এই পরেরটার পুরাপুরি দায় একান্তই আপনার। এমনকি ‘ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ’ করা, এটা অপরাধের সীমায় নিয়ে ফেলে আপনাকে।

তিনি মনে করছেন, “এটা স্পষ্ট, ভারতের নিরাপত্তার জন্য নেপাল হুমকি হয়ে উঠেছে”।  কেন এমন মনে হচ্ছে তাঁর? কারণ “কমিউনিস্টদের হাতে গণতন্ত্র টিকে কি না” তিনি  এটা অনিশ্চিত। বাহারে গণতন্ত্রী! [Whether democracy will survive under communist rule is uncertain. What is clear is that Nepal is impinging on Indian security.] আর এটাই নাকি ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি!

তার মানে রাজতন্ত্রী-নেপাল রাষ্ট্র যখন ছিল তখন ভারতীয় চেলানি ভারতের জন্য এটাকে নিরাপত্তার হুমকি মনে করেন নাই। এখন কমিউনিস্টরা নতুন রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করেছে এবং ক্ষমতায় আছে বলে তিনি হুমকি দেখছেন। বাহ রে বা! চেলানির কথার ধরনের ব্যাপারটা অনেকটা নেকড়ে-ভেড়ার গল্পের মতো যে, ভাটিতে থেকে তুই না হলে তোর দাদা উজানে আমার পানি ঘোলা করেছিস। অতএব আমি এখন তোর ঘাড় মটকাব…।

চেলানিকে আসলে এখানে চ্যালেঞ্জ জানানো যায়। রাষ্ট্র গঠন বৈশিষ্ট ও নীতি হিসাবে একটা রাষ্ট্রকে কিভাবে বিচার করব – এর মাপকাঠি কী? এই আলোকে চেলানির চিন্তায় ঘাটতি আছে তা বলা যায়। হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রাষ্ট্র রিপাবলিক বৈশিষ্ট এনেছে, নিজেকে সাজিয়েছে। অন্যদিকে বিপরীতে, ভারত-রাষ্ট্র যে জন্ম-খুত নিয়ে সাতচল্লিশে জন্ম নিয়েছে আর এখনো প্রধান কারণ হিসাবে যা তাকে দগ্ধাচ্ছে তা হল, এর ফেডারল বৈশিষ্ট নাই বা অসম্পুর্ণ। বরং নেহেরু  এন্ড গংয়েরা সেকালে জোর দিয়েছিল, ভারতকে এক রাখবে কী করে সেটাকে সমস্যা হিসাবে দেখে। কতগুলো ফেডারল প্রদেশের ভারত রাষ্ট্র নয় বরং কী করে জবরদস্তি জোর খাটিয়ে ভারতের প্রদেশগুলোকে এক করে রাখা যায়; এই “জবরদস্তির ভারত” এটাই তাদের চোখে একমাত্র সমাধান মনে হয়েছিল। এখনও ভারতের কোন একাদেমিক ভারতের জন্য এক ফেডারল রাষ্ট্র ধারণা কেন গুরুত্বপুর্ণ তা নিয়ে একাদেমিক আলোচনা করেছেন তা দেখা যায় নাই। আবার রাজনীতিকেরা, নেহেরুর জমানা থেকেই ভারতের রাজনীতিকরা ফেডারল অর্থে রাষ্ট্র ধারণা বুঝেছেন (যেমন  আমেরিকার ফেডারল বৈশিষ্ট) এমনটা জানা যায় না। রাষ্ট্র কী করে এক জায়গায় সবাইকে ধরে রাখে, কোন জবরদস্তি ছাড়াই  রাখা যায় ও সম্ভব – এই প্রশ্নে তারা সবসময় একটা ‘আঠা’ বা গ্লু (glue) খুজে ফিরেছেন। আর সেই গ্লু হিসাবে পেয়েছে হিন্দুত্ব। চিন্তার এই মারাত্মক গলদ ও ঘাটতির কারণে ‘হিন্দুত্ব’  – একেই উপযুক্ত গ্লু মনে করে ভারতের সকল রাজনীতিবিদ। হিন্দুত্ব ছাড়া ভারত অচল, “এক ভারত” হয়ে ভারতকে ধরে রাখার বেকুবি মহামন্ত্র। এটা বিজেপি বলে প্রকাশ্যে আর অন্যেরা মন বাসনায় ও কাজে বলে থাকে; এই প্রশ্নে কংগ্রেস বিজেপি-কমিউনিস্টসহ সকলে এখানে এক।  নিশ্চিত করে বলা যায়, নেপালের ফেডারল বৈশিষ্ট ও হিন্দুগিরি ছেড়ে নেপাল রিপাবলিক বৈশিষ্ট – অন্তত এই দুই প্রশ্ন বর্তমান নেপাল ভারত-রাষ্ট্রের চেয়ে শতগুণে উন্নত, চিন্তায় পোক্ত। রাজতান্ত্রিক নেপাল-ই যার কাছে আপন সেই চেলানি আসলে কোন রাষ্ট্র-বৈশিষ্ট বিচার করার অযোগ্য – “রাজতান্ত্রিক নেপাল” কামনা করে এই প্রমাণ উনি নিজেই আমাদের জানিয়েছেন। আমাদের কিছু বলার নাই!

সামনে আরো যাওয়ার আগেই বলে নেয়া যায়, চেলানির লেখার মধ্যেই বিরাট বিরাট স্ববিরোধীতায় ভরা। যেমন, একদিকে তিনি বলছেন, নেপালের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্টরা ভারতের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আবার লেখার মধ্যে তিনি নিজেই লিখছেন, ভারতের জন্য যে চ্যালেঞ্জ নেপাল তৈরি করেছে সেটা আসলে ভারতেরই নিজ-সৃষ্ট। [Simply put, Nepal represents a critical challenge for India. But, to a significant extent, this is a self-created problem. ]। তাহলে কী দাঁড়াল? ঘটনা যদি ভারতেরই সেলফ ক্রিয়েটেড বা নিজ সৃষ্ট হয়ে থাকে, চেলানি তাই মনে করে থাকেন; আর ঘটনার বড় প্রভাবক যদি ভারত নিজেই হয়ে থাকে তবে আবার সেটার জন্য নেপালকে দায়ী করার সুযোগ কই? ব্রহ্ম চেলানির এই বক্তব্যই তো স্ববিরোধী। এ ছাড়া তিনি ওই রচনার শিরোনাম দিয়েছেন এভাবে; লিখছেন, “ভারতের ভুলের কারণে তা চীনকে নেপালে জায়গা করে নিতে সুযোগ করে দিয়েছে”।

অর্থাৎ নিজেই যেচে ভারতের দায় স্বীকার করে নিচ্ছেন। ভারতের শাসকদের দায়ী করছেন। এরপর তিনি নিজেই পরের বাক্যে এবার এক তালিকা দিয়ে বলছেন, ভারতের তিনটা ভুল কী কী? বলছেন, ‘ভারতের তিনটা ব্লান্ডারের প্রথমটা হল, নেপালি রাজতন্ত্র অবসানের ক্ষেত্রে ভারতের মূল চালিকাশক্তি হয়ে যাওয়া। দ্বিতীয়টা হল, দাহালের দল মাওবাদীরা ছিল আন্ডারগ্রাউন্ড গোপন সশস্ত্র দল। ভারত তাদের নেপালের রাজনীতিতে মধ্যমণি হতে দিয়েছে। আর তৃতীয়টা হল, নেপালের সমতলে বাস করা মাধেসি জনগোষ্ঠীকে ভারত উস্কানি দিয়ে রাস্তায় নামিয়ে হাত ছেড়ে দিয়েছে।

[Three Indian blunders since the mid-2000s have proved very costly for India — spearheading the abolition of Nepal’s constitutional monarchy; bringing the underground Maoists to the centre-stage of Nepali politics; and, more recently, aiding the plains people’s revolt against the new, 2015-drafted Nepali Constitution and then abandoning their movement and pressuring them (Madhesis) to participate in the 2017 elections, thus legitimising a Constitution it said was flawed.]

তৃতীয় ব্লান্ডারের বিস্তারিত দিকটা হল, গত ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন বা ঘোষণা করে দেয়ার পরে ভারত প্রকাশ্যে এর বিরুদ্ধে অবস্থানের কথা জানায়। তারা মাধেসিদেরকে বিদ্রোহী হয়ে ‘মানি না বলে’ উঠতে উসকানি দিয়েছিল। এটা চেলানিও স্বীকার করেই কথা বলছেন। নেপালে রান্নার জ্বালানিসহ সব ধরনের ভোগ্যপণ্য সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর তারা শতভাগ নির্ভরশীল। আর এই উস্কানির অর্থ ছিল,  সেই ভারত থেকে নেপালে সব পণ্য আমদানি পুরোপুরি বন্ধ করেছিল ভারত, অজুহাত দিয়েছিল যে এটা মাধেসিদের বাধা। যা বাস্তবে ছিল নেপালে ভারতেরই পণ্য-অবরোধ। কিন্তু এতে নেপালের গরিব-ধনী নির্বিশেষে সকলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে সব জনগোষ্ঠী চরমভাবে ভারতবিরোধী হয়ে যায়। সমতলের বাসিন্দা মাধেসিদেরকেও তারা ভারতের হাতের পুতুল হয়ে পড়ার জন্য দায়ী করে। প্রায় পাঁচ মাস পর এই পণ্য অবরোধ চরমে ওঠে। আর ফলাফল পরিস্থিতি চরমভাবে উলটো ভারতবিরোধী দিকে চলে যাওয়াতে, ভারত এবার সব দায় মাধেসিদের ওপর চাপিয়ে তাদের পরিত্যাগ করে। ফলে পরবর্তিতে, ২০১৭ সালের নির্বাচনে মাধেসিরা ভারতের সংশ্লিষ্টতা পুরো ত্যাগ করে মূল ধারার রাজনীতির মধ্যে ফিরে যায়। তারা, মূল ধারার রাজনীতিকদের সাথে একসাথে মিলে বিরোধ মিটিয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়। শুধু তাই নয়, মাধেসিদের মূল বিরোধ বিতর্ক ছিল, মাধেসিদের প্রদেশ একটি নয় দুটি নিয়ে হতে হবে, আর এর সীমানাইবা কী হবে আর প্রদেশের ক্ষমতা কী হবে এসব ছিল বিতর্কের ইস্যু। এ প্রসঙ্গে সমস্ত বিরোধ তারা আপস মীমাংসায় মিটিয়ে ফেলে। এব্যাপারে সব ভুলে সবচেয়ে বড় হাত বাড়ানো ভূমিকা পালন করে কমিউনিস্ট দাহাল। ফলে আপসে বিরোধগুলোর মীমাংসা এরপর কনস্টিটিউশনে সংশোধনী লিখে পাস করে নেয় সবাই। আর সবশেষে এখন মাধেসিরা ক্ষমতাসীন সরকারের জোটের অংশ হয়ে আছে। মাধেসিদের উসকানি দিয়ে অবরোধের রাস্তায় নামিয়ে পরে তাদের হাত ছেড়ে পরিত্যাগ করা- ব্রহ্ম চেলানি নিজে এটাকেই ভারতের তৃতীয় ভুল বলছেন!

তাহলে ঘটনা হল, ভারতের সব অপরাধই চেলানি নিজেই তালিকা দিয়ে স্বীকার করে নিচ্ছেন। অথচ নেপালের কমিউনিস্টদের দায় দিচ্ছেন, অনাস্থা রাখছেন। আসলে এখানে ঘটনাটা হল, শকুনের বদদোয়ায় গ্রামের গরুগুলো কখনোই মারা যায় না। আর শকুন অভুক্ত শকুন হয়ে থাকলে তাই হয়ে থেকে যায়।

ভারতের পাপ বা অপরাধ এতই বিশাল ও দৃশ্যমান যে চেলানি তা লুকানোর চেষ্টা না করে বলছেন, ‘ভারতের উচিত অতীতে নেপালের জনগণের জন্য কষ্টদায়ক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য নেপালের জনগণের কাছে ভারতের উচিত হবে ক্ষমা চাওয়া। পরিস্থিতিটা ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে, আর এরই সুযোগ নিয়েছে চীন।’

[New Delhi indeed owes an apology to Nepal’s citizens for its past meddling, which, as if to underscore the law of unintended consequences, boomeranged on India’s own interests. India’s mistakes set in motion developments that seriously eroded its clout in Nepal and helped China to make major inroads.]

এই পুরো বিপর্যয় ঘটানোর জন্য তৎকালীন কংগ্রেসের মনমোহন সরকারকে চেলানি দায়ী করেন। কিন্তু এবার কথার ফাঁক সৃষ্টি করতে শুরু করেন তিনি। বলেন, “২৩৯ বছরের নেপালি রাজতন্ত্র ছিল নেপালের স্থিতিশীলতার প্রতীক। ভারত সরকার নেপালের রাজতন্ত্রকে উৎখাত করেছে আর মাওবাদীদের ক্ষমতার কেন্দ্রে এনেছে”। আসলে কী বলা যায় চেলানির রাজতন্ত্র প্রীতি দেখে – নেপালের প্রাক্তন রাজারাও লজ্জা পাবে। আসলে ব্যাপারটা হলো, রাজতন্ত্রের আমলে নেপালে ভারতের স্বার্থ যেভাবে রক্ষিত হচ্ছিল এখন আর তা রক্ষিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু সে জন্য ভারতের কোনো একাডেমিক কি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে পারেন? অথবা এর দরকারই বা কী? অথচ চেলানি সেটাই করছেন!

ভারতের নিজের স্বার্থ দেখবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা কী করে? সেটা একটা বিষয় অবশ্যই। কিন্তু সে জন্য কোনো একাদেমিক রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই গাইতে যাবেন কেন? অর্থাৎ চিন্তার সততা নয়, চরম উগ্র জাতিবাদী এক ভারতীয়ই থাকতে চাইলেন ব্রহ্ম চেলানি বেছে নিলেন!

একালে যেটা চেলানির মতো একাডেমিকদের প্রো-আমেরিকান ভারতীয় ধারা, এই ধারার জন্ম ও শুরু করে দিয়ে গেছিলেন সাতচল্লিশের প্রধানমন্ত্রী নেহরু। তার দৃষ্টিভঙ্গিই ছিল এটা। যেমন, সাধারণভাবে নেহরু কলোনি শাসনকে খারাপ মনে করতেন না। ভারতের ওপর ব্রিটিশ কলোনির যে শাসনটা চড়ে ছিল সেটা মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে খারাপ ছিল না। এই ছিল তার অভিমত। তবে তা ভারতের ওপর চড়ে ছিল বলে একে খারাপ ভাবতেন তিনি। অর্থাৎ ব্রিটিশের ভারত ত্যাগে, ভারতের কলোনি মুক্তির পরে এবার ভারতই যদি নেপালকে কলোনি করার সুযোগ পায় তবে সেই সুযোগ নেয়ার চেষ্টাই ভারতের করা উচিত – এই ছিল নেহরুর কলোনি শাসন কী জিনিস সে সম্পর্কে বুঝ ও মনোভাব। তা বুঝার জন্য সবচেয়ে বড় তাতপর্যপুর্ণ হল ১৯৫০ সালের নেপাল চুক্তি। আর তাই নেপালের সাথে ভারতের তথাকথিত ঐ বন্ধুত্ব চুক্তি করে নেপালকে দাসত্বে বেঁধে ফেলা জায়েজ মনে করেই নেহরু ওই চুক্তি করেছিলেন। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে দুনিয়ায় নতুন যে পরিবর্তন এসেছিল : ১. দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন উঠে যাওয়া এবং তা অন্যায্য মনে করার প্রতিশ্রুতি দুনিয়া পেয়ে যায়। ২. দুনিয়া কলোনি ইউরোপের শাসকদের নেতৃত্বের কবজা থেকে মুক্ত হয়ে এবার আমেরিকান নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নিয়মে সাজানো হয়ে যায়।

এসব মৌলিক পরিবর্তনের তাৎপর্য ও গাঁথা নেহরুর চোখ-কান-মগজে ঢুকে ছিল এমন প্রমাণ দেখা যায় না, বরং তার কাজ দেখে বলা যায়, কোনো প্রভাবই পড়েনি। নেপালের সাথে নেহরুর করা ১৯৫০ সালের কলোনি চুক্তি এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ। নেহরু ধরে নিয়েছিলেন কলোনি শাসন ব্যাপারটা চিরন্তন। ওটাই দুনিয়ার নিয়ম। দুনিয়া ভাগ্য চিরকাল কলোনি শাসন দিয়েই লেখা হবে। তাই কথিত ‘সমাজতন্ত্রী নেহরু’ অবলীলায় পুরানা বৃটিশ-নেপাল চুক্তিতে (১৯২৩) ব্রিটিশের জায়গায় নেহরুর ভারতকে আসীন করে নেন। আর এভাবে নেপালে নেহরু-ভারতের কলোনি শাসন কায়েম করে নেন।
আর আজকের ব্রহ্ম চেলানি ওই নেহরু-ভারতের কলোনি শাসনই ফেরত দেখতে চাচ্ছেন। কারণ কলোনি হয়ে থাকা নেপালি অংশের অপর নাম হল নেপালি রাজতন্ত্র। চেলানি নেপালি রাজতন্ত্র এর পক্ষে সাফাই দিয়ে একালে বলছেন সেটাই নাকি ভারতের জন্য ভালো ছিল। নেপালে ভারতের স্বার্থ একমাত্র রাজতন্ত্রী নেপাল হলেই আদায় হবে – এই চিন্তাটাই একটা অযোগ্য, দেউলিয়া চিন্তা।

না ভুল বোঝা যাবে না। এখানে, ভারতের কোনো স্বার্থ থাকতে পারবে না বা ভারতকে স্বার্থ-ভোলা অবস্থান নিতে হবে- এমন কোনো সুপারিশ করা হচ্ছে না। খেয়াল করলে দেখা যাবে, ঠিক যেমন বিশ্বযুদ্ধের কালে সারা দুনিয়াকে ইউরোপের কলোনি শাসনের অধীনে রাখার বিরুদ্ধে ১৯৪০-এর দশকের আগে থেকেই আমেরিকা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট  বাধ্য করেছিলেন কলোনি শাসন ত্যাগ করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে। এবং তিনি তা আদায় করেছিলেন। কিন্তু তার মানে কী আমেরিকা নিঃস্বার্থ বা আত্মভোলা ছিল? মোটেও না। কলোনি শাসনের বদলে আমেরিকা নতুন গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিল এবং তা করেছিল। যেটা কলোনি শাসনের চেয়ে তুলনায় ঢের গুণে অগ্রসর সেই ব্যবস্থা – নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে এর মাধ্যমে দুনিয়ার নেতা হয়ে আমেরিকা নিজের স্বার্থ হাসিল করেছিল। আমেরিকার কায়েম করা সেই  ব্যবস্হাটারই শেষ দিনগুলোতে আমরা এখন আছি।তুলনায় এটা অবশ্যই বৃটিশ কলোনি শাসনের চেয়ে অনেক ভাল এবং তুলনায় মুক্ত।

আবার এই বিচারে বলা যায়, আগামীতে আমেরিকার বদলে দুনিয়া চীনের অর্থনৈতিক নেতৃত্বে চলে গেলে সেটাও এখনকার আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়ার চেয়ে তুলনামূলকভাবে অগ্রসর দুনিয়াই হবে।

বিশ্বযুদ্ধের শেষে সেকালের দুনিয়ার গতি-প্রকৃতি যেমন নেহরুর চোখে ধরা পড়েনি, পুরনো কলোনি শাসনই তিনি অনুকরণীয় ভেবেছিলেন, আজো তেমনি ব্রহ্ম চেলানির চোখেও আমেরিকার নেতৃত্বটাই ভালো বোধ হচ্ছে অথচ সেটা তো এখন বিগতযৌবনা। অপসৃয়মান সেটা, ফলে চাইলেও এর সমাপ্তি চেলানি ঠেকাতে পারবেন না, ঠেকানো যাবে না।

ব্রহ্ম চেলানির চোখে ধরাই পড়ছে না যে চীন যেখানে নেপালকে শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে ট্রানজিট দিতে রাজি হয়ে যাচ্ছে সেই মুরোদ গত সত্তর বছরে ভারতের হলো না কেন, ভারত চিন্তাও করতে পারেনি কেন?

কিন্তু সাবধান, এটা নেপালের জন্য চীন এক বড়ই মহান – এমন ঢোল পিটানির কথা মোটেও বলা হচ্ছে না। ব্যাপারটা হল, শর্তহীনভাবে চীনের ওপর দিয়ে নেপালকে ট্রানজিট দিলে তাতে চীনেরই লাভ বেশি। এই হলো নতুন বাস্তবতা। আর অবাধ ট্রানজিট দিলে তাতে নেপালে চীনের বিনিয়োগ ও বাণিজ্য স্বার্থ আরো ভালোভাবে রক্ষিত হয়। ঠিক যেমন দুনিয়ার বিশ্বযুদ্ধের সেকালে কোনো রাষ্ট্রকে সরাসরি কলোনি বানিয়ে না রাখাতেই ছিল আমেরিকার স্বার্থ। বরং তারা কলোনি শাসন মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র কিন্তু আমেরিকান পণ্য বিনিয়োগ খাতক হলেই তাতেই সেকালে আমেরিকার স্বার্থ সবচেয়ে ভালোভাবে রক্ষিত হয়েছিল। তাই আমেরিকাই দুনিয়ার নতুন নেতা ছিল।

আর কমিউনিস্টদের সম্পর্কে একটা কথা।  চেলানি হয় জানেন না অথবা স্বীকার করতে চান না যে সেকালে ভারত মাওবাদীদের পক্ষে এবং নেপালি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়েছিল, মূলত আমেরিকার পরামর্শে, ক্রিস্টিনা রাকার নেপাল সফর থেকে যার শুরু। [এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত আমার লেখা “নতুন নেপাল” বইতে আলোচনা করেছি, সেখানে দেখা যেতে পারে। ] এছাড়া, গত ২০০৫ সালে বুশ প্রশাসনের ‘চীন ঠেকাও’ পলিসির মধ্যে ভারত গোনার ধরার মধ্যে নিজের জায়গা পেয়ে ভারত ভেবেছিল এটাই তার সর্বোচ্চ পাওয়া। সে বুঝতেই পারেনি যে, আমেরিকা একটা ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। যার হাত সে ধরতে যাচ্ছে। আমেরিকা ভারতের কাঁধে চড়ে চীনের আগমন ও উত্থান ঠেকিতে রাখতে এসেছে। সে নিজে জানে এই উত্থান নিশ্চিতভাবে ঠেকানো যাবে না। তাই যতদূর পারা যায় নিজের পতন দীর্ঘায়িত করতে চাচ্ছে সে কেবল।

তাই প্রো-আমেরিকান একাডেমিক মানে ডুবন্ত শক্তির পক্ষে দাঁড়িয়ে যে কেবল সঙ্কীর্ণভাবেই নিজের স্বার্থ খুঁজতে অভ্যস্ত। আর সেটা যেনবা হিন্দুত্বেরই আর এক নাম।

তাই ব্রহ্ম চেলানি ভারতের শাসকদের দোষারোপ করেন আর নাই করেন;  নেপালি রাজতন্ত্রের পক্ষে সাফাই দেন বা না দেন – এখনকার বটম লাইনটা হল, নেপাল ভারতের হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। এখন এই নতুন নেপাল, এটা আগের চেয়ে তুলনামূলক মুক্ত এক নেপাল। এ’আর ফিরবে না। বাংলাদেশও এমন প্রথম সুযোগে বের হয়ে যাবেই। আমরা কেউ পিছনে ফিরে যাই না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে রাজতন্ত্র ভেঙে দেয়া ভারতের ভুল ছিল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

‘হামবড়া’ ভারত  হারু-নেপালনীতির পথেই আবার

‘হামবড়া’ ভারত  হারু-নেপালনীতির পথেই আবার

গৌতম দাস
১২ এপ্রিল ২০১৮,  বৃহস্পতিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2rh

 

ভারতকে নেপালে পানিবিদ্যুতের ড্যাম নির্মাণ প্রকল্পের কাজ না দিয়ে তা চীনকে দিলে ভারত ওই উৎপাদিত বিদ্যুৎ নিজেও কিনবে না আর নেপালের বাইরে কাউকে বিক্রি করতেও দেবে না। এ নিয়ে দু’দেশের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যে নেপালের প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি গত সপ্তাহে (৬-৮ এপ্রিল) দু’দিনের ভারত সফর করে গেলেন।

গত ডিসেম্বর ২০১৭ সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ের পরে গত মাসের ১১ মার্চ নেপালের প্রথম নির্বাচিত সংসদে ৮৮ শতাংশ আস্থা ভোট পাওয়া প্রধানমন্ত্রী হলেন খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলি। তার দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট-লেনিনিস্ট (UML) এবং অপর কমিউনিস্ট মাওবাদী দলের সাথে মিলে জোট করে নির্বাচনে লড়েছিল তাঁরা এবং প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতেছিল। আর নির্বাচন সম্পন্ন হবাব পর ফলাফলে দেখা যায় বড় দুই মাধেসি আঞ্চলিক দলই কেবল মূলত মাধেসি অঞ্চলের আসনগুলো লাভ করে। ফলে  এদেরকেও  ঐ কমিউনিষ্ট জোটে সাথে নেওয়াতে সংসদের মোট ৮৮ শতাংশ আসনের সমর্থনে প্রধানমন্ত্রী কে পি অলির দল সরকার গঠন করেছিল গত মাসে। আর চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে এক যৌথ সম্মেলনের ঘোষণা দিয়েছে দুই কমিউনিস্ট পার্টি, তারা এবার এক পার্টি হওয়ার পথে আগাচ্ছে।

ভারতের বাধা উপেক্ষা করে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন প্রোক্লেমশনের মাধ্যমে নেপালে নতুন সংবিধানের কার্যকারিতা শুরু হয়েছিল। পরে ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে নেপালে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৫ সাল থেকেই নেপালে ভারতের প্রভাব খর্ব হওয়ার মতো একের পর এক আনুষ্ঠানিক পরাজয় শুরু হয়েছে। যার সর্বশেষ বড় পরাজয় ছিল সাধারণ নির্বাচনে দুই কমিউনিস্ট জোটের নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ, দুই পার্টি আবার এই এপ্রিল মাসেই এক পার্টি হতে যাচ্ছে। আর এই জোটবদ্ধতা বেড়ে ৮৮ শতাংশ আসনের সমর্থনের সরকারে পরিণত হওয়া। নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই পরিবর্তন আসলে ভারতের বিদেশনীতির পরোক্ষ অবদান। ভোটের হিসাবেও বলা যায়, ৮৮ শতাংশ আসন বা ভোটার সমর্থকেরা এখন ভারতবিরোধী। ভারতের বিদেশনীতি বা নেপালনীতির এমনই নেতিগুণ।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর ২০১৭-এর সাধারণ নির্বাচন পর্যন্ত এই সময়কালের মধ্যে সারা নেপালে ভারতবিরোধিতা সবচেয়ে চরমে উঠেছিল। আর এই সময়কালে ভারতের সর্বশেষ আর একমাত্র আশ্রয় হয়েছিল মাধেসি আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো। অথচ গত মাসে ওলির সরকার গঠনের সময় থেকে মাধেসি অঞ্চলের প্রায় সব আসন পাওয়া আঞ্চলিক দুই দলও অলির জোটকে সমর্থন করে কোয়ালিশনে যোগ দিয়েছে। ফলে ভারতের সমর্থক নেপালের রাজনৈতিক দল বলতে এখন রয়ে গেছে নেপালি কংগ্রেস। ভারতের সংবাদপত্র ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সাংবাদিক ও বিশ্লেষক জ্যোতি মালহোত্রা কেবল এই এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে এ বিষয়ে লেখা তার নিয়মিত রিপোর্টে ভারত সরকার তার ভুল স্বীকার ও সংশোধন করছে বলে জানিয়েছেন। এপ্রিলের চার তারিখে “Winning the neighbourhood শিরোনামে তিনি লিখেছেন,

As India stoops to conquer Nepal by laying out the red carpet for the visit of prime minister Khadga Prasad Oli later this week, it is indicating a new self-awareness that its foreign policy missteps have allowed China to gain ground in the neighbourhood, and demonstrating its willingness to sweat behind the scenes to make up for lost time.

জ্যোতি মালহোত্রার ভাষায় ভারত ‘stoops to conquer Nepal’ মানে নেপালের মন জয়ের জন্য নিজেকে বাকা বা নমনীয় করেছে। এটা নাকি ভারতের “foreign policy missteps” বিদেশনীতির ভুল পদক্ষেপ সম্পর্কে আত্মসচেতন বা নিজে নিজের ভুল সংশোধনের নজির।

ভারত এক ভিন্ন রাষ্ট্র হয়েও নেপাল রাষ্ট্রের জনপ্রতিনিধিদের প্রণীত কনষ্টিটিউশনে তার অনধিকারে অযাচিত আপত্তি জানিয়েছিল। আর কারণ হিসাবে বলেছিল, নেপালের সমতলি তরাই ও মাধেসি অঞ্চলের মানুষের স্বার্থ এতে ক্ষুন্ন হয়েছে। এরই আপত্তি করছে ভারত। অর্থাত ভারতই যেন নেপালের ঐ অঞ্চলের অযাচিত ও স্বঘোষিত জনপ্রতিনিধি।

নেপালে কমিউনিস্ট জোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচনে জয়ী হবার পরে ভারত সরকার তার বিগত দুবছরের নেপাল নীতি পদক্ষেপের ভুল স্বীকার করে নতুন পথে হাটতে গত ১ ফেব্রুয়ারি নেপাল সফরে আসেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।  তাই জ্যোতি মালহোত্রা লিখছেন, in Kathmandu, she told Oli that Delhi is ready to deal with Nepal as an important neighbour, irrespective of how it wants to discriminate against the people of the Terai. মানে সুষমা বলেছেন তারা আর তরাই অঞ্চল নিয়ে মাথা গলাবে না তাতে নেপাল তরাই অঞ্চলের সাথে বৈষম্যমূলক রাখুক কিংবা না।

আসলে ভারতের এমন উপলব্দি স্বীকার খাওয়াটাই বাহুল্য। কারণ সমতলি তরাই ও মাধেসি অঞ্চলের যতগুলো নির্বাচিত প্রতিনিধি আছে তারা দুই কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যই হোক কিংবা আঞ্চলিক বড় দুই মাধেসি দলের – এরা সকলেই এখন ওলির সরকারের সমর্থনে দাঁড়িয়ে আছে। অলির সরকারের পার্টনার। এটা যেন দুধ আর আম এক হয়ে যাওয়া আর (ভারতের) আমের আঠি হয়ে দূরে হেলায় গড়াগড়ি যাওয়া!  ফলে সুষমা স্বরাজ একথা না বলে আর কী করবেন!

নেপালের বিগত সরকারের পাঁচ বছর কেটেছিল নানান কোয়ালিশন সরকারে। সে সময়ের নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত আসন এমন ছিল যে, প্রতি দু’টি মিলে কোয়ালিশন করলেই সংখ্যার দিক থেকে তা সরকার গঠন করার জন্য যথেষ্ট হত, আর এভাবেই কমপক্ষে চারবার কোয়ালিশন সরকার  (ভেঙ্গে ও গড়ে) গড়ে নেপালের রাজনীতি কেটেছিল। এরই সর্বশেষ ঘটনা ছিল, প্রত্যেকে ১১ মাস করে গঠিত দুই সরকার যার প্রথমটা ছিল মাওবাদী পুষ্পকমল দাহালের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার আর শেষেরটা নেপালি কংগ্রেসের দুবের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার।

নেপালের রাজনীতিতে দুই কমিউনিস্ট দলের প্রধান দাহাল ও অলির মধ্যে তুলনা করলে দাহালের ভূমিকা হল, দেশের দলগুলোর যেকোনো বিভক্ত মতামত (দলের ভেতরে বা বাইরে) ও উদ্যোগ নাই পরিস্থিতিতে তিনিই হাজির হন কাণ্ডারি হিসেবে। তিনি নিজে উদ্যোগী হয়ে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা মতামত বা কমন অবস্থানে সবাইকে (সব বিবদমান দল বা পক্ষকে) নিয়ে এসে এবার সঙ্কট কাটিয়ে করে এগিয়ে যাওয়ার পথ রচনা করেন। এভাবে প্রতিবার নানান রাজনৈতিক বাধা কাটিয়ে নেপালকে এগিয়ে নেয়ার পক্ষে কাজ করে যাওয়া নেপালের রাজনীতিতে অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব হলেন দাহাল। বিপরীতে খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলি, তিনি ভিন্ন নরম কমিউনিস্ট পার্টির। গত ২০১৩ সালের দ্বিতীয় কনস্টিটিউয়েন্ট অ্যাসেম্বলির নির্বাচনের সময় থেকে তিনি মূলত ক্রমেই ভারতবিরোধী অবস্থান নেয়া শুরু করেন। যদিও তার দল ও দলের রাজনীতি কখনই কোনো রেডিক্যাল কমিউনিস্ট অবস্থানের দল নয়; বরং গত নব্বইয়ের দশকে নেপাল-ভারতের যৌথ নদী, মহাকালি নদীর পানিবণ্টনের ঝগড়া মীমাংসার ক্ষেত্রে মন্ত্রী হিসাবে অলি নিজ দলের অবস্থানের বাইরে গিয়ে ভারতপন্থী অবস্থান নিয়েছিলেন সে ইতিহাস আছে।

সেই অলি গত সেপ্টেম্বরে ২০১৫ সালে কনস্টিটিউশন প্রোক্লেমশনের পরে কোয়ালিশন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়ে চরম ভারতবিরোধী অবস্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বিশেষত ওই সময়টা যখন টানা প্রায় পাঁচ মাস নেপালে সব পণ্য আমদানিতে ভারত অবরোধ আরোপ করে রেখেছিল। ফলে সারা নেপাল গরিব-ধনী নির্বিশেষে ভারতবিরোধী হয়ে উঠেছিল আর সবচেয়ে কষ্টকর দুর্বিষহ জীবন হয়ে উঠেছিল গরিব ও নারীদের। কারণ রান্নার গ্যাস বা যানবাহন চলাচলের জ্বালানির সরবরাহও বন্ধ করে রেখেছিল ভারতের ওই পণ্য অবরোধ। তাই বলা চলে অবরোধের কারণে নেপালের জনগণের মধ্যে যে চরম ভারত বিরোধিতার সেন্টিমেন্ট উঠেছিল, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলি পরিপূর্ণভাবে এর সাথে ছিলেন এবং ঐ আবেগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই সময় থেকে তার ভারতবিরোধী অবস্থান তিনি এখনো স্থায়ী করে রেখেছেন। আর তার সাথে দাহালকে তুলনা করলে দেখা যায়, তিনি যেন ভারতের নেপালনীতির বিরোধিতার প্রবক্তা হওয়ার কাজ অলিকেই একছত্রভাবে দিয়ে দিয়েছেন। আর নিজে ভারতের তৈরি মাধেসি ইস্যুর জট কাটানো, অনিশ্চিত হয়ে থাকা কনস্টিটিউশন সংশোধনীর কাজ শেষ করা, প্রদেশে ভাগ করে সীমানা টানার অসমাপ্ত কাজ ঐকমত্য গড়ে সমাপ্ত করা, বিগত ২০ বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়নি, তা অনুষ্ঠিত করা এবং থিতু এক কনস্টিটিউশনে পৌঁছানো এবং সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার পথ খুলে দেয়া ইত্যাদি জটিল সব কাজ সমাপ্ত করার মূল উদ্যোক্তা ছিলেন তিনি। এ যেন অলি আর দাহালের মধ্যে একধরনের শ্রমবিভাজন, যা তাদের পরস্পরের পরিপূরক।

দাহাল যেন জানতেন ভারতের নেপালনীতির বিরোধিতার মূল প্রবক্তা তিনিও হতে পারতেন, কিন্তু তাতে ভারতের বিষিয়ে তোলা মাধেসি জনমতের সাথে একটা নিগোশিয়েশন ও ঐকমত্য তৈরিসহ একটা সমঝোতায় পৌঁছানো, আর এই উদ্যোগের নেতা হয়ে কাজ শেষ করা তার জন্য কঠিন হত।

যেকথা বলছিলাম মাওবাদী ও নেপালি কংগ্রেস – এই দুই দলের চুক্তিতে  সর্বশেষ ১১ মাসের করে কোয়ালিশন সরকার গঠনের করে ক্ষমতায় থাকার কথা। পুষ্পকমল দাহাল তার প্রথম ১১ মাসের প্রধানমন্ত্রীর আমলে নেপালের বুধি-গান্ডাকি (Budhi Gandaki) নদীতে আড়াই বিলিয়ন ডলারের ‘বুধি-গান্ডাকি ড্যাম ও পানিবিদ্যুৎ (১২০০ মেগাওয়াট) নির্মাণ প্রকল্পের’ (Budhi Gandaki project) চুক্তি করেছিলেন চীনের এক কোম্পানীর সাথে। কিন্তু ঘটনা অন্যদিকে চলে যায়। মাওবাদী ও নেপালি কংগ্রেস এই দুই দলের চুক্তি অনুযায়ী শেষের ১১ মাসের সরকার গঠন করে নেপালি কংগ্রেসের সভাপতি শের বাহাদুর দুবের সরকার (২০১৭ সালের ডিসেম্বরে সাধারণ নির্বাচন এ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল)। ক্ষমতায় এসে তিনি প্রথম ভারত-তোষণে অবস্থান নেয়া শুরু করেন। ভারতীয় প্ররোচনায় দুবে চীনের সাথে করা ওই পানিবিদ্যুত প্রকল্প চুক্তি বাতিল ঘোষণা করা দেন। আর ভারতে মিডিয়া রিপোর্ট ছড়িয়েছিল যে, (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ১৫ নভেম্বর ২০১৭) ওই প্রকল্প ভারতের সরকারি করপোরেশনকে (NHPC) দেয়া হচ্ছে। শিরোনামেই লিখেছিল , “Nepal scraps hydro project with Chinese company; Indian company to get it?”।

এটা ছিল নির্বাচনের এক মাস আগের ঘটনা। নির্বাচনের পরে অলির দলের কমিউনিস্ট জোট ফলাফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে আর অলির দলই সবচেয়ে বেশি আসন পেলে তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, এটা নিশ্চিত হয়ে যায়। এশিয়ার প্রভাবশালী দুই দৈনিকের একটা হংকংয়ের সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট পত্রিকায় গত ১৯ ফেব্রুয়ারি এক সাক্ষাৎকার দেন হবু প্রধানমন্ত্রী অলি। সেখানে তিনি ওই বিদ্যুৎ প্রকল্প আবার চালু করার কথা বলেন।  তিনি ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করেন এভাবে,  “Political prejudice or pressure from rival companies may have been instrumental in scrapping of the project. But for us, hydropower is a main focus and come what may, we will revive the Budhi Gandaki project,” । অর্থাৎ তিনি বলছেন, “ওই প্রকল্পের কাজ পেতে বিবদমান প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির সাথে  আসা রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব ও চাপের কারণে প্রকল্প বাতিল হয়েছিল। কিন্তু আমাদের কাছে বিদ্যুৎ পাওয়াই মূল বিষয়। তাই আমরা প্রকল্প আবার চালু করব”।

এছাড়া অলি ভারতের জন্য অস্বস্তিকর ও ধরা পড়ে যাবার মত ইস্যু কিন্তু নেপালের জন্য যা খুবই জেনুইন কিছু স্বার্থ নিয়ে কথা বলেছিলেন। তিনি  ‘১৯৫০ সালের নেপাল-ভারত শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি’ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তবে কথাটা এভাবে বলেন যে তিনি ঐ চুক্তির ‘আপডেট’ করা ও ‘সমকালীন উপযোগী’ করতে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনের কথাও তুলেছিলেন ওই সাক্ষাৎকারে। এ ছাড়া নেপালের গোর্খা সৈনিকেরা এক চুক্তি অনুসারে ভারতীয় সেনা ও প্যারামিলিটারি বাহিনীতে নিযুক্ত হয়ে আছে। ওই চুক্তির পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে তাদের দেশের নিজবাহিনীতে ফিরিয়ে নেয়াসহ ভারতের জন্য অস্বস্তিকর বহু ইস্যু নিয়ে খোলামেলা কথা তুলেছিলেন। যদিও নির্বাচনে কমিউনিস্টদের ব্যাপক বিজয় ও ফলাফলে অলি সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার পর থেকেই হাওয়া বদলে যায়। স্পষ্টত ভারতের নেপালনীতি হেরে যাওয়ায় নতুন সংশোধিত নীতি হিসেবে মোদি সরকার সুর নরম করে ফেলেন। তিনি দুইবার অলিকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোন করেছিলেন আর অলিকে ভারত সফরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। একই সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে গত ফেব্রুয়ারিতে পালে পাঠিয়েছিলেন। আর অলির সফর ছিল ৬-৮ এপ্রিল।

কিন্তু ভারতের মনের যত খারাপ দিক ও কলোনিয়াল বাসনা ফুটে উঠতে শুরু করে ওলির সফরের দিন ৬ তারিখ থেকে। ঐদিন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় আবার এক বেনামি সরকারি মন্তব্য ও মনোভাব ছাপা হয়। যার শিরোনাম হল, “যদি চীন তোমার ড্যাম নির্মাণ করে দেয় তাহলে ইন্ডিয়া তোমার বিদ্যুৎ কিনবে না : মোদি অলিকে বলবেন।’ [If China builds your dams, India won’t buy energy: PM Narendra Modi to tell KP Oli।]। বেনামী “সিনিয়র সরকারি অফিসিয়ালের” বরাতে এই খবর ভারত সরকার ছেড়ে দেয়।  ভারত সকারের এই বিরক্তিকর বীরত্বের রিপোর্টে একটা অসত্য বা ‘সত্য লুকানোর’ ঘটনা আছে। যদিও আপতিকভাবে অনেকেরই মনে হতে পারে যে, প্রকল্প নির্মাণ চীন করলে ওতে উতপাদিত বিদ্যুৎ ভারতকে কেনার বাধ্যবাধকতার কথা আসবে কেন, ফলে কোন কিছুরই দায় বর্তায় না। এই কথাই সঠিক।  ফলে ভারত খুবই ন্যায্য কথা বলেছে বলে মনে হয়। কিন্তু সরি, ব্যাপারটা তা না। ব্যাপারটা বুঝতে তাই, বরং প্রশ্ন করা যাক উৎপাদিত পানিবিদ্যুৎ ভারতের কেনা বা না কেনার প্রশ্ন উঠছে কেন?

ভোক্তা হিসাবে নেপালকে বিচার করলে, ১২০০ মেগাওয়াট উতপাদিত বিদ্যুৎ দেশটির ছোট অর্থনীতির বিচারে বেশি বা বাড়তি। ফলে এর কিছু অংশ বিক্রি করতেই হবে। কিন্তু স্বাধীনভাবে নেপাল এই বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবে কি?  এটাই মুখ্য প্রশ্ন। যেমন-  এই বিদ্যুৎ   বাংলাদেশের কাছে বিক্রি করলেই তো হয়, বিশেষত পানিবিদ্যুৎ বলে এটা জ্বালানি পুড়িয়ে উৎপাদিত বিদ্যুতের উতপাদন খরচ তুলনায় অনেক সস্তা পড়বে। বাংলাদেশের হিসাবে ২৫-৩৫ পয়সা ইউনিট। না, নেপাল তা বিক্রি করতে পারবে না। এখানেই ভারতের লুকানো গোপন করা সত্য আছে। নেপাল-ভারত তথাকথিত শান্তি বন্ধুত্ব চুক্তি অনুযায়ী, নেপালে উৎপাদিত কোনো পণ্য তা ভারতীয় বা নেপালি কোম্পানি যারই উতপাদিত হোক, তা নেপালের বাইরে বিক্রির কোম্পানি হতে হবে ভারতীয় মালিকের। আর উতপাদন অথবা  বিক্রির কোম্পানি নেপালি কোম্পানি হলে সেটা প্রতিটি কেসের বেলায় ভারত সরকারের কাছে আগাম অনুমতি নিতে হবে। সেই অনুমতি পাওয়া সাপেক্ষেই কেবল বিক্রি করতে পারে। আসলে এই অনুমতি পাওয়া যাবে না। মূলকথা নেপালের পণ্য তৃতীয় দেশে বিক্রি করতে গেলে কেবল ভারতীয় ব্যবসায়ীরাই তা করতে পারবেন। এই হল সেই কলোনি সম্পর্কে দাবড়ে রাখা চুক্তি। ফলে নেপালকে কেবল ভারতীয়দের কাছেই বিক্রি করতে হবে বা এজেন্ট নিয়োগ দিতে হবে। আর এ কারণেই এখানে “ভারতের কেনার” প্রসঙ্গ আসছে। এতে একেবারে মূলকথা দাঁড়াচ্ছে, ভারতের সরকার বা ব্যবসায়ীর ইচ্ছাতেই কেবল নেপালে কোনো পণ্য উৎপাদন করা যাবে। এই দাসখত কলোনি চুক্তি দিয়ে ভারত নেপালকে বেঁধে রাখতে চায়। বামন অবিকশিত নেপাল করে রাখতে চায়।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে নাম পরিচয় ছুপানো সরকারি কর্তা নেপালের জন্য এক লাল দাগের লক্ষণ রেখা টেনে দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন। ঐলাইন ক্রশ করলে নেপালের উপর তারা ঝাপায় পড়বেন। […….will be couched in the niceties of diplomatic prose, but there will be no denying “India’s red lines,” a senior government official told The Indian Express.] এর মানে হল এখনও ভারতের আক্কেল হয় নাই।

তাই ভারতের নীতি ও পদক্ষেপের ধরণ ও  অভিমুখ বিচার করে বলা যায়, এশিয়ার বাংলাদেশ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোর সাথে ভারতের সম্পর্ক আরো বড় সঙ্ঘাতময় হয়ে উঠার সম্ভাবনা সামনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এমনকি বাংলাদেশে যদি হাসিনা সরকারের মতো সরকার থাকে তাহলেও। এই সঙ্ঘাতের মূল কারণ হবে, ভারতের কলোনি বৈশিষ্ঠের বিদেশনীতি অথবা বলা যায় এই একুশ শতকে এসেও কলোনিয়াল মনোভাবে গড়ে ওঠা বিদেশনীতির কারণে।  ভারত অকর্মন্য ও উত্থানরহিত অথচ সে ভাবে তার অর্থনীতির এই খামতি যেন বা কলোনি স্টাইলের নীতি দিয়ে উতরানো যাবে। তবে আর এক দিক থেকে বলা যায় এর মৌলিক বৈশিষ্ট হল, এক শব্দে ‘হামবড়া’। যার অর্থ হল আক্ষরিক অর্থে আমি বড় বা শ্রেষ্ঠ। কিন্তু এতটুকুই না; এর আরো অর্থ হল, বিশেষত যখন কেউ নিজে বড় বা বিশেষ কেউ না হওয়া সত্ত্বেও মিছাই নিজেকে ওভার-এস্টিমেট করে বড় বা ক্ষমতাবান মনে করে।

সক্ষমতা অর্থে ক্ষমতাকে যদি দু’টি প্রকরণে ভাগ করে বলি, তবে এর একটা হল অবজেকটিভ। মানে বৈষয়িক বা ফিজিক্যাল দিক থেকে যা বাস্তব। আর অপরটি হলো সাবজেকটিভ, মানে কর্তাসাপেক্ষ। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা চীনের এক বিশাল অবজেকটিভ সক্ষমতা। সাধারণভাবে বললে এটি আসলে একটি বিশাল পরিমাণ বিনিয়োগ সক্ষমতা, যা যেখানে লাগাবে যেভাবে লাগাবে এর ওপর নির্ধারিত হবে আগামী দিনের দুনিয়া দেখতে কেমন হবে। যদি যুদ্ধের পেছনে ব্যয় করে বা বাধ্য হয়, তাহলে তা এক রকম হবে। যদি অর্থনীতিতে বিনিয়োগ হিসাবে ব্যবহার করে, যার আবার দু’টি ধরণ হয়; স্বল্পসুদের অবকাঠামোতে বিনিয়োগ আর সরাসরি (এফডিআই) বাণিজ্যিক বিনিয়োগ – এ দুইয়ের এক ভারসাম্য অনুপাত বিনিয়োগ হয় তবে আরেক রকম হবে। এটা অবজেকটিভ ক্ষমতা।

একুশ শতকের এখনকার দুনিয়ায় সবচেয়ে নির্ধারক শক্তি চীনের এই সক্ষমতা আছে। অপর দিকে চীনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেটা সাবজেকটিভ, এরা ওই অবজেকটিভ ক্ষমতাকে ব্যবহার করতে চাইলে বা না চাইলেও চীনের এই সক্ষমতা থেকে যাবে। কিন্তু আরেকটা পরিস্থিতিও কল্পনা করা যাক। ধরা যাক চীনের অবজেকটিভ পটেনশিয়াল বা সক্ষমতা নেই বা থাকলেও তবে সেটা তেমন নয়। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের আকাঙ্খা প্রবল এবং খুবই ভালো স্বপ্ন ও পরিকল্পনাও আছে – তাহলে কী হবে? সেটাই হলো ওই ‘হামবড়া’ পরিস্থিতি। আর এ অবস্থাই হলো ভারতের। সক্ষমতা নাই কিন্তু স্বপ্ন আছে। ভারতের এই ‘হামবড়া’ বৈশিষ্ট্যের বিদেশনীতি এশিয়ার ভারতসহ আমাদের সবার জন্য বিরাট দুঃখের কারণ।

যেমন চীনকে দেয়া আড়াই বিলিয়ন ডলারের প্রকল্পের মতই বহু আগে ভারতকে কার্যাদেশ দিয়ে দেয়া এমনই এক প্রকল্প আছে, যা গত দুবছর ধরে পড়ে আছে, কোন কাজও শুরু হয় নাই। কিন্তু দেখেন ভারতের অবস্থান হল সে পারুক আর নাই পারুক নেপাল তা ভারতকেই দিবে। এই বক্তব্য আমার নয়, নভেম্বর ২০১৭ সালে চুক্তি বাতিলের সময় খোদ সুবীর ভৌমিক ভারতের নীতির এই দশা অকর্মন্যতার কথা তুলে ভারত নিজে যতটুকু পারে তাতে মনোযোগ দিতেও পরামর্শ রেখেছিল।

নেপালে স্যাটেলাইট-ইন্টারনেট সার্ভিস একচেটিয়া সরবরাহকারি ছিল ভারত। সম্প্রতি চীনও সেখানে বিকল্প সরবরাহকারি হিসাবে হাজির হয়ে একচেটিয়া ভেঙে দিয়েছে। ফলে এখন ভাল সার্ভিস দেওয়ার ও মুল্যের  প্রতিযোগিতা করেই ভারতকে টিকতে হবে। এধরণের বিষয়গুলোর ভারতের কলোনি মালিকের মত আচরণের পিছনের মূল কারণ। স্বভাবতই এখনই নিশ্চিত করেই বলা যায় কলোনি মালিকেরা নিপাত যাবে, হেরে যাবে।

তাহলে নেপাল এখন কোন দিকে যাবে? বলা বাহুল্য, ভারতই নেপালকে এখন তথাকথিত ১৯৫০ সালের চুক্তি ভাঙার পথে ঠেকে দিচ্ছে ও যাবে। মনে রাখতে হবে, ৮৮ শতাংশ আসনের সমর্থনের সরকার এখন নেপালে। দেশটির জনগণের সামনে এই ভারতীয় নিগড়, এই চুক্তি ভাঙা, ছুড়ে ফেলে দেয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই। এই বাস্তবতা আরও প্রকট হবে সামনের দিনে। নেপালকে সেদিকে ঠেলে দিচ্ছে ভারত।

চীনের সক্ষমতার সাথে পেরে না উঠে ভারত কলোনি স্টাইলে নিগড়ে নেপালকে বেঁধে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নেপালের জনগণেরই বিজয় হবে। আর ভারতের ভাগ্যে জুটবে চিরদিনের ঘৃণা। অন্য দিকে আন্তর্জাতিক আইন ক্রমেই নেপালের মতো রাষ্ট্রের স্বার্থের দিকে মানে ল্যান্ডলকড রাষ্ট্রের পক্ষে হাজির হচ্ছে। অন্য রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে অবাধ পণ্য আনা নেয়া “ল্যান্ডলকড রাষ্ট্রের অধিকার” হিসেবে জাতিসঙ্ঘের আঙ্কটার্ডের অধীনে সুবিন্যস্ত করে হাজির হচ্ছে।

ভারত একদিকে নিজেই স্বীকার করছে নেপালে নিজের ভুলনীতি ও পদক্ষেপের কারণে সেখানে চীন ঢুকে পড়েছে। অথচ নিজে সংশোধন হয়ে যাবার কথা বলে আবার সেই একই পথে হাটছে। ভারতের  নিজের অবজেকটিভ অসক্ষমতা সম্ভবত তাকে এই ভুল করতে প্ররোচিত করছে। মিথ্যা হামবড়া বোধ, যা সে নয় এমন এক কল্পিত বোধ তাকে বারবার স্বপ্নে পোলাও খেতে ডেকে নিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, এটাই এশিয়ার দুঃখ হয়ে থাকবে অনেকদিন!

ওদিকে অলির ভারত সফরে স্বাগত  জানাতে এয়ারপোর্টে মোদি নিজে না গিয়ে হঠাৎ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথকে পাঠিয়েছেন। সোজাসাপ্টা করে বললে এতে নেপালবাসীকে অপমান করা হয়েছে এবং এটা অপ্রয়োজনীয় ও অযাচিত সস্তা আচরণ, তাই অগ্রহণযোগ্য। রাষ্টাচারের কনভেনশনে ছোট রাষ্ট্র বা বড় রাষ্ট্র বলে কিছু নাই। আছে মূলত নাগরিক জনগণের সম্মান, যা অলংঘনী্‌ যা ওভারস্টেপ করা যায় না। এমন আচরণ নেপালও করতে পারে। যদিও এগুলো কোনো বাহাদুরি নয়। ফলে এটা কাম্য নয়। কোন রাষ্ট্রদ্বয়ের পরস্পর রাজনৈতিক স্বার্থ না মিললে কোনো সম্পর্ক হবে না, কিন্তু নেপালের জনগণকে অপমান করার অধিকার মোদীর নাই। এটা কোন প্রধানমন্ত্রীর নয়, ভাংড়ির দোকানদারের আচরণ হয়েছে। এটা মোদীর ভুলা উচিত নয়।  মোদীকে একদিন  চুকাতে হবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নেপালে ভারতের ‘হামবড়া’ কূটনীতি  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

নেপাল-ভারতের সীমান্ত হত্যা থেকে শিক্ষা

নেপাল-ভারতের সীমান্ত হত্যা থেকে শিক্ষা

গৌতম দাস

১৪ এপ্রিল ২০১৭,  শুক্রবার

http://wp.me/p1sCvy-2ev

 

প্রবাদ আছে- কারো উপর বেইনসাফি আর জুলুম করলে সে কাজের কাফফারাও চুকাতে হয়। কিন্তু অনেকের বেলায় এমন হয় যে, কাফফারা পরিশোধ আর যেন শেষ হতে চায় না। সেই দশাকে খুবই খারাপ সময় বলতে হয়। নেপাল-ভারত সম্পর্কের বেলায় ভারতের জন্য এখন সেই ‘খারাপ সময়’ চলছে, যখন তার কাফফারা চুকানো যেন আর শেষ হতে চাচ্ছে না। নেপালে রাজতন্ত্র উৎখাত করে প্রজাতান্ত্রিক(রিপাবলিক) নেপাল হওয়ার লড়াই বিজয়ী হয়েছে সম্প্রতিকালে। তাতে আমেরিকার অনেক নেতি ভুমিকা থাকলেও শেষে  ইতিবাচক ভুমিকায় সে নেপালের লড়াইয়ে সাথে থাকতে পেরেছিল। আমেরিকার ইতিবাচক অবস্থানের সাথে  মিলে ভারতেরও অনেক ইতিবাচক ভূমিকা ছিল। সময়ে নির্ধারক ভুমিকাও ছিল, তাতে সন্দেহ নেই। এককথায়, ভারত সে লড়াইয়ের সাথে পরিশেষে ইতিবাচক পথ ধরেই হাঁটতে পেরেছিল। যদিও এরও পরে নেপালে নতুন কনস্টিটিউশন গঠনের কালে  ভারতের ভুমিকা তা আর থাকে নাই। ভারত কল্পনাও করতে পারে নাই যে  আগের রাজতন্ত্রী নেপাল-ভারতের কলোনিয়াল দাসত্ব চুক্তির বাইরে নতুন নেপালের সাথে ভারতের সম্পর্ক ভিন্ন কিছু হবে;  স্বভাবতই দিন বদলেছে- সেটা বুঝতে ভুল করেছিল এখানেই। অথচ ভারত প্রাকটিক্যাল হতে পারলে অন্য কিছু হতে পারত হয়ত। বলা বাহুল্য, সেটা কখনোই হয়নি। হওয়ার আর সম্ভব কিনা সে প্রশ্ন উঠছে।আর উল্টো নেপালের মূল তিনটি রাজনৈতিক দল (নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল বা ট্র্যাডিশনাল কমিউনিস্ট আর সশস্ত্র ধারার নতুন মাওবাদী কমিউনিস্ট) যারা একসাথে সংসদের মোট ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ আসনে প্রতিনিধিত্ব করে- এদের সবার সাথে ভারতের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে যায়। নতুন রিপাবলিক নেপালের তাৎপর্য ভারত বুঝতে ভুল করেছিল। বলা যায়, ভারত নেপালের পরিবর্তনের গুরুত্ব ধরতে পারে নাই। ভারতের সম্ভবত এমন ভাববার কারণ হল সে ভেবেছিল, নতুন নেপাল রিপাবলিক হলেও তাতে কী? সে তো আগের মতই ল্যান্ডলকড যা ছিল তাই, ভারত দিয়ে ভৌগোলিকভাবে ঘেরা। ফলে সে ধরে নিয়েছিল, নতুন নেপালও আগের মতোই ভারতের অনুগ্রহে এবং ভারতের আরো নিয়ন্ত্রণের নেপালই হবে। ভারতের এমন আচরণ দেখলে মনে হয়, ভারতে প্রশাসনের চোখে, আমলা-গোয়েন্দার ইমাজিনেশনে আন্তঃরাষ্ট্রীয় ‘সম্পর্ক’ বলতে কলোনিয়াল সম্পর্ক ছাড়া আর কোনো ধরনের সম্পর্কের কথা কখনোই তাদের জানা হয়নি। ফলে ভারত সীমান্তসংলগ্ন মাধেসি ও তরাই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর সাথে নেপালের প্রধান ধারার জনগোষ্ঠীর, পাহাড়ি-সমতলী স্বার্থবিরোধকে উসকে দিয়ে তা থেকে নেপালের রাজনীতিতে নিজের গুরুত্ব বাড়ানোর শেষ চেষ্টাই ছিল ভারতের শেষ ভরসা। কিন্তু এটা করতে গিয়ে সব হারিয়ে ফেলেছে ভারত।
নেপাল ল্যান্ডলকড এই অবস্থাটির অর্থ কেমন, তা সহজেই  বোঝা যায় নেপালের শুধু ছোট-বড় শহুরের জ্বালানি ব্যবহার করা দেখলে। নেপালের গ্রাম হয়তো লাকড়ি দিয়ে চলে, কিন্তু একটি সেমি-আরবান শহরও গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে অভ্যস্ত এবং নির্ভরশীল; তবে অবশ্যই ভারত যদি সেই গ্যাস নেপালে আসতে দেয়। শুধু গ্যাস নয়, নেপালের জনগোষ্ঠী বরাবরই একমাত্র ভারতের ভেতর দিয়ে রান্নার গ্যাসসহ সব ধরনের জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় ও ভোগ্যপণ্য আমদানি করে আসছিল। কিন্তু ভারত নেপালের সব শ্রেণীর জনগণের এই মৌলিক চাহিদা জ্বালানিসহ ভোগ্যপণ্যের চাহিদাকে পণবন্দী করে চাপ প্রয়োগের আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। বিশেষত নেপালের ওই তিন প্রধান দল পারস্পরিক বোঝাপড়ায় নেপালে ভারতের সব প্রভাব ও স্বার্থ অস্বীকার করেছিল। এরই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল ওই তিন দল সমন্বিতভাবে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা। এই ঘোষণা দেয়া মাত্র যেন নেপালের রাজনীতিতে ভারত আসলেই সব নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব হারিয়ে ফেলেছে, সেটা প্রমাণিত হয়ে গিয়েছিল। তাই দিগবিদিক হারিয়ে ভারত পাঁচ মাস ধরে সব ধরনের পণ্য নেপালে যেতে বাধা দিয়ে অবরোধ করে রাখে। এই চরম পদক্ষেপের পথ ধরাতে নেপালের গরিব সাধারণ মানুষের স্তরেও জন-মন থেকে ভারতের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এত দিন সম্পর্কের যে চরম অবনতি ঘটেছিল রাজনীতিকদের স্তরে, তা এবার সেখানে সীমিত না থেকে সর্বস্তরের আমজনতা লেভেলে ছড়িয়ে পড়েছিল। হতে পারে ভারত এ দিকটি নিয়ে যথেষ্ট ভাবেনি অথবা তার সব কার্ড ফুরিয়েছিল। তবে সব হারানো ভারত চিন্তাও করেনি এর কাফফারা কী হতে পারে। কারণ পণ্য অবরোধের মূল ধাক্কা বিশেষ করে জ্বালানি অবরোধের ধাক্কা খেয়েছিল স্বল্প আয়ের মানুষ। এদের জীবনও ভারত পণবন্দী করে ফেলেছিল। এরই ফলাফল হিসেবে নেপাল-ভারত সম্পর্কের মধ্যে এখন জনগণের পর্যায়ে তৈরি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী ভারতবিরোধী মনোভাব।
নেপাল-ভারত সীমান্ত প্রায় ১৭০০ কিলোমিটার। সীমান্ত অঞ্চলের বাসিন্দাদের পারস্পরিক সম্পর্ক আগে যেখানে ছিল আরেক পাড়ায় গিয়ে সওদা কেনার মত, আজ সেই সম্পর্কের মধ্যেও যেন আগুন লেগেছে। সীমান্তে এক কালভার্ট নির্মাণ করাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয়। আর তাতে আলাপ-আলোচনার পথে গিয়ে নয়, ভারতের সীমান্ত রক্ষীবাহিনী দিয়ে নেপালিদের সাথে এই বিরোধ মোকাবেলা করতে গিয়ে গুলি করায় এক নেপালি তরুণের (গোবিন্দ গৌতম) মৃত্যু হয়। ভারতের দুর্দশা এখন এমন যে, ক্ষুব্ধ মারমুখী নেপালি সাধারণ জনগণকে মোকাবেলা করতে ভারতকে নিজের রক্ষীবাহিনীর ওপর ভর করতে হচ্ছে। অথচ ভারত গত বছর প্রায় পাঁচ মাস ধরে নেপালে পণ্য চলাচল আটকে রেখেছিল, কনস্টিটিউশনের বিরোধিতা করেছিল। এসব নাকি নেপালের সীমান্তবর্তী জনগণের স্বার্থেই! আজ নেপালি পুলিশের ভূমিকা হলো লড়াকু নেপালিদের ফেরানো, যেন তারা ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে মারমুখী না হয়।
ঘটনার সূত্রপাত ও সারসংক্ষেপ হল, সীমান্তে নেপালের কালভার্ট নির্মাণকে কেন্দ্র করে কিছু ভারতীয় দাবি করে, কালভার্টের অপর পার নোম্যান্সল্যান্ডে পড়েছে, তাই তাদের আপত্তি আছে। কিন্তু এর বিরুদ্ধে নেপালি পক্ষের বক্তব্যও জোরালো। কারণ তাদের কথা হল, সীমান্ত নিয়ে তর্ক-বিতর্ক টেবিলে বসে ঠিক করা হোক। আর আসলেই তা টেবিলেই ছিল। কিন্তু সেটাকে বল প্রয়োগের স্তরে নিয়ে গিয়েছে ভারতীয় পক্ষই। আর কেন এতে এক নেপালিকে হত্যা করা হলো? ফলে তারা প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ।
নেপালের ‘মাই রিপাবলিকা’ ইংরেজি দৈনিক গত ১১ মার্চ নেপালি সরকারি কর্মকর্তার বরাতে লিখছে, ভারতীয় পক্ষ দ্বিপক্ষীয় আলোচনার ঐকমত্য ভঙ্গ করে নেপাল-ভারত সীমান্তে কাঞ্চনপুর জেলায় আনন্দবাজারে নির্মীয়মাণ কালভার্ট ভেঙে দিয়েছে। আর তা থেকে ডেকে আনা মুখোমুখি সঙ্ঘাতে একজন নেপালি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে গত ৯ মার্চ। নেপালের স্থানীয় সমাজকর্মী হরি লামসাল বলছেন, ‘দুই সপ্তাহ আগে উভয় দেশের স্থানীয়রা ও নিরাপত্তা সদস্যরা মিলে একমত হয় যে, কালভার্ট নির্মাণ হবে। কিন্তু পরে এই একমত হওয়া বিষয়টি না মেনে তারা কালভার্ট ভেঙে দেয়।’ কাঞ্চনপুর জেলার এসপি প্রকাশ বাহাদুর চাঁদও প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি বলছেন, ‘দুই দেশের কর্তৃপক্ষ একমত হয়েছিল এই নির্মাণে। অথচ পরে ভারতীয় পক্ষ এককভাবে এটা ভেঙে দিচ্ছে। এটাই সীমান্ত উত্তেজনা আরো বাড়িয়েছে।’

ঘটনাস্থল ভারত-নেপাল সীমান্তে নেপালের কাঞ্চনপুর জেলার ‘পুনর্বাসন মিউনিসিপালিটির’ অন্তর্গত। ওই মিউনিসিপালিটির প্রধান নির্বাহী শের বাহাদুর বুধা বলেন, তারা নেপালের মাটিতে ওই কালভার্ট নির্মাণের জন্য পাঁচ লাখ টাকা মঞ্জুর করেছিলেন। নেপাল ও ভারতীয় পক্ষ কালভার্ট নির্মাণে একমত হওয়ার পরই ওই ফান্ড মিউনিসিপালিটি অনুমোদন করেছিল। ওই জেলা পুলিশ অফিসার এবং তার ভারতীয় প্রতিপক্ষ গত ২০ ফেব্রুয়ারি দু’জনে বসে ওই নির্মাণের বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। সেই সূত্রে নেপালের সংশ্লিষ্ট উপপ্রধান জেলা অফিসার (ডেপুটি ডিসি) ও তার ভারতীয় প্রতিপক্ষও পরের দিন একসাথে বসে একমত হয়েছিলেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও স্থানীয় ভারতীয়রা বুধবার সন্ধ্যা (৮ মার্চ) ৬টার দিকে কালভার্টটি ভাঙা শুরু করেছিল আর স্বভাবতই তা নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়।
বাংলাদেশের সংলগ্ন ভারতীয় সীমান্তের ভারতীয় রক্ষীবাহিনী নাম যেমন বিএসএফ, নেপাল-ভারত সীমান্তে এখানে সে বাহিনীর নাম এসএসবি (সশস্ত্র সীমা বল)। রিপাবলিকা লিখছে, ‘ভারতীয় এসএসবির একজন এএসপি আর কে মোড়ল স্বীকার করেছেন, কালভার্টটি দুই দেশের সম্মতি অনুসারে নির্মিত হচ্ছিল।’ এ ছাড়া কাঞ্চনপুরের পাশের জেলা কাইলালির (এটাও নেপালের আরেক ভারতীয় সীমান্ত জেলা শহর) চিফ জেলা অফিসার (ডিসি) গোবিন্দ রিজালের বরাতে আরো জানিয়েছে, রিজাল পরের দিন (১০ মার্চ) ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে দেখা করেছেন। তিনি জানান, ‘আমরা তাদের বলেছি, দ্বিপক্ষীয়ভাবে একমত হওয়ার ভিত্তিতে এরপর তৈরি করা কালভার্ট তারা একতরফা ভেঙে দিতে পারে না।
৯ মার্চ সকাল থেকেই ক্ষুব্ধ স্থানীয় নেপালিরা সঙ্ঘবদ্ধ হতে থাকে। কোনো কোনো মিডিয়ার (যেমন নিউইয়র্ক টাইমস), অনুমানে তারা প্রায় ১০ হাজারের বেশি। তারা ভাঙা কালভার্টের স্থানে প্রতিবাদ জানাতে থাকে। আর তা রুখতে সীমান্ত সীমার অপর পারে ভারতীয় এসএসবিও সমবেত হয়। ৯ তারিখের রিপাবলিকা এক প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে লিখেছে, এসএসবির লোকাল ইউনিট চিফ যাকে স্থানীয় ভাষায় ‘থানেদার’ ডাকা হয়, পিস্তল বের করে পরপর চারটি ফায়ার করেন এবং চতুর্থ শটটি গোবিন্দকে কোমরে আঘাত করে। কথাগুলো বলছিলেন, দেবেন্দ্র খাড়কা, তিনি মৃতব্যক্তির এলাকার। খাড়কা বলেন, ‘বুলেটটি গোবিন্দের কোমর বরাবর আঘাত করলে সাথে সাথে ও পড়ে যায়।’ তিনি আরো বলেন, ‘থানেদার অরবিন্দ কুমার শুক্লা গুলি ছোড়ার আগে নেপালি প্রতিবাদকারীদের ছোড়া পাথরে আঘাত পেয়েছিলেন। গুলিতে আহত গোবিন্দকে ধানগাড়ী সিপি হাসপাতালে নিয়ে গেলেও বাঁচানো যায়নি।’
ঐকমত্যে নির্মিত কালভার্ট ভেঙে দেয়া আর এসএসবির গুলি ছোড়ার ঘটনায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। কিন্তু তাতে আরো ঘি ঢেলে দেয় নেপালের ভারতীয় হাইকমিশন। এ ঘটনায় হাইকমিশন এক টুইট বিবৃতি প্রচার করে। কিন্তু সেটা সব দায় অস্বীকার করা এক বক্তব্য। ‘কাঞ্চনপুরের আনন্দবাজার সীমান্তে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি, যেখানে এসএসবি গুলি ছুড়েছে’ বলে ওই বিবৃতি সব কিছুই অস্বীকার করেছিল। বলা বাহুল্য ভারতের দিক থেকে এটা ছিল খুবই দায়িত্বজ্ঞানহীন ও অপেশাদার কাজ।
এতে স্বভাবতই ফুঁসে ওঠা নেপালি সাধারণ মানুষ, ভারতবিরোধী স্লোগান তুলে সারা নেপাল তোলপাড় করে ফেলেছে। পরিস্থিতি উত্তেজনাকর হয়ে ওঠায় ভারত এক দিন পরই অবস্থান বদলায়। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে জানায়, তাদের অবস্থানের রেকর্ড ঠিক রাখার চেষ্টা হিসেবে এসএসবি অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে । আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির হয়ে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা অজিত দোভাল নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। তিনি নিহত ব্যক্তির পরিবারকে সহমর্মিতা জানান এবং তদন্ত করে দেখছেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। ইতোমধ্যে নেপাল সরকার গুলিতে নিহত গোবিন্দ গৌতমকে শহীদ ঘোষণা করে এবং পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কাঞ্চনপুর জেলার ডোডা নদীর তীরে তার সৎকারের আয়োজন শুরু করে।
এ ব্যাপারে ভারতের অবস্থান যে ভুল ছিল এর প্রতিফলন ঘটে ভারতের এনিডিটিভির এক রিপোর্টের শিরোনামে। তা হলো ‘সীমান্ত হত্যায় প্রতিবাদ প্রতিরোধ বেড়েই চলছে। ফলে ভারত নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে তদন্ত করার প্রতিজ্ঞা করেছেন।’ ইতোমধ্যে নেপালের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্যালাস্টিক পরীক্ষার রিপোর্টেও নিশ্চিত প্রমাণ পেয়েছেন, এই বুলেট এসএসবির। ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে ওই রিপোর্ট তিনি হস্তান্তর করেছেন। সুষমা শাস্তি দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি অভ্যন্তরীণ যাচাইয়ের জন্য অপেক্ষা করছেন।
অপর দিকে মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ভারতীয় শাখার নির্বাহী পরিচালক আকার পাতিল নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত দাবি করেন, বিশেষ করে ভারতীয় এসএসবির সদস্যরা ‘প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ করেছে কি না তা খতিয়ে দেখতে দাবি জানান। নেপালে এবারের ঘটনায় লক্ষণীয় বিষয়, মিডিয়ায় রিপোর্টিংয়ে সঠিক আইনি ভাষা প্রয়োগ। বেশির ভাগ মিডিয়া শুরু থেকেই খুব বেছে একটা শব্দ প্রয়োগ করেছে- ‘হাইহ্যান্ডেডনেস’। কথাটির আইনি অর্থ হলো- কোনো নিরাপত্তা বাহিনী প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ, যেমন কাউকে গ্রেফতার করে গাড়িতে উঠানোর সময় কোনো বাধা না দিলেও তাকে টেনেহিঁচড়ে অথবা অযথা কোমরে একটা রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে মেরে তোলা অথবা প্রতিহিংসামূলকভাবে বল প্রয়োগ ইত্যাদি। মাই রিপাবলিক পত্রিকা আইনি শব্দে নেপালিদের ভাষ্য খুবই সফলভাবে তুলে ধরেছে। যেমন পর্যবেক্ষণ ধরনের ১১ মার্চের এই রিপোর্ট লিখছে, ‘একটা দেশের একজন নাগরিক অন্য দেশের (বাহিনীর) ছোড়া গুলিতে মারা যাওয়া; এটা খুবই সিরিয়াস ইস্যু। এটা এমন এক ইস্যু যা সর্বোচ্চ সতর্কতা, যতœ ও সূক্ষ্ম সেনসিটিভ বিষয়াদির দিকে খেয়াল রেখে নাড়াচাড়া করা উচিত।’ পত্রিকাটি কথাগুলো বলছিল ভারতীয় হাইকমিশনের দায় অস্বীকার করা বিবৃতি দেখে। তাই আরো বলছিল, ‘ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে সেই টেনশন কমানোর বদলে হাইকমিশনের ঘটনার দায় অস্বীকার করা; এমনকি এসএসবির বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পর ন্যূনতমভাবেও এটাই বলতে পারেনি যে, আমরা ব্যাপারটা আরো খুঁজে বা যাচাই করে দেখব। অ্যাম্বাসি অফিসিয়ালদের এমন আচরণ যদি চলতে থাকে তবে নেপালে ভারতের দীর্ঘ পণ্য অবরোধে ইতোমধ্যেই (২০১৫ সালে) দাগ লেগে থাকা নেপাল-ভারত সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটবে। এ সবের ফলাফলে ভারতবিরোধী যে জ্বর এখন নেপালে বয়ে যাচ্ছে, তা দিয়ে নেপালে ভারতের কোন স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে, তা বোঝা মুশকিল। এভাবে ভারত প্রসঙ্গে আমাদের মুখ যদি এত তেতো হয়ে যায়, তাতে স্বভাবতই এর প্রতিফল হিসেবে জনগণের ভেতর থেকে একটা চাপ প্রবল হতে থাকবে যে, চীনের সাথে যোগাযোগ সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করো। স্বভাবতই এটা ভারতের জন্য সবচেয়ে বাজে এক ব্যাপারে হবে। সেজন্য নেপালের পাবলিক সেন্টিমেন্টের বিষয়ে আরো সেনসিটিভ হতে নেপালে ভারতীয় কর্মকর্তাদের আহ্বান জানাই। নেপাল-ভারত সম্পর্ক ইতোমধ্যে অনেক জটিল হয়ে গেছে, একে আর জটিল করবেন না।’
ভারতের সাথে নেপালের সীমান্তবিরোধ কী করে মোকাবেলা করতে হয়- তা সবার জানা-বোঝার জন্য নেপালের জনগণ এখানে কিছু শিক্ষা রেখে গেল।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে ০৯ এপ্রিল ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় (প্রিন্ট পত্রিকায় পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা

নেপালে সব হারানো ভারতের ভরসা এখন প্রতিহিংসা
গৌতম দাস
২৩ আগষ্ট ২০১৬, সোমবার

http://wp.me/p1sCvy-1Jc

 

 

নেপালের রাজনীতিতে আবার কিছু উত্তাপ দেখা দিয়েছে। মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল (প্রচণ্ড) আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। আবার বলছি এ জন্য যে, তিনি নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উৎখাতের নায়ক। রাজতন্ত্র উৎখাতের পর নেপালে ২০০৮ সালে এই মাওবাদী গেরিলা নেতা প্রথম নির্বাচিত ও পপুলার প্রধানমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন । কিন্তু এর পরের ও সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে নেপালের ৫৯৫ জনের আসনের পার্লামেন্টে প্রাপ্ত আসন বিন্যাসে নেপাল রাজনীতিতে প্রধান তিনটা দলের অবস্থান ছিল, নেপালি কংগ্রেস ১৯৬ আসন, লিবারেল কমিউনিস্ট দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল বা সিপিএন (ইউএমএল) এর ১৭৫ আসন আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএন (মাওবাদী সেন্টার)-এর ৮০ আসন। এটাই চলতি   সংসদের আসন বিন্যাস। এভাবে মোট ৪৫১ আসন (৭৫% আসন) এই তিন দলের ভাগে আর বাকি ১৪৪টা আসন আরো প্রায় ২৭টা ছোট ছোট দলের (মাধেসি ও ত্বরাই অঞ্চলের দলসহ) মধ্যে বিভক্ত। ফলে এমন আসনবিন্যাস অনুসারে মূল তিন দলের প্রতি দুই দলের জোট হলেই সরকার গঠন সম্ভব। কারণ তাতে কোয়ালিশন অর্থে কোনো সরকার গঠনের মত সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখানো সম্ভব। ২০১৩ সালের নির্বাচনের পর থেকে এর আগে দু-দু’বার কোয়ালিশন সরকার হয়েছিল, যা এবা্রেরটা নিয়ে তৃতীয়বারের কোয়ালিশন সরকার হল। প্রথমটা ছিল নেপালি কংগ্রেসের নেতৃত্বে লিবারেল কমিউনিস্টদের সমর্থনে সরকার গঠন । আর টিকেছিল ফেব্রুয়ারি ২০১৪ থেকে অক্টোবর ২০১৫ পর্যন্ত। যেখানে মাওবাদী ছিল বাইরে বিরোধী দলে। নেপালের প্রথম কনস্টিটিউশন অনুমোদিত ও গৃহীত হয়েছিল ঐ সরকারের আমলে, তবে প্রধান তিন দলেরই সক্রিয় জোটবদ্ধ সমর্থনে। এরপর ওই প্রথম কোয়ালিশন সরকার ভেঙে দ্বিতীয়বার কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়েছিল। সেবার তা হয়েছিললিবারেল কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে খাড়গা প্রসাদ অলিকে প্রধানমন্ত্রী করে  আর মাওবাদী কমিউনিস্টদের সমর্থনে, যা টিকেছিল গত ২৪ জুলাই ২০১৬ পর্যন্ত মাত্র ৯ মাস। আর সেখানে নেপালি কংগ্রেস ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে ছিল। আর এবার আবার মাওবাদী নেতৃত্বে আর নেপালি কংগ্রেসের সমর্থনে সরকার গঠন হয়েছে, আর লিবারেল কমিউনিস্টরা আছে ক্ষমতার বাইরে বিরোধী দলে। অর্থাৎ সর্বশেষ ২০১৩ সালের নির্বাচনে কারো সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায় ঝুলন্ত পার্লামেন্ট তৈরি হওয়ায় এটা স্বাভাবিক যে এ পর্যন্ত তৃতীয়বার কোয়ালিশন সরকার দেখা হয়ে গেল।

গত ৪ আগস্ট ২০১৬ মাওবাদী নেতা ৬১ বছর বয়সী পুষ্পকমল দাহাল প্রচণ্ড প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। এর আগের দিন পার্লামেন্ট ভোটে এই নেতা দাহাল, কোয়ালিশন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন লাভ করেছিলেন। কিন্তু সরকার বদলের ঘটনায় আনসিন বা অদেখা অংশে কী ঘটেছিল?
বলা হয়ে থাকে নেপালের প্রধান তিন দল নেপালি কংগ্রেস, লিবারেল কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) আর মাওবাদী কমিউনিস্ট ইউসিপিএনের মধ্যে ভারত নিজের দিক থেকে সে যার ওপর সবচেয়ে খাপ্পা সে দল হলো বিগত প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ অলির লিবারেল কমিউনিস্ট। ভারতের এক থিংকট্যাংক জাতীয় সংগঠন যার নাম  “সাউথ এশিয়া অ্যানালাইসিস গ্রুপ”। তাদের রাগ-ক্ষোভ পাঠ করে আমরা ব্যাপারটাকে বুঝতে চেষ্টা করব। নেপালের রাজনৈতিক পরিবর্তনে মাওবাদী দাহাল সরকার শপথ নেয়ার দিন ছিল গত ৪ আগস্ট আর ওই দিন প্রকাশিত হয় ড. এস চন্দ্রশেখরের নামে একজনের লেখা তাদের এই রিপোর্ট। বিগত প্রধানমন্ত্রী অলি সম্পর্কে তিনি লিখছেন, “অলি ছিল তিতা। (বলতে চাচ্ছেন পার্লামেন্টে প্রধানমন্ত্রী অলির সমাপনী বক্তৃতার ভাষা ছিল তিতা) তাঁর তিতা হওয়ার কারণ আছে। কারণ নেপালি কংগ্রেস আর মাওবাদী দুই দলই তাকে নিচু করেছে, নিচু দেখিয়ে ছেড়েছে। অলি বলেছেন, যেভাবে তার সরকারকে নামানো হয়েছে এটা নীতিবিহীন ও তা কাম্য ছিল না”। লেখক চন্দ্রশেখর নেপালের সংসদে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির দেয়া ১১০ মিনিটের সমাপনী বা শেষ বক্তৃতার কথা বলছিলেন। চন্দ্রশেখর বলছেন, ‘সবাই অলিকে অদক্ষতা ও অযোগ্য শাসকের অপবাদ দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়েছে অথচ এসবই আগের সব সরকারের ব্যর্থতার ফসল”। না, চন্দ্রশেখর সবটা ঠিক বললেন না। কারণ, নেপালের বিরুদ্ধে চালানো ভারতের সাড়ে চার মাসের সড়ক-রফতানি অবরোধের কারণে বাজারে জ্বালানি তেলের যে কালোবাজারি তৈরি হয়েছিল। এর বিরুদ্ধে অলি সরকার কড়া অ্যাকশন নিতে সক্ষমতা দেখাতে পারলে জনগণের কিছু কষ্ট লাঘব নিশ্চয়ই করা যেত। কিন্তু সরকার তা পারেনি। এটা তো অন্যের সরকারের আমলের কাহিনী না। ফলে অলি সরকার যার সমর্থনের সরকার ছিল, সেই মাওবাদীরা আগেই কয়েকবার অলি সরকারের এই অযোগ্যতার কঠোর সমালোচনা করেছিল, সরকারকে সাবধান করেছিল। আসলে চন্দ্রশেখর যেন বলতে চাইছেন অন্যেরা অলি সরকারের বিরুদ্ধে যা অভিযোগ এনেছিল সেগুলো ভুল। বরং চন্দ্রশেখর বিগত অলি সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বিশেষ অভিযোগ আনতে চান যে অভিযোগগুলোি একমাত্র সাচ্চা। খোঁচা মেরে তিনি বলছেন, “অলির যদি নেপালের রাজনীতিতে কোনো অবদান থাকে তা হল, তিনি নেপালের রাজনীতিকে পাহাড়ি আর মাধেসি বলে পুরোপুরি দুই ভাগে বিভক্ত করে ছেড়েছেন”। এই বয়ানেও চন্দ্রশেখর ভারতের সব আকামের দায় আবর্জনাও অলির মাথায় ঢেলে দেয়ার চেষ্টা করলেন। ফ্যাক্টস হল, ভারতের অবস্থা এখন সব হারিয়ে কাশ্য গোত্র। ভারতের ভুল নীতির কারণে নেপালের প্রধান তিনটা দলের সাথেই ভারতের কাজের সম্পর্ক অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ভারতের স্বার্থ তাদের মধ্য দিয়ে এই তিন দলের কোন একটার ভিতর দিয়ে পার করে আনার ন্যূনতম সুযোগ সেখানে আর ভারতের জন্য অবশিষ্ট নেই। ভারত তাই সব হারিয়ে কম বা ছোট প্রভাবের মাধেসিদের দলগুলোকে একমাত্র ভরসা করতে গিয়েছে। এই নিরুপায় অবস্থা এটাই ভারতের ভালনারেবিলিটির প্রকাশ।  আবার সেসব ছোট দল গুলোকেও প্রভাবিত করেছে যাতে তারা সব ধরনের চরম আপসহীন লাইন ধরে। যাদেরকে কেবল সবকিছুতে ‘মানি না’ বলতে পারাটাকে অর্জন বলে বুঝানো হয়েছে। অথচ শেষ বিচারে অপরাপর নেপালি জনগোষ্ঠির প্রতিনিধির সাথে একটা কার্যকর কাজের সম্পর্কে পৌছানো, নিগোশিয়েশন এখানেই তাদের আসতে হবে। এরা জানে না, নিজের স্বার্থ আদায় অর্জনের পথ কোনটা। ভারত সাড়ে চার মাসের  তাদের সহায়তায় অবরোধ চালিয়েছে। এভাবে চলে অবস্থা এখন এমন যে মাধেসিদেরও নেপালের রাজনীতিতে তাদের যতটুকু গুরুত্ব ছিল তা খুইয়ে তাদের পথে বসিয়ে ছেড়েছে ভারত। ভারত এখন নিজের সব আকামের ফলাফল থেকে হাত ধুয়ে ফেলে এর সব দায়ও অলির ওপর চাপাচ্ছে।
চন্দ্রশেখর এর পরও বলছেন, ‘আমিই বরং আমার আরো কিছু নিজের গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ অলির ওপর চাপাব।’ বলছেন, অলি নাকি “ভারত-নেপাল সম্পর্কের ওপর আর কিছুতেই কাটানো যাবে এমন কিছু ক্ষতি” করে ফেলেছেন। চন্দ্রশেখরের দাবি, “আগামীতে অলিকে সবাই স্মরণ করবে ভারতের ওপর নেপালের অতি নির্ভরতা কমানোর উদ্যোক্তা পিতার ভূমিকার জন্য এবং চীনের সাথে সম্পর্কের রাস্তা খোলার জন্য। যদিও এটা সম্ভবত খুব একটা সফলতা দেখাতে পারবে না। তবে তার উদ্যোগ নেপালে প্রশংসার চোখে দেখা হবে”। অর্থাৎ মনে চরম ক্ষোভের কথা কিছু মিষ্টি শব্দে প্যাঁচ দিয়ে হাজির করলেন তিনি। চন্দ্রশেখরণের এই মন্তব্য নিয়ে খুব কিছু বলার নেই, কারণ এটা প্রকারান্তরে ভারতেরই আপন দোষ স্বীকারের আর স্বব্যাখ্যাত ধরনের। তবে ভারত নিজেকে আত্মজিজ্ঞাসায় ফেলার, নিজ দোষ মূল্যায়নের একটা এক্সারসাইজ করে দেখতে চাইলে তা করার সুযোগ নিতে পারে। আমাদের সিপিবি বা মেননের গোত্রের স্ট্যান্ডার্ডের এক লিবারেল কমিউনিস্ট দল হল প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড মার্কসিস্ট লেলিনিস্ট)। ভারত এমন কী নীতি নিল যে, কেন এরা এমন চরম ভারতবিরোধী হয়ে গেল, নেপালের অতি ভারতনির্ভরতা কমানোর আর চীনের সাথে যেচে সম্পর্ক গড়ার নায়ক হয়ে গেল? অথচ এরা তো নামেই কমিউনিস্ট কিন্তু আজীবন এরা অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া দূরে থাক, রাজতন্ত্রের অধীনে আইন মানা এক নির্বাচনী দল ছিল মাত্র। সেই দল কেন কিসের ফেরে পড়ে এমন ভারতবিরোধী রেডিক্যাল অবস্থানের দল হয়ে গেল? ভারতের থিংকট্যাংক ওয়ার্কিং অ্যাকাডেমিকদের এর জবাব সবার আগে নিজেকে নিজে দেবেন। একমাত্র এরপরই তাদের উচিত হবে তাদের সরকারকে কোনো পরামর্শ দেয়া। তাই নয় কী! মনে রাখতে হবে, আমরা অলির দলের কথা বলছি। আমরা মাওবাদী দাহালের কথা বলছি না। যেটা হলে সহজেই এরা নিজেদের বেকুবি আড়াল করতে পারতেন আর এসব অ্যাকাডেমিকদের পণ্ডিতি ফলানো সহজ হতো হয়তো।
এটা কমবেশি এখন পরিষ্কার যে মাওবাদী আর নেপালি কংগ্রেস জোটের বর্তমানের নতুন গঠিত সরকার আগামী ২০১৮ সালে নেপালের নির্বাচনের আগ পর্যন্ত ভাগাভাগি পালা করে ক্ষমতায় থাকার এক চুক্তি করেছে এবং এর প্রথম টার্মে মাওবাদী দাহাল ক্ষমতা নিয়েছে। এ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী দাহালের সরকার ক্ষমতায় থাকবে আগামী ১১ মাস। চন্দ্রশেখরণ এবার তার লেখায় প্রধানমন্ত্রী দাহালের সমস্যা কী হবে তা নিয়ে কথা বলছেন। চন্দ্রশেখরণের ভাষায়, দাহালের সমস্যাঃ
১. “দাহাল কোনো ঐকমত্যের সরকার গড়তে পারবেন না। কারণ মাধেসি ইস্যুতে কনস্টিটিউশন সংশোধনের দরকারে অলির দল তাতে বাধা সৃষ্টি করবে”। কথাটা বদ-দোয়ার মত শোনালেও কথা সত্য সংসদের আসনের বিন্যাসের হিসেবে অলির দলের সমর্থন ছাড়া দাহালের পক্ষে এমন কোনো বিল পাস সম্ভব নয়। কিন্তু মজার দিক হলো, এর ভেতর দিয়ে মাওবাদী দাহাল এক গঠনমূলক ও সঠিক উদ্যোগ নেয়ার মত এবং যোগ্যতা দেখানোর মত এক রাজনীতির নেতা – একথা ভারতের এই অ্যাকাডেমিক স্বীকার করে নিচ্ছেন। আর তাহলে মাধেসি ইস্যুতে এবং মাধেসিদের বিরুদ্ধে দাহালের কোনো ক্ষোভ-ঘৃণা তো না-ই, বরং নিজ সমগ্র জনগোষ্ঠীকে একক রাজনৈতিক কমিউনিটিতে গড়ার কাজটা সম্পর্কে তিনি খুবই সচেতন, এমনটাই প্রমাণ হচ্ছে। মাধেসিরা অবরোধের সাড়ে চার মাসে ভারতের স্বার্থের পুতুলের ভূমিকাকে প্রধান করে ভারতেরই রাজনীতি করে গেছে। তবুও সেটা নিয়েও দাহাল তাদেরকে কোনো শাস্তি দিতে চান এমন মনোভাব নেই। এখন তাহলে বাকি থাকল অলির দল। সে ক্ষেত্রে অলির দল কেন মাধেসি ইস্যুতে শুধুই বিরোধিতা করবে? মাধেসিদের ওপর অথবা দাহালের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসায়? এটা খুব ভালো কনভিন্সিং ব্যাখ্যা হলো না। এটা আসলে ভারতের স্বার্থের খায়েশ হয় তো! যদি অলি খামাখা এক বিরোধী অবস্থান নেয় তবে সেটা ভারতকে নেপালি রাজনীতিতে ঢুকে পড়ার বা অনবোর্ড হওয়ার একটা অছিলা হয়ে হাজির হতে পারে? কিন্তু শকুনের বদ-দোয়ায় কি গরু মরে!
২. দাহালের দ্বিতীয় সমস্যা হিসেবে চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “দ্বিতীয়টা হলো ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কমিশন ইস্যু”। একথা ঠিক, এবার প্রধানমন্ত্রিত্বে ক্ষমতায় আসীন হওয়ার দাহালের আগ্রহের পেছনে অন্যতম কারণ এই ইস্যু।  চন্দ্রশেখরণ লিখছেন, “মাওবাদীদের সশস্ত্র রাজনীতি করার সময়ে ঘটা কিছু নিষ্ঠুরতার ঘটনা থেকে নিজেদের বেমালুম খালাস করিয়ে নেয়ার তাগিদ কাজ করেছে। এ ধরনের কয়েক হাজার মামলা থেকে সহজে এরা পার পাবে না”। এই উপস্থাপনও তো দেখা যাচ্ছে চন্দ্রশেখরের বদ-দোয়া দেয়ার।
প্রথম কথা হল, নেপালের রাজনীতিতে বেইল হারানো, প্রভাব হারানো ভারত নিজেকে গোনায় ধরানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। খড়কুটোও আঁকড়ে ধরতে চাইছে। এমনকি তারা নিজের জ্ঞানবুদ্ধির ওপরও ভরসা রাখতে পারছে না। তাই নেপালের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর কার কী দুর্বলতা বা ভুল আছে, সেগুলো খুঁজে খুঁজে ভারত তা ক্যাশ করার তালে নেমেছে। কিন্তু সেকাজেও তারা পটু নয়। যথেষ্ট হোম-ওয়ার্ক করে তারা নামে নাই। বরং নেপালের দলগুলো প্রতিহিংসার রাজনীতি করুক এটা কামনা করছে। যেগুলো আসলে কামনা না বদমানুষের বদ-দোয়া। এভাবে কারো কিছুই অর্জন হয় না। দিন চলে না, চলবে না। কারণ শেষ বিচারে জীবন খুবই ইতিবাচক। ভারতেরও এই সত্য আঁকড়ে ধরা উচিত।
এবার প্রসঙ্গের আরো ভেতরে যাওয়া যাক। কথা সত্য যে, এই ইস্যুতে দাহাল বহু সময় উদ্বিগ্ন হয়েছেন। কারণ বিশেষ করে এই ইস্যু থেকে হিউম্যান রাইটের ভায়োলেশনের কোনো কেস বানিয়ে আন্তর্জাতিক আদালত আইসিসিকে প্রভাবিত করতে ভারতের তৎপরতা আছে, যাতে দাহালকে যদি ফাঁসাতে পারে তবে শকুনের বদদোয়ায় গরু মরার মতো হয় ব্যাপারটা। ফলে ভারতের আঙুল ঢুকানোর আর খোঁচাখুঁচির খবর দাহাল পাচ্ছিলেন। ফলে তিনি এই ইস্যুটা ফেলে রাখা, হেলেদুলে গাফিলতি দেখানো অদক্ষতা করার বিরুদ্ধে বিগত সরকার অলির কাছে বৈঠক করে অসন্তোষ জানিয়েছিলেন। কিন্তু চন্দ্রশেখরণের এটাকে দ্বিতীয় সমস্যা বলে হাজির করতে গিয়ে – এর বয়ানে ভারতের বদ মনোবাঞ্ছা প্রকাশ করে ফেলেছেন।
চন্দ্রশেখরণ খেয়াল করেননি তিনি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ নিয়ে কথা বলছেন। কোন আদালতের বিচার নিয়ে নয়।  দক্ষিণ আফ্রিকার ডেসমন্ড টুটুর দেখানো এই পথ অবশ্যই এক ন্যায়বিচার ইনসাফের রাস্তা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা থেকে জাত। কিন্তু তা প্রচলিত আদালতের পথে নয়। কারণ এটা আজকাল সবাই মানেন যে, আদালতের পথেও ন্যায়ভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। এতে প্রয়োজনীয় আরো অনেক কিছু মানবিক উপাদান উপেক্ষায় হারিয়ে যেতে পারে। তাই সবচেয়ে বড় কথা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন’ কোনো ধরনের প্রতিহিংসার পথ নয়। যে্মন প্রতিহিংসা চন্দ্রশেখরণ তার এই পুরো রচনার ছত্রে ছত্রে হাজির রেখেছেন। ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে একটা সত্য, তা সে যতই তিতা হোক তাকে সামনে আনতে হয় আর সেটি কমিউনিটির সব মানুষকে নিয়ে পুনর্গঠন করার পথ। কেবল আদালতে ধরে এনে শাস্তিই দিয়ে এটা অর্জন করা যাবে না। কষ্ট দেয়া আর কষ্ট পাওয়া এমন উভয়ের আত্মশুদ্ধি আর ক্ষত সারানো এক লম্বা প্রক্রিয়া এটা। একটা সামাজিক ও কমিউনিটি পুনর্গঠন এর লক্ষ্য। কোনো হিংসার বদলে প্রতিহিংসার শাস্তি  – এমন কোনো চেইন কোথাও তৈরি থাকলে তৈরি হয়ে গেলে তা ভেঙে দেয়াই এর লক্ষ্য। আর সোজা কথা আগে বলেছি, এটা কোনো আদালতের পথ নয়। তবে অবশ্যই ইনসাফ সন্ধানের পথ। এখন দাহালের সমস্যা দূরে থাক, সমস্যা আসলে চন্দ্রশেখরণের। তার মনে রয়ে গেছে যেন কোন আফালতের বিচার নিয়ে তিনি কথা বলছেন অথচ মুখে তিনি দাবি করছেন যে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনের কথা তিনি বলছেন। অথবা হতে পারে অজ্ঞতায় দুটাই তার চোখে একই ঠেকে। অথচ তিনি এর ভেতর এটা দাহালের ‘হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি’ আকাক্সক্ষা খুঁজছেন, দেখতে পাচ্ছেন? মানে একটা  ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনকে তিনি দেখছেন এটা নাকি নিষ্ঠুরতা থেকে হাত ধুয়ে ফেলে বেচে যাওয়ার উপায় হিসাবে। তার মানে ডেসমন্ড টুটুও তাই করেছিলেন। এটা তার উদ্দেশ্য ছিল বলে তিনি অভিযোগ করছেন। তার মানে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশনে কি কেউ নিজেকে হোয়াইট ওয়াশ অব এট্রোসিটি করতে পারে? একথা বলে চন্দ্রশেখ্রণ প্রমাণ করলেন তিনি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন সম্পর্কে কিছুই জানেন না। এর প্রক্রিয়া সম্পর্কে কোন ধারণাই তাঁর নাই। অথচ এই পদ্ধতি হল, কেউ কাউকে যে কষ্ট দিয়েছে তা খোলা মনে নিজেই স্বীকার করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটা। শুধু তা-ই নয়, তা আবার এমন খোলা নিষ্পাপ মনে হতে হবে যেন তা ভিকটিমের মন ছুঁয়ে যায়। স্পর্শ করলে বুঝতে হবে খোলা মনে সব স্বীকার করেছে। তবেই ভিকটিম বা তার আত্মীয় স্বজনের মনের সব ক্ষোভ দূর হবে সব হিংসা-প্রতিহিংসা মিলিয়ে যাবে। এখানে পুরা প্রক্রিয়ায় কারো কোনো নিষ্ঠুরতার “হোয়াইট ওয়াশ” বা ধুয়ে আনা দেখার সুযোগ কোথায়? আসলে চন্দ্রশেখরের কথার মানে কেউ অপরাধ করেছে আর তিনি এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে নিজের জিঘাংসা চরিতার্থ ব্যবহার করতে চাইছেন। মন ভর্তি জিঘাংসা নিয়ে থাকলে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেশন কেউ মুখে যতই উচ্চারণ করুক না কেন তিনি বিষয়টিই বুঝবেন না। আসলে ভারতের বা সেই অর্থে চন্দ্রশেখরের সমস্যা হল, দাহালের ওপর প্রতিহিংসার শাস্তি দেয়ার সুযোগটি হারিয়ে যাওয়ার জন্য তারা আক্ষেপ শুরু করেছেন। আর কেন দাহাল তাদের এই সুযোগ দিচ্ছে না, এতেও দাহালের দোষ খুঁজছেন। সত্যিই অপূর্ব মানুষের জিঘাংসা মনের প্রতিহিংসা!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় গত ৭ আগষ্ট ২০১৬ অনলাইনে (প্রিন্টে ৮ আগষ্ট ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। তা আবার আরও এডিট ও সংযোজন করে এখানে আবার ছাপা হল।]