পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

গৌতম দাস

০৩ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2AL

 

বাংলাদেশের “পররাষ্ট্রনীতি” বলতে যা কিছু আছে তা হঠাৎ করে আমেরিকানদের নজরে পড়েছে মনে হচ্ছে। যদিও এরা কোন আমেরিকান, কারা এরা, তা নিয়েও কথা আছে অবশ্য। সে কথায় পরে আসা যাবে। এই নড়াচড়া বা নজর ফেলা এককথায়, পন্ডশ্রম। বিষয়টা ‘প্রথম আলো’র ভাষাতেই বললে, গত ১৭ মে তাদের একজন লিখেছে, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোন পথে- এই জিজ্ঞেস নিয়ে সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন রাজনীতিক, কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। আলোচনায় উঠে আসে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভেতর-বাহির, জাতীয় নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা দিক। আয়োজক ছিল বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই, BEI) এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই, IRI )“।

আয়োজক প্রতিষ্ঠান দু’টি আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ধরনের দুই প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত। তারা ঐ থিঙ্কট্যাঙ্কেরই বাংলাদেশ শাখা নাকি কেবল ফান্ডদাতা-এনজিও সম্পর্ক, কোনটা- সেটা তাদের মুখ থেকেই আমাদের জানার বাকি আছে। যা হোক, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো যা কিছু নিজের কাজের ইস্যু হিসেবে তুলে আনে, অনুমান করা অবাস্তব হবে না যে, তা আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ বলে তারা মনে করে।

কথা হল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন আছে, এর ঘাটতি, খামতি কী – সে প্রশ্ন এখন কেন? বিশেষ করে আজকের খোদ বাংলাদেশই যে দশায় আছে, একে এই অবস্থায় আনা ও ফেলার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকায় আমেরিকান বন্ধুদেরও অবদান আছে। গত ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকায় ক্ষমতায় থাকা বুশ এবং ওবামা- এই দুই প্রশাসনের তো বটেই অন্তত আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটেরও [AEI] বিশেষ ভূমিকা এ ক্ষেত্রে আছে। বাংলাদেশকে নিয়ে কী করা হবে এনিয়ে অন্তত  ভারত-আমেরিকার আলোচনাগুলোতে, গোলটেবিল বা ইনফরমাল বৈঠকে ইনপুট দিয়ে।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক ধরনের পরিণতি, এই অর্থে ‘উত্তরসূরি’ বলা যায়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশে যে এক ধরনের সামরিক ক্ষমতা দখল হয়েছিল তাকে আমরা অনেকে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বলি, যা দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। কেন এই ঘটনা ঘটেছিল, এর ‘আনুষ্ঠানিক’ কারণ কখনও জানা যাবে না। কিন্তু আসল কারণ যা দখলকারীদের সাফাই-বক্তব্য থেকে জানা যায়, মোটাদাগে সে ভাষ্যটা হল – আগের সরকার  “ওয়ার অন টেরর” -কে ঢিলেঢালাভাবে নেয়াতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে “জঙ্গি মোকাবেলার উপযোগী” করে ঢেলে সাজানো ও সংস্কার করা হয়নি। সে কাজগুলো সম্পন্ন করতেই ঐ ক্ষমতা দখল। কিন্তু এই বক্তব্যটা ক্ষমতা দখলের ছয় মাস পরে বদলে যায়।

মূল কারণ, আমেরিকান অগ্রাধিকার মানে কোনটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ ও আগে দরকার সেই বোধ বদলে গিয়ে এক নতুন আকার নিয়েছিল। আমেরিকা ওয়ার অন টেরর বা জঙ্গি ঠেকানোর চেয়ে তখন থেকেই “চীন ঠেকানো’-কে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য অগ্রাধিকার সাব্যস্ত করেছিল।  না সাব্যস্ত করা ছিল আগেই তবে বাস্তবায়ক রেডি ছিল না তখন। আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’[China containment], মানে ‘চীন ঠেকানো’ নামের কর্মসূচি আছে। এর অর্থ হল, ২০০৫ সালের পর থেকে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হিসেবে চীনা উত্থান আর আমেরিকার পতন যখন আমেরিকার নিজের করা সার্ভে ও পরে তা নিয়ে প্রকাশিত (২০০৮) রিপোর্টও স্বীকার করে, তখন এশিয়ার দুই ‘রাইজিং অর্থনীতি’ চীন ও ভারত – এদের একটাকে (ভারতকে) কাছে টেনে একে অপরটির (চীনের) বিরুদ্ধে লাগানোর নীতিই আমেরিকার “চায়না কনটেইনমেন্ট”। আমেরিকার এই “চায়না ঠেকানোর” নীতিতে ভারত নিজেকে পরিচালিত হতে দিতে রাজি হয়ে যায় এসময়েই। বাংলাদেশে আমেরিকান প্রায়োরিটি বদলের রহস্য এখানেই।  সেজন্যই হঠাত করে এই রদবদল ঘটেছিল।

আর এর বিনিময়ে ভারত পায় – এক. একদিকে আমেরিকায় পণ্যের রফতানি বাজারে বিনা বা কম শুল্কে আমেরিকায় প্রবেশ সুবিধা, ভারতের আমেরিকান হাইটেক অস্ত্র আমদানি ইত্যাদি। আর দুই. এছাড়াও অন্য দিকে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে “দেখভালের দায়িত্ব” তুলে দেয় যাতে জঙ্গী ঠেকানো কথার আড়ালে ভারত বিনা পয়সার করিডোর, আসামের বিদ্রোহ দমনে বাংলাদেশকে ব্যবহারসহ এ দেশকে সরাসরি অন্যান্য নানান ব্যবহার করে সব সুবিধাই নিতে পারে ভারত।  প্রায় নিয়ন্ত্রক বনে ভারতের হাতে চলে যায় বহু কিছু। যেমন, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে ও প্রয়োজনে একটা গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে চীনের সাহায্য নিবে কিনা তা নির্ভর করবে ভারতের স্বার্থ এই অগ্রাধিকার যদি তা এলাও করে একমাত্র তবেই। এর সোজা অর্থ, ভারত বন্দর চায় না তাই বাংলাদেশ এটা করতে পারবে না।

ফলে এভাবেই এরপর থেকে চলে আসছে আজ পর্যন্ত, আমাদের এই দুর্দশার শুরু এখান থেকে। কিন্তু সেই আমেরিকা এখন আবার আরও কী চায়? একই লোকদের আমরা আবার তৎপর হতে দেখছি কেন?

গত ২০১৪ সালের নির্বাচন উপলক্ষ্যে আমরা দেখেছিলাম যে, সেবার বাংলাদেশের বিনা ভোটের নির্বাচনকে ভারত প্রকাশ্যে সদর্পে সমর্থন দিয়েছিল আর তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এত ঘনিষ্ঠতায় মিলে গেছিল যে, তারা কেউই আর যেন আমেরিকাকে চেনেই না। বাংলাদেশে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ডন মোজিনা, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নিজের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ব্রিফিং না পেয়ে বা না নিয়ে ভারতে গেছিলেন – এই ব্যাপারটা খুবই প্রতীকী নিঃসন্দেহে!

বাস্তবতা হল, আমেরিকা এখন নিজের সব মুরোদই হারিয়েছে। চীন ঠেকানোর যে কাজ ভারতকে দিয়ে করানোর বিনিময় হিসেবে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে দেখার দায় তুলে দিয়েছিল, তাতে কি চীনের উত্থান ঠেকানো গেছে? প্রশ্নই উঠে না কারণ এভাবে তা হয় না।  তাই আমেরিকা তা ঠেকাতে পারেনি। কোন দাগও ফেলতে পারেনি, আমাদেরকে কষ্ট-দুর্দশায় ফেলা ছাড়া। বরং নিজেরই বেগতিক অবস্থায় আর দুর্দিনে আমেরিকা এক “পাগলা প্রেসিডেন্ট” পেয়েছে, যিনি নিজেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতাগিরি ছেড়ে দিতে চান। তিনি নাকি ন্যাশনালিস্ট আমেরিকান! কী তামাশা! গ্লোবালাইজেশনের নেতা আমেরিকা, যে দুনিয়াটাকে অন্তত ৩০ বছর ধরে একটা গ্লোবালাইজড শ্রমবিভাজিত এক গ্লোবাল অর্থনীতিতে নিয়ে গিয়েছে, সেই আমেরিকার পাগলা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, উনি এখন নাকি ‘ন্যাশনালিস্ট’, সবকিছু “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে ফরে সাজিয়ে ফেলবেন বা হয়ে যাবেন। যেন বুড়া বয়সে বিড়াল বলছে সে আর মাছ খাবে না।

কিন্তু ঘটনার কঠিন সত্য দিকটা হল, আমরা কেউই মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে পারি না, পারব না।  এটা সম্ভব নয়। তাই এর চিন্তাই করি না। কিন্তু এই গোয়াড় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন এটাও নাকি করা সম্ভব। ব্যাপারটা এমনই নাকি সহজ। আসলে পাগলামি আর দেশ চালানো তো এক জিনিস নয়। তাতে আমাদের অসুবিধা নেই; কিন্তু যারা বাংলাদেশে আমেরিকান স্বার্থের দেখভাল করে সেই “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা” তাদেরকে আবার তৎপর হতে আর বড়ই পেরেশান দেখাচ্ছে। সমস্যাটা মূলত তাদের। মনে হচ্ছে তাঁরা এটা বুঝতে বা এই বাস্তবতা মানতে চাচ্ছেন না।

অন্য রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করা ন্যায় কিনা কথা সেটা না। সে প্রশ্ন পাশে ফেলে রেখে আগালে এসব ব্যাপারে প্রথম দেখা প্রয়োজন হয় মুরোদ আছে কী না। কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকা মুরোদহীন। অর্থাৎ তিনি আমেরিকাকে মুরোদহীন করে ফেলেছেন অথবা আমেরিকা যে মুরোদহীন এটা মেনে নিয়েছেন। এখন ‘মুরোদহীন’ হলে আর সে তো মরদ থাকে না। তাই আমেরিকার মরদগিরি শেষ। ভারতকে বাংলাদেশ দিয়ে দেয়ার পর থেকে ঘটনাচক্রে আমেরিকাও এই মুরোদহীন হয়ে যায়, ট্রাম্পের উত্থানের মধ্য দিয়ে। তাই, ইতিহাসে ২০০৭ সালই সম্ভবত বাংলাদেশে ‘সর্বশেষ আমেরিকান হস্তক্ষেপ’ বলে উল্লেখ থাকবে। অন্তত ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, মানে ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত আমেরিকা এমন থাকবে – অভিমুখ, ঝোঁক তাই বলছে। ২০২১ সালে (মানে ২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে) কে প্রেসিডেন্ট হিসাবে জিতে বসবে – ডেমোক্রাট না রিপাবলিকান, এছাড়া আবার সে কেমন প্রেসিডেন্ট হবে – এগুলো হাজারটা শর্তের “যদি-না-কিন্তু” এর প্রশ্ন। এককথায় বিষয়টা এখন পুরাটাই অনিশ্চিত। আর ততদিনে আমেরিকার আগের মতন বাস্তব হস্তক্ষেপের মুরোদই থাকবে না, তা না হলেও তা আরও কমে যাবে। বাস্তবতাই থাকবে না হয়ত। অতএব, বাংলাদেশের “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকান” – আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কিছুই হচ্ছে না। পারছেন না। আমরা জানি নভেম্বর ২০১৮ জেমস মাতিসের [Mattis] পদত্যাগ আপনাদের সব আশার বাতি নিভিয়ে দিয়েছে, আপনারা অনেক দুঃখ পেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হল আসলে সেটাই শেষ।  মনে রাখতে পারেন – ট্রাম্প যতদিন অফিসে আছে তিনি সবকিছু ফ্রিজ করে দিবেন। এই সময়ের মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগন ইত্যাদি যেখানেই যা কিছু নড়াচড়া শুরু হোক না কেন, সেসব হোয়াইট হাউজে যাওয়া মাত্রই ‘আমেরিকান স্বার্থের’ সবচেয়ে ‘ভালো ভালো উদ্যোগ ও প্রস্তাব’ তা যত ভালই হোক না কেন – এসবই ডিপ ফ্রিজে চলে যাবে। কারণ, পুরনো অভ্যাসে “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকার”  এসব তৎপরতার প্রতি ট্রাম্প ন্যূনতম আগ্রহী নন। এখান থেকেই এটাকে ‘মুরোদহীনতা’র শুরুও বলতে পারেন। কাজেই দিন শেষ!

আসলে ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ যারা তাঁরা সম্ভবত আসলে খেয়ালই করেননি যে ২০০৭ সালেই তাদেরকে অসত্য বলা হয়েছিল। ‘ওয়ার অন টেরর’-এর ভয়াবহতার কথা তুলে তা সামনে রেখে এর আড়ালে আমেরিকা ‘চীন ঠেকানোর প্রায়রিটি’তে মেতে উঠেছিল। ভারতের হাতে সব তুলে দিয়েছে অথচ বাংলাদেশের বন্ধুদেরই তা বলেনি। আর বাংলাদেশের বন্ধুরা যদি জানতেনই তাহলে তারা বিশ্বাসঘাতক ও আত্মঘাতি। তবে তাদের শান্ত্বনা এই যে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এসে আমেরিকার পক্ষে আর সত্য লুকায়ে রাখা সম্ভব হয় নাই।  ‘ওয়ার অন টেরর’ যে আর আমেরিকার প্রায়রিটি নয়, সে তা আর লুকিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস মাতিস এই সময়ে এসে আর না লুকিয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছেন [Mattis: US national security focus no longer terrorism]। এটা ২০১৮ সালের শুরুতে ১৯ জানুয়ারি বিবিসির সংবাদ শিরোনাম। মাতিস বলছেন, “টেররিজম নয়, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা আমেরিকার জন্য প্রধান হুমকি”। অথচ এই কথাটাই ২০০৭ সাল থেকেই তাদের মনের কথা। কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে সিদ্ধান্তের সময় থেকেই সব স্তরে তা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মুল কারণ দুনিয়াতে চীনা উত্থান অনিবার্যভাবে আসন্ন – সেকথা তারা তখনই গবেষণা সার্ভে ও স্টাডির রিপোর্ট প্রকাশের প্রাক-কাল অবস্থা থেকেই তা নিশ্চিত হয়ে গেছিল। আনুষ্ঠানিক এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে।

এই বিকল্প ডেভেলবমেন্টগুলো ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ এরা আমল করেছিলেন বা করতে সক্ষম ছিলেন তা তাদের কারবার ততপরতা দেখে কখনও মনে হয় নাই। কিন্তু এতে আসলে যা মূল জিনিষটা বদলে গেছে, বিশেষ করে খোদ ‘ফ্রেন্ডস’ শব্দটিরই সংজ্ঞা বদল হয়ে গেছে ট্রাম্পের হাতে, সেটাই কেউ আমল করেছে মনে হয় নাই। ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান – তাঁর পরিচলন নীতিটাই আসলে বলে দিয়েছে, প্রশ্ন তুলে দিয়েছে যে – আদৌ আমেরিকার কোনো ফ্রেন্ড দরকার আছে কি না? ট্রাম্প নিজেই জবাব দিয়েছেন, যে দরকার নাই। আর যদি থাকেও, তারা ভিন্ন কেউ; অথবা বাংলাদেশে তার এমন ফ্রেন্ড আর লাগবে না। ট্রাম্প নিশ্চয় সরাসরি এ কথা বলেননি, তবে তাঁর অনুসৃত নীতি (ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্প বা ট্রাম্পের নাশনালিজম) এই মেসেজটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে।

বাংলাদেশে আমেরিকান বন্ধুদের (Friends of America, in Bangladesh) বাংলাদেশকেই সবকিছুর জন্য দোষী ঠাউরানো – অস্বাভাবিক বা নতুন না। এটাই তারা সবসময় করে এসেছেন। যেমন এভাবে অনেকে এখনও বলছেন যে, ভাল ভাল “গণতান্ত্রিক দেশে”  তাদের পররাষ্ট্রনীতি নাকি “জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে” সমর্থিত ও সমৃদ্ধ থাকে বলে, পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ তারা সহজেই মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু আমরা দুর্ভাগা; সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি। আবার প্রথম আলো পত্রিকা যে রিপোর্ট করছে তাতেও দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় প্যারায় তারাও লিখেছে এভাবে – “আলোচনায় প্রায় সব বক্তা অভিমত প্রকাশ করেন, যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হল সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য সুদৃঢ় না হলে সেটি অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিরোধী দলে থাকতে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘সার্বভৌমত্ব’ বিকিয়ে দেয়ার অভিযোগ করে থাকে, যা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে পররাষ্ট্রনীতিও অনেকটা বদলে যায় বলে জনমনে ধারণা আছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সুশাসনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক আলোচক”। অর্থাৎ সার কথা আমেরিকার কোন দোষ নাই। সব আমাদের দুই দলের রেষারেষির কারণে, তাই সবদোষ আমাদেরই।

বিইআই ও আইআরআই-এর আলোচনা সভায় আমাদের রাজনৈতিক দলের ওপর সব দায় চাপিয়ে এমন মন্তব্য খুবই অনুচিত ও অবিচার তা বলাই বাহুল্য। কারণ, ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও অবস্থানের ব্যাপার কমবেশি সবই আপনারা তো জানেন। আমাদের রাজনৈতিক দলের বিবাদ আছে কথা সত্য, ফলে তা অনেক কারণের একটা । কিন্তু তা থাকলেও সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী কারণ তো – আমেরিকার হস্তক্ষেপ।

ঠিক আছে তাহলে আসেন, আপনাদের বক্তব্যকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়া ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ, আপনাদের বক্তব্যের দুদিন পরেই। ভেঙ্গে বললে, একটা বড় ঘটনাই ঘটেছে। সম্ভবত বলা যায় যে চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে আমাদের সম্মিলিত বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এটাই এই প্রথম আমরা প্রধান দলগুলো একটা সফল এককাট্টা অবস্থান প্রকাশ করেছে।

তাহলে ঠিক এখনই আপনাদের নড়াচড়া কেন?
সম্প্রতি চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এই প্রথম প্রধান দলগুলো একটা সফল অভিন্ন অবস্থান প্রকাশ করেছে। আর এটা তারা করেছে ভারতের এব্যাপারে অবস্থান যাই হোক না কেন – এই প্রথম এটা ধরে নিয়ে। “গত ১৯ মে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘বাংলাদেশ চীন সিল্ক রোড ফোরাম’ গঠন করেছেন”। বেশির ভাগ পত্রিকার হেডিং এটাই। এর বেশির ভাগ কৃতিত্ব হয়ত বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদুতের – তা যারই হোক, এ ঘটনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভি, ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং জুয়ো -এদের উপস্থিতিতে সহায়ক সে কমিটি করা হয়েছে সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানসহ অনেকে এর সদস্য হয়েছেন। মঈন খান বক্তৃতায় করেছেন। ওদিকে ড. গওহর রিজভী [Gowher Rizvi] ঐ সভায় দাবি করেছেন যে, “ভারত নিজেই এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করছে”।

এই কথাটার বাস্তবতা অবশ্যই আছে। তবু বাস্তবতা যতটুকুই থাক একেবারে মাঠের ফ্যাক্টস হল, এই গতকাল ১ জুন ২০১৯ ব্লুমবার্গ রিপোর্ট লিখেছে যে ট্রাম্প চীন ঠেকানোর ঠিকাদারিসহ  ভারতের সাথে কোন খাতিরের সম্পর্কই করতে চান না। সবকিছুর মাথা মুড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। কাগজ কলমে ভারত সুবিধাদিগুলো উপভোগ করত কারণ, ভারত আমেরিকার বিবেচনায় একটা উন্নয়নশীল দেশ [Developing Nation] ঘোষণা করা ছিল বলে। এখন ট্রাম্প সেটার মাথা মুড়িয়ে দিয়েছে, বলছে Trump Ends India’s Trade Designation as a Developing Nation.। এমনিতেই আগের ভারতকে দেয়া সবসুবিধা ( যা চীন ঠেকানোর বুটি হিসাবে ওবামা দিয়েছিল) ট্রাম্পের আমেরিকা বন্ধ করে দিয়েছিল গত বছর ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। শুধু তাই না উলটা ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক ট্যারিফ বসিয়ে দিয়েছিল যাতে রপ্তানিই অকার্যকর হয়ে যায়।

কাজেই ভারত এখনও আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর খেপ মারতে” পুরানো শর্ত রাজি থাকলেও খোদ ট্রাম্প বাবাজিরই “মন” নাই। নট ইন্টারেস্টেড। এই ফ্যাক্টসটা আমল করলে বাংলাদেশের ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ এদের সব ততপরতাই পন্ডশ্রম। ওদিকে খেয়াল করলেই আমরা নিজেরাও বুঝব যে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলতে চীন গত বছর থেকেই পুরাপুরি তৈরি – এবং তা বাস্তবায়িতই হয়ে গেছে। এর প্রমাণ সফল  য়ুহান সম্মেলন (Wuhan Summit)। এমনকি এবছরও সম্ভবত পরের মাসে দ্বিতীয় য়ুহান সম্মেলন হতে চলেছে। এসব ততপরতার সার কথাটা হল এবার হয় ভারত চীনা শুধু বেল্ট ও রোড প্রকল্পেই না খোদ চীনা নৌকাতেই উঠবে। যদি কোন কারণে না উঠতে পারে, বনাবনি না হয় তবে পরস্পর কঠিন শত্রুতার দিন শুরু হবে। সুতরাং  নিঃসন্দেহে ভারত অনেক দাম চাইবে। যা তার দাম নয় এর চেয়েও বেশি হবে হয়ত সেই প্রাথমিক “asking price” । কিন্তু চীনা স্বার্থের চেয়েও বেশি এমন অসম্ভব অবাস্তব কিছু না চাইলে এই ডিল হবার সমূহ সম্ভাবনা। বিশেষ করে দুটা ফ্যাক্টস এর পটভুমিতে একথা বিবেচনা করা যায়। এক. চীন-আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধ মিটিয়ে নিবার ডিল ব্যর্থ হয়ে গেছে যা, এখন পরবর্তি ঝড়ের অপেক্ষায় যা এখন আসন্ন। আর দুই. ভারত শত চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের কোন ডিল, কোন “খেপ” পাবার কিছুই নাই, কোন অফারও নাই। বরং পুরা উপেক্ষা আছে। ভারত চীনের কোলে গিয়ে উঠে বসলেও যেন ট্রাম্পের তা নিয়ে কোন পরোয়া নাই। ভারতকে এমনই তাচ্ছিল্যের মুডে আছেন ট্রাম্প। যার মূল কারণ হল, ট্রাম্প তার এখন প্রধান লক্ষ্য হল দ্বিতীয় বার নির্বাচনে দাঁড়ানো – এই মুডেই তিনি আছেন। আর তাই যা কিছু সিদ্ধান্ত তিনি এখন নিচ্ছেন তা সে উদ্দেশ্যেই প্রভাবিত। চীনের সাথে বিরোধ মিটিয়ে কোন বাণিজ্য ডিল না করা অথবা ভারতকে কোন বিশেষ সুবিধা না দেওয়া ইত্যাদি এমন সবই একারণে তুচ্ছ ট্রাম্পের কাছে। বরং তিনি বীর, তিনি আমেরিকান ন্যাশনালিস্ট – এই পরিচয় গড়তে তিনি একমাত্র ব্যস্ত যা দিয়ে তিনি নির্বাচন লড়বেন। যদি না আবার ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হন!

কাজেই ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ, আপনাদের উচিত হবে বাস্তববাদী হওয়ার, সময় পার হয়ে যাচ্ছে। পন্ডশ্রম অর্থহীন। বরং ফ্রেন্ডশীপ রিনিউ বা চেক করে দেখতে পারেন – তা এখনও বহাল আছে কী না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutam.das@gmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০১ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) পররাষ্ট্রনীতি আমেরিকার বন্ধুদের নজরে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

গৌতম দাস

১৩ মে ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2Ae

 

চীনের মেগা অবকাঠামো প্রকল্প – বেল্ট ও রোডের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাসের ২৫-২৭ এপ্রিল। আর সেই সম্মেলনের পাঁচ দিন আগে, ২০ এপ্রিল সম্মেলন সম্পর্কে মানুষকে জানান দিতে ঢাকার চীনা দূতাবাস প্রচ্ছন্ন থেকে এক স্বাগত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এটাকে বলা যায় চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্পের পক্ষে এক প্রচারণার অনুষ্ঠান। “দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড” – এই নামে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এক ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হবে এক থিঙ্কট্যাঙ্কের আয়োজনে – এই বার্তা পৌঁছে দেয়া ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। আর সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। সাথে সেখানে আরও অনেকের মধ্যে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছিলেন ঢাকায় চীনা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স চেন উয়ি (Chen Wei )।

সেখানে প্রধান অতিথি গওহর রিজভীর যে বক্তব্যে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম করা হয়েছে সেটা হল, তিনি বলেছেন – চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ ‘ফিটস ইনটু আওয়ার ন্যাশনাল প্রায়োরিটি’ [as it ‘fits into our national priorities’…]। সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া ফাউন্ডেশন (Center for East Asia Foundation (CEAF) ) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। বেশির ভাগ বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা বিডিনিউজ২৪ পত্রিকা অনুসরণে রিপোর্টটি করেছিল, তাকে রেফার করে অথবা না করে। সম্ভবত সে কারণে অনেকেরই খবরের কমন শিরোনাম হল, গওহর রিজভী বলেছেন, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের সাথে একদম ফিট করে [China’s Belt and Road fits into Bangladesh’s priority: Gowher Rizvi]। আর বিডিনিউজের রিপোর্টের ছবিটাই একমাত্র ছবি দেখা যাচ্ছে যা কিছু ইংরেজি দৈনিকেও ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবত বিডিনিউজের ছবিটাই সেটা। তাই, এক মানবজমিন ছাড়া অন্য সব বাংলা পত্রিকা কোনো ছবি ছাড়াই রিপোর্টটা করেছে। সবচেয়ে ভাল ট্রিটমেন্ট দেয়া নিউজ করেছে মানবজমিনে। আর এরপরের ভাল ট্রিটমেন্ট হল, বণিকবার্তারটা এখানে।  এমনকি চীনের পপুলার সরকারি পত্রিকাও শিনহুয়াও (Xinhua) গওহর রিজভিকে হাইলাইট করেই রিপোর্টটা কাভার করেছে।

গওহর রিজভী সেখানে আরও বলেছেন, “আমাদের নিজেদের বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর, ) আছে, যেটা আসলে চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগেরই সংক্ষিপ্ত ভার্সন [ “We had our own BCIM (Bangladesh, China, India and Myanmar Economic Corridor) which is essentially a reduced version of the Belt and Road Initiative,”]। বণিকবার্তা আরও জানাচ্ছে – গওহর রিজভী বলেন, “বাংলাদেশ এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে গর্বিত। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও উদ্যোগের মডেল”।

এ ছাড়া সেখানে, গওহর রিজভি আর এক বিশাল দাবি করেছেন। তিনি চীন ও ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তার বৈদেশিক সম্পর্কগুলো সামলানোর দিক থেকে খুবই সফল” [“Bangladesh is extremely successful in managing its foreign relations,” added Gowher.] কিন্তু কিভাবে সেটা? তিনি বলছেন, আমরা “কোনো দিকে কোনো পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলি” বলেই আমাদের এই সফলতা ; [“It has always avoided taking sides,”]।
খুবই ভাল আর গর্বের কথা বটে। কিন্তু আসলেই কী তাই!

গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলপ্রকাশ ও নতুন সরকার গঠনের পরপরই আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০ জানুয়ারি ভারতীয় ‘সিএনএন-নিউজ১৮’ টিভিকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে এবং সুনির্দিষ্ট করে বিসিআইএম প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার কথা ভারতকে জানানো তো বটেই, উল্টো ভারতকেও আহ্বান করেছিলেন, যাতে দ্বিধা-আপত্তি ফেলে তারাও এতে যোগ দেন। বলেছিলেন “বিসিআইএম প্রকল্প স্বাক্ষরের পর আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই” [“After signing that agreement, I think there is no reason to worry about the corridor for India,” ]। আর ‘ভয় পাওয়ার কোনো ইস্যু থাকলে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয়ভাবে’ (বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে) কথা বলে তা মিটিয়ে নিতে পারে ভারত। হাসিনার এই সাক্ষাৎকারের আলোকে দেখলে গওহর রিজভীর গতমাসের এই বক্তব্য এরই ধারাবাহিকতা মনে হবে।

রিজভীর এই বক্তৃতা ২০ এপ্রিলের। বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলন ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা। তাই এমনকি রিজভী ওই সভায় জানিয়েছিলেন, আমাদের শিল্পমন্ত্রী দ্বিতীয় সম্মেলনে বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। সব ঠিকঠাক, কিন্তু একটা ‘কিন্তু’। কোথায় গেল গওহর রিজভির “কারও কোন পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলির” – কূটনীতিক সাফল্য?

এর ঠিক তিন দিন পর, ২৩ এপ্রিল মানে চীনে মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনের দুই দিন আগে  – আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের হঠাত এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয় হংকংয়ের দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে। এর শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে” [Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans as it seeks to fund future development]।’
তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? যে মেগা প্রকল্পকে বাংলাদেশ ‘স্বাগত জানায়’, আমাদের “প্রায়োরিটির সাথে যা খাপে খাপে মিলে গেছে” বলে দাবি করি, আমরা যার “অংশ হতে পেরে গর্বিত”, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ‘সাকসেস স্টোরি’, ইত্যাদি কথা বললেন গওহর রিজভী দুই দিন আগে, সেসব বয়ান এবার উল্টো রথে গেল কেমন করে? আর  পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তিনিইবা কেন এবং কিভাবে বলছেন, বাংলাদেশ ‘চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে?’ এমনকি যেখানে ওই ২৩ এপ্রিলই আমাদের শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ন বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের সম্মেলনে যোগ দিতে চীন রওনা হয়েছেন! আসলেই এটা সত্যিই এক বিরাট তামাশা যে, মানুষ যা নিয়ে “গর্ব করে” তারই আবার “বিকল্প খোঁজে” কিভাবে এবং কেন?

এরপর থেকে সব সুনসান, শিল্পমন্ত্রীও চীন থেকে ফিরে এসেছেন। মনে হচ্ছে চুপচাপ থাকছেন। কারণ, মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো রিপোর্ট প্রচারিত হয়নি। ভারত আগের মতোই, তারা এবারের বেল্ট ও রোড মেগাপ্রকল্পের এবারের সম্মেলনেও নাই। যদিও ভারতের মিডিয়ার পাল্টা প্রপাগান্ডা আছে। যেমন ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা রিপোর্ট করেছিল, তারা খুব খুশি যে, “বিসিআইএম প্রকল্প নাকি এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনে বাদ” [China drops BCIM from BRI projects’ list] দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সে সময়ের ‘আবহাওয়া’ ভারতের দখলে, অন্তত ৮ মের আগ পর্যন্ত। ওই আবহাওয়ার ভারতীয় মেসেজ ছিল এমন যেন বলতে চাচ্ছিল – বাংলাদেশ বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে “অগ্রাধিকার খুঁজে পেয়ে” বা এতে “গর্বিত” হয়ে বা ভারতকে এ প্রকল্পে যোগ দিতে “ভয় নেই” বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘আহ্বান রেখে’ যেন বিরাট অন্যায় করে ফেলেছেন। তাহলে আসলেই কি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আমরা কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলতে পেরেছি, নাকি ভারতের আপত্তির ভয়ে সিটকে গেছিলাম? কিন্তু কেন?

ক্ষমতা কেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে না যে সেই ক্ষমতাঃ
কথা এটা নয় যে, বর্তমান সরকার বৈধ কি অবৈধ, নির্বাচিত প্রতিনিধি কিংবা নয়, সুষ্ঠু ভোট হয়েছে কি হয়নি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন, এটাই বাস্তব। তার হাতেই ক্ষমতা আছে। তিনিই ডি-ফ্যাক্টোভাবে ক্ষমতায় আছেন। মানে, পদ-অধিকারী হিসেবেই তিনি ক্ষমতায় আছেন। তিনিই ক্ষমতাসীন এবং প্রধানমন্ত্রী। ফলে নিজ ক্ষমতায় অবিশ্বাস করার কী আছে? কিন্তু খোদ ক্ষমতা যখন বিশ্বাস করতে পারে না যে সেই ক্ষমতা বা তার কাছেই ক্ষমতা তখন – এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!

গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে আর একটা বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, ভারতের সমর্থন ছাড়াই এই সরকার একটা নির্বাচন পেরিয়ে নিজেকে পুনর্নির্বাচিত করাতে পারে। তখন থেকে এটা দাঁড়িয়েছে যে, ভারতের সমর্থন পাওয়া কথাটা আসলে ফেটিশ, ভুতুড়ে! কোন মানে নাই, অর্থহীন। তাতে বাংলাদেশে ওই নির্বাচনের কোয়ালিটি যেমন হোক না কেন, তাহলে ক্ষমতা কেন বুঝতে পারে না যে, সে-ই বাস্তবে ক্ষমতায়?

ধন্যবাদ দিতে হয় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূতকে। তিনি আমাদের ‘উদ্ধার’ করেছেন। আমাদের মিডিয়ার মুখে কিছু শব্দ দিয়েছেন। তিনি বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের গত ২৫-২৭ এপ্রিলের দ্বিতীয় সম্মেলনের সফল সমাপ্তিতে গত ৮ মে ঢাকায় মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছিলেন। তিনিই সদর্পে আমাদের জানালেন, বিসিআইএম প্রকল্প বহাল তবিয়তে আছে। শুধু তাই নয়, তিনি আশা করেন ভারতও এতে যোগ দেবে (‘হোপ ইন্ডিয়া উড বি পার্ট’)। আর এতে যেন বুঝিয়ে দিলেন, আমাদের সরকারের নিজের থেকে নিজের ‘মুখ লুকিয়ে রাখা’র কিছু নেই।

আচ্ছা, আগামীতে ভারত চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে যে যোগ দিবে না, এর নিশ্চয়তা কী? কোথায়, কে দিতে পারে? কেউ কী পারে? তাহলে? আমরা কার কেন, ধমকানি শুনছি কী?

আমরা কি জেনে অথবা না জেনে ভারতের পক্ষে ভাঁড় ও ভার হয়ে দাঁড়াতে চাইছি, যাতে মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার বিনিময়ে ভারত চীনের থেকে বিশাল বার্গেনিং সুবিধা লাভ করতে পারে? কিন্তু এতে আমাদের কী লাভ? আর ভারত নিজের লাভের পোটলা বাধ হয়ে গেলে আমাদের জন্য কী কোন অপেক্ষা করবে, চিন্তিত হবে? আমরা কী পেলাম তা জানার কী ভারতের কোন আগ্রহ থাকবে? নাকি থাকতে পারার কথা! নাকি নিজের পথে হাটা দিবে? এগুলো আমাদের না বুঝতে পারার তো কিছু নাই।

তাহলে ক্ষমতা কেন বিশ্বাস করতে পারে না যে সে-ই ক্ষমতা!

গত ৮ চীনা রাষ্ট্রদূতের সংবাদ সম্মেলনের ইস্যু মিডিয়ায় কিছুটা তোলপাড় তুলেছে। ৯ মের আগে বাংলাদেশে কোনো মিডিয়া এই সম্মেলনের কাভার রিপোর্ট ছাপেনি। আর পরের দিন ১০ মে দুপুরেই কলকাতার আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ামূলক রিপোর্ট তোলপাড় এনেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে- আনন্দবাজারের রিডিং হল, চীনা রাষ্ট্রদূত বিসিআইএম প্রকল্পকে এবার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে পেঁচিয়ে তুলে ধরছেন। ব্যাপারটা নাকি এখন চীনের ‘অর্থনৈতিক করিডোরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে তাকে যুক্ত’ করে পদক্ষেপ নেয়া হলো। এর ফলে ‘যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না’।

হ্যাঁ কথা সত্য, রোহিঙ্গা ইস্যু আর বিসিআইএম ইস্যুকে তিনি জড়িয়েছেন। কিন্তু এমন কথা তো নতুন নয়। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিনিয়োগসহ ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা শুরু করা গেলে সেটাই হবে রোহিঙ্গা সমস্যার ভালো সমাধান – চীনা রাষ্ট্রদূত এ কথাই বলেছেন। ঠিক যেমন অনেক প্রগতিবাদী বলেন ও ব্যাখ্যা দেন যে, আলকায়েদা বা আইএস তৎপরতা বৃদ্ধির কারণ অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা। ফলে তরুণেরা কাজকাম পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তরুণেরা আর আলকায়েদা বা আইএস করবে না”।’ এমন যুক্তি দেওয়ার অনেক লোকই আছে। তা থাক। চীনের রাষ্ট্রদূতও দিয়েছেন, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। বরং এ বক্তব্যকে স্বাগত। কারণ, ভারত যদি একমাত্র এমন বয়ানে ভয় পেয়ে থাকে কিংবা তার কানে পানি ঢোকে কিংবা এই বয়ানে ভয় পেয়েছে বলে ভারত এটাকে অছিলা হিসেবে ব্যবহার করে, মোটা দাঁও মেরে চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আপত্তি করার কী আছে? কিছু নেই।

এ ছাড়া আর একটা অর্থে আমরা রাষ্ট্রদূতের কথা বুঝতে ও গ্রহণ করতেই পারি। বিসিআইএম প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করা হয়েছে দেখতে চাইলে এর আগেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে, মানে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে কোনো টেনশন নেই, এটা অবশ্যই দেখতে পেতে হবে। মিয়ানমারের সাথে টেনশন ও অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকবে; অথচ পাশাপাশি বিসিআইএম প্রকল্প বাস্তব দেখতে চাইছি, এমন তো হতেই পারে না। ফলে রোহিঙ্গা ও বিসিআইএম একসাথে যুক্ত হয়ে থাকারই ইস্যু। তা ভারত বা আনন্দবাজার যেভাবেই বুঝুক।

তবে প্রথমত আনন্দবাজারের ওই রিপোর্টকে পড়তে হবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ইনফরমাল প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কারণ পেছনের কাহিনী সাধারণত এমন হয় যে, আনন্দবাজার ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য জানার পর তা নিয়ে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারো কাছে গেলে তাঁরা আনন্দবাজারকে “এমন রিপোর্ট করতে পারে” বলে সায় জানিয়েছে – এরকমই কিছু একটা হয়েছে বলে মনে করা যায়। কারণ “কারো” সাথে কথা না বলে এমন রিপোর্ট সাধারণত করা হয় না, এটা নিশ্চিত থাকতে পারি। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রণালয় এমন গুড মুডে কেন যে, এমন চীনাপ্রীতি বা সহানুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে আনন্দবাজারের রিপোর্টে? এটাই আসল বিষয়। কারণ আসলে, ‘মুড কুছ এইসাই চলতা হ্যায়’ আজকাল।

সংক্ষেপে মূলকথাগুলো হল – ইইউকে চীন নিজের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে গিয়ে পশ্চিমের নেয়া বা গ্লোবাল প্রকল্পে সেসব “স্ট্যান্ডার্ড প্রাকটিস” অনুসরণ করা হয় সেগুলোকেই চীনও অনুসরণ করতে রাজি হয়ে যায়, যেটা চীন-ইইউর গত মাসের সামিট থেকে প্রকাশিত তাদের “যৌথ ঘোষণায়” ঠাঁই পেয়েছে। ঠিক একই ইস্যুগুলো একমত হয়ে চীন ও সম্মেলনের রাষ্ট্র-সরকার প্রধানদের এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাতেও তুলে এনে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে চীনের বিরুদ্ধে ‘ঋণফাঁদ’ প্রপাগান্ডার সুযোগ অচিরেই বাস্তবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, নীতিগত দিকটি ইতোমধ্যে চীনের কাছে এগুলো গৃহীত। এরই লেজ ধরে এবার চীন এগিয়েছে। ভারতকেও নিজের মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে পরিকল্পনা করেছে। তা করতে গিয়ে চীন ভারতের জন্যও এক পুরা প্যাকেজ নিয়ে তৈরি হয়েছে। এর প্রাথমিক দিক ইতোমধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব গোখলের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের আগেই ২১-২২ এপ্রিল গোখলের সেই চীন সফর ঘটে গেছে। কিন্তু যতই গুরুত্বের ছিল এই সফর, গোখলেরা ততই এটাকে একেবারে অগুরুত্বপূর্ণ, ‘রুটিন’ সফর বলে প্রচার করে রেখেছেন। ভারতীয় থিঙ্কট্যাংক ওআরএফ এর মনোজ যোশীও তার লেখায় ব্যাপারটাকে “খুবই রুটিন” বলে ঢেকে দিতে চেয়েছেন। তবুও ঐ প্যাকেজের দু’টি বিষয় প্রকাশিত হয়ে গেছে বা করা হয়েছে। কাশ্মীর বিচ্ছিন্নতাবাদী মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের তালিকায় তুলতে চীনের আপত্তি প্রত্যাহার আর ভারতের সাথে বিতর্কিত বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা যা এতদিন চীনের অংশ বলে চীনের ম্যাপে দেখানো হইয়েছে সেসবের অনেক কিছু, তা এখন থেকে প্রত্যাহার। দু’টিই মূলত চীন-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এক আন্ডারস্টান্ডিংয়ের অংশ। যে কারণে এ দুই ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক। তবে মোদী আজহারসহ দু’টি ইস্যুকে চলতি নির্বাচনে নিজের সাফল্য বলে ব্যবহার করতে চায় – একারণেই  এ দুটা ইস্যু কেবল আগে প্রকাশিত হয়ে গেছে।

আসলে পুরো প্যাকেজ নিয়ে চীন অপেক্ষা করছে – ভারতের নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলেই নতুন সরকারের সাথে চীন আলোচনা ও নেগোশিয়েশন শুরু করতে সে অপেক্ষা করছে। গত বছরের মত সম্ভবত আর এক ভারত-চীন শীর্ষ সামিট – ‘য়ুহান সম্মেলন টু’ থেকে সব কিছু চূড়ান্ত করা হবে বলে গোখলের সাথে প্রাথমিক বোঝাবুঝি হয়েছে। মিডিয়ার অনুমিত রিপোর্টগুলো এরকমই। এরমধ্যে দ্যা হিন্দুর এই রিপোর্টটা ভাল ইনফরমেটিভ। রিপোর্টার অতুল আনিজা চীনে অবস্থিত দ্যা হিন্দুর একমাত্র স্থায়ী প্রতিনিধি। চীনের লক্ষ্য ভারতকে যত দূর অফার করা যায়, এর সর্বোচ্চটা দিয়ে হলেও নিজের মেগা প্রকল্পে ভারতকে শামিল করে নেয়া। এটা এমন অফার হবে যে, ভারত রাজি না হওয়া মানে হবে, বেশি চিপা লেবুর দশা।

এখন খুব সম্ভবত আমরা বুঝে না বুঝে ভারতের ভাঁড় অথবা ভারতপক্ষে বার্গেনিং ভার হতে চাচ্ছি। শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ খোলা এই অপ্রয়োজনীয়  নিজের পিঠে নিজেই ছুরি মারা প্রতিক্রিয়াই ঘটিয়েছি আমরা। ওইদিকে গওহর রিজভীর বক্তব্য- বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে – ‘ভারতের কোলে’ বসে এসব কথা তিনি কেন বলেন? এতে কোন বাহাদুরি হয়? এর সদুত্তর পাওয়া মুশকিল। আমরা যদি শক্তিহীনই হই তো চুপ থাকতে পারতাম, অন্তত! শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ না খুলে কী পারত না? কী ক্ষতি হত? নাকি আমরা কী এতই ঠেকছি যে নিজের ফেলা থুতু চাটতে হয় আমাদেরকে !

চীন-ভারত সম্ভাব্য বার্গেনিং রফায় আমরা ভারতের পক্ষে চীনের বিপরীতে ‘ওজন’ হব কেন? আমরা কেন চীন-ভারত সম্পর্কের উচ্ছিষ্টভোগী অবস্থান বেছে নিবো? চীন ও ভারতের মধ্যে কোনো রফা যদি নাই হয় তবে সেক্ষেত্রে চীনের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক কেন হতে পারবে না? এটাই কি গওহর রিজভীর ‘বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে?’ এর আসল চিত্র? এ বুঝগুলো তারা কাকে দিলেন? দিলেন কেন?

দুঃখের কথা পদ-অধিকারী হয়ে থেকেও ক্ষমতা নিজেকে বিশ্বাস করছে না যে, সে-ই ক্ষমতা। সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য কি আমাদের সেই ক্ষমতাবোধ ফিরে জাগাতে ভূমিকা রাখতে পারবে!

———–মূল লেখা এখানেই সমাপ্তি। ————-


বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে – বিস্তারিত, যাদের পড়বার মত বেশি সময় আছে তাদের জন্যঃ
এখানে “বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে” পাঠককে আবার মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। এটা মূলত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কেন্দ্রিক চারদেশীয় সড়ক ও রেল সংযোগ প্রকল্প। এটা সিঙ্গাপুরের গভীর সমুদ্র বন্দরে মালসামান নামিয়ে এরপর আবার ছোট লাইটার জাহাজে করে তা চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর এনে – এভাবে বাংলাদেশকে মহাসমুদ্র হয়ে বিদেশের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া নয়। তাই, প্রথমত এটা লাইটার জাহাজ আর না বরং মহাসমুদ্রগামী (Ocean Shiping Line) জাহাজ এখানে সরাসরি সোনাদিয়া বন্দরে কনটেইনার নামাবে। এরপর চার দেশ [বাংলাদেশ, চীন (মানে পুর্বচীন কুনমিং-এ), ইন্ডিয়া (পূর্বে কলকাতা) ও মায়ানমার] যার যার কনটেইনার সরাসরি নামিয়ে সহজেই তা নিজ দেশে নিতে পারবে; চাইলে আগের মতই আবার লাইটার জাহাজে অথবা সরাসরি সড়ক বা রেল পথে। এই সড়ক বা রেলপথের রুটটা হল – সোনাদিয়া [কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার অন্তর্গত] থেকে মায়ানমার হয়ে চীনের পুবদিকে কুনমিং-এ পৌছানো। আর ওদিকে ভারত সোনাদিয়া হবু বন্দরে যুক্ত হতে পারে লাইটার জাহাজে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার থেকে। অথবা কলকাতা থেকে যশোর হয়ে সড়ক বা রেল পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কর্ণফুলি টানেল হয়ে সোনাদিয়া বন্দর এভাবে। আসলে এই চারদেশের পুর্বদিকে যার যা জেলা অথবা প্রদেশ তা সবই ল্যান্ডলকড পাহাড়ি ভুমিঅঞ্চলে আবদ্ধ। চীনের পশ্চিম দিক যেমন হিমালয়সহ অন্যান্য পাহাড়ে আবদ্ধ; তেমন ওর দক্ষিণ দিক পুরাটাই আর বিশেষ করে দক্ষিণপুর্ব কোনা এটাই কুনমিং অঞ্চল – এটাও ল্যান্ডলকড। চীনের একমাত্র সেন্টার পুর্বদিকটাই সরাসরি সমুদ্রে উন্মুক্ত। কোন রাষ্ট্রের সমুদ্রে-উন্মুক্ত দিক নাই – তা একটা অঞ্চল নাই অথবা কোন দিকেই নাই এটা সেই রাষ্ট্রকে যোগাযোগ ব্যবসা বাণিজ্যে পিছনে ফেলে রাখবে – এই হল ব্যাপারটা বুঝার সরল ফর্মুলা। তাই এই চার রাষ্ট্রের জন্যই সোনাদিয়া বন্দর হল নিজ নিজ ল্যান্ড লকড অঞ্চলকে সমুদ্রে-উন্মুক্ত করার সুযোগ নেয়া। বিশেষ করে চীন যেমন তার পশ্চিম অঞ্চলকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের বড় সুবিধাভোগী হয়ে নিজেকে “সমুদ্রে-উন্মুক্ত” করার সুযোগ নিয়েছে। ঠিক তেমনি পুবদিকে সে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়ে সমুদ্রে-উন্মুক্ত হতে চাইছে। সোনাদিয়া বন্দরসহ এই বিসিআইএম প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারি ফলে অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হবে চীন; ফলে এর অবকাঠামো ঋণ পরিশোধে বড় রাজস্ব আয় আসবে ব্যবহারকারি চীনের কাছ থেকে।
বাংলাদেশ হবে আর এক বড় সুবিধাভোগী যে সিঙ্গাপুর নির্ভরতা ত্যাগ করতে পারবে। এছাড়া পুরা প্রকল্পের মূল ততপরতা কেন্দ্র নিজভুমিতেই নির্মিত হবে বলে এর সুযোগে নিজ অর্থনীতিকে এক আঞ্চলিক হাব – বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠার সুযোগ পেয়ে যাবে।

ভারতের আসল ল্যান্ডলকড অঞ্চল হল তার নর্থ-ইস্ট; মানে বাংলাদেশের উপরে বা, পুরা উত্তর-জুড়ে আমাদের সুনামগঞ্জ টু পঞ্চগড় এই পুরা পুব-পশ্চিম কোণার উপরে, সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল। [পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল – এরই পুব দিকটা হল মায়ানমারের পশ্চিমে, তার ল্যান্ডলকড অঞ্চল।] ভারতের নর্থ ইস্ট মানে মূলত প্রধান বড় অংশ আসামসহ বাকি ছোট ছোট পাহাড়ি মোট সাত রাজ্য। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তাদের বাংলাদেশের উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে সুক্ত হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কেবল আমাদের উত্তর পশ্চিম কোণে মানে তাদের শিলিগুড়ি চিকন-গলা হয়ে আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে এখন যুক্ত।

আসামের মুল সমস্যা মুসলমান বা বাংলাদেশি মুসলমান এগুলা কিছু না। মূল সমস্যা ল্যান্ডলকড। সমুদ্রে-উন্মুক্ত কোন অঞ্চল বা পথ নাই, এক কলকাতা যাওয়া ছাড়া।
কিন্তু নেহেরু থেকে এপর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসলেই পুরাপুরি দ্বিধাগ্রস্থ যে তাঁরা নর্থ-ইস্টকে ল্যান্ডলকড মুক্ত করতে চায় কী না! তারা একেবারেই নিশ্চিত না যে তারা আসলে কী চায়। এই কথা কিসের ভিত্তিতে বলছি? বলছি কারণ বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান। প্রথমত ভারত “বিসিআইএম প্রকল্প” বলতে যা বুঝে সেটা সোনাদিয়ায় কোন বন্দর ছাড়াই, কেবল চারদেশের সড়ক বা রেল যোগাযোগ প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের নেতৃত্ব কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্টকেই – এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকার সুবিধার আওতায় আনতে দেখতে চায় না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ভারত যতদিন বিসিআইএম প্রকল্পে সক্রিয় ছিল, টেকনিক্যাল বা রাজনৈতিক সভায় অংশ নিয়েছে সেখানে কোথাও ‘বন্দর’ বা ‘সোনাদিয়া’ শব্দ উচ্চারিত হতে দেয় নাই। সেটা ছিল চীনের বেল্ড ও রোড মেগাপ্রকল্প আইডিয়া হিসাবেই হাজির ছিল না। তাতেই বিসিআইএম প্রকল্প বলতে ভারত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর ছাড়াই কেবল চারদেশের সড়ক ও রেলের বাইরে অন্যকিছু আমল করতে চাইত না। পরে বেল্ট ও রোড প্রকল্প গেড়ে বসার পরে এর সাথে বিসিআইএম প্রকল্প যুক্ত করার প্রস্তাব আসাতে এই সুযোগে সবকিছু থেকেই ভারত দূরে থাকার সুবিধা নেয়।অর্থাৎ সোজা কথায় কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকা ভারতের নেতৃত্বের ভারতের স্বার্থের জন্য কোনই দরকারি মনে করে না। বরং বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর নিয়ে লাইটার জাহাজের উপযুক্ত বাংলাদেশের দুই বন্দর ব্যবহার করতে পেলে ভারত আর কিছু দরকার মনে করে না। আসাম বরং ‘বাংলাদেশি কথিত অনুপ্রবেশকারি’, ‘তেলাপোকা’ বা ‘মুসলমান খেদাও’ আন্দোলন করবে – এতেই ভারতের স্বার্থ, ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যত বলে বিশ্বাস করে ভারতের দলগুলো প্রায় সবাই। ভারতের অবস্থান যে ঠিক বুঝিছি আমরা এর আর এক সর্বশেষ প্রমাণের দিতে তাকানো যাক।

আট মে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদুতের সংবাদ সম্মেলনকে নিয়ে কেন ভারত এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আনন্দবাজার সেসব সাফাই জানিয়ে এক পালটা রিপোর্ট করেছে। লিখেছে,

“কূটনীতিকদের মতে, ঘোরতর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিসিআইএম নিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের অসন্তোষ জানাতে পারে না ভারত। কারণ বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে”।

যাক, গত পরশুদিনের আনন্দবাজার ভারতের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের বুঝ ও অনুমান পুরাপুরি সঠিক- তাই নিশ্চিত করল। এর মানে দাড়াল কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ল্যান্ডলকড করেই রাখতে চায়, দমবন্ধ করেই রাখতে চায়। কারণ এরা গভীর সমুদ্রে উন্মুক্ত হয়ে গেলে, অর্থনৈতিক ততপরতা ভাইব্রেন্ট হয়ে গেলে তারা আর ভারতের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। কথাগুলো শুনে মনে হল খামোখা রক্ষণশীল বাবা কথা বলছে যে মেয়েকে স্কুলে দিলে সে ছেলেদের সাথে পালিয়ে যেতে পারে। বলাই বাহুল্য কথিত সেই দুস্ট ছেলে হল চীন!

সেকথাটাও চীন হাট করে খুলেই বলছে। পরিস্কার করেই লিখেছে, বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে” এজন্যই নাকি চীনা বিনিয়োগ না। কেবল জাপান বা সিঙ্গাপুরের নাকবোচা ছেলের সান্নিধ্য অনুমোদিত ছিল গত পাঁচ বছর। বাহ বাহ, ভারত বাপের কী বুদ্ধি!
কিন্তু সরি দুটা ভুল তথ্য আছে এখানে। ভুগোল-বোধের সমস্যা আছে। কলকাতা থেকে ঢাকা পরে সোনাদিয়া বন্দর হয়ে মায়ানমারের উপর দিয়ে চীন যেতে গেলে পথে ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন রাজ্য পড়বে না। সোনাদিয়া হবু বন্দর থেকে চীনের উলটা পথে একমাত্র আমাদের ফেনী বা আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করলে এরপর আসামের নাগাল পাওয়া গেলেও যেতে পারে।অর্থাৎ আনন্দবাজারের কথার তালমাথা নাই। এর সোজা সমাধান হল ভারত বিসিআইএম প্রকল্প থেকেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেই তো পারে। মানে সেক্ষেত্র্বে প্রকল্পের নাম হবে বিসিএম প্রকল্প সোনাদিয়া বন্দর করিডোর প্রকল্প। কিন্তু এটাও ভারত হতে দিতে চায় না। কেন? সেটা কী কোন ঈর্যা জনিত? কেন?
দ্বিতীয় ফ্যাক্টসের গড়মিল হল বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি রামমাধব তাহলে গতবছর চীনে গিয়ে নর্থ-ইস্টের জন্য বিনিয়োগ আনতে দেন-দরবারে করেছিলেন কেন? According to a PTI report, the latest Indian plan was conceived after a ministerial delegation from the northeastern states of Assam, Tripura and Nagaland led by Ram Madhav, a senior leader from the ruling Bharatiya Janata Party (BJP), visited the southern Chinese city of Guangzhou and held talks with both Chinese and Indian businessmen. ভারত মুখে এককথা আর পেটে বা মনে অন্য কথা রেখে দিয়ে আগাতে চায়; ভারতের মিডিয়াও এর থেকে বাইরে নয়।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১১ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

গৌতম দাস

০৬ মে ২০১৯, 0১:৩৬

https://wp.me/p1sCvy-2zV

 

The Second Belt and Road Forum for International Cooperation

চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প, গত ২৫-২৭ এপ্রিল ছিল এবিষয়ে তাদের দ্বিতীয় সম্মেলন বা সামিট। যার পুরা আনুষ্ঠানিক নাম হল “The Second Belt and Road Forum for International Cooperation”, সংক্ষেপে বিআরএফ [BRF]। গত ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটের মত এবারও এটা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বলা হয়, বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আইডিয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের অক্টোবরে কাজাখাস্তানের এক সম্মেলন থেকেই প্রথম হাজির করেছিলেন। সেই থেকে ধরলে গত ছয় বছরে এই মহা প্রকল্পের মুখ্যনাম এক-দু’টা থাকেনি, কয়েকটা হাজির হয়েছে। ঠিক যেমন চলতি এই দ্বিতীয় সম্মেলনে এর নাম দেয়া হয়েছে “বেল্ট ও রোড ফোরাম” বা বিআরএফ। প্রথম সামিটে যেখানে নাম ছিল “বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই।

২০১৭ সালে এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলনকে ডাকা হয়েছিল “বেল্ট রোড সামিট” বলে। সম্ভবত বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন ছিল সেটি, সেদিকটা মুখ্য করতে। ওদিকে জন্মের শুরুতে এর নাম ছিল সিল্ক রোড প্রকল্প, সিল্ক রুট প্রকল্প, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইত্যাদি অনেক কিছু।
আসলে প্রকল্পের আইডিয়া ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টা ছিল খুবই ব্যাপক, যে কারণে এটাকে শুধু প্রকল্প না বলে মহাপ্রকল্প লিখছি। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিষয়টার বহু কিছুই ইভলভিং [evolving] বা ফুলের পাপড়ি খোলার মত বীজ আইডিয়াটা ক্রমান্বয়ে বাস্তব ও স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পে নতুন নতুন মুখ্যনাম বলাতে বিষয়টা একেক সময় একেকটা, এমন অবশ্যই নয়। বরং বলা যায় একই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আনফোল্ডিং [unfolding] মানে ক্রমেই ভাঁজ খুলে নিজেকে পূর্ণ আর স্পষ্ট অবয়বে হাজির করা হয়েছে। আর সেই সাথে অবশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে ক্রমেই নেগোসিয়েশনে বা পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমলে নিয়ে নতুন বোঝাপড়ায় যাওয়া – আর সেই ভিত্তিতে এসবের চুক্তি সম্পন্ন করা। “ক্রমেই ভাঁজ খোলা” বলতে আমরা এটাও বুঝতে পারি।

দুনিয়ায় খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এক অবকাঠামো প্রকল্প, যা কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের। জাতিসঙ্ঘের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৭০-এর বেশি রাষ্ট্র এই প্রকল্পের অংশ হয়ে গেছে বা আনুষ্ঠানিক যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে। আর প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়ে সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ১২৯ রাষ্ট্র। অপর দিকে ওই ৭০ রাষ্ট্র, যারা যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে, এদের বড় অংশই হল এশিয়ান বড় বা উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো, এছাড়া ইদানীং ইউরোপীয় রাষ্ট্রের যোগদান বাড়ছে। তবে এখানে এশিয়া বলতে তা মধ্য-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ – এভাবে বুঝতে হবে, যেখানে এশিয়া ও ইউরোপ সড়ক ও রেল পথে সংযুক্ত হচ্ছে এই মধ্য এশিয়াকে মাঝখানে রেখে।
এই মহাপ্রকল্পের সাথে আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় এমন ২৯ টা সংগঠনও জড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ হল জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতারেস [António Guterres] আর আইএমএফ-এর প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাগার্দে [Christine Lagarde] যারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

এই পর্যন্ত এই মহাপ্রকল্পে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে, যা বছরে ৫.২% করে বেড়ে এমন হয়েছে। এছাড়া BRI এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই সময়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এদিকে চীনের সাথে BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এখনই বাণিজ্য বাজার কেমন তা নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, এটা ইতোমধ্যেই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে আর তা বছরে ৪% হারে বাড়ছে। এমন BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলো সব মিলিয়ে এদের সাথে চীনের বাণিজ্য, এখনই চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ২৭.৪% । অর্থাৎ এটা হেলাফেলা ফিগার হবার কথা নয়। আর বলাই বাহুল্য এই মহাপ্রকল্প যত সম্পন্ন হতে থাকবে এটাই চীনের প্রধান বৈদেশিক বাণিজ্যের রুটখাত হতে থাকবে।

সম্মেলনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন? ২০১৭ সালের প্রথম সম্মেলনে সে সংখ্যাটি ছিল ২৯, আর এবার ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে তা আট বেড়ে হয়েছে ৩৭ জন। মানে এই ৩৭ রাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রপ্রধান নয় তবে, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আবার ইইউর সদস্য এমন রাষ্ট্রপ্রধান যারা এখানে উপস্থিত হয়েছে, এমন রাষ্ট্র ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। ওদিকে কেবল পুর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকেই যোগ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধান ছিল প্রায় ১১ জন। এদের মধ্যে ছিলেন, যেমন পাকিস্তানের ইমরান খান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি অন্যতম। এছাড়া পুর্ব এশিয়ার এবারই প্রথম রাষ্ট্র বা সরকারের যেসব প্রধান যোগ দিয়েছে, এমন দুই রাষ্ট্র হল সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এতে ১০ সদস্যের আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের প্রায় সবাই এবার যোগ দেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড খুবই উল্লেখযোগ্য।

বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পকে বুঝবার সময় এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবেঃ সোভিয়েত যুগের মানে, কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) চিন্তার অভ্যাসে আমাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু ধারণা দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মনে হতে পারে যে, যেখানে নতুন গ্লোবাল নেতা চীনা সেখানে আমেরিকা বা তার জোটের কেউ যোগ দিবেই না। ঠিক যেমন সেকালে সোভিয়েত ব্লকের কোর রাষ্ট্রগুলা আমেরিকা ব্লকের রাষ্ট্রের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন-বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, ঠিক তেমনই একালেও বোধহয় ঘটনাগুলো সে রকম। এমন ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হবে। কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি ও ব্লক ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাবার পর থেকে একালের দুনিয়া সেকালের সাথে পুরাটাই অমিল, তাই বরং মিল খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল হবে।  যেমন একালের চীন-ভারত – এদের স্বার্থবিরোধের শেষ নেই, অথচ তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশাল; এখনই তা ৮০ বিলিয়ন ডলারের, যা ১০০ বিলিয়নের পথে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আবার খোদ চীন-আমেরিকা গত আশির দশকে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই ব্যাপক ঘনিষ্টভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পণ্য ও বাজারে ব্যাপক লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক করে গেছে। কেবল একালেই তারা বাণিজ্যঝগড়ায় হাজির হয়েছে, যা আবার নিরসন মীমাংসারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও চীনে আমেরিকান বিনিয়োগ আগের মতোই চলছে, বাণিজ্যও চলছে এবং তা আকারে এখনও বিপুল যদিও তা চলছে বাধা পেয়ে পেয়ে। এমনকি গত ২০১৭ সালের BRI সম্মেলনে আমেরিকার এক আমলা প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। আর যদিও এবারো এমনভাবেই যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল কিন্তু শেষে কোন কারণে আমেরিকার প্রতিনিধি আসে নাই।
তাহলে এক কথায়, একালের মূল বৈশিষ্ট খেয়াল করতে হবে; তা হল, বাণিজ্যিক লেনদেনের সবসম্পর্ক রেখেই একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রস্বার্থ ইস্যু নিয়েও ঝগড়া চালাবে তারা। এখানে সেকালের মত “ও পুঁজিবাদি, আমি নই”- তাই কোন সম্পর্ক নাই – এসব নাই। আসলে এভাবে মতাদর্শের কথা তুলে এরই আড়ালে উভয় জোটের সদস্য  রাষ্ট্রগুলো রাশিয়া অথবা আমেরিকার ধামাধরা হত – এমন বাস্তবতাই আর নাই। ফলে তেমন কোন ভিত্তি একালে নেই। বরং ব্যাপারটা অনেকটা, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখেই যেমন সন্তানেরা অনেকসময় আরো বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করে, রাগ দেখায় বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, অনেকটা তেমনই। অর্থাৎ মূল কথা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরের নতুন পরিস্থিতিতে এবার সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হল – এবার সব রাষ্ট্রই একমাত্র এবং একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এবং এরই অংশ হয়ে থেকে গেছে। আর এতে রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পণ্য, পুঁজি, বিনিয়োগ, বাজার ইত্যাদি বিনিময়ে জড়িয়ে এক গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু একই সাথে তারা নিজের যার যার স্বার্থের জন্যও লড়ে যাচ্ছে। আবার ক্যাপিটালিজমের বদ খাসলতগুলোর এখন তাহলে কী হয়েছে? এছাড়া সেগুলা কি মিথ্যা ছিল? অবশ্যই নয়। কিন্তু সেসব বদ-খাসলত এখনও বর্তমান হলেও ওর বিরুদ্ধে লড়ার আঙ্গিক, পাটাতন, কায়দা ইত্যাদি সবই এখন বদলে গেছে। তাই লড়াইও চলছে ও চলবেই; এমনকি জোট হয়ে বা আলাদাভাবে লড়ার ধরণ বদল হলেও। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিআরএফের বৈশিষ্ট্য ও অর্জন কী?

কথিত ঋণফাঁদ আর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডঃ
এই সম্মেলনেও এবার এ’দু’টিই মুখ্য ইস্যু হয়েছে। কারণ, শি জিনপিং তাঁর মূলবক্তব্যে নিজেই সোজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর এছাড়া সম্মলনের শেষ দিনে প্রকাশিত ৩৮ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণা [Joint Communique ] থেকেও এই সম্মেলন এ’দুই ইস্যুকে এবার মুখ্য বিষয় করা হয়েছে। চীনা সরকারি মিডিয়া CGTN-এর ভাষায় বললে, এই মহা প্রকল্প নিয়ে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে পশ্চিমারা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, প্রেসিডেন্ট শি সেগুলোরই জবাব দিয়েছেন, যাতে সন্দেহ দূর হয়। [President Xi also responded to Western skepticism about China’s “strategic intentions” behind the landmark initiative. ]  এছাড়া হংকংয়ের SCMP লিখেছে, একটা সুক্ষ-কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট শি চীনের নেয়া প্রকল্পগুলোতে টেকসই ঋণ, পরিবেশ রক্ষা আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা- এ দিকগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [In a subtle shift …, Xi’s pledges over the past two days on debt sustainability, environmental protection and corruption control show Beijing is trying to expand its policy by paying heed to international concerns, according to analysts. এ থেকেই মনে হচ্ছে, তিনি পশ্চিমা সমালোচনা, প্রপাগান্ডা ও উদ্বেগগুলোর দিকে মনোযোগী হতে চাচ্ছেন।

হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকা কিছু এক্সপার্টকে উদ্ধৃত করে আমাদেরকে জানাচ্ছে, তারা মনে করেন, শি-এর এবারের বক্তব্য ছিল খুবই আপসমূলক টোনে। আর খুব সম্ভবত তা আমেরিকা, ভারত, জাপান আর ওদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের কথা মাথায় রেখে করেছেন। [The president’s conciliatory tone during the second Belt and Road Forum in Beijing was apparently aimed at critics in the United States, India, Japan and major European powers such as Germany and France.]

এদিকে বেল্ট-রোড প্রকল্প চীনের একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলার বুদ্ধি, অথবা “ঋণফাঁদের ডিপলোম্যাসি” বলে প্রো-আমেরিকান গবেষক বা একাদেমিকেরা প্রচার প্রপাগান্ডা চালালেও  এক জর্মান থিঙ্কট্যাংক গবেষক, Lucrezia Poggetti, খাড়া কথাটাই বলেছেন এভাবে, “চীনের এমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রতি বিভিন্ন দেশের নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে এতে নেয়া প্রকল্পগুলাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও মানদন্ড বজায় থাকার প্রতি আকাঙ্খাও প্রবল হচ্ছে”। […a research associate at the Mercator Institute for China Studies in Berlin, said that while interest in China’s infrastructure and investment plan was undoubtedly growing, there was an equal desire for the projects it encompassed to abide by international rules and standards.]

ব্যাপারটা হল, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আমরা এখনো আছি। এটাই ডমিনেটিং। আর এতে  তৈরি হওয়া এতদিনের নানান স্ট্যান্ডার্ড  বা মানদন্ডও অবশ্যই তৈরি হয়েছে এবং বহাল আছে। যদিও তা “চরম ভালো মানের বা আদর্শের” এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ব্যাপারে চীনের এত দিনের অবস্থান ছিল এ রকম – যেন চীন নিজেই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর দুনিয়ায় যে স্ট্যান্ডার্ড চালু আছে, তা পশ্চিমা। যেন সে জন্য এটা খারাপ। কিন্তু আসল কথা হল, এ’পর্যন্ত দুনিয়ায় যা কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াতেই হয়েছে ও আছে। আর তা একেবারে চরম মানসম্পন্ন বা আদর্শ- ব্যাপারটা এমন তো নয়, বরং এর খামতির শেষ নেই, তা-ও হয়ত বলা যাবে। কিন্তু এর কোনো মানদণ্ড নেই- এমন ধারণা করা মানে, নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হবে। তাই সারকথাটা হল, মানবাধিকারসহ সব বিষয়ে চীন নতুন নেতা হিসেবে নিজের মানদণ্ড বলে কিছু দেখাতে চাইলে তা করতে হবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে শুরুর ভিত্তি ধরে। মানে, চীন এর চেয়ে আরো ভালো কী করতে পারে, সেটাই তাকে দেখাতে হবে। তাই বলাই বাহুল্য, এছাড়া চীনের সাবধান থাকাই ভাল যে, পশ্চিমা মানদণ্ডের নিচে সব কিছুই এখানে অগ্রহণযোগ্য হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই থাক এরপরেও, আমাদের মত দেশে বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্প নেয় তাতে সে বেশ কিছু মানদন্ড মেনে চলে। যেমন এর একটা হল, বিশ্বব্যাংকের নেয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে যে দেশই দাতা-পার্টনার থাকুক না কেন, খোলা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক টেন্ডারেই একমাত্র সাব্যস্ত হবে যে, কাজ কে পাবে। মানে, ঐ দাতা দেশকেই কাজ দিতে হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। আমাদের যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান এক বড় ফান্ড-দাতা ছিল। অথচ পাঁচ আলাদা অংশের টেন্ডারে বিভক্ত ঐ প্রকল্পের কাজে জাপান একটাও পায় নাই বা জড়িত ছিল না। অথচ প্রায় সব চীনা প্রকল্পই এই মানদন্ডে অচল। চীনা-প্রকল্পের সাধারণ অভিমুখ হল, চীনারাষ্ট্র হয় দাতা, ঠিকাদার হবে চীনা কোম্পানি, আর তা হবে বিনা টেন্ডারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হল, এক লোকাল এজেন্ট কোম্পানি থাকবেই, ব্যকডোরে যার মূল ভুমিকা বা কাজ হবে প্রকল্পগ্রহীতা দেশের প্রশাসনে ঘুষ-বন্দোবস্তের উপায় হিসাবে কাজ করা। তাই এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের জন্মের ৭৫ বছর পরে হাজির হয়ে, বিশ্বব্যাংকের মানদন্ডের চেয়ে নিচা-মানদন্ডে চীনা অবকাঠামো-প্রকল্প এভাবে চলতেই পারবে না। বেল্ট রোডসহ চীনা প্রকল্পগুলো এভাবে চলতে থাকলে এককথায়  চীনের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার, সব ভেঙ্গেচুড়ে পড়বেই।

এর বিপরীতে চীনারা হয়ত বলবে, আমরা  পশ্চিমাদের মত কোন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করি না, পলিটিক্যাল স্বার্থ নাই বা স্টেক রাখি না। তাই কোন দেশে যদি দুর্নীতি থাকে (আমাদের মত দেশে যা অফুরন্ত ও ঘুষ খাবার জন্য ওঁত পেতে আছে) তবে ঐ দুর্নীতি উচ্ছেদ আমার কাজ নয়। সেকারণেই যে দেশ ঘুষ নিয়েই কাজ দেয়, তাকে আমরা ব্যাপক ঘুষ দেই, আর যে নেয় না তাকে সাধাসাধিও করি না। অতএব ঘুষ দিয়ে কাজ নেব কি না, সেটা চীন কখনও ঠিক করেনি।

আসলে এটা দায় এড়ানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি। কারণ, চীনা রাষ্ট্র কোন নৈতিকতাহীন বাণিজ্যিক কোম্পানি নয় যে যেকোন উপায়ে তাকে মুনাফা করতেই হবে। এ ছাড়া চীন দুনিয়ার (অন্তত) অর্থনৈতিক নেতা হতে খায়েস রাখে। কাজেই নৈতিকতা পালনের দায়, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার দায়পাল্পনের ঊর্ধ্বে থেকে চীন নেতা হতে পারে না। অথচ পশ্চিমা মানে, আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কোনো কোম্পানির বিদেশে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়া অপরাধ; যদিও এর প্রয়োগ খুবই কম তবে এর কিছুটা প্রয়োগ একালে দেখা যাচ্ছে ওয়ার অন টেররের ইস্যুতে মানিলন্ডারিং আইনের কারণে। আরও কথা আছে, এনিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন আছে। স্বাক্ষরকারি হিসাবে চীনের দায় আছে, ফলে সে দায়মুক্ত নয়। এই বাস্তবতা ও মানদণ্ডকে এড়িয়ে মানদন্ডে পিছনে পড়ে থেকে চীন কিভাবে নেতা হতে পারবে? আমাদের মতো দেশগুলোকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে দিয়ে এর জন্য প্রধান দায়ী হয়েও চীন কোন নেতাগিরির আশা করে? আমেরিকার দোষত্রুটির শেষ নাই। কিন্তু আমেরিকা  গায়ে বাতাস লাগিয়ে  দুনিয়াকে “আমেরিকান সেঞ্চুরি” করে নিতে এমনি এমনি সক্ষম হয় নাই। কিছু অন্তত অবদান রাখতে হয়েছে। চলতে চালাতে গিয়ে সে বহু কিছুর মানদন্ড, আইন কনভেনশন বা প্রতিষ্ঠান গড়া ইত্যাদি এসব অনেক কিছুই তাকে করতেই হয়েছে। এগুলোকে আন্ডারএস্টিমেট করা, তুচ্ছ বা নজর আন্দাজ করা অবশ্যই চীনের অযোগ্যতা ও আত্মঘাতি হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই এককথায় বললে, ব্যাপারটা পশ্চিমা-অপশ্চিমার ইস্যুই নয়।

এটাও ঠিক, চীনের নেয়া বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থই একমাত্র নয়, এর বাইরে চীনা রাষ্ট্রের একধরনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও থাকে, যেটা অস্বাভাবিক নয়। যেমন গোয়াদর বন্দর বা  চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প। এর নামই বলছে, চীনের ল্যান্ডলকড হয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া পশ্চিমা ভূখন্ডকে [জিনজিয়াংয়ের উইঘুর বাসিন্দারা এখানেরই] মুক্ত করার লক্ষ্যে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত প্রবেশ – করিডোর নেয়াই- চীনের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সোজা কথায় প্রকল্পের সুবিধাভোগী একা পাকিস্তান নয়, চীনও। কাজেই ঋণচুক্তির দায় ও শর্তাবলিতে এর ছাপ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন চীনা ঋণ শোধ দেয়ার সময় সাধারণত ২০ বছর হতে দেখা যায়। সে তুলনায় বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল ঋণের সাধারণ মানদন্ড হল, তা ৪০ বছরের, যার প্রথম ১০ বছর আবার সুদবিহীন। চীনারাও করিডোর পাওয়া সুবিধাভোগী, তাই একা পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর এর বিপুল ঋণ শোধের দায় চাপানো অনৈতিক ও অবাস্তব অবান্তর। কাজেই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছর সুদ-আসল পুরো কিস্তিবিহীন করা ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই করতে পারতে হত। সারকথায়, একটা ‘অবজেকটিভ ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস’ করে [সেক্ষেত্রে দরকার হলে চীনের অ-বাণিজ্যিক কোন সামরিক বা অন্যকোন রাষ্ট্রস্বার্থ থাকলে এরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য ধরে নিয়ে সে হিসাব করা সম্ভব] পাকিস্তান-চীন উভয়কেই দায় ভাগ করে নিতে হবে, সেটাই হত সবচেয়ে ন্যায্য। কিন্তু আমরা দেখছি, কিস্তি দেওয়া শুরু হবার আগে পাকিস্তান এখনই ধুঁকছে। এই করিডোর ঋণের কিস্তি যদিও এখনো শুরুই হয়নি, সম্ভবত ২০২২ সালের আগে শুরু হবে না; তখন পাকিস্তানের কী হবে?

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখিয়ে এখনই আমেরিকা এবং আইএমএফ টিটকারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা আমেরিকার অর্থনীতি ঢলে পড়া ঠেকানোর স্বার্থে চালানো প্রপাগান্ডাকেই সাহায্য করছে। এটা নিশ্চয়ই চীনের পক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই, বাণিজ্যিকের সাথে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রকল্পও হতেই পারে। কিন্তু দায় ভাগাভাগির একটা মানদন্ডও অবশ্যই থাকতেই হবে। পাকিস্তানের শাসকেরা চোর ও লোভী বলে চীন এর সুবিধা নিয়ে নিজের ভাগ্য গুছাবে আর এভাবে দুনিয়ার নেতা হতে পারবে কী করে? এটা কোন বুঝ? বস্তুত কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি মানে প্রকল্প গ্রাহক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোন প্রকল্প-ঋণ শোধের যোগ্য বা সম্ভব হবে কি না, এর যাচাই চীন আদৌ করে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এমন চিন্তা একালে অকল্পনীয়।

কেন? চীন কেন এখানে উদাসীন থাকে? ‘পুঁজিবাদী’ ব্যাপার বলে? চীনের সাফাই কী, আমরা জানি না। অথচ এমন হওয়ার কারণে আইএমএফের প্রেসিডেন্ট মিস লাগার্দের নসিহত শুনতে হচ্ছে চীনকে যে, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে এর ভায়াবিলিটি’ যাচাই কর”ন। চলতি BRF সম্মেলনের দাওয়াতের যোগ দিয়ে বক্তৃতায় তিনি মুখের উপর বলেছেন ব্যাপক বেল্ট-রোডের প্রকল্প সেখানেই যাওয়া উচিত আর যে অর্থনীতি এর ঋণশোধের দায়ভার বইতে সক্ষম। [“China’s massive Belt and Road infrastructure program should only go where it is needed and where the debt it generates can be sustained…] ব্যাপারটা চীন জানত না এমন নয়, লাগার্দে প্রথম বলছেন তা তো নয়ই।  আবার এটা অবিশ্বাস্য যে গ্রাহক রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলাই চীনের বড়লোক হবার পথ, আর এটা চীন বিশ্বাস করে। এটা একটা রাষ্ট্রের দুনিয়ার নেতা হবার কোন স্ট্রাটেজিক উপায়ও তো হতেই পারে না, এই এবসার্ডিটি বা অবান্তর কথা চীন বুঝে নাই তেমন কঠিন কথা এতা নয়? তাহলে?

এটা চরম গোয়ার্তুমি আর পশ্চিমকে তাদের চিন্তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভবত এমনই কিছু একটা।  আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকে আবার সময়ে তার দরকার থাকলে এই অজুহাতে হস্তক্ষেপও করে থাকে – একথা সত্য। চীন কী মনে করে, সহজে ঋণপ্রাপ্তি ও ঘুষের নহর বইয়ে দেয়া, এভাবে স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখা – এটা যে আরও বড় হস্তক্ষেপ – এটা চীনের বুঝে ধরা পড়ে নাই।

দুনিয়ার কোথাও শিল্পায়ন বা ক্যাপিটালিজম হয় নাই – রাষ্ট্রের অর্থ না মেরে দিয়ে। তারা বিশেষ করে কাস্টমসের টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে। পুঁজিপতিরা আদিম-পুঁজির সংগ্রহ সবসময় এভাবেই করেছে। কিন্তু এর মানে কী এই যে চীন উদ্দেশ্য করেই অর্থ লুটপাটকে উতসবে পরিণত করবে? এটা কোন ক্যাপিটালিজমের বুঝ? নাকি এটাই ইঙ্গিত করছে যে গ্লোবাল আইন, কনভেনশন, নাগরিক অধিকার, বেস্ট প্রাকটিস, মোডাল, ইন্সটিটিউশন গড়া, ইত্যাদি সম্পর্কে চীনের বুঝাবুঝিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে?

কাজেই ক্রিশ্চান লাগার্দের এই নসিহত বা কখনো টিটকারি শুনে চীনের কেমন লাগছে? কোন ইজ্জত বাড়ছে জানা যায় না। আর এখান থেকেই চীন ‘ঋণফাঁদ’ পেতেছে- এই আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার সুযোগ তৈরি করছে এতদিন চীন নিজেই।

হতাশার কথা থাক। মনে হচ্ছে, তাহলে কি এখন কানে পানি ঢুকেছে? এবারের বিআরএফ সম্মেলন থেকে আমরা কি সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি? সম্ভবত হ্যাঁ। কিসের ভিত্তিতে এমন বলা যায়? খুব সহজ। উপরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট বা বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই এটাই বলছে। কিন্তু এটা এখন এত সহজে এসে গেল আগে হয় নাই কেন, এর জবাব কী? গত মাসে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। দেখা যায়, অবকাঠামো প্রকল্পে যেসব স্টান্ডার্ড এপর্যন্ত তৈরি হয়েছে  চীন সুগুলো মেনে চলা আর এ নিয়ে আরও বিকশিত কাজ করতে চীন সেখানে ইইউর সাথে একমত জানিয়েছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা এখানে । কাজেই প্রেসিডেন্ট শি আসলে এবারের বিআরএফ থেকে বলতে চাইলেন, তিনি ইইউর সাথে ইতোমধ্যে যা যা একমত হয়েছেন, সেটাই এখন বিআরএফ ফোরামেও বাস্তবায়নে কাজ করবেন – এভাবে বলাটা কঠিন ছিল না। আর যাতে পরের বিআরএফ সম্মেলনে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও হাজির করতে পারেন।

এখন যদি আমরা আমেরিকার সাথে তুলনা করে বলি তাহলে ব্যাপারটা দারাল এই যে, ট্রাম্পের আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে নেতি প্রপাগান্ডা করেই গেল। আর ইইউ চীনকে মানদন্ডে আসতে বাধ্য করল, যাতে সম্ভাব্য গ্লোবাল নেতা চীনের পার্টনার হয়ে ইইউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

তাহলে এখন বেল্ট রোডে ভারতের কী হবে?
ইইউর মতো ভারতের জন্যও চীনা প্যাকেজ আছে মনে হচ্ছে। তাই সম্ভবত চীনা পথ হতে যাচ্ছে, সঙ্ঘাত নয়। বরং আরো সুবিধা অফার করে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলে নেয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, পাকিস্তানের কথিত জঙ্গি মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের আর আপত্তি না করা সম্ভবত সেটারই ইঙ্গিত। তবে এটা কেবল একা ভারতকে ছাড় দেয়া নয়। অনুমান করা যায়, ভারতকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, মাসুদ ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের ওপর এখন চাপ সৃষ্টি করতে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না। তাই পাকিস্তানও চীনা সিদ্ধান্তে কোন আপত্তি প্রকাশ করে নাই, বরং গ্রহণ করেছে। আসলে চীন অনেক আগে থেকেই এমন সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। এমনকি সম্ভবত কাশ্মির ইস্যুতে লম্বা পথের হলেও একটা সুরাহা, অন্তত ডায়ালগ শুরু করে পথ খুঁজে পাওয়া- এত দূর পর্যন্ত পরিকল্পনায় আছে। চীন সে জন্য অরুণাচল বা কাশ্মিরের সাথে ম্যাপে কার কোনটা এলাকা – সে সংক্রান্ত অনেক দাবি থেকেও সরে এসেছে, তা ভারতের মিডিয়াই বলছে। অনেকে অবশ্য অনুমান করে বলছেন, চীনের এত ছাড়ের অর্থ- অন্য আর একটা । তা হল চীন সম্ভবত মনে করছে ভারতের চলতি নির্বাচনে মোদী নয়, নতুন সরকার আসছে – এটা তারই ইঙ্গিত। তাই নতুন হবু সরকারকে দেয়া এটা চীন উপহার। ওদিকে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হলে চীনে সেকেন্ড য়ুহান [WUHAN] সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।

কিন্তু তাহলে বাংলাদেশের ভাগে কী?
আপাতত ফুটা কড়ি। নির্বাচিত হওয়ার পরই আমাদের সরকার ভারতীয় মিডিয়ায় এক হুঙ্কার দেয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। সেটা এখন ফাঁপা বলে হাজির হয়েছে। সেখানে ধারণা দেয়া হয়েছিল ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের সরকার নিজেই চীনা বেল্ট রোড প্রকল্পসহ চীনের সাথে ব্যাপক সম্পর্কে যাচ্ছে । সে ইঙ্গিত, সেসব ফেলে এখন বাস্তবত সরকার মুরোদহীন বলে নিজেকে প্রমাণ করছে। কারণ, ওই সাক্ষাৎকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ হত গত ২৫-২৭ এপ্রিলের বিআরএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনে টিম যাওয়ার, তা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল একমাত্র ইত্তেফাক বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী নয়, একা শিল্পমন্ত্রী নাকি যাচ্ছেন। আর কোন মিডিয়া ইস্যুটা নিয়ে কিছু না করে উলটা ব্ল্যাক আউট করে দেয়। ইস্যুটিকে মিডিয়া এভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে ট্রিট করেছে, এতে অনুমান হয়-সরকারের কাছেও এটা অগুরুত্বপূর্ণ; তাই এমন। তাহলে জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার বোল্ড অবস্থানের পর এখন এই গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অর্থ কী?
খবর না থাকাটাই একটা খবর। সেক্ষেত্রে সোজা অর্থ হল, জানুয়ারিতে সাক্ষাতকারে যাই দাবি  করে থাকুক এখন সরকার বুঝাতে চাইছে, তাঁর এখন কোনো সক্ষমতা নেই যে, ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থে সে চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যায়। ব্যাপারটি দাঁড়াল এমন যে, নির্বাচিত হলেও ভারতের স্বার্থ ুপেক্ষা করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে কোনো অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই বলে সরকারেরই অনুমান। তাই সে আবার স্ট্যাটাস কো ফিরে গেল; যা ছিল তাই আগের জায়গায়। ভারতের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে থাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা আমাদের সরকারের এখনো নাই, এতাই সারকথা। ইতোমধ্যে ভারতের এক মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে, চীন এবারের BRI  এর নেয়া প্রজেক্টের তালিকায় BCIM কে রাখে নাই। [China drops BCIM from BRI projects’ list]। বিসিআইএম মানে- বার্মা হয়ে আমাদের চীনের কুনমিং যাওয়ার এবং সোনাদিয়া বন্দর – এই পুরা প্রকল্পই চীন নাকি গুটিয়ে ফেলেছে। এই ক্ষবর কতটা সত্য অথবা কেন আমরা এখনও জানি না।
ফলে আপাতত, বাংলাদেশের জন্য সব কিছুর প্রাপ্তি শূন্য। আসলে বাস্তবত পেছনের জনসমর্থন ছাড়া এক সক্ষমতাহীন ক্ষমতা আমাদের সরকারের -= এদিকটা আঁচ করেই সম্ভবত চীন বা ভারত আমাদের সরকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। তাই ভারতের স্বার্থ পূরণের অগ্রাধিকারের নিচেই চাপা পড়া আমরা। নিঃসন্দেহে তা খুবই হতাশাজনক!

এদিকে আবার আরেক কাহিনী। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলছেন, “সরকার চীনের বিকল্প ফান্ড দাতা খুঁজছে”। সেই খবরের শিরোনামটাই হল – “Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans…।  সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের [SCMP] ২৩ এপ্রিল ছাপা এই খবরের রিপোর্টার বাংলাদেশে এসে ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতের প্রো-আমেরিকান কথিত বিজ্ঞদের বক্তব্য সেখানে ছাপা হয়েছে, যার সারকথা বাংলাদেশের চীনা ঋণ নিতে যাওয়া ঠিক নয়। ব্যাপারটা আসলে বড়ই রহস্যময়! প্রধানমন্ত্রী চীনা বেল্ট রোডে যোগ দিতে চেয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর তিন মাসের মাথায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বলছেন, তারা চীনা বেল্ট রোডের বিকল্প ফান্ড খুঁজছেন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০৪ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)বেল্ট রোড ফোরাম সম্মেলন আমরা কি নাই হয়ে যাচ্ছি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

নির্বাচনকে সাফাই দিতে ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বিপদ

নির্বাচনকে সাফাই দিতে ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বিপদ

গৌতম দাস

৩১ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2×5

[সার সংক্ষেপঃ বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত সংসদ নির্বাচন ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক-গুলোকে বেশ বিপদেই ফেলেছে, মনে হচ্ছে। তারা সাধারণ ও সোজা যুক্তিবুদ্ধি সাজিয়ে অর্থপূর্ণ একটি লেখা দাঁড় করাতেও হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে এর আগে একটা লেখা ছাপিয়েছিলাম যেগুলো মূলত ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্কের বাইরের লেখকদের লেখা নিয়ে। সেসব লেখায় দেখেছিলাম – সেখানে এ জাতীয় সমস্যা দেখা যায়নি। থিঙ্কট্যাঙ্কের বাইরের লেখকেরা স্বাধীনভাবেই তাদের মনের কথা পরিষ্কার বলেছিলেন।  কিন্তু থিঙ্কট্যাঙ্কের ভিতরের লেখকেরা? বুঝা যাচ্ছে থিঙ্কট্যাঙ্কের লেখকেরা ভারত সরকারের অবস্থানের সাথে মিল রেখে কথা বলার দায় রেখে লিখছেন। তাতেই অর্থপুর্ণ বাক্যগঠন ঠিক রাখতে পারছেন না। অথচ যেভাবেই হোক নির্বাচনের ফলাফলের পক্ষে সাফাই খাঁড়া করতে চাইছেন। এতেই এলোমেলো সব বিপদ ভেসে উঠছে। ]

এমনিতেই ভারতে বিদেশের (মূলত আমেরিকা) সাথে সম্পর্কিত থিঙ্কট্যাঙ্ক (Pro-US Think Tank) আর অপর দিকে ভারত থেকে প্রকাশিত বিদেশি মিডিয়া  (পাবলিশিং অথবা এজেন্সি, যেমন রয়টার্স)- এদেরকে নিয়ে এক বিরাট সমস্যা। বোঝা যায়, ভারত থেকে এগুলো প্রকাশিত হওয়ার ক্ষেত্রে ভারতের বিদেশনীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রাখা অথবা এদের অবস্থান যেন সরকারি অবস্থানের বিপরীত হয়ে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে, সম্ভবত অলিখিত কোনো শর্তে, তা প্রকাশিত হতে গিয়ে এসব সমস্যা হাজির হয়। যেমন- কিছু থিঙ্কট্যাঙ্কের দৌরাত্ম্যের প্রাবল্য এত দিন যা নিয়ে ভরপুর ছিল তা হলো চায়নাব্যাশিং বা চীন ঠেকানোর জন্য আমেরিকার থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা থেকে প্রকাশিত নানান প্রপাগান্ডা। অর্থাৎ তারা আর মূলত থিংকট্যাংক থাকতে চাইছিলেন না বা ছিল না। আমেরিকার স্বার্থে চীনের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডার ‘ঘেঁটু’ হয়ে উঠতে চাইছিল এরা। বাক্যে মিল থাকুক আর না-ই থাকুক, অর্থপূর্ণ যুক্তি সাজানো হোক আর না-ই থাক, চীনবিরোধী প্রপাগান্ডায় সরব থাকতে হবে – এই ছিল তাদের কান্ডকাখানা।

তবে এই সমস্যা থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের স্বস্তি দিয়ে বাঁচিয়েছেন। ভারতে বসে আমেরিকান থিংকট্যাংকের চীন ঠেকানোর প্রপাগান্ডায় অর্থ ঢালা অথবা ভারতকে এর বিনিময়ে কোনো বাণিজ্য সুবিধা দেয়া – এসবের মধ্যে তিনি আগের প্রেসিডেন্টদের মত তিনি নাই, থাকতে চান না – এটা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। সম্ভবত সে কারণে ভারতের কিছু থিংকটাংকের খামাখা চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা ইদানীং আর দেখা যায় না। বিশেষ করে, এপ্রিল ২০১৮ সালে চীনে অনুষ্ঠিত মোদি-শি জিনপিং এর মধ্যে  য়ুহান সামিটের [Wuhan Summit] পরে। বলা যায় এই সামিট থেকেই আমেরিকার হয়ে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা করা থেকে ভারত সরে আসতে শুরু করে।  তবে এ ছাড়াও এর আরেক কারণ, বুদ্ধিমান মোদী সরকার চীনের সাথে ঐ সামিট-সুখালাপের সময় যাতে কোন বিরূপভাব তৈরি না হয় তা নিশ্চিত করতে চীনবিরোধী এধরনের থিংকট্যাংকগুলোর তৎপরতা বন্ধ করতে তাদেরকে সভা-সেমিনার করার অনুমতি না দেয়াকে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এতে এগুলোর অনেকেই তৎপরতা গুটিয়ে গিয়েছিল বা সরাসরি গুটিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। তবুও ভারতের সরকারি নীতির পক্ষে প্রচারে থাকা কিছু থিংকট্যাংক এখনো আছে। বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে লিখতে গিয়ে এরাই সমস্যায় পড়েছে।

সাধারণভাবে  মানুষের পক্ষে লেখা ও চিন্তা করা সমান্তরাল কাজ, যা প্রায় সমার্থক। এ জন্য দরকার মুক্তভাবে চিন্তা করতে পারা; এ কারণে, এক দিকে ফরমায়েশি সরকারি অবস্থানের পক্ষে থাকতে হবে আবার নিজ মনে (ফ্রি আরগুমেন্টে) লিখতে হবে – এ দুই কাজ এক সাথে করা কঠিন। প্রায় অসম্ভব। তবুও চাকরি বাচাতে অনেককে এমনটা করতেই হয়। সেক্ষেত্রে ফরমায়েশি সে লেখা শেষ করলেও এটা যে ফরমায়েশি, এর ছাপ লেখাতেই থেকে যায়। এ জন্য বলা হয়, চিন্তাকে বন্ধক রেখে গবেষক বা  একাডেমিক হওয়া যায় না। থিংকট্যাংক “অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন” বা ওআরএফের [ORF] ফেলো ডঃ জয়িতা ভট্টাচার্য আর বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশন বা ভিআইএফের [Vivekananda International Foundation (VIF) ] ফেলো ডঃ শ্রীরাধা দত্তের বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে দুটা আলাদা আর্টিকেল রচনায় তাদের সেই হাল হয়েছে। ভারতের মিডিয়ায় ভিআইএফ -কে বিজেপির মোদী সরকারের থিঙ্কট্যাঙ্ক বলা হয়েছে।

এমনিতেই কোন একাডেমিক পরিচয়ধারী যদি আবার আনক্রিটিক্যাল হন – এটা খুবই অযাচিত কম্বিনেশন। আন-ক্রিটিক্যাল মানে যে ক্রিটিক্যাল নয় অর্থাৎ আগে থেকেই সব জানার অজুহাতে, যেকোনো জিনিসকে পুনরায় উল্টেপাল্টে নানান দিক থেকে দেখে না, যাচাই-বাছাই বা সন্দেহ করার দৃষ্টি যার তৈরি হয়নি, এদের পক্ষে নিজের একাডেমিক পরিচয়ের প্রতি সুবিচার করা কঠিন। কিছু একাডেমিকের “ভারতীয় সেকুলারিজম” বিষয়ক ধারণা ও এর ব্যাখ্যার প্রতি আস্থা-বিশ্বাস এতই আনক্রিটিক্যাল যে, এটা পোপের বাইবেলের উপর আস্থা-বিশ্বাসকেও হার মানায়। অনেকের ধারণা – থিওলজিতে কারও ক্রিটিক্যালনেস বলে কিছু নেই; কিন্তু সেটিও আসলে ভিত্তিহীন। আধুনিকতাতেই শুধু ক্রিটিক্যালনেস বা উল্টেপাল্টে নানান দিক থেকে দেখা ও যাচাই করা আছে, এ কথা সত্য নয়। থিওলজিতেও ক্রিটিক্যালনেস দেখা যায়। এর ভালো প্রমাণ হল, থিওলজির ইন্টারপ্রিটেশনে বা তাফসিরে ভিন্নতা। আর সেখান থেকেই একই ধর্মের নানান ইস্যুতে বিভিন্ন ব্যাখ্যার উৎপত্তি। আর তা অনুসরনের ভিত্তিতে বিভিন্ন ধারা বা Sect দেখতে পাওয়া যায়, যা খুবই স্বাভাবিক। তবুও ভারতীয় সেকুলারিজম ও এর ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কোন ক্রিটিক্যাল অবস্থান দেখা যায় না।

জয়িতা ভট্টাচার্য, বাংলাদেশের এবারকার নির্বাচনের আগেই ২৬ ডিসেম্বর এক নিবন্ধ লিখেছিলেন। ঐ লেখার প্রথম তিন অনুচ্ছেদ ধর্মীয় রাজনৈতিক সংগঠন নিয়ে। এর মধ্যে এক উপশিরোনাম আছে, তা হল- “নির্বাচন কমিশনে ৭০টা রেজিস্টার্ড দলের মধ্যে ১০টাই ধর্মীয় রাজনৈতিক দল” [10 Out of 70 Religious Political Parties Registered With EC]। কিন্তু তাতে জয়িতা সমস্যা দেখছেন কোথায়? মানে তিনি এটাকে বাংলাদেশের জন্য ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখছেন কেন? ওরা ধর্মীয় রাজনৈতিক দল বলে? আর এখানে ধর্মটার নাম ‘ইসলাম’ বলে? তাই কী?

কিন্তু ব্যাপার হল, ইসলামি দল হলেই এমন খড়্গহস্ত হওয়া অপ্রয়োজনীয়। বরং এমন চিন্তার মানে, দেখা যাবে হয়ত কথিত এই ‘সেকুলার দৃষ্টিভঙ্গি” আসলে নিজেই ইসলামোফোবিক। আবার ভাবনা-চিন্তা করা দরকার যে এই ১০টি ইসলামী রাজনৈতিক দলের সাথে ভারতে হিন্দুত্বের দল বিজেপির ফারাক কিসে? জয়িতা বিজেপিকে সহ্য করতে পারলে বাংলাদেশের এই ১০টি ইসলামী দলকে করতে পারছেন না কেন? আরও সিরিয়াস কথায় আসা যাক। জয়িতার সম্ভাব্য আপত্তি বা বিচার করার ক্রাইটেরিয়া কী? স্বভাবতই আগে ক্রাইটেরিয়া বা মাপকাঠি ঠিক না করে কথা বলতে গেলে ব্যক্তিগত পক্ষপাতিত্ব বা ফোবিক [-phobic] অথবা বিদ্বেষী হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

আসল কথায় আসি। জয়িতা জানাচ্ছেন – এই ১০টি দল নির্বাচন কমিশনে রেজিস্টার্ড। আমরা নিশ্চয়ই বুঝি ‘রেজিস্টার্ড’ শব্দের মানে। এর সোজা অর্থ হল – বাংলাদেশের রিপাবলিক কনস্টিটিউশনকে মেনে সে অনুসারে রাজনৈতিক দলের যা যা বৈশিষ্ট্য থাকতে বাধ্য বলে (দলটা নয়) নির্বাচন কমিশন মনে করে, সেসব শর্ত এই দলগুলো পূরণ করেছে। সে কারণে এরা রেজিস্টার্ড দল, সার্টিফায়েড। এখন এসব রেজিস্টার্ড দলের গায়ে গন্ধ, চিহ্ন, শব্দ ও রঙের মধ্যে যতই স্পষ্ট করে ইসলাম প্রকাশ পাক না কেন, যেহেতু বাংলাদেশের কনস্টিটিউশন মেনেই এরা রেজিস্টার্ড হয়েছে, রাজনীতি করতে চাইছে, তাতে আর সমস্যা কী? একে এরপরও সমস্যা ভাবার কারণ কী? বরং এরপরও কারো কাছে ‘সমস্যা’ মনে হলে সেটি তারই ইসলামবিদ্বেষ মানে, মনের ফোবিয়ার সমস্যা হতে পারে। যেখানে এমনকি আগামীতেও নির্বাচন কমিশন যদি বাড়তি কিন্তু কনস্টিটিউশন কাভার করে, এমন কোনো নতুন শর্ত আরোপ করে, সেটাও তো এসব রাজনৈতিক দল মানতে বাধ্য থাকবে। তাহলে এরপরে আর আপত্তির কী আছে? আপনি আর কী চাইতে পারেন? আসলে সবার আগে আমাদেরকেই “চাইতে” জানতে হবে। একটা ইসলামী দল রিপাবলিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই থাকতে চাইছে, আর কী চান আপনারা? আসলে এর পরের স্তর হল, রজনীকান্তের সেই গানের কলি- “ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়”। আসলে রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য অথবা রাষ্ট্র কী, তা জানা বোঝা সম্পন্ন না হয়ে মানে, বাকি রেখে কোনো আপত্তি প্রকাশ করতে গেলে তা শেষে ‘ফোবিয়া’ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি থাকবে।

জয়িতা ভট্টাচার্যের ওই রচনায় আর একটা উপশিরোনাম হল – তিনি বলছেন, বাংলাদেশের নির্বাচনে “ধর্মভিত্তিক দলের ভোট-শেয়ার গুরুত্বপূর্ণ নয়” [Vote-Share of Religion-Based Parties Not Too Significant]। বাস্তবে জয়িতার এই দাবি ভিত্তিহীন। কারণ, যেমন বলা যায় গত ২০১৩ সালের ৫ মের পরে প্রথম নির্বাচন ছিল ঢাকার বাইরের গাজীপুরসহ কিছু শহরের “মেয়র নির্বাচন”। ঐ নির্বাচনে সরকার সবখানেই গো-হারা হেরে যায়। কেন? কারণ, জামায়াত নয় এমন কিছু ধর্মীয় দল নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তাদের প্রার্থীকে ভোট না দিতে ক্যাম্পেইনে নেমেছিল; মানুষের বাড়ি বাড়ি ঘুরেছিল। আর তাতেই ঐ ফলাফল হয়েছিল। তাই কেউ নিজে ভোটে দাঁড়ালে কয়টা ভোট পাবে সেটাই নয়, বরং অন্যের ভোট কত কাটতে পারবে, সেটাও এক বিরাট সক্ষমতা ও নির্ধারক ফ্যাক্টর। আর এরপর থেকে, “নির্বাচনের মা মারা যাওয়াতে” সেই শোকে ঐ নির্বাচনের পর থেকে (আগের মানের) “অবাধ নিরপেক্ষ” নির্বাচন বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যায়; তা আর কখনো হয়নি। বুদ্ধিমান জয়িতা নিশ্চয়ই এসব কথা বুঝবেন। এছাড়া আরও বিস্তারে জানা ও যাচাই করতে তিনি গোয়েন্দা লাগাতে বা খোঁজ নিতে পারেন। আসলে বাংলাদেশে ধর্ম আর রাজনীতির সম্পর্ক বুঝা, তা বিশেষ করে ভারতীয় সেকুলারিজমের বুঝ দিয়ে বুঝতে যাওয়া, আরও অসম্ভব।

জয়িতা নির্বাচনের পরেও গত ৩ জানুয়ারি আমাদের নির্বাচন প্রসঙ্গে আর একটা নিবন্ধ লিখেছেন । তা প্রকাশিত হয়েছিল ওআরএফের ওয়েবসাইটে।

জয়িতা ভট্টাচার্য এবং রাধা দত্তের রচনায় এক অভিন্ন ত্রুটি হল, তাঁরা আগে বলে নিচ্ছেন না যে, তারা কেবল নির্বাচন কমিশনের হাতে প্রকাশিত ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে লিখছেন। কারণ, এই নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ আদৌ ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে কি না, তা অবাধ ছিল কি না, বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এখন কেমন ইত্যাদি আনুষঙ্গিক দিক সম্পর্কে চারদিক থেকে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে এরা সেসবের কোন খোঁজ নিয়েছেন, তাদের জানাশোনা আছে, তা মনে হয় নাই। তাঁরা দাবিওও করেন নাই। কেবল সব জায়গায় “নিষ্ঠাবান যুধিষ্ঠির” (পুরাণে যে কখনও মিথ্যা বলেন নাই বলে মনে করা হয়) ভেবেছেন আমাদের নির্বাচন কমিশনের বচনকে।  বলা যেতে পারে, কমিশনের বয়ানের বাইরে্র কোন উৎস ও তথ্যকে তাদের বিবেচনায় তারা কোন কারণে আনতে পারেননি বা আনেননি। এ অবস্থাতেই তাদের ওই রচনা লিখিত হয়েছে।

জয়িতার দ্বিতীয় এই লেখায়, তৃতীয় প্যারা থেকে পরের চার প্যারা মিলিয়ে তিনি একটা বয়ান সাজিয়েছেন। এর প্রথম প্যারায় বলেছেন, “বিএনপি ভোটে কারচুপির অভিযোগ করেছে”। এর পরের প্যারায় বলছেন, “কিন্তু নির্বাচন অবজারভারেরা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করেনি”। [অর্থাৎ পাঠককে ইঙ্গিত ও সাজেশন হল, বিএনপির অভিযোগ বাতিল হয়র গেল।] এবার পরের প্যারায় জয়িতা বলছেন, “১৯ জন লোক মারা গেছে। সুতরাং নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি”। এর শেষে বলছেন, “নির্বাচনের আগে বিরোধীরা আওয়ামি লীগের ক্যাডারদের সন্ত্রাস ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ করেছে। আর একইভাবে লীগও বিরোধীদের বিরুদ্ধে পালটা অভিযোগ এনেছে”। [পাঠককে ইঙ্গিত ও সাজেশন হচ্ছে, তাহলে মামলা ডিসমিস]। অথচ এরপরেই আবার লিখছেন, “নির্বাচনপূর্ব ভায়োলেন্সের মাত্রা দেখে মানুষ ভোট দিতে আসে কিনা এনিয়ে আশঙ্কা ছিল”। কিন্তু ভোটের শেষে কমিশন বলেছেঃ আশি ভাগ ভোট পড়েছে; তাই ওই ভয়-আশঙ্কা ছিল ভুয়া”। [মানে এখানেও সাজেশন হচ্ছে, তাহলে মামলা ডিসমিস]

আসলে এসব বাক্যের মাধ্যমে জয়িতা নিজের পরিচয়  “থিংকট্যাংক গবেষক” থেকে “প্রপাগান্ডিস্টের” স্তরে নিজেই নামিয়েছেন। কারণ এটা কোনো গবেষকের কাজ নয়, কাজের পদ্ধতিও নয়। সাধারণ বিবেচনা হল, দু’টি বিবদমান পক্ষের বেলায় কার কথা গ্রহণ করা হবে, তা ঠিক করতে হয় স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য তৃতীয় ওয়াকিবহাল পক্ষের কাছ থেকে। কিন্তু তিনি আগেই একটা পক্ষ বেছে নিয়েছেন। এটা গবেষকের উচিত নয়, কাজও হতে পারে না। কথিত কিছু নির্বাচন “অবজারভারদের” বরাতে জয়িতা বলছেন, “ভোটে কারচুপি হয়নি, কারণ অবজারভারেরা গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি”। কিন্তু খোদ “অবজারভারদেরই” গ্রহণযোগ্যতা কী ছিল? তা কি তিনি জেনে নিয়েছিলেন? সম্প্রতিকালে ঐ “অবজারভারদের” অনেকেই এখন “তওবা” পড়ছেন, বড় ভুল হয়ে গেছে বলছেন। তাহলে জয়িতা এখন কী বলবেন?

শেষের প্যারায় তিনি একবার ভায়োলেন্সের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ তুলে এটা ‘ডিসমিস’ করছেন। অথচ পরের বাক্যেই বলছেন, ভায়োলেন্সের মাত্রা দেখে [Considering the level of pre-poll violence] ভোটার আসে কি না সে শঙ্কা ছিল। এর মানে জয়িতাই আবার মেনে নিচ্ছেন যে, আসলে উল্লেখযোগ্য মাত্রারই ভায়োলেন্স সেখানে হয়েছিল। তাহলে? মোট কথা, তার গল্পটা এখানে এসে আর মিল রাখতে পারল না।

আবার লক্ষণীয়, ১৯ জন মারা গেছে দাবি করে তিনি সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন, এর মানে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হয়নি। আসলে এ কথার মানে হয় না। কারণ, ঠিক কতজন মারা গেলে কোনো নির্বাচন ‘শান্তিপূর্ণ’ হবে? কোথাও এমন কোন মাপকাঠি কী আছে? আর এই মাপকাঠি কে দিয়েছে? ওদিকে আবার এই ১৯ জন কারা? কিভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে? এটা কেবল লীগের দেয়া ফিগার। এদের মধ্যে আওয়ামিলীগেরই অভ্যন্তরীণ কোন্দলে মৃত্যু কয়জনের? সে খোঁজ কি নেয়া হয়েছে? অথচ ‘১৯ জন মরেছে – মানে শান্তিপূর্ণ ভোট হয়নি” – এসব মুখস্থ বলছেন তিনি। কোনো সিরিয়াস মানুষ বা গবেষক এভাবে মুখস্থ কথা বলার কথা না।

আবার তার লেখায় (শেষের দিক থেকে গণনায়) চতুর্থ প্যারায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে “মানবাধিকার লঙ্ঘনের এবং ‘ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশনে বাধা’ তৈরির অভিযোগ তুলেছেন জয়িতা। অথচ এর আগে আমরা দেখেছি বিরোধীদের তোলা অভিযোগ নাকচ করেছিলেন জয়িতা। কেন? সে ব্যাখ্যা অনুপস্থিত। তাহলে শেষে দাঁড়ালো কী? জয়িতার লেখা পড়ে মনে হয়েছে সরকারি “ব্রিফিং ঠিক রাখতে আর, ভাষ্য ব্যালেন্স করতে গিয়েই তিনি তাল হারিয়ে ফেলেছেন। অথচ কারও ভাষ্যের ব্রিফিং ঠিক রাখা, সেই তালে কথা বলা কোনো গবেষকের কাজ হতে পারে না। এভাবে তিনি নিজেই নিজের কাজের মান প্রকাশ করলেন।

শ্রীরাধা দত্তের লেখা :
আমাদের নির্বাচনের পরে তাঁর লেখা দেখেছি একটাই। আর সে লেখার চার ভাগের তিন ভাগই হল, আমাদের প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ভারতের নর্থইস্টকে করিডোর দিয়ে ভারতের কত কী উন্নতি করে দিয়েছেন, এরই ফিরিস্তি। অথচ এই লেখার মূল প্রসঙ্গ আমাদের নির্বাচন কাভারেজ। অর্থাৎ এই লেখার সাথে বাংলাদেশের নির্বাচন বা শেখ হাসিনার বিজয়ের সম্পর্ক কী? অথবা এটা কি বাংলাদেশের কোনো উন্নয়নের গল্প? হাসিনা ভারতের নর্থইস্টকে করিডোর উন্নয়ন করে দিয়েছেন, তাই কী? সেটা যাই হোক ব্যাপারটা অপ্রাসঙ্গিক।

শ্রীরাধার লেখায় শেষের একটা প্যারায় এক অদ্ভুত কথা আছে। তিনি লিখেছেন- “বিএনপি নিজেই দায়ী”। কোথায় কী বিষয়ে আমরা তা দেখব। তবে রাধা সবচেয়ে কড়া এক বাক্য লিখেছেন। সে কথাটি হল – আওয়ামী লীগের জোট ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টি পেল আর বিএনপি জোট মাত্র সাতটি পেল; এটা ”মনে হচ্ছে আমি মানতে পারলাম না”[looks unconvincing]

কিন্তু তিনিই শেষের দিকে বলছেন, “২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি ওয়াকওভার দিয়েছে”। কিন্তু এবারের ফলাফলের জন্য অন্য কেউ নয় তাঁরা নিজেরাই দায়ী। এমনকি যদি কেউ মেনেও নেয় যে নির্বাচনে নির্বাহি ক্ষমতার বিরুদ্ধে সর্বত্র হাত ঢুকানোর অভিযোগ, হাসিনার অসহিষ্ণুতা, আর যেকোন ভিন্নমতের প্রতি তাঁর দমনের নীতি তবুও সরকার বিরোধীরা নিজেই আসলে নিজেদেরকে কোণায় চিপার মধ্যে ফেলার জন্য দায়ী। […this time around they have none to blame for their dismal performance. Even if one accepts the allegations of executive overreach, Hasina’s intolerance, and her increasing repressive ways towards any contrarian views, the opposition had really bound themselves into a corner]।

অর্থাৎ বলছেন- “এবারো খারাপ ফলাফলের জন্য বিরোধীরা অন্যকে দায়ী করতে পারে না। যদি নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ, হাসিনার অসহিষ্ণুতা, ক্রমবর্ধমান বিরোধী মত দমন এসব অভিযোগ যা-ই ঘটুক তা সত্ত্বেও বিরোধীরা নিজেই নিজেদের এক কোনায় বন্দী করেছে”।
এটি কি নুন্যতম অর্থপূর্ণ কোন কথা? না পুরাটাই স্ববিরোধী? দুঃখিত, আসলেই বুঝতে অপারগতা জানাচ্ছি। পাঠক নিজেকে সাহায্য করেন……।
এ কারণেই, শুরুতে বলেছি বাংলাদেশের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন ভারতের থিংকট্যাংকগুলোকে অর্থপূর্ণ অন্তত কয়েকটা বাক্যও লিখতেও বিশাল বিপদেই ফেলে দিয়েছে, দেখা যাচ্ছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২১ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নির্বাচনঃ ভারতের থিংকট্যাংকের বিপদ” – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন-ভারতের পারস্পরিক শত্রুতা ও মিত্রতা

চীন-ভারতের পারস্পরিক শত্রুতা ও মিত্রতা

গৌতম দাস

২৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2w6

 

নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং – ফাইল ছবি

আমরা এমন এক দুনিয়ায় এসে পৌঁছেছি, যেখানে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি চলে। শুনতে স্ববিরোধী মনে হলেও কথাটা সত্য। আর তা বোঝার জন্য কথা আরো ভেঙে বলা যেতে পারে। এখন দুই রাষ্ট্রের মধ্যে একই সাথে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি চলতে পারে এবং চলে, এজন্য যে এখন কূটনীতি চলে ইস্যুভিত্তিক। ইস্যুটা কী – আলাদা করে শুধু সেই ইস্যুর ওপর নির্ভর করে রাষ্ট্রের অবস্থান বা নীতি-পলিসি নিতে হয়। তাই অপর রাষ্ট্রের সাথে একটা ইস্যুতে মিত্রতা বা আপসের একই অবস্থান আছে, অথচ দেখা যাবে হয়ত অন্য ইস্যুতে অপর ঐ রাষ্ট্রের সাথেই শত্রুতা, মানে প্রবল ঝগড়া-দ্বন্দ্বের অবস্থান দাঁড়াতে পারে, দাঁড়াতে হয়। এর অনেক উদাহরণই আছে, তবে এব্যাপারে সম্ভবত সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হল, চীন-ভারত সম্পর্ক।

ভারত-চীন দুই রাষ্ট্রের নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ইস্যুতে ভারত বর্তমানে অন্তত চলতি বছরের প্রথম কোয়ার্টার থেকে খুবই নরম ও ঐক্যকামী। কিন্তু এশিয়ার তৃতীয় যে কোনো রাষ্ট্রে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়া দেখা গেলে ভারত এর বিরুদ্ধে চরমতম বিরোধীতায় ততপর। সম্পর্ক-অবস্থান ইস্যুভিত্তিক বলে, ভারত-চীনের এমন খারাপ-ভাল অথবা উত্থান-পতনের সম্পর্কের মাঝেও তাদের এক বড় সফলতা হল য়ুহান সম্মেলন (Wuhan, April 2018)। এটা ছিল যারা ভারত-চীনের ঘনিষ্ঠতায় নিজের স্বার্থহানি দেখেন এমন প্রো-আমেরিকানদের মুখে ছাই দিয়ে, চীন-ভারতের প্রথম কাছাকাছি আসার ভিত্তি তৈরির উদ্যোগে, চীনের য়ুহান শহরে শীর্ষ সম্মেলন।   প্রধান সব রাষ্ট্রের আমেরিকায় পণ্য রপ্তানির উপর ট্রাম্পের  বাড়তি ট্যারিফ শুল্ক আরোপের যুদ্ধে ভারতকেও তালিকায় যুক্ত করাতে ভারত আমেরিকায় রফতানি বাজার হারানোর পর থেকে এই নাটকীয় পরিবর্তনের শুরু। এতে চীন-ভারতের বিভিন্ন স্বার্থবিরোধে তা পুরা মিটিয়ে না হলেও কমিয়ে আরও কাছাকাছি আসার বিরাট উদ্যোগ ছিল এটা। মোদী চীনের য়ুহান প্রদেশ সফরে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে এক বিশেষ ধরনের বৈঠকে বসেছিলেন। এই সম্মেলন আর এর প্রবল প্রভাবের কাল ছিল এ বছরেরই গত এপ্রিল-মে মাসজুড়ে।

এটা বিশেষ ধরনের বৈঠক মানে এখানে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আনুষ্ঠানিক রেকর্ডে এখানে বলা হয়েছে, এটা ছিল এক “ইনফরমাল সামিট”; মানে অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলন। অর্থাৎ যে বৈঠকের কথা বিস্তারিত প্রকাশ করতে হবে না। আবার কোনো ইস্যুতে ঠিক কী কথা হয়েছে সেটি যেহেতু অনানুষ্ঠানিক, তাই এমন বা অমন কথা হয়েছে সে রকম কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড [রেকর্ড অবশ্যই থাকবে কিন্তু তা কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে রেফার/স্বীকার করা হবে না। ] রাখার দায়ও কোনো পক্ষের নেই। এ এক বিরাট সুবিধা। বিশেষ করে ভারতের। কারণ, ভারতে রাজনীতি চর্চার স্টাইল ভোটের সস্তা পপুলিস্ট হওয়ার কারণে অনেক সময় ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে অন্য বিরোধীরা বিদেশে আপোষ করে এসেছে বলে প্রপাগান্ডার নানা অভিযোগ তুলে বসে। আর এই ভয় থাকার কারণে কিছু বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অনেক বিরোধ আর কাটে না।

এ বিষয়ে সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল, পাকিস্তান ইস্যুতে ভারতের যেকোনো সরকারের নেয়া সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ। এই বিচারে য়ুহান সম্মেলনে আলোচনার কাঠামোই এমন ছিল যে, এখানে সেসব সমস্যা নেই। ফলে এই সম্মেলনে চীন-ভারতের বহু বা প্রায় সব ইস্যুতে দুই শীর্ষ নেতা মন খুলে কথা বলেছেন, সাক্ষ্য প্রমাণ রাখার ভয় ভুলে, না রেখে বা ফরমাল নোট না রেখে। দোভাষী ছাড়া অন্য কোনো সহায়ক ব্যক্তিকেও কোনো পক্ষ সাথে সেখানে রাখেন নাই।

অথচ এখানেই উভয়পক্ষ বহু বিষয়ে বিরোধ মীমাংসার মৌলিক নীতিগত দিক সেটেল করেছেন। যাতে এই মৌলিক নীতিগত দিকের ওপর দাঁড়িয়ে পরবর্তীকালে বহু অমীমাংসিত ইস্যুতে আনুষ্ঠানিকভাবে সমাধান টানা হতে পারবে। এটি ছিল এই সম্মেলনের বড় সুবিধা।

তবে মিত্রতা আর শত্রুতা পাশাপাশি নিয়ে চলার দুনিয়ায় আমরা এসে পৌঁছানোতে কি ব্যাপারটা খারাপ হয়েছে?  না, অবশ্যই নয়। তাহলে খারাপের ধারণা কেন আসছে?  আসলে ‘খারাপ’ হতে পারে এই ধারণাটাই হল – কোল্ড ওয়ার আমলের (১৯৫০-৯১) চিন্তার অভ্যাসে বলা কথা। কারণ, কোল্ড ওয়ার মানেই দুনিয়াকে পরস্পর দুই শত্রুর দু’টি রাষ্ট্রের গ্রুপে – সোভিয়েত ইউনিয়ন আর আমেরিকা এভাবে দুটো ব্লকে দুনিয়াকে ভাগ করে ফেলা। এটা এমনই ব্লক যে, এখানে শত্রুতা ছাড়া অন্য কিছুর জায়গাই নেই। একেবারে হিন্দু জাতপ্রথার ছোঁয়াছুঁয়ির মত দুই রাষ্ট্রজোটের পরস্পরের সাথে সম্পর্কহীন থাকা আর শত্রুতাই এর একমাত্র বাস্তবতা। তবে আলোচ্য এখানকার প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হল, কেন এমন সম্পর্কহীনতার দুই ব্লক সেকালে চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল? এর জবাব হল, মুল কারণ যেহেতু দুই ব্লকের মধ্যে কোনো অর্থনৈতিক সম্পর্ক বা বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, তাই এটা টিকে ছিল। অর্থনৈতিক বা বিনিময় সম্পর্ক মানে হল – কোনো পণ্য, পুঁজি বা বিনিয়োগ এর বিনিময় সম্পর্ক। ফলে এমনকি কোনো ভাব বিনিময় সম্পর্কও সেখানে ছিল না। তাই সম্পর্কহীনতার দুই রাষ্ট্রজোট বা ব্লক চালু রাখা সম্ভব হয়েছিল।

বিপরীতভাবে বললে, এ কালে সম্পর্কহীনতার এমন কোনো দুই ব্লক থাকা সম্ভব নয়। অথবা ইতিবাচকভাবে বললে, একালেই ‘য়ুহান ইনফরমাল সামিট’ সম্ভব। কেন? এর মূল কারণ দুনিয়ায় এখন আগের সোভিয়েত ব্লকের সকলেসহ সব রাষ্ট্র একই “গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার” – এর নিয়মশৃঙ্খলার অংশ। তাই সবধরণের পণ্য, পুঁজি বা বিনিয়োগসহ সব ধরণের বিনিময় সম্পর্ক ওতপ্রতভাবে জড়িত। ভাব-ভাষাও।

পুঁজির জন্ম-স্বভাব হচ্ছে গ্লোবাল হয়ে উঠা, গ্লোবাল থাকা; তাই সে দুনিয়াজুড়েই বিস্তৃত হবে। লোকাল পুঁজি বা কেবল কোন এক ছোট ভুগোলের পুঁজি বলে কিছুই থাকবে না। তাই, দুনিয়ার বিভিন্ন দেশ-মহাদেশের প্রতিটি কোনায় বিচ্ছিন্নভাবে শুরু হওয়া পুঁজিতান্ত্রিক তৎপরতাগুলো ক্রমেই অপরাপর কোণের ততপরতাগুলো এরা পরস্পরের হাত ধরে ফেলবে, আর ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতরভাবে সম্পর্কিত হয়ে যাবে। আর এই সম্পর্ক মানে? মনে রাখতে হবে, এটা হল পরস্পরের ওপর পরস্পরের গভীরভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়া এক সম্পর্ক। এক গ্লোবাল সমাজ হয়ে উঠা। আবার একই ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার’ – এই সিস্টেম শৃঙ্খলার অংশ বলেই এটা সহজ এবং তা হতে বাধ্য। এই ইতিবাচক দিকটিই চীন-ভারতের চরম স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাতের মধ্যেও “য়ুহান ইনফরমাল সামিট” ঘটিয়ে ফেলতে সাহায্য করেছিল।

চলতি ২৩-২৪ নভেম্বর ২০১৮, চীন-ভারত সীমান্ত-বিরোধ মীমাংসার ২১তম বৈঠক শুরু হয়েছে। ২১তম মানে এ ধরনের বৈঠকের শুরু অনেক পুরানা দিনে, সেই ২০০৩ সালে বাজপেয়ির চীন সফর থেকে। চুক্তি বা বুঝাবুঝি অনুসারে এর বৈশিষ্ট্য হল, এখানে দুই রাষ্ট্রপক্ষের পূর্বঘোষিত স্থায়ী দুই ‘স্পেশাল রিপ্রেজেন্টেটিভ’ থাকবে। আর তাদের উদ্যোগে ডায়ালগের মাধ্যমেই চীন-ভারত সীমান্ত-বিরোধের সমাধান তারা খুঁজবে। ভারত-চীনের সীমান্তের অনেক জায়গায় উভয়পক্ষের একমতে টানা সীমান্ত বা ‘ডিমারকেটেড’ বা চিহ্নিত নাই। এই অচিহ্নিত সীমান্ত সমস্যা সেই কলোনি আমল থেকে, এটা অমীমাংসিত হয়ে থেকে যাওয়া সমস্যা। সেটাই মিটানোর চেষ্টাই এর উদ্দেশ্য। সে হিসেবে এই বৈঠক এখন রুটিনের মতো হয়ে গেলেও য়ুহান ‘ইনফরমাল সামিট’-এর পরে এর গুরুত্ব এবার অনেক বেশি। কেন?

কোনটা, কত দূর কার সীমানা – সে ব্যাপারে উভয়ের একমত হয়ে এভাবে পুরো চীন-ভারত সীমান্তকে ‘চিহ্নিত সীমানা’ হিসেবে এঁকে ফেলা অবস্থায় পৌঁছানোই ‘এমন বিশেষ বৈঠক’ উদ্যোগে এবারের লক্ষ্য।  এখানে LAC বা ‘লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল’ বলে উভয় পক্ষের একমতে একটা ধারণা আছে। সেটা হল, এক মতে “সীমানা চিহ্নিত” করে ফেলার আগে এখন সীমান্ত-ভূমি যেখানে যার দখলে যা আছে ও স্থিতাবস্থায় আছে, সেটাকেই উভয়ে “লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল বা এলএসি” বলে মানে। যেটাকে আসলে “অস্থায়ী কিন্তু বাস্তব সীমানা’ বলা যায়। এবারের ২১তম আলোচনায় উভয়পক্ষ এখানেই এক নীতিগত জায়গায় পৌঁছানোর চেষ্টা করবে। তা হল, সীমানা বিরোধ মিটানোর কাজে অগ্রগতি আর কিছু হোক আর না-ই হোক, বর্তমান এলওসি বা “অস্থায়ী বাস্তব সীমানা”- এটাকেই উভয়পক্ষ ‘বেস্ট অপশন’ বা সবচেয়ে ভাল সমাধান বলে মেনে নিবে। [“best option is “as it is; where it is”.] এ বিষয়ে উভয়ের ঘোষিত ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা। এরপর আরও আলোচনা চলবে উভয়ের একমতে এরচেয়েও ভাল সমাধান খুঁজে পেতে।

সুতরাং চীন-ভারতের সীমান্ত আলোচনায় “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” কথাটার বিশেষ মানে আছে। এখানে ভারত-চীন কাকে নিজ নিজ পক্ষের “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” বলে ঘোষণা করে রাখবে – সেটা এপর্যন্ত দেখা অভিজ্ঞতা বলছে এটা চলতি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা নিরাপত্তা  উপদেষ্টা অথবা চীনের ক্ষেত্রে পলিটব্যুরোর বিশেষ সদস্যকেও হতে দেখা গেছে। ভারতের পক্ষ থেকে এবার থাকবেন নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। আর চীনের দিক থেকে ছিলেন  পলিটব্যুরোর এক বিশেষ প্রভাবশালী সদস্য। এবার সভা থেকে তাঁর বদলে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীই দায়িত্বে পাবেন। আসলে “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” এরা মূলত সীমান্ত ইস্যুতে কথা বলার জন্য হলেও এর একটা স্থায়ী দায়ীত্বের পোস্ট বলে এদের কিছু আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ উভয়পক্ষ বাড়তি ইনফরমালি অনেক মনের কথা বলার সুযোগ ও দায়িত্ব এরা পালন করে থাকে। যেমন এরা এবার চীনের “বেল্ট-রোড উদ্যোগ”(BRI) [ এতে যোগ দেওয়ার অফার এপর্যন্ত ভারত ফিরিয়ে দিয়ে আসছে ] নিয়েও কিছু কথা বলবেন।  ভারতের হিন্দুস্তান টাইমস লিখছে,  “স্পেশাল রিপ্রেসেন্টেটিভ” অজিত দোভাল এলএসি, বিআরআই এবং অন্যান্য ইস্যুর সাথে নিরাপত্তা নিয়েই কথা বলবেন। [Ajit Doval will discuss security along the Line of Actual Control (LAC), belt and road initiative (BRI) and other issues]।

ভারতের এক প্রাক্তন কূটনীতিক এমকে ভদ্রকুমার। ভারতের প্রায় সব প্রাক্তন কূটনীতিক যেখানে চাকরি শেষে প্রো-আমেরিকান; মানে প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানে কাজ খুঁজে নিতে ব্যস্ত, সেখানে তিনি হাতেগোনা দু-তিন কূটনীতিকের মধ্যে একজন, যিনি তা নন। উজবেকিস্তান ও তুরস্কে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত ভদ্রকুমার, যিনি ভারতের ভবিষ্যৎ আমেরিকার মধ্যে দেখেন না। সেই ভদ্রকুমার দেখছেন, চীনের সাথে ভারত তার নানান বিরোধের ইস্যুগুলো মিটাতে এখন প্রবল আগ্রহী হয়ে উঠতে; একালের চলতি সময়ে মোদির ভারতকে।

অবশ্য শুধু সীমান্ত-বিরোধ মীমাংসার বৈঠক দেখে তিনি এ কথা বলেননি। তিনি আরো এক ইস্যু দেখেছেন। এই ১৩-১৪ নভেম্বর সিঙ্গাপুরে ‘ইস্ট এশিয়া সামিট’ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। এটা আমেরিকা, রাশিয়া, চীন, ভারতসহ মোট ১৮ রাষ্ট্রের এক সম্মেলন; যার শুরু হয়েছিল আসিয়ান রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে সাথে অন্যান্য ইস্ট এশিয়ান রাষ্ট্রকে নিয়ে। অর্থাৎ এখন এতে বাড়তি অনেককেই সদস্য করে নিয়েছে।

এবারের এই বৈঠক থেকে চীনের অর্জন অনেক। এখানে চীন-সিঙ্গাপুরের মধ্যে এক ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের (আপগ্রেড ভাষ্য) স্বাক্ষরিত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ভদ্রকুমার বলছেন,  এতে এই প্রথম “বেল্টরোড উদ্যোগ”ও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। [One highlight is the signing on Monday of an upgraded Free Trade Agreement between China and Singapore to include Belt and Road Initiative for the first time.] বলাই বাহুল্য, যারা চীনের ‘বেল্টরোড উদ্যোগে’ অন্তর্ভুক্ত হতে আপত্তি বা দ্বিধা করে থাকে, তাদের মধ্যে সিঙ্গাপুর অন্যতম ছিল। বিশেষ করে যেখানে আবার পশ্চিমের কাছে সিঙ্গাপুর এক বিশেষ অর্থ ও গুরুত্ব বহন করে। যেখানে তারা সিঙ্গাপুরকে গড়ে তুলেছিল ফ্রি-পোর্টসহ পশ্চিমের উৎপাদিত পণ্যের এশিয়ান স্টোর/গোডাউন হিসেবে; আর একই সাথে ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ পুঁজির স্থানীয় বা বর্ধিত অফিস হিসেবে। এই হল ফ্রি-পোর্ট সিটির সিঙ্গাপুর; মানে বিনা মাশুলে পুনঃরফতানিযোগ্য করে নিয়ম বানানোর সিঙ্গাপুর। পশ্চিমের সেই সিঙ্গাপুরে এখন বেল্ট-রোড উদ্যোগকে একালে জায়গা করে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ বৈকি। অবশ্য এটিও মনে রাখতে হবে, আজকাল খোদ সেই সিঙ্গাপুরও চীনের ওপর কত বিরাট নির্ভরশীল। সেটা কী রকম?

পশ্চিম চীনের সাথে বহু সম্পর্কই করে থাকে সিঙ্গাপুরের মাধ্যমে, সিঙ্গাপুরে অফিস খুলে। যেমন একটা উদাহরণ দেই। আজকাল চীনে উঠতি সম্পদের মালিক যারা, এমন যাদের এক মিলিয়ন ডলার বা এর বেশি অর্থ বাজারে বিনিয়োগের সক্ষমতা আছে – এমন এদেরকে বাজারে নিয়ে আসা সহজ করতে সাহায্য করতে, এমন ব্যক্তি ক্লায়েন্টদের ধরতে আমেরিকা বা সুইজারল্যান্ডের বিনিয়োগ কোম্পানিগুলো সিঙ্গাপুরে অফিস খুলেছে। আর সেখান থেকে তাদের রিলেশনশিপ ম্যানেজাররা চীনে সরাসরি ক্লায়েন্টদের বাসা সফর করছে। ফলে সার কথায় সিঙ্গাপুর আর কেবল পশ্চিমের এক্সটেনডেড দোকান থাকেনি, চীনেরও হয়ে উঠছে। তাহলে এখন বেল্ট-রোড উদ্যোগে নতুন অন্তর্ভুক্তি, সেটা শুধু কি সিঙ্গাপুরই?

না আরো আছে, আরও বড় সে নাম হল খোদ জাপান। কারণ কী? ব্যাপারটা হল, চীনের নতুন এক সিদ্ধান্ত। এমনিতেই চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগ এক বহুরাষ্ট্রীয় (৬৫ রাষ্ট্রেরও বেশি) অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প। ফলে ভুগোলের বিচারে এতে বিনিয়োগ সুযোগের বড় অংশই চীনের বাইরে। চীন ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগের’ অংশ হিসেবে তৃতীয় রাষ্ট্রে চীনের সাথে যৌথ বিনিয়োগে সিঙ্গাপুর বা জাপানকে সংশ্লিষ্ট হতে চীন অফার (Investment in Third Country) দিয়েছে। এতে সিঙ্গাপুরের মত জাপানও প্রবল আগ্রহ দেখিয়েছে।

ওদিকে সবকিছুর পালটা কিছু থাকে। তাই, এশিয়ায় চীনের ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’-এর পাল্টা আমেরিকান নেতৃত্বের যে উদ্যোগ আছে, সেটি মূলত “ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি” নামে হাজির আছে। আর এর সহযোগী উদ্যোগ হল “কোয়াড”(QUAD) , মানে চীনবিরোধী ‘আমেরিকা, জাপান, ভারত ও অস্ট্রেলিয়া’ এই চারদেশীয় জোট। কিন্তু কখনই এই চার দেশ একসাথে একমতে খাড়া হতে পারেনি। কমন ভাষায় একটা বিবৃতি দিতে পারে নাই। এর মূল কারণ, এরা সবাই চীনের সাথে নানান ব্যবসায়িক স্বার্থে জড়িয়ে আছে আবার একই সাথে অন্যন্য স্বার্থবিরোধে জড়িয়ে থাকার কারণে আমেরিকার সাথে এক কমন প্লাটফর্মে আসতে চেয়েছে কিন্তু বড় কিছু করে দেখাতে অসফল। ফলে সব সময়ই দেখা গেছে এই চারের কেউ একজন চীনের সাথে নিজের ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রাবল্য অনুভব করে বাকিদের সাথে থাকেনি।

‘বেল্ট-রোড উদ্যোগ’ চীনের সাথে তৃতীয় রাষ্ট্রে যৌথ বিনিয়োগের অফার পাওয়া জাপান, তাদের প্রতিক্রিয়া বোঝাতে ভদ্রকুমার কিছু ঘটনা টেনেছেন। তাঁকে এক জাপানি কূটনীতিক বলছেন, “আমাদের কিছু আসিয়ান সদস্য বেল্ট-রোড উদ্যোগের সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজিকে তুলনা করতে পছন্দ করছে না”। [“Some ASEAN members didn’t like the idea of having to make a choice between an Indo-Pacific strategy and the Belt and Road Initiative]।  ফলে জাপানের প্রধানমন্ত্রী আবে এরপর “ইন্দো-প্যাসিফিক” শব্দটি বলা বন্ধ করেছেন। তা না বলে এর বদলে বলছেন “ভিশন”। ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জাপানি কর্মকর্তা বলছেন, আসলে “স্ট্র্যাটেজি শব্দটির মধ্যে অন্য রাষ্ট্রকে পরাজিত করানোর একটা অর্থ লেপটে আছে, সে কারণেই এই পরিবর্তন”। অর্থাৎ জাপানও কোয়াড থেকে নিজেকে দূরে নিতে চাচ্ছে। কিন্তু এত কিছুর পরও ছাড়া ছাড়াভাবে চলা কোয়াডের যুগ্মসচিব পর্যায়ের এক বৈঠকে ভারত যোগ দিচ্ছে। সেই রেফারেন্স তুলে ভদ্রকুমার বলছেন, জাপান ভারতকে পেছনে ফেলে সিদ্ধান্ত নিয়ে চলে গেল। এভাবে এশিয়া-প্যাসিফিকের ভূকৌশলগত অবস্থা পরিস্থিতিই বদলে যাচ্ছে। আর মোদির ভারত এতে বিরাট কিছু সুবিধা হারাচ্ছে, অথচ নিজ অবকাঠামোগত সুবিধা পাওয়া বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না।

শেষ কথাঃ
শেষ বিচারে চীন-ভারত সম্পর্কের ঐতিহাসিক গন্তব্য-অভিমুখ হল তাদেরকে পরস্পর ঘনিষ্ট হয়ে আমেরিকার বিরুদ্ধে হাত ধরে উঠে দাঁড়ানো। আমেরিকা দুনিয়ার অতীত, যেখানে চীন আগামি। ভারতকেও আগামির অংশ হওয়ার খাতিরে খাবলা-সুবিধা নেয়া ত্যাগ করে স্থির-পক্ষ নিতে হবে। কিন্তু মায়ের দুষ্ট ছেলের মত প্রলোভনে প্রলুব্ধ হয়ে ভারত প্রায়ই টেবিল ছেড়ে চলে যায়; যার অনিরাপদবোধও আছে। এসবের মানে আবার এই না যে চীনের সিদ্ধান্ত বা অবস্থান সবসময় ফেয়ার বা বেস্ট হয় বা থাকে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীন-ভারতের শত্রুতা ও মিত্রতা”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]