পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আমেরিকার বন্ধুদের নড়াচড়া, কী বুঝে

গৌতম দাস

০৩ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2AL

 

বাংলাদেশের “পররাষ্ট্রনীতি” বলতে যা কিছু আছে তা হঠাৎ করে আমেরিকানদের নজরে পড়েছে মনে হচ্ছে। যদিও এরা কোন আমেরিকান, কারা এরা, তা নিয়েও কথা আছে অবশ্য। সে কথায় পরে আসা যাবে। এই নড়াচড়া বা নজর ফেলা এককথায়, পন্ডশ্রম। বিষয়টা ‘প্রথম আলো’র ভাষাতেই বললে, গত ১৭ মে তাদের একজন লিখেছে, “বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কোন পথে- এই জিজ্ঞেস নিয়ে সম্প্রতি এক গোলটেবিল বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন রাজনীতিক, কূটনীতিক, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। আলোচনায় উঠে আসে আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ভেতর-বাহির, জাতীয় নিরাপত্তা, রোহিঙ্গা সমস্যা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা দিক। আয়োজক ছিল বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট (বিইআই, BEI) এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই, IRI )“।

আয়োজক প্রতিষ্ঠান দু’টি আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ধরনের দুই প্রতিষ্ঠানের সাথে সম্পর্কিত। তারা ঐ থিঙ্কট্যাঙ্কেরই বাংলাদেশ শাখা নাকি কেবল ফান্ডদাতা-এনজিও সম্পর্ক, কোনটা- সেটা তাদের মুখ থেকেই আমাদের জানার বাকি আছে। যা হোক, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো যা কিছু নিজের কাজের ইস্যু হিসেবে তুলে আনে, অনুমান করা অবাস্তব হবে না যে, তা আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থ বলে তারা মনে করে।

কথা হল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি কেমন আছে, এর ঘাটতি, খামতি কী – সে প্রশ্ন এখন কেন? বিশেষ করে আজকের খোদ বাংলাদেশই যে দশায় আছে, একে এই অবস্থায় আনা ও ফেলার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকায় আমেরিকান বন্ধুদেরও অবদান আছে। গত ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকায় ক্ষমতায় থাকা বুশ এবং ওবামা- এই দুই প্রশাসনের তো বটেই অন্তত আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটেরও [AEI] বিশেষ ভূমিকা এ ক্ষেত্রে আছে। বাংলাদেশকে নিয়ে কী করা হবে এনিয়ে অন্তত  ভারত-আমেরিকার আলোচনাগুলোতে, গোলটেবিল বা ইনফরমাল বৈঠকে ইনপুট দিয়ে।

বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এক ধরনের পরিণতি, এই অর্থে ‘উত্তরসূরি’ বলা যায়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি বাংলাদেশে যে এক ধরনের সামরিক ক্ষমতা দখল হয়েছিল তাকে আমরা অনেকে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ বলি, যা দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। কেন এই ঘটনা ঘটেছিল, এর ‘আনুষ্ঠানিক’ কারণ কখনও জানা যাবে না। কিন্তু আসল কারণ যা দখলকারীদের সাফাই-বক্তব্য থেকে জানা যায়, মোটাদাগে সে ভাষ্যটা হল – আগের সরকার  “ওয়ার অন টেরর” -কে ঢিলেঢালাভাবে নেয়াতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে “জঙ্গি মোকাবেলার উপযোগী” করে ঢেলে সাজানো ও সংস্কার করা হয়নি। সে কাজগুলো সম্পন্ন করতেই ঐ ক্ষমতা দখল। কিন্তু এই বক্তব্যটা ক্ষমতা দখলের ছয় মাস পরে বদলে যায়।

মূল কারণ, আমেরিকান অগ্রাধিকার মানে কোনটা বেশি গুরুত্বপুর্ণ ও আগে দরকার সেই বোধ বদলে গিয়ে এক নতুন আকার নিয়েছিল। আমেরিকা ওয়ার অন টেরর বা জঙ্গি ঠেকানোর চেয়ে তখন থেকেই “চীন ঠেকানো’-কে আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের জন্য অগ্রাধিকার সাব্যস্ত করেছিল।  না সাব্যস্ত করা ছিল আগেই তবে বাস্তবায়ক রেডি ছিল না তখন। আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’[China containment], মানে ‘চীন ঠেকানো’ নামের কর্মসূচি আছে। এর অর্থ হল, ২০০৫ সালের পর থেকে গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা হিসেবে চীনা উত্থান আর আমেরিকার পতন যখন আমেরিকার নিজের করা সার্ভে ও পরে তা নিয়ে প্রকাশিত (২০০৮) রিপোর্টও স্বীকার করে, তখন এশিয়ার দুই ‘রাইজিং অর্থনীতি’ চীন ও ভারত – এদের একটাকে (ভারতকে) কাছে টেনে একে অপরটির (চীনের) বিরুদ্ধে লাগানোর নীতিই আমেরিকার “চায়না কনটেইনমেন্ট”। আমেরিকার এই “চায়না ঠেকানোর” নীতিতে ভারত নিজেকে পরিচালিত হতে দিতে রাজি হয়ে যায় এসময়েই। বাংলাদেশে আমেরিকান প্রায়োরিটি বদলের রহস্য এখানেই।  সেজন্যই হঠাত করে এই রদবদল ঘটেছিল।

আর এর বিনিময়ে ভারত পায় – এক. একদিকে আমেরিকায় পণ্যের রফতানি বাজারে বিনা বা কম শুল্কে আমেরিকায় প্রবেশ সুবিধা, ভারতের আমেরিকান হাইটেক অস্ত্র আমদানি ইত্যাদি। আর দুই. এছাড়াও অন্য দিকে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে “দেখভালের দায়িত্ব” তুলে দেয় যাতে জঙ্গী ঠেকানো কথার আড়ালে ভারত বিনা পয়সার করিডোর, আসামের বিদ্রোহ দমনে বাংলাদেশকে ব্যবহারসহ এ দেশকে সরাসরি অন্যান্য নানান ব্যবহার করে সব সুবিধাই নিতে পারে ভারত।  প্রায় নিয়ন্ত্রক বনে ভারতের হাতে চলে যায় বহু কিছু। যেমন, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে ও প্রয়োজনে একটা গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে চীনের সাহায্য নিবে কিনা তা নির্ভর করবে ভারতের স্বার্থ এই অগ্রাধিকার যদি তা এলাও করে একমাত্র তবেই। এর সোজা অর্থ, ভারত বন্দর চায় না তাই বাংলাদেশ এটা করতে পারবে না।

ফলে এভাবেই এরপর থেকে চলে আসছে আজ পর্যন্ত, আমাদের এই দুর্দশার শুরু এখান থেকে। কিন্তু সেই আমেরিকা এখন আবার আরও কী চায়? একই লোকদের আমরা আবার তৎপর হতে দেখছি কেন?

গত ২০১৪ সালের নির্বাচন উপলক্ষ্যে আমরা দেখেছিলাম যে, সেবার বাংলাদেশের বিনা ভোটের নির্বাচনকে ভারত প্রকাশ্যে সদর্পে সমর্থন দিয়েছিল আর তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সরকার এত ঘনিষ্ঠতায় মিলে গেছিল যে, তারা কেউই আর যেন আমেরিকাকে চেনেই না। বাংলাদেশে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ডন মোজিনা, ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নিজের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে ব্রিফিং না পেয়ে বা না নিয়ে ভারতে গেছিলেন – এই ব্যাপারটা খুবই প্রতীকী নিঃসন্দেহে!

বাস্তবতা হল, আমেরিকা এখন নিজের সব মুরোদই হারিয়েছে। চীন ঠেকানোর যে কাজ ভারতকে দিয়ে করানোর বিনিময় হিসেবে আমেরিকা ভারতের হাতে বাংলাদেশকে দেখার দায় তুলে দিয়েছিল, তাতে কি চীনের উত্থান ঠেকানো গেছে? প্রশ্নই উঠে না কারণ এভাবে তা হয় না।  তাই আমেরিকা তা ঠেকাতে পারেনি। কোন দাগও ফেলতে পারেনি, আমাদেরকে কষ্ট-দুর্দশায় ফেলা ছাড়া। বরং নিজেরই বেগতিক অবস্থায় আর দুর্দিনে আমেরিকা এক “পাগলা প্রেসিডেন্ট” পেয়েছে, যিনি নিজেই আমেরিকার গ্লোবাল নেতাগিরি ছেড়ে দিতে চান। তিনি নাকি ন্যাশনালিস্ট আমেরিকান! কী তামাশা! গ্লোবালাইজেশনের নেতা আমেরিকা, যে দুনিয়াটাকে অন্তত ৩০ বছর ধরে একটা গ্লোবালাইজড শ্রমবিভাজিত এক গ্লোবাল অর্থনীতিতে নিয়ে গিয়েছে, সেই আমেরিকার পাগলা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, উনি এখন নাকি ‘ন্যাশনালিস্ট’, সবকিছু “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিতে ফরে সাজিয়ে ফেলবেন বা হয়ে যাবেন। যেন বুড়া বয়সে বিড়াল বলছে সে আর মাছ খাবে না।

কিন্তু ঘটনার কঠিন সত্য দিকটা হল, আমরা কেউই মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে পারি না, পারব না।  এটা সম্ভব নয়। তাই এর চিন্তাই করি না। কিন্তু এই গোয়াড় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মনে করেন এটাও নাকি করা সম্ভব। ব্যাপারটা এমনই নাকি সহজ। আসলে পাগলামি আর দেশ চালানো তো এক জিনিস নয়। তাতে আমাদের অসুবিধা নেই; কিন্তু যারা বাংলাদেশে আমেরিকান স্বার্থের দেখভাল করে সেই “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা” তাদেরকে আবার তৎপর হতে আর বড়ই পেরেশান দেখাচ্ছে। সমস্যাটা মূলত তাদের। মনে হচ্ছে তাঁরা এটা বুঝতে বা এই বাস্তবতা মানতে চাচ্ছেন না।

অন্য রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ করা ন্যায় কিনা কথা সেটা না। সে প্রশ্ন পাশে ফেলে রেখে আগালে এসব ব্যাপারে প্রথম দেখা প্রয়োজন হয় মুরোদ আছে কী না। কিন্তু ট্রাম্পের আমেরিকা মুরোদহীন। অর্থাৎ তিনি আমেরিকাকে মুরোদহীন করে ফেলেছেন অথবা আমেরিকা যে মুরোদহীন এটা মেনে নিয়েছেন। এখন ‘মুরোদহীন’ হলে আর সে তো মরদ থাকে না। তাই আমেরিকার মরদগিরি শেষ। ভারতকে বাংলাদেশ দিয়ে দেয়ার পর থেকে ঘটনাচক্রে আমেরিকাও এই মুরোদহীন হয়ে যায়, ট্রাম্পের উত্থানের মধ্য দিয়ে। তাই, ইতিহাসে ২০০৭ সালই সম্ভবত বাংলাদেশে ‘সর্বশেষ আমেরিকান হস্তক্ষেপ’ বলে উল্লেখ থাকবে। অন্তত ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত, মানে ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত আমেরিকা এমন থাকবে – অভিমুখ, ঝোঁক তাই বলছে। ২০২১ সালে (মানে ২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে) কে প্রেসিডেন্ট হিসাবে জিতে বসবে – ডেমোক্রাট না রিপাবলিকান, এছাড়া আবার সে কেমন প্রেসিডেন্ট হবে – এগুলো হাজারটা শর্তের “যদি-না-কিন্তু” এর প্রশ্ন। এককথায় বিষয়টা এখন পুরাটাই অনিশ্চিত। আর ততদিনে আমেরিকার আগের মতন বাস্তব হস্তক্ষেপের মুরোদই থাকবে না, তা না হলেও তা আরও কমে যাবে। বাস্তবতাই থাকবে না হয়ত। অতএব, বাংলাদেশের “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকান” – আপনারা নিশ্চিত থাকতে পারেন ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত কিছুই হচ্ছে না। পারছেন না। আমরা জানি নভেম্বর ২০১৮ জেমস মাতিসের [Mattis] পদত্যাগ আপনাদের সব আশার বাতি নিভিয়ে দিয়েছে, আপনারা অনেক দুঃখ পেয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হল আসলে সেটাই শেষ।  মনে রাখতে পারেন – ট্রাম্প যতদিন অফিসে আছে তিনি সবকিছু ফ্রিজ করে দিবেন। এই সময়ের মধ্যে স্টেট ডিপার্টমেন্ট, পেন্টাগন ইত্যাদি যেখানেই যা কিছু নড়াচড়া শুরু হোক না কেন, সেসব হোয়াইট হাউজে যাওয়া মাত্রই ‘আমেরিকান স্বার্থের’ সবচেয়ে ‘ভালো ভালো উদ্যোগ ও প্রস্তাব’ তা যত ভালই হোক না কেন – এসবই ডিপ ফ্রিজে চলে যাবে। কারণ, পুরনো অভ্যাসে “ফ্রেন্ডস অব আমেরিকার”  এসব তৎপরতার প্রতি ট্রাম্প ন্যূনতম আগ্রহী নন। এখান থেকেই এটাকে ‘মুরোদহীনতা’র শুরুও বলতে পারেন। কাজেই দিন শেষ!

আসলে ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ যারা তাঁরা সম্ভবত আসলে খেয়ালই করেননি যে ২০০৭ সালেই তাদেরকে অসত্য বলা হয়েছিল। ‘ওয়ার অন টেরর’-এর ভয়াবহতার কথা তুলে তা সামনে রেখে এর আড়ালে আমেরিকা ‘চীন ঠেকানোর প্রায়রিটি’তে মেতে উঠেছিল। ভারতের হাতে সব তুলে দিয়েছে অথচ বাংলাদেশের বন্ধুদেরই তা বলেনি। আর বাংলাদেশের বন্ধুরা যদি জানতেনই তাহলে তারা বিশ্বাসঘাতক ও আত্মঘাতি। তবে তাদের শান্ত্বনা এই যে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে এসে আমেরিকার পক্ষে আর সত্য লুকায়ে রাখা সম্ভব হয় নাই।  ‘ওয়ার অন টেরর’ যে আর আমেরিকার প্রায়রিটি নয়, সে তা আর লুকিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস মাতিস এই সময়ে এসে আর না লুকিয়ে পরিষ্কার করে দিয়েছেন [Mattis: US national security focus no longer terrorism]। এটা ২০১৮ সালের শুরুতে ১৯ জানুয়ারি বিবিসির সংবাদ শিরোনাম। মাতিস বলছেন, “টেররিজম নয়, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা আমেরিকার জন্য প্রধান হুমকি”। অথচ এই কথাটাই ২০০৭ সাল থেকেই তাদের মনের কথা। কিন্তু বাংলাদেশ নিয়ে সিদ্ধান্তের সময় থেকেই সব স্তরে তা লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। মুল কারণ দুনিয়াতে চীনা উত্থান অনিবার্যভাবে আসন্ন – সেকথা তারা তখনই গবেষণা সার্ভে ও স্টাডির রিপোর্ট প্রকাশের প্রাক-কাল অবস্থা থেকেই তা নিশ্চিত হয়ে গেছিল। আনুষ্ঠানিক এমন রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল ২০০৮ সালে।

এই বিকল্প ডেভেলবমেন্টগুলো ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ এরা আমল করেছিলেন বা করতে সক্ষম ছিলেন তা তাদের কারবার ততপরতা দেখে কখনও মনে হয় নাই। কিন্তু এতে আসলে যা মূল জিনিষটা বদলে গেছে, বিশেষ করে খোদ ‘ফ্রেন্ডস’ শব্দটিরই সংজ্ঞা বদল হয়ে গেছে ট্রাম্পের হাতে, সেটাই কেউ আমল করেছে মনে হয় নাই। ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান – তাঁর পরিচলন নীতিটাই আসলে বলে দিয়েছে, প্রশ্ন তুলে দিয়েছে যে – আদৌ আমেরিকার কোনো ফ্রেন্ড দরকার আছে কি না? ট্রাম্প নিজেই জবাব দিয়েছেন, যে দরকার নাই। আর যদি থাকেও, তারা ভিন্ন কেউ; অথবা বাংলাদেশে তার এমন ফ্রেন্ড আর লাগবে না। ট্রাম্প নিশ্চয় সরাসরি এ কথা বলেননি, তবে তাঁর অনুসৃত নীতি (ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্প বা ট্রাম্পের নাশনালিজম) এই মেসেজটিই স্পষ্ট করে দিয়েছে।

বাংলাদেশে আমেরিকান বন্ধুদের (Friends of America, in Bangladesh) বাংলাদেশকেই সবকিছুর জন্য দোষী ঠাউরানো – অস্বাভাবিক বা নতুন না। এটাই তারা সবসময় করে এসেছেন। যেমন এভাবে অনেকে এখনও বলছেন যে, ভাল ভাল “গণতান্ত্রিক দেশে”  তাদের পররাষ্ট্রনীতি নাকি “জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে” সমর্থিত ও সমৃদ্ধ থাকে বলে, পররাষ্ট্রনীতির চ্যালেঞ্জ তারা সহজেই মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু আমরা দুর্ভাগা; সেই সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারিনি। আবার প্রথম আলো পত্রিকা যে রিপোর্ট করছে তাতেও দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় প্যারায় তারাও লিখেছে এভাবে – “আলোচনায় প্রায় সব বক্তা অভিমত প্রকাশ করেন, যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য হল সর্বোচ্চ জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য সুদৃঢ় না হলে সেটি অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিরোধী দলে থাকতে একে অপরের বিরুদ্ধে ‘সার্বভৌমত্ব’ বিকিয়ে দেয়ার অভিযোগ করে থাকে, যা জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পরিপন্থী। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে ক্ষমতার পালাবদল হলেও পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হয় না। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে পররাষ্ট্রনীতিও অনেকটা বদলে যায় বলে জনমনে ধারণা আছে। এ ছাড়া পররাষ্ট্রনীতির বিষয়টি অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও সুশাসনের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বলে মন্তব্য করেছেন একাধিক আলোচক”। অর্থাৎ সার কথা আমেরিকার কোন দোষ নাই। সব আমাদের দুই দলের রেষারেষির কারণে, তাই সবদোষ আমাদেরই।

বিইআই ও আইআরআই-এর আলোচনা সভায় আমাদের রাজনৈতিক দলের ওপর সব দায় চাপিয়ে এমন মন্তব্য খুবই অনুচিত ও অবিচার তা বলাই বাহুল্য। কারণ, ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও অবস্থানের ব্যাপার কমবেশি সবই আপনারা তো জানেন। আমাদের রাজনৈতিক দলের বিবাদ আছে কথা সত্য, ফলে তা অনেক কারণের একটা । কিন্তু তা থাকলেও সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী কারণ তো – আমেরিকার হস্তক্ষেপ।

ঠিক আছে তাহলে আসেন, আপনাদের বক্তব্যকে সরাসরি মিথ্যা প্রমাণ করে দেয়া ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ, আপনাদের বক্তব্যের দুদিন পরেই। ভেঙ্গে বললে, একটা বড় ঘটনাই ঘটেছে। সম্ভবত বলা যায় যে চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে আমাদের সম্মিলিত বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এটাই এই প্রথম আমরা প্রধান দলগুলো একটা সফল এককাট্টা অবস্থান প্রকাশ করেছে।

তাহলে ঠিক এখনই আপনাদের নড়াচড়া কেন?
সম্প্রতি চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্প প্রসঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান কী হবে তা নিয়ে এই প্রথম প্রধান দলগুলো একটা সফল অভিন্ন অবস্থান প্রকাশ করেছে। আর এটা তারা করেছে ভারতের এব্যাপারে অবস্থান যাই হোক না কেন – এই প্রথম এটা ধরে নিয়ে। “গত ১৯ মে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ‘বাংলাদেশ চীন সিল্ক রোড ফোরাম’ গঠন করেছেন”। বেশির ভাগ পত্রিকার হেডিং এটাই। এর বেশির ভাগ কৃতিত্ব হয়ত বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদুতের – তা যারই হোক, এ ঘটনা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভি, ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ঝাং জুয়ো -এদের উপস্থিতিতে সহায়ক সে কমিটি করা হয়েছে সেখানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খানসহ অনেকে এর সদস্য হয়েছেন। মঈন খান বক্তৃতায় করেছেন। ওদিকে ড. গওহর রিজভী [Gowher Rizvi] ঐ সভায় দাবি করেছেন যে, “ভারত নিজেই এখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন করছে”।

এই কথাটার বাস্তবতা অবশ্যই আছে। তবু বাস্তবতা যতটুকুই থাক একেবারে মাঠের ফ্যাক্টস হল, এই গতকাল ১ জুন ২০১৯ ব্লুমবার্গ রিপোর্ট লিখেছে যে ট্রাম্প চীন ঠেকানোর ঠিকাদারিসহ  ভারতের সাথে কোন খাতিরের সম্পর্কই করতে চান না। সবকিছুর মাথা মুড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। কাগজ কলমে ভারত সুবিধাদিগুলো উপভোগ করত কারণ, ভারত আমেরিকার বিবেচনায় একটা উন্নয়নশীল দেশ [Developing Nation] ঘোষণা করা ছিল বলে। এখন ট্রাম্প সেটার মাথা মুড়িয়ে দিয়েছে, বলছে Trump Ends India’s Trade Designation as a Developing Nation.। এমনিতেই আগের ভারতকে দেয়া সবসুবিধা ( যা চীন ঠেকানোর বুটি হিসাবে ওবামা দিয়েছিল) ট্রাম্পের আমেরিকা বন্ধ করে দিয়েছিল গত বছর ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে। শুধু তাই না উলটা ভারতীয় রপ্তানি পণ্যের উপর বাড়তি শুল্ক ট্যারিফ বসিয়ে দিয়েছিল যাতে রপ্তানিই অকার্যকর হয়ে যায়।

কাজেই ভারত এখনও আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর খেপ মারতে” পুরানো শর্ত রাজি থাকলেও খোদ ট্রাম্প বাবাজিরই “মন” নাই। নট ইন্টারেস্টেড। এই ফ্যাক্টসটা আমল করলে বাংলাদেশের ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ এদের সব ততপরতাই পন্ডশ্রম। ওদিকে খেয়াল করলেই আমরা নিজেরাও বুঝব যে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলতে চীন গত বছর থেকেই পুরাপুরি তৈরি – এবং তা বাস্তবায়িতই হয়ে গেছে। এর প্রমাণ সফল  য়ুহান সম্মেলন (Wuhan Summit)। এমনকি এবছরও সম্ভবত পরের মাসে দ্বিতীয় য়ুহান সম্মেলন হতে চলেছে। এসব ততপরতার সার কথাটা হল এবার হয় ভারত চীনা শুধু বেল্ট ও রোড প্রকল্পেই না খোদ চীনা নৌকাতেই উঠবে। যদি কোন কারণে না উঠতে পারে, বনাবনি না হয় তবে পরস্পর কঠিন শত্রুতার দিন শুরু হবে। সুতরাং  নিঃসন্দেহে ভারত অনেক দাম চাইবে। যা তার দাম নয় এর চেয়েও বেশি হবে হয়ত সেই প্রাথমিক “asking price” । কিন্তু চীনা স্বার্থের চেয়েও বেশি এমন অসম্ভব অবাস্তব কিছু না চাইলে এই ডিল হবার সমূহ সম্ভাবনা। বিশেষ করে দুটা ফ্যাক্টস এর পটভুমিতে একথা বিবেচনা করা যায়। এক. চীন-আমেরিকার বাণিজ্য যুদ্ধ মিটিয়ে নিবার ডিল ব্যর্থ হয়ে গেছে যা, এখন পরবর্তি ঝড়ের অপেক্ষায় যা এখন আসন্ন। আর দুই. ভারত শত চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের কোন ডিল, কোন “খেপ” পাবার কিছুই নাই, কোন অফারও নাই। বরং পুরা উপেক্ষা আছে। ভারত চীনের কোলে গিয়ে উঠে বসলেও যেন ট্রাম্পের তা নিয়ে কোন পরোয়া নাই। ভারতকে এমনই তাচ্ছিল্যের মুডে আছেন ট্রাম্প। যার মূল কারণ হল, ট্রাম্প তার এখন প্রধান লক্ষ্য হল দ্বিতীয় বার নির্বাচনে দাঁড়ানো – এই মুডেই তিনি আছেন। আর তাই যা কিছু সিদ্ধান্ত তিনি এখন নিচ্ছেন তা সে উদ্দেশ্যেই প্রভাবিত। চীনের সাথে বিরোধ মিটিয়ে কোন বাণিজ্য ডিল না করা অথবা ভারতকে কোন বিশেষ সুবিধা না দেওয়া ইত্যাদি এমন সবই একারণে তুচ্ছ ট্রাম্পের কাছে। বরং তিনি বীর, তিনি আমেরিকান ন্যাশনালিস্ট – এই পরিচয় গড়তে তিনি একমাত্র ব্যস্ত যা দিয়ে তিনি নির্বাচন লড়বেন। যদি না আবার ইমপিচমেন্টের মুখোমুখি হন!

কাজেই ‘ফ্রেন্ডস অব আমেরিকা’ ইন বাংলাদেশ, আপনাদের উচিত হবে বাস্তববাদী হওয়ার, সময় পার হয়ে যাচ্ছে। পন্ডশ্রম অর্থহীন। বরং ফ্রেন্ডশীপ রিনিউ বা চেক করে দেখতে পারেন – তা এখনও বহাল আছে কী না।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutam.das@gmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০১ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) পররাষ্ট্রনীতি আমেরিকার বন্ধুদের নজরে এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

গৌতম দাস

১৩ মে ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2Ae

 

চীনের মেগা অবকাঠামো প্রকল্প – বেল্ট ও রোডের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাসের ২৫-২৭ এপ্রিল। আর সেই সম্মেলনের পাঁচ দিন আগে, ২০ এপ্রিল সম্মেলন সম্পর্কে মানুষকে জানান দিতে ঢাকার চীনা দূতাবাস প্রচ্ছন্ন থেকে এক স্বাগত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এটাকে বলা যায় চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্পের পক্ষে এক প্রচারণার অনুষ্ঠান। “দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড” – এই নামে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এক ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হবে এক থিঙ্কট্যাঙ্কের আয়োজনে – এই বার্তা পৌঁছে দেয়া ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। আর সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। সাথে সেখানে আরও অনেকের মধ্যে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছিলেন ঢাকায় চীনা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স চেন উয়ি (Chen Wei )।

সেখানে প্রধান অতিথি গওহর রিজভীর যে বক্তব্যে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম করা হয়েছে সেটা হল, তিনি বলেছেন – চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ ‘ফিটস ইনটু আওয়ার ন্যাশনাল প্রায়োরিটি’ [as it ‘fits into our national priorities’…]। সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া ফাউন্ডেশন (Center for East Asia Foundation (CEAF) ) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। বেশির ভাগ বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা বিডিনিউজ২৪ পত্রিকা অনুসরণে রিপোর্টটি করেছিল, তাকে রেফার করে অথবা না করে। সম্ভবত সে কারণে অনেকেরই খবরের কমন শিরোনাম হল, গওহর রিজভী বলেছেন, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের সাথে একদম ফিট করে [China’s Belt and Road fits into Bangladesh’s priority: Gowher Rizvi]। আর বিডিনিউজের রিপোর্টের ছবিটাই একমাত্র ছবি দেখা যাচ্ছে যা কিছু ইংরেজি দৈনিকেও ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবত বিডিনিউজের ছবিটাই সেটা। তাই, এক মানবজমিন ছাড়া অন্য সব বাংলা পত্রিকা কোনো ছবি ছাড়াই রিপোর্টটা করেছে। সবচেয়ে ভাল ট্রিটমেন্ট দেয়া নিউজ করেছে মানবজমিনে। আর এরপরের ভাল ট্রিটমেন্ট হল, বণিকবার্তারটা এখানে।  এমনকি চীনের পপুলার সরকারি পত্রিকাও শিনহুয়াও (Xinhua) গওহর রিজভিকে হাইলাইট করেই রিপোর্টটা কাভার করেছে।

গওহর রিজভী সেখানে আরও বলেছেন, “আমাদের নিজেদের বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর, ) আছে, যেটা আসলে চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগেরই সংক্ষিপ্ত ভার্সন [ “We had our own BCIM (Bangladesh, China, India and Myanmar Economic Corridor) which is essentially a reduced version of the Belt and Road Initiative,”]। বণিকবার্তা আরও জানাচ্ছে – গওহর রিজভী বলেন, “বাংলাদেশ এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে গর্বিত। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও উদ্যোগের মডেল”।

এ ছাড়া সেখানে, গওহর রিজভি আর এক বিশাল দাবি করেছেন। তিনি চীন ও ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তার বৈদেশিক সম্পর্কগুলো সামলানোর দিক থেকে খুবই সফল” [“Bangladesh is extremely successful in managing its foreign relations,” added Gowher.] কিন্তু কিভাবে সেটা? তিনি বলছেন, আমরা “কোনো দিকে কোনো পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলি” বলেই আমাদের এই সফলতা ; [“It has always avoided taking sides,”]।
খুবই ভাল আর গর্বের কথা বটে। কিন্তু আসলেই কী তাই!

গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলপ্রকাশ ও নতুন সরকার গঠনের পরপরই আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০ জানুয়ারি ভারতীয় ‘সিএনএন-নিউজ১৮’ টিভিকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে এবং সুনির্দিষ্ট করে বিসিআইএম প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার কথা ভারতকে জানানো তো বটেই, উল্টো ভারতকেও আহ্বান করেছিলেন, যাতে দ্বিধা-আপত্তি ফেলে তারাও এতে যোগ দেন। বলেছিলেন “বিসিআইএম প্রকল্প স্বাক্ষরের পর আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই” [“After signing that agreement, I think there is no reason to worry about the corridor for India,” ]। আর ‘ভয় পাওয়ার কোনো ইস্যু থাকলে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয়ভাবে’ (বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে) কথা বলে তা মিটিয়ে নিতে পারে ভারত। হাসিনার এই সাক্ষাৎকারের আলোকে দেখলে গওহর রিজভীর গতমাসের এই বক্তব্য এরই ধারাবাহিকতা মনে হবে।

রিজভীর এই বক্তৃতা ২০ এপ্রিলের। বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলন ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা। তাই এমনকি রিজভী ওই সভায় জানিয়েছিলেন, আমাদের শিল্পমন্ত্রী দ্বিতীয় সম্মেলনে বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। সব ঠিকঠাক, কিন্তু একটা ‘কিন্তু’। কোথায় গেল গওহর রিজভির “কারও কোন পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলির” – কূটনীতিক সাফল্য?

এর ঠিক তিন দিন পর, ২৩ এপ্রিল মানে চীনে মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনের দুই দিন আগে  – আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের হঠাত এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয় হংকংয়ের দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে। এর শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে” [Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans as it seeks to fund future development]।’
তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? যে মেগা প্রকল্পকে বাংলাদেশ ‘স্বাগত জানায়’, আমাদের “প্রায়োরিটির সাথে যা খাপে খাপে মিলে গেছে” বলে দাবি করি, আমরা যার “অংশ হতে পেরে গর্বিত”, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ‘সাকসেস স্টোরি’, ইত্যাদি কথা বললেন গওহর রিজভী দুই দিন আগে, সেসব বয়ান এবার উল্টো রথে গেল কেমন করে? আর  পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তিনিইবা কেন এবং কিভাবে বলছেন, বাংলাদেশ ‘চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে?’ এমনকি যেখানে ওই ২৩ এপ্রিলই আমাদের শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ন বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের সম্মেলনে যোগ দিতে চীন রওনা হয়েছেন! আসলেই এটা সত্যিই এক বিরাট তামাশা যে, মানুষ যা নিয়ে “গর্ব করে” তারই আবার “বিকল্প খোঁজে” কিভাবে এবং কেন?

এরপর থেকে সব সুনসান, শিল্পমন্ত্রীও চীন থেকে ফিরে এসেছেন। মনে হচ্ছে চুপচাপ থাকছেন। কারণ, মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো রিপোর্ট প্রচারিত হয়নি। ভারত আগের মতোই, তারা এবারের বেল্ট ও রোড মেগাপ্রকল্পের এবারের সম্মেলনেও নাই। যদিও ভারতের মিডিয়ার পাল্টা প্রপাগান্ডা আছে। যেমন ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা রিপোর্ট করেছিল, তারা খুব খুশি যে, “বিসিআইএম প্রকল্প নাকি এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনে বাদ” [China drops BCIM from BRI projects’ list] দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সে সময়ের ‘আবহাওয়া’ ভারতের দখলে, অন্তত ৮ মের আগ পর্যন্ত। ওই আবহাওয়ার ভারতীয় মেসেজ ছিল এমন যেন বলতে চাচ্ছিল – বাংলাদেশ বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে “অগ্রাধিকার খুঁজে পেয়ে” বা এতে “গর্বিত” হয়ে বা ভারতকে এ প্রকল্পে যোগ দিতে “ভয় নেই” বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘আহ্বান রেখে’ যেন বিরাট অন্যায় করে ফেলেছেন। তাহলে আসলেই কি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আমরা কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলতে পেরেছি, নাকি ভারতের আপত্তির ভয়ে সিটকে গেছিলাম? কিন্তু কেন?

ক্ষমতা কেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে না যে সেই ক্ষমতাঃ
কথা এটা নয় যে, বর্তমান সরকার বৈধ কি অবৈধ, নির্বাচিত প্রতিনিধি কিংবা নয়, সুষ্ঠু ভোট হয়েছে কি হয়নি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন, এটাই বাস্তব। তার হাতেই ক্ষমতা আছে। তিনিই ডি-ফ্যাক্টোভাবে ক্ষমতায় আছেন। মানে, পদ-অধিকারী হিসেবেই তিনি ক্ষমতায় আছেন। তিনিই ক্ষমতাসীন এবং প্রধানমন্ত্রী। ফলে নিজ ক্ষমতায় অবিশ্বাস করার কী আছে? কিন্তু খোদ ক্ষমতা যখন বিশ্বাস করতে পারে না যে সেই ক্ষমতা বা তার কাছেই ক্ষমতা তখন – এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!

গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে আর একটা বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, ভারতের সমর্থন ছাড়াই এই সরকার একটা নির্বাচন পেরিয়ে নিজেকে পুনর্নির্বাচিত করাতে পারে। তখন থেকে এটা দাঁড়িয়েছে যে, ভারতের সমর্থন পাওয়া কথাটা আসলে ফেটিশ, ভুতুড়ে! কোন মানে নাই, অর্থহীন। তাতে বাংলাদেশে ওই নির্বাচনের কোয়ালিটি যেমন হোক না কেন, তাহলে ক্ষমতা কেন বুঝতে পারে না যে, সে-ই বাস্তবে ক্ষমতায়?

ধন্যবাদ দিতে হয় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূতকে। তিনি আমাদের ‘উদ্ধার’ করেছেন। আমাদের মিডিয়ার মুখে কিছু শব্দ দিয়েছেন। তিনি বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের গত ২৫-২৭ এপ্রিলের দ্বিতীয় সম্মেলনের সফল সমাপ্তিতে গত ৮ মে ঢাকায় মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছিলেন। তিনিই সদর্পে আমাদের জানালেন, বিসিআইএম প্রকল্প বহাল তবিয়তে আছে। শুধু তাই নয়, তিনি আশা করেন ভারতও এতে যোগ দেবে (‘হোপ ইন্ডিয়া উড বি পার্ট’)। আর এতে যেন বুঝিয়ে দিলেন, আমাদের সরকারের নিজের থেকে নিজের ‘মুখ লুকিয়ে রাখা’র কিছু নেই।

আচ্ছা, আগামীতে ভারত চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে যে যোগ দিবে না, এর নিশ্চয়তা কী? কোথায়, কে দিতে পারে? কেউ কী পারে? তাহলে? আমরা কার কেন, ধমকানি শুনছি কী?

আমরা কি জেনে অথবা না জেনে ভারতের পক্ষে ভাঁড় ও ভার হয়ে দাঁড়াতে চাইছি, যাতে মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার বিনিময়ে ভারত চীনের থেকে বিশাল বার্গেনিং সুবিধা লাভ করতে পারে? কিন্তু এতে আমাদের কী লাভ? আর ভারত নিজের লাভের পোটলা বাধ হয়ে গেলে আমাদের জন্য কী কোন অপেক্ষা করবে, চিন্তিত হবে? আমরা কী পেলাম তা জানার কী ভারতের কোন আগ্রহ থাকবে? নাকি থাকতে পারার কথা! নাকি নিজের পথে হাটা দিবে? এগুলো আমাদের না বুঝতে পারার তো কিছু নাই।

তাহলে ক্ষমতা কেন বিশ্বাস করতে পারে না যে সে-ই ক্ষমতা!

গত ৮ চীনা রাষ্ট্রদূতের সংবাদ সম্মেলনের ইস্যু মিডিয়ায় কিছুটা তোলপাড় তুলেছে। ৯ মের আগে বাংলাদেশে কোনো মিডিয়া এই সম্মেলনের কাভার রিপোর্ট ছাপেনি। আর পরের দিন ১০ মে দুপুরেই কলকাতার আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ামূলক রিপোর্ট তোলপাড় এনেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে- আনন্দবাজারের রিডিং হল, চীনা রাষ্ট্রদূত বিসিআইএম প্রকল্পকে এবার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে পেঁচিয়ে তুলে ধরছেন। ব্যাপারটা নাকি এখন চীনের ‘অর্থনৈতিক করিডোরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে তাকে যুক্ত’ করে পদক্ষেপ নেয়া হলো। এর ফলে ‘যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না’।

হ্যাঁ কথা সত্য, রোহিঙ্গা ইস্যু আর বিসিআইএম ইস্যুকে তিনি জড়িয়েছেন। কিন্তু এমন কথা তো নতুন নয়। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিনিয়োগসহ ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা শুরু করা গেলে সেটাই হবে রোহিঙ্গা সমস্যার ভালো সমাধান – চীনা রাষ্ট্রদূত এ কথাই বলেছেন। ঠিক যেমন অনেক প্রগতিবাদী বলেন ও ব্যাখ্যা দেন যে, আলকায়েদা বা আইএস তৎপরতা বৃদ্ধির কারণ অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা। ফলে তরুণেরা কাজকাম পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তরুণেরা আর আলকায়েদা বা আইএস করবে না”।’ এমন যুক্তি দেওয়ার অনেক লোকই আছে। তা থাক। চীনের রাষ্ট্রদূতও দিয়েছেন, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। বরং এ বক্তব্যকে স্বাগত। কারণ, ভারত যদি একমাত্র এমন বয়ানে ভয় পেয়ে থাকে কিংবা তার কানে পানি ঢোকে কিংবা এই বয়ানে ভয় পেয়েছে বলে ভারত এটাকে অছিলা হিসেবে ব্যবহার করে, মোটা দাঁও মেরে চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আপত্তি করার কী আছে? কিছু নেই।

এ ছাড়া আর একটা অর্থে আমরা রাষ্ট্রদূতের কথা বুঝতে ও গ্রহণ করতেই পারি। বিসিআইএম প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করা হয়েছে দেখতে চাইলে এর আগেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে, মানে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে কোনো টেনশন নেই, এটা অবশ্যই দেখতে পেতে হবে। মিয়ানমারের সাথে টেনশন ও অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকবে; অথচ পাশাপাশি বিসিআইএম প্রকল্প বাস্তব দেখতে চাইছি, এমন তো হতেই পারে না। ফলে রোহিঙ্গা ও বিসিআইএম একসাথে যুক্ত হয়ে থাকারই ইস্যু। তা ভারত বা আনন্দবাজার যেভাবেই বুঝুক।

তবে প্রথমত আনন্দবাজারের ওই রিপোর্টকে পড়তে হবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ইনফরমাল প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কারণ পেছনের কাহিনী সাধারণত এমন হয় যে, আনন্দবাজার ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য জানার পর তা নিয়ে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারো কাছে গেলে তাঁরা আনন্দবাজারকে “এমন রিপোর্ট করতে পারে” বলে সায় জানিয়েছে – এরকমই কিছু একটা হয়েছে বলে মনে করা যায়। কারণ “কারো” সাথে কথা না বলে এমন রিপোর্ট সাধারণত করা হয় না, এটা নিশ্চিত থাকতে পারি। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রণালয় এমন গুড মুডে কেন যে, এমন চীনাপ্রীতি বা সহানুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে আনন্দবাজারের রিপোর্টে? এটাই আসল বিষয়। কারণ আসলে, ‘মুড কুছ এইসাই চলতা হ্যায়’ আজকাল।

সংক্ষেপে মূলকথাগুলো হল – ইইউকে চীন নিজের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে গিয়ে পশ্চিমের নেয়া বা গ্লোবাল প্রকল্পে সেসব “স্ট্যান্ডার্ড প্রাকটিস” অনুসরণ করা হয় সেগুলোকেই চীনও অনুসরণ করতে রাজি হয়ে যায়, যেটা চীন-ইইউর গত মাসের সামিট থেকে প্রকাশিত তাদের “যৌথ ঘোষণায়” ঠাঁই পেয়েছে। ঠিক একই ইস্যুগুলো একমত হয়ে চীন ও সম্মেলনের রাষ্ট্র-সরকার প্রধানদের এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাতেও তুলে এনে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে চীনের বিরুদ্ধে ‘ঋণফাঁদ’ প্রপাগান্ডার সুযোগ অচিরেই বাস্তবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, নীতিগত দিকটি ইতোমধ্যে চীনের কাছে এগুলো গৃহীত। এরই লেজ ধরে এবার চীন এগিয়েছে। ভারতকেও নিজের মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে পরিকল্পনা করেছে। তা করতে গিয়ে চীন ভারতের জন্যও এক পুরা প্যাকেজ নিয়ে তৈরি হয়েছে। এর প্রাথমিক দিক ইতোমধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব গোখলের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের আগেই ২১-২২ এপ্রিল গোখলের সেই চীন সফর ঘটে গেছে। কিন্তু যতই গুরুত্বের ছিল এই সফর, গোখলেরা ততই এটাকে একেবারে অগুরুত্বপূর্ণ, ‘রুটিন’ সফর বলে প্রচার করে রেখেছেন। ভারতীয় থিঙ্কট্যাংক ওআরএফ এর মনোজ যোশীও তার লেখায় ব্যাপারটাকে “খুবই রুটিন” বলে ঢেকে দিতে চেয়েছেন। তবুও ঐ প্যাকেজের দু’টি বিষয় প্রকাশিত হয়ে গেছে বা করা হয়েছে। কাশ্মীর বিচ্ছিন্নতাবাদী মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের তালিকায় তুলতে চীনের আপত্তি প্রত্যাহার আর ভারতের সাথে বিতর্কিত বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা যা এতদিন চীনের অংশ বলে চীনের ম্যাপে দেখানো হইয়েছে সেসবের অনেক কিছু, তা এখন থেকে প্রত্যাহার। দু’টিই মূলত চীন-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এক আন্ডারস্টান্ডিংয়ের অংশ। যে কারণে এ দুই ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক। তবে মোদী আজহারসহ দু’টি ইস্যুকে চলতি নির্বাচনে নিজের সাফল্য বলে ব্যবহার করতে চায় – একারণেই  এ দুটা ইস্যু কেবল আগে প্রকাশিত হয়ে গেছে।

আসলে পুরো প্যাকেজ নিয়ে চীন অপেক্ষা করছে – ভারতের নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলেই নতুন সরকারের সাথে চীন আলোচনা ও নেগোশিয়েশন শুরু করতে সে অপেক্ষা করছে। গত বছরের মত সম্ভবত আর এক ভারত-চীন শীর্ষ সামিট – ‘য়ুহান সম্মেলন টু’ থেকে সব কিছু চূড়ান্ত করা হবে বলে গোখলের সাথে প্রাথমিক বোঝাবুঝি হয়েছে। মিডিয়ার অনুমিত রিপোর্টগুলো এরকমই। এরমধ্যে দ্যা হিন্দুর এই রিপোর্টটা ভাল ইনফরমেটিভ। রিপোর্টার অতুল আনিজা চীনে অবস্থিত দ্যা হিন্দুর একমাত্র স্থায়ী প্রতিনিধি। চীনের লক্ষ্য ভারতকে যত দূর অফার করা যায়, এর সর্বোচ্চটা দিয়ে হলেও নিজের মেগা প্রকল্পে ভারতকে শামিল করে নেয়া। এটা এমন অফার হবে যে, ভারত রাজি না হওয়া মানে হবে, বেশি চিপা লেবুর দশা।

এখন খুব সম্ভবত আমরা বুঝে না বুঝে ভারতের ভাঁড় অথবা ভারতপক্ষে বার্গেনিং ভার হতে চাচ্ছি। শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ খোলা এই অপ্রয়োজনীয়  নিজের পিঠে নিজেই ছুরি মারা প্রতিক্রিয়াই ঘটিয়েছি আমরা। ওইদিকে গওহর রিজভীর বক্তব্য- বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে – ‘ভারতের কোলে’ বসে এসব কথা তিনি কেন বলেন? এতে কোন বাহাদুরি হয়? এর সদুত্তর পাওয়া মুশকিল। আমরা যদি শক্তিহীনই হই তো চুপ থাকতে পারতাম, অন্তত! শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ না খুলে কী পারত না? কী ক্ষতি হত? নাকি আমরা কী এতই ঠেকছি যে নিজের ফেলা থুতু চাটতে হয় আমাদেরকে !

চীন-ভারত সম্ভাব্য বার্গেনিং রফায় আমরা ভারতের পক্ষে চীনের বিপরীতে ‘ওজন’ হব কেন? আমরা কেন চীন-ভারত সম্পর্কের উচ্ছিষ্টভোগী অবস্থান বেছে নিবো? চীন ও ভারতের মধ্যে কোনো রফা যদি নাই হয় তবে সেক্ষেত্রে চীনের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক কেন হতে পারবে না? এটাই কি গওহর রিজভীর ‘বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে?’ এর আসল চিত্র? এ বুঝগুলো তারা কাকে দিলেন? দিলেন কেন?

দুঃখের কথা পদ-অধিকারী হয়ে থেকেও ক্ষমতা নিজেকে বিশ্বাস করছে না যে, সে-ই ক্ষমতা। সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য কি আমাদের সেই ক্ষমতাবোধ ফিরে জাগাতে ভূমিকা রাখতে পারবে!

———–মূল লেখা এখানেই সমাপ্তি। ————-


বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে – বিস্তারিত, যাদের পড়বার মত বেশি সময় আছে তাদের জন্যঃ
এখানে “বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে” পাঠককে আবার মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। এটা মূলত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কেন্দ্রিক চারদেশীয় সড়ক ও রেল সংযোগ প্রকল্প। এটা সিঙ্গাপুরের গভীর সমুদ্র বন্দরে মালসামান নামিয়ে এরপর আবার ছোট লাইটার জাহাজে করে তা চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর এনে – এভাবে বাংলাদেশকে মহাসমুদ্র হয়ে বিদেশের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া নয়। তাই, প্রথমত এটা লাইটার জাহাজ আর না বরং মহাসমুদ্রগামী (Ocean Shiping Line) জাহাজ এখানে সরাসরি সোনাদিয়া বন্দরে কনটেইনার নামাবে। এরপর চার দেশ [বাংলাদেশ, চীন (মানে পুর্বচীন কুনমিং-এ), ইন্ডিয়া (পূর্বে কলকাতা) ও মায়ানমার] যার যার কনটেইনার সরাসরি নামিয়ে সহজেই তা নিজ দেশে নিতে পারবে; চাইলে আগের মতই আবার লাইটার জাহাজে অথবা সরাসরি সড়ক বা রেল পথে। এই সড়ক বা রেলপথের রুটটা হল – সোনাদিয়া [কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার অন্তর্গত] থেকে মায়ানমার হয়ে চীনের পুবদিকে কুনমিং-এ পৌছানো। আর ওদিকে ভারত সোনাদিয়া হবু বন্দরে যুক্ত হতে পারে লাইটার জাহাজে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার থেকে। অথবা কলকাতা থেকে যশোর হয়ে সড়ক বা রেল পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কর্ণফুলি টানেল হয়ে সোনাদিয়া বন্দর এভাবে। আসলে এই চারদেশের পুর্বদিকে যার যা জেলা অথবা প্রদেশ তা সবই ল্যান্ডলকড পাহাড়ি ভুমিঅঞ্চলে আবদ্ধ। চীনের পশ্চিম দিক যেমন হিমালয়সহ অন্যান্য পাহাড়ে আবদ্ধ; তেমন ওর দক্ষিণ দিক পুরাটাই আর বিশেষ করে দক্ষিণপুর্ব কোনা এটাই কুনমিং অঞ্চল – এটাও ল্যান্ডলকড। চীনের একমাত্র সেন্টার পুর্বদিকটাই সরাসরি সমুদ্রে উন্মুক্ত। কোন রাষ্ট্রের সমুদ্রে-উন্মুক্ত দিক নাই – তা একটা অঞ্চল নাই অথবা কোন দিকেই নাই এটা সেই রাষ্ট্রকে যোগাযোগ ব্যবসা বাণিজ্যে পিছনে ফেলে রাখবে – এই হল ব্যাপারটা বুঝার সরল ফর্মুলা। তাই এই চার রাষ্ট্রের জন্যই সোনাদিয়া বন্দর হল নিজ নিজ ল্যান্ড লকড অঞ্চলকে সমুদ্রে-উন্মুক্ত করার সুযোগ নেয়া। বিশেষ করে চীন যেমন তার পশ্চিম অঞ্চলকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের বড় সুবিধাভোগী হয়ে নিজেকে “সমুদ্রে-উন্মুক্ত” করার সুযোগ নিয়েছে। ঠিক তেমনি পুবদিকে সে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়ে সমুদ্রে-উন্মুক্ত হতে চাইছে। সোনাদিয়া বন্দরসহ এই বিসিআইএম প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারি ফলে অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হবে চীন; ফলে এর অবকাঠামো ঋণ পরিশোধে বড় রাজস্ব আয় আসবে ব্যবহারকারি চীনের কাছ থেকে।
বাংলাদেশ হবে আর এক বড় সুবিধাভোগী যে সিঙ্গাপুর নির্ভরতা ত্যাগ করতে পারবে। এছাড়া পুরা প্রকল্পের মূল ততপরতা কেন্দ্র নিজভুমিতেই নির্মিত হবে বলে এর সুযোগে নিজ অর্থনীতিকে এক আঞ্চলিক হাব – বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠার সুযোগ পেয়ে যাবে।

ভারতের আসল ল্যান্ডলকড অঞ্চল হল তার নর্থ-ইস্ট; মানে বাংলাদেশের উপরে বা, পুরা উত্তর-জুড়ে আমাদের সুনামগঞ্জ টু পঞ্চগড় এই পুরা পুব-পশ্চিম কোণার উপরে, সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল। [পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল – এরই পুব দিকটা হল মায়ানমারের পশ্চিমে, তার ল্যান্ডলকড অঞ্চল।] ভারতের নর্থ ইস্ট মানে মূলত প্রধান বড় অংশ আসামসহ বাকি ছোট ছোট পাহাড়ি মোট সাত রাজ্য। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তাদের বাংলাদেশের উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে সুক্ত হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কেবল আমাদের উত্তর পশ্চিম কোণে মানে তাদের শিলিগুড়ি চিকন-গলা হয়ে আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে এখন যুক্ত।

আসামের মুল সমস্যা মুসলমান বা বাংলাদেশি মুসলমান এগুলা কিছু না। মূল সমস্যা ল্যান্ডলকড। সমুদ্রে-উন্মুক্ত কোন অঞ্চল বা পথ নাই, এক কলকাতা যাওয়া ছাড়া।
কিন্তু নেহেরু থেকে এপর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসলেই পুরাপুরি দ্বিধাগ্রস্থ যে তাঁরা নর্থ-ইস্টকে ল্যান্ডলকড মুক্ত করতে চায় কী না! তারা একেবারেই নিশ্চিত না যে তারা আসলে কী চায়। এই কথা কিসের ভিত্তিতে বলছি? বলছি কারণ বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান। প্রথমত ভারত “বিসিআইএম প্রকল্প” বলতে যা বুঝে সেটা সোনাদিয়ায় কোন বন্দর ছাড়াই, কেবল চারদেশের সড়ক বা রেল যোগাযোগ প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের নেতৃত্ব কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্টকেই – এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকার সুবিধার আওতায় আনতে দেখতে চায় না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ভারত যতদিন বিসিআইএম প্রকল্পে সক্রিয় ছিল, টেকনিক্যাল বা রাজনৈতিক সভায় অংশ নিয়েছে সেখানে কোথাও ‘বন্দর’ বা ‘সোনাদিয়া’ শব্দ উচ্চারিত হতে দেয় নাই। সেটা ছিল চীনের বেল্ড ও রোড মেগাপ্রকল্প আইডিয়া হিসাবেই হাজির ছিল না। তাতেই বিসিআইএম প্রকল্প বলতে ভারত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর ছাড়াই কেবল চারদেশের সড়ক ও রেলের বাইরে অন্যকিছু আমল করতে চাইত না। পরে বেল্ট ও রোড প্রকল্প গেড়ে বসার পরে এর সাথে বিসিআইএম প্রকল্প যুক্ত করার প্রস্তাব আসাতে এই সুযোগে সবকিছু থেকেই ভারত দূরে থাকার সুবিধা নেয়।অর্থাৎ সোজা কথায় কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকা ভারতের নেতৃত্বের ভারতের স্বার্থের জন্য কোনই দরকারি মনে করে না। বরং বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর নিয়ে লাইটার জাহাজের উপযুক্ত বাংলাদেশের দুই বন্দর ব্যবহার করতে পেলে ভারত আর কিছু দরকার মনে করে না। আসাম বরং ‘বাংলাদেশি কথিত অনুপ্রবেশকারি’, ‘তেলাপোকা’ বা ‘মুসলমান খেদাও’ আন্দোলন করবে – এতেই ভারতের স্বার্থ, ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যত বলে বিশ্বাস করে ভারতের দলগুলো প্রায় সবাই। ভারতের অবস্থান যে ঠিক বুঝিছি আমরা এর আর এক সর্বশেষ প্রমাণের দিতে তাকানো যাক।

আট মে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদুতের সংবাদ সম্মেলনকে নিয়ে কেন ভারত এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আনন্দবাজার সেসব সাফাই জানিয়ে এক পালটা রিপোর্ট করেছে। লিখেছে,

“কূটনীতিকদের মতে, ঘোরতর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিসিআইএম নিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের অসন্তোষ জানাতে পারে না ভারত। কারণ বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে”।

যাক, গত পরশুদিনের আনন্দবাজার ভারতের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের বুঝ ও অনুমান পুরাপুরি সঠিক- তাই নিশ্চিত করল। এর মানে দাড়াল কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ল্যান্ডলকড করেই রাখতে চায়, দমবন্ধ করেই রাখতে চায়। কারণ এরা গভীর সমুদ্রে উন্মুক্ত হয়ে গেলে, অর্থনৈতিক ততপরতা ভাইব্রেন্ট হয়ে গেলে তারা আর ভারতের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। কথাগুলো শুনে মনে হল খামোখা রক্ষণশীল বাবা কথা বলছে যে মেয়েকে স্কুলে দিলে সে ছেলেদের সাথে পালিয়ে যেতে পারে। বলাই বাহুল্য কথিত সেই দুস্ট ছেলে হল চীন!

সেকথাটাও চীন হাট করে খুলেই বলছে। পরিস্কার করেই লিখেছে, বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে” এজন্যই নাকি চীনা বিনিয়োগ না। কেবল জাপান বা সিঙ্গাপুরের নাকবোচা ছেলের সান্নিধ্য অনুমোদিত ছিল গত পাঁচ বছর। বাহ বাহ, ভারত বাপের কী বুদ্ধি!
কিন্তু সরি দুটা ভুল তথ্য আছে এখানে। ভুগোল-বোধের সমস্যা আছে। কলকাতা থেকে ঢাকা পরে সোনাদিয়া বন্দর হয়ে মায়ানমারের উপর দিয়ে চীন যেতে গেলে পথে ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন রাজ্য পড়বে না। সোনাদিয়া হবু বন্দর থেকে চীনের উলটা পথে একমাত্র আমাদের ফেনী বা আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করলে এরপর আসামের নাগাল পাওয়া গেলেও যেতে পারে।অর্থাৎ আনন্দবাজারের কথার তালমাথা নাই। এর সোজা সমাধান হল ভারত বিসিআইএম প্রকল্প থেকেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেই তো পারে। মানে সেক্ষেত্র্বে প্রকল্পের নাম হবে বিসিএম প্রকল্প সোনাদিয়া বন্দর করিডোর প্রকল্প। কিন্তু এটাও ভারত হতে দিতে চায় না। কেন? সেটা কী কোন ঈর্যা জনিত? কেন?
দ্বিতীয় ফ্যাক্টসের গড়মিল হল বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি রামমাধব তাহলে গতবছর চীনে গিয়ে নর্থ-ইস্টের জন্য বিনিয়োগ আনতে দেন-দরবারে করেছিলেন কেন? According to a PTI report, the latest Indian plan was conceived after a ministerial delegation from the northeastern states of Assam, Tripura and Nagaland led by Ram Madhav, a senior leader from the ruling Bharatiya Janata Party (BJP), visited the southern Chinese city of Guangzhou and held talks with both Chinese and Indian businessmen. ভারত মুখে এককথা আর পেটে বা মনে অন্য কথা রেখে দিয়ে আগাতে চায়; ভারতের মিডিয়াও এর থেকে বাইরে নয়।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১১ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]