রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প অবশ্যই সম্পর্কিত

গৌতম দাস

১৩ মে ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2Ae

 

চীনের মেগা অবকাঠামো প্রকল্প – বেল্ট ও রোডের দ্বিতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত মাসের ২৫-২৭ এপ্রিল। আর সেই সম্মেলনের পাঁচ দিন আগে, ২০ এপ্রিল সম্মেলন সম্পর্কে মানুষকে জানান দিতে ঢাকার চীনা দূতাবাস প্রচ্ছন্ন থেকে এক স্বাগত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। এটাকে বলা যায় চীনা বেল্ট ও রোড প্রকল্পের পক্ষে এক প্রচারণার অনুষ্ঠান। “দ্য বেল্ট অ্যান্ড রোড” – এই নামে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এক ত্রৈমাসিক ম্যাগাজিন প্রকাশিত হবে এক থিঙ্কট্যাঙ্কের আয়োজনে – এই বার্তা পৌঁছে দেয়া ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। আর সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী। সাথে সেখানে আরও অনেকের মধ্যে উপস্থিত থেকে বক্তব্য রেখেছিলেন ঢাকায় চীনা চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স চেন উয়ি (Chen Wei )।

সেখানে প্রধান অতিথি গওহর রিজভীর যে বক্তব্যে বেশির ভাগ মিডিয়ায় শিরোনাম করা হয়েছে সেটা হল, তিনি বলেছেন – চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ ‘ফিটস ইনটু আওয়ার ন্যাশনাল প্রায়োরিটি’ [as it ‘fits into our national priorities’…]। সেন্টার ফর ইস্ট এশিয়া ফাউন্ডেশন (Center for East Asia Foundation (CEAF) ) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল। বেশির ভাগ বাংলা ও ইংরেজি পত্রিকা বিডিনিউজ২৪ পত্রিকা অনুসরণে রিপোর্টটি করেছিল, তাকে রেফার করে অথবা না করে। সম্ভবত সে কারণে অনেকেরই খবরের কমন শিরোনাম হল, গওহর রিজভী বলেছেন, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের সাথে একদম ফিট করে [China’s Belt and Road fits into Bangladesh’s priority: Gowher Rizvi]। আর বিডিনিউজের রিপোর্টের ছবিটাই একমাত্র ছবি দেখা যাচ্ছে যা কিছু ইংরেজি দৈনিকেও ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবত বিডিনিউজের ছবিটাই সেটা। তাই, এক মানবজমিন ছাড়া অন্য সব বাংলা পত্রিকা কোনো ছবি ছাড়াই রিপোর্টটা করেছে। সবচেয়ে ভাল ট্রিটমেন্ট দেয়া নিউজ করেছে মানবজমিনে। আর এরপরের ভাল ট্রিটমেন্ট হল, বণিকবার্তারটা এখানে।  এমনকি চীনের পপুলার সরকারি পত্রিকাও শিনহুয়াও (Xinhua) গওহর রিজভিকে হাইলাইট করেই রিপোর্টটা কাভার করেছে।

গওহর রিজভী সেখানে আরও বলেছেন, “আমাদের নিজেদের বিসিআইএম (বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর, ) আছে, যেটা আসলে চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগেরই সংক্ষিপ্ত ভার্সন [ “We had our own BCIM (Bangladesh, China, India and Myanmar Economic Corridor) which is essentially a reduced version of the Belt and Road Initiative,”]। বণিকবার্তা আরও জানাচ্ছে – গওহর রিজভী বলেন, “বাংলাদেশ এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে গর্বিত। বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও উদ্যোগের মডেল”।

এ ছাড়া সেখানে, গওহর রিজভি আর এক বিশাল দাবি করেছেন। তিনি চীন ও ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, ‘বাংলাদেশ তার বৈদেশিক সম্পর্কগুলো সামলানোর দিক থেকে খুবই সফল” [“Bangladesh is extremely successful in managing its foreign relations,” added Gowher.] কিন্তু কিভাবে সেটা? তিনি বলছেন, আমরা “কোনো দিকে কোনো পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলি” বলেই আমাদের এই সফলতা ; [“It has always avoided taking sides,”]।
খুবই ভাল আর গর্বের কথা বটে। কিন্তু আসলেই কী তাই!

গত জানুয়ারিতে বাংলাদেশের নির্বাচনের ফলপ্রকাশ ও নতুন সরকার গঠনের পরপরই আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০ জানুয়ারি ভারতীয় ‘সিএনএন-নিউজ১৮’ টিভিকে যে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে এবং সুনির্দিষ্ট করে বিসিআইএম প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগ দেয়ার কথা ভারতকে জানানো তো বটেই, উল্টো ভারতকেও আহ্বান করেছিলেন, যাতে দ্বিধা-আপত্তি ফেলে তারাও এতে যোগ দেন। বলেছিলেন “বিসিআইএম প্রকল্প স্বাক্ষরের পর আর ভয় পাওয়ার কিছু নেই” [“After signing that agreement, I think there is no reason to worry about the corridor for India,” ]। আর ‘ভয় পাওয়ার কোনো ইস্যু থাকলে দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয়ভাবে’ (বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে) কথা বলে তা মিটিয়ে নিতে পারে ভারত। হাসিনার এই সাক্ষাৎকারের আলোকে দেখলে গওহর রিজভীর গতমাসের এই বক্তব্য এরই ধারাবাহিকতা মনে হবে।

রিজভীর এই বক্তৃতা ২০ এপ্রিলের। বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলন ২৫ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা। তাই এমনকি রিজভী ওই সভায় জানিয়েছিলেন, আমাদের শিল্পমন্ত্রী দ্বিতীয় সম্মেলনে বাংলাদেশ দলকে প্রতিনিধিত্ব করবেন। সব ঠিকঠাক, কিন্তু একটা ‘কিন্তু’। কোথায় গেল গওহর রিজভির “কারও কোন পক্ষ নিয়ে নেয়া এড়িয়ে চলির” – কূটনীতিক সাফল্য?

এর ঠিক তিন দিন পর, ২৩ এপ্রিল মানে চীনে মেগা প্রকল্পের দ্বিতীয় সম্মেলনের দুই দিন আগে  – আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের হঠাত এক সাক্ষাৎকার ছাপা হয় হংকংয়ের দৈনিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে। এর শিরোনাম হল, ‘বাংলাদেশ নিজের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে” [Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans as it seeks to fund future development]।’
তাহলে কী দাঁড়াল ব্যাপারটা? যে মেগা প্রকল্পকে বাংলাদেশ ‘স্বাগত জানায়’, আমাদের “প্রায়োরিটির সাথে যা খাপে খাপে মিলে গেছে” বলে দাবি করি, আমরা যার “অংশ হতে পেরে গর্বিত”, আমাদের পররাষ্ট্রনীতির ‘সাকসেস স্টোরি’, ইত্যাদি কথা বললেন গওহর রিজভী দুই দিন আগে, সেসব বয়ান এবার উল্টো রথে গেল কেমন করে? আর  পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম তিনিইবা কেন এবং কিভাবে বলছেন, বাংলাদেশ ‘চীনা বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের বিকল্প ফান্ড খুঁজছে?’ এমনকি যেখানে ওই ২৩ এপ্রিলই আমাদের শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ হুমায়ন বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের সম্মেলনে যোগ দিতে চীন রওনা হয়েছেন! আসলেই এটা সত্যিই এক বিরাট তামাশা যে, মানুষ যা নিয়ে “গর্ব করে” তারই আবার “বিকল্প খোঁজে” কিভাবে এবং কেন?

এরপর থেকে সব সুনসান, শিল্পমন্ত্রীও চীন থেকে ফিরে এসেছেন। মনে হচ্ছে চুপচাপ থাকছেন। কারণ, মিডিয়ায় এ নিয়ে কোনো রিপোর্ট প্রচারিত হয়নি। ভারত আগের মতোই, তারা এবারের বেল্ট ও রোড মেগাপ্রকল্পের এবারের সম্মেলনেও নাই। যদিও ভারতের মিডিয়ার পাল্টা প্রপাগান্ডা আছে। যেমন ভারতের বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকা রিপোর্ট করেছিল, তারা খুব খুশি যে, “বিসিআইএম প্রকল্প নাকি এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনে বাদ” [China drops BCIM from BRI projects’ list] দেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে সে সময়ের ‘আবহাওয়া’ ভারতের দখলে, অন্তত ৮ মের আগ পর্যন্ত। ওই আবহাওয়ার ভারতীয় মেসেজ ছিল এমন যেন বলতে চাচ্ছিল – বাংলাদেশ বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে “অগ্রাধিকার খুঁজে পেয়ে” বা এতে “গর্বিত” হয়ে বা ভারতকে এ প্রকল্পে যোগ দিতে “ভয় নেই” বলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘আহ্বান রেখে’ যেন বিরাট অন্যায় করে ফেলেছেন। তাহলে আসলেই কি আমাদের পররাষ্ট্রনীতিতে আমরা কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলতে পেরেছি, নাকি ভারতের আপত্তির ভয়ে সিটকে গেছিলাম? কিন্তু কেন?

ক্ষমতা কেন নিজেকে বিশ্বাস করতে পারবে না যে সেই ক্ষমতাঃ
কথা এটা নয় যে, বর্তমান সরকার বৈধ কি অবৈধ, নির্বাচিত প্রতিনিধি কিংবা নয়, সুষ্ঠু ভোট হয়েছে কি হয়নি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আছেন, এটাই বাস্তব। তার হাতেই ক্ষমতা আছে। তিনিই ডি-ফ্যাক্টোভাবে ক্ষমতায় আছেন। মানে, পদ-অধিকারী হিসেবেই তিনি ক্ষমতায় আছেন। তিনিই ক্ষমতাসীন এবং প্রধানমন্ত্রী। ফলে নিজ ক্ষমতায় অবিশ্বাস করার কী আছে? কিন্তু খোদ ক্ষমতা যখন বিশ্বাস করতে পারে না যে সেই ক্ষমতা বা তার কাছেই ক্ষমতা তখন – এর চেয়ে দুর্ভাগ্য আর কী হতে পারে!

গত ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনে আর একটা বিষয় প্রমাণিত হয়েছে, ভারতের সমর্থন ছাড়াই এই সরকার একটা নির্বাচন পেরিয়ে নিজেকে পুনর্নির্বাচিত করাতে পারে। তখন থেকে এটা দাঁড়িয়েছে যে, ভারতের সমর্থন পাওয়া কথাটা আসলে ফেটিশ, ভুতুড়ে! কোন মানে নাই, অর্থহীন। তাতে বাংলাদেশে ওই নির্বাচনের কোয়ালিটি যেমন হোক না কেন, তাহলে ক্ষমতা কেন বুঝতে পারে না যে, সে-ই বাস্তবে ক্ষমতায়?

ধন্যবাদ দিতে হয় বাংলাদেশে চীনা রাষ্ট্রদূতকে। তিনি আমাদের ‘উদ্ধার’ করেছেন। আমাদের মিডিয়ার মুখে কিছু শব্দ দিয়েছেন। তিনি বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পের গত ২৫-২৭ এপ্রিলের দ্বিতীয় সম্মেলনের সফল সমাপ্তিতে গত ৮ মে ঢাকায় মিডিয়া ব্রিফিংয়ের আয়োজন করেছিলেন। তিনিই সদর্পে আমাদের জানালেন, বিসিআইএম প্রকল্প বহাল তবিয়তে আছে। শুধু তাই নয়, তিনি আশা করেন ভারতও এতে যোগ দেবে (‘হোপ ইন্ডিয়া উড বি পার্ট’)। আর এতে যেন বুঝিয়ে দিলেন, আমাদের সরকারের নিজের থেকে নিজের ‘মুখ লুকিয়ে রাখা’র কিছু নেই।

আচ্ছা, আগামীতে ভারত চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্পে যে যোগ দিবে না, এর নিশ্চয়তা কী? কোথায়, কে দিতে পারে? কেউ কী পারে? তাহলে? আমরা কার কেন, ধমকানি শুনছি কী?

আমরা কি জেনে অথবা না জেনে ভারতের পক্ষে ভাঁড় ও ভার হয়ে দাঁড়াতে চাইছি, যাতে মেগা প্রকল্পে যোগ দেয়ার বিনিময়ে ভারত চীনের থেকে বিশাল বার্গেনিং সুবিধা লাভ করতে পারে? কিন্তু এতে আমাদের কী লাভ? আর ভারত নিজের লাভের পোটলা বাধ হয়ে গেলে আমাদের জন্য কী কোন অপেক্ষা করবে, চিন্তিত হবে? আমরা কী পেলাম তা জানার কী ভারতের কোন আগ্রহ থাকবে? নাকি থাকতে পারার কথা! নাকি নিজের পথে হাটা দিবে? এগুলো আমাদের না বুঝতে পারার তো কিছু নাই।

তাহলে ক্ষমতা কেন বিশ্বাস করতে পারে না যে সে-ই ক্ষমতা!

গত ৮ চীনা রাষ্ট্রদূতের সংবাদ সম্মেলনের ইস্যু মিডিয়ায় কিছুটা তোলপাড় তুলেছে। ৯ মের আগে বাংলাদেশে কোনো মিডিয়া এই সম্মেলনের কাভার রিপোর্ট ছাপেনি। আর পরের দিন ১০ মে দুপুরেই কলকাতার আনন্দবাজারে প্রকাশিত প্রতিক্রিয়ামূলক রিপোর্ট তোলপাড় এনেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে- আনন্দবাজারের রিডিং হল, চীনা রাষ্ট্রদূত বিসিআইএম প্রকল্পকে এবার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে পেঁচিয়ে তুলে ধরছেন। ব্যাপারটা নাকি এখন চীনের ‘অর্থনৈতিক করিডোরকে সামনে এনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের সাথে তাকে যুক্ত’ করে পদক্ষেপ নেয়া হলো। এর ফলে ‘যা ভারতের পক্ষে অগ্রাহ্য করা সম্ভব হবে না’।

হ্যাঁ কথা সত্য, রোহিঙ্গা ইস্যু আর বিসিআইএম ইস্যুকে তিনি জড়িয়েছেন। কিন্তু এমন কথা তো নতুন নয়। মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিনিয়োগসহ ব্যাপক অর্থনৈতিক তৎপরতা শুরু করা গেলে সেটাই হবে রোহিঙ্গা সমস্যার ভালো সমাধান – চীনা রাষ্ট্রদূত এ কথাই বলেছেন। ঠিক যেমন অনেক প্রগতিবাদী বলেন ও ব্যাখ্যা দেন যে, আলকায়েদা বা আইএস তৎপরতা বৃদ্ধির কারণ অর্থনৈতিক অনগ্রসরতা। ফলে তরুণেরা কাজকাম পেলে সব ঠিক হয়ে যাবে। তরুণেরা আর আলকায়েদা বা আইএস করবে না”।’ এমন যুক্তি দেওয়ার অনেক লোকই আছে। তা থাক। চীনের রাষ্ট্রদূতও দিয়েছেন, তাতেও কোনো অসুবিধা নেই। বরং এ বক্তব্যকে স্বাগত। কারণ, ভারত যদি একমাত্র এমন বয়ানে ভয় পেয়ে থাকে কিংবা তার কানে পানি ঢোকে কিংবা এই বয়ানে ভয় পেয়েছে বলে ভারত এটাকে অছিলা হিসেবে ব্যবহার করে, মোটা দাঁও মেরে চীনের বেল্ট ও রোড মেগা প্রকল্প বা বিসিআইএম প্রকল্পে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আপত্তি করার কী আছে? কিছু নেই।

এ ছাড়া আর একটা অর্থে আমরা রাষ্ট্রদূতের কথা বুঝতে ও গ্রহণ করতেই পারি। বিসিআইএম প্রকল্পকে বাস্তবায়ন করা হয়েছে দেখতে চাইলে এর আগেই রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান হয়ে গেছে, মানে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে কোনো টেনশন নেই, এটা অবশ্যই দেখতে পেতে হবে। মিয়ানমারের সাথে টেনশন ও অবিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়ে থাকবে; অথচ পাশাপাশি বিসিআইএম প্রকল্প বাস্তব দেখতে চাইছি, এমন তো হতেই পারে না। ফলে রোহিঙ্গা ও বিসিআইএম একসাথে যুক্ত হয়ে থাকারই ইস্যু। তা ভারত বা আনন্দবাজার যেভাবেই বুঝুক।

তবে প্রথমত আনন্দবাজারের ওই রিপোর্টকে পড়তে হবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের ইনফরমাল প্রতিক্রিয়া হিসেবে। কারণ পেছনের কাহিনী সাধারণত এমন হয় যে, আনন্দবাজার ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য জানার পর তা নিয়ে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কারো কাছে গেলে তাঁরা আনন্দবাজারকে “এমন রিপোর্ট করতে পারে” বলে সায় জানিয়েছে – এরকমই কিছু একটা হয়েছে বলে মনে করা যায়। কারণ “কারো” সাথে কথা না বলে এমন রিপোর্ট সাধারণত করা হয় না, এটা নিশ্চিত থাকতে পারি। কিন্তু বিদেশ মন্ত্রণালয় এমন গুড মুডে কেন যে, এমন চীনাপ্রীতি বা সহানুভূতি প্রকাশ পাচ্ছে আনন্দবাজারের রিপোর্টে? এটাই আসল বিষয়। কারণ আসলে, ‘মুড কুছ এইসাই চলতা হ্যায়’ আজকাল।

সংক্ষেপে মূলকথাগুলো হল – ইইউকে চীন নিজের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে গিয়ে পশ্চিমের নেয়া বা গ্লোবাল প্রকল্পে সেসব “স্ট্যান্ডার্ড প্রাকটিস” অনুসরণ করা হয় সেগুলোকেই চীনও অনুসরণ করতে রাজি হয়ে যায়, যেটা চীন-ইইউর গত মাসের সামিট থেকে প্রকাশিত তাদের “যৌথ ঘোষণায়” ঠাঁই পেয়েছে। ঠিক একই ইস্যুগুলো একমত হয়ে চীন ও সম্মেলনের রাষ্ট্র-সরকার প্রধানদের এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের যৌথ ঘোষণাতেও তুলে এনে প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে চীনের বিরুদ্ধে ‘ঋণফাঁদ’ প্রপাগান্ডার সুযোগ অচিরেই বাস্তবে শেষ হয়ে যাচ্ছে। কারণ, নীতিগত দিকটি ইতোমধ্যে চীনের কাছে এগুলো গৃহীত। এরই লেজ ধরে এবার চীন এগিয়েছে। ভারতকেও নিজের মেগা প্রকল্পে উঠিয়ে নিতে পরিকল্পনা করেছে। তা করতে গিয়ে চীন ভারতের জন্যও এক পুরা প্যাকেজ নিয়ে তৈরি হয়েছে। এর প্রাথমিক দিক ইতোমধ্যেই ভারতের পররাষ্ট্র সচিব গোখলের কাছে তুলে ধরা হয়েছে। এবারের বেল্ট রোড সম্মেলনের আগেই ২১-২২ এপ্রিল গোখলের সেই চীন সফর ঘটে গেছে। কিন্তু যতই গুরুত্বের ছিল এই সফর, গোখলেরা ততই এটাকে একেবারে অগুরুত্বপূর্ণ, ‘রুটিন’ সফর বলে প্রচার করে রেখেছেন। ভারতীয় থিঙ্কট্যাংক ওআরএফ এর মনোজ যোশীও তার লেখায় ব্যাপারটাকে “খুবই রুটিন” বলে ঢেকে দিতে চেয়েছেন। তবুও ঐ প্যাকেজের দু’টি বিষয় প্রকাশিত হয়ে গেছে বা করা হয়েছে। কাশ্মীর বিচ্ছিন্নতাবাদী মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের তালিকায় তুলতে চীনের আপত্তি প্রত্যাহার আর ভারতের সাথে বিতর্কিত বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা যা এতদিন চীনের অংশ বলে চীনের ম্যাপে দেখানো হইয়েছে সেসবের অনেক কিছু, তা এখন থেকে প্রত্যাহার। দু’টিই মূলত চীন-ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে এক আন্ডারস্টান্ডিংয়ের অংশ। যে কারণে এ দুই ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াও ইতিবাচক। তবে মোদী আজহারসহ দু’টি ইস্যুকে চলতি নির্বাচনে নিজের সাফল্য বলে ব্যবহার করতে চায় – একারণেই  এ দুটা ইস্যু কেবল আগে প্রকাশিত হয়ে গেছে।

আসলে পুরো প্যাকেজ নিয়ে চীন অপেক্ষা করছে – ভারতের নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হলেই নতুন সরকারের সাথে চীন আলোচনা ও নেগোশিয়েশন শুরু করতে সে অপেক্ষা করছে। গত বছরের মত সম্ভবত আর এক ভারত-চীন শীর্ষ সামিট – ‘য়ুহান সম্মেলন টু’ থেকে সব কিছু চূড়ান্ত করা হবে বলে গোখলের সাথে প্রাথমিক বোঝাবুঝি হয়েছে। মিডিয়ার অনুমিত রিপোর্টগুলো এরকমই। এরমধ্যে দ্যা হিন্দুর এই রিপোর্টটা ভাল ইনফরমেটিভ। রিপোর্টার অতুল আনিজা চীনে অবস্থিত দ্যা হিন্দুর একমাত্র স্থায়ী প্রতিনিধি। চীনের লক্ষ্য ভারতকে যত দূর অফার করা যায়, এর সর্বোচ্চটা দিয়ে হলেও নিজের মেগা প্রকল্পে ভারতকে শামিল করে নেয়া। এটা এমন অফার হবে যে, ভারত রাজি না হওয়া মানে হবে, বেশি চিপা লেবুর দশা।

এখন খুব সম্ভবত আমরা বুঝে না বুঝে ভারতের ভাঁড় অথবা ভারতপক্ষে বার্গেনিং ভার হতে চাচ্ছি। শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ খোলা এই অপ্রয়োজনীয়  নিজের পিঠে নিজেই ছুরি মারা প্রতিক্রিয়াই ঘটিয়েছি আমরা। ওইদিকে গওহর রিজভীর বক্তব্য- বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে – ‘ভারতের কোলে’ বসে এসব কথা তিনি কেন বলেন? এতে কোন বাহাদুরি হয়? এর সদুত্তর পাওয়া মুশকিল। আমরা যদি শক্তিহীনই হই তো চুপ থাকতে পারতাম, অন্তত! শাহরিয়ার আলমের মিডিয়ায় মুখ না খুলে কী পারত না? কী ক্ষতি হত? নাকি আমরা কী এতই ঠেকছি যে নিজের ফেলা থুতু চাটতে হয় আমাদেরকে !

চীন-ভারত সম্ভাব্য বার্গেনিং রফায় আমরা ভারতের পক্ষে চীনের বিপরীতে ‘ওজন’ হব কেন? আমরা কেন চীন-ভারত সম্পর্কের উচ্ছিষ্টভোগী অবস্থান বেছে নিবো? চীন ও ভারতের মধ্যে কোনো রফা যদি নাই হয় তবে সেক্ষেত্রে চীনের সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক কেন হতে পারবে না? এটাই কি গওহর রিজভীর ‘বাংলাদেশ কারো পক্ষ নেয়া এড়িয়ে চলে?’ এর আসল চিত্র? এ বুঝগুলো তারা কাকে দিলেন? দিলেন কেন?

দুঃখের কথা পদ-অধিকারী হয়ে থেকেও ক্ষমতা নিজেকে বিশ্বাস করছে না যে, সে-ই ক্ষমতা। সাংবাদিক ব্রিফিংয়ে চীনা রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য কি আমাদের সেই ক্ষমতাবোধ ফিরে জাগাতে ভূমিকা রাখতে পারবে!

———–মূল লেখা এখানেই সমাপ্তি। ————-


বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে – বিস্তারিত, যাদের পড়বার মত বেশি সময় আছে তাদের জন্যঃ
এখানে “বিসিআইএম প্রকল্প প্রসঙ্গে” পাঠককে আবার মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। এটা মূলত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ কেন্দ্রিক চারদেশীয় সড়ক ও রেল সংযোগ প্রকল্প। এটা সিঙ্গাপুরের গভীর সমুদ্র বন্দরে মালসামান নামিয়ে এরপর আবার ছোট লাইটার জাহাজে করে তা চট্টগ্রাম বা মোংলা বন্দর এনে – এভাবে বাংলাদেশকে মহাসমুদ্র হয়ে বিদেশের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া নয়। তাই, প্রথমত এটা লাইটার জাহাজ আর না বরং মহাসমুদ্রগামী (Ocean Shiping Line) জাহাজ এখানে সরাসরি সোনাদিয়া বন্দরে কনটেইনার নামাবে। এরপর চার দেশ [বাংলাদেশ, চীন (মানে পুর্বচীন কুনমিং-এ), ইন্ডিয়া (পূর্বে কলকাতা) ও মায়ানমার] যার যার কনটেইনার সরাসরি নামিয়ে সহজেই তা নিজ দেশে নিতে পারবে; চাইলে আগের মতই আবার লাইটার জাহাজে অথবা সরাসরি সড়ক বা রেল পথে। এই সড়ক বা রেলপথের রুটটা হল – সোনাদিয়া [কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার অন্তর্গত] থেকে মায়ানমার হয়ে চীনের পুবদিকে কুনমিং-এ পৌছানো। আর ওদিকে ভারত সোনাদিয়া হবু বন্দরে যুক্ত হতে পারে লাইটার জাহাজে কলকাতার ডায়মন্ডহারবার থেকে। অথবা কলকাতা থেকে যশোর হয়ে সড়ক বা রেল পথে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কর্ণফুলি টানেল হয়ে সোনাদিয়া বন্দর এভাবে। আসলে এই চারদেশের পুর্বদিকে যার যা জেলা অথবা প্রদেশ তা সবই ল্যান্ডলকড পাহাড়ি ভুমিঅঞ্চলে আবদ্ধ। চীনের পশ্চিম দিক যেমন হিমালয়সহ অন্যান্য পাহাড়ে আবদ্ধ; তেমন ওর দক্ষিণ দিক পুরাটাই আর বিশেষ করে দক্ষিণপুর্ব কোনা এটাই কুনমিং অঞ্চল – এটাও ল্যান্ডলকড। চীনের একমাত্র সেন্টার পুর্বদিকটাই সরাসরি সমুদ্রে উন্মুক্ত। কোন রাষ্ট্রের সমুদ্রে-উন্মুক্ত দিক নাই – তা একটা অঞ্চল নাই অথবা কোন দিকেই নাই এটা সেই রাষ্ট্রকে যোগাযোগ ব্যবসা বাণিজ্যে পিছনে ফেলে রাখবে – এই হল ব্যাপারটা বুঝার সরল ফর্মুলা। তাই এই চার রাষ্ট্রের জন্যই সোনাদিয়া বন্দর হল নিজ নিজ ল্যান্ড লকড অঞ্চলকে সমুদ্রে-উন্মুক্ত করার সুযোগ নেয়া। বিশেষ করে চীন যেমন তার পশ্চিম অঞ্চলকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের বড় সুবিধাভোগী হয়ে নিজেকে “সমুদ্রে-উন্মুক্ত” করার সুযোগ নিয়েছে। ঠিক তেমনি পুবদিকে সে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর প্রকল্পের সুবিধাভোগী হয়ে সমুদ্রে-উন্মুক্ত হতে চাইছে। সোনাদিয়া বন্দরসহ এই বিসিআইএম প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যবহারকারি ফলে অর্থনৈতিক সুবিধাভোগী হবে চীন; ফলে এর অবকাঠামো ঋণ পরিশোধে বড় রাজস্ব আয় আসবে ব্যবহারকারি চীনের কাছ থেকে।
বাংলাদেশ হবে আর এক বড় সুবিধাভোগী যে সিঙ্গাপুর নির্ভরতা ত্যাগ করতে পারবে। এছাড়া পুরা প্রকল্পের মূল ততপরতা কেন্দ্র নিজভুমিতেই নির্মিত হবে বলে এর সুযোগে নিজ অর্থনীতিকে এক আঞ্চলিক হাব – বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠার সুযোগ পেয়ে যাবে।

ভারতের আসল ল্যান্ডলকড অঞ্চল হল তার নর্থ-ইস্ট; মানে বাংলাদেশের উপরে বা, পুরা উত্তর-জুড়ে আমাদের সুনামগঞ্জ টু পঞ্চগড় এই পুরা পুব-পশ্চিম কোণার উপরে, সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল। [পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশের উপরের অঞ্চল – এরই পুব দিকটা হল মায়ানমারের পশ্চিমে, তার ল্যান্ডলকড অঞ্চল।] ভারতের নর্থ ইস্ট মানে মূলত প্রধান বড় অংশ আসামসহ বাকি ছোট ছোট পাহাড়ি মোট সাত রাজ্য। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে তাদের বাংলাদেশের উপর দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে সুক্ত হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। কেবল আমাদের উত্তর পশ্চিম কোণে মানে তাদের শিলিগুড়ি চিকন-গলা হয়ে আসামসহ পুরা নর্থ-ইস্ট পশ্চিমবঙ্গ বা কলকাতার সাথে এখন যুক্ত।

আসামের মুল সমস্যা মুসলমান বা বাংলাদেশি মুসলমান এগুলা কিছু না। মূল সমস্যা ল্যান্ডলকড। সমুদ্রে-উন্মুক্ত কোন অঞ্চল বা পথ নাই, এক কলকাতা যাওয়া ছাড়া।
কিন্তু নেহেরু থেকে এপর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আসলেই পুরাপুরি দ্বিধাগ্রস্থ যে তাঁরা নর্থ-ইস্টকে ল্যান্ডলকড মুক্ত করতে চায় কী না! তারা একেবারেই নিশ্চিত না যে তারা আসলে কী চায়। এই কথা কিসের ভিত্তিতে বলছি? বলছি কারণ বিসিআইএম প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান। প্রথমত ভারত “বিসিআইএম প্রকল্প” বলতে যা বুঝে সেটা সোনাদিয়ায় কোন বন্দর ছাড়াই, কেবল চারদেশের সড়ক বা রেল যোগাযোগ প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের নেতৃত্ব কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্টকেই – এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকার সুবিধার আওতায় আনতে দেখতে চায় না। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ভারত যতদিন বিসিআইএম প্রকল্পে সক্রিয় ছিল, টেকনিক্যাল বা রাজনৈতিক সভায় অংশ নিয়েছে সেখানে কোথাও ‘বন্দর’ বা ‘সোনাদিয়া’ শব্দ উচ্চারিত হতে দেয় নাই। সেটা ছিল চীনের বেল্ড ও রোড মেগাপ্রকল্প আইডিয়া হিসাবেই হাজির ছিল না। তাতেই বিসিআইএম প্রকল্প বলতে ভারত সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর ছাড়াই কেবল চারদেশের সড়ক ও রেলের বাইরে অন্যকিছু আমল করতে চাইত না। পরে বেল্ট ও রোড প্রকল্প গেড়ে বসার পরে এর সাথে বিসিআইএম প্রকল্প যুক্ত করার প্রস্তাব আসাতে এই সুযোগে সবকিছু থেকেই ভারত দূরে থাকার সুবিধা নেয়।অর্থাৎ সোজা কথায় কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই ল্যান্ডলকড অঞ্চলকেই কোন গভীর সমুদ্র বন্দরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকা ভারতের নেতৃত্বের ভারতের স্বার্থের জন্য কোনই দরকারি মনে করে না। বরং বিনা পয়সায় বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোর নিয়ে লাইটার জাহাজের উপযুক্ত বাংলাদেশের দুই বন্দর ব্যবহার করতে পেলে ভারত আর কিছু দরকার মনে করে না। আসাম বরং ‘বাংলাদেশি কথিত অনুপ্রবেশকারি’, ‘তেলাপোকা’ বা ‘মুসলমান খেদাও’ আন্দোলন করবে – এতেই ভারতের স্বার্থ, ভারতের রাজনৈতিক ভবিষ্যত বলে বিশ্বাস করে ভারতের দলগুলো প্রায় সবাই। ভারতের অবস্থান যে ঠিক বুঝিছি আমরা এর আর এক সর্বশেষ প্রমাণের দিতে তাকানো যাক।

আট মে ঢাকায় চীনা রাষ্ট্রদুতের সংবাদ সম্মেলনকে নিয়ে কেন ভারত এসব প্রকল্পের বিরুদ্ধে আনন্দবাজার সেসব সাফাই জানিয়ে এক পালটা রিপোর্ট করেছে। লিখেছে,

“কূটনীতিকদের মতে, ঘোরতর আপত্তি থাকা সত্ত্বেও বিসিআইএম নিয়ে প্রকাশ্যে নিজেদের অসন্তোষ জানাতে পারে না ভারত। কারণ বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে”।

যাক, গত পরশুদিনের আনন্দবাজার ভারতের অবস্থান সম্পর্কে আমাদের বুঝ ও অনুমান পুরাপুরি সঠিক- তাই নিশ্চিত করল। এর মানে দাড়াল কলকাতাসহ পুরা নর্থ-ইস্ট, এই অঞ্চলকে পরিকল্পিতভাবে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ল্যান্ডলকড করেই রাখতে চায়, দমবন্ধ করেই রাখতে চায়। কারণ এরা গভীর সমুদ্রে উন্মুক্ত হয়ে গেলে, অর্থনৈতিক ততপরতা ভাইব্রেন্ট হয়ে গেলে তারা আর ভারতের নিয়ন্ত্রণে নাও থাকতে পারে। কথাগুলো শুনে মনে হল খামোখা রক্ষণশীল বাবা কথা বলছে যে মেয়েকে স্কুলে দিলে সে ছেলেদের সাথে পালিয়ে যেতে পারে। বলাই বাহুল্য কথিত সেই দুস্ট ছেলে হল চীন!

সেকথাটাও চীন হাট করে খুলেই বলছে। পরিস্কার করেই লিখেছে, বিসিআইএম রূপায়িত হলে ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে”। ……”ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত। বরং জাপান, সিঙ্গাপুরের মতো রাষ্ট্রগুলির বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্প উত্তরপূর্বাঞ্চলে এনে সেখানকার মানুষের মন জয়ের চেষ্টা হয়েছে গত পাঁচ বছরে। উদ্দেশ্য চিন যাতে সেখানে কোনও প্রভাব তৈরি করতে না পারে” এজন্যই নাকি চীনা বিনিয়োগ না। কেবল জাপান বা সিঙ্গাপুরের নাকবোচা ছেলের সান্নিধ্য অনুমোদিত ছিল গত পাঁচ বছর। বাহ বাহ, ভারত বাপের কী বুদ্ধি!
কিন্তু সরি দুটা ভুল তথ্য আছে এখানে। ভুগোল-বোধের সমস্যা আছে। কলকাতা থেকে ঢাকা পরে সোনাদিয়া বন্দর হয়ে মায়ানমারের উপর দিয়ে চীন যেতে গেলে পথে ভারতের নর্থ-ইস্টের কোন রাজ্য পড়বে না। সোনাদিয়া হবু বন্দর থেকে চীনের উলটা পথে একমাত্র আমাদের ফেনী বা আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরায় প্রবেশ করলে এরপর আসামের নাগাল পাওয়া গেলেও যেতে পারে।অর্থাৎ আনন্দবাজারের কথার তালমাথা নাই। এর সোজা সমাধান হল ভারত বিসিআইএম প্রকল্প থেকেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিলেই তো পারে। মানে সেক্ষেত্র্বে প্রকল্পের নাম হবে বিসিএম প্রকল্প সোনাদিয়া বন্দর করিডোর প্রকল্প। কিন্তু এটাও ভারত হতে দিতে চায় না। কেন? সেটা কী কোন ঈর্যা জনিত? কেন?
দ্বিতীয় ফ্যাক্টসের গড়মিল হল বিজেপির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি রামমাধব তাহলে গতবছর চীনে গিয়ে নর্থ-ইস্টের জন্য বিনিয়োগ আনতে দেন-দরবারে করেছিলেন কেন? According to a PTI report, the latest Indian plan was conceived after a ministerial delegation from the northeastern states of Assam, Tripura and Nagaland led by Ram Madhav, a senior leader from the ruling Bharatiya Janata Party (BJP), visited the southern Chinese city of Guangzhou and held talks with both Chinese and Indian businessmen. ভারত মুখে এককথা আর পেটে বা মনে অন্য কথা রেখে দিয়ে আগাতে চায়; ভারতের মিডিয়াও এর থেকে বাইরে নয়।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১১ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)রোহিঙ্গা ইস্যু ও বিসিআইএম প্রকল্প এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

বেল্ট-রোড ফোরাম, আমরা কী নাই হয়ে যাচ্ছি

গৌতম দাস

০৬ মে ২০১৯, 0১:৩৬

https://wp.me/p1sCvy-2zV

 

The Second Belt and Road Forum for International Cooperation

চীনা বেল্ট ও রোড মহাপ্রকল্প, গত ২৫-২৭ এপ্রিল ছিল এবিষয়ে তাদের দ্বিতীয় সম্মেলন বা সামিট। যার পুরা আনুষ্ঠানিক নাম হল “The Second Belt and Road Forum for International Cooperation”, সংক্ষেপে বিআরএফ [BRF]। গত ২০১৭ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম সামিটের মত এবারও এটা বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। বলা হয়, বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আইডিয়া চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০১৩ সালের অক্টোবরে কাজাখাস্তানের এক সম্মেলন থেকেই প্রথম হাজির করেছিলেন। সেই থেকে ধরলে গত ছয় বছরে এই মহা প্রকল্পের মুখ্যনাম এক-দু’টা থাকেনি, কয়েকটা হাজির হয়েছে। ঠিক যেমন চলতি এই দ্বিতীয় সম্মেলনে এর নাম দেয়া হয়েছে “বেল্ট ও রোড ফোরাম” বা বিআরএফ। প্রথম সামিটে যেখানে নাম ছিল “বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ” বা বিআরআই।

২০১৭ সালে এর প্রথম আনুষ্ঠানিক সম্মেলনকে ডাকা হয়েছিল “বেল্ট রোড সামিট” বলে। সম্ভবত বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে প্রথম সম্মেলন ছিল সেটি, সেদিকটা মুখ্য করতে। ওদিকে জন্মের শুরুতে এর নাম ছিল সিল্ক রোড প্রকল্প, সিল্ক রুট প্রকল্প, ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড ইত্যাদি অনেক কিছু।
আসলে প্রকল্পের আইডিয়া ও এর বাস্তবায়নের বিষয়টা ছিল খুবই ব্যাপক, যে কারণে এটাকে শুধু প্রকল্প না বলে মহাপ্রকল্প লিখছি। আর এর চেয়ে বড় ব্যাপার হল, বিষয়টার বহু কিছুই ইভলভিং [evolving] বা ফুলের পাপড়ি খোলার মত বীজ আইডিয়াটা ক্রমান্বয়ে বাস্তব ও স্পষ্ট হয়েছে। কাজেই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পে নতুন নতুন মুখ্যনাম বলাতে বিষয়টা একেক সময় একেকটা, এমন অবশ্যই নয়। বরং বলা যায় একই বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পের আনফোল্ডিং [unfolding] মানে ক্রমেই ভাঁজ খুলে নিজেকে পূর্ণ আর স্পষ্ট অবয়বে হাজির করা হয়েছে। আর সেই সাথে অবশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে ক্রমেই নেগোসিয়েশনে বা পরস্পরের সুবিধা-অসুবিধাগুলো আমলে নিয়ে নতুন বোঝাপড়ায় যাওয়া – আর সেই ভিত্তিতে এসবের চুক্তি সম্পন্ন করা। “ক্রমেই ভাঁজ খোলা” বলতে আমরা এটাও বুঝতে পারি।

দুনিয়ায় খুব সম্ভবত এটাই এখন পর্যন্ত সর্ববৃহৎ এক অবকাঠামো প্রকল্প, যা কয়েক ট্রিলিয়ন ডলারের। জাতিসঙ্ঘের ছোট-বড় মিলিয়ে ১৯৩ সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৭০-এর বেশি রাষ্ট্র এই প্রকল্পের অংশ হয়ে গেছে বা আনুষ্ঠানিক যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে। আর প্রাথমিক আগ্রহ জানিয়ে সম্মেলনে যোগ দিয়েছে মোট ১২৯ রাষ্ট্র। অপর দিকে ওই ৭০ রাষ্ট্র, যারা যোগদানের ঘোষণা দিয়েছে, এদের বড় অংশই হল এশিয়ান বড় বা উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো, এছাড়া ইদানীং ইউরোপীয় রাষ্ট্রের যোগদান বাড়ছে। তবে এখানে এশিয়া বলতে তা মধ্য-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যসহ – এভাবে বুঝতে হবে, যেখানে এশিয়া ও ইউরোপ সড়ক ও রেল পথে সংযুক্ত হচ্ছে এই মধ্য এশিয়াকে মাঝখানে রেখে।
এই মহাপ্রকল্পের সাথে আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় এমন ২৯ টা সংগঠনও জড়িয়ে আছে। এদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ হল জাতিসংঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তোনিও গুতারেস [António Guterres] আর আইএমএফ-এর প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ল্যাগার্দে [Christine Lagarde] যারা সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

এই পর্যন্ত এই মহাপ্রকল্পে ২০১৮ সাল পর্যন্ত হিসাবে ৯০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়ে গেছে, যা বছরে ৫.২% করে বেড়ে এমন হয়েছে। এছাড়া BRI এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোও একই সময়ে ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। এদিকে চীনের সাথে BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলোর এখনই বাণিজ্য বাজার কেমন তা নিয়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লুমবার্গ জানাচ্ছে, এটা ইতোমধ্যেই ৬ ট্রিলিয়ন ডলার পার হয়ে গেছে আর তা বছরে ৪% হারে বাড়ছে। এমন BRI সদস্য রাষ্ট্রগুলো সব মিলিয়ে এদের সাথে চীনের বাণিজ্য, এখনই চীনের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের মাত্র ২৭.৪% । অর্থাৎ এটা হেলাফেলা ফিগার হবার কথা নয়। আর বলাই বাহুল্য এই মহাপ্রকল্প যত সম্পন্ন হতে থাকবে এটাই চীনের প্রধান বৈদেশিক বাণিজ্যের রুটখাত হতে থাকবে।

সম্মেলনে যোগ দেয়া রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান কতজন? ২০১৭ সালের প্রথম সম্মেলনে সে সংখ্যাটি ছিল ২৯, আর এবার ২০১৯ সালে দ্বিতীয় সম্মেলনে তা আট বেড়ে হয়েছে ৩৭ জন। মানে এই ৩৭ রাষ্ট্র বাদে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলো রাষ্ট্রপ্রধান নয় তবে, মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। আবার ইইউর সদস্য এমন রাষ্ট্রপ্রধান যারা এখানে উপস্থিত হয়েছে, এমন রাষ্ট্র ছিল অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল। ওদিকে কেবল পুর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়া থেকেই যোগ দেয়া রাষ্ট্রপ্রধান ছিল প্রায় ১১ জন। এদের মধ্যে ছিলেন, যেমন পাকিস্তানের ইমরান খান, মালয়েশিয়ার মাহাথির মোহাম্মদ, নেপালের রাষ্ট্রপতি ভান্ডারি অন্যতম। এছাড়া পুর্ব এশিয়ার এবারই প্রথম রাষ্ট্র বা সরকারের যেসব প্রধান যোগ দিয়েছে, এমন দুই রাষ্ট্র হল সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড। এতে ১০ সদস্যের আসিয়ান রাষ্ট্র জোটের প্রায় সবাই এবার যোগ দেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ড খুবই উল্লেখযোগ্য।

বেল্ট রোড মহাপ্রকল্পকে বুঝবার সময় এখানে একটা কথা খেয়াল রাখতে হবেঃ সোভিয়েত যুগের মানে, কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫৩-৯১) চিন্তার অভ্যাসে আমাদের মনে গেঁথে থাকা কিছু ধারণা দিয়ে চিন্তা করলে আমাদের মনে হতে পারে যে, যেখানে নতুন গ্লোবাল নেতা চীনা সেখানে আমেরিকা বা তার জোটের কেউ যোগ দিবেই না। ঠিক যেমন সেকালে সোভিয়েত ব্লকের কোর রাষ্ট্রগুলা আমেরিকা ব্লকের রাষ্ট্রের সাথে কোনো অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লেনদেন-বিনিময় সম্পর্ক ছিল না, ঠিক তেমনই একালেও বোধহয় ঘটনাগুলো সে রকম। এমন ধারণা মাথা থেকে ফেলে দিতে হবে। কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি ও ব্লক ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে ভেঙ্গে যাবার পর থেকে একালের দুনিয়া সেকালের সাথে পুরাটাই অমিল, তাই বরং মিল খুঁজতে যাওয়াটাই ভুল হবে।  যেমন একালের চীন-ভারত – এদের স্বার্থবিরোধের শেষ নেই, অথচ তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিশাল; এখনই তা ৮০ বিলিয়ন ডলারের, যা ১০০ বিলিয়নের পথে নেওয়ার উদ্যোগ চলছে। আবার খোদ চীন-আমেরিকা গত আশির দশকে তাদের সম্পর্কের শুরু থেকেই ব্যাপক ঘনিষ্টভাবে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, পণ্য ও বাজারে ব্যাপক লেনদেন-বিনিময়ের সম্পর্ক করে গেছে। কেবল একালেই তারা বাণিজ্যঝগড়ায় হাজির হয়েছে, যা আবার নিরসন মীমাংসারও চেষ্টা চলছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এখনও চীনে আমেরিকান বিনিয়োগ আগের মতোই চলছে, বাণিজ্যও চলছে এবং তা আকারে এখনও বিপুল যদিও তা চলছে বাধা পেয়ে পেয়ে। এমনকি গত ২০১৭ সালের BRI সম্মেলনে আমেরিকার এক আমলা প্রতিনিধি যোগ দিয়েছিল। আর যদিও এবারো এমনভাবেই যোগ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল কিন্তু শেষে কোন কারণে আমেরিকার প্রতিনিধি আসে নাই।
তাহলে এক কথায়, একালের মূল বৈশিষ্ট খেয়াল করতে হবে; তা হল, বাণিজ্যিক লেনদেনের সবসম্পর্ক রেখেই একই সাথে অন্যান্য রাষ্ট্রস্বার্থ ইস্যু নিয়েও ঝগড়া চালাবে তারা। এখানে সেকালের মত “ও পুঁজিবাদি, আমি নই”- তাই কোন সম্পর্ক নাই – এসব নাই। আসলে এভাবে মতাদর্শের কথা তুলে এরই আড়ালে উভয় জোটের সদস্য  রাষ্ট্রগুলো রাশিয়া অথবা আমেরিকার ধামাধরা হত – এমন বাস্তবতাই আর নাই। ফলে তেমন কোন ভিত্তি একালে নেই। বরং ব্যাপারটা অনেকটা, বাবা-মায়ের সাথে সম্পর্ক রেখেই যেমন সন্তানেরা অনেকসময় আরো বেশি সুবিধা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করে, রাগ দেখায় বা উল্টাপাল্টা কিছু করে বসে, অনেকটা তেমনই। অর্থাৎ মূল কথা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পরের নতুন পরিস্থিতিতে এবার সম্পর্কের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও লক্ষণ হল – এবার সব রাষ্ট্রই একমাত্র এবং একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এবং এরই অংশ হয়ে থেকে গেছে। আর এতে রাষ্ট্রগুলো পরস্পরের পণ্য, পুঁজি, বিনিয়োগ, বাজার ইত্যাদি বিনিময়ে জড়িয়ে এক গ্লোবাল লেনদেন-বিনিময়ের অংশ হয়ে যায়। কিন্তু একই সাথে তারা নিজের যার যার স্বার্থের জন্যও লড়ে যাচ্ছে। আবার ক্যাপিটালিজমের বদ খাসলতগুলোর এখন তাহলে কী হয়েছে? এছাড়া সেগুলা কি মিথ্যা ছিল? অবশ্যই নয়। কিন্তু সেসব বদ-খাসলত এখনও বর্তমান হলেও ওর বিরুদ্ধে লড়ার আঙ্গিক, পাটাতন, কায়দা ইত্যাদি সবই এখন বদলে গেছে। তাই লড়াইও চলছে ও চলবেই; এমনকি জোট হয়ে বা আলাদাভাবে লড়ার ধরণ বদল হলেও। তাহলে এই পরিপ্রেক্ষিতে এবারের বিআরএফের বৈশিষ্ট্য ও অর্জন কী?

কথিত ঋণফাঁদ আর গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডঃ
এই সম্মেলনেও এবার এ’দু’টিই মুখ্য ইস্যু হয়েছে। কারণ, শি জিনপিং তাঁর মূলবক্তব্যে নিজেই সোজা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর এছাড়া সম্মলনের শেষ দিনে প্রকাশিত ৩৮ পয়েন্টের যৌথ ঘোষণা [Joint Communique ] থেকেও এই সম্মেলন এ’দুই ইস্যুকে এবার মুখ্য বিষয় করা হয়েছে। চীনা সরকারি মিডিয়া CGTN-এর ভাষায় বললে, এই মহা প্রকল্প নিয়ে চীনের কৌশলগত উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে পশ্চিমারা সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, প্রেসিডেন্ট শি সেগুলোরই জবাব দিয়েছেন, যাতে সন্দেহ দূর হয়। [President Xi also responded to Western skepticism about China’s “strategic intentions” behind the landmark initiative. ]  এছাড়া হংকংয়ের SCMP লিখেছে, একটা সুক্ষ-কিন্তু গুরুত্বপুর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। প্রেসিডেন্ট শি চীনের নেয়া প্রকল্পগুলোতে টেকসই ঋণ, পরিবেশ রক্ষা আর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা- এ দিকগুলো নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। [In a subtle shift …, Xi’s pledges over the past two days on debt sustainability, environmental protection and corruption control show Beijing is trying to expand its policy by paying heed to international concerns, according to analysts. এ থেকেই মনে হচ্ছে, তিনি পশ্চিমা সমালোচনা, প্রপাগান্ডা ও উদ্বেগগুলোর দিকে মনোযোগী হতে চাচ্ছেন।

হংকং-ভিত্তিক ‘সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট’ পত্রিকা কিছু এক্সপার্টকে উদ্ধৃত করে আমাদেরকে জানাচ্ছে, তারা মনে করেন, শি-এর এবারের বক্তব্য ছিল খুবই আপসমূলক টোনে। আর খুব সম্ভবত তা আমেরিকা, ভারত, জাপান আর ওদিকে জার্মানি ও ফ্রান্সের কথা মাথায় রেখে করেছেন। [The president’s conciliatory tone during the second Belt and Road Forum in Beijing was apparently aimed at critics in the United States, India, Japan and major European powers such as Germany and France.]

এদিকে বেল্ট-রোড প্রকল্প চীনের একটা “ঋণের ফাঁদে” ফেলার বুদ্ধি, অথবা “ঋণফাঁদের ডিপলোম্যাসি” বলে প্রো-আমেরিকান গবেষক বা একাদেমিকেরা প্রচার প্রপাগান্ডা চালালেও  এক জর্মান থিঙ্কট্যাংক গবেষক, Lucrezia Poggetti, খাড়া কথাটাই বলেছেন এভাবে, “চীনের এমন অবকাঠামো ও বিনিয়োগ পরিকল্পনার প্রতি বিভিন্ন দেশের নিঃসন্দেহে আগ্রহ বাড়ছে। একই সাথে এতে নেয়া প্রকল্পগুলাতে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও মানদন্ড বজায় থাকার প্রতি আকাঙ্খাও প্রবল হচ্ছে”। […a research associate at the Mercator Institute for China Studies in Berlin, said that while interest in China’s infrastructure and investment plan was undoubtedly growing, there was an equal desire for the projects it encompassed to abide by international rules and standards.]

ব্যাপারটা হল, বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নিয়ন্ত্রিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অবস্থায় আমরা এখনো আছি। এটাই ডমিনেটিং। আর এতে  তৈরি হওয়া এতদিনের নানান স্ট্যান্ডার্ড  বা মানদন্ডও অবশ্যই তৈরি হয়েছে এবং বহাল আছে। যদিও তা “চরম ভালো মানের বা আদর্শের” এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই। এখন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এসব ব্যাপারে চীনের এত দিনের অবস্থান ছিল এ রকম – যেন চীন নিজেই একটা স্ট্যান্ডার্ড আর দুনিয়ায় যে স্ট্যান্ডার্ড চালু আছে, তা পশ্চিমা। যেন সে জন্য এটা খারাপ। কিন্তু আসল কথা হল, এ’পর্যন্ত দুনিয়ায় যা কিছু স্ট্যান্ডার্ড বা মানদন্ড, তা নিঃসন্দেহে আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়াতেই হয়েছে ও আছে। আর তা একেবারে চরম মানসম্পন্ন বা আদর্শ- ব্যাপারটা এমন তো নয়, বরং এর খামতির শেষ নেই, তা-ও হয়ত বলা যাবে। কিন্তু এর কোনো মানদণ্ড নেই- এমন ধারণা করা মানে, নিজেকেই ফাঁকি দেয়া হবে। তাই সারকথাটা হল, মানবাধিকারসহ সব বিষয়ে চীন নতুন নেতা হিসেবে নিজের মানদণ্ড বলে কিছু দেখাতে চাইলে তা করতে হবে পশ্চিমা মানদণ্ডকে শুরুর ভিত্তি ধরে। মানে, চীন এর চেয়ে আরো ভালো কী করতে পারে, সেটাই তাকে দেখাতে হবে। তাই বলাই বাহুল্য, এছাড়া চীনের সাবধান থাকাই ভাল যে, পশ্চিমা মানদণ্ডের নিচে সব কিছুই এখানে অগ্রহণযোগ্য হবে।

বিশ্বব্যাংকের বিরুদ্ধে অভিযোগ যতই থাক এরপরেও, আমাদের মত দেশে বিশ্বব্যাংক যেসব প্রকল্প নেয় তাতে সে বেশ কিছু মানদন্ড মেনে চলে। যেমন এর একটা হল, বিশ্বব্যাংকের নেয়া অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্পে যে দেশই দাতা-পার্টনার থাকুক না কেন, খোলা প্রতিযোগিতার আন্তর্জাতিক টেন্ডারেই একমাত্র সাব্যস্ত হবে যে, কাজ কে পাবে। মানে, ঐ দাতা দেশকেই কাজ দিতে হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। আমাদের যমুনা সেতু প্রকল্পে জাপান এক বড় ফান্ড-দাতা ছিল। অথচ পাঁচ আলাদা অংশের টেন্ডারে বিভক্ত ঐ প্রকল্পের কাজে জাপান একটাও পায় নাই বা জড়িত ছিল না। অথচ প্রায় সব চীনা প্রকল্পই এই মানদন্ডে অচল। চীনা-প্রকল্পের সাধারণ অভিমুখ হল, চীনারাষ্ট্র হয় দাতা, ঠিকাদার হবে চীনা কোম্পানি, আর তা হবে বিনা টেন্ডারে এবং গুরুত্বপূর্ণ হল, এক লোকাল এজেন্ট কোম্পানি থাকবেই, ব্যকডোরে যার মূল ভুমিকা বা কাজ হবে প্রকল্পগ্রহীতা দেশের প্রশাসনে ঘুষ-বন্দোবস্তের উপায় হিসাবে কাজ করা। তাই এটা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশ্বব্যাংকের জন্মের ৭৫ বছর পরে হাজির হয়ে, বিশ্বব্যাংকের মানদন্ডের চেয়ে নিচা-মানদন্ডে চীনা অবকাঠামো-প্রকল্প এভাবে চলতেই পারবে না। বেল্ট রোডসহ চীনা প্রকল্পগুলো এভাবে চলতে থাকলে এককথায়  চীনের ভবিষ্যৎ হবে অন্ধকার, সব ভেঙ্গেচুড়ে পড়বেই।

এর বিপরীতে চীনারা হয়ত বলবে, আমরা  পশ্চিমাদের মত কোন দেশে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করি না, পলিটিক্যাল স্বার্থ নাই বা স্টেক রাখি না। তাই কোন দেশে যদি দুর্নীতি থাকে (আমাদের মত দেশে যা অফুরন্ত ও ঘুষ খাবার জন্য ওঁত পেতে আছে) তবে ঐ দুর্নীতি উচ্ছেদ আমার কাজ নয়। সেকারণেই যে দেশ ঘুষ নিয়েই কাজ দেয়, তাকে আমরা ব্যাপক ঘুষ দেই, আর যে নেয় না তাকে সাধাসাধিও করি না। অতএব ঘুষ দিয়ে কাজ নেব কি না, সেটা চীন কখনও ঠিক করেনি।

আসলে এটা দায় এড়ানোর দায়িত্বজ্ঞানহীন যুক্তি। কারণ, চীনা রাষ্ট্র কোন নৈতিকতাহীন বাণিজ্যিক কোম্পানি নয় যে যেকোন উপায়ে তাকে মুনাফা করতেই হবে। এ ছাড়া চীন দুনিয়ার (অন্তত) অর্থনৈতিক নেতা হতে খায়েস রাখে। কাজেই নৈতিকতা পালনের দায়, অথবা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতার দায়পাল্পনের ঊর্ধ্বে থেকে চীন নেতা হতে পারে না। অথচ পশ্চিমা মানে, আমেরিকায় রেজিস্টার্ড কোনো কোম্পানির বিদেশে ঘুষ দিয়ে কাজ নেয়া অপরাধ; যদিও এর প্রয়োগ খুবই কম তবে এর কিছুটা প্রয়োগ একালে দেখা যাচ্ছে ওয়ার অন টেররের ইস্যুতে মানিলন্ডারিং আইনের কারণে। আরও কথা আছে, এনিয়ে জাতিসংঘের কনভেনশন আছে। স্বাক্ষরকারি হিসাবে চীনের দায় আছে, ফলে সে দায়মুক্ত নয়। এই বাস্তবতা ও মানদণ্ডকে এড়িয়ে মানদন্ডে পিছনে পড়ে থেকে চীন কিভাবে নেতা হতে পারবে? আমাদের মতো দেশগুলোকে আরও দুর্নীতিগ্রস্ত করে দিয়ে এর জন্য প্রধান দায়ী হয়েও চীন কোন নেতাগিরির আশা করে? আমেরিকার দোষত্রুটির শেষ নাই। কিন্তু আমেরিকা  গায়ে বাতাস লাগিয়ে  দুনিয়াকে “আমেরিকান সেঞ্চুরি” করে নিতে এমনি এমনি সক্ষম হয় নাই। কিছু অন্তত অবদান রাখতে হয়েছে। চলতে চালাতে গিয়ে সে বহু কিছুর মানদন্ড, আইন কনভেনশন বা প্রতিষ্ঠান গড়া ইত্যাদি এসব অনেক কিছুই তাকে করতেই হয়েছে। এগুলোকে আন্ডারএস্টিমেট করা, তুচ্ছ বা নজর আন্দাজ করা অবশ্যই চীনের অযোগ্যতা ও আত্মঘাতি হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই এককথায় বললে, ব্যাপারটা পশ্চিমা-অপশ্চিমার ইস্যুই নয়।

এটাও ঠিক, চীনের নেয়া বেশির ভাগ প্রকল্পের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক স্বার্থই একমাত্র নয়, এর বাইরে চীনা রাষ্ট্রের একধরনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থও থাকে, যেটা অস্বাভাবিক নয়। যেমন গোয়াদর বন্দর বা  চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প। এর নামই বলছে, চীনের ল্যান্ডলকড হয়ে থাকা ও পিছিয়ে পড়া পশ্চিমা ভূখন্ডকে [জিনজিয়াংয়ের উইঘুর বাসিন্দারা এখানেরই] মুক্ত করার লক্ষ্যে গোয়াদর বন্দর পর্যন্ত প্রবেশ – করিডোর নেয়াই- চীনের স্ট্র্যাটেজিক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ সোজা কথায় প্রকল্পের সুবিধাভোগী একা পাকিস্তান নয়, চীনও। কাজেই ঋণচুক্তির দায় ও শর্তাবলিতে এর ছাপ অবশ্যই থাকতে হবে। যেমন চীনা ঋণ শোধ দেয়ার সময় সাধারণত ২০ বছর হতে দেখা যায়। সে তুলনায় বিশ্বব্যাংকের কনসেশনাল ঋণের সাধারণ মানদন্ড হল, তা ৪০ বছরের, যার প্রথম ১০ বছর আবার সুদবিহীন। চীনারাও করিডোর পাওয়া সুবিধাভোগী, তাই একা পাকিস্তানের অর্থনীতির ওপর এর বিপুল ঋণ শোধের দায় চাপানো অনৈতিক ও অবাস্তব অবান্তর। কাজেই এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের প্রথম ২০ বছর সুদ-আসল পুরো কিস্তিবিহীন করা ইত্যাদি এমন অনেক কিছুই করতে পারতে হত। সারকথায়, একটা ‘অবজেকটিভ ফাইন্যান্সিয়াল এনালাইসিস’ করে [সেক্ষেত্রে দরকার হলে চীনের অ-বাণিজ্যিক কোন সামরিক বা অন্যকোন রাষ্ট্রস্বার্থ থাকলে এরও একটা অর্থনৈতিক মূল্য ধরে নিয়ে সে হিসাব করা সম্ভব] পাকিস্তান-চীন উভয়কেই দায় ভাগ করে নিতে হবে, সেটাই হত সবচেয়ে ন্যায্য। কিন্তু আমরা দেখছি, কিস্তি দেওয়া শুরু হবার আগে পাকিস্তান এখনই ধুঁকছে। এই করিডোর ঋণের কিস্তি যদিও এখনো শুরুই হয়নি, সম্ভবত ২০২২ সালের আগে শুরু হবে না; তখন পাকিস্তানের কী হবে?

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখিয়ে এখনই আমেরিকা এবং আইএমএফ টিটকারি দিয়ে বেড়াচ্ছে। যা আমেরিকার অর্থনীতি ঢলে পড়া ঠেকানোর স্বার্থে চালানো প্রপাগান্ডাকেই সাহায্য করছে। এটা নিশ্চয়ই চীনের পক্ষে যাচ্ছে না। কাজেই, বাণিজ্যিকের সাথে স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের প্রকল্পও হতেই পারে। কিন্তু দায় ভাগাভাগির একটা মানদন্ডও অবশ্যই থাকতেই হবে। পাকিস্তানের শাসকেরা চোর ও লোভী বলে চীন এর সুবিধা নিয়ে নিজের ভাগ্য গুছাবে আর এভাবে দুনিয়ার নেতা হতে পারবে কী করে? এটা কোন বুঝ? বস্তুত কোনো প্রকল্পের অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি মানে প্রকল্প গ্রাহক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোন প্রকল্প-ঋণ শোধের যোগ্য বা সম্ভব হবে কি না, এর যাচাই চীন আদৌ করে বলে আমাদের জানা নেই। অথচ বিশ্বব্যাংকের প্রকল্পে এমন চিন্তা একালে অকল্পনীয়।

কেন? চীন কেন এখানে উদাসীন থাকে? ‘পুঁজিবাদী’ ব্যাপার বলে? চীনের সাফাই কী, আমরা জানি না। অথচ এমন হওয়ার কারণে আইএমএফের প্রেসিডেন্ট মিস লাগার্দের নসিহত শুনতে হচ্ছে চীনকে যে, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে এর ভায়াবিলিটি’ যাচাই কর”ন। চলতি BRF সম্মেলনের দাওয়াতের যোগ দিয়ে বক্তৃতায় তিনি মুখের উপর বলেছেন ব্যাপক বেল্ট-রোডের প্রকল্প সেখানেই যাওয়া উচিত আর যে অর্থনীতি এর ঋণশোধের দায়ভার বইতে সক্ষম। [“China’s massive Belt and Road infrastructure program should only go where it is needed and where the debt it generates can be sustained…] ব্যাপারটা চীন জানত না এমন নয়, লাগার্দে প্রথম বলছেন তা তো নয়ই।  আবার এটা অবিশ্বাস্য যে গ্রাহক রাষ্ট্রগুলোকে ঋণের ফাঁদে ফেলাই চীনের বড়লোক হবার পথ, আর এটা চীন বিশ্বাস করে। এটা একটা রাষ্ট্রের দুনিয়ার নেতা হবার কোন স্ট্রাটেজিক উপায়ও তো হতেই পারে না, এই এবসার্ডিটি বা অবান্তর কথা চীন বুঝে নাই তেমন কঠিন কথা এতা নয়? তাহলে?

এটা চরম গোয়ার্তুমি আর পশ্চিমকে তাদের চিন্তাকে তুচ্ছ জ্ঞান করা সম্ভবত এমনই কিছু একটা।  আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার পক্ষে থাকে আবার সময়ে তার দরকার থাকলে এই অজুহাতে হস্তক্ষেপও করে থাকে – একথা সত্য। চীন কী মনে করে, সহজে ঋণপ্রাপ্তি ও ঘুষের নহর বইয়ে দেয়া, এভাবে স্বৈরাচারদের টিকিয়ে রাখা – এটা যে আরও বড় হস্তক্ষেপ – এটা চীনের বুঝে ধরা পড়ে নাই।

দুনিয়ার কোথাও শিল্পায়ন বা ক্যাপিটালিজম হয় নাই – রাষ্ট্রের অর্থ না মেরে দিয়ে। তারা বিশেষ করে কাস্টমসের টাকা, ব্যাঙ্কের টাকা মেরে দিয়েছে। পুঁজিপতিরা আদিম-পুঁজির সংগ্রহ সবসময় এভাবেই করেছে। কিন্তু এর মানে কী এই যে চীন উদ্দেশ্য করেই অর্থ লুটপাটকে উতসবে পরিণত করবে? এটা কোন ক্যাপিটালিজমের বুঝ? নাকি এটাই ইঙ্গিত করছে যে গ্লোবাল আইন, কনভেনশন, নাগরিক অধিকার, বেস্ট প্রাকটিস, মোডাল, ইন্সটিটিউশন গড়া, ইত্যাদি সম্পর্কে চীনের বুঝাবুঝিতে মারাত্মক ঘাটতি আছে?

কাজেই ক্রিশ্চান লাগার্দের এই নসিহত বা কখনো টিটকারি শুনে চীনের কেমন লাগছে? কোন ইজ্জত বাড়ছে জানা যায় না। আর এখান থেকেই চীন ‘ঋণফাঁদ’ পেতেছে- এই আমেরিকান প্রপাগান্ডা করার সুযোগ তৈরি করছে এতদিন চীন নিজেই।

হতাশার কথা থাক। মনে হচ্ছে, তাহলে কি এখন কানে পানি ঢুকেছে? এবারের বিআরএফ সম্মেলন থেকে আমরা কি সেই ইঙ্গিত পাচ্ছি? সম্ভবত হ্যাঁ। কিসের ভিত্তিতে এমন বলা যায়? খুব সহজ। উপরে আমরা দেখলাম বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট বা বিশ্লেষকদের ব্যাখ্যা ইত্যাদি সবই এটাই বলছে। কিন্তু এটা এখন এত সহজে এসে গেল আগে হয় নাই কেন, এর জবাব কী? গত মাসে ৯ এপ্রিল চীন-ইইউ সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে এক যৌথ বিবৃতি প্রকাশ হয়। দেখা যায়, অবকাঠামো প্রকল্পে যেসব স্টান্ডার্ড এপর্যন্ত তৈরি হয়েছে  চীন সুগুলো মেনে চলা আর এ নিয়ে আরও বিকশিত কাজ করতে চীন সেখানে ইইউর সাথে একমত জানিয়েছে। এবিষয়ে আমার আগের লেখা এখানে । কাজেই প্রেসিডেন্ট শি আসলে এবারের বিআরএফ থেকে বলতে চাইলেন, তিনি ইইউর সাথে ইতোমধ্যে যা যা একমত হয়েছেন, সেটাই এখন বিআরএফ ফোরামেও বাস্তবায়নে কাজ করবেন – এভাবে বলাটা কঠিন ছিল না। আর যাতে পরের বিআরএফ সম্মেলনে তিনি জার্মান চ্যান্সেলর আর ফরাসি প্রেসিডেন্টকেও হাজির করতে পারেন।

এখন যদি আমরা আমেরিকার সাথে তুলনা করে বলি তাহলে ব্যাপারটা দারাল এই যে, ট্রাম্পের আমেরিকা চীনের বিরুদ্ধে নেতি প্রপাগান্ডা করেই গেল। আর ইইউ চীনকে মানদন্ডে আসতে বাধ্য করল, যাতে সম্ভাব্য গ্লোবাল নেতা চীনের পার্টনার হয়ে ইইউ নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারে।

তাহলে এখন বেল্ট রোডে ভারতের কী হবে?
ইইউর মতো ভারতের জন্যও চীনা প্যাকেজ আছে মনে হচ্ছে। তাই সম্ভবত চীনা পথ হতে যাচ্ছে, সঙ্ঘাত নয়। বরং আরো সুবিধা অফার করে ভারতকে নিজের নৌকায় তুলে নেয়া হবে। সংক্ষেপে বললে, পাকিস্তানের কথিত জঙ্গি মাসুদ আজহারের নাম জাতিসঙ্ঘের জঙ্গি তালিকায় তুলতে চীনের আর আপত্তি না করা সম্ভবত সেটারই ইঙ্গিত। তবে এটা কেবল একা ভারতকে ছাড় দেয়া নয়। অনুমান করা যায়, ভারতকেও প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে যে, মাসুদ ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের ওপর এখন চাপ সৃষ্টি করতে বা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো প্রপাগান্ডা বা সামরিক বা স্ট্র্যাটেজিক কোনো পদক্ষেপে যাবে না। তাই পাকিস্তানও চীনা সিদ্ধান্তে কোন আপত্তি প্রকাশ করে নাই, বরং গ্রহণ করেছে। আসলে চীন অনেক আগে থেকেই এমন সমাধানের ইঙ্গিত দিয়ে আসছিল। এমনকি সম্ভবত কাশ্মির ইস্যুতে লম্বা পথের হলেও একটা সুরাহা, অন্তত ডায়ালগ শুরু করে পথ খুঁজে পাওয়া- এত দূর পর্যন্ত পরিকল্পনায় আছে। চীন সে জন্য অরুণাচল বা কাশ্মিরের সাথে ম্যাপে কার কোনটা এলাকা – সে সংক্রান্ত অনেক দাবি থেকেও সরে এসেছে, তা ভারতের মিডিয়াই বলছে। অনেকে অবশ্য অনুমান করে বলছেন, চীনের এত ছাড়ের অর্থ- অন্য আর একটা । তা হল চীন সম্ভবত মনে করছে ভারতের চলতি নির্বাচনে মোদী নয়, নতুন সরকার আসছে – এটা তারই ইঙ্গিত। তাই নতুন হবু সরকারকে দেয়া এটা চীন উপহার। ওদিকে ভারতের নির্বাচন সমাপ্ত হলে চীনে সেকেন্ড য়ুহান [WUHAN] সম্মেলনেরও প্রস্তুতি চলছে।

কিন্তু তাহলে বাংলাদেশের ভাগে কী?
আপাতত ফুটা কড়ি। নির্বাচিত হওয়ার পরই আমাদের সরকার ভারতীয় মিডিয়ায় এক হুঙ্কার দেয়া সাক্ষাৎকার দিয়েছিল। সেটা এখন ফাঁপা বলে হাজির হয়েছে। সেখানে ধারণা দেয়া হয়েছিল ভারতের আপত্তি উপেক্ষা করে আমাদের সরকার নিজেই চীনা বেল্ট রোড প্রকল্পসহ চীনের সাথে ব্যাপক সম্পর্কে যাচ্ছে । সে ইঙ্গিত, সেসব ফেলে এখন বাস্তবত সরকার মুরোদহীন বলে নিজেকে প্রমাণ করছে। কারণ, ওই সাক্ষাৎকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ হত গত ২৫-২৭ এপ্রিলের বিআরএফ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে চীনে টিম যাওয়ার, তা ঘটেনি। ২৩ এপ্রিল একমাত্র ইত্তেফাক বলেছিল, প্রধানমন্ত্রী নয়, একা শিল্পমন্ত্রী নাকি যাচ্ছেন। আর কোন মিডিয়া ইস্যুটা নিয়ে কিছু না করে উলটা ব্ল্যাক আউট করে দেয়। ইস্যুটিকে মিডিয়া এভাবে অগুরুত্বপূর্ণ করে ট্রিট করেছে, এতে অনুমান হয়-সরকারের কাছেও এটা অগুরুত্বপূর্ণ; তাই এমন। তাহলে জানুয়ারীতে প্রধানমন্ত্রীর ভারতের মিডিয়ায় সাক্ষাৎকার দেয়ার বোল্ড অবস্থানের পর এখন এই গুরুত্বহীন করে দেওয়ার অর্থ কী?
খবর না থাকাটাই একটা খবর। সেক্ষেত্রে সোজা অর্থ হল, জানুয়ারিতে সাক্ষাতকারে যাই দাবি  করে থাকুক এখন সরকার বুঝাতে চাইছে, তাঁর এখন কোনো সক্ষমতা নেই যে, ভারতের স্বার্থের বাইরে গিয়ে নিজ স্বার্থে সে চীনের সাথে কোনো সম্পর্কে যায়। ব্যাপারটি দাঁড়াল এমন যে, নির্বাচিত হলেও ভারতের স্বার্থ ুপেক্ষা করে ইন্ডিপেন্ডেন্ট থেকে কোনো অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা সরকারের নেই বলে সরকারেরই অনুমান। তাই সে আবার স্ট্যাটাস কো ফিরে গেল; যা ছিল তাই আগের জায়গায়। ভারতের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে থাকা। ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবস্থান নেয়ার সক্ষমতা আমাদের সরকারের এখনো নাই, এতাই সারকথা। ইতোমধ্যে ভারতের এক মিডিয়ায় খবর বেরিয়েছে, চীন এবারের BRI  এর নেয়া প্রজেক্টের তালিকায় BCIM কে রাখে নাই। [China drops BCIM from BRI projects’ list]। বিসিআইএম মানে- বার্মা হয়ে আমাদের চীনের কুনমিং যাওয়ার এবং সোনাদিয়া বন্দর – এই পুরা প্রকল্পই চীন নাকি গুটিয়ে ফেলেছে। এই ক্ষবর কতটা সত্য অথবা কেন আমরা এখনও জানি না।
ফলে আপাতত, বাংলাদেশের জন্য সব কিছুর প্রাপ্তি শূন্য। আসলে বাস্তবত পেছনের জনসমর্থন ছাড়া এক সক্ষমতাহীন ক্ষমতা আমাদের সরকারের -= এদিকটা আঁচ করেই সম্ভবত চীন বা ভারত আমাদের সরকারকে তুচ্ছ জ্ঞান করছে। তাই ভারতের স্বার্থ পূরণের অগ্রাধিকারের নিচেই চাপা পড়া আমরা। নিঃসন্দেহে তা খুবই হতাশাজনক!

এদিকে আবার আরেক কাহিনী। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এক সাক্ষাৎকার দিয়ে বলছেন, “সরকার চীনের বিকল্প ফান্ড দাতা খুঁজছে”। সেই খবরের শিরোনামটাই হল – “Bangladesh eyes alternatives to China’s belt and road loans…।  সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের [SCMP] ২৩ এপ্রিল ছাপা এই খবরের রিপোর্টার বাংলাদেশে এসে ওই সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বলে মনে হয়েছে। আর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ভারতের প্রো-আমেরিকান কথিত বিজ্ঞদের বক্তব্য সেখানে ছাপা হয়েছে, যার সারকথা বাংলাদেশের চীনা ঋণ নিতে যাওয়া ঠিক নয়। ব্যাপারটা আসলে বড়ই রহস্যময়! প্রধানমন্ত্রী চীনা বেল্ট রোডে যোগ দিতে চেয়ে সাক্ষাৎকার দিচ্ছেন। আর তিন মাসের মাথায় সরকারের প্রতিমন্ত্রী বলছেন, তারা চীনা বেল্ট রোডের বিকল্প ফান্ড খুঁজছেন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ০৪ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)বেল্ট রোড ফোরাম সম্মেলন আমরা কি নাই হয়ে যাচ্ছি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

“বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

গৌতম দাস

৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yW

BRI-2, First China freight train arrives in London 2017
BELT-ROAD SUMMIT-2,  আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – ছবি : সংগ্রহ

গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আমেরিকার বদলে চীন মূল ভূমিকা নেয়ার ক্ষেত্রে চীন এগিয়েই চলেছে এবং এই পরিবর্তনে চীনের জিডিপি সব সময় ইতিবাচক থেকেছে, যদিও সময়ে তা কম-বেশি হয়েছে। অগ্রগতির সে বিচারে গত কয়েক মাস ছিল চীনের দিক থেকে খুবই নির্ধারক কিছু ঘটনার যা, চীন ইতিবাচক সাফল্যের সাথে পার হয়েছে। আর এমন সাফল্যের ওপর চড়ে চলতি এপ্রিল মাসে চীন আরেক সাফল্য লাভ করতে যাচ্ছে, যা আগামী ইতিহাসে চীনা উত্থানের দ্বিতীয় পর্যায় বলেই চিহ্নিত হবে মনে হচ্ছে। কিন্তু কী সেটা?

চীনা বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ (বিআরআই) বা [Belt and Road Initiative (BRI) ] সম্পর্কে এতদিনে আমরা সবাই কমবেশি জেনে গেছি যে, এটা ৬৫টিরও বেশি রাষ্ট্রকে একসাথে ভৌত অবকাঠামোগতভাবে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে কানেক্ট করার এক মহাপ্রকল্প। কাঠামোগতভাবে এটা  মহাদেশীয় পর্যায়ের সংযোগ প্রকল্প; যা মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপ এদুই মহাদেশকে সংযুক্ত করে ফেলার প্রকল্প এবং আরও। তাই এর সাথে এ’দুই মহাদেশের মাঝখানে সেন্ট্রাল এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের সবাই যুক্ত হবে। আর ওদিকে এই কানেক্টিভিটি প্রকল্পের আরেক প্রান্ত কেনিয়া ও ইথিওপিয়া দিয়ে পূর্ব আফ্রিকার সাথেও সংযুক্ত হবে। এ ছাড়া পুরো প্রকল্পই স্থানে স্থানে ছয়টিরও বেশি গভীর সমুদ্রবন্দর দিয়ে সমুদ্রপথের পণ্য পরিবহণের সাথেও যুক্ত থাকবে। আইডিয়া হিসেবে বিআরআই উদ্যোগের মূল ধারণা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম হাজির করেছিলেন তাঁর কাজাখাস্তান সফরের সময়, সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে। তখন এর নাম বেল্টরোড, সিল্করোধ, সিল্করুট ইত্যাদি নানান নামে হাজির করা হয়েছিল। সে ঘটনাক্রম সম্পর্কে এখান থেকে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।  তবে গত ২০১৭ সালের মে মাসে এর প্রথম সামিট (বা সদস্য রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানদের নিয়ে সভা, বেল্ট রোড সামিট) এর সময় তা “বেল্ট রোড উদ্যোগ” (BRI) নামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে মূল ফোকাস ছিল – কোন কোন রাষ্ট্র এই বড় প্রকল্পের অংশ হতে চায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো। আজ এই ২০১৯ সালের চলতি এপ্রিল মাসের শেষে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত এবারের নাম Belt and Road Forum বলতে দেখা যাচ্ছে। এর জন্য নতুন খোলা পোর্টাল এখানে।]  এই সামিট টু কেন গুরুত্বপূর্ণ বা এর মূল তাৎপর্য কী হতে যাচ্ছে?

বেল্ট রোড অবকাঠামো প্রকল্পের মূল কাঠামো হল মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপকে সব উপায়ে সংযুক্ত করে ফেলা। অর্থাৎ এশিয়ার অপরপ্রান্ত হবে ইউরোপ, এত দিন যা খুবই সীমিত সুযোগে কানেক্টেড ছিল। আর এখানে ইউরোপ মানে সারা ইউরোপ; অর্থাৎ ২৫ সদস্য রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যদিও সংখ্যায় ২৫ অনেক বেশি, কিন্তু আসলে ইউরোপের প্রভাবশালী মাতবর রাষ্ট্র – চার থেকে আট রাষ্ট্র, যারা যেকোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক। এই প্রথম চার রাষ্ট্রের মধ্যে মূল দুই রাষ্ট্র আবার হলো ফ্রান্স ও জার্মানি। এর সাথে বাকি দুই রাষ্ট্র ব্রিটেন আর ইতালি। এমনিতে আমেরিকান মাতবরিতে চলা গত ৭০ বছরের দুনিয়া বিচারে, আমেরিকা একা একা চলে নাই; সাগরেদ রাষ্ট্রসহ দলেবলে চলেছে। এভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্রজোট হল ‘গ্রুপ সেভেন’ বা জি-৭। একটু বিস্তারিত জানতে এই ফাইনান্সিয়াল বিনিয়োগ-পিডিয়া সাইট, ইনভেস্টোপিডিয়া – এটা দেখা যেতে পারে।  ইউরোপের সেই চার রাষ্ট্র – ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি – এই চার রাষ্ট্রই হল ‘গ্রুপ সেভেন’-এর চার ইউরোপীয় সদস্য; আর বাকি কানাডা, আমেরিকা ও জাপান মিলে পূর্ণ হয় ‘গ্রুপ সেভেন’।

বেল্ট-রোড উদ্যোগের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে এই কাঠামোতে এখানে এশিয়ার অপর প্রান্ত ইউরোপ। অথচ ২০১৭ সালে প্রথম বেল্ট রোড সামিট অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত এর অগ্রগতি ও অর্জন মেপে দেখলে সেখানে বড় খামতির দিক ছিল যে, সেকালে পর্যন্ত ইউরোপের কে কে বা বিশেষ করে প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রের কাউকে এই প্রকল্পে যোগ দিতে আগ্রহী করাতে পারেনি বা কমপক্ষে কাউকে দিয়ে আনুষ্ঠানিক ওয়াদা চীন আদায় করতে পারেনি। সেই খামতিই এবার পূরণ হতে চলেছে।
তবে এত দিন চীন কেন তা পারেনি তা বুঝতে প্রথমত চীনের কাছে জি-৭ কী, এটা বুঝলে অনেকটাই স্পষ্ট হবে সমস্যার জটিলতা কোথায়? গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা বা প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত চীন ও আমেরিকার মধ্যে। আমেরিকার জায়গা নিতে চায় চীন। তাহলে ইউরোপ? এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউরোপ কেউ নয়। কারণ ইউরোপ বিগত-যুবা। ফলে সে ঐ দু’য়ের লড়াইয়ে কারও জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়। তবে আমরা ইতিহাস হিসাবে মনে রাখতে পারি যে, যদিও ইউরোপও একসময় দুনিয়ার নেতা এবং তাঁর সেখানে রুস্তমি ছিল; তবে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এবং সেটা ছিল কলোনি রুস্তমি।  আর ঐ বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ হয়েছিল আমেরিকার এক নম্বর সাগরেদ।

যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় (১৯৪২) থেকেই গ্লোবাল নেতৃত্ব আমেরিকা নিজের হাতে নিয়ে নিতে সক্ষম হয়ে যায়; আর সারা ইউরোপ ছোট-বড় সবাই হয়ে যায় আমেরিকার অনুগ্রহ প্রার্থী। এমনকি মাথা তুলে দাড়াতে চেষ্টা করা হিটলারের জার্মানি, মুসোলিনির ইটালি অথবা এশিয়ার জাপান বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাবার পর আরও বেশি করে আমেরিকার অনুগ্রহ-প্রার্থী হয়। ওদিকে ঐ বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা এককভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের প্রায় সবাইকে যুদ্ধে সবরকম সাহায্য করা, প্রধান খরচগুলো নিজে বহন করা, অনুদান দেয়া তো বটেই এমনকি যুদ্ধ সমাপ্তিতে ইউরোপের অর্থনীতিগুলোকে পুনর্বাসনের যে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, সেটাও একা আমেরিকা জুগিয়েছিল। তাই আমেরিকা ও ইউরোপের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায় যেন, আমেরিকা একাই ত্রাতা ও দাতা আর  ইউরোপ ওরই পাণিপ্রার্থী। সে সম্পর্কই সেই থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসছে জি-সেভেন ধরনের গ্রুপেও, এক উঁচু-নিচু সম্পর্কে। আমেরিকা কী বলে বা সে কী চায়, তা আমল করে শুনতে ইউরোপ অভ্যস্ত হয়ে যায়। যদিও ১৯৪৪ সাল থেকে গ্লোবাল ইকোনমিক সিস্টেম, যা বহুরাষ্ট্রীয় নানান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল, তা গড়তে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ ও নেতারা আমেরিকার সাগরেদ হয়ে পাশে থেকে নিজেদেরকেও গুরুত্বপূর্ণ করে নিয়েছিল। এভাবে ইউরোপের প্রভাবশালী চার-ছয় রাষ্ট্র আমেরিকার পাশে ছোট-তরফ বা সাগরেদ হয়ে উঠতে জায়গা পেয়েছিল।

তাহলে অর্থ দাঁড়াল, একালে আমেরিকাকে সরিয়ে গ্লোবাল নেতৃত্বের সে জায়গা চীন নিতে চাইলে ইউরোপের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকেও চীনমুখী করে নিতে হবে আগে। “আমেরিকা-ইউরোপের” সম্পর্কের বদলে একে ছাপিয়ে “চীন-ইউরোপের” মধ্যে সম্পর্ককে খাঁড়া হতে হবে আরও প্রবল প্রভাবশালী সম্পর্ক হিসাবে। আর এটাই হবে বাস্তবত আমেরিকাকে দুনিয়ায় কম গুরুত্বপূর্ণ করে দেয়া। অতএব, বিশাল হইচই ফেলে দেয়া ঘটনা হল – ইতালির বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা। এবছরের মার্চ মাসের ২১ তারিখ থেকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি-এর সপ্তাহব্যাপী ইউরোপ সফর ছিল। আর সেখানেই স্বাক্ষরিত ১৭টি চুক্তির মধ্যে একটি হলো চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ‘প্রাথমিক বোঝাবুঝিগুলো’ (এমওইউ বা MOU ) দলিল করে স্বাক্ষরিত হয়েছে। আর চলতি মাসের বেল্ট রোড সামিট টু-তে অংশ নেয়ার সময় তা পূর্ণতা পাবে।

ইটালির এই যোগদান-সম্মতির চীনা উত্থানের জন্য এক মাইলস্টোন তাতপর্যের। কারণ ইতালিই হল প্রথম জি-৭ গ্রুপের সদস্য যে খোলাখুলি আমেরিকান মেরু ত্যাগ করল। শুধু তাই নয় ইতালিই প্রথম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে যে (আমেরিকার হাত ছেড়ে) চীনের সাথে “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” – সম্পর্ক করতে যাচ্ছে। [The communique said the two sides have agreed to advance China-Italy comprehensive strategic partnership…… ] অর্থাৎ চীন-ইতালি সম্পর্কটা কেবল অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক নয়। [এপ্রসঙ্গ আরও একটু বিস্তারিত পরের প্যারায়।] বৃটেনসহ অন্যান্যরাও ইতোমধ্যে অনেক দূর গিয়েছে কিন্তু সেগুলো ছাড়াছাড়া। যেমন এলেখার শিরোনামের ছবিটা; এছবি বেল্ট-রোড ব্যবহার করেই প্রথম ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে, চীন থেকে লন্ডন পর্যন্ত মালবাহী ট্রেন ব্যবহারের। যেটা অনেকটা বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের লাইন থেকে বাসায় একটা সংযোগ নেওয়ার মত। কিন্তু সেটা ঐ বিদ্যুৎ কোম্পানির সাথে মালিকানা-বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া নয়।

কিন্তু ইতালি ইউরোপের বাকি সবার আগে এত গভীরভাবে জড়িত হয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তার প্রধান বস্তুগত স্বার্থের দিক হল – পুরো বেল্ট রোড প্রকল্পে ইউরোপীয় আর এক প্রভাবশালী প্রান্ত বা শেষ মাথা হবে ইতালি। তাতে ইউরোপের যে গভীর সমুদ্রবন্দর বেল্ট রোডের সড়ক ও রেলকে সংযুক্ত করাবে, সেই বন্দর গড়ে উঠবে ইতালিতে। যার মানে হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতা মুসোলিনি, তিনি হিটলারের সাথে গাঁটছড়া বাঁধার কারণে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে – সেই থেকে পিছিয়ে পড়া আর ধুঁকে চলা অর্থনীতির ইতালি এবার সামনের সারিতে চলে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। ডাচ রটারডামকে ছাড়িয়ে ইতালি হয়ে উঠবে ইউরোপের হাব [hub] – সড়ক, রেলের সাথে সমুদ্রপথ যুক্ত হওয়ার বড় সংযোগস্থল। সব দিকের সাথে কানেক্টিভিটির এই বিশেষ সুবিধার জন্য ইতালি হয়ে উঠবে বুড়ো শরীরে আবার যৌবনের জোয়ার – ইতালি হবে এখন ইপিজেড-ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের হাবও। তাই নিজ বিপুল সম্ভাবনার সামনে এখন থেকে আমেরিকার হাত হালকা করে ধরা আর ইউরোপের অন্যরা – ফ্রান্স, জর্মানি বা ব্রিটেন- এদের সবাইকে টপকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে চীনের হাত শক্ত করে জাপটে ধরা হবে ইতালির কাছে খুবই জায়েজ।

কিন্তু তাই বলে জার্মান, ফ্রান্স বা ব্রিটেনকেও চীন বিমুখ করেছে ব্যাপারটা ঠিক তাও নয়। বিস্তারে তা বুঝতে আরেকটা ধারণার সাথে পরিচয় করাতে হবে। “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” [Comprehensive Strategic Partner]’ হলো সেই নতুন শব্দগুচ্ছ – যা চীন একালে ব্যাপক ব্যবহার করছে। বাংলায় “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” – চীন দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সবাইকে এমন “কৌশলগত মিত্র” হিসেবে পেতে চায়। এটা একটা (বেল্ট রোড) প্রকল্পেই কেবল চীন সবাইকে পেতে চায় তা নয়, বরং আরও এবং সামগ্রিক। আসলে খোদ বেল্ট রোড প্রকল্পটি চীনের একটি কৌশলগত প্রকল্প। কেবল বাণিজ্যিক নয়।

স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত বলতে এর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অর্থ হল, যা কেবল অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লাভালাভের দিকটাই নয়, আরও অনেক কিছু। কী সেটা? অন্তত আপাতত অর্থ হল, আমেরিকাকে বাইরে রেখে বাকিদের নেয়া হয়েছে এমন এক পক্ষজোট- যার মধ্যে রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক ইত্যাদি সব (এই অর্থে তা সামগ্রিক) স্বার্থেই এখানে চীনের নেতৃত্বে সকলে আছে। এই অর্থে এটা আমেরিকাকে বাইরে রেখে এক রাষ্ট্রস্বার্থ জোট। আবার এই জোটের কাম্য সদস্যরা মানেই এরা সবাই বড় ক্ষমতার রাষ্ট্র, ঠিক তা নয়। যেমন হাসিনার বাংলাদেশ (অন্তত ঘোষণা মোতাবেক), আমরাও চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। ব্যাপারটা আর একটু বিস্তার করতে আরেক দিকে আলো ফেলব।

ক্রাইস্টচার্চ ম্যাসাকার সামলানোর জন্য সদ্য সুখ্যাতি অর্জন করা নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা, এ মাসের ১ এপ্রিল চীন সফরে গিয়ে চীনের “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” হয়ে এসেছেন। এমন মিত্র হওয়াতে এর অর্থ বুঝতে হবে এভাবে; নিউজিল্যান্ড বেল্ট রোড প্রকল্পের সাথে কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হয়েছে ও নিয়েছে। অর্থাৎ চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার না হয়েও কেউ বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হতে পারে। এই সুযোগ থাকলেও জেসিন্ডা স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হওয়া বেশি লাভজনক মেনেছেন। আর বিপরীতে কেবল বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হলে স্বভাবতই সে ক্ষেত্রে সেটা কেবল “বাণিজ্যিক স্বার্থ” ধরনের সম্পর্ক হত। ফলে চীনের দেয়া অন্য অনেক সুযোগ সুবিধা সে পেত না। যেমন- কোন রাষ্ট্র যদি কোন কারণে ঋণের কিস্তি শোধ দিতে পারছে না অবস্থায় পড়ে। এমন ক্ষেত্রে ওই রাষ্ট্র আবার চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হলে চীন ব্যাপারটাকে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যিক দিক থেকে দেখে থেমে থাকবে না। চীন তাকে বরং অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে, বিপদ থেকে বের হয়ে আসতে আরও ঋণ দেওয়াসহ সব সাহায্য করবে। চীনের এখনকার সাধারণ নীতি-কৌশল হল সব রাষ্ট্র বা প্রকল্পের সম্পর্ককে সব সময় স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার সম্পর্ক পর্যন্ত বিস্তৃত করা। যদি পার্টনার রাজি থাকে কেবল তখন সেটা আনুষ্ঠানিকতা পায়, কিন্তু চীনের দিক থেকে আগ্রহ জারি থাকে সব ক্ষেত্রে ও সময়ে।

কিন্তু নিউজিল্যান্ডের উদাহরণ কেন আনলাম? কারণ, ঠিক এর বিপরীত ঘটনা বা রাষ্ট্র হলো অস্ট্রেলিয়া। মনে রাখতে হবে, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড প্রায় সময় একসাথে উচ্চারিত শব্দ। মূল কারণ তারা একইভাবে, একই ভাগ্যে রকই সময়ে ব্রিটেনের কলোনি হয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ফলে রাষ্ট্রস্বার্থ ও নীতিগত মিল এক হতে বেশির ভাগ সময় দেখতে পাওয়া যায়। যদিও চীন না আমেরিকা কোন ক্যাম্পে থাকবে প্রশ্নে তাদের ভিন্নতা দেখা দিল। আর জেসিন্ডা প্রমাণ করলেন অষ্ট্রেলিয়া ভুল করেছে।

চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রবল দ্বন্দ্ব অনেক আগে থেকেই অন্তত ওবামা আমল থেকে,  তবে চাদরের নিচে থেকে আস্তে আস্তে প্রকট হয়ে ভেসে উঠছিল। যা কেবল এ’কালে ট্রাম্পের আমলে এসেই চাদর উঠে গেছে। আর সবচেয়ে বড়ভাবে আরেকবার চাদর উঠেছিল ২০১৫ সালে, চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক – এআইআইবি [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB) ] গড়ার সময়ে। ওবামা লজ্জার মাথা খেয়ে খোলাখুলি সেই সময়ে এই নতুন ব্যাংক প্রকল্পে যেন এশিয়ার জাপান, কোরিয়া তাইওয়ান বা অস্ট্রেলিয়া (যারা আমেরিকার বহু পুরনো বন্ধু মনে করা হয়) এরা তো বটেই, এমনকি ইউরোপেরও কেউ যেন যোগ না দেয় এর লক্ষ্যে, কান-পড়া দিয়ে কার বিয়ে ভেঙে দেয়ার মত, করে ব্যাপক প্রপাগান্ডা ও আপত্তিতে ছেয়ে ফেলেছিল। যদিও ফলাফলে আমেরিকার হার হয়েছিল; শেষে প্রায় সব রাষ্ট্রই ওই ব্যাংক প্রকল্পে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু চীনের নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট আর আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট সেই থেকে প্রায় প্রকাশ্যেই তৎপর হয়ে যায়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া এআইআইবি ব্যাংকে সদস্য হয়েও আমেরিকার জোটেই যোগ দিয়েছিল। এছাড়া আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোটে আর সদস্য হয়েছিল জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ানের মত রাষ্ট্রগুলো এবং স্বভাবতই আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর ঠিকা” নেয়া ভারত তো ছিল।

এমনকি অস্ট্রেলিয়া আরও একধাপ এগিয়ে নিজের উপকূলে এক আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিও স্থাপন (২০১৬ সালে চালু হয়) করতে দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় সবাই ধরা খেয়ে যায় ট্রাম্পের আমলে এসে, তাঁর জাতীবাদি ট্রাম্প হয়ে উঠার কারণে। কারণ ট্রাম্পের সারকথা, বিড়াল যেন বলছে আর মাছ খাবো না। দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের অর্থনীতিতে রূপান্তর মানে দুনিয়া জুড়ে ব্যাপক পণ্য বিনিময়ের গ্লোবাল সমাজের দুনিয়া গড়তে নেতৃত্ব দেয়া সেই আমেরিকা, ট্রাম্পের হাতে পড়ে হয়ে গেল অ্যান্টি-গ্লোবাল। এক জাতিবাদি আমেরিকা; আমেরিকা ফাস্টের নীতি চর্চা শুরু করল। ফলে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক জোট মুখ থুবড়ে পড়লেও বিপরীতে চীনেরটা সদর্পে আরও এগিয়ে যেতে সুযোগ পেয়ে যায়। সেটারই স্পষ্ট সফলতা এই প্রথম এখন প্রমাণ হল গত মাসের শেষে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং -এর ইউরোপ সফরে। মুখ পোড়ানো অস্ট্রেলিয়ার অতি উৎসাহ যে ভুল ছিল তা যেন আরো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে নিউজিল্যান্ড এবার অস্ট্রেলিয়ার অকেজো স্ট্র্যাটেজিক জোটের পাল্টা চীনা স্ট্র্যাটেজিক জোটে যোগ দিল।

এদিকে ট্রাম্পের আগমনের পর থেকেই ইউরোপের জার্মানি – যে ট্রাম্পের “অ্যান্টি-গ্লোবাল” অবস্থানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি পাল্টা সোচ্চার অবস্থান নিয়েছিল এবং ভোকাল ছিল, সেই জার্মানির সাথেই চীনের সম্পর্ক গভীর হয়ে যায়। চীনা শিল্প-উদ্যোগের যুগ এখন দ্বিতীয় পর্যায় চলছে, যার সারকথা প্রত্যেক ট্রেডকেই হাইটেকে বা উচ্চ প্রযুক্তিতে নিয়ে যাওয়া। যেখানে প্রথম পর্যায়টা ছিল বাল্ক উতপাদন করে উতপাদন খরচ নামিয়ে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বি করে ফেলা। তাই এবার হাইটেকে যাত্রার দ্বিতীয় পর্যায়ে – এখানেই জার্মানির সাথে চীন গভীর পার্টনারশিপ হয়। ব্যাপারটা জার্মানির দিক থেকে দেখলে, চীনের মতো বড় আর ব্যাপক এবং হাইটেকের চাহিদার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যাওয়া জার্মানির জন্য তা বিরাট কিছু। সাধারণভাবে হাইটেকে আর বিশেষত গাড়ি তৈরির অটো শিল্পে চীনের মূল পার্টনার এখন জার্মানি।  জার্মানরা বিনিয়োগ নয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে। চীনে গত তিন বছরে লাগাতার  জার্মান সংশ্লিষ্টতা ও বিনিয়োগ বেড়ে চলা চলছেই, গ্রোথ রেট ১৪০ শতাংশ বলা হচ্ছে। সম্প্রতি ফ্রান্স সফরে এক মূল সম্মেলনের সাইড লাইনে প্রেসিডেন্ট শিং-এর জর্মান চ্যান্সেলার মার্কেলের সাথে বৈঠকের মিডিয়া রিপোর্ট বলছে [China was Germany’s largest trading partner for a third consecutive year in 2018, with a nearly 140 percent increase in German companies’ actual investment in China, he said.]। এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে এই বৈঠক থেকে চীনের সাথে জর্মানির ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” হওয়া বা না হওয়া বিষয়ে কোন সুর ভেসে আসে নাই। কিন্তু তা সত্বেও চ্যান্সেলার মার্কেল জানাচ্ছেন তিনি ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ফোরামে জার্মানি যোগ দিচ্ছে। [Germany would like to deepen its economic and trade relations with China in the digital age, and is willing to actively participate in the second Belt and Road Forum for International Cooperation, Merkel said.]।

ওদিকে ফ্রান্সের সাথে চীনের সম্পর্ক আর এক মাত্রায় হাজির। এবার প্রেসিডেন্ট শি-এর সফরে ইতালির বাইরে আরেক গুরুত্বের সফরের জায়গা ছিল ফ্রান্স। এই সফরে যত না চীনের খুশির, এর চেয়ে বড় খুশি প্যারিসের, সে গদগদ। মূল কারণ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ফরাসি পণ্য-ক্রয়ের চুক্তি।  চীন, আমেরিকার বোয়িংয়ের চলতি খারাপ সময়ে ইউরোপের ফ্রান্সের বড় শেয়ারের (চীনে অবস্থিত ফ্যাক্টরি থেকে) এয়ারবাস থেকে বিমান কেনার জন্য ৪৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। অর্থাৎ এর সোজা মানে হল, জার্মান ও ফ্রান্স চীনের পক্ষে কৌশলগত জোটের প্রত্যক্ষ পার্টনার না হলেও তারা ঘনিষ্ঠ; অন্তত তারা আমেরিকার জোটের নয়।

ইউরোপের চার কুতুবকে নিয়ে কথা বলতে এবার বাকি থাকল বৃটেন। ব্রিটেন এত বাছবিচার না রেখে খোলাখুলি বেল্ট রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে লম্বা পরিকল্পনা নিয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয় হংকং ব্যাংকের এক সাবেক চেয়ারম্যান ডগলাস ফ্লিন্টকে বিশেষ দুত ও প্রধান করে তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে এ লক্ষ্যে কাজ ও পরিকল্পনা শুরু করতে।[Sir Douglas Flint, who was appointed as the Special Envoy to BRI of the British Treasury in December 2017]। ফ্লিন্ট জানাচ্ছেন, The Belt and Road Initiative (BRI) “is a real opportunity” to strengthen UK-China cooperation। বেল্ট রোড সামিট টু ব্রিটেনের জন্য এক বিরাট সুযোগ বলে ডগলাস ফ্লিন্ট প্রকাশ্যেই জানাচ্ছেন।

তাই এককথায় বললে, চলতি এপ্রিলের ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ থেকে এর ওলটপালট ঝড় আসন্ন হয়ে উঠেছে। গ্লোবাল নেতৃত্বে চীনের আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে তা আর এক ধাপ উঠে দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত হতে যাচ্ছে।

কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ?
বেল্ট-রোড প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান সরাসরি বিরোধিতার। গত ২০১৭ সালের সামিটের দাওয়াত তাই সরাসরি প্রত্যাখান করেছিল। আর বাংলাদেশ গত ২০১৭ সালে বেল্ট রোড সামিট-ওয়ানের সময় ভারতের মন রক্ষা করতে বাংলাদেশ লো-প্রোফাইলে থেকেছিল।  তবে বেল্ট রোড প্রকল্পে চীনের সাথে বাংলাদেশ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত লুকাতেও চায়নি বা পারেনি। বরং অক্টোবর ২০১৭ সালে ভারতকে বুঝিয়ে রাজি করার এক  উদ্যোগ নিয়েছিল যে ভারত যেন আমাদেরকে এই সম্পর্কে যেতে আপত্তি না করে বা ভালভাবে নেয় – তা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। বরং আমাদের পররাষ্ট্র সচিবকে একাজে ভারতে পাঠানোয় উলটা ভারতের সাথে আমাদের অবস্থান-ভিন্নতা আরো প্রকট ও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছিল। আজ দুবছর পরে এই ইস্যুটা এখন যে  অবস্থায় চলে গেছে তাতে এখন  ভারতের মুখ চেয়ে স্থবির হয়ে থাকা যাবে সে জায়গাতেও আর নেই। মূল কারণ বটম লাইনটা আমাদের মনে রাখতে হবে। বেল্ট-রোড প্রকল্পে হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে

মূল প্রশ্ন বাংলাদেশ সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীনের (কুনমিং প্রদেশে) সাথে সরাসরি যুক্ত হবে কী না? যেখানে কলকাতাও বাংলাদেশ হয়ে যুক্ত থাকবে। এটাই বিসিআইএম (BCIM যা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর) প্রকল্প। তবে এই প্রকল্পের আর এক অনুষঙ্গ গুরুত্বপুর্ণ দিক ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর। আসলে উলটা – মূলত এই গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করেই এই চার দেশের ঐ অঞ্চলটার মূলত ল্যান্ড লকড দশায়; তাই সে অবস্থা ছুটানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এখানে ল্যান্ড লক কথাটা আমাদের বন্দর আছে কিন্তু গভীর সমুদ্র বন্দর নাই – এই অর্থে বুঝতে হবে। বাস্তবে চট্টগ্রাম লাইটার জাহাজের বন্দর, যার কানেকটিং গভীর সমুদ্র বন্দরটা সিঙ্গাপুরে। তাই চার দেশের এই বদ্ধ অঞ্চল – এটাকে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর দিয়ে উন্মুক্ত করাটাই ছিল মুল উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতের অনাগ্রহের কারণে সোনাদিয়া ছাড়াই কেবল রেল ও সড়কের BCIM প্রকল্পের আওয়াজ উঠতে উঠতে এখন সেই প্রকল্পের সব কিছুই মুখ থুবড়ে গায়েব। কেন?

ভারতের যুক্তি চীন BCIM প্রকল্পকে এখন বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত করতে চায়। অবশ্যই চায়। বাংলাদেশও চায়। আর প্রশ্নটায় এখন তখনের কিছু নাই। বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য এটা খুবই জরুরি যে আমরা আন্তঃমহাদেশীয় প্রকল্প বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত থাকি। তাই BCIM প্রকল্প যুক্ত থাকুক – এটাই তো আমাদের স্বার্থ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হাতে গুনে মনে রাখতে হবে – হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ যদি শুরু থেকে বেল্ট-রোডে জড়িয়ে না থাকে বা থাকতে না পারে তবে আমাদেরকে আজন্ম এর কাফফারা দিতে থাকতে হবে। আর ভারতের এখন-তখনের যুক্তির পালটা কথাটা হল, BCIM প্রকল্পের মূল আইডিয়ায় সোনাদিয়া বন্দর ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। সেটাই বা বাদ দেয়া হয়েছিল কেন? কেন হাসিনার ২০১৪ সালের চীন সফরের কালে সোনাদিয়া বন্দর চুক্তিতে বাধা দেয়া হয়েছিল?

ভারত যদি মনে করে আর চায় তাহলে কলকাতা থেকে কুনমিং পর্যন্ত না হয়ে এই প্রকল্প হবে না। নো প্রবলেম। বরং তাদেরকে বাদ দিয়ে ঢাকা-বার্মা-কুনমিং হবে অর্থাৎ BCM প্রকল্প হবে অসুবিধা কী! আর এই প্রকল্পের কেন্দ্র সোনাদিয়া বন্দরও একই সাথে।  সেইসাথে বেল্ট-রোড প্রকল্পেও BCM -এটাও অবশ্যই যুক্ত থাকবে। কিন্তু   ভারতের এতে আপত্তি বা  একমত হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু ভারতের অবস্থানটা হল  – সে  নিজে এই প্রকল্পে যুক্ত থাকবে না, আবার তাকে বাদ দিয়ে বেল্ট-রোডসহ কোন প্রকল্পই সে হতে দিবে না।

কেন? কারণ চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্প  সম্পন্ন হতে দিলে আর তাতে ভারত জড়িয়ে থাকলে  তাতে চীন বহু আগিয়ে যাবে আর ভারত চীনের অধীনস্ত হয়ে যাবে। তা হতেও পারে, অসম্ভব না। কারণ ব্যাপারটা মুরোদের – সক্ষমতা ও যোগ্যতার। ভারতের মুরোদ না থাকলে তার বা কারও কী আর করার আছে? কিন্তু তাই বলে, কান-পড়া দিয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেবার মত  ভারত কূট-ষড়যন্ত্রের পথ ধরবে? যেটা কোন কাজের কথা নয়।  নাকি গঠনমূলকভাবে, ভারত চীনের এখনকার সহযোগিতাগুলো কাজে লাগানো আর নিজের মুরোদ অর্জন করা্র দিকে যাবে? যাতে কোন একদিন চীনকেও ভারত ছাড়িয়ে যেতে পারে! আজকের চীনের অবস্থাই কী এর প্রমাণ নয়। এককালে আমেরিকার সাহায্য নিয়েই কী আজ চীন এজায়গায় নয়? তাতে সে কী এখন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে না!

এভাবে  ভারতের মুরোদ অর্জন বিকল্প কূট-ষড়যন্ত্রের পথ – এটা কখনই নয় হতে পারে না। এমনকি ঈর্ষা বা প্রতিহিংসা তো নয়ই! পাকিস্তান কাশ্মীরের উপর দিয়ে বেল্ট-রোডের মূল বা পাকিস্তান করিডোর গিয়েছে – ভারতের এটা ফর্মাল আপত্তির যুক্তি। সেটাও আসলে খাটে না। কারণ পাকিস্তান অংশসহ পুরা কাশ্মীর ভারতের কী না এটা তো কোন বিতর্কই নয়। কারণ, বিতর্ক হল সারা কাশ্মীরিরা কীভাবে কার হাতে শাসিত হতে তারা সম্মত হবে? ভারত বা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে শাসিত হবে নাকি নিজেরাই আলাদা হবে?  এরপরেই কেবল, পুরা কাশ্মীর ভারতের হবে কীংবা হবে না তা তখন মীমাংসিত হতে পারে। এর আগে কোন কাশ্মীরই ভারতের নয়, কেউ না।

অতএব ঈর্ষা বা প্রতিহিংসাবশত  বেল্ট-রোডে যোগ না দেওয়ার ভারতের কোন বিদেশনীতি যদি হাজির থাকে তবে তা ভারতেরই থাক। তা আমাদের তো নয়ই, আমাদের দায়ও নয়। তাই আমরা কী করব তা ভারতকে জিজ্ঞাসারও কিছু নাই। আমাদের স্বার্থ, আমাদের ভাল-মন্দ ক্ষতি সব আমাদেরই বইতে হবে। যদিও এব্যাপারে বাংলাদেশের দিক থেকে সর্বশেষ কিছু অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালে আমাদের নির্বাচন পরবর্তি সময়কালে।

এ বছর আমাদের নির্বাচনের পরে আমরা দেখেছিলাম, কারও পরোয়াহীন এক  চীনা ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শন। আর বিশেষ করে সিএনএন-নিউজ১৮ (CNN-NEWS18) নামে ভারতীয় টিভিতে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই বোল্ড ছিল। এবং তা এক স্থির সিদ্ধান্তের প্রকাশ দেখিয়ে ফেলেছিল যে, সোনাদিয়া বন্দরসহ বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে হাসিনা সরকার আর থামবে না। এমনকি ওই সাক্ষাৎকার আসলে খোদ ভারতকেই চীনের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে আহ্বান রাখা হয়েছিল। এই সাক্ষাৎকারের আলো অনুসরণে চিন্তা করলে মনে হয়, এবারের এপ্রিলে বেল্ট রোড সামিট টু-তে চীনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিধিত্ব করতে আমরা দেখব।

কিন্তু এর ভারতীয় প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? প্রথমত, ভারতে এখন রুটিন সরকার; মানে মোদীসহ রাজনৈতিক নেতাদের সময় নেই এনিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার। এর চেয়ে নিজ নিজ এলাকায় মাঠের নির্বাচনী প্রচারে যোগ দিয়ে নিজের আসন নিশ্চিত করা তাদের এখন প্রায়োরিটি, একমাত্র কাজ। আগামী মাসে ২৩ মের আগে ভারতে সরকারে কে আসবে, কে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তা জানার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় এক কথায় বললে, ভারতের নিজের বেল্ট রোড সামিট টু-এর পক্ষে কোনো অবস্থান দেখতে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশকে এবারো কি তারা ঠেকাতে পারবে?

ঠেকাতে ২০১৭ সালে আগেরবারই পারেনি। ফলে এবারো পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে, সাক্ষাৎকার দিয়ে বলা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি দিক থেকে দেখলে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব আমাদের দেখতে পাওয়ার কথা। যদি তা আমরা না দেখতে পাই, তবে বুঝতে হবে সরকার আবার আপস করল। সেটা হবে বাংলাদেশের প্রবল সব সম্ভাবনাগুলোর মাথা মুড়িয়ে ফেলে রাখা আর পিটিয়ে কাউকে খাটো বামন বানিয়ে রাখার মতই একটা কাজ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত 0৬ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন : চীন আরেক ধাপ আগালো

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত
চীন আরেক ধাপ আগালো

গৌতম দাস

মে ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2fm

চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ (Belt & Road Initiative)। এটা এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকা মহাদেশকে এক সাথে জুড়ে এমন এক যোগাযোগ অবকাঠামো প্রকল্প। যোফাযোগ সড়ক পথে ও সমুদ্র পথে এবং দুটাকে মিশিয়ে ব্যবহার করা হবে। এখানে তাই দুটা প্রকল্পের সমাহার। সড়ক প্রকল্পের নাম  Silk Road Economic Belt আর সমুদ্র পথ (যেটাতে জায়গায় জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের সুবিধা থাকবে আর ঐ বন্দরগুলো থেকে অন্তত ছয়টা সড়ক যোগাযোগের করিডোর বেল্ট রোডে গিয়ে যুক্ত হবে) এই প্রকল্পের নাম  Maritime Silk Road। এই দুই মেগা প্রকল্পকে একসাথে বেল্ট ও রোড উদ্যোগ নাম দেয়া হয়েছে।

চীনা উদ্যোগে ও বিনিয়োগে নেয়া এই প্রকল্প যেসব দেশের উপর দিয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট সেসব ৬৫ টা রাষ্ট্র এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে – এটা এমন এক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে এশিয়ার কোন রাষ্ট্রকে বাদ রাখা হয় নাই। তবে যদি না কেউ নিজে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, সেকথা আলাদা। বলা ভাল এখানে এশিয়ান রাষ্ট্রগুলোরই প্রাধান্য; তবে অবশ্যই সাথে ইউরোপ, সেন্ট্রাল এশিয়া আর আফ্রিকার কিছু দেশও অন্তর্ভুক্ত। এর ভৌগলিক ধারণাটা হল, বাংলাদেশ থেকেই যদি ধরি, এখান থেকে মূল হাইওয়ে সড়ক পথে (যেটাকে Silk Road Economic Belt বলা হচ্ছে)  চীন হয়ে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে, পুর্ব ইউরোপ হয়ে পশ্চিম ইউরোপে যাওয়া সম্ভব। এটাই মূল হাইওয়ে। আর পথের দুপাশের সব রাষ্ট্রকে এই অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নেয়া হবে। ওদিকে এই পথের শেষ হচ্ছে ইউরোপের রটারডাম (নেদারল্যান্ড) গিয়ে। সেখান থেকে আবার একই রোডে না ফিরে  ফিরতি সমুদ্র পথ নিবার সুযোগ আছে। সে হিসাবে এবার ইতালি হয়ে নৌপথে অথবা কখনও কোস্টাল সড়ক ঘুরে বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব। তবে ঐ মূল হাইওয়েতে সময়ে সময়ে করিডর হিসাবে অন্তত ছয় জায়গায় ছয়টা করিডর-সংযোগ সড়ক  থাকবে মূল হাইওয়ে সড়কে।  আর ঐ নৌপথের মধ্যে মধ্যে অন্তত দশটা জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের যোগাযোগ আছে/ থাকবে যেখান দিয়ে নৌপথ ছেড়ে কোন একটা করিডর ধরে মূল হাইওয়ে সড়কে উঠা সম্ভব।

২০১৩ সালের শেষের দিকে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নামে এই আইডিয়া প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিলেন চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাই এই প্রকল্পকে শি জিনপিং এর মাথা থেকে আসা প্রকল্পও বলে থাকেন অনেকে। গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ (আগের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’কে কেন্দ্র করে এই সম্মেলনের নাম এটা) এই মেগাপ্রকল্পের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ খবর মতে, মোট ৩০টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান এতে যোগদান করেছিলেন জানা গেল। এছাড়া মোট ১০০টারও বেশী রাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।  এদের মধ্যে ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধান বলতে রাশিয়ার পুতিন ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ অনেকে রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। আর দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যাদের এমন ওপর দিক থেকে সাতটা বড় রাষ্ট্র হিসেবে তাদের ক্লাব জি-৭ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রীই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তাই বলে ব্রিটেন, জার্মানি বা ফ্রান্স – ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই তিন মূল মাতবর এই সম্মেলন ঠিক বর্জন করছেন তা নয়, তবে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী হাজির ছিলেন।

আসলে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির চলতি দুনিয়ায় এবার নতুন করে চীনা নেতৃত্বে নতুন পোলারাইজেশনে ঢেলে সাজিয়ে খাড়া হতে চাচ্ছে; দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি এই শতকের শুরু থেকে সে দিকে। বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ সে পথে অগ্রসর হওয়ার দিক থেকে আর এক ধাপ উদ্যোগ বলা যায়। বিশেষ করে চীনের নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক যাকে বলা হয়, সেই এআইআইবি বা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) গঠনের সময় যেমন পশ্চিমের নেতি প্রতিক্রিয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এবার বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের সম্মেলন এর সময়ও অনেকটা সে মাত্রার না হলেও সেরকম কিছু নেতি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এবার ভারতের দিক থেকে। আর ওদিকে নেতি প্রতিক্রিয়ার নেতা খোদ আমেরিকা এবং এশিয়ায় আমেরিকার ঘনিষ্ঠ অংশীদার জাপান, এই দুই রাষ্ট্র বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর কথা সম্মেলনের আগে শুনা গেছিল।
তবে সম্মেলন শেষ পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে যাকিছু ছিল জল্পনাকল্পনা এখন সেসব সত্যি হয়েছে। আমেরিকান সরকারী  দলের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রেসিডেন্টের এডভাইজার (White House adviser Matt Pottinger)।  ভারতীয় মিডিয়া গত ১৩ মে থেকে প্রবলভাবে দাবি করছিল যে আমেরিকা ইউটার্ন নিয়েছে। সে এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছিল। আবার ব্যাপারটা একেবারে আকস্মিক বা হতেই পারে না তাও ছিল না। কারণ গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর থেকে ট্রাম্প শিবিরের এক্সপার্টরা বলতে শুরু করেছিলেন যে ওবামা এআইআইবি ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ এবং বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ এই দুটোর বিরোধিতা করে ঠিক করেননি।
ওদিকে ভারত অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কী নিয়েছে তা সম্মেলন শুরুর আগের সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পষ্ট জানা যায়নি। তবে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, ‘আমেরিকার ইউটার্ন ভারতের ওপর চাপ তৈরি করেছে’। কিন্তু ঠিক কী কারণে ভারত এই সম্মেলন বর্জন করছে এ বিষয়ে দুটো মিডিয়া দুই রকম জবাব দিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, ‘চীন বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প নিয়ে ভারতের জন্য যথেষ্ট আস্থার পরিবেশ তৈরি করেনি’ (…”China has not created an environment of trust to carry out the belt and road projects”.) তাই সে যাচ্ছে না। তবে ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসির কোন জুনিয়র প্রতিনিধি দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল। বিপরীতে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস লিখছিল, সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করে একটা মেসেজ দেয়া দরকার। কারণ তারা আমাদের সার্বভৌমত্ব ইস্যুকে হালকা করে দেখেছে। (India is set to skip China’s ambitious One Belt One Road summit over sovereignty issues related to the latter’s involvement in the China-Pakistan Economic Corridor (CPEC), news agency PTI reported. ) অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে ভারতের অংশগ্রহণ এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে সরকার ঠিক কী কারণ দেখাবে তা সম্ভবত এখনো অফিসিয়ালি সাব্যস্ত হয়নি। যার অর্থ দাড়ায়, সার্বভৌমত্বের অভিযোগটা নিয়ে ভারতই সিরিয়াস নয়। ব্যাপারটা আসলে এমনই এটা মনে করার কারণও আছে। কিন্তু ভারত অভিযোগটা উঠাল কোন সূত্রে?
পাকিস্তানের গোয়াদরে (আরব সাগরের মুখে, ইরানের সাথে সীমান্তে) গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের বুক চিরে দক্ষিণ থেকে উত্তর পেরিয়ে হাইওয়ে (চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর) সড়কপথ চালু করা হয়েছে। এটা পাকিস্তান পেরিয়ে চীনের ল্যান্ডলকড জিংজিয়ান প্রদেশের খাসগড়ে গিয়ে মিলেছে। তবে চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর এই করিডোর-সড়ক বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের মূল হাইওয়ে সড়ক আগে ক্রস করে নিয়েছে। অর্থাৎ গোয়াদর থেকে আসা সড়কই চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর। চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর। কিন্তু আবার পাকিস্তান পেরোনোর আগে এই সড়কের কিছুটা অংশে পাকিস্তানের আওতাধীন কাশ্মির পেরিয়ে এসেছে। আর এটাকেই ভারত ইস্যু করতে চাইছে। বাস্তবতা না থাকলেও ‘কাশ্মিরের পুরোটাই ভারতের অংশ’ বলে ভারতের এক অফিসিয়াল দাবি আছে। অতএব চীন পাকিস্তান-কাশ্মির ব্যবহার করে এই সড়ক তৈরি করে ভারতের সার্বভৌমত্ব হালকা করে দেখেছে -এই হল ভারতের উছিলা, ভারতের যুক্তি। অর্থাৎ এটা কোনোমতে মেলানো এক দাবি মাত্র। আগেই বলেছি ভারতের দুই মিডিয়ার দুই ধরনের বক্তব্য প্রমাণ করে ভারত সরকার নিজেই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে সিরিয়াস নয়। বরং চীন আরো কত তেল মারলে ভারত নিজেই এই সম্মেলনে যোগদান করবে যেন এরই অপেক্ষা। এ দিকটাতে তাকিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, “এবার এখনই সম্মেলনে প্রতিনিধি না পাঠালে ভারতের বস্তুগত লাভালাভের দিক থেকে ক্ষতি বৃদ্ধি নেই, কারণ ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প কোনো সদস্যপদভিত্তিক সংস্থা নয়’। অর্থাৎ আরো দেরি করে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে নিজের দাম আরো বাড়ে কি না তা পরখে নামতে চায় ভারত। তবে যোগদান না করার ব্যাপারে ভারত অবশ্যই বেপরোয়া নয়, কারণ এটা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং তা ফিজিক্যালিই গ্লোবাল। (There may not be any immediate material loss to India if it goes unrepresented because OBOR is not a membership-based organisation)। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় ভারত কখনোই চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সম্মেলনে যোগদান করবে না তা বলে নাই। অর্থাৎ আগেই একেবারে না করে দেয়নি। তবে এই প্রকল্পের প্রতি আমেরিকা নীতি অবস্থান, মতামত বদলে ছিল বলে নয়, এই সম্মেলন যে ইতোমধ্যে গ্লোবাল আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে এর আর এক ভালো প্রমাণ হল, এতে অংশগ্রহণ করছেন জাতিসঙ্ঘের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তেনিও গুতারেস এবং  বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের নির্বাহী প্রধানরা। এর অর্থ গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প একটা ফ্যাক্টর এর পক্ষে স্বীকৃতি এসেছে। আর তা হওয়ার কোন কারণ নাই। কারণ, পুরা প্রজেক্ট মানে ৬৫ টা রাষ্ট্রের তরফে সব বিনিয়োগ যোগ করলে শেষে সেটা ৯০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে এক অনুমিত হিসাব দেখিয়েছে।

তবে শুরুতে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে, তা ইতোমধ্যেই রেডী। এর জবাবে চীন বলছে ৪০ বিলিয়ন ডলার চীন নিজের উন্নয়ন ব্যাংক থেকে জোগান দেবে। আর তাতক্ষণিক বাকিটা আসবে সদ্য গঠিত এআইআইবি ব্যাংক থেকে। এ ছাড়া ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের ভেতরে যে আরো একটা অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক আছে (নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে, সম্প্রতি যেখানে বাংলাদেশসহ ১৫ এশিয়া দেশকে সদস্য করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে) সেখান থেকেও জোগানো হতে পারে। মোট ৬৫টি রাষ্ট্র এই প্রকল্পে যোগ দেয়া আর নিজের নিজের রাষ্ট্রকে মূল অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নিতে গেলেও প্রত্যেক রাষ্ট্রকেও কিছু সংযোগ-অবকাঠামো করে নিতে হবেই। আর সে কাজেও যা বিনিয়োগ লাগবে সে ঋণের বড় অংশ  চীন জোগান দিতে রাজি। আবার বিশ্বব্যাংকো কী বিনিয়োগের সুযোগ নিবে না? আর পশ্চিমা জগতের যেখান থেকে বিনিয়োগ আসুক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে বিনিয়োগের মুল উৎস হবে আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট। অতেওব আমেরিকাসহ সাড়া পশ্চিম এতে অংশগ্রহণে ঝাপিয়ে পড়বে এতাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা চীনা বিনিয়োগ পাব বেশ বড় অঙ্কে, সেটা অনেক বেশি পরিমাণ হবে। তাহলে ভারত কী দূরে গোসা ঘরে খিল লাগিয়ে বসে থাকবে, পারবে? নাকি পোষাবে?

কলকাতা থেকে বাংলাদেশ, মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং – যেটা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে বিসিআইএম (BCIM) প্রকল্প বলা হয়- সেই হাইওয়ে সড়ক কুনমিং চীন হয়ে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা, পরিকল্পনা মোতাবেক। এই সড়কের আর একটা অংশ হবু সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত থা্কার কথা। সোনাদিয়া-বিসিআইএমের মাধ্যমে এটাই আর একটা করিডোর হিসেবে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হবে। এই হল পরিকল্পনা। এখন ভারতের ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পে যোগ না দিতে ইচ্ছা জানানোর অর্থ হবে ভারত বিসিআইএম প্রকল্পে নেই। কলকাতা-বাংলাদেশ অংশটা নাই। এমন ইচ্ছা করতে ভারত চাইতেই পারে। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না এমন ইচ্ছার কাফফারাও আছে তা ভারতের অজানা নয়। তবু একটা কথা এবার স্পষ্ট যে এতদিন বিসিআইএম নিয়ে গড়িমসি করা, মিয়ানমারকে নিরাসক্ত করে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা, বাংলাদেশে বন্দরের স্থান নির্বাচন নিয়ে হাসিনার উপর অর্থহীন হস্তক্ষেপ ও সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি যা কিছুতে ভারত ভূমিকা রাখতে পেরেছিল, এবার সেসবের দিন শেষ। ভারতের পড়শি কোনো রাষ্ট্র এই সম্মেলনে যোগ দিতে বাকি নেই, মিয়ানমার নেপালসহ, ব্যতিক্রম শুধু ভুটান।এটা এখন সবার কাছে স্বচ্ছ যে ভারত, ভুটান আর ওদিকে জাপান ছাড়া এশিয়ার আর কোন রাষ্ট্র বাকী নাই। সবাই ভারতকে ছেড়ে চলে গেছে।
এক কথায় বললে ভারতের পক্ষে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী না সম্ভবত বলা যায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ভারতের পক্ষে অসম্ভব। যেমন সেক্ষেত্রে এর একটা অর্থ হবে, ৬৫টি রাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে বা একই পদক্ষেপে একই অবকাঠামো সুবিধায় যুক্ত হওয়া – যেকোন রাষ্ট্রের জন্য এ’এক বিরাট সুযোগ। এথেকে ভারত নিজেকে বাইরে রাখবে? যদি জিদ করে রাখেই (যদিও জিদ করে রাষ্ট্র চলে না) তবে সেটা হবে দেখার মত ঘটনা। কারণ সেটা হবে রীতিমত নিজেই নিজের ওপর অবরোধ ডাকার শামিল। সবার থেকে একঘরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ফলে ভারতের এমন সিদ্ধান্ত নেয়া অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, কিছুটা দেরি করতে পারে। কিন্তু তাতেও নিজের ক্ষতি, পিছিয়ে পড়ায় ঘটবে।

আগেই বলেছি  গ্লোবাল অর্থনীতির চীনের নতুন নেতা হওয়ার দিক থেকে বিচারে,  বিশ্বব্যাংকের সমান্তরালে এআইআইবি ব্যাংক চালু করে ফেলতে পারা – এটা যদি নতুন নেতা হবার পথে একটা অগ্রপদক্ষেপ হয়ে থাকে, তবে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ হবে প্রায় সমান্তরাল তবে বেশী গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় পদক্ষেপ। আর এক ধাপ আগানো। যদিও প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক থেকে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের ইমপ্যাক্ট হবে এআইআইবি ব্যাংকের চেয়ে বেশি। কারণ এটা অবকাঠামো, মানে ফিজিক্যাল পদক্ষেপ। আর এই ফিজিক্যাল পদক্ষেপের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকার কারণে গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের ওজন ও গুরুত্ব হবে আরো দৃশ্যমান এবং এটা হবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গ্লোবাল অর্থনীতিতে ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছর ডাবল ডিজিট গ্রোথের কাল মানা হয়, বর্তমানে যা তুলনামূলক শ্লথভাবে চলছে। মনে রাখতে হবে সে অর্থনীতিতে আবার এক গতির সঞ্চার করার সম্ভাবনা রাখে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ।
আজকের ভারত হল, সেই ডাবল ডিজিট গ্রোথের কালের এক অন্যতম বেনিফিশিয়ারি। আবার এআইআইবি ব্যাংক গড়ার কালে ভারত ছিল সঠিকভাবেই চীনের সমর্থক, প্রধান সাগরেদ। ওই ব্যাংকের মালিকানায় চীনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ, এরপরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারতের প্রায় ১০ শতাংশ, অন্যদের মধ্যে ৫ শতাংশর ওপরে কেউ নেই। আমেরিকার শত প্ররোচনাতেও ভারত চীনের ওই ব্যাংক উদ্যোগে সাথ ছাড়েনি।

তাহলে ভারত ঠিক কিসের বিরোধিতা করছে, কী পেতে সেটা করছে? আমরা আশা করি না এসব ক্ষেত্রে ভারতের কোনো সিদ্ধান্ত ঈর্ষাপ্রসূত, ভুল ভিত্তির এক্সপেকটেশন বা ওভার এস্টিমেশনের দোষে দুষ্ট হবে। দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম জেঁকে বসার পর থেকে দেখা গেছে এক এক কালে কোনো এক রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডে ওই কালের সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ভূমি হয়ে হাজির হয়েছে। যার অর্থ এরপরের নতুন বিনিয়োগ বা নতুন যেকোনো উদ্যোগ নেয়ার সুবিধা ওই রাষ্ট্র এককভাবে পেয়েছে। এখন সে সুবিধা ভোগের  দিন চলছে চীনের। এটা অবজেকটিভ, ফলে এর সাথে লড়ার বা একে মানতে না চাওয়ার কিছু নেই। কারণ এই সঞ্চিত উদ্বৃত্ত এটাই যেকোনো রাষ্ট্রের পরাশক্তি, রুস্তমি, প্রভাব বিস্তারসহ সব ধরনের ভূমিকায় হাজির হওয়ার আসল উৎস। এটা অবজেকটিভ বলে তা না মানাও মুশকিল। ফলে দুটি কথা ভারতকে মানতেই হবে। এক. আমেরিকা ভারতের ভবিষ্যৎ নয়। ভারতের পক্ষের শক্তি নয়, বড়জোর অস্ত্রের সরবরাহকারী হতে পারে। তা হোক, তাতে সমস্যা নেই। তবে গ্লোবাল অর্থনীতির আগামী নেতৃত্বের ভাগ অর্থে ভারতের পক্ষের শক্তি হল চীন। এটা শুনতে অনেকের ঈর্ষা মনে কটু লাগতে পারে কিন্তু এটা বাস্তবতা। ফলে চীনের সাথে সীমানা বিরোধসহ যা কিছু বিরোধ আছে তা নিগোসিয়েশনের সুযোগ নেয়া হবে ভারতের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।কিসের ভিত্তিতে ভারত ধরেই নিয়েছে চীনের সাথে তার য়াগামি দিন হবে সংঘাত ও বিরোধে? পিছন ফিরে বা আশেপাশে তাকালে এটা দেখতে পাওয়া মোটেই কঠিন নয় যে এই ধারণার উৎস ও সরবরাহকারি হল খো আমেরিকা। আর তার পরিচালিত নানান থিঙ্কট্যাংক-গুলো। আজকে এসব ঠিঙ্ক-ট্যাংকগুলো আমেরিকার প্রতিনিধি পাঠানোর এই ইউ-টার্ণ এর কী ব্যাখ্যা দিবে? চীন নাকি খালি ভারতকে ঘিরে ধরার মতলবে আছে? তাহলে সেই ভারতকে ফেলে আমেরিকা কোথায় ছুটছে? আসলে কারও প্ররোচিত বক্তব্যে, বুলিতে থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক হয়না। চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। আর এর প্রধান শর্ত অন্তত দেশীয় অর্থে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়।

এ ছাড়া এশিয়াতে কার ভূমিকা প্রধান হবে ভারতের না চীনের? এই তর্ক কী ভারতের ইচ্ছাধীন নাকি ভারতের অর্থনৈতিক সামর্থের উপর নির্ভরশীল? ভারতের সামর্থ এশিয়ায় চীনের চেয়ে বেশি হলে ভারত বাড়তি সুবিধা পাবে, নইলে নয়। তাই নয় কী?  এটা তো বাংলাদেশে একজন বসিয়ে, ল্যান্ডলক নেপালে ঐতিহ্যবাহী নিয়ন্ত্রণ আগের মতই বজায় থাকবে ধরে নিয়ে, শ্রীলঙ্কায় নতুন সরকার কায়েম করে চীনের প্রভাব কমাতে হবে ইত্যাদিতে যা কিছু করা হয়েছে তাতে কোনো কিছুই সামলানো যায়নি, যাবে না। এছাড়া এটা আর কলোনি সাম্রাজ্যের যুগ নয়। এ যুগে “চীনের সাথে ভারতের পড়শিরা সম্পর্ক রাখতে পারবে না” ভারত সবাইকে চীনমুক্ত দেখতে পাবে –  এটা ভারতের কোনো মুরোদের ওপর ভরসা করে নেয়া বিদেশনীতি? এর চেয়েও অবাক কাণ্ড এই বাস্তবতাহীন নীতিকে প্রশ্ন করার লোকজন ভারতে ক্রমশ  দুষ্প্রাপ্য হচ্ছে। যার মূল কারণ সম্ভবত এরা আমেরিকার পে-রোলে নাম লিখিয়েছে। অথচ খোদ আমেরিকাই পল্টি মেরেছে! তাই নয় কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। চীনে শীর্ষ সম্মেলন যা এই লেখার বিষয়বস্তু তা ছিল ১৪-১৫ মে। ফলে লেখাটা শেষ করা হয়েছিল সম্মেলন শুরুর আগে। আর এখানে এখন যখন আবার প্রকাশ করা হচ্ছে তখন ঐ সম্মেলন শেষ হয়ে গেছে। ফলে আপডেট করার মত বহু তথ্য এখন জমা হয়ে গেছে। তার বহু তথ্য এখানে যতটা সম্ভব আপডেট করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটা আগের লেখার থেকে বহুলাংশে সংযোজিত এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীনা প্রেসিডেন্টের সফরঃ গভীর সমুদ্রবন্দরের কী হবে

চীনা প্রেসিডেন্টের সফর

গভীর সমুদ্রবন্দরের কী হবে

গৌতম দাস

১৬ অক্টোবর ২০১৬, রবিবার
http://wp.me/p1sCvy-1RU

[লেখাটা গত ১৪ অক্টোবর শুক্রবার চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের দিনেই লেখা। তবে খুব সকালে বসে লেখা যখনও তিনি ঢাকায় অবতরণ করেন নাই। অর্থাৎ এটা চীনা প্রেসিডেন্টের সফর-পুর্ব সময়ে লেখা। কী আশা করা যেতে পারে, এই সফরে কী হতে পারে ইত্যাদি চিন্তা করে লেখা। সফর শেষের পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন, কিছুটা যা অনুমান করা গিয়েছিল তাই। সেসব নিয়ে আর একটা লেখা লিখতে হবে। আজ এই সফর-পরবর্তি পরিস্থিতিতে বসে আপাতত সফর-পুর্বের লেখা মনে রেখে এ’লেখা পড়তে হবে।]

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফরকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের সরকারের উৎসাহ ও প্রচার ছিল লক্ষণীয়। যার অন্তর্নিহিত বার্তা সম্ভবত এই যে ১. অনির্বাচিত ভাবে ক্ষমতায় থাকা বর্তমান সরকার দেখাতে চায় যে চীনা প্রেসিডেন্টের মত গুরুত্বপুর্ণ ও ক্ষমতাধর বাংলাদেশে এসেছে, অতএব আমার স্বীকৃতির প্রসঙ্গ এতে অনেকটাই কেটে গেছে।  আর ২. বর্তমান সরকার ভারত-নির্ভরশীল ও ভারতের গভীর সমর্থনের উপর দাঁড়ানো হলেও সরকার চীনের প্রেসিডেণ্টের এই সফরের গুরুত্ব বুঝেছে ও গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই কি? খুব সম্ভবত তা নয়। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরের সময় থেকে যেভাবে হঠাৎ করে গভীর সমুদ্রবন্দর ইস্যুতে সরকার থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল কারণ ভারত চাইছে সরকার দূরে থাকুক; সে থেকে ‘চীনকে দূরে রাখতে হবে’ বলে একধরনের ‘চীন-শীতলতা’ আমরা দেখে আসছিলাম, সে অবস্থান কী হিলেছে? নাই? হিসাব পরিবর্তিত হয়ে গেছে এবং তাও ভারতের কোন স্বার্থেই- তাই কী? এর স্পষ্ট চিত্র বুঝতে আর একটু অপেক্ষা করতে হবে। ইতোমধ্যে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিডিয়ায় বক্তব্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফর থেকে আমাদের সরকার বিশেষ আশাভরসা নিয়ে অপেক্ষা করছে, তা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তবে এটা সরকারের ভারত নির্ভরশীলতাকে ছাপিয়ে চীনা প্রেসিডেন্টের সফরকে গুরুত্ব দেয়া হিসেবে পাঠ করার অবস্থায় যায়নি- এটা মনে করাই সম্ভবত সঠিক হবে। যেমন একটা প্রশ্ন করে আগানো যাক, প্রায় মৃত গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প- সেটা সোনাদিয়া বা অন্য কোথাও যেখানেই হোক- তা কি এখনো জীবিত এবং এবারের সফরে বিনিয়োগ প্রকল্প স্বাক্ষরের তালিকায় আছে বা থাকবে কি? সোনাদিয়া হয়তো থাকবে না এটা আগাম ধরে নেয়াই যায়। তবে কী অন্য কিছু হতে পারে! আমাদের কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে। যদিও সে প্রসঙ্গে কিছু কথা স্পষ্ট করে এখনই বলে দেয়া যায়। তা হল, আসলে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর এবারের বাংলাদেশ সফরে বন্দর প্রসঙ্গে যদি কিছু না হয় তবে এই সরকারের আমলে কোনো গভীর সমুদ্রবন্দর আর হচ্ছে না। বন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা – এই পরিপ্রেক্ষিত থেকে কথাটা বুঝে বলা।  কারণ কথা হল, এমন সম্ভাব্য বন্দর নির্মাণ প্রকল্পে চীন সরকার জড়িয়ে থাকলে একমাত্র তবেই হবু বন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বজায় থাকবে, নইলে নয়। কারণ একা চীনই বড় ব্যবহারকারী হবে। দেশটি ল্যান্ড-লকড দক্ষিণ-পূর্ব দিককে সমুদ্র পর্যন্ত উন্মুক্ত করতে সড়ক ধরে এসে বন্দর ব্যবহারের জন্য  চীন খুবই আগ্রহী। আর তা করতে চীনের একারই এক গভীর সমুদ্রবন্দর দরকার। আর চীনের ব্যবহারের ভলিউম এতই বিরাট হবে যে, একা চীনই সে বন্দর ব্যবহার করে বিনিয়োগ তুলে আনার দেয়ার নিশ্চয়তা দিতে পারে। সে তুলনায় ব্যবহারকারী হিসেবে ভারতের থাকা না থাকাটা অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার দিক থেকে প্রভাবহীন ফলে অগুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারত বড় কোনো ব্যবহারকারী নয়। ফলে ঠিক এই কারণে চীনকে ব্যবহারকারী হিসেবে বাইরে রাখা কথাটার সোজা অর্থ বাংলাদেশের কোন গভীর সমুদ্র বন্দর না হতে দেওয়া। অন্য ভাষায় চীন ছাড়া এক্সক্লুসিভ ভারতের ইচ্ছায় গভীর সমুদ্রবন্দর পায়রায় হওয়ারও সম্ভাবনা নাই। কারণ একক ব্যবহারকারি  যদি ভারত হয় সেক্ষেত্রে ঐ হবু বন্দরের বিনিয়োগ তুলে আনা অসম্ভব। ফলে এক্ষেত্রে আগ্রহী বিনিয়োগকারী খুঁজে পাওয়ার সমস্যাও দেখা দিবে। আর অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা দুর্বল হলে সেই সমস্যা আরো বেশি। সারকথায়, একা চীন ও বাংলাদেশ ব্যবহারকারী হলেই বাংলাদেশে কোন গভীর সমুদ্রবন্দরের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার (বন্দরের আয় থেকে বিনিয়োগ ফেরত আনা) জন্য তা যথেষ্ট হবে। কিন্তু একা ভারত ও বাংলাদেশ ব্যবহারকারী হলে তা যথেষ্ট হবে না। ওদিকে আবার বন্দর বিষয়ে ভারতের অবস্থান হল, সে চায় না চীন ব্যবহারকারী বা বিনিয়োগকারী কোনোটা হিসেবেই এই প্রকল্পে জড়িয়ে থাকুক। এই অবস্থায় মিডিয়ার অনুমিত ভাষ্য হল, এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী হাসিনার গত চীন সফরের সময় শেষ মুহূর্তে বন্দর বিষয়ে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। নিজ সরকার টিকিয়ে রাখার জন্য ভারতের সমর্থন নির্ধারক বিবেচনা করে বলে অতএব ভারতের এই ইচ্ছা-স্বার্থকে গুরুত্ব দেয়া এই সরকারের জরুরি। এই বিচারের জায়গায় বসে দেখলে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর এই সরকারের আমলে হওয়ার সম্ভাবনা নাই। যদি না ইতোমধ্যে নতুন কিছু ডেভেলপমেন্ট না থাকে। অর্থাৎ ওপরে যেটা বলেছি, ইতোমধ্যে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিডিয়ায় বক্তব্য এই অর্থে ‘নতুন কিছু ডেভেলপমেন্ট’ দেখা দিয়েছে কি না সে সন্দেহ রাখা যায়। আগামীকালের মধ্যে তা স্পষ্ট জানা যাবে আশা করা যায়। প্রথম আলো লিখেছে, প্রেসিডেন্ট শি এর সফরে নাকি ২৯টি বিনিয়োগ প্রকল্প আছে যার মোট পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন ডলার – যা আলোচনার টেবিলে আছে। কিন্তু কী কী সেই প্রজেক্ট তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে তারা উল্লেখ করতে পারেনি।
এ ছাড়া আর একটা সম্ভাবনা আছে। প্রথম আলো লিখছে, “শি জিনপিংয়য়ের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ বা ওবোর নামে পরিচিত উন্নয়ন কৌশল ও রূপরেখায়” বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত হতে সম্মতি জানালে বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো গড়তে ‘চীনের সিল্করোড ফান্ড (এই উদ্যোগে যুক্ত দেশগুলোর জন্য চীনের সরকারি বিনিয়োগ তহবিল) থেকে স্বল্পসুদে ও সহজ শর্তে ঋণ’ পাবে। কিন্তু প্রথম আলো যা জানায়নি তা হল, কোনো গভীর সমুদ্রবন্দরের পরিকল্পনা সাথে যদি সংযুক্ত না থাকে তাহলেও কি চীন ওই সিল্করোড ফান্ড উন্মুক্ত করবে? এটাই খুবই নির্ধারক প্রশ্ন? বাংলাদেশ মাতারবাড়ি বা অন্য কোথায় চীনকে গভীর সমুদ্রবন্দর করতে দিতে রাজি হলে বা উভয়ে একমত হলে তবেই বিড়ালের ভাগ্য এসব শিকা ছিঁড়বে, তা আগেই বলে দেয়া যায়।

কোল্ড ওয়ারের কালের (১৯৫০-৯২) গ্লোবাল অর্থনীতি থেকে এ কালের গ্লোবাল অর্থনীতি বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম মৌলিকভাবে আলাদা। যেমন, একালে একই চীনের সাথে ভারতের ব্যবসা বিনিয়োগ লেনদেনের সম্পর্ক খুবই ঘনিষ্ঠ গভীর ও ভালো বটে। কিন্তু আবার আগামীতে অন্য সম্ভাব্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে ভারতের যুদ্ধ লাগার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি কার সাথে ভারত দেখে  – এই বিচারে সেই নামের তালিকায় এক নম্বরে আছে চীন। এটাই একালের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের বিশেষ আলাদা বৈশিষ্ট্য। কিন্তু ভারতের মিডিয়া – তারা এই আলাদা বৈশিষ্ট্য আমল করার যোগ্য এর প্রমাণ রাখতে পারে নাই। ফলে চীনের সাথে ভারতের বৈরিতা, সম্ভাব্য যুদ্ধ বা শত্রু কেবল এই দিকগুলো প্রবলভাবে সবসময় তারা হাজির করে থাকে এবং কোল্ড ওয়ারের সময়ের চশমায় দেখা  -বিরোধ ভাবনা বা জাতীয়তাবাদ ভাবনা মাথায় রেখে চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা চালিয়ে থাকে। যেন আমরা কোল্ড ওয়ার সময়ে বসবাস করছি।
ভারতের মিডিয়ায় বিষয়গুলো এতই প্রকট যে চীনের মিডিয়ারও তা নজর এড়ায় নাই। প্রেসিডেন্ট শি-এর সফর উপলক্ষে ভারতের মিডিয়াকে কিছু হেদায়েত করার কথা খেয়াল করে চীনের সরকারি এক মিডিয়া ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকায় গত ১২ অক্টোবর একটা কলাম ছাপা হয়েছে। ওর শিরোনাম হল, “India has nothing to fear from closer relationship between China and Bangladesh” – অর্থাৎ চীন-বাংলাদেশের কাছাকাছি আসা এই সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে ভারতের ভীত হবার কিছু নাই। আর এই উপসম্পাদকীয় বা কলাম নিয়ে ভারতের প্রায় সব দৈনিকে একটা করে রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। গ্লোবাল টাইমসের কলামের সার কথা হল, ভারতীয় মিডিয়ার খামোখা চীনবিরোধী প্রপাগান্ডা আর কোল্ড ওয়ার যুগের সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদ যা একালে অকেজো- এসব প্রচারকে নাকচ করে এমন কিছু মৌলিক তথ্য সে হাজির করতে চায়। সেজন্য ওই কলামের প্রথম বাক্যের চতুর্থ শব্দ হল, ‘মিসকনসেপশন’ অর্থাৎ মিথ্যা ধারণা কাটানো। কিন্তু গ্লোবাল টাইমসের এই উদ্যোগ সত্ত্বেও ভারতের প্রত্যেকটা মিডিয়া তাদের রিপোর্টে এই শব্দটা বাদ দিয়ে আর সব শব্দ দিয়ে তাদের পুরনো মিথ্যা ধারণাগুলোকেই আবার পুষ্ট করেছে।
যেমন এনডিটিভি সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে ‘জেলাস’ (ইংরেজি জেলাস, বাংলায় ঈর্ষা) শব্দের ওপর। শব্দটা কলামের শেষ দুই প্যারায় ছিল। তবে তা কিছুটা তামাশা করে বা মজা করে লেখার স্বার্থে। ওই দুই প্যারা, সারকথায় বললে, বলছে, ‘বাংলাদেশের সাথে চীনের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা দেখে ভারতের ঈর্ষা করার কিছু নাই। কারণ এই সম্পর্ক বাড়লে এর অবকাঠামোগত সুবিধার ভাগ এই অঞ্চলের সবাই তথা ভারতও পাবে।’ ফলে “এ দিকটা আমল করে ভারত যদি চীনের সাথে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ করতে নিজে চাপ অনুভব করে, সে আলোকে এই অঞ্চলে নিজের স্ট্র্যাটেজি পুনর্মূল্যায়ন করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে বিশেষ করে ভারতের গোয়ায় আসন্ন ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে”, তবে সেটা বাড়তি পাওনা হবে। অর্থাৎ ‘ঈর্ষা’ শব্দটা এখানে ঠিক নেতিবাচক অর্থে ব্যবহার করা হয় নাই। যেমন ‘ভারতের স্ট্র্যাটেজি বদলানো উচিত’ এভাবে বাক্যটা লেখা হয় নাই। বরং বলা হয়েছে ‘ it would not necessarily be a bad thing’,  – অর্থাৎ ‘হলে খারাপ হয় না’ অথবা ‘সেটা বাড়তি পাওনা হবে’- এমন কথা বুঝানো হয়েছে। আর আসলেই তো তাই। কারণ এই সফরে যে অবকাঠামো বিনিয়োগ ঋণচুক্তির কথা বলা হচ্ছে সেখানে বাংলাদেশের প্রস্তাব হল, নির্মীয়মান পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে নতুন যশোর-ঢাকা রেল যোগাযোগ প্রকল্প, এখানে চীনের কাছ থেকে সরকার বিনিয়োগ আশা করছে। আর এই যোগাযোগ করিডোর অবকাঠামো ভারতকে দেয়ার জন্যই। ফলে চীন-বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ বিনিয়োগ সম্পর্কের সুবিধা তো ভারতের স্বার্থেই।
ওদিকে আনন্দবাজার পত্রিকা এই সফর উপলক্ষে শিরোনাম করেছে স্বভাবসুলভ ‘জবরদস্তি করে পাকিস্তান বিরোধিতা দিয়ে’। তারা শিরোনাম লিখেছে, “ঢাকা সফরে আসছেন চিনা প্রেসিডেন্ট, মহা উদ্বেগে পাকিস্তান’।  বাংলাদেশে চীনের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ (বাণিজ্যিক বিনিয়োগ নয়, কম সুদের ঋণ চুক্তি) খুব বড় নয়। চার লেনের সড়ক অথবা বিদ্যুৎ উতপাদন ইত্যাদি যা আছে তা চীনের বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং ঠিকাদার কোম্পানী – এরাই বেশি। কিন্তু এসব নিয়ে পাকিস্তানের উদ্বেগ – এটা খুবই আজব কথা। অমিত বসুর ঐ পুরা লেখায় পাকিস্তানের উদ্বেগ কী তা নিয়ে কিছুই লেখা হয় নাই। পুরা ঘটনা কাশ্মীর নিয়ে। মানে ভারত-পাকিস্তানের কাশ্মীর ইস্যুতে। অযথা কাশ্মীরের কথা টেনে একবার লেখা হল,  “… আগুন কত দূর ছড়াবে স্পষ্ট নয়। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতিতে ১৪ অক্টোবর দু’দিনের বাংলাদেশ সফর চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর”।  কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের টেনশন থাকতে পারে কিন্তু এর সাথে চীনের প্রেসিডেন্টের সফপ্রের সম্পর্ক কী? আর বাংলাদেশেরই বা কী? আবার চীনা প্রেসিডেন্ট তো কেবল বাংলাদেশেই আসছেন না। তিনি বাংলাদেশ সফর শেষে এখান থেকে ভারতের গোয়ায় যাচ্ছেন। মানে অমিত বসুর “মেরা ভারত মহান” – সেই ভারত সফরেই তো যাচ্ছেন। তো সেক্ষেত্রে কেবল বাংলাদেশ সফরকে খোচা দিয়ে বা বাকা চোখে তুলে ধরার অর্থ কী? চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশের সফর যদি ভারতের স্বার্থের বিরোধী হয় তাহলে ঐ একই চীনা প্রেসিডেন্টের খোদ ভারত সফর – এটাকেও কী চোখে দেখা হবে? এখানে সফরকে খোচা দিয়ে বা বাকা চোখে দেখা হবে না কেন? আর যদি না থাকে তাহলে চীন একই সাথে ভারতের বন্ধুও। তাহলে ভারতের বন্ধু বাংলাদেশে আসলে ভারতের চোখ টাটানোর কী আছে? বা থাকতে পারে? রাস্তার ধারের চা দোকানে বসে আমরা অনেককে বিরাট দিগগজের মত রাজাউজির মারতে দেখি। অমিত বসুর এসব আলাপ মানের দিক থেকে এর চেয়েও নিচে। চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরে  “পাকিস্তানের উদ্বেগ” দেখেছিলেন অমিত বসু। লেখার ভিতর পাকিস্তানের উদ্বেগ কী নিয়ে এর কোন হদিশ না দিয়ে শেষ প্যারায় লিখছেন, “এই সব টানাপড়েনের মধ্যেই জিনপিংয়ের ঢাকা সফর নিয়ে কিন্তু ঘোর চিন্তায় পাকিস্তান। যে চিনকে দাদা বলে নিজের অপকর্ম চালিয়ে যেতে চাইছে পাকিস্তান, সেই চিন কিনা শত্রু বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে! ঢাকার সঙ্গে বেজিঙের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি মানেই তাদের ক্ষতি, এটা হাড়ে হাড়ে বোঝে ইসলামাবাদ। তাই উদ্বেগ তো হবেই”। আচ্ছা,  “ঢাকার সঙ্গে বেজিঙের ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি মানেই তাদের ক্ষতি” – মানে পাকিস্তানের ক্ষতি কেন কোথায় কীভাবে? এটা আসলে ভারতের পাকিস্তানবিদ্বেষ, যেটা বাংলাদেশের ঘাড়েও জবরদস্তিতে আছে বলে দাবি করা ছাড়া আর কী? রাষ্ট্রীয় শত্রুতা বলতে যা বুঝায় তা পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে আছে সন্দেহ নাই। কিন্তু তাই বলে পাকিস্তান-বাংলাদেশের সম্পর্ক এটাও কী তাই? এখানে বিরোধ, মনোমালিন্য আছে,  ঘনিষ্টতা নাই – এটাই সত্য। ভিন রাষ্ট্র মাত্রই কমবেশি তা থাকে। যেমন চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে আসছেন। তো চীনের সাথে কী বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধ নাই? অবশ্যই আছে। দগদগে ভাবে আছে। সব রাষ্ট্রই নিজের আপন আপন স্বার্থের যায়গা থেকে অবস্থান নিবে। সেখানে কেবল যেখানে যেখানে স্বার্থ কমন হয়ে এবং সময়ে তা দেখা দিবে কেবল সে ইস্যুতে ঘনিষ্টতা। এর চেয়ে বেশি কেউ কারও স্বার্থের পক্ষের কেউ না।   কিন্তু পাকিস্তান-ভারতের মত পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় শত্রুতা বাংলাদেশের নাই। অমিত বসুর ধারণা তাঁর ন্যারো পেটি আর অহেতুক ইর্ষার চোখ দিয়ে সবাইকে মানে আমাদেরকেও সব দেখতে হবেই।

তো চীনা মিডিয়া জানে ভারতের মিডিয়া জুড়ে এসব অমিত বসুদের সংখ্যাই বেশি। সেকথা মনে রেখে গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা ‘চীন বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে ভারতের ভয় পাওয়ার কিছুই নাই’ শিরোনামে লেখা ছেপেছিল। এরপর প্রথম প্যারাতে বলা হয়েছে, ভারতের একটা মিসকনসেপশন আছে যে ‘ভারতের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে চীন অখুশি’। গ্লোবাল টাইমসে – মিসকনসেপশন বলে – এই ধারণাকে নাকচ করার চেষ্টা করা হয়েছে। এরপর দ্বিতীয় প্যারায় বলা হয়েছে, ‘ভারতের অনেকের ধারণা চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়েএর সফর যেন ভারতের কোল থেকে বাংলাদেশকে ছিনিয়ে নেয়ার সফর।’ বলা হয়েছে এমন ধারণাগুলোও ভিত্তিহীন। এমনকি, “চীনের ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পও যেন ভারতকে আটকে রেখে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা” – এটাও ভিত্তিহীন। “ওদের জানা উচিত এই প্রকল্প উদ্যোগটা কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার না। বরং সাড়ে চার বিলিয়ন জনসংখ্যাকে ছুঁয়ে এবং মোট ৬৫টি রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে এই প্রকল্পের সড়ক বিস্তৃত থাকবে”। আর সবচেয়ে বড় কথা “এতে যুক্ত হওয়া না হওয়া- এই রুটে পড়েছে এমন সংশ্লিষ্ট যে কোন রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ নিজ ইচ্ছার ওপর তা নির্ভর করে”।
ফলে আসলেই এখানে জোড়াজুড়ির কিছু নাই। প্রভাবিত করার কিছু নাই। ভারতকে আটকে রেখে বাংলাদেশকে নিয়ন্ত্রিত করার কিছু নাই। বলা হয়েছে, চীনের প্রতি কোনো রাষ্ট্রের এই ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে বড় করে আগ্রহ দেখালে তবেই একমাত্র চীন সেই রাষ্ট্রকে সিল্ক রুট ফান্ডে জড়িত করবে। যেমন কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে, বার্মা হয়ে চীন- এই পথে (বিসিআইএম ইকোনমিক করিডোর) ভারত যুক্ত হতে চাইলে সেটা তার ইচ্ছা, নইলে নাই। কিন্তু এটা তো গেল ভারতের যুক্ত হওয়ার স্বার্থ ও ইচ্ছা। বাংলাদেশের স্বার্থ ও ইচ্ছা বোধ করলে তবেই। এই প্রকল্পে ইতোমধ্যেই প্রধানমন্ত্রী মিডিয়াতে তার আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন। তবে খোদ চীনের বেলায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজারের কোথাও যুক্ত করা যায় এমন কোনো একটা গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকলে এই পথে চীনের আগ্রহী হওয়ার কিছু নাই, এ কথাও সত্য। সে ক্ষেত্রে ভারতের কী ইচ্ছা এর আর কোনো অর্থ নাই। বাংলাদেশেরও সিল্ক রোডে যুক্ত হওয়ার ইরাদার কোনো অর্থ নাই। ফলে চীনকে বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ থেকে রুখতে হবে, এ কাজে বাংলাদেশকে প্রভাবিত করতে হবে ভারতের এমন কাজ তৎপরতা আসলেই ভারতের পক্ষে যাবে কিনা তা ভারতকেই ভেবে চিনতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এখানে ‘বাংলাদেশ যেন ভারতের, ফলে চীনকে দূরে রাখতে হবে’- এসব বাতুল অকেজো আলাপ দূরে রাখতেই হবে।

আজ রবিবার কিছু বাড়তি সংযোজন
চীনা প্রেসিডেন্টের সফর শেষ হয়েছে। তিনি ভারতের গোয়া রওনা দিয়েছেন সেখানে ব্রিকসের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিবার জন্য। এদিকে এই সফরে গভীর সমুদ্র বন্দর অথবা চীনের ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে বাংলাদেশের যোগদান – এমন কোনটাতেই কিছুই অগ্রগতি নাই। কোন ব্রেক থ্রু নাই। অবস্থা আগের মতই, যেখানে ছিল। এসবের সার কথা  গভীর সমুদ্র বন্দর এই সরকারের আমলে হচ্ছে না, কোন সম্ভাবনা নাই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ অক্টোবর দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে ১৫ অক্টোবর) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার কিছু এডিট ও সংযোজন করে আবার ছাপা হল।]