“বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

বেল্ট-রোড সামিট টু” ঝড় ধেয়ে আসছে

গৌতম দাস

৮ এপ্রিল ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yW

BRI-2, First China freight train arrives in London 2017
BELT-ROAD SUMMIT-2,  আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – ছবি : সংগ্রহ

গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে আমেরিকার বদলে চীন মূল ভূমিকা নেয়ার ক্ষেত্রে চীন এগিয়েই চলেছে এবং এই পরিবর্তনে চীনের জিডিপি সব সময় ইতিবাচক থেকেছে, যদিও সময়ে তা কম-বেশি হয়েছে। অগ্রগতির সে বিচারে গত কয়েক মাস ছিল চীনের দিক থেকে খুবই নির্ধারক কিছু ঘটনার যা, চীন ইতিবাচক সাফল্যের সাথে পার হয়েছে। আর এমন সাফল্যের ওপর চড়ে চলতি এপ্রিল মাসে চীন আরেক সাফল্য লাভ করতে যাচ্ছে, যা আগামী ইতিহাসে চীনা উত্থানের দ্বিতীয় পর্যায় বলেই চিহ্নিত হবে মনে হচ্ছে। কিন্তু কী সেটা?

চীনা বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ (বিআরআই) বা [Belt and Road Initiative (BRI) ] সম্পর্কে এতদিনে আমরা সবাই কমবেশি জেনে গেছি যে, এটা ৬৫টিরও বেশি রাষ্ট্রকে একসাথে ভৌত অবকাঠামোগতভাবে সড়ক, রেল ও সমুদ্রপথে কানেক্ট করার এক মহাপ্রকল্প। কাঠামোগতভাবে এটা  মহাদেশীয় পর্যায়ের সংযোগ প্রকল্প; যা মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপ এদুই মহাদেশকে সংযুক্ত করে ফেলার প্রকল্প এবং আরও। তাই এর সাথে এ’দুই মহাদেশের মাঝখানে সেন্ট্রাল এশিয়া আর মধ্যপ্রাচ্যের সবাই যুক্ত হবে। আর ওদিকে এই কানেক্টিভিটি প্রকল্পের আরেক প্রান্ত কেনিয়া ও ইথিওপিয়া দিয়ে পূর্ব আফ্রিকার সাথেও সংযুক্ত হবে। এ ছাড়া পুরো প্রকল্পই স্থানে স্থানে ছয়টিরও বেশি গভীর সমুদ্রবন্দর দিয়ে সমুদ্রপথের পণ্য পরিবহণের সাথেও যুক্ত থাকবে। আইডিয়া হিসেবে বিআরআই উদ্যোগের মূল ধারণা চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম হাজির করেছিলেন তাঁর কাজাখাস্তান সফরের সময়, সেপ্টেম্বর ২০১৩ সালে। তখন এর নাম বেল্টরোড, সিল্করোধ, সিল্করুট ইত্যাদি নানান নামে হাজির করা হয়েছিল। সে ঘটনাক্রম সম্পর্কে এখান থেকে একটা ধারণা পাওয়া যেতে পারে।  তবে গত ২০১৭ সালের মে মাসে এর প্রথম সামিট (বা সদস্য রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানদের নিয়ে সভা, বেল্ট রোড সামিট) এর সময় তা “বেল্ট রোড উদ্যোগ” (BRI) নামে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে মূল ফোকাস ছিল – কোন কোন রাষ্ট্র এই বড় প্রকল্পের অংশ হতে চায় তা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো। আজ এই ২০১৯ সালের চলতি এপ্রিল মাসের শেষে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত এবারের নাম Belt and Road Forum বলতে দেখা যাচ্ছে। এর জন্য নতুন খোলা পোর্টাল এখানে।]  এই সামিট টু কেন গুরুত্বপূর্ণ বা এর মূল তাৎপর্য কী হতে যাচ্ছে?

বেল্ট রোড অবকাঠামো প্রকল্পের মূল কাঠামো হল মূলত এশিয়া ও সারা ইউরোপকে সব উপায়ে সংযুক্ত করে ফেলা। অর্থাৎ এশিয়ার অপরপ্রান্ত হবে ইউরোপ, এত দিন যা খুবই সীমিত সুযোগে কানেক্টেড ছিল। আর এখানে ইউরোপ মানে সারা ইউরোপ; অর্থাৎ ২৫ সদস্য রাষ্ট্রের ইউরোপীয় ইউনিয়ন। যদিও সংখ্যায় ২৫ অনেক বেশি, কিন্তু আসলে ইউরোপের প্রভাবশালী মাতবর রাষ্ট্র – চার থেকে আট রাষ্ট্র, যারা যেকোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নির্ধারক। এই প্রথম চার রাষ্ট্রের মধ্যে মূল দুই রাষ্ট্র আবার হলো ফ্রান্স ও জার্মানি। এর সাথে বাকি দুই রাষ্ট্র ব্রিটেন আর ইতালি। এমনিতে আমেরিকান মাতবরিতে চলা গত ৭০ বছরের দুনিয়া বিচারে, আমেরিকা একা একা চলে নাই; সাগরেদ রাষ্ট্রসহ দলেবলে চলেছে। এভাবে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী অর্থনৈতিক রাষ্ট্রজোট হল ‘গ্রুপ সেভেন’ বা জি-৭। একটু বিস্তারিত জানতে এই ফাইনান্সিয়াল বিনিয়োগ-পিডিয়া সাইট, ইনভেস্টোপিডিয়া – এটা দেখা যেতে পারে।  ইউরোপের সেই চার রাষ্ট্র – ফ্রান্স, জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি – এই চার রাষ্ট্রই হল ‘গ্রুপ সেভেন’-এর চার ইউরোপীয় সদস্য; আর বাকি কানাডা, আমেরিকা ও জাপান মিলে পূর্ণ হয় ‘গ্রুপ সেভেন’।

বেল্ট-রোড উদ্যোগের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে এই কাঠামোতে এখানে এশিয়ার অপর প্রান্ত ইউরোপ। অথচ ২০১৭ সালে প্রথম বেল্ট রোড সামিট অনুষ্ঠিত হওয়া পর্যন্ত এর অগ্রগতি ও অর্জন মেপে দেখলে সেখানে বড় খামতির দিক ছিল যে, সেকালে পর্যন্ত ইউরোপের কে কে বা বিশেষ করে প্রভাবশালী চার রাষ্ট্রের কাউকে এই প্রকল্পে যোগ দিতে আগ্রহী করাতে পারেনি বা কমপক্ষে কাউকে দিয়ে আনুষ্ঠানিক ওয়াদা চীন আদায় করতে পারেনি। সেই খামতিই এবার পূরণ হতে চলেছে।
তবে এত দিন চীন কেন তা পারেনি তা বুঝতে প্রথমত চীনের কাছে জি-৭ কী, এটা বুঝলে অনেকটাই স্পষ্ট হবে সমস্যার জটিলতা কোথায়? গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা বা প্রধান চালিকাশক্তি হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মূলত চীন ও আমেরিকার মধ্যে। আমেরিকার জায়গা নিতে চায় চীন। তাহলে ইউরোপ? এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইউরোপ কেউ নয়। কারণ ইউরোপ বিগত-যুবা। ফলে সে ঐ দু’য়ের লড়াইয়ে কারও জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীই নয়। তবে আমরা ইতিহাস হিসাবে মনে রাখতে পারি যে, যদিও ইউরোপও একসময় দুনিয়ার নেতা এবং তাঁর সেখানে রুস্তমি ছিল; তবে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এবং সেটা ছিল কলোনি রুস্তমি।  আর ঐ বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইউরোপ হয়েছিল আমেরিকার এক নম্বর সাগরেদ।

যুদ্ধের মাঝামাঝি সময় (১৯৪২) থেকেই গ্লোবাল নেতৃত্ব আমেরিকা নিজের হাতে নিয়ে নিতে সক্ষম হয়ে যায়; আর সারা ইউরোপ ছোট-বড় সবাই হয়ে যায় আমেরিকার অনুগ্রহ প্রার্থী। এমনকি মাথা তুলে দাড়াতে চেষ্টা করা হিটলারের জার্মানি, মুসোলিনির ইটালি অথবা এশিয়ার জাপান বিশ্বযুদ্ধে হেরে যাবার পর আরও বেশি করে আমেরিকার অনুগ্রহ-প্রার্থী হয়। ওদিকে ঐ বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা এককভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নসহ ইউরোপের প্রায় সবাইকে যুদ্ধে সবরকম সাহায্য করা, প্রধান খরচগুলো নিজে বহন করা, অনুদান দেয়া তো বটেই এমনকি যুদ্ধ সমাপ্তিতে ইউরোপের অর্থনীতিগুলোকে পুনর্বাসনের যে অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, সেটাও একা আমেরিকা জুগিয়েছিল। তাই আমেরিকা ও ইউরোপের সম্পর্ক দাঁড়িয়ে যায় যেন, আমেরিকা একাই ত্রাতা ও দাতা আর  ইউরোপ ওরই পাণিপ্রার্থী। সে সম্পর্কই সেই থেকে প্রতিফলিত হয়ে আসছে জি-সেভেন ধরনের গ্রুপেও, এক উঁচু-নিচু সম্পর্কে। আমেরিকা কী বলে বা সে কী চায়, তা আমল করে শুনতে ইউরোপ অভ্যস্ত হয়ে যায়। যদিও ১৯৪৪ সাল থেকে গ্লোবাল ইকোনমিক সিস্টেম, যা বহুরাষ্ট্রীয় নানান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা হয়েছিল, তা গড়তে ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ ও নেতারা আমেরিকার সাগরেদ হয়ে পাশে থেকে নিজেদেরকেও গুরুত্বপূর্ণ করে নিয়েছিল। এভাবে ইউরোপের প্রভাবশালী চার-ছয় রাষ্ট্র আমেরিকার পাশে ছোট-তরফ বা সাগরেদ হয়ে উঠতে জায়গা পেয়েছিল।

তাহলে অর্থ দাঁড়াল, একালে আমেরিকাকে সরিয়ে গ্লোবাল নেতৃত্বের সে জায়গা চীন নিতে চাইলে ইউরোপের প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোকেও চীনমুখী করে নিতে হবে আগে। “আমেরিকা-ইউরোপের” সম্পর্কের বদলে একে ছাপিয়ে “চীন-ইউরোপের” মধ্যে সম্পর্ককে খাঁড়া হতে হবে আরও প্রবল প্রভাবশালী সম্পর্ক হিসাবে। আর এটাই হবে বাস্তবত আমেরিকাকে দুনিয়ায় কম গুরুত্বপূর্ণ করে দেয়া। অতএব, বিশাল হইচই ফেলে দেয়া ঘটনা হল – ইতালির বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার ঘোষণা। এবছরের মার্চ মাসের ২১ তারিখ থেকে চীনা প্রেসিডেন্ট শি-এর সপ্তাহব্যাপী ইউরোপ সফর ছিল। আর সেখানেই স্বাক্ষরিত ১৭টি চুক্তির মধ্যে একটি হলো চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে ইতালির যুক্ত হওয়ার লক্ষ্যে ‘প্রাথমিক বোঝাবুঝিগুলো’ (এমওইউ বা MOU ) দলিল করে স্বাক্ষরিত হয়েছে। আর চলতি মাসের বেল্ট রোড সামিট টু-তে অংশ নেয়ার সময় তা পূর্ণতা পাবে।

ইটালির এই যোগদান-সম্মতির চীনা উত্থানের জন্য এক মাইলস্টোন তাতপর্যের। কারণ ইতালিই হল প্রথম জি-৭ গ্রুপের সদস্য যে খোলাখুলি আমেরিকান মেরু ত্যাগ করল। শুধু তাই নয় ইতালিই প্রথম রাষ্ট্র হতে যাচ্ছে যে (আমেরিকার হাত ছেড়ে) চীনের সাথে “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” – সম্পর্ক করতে যাচ্ছে। [The communique said the two sides have agreed to advance China-Italy comprehensive strategic partnership…… ] অর্থাৎ চীন-ইতালি সম্পর্কটা কেবল অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক নয়। [এপ্রসঙ্গ আরও একটু বিস্তারিত পরের প্যারায়।] বৃটেনসহ অন্যান্যরাও ইতোমধ্যে অনেক দূর গিয়েছে কিন্তু সেগুলো ছাড়াছাড়া। যেমন এলেখার শিরোনামের ছবিটা; এছবি বেল্ট-রোড ব্যবহার করেই প্রথম ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে, চীন থেকে লন্ডন পর্যন্ত মালবাহী ট্রেন ব্যবহারের। যেটা অনেকটা বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়া বিদ্যুতের লাইন থেকে বাসায় একটা সংযোগ নেওয়ার মত। কিন্তু সেটা ঐ বিদ্যুৎ কোম্পানির সাথে মালিকানা-বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া নয়।

কিন্তু ইতালি ইউরোপের বাকি সবার আগে এত গভীরভাবে জড়িত হয়ে পড়ার ক্ষেত্রে তার প্রধান বস্তুগত স্বার্থের দিক হল – পুরো বেল্ট রোড প্রকল্পে ইউরোপীয় আর এক প্রভাবশালী প্রান্ত বা শেষ মাথা হবে ইতালি। তাতে ইউরোপের যে গভীর সমুদ্রবন্দর বেল্ট রোডের সড়ক ও রেলকে সংযুক্ত করাবে, সেই বন্দর গড়ে উঠবে ইতালিতে। যার মানে হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নেতা মুসোলিনি, তিনি হিটলারের সাথে গাঁটছড়া বাঁধার কারণে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে – সেই থেকে পিছিয়ে পড়া আর ধুঁকে চলা অর্থনীতির ইতালি এবার সামনের সারিতে চলে আসার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। ডাচ রটারডামকে ছাড়িয়ে ইতালি হয়ে উঠবে ইউরোপের হাব [hub] – সড়ক, রেলের সাথে সমুদ্রপথ যুক্ত হওয়ার বড় সংযোগস্থল। সব দিকের সাথে কানেক্টিভিটির এই বিশেষ সুবিধার জন্য ইতালি হয়ে উঠবে বুড়ো শরীরে আবার যৌবনের জোয়ার – ইতালি হবে এখন ইপিজেড-ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের হাবও। তাই নিজ বিপুল সম্ভাবনার সামনে এখন থেকে আমেরিকার হাত হালকা করে ধরা আর ইউরোপের অন্যরা – ফ্রান্স, জর্মানি বা ব্রিটেন- এদের সবাইকে টপকে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ভুলে চীনের হাত শক্ত করে জাপটে ধরা হবে ইতালির কাছে খুবই জায়েজ।

কিন্তু তাই বলে জার্মান, ফ্রান্স বা ব্রিটেনকেও চীন বিমুখ করেছে ব্যাপারটা ঠিক তাও নয়। বিস্তারে তা বুঝতে আরেকটা ধারণার সাথে পরিচয় করাতে হবে। “কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” [Comprehensive Strategic Partner]’ হলো সেই নতুন শব্দগুচ্ছ – যা চীন একালে ব্যাপক ব্যবহার করছে। বাংলায় “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” – চীন দুনিয়ার গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর সবাইকে এমন “কৌশলগত মিত্র” হিসেবে পেতে চায়। এটা একটা (বেল্ট রোড) প্রকল্পেই কেবল চীন সবাইকে পেতে চায় তা নয়, বরং আরও এবং সামগ্রিক। আসলে খোদ বেল্ট রোড প্রকল্পটি চীনের একটি কৌশলগত প্রকল্প। কেবল বাণিজ্যিক নয়।

স্ট্র্যাটেজিক বা কৌশলগত বলতে এর সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অর্থ হল, যা কেবল অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক লাভালাভের দিকটাই নয়, আরও অনেক কিছু। কী সেটা? অন্তত আপাতত অর্থ হল, আমেরিকাকে বাইরে রেখে বাকিদের নেয়া হয়েছে এমন এক পক্ষজোট- যার মধ্যে রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, ব্যবসায়িক ইত্যাদি সব (এই অর্থে তা সামগ্রিক) স্বার্থেই এখানে চীনের নেতৃত্বে সকলে আছে। এই অর্থে এটা আমেরিকাকে বাইরে রেখে এক রাষ্ট্রস্বার্থ জোট। আবার এই জোটের কাম্য সদস্যরা মানেই এরা সবাই বড় ক্ষমতার রাষ্ট্র, ঠিক তা নয়। যেমন হাসিনার বাংলাদেশ (অন্তত ঘোষণা মোতাবেক), আমরাও চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার। ব্যাপারটা আর একটু বিস্তার করতে আরেক দিকে আলো ফেলব।

ক্রাইস্টচার্চ ম্যাসাকার সামলানোর জন্য সদ্য সুখ্যাতি অর্জন করা নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা, এ মাসের ১ এপ্রিল চীন সফরে গিয়ে চীনের “সামগ্রিক কৌশলগত মিত্র” হয়ে এসেছেন। এমন মিত্র হওয়াতে এর অর্থ বুঝতে হবে এভাবে; নিউজিল্যান্ড বেল্ট রোড প্রকল্পের সাথে কৌশলগত সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হয়েছে ও নিয়েছে। অর্থাৎ চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার না হয়েও কেউ বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হতে পারে। এই সুযোগ থাকলেও জেসিন্ডা স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্কের গভীরতা থেকে যুক্ত হওয়া বেশি লাভজনক মেনেছেন। আর বিপরীতে কেবল বেল্ট রোড প্রকল্পকে যুক্ত হলে স্বভাবতই সে ক্ষেত্রে সেটা কেবল “বাণিজ্যিক স্বার্থ” ধরনের সম্পর্ক হত। ফলে চীনের দেয়া অন্য অনেক সুযোগ সুবিধা সে পেত না। যেমন- কোন রাষ্ট্র যদি কোন কারণে ঋণের কিস্তি শোধ দিতে পারছে না অবস্থায় পড়ে। এমন ক্ষেত্রে ওই রাষ্ট্র আবার চীনের স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার হলে চীন ব্যাপারটাকে কেবল ব্যবসা-বাণিজ্যিক দিক থেকে দেখে থেমে থাকবে না। চীন তাকে বরং অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তুলতে, বিপদ থেকে বের হয়ে আসতে আরও ঋণ দেওয়াসহ সব সাহায্য করবে। চীনের এখনকার সাধারণ নীতি-কৌশল হল সব রাষ্ট্র বা প্রকল্পের সম্পর্ককে সব সময় স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার সম্পর্ক পর্যন্ত বিস্তৃত করা। যদি পার্টনার রাজি থাকে কেবল তখন সেটা আনুষ্ঠানিকতা পায়, কিন্তু চীনের দিক থেকে আগ্রহ জারি থাকে সব ক্ষেত্রে ও সময়ে।

কিন্তু নিউজিল্যান্ডের উদাহরণ কেন আনলাম? কারণ, ঠিক এর বিপরীত ঘটনা বা রাষ্ট্র হলো অস্ট্রেলিয়া। মনে রাখতে হবে, অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ড প্রায় সময় একসাথে উচ্চারিত শব্দ। মূল কারণ তারা একইভাবে, একই ভাগ্যে রকই সময়ে ব্রিটেনের কলোনি হয়ে যাত্রা শুরু করেছিল। ফলে রাষ্ট্রস্বার্থ ও নীতিগত মিল এক হতে বেশির ভাগ সময় দেখতে পাওয়া যায়। যদিও চীন না আমেরিকা কোন ক্যাম্পে থাকবে প্রশ্নে তাদের ভিন্নতা দেখা দিল। আর জেসিন্ডা প্রমাণ করলেন অষ্ট্রেলিয়া ভুল করেছে।

চীন-আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রবল দ্বন্দ্ব অনেক আগে থেকেই অন্তত ওবামা আমল থেকে,  তবে চাদরের নিচে থেকে আস্তে আস্তে প্রকট হয়ে ভেসে উঠছিল। যা কেবল এ’কালে ট্রাম্পের আমলে এসেই চাদর উঠে গেছে। আর সবচেয়ে বড়ভাবে আরেকবার চাদর উঠেছিল ২০১৫ সালে, চীনের বিকল্প বিশ্বব্যাংক – এআইআইবি [Asian Infrastructure Investment Bank (AIIB) ] গড়ার সময়ে। ওবামা লজ্জার মাথা খেয়ে খোলাখুলি সেই সময়ে এই নতুন ব্যাংক প্রকল্পে যেন এশিয়ার জাপান, কোরিয়া তাইওয়ান বা অস্ট্রেলিয়া (যারা আমেরিকার বহু পুরনো বন্ধু মনে করা হয়) এরা তো বটেই, এমনকি ইউরোপেরও কেউ যেন যোগ না দেয় এর লক্ষ্যে, কান-পড়া দিয়ে কার বিয়ে ভেঙে দেয়ার মত, করে ব্যাপক প্রপাগান্ডা ও আপত্তিতে ছেয়ে ফেলেছিল। যদিও ফলাফলে আমেরিকার হার হয়েছিল; শেষে প্রায় সব রাষ্ট্রই ওই ব্যাংক প্রকল্পে যোগ দিয়েছিল। কিন্তু চীনের নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট আর আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোট সেই থেকে প্রায় প্রকাশ্যেই তৎপর হয়ে যায়। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া এআইআইবি ব্যাংকে সদস্য হয়েও আমেরিকার জোটেই যোগ দিয়েছিল। এছাড়া আমেরিকার নেতৃত্বে স্ট্র্যাটেজিক জোটে আর সদস্য হয়েছিল জাপান, কোরিয়া, তাইওয়ানের মত রাষ্ট্রগুলো এবং স্বভাবতই আমেরিকার হয়ে “চীন ঠেকানোর ঠিকা” নেয়া ভারত তো ছিল।

এমনকি অস্ট্রেলিয়া আরও একধাপ এগিয়ে নিজের উপকূলে এক আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিও স্থাপন (২০১৬ সালে চালু হয়) করতে দিয়েছিল। কিন্তু প্রায় সবাই ধরা খেয়ে যায় ট্রাম্পের আমলে এসে, তাঁর জাতীবাদি ট্রাম্প হয়ে উঠার কারণে। কারণ ট্রাম্পের সারকথা, বিড়াল যেন বলছে আর মাছ খাবো না। দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের অর্থনীতিতে রূপান্তর মানে দুনিয়া জুড়ে ব্যাপক পণ্য বিনিময়ের গ্লোবাল সমাজের দুনিয়া গড়তে নেতৃত্ব দেয়া সেই আমেরিকা, ট্রাম্পের হাতে পড়ে হয়ে গেল অ্যান্টি-গ্লোবাল। এক জাতিবাদি আমেরিকা; আমেরিকা ফাস্টের নীতি চর্চা শুরু করল। ফলে আমেরিকার স্ট্র্যাটেজিক জোট মুখ থুবড়ে পড়লেও বিপরীতে চীনেরটা সদর্পে আরও এগিয়ে যেতে সুযোগ পেয়ে যায়। সেটারই স্পষ্ট সফলতা এই প্রথম এখন প্রমাণ হল গত মাসের শেষে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং -এর ইউরোপ সফরে। মুখ পোড়ানো অস্ট্রেলিয়ার অতি উৎসাহ যে ভুল ছিল তা যেন আরো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে নিউজিল্যান্ড এবার অস্ট্রেলিয়ার অকেজো স্ট্র্যাটেজিক জোটের পাল্টা চীনা স্ট্র্যাটেজিক জোটে যোগ দিল।

এদিকে ট্রাম্পের আগমনের পর থেকেই ইউরোপের জার্মানি – যে ট্রাম্পের “অ্যান্টি-গ্লোবাল” অবস্থানের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি পাল্টা সোচ্চার অবস্থান নিয়েছিল এবং ভোকাল ছিল, সেই জার্মানির সাথেই চীনের সম্পর্ক গভীর হয়ে যায়। চীনা শিল্প-উদ্যোগের যুগ এখন দ্বিতীয় পর্যায় চলছে, যার সারকথা প্রত্যেক ট্রেডকেই হাইটেকে বা উচ্চ প্রযুক্তিতে নিয়ে যাওয়া। যেখানে প্রথম পর্যায়টা ছিল বাল্ক উতপাদন করে উতপাদন খরচ নামিয়ে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বি করে ফেলা। তাই এবার হাইটেকে যাত্রার দ্বিতীয় পর্যায়ে – এখানেই জার্মানির সাথে চীন গভীর পার্টনারশিপ হয়। ব্যাপারটা জার্মানির দিক থেকে দেখলে, চীনের মতো বড় আর ব্যাপক এবং হাইটেকের চাহিদার বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে যাওয়া জার্মানির জন্য তা বিরাট কিছু। সাধারণভাবে হাইটেকে আর বিশেষত গাড়ি তৈরির অটো শিল্পে চীনের মূল পার্টনার এখন জার্মানি।  জার্মানরা বিনিয়োগ নয়ে ঝাপিয়ে পড়েছে। চীনে গত তিন বছরে লাগাতার  জার্মান সংশ্লিষ্টতা ও বিনিয়োগ বেড়ে চলা চলছেই, গ্রোথ রেট ১৪০ শতাংশ বলা হচ্ছে। সম্প্রতি ফ্রান্স সফরে এক মূল সম্মেলনের সাইড লাইনে প্রেসিডেন্ট শিং-এর জর্মান চ্যান্সেলার মার্কেলের সাথে বৈঠকের মিডিয়া রিপোর্ট বলছে [China was Germany’s largest trading partner for a third consecutive year in 2018, with a nearly 140 percent increase in German companies’ actual investment in China, he said.]। এখানে বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয় যে এই বৈঠক থেকে চীনের সাথে জর্মানির ‘কম্প্রিহেনসিভ স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার” হওয়া বা না হওয়া বিষয়ে কোন সুর ভেসে আসে নাই। কিন্তু তা সত্বেও চ্যান্সেলার মার্কেল জানাচ্ছেন তিনি ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ফোরামে জার্মানি যোগ দিচ্ছে। [Germany would like to deepen its economic and trade relations with China in the digital age, and is willing to actively participate in the second Belt and Road Forum for International Cooperation, Merkel said.]।

ওদিকে ফ্রান্সের সাথে চীনের সম্পর্ক আর এক মাত্রায় হাজির। এবার প্রেসিডেন্ট শি-এর সফরে ইতালির বাইরে আরেক গুরুত্বের সফরের জায়গা ছিল ফ্রান্স। এই সফরে যত না চীনের খুশির, এর চেয়ে বড় খুশি প্যারিসের, সে গদগদ। মূল কারণ ৪৫ বিলিয়ন ডলারের ফরাসি পণ্য-ক্রয়ের চুক্তি।  চীন, আমেরিকার বোয়িংয়ের চলতি খারাপ সময়ে ইউরোপের ফ্রান্সের বড় শেয়ারের (চীনে অবস্থিত ফ্যাক্টরি থেকে) এয়ারবাস থেকে বিমান কেনার জন্য ৪৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। অর্থাৎ এর সোজা মানে হল, জার্মান ও ফ্রান্স চীনের পক্ষে কৌশলগত জোটের প্রত্যক্ষ পার্টনার না হলেও তারা ঘনিষ্ঠ; অন্তত তারা আমেরিকার জোটের নয়।

ইউরোপের চার কুতুবকে নিয়ে কথা বলতে এবার বাকি থাকল বৃটেন। ব্রিটেন এত বাছবিচার না রেখে খোলাখুলি বেল্ট রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে লম্বা পরিকল্পনা নিয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। ব্রিটিশ অর্থ মন্ত্রণালয় হংকং ব্যাংকের এক সাবেক চেয়ারম্যান ডগলাস ফ্লিন্টকে বিশেষ দুত ও প্রধান করে তাঁকে দায়িত্ব দিয়েছে এ লক্ষ্যে কাজ ও পরিকল্পনা শুরু করতে।[Sir Douglas Flint, who was appointed as the Special Envoy to BRI of the British Treasury in December 2017]। ফ্লিন্ট জানাচ্ছেন, The Belt and Road Initiative (BRI) “is a real opportunity” to strengthen UK-China cooperation। বেল্ট রোড সামিট টু ব্রিটেনের জন্য এক বিরাট সুযোগ বলে ডগলাস ফ্লিন্ট প্রকাশ্যেই জানাচ্ছেন।

তাই এককথায় বললে, চলতি এপ্রিলের ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ থেকে এর ওলটপালট ঝড় আসন্ন হয়ে উঠেছে। গ্লোবাল নেতৃত্বে চীনের আসীন হওয়ার ক্ষেত্রে তা আর এক ধাপ উঠে দ্বিতীয় পর্যায়ে উন্নীত হতে যাচ্ছে।

কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ?
বেল্ট-রোড প্রকল্প নিয়ে ভারতের অবস্থান সরাসরি বিরোধিতার। গত ২০১৭ সালের সামিটের দাওয়াত তাই সরাসরি প্রত্যাখান করেছিল। আর বাংলাদেশ গত ২০১৭ সালে বেল্ট রোড সামিট-ওয়ানের সময় ভারতের মন রক্ষা করতে বাংলাদেশ লো-প্রোফাইলে থেকেছিল।  তবে বেল্ট রোড প্রকল্পে চীনের সাথে বাংলাদেশ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত লুকাতেও চায়নি বা পারেনি। বরং অক্টোবর ২০১৭ সালে ভারতকে বুঝিয়ে রাজি করার এক  উদ্যোগ নিয়েছিল যে ভারত যেন আমাদেরকে এই সম্পর্কে যেতে আপত্তি না করে বা ভালভাবে নেয় – তা পুরাপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। বরং আমাদের পররাষ্ট্র সচিবকে একাজে ভারতে পাঠানোয় উলটা ভারতের সাথে আমাদের অবস্থান-ভিন্নতা আরো প্রকট ও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছিল। আজ দুবছর পরে এই ইস্যুটা এখন যে  অবস্থায় চলে গেছে তাতে এখন  ভারতের মুখ চেয়ে স্থবির হয়ে থাকা যাবে সে জায়গাতেও আর নেই। মূল কারণ বটম লাইনটা আমাদের মনে রাখতে হবে। বেল্ট-রোড প্রকল্পে হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে

মূল প্রশ্ন বাংলাদেশ সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীনের (কুনমিং প্রদেশে) সাথে সরাসরি যুক্ত হবে কী না? যেখানে কলকাতাও বাংলাদেশ হয়ে যুক্ত থাকবে। এটাই বিসিআইএম (BCIM যা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর) প্রকল্প। তবে এই প্রকল্পের আর এক অনুষঙ্গ গুরুত্বপুর্ণ দিক ছিল সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর। আসলে উলটা – মূলত এই গভীর সমুদ্র বন্দরকে কেন্দ্র করেই এই চার দেশের ঐ অঞ্চলটার মূলত ল্যান্ড লকড দশায়; তাই সে অবস্থা ছুটানোই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এখানে ল্যান্ড লক কথাটা আমাদের বন্দর আছে কিন্তু গভীর সমুদ্র বন্দর নাই – এই অর্থে বুঝতে হবে। বাস্তবে চট্টগ্রাম লাইটার জাহাজের বন্দর, যার কানেকটিং গভীর সমুদ্র বন্দরটা সিঙ্গাপুরে। তাই চার দেশের এই বদ্ধ অঞ্চল – এটাকে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্র বন্দর দিয়ে উন্মুক্ত করাটাই ছিল মুল উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতের অনাগ্রহের কারণে সোনাদিয়া ছাড়াই কেবল রেল ও সড়কের BCIM প্রকল্পের আওয়াজ উঠতে উঠতে এখন সেই প্রকল্পের সব কিছুই মুখ থুবড়ে গায়েব। কেন?

ভারতের যুক্তি চীন BCIM প্রকল্পকে এখন বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত করতে চায়। অবশ্যই চায়। বাংলাদেশও চায়। আর প্রশ্নটায় এখন তখনের কিছু নাই। বাংলাদেশের স্বার্থের জন্য এটা খুবই জরুরি যে আমরা আন্তঃমহাদেশীয় প্রকল্প বেল্ট-রোডের সাথে যুক্ত থাকি। তাই BCIM প্রকল্প যুক্ত থাকুক – এটাই তো আমাদের স্বার্থ। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ কথাটা হাতে গুনে মনে রাখতে হবে – হয় এখনই না হলে ট্রেন মিস, বহু অতলে পিছিয়ে হারিয়ে যেতে হবে। বাংলাদেশ যদি শুরু থেকে বেল্ট-রোডে জড়িয়ে না থাকে বা থাকতে না পারে তবে আমাদেরকে আজন্ম এর কাফফারা দিতে থাকতে হবে। আর ভারতের এখন-তখনের যুক্তির পালটা কথাটা হল, BCIM প্রকল্পের মূল আইডিয়ায় সোনাদিয়া বন্দর ছিল কেন্দ্রীয় বিষয়। সেটাই বা বাদ দেয়া হয়েছিল কেন? কেন হাসিনার ২০১৪ সালের চীন সফরের কালে সোনাদিয়া বন্দর চুক্তিতে বাধা দেয়া হয়েছিল?

ভারত যদি মনে করে আর চায় তাহলে কলকাতা থেকে কুনমিং পর্যন্ত না হয়ে এই প্রকল্প হবে না। নো প্রবলেম। বরং তাদেরকে বাদ দিয়ে ঢাকা-বার্মা-কুনমিং হবে অর্থাৎ BCM প্রকল্প হবে অসুবিধা কী! আর এই প্রকল্পের কেন্দ্র সোনাদিয়া বন্দরও একই সাথে।  সেইসাথে বেল্ট-রোড প্রকল্পেও BCM -এটাও অবশ্যই যুক্ত থাকবে। কিন্তু   ভারতের এতে আপত্তি বা  একমত হওয়ার কিছু নাই। কিন্তু ভারতের অবস্থানটা হল  – সে  নিজে এই প্রকল্পে যুক্ত থাকবে না, আবার তাকে বাদ দিয়ে বেল্ট-রোডসহ কোন প্রকল্পই সে হতে দিবে না।

কেন? কারণ চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্প  সম্পন্ন হতে দিলে আর তাতে ভারত জড়িয়ে থাকলে  তাতে চীন বহু আগিয়ে যাবে আর ভারত চীনের অধীনস্ত হয়ে যাবে। তা হতেও পারে, অসম্ভব না। কারণ ব্যাপারটা মুরোদের – সক্ষমতা ও যোগ্যতার। ভারতের মুরোদ না থাকলে তার বা কারও কী আর করার আছে? কিন্তু তাই বলে, কান-পড়া দিয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেবার মত  ভারত কূট-ষড়যন্ত্রের পথ ধরবে? যেটা কোন কাজের কথা নয়।  নাকি গঠনমূলকভাবে, ভারত চীনের এখনকার সহযোগিতাগুলো কাজে লাগানো আর নিজের মুরোদ অর্জন করা্র দিকে যাবে? যাতে কোন একদিন চীনকেও ভারত ছাড়িয়ে যেতে পারে! আজকের চীনের অবস্থাই কী এর প্রমাণ নয়। এককালে আমেরিকার সাহায্য নিয়েই কী আজ চীন এজায়গায় নয়? তাতে সে কী এখন আমেরিকাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে না!

এভাবে  ভারতের মুরোদ অর্জন বিকল্প কূট-ষড়যন্ত্রের পথ – এটা কখনই নয় হতে পারে না। এমনকি ঈর্ষা বা প্রতিহিংসা তো নয়ই! পাকিস্তান কাশ্মীরের উপর দিয়ে বেল্ট-রোডের মূল বা পাকিস্তান করিডোর গিয়েছে – ভারতের এটা ফর্মাল আপত্তির যুক্তি। সেটাও আসলে খাটে না। কারণ পাকিস্তান অংশসহ পুরা কাশ্মীর ভারতের কী না এটা তো কোন বিতর্কই নয়। কারণ, বিতর্ক হল সারা কাশ্মীরিরা কীভাবে কার হাতে শাসিত হতে তারা সম্মত হবে? ভারত বা পাকিস্তানের সাথে যুক্ত হয়ে শাসিত হবে নাকি নিজেরাই আলাদা হবে?  এরপরেই কেবল, পুরা কাশ্মীর ভারতের হবে কীংবা হবে না তা তখন মীমাংসিত হতে পারে। এর আগে কোন কাশ্মীরই ভারতের নয়, কেউ না।

অতএব ঈর্ষা বা প্রতিহিংসাবশত  বেল্ট-রোডে যোগ না দেওয়ার ভারতের কোন বিদেশনীতি যদি হাজির থাকে তবে তা ভারতেরই থাক। তা আমাদের তো নয়ই, আমাদের দায়ও নয়। তাই আমরা কী করব তা ভারতকে জিজ্ঞাসারও কিছু নাই। আমাদের স্বার্থ, আমাদের ভাল-মন্দ ক্ষতি সব আমাদেরই বইতে হবে। যদিও এব্যাপারে বাংলাদেশের দিক থেকে সর্বশেষ কিছু অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল ২০১৯ সালে আমাদের নির্বাচন পরবর্তি সময়কালে।

এ বছর আমাদের নির্বাচনের পরে আমরা দেখেছিলাম, কারও পরোয়াহীন এক  চীনা ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শন। আর বিশেষ করে সিএনএন-নিউজ১৮ (CNN-NEWS18) নামে ভারতীয় টিভিতে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই বোল্ড ছিল। এবং তা এক স্থির সিদ্ধান্তের প্রকাশ দেখিয়ে ফেলেছিল যে, সোনাদিয়া বন্দরসহ বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে হাসিনা সরকার আর থামবে না। এমনকি ওই সাক্ষাৎকার আসলে খোদ ভারতকেই চীনের সাথে আলাপ আলোচনার মাধ্যমে বেল্ট রোড প্রকল্পে যুক্ত হতে আহ্বান রাখা হয়েছিল। এই সাক্ষাৎকারের আলো অনুসরণে চিন্তা করলে মনে হয়, এবারের এপ্রিলে বেল্ট রোড সামিট টু-তে চীনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রতিনিধিত্ব করতে আমরা দেখব।

কিন্তু এর ভারতীয় প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? প্রথমত, ভারতে এখন রুটিন সরকার; মানে মোদীসহ রাজনৈতিক নেতাদের সময় নেই এনিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেয়ার। এর চেয়ে নিজ নিজ এলাকায় মাঠের নির্বাচনী প্রচারে যোগ দিয়ে নিজের আসন নিশ্চিত করা তাদের এখন প্রায়োরিটি, একমাত্র কাজ। আগামী মাসে ২৩ মের আগে ভারতে সরকারে কে আসবে, কে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তা জানার সুযোগ নেই। এ অবস্থায় এক কথায় বললে, ভারতের নিজের বেল্ট রোড সামিট টু-এর পক্ষে কোনো অবস্থান দেখতে পাওয়া একেবারেই অসম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশকে এবারো কি তারা ঠেকাতে পারবে?

ঠেকাতে ২০১৭ সালে আগেরবারই পারেনি। ফলে এবারো পারবে না। কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে দেখলে, সাক্ষাৎকার দিয়ে বলা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি দিক থেকে দেখলে, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধিত্ব আমাদের দেখতে পাওয়ার কথা। যদি তা আমরা না দেখতে পাই, তবে বুঝতে হবে সরকার আবার আপস করল। সেটা হবে বাংলাদেশের প্রবল সব সম্ভাবনাগুলোর মাথা মুড়িয়ে ফেলে রাখা আর পিটিয়ে কাউকে খাটো বামন বানিয়ে রাখার মতই একটা কাজ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত 0৬ এপ্রিল ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) আসছে ‘বেল্ট রোড সামিট টু’ ঝড় – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

গৌতম দাস

১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2wJ

যেমনই হোক, বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে আগামী দিনের ইতিহাস অন্য এক কারণে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন মনে করবে। কিন্তু কিসের? গ্লোবাল নেতা ও নেতৃত্ব বদলে যাবার। বলা হবে, বাংলাদেশের দিক থেকে দেখা দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল টের পাওয়া গিয়েছিল এই নির্বাচন থেকে। আমেরিকার দিন শেষ, গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে তাঁর ছুটি হয়ে গিয়েছিল। হেরে গিয়েছিল। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চীন গ্লোবাল নেতার আসন গ্রহণ করে নিয়েছিল। মুরোদহীন সোভিয়েত কমিউনিস্টরা সত্তরের দশকে একটা স্লোগান দিত – হাত গুটাও মার্কিন। তাই যেন হয়ে গেল; এসবেরই মাইলস্টোন এই নির্বাচন। আর এখান থেকেই বাংলাদেশ-সম্পর্কিত গ্লোবাল সম্পর্কগুলোর মধ্যে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে নতুন ধরণের এক স্ট্রাটেজিক ভারসাম্যে প্রবেশ করে গেল।

আমরা যে দুনিয়াকে “গ্লোবাল রাজনৈতিক দুনিয়া” অথবা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া” বলে আজ চিনি, এর বয়স খুব বেশি না হলেও তা সর্বোচ্চ ‘সত্তর থেকে ছিয়াত্তর বছরের’। এর মানে এর আগে দুনিয়ায় কি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না? হ্যাঁ ঠিক তাই; ছিল না। আর সে দুনিয়া মানে ছিল এক কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া। এখানে সম্পর্ক  কথাটা বুঝতে হবে বহুরাষ্ট্রীয় (শুধু পণ্য নয়) ভাব-ভাষাসহ  সব কিছুর লেনদেন বিনিময় – এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ হিশাবে। যেমন আগের সে দুনিয়ায় আমাদের নাম ছিল ব্রিটিশ-ভারত; মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলোনি-দখল-ভূমি হয়ে থাকা, তাদের মালিকানায় থাকা এক ভারতবর্ষ; “ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া” নাম ছিল আমাদের। এই অবস্থাটা বজায় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত; সেকালের যার গ্লোবাল রূপটা ছিল – এক দিকে উপনিবেশ মালিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মত তবে ছোট-বড় সব মিলিয়ে ছয়-সাতটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র, যারা সারা দুনিয়াকে নিজেদের মধ্যে দখল-মালিকানায় ভাগ করে নিয়ে রেখেছিল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। সোজা ভাষায় তাই স্বাধীন রাষ্ট্র বা কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রের ফেনোমেনা শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পর থেকে।

যেমন ১৯৪৫ সালের পরে ১৯৪৭ সালে এসে আমরা উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছিলাম। তবে সেটি অবশ্য আর কোন অর্থেই আগের অখণ্ড ভারত নয়, বরং ভারত আর পাকিস্তান দুই আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা মুক্ত হয়েছিলাম। তবে বড় কথা, সেটি আবার শুধু ভারতবর্ষেরই ফেনোমেনা নয় বরং সারা দুনিয়াতেই উপনিবেশ হয়ে থাকা বেশির ভাগ রাষ্ট্র পরের ২০ বছরের মধ্যে সবাই মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায়। তাই কথাটি এভাবে বলা যায়, ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়া হল – উপনিবেশ হয়ে থাকা দুনিয়া বা কলোনি মাস্টার-প্রজা সম্পর্কের দুনিয়া।

আর এর বদলে বিশ্বযুদ্ধ শেষে এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের দুনিয়া; যেটি আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুনিয়া। আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি শাসনের শেষে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার কথাই বলছিলাম যার বয়স মাত্র প্রায় ৭০ বছর। তবে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার প্রায় শেষ পর্বে দাঁড়িয়ে আমরা এখন কথা বলছি। এখন শুরু হবে বা হয়ে গেছে তৃতীয় পর্ব। চলতি একুশ শতকে এসে মোটামুটি এখান থেকেই শুরু হয়েছে পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের দিন শেষ আর বদলে তার জায়গা নিতে – বাংলাদেশের প্রেক্ষিত থেকে বলা যায়, এই নির্বাচনকালীন সময় হল সেই চিহ্ন যে চীন নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের দিক থেকে অনুভবে চীন আর আসন্ন নয়, চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের আসন নিয়ে নিল।  তৃতীয় এই পর্বে দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে কবে কী ঘটেছিল – আগামী দিনের লেখা ইতিহাসে তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আমাদের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে মনে করা হবে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন।

এই পথচিহ্ন নির্দেশ করবে যে, এই নির্বাচন থেকেই পুরনো নেতা আমেরিকার বাংলাদেশে নেতাগিরি সমাপ্ত হতে দেখা গিয়েছিল। আমেরিকার প্রভাব-আধিপত্যের মধ্যে বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগের মধ্যে যে বাংলাদেশ এত দিন ছিল, সেটি এখন বদল হয়ে নতুন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা, চীনের নেতৃত্ব প্রভাবের যুগে প্রবেশ করল। যদিও অনেক আগে থেকেই চীনা প্রভাব ক্রমেই বাড়ছিল কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাও পাশাপাশি থেকে গেছিল বলে এত দিন সেটাকে চীনের নেতৃত্বের যুগে প্রবেশ বলা যাচ্ছিল না। এত দিনের পরিচিত আমেরিকার প্রভাব আধিপত্য ও হস্তক্ষেপের সক্ষমতা এই প্রথম পুরাপুরি অকার্যকর হতে ও থাকতে আমরা দেখলাম আর এভাবেই যেমনই হোক বাংলাদেশের একটা নির্বাচন সমাপ্ত হল।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭ শতাংশ আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও পক্ষে অথবা বিপক্ষে তার কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭% (২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮) আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল [imperial – imperial role of Empire] বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা অথবা পক্ষে/ বিপক্ষে কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি। আসলে নেতা বা এম্পায়ার সক্ষমতা হারিয়ে কখন উত্থান রহিত হয়ে গেছে তা বুঝার সহজ ইঙ্গিত হল – যখন দেখা যাবে নেতা বোকা বোকা কথা বলছে। আমাদের নির্বাচনের পর দেখা গেল আমেরিকা বোকা বোকা কথা বলছে। কেমন নির্বাচন হল, আদৌও সেটাকে নির্বাচন বলা যায় কী না – সেসবের খবর নাই আমেরিকা বিবৃতি দিয়ে বলছে, “নির্বাচনে সব প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি” বলে মনে করছে […… decision of all major opposition political parties to participate, a positive development…।] যেন পায়ে সাপের ছোবল খেয়ে মৃত মানুষের বাসায় এসে কেউ দুঃখে বলছে যাক, ভাগ্যিস ছোবলে চক্ষুটা কাটা পরে নাই – এমনই এক বিবৃতি। কিন্তু আমেরিকার এই অবস্থান বদল কেন?

কেন এমনটা হচ্ছে? ট্রাম্প আমেরিকাকে এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকায়” বদল করতে চেষ্টা করছে। মানে হল, গত ৭০ বছরে যে আমেরিকাকে দুনিয়া চিনে এসেছে, তা কোনো ‘ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা’ ছিল না; বরং তা ছিল গ্লোবাল এম্পেরিয়াল  আমেরিকা; অথবা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা। এই প্রথম সেই চিরচেনা ভূমিকায় আমেরিকা এবার বাংলাদেশে তার পদক্ষেপ, আচরণ রাখেনি; ত্যাগ করেছে। এটাকেই মূলত আমেরিকান হস্তক্ষেপের সক্ষমতার সমাপ্তি চিহ্ন ধরা হচ্ছে; তাতে এই হস্তক্ষেপ যে যেজায়গা থেকে দেখে ইতি বা নেতি মনে করতে পারে।

তবে এই সমাপ্তি চিহ্ন পয়দা করতে হাসিনার কোন ভুমিকা নাই বললেই চলে। ভারতেরও নাই। এমনকি, চীনসহ অন্য কারও কোন ভূমিকার চেয়ে আসলে একক ভূমিকা ছিল খোদ আমেরিকারই। মানে হোয়াইট হাউসের। সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ট্রাম্পের অফিস – হোয়াইট হাউজকে যদি আলাদা করি তবে আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত, অবস্থান ও ভূমিকা এককভাবে ট্রাম্পের অফিস হোয়াইট হাউজের।

ট্রাম্পের ক্ষমতা নেয়া বা শপথ চলতি জানুয়ারিতে দুই বছর পূর্ণ হবে। গত ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকেই অর্থাৎ শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে আসছেন যে, তিনি এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকার” অবস্থান নিবেন; নেতা হবেন, সেভাবে আমেরিকাকে সাজাবেন। অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়রাল বা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া – এরই এক সাম্রাজ্যের নেতা হিসেবে ওর ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা আর থাকবে না। আমেরিকার যে চেহারাটা আমরা ৭০ বছর ধরে অভ্যস্ত হয়ে দেখেছি। ট্রাম্পের নতুন আমেরিকা কেমন হবে সে সম্পর্কে নতুন চিহ্নবাচক শব্দগুলো ট্রাম্প বলেছিলেন যেমন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ [AMERICA FAST] বা ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ এক ইকোনমি [TRUMP’s Anti-Globalization] অথবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাদের ডমিনেটিং স্বার্থের সরকার তিনি হবেন – সেটা (গত সত্তর বছরের মত) ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর মত গ্লোবাল স্বার্থের হবে না, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোরও নয় [কারণ তাঁর শ্লোগান ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ ] – বরং তিনি হবেন – আমেরিকান স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারারদের যারা আমেরিকানদের চাকরিদাতা। এমন সব ফিচারের এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” গড়তে ট্রাম্প উদ্যোগী এবং রওনা দিয়েছেন।

সে কারণে এই ম্যানুফ্যাকচারারদের স্বার্থে এক বাণিজ্যযুদ্ধ, আমেরিকানদের চাকরি বাঁচানো ইত্যাদি হল আমেরিকার এখনকার সেই ক্যাচি ওয়ার্ড। এসব কথা যে চিরচেনা আমেরিকার আগের গ্লোবাল ভূমিকা বদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত তা আমরা অনেকেই বুঝিনি, বুঝতে চাইনি অথবা যারা বুঝেছি তারা বিশ্বাস করিনি – সম্ভবত পুরনো অভ্যাসের কারণে। এই পুরনো অভ্যাস এতই তীব্র যে, সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন বলতে যা বুঝায় বলা হয় সেও ভুল করে। মনে করে ট্রাম্পের আমেরিকা যেন আগের গ্লোবাল আমেরিকাটাই – গ্লোবাল স্বার্থের নেতা আমেরিকা। এটাই হোয়াইট হাউজ আর বাদবাকি ট্রাম্প প্রশাসনের এক না থাকা, এক আপাত-ভিন্নতা। মূল কারণ আমেরিকান আমলা ব্যুরোক্রাসি গ্লোবাল আমেরিকা দেখতে দেখতেই বড় হয়েছে, হাত পাকিয়েছে। তাই এটাই রুটিন আমেরিকান প্রশাসন। আর সম্ভবত একারণেই ট্রাম্প যাকেই মন্ত্রী-উপদেষ্টার বা কর্মকর্তার নিয়োগ দেন না কেন তারা নিয়মিত ক্রমান্বয়ে পদত্যাগ করছেন, স্থিরভাবে পদে না থাকতে পারার অস্থিরতাি এখন নিয়ম মানে “নিউ নরম্যাল” হয়ে গেছে। যেটাকে আমরা “পাগলা ট্রাম্পের কান্ড” মনে করছি।

অথচ আমেরিকা আর কখনো কোন গ্লোবাল (ইতি বা নেতি) ভূমিকা পালন করবে না – যেন সত্যিই বিড়াল এবার প্রতিজ্ঞা করছে যে সে আর মাছ খাবে না – দুই বছর ধরে এই হলো ট্রাম্পের হাতে সেট হওয়া অভিমুখ। আফগানিস্তান থেকে আরও সৈন্য প্রত্যাহার (ওবামা দশ হাজার বলে প্রতিজ্ঞা করেও শেষে ১৪ হাজার রেখে যাওয়া – সেটা থেকে আরও পাঁচ হাজার প্রত্যাহার করবেন ট্রাম্প), তালেবানদের সাথে কথা-আলাপ শুরু করেছেন সব ফেলে পালায় আসার লক্ষ্যে,  সিরিয়ায় ISIL মরে শেষ হোক আর না হোক সেখান থেকে প্রত্যাহার শুরু হয়ে গিয়েছে, জাতিসংঘে প্রদেয় আমেরিকান বার্ষিক অবদান আট থেকে  সাত বিলিয়নে নামিয়ে এনেছেন, প্রায়ই জাতিসংঘ থেকেই প্রত্যাহারের হুমকি দিচ্ছেন, ন্যাটো থেকে ফিরে যেতে চাচ্ছেন, বিশ্বযুদ্ধের পরে ‘শত্রুশক্তিকে’ রাজনৈতিক কব্জায় রাখতে জার্মানি আর জাপান আমেরিকার স্থায়ী ব্যারাকে সৈন্য রাখা আছে। স্ব স্ব দেশকে এর খরচের ভার নিতে বলছেন নইলে গুটিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ইত্যাদি অসংখ্য প্রত্যাহারের ঘটনা আমরা বলতে পারা যাবে। এইসব প্রতিষ্ঠান গাড়া হয়েছিল গ্লোবাল নেতা আমেরিকার উদ্যোগে ও একক খরচে। ট্রাম্পের “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” মানে তো আসলেই আমেরিকার সব প্রত্যাহার, গুটিয়ে নেয়া ভুমিকা – এটাই ট্রাম্পের সেট করা আমেরিকার নতুন অভিমুখ। অতএব  এটা এখন আমাদের সু অথবা দুর্ভাগ্য যে, এই সেট করা পথে আমেরিকা আগামীতে অন্তত আরো দুই বছর থাকবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হলে এরপর সম্ভবত ডেমোক্র্যাট কোনো প্রেসিডেন্ট আসলেও সেক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে আবার আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার জায়গায় ফিরে বসানোর সম্ভবত বেচে থাকবে না। তাই “ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্পের নীতি” – এটাই আমেরিকান ভুমিকা পরিবর্তনের প্রধান ও একক নিয়ামক।  ট্রাম্পের এই নীতিই – চীনের গ্লোবাল ভূমিকা ও নেতৃত্বে এখনই বসা নিশ্চিত করছে এবং আগামীতে আরো নিশ্চিত করে চলবেন। তাই আমেরিকান গ্লোবাল ভূমিকার সমাপ্তি ঘটাতে এটা চীনের কোন লিড নয়। তবে এমন লিড না থাকলেও এই ভুমিকা সমাপ্তিতে যে নতুন পরাশক্তিগত স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য তৈরি হবে, এটার মূল সুবিধাভোগী বা কোলে এসে পড়া সুবিধা যাবে এখন মূলত চীনের ভোগে।

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে এ থেকে বাংলাদেশে ভারত নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে ভারত বাংলাদেশে নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমতে থাকবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

ঐক্যফ্রন্ট ফেনোমেনাঃ  হাসিনার ক্ষমতায় দাঁত বসানোর দিক থেকে বিচারে ঐক্যফ্রন্টকে অনেকে হয়ত অসফল বলবেন। কিন্তু অন্তত ভারতকে পাগল করে দেওয়ার জন্য খুবই সফল। আসলে বিএনপি একা না পারলেও ঐক্যফ্রন্ট ভারতকে বিভ্রান্ত ও পাগল করে দিয়েছিল। প্রাইম ঘটনাটা হল, গত একবছর ধরে হাসিনা অনুরোধ করে গেছিল যে ২০১৮ এর নির্বাচনে ভারত যেন ২০১৪ সালের মত প্রকাশ্য সমর্থন জানায়। কিন্তু ভারত তা উপেক্ষা করে গিয়েছে। কেন? অনেক বিবেচনা নিশ্চয় ছিল। কিন্তু সেসবের মধ্যে হাসিনার ‘পাবলিক রেটিং’ সম্পর্কে ভারতের নিজের মূল্যায়ন ছিল মুখ্য নিয়ামক। যা খুব ইতিবাচক ছিল না। তবে এ সম্পর্কে ভারতের মাপ-অনুমান যাই থাক, সেটা নিয়ে ক্রমশ একটা শঙ্কা বড় হচ্ছিল। সেটাকে আরো বড় করে ফেলে ঐক্যফ্রন্টের জন্ম ও আবির্ভাব। এসবের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ও প্রকাশ হল, পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বিখ্যাত উল্টা গান রচনা- হাসিনা ব্যাসিং। কারণ ভারতের সবচেয়ে ভয় হচ্ছিল “ঐক্যফ্রন্ট যদি এসে যায়” কারণ ততদিনে তাদের সব রেটিং অনুমান সেকথাই বলছিল। তাই হাসিনার অনুরোধ উপেক্ষা করা। তবে উপেক্ষার আরো কারণ হিসেবে অন্যান্য কম প্রভাবের ফ্যাক্টরগুলোও ছিল। যেমন হাসিনা চীনের বেল্টরোড প্রকল্পে ঢুকবেই আর ‘বোকার মতো’ সে কথা আবার ভারতকে বুঝাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়েছিলেন, তিনি ভারতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েই সে কথা তুলেছিলেন।

এ ছাড়া আরও বলা যায়, মোদী চান নাই এক্ষেত্রে তিনি সোনিয়ার কংগ্রেস হবেন যাতে তার সচিব গোখলে আগের সুজাতা সিংয়ের মত অ্যাগ্রেসিভ, প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ও রিস্কি কূটনীতিক তৎপরতার বাজে উদাহরণ তৈরি করে। এসব মিলিয়ে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের চার থেকে সাত দিন আগেই কেবল ভারত জানতে পারে যে, নির্বাচনে লীগের নির্বাচনে নিশ্চিত জিতবার স্ট্র্যাটেজি কৌশল ও মেকানিজম কী। কিন্তু এটা জেনে ততদিনে ভারতের অবস্থান বদলের সুযোগ ছিল না বা তা কোন অর্থ বহন করত না।  ফলে ভারত হাসিনার অনুরোধে নতুন করে আর এতটুকুও হেলেনি।  কিন্তু ভারতের কাফফারা শুরু এখান থেকে হচ্ছে এবং আগামিতে তা আরও বিরাট হবে। এসব থেকে এখন এমন এক এত বিশাল থাপ্পড় খেতে যাচ্ছে ভারত, যা এর আগে কখনো কল্পনাও করেনি। শুধু তা-ই নয়, বলা যায় শুরু। হাসিনা-ভারতের সম্পর্ক গত দশ বছরেরও বেশি, এত দিন হাসিনা ছিল ভারতকে তুষ্ট করে রাখতে ব্যস্ত এক অনুগ্রহ প্রার্থী। আর এখন, সম্পর্ক অবশ্যই থাকবে কিন্তু সম্পর্কের ডিকটাট এই প্রথম চলে গেছে ও আরও আসবে হাসিনার হাতে। বাংলাদেশের হাতে যদি না-ও হয় তবুও সুদে-আসলে বহু কিছু শোধ হতে থাকবে। আর ওদিকে সোনাদিয়া বা বেল্টরোড নিয়ে কোনো কথাই তোলার অবস্থায় থাকবে না ভারত।

না, আবারও বলছি – এগুলো ভারত অথবা চীনের ক্রেডিট অথবা ডিসক্রেডিট কোনোটাই নয়। মূল কারণ বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার প্রভাব, আর তা থেকে হস্তক্ষেপের ভয় আশঙ্কায় থাকত যে হাসিনার। তাই মূলত এটা কাউন্টার করতেই ভারতমুখিতা।   ভারত-আমেরিকার মধ্যে চীন ঠেকানোসহ বিশেষ কিছু বোঝাবুঝি সম্পর্কের কারণে সেই সুবিধায় ভারত হাসিনার ভয় আশঙ্কাকে নিস্তেজ অথবা ব্যালেন্স করে দিত বলে একটা অনুমান কার্যকর ছিল। এছাড়া ২০১৪ সালে অনির্বাচিত সরকার গঠন পরবর্তিতে  কূটনৈতিক অস্বীকৃতির সমস্যায় হাসিনার বড় সহায় ছিল ভারত। দুনিয়াব্যাপী ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি আর জাতিসঙ্ঘসহ বহুরাষ্ট্রীয় সব কূটনৈতিক ফোরাম-লবিতে ভারতের হাসিনা সরকারের পক্ষে সমর্থন ও সাফাই গেয়ে যাওয়া হাসিনার জন্য খুবই কার্যকর ও জরুরি ছিল। তাই কাছাখোলা সুবিধা দিয়ে গিয়েছে ভারতকে।

বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে হিউম্যান রাইটস বা অন্য অজুহাতের চাপ বা হুমকি এখন থেকে হাসিনার ওপর না থাকার মতো থাকবে। মানে হাসিনার জন্য আমেরিকার হস্তক্ষেপের ফ্যাক্টর দুর্বল, প্রায় নাই হয়ে থাকবে। তাই এখন থেকে ভারতকে খাতির-তোষামোদ করে, বাংলাদেশ হস্তক্ষেপের সব সুযোগ দিয়ে, দেখেও না দেখা করে রাখার যে দরকার এতদিন হাসিনার ছিল সেটা আর তাঁর কাছে অন্তত অনিবার্য মনে হবে না। এটাকেই হাসিনা-ভারত সম্পর্কের ডিকটাট হাসিনার হাতে আসবে বলছি।

এ ছাড়া অন্য কিছু ফ্যাক্টরও আছে, আগামী মে মাসে ভারতের নির্বাচন। এই নির্বাচন বিজয়ে মোদীর সম্ভাবনা খুবই কম, কংগ্রেস কোয়ালিশনেরও বিজয় সম্ভাবনা কিছু আছে তবে অনেক কম। আঞ্চলিক দলের ফেডারল জোটের সম্ভাবনা বাড়ছে। ধরা যাক যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন জিতে তাহলেও সেই সরকার এখনকার মোদির চেয়েও বেশি চীনা-বন্ধু এক সরকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। যদিও সম্প্রতি উত্তর প্রদেশে দুই আঞ্চলিক দলের জোট গড়তে সক্ষম হয়ে যাওয়া মোদীর বিজেপি এবং রাহুলের কংগ্রেস দুজনের জন্যই খুবই খারাপ সঙ্কেত।  সবচেয়ে বেশি আসনের (৮০) রাজ্য, উত্তর প্রদেশ মোদী বা রাহুল এদের দুই দলেরই হাতছাড়া হয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ফেডারল জোটের বিজয় সম্ভাবনা বেড়ে গেল।

সব মিলিয়ে হাসিনার নতুন সরকারে ভারতের ভূমিকা শুকিয়ে যাবে অনেকটাই। আর ভারতকে কাফফারা দিতে হবে, উল্টো ডিকটাট মানতে হবে। হাসিনার মন্ত্রিসভায় সিনিয়ররা না থাকা বা রাখাতে এরই ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে। চীনের আগবাড়িয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানানোতে এমনটি হয়েছে তা সত্যি নয় বরং খোদ আমেরিকারই গুটিয়ে যাওয়া সব কারণের কারণ।

চীনা ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের পরিস্থিতির পাঠ ও মনোভাব ব্যক্ত করেছে। খুবই পুওর ‘বেচারা ধরনের’ এক মনোভাব, পুরাটাই সরাসরি ‘তেল মারা’ এক রচনা এটা। যেমন এখানে দাবি করা হয়েছে বিরোধিদের নির্বাচনি ফলাফল প্রত্যাখান পশ্চিমাশক্তির উস্কানিতে হয়েছে – [ …further fueling the opposition uproar.]। বস্তুত চীনের এমন মনে করার কোন কারণ নাই যে ‘কোনটা কেন হয়েছে’ সেটা প্রধানমন্ত্রীর জানা নাই। যদি চীনা এই ভাষ্য দিয়ে যেন তারা বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে তারাও সরকারের মন পেতে মাখন লাগাতে আগ্রহী। মনে হয় না এই নিম্ন বিবেচনা প্রধানমন্ত্রী আমল করতে পারবেন না। তবে চীনের  এমন অনুমান ও মনোভাবের মূল কারণ, নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা ও এর নিশ্চয়তা দিতে হবে এটা কোন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক এজেন্ডাই নয়। অথবা রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে কেবল চীন নয়, সাধারণভাবে কমিউনিস্টদের চিন্তা-ভাবনার রেকর্ড খুবই দুর্বল। সোজাসাপ্টা বললে রাজনৈতিক অধিকার, মানে নাগরিক গুম বা খুন হয়ে যাবে না, এর নিশ্চয়তা বা সুরক্ষার আইনি ও মাঠের প্রতিশ্রুতি – এগুলো কোনো কমিউনিস্ট রাজনীতির বিষয় মনে করা হয় না। তারা রাজনৈতিক অধিকার বুঝে না বা আমল করে না, কেবল বোঝে নাগরিকের ‘বৈষয়িক’ লাভালাভ। যেমন অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান লাভ তারা বুঝে। তাও ‘নাগরিক’ শব্দটি দিয়ে সেটা বুঝতে তারা রাজি নয়। কারণ নাগরিক বুঝলেই নাগরিক ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ প্রসঙ্গ এসে পড়ে। যা হোক, চীনের মনোভাব হিসেবে লেখা ঐ রচনায় বয়ানের সারকথা হল, লীগ-বিএনপির ঝগড়ার কারণের নাকি আমেরিকা বাংলাদেশে হাত ঢুকানোর সুবিধা নিচ্ছে। আর চীন ভাল সে এমন হাত ঢুকায় না। ব্যাপার হল, রাজনীতি বা অধিকার – যা চীনের বিষয় বা প্রসঙ্গ নয় তা নিয়ে চীনের কথা বলতে যাওয়ার দরকার ছিল না। তাই এই বাজে কথাগুলো চীন না বললেই পরিস্থিতি তার পক্ষে যেত বেশি। তবে নিঃসন্দেহে চীনের বিনিয়োগ স্পৃহা আর হাসিনার উন্নয়নের রাজনীতি এদুইয়ের পরস্পর পরিপূরক হয়ে উঠার সুযোগ আছে। আর যেটা নিয়েই ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির লোকেদের শঙ্কা ও হতাশা আছে। বাড়তি বিষয় হল, বেল্টরোড বা সোনাদিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশের নিজেরই লম্বা ও গভীর স্বার্থ আছে।

কিন্তু কথা অন্য দিকে। সরকার যেমনই হোক, যে মাত্রারই চোর বা সাধু হোক, চীনের নীতি হলো সব উপেক্ষা করা – জাজমেন্টাল বা ইথিকস বা পুলিশিং অবস্থান না নিয়ে কাজের সম্পর্ক করা। এই অবস্থান আমেরিকার চেয়ে ভালো না মন্দ সে বিবেচনা করতে বসা ভুল ট্রেনে চড়া হবে। আসলে চীনের এই নীতির মানে হল, রাজনৈতিক অবস্থা না, বৈষয়িক লাভালাভের সুবিধাতেই চীনের এখনকার লাভ-মতলব বেশি তাই অন্য দিকে মন না দেয়া। এই নীতিই এখনকার জন্য তার স্বার্থ উদ্ধারে বেস্ট হাতিয়ার। যেটা আবার কালকে বদলাতেও পারে। তাই ঘুষ কমিশন ছাড়া নড়ে না এমন সরকারের সাথে বেস্ট পার্টনার হতে পারে চীনা বিনিয়োগ ও চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ।। চুরির সব ব্যবস্থা সে করে দেবে। আবার কালকে ঐ দেশে তুলনামূলক ভালো সৎ, স্বচ্ছ টেন্ডার জবাবদিহিতার সরকার এলেও চীন তার সাথেও পরিচ্ছন্নভাবেই কাজ-সম্পর্ক গড়বে। মনে রাখতে হবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের দুই বিকল্প বিশ্বব্যাংক উদ্যোগ আছে (BRICS , AIIB), যার প্রধান বিনিয়োগ খাতক হল ভারত। ফলে ভারতের স্টান্ডার্ডে সেখানে চীনকে স্বচ্ছতা, টেন্ডার বা জবাবদিহিতার বিষয়গুলো বজায় রাখতে হয়। অর্থাৎ অবস্থায় পড়লে চীন সেটাও পারে। এটা প্রমাণ করে আপনি চোর-গুণ্ডা অথবা সাধু যা হতে চান, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে কমিশনের টাকা রাখতে চান, সব ব্যবস্থাই করে দেবে চায়না, সবকিছুরই পক্ষে আছে চীন।

এ দিকে আমাদের নতুন সরকার গঠন হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু মনে হচ্ছে যে, সে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছ নয় – তার ভিতরে এমন সত্য বা মিথ্যাভাবে এক অনুতাপ যেন দেখা দিয়েছে মনে হচ্ছে। ভালো ইমেজ গড়ার সক্ষমতা তার থাক আর না-ই থাক, নতুন অর্থমন্ত্রী খায়েশ প্রকাশ করেছেন- ‘এক টাকাও খেলাপি ঋণ হবে না’।
সারকথা কোনো সরকার কি নিজেই নিজের সমর্থক ভিত্তি বদলাতে পারে? মনে হয় না। তাই হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুনই  চালু থাকতে হবে। তবুও এই নির্বাচনের পর দেশী বা বিদেশী সম্পর্কের সবখানেই নতুন ভারসাম্য হাজির হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নির্বাচনের পরে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

ট্রাম্প-কিম বৈঠক, দুনিয়ায় আসন্ন বদলের ইঙ্গিত!

গৌতম দাস

১৪ জুন ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2sc

 

 

আগামি দুনিয়ার বহু কিছুর নির্ধারক হবে এমন, সিঙ্গাপুরের এক বিশেষ ঘটনার দিকে গত ১২ জুন সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল। ঘটনাটা হল, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন – এদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইকোনমিস্ট (৭ জুন ২০১৮) পত্রিকার ভাষায়, [WHEN a great power promises a smaller country a “win-win” deal, diplomats mordantly joke, that means the great power plans to win twice.]  কোনো ক্ষমতাধর পরাশক্তি যখন কোনো তুলনামূলক ছোট রাষ্ট্রের সাথে বৈঠক থেকে ‘উইন-উইন’ (win-win) ফল আসবে বলে জানায়, মানে তাতে ‘উভয় পক্ষের জন্য জিত’ হবে বলে ঢোল পেটায়; তখন এটা নিয়ে কূটনীতিকেরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করেন। কারণ, তাদের জানেন এসব ক্ষেত্রে ওই উইন-উইন কথার আসল অর্থ কী! আদতে সেখানে বিষয়টা দু’জনেরই লাভালাভ ধরণের কিছু নয়, বরং কেবল একজন, পরাশক্তি অংশটার একারই দুইবার বিজয়। এটাই উইন-উইন কথার আসল অর্থ। কিন্তু ইকোনমিস্ট সাবধান করে বলছে, এবারের ঘটনাটা হবে ব্যতিক্রম। কেন?

প্রথম কথা হল, ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্র এখান থেকে কী পাওয়ার আশা করে? অথবা আরো গোড়ার প্রশ্ন, ট্রাম্প এমন বৈঠকে বসতে রাজি হলেন কেন? তার তাগিদ কি অনেক? কী সেই তাগিদ বা দুর্বলতা?

এখানে ঘটনার পটভূমি খুবই পুরনো, সেই ১৯৫০-এর দশকের। অন্যভাবে বললে, সময়টা হল যখন থেকে সোভিয়েত কমিউনিস্টরা লেনিনের সাম্রাজ্যবাদ ধারণা বা শব্দকে নিয়ে এবার আমেরিকাকে ‘সাম্রাজ্যবাদ’ বলে ডাকা বা গালি দেয়া শুরু করেছিল। কারণ এর আগে আমেরিকার হাতে দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কোনোটাই ছিল না, তাই। ছিল ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফ্রান্সের মতো কলোনি মাস্টারদের হাতে। অথবা এই বিচারে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মঞ্চে যখন দুনিয়ার নেতৃত্ব ও ক্ষমতার প্রথম এক পালাবদল মঞ্চস্থ হচ্ছিল, ইউরোপের কলোনি মাস্টারদের থেকে আমেরিকার হাতে। এরই ঠিক অপর পিঠের না হলেও অনুষঙ্গ ঘটনা হল, অবিভক্ত কোরিয়া আগে জাপানের কলোনি হয়ে ছিল আর সেবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত জাপানের হাত থেকে কোরিয়া মুক্ত হয়েও এক স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, নাকি আবার ইউরোপের কারও অধীনে নতুন করে চলে যাবে; তার ফয়সালা আসতে দেরি হচ্ছিল।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্ন বা ইচ্ছা কোনোটাই ছিল না দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়ায় কাউকে নিজের কলোনি করে রাখায় অথবা অন্য কাউকে কলোনি করতে দিতে। বরং “নিজস্বার্থে কলোনি ব্যবস্থা উতখাত” এই মূল নীতিতে তিনি বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকাকে পরিচালিত করেছিলেন। তাই ১৯৪৫ সালে সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় তাঁর হঠাৎ মৃত্যুতে পরের রুজভেল্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট, রুজভেল্টের ভাবশিষ্য এবং পরবর্তি (প্রায় আট বছরের) প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যানের নীতিও ছিল রুজভেল্টের নীতি ও এরই ধারাবাহিকতা। কিন্তু তাঁরও পরের নির্বাচনে বিজয়ী হিসাবে ১৯৫৩ সালের জানুয়ারিতে পরের প্রেসিডেন্টের শপথ নেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সেনাপতি আইসেনহাওয়ার। আর এতেই ঝুলে থাকা ট্রুম্যানের আমেরিকান নীতি বাস্তবে এতদিন যে দ্বিধা ও লিম্ব হয়ে ছিল যে, কলোনি-উত্তর পরিস্থিতিতে কোরিয়া কি আমেরিকার কলোনি হবে নাকি কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে, এবার সেটা নির্ধারিত হয়ে যায়। নতুন পথে যাত্রা শুরু করে।
রাষ্ট্রসংঘ জন্মের পরেপরে এর উদ্যোক্তা নেতা ছিল আমেরিকা। তার তা ছিল দুনিয়ার যে কোন বিবাদে মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নেয়া ট্রুম্যানের আমেরিকা। এবার তা আইসেনহাওয়ার আমেরিকা হয়েই আর মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা নয়, এবার নিজেই একটা পক্ষ হয়ে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে সামরিক একশনে চলে যায়। আমেরিকা ১৯৫৩ সালে ‘কোরিয়া যুদ্ধ’ শুরু করেছিল। তবে এই যুদ্ধ লম্বা সময়ব্যাপী অমীমাংসিত হয়ে যেতে থাকায় শেষে এ থেকে বের হতে – কমিউনিস্ট কোরিয়া আর আমেরিকা প্রভাবিত কোরিয়া – এভাবে দুই রাষ্ট্রে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া হিসেবে এক আপসরফায় কোরিয়া ভাগ হয়ে যায়। সামনে উদাহরণও ছিল ১৯৪৯ সালে বিপ্লব করা মাওয়ের চীন।  চীনা বিপ্লবের শেষের দিকে সেখানেও মূল চীন থেকে দ্বীপাঞ্চল তাইওয়ানকে আলাদা রাষ্ট্র বলে ভাগ করে বিপ্লব বা যুদ্ধের পরিসমাপ্তি করা হয়েছিল।

আসলে পুরনো জাপানিজ কলোনি অবিভক্ত কোরিয়া মুক্ত হয়ে নতুন তর্কের মধ্যে পড়ে যে, এবার তা আমেরিকান প্রভাবমুক্ত কোরিয়া হবে, না কমিউনিস্ট কোরিয়া হবে – এ বিষয়টিরই আপাত মীমাংসা মনে করা হয়েছিল কোরিয়া ভাগ করে দিয়ে। ফলে এটাকে বলা যায় সোভিয়েত-মার্কিন ‘কোল্ড ওয়ারের’ যুগ শুরুর অন্যতম উদাহরণ। [আর এক উদাহরণ ইরান, নিজ তেল সম্পদের মালিকানা রক্ষার বিবাদ] আর সেই সময় থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকা নিজের স্থায়ীভাবে সেনা ব্যারাক বানিয়ে অবস্থান নিয়েছিল, যা এখনো বর্তমান। সেই থেকে আমেরিকাই এই দেশ দুটোর প্রতিরক্ষা দেখার কাজ স্বতপ্রবৃত্তভাবে নিজের দখলে নিয়ে নিয়েছিল। আর তা থেকে এর পরে আরেক সমস্যার সৃষ্টি হয়।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান থেকে ঘাঁটি এসে আমেরিকা যেকোনো সময় উত্তর কোরিয়ায় হামলা করতে পারে, উত্তর কোরিয়ায় এই আশঙ্কা বাড়তে থাকে। আর এই চাপ থেকে মুক্ত হতে একমাত্র উপায় বা সমাধান হিসেবে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ঝুঁকে যায় ও সফলতাও লাভ করেছিল। এতে চাপ এবার উল্টো আমেরিকার ওপর পড়ে। আমেরিকা বুঝে যে, উত্তরকে কোন রকম চিন্তাভাবনা না করে, যথেষ্ট না করে বা ভুলভাবে নাড়াচাড়া করলে দুনিয়ার সকলকেসহ ঐ এলাকার সবাইকে পারমাণবিক বোমার বিপর্যয় দেখতে ও ভুগতে হতে পারে।

তবে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে উত্তর কোরিয়া প্রমাণ করেছিল, পারমাণবিক বোমা লাভ নিঃসন্দেহে দুনিয়ায় প্রাণ প্রকৃতি ও জীবন টিকে থাকার দিক থেকে খুবই বিপজ্জনক ও চরম আত্মধ্বংসী ও ক্ষতিকারক এক কাজ। তা হওয়া সত্ত্বেও অন্য আরেক দিক বিচারে পারমাণবিক বোমা অর্জন আর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের রক্ষাকবজ যেন প্রায় সমার্থক। বোমা নিজ নাগালে থাকলে আমেরিকার মত পরাশক্তির হাত থেকেও নিজের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব। আবার এটাও ঠিক, এই বোমা অর্জন মানে গরিব দেশের জনগোষ্ঠীর সীমিত সম্পদের উপর নতুন এক বিপুল পরিমাণ খরচ জোগানোর দায় চাপানো। জনগণের জীবনমান কমিয়ে ফেলা, কম্প্রোমাইজে ঠেলে দেওয়া। উত্তর কোরিয়া তবুও সব বিবেচনা শেষে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষাকেই প্রাধান্যে রেখে অবস্থান ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অপর দিকে এতে আমেরিকার দিক থেকেও কিছু সান্ত্বনা ছিল যে, উত্তর কোরিয়ার বোমা সরাসরি আমেরিকা পর্যন্ত পৌঁছানোর যোগ্য নয়। কারণ, কোরিয়া থেকে আমেরিকা হাজার পাঁচেক মাইল দূরে আরেক মহাদেশে। যদিও দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে আমেরিকান স্থাপনা বা বিনিয়োগ সহজেই উত্তর কোরিয়ান বোমা খাওয়ার নাগালে ছিল, এটাও কম ঝুঁকি বা বিপদের নয়। তবে সামগ্রিক ফলাফলে সেই থেকে কোরিয়া-জাপান-চীন এশিয়ার এই কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলের প্রায় সবার (আমেরিকাসহ) পকেটে পারমাণবিক বোমা আছে বলে কেউই আর যুদ্ধের ঝুঁকিতে যায়নি, এড়িয়ে চলতে পেরেছে। কিন্তু ভুলচুকে বা উত্তেজনায় কখনো সবাই বোমা খেয়ে মরতে হতে পারে, পারমাণবিক বোমার ভয়ে ভীতিকর সেই সম্ভাবনা ওই অঞ্চলে টিকটিক করে আছে।

ইতোমধ্যে ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা বিশ্বব্যবস্থায় এই বিষয় সম্পর্কিত দুটা বড় ধরণের পরিবর্তনের বিষয় সামনে এসেছে।

প্রথমটা হল, চীনের অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে নিশ্চিত উত্থান। আর সাথে  ঘটেছে সম্ভাব্য গ্লোবাল লিডার হিসেবে আমেরিকার জায়গা দখল করে নিতে যাচ্ছে চীন। এ ছাড়া, বিশ্বের উদ্বৃত্ত সম্পদ একুমুলেশন বা সঞ্চিত হওয়ার একমাত্র এবং অপ্রতিদ্বন্দ্বী গন্তব্য হয়েছে এখন চীন। ফলে ভিন্ন শব্দে বললে চীন এখন একমাত্র ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সক্ষমতার উদীয়মান সুর্য। ফলে এক নির্ধারক রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী এখন চীন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এক দিকে যত সম্পদ বাড়ে ততই সেটি সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তাও বেশি হতে থাকে। সম্পদ যত কম তা সুরক্ষার বালাই তত কম। তাই চীনের এই স্বার্থ,  বা ফলাফলে তার যেকোন কথার ওজনও অন্য সবার চেয়ে বেশি ভারী হয়ে ওঠে।

যদিও চীন খোদ নিজেই পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়েছিল সেই ১৯৬৪ সালে; তবুও চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের সাথে সাথে পারমাণবিক বোমা ঝুঁকিতে থাকা তার নিজের অঞ্চলকে মুক্ত দেখার এক তাগিদ চীনের ভেতর দেখা দেয়াই স্বাভাবিক। ফলে এ সম্পর্কে একটা নীতির কথা চীন বলা শুরু করে তখন থেকে। তা হল, কোরিয়া-জাপান-চীনের ওই পুরো অঞ্চলকেই পারমাণবিক বোমামুক্ত করা। এতেই সবার স্বার্থ সুরক্ষিত হতে পারে। আর একধাপ ভেঙে বললে, ওই অঞ্চলে আমেরিকান কোনো সেনাঘাঁটিতে অথবা তাকে আশ্রয় দেয়া কোরিয়া ও জাপানের হাতে অথবা চীনের হাতেও কিংবা সম্ভাব্য অন্য কারো হাতে বোমা মজুদ না রাখার এই নীতিতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে ঐকমত্যে আসা। যদিও সবচেয়ে বড় প্লেয়ার আমেরিকা কখনো চীনের এই প্রস্তাবের প্রতি গরজ দেখায়নি। অর্থাৎ এই প্রস্তাবের ভেতরে আমেরিকা নিজের তাৎক্ষণিক স্বার্থ দেখেনি; বরং পাল্টা উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগের ডালি খুলে বসে থেকেছে সব সময়। যদিও সেসব অভিযোগ আবার মিথ্যাও নয়। উত্তর কোরিয়াও আবার আমেরিকার বিরুদ্ধে নিজের নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে রাখার জন্য হাজারটা অভিযোগ তুলতে পারবে, সেগুলোও মিথ্যা নয়। তাতে প্রেসিডেন্ট বুশ উত্তর কোরিয়াকে ‘এক্সিস অব এভিল’ বলে ক্ষোভ ঝাড়লেও কিছু এসে-যায় না। উত্তর কোরিয়া পাকিস্তান বা ইরানকে বোমা সংগ্রহ ও অর্জনে সাহায্য করেছে, এ কথা মিথ্যা নয়। এক কথায় বললে ১৯৪৫ সালে জাপানে আমেরিকার পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ, অর্থাৎ ব্যবহার ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর থেকে সোভিয়েত-মার্কিন এক সমঝোতা হয় যে, দুনিয়ায় আর সব রাষ্ট্রকে বোমা অর্জন থেকে দূরে রাখা তাদের উভয়েরই কমন স্বার্থ। এটাকে দুনিয়ায় পরমাণু অস্ত্রের আরও বিস্তার ঠেকানোর জন্য সমঝোতা বলে হাজির করারও সুযোগ ছিল। ফলে বলা যায়, এও সমঝোতার প্রতিক্রিয়া দুনিয়াতে এক উল্টো অপবস্থা তৈরি করে। তা হল, এখান থেকেই  সোভিয়েত-মার্কিন এ দুই রাষ্ট্রের বাইরের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে টেকনোলজি শেয়ার ও বেচা-বিক্রির এক নতুন দুনিয়া শুরু হয়েছিল। তবে ওয়ার অন টেররের আমলে ব্যাপারটা আরও কিছু নতুন মাত্রা পেয়েছিল। তা আমেরিকার এই ভয় থেকে যে, র‍্যাডিক্যাল সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির ধারাগুলো যেন এই টেকনোলজি বা বোমা  হাতে না পেয়ে যায়। আর উত্তর কোরিয়া যেন এর সরবরাহকারী হিসেবে না হাজির হয়ে যায়। সেই সম্ভাবনা ঠেকানোর অভিপ্রায় থেকেই বুশ ‘এক্সিস অব এভিল’-এর তত্ত্ব হাজির করেছিলেন।

ইতোমধ্যে একালের উল্লেখযোগ্য দ্বিতীয় নতুন ঘটনা হলো উত্তর কোরিয়ার ইন্টার কন্টিনেন্টাল ব্যালেস্টিক মিসাইল অর্জন। মানে মহাদেশ টপকিয়ে মিসাইল ছুড়ে মারার যে সীমাবদ্ধতা উত্তর কোরিয়ার ছিল, তা সে কাটিয়ে তুলতে পেরেছে। এসবের ঘোষণাও প্রকাশ হয়ে পড়া থেকেই নতুন তোলপাড় শুরু হয় কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চলে। চীনের পুরনো প্রস্তাব আবার আলো-বাতাস পায়।

কিন্তু এবার আমেরিকা এখন তার যৌবন হারিয়ে উত্থান রহিত শরীর ও ক্ষমতায়। বিশেষ করে যখন তার মুরব্বিয়ানা ঢলে পড়ার আমল এসে গেছে তখন এসব ঘটছে। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধের ডালি খুলে লড়াই শুরু করেছিল তখন উত্তর কোরিয়ার নতুন সক্ষমতার কথা চাউর হয়েছে। ট্রাম্প যেন তাই লজ্জার মাথা খেয়ে হলেও চীনকে নিজের প্রভাব বিস্তার করে উত্তর কোরিয়াকে মানাতে কাজ করতে অনুরোধ করে। অর্থাৎ আমেরিকান প্রভাব এখানে ভোঁতা ও অকার্যকর, সেটাই যেন মেনে নিয়েছিল আমেরিকা। সবচেয়ে বড় কথা, অতি দ্রুততায় সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প চীনকে তাগিদ দিয়ে জানান, উত্তর কোরিয়াকে ডি-নিউক্লিয়ারাইজড অবস্থায় তিনি দেখতে চান। এর জন্য আমেরিকাকে কী কী করতে হবে সেসব শর্ত নিয়ে কথা শুরু করতে তিনি রাজি। এ অংশটির সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নিয়েছিলেন কল্পনার চেয়েও দ্রুততায়। ফলে চীন মাঠে নেমে তৎপরতায় নিজের প্রভাব ব্যবহার করে কাজে নেমে যায়।

আগামী দিনে ইতিহাস লিখতে বসে ঐতিহাসিকেরা নিশ্চয়ই মৃদু তর্ক করতে পারেন যে, কবে থেকে অথবা কোন ঘটনা থেকে চীন আমেরিকাকে হটিয়ে সেই জায়গায় বসে দুনিয়াকে নেতৃত্ব দিতে শুরু করেছিল, সেই প্রারম্ভিক ঘটনা কোনটি? সেই প্রারম্ভিক ঘটনাটি কী হবে, তাই যেন নির্ধারিত হতে যাচ্ছিল প্রায়। সেটি হত, সম্ভবত চীনা উদ্যোগে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে পারমাণবিক ইস্যুতে সমঝোতা ঘটিয়ে দেয়া।
হত বলছি এ জন্য যে, এটা যত দ্রুত ঘটার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল, তাতে হঠাৎ ‘জন বোল্টন’ সিম্পটম দেখা দেয়ায় ঘটনায় ছেদ ঘটে যায়। ফলে তা থমকে দাঁড়িয়েছিল। মাস খানেকেরও বেশি আগে ঠিক হয়েছিল ১২ জুন চীনা উদ্যোগ কাজ শুরু করবে সিঙ্গাপুরে ট্রাম-কিম সরাসরি এক আলোচনা থেকে।

জন বোল্টন এখন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, একজন হকিস (hawkish) বা যুদ্ধবাজ। বুশের আমলে তিনি রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকান প্রতিনিধি ছিলেন, আজকের নিকি হ্যালি যে পদে আছেন। বোল্টনের বৈশিষ্ট্য হল, বল প্রয়োগ আর জবরদস্তিই সব কিছুর উপযুক্ত সমাধান বলে বিশ্বাসী তিনি। ট্রাম্পের গ্রিন সিগনালে চীনা উদ্যোগ পারমাণবিক সমঝোতার তৎপরতা যখন মাঠে কাজে নেমেছিল, সে সময় হঠাৎ করে সম্ভবত সেকেন্ড থট হিসেবে ট্রাম্প পিছটান দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আর এরই বাস্তবায়নে তিনি বোল্টনকে ভিলেন হিসাবে মাঠে ছেড়ে দেন বলে অনেকের অনুমান। আর তা থেকে অনেক লিখেন, TRUMP-KIM TALKS: THE ART OF NO DEAL অর্থাৎ ট্রাম্পের কৌশল ছিল, কী করে একটা হবু ডিল ভেঙ্গে দিতে হয়

লিবিয়ার গাদ্দাফির কথা আমাদের মনে আছে। তিনিও তার পারমাণবিক কর্মসূচি যা ছিল তা গুটিয়ে রেখে আমেরিকার সাথে ডিল করতে গিয়েছিলেন সেই ২০০৪ সালে, আমেরিকা কখনও লিবিয়ায় আক্রমণে যাবে না- এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে। কিন্তু মাঝখানে ওবামার আমলে আরব স্প্রিংয়ের উত্থানের কালে আমেরিকা বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে। পারমাণবিক কর্মসূচি-হারা গাদ্দাফি – তার ওই দুর্বলতার সুযোগে ওবামার আমেরিকা তাকে ক্ষমতাচ্যুত ও নৃশংসভাবে পাবলিক লিঞ্চিংয়ে হত্যা করেছিল। জন বোল্টন এক টিভি কথোপকথনে উত্তর কোরিয়ায় ‘লিবিয়া মডেল’ প্রয়োগ করবেন বললে সেখান থেকেই এই সন্দেহের ঝড় উঠে আসে। যে তিনি সম্ভবত হুমকি দিচ্ছেন। আমেরিকা বিশ্বাঘাতক সেটাই তিনি যেন মনে করায় দিয়ে, এর মাধ্যমে বলপ্রয়োগের হুমকি বা চাপ তৈরি করে কাজ আদায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

গত ১৯৯২ সাল থেকেই আমেরিকা-উত্তর কোরিয়া বা দুই কোরিয়ার “শান্তি” আলোচনার উদ্যোগ চলে আসছে। ফলে এবারের দুই কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের প্রথম সাক্ষাত (যেখান থেকে পরিণতিতে আমেরিকা-উত্তর কোরিয়ার ১২ জুন বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছিল) যেটা ২৫ এপ্রিল শুরু হয়েছিল সেটা নতুন না হলেও, এবারেরটা একেবারে নতুন ছিল। কী অর্থে?

সবচেয়ে বড় কারণ দৃশ্যমানভাবে এবারের সমঝোতা আলোচনার উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হল রাইজিং চীন। এর তাতপর্য সুদুর প্রসারি। খুব সম্ভবত এটাই গ্লোবাল বিরোধ মীমাংসায় উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী হিসাবে চীনের ভুমিকার প্রথম প্রয়াস হিসাবে চিহ্নিত হবে। এটাকেই এক এম্পায়ার রোল – দুনিয়ার এম্পায়ারের ভুমিকা  ও নেতৃত্ব নেয়া বলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই ভুমিকা পালন করে আসছিল আমেরিকা। একারণের আলোকেই বলেছিলাম আগামি ইতিহাসবিদেরা সম্ভবত চীনের এম্পায়ার বা নেতা হওয়ার সুত্রপাতের ঘটনা বলে চিহ্নিত করবে। আবার মনে করিয়ে দেই এই ভুমিকাটা – উদ্যোক্তা ও মধ্যস্থতাকারী গ্লোবাল নেতার। ডিপ্লোমেসিরর ভাষায় “main powerbroker behind” বলা হয়। এদিকটা বুঝে এই অঞ্চলের মিডিয়া পলিটিক্যাল কমেন্টেটর BERTIL LINTNER এর ভুল হয় নাই। এই প্রসঙ্গে তার লেখা এখানে দেখা যেতে পারে।

উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এর চীন সফর দিয়ে এবারের চীনের উদ্যোগে পারমাণবিক সমঝোতার বল গড়ানো প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করা যেতে পারে। এটাকে বলা যায় কী কৌশলে আগানো হবে এর কমন আন্ডারস্টাডিং ও ব্রিফিংয়ের সফর। এরপরে ২৫ এপ্রিল উত্তরের প্রেসিডেন্ট কিম এবার দক্ষিণ কোরিয়া গিয়ে ওখানের প্রেসিডেন্ট মুনের সাথে বৈঠক করেন। কিন্তু এর আগে কিমের চীন সফর ছিল লিডিং ঘটনা। কেন?

এক. এবারের নেতা ও উদ্যোক্তা আর আগের প্রত্যেকটার মত (দুনিয়ার নেতা) আমেরিকা নয়, চীন। দুনিয়ার হবু নেতা এখন চীন।

দুই. কিম এবারও দক্ষিণ কোরিয়া যাবেন। কিন্তু আগের দক্ষিণ আর এবারেরটা এক নয়। আগের দক্ষিণ আমেরিকার এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র। আমেরিকার উপর নিজ নিরাপত্তার ব্যাপারে শতভাগ নির্ভরশীল রাষ্ট্র। আর এবার? এটা ট্রাম্পের আমেরিকা। একলা চল ‘আমেরিকা ফাস্ট’ এর আমেরিকা অর্থাৎ আমেরিকার আর এম্পায়ার নয়। গ্লোবাল বিরোধে কোন উদ্যোক্তা মধ্যস্থতাকারির ভুমিকা ত্যাগী আমেরিকা। এন্টি গ্লোবালাইজেশনের আমেরিকা। ট্রাম্প নিজেই আগে থেকে বলে আসছে, এবারের কিমের সাথে আলোচনায় সেটা দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের স্বার্থকেও সাথে মনে রেখে কথা বলা সেটা প্রাধান্য নাও পেতে পারে। কারণ এটা ‘আমেরিকা ফাস্ট’।

তিন. ফলে এটা দক্ষিণ কোরিয়ার এক বাপ-মা হারা দশা। আর ঠিক এটাকেই ক্যাশ করতে এবারের কিম – দক্ষিণের প্রেসিডেন্ট মুনের (Moon Jae-In) সঙ্গে সাক্ষাতে অতিরিক্ত উদার, আলিঙ্গনের বডি ল্যাঙুয়েজে। ব্যাপারটা অনেক মিডিয়াও নজর করেছে।  কিম ইঙ্গিত দিয়ে বুঝাতে চাইছেন কাল দিন, এম্পায়ার আমেরিকার দিন শেষ। এখন আমরা আমরা আমাদের নিজেদের বিরোধ নিজেরাই সমাধান করতে আগায় আসতে পারি। এবং আমি কিম রাজি। যারা সাক্ষাতের ভিডিও ক্লিপটা দেখেছেন, তাদের আমার কথা বুঝতে সহজ হবে।

এককথায় বললে, চীনের নেতৃত্বে আসন্ন নতুন দুনিয়ায় এক নতুন উষালগ্নে কিম-মুন আলোচনা হচ্ছে – একথাটা যেন দক্ষিণের মুন এর পক্ষ বুঝে এটাই কিমের মুল বার্তা।

তবে ১২ জুনের বৈঠকের উপর মাঝে অনিশ্চিতর কালো ছায়া পড়েছিল প্রকাশ্য মূল যে বিবাদকে কেন্দ্র করে তা হল, যখন উত্তর ও দক্ষিণের প্রেসিডেন্টদ্বয় পারস্পরিক সাক্ষাৎ ও কথাবার্তার কারণে ইতিবাচক আবহ তৈরি হয়েছিল; কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ করে দক্ষিণ কোরিয়া আর আমেরিকা যৌথ সামরিক মহড়া শুরু করে। আর তা থেকে উত্তর কোরিয়ার কিম সব যোগাযোগ-আলোচনা ভেঙে দেন।

প্রশ্ন হল, ট্রাম্প কেন সাময়িক পিছু হটে গিয়েছিলেন? বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া করে নেতি কালো ছায়া কেন ছুড়েছিলেন? খুব সম্ভবত খোদ আমেরিকা উত্তরের কিমের পারমানবিক বোমার নাগালে – এর যে নিরাপত্তা হুমকি তা ট্রাম্পের প্রশাসনের কাছে এক বিরাট বিষয়। অন্যদিকে চীনের উদ্যোগ ও মধ্যস্থতায় যদি প্রমানুমুক্ত উত্তর কোরিয়া পাওয়া যায় তবে তা বুড়া সিংহ আমেরিকার জন্য অমুল্য। কারণ কোন যুদ্ধ ক্ষয়ক্ষতি, অর্থ প্রাণ কিছুই না হারিয়ে উলটা নিজ পারমানবিক বোমা থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত পাওয়া। কিন্তু এর মূল্য বা খেসারতও কী কম?

এঘটনার ভিতর দিয়ে চীন দুনিয়ার এম্পায়ার, গ্লোবাল বিরোধে  উদ্যোগ ও মধ্যস্থতাকারি হিসাবে স্বীকৃত হয়ে যাবে। শুধু তাই না এটা আমেরিকার নিজের হাতে দেয়া স্বীকৃতি হবে।

কিন্তু ইতোমধ্যে কিমও বোল্টনের টিভি সাক্ষাতকার আর দক্ষিণের সাথে যৌথ সামরিক মহড়া দেখে প্রচন্ড হতাশ ও ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিলেন।  তিনি দক্ষিণের প্রেসিডেন্টকে দায়ী করেন। এই বিরাট ঐতিহাসিক সুযোগ হেলায় হারানোর জন্য। তাই ঘটনার গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে মুনকে তিনি  ‘অজ্ঞ’ ও ‘অযোগ্য’ বলে অভিযুক্ত করেন। এছাড়া, দক্ষিণ কোরিয়ার ভিতরের নেপথ্যের সংবাদ হল, জেনারেলরা নিজ স্বার্থে ও আমেরিকান প্ররোচনায় এই কাজ করেছিল। ফলে উত্তর কোরিয়ার কিমের এই ঘোষণার ফলে ১২ জুনের বৈঠক অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পরে এবার ট্রাম্পের দিক থেকে ২৫ মে ওই বৈঠক বাতিল উল্লেখ করে কিমকে চিঠি দেয়া হয়। ফলে সব আশা-ভরসা শেষ হয়ে যায়।

দোদুল্যমান ট্রাম্প প্রশাসন আসলে উভয় সঙ্কটে আছে। কিন্তু পারমানবিক বোমা খাওয়া থেকে নিজের নিরাপত্তা রক্ষার ইস্যু আবার প্রাধান্য পায়।  খুব সম্ভবত একারণেই  দোদুল্যমান ট্রাম্পেরআবার পিছু হটেন। নিজ নিরাপত্তার কথা ভেবে সেটাকেই প্রাধান্য দিতে এগিয়ে আসা। আবার সিদ্ধান্ত বদলান।

সুযোগ নেন এই বলে যে, আলোচনা ভঙ্গ হয়ে গেলে এতে চীন নিজে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে জানিয়েছে। এবং আমেরিকাকে নিজের উদ্বিগ্নতার কথা জানিয়েছে।  কোরিয়া উপদ্বীপকে অনিশ্চয়তায় ফেলে রাখলে তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় চীন। অতএব চীনের আবেদনে সাড়া দিতেই ট্রাম্প এটাকে আবার উদ্যোগ নেয়ার অছিলা হিসেবে নেন। আর এতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হঠাৎ করে আবার উত্তরে সফরে যান। আর তাতেই আবার ১২ জুনের বৈঠক প্রাণ ফিরে পায়।
এতে ফলাফল কী আসবে, সেটি জানতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ ঘটনার শুরু থেকেই কোনো পশ্চিমা মিডিয়া বা একাডেমিক বা থিংকট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান- কেউ ট্রাম্পের কথা বা কাজের ওপর আস্থা রেখেছেন, এমন দেখা যায়নি। যেমন বোল্টনের মন্তব্যের সময় থেকেই মিডিয়ায় সব ধরনের ভাষ্যের সারকথা ছিল কোন ডিল কেমন করে না করতে হয়, ভেঙে দিতে হয়, এড়িয়ে যেতে হয়; ট্রাম্প তার ওস্তাদি আমাদের দেখাচ্ছেন এই ছিল তাদের মূল্যায়ন। অর্থাৎ সব কিছুর দায় এককভাবে পশ্চিমা সমাজ ট্রাম্পের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। ট্রাম্পের একা চলার নীতি যেমন এই বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপানের স্বার্থের দিক থেকে কথা তুলবে না, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগও আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ট্রাম্প-কিম বৈঠক”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

এই রচনার উতসর্গঃ সাইফুল ইসলাম কে। আমার সব লেখার একনিষ্ঠ পাঠক। তাঁর নিরন্তর তাগিদ থেকে এলেখার জন্ম।

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন বাঁক

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন বাঁক

গৌতম দাস
২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার

https://wp.me/p1sCvy-2qc

ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন ও উল্লেখযোগ্য বাঁক নেয়া শুরু হয়েছে। একালে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিরোধ বা স্বার্থসংঘাতের ধরন ও প্রকাশ কিছুটা নতুন। কারণ, এখন বিরোধ বা সংঘাত হয় ইস্যুভিত্তিক; মানে একেক ইস্যুতে একেক রকম। অর্থাৎ এক ইস্যুতে চরম বিরোধে সামরিক সংঘাত পর্যন্ত লাগার অবস্থা, অথচ একই সময়ে আরেক ইস্যুতে গলাগলি সহযোগিতা অথবা আধা সহযোগিতা, কিংবা নিউট্রাল অথবা সুপ্ত বিরোধে আগানো ইত্যাদি নানা রূপ এখন দেখা যায়। অবশ্য এর কোনো কোনোটা দীর্ঘ সময় বা স্থায়ীভাবে মুখ্য বিরোধের বিষয় হয়ে থাকে।

ভারতের পিঠে হাত রেখে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment) পলিসি, একটা ভিত্তি প্রস্তুত করা অর্থে শুরু হয়েছিল মোটা দাগে ২০০৫ সাল থেকে বুশের আমলে। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার দুই টার্মের সময়ে সেটা আরো পোক্ত হয়েছিল, অ্যাকশনে গিয়েছিল। আর সেটাই ট্রাম্পের আমলে এঁটে বসা পলিসি হিসেবে এখনো আছে, তবে প্রশাসনের রুটিন গাইডলাইনের মত। মানে অতিরিক্ত বা নতুন কোনো মাত্রা তাতে যোগ হয়নি। তবে ট্রাম্পের অর্থনীতি্তের বৈশিষ্টে – বাজারে কাজ সৃষ্টি, হাতছাড়া হওয়া কাজ ফেরানো অথবা  ‘আমেরিকা ফাস্ট’ ধরনের যেসব কথিত ‘দেশী জোশের’ (অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন) কর্মসূচি আছে তাতে অর্থনৈতিকভাবে ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক। বিশেষ করে আইটি খাতে ভারত বাজার ও চাকরি হারিয়েছে; কিন্তু তা নিয়ে ট্রাম্প কোনো দয়ামায়া দেখাননি, বিকল্প কিছু দিয়ে ক্ষতিপুরণ করেননি । এমনিতেই আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসিকে ভারতের দিক থেকে দেখা হয়েছিল এভাবে যে, এর আসল ঠেকা আমেরিকানদের। ফলে আমেরিকা ‘ভালো দাম ধরে দিলে’ তবেই ভারত এতে খেদমত করতে রাজি। ফলে ব্যাপারটা যেন এমন যে – আমেরিকা হল তোয়াজকারি কাজদাতা আর ভারত এক্সিকিউটর বা বাস্তবায়ক। ‘উপযুক্ত মূল্য দাও তো কাজ করে দেবো’ ধরণের এক সম্পর্ক। তবে আবার ভারতের অনুভূতি হল, আমেরিকাকে তার দরকার, গভীরভাবে দরকার। এটা তার অন্তরের অনুভব; অন্তত দু’টি প্রসঙ্গে। এক. আমেরিকা হলো ভারতের জন্য পারফেক্ট অস্ত্রের সরবরাহকারী বা উৎস। কারণ, ভারতের দৃষ্টিতে তার নিজের সমস্যা হচ্ছে, কখনো যদি কোনো সামরিক বিরোধে তাকে জড়াতে হয় তবে সম্ভাব্য সেই যুদ্ধের বিপক্ষ হিসেবে চীনকে দেখতে পায় সে। পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়ে ভারত দেখে চীনকে; কারণ, পাকিস্তান বিষয়টা ভারত নিজেই ম্যানেজ করতে পারবে বলে মনে করে। ওদিকে আবার চীন-ভারত বাণিজ্য সম্পর্কে আমদানি-রপ্তানি হয় মোট প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের, যেখানে ৯০ শতাংশই চীনা রফতানি। এছাড়াও ভারতে চীনা বিনিয়োগ আছে। কিন্তু তাই বলে, ভারতে চীনা অস্ত্র আমদানি এক অসম্ভব কল্পনা। আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গ হল, যে পাড়ায় আপনি থাকেন সেখানে সম্ভাব্য বিরোধের বিষয় থাকলে আপনি আগেই পাড়ার প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সালিস বৈঠকের সাধারণত মধ্যস্থতাকারী যে হয় তাঁর সাথে আগাম যোগাযোগ রাখা দরকার মনে করেন। ভারতের কাছে আমেরিকার গভীর প্রয়োজন মূলত এখানেই।

সম্প্রতি সম্ভবত ভারত মত ও নীতি বদলিয়েছে বা বদলাচ্ছে। মানে, আমেরিকা যেসব সুযোগ সুবিধা ভারতকে দেয়ার জন্য কমিটেড, যেসব বাড়তি বা ফাও সুবিধা ভারত পায়, সে বিষয়টি ভারত নতুন করে সম্ভবত মূল্যায়ন করেছে। অনুমান হলো, ভারত চেষ্টা করলে আরো বেশি মূল্য আদায় করতে পারে। ফলে সে আমেরিকার উদ্দেশ্যে নাক উঁচা করেছে।

ঘটনা শুরু হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের’ বার্ষিক সভায়। এ সভা মূলত অর্থনীতিতে গ্লোবালাইজেশনের ইস্যুতে সুবিধা-অসুবিধা বা বাধা নিয়ে এক ধরনের সমন্বয় সভা। ফলে এর মূল ফোকাস হল, গ্লোবালাইজেশন। ওদিকে, গত বছর ট্রাম্প নির্বাচনে জিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়ে শপথ নেয়ার সময় থেকেই অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের ধারণায় তথাকথিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতিবাদী নীতির কথা বলতে শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ গ্লোবালাইজেশনের শুরুর দিকের এর সপক্ষে যে মূল নেতা ছিল সেই আমেরিকা এখন ট্রাম্পের আমলে এসে পারুক আর না-ই পারুক ‘উগ্র’ জাতিবাদী এবং নিজ বাজার সংরক্ষণবাদী নীতির স্লোগান তুলেছিল। প্রতিবার এই ফোরামের সভা হয় জানুয়ারির শেষে, মানে গত বছরও তা হয়েছিল ট্রাম্পের শপথ নেয়ার দিন ২০ জানুয়ারির পরে; তবে তা হলেও ট্রাম্প গতবার এই সভায় নিজে যোগ দেননি। ফলে ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ সারা ইউরোপ শান দিয়ে বসে ছিল ট্রাম্পকে ‘ধোলাই দিতে’, কিন্তু পারেনি। একটা জাতিবাদী ভিত্তিক গ্লোবাল অর্থনীতিকে গ্লোবালাইজেশনে নিয়ে যাওয়া অনেক সহজ। কিন্তু একই গ্লোবে বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিগুলোকে একবার একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীলভাবে গড়ে তুলে এবং বাজার শেয়ারের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে সাজিয়ে দিয়ে ফেললে (যাকে আমরা গ্লোবালাইজেশন বলি) তাতে এভাবে ঢুকে যাওয়ার পরে তাকে ফিরিয়ে আবার আগের জায়গায় আনা কঠিন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব। আমেরিকার উদ্যোগে সাড়া দিয়েই ইউরোপ একসাথে গ্লোবালাইজেশনের পথে এসেছিল। কারণ, গ্লোবালাইজেশনে একসাথেই যেতে হয়, একসাথে করার বিষয় এটা। এখন একা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতিবাদী ও সংরক্ষণবাদী নীতি আওড়ানোর ফলে চীন ও ইউরোপের ক্ষোভ বেশি; এমনকি ভারতেরও। তাই এবারই প্রথম ট্রাম্পকে পাওয়ার পর তাকে কঠোর সমালোচনার সামনে পড়তে হয়। আর এবার মোদি সেখানে ছিলেন প্রথম বক্তা। তিনি নাম না ধরে ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী নীতির কঠিন সমালোচনা করেছেন। [“Instead of globalization, the power of protectionism is putting its head up,” ] জলবায়ু-পরিবেশ ইস্যু থেকে দায়িত্ব না নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্যও আমেরিকার সমালোচনা করেন তিনি। এমনকি প্রটেকশনিজম (সংরক্ষণবাদ) ‘সন্ত্রাসবাদের মতোই ভয়ঙ্কর’ (as dangerous as terrorism) বলে এক বাণী দেন তিনি। আনন্দবাজার লিখেছে,  “ট্রাম্পের আমলে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ফলে ধাক্কা খাচ্ছে ভারত-সহ একাধিক দেশ”। এরপরে এমনকি টিট ফর টেট হিসাবে বাড়তি ট্যাক্স আরোপ করার কথা, এভাবে ট্রাম্পও পালটা পাটকেল মারার কথা ভাবছে বলে ভারতের আর এক টিভি, এনডিটিভি জানাচ্ছে।  

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, এটা মূলত দুনিয়ার প্রভাবশালী সরকার এবং ব্যবসায় প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীদের মিলে এক ‘প্রাইভেট-পাবলিক জমায়েত’। ফলে সব দেশের সরকারপ্রধান প্রতিবার নিজে এ ফোরামে যান না। তবে কেউ নিজেকে ব্যবসাবান্ধব বা ব্যবসা-উপযোগী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটা একটা ভাল ফোরাম মনে করা হয়। এ বিচারে গতবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম গিয়েছিলেন। অনেকটা আমেরিকার কাছাকাছি গ্লোবাল লিডার হয়েছে চীন, যেন সেটা জানান দিতে। আর এবার মোদি গেলেন ভারত নেতা হয়েছে; না হলেও অনেক দূর এগিয়েছে, এটা জানাতে। কিন্তু এসব কিছুকে ছাপিয়ে ওঠা এক ঘটনা হল, ভারতের ‘গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে দাঁড়ানো ও আমেরিকার সমালোচনাকে’ চীনের পররাষ্ট্র বিভাগের রেগুলার ব্রিফিংয়ে প্রকাশ্যে ও  সরাসরি প্রশংসা করা হয়। এমনকি চীনা পত্রিকা গ্লোবাল টাইমসের প্রথম পেজে মোদির ছবিসহ এ প্রসঙ্গে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ এ ইস্যুতে আমেরিকা হলো পুরনো নেতা; কিন্তু সূর্যের মতো ক্রমেই ডুবে যাওয়া বিরাট শক্তি। এর বিপরীতে চীন নতুন নেতা, ভারতও উদীয়মান। এ বিচারে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ভারতের অভিন্ন অবস্থান আকাঙ্খিত, এমনই হওয়ার কথা অন্তত ইকোনমিক ইস্যুতে। কিন্তু তা না হয়ে ভারত দুই নৌকায় পা দিয়ে গাছের আর তলার দুই দিকে খামচা দিয়ে খাচ্ছে; যেন দুনিয়ার কোনো কিছুতে তার দায় নেই। আবার ন্যূনতম ন্যায়নীতি বইবার মতো কাঁধই তার তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ তার কাছে এতই তুচ্ছ যে, তাদের ভোটাধিকার পর্যন্ত নষ্ট করে দিতে সে বেপরোয়া, কোনো কিছুতে যার কমিটমেন্ট নেই। আর ওদিকে চীন খামাখা ধর্মবিরোধিতা করে বেড়াচ্ছে আর মানুষের ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টাকেই চীন আমল করার যোগ্য হয়নি বলে, আমাদের ধারণা দিচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক মুল্যবোধের বিষয়ে  গ্লোবাল অর্জনগুলো রক্ষার ও তা বয়ে নিবার জন্য অন্তত মুখে সমর্থন করার যোগ্য, দুনিয়ার আগামী সম্ভাব্য নেতৃত্ব এরা কেউ নয়। এমনই এক অবস্থায় সমগ্র দুনিয়া যেন ঝুলে আছে বা জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে।

এ দিকে আরেক ঘটনা হল – অস্থির সময়ে ‘পাগলা’ ট্রাম্পের আড়ালে আমেরিকার ড্রাইভিং সিটে ক্রমেই সাবেক আর সিটিং জেনারেলরা সংগঠিত হয়ে উঠছেন। ‘পাগলা’ ট্রাম্পকে সামনে রেখে কোর আমেরিকান স্বার্থ ধরে রাখা আর নানাভাবে দুনিয়ার নেতৃত্বে আমেরিকার টিকে থাকা এবং একে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। বুড়া ঘোড়াকে চাবকে আবার খাড়া করার চেষ্টা বলা যায় এটাকে। তেমনি এক ঘটনার ক্ষেত্র হল, থাইল্যান্ড। অর্থনৈতিক দিক থেকে থাইল্যান্ড আমাদের চেয়ে অগ্রসর এবং এর সেনাবাহিনী আমেরিকার হাতে তৈরি। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও আমেরিকার সাথে উঠাবসা করে জন্ম নেয়া। স্থানীয় থাই এলিটদের পছন্দের গন্তব্য ইউরোপের কোনো শহর নয়, আমেরিকা। রাজধানী ব্যাঙ্কক, এর কালচারাল মডেল হচ্ছে আমেরিকা। কিন্তু ওয়াশিংটনের আজকের দুরবস্থা দেখে সেই ব্যাঙ্কক আজ মুখ ফিরিয়েছে, তাদের সম্পর্ক ঢলে পড়া ও স্থবির হয়ে গেছে। তবে সম্প্রতি ব্যাঙ্ককের সামরিক শাসনের ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করেছিল আমেরিকা, এটাও কারণ। সেই স্থবিরতা ঘুচাতে বহুদিন পরে আমেরিকান মেরিনের জয়েন্ট চিফ জেনারেল ডানফোর্ড ব্যাংকক হাজির হয়েছেন। উদ্দেশ্য, পুরনো সামরিক সম্পর্কসহ রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ও চাঙ্গা করা। কিন্তু তিনি প্বরথমেই কথা শুরু করেছেন এভাবে বলে, ‘আমেরিকা কোনো পড়তি শক্তি নয়’ (not a declining power)। অর্থাৎ জেনারেলের মনে আসলে ভয় ঢুকেছে, তা বোঝা যাচ্ছে। তবে বাস্তবতায় কে না ভয় পায়? ওবামাও ২০১১ সালে আয়ারল্যান্ড সফরের সময় পাবলিক মিটিংয়ে বলেছিলেন, ‘দুনিয়াকে আমেরিকাই আরো বহুদিন নেতৃত্ব দিয়ে যাবে, চিন্তার কিছু নেই।’

আর এক ঘটনা হল, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ভারত সফর করে গেলেন। যখন ট্র্রাম্পের আমেরিকা ইরানের সাথে করা নিউক্লিয়ার চুক্তি (এটা আমেরিকা-ইরান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নয়, বরং পি৫+১; অর্থাৎ এর সাথে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো সদস্য ও জার্মানি মিলে একত্রে করা চুক্তি, Nuclear Deal) বাতিল করে আবার কঠোর অবরোধ আরোপ করতে চাইছে। সেটা মূলত ইসরাইল ও সৌদি আরবের চাপ ও লবিতে। এর সারকথায় বলে দেখা যাচ্ছে, চীন ঠেকানো ইস্যুতে আমেরিকার দেয়া সুবিধা সব আদায় করে নিলেও ভারত ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি অনুসরণ করতে পারছে না। অবশ্য ইরান আবার চীনের সাথেও বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। তবে তাতে ভারত অথবা ইরান এদের নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক গড়তে কারো কোন সমস্যা নেই। এর প্রধান কারণ হলো পাকিস্তানের বিকল্প হিসেবে, ইরান হয়ে আফগানিস্তান ঢোকার নতুন এক সড়ক-ট্রানজিট রুট তৈরি করেছে ওই জোট। আনুষ্ঠানিকভাবে এটা ভারত, পাকিস্তানসহ সাত রাষ্ট্রীয় ‘আশগাবাত চুক্তি’ নামে পরিচিত; আর আশগাবাত বা আশাকাবাদ (Ashgabat)  তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী এবং তা ইরানি সমুদ্রসীমায় চাবাহার নতুন পোর্টকে কেন্দ্র করে গড় উঠেছে। ফলে স্বভাবতই ইরান এখানে গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রানজিট হাব’ হবে। বলা বাহুল্য এটা আমেরিকার জন্য অস্বস্তিকর।

এম ভদ্রকুমার ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত। তার ভাষায়, এটা ভারতের আমেরিকান নীতিকে অমান্য ও উপেক্ষা করা। শুধু এটুকুই নয়, ভারতের তৃতীয় তেল সরবরাহকারী দেশ এখন ইরান। এ ছাড়া পুতিনের রাশিয়ার এক কোম্পানি ইরান থেকে ইন্ডিয়া পর্যন্ত  এক গ্যাস পাইপলাইনের প্রকল্পের দিকে এগোচ্ছে। সব মিলিয়ে আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে ভারত নতুন ‘অরবিট’ তৈরি করছে ও যোগ দিচ্ছে। তবে আমেরিকার জন্য ‘সবচেয়ে উদ্বেগজনক’ বিষয় এখানে আর একটা আছে; তা হলো- রাশিয়া, ইরান ও ইন্ডিয়া এরা মিলে তৈরি সব প্রকল্পে পরস্পরের দেনা-পাওনার মুদ্রা হিসাবে তা আমেরিকান ডলারে না করে নিজস্ব মুদ্রায় করবে। বলা বাহুল্য, এটা হবে আমেরিকার জন্য বিরাট ‘বড় ঘুষি’ খাওয়া।

আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ নীতিতে ভারতের আবদার মেটাতে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক দিয়েছে – এটাই হল মূল কথা। কিন্তু এ দিকে যত দিন যাচ্ছে, নানান ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থজোট যত তৈরি হচ্ছে তাতে আমেরিকার বা ভারতের স্বার্থ বেশির ভাগ সময় একই লাইনে মিলছে না বা থাকছে না। অর্থাৎ ভারতের স্বার্থ, আমেরিকান স্বার্থের মুখোমুখি বিরোধী হয়ে যাচ্ছে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হলো মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা ইস্যু। আমেরিকা মিয়ানমার সরকারকে জেনোসাইডের জন্য ধমকাচ্ছে আর ভারত মিয়ানমারের জেনোসাইডের পক্ষে সাফাই বয়ান দিচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারতের ও আমেরিকান স্বার্থ এক জায়গায় থাকছে না।

তবে এ কথা ঠিক, ভারতের ও আমেরিকার স্বার্থবিরোধ প্রকট হয়ে হাজির করার পেছনে কিছু অংশের অবদান ভারত;  আমেরিকার কাছ থেকে বেশি দাম আদায় করার জন্য। এর অর্থ, এখানে আমেরিকানদের ঠেকা বেশি, তাই সেই সুযোগে ভারত বেশি মূল্য আদায় করতে চাইছে। আর বাকি অংশ আমেরিকা বা ভারত না চাইলেও সেসব ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ বিরোধী হয়ে উঠে আসছে, সেটা মৌলিকভাবেই পরস্পরবিরোধী। এই স্বার্থবিরোধ কি তাহলে কোন চূড়ায় বা চরমে পৌঁছেছে? বিশেষ করে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলছেন, ‘টেররিজম নয়; আমাদের প্রধান হুমকি চীন ও রাশিয়া’। ফলে ভারত-আমেরিকান ‘সহযোগিতা’র বেলায় যে অভিন্ন জায়গা বের করা হয়েছিল তা কি এখন বন্ধ বা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে? তাহলে আমাদের কি মুক্তি মিলবে? এ দিকে সতর্ক চোখ রাখতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্পের ১০০ দিনের মূল্যায়ন

ট্রাম্পের ১০০ দিনের মূল্যায়ন

গৌতম দাস

০৯ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:৪০

http://wp.me/p1sCvy-2fj

আমেরিকার চলতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিন পূর্ণ হয়ে গেল। তিনি শপথ গ্রহণ করেছিলেন গত ২০ জানুয়ারি। গত ২৯ এপ্রিল সে ক্ষমতার ১০০ দিন পূর্ণ হল। লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট (২৮ এপ্রিল ২০১৭) বলছে, “আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ১০০ দিনের কাজ ও তৎপরতা মাপার ব্যাপারটা প্রায়ই খুব চাতুর্যপূর্ণ হয়”। (Measuring the performance of presidents is often tricky. ) কথা সঠিক। আসলে এটা যেন নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হয়ে গেলেও এর এক সর্বশেষ অংশ। ঐ প্রচারণায় সত্য-মিথ্যা বহু কিছু বলা হয়, আমাদের ঘরোয়া ভাষায় যাকে আমরা চাপাবাজি বলি, এর চূড়ান্ত মাত্রা ঘটতে দেখা যায়। এ ছাড়া, এটাকে কথা বিকৃত (টুইষ্ট) করা অথবা কায়দা করে মিথ্যা বলার এক চূড়ান্ত মহড়াও বলা যায়। আর ‘ক্ষমতার ১০০ দিন হল’ অনেকটা এমন বলা যে, আমরা বেশি মিথ্যা বলিনি। তা আমরা ক্ষমতা পেলেই প্রথমে কী কী করব বলছি, এর তালিকা দেখে বুঝতে পারবেন। বলা যায়, এটা হল – নির্বাচনের মিথ্যা আর চাপাবাজি থেকে প্রথম সংযত হয়ে বাস্তবে ফেরার প্রয়াস। সে জন্য ঐ ১০০ দিনে বেছে কিছু কাজ ও সিদ্ধান্তের তালিকাও প্রকাশ হতে আমরা দেখি।

তাই,  ট্রাম্প “আমেরিকাকে আবার মহান বানাবেন”  – এই লক্ষ্যে প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনার তালিকা একটা ছিল যাতে ১৮ টা সিদ্ধান্ত-পদক্ষেপ নেবার কথা আর কংগ্রেসে ১০টা নতুন আইনের প্রস্তাব আনার কথা লেখা ছিল। এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপুর্ণ তিনটা ইস্যুও ছিল – ১. আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে বাস্তবিকই কংক্রিটের দেয়াল তুলে বেআইনি অভিবাসীর অনুপ্রবেশ বন্ধ করবেন, সন্ত্রাস-প্রবণ মুসলমান দেশ থেকে প্রবেশকারীদের আমেরিকার প্রবেশ ঠেকাবেন। (যদিও এখানে কথাটা সন্ত্রাস আর মুসলমান শব্দ দিয়ে পরিচিত করে হাজির করা হয়েছিল। কিন্তু এর আসল উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসের কথা তুলে এর আড়ালে আরও কিছু অবৈধ ও চাকরিপ্রার্থী অভিবাসী ঠেকানো/কমানো)। আর চীনের নিজ মুদ্রামান কারসাজি করে আমেরিকার বাজারে নিজ পণ্য প্রবেশের সুবিধা গ্রহণকারী (ম্যানিপুলেটর) হিসেবে করা তৎপরতা বন্ধ করবেন- এমন বিষয়ও ওই ১৮ কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ১০০ দিনের ব্যাপারটা কী, তা নিয়ে  তার ঐ লেখায় ‘ইকোনমিস্ট’  কী মনে করে এমন এক ব্যাখ্যা দিয়েছে। সাময়িকী বলছে, “(১০০ দিন) এই সময়কাল আসলে সে বছর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ব্যবহার কত উঁচুমাত্রায় উঠেছিল তা দেখার একটা সুযোগ। ওই সময়টা আসলে প্রেসিডেন্ট জনপ্রিয়তা উপভোগ করেন, আবার আগের প্রচারণা থেকে নির্বাচন পর্যন্ত পথ চলার পর বিজয়লাভ ঘটে গেলে তাতে তিনি যে জোশ পেলেন, তা ঐ ১০০ দিনে খরচ করেন যাতে এবার তিনি পরের চার বছরের কাজের এজেন্ডা কী হবে, তা ঠিক করেন আর কংগ্রেসকে কী কী আইন পাস করাতে চাপ দেবেন, সে পরিকল্পনা হাতে নেন”। ইকোনমিস্টের কথা একদিক থেকে সঠিক। তবে এর সার কথা হল, বিজয়লাভ করেছ এবার উচ্ছ্বাস থুয়ে বাস্তবের মাটিতে পা নামাও।

ইকোনমিস্ট বলছে, ১০০ দিনের ‘অগ্রগতি খুবই ধীর’ (progress has been slow. )। তবে এর চেয়েও আমাদের আগ্রহ জাগায়, এমন ব্যাপার হল, ইকোনমিস্ট নিজের উদ্যোগে ২২ এপ্রিলে করা, আমেরিকান নাগরিকের ওপর এক সার্ভের খবর দিয়েছে আমাদের। অবশ্য এটা ছোট স্যাম্পলের, ১৫০০ জন। আর ওখানে যাচাইয়ের বিষয় ছিল – “প্রেসিডেন্ট উত্তরদাতাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছেন কিনা”। জবাবদাতাদের মধ্যে ওখানে বড় একটা ভাগ হল, কারা নিজেদের ডেমোক্র্যাট/রিপাবলিকান হিসেবে অর্থাৎ কারা নিজের পার্টিজান পরিচয় দিয়েছেন আর কারা দেননি। সে হিসেবে কোনো না কোনো পার্টিজান পরিচয় যাদের আছে, তাদের মধ্যকার ৩০ শতাংশ মনে করেন, তাদের আশা পূরণ হয়েছে। কিন্তু যারা ওই ৩০ শতাংশের বাইরে (মানে বাকি ৭০ শতাংশ) তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মূল্যায়ন দেখা গেছে। যেমন এই ৭০ শতাংশের ৪১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট আর ২৮ শতাংশ রিপাবলিকান, যারা সবাই পার্টিলাইনে মন্তব্য করেছেন। ডেমোক্র্যাটরা বলেছেন, তারা আকাঙ্খা যা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট তার চেয়ে খারাপ করেছেন। বিপরীতে রিপাবলিকানরা বলেছেন, তারা আকাঙ্খা যা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ‘তার চেয়ে ভালো’ করেছেন। তবে ইকোনমিস্ট বলছে, এটা আসলে প্রেসিডেন্টের পক্ষে জনমত কেমন (যেটাকে রেটিং বলে) তার প্রকাশ। ট্রাম্প বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে কম রেটিংয়ের প্রেসিডেন্ট। তবে এই রেটিং একেবারে দলভিত্তিক। রিপাবলিকানদের মধ্যে ৮৮ শতাংশ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টকে অনুমোদন করেছেন। ওদিকে ডেমোক্র্যাটদের ৮২ শতাংশ প্রেসিডেন্টকে অনুমোদন করেন নাই।

এখন এসবের বাইরে, আমেরিকার রাজনীতির প্রত্যেকটি ইস্যুভিত্তিক বিচারে যদি আসি, তবে এই ১০০ দিনে সেগুলোর হাল-দশা কী, এই বিচারে বলতে হয়,
০১. মেক্সিকো প্রাচীর : স্বভাবতই শুরুতেই ট্রাম্পের সাথে এই ইস্যুতে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের বিরোধ ঘটেছিল। যে দুই রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাথে ট্রাম্পের প্রায় প্রকাশ্যে বিরোধ হয়েছে সে দুটো হল, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকো। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সাথে ট্রাম্পের অন্য বিরোধের ইস্যুও আছে। ট্রাম্পের দাবি মতে, বলা বাহুল্য ওই প্রাচীর বানানোর খরচ দিতে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট অস্বীকার করেছিলেন। আর মেক্সিকান পাবলিকের দিক থেকে দেখলে তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন; কারণ মাইগ্রেট করে আমেরিকায় প্রবেশের ওপর কড়াকড়ি তাদেরকেই ক্ষতিগ্রস্থ করে। এই বিরুদ্ধে চলে যাওয়া, এটাই আবার মেক্সিকার প্রেসিডেন্টের পক্ষে দেয়া নাগরিকদের সমর্থন হিসেবে হাজির হয়েছিল।  এ’ব্যাপারে সর্বশেষ হল, নিজ খরচে “প্রাচীর গড়ে পরে মেক্সিকোর কাছ থেকে অর্থ কেটে” নিবেন ট্রাম্প – এরও কোনো খবর নেই। কারণ কংগ্রেস এক ট্রিলিয়ন ডলারের যে বাজেট পাস করেছে, সেখানে পরিষ্কার উল্লেখ করে দিয়েছে, এর অর্থ দিয়ে ঐ প্রাচীর নির্মাণ করা যাবে না।

০২. মুসলিম নিষেধাজ্ঞা (মুসলিম ব্যান) : সবচেয়ে বেশি প্রচারিত ট্রাম্পের এই উদ্যোগ নেয়া এবং ব্যর্থ হওয়ার খবর আমরা প্রায় সবাই দেখেছি। ট্রাম্প এ বিষয়ে দু’বার নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু দু’বারই তা ফেডারেল আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে এর কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে যায়। আদালতে তা চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবার পক্ষে  মূল যুক্তি ছিল “কেবল মুসলমানদের” টার্গেট করে এই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। ফলে তা বৈষম্যপুর্ণ, সুতরাং  কনস্টিটিউশন বিরোধী। অর্থাৎ এই ইস্যু এখন আদালতের হিমঘরে। মনে হয় না আর কখনো এটা জাগবে।

০৩. ন্যাটো একটা অচল প্রতিষ্ঠান : নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছিলেন, ন্যাটো কোল্ড ওয়ার যুগের প্রতিষ্ঠান; যখন সোভিয়েত ইউনিয়নকে পশ্চিম নিজের জাতশত্রু মনে করে এর বিরুদ্ধেই ন্যাটো বানানো হয়েছিল। কোল্ড ওয়ার আর সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটোই এখন ‘নাই’ হয়ে গেছে। ওদিকে, ‘গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর’ এখন মুখ্য ইস্যু। ফলে এত পয়সা খরচ করে ন্যাটো রাখার কী দরকার! এই বুঝের ওপর দাঁড়িয়ে তাই শপথ নেয়ার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় তিনি বলে বসেন, ন্যাটো একটি অচল প্রতিষ্ঠান। আর এই গত মাসে ১২ এপ্রিল তিনি উল্টা বলেন, “ন্যাটো আর অচল প্রতিষ্ঠান নয়”। কেন এমন করলেন? ব্যাপারটা পাবলিকলি আনা হয়নি। তবে ইউরোপের দিক থেকে ব্যাপক দেনদরবার হয়েছে বলে এই ‘উলটো কথা’। তবে ন্যাটোর সেক্রেটারী জেনারেলের সঙ্গে মিটিং শেষ করে প্রেসের সামনে ট্রাম্প বলেন, আপনারা (ন্যাটো সদস্যরা)  সিরিয়ায় আমার ৫৯ টা মিসাইল নিক্ষেপে হামলার কাজ ও সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছেন সেজন্য ধন্যবাদ। এবং “ন্যাটো আর অচল প্রতিষ্ঠান নয়”
যদিও এমন ধরণের কথার পেছনে মূল কারণ হল – খরচের বিষয়, এসব প্রতিষ্ঠান চালানোর  সিংহভাগ  খরচ আমেরিকাকে একা বইতে হয়। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অন্য রাষ্ট্রে যেখানেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে (জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া. অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি) এর খরচও আমেরিকা একা বহন করে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে সেই থেকে আমেরিকা এক এম্পায়ার আমেরিকা, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মাতব্বর হিসেবে উঠে এসেছিল। মাতব্বরদের বহু অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়, কমিউনিটি-দুনিয়ার দায় একা বহন করতে হয়। ফলে এভাবেই এতদিন চলে আসছিল। এ ছাড়াও একটা এম্পায়ার- সাম্রাজ্য মোড়লিপনা চালানো বেশ জটিল। যেমন দক্ষিণ কোরিয়াকে উদাহরণ হিসাবে নেয়া যাক। সেখানে আমেরিকা নিজের (THAAD) থাড অ্যান্টি মিসাইল ব্যবস্থা বসিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার হাত থেকে দক্ষিণ কোরিয়াকে, অর্থাৎ নিজ মিত্রকে রক্ষার জন্য। কিন্তু এটা বসানোর জায়গা দেয়া ছাড়া অ্যান্টি মিসাইল ব্যবস্থা বসানোর আর কোনো খরচ কোরিয়া বহণ করে না, সব খরচ আমেরিকাই বহন করে। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমেরিকা চাইছে, এই ‘ঐতিহাসিক’ দায় থেকে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু একথার মানে কি, আমেরিকার মাতব্বরিও ত্যাগ করতে চাইছেন তিনি? অবশ্যই ঠিক তা নয়। তবে তাঁর প্রথম বিবেচনা হচ্ছে, আমেরিকাকে এই খরচের বোঝা কমাতে হবে। তাতে মাতব্বরি কিছু কমে যাবে কিনা সেটা পরে দেখা যাবে। মাতব্বরি কমলে কী হবে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র মানতে তৈরি কিনা, তা দ্বিতীয় বিবেচনা। কিন্তু বাস্তবতা হল, চাইলেও ট্রাম্প সে খরচ তুলে আনতে পারছেন না। কারণ থাড অ্যান্টি মিসাইল ব্যবস্থার পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা এখন পুরাপুরি আমেরিকান বাহিনীর হাতে। ট্রাম্প সম্প্রতি এর এক বিলিয়ন ডলার দাম চেয়েছেন কোরিয়ার কাছে; কিন্তু এটা কি আমেরিকা বিক্রি করতে চাইছে, নাকি এটা বিক্রিযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে? জবাব হলো, না। এই সিরিয়াস টেকনোলজি আমেরিকা কোনো ঘনিষ্ঠ মিত্রকে বা আসলে কাউকেই বিক্রি করতে চায় না। এদিকে, দঃ কোরিয়া বলছে, আমরা চাইলেও তো অর্থ দিতে পারছি না। আগে তোমরা বিক্রির সিদ্ধান্ত নাও। তবেই না! এ ধরনের বহুবিধ টেকনিক্যাল সমস্যা আছে, যেসবের কারণে শুরু থেকেই আমেরিকা নিজে থেকেই যেচে এর খরচ বহন করে থাকে। তাই ট্রাম্পের আমেরিকা চাইলেই এখান থেকে আমেরিকাকে বের করে নিতে পারবে না। অন্তত সেটা একেবারে সহজ কোন কাজ নয়। তাই ট্রাম্পের ১০০ দিনের অন্যতম ব্যর্থ ইস্যু এটা।

০৪. চীন ইস্যু : চীনকে ‘ঝাড়ি’ মারতে গিয়ে ট্রাম্প এখন উলটো ‘কেঁচো’ হয়ে গেছেন। আসলে ট্রাম্প এখন উলটো চীনকে দেখছেন তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাফল্য আনার এক উপায় হিসেবে। চীনকে যতটা সম্ভব পক্ষে নিয়ে উত্তর কোরিয়া ইস্যুর যদি একটা সুরাহা করা যায় তবে সেটা সত্যি সত্যিই আগের প্রেসিডেন্টদের তুলনায় ট্রাম্পের একটা বিরাট সাফল্য বলে বিবেচিত হবে। ট্রাম্প পাগলা হলেও এটা বুঝতে তাঁর দেরি হয় নাই। কিন্তু এটা তো ১০০ দিনের অর্জনের বিষয় নয়। সম্ভাব্য অর্জনের তালিকায় নাই। বরং ওখানে চীনকে যেভাবে ভিলেন হিসেবে হাজির করে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল, চীনের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে উগ্র জাতীয়তাবাদী আমেরিকা খাড়া করানো হবে বলা হয়েছিল- সেটা তো একেবারেই হয়নি। করা যায়নি।  কারণ শত্রু ঠাহর করায় ভুল ছিল। ট্রাম্প এখন চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে তার সম্পর্কের ‘ভালো কেমিস্ট্রির’ কথা বলছেন। কিন্তু তবু তাতে তো এটা আর- ‘আমেরিকা ফাস্ট’-এর অবস্থান থাকল না। এটা হয়ে গেছে আসলে উলটা – ‘গ্লোবাল আমেরিকা’র পক্ষে অবস্থান। মানে, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির হার।

০৫. বাণিজ্য জোট (নাফটা, টিপিপি) ত্যাগ : ঘোষণা দিয়ে বাণিজ্য জোট ত্যাগের ঘটনা ঘটানো সহজ, আর তা ঘটেছে। ফলে ১০০ দিনের কাজ হিসেবে এই ইস্যু সফল। কিন্তু এর ফলাফল কি সুখপ্রদ? এর জবাব হল, না। আসলে এই তর্কে গোড়ার প্রশ্ন যদি করি, বিজয়ী ট্রাম্প জাতিবাদী আমেরিকা হিসেবে হাজির হয়েছিলেন। এর অর্থ, খোদ আমেরিকাই আর গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে থাকবে না, এই সিদ্ধান্ত। এই বিচারে এখন বলা যায়, তিনি নিজে গ্লোবালাইজেশনের পক্ষেই থেকে গেছেন। অবস্থান তিনি একচুলও সরাতে পারেননি। বরং তার নীতির প্রায় সব ঝোঁক ওবামার নীতি অবস্থানে ফেরত যাওয়ার দিকে (বিশেষ কতগুলো ছাড়া)। সিএনএন মানি জানাচ্ছে,   নতুন করে নাফটা নিয়ে কথা বলা আর নতুন নিগোশিয়েশন শুরু করতে চাইছে ট্রাম্পের আমেরিকা। আর ট্রাম্পের উপদেষ্টারা এখন বিতর্ক করছেন কত দ্রুত নাফটা আলাপ শুরু করা যায়, এর সম্ভাব্য উপায় কী।  আর ‘বিশেষ কতগুলো’ কথাটা ভারতের সাথে বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের হাত থেকে আমেরিকানদের চাকরি উদ্ধার বা কাজ ফেরানো এবং সে লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন, তা কিন্তু এগিয়েই চলছে; আগের মতই। এজন্য মোদি আগামী মাসের মধ্যে ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাতের জন্য খুবই চেষ্টা করছেন।

০৬। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে আসা : বের হয়ে আসার প্রক্রিয়া চলছে বটে; তবে ধীরগতিতে আর ভাষা নরম করে। তবে কানাডা থেকে পাইপলাইনে (পরিবেশগতভাবে নোংরা এবং বিপর্যয়ের হুমকির কারণে বিপজ্জনক) তেল আনার বিষয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, পাইপ প্রস্তুতে আমেরিকান স্টিল সেখানে ব্যবহার করাবেনই। অর্থাৎ আমেরিকা ফাস্ট নীতি কার্যকর করবেনই তিনি এখানে। কিন্তু না, এখানে ট্রাম্প ব্যর্থ। তিনি আমেরিকান স্টিল ব্যবহার করাতে পারেননি। বরং এবিষয়ে নিজের নির্বাহী আদেশ বদলাতে হয়েছে তাঁকে।
আরো এমন অনেক পয়েন্ট তোলা যায় কিন্তু এখানেই শেষ করছি। এক কথায় বললে,  শপথ গ্রহণের দিনের বক্তৃতায়  ট্রাম্প যেভাবে পূর্বসূরি প্রেসিডেন্টদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বা বোকা ভেবে তাদের নীতির তুলোধুনা করেছিলেন, আর ক্ষমতা পেলেই সব বদলে ফেলার হুঙ্কার দিচ্ছিলেন, তা ১০০ দিন বা সাড়ে তিন মাসেই ফানুসের মতো চুপসে গেয়েছে। বলা যায়, চাপাবাজি আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবের মাটিতে পা দিতেই সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

অনলাইন ‘মিডলইস্ট আই’ পত্রিকা ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছে, ট্রাম্পের উল্টামুখিতার আংশিক ব্যাখ্যা হিসাবে বলা যায়-  এর কারণ হোয়াইট হাউজের ভেতরের রেডিক্যালেরা যেমন স্টিভ ব্যানন, মাইক ফ্লিন, কেটি ম্যাকফারল্যান্ড- এরা হয় পদত্যাগ করেছেন, না হলে সাইডলাইনে চলে গেছেন। ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে ম্যাকমাস্টার আসাতে তিনি বহু কিছুকেই ফ্যাক্টবেজ করে ফেলেছেন। ফলে “রেডিক্যাল বা রাইট উইং দের” এই পতনকেই আমরা ট্রাম্পের উল্টোমুখিতা হিসেবে বাইরে থেকে দেখছি। আর এর আর এক বিপরীতের ঘটনা হল, “ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কা, ট্রাম্পের জামাই কুশনার আর শীর্ষ অর্থনৈতিক পরামর্শক গ্রে কোহেন যারা মূলত গ্লোবালিস্ট; এদের অবস্থান ক্রমেই উঁচুতে জেঁকে বসছে। তবে ট্রাম্প পরিবর্তনের এই অভিমুখ নেয়াতে তিনি রিপাবলিকান দলের ধূর্তদের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন ওরাই কিন্তু তাকে নির্বাচনী লড়াইয়ে বিজয়ী হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন”। খুবই খাটি কথা গুলো এখানে তুলে আনা হয়েছে। দেখা যাক এটা ট্রাম্পকে কোথায় নিয়ে যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় ০৭ মে ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন)। আজ এখানে তা আবার আপডেট, এডিট করে থিতু ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

ট্রাম্পের পাগলামি সহনীয় করার উপায়

ট্রাম্পের পাগলামি সহনীয় করার উপায়

গৌতম দাস

১৭ মার্চ ২০১৭,  শুক্রবার

http://wp.me/p1sCvy-2dA

 

 

 

আপনি যদি  ক্ষমতাবান কিন্তু পাগলা মানে আপনি কখন কী করে বসেন আগাম অনুমান করা যায় না এমন এক প্রেসিডেন্ট হন, তবে আপনার প্রয়োজন আসলে সাথে একজন বুঝমান জামাই থাকা বা রাখা। যেটা হবে আপনার স্টাবিলাইজিং ফ্যাক্টর বা আপনাকে থিতু রাখার উপায়।  আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেলায় কথাটা সম্ভবত এক কঠিন সত্যি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম স্ত্রীর ঘরের বড় মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প (Ivanka Trump) আর তাঁর স্বামী জেরাড কুশনার (Jared Kushner)। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার শুরু থেকেই আমেরিকান মিডিয়া ট্রাম্পের তৃতীয় ও বর্তমান স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প আর প্রথম স্ত্রীর ঘরের মেয়ে ইভানকা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবনকাহিনী নানান স্পট টেনে এনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পেরেশান করে ছেড়েছিল। এ দিকে মেলানিয়া ফার্স্টলেডি বলে আখ্যায়িত হলেও তিনি তাদের ১০ বছরের একমাত্র সন্তানকে নিয়ে নিউ ইয়র্কের পুরানা বাসায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্টের সাথে মানে বাবার সাথে তাঁর আবাসস্থলে বসবাস করা শুরু করছেন বড় মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প তাঁর স্বামী কুশনারকে সাথে নিয়ে । সেখানে ইভানকা কার্যত ফার্স্টলেডির ভূমিকা নিয়েছেন, বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের অতিথিদের আপ্যায়িত করার ভূমিকা ও দেখাশুনার ভার নিয়েছেন তিনি। ওদিকে ইভানকার স্বামী কুশনারও শ্বশুরের মতোই হাউজিং ডেভেলপার ব্যবসায়ী হলেও নিজের ব্যবসার সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে তিনি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একজন সিনিয়র অ্যাডভাইজার। তবে অবৈতনিক।  মিডিয়ায় যদিও শুরু থেকেই কুশনারের ইহুদি পরিচয়টা কখনোই মুখ্য করতে ভোলে না। প্রথম দিকে মিডিয়ায় মেয়ে-জামাইয়ের ব্যাপারটাকে কোনো ধান্ধাল জামাইয়ের কাণ্ডকারখানা হিসেবে ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু ইদানীং অন্তত দুটো ঘটনার-ইস্যুতে মিডিয়ায় ইভানকা-কুশনার এদের ভূমিকা নিয়ে খুবই ইতিবাচক রিপোর্ট আসতে দেখা যাচ্ছে।
অনেকেই জানেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবেশবিষয়ক অবস্থান ও নীতি খুবই বিতর্কিত বললেও কম বলা হবে। এমনিতেই ট্রাডিশনালি রিপাবলিকান রাজনীতি মানেই – সমাজের দীর্ঘমেয়াদী কমন স্বার্থের ইস্যুই বা কী, কিংবা পাবলিক ইন্টারেস্ট বা গণ স্বার্থের বিষয়গুলোর বেলায় সবার উপরে ব্যবসাদারের বা ব্যবসায়িক স্বার্থকে জায়গা প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া এদের খাসিলত। ফলে রিপাবলিকান ট্রাম্পের বেলায় এক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। ট্রাম্পের পরিবেশনীতি যা দুনিয়ার কোন পরিবেশবিদের উদ্বেগের সাথেই তিনি একমত নয়। তাঁর এমন নীতি যারা ঘিরে আগলে রেখেছে এরা হলেন– ট্রাম্পের শুরুর দিকের পরিবেশমন্ত্রী (পরামর্শক) হলেন পরিবেশের ক্ষতি অস্বীকারকারি Myron Ebell, বর্তমান এনার্জি মন্ত্রী (পরামর্শক) রিক পেরি Rick Perry, এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন কর্তৃপক্ষের প্রধান স্কট প্রুরিট Scott Pruitt এবং জেফ সেশন Jeff Sessions, যাকে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়েছে আর সেক্রেটারি অব স্ট্রেট রেক্স টিলারশন Rex Tillerson, যিনি এক্সন-মোবাইল তেল কোম্পানির সাবেক প্রধান নির্বাহী – এমন সব মার্কামারা লোকজন তাঁরা। এরা মনে করেন, কার্বনডাই-অক্সাইডে দুনিয়ার তাপ বেড়ে যায় এটা তাঁরা মানেন না এবং তাতে পরিবেশ ধ্বংস হয় এর প্রমাণ কী? তাঁরা বলে থাকেন, পরিবেশ ধ্বংসের আলাপ তোলাটা আসলে চীনা প্রচারণা মাত্র। আমেরিকান ব্যবসায়ের ওপর চীনকে সুবিধা দিতে এই মিথ্যা প্রচারণা চলছে। এই হলো তাদের ভয়াবহ সব সার-বক্তব্য। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের মেয়ে ইভানকা ও জামাই কুশনার এদের ভুমিকা উলটা, তাঁরা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরিবেশ বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে ইতিবাচক দিকে প্রভাবিত করেছেন। পরিবেশবিষয়ক এক বিখ্যাত পত্রিকা ইকোওয়াচ জানাচ্ছে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সূত্রে এক খবর হল, পরিবেশ বিষয়ে ট্রাম্পের এক এক্সিকিউটিভ অর্ডারে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সব রাষ্ট্রের মিলিত দলিল – ‘প্যারিস ঐকমত্য’কে সরাসরি নিন্দা-সমালোচনা করে কোনো কথা ট্রাম্প সেখান থেকে বাদ দিয়েছেন, বলছেন না। ট্রাম্পের মেয়ে-জামাই তাঁকে এব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছেন।

দ্বিতীয় গুরুত্বপুর্ণ বিষয়, যেখানে ট্রাম্পের পাগলামি অবস্থান সিদ্ধান্তকে ঠাণ্ডা ও থিতু করার ক্ষেত্রে জামাই কুশনার ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা যাচ্ছে তা হল – চীন ইস্যু। আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেন তিনি। ফলে ‘ইনফরমাল’ আলাপে ‘গঠনমূলক’ পথে চীনা-আমেরিকান স্বার্থবিরোধের সব ইস্যুতে উত্তেজনা নামিয়ে আনতে নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন কুশনার। এ ব্যাপারে যেমন প্রথম ব্রেক-থ্রু বা বাদাম ভাঙার কাজটা ছিল, ট্রাম্পকে এক-চীন নীতি মানতে ফেরত আনা। ফলে শপথ নেয়ার পর দীর্ঘ প্রায় তিন সপ্তাহ পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ০৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ফোন করেন। সেটা ছিল এমন এক পরিস্থিতি যখন  ট্রাম্পের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর থেকে বাস্তবে চীনের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের সব ধরণের যোগাযোগ ও ততপরতা স্থবির হয়ে পড়ে ছিল। কারণ প্রার্থী হওয়া থেকে নির্বাচিত হয়ে যাবার পরও চীন ইস্যুতে  ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল – চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলছে, চীনা পণ্য আমেরিকায় প্রবেশ ঠেকাতে ৪৫ শতাংশ ট্যাক্স বসাবো, দুনিয়ার তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে বলে পরিবেশবাদীদের হইচই আসলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনা প্রপাগান্ডা, একচীন নীতি মেনে চলার ক্ষেত্রে আমেরিকানদের বাধ্যবাধকতা নেই ইত্যাদিতে ট্রাম্পের এসব রেটরিক বাকোয়াজে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে রুটিন কূটনৈতিক সম্পর্ক কাজ চালিয়ে নিতে যেসব তৎপরতা লাগে ট্রাম্পের প্রশাসন দিকনির্দেশনার অভাবে তাও চালিয়ে রাখতে পারছিল না। ফলে জামাই কুশনার এক্ষেত্রে আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে অনানুষ্ঠানিক আলাপ এগিয়ে নিয়ে সম্পর্কের পুনর্গঠন ও অভিমুখ ঠিক করতে ভুমিকা নিয়েছিল। যদিও এক্ষেত্রে আমরা অনুমান করতে পারি এমন পদক্ষেপের পক্ষে  ট্রাম্পের দিক থেকে আগাম সম্মতি ও আস্থা কুশনার আদায় করতে সক্ষম হয়ে নিয়েছিলেন। কুশনারের বিপরীতে চীনা অবস্থান ছিলও খুবই ইতিবাচক ও ঠাণ্ডামাথায় পরিচালিত। ফলে ট্রাম্পের ওই ফোনালাপে কুশনার-চীনারাষ্ট্রদুতের আগাম স্থির হওয়া এক টার্গেট ছিল যে, উভয় শীর্ষ নেতা কুশল বিনিময়ের পরে ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের একচীন নীতির পক্ষে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করবেন। আর এতে বিনিময়ে চীন বলবে, চীন-আমেরিকার বাণিজ্য-বিরোধ পারস্পরিক বসে আপস আলোচনায় মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। আর সব শেষে এর পর থেকে নিজ নিজ পক্ষের কূটনীতিকেরা বসে কাজ-সম্পর্ক এগিয়ে নেবে এ ব্যাপারে একমত প্রকাশ করে আলাপ শেষ হবে। এই ছিল কুশনার ও চীনা রাষ্ট্রদূত তাদের একমত পরিকল্পনা। সুন্দরভাবে সম্পর্কের এই প্রথম পর্ব সমাপ্ত হয়েছিল। এটা সম্ভব করতে কুশনারের এক বড় ভুমিকা ছিল। এবার দ্বিতীয় পর্বেও উভয়ের এক একমত টার্গেট হল, শি-ট্রাম্পের এক শীর্ষ বৈঠক আয়োজন করা। এই লক্ষ্যে কুশনার ও চীনা রাষ্ট্রদূত কাজ করছেন। মনে রাখতে হবে, আসলে বাইরে থেকে যেটাকে কোনো দুই রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ বৈঠক বলে আমরা যে দিনক্ষণটা দেখি সে দিনটা আসলে উভয়ের আগেই একমত হয়ে থাকে (ছোটখাট ব্যতিক্রমী কিছু টুকটাক বিষয় বাদে ) সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের দিন। অর্থাৎ আলোচনায় কী কী ইস্যু আসবে আর তাতে উভয়ে কোথায় একমত হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই দীর্ঘ দিন ধরে আলাপ ও বোঝাবুঝি নেগোসিয়েশন সবই আগেই চলতে থাকে। চীন-আমেরিকার ক্ষেত্রেও এই কাজটাই বর্তমানে চলছে। এরই কাজে চীনের দিক থেকে প্রভাবশালী সিনিয়র এক কূটনীতিক প্রতিনিধি ইয়াং জিচি (Yang Jiechi ) দুই দিনের আমেরিকা সফর করে গেলেন। ইয়াং জিচির সফরের প্রধান লক্ষ্য ছিল, আগামী এপ্রিলে না হলেও যেন মে মাসের মধ্যে শি-ট্রাম্পের শীর্ষ সফর আয়োজনে করা যায়, এরই ভিত্তি স্থাপন করে যাওয়া। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক এক থিংকট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর প্রধান মাইকেল গ্রিনের উদ্ধৃতি দিয়ে হংকংয়ের পত্রিকা সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানাচ্ছে, সম্ভবত আগামী মাসে মানে এপ্রিলে এই শীর্ষ সফর হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ইয়াং জিচির ওয়াশিংটন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও বৈঠকে ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং ট্রাম্পের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে কুশনারও ওই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। আসলে আগামী জুলাইয়ে এবারের জি২০-এর মিটিং আয়োজিত আছে জার্মানিতে। ওই মিটিংয়ে মুখোমুখি সাক্ষাতের আগেই উভয় পক্ষই শি-ট্রাম্পের শীর্ষ সফর শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে আগাচ্ছেন। সেই লক্ষ্যে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়েন নিজে যেচে বাণিজ্য-বিরোধ বিতর্কগুলো আলাপ-আলোচনায় মিটিয়ে ফেলা সম্ভব বলে বক্তব্য রেখেছেন। চীনা বাণিজ্যমন্ত্রী গাও এ নিয়ে বিস্তর কথা বলে আশাবাদ রেখেছেন। অর্থাৎ চীনের দিক থেকে একটা প্রস্তুতি হোমওয়ার্ক করা আছে যে কী কী বিষয়ে ছাড় দিলে আপোষে এ যাত্রায় ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে একটা রফায় পৌঁছানো সম্ভব।

এখানে একটা তুলনামূলক ছবি আঁকা যায়। ট্রাম্পের নীতির এই আমলে ভারতের সাথেও আমেরিকার বড় স্বার্থবিরোধ রয়েছে। ভারত আমেরিকানদের কাজ খেয়ে ফেলছে বলে বিশাল বিতর্ক ট্রাম্প প্রশাসনে শুধু নয়, কংগ্রেস ও সিনেটেও অভিযোগ বিতর্ক উঠেছে। চীনের বিরুদ্ধেও ট্রাম্প প্রশাসনের ঠিক একই অভিযোগ করছে। কিন্তু ফারাক একটা জায়গায়। ভারতের বেলায় এক দিকে ভারতের কূটনীতিক বা বিদেশসচিবদের সাথে প্রত্যক্ষ আলোচনায় ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে আমরা ভারতের মিডিয়ায় শুনছি, কিন্তু একই সাথে বাস্তবে দেখছি ভারতের কূটনীতিক বা বিদেশসচিবেরা ভারতে ফেরা মাত্র আমেরিকান কংগ্রেসে দেশেই চাকরি ঠেকানোর পক্ষে নতুন নতুন আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে অথবা আইন জারি করা হচ্ছে। যেমন বর্তমানে ভারতে কল সেন্টার বসিয়ে তাদের দিয়ে আমেরিকায় কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস দেয়া যেটা এতদিন চলে আসছে সেই ব্যবসার বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। যাতে আমেরিকার কল সেন্টার ব্যবসা আমেরিকায় বসেই করা হয়। আউটসোর্সিং না করা হয়।  ফলে অভিমুখ হিসেবে দেখলে ভারতের বেলায় ট্রাম্প প্রশাসন মতানৈক্য ও প্রকাশ্য সংঘাতের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। আর এদিকে চীনের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ একটা আপসরফার সম্ভাবনা উজ্জ্বল যতটুকুই হোক, চীনের বিরুদ্ধে অন্তত প্রতিরোধমূলক আইন প্রণয়ন চীনের বেলায় আপাতত এখনই হচ্ছে না তা বলা যায়। যদিও এটা কতদুর কোন দিকে যাবে, মোড় নিবে সেটা শিং জিনপিন ও ট্রাম্পের আসন্ন শীর্ষ বৈঠকের ফলাফল থেকে পরিস্কার বুঝা যাবে।
এসব তৎপরতা দেখে পাগলা ট্রাম্পের জন্য একজন ঠাণ্ডা মাথার জামাই থাকা খুব জরুরি সমাধান, অ্যান্টিডোট বলে হাজির হয়েছে।

 

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনের ১২ মার্চ ২০১৭ সংখ্যায় (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল। ]]

ট্রাম্পের অচল জাতীয়তাবাদ

ট্রাম্পের অচল জাতীয়তাবাদ

গৌতম দাস

মার্চ ১৪, ২০১৭  মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2dv

 

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় দেড় মাস পার হয়ে গেল। কিন্তু এই ক্ষমতার হামবড়া, মিথ্যা প্রপাগাণ্ডা আর ষাটের দশকের অনুকরণে সস্তা জাতীয়তাবাদী বোলচাল এখন ওশেষ হলো না। তবে এবার সেসব সিদ্ধান্তের কিছু ব্যাকফায়ার করা শুরু করেছে। ফলে একালে তা এক০ অচল জাতীয়তাবাদ হিসাবে তা হাজির হয়েছে।

ট্রাম্প শপথ নেওয়ার দিন, ২০ জানুয়ারিতেই তিনি তাঁর বক্তৃতায় এক স্লোগান এনেছিলেন  – ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক ছিল কলোনি-মুক্তির প্রথম দশক। কলোনি মাস্টারেরা কলোনি ছেড়েছে বলে সদ্য কলোনিমুক্ত দেশে কিছু ‘মুক্তির’ উচ্ছ্বাস আর দেশপ্রেমের নহর একটু-আধটু বইবে এটা স্বাভাবিক। ফলে এক দেশপ্রেমের ধারণা – সবার আগে দেশ, দেশের স্বার্থ আগে ইত্যাদিতে যা সত্য নয় তাই বলে আবেগের বাড়াবাড়িও সেখানে থাকবে, সেটাও হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু যে বিষয়টা কখনোই মেলেনি, পরিষ্কারও জানা হয়নি যে, ঠিক কী করলে কীভাবে করলে সেটা ‘সবার আগে দেশ’ অথবা ‘দেশের স্বার্থ আগে’ এই আবেগী স্লোগানগুলার বাস্তব রূপ হয়। কারণ আগে তো নিশ্চিত হতে হবে যে কী করলে, কীভাবে করলে তা দেশের স্বার্থের পক্ষে যাবে, ‘দেশের স্বার্থ আগে’ হবে! কারণ দেশের স্বার্থে ভালো মনে করে করা কাজ যথেষ্ট না বুঝে যাচাই করে তা করা হয় না বলে তা দেশের বিরুদ্ধের কাজ হয়ে যেতে পারে। ভাল মনে করে করলে সেটাতে দেশের ভাল না হয়ে উলটা খারাপ বা ক্ষতিকর না হয়ে যায় – এটা তা আগে নিশ্চিত হতে হবে।

কোনটা দেশের স্বার্থ সেটা নিশ্চিত হওয়া খুব সহজ কাজ নয়। বিশেষত আনাড়িপনার কাছে। যেমন আমরা বাংলাদেশের মানুষ যা যা ভোগ করি এর সবটাই দেশে উৎপন্ন করতে পারা দেশপ্রেমের কাজ বলে সকলেই মনে করবে। ব্যাপারটাও খুব সহজই মনে হয়। কিন্তু কথাটা কী ঠিক? কারণ চরম অদক্ষপনা আর অযোগ্যতাতে হলেও সব কিছুই নিজ দেশে উৎপন্ন করতে হবে এমন মাথার দিব্বি দেওয়া ঠিক নয়। অর্থাৎ কোনো পণ্য উৎপাদনে আমাদের দক্ষতা না থাকতে পারে, কাঁচামাল টেকনিক্যালিটির সমস্যা থাকতে পারে, নিজেদের বাজার যথেষ্ট বড় না বলে কোনো পণ্যের লাভজনক উৎপাদন আদৌ শুরু করা সম্ভব নাও হতে পারে ইত্যাদি। কাজেই সব কিছুই নিজ দেশে উৎপন্ন করতে হবে  এটা হিতে বিপরীত কথা। এর চেয়ে বরং কেবল যা দেশি-বিদেশি বাজারে আমরা দক্ষতার সঙ্গে সরবরাহ করতে পারি। যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা করে বাজার দখল পেয়েছি অর্থাৎ আমাদের দক্ষতা আন্তর্জাতিক স্বীকৃত, তাই বেশি উৎপাদন করে বিনিময়ে আমাদের অন্যন্য প্রয়োজনীয়  ভোগ্যপণ্য আমদানি করা লাভজনক হতে পারে। একমাত্র সেটাই ‘দেশের স্বার্থ আগে’ করা কাজ বলে কথাটার সত্যিকার অর্থ হতে পারে। ফলে সাধারণভাবে আমদানি করা মানেই খারাপ আর রফতানি করা মানেই ভালো ব্যাপারটা তা নয়; এত সরলও নয়।

নিজ দেশের তৈরি গাড়ির কথাই ধরা যাক। ধরা যাক, আমরা নিজেদের গাড়ির চাহিদা মিটাতে সক্ষম এমন গাড়ি তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু তা তেল বেশি খায়, সার্ভিস ভালো দেয় না, পরিবেশ নষ্ট করে ইত্যাদি। এখন যেহেতু দেশে তৈরি গাড়ি, ফলে তা ব্যবহারে যদি নাগরিককে আইন কানুন চাপিয়ে বাধ্য করা হয় এর পরিণতি কী হবে? এর সহজ পরিণতি হবে নিজ গাড়ি উৎপাদন সেক্টরের অযোগ্যতা-অদক্ষতা, অপচয় (দুর্নীতিও থাকতে পারে) সব কিছুকে প্রশ্রয় দিয়ে পুষে রাখার এক আড়ত হয়ে উঠবে সেটা। ব্যাপারটা অনেকটা নিজ বাসায় আনন্দে ‘নিজ’ গারবেজ তাই, জমা করে রাখার মত। এখানে কারণ একটাই – গারবেজটা দেশি! কিন্তু গারবেজ তো মানুষের ঘরে রাখার জিনিস না, রাখাও যায় না। আর গারবেজ শেষ বিচারে সেটা ময়লা- আবর্জনা, গারবেজই। সুতরাং এতে একটা জিনিসই কেবল নিশ্চিত হয়, তা হলো দেশি ওই গাড়ি কোম্পানি জীবনে আর কখনো দক্ষ হতে পারবে না। এখন এটা কী আমাদের দেশপ্রেম? অথবা ‘সবার আগে দেশের স্বার্থরক্ষা’ ধরনের কাজ?

তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াল এই যে, কী করলে তাতে ঠিক দেশপ্রেম হবে এটাও আগাম নিশ্চিত হয়ে নেওয়ার দরকার আছে। একইভাবে বিদেশি পুঁজি দেশে আসতে দেওয়া প্রসঙ্গটিও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। সাধারণভাবে বিদেশি পুঁজিকে খুব খারাপ জিনিস মনে করা হয়। বিশেষত কমিউনিস্টদের এমন প্রচারণা ও মনে করা আছে তাই। অনেক সময় সস্তা জাতীয়তাবাদী কিংবা দেশপ্রেমিক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য সহজ উপায় হল বিদেশি পুঁজির বিরোধিতা করা। কারণ এটা নাকি শোষণ করে। কিন্তু এতটুকু বুঝতে পারাই কী যথেষ্ট? কোনো সমাজ-অর্থনীতিতে যে নতুন নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন বা চাহিদা দেখা দেয় স্বাভাবিক অবস্থায় তা নিজ অর্থনীতিই যোগাড় করতে বা একুমুলেট করতে পারে। কিন্তু আবার কখনো পারেও না। কখন? যদি লাগাতর ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে বৃটিশ কলোনি শাসনামলের মত উদ্বৃত্ত পাচার হয়ে গিয়ে থাকে। এই বিনিয়োগ ঘাটতি, কলোনি মুক্ত হয়ে গেলেও আর পূরণ করা সম্ভব হয় না। এরপর যতই দিন যায় একদিকে জনসংখ্যা ও বাজার মিলিয়ে বিনিয়োগ চাহিদার পরিমাণ বাড়তে থাকে, অন্যদিকে ছোট হয়ে থাকা নিজ অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগের সংগ্রহ চাহিদার তুলনায় পরিমাণে অনেক কম হয়। ফলে প্রশ্নটা আর বিদেশি বিনিয়োগের খারাপ দিকগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না। আরও বিষয় বিবেচনায় আমলে নিতে হয়।  বিনিয়োগ না থাকাটাই প্রকট এবং তুলনায় আরো বড় খারাপ বিষয় বা সমস্যার মূল হিসাবে হাজির হয়ে যায়। ফলে বিকল্প সীমিত ঐ পরিস্থিতিতে সাময়িক বিদেশি বিনিয়োগ নেওয়ার সিদ্ধান্তই সঠিক পথ হয়ে উঠতে পারে। আর তাতে নিজ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার থেকে বাড়তি সঞ্চয় ও পুঞ্জিভবন ঘটলে পরিস্থিতিও বদলে যেতে পারে। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগ প্রশ্নটা ভালো অথবা মন্দ এমন সরল ইস্যু নয়, বরং তুলনামূলক কম খারাপ বেছে নেওয়ার ইস্যু হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে সাধারণভাবে বিদেশি বিনিয়োগ মানেই খারাপ এটা খুব যুক্তিসঙ্গত কথা নয়। সার কথা, কোন সিদ্ধান্তটা ‘দেশ সবার আগে’ এই স্লোগানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা বুঝতে হবে। পরীক্ষা নিরিক্ষা করে নিতে হবে। সেটা না বুঝে স্লোগান দিলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সম্ভাবনাই বেশি।

ট্রাম্পের সস্তা জাতীয়তাবাদ এমনই জটিলতার মুখোমুখিতে অচল জাতীয়তাবাদ হয়ে হাজির হয়েছে। এমনিতেই আমেরিকা গত সত্তরের দশক থেকেই গোটা দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের আওতায় আসতে বাধ্য করেছিল, শর্ত তৈরি করে চাপ সৃষ্টি করেছিল। দুনিয়াকে গ্লোবালাইজড উৎপাদন ও পণ্য বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থায় প্রবেশ করিয়ে ফেলেছিল। অথচ আজ ট্রাম্পের কালে এসে ট্রাম্পের আমেরিকা নিজেই সেই গ্লোবালাইজড দুনিয়া ছেড়ে ‘জাতীয়তাবাদী’ স্লোগান তুলছে। সংরক্ষণবাদী প্রটেকশনিস্ট হতে চেষ্টা করছে। কিন্তু চাইলেই কী তা হওয়া যাবে?

কী-স্টোন পাইপলাইন (Keystone XL pipeline) – কানাডারও উত্তরে আলবার্টা থেকে আমেরিকার নেব্রাসকা পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন করে নিয়ে জ্বালানি তেল আনার এক প্রজেক্টের নাম কীস্টোন পাইপলাইন সিস্টেম। ওবামার আমলে ২০১০ সালে এটা শুরু হলেও কয়েক ফেজ বা পর্যায় শেষ হওয়ার পর মূলত পরিবেশবাদীদের আপত্তি ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই প্রজেক্ট পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। কারণ এই শ্লেট থেকে তেল শুষে বের করার টেকনোলজি ও পদ্ধতিতে পৃথিবীকে অতিরক্ত উত্তপ্ত করার ঘটনা সংশ্লিষ্ট আছে। এ ছাড়া এত লম্বা পাতা পাইপলাইন থেকে তেল ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে পথে কোন সেনসেটিভ জায়গায় পড়ে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটতে পারে। ফলে পরিবেশবাদীদের ভাষায় এটা নোংরা বা ডার্টি তেল প্রজেক্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই সেই পরিত্যক্ত প্রজেক্টকে আবার চালু করেছেন। আজ এখানে লেখার প্রসঙ্গ ঠিক এই পাইপলাইন প্রজেক্টের পরিবেশগত দিক নয়। ফলে এর চেয়ে বেশি পরিবেশ বিষয়ে তথ্যের দিকে আর যাব না। এখানে আলোচ্য বিষয় স্টিলের তৈরি ওই পাইপ লাইন। এতে কোন স্টিল এ পাইপলাইনে ব্যবহার করা হবে? আমেরিকান স্টিল কি না?

কেন এমন প্রশ্ন? কারণ এখানেই এক বিরাট অংশজুড়ে আছে ট্রাম্পের সস্তা বা অচল জাতীয়তাবাদ।

আগেই বলেছি, ট্রাম্প শপথ গ্রহণের বক্তৃতা থেকেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এ সস্তা জাতীয়তাবাদী স্লোগান, এই দামামা বাজিয়ে চলেছেন তিনি। শপথ গ্রহণের চারদিন পর গত ২৪ জানুয়ারি তিনি এক নির্বাহী আদেশে সই করেন যে, কী-স্টোন পাইপলাইনে আমেরিকার তৈরি স্টিল ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে। নিজ দেশের স্টিল – একালে এসেও এই সস্তা আবেগ। ট্রাম্প এভাবেই তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদ প্রদর্শনের সুযোগ নেন। কিন্তু ক্যাপিটালিজমের অ আ ক খ যে জানে সে বোঝে এমন ব্যাপারগুলোর বিতর্ক বহু আগেই সমাপ্ত হয়েছে। আরও একটা উদাহরণ যেমন ধরা যাক, আমাদের বেক্সিমকোর একটা কম্পিউটার কোম্পানিও আছে। এখন বেক্সিমকো গ্রুপের সব কোম্পানি যেন তাদের কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট সার্ভিস কেনাকাটা কেবল নিজ কম্পিউটার কোম্পানি থেকেই করে এবং তা বাধ্যতামূলক  – এই মর্মে গ্রুপ ম্যানেজমেন্ট যদি অধীনস্ত কোম্পানিগুলোকে নোটিশ পাঠায় তাহলে কী সেটা সঠিক হবে? এটাই কী গ্রুপ ম্যানেজমেন্টের নিজ কোম্পানিপ্রেম (বেক্সিমকো-বাদ) প্রদর্শনের সবচেয়ে ভালো উপায় বলে গণ্য হবে?

এর সোজা জবাব – না। বরং এই প্রসঙ্গের আসল জবাব হবে ঠিক এর উল্টা। গ্রুপ ম্যানেজমেন্ট বরং নোটিশ পাঠাবে যে তাদের অধীনস্ত যে কোনো কোম্পানি যেন কম্পিউটার সার্ভিস ক্রয়ের জন্য বাজার যাচাই করে কেবল সবচেয়ে ভালো কম্পিউটার কোম্পানি যাকে মনে হবে সেখান থেকেই কেনাকাটা করে। কেন এমন সিদ্ধান্তই সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ও কোম্পানি-প্রেমি সিদ্ধান্ত হবে? কারণ ‘নিজ কোম্পানি’ বলে আবেগ তুললেই  – এ তথাকথিত কোম্পানিপ্রেমের আওয়াজ তুললে সেক্ষেত্রে নিজ কোম্পানি আর দক্ষ ও যোগ্য প্রতিযোগী কি না সে বিবেচনা করা বা যাচাই করার সুযোগ থাকবে না। আর এতে নিজ কোম্পানির সমস্ত অযোগ্যতা, অদক্ষতা ইত্যাদি পুষে পেলে প্রশ্রয়ে বড় করা হবে। তাতে এক পর্যায়ে এ কোম্পানিও নিজেই ডুবে যাবে হয়তো।

অপরদিকে, নিজের গ্রুপের অন্য কোম্পানি যারা নিজের কম্পিউটার কোম্পানির ক্রেতা হয়ে থাকবে এরা নিজেদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট গুডস ও সার্ভিস সঠিক না পেয়েও নিজ কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার জন্য এবং মূল্য পরিশোধের জন্য। আমেরিকার স্টিল ব্যবহার করতেই হবে – ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত তেমনই এক অথর্ব এবং স্লোগানসর্বস্ব ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত। বরং কীস্টোন কোম্পানিকে স্বাধীনভাবে স্টিল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিলে সেটাই হতো আমেরিকান স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত।

ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন, তিনি আসলেই একজন সস্তা জাতীয়তাবাদী। এদিকে সবশেষে তিনি আমেরিকান স্টিলই ব্যবহার করতে হবে এমন নির্বাহী সিদ্ধান্ত নিয়ে তা টেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন। গত ৩ মার্চ রয়টার্স জানায়, ট্রাম্প নিজের নির্বাহী আদেশ নিজেই এখন শিথিল করেছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র সারাহ স্যান্ডারর্স এক মুখরক্ষা বক্তব্যে বলেন, ‘যেহেতু ওগুলো ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে, স্টিল আক্ষরিকভাবেই বসানো হয়ে গেছে ফলে এখন ফিরে শুরু করা কঠিন। তবে এগুলোর বাইরে যা কিছু থাকবে কেবল সেগুলোর ওপর নির্বাহী আদেশটা কার্যকর থাকবে’।

পথ চলতে চলতে এক দাম্ভিক বুড়ি পা পিছলে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। তো বুড়ি তখন বলেন, ‘মাটিতে এই যখন বসলাম তখন পানটা খেয়েই নেই।’

লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

[এই লেখাটা এর আগে অনলাইন পত্রিকা “পরিবর্তন” এর গত ১৩ মার্চ ২০১৭ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল। ]

 

ট্রাম্পের পর ভারতও – ‘এক-চীন’ নীতিতেই

ট্রাম্পের পর ভারতও, ‘এক-চীন’ নীতিতেই

গৌতম দাস

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার

http://wp.me/p1sCvy-2d3

ভারতও এক-চীন নীতি মেনে চলতে চায় বা মেনে চলছে – পরোক্ষে সেকথাই ভারত চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। একচীন নীতি মানে হল, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এটা স্বীকার করা। ‘এক চীন নীতি’ মেনে নিয়ে গত ০৯ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপ করেছেন, সে খবর জেনে দুনিয়া হাঁফ ছেড়ে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়েছিল। কারণ চীন-আমেরিকার কোন স্বার্থ সংঘাত থেকে কোন সামরিক উত্তেজনা তৈরি করুক সেটার মুখোমুখি হতে দুনিয়ার বেশির ভাগ সংশ্লিষ্ট পক্ষ এখন চায় না।  কিন্তু এ খবর শুনে কেউ কেউ দুঃখে হতাশও হয়েছিল। সম্ভবত তেমন রাষ্ট্র হল ভারত। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে বিশেষ করে জয় লাভের পরে, আরও শক্ত করে ক্রমাগত চীনবিরোধী ‘রেঠরিক’ তুলে চলছিল। যেমন- আমেরিকায় চীনা পণ্যের প্রবেশের উপর ৪৫ শতাংশ ট্যাক্স বসাব, চীন কারেন্সি ম্যানিপুলেটর (মুদ্রা বিনিময় হারের উপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ করা), চীন আমেরিকানদের চাকরি নষ্ট করছে, পরিবেশবাদীদের পরিবেশ ক্ষতির আওয়াজ আসলে চীনা প্রচারণা, এক চীন নীতি মানতে আমরা বাধ্য নই ইত্যাদি আপত্তির বোলচাল হাজির করেছিল। এভাবে এক কথায় বললে ট্রাম্প যেন বিশাল এক ‘চীন-লড়ানি’ দিতে আসতেছেন বক্তব্যের এমন ভাব তৈরি করে ট্রাম্প দুনিয়াকে উদ্বিগ্নতায় অস্থির করে ফেলেছিলেন। বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্পের সেসব তৎপরতা ও বোলচালে সবচেয়ে বেশি আস্থা স্থাপন করেছিল ভারত। ট্রাম্প এভাবে  সামনে খাড়ায় গেলে তাঁকে আড়াল হিসেবে রেখে সে আড়ালকে ব্যবহার করার সুযোগ দেখেছিল ভারত। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ট্রাম্পের আমেরিকার ওপর ভারতের আস্থা রাখা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। মানুষ অন্যের মাথায় কাঁঠাল রেখে খায়, কথা সত্য। কিন্তু বুদ্ধিমানেরা কেবল এই সুবিধার দিকটাই দেখে না, সম্ভাব্য অনুষঙ্গি অসুবিধা বা ক্ষতির দিকেও চোখ রাখে। মনে হচ্ছে, ভারত সেটা রাখতে পারেনি।  দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প ‘পল্টি’ দিয়ে অবস্থান বদল করলে কী হবে, সেটা নিয়ে কমই ভেবেছিল ভারত। তাই ভারত তাইওয়ানের এক সরকারি প্রতিনিধিদলকে (তিনজন এমপিসহ ব্যবসায়ীরা) ভারতে তিন দিনের সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে সফরের আয়োজন করেছিল। ইতোমধ্যে সে সফর সম্পন্নও হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আফটার এফেক্ট বা পরবর্তি-প্রতিক্রিয়া রেখে গেছে।

বিগত ’৭০-এর দশক থেকেই এক চীন নীতি মেনে চলার আমেরিকান প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করে ট্রাম্প তা মানতে না চাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন- এই মাসল ফুলানো দেখে ভারত সেটাকে নিজের মাসল মনে করে বসেছিল। ভুলে গিয়েছিল যে ভারতও এক চীন নীতি মেনে এই শর্তেই চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ও সে সম্পর্কে আছে। ফলে স্বভাবতই ভারত তাইওয়ানকে স্বাধীন সরকার গণ্য করতে পারে না। অর্থাৎ তাইওয়ানের সাথে ভারতের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। কিন্তু ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে, যেটা চীন সরকারও আপত্তি করে না।
যেমন তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে ভারতের ‘কার্যত এক অ্যমবেসি’ আছে যেটার আনুষ্ঠানিক নাম হল ইন্ডিয়া-তাইপে সমিতি (ভারত-বাংলাদেশ সমিতির মত)। কারণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি সম্পর্ক নেই বলে তাইপে-তে ভারতীয় অ্যামবেসি খোলা সম্ভব নয়। তবে লক্ষ করার বিষয় রাষ্ট্র পরিচয়ে ইন্ডিয়া বলা হলেও এর সমান্তরালে ‘তাইওয়ান’ বলা হয়নি, ধরা হয়নি। তাইওয়ানকে রাষ্ট্র বিবেচনা করা হয়নি। (রাষ্ট্রের নামের জায়গায় রাজধানীর নাম) তাইপে বলা হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে এখানে নাম বলার লজিকে মিল নেই, ইচ্ছা করে রাখা হয়নি। কারণ বলতে হত হয় ইন্ডিয়া-তাইওয়ান, না হলে দিল্লি-তাইপে। এর কোনোটাই না হয়ে নাম রাখা হয়েছে ইন্ডিয়া-তাইপে অ্যাসোসিয়েশন (সমিতি)। আর এর বিপরীতে  দিল্লিতে তাইওয়ানের সমিতি অফিসের সমতুল্য হিসাবে তাইপে-তে অফিসটির নাম রাখা হয়েছে – ‘তাইপে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’, মাত্র ১৯৯৫ সালে যা প্রতিষ্ঠিত। চীনের সাথে অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক বিনিময়ের শর্ত হলো তাইওয়ান চীনের অংশ, এটা মানতে হবে। ফলে কোন রাষ্ট্র তাইওয়ানের সাথে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারবে না। তবে তাইওয়ানের সাথে ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’ সম্পর্ক রাখা যাবে। যেমন, তাইওয়ানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কও ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’। কোনো কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। আসলে এটাই কোনো রাষ্ট্রের একই সাথে তাইওয়ান ও চীনের সাথে সম্পর্ক রাখার একমাত্র উপায় – এই একটাই উপায়  চীন খুলে রেখেছে। আমেরিকা, ভারত বা বাংলাদেশসহ সবাই তাই এই পথের পথিক।

যেটা বলছিলাম ভারত ট্রাম্পের আড়ালে সুযোগ নিতে চেয়েছিল। তাইওয়ানের সংসদীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে তিন এমপিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এবং গত সপ্তাহে তাদের ভারত সফর সমাপ্ত হয়। এরপরই চীনা কড়া প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। প্রতিশ্রুত এক চীন নীতি থেকে ভারতের সরে যাওয়ার কথা চীন স্মরণ করিয়ে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কড়া’ আপত্তি জানায়। কূটনৈতিক ভাষায় এ ধরনের আপত্তি তোলাকে ‘সলেম রিপ্রেজেন্টেশন’ (solemn representation) বলে। অর্থ হল, যথেষ্ট ভাবনা চিন্তা করে শপথ করে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলার জন্য দেখা করা।  দু’টি উৎস থেকে চীনের এই আপত্তির খবর জানা যায়। এক. চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের প্রেস-ব্রিফিংয়ের প্রশ্ন-উত্তরে। আর দুই. চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা থেকে। এটা ‘বিশেষ’ এক সরকারি পত্রিকা। চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয় যেসব কথা, মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া বা মনোভাব যেটা তাদের মনের আসল কথা কিন্তু নানান জটিলতা এড়াতে আনুষ্ঠানিকভাবে তা বাইরে বলতে চায় না অথচ চীনা সরকারি অবস্থান কী, কী ভাবছে তারা এটা দেশে-বিদেশে সবাইকে জানাতে চায়, সেই প্রয়োজন আর এমন সব পাঠকের কথা চিন্তা করে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে। দেশী-বিদেশী মিডিয়া পাঠকেরা তাই এই চোখেই গ্লোবাল টাইমস পাঠ করে থাকে। বিশেষ করে এই পত্রিকার নিয়মিত সম্পাদকীয় এর মাধ্যমে চীনা সরকারি অবস্থান অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়। গ্লোবাল টাইমস ১২ ফেব্রুয়ারিতে লেখা এক সম্পাদকীয়তে তাইওয়ানিজ প্রতিনিধি দলের ভারত সফর সম্পর্কে চীনের বিস্তারিত মনোভাব ও আপত্তির দিক জানিয়েছে। এর শিরোনাম হল – “নয়াদিল্লি তাইওয়ান কার্ড খেললে হারার ক্ষতিতে ভুগবে”। (New Delhi will suffer losses if it plays Taiwan card)।

ইতোমধ্যে চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেছেন,  “We hope India would understand and respect China’s core concerns and stick to the One-China principle and prudently deal with Taiwan-related issues and maintain sound and steady development of India-China relations.”। বাংলা করে বললে, “আমরা আশা করি, এক চীন নীতি চীনের মুখ্য স্বার্থ এটা ভারত জানে। ফলে তা ভারতের বোঝা ও সম্মান করা উচিত। অতএব বুদ্ধিমানের মতো করে সে তাইওয়ান সম্পর্কিত ইস্যু নাড়াচাড়া করবে এবং চীন-ভারতের সম্পর্ককে নিস্তরঙ্গে ও ধারাবাহিকতায় বিকশিত করবে”। ওই মুখপাত্র এক চীন নীতিতে তাইওয়ান সম্পর্কিত ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমরা সব সময় (তাইওয়ানের সাথে) সরকারি যোগাযোগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক বা কোনো সরকারি প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ার বিরোধিতা করে এসেছি”। এ বিষয়টা মিডিয়ায় সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে এসেছে ভারতের হিন্দুস্তান টাইমসের বেইজিং প্রতিনিধি- সুতীর্থ পত্রনবীশের এক বিস্তারিত রিপোর্টে। যেটা হিন্দুস্তান টাইমসসহ অন্যান্য বিদেশী পত্রিকাতেও অনুমতি নিয়ে কপি ছাপা হয়েছে।

চীনা গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে লেখা প্রথম বাক্য হল – এক চীন নীতিতে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টে গেছেন তখন ভারত উসকানিদাতা (‘provocateur’) হতে চাচ্ছে। এ সফর আয়োজনে ভারতের মতলব কী ছিল, সে সম্পর্কে চীন কী মনে করে তা জানা যায় পরের প্যারা থেকে। এখানে তা অনুবাদ করে তুলে আনছি : ‘কিছু ভারতীয় তাইওয়ান প্রশ্নকে চীনের গোড়ালিতে কাঁটা মনে করে। এরা দীর্ঘ দিন ধরে তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর ও দালাই লামা ইস্যুকে চীনের বিরুদ্ধে দরকষাকষিতে ব্যবহার করতে চেয়ে আসছে। সাম্প্রতিককালে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর [এটা প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প; পাকিস্তানের গভীর সমুদ্রবন্দর Gwadar Port থেকে দক্ষিণ-উত্তর এভাবে সারা পাকিস্তানের বুক চিরে যে সড়ক চীনের ল্যান্ড লকড পশ্চিমাংশে প্রবেশ করেছে – এই ব্যাখ্যা আর্টিকেল লেখকের] প্রকল্পের অগ্রগতিতে চীনের বিরুদ্ধে ভারতের স্ট্রাটেজিক সন্দেহ বাতিকতা বাড়ছে। ভারত জেনেশুনে গোঁয়ারের মতো চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে, যেটা আসলে যেসব রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে যাবে তাদের সবাইকে সুবিধা দেবে- এমনকি ভারতকেও একইভাবে (যদি ভারত চায়)। ওই অর্থনৈতিক করিডোর যেহেতু পাকিস্তান কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে কিছু অংশ যাবে (কাশ্মিরের পাকিস্তান অংশ তুলনায় রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হলেও ভারতের চোখে যেহেতু পুরো কাশ্মিরই বিতর্কিত) ফলে সেটা বিতর্কিত ভারতের কিছু কূটবুদ্ধিদাতা এই যুক্তিতে মোদি সরকারকে তাইওয়ানিজ কার্ড খেলার পরামর্শ দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হল, ভারত চীনের এক চীন নীতি মেনে চীনের সাথে সম্পর্ক করেছে তাই এর বিনিময়ে (পুরো কাশ্মির ভারতের এই) ‘এক ভারত’-এর পক্ষে চীন সমর্থন চেয়ে বসুক। কিন্তু তাইওয়ান প্রশ্নে চীনকে চ্যালেঞ্জ করে ভারত আসলে আগুন নিয়ে খেলছে। এই দ্বীপ (তাইওয়ান) ভারতের কোনো কাজে আসবে না, না তাকে ব্যবসা বিনিয়োগের উন্নতিতে, না মেনল্যান্ড চীনকে ঠেকিয়ে দিতে। ওদিকে স্টিল, টেলিকম ও আইটি ব্যবসায় মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিতে তাইওয়ানিজ বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে মেনল্যান্ড-চীন ভারতের এক মেজর ট্রেডিং পার্টনার আর এই সম্পর্কের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধও কিছু পুরনো ঝগড়ার কারণে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সময়ে কঠিন হয়ে যায়”।

এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্প
এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্প

এত দূর বলে সম্পাদকীয় এবার দুটো বাক্যে – একটি সাবধান বাণী আরেকটিতে পরামর্শ রেখেছে। সাবধান বাণী হল, তাইওয়ান ও মেনল্যান্ড চীনের বিবাদে ভারত যেন ব্যবহৃত না হয়ে যায়, তাইওয়ানের এমন উদ্দেশ্য আছে। আর পরামর্শ হল – ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে [যেটা এশিয়া (পাকিস্তান) থেকে ইউরোপ পর্যন্ত এক সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা, যার বিভিন্ন স্থানে গভীর সমুদ্রবন্দরের কানেকশন থাকবে] যোগদানের সুবিধা নিয়ে ভারত চীন থেকে প্রচুর বিদেশী বিনিয়োগ আনতে পারে।
এ তো গেল চীনের প্রতিক্রিয়া। কিন্তু ট্রাম্পের পিছু হটার পর এবং ভারতের কেসে চীনের শক্ত আপত্তি তোলার পর ভারতের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? চীনের একটা শক্ত আপত্তির পয়েন্ট ছিল তাইওয়ান-ভারতের সম্পর্ককে কখনোই সরকারি ছাপ দেয়ার চেষ্টা বা সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা অতীতে করা হয়নি। এখন কেন ভারত দাওয়াত দিচ্ছে? এ প্রশ্নে বাস্তবতা কী তা সহজে সবচেয়ে ভালোভাবে আমরা জানতে পারি হিন্দুস্তান টাইমসের পত্রনবীশের লেখা রিপোর্ট থেকে। সবচেয়ে মুল্যবান রিপোর্ট সেটা। তিনি জানাচ্ছেন এই গত বছর মে মাসের কাহিনী, সময়টা ছিল এখনকার তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্টের নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের। তিনি ভারতকে সরকারি পর্যায়ে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু ভারত সেখানে কোনো প্রতিনিধি পাঠাতে রাজি হয়নি। এই উদ্ধৃতি দেয়ার পর পত্রনবীশ প্রশ্ন তুলে বলছেন, তাই এখন “তাইওয়ানিজ ডেলিগেশনকে দাওয়াত দেয়ার অর্থ ভারত তার নীতি থেকে সরে গেছে, বদল ঘটিয়েছে”। অর্থাৎ পত্রনবীশের চোখেও ভারতের আচরণ অস্বাভাবিক ও বেমিল।
ভারতের দিক থেকে চীনা অভিযোগের জবাবে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপের সাফাই বক্তব্য আছে। ভারতের লাইভমিন্ট পত্রিকা থেকে নিয়ে তা অনুবাদ করে বললে তা এ রকম : “ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে এমন বেসরকারি (ইনফরমাল) ভারত সফর এর আগেও হয়েছে। আমার জানা মতে তাঁরা এমন সফরে চীনেও যায়। তাই এই সফরের মধ্যে নতুন বা অস্বাভাবিক কিছু নেই। আর এর ভেতরে রাজনৈতিক মানে খোঁজারও কিছু নেই”।

কূটনীতির ভাষা হয় ক্যালকুলেটিভ, আগেভাগে হিসাব-কিতাব করে বলা কথা। বিকাশ স্বরূপ তাই করেছেন। তার বক্তব্যের মূল অর্থ বহনকারী শব্দগুলো হল – ‘ইনফরমাল’, ‘নতুন বা অস্বাভাবিক’, ‘রাজনৈতিক মানে’ ইত্যাদি। তিনি প্রথমেই সব কিছু ঠাণ্ডা করতে এই সফর বা দাওয়াত সরকারি নয়, ‘ইনফরমাল’- এই অস্ত্র চেলে দিয়েছেন। এভাবে সব অভিযোগ নাল ও ভয়েড করে দিয়েছেন তিনি।  যদিও ডেলিগেশনে ‘সংসদীয় প্রতিনিধি কেন’ এই প্রশ্নে তিনি কিছু বলতে না পারায় এটা তাঁর সাফাইকে একটু দুর্বল করেছে। তাই তিনজন ‘সংসদীয় এমপি’ এদের এই পরিচয়টি উহ্য রেখে আড়াল করে তিনি বলতে ছেয়েছেন – ওরা ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে ভারতে আসা লোকজন। এই বলে পরিচয়টি হালকা করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তাইওয়ানিজরা চীন সফরে যায় এ কথাও সত্য। এমনকি তারা চীনের বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য যে নতুন ব্যাংক (AIIB) হয়েছে, তারও আলাদা সদস্য হয়েছে তাইওয়ান। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ কথাগুলো সত্ত্বেও একটাই ফারাক যে, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টতা বা সফরের একটাও চীনের সরকারি পর্যায়ে দেয়া দাওয়াত নয়। চীনা নীতি হল রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক বা স্বীকৃতি না হলেই হল। মূলত ব্যবসায়ী যোগাযোগ, এটা করা জায়েজ। বিকাশ স্বরূপ তাই ব্যবসার কথা এনে সবশেষে তাইওয়ানিজদের সাথে এই যোগাযোগের কোনো ‘রাজনৈতিক মানে’ নেই দাবি করছেন। অর্থাৎ এটা রাজনৈতিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক নয়, তাই তিনি বলে সাফাই আনতে চাইছেন।

তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ মিডিয়ার অনেকে এটা ভারতের নীতি পরিবর্তন বলে ভারত সরকারকে অভিযোগ করেছে। আবার অনেকে এটাকে – চীনা দাবি ভারতের ‘উড়িয়ে দেয়া’ এমন বিশেষণ লাগিয়ে হাজির করেছেন। স্বভাবতই ‘উড়িয়ে দেয়া’ বিশেষণ এটা জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা। কিন্তু আসলেই কি এটা বিকাশ স্বরূপের চীনকে ‘উড়িয়ে দেয়া’?
অবশ্যই নয়। প্রথমত, ভারতের বক্তব্যের সারকথা হল, আমরা এক চীন নীতি ভাঙিনি, নীতির বাইরে যাইনি, নতুন কিছু করিনি। এটা আগের মতোই। এবং সর্বপরি, এটা ইনফরমাল” – এই কথাটা গুরুত্বপুর্ণ।  কথার সোজা অর্থ হলো ভারত এক চীন নীতিকে দেয়া প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে চায়, চলেছে এবং মেনে চলা দরকার মনে করে। অমান্য করতে চায় না। ভারতও এক-চীন নীতি মেনে চলতে চায় বা মেনে চলছে – পরোক্ষে সেকথাই ভারত চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে ভারত। ফলে তাইওয়ানের সাথে সরকারি যোগাযোগ ভারত করতে চায় না। অর্থাৎ আমি আইন মানা ভারত- এটাই বলতে চাওয়া। ভারত চীনকে চ্যালেঞ্জও করছে না। ট্রাম্পের মতো উড়িয়ে দেয়া নয় এটা।
অতএব এটা ট্রাম্পের মতো অবস্থান নয়। ভারত বলছে না এক চীন নীতি মানতে হবে কেন? অথবা মানব কি না তা নিয়ে দরকষাকষি করতে চাই; অথবা আমাকে অমুকটা দিলে তাহলে মানব- এমন অবস্থান এটা নয়। তাহলে এটা উড়িয়ে দেয়া হয় কী করে? এটা উড়িয়ে দেয়া নয়।
আরো স্পষ্ট করে বললে ভারত মনে করে, মেনল্যান্ড চীনের সাথে সম্পর্ক ভারতের কাছে তাইওয়ানের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ ভাবটাই ভারত প্রকাশ করেছে। ব্যাপারটা বাস্তবেও তাই।
আসলে ব্যাপার হল, চীনের সাথে কোন রাষ্ট্রের এক চীন নীতি মানতে না চাওয়ার মানে হল ওই রাষ্ট্র চীনের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলতে পরোয়া করে না। ক্ষেপাটে ট্রাম্প চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এমন অনেক কথা বলতেই পারেন। কারণ পরিণতি চিন্তা না করে তা বলা একেবারেই সহজ। কিন্তু সম্পর্ক ছিন্নের অর্থ চীনে আমেরিকার যেসব ছোট বা বড় ব্যবসায়ী, ওয়ালস্ট্রিট বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে ভালো বোঝেন। যারা  চীনে ব্যবসা করে টিকে আছেন, এখন তাদের সবাইকে চীনের সাথে সম্পর্কহীন হতে হবে। এটা কি সম্ভব? এটা কেউ কি রাজি হবেন? অর্থাৎ এই এখানে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেয়ার আসলে কেউই নন। আর ভারতের ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা কম-বেশি এমন নয়? বাস্তবতা হল চীনের বিনিয়োগ, ভারতে শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ভাইটাল। অবশ্যই চীনের কাছেও এই সম্পর্ক কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। ছয় মাস আগে ভারতের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল চীনা বিনিয়োগ আনতে চীন সফরে গিয়েছিল। চীনের সাথে ভারতের বিনিয়োগ আনার সম্পর্ক এটা রিয়েলিটি। আসলে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় উদ্বৃত্ত বিনিয়োগ পুঁজি, সক্ষমতা যে কালে যেখানে যে রাষ্ট্রে আছে, বিনিয়োগ সেখান থেকেই আসবে। সেদেশ সবচেয়ে অপছন্দের হলেও। এটাই স্বাভাবিক। তবুও ট্রাম্পের কোলে চড়ে কিছু যদি বাড়তি ভারতের হাতে লেগে যায়- এমন ব্যর্থ প্রচেষ্টার ব্যতিক্রমও আমরা দেখতে পাবো।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

ট্রাম্পের প্রথম আপোষ

ট্রাম্পের প্রথম আ্পোষ

গৌতম দাস

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2cS

 

 

 

হাওয়া কি এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে? অনানুষ্ঠানিক আলাপে আমরা কাউকে যেমন পাগলা বলি, ঠিক তেমন আমেরিকান নতুন প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে নিজের নামের আগে আমাদের দেশী ভাষায় এই ‘পাগলা’ বিশেষণ লাগিয়ে ফেলার মত কাজ করেছেন – পাগলা ট্রাম্প। তো সেই ব্যক্তি কি এত তাড়াতাড়ি চীনের ইস্যুতেই ঠাণ্ডা আর থিতু হয়ে গেলেন? কিভাবে? হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতি থেকে জানা যাচ্ছে, ৯ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ফোন করেছিলেন এবং তার সাথে কথা বলেছেন। যে সে কথা নয়; ঐ বিবৃতির ভাষা অনুযায়ী,  “এক ‘দীর্ঘ ফোনালাপ’ [“a lengthy telephone conversation”] করেছেন। বিস্ময়কর তথ্য আরো আছে।

একই বিবৃতির আরো ভাষ্য বা বক্তব্য হল, “The two leaders discussed numerous topics and President Trump agreed, at the request of President Xi, to honor our “one China” policy.  Representatives of the United States and China will engage in discussions and negotiations on various issues of mutual interest”.
বাংলায় অনুবাদ করে বললে, “চীনা প্রেসিডেন্ট শি’র অনুরোধে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘একচীন নীতি’কে সম্মান জানাতে একমত হয়েছেন। … চীন ও আমেরিকা উভয় রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা এখন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ও দরকষাকষিতে বসবেন”। এ থেকে বোঝা গেল, অন্তত এই একটা ইস্যুতে ট্রাম্পের অপরিপক্ক হম্বিতম্বি এমনভাবে শেষ হল যে,  ট্রাম্পের আমেরিকাকে মেনে নিতে হল যে গত সত্তরের দশক থেকে তাদের পুর্বপুরুষ নেতৃত্ব যে ‘একচীন নীতি’ স্বাক্ষর করেছিলেন, মেনে চলেছিলেন নিজ নিজ প্রশাসনের আমলে তারা গবেট ছিলেন না। আর এটাই ট্রাম্পের প্রথম পিছু হটা এবং আপসরফা। এমন নাকে-খতের পথ তাকে আরও নিতে হবে।

একচীন নীতি মানে হলো, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এটা স্বীকার করা। এই পূর্বশর্ত পূরণ করার পরই এর ভিত্তিতে চীন যেকোনো রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করে থাকে। আমেরিকার সাথে মাওয়ের চীন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল গোপনে অন্তত ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে। পরের বছর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেকালের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফর দিয়ে সেটা প্রকাশ্যে ঘটেছিল। আর এসব ঘটনার পরম্পরায় শেষে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত এক পারস্পরিক চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পারস্পরিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও সম্পর্ক শুরু করেছিল চীন-আমেরিকা। বলা বাহুল্য, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ এই শর্ত মেনেই আমেরিকা তাতে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প ১১ ডিসেম্বর ২০১৬ ফক্স নিউজ কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন বয়ান দেয়া শুরু করেছিলেন যে, আমেরিকা কেন সেই ‘পুরনো কমিটমেন্টে আটকে’ থাকবে। প্রশ্নের ভঙ্গিতে তিনি কথাটা তুলেছিলেন। এর আগে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট তাকে স্বাগত জানানোর উছিলায় ফোনকল করেছেন বলে তাতে ট্রাম্প সাড়া দিয়ে কথা বলেছিলেন। এ রকম অন্তত আরো তিনটি ঘটনা আছে যেখানে ‘একচীন নীতি’ ট্রাম্প মানতে চান না অথবা মানবেন না কিংবা দরকার হলে চীনের সাথে ট্রাম্প সংঘাতে যেতে চাইতে পারেন, তা প্রকাশ পেয়েছিল। যেমন ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেকস টিলারসন তার প্রার্থিতা সিনেটে অনুমোদনের শুনানিতে জবাবে, সাউথ চায়না সি থেকে চীনাদের তাড়ানোর জন্য সামরিক বলপ্রয়োগের কথা বলেছিলেন। জন বোল্টন জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মে (২০০১-২০০৫) জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাইওয়ানের পক্ষে লবি করার এক বড় প্রবক্তা মনে করা হয় তাকে। কূটনীতিতে বলপ্রয়োগ বা চাপে ফেলে আমেরিকান নীতির পক্ষে অন্য রাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ে সিদ্ধহস্ত এই কূটনীতিক। ট্রাম্পের বিজয়ের পর তিনি সরব হয়ে উঠেছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, তিনি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বা সেক্রেটারি অব স্টেট) হতে যাচ্ছেন হয়ত। কারণ ট্রাম্পের বিজয়ের পরে তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎও করেছিলেন। এছাড়া, স্টেফান ইয়েটস, বুশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির ডেপুটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। তিনিও ট্রাম্পের পরোক্ষ দূত হিসেবে আন-অফিসিয়ালি তাইওয়ান সফরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরেই তিনিই প্রথম তর্ক উঠান যে, ‘একচীন নীতি’তে দেয়া প্রতিশ্রুতিতে আমেরিকাকে আটকে থাকতে হবে কেন?
এই তিন ঘটনা ছাড়াও, চীনের অর্থনীতির উত্থানের কারণে আমেরিকানদের কাজ ও চাকরি নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। পুরা নির্বাচনী প্রচারণা জুড়ে এটাই ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল। ফলে ট্রাম্প আমেরিকার বাজারে চীনা পণ্য প্রবেশের উপর  ৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে তা ঠেকাবেন- এজাতীয় সস্তা জাতীয়তাবাদী স্লোগান ছিল নির্বাচনে ভোটের বাক্স ভরতে ট্রাম্পের পপুলার দাবি। এসব মিলিয়ে সত্তরের দশক থেকে ক্রমশ দাঁড়ানো চীন-আমেরিকার গভীর সম্পর্ক ট্রাম্পের আমলে এক বিরাট ধাক্কা খেতে যাচ্ছে মনে করে দুনিয়ার সংশ্লিষ্ট সবাই শঙ্কিত হয়ে উঠছিলেন। টলারশন সামরিক হুমকি দিয়েছেন আর ট্রাম্প চীনের সাথে সংঘাতে যেতে চান এমন ধারণাগুলো প্রচার করা সত্ত্বেও আমেরিকার কোনো ব্যবসায়ী, ওয়াল স্ট্রিট অথবা কোনো করপোরেট গ্রুপ – কেউই ট্রাম্পের সামরিক পথে অবস্থানের ইচ্ছা বা সঙ্ঘাতমূলক পন্থা গ্রহণকে সমর্থন করতে পারেনি, তাতে চীন-আমেরিকান কোন সম্ভাব্য সংঘাতে তাদের অবস্থানের যে দিকেই থাকুক। কিন্তু কেউই নিশ্চিত থাকতে পারছিলেন না যে, এই পাগলা প্রেসিডেন্ট শেষে হঠাৎ না কী করে বসেন। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে  ট্রাম্প আর শি জিনপিংয়ের ফোনালাপ তাই সবাইকে একধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।

ব্যাপারটাকে চীনের দিক থেকে দেখলে, এ প্রসঙ্গে চীনা অবস্থান শুরু থেকেই ছিল খুবই পরিপক্ব ও মাপা। ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের তারিখ ছিল ২০ জানুয়ারি। ফলে ওই তারিখের আগে মিডিয়ায় যতই নতুন নতুন উসকানিমূলক খবর নিয়মিত প্রকাশ পাক না কেন, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সব সময় এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিল। কেবল বলেছিল,  ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার আগে সব মিডিয়া রিপোর্টই জল্পনাকল্পনামূলক, আনুষ্ঠানিক কিছু নয়। তাই অনুমাননির্ভর বিষয়ে চীন কথা বলবে না। তবে, কেবল ৮ নভেম্বর ২০১৬  ট্রাম্প নির্বাচনে জিতেছিল। তাই এই ফল প্রকাশের পর থেকে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের মূলনীতি বিষয়ক একটা কথা চীন বলে এসেছে যে, গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে চীন-আমেরিকার ভবিষ্যৎ ভাগ্য এক সুতায় বাঁধা পড়েছে। ফলে একমাত্র পরস্পর ডায়লগ করেই এক সাথে হাঁটতে হবে। চীন এ কথা ক্রমাগত প্রচার করে গেছে। ওদিকে আবার নির্বাচনে বিজয়ের পর ট্রাম্পের একচীন নীতি নিয়েও আবার দরকষাকষি করতে চাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করার পর প্রতিক্রিয়ায় চীন পরিষ্কার করে বলেছে, ‘চীনের একচীন নীতি কোনো দরকষাকষির বিষয়ই নয়’।

তবে ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর থেকে দুটো কারণে চীন প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হতে শুরু করেছিল।  সাধারণভাবে বললে তখন থেকে, চীন গাজর-লাঠি (হয় গাজর খাও, না হলে লাঠির বাড়ি) নীতিতে চলে যায়। তা হল, আমেরিকান লোকদের কাজ বা চাকরির সমস্যা নিয়ে চীনের সাথে বসে আলোচনায় সমাধান সম্ভব। চীন সেখানে ছাড় দিতেও রাজি। ওবামা আমলে ২০১১ সালে এমন এক আপসরফা হয়েছিল। কিন্তু চাকরির সমস্যাকে উছিলা করে সঙ্ঘাতের রাস্তায় সামরিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনার পথ ধরলে মুখোমুখি মোকাবেলার পথে যাওয়া হবে – এই ছিল চীনের ম্যাসেজ। এটা হলো অনেকটা এক জামাইয়ের বড়লোক শ্বশুরের মেয়ে বিয়ে করার অবস্থা। বিয়ের পর বউ-সন্তান নিয়ে জামাইয়ের দিন-খারাপ কাটছিল না। কিন্তু হঠাৎ করে জামাইয়ের মনে হল, বিয়ের আগের তুলনায় এখন তাঁর সংসার খরচ বেড়ে গেছে। তাই সে বউ তালাক দিতে চায়। এ কথা শুনে শ্বশুর প্রথমে জামাইকে তোষামোদ করে আর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাকে তালাকের সিদ্ধান্ত থেকে সরানোর চেষ্টা করছিলেন। শেষে না পেরে একপর্যায়ে শ্বশুর বললেন, হয় তুমি আলাপ আলোচনায় আস, তাতে সংসার চালানোর অর্থে টান পড়লে ভর্তুকিও দেয়া হতে পারে। কিন্তু তুমি যদি না মানো, তবে তোমাকে লাঠিপেটা করা হবে।’ এই গাজর-লাঠির নীতিতে কাজ হয়েছিল। জামাই আলোচনার টেবিলে বসে সব সমস্যার সমাধান করেছিল। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে,  ট্রাম্প বিরতিহীন গরম কথা বলতে বলতে তাথেকে এই প্রথম অন্তত একটা ইস্যুতে তাঁকে  পিছু হটতেই হল। কারণ ট্রাম্পের এখন সেই জামাইয়ের দশা। ইতোমধ্যে চীন দক্ষিণ চীন সাগর রক্ষা নিয়ে সামরিক মহড়াসহ পালটা প্রস্তুতি হিসাবে অনেক কিছুই তাকে আমরা করতে দেখেছি। তবে সেটা যা-ই করুক আর না করুক, চীনের মূল উদ্বিগ্নতা ছিল আরো ব্যবহারিক। কী সেটা?
কয়েক দিন আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ট্রাম্পের ফোনালাপ মাঝপথে হঠাৎ থেমে যায়। নির্ধারিত সময় অর্ধেক শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প ফোন রেখে দিয়েছিলেন এবং ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় হঠাৎ থেমে যাওয়া সেই ফোনালাপের ঘটনা কী পরিস্থিতিতে থেমে যায় তা ফাঁস হয়ে যায়। এই ঘটনার কথা চিন্তা করে চীনা সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল। ‘পাগলা’ ট্রাম্পের সাথে চীনা প্রেসিডেন্ট কিভাবে কথা বলবেন – ট্রাম্প যদি সেখানেও অর্ধেক কথা বলেই ফোন রেখে দেন? এরপর যদি একইভাবে সবকিছু মিডিয়ায়  ফাঁস হয়ে যায় তবে তো তিনিও বিব্রত হবেন, এই ভয় পেয়ে বসেছিল শিং জিনপিংকে। ফলে কূটনৈতিক পর্যায়ে চীন-আমেরিকার পররাষ্ট্র বিভাগ বসে আগেই সব কিছু ঠিক করে নেন। প্রেসিডেন্ট-দ্বয় কে কিভাবে কথা বলবেন, কতটুকু কোথায় রাজি হবেন ইত্যাদি নিয়ে আগেই কথা বলে নিয়েছিলে উভয় পক্ষ। অর্থাৎ আগে স্ক্রিপ্ট আর পরে সেই স্ক্রিপ্ট মোতাবেক শুটিং। এই ফরম্যাট মোতাবেক আগের দিন মানে বুধবার ট্রাম্পের অফিস সংবাদমাধ্যমকে জানায় যে, পরের দিন তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে কথা বলবেন। এরপর তাদের ফোনালাপ শেষে দুই পররাষ্ট্র অফিস থেকে দুটো আলাদা পূর্বনির্ধারিত বিবৃতি যায়। সব কিছু আগেই আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করে নেয়া হয়েছিল। সবই পাগলা ট্রাম্পের মহা কৃতিত্ব।

একটা বাড়তি পাওয়া প্রসঙ্গ আছে – তাইওয়ানের প্রতিক্রিয়া। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখছে,
“Taiwan’s presidential office spokesman Alex Huang said in a statement that the island’s government and the United States “both maintain close contact and communication so as to keep a ‘zero accident’ approach” to their relationship”.
“হাতছুট কোন দুর্ঘটনা শুণ্যে নামিয়ে রাখা – এই এপ্রোচ নিয়ে  দ্বীপ (তাইওয়ান) সরকার ও আমেরিকা দুই পক্ষ ঘনিষ্ট সংযোগ ও যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে”। কারণ চীন-আমেরিকার কোন উত্তেজনায় প্রথম বোমাটা তাইওয়ানেরই খাবার সম্ভাবনা।

এখন পুরা ঘটনা থেকে অন্তত একটা জিনিস পরিষ্কার হল যে, এখনো ট্রাম্পের প্রশাসনের কিছু লোক আছেন যারা ট্রাম্পকে পরামর্শ শুনতে বাধ্য করতে পারেন। ট্রাম্প কি এখন থেকে থিতু হয়ে কথা বলবেন? যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে করে কথা বলবেন?

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

 

ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

গৌতম দাস

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2cF

 

 

 

বলার অপেক্ষা রাখে না দুনিয়াজুড়ে সবার উপরে এক ট্রাম্প-জ্বর চেপে বসেছে। ট্রাম্প মানে, গেল মাসে শপথ নেয়া আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প। ট্রাম্পের আগমণের মুল ম্যাসেজ হল, আমেরিকার সাথে সম্পর্কিত দুনিয়াজুড়ে যত ঘটনা আছে তা আর আগের মতো করেই আগের নিয়মে, অভ্যাসে বা আইনে ঘটবে না এটাই আজকে ধরে নিতে হবে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তবে এর চেয়ে বড় কথা ‘ট্রাম্প কেন এমন’ গভীরে গিয়ে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। যদিও বলা হচ্ছে ট্রাম্প আনপ্রেডিক্টেবল লোক। মানে লোকটা কখন কী করে তা আগে বলা যায় না, এর তালঠিকানা নেই। কিন্তু যে লোক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তার তালঠিকানা নেই এটা বুঝতে হবে, সেটা আবার কেমন কথা? হ্যাঁ, তা ঠিক। ব্যাপারটা হল, আসলে আমরা বলতে চাচ্ছি, কোনো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের যেসব কাজ যেভাবে করা্র কথা না বা যেভাবে বলার কথা না বা অথবা যেসব নীতি নেয়া অসম্ভব অথবা হওয়ার কথা নয় বলে আমরা মনে করতাম; ট্রাম্পকে আমরা তেমন কাজ করা ও সিদ্ধান্ত নিতেই  দেখছি। ফলে কাম্য অর্থে আমরা বলছি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তালঠিকানা নেই। ব্যাপারটা যেন এ রকম যেমন, আমেরিকা এক এম্পায়ার, মানে এক মোড়ল বলে ধরতে পারি। এখন যে লোক মোড়ল তার বাসায় সারা দিন বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের লোকের আসা লেগেই থাকবে। ফলে স্বভাবতই তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও মোড়লকে করতে হবে। এই আপ্যায়ন বলতে ন্যূনতম চা-নাশতা আর এর চেয়েও প্রধান বিষয় যথেষ্ট বসার জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন মোড়ল যদি হঠাৎ বলে এখন থেকে আর বসার কোনো ব্যবস্থাই থাকবে না, দাঁড়িয়ে কথা শেষ করতে হবে তাহলে সমাজ বলবে এই মোড়লের তালঠিকানা নেই।

ট্রাম্পের নীতি কেমন এই প্রশ্নে মিডিয়া বলছে সে প্রটেকশনিস্ট, মানে সংরক্ষণবাদী। সংরক্ষণবাদী মানে কী? মানে হল যে নিজ বাজার বিশেষত অন্য অনেক কিছুর সাথে নিজ জনগণের চাকরির বাজার সংরক্ষণ করে আগলে রাখতে চায়। সাধারণ অর্থে এটা দোষের কিছু নয়। সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হল কী ভাবে? যেভাবে করতে চাওয়া হচ্ছে তা কী কাজ করবে? অন্য কোন পথ কী নাই?  ট্রাম্প নিজে তার এই নীতির দিকটা ঠিক ‘সংরক্ষণবাদী’ বলে পরিচয় করান না। বলছেন, এটা নাকি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, মানে সবকিছুতে সবার আগে আমেরিকা – এই নীতি। তার শপথ নেয়ার পরবর্তী বক্তৃতার প্রথম প্রসঙ্গ ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বয়ান।
আবার অনেকে  বলছেন,  ট্রাম্পের নীতি অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন। সংরক্ষণবাদী মানে এর আর এক অর্থ ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন’ ত বটেই।  সেই সত্তরের দশক থেকে আমেরিকা এত দিন সবাইকে গ্লোবালাইজেশন যোগ দিয়ে নিজ নিজ বাজার খুলে দিতে প্ররোচিত করত চাপ দিত। আজ, সেই আমেরিকা ট্রাম্পের জমানায় এসে উল্টো দিকে চলা শুরু করেছে। যেমন সে ওবামার আমলে সে চীন বাদে ১২ রাষ্ট্রের বাণিজ্য জোট – টিপিপি করেছিল। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে প্রথম সপ্তাহেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমেরিকাকে ওই বাণিজ্য জোট থেকে বের করে এনেছে।

কিন্তু গ্লোবালাইজেশন আর বাজার এর সম্পর্ক কী – এসম্পর্কে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে।  গ্লোবালাইজেশন মানে অবশ্যই নিজ বাজার খুলে দেওয়া। কিন্তু এটাই এর একমাত্র অর্থ বা দিক বৈশিষ্ট নয়। বাজার খোলা মানে অন্যের বাজার খোলা পাওয়াও বটে। অন্যের বাজার খোলা পেয়েছি বলেই ত গার্মেন্ট বেচে বছরে ৩২-৩৮ বিলিয়ন ডলার কামাতে পারি। যদিও আমেরিকার মাতব্বরি তাই গ্লোবালাইজেশনে এসে কম অথবা অকার্যকরও হয়ে যায় নাই। আমাদের বাজার খুলে দিবার মানে গ্লোবালাইজেশনের অংশ হবার আগেও যেমন আমাদের উপর আমেরিকান দাদাগিরি ছিল এখনও প্রায় তেমন কার্যকর আছে। এমনকি গার্মেন্টস নিয়ে আমেরিকার বাজারে সব পণ্য কোডে ঢুকতে যাতে না পারি সেজন্য কোটার নিয়ন্ত্রণ দেয়া আছে। এতসব কিছুর পরও ব্যাপারটা হল – কিছু কিছু ছিদ্র আছে, শর্ত পরিস্থিতি আছে, ক্যাপিটালিজমের লজিক আছে, স্ববিরোধীতা আছে  যেখানে আমেরিকা মুরুব্বির ক্ষমতা থাকলেও তা প্রয়োগ করতে পারে না। কাজে লাগে না। তাদের আরো বড় ক্ষতি হবে বলে। এদিকে আমাদের নিজ সক্ষমতা আছে, দক্ষতা আছে, নিজ শ্রমের বাজারমুল্য বিদেশের তুলনায়  সস্তা এবং দক্ষ (নুন্যতম মজুরি বাড়িয়ে দিলেও তা সস্তা থাকবে) – এই ধরণের আরও অনেক তুলনামূলক-সুবিধা (কমপিটিটিভ এডভ্যানটেজ) আছে – এগুলো আমেরিকা চাইলেও ঠেকায় রাখতে পারে না। আমাদের এসব সুবিধার দিক গুলো নিয়ে –  লেগে থাকা স্টাডি, আর বুদ্ধি খরচ করে চলতে পারলে আমাদের জন্য বন্ধ বাজার (প্রটেকশনিজম) এর  চেয়ে তুলনায় গ্লোবালাইজেশন এর সুবিধা বেশি। ফলে আজকের যুগের লড়াইটা  – গ্লোবাল বাজারে নিজের শেয়ার বাড়ানোর, এটা ঠিক নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়, বা অন্যের প্রবেশ ঠেকানো নয়

চলতি শতকের শুরু থেকেই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে বুশের দ্বিতীয় টার্ম (২০০৫ সাল) থেকে শুরু করে ওবামার দুই টার্ম এই পুরা সময় ধরে আমেরিকা এশিয়ায় চীনা কনটেনমেন্ট নীতি বা ‘চীন ঠেকানোর আমেরিকার নীতি’ চালু রেখেছিল। এই নীতির সার কথা হল – চায়না ঠেকানো ( China Containment)। মানে দুই রাইজিং ইকোনমির (ভারত ও চীন) একটাকে কাছে টেনে ফেবার করে, সুযোগ সুবিধা দিয়ে অন্যটার বিরুদ্ধে লাগা ও লাগানো। ভারতকে কাছে টেনে কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে, নিজের মোড়লি-শক্তির কিছু ভাগ ভারতকে দিয়ে তাকেও চীন ঠেকানোয় কাজে লাগানো। গত প্রায় ১০-১২ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি এটাই।   কিন্তু এই ব্যাপারে ট্রাম্পের নীতি সম্ভবত ভিন্ন হতে যাচ্ছে, না চাইতেও। যেমন চীন বা ভারতের সাথে ট্রাম্প যে আমেরিকা সাজাতে চাইছে তাতে এই দুই রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তি হবে – আমেরিকান কাজের বাজার এই চীন বা ভারত কে কোথায় নষ্ট করছে সেটা দেখা ও ঝগড়া করে ঠেকানো। যে যেখানে আমেরিকান কাজের বাজার নষ্ট করছে সেখানে তার সাথে বিরোধিতা চরমে নেওয়ার নীতি এটা। এজন্য যদিও ট্রাম্প পরিষ্কার করে বলেননি যে চীন ঠেকানোর পুরনো নীতি তার আমলে কী হবে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, আমেরিকান কাজের বাজার কেউ নষ্ট না করুক এটাই ট্রাম্পের ফোকাস। আর সেটাকে বাধা দেয়াকে মুখ্য করে বিদেশ নীতি সাজানো ট্রাম্পের নীতি।

তাহলে সার কথা দাঁড়াল, চীনের বিরোধিতা ওবামারও ছিল। অর্থাৎ  ‘চীন ঠেকানোর’ “এশিয়াতে আমেরিকা পিভোট বা ভারসাম্য আনয়নকারী হয়ে থাকবে” এই নীতি ওবামা চালিয়ে গিয়েছেন। মানে সেটা এশিয়ায় চীনা প্রভাব ঠেকানো অর্থে। এদিকে ট্রাম্পও চীন-বিরোধী তবে সেটা আমেরিকার কাজের বাজার কতটা চীন ধ্বংস করছে সেটা ঠেকানো অর্থে। আর ওদিকে ভারতের বেলায়, ওবামা (এবং তারও আগে বুশও ছিল) ভারত-তোয়াজের পক্ষে, চীন ঠেকানো তত্ত্বের কারণে। কিন্তু ট্রাম্প ইতোমধ্যে ভারত-বিরোধী অবস্থান নিয়েছে, তবে সম্পুর্ণ ভিন্ন ভাবে। কারণ ভারতের আইটি শিল্প এই টেকনোলজি আমেরিকান নাগরিকের চাকরি খাচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। প্রসঙ্গটাকে আমরা ‘H1-B ভিসা কর্মসূচি’ দিয়ে বুঝতে পারি। এটা একটা বিশেষ ক্যাটাগরির ভিসা কর্মসূচির নাম। আমেরিকার আইটি শিল্প বা সফটওয়্যার ব্যবসার বাজারটা মোটামুটি ১২০-১৫০ বিলিয়ন ডলারের। এর প্রায় ৭০ ভাগ বাজার ভারতের দখলে। ভারতীয় মালিকানার তবে আমেরিকায়ও রেজিষ্টার্ড তিন-চারটা কোম্পানী এই বাজার দখল করেছে। আমেরিকায় রেজিস্টার্ড ভারতীয় মালিকানা কোম্পানিগুলো ওই ভিসা ক্যাটাগরিতে ভারত থেকে প্রোগ্রামারদের এনে আমেরিকার প্রোগ্রামারের থেকে কম বেতনে কাজে নিয়োগ করে আসছিল। যদিও ওই ভিসা ক্যাটাগরির পেছনের আইনে বলা ছিল যে এই ক্যাটাগরিতে ভারতীয় বা বিদেশীদের আনতে গেলে তাদের ন্যূনতম বেতন বছরে ৬০ হাজার ডলার বা এর বেশি হতে হবে। শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর সাফাই ছিল যে, যেসব দক্ষ ও মেধাবী শ্রমগুলো (যাদের বেতন ৬০ হাজার ডলার এই মাপকাঠির ) আমেরিকায় যথেষ্ট পাওয়া যায় না আর সেকারণে তারা বিদেশ থেকে আনতে চাইছে। এই কথা আরো পোক্ত করতে বলা হত যে, ভারতীয়দের মাস্টার্সও আছে, আমেরিকানদের বেলায় মাস্টার্স করা চাকরিপ্রার্থী থাকে খুব কম জনের।
ট্রাম্প এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিপক্ষে তবে সেটা সে করতে চায় শর্তগুলোকে আরও কঠিন করে দিয়ে। তবে আরও শর্ত আরোপ করে এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিরুদ্ধে কেবল ট্রাম্প নয়; এমনকি কংগ্রেসে ও সিনেটে এখন সংখ্যাগরিস্ট রিপাবলিকান – ট্রাম্পের দল শুধু এই রিপাবলিকানরাও নয়, এই দলে অনেক ডেমোক্র্যাটও আছেন। তাই ট্রাম্পের শপথ নেয়ার আগেই গত ৫ জানুয়ারি থেকে কংগ্রেসে ‘হাই-স্কিল্ড ইনটিগ্রিটি অ্যান্ড ফেয়ারনেস অ্যাক্ট, ২০১৭’ নামে বিল আনার তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। এই কাজে এখনই চার থেকে পাঁচটা প্রস্তাবিত আইন কংগ্রেসে ঘোরাফেরা করছে। সেগুলোর অন্তত একটা বাই-পার্টিজান মানে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দুই দলের দুই সদস্যের যৌথ প্রস্তাব। শুরুর দিকের প্রস্তাবগুলোতে সংশোধিত  ‘H1-B ভিসা কর্মসূচিতে’ মুখ্য দুই পরিবর্তনের মধ্যে ছিল ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ডলার করা; আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা। এমন প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি হল, বছরে এক লাখ ডলার মানে মাসে আট হাজার ডলারের বেশি দিয়ে বিদেশী-ভারতীয় লোক আনতে গেলে সেটা আর আমদানিকারক কোম্পানীর কাছে লাভজনক থাকবে না। কারণ ওর চেয়ে কম বেতনে আমেরিকা থেকেই স্থানীয়ভাবে প্রোগ্রামার পাওয়া যাবে। আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকার শর্ত উঠিয়ে দেয়া মানে স্থানীয়ভাবে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামাররা ওই চাকরির আবেদন করতে পারবে ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হতে পারবে। এদিকে ট্রাম্পের শপথের পরে আরো যেসব নতুন বিল বা আইনের প্রস্তাব কংগ্রেসে উঠেছে সেগুলোতে ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ত্রিশ হাজার রাখা হয়েছে। বলা বাহুল্য ভারতীয়দের মাথায় হাত। ইতোমধ্যে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর ভারতে রেজিস্টার্ড অংশে শেয়ার বাজারে দরপতন হয়েছে গড়ে শতকরা ৯ ভাগ। আমেরিকান শেয়ারবাজারের এক অ্যানালিস্ট হিসাব করে বলছেন ভারতীয় তিন শীর্ষ কোম্পানিকে [টিসিএস (টাটা), ইনফোসিস ও উইপ্রো] নতুন হবু আইনে ৬০-৭০ ভাগ বেশি বেতন গুনতে হবে। ফলে আনুপাতিক মুনাফা কমে যাবে। অর্থাৎ অবস্থা খুবই বেগতিক। এসব কোম্পানির এক মালিক সমিতি আছে নাম ন্যাসকম (NASSCOM)। তারা খুবই তৎপর হয়ে লবিং করছে। তাদের কোম্পানীগুলো আমেরিকায় ব্যবসা করে কত ট্যাক্স দেয়, কত নতুন আনুষঙ্গিক কাজ সৃষ্টি করেছে এর এক স্টাডির ফিরিস্তি দিয়ে ট্রাম্পের দলবলের মনগলানোর চেষ্টা করছে। ওদিকে মজার কথা হল, মোদি সরকার নিশ্চুপ, প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অথচ গত নভেম্বরে ট্রাম্পের বিজয়ের পর থেকে এই বিপদ যে আসছে তা সরকার ও সংশ্লিষ্টরা সবাই জানে। তাহলে? বিষয়টা হল, কৌশল আর এক পুরনো বিশ্বাস। প্রকাশ্যে আপত্তি হইচইয়ের থেকে গোপনে যেভাবে সে আমেরিকার বিশেষ নজরের বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছিল এতদিন, সেটার অপেক্ষায় থাকা আর সে দিকে চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মোদি সরকার। আনন্দবাজার পত্রিকার এমনই এক রিপোর্টের শিরোনাম, ‘ট্রাম্পের শরণার্থী বিতর্ক এড়িয়ে আপন স্বার্থে নজর ভারতের’।  ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার পর মোদি পঞ্চম রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। এরপরে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ শেষে ২৫ জানুয়ারি সরকারপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ফোনে কথা বলেছেন। কিন্তু সেখানে কী আলাপ হয়েছে কোন আশার আলো আছে কিনা এসব বিষয়ে তেমন কোনো ব্রিফিং নাই।  ভারতের উদ্বিগ্নতার ইস্যুগুলো নিয়ে কোনো আলাপ হয়েছে কি না তেমন কোন কিছু জানা যায়নি। তবে কয়েকজন আমেরিকান বিশেষজ্ঞের মতামত হল, ভারত আমেরিকানদের চাকরি খেয়েছে – এই জায়গা থেকে কোনো ছাড় দেয়া অথবা সরে আসার কোন সম্ভাবনা তারা দেখেন না।

অনেক পাঠকের মনে হতে পারে যে, ট্রাম্প বা যেকোনো জাতীয়তাবাদী তো এমন সংরক্ষণবাদী অবস্থান নেবেই, ফলে এই সিদ্ধান্ত সঠিক। সরি, আসলে ব্যাপারটা তা নয়, এত সরলও নয়। বরং সস্তা জাতীয়তাবাদ, তাই এটা এযুগে অচল। যদিও আপাতদৃষ্টিতে তা সঠিক মনে হচ্ছে। কেন?
মূল বিতর্ক হল – শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর যুক্তি হল, যেমন একজন বলছেন –

Mr. Levie said, “When you have incredible talent that wants to work in your organization but you are preventing them from doing so, that is disastrous to innovation and competition.”

বাংলা করলে, ‘এক দিকে বিরাটসংখ্যক ট্যালেন্ট আমাদের সংগঠনের সাথে কাজ করতে চাইছে আর আমরা তাদের আটকে রাখতে চাইছি, এটা উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার দিক থেকে ধ্বংসাত্মক’। ইমোশনাল না হয়ে দেখলে আসলে, এখানে ট্যালেন্ট বলে ডেকে কোম্পানীগুলোর অবস্থানের পক্ষে এই সাফাই তৈরি করা হয়েছে। যার পিছনের সত্যি কথাটা হল, এই ‘ট্যালেন্টদের’ ভারত থেকে সস্তায় কম বেতনে পাওয়া যায় বলেই তাদেরকে গৌরবান্বিত করে এমন ট্যালেন্ট ডাকা হচ্ছে। কোনো কারণে যদি আমেরিকাতেই তুল্য দক্ষ শ্রম সস্তায় পাওয়া যেত, তবে সেসব আমেরিকানরাই সেক্ষেত্রে আবার ট্যালেন্ট হয়ে যেত। আসল কথা আমাদেরকে ক্যাপিটালিজমের স্বভাব বৈশিষ্ট্য খেয়াল রাখতে হবে। সে অবশ্যই সস্তা শ্রমের পক্ষে সব ধরনের যুক্তি-সাফাই গাইবেই। এখন প্রশ্ন হল, ক্যাপিটালিজমের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে আইন বানিয়ে ট্রাম্পের পক্ষে জয়লাভ করতে পারা সম্ভব কি না?

না, পারার কথা নয়। কেন? এই আইন কার্যকর হলে বিদেশী নয় আমেরিকানদের চাকরি হবে। কথা সত্য। কারণ সে ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা কোম্পানীগুলোর ভারতীয়দের চেয়ে স্থানীয়দের নিয়োগ দিলে বেতনের বিবেচনায় লাভজনক হবে। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এটাই একমাত্র বিবেচনার বিষয় নয়, আরও দিক আছে। মূলকথা এই স্থানীয় নিয়োগের বেলার এদের বেতন কিন্তু এখনকার তুলনায় ৬০-৭০ ভাগ বেশি হবে।  যার অর্থ এই সেক্টরের সফটওয়ার প্রডাক্টে ক্রেতাদেরকে  বেশি মূল্যে সফটওয়্যার ও সার্ভিস কিনতে হবে। অর্থাৎ আমেরিকানদের চাকরি দিতে গিয়ে – এই জাতীয়তাবাদ দেখাতে গিয়ে রাষ্টের পুরা সবাইকে  আমেরিকান – জাতিকে বেশি মূল্যে পণ্য কিনতে হবে। কিন্তু সে বাড়তি মূল্য দেয়া অপ্রয়োজনীয়, এই অর্থে কারো ভোগে লাগবে না। পুরোটাই লস। ব্যাপারটা হলো যেন সব আমেরিকান মিলে চাঁদা দিয়ে পকেট থেকে পয়সা গুনে বেকার আমেরিকান আইটি গ্র্যাজুয়েটদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াল। এর চেয়ে বেকারভাতা দেয়া কি সহজ ছিল না? এটা কি ন্যাশনাল প্রডাকশন বাড়ল না ন্যাশনাল লস? কোন খাতে ফেলব? প্রশ্নটা কাজ দেওয়ার, নাগরিকের পকেট কাটা নয়।  অতএব বলে দেয়া যায় – এই সস্তা জাতীয়তাবাদ টিকবে না।

এক গোড়ার সত্য বলি। সত্য এক. আমাদের মতো গরিব ছোট অর্থনীতির দেশের শ্রম (দক্ষ বা অদক্ষ দু’টিই) উন্নত বা বড় অর্থনীতির দেশের শ্রমের চেয়ে সস্তা ও প্রতিদ্বন্দ্বী হবেই। এখনো অনেক দিন এটা হবে। আর সত্য দুই. ক্যাপিটালিজমের সাধারণ ঝোঁক হবে এই সস্তা শ্রমের পক্ষ নেয়া, কারণ ওখানে মুনাফা বেশি হবে। এই সত্য অস্বীকার করে কেউ টিকবে না।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস আমেরিকা যায় – এর তাৎপর্য হল, এতে আমেরিকার শ্রমের বাজারে শ্রমের ন্যূনতম মূল্য তুলনীয় বিচারে কম রাখা সম্ভব হয়, হবে। কেন? আমেরিকান ঐসব শ্রমজীবিরা আমেরিকান বাজারে তাদের পোশাকের চাহিদা মিটাতে পারবে তুলনামূলক কম পয়সায়, এর ফলে আমেরিকায় ন্যূনতম মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব। আবার অন্যদিকে,  বাংলাদেশের কৃষিতে ভর্তুকি দেয়া মানে বাংলাদেশের গার্মেন্টসে মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব করা।

তাহলে সোজা কথাটা হল, অল্প কিছু যেসব পণ্যে আমরা আমেরিকার চেয়ে দামে ও মানে প্রতিদ্বন্দ্বী ও যোগ্য এসবের বাজার আমাদের হাতে আজ অথবা কাল তাদেরকে ছাড়তেই হবে। এ কথা যে যত তাড়াতাড়ি বুঝবে সে ভালো টিকবে। তবে সস্তা জাতীয়তাবাদের সুড়সুড়ি দিয়ে ভোট জোগাড় সেটা হয়ত ফাঁকফোকরে চলতেই থাকবে। রাজনীতিতে মিথ্যা ব্লাফ তো থাকেই।

ঘটনার আরেক মাত্রা আছে। ট্রাম্পের আমলে খুব সম্ভবত আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব ওবামা আমলের মতো আর থাকছে না। কারণ এখন পর্যন্ত ওবামার ‘চীন ঠেকানোর নীতি’ ট্রাম্প চালু রাখবেন কি না, ওবামার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করবেন কি না এর সপক্ষে ট্রাম্পের কোনো অ্যাকশন, নীতি বা কোনো আলামত দেখা যায়নি। বরং এশিয়ায় চীনবিরোধী কোনো জোট গড়ার ওবামার নীতির পথে ট্রাম্প হাঁটছেন না, ইচ্ছাও নাই – তাই স্পষ্ট হচ্ছে। এটাই প্রকাশিত। যেমন যত সহজে ট্রাম্প অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপ ‘গেট লস্ট’ বলে শেষ করলেন সেখানে এর ইঙ্গিত আছে। অথচ ওবামার এই আমলে তার এশিয়া নীতিতে একমাত্র অস্ট্রেলিয়াতেই আমেরিকান মেরিন ঘাঁটি গাড়া হয়েছে। এই অঞ্চলে আমেরিকান নীতি স্ট্রাটেজির সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল অষ্ট্রেলিয়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]