ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

ভারতের কী হাসিনাবিরোধী অবস্থান আসন্ন!

গৌতম দাস

১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2xv

সম্প্রতি ‘বিবিসি বাংলা’ হঠাৎ নড়েচড়ে জেগে উঠেছে। তারা ভারতের পক্ষ হয়ে হাসিনাকে তোয়াজ করতে, মন গলাতে এক আর্টিকেল ছেপেছে যার শিরোনাম হল, “বিএনপিকে নিয়ে ভারতের সমস্যাটা ঠিক কোথায়?”

তাতে মনে হয়েছে বিবিসি যেন শেখ হাসিনা সরকারের এক কড়া সমালোচক – এই মর্মে নিজের একটা পরিচয় তাকে দাঁড় করাতে হবে, যেন এমন পণ করেছে বিবিসি। গত দশ বছরে আমরা বিবিসির এমন ভূমিকা দেখিনি। এ সময়টায় আমরা দেখে চলেছি যখন আমাদের প্রায় সব মিডিয়া হাউজগুলো সরকারের মুখ চেয়ে রিপোর্ট করে চলেছে। সেখানে গত নির্বাচনের সময় থেকে হঠাৎ করে এখন বিবিসি যে সরকারবিরোধী, ধারাবাহিকভাবে তা প্রমাণে এবার তারা উঠে পড়ে লেগেছে। যদিও এবার বাড়তি আর একটা দিক লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে মূলত ভারতের হয়ে কিছু কাজ করে দেয়ার দায়িত্ব বিবিসি নিয়েছে। তাই কয়েকদিন আগে ২৯ জানুয়ারি ঐ রিপোর্ট তারা ছেপেছে।

দেখা গেছে, মূলত ভারত “বিএনপিকে যে কত গভীরভাবে অপছন্দ করে” এরই প্রমাণ-দলিল হতে চেয়েছে এই রিপোর্ট। ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের, বিশেষ করে ‘বাংলা’র নেতাদের সাথে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয় বিবিসি-বাংলার এমন সাংবাদিক হলেন শুভজ্যোতি ঘোষ। এই রিপোর্ট তারই লেখা।

এটা যেন এক অর্ডার দেয়া রিপোর্ট, এমন মনে করার কারণ আছে। কেন? ব্যাপারটা হল, বিএনপি সম্পর্কে ভারতের বিজেপি সরকারের “শক্ত রিজার্ভেশন” বা আপত্তি আছে, এই কথাটা বলবার অছিলা হিসাবে ভারতের থেকে যেন খেপ নিয়েছে বিবিসি। বিবিসি যেন ভান করে যে, তারা নিজের উদ্যোগেই ভারতের কাছে জানতে চেয়েছে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের (বা বিজেপির) সরকারি অবস্থান কী? আর তা জেনে এর ভিত্তিতে এই রিপোর্ট করছে। এটাই শুভজ্যোতি ঘোষের রিপোর্ট। এতে ভারতের লাভালাভ হল যে, তারা বিএনপির বিরুদ্ধে কটু কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন ও নিচ্ছেন। এ ছাড়া দেখানো গেল যে, বিএনপিবিরোধী কথা তারা নিজে যেচে বলেননি, বরং বিবিসি জানতে চাওয়াতে তাদের বলতে হয়েছে।

কিন্তু মোদি সরকার বা বিজেপিকে এখন এই রিপোর্ট করতে হচ্ছে কেন? এটাই সেই তাতপর্যপুর্ণ প্রশ্ন।

আমরা ইতোমধ্যে সবাই কমবেশি জানি, নির্বাচনের আগে কৌশলগত কারণে বিএনপি ভারতের সাথে একটা ‘ওয়ার্কিং টার্ম’ বা একসাথে কাজ করার ন্যূনতম কিছু বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল। ভারতও তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিল। আর  ৯৭% আসন নিয়ে বিজয়ী হাসিনার ভয়ে ভারত এখন সেটাই প্রবল অস্বীকার করতেই বিবিসি দিয়ে করিয়েছে এই রিপোর্ট। যদিও বিএনপির দিক থেকে বোকামি আর অদূরদর্শী নেতৃত্ব বা পাঠানো প্রতিনিধিদের নাদান পারফরম্যান্সের কারণে ভারতের সাথে বিএনপি কথা বলতে গিয়ে ব্যাপারটা অনেকটা নিজের ‘বাবা-মাকে গালি দেয়ার’ মতো অবস্থা করে ফেলেছিলেন তারা। অথবা সময়ে কখনও তারা দৃশ্যত ভারতের ‘অধীনস্থতার’ পর্যায়ে চলে গিয়েছিলেন। তবে নির্বাচনের আগে বিএনপি কৌশলগত কারণে ভারতের দিকে আগোনোতে বা কথা বলাতে সেটা ভুল হয়েছে বা সমস্যা তৈরি করা হয়েছে – এমন মনে করা ভুল হবে। যেকোনো দল কৌশলগত কারণে এমনই করে থাকে। অনেক সময় ক্রিটিক্যাল প্রতিপক্ষকে আস্থায় নিতে বা ‘ঠাণ্ডা’ রাখার জন্য ভিন্ন রাষ্ট্রকে অনেক রকম কথা বলতে হয়, জড়াতে হয়।

যদিও খেয়াল রাখতে হয় যে আমরা এমন কোনো দাগের নিচে নামতে পারি না, যে দাগ আগেই টেনে নিয়ে একাজে নামতে হয়; আর সেটা কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হয়। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা, হোমওয়ার্ক (আমরা কী বললে প্রতিপক্ষ কী কী বলতে পারে এর আগাম অনুমান আর জবাব প্রস্তুত করা) সাথে করে রাখতে হয় আগেই। তদুপরি দক্ষ পেশাদার লোককে প্রতিনিধি বেছে নিয়ে কাজে নামতে তো হয়ই। এমন সব ক্ষেত্রেই বিএনপির মারাত্মক কিছু ত্রুটি ছিল। এ ছাড়া ভারতের সাথে এই আলাপে বিএনপির দিক থেকে মূল কী মেসেজ দিতে চাওয়া হচ্ছে- এর ভাষা, ভঙ্গি আর উপস্থাপন দক্ষতা আগেই নিজের কাছে স্পষ্ট করে নিতে হয়। এককথায় বললে, এ ক্ষেত্রে বিএনপির বড় রকমের কিছু অগ্রহণযোগ্য ব্যর্থতা ও অযোগ্যতা ছিল।

ভারতের দিক থেকে বললে, তারা ভেবেছিল বিএনপির এই এগিয়ে আসা, এটা তাদের ‘উপভোগের সময়’। ব্যাপারটা যেন হাতি হয়ে আয়েশে বসে নত বিএনপির সালাম নেয়ার সময় তাদের। যেন তারা বুঝাতে চাইছে, বাংলাদেশে ভারতপ্রীতির সরকার কায়েম থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের বিরোধী দল নিজেই ভারতের মন পাওয়া বা গলানোর চেষ্টা করছে। ফলে বিএনপিকে এবার ‘বাগে পেয়েছি’ ধরনের আচরণ ভারতের জন্য সঠিক প্রতিক্রিয়া বলে তারা মনে করেছে। যেন বোঝাতে চেয়েছিল, “বাংলাদেশের রাজা ঠিক করার ক্ষমতা আমাদের হাতে, বুঝেছ!”। অথচ তখন নিজেই বুঝেনি, এই নির্বাচন ভারতের জন্য কোন দুর্ভাগ্য বয়ে আনছে। এ প্রসঙ্গে আরো আলোচনায় আমরা পরে আবার আসব। তবে বিএনপি প্রসঙ্গে ভারতের আচরণ, কেবল এটাই বাংলাদেশের নির্বাচন প্রসঙ্গে ভারতের পুরা অবস্থান নয়। বরং বলা যায়- একেবারেই বাইরের দিক, “শো আপ” অংশ এটা।

আসলে ভেতরে রূপটা ছিল খুবই উদ্বিগ্নতার। আমাদের এবারের নির্বাচনে কী হয়, কোনদিকে যায় কী ফল আনে এসব অনিশ্চয়তা নিয়ে ভারত ছিল উদ্বিগ্ন। এর বড় কারণটা হল – তাদের গোয়েন্দা অনুসন্ধানভিত্তিক স্টাডি রিপোর্ট। এসংক্রান্ত বিশ্বাস ছিল, নির্বাচনে কী হতে পারে, ফলাফল ও পরিস্থিতি ইত্যাদির রিপোর্ট। সবখানেই তারা নিশ্চিত হচ্ছিল,”এবার হাসিনার আর খবর থাকবে না”, “আওয়ামী লীগ খারাপভাবে হারবে”। আর বারবার নানা দিক থেকে অনুসন্ধানের একই ফল আসাতে তারা খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। এককথায় তারা দেখছিল হাসিনার “পাবলিক রেটিং” খুবই শোচনীয়। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা যে তারা কী এজন্য নতুন করণীয় পদক্ষেপ ঠিক ভাবে নয়েছে? নাকি তা করতে পিছিয়ে পড়ে যাচ্ছে? অর্থাৎ রেটিং” খুবই শোচনীয় হলে তো হাত ছেড়ে দিতে হবে; নতুন বিকল্প খুঁজতে হবে……ইত্যাদি। ফলে শেখ হাসিনার ওপর থেকে আস্থা একেবারে তুলে না নিলেও ঢিলা দিয়ে ফেলেছিলেন। অথবা বলা যায়, এরই এক প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছিলাম – বিএনপির প্রতিনিধিদের সাথে দেখা করতে আগ্রহী হওয়া। এভাবে আলাপ করার সুযোগ নেয়া হয়েছিল যে, বিএনপি কী চায় সেটা মন দিয়ে শুনতে হবে। আর এগুলো তারা করেছিল আসলে আগ্রহের সাথেই। অথচ এখন এই বিবিসি রিপোর্টে সেসব আগ্রহের কথা এড়িয়ে হাত সব ধুয়ে ফেলার প্রয়াস চলছে। সারকথায়, সে সময়ে বিএনপির সাথে তারা সম্পর্কটা এমন জায়গায় উঠিয়েছিলেন যাতে, যদি শেখ হাসিনার পতন হয়েই যায় সে ক্ষেত্রে সেখান থেকে যেন শুরু করা যায়। যাতে অন্ধকার বা একটা শুধু আঁচড়ের দাগ থেকে তখন শুরু না করতে হয়। অথবা, সেক্ষেত্রে নির্বাচনে সম্ভাব্য “জয়ী নায়ক বিএনপির” ভারতের কাছে একেবারেই অপরিচিত বলে না হাজির হয়, বা ভারতকে “সেই” বিএনপির পেছনে ঘুরতে না হয়।

ভারতের দিক থেকে দেখলে, এটা নিঃসন্দেহে তাদেরকে একটা বড় রিস্ক নেয়া। শুধু তাই নয়, আরও কিছু দিক আছে। যেমন বাংলাদেশের এবারের নির্বাচনে মোদি সরকার শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে সমর্থনের অনুরোধ পেয়েও তা রাখতে পারেনি। এমনকি,  ভারতকে হাসিনার “দেয়ার ভাণ্ডার সব খুলে ধরা” সত্ত্বেও ২০১৪ সালের মতো একজন ‘সুজাতা’ পাঠিয়ে হাসিনার পক্ষে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে পারেনি। বরং উলটা; অর্থাৎ মোদীর ভারত বিএনপির সাথে বাতচিতের খাতা খুলেছিল; যার সোজা মানে হল, বিএনপি ক্ষমতায় এসে যেতেও পারে এমন সম্ভাবনাকে ভারত তখন স্বীকার করেছিল।

কিন্তু পরবর্তিতে যদি ফলাফলে দেখা যায় বিএনপি ক্ষমতায় আসতে পারেনি, তবে সে ক্ষেত্রে এটা হবে শেখ হাসিনাকে অখুশি করার বিরাট এক রিস্ক নেয়া। ভারত সেই রিস্কটাই নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত নিতে ভারত উদ্বিপ্ত হয়েছিল কারণ রেটিং সম্পর্কে ভারতের নিজেদের গোয়েন্ডা অনুসন্ধান রিপোর্ট। অথচ নির্বাচনের পরে ফলাফল পেয়ে ভারত দেখেছিল আসলে বাস্তবেই বিরাট রিস্ক নেওয়াই হয়েছে। কোন অনুমান ফলে নাই।

আবার, কূটনৈতিক রীতি নীতি ভেঙে নির্বাচনে আওয়ামি লীগকে এবারও প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে না পারায় সেটাও আর এক বাড়তি রিস্ক ছিল। বাড়তি রিস্ক এ জন্য যে, আগের বার কূটনৈতিক রীতি ভেঙে সমর্থন করার “সুজাতা স্টান্ডার্ড” তো ভারতেরই সৃষ্টি। এমনকি নির্বাচনের আগে গত বছর মে মাসে শেষ ভারত সফর থেকে ফিরে শেখ হাসিনার হতাশা প্রকাশ আর তখন হাসিনার সেই তাতপর্যপুর্ণ  মন্তব্য “আমরা ভারতকে যেটা দিয়েছি দেশটিকে তা সারা জীবন মনে রাখতে হবে” আমরা স্মরণে রাখতে পারি। হাসিনা কথাটা বলেছিলেন, মঞ্জুরুল ইসলাম বুলবুলকে (বর্তমানে ২১শে টিভির সিইও) দিয়ে করানো এক প্রশ্নের জবাবে।

মোটকথা, ভারত একটা চরম বাজি ধরেছিল। এখন বলাই বাহুল্য ভারত তাতে হেরে গেছে। সারাংশে বললে, ‘শেখ হাসিনা আবার না-ও জিততে পারেন, এর বেশ সম্ভাবনা আছে’ ভারতকে এই অবস্থান নিতে হয়েছিল তার নিজ গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণের কারণে, আর এটাই ছিল তার ‘বাজি’। তবে এটা জুয়ার মতো নয় যে, চরকির কাঁটা কোথায় গিয়ে থামে, এমনটা দেখতে হয়। কিন্তু তাহলে ভারত কোথায় পরাজিত হয়েছিল? যেসব অনুমানের উপর ভারতের গোয়েন্দা অনুসন্ধান বিশ্লেষণ দাড়িয়েছিল এর একটা না ঘটলে কী হবে অথবা তা মিথ্যা হয়ে যেতে পারে – এটা হতেই পারে না ধরে নেয়া হয়েছিল। আর তাই হয়েছিল। মানুষ তো ভোট দিবেই। তাই “যদি মানুষ ভোট দিতে পারে’- ভারতেই সিদ্ধান্ত ছিল এই অনুমানের ওপর দাঁড়ানো। মানে, ২০০৬ সালের আগের বাংলাদেশের স্টান্ডার্ডে অবাধ-নিরপেক্ষ কোনো ভোট এখানে হলে। সেটা ধরে নেয়া হয়েছিল।

কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’, আর সে অনুযায়ী ফলাফল আসে, সে ক্ষেত্রে কী হবে? খুব সম্ভবত, ধরে নেয়া যায় এমন সম্ভাবনার কথা তাদের মাথায়ই আসেনি, তাই ভারতের কোন অনুমানেই এটা ছিল না। ভারতের চন্দন নন্দীর টুইট বলছে, গোয়েন্দারা এমন তথ্য জেনে পাথর (stunned by the outcome) হয়ে গেছিলেন। আর খুব সম্ভবত তা, ভোটের মাত্র চারদিন আগে।

মানে তাদের কোন অনুমানও ছিল না যে,  মানুষ যদি ভোট দিতে না পারে, অথচ ফলাফল ‘রেডি’ পাওয়া যায় সে ক্ষেত্রে কী হবে? এজন্যই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা অনুমান-বিশ্লেষণ মেলেনি। মানে, গোয়েন্দাদের তথ্য সংগ্রহের ব্যর্থতা, সব কিছুর মূলে। ফলে এখন মুখপোড়া অবস্থা। আর সেখান থেকে স্বীয় অবস্থান পুনরুদ্ধারের জন্য ভারতীয় তাগিদের প্রমাণ হল, বিবিসি বাংলার আলোচ্য রিপোর্ট।

নির্বাচনের ফলাফল বা পরিণতি নিয়ে ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণজাত উপসংহার আর এর ওপর দাঁড়িয়েই এটা তাদের কতটা গভীর নির্ভরতা / নিশ্চয়তা দিয়েছিল এর সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল – ৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে লেখা পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর নিবন্ধ। এটা ভারতের গোয়েন্দা বিশ্লেষণের ওপর দাঁড়িয়ে লেখা নিবন্ধ বলে সহজেই অনুমান করা যায়। পিনাক রঞ্জন সেখানে লিখেছিলেন, “… ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে যে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে”। অর্থাৎ তিনি ওই লেখায় ভারতের দিক থেকে শেখ হাসিনার ওপর আর কোন আশা-ভরসা দেখেন নাই না রাখেন নাই।

তাই ভারত হাসিনার আবার ক্ষমতায় ফিরে আসার সম্ভাবনা দেখেননি; এমন ধারণা-অনুমানের ভিত্তিতে পিনাক রঞ্জন লিখেছেন। সেই কারণে আরও সাহস দেখিয়ে আগ বাড়িয়ে হাসিনার বিরুদ্ধে তিনি “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” অভিযোগ, “হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্যের” [সবচেয়ে মজার অভিযোগ ছিল এটা] অভিযোগের মত মারাত্মক বিষয়গুলো এনেছিলেন। সবচেয়ে মারাত্মক দিকটা হল, পিনাক অভিযোগ তুলেছেন, হাসিনা  “গুলি করে হত্যার” নীতি নিয়েছেন। পিনাক লিখেছেন, “মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবসিত”। তবে এটা অন্যের অভিযোগ যা তিনি কেবল ব্যবহার করছেন, বলেছেন। এই ছলের আড়ালে পিনাক কথাটা বলার সুযোগ নিয়েছেন। এ ছাড়াও তাঁর লেখার শেষের বাক্য আরও মারাত্মক বলে প্রতীয়মান। তিনি লিখছেন, “শেখ হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তাঁর প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করাটা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়। ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে’। অর্থাৎ ইন্টারেস্টিং অংশটা হল, সবশেষে শেখ হাসিনাকে ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের একটা হুমকিও দিয়ে ফেলেছেন পিনাক রঞ্জন। তিনি হাসিনাকে ক্ষমতায় আনার সময়ে বাংলাদেশে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। তিনিই ভারতের নীতিনির্ধারণী-পর্যায়ে একসেস রাখেন এবং থিঙ্কট্যাঙ্ক ওআরএফ [ORF] এর ফেলো।

আগেই বলেছি, ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্ট তাদেরকে এভাবে পরিচালিত করেছে। আর রিপোর্ট হয়ত ভুল ছিল না। কিন্তু যদি আগের দিনই ‘ভোট হয়ে যায়’ এই তথ্য বা অনুমান তাদের ছিলই নয়া। এজন্যই তারা পরাজিত হন। এছাড়া আর এক বিষয় তাদেরকে বিভ্রান্ত করেছে।

বিএনপিকে সাথে নিয়ে কামাল হোসেনের জোট ঐক্যফ্রন্ট গঠনঃ এর গঠনের সাথে সাথে এর খুবই দ্রুত উত্থান ঘটেছিল। এই ফেনোমেনাটাকে ভারত নিজের গোয়েন্দা রিপোর্টের সাথে মিল খায়, এমন ঘটনা হিসেবে দেখেছিল। বলা যায়, “নির্বাচনের আগে থেকে ক্ষমতাসীন হাসিনার পতন আসন্ন” ধরনের একচোখের অনুমান ভারতকে শেষে করে দেয়। এতে বড় বিভ্রান্তিতে পড়ে এবার ভারত সব হারানোর দিকে আগানোর ষোলকলা পূর্ণ হয়ে যায়।

তাই বাংলাদেশের নির্বাচন শেষ হওয়ার পর থেকে ভারতের “দিন খারাপ যাওয়া” শুরু হয়েছে, বলা যায়। “চিরদিন, কাহারো সমান নাহি যায়”। বলা যায় আসলে সংসদ নির্বাচনের পরদিন, ৩১ ডিসেম্বর থেকে পরের ছয় দিনে অর্থাৎ নির্বাচনের পরের দিন থেকে মন্ত্রিসভা নির্ধারণের আগের দিন -এর  মধ্যেকার সময়ে বহু কিছু ঢেলে সাজানো হয়ে গেছে। সেই ফেনোমেনাটার নাম দেয়া যায়- এটা ছিল “চীনের সাথে ঘনিষ্ঠতা আর ভারতের সাথে দূরত্ব” তৈরির শুরু। মন্ত্রিসভা সাজানোর ক্ষেত্রে যার প্রথম প্রকাশ ঘটতে আমরা দেখেছি।

আরও লক্ষণীয় হল, ভারতের থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষক (যারা ভারতের সরকারি অবস্থান অনুসরণ করে চলেন) জয়িতা ভট্টাচার্য আর শ্রীরাধা দত্তের প্রবন্ধেও আমারই এক আগের লেখায় আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম আর এক নতুন রূপবৈশিষ্ট্য। আগে ভারতের একাডেমিক জগতের প্রায় সকলেই বাংলাদেশে চীনের ততপরতা ও ঘনিষ্ঠতা বাকাচোখে দেখত। চীনের বিনিয়োগ বা ঘনিষ্ঠতা বেড়ে যাওয়াকে, ভীষণ নেতিবাচক উপস্থাপন করে এই বিষয়গুলোকে দেখতেন। তাদের সকলেরই কল্পিত এক ভারতের “এরিয়া অব ইনফ্লুয়েন্স” বলে এক এলাকা ছিল। আর বাংলাদেশ হল সেই এরিয়ার অন্তর্গত সুতরাং বাংলাদেশে কেউ ঢুকতে পারবে না, এমন উদ্ভট তালুকদারি-দাবি তাদের থাকত। তাঁরা বোঝাতে চাইতেন এখানে ভারত ছাড়া অন্য কারও ঢুকা – এটা ভারতের স্ট্রাটেজিক স্বার্থবিরোধী – এ্মন “গাঁয়ে মানে না” ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তাঁরা লিখে চলতেন। অথচ এখন তারা ভোল বদলিয়ে ফেলেছেন।  শ্রীরাধা [VIF] এখন চীনের ভূমিকার বাস্তবতা মেনে নিয়ে নির্বাচনের পরে লিখছেন – “চীন ও ভারত উভয়েই আর বাংলাদেশের সাথে তাদের সম্পর্ককে নিজ নিজ দ্বিপক্ষীয় সীমার মধ্যে রেখে দেখে না… তাই হাসিনার নির্বাচনী বিজয়ের পাশে চীন ও ভারতের শক্ত হয়ে দাঁড়ানো অযাচিত নয়”।  [Interestingly, both India and China have viewed Bangladesh not only through the prism of bilateralism but also amidst the landscape of the growing regional framework] অর্থাৎ চীন যে এ সরকারের ঘনিষ্ঠ হয়েই গেছে এটা মেনে নিয়েই তাঁরা এখন কথা শুরু করছেন। অবশ্য এর সাথে বোঝানোর চেষ্টা করছেন “তবে, চীনের পাশাপাশি ভারতও আছে”। প্রশ্ন হলো, আসলেই কি ভারতও আছে?

বাস্তবে নেই। আর সেটা আমার কথা নয়, ভারতের আচরণ এর প্রমাণ। চীনের মত নয় বড়জোর সাথে ভারতও আছে হয়ত কিন্তু তা আর একই সমতলে পাশে দাঁড়িয়ে নেই। বরং পাত্তা না পাওয়া, টানাটানি শুরু হওয়ার এক দুরবস্থা শুরু হয়ে গেছে যার প্রতিক্রিয়াটাই হলো বিবিসির এই রিপোর্ট।

এবার, শেষের কথাটা আগে বলে দিয়ে শুরু করি। ভারত এত দিন বাংলাদেশ সরকারের মুখটা এক দিক থেকে দেখে এসেছে, এবার আরেক দিকটা দেখবে। প্রধানমন্ত্রী হাসিনা ২০১৪ সালের জুন মাসে চীন সফরে গিয়েও শেষ পর্যন্ত সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ চুক্তি স্বাক্ষর করেন নাই। অনির্দিষ্টকাল তা পিছিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের মুখের দিকে চেয়ে। তবে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, ৬৫ এর বেশি রাষ্ট্রকে অন্তর্ভুক্ত করা এই গ্রান্ড প্রকল্পে বাংলাদেশেরও অন্তর্ভুক্তি, কর্ণফুলীতে টানেল ব্রিজ, বার্মা হয়ে রেল ও রোডে চীনের কুনমিং যাওয়া ইত্যাদিসহ বহু প্রকল্প চুক্তিতে সই করেন বা সংশ্লিষ্ট উদ্যোগ শুরু করে আসেন তিনি। এগুলো পরে অক্টোবর ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর বাংলাদেশ সফরের সময়ে ফাইনাল হয়। সব মিলিয়ে সেসময় অবকাঠামো বিনিয়োগ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল ২৪ বিলিয়ন ডলারের।

অর্থাৎ ২০১৪ সালে নির্বাচনে ‘সুজাতা স্ট্যান্ডার্ডে” ভারতের সমর্থনের মাশুল ভারত সেবার উসুল করেছিল এভাবে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর চুক্তি না হতে হাসিনাকে রাজি করিয়ে। এছাড়া পরে ভারত আমাদের বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রবল আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু এবারের ২০১৮ নির্বাচনে? এই লেখায় আগেই বলেছি “ছয় দিনের” কথা। আমাদের নির্বাচনের পরবর্তীতে হাসিনার একদম খাড়া পদক্ষেপ হল , গত ২০ জানুয়ারি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন নিউজ এইটিনকে [CNN-NEWS18] বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দেয়া সাক্ষাৎকার, যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। বলা যায় এই প্রথম বাংলাদেশ ভারতকে ডিকটাট করতে সক্ষমতা দেখিয়েছেন।

[CNN-NEWS18] এটা আমেরিকার CNN এর সাথে ভারতের Network 18 এর জয়েন্ট ভেঞ্চার, ভারতের এক টিভি মিডিয়া।

আসলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার ক্ষেত্রে এত দিন যেসব ক্ষেত্রে হাসিনা ভারতের স্বার্থের দিকে চেয়ে আর আগান নাই, এখন সেখান থেকেই আবার উদ্যোগ নিয়া তিনি সেই “খাতিরদারির” সমাপ্তি টানছেন। এই খাতিরদারি তার নড়বড়ে অ-অভিষিক্ত ক্ষমতার খামতি পূরণের দিক থেকে এসেনশিয়াল – এমন এক ধারণা তাঁর ভিতরে কাজ করে বলে মনে হয়। যেটা খুব সম্ভবত সমাপ্ত এখন। হাসিনার ঐ সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে বিবিসির আর এক রিপোর্ট ২৩ জানুয়ারি ছাপিয়েছে ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে দেয়া । দৃশ্যত, ভারতের স্বার্থের অনুকূলে দাঁড়িয়ে লেখা সে রিপোর্ট। যার ভাষ্য হল, “ভারতকে হাসিনা তাঁর “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছেন”। অর্থাৎ এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে যে হাসিনা এতদিন নিজ দেশের স্বার্থ বলি দিয়ে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। আর এখন হাসিনা নিজ দেশের স্বার্থকে আর পিছনে ফেলতে রাজি না – এটা বুঝাতে চেয়ে বিবিসি লিখেছে – “নিজ দেশের অগ্রাধিকারের” ব্যাপারটাই ……। কথা ঠিক; এবার দরকার হলে ভারতের বিরুদ্ধে তিনি যাবেন, রাজি আছেন। কারণ এবার “বেল্টরোডে অন্তর্ভুক্তির”  ব্যাপারে তিনি শক্ত করে মন বেঁধে ফেলেছেন। তদুপরি চীনের অবস্থানের সাথে তাল মিলিয়ে বলছেন, “বেল্টরোড নিয়ে ভারত দ্বিপক্ষীয় বা ত্রিপক্ষীয় (চীনকে সাথে নিয়ে) কথা বলতে পারে”। আসলে এই প্রস্তাবটা মূলত চীনের।  গত ২০১৭ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে প্রথমবারের মত  BRI (“Belt and Road Initiative”) সামিট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেখানে অংশগ্রহণ করতে ভারতকে চীনের দাওয়াত দেওয়ার পর সেই প্রথম ভারত এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান আপত্তি তুলে ধরেছিল। আর তখন থেকেই চীনের প্রস্তাব হল, আসেন “কথা বলে” নিগোশিয়েট করি। চীনের সেই কথা বলার প্রস্তাবই এবার সাহসের সাথে হাসিনা ভারতের মুখের উপর ছুড়ে দিল। বা বলতে পারি, হাসিনা বুঝিয়ে দিল যে তার সিদ্ধান্ত ফাইনাল। এবার আর ২০১৪ সালের নির্বাচনে ভারতের প্রকাশ্যে সমর্থনের মত ভারতের মুখ চেয়ে সিদ্ধান্ত নিবার কোন দায় হাসিনার নাই। তি এবার সমর্থন পান নাও অথবা নেন নাই – তাই। তাই মন শক্ত বেঁধে তিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ঢুকে পড়বেন। বাংলাদেশ-চীনের সম্পর্ক [Bangla-China Relation] নতুন মাত্রায় উত্থিত হবে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে  বেল্ট-রোড প্রকল্প বলতে বুঝতে হবে – সোনাদিয়া বন্দর সহ, সড়ক ও রেল পথে বার্মা হয়ে চীন যাওয়ার অবকাঠামোসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রকল্প এমনকি এর বাইরেরও চীনের সাথে বাংলাদেশের সব প্রকল্প। অর্থাৎ ভারতের স্বার্থ পরোনা করে উপেক্ষায় হাসিনার বাংলাদেশ চীনের কোলে উঠে যাবে এখন। [ সাক্ষাতকারের YOUTUBE LINK এখানে]  ঐ সাক্ষাতকারে হাসিনার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ এন্ড ল্যাঙ্গুয়েজ – ইঙ্গিত দিয়েছে হাসিনা এবার জানেন তিনি পিছনে ফিরবেন না। খুব সম্ভবত – ভারতের মুখ চেয়ে চলার দিন ঘুরে গেছে বা শেষ হয়ে গেছে – এমন অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তিনি পথ চলতে শুরু করেছেন। মুখ চেয়ে চলায় তিনি কত ডেস্পারেট ছিলেন তা বুঝতে আমরা মনে রাখতে পারি – তিতাস নদী আড়াআড়ি বাঁধ দিয়ে ভরাট করে তিনি ত্রিপুরায় লং-হুইল ট্রাকে মালামাল কনটেইনার চলাচলের রাস্তা করে দিয়েছিলেন। সেই থেকে ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীটা এখন মরেই গেছে, ধান চাষাবাদ হয়েছে এবার।    

এখন এই “দৃঢ় প্রতিজ্ঞ” হাসিনাকে নিয়ে ভারত কী করবে? কোথায় রাখবে? প্রথমত, কোন বিশেষ গায়েবি চমক না ঘটলে, ভারতের পক্ষে বেল্ট-রোড বা এর সংশ্লিষ্ট কোন কিছু মেনে নেয়া প্রায় অসম্ভব। বরং চীনে ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কান্থা [Ashok K Kantha] (যিনি বেল্ট-রোড প্রকল্পে ভারতের অন্তর্ভুক্তির বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভোকাল) এখন অবসরে ভারতে বসেই “চীনা স্টাডিজ” থিঙ্কট্যাঙ্ক খুলেছেন। তিনি আগে আমাদের যা জানিয়েছিলেন ওর সারকথাটা ছিল – “বেল্ট-রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার চীনে দাওয়াত এটা মেনে নেয়া ভারতের জন্য সম্ভব না কারণ, তাতে ভারত চিরদিনের মত চীনের পিছনে পড়ে যাবে”। কিন্তু গ্লোবাল অর্থনীতিতে ভারতের কী চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া, উপরে থাকা সম্ভব – সে মুরোদ কী আছে? না কী এটা অসক্ষমতার কোন “ফ্যান্টাসি আকাঙ্খা” – এনিয়ে কোন কথা জানা যায় নাই। তবে  নিশ্চয় এখন বেল্ট-রোড প্রকল্প বিরোধী আরও শক্ত যুক্তি আছে তাঁদের কাছে।  অতএব এর সোজা মানে হল, ভারতের পক্ষে আগের মত হাসিনার ‘খাতিরের লোক’ হিসেবে ট্রিটেড বা আলগা খাতিরের লোক হতে চাইলে হাসিনার পরামর্শ মেনে ভারতকেই এখন বেল্ট-রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। আর তা নইলে, ভারতকে কেবল চীন নয়, ঢাকার হাসিনা সরকারেরও বিরুদ্ধে খোলাখুলি অবস্থান ও পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি মাঠে হাজির হতে হবে! যেভাবে নির্বাচনের পরে মাত্র ২২ দিনের মাথায় আমরা হাসিনাকে CNN-NEWS18 সাক্ষাতকার দেখেছি তাতে – অচিরেই ভারতকে কী এমন নতুন অবস্থানে দেখব আমরা?

তাহলে মানে দাঁড়াল, এই নির্বাচনের ফল ভারতের জন্য আর আরামের “শান্তি নাই”; বরং এক ব্যাপক উদ্বিগ্নতা নিয়ে এসেছে। শুধু তাই নয়, যেটা আরো বাড়তে পারে। কারণ ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সময়গুলোতে কোন দেশের বেলার মত বাংলাদেশ সরকারপ্রধানেরও স্বাভাবিক ঝোঁক হয় – এখন ক্রমেই তিনি ড্রাইভিং সিটে বসে পড়তে চাইবেন। বা বলা যায়,মূল কারণ পরিস্থিতি এখন তার অনুকূলে।  ওদিকে ভারতের অবস্থান দেখা যাচ্ছে খুবই করুণ। যেন সেই করুণ দশা বলেই সেটাকে কিছুটা হালকা করার জন্য ভারতের মোদীর নীতিনির্ধারকেরা বিএনপির বিরুদ্ধে কিছুটা বিষোদগার করে হাসিনার মন গলাতে চাইছেন । তাই বিবিসির এহেন রিপোর্ট। ভারত এখন বিএনপিকে মুখরোচক তবে অর্থহীন ইস্যু ‘জামায়াত ছাড়া’র কথা  – হঠাত করে শর্ত হিসেবে খাড়া করছেন। অথচ ভারতের এটা করার বেস্ট সময় ছিল নির্বাচনের আগে বিএনপি যখন ভারত সফরে-লবিতে ছিল তখন তুলে ধরা। অথচ এখন ভারত বলছে বিএনপি  ‘জামায়াত ছাড়া’ না হলে এখন বলছে, না হলে সম্পর্ক হবে না – এমন ভাব ধরছেন।  যার সোজা মানে ভারত পথ হারিয়েছে। এটা তার মুখরক্ষা ততপরতা; সে সিরিয়াস নয়। অথচ বিপরীতে ইতোমধ্যে বিএনপিই ভারতকে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী চরম যে ক্ষোভ-আপত্তি আছে  এখন সেগুলোরই প্রতিনিধিত্বের রাজনীতি করতে ফিরে যাবে বিএনপি। এটাই কী স্বাভাবিক নয়!

আসলে জামায়াত ইস্যু, জঙ্গি বা উলফা ইস্যু ইত্যাদিতে বাংলাদেশের হাসিনার সহায়তার যেসব ইস্যু তুলে আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠতা আর বিএনপি ভারতের কেউ নয় বলে যে লাইন টানতে চাইছে ভারত, খোদ প্রধানমন্ত্রী হাসিনার কাছেই এগুলো আর গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু না, সেসব আর এখন মুখ্য নয়, হিসেবে থাকছে না। বরং চীনের সাথে  হাসিনা সরকারের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা গড়তে ভারতের আপত্তিগুলোর নিরসন না হলেও সেসব কিছু উপেক্ষা করে এগিয়ে যাওয়াই ক্ষমতাসীন নেত্রীর কাছে এখন বড় ইস্যু। ভারতের জন্য কঠিনতম বিপদ এখানেই।

বিশেষত, গভীর সমস্যার দিকটা হল, ভারতের জন্য সময় এখন উলটা হাসিনাকে তুষ্ট করার, মন পাবার। কিন্তু ঘটনা হল, হাসিনাকে তুষ্ট করতে ভারতকে যা করতে হবে তা দেশটি করতে পারবে না। এটা বিবিসির এসব তুচ্ছ রিপোর্ট দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না। বরং ক্রমেই ভারতকে স্বীয় স্বার্থে নতুনভাবে হাসিনা-বিরোধীতার রাজনীতি ও অবস্থানে  উঠে আসতেই আমরা দেখব, আর সে সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারত কি হাসিনাবিরোধী হয়ে যাবে? – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

নির্বাচন পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

গৌতম দাস

১৪ জানুয়ারি ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2wJ

যেমনই হোক, বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। তবে আগামী দিনের ইতিহাস অন্য এক কারণে সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন মনে করবে। কিন্তু কিসের? গ্লোবাল নেতা ও নেতৃত্ব বদলে যাবার। বলা হবে, বাংলাদেশের দিক থেকে দেখা দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্বে বদল টের পাওয়া গিয়েছিল এই নির্বাচন থেকে। আমেরিকার দিন শেষ, গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে তাঁর ছুটি হয়ে গিয়েছিল। হেরে গিয়েছিল। আর বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে চীন গ্লোবাল নেতার আসন গ্রহণ করে নিয়েছিল। মুরোদহীন সোভিয়েত কমিউনিস্টরা সত্তরের দশকে একটা স্লোগান দিত – হাত গুটাও মার্কিন। তাই যেন হয়ে গেল; এসবেরই মাইলস্টোন এই নির্বাচন। আর এখান থেকেই বাংলাদেশ-সম্পর্কিত গ্লোবাল সম্পর্কগুলোর মধ্যে এক নতুন ভারসাম্য তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে নতুন ধরণের এক স্ট্রাটেজিক ভারসাম্যে প্রবেশ করে গেল।

আমরা যে দুনিয়াকে “গ্লোবাল রাজনৈতিক দুনিয়া” অথবা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া” বলে আজ চিনি, এর বয়স খুব বেশি না হলেও তা সর্বোচ্চ ‘সত্তর থেকে ছিয়াত্তর বছরের’। এর মানে এর আগে দুনিয়ায় কি স্বাধীন রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না? হ্যাঁ ঠিক তাই; ছিল না। আর সে দুনিয়া মানে ছিল এক কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া। এখানে সম্পর্ক  কথাটা বুঝতে হবে বহুরাষ্ট্রীয় (শুধু পণ্য নয়) ভাব-ভাষাসহ  সব কিছুর লেনদেন বিনিময় – এক গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ হিশাবে। যেমন আগের সে দুনিয়ায় আমাদের নাম ছিল ব্রিটিশ-ভারত; মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কলোনি-দখল-ভূমি হয়ে থাকা, তাদের মালিকানায় থাকা এক ভারতবর্ষ; “ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া” নাম ছিল আমাদের। এই অবস্থাটা বজায় ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত; সেকালের যার গ্লোবাল রূপটা ছিল – এক দিকে উপনিবেশ মালিক ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মত তবে ছোট-বড় সব মিলিয়ে ছয়-সাতটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র, যারা সারা দুনিয়াকে নিজেদের মধ্যে দখল-মালিকানায় ভাগ করে নিয়ে রেখেছিল। ফলে স্বাধীন রাষ্ট্র বলতে কিছুর অস্তিত্ব ছিল না বললেই চলে। সোজা ভাষায় তাই স্বাধীন রাষ্ট্র বা কলোনিমুক্ত রাষ্ট্রের ফেনোমেনা শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) পর থেকে।

যেমন ১৯৪৫ সালের পরে ১৯৪৭ সালে এসে আমরা উপনিবেশমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়েছিলাম। তবে সেটি অবশ্য আর কোন অর্থেই আগের অখণ্ড ভারত নয়, বরং ভারত আর পাকিস্তান দুই আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আমরা মুক্ত হয়েছিলাম। তবে বড় কথা, সেটি আবার শুধু ভারতবর্ষেরই ফেনোমেনা নয় বরং সারা দুনিয়াতেই উপনিবেশ হয়ে থাকা বেশির ভাগ রাষ্ট্র পরের ২০ বছরের মধ্যে সবাই মুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে যায়। তাই কথাটি এভাবে বলা যায়, ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়া হল – উপনিবেশ হয়ে থাকা দুনিয়া বা কলোনি মাস্টার-প্রজা সম্পর্কের দুনিয়া।

আর এর বদলে বিশ্বযুদ্ধ শেষে এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের দুনিয়া; যেটি আসলে আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দুনিয়া। আগের প্রায় ৩০০ বছরের কলোনি শাসনের শেষে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার কথাই বলছিলাম যার বয়স মাত্র প্রায় ৭০ বছর। তবে আমেরিকার নেতৃত্বের এই দুনিয়াটার প্রায় শেষ পর্বে দাঁড়িয়ে আমরা এখন কথা বলছি। এখন শুরু হবে বা হয়ে গেছে তৃতীয় পর্ব। চলতি একুশ শতকে এসে মোটামুটি এখান থেকেই শুরু হয়েছে পুরনো আমেরিকার নেতৃত্বের দিন শেষ আর বদলে তার জায়গা নিতে – বাংলাদেশের প্রেক্ষিত থেকে বলা যায়, এই নির্বাচনকালীন সময় হল সেই চিহ্ন যে চীন নেতৃত্ব নিয়ে নিয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশের দিক থেকে অনুভবে চীন আর আসন্ন নয়, চীন গ্লোবাল নেতৃত্বের আসন নিয়ে নিল।  তৃতীয় এই পর্বে দুনিয়ায় গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে কবে কী ঘটেছিল – আগামী দিনের লেখা ইতিহাসে তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে আমাদের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে মনে করা হবে এক মাইলস্টোন মার্ক বা পথচিহ্ন।

এই পথচিহ্ন নির্দেশ করবে যে, এই নির্বাচন থেকেই পুরনো নেতা আমেরিকার বাংলাদেশে নেতাগিরি সমাপ্ত হতে দেখা গিয়েছিল। আমেরিকার প্রভাব-আধিপত্যের মধ্যে বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সুযোগের মধ্যে যে বাংলাদেশ এত দিন ছিল, সেটি এখন বদল হয়ে নতুন সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা, চীনের নেতৃত্ব প্রভাবের যুগে প্রবেশ করল। যদিও অনেক আগে থেকেই চীনা প্রভাব ক্রমেই বাড়ছিল কিন্তু আমেরিকার হস্তক্ষেপের সক্ষমতা ও সম্ভাবনাও পাশাপাশি থেকে গেছিল বলে এত দিন সেটাকে চীনের নেতৃত্বের যুগে প্রবেশ বলা যাচ্ছিল না। এত দিনের পরিচিত আমেরিকার প্রভাব আধিপত্য ও হস্তক্ষেপের সক্ষমতা এই প্রথম পুরাপুরি অকার্যকর হতে ও থাকতে আমরা দেখলাম আর এভাবেই যেমনই হোক বাংলাদেশের একটা নির্বাচন সমাপ্ত হল।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭ শতাংশ আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও পক্ষে অথবা বিপক্ষে তার কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি।

সদ্যসমাপ্ত নির্বাচন যেটায় আওয়ামী জোটের ৯৭% (২৯৮ আসনের মধ্যে ২৮৮) আসন লাভের কারণে একে প্রশ্নবিদ্ধ বলা হচ্ছে, সেই নির্বাচনে এই প্রথম আমেরিকার কোনো ইম্পেরিয়াল [imperial – imperial role of Empire] বা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা অথবা পক্ষে/ বিপক্ষে কোন ভুমিকা ছিল না, কাজ করেনি। আসলে নেতা বা এম্পায়ার সক্ষমতা হারিয়ে কখন উত্থান রহিত হয়ে গেছে তা বুঝার সহজ ইঙ্গিত হল – যখন দেখা যাবে নেতা বোকা বোকা কথা বলছে। আমাদের নির্বাচনের পর দেখা গেল আমেরিকা বোকা বোকা কথা বলছে। কেমন নির্বাচন হল, আদৌও সেটাকে নির্বাচন বলা যায় কী না – সেসবের খবর নাই আমেরিকা বিবৃতি দিয়ে বলছে, “নির্বাচনে সব প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণ খুবই ইতিবাচক অগ্রগতি” বলে মনে করছে […… decision of all major opposition political parties to participate, a positive development…।] যেন পায়ে সাপের ছোবল খেয়ে মৃত মানুষের বাসায় এসে কেউ দুঃখে বলছে যাক, ভাগ্যিস ছোবলে চক্ষুটা কাটা পরে নাই – এমনই এক বিবৃতি। কিন্তু আমেরিকার এই অবস্থান বদল কেন?

কেন এমনটা হচ্ছে? ট্রাম্প আমেরিকাকে এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকায়” বদল করতে চেষ্টা করছে। মানে হল, গত ৭০ বছরে যে আমেরিকাকে দুনিয়া চিনে এসেছে, তা কোনো ‘ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা’ ছিল না; বরং তা ছিল গ্লোবাল এম্পেরিয়াল  আমেরিকা; অথবা গ্লোবাল নেতা হিসেবে তার ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা। এই প্রথম সেই চিরচেনা ভূমিকায় আমেরিকা এবার বাংলাদেশে তার পদক্ষেপ, আচরণ রাখেনি; ত্যাগ করেছে। এটাকেই মূলত আমেরিকান হস্তক্ষেপের সক্ষমতার সমাপ্তি চিহ্ন ধরা হচ্ছে; তাতে এই হস্তক্ষেপ যে যেজায়গা থেকে দেখে ইতি বা নেতি মনে করতে পারে।

তবে এই সমাপ্তি চিহ্ন পয়দা করতে হাসিনার কোন ভুমিকা নাই বললেই চলে। ভারতেরও নাই। এমনকি, চীনসহ অন্য কারও কোন ভূমিকার চেয়ে আসলে একক ভূমিকা ছিল খোদ আমেরিকারই। মানে হোয়াইট হাউসের। সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন থেকে ট্রাম্পের অফিস – হোয়াইট হাউজকে যদি আলাদা করি তবে আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত, অবস্থান ও ভূমিকা এককভাবে ট্রাম্পের অফিস হোয়াইট হাউজের।

ট্রাম্পের ক্ষমতা নেয়া বা শপথ চলতি জানুয়ারিতে দুই বছর পূর্ণ হবে। গত ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকেই অর্থাৎ শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলে আসছেন যে, তিনি এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকার” অবস্থান নিবেন; নেতা হবেন, সেভাবে আমেরিকাকে সাজাবেন। অর্থাৎ গ্লোবাল এম্পায়রাল বা “গ্লোবাল অর্থনৈতিক দুনিয়া – এরই এক সাম্রাজ্যের নেতা হিসেবে ওর ইচ্ছা ও স্বার্থে কাজ করা এক আমেরিকা আর থাকবে না। আমেরিকার যে চেহারাটা আমরা ৭০ বছর ধরে অভ্যস্ত হয়ে দেখেছি। ট্রাম্পের নতুন আমেরিকা কেমন হবে সে সম্পর্কে নতুন চিহ্নবাচক শব্দগুলো ট্রাম্প বলেছিলেন যেমন, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ [AMERICA FAST] বা ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ এক ইকোনমি [TRUMP’s Anti-Globalization] অথবা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যাদের ডমিনেটিং স্বার্থের সরকার তিনি হবেন – সেটা (গত সত্তর বছরের মত) ওয়াল স্ট্রিট বিনিয়োগ কোম্পানিগুলোর মত গ্লোবাল স্বার্থের হবে না, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোরও নয় [কারণ তাঁর শ্লোগান ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের’ ] – বরং তিনি হবেন – আমেরিকান স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারারদের যারা আমেরিকানদের চাকরিদাতা। এমন সব ফিচারের এক “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” গড়তে ট্রাম্প উদ্যোগী এবং রওনা দিয়েছেন।

সে কারণে এই ম্যানুফ্যাকচারারদের স্বার্থে এক বাণিজ্যযুদ্ধ, আমেরিকানদের চাকরি বাঁচানো ইত্যাদি হল আমেরিকার এখনকার সেই ক্যাচি ওয়ার্ড। এসব কথা যে চিরচেনা আমেরিকার আগের গ্লোবাল ভূমিকা বদলের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত তা আমরা অনেকেই বুঝিনি, বুঝতে চাইনি অথবা যারা বুঝেছি তারা বিশ্বাস করিনি – সম্ভবত পুরনো অভ্যাসের কারণে। এই পুরনো অভ্যাস এতই তীব্র যে, সাধারণভাবে ট্রাম্প প্রশাসন বলতে যা বুঝায় বলা হয় সেও ভুল করে। মনে করে ট্রাম্পের আমেরিকা যেন আগের গ্লোবাল আমেরিকাটাই – গ্লোবাল স্বার্থের নেতা আমেরিকা। এটাই হোয়াইট হাউজ আর বাদবাকি ট্রাম্প প্রশাসনের এক না থাকা, এক আপাত-ভিন্নতা। মূল কারণ আমেরিকান আমলা ব্যুরোক্রাসি গ্লোবাল আমেরিকা দেখতে দেখতেই বড় হয়েছে, হাত পাকিয়েছে। তাই এটাই রুটিন আমেরিকান প্রশাসন। আর সম্ভবত একারণেই ট্রাম্প যাকেই মন্ত্রী-উপদেষ্টার বা কর্মকর্তার নিয়োগ দেন না কেন তারা নিয়মিত ক্রমান্বয়ে পদত্যাগ করছেন, স্থিরভাবে পদে না থাকতে পারার অস্থিরতাি এখন নিয়ম মানে “নিউ নরম্যাল” হয়ে গেছে। যেটাকে আমরা “পাগলা ট্রাম্পের কান্ড” মনে করছি।

অথচ আমেরিকা আর কখনো কোন গ্লোবাল (ইতি বা নেতি) ভূমিকা পালন করবে না – যেন সত্যিই বিড়াল এবার প্রতিজ্ঞা করছে যে সে আর মাছ খাবে না – দুই বছর ধরে এই হলো ট্রাম্পের হাতে সেট হওয়া অভিমুখ। আফগানিস্তান থেকে আরও সৈন্য প্রত্যাহার (ওবামা দশ হাজার বলে প্রতিজ্ঞা করেও শেষে ১৪ হাজার রেখে যাওয়া – সেটা থেকে আরও পাঁচ হাজার প্রত্যাহার করবেন ট্রাম্প), তালেবানদের সাথে কথা-আলাপ শুরু করেছেন সব ফেলে পালায় আসার লক্ষ্যে,  সিরিয়ায় ISIL মরে শেষ হোক আর না হোক সেখান থেকে প্রত্যাহার শুরু হয়ে গিয়েছে, জাতিসংঘে প্রদেয় আমেরিকান বার্ষিক অবদান আট থেকে  সাত বিলিয়নে নামিয়ে এনেছেন, প্রায়ই জাতিসংঘ থেকেই প্রত্যাহারের হুমকি দিচ্ছেন, ন্যাটো থেকে ফিরে যেতে চাচ্ছেন, বিশ্বযুদ্ধের পরে ‘শত্রুশক্তিকে’ রাজনৈতিক কব্জায় রাখতে জার্মানি আর জাপান আমেরিকার স্থায়ী ব্যারাকে সৈন্য রাখা আছে। স্ব স্ব দেশকে এর খরচের ভার নিতে বলছেন নইলে গুটিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন ইত্যাদি অসংখ্য প্রত্যাহারের ঘটনা আমরা বলতে পারা যাবে। এইসব প্রতিষ্ঠান গাড়া হয়েছিল গ্লোবাল নেতা আমেরিকার উদ্যোগে ও একক খরচে। ট্রাম্পের “ন্যাশনালিস্ট আমেরিকা” মানে তো আসলেই আমেরিকার সব প্রত্যাহার, গুটিয়ে নেয়া ভুমিকা – এটাই ট্রাম্পের সেট করা আমেরিকার নতুন অভিমুখ। অতএব  এটা এখন আমাদের সু অথবা দুর্ভাগ্য যে, এই সেট করা পথে আমেরিকা আগামীতে অন্তত আরো দুই বছর থাকবে। অর্থাৎ ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হলে এরপর সম্ভবত ডেমোক্র্যাট কোনো প্রেসিডেন্ট আসলেও সেক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে আবার আমেরিকাকে গ্লোবাল নেতার জায়গায় ফিরে বসানোর সম্ভবত বেচে থাকবে না। তাই “ন্যাশনালিস্ট ট্রাম্পের নীতি” – এটাই আমেরিকান ভুমিকা পরিবর্তনের প্রধান ও একক নিয়ামক।  ট্রাম্পের এই নীতিই – চীনের গ্লোবাল ভূমিকা ও নেতৃত্বে এখনই বসা নিশ্চিত করছে এবং আগামীতে আরো নিশ্চিত করে চলবেন। তাই আমেরিকান গ্লোবাল ভূমিকার সমাপ্তি ঘটাতে এটা চীনের কোন লিড নয়। তবে এমন লিড না থাকলেও এই ভুমিকা সমাপ্তিতে যে নতুন পরাশক্তিগত স্ট্র্যাটেজিক ভারসাম্য তৈরি হবে, এটার মূল সুবিধাভোগী বা কোলে এসে পড়া সুবিধা যাবে এখন মূলত চীনের ভোগে।

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে এ থেকে বাংলাদেশে ভারত নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

বাংলাদেশের বিদেশী প্রভাব ফ্যাক্টর হিশাবে সবচেয়ে নিয়ামক তিন রাষ্ট্র আমেরিকা, চীন ও ভারতকে বিবেচনা করা যায়। এই বিবেচনার উপর দাঁড়িয়ে এখন থেকে বলা যায় নতুন পরিস্থিতিতে আমেরিকা ক্রমশ অনুপস্থিত মানে ‘ফেড আউট’ হয়ে যাবে, মানে ক্রমেই দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে যাবে। কিন্তু তাই বলে ভারত বাংলাদেশে নিজের ভাগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে এথেকে সুবিধা নিতে কোনো প্রার্থীই হতে পারবে না বরং অকল্পনীয় হারে তারও  প্রভাব কমতে থাকবে। আর সুবিধার লায়ন শেয়ার যাবে চীনের ভোগে। কেন?

ঐক্যফ্রন্ট ফেনোমেনাঃ  হাসিনার ক্ষমতায় দাঁত বসানোর দিক থেকে বিচারে ঐক্যফ্রন্টকে অনেকে হয়ত অসফল বলবেন। কিন্তু অন্তত ভারতকে পাগল করে দেওয়ার জন্য খুবই সফল। আসলে বিএনপি একা না পারলেও ঐক্যফ্রন্ট ভারতকে বিভ্রান্ত ও পাগল করে দিয়েছিল। প্রাইম ঘটনাটা হল, গত একবছর ধরে হাসিনা অনুরোধ করে গেছিল যে ২০১৮ এর নির্বাচনে ভারত যেন ২০১৪ সালের মত প্রকাশ্য সমর্থন জানায়। কিন্তু ভারত তা উপেক্ষা করে গিয়েছে। কেন? অনেক বিবেচনা নিশ্চয় ছিল। কিন্তু সেসবের মধ্যে হাসিনার ‘পাবলিক রেটিং’ সম্পর্কে ভারতের নিজের মূল্যায়ন ছিল মুখ্য নিয়ামক। যা খুব ইতিবাচক ছিল না। তবে এ সম্পর্কে ভারতের মাপ-অনুমান যাই থাক, সেটা নিয়ে ক্রমশ একটা শঙ্কা বড় হচ্ছিল। সেটাকে আরো বড় করে ফেলে ঐক্যফ্রন্টের জন্ম ও আবির্ভাব। এসবের সবচেয়ে বড় চিহ্ন ও প্রকাশ হল, পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর বিখ্যাত উল্টা গান রচনা- হাসিনা ব্যাসিং। কারণ ভারতের সবচেয়ে ভয় হচ্ছিল “ঐক্যফ্রন্ট যদি এসে যায়” কারণ ততদিনে তাদের সব রেটিং অনুমান সেকথাই বলছিল। তাই হাসিনার অনুরোধ উপেক্ষা করা। তবে উপেক্ষার আরো কারণ হিসেবে অন্যান্য কম প্রভাবের ফ্যাক্টরগুলোও ছিল। যেমন হাসিনা চীনের বেল্টরোড প্রকল্পে ঢুকবেই আর ‘বোকার মতো’ সে কথা আবার ভারতকে বুঝাতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিবকে পাঠিয়েছিলেন, তিনি ভারতে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েই সে কথা তুলেছিলেন।

এ ছাড়া আরও বলা যায়, মোদী চান নাই এক্ষেত্রে তিনি সোনিয়ার কংগ্রেস হবেন যাতে তার সচিব গোখলে আগের সুজাতা সিংয়ের মত অ্যাগ্রেসিভ, প্রকাশ্য হস্তক্ষেপ ও রিস্কি কূটনীতিক তৎপরতার বাজে উদাহরণ তৈরি করে। এসব মিলিয়ে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের চার থেকে সাত দিন আগেই কেবল ভারত জানতে পারে যে, নির্বাচনে লীগের নির্বাচনে নিশ্চিত জিতবার স্ট্র্যাটেজি কৌশল ও মেকানিজম কী। কিন্তু এটা জেনে ততদিনে ভারতের অবস্থান বদলের সুযোগ ছিল না বা তা কোন অর্থ বহন করত না।  ফলে ভারত হাসিনার অনুরোধে নতুন করে আর এতটুকুও হেলেনি।  কিন্তু ভারতের কাফফারা শুরু এখান থেকে হচ্ছে এবং আগামিতে তা আরও বিরাট হবে। এসব থেকে এখন এমন এক এত বিশাল থাপ্পড় খেতে যাচ্ছে ভারত, যা এর আগে কখনো কল্পনাও করেনি। শুধু তা-ই নয়, বলা যায় শুরু। হাসিনা-ভারতের সম্পর্ক গত দশ বছরেরও বেশি, এত দিন হাসিনা ছিল ভারতকে তুষ্ট করে রাখতে ব্যস্ত এক অনুগ্রহ প্রার্থী। আর এখন, সম্পর্ক অবশ্যই থাকবে কিন্তু সম্পর্কের ডিকটাট এই প্রথম চলে গেছে ও আরও আসবে হাসিনার হাতে। বাংলাদেশের হাতে যদি না-ও হয় তবুও সুদে-আসলে বহু কিছু শোধ হতে থাকবে। আর ওদিকে সোনাদিয়া বা বেল্টরোড নিয়ে কোনো কথাই তোলার অবস্থায় থাকবে না ভারত।

না, আবারও বলছি – এগুলো ভারত অথবা চীনের ক্রেডিট অথবা ডিসক্রেডিট কোনোটাই নয়। মূল কারণ বাংলাদেশের ওপর আমেরিকার প্রভাব, আর তা থেকে হস্তক্ষেপের ভয় আশঙ্কায় থাকত যে হাসিনার। তাই মূলত এটা কাউন্টার করতেই ভারতমুখিতা।   ভারত-আমেরিকার মধ্যে চীন ঠেকানোসহ বিশেষ কিছু বোঝাবুঝি সম্পর্কের কারণে সেই সুবিধায় ভারত হাসিনার ভয় আশঙ্কাকে নিস্তেজ অথবা ব্যালেন্স করে দিত বলে একটা অনুমান কার্যকর ছিল। এছাড়া ২০১৪ সালে অনির্বাচিত সরকার গঠন পরবর্তিতে  কূটনৈতিক অস্বীকৃতির সমস্যায় হাসিনার বড় সহায় ছিল ভারত। দুনিয়াব্যাপী ভারতের কূটনৈতিক উপস্থিতি আর জাতিসঙ্ঘসহ বহুরাষ্ট্রীয় সব কূটনৈতিক ফোরাম-লবিতে ভারতের হাসিনা সরকারের পক্ষে সমর্থন ও সাফাই গেয়ে যাওয়া হাসিনার জন্য খুবই কার্যকর ও জরুরি ছিল। তাই কাছাখোলা সুবিধা দিয়ে গিয়েছে ভারতকে।

বিপরীতে ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে হিউম্যান রাইটস বা অন্য অজুহাতের চাপ বা হুমকি এখন থেকে হাসিনার ওপর না থাকার মতো থাকবে। মানে হাসিনার জন্য আমেরিকার হস্তক্ষেপের ফ্যাক্টর দুর্বল, প্রায় নাই হয়ে থাকবে। তাই এখন থেকে ভারতকে খাতির-তোষামোদ করে, বাংলাদেশ হস্তক্ষেপের সব সুযোগ দিয়ে, দেখেও না দেখা করে রাখার যে দরকার এতদিন হাসিনার ছিল সেটা আর তাঁর কাছে অন্তত অনিবার্য মনে হবে না। এটাকেই হাসিনা-ভারত সম্পর্কের ডিকটাট হাসিনার হাতে আসবে বলছি।

এ ছাড়া অন্য কিছু ফ্যাক্টরও আছে, আগামী মে মাসে ভারতের নির্বাচন। এই নির্বাচন বিজয়ে মোদীর সম্ভাবনা খুবই কম, কংগ্রেস কোয়ালিশনেরও বিজয় সম্ভাবনা কিছু আছে তবে অনেক কম। আঞ্চলিক দলের ফেডারল জোটের সম্ভাবনা বাড়ছে। ধরা যাক যদি কংগ্রেস কোয়ালিশন জিতে তাহলেও সেই সরকার এখনকার মোদির চেয়েও বেশি চীনা-বন্ধু এক সরকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। যদিও সম্প্রতি উত্তর প্রদেশে দুই আঞ্চলিক দলের জোট গড়তে সক্ষম হয়ে যাওয়া মোদীর বিজেপি এবং রাহুলের কংগ্রেস দুজনের জন্যই খুবই খারাপ সঙ্কেত।  সবচেয়ে বেশি আসনের (৮০) রাজ্য, উত্তর প্রদেশ মোদী বা রাহুল এদের দুই দলেরই হাতছাড়া হয়ে গেল বলে মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ফেডারল জোটের বিজয় সম্ভাবনা বেড়ে গেল।

সব মিলিয়ে হাসিনার নতুন সরকারে ভারতের ভূমিকা শুকিয়ে যাবে অনেকটাই। আর ভারতকে কাফফারা দিতে হবে, উল্টো ডিকটাট মানতে হবে। হাসিনার মন্ত্রিসভায় সিনিয়ররা না থাকা বা রাখাতে এরই ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে। চীনের আগবাড়িয়ে হাসিনাকে সমর্থন জানানোতে এমনটি হয়েছে তা সত্যি নয় বরং খোদ আমেরিকারই গুটিয়ে যাওয়া সব কারণের কারণ।

চীনা ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে তাদের পরিস্থিতির পাঠ ও মনোভাব ব্যক্ত করেছে। খুবই পুওর ‘বেচারা ধরনের’ এক মনোভাব, পুরাটাই সরাসরি ‘তেল মারা’ এক রচনা এটা। যেমন এখানে দাবি করা হয়েছে বিরোধিদের নির্বাচনি ফলাফল প্রত্যাখান পশ্চিমাশক্তির উস্কানিতে হয়েছে – [ …further fueling the opposition uproar.]। বস্তুত চীনের এমন মনে করার কোন কারণ নাই যে ‘কোনটা কেন হয়েছে’ সেটা প্রধানমন্ত্রীর জানা নাই। যদি চীনা এই ভাষ্য দিয়ে যেন তারা বুঝানোর চেষ্টা করেছে যে তারাও সরকারের মন পেতে মাখন লাগাতে আগ্রহী। মনে হয় না এই নিম্ন বিবেচনা প্রধানমন্ত্রী আমল করতে পারবেন না। তবে চীনের  এমন অনুমান ও মনোভাবের মূল কারণ, নাগরিককে রাজনৈতিক অধিকার রক্ষা ও এর নিশ্চয়তা দিতে হবে এটা কোন কমিউনিস্ট রাজনৈতিক এজেন্ডাই নয়। অথবা রাষ্ট্র কেমন হওয়া উচিত এ বিষয়ে কেবল চীন নয়, সাধারণভাবে কমিউনিস্টদের চিন্তা-ভাবনার রেকর্ড খুবই দুর্বল। সোজাসাপ্টা বললে রাজনৈতিক অধিকার, মানে নাগরিক গুম বা খুন হয়ে যাবে না, এর নিশ্চয়তা বা সুরক্ষার আইনি ও মাঠের প্রতিশ্রুতি – এগুলো কোনো কমিউনিস্ট রাজনীতির বিষয় মনে করা হয় না। তারা রাজনৈতিক অধিকার বুঝে না বা আমল করে না, কেবল বোঝে নাগরিকের ‘বৈষয়িক’ লাভালাভ। যেমন অন্ন-বস্ত্র-শিক্ষা-চিকিৎসা-বাসস্থান লাভ তারা বুঝে। তাও ‘নাগরিক’ শব্দটি দিয়ে সেটা বুঝতে তারা রাজি নয়। কারণ নাগরিক বুঝলেই নাগরিক ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ প্রসঙ্গ এসে পড়ে। যা হোক, চীনের মনোভাব হিসেবে লেখা ঐ রচনায় বয়ানের সারকথা হল, লীগ-বিএনপির ঝগড়ার কারণের নাকি আমেরিকা বাংলাদেশে হাত ঢুকানোর সুবিধা নিচ্ছে। আর চীন ভাল সে এমন হাত ঢুকায় না। ব্যাপার হল, রাজনীতি বা অধিকার – যা চীনের বিষয় বা প্রসঙ্গ নয় তা নিয়ে চীনের কথা বলতে যাওয়ার দরকার ছিল না। তাই এই বাজে কথাগুলো চীন না বললেই পরিস্থিতি তার পক্ষে যেত বেশি। তবে নিঃসন্দেহে চীনের বিনিয়োগ স্পৃহা আর হাসিনার উন্নয়নের রাজনীতি এদুইয়ের পরস্পর পরিপূরক হয়ে উঠার সুযোগ আছে। আর যেটা নিয়েই ভারতের বুদ্ধিবৃত্তির লোকেদের শঙ্কা ও হতাশা আছে। বাড়তি বিষয় হল, বেল্টরোড বা সোনাদিয়া ইস্যুতে বাংলাদেশের নিজেরই লম্বা ও গভীর স্বার্থ আছে।

কিন্তু কথা অন্য দিকে। সরকার যেমনই হোক, যে মাত্রারই চোর বা সাধু হোক, চীনের নীতি হলো সব উপেক্ষা করা – জাজমেন্টাল বা ইথিকস বা পুলিশিং অবস্থান না নিয়ে কাজের সম্পর্ক করা। এই অবস্থান আমেরিকার চেয়ে ভালো না মন্দ সে বিবেচনা করতে বসা ভুল ট্রেনে চড়া হবে। আসলে চীনের এই নীতির মানে হল, রাজনৈতিক অবস্থা না, বৈষয়িক লাভালাভের সুবিধাতেই চীনের এখনকার লাভ-মতলব বেশি তাই অন্য দিকে মন না দেয়া। এই নীতিই এখনকার জন্য তার স্বার্থ উদ্ধারে বেস্ট হাতিয়ার। যেটা আবার কালকে বদলাতেও পারে। তাই ঘুষ কমিশন ছাড়া নড়ে না এমন সরকারের সাথে বেস্ট পার্টনার হতে পারে চীনা বিনিয়োগ ও চীনের স্ট্রাটেজিক স্বার্থ।। চুরির সব ব্যবস্থা সে করে দেবে। আবার কালকে ঐ দেশে তুলনামূলক ভালো সৎ, স্বচ্ছ টেন্ডার জবাবদিহিতার সরকার এলেও চীন তার সাথেও পরিচ্ছন্নভাবেই কাজ-সম্পর্ক গড়বে। মনে রাখতে হবে বিশ্বব্যাংকের বিকল্প চীনের দুই বিকল্প বিশ্বব্যাংক উদ্যোগ আছে (BRICS , AIIB), যার প্রধান বিনিয়োগ খাতক হল ভারত। ফলে ভারতের স্টান্ডার্ডে সেখানে চীনকে স্বচ্ছতা, টেন্ডার বা জবাবদিহিতার বিষয়গুলো বজায় রাখতে হয়। অর্থাৎ অবস্থায় পড়লে চীন সেটাও পারে। এটা প্রমাণ করে আপনি চোর-গুণ্ডা অথবা সাধু যা হতে চান, সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে কমিশনের টাকা রাখতে চান, সব ব্যবস্থাই করে দেবে চায়না, সবকিছুরই পক্ষে আছে চীন।

এ দিকে আমাদের নতুন সরকার গঠন হয়েছে ইতোমধ্যে। কিন্তু মনে হচ্ছে যে, সে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছ নয় – তার ভিতরে এমন সত্য বা মিথ্যাভাবে এক অনুতাপ যেন দেখা দিয়েছে মনে হচ্ছে। ভালো ইমেজ গড়ার সক্ষমতা তার থাক আর না-ই থাক, নতুন অর্থমন্ত্রী খায়েশ প্রকাশ করেছেন- ‘এক টাকাও খেলাপি ঋণ হবে না’।
সারকথা কোনো সরকার কি নিজেই নিজের সমর্থক ভিত্তি বদলাতে পারে? মনে হয় না। তাই হেলমেট বাহিনী আর গুম-খুনই  চালু থাকতে হবে। তবুও এই নির্বাচনের পর দেশী বা বিদেশী সম্পর্কের সবখানেই নতুন ভারসাম্য হাজির হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নির্বাচনের পরে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত!

ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত!

গৌতম দাস

০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2tL

 

পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী, ভারতের এক সাবেক কূটনীতিক, ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব; আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হল, ২০০৭ সালে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কালে তিনি বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন। বর্তমানে তিনি ভারতের একটা বেসরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো হিসেবে সক্রিয়। তাঁর বিশেষ গুরুত্বের দিকটা হল, বাংলাদেশ ইস্যুতে ভারতের নীতিনির্ধারক যারা – ভাবেন, অবস্থান নেন এমন সবার সাথে, অন্য সব কূটনীতিকের চেয়ে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও আস্থার সাথে সংযুক্ত এমন এক ব্যক্তিত্ব তিনি। তাঁর সার্ভিস পিরিয়ড, ২০০৭-০৯ সময়পরিধিতে তাঁর বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনারের দায়িত্বে থাকাকালীন কিছু কাজ এর পিছনের সম্ভাব্য কারণ বলে মনে করা হয়। না, এটা যথেষ্টভাবে বলা হলো না। তবে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে এই রচনা কী নিয়ে সেদিক আলোকপাত করে কিছু কথা বলা দরকার।

আসলে, বাংলাদেশ যে পিনাক রঞ্জনকে চিনত সে নয়; তা থেকে একেবারে ভিন্ন, ‘আনলাইক’ এক পিনাক রঞ্জনের এক প্রবন্ধ ছাপা হয়েছে গত ৫ সেপ্টেম্বর ‘সাউথ এশিয়ান মনিটর’ পত্রিকায়। সে প্রবন্ধের ভাষ্য এমন যে এটা শেখ হাসিনা সরকারের উপর থেকে ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত হিসেবে তা পাঠ করার সুযোগ রেখে লেখা হয়েছে। [এটা বাংলা ও ইংরাজী দুই ভাষাতেই একই লেখা প্রকাশিত হয় এমন এক ওয়েব পত্রিকা, ফলে বাংলায় অনুদিত ও প্রকাশিত ভাষ্য পাঠকেরা পড়তে পারেন। ]

এক-এগারোর সরকারের ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে এবং পরিণতিতে, আমেরিকা যদি বাংলাদেশকে ভারতের কাছে হাওলা বা হস্তান্তর করে দেওয়ার কাজ সম্পন্ন করে থাকে; তবে ভারতের দিক থেকে এতে এক নম্বর পরামর্শদাতা এবং বাস্তবে তা রূপদানকারী ব্যক্তি হলেন কাকাবাবু প্রণব মুখার্জি। আর সে কাজেরই মাঠের বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিলেন হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী।

প্রকাশিত উইকিলিকস ফাইল থেকে জানা যায়, এক-এগারোর টেকওভার বা ক্ষমতা দখল এবং এর লক্ষ্য অনুযায়ী সাধিত কাজ শেষে এরপর এর এক্সিট রুট কী হবে, মানে কাকে ক্ষমতা দিয়ে তাঁরা তখন কেটে পড়বে, এটা নিয়ে শত প্রশ্ন ও অনুরোধ সত্ত্বেও ক্ষমতা দখলকারীরা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বিউটেনিসের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর জানতে পারেনি। উপায়ন্তরহীন সেই পরিস্থিতিতে অবস্থা দেখে মনে হয়, এ ব্যাপারে ক্ষমতা দখলকারীরা একটা নিজস্ব আবছা সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। তা হল, লক্ষ্য অনুযায়ী কাজ হওয়া শেষে তারা নিজেরাই এরশাদের মতো কোনো দল গঠন করে রাজনীতিতে নেমে পড়বে। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ২০০৭ সালের জুনের পর থেকে অক্টোবরের মধ্যে এটা ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকে যে, আমেরিকা এ অঞ্চলের তার -ওয়ার অন টেররে – “টেররিজমের বিরুদ্ধে পাহারাদারের” ঠিকা ভারতকে দিচ্ছে। আমেরিকান এক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেমিনারে সাব্যস্ত হয় যে,  “ভারতের চোখ দিয়ে আমেরিকা দক্ষিণ এশিয়ায় তার নিরাপত্তা স্বার্থ” দেখবে ও বুঝে নেবে। এথেকে তাই মনে করা হয়, এরই নিট ফলাফলে বাংলাদেশ ভারতের ইচ্ছাধীনে চলে যায়। এর অন্য আরেকটি লুকানো দিক ছিল, আসলে এটা ছিল আমেরিকার ওয়ার অন টেররের নামে পদক্ষেপের আড়ালে ভারতকে নিজের নৌকায় অন বোর্ড করে নেওয়া। যার মানে হল, এটাই আমেরিকান স্বার্থে ‘চীন ঠেকাও’ বা ‘China containment’ এর কাজটা ভারতকে দিয়ে করিয়ে নিতে আমেরিকা তাকে রাজি করিয়ে নেয়, আর দেনা-পাওনাও ঠিক করে নেয়। বিনিময়ে এরই রাজভেট হল, “বাংলাদেশকে বলি দেওয়া” – আমেরিকার বাংলাদেশকে ভারতের কাছে হস্তান্তর, ভারতের করিডোর লাভ থেকে শুরু করে লাভ আর লাভ ইত্যাদি।

কিন্তু বিউটেনিস নিজেদের এই নতুন সিদ্ধান্তের পক্ষে মইন-ফখরুদ্দীন ও তার সঙ্গীদেরকে রাজি করাতে পারছিল না। একারণে শেখ হাসিনার জামিন, দেশত্যাগ, স্টেট ডিপার্টমেন্টের সাথে আলোচনা করতে দেয়া ও তাকে ক্ষমতায় আনা ইত্যাদিতে সহযোগিতা করতে তারা রাজি হচ্ছিল না। এ সময় পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী কিছু নির্ধারক কাজ করে, আর তাতে মইন ও তার সঙ্গীদেরকে বাধ্য হয়ে রাজি করাতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর শেখ হাসিনার ক্ষমতায় আগমনের পরে ২০০৯ সালে পিনাক রঞ্জন তার ‘সফল’ অ্যাসাইনমেন্ট শেষে দেশে ফিরেছিলেন।

পিনাক রঞ্জনের বিশেষ প্রবন্ধ
পিনাক রঞ্জনের এই বিশেষ প্রবন্ধের শিরোনাম অবশ্যই সেটা পিনাক রঞ্জন-সুলভ ছিল না। যেমন লেখাটার বাংলা শিরোনাম হল- “বাংলাদেশের নির্বাচনে ভারতের ছায়া, হাসিনা সরকারের দুর্নীতি, বিএনপিকে দমন”। আর ইংরাজিতে, “Shadow of India, Hasina government’s corruption, repression of BNP looms over Bangladesh polls.” অনুমান করা যায় লেখাটা ইংরাজীতে আর পরে তার অনুবাদ বাংলায় করা হয়েছে।

এখানে দেখা যাচ্ছে, এটা সত্যিই বেশ তামাশার যে “বিএনপির ওপর নিপীড়ন হচ্ছে” – এই কথা তুলে ভারতের সাবেক এক রাষ্ট্রদূত তাঁর লেখায় এটাকে শিরোনাম করেছে। তবে এর চেয়েও আরো বিস্ময়কর হল, শিরোনামের কিছু বিশেষ ‘শব্দ’ পছন্দ করে নেওয়া। যেমন, বাংলাদেশে দুর্নীতি হচ্ছে কি না, শেখ হাসিনা সরকার সেই দুর্নীতি করছে কি না – এটা গত দশ বছরে ভারত বা পিনাক রঞ্জনের ভাষায় তা কখনও উঠে আসেনি। ভারতের মিডিয়া বা ইন্টেলেক্টরাও কখনও এসবকে তাদের লেখার বিষয়বস্তু করেনি। বরং হাসিনার শাসনে ভারত কত কিছু – না চাইতেই সব উপুড় করে পাচ্ছে, তাদের পছন্দে ও ভাষ্যে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দিচ্ছে – হাসিনা সরকারের এসব অবদান নিয়েই সবসময় তাঁরা বিগলিত থেকেছে। আসলে “দুর্নীতি” – এটি মূলত আমেরিকান ভাষা। ফলে অচানক এটা পিনাকের ভাষা হয়ে উঠা সত্যিই ‘তাতপর্যপুর্ণ’, তা বলতেই হয়।

এভাবে পিনাক রঞ্জনের পুরা লেখাতে যেসব বিস্ময়কর প্রসঙ্গ উঠে এসেছে তার একটি তালিকা এখানে আমরা দেখে নেই।

এক. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনঃ
অচিন্তনীয় ঘটনা হল, পিনাক রঞ্জন আওয়ামী লীগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার দায়ে সরাসরি অভিযুক্ত করেছেন। তিনি
লিখেছেন,

“আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পদক্ষেপকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং এর মাধ্যমে অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের নীলনকশা হিসেবে দেখা হয়েছে। অথচ নির্মম বাস্তবতা হচ্ছে, এই আওয়ামী লীগই নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার বিক্ষোভ করেছিল। এর জের ধরে বিএনপি সরকার সংবিধানে বিধিটি অন্তর্ভুক্ত করেছিল। সেনাসমর্থিত কেয়ারটেকার সরকার আয়োজিত ২০০৮ সালের নির্বাচনে পার্লামেন্টে তিন-চতুর্থাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করার পর ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাটি বাতিল করে”।

দুই. কোটা আন্দোলন ও যানবাহন ইস্যুতে ছাত্রদের আন্দোলন সামলাতে ব্যর্থতা ও হার্ডলাইনে যাওয়াঃ
এটাও সত্যিই বিস্ময়কর যে, পিনাক রঞ্জনের মত ভারতের কোন কূটনীতিক হাসিনাকে “হার্ডলাইনে দমন করা” [যে হার্ড লাইন ছাড়া আর কোন লাইনে তিনি কখনও দাঁড়াতেই পারেন নাই।] আর ‘কাজ’ সামলাতে ‘ব্যর্থতার’ জন্য আঙুল তুলে অভিযোগ আনছে।  কিছুটা আমেরিকান বা পশ্চিমা কূটনীতিকের আদলে মানবাধিকারের কথা ব্যাকগ্রাউন্ডে মনে রেখে তারা যেভাবে কথা বলেন, যা বলাই বাহুল্য “পিনাক-সুলভ নয়” আর তা না হয়েও তিনি লিখেছেন –
“সরকারি চাকরির কোটার মতো ঘরোয়া ইস্যু এবং ঢাকার অবাধ্য ও বিশৃঙ্খল যানবাহন নিয়ন্ত্রণ প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা আন্দোলন অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার ক্ষমতা রাখে। বিভিন্ন ইস্যুতে হাসিনা সরকারের ছন্দপতন ঘটেছে, যথাযথভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল, ঢাকার অবাধ্য যানবাহন চালকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। এসব চালক দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে থাকে। দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ফলে দেশব্যাপী ছাত্রদের ক্রোধ উসকে দেয়া এবং এ ইস্যুতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নস্যাতের অভিযোগে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক ফটোগ্রাফারকে গ্রেফতার ছিল বেপরোয়া সিদ্ধান্ত। এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে, কিন্তু শেখ হাসিনা কোনো ধরনের নমনীয়তা প্রদর্শন করেননি”।

অর্থাৎ এমনকি “আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এক ফটোগ্রাফারকে গ্রেফতার” বলে শহিদুল আলমের কথাও তিনি উল্লেখ করে সে ড্রাম পিটানো ছদ্ম এক্টিভিস্ট সাজতে  তিনি এখানে দ্বিধা করছেন না, আর লিখেছেন – “এটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করে”।
মজার ব্যাপার হল, গত দশ বছরে ভারতের কোনো কূটনীতিক, কলামিস্ট, মিডিয়া রিপোর্ট কেউ শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে কোনো গুম-খুন, পায়ে গুলি করে পঙ্গু করে দেয়া ইত্যাদি থেকে শুরু করে, ‘হার্ডলাইনে দমন করা’ আর কাজ সামলাতে ‘ব্যর্থতার’ জন্য আঙুল তুলছে আমরা এমন কখনও দেখিনি।

তিন. স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতিঃ
নিজ চোখে দেখলেও এটি বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ভারতীয় কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন “স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতির” অভিযোগ আনছেন। বিশেষত যখন, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় আনার কালে মাঠের এক কুশীলব ছিলেন তিনি নিজেই। তিনি লিখেছেন –
“হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে স্বৈরতান্ত্রিক শাসন, বিরোধী দলকে দলন ও ব্যাপক দুর্নীতি। নির্বাচনী প্রচারণায় এসব ইস্যু ও ভারত ফ্যাক্টর প্রাধান্য পাবে। রাজনৈতিক বিরোধীদের অব্যাহতভাবে হয়রানি করার ফলে জনগণের বিভিন্ন অংশের মধ্যে নীরব ক্ষোভ বেড়েই চলেছে এবং ব্যাপকভাবে এ ধারণার সৃষ্টি করেছে যে, আওয়ামী লীগ সরকার পরিকল্পিতভাবে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করছে। ক্রমেই এমন অভিমত জোরালো হচ্ছে, নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হলে আওয়ামী লীগ আগামী সংসদ নির্বাচনে লজ্জাজনক সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে। অনেক সমালোচক বিশ্বাস করেন, হাসিনা সরকার নির্বাচন ‘ম্যানেজ’ করবে। দক্ষিণ এশিয়ায় একে বলা হয় ‘নির্বাচনী জালিয়াতি’ “।

চার. মাদকবিরোধী অভিযান আসলে “গুলি করে হত্যার” নীতিঃ
কূটনীতিক পিনাক রঞ্জন কি পরিচয় বদলে ‘মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্ট’ হয়ে যাচ্ছেন? সে এক বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন! যেমন তিনি লিখেছেন –
“মাদকের বিরুদ্ধে কথিত জাতীয় অভিযানটি ‘গুলি করে হত্যার’ নীতিতে পর্যবসিত হয় বলে মানবাধিকার অ্যাক্টিভিস্টরা জানিয়েছেন। এতে অনেক নিরপরাধ মারা যায়”।  আসলে বরং ফ্যাক্টস হল, গত দশ বছরে ভারতের ‘বাংলাদেশ নীতি’ কখনও হাসিনা সরকারের হিউম্যান রাইট মেনে চলার রিপোর্ট কার্ড রেকর্ড কেমন কখনও সেটাকে ইস্যু করে নাই, সবসময় এড়িয়ে চলেছে, মাতে নাই ফলে কোন অভিযোগও কখনও তুলে নাই। তাহলে পিনাক এখন এতবড় ব্যতিক্রম কেন?

পাঁচ. সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ও আওয়ামী লীগের হিন্দু দলন ইস্যুঃ
ভারতের কোনো সাবেক হাইকমিশনার শেখ হাসিনা ও তার দলকে “হিন্দু সংখ্যালঘুদের দলন, হয়রানি ও বৈষম্য করছে” বলে অভিযোগ করছে – এটা এর আগে কখনও চিন্তাও করা যায়নি। তাহলে, এটাই কি হাত ছেড়ে দেয়ার চূড়ান্ত ইঙ্গিত? সবাইকে অবাক করে পিনাক রঞ্জন এই অভিযোগ তুলে বলেছেন,
“হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য সুপ্রিম কোর্টের সাবেক এক প্রধান বিচারপতি সরকারের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পদত্যাগ করতে ও বিদেশে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। সাধারণভাবে আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থনসূচক থাকা হিন্দু সংখ্যালঘুরাও ক্ষুব্ধ। কারণ, আওয়ামী লীগ নেতারা দায়মুক্তির সাথে হিন্দু সম্পত্তি জবরদখল করেছে। আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করেন, আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা ছাড়া ভারতের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই এবং হিন্দু সংখ্যালঘুদের হয়রানি ও বৈষম্য করা হলেও কিছু বলবে না”।

ছয়. বিএনপির প্রতি সহানুভূতিঃ
পিনাক রঞ্জনের দু-দুটি প্যারাগ্রাফ ধরে বিএনপির প্রতি সহানুভূতিমূলক ভাষায়, “তারা হাসিনা সরকারের হাতে নির্যাতিত” এই পটভূমি তৈরি করে লিখেছেন,
“তবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় দেশজুড়ে বিক্ষোভ কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে বিএনপি”। অর্থাৎ বিএনপির সম্ভাব্য আন্দোলনের প্রতিও তার সহানুভূতির ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। তিনি পরের প্যারাগ্রাফে আরো লিখেছেন, “কয়েক দিনের মধ্যেই আদালত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান উভয়কেই মৃত্যুদণ্ড দেয়া হতে পারে। তা ঘটলে বাংলাদেশ নিশ্চিতভাবেই ব্যাপক বিক্ষোভে ফেটে পড়বে”। পিনাক রঞ্জন এখানে গণক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার হয়ে উঠতে চাওয়া তাতপর্যপুর্ণ।
এখানে পাঠককে একটু সাবধান করার আছে যে, এখনই কোনো “সরল” সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ঝাপিয়ে পড়ার কিছু নেই। ওয়েট অ্যান্ড সি। বরং অবজারভ করেন মন দিয়ে। পিনাক রঞ্জনের ভাষা ও বক্তব্যের মধ্যে সত্যিই কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে কি না এই বিচার্য বিষয়ে, এতটুকুতেই আপাতত থাকাই ভাল।

সাত. আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপির ভেতরে কথিত ভাঙনের গুজব ছড়ানোর দায় আনাঃ
পিনাক রঞ্জন “আগে দেখা যায় নাই” এমন বেশ খোলাখুলিই লিখেছেন,
“বিএনপির প্রবীণ নেতারা তারেককে অপছন্দ করেন। তারা নেতা হিসেবে খালেদাকেই অগ্রাধিকার দেবেন। বিএনপির মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা রয়েছে, এমন গুঞ্জনও রয়েছে যে ভাঙনের মাধ্যমে নতুন দলের আবির্ভাব ঘটতে পারে। সম্ভাব্য ভাঙনে আওয়ামী লীগের হাত আছে বলেও গুঞ্জন রয়েছে”।
এই ভাষ্যে লক্ষণীয় বিষয়টা হল,  বিএনপি নিয়ে এত কথা পিনাক রঞ্জন লিখেছেন অথচ ২০০১-০৬ সালের বিএনপি সরকারের কোনো কাজ বা পদক্ষেপের কোনই সমালোচনা নেই। এমনকি, দশ ট্রাক অস্ত্র অথবা কথিত জঙ্গি বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মদদ দেয়ারও কোনো অভিযোগও তিনি তোলেননি। এটি কোন ভারতের কূটনীতিক ও সাবেক হাইকমিশনারের জন্য চরম সীমাহীন ব্যতিক্রম। বিশেষ করে ঠোঁট কাটা অ-কূটনীতিক-সুলভ মন্তব্যের জন্য যেই পিনাক রঞ্জন খারাপভাবে খ্যাত।

আট. নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অধস্তন করে রাখার অভিযোগঃ
এই অভিযোগটা তুলেছিল মূলত বিএনপি। কিন্তু পিনাক রঞ্জন সেই অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে সামনে তুলে এনেছেন। তবে অবশ্যই “নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অধস্তন করে রাখার” এই অভিযোগ যে কোন নির্বাহী সরকারের বিরুদ্ধে খুবই মারাত্মক। তিনি লিখেছেন,
“‘বিএনপির নির্বাচনী প্ল্যাটফর্মের মধ্যে রয়েছে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন আয়োজনের দাবি। দলটি অভিযোগ করছে, আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে অধস্তন করে রেখেছে”।

পিনাক রঞ্জনের লেখায় মূল অভিযোগ মূলত এগুলোই। তবে কামাল হোসেনের যুক্তফ্রন্টকে নিয়ে হাসিনার ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ মন্তব্যেরও পিনাক সমালোচনা করেছেন। এ ছাড়া ‘ভারত ফ্যাক্টর’ বলে একটি শব্দ তিনি ব্যবহার করেছেন। ব্যাপারটা হল, অনেকটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রায় সব কিছুতেই ভারতের নিরন্তর দাদাগিরি ও হস্তক্ষেপ আর নিজের একক স্বার্থে মাখনটুকু নিয়ে যাওয়া ইত্যাদির গত দশ বছর ধরে এমন আচরণ – এসব কিছুকে ইঙ্গিত করে এটাকেই তিনি ‘ভারত ফ্যাক্টর’ বলে বুঝাতে চেয়েছেন, আর তা করেছেন অনেকটা ক্ষমা চেয়ে নেয়ার ভঙ্গিতে। যেমন নিজে থেকেই প্রসঙ্গ তুলে বলেছেন,
“বাংলাদেশ ও ভারতে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ফলে বিএনপির হাসিনাকে ভারতের প্রতি অতিরিক্ত নতজানু দেখানোর সম্ভাবনা থাকায় ভারত ফ্যাক্টর হবে বিপুল। প্রধান সমালোচনা হবে, হাসিনা ভারতকে খুব বেশি ছাড় দিয়েছেন, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছেন অতি সামান্য”।

অর্থাৎ পিনাক রঞ্জন এখানে নিজে থেকেই হাসিনার ভারতের সাথে ঘষাঘষি (মুল ইংরাজীটা ছিল kowtowing); যেমন বলেছিলেন “pillory Hasina of kowtowing to India” –  মানে ভারতের সাথে ঢলাঢলিতে গায়ে পড়া হয়ে সব দিয়ে দেওয়া্র দায়ে হাসিনাকে কাঠগড়ায় তোলা – এর সুযোগ আছে বলে পিনাক রঞ্জন নিজেই দেখতে পাচ্ছেন। তাই এই ভাষা বা অর্থ দিয়ে তা পিনাক রঞ্জন নিজে থেকে আঁকছেন।  খুব সম্ভবত এর কারণ সাধারণ মানুষের ক্ষভ প্রশমন ও তাদের সহানুভুতি সংগ্রহ। তাই পিনাকে এই অংশের “উপস্থাপন” সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ।

আবার ভারতের পানি না দেয়া ইস্যু নিজেই তুলে বলছেন, “নদীর পানিবণ্টন এখনো দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেলেও তা কাটিয়ে ওঠা যাবে না এমন নয়“।
এ ছাড়া, আসাম নাগরিকত্ব ইস্যুতে মিস্টি প্রস্তাবের সুরে বলেছেন, “…দীর্ঘ দিন ঝুলে থাকা অবৈধ অভিবাসী ইস্যুটি বাংলাদেশকে অব্যাহতভাবে উদ্বিগ্ন করবে। বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এনআরসি থেকে সৃষ্ট অনিবার্য প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে”।

সোজা কথায় রাখঢাক না করে বললে ব্যাপারটা হল, গত ১০ বছরে ভারতের যত রুস্তমি, প্রভাব বিস্তার বা বর্ডার কিলিং থেকে শুরু করে তার যা দরকার তা উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া, ভারতের স্বার্থ সবার উপরে এই নীতিতে এভাবে ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ যে চরমভাবে ক্ষুব্ধ, সে সম্পর্কে পিনাক রঞ্জন সচেতন – তাই জানা গেল। তবে এখানে তিনি ইঙ্গিতে যা বলতে চাইছেন, তা যদি আমরা বুঝে থাকি তা সম্ভবত এমন যে, তিনি বলতে চাইছেন, সম্ভাব্য নতুন সরকার এলে পুরানা সব ভুলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন যাত্রা করা যেতে পারে।
বলা বাহুল্য, মি. পিনাক রঞ্জন আসলে এখানে অনেক ফাস্ট। ফলে অনেক দূর আগেই কল্পনা করে ফেলেছেন। তাই দ্রুত অনেক আগে চলে গেছেন আর খুবই “সরল” আর প্রায় ‘খ্রীষ্টীয় ইনোসেন্ট’ ধরণের সব নানান ভাষ্য হাজির করেছেন। বাংলাদেশে গুম হওয়া কোনো মানুষ ভারতের মাটিতে পাওয়া যাওয়া কি আসলেই এতই সরল আর ইনোসেন্ট? পিনাক রঞ্জন নিজেকেই এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করে দেখতে পারেন! ফলে পিনাক রঞ্জন খুব গভীর সচেতন তা বলতে পারছি না। তবে তাকে অনেক গভীরে চিন্তা করতে হবে আর স্বভাবতই তাতে অনেক কাঠ এবং খড়ও পুড়বে।

সবশেষে পিনাকের রচনার শেষ প্যারাগ্রাফের চারটি বাক্য সম্পর্কেঃ
প্রথম বাক্যঃ
বাংলাদেশে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করুক এর বিরুদ্ধে ভারতের আপত্তি ঈর্ষামূলক ও ক্ষতিকর তা কি ভারত এখন বুঝেছে? মনে হয় না কারণ, আমরা কোথাও এমন কিছু দেখিনি। ফলে তার শেষ প্যারাগ্রাফের প্রথম বাক্য –
“বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক পূর্ণ বিকশিত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে এবং পরিকাঠামোর আরো একীভূতকরণ, সীমান্ত বাণিজ্য কেন্দ্র আরো আধুনিকায়ন, মোটরযান চুক্তি ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ভবিষ্যতে আরো জোরালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে”   – এই আশার কোনো ভিত্তি নেই। খামাখা ইউজলেস। নন স্টার্টার!

দ্বিতীয় বাক্যঃ
“ঢাকায় যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারত তার সাথে কাজ করবে”।
এই বাক্য থেকে আমরা হাসিনা সরকার যে দুর্বল দুস্ত অবস্থায় আছে, তাই সম্ভবত তিনি বুঝতে চাইছেন মনে করতে পারি। কিন্তু ২০১৩ সালে পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশ সফর, তাঁর মাতব্বরি ও নোংরা হাত ঢুকানোর সাথে এই বক্তব্যের কোন মিল খুঁজে পাই না। সুজাতা ফরমান জারির মত করে বলেছিলেন, “যারা নির্বাচনে আসবে তাদের নিয়েই নির্বাচন হবেই” আর এরশাদ যেন বিরোধী দলের জায়গা পূরণ করে। সেটা তাহলে কেন বলেছিলেন? কেন তখন বলতে পারেন নাই যে, ঢাকায় যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, ভারত তার সাথে কাজ করবে? বাস্তবতা হল, তিনি তা পারেন নাই। তাহলে এখানে প্রশ্ন উঠবেই যে এখন কেন পিনাক রঞ্জন একথা বলছেন? এটার অর্থ কী এই যে ভারতের “বাংলাদেশ নীতি” বদল হয়ে গেছে? কিংবা পুরান প্রেম ও পছন্দের সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে নিতে চাইছে – আর ভাল লাগছে না বলে, তাই কী? পিনাকের কথার অর্থ কোনটা করব? পিনাক নিজেকেই সবার আগে এসব বিভ্রান্তি খোলসা করতে হবে।

তৃতীয় বাক্যঃ
“তাই বলে কোনো হাসিনাবিরোধীকে ভারত বিকল্প মনে করছে, এমন কিছু ভাবা হবে কষ্টকর কল্পনা”। বোঝা গেল এটা পিনাকের ‘সংবিধি সতর্ককরণ’ বা একটা “ডিসক্লেমার” দিয়ে রাখা যে ভারত বিএনপিকে ক্ষমতায় দেখতে চাচ্ছে ব্যাপারটা এমন সরল না। নো প্রবলেম। আমাদেরও এমন তাড়া নাই!

চতুর্থ ও শেষ বাক্যঃ
“অবশ্য, হাসিনার স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতা ও তার প্রতি ভারতের সমর্থন অনিবার্য মনে করা ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়, ভারতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ক্রমেই এমন অনুভূতিও জোরালো হচ্ছে”।
সরি মি. পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী; এটা এভাবে বলতেই হচ্ছে যে “ভারতের স্বার্থের অনুকূল নয়” – আসলে এটাই হল আপনাদের ঘুরিয়ে বলা যে কাজ ফুরিয়েছে, শেখ হাসিনা ক্রমেই এখন লায়াবিলিটি বলে অনুভূত হচ্ছেন, আপনাদের কাছে। বলাই বাহুল্য, আসলে এমনটাই হয়ে থাকে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত!  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]