‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

গৌতম দাস

৩০ জুন ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2sr

 

থিংক ট্যাংক ধারণাটা আমেরিকান, ইউরোপীয় নয়। যে অর্থে আমেরিকা ইউরোপ নয় তবে ইউরোপেরই এক নবপ্রজন্ম, যাদের আবার ইউরোপকে আমেরিকার কলোনি শাসক হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা আছে এবং সশস্ত্রভাবে লড়ে ইউরোপকে পরাজিত করে নিজে কলোনিমুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এই অর্থে আমেরিকা এক নতুন ধারার পোস্ট-ইউরোপীয়ান প্রজন্ম। ফলে বহু নতুন নতুন আইডিয়ার জন্মদাতাও। যার বেশির ভাগটাই ঘটেছে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার নেতৃত্বে দুনিয়া পরিচালিত হওয়ার কালে। তবে থিংক ট্যাংক ধারণাটার আবার আমাদের অঞ্চলে একালে এক নতুন অর্থে হাজির করেছে সেই আমেরিকাই। কিন্তু কপাল খারাপ। টাইমিং প্রবলেম!

কোকিল কাকের ঘরে ডিম পেড়ে রেখে আসে, নিজের ডিম ফুটিয়ে নেয় কাককে দিয়ে। আমেরিকা সেই পদ্ধতি কপি করে নিজের থিংক ট্যাংকের ইন্ডিয়ান শাখা খুলে ইন্ডিয়ানদের দিয়ে ইন্ডিয়ায় বসে চালায়। এমনকি ছোট-বড় কিছু স্কলারশিপ অথবা হায়ার স্টাডি বা পিএইচডি করার সুযোগ অফার করে। আর সার বিচারে এতে এক বিরাটসংখ্যক আমেরিকার নীতি পলিসির বাহক ও চোখ-কান যেন এমন এক দঙ্গল ভারতীয় একাডেমিক পেয়ে যায় আমেরিকা। মানে নামে ইন্ডিয়ান কিন্তু ফলে ও কাজে আমেরিকান। আর ভারতীয় প্রশাসকরা ভাবল আমেরিকানদের ভালই ঠকিয়েছি। আমেরিকানদের ঘাড়ে চড়ে তাদের পয়সায় থিংক ট্যাংক খুলে নিয়েছি। কিন্তু এতে কে যে কাকে ঠকিয়েছে তা বুঝমান লায়েক না হলে বুঝা যাবে না! যাই হোক, মূল কথাটা হল, ঠিক যেমন বাংলাদেশে একটা “আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের” কিংবা আমেরিকান “হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের” শাখা খুললে সেটা আমেরিকান চোখ-কান খোলা এক আমেরিকান থিংক ট্যাংকই থাকে; বাংলাদেশের চোখ-কান হয়ে যাবে না।

যা হোক, প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংকের এরাই ভারতজুড়ে এবং বাইরে ছড়িয়ে আছে – তারা ভারতীয় কিন্তু আমেরিকান নীতি পলিসির পক্ষে প্রচারক। অর্থাৎ ভারতীয় কাকের ঘরে আমেরিকান কোকিলের ডিম। এভাবে গত তেরো-চোদ্দ বছর ধরে এদের জমানা চলে আসছিল, তাদের জন্য তা খারাপ চলছিল না। কিন্তু এখন হঠাৎ বিধি বাম! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। গত ষোলো বছর ধরে বুশ আর ওবামা প্রশাসনের মিলিত আমল ধরে ভারতে যে আমেরিকান থিংক ট্যাংক বিস্তার লাভ করেছিল তা এখন চরম দুর্দিনে। এর মূল কারণ হল, আমেরিকান চোখ, কান ও মন হিসেবে লোকাল ভারতীয় একাডেমিক তৈরি সবই ঠিক ছিল; কিন্তু সমস্যা হলো তাদের “প্রডাক্ট শো” করার সুযোগ আর নেই, বন্ধ হয়ে গেছে। ‘প্রডাক্ট শো’ মানে? থিংক ট্যাংক অ্যাকাডেমিকদের প্রডাক্ট মানে হলো ঘরোয়া সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি আয়োজন ও বয়ান প্রেজেন্টেশন এবং প্রচারণা। প্রো-আমেরিকান নীতি পলিসি চিন্তার পক্ষে প্রচারণা। ভারত সরকার এর আগে আমেরিকান প্রভাবিত এসব থিংক ট্যাংকগুলো খুলতে ও চলতে অনুমতি দিয়েছিল স্থায়ীভাবেই। কিন্তু প্রত্যেকবার তারা কোনো “প্রডাক্ট শো” করতে গেলে তাদের ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে আগাম একটা “নো অবজেকশন” লিখিত পত্র পেতে লাগত, যেটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ ধরা যাক, কোনো এক থিংক ট্যাংক চীনবিরোধী এক কড়া একাডেমিক বক্তব্য নিয়ে প্রচারে হাজির হয়ে গেলে, মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রচার হয়ে যেতে পারে ওই সভার বক্তব্য – অথচ ওই প্রসঙ্গে ভারতের চীননীতি হয়ত এত কড়া হতে চায় না। এই ভুল বুঝাবুঝি বা নিয়ন্ত্রণ-বিহীন প্রভাব ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় পছন্দ না করাটাই স্বাভাবিক। তাই এই ব্যবস্থা। যেমন, গত মার্চে টাইমস অব ইন্ডিয়ার  ডিপ্লোমেটিক এডিটর ইন্দ্রানি বাগচী জানিয়েছিল যে  থিংক ট্যাংক Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) এরকম এক বার্ষিক কনফারেন্স বিদেশ মন্ত্রণালয় অনুমতি না দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। যেখানে আলোচনার থিম ছিল “India-China: a new equilibrium”.

এতদিন প্রো-আমেরিকান ভারতীয় থিংক ট্যাংকগুলো আরামে আমেরিকার “চীন ঠেকাও” নীতির অধীনে চলত বলে তাদের সভা সেমিনার থেকে যা খুশি চীনবিরোধী বলে চলতে পারত। কিন্তু ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ চীন থেকে শুরু হয়ে এখন ভারত আর ইউরোপের বিরুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। দিনকে দিন অনেকের আশাকে ব্যর্থ করে দিয়ে চীনের সাথে কোনো রফা হয়ে যাওয়ার বদলে বিরোধ স্থায়ী রূপ নেয়ার দিকে যাচ্ছে। ফলে এই অবস্থায় ভারতের সাথে আমেরিকার আগের রফতানি বাণিজ্য সম্পর্কের অবস্থায় ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ ট্রাম্পের নীতির মূল কথা হল, সবার আগে আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি, (তাতে অবশ্য ট্রাম্প যেভাবে যেটাকে আমেরিকার “বাণিজ্য স্বার্থ বলে” বুঝবে সেটাই বুঝতে হবে)। ফলে আমেরিকার যে পুরান “চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত ভারত করত আর বিনিময়ে  আমেরিকায় রফতানি বাজার ভোগ করত, তা ট্রাম্প এবার বন্ধ করে দিয়েছে। আর তা স্থায়ীভাবেই বন্ধ হয়েছে এটাই ধরে নিতে হবে। এমনকি আগামী আড়াই বছর পরেই কেবল তখন আমেরিকার কোনো নতুন প্রেসিডেন্ট এলেও তখনকার হবু আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাণিজ্যের দিন আবার ফেরত না আসার সম্ভাবনা খুবই বেশি- সে এক অনিশ্চিত অবস্থা। অতএব মূল কথা আমেরিকার যে ‘চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত করার সুযোগ ভারতের ছিল বলেই সে কারণে, আমেরিকান থিংক ট্যাংক ভারতে বিস্তার লাভ করেছিল। এখন খেদমতের সুযোগ নেই, রফতানি বাণিজ্য নেই ফলে থিংক ট্যাংক তৎপরতা ও এর বিস্তারের সুযোগ নেই।

আমেরিকায় থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ফান্ডের সংস্থান হিসাবে চিন্তা করা হয়েছিল দাতব্য প্রতিষ্ঠান। ফলে এখনও এগুলো চলে প্রায় একচেটিয়াভাবে বিভিন্ন দাতব্য ফিলেন্থোপিক প্রতিষ্ঠানের অর্থে। আমেরিকানরা প্রতিষ্ঠান গড়তে জানে, প্রতিষ্ঠানের কদর বুঝে ফলে, করপোরেট হাউজগুলোর কাছ থেকে স্থায়ীভাবে নিয়মিত ফান্ড তারা পায়। এভাবে চলা অসংখ্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানও আছে। যদিও অভ্যন্তরে এরা আবার সেটা রিপাবলিকান না ডেমোক্র্যাট প্রতিষ্ঠান এমন সুপ্ত ভাগ রেষারেষিও আছে। কিন্তু এই বিভেদ কোনোভাবেই সুস্পষ্ট বা প্রকট নয়।
ভারত তার মাটিতে থিংক ট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলতে দেখেছিল আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ খেদমতের প্রোগ্রামে তৎপর প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ভারতের ট্রাডিশনাল থিংক ট্যাংক বলতে ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা যায় (যেমন (IDSA) ), যেগুলো সরকারি প্রতিরক্ষা ফান্ড শেয়ার করে চলে। ফলে সীমিত ফান্ডের এমন প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল এবং আছে। তবে এসবেরও বাইরে এক বড় ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠান হল, ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (ওআরএফ)। ব্যতিক্রম এজন্য কারণ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতীয় করপোরেট ব্যবসায়ী রিলায়েন্স গ্রুপের দাতব্যে দেয়া অর্থে। ওআরএফ (ORF), এটা এখন এক দাতব্য ট্রাস্ট সংগঠন। অর্থাৎ এটা সরকারিও না, আবার প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক নয়। আবার কোনো রাজনৈতিক দলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানও না। এসব অর্থে এটা বেশ ব্যতিক্রম। এখনো এর চলতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ বার্ষিক ফান্ডের জোগানদার রিলায়েন্স গ্রুপ। আর বাকিটা অন্যান্য দেশী-বিদেশী সবার কাছ থেকেই নিয়ে থাকে।

এটা স্বাভাবিক যে, কোনো থিংক ট্যাংকের পক্ষে সরকারি পলিসির সরাসরি ও প্রকাশ্য সমালোচনা করা সহজ কাজ নয়। এ ছাড়া তা ভালো ফল দেবেই সবসময় তা এমনও মনে করে নেওয়া যায় না। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সরকারি নীতি পলিসির সমালোচনা, মূল্যায়ন বা ভিন্নমত ইত্যাদি সেগুলো তো অবশ্যই চলবে, তবে এগুলো আলাদা বিষয়।
ওআরএফ নামের থিংক ট্যাংকের এক গুরুত্বপূর্ণ ফেলো হলেন মনোজ যোশী। তিনি মূলত দিল্লির জওহর লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি এবং ওআরএফে যোগ দেয়ার আগে প্রায় তিন দশক ধরে সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর অনেকগুলোতে রাজনৈতিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।

সম্প্রতি বিএনপির এক প্রতিনিধিদলের ভারতের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার কথা জানা যায়। তারা এই মনোজ যোশীর সাথেই সাক্ষাৎ করেছিলেন। ভারতের বাংলাদেশ নীতি কী হবে তাতে ভারতের স্বার্থের কী সম্ভাবনা ও বাধা এসব নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল মনোজ যোশীর একটা লেখা প্রকাশ হয়েছিল। শিরোনাম ছিল।  “Bangladesh polls pose a challenge to regional stability”। সেই সুত্রে মনে করা যায় ভারতের আমলা-গোয়েন্দা ও রাজনীতিবিদদের সাথে সরকারের নীতি পলিসি বিষয়ে কথাবার্তায় থিংক ট্যাংক ওআরএফের পক্ষ থেকে মনোজ যোশীই দেখে থাকেন। তাই সম্ভবত তার গুরুত্ব। যদিও ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ার তারেক জিয়া এবং ভারতের জন্যও এই বিপর্যয়কর অভিজ্ঞতা হয়ে শেষ হয়। কারণ মা খালেদা জিয়া তার “মুখপাত্রকে”  দিয়ে ঐ প্রতিনিধিদল কারা, তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকেই প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে দিয়েছেন।

সে যাই হোক আমাদের এখানে ইস্যু, মালদ্বীপ। দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগের ইস্যু হয়ে উঠেছে মালদ্বীপ। এটা নতুন শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হয়েছে। ব্যাপারটা হল,  ভারত তার পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে আপন বাড়ির পিছনে নিজেরই বাগানবাড়ির অংশ যেন এমনভাব করে চলেছে এতদিন। এই অভিযোগ অনেক পুরানা। ভারত সুযোগ পরিস্থিতিতে একটা শব্দ এখানে ব্যবহার করে – “area of influence। যার বাংলা করলে হবে সম্ভবত, “আমার প্রভাবাধীন এলাকা”। যার খাস মানে হল “আমার তালুক”। যদিও  বৃটিশ-বাপ অথবা ভারতের কোন শ্বশুর এই তালুক কিনেছিল কি না জানা যায় না। তো ব্যাপার হল দাবিকৃত সেই তালুকগিরি এখন নাই হতে লেগেছে।  তবে মনোজ যোশীর ভাষায় পড়শি দেশ যেমন “শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও এখন মালদ্বীপ” আর আগের মতো থাকছে না। ভারতের ছোট পড়শি ম্যানেজ করা কঠিন হয়ে গেছে। কারণ ক্রমাগত বিনিয়োগের অভাবে ধুকতে থাকা ভারতের পড়শি সকল্বর দরজায় এখন ব্যাপক উদ্বৃত্ব বিনিয়োগের অর্থ নিয়ে চীন  হাজির, সবার দরজায় নক করছে সে।
ব্রিটিশরা এশিয়া ত্যাগ করার পর ভারত সেই নেহরুর সময় থেকে সবসময় পড়শিদের সাথে ভাব করেছে যে, সে যেন এবার নতুন কলোনি মাস্টার, আর নেহরু যেন এর ভাইসরয়। সেখান থেকেই এই পড়শিদের নিজ বাগানবাড়ি মনে করার শুরু। ফলে এখান থেকে ভারতের পড়শিদেরও ভারত সম্পর্কে মূল্যায়ন নির্ভুল হতে আর কোনো অসুবিধা হয়নি। তবে সবাই আসলে অপেক্ষায় ছিল সঠিক সময়ের। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে হাজিরা স্বভাবতই ভারতের পড়শিদের সবাইকে এনে দিয়েছে  নিজেদের দিন ফেরার সুযোগ। এটাই স্বাভাবিক যে  ধুঁকে মরা এই পড়শিরা সবাই এখন তুলনামূলক বেশি স্বাধীন মুক্ত হওয়ার সুযোগ চাইবে। আর সেই সাথে আগের দুঃপ্রাপ্য বিনিয়োগ  এখন যদি সহজলভ্য হয়ে যায় তা তো অবশ্যই সোনায় সোহাগা। বিপরীতে তাদের সকলের স্মরণে আছে যে ভারতের ইতিহাস আছে অন্তত দুটো পড়শি রাষ্ট্রে (শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে) নিজ সৈন্য পাঠিয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করার।

চীনের উত্থানের আগে পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়া যে ভারতকে দেখেছে তা হল, সে কখনও নিজেরই তৈরি কোনো নীতি পলিসি মেনে চলে নাই। অর্থাৎ ভারত কী কী করতে পারে, আর কী কী সে করে না, করবে না, কখনত,তার করা উচিত হবে না মনে করে – এমন কোন গাইডলাইন, সেটা ভারতেরই নিজের জন্য সাব্যস্ত করা কোনো নীতিতে সে কখনও পরিচালিত হয়নি। অথচ ভারতের অপর মানে পড়শি; মানে আর একটা রাষ্ট্র। ফলে অন্তত সেখানে এক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আছে, যা ভারতের সম্মান করে চলা উচিত। এটা স্বাভাবিক ও নুন্যতম হওয়ার কথা। কোনো হস্তক্ষেপ করা থেকে ভারতের সাবধান থাকা উচিত। অথচ ভারত এখন বিশাল পরাশক্তির ভাব করে চলে। সে এখন বাংলাদেশের মানুষ নিজের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও সরকার গঠন করা সেটাই হতে না দেয়া এবং জনগণকে ভোট না দিতে দেয়াতে ভূমিকা রাখা – এটা ভারতের জন্য কতবড় মারাত্মক সুদূরপ্রসারি নেতি পদক্ষেপ তা ভারতের কেউ বুঝেছে বলে মনে হয় না। আর এই নীতি পলিসিহীন ছেচড়ামির ভারতই আমরা দেখে এসেছি, আসছি।

মনোজ যোশী মালদ্বীপ নিয়ে এক রচনা লিখেছেন,  ভারতীয় ইংরেজি স্ক্রোল ম্যাগাজিনে; যেটা আরো অনেক পত্রিকাও ছেপেছে। লেখার শিরোনামটাই ইন্টারেস্টিং “India is losing the plot in the Maldives – and New Delhi’s self-goals and inflated ego are to blame”। [রাঙানো আমার করা] এই লেখার বিশেষত্ব হল, এই প্রথম আমরা দেখতে পাচ্ছি, কড়া শব্দ ব্যবহার করে এখানে ভারতের নীতি পলিসির সমালোচনা করা হয়েছে। তাও একেবারে শিরোনামেই এই সমালোচনা করা হয়েছে। লেখার ওই শিরোনামের বাংলা করলে দাঁড়ায়, “মালদ্বীপে তাল-নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ভারত এবং নয়াদিল্লির আত্মগর্বে নির্ধারিত লক্ষ্য (self-goals) ও ফুলানো ফাঁপানো ইগো (inflated ego) এর জন্য দায়ী”। ইংরেজিটাও সাথে উল্লেখ করেছি, এমন শব্দ দুটাকে বেশ কড়া বললেও কম বলা হয়। সোজা বাংলায় বললে ব্যাপারটা হল শিরোনামটা বলতে চাইছে, “মুরোদহীন ভারতকে ফাঁপা ইগো সামলাতে হবে”।

মনোজ যোশী এই লেখায় মালদ্বীপে গত এক বছরের  নতুন সব যা ডেভেলপমেন্ট ঘটেছে তার সবের উল্লেখ আছে এবং তা আছে চীনকে কোন রকম দায়ী না করে, নৈর্ব্যক্তিকভাবে। এমনকি তিনি লিখছেন, “চীনারা সেখানে যৌথভাবে এই মহাসাগরে পর্যবেক্ষণ স্টেশন তৈরিতে সাহায্য করছে, (The Chinese are also helping build a Joint Ocean Observation Station)”। অর্থাৎ মনোজ, মালদ্বীপে কোনো সামরিক স্থাপনা চীন করছে এমন কোনো অভিযোগ তিনি করছেন না। বরং তিনিই লিখছেন, “এখনো পর্যন্ত ভারতের বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে চীনা তৎপরতার কোনো সামরিক অভিপ্রায়গগত দিক আছে’ (As of now, India has no reason to believe that the Chinese activities have military implications)”। বলা বাহুল্য, এটা দেখা যায় না এমন এক বিরাট সার্টিফিকেট।  তবে তিনি বলছেন, “চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং এই অঞ্চলে চীনের হাজিরা ভারতের জন্য কাজ কঠিন করে দিয়েছে”।  এবং সেটাই কী স্বাভাবিক নয়!
এছাড়া যেকথা উপরে বলা হচ্ছিল, ভারত এতদিন কোনো নীতি মেনে পড়শিদের সাথে চলেইনি। এর কিছু কিছু মূল্য এখন না চাইলেও ভারতকে দিতে তো হবেই। মনোজ লিখছেন, “ভারতের নিজ মুরোদে, পড়শিদের কাছে বেচার মতো কোনো অস্ত্র তার নিজের নেই। তাই সে চীনের সাথে পারছে না”। বলা বাহুল্য, এটা চীন বা ভারতের পড়শিদের কোনো অপরাধ অবশ্যই নয়।

তাহলে মনোজ কেন এই রচনা লিখলেন? তিনি আসলে ভারতকে চীনের সাথে স্বার্থবিরোধ অনুভব করতে গিয়ে “আত্মগরিমায়”, নিজ ক্ষমতাকে “ফুলায় ফাঁপায় দেখে” যেন আগের মতো  মালদ্বীপে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের কথা যেন চিন্তা না করে বসে এটাই বলতে চাইছেন। সাবধান করছেন।
তিনি লিখছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে খবর বেরিয়েছিল যে “চীনা নেভাল কমব্যাট ফোর্স ভারতের সম্ভাব্য মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে ভারত মহাসাগরে হাজির আছে”। আমরা স্মরণ করতে পারি সেসময়ের কথা।  সে কারণে সে সময় পররাষ্ট্র সচিব গোখলেকে যেচে চীনে গিয়ে জানিয়ে আসতে হয়েছিল যে ভারতের এমন কোনো হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা নেই। এক সিনিয়র গভর্মেন্ট অফিসিয়ালের বরাতে ২৮ মার্চ সকালে ‘Stepping back from Maldives, India tells China’- এই শিরোনামে খবরটা এসেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়।

তাহলে মনোজের শঙ্কাটা কী থেকে? কারণ ইতোমধ্যে কিছু খুচাখুচি ঘা বানানোর চেষ্টা দেখা গিয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও আমলা-গোয়েন্দারা তাদের inflated ego এর খাসলত এখনও যায় নাই। সেই ইগোর ঠেলায় তারা এবার আবার কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করেনি বটে কিন্তু এক খাউজানির কূটনৈতিক লবি করেছে।  আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টকে দিয়ে একটা বিবৃতি দেয়াইয়েছে যে “মালদ্বীপে মানবাধিকার লঙ্ঘন” চলছে। ঐ বিবৃতির শিরোনাম, [“Conviction of Maldives Supreme Court Justices and Former President”]।  ঐ বিবৃতিতে আমেরিকার দাবি হল – “মালদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, সাবেক প্রধান বিচারপতি ও অন্য একজন বিচারপতিকে সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে বিচারে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়নি। এতে ‘আইনের শাসনে ব্যত্যয় ঘটেছে এবং আগামী সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ‘নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার’ হওয়ার ক্ষেত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।” [This outcome casts serious doubt on the commitment of the Government of Maldives to the rule of law and calls into question its willingness to permit a free and fair presidential election in September that reflects the will of the Maldivian people”. ] আর আমেরিকার এই বিবৃতির পরে ভারতও এই একই লাইনে নিজে এক বিবৃতি দিয়েছে।

এখানে মজার বিষয়টা হল, আমরা এই বিবৃতি খুবই পছন্দ করেছি। আর দাবি করছি, এই একই বিবৃতি বাংলাদেশের বেলায় ভারত কেন দেবে না? জনগণের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও পছন্দের সরকার গঠনের অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ কী একই জায়গায় কেন নয়? কিন্তু ভারত কেন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলবে না? আমরা জানতে চাই।

আগেই বলেছি, ভারত তার পড়শির বেলায় কোনো নীতি পলিসি মেনে চলা রাষ্ট্র নয়। এক হাভাতে খাই খাই পেট নিয়ে চলে ভারত। ফলে পেট ভরানোর উপরে অন্য চিন্তার জগতে সে এখনও উঠতে পারে নাই। আর এখানে যোশীর সাবধানবাণীর কারণ সম্ভবত এই যে, ভারত যেন আমেরিকার কথায় না নাচে। কারণ কোনো সম্ভাব্য ও ন্যূনতম সামরিক সঙ্ঘাত পরিস্থিতিতে আমেরিকার ওপর ভারতের ভরসা করার সুযোগ নেই। ভারত পক্ষে আপাতত ওই এক বিবৃতি পাওয়া গেছে এটাই খুব। কারণ য়ামরা মনে রাখতে পারি যে ডোকলাম ইস্যুতে আমেরিকা ভারতের পক্ষে একটা বিবৃতিও দেয়নি। এটা তাদের সবার মনে আছে নিশ্চয়। ফলে ভারত যেন মালদ্বীপ ইস্যুতে কেবল কূটনৈতিক এপ্রোচের মধ্যে থাকে এবং আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করে – এটাই মনোজ যোশীর আবেদন।

ভারত সব হারাচ্ছে, আরো হারাবে। কারণ ভারত কোনো নীতিগত জায়গায় দাঁড়ায়ে তার পড়শি নীতি পলিসি মেনে চলে না, চলছে না। তবে সারকথাটা হল, মালদ্বীপ পরিস্থিতি আমাদের আশ্বস্ত করছে যে আগামীতে অন্তত আর কোনো পড়শি দেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ সম্ভাবনা নাই হয়ে গেল। কারণ, মালদ্বীপে চীন সেখানে এক বিরাট বাধা হিসেবে উপস্থিত ও হাজির হয়ে গেছে, এটা প্রায় এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে ও নেবে। কারণ মালদ্বীপের মতো ভারতের প্রত্যেক পড়শি রাষ্ট্রে চীনের বিনিয়োগ স্বার্থ বর্তমান এবং তা স্থায়ী।

সবশেষে, এই ইস্যুতে মনোজ যোশীর মত আর এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া মিডিয়ায় দেখা গেছে। এম কে ভদ্রকুমার ভারতের এক অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। এক কমিউনিস্ট পরিবারের সন্তান। ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিকরা বেশির ভাগই “ভারতে আমেরিকান থিংক ট্যাংক” এর খেপ ধরতে গিয়ে প্রো-আমেরিকান হয়ে জড়িয়ে পরেছেন। যে দুচারজন এমন পেটভরানো চক্রের এর বাইরে আছেন ভদ্রকুমার তাদের একজন। মালদ্বীপ ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” বিবৃতিতে তিনি প্রচন্ড ক্ষিপ্ত। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই সপ্তাহেই  ভারতের কাশ্মিরে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য খোদ জাতিসংঘ কাউন্সিল কঠোর সমালোচনা করেছে – তা কী ভারত ভুলে গেছে?  তিনি লিখেছেন,

Ironically, Delhi’s tough statement on the democracy deficit in Maldives coincides with an unprecedented report by the United Nations Human Rights Council condemning India’s track record in Kashmir. The UN report demands the constitution of an impartial international commission to investigate India’s alleged human rights violations in Kashmir.

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মালদ্বীপে ভারতের ইগো”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

সাংহাই গ্রুপ ও আফগান তালেবানদের সাথে প্রথম অস্ত্রবিরতি

সাংহাই গ্রুপ ও আফগান তালেবানদের প্রথম অস্ত্রবিরতি

গৌতম দাস

২৩ জুন ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2sl

 

 

SCO, সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন – এই সংগঠন শুরুর ইতিহাস বহু পুরনো। এর আজকের জায়গায় আসার পেছনে কয়েকটা ঘটনা পটভূমি হয়ে আছে। সেখান থেকে জানা যায়, এসসিও বা সাংহাই গ্রুপের আজকের ভূমিকা এবং এর সম্ভাবনা ও অভিমুখ। এসসিও (SCO) বা সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন কী ও কেন?

এমনিতেই পুরনো ইতিহাস অর্থে সাধারণভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়ার (মধ্য এশিয়া বলতে পাঁচ রাষ্ট্র বুঝায় কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। যদিও এর বাইরে মঙ্গোলিয়াসহ অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রের অংশকেও মধ্য এশিয়া বলতে বুঝানো হয়ে থাকে।) সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী ঘটনা ঘটেছিল ইসলাম যখন বাগদাদ কেন্দ্রিক আব্বাসীয় (abbasid dynasty) খলিফা শাসন (৭৫০-১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) আমলে। আগের শাসক চীনা ‘তাং রাজবংশ’ (Tang dynasty) আব্বাসীয়দের হাতে পরাজিত হলে সেন্ট্রাল এশিয়া সদলবলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। আর দ্বিতীয় বড় প্রভাবের ঘটনা হল, কলোনি দখলদারি যখন দুনিয়ার মুল অভিমুখ ও সাম্রাজ্য শাসনের স্টাইল সেই আমলে রাশিয়ান জার এম্পায়ারের। সে আমলে ১৮৩৯-৮৫ খ্রিস্টাব্দ মধ্যে নানান যুদ্ধে রাশিয়ার প্রাচীন জার সাম্রাজ্যের সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিজের সাম্রাজ্যের অংশ করে নেয়। যতক্ষণ না এর পালটা বৃটিশ এম্পায়ার বৃটিশ-ইন্ডিয়ার দিক থেকে পাকিস্তানের পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্থানে না পৌছেছিল।

আর একালের প্রথম ঘটনা হল, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া (১৯৯১) যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য ছিল রাশিয়াসহ সেন্ট্রাল এশিয়ার ঐ পাঁচ রাষ্ট্রই। তবে রাশিয়াসহ কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরঘিজস্তান এরা সবাই এখন সাংহাই গ্রুপের সদস্য। আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে এক জোট গঠন তাদের হাতে শুরু হয়েছিল ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ- এই নাম দিয়ে ১৯৯৬ সালে; তবে তখনো উজবেকিস্তান এতে যোগ দেয়নি বলে তখন ছিল পাঁচ রাষ্ট্র, তাই ‘সাংহাই ফাইভ’।

দ্বিতীয় ঘটনাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে রাশিয়াকে সবচেয়ে বড় যে ভয়ে সবসময় দিন কাটাতে হত তা হল, আমেরিকা বা ইউরোপ অর্থে, পশ্চিমা শক্তি যেন ভেঙে যাওয়া সোভিয়েত থেকে আলাদা হয়ে পড়া ১৫ রাষ্ট্র বিশেষ করে, সেন্ট্রাল এশিয়ার কোন রাষ্ট্রে বন্ধুত্ব ও খাতির জমিয়ে ঢুকে না পড়ে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক ধরণের সম্পর্ক জমিয়ে এগিয়ে যেতে না শুরু করে। যদি তা পারে তাহলে প্রায় ১৮৮৫ সালের পর থেকে নিশ্চিত থাকা রাশিয়ার এশিয়ার দিক থেকে নিরাপত্তা এবার হুমকির মুখে পড়বে। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও রাশিয়া সবসময় চেষ্টা করে গেছে নানা উছিলা, নানান জোট, সামাজিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক করে এর মধ্য দিয়ে সেন্ট্রাল এশিয়ার সাথে জড়িয়ে থাকতে। [তবে সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে একটা রাষ্ট্রের কথা এতক্ষণ বাদ পড়ে যাচ্ছে, তা হলো তুর্কমেনিস্তান। কারণ, দেশটি সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশনের সদস্য নয় বলে উল্লেখ করা হচ্ছে না।]

এখন গুরুত্বপূর্ণ কথা, সেন্ট্রাল এশিয়ার নিজের সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক হল এটা ল্যান্ডলকড এবং চার দিকে পাহাড় পর্বতের ভেতর ডুবে থাকা, এক কথায় বদ্ধ। এশিয়ার সর্বোচ্চ উত্তরে, গহীন পাহাড়ি অঞ্চল। ফলে যত বিদেশী শাসক এর জীবনে এসেছে শেষ বিচারে সে কলোনিপ্রভু এ যেমন সত্য, ততোধিক সত্য হয়ে যে, সেইই তার বদ্ধ-দশা বিশেষত বদ্ধ অর্থনৈতিক জীবনে প্রাণ সঞ্চারের ভূমিকা ও গতি আনার ক্ষেত্রে, ত্রাতা হয়ে কম বেশি ভূমিকা রেখেছে। সেন্ট্রাল এশিয়া গহীন পাহাড় ঘেরা অঞ্চল বলে সেকালের পশ্চিমা শক্তি ইউরোপও এদের দখলে নিতে আসতে পারেনি অথবা এটা তাদের পোষায়নি। তবু শেষ দিকে ব্রিটিশেরা একবার উঁকি মেরেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ এম্পায়ার তার উপনিবেশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে আজকের পাকিস্তান তথা পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশের চেষ্টা চালাতেই সেন্ট্রাল এশিয়া আরো নিশ্চিতভাবে রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের অধীনে পোক্ত হয়ে যায়।

বলা যায়, সেই থেকে জার সম্রাটের উপনিবেশ হয়ে গিয়েছিল সেন্ট্রাল এশিয়া। এই সত্য পূর্ণ স্বীকার করেও বলা যায়, এই সম্রাট ও সাম্রাজ্যই ছিল তার একমাত্র আশার বাতি। কেন? কারণ ল্যান্ডলকড সেন্ট্রাল এশিয়ার আবদ্ধতা ঘোচানোর ক্ষেত্রে তিনিই একটু সম্ভাবনা। এখান থেকে বের করে সমুদ্রে পৌঁছানোর রাস্তা অথবা অন্য রাষ্ট্রের ভূমি পেরোনোর পর সমুদ্রে পৌঁছানোর সুযোগ কেউ যদি দেখাতে পারেন, তিনি হলেন ঐ উপনিবেশবাদী শাসক জার সম্রাট। ইতোমধ্যে জার সম্রাটের উচ্ছেদ ঘটিয়ে লেনিনের বিপ্লব (১৯১৭) হয়ে গেলেও ‘সেন্ট্রাল এশিয়া হল পুরনো জারের কলোনি’- এই সম্পর্কটাই থেকে যায় কিছুটা নতুন সোভিয়েত কাঠামোতেও। যা হোক, আজো সেন্ট্রাল এশিয়ায় যা কিছু কলকারখানা তা সোভিয়েত সূত্রের এবং তার সমুদ্র দর্শনও। আর অনেক কথার এক কথা হিসেবে বলা যায়, সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পরে, এখনো সেন্ট্রাল এশিয়ার পাঁচ রাষ্ট্রের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী অনবরত রাশিয়ান ভাষায় কথা বলতে পারেন। এটা তাদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। হয়তো নিজ নিজ স্কুলগুলোতে রুশ ভাষা শেখার সুযোগ আগের মতোই তারা এখনও চালু রেখেছেন।

আর একাল? পুতিনের রাশিয়ার উদ্বেগের মূল কথা উপরে বলেছি। কিন্তু সামর্থ্য বা মুরোদ পুতিনের নেই। সেন্ট্রাল এশিয়ায় আমেরিকাসহ পশ্চিমের কোনো প্রভাব ঠেকাতে হলে আগেই ব্যাপক অর্থনৈতিক অবকাঠামো ব্যয় ও বিপুল বিনিয়োগের সামর্থ্য থাকতে হবে। তা হলেই হয়ত সেন্ট্রাল এশিয়ায় পশ্চিমা প্রভাব ঠেকানো সম্ভব। এই বিবেচনা থেকেই পুতিনের সব সামর্থের মূল উৎস হল চীন। পুতিনকে সাথে নিয়ে চীন ১৯৯৬ সালে ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ’ তৈরি করেছিল। এটা একই সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাবিষয়ক জোট হিসেবে হাজির হয়েছিল। তুলনায় আর অন্য সব জোটের কথা আমরা শুনি এরা মূলত সবগুলোই অর্থনৈতিক জোট। এছাড়া এই জোটের ক্ষেত্রে কয়েক বছরের মধ্যে আরো সহজেই আগানোর সুযোগ এর হাতে আসে।

নাইন-ইলেভেনের (২০০১) হামলার পর আমেরিকার আফগানিস্তান ও ইরাক হামলা সাংহাই উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে প্রথম ধাক্কায় মনে হলেও পরে (২০১১) বুঝা যায়, এটা আসলে আশীর্বাদ হয়েই এসেছে। তবে মনে রাখতে হবে, নাইন-ইলেভেনের আগেই ২০০১ সালের জুন মাসে আগের ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ’ নিজেকে SCO, (সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন)- এই নতুন নামে ও ম্যান্ডেটে নিজেদের পুনর্গঠিত করে নিয়েছিল। এই লেখায় সংক্ষেপে এরপর থেকে একে ‘সাংহাই গ্রুপ’ লিখব।

ওবামার আমেরিকার ২০১১ সালে এসে আফগানিস্তান থেকে হাত গুটিয়ে এ দেশকে বিধস্ত করে ফেলে পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মূল কারণ ওই যুদ্ধ অনন্তকাল অমীমাংসিত থেকে যাওয়ার দিকে চলে গিয়েছিল। এ ছাড়াও যুদ্ধের ব্যয় বেড়েই চলেছিল। এ এক বিরাট জগাখিচুড়ি। জট পাকানো এই দশা থেকে বের হওয়ার সব উপায় আমেরিকা হারিয়ে ফেলেছিল। ওদিকে যুদ্ধের ব্যয় বহন করতে গিয়ে আমেরিকা অপারগ হয়ে শুধু নিজ অর্থনীতি ভেঙে ফেলা নয়, বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দাও ডেকে এনেছিল। এই পরিস্থিতিই SCO -এর জন্য বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দেয়।

লক্ষণীয় ব্যাপার হল, ভৌগোলিক অবস্থান হিসেবে সাংহাই গ্রুপের সদস্য সবাই আফগানিস্তানের পড়শি এবং আফগানিস্তানের সাথে তাদের সীমান্ত আছে। ফলে আমেরিকা নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার পরের পরিস্থিতিতে কারা তালেবান ও প্রো-আমেরিকান আফগান সরকারকে সহায়তা করবে, কে শান্তি স্থিতিশীলতার দিকে নেবে, এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা কারা তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনার কোন রফায় পৌঁছাতে পারবে – এমন শক্তির অনুপস্থিতি ও অভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। বলা বাহুল্য, ওই অঞ্চলের সবকিছুকে গভীর সঙ্কটে হ-য-ব-র-ল করে ফেলা আমেরিকা নিজেরও স্বার্থ ছিল এখানে। কিন্তু সে কাজে তার নিজের কোনো ভূমিকার গ্রহণযোগ্যতা কোথাও ছিল না।

স্বভাবত এই পরিস্থিতিতে চীনের নেতৃত্বে সাংহাই গ্রুপ দুনিয়াজুড়ে সবার কাছেই ‘একমাত্র ত্রাতা’ হয়ে হাজির হয়। কারণ আফগানিস্তানে পশ্চিমা শক্তির তুলনায় যে কারো চেয়ে চীন হল সবচেয়ে বড় গ্রহণযোগ্য শক্তি। এর মূল কারণ, আফগানিস্তানে একমাত্র চীনের হাতেই কোনো অস্ত্র নেই। ফলে অসহায় আমেরিকা প্রকাশ্যে চেয়েছে এবং স্বীকার করেছে চীন আফগানিস্তানে ভূমিকা নিক। সাংহাই গ্রুপ ভূমিকা রাখুক। অন্তত যুদ্ধে ভেঙে পড়া আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে, অবকাঠামো গড়তে।

মোটামুটি ২০১৫ সাল থেকেই চীন আফগান তালেবানদের সাথে ডায়লগে এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। তবে এর আগেও এবং পাশাপাশি, আফগানিস্তানে সামাজিক পুনর্বাসন, পুনর্গঠনসহ বহু অর্থনৈতিক অবকাঠামো খাতে চীন বিনিয়োগ নিয়ে তৎপর হয়ে গেছিল। এ ছাড়াও আফগানিস্তানকে এখন সাংহাই গ্রুপের ‘অবজারভার সদস্য’ করে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত ও পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রই এ বছর থেকে এর পূর্ণ সদস্য। ফলে সব মিলিয়ে আফগানিস্তান বুঝে গিয়েছিল আমেরিকার মতো চীনের হাতে অস্ত্র নেই, অথচ চীনের হাতে আছে পলিটিক্যাল নেগোসিয়েশনের সামর্থ্য ও যোগ্যতা। আর শান্তি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যা প্রধান উপাদান, মানুষকে পুনরায় অর্থনৈতিক জীবন ও তৎপরতায় ফিরিয়ে নেয়ার বাস্তব শর্ত- বিনিয়োগ সক্ষমতা, যা একমাত্র চীনের এবং সে তা দিতে অপেক্ষা করছে।  ফলে চীনা উদ্যোগ এবং তার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা – সহজেই কাজ করতে শুরু করেছিল। এখন শুধু কাজ করতে নয়, ফল দিতেও শুরু করেছে।

এটা টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটা রিপোর্ট। এখানে মূল ঘটনাটা হল চীনের তালেবান ইস্যুতে অর্জন। ঘটনাটা হচ্ছে, সদ্য শেষ হওয়া এই ঈদে তালেবান বনাম সরকার যুদ্ধে এই প্রথম উভয় পক্ষ তিন দিনের অস্ত্রবিরতি পালন করেছে। তাই খবরের শিরোনাম, “Taliban agrees to unprecedented Eid ceasefire with Afghan forces”।  ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে এই প্রথম এক সত্যিকারের ঈদ অনুভব। তাঁরা এই প্রথম আত্মীয়স্বজনে মিলে ঈদ পালন করেছে। ওই রিপোর্ট লিখছে, ‘তালেবানেরা ২০০১ সালের পর এই প্রথম আফগান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এক অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করে। চিন্তাও করা যায় না এমন ঘোষণাটা আসে আফগান সেনাবাহিনী তালেবানদের বিরুদ্ধে তাদের তৎপরতা সপ্তাহব্যাপী স্থগিত ঘোষণা করার দু’দিন পরে। [“The Taliban announced its first ceasefire in Afghanistan since the 2001 US invasion today against the country’s security forces.  The unexpected move came two days after the Afghan government’s own surprise announcement of a week-long halt to operations against the Taliban.] তবে তালেবানদের শর্ত ছিল, এই বিরতি ‘বিদেশী দখলদার’ [আমেরিকা বা তার বন্ধুদের বুঝানো হয়েছে] জন্য প্রযোজ্য হবে না।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের মিডিয়া রিপোর্ট হল, পাকিস্তান ও চীনের প্রবল তৎপরতার কারণেই কেবল তালেবানেরা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। [Afghan Eid truce ‘backed by Pakistan, China’] কারণ এব্যাপারে তালেবান নেতাদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল যে, “কেবল চীন ও পাকিস্তান গ্যারান্টার হলে তবেই আমরা যুদ্ধবিরতিতে যাবো। কারণ আমরা বাকিদের (আমেরিকা) বিশ্বাস করি না”।

ডিপ্লোম্যাট মহলে এখন এমন আলোচনা উঠেছে, চীন এমন এক ক্ষমতাবান মধ্যস্থতাকারীর আস্থা অর্জন করেছে যে, চাইলে এক দিকে আফগান সরকারের ওপর চাপ খাটাতে পারে, অন্য দিকে সে কারণে চাপ খাটাতে পারে তালেবানদের ওপরেও। কেন এবং কী করে এটা সম্ভব হয়েছে? কারণ, গত ডিসেম্বর থেকে আফগান-পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে চীন নিয়মিত ডায়লগ অনুষ্ঠান করে আসছে। ফলে স্বভাবতই এখন যেকোনো সময় আফগানিস্তানে অস্ত্রবিরতি ডাকা, নেগোসিয়েশনে বসানো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে চীন ঘন ঘন দেখতে পা্রবে বলে সবাই আশা করছে। নিঃসন্দেহে, এটা এক বিরাট আশার আলো।

এখন এর পাল্টা ঘটনাটা স্মরণ করা যেতে পারে। ঘটনাটা হল, গত বছরের আগস্টে ট্রাম্পও তাঁর আফগান পলিসি দিয়েছিলেন। সেখানে ভারতকে আফগানিস্তানে ব্যবসার সুবিধা নিতে ডাকা হয়েছিল আর পাকিস্তানকে তালেবানদের (হাক্কানি গ্রুপ) সহায়তার দায়ে অভিযুক্ত করে সাবধান করা হয়েছিল। সাথে আমেরিকান ৮০০ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছিল। আসল ঘটনা ছিল অন্য।

পাক-আফগান সীমান্ত চিহ্নিতকরণ নিয়ে বিতর্ক সেই ১৮৯৩ সালের আফগান যুদ্ধ-পরবর্তী “ডুরান্ড লাইন” টানা থেকে। এটা অবাস্তাবায়িত থেকে যাওয়ার মূল কারণ মূল পশতুন বা পাঠান জনগোষ্ঠিকে ভাগ করে ফেলে এই লাইন। ফলে লাইন ফেলে রেখে সীমান্ত পোস্ট বৃটিশ আমল থেকেও বৃটিশ-ভারতের [বর্তমান পাকিস্তান] ভিতরে গাড়া হয়, তাতেও সুরাহা আসে নাই।  এ ছাড়া একালের কয়েক লাখ আফগান উদ্বাস্তু হয়ে পাকিস্তানে এসেছে, এখন তারা প্রায় স্থায়ী। ফেরার নাম নাই।  স্থানীয় পাকিস্তানিদের মতোই সব ব্যবসায় ওরা জড়িত। এসব খুবই স্পর্শকাতর ইস্যু। এর বিতর্ক খুবই গভীর কিন্তু তালেবান ইস্যু সামনে থাকাতে এর আড়ালে তা কাজ করে থাকে।  খুব সম্ভবত আগাম পদক্ষেপ হিসেবে পাকিস্তান আফগানিস্তানে নিজ প্রভাব তৈরির কথা ভেবে কিছু তৎপরতা পরিচালনা করে থাকে। তাই আফগান তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপের সাথে পাকিস্তান বিশেষ সম্পর্ক রাখে। এটাকেই ট্রাম্প প্রচার করেছেন যেন ‘পাকিস্তানের প্ররোচনাতেই তালেবানেরা তালেবান হয়েছে’- এমন প্রপাগান্ডায় শামিল হয়ে। অপর দিকে, এটাই ট্রাম্পের সাথে ভারতের নীতির মিল। ‘পাকিস্তান মানে তালেবান’- এই প্রপাগান্ডা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে মাইলেজ দেয়। ট্রাম্পের এই প্রপাগান্ডা যেন বলতে চায়, পাকিস্তানই টুইন টাওয়ারে হামলা করেছিল। পাকিস্তানই তালেবানের জনক। অথচ কঠিন বাস্তব তা হল, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখলের প্রতিক্রিয়া থেকে পাকিস্তান আমেরিকার ইচ্ছায় বাধ্য হয়ে তালেবান দায় নিয়ে আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধ করে গেছে, যাচ্ছে।

যা হোক, ট্রাম্পের আমেরিকার পাশাপাশি চীনা কূটনীতির অ্যাপ্রোচ লক্ষণীয়। চীন শুরু করেছে পাক-আফগান অমীমাংসিত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা থেকে এবং তাদের ডায়লগ এখান থেকেই। ট্রাম্পের মত পাকিস্তানকে তালেবান বলে গালি দিয়ে, সব দায় চাপিয়ে ওরা শেষ করেনি।
এ ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট, গ্লোবাল এম্পায়ার বা লিডারের কিছু ভূমিকায় ইতোমধ্যেই চীন আমেরিকাকে সরিয়ে জায়গা নিয়ে ফেলেছে, ক্রমশ আগিয়ে আসছে চীন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২১ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “সাংহাই গ্রুপ ও তালেবানের প্রথম অস্ত্রবিরতি”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

গৌতম দাস

২ জুন ২০১৮, ০০:০৩, শনিবার

https://wp.me/p1sCvy-2rS

 

 


Illustration: Ajit Ninan, Times of India – মোদীও সওয়ার হওয়ার কথা ভাবছেন!

 

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের পয়লা টার্গেট ছিল চীন, তবে সেই সাথে দ্বিতীয় বা সহ-টার্গেট ছিল ভারতও। এই নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমেরিকা হয়ে পড়ে একা। অন্যদিকে, এই নতুন পরিস্থিতি চীন-ভারতকে কাছাকাছি এনে ফেলেছে। উল্টো করে বলা যায়, আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতির খেদমতে ও সমর্থনে ভারতেরও আর আমেরিকান ঐ নীতি পো-ধরে আগিয়ে চলার  বাস্তবতা লোপ পায়। ফলে মোদী ও ভারতের চীন নীতিও আমূল বদলে যাচ্ছে। আগে যতই উসকানিমূলক অবস্থান থাকুক না কেন, ভারত এবার থুক্কু বলে সব ভুলে চীনের সাথে সহযোগী সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবেই ২৭ এপ্রিল মোদির চীন যাত্রা ঘটেছিল। চীনে মাওয়ের অবসর যাপনের শহর য়ুহানে (Wuhan), চীন-ভারত “ইনফরমাল শীর্ষ সামিট” বা মোদী-জিনপিং এই দুই শীর্ষ রাষ্ট্র নির্বাহীর অনানুষ্ঠানিক কিন্তু ওজনদার ও গুরুত্বপূর্ণ আলাপের শুরু হয় সেখান থেকে।

ট্রাম্পের আমেরিকা হল এখন এক ‘একাকী আমেরিকা’ হতে রওনা দিয়েছে। এই অবস্থায় মানে “এন্টি গ্লোবাইজেশন” আর “সবার আগে আমেরিকা” এ দুই নীতিতে চলে যাওয়ার পর চাইলেও আর ভারতের পক্ষে আমেরিকার কোলে বসে আর কোনো কৌশলগত বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগের মতো চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া উদীয়মান ভারতের অর্থনীতির প্রবল ও বিপুল বিনিয়োগ চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও দেখা গেল, আমেরিকা এক্ষেত্রে ভারতের জন্য দরকারি কেউই না। অথচ চীন-ভারত সম্পর্ককে মোদী সংঘাতময় করে ফেলে রাখা সত্ত্বেও চীনই ছিল ভারতের জন্য একমাত্র উপযুক্ত বিনিয়োগদাতা। ফলে য়ুহান সম্মেলনে অন্তত ভারতের বিনিয়োগ সম্পর্কের দিক বা বিনিয়োগ প্রয়োজনের গুরুত্ব মোদি ভালোভাবেই বুঝেছিলেন।

গত ২৭ এপ্রিল ভারত ত্যাগের আগে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, এই সম্মেলন থেকে ‘চীন-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জোরদার করা’ তার বিশেষ লক্ষ্য। [“Modi stresses on strengthening economic ties]

আগামী বছর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা ক্ষমতার নির্বাচন। ফলে ক্ষমতার আকাঙ্খী বিরোধী অপর দল কংগ্রেসে এবার মা সোনিয়া গান্ধী ছেলে রাহুল গান্ধীকে দলের নতুন নেতা করে নামিয়েছেন। রাহুলও তৎপর হয়ে প্রায় প্রত্যেক ইস্যুতেই প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আক্রমণ ও সমালোচনা করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে চলেছেন। ফলে মোদীর য়ুহান যাত্রার আগেও ব্যতিক্রম করেননি। কিন্তু হায়! গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অভিমুখ সম্পর্কে রাহুল গান্ধীর মত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্ভবত যথেষ্ট সচেতন হন নাই, হোমওয়ার্ক করেন না – এমন আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করলেন রাহুল এক টুইট বার্তা দিয়ে। য়ুহান যাত্রার প্রাক্কালে তিনি মোদীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে লিখলেন – তিনি যেন “ডোকলাম ইস্যু” ও “চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তির” কথা তুলে ধরতে ভুলে না যান।

এর সোজা অর্থ মোদি-জিনপিং শীর্ষ বৈঠকের পিছনের কথা বা ব্যাকগ্রাউন্ড এবং গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে এই সম্মেলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং ভারতের অর্থনীতির জন্য তা কেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ আশীর্বাদ হয়ে আসবে সেসব সম্পর্কে একেবারেই বেখবর রাহুল। প্রথমত, মোদির কাছে বা ভারতের দিক থেকে এই সফর হল বিগত দুই বছরে চীন-ভারতের সম্পর্ক যে সঙ্ঘাত ও বৈরিতার পথে চলে গিয়েছিল, তা ছেড়ে পারস্পরিক সহযোগিতার পথে উঠে আসার জন্য ভারতের সুযোগ নেয়ার সফর। ফলে এই সফর থেকে ভুটানের ডোকলাম সীমান্ত নিয়ে নতুন করে সঙ্ঘাত তুলে আনা কোনোভাবেই মোদির বা ভারতের লক্ষ্য নয়। বরং ডোকলামের সঙ্ঘাত যা মূলত ডেড ইস্যু যা মোদী শেষে সফলভাবে চাপা দিতে পেরেছিল; চীনের সাথে কোনো বড় সঙ্ঘাতের দিকে তা চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল, এটাই মোদীর বিরাট অর্জন ছিল। ফলে ডোকলাম ভারতের কাছে, অন্তত মোদীর জন্য কোন অমীমাংসিত ইস্যু নয়, ভালভাবে ও কমপক্ষে আপাত হলেও মীমাংসিত ইস্যু। অথচ রাহুল মোদীকে ডোকলাম ইস্যুতে চীনের সাথে আলাপ তুলে পুরান ঘা খোঁচাখুচি করতে মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

[Congress president Rahul Gandhi said the PM looked tense in the live TV feed of the China visit. “Saw the live TV feed of your “No Agenda” China visit. You look tense! A quick reminder: 1. Doklam. 2. China Pakistan Economic Corridor passes through PoK. That’s Indian territory. India wants to hear you talk about these crucial issues. You have our support,” Rahul Gandhi said on Twitter.]

রাহুল দ্বিতীয় প্রসঙ্গ তুলছেন, চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তি নিয়ে। এই দাবিও অপ্রাসঙ্গিক। মোদী য়ুহান সামিটে যাচ্ছেন মূলত চীন-ভারত সামগ্রিক অর্থে অর্থনৈতিক ও বিশেষ করে বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে এর ভিত্তিমূলক আলাপ করতে। বোঝা যাচ্ছে, এর খবর রাহুলের কাছে নেই। মোদীর এই উদ্যোগ সরকার বিরোধী নেতা বলে রাহুলের তো তা ভন্ডুল করে দেয়া বা বেখবর থাকা কোন দায়ীত্ববান লোকের কাজ না।  অথচ তিনি ভেবেছেন যেন মোদী চীন যাচ্ছেন চীন-ভারত সীমান্ত বিতর্কে কোনো অমীমাংসিত ইস্যুতে ভারতের স্বার্থ আদায় করতে। দেখা যাচ্ছে রাহুল তো ইস্যুই বুঝেন নাই!

আসলে চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এক বিনিয়োগ প্রকল্প। এটা মূলত চীনের নিজের স্বার্থের অবকাঠামো প্রকল্প। পশ্চিম বা দক্ষিণ-পশ্চিম চীন যেটা পাহাড় পর্বতমালায় পুরোপুরি ল্যান্ডলক্ড অবস্থায়; সেই অঞ্চলকে  গভীর সমুদ্রবন্দরে প্রবেশসহ সব আবদ্ধতা ভেঙে ফেলে উন্মুক্ত করার অবকাঠামো প্রকল্প। এটা পাকিস্তানের উত্তর-দক্ষিণ বরাবর পুরা পাকিস্তানের বুকচিরে চলা এক হাইওয়ে যোগাযোগব্যবস্থা, যার একদিকে গভীর সমুদ্র বন্দর গোয়াদর আর অন্য প্রান্তে শেষে এটা চীনের অবরুদ্ধ পশ্চিম চীনের ভেতরে পর্যন্ত ঢুকে গেছে। এ ছাড়া এটাই চীনের ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিআরআই (BRI) এর অংশ; যা দুনিয়ার ৬৫টি রাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে এমন অবকাঠামো প্রকল্প।

ভারত এই প্রকল্পে অংশ নিতে চায় না – একথা বলে ভারত এখন নিজের দাম বাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টার মোডে আছে; এই স্তরে আছে। এরই অজুহাত হিসেবে ভারত এখন এক নন-সিরিয়াস অভিযোগ তুলে রেখেছে যে এই করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে গেছে। আর ভারতের চোখে কাশ্মীর এক বিতর্কিত ভূমি এবং দাবি যে কাশ্মীর পুরোটাই ভারতের। ফলে এই সুত্র এটা ভারতের সার্বভৌমত্বের রক্ষার প্রশ্ন। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এই আপত্তি তুলে রেখেছে সত্য কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার মনের আসল ইচ্ছা হল, ভারতকে বিআরআই (BRI) প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে চীন ভারতকে আরো কী কী ছাড় ও সুবিধা দেয় তার দরকষাকষি করা। এ ব্যাপারে চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন অশোক কান্থা; তিনি অবসরে যাওয়ার পরে গণমাধ্যমে নিজেই এক বয়ান দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্ষমতাবান ‘ক্রমবর্ধমান ধেয়ে আসা চীনের প্রভাব’ মোকাবেলা করাই হলো ‘ভারতের কূটনীতির জন্য আগামীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’। আর এই কাজে চীনকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দিতেই ভারত বিআরআই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত না হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। [……”how to deal with an increasingly assertive China… in an uncertain, fluid international environment, this is going to be possibly the biggest challenge in India’s foreign policy in years to come,” ]

তিনি মূলত বলেছিলেন BRI/OBOR প্রকল্পে যোগ দিলে ভারত চীনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে যাবে। তাই ভারতের যোগদানের সম্ভাবনা নাই। [……joining OBOR, which is going to have strategic agenda for China, as a junior partner is highly unlikely for India. It might work for smaller countries, but for India it is a difficult proposition,”]

এই কথাগুলো কান্থাসহ প্রো-আমেরিকান ধারার আমলারা যখন বলছিলেন, ভারত আমেরিকায় ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি নিজ ভর্তুকির পণ্য রফতানির সুযোগ তখনও বজায় ছিল। বিনিময়ে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতি নিজেরও নীতি, ভারতকে এটা আমল করে নিজ মুকুটে পালক হিসেবে লাগিয়ে রাখতে হয়েছিল। অশোক কান্থাসহ আমলাদের এই আমেরিকান ধারা এখন পরাজিত বলেই গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে চীন-ভারত য়ুহান সম্মেলন হতে পেরেছিল। বোঝা যাচ্ছে কংগ্রেসের রাহুল একেবারেই এতই নাদান যে বাস্তবের এসব ঘটনার কোনো ন্যূনতম তথ্যও তার কাছে নেই। তাই তিনি চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের সার্বভৌমত্বের আপত্তি নিয়ে কথা বলতে মোদীকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। যেন মোদী চীন সফরে যাচ্ছিলেন, পাকিস্তান অংশের কাশ্মীরে ভারতের নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই করতে।

ভারতের আরেক রাজনীতিক কাপিল সিবাল। তারও দল হল, সোনিয়া-রাহুলের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। মূলত তিনি দিল্লির চাঁদনী চক নির্বাচনী এলাকা থেকে সাধারণত নির্বাচনে দাঁড়ান। কিন্তু গত ২০১৪ সালের কেন্দ্র-নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে দাড়িয়ে হেরে গিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি ভারতীয় সংসদের দ্বিতীয় কক্ষ, রাজ্যসভার সদস্য। পেশাগতভাবে তার মূল পরিচয় মূলত তিনি হলেন দিল্লি সুপ্রিম কোর্টের উকিল, যিনি দিল্লি বার অ্যাসোসিয়েশনের তিনবারের সভাপতি। বিগত কংগ্রেস সরকারের দুই টার্মের তিনি অনেক মন্ত্রণালয়ের যেমন আইনমন্ত্রী, টেলিকমমন্ত্রী, মানবসম্পদমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। তাকে কংগ্রেসের সিনিয়র রাজনীতিবিদদের একজন মানা হয়।
কাপিল গত ২১ মে টাইমস অব ইন্ডিয়া নিজের এক মতামত ছেপেছেন। এটা ছিল টাইমস অব ইন্ডিয়ার ব্লগে কাপিল সিবালের লেখা। এই লেখাটাকে পড়া যেত হয়ত রাহুল গান্ধীর তথ্য ও চিন্তার খামতি পূরণের একটা উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু তা যায়নি এ জন্য যে, এটা কাপিল সিবালের ব্যক্তিগত মতামত বলে উল্লেখ করেই ছাপা হয়েছে।

কাপিলের এই লেখা বরং মোদিকে সার্টিফিকেট দেয়া বা এগিয়ে যেতে বাহবা দেয়া বলে মনে করা যায়। যেমন শিরোনামটাই তেমন বিনয়ের যদিও তা খোঁচা দেয়ারও। [Modi gets real on China: Wuhan summit demonstrated that a weak economy gives India few cards to deal]

এতদিন আমেরিকার কথায় নেচে ফাঁপা হামবড়া দেখানো যে ভুল ছিল কাপিল তা স্বীকার করছেন। কিন্তু স্বীকার করেও এর দায় কেবল মোদীর ওপর ফেলতে চাচ্ছেন। বাংলায় কাপিলের লেখার শিরোনামটা হল, “আসল চীনের সামনে মোদী এখন বুঝছেঃ য়ুহান সম্মেলন দেখাল নিজের দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে চীনকে মোকাবেলা করতে যাওয়া ভারতের হাতে কার্ড খুব কমই আছে”। মোদী এখন বুঝুক – টাইপের কাপিলের এই বয়ান পুরাপুরি অন্যায্য। যেন মোদী একাই আমেরিকার প্ররোচনায় চীনের সাথে মিথ্যা হামবড়া করে বা এমন হামবড়া দেখিয়ে চলেছিল। অথচ সোনিয়া-প্রণবের কংগ্রেসের আমলেও (২০০৪-১৪) চীন মোকাবেলার ক্ষেত্রে তারাও কি আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর উসকানিতে’ তাল দিয়ে একই মিথ্যা হামবড়া করে চলেনি? আর কাপিল কি সেই দুই টার্মের কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রী ছিলেন না? তাহলে একা মোদীকে দায় দেয়া কেন?

যা হোক কাপিল তার লেখায় এবার সোজা দেনা পাওনার আলাপে চলে এসেছেন। বলছেন, “বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, বার্মা, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা – এসব দেশে চীন প্রায় দেড় শ’ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভারতের অর্থনীতিতেও প্রধান সেক্টরগুলোতে চীন আমাদের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ করবে। আমাদের ১৮টা বড় শহরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে সব বিনিয়োগ চীনাদের”। ইত্যাদি সব কথাই আছে সেখানে।
কিন্তু এবার তিনি এক মজার আলাপ তুলেছেন।  চীনের বিরুদ্ধে কংগ্রেস সরকার যেসব অভিযোগ করত বা এখনো যেসব অভিযোগ, তিনি তার সব ফিরিয়ে নিচ্ছেন আর মোদীকেও তা ফিরিয়ে নিতে সুপারিশ করছেন। এটাই খুবই ইন্টারেস্টিং, স্রোত বদলের সরাসরি ইঙ্গিত।  “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে” – এই শিরোনাম দিয়ে তিনি এক তালিকা দিয়েছেন।

বলছেন, “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে”।
“চীন কখনো পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব ছাড়বে না। জাতিসঙ্ঘের উচ্চ আসনে চীনারা আমাদের প্রার্থিতা সমর্থন করবে না। [এই কাগুজে প্রার্থিতা  চীনের সমর্থন করার কোন কথা কোথায় হয় নাই। বুশ_ ওবামা দুজনের আশ্বাস দিয়েছিল। ] আবার নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে সদস্য হিসেবে ঐ সংগঠনে আমাদের অন্তর্ভুক্তি চীনারা মেনে নেবে না। আমাদের বাজারে চীনের প্রবেশাধিকার থাকলেও প্রতিদানে আইটি সেক্টরসহ তাদের বাজারে আমাদের তারা প্রতিদান দেবে না। যদিও চীনারা সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে আমাদের তৈরী ওষুধ চীনা বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। এরকম অনেক তালিকা আছে। কিন্তু এখানে মূল কথাটা হলো, নিজে মেনে নেয়া এবং সবাইকে মেনে নিতে সুপারিশ করা”।

আসলে ব্যাপার হল, এগুলো চীনের বিরুদ্ধে ঠিক ভারতের তোলা অভিযোগ নয়। বরং ভারতকে আমেরিকার দেয়া মিথ্যা আশ্বাসের তালিকা। যেমন জাতিসঙ্ঘ বা সাপ্লায়ার্স গ্রুপে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে দেবে, এই আলাপ ছিল ভারতকে দেয়া আমেরিকার মিথ্যা আশ্বাস।  আসলে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বও ছিল এতটাই নাদান যে, তারা এটা বিশ্বাস করেছিল। ধরে নিয়েছিল আ-মে-রি-কা; এই আমেরিকা চাইলে সবই যেন সে কাউকে দিতে পারে। তবে মূল কথা কাপিলের এসব বক্তব্য তাদের দলের নাদান সভাপতি রাহুলের বক্তব্যের চেয়ে অনেক বাস্তবে পা দিয়ে চলা – এমন কথা। অন্তত বক্তব্যের পটভূমি বুঝে তিনি কথা বলেছেন।

তবে এই প্রসঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশেষ করে আমাদের কাকাবাবু প্রণব মুখার্জির গ্লোবাল ইতিহাসবোধের উদাহরণ না তুলে ধরে পারছি না। বুশ এবং ওবামার আমলেও  (বিশেষ করে ২০০৯ সালে ওবামা ক্ষমতায় আসার পর) ভারতকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার সদস্যপদ ভারতকে এনে দেয়া হবে। আর প্রণব মুখার্জির মত নীতি নির্ধারকেরা তা বিশ্বাস করেছিল। এমনকী ভেটো ক্ষমতা পেলে সবার আগে পাবার সম্ভাবনা একালে মার্কেলের জার্মানী। সেই জর্মানি রাষ্ট্রও কেমন (P5+1) হয়ে ঝুলে আছে সেটাও লক্ষ্য করতে ভারত ভুলে গেছে। আর এর চেয়েও বড় কথা হল কেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে ভেটোক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাব করে, এর জন্ম দিতে হয়েছিল সে ইতিহাস জানলে যে কেউ বুঝবে কেন এখন পাঁচ ভেটো ক্ষমতাধর সদস্য একালে বাড়াতে যাবার সোজা মানে হল রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একক ক্ষমতাধর আমেরিকা এখন একালে আর  সেই ক্ষমতাধর নয় অথবা কখনই ফিরে আসবে না। ফলে রাষ্ট্রসংঘ পুনর্গঠনের মুরোদ আর আমেরিকার নাই। আগামিতে ঠিক কার বা কার কার এই মুরোদ হতে পারে সবটাই আবছা। এছাড়া “রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন” এর জন্য কী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটবার প্রয়োজনীয় পুর্বশর্তের মত এবারও একটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগবে, তাই কী! বিশেষত যখন আমেরিকার এক নম্বর ক্ষমতাধর জায়গা থেকে বিদায়ের আলামত চারিদিকে ফুটে উঠেছে। অথচ সেই ঢলে যাওয়া লোলচর্ম  আমেরিকার পকেটেই যেন গ্লোবাল ক্ষমতা ধরা আছে এই হল কাকাবাবুদের গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে রিডিং।

তবে আসল তামাশার কথা বলাটা এখনও বাকি। গত ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি শেষ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রথম ভারত সফর করেছিলেন। সেখানে হাসিনাকে দিয়ে পঞ্চাশেরও বেশি পয়েন্টে হাসিনাকে দিয়ে স্বাক্ষরিত এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল। ওর ৪৭ নম্বর দফা ছিল এরকমঃ

Responding to the Prime Minister of India, the Prime Minister of Bangladesh conveyed her country’s support in principle for India’s candidature for the permanent membership of the United Nations Security Council as and when the reform of the UN Security Council is achieved. Bangladesh conveyed its support to the Indian Candidature for a non-permanent seat in the UNSC for the term 2011-2012. India also conveyed its support to the Bangladesh’s candidature for a non-permanent seat in UNSC for the term 2016-2017.

অর্থাৎ ঐ ঘোষণার ৪৭ নম্বর পয়েন্ট ছিল এরকম, “বাংলাদেশ ভারতের ভেটো সদস্যপদের দাবি সমর্থন করছে”। মানে বাংলাদেশকে দিয়ে যা মনে চায় তাই স্বাক্ষর করে নেয়া যায় বলে কাকাবাবু এটাও ছাড়তে রাজি হয় নাই। তার কোন মুল্য থাক আর নাই থাক। যদি লাইগা যায়! আসল কথাটা হল রাষ্ট্রসংঘের ভেটো সদস্যপদ ভারত আমেরিকার কাছে আবদার করেছিল। অথচ এটা আমেরিকার কাছে আবদার করে পাবার জিনিষ নয়, আমেরিকাও তা একক ইচ্ছায় কাউকে দান করার কখনই কেউ নয়, কেউ ছিলও না। এটাই কাকাবাবুরা বুঝেন না!

এবার সবশেষে সুবীর ভৌমিকের দেয়া এক তথ্য। বিসিআইএম (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোর কথাটা গণমাধ্যমে অনেক দিন উচ্চারিত হয়নি। উচ্চারিত হওয়া বন্ধই হয়ে গিয়েছিল ভারতের আপত্তি, অনাগ্রহের কারণে। বিসিআইএম হল, বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার এই চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে লেখা নাম। এই নাম দেয়া হয়েছে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে এরপর বার্মার গুমদুম হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত এক অর্থনৈতিক করিডোর অবকাঠামো প্রকল্প, যার নাম বিসিআইএম (BCIM)। সুবীর বলছেন, “য়ুহানে মোদি-শি জিংপিংয়ের বৈঠকের একটা ইতিবাচক ফল মনে হচ্ছে আসন্ন হয়ে উঠেছে”। কলকাতায় চীনা দূতাবাসের এক কনসাল জেনারেল লেবেলের অফিস আছে। সেই কনসাল জেনারেল  (Ma Jhanwu ) মা ঝানয়ু-এর বরাত দিয়ে সুবীর জানাচ্ছেন, তিনি এক প্রেস কনফারেন্সে বলেছেন, বিসিআইএম প্রকল্প এখন শুরু হবে কারণ এ দুই শীর্ষ নেতা একমত হয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়া সামনে এগিয়ে নিতে হবে।’ [……”BCIM would take off now because the two leaders had agreed to take the process forward”. ]

খুবই তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি, যদিও খুবই কম তথ্য এটা সন্দেহ নেই। বিশেষ করে সড়ক ও রেল যোগাযোগের বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর ব্যবস্থা চালু হয়ত হয়ে যাবে কখনও। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর, যেটা ছিল বিসিআইএম প্রকল্পের সাথে সংযুক্ত, এক গভীর সমুদ্রবন্দর অবকাঠামো। এ ছাড়া আরেকটা দিক আছে। বন্দর সুবিধাসহ সব মিলিয়ে বিসিআইএম প্রকল্পও চীনা ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ একটা অংশ হওয়ার কথা। ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সুবিধা থাকার কথা, বিসিআইএম প্রকল্প তার একটি। তাহলে ভারত কি আস্তে ধীরে বেল্ট-রোড উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার পথে?

না এটা এখনই অতিরিক্ত আশা। যদিও তা কোনো দিন হবে হয়ত, এমন অনুমান করা অবাস্তব হবে না। তবে খুব সম্ভবত আমরা অনেক আগেই এবং বেশি দ্রুত তা অনুমান করছি। যদিও একটা বিষয় এখনই পরিষ্কার করে রাখা যায়।

য়ুহান সম্মেলনের কোনো ফলাফল যদি আসতে শুরু করে, তবে তা হবে সবার আগে শুরু হবে, ভারতের একান্ত নিজের জন্য নেয়া চীনা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো থেকে। চীন-ভারত সম্পর্ক সবার আগে এদিক দিয়ে উন্মুক্ত হবে। কিন্তু এর অর্থ বাংলাদেশেরও চীনা অবকাঠামো প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় বর্তমান যে আপত্তিগুলো আছে তা আপনাতেই সরে যাওয়া নয়। ভারতীয় কূটনীতিতে এ দুটো আলাদা বিষয়। বাংলাদেশে চীনা অবকাঠামো প্রকল্প ভারতের আপত্তি এখনও সক্রিয় আছে বলেই সম্ভবত এবার প্রধানমন্ত্রীর শান্তিনিকেতন সফরের সময়, কথিত ভারতের কাছ থেকে “প্রতিদান” পাওয়ার আলাপ উঠতে আমরা দেখেছি। সেই সাথে আমরা দেখেছি, কথিত “প্রতিদান” পাওয়ার জন্য সরকারের বেপরোয়া কাছাখোলা ও মরিয়া অবস্থা। যদিও এ ব্যাপারে আবার সরকারের সর্বশেষ অবস্থান হল, নিজের মরিয়া দুর্দশা সে আর বাইরে দেখাতে চাচ্ছে না। গত বুধবারের প্রেস কনফারেন্সে তাই বোধহয় একটু ইউ-টার্ণ। যদিও আগের দিন ২৮ মে সরকারি প্যানেল সাংবাদিক নেতাদের আলোচনা সভা ছিল অভুতপুর্ব, দেখার মত।  খুব সম্ভবত, প্রতিদান পাবার বেপরোয়া দেখালেও কোনো ফল আসবে না বা আসছে না, এমন হয়ত তাদের অনুমান।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩১ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিচ্ছে ভারত!”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

ট্রাম্পভক্তি ভারতের থিংকট্যাংকে বাঁচাবে না

গৌতম দাস

১২ মে ২০১৮, শনিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2rG

 

 

 

ভারতীয় থিংকট্যাংক (Think Tank or Policy Institute) প্রতিষ্ঠানগুলোর দশা হালহকিকত নিয়ে প্রায় সময়ই আমার লেখায় নানা মন্তব্য থাকে। সেখানে আমি সবসময় প্রশ্ন তুলেছি যে, কোন আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা (আমেরিকান ফান্ড চলা) ভারত রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষ থেকে পলিসি নিয়ে কাজ করা কঠিন, প্রায় অসম্ভব। ফলে শেষ বিচারে এগুলো আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের এক পলিসি প্রতিষ্ঠানই হবে। কারণ এটা  থিংকট্যাংক অর্থাৎ চিন্তা, আইডিয়া ও মতাদর্শ তৈরি করা বা করার প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রস্বার্থ জিনিষটা কোকিলের ঘরে কাকের বাসার গড়ার মত কাজ কারবারের না; সেটা এখানে চলতে পারে না। ফলে শুধু আমেরিকান থিংকট্যাংকের ভারতীয় শাখা নয়, এমনকি আমেরিকান (এনজিও) ফান্ডে চলে এমন স্থানীয় ভারতীয় থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই কারণে সেগুলোও ভারতের মাটিতে “আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থের পলিসি প্রতিষ্ঠানই” হবে।

বুশের আমল থেকে এভাবেই আমেরিকা ভারতের ঘাড়ে চড়ে আমেরিকার নিজের “চীন ঠেকাও নীতি” বাস্তবায়ন চালিয়ে গিয়েছে। তবে খেয়াল রাখতে হবে এখানে কথাগুলোর মূল বিষয় সাধারণভাবে বিদেশি এনজিও প্রসঙ্গে নয়। ফলে সাধারণভাবে এনজিও এর মাধ্যমে আমেরিকান ফান্ড বিতরণ এর বিরুদ্ধে কথা বলা বলে বুঝলে ভুল হবে। যারা বস্তুগত, বা বিষয়আশয় বিতরণের দাতব্য বিদেশি এনজিও – তাদের ক্ষেত্রে এই কথা বলা হচ্ছে না। কিন্তু চিন্তা, মতামত ও পলিসি তৈরির প্রতিষ্ঠান বিদেশি ফান্ডে হলে এখানে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের সাথে স্বার্থ সংঘাত, সমস্যা হবেই। এটাই মূল কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এত চরম ন্যাশনালিজমের ভারতের রাজনীতি, অথচ থিংকট্যাংক প্রশ্নে ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংককে অবলীলায় ততপর করে রেখেছে।  আসলে আমেরিকায় ভারতের ভর্তুকির রপ্তানি পণ্য বিক্রি করতে দেওয়াতে রপ্তানি বাজারের এই লোভে সম্ভবত ভারতরাষ্ট্র নিজ দেশে আমেরিকান থিংকট্যাংকের প্রভাব প্রতিপত্তি চালু রাখতে দিয়েছে। এই অনুমান যদি সঠিক হয় তবে বুঝতে হবে এবার  ভারতে ততপর আমেরিকান থিংকট্যাংকের শাখা অথবা অথবা আমেরিকান ফান্ডে চলা লোকাল থিংকট্যাংক এদের সবার ততপরতা ও প্রভাব প্রতিপত্তিতে এবার ঢিলা পড়ার প্রবল সম্ভাবনা। হাত গুটাতে হবে তাদের। এক ব্যাপক বদল আসন্ন হয়ে উঠছে। মূল কারণ আমেরিকান এশিয়া নীতিতে “চীন ঠেকানো” প্রায় স্থায়ী নীতি হয়ে ছিল বিগত প্রায় ষোল বছর – প্রেসিডেন্ট বুশের আট বছর আর পরে ওবামার আরও আট বছরে। এর ফলে এটা শুধু স্থায়ী নীতি হয়ে যাওয়া না, বরং “চীন ঠেকানো” ছিল আগের বুশ ও ওবামা প্রশাসনের পলিসিগুলোর মধ্যে টপ প্রায়োরিটি বা অগ্রাধিকার। কিন্তু এই প্রথম প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। অন্তত প্রায়রিটি উলটে দিয়েছেন তিনি। আগের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল আমেরিকান রাষ্ট্র স্বার্থের টপ প্রায়রিটি। আর এর বদলে ট্রাম্পের প্রায়রিটি হল বাণিজ্যস্বার্থ এখন টপ প্রায়রিটি। অর্থাৎ চীন ঠেকানো ট্রাম্পের কাছে প্রায়রিটি নয়। চীনের কাছে হারিয়ে ফেলা বাণিজ্য স্বার্থ উদ্ধার ট্রাম্পের টপ প্রায়রিটি। এসবের ফলাফলে  ভারতে আমেরিকান থিংকট্যাংক ততপরতাগুলোর শুকিয়ে যাবার কথা। দেখা যাক কী হয়। বাস্তবে কী ঘটে তা দেখার জন্য আমাদেরকে কমপক্ষে এবছরটা অপেক্ষা করতে হবে।

তবে ভবিষ্যত অবস্থা যতই অনিশ্চিত হোক না কেন, ভারতের আমেরিকান থিংকট্যাংক ব্যাক্তিত্বরা এখনই হাল ছেড়ে দেন নাই।  তেমনই এক উল্লেখযোগ্য প্রভাবশালী থিংকট্যাংকার ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজা মোহন। বর্তমানে তিনি কার্ণিগি ইন্ডিয়ার (Carnegie India) প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর। কার্ণিগি মানে হল, আমেরিকার ওয়াশিংটনভিত্তিক এক ফরেন পলিসি – বিষয়ক থিংকট্যাংক যার নাম – কার্ণিগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারনাশনাল পিস (Carnegie Endowment for International Peace)। এই পুরো নামের সংক্ষিপ্ত রূপের নাম হল, কার্নোগি। আর এর ভারতীয় শাখা হল, কার্নোগি ইন্ডিয়া। রাজামোহন ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের লোক। তিনি নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে মাস্টার্স পাস করেছেন অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে। তবে পরে দিল্লির জওয়াহের লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি করেছেন। এরপর অধ্যাপনা করেছেন অথবা নানান ধরণের একাডেমিক কাজে জড়িয়ে ছিলেন কখনও ভারতে, সিঙ্গাপুরে, অস্ট্রেলিয়ায় নয়তো আমেরিকায়। তবে তার মূল পরিচয় এখন “ফরেন পলিসি এনালিস্ট”, তার নিজের পরিচিতির ভাষায় তিনি “থিংকট্যাংকার”। আমেরিকায় থাকার সময় থেকে তিনি দক্ষিণ ভারতে তামিলনারুর প্রাচীন ইংরেজ জমানার ইংরেজি দৈনিক দ্য হিন্দু পত্রিকার ওয়াশিংটন করসপন্ডেন্স ছিলেন। পরে ডিপ্লোমেটিক এডিটর বা কলামিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন এই দ্য হিন্দু অথবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকাতেও। বর্তমানে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় নিয়মিত সাপ্তাহিক কলাম লিখছেন। ভারত সরকারের নিরাপত্তাবিষয়ক অথবা থিংকট্যাংক সংশ্লিষ্ট যত প্রতিষ্ঠান বা নীতিনির্ধারক বোর্ড আছে তিনি প্রতি বছরই একাধিক এমন সব প্রতিষ্ঠানের বোর্ড সদস্য থাকেন। তিনি এমনই প্রভাবশালী শিরোমণি। তার গুরুত্বপূর্ণ উত্থান ২০০৪ সালের আশেপাশের সময় থেকে। বিশেষ করে ওয়ার অন টেররের আমলে, জুলাই ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম ভারত সফর কাল থেকে। আমেরিকার ভারতনীতি কী হবে – তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে তখন থেকেই ‘আমেরিকার বন্ধু’ হিসেবে তিনি ভূমিকা রেখে চলেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার প্রভাব ও নীতির বিচারে তিনি প্রভাবশালী এক বিরাট ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশও সফর করেছেন কয়েক বছর আগে; অনুমান করি সেটা ভারতের বাংলাদেশ নীতি সমন্বয়ের কাজে। সে সময়ে চ্যানেল আই টিভিতে জিল্লুর রহমানের টকশো অনুষ্ঠানের শ্লটে। কিন্তু রাজামোহন সেখানে এসেছিলেন একক বক্তা, বলা যায় সেটা ছিল ডায়ালগের বদলে এক মনোলগ অনুষ্ঠানে। বলা বাহুল্য, তিনি আমেরিকার এশিয়া নীতিতে ‘চায়না কনটেনমেন্ট’ (বা চীন ঠেকাও) – এর প্রবক্তা। যার বাংলা কথাটা হল, এশিয়ার সবাই আমেরিকার পাশে থেকে চীন কোপাক, চীন ঠেকানোর কাজে লাগুক। আমেরিকার এই স্বার্থের পক্ষে অবস্থান নেক। যেটাতে রাজামোহন যেন একজন ন্যাশনালিস্ট ভারতীয়ের বক্তব্য দিচ্ছেন এমন মনে করানোর চেষ্টা থাকে। যদিও আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজের কাঁধে তুলে নিলে অথবা না নিলে সেটা ভারতের স্বার্থের পক্ষে যাবেই ব্যাপারটা এমন নয়। তবু এতদিন প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভারতের সব মিডিয়া এই একই ধারায় প্রপাগাণ্ডা করে গেছে। উইকিপিডিয়া পরিচিতি হিসেবে রাজামোহনের সম্পর্কে লিখা হয়েছে, তাঁর বিদেশনীতি বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গি হলো “মোটা দাগে লিবারেল ও বাস্তববাদী, তবে তিনি আমেরিকার মতো গ্লোবাল প্লেয়ারদের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার” পক্ষে কথা বলে থাকেন।

আগেই বলেছে ট্রাম্প আমলে এসে, ভারতের এহেন থিংকট্যাংকদের দিনকাল ইদানীং খুবই খারাপ যাচ্ছে। ট্রাম্প ও তার নীতি ভারতের থিংকট্যাংকারদের তাদের কাজ তৎপরতাসহ সব এলোমেলো করে ডুবিয়ে দিয়েছে। মূল কারণ তারা অবিরত ভারতে আমেরিকার হয়ে জনমত তৈরি ও প্রভাব সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। অথচ ট্রাম্প বাড়তি ট্যারিফ আরোপ করে ভারতের আমেরিকাতে রপ্তানি ততপরতায় হাহাকার তুলে ফেলেছে।  আমেরিকায় ভর্তুকির ভারতীয় পণ্যের প্রবেশ বন্ধ করা বা বাড়তি ট্যারিফ বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ট্রাম্প এদের সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’ নীতি নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে ফেরি করার দিন শেষ। এসবের আর মূল্য নেই। অথবা আমেরিকা প্রভাবিত থিংকট্যাংকগুলোর করা ভারতের মিডিয়া-প্রোপাগান্ডা সব মিথ্যা হয়ে যাওয়ার চেয়েও সেগুলো বাস্তবতা হারিয়ে অচল অসার বক্তব্য হয়ে গেছে। আর ওই দিকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও মোদির সরকার লজ্জার মাথা খেয়ে যেসব তৎপরতায় নেমেছে সেটাকে যদি চীনকে খুশি করার উদ্যোগ বলা এড়াতেও চাই তো বলতে হবে ‘চীন অখুশি হবে’ এমন সব কাজ পদক্ষেপ বন্ধ করে দিয়েছে। এর সবচেয়ে বড় চোটটা গিয়ে পড়েছে তিব্বতের দালাইলামার ওপরে। এসব ব্যাপারে সর্বশেষ ঘটনা হল, মোদি ও শি জিনপিংয়ের দুই দিনের একান্ত ইনফরমাল সামিট। (বিস্তারিত এখানে)

রাজামোহন গত ১ মে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় তার নিয়মিত কলামে মোদি ও শি জিনপিংয়ের একান্ত ইনফরমাল সামিটকে নিজের লেখার প্রসঙ্গ করেছেন। কিন্তু সেখানে দেখা যায়, তিনি ভারতের প্রো-আমেরিকান থিংকট্যাংকারদের করুণ অবস্থা স্বীকার করতে এখনো রাজি হননি। বরং রাজামোহন লিখছেন, গত সপ্তাহে মোদি ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে চীনের য়ুহান (Wuhan) শহরে একান্ত ইনফরমাল সামিট হয়েছে, সেটা ভারতের চীনা নীতিকে রিসেট (reset) বা “ফিরসে শুরু” করা হয়েছে বলে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। কিন্তু খুব কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দেখলে বোঝা যায় এটা আসলে বরং চীন, যে এশিয়ার তার ‘প্রতিবেশী নীতি’ বদলিয়েছে। আর দিল্লি তাতে কেবল চিন্তাই করা যায় না এমন পাওয়া সুবিধা পেতে সাড়া দিয়েছে মাত্র। ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করলে দেখা যাবে, চীনই তার আঞ্চলিক নীতি ‘ফির সে শুরু’ করে সাজিয়েছে কারণ সে ট্রাম্পের উজানে বাওয়া দেখে এর প্রতিক্রিয়ায় চীনকে এমনটা করতে হয়েছে। [Last week’s informal summit in Wuhan between Prime Minister Narendra Modi and President Xi Jinping was widely billed as India’s ‘reset’ of its China policy. A close look suggests it was Beijing that was really recasting its policy towards its Asian neighbours. Delhi was merely responding to an unexpected opportunity. A closer examination, however, suggests China’s reset of its regional policy was itself a response to the American upheaval under President Donald Trump.]

ইন্টেলকট বা একাদেমিক বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ যাদের করতে হয় তাদের বক্তব্যের ধার বা পয়েন্ট যখন এমন হাল্কা তর্কে নামা খুবই খারাপ লক্ষণ। বুঝা যাচ্ছে, রাজামোহনের অবস্থা আসলে খুবই মরিয়া দশায়। পরের প্যারায় তিনি ট্রাম্পের প্রশংসা করে আরও লিখছেন, “গ্লোবাল ক্ষমতার ভারসাম্য আমেরিকা-চীন এই দুইয়ের মধ্যে চীনের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে বলে যে ব্যাপক ধারণা তৈরি হয়ে গেছিল মাত্র ১৬ মাসে তা একা হাতে ট্রাম্প চ্যালেঞ্জ করে উল্টে দিতে পেরেছে।’ ট্রাম্প কেবল তার নিজের বিশেষ আজব ঢংয়ে বলে দিতে পেরেছে, ‘না, এত তাড়াতাড়ি সেটা ঘটবে না”। [“In a short span of 16 months, Trump has single-handedly challenged widespread perception that the balance of power between America and China was tilting in favour of the latter. Trump, in his own peculiar way, has said, ‘not so fast’”.

এই লেখা আসলে ডেসপারেট এক ট্রাম্পভক্তের; রাজামোহন সম্পর্কে এ ছাড়া আর কিছু বলার সুযোগ নেই। যেন এ’এক আমেরিকা প্রেমে মজে অন্ধ হয়ে যাওয়া। যেন দুই শিশু তুমুল তর্ক করছে যে, “কার বাবা বেশি বড়লোক”। কম করে বললে এমন তর্ক অশোভন, অন্তত একাডেমিক পর্যায়ের লোকদের তর্ক এটা নয়।

এটা আমেরিকা অথবা চায়নাকে ভাল বলে তাদের কারও পক্ষে ওকালতির ইস্যু না। ট্রাম্পের আমেরিকা ভাল না চায়না ভাল – এই স্টাইলে তর্ক  বলাই বাহুল্য খুবই নিম্নমানের। বরং একাডেমিকদের তর্ক হতে পারে যে, ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশনের নীতি ছেড়ে চলে যেতে পরোয়া করছে না কেন?  দুনিয়ায় গত সত্তর বছরেরও বেশি পুরনো আমেরিকার যে গ্লোবাল ভূমিকা ও এক এম্পায়ার (empire) ভূমিকা এবং দুনিয়ার নেতার ভূমিকা – সেসব ঢিলা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে তা আমরা মানলেও ট্রাম্পের আমেরিকা তা যেচে ত্যাগ করতে আর পরোয়া করছে না, কেন? আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের হাতে আকার পেয়েছিল রাষ্ট্রসঙ্ঘ – এখন সেই গর্বও ছেড়েছুড়ে দিয়ে চলে যাওয়ার নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছে রাষ্ট্রসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি হ্যালি। কেন? একই সময়ে গত সত্তর বছরের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা ইউরোপের সাথে আমেরিকার প্রধান সহযোগী হিসাবে সম্পর্ক, সত্তর বছর পরে এসে আমেরিকা অবলীলায় এই প্রথম বেপরোয়াভাবে এই সম্পর্ককে ত্যাগ করছে। ন্যাটোসহ ইউরোপের সাথে মিলে যা কিছু যৌথ প্রতিষ্ঠান এতদিন  ধরে গড়ে তুলেছিল, ট্রাম্পের আমেরিকা এখন সব ভেঙে দেয়ার হুমকি দিচ্ছে। অথচ এগুলোই তো আমেরিকার গ্লোবাল নেতৃত্বের মৌলিক ভূমিকা পালনের মুখ্য প্রতিষ্ঠান হিসাবে আমেরিকাকে সুযোগ দিয়েছিল। অথচ এগুলোকেই ট্রাম্প স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে চাইছে, ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। তাহলে “চীনের বদলে আমেরিকার হাতেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থাকছে, এত তাড়াতাড়ি তা যাচ্ছে না” – রাজামোহনের এই কথা বলে ট্রাম্পকে বিরাট ত্রাতা বলে তোষামোদীর কারণ কী?  এছাড়া ওদিকে ট্রাম্প নিজেই তার কোনো উপদেষ্টার কোনো কথা রাখছেন না বা অবস্থান কমিটমেন্ট যেখানে যা কিছু বলে আসছেন ট্রাম্প তা রক্ষা করছেন না, মানছেন না। তিনি মূলত পরিচালিত হয়ে চলছেন অসংখ্য লবিস্ট (ব্যবসায়ী) তাকে যখন যেভাবে বলাচ্ছেন বেশির ভাগ সময় তিনি তাদের খপ্পরে। ট্রাম্পের প্রশাসনের এসব অস্থিরতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, ট্রাম্পের আমলেই রেকর্ড পরিমাণ কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নিয়োগকৃত উপদেষ্টা বা প্রশাসনিক কর্তার বরখাস্ত হওয়া বা পদত্যাগ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। এথেকে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে আন্দাজ পাওয়া যায়!

আর সবচেয়ে বড় কথা ট্রাম্পের প্রশংসা করে রাজামোহনের দাবি যদি সঠিকও হয় তাতে রাজামোহনের ভারতের কী লাভ এতে? মোদির সরকার প্রশাসন থেকে কী আমরা ইতোমধ্যেই জানি নাই যে, খোদ ট্রাম্প বা আমেরিকার কাছ থেকে বাণিজ্য ইস্যুতে ভারতের আর কিছুই পাওয়া নেই? এটা মোদির সরকার প্রশাসন প্রকাশ করেননি! ভারত আমেরিকায় তার রফতানি বাজারটাই হারিয়েছে, এটাই চরম বাস্তবতা। তাহলে রাজামোহন কার প্রতিনিধিত্ব করছেন? কার খুশিতে খুশি হচ্ছেন? কোন আমেরিকা? এই আমেরিকা কী কেবল শুধু ভারতের নয়, দুনিয়ার কারো জন্যই কেউ নয়, তাই নয়? তাহলে রাজামোহন কার স্বার্থের প্রতিনিধি? বটম অব দা হার্ড ফ্যাক্টস হল, ট্রাম্প আমেরিকার রাজনৈতিক স্বার্থের উপরে বাণিজ্যিক স্বার্থকে টপ প্রায়রিটিতে এনেছেন। আর আগের আমেরিকার “চীন ঠেকানো” – এটাকে রাজনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে দেখে ও প্রাধান্যে রাখাতে ভারতের পণ্য তা প্রতিযোগিতায় না পারলেও ভর্তুকিতে রপ্তানিযোগ্য করে তা আমেরিকায় রপ্তানি করতে দিয়েছিল। এই সত্যকে আড়াল করে ট্রাম্পকে রাজামোহন হিরো বানায় কী করে, এটা সত্যিই বিস্ময়! ্ট্রাম্প কার চোখে হিরো? কার জন্য হিরো?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া এরা পূর্ব এশিয়ায় আমেরিকার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়েছিল ও থেকেছিল। আর আমেরিকা ছিল তাদের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাদাতা। ছিল বলছি কারণ ট্রাম্পের বাণিজ্য সংরক্ষণ  নীতির কারণে এর দিন শেষ। অথচ এসব ইঙ্গিত যেমন, চলতি দুই কোরিয়ার সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন এবং জাপানের গুরুত্বপূর্ণ মোচড় মনে হচ্ছে রাজামোহন দেখেও না দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই পরিবর্তনের মধ্যে মূল ইঙ্গিতটা হল, পুর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো মনে করছে আমেরিকাকে সবসময় নিজ ভাবনার সাথে মিলিয়ে এক গণ্ডিতে সাথে রেখে চিন্তাভাবনা করার দিন ফুরিয়েছে। ভারতের এ্ক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের (O.P. Jindal Global University, in Sonipat, India) দুই প্রফেসর জাপানের নতুন ভাবনার পক্ষে বিভিন্ন ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে লিখে চলেছেন। যেমন দেখুন, Trump Is Driving Xi Into Modi’s Arms

সেসব রচনার সার কথা হল, সাম্প্রতিককালে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জাপান সফরের পর থেকে বহু কিছু বদলে গেছে। জাপান এমনকি চীনের বেল্ট ও রোড প্রকল্পে যোগ দেয়ার সুযোগ কী তার জন্য আছে তা এক্সপ্লোর করতে শুরু করেছে। এমন একটা আর্টিকেলে লেখা হয়েছে, ভারতের জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা দরকার। [A lesson for India in Japan’s approach to China’s belt and road initiative] অপরদিকে দুই কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ সামিট সম্প্রতি আমরা দেখেছি – যদিও এমন সামিট এর আগেও মানুষ দেখেছে। কিন্তু এবার নেতাদের যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ তা বিশেষ ধরনের আলাদা। যেন দুই কোরিয়া একসাথে সামনে এগিয়ে যাওয়ার রাস্তা তারা এবার খুজে পেয়ে গেছে। প্রথম যেদিনে সীমান্তে দুই প্রেসিডেন্টের পরস্পর দেখা হয়, তখন থেকে। বিশেষ করে উত্তরের প্রেসিডেন্টের আন্তরিকতা দক্ষিণের প্রেসিডেন্টের কাছেও কাম্য অবশ্যই, তবে অদৃশ্যপূর্ব ঠেকেছে। এর পেছনের মূল কথাটা কী? সেটি হল, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ থেকে আমেরিকাকে দূরে রাখতে হবে, পরস্পরের প্রতি এই প্রতিশ্রুতি। তাই এটা এখনই বলে দেয়া যায় আগামী ইতিহাসে যখন খুঁজে দেখা হবে যে, কবে থেকে গ্লোবাল ক্ষমতার ভারকেন্দ্র আমেরিকা থেকে চীনের হাতে চলে এসেছিল? এক বাক্যে সেই ইতিহাস বলবে চীনের মধ্যস্থতায় দুই কোরিয়ার পরস্পরকে বিশ্বাসের সাথে পরস্পরের কাছে আসার শুরু থেকে। আর আমেরিকার ঐতিহ্যগত বন্ধু জাপান যখন আমেরিকা ছেড়ে চীনের ভেতরে বন্ধুত্ব খুঁজতে রওনা হয়েছিল আর চীন এর উপযুক্ত জায়গা খুঁজে দিতে পেরেছিল, তখন থেকে।

আসলে এসবের মূল কথাটা হল, যে আমেরিকা কেবল নিজের জন্য আমেরিকা – এটা কোন এম্পায়ার আমেরিকা নয়। বরং নিজেই নিজেকে দুনিয়ার নেতা – এম্পায়ার – এই অবস্থান থেকে নিজেই নিজেকে খারিজ করে দেয়া। এভাবে কোনো রাষ্ট্র যখন চরম রক্ষণশীল অবস্থান নেয় তখন কেউই আর সেই আমেরিকার কেউ থাকে না। এ যুগে এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান বলে নিজের কোনো অবস্থানের বাস্তবতা সম্ভব বলে মনে করা হলে এর সোজা অর্থ হল – সেই রাষ্ট্র আর তখন ইউরোপ, জাপান বা কোরিয়ার জন্য কেউই নয় হয়ে যায়। কেবল তখনও ট্রাম্পের আমেরিকার একমাত্র ভক্ত-বন্ধু থাকে সি রাজামোহন!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারতের থিংকট্যাংক এখনো ট্রাম্পভক্ত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

“পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” – সেই বিউগল বেজে গেছে

“পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” – সেই বিউগল বেজে গেছে

গৌতম দাস

০৩ এপ্রিল ২০১৮,  মঙ্গলবার, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2r9

কথা সত্য। চীন-ভারত সম্পর্ক আগে যেখানে যা অবস্থায় ছিল এর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে, ভারতের ভাষায় এটা রি-সেট (“reset”) হয়ে গেছে। মানে ‘ফির সে শুরু’ হয়ে গেছে। এটা হতে ১৬ বছর লাগল। তাই আজ কথা শেষের দিক থেকে শুরু করে বলব। প্রায় ষোলো বছর পর ভারত মেনে নিল যে এই অঞ্চলে চীনের ক্ষমতা ও প্রভাব ঠেকানোর সক্ষমতা ভারতের নেই। সে হার স্বীকার করে নিচ্ছে। তাই সে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করছে না, বরং মাঠ ছেড়ে যাচ্ছে। ভারত মালদ্বীপ থেকেও নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে চীন যেন ভারতের দিকটাও একটু খেয়াল রাখে। অর্থাৎ প্রকারান্তরে ভারত স্বীকার করে নিল যে, আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’ অথবা চীন ঠেকানো বৈদেশিক নীতির যে ঠিকা আমেরিকার কাছ থেকে ভারত এত দিন নিয়ে খেদমত দিয়ে গেছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত এখন তা পরিত্যাগ করছে, ক্ষেমা দিচ্ছে। ফলে চীন যেন ভারতকে এর প্রতিদান দেয় (“it is clear that Delhi expects Beijing to reciprocate”)।

‘পরাজয়ের সংবাদ বাহক’ যাকে এককথায় ভগ্নদূত বলে তা কেউ হতে চায় না। তাই ভারতের এই ‘মেনে নেয়ার’ ঘটনাটা ঘটেছে খুবই নীরবে। এমনকি তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে, আবার বেনামে তা স্বীকার করে নিয়ে, ঘোষণা ছাড়া সাংবাদিক ডেকে ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে, এভাবে। গত ২৮ মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটা বিশেষ রিপোর্ট হিসেবে এটা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে ‘এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে’ এটা বলেছে। Stepping back from Maldives, India tells China – এই শিরোনামে এই খবরটা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনলাইনে যে কেউ পড়ে নিতে পারেন।

সেখানে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঠিক কী বলেছে তা নিয়ে ওই রিপোর্টের অন্তত দুটি প্যারার কোটেড বক্তব্য আছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটা নিচে বাংলা অনুবাদ করা হল – “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংবেদনশীলতা ও বৈধতার সীমাবোধ (lines of legitimacy) সম্পর্কে তাদের জানাতে পারি। যদি এর পরেও তারা তা অতিক্রম করে তবে আমাদের পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা (strategic trust) নষ্ট করার দায় বেইজিংয়ের ওপর বর্তাবে”।

“India cannot claim sole proprietorship of the region. We can’t stop what the Chinese are doing, whether in the Maldives or in Nepal, but we can tell them about our sensitivities, our lines of legitimacy. If they cross it, the violation of this strategic trust will be upon Beijing,” the official said.

এখানে শেষের রঙিন বাক্যে রঙ দিয়েছি আমি। এই বক্তব্যের অর্থ ও ইঙ্গিতে খুবই করুণ ও অসহায়। ভারত যেন বলতে চাইছে, “এই দুনিয়ার লড়াইয়ে শক্তি আর মুরোদে আমরা হেরে গেছি, তবে পরকালে যেন বিচার হয় তেমন একটা বিচার দিছি”।’ এ ছাড়া দ্বিতীয় গুরুত্বপুর্ণ ভারতের কোটেড প্যারাগ্রাফের বক্তব্য হল এ রকমঃ – “যেদিন ভারত দেখেছে সে আর দক্ষিণ এশিয়াকে প্রভাবিত করে রাখতে ও চীনের মতো শক্তিকে  এখানে ক্ষমতার বিস্তার দেখাতে আসা বন্ধ করতে পারছে না সেদিন সে বুঝে গেছে এসব কিছু নিজের প্রভাববলয়ের বাইরে চলে গেছে”।

“The days when India believed that South Asia was its primary sphere of influence and that it could prevent other powers, such as China, from expanding its own clout are long gone,” a senior government official told The Indian Express. 

খুবই পরিস্কার ভাষায় বলা অক্ষম অসহায়ত্বের বক্তব্য। যদিও এতদিন এসব প্রসঙ্গে ভারত চাপাবাজি করে বলে রেড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়া তার প্রভাবাধীন এলাকা, এখানে চীন আসতে পারে না।

এ ছাড়া মালদ্বীপ নিয়ে খুবই পরিস্কার ভাষায় ভারতের আর এক তৃতীয় বক্তব্য আছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্টার দাবি করছেন, ওই সিনিয়র অফিসার তাকে বলেছেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলের গত ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি চীন সফরের সময় তিনি চীনকে জানিয়ে দিয়েছেন, “ভারত মালদ্বীপ থেকে সরে যাচ্ছে। ফলে মালদ্বীপে ভারতের  হস্তক্ষেপের কোনো সম্ভাবনা নেই”। আর এই বাক্যটাকেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তার রিপোর্টের শিরোনাম করেছে। On the Maldives, for example, the unusual overture to China was made by none other than Foreign Secretary Vijay Gokhale during his trip to Beijing in February,

অনুমান করা যায়, এখানে ভারতীয় এই স্বীকারোক্তির অ্যারেঞ্জমেন্ট করা হয়েছে এভাবে যে, সবার আগে এটা ‘সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল’-এভাবে পরিচয় লুকানো এক বরাতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস খবরটা ছাপবে। এরপর বাকি প্রায় সব লিডিং দৈনিকগুলো সবাই এবার তা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে ছাপবে। তাই-ই হয়েছে। তবে এভাবে এখানে ছাপা হওয়ার মধ্যে লক্ষণীয় দুটো দিক হল, কোনো মিডিয়াই কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট বা এর রেফারেন্সকে অস্বীকার অথবা অবিশ্বাস করেনি। এমনকি তারা এই খবরের সত্যতা যাচাই করতে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বা কোন মুখপা্ত্রকে জিজ্ঞাসা করতে যায়নি। এটাই খুবই  ইন্টারেস্টিং। এর অর্থ  হল বাকি সব পত্রিকা বরং নিজেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে এই খবর ছেপে বলতে চাইছে যে, তারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে এই খবর সত্য, তারাও ব্যাপারটা জানে। এ ছাড়া অন্যদিকে ভারত সরকারও মিডিয়াগুলোতে এই রিপোর্ট ছাপা হয়ে গেছে অথচ এই খবরকে অস্বীকার করে কোনো বিবৃতিও দেয়নি। এর অর্থ তারাও পরোক্ষে স্বীকার করছে যে হা এটাই তাদের বক্তব্য।

এদিকে আরেক ইংরেজি দৈনিক – ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’, সবার মতো সেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতের রিপোর্ট  ছেপেছিল । তবে সেটা ছাড়াও রয়টার্সের বরাতে সে পরের দিন আরেকটা রিপোর্ট করেছে। শিরোনাম ‘Dalai Lama faces cold shoulder as India looks to improve China ties”। এখানে বলতে চাওয়া হয়েছে দালাইলামাকে ‘শীতল কাঁধ দেখানোর’ কারণ ভারত বুঝিয়ে বলাতে তিনি ব্যাপারটাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন, মনে কোনো ক্ষোভ বা আকাঙ্খা নিয়ে দেখেননি। আসলে ঘটনা হল, বেচারা দালাইলামা তার সব কর্মসূচিতে ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা বাতিল করে দিয়েছে। আসলে এটা ছিল দালাইলামাদের চীনের বিরুদ্ধে ব্যর্থ বিদ্রোহের ৬০তম বার্ষিকী পালনের দিন। কিন্তু দিল্লীতে যত অনুষ্ঠান নেয়া হয়েছিল মোদী সব কিছুর পালনের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।  এমনকি ভারত তাদের থাকতে দিয়েছে এজন্য দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য  সরকারকে “ধন্যবাদ জানাবার কর্মসূচিও” বাতিল করে তা তিব্বতের ধর্মশালায় সরিয়ে নিতে দালাইলামাকে বাধ্য করা হয়েছে। আর সাথে মোদীর সরকারের সার্কুলার জারি করা হয়েছে যে কোনো মন্ত্রী বা সরকারি কর্মচারী যেন এদের সাথে কোনো সম্পর্ক না রাখে। কারণ চীন মনে করে, দালাইলামা চীনের জন্য খুবই বিপজ্জনক এক বিচ্ছিন্নতাবাদী। এককথায় বললে চীনকে খুশি করতে, রাখতে ভারত চরমতম মরিয়া অবস্থান নিয়েছে। গত ছাপান্ন বছরে এমন “চীন তোষামোদী” ভারত কেউ আগে দেখেনি। দালাইলামা সম্পর্কে  চীনের মূল্যায়ন ও মনোভাবকে পবিত্র আমানত জ্ঞান ও আমল করে আগলে রাখতে ভারত এখন ভীষণ ব্যস্ত। কিন্তু টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই রিপোর্টের সাথেও নাম প্রকাশ না করে আরও এক সোর্সের বরাতে টাইমস অব ইন্ডিয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছাপিয়েছে। প্রথমত সেখানে বলা হয়েছে, নাম গোপন রাখা এই সোর্স তিনি নাকি ভারতের চীননীতির সাথে সংশ্লিষ্ট কোন উচু ব্যক্তি। তিনি জানাচ্ছেন, “চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর করে নিয়ে এগিয়ে যেতে আমাদের আইডিয়া হল, ২০১৭ সাল পর্যন্ত যা যা ঘটে গেছে তা ভুলে গিয়ে পেছনে ফেলে রাখতে চাই আমরা”। “We are moving forward with this relationship, the idea is to put the events of 2017 behind us,” a government source involved in China policy said. অর্থাৎ আর পরিস্কার নিশ্চিত করা বক্তব্য আমরা এখানে পাচ্ছি।

তবে রিপোর্টে প্রত্যক্ষ সরকারি স্বীকৃতি এখনো না দিলেও ভারতের অপর পক্ষ চীন, মানে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের রেগুলার ব্রিফিং থেকেও এ বিষয়ে অনেক কিছুর স্বীকৃতি মিলছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে মুখপাত্রকে (Foreign Ministry Spokesman Lu Kang) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তাঁঁর সেই বয়ানে। “চীন কি সাম্প্রতিক ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের (দালাই লামার সাথে দূরত্ব তৈরিসহ) প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানায়?” – এই ছিল সেই প্রশ্ন, মুখপাত্র এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেলেন। মুখপাত্র  দালাই লামা শব্দটা এড়িয়ে উচ্চারণ না করে বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিত থেকে জবাবে দেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, তিনি বলেছেন, “সাম্প্রতিক কালে তাদের উভয় পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়ে বলেন, চীন-ভারত সম্পর্ক বাধাহীন গতিতে (‘সাউন্ড মোমেন্টাম’ বা ‘sound momentum’) বিকশিত হয়ে চলেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা এর সাফল্য দেখতে পাচ্ছি”।

আসলে আগামী জুন মাস পর্যন্ত চীন-ভারত তাদের বিভিন্ন মন্ত্রিপর্যায়ে (গড়ে সম্ভবত প্রতি মাসে প্রায় দু’টি করে) মিটিং আছে। আর সর্বশেষ জুন মাসে সাংহাই করপোরেশন সংস্থার (SCO, http://eng.sectsco.org/about_sco/) চীনে অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক সভার সাইড লাইনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাক্ষাৎ হবে।  আর আগামী মাসে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর চীন সফর দিয়ে বৈঠকগুলো শুরু হবে। এরপর আছে, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, বাণিজ্য ইত্যাদি।

আগামী জুন মাস পর্যন্ত তৎপরতায় ভারতের লক্ষ্য কী এ দিকে তাকিয়ে বললে এর এক কথায় জবাব হল, মুখ্যত চীনে ভারতের রফতানির বাজার লাভ করতে চায়। ভারত এত দিন চীনের সাথে সম্পর্ককে তিক্ত করে রেখেছিল, আমেরিকার চীন ঠেকানোর নীতি নিজের কাঁধে নিয়েছিল বলে। আর তা নিজের কাঁধে নিয়েছিল বিনিময়ে আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাজার পেয়েছিল বলে। কথাটা ভেঙ্গে সার কথাটা বললে, ভারতীয় পণ্য মূলত রফতানিতে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে একে আমেরিকার পণ্যের চেয়ে সস্তা ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে নেয়া ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের আগের দুই প্রেসিডেন্টের দুই দুই করে টার্মে (মোট ষোলো বছরে) সবসময় আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের ওপর রাজনৈতিক স্বার্থকে (চায়না কনটেইনমেন্ট) প্রাধান্য দিয়ে বিদেশনীতি সাজানো ছিল। তাই তখন ভারতকে ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নেশন’ ঘোষণা করে ভারতের ভর্তুকির রফতানিকেও অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তবে শর্ত ছিল যে ভারতের গড় মাথাপিছু আয় কেবল এক হাজার ডলার না হওয়া পর্যন্ত এই বিশেষ সুবিধা বজায় থাকবে। কিন্তু গত ২০১৫ সালে এই শর্ত পূরণ হয়ে গেলেও রফতানি সুবিধা ভারত পেয়ে চলছিল। মোটা দাগে বললে, ট্রাম্পের সাথে আগের দুই আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ভারত-বিষয়ক নীতির ভিন্নতা কী – এভাবে কথাটা তুললে তার জবাব হবে – ট্রাম্প আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের ওপর রাজনৈতিক স্বার্থকে আর কোনো প্রাধান্য না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি উল্টো ‘বাণিজ্য স্বার্থ সবার ওপরে সব ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে’ এই নীতিতে চলতে চাইছেন (যদিও কতটা পারবেন পারছেন সেটা অন্য কথা)। ঠিক এ কারণেই ভারতের “ট্রাম্প রিডিং” হল, ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের আর বাণিজ্য সুবিধা কিছুই পাওয়ার নেই। তাই ভারতের উল্টো দ্রুত চীনের দিকে ও কাছে যেতে পথ বদল ঘটেছে। আর বাণিজ্য সুবিধা এবার চীনের কাছ থেকে পাওয়ার আশায়, ভারত চীনের মন জোগাতে নিজের সর্বস্ব ঢেলে দেয়ার নীতি নিয়ে আগাচ্ছে। চীন-ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি  ৫০ বিলিয়ন ডলারের, (এখন চীনের ভারতে রফতানি ৬০ বিলিয়ন ডলার, ভারতের চীনে ১০ বিলিয়ন)। ভারতের লক্ষ্য চীন থেকে কমপক্ষে ৩০ বিলিয়নের রফতানি বাজার লাভ করা। মূলত কৃষিজাত পণ্য রফতানি ভারতের লক্ষ্য।

আমার লেখায় সবসময় বলে আসছি, চলতি আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির দুনিয়া ক্রমেই চীনের নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি হয়ে বদলে যাওয়ার অভিমুখী হয়ে আগাচ্ছে। এই বিচারে চীন হল ‘রাইজিং অর্থনীতি’ এই নতুন অভিমুখের নেতা, বিপরীতে আমেরিকার অর্থনীতি পড়তি দশার। আর এই পরিস্থিতিতে ভারতের ন্যাচারাল অবস্থান ও অভিমুখ হল – চীনের সাথে ও পক্ষে, আমেরিকার বিপক্ষে। আমেরিকা হল অতীত যেখানে চীন হল আগামি – এই সুত্রের মধ্যে ভারতের ভবিষ্যত হল চীনের সাথে মিলে নতুন করে গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক অর্ডার শৃঙ্খলা তৈরি।  কিন্তু এতদিন সে কাজ না করে ভারত রিভার্স খেলে বাড়তি নগদ সুবিধা যা পায় তা কুড়িয়ে নিচ্ছিল। যেন কোন বালক তার নির্ধারিত খেলাধুলার বাল্য বয়েস এক্সটেন্ডেড করে নিয়ে হাসিখেলা আর মজা করে কাটাচ্ছিল। সেটারই এবার পরিসমাপ্তি ঘটল, এভাবে বলা যায়। গ্লোবাল অর্থনীতিতে নতুন সিস্টেম নতুন ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রশ্নে ট্রাম্পের হাতে ও উদ্যোগে ভারত-আমেরিকার আর একসাথে কাজ করার দিন সম্ভবত এখান থেকে পরিসমাপ্তি লাভ করবে। বাস্তব শর্তগুলো (যেমন ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নেশন’ ঘোষণা) ট্রাম্পের হাতে চির নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার পথ নেবে। ওদিকে ভারতের ইচ্ছা ও আকাঙ্খা যে ভারতের আমেরিকায় হারানো রফতানি টার্গেট বা বাজার ঘাটতি যা হয়েছে তা চীন পূরণ করে দিক, চীনে রফতানির বাজার দিক। মূলত এজন্যই ভারতের চীনের সামনে মরিয়া ও হাটুগাড়া অবস্থায় নিজেকে উপস্থাপন।   চীনও খুব সম্ভবত কিছু বাজার দেবে, বিশেষত ভারতকে আমেরিকা থেকে আলাদা করার তাগিদ চীনেরও আছে। আর ভারত এতই মরিয়া যে, চীনের সামনে ‘নীলডাউন’ অবস্থা। তবে আপাতত সফররত চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী কোনো চুক্তি ছাড়া গতকাল ভারত সফর শেষ করে চীনে ফিরে গেছেন। তবে ভারতকে রফতানি বাজার দেয়ার ‘প্রমিজ’ করেছেন, ভারতের মিডিয়া বলছে। চীনের প্রমিজ বা ওয়াদা সত্যিকারের ওয়াদা, ভারত আস্থা রাখতে পারে, রাখবে। কিন্তু ভারতের কাল থেকেই যেন এটা পেতে চায়।

স্বাভাবিকভাবেই এখন ভারতকে মুখোমুখি হতে হবে চীনের “বেল্ট-রোড উদ্যোগ” (http://english.gov.cn/beltAndRoad/) – এই ইস্যুতে। সত্যি কথাটা হল, এবার সত্যিকার অবস্থানটা ভারতকে বলতে হবে। সম্ভবত আর ভ্যানিটি  বা মিছা লোক দেখানো অবস্থান আর নয় যে ভারত একনম্বর অর্থনীতি হতে যাচ্ছে এরকম নয়, বাস্তব সত্য অবস্থান অর্থাৎ তা প্রকাশ করার বিনিময়েই খুব সম্ভবত চীনের কাছ থেকে ভারতকে রফতানি বাজার সুবিধা পেতে হবে। কারণ ভারত নিজেই নিজের মিথ্যা ভ্যানিটি- ‘আমেরিকা আমার পিঠে হাত রেখেছে’, ‘মুই কী হনুরে’- এগুলো তার ভুয়া পরিচয়, ভারত নিজেই তা ভেঙে ফেলে এখন চীনের সামনে নীলডাউন। কাজেই ভুয়া মিথ্যা চাপাবাজির দিন শেষ। সত্যি কথাটা হল আজ শেখ হাসিনা ভোটের কথা চিন্যেতা করে যে উন্নয়ন বা “মধ্য আয়ের দেশের”  তর্ক  তুলেছেন ভারত সেই “লোয়ার মধ্য আয়ের দেশের” (“lower-middle-income” economy ) হয়েছে মাত্র ২০১৬ সালের জুনে। ভারতেরই এক মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, The World Bank has dropped the use of developing nation tag for India in its specialized reports and instead classifies it as a “lower-middle-income” economy in South Asia, a top official has said. ফলে সে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি এই হল বলে, অথবা চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগে যোগ দিলে সে “চীনের সাবরডিনেট বা অধস্থন অবস্থায় চলে যাবে” এসব কল্পিত গল্পের জগত ফেলে ভারতকে বাস্তবে নেমে আসতে হবে। কারণ বেসিক কথাটা হল, কোন  রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা জিনিষটা অবজেকটিভ। একে কেউ চাইলেই সাবজেকটিভলি দাবায় বা অস্বীকার করতে পারবে না। কাজেই স্বপ্নে পোলাও খাওয়া অথবা গল্প প্রচার একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।

তবে মিথ্যা ভ্যানিটি বা গর্বের কী দশা হয় এর এক আদর্শ ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। আমেরিকা বা চীনের মত থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান খুলে ভারতের স্বার্থ কী হতে পারে তার ষ্ট্রাট্রজিক বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা ও পরামর্শ তৈরি করার শখ ভারতেরও। কিন্তু এর খরচ?  ২০০৫ সালে বুশের প্রস্তাবে এর খরচের দায় আমেরিকা নিয়েছে। ভারতের ধারণা সে আমেরিকাকে মহাঠকিয়ে থিঙ্কট্যাঙ্ক চালানোর খরচ আমেরিকার উপর চাপিয়ে দিতে সফল হয়েছে। আপনার স্ত্রী-সন্তান মানে সংসার প্রতিপালনের খরচ অন্যের উপর চাপিয়ে নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে করতে পারেন আপনি। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন ঐ সংসার আর অচিরেই আপনার থাকবে না। ফলে থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো গজিয়েছে হয় ভারতে এনজিও রূপে যার ফান্ড করছে আমেরিকান কোন ফাউন্ডেশন অথবা আমেরিকান কোন থিঙ্কট্যাঙ্ক এক্সটেন্ডেড হয়ে ভারতে শাখা খুলেছে। আর এতে সবচেয়ে খুশি হয়েছে তরুণ একাদেমিক কেরিয়ারিস্ট্রা যারা ভারতের স্বার্থের চেয়ে নিজের কেরিয়ারে আগ্রহ রাখে বেশি। আর এতে ভারেতের প্রায় সব থিঙ্কট্যাঙ্কঅগুলো আসলে আমেরিকান বিদেশনীতিই ভারতে প্রচার করার কাজএ লিপ্ত হয়েছে। আমেরিকান অর্থ উসুল হয়েছে এভাবে।  মুক্তমালার মত চীনের ভারতকে ঘিরে ফেলার তত্ব তারাই খাইয়েছে ভারতকে, সয়লাব করে ফেলেছে। এমনকি যে দুএকটা ভারতের ডিফেন্সের নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোতেও আমেরিকান বিদেশনীতির প্রভাব ঢুকাতে পেরেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে IDSA নামে এমন এক প্রতিষ্ঠানের “চীন-ভারতঃ নতুন ভারসাম্য” শিরোনামের থিম নিয়ে বার্ষিক কনফারেন্স করতে অনাপত্তি-পত্র দেয় নাই ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়।  অনুমান করা যায় আমেরিকার চোখে দেখা চীনা সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিত সেখানে ছিল বা থাকতে পারে – তা চীনের মন জয়ে ভারতের  জন্য বাধা হিতে পারে আশঙ্কায়, চীন অখুশি হতে পারে  – তাই এই অনুমতি প্রদান না দেওয়া্র ঘটনা ঘটেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে,  Meanwhile, the MEA has refused clearance to an annual conference by the ministry of defence-sponsored think tank, Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) whose theme was “India-China: a new equilibrium”. The conference slated for this week has been “deferred” said people familiar with developments. এথেকে বুঝা যায় ভারতকে এখন কত গভীর পর্যায়ে চীন-বিরোধীতার খোলনলচে বদলাতে হবে।

ওদিকে ট্রাম্পের ‘বাণিজ্য স্বার্থ সবার উপরে প্রায়োরিটি’ এই নীতি তিনি যদি ধরে রেখে এগিয়ে যান (যেটা এখনও পর্যন্ত এর ভিন্ন কিছু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ) কারণ ট্রাম্প মনে করেন তার ‘বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি’ এই নীতির প্রশ্নে তিনি – এতটাই সিরিয়াস যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে  এই প্রথম ইউরোপের সাথেও আমেরিকার ভিন্ন অবস্থান হতে বা তা নিয়ে লড়তে তিনি পিছপা নন। এমনকি আমেরিকা দুনিয়ার এক ‘এম্পায়ার’ অথবা রাষ্ট্রসঙ্ঘ আমেরিকার প্রভাবে চলে  – এসব কথাগুলোও বাদ দিতে বা বদলাতে হলেও ট্রাম্পের আমেরিকা এসব ভ্যানিটি ছাড়তে রাজি। তবু ‘বাণিজ্য প্রায়োরিটি’ নীতির জায়গা থেকে তিনি সরবেন না বলেই মনে হচ্ছে। দেখা যাক কোথায় দাঁড়ায়।

এবার এই সূত্রে বলা যায়, আমেরিকার ভারতের কাছে ‘বাংলাদেশকে বন্ধক দেয়া’- সে বাস্তবতারও একই সাথে অবসান হতে চলেছে বা ঘটবেই। যদিও সেটা বাস্তবায়িত হতে, কার্যকর হতে – বাস্তবে এর প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগবে। তবে পরিবর্তনের আগমনী ‘ঘণ্টা বাজিয়ে’ দেয়া হয়ে গেছে। এ ছাড়াও এখন থেকে ভারতের নতুন নীতি, নতুন বন্ধু, মিত্র এগুলো থিতু হয়ে বসতে, সমন্বিত হয়ে বসতে কিছু সময় লাগবে। আবার ওদিকে আমেরিকা দিক থেকে বললে, তার “ভারত-বিবেচনার দায়” ছুটে যাচ্ছে অর্থাৎ ভারত আর আমেরিকার হয়ে চীন ঠেকানোর খেদমত করবে কিনা তা নিয়ে আর কোন ভরসা ট্রাম্পের আছে বলে মনে হয় না। এই কারণে অবশ্যই আমেরিকা নিজেই “ইন্ডিপেন্ডেন্টলি” বাংলাদেশ নিয়ে কিছু সরাসরি ভূমিকা বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে এর শর্ত তৈরি হয়ে গেছে, সে কথাও সত্যি। ফলে ভারতের পরামর্শ, মতামত সমন্বয় এগুলো আমেরিকার কাছে আর আগের মতো নেই, থাকবে না। বলাই বাহুল্য। তবে এমন পরিবর্তন যদিও শুরু হয়েছে মাত্র। ফলে ফল দেখতে পেতে ধীর লয়ের কারণে দেরি হতে পারে বা দ্রুতও হতে পারে।  কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। সারকথা “পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” সেই বিউগল বেজে গেছে। এতে কে কার কাছে আসবে, কোলে উঠবে নাকি চিরতরে সুদূরে চলে যাবে এমন ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পাব আমরা।

লেখক : রাজনৈতিক বিশেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০১ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীনকে কোথায় বসতে দেয় সেই অস্থিরতায় ভারত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন বাঁক

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন বাঁক

গৌতম দাস
২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, বুধবার

https://wp.me/p1sCvy-2qc

ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে কিছু নতুন ও উল্লেখযোগ্য বাঁক নেয়া শুরু হয়েছে। একালে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিরোধ বা স্বার্থসংঘাতের ধরন ও প্রকাশ কিছুটা নতুন। কারণ, এখন বিরোধ বা সংঘাত হয় ইস্যুভিত্তিক; মানে একেক ইস্যুতে একেক রকম। অর্থাৎ এক ইস্যুতে চরম বিরোধে সামরিক সংঘাত পর্যন্ত লাগার অবস্থা, অথচ একই সময়ে আরেক ইস্যুতে গলাগলি সহযোগিতা অথবা আধা সহযোগিতা, কিংবা নিউট্রাল অথবা সুপ্ত বিরোধে আগানো ইত্যাদি নানা রূপ এখন দেখা যায়। অবশ্য এর কোনো কোনোটা দীর্ঘ সময় বা স্থায়ীভাবে মুখ্য বিরোধের বিষয় হয়ে থাকে।

ভারতের পিঠে হাত রেখে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment) পলিসি, একটা ভিত্তি প্রস্তুত করা অর্থে শুরু হয়েছিল মোটা দাগে ২০০৫ সাল থেকে বুশের আমলে। এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার দুই টার্মের সময়ে সেটা আরো পোক্ত হয়েছিল, অ্যাকশনে গিয়েছিল। আর সেটাই ট্রাম্পের আমলে এঁটে বসা পলিসি হিসেবে এখনো আছে, তবে প্রশাসনের রুটিন গাইডলাইনের মত। মানে অতিরিক্ত বা নতুন কোনো মাত্রা তাতে যোগ হয়নি। তবে ট্রাম্পের অর্থনীতি্তের বৈশিষ্টে – বাজারে কাজ সৃষ্টি, হাতছাড়া হওয়া কাজ ফেরানো অথবা  ‘আমেরিকা ফাস্ট’ ধরনের যেসব কথিত ‘দেশী জোশের’ (অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন) কর্মসূচি আছে তাতে অর্থনৈতিকভাবে ভারত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক। বিশেষ করে আইটি খাতে ভারত বাজার ও চাকরি হারিয়েছে; কিন্তু তা নিয়ে ট্রাম্প কোনো দয়ামায়া দেখাননি, বিকল্প কিছু দিয়ে ক্ষতিপুরণ করেননি । এমনিতেই আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ পলিসিকে ভারতের দিক থেকে দেখা হয়েছিল এভাবে যে, এর আসল ঠেকা আমেরিকানদের। ফলে আমেরিকা ‘ভালো দাম ধরে দিলে’ তবেই ভারত এতে খেদমত করতে রাজি। ফলে ব্যাপারটা যেন এমন যে – আমেরিকা হল তোয়াজকারি কাজদাতা আর ভারত এক্সিকিউটর বা বাস্তবায়ক। ‘উপযুক্ত মূল্য দাও তো কাজ করে দেবো’ ধরণের এক সম্পর্ক। তবে আবার ভারতের অনুভূতি হল, আমেরিকাকে তার দরকার, গভীরভাবে দরকার। এটা তার অন্তরের অনুভব; অন্তত দু’টি প্রসঙ্গে। এক. আমেরিকা হলো ভারতের জন্য পারফেক্ট অস্ত্রের সরবরাহকারী বা উৎস। কারণ, ভারতের দৃষ্টিতে তার নিজের সমস্যা হচ্ছে, কখনো যদি কোনো সামরিক বিরোধে তাকে জড়াতে হয় তবে সম্ভাব্য সেই যুদ্ধের বিপক্ষ হিসেবে চীনকে দেখতে পায় সে। পাকিস্তানকে পেছনে ফেলে দিয়ে ভারত দেখে চীনকে; কারণ, পাকিস্তান বিষয়টা ভারত নিজেই ম্যানেজ করতে পারবে বলে মনে করে। ওদিকে আবার চীন-ভারত বাণিজ্য সম্পর্কে আমদানি-রপ্তানি হয় মোট প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলারের, যেখানে ৯০ শতাংশই চীনা রফতানি। এছাড়াও ভারতে চীনা বিনিয়োগ আছে। কিন্তু তাই বলে, ভারতে চীনা অস্ত্র আমদানি এক অসম্ভব কল্পনা। আর দ্বিতীয় প্রসঙ্গ হল, যে পাড়ায় আপনি থাকেন সেখানে সম্ভাব্য বিরোধের বিষয় থাকলে আপনি আগেই পাড়ার প্রভাবশালী ব্যক্তি বা সালিস বৈঠকের সাধারণত মধ্যস্থতাকারী যে হয় তাঁর সাথে আগাম যোগাযোগ রাখা দরকার মনে করেন। ভারতের কাছে আমেরিকার গভীর প্রয়োজন মূলত এখানেই।

সম্প্রতি সম্ভবত ভারত মত ও নীতি বদলিয়েছে বা বদলাচ্ছে। মানে, আমেরিকা যেসব সুযোগ সুবিধা ভারতকে দেয়ার জন্য কমিটেড, যেসব বাড়তি বা ফাও সুবিধা ভারত পায়, সে বিষয়টি ভারত নতুন করে সম্ভবত মূল্যায়ন করেছে। অনুমান হলো, ভারত চেষ্টা করলে আরো বেশি মূল্য আদায় করতে পারে। ফলে সে আমেরিকার উদ্দেশ্যে নাক উঁচা করেছে।

ঘটনা শুরু হয়েছিল সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের’ বার্ষিক সভায়। এ সভা মূলত অর্থনীতিতে গ্লোবালাইজেশনের ইস্যুতে সুবিধা-অসুবিধা বা বাধা নিয়ে এক ধরনের সমন্বয় সভা। ফলে এর মূল ফোকাস হল, গ্লোবালাইজেশন। ওদিকে, গত বছর ট্রাম্প নির্বাচনে জিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়ে শপথ নেয়ার সময় থেকেই অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশনের ধারণায় তথাকথিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতিবাদী নীতির কথা বলতে শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ গ্লোবালাইজেশনের শুরুর দিকের এর সপক্ষে যে মূল নেতা ছিল সেই আমেরিকা এখন ট্রাম্পের আমলে এসে পারুক আর না-ই পারুক ‘উগ্র’ জাতিবাদী এবং নিজ বাজার সংরক্ষণবাদী নীতির স্লোগান তুলেছিল। প্রতিবার এই ফোরামের সভা হয় জানুয়ারির শেষে, মানে গত বছরও তা হয়েছিল ট্রাম্পের শপথ নেয়ার দিন ২০ জানুয়ারির পরে; তবে তা হলেও ট্রাম্প গতবার এই সভায় নিজে যোগ দেননি। ফলে ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী নীতির বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ সারা ইউরোপ শান দিয়ে বসে ছিল ট্রাম্পকে ‘ধোলাই দিতে’, কিন্তু পারেনি। একটা জাতিবাদী ভিত্তিক গ্লোবাল অর্থনীতিকে গ্লোবালাইজেশনে নিয়ে যাওয়া অনেক সহজ। কিন্তু একই গ্লোবে বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিগুলোকে একবার একে অন্যের সাথে সম্পর্কিত ও নির্ভরশীলভাবে গড়ে তুলে এবং বাজার শেয়ারের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে সাজিয়ে দিয়ে ফেললে (যাকে আমরা গ্লোবালাইজেশন বলি) তাতে এভাবে ঢুকে যাওয়ার পরে তাকে ফিরিয়ে আবার আগের জায়গায় আনা কঠিন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব। আমেরিকার উদ্যোগে সাড়া দিয়েই ইউরোপ একসাথে গ্লোবালাইজেশনের পথে এসেছিল। কারণ, গ্লোবালাইজেশনে একসাথেই যেতে হয়, একসাথে করার বিষয় এটা। এখন একা ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ জাতিবাদী ও সংরক্ষণবাদী নীতি আওড়ানোর ফলে চীন ও ইউরোপের ক্ষোভ বেশি; এমনকি ভারতেরও। তাই এবারই প্রথম ট্রাম্পকে পাওয়ার পর তাকে কঠোর সমালোচনার সামনে পড়তে হয়। আর এবার মোদি সেখানে ছিলেন প্রথম বক্তা। তিনি নাম না ধরে ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদী নীতির কঠিন সমালোচনা করেছেন। [“Instead of globalization, the power of protectionism is putting its head up,” ] জলবায়ু-পরিবেশ ইস্যু থেকে দায়িত্ব না নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার জন্যও আমেরিকার সমালোচনা করেন তিনি। এমনকি প্রটেকশনিজম (সংরক্ষণবাদ) ‘সন্ত্রাসবাদের মতোই ভয়ঙ্কর’ (as dangerous as terrorism) বলে এক বাণী দেন তিনি। আনন্দবাজার লিখেছে,  “ট্রাম্পের আমলে ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ফলে ধাক্কা খাচ্ছে ভারত-সহ একাধিক দেশ”। এরপরে এমনকি টিট ফর টেট হিসাবে বাড়তি ট্যাক্স আরোপ করার কথা, এভাবে ট্রাম্পও পালটা পাটকেল মারার কথা ভাবছে বলে ভারতের আর এক টিভি, এনডিটিভি জানাচ্ছে।  

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, এটা মূলত দুনিয়ার প্রভাবশালী সরকার এবং ব্যবসায় প্রভাবশালী বিনিয়োগকারীদের মিলে এক ‘প্রাইভেট-পাবলিক জমায়েত’। ফলে সব দেশের সরকারপ্রধান প্রতিবার নিজে এ ফোরামে যান না। তবে কেউ নিজেকে ব্যবসাবান্ধব বা ব্যবসা-উপযোগী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এটা একটা ভাল ফোরাম মনে করা হয়। এ বিচারে গতবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং প্রথম গিয়েছিলেন। অনেকটা আমেরিকার কাছাকাছি গ্লোবাল লিডার হয়েছে চীন, যেন সেটা জানান দিতে। আর এবার মোদি গেলেন ভারত নেতা হয়েছে; না হলেও অনেক দূর এগিয়েছে, এটা জানাতে। কিন্তু এসব কিছুকে ছাপিয়ে ওঠা এক ঘটনা হল, ভারতের ‘গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে দাঁড়ানো ও আমেরিকার সমালোচনাকে’ চীনের পররাষ্ট্র বিভাগের রেগুলার ব্রিফিংয়ে প্রকাশ্যে ও  সরাসরি প্রশংসা করা হয়। এমনকি চীনা পত্রিকা গ্লোবাল টাইমসের প্রথম পেজে মোদির ছবিসহ এ প্রসঙ্গে রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়। ‘গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা’ এ ইস্যুতে আমেরিকা হলো পুরনো নেতা; কিন্তু সূর্যের মতো ক্রমেই ডুবে যাওয়া বিরাট শক্তি। এর বিপরীতে চীন নতুন নেতা, ভারতও উদীয়মান। এ বিচারে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন ও ভারতের অভিন্ন অবস্থান আকাঙ্খিত, এমনই হওয়ার কথা অন্তত ইকোনমিক ইস্যুতে। কিন্তু তা না হয়ে ভারত দুই নৌকায় পা দিয়ে গাছের আর তলার দুই দিকে খামচা দিয়ে খাচ্ছে; যেন দুনিয়ার কোনো কিছুতে তার দায় নেই। আবার ন্যূনতম ন্যায়নীতি বইবার মতো কাঁধই তার তৈরি হয়নি। বাংলাদেশের মানুষ তার কাছে এতই তুচ্ছ যে, তাদের ভোটাধিকার পর্যন্ত নষ্ট করে দিতে সে বেপরোয়া, কোনো কিছুতে যার কমিটমেন্ট নেই। আর ওদিকে চীন খামাখা ধর্মবিরোধিতা করে বেড়াচ্ছে আর মানুষের ‘রাজনৈতিক অধিকারের’ মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টাকেই চীন আমল করার যোগ্য হয়নি বলে, আমাদের ধারণা দিচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক মুল্যবোধের বিষয়ে  গ্লোবাল অর্জনগুলো রক্ষার ও তা বয়ে নিবার জন্য অন্তত মুখে সমর্থন করার যোগ্য, দুনিয়ার আগামী সম্ভাব্য নেতৃত্ব এরা কেউ নয়। এমনই এক অবস্থায় সমগ্র দুনিয়া যেন ঝুলে আছে বা জটিলতায় পড়তে যাচ্ছে।

এ দিকে আরেক ঘটনা হল – অস্থির সময়ে ‘পাগলা’ ট্রাম্পের আড়ালে আমেরিকার ড্রাইভিং সিটে ক্রমেই সাবেক আর সিটিং জেনারেলরা সংগঠিত হয়ে উঠছেন। ‘পাগলা’ ট্রাম্পকে সামনে রেখে কোর আমেরিকান স্বার্থ ধরে রাখা আর নানাভাবে দুনিয়ার নেতৃত্বে আমেরিকার টিকে থাকা এবং একে দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করছে। বুড়া ঘোড়াকে চাবকে আবার খাড়া করার চেষ্টা বলা যায় এটাকে। তেমনি এক ঘটনার ক্ষেত্র হল, থাইল্যান্ড। অর্থনৈতিক দিক থেকে থাইল্যান্ড আমাদের চেয়ে অগ্রসর এবং এর সেনাবাহিনী আমেরিকার হাতে তৈরি। দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও আমেরিকার সাথে উঠাবসা করে জন্ম নেয়া। স্থানীয় থাই এলিটদের পছন্দের গন্তব্য ইউরোপের কোনো শহর নয়, আমেরিকা। রাজধানী ব্যাঙ্কক, এর কালচারাল মডেল হচ্ছে আমেরিকা। কিন্তু ওয়াশিংটনের আজকের দুরবস্থা দেখে সেই ব্যাঙ্কক আজ মুখ ফিরিয়েছে, তাদের সম্পর্ক ঢলে পড়া ও স্থবির হয়ে গেছে। তবে সম্প্রতি ব্যাঙ্ককের সামরিক শাসনের ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনা করেছিল আমেরিকা, এটাও কারণ। সেই স্থবিরতা ঘুচাতে বহুদিন পরে আমেরিকান মেরিনের জয়েন্ট চিফ জেনারেল ডানফোর্ড ব্যাংকক হাজির হয়েছেন। উদ্দেশ্য, পুরনো সামরিক সম্পর্কসহ রাজনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ও চাঙ্গা করা। কিন্তু তিনি প্বরথমেই কথা শুরু করেছেন এভাবে বলে, ‘আমেরিকা কোনো পড়তি শক্তি নয়’ (not a declining power)। অর্থাৎ জেনারেলের মনে আসলে ভয় ঢুকেছে, তা বোঝা যাচ্ছে। তবে বাস্তবতায় কে না ভয় পায়? ওবামাও ২০১১ সালে আয়ারল্যান্ড সফরের সময় পাবলিক মিটিংয়ে বলেছিলেন, ‘দুনিয়াকে আমেরিকাই আরো বহুদিন নেতৃত্ব দিয়ে যাবে, চিন্তার কিছু নেই।’

আর এক ঘটনা হল, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ভারত সফর করে গেলেন। যখন ট্র্রাম্পের আমেরিকা ইরানের সাথে করা নিউক্লিয়ার চুক্তি (এটা আমেরিকা-ইরান দ্বিপক্ষীয় চুক্তি নয়, বরং পি৫+১; অর্থাৎ এর সাথে রাষ্ট্রসঙ্ঘ ও নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ ভেটো সদস্য ও জার্মানি মিলে একত্রে করা চুক্তি, Nuclear Deal) বাতিল করে আবার কঠোর অবরোধ আরোপ করতে চাইছে। সেটা মূলত ইসরাইল ও সৌদি আরবের চাপ ও লবিতে। এর সারকথায় বলে দেখা যাচ্ছে, চীন ঠেকানো ইস্যুতে আমেরিকার দেয়া সুবিধা সব আদায় করে নিলেও ভারত ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতি অনুসরণ করতে পারছে না। অবশ্য ইরান আবার চীনের সাথেও বিশেষ বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। তবে তাতে ভারত অথবা ইরান এদের নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক গড়তে কারো কোন সমস্যা নেই। এর প্রধান কারণ হলো পাকিস্তানের বিকল্প হিসেবে, ইরান হয়ে আফগানিস্তান ঢোকার নতুন এক সড়ক-ট্রানজিট রুট তৈরি করেছে ওই জোট। আনুষ্ঠানিকভাবে এটা ভারত, পাকিস্তানসহ সাত রাষ্ট্রীয় ‘আশগাবাত চুক্তি’ নামে পরিচিত; আর আশগাবাত বা আশাকাবাদ (Ashgabat)  তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী এবং তা ইরানি সমুদ্রসীমায় চাবাহার নতুন পোর্টকে কেন্দ্র করে গড় উঠেছে। ফলে স্বভাবতই ইরান এখানে গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রানজিট হাব’ হবে। বলা বাহুল্য এটা আমেরিকার জন্য অস্বস্তিকর।

এম ভদ্রকুমার ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত। তার ভাষায়, এটা ভারতের আমেরিকান নীতিকে অমান্য ও উপেক্ষা করা। শুধু এটুকুই নয়, ভারতের তৃতীয় তেল সরবরাহকারী দেশ এখন ইরান। এ ছাড়া পুতিনের রাশিয়ার এক কোম্পানি ইরান থেকে ইন্ডিয়া পর্যন্ত  এক গ্যাস পাইপলাইনের প্রকল্পের দিকে এগোচ্ছে। সব মিলিয়ে আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে ভারত নতুন ‘অরবিট’ তৈরি করছে ও যোগ দিচ্ছে। তবে আমেরিকার জন্য ‘সবচেয়ে উদ্বেগজনক’ বিষয় এখানে আর একটা আছে; তা হলো- রাশিয়া, ইরান ও ইন্ডিয়া এরা মিলে তৈরি সব প্রকল্পে পরস্পরের দেনা-পাওনার মুদ্রা হিসাবে তা আমেরিকান ডলারে না করে নিজস্ব মুদ্রায় করবে। বলা বাহুল্য, এটা হবে আমেরিকার জন্য বিরাট ‘বড় ঘুষি’ খাওয়া।

আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ নীতিতে ভারতের আবদার মেটাতে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক দিয়েছে – এটাই হল মূল কথা। কিন্তু এ দিকে যত দিন যাচ্ছে, নানান ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থজোট যত তৈরি হচ্ছে তাতে আমেরিকার বা ভারতের স্বার্থ বেশির ভাগ সময় একই লাইনে মিলছে না বা থাকছে না। অর্থাৎ ভারতের স্বার্থ, আমেরিকান স্বার্থের মুখোমুখি বিরোধী হয়ে যাচ্ছে। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হলো মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা ইস্যু। আমেরিকা মিয়ানমার সরকারকে জেনোসাইডের জন্য ধমকাচ্ছে আর ভারত মিয়ানমারের জেনোসাইডের পক্ষে সাফাই বয়ান দিচ্ছে। বাস্তব পরিস্থিতিতে ভারতের ও আমেরিকান স্বার্থ এক জায়গায় থাকছে না।

তবে এ কথা ঠিক, ভারতের ও আমেরিকার স্বার্থবিরোধ প্রকট হয়ে হাজির করার পেছনে কিছু অংশের অবদান ভারত;  আমেরিকার কাছ থেকে বেশি দাম আদায় করার জন্য। এর অর্থ, এখানে আমেরিকানদের ঠেকা বেশি, তাই সেই সুযোগে ভারত বেশি মূল্য আদায় করতে চাইছে। আর বাকি অংশ আমেরিকা বা ভারত না চাইলেও সেসব ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ বিরোধী হয়ে উঠে আসছে, সেটা মৌলিকভাবেই পরস্পরবিরোধী। এই স্বার্থবিরোধ কি তাহলে কোন চূড়ায় বা চরমে পৌঁছেছে? বিশেষ করে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলছেন, ‘টেররিজম নয়; আমাদের প্রধান হুমকি চীন ও রাশিয়া’। ফলে ভারত-আমেরিকান ‘সহযোগিতা’র বেলায় যে অভিন্ন জায়গা বের করা হয়েছিল তা কি এখন বন্ধ বা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে? তাহলে আমাদের কি মুক্তি মিলবে? এ দিকে সতর্ক চোখ রাখতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক“, এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

জেরুসালেমঃ সমাধান, মজলুম ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো

জেরুসালেমঃ সমাধান, মজলুম ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো

গৌতম দাস
২৬ ডিসেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:২৩

https://wp.me/p1sCvy-2pc

গত ৬ ডিসেম্বর ২০১৭ অর্থাৎ চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ থেকে এক ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বলে স্বীকৃতি দেয়ার সময় হয়েছে।’ কিন্তু কেন তিনি এমন বললেন? এখনইবা বললেন কেন? এছাড়া, ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে দুনিয়ার কোথায় কোথায় কী কী ইস্যুতে এর ইতি অথবা নেতি প্রভাব পড়বে? আর তাতে আমরা বাংলাদেশীরা কোথায় কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হবো? সবচেয়ে বড় কথা ন্যায়-অন্যায়ের আলোকে এতে অন্যায়টা কী করছেন ট্রাম্প? এবিষয়গুলো নিয়ে বুঝাবুঝি করতে হবে আমাদের।

ওদিকে আর এক প্রশ্ন আমাদের মনে জাগা স্বাভাবিক যে ইসরাইলের জন্মের (১৪ মে ১৯৪৮) প্রায় ৭০ বছর পরে এসে এখন ট্রাম্পকে কেন স্বীকৃতির ঘোষণা দিতে হচ্ছে কোনটা ইসরাইলের রাজধানী? কারণ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের রেজুলেশন অনুসারে, জেরুসালেম একটা অকুপায়েড বা অবৈধ দখলি এলাকা। অথবা আরও বলা যায়, ১৯৪৭ সাল থেকেই জেরুজালেম কোন রাষ্ট্রের অংশ হবে সেই বিচারে এটা অমীমাংসিত এলাকা, ফলে কারও না।  জাতিসংঘের আইনি ভাষায় “corpus separatum”। যার অর্থ, জেরুসালেম একটা আন্তর্জাতিক জোন। তাই আইনত এটা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে থাকা এলাকা । ১৯৪৭ সালের জাতিসঙ্ঘের ১৮১ নম্বর রেজুলেশন অনুসারে জেরুসালেম একটা আন্তর্জাতিক জোন (corpus separatum — a separate entity under international jurisdiction)। এই রেজুলেশন বা গৃহিত প্রস্তাব অনুসারে – ওর PART III অংশে,  ‘City of Jerusalem’ শিরোনামের অধীনে উপশিরোনাম হল – A. SPECIAL REGIME।
সেখানে লেখা আছে,
“The City of Jerusalem shall be established as a corpus separatum under a special international regime and shall be administered by the United Nations. The Trusteeship Council shall be designated to discharge the responsibilities of the Administering Authority on behalf of the United Nations.” ….  দেখুন A. SPECIAL REGIME, City of Jerusalem, PART III.

এ ছাড়া পরবর্তীকালে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধে, বিশেষ করে যেটাকে পূর্ব জেরুসালেম বলা হচ্ছে সে ক্ষেত্রেঃ ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল পূর্ব জেরুসালেম পুরো অংশ (ঐ যুদ্ধের আগে পর্যন্ত সেটা জর্ডানের অংশ ছিল) দখল করে নেয়। তাই এ নিয়ে পরে জাতিসঙ্ঘের পাস করা প্রস্তাব হল, এটা দখল করা এলাকা। ইসরাইল তার সংসদে পুরো জেরুসালেমকে নিজের রাষ্ট্রের অংশ-ভূমি বলে দেখিয়েছে। এর বিরুদ্ধেই জাতিসঙ্ঘ রেজুলেশনটা হয়েছিল। কারণ জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ইসরাইল তাঁর সংসদ, প্রেসিডেন্ট হাউজ, প্রধানমন্ত্রীর অফিসসহ বহু কিছু জেরুসালেমে বানিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে  জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ছিল – জাতিসংঘের ঐ রেজুলেশন, নম্বর ৪৭৮, ২০ আগষ্ট ১৯৮০।   ১৯৮০ সালের জাতিসংঘের ঐ সিদ্ধান্তে, বিদেশী সব মিশন বা অ্যাম্বাসির অফিস  জেরুসালেমের বাইরে নিতে সব সদস্য রাষ্ট্রকে বলা হয়।

  1. Decides not to recognize the “basic law” and
    such other actions by Israel that, as a result of this law,
    seek to alter the character and status of Jerusalem and
    calls upon:
    (a) All Member States to accept this decision;
    (b) Those States that have established diplomatic
    missions at Jerusalem to withdraw such missions from
    the Holy City;

এখানে “বেসিক ল” মানে হল ইসরায়েলি সংসদ নেসেটে, ঐ “বেসিক ল” বলে পুরা জেরুজালেমকে ইসরায়েলের দখল করা এলাকা বলে জায়েজ করা হয়েছে। তাই জাতিসংঘ গৃহিত ঐ প্রস্তাবে “বেসিক ল” এর ধারণাকে স্বীকৃতি দেয়া হয় নাই বলা হচ্ছে। তাই 5(b) অনুচ্ছেদে, সকল সদস্য রাষ্ট্রকে জেরুজালেমে কেউ ইতোমধ্যে অফিস খুলে থেকে থাকলে তা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।

বাস্তবে তাই এই কারণেই ইসরাইলে অন্য সব রাষ্ট্রের অ্যাম্বাসি জেরুসালেম থেকে ৬৫ কিমি দূরে তেল আবিবে স্থাপিত। অর্থাৎ আমেরিকাসহ কোনো রাষ্ট্রই ইসরাইলের দখলি এলাকায় নিজের অফিস খুলে নিজেকে বিতর্কিত করতে চায়নি।

এবার সর্বশেষে,  ট্রাম্পের এই নতুন ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে গত ১৮ ডিসেম্বর প্রস্তাব আনা হয়েছিল। স্বভাবতই ভেটোদানের ক্ষমতাবান সদস্য হিসেবে আমেরিকার সেই প্রস্তাবকে ভেটো দিয়ে স্থগিত করে দেয়। ওই ভেটো দেয়ার আগে জাতিসঙ্ঘে আমেরিকান স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি নিম্রতা হ্যালির (হা, তিনি মাইগ্রেটেড ভারতীয় শিখ পরিবারের সন্তান, শিখ অরিজিন আমেরিকান ও রিপাবলিকান) দেয়া বক্তৃতায় বলেন, “সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকা নিজের অ্যাম্বাসি কোথায় বানাবে, আদৌ বানাবে কিনা তা নিজে ঠিক করবে। ফলে যারা প্রস্তাব এনেছিল তারা আমেরিকাকে অপমান করতেই এই প্রস্তাব তোলার চেষ্টা করেছিল”। নিকির এই মন্তব্য শুনে পাঠকেরা অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারেন যে, হ্যাঁ, তাই তো আমেরিকান সাবভৌমত্বের কথা তো ঠিক মনে হচ্ছে। না বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। কারণ জেরুসালেম হলো অন্যের ভূমি, যা ইসরাইলের দখল করা। কারো কোনো দখলি ভূমিতে অ্যাম্বাসি খোলার অধিকার আমেরিকা বা ইসরাইলেরও নেই। আরো বিশেষ করে জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত হলো ওটা দখলি ভূমি, corpus separatum। অর্থাৎ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ইসরাইল ও আমেরিকার এমন বহু সিদ্ধান্ত আছে। সিএনএনকে দেয়া ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিকির সাক্ষাতকার দেখুন, কিছু নমুনা পাবেন এই ক্লিপে। সে জাতিসংঘের কোন রেজুলেশন যে আছে তা লুকিয়ে কথা বলে যাচ্ছে।  তাহলে মূলকথা হলো জর্ডান-ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে নিয়ে তা নিজের (‘বেসিক ল’) বলে দাবি করে সেখানে ইসরাইল তার রাজধানী গড়েছে। আর ওদিকে এবার কথা ঘুরিয়ে বলছে, ইসরাইলের রাজধানী কোথায় হবে এটা ঠিক করার অধিকার ইসরাইলের সার্বভৌম অধিকার। হ্যাঁ, অবশ্যই তার অধিকার যদি সেটা কোনো দখলি জমিতে না হয়।

ঠিক একই মিথ্যা যুক্তিতে জাতিসঙ্ঘ রেজুলেশন অমান্য করে, ১৯৯৫ সালে আমেরিকায় একটি আইন পাস হয়েছিল। তার নাম ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট ১৯৯৫’, এই পিডিএফ লিঙ্ক থেকে আগ্রহিরা তা নামিয়ে নিতে পারেন। এই আইন আমেরিকান সিনেট ও সংসদে ১৯৯৫ সালে পাস হয়ে ও পরে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হয়েছিল। ওই আইনের সেকশন দুইয়ের ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধে জেরুসালেমের দুই অংশ এক হয়ে যায়।’ [(6) In 1967, the city of Jerusalem was reunited during the conflict known as the Six Day War.]

কিন্তু কীভাবে এটা ঘটেছিল? দুই অংশ নিজেরাই হেঁটে হেঁটে দুই বোনের মিলনের মত? নাকি যুদ্ধে মানুষ মেরে, খেদিয়ে দখল করে নেয়াতে? এ কথা সেখানে বলা নেই। এই আইনটি হল (মূল কথায় বললে), আমেরিকা যেন ১৯৯৯ সালের ৩১ মের মধ্যে ইসরাইলে তাদের অ্যাম্বাসি তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুসালেমে নেয় সেজন্য আমেরিকার নির্বাহী রাষ্ট্রপতিকে আইনগত বাধ্যবাধকতায় আনার জন্য প্রণীত আইন এটা। তবে একটি ছাড় আছে সেখানে যে, প্রেসিডেন্ট এটা করতে ব্যর্থ হতে পারবেন কেবল এক শর্তে; যদি তিনি আগাম কংগ্রেসকে জানান যে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার কারণে তিনি এটা নির্ধারিত সময়ে করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আর এভাবে তিনি ছয় মাস ছয় করে বার বার সময় বাড়িয়ে চলতেই থাকতে পারবেন। গত ১৯৯৫ সালে বিল ক্লিনটনের আমলে এই আইন করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৫ সালে ক্লিনটনের পরের ডেমোক্র্যাট অথবা রিপাবলিকান উভয় প্রেসিডেন্টই ওই আইনের সেকশন সাত-এর ‘প্রেসিডেন্টের ওয়েভার’ বা ছাড় [SEC. 7. PRESIDENTIAL WAIVER.] এর সুবিধা নিয়ে ওই আইন বাস্তবায়ন না করে ছাড় ছয় মাস করে করে বাড়িয়েই চলে আসছেন। এবার ট্রাম্প বলছেন তিনি ছাড় না নিয়ে আইনটা সরাসরি বাস্তবায়ন করবেন, এই হল ঘটনা।

১৯৪৮ সালে ইসরাইল জন্মের সময় থেকে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইল তার স্বপক্ষে জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া ছিল সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। সেটা ইসরায়েলের কাছে একেবারে “না হলে নয় এর মতো প্রয়োজনীয়” ছিল, ফলে কঠিন বিষয়। কিন্তু তা সফল হয়েছিল আমেরিকার সমর্থনে। সেই থেকে আমেরিকান জনমত নিজের পক্ষে রাখা হয়ে আছে ইসরাইলের ধ্যানজ্ঞান। ট্রাম্পের তাই নিজে কেন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন এর স্বপক্ষে সাফাই যুক্তি দিচ্ছেন এভাবে যে, আগের প্রেসিডেন্টরা সবাই নির্বাচনের সময় ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন, তাই তিনি হচ্ছেন সেই সাচ্চা বীর যে এটা বাস্তবায়ন করছেন।

স্বভাবতই ট্রাম্পের এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়া হয়েছে দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে। জাতিসঙ্ঘের ভেতরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে, নিরাপত্তা কাউন্সিলের আমেরিকাবিরোধী প্রস্তাবে আমেরিকা ভেটো দিয়ে বন্ধ করে দিতে পারলেও এরপর প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শোচনীয়ভাবে আমেরিকা হেরে যায়। আমেরিকার জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বলে মানা- এটা ‘null and void’ বলে বাতিল করে দেয়া হবে কিনা এ নিয়ে ভোটাভুটি নেয়া হয়। তোলা এই প্রস্তাবের পক্ষে ১২৮ রাষ্ট্র ভোট দিয়ে প্রস্তাবকে জিতিয়ে দেয়। ওদিকে মাত্র ০৯ রাষ্ট্র বিপক্ষে আর ৩৫ রাষ্ট্র বিরত থেকে ভোটদান সম্পন্ন করেছিল। [The United Nations has voted by a huge majority to declare a unilateral US recognition of Jerusalem as Israel’s capital “null and void”.]

এখানে নিউ ইয়র্ক টাইমস ব্যতিক্রমি আমেরিকান মিডিয়া হিসাবে একটা সততার কাজ করেছে। তাঁর এক বিশেষ রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত জেরুজালেম নিয়ে জাতিসংঘের গৃহিত প্রস্তাব অমান্য করেছে” [Trump’s Move Departs From U.N. Resolutions on Jerusalem]। এই রিপোর্টের তাতপর্য হল, সমস্ত আমেরিকান মিডিয়া এবং প্রশাসন যখন জেরুজালেম যে দখলি এলাকা সেকথা লুকিয়ে যাচ্ছে, এর বিরুদ্ধে জাতিসংঘের রেজুলেশনের অস্তিত্ব লুকিয়ে কথা বলে যাছে; সেখানে ট্রাম্পের ঘোষণার পরের দিন নিউ ইয়র্ক টাইমস  ০৭ ডিসেম্বরে এসে সরাসরি এক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এখানে আমেরিকা জাতিসংঘের মোট নয়টা রেজুলেশন (UN Resolution UN Resolution 1073 Sep 1996UN Resolution 1322 Oct 2000UN Resolution 1397 Mar 2002UN Resolution 181UN Resolution 2334 Dec 2016UN Resolution 242 Nov. 1967UN Resolution 252 May 1968UN Resolution 465 Mar 1980UN Resolution 478 Aug 1980UN Resolution 672 Oct 1990,) ভঙ্গ করেছে এর একটা তালিকা করে দেয়া হয়েছে।

ওদিকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে, তাঁর সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের পক্ষে ইউরোপের বন্ধুদের মন পাওয়ার চেষ্টায় সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন সফরে বের হয়ে একেবারে খালি হাতে ফিরে আসেন। কোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্র ট্রাম্পকে সমর্থন করতে রাজি হয়নি। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকেও কোনো সমর্থক রাষ্ট্র পাওয়া যায়নি। সারাক্ষণ ইরান-ভীতিতে থাকা সৌদি আরব ও তার বন্ধুরা ইসরাইলকে বাস্তবে কাছের ও নিজের মনে করলেও, সৌদি আরব বা তার বন্ধুরা কেউই এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পক্ষে দাঁড়ায়নি। বরং সৌদি আরবও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘নিন্দা করে গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে। ট্রাম্পের এই দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছিল সাধারণ পরিষদের ভোটেও। বলা যায় সারা দুনিয়া ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেয়ে প্রস্তাব নিয়েছে।  নিকি হ্যালির মতো রিপাবলিকান জন বোল্টনও বুশের আমলে (২০০৫-৬) জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। যে কোন ভোটাভুটিতে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে ভয় দেখিয়ে আমেরিকার পক্ষে রাখার ও পক্ষে ভোট নেয়ার আবিষ্কারক তিনি। এবার নিকি হ্যালিও সেই জন বোল্টনের পুরনো পথে নেমেছেন। তবে এবার এর বিশেষত্ব হল, এটা খুবই ন্যাংটা। কারণ তিনি প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়েছেন যেটা বোল্টন কখনো করেননি। অথচ নিকি বলেছেন, ভোট না দিলে এইড বন্ধ হয়ে যাবে, দেখে নেবো ইত্যাদি। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি, উল্টো আমেরিকার ইজ্জত গেছে। নিকি আসলে ভুলে গেছেন এটা আর সেই আমেরিকার রুস্তমির দিন নয়, তা শেষ। তাই এক ইসরাইল ছাড়া আমেরিকার পক্ষে বাস্তবে ন্যূনতম গুরুত্ব দেবার মতো কোনো রাষ্ট্র দাঁড়ায়নি।

ট্রাম্পের ইউরোপের সমর্থন না পাওয়ার মূল কারণ কী? আমেরিকা জাতিসংঘ রেজুলেশন অমান্য করে  ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট ১৯৯৫’ আইন করেছে।  বলা যায় সেটা ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পুর্ব জেরুজালেমকে অবৈধ ও গায়ের জোরে জমিদখলকে স্বীকৃতি দিয়ে এর উপর দাঁড়িয়ে বানানো। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান তা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান জাতিসঙ্ঘের রেকর্ড অনুসরণ করে নেয়া  অবস্থান। শুধু তাই না এটা যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান তাও ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক পত্র দিয়ে জানিয়েছে বহু আগেই ।  সে মোতাবেক, ১৯৯৯ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক রেজুলেশন হলো যে জেরুসালেম corpus separatum।

এছাড়া এদিকে ইউরোপের বিবেচনায় এখন ট্রাম্পের এই প্রস্তাব কোনো জরুরি অথবা রাজনৈতিক লাভালাভের ইস্যু ছিল না। এ ছাড়া, বেশির ভাগ ইউরোপীয় বন্ধুরা বলছেন, তারা মনে করছে এতে আমেরিকার ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্ব মেটাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে, যেটা হবে এক কাউন্টার প্রডাকটিভ কাজ। আসলে বেশির ভাগ রাষ্ট্রই “দ্বন্দ্ব মেটাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা হারিয়ে ফেলা” ভুল হবে এই যুক্তিকেই বেশি সামনে আনছেন। কারণ এই অবস্থানটা আসলে ‘জেরুসালেম ইসরাইলের রাজধানী কিনা’ এই বিতর্কে কোনো অবস্থান না নিয়ে থাকার অবস্থান। এ ছাড়াও এতে জেরুসালেম ইস্যুটা আলোচনা নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে নিরসিত হোক, এই আকাঙ্খার অবস্থানে থাকা যায়। তবে সার কথা, আমেরিকা এখন পুরাপুরি একঘরে হয়ে গেছে, সেটা আনন্দবাজারেরও নজরে এসেছে

তাহলে ট্রাম্প এমন অবস্থান তিনি নিজেকে নিয়ে গেলেন কেন? যেখানে এমনকি এটাও এখন জানা যাচ্ছে যে, এই সিদ্ধান্ত নিতে ট্রাম্পের মতামতদানের বৈঠকে প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্রসহ সব উপদেষ্টারা সবাই তাকে না করেছিলেন। তিনি কারও কথা শোনেননি। এ অবস্থার একটি ব্যাখ্যা বা উত্তর দিয়েছে, আমেরিকার শতবর্ষী পুরনো এক গবেষণা থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান – ব্রুকিংস (Brookings)। তাদের এক রিপোর্ট এর শিরোনাম হল, মূলত খ্রিষ্টান ইভানজেলিকদের খুশি করতে বা তাদের বিজয়ী করতে ট্রাম্প এটা করেছেন। [Trump’s Jerusalem decision is a victory for Evangelical politics] কথাটা ব্যাখ্যা করতে ‘খ্রিষ্টান-জায়নিস্ট’ বলে একটা টার্ম এনেছে ব্রুকিংস। [লিখেছে, in particular the views of Christian Zionists, who believe that the return of the Jews to the Holy Land is in accordance with God’s will, and biblical prophecy.] এছাড়া, এ প্রসঙ্গে তারা বেশ কিছু জনমত সার্ভেও করেছে, যার হদিস আছে ওদের রিপোর্টে সেখানে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।

ট্রাম্পের আমেরিকা কী আসলে সন্ত্রাস-দমন চায়?
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ট্রাম্পের এই ‘ইসরাইলি’ সিদ্ধান্ত – বলতে গেলে আসলে সারা পশ্চিমকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত ১৭ বছর ধরে পশ্চিমের নাম্বার ওয়ান গ্লোবাল কর্মসূচি হল, ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাস-দমন। কাউকে সন্ত্রাসী মনে হলে পশ্চিম তাকে অস্তিত্বহীন করে দিতেও দ্বিধাহীন থাকে। এদিকে এটা বুঝতে কাউকে গবেষকও হতে হয় না যে, পশ্চিম যাকে ‘গ্লোবাল টেররিজম’ বলছে এই ফেনোমেনা আসলে এই বেইনসাফির প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া। যেখানে হয়ত কাম্য ধরণের প্রতিক্রিয়া এটা নয়। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়া  হাজির হবার পিছনে সবচেয়ে বড় এক কারণ হল, আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, ভূমি দখল, অবাধ্য ইসরাইল- ফলে ফিলিস্তিদের প্রতি বে-ইনসাফ, উদাসীন্য, তাদের দীর্ঘ মানবেতর জীবনে ফেলে রাখা ইতাদি। তাই এই ‘গ্লোবাল টেররিজম’ ফেনোমেনার একমাত্র ও আল্টিমেট জবাব ও করণীয় হল, মজলুমের পক্ষে সবলে দাঁড়ানো ও ইনসাফ দেয়া। অথচ ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন উল্টো। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে সারা দুনিয়াতে মানুষ বে-ইনসাফিতে তাদের অসহায়বোধ আরও চরমে উঠছে। উল্টা বললে, তাহলে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত, এটা কি গ্লোবাল টেররিজম’ বাড়িয়ে তোলার কর্মসূচি নয়? ‘গ্লোবাল টেররিজম’ বাড়িয়ে তোলার কর্তা কি তাহলে ট্রাম্প হতে চাচ্ছেন? এ প্রশ্নের জবাব ট্রাম্পকে দিতে হবে, আজ অথবা কাল।

অন্যের জমি দখলের ও একাজের পক্ষে সাফাইদানে ওস্তাদ ইসরায়েল
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের ফলে আমরা বেশ কিছু প্রো-ইসরাইলি ভাষ্য ও ভাষ্যদাতাদের চিনতে পেরেছি। প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরনো বোস্টনের ‘দা আটল্যান্টিক’, মাসিক এই ম্যাগাজিন ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে খুবই খুশি। কেন তা নিয়ে এক আর্টিকেল ছেপেছে তারা, শিরোনাম- ‘অবশেষে এই প্রেসিডেন্টকে পাওয়া গেল যে ইসরাইলকে লজিক্যালি দেখেছে’। [Finally, a President Who Looks at Jerusalem Logically]। তারা ট্রাম্পের কাজের মধ্যে এই প্রথম যুক্তি খুঁজে পেয়েছে, কী আর করা!

এছাড়া, আর সবচেয়ে ভয় পাওয়া এক আর্টিকেল দেখা গেছে হংকং থেকে প্রকাশিত অনলাইন ‘এশিয়া টাইমসে’। পশ্চিমের বাইরে এশিয়ায় দু’টি ব্যাপক কাভারেজের উঠতি পত্রিকার একটা হলো এটা। এর কলামিস্ট হলেন ডেভিড পি গোল্ডম্যান যিনি  SPENGLER ছদ্মনামে লেখেন। অথচ তার লেখা কলামের শিরোনাম হলো, ‘অমর্যাদা করে মুখ ঠেসে ধরা : মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির একমাত্র পথ’ (Humiliation – the only path to peace for the Middle East)।

ডেভিডের যুক্তি খুব সহজ। তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে বিরোধের ফয়সালাকেই দুনিয়ার সব বিতর্ক বিবাদের সঠিক ও ন্যায্য ফয়সালা মনে করেন। কিন্তু তাঁর সমস্যা হল, ‘হারু পার্টি আরবরা হেরেও ইসরাইলের কাছে হার স্বীকার করে না এমন নাছোড়বান্দা’। তাই তিনি এবার নতুন ওষুধের প্রেসক্রপশন হিসেবে বলছেন, “যুদ্ধে পরাস্তের পরে আরেক ধাপ হল ওদেরকে মানে হারু পার্টিকে মুখ মাটিতে ঠেসে ধরার মতো চরম অমর্যাদার অবস্থায় ফেলে দিতে হবে, তাহলে এবার তাঁরা হার মানবে। আর ঝামেলা করবে না। দেখেন না জাপানে কী হয়েছিল! দুটি আণবিক বোমা মেরে দেয়াতে মাটিতে ওদের মুখ চেপে ধরা হয়েছিল। তাই চুপ মেরে গেছে…।” এই হল ডেভিড পি গোল্ডম্যান। ‘এখন আমরা সুজনেরা বুঝে ফেলেন কী বলতে চাইলেন ডেভিড। ডেভিড আমাদেরকে যেটা বুঝাতে চাচ্ছেন তা হল – দুনিয়ায় ন্যায়-অন্যায়, ন্যায্য-অন্যায্য, মানে ইনসাফের ধারণা এগুলো খামোখা, কিছু না। ফলে কেউ যুদ্ধে হারলে বুঝতে হবে সে অন্যায়কারী, অন্যায্য। অর্থাৎ যার গায়ের জোর বেশি সেই সঠিক ও ন্যায্য।

এটাই জায়নিস্ট বুঝ। তা আমরা আগেও দেখেছি। যে অন্যের জমিতে তারা ইসরাইল রাষ্ট্র গড়েছে তা তাদের হল কী করে, কিসের ভিত্তিতে? এটা বুঝাতে এরা সবসময় ‘গায়ের জোরের ন্যায্যতার কথা আনে’ আমরা দেখেছি। যেহেতু গায়ের জোরে তারা অন্যের ভূমি দখল করেছে, ফলে তা ন্যায্য। এই তত্ত্বই তারা কপচাতে থাকে। ফলে সেটাই সঠিক ও ন্যায্য। হিটলারের হাতে নির্মম মার খেয়ে এরা ইনসাফের ওপর আস্থাহীন বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তবু ইনসাফ ফিরে আসবেই। আমাদের তা লাগবে। ইনসাফ কায়েম করতেই হবে। সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে ইনসাফের ওপর। ইনসাফের ওপর সমাজের আয়ু, শ্রীবৃদ্ধি ও টিকে থাকা নির্ভর করে। যদিও আবার সাময়িক বে-ইনসাফিও দেখা দিতে পারে। তবে তারও একমাত্র সমাধান ও স্থিতিশীলতা আনার জাদুকাঠি হল ইনসাফ কায়েম। আমেরিকার পরাশক্তি অবস্থান একটু ঢিলা হতে শুরু করলে ‘গায়ের জোরের ন্যায্যতার’ তত্ত্ব আর ইসরাইলকে বাঁচাতে পারবে না; তারা তা আর কপচাবেও না। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) জেরুসালেম : একমাত্র সমাধান ইনসাফ’, শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

Talks over dinner: Prime Minister Narendra Modi with U.S. President Donald Trump, Japanese Prime Minister Shinzo Abe and other leaders at a dinner in Manila on Sunday. | Photo Credit: PTI

চীনবিরোধী ‘কোয়াড ব্লক’ জন্মের আগেই মারা গেল!

গৌতম দাস
২৮ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lK

 

 

চলতি নভেম্বর মাসে প্রথম দুই সপ্তাহ জুড়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এশিয়াতে নানান রাষ্ট্রে এক সিরিজ সফরে এসেছিলেন। তিনি ৩ নভেম্বর হাওয়াই দিয়ে সফর শুরু করেছিলেন। এরপর পাঁচটি রাষ্ট্রের (জাপান, দ: কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন) প্রত্যেক রাষ্ট্রে তিনি কমপক্ষে এক দিন করে কাটিয়েছেন। এ ছাড়া এই সফরকালে দুটি ‘রাষ্ট্রজোটের সম্মেলন’ হওয়ার সিডিউল ছিল – ভিয়েতনামে ২১টি রাষ্ট্রের এপেক সম্মেলন আর ফিলিপাইনে ১০ রাষ্ট্রীয় আসিয়ান সম্মেলন। ফলে ওই দুই সম্মেলনসহ মিলিয়ে ট্রাম্পের অংশগ্রহণ হিসাব করলে আরও প্রায় দুই ডজন রাষ্ট্রপ্রধানের সাথে ট্রাম্প এই স্বল্পকালে মোলাকাত করেছেন। এদের মধ্যে বার্মার সু চিও ছিলেন। এর বাইরে, এই সফরে ট্রাম্পের যাওয়া হয়নি এমন আরো কিছু এশিয়ান রাষ্ট্রে (আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার) কাছাকাছি সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) রেক্স টিলারসন সফর করেছেন। সব মিলিয়ে গত এক মাস এশিয়া ছিল আমেরিকান কূটনীতির টগবগে মুখ্য ফোকাস।

ট্রাম্পের এই এশিয়া সফরকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখা যায়। তাতে এর একটা অংশে ছিল বলা যায় ট্রাম্পের চীন সফর; মানে চীনের কাছ থেকে সঙ্ঘাতহীন পথে, তবে স্বার্থে অটল থেকে, আমেরিকান বিনিয়োগ, ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বার্থ বুঝে নেয়া বা আদায় করার আলাপ। আর এর সাথেই এই অংশে ছিল, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক বোমা ইস্যুতে চীনের ভূমিকা আমেরিকার জন্য ইতিবাচক – এই অনুভব নিয়ে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষিণ কোরিয়া, তাকে আশ্বস্ত করার সফর। ট্রাম্পের বাকি এশিয়ান রাষ্ট্র সফর ছিল অন্য ভাগে। সেটার নাম দেয়া যায়, এশিয়ায় চীনের পাল্টা প্রভাব সৃষ্টি ও বিস্তারের লক্ষ্যে সফর। আগের ওবামার প্রশাসন বলেছিল, তাঁর ভাষায়, ‘এশিয়ায় এখনো আমরাই নেতা আছি’। এই ভাব ধরে তিনি এশিয়া সফর করেছিলেন; তবে এটা কূটনীতিক ভাষার আড়াল। এখান থেকে লুকিয়ে থাকা কথার তাৎপর্য খুব বোঝা যাবে না। তাই সরাসরিভাবে বললে, এশিয়ায় আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ (China Containment’) নীতি জারি আছে সেই ২০০৭-০৮ সাল থেকে। সে সময় সেটা প্রথম প্রেসিডেন্ট বুশ তাঁর কর্মসূচি হিসাবে চালু করেছিলেন। সেটা ওবামার হাতে আরও গোছানো আকার পেয়ে নাম হয়েছিল ‘এশিয়া পিভট’ বা ভরকেন্দ্র নীতি (Asia pivot)। সেই নীতিটাকেই আরেকবার অন্তত নামের কিছু পরিবর্তন করে তা নিয়ে এবার ট্রাম্প এশিয়ায় গিয়েছিলেন। বদলে নেয়া সে নাম হল, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ পলিসি (indo-pacific)। এটাকেই আগে ‘এশিয়া-প্যাসিফিক’ নীতি বলা হত। এখন ট্রাম্পসহ তার প্রশাসনের লোকেরা আনুষ্ঠানিকভাবে একে ডাকছেন ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নীতি বলে। বলছেন, ‘একটা মুক্ত অবাধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অঞ্চল’ (“free and open Indo-Pacific” ) বজায় রাখার পক্ষে আমেরিকা সবার অবস্থান তৈরি করতে চাইছে। ‘ইন্দো-প্যাসিফিক’ নামে ডাকার পরে এ নিয়ে মিডিয়া-প্রতিক্রিয়া হল, এটা কোনো নতুন নীতি নয়। অর্থাৎ চীন ঠেকাও নীতি আমেরিকার যেটা ছিল – সেটাই নতুন মোড়কে এখনও মূল লক্ষ্য হয়ে আছে। তবে একালে এর ভেতর কিছু লক্ষণীয় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে আমেরিকা ও তার বন্ধুজগতে।

তবে ‘চীন ঠেকানো’ – এই ধারণার অরিজিনাল উৎস অন্যখানে, অন্য কারণে। সেটা হল, আমেরিকা একক পরাশক্তির এক গ্লোবাল পাওয়ার হলেও তা আর থাকছে না – নিজ সার্ভে-স্টাডি  থেকে পাওয়া ফ্যাক্টস আমেরিকা যেদিন নিজ সরকারি গবেষণা অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়ে যায়, তখন থেকেই প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকার করণীয় পদক্ষেপ হিসাবে  ‘চীন ঠেকানোর’ চিন্তাভাবনার শুরু ঘটেছিল। দুনিয়ার আমেরিকান নেতৃত্বের (অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্ব) অবস্থান চীনের হাতে চলে যাওয়া এবং স্টাডি বলছে তা আর ঠেকানো অসম্ভব বলে আমেরিকান অবস্থান হল, তাহলে  অন্তত বিলম্বিত করিয়ে দেয়া যায় কি না, এর লক্ষ্যেই ঐ  ‘চীন ঠেকানোর’  পদক্ষেপ নিয়েছিল আমেরিকা। সেই পদক্ষেপ হিসেবে যেমন, এশিয়ায় আরেক রাইজিং অর্থনীতি হল ভারত, আমেরিকা সিদ্ধান্ত নেয় যে তাহলে ভারতের পিঠে হাত রাখা, আর কাছে টেনে ফেভার করে অন্তত ভান করে একে চীনের বিরুদ্ধে লাগানো –  আমেরিকার এই ভারত নীতিও চীন ঠেকানোর মতলবে। তবে আমেরিকা সেকাজ  ‘একটি মুক্ত অবাধ এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’- এর গুরুত্ব বুঝানোর আড়ালে এটাকেই তার ‘এশিয়া নীতি’ বলে হাজির করেছে।

সাইড লাইন
যেকোনো রাষ্ট্রজোটের আহূত সম্মেলনে মূল অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপ্রধানরা অংশগ্রহণ করেও এর ফাঁকে ফাঁকে সংক্ষিপ্ত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও সেরে নিয়ে থাকেন। আসিয়ান সম্মেলনে তেমনি এক “বিশেষ বৈঠক” হয়েছে। এই বৈঠকের ব্যাপারটা, মানুষের অনেক গোপন সম্পর্ক থাকে এবং মরার বয়সে পৌঁছলে সে পাবলিকলি তা স্বীকার করে ফেলে, অনেকটা যেন সেরকম। তবে এর গুরুত্ব ভিন্ন অর্থে আসিয়ান সম্মেলনের চেয়ে বেশি বলে অনেক মিডিয়া গুরুত্ব দিয়েছে। সেই “বিশেষ বৈঠকের” নাম হল, এক ‘কোয়াড’ ব্লকের মিটিং।

আসিয়ান সম্মেলনের সাইড লাইনে এশিয়ায় চীনবিরোধী এক  নিরাপত্তা জোটের আদলে তবে প্রকাশ্যে – আমেরিকা, জাপান, ইন্ডিয়া ও অস্ট্রেলিয়া – এই চার রাষ্ট্রপ্রধানেরা এক সাথে বসেছিলেন। কিন্তু সেটা আবার কোনোভাবেই যেন শোরগোল না তুলে ফেলে, চীন যেন ক্ষেপে না যায়, সে দিকে খেয়াল রেখে তা তারা করতে চেয়েছে। যেমন এভাবে চার রাষ্ট্রের একসাথে বসার নাম কী, সে দিকে তারা নিজেরা এর কোন নাম দেননি। কিন্তু  মিডিয়া এটাকে নিজ উদ্যোগে বা নিজের রিপোর্টিংয়ের স্টাইলে  “কোয়াড ব্লক”  [QUAD BLOC] (ইংরেজি কোয়াড মানে চার – ফলে যেন চার মুরব্বির জোট) বলা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কোনো যৌথ ঘোষণাও ঐ বৈঠক থেকে দেয়া হয়নি। নেহায়েতই চার নেতার এক ডিনার যেন এভাবে লো-প্রফাইলে রেখে, তবে যারা ট্রাম্পের এশিয়া নীতি- ‘একটি খোলা এশিয়া-প্যাসিফিকের অঞ্চল’-এর গুরুত্ব বোঝানোর কাজে একমত, তারাই যেন জড়ো হয়েছেন। তবে এই ‘কোয়াড’ করার আইডিয়াটা অনেক পুরনো। ২০০৭ সালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে এই চার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে প্রস্তাবটা পেশ করেছিলেন। কিন্তু এত দিন সেটা আলোর মুখ দেখেনি। আর এখন যৌথ ঘোষণা না দিতে পারা ‘কোয়াড’, ওই ডিনার অনুষ্ঠানের পরবর্তীকালে নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের সচিবপর্যায়ে একসাথে বসলেও শেষে যে বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় – (ভারতের প্রাচীন দক্ষিণী দৈনিক ‘দি হিন্দু’ অনুসারে), ‘চার দেশের বিবৃতি চার রকমের।’ সার কথায় বললে, এখন আমরা দেখছি, আসলে তাদের পরস্পরের অবস্থানে বড় ধরণের ভিন্নতা আছে। সেসব নিরসন করে নিবার আগেই কিংবা তা নিরসণযোগ্য কিনা সেসব যাচাইয়ের আগেই তারা তাড়াহুড়াতে একসাথে বসে গিয়েছিলেন বলে মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ভারত, এটা চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সরাসরি বিরোধিতাকারী জোট হবে বলে আশা করেছিল। কিন্তু বাকিরা মনে হচ্ছে সেখান থেকে সরে গেছেন। বিশেষ করে ট্রাম্পের এ মাসের চীন সফরে তিনি, চীন-আমেরিকার যৌথ ৪০ বিলিয়ন ডলারের এক ‘সিল্ক রোড ফান্ড’ গঠনের চুক্তি করে ফেলেছেন বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে?

গ্লোবাল বা রিজিওনাল রাজনীতি বোঝাবুঝির দিক থেকে, বিশেষ করে ‘জাতীয়তাবাদী’ অবস্থান বলতে  কী বুঝায় আর তা একালে বুঝাবুঝির দিক থেকে তা কী আগের কোল্ড ওয়ার কালের মতই নয়? জবাব হল যে না, চলতি শতক আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই বুঝাবুঝির দিক থেকে ভিন্ন হয়ে গেছে। বোঝাবুঝি এখন বদলে গেছে। আমরা যে জাতীয়তাবাদী ধারণা নিয়ে গত শতকে যেসব অভিজ্ঞতায় বড় হয়েছি তার অনেক কিছুই এই শতকে আর মিলছে বা মিলবে না, অচল। সংক্ষেপে বললে এর মূল কারণ হল, সেগুলোর পটভূমি ছিল কোল্ড ওয়ারের ‘গ্লোব’, অর্থাৎ যেকালে দুনিয়া একই তা সত্বেও সেটা দুটা বিচ্ছিন্ন অর্থনীতির ব্লক, দুটা রাষ্ট্রজোট হয়ে দুনিয়ায় বিরাজ করত। অর্থাৎ যোগাযোগ সম্পর্কের দিক থেকে দুটোই আলাদা, বিচ্ছিন্ন। পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির বিনিময়ের দিক থেকে বিচ্ছিন্ন দুটি অর্থনীতিতে বড় হয়ে ঐ শতক কাটিয়েছি আমরা। ক্যাপিটালিজম সম্পর্কে বা এর বিস্তারিত বিনিময় সম্পর্ক সম্পর্ককে আমরা যা জেনেছি বুঝেছি, তা কোল্ড ওয়ারের বিচ্ছিন্ন দুই ব্লকের অর্থনীতির পটভূমিতে। পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৯১ সালে (চীনের বেলায় আরো আগেই, ১৯৭৮ সালের পর থেকে) ভেঙে যাওয়ার পর ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা আগের দুনিয়া তখন থেকে আর বিভক্ত থাকল না, এবার এক্‌ একটাই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অধীনে সকলে এসে গেছিল। এতে আমরা সবাই এবার ভাগহীন, দুনিয়াজুড়ে এক ব্যাপক বিনিময় সম্পর্কের – পণ্য পুঁজি টেকনোলজি ইত্যাদির ব্যাপক বিনিময়ের যুগে প্রবেশ করে গেছি। যেটা আবার আর কখনও উলটা পিছনে ফিরে যাবে না  (irreversible)।  আর এর ভেতরে আগের রক্ষণশীল ব্লক যুগের জাতীয়তাবাদের ধারণা যেটা ছিল, তা একালে অচল হয়ে যায়। কারণ আগেকার কালের পারস্পরিক বিনিময় সম্পর্কহীন যে দশা দুনিয়া ছিল তার আর  কোনো অবশেষও নেই এখন, এমন সেইকালের জাতীয়তাবাদ ধারণা এখন পালটিয়ে গেছে। আমরা এখন দুনিয়াজুড়ে সবাই  ওতপ্রোতভাবে পরস্পরের সাথে গভীর পণ্য লেনদেনে ও বিনিময় সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। চলতি পটভূমিতে তখনকার জাতীয়তাবাদবোধ তো অচল হবেই। তাই এই নতুন গ্লোবাল বিনিময়ের দুনিয়ায় কোনো এক রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কিছু রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্রজোট খাড়া করা এবং তা টেকানো খুবই কঠিন ও জটিল। যেমন চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার অন্যদের নিয়ে কোনো রাষ্ট্রজোট করে টিকানো খুবই কঠিন ও জটিল হবে। তাই আমরা দেখছি। কারণ খোদ আমেরিকাসহ হবু জোটের সব রাষ্ট্রই প্রত্যেকে আলাদা আলাদা করে আবার চীনের সাথে নানা পণ্য বিনিময়, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্কে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। তবে সেই সাথে যার যার মত স্বার্থবিরোধও আছে। কিন্তু তা থাকলেও চীনের বিরুদ্ধে সবার স্বার্থ-ঝগড়া  কমন নয়, একরকম নয়। অর্থাৎ চীনের সাথে বিরোধ আছে; কিন্তু একেক রাষ্ট্রের ইস্যু একেকটা। সেখান থেকে একটা কমন স্বার্থ বের করা খুবই মুশকিল। এ ছাড়া ‘কোয়াডের’ চার রাষ্ট্র তাদের নিজেদের মধ্যেও তো পরস্পরবিরোধী গুরুতর স্বার্থবিরোধ আছে। যেমন-  বিদেশি ব্যাংক, বিনিয়োগ ও ফাইন্যান্সিং খাতে ভারত ও অস্ট্রেলিয়া নানা ইস্যুতে তৎপরতায় খোদ আমেরিকার বিরুদ্ধে তাদের স্বার্থ-অবস্থান আছে। আবার এবিষয়ে চীনের সাথে তাদের গভীর স্বার্থ সম্পর্ক। ফলে তারা চীনের সাথে এখানে হাত মিলিয়ে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। ওদিকে আমেরিকার বিরোধী রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে গঠিত নিরাপত্তা ও বাণিজ্য জোট ‘সাংহাই কো-অপারেশন’ গড়ে উঠে জমে উঠছে। আর তাতে সদ্য যোগ দেয়া সদস্য হল ভারত। ফলে  চীন যেমন গ্লোবাল অর্থনীতিতে আমেরিকার স্থান নেয়ার জন্য ধাবমান, প্রায় তেমনি অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমেরিকাকে পেছনে ফেলে দেয়ার আকাঙ্খা তো ভারতেরও আছে। কারণ আগের নেতা মাতবরের মাতবরি ঢিলা না হলে চীন বা ভারত উঠবে কেমন করে। ফলে সেই আকাঙ্খা পূরণের দিক থেকে দেখলে, অন্তত এই ব্যাপারে ভারতের কাছে চীন বাস্তব সঙ্গী ও বন্ধু; এক পথের পথিক। এই অবস্থায় আগেরকালের জাতীয়তাবাদ দিয়ে একালের রাষ্ট্রস্বার্থবোধ বুঝতে চাইলে মারাত্মক ভুল হবে; আগের জাতীয়তাবাদী বোধের ধারণা একালে এজায়গায়  অচল। জটিলতা হল একালে যার সাথে বড় স্বার্থবিরোধ আছে, তার সাথেই আবার গভীর বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্কে জড়িয়েও থাকে।

আরো কথা আছে। রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের জন্য বিরাট শিক্ষক, বিরাট অভিজ্ঞতা-দাতা। মানুষের কী হবে, মানুষ কে, কী – এসবের জবাব উত্তর একালে জানতেই লাগবে। মানুষের মর্যাদা কী হবে, এটা কি অর্থনীতির বাইরের প্রশ্ন? মানুষের মর্যাদা, মৌলিক মানবিক-রাজনৈতিক অধিকার এগুলো পাশ কাটিয়ে কি আমরা একটি গ্লোবাল অর্থনীতি চালাতে টিকাতে পারব, এর এক অর্ডার, নিয়মশৃঙ্খলা কায়েম করতে পারব?

জবাবে সারকথাটা হচ্ছে, আসলে মানুষের মর্যাদা, মানুষের মৌলিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার প্রসঙ্গে দুনিয়ায় সবার জন্য পালনীয় এবং তা সবাইকে রক্ষা করতে বাধ্য ও কমিটেড হতে হবে – এমন এক গ্লোবাল রাজনৈতিক ব্যবস্থা অবশ্যই লাগবে, এটা পূর্বশর্ত। এটা ছাড়া কোন গ্লোবাল অর্থনীতি হবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আমেরিকাকে এ’বিষয়ে নুন্যতম কিছু কমিটমেন্টে যেতে হতেছিল।
কেবল অর্থনীতিই সব, জীবনের সব লক্ষ্য অর্জন মানেই বৈষয়িক অর্জন- এটা সবচেয়ে ভুল কথা, এক অর্থহীন ধারণা এর প্রমাণ?

এই যে ‘কোয়াড ব্লক’, আমেরিকা জাপান ভারত ও অস্ট্রেলিয়া মিলে চারটি রাষ্ট্র – চীনের বিরুদ্ধে, চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের বিরুদ্ধে জোট হয়ে উঠতে চেয়েছিল। চীনের বিরুদ্ধে এটাই তাদের কমন লক্ষ্য হওয়ার কথা। তাহলে রোহিঙ্গারা, সামান্য এগারো লাখের এক জনগোষ্ঠী – এক রোহিঙ্গা ইস্যু তাদের কোথায় নিয়ে গেল? আমরা দেখলাম মোটা দাগে বললে যে প্রক্রিয়াতে যাক, চীন আর ভারত এক দিকে  বা পক্ষে, আর আমেরিকা আরেক দিকে, কেন? ‘কোয়াড’ গড়ার খায়েশ যাদের আছে তাদের তো এই আলাদা আলাদা পরিণতি হওয়ার কথা নয়। কোয়াড ব্লকের সাথে মিলের দিকে তাকিয়ে বললে চীন একা আর বাকি চার বিপরীত পক্ষে এমন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা হয় নাই। কেন?

এটা প্রমাণ করে যে, মানুষের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে কোনো জোট বা কোনো কমন স্বার্থ খাড়া করা যায় না, যাবে না। টিকবে না। মানুষকে বাদ দিয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ বলেও কিছু নেই।

ভারতের এক আঁতেল, থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব হলেন সাবেক নৌ-কমডোর সি উদয়ভাস্কর।  ‘কোয়াড’ গঠনে তিনি মহা খুশি, উদ্বেলিত আবেগি। তিনি বলছেন, চার রাষ্ট্রজোট গঠনে উচ্ছসিত তিনি শিরোনামেই লিখছেন, এটা নাকি “ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স” বলে। বলছেন, ‘কোয়াড’ যাদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে তারা হলেন সব ‘গণতন্ত্রের লোক’। ‘গণতন্ত্র তাদের লক্ষ্য, তাদের ধ্রুবতারা-চোখের মণি। [Democracy as a lodestar for partnership is enticing.] সে দিকে তাকিয়ে নাকি হাঁটছে ওই ‘কোয়াড’। ‘এটা হলো গণতন্ত্রীদের ঐক্যতান কনসার্ট’(concert of democracies ) । হতে পারে হয়তো; তবে সেটা স্ব স্ব রাষ্ট্রসীমার ভেতরে। আর চীনকে নিচু দেখানোর উদ্দেশ্যে বললে, তা বটে, ঐ চার তারা নির্বাচনের দেশ। কিন্তু তাহলে রোহিঙ্গা ইস্যুতে পুরো ‘কোয়াডের’ সদস্যরা (like-minded democracies) একমত নন কেন? একপক্ষে নন কেন? ‘গণতন্ত্রীদের ঐক্যতানের’ পক্ষরা এক দিকে; আর বিপক্ষরা চীনের সাথে অন্য দিকে – এই ভিত্তিতে অবস্থান নিতে পারলেন না কেন? আর তারা যদি গণতন্ত্রকে “ধ্রুবতারা মেনে হেঁটেই” থাকেন, সে ক্ষেত্রে তাদের এই গণতন্ত্রবোধ নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমায় থেমে যায়? বাইরে অকেজো কেন? বার্মার জেনারেল বা সু চির উপর প্রযোজ্য নয় কেন? উদয়শঙ্করের ভারতের “গণতন্ত্রবোধ”  রাষ্ট্রসীমার ভেতরেই কেবল কাজ করে, কেন? আর বাইরে কাজ করে না বলেই রোহিঙ্গারা মরবে, ১৯৯২ সালের নাগরিকত্ব আইন ওদের ওপর প্রয়োগ করা হবে কেন? গ্লোবাল ইউনিভার্সাল হিউম্যান রাইট বলে কিছু থাকবে না বা নেই কেন? অথচ উদয় শঙ্করেরা এ ব্যাপারে উদাসীন হবেন। হায়রে গণতন্ত্রী!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছেন

ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছে্ন

গৌতম দাস

২৯ আগস্ট ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০১

http://wp.me/p1sCvy-2hm

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প জানাচ্ছেন তিনি আমেরিকাকে আবার  নতুন করে আফগানিস্তানের যুদ্ধে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।  গত সপ্তাহে ২১ আগষ্ট তিনি নতুন করে দেয়া তার আফগান পলিসি ঘোষণা করেছেন, আর তাতে  নতুন করে আবার আরও সৈন্য পাঠানোর ইচ্ছা জানিয়েছেন।  স্বভাব সুলভ হামবড়া ভাবে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প প্রায়শই নিজেকে এক মশকরার পাত্র বানিয়ে ফেলেন। এখানেও ট্রাম্প তার নতুন ‘আফগান নীতি’ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “আমরা এবার সেখানে আর আফগান রাষ্ট্র গড়তে যাচ্ছি না, আমরা যাচ্ছি টেররিস্ট মারতে”। [“We are not nation building again. We are killing terrorists.”] বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক মিডিয়া ট্রাম্পের আফগান যুদ্ধে নবপ্রবেশকে ঠাট্টা তামাশা করে বা খোঁচা দিয়ে হাজির ধরেছে। প্রকারন্তরে যার অর্থ তারা কেউই যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখছেন না।

“I provide my input through the chain of command,” Gen. John Nicholson said during a news conference in Kabul on Thursday. Credit Rahmat Gul/Associated Press

তাহলে কী খোদ ট্রাম্পের কথার ভিতর সিরিয়াস-নেসের অভাব আছে? হা, সম্ভবত তাই। আর সেজন্য এই প্রশ্নও জাপানের  থিঙ্কট্যাঙ্ক  ম্যাগাজিন ডিপ্লোমেটিক পত্রিকার এক আর্টিকেলে তোলা হয়েছে। এই পত্রিকায় ছাপা হওয়া দুটা আর্টিকেলই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে নিয়েছে। ফলে সবমিলিয়ে  আবার আমেরিকাকে আবার আফগানিস্তানে নিবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত – এর মানে আফগানিস্তান কী টেররিজমের ইস্যু না ব্যবসা বাগিয়ে নিবার ইস্যুই সে প্রশ্নও উঠেছে।

গত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আফগান যুদ্ধ থেকে সব সৈন্য ফিরিয়ে নিবার প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়নের পরেও ফেলে ছড়িয়ে আফগানিস্তানে এখনও আসাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। আমেরিকান এক জেনারেল জন নিকলসনের নেতৃত্বে এই সৈন্যরা সেখানে আছেন। ওদিকে  ট্রাম্পের ক্ষমতাগ্রহণও অষ্টম মাসে পড়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত  ঐ জেনারেলের সাথে ট্রাম্পের কোন সাক্ষাত ঘটে নাই। যদিও ট্রাম্প নতুন আফগান নীতি দিয়ে দিলেন। ব্যাপারটাকে নিয়ে তাই নিউইয়র্ক টাইমসের প্রচ্ছদে ঐ জেনারেলের ছবি দিয়ে প্রশ্ন রেখেছে, এমন আফগান নীতিতে – “এ’এক আজীব সম্পর্ক!” সিএনএনও এক মশকরা রিপোর্ট ছেপেছে, “আফগানিস্তান সম্পর্কে ট্রাম্পের চিন্তার ইতিহাস” এই শিরোনামে।  গত ২০১১ সাল থেকে চলতি সময় পর্যন্ত ট্রাম্প আফগানিস্তান নিয়ে যত মন্তব্য করেছেন তার ক্রমিক ইতিহাস এটা।  সেখানে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো হল যেমন,  ‘অর্থ বরবাদের জায়গা আফগানিস্তানে’ বা  ‘আফগানিস্তান এক বিপর্যয়ের নাম’, অথবা ‘আমাদের  এখনই আফগানিস্তান ছেড়ে আসা উচিত’ ইত্যাদি থেকে শুরু হয়ে শেষে ২০১৭ সালে এসে গত ১৯ আগষ্ট তিনি টুইট লিখছেন, “ট্যালেন্টড জেনারেলদের সাথে ভাল সময় কেটেছে আফগানিস্তানসহ অনেক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি”। অথচ এই ট্রাম্প নিজেকে এতদিন ন্যাশনালিস্ট অবস্থান নিয়েছেন মনে করে তিনি আফগানিস্তানে আমেরিকান সৈন্যের যুদ্ধ করাসহ এমনকি বিভিন্ন দেশে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে) আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এসব রাষ্ট্রিয় খরচের উদ্দেশ্য- ন্যায্যতা জানতে চেয়ে এসেছেন। তার আগেকার টুইটগুলোই সেসবের প্রমাণ। তাই তিনি নিজের ‘আফগান পলিসি’ ঘোষণা করতে গিয়েও স্বীকার করছেন যে নিজের ব্যক্তি অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি এটা করছেন।

আমেরিকার আফগানিস্তানে হামলার আর ‘ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের নেতা ছিলেন জর্জ বুশ। কিন্তু এতে তিনি আমেরিকাকে এক অসীম এবং কখনও শেষ হবে না এমন যুদ্ধের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন। নিজেও আটকে পড়েছিলেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার মুল লক্ষ্য কি ছি তা স্মরণ করিয়ে দিতে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক কমেন্টেটর পন্ডিত লিখছেন মূলত, “আফগানিস্তান থেকে আলকায়েদা ততপরতা ও তাদের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা, তাদের শীর্ষ নেতাদেরকে হত্যা করা, তাদের অর্থ সরবরাহ ও লেনদেনের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা ইত্যাদি ছিল আফগানিস্তানে আমেরিকান সামরিক হামলার মৌলিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য”। কিন্তু ১৬ বছরের এই যুদ্ধে সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্যের কিছুই অর্জিত হয় নাই। অথচ ইতোমধ্যে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ জীবন দিয়ে ফেলেছে ২৪০০ আমেরিকান সৈন্য, এই পর্যন্ত ১৬ বছর ধরে  বহণ করা হয়েছে ঐ যুদ্ধের খরচ, আর তাতে মোট ব্যয় হয়ে গেছে প্রায় ১.০৭ ট্রিলিয়ন বা ১০৭০ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয় আমেরিকান অর্থনীতির যে বিরাট ক্ষতি হয়েছিল যেটার আঁচ গ্লোবাল অর্থনীতিতে গিয়ে লেগেছিল তাতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাও দেখা দিয়েছিল।  এর আগে বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৩০ সালে ঘটা প্রথম গ্লোবাল মহামন্দার পরে সেটাই ছিল দ্বিতীয়বার ২০০৭-৮ সালের মহামন্দা। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ইউরোপ আমেরিকা। ফলে পুরা পশ্চিমাসহ এর প্রভাবে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো মহামন্দায় কম-বেশি ডুবে গেলেও তখনও আলোর বাতি হয়ে টিকেছিল চীন; যদিও চীনের ডাবল ডিজিটের জিডিপি সেখান থেকে নেমে সিঙ্গেল ডিজিটে, অর্থাৎ কম হারে এসে গেলেও তা ভালর দিকে অর্থাৎ তখনও চীনের অর্থনৈতিক গ্রোথ ছিল ইতিবাচক। অবশ্য  ততদিনে আমেরিকান এক সরকারি গবেষণা, এক সার্ভে ষ্টাডিতে এটা পরিস্কার হয়ে গেছিল যে আমেরিকা আর একক পরাশক্তি থাকতে পারছে না। তবে অন্য আর চার বা পাঁচ পরাশক্তির অন্যতম একটা হতে যাচ্ছে মাত্র। আর চীনের অর্থনীতি এবার আমেরিকান অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে চলে যাবে। এসব আগাম অনুমানগুলোর বাস্তব লক্ষণ দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল আমেরিকান অর্থনীতির ঐ পতন শুরুর কালে। ফলে বুশকে যদি বলা হয় আমেরিকাকে এক অনন্ত যুদ্ধে প্রবেশের রূপকার তবে এথেকে আমেরিকাকে বের করা আনার ত্রাতা হলেন বারাক ওবামা। গত ২০০৭ সাল মানে বুশের আমল থেকেই যুদ্ধ করে কী লাভ-ক্ষতি হল এর নানান মুল্যায়ন শুরু হয়েছিল। বলা বাহুল্য অর্জন বা লাভক্ষতির এসব মুল্যায়ন হিসাবগুলোতে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে আমেরিকা অর্থহীন ততপরতার এক বিশাল ফাঁদে আটকা পড়েছে। কোন লক্ষ্যই মূলত অর্জিত হয় নাই। ফলে  এখান থেকে আমেরিকাকে বের করা উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত আসে বা তা নিতে হয় ততদিনে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। তিনি আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনার জন্য উলটা হিসাব করে আগে একটা তারিখ ঠিক করেছিলেন। না সেটা, আর কত দিনের যুদ্ধে বা কবে কবের মধ্যে  কী কী অর্জন করতে হবে এর তালিকা না। তিনি মাপলেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সামর্থ  আমেরিকান অর্থনীতির আর কতদিন আছে যাতে সেফ থেকে অর্থনীতির বড় ক্ষতি না করে যুদ্ধ সমর্থন করেও সহি সালামতে ফিরে আসা যাবে। সেই হিসাবে ২০১২ সালেই তিনি যুদ্ধের কাট-অফ তারিখ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন; আর সে তারিখ হল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। অর্থাৎ এই তারিখের মধ্যে যুদ্ধের লক্ষ্য কিছু অর্জিত হলে ভাল; কিন্তু তা না হলেও সৈন্যরা বাড়ি ফিরে আসবেই – এটা নির্ধারিত করে ফেলেন তিনি। তবে কেবল সামরিক কাঠামোটা ধরে রাখার জন্য আর কেবল কিছু ট্রেনিং এর উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ দশ হাজার আমেরিকান সৈন্য আফগানিস্তানে রেখে দিবার সিদ্ধান্ত নেন। বাস্তবে সেটাই হয়ে আছে, এখন সাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারার জন্য ওবামা সেই থেকে বুশের ত্রাতা হয়ে আছেন। এই প্রেক্ষিতে বলা যায় ট্রাম্পের ত্রাতা কে হবেন তা কী তিনি আগে ঠিক করেছেন?

গত ১০ জুলাই রয়টার্স এক মন্তব্য প্রতিবেদন ছেপেছিল। কারণ ততদিনে ট্রাম্পের নতুন আফগান নীতি কেন আসছে না তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়ে গেছিল। ঐ রিপোর্টর তার প্রথম বাক্যে লিখেছে, “বিদেশ নীতি সার্কেলে প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাকমাস্টার আর সেক্রেটারি অফ স্টেট টিলারসন – ট্রাম্প প্রশাসনের এই তিনমুর্তি যে  আফগানিস্তান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেক, এই নীতির পক্ষে প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করার বড় মুরুব্বি, এটা সবাই জানে। মাত্র তিন বছরের মাথায় এরা চায় আমেরিকা তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলুক”। অর্থাৎ এরা হলেন যুদ্ধের দামামা বাজানোর পক্ষে মুল হোতা।  রয়টার্সের ঐ রিপোর্টে লিখছে একমাত্র ট্রাম্পের প্রাক্তন চীফ ষ্ট্রাটেজিষ্ট স্টিভ ব্যানন যাকে গ্লোবালাইজেশন বিরোধী ন্যশনালিস্ট, ‘সাদাচামড়া্দের শ্রেষ্ঠত্বতা ফেরি করার  নেতা ইত্যাদি বলা হয় একমাত্র তিনি ছিলেন সঠিক নীতির লোক।  কারণ তিনিই একমাত্র ছিলেন এর বিপক্ষে। তিনিই ট্রাম্পকে আফগানিস্তানে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সাবধান করেছিলেন। আসলে ঐ রিপোর্ট বলতে চাইছে যে ট্রাম্পের এই আফগান নীতি ঠিক হয় নাই। স্টিভ ব্যাননকে অনেক আগেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউস থেকে বের করে দিয়েছেন। ফলে ঐ রিপোর্টের ভাষ্য হল আমরা স্টিভ ব্যাননের বাকি সব ইস্যুতে একমত না হতে পারি কিন্তু তিনিওই পারতেন প্রেসিডেন্টকে আফগানিস্তানে ফেরত যাবার সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকতে।

আসলে যুদ্ধবাজদের প্রেসিডেন্টকে  প্রভাবিট করে ফেলার  ঘটনার স্পষ্ট হতে শুরু হয়েছিল বর্তমান আমেরিকান ‘সিনেটের আর্মস সার্ভিস কমিটির’ শুনানি বৈঠকে গত জুন মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস সেখানে সাক্ষ্য দিতে আসার সময় থেকে।  আফগানিস্তানে আমেরিকার সৈন্যদের নেতা জেনারেল নিকলসন তিনি ঐ শুনানিতে স্পষ্ট করে বলেন যে, “সামর্থের অভাবে আমরা সেখানে ‘স্টেলমেটে’ মানে কেউ জিতে নাই এমন একটা স্থবিরতার মধ্যে আটকে আছি”। ফলে একথার পরে  সেখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিসও তার স্বাক্ষ্যে বলা সহজ হয়ে যায় যে “আমরা আফগানিস্তানে জিততে পারছি না। তবে আমরা এটা সংশোধন করব”। এই সংশোধন করার কথা  থেকেই ঐ সিনেট কমিটি চেয়ারম্যান ম্যাককেইন ম্যাট্টিসকে ধরে বসেন যে জেনারেলদেরকে তাহলে এখন যুদ্ধের একটা নতুন স্ট্রাটেজি দিতে বলেন; না হলে তো সিনেট থেকে কোন থিতু মিলিটারি বাজেট দেয়া সম্ভব না। কিন্তু জেনারেলদের জন্য আসল সমস্যা হল অন্যখানে। এই যুদ্ধের মূল যে লক্ষ্য ছিল যে “আলকায়েদার সব কিছু উপড়ে ফেলা বা সমাপ্তি ঘটানো” সেটা কী জেনারেলদের পক্ষে দিন তারিখ দিয়ে বলা ও করা সম্ভব যে কবে এই লক্ষ্য অর্জিত হবে! যেই লক্ষ্য বিগত ১৬ বছরে কিছুই অর্জিত হল না তা এখন জেনারেলদের পক্ষে কী দিন তারিখ আর যুদ্ধকৌশলসহ বয়ান করে বলা সম্ভব। সেকথা এখানে আমল করা হয় নাই। যেমন  একটা কথা। আফগানিস্তানে আমেরিকার সর্বোচ্চ সেনাবাহিনী একসময় ছিল একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার। অথচ এখন যে সৈন্য বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্প বলছেন এটা তারা প্রকাশ করবেন না। কিন্তু ইনফরমালি সেই সংখ্যা হল আগের সাড়ে আট হাজারের উপর আরও বড়জোর মাত্র পাঁচ হাজার। তাহলে তাতে হবে সাড়ে তের হাজার। অথচ এই সাড়ে তের হাজার সৈন্য এরা কী একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার সৈন্যের সমতুল্য ফলাফল  আনতে পারে? পারা সম্ভব? তা ভেবে দেখা হচ্ছে না। তাহলে এখনই নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজানো হচ্ছে কেন? ব্যাপারটা কী এমন যে, খুব সম্ভবত যুদ্ধ শুরু হলে ছোটবড় যে সব ঠিকাদারি কাজ বা সরকারি ব্যয় সচল হয়ে উঠবে তার সুফলভোগী সংশ্লিষ্ট লোকজনের স্বার্থের ততপরতা এগুলা। তাই এপ্রসঙ্গে জাপানের ডিপ্লোম্যট ম্যাগাজিনের এক আর্টকেল প্রশ্ন রেখেছে যুদ্ধের লক্ষ্য কী, আর এর টাইমটেবিল ও বাজেট কী সে সম্পর্কে যথেষ্ট যাচাই না করে কেন এই অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।[the President “has given in to the Pentagon’s incessant demand of ceaseless war in Afghanistan and linking troop drawdown to conditions rather than an arbitrary timeline”.]

সবশেষে ট্রাম্পের এই প্রসঙ্গে পাকিস্তানকে দেয়া এক হুমকি কথা বলে শেষ করব। ট্রাম্প পাকিস্তানকে অনেকটা ‘ভাল হয়ে যেতে’ বলেছেন। আর বলা বাহুল্য তা শুনে ভারত খুবই খুশি হয়েছে, স্বাগত জানিয়েছে। বিষয়টা হল, হাক্কানি নেটওয়ার্ক এই আফগানি তালেবানদের ব্যাপারে নাকি পাকিস্তান কঠোর না – এই অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা। ব্যাপারটা অনেক পুরানা এবং গভীর। যদিও এপ্রসঙ্গে ভারতের সহজ ব্যাখ্যাটা হল এরকম যে, পাকিস্তান বা এর জেনারেলেরা সব সময় জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেয় সেটা এবার ট্রাম্পও বুঝেছে ও তিনি সরব হয়েছে। কিন্তু খুব সম্ভবত ব্যাপারটা এত সরল না। আর এসব বিষয়ের জট মোকাবোলা করার পথ এটা নয়।  আফগানিস্তানের তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নন-একশন থাকার অভিযোগ তা সত্য হলে খুজে দেখতে ও পরিস্কার করে বুঝতে হবে যে পাকিস্তানের কোন কৌশলগত কারণে ও স্বার্থে সে এমন করছে। এব্যাপারে আমেরিকার স্বার্থ যা তাই পাকিস্তানেরও স্বার্থ হতেই হবে তা ধরে নেয়া ঠিক নয়।  পাকিস্তানের স্বার্থ বলেও তো আলাদা কিছু থাকতে পারে, আছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ ফলে তা থেকে ভিন্ন ভিন্ন ষ্ট্রাটেজি থাকে। তবে চাইলে সেগুলো একসাথে  সমন্নিত করে একটা একই কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব যার ভিতর সবাইকে নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু এই সমস্যা হুমকি দিয়ে মিটবে না। স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ফারাক তো ধমক দিয়ে মিটবে না।  আর আমেরিকার এক পুরান খাসলত হল আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিরোধ আমেরিকা এতদিন পাকিস্তানকে অর্থ সাহায্যের লোভ দেখিয়ে ভুলে থাকতে বলেছিল। কিন্তু  এবার পাকিস্তান সে অর্থও নেয় নাই, স্বার্থও ছাড়ে নাই। মোট বরাদ্দ ছিল ৮০০ মিলিয়ন। এপর্যন্ত ৫০০ মিলিয়ন বতরণের পরে বতর্ক লেগে আর বাকিটা পাকিস্তান নেয় নাই বা আমেরিকা আর ছাড় করে নাই। আর মূল কারণের কথা যা জানা যায় তা হল, পাক-আফগান সীমান্তে  কলোনি বৃটিশ যে ডুরান্ড লাইন টেনেছিল তা নিয়ে আফগান আপত্তি আছে বলে প্রায়ই কথা উঠে।  ফলে তালেবান ইস্যু ঠান্ডা হয়ে গেলে আফগানিস্তান সীমান্ত ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে বিরোধে মনোযোগি হয়ে উঠবে বলে পাকিস্তানের আশঙ্কা আছে। তাই সে আফগান তালেবান পুরাপুরি ঝেটিয়ে বিদায় করতে আগ্রহি নয়। এমন এক ব্যাখ্যা ইনফরম্যালি জানা যায়। ঘটনা যদি এটা হয় তাহলে আমেরিকার উচিত হবে সীমান্ত চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পাক-আফগান বিরোধ নিয়ে কথা তোলা। অন্কাতত একটা মোটাদাগের ডিলে পৌছানোর চেষ্টা করতে মধ্যস্থতার পথে যেতে পারে।   এটা ছাড়া আমেরিকার কখনই পাকিস্তানকে পুরাপরি নিজের ষ্পট্ক্ষেরাটেজির পক্ষে পাবে না। এটা কোনভাবেই পাকিস্তানী জেনারেলদের জঙ্গীবাদ ভালবাসার ব্যাপার নয়।

আবার ট্রাম্প এক মজার আবদার রেখেছেন ভারতের কাছে। বা বলা উচিত আলকায়েদা বা তালেবান ইস্যুটা আমেরিকার কাছে আসলে যে ব্যবসার ইস্যু তাই যেন এতে স্পষ্ট হয়েছে।  ট্রাম্প বলেছে, ভারত আমেরিকার সাথে ব্যবসা করে প্রচুর ডলার কামিয়েছে ফলে আমেরিকা চায় ভারত সে অর্থ আফগানিস্তানে ব্যয় করুক। কিন্তু ভারত আফগানিস্তানে এই ব্যয় কিসে করবে ব্যবসায় না যুদ্ধে? নামকাওয়াস্তে না হয়ে যদি আফগানিস্তানে অর্থপুর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের ব্যয়ের কথা ট্রাম্প বলে থাকেন তাহলে বুঝা গেল ট্রাম্প আসলে সিরিয়াস না। কারণ ভারত সেই সামর্থের অর্থনীতি কোথায়, তা তো সে এখনও নয়। আর যদি ব্যবসা বুঝিয়ে থাকেন তার অর্থ  আফগানিস্তান ট্রাম্পের কাছে আসলে টেররিজমের ইস্যু নয়। ব্যবসার ইস্যু।

মূলকথা ট্রাম্পকে সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আফগানিস্তান তার কাছে কী ইস্যু – টেররিজম না ব্যবসা!  ট্রাম্প ভারতকে সংশ্লিষ্ট করবে ব্যবসায় আর পাকিস্তানকে ধমক দিবে, আবার খোদ নিজে আফগানিস্তানে কেন সৈন্য পাঠাবে এব্যাপারে দিশেহারা নন-সিরিয়াস থাকবে ফলে এগুলা একটাও তো আসলে কোন কাজের কথা নয়। যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের পেটি স্বার্থ ছাড়া, আর কিছু নয়। ফলে স্বভাবতই  ট্রাম্পের আমেরিকার যুদ্ধের নামে আর একবার অনন্ত খরচের মধ্যে জড়িয়ে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। আবার ট্রাম্পকে মনে রাখতে হবে ইরান ও রাশিয়ার সাথে তালেবানদের সম্পর্কে দিনকে দিন ভাল হচ্ছে।  এই আফগানিস্তান অথবা এই তালেবান আর আগের আফগানিস্তান অথবা তালেবান নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২৮ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে

পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে, দুনিয়া মজলুমের পক্ষেই দাঁড়াবে

গৌতম দাস

১৩ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার ০০ঃ০৪

http://wp.me/p1sCvy-2g5

 

ট্রাম্পের সৌদি সফরে (২০-২১ মে ২০১৭) সৌদি ড্যান্সের তিন সপ্তাহের মধ্যে সৌদি আরব আবার খবরের প্রধান শিরোনাম। যদিও এবার সাথে নিয়েছে বা বলা ভাল এবারের সৌদি টার্গেট কাতার। কাতারকে সাইজ করা। সংক্ষিপ্ত করে বললে খবরটা হল, মধ্যপ্রাচ্যের রাজাতন্ত্রী ছয় রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্র-জোট আছে নাম GCC জিসিসি বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল।  কাতার, সৌদি আরব, ইউএই (এটা আবার দুবাই ও আবুধাবিসহ সাত আমির-শাসিত রাষ্ট্র বা আমিরাতের এক ফেডারেশন), ওমান, কুয়েত, বাহরাইন এই ছয় রাষ্ট্রকে নিয়ে জিসিসি গঠিত। হঠাৎ করে গত ৫ জুন ২০১৭ এর খবর হল,  জিসিসির সৌদি আরব, ইউএই, বাহরাইন আর জিসিসির বাইরের মিসর, এই চার রাষ্ট্র কাতারের সাথে সব ধরণের কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা করেছিল। আর, নৌ, আকাশ ও সড়ক পথ ও সীমান্ত বন্ধ করে সব বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।  কাতারি কূটনীতিকদেরকে এই চার রাষ্ট্র, তারা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তাদের প্রত্যেকের রাষ্ট্র ত্যাগ করে চলে যেতে বলেছিল।  প্রাথমিক খবর হিসাবে প্রথম কয়েক ঘন্টা আমরা শুনেছিলাম যে, সরকারি ‘কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাক হয়ে গিয়ে সেখান থেকে সৌদি বাদশাকে নিন্দা করে কিছু খবর প্রচার করা হয়েছিল। তা থেকেই নাকি ক্ষুব্ধ সৌদি প্রতিক্রিয়া এটা। গত ২৩ মে, সেঘটনার ধোঁয়া থেকে সব শুরু। খুব সংক্ষেপে মুল ঘটনাটা বললে, ট্রাম্পের সৌদি সফরের পরের দিন কাতারের আমির শেখ তামিম আল থানি কাতারের মিলিটারি একাদেমি সফর করতে গিয়েছিলেন। সেখানে নাকি ট্রাম্পের ঐ সফর আর সৌদি বাদশার সমালোচনা করে তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন আর সেটাই সরকারী কাতার নিউজ এজেন্সী প্রচার করেছিল। আর এই খবরকে রেফার করে সৌদি আরব ও দুবাইয়ে খবর প্রচার করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পালটা বার্তা দিয়ে কাতারের আমির জানায়, এটা সম্পুর্ণ মিথ্যা। হ্যাকারের হাতে কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাকড হয়ে এটা একটা মিথ্যা খবর প্রচার করা থেকে এটা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা রয়টার নিউজ এজেন্সীকে কাতারী আমীর জানিয়েছিলেন যে তিনি মিলিটারি একাদেমিতে গেছিলেন কথা সত্য কিন্তু তিনি সেখানে কোন বক্তৃতাই সেখানে দেন নাই, অথবা কোন বিবৃতিও দেন নাই।  এদিকে জুনের ঐ ৫ তারিখেই কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমরা আল জাজিরার মাধ্যমে শুনলাম ‘কাতার নিউজ এজেন্সীর ওয়েব সাইট হ্যাকের ঘটনার সাথে – আমেরিকায় দুবাইয়ের রাষ্ট্রদুতের ইমেল একাউন্ট – এর সংশ্লিষ্টতা আছে এর প্রমাণ মিলেছে।  কিন্তু আরও কয়েক ঘন্টার মধ্যে কাতারের বিরুদ্ধে ঐ চার রাষ্ট্রের সরব অভিযোগ যেমন – কাতার নিউজ এজেন্সীর কথিত খবর, কাতারের আমীরের সৌদি বাদশার নিন্দা ইত্যাদি সব ছেড়ে এবার সৌদিসহ অভিযোগকারিরা তাদের ‘আসল’ অভিযোগ দায়ের করতে শুরু করে।

সার কথায় সেসব অভিযোগ হল, কাতার এক “সন্ত্রাসী রাষ্ট্র”, কারণ সে সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়। যেমন বিবিসি [যদিও বিবিসির রিপোর্ট ও ভুমিকা বড়ই তামাসাময়  ও খুবই নিচা স্টান্ডার্ডের। কাতারের আমীরের কোন বক্তব্যই না দিয়ে কেবল সৌদি বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে পুরা স্টোরি তৈরি করে হয়েছে।] তারা কেবল সৌদি বয়ানের উপর ভর করে এসম্পর্কে সৌদি সরকারি এজেন্সীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল,”সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিপদ থেকে সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থসংরক্ষণকে নিরাপদ করতে তারা কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে”। ঐ একই বিবিসি রিপোর্টে আবুধাবিও একই রকম মন্তব্যে জানিয়েছিল, “তারা মনে করে কাতারের দোহা সরকার, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা নিয়ে চলে ও তাদেরকে সমর্থন ও অর্থ দিয়ে তাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে”। অর্থাৎ কে কী প্রচার করেছে সেটা আর প্রসঙ্গ নয়। কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন, অর্থ দেয়া প্রশ্রয় দেয়া ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এটাই আসল ইস্যু, আর তা সামনে এসে গেছে।

কিন্তু কাতার ‘সন্ত্রাসবাদী’, এটা আবার কোন সন্ত্রাসবাদ? কাছকাছি সময়ের ঘটনায় “এই সন্ত্রাসবাদের” স্পষ্ট হদিস রেফারেন্স পাওয়া যায় গত ২০-২১ মে ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরকালে। “ইরান সন্ত্রাসবাদ করে” আর এর বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তৃতা করেছিলেন তিনি। আর এটা বলতেই যেন সৌদি বাদশা তাকে হায়ার করে এনেছিলেন। আর এই সন্ত্রাসবাদ বলতে – প্যালেস্টাইনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও মিসরের ব্রাদারহুড এদের ততপরতাকে ট্রাম্পের আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে। এটা আমেরিকার অনেক পুরানা বয়ান, [যদিও মাঝে “আরব স্প্রিংয়ের চলার সময়” আমেরিকা ও সৌদি আরব উভয়েই ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করা ভুলে গেছিল, বলা যায় সন্ত্রাসী মনে করতে বিরতি বা ক্ষমা দিয়েছিল। তারা ব্রাদারহুডকে মিসরে ক্ষমতায় আনতে একসাথে কাজ করেছিল। যাই হোক, সৌদি আরবের যারে দেখতে নারি তার চলন বাকা ফর্মুলায় আমেরিকাকে অনুসরণ করে যাকে পছন্দ হয় না, হুমকি মনে হয় তার গায়ে সন্ত্রাসীর ট্যাগ লাগায় দেয় তারা। ফলে ইরান সন্ত্রাসী, আর কাতার সন্ত্রাসী। এই “বাড়তি সন্ত্রাসবাদ”  ধারণা, সৌদি আরব ট্রাম্পকে তাল দিতে নিজে দেশে ডেকে এনে উচ্চারণ করিয়ে নিয়েছিল। ইরান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হলে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ রাষ্ট্র + জার্মানি এই (পি৫+১) এরা একসাথে এবং জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যে ‘সন্ত্রাসী’ ইরানের সাথে কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি করেছিল কী করে?

কিন্তু কাতার জিসিসির সদস্য হয়েও এসব প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠনকে, বিশেষ করে হামাসকে সর্বতভাবে সমর্থন করে, তাদের ততপরতার  প্রতি সহমর্মিতা দেখায়, সমর্থন দেয়, আশ্রয় দেয় সহযোগিতা করে। এই সুত্রে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদিদের “সন্ত্রাসবাদের” অভিযোগ। আমেরিকান “সন্ত্রাসবাদ” ধারণাকেও নিজের সংকীর্ণ স্বার্থ মোতাবেক টেনে লম্বা করে নেওয়া।

এখন তাহলে পুরা ঘটনায় একেবারে আসল, মূল বিষয়টা কী? এক শব্দে বললে, বিষয়টা হল, সৌদি রাজতন্ত্রের আয়ু সমস্যা। এখানে রাষ্ট্র বা ভুখন্ড হিসাবে সৌদি আরবের আয়ুর কথা বলা হচ্ছে না। ঐ রাষ্ট্র পরিচালনের সিস্টেম হিসাবে “রাজতন্ত্র” – এর ভবিষ্যত বা আয়ুর কথা বলা হচ্ছে। সম্ভবত আরও সঠিক ভাষ্য হবে – সৌদি রাজ-সরকার নিজের ভবিষ্যত, আয়ূ বা হুমকি প্রসঙ্গে নিজের পারসেপশন বা ধারণা কী সেটাই এখানে মূল ইস্যু বা সমস্যা।

সৌদি আরব মনে করে তার রাজতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ইরান, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরের ইরান। দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ইসলামি জনগোষ্ঠি নিজেদের মাঝে ইসলামের নানা ফ্যাকড়ায় তাদের বিভক্তি বা ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সব জনগোষ্ঠিই তাদের স্ব স্ব রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রথম আর সবচেয়ে কমন অবস্থান হল – কাম্য সিস্টেম হিসাবে তারা রাজতন্ত্রকে নাকচ করা। আর খুবই সহজে ইরান এই কথাটাই তাদের মনে করিয়ে দেবার কাজ করে ফেলতে পারে — এটাই সৌদি আরবের চোখে সবচেয়ে বড় “সন্ত্রাসী” কাজ। সবাই জানেন ইরান সুন্নি নয়, তাসত্ত্বেও হামাস, হিজবুল্লাহ ও ব্রাদারহুডের মত দলের রাজনৈতিক প্রতিরোধ  লড়াই সংগ্রামের প্রতি ইরানের সক্রিয় সমর্থন অবস্থান এটা ইরান মুল্যায়নে খুবই নির্ধারক।  কারও ইরানের ব্যাপারে রিজার্ভেশন থাকলেও তাসত্ত্বেও ইরানের সারা দুনিয়ার মজলুমদের প্রতিরোধ আন্দোলনকে সক্রিয়  সমর্থন দেয় এই কারণে – এই ভুমিকাকে মুসলমানেরা অন্তর থেকে ইতিবাচক মনে করে।

তবে সৌদি আরবের ইরান মুল্যায়ন শেষে তার দ্ব্যার্থহীন অবস্থান হল,

একঃ যে কেউ শিয়া বা সুন্নি যাই হোক, ইরানের সাথে যে কোন ধরণের সম্পর্ক রাখে সে সৌদি আরবের শত্রু। তাকে কোন ধরণের সহানুভুতি বা সমর্থন, অনুমোদন কিছুই দেয়া যাবে না। শুধু তাই নয় তাকে উচ্ছেদ করে দেওয়াতেই সৌদি আরবের শান্তি, এটাই তার নীতি।

দুইঃ সৌদি রাজতন্ত্রের ফাস্ট লাইন অব ডিফেন্স স্বভাবতই তার নিজ সেনা বাহিনী। আর এর পরের বলয় হল জিসিসি; যার মূল পরিচয় এরা সৌদির  মতই মধ্যপ্রাচ্য ভুগোলের রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র। এছাড়া জিসিসি কেবল সাধারণ কোন রাজনৈতিক জোট নয়, বরং এই ছয় রাষ্ট্র নিজেদের সামরিক সক্ষমতাগুলোকে একপাত্রে নিয়ে কমন একটা অবস্থান থেকে পরস্পরকে রক্ষায় তা ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য জিসিসির স্টিয়ারিং হাতে রাখা সৌদি আরব  – মূলত সৌদি প্রভাবে, ইয়েমেনে হুতিদের দমনে কাতারের ভিন্নমত দৃষ্টিভঙ্গী থাকলেও নিজের যুদ্ধবিমান নিয়ে যোগ দিতে সেও বাধ্য হয়েছে। তাতে বিষয়টাতে কাতারের যতই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থাক। আর ওদিকে জিসিসির পরের লাইন অব ডিফেন্স হল, একদিকে অন্যান্য মুসলিম জনসংখ্যা-প্রধান রাষ্ট্রগুলো (তবে খোদ জনগোষ্ঠি নয়, কেবল সরকার) আর অন্যদিকে বড় কুতুব আমেরিকা।

তিনঃ সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন অস্বস্তিকর দুস্থবোধ এনে দিয়েছিল ওবামা, ২০১৪ সাল থেকে। এবিষয়ে আরও বিস্তারিতের জন্য আগের লেখা  এখানে দেখুন।  সে বছর থেকে ইরান বিপ্লবের পরে এই প্রথম প্রকাশ্য সমঝোতায়  ইরান-আমেরিকা ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’ (পি+৫) করার আলাপ শুরু হয়েছিল। যদিও ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের এতদিন পরে ওবামা প্রশাসনের হঠাত এই মতি বদলের পিছনে প্রধান কারণ ছিল ইরাকে আইএস ততপরতা বৃদ্ধি আর তা নিজে সামলাতে গেলে আমেরিকাকে আবার মাঠে আমেরিকান মেরিন নামানোর সিদ্ধান্ত নিতে হত। যে খরচ বিতে সে অপারগ। তাই এই কাজটা সে ইরান এবং ইরান প্রভাবিত ইরাক এবং শিয়া মিলিশিয়া ইত্যাদি দিতে করাতে চাওয়ার আমেরিকান  স্বার্থ এটাই ইরানের সাথে ওয়ার্কেবল সম্পর্ক পাতানোর তাগিদ অনুভবের  মূল কারণ ছিল। তাই ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’  মানে নিউক্লিয়ার অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা সে আর করবে না – এই প্রতিশ্রুতি আর তা মনিটরিং করতে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের উপর থেকে আমেরিকাসহ পশ্চিম এবার সব অর্থনৈতিক অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নিবে এই নিগোশিয়েশন শুরু হয়েছিল। এই সফল নিগোশিয়েশন  আলাপের সমাপ্তিতে গত  ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তা স্বাক্ষরিত ও কার্যকর হয়ে যায়। মনিটরিংসহ নানা শর্ত সাপেক্ষে হলেও এতে অবরোধ তুলে নেওয়াতে ইরান বিরাট শক্তি সঞ্চয় করে আবার ফিরে উঠে আসতে থাকে। অর্থনীতি আবার প্রাণ পায়। আর তাই উলটা দিকে সৌদি আরবের ভালনারেবল অবস্থা ভীতি অস্বস্তি বোধ – সেখান থেকে।  গত ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পরও সৌদি আরব এমন দুস্থ অসহায় বোধ করে নাই। অথচ এই চুক্তির কারণে, ইরানের সাথে আমেরিকার নীতি অবস্থান স্বার্থবিরোধ কিছু কিন্তু মিটে যায় নাই। কেবল একটা একসাথে সহবস্থানের একটা ওয়ার্কেবল অবস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র। যা আবার স্থায়ী নয়, প্রতি বছর মনিটরিং মুল্যায়নের অধীনে ও ভাল রিপোর্ট সাপেক্ষে চালু থাকবে, আছে। তবু এটাও সহ্য করা সৌদি আরবের কাছে অসম্ভব, অগ্রহণযোগ্য।
আমেরিকা-ভিত্তিক ‘সৌদি-আমেরিকান পাবলিক রিলেশন এফেয়ার্স কমিটি’  – এটা এক লবিষ্ট ফার্ম এর নাম। এর সভাপতি  সালমন আল-আনসারি। তিনি তাঁর ক্লায়েন্ট সৌদি আরবের পক্ষে এক ক্ষুব্ধ মন্তব্য করে বলেছেন, “কাতারের আমীর – সন্ত্রাসবাদী ইরান সরকারের পক্ষে তোমার অবস্থান আর কাস্টডিয়ান অব টু হলি মস্ক – তাকে অপমান করেছ। আমি তোমাকে মনে করায় দিয়ে চাই মিসরের মোরসি ঠিক একই কাজ করেছিল আজ সে খতম হয়ে গেছে, জেলে পচতেছে”।   আনসারির এই কথা গুলো খুবই প্রতীকী, সৌদি মনোভাব অবস্থানের আসল প্রতিফলন। এভাবে বলা কথাটা ‘সহি কিনা’ সেটা এখানে একেবারেই বিচার্য নয়।

চারঃ সৌদি আরব যা বলতে চাইছে এর সারকথা হল,  কাতারে বিদেশনীতি আমার চেয়ে ভিন্ন হতে পারবে না। কাতার নুন্যতম ভিন্ন চোখে ইরানকে দেখতে পারবে না।  কাতার সেটা করার চেষ্টা করেছে তাই সে কাতারকে আসলে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ না, কাতারকে সে সাধারণ খাদ্য ও পণ্যেও সরবরাহের বিরুদ্ধে অবরোধ করবে। কোন ব্যবসা করতেও দিব না। আমার কথা না শুনলে এমনকি তোমাকে সরিয়ে তোমার কোন জ্ঞাতি ভাইকেও ক্ষমতার আনার চেষ্টা করব।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল আল-যুবেইর প্যারিস সফরে ছিলেন। সেখান থেকে রয়টারের সংগৃহিত তাঁর বক্তব্য পরের দিন ছয় জুন ছাপা হয়। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে সৌদিদের মনের অনেক কথা বলে দিয়েছেন।  তার সোজা কথা, আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক রাখতে গেলে কাতারকে অবশ্যই হামাস এবং ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ক ছিন্নসহ আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। [Qatar must take several steps, including ending its support for the Palestinian group Hamas and the Muslim Brotherhood, to restore ties with other Arab states.]  তিনি আরও বলছেন, “সন্ত্রাসবাদী চরমপন্ন্থা (এটা বলতে হামাস, ব্রাদারহুড বুঝতে হবে),  হোস্টাইল বা বেয়াদব মিডিয়াকে সোজা করা (আল জাজিরা পড়তে হবে) আর ভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ (এটা বলতে বাহারাইনের আন্দোলনকারিদের প্রতি সহানুভুতি বুঝতে হবে) বন্ধ করবে“ – বিগত কয়েক বছরে আমরা এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলছি আর কাতার তাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন কাতার এগুলো বাস্তবায়ন করেছে আমরা দেখতে চাই”। এই বক্তব্য রয়টার থেকে কোট-আনকোট নেয়া। সরাসরি ইংরাজিটা তুলে দিচ্ছি, “We want to see Qatar implement the promises it made a few years back with regard its support of extremist groups, regards its hostile media and interference in affairs of other countries,” Jubeir told reporters in Paris.

যুবেইরের এসব মন্তব্যের সবচেয়ে মজার অংশ হল, তিনি বলছেন কাতার “প্যালেস্টাইন অথরিটি আর মিসর সরকারকে আন্ডারমাইন” করেছে বা নীচা দেখিয়েছে।  আসলে তিনি বলতে চাইছেন আমাদের ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে অবস্থানের ফলে পরে পাওয়া সুবিধায় মিসরের সিসি এখন আরামে ক্ষমতায় আছে। আর আমরা সেই সুবিধা তৈরি করে দেওয়ার বিনিময়ে সিসির চোখ বন্ধ করা সমর্থন আমাদের পক্ষে পেয়েছি। আসলে  তিনি স্পষ্ট করেই বলছেন, হামাসের নেতা মিশেল অথবা ব্রাদারহুডের কোন নেতা-কর্মীকে ভাত-কাপড়-আশ্রয় কিছু দেয়া যাবে। বাস্তবে আসলে চাপে পড়ে, কাতারের আমীর  অনেক আগেই সবাইকে বের করে দিতে হয়েছে। সম্ভবত এখন ইসলামি স্কলার কারযাভিকেই একমাত্র আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। কিন্তু তাতেও সৌদিরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করতে পারছেন না। বেচারা থানি, তিনি কাতারের আমীর হলেও তার একটা শক্ত নীতি হল, কোন মানুষ সে যেই হোক সে আশ্রয় চাইলে তাকে তিনি ভাত-কাপড় আশ্রয় দিতে নিজের কাছেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু আমীর থানির মেহমানেরা সৌদি চাপে আশ্রয়দাতার দুরবস্থা দেখে আমীর তাদেরকে কিছুই না বললেও  নিজেই নিজের করণীয় হিসাবে কাতার ত্যাগ করে চলে গিয়েছেন।  এরপরেও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঐ বক্তব্য শেষে হুমকি দিয়ে বলছেন,   “সঠিক পথ নিতে কাতারের ‘কমন সেন্স ও লজিক’ জাগবে। আর যদি না হয় তবে আমার মনে হয় না কাতারিরা এর মুল্য পরিশোধ করতে পারবে”। আসলে পুরা পরিস্থিতিতে সৌদি-ইচ্ছার সারকথা এখানে আছে।

কিন্তু বিরাট একটা লিগ্যাল প্রশ্ন আছে। যুবেইরের ফরমাল এই অবস্থান এটা সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, ফলে একারণে সৌদি আরবকেই অভিযুক্ত করা সম্ভব। কাতার কী বিদেশ নীতি নিবে তা করতে বাধ্য করার চেষ্টা এটা কাতারের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন। এছাড়া সৌদি ইচ্ছায় বিদেশনীতি না সাজালে কাতারের বাসিন্দাদেরকে খাদ্য পাণীয়ের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হবে – এটাও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। WTO এর আইন অনুযায়ী না-হক কাজ।  উপরে ম্যাপের ছবির দিকে তাকালে আমরা দেখবে কাতার আসলে ঠিক ল্যান্ড-লকড দেশ নয়। বরং সৌদি আরবের তীরে, পারস্য উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত। ফলে কাতারের চারদিকের প্রায় ৮০ ভাগ  সীমানা এলাকাই উপসাগরের স্পর্শে। অর্থাৎ পোর্ট সুবিধা চাইলে তৈরি করা সম্ভব। আর ২০ ভাগ এলাকা সরাসরি ভুমিতে সৌদি আরবের সাথে সীমান্ত। সম্ভবত নিজ জনসংখ্যা মাত্র ২৩ লাখ (2.235 million (2015) World Bank) বলে নিজ খরচে আলাদা এক্সক্লুসিভ নিজ ভুখন্ডে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে যায় নাই। এর চেয়ে খুবই চালু  গভীর সমুদ্র বন্দর পাশের দুবাইয়ে বলে, সেই পোর্টে মালামাল নামিয়ে ট্রাকে করে সৌদি আরব হয়ে সে পণ্য নিজ দেশে প্রবেশ করে নেয়।  কিন্তু এখন  সৌদি ভুমি দিয়ে ট্রাক প্রবেশ এটাকেই চাপ দিবার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে – এই সুবিধা নিয়ে সৌদি আরব ট্রাক চলাচল আটকে পণ্য পরিবহণে বাধা তৈরি করার সুবিধা নিচ্ছে। যাহোক, তবে দেরিতে হলেও এই পয়েন্টটা তুলে ধরে আল জাজিরা কিছু প্কিরচার রিপোর্ছুট তৈরি করাতে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষন করতে পেরেছে। এমেনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ইস্যুতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তাতে  খোদ ট্রাম্প সৌদি আরবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন।  কাতারে বসবাসকারি দেশি বিদেশি সাধারণ মানুষের স্বার্থে ট্রাম্প নিজেই শিথিলভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আহবান জানাতে বাধ্য হয়েছেন। আসলে এটা ছিল ট্রাম্পের সৌদি সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব থেকে নিজেকে আলাদা করে নেয়া। অর্থাৎ আইন লঙ্ঘনের দায় তিনি সৌদিদের কাধে ফেলায় দিলেন। ট্রাম্প এটা কেন করলেন? কারণ ইতোমধ্যে তিনি এক বিরাট কেলেঙারির

পাঁচঃ ট্রাম্পের আমেরিকা; অনেকেই বিভ্রান্ত আমেরিকার অবস্থান ঠিক কোথায়? এনিয়ে। হা ট্রাম্প, নিজ অবস্থানের সবচেয়ে উপর পর্দা দিয়ে সেটা বিভ্রান্ত করে রেখেছেন। সব আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা আমেরিকান রাজনীতিতে   “লবি ব্যবসা” (বিভিন্ন বিদেশী রাষ্ট্রের স্বার্থে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রশাসনে লবি করে দেওয়ার জন্য ভাড়া খাটার ব্যবসা”) এর স্বার্থের ভিতরেই বসবাস করেন ও আর এর মধ্যেই কাজ করে থাকেন। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে সেটা খুবই এক বাড়াবাড়ি জায়গায় গিয়েছে দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের দোস্ত-বেরাদরেরা  বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে  লবির ফি এর নামে কমিশন নিয়েছেন (আমেরিকান আইনে এটা আইন বিভাগের রক্ষিত খাতায় নিজে গিয়ে লিখিত বলে দিতে হয় এবং তাহলে এটা আর অবৈধ না। ইতোমধ্যে ১৪০ মিলিয়ন ডলারের কাহিনী আমরা নিইয়র্ক টাইমসে দেখেছি।)  এমন দোস্ত-বেরাদরেরা ট্রাম্পের একদম চারপাশে ও কোলের মধ্যে বসে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেজন্য  এমনকি মনে হয়, ট্রাম্প তাঁর মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকেও বলে দিয়েছেন যে, এডমিনিষ্ট্রেশনের অবস্থান-বক্তব্যেরও থেকে দূরে তিনি ভান করে কখনও কখনও সরে যাবেন, কখনও ভুয়া কথার কথায় “লিপ-সার্ভিস” দিবেন। যেন ট্রাম্পের দোস্ত বেরাদরেরা যে ফি নিয়েছেন তা কাভার দিয়ে যায়েজ করে নিতে পারেন – তা বলে দিয়েছেন তিনি। তবে  মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকে তিনি বলতে চাচ্ছেন  কিন্তু তাসত্ত্বেও তোমরা তোমাদের এডমিনিষ্ট্রেশনের মুল অবস্থান-বক্তব্যের মধ্যেই থেকে যাবা, কাজ করে যাবা। এখানে মজার কথা হল, এতদিন আমেরিকান রাজনীতির ভোকাবুলারিতে – ‘এডমিনিষ্ট্রেশন’ বলতে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির ফরমাল নীতি-অবস্থান বুঝাত। যেমন ‘ওবামা প্রশাসন’ কথাটার মানে ওবামার নিজের কথা আর তাঁর আমলা, নীতি-নির্ধারকদেরসহ সবারই ফরমাল অবস্থান – এটা  বুঝাত। তবে যদিও এই ফরমাল অবস্থানের নিচে আবার ‘আন্ডারকারেন্ট’ হিসাবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর পেন্টাগণের অবস্থানের লড়াই ঝগড়ায় খুচরা নানা অবস্থান ভিন্নতাও থাকতে দেখা যেত। কিন্তু এখন ট্রাম্পের আমলে এসে আমরা দেখছি,  ট্রাম্পের বক্তব্য (লিপ সার্ভিস) আর ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান-বক্তব্য এই দুটা এক নাও হতে পারে। ফলে ট্রাম্প – এটা ভুয়া কথা বলে লবি ব্যবসা ধরার এক স্বর্ণযুগ তৈরি করেছেন বলা যায়।
তাই এর আরেক তামাসার দিকটা হল, সৌদি আরবেরও সেটা অজানা নয়। তাঁরা ট্রাম্পের লিপ-সার্ভিসও জেনে শুনে কিনতে চায়। সেটাই তাদের কাছে নাকি অনেক। গত মাসে ট্রাম্প সৌদি সফরে এসে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” – এই ফাঁপা বাড়তি বা এক্সটেনডেড মিথ্যা সংজ্ঞা আউড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অথচ এটা আমেরিকা প্রশাসনের অবস্থান নয়। যেমন ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যেই ওবামা আমলের শেষ বছরে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সাথে করা ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ – এটা “সঠিকভাবেই চুক্তির শর্ত মোতাবেক কোন ব্যার্তয় না ঘটিয়ে” আগিয়ে যাচ্ছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারশনের লিখিত স্বাক্ষ্য- রিপোর্ট তিনি কংগ্রেসকে  জানিয়েছেন ইতোমধ্যেই। অর্থাৎ নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের যে চাপাবাজি ছিল যে নির্বাচিত হলে তিনি ‘ইরান ‘নিউক্লিয়ার ডিল’  বাতিল করে দিবেন। কিন্তু তিনি এখন ইতোমধ্যেই ঐ চুক্তি “ঠিকঠাক” চলছে, মানে তিনি এটা গ্রহণ করেছেন বলে স্বাক্ষ্য-রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছেন কংগ্রেসকে।
ফলে ট্রাম্পের ইরান বিরোধী চাপাবাজি নির্বাচনের আগের অবস্থান যাই থাক তিনি এখন ওবামার ইরানী “নিউক্লিয়ার ডিল” সহি বলে অনুমোদন করে দিয়েছেন। এটা গত ১৮ মে এর খবর। তাই, ২০ মে সৌদি আরবে গিয়ে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” বলে যা কিছু চাপাবাজি করেছেন সেটা তাহলে আসলে লিপ সার্ভিস ছাড়া কিছু ছিল না। আর এটাই সৌদি আরব ‘কিনেছে’।

এমনকি কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার পর সৌদি আরব আবার লিপ সার্ভিস কিনতে এসেছে, দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের এবারের চাপাবাজি হল তিনি টুইট করছেন আর এই ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিজে নিবার চেষ্টা করছেন।  টুইট করতে আমোদ পাওয়া ট্রাম্প এক টুইট করে  বলছেন যে, “আমার সৌদি সফর ফল দেওয়া শুরু করেছে। কাতারের দিকে আঙ্গুল তুলে টেররিষ্ট ফান্ডিং এর বিরুদ্ধে তারা সবাই শক্ত অবস্থান নিয়েছে, অচিরেই টেররিজমের ভীতিকর দিন শেষ হবে”। “So good to see the Saudi Arabia visit with the King and 50 countries already paying off. They said they would take a hard line on funding extremism, and all reference was pointing to Qatar. Perhaps this will be the beginning of the end to the horror of terrorism!” Trump wrote on Twitter.     একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কত নিচে নামতে পারে এর উদাহরণ হয়ে থাকল এটা। কিন্তু এটাও ট্রাম্পের নীচা হবার শেষ নয়। তিনি ঐদিক শুধু টুইট নয়, বক্তৃতা করে বলেছিলেন, কাতারকে নাকি টেররিজম ফাইন্যান্সিং করে আর এটা তাকে ছাড়তেই হবে। কিন্তু পরের দিনই তার একেবারে উলটা মুর্তি। সিএনএনের ভাষায় অলিভ গাছের ডাল মাথায় বেধে নিয়ে (এটা শত্রু বা বিরোধীকে ইঙ্গিত দেয়া যে বিরোধীর সাথে আপনি এখন আপোষ করতে চান।) ট্রাম্প কাতারের আমীরকে ফোন করেছেন। নানান মিঠা কথা বলেছেন কারণ এক বিলিয়ন ডলার খরচ করে বানানো ঐ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আমেরিকান সামরিক ঘাটি আছে কাতারে। এছাড়া আর এক কারণ হল, ঐদিক তিনি যখন কাতারকে ধুয়ে ফেলতেছিলেন, সৌদিদের কোলে উঠে প্রশংসা করতেছিলেন, ঠিক সেই সময় তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলার সন ঠিক তার উলটা কথা বলছিলেন, যে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বে আরবদের অবরোধ শেষ করা উচিত কারণ এতে ঐ “সামরিক ঘাটির ততপরতা ব্যহত হচ্ছে”। অর্থাৎ টিলারসন কাতার ক্রাইসিস থেকে আমেরিকাকে নিউট্রাল জোনে নিতে চাচ্ছেন। আর ট্রাম্প সেখানে কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিচ্ছেন। এই স্ববিরোধীতা সামলে নিতে, বেকুবি আড়াল করতে ট্রাম্প তাই মিষ্ট কথায় ফোন করেছেন কাতারের আমীরকে। এছাড়া রয়টার্স লিখছে,  ট্রাম্প যখন কাতার ইস্যুতে এভাবে আরবদের পিঠ চাপড়াচ্ছিলেন, পেন্টাগন ঠিক তখন  কাতারের সাথে ফোনে ছিলেন আর প্রশংসা করছিলেন যে, “কাতার সরকার আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে কাতারে আমেরিকান সামরিক ঘাটির হোস্ট হিসাবে নিরলস খেদমত করে যাচ্ছেন আমরা এর প্রশংসা করি”। এভাবেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাতারি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে আমেরিকান মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন। [U.S. Defense Secretary Jim Mattis spoke on Tuesday by phone with his Qatari counterpart, a Pentagon spokesman said, without disclosing the details of their discussion] রয়টার্স আমেরিকান এক কূটনৈতিকের বরাতে জানাচ্ছে, “ট্রাম্পের টুইট একটু অস্বস্তিকর হলেও আমেরিকা নিরবে সৌদি আর কাতারের উত্তেজনা ঠান্ডা করার পক্ষে কাজ করছে কারণ কাতার আমাদের কাছে সামরিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপুর্ণ”।

এই হল লিপ সার্ভিসের কথা। তবু কাতার সরকারকে সৌদিরা উঠিয়ে ফেলে দিতে পারে, নিজ পছন্দের যে কাউকে আমীর বানাতে পারে। এককথাট বললে সৌদিরা কাতারে সামরিক হস্তক্ষেপ করে বসতে পারে সে সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু, তা মিটিয়ে নষ্ট করে দিয়েছে তুরস্কের এরদোগান। প্রথম দিন তিনি এক বিবৃতি দিয়ে বয়ানে নিজের পক্ষে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেন। বলেন যে কাতারের বিরুদ্ধে ‘টেররিজমের অভিযোগ সত্য’ হলে তিনি নিজেই আগে ব্যক্তিগতভাবে আমল ও হস্তক্ষেপ করতেন। [ “Presenting Qatar as a supporter of terrorism is a serious accusation,” the Turkish leader said. “I know [Qatar’s leaders] well and if that had been the case, I would have been the first head of state to confront them.”] অর্থাৎ তিনি আসলে বলছেন, টেররিজমের অভিযোগ ছাড়েন, কাতারকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে আমি দিব না।

এটাকে বলা যায়, সৌদিরাই কী দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির প্রধান নেতা হবেন? নাকি নাকি তিনি কেউ নন?  – এই প্রশ্নে এরদোগানের জিত হয়েছে। তিনি আসলে বলেছেন আমি দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির মনঃকামনা পুরণের নেতা।  আর তাই পরেরদিন তুরস্ক ২০১৪ সালের এক চুক্তি মোতাবেক কাতারে এক সামরিক ঘাটি স্থাপন করেছে, জানতে পারি।  তুরস্কের পার্লামেন্ট এটা অনুমোদন দিয়েছে।  আর এটাই সম্ভাব্য যে কোন সৌদি সেনা পাঠানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এক বিরাট ডিটারেন্ট, পাল্টা অবস্থান যা সৌদিদের যে কোন গোপন-প্রকাশ্য ইচ্ছাকে একাবারে নাকচ করে ফেলেছে। তাই এক কথায় বলা পরিস্থিতি এখন স্টেলমেট। অর্থাৎ গায়ের জোর বা সামরিক মাসল দেখানোর আর সুযোগ নাই। এখন খুব সম্ভবত পরিস্থিতি বাতচিত ডায়লগ এই লাইনে আগাবে ও শেষ হবে – বিবদমান সবপক্ষের জন্য এটাই একমাত্র খোলা পথ।  ওদিকে জার্মানীর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক সাক্ষাতকারে ট্রাম্পকে কাতার পরিস্থিতির জন্য এক হাত নিয়েছেন। তিনি অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করাসহ ট্রাম্পের এই নীতিকে কঠোর সমালোচনা করেছেন। এটাও কম তাতপর্যপুর্ণ নয়।

খুব সম্ভবত সৌদিদের হার এখন ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকবে। রাশিয়া সফররত কাতারি পররাষ্ট্র মন্ত্রী (সন্তান থানি) যখন মিডিয়া সাক্ষাতে বলেন “হামাস রাজনৈতিকভাবে এক বৈধ  প্রতিরোধ আন্দোলন” – এই বয়ানের ওজন ভয়ানক। মজলুমের পক্ষে দুনিয়াব্যাপী মুসলমান জনগোষ্ঠি এই বয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে ও যাবে, যা অপ্রতিরোধ্য।

এঘটনায় সবচেয়ে বড় সুযোগ এসেছে সৌদি বাদশার। তিনি চাইলে ছেলের বুদ্ধিসুদ্ধির ব্যাপারে কিছু শিক্ষা নিতে পারেন। নাকি ২০৩০ সালে সব শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে চান! আমরা অপেক্ষা করব হয়ত দেখার জন্য।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]