ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

গৌতম দাস

২ জুন ২০১৮, ০০:০৩, শনিবার

https://wp.me/p1sCvy-2rS

 

 


Illustration: Ajit Ninan, Times of India – মোদীও সওয়ার হওয়ার কথা ভাবছেন!

 

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের পয়লা টার্গেট ছিল চীন, তবে সেই সাথে দ্বিতীয় বা সহ-টার্গেট ছিল ভারতও। এই নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমেরিকা হয়ে পড়ে একা। অন্যদিকে, এই নতুন পরিস্থিতি চীন-ভারতকে কাছাকাছি এনে ফেলেছে। উল্টো করে বলা যায়, আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতির খেদমতে ও সমর্থনে ভারতেরও আর আমেরিকান ঐ নীতি পো-ধরে আগিয়ে চলার  বাস্তবতা লোপ পায়। ফলে মোদী ও ভারতের চীন নীতিও আমূল বদলে যাচ্ছে। আগে যতই উসকানিমূলক অবস্থান থাকুক না কেন, ভারত এবার থুক্কু বলে সব ভুলে চীনের সাথে সহযোগী সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবেই ২৭ এপ্রিল মোদির চীন যাত্রা ঘটেছিল। চীনে মাওয়ের অবসর যাপনের শহর য়ুহানে (Wuhan), চীন-ভারত “ইনফরমাল শীর্ষ সামিট” বা মোদী-জিনপিং এই দুই শীর্ষ রাষ্ট্র নির্বাহীর অনানুষ্ঠানিক কিন্তু ওজনদার ও গুরুত্বপূর্ণ আলাপের শুরু হয় সেখান থেকে।

ট্রাম্পের আমেরিকা হল এখন এক ‘একাকী আমেরিকা’ হতে রওনা দিয়েছে। এই অবস্থায় মানে “এন্টি গ্লোবাইজেশন” আর “সবার আগে আমেরিকা” এ দুই নীতিতে চলে যাওয়ার পর চাইলেও আর ভারতের পক্ষে আমেরিকার কোলে বসে আর কোনো কৌশলগত বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগের মতো চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া উদীয়মান ভারতের অর্থনীতির প্রবল ও বিপুল বিনিয়োগ চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও দেখা গেল, আমেরিকা এক্ষেত্রে ভারতের জন্য দরকারি কেউই না। অথচ চীন-ভারত সম্পর্ককে মোদী সংঘাতময় করে ফেলে রাখা সত্ত্বেও চীনই ছিল ভারতের জন্য একমাত্র উপযুক্ত বিনিয়োগদাতা। ফলে য়ুহান সম্মেলনে অন্তত ভারতের বিনিয়োগ সম্পর্কের দিক বা বিনিয়োগ প্রয়োজনের গুরুত্ব মোদি ভালোভাবেই বুঝেছিলেন।

গত ২৭ এপ্রিল ভারত ত্যাগের আগে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, এই সম্মেলন থেকে ‘চীন-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জোরদার করা’ তার বিশেষ লক্ষ্য। [“Modi stresses on strengthening economic ties]

আগামী বছর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা ক্ষমতার নির্বাচন। ফলে ক্ষমতার আকাঙ্খী বিরোধী অপর দল কংগ্রেসে এবার মা সোনিয়া গান্ধী ছেলে রাহুল গান্ধীকে দলের নতুন নেতা করে নামিয়েছেন। রাহুলও তৎপর হয়ে প্রায় প্রত্যেক ইস্যুতেই প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আক্রমণ ও সমালোচনা করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে চলেছেন। ফলে মোদীর য়ুহান যাত্রার আগেও ব্যতিক্রম করেননি। কিন্তু হায়! গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অভিমুখ সম্পর্কে রাহুল গান্ধীর মত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্ভবত যথেষ্ট সচেতন হন নাই, হোমওয়ার্ক করেন না – এমন আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করলেন রাহুল এক টুইট বার্তা দিয়ে। য়ুহান যাত্রার প্রাক্কালে তিনি মোদীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে লিখলেন – তিনি যেন “ডোকলাম ইস্যু” ও “চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তির” কথা তুলে ধরতে ভুলে না যান।

এর সোজা অর্থ মোদি-জিনপিং শীর্ষ বৈঠকের পিছনের কথা বা ব্যাকগ্রাউন্ড এবং গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে এই সম্মেলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং ভারতের অর্থনীতির জন্য তা কেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ আশীর্বাদ হয়ে আসবে সেসব সম্পর্কে একেবারেই বেখবর রাহুল। প্রথমত, মোদির কাছে বা ভারতের দিক থেকে এই সফর হল বিগত দুই বছরে চীন-ভারতের সম্পর্ক যে সঙ্ঘাত ও বৈরিতার পথে চলে গিয়েছিল, তা ছেড়ে পারস্পরিক সহযোগিতার পথে উঠে আসার জন্য ভারতের সুযোগ নেয়ার সফর। ফলে এই সফর থেকে ভুটানের ডোকলাম সীমান্ত নিয়ে নতুন করে সঙ্ঘাত তুলে আনা কোনোভাবেই মোদির বা ভারতের লক্ষ্য নয়। বরং ডোকলামের সঙ্ঘাত যা মূলত ডেড ইস্যু যা মোদী শেষে সফলভাবে চাপা দিতে পেরেছিল; চীনের সাথে কোনো বড় সঙ্ঘাতের দিকে তা চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল, এটাই মোদীর বিরাট অর্জন ছিল। ফলে ডোকলাম ভারতের কাছে, অন্তত মোদীর জন্য কোন অমীমাংসিত ইস্যু নয়, ভালভাবে ও কমপক্ষে আপাত হলেও মীমাংসিত ইস্যু। অথচ রাহুল মোদীকে ডোকলাম ইস্যুতে চীনের সাথে আলাপ তুলে পুরান ঘা খোঁচাখুচি করতে মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

[Congress president Rahul Gandhi said the PM looked tense in the live TV feed of the China visit. “Saw the live TV feed of your “No Agenda” China visit. You look tense! A quick reminder: 1. Doklam. 2. China Pakistan Economic Corridor passes through PoK. That’s Indian territory. India wants to hear you talk about these crucial issues. You have our support,” Rahul Gandhi said on Twitter.]

রাহুল দ্বিতীয় প্রসঙ্গ তুলছেন, চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তি নিয়ে। এই দাবিও অপ্রাসঙ্গিক। মোদী য়ুহান সামিটে যাচ্ছেন মূলত চীন-ভারত সামগ্রিক অর্থে অর্থনৈতিক ও বিশেষ করে বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে এর ভিত্তিমূলক আলাপ করতে। বোঝা যাচ্ছে, এর খবর রাহুলের কাছে নেই। মোদীর এই উদ্যোগ সরকার বিরোধী নেতা বলে রাহুলের তো তা ভন্ডুল করে দেয়া বা বেখবর থাকা কোন দায়ীত্ববান লোকের কাজ না।  অথচ তিনি ভেবেছেন যেন মোদী চীন যাচ্ছেন চীন-ভারত সীমান্ত বিতর্কে কোনো অমীমাংসিত ইস্যুতে ভারতের স্বার্থ আদায় করতে। দেখা যাচ্ছে রাহুল তো ইস্যুই বুঝেন নাই!

আসলে চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এক বিনিয়োগ প্রকল্প। এটা মূলত চীনের নিজের স্বার্থের অবকাঠামো প্রকল্প। পশ্চিম বা দক্ষিণ-পশ্চিম চীন যেটা পাহাড় পর্বতমালায় পুরোপুরি ল্যান্ডলক্ড অবস্থায়; সেই অঞ্চলকে  গভীর সমুদ্রবন্দরে প্রবেশসহ সব আবদ্ধতা ভেঙে ফেলে উন্মুক্ত করার অবকাঠামো প্রকল্প। এটা পাকিস্তানের উত্তর-দক্ষিণ বরাবর পুরা পাকিস্তানের বুকচিরে চলা এক হাইওয়ে যোগাযোগব্যবস্থা, যার একদিকে গভীর সমুদ্র বন্দর গোয়াদর আর অন্য প্রান্তে শেষে এটা চীনের অবরুদ্ধ পশ্চিম চীনের ভেতরে পর্যন্ত ঢুকে গেছে। এ ছাড়া এটাই চীনের ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিআরআই (BRI) এর অংশ; যা দুনিয়ার ৬৫টি রাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে এমন অবকাঠামো প্রকল্প।

ভারত এই প্রকল্পে অংশ নিতে চায় না – একথা বলে ভারত এখন নিজের দাম বাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টার মোডে আছে; এই স্তরে আছে। এরই অজুহাত হিসেবে ভারত এখন এক নন-সিরিয়াস অভিযোগ তুলে রেখেছে যে এই করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে গেছে। আর ভারতের চোখে কাশ্মীর এক বিতর্কিত ভূমি এবং দাবি যে কাশ্মীর পুরোটাই ভারতের। ফলে এই সুত্র এটা ভারতের সার্বভৌমত্বের রক্ষার প্রশ্ন। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এই আপত্তি তুলে রেখেছে সত্য কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার মনের আসল ইচ্ছা হল, ভারতকে বিআরআই (BRI) প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে চীন ভারতকে আরো কী কী ছাড় ও সুবিধা দেয় তার দরকষাকষি করা। এ ব্যাপারে চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন অশোক কান্থা; তিনি অবসরে যাওয়ার পরে গণমাধ্যমে নিজেই এক বয়ান দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্ষমতাবান ‘ক্রমবর্ধমান ধেয়ে আসা চীনের প্রভাব’ মোকাবেলা করাই হলো ‘ভারতের কূটনীতির জন্য আগামীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’। আর এই কাজে চীনকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দিতেই ভারত বিআরআই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত না হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। [……”how to deal with an increasingly assertive China… in an uncertain, fluid international environment, this is going to be possibly the biggest challenge in India’s foreign policy in years to come,” ]

তিনি মূলত বলেছিলেন BRI/OBOR প্রকল্পে যোগ দিলে ভারত চীনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে যাবে। তাই ভারতের যোগদানের সম্ভাবনা নাই। [……joining OBOR, which is going to have strategic agenda for China, as a junior partner is highly unlikely for India. It might work for smaller countries, but for India it is a difficult proposition,”]

এই কথাগুলো কান্থাসহ প্রো-আমেরিকান ধারার আমলারা যখন বলছিলেন, ভারত আমেরিকায় ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি নিজ ভর্তুকির পণ্য রফতানির সুযোগ তখনও বজায় ছিল। বিনিময়ে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতি নিজেরও নীতি, ভারতকে এটা আমল করে নিজ মুকুটে পালক হিসেবে লাগিয়ে রাখতে হয়েছিল। অশোক কান্থাসহ আমলাদের এই আমেরিকান ধারা এখন পরাজিত বলেই গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে চীন-ভারত য়ুহান সম্মেলন হতে পেরেছিল। বোঝা যাচ্ছে কংগ্রেসের রাহুল একেবারেই এতই নাদান যে বাস্তবের এসব ঘটনার কোনো ন্যূনতম তথ্যও তার কাছে নেই। তাই তিনি চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের সার্বভৌমত্বের আপত্তি নিয়ে কথা বলতে মোদীকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। যেন মোদী চীন সফরে যাচ্ছিলেন, পাকিস্তান অংশের কাশ্মীরে ভারতের নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই করতে।

ভারতের আরেক রাজনীতিক কাপিল সিবাল। তারও দল হল, সোনিয়া-রাহুলের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। মূলত তিনি দিল্লির চাঁদনী চক নির্বাচনী এলাকা থেকে সাধারণত নির্বাচনে দাঁড়ান। কিন্তু গত ২০১৪ সালের কেন্দ্র-নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে দাড়িয়ে হেরে গিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি ভারতীয় সংসদের দ্বিতীয় কক্ষ, রাজ্যসভার সদস্য। পেশাগতভাবে তার মূল পরিচয় মূলত তিনি হলেন দিল্লি সুপ্রিম কোর্টের উকিল, যিনি দিল্লি বার অ্যাসোসিয়েশনের তিনবারের সভাপতি। বিগত কংগ্রেস সরকারের দুই টার্মের তিনি অনেক মন্ত্রণালয়ের যেমন আইনমন্ত্রী, টেলিকমমন্ত্রী, মানবসম্পদমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। তাকে কংগ্রেসের সিনিয়র রাজনীতিবিদদের একজন মানা হয়।
কাপিল গত ২১ মে টাইমস অব ইন্ডিয়া নিজের এক মতামত ছেপেছেন। এটা ছিল টাইমস অব ইন্ডিয়ার ব্লগে কাপিল সিবালের লেখা। এই লেখাটাকে পড়া যেত হয়ত রাহুল গান্ধীর তথ্য ও চিন্তার খামতি পূরণের একটা উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু তা যায়নি এ জন্য যে, এটা কাপিল সিবালের ব্যক্তিগত মতামত বলে উল্লেখ করেই ছাপা হয়েছে।

কাপিলের এই লেখা বরং মোদিকে সার্টিফিকেট দেয়া বা এগিয়ে যেতে বাহবা দেয়া বলে মনে করা যায়। যেমন শিরোনামটাই তেমন বিনয়ের যদিও তা খোঁচা দেয়ারও। [Modi gets real on China: Wuhan summit demonstrated that a weak economy gives India few cards to deal]

এতদিন আমেরিকার কথায় নেচে ফাঁপা হামবড়া দেখানো যে ভুল ছিল কাপিল তা স্বীকার করছেন। কিন্তু স্বীকার করেও এর দায় কেবল মোদীর ওপর ফেলতে চাচ্ছেন। বাংলায় কাপিলের লেখার শিরোনামটা হল, “আসল চীনের সামনে মোদী এখন বুঝছেঃ য়ুহান সম্মেলন দেখাল নিজের দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে চীনকে মোকাবেলা করতে যাওয়া ভারতের হাতে কার্ড খুব কমই আছে”। মোদী এখন বুঝুক – টাইপের কাপিলের এই বয়ান পুরাপুরি অন্যায্য। যেন মোদী একাই আমেরিকার প্ররোচনায় চীনের সাথে মিথ্যা হামবড়া করে বা এমন হামবড়া দেখিয়ে চলেছিল। অথচ সোনিয়া-প্রণবের কংগ্রেসের আমলেও (২০০৪-১৪) চীন মোকাবেলার ক্ষেত্রে তারাও কি আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর উসকানিতে’ তাল দিয়ে একই মিথ্যা হামবড়া করে চলেনি? আর কাপিল কি সেই দুই টার্মের কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রী ছিলেন না? তাহলে একা মোদীকে দায় দেয়া কেন?

যা হোক কাপিল তার লেখায় এবার সোজা দেনা পাওনার আলাপে চলে এসেছেন। বলছেন, “বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, বার্মা, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা – এসব দেশে চীন প্রায় দেড় শ’ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভারতের অর্থনীতিতেও প্রধান সেক্টরগুলোতে চীন আমাদের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ করবে। আমাদের ১৮টা বড় শহরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে সব বিনিয়োগ চীনাদের”। ইত্যাদি সব কথাই আছে সেখানে।
কিন্তু এবার তিনি এক মজার আলাপ তুলেছেন।  চীনের বিরুদ্ধে কংগ্রেস সরকার যেসব অভিযোগ করত বা এখনো যেসব অভিযোগ, তিনি তার সব ফিরিয়ে নিচ্ছেন আর মোদীকেও তা ফিরিয়ে নিতে সুপারিশ করছেন। এটাই খুবই ইন্টারেস্টিং, স্রোত বদলের সরাসরি ইঙ্গিত।  “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে” – এই শিরোনাম দিয়ে তিনি এক তালিকা দিয়েছেন।

বলছেন, “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে”।
“চীন কখনো পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব ছাড়বে না। জাতিসঙ্ঘের উচ্চ আসনে চীনারা আমাদের প্রার্থিতা সমর্থন করবে না। [এই কাগুজে প্রার্থিতা  চীনের সমর্থন করার কোন কথা কোথায় হয় নাই। বুশ_ ওবামা দুজনের আশ্বাস দিয়েছিল। ] আবার নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে সদস্য হিসেবে ঐ সংগঠনে আমাদের অন্তর্ভুক্তি চীনারা মেনে নেবে না। আমাদের বাজারে চীনের প্রবেশাধিকার থাকলেও প্রতিদানে আইটি সেক্টরসহ তাদের বাজারে আমাদের তারা প্রতিদান দেবে না। যদিও চীনারা সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে আমাদের তৈরী ওষুধ চীনা বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। এরকম অনেক তালিকা আছে। কিন্তু এখানে মূল কথাটা হলো, নিজে মেনে নেয়া এবং সবাইকে মেনে নিতে সুপারিশ করা”।

আসলে ব্যাপার হল, এগুলো চীনের বিরুদ্ধে ঠিক ভারতের তোলা অভিযোগ নয়। বরং ভারতকে আমেরিকার দেয়া মিথ্যা আশ্বাসের তালিকা। যেমন জাতিসঙ্ঘ বা সাপ্লায়ার্স গ্রুপে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে দেবে, এই আলাপ ছিল ভারতকে দেয়া আমেরিকার মিথ্যা আশ্বাস।  আসলে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বও ছিল এতটাই নাদান যে, তারা এটা বিশ্বাস করেছিল। ধরে নিয়েছিল আ-মে-রি-কা; এই আমেরিকা চাইলে সবই যেন সে কাউকে দিতে পারে। তবে মূল কথা কাপিলের এসব বক্তব্য তাদের দলের নাদান সভাপতি রাহুলের বক্তব্যের চেয়ে অনেক বাস্তবে পা দিয়ে চলা – এমন কথা। অন্তত বক্তব্যের পটভূমি বুঝে তিনি কথা বলেছেন।

তবে এই প্রসঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশেষ করে আমাদের কাকাবাবু প্রণব মুখার্জির গ্লোবাল ইতিহাসবোধের উদাহরণ না তুলে ধরে পারছি না। বুশ এবং ওবামার আমলেও  (বিশেষ করে ২০০৯ সালে ওবামা ক্ষমতায় আসার পর) ভারতকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার সদস্যপদ ভারতকে এনে দেয়া হবে। আর প্রণব মুখার্জির মত নীতি নির্ধারকেরা তা বিশ্বাস করেছিল। এমনকী ভেটো ক্ষমতা পেলে সবার আগে পাবার সম্ভাবনা একালে মার্কেলের জার্মানী। সেই জর্মানি রাষ্ট্রও কেমন (P5+1) হয়ে ঝুলে আছে সেটাও লক্ষ্য করতে ভারত ভুলে গেছে। আর এর চেয়েও বড় কথা হল কেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে ভেটোক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাব করে, এর জন্ম দিতে হয়েছিল সে ইতিহাস জানলে যে কেউ বুঝবে কেন এখন পাঁচ ভেটো ক্ষমতাধর সদস্য একালে বাড়াতে যাবার সোজা মানে হল রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একক ক্ষমতাধর আমেরিকা এখন একালে আর  সেই ক্ষমতাধর নয় অথবা কখনই ফিরে আসবে না। ফলে রাষ্ট্রসংঘ পুনর্গঠনের মুরোদ আর আমেরিকার নাই। আগামিতে ঠিক কার বা কার কার এই মুরোদ হতে পারে সবটাই আবছা। এছাড়া “রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন” এর জন্য কী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটবার প্রয়োজনীয় পুর্বশর্তের মত এবারও একটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগবে, তাই কী! বিশেষত যখন আমেরিকার এক নম্বর ক্ষমতাধর জায়গা থেকে বিদায়ের আলামত চারিদিকে ফুটে উঠেছে। অথচ সেই ঢলে যাওয়া লোলচর্ম  আমেরিকার পকেটেই যেন গ্লোবাল ক্ষমতা ধরা আছে এই হল কাকাবাবুদের গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে রিডিং।

তবে আসল তামাশার কথা বলাটা এখনও বাকি। গত ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি শেষ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রথম ভারত সফর করেছিলেন। সেখানে হাসিনাকে দিয়ে পঞ্চাশেরও বেশি পয়েন্টে হাসিনাকে দিয়ে স্বাক্ষরিত এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল। ওর ৪৭ নম্বর দফা ছিল এরকমঃ

Responding to the Prime Minister of India, the Prime Minister of Bangladesh conveyed her country’s support in principle for India’s candidature for the permanent membership of the United Nations Security Council as and when the reform of the UN Security Council is achieved. Bangladesh conveyed its support to the Indian Candidature for a non-permanent seat in the UNSC for the term 2011-2012. India also conveyed its support to the Bangladesh’s candidature for a non-permanent seat in UNSC for the term 2016-2017.

অর্থাৎ ঐ ঘোষণার ৪৭ নম্বর পয়েন্ট ছিল এরকম, “বাংলাদেশ ভারতের ভেটো সদস্যপদের দাবি সমর্থন করছে”। মানে বাংলাদেশকে দিয়ে যা মনে চায় তাই স্বাক্ষর করে নেয়া যায় বলে কাকাবাবু এটাও ছাড়তে রাজি হয় নাই। তার কোন মুল্য থাক আর নাই থাক। যদি লাইগা যায়! আসল কথাটা হল রাষ্ট্রসংঘের ভেটো সদস্যপদ ভারত আমেরিকার কাছে আবদার করেছিল। অথচ এটা আমেরিকার কাছে আবদার করে পাবার জিনিষ নয়, আমেরিকাও তা একক ইচ্ছায় কাউকে দান করার কখনই কেউ নয়, কেউ ছিলও না। এটাই কাকাবাবুরা বুঝেন না!

এবার সবশেষে সুবীর ভৌমিকের দেয়া এক তথ্য। বিসিআইএম (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোর কথাটা গণমাধ্যমে অনেক দিন উচ্চারিত হয়নি। উচ্চারিত হওয়া বন্ধই হয়ে গিয়েছিল ভারতের আপত্তি, অনাগ্রহের কারণে। বিসিআইএম হল, বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার এই চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে লেখা নাম। এই নাম দেয়া হয়েছে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে এরপর বার্মার গুমদুম হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত এক অর্থনৈতিক করিডোর অবকাঠামো প্রকল্প, যার নাম বিসিআইএম (BCIM)। সুবীর বলছেন, “য়ুহানে মোদি-শি জিংপিংয়ের বৈঠকের একটা ইতিবাচক ফল মনে হচ্ছে আসন্ন হয়ে উঠেছে”। কলকাতায় চীনা দূতাবাসের এক কনসাল জেনারেল লেবেলের অফিস আছে। সেই কনসাল জেনারেল  (Ma Jhanwu ) মা ঝানয়ু-এর বরাত দিয়ে সুবীর জানাচ্ছেন, তিনি এক প্রেস কনফারেন্সে বলেছেন, বিসিআইএম প্রকল্প এখন শুরু হবে কারণ এ দুই শীর্ষ নেতা একমত হয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়া সামনে এগিয়ে নিতে হবে।’ [……”BCIM would take off now because the two leaders had agreed to take the process forward”. ]

খুবই তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি, যদিও খুবই কম তথ্য এটা সন্দেহ নেই। বিশেষ করে সড়ক ও রেল যোগাযোগের বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর ব্যবস্থা চালু হয়ত হয়ে যাবে কখনও। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর, যেটা ছিল বিসিআইএম প্রকল্পের সাথে সংযুক্ত, এক গভীর সমুদ্রবন্দর অবকাঠামো। এ ছাড়া আরেকটা দিক আছে। বন্দর সুবিধাসহ সব মিলিয়ে বিসিআইএম প্রকল্পও চীনা ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ একটা অংশ হওয়ার কথা। ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সুবিধা থাকার কথা, বিসিআইএম প্রকল্প তার একটি। তাহলে ভারত কি আস্তে ধীরে বেল্ট-রোড উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার পথে?

না এটা এখনই অতিরিক্ত আশা। যদিও তা কোনো দিন হবে হয়ত, এমন অনুমান করা অবাস্তব হবে না। তবে খুব সম্ভবত আমরা অনেক আগেই এবং বেশি দ্রুত তা অনুমান করছি। যদিও একটা বিষয় এখনই পরিষ্কার করে রাখা যায়।

য়ুহান সম্মেলনের কোনো ফলাফল যদি আসতে শুরু করে, তবে তা হবে সবার আগে শুরু হবে, ভারতের একান্ত নিজের জন্য নেয়া চীনা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো থেকে। চীন-ভারত সম্পর্ক সবার আগে এদিক দিয়ে উন্মুক্ত হবে। কিন্তু এর অর্থ বাংলাদেশেরও চীনা অবকাঠামো প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় বর্তমান যে আপত্তিগুলো আছে তা আপনাতেই সরে যাওয়া নয়। ভারতীয় কূটনীতিতে এ দুটো আলাদা বিষয়। বাংলাদেশে চীনা অবকাঠামো প্রকল্প ভারতের আপত্তি এখনও সক্রিয় আছে বলেই সম্ভবত এবার প্রধানমন্ত্রীর শান্তিনিকেতন সফরের সময়, কথিত ভারতের কাছ থেকে “প্রতিদান” পাওয়ার আলাপ উঠতে আমরা দেখেছি। সেই সাথে আমরা দেখেছি, কথিত “প্রতিদান” পাওয়ার জন্য সরকারের বেপরোয়া কাছাখোলা ও মরিয়া অবস্থা। যদিও এ ব্যাপারে আবার সরকারের সর্বশেষ অবস্থান হল, নিজের মরিয়া দুর্দশা সে আর বাইরে দেখাতে চাচ্ছে না। গত বুধবারের প্রেস কনফারেন্সে তাই বোধহয় একটু ইউ-টার্ণ। যদিও আগের দিন ২৮ মে সরকারি প্যানেল সাংবাদিক নেতাদের আলোচনা সভা ছিল অভুতপুর্ব, দেখার মত।  খুব সম্ভবত, প্রতিদান পাবার বেপরোয়া দেখালেও কোনো ফল আসবে না বা আসছে না, এমন হয়ত তাদের অনুমান।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩১ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিচ্ছে ভারত!”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস

একা ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস
গৌতম দাস
০৭ জুন, ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1g9

যুদ্ধে প্রথম পারমানবিক বোমা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আমেরিকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফলাফল আমেরিকার পক্ষে আসন্ন এটা নির্ধারিত হয়ে উঠার পরও আমেরিকা ১৯৪৫ সালে এই বোমা জাপানের উপরে ব্যবহার করেছিল। এমন করার পিছনের কারণ যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে এর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাখা এবং এর ভয়াবহতার মাত্রা কেমন হয় সেটাও বুঝে রাখতে। বলা বাহুল্য কোন হুশজ্ঞানওয়ালা চিমটি কাটলে লাগে টের পায় এমন মানুষের জন্য সেটা খুবই খারাপ ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। সম্ভবত সেটাই এরপর থেকে আজ পর্যন্ত  দুনিয়া আর কোথাও এই অস্ত্রের ব্যবহার আমরা আর দেখেনি। কিন্তু এসব বাজে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তবু বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারমানবিক অস্ত্র অর্জন এবং ভান্ডারে রাখার আগ্রহ কমাতে পারে নাই। বিগত ১৯৭৬ সালের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান পারমানবিক বোমা অর্জন করে ফেলেছিল। এটা উপমহাদেশীয় বা একদিকের পরিস্থিতি। কিন্তু ততদিনে অন্যদিকে অর্থাৎ পশ্চিমে বা কোল্ড ওয়ার লড়ার দুই মাতবর আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুনিয়ার পরিস্থিতি তাদেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে – এটা বিপদ বুঝতে পেরে গিয়েছিল।  তাই, পারমানবিক অস্ত্র আর ব্যবহার করবে না বলে পরস্পর পরস্পরের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক চুক্তি স্বাক্ষর দিয়ে ফেলেছিল।  এটাই Non-Proliferation Treaty অথবা NPT – সেই আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৯৬৮ সালে যা স্বাক্ষরিত হয়। সে বিষয়ে পরে আসছি। কিন্তু এখানে আলোচনার জন্য গুরুত্বপুর্ণ হল, ভারত ও পাকিস্তান; যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে তা সবাই জানে। কিন্তু এরা দুজন আজ পর্যন্ত কখনই এনপিটি তে স্বাক্ষর করে নাই। এটা ঠিক যে অস্ত্র হিসাবে পারমানবিক অস্ত্র পশ্চিমের কাছে ডেড ইস্যু, খামোখা পয়সা নষ্ট ধরণের বিষয় আর এর সবচেয়েও বড় দিক খতরনাক। কিন্তু এতটুকুওই সব বা শেষ কথা নয়। যেমন, এই অস্ত্রই যদি আবার এশিয়ার কোন দেশ যদি এখনও তা অর্জন করতে চায় তবে সে ঘটনাতে পশ্চিমা যে কোন মাতব্বর দেশ নড়চড়ে বসে আর নিজের জন্য হুমকি গণ্য করে থাকে।

তা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতিতে “ভারত ও এনপিটি” আবার এখন ইস্যু। সারকথায় বললে এর মূল কারণ, ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করলেও একালে আমেরিকা যেচে পড়ে ভারতকে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল দিবে বলে উস্কানি দিয়েছে। এবং সেটা ভারত এনপিটিতে এবার স্বাক্ষর না করেই হাসিল করতে পারে এমন লোভের মুলা ঝুলিয়েছে আমেরিকা। এর উদ্দেশ্য হল, ভারতের কথিত চীন-ভীতির বিপরীতে দেখানো যে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে আমেরিকা কত কেয়ার করে! ভারত আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার হয়ে আরও কাছে আসুক। এছাড়াও আমেরিকান খায়েসটাকে গুছিয়ে বললে তা হল এরকম যে প্রতিদানে, নতুন যে গ্লোবাল অর্থনীতিক অর্ডার আসন্ন, যাতে মনে করা হচ্ছে চীনের স্টেক হবে হাই বা অনেক বেশি। তাতে ভারত যেন আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের সাথে সে নতুন অর্ডারের পক্ষে অবস্থান না নেয়। অর্থাৎ পুরান বা চলতি গ্লোবাল অর্ডার, যেটা আমেরিকান নেতৃত্বে সাজানো তা এখনও ভারতের স্বার্থের দিক থেকে লোভনীয় বলে যেন ভারত মনে করে। পারমানবিক ইস্যুর দিক থেকে এই বিষয়টা বুঝতে আজকের প্রসঙ্গ সেদিকে নিব।

গত ২০০৫ সাল, সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম টার্মের শাসন রাজত্বের শেষ বছর। আর একই সাথে আমেরিকার দিক থেকে সেটা ছিল ভারতকে কাছে টানার কৌশলের অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে উস্কে তোলা শুরুর বছর। চীন ও ভারতের নিজেদের পারস্পরিক স্বার্থে নিজেদের ভিতর মিল-অমিল, ঝগড়া-বন্ধুত্ব বহু কিছু আছে। থাকাও স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘস্থায়ী দিক থেকে দেখলে তাদের কিছু গভীর কমন স্বার্থ আছে ফলে এই অর্থে তারা ঘনিষ্ট বন্ধু, কিন্তু আপাত দিক থেকে এটাই আবার পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতারও এবং নানান স্বার্থ-বিরোধেরও। তাই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের লক্ষ্য ছিল, চীন-ভারতের সম্পর্কের ভিতর যতই ভালভালাইয়া থাকুক সেটার ফলাফল হিসাবে তা থেকে উভয়েই যেন একসাথে আমেরিকা তাদের ‘কমন এনিমি’ এই জ্ঞান না করে বসে, এই প্রশ্নে যেন তারা এককাট্টা হয়ে দাড়িয়ে না যায়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বুশ জুলাই ২০০৫ সালে প্রথম ভারত সফরে আসেন। এক যৌথ ঘোষণাও স্বাক্ষরিত হয় ১৮ জুলাই ২০০৫। সেই সাথে এই প্রথম পাবলিক হয়েছিল যে ভারত ও আমেরিকার সামরিক সম্পর্কই শুধু নয় কী ভিত্তিগত কাঠামোর মধ্যে ভারত-আমেরিকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্ক  হবে তাও ইতোমধ্যেই তারা চুড়ান্ত করে ফেলেছে।

একেবারে জন্মের সময়ের পটভুমির দিক থেকে বললে,  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একচেটিয়া সরবরাহকারী ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বা বর্তমান রাশিয়া) কে কেন্দ্র করে সাজানো অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার সময় থেকেই ওর মূল সরঞ্জাম ও এর সরবরাহ মূলত রাশিয়া ঘরাণার। কোল্ড ওয়ার মানে দুনিয়াটা দুই ব্লকে বিভক্ত থাকবার সময় বা বিভক্ত হয়ে ছিল যখন। ছোট-বড় সব রাষ্ট্রকে যখন হয় সোভিয়েত ব্লক নয়ত আমেরিকান ব্লকে ঢুকে যেতেই হয়েছিল। যখন দুটা থেকেই বাইরে থাকার উপায় ছিল না বা যেত না। এটা ছিল সেই ব্লক যুগ বা কোল্ড ওয়ারের যুগ। কোল্ড ওয়ার – মানে ঠিক যুদ্ধ লাগিয়ে জড়িয়ে যাওয়া নয় কিন্তু সব সময় যুদ্ধে জড়িয়ে থাকার মতই টেনশনে থাকা। আর গোয়েন্দা আর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স, সাবভারসিভ এক্টের ষড়যন্ত্র চারদিকে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯২) যাবার পর থেকে কার্যত সেই কোল্ড ওয়ার এখন মৃত, দুনিয়া আর এখন ব্লকে ভাগ করা নাই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সে সময়ের তৈরি হওয়া অস্ত্রের ঘরানা সেই হিসাব, কেবল তাই এখনও প্রচ্ছন্নে বহাল আছে।

ইতোমধ্যে ১৯৯২ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আলাদা ১৫ রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া – এটাকে কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তি সুচনা বলা যায়। ওদিকে এই ঘটনার পরের দুই টার্ম (১৯৯৩-২০০১) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিল ক্লিনটন। আর ক্লিনটন যুগের পরিসমাপ্তিতে, এরপরেই ২০০১ সাল থেকে জুনিয়র বুশও পরপর দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল –“কোল্ড ওয়ার শেষ হয়েছে এখন তারা একলাই রাজা” ধরণের আমোদে থাকার। কারণ কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তিতে দুনিয়াতে আর আমাদের মত দেশগুলোকে সোভিয়েত অথবা আমেরিকান কোন না কোন ব্লকে ঢুকে টিকে থাকতে হবে এই বাস্তবতার অবসান ঘটেছিল। একথাকেই আর একভাবে বলা যে দুনিয়া তখন থেকে আর বাইপোলার নয়। মানে, পরাশক্তি অর্থে দুনিয়া আর দুই মেরুতে বিভক্ত থাকে নাই। এতে স্বভাবতই আমেরিকান বিদেশ নীতিতে সেই প্রথম বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। নতুন মৌলিক কিছু বদল তখনই মানে, ক্লিনটনের আমলেই হয়েছিল। যেমন আমাদের মত দেশে আমেরিকা সমর্থিত কোন সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাকে আর ‘আগের মত’ সামরিক সরকার হতে হবে না। স্টেট ডিপার্টমেন্টের নতুন নির্দেশিকা অবস্থান হল, বেসামরিক সরকারের পক্ষে থাকতে হবে। সর্বোতভাবে চেষ্টা করতে হবে ক্ষমতা বেসামরিক হাতে রাখতে। কোল্ড ওয়ারের যুগে আমেরিকা ব্যতিক্রমহীনভাবে আমাদের মত যে কোন দেশে কোথাও বেসামরিক সরকার টিকাতে পারে নাই। ফলে আমেরিকা সমর্থিত সরকার মানেই সেটা সামরিক সরকারই হতে দেখা গিয়েছিল। এই অর্থে ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে বেসামরিক সরকার টিকানোর সফলতা উপভোগের কাল। অবশ্য এটাও বাইরের দিক থেকে তাকিয়ে বলা। আর ভিতরে ভিতরে তা ছিল নতুন পরিস্থিতিতে এক মেরুর কালে আমেরিকান নতুন বিদেশনীতিতে আর কী বৈশিষ্ট আনা যেতে পারে,  কী হওয়া উচিত তা নিয়ে আরও বিস্তারে ভাবনা চিন্তার কাল। তবে আমেরিকান নতুন বিদেশ নীতির আরও পোক্ত রূপ হাজির করতে এবং তার বাস্তবায়ন শুরু হতে হতে ক্লিনটন আমল পেরিয়ে বুশের আমল চলে আসে।  আর এসব নতুন চিন্তা ভাবনা থেকেই পুরানা চিন্তা ও ব্লক ভেদাভেদ দৃষ্টিভঙ্গী ভেঙ্গে আমেরিকা ভারতের দিকে এগিয়ে আসার নতুন নীতি নেয়। বুশের আমল থেকে আমরা আমেরিকার নতুন ও পোক্ত বিদেশ নীতির বাস্তবায়নের কাল হিসাবে দেখতে পারি।

ওদিকে জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মই আবার একই সাথে ভিন্ন আর এক ফেনোমেনা স্পষ্ট দৃশ্যমান হাজির হবার বছর। সেটা ছিল চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের দু’দশকের কালপর্ব (১৯৯০-২০১০), ডাবল ডিজিট জিডিপি গ্রোথের সেকেন্ড ডিকেড বা দ্বিতীয় দশ বছর। যদিও চীনের এই উত্থানের ফলে আমেরিকা-রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের উপর এর প্রভাব পরিণতি কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমেরিকান সরকারি স্পষ্ট গবেষণা লব্ধ ফল আসা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের পর থেকে, যার চুড়ান্ত রিপোর্ট এসেছিল ২০০৮ সালে। এসবের আগে যদিও অনুমান নির্ভর কিছু খবর যেমন, প্রজেক্টেড রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল ২০০৪ সালেই (ষ্টাটিষ্টিক্যাল প্রজেকশন রিপোর্টের জন্য আমেরিকান বিখ্যাত ম্যাগাজিন)  ফর্বস ম্যাগাজিনের সৌজন্যে। ফলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন-ভারত একজোটে কোন কমন স্টাটেজিতে যেন না দাঁড়ায়  সে উদ্দেশ্যে ভারতকে কাছে টেনে বাড়তি খাতির করে চীন ও ভারতের মধ্যে দুরত্ত্ব তৈরি করা ছিল সেকালে আমেরিকান বিদেশ নীতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট। জুনিয়র বুশের ২০০৫ সালের জুলাইয়ের ভারত সফরকে এই আলোকে দেখলে অনেক প্রশ্নের ব্যাখ্যা মিলবে। ঐ সফরের ফোকাস ঘটনা ছিল, ভারতকে আমেরিকার নিউক্লিয়ার টেকনোলজিসহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বা বিক্রির সিদ্ধান্ত।

আগেই বলেছি, নিউক্লিয়ার বোমা বা পারমাণবিক বোমা পশ্চিমের হাতে এসে মারাত্মক অস্ত্র হিসাবে কার্যকর হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ কালে। এরপর সেখান থেকে এই অস্ত্রের গবেষণা ও বিকাশ বিস্তা্র সবচেয়ে বেশি ঘটে কোল্ড ওয়ারের সময় (মোটামুটি ১৯৫০-১৯৯২) কালে। যদিও ঠিক এর উলটা অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্রের উতপাদন বৃদ্ধি ও বিস্তার রোধে পরাশক্তিগত ততপরতাও শুরু হয় ১৯৬৮ সাল থেকে। স্বাক্ষরিত হয় NPT চুক্তি। অর্থাৎ প্রো-লাইফারেশন কথার সোজা বাংলা অর্থ “আয়ু দেয়া” বা “সহজেই যা বিস্তার লাভ করে”। কাজেই পারমাণবিক NPT  কথার মানে বাংলা করলে দাড়ায়, পারমানবিক অস্ত্র বা এর টেকনোলজির বিস্তার রোধের চুক্তি। আমেরিকান সরকারি ইতিহাস অনুসারে ১৯৬১-৬৮ প্রায় এই ৭ বছর ধরে নিগোশিয়েশনের ফসল হল এই চুক্তি। এর আবার তিন পৃথক পর্যায় বা অংশ আছে – নন-প্রোলিফারেশন, ডিসআর্মামেন্ট ও পিসফুল ইউজ। অর্থাৎ বিস্তার রোধ (অস্ত্রে ব্যবহারের লক্ষ্যে গবেষণা ও উতপাদন বন্ধ), নিরস্ত্রীকরণ (যে অস্ত্র তৈরি হয়ে গেছে এর ধ্বংস বা ব্যবহার বন্ধ করা) ও (যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে নয় তবে এই টেকনোলজির) শান্তিপুর্ণ ব্যবহার। প্রথম চোটে আমেরিকা, বৃটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এতে স্বাক্ষর করেছিল ১৯৬৮ সালে। কিন্তু তবুও  চীন ও ফ্রান্স  ১৯৯২ সালের আগে স্বাক্ষর করে নাই বলে একমাত্র এরপরই জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যরেই স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়। অন্যভাবে বলা যায় এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের বিষয়টাই ১৯৯২ সালের আগে অর্থাৎ  কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তির আগে কার্যকর করা যায় নাই। বিশেষ করে যারা ভেটো-ক্ষমতাধারী এবং যাদের সবার হাতে পারমানবিক অস্ত্র মজুদও আছে, একারণে। এছাড়া যাদের হাতে অস্ত্র মজুদ নাই তারাসহ বর্তমানের মোট স্বাক্ষর করা দেশের (তাইওয়ানসহ) সংখ্যা ১৮৯। কিন্তু স্বাক্ষর করতে একেবারেই ইচ্ছুক নয় (এদের মধ্যে যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে জানা যায় বা অনুমান করা যায়) এমন রাষ্ট্র হল  ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও সাউথ সুদান। সাউথ আফ্রিকাকেও এই দলে ফেলা যেত সে সময়। কিন্তু ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদিতা বিরোধী সরকার কায়েমের পরে সে এনপিটি স্বাক্ষর করা দেশ হয়ে যায়। ওদিকে উত্তর কোরিয়া স্বাক্ষর করেছিল প্রথমে কিন্তু আবার প্রত্যাহার করেছে ২০০৩ সালে। এদের মধ্যে কেবল ভারত ও পাকিস্তান হল এমন রাষ্ট্র যাদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র থাকার ব্যাপারটা সবাই জানে এবং তারা নিজেরাও স্বীকার করে। নিজ স্বীকারোক্তির ১৯৭৪-৬ সাল থেকেই পারমানবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হলেও এরা এনপিটি তে স্বাক্ষর করতেও চায় না। চলতি একবিংশ শতকের আগে এনপিটি বিষয়টা এভাবেই ছিল।  আর এসবের টেকনিক্যাল খুটিনাটি দিক তদারক করা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে রিপোর্ট করার প্রতিষ্ঠান হল IAEA (ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এসোশিয়েশন)।

এনপিটি স্বাক্ষরিত দেশগুলোর মধ্যে পশ্চিমের যেসব দেশের হাতে পারমানবিক অস্ত্র ও টেকনোলজি আছে এবং যারা সেটা অন্য রাষ্ট্র কাউকে (কেবল শান্তিপুর্ণ ব্যবহারের জন্য) দিতে চায় তাদের সেই  দেওয়ার বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ৪৮ সদস্যের এক নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ আছে যার নাম NSG, নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি। গ্রুপের সদস্যরা মূলত পারমানবিক টেকনোলজি অথবা মালামাল সরবরাহে সক্ষম। ফলে শান্তিপুর্ণ ব্যবহার যেমন বিদ্যুৎ উতপাদনে এবং বৈধভাবে ব্যবহার করতে চাইলেও কোন এক এনএসজি গ্রুপের সদস্যকে ধরতে  হবে।  তবে কিছু ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি এখানে স্পষ্ট করা দরকার। যেমন ইরান, অনুমান করা হয় সে পাকিস্তান (ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞানী কাদের খান) বা উত্তর কোরিয়া অথবা উভয়ের কাছ থেকে মালামাল ও টেকনোলজি সংগ্রহ করেছে। অর্থাৎ এনএসজি এর কেউ তাকে সরবরাহে রাজি হয় নাই। ভিন্ন আর এক ব্যতিক্রম ভারত। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ ভারত সফরে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল সরবরাহ বিষয়ে চুক্তি করেছিল।

এই হল পিছনের পটভুমি। এখন ভারত ঐ চুক্তি কার্যকর হয়েছে দেখতে চাইলে তাকে আর এক বাধা পার হতে হবে। সেটা হল, উপরে যে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি এর কথা বলেছি, ভারতকে ঐ গ্রুপের সদস্য হয়ে নিতে হবে। কারণ ভারতের সাপ্লায়ার আমেরিকা ভারতকে সরবরাহ দিতে পারে যদি ভারত এনএসজি এর সদস্য হয়। অন্য ভাষায় বললে এই গ্রুপের পালনীয় নিয়মকানুন মেনে সরবরাহকৃত মালামাল ও টেকনোলজি ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দেয়। আমেরিকার সরবরাহ পেতে ভারতকে আগে এনএসজি এর সদস্যপদ পেয়ে নিতে হবে এব্যাপারে খোদ ভারত বা আমেরিকার কোন বিতর্ক নাই। তাহলে বিতর্ক কী নিয়ে? বিতর্কে ভারতের দাবি, আমার অতীত আচরণ ও ট্রেক রেকর্ড ভাল ফলে আমি আমেরিকা এই NSG থেকে সাপ্লাই পাবার যোগ্য।  কিন্তু স্পষ্ট করে যেটা ভারত বলছে না তা হল, এর অর্থ কী ভারতের NSG এর সদস্য গণ্য করে নিতে হবে, অথবা আর কোন বিবেচনায় না গিয়ে সদস্যপদ দিয়ে দিতে হবে? এছাড়াও NPT স্বাক্ষরের কী হবে? ভারত NPT তে স্বাক্ষর না করলেও NSG এর সদস্য গণ্য হতে পারে? এর মানে NPT তে স্বাক্ষর করা NSG এর সদস্য হবার ক্ষেত্রে পুর্বশর্ত নাও হতে পারে? তাই কী?

যারা এনপিটি এর সদস্য অর্থাৎ পারমানবিক মালামাল ও টেকনোলজি যারা কেবল শান্তিপুর্ণ কাজে, অস্ত্র নয় বিদ্যুৎ উতপাদনের মত কাজে ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বলে স্বাক্ষর করেছে কেবল তাদেরকে নিয়েই এনএসজি বা সরবরাহকারিদের গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। অর্থাৎ এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হল এনপিটি তে স্বাক্ষর করে আসা, এর সদস্য হওয়া। কিন্তু ভারত কখনই এনপিটিতে স্বাক্ষর করে নাই। ফলে সে এনপিটি এর সদস্যই নয়। ফলে তর্কের বিষয় এটা যে, এনপিটি সদস্য না হয়েও ভারত এনএসজি এর সদস্য বলে গৃহীত হবে কী না?

সোজা ভাষায় ভারত চাচ্ছে বা চেষ্টা করছে, এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেই সে আমেরিকার টেকনোলজি ও মালামাল পেতে চায়। কিভাবে?

ভারতের মিডিয়া চলতি মে মাসে অভিযোগের রিপোর্ট ছেপেছে যে আমেরিকা থেকে ভারতের নিউক্লিয়ার বিষয়ক সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে  চীন বাধা সৃষ্টি করছে।  যেমন ইংরাজি ‘দি হিন্দু’ এর শিরোনাম “চীন ও পাকিস্তানের আপত্তি উল্টায়ে দিয়ে আমেরিকা বলছে ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি”। এটা শিরোনাম, আর রিপোর্টের বডিতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জন কিরবি এর উদ্ধৃতিতে বলা হচ্ছে, তিনি বলেছেন, “ ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট (ওবামা) ভারত সফরের সময় তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে, আমেরিকার ব্যাখ্যায় ভারত মিসাইল টেকনোলজি কনট্রোল রেজিমের শর্তাবলী পূরণ করে এবং ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি (India meets missile technology control regime requirements and is ready for NSG membership,)”। বুঝাই যাচ্ছে আমেরিকা সরাসরি একথা বলছে না যে ভারত এনপিটি এর সদস্য না হলেও এনএসজি এর সদস্য বিবেচিত হতে পারে কীনা। এছাড়া আমেরিকার বুঝ ব্যাখ্যার কথা বলা হচ্ছে। তার মানে অন্য কারো ব্যাখ্যা আর এক রকম হতেও পারে। এসবের বিপরীতে চীন বলছে। আমেরিকার সাথে ভারতের চুক্তি সেটা এখানে ইস্যু নয়। সেটার ভিতর চীনের আপত্ দেখার কিছু নাই। তার অবস্থান হল, ভারত এনপিটি এর সদস্য হয়ে নিলেই সব সমাধান। এর কারণ হিসাবে চীন বলছে গত বছর এনএসজি এর সভায়, এনপিটি এর সদস্য হতে হবে আগে – এটাই এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হিসাবে বলা হয়েছে। ফলে এখানে চীনের বাড়তি পরামর্শ হল বিষয়টা নিয়ে এনএসজির যারা সদস্য তাদের সাথে কথা বলে ভারত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারে। অর্থাৎ এটা পরিস্কার ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বা তাদের কোন চুক্তির বিরোধিতা বা ঠেকায় দেয়া দিবার কোন ইচ্ছা এখানে চীনের নাই।

‘দি হিন্দু’ স্টেট ডিপার্টমেন্টের জন কিরবিকে উদ্ধৃত করে আরও বলছে, “কেউ এনএসজি এর সদস্য হতে পারবে কীনা তা নিয়ে দেয়া বক্তব্য বর্তমান সদস্যদের আভ্যন্তরীণ বিষয়”। অর্থাৎ এনিয়ে ভারতের বলার কিছু নাই।

তাহলে শেষে কোথায় দাড়াল বিষয়টা? শেষ কথা হল, মিডিয়াগুলোকে – ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক জমে উঠতে চীন বাধা দিচ্ছে এমন এক ধারণা – ছড়াতে ব্রিফ করা হয়েছে। আর এই খামোখা চীন বিরোধিতা তাতিয়ে দিয়ে খোদ ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি এখন চীন সফরে আছেন। আর আলোচনার মূল বিষয় এনএসজি এর সদস্যপদ, একেবারে ‘হর্সেস মাউথ’ ফয়সালা।

কে না জানে, এনপিটি স্বাক্ষরের সোজা অর্থ পরমাণুর অস্ত্রে ব্যবহার তাহলে এরপর আর করা যাবে না। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের পাঁচ ভেটো ক্ষমতার রাষ্ট্র সহ প্রায় সকলে এই কনভেনশনে স্বাক্ষরদান করে ফেলেছে। ফলে কারই আর যে সুবিধা নাই এবং সবাই স্বাক্ষর দিয়ে প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ যে আর পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে কেন আমেরিকা বা এদের কারো সহয়তাতেই অস্ত্র বানানো ও প্রয়োগের ভারতের একা সুবিধা থাকবে? এবং থাকবে সেটা আমেরিকার হাত দিয়ে, সুপারিশে? ভারত কী আশা করে দুনিয়ায় এনপিটি স্বাক্ষর না-কারি রাষ্ট্র হবে একমাত্র ভারত! যাকে আবার তোলা তোলা করে বিশেষ খাতিরে আমেরিকা পরমাণু টেকনোলজি ও মালামালও দিবে। কারণ আমেরিকার চীনের উত্থানের এতই ঠেকেছে! আর এই সুবিধা আর কারো থাকবে না। তবে একা ভারত ঐ টেকনোলজি ও মালামাল দিয়ে অস্ত্র বানানোর দিকেও চাইলে চলে যেতেও পারবে! কী তামশা! বলা বাহুল্য ভারত স্বপ্নের ঘোরে আছে। আর কেউ স্বপ্নে খেলে পোলাও খাওয়াই উচিত!

 

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের ৩০মে ২০১৬ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও বর্ধিত আকারে ও এডিট করে ছাপা হল।]