শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা

শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা
গৌতম দাস
১৮  জুন ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1jc

 

‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’ বা Shangri-La Dialogue। এটা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় এমন একটি নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলনের নাম। পুরা নাম IISS Shangri-La Dialogue। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রায়.৫০ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের নিয়ে সিঙ্গাপুরে এর আয়োজন হয়। তাদের মধ্যে আমেরিকা, চীন, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ইত্যাদি ছাড়াও এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্য অনেক রাষ্ট্রও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। শাঙ্গরি-লা নামটা মূলত ইন্ট্যারনাশনাল এক চেইন হোটেল গ্রুপের। আর ওদিকে আইআইএসএস- ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা ইংল্যান্ড ভিত্তিক এক থিঙ্কটাংক বা গবেষণা স্টাডি ধরনের প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ আইআইএসএস ও সিঙ্গাপুর সাংরিলা হোটেলের যৌথ উদ্যোগে ২০০২ সালে জন্মের পর থেকে সিঙ্গাপুরের শাঙ্গরি-লা হোটেলে প্রতি বছর এই নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন হয়ে থাকে। আর শাঙ্গরি-লা হোটেলে নাম থেকে শাঙ্গরি-লা শব্দটা ধার নিয়ে এই সম্মেলনের নামকরণ করা হয়েছে ‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’। সে হিসাবে একইভাবে এবারের সম্মেলন শুরু হয়েছিল ৩ জুন ২০১৬ থেকে। চলেছিল রোববার ৫ জুন পর্যন্ত।

হংকংয়ের সবচেয়ে পুরানা এক দৈনিক পত্রিকা হল, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। শাঙ্গরি-লা ডায়লগ প্রসঙ্গে তারা বিরাট রিপোর্ট ছেপেছে। যার মূল বক্তব্য হল, সম্মেলনের এবারেরও ফোকাস আবার সেই দক্ষিণ চীন সাগর। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে চীন ও আমেরিকা উভয়পক্ষ চাচ্ছে কোনো রেটরিক বা উচ্চবাচ্য থেকে যেন উত্তেজনা না ছড়িয়ে যায়। উভয় পক্ষ কোনোভাবেই চায় না যে সমুদ্রসীমা বিতর্ক চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে অচল ও তেতো বানিয়ে ফেলে।
যেমন ওয়াশিংটনভিত্তিক এক থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারনাশনাল স্ট্রাডিজ’-এর ড. বন্নি গ্লসার মনে করেন দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্ক ইস্যুতে চীন ও আমেরিকা প্রত্যেকেই নিজ অবস্থানে শক্ত হয়ে দাঁড়াবেন। কিন্তু কোনোভাবেই তারা উভয়েই এই মিটিংকে তাদের বিরোধ প্রকাশ বা প্রদর্শনের জায়গা বানাবেন না। গ্লসার বলছেন, “এ কথা সত্যি যে দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে আমাদের মৌলিক কিছু স্বার্থ সঙ্ঘাত আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনোভাবেই শাঙ্গরি-লা ডায়লগ আমাদের বিরোধে কোনো ফয়সালা আনার স্থান নয়”।
ঐ রিপোর্ট লিখছে, “আমেরিকা চায় এই অঞ্চল শান্তি, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে তাকে বিবেচনা করুক ও তার ওপর আস্থা রাখুক। কিন্তু একইসাথে এ অঞ্চল চীন-আমেরিকার সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রভূমি হয়ে উঠুক এটাও চায় না। এটা আমেরিকা বুঝে। তাই শাঙ্গরি-লা ডায়লগে আমেরিকার প্রচেষ্টা থাকার কথা এ দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা”। একারণে আমরা দেখছি এই রিপোর্টের শুরুতে উপরে উধৃত এই লম্বা বাক্যটা আছে। কিন্তু তাতে একটা ছোট শব্দ আছে বাংলায় বললে তা হলো ‘আগলে ধরে রাখা’ বা ইংরাজিতে contain। বলা হচ্ছে চীন ও আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে উত্থিত যেকোনো টেনশন আগলে ধরে রাখার পক্ষে পদক্ষেপ নিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে একমত হয়েছে।

ঐ রিপোর্ট সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও চীন-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হুয়াঙ জিং কে উদ্ধৃত করেছে। তিনি বলছেন, “চীন-আমেরিকার বিরোধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে, এটা দাঁড়িয়ে দেখা উভয়ের কারও স্বার্থের পক্ষে যায় না”। হুয়াঙ শাঙ্গরি-লা ডায়লগের অর্গানাইজিং কমিটির একজন সদস্যও। তিনি ভিতরের তথ্য জানাচ্ছেন, “আসলে দক্ষিণ চীন সাগর টেনশনের ইস্যু সম্মেলনের তিন দিনের পাঁচ সেশনে কখনই আনা হবে না। এর বদলে বরং শেষের দুই দিনের অনুষ্ঠিতব্য যে ছয়টা সাইড মিটিং হওয়ার কথা তার কোন একটাতে এনিয়ে কথা হবে”। অর্থাৎ মূল আলোচনায় নয় পার্শ্ব-আলোচনার বিষয় হিসেবে সাউথ চায়না সি বিতর্ক রাখা হয়েছে। হুয়াঙ বলছেন, “চীন ও আমেরিকা উভয়েই চায় তাদের অবস্থানের মতভেদকে নিচুস্বরে নামিয়ে রাখতে এবং শাঙ্গরি-লা ডায়লগের হোস্ট সিঙ্গাপুরও চায় না যে তার আয়োজিত এই সভা দক্ষিণ চীন সাগরে ইস্যুর ভেতরে হাইজাক হয়ে যাক”। অবশ্য এখানে আর এক মজার তথ্য তিনি শেয়ার করেছেন। হুয়াঙ জিং বলছেন, দিনকে দিন নিজের দাবিনামা নিয়ে চীন যেভাবে সরব অগ্রসর হচ্ছে তাতে সেটাকে আমেরিকা কী করে মোকাবেলা করবে, মুখোমুখি হবে – এ প্রশ্নে আসলে খোদ আমেরিকাতেই ‘হোয়াইট হাউজ বনাম পেন্টাগনের’ মধ্যে বিতর্ক ও মতভেদ আছে। তবে সেই বিতর্ক ও মতভেদ থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কোনোভাবেই চীন-আমেরিকার পরস্পরের দিকে থুথু ছিটিয়ে ঝগড়া করুক তা হতে দেবেন না। কারণ আগামী সপ্তাহ থেকে চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক “স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ” অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটা উভয় রাষ্ট্রের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রতিবছর নিয়মিত হয়ে আসছে। সেটার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাক ওবামা তা হতে দিতে পারেন না।
তাই হুয়াঙ ও গ্লসার উভয়েই নিশ্চিত করে বলছেন, শাঙ্গরি-লা ডায়লগ অনুষ্ঠানে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এস্টন কার্টার যে নির্ধারিত বক্তৃতা রাখার কথা আছে সেখানেও এস্টনের স্বভাবসুলভ গরম বক্তব্যও নিচুস্বরে হাজির করা হবে। যেমন এস্টন কার্টার এর আগে – চীন তার দাবির পক্ষে জোরাজুরি করতে গিয়ে ‘বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার এক গ্রেট ওয়াল’ রিস্ক নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। চীন এই শাঙ্গরি-লা মিটিংয়ে কোন মন্ত্রী নয় বরং এক সামরিক কর্তা এডমিরাল সান জিয়াঙগুয়ের নেতৃত্বে যোগ দিয়েছে। ফলে এমন প্রশ্নের জবাবে, এডমিরাল সান সম্ভবত নিজেদের পুরানা অবস্থানই রক্ষা করে চলবেন। এসব দিক বিবেচনা করে গ্লসার বলছেন, ‘আমি মনে করি না যে, চীনা পক্ষের আগামীকালের বক্তৃতায় আমরা নতুন কোন কথা শুনব’। এই “সাংরিলা মঞ্চ নিজের পার্থক্য নিয়ে কথা বলার একটা খুবই ভালো জায়গা, কিন্তু আসলে একটা ভারসাম্য অবস্থা বের করে আনার পক্ষেই আমাদের কাজ। সে জন্য আমি মনে করি না যে এই সভা থেকে কোনো শক্ত কথার মার বা ধারালো রেটরিক কিছুই শুরু হবে না। বিশেষত যখন চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক ‘স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ’ অনুষ্ঠান যখন পরের সপ্তাহে”।
এমন ঠাণ্ডা বাতাবরণ যে ইতোমধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এর আর এক লক্ষণ হল, ভিয়েতনামের ততপরতা। দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্কে চীনের সাথে একমাত্র ভিয়েতনামের সম্ভবত সবচেয়ে তিক্ত সম্পর্কটা হয়ে গেছে। সেই ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির নৌবহরকে ভিয়েতনামের কোনো এক পোর্টে নোঙর করে অতিথির বেড়ানো বেড়িয়ে যেতে দাওয়াত দিয়েছে। ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা দফতরের মুখপাত্র সুত্রে এটা জানা গেছে।
সাউথ চাইনা মর্নিং পোষ্ট এই রিপোর্টের শেষে কিছু ছোট মজার মন্তব্য করেছে। যেমন ওই রিপোর্টে তথ্য দিয়ে বলেছে, “ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াত দিয়েছে এমন সময় যখন ভারতের দুইটা যুদ্ধজাহাজ ভিয়েতনামের ‘ক্যাম রণ বে’ বন্দর গত বৃহস্পতিবার ত্যাগ করে গেছে। এ ছাড়া পোস্টের আর একটা মন্তব্য বাক্য, ‘দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে কিন্তু আমেরিকার মত ভারতেও কোনো দাবি বা স্টেক নেই; ফলে বিরোধ-বিবাদের সে কোনো পক্ষও নয়’।
পোষ্টের এই মন্তব্যে অনেক কথা লুকানো আছে। সময়ের অভাবে সব এখানে আনার সম্ভব হবে না। শুধু ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াতের এক ঘটনাই আবহাওয়া সম্পর্কে অনেক কিছুর নির্দেশক। অর্থাৎ গুমট পরিস্থিতির ভেতরে কোথাও থেকে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। না হলে এটা দাওয়াতপত্র পর্যন্ত গিয়েছে তা হতো না।
তবে এখানে আমরা গত বছরের শাঙ্গরি-লা ডায়লগের কথা স্মরণ করতে পারি। সে সময়কাল প্রায় একই ছিল, ২৯-৩১ মে ২০১৫ সাল। ইস্যুও প্রায় একই। দক্ষিণ চীন সাগরের পূর্ব দিক পূর্ব চীন সাগর চীন সীমান্তের যার অপর পাড়েই জাপান। পূর্ব চীন সাগর  নিয়ে চীন ও জাপানের সমুদ্র সীমা বিতর্ক আছে। আমেরিকার উস্কানিতে জাপান  গতবার পূর্ব চীন সাগর ইস্যুকে তেতে উঠেছিল।  গত বছরের প্রথম থেকেই এই ইস্যু নিয়ে চীন-জাপানের বিরোধ বিবাদকে তাতিয়ে তুলে চলছিল আমেরিকা । কিন্তু এবারের মত একইভাবে গতবারও আমেরিকা জাপানকে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নেয়ার অবস্থা করেছিল। বছরের শুরু থেকেই জাপানকে দিয়ে চীনের সাথে  ঝগড়ার মুখোমুখি করিয়ে যেন এখনই যুদ্ধ লেগে যাচ্ছে এমন এক অবস্থায় এনে শেষে শাঙ্গরি-লা ডায়লগে যখন উভয়ের মুখোমুখি হয়ে গেল তখন এখানে এসে পূর্ব চীন সাগর ইস্যুতে আমেরিকার পুরা উল্টো অবস্থান। ভোল পালটে মিটিংয়ে আমেরিকানরা এবার জাপানিজদের খালি জামা টেনে ধরা শুরু করেছিল। কি জানি যদি জাপানিজরা চীনাদের সাথে যদি ঝগড়া বাধিয়েই ফেলে তবে সেটা তো আমেরিকাকেও জাপানের সাথে মিলে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে যাওয়ার অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে। আর পৌঁছালে তখন কী হবে? এই আসল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল আমেরিকা। অর্থাত এশিয়ায় আমেরিকার এই নীতির মূল কথা হলো যেন, কোন রাষ্ট্র বিরোধ ও স্বার্থসঙ্ঘাত দেখা দিলেই সেটাকে যুদ্ধের দিকে নিতে হবে, ঠেলে দিতে হবে। অথচ এটা তো কোনো কাজের কথা নয়। একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এমন নীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব বলে একেবারে না করে দেয়া যাবে না। তবে এটা খুবই এক্সষ্ট্রীম পথ, সর্বশেষ অবলম্বন; সব পথ ফেল করার পর যা করা হয়। তাই গতবারের সাংরিলার পর আজ পর্যন্ত আমরা দেখছি খোদ জাপানসহ সবাই যেন ভুলে গেছে যে পূর্ব চীন সাগরে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে চীনের সাথে জাপানের কোন ইস্যু ছিল।
পাঠক কেউ যেন বুঝতে ভুল না করেন। তাই কিছু কথা পরিস্কার করে বলে রাখা ভাল। তা হল, এখানে উপস্থাপিত বক্তব্যে এটা বলা হচ্ছে না যে চীন এক মহাপরাক্রমশালী হয়ে গেছে ফলে জাপান ভিয়েতনাম ইত্যাদিরা যেন চীনকে ‘লাড়তে’ না যায়! এমন ওকালতি আমরা এখানে করতে বসিনি। চীনের পক্ষে এমন খেয়ে না খেয়ে এজেন্ট বা চীনের বিদেশনীতির ব্যাগ বহনকারী দালাল সাজার আগ্রহ আমাদের নেই। এর কোনো অর্থও হয় না।
বিষয়টা হল, যুদ্ধ সম্পর্ক আমাদের দেখা বা জানা পুরানা ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভিতর ইতোমধ্যে এক ব্যাপক বদল ঘটে গেছে। বিশেষ করে এই সদ্য পেছনে ফেলা কোল্ড ওয়ারের কালের (১৯৫০-৯২) যুদ্ধ ধারণা। ঐ সময়ের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের বিরোধ মানেই শেষ বিচারে আসলে তা সোভিয়েত-আমেরিকান মতাদর্শিক, রাজনীতি বা অর্থনৈতিকসহ সবকিছুতে স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাত। কিন্তু তবু কেবল একটা বিষয় ছাড়া সেসব বিরোধের অন্য সব দিক প্রায় সবই এখনকার মতোই । সে অমিলের দিকে সবার মনোযোগ দিতে বলব। কোল্ড ওয়ারের ওই সময়কালে যেকোনো সঙ্ঘাতের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সেই স্বার্থবিরোধে সোভিয়েত অথবা আমেরিকা পরস্পর পরস্পরকে যুদ্ধের মাঠেই একমাত্র ফয়সালা করবে এভাবে ঠেলে দিতে পারত, সম্ভব ছিল। অর্থাৎ শত্রু মানেই নির্মূল। যেন একই কথা। নির্মুল ছাড়া শত্রু মোকাবিলা বলে আর কিছুই হতে পারেনা, এমন ধরেই নেয়া হত।  এটাই ছিল একমাত্র পথ ও লক্ষ্য। এর মাধ্যমেই যেকোনো বিরোধের মীমাংসা করতে হবে এটা সহজেই ভাবা যেত। কোনো স্বার্থবিরোধ দেখা দিলেই কূটনীতি বা ডায়লগের ন্যূনতম কথা বলার চেষ্টাও না করে তাকে শত্রু নিশ্চিহেৃর লাইনে ভাবা সম্ভব ছিল।
এমন ভাবনার মূল কারণ, দুনিয়ায় তখন ছিল দুটো অর্থনীতি। যাদের মধ্যে আবার কোনো লেনদেন বিনিময় বলতে কিছু ছিল না, এমনিভাবে দুনিয়া দুই ধরণের অর্থনীতি ও পরস্পর সম্পর্কহীন হয়ে বিরাজ করত। কেউ কারও সাথে লেনদেন বিনিময়েওর সম্পর্কে নাই। কেবল দুইটা অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ নিজ নিজ ব্লকের ভিতর আলাদা আলাদা বিনিময় ব্যবস্থার এমন দুই জোটে বিভক্ত ছিল। ফলে একের বোমা হামলায় অপরের অর্থনীতি ও প্রাণসহ বৈষয়িক সব কিছু নিশ্চিহৃ হয়ে গেলেও তাতে বোমা আক্রমণকারীর কোনোই ক্ষতি ছিল না। যেমন, আমেরিকা পক্ষের কোনো পুঁজি পণ্য লেনদেন বিনিয়োগ অপর সোভিয়েত ইউনিয়নে কোথাও বি-নিয়োজিত ছিল না। ফলে সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হয়ে গেলেও তাতে এর লেনদেন বিনিয়োগ প্রভাব আমেরিকায় পড়বে না। রাশিয়ায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগকারীই ছিল না বলে আমেরিকারই ফেলা বোমায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগ নষ্ট হবে এমন কোনো সম্ভাবনা ছিল না। আর একালে ঠিক এর উলটা। দুটো অর্থনীতি বলতে দুনিয়ায় এখন কিছু নেই, বরং আছে একটাই, একই গ্লোবাল পুজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ফলে এখন চীনে আমেরিকা বোমা ফেললে তাতে অবশ্যই কোনো না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপরই সে বোমা পড়বে। একারণে রাষ্ট্র স্বার্থবিরোধে একমাত্র যুদ্ধই করতে হবে, যুদ্ধে ফয়সালা করতে হবে অথবা এটাই একমাত্র সমাধানের পথ একথা আর সত্য নয়, বাস্তবতাও নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের (১৯৯২) পরে অথবা কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তিতে এটাই আমাদের যুদ্ধ ও স্বার্থ ধারণায় ইতোমধ্যেই এক বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যদিও তা আমরা অনেকেই টের পাইনি অথবা কিছু হলেও অনেকেই পেয়েছেন।
অথচ এই নতুন বাস্তবতাতেও সবাই আমাদের চোখে পট্টি পড়াতে চাচ্ছে। সবাই আমরা একালের স্বার্থ বিরোধকে সেকালে কোল্ড ওয়ার কালের চোখ দিয়ে দেখগাতে চাচ্ছে। পুরনো চশমায় যুদ্ধ পরিস্থিতি বুঝার কল্পনা করার চেষ্টা করছি। অথচ এটা ভুল, অবাস্তব। বরং এভাবে আমেরিকা যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে নিজের যুদ্ধ বা স্ট্রাটেজিক জোটের খোলে ছোটবড় দেশকে তুলে নিতে চাচ্ছে। আর বুঝে না বুঝে এতে তাল ধরেছে ভারত। চীনের সাথে যেন ভারতের যেন একটাই সম্ভাব্য সম্পর্ক  – যুদ্ধ। আমেরিকা প্রতিবারই সারাবছর চীনের বিরুদ্ধে সে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জন্য খুবই একটা দরকারি শক্তি এটা প্রমাণ করতে গরম অবস্থা তৈরি করে থাকে। কিন্তু শেষে শাঙ্গরি-লা সম্মেলন এলেই তাকে ক্ষেমা দিতে হয়। কারণ এটা ডায়লগের আসর। ডায়লগের আসরে হুমকি চলে না। আর যদি যুদ্ধ লেগে যায় সেটা হবে – দেশ ভিন্ন, কিন্তু  সেই ভিন দেশের কোন না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ এর উপরে তাহলে আমেরিকাকেই বোমা মারার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমেরিকা জানে এটা এবসার্ড, এটা সে করতে পারে না। এখন কথা হল শাঙ্গরি-লা ডায়লগ এলেই সব ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দেয়া হয় কেন? ঠাণ্ডা পানিই যদি বাস্তবতা হয় তবে ভুয়া গরম সৃষ্টি করা আমেরিকার ও তার সাগরেদদের দিক থেকে এক মারাত্মক দায়িত্বহীনতা। আর এমন সাগরেদ হয়ে ভারতের নিজ জনগণকে মিথ্যা বলছে, প্রতারণা করে চলছে – কোল্ড ওয়ার যুগের মত মিডিয়া গরম করে বলে যাচ্ছে – চীন এই নিয়ে গেল সেই নিয়ে গেল। চীন ভারতের সব উন্নতির পথে বাধা! অথচ কে না জানে এটা কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫০-১৯৯২) দুই অর্থনীতির সম্পর্কহীন  লেনদেন হীন সময় নয়। এখানে দুই রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধ প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বীতা সবই আছে।, আবার চীন-ভারতের ঘনিষ্ঠ  বছরে ৭৩ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন আছে। কারণ তারা একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত একই অর্থনীতির দুই অংশ মাত্র। যে কারণে ঐ চীনকেই আবার মোদির “বিকাশের প্রোগ্রামের” ভারত , নিজেরর আগামির জন্য নতুন পাচ শহরের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দিয়ে চুক্তি করেছে। আমরা নতুন ধরণে যুগে প্রবেশ করে গেছি। একে বুঝতে আমরা যেন অন্তত আশির দশকের কোল্ড ওয়ারের ধারণা ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করতে না যাই। কারণ ওটা অচল, আনফিট।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ০৬ জুন (প্রিন্টে ০৭ জুন) ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ওয়েবে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার পরিবর্ধিত ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]

স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস

একা ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস
গৌতম দাস
০৭ জুন, ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1g9

যুদ্ধে প্রথম পারমানবিক বোমা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আমেরিকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফলাফল আমেরিকার পক্ষে আসন্ন এটা নির্ধারিত হয়ে উঠার পরও আমেরিকা ১৯৪৫ সালে এই বোমা জাপানের উপরে ব্যবহার করেছিল। এমন করার পিছনের কারণ যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে এর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাখা এবং এর ভয়াবহতার মাত্রা কেমন হয় সেটাও বুঝে রাখতে। বলা বাহুল্য কোন হুশজ্ঞানওয়ালা চিমটি কাটলে লাগে টের পায় এমন মানুষের জন্য সেটা খুবই খারাপ ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। সম্ভবত সেটাই এরপর থেকে আজ পর্যন্ত  দুনিয়া আর কোথাও এই অস্ত্রের ব্যবহার আমরা আর দেখেনি। কিন্তু এসব বাজে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তবু বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারমানবিক অস্ত্র অর্জন এবং ভান্ডারে রাখার আগ্রহ কমাতে পারে নাই। বিগত ১৯৭৬ সালের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান পারমানবিক বোমা অর্জন করে ফেলেছিল। এটা উপমহাদেশীয় বা একদিকের পরিস্থিতি। কিন্তু ততদিনে অন্যদিকে অর্থাৎ পশ্চিমে বা কোল্ড ওয়ার লড়ার দুই মাতবর আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুনিয়ার পরিস্থিতি তাদেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে – এটা বিপদ বুঝতে পেরে গিয়েছিল।  তাই, পারমানবিক অস্ত্র আর ব্যবহার করবে না বলে পরস্পর পরস্পরের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক চুক্তি স্বাক্ষর দিয়ে ফেলেছিল।  এটাই Non-Proliferation Treaty অথবা NPT – সেই আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৯৬৮ সালে যা স্বাক্ষরিত হয়। সে বিষয়ে পরে আসছি। কিন্তু এখানে আলোচনার জন্য গুরুত্বপুর্ণ হল, ভারত ও পাকিস্তান; যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে তা সবাই জানে। কিন্তু এরা দুজন আজ পর্যন্ত কখনই এনপিটি তে স্বাক্ষর করে নাই। এটা ঠিক যে অস্ত্র হিসাবে পারমানবিক অস্ত্র পশ্চিমের কাছে ডেড ইস্যু, খামোখা পয়সা নষ্ট ধরণের বিষয় আর এর সবচেয়েও বড় দিক খতরনাক। কিন্তু এতটুকুওই সব বা শেষ কথা নয়। যেমন, এই অস্ত্রই যদি আবার এশিয়ার কোন দেশ যদি এখনও তা অর্জন করতে চায় তবে সে ঘটনাতে পশ্চিমা যে কোন মাতব্বর দেশ নড়চড়ে বসে আর নিজের জন্য হুমকি গণ্য করে থাকে।

তা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতিতে “ভারত ও এনপিটি” আবার এখন ইস্যু। সারকথায় বললে এর মূল কারণ, ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করলেও একালে আমেরিকা যেচে পড়ে ভারতকে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল দিবে বলে উস্কানি দিয়েছে। এবং সেটা ভারত এনপিটিতে এবার স্বাক্ষর না করেই হাসিল করতে পারে এমন লোভের মুলা ঝুলিয়েছে আমেরিকা। এর উদ্দেশ্য হল, ভারতের কথিত চীন-ভীতির বিপরীতে দেখানো যে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে আমেরিকা কত কেয়ার করে! ভারত আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার হয়ে আরও কাছে আসুক। এছাড়াও আমেরিকান খায়েসটাকে গুছিয়ে বললে তা হল এরকম যে প্রতিদানে, নতুন যে গ্লোবাল অর্থনীতিক অর্ডার আসন্ন, যাতে মনে করা হচ্ছে চীনের স্টেক হবে হাই বা অনেক বেশি। তাতে ভারত যেন আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের সাথে সে নতুন অর্ডারের পক্ষে অবস্থান না নেয়। অর্থাৎ পুরান বা চলতি গ্লোবাল অর্ডার, যেটা আমেরিকান নেতৃত্বে সাজানো তা এখনও ভারতের স্বার্থের দিক থেকে লোভনীয় বলে যেন ভারত মনে করে। পারমানবিক ইস্যুর দিক থেকে এই বিষয়টা বুঝতে আজকের প্রসঙ্গ সেদিকে নিব।

গত ২০০৫ সাল, সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম টার্মের শাসন রাজত্বের শেষ বছর। আর একই সাথে আমেরিকার দিক থেকে সেটা ছিল ভারতকে কাছে টানার কৌশলের অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে উস্কে তোলা শুরুর বছর। চীন ও ভারতের নিজেদের পারস্পরিক স্বার্থে নিজেদের ভিতর মিল-অমিল, ঝগড়া-বন্ধুত্ব বহু কিছু আছে। থাকাও স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘস্থায়ী দিক থেকে দেখলে তাদের কিছু গভীর কমন স্বার্থ আছে ফলে এই অর্থে তারা ঘনিষ্ট বন্ধু, কিন্তু আপাত দিক থেকে এটাই আবার পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতারও এবং নানান স্বার্থ-বিরোধেরও। তাই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের লক্ষ্য ছিল, চীন-ভারতের সম্পর্কের ভিতর যতই ভালভালাইয়া থাকুক সেটার ফলাফল হিসাবে তা থেকে উভয়েই যেন একসাথে আমেরিকা তাদের ‘কমন এনিমি’ এই জ্ঞান না করে বসে, এই প্রশ্নে যেন তারা এককাট্টা হয়ে দাড়িয়ে না যায়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বুশ জুলাই ২০০৫ সালে প্রথম ভারত সফরে আসেন। এক যৌথ ঘোষণাও স্বাক্ষরিত হয় ১৮ জুলাই ২০০৫। সেই সাথে এই প্রথম পাবলিক হয়েছিল যে ভারত ও আমেরিকার সামরিক সম্পর্কই শুধু নয় কী ভিত্তিগত কাঠামোর মধ্যে ভারত-আমেরিকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্ক  হবে তাও ইতোমধ্যেই তারা চুড়ান্ত করে ফেলেছে।

একেবারে জন্মের সময়ের পটভুমির দিক থেকে বললে,  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একচেটিয়া সরবরাহকারী ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বা বর্তমান রাশিয়া) কে কেন্দ্র করে সাজানো অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার সময় থেকেই ওর মূল সরঞ্জাম ও এর সরবরাহ মূলত রাশিয়া ঘরাণার। কোল্ড ওয়ার মানে দুনিয়াটা দুই ব্লকে বিভক্ত থাকবার সময় বা বিভক্ত হয়ে ছিল যখন। ছোট-বড় সব রাষ্ট্রকে যখন হয় সোভিয়েত ব্লক নয়ত আমেরিকান ব্লকে ঢুকে যেতেই হয়েছিল। যখন দুটা থেকেই বাইরে থাকার উপায় ছিল না বা যেত না। এটা ছিল সেই ব্লক যুগ বা কোল্ড ওয়ারের যুগ। কোল্ড ওয়ার – মানে ঠিক যুদ্ধ লাগিয়ে জড়িয়ে যাওয়া নয় কিন্তু সব সময় যুদ্ধে জড়িয়ে থাকার মতই টেনশনে থাকা। আর গোয়েন্দা আর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স, সাবভারসিভ এক্টের ষড়যন্ত্র চারদিকে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯২) যাবার পর থেকে কার্যত সেই কোল্ড ওয়ার এখন মৃত, দুনিয়া আর এখন ব্লকে ভাগ করা নাই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সে সময়ের তৈরি হওয়া অস্ত্রের ঘরানা সেই হিসাব, কেবল তাই এখনও প্রচ্ছন্নে বহাল আছে।

ইতোমধ্যে ১৯৯২ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আলাদা ১৫ রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া – এটাকে কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তি সুচনা বলা যায়। ওদিকে এই ঘটনার পরের দুই টার্ম (১৯৯৩-২০০১) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিল ক্লিনটন। আর ক্লিনটন যুগের পরিসমাপ্তিতে, এরপরেই ২০০১ সাল থেকে জুনিয়র বুশও পরপর দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল –“কোল্ড ওয়ার শেষ হয়েছে এখন তারা একলাই রাজা” ধরণের আমোদে থাকার। কারণ কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তিতে দুনিয়াতে আর আমাদের মত দেশগুলোকে সোভিয়েত অথবা আমেরিকান কোন না কোন ব্লকে ঢুকে টিকে থাকতে হবে এই বাস্তবতার অবসান ঘটেছিল। একথাকেই আর একভাবে বলা যে দুনিয়া তখন থেকে আর বাইপোলার নয়। মানে, পরাশক্তি অর্থে দুনিয়া আর দুই মেরুতে বিভক্ত থাকে নাই। এতে স্বভাবতই আমেরিকান বিদেশ নীতিতে সেই প্রথম বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। নতুন মৌলিক কিছু বদল তখনই মানে, ক্লিনটনের আমলেই হয়েছিল। যেমন আমাদের মত দেশে আমেরিকা সমর্থিত কোন সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাকে আর ‘আগের মত’ সামরিক সরকার হতে হবে না। স্টেট ডিপার্টমেন্টের নতুন নির্দেশিকা অবস্থান হল, বেসামরিক সরকারের পক্ষে থাকতে হবে। সর্বোতভাবে চেষ্টা করতে হবে ক্ষমতা বেসামরিক হাতে রাখতে। কোল্ড ওয়ারের যুগে আমেরিকা ব্যতিক্রমহীনভাবে আমাদের মত যে কোন দেশে কোথাও বেসামরিক সরকার টিকাতে পারে নাই। ফলে আমেরিকা সমর্থিত সরকার মানেই সেটা সামরিক সরকারই হতে দেখা গিয়েছিল। এই অর্থে ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে বেসামরিক সরকার টিকানোর সফলতা উপভোগের কাল। অবশ্য এটাও বাইরের দিক থেকে তাকিয়ে বলা। আর ভিতরে ভিতরে তা ছিল নতুন পরিস্থিতিতে এক মেরুর কালে আমেরিকান নতুন বিদেশনীতিতে আর কী বৈশিষ্ট আনা যেতে পারে,  কী হওয়া উচিত তা নিয়ে আরও বিস্তারে ভাবনা চিন্তার কাল। তবে আমেরিকান নতুন বিদেশ নীতির আরও পোক্ত রূপ হাজির করতে এবং তার বাস্তবায়ন শুরু হতে হতে ক্লিনটন আমল পেরিয়ে বুশের আমল চলে আসে।  আর এসব নতুন চিন্তা ভাবনা থেকেই পুরানা চিন্তা ও ব্লক ভেদাভেদ দৃষ্টিভঙ্গী ভেঙ্গে আমেরিকা ভারতের দিকে এগিয়ে আসার নতুন নীতি নেয়। বুশের আমল থেকে আমরা আমেরিকার নতুন ও পোক্ত বিদেশ নীতির বাস্তবায়নের কাল হিসাবে দেখতে পারি।

ওদিকে জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মই আবার একই সাথে ভিন্ন আর এক ফেনোমেনা স্পষ্ট দৃশ্যমান হাজির হবার বছর। সেটা ছিল চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের দু’দশকের কালপর্ব (১৯৯০-২০১০), ডাবল ডিজিট জিডিপি গ্রোথের সেকেন্ড ডিকেড বা দ্বিতীয় দশ বছর। যদিও চীনের এই উত্থানের ফলে আমেরিকা-রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের উপর এর প্রভাব পরিণতি কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমেরিকান সরকারি স্পষ্ট গবেষণা লব্ধ ফল আসা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের পর থেকে, যার চুড়ান্ত রিপোর্ট এসেছিল ২০০৮ সালে। এসবের আগে যদিও অনুমান নির্ভর কিছু খবর যেমন, প্রজেক্টেড রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল ২০০৪ সালেই (ষ্টাটিষ্টিক্যাল প্রজেকশন রিপোর্টের জন্য আমেরিকান বিখ্যাত ম্যাগাজিন)  ফর্বস ম্যাগাজিনের সৌজন্যে। ফলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন-ভারত একজোটে কোন কমন স্টাটেজিতে যেন না দাঁড়ায়  সে উদ্দেশ্যে ভারতকে কাছে টেনে বাড়তি খাতির করে চীন ও ভারতের মধ্যে দুরত্ত্ব তৈরি করা ছিল সেকালে আমেরিকান বিদেশ নীতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট। জুনিয়র বুশের ২০০৫ সালের জুলাইয়ের ভারত সফরকে এই আলোকে দেখলে অনেক প্রশ্নের ব্যাখ্যা মিলবে। ঐ সফরের ফোকাস ঘটনা ছিল, ভারতকে আমেরিকার নিউক্লিয়ার টেকনোলজিসহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বা বিক্রির সিদ্ধান্ত।

আগেই বলেছি, নিউক্লিয়ার বোমা বা পারমাণবিক বোমা পশ্চিমের হাতে এসে মারাত্মক অস্ত্র হিসাবে কার্যকর হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ কালে। এরপর সেখান থেকে এই অস্ত্রের গবেষণা ও বিকাশ বিস্তা্র সবচেয়ে বেশি ঘটে কোল্ড ওয়ারের সময় (মোটামুটি ১৯৫০-১৯৯২) কালে। যদিও ঠিক এর উলটা অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্রের উতপাদন বৃদ্ধি ও বিস্তার রোধে পরাশক্তিগত ততপরতাও শুরু হয় ১৯৬৮ সাল থেকে। স্বাক্ষরিত হয় NPT চুক্তি। অর্থাৎ প্রো-লাইফারেশন কথার সোজা বাংলা অর্থ “আয়ু দেয়া” বা “সহজেই যা বিস্তার লাভ করে”। কাজেই পারমাণবিক NPT  কথার মানে বাংলা করলে দাড়ায়, পারমানবিক অস্ত্র বা এর টেকনোলজির বিস্তার রোধের চুক্তি। আমেরিকান সরকারি ইতিহাস অনুসারে ১৯৬১-৬৮ প্রায় এই ৭ বছর ধরে নিগোশিয়েশনের ফসল হল এই চুক্তি। এর আবার তিন পৃথক পর্যায় বা অংশ আছে – নন-প্রোলিফারেশন, ডিসআর্মামেন্ট ও পিসফুল ইউজ। অর্থাৎ বিস্তার রোধ (অস্ত্রে ব্যবহারের লক্ষ্যে গবেষণা ও উতপাদন বন্ধ), নিরস্ত্রীকরণ (যে অস্ত্র তৈরি হয়ে গেছে এর ধ্বংস বা ব্যবহার বন্ধ করা) ও (যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে নয় তবে এই টেকনোলজির) শান্তিপুর্ণ ব্যবহার। প্রথম চোটে আমেরিকা, বৃটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এতে স্বাক্ষর করেছিল ১৯৬৮ সালে। কিন্তু তবুও  চীন ও ফ্রান্স  ১৯৯২ সালের আগে স্বাক্ষর করে নাই বলে একমাত্র এরপরই জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যরেই স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়। অন্যভাবে বলা যায় এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের বিষয়টাই ১৯৯২ সালের আগে অর্থাৎ  কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তির আগে কার্যকর করা যায় নাই। বিশেষ করে যারা ভেটো-ক্ষমতাধারী এবং যাদের সবার হাতে পারমানবিক অস্ত্র মজুদও আছে, একারণে। এছাড়া যাদের হাতে অস্ত্র মজুদ নাই তারাসহ বর্তমানের মোট স্বাক্ষর করা দেশের (তাইওয়ানসহ) সংখ্যা ১৮৯। কিন্তু স্বাক্ষর করতে একেবারেই ইচ্ছুক নয় (এদের মধ্যে যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে জানা যায় বা অনুমান করা যায়) এমন রাষ্ট্র হল  ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও সাউথ সুদান। সাউথ আফ্রিকাকেও এই দলে ফেলা যেত সে সময়। কিন্তু ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদিতা বিরোধী সরকার কায়েমের পরে সে এনপিটি স্বাক্ষর করা দেশ হয়ে যায়। ওদিকে উত্তর কোরিয়া স্বাক্ষর করেছিল প্রথমে কিন্তু আবার প্রত্যাহার করেছে ২০০৩ সালে। এদের মধ্যে কেবল ভারত ও পাকিস্তান হল এমন রাষ্ট্র যাদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র থাকার ব্যাপারটা সবাই জানে এবং তারা নিজেরাও স্বীকার করে। নিজ স্বীকারোক্তির ১৯৭৪-৬ সাল থেকেই পারমানবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হলেও এরা এনপিটি তে স্বাক্ষর করতেও চায় না। চলতি একবিংশ শতকের আগে এনপিটি বিষয়টা এভাবেই ছিল।  আর এসবের টেকনিক্যাল খুটিনাটি দিক তদারক করা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে রিপোর্ট করার প্রতিষ্ঠান হল IAEA (ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এসোশিয়েশন)।

এনপিটি স্বাক্ষরিত দেশগুলোর মধ্যে পশ্চিমের যেসব দেশের হাতে পারমানবিক অস্ত্র ও টেকনোলজি আছে এবং যারা সেটা অন্য রাষ্ট্র কাউকে (কেবল শান্তিপুর্ণ ব্যবহারের জন্য) দিতে চায় তাদের সেই  দেওয়ার বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ৪৮ সদস্যের এক নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ আছে যার নাম NSG, নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি। গ্রুপের সদস্যরা মূলত পারমানবিক টেকনোলজি অথবা মালামাল সরবরাহে সক্ষম। ফলে শান্তিপুর্ণ ব্যবহার যেমন বিদ্যুৎ উতপাদনে এবং বৈধভাবে ব্যবহার করতে চাইলেও কোন এক এনএসজি গ্রুপের সদস্যকে ধরতে  হবে।  তবে কিছু ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি এখানে স্পষ্ট করা দরকার। যেমন ইরান, অনুমান করা হয় সে পাকিস্তান (ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞানী কাদের খান) বা উত্তর কোরিয়া অথবা উভয়ের কাছ থেকে মালামাল ও টেকনোলজি সংগ্রহ করেছে। অর্থাৎ এনএসজি এর কেউ তাকে সরবরাহে রাজি হয় নাই। ভিন্ন আর এক ব্যতিক্রম ভারত। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ ভারত সফরে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল সরবরাহ বিষয়ে চুক্তি করেছিল।

এই হল পিছনের পটভুমি। এখন ভারত ঐ চুক্তি কার্যকর হয়েছে দেখতে চাইলে তাকে আর এক বাধা পার হতে হবে। সেটা হল, উপরে যে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি এর কথা বলেছি, ভারতকে ঐ গ্রুপের সদস্য হয়ে নিতে হবে। কারণ ভারতের সাপ্লায়ার আমেরিকা ভারতকে সরবরাহ দিতে পারে যদি ভারত এনএসজি এর সদস্য হয়। অন্য ভাষায় বললে এই গ্রুপের পালনীয় নিয়মকানুন মেনে সরবরাহকৃত মালামাল ও টেকনোলজি ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দেয়। আমেরিকার সরবরাহ পেতে ভারতকে আগে এনএসজি এর সদস্যপদ পেয়ে নিতে হবে এব্যাপারে খোদ ভারত বা আমেরিকার কোন বিতর্ক নাই। তাহলে বিতর্ক কী নিয়ে? বিতর্কে ভারতের দাবি, আমার অতীত আচরণ ও ট্রেক রেকর্ড ভাল ফলে আমি আমেরিকা এই NSG থেকে সাপ্লাই পাবার যোগ্য।  কিন্তু স্পষ্ট করে যেটা ভারত বলছে না তা হল, এর অর্থ কী ভারতের NSG এর সদস্য গণ্য করে নিতে হবে, অথবা আর কোন বিবেচনায় না গিয়ে সদস্যপদ দিয়ে দিতে হবে? এছাড়াও NPT স্বাক্ষরের কী হবে? ভারত NPT তে স্বাক্ষর না করলেও NSG এর সদস্য গণ্য হতে পারে? এর মানে NPT তে স্বাক্ষর করা NSG এর সদস্য হবার ক্ষেত্রে পুর্বশর্ত নাও হতে পারে? তাই কী?

যারা এনপিটি এর সদস্য অর্থাৎ পারমানবিক মালামাল ও টেকনোলজি যারা কেবল শান্তিপুর্ণ কাজে, অস্ত্র নয় বিদ্যুৎ উতপাদনের মত কাজে ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বলে স্বাক্ষর করেছে কেবল তাদেরকে নিয়েই এনএসজি বা সরবরাহকারিদের গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। অর্থাৎ এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হল এনপিটি তে স্বাক্ষর করে আসা, এর সদস্য হওয়া। কিন্তু ভারত কখনই এনপিটিতে স্বাক্ষর করে নাই। ফলে সে এনপিটি এর সদস্যই নয়। ফলে তর্কের বিষয় এটা যে, এনপিটি সদস্য না হয়েও ভারত এনএসজি এর সদস্য বলে গৃহীত হবে কী না?

সোজা ভাষায় ভারত চাচ্ছে বা চেষ্টা করছে, এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেই সে আমেরিকার টেকনোলজি ও মালামাল পেতে চায়। কিভাবে?

ভারতের মিডিয়া চলতি মে মাসে অভিযোগের রিপোর্ট ছেপেছে যে আমেরিকা থেকে ভারতের নিউক্লিয়ার বিষয়ক সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে  চীন বাধা সৃষ্টি করছে।  যেমন ইংরাজি ‘দি হিন্দু’ এর শিরোনাম “চীন ও পাকিস্তানের আপত্তি উল্টায়ে দিয়ে আমেরিকা বলছে ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি”। এটা শিরোনাম, আর রিপোর্টের বডিতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জন কিরবি এর উদ্ধৃতিতে বলা হচ্ছে, তিনি বলেছেন, “ ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট (ওবামা) ভারত সফরের সময় তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে, আমেরিকার ব্যাখ্যায় ভারত মিসাইল টেকনোলজি কনট্রোল রেজিমের শর্তাবলী পূরণ করে এবং ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি (India meets missile technology control regime requirements and is ready for NSG membership,)”। বুঝাই যাচ্ছে আমেরিকা সরাসরি একথা বলছে না যে ভারত এনপিটি এর সদস্য না হলেও এনএসজি এর সদস্য বিবেচিত হতে পারে কীনা। এছাড়া আমেরিকার বুঝ ব্যাখ্যার কথা বলা হচ্ছে। তার মানে অন্য কারো ব্যাখ্যা আর এক রকম হতেও পারে। এসবের বিপরীতে চীন বলছে। আমেরিকার সাথে ভারতের চুক্তি সেটা এখানে ইস্যু নয়। সেটার ভিতর চীনের আপত্ দেখার কিছু নাই। তার অবস্থান হল, ভারত এনপিটি এর সদস্য হয়ে নিলেই সব সমাধান। এর কারণ হিসাবে চীন বলছে গত বছর এনএসজি এর সভায়, এনপিটি এর সদস্য হতে হবে আগে – এটাই এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হিসাবে বলা হয়েছে। ফলে এখানে চীনের বাড়তি পরামর্শ হল বিষয়টা নিয়ে এনএসজির যারা সদস্য তাদের সাথে কথা বলে ভারত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারে। অর্থাৎ এটা পরিস্কার ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বা তাদের কোন চুক্তির বিরোধিতা বা ঠেকায় দেয়া দিবার কোন ইচ্ছা এখানে চীনের নাই।

‘দি হিন্দু’ স্টেট ডিপার্টমেন্টের জন কিরবিকে উদ্ধৃত করে আরও বলছে, “কেউ এনএসজি এর সদস্য হতে পারবে কীনা তা নিয়ে দেয়া বক্তব্য বর্তমান সদস্যদের আভ্যন্তরীণ বিষয়”। অর্থাৎ এনিয়ে ভারতের বলার কিছু নাই।

তাহলে শেষে কোথায় দাড়াল বিষয়টা? শেষ কথা হল, মিডিয়াগুলোকে – ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক জমে উঠতে চীন বাধা দিচ্ছে এমন এক ধারণা – ছড়াতে ব্রিফ করা হয়েছে। আর এই খামোখা চীন বিরোধিতা তাতিয়ে দিয়ে খোদ ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি এখন চীন সফরে আছেন। আর আলোচনার মূল বিষয় এনএসজি এর সদস্যপদ, একেবারে ‘হর্সেস মাউথ’ ফয়সালা।

কে না জানে, এনপিটি স্বাক্ষরের সোজা অর্থ পরমাণুর অস্ত্রে ব্যবহার তাহলে এরপর আর করা যাবে না। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের পাঁচ ভেটো ক্ষমতার রাষ্ট্র সহ প্রায় সকলে এই কনভেনশনে স্বাক্ষরদান করে ফেলেছে। ফলে কারই আর যে সুবিধা নাই এবং সবাই স্বাক্ষর দিয়ে প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ যে আর পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে কেন আমেরিকা বা এদের কারো সহয়তাতেই অস্ত্র বানানো ও প্রয়োগের ভারতের একা সুবিধা থাকবে? এবং থাকবে সেটা আমেরিকার হাত দিয়ে, সুপারিশে? ভারত কী আশা করে দুনিয়ায় এনপিটি স্বাক্ষর না-কারি রাষ্ট্র হবে একমাত্র ভারত! যাকে আবার তোলা তোলা করে বিশেষ খাতিরে আমেরিকা পরমাণু টেকনোলজি ও মালামালও দিবে। কারণ আমেরিকার চীনের উত্থানের এতই ঠেকেছে! আর এই সুবিধা আর কারো থাকবে না। তবে একা ভারত ঐ টেকনোলজি ও মালামাল দিয়ে অস্ত্র বানানোর দিকেও চাইলে চলে যেতেও পারবে! কী তামশা! বলা বাহুল্য ভারত স্বপ্নের ঘোরে আছে। আর কেউ স্বপ্নে খেলে পোলাও খাওয়াই উচিত!

 

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের ৩০মে ২০১৬ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও বর্ধিত আকারে ও এডিট করে ছাপা হল।]