নেপালের পর এবার ভুটানও ভারতের হাতছাড়া!

নেপালের পর এবার ভুটানও ভারতের হাতছাড়া!

গৌতম দাস

২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2uc

ভুটানের সদ্য শেষ হওয়া সাধারণ নির্বাচনে ভোটদানের অপেক্ষা

ভারতের জন্য সম্ভবত “আরেকটা উইকেটের পতন” হতে যাচ্ছে। না, দুবাইয়ের এশিয়া কাপ ক্রিকেট খেলা নয়, ভুটানের নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে। ভুটানের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮। প্রো-ইন্ডিয়ান যে দল এতদিন ক্ষমতায় ছিল যার নাম পিডিপি [Peoples’ Democratic Party’s (PDP)], এবারের নির্বাচনে এর শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। ভোটের ফলাফলে দলটি নেমে গেছে প্রথম থেকে তৃতীয় অবস্থানে। এটা অবশ্য প্রথম রাউন্ডের নির্বাচন। সেকেন্ড বা ফাইনাল রাউন্ড অনুষ্ঠিত হবে আগামি মাসে ১৮ অক্টোবর। ২১ সেপ্টেম্বর ছিল দ্বিতীয় রাউন্ডের নমিনেশন পেপার জমা দেয়ার শেষ দিন।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে ভারত “নিজের বাড়ির পিছনের বাগানবাড়ি” মনে করতে ভালোবাসে। শুধু তাই নয়, নিজের কোনো মুরোদ থাকুক আর নাই থাকুক, চীন কেন সেখানে অবকাঠামো ঋণ নিয়ে হাজির হবে এবং এতে সেখানে চীনের প্রভাব কেন বাড়াবে তা নিয়ে ভারতের নাই-মুরোদের অস্বস্তি ও আপত্তি কেউ শুনুক আর না শুনুক, ভারত নিয়মিত এনিয়ে উষ্মা-অভিযোগ করে যেতে খুবই ভালোবাসে।

ভুটান-ভারত বন্ধুত্বের(?) চুক্তি ১৯৪৯
ভুটান এক দিকে ভারত ও অন্য দিকে চীন দিয়ে ঘেরা। আর এক পড়শি নেপাল রাষ্ট্রের মতই ভুটানও চারদিকে অন্যের ভুমি দিয়ে ভূমিবেষ্টিত বা ল্যান্ডলকড। বাইরে বের হতে চাইলে ভুটানকে ভারত অথবা চীনের ভুমি পেরিয়ে তবেই তাদেরই কোন সমুদ্র বন্দরের নাগাল পেতে পারে। বাণিজ্য ও পণ্য আনা নেওয়া সচল করতে পারে। সাম্প্রতিককালে ভারতের নাগপাশ ছিঁড়ে নেপালের সার্বভৌমত্বের চর্চা, সাহস এবং তার নেয়া পদক্ষেপগুলো দেখে সম্ভবত ভুটানের মনেও অনেক সাহস জমা হয়ে থাকবে। ভুটানের প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনের ফলাফলে অন্তত এর একটা প্রকাশ ঘটেছে বলে মনে করার কারণ আছে; তাই এতে ভুটানও হাতছাড়া হয়ে যাওয়া ভারতের জন্য সম্ভবত আরেক উইকেটের পতনের ইঙ্গিত!

নেপালের মত ভুটানও “ভুটান-ভারত বন্ধুত্বের চুক্তি ১৯৪৯” নামে ভারতের কাছে দাসখতের খোটায় বাধা পরে আছে। এগুলো একালে ১৯৪৭ সালের পরে ভারতের রিনিউ বা নতুন করে করা চুক্তি হলেও, সবই কলোনি আমলে বৃটিশ এম্পায়ারের সাথে ভুটানের (নেপালেরও) যে দাসত্ব চুক্তি ছিল, মুলত সেটারই কপি। কেবল “বৃটিশ সরকারের” জায়গায় “ভারত সরকার” বসিয়ে নিয়েছেন ভারতের নেহেরু সাহেব।  সে আমলে কলোনি মালিক বলতে বৃটিশ, ফরাসি, ডাচ, স্পেনিস, পর্তুগীজ মূলত এরাই ছিল, আর ছিল এদের পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কার কলোনি কে যেকোন উপায়ে টান দিয়ে নিয়ে যায় এনিয়ে প্রতিযোগিতা চলত। একারণে পুরানা রাজার রাজ্য কলোনি করে নিতে পারলে এরপর অনেক সময় সেটাকে “করদ রাজ্য” বলে ছাড় দিয়ে রাখত। আর করদ রাজ্য অন্যতম বৈশিষ্ট হত এক চুক্তিপত্র যেখানে লেখা থাকত যে ঐ রাজ্য আর বৈদেশিক বিষয়ে নিজে নিজের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে না, সেটা করবে বৃটেন। […the Kingdom of Bhutan is guaranteed its independence, but agrees to be represented by Great Britain in its foreign affairs.] এটা (১৯১০ সালে) বৃটেন ও ভুটানের মধ্যেকার চুক্তিপত্র  থেকে তুলে আনলাম। চুক্তিতে এমন লেখা থাকার মূল কারণ যাতে নেপাল বা ভুটান অন্যকোন কলোনি শক্তির সাথে নতুন চুক্তি করে চলতি চুক্তি ভেঙ্গে না দিতে পারে। পুরান চুক্তির কলোনি প্রভুদের কথাগুলোই কপি করার মধ্য দিয়ে “কথিত প্রগতিবাদী” প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর নিজেই কলোনি-প্রভু হবার খায়েস এবং কলোনি-শাসক-প্রিয়তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। সেই থেকে ভারতের সিভিল-মিলিটারি আমলা প্রশাসনের ওরিয়েন্টেশনে ও মন-মানসিকতায় অন্য রাষ্ট্রকে কলোনি-সম্পর্কে আবদ্ধ করার আগ্রহ অভ্যাস হিসাবে রপ্ত হয়ে যায়।
অনেকে মনে করতে পারেন কলোনি আমলে কলোনি বানানো জায়েজ হলে একালে নয় কেন, নেহেরুর তাহলে দোষ কী? অবশ্যই দোষের এবং ঘোরতর দোষের। কারণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের দুনিয়া শুরু হচ্ছে রাষ্ট্রগুলোর নীতিগত অবস্থান ও কনভেনশনে যে, কলোনি শাসন অন্যায়, অবৈধ। ভিন্ন ভাষায়, “প্রত্যেক জনগোষ্ঠি কিভাবে শাসিত হবে তা তাঁরা নিজেরাই নির্ধারণ করবে। আর এই নির্ধারণ তাদের অধিকার”। তাই ১৯৪১ সালের পরে জন্ম নেয়া জাতিসংঘসহ সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এই ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আছে। সেকারণে কফি আনান বলতে পেরেছিলেন, সাদ্দাম-উতখাতের পরের ইরাকে আমেরিকার বুশ প্রশাসনের উপস্থিতি – জাতিসংঘের চোখে এখানে “আমেরিকা এক দখলদার শক্তি”।

আর এটারই নেহেরু আমলে ১৯৪৯ সালের করা চুক্তির ভাষ্যে, তৃতীয় দফা আছে এভাবে, “……বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ে ভারত সরকার  ভুটান সরকারকে যা বলবে ভুটান সেই পরামর্শ অনুসরণ করবে বলে রাজি হচ্ছে”। [On its part the Government of Bhutan agrees to be guided by the advice of the Government of India in regard to its external relations.] অর্থাৎ কেবল ভাষার রকম ফের করে একই জিনিষ রেখে দেয়া হয়েছে। মজার কথা হল, এই চুক্তিতে ভুটান সরকারকে বৃটিশ সরকারের একটা ক্ষতিপুরণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া ছিল। যার ১৯১০ সালের মূল চুক্তি অনুযায়ী ছিল সেকালের মুদ্রায় ১০ লাখ ভারতীয় রুপী। আর ১৯৪৯ সালে এসে দেখা যায়, নেহেরু সাব একালের মুদ্রামানে বাড়ানো দূরে থাক বরং কমিয়ে করেছিলেন মাত্র ৫ লাখ রুপী। তবে এসব প্রসঙ্গগুলো ২০০৭ সালে চুক্তি আপডেট [update the 1949 Treaty] এর সময় বাদ দেয়া হয়েছে । আর সেই সাথে ২০০৭ সালের এই আপডেট চুক্তিতে কী শর্তে ভারতের ভুমি ব্যবহার করে মালামাল আমদানি করতে পারবে এই ইস্যু ঢুকানো হয়েছে। তবে বলা হয়েছে ভুটান সব কিছুই আমদানি করতে পারবে “ভারত যতক্ষণ সন্তুষ্ট” [as long as the Government of India is satisfied] থাকবে। এটা নেপাল-ভারত ১৯৫০ সালের চুক্তির ভাষ্যটাই এটাই। এবার সেটার আলোকে ২০০৭ সালে ভারত-ভুটান আপডেট চুক্তি করে নেয়া হয়েছে। এর সোজা অর্থ হল এই চুক্তি অর্থহীন। কারণ ভারত যে কোন সময় কোন কারণ না দেখিয়ে যেকোন আমদানিকে “বন্ধ” বলতে পারবে – কেবল সে “অসন্তুষ্ট” একথা উল্লেখ করার যথেষ্ট হবে।

এখান থেকে এটা পরিস্কার কেন ভুটান চীনের সাথে সম্পর্ক পাতাতে আগ্রহী। নেপাল বা ভুটান উভয়েই ভারতের শর্তের বেড়াজাল ভাঙতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। সম্প্রতি নেপাল কোন কিছু আমদানি করতে গেলে এতদিনের ভারতের উপর তার শতভাগ নির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠার পথ পেয়ে গেছে। নেপালকে ট্রানজিট দানের ক্ষেত্রে ভারতের একচেটিয়ার দিন শেষ হয়েছে।  ভারতের বিকল্প হিসাবে চীনের ভুমি ব্যবহার করে চীনের চারটা সমুদ্র পোর্টসহ ও স্থলবন্দর মিলিয়ে মোট সাতটা পয়েন্ট দিয়ে আমদানি করতে পারার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চীনের সাথে এই চুক্তির ফলে বাস্তবত এটা নেপাল-ভারত মৈত্রী চুক্তির নামে দাসত্ব চুক্তি নেপালের কাছে “অপ্রয়োজনীয়” হয়ে গেছে। চীন-নেপাল সম্পর্কের এই নতুন বিকাশ ও অভিমুখ ভুটানের অজানা থাকার কারণ নাই। নেপালকে অনুসরণ এখন ভুটানের জন্য কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র।

২০১৩ ও ২০১৮ এর নির্বাচন কিছু তুলনামূলক আলাপ
গত ২০০৭ সালে আগের পুরা রাজতন্ত্র থেকে কনষ্টিটিউশনাল শাসনে আসার পর থেকে এটা ভুটানের তৃতীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন। তবে ভুটানে নির্বাচনব্যবস্থা দুই স্তরে সম্পন্ন হয়। তাই এবারের নির্বাচনপ্রক্রিয়া শেষ করতে, দ্বিতীয় ও শেষ স্তরের নির্বাচন হবে ১৮ অক্টোবর। যেখানে এবার প্রার্থী হতে পারবেন, ১৫ সেপ্টেম্বরের ফলাফলে সর্বোচ্চ প্রাপ্ত ভোটে যারা প্রথম ও দ্বিতীয়, কেবল সেই দুই দলের প্রত্যেকের (ভুটানের পার্লামেন্টে মোট সংসদীয় আসন ৪৭ মাত্র) ৪৭ জন করে প্রার্থী।

২০১৩ সালের নির্বাচনের ফলাফলের সাথে এবারের একটা তুলনার মাধ্যমে ধারণা পাওয়া যায়। সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দলের মধ্যে তুলনা করে বলা চলে যে, গত ২০১৩ সালের নির্বাচনে যে (পিডিপি) [[Peoples’ Democratic Party’s (PDP)],] দল বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় ছিল সেই দল এবার ২০১৮ সালের প্রথম রাউন্ডে হয়ে গেছে তৃতীয়। আর ২০১৩ সালে যে দল দ্বিতীয় হয়েছিল (ডিপিটি) [Druk Phuensum Tshogpa (Bhutan Peace and Prosperity Party) (DPT)]; সে এবারো দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। কিন্তু তৃতীয় দল (ডিএনটি) [Druk Nyamrup Tshogpa (DNT) দলের মূলনেতা ডাক্তার লোটে শেরিং] এবার চমক দিয়ে উঠে এসে একেবারে প্রথম হয়ে গেছে। আর প্রথম হওয়া দলটা গঠিত হয়েছিল মাত্র গত ২০১৩ নির্বাচনের আগদিয়ে।

খুব ছোট দেশ ভুটানের লোকসংখ্যা মাত্র প্রায় আট লাখ [আমাদের মধ্যম মানের দুটা উপজেলার মোট জনসংখ্যা এরকমই; যার মধ্যে আবার এবারের মোট ভোটার প্রায় তিন লাখ (২৯১,০৯৮)। এবার ভোটদানের হারও বেশি; ভোট পড়েছে মোট ভোটারের ৬৬%, গতবার যা ছিল ৫৫.৩%। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে ভুটানি মিডিয়া বলছে, পোস্টাল ভোট এবার অনেক বেশি পড়েছে। এর বেশির ভাগ পেয়েছে প্রথম হওয়া দল। সরকারি কর্মচারী আর প্রবাসী ভুটানি (যারা আগে থেকে রেজিস্টার্ড)- এরাই মূলত পোস্টাল ভোটার। ওই দিকে বাংলাদেশের কোনো কোনো পত্রিকায় খবর বের হয়েছে [ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন ময়মনসিংহ মেডিক্যালের ছাত্র লোটে শেরিং] – প্রথম হওয়া ডিএনটি দলের প্রধান একজন এমবিবিএস ডাক্তার, তিনি আমাদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ থেকে গ্র্যাজুয়েট। যা হোক, তার দলের বিরাট জনপ্রিয়তা ও প্রথম হওয়ার কারণ বলে মনে করা হচ্ছে যে, তার প্রধান নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ছিল যে, তিনি বিজয়ী হলে গ্রামে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা পৌঁছে দেবেন, বিশেষ করে মা ও মেয়েদের ব্যাপারে বিশেষ জোর দিয়ে চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তুলবেন। মনে হচ্ছে এই প্রতিশ্রুতি তাদের মনে ধরেছে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় যেকোনো অবকাঠামো যেখানে খুবই অপ্রতুল যেমন – মোট মাত্র ১৮ হাজার বর্গমাইলের ভুটানের (তুলনায় ৫৭ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ) পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তে যেতে আজও এক সপ্তাহ সময় লাগে।

সাহস করে ভুটানের চীনের প্রতি আগ্রহের হাত বাড়ানো
তবে আরেক ফ্যাক্টস হল, এবারের দ্বিতীয় হওয়া দল ২০০৮ সালের নির্বাচনে ‘ডিপিটি’ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন  করে ক্ষমতায় (২০০৮-১৩) ছিল। কিন্তু ভারতের চোখে এই দলের “অপরাধ” হল, ২০১২ সালে তৎকালীন চীনা প্রেসিডেন্ট ওয়েন জিয়াবাওয়ের সাথে ব্রাজিলে দলের নেতা ও তৎকালীন ভুটানি প্রধানমন্ত্রী সাক্ষাৎ করেছিলেন। এতে ভারত খুবই নাখোশ হয়। এই প্রসঙ্গে টাইমস অব ইন্ডিয়ার কূটনৈতিক রিপোর্টার ইন্দ্রাণী বাগচী লিখছেন, India has had a rocky relationship with DPT which was in government between 2008 and 2013, largely because of the then PM Jigme Thinley’s interest in building ties with China.অর্থাৎ ডিপিটির প্রধানমন্ত্রী জিগমে থিনলে চীনের সাথে সম্পর্ক গড়তে আগ্রহী হয়ে পড়েছিলেন। আর এখান থেকেই পড়শি সব দেশে ভারতের যা করা স্বভাব যে, কোনো একটি দলকে প্রভাবিত করে সেটাকে ভারতের অন্ধ দালাল বানিয়ে ঐ দেশের রাজনীতি কলুষিত করে ফেলা, তা শুরু হয়। ফলে ভুটানের সেসময়ের ক্ষমতাসীন দল ‘ডিপিটি এর প্রতিদ্বন্দ্বি দল – পিডিপি ‘ভারতের দালাল’ হিসেবে পরের নির্বাচনে হাজির হয়ে যায় ও জয়লাভ করে।

সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত এক গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা ‘স্ট্রেইট টাইমস’।  ইন্ডিয়া থেকে এর ব্যুরো চিফ হলেন নির্মলা গণপতি। তিনি তাঁর রিপোর্টে ভুটানিরা ভারত ও চীন ইস্যুকে কিভাবে দেখে তা বোঝাতে একটা সাবহেডিং বাক্য লিখেছেন এমন – “ভুটানিরা দিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে মূল্য দেয়, কিন্তু তাঁরা একই সাথে বেইজিংয়ের সাথেও সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়”। [While Bhutanese value close ties with Delhi, they also feel need for relations with Beijing…]
যদিও ব্যাপারটা হল- ‘মূল্য দেয়’ অবশ্যই অগত্যা। কারণ, না দিলে আরো বিপদ। কিন্তু বেইজিংকেও খুঁজতে হয়। কারণ একতরফা ভারতের কর্তৃত্ব থেকে তাদের যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতেই হবে।

চীনের সাথে এখনও ভুটানের রাষ্ট্রদূত বিনিময় হয়নি। সেটা এখন প্রক্রিয়াধীন। তবে ইতোমধ্যেই ভারতে পরস্পরের অফিস বা অন্য কোন দেশের কোথাও গিয়ে তারা দেখা করে কথা বলে। কিন্তু তাতেও ঘোরতর অস্বস্তি আমরা বুঝতে পারি যখন দেখি যে ভারতের পার্লামেন্ট -লোকসভার সংসদীয় প্রশ্নোত্তরে এটাকে প্রসঙ্গ করা হয়েছিল। ব্যাপারটা এমনভাবে হাজির করা হয়েছে, যেন বৌমা কেন কোন পরপুরুষের সাথে কথা বলেছে আর শাশুড়ির তা নিয়ে কথা তোলার সুযোগ পেয়েছে। এনিয়ে সংসদীয় রিপোর্ট এখানে দেখা যাবে, [Q NO. 1470 BHUTAN-CHINA GETTING CLOSER]।

এ দিকে, ২০০৭ সালের পর থেকে ভুটান আর রাজার খেয়ালি শাসনের দেশ নয়, সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের রাষ্ট্র। এবার নিয়ে সেখানে তৃতীয়বার পার্লামেন্ট নির্বাচন হল। আর এর আগে প্রায় শত বছরের পুরনো (১৯১০) স্বাধীন রাজতন্ত্র হলেও, ১৯৪৭ সালে নেহরুর আমল থেকে ভুটানের পররাষ্ট্রনীতি ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতনির্ভর।

যেহেতু ভারতের ভূমির ওপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া ভুটানের ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্তি নেই- এটাকেই ভারত একরকম মুক্তিপণ বানিয়ে নিয়েছে; আর ভারতনির্ভর হতে বাধ্য করার সুযোগ হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু কত দিন ভারত সেসুযোগ পাবে? ভুটানের নতুন প্রজন্ম এথেকে মুক্তি পেতে যেন মরিয়া। যা সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই সতর্কভাবে ভুটানিজদের অন্তরে ভারত-বিরোধিতা আর চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ার হাতছানি – দুটোই বাড়ছে। নেপাল ভারতের বিকল্প এবং ভারতের চেয়ে প্রাপ্ত সুবিধাদির দিক থেকেও অগ্রসর চীনা ট্রানজিট (রেল যোগাযোগ) জোগাড় করতে পারলে, তাহলে ভুটানেরও সেটা না পারার কোনো কারণ নেই। কেবল তা কিছু সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর এটা অতীতে ১৯৪৭ সাল থেকেই নেহরুর ‘ভাইসরয়’ ভাব ধরে থাকার যে খায়েশ দেখিয়ে গেছে, ভারতের সিভিল ও গোয়েন্দা আমলা প্রশাসন এখনও যেই নীতির অনুসারি এর তো ক্ষতিপূরণ ভারতকে এখন দিতেই হবে। নেহরুর সেই আত্মঘাতী চিন্তার মূল্য ভারতকে চুকাতেই হবে।

খুব সম্ভবত এসব চিন্তা করেই ২০০৭ সালের পর থেকে রাজার আর খামখেয়ালি তো শাসন নয়। ভারতের হাত থেকে ভুটানকে বাঁচাতে তিনি তা একা পারবেন না, তাই জনগণকে শাসন-ক্ষমতার সাথে সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন। স্বেচ্ছায় রাজা জননির্বাচিত প্রতিনিধিত্বের সরকার আর কনস্টিটিউশনের অধীনে (রাজার খেয়াল নয়) পরিচালিত সরকার – এমন কনষ্টিটিউশনাল রাজতন্ত্র চালু করে দেন; আর সেই সাথে রাজনৈতিক দল ও তৎপরতা চালু হওয়ায় সরকার গঠনে জনসম্পৃক্ততাও আসে। এখান থেকেই ভুটান সরকারের নিজেরা নিজের সার্বভৌমত্ব চর্চা ও নিজ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের উদ্যোগ ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। ২০১২ সালে তদানীন্তন চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ ছিল এর অংশ। কিন্তু ভারত এতে অসন্তুষ্ট হয়েছিল ও নিজের কোটারি স্বার্থের বিপদ দেখেছিল। ভুটানের জ্বালানি তেলের সরবরাহকারী ভারত, আর এতে ভারত কিছু ভর্তুকি দিয়ে থাকে। তাই ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগের দিন ওই নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে, নিজের পক্ষে ভুটানিদের ওপর চাপ দিতে – ভারত ওই ভর্তুকি প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিয়েছিল। হঠাৎ এই চাপের মুখে, জনমনে কিছুটা ভয়ে – সব মিলিয়ে এর প্রভাবেই ঐ নির্বাচনে ভারতপন্থী দল পিডিপি ক্ষমতায় জয়লাভ করেছিল বলে মনে করা হয় এখনও। এমনকি ভারতীয় মিডিয়াতেও  কেউ কেউ এটাকে ভারতীয় সরকারের ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া বলে দোষারোপ করে থাকে।

চীনের ঝাড়ি মারা
কিন্তু এবারের নির্বাচনে প্রো-ইন্ডিয়ান দলের এক নম্বর অবস্থান থেকে তিনে চলে যাওয়াতে ভারতীয় মিডিয়ায় প্রচুর হইচই পড়ে যায়। এমনকি কোথাও ভারত সরকারকে হস্তক্ষেপ করার আহ্বান ও পরামর্শও আসতে থাকে। তেমনি এক রিপোর্ট হল – টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন। এতে কূটনৈতিক রিপোর্টার ইন্দ্রানী বাগচী লিখছেন, “ভুটানে ভারতকে উদ্যোগ ও তৎপরতা দ্বিগুণ করতে হবে”। [India will have to work doubly hard to help its closest neighbour achieve its aspirations while securing its interest…]
কিন্তু ভুটানে ভারতকে  “কোন উদ্যোগ” (হস্তক্ষেপের?) নিতে তিনি তাগিদ দিচ্ছেন সেটা ইন্দ্রাণী উহ্য রাখছেন। ইঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে, তিনি আগের মত কোন ভারতীয় হস্তক্ষেপের কথা বলছেন। লিখছেন, ‘পড়শিকে তার স্বার্থরক্ষার আকাঙ্খা অর্জন করতে ভারত যেন ভুটানে নিজ প্রচেষ্টা দ্বিগুণ করে”। এটা কি সাংবাদিকতা না উগ্র জাতীয়তাবাদী মনের আধিপত্য কামনা? আবার ভাব ধরছেন বিরাট কূটনীতিকের। কসরত করেছেন কোন এক কায়দা ব্যবহার করে “ভারতকে হস্তক্ষেপ করতে” আহ্বান করবেন যা কূটনৈতিক বা সাংবাদিকতার নর্মস অথবা আইনের বরখেলাপ মনে না হয়।
এটা আসলে পড়শির মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়া না, পড়শির মাথায় চায়ের কাপ রেখে আরাম করে হাত-পা ছড়িয়ে চা খাওয়ার বেকুবি চেষ্টা। সেই নেহরুর আমল থেকে এটাই ভারতের নিয়মনীতি বা পড়শি পলিসি হয়ে আছে। এভাবেই বিশেষ করে ল্যান্ডলকড পড়শিদের নানা চুক্তিতে বাধ্য করে সুবিধা আদায় করে এসেছে ভারত। ব্রিটিশ কলোনি মাস্টার ভারত ত্যাগ করে চলে গেলেও নেপাল বা ভুটানের মতো পড়শি দেশের বেলায় নেহরুকে যেন বৃটিশ “ভাইসরয়” হিসেবে ভূমিকা পালন করতে দিয়ে গেছে। মোটকথা, পড়শিদের ভারতকে ‘ট্যাক্স’ দিয়ে চলতে হবে, যাতে নিধিরাম সর্দার ভারত দাবি করতে পারে যে – “এই চীন, এদিকে এসো না, এটা কিন্তু ভালো হচ্ছে না; এটা আমার এরিয়া অফ ইন্টারেস্ট!”

কিন্তু কঠিন বাস্তবতাটা হল, ভারতের অর্থনীতিতে যেমন অবকাঠামো ঋণের চাহিদা ও অভাব প্রবল – আর তা মেটাতে সে চীনের কাছ থেকে ঋণ নিচ্ছে; তেমনি নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ বা শ্রীলঙ্কার মতো পড়শিরাও একই কারণে সেটাই করছে। কারণ কলোনি আমল থেকে ভারতসহ আমাদের সবার অর্থনীতিতে স্থানীয় মানুষের হাড় ভেঙে খেটে যা উদ্বৃত্ত সঞ্চয়, যা আমাদের হক এবং হবু বিনিয়োগ পুঁজি, তা লোপাট ও নিজ দেশে পাচার করেছে ব্রিটিশরা। সে অভাব, সেই থেকে বিনিয়োগ চাহিদা আর প্রাপ্তির যে বিরাট গ্যাপ সেটা এখন একটু মনোযোগ পাচ্ছে – কারণ চীনের হাতে ব্যাপক উদ্বৃত্ত সঞ্চিত হয়েছে, যা অবকাঠামো ঋণ হিসেবে দিতে চীনও আগ্রহী।

তাই ভারতসহ সবাই আমরা বুভুক্ষের মতো চীনা অবকাঠামো ঋণ ও প্রকল্প নেবো কারো বাধা না মেনে। তবে যাদের সরকার, রাজনীতি বা রাষ্ট্র ইতোমধ্যে যথেষ্ট শক্তপোক্ত হয়ে গেছে, ব্যাপস্থাপনায় দক্ষ; তারা প্রকল্প ও শর্তগুলো ভালো বাছবিচার করতে পারবে। না হলে কোন কোন দেশ কিছু আরও কষ্ট স্বীকার করবে, কোন কোন প্রকল্প লাটে উঠবে, চুরি দুর্নীতিতে ভরে যাবে।

সব ঘটনার মূল কারণ তাহলে, আমাদের সীমাহীন অবকাঠামো ঋণ চাহিদা এবং বিনিয়োগ না হওয়া। এই চাহিদা প্রসঙ্গে এডিবির এক স্টাডি বলছে – এশিয়াতে বিশ্বব্যাংক, এডিবি আর এআইআইবি (AIIB, চীনের বিশ্বব্যাংক) সবাই মিলে তাদের সব সামর্থ্য ঢেলে অবকাঠামো বিনিয়োগ করলেও তাতে এশিয়ার এখন অবকাঠামো বিনিয়োগ চাহিদা যত তা পূরণ করা সম্ভব হবে না। ঘাটতি থেকেই যাবে। অবকাঠামো ঋণ পেতে এ ব্যাপারে ভারতসহ আমরা সবাই “একই নৌকায়”। ভারতের যেমন, আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের পড়শি সব রাষ্ট্রেরও একই অবস্থা। ভারতসহ সবাই এক কাতারে যে, চীন আমাদের সবার অবকাঠামো ঋণ চাহিদা পূরণকারী এবং দীর্ঘ দিনের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ না হওয়া খরা-দশায় মূল ঋণদাতা। ফলে ‘আমার বাগানবাড়িতে চীন ঢুকে গেল’ এসব অর্থহীন কথা আর ভুয়া অহঙ্কার ভারতের বন্ধ করা উচিত। এগুলো আমাদের না কারও আর না বুঝার কিছু নাই।

আসলে ভারতের উচিত সবার আগে নিজে “চীনা অবকাঠামো বিনিয়োগ” না নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুক । চীন খোদ ভারতের অর্থনীতিতেই ঋণদাতা হয়ে ঢুকে বসে আছে, ভারত চীনের এআইআইবির (চীনের বিশ্বব্যাংক) সবচেয়ে বড় ঋণগ্রহীতা। মানে চীন ভারতের বাগানবাড়ি না খোদ মূল বাড়িতে ঢুকে বসে আছে। এটা সবাই জানে।

ভারতীয় মিডিয়া হৈ চৈ প্রসঙ্গটা, ব্যাপারটা চীনের সরকারি ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকারও নজর এড়ায়নি।  তাই গ্লোবাল টাইমসের এক রিপোর্ট প্রশ্ন তুলেছে ভুটানের নির্বাচনী ইস্যুতে ইন্দ্রাণী বাগচীর লেখাসহ ভারতীয় মিডিয়ার হইচই নিয়ে। আর বলেছে, ‘ভারত যেটাকেই উন্নয়নের আদর্শ মডেল মনে করুক, তা যেন সব জায়গায়ই একই থাকে, আর ভারত যেন সেই একই মডেলের পক্ষে থাকে।’ উদাহরণ হিসেবে বলছে, ভুটান পূর্ব-পশ্চিমব্যাপী হাইওয়ে তৈরিতে এডিবির থেকে একটা ঋণ পেতে যাচ্ছিল কিন্তু ভারতীয় প্ররোচনায় সেটা বাতিল হলো কেন? ভারত একচেটিয়াভাবে ভুটানের সস্তা জলবিদ্যুৎ নিজে ব্যবহার করে; অথচ তৃতীয় দেশে এর বিক্রি বাণিজ্যের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে রেখেছে। কিন্তু কেন?

আইএমএফের রেফারেন্স দিয়ে পত্রিকাটি প্রশ্ন করছে, ‘ভুটান কেন ঋণগ্রস্ত, এত আকণ্ঠে নিমজ্জিত? ভুটানের মোট ঋণ তার জিডিপি-এর চেয়েও বেশি হয়ে গেছে কেন? তাহলে ভুটান নিয়ে চাপাবাজি করছে কে? [Who is bullying Bhutan, China or India?] আর সেটা হয়েছে গত মাত্র ছয় বছরে – ভুটানের ঋণ জিডিপির ৬৭ শতাংশ থেকে ১১৮ শতাংশে উঠে গেছে। সবচেয়ে বড় কথা, ভুটানের মোট ঋণের ৬৪ শতাংশ ঋণই হল ভারতের প্রদত্ত?

আসলে ইন্দ্রাণীর ভারত সরকারকে সরাসরি কিছু করার (হস্তক্ষেপের) আহ্বান, নিঃসন্দেহে এটা এক বেপরোয়া কাজ হয়েছে। ইন্দ্রাণী তার লেখার শুরুতে ‘হাইলাইট’ উপ-শিরোনামে তিনটি পয়েন্ট মানে তিনটি বাক্য লিখেছেন। এর প্রথম বাক্যটা হল এই বেপরোয়া আচরণ। আর পরের দুটা হল তার হতাশার কারণ বর্ণনা। যেমন, দ্বিতীয় বাক্যে তিনি আক্ষেপ করে লিখছেন, “২০১৩ সালের মত এবারের ২০১৮ সালে ভুটানের নির্বাচনে “ভারত কোনো ইস্যুই হতে পারেনি”। আর তৃতীয় বাক্য হল, “ভুটানে যে দুটো দল প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছে তারা ভারতের সাথে খাতিরের সম্পর্ক গড়ার কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়েই আমাদের খালি কিছু আশ্বাস শুনিয়েছে”।

আসলে ভুটানের এই নির্বাচনের বহু আগে থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে ভুটানিদের মধ্যে ক্ষোভ-বিক্ষোভ ছিল এবং করণীয় নিয়ে খুবই সংগঠিতভাবে আলোচনা ও প্রচার তাঁরা চালিয়েছে। যেমন এনিয়ে “ভুটানিজ ফোরাম” নামে ফেসবুক গ্রুপ, সেছিল সবচেয়ে সরব। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়ার সাথে কথা বলার সময় তারা একেবারে লো প্রোফাইল। কোনো দলের ক্ষোভ থাকুক আর ভালোবাসাই থাকুক নির্বাচনের মূল তিনটা দল ভুটানে “ভারতের তৎপরতার” বিরুদ্ধে তাদের অসন্তোষ সম্পর্কে ছিল একেবারেই নিশ্চুপ। সম্ভবত তাদের ভয় ছিল, এতে ২০১৩ সালের মতো ভারতের কোনো পদক্ষেপ তাদের সাধারণ মানুষকে আরো কষ্টে ফেলে দিতে পারে। তাই তারা ভারতীয় মিডিয়ায় নয়, নিজ ভোটারের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছে, আর ভোটের বাক্সে ভোট দিয়ে আসল কাজটা করেছে; ভারতকে আসল জবাবটা দিয়েছে।

বহু পুরনো এক প্রবাদ হলো, কারো ক্ষতি করে সেটা থেকে তোমার লাভ আসবে – সেটা আশা করো না কখনও।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “নেপালের পর এবার ভুটান হাতছাড়া!  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ধরতে পারবে

 

মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ফিরে ধরতে পারবে
গৌতম দাস
০৭ নভেম্বর ২০১৭, রাত ০০ঃ৪৩
https://wp.me/p1sCvy-2kC

আমেরিকা কি ফেল করা ট্রেন আবার ধরতে পারবে? কোন ট্রেন? বার্মা ট্রেন, নাকি মিয়ানমার ট্রেন? আসলে এসব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলে লাভ নেই; কথা হলো এটা রোহিঙ্গা-ট্রেন! অর্থাৎ আমেরিকা কি ফেল করা রোহিঙ্গা-ট্রেন আবার ফিরে ধরতে পারবে? আবার ধরার জন্য কতদুর সিরিয়াস যাবে? রোহিঙ্গা-ট্রেন  – একথারই বা মানে কী? কী বলতে চাওয়া হচ্ছে? রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার একটা খুবই ক্ষুদ্র অংশ, মাত্র চার পারসেন্ট। কিন্তু মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গা-মানুষের মর্যাদা এতই পর্যুদস্ত, এতই নিচে অমানুষের বা ঊন-মানুষের স্তরে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ নিয়ে গেছে যে, দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে গেছে রোহিঙ্গা পারসিকিউশন বা অত্যাচার নিষ্পেষণ। সেই সাথে বার্মিজ জেনারেলদের নাম নৃশংসতার ওস্তাদ হিসেবেও ছড়িয়ে পড়েছে। এরা নির্মূল ক্লিনজিংয়ে কত দক্ষ এর স্বাক্ষর-চিহ্ন ব্যাপক ছড়াছড়ির মুখে জাতিসঙ্ঘকে বলতেই হয়েছে যে, ‘দুনিয়ার সবচেয়ে পারসিকিউটেড বা নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা’। অতেব আমাদের সামনে এখন প্রশ্ন হল, আমেরিকা কি বর্মি জেনারেলদের একটা শিক্ষা দিতে পারবে? কতদুর পর্যন্ত সিরিয়াসলি যাবে?

আগে আমরা দেখছি, আমেরিকা ভুলে গিয়েছিল মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে, জেনোসাইড বা ক্লিনজিংয়ের বিষয়ে দুনিয়ার কাছে তার কমিটমেন্ট কী? দুনিয়ার কাছে কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে গ্লোবাল লিডার হয়েছিল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গ্লোবাল ইকনোমিক ব্যবস্থায় একটা অর্ডার বা নিয়ম শৃঙ্খলা কায়েম করেই আমেরিকা আজকের ওয়ার্ল্ড লিডার হয়েছিল। তবে  শুধু এতটুকু করেই হতে পারেনি। এটা সে হতে পেরেছিল কারণ সাথে কিছু পলিটিক্যাল কমিটমেন্টও তাকে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির প্রতিশ্রুতি। যদিও তাতে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। বিভিন্ন সময়ে আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার  বিষয়টাকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করেছে, নিজ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ‘রেজিম চেঞ্জের’ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নজির স্থাপন করেছে। এখনো এই সমস্যা দুনিয়াতে আছে যে, সুদানের বশির একটা গণহত্যা চালালেও চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ যদি উদ্ধার হয় তবে বলা হবে গণহত্যা হয়নি, বরং ‘গণহত্যার কাছাকাছি’ কিছু একটা হয়েছে। কারণ চীনের এ কথা না মানলে চীন ভেটো দিয়ে দিবে; একই উদাহরণ আমেরিকারও আছে। ফলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিচার বিবেচনা মুল্যায়নে একটা গণহত্যা ঘটেছে কি না তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে দুনিয়ায় এখনো বহু সীমাবদ্ধতা আছে। আসলে তাই দরকার আবার এক রুজভেল্টের, আবার এক নতুন প্রতিশ্রুতিতে নতুন করে জাতিসঙ্ঘ গড়া। অথচ আমেরিকা নিজেরই সেসব ইতিহাস ভুলে বসে আছে। আর বাস্তবে হারার আগেই মনে মনে হেরে গেছে।

এ কথা ঠিক যে, ২০০৭-০৮ সাল থেকেই এটা জানা গিয়েছিল যে, দুনিয়ার অন্তত অর্থনৈতিক পরাশক্তি ও লিডার অর্থে চীনের কাছে আমেরিকার কাঁধবদলের সময় হয়ে গেছে। আমেরিকার জায়গায় সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থিত হচ্ছে চীন। এ কথাও সত্যি যে, কারো অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে উত্থিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে এটা তখন থেকে কেবল সময়ের ব্যাপার যে, সেই রাষ্ট্র এখন ক্রমে ক্রমে সব অর্থেই গ্লোবাল পরাশক্তি হিসেবে হাজির হবে। কিন্তু তাই বলে একথাও ভুলে যাওয়া যাবে না যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আমেরিকা কেবল অর্থনৈতিক আর সামরিক শক্তির জোরে গ্লোবাল পরাশক্তি বা গ্লোবাল লিডার হয়নি। সাথে রাজনৈতিক শক্তি হতে হয়েছে আগে, কিছু গ্লোবাল রাজনৈতিক মুল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে আগে;  তবেই আমেরিকার গ্লোবাল লিডার হওয়া গেছে। এমনি এমনি আমেরিকা দুনিয়াকে নিজের এম্পায়ার বানাতে সক্ষম হয়নি। পলিটিক্যাল আইডিয়া, এর উপযোগী গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আর সর্বোপরি কমিটমেন্ট – এসব প্রতিটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণভাবে হাজির করাতে হয়েছিল আমেরিকাকে। আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি? সেটা বাইরে কাউকে না খোদ নিজের কাছে নিজেকে দিতে হয়েছিল যে – মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা কেবল আমেরিকাতে করলেই হবে না, সারা দুনিয়ার ব্যাপারেও অন্তত নীতি-অবস্থানগত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এতকিছু বলার পরেও এ কথাও সত্য যে, ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস চার্টার যেটা রচিত হয়েছিল বটে কিন্তু ওখানের ‘ইনডিভিজুয়ালিজম’ ধারণায় ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা আছে, তাই তা নিয়ে দুনিয়াকে আরো অনেক কাজ করতে হবে। সারকথা কোনো ‘রাজনৈতিক’ নীতি-অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া আমেরিকা গ্লোবাল লিডার হয়নি, হতে পারেনি। আজকের জায়গায় আমেরিকা এমনি এমনি উঠে আসেনি। তাই আগেই বলে দেয়া যায় এই নুন্যতম শর্তপুরণ ছাড়া  আগামিতে অন্য কেউও হতে পারবে না।

অথচ এই শতকে এসে  আমেরিকা সত্যি সত্যি হেরে যাওয়ার আগেই ২০০৮ সালে সব ছেড়েছুড়ে আগেই হার স্বীকার করে নিয়েছিল। এর আগে নানা সিরিয়াস হিউম্যান রাইটস ভঙ্গের কারণে ২০০৮ সালের আগের বার্মা ছিল আমেরিকান অবরোধে ডুবে থাকা, বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় একঘরে হয়ে থাকা এক বার্মা। অথচ চীনের দেখানো রাস্তায় সেই মতনই বার্মায় বিনিয়োগ ও ট্রেড আর ব্যবসার ভাগ পেতে মরিয়া লোভী হয়ে আমেরিকা চীনের পথ অনুসরণ করে বসেছিল। বর্মি জেনারেলদের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রেসিজমে নির্মূল ক্লিনজিং দেখেও না দেখার ভান করার দিন দুনিয়াতে যেন আবার ফিরে এসেছিল – চীনের দেখানো সর্টকাট রাস্তার লোভে পরে আমেরিকাও এই শর্টকাট পথ নেয়ার লোভে পড়েছিল। আমেরিকা মনে করে নিয়েছিল যেন দুনিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক নীতি অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া দুনিয়া এ পর্যন্ত আসতে পেরেছিল। আর আমেরিকা কোনো কমিটমেন্ট ছাড়াই বোধহয় সে এই দুনিয়ার নেতা হয়েছিল। ২০০৮ সালের বার্মার কনস্টিটিউশন চালুর পরেও সেই একই দানব ও কোটারি এক সামরিক রাষ্ট্রই ছিল বার্মা। অথচ বলা হচ্ছিল বার্মা নাকি ‘গণতন্ত্রের পথে’ যাত্রা শুরু করেছে, গণতন্ত্রের পথে নাকি ট্রানজিশনে বা অন্তর্বর্তি রাস্তায় আছে বার্মা। আর সু চি নাকি শান্তির নোবেল মানুষ ইত্যাদি। এসব ভুয়া সার্টিফিকেট বিতরণ করেছিল আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিম।  চলতি আগষ্টে বার্মায় ফিরে গণহত্যা শুরুর পরে সু চি তাঁর সাফাই ভাষণে গণহত্যার অভিযোগের জবাবে মিয়ানমারের ‘শিশু গণতন্ত্রের’ যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তা শুনে প্রখ্যাত মার্কিন জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ ড. গ্রেগরি এইচ স্ট্যানটন যথার্থই বলেছেন, “এটা গতানুগতিক অজুহাত। অভিযোগ প্রত্যাখ্যানকারীদের দিক থেকে এটা বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল। তারা বলে থাকেন, গণহত্যা বন্ধের দিকে নজর দেয়ার চেয়ে শান্তিপ্রক্রিয়া বজায় রাখাটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। অং সান সু চি তাই করেছেন”।

অথচ আমেরিকা ট্রেন মিস করেছিল। রাজনৈতিক কর্তব্য ভুলে সস্তা ব্যবসাব ও বৈষয়িকতার লোভের ফাঁদে বর্মি জেনারেলদের কাছে নিজেকে ধরা দিয়েছিল। নিজেকে সস্তা করে তুলে, সস্তায় বিক্রি করে দিয়েছিল। নিজের দাম নিজে বোঝেনি। যার দায় ওবামা প্রশাসনেরও কম নয়। চীনের কাছে দুনিয়ার নেতৃত্ব হারানোর আগেই আমেরিকা উলটো নিজেকে চীনের পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছিল।

আচ্ছা আমেরিকা কী কখনও খেয়ালই করেনি দুনিয়াতে কোথাও রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কমিউনিস্টদের কোনো রাজনৈতিক সিরিয়াস প্রতিশ্রুতিই নেই। এরা নিজ নিজ বিপ্লবের পরে রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ বলে একটা শব্দ রেখেছে, ইংরেজির একটা ‘আর’ অক্ষর সেখানে আছে বা ছিল। লুপ্ত হয়ে যাওয়া সোভিয়েত মানে ওর ‘ইউএসএসআর’ (USSR) নামে ‘আর’ অক্ষরটা ছিল। এখনও বর্তমান মাও এর চীনের নাম ‘পিআরসি’ (PRC) তেও ‘আর’ অক্ষরটা আছে। এই ‘আর’  এর অর্থ হল ‘রিপাবলিক’। রাজতন্ত্র উতখাত করে পিপলস রিপারলিক প্রতিষ্ঠা ছাড়াও মর্ডান রিপাবলিকের আরও অর্থ হল রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কমিউনিস্টদের কাছে  এসব কথার সাথে কোনো ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ অ্যাক্ট’ তৎপরতা তাদের কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের করণীয় নাই। সেখানে কনস্টিটিউশনের কোনো গুরুত্ব নেই, কী লেখা আছে সেখানে তাও তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা সেটা তো কোনো সিরিয়াস কিছু নয়। কারণ এসব কথার কথার নাকি নেহাতই ভোটের হিসাব; যেমন কোনো করপোরেট চেয়ারম্যানেরও এক ভোট, এক ফকিরেরও এক ভোট। তাই মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির কথাবার্তার কোন মুল্য কমিউনিস্টদের কাছে নাই। মৌলিক মানবাধিকার ইস্যুটা নাকি কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে আমেরিকার ষড়যন্ত্র। যদিও একথা সত্য রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা নয়। ফলে এটা যথেষ্ট নয়। কিন্তু তাই বলে এটা কোন অর্জনই নয়, এটা মারাত্মক ভুল ধারণা। ফলে মর্ডান রিপাবলিকে মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য  ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা কমিউনিস্টদের কাজই নয়, এর কোন গুরুত্ব নাই, এটা কারও কাজে লাগে না, এগুলো মানুষের কোন অর্জন নয় – এটা মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা শুধু না। খুবই নিম্ন বোধের – মানুষ কেবল জীব, এই অনুমানে বলা বক্তব্য। মানুষকে রিডিউসড নীচা গণ্য করা বক্তব্য।

তাই চীনের বুঝ হল, তারা যে দানব বর্মি জেনারেলদের পা-চুমে বিনিয়োগ ব্যবসা খাচ্ছে – এর পাশেই লাখ লাখ রোহিঙ্গা ঐ জেনারেলদের হাতেই কচুকাটা ক্লিন হয়ে গেলে তাতে চীনের কী দায়! তার কোনো দায় নেই। সেই, ১৯৭০-এর দশক থেকেই চীন নিজের কাছে পরিষ্কার যে, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের দুনিয়ায় সে যাচ্ছে বটে কিন্তু কোনো গ্লোবাল ইউনিভার্সাল রাজনৈতিক মুল্যবোধ প্রতিষ্ঠা হওয়া বা থাকা না থাকার দায়দায়িত্ব সে নেবে না। কেবল কোন ব্যবসাটা সে পাবে সেই ভাগ সে ঠিকই গ্লোবাল প্লেয়ারদের ভাগ থেকে নিজেরটা বুঝে নেবে। এই নীতিতেই চীনের বিদেশনীতির ডিপলোম্যাসি এত দিন চলে এসেছিল। আর প্রমাণ হয়েছে এটা অচল। রোহিঙ্গারা প্রমাণ করে দিয়েছে   এই চীন ব্যর্থ। এই চীন গড়ে তোলা অর্থহীন, খামোখা। মানুষ কেবল জীব নয়, সে কেবল একটা বৈষয়িক জীব-জীবন নয়। মানুষের জীবনের আরও অর্থ উদ্দেশ্য লক্ষ্য আছে; দায় কর্তব্য আছে। স্পিরিচুয়ালিটির দিক আছে। জীব জীবন ছাড়িয়ে মানুষের তাই আরও উন্মেষ দরকার হয়। সেকথাটাই আর ভাবে বললে হয়, মানুষের রাষ্ট্রের তাই রাজনৈতিক কমিটমেন্ট দরকার থাকে। মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক ইনসাফ, মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ার স্তরে তাই মানুষের নুন্যতম দায়। এসব পুরণের পথে নুন্যতম দায় কর্তব্যবোধ নাই চীনের। ফলে আগেই বলা যায় কোন গ্লোবাল নেতা হওয়ার খায়েশ চীনের পূরণ হবার সুযোগই নাই। আসলে সে ধরা খেয়েছে। কিভাবে?

আগেই বলেছি আমেরিকা লোভে পড়ে হুঁশ হারিয়েছিল। নিজের গৌরব নিজের অবদান ভুলতে বসেছিল। এমনকি এবারের আগষ্টের পর থেকে নবউদ্যোগে নির্মূল অভিযান শুরুর পরে, ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে বক্তব্যে বিষয়ে আমেরিকার উপমন্ত্রী মার্ফি সাহেবের কথাবার্তা লক্ষ্য করা যাক। তিনি তখনও কেবল সতর্ক কী বলতে কী বলে ফেললে আবার বর্মি জেনারেলদের মন উঠে যায়, অখুশি হয়ে যায় – সেদিকে খুবই সতর্ক থেকে ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে কথা বলছেন। জেনারেলদের মন জোগাতে মার্ফি বলার চেষ্টা করছিলেন যে এটা নাকি রোহিঙ্গা বা মুসলমান নির্মূল ক্লিনজিংয়ের ইস্যু নয়, এটা নাকি রাখাইন স্টেটের দুই জাতিগোষ্ঠীর ঝগড়া, অর্থাৎ বার্মা রাষ্ট্র বা মিলিটারির কোন ভূমিকা নেই। তার এই অবস্থা দেখে সিবিএস নিউজের সাংবাদিক সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করায় জবাবে মার্ফি সাহেব আবার সে কথা কনফার্ম করেছিলেন। কিন্তু এরপরেও সব চিতপট হয়ে যায়, সব কিছু ঘুরে যায়। গত ২ অক্টোবর মিয়ানমারে অবস্থিত ২০টি দেশের রাষ্ট্রদূত একসাথে রাখাইন প্রদেশ সরেজমিন সফর করে এসে এরপরে তা নিয়ে মিয়ানমারে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত যে বিবৃতি দেন তাতে পরিস্থিতি উলটে যায়। যার মূল কথা হল, বার্মার জেনারেলদেরকে অধিকার সংরক্ষণে রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বে স্মরণ করিয়ে দেয়া, আর বারে বারে চাপ দিয়ে বলা যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে, জাতিসঙ্ঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন আসতে দেয়া ইত্যাদি। এসব নিয়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

অর্থাৎ তখন থেকে আমেরিকা সুর পালটিয়ে ফেলেছিল। নিজ শক্তি, তুচ্ছ করে ফেলে রাখা হারানো গৌরবের কথা মনে পড়ে গেছিল। ফলে এরপর থেকে আর এটাকে ‘রাখাইন প্রদেশের জাতিগোষ্ঠীর নিজেদের ঝগড়া’ বলে আড়াল করতে চাইছে না। এটাকে বলা যায় আমেরিকান বার্মা নীতিতে মেজর শিফট পটপরিবর্রতন।  এরপরে ২৩ অক্টোবর এসে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতি – এটা একেবারে কঠোর অ্যাকশনের দলিল নির্দেশনামা যেন। সাথে আগের মতো যে দায়ী ইনভেস্টিগেট করো, তাকে ধরে নিয়ে আসো সেসব কথা তো আছেই। তবে মূল কথা হল, ২০০৮ সালের আগে আরোপিত আমেরিকার দেয়া যেসব অবরোধ উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল সেগুলো আবার কার্যকর করা হয়েছে বলে ঘোষণা করে দেওয়া। বিশেষত বর্তমান ও সাবেক সামরিক অফিসারদের ওপর ট্রাভেল ব্যান আবার বলবৎ করা, বার্মা থেকে রুবিসহ দামি পাথর আমেরিকায় পাঠানো ব্যবসার ওপর নিষেধাজ্ঞা ফিরে আরোপ, আর সামরিক বাহিনীর জন্য নেয়া আমেরিকার স্পন্সরড যেকোনো কর্মসূচি স্থগিত করে দেয়া। এক কথায় আমেরিকান রাষ্ট্রের সাথে বর্মি আর্মি সদস্যদের সব ধরনের যেকোনো সংশ্লিষ্টতা ও যৌথ তৎপরতা স্থগিত।
তবে এবারের সারকথায় গুরুত্বপুর্ণ দিক হল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতে দেখতে চায় আমেরিকা এই দাবিটা ছিল মুখ্য। আর, একথা শুনে জেনারেলদের কাপড় নষ্ট করে ফেলার জন্য যথেষ্ট। ভারতের মিডিয়া ভাষ্যকারদের মতে, ‘ভারত নাকি প্লট হারিয়ে চীনের কাছে হেরে হাত গুটিয়ে’ নিয়েছে। তাই বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া’ নিয়ে আলাপে বসতে আয়োজন করে দিয়েছে নাকি চীন। কিন্তু তাতে আমাদের মন্ত্রী দেশে ফিরতে-না-ফিরতেই যাকে বলে দু’জনে দুই মন্ত্রী দু’দিকে দুই ধরনের কথাতে হয়ে পড়েছেন একেবারে ‘ফল এপার্ট’। তাতে বোঝা গেল যে বর্মি জেনারেলদের শায়েস্তা করা চায়নিজ কূটনীতির কাজ নয়। এ ব্যাপারে চায়নিজরা চাইলে আমেরিকানদের কাছে মধ্যস্থতাকারীর কাজে কূটনৈতিক কিছু শিক্ষা নিতে পারে। আচ্ছা এটা কি জানা কথা না যে, পিছলা বার্মিজ জেনারেল ভাষ্য বদলে দেবে। অতএব আগে থেকেই চীনাদের ‘দুটা মানে হয়’ এমন সুযোগ যাতে না থাকে এমন শব্দ বা কথা না রাখা – সেই ফুটা বন্ধ করার ব্যাপারে চীনাদের সাবধান হওয়া দরকার ছিল!

কিন্তু এরও আগে যে কথা বলতে হবে, তা হলো- ১৯৭০-এর দশক থেকে নেয়া চীনাদের পলিটিক্যাল দায় বা সংশ্লিষ্টতা না নিয়ে গ্লোবাল পলিটিক্যাল-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে কেবল অর্থনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্টতায় থেকে মাখন খেয়ে যাবো খালি, চীনাদের এই বুদ্ধি অচল-অকেজো এটাই প্রমাণ হয়েছে। কারণ আমরা দেখছি, আমেরিকানদের সামান্য একটু নাড়াচাড়াতেই ভয় পেয়ে বর্মি জেনারেলদের কী করে চীন রক্ষা করবে তা নিয়ে চীনকে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। চীনাদের হাতে ভেটো ক্ষমতা থাক আর না থাক কিছু যায় আসে না তাতে। এথেকে চীন কী শিক্ষা নিয়েছে যে,  দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। অর্থনৈতিক শক্তি বা মুরোদ আপনার অঢেল থাকতে পারে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক শক্তির বিকল্প নয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক কমিটমেন্ট, নীতি-অবস্থান থাকতেই হবে, এসব দিক- তো আছেই। বাংলাদেশ-মিয়ানমারকে একসাথে বসানোর কাজে চীনাদের নামা প্রমাণ করেছে রাজনৈতিক সমাধানের পথ কী জিনিস। এটা রোহিঙ্গারা মরুক যা হোক, আর্মি জেনারেলদের কাছ থেকে বিনিয়োগ আর ব্যবসা বাগানোর কাজটা ভালো জানলেই চলবে – চীনের অনুমান যে মিথ্যা ছিল তা চীনকে বুঝিয়ে দিয়েছে। এই ধারণার যে ভিত্তি নেই, এটা মিথ্যা ও অচল তা বুঝিয়ে দিলেও কী চীন সে শিক্ষা নিয়েছে আমরা নিশ্চিত না। কারণ চীনকে ‘রাজনৈতিক কমিটমেন্ট নেগোসিয়েশন’ এর গুরুত্বের কথা মেনে নিতে হয়েছে। আর আসলে রোহিঙ্গারা সব অত্যাচার নিষ্পেশন সহ্য করতে হয়েছে কথা ঠিক কিন্তু তা করে  সারা দুনিয়াকে রোহিঙ্গা ইস্যু দেখিয়ে দিয়েছে যে দুনিয়া চলে দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। রাজনৈতিক কমিটমেন্ট তাতে লাগবেই। আর তা নাই বলে, চীনাদের দুনিয়ার গ্লোবাল নেতা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

উপরের এসব কথার উপর দাঁড়িয়ে আর একটা কথা বলে দেয়া যায়।  কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র দুনিয়াকে অ্যাম্পায়ার হিসেবে নিজের নেতৃত্বে চালাতে কখনই পারবে না, কখনোই সম্ভব হবে না। এর মূল কারণ রাজনৈতিক কমিটমেন্ট না দেখিয়ে, হিউম্যান রাইটসকে নিজের ইস্যু গণ্য না করে দুনিয়া চালানো অসম্ভব। রিপাবলিক রাষ্ট্র আর তাতে মানুষের  মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য ইনসাফ কায়েম ইত্যাদিতে মানবাধিকার সুরক্ষার ইস্যু আগামীতে আরো সিরিয়াস ইস্যু হয়ে উঠবে দুনিয়াতে। কমিউনিস্ট জগতে যার কোনো ন্যূনতম ধারণা বা আমলই নেই। কমিউনিস্টদের এখনো ধারণা, ‘তাদের বেইজ্জতি করতেই’ নাকি আমেরিকা এই ইস্যুটা হাজির রাখে। এর চেয়ে অজ্ঞতার আর কী হতে পারে! এর মানে কি কমিউনিস্ট বলতে চাইছে দুনিয়াতে গণহত্যা ক্লিনজিং রেসিজম – এগুলো চলবেই? তাই কি? তবে আমি শিউর মাফিয়া রাষ্ট্র রাশিয়ার পুতিন অথবা চীনে নতুন জেঁকে বসা শি জিনপিংয়ের ‘মডার্ন সমাজতন্ত্র’ নামে সোনার পাথরের বাটি ধারণার ভেতর এর কোনো জবাব পাওয়া যাবে না।

কিন্তু আমেরিকানরা কত দূর যাবে? রোহিঙ্গারা কি ঘরে ফিরবে? আমেরিকানরা কতটা সিরিয়াস? অর্থাৎ উপরে আমেরিকার সৎ পথে রওনা হবার অনেক ইঙ্গিত দিবার পরেও আমি সন্দেহ রাখছি যে  আমেরিকা শেষ মাথা পর্যন্ত যাবে কীনা? কতদুর যাবে?  বাংলাদেশের মানুষদের জন্য এসব মাপার দ্রুত একটা মাপকাঠি দেই।

‘এশিয়ায় আমেরিকান (নিরাপত্তা) স্বার্থ আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে’ এই নীতিতে ২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বুশ প্রশাসন চালু করে দিয়ে গেছে। এই কথার একটা ইম্পিকেশন অর্থে সারার্থ হল, সেই থেকে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক দিয়ে রেখে গেছিল। সেটা এখনও ওরকমই আছে। ট্রাম্প হয়ত ব্যাপারটা নিয়ে ভোকাল ততপর নয়। কিন্তু রুটিন প্রসাশনের গাইডিং প্রিন্সিপাল এখনও সেটাই। এখন এই সপ্তাহ ট্রাম্পসহ স্টেট ডিপার্টমেন্টের মন্ত্রী মুরুব্বিরা মানে রেক্স টিলারসন এবং আন্ডার সেক্রেটারিসহ এভাবে সবাই আমাদের দেশ বা পড়শি দেশে থাকবে। এগুলো যত যা-ই ঘটুক যতক্ষণ না আমেরিকা আমাদেরকে ভারতের কাছে দিয়ে রাখা  বন্ধকদশা থেকে ছুটিয়ে আমাদের সাথে সরাসরি ডিল না করবে, এই ব্যাপারে স্পষ্ট অবস্থান নিবে তত দিন অন্য যাই কিছু আমরা দেখি না কেন আমেরিকার ওপর আমাদের আস্থা রাখার কোনো কারণ সৃষ্টি হয়নি এটাই বুঝতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মোদির রাজনীতি, গরু নিষেধাজ্ঞা

মোদির রাজনীতি, গরু নিষেধাজ্ঞা

২০ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার

গৌতম দাস

http://wp.me/p1sCvy-2go

 হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গড়া ও দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র হল ভারত। এই রাষ্ট্র গঠনের সময় মনে করে করা হয়েছিল যে, বিভিন্ন প্রাদেশিক বৈশিষ্টে বিভক্ত রাজ্যের (এখন ২৯ রাজ্যে বিভক্ত) ভারতকে ‘হিন্দুত্ব’ এই আঠা না থাকলে একে এক রাখার আর কোনো উপায় নেই; এই ধারণাটা ভুল যদিও। ভারতের উগ্র হিন্দুসমাজ মুসলমানসমাজকে নিজের অধীনে আনা ও চাপে রাখার জন্য কী না করতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এরই আদর্শ নমুনা। ভারতে গরুর (মহিষ উট গবাদিসহ সব পশু) গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ। [The notification covers bulls, bullocks, cows, buffaloes, steers, heifers and calves, as well as the camel trade.] মানে, বেচাবিক্রি, জবাই ও খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এর আসল উদ্দেশ্য হল, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের দিক থেকে আধিপত্যে থাকা সংখ্যাগুরু কমিউনিটির পছন্দসই বিধিব্যবস্থার অধীনে মুসলমান কমিউনিটিকে আনা, দাবড়ানো। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা সরাসরি নয়, জারি করা হয়েছে এক অদ্ভুত কায়দায়। কংগ্রেসের নেহরু আমলে তারা এর প্রথম কায়দাটা বের করেছিলেন। তা হল ভারতীয় রাষ্ট্র “পশু-প্রেমী” হয়ে গিয়েছিল। তারা ‘প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেল অ্যাক্ট ১৯৬০’ নামে এক আইন পাস করে ফেলেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই আইন বাস্তবায়নের জন্য ‘সোসাইটি ফর প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেলস’ নামে সমিতি গড়ার ব্যবস্থাও করেছিলেন। মুল কথা ছিল, “পশুকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যথা বা কষ্ট দেয়ার মতো নিষ্ঠুরতা করা যাবে না” এর ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এই আইনটা লেখা হয়েছিল। আইনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সব জায়গায় একই কথা বলা হয়েছিল যে, ‘পশুকে অপ্রয়োজনীয় ব্যথা ও কষ্ট দেয়া রোধ’ করাই উদ্দেশ্য। আইনটি কেমন তা বোঝার সবচেয়ে ভালো এক উপায় হল, এতে ব্যবহৃত কয়েকটি শব্দ লক্ষ করতে হবে। যেমন ‘পশুর কল্যাণ, ‘পশুর ব্যথা’, ‘পশুর কষ্ট’, ‘পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা’ ইত্যাদি। অর্থাৎ বোধ বা অনুভূতিগুলো (ফলে শব্দগুলো) আসলে মানুষের, মানুষ সম্পর্কিত। কিন্তু সেগুলোকে অবলীলায় পশুর ওপর প্রয়োগ করে ধারণাগুলো তৈরি করা হয়েছে। আর এখানে সবচেয়ে তামাশার শব্দ হল, ‘পশুর কল্যাণ বা ওয়েলফেয়ার’। বিগত ১৯৬০ সালের ভারতে তো বটেই, এখনকার ভারতেও কোনো কোনো আম-মানুষের অবস্থা এমন যে, পশুর ওপর তো বটেই, আপন সন্তান বা স্ত্রীসহ পরিবারের আপন সদস্যদের ওপর “ব্যথা, কষ্ট বা নিষ্ঠুরতা” দেখানো ছাড়া নিজের পেটের ভাত জোগাড়ের আর কোনো উপায় থাকে না। অথচ সেই দেশে মানুষের বদলে পশুর ওয়েলফেয়ার নিয়ে আইন করা হয়েছিল, চিন্তা করতে বলা হয়েছিল। আসলে আইনটি করেছিল অবস্থাপন্ন শ্রেণী। করেছিল মুসলমান কমিউনিটিকে হেয় করে দেখাতে যে, তারা ‘ব্যথা ও কষ্ট দিয়ে বা নিষ্ঠুরতা করে’ গরুর গোশত খায়। অতএব এটা বন্ধ করতে হবে। এক কথায় একটা ধর্মবিদ্বেষ বা ইসলামবিদ্বেষ তৈরি করার জন্য এটা করা হয়েছিল। তবে অবশ্য এটা ছিল এক ইনডাইরেক্ট ফ্রি-কিক, এক পরোক্ষ আইন। কারণ এই আইনের সেকশন ২৮-এ এক ফাঁকে একটা ছাড় দেয়া ছিল। [Section 28 of the Act 1960, mandates that “nothing contained in this Act (1960 Act) shall render it an offence to kill any animal in a manner required by the religion of any community.”]। বাংলা করলে বলা হয়েছিল, “কোনো কমিউনিটির ধর্মীয় আচার হিসেবে বিধান মতে যদি জবাই করা হয়, পশুকে ব্যথা, কষ্ট বা নিষ্ঠুরতা দেখানো হয়, তবুও সে ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে না”।

কিন্তু গত ১৯৬০ সালের সেই আইনের ওপরে এবং সেই আইনের সীমার মধ্যে থেকে নতুন করে দু’টি বিধি তৈরি করেছে মোদি সরকার। এর একটা হল,
Prevention of Cruelty to Animals (Regulation of Livestock Markets) Rules, 2017, &
Prevention of Cruelty to Animals (Care and Maintenance of Case Property Animals) Rules, 2017

সোজা বাংলায় বললে, প্রথমটা মুল অর্থ হল, পশুর হাট বা মার্কেট ভেঙে দেয়া। অর্থাৎ জবাই করার উদ্দেশ্যে মার্কেটে থেকে কোন পশু কেনা অথবা বেচা যাবে না- এরই আইন এটা। কারণ দেখা গেছে, প্রায় ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে জবাইয়ের গরুটা হাট/মার্কেট হয়ে আসে। তাই প্রথম আইনটার ২২ (৩) ধারায় বলা হয়েছে “জবাইয়ের উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য কোনো পশু কোনো মার্কেটে তোলা, কেনাবেচা করা যাবে না’। [22 (iii) stating that the cattle has not been brought to market for sale for slaughter;] আর সাথে এই কথাটাই হাটে যে কোন গরু উঠানোর পর  ‘রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে আর সেখানে শপথ করে বলতে হবে” ইত্যাদি তো আছেই। আর দ্বিতীয় আইন হলটা হল কেয়ার মেন্টেনেন্স না করলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে সেসব সংক্রান্ত।

হাটে পশু উঠবে, রেজিস্ট্রেশন হবে, কানে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার লাগবে, কেনাবেচা হবে; তবে তা কেবল পশু কৃষিকাজের ব্যবহারের উদ্দেশ্য। গরুর ক্রেতা ও বিক্রেতা এই লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েই কেবল হাটে গরু বেচা ও ক্রয় করতে পারবে।  তাহলে মূল কথাটা হল,  গরুর গোশতের জন্য গরু কেনাবেচা করা যাবে না। এমনকি পশু মারা গেলে বা পশু অসুস্থ হয়ে মরা অথবা আয়ু শেষে মরা যা-ই হোক, সব ক্ষেত্রেই মরা গরু একেবারে সোজা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। কোন ভাবেই মরা গরুর বা মারা গরুর চামড়া ছিলানো যাবে না। অথবা মারা বা কাটা গরুর হাড়গোড়সহ কোনো অবশেষই সংগ্রহ ও বিক্রি করা যাবে না। চামড়াও বিক্রি করা যাবে না।

এই হলো মোটা দাগে আইনটি সম্পর্কে ধারণা দেয়া যেখানে দেখা যাচ্ছে শুরু থেকেই এই আইনের উদ্দেশ্য প্রশ্নবোধক। ফলে কথাটা এভাবে বলা যায়, “পশুর উপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানোর” নামে কংগ্রেস আমলেই মুসলমানের প্রতি বৈষম্যটা করা হয়েছিল, কিন্তু দুর্বলভাবে। আর সেটাকেই এখন সবলভাবে করতে চাইছেন বিজেপি-আরএসএসের নেতা মোদি। গত ২৩ মে গেজেটেড বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন আইন সম্পর্কে মোদি সরকার সবাইকে “নোটিফাই করে” জানিয়েছে। আর এই আইন জারি করে তা সেই পুরনো আইনের ওপর দাঁড় করানো বলে এটা কংগ্রেসকেও বেকায়দায় ফেলতে পেরেছে, যাতে কংগ্রেস মোদির সমালোচনা করতে গিয়ে থেমে যায়। কারণ তাতে ১৯৬০ সালের নেহরুকেই সমালোচনা করা হয়ে যায়। আবার ‘পশুর ওপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানো’র নামে এবার সবলভাবে ইসলামবিদ্বেষটা মোদি সফলভাবে দেখাতে পারেন। তবে আরো কারণও আছে।

একটা কথা পরিস্কার রাখা দরকার। এতদিন গরু জবাই দেয়া, বেচাকেনা ও খাওয়া সম্পর্কে যেসব খবর আমরা শুনে আসছিলাম তা কেন্দ্রীয় বা মোদি সরকারের কোনো আইন ছিল না। এমনকি ২০১৫ সালে মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশের সীমান্তে এসে বিএসএফকে ‘বাংলাদেশের গরু খাওয়া বন্ধ করা’র যে তাতানো বক্তব্য দিয়েছিলেন সেটাও আসলে মন্ত্রীর অনধিকারচর্চা ছিল। কারণ গরু জবাই বন্ধ করা কেন্দ্রের বা রাজনাথদের মন্ত্রিসভার কোনো সিদ্ধান্ত বা আইন ছিল না, আবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারেরও কোনো আইন ছিল না সেটা। তবে দুই বছর আগে মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সেখানে এ আইন পাস করা হয়েছিল। আর তা সবচেয়ে বেশি প্রচার পেয়েছিল বা বিজেপি প্রচার করেছিল। এজন্য এটা যে কোন কেন্দ্রিয় মন্ত্রীর জন্য অনধিকার ছিল।  তবে এবার প্রথম কেন্দ্র নিজেই আইন জারি করা হলো। কিন্তু এতে বিভিন্ন অ-বিজেপি রাজ্যসহ বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্য থেকেও বিরোধিতা প্রবল হয়ে উঠেছে। কৃষিকাজ সংশ্লিষ্ট এই বিষয় ‘রাজ্যসরকারের এখতিয়ার’ এমন দাবি বা এই প্রশ্ন উঠিয়েছে কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গ। কথা সত্য ইস্যুটায় রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত নিবার এক্তিয়ার।  মমতা ব্যানার্জি এই আইনকে কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। অন্যান্য রাজ্যকেও তারা আপত্তি তোলার আহ্বান রেখেছিলেন। শেষে গত ২ জুন ‘মোদির সেনাপতি’ অরুণ জেটলি বলেন, ‘নতুন বিজ্ঞপ্তি রাজ্যসরকারের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ নয়।’ দৈনিক আনন্দবাজার এই কথার অর্থ করেছে, ‘গবাদিপশু জবাইয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাজ্যের হাতেই থাকছে’। মোদির খাস লোক তার অর্থমন্ত্রী জেটলির মন্তব্যের একটা ব্যাখ্যা আনন্দবাজার হাজির করে বলছে, ‘এখন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে যে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে, তাতে রাজ্যের আইনে হস্তক্ষেপ হচ্ছে না। এটি শুধু গবাদিপশুর কেনাবেচার স্থানসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি। কৃষকেরা গবাদিপশু শুধু বাজারে বেচতে পারবেন নাকি বাজারের বাইরে থেকেও কেনা যাবে, বিজ্ঞপ্তি শুধু সেটি নিয়েই। কিন্তু তাদের জবাই করার জন্য রাজ্যের আইনই বলবৎ থাকবে”।

কিন্তু আইনগত দিক থেকে মোদির এই আইন কি আদালতে টিকবে, নাকি কনস্টিটিউশনের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে বাতিল হয়ে যাবে? গুজরাটের হাইকোর্টের (ময়ূর) বিচারপতি গোমূত্র পানে ও প্রশংসায় বেহুঁশ, তা আমরা জেনেছি। কিন্তু শক্ত তর্ক উঠেছে দক্ষিণে তামিলনাড়–তে মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চে। সেখানকার রিট পিটিশনের পয়েন্ট খুবই শক্তিশালী। যেমন তারা বলছেন, “নতুন আইনটা প্যারেন্ট আইনের বাইরে যেতে পারে না”। ১৯৬০ সালের আইনে যেকোনো কমিউনিটির ধর্মীয় শরিয়ত বা রিচুয়াল হিসেবে পশু কেনাবেচা, কোরবানি এবং গোশত খাওয়ার ওপরে এই আইন প্রযোজ্য করা হয় নাই, বাইরে ছাড় দিয়ে রাখা হয়েছিল। কাজেই এখনও কেন্দ্রের কোনো এখতিয়ার নেই সেটা লঙ্ঘন করার। এ ছাড়া ভারতীয় কনস্টিটিউশনে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারবিষয়ক ২৫ ধারায় ‘অবাধে ধর্মপালন নাগরিকের অধিকার’ এবং ২৯ ধারায় ‘সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষা’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এই দুই অধিকারই মোদির নতুন আইনে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ ছাড়া আর একটা পয়েন্ট আনা হয়েছে তা হলো, ভারতীয় কনস্টিটিউশনের অনুচ্ছেদ ১৯ (১)(জি) অনুসারে কোনো পেশার লোককে বেকার করে দেয়া যাবে না। এখানে কসাইসহ চামড়া ইত্যাদির প্রক্রিয়াজাত করা যাদের পেশা তাদেরকে কাজ-পেশাহীন করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটাও অভিযোগের একটি জোরালো যুক্তি।
ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও একটা জনস্বার্থ বা পাবলিক লিটিগেশনের মামলা হয়েছে। সেখানেও উপরের পয়েন্টগুলো ছাড়াও একটা বাড়তি পয়েন্ট হল, পুরনো আইনের ১১ অনুচ্ছেদ। সেখানে গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে পশু জবাইকে খাদ্য জোগাড় হিসেবে দেখা হয়েছিল, নিষ্ঠুরতা হিসেবে দেখা হয়নি। তবে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কষ্ট দেয়া ও নিষ্ঠুরতা না করা সাপেক্ষে তা করতে হবে। তাই এবার সুপ্রিম কোর্ট আগামী ১১ জুলাই শুনানির দিন ধার্য করেছেন আর সরকারকে জবাব তৈরি করে আসতে বলেছেন। এই মামলার বাদি হলো হায়দরাবাদের এক এনজিও, বাদির দাবি- মোদির দুই নতুন আইন অসাংবিধানিক ঘোষণা করে তা বাতিল করে দিতে হবে।

তবে আগেই বলেছিলাম মোদির আইনে ‘পশুর ওয়েলফেয়ার’ কথাটার সত্যিই বিষ্ময়কর। এক ধরনের ওয়েলফেয়ার সংগঠনের কথা আইনে অনেকবার রেফার করা হয়েছে। আর এটাই হল, বিজেপি- আরএসএসের লোকাল ‘পশুর ওয়েলফেয়ার কমিটি’ যাদের হাতে পশু ব্যবসায়ীরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, এরা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে এবং তারা পাবলিক লিঞ্চিং বা প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনাও ঘটাচ্ছে। আশা করা যায়, এ বিষয়গুলোও আদালত আমলে নেবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, মোদির আইন দু’টি আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি তা হয়, তবে এটা ভারত রাষ্ট্রকে বাড়তি কিছু আয়ু দেবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ১৯ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের নির্বাচনে উদোম হিন্দুত্ব পরিচয়

ভারতের নির্বাচনে উদোম হিন্দুত্ব পরিচয়

গৌতম দাস

মার্চ ২৩, ২০১৭ বিকেল সাড়ে পাঁচটা

http://wp.me/p1sCvy-2dN

 

 

ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক ভিত্তি হিন্দুত্ব। ভারত রাষ্ট্রের প্রদেশগুলো যেগুলোকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য বলে। এগুলাকে আমরা রাজ্য সরকার পরিচালিত প্রদেশ বলে চিনতে পারি। এমন ২৯টা রাজ্য নিয়েই এখনকার ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নামের রাষ্ট্র গঠিত। এই রাষ্ট্রের জন্ম বা গঠনের সময় এর সংগঠকেরা চিন্তাভাবনা করতেই পারেনি যে, এই রাজ্যগুলোকে একজায়গায় বেঁধে ভারত বানিয়ে রাখার সেই সুপার গ্লুটা ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে। মুখে বলা হয়েছিল এটা রিপাবলিক বা হিন্দিতে ‘সাধারণতন্ত্র’ হবে। কিন্তু নিজেদের আস্থাই তত গভীর ছিল না। তাই বাস্তবে ও কাজে হিন্দুত্বের গ্লু-এর ভরসা ছাড়া অন্য কিছু বোঝেনি।

রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য- নাগরিক সাম্য ও মানবিক অধিকার, মর্যাদা অথবা এককথায় ইগালেটারিয়ান সমাজ গড়তে হবে। কিন্তু এসব বানাবার বিষয়গুলো তাত্ত্বিক কথার কথা হয়েই বইতে রয়ে গেছে। আর বাস্তব কাজে ভরসা মেনেছে ‘হিন্দুত্ব’-এর জাতিবাদ। আর তত্ত্বকথায় ইমান কম বলে বাস্তবে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে বাড়তি এক কথা আনতে হয়েছিল তাদের। যদিও আরও অনেক পরে ‘সেকুলারিজম’ বলে বাড়তি আরও এক অর্থহীন কথা এনেছিল। এই হল হিন্দুত্বের ভারত। এই হিন্দুত্বের ভারতে আবার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও বিজেপি যাদের কারও হিন্দুত্ব নিয়ে কোনো সমস্যা নেই, তারা কোনো সমস্যা দেখে না। তবে ফারাক হল কংগ্রেস মনে করে ‘হিন্দুত্ব’ কথাটা বা এই পরিচয়টা লুকাতে সেকুলার জামার আড়াল নেওয়া উচিত। আর বিপরীতে বিজেপি মনে করে এই হিন্দুত্ব পরিচয়ের লুকোছাপার ‘দরকার কী’ । বরং বুক ফুলিয়ে বলতে পারলে ভিন্ন লাভ আছে, ভোট বেশি পাওয়া যাবে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে মোদির বিজেপি প্রথম একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে। এর আগে ১৯৯৮-২০০৪ আমলে বিজেপির বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সেটা ছিল এক কোয়ালিশন, এনডিএ-এর সরকার। ২০১৪ সালের বিরাট এক মোদি-জ্বর সৃষ্টি করতে পারলেও মোদি নিশ্চিত ছিলেন না যে হিন্দুত্বকেই খোলাখুলি এবং একমাত্র নির্বাচনী বয়ান করা ঠিক হবে কিনা। মোদি সরকারের প্রায় তিন বছরের মাথায় উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী ফলাফল আসার পরে মোদি এই প্রথম এখন নিশ্চিত যে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ‘হিন্দুত্বই’ হবে বিজেপির একমাত্র মূল মন্ত্র। এখন কেন? কারণ সদ্যসমাপ্ত ভারতের সবচেয়ে বড় আসনের রাজ্য উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির প্রায় ৭৮ ভাগ আসন (৩১২/৪০৩) পেয়ে জয়লাভ করেছে। এর সাথে অবশ্য অন্য চার রাজ্যের নির্বাচনও হয়েছে। আর সেগুলোর ফলাফলে এক পাঞ্জাব ছাড়া অন্য তিন রাজ্যে কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। উত্তর প্রদেশের ফলাফল বিজেপির বিপুল বিজয় এসেছে কথা সত্য; কিন্তু এর তাৎপর্য ছাপিয়ে আরও বড় বিষয় হলো বিজেপির টিকেটে বিজয়ী ওই ৩১২ রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের সবাইকে ফেলে, এক কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কে এই যোগী আদিত্যনাথ? তার আসল নাম ছিল অজয় সিং বিসত। উত্তর প্রদেশের গোরক্ষনাথ জেলায় প্রাচীন নাথপন্থীদের এক মঠ-মন্দির আছে। কালক্রমে ব্রিটিশ আমলেই এটা ‘হিন্দু মহাসভার’ এক আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই মঠের প্রধান পুরোহিত ও হিন্দু মহাসভা নেতা ছিলেন মোহান্ত অবৈদ্যনাথ। এছাড়া বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে মন্দির নির্মাণ আন্দোলনের রাজনীতিতে ১৯৪৯ সালের নেতা হলেন এই মোহান্ত। অজয় সিং মোহান্তের শিষ্যত্ব নিয়ে তাকে পিতা ডাকেন আর নিজে নতুন নাম নেন- যোগী আদিত্যনাথ। হিন্দু মহাসভা হলো বিজেপিরও পেরেন্ট সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আগের নাম। সে সময় হিন্দু মহাসভা নামে একইসঙ্গে হিন্দু ধর্মতাত্ত্বিক সাংগঠনিক তৎপরতা আর হিন্দু রাজনৈতিক সাংগঠনিক তৎপরতা একই নামে চালানো হতো। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে এই মঠগুরু, আরএসএস ও বিজেপি সংশ্লিষ্ট সকলে ‘হিন্দু কর সেবক’ এই নামে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তৎপরতায় সামিল হয়েছিলেন। যোগী আদিত্যের গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ আগে হিন্দু মহাসভা থেকে নির্বাচিত এমপি ছিলেন। সেবার ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে তিনি বিজেপি থেকে নির্বাচনে এমপি হয়ে পড়েন। তিনি ১৯৯৪ সালেই তরুণ শিষ্য যোগী আদিত্যনাথকে আনুষ্ঠানিকভাবে গোরক্ষনাথ মঠের মোহান্ত বা প্রধান পুরোহিত হিসেবে নিজের স্থানে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যান। আর ১৯৯৮ সালের নির্বাচন থেকেই যোগী আদিত্যনাথ গুরুর আসন থেকে নির্বাচন করা শুরু করে এ পর্যন্ত পরপর পাঁচ বার কেন্দ্রীয় সংসদের এমপি নির্বাচিত হন। প্রথমবার তিনি এমপি হন মাত্র ২৬ বছর বয়সে। গত ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ মারা যান। এদিকে গুরু এবং শিষ্য, ১৯৯১ সাল থেকে বিজেপির টিকেটে নির্বাচন করা শুরু করলেও সবসময় বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরেই স্বাধীন থাকতেন। সে অর্থে তাদের ব্যবহারিক নিজের সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হতো খোদ গোরক্ষনাথ মঠ ও মঠের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত গোরক্ষনাথ কলেজ। এরপর ২০০২ সালে যোগী বিজেপির প্রভাবের বাইরে নিজস্ব সংগঠন হিসেবে কলেজের ছাত্রদের নিয়ে ‘হিন্দু যুব বাহিনী’ গঠন করেন। দক্ষিণ ভারতভিত্তিক ইংরেজি মিডিয়া ‘দি হিন্দু’ এই সংগঠনের পরিচয় বলেছে- ‘এক ভয়ঙ্কর যুব শক্তির সংগঠন যারা বহুবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণে অংশ নিয়েছে’। আদিত্যনাথ ও তার বাহিনী প্রায়ই যে ভাষায় কথা বলে তা হলো- মুসলমানেরা ভারতে থাকতে পারবে না, পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবে। এরকম সরাসরি উস্কানিমূলক বক্তব্য আর ‘লাভ জিহাদ’ বা ‘ঘর উয়াপসি’ বা গোমাংস খাওয়া বা বহন করা যাবে না ইত্যাদি কর্মসূচিতে নিয়মিত মুসলমানদের দাবড়িয়ে রাখা। যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণার পর আনন্দবাজার যোগীর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার রিপোর্টে লিখেছে- ২০০৫ সালের সংসদে যোগী বলেছেন, ‘উত্তরপ্রদেশসহ গোটা ভারতকে হিন্দু মহারাষ্ট্র না বানানো পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না।…’ দিন দিন তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। আর তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে ভোট বাক্সে। ২০০৭ সালে গোরক্ষপুর দাঙ্গায় তাঁকে প্রধান অভিযুক্ত করে প্রশাসন। তাঁকে গ্রেফতার করে ফৌজদারি মামলা রুজু করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় মামলা রয়েছে’।

আবার ২০০৭ সাল থেকেই প্রতিবার নির্বাচনের আগে তার বাহিনীর প্রার্থীকে বিজেপির টিকেট দেওয়া নিয়ে বিরোধ তিনি বিজেপিকে অস্বীকার করা পর্যন্ত গড়াত। যেটা একমাত্র মধ্যস্থতা করে দিতে আরএসএস পর্যায়ে যেতে হতো। এবারের নির্বাচনেও যোগীর ‘বাহিনীর’ ১৬ জনকে বিজেপির প্রার্থী করার দাবি জানিয়েছিল; কিন্তু সভাপতি অমিত শাহ আপোস করেননি। এই নির্বাচনে জিতলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবে তা উহ্য রেখে ‘ফলে পরিচয়’ না করিয়ে মোদির নামে তাকে সামনে রেখে বিজেপি নির্বাচনে গিয়েছিল। নির্বাচনে বিপুল বিজয় দেখার পরে যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়। সাথে দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী করা হয় (দুজনই উত্তরপ্রদেশ বিজেপির নেতা, একজন উঁচু জাতের অন্যজন নিচু জাতের।) যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী বলে বিজেপির ঘোষণা আসায় সবচেয়ে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে মিডিয়ায়। ভারতের কনস্টিটিউশন আর রাজনীতির সবটা ‘হিন্দুত্বে’র হলেও তারা এতদিন অন্যকে সেকুলারিজমের সবক দিতে পারত। কিন্তু মোদি আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করায় মিডিয়ার অস্বস্তির কারণ অনুমান করা যায়। যেমন গতকাল আনন্দবাজার লিখছে, ‘ভোটে বিপুল জয়ের পরেই তাঁর (মোদির) আস্তিন থেকে বেরিয়ে এল হিন্দুত্বের আসল তাস। গেরুয়া বসনধারী যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরে মুখে যতই উন্নয়নের কথা বলুন না কেন, তাঁকে বাছাইয়ের পেছনে যে হিন্দুত্বের অঙ্কই কাজ করছে সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মোদী-অমিতরা’। অর্থাৎ আনন্দবাজারের চোখে ‘হিন্দুত্ব যদি আস্তিনের সাপই হয়’ তবে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার আগে কী মোদির আস্তিনে সাপ ছিল না? আনন্দবাজারই যোগী সম্পর্কে পুরাণ তথ্য এনে লিখছে, ওই বছরই (২০১৫ সালে) বারাণসীর একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেন, ‘যারা সূর্য নমস্কার করে না তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কিংবা সমুদ্রে ডুবিয়ে মারা উচিত। আর তা না হলে বাকি জীবনটা তাদের অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখা উচিত।’ অর্থাৎ যোগী যারা ভারতীয় মুসলমান বা খিস্ট্রান তাদের ধরে ধরে তিনি তাঁর ‘ঘর ওয়াপাসি’ মানে হিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে খায়েস করেন। তবে এবারের নির্বাচনের জনসভায় যোগীর আর এক মন্তব্য হলো- নির্বাচনী প্রচারে তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায় এলে শুধু কবরস্থানের উন্নতি হবে আর বিজেপি ক্ষমতায় এলে অনেক বেশি রামমন্দির হবে।’ সমাজবাদী পার্টি মানে যারা মূলত নীচু জাতের ‘যাদব’ আর মুসলমান কনস্টিটিউয়েন্সির রাজনৈতিক দল এবং এর আগে যারা সরকারে ছিল। তাদের উদ্দেশ্য করে বলছেন। কিন্তু কবরস্থানের সঙ্গে মন্দিরের তুলনা কী, কেমনে তা হয়? আর কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা শুধু মুসলমানের ব্যাপার তো নয়। সিটির একই মহল্লায় কবর দেওয়ার জায়গা না পেলে তা একই কমিউনিটিতে হওয়ার কারণে হিন্দু জীবন-যাপনকেও ব্যাহত করে। তাই নয় কী? ফলে এক কথায় যোগী গদ্গদে একটা ঘৃণা আছে বোঝা গেলেও তিনি এর সাফাইটা বলতে পারেননি।

এই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বিজেপির প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষক ছিলেন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী ভেঙ্কটেশ নাইডু। মুখ্যমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় তিনি বলেন, এটা নাকি এক বিজেপির জন্য এক ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’। ওয়াটারশেড কথার মানে হলো, যেখান থেকে সুনির্দিষ্ট করে চেনা যায় এমন পথ আলাদা হয়ে গেছে। তো নাইডু নিজে এর অর্থ করছেন এভাবে যে, এখন থেকে নাকি বিজেপি এই প্রথম ‘সাধারণ মানুষের দলে’ পরিণত হয়েছে। তারা উন্নয়নের পক্ষে এবং দুর্নীতি ও কালোটাকার বিরুদ্ধে পরিষ্কার রায় দিয়েছে’। কিন্তু কথা হলো আদিত্যনাথ এগুলো একটারও প্রতীক নন। তিনি হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক। এটা বিজেপিও জানে। বিজেপি আসলে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত উন্নয়ন পেছনে ফেলে হিন্দুত্বের রাজনীতি করে দাবড়াবে তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বা রায় হিসেবে দেখেছে নাইডুর বিজেপি।

ওদিকে আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় খুব দুঃখ ব্যাথা পেয়ে আছেন। তিনি এক সম্পাদকীয় লিখেছেন যার শিরোনাম হলো, ‘বহুত্ববাদী এই দেশের মেরুদণ্ডে হিমস্রোত এখন’। অর্থাৎ আগে যেন ভারত বহুত্ববাদি ছিল, এখন থেকে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার পর থেকে নেই। আমি যে এই প্রশ্নটা তুলেছি তা তিনি নিজে সাফাই দিয়ে বলছেন। যেমন পরে তিনি লিখছেন, ‘যোগী আদিত্যনাথ মানে বিতর্ক, অসহিষ্ণুতা ও মুসলিমবিদ্বেষ’ এই বক্তব্যটি তিনি নিজেও কোনো দিন খারিজ করেননি। বস্তুত এই ভাবমূর্তিটি সযত্নে লালন করে এসেছেন কয়েক দশক ধরে। এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন। এ বারের ভোটেও তাঁর কট্টর বক্তব্যের ঘোষণার ডেসিবেল বরং বাড়িয়েই গিয়েছেন এক পর্যায় থেকে আর এক পর্যায়ে। তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়ে পুরস্কার দিল দল’। অর্থাৎ তিনি নিজেই বলছেন, আদিত্যনাথ এগুলো অন্তত গত দশক ধরেই করে আসছেন। অঞ্জনই বলছেন, ‘এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন’। আসলে তিনি আদিত্যনাথের কাজগুলোকে ঠিক বন্ধ নয়, একটু ঢাকাঢুকা দিয়ে রাখতে চান এই আর কী? যাতে অস্বস্তি, মেরুদণ্ডে হিমশ্রোতের অস্বস্তিটা না লাগে! আসলে ভারতের কনস্টিটিউশনের প্রিএম্বেলের লেখার মতো সত্য সামনে আসতে দেওয়াই ভালো নয় কী!

 

গৌতম দাস : লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে পরিবর্তন অনলাইন পত্রিকায় ২০ মার্চ ২০১৭ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল। ]]

মোদির আগামি দুবছরের রাজনীতি হবে কেবল হিন্দুত্ব

মোদির আগামি দুবছরের রাজনীতি হবে কেবল হিন্দুত্ব

গৌতম দাস

২৩ মার্চ ২০১৭, বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-2dG

ভারতের ছোট-বড় মিলিয়ে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন সম্পন্ন হবার পর এর ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে গত ১১ মার্চ। এই নির্বাচন ছিল রাজ্য সরকারের অর্থাৎ প্রাদেশিক সরকারের নির্বাচন। ভারতের সংবিধানে ইংরেজিতে একে রাজ্য অ্যাসেম্বলি ইলেকশন (State Assembly Election) বা বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন নামে অভিহিত করা হয়েছে। জন্মের শুরু থেকেই ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য ছিল উত্তর প্রদেশ। সেখান থেকে কিছু জেলা (উত্তরপ্রদেশেরও উত্তর অংশের) আলাদা করে নিয়ে গত ২০০০ সালে বানানো নতুন রাজ্যের নাম ‘উত্তরখণ্ড’। এরপরে এখনও উত্তর প্রদেশ সবচেয়ে বড় রাজ্য। এই দুই রাজ্য এবং পাঞ্জাব, গোয়া ও মনিপুর মিলে মোট এই পাঁচ রাজ্যে এবার প্রায় এক মাস ধরে সাত পর্বে নির্বাচন শেষ হয় গত ৮ মার্চ। এরপরেই ১১ মার্চ সকাল থেকে সবগুলো রাজ্যের একযোগে ভোট গণনা ও ফল প্রকাশ শুরু হয়। উত্তর প্রদেশ ও উত্তরখণ্ড রাজ্যে বিজেপি আর পাঞ্জাবের রাজ্য নির্বাচনে কংগ্রেস একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়লাভ করেছে।
বাকি দুই রাজ্য গোয়া ও মনিপুরে কেউ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তবে কংগ্রেস অন্য সব দলের চেয়ে বেশি আসনে জয়লাভ করেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিজেপি প্রবল তৎপরতায় কংগ্রেস বাদে আর সব ছোট দল ও স্বতন্ত্র সদস্য যারা জিতেছে তাদের সবাইকে বিজেপি সাথে নিয়ে জোট বেঁধে এই দুই রাজ্যে সরকার গঠন করে ফেলেছে। অর্থাৎ বিজেপির নেতৃত্বে গোয়া ও মনিপুরে কোয়ালিশন গর্ভমেন্ট গড়তে সফল হয়েছে বিজেপি।  এখানে ‘তৎপরতা’ কথাটা অর্থপূর্ণ এই অর্থে যে, বিজেপি যখন কংগ্রেস বাদে আর সব নির্বাচিত ছোট দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সাথে সরকার গঠনের দেনা-পাওনা আলাপ আলোচনা চালিয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠনের ‘চুক্তি’ সম্পন্ন করে ফেলছিল, কংগ্রেস তখন কে তাদের মধ্যে মুখ্যমন্ত্রী হবে এ নিয়ে ঝগড়া ও মনকষাকষিতে মত্ত থেকে সরকার গঠনের সুযোগ হারিয়েছিল।

ওদিকে প্রায় এরকমই অন্য কিছু তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটেছিল উত্তরপ্রদেশ। এর মূল কারণ রাজ্যগুলোর মধ্যে উত্তরপ্রদেশ জনসংখ্যায় সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে বেশি নির্বাচনী এলাকার – কেন্দ্রিয় লোকসভা আসন ৮০। ভারতের জন্মের পর থেকে (১৯৮৫ পর্যন্ত) পুরো নেহরু পরিবারের কাল পর্বে ভারতের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে উত্তরপ্রদেশ থেকেই। বাবরি মসজিদ ধ্বংসতাণ্ডব, গোধন ট্রেনে আগুন ও ব্যাপক দাঙ্গার ঘটনাপর্ব সামগ্রিকভাবে বিজেপির রাজনৈতিক উত্থান ঘটিয়েছে। আর সে সবের বেশির ভাগ এই উত্তরপ্রদেশই। সেই উত্তরপ্রদেশে মোট ৪০৩ আসনের বিধানসভা নির্বাচনে এবারই প্রথম বিজেপি ৩২৬ আসনে জয়লাভ করেছে। এর আগে গত ২০১৪ সালে মোদির প্রধানমন্ত্রী হওয়ার লোকসভা নির্বাচনে অবশ্য বিজেপি প্রথম মোট ৮০ আসনের মধ্যে ৭৩ আসনের বিজয় লাভ করেছিল। সেটাই উত্তরপ্রদেশে বিজেপির পা রেখে পেখম মেলার শুরু বলা যায়। পরে কেবল দিল্লি রাজ্য সরকারের নির্বাচনে এবং বিহারের রাজ্য নির্বাচনে বিজেপির খুব খারাপ হার হওয়াতে এবারের নির্বাচনে বিজেপি আবার উত্তরপ্রদেশে আগের মতো বিরাট ব্যবধানে জিতবেই এটা কোনো পক্ষই নিশ্চিত ধরেনি। যদিও বিজেপির পক্ষ থেকে এমন বিজয়ের দাবি বরাবর করে যাওয়া হচ্ছিল। এ ছাড়া চার মাস আগে মোদি ভারতের মোট ছাপা নোটের ৮৫ শতাংশ মূল্য ধারণ করে এমন ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট দুটা বাতিল করে দিয়েছি, আর নতুন নোটে তা বদলে দিয়ে ছিল। তবে এথেকে কালো টাকা উদ্ধারের কোনো সুফল মোদি দেখাতে পারেননি। আবার নোট বাতিলের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা আরো খুবই কষ্টের হয়ে পড়েছিল। এর চেয়েও মারাত্মক ব্যাপার হল, সেই থেকে ভারতের অর্থনীতি প্রচণ্ড খারাপ অবস্থায় পড়েছে। ব্যাংক গভর্ভর থেকে সরকারি টেকনিক্যাল উপদেষ্টারাও তা অস্বীকার করে পারে নাই। এতে  নির্বাচন বিশেষজ্ঞসহ সব পক্ষই আশঙ্কা করছিল, এই নির্বাচনের দেওয়া ভোটে সেটা বড় ছাপ ফেলতে পারে এবং মোদি একটা বড় ধাক্কা খেতে পারেন। শুধু তাই না, সেটা হলে তা ২০১৯ সালের মোদির দ্বিতীয় নির্বাচনী ফলাফলকেও প্রভাবিত করবে। কিন্তু মোদির কপাল ভাল তা হয় নাই। ভারতের রাজনীতির বিচারে নোট বাতিল কেন্দ্রের রাজনীতির ইস্যু; স্থানীয় রাজনীতির নয়। তাই এক কথায় বললে, উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনে ভোটদাতারা ভোট দিয়েছে কেন্দ্রীয় ‘নোট বাতিল ও এর প্রভাবকে’ উপেক্ষা করে বরং স্থানীয় নানা ইস্যুতে। এসব আশঙ্কাকে মিথ্যা প্রমাণ করার পটভূমিতে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির পালটা বিপুল জয়লাভ ভিন্ন অনেক কিছুর ইঙ্গিত বহন করে। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির বিপুল বিজয়ের অর্থ হল, কংগ্রেসের জায়গা দখল করে কংগ্রেসের মতোই সর্বভারতীয় দল হিসেবে বিজেপি ভারতীয় রাজনীতিতে উত্থিত হয়ে জায়গা করে নিয়েছে। এই নির্বাচনের ফলাফল তাই প্রমাণ করছে। এই দাবি অনেক বিশ্লেষকও করছেন। আগামী দিনের ঘটনাবলী তা নিশ্চিত করবে।
কিন্তু এসবের বাইরে উত্তরপ্রদেশে বিজেপির বিপুল বিজয় সাময়িক হতাশ থাকা মোদিকে আরো চাঙ্গা ও আস্থাবান করে তুলেছে। এই বিজয়কে কেন্দ্র করে মোদি ও বিজেপি আগামী ২০১৯ সালের কেন্দ্রে নির্বাচনে জয়লাভের ছক সাজানো শুরু করেছে। কারণ বিজেপির মূল্যায়ন হল, হিন্দুত্ববাদকে মুখ্য করে পরিচালিত রাজনীতি হল, ভোটের বাক্স ভরানোর উপযুক্ত এবং বিজেপির জন্য পারফেক্ট রাজনীতি।
মোদির পরপর তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী থেকে পরে কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত এবং সেই সাথে বিজেপির উত্থানপর্বে সবসময় আগ্রাসী নীতিতে পরিচালিত হয়েছেন। বাজি ধরে ধরে এগিয়েছেন। যত ঝুঁকি নিয়েছেন, প্রায় সব ফলাফলই তার পক্ষে গেছে। ফলে সাহসী হয়ে উঠছেন অথবা বলা যায় বাজি ধরে ঝুঁকি নেওয়াই তাঁর একমাত্র বিকল্প তার হাতে আছে ধরে নিয়ে এগিয়েছিলেন। উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যার কুড়ি শতাংশ মুসলমান। এবারে বিজেপি যে কৌশলের ওপর এককভাবে দাঁড়িয়ে সে ৭৮ ভাগ আসন জিতেছে তা হল, ২০ শতাংশ মুসলমান ভোটারের পরোয়া না করে এর বিপরীতে ব্রাহ্মণ থেকে যাদব ও আরো নিচু জাত – এভাবে সব হিন্দু জনসংখ্যার নানা অংশকে যতদূর সম্ভব ভোটের একই বাক্সে ভরে আনা। এমন এক বড় রেঞ্জের হিন্দু-কোয়ালিশন গড়ে নির্বাচন লড়া।
যোগী আদিত্যনাথকে বিজেপি উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উগ্র আগ্রাসী ও বিতর্কিত মন্তব্যকারী মাত্র ৪৪ বছর বয়সের বিজেপি নেতা আদিত্যনাথ। বিগত ১৯৯৮ সালে সবচেয়ে কম বয়স, মাত্র ২৬ বছরে তিনি প্রথমবার লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন এবং সেই থেকে পরপর পাঁচবার তিনি ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ বা লোকসভার এমপি। যদিও  এই আসনটা ছিল তার গুরু অবৈদ্যনাথ মোহন্ত এর, যিনি এই আসন থেকে নির্বাচিত হতেন। উত্তরপ্রদেশের গোরক্ষনাথে এক প্রাচীন মঠ আছে, গুরু অবৈদ্যনাথ যার প্রধান পুরোহিত ছিলেন। গুরুর মৃত্যুর আগেই ১৯৯৪ সালে যোগীকে এই মঠের প্রধান পুরোহিত করে যান। আর এই মঠকে নিজেদের প্রভাবে এলাকায় নতুন মাত্রার রাজনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছিলেন যোগী। এখানে পুরনো গোরক্ষনাথ কলেজও হয়ে পড়ে তরুণদের প্রভাবিত করার উপায়। কলেজকে কেন্দ্র করে বিজেপি রাজনৈতিক তৎপরতা, বিশেষ করে বাবরি মসজিদ ভাঙাকে কেন্দ্র করে চলা তৎপরতা জোরদার হয়েছিল এই কলেজকে ঘিরেই। গত ২০০২ সালে যোগী আদিত্যনাথ এখানে তরুণদের নিয়ে ‘হিন্দু যুব বাহিনী’ নামে এক নতুন সংগঠনের জন্ম দেন। আসলে উগ্র ও আক্রমণাত্মক ভাষায় মুসলমান ও ইসলাম অথবা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য ও বয়ান দি্তে এই আগ্রাসী সংগঠন তিনি গড়ে তোলেন। তিনি প্রায়ই বক্তৃতায় হিন্দুত্বের রাজনীতির পক্ষে তার সাফাই তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘হিন্দুত্ব কখনোই ত্যাগ করতে পারব না। কিছু জায়গায় হিন্দুরা নির্যাতিত। হিন্দুদের দেশে এটা হতে পারে না। তাই আমি হিন্দুত্বের পক্ষে কথা বলি। আমাকে বলতেই হবে”। এবারের রাজ্য নির্বাচনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রসঙ্গে তার এক আজব দাবি আছে। তিনি দাবি করেন, ট্রাম্প মোদিকে অনুসরণ করে জিতেছেন। মুসলমানদের বিরুদ্ধে কথা বলে ট্রাম্প জিতেছেন। রাশিয়ার পুতিনও মুসলমানদের বিরোধী। বিষয়গুলোতে নাকি তাদের চোখ খুলে দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদি। বিভিন্ন সময়ে তাঁর চরম উত্তেজক ও মুসলমান বিদ্বেষ ছড়ানো মন্তব্যগুলো এক জায়গায় এনেছে আনন্দবাজার পত্রিকা এখানে। 
সেই যোগী আদিত্যনাথ উত্তরপ্রদেশের নির্বাচন শুরুর দু’বছর আগে থেকেই  – মুসলমানদের ভারত থেকে বিতাড়িত করতে হবে, পাকিস্তান পাঠিয়ে দিতে হবে বলে দাবি জানিয়ে বক্তৃতা শুরু করেছিলেন। নির্বাচনের ফলাফলের পরে উত্তরপ্রদেশের কয়েকটা জেলায় ইতোমধ্যে মুসলমান বিতাড়নের পক্ষে পোস্টার পড়েছে। কয়েকটা ভারতীয় ইংরেজি দৈনিক এর ছবি ছেপেছে। এরপরই বিজেপির সংসদীয় বোর্ড মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আদিত্যনাথের নাম ঘোষণা করেছে।
আদিত্যনাথের তৎপরতার একটা প্যাটার্ন লক্ষ করা যায়। তার কাজের ধরন হল, মুসলমানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে উসকানিমূলকভাবে কথা বলা। এরপর এতে গ্রেফতার হলে তাকে মুক্ত করে আনার জন্য শহরে দাঙ্গা হাঙ্গামা তৈরি করা যাতে এই চাপে প্রশাসন তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ ক্রমাগত আগ্রাসীভাবে েকের পর এক পদক্ষেপে চাপ বাড়িয়ে চলা। এভাবেই মুম্বাই-গোরক্ষপুর গোধন এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন দেয়ার ঘটনাটা ঘটেছিল তার ‘হিন্দু যুব বাহিনীর’ হাতে। এখানে এই তথ্যগুলোর বেশির ভাগ ভারতের ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। এভাবে যোগীর চাপ প্রয়োগ এবং ইচ্ছামতো কাজ করিয়ে নিয়ে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে  প্রধান হাতিয়ার হল তাঁর ‘হিন্দু যুব বাহিনী’। একই প্রক্রিয়ার চাপ তিনি কখনো কখনো খোদ বিজেপির ওপরও প্রয়োগ করেছেন। এবারের নির্বাচনে এই বাহিনী এত ক্ষমতাবান বোধ করে যে, তারা নিজস্ব ১৪ জন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিতে দাবি জানিয়েছিল। বিজেপির সভাপতি অমিত শাহ তা মানেননি। ফলে মনকষাকষি চলছিল। এর মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে আদিত্যনাথের নামের ঘোষণা আসে।
ভেতরের এসব বিতর্ক যতই থাকুক বিজেপির এই নির্বাচনের মূল্যায়ন হল, হিন্দুত্বের জাতিবাদ আর মুসলমানবিরোধী গলাবাজি তবে – এটা সঠিক অনুপাতে ব্যবহার করার কৌশল নিতে পারলে ২০১৯ সালের নির্বাচনেও আবার তাদের জিতিয়ে আনতে পারে – এই বিশ্বাস তাদের দৃঢ় হয়েছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই অর্থে এবারের নির্বাচন আর বিজেপির বিপুল বিজয় হলো প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে শেষবার দপ করে জ্বলে ওঠা। দেখা যাক আগামিতে ২০১৯ এর নির্বাচন পর্যন্ত হিন্দুত্বকে পুরাপুরি আকড়ে ধরলে সেই রাজনীতি কতটা ভারতের আর কতটা বিজেপিকে সফলতা দেয়।

[এই নির্বাচন প্রসঙ্গ কভার করে আরও বিস্তারিত একটা লেখা আজ এখনই ছাপা হইয়েছে এখানে দেখুন।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনের ১৯ মার্চ ২০১৭ সংখ্যায় (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল। ]]

স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস

একা ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেও সব সুবিধা পাবার খায়েস
গৌতম দাস
০৭ জুন, ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1g9

যুদ্ধে প্রথম পারমানবিক বোমা ব্যবহারের অভিজ্ঞতা আমেরিকার। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ফলাফল আমেরিকার পক্ষে আসন্ন এটা নির্ধারিত হয়ে উঠার পরও আমেরিকা ১৯৪৫ সালে এই বোমা জাপানের উপরে ব্যবহার করেছিল। এমন করার পিছনের কারণ যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে এর ব্যবহারের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাখা এবং এর ভয়াবহতার মাত্রা কেমন হয় সেটাও বুঝে রাখতে। বলা বাহুল্য কোন হুশজ্ঞানওয়ালা চিমটি কাটলে লাগে টের পায় এমন মানুষের জন্য সেটা খুবই খারাপ ও ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। সম্ভবত সেটাই এরপর থেকে আজ পর্যন্ত  দুনিয়া আর কোথাও এই অস্ত্রের ব্যবহার আমরা আর দেখেনি। কিন্তু এসব বাজে ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তবু বিভিন্ন রাষ্ট্রের পারমানবিক অস্ত্র অর্জন এবং ভান্ডারে রাখার আগ্রহ কমাতে পারে নাই। বিগত ১৯৭৬ সালের মধ্যে ভারত ও পাকিস্তান পারমানবিক বোমা অর্জন করে ফেলেছিল। এটা উপমহাদেশীয় বা একদিকের পরিস্থিতি। কিন্তু ততদিনে অন্যদিকে অর্থাৎ পশ্চিমে বা কোল্ড ওয়ার লড়ার দুই মাতবর আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুনিয়ার পরিস্থিতি তাদেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে – এটা বিপদ বুঝতে পেরে গিয়েছিল।  তাই, পারমানবিক অস্ত্র আর ব্যবহার করবে না বলে পরস্পর পরস্পরের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক চুক্তি স্বাক্ষর দিয়ে ফেলেছিল।  এটাই Non-Proliferation Treaty অথবা NPT – সেই আন্তর্জাতিক চুক্তি, ১৯৬৮ সালে যা স্বাক্ষরিত হয়। সে বিষয়ে পরে আসছি। কিন্তু এখানে আলোচনার জন্য গুরুত্বপুর্ণ হল, ভারত ও পাকিস্তান; যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে তা সবাই জানে। কিন্তু এরা দুজন আজ পর্যন্ত কখনই এনপিটি তে স্বাক্ষর করে নাই। এটা ঠিক যে অস্ত্র হিসাবে পারমানবিক অস্ত্র পশ্চিমের কাছে ডেড ইস্যু, খামোখা পয়সা নষ্ট ধরণের বিষয় আর এর সবচেয়েও বড় দিক খতরনাক। কিন্তু এতটুকুওই সব বা শেষ কথা নয়। যেমন, এই অস্ত্রই যদি আবার এশিয়ার কোন দেশ যদি এখনও তা অর্জন করতে চায় তবে সে ঘটনাতে পশ্চিমা যে কোন মাতব্বর দেশ নড়চড়ে বসে আর নিজের জন্য হুমকি গণ্য করে থাকে।

তা সত্ত্বেও এই পরিস্থিতিতে “ভারত ও এনপিটি” আবার এখন ইস্যু। সারকথায় বললে এর মূল কারণ, ভারত এনপিটিতে স্বাক্ষর না করলেও একালে আমেরিকা যেচে পড়ে ভারতকে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল দিবে বলে উস্কানি দিয়েছে। এবং সেটা ভারত এনপিটিতে এবার স্বাক্ষর না করেই হাসিল করতে পারে এমন লোভের মুলা ঝুলিয়েছে আমেরিকা। এর উদ্দেশ্য হল, ভারতের কথিত চীন-ভীতির বিপরীতে দেখানো যে ভারতের নিরাপত্তা নিয়ে আমেরিকা কত কেয়ার করে! ভারত আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার হয়ে আরও কাছে আসুক। এছাড়াও আমেরিকান খায়েসটাকে গুছিয়ে বললে তা হল এরকম যে প্রতিদানে, নতুন যে গ্লোবাল অর্থনীতিক অর্ডার আসন্ন, যাতে মনে করা হচ্ছে চীনের স্টেক হবে হাই বা অনেক বেশি। তাতে ভারত যেন আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনের সাথে সে নতুন অর্ডারের পক্ষে অবস্থান না নেয়। অর্থাৎ পুরান বা চলতি গ্লোবাল অর্ডার, যেটা আমেরিকান নেতৃত্বে সাজানো তা এখনও ভারতের স্বার্থের দিক থেকে লোভনীয় বলে যেন ভারত মনে করে। পারমানবিক ইস্যুর দিক থেকে এই বিষয়টা বুঝতে আজকের প্রসঙ্গ সেদিকে নিব।

গত ২০০৫ সাল, সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বুশের প্রথম টার্মের শাসন রাজত্বের শেষ বছর। আর একই সাথে আমেরিকার দিক থেকে সেটা ছিল ভারতকে কাছে টানার কৌশলের অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে উস্কে তোলা শুরুর বছর। চীন ও ভারতের নিজেদের পারস্পরিক স্বার্থে নিজেদের ভিতর মিল-অমিল, ঝগড়া-বন্ধুত্ব বহু কিছু আছে। থাকাও স্বাভাবিক। তবে দীর্ঘস্থায়ী দিক থেকে দেখলে তাদের কিছু গভীর কমন স্বার্থ আছে ফলে এই অর্থে তারা ঘনিষ্ট বন্ধু, কিন্তু আপাত দিক থেকে এটাই আবার পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতারও এবং নানান স্বার্থ-বিরোধেরও। তাই আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের লক্ষ্য ছিল, চীন-ভারতের সম্পর্কের ভিতর যতই ভালভালাইয়া থাকুক সেটার ফলাফল হিসাবে তা থেকে উভয়েই যেন একসাথে আমেরিকা তাদের ‘কমন এনিমি’ এই জ্ঞান না করে বসে, এই প্রশ্নে যেন তারা এককাট্টা হয়ে দাড়িয়ে না যায়। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে বুশ জুলাই ২০০৫ সালে প্রথম ভারত সফরে আসেন। এক যৌথ ঘোষণাও স্বাক্ষরিত হয় ১৮ জুলাই ২০০৫। সেই সাথে এই প্রথম পাবলিক হয়েছিল যে ভারত ও আমেরিকার সামরিক সম্পর্কই শুধু নয় কী ভিত্তিগত কাঠামোর মধ্যে ভারত-আমেরিকার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সম্পর্ক  হবে তাও ইতোমধ্যেই তারা চুড়ান্ত করে ফেলেছে।

একেবারে জন্মের সময়ের পটভুমির দিক থেকে বললে,  ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা একচেটিয়া সরবরাহকারী ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বা বর্তমান রাশিয়া) কে কেন্দ্র করে সাজানো অর্থাৎ কোল্ড ওয়ার সময় থেকেই ওর মূল সরঞ্জাম ও এর সরবরাহ মূলত রাশিয়া ঘরাণার। কোল্ড ওয়ার মানে দুনিয়াটা দুই ব্লকে বিভক্ত থাকবার সময় বা বিভক্ত হয়ে ছিল যখন। ছোট-বড় সব রাষ্ট্রকে যখন হয় সোভিয়েত ব্লক নয়ত আমেরিকান ব্লকে ঢুকে যেতেই হয়েছিল। যখন দুটা থেকেই বাইরে থাকার উপায় ছিল না বা যেত না। এটা ছিল সেই ব্লক যুগ বা কোল্ড ওয়ারের যুগ। কোল্ড ওয়ার – মানে ঠিক যুদ্ধ লাগিয়ে জড়িয়ে যাওয়া নয় কিন্তু সব সময় যুদ্ধে জড়িয়ে থাকার মতই টেনশনে থাকা। আর গোয়েন্দা আর কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স, সাবভারসিভ এক্টের ষড়যন্ত্র চারদিকে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে (১৯৯২) যাবার পর থেকে কার্যত সেই কোল্ড ওয়ার এখন মৃত, দুনিয়া আর এখন ব্লকে ভাগ করা নাই। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে সে সময়ের তৈরি হওয়া অস্ত্রের ঘরানা সেই হিসাব, কেবল তাই এখনও প্রচ্ছন্নে বহাল আছে।

ইতোমধ্যে ১৯৯২ সাল নাগাদ সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে আলাদা ১৫ রাষ্ট্র হয়ে যাওয়া – এটাকে কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তি সুচনা বলা যায়। ওদিকে এই ঘটনার পরের দুই টার্ম (১৯৯৩-২০০১) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিল ক্লিনটন। আর ক্লিনটন যুগের পরিসমাপ্তিতে, এরপরেই ২০০১ সাল থেকে জুনিয়র বুশও পরপর দুই টার্ম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল –“কোল্ড ওয়ার শেষ হয়েছে এখন তারা একলাই রাজা” ধরণের আমোদে থাকার। কারণ কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তিতে দুনিয়াতে আর আমাদের মত দেশগুলোকে সোভিয়েত অথবা আমেরিকান কোন না কোন ব্লকে ঢুকে টিকে থাকতে হবে এই বাস্তবতার অবসান ঘটেছিল। একথাকেই আর একভাবে বলা যে দুনিয়া তখন থেকে আর বাইপোলার নয়। মানে, পরাশক্তি অর্থে দুনিয়া আর দুই মেরুতে বিভক্ত থাকে নাই। এতে স্বভাবতই আমেরিকান বিদেশ নীতিতে সেই প্রথম বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। নতুন মৌলিক কিছু বদল তখনই মানে, ক্লিনটনের আমলেই হয়েছিল। যেমন আমাদের মত দেশে আমেরিকা সমর্থিত কোন সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাকে আর ‘আগের মত’ সামরিক সরকার হতে হবে না। স্টেট ডিপার্টমেন্টের নতুন নির্দেশিকা অবস্থান হল, বেসামরিক সরকারের পক্ষে থাকতে হবে। সর্বোতভাবে চেষ্টা করতে হবে ক্ষমতা বেসামরিক হাতে রাখতে। কোল্ড ওয়ারের যুগে আমেরিকা ব্যতিক্রমহীনভাবে আমাদের মত যে কোন দেশে কোথাও বেসামরিক সরকার টিকাতে পারে নাই। ফলে আমেরিকা সমর্থিত সরকার মানেই সেটা সামরিক সরকারই হতে দেখা গিয়েছিল। এই অর্থে ক্লিনটনের সময়কালটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে বেসামরিক সরকার টিকানোর সফলতা উপভোগের কাল। অবশ্য এটাও বাইরের দিক থেকে তাকিয়ে বলা। আর ভিতরে ভিতরে তা ছিল নতুন পরিস্থিতিতে এক মেরুর কালে আমেরিকান নতুন বিদেশনীতিতে আর কী বৈশিষ্ট আনা যেতে পারে,  কী হওয়া উচিত তা নিয়ে আরও বিস্তারে ভাবনা চিন্তার কাল। তবে আমেরিকান নতুন বিদেশ নীতির আরও পোক্ত রূপ হাজির করতে এবং তার বাস্তবায়ন শুরু হতে হতে ক্লিনটন আমল পেরিয়ে বুশের আমল চলে আসে।  আর এসব নতুন চিন্তা ভাবনা থেকেই পুরানা চিন্তা ও ব্লক ভেদাভেদ দৃষ্টিভঙ্গী ভেঙ্গে আমেরিকা ভারতের দিকে এগিয়ে আসার নতুন নীতি নেয়। বুশের আমল থেকে আমরা আমেরিকার নতুন ও পোক্ত বিদেশ নীতির বাস্তবায়নের কাল হিসাবে দেখতে পারি।

ওদিকে জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মই আবার একই সাথে ভিন্ন আর এক ফেনোমেনা স্পষ্ট দৃশ্যমান হাজির হবার বছর। সেটা ছিল চীনের অর্থনৈতিক উত্থানের দু’দশকের কালপর্ব (১৯৯০-২০১০), ডাবল ডিজিট জিডিপি গ্রোথের সেকেন্ড ডিকেড বা দ্বিতীয় দশ বছর। যদিও চীনের এই উত্থানের ফলে আমেরিকা-রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের উপর এর প্রভাব পরিণতি কী হতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমেরিকান সরকারি স্পষ্ট গবেষণা লব্ধ ফল আসা শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের পর থেকে, যার চুড়ান্ত রিপোর্ট এসেছিল ২০০৮ সালে। এসবের আগে যদিও অনুমান নির্ভর কিছু খবর যেমন, প্রজেক্টেড রিপোর্ট পাওয়া গিয়েছিল ২০০৪ সালেই (ষ্টাটিষ্টিক্যাল প্রজেকশন রিপোর্টের জন্য আমেরিকান বিখ্যাত ম্যাগাজিন)  ফর্বস ম্যাগাজিনের সৌজন্যে। ফলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীন-ভারত একজোটে কোন কমন স্টাটেজিতে যেন না দাঁড়ায়  সে উদ্দেশ্যে ভারতকে কাছে টেনে বাড়তি খাতির করে চীন ও ভারতের মধ্যে দুরত্ত্ব তৈরি করা ছিল সেকালে আমেরিকান বিদেশ নীতির এক বিশেষ বৈশিষ্ট। জুনিয়র বুশের ২০০৫ সালের জুলাইয়ের ভারত সফরকে এই আলোকে দেখলে অনেক প্রশ্নের ব্যাখ্যা মিলবে। ঐ সফরের ফোকাস ঘটনা ছিল, ভারতকে আমেরিকার নিউক্লিয়ার টেকনোলজিসহ সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বা বিক্রির সিদ্ধান্ত।

আগেই বলেছি, নিউক্লিয়ার বোমা বা পারমাণবিক বোমা পশ্চিমের হাতে এসে মারাত্মক অস্ত্র হিসাবে কার্যকর হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ কালে। এরপর সেখান থেকে এই অস্ত্রের গবেষণা ও বিকাশ বিস্তা্র সবচেয়ে বেশি ঘটে কোল্ড ওয়ারের সময় (মোটামুটি ১৯৫০-১৯৯২) কালে। যদিও ঠিক এর উলটা অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্রের উতপাদন বৃদ্ধি ও বিস্তার রোধে পরাশক্তিগত ততপরতাও শুরু হয় ১৯৬৮ সাল থেকে। স্বাক্ষরিত হয় NPT চুক্তি। অর্থাৎ প্রো-লাইফারেশন কথার সোজা বাংলা অর্থ “আয়ু দেয়া” বা “সহজেই যা বিস্তার লাভ করে”। কাজেই পারমাণবিক NPT  কথার মানে বাংলা করলে দাড়ায়, পারমানবিক অস্ত্র বা এর টেকনোলজির বিস্তার রোধের চুক্তি। আমেরিকান সরকারি ইতিহাস অনুসারে ১৯৬১-৬৮ প্রায় এই ৭ বছর ধরে নিগোশিয়েশনের ফসল হল এই চুক্তি। এর আবার তিন পৃথক পর্যায় বা অংশ আছে – নন-প্রোলিফারেশন, ডিসআর্মামেন্ট ও পিসফুল ইউজ। অর্থাৎ বিস্তার রোধ (অস্ত্রে ব্যবহারের লক্ষ্যে গবেষণা ও উতপাদন বন্ধ), নিরস্ত্রীকরণ (যে অস্ত্র তৈরি হয়ে গেছে এর ধ্বংস বা ব্যবহার বন্ধ করা) ও (যুদ্ধের অস্ত্র হিসাবে নয় তবে এই টেকনোলজির) শান্তিপুর্ণ ব্যবহার। প্রথম চোটে আমেরিকা, বৃটেন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন এতে স্বাক্ষর করেছিল ১৯৬৮ সালে। কিন্তু তবুও  চীন ও ফ্রান্স  ১৯৯২ সালের আগে স্বাক্ষর করে নাই বলে একমাত্র এরপরই জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্যরেই স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়। অন্যভাবে বলা যায় এই চুক্তিতে স্বাক্ষরের বিষয়টাই ১৯৯২ সালের আগে অর্থাৎ  কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তির আগে কার্যকর করা যায় নাই। বিশেষ করে যারা ভেটো-ক্ষমতাধারী এবং যাদের সবার হাতে পারমানবিক অস্ত্র মজুদও আছে, একারণে। এছাড়া যাদের হাতে অস্ত্র মজুদ নাই তারাসহ বর্তমানের মোট স্বাক্ষর করা দেশের (তাইওয়ানসহ) সংখ্যা ১৮৯। কিন্তু স্বাক্ষর করতে একেবারেই ইচ্ছুক নয় (এদের মধ্যে যাদের পারমানবিক অস্ত্র আছে জানা যায় বা অনুমান করা যায়) এমন রাষ্ট্র হল  ভারত, পাকিস্তান, ইসরায়েল ও সাউথ সুদান। সাউথ আফ্রিকাকেও এই দলে ফেলা যেত সে সময়। কিন্তু ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদিতা বিরোধী সরকার কায়েমের পরে সে এনপিটি স্বাক্ষর করা দেশ হয়ে যায়। ওদিকে উত্তর কোরিয়া স্বাক্ষর করেছিল প্রথমে কিন্তু আবার প্রত্যাহার করেছে ২০০৩ সালে। এদের মধ্যে কেবল ভারত ও পাকিস্তান হল এমন রাষ্ট্র যাদের হাতে পারমানবিক অস্ত্র থাকার ব্যাপারটা সবাই জানে এবং তারা নিজেরাও স্বীকার করে। নিজ স্বীকারোক্তির ১৯৭৪-৬ সাল থেকেই পারমানবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র হলেও এরা এনপিটি তে স্বাক্ষর করতেও চায় না। চলতি একবিংশ শতকের আগে এনপিটি বিষয়টা এভাবেই ছিল।  আর এসবের টেকনিক্যাল খুটিনাটি দিক তদারক করা এবং জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কাছে রিপোর্ট করার প্রতিষ্ঠান হল IAEA (ইন্টারন্যাশনাল এটমিক এনার্জি এসোশিয়েশন)।

এনপিটি স্বাক্ষরিত দেশগুলোর মধ্যে পশ্চিমের যেসব দেশের হাতে পারমানবিক অস্ত্র ও টেকনোলজি আছে এবং যারা সেটা অন্য রাষ্ট্র কাউকে (কেবল শান্তিপুর্ণ ব্যবহারের জন্য) দিতে চায় তাদের সেই  দেওয়ার বিষয়টা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ৪৮ সদস্যের এক নিয়ন্ত্রণ গ্রুপ আছে যার নাম NSG, নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি। গ্রুপের সদস্যরা মূলত পারমানবিক টেকনোলজি অথবা মালামাল সরবরাহে সক্ষম। ফলে শান্তিপুর্ণ ব্যবহার যেমন বিদ্যুৎ উতপাদনে এবং বৈধভাবে ব্যবহার করতে চাইলেও কোন এক এনএসজি গ্রুপের সদস্যকে ধরতে  হবে।  তবে কিছু ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি এখানে স্পষ্ট করা দরকার। যেমন ইরান, অনুমান করা হয় সে পাকিস্তান (ব্যক্তিগতভাবে বিজ্ঞানী কাদের খান) বা উত্তর কোরিয়া অথবা উভয়ের কাছ থেকে মালামাল ও টেকনোলজি সংগ্রহ করেছে। অর্থাৎ এনএসজি এর কেউ তাকে সরবরাহে রাজি হয় নাই। ভিন্ন আর এক ব্যতিক্রম ভারত। ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশ ভারত সফরে পারমানবিক টেকনোলজি ও মালামাল সরবরাহ বিষয়ে চুক্তি করেছিল।

এই হল পিছনের পটভুমি। এখন ভারত ঐ চুক্তি কার্যকর হয়েছে দেখতে চাইলে তাকে আর এক বাধা পার হতে হবে। সেটা হল, উপরে যে নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপ বা এনএসজি এর কথা বলেছি, ভারতকে ঐ গ্রুপের সদস্য হয়ে নিতে হবে। কারণ ভারতের সাপ্লায়ার আমেরিকা ভারতকে সরবরাহ দিতে পারে যদি ভারত এনএসজি এর সদস্য হয়। অন্য ভাষায় বললে এই গ্রুপের পালনীয় নিয়মকানুন মেনে সরবরাহকৃত মালামাল ও টেকনোলজি ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দেয়। আমেরিকার সরবরাহ পেতে ভারতকে আগে এনএসজি এর সদস্যপদ পেয়ে নিতে হবে এব্যাপারে খোদ ভারত বা আমেরিকার কোন বিতর্ক নাই। তাহলে বিতর্ক কী নিয়ে? বিতর্কে ভারতের দাবি, আমার অতীত আচরণ ও ট্রেক রেকর্ড ভাল ফলে আমি আমেরিকা এই NSG থেকে সাপ্লাই পাবার যোগ্য।  কিন্তু স্পষ্ট করে যেটা ভারত বলছে না তা হল, এর অর্থ কী ভারতের NSG এর সদস্য গণ্য করে নিতে হবে, অথবা আর কোন বিবেচনায় না গিয়ে সদস্যপদ দিয়ে দিতে হবে? এছাড়াও NPT স্বাক্ষরের কী হবে? ভারত NPT তে স্বাক্ষর না করলেও NSG এর সদস্য গণ্য হতে পারে? এর মানে NPT তে স্বাক্ষর করা NSG এর সদস্য হবার ক্ষেত্রে পুর্বশর্ত নাও হতে পারে? তাই কী?

যারা এনপিটি এর সদস্য অর্থাৎ পারমানবিক মালামাল ও টেকনোলজি যারা কেবল শান্তিপুর্ণ কাজে, অস্ত্র নয় বিদ্যুৎ উতপাদনের মত কাজে ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে বলে স্বাক্ষর করেছে কেবল তাদেরকে নিয়েই এনএসজি বা সরবরাহকারিদের গ্রুপ গঠন করা হয়েছে। অর্থাৎ এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হল এনপিটি তে স্বাক্ষর করে আসা, এর সদস্য হওয়া। কিন্তু ভারত কখনই এনপিটিতে স্বাক্ষর করে নাই। ফলে সে এনপিটি এর সদস্যই নয়। ফলে তর্কের বিষয় এটা যে, এনপিটি সদস্য না হয়েও ভারত এনএসজি এর সদস্য বলে গৃহীত হবে কী না?

সোজা ভাষায় ভারত চাচ্ছে বা চেষ্টা করছে, এনপিটিতে স্বাক্ষর না করেই সে আমেরিকার টেকনোলজি ও মালামাল পেতে চায়। কিভাবে?

ভারতের মিডিয়া চলতি মে মাসে অভিযোগের রিপোর্ট ছেপেছে যে আমেরিকা থেকে ভারতের নিউক্লিয়ার বিষয়ক সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে  চীন বাধা সৃষ্টি করছে।  যেমন ইংরাজি ‘দি হিন্দু’ এর শিরোনাম “চীন ও পাকিস্তানের আপত্তি উল্টায়ে দিয়ে আমেরিকা বলছে ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি”। এটা শিরোনাম, আর রিপোর্টের বডিতে আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জন কিরবি এর উদ্ধৃতিতে বলা হচ্ছে, তিনি বলেছেন, “ ২০১৫ সালে প্রেসিডেন্ট (ওবামা) ভারত সফরের সময় তিনি নিশ্চিত করেছিলেন যে, আমেরিকার ব্যাখ্যায় ভারত মিসাইল টেকনোলজি কনট্রোল রেজিমের শর্তাবলী পূরণ করে এবং ভারত এনএসজি এর সদস্য হবার জন্য রেডি (India meets missile technology control regime requirements and is ready for NSG membership,)”। বুঝাই যাচ্ছে আমেরিকা সরাসরি একথা বলছে না যে ভারত এনপিটি এর সদস্য না হলেও এনএসজি এর সদস্য বিবেচিত হতে পারে কীনা। এছাড়া আমেরিকার বুঝ ব্যাখ্যার কথা বলা হচ্ছে। তার মানে অন্য কারো ব্যাখ্যা আর এক রকম হতেও পারে। এসবের বিপরীতে চীন বলছে। আমেরিকার সাথে ভারতের চুক্তি সেটা এখানে ইস্যু নয়। সেটার ভিতর চীনের আপত্ দেখার কিছু নাই। তার অবস্থান হল, ভারত এনপিটি এর সদস্য হয়ে নিলেই সব সমাধান। এর কারণ হিসাবে চীন বলছে গত বছর এনএসজি এর সভায়, এনপিটি এর সদস্য হতে হবে আগে – এটাই এনএসজি এর সদস্য হবার পুর্বশর্ত হিসাবে বলা হয়েছে। ফলে এখানে চীনের বাড়তি পরামর্শ হল বিষয়টা নিয়ে এনএসজির যারা সদস্য তাদের সাথে কথা বলে ভারত আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারে। অর্থাৎ এটা পরিস্কার ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বা তাদের কোন চুক্তির বিরোধিতা বা ঠেকায় দেয়া দিবার কোন ইচ্ছা এখানে চীনের নাই।

‘দি হিন্দু’ স্টেট ডিপার্টমেন্টের জন কিরবিকে উদ্ধৃত করে আরও বলছে, “কেউ এনএসজি এর সদস্য হতে পারবে কীনা তা নিয়ে দেয়া বক্তব্য বর্তমান সদস্যদের আভ্যন্তরীণ বিষয়”। অর্থাৎ এনিয়ে ভারতের বলার কিছু নাই।

তাহলে শেষে কোথায় দাড়াল বিষয়টা? শেষ কথা হল, মিডিয়াগুলোকে – ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক জমে উঠতে চীন বাধা দিচ্ছে এমন এক ধারণা – ছড়াতে ব্রিফ করা হয়েছে। আর এই খামোখা চীন বিরোধিতা তাতিয়ে দিয়ে খোদ ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জি এখন চীন সফরে আছেন। আর আলোচনার মূল বিষয় এনএসজি এর সদস্যপদ, একেবারে ‘হর্সেস মাউথ’ ফয়সালা।

কে না জানে, এনপিটি স্বাক্ষরের সোজা অর্থ পরমাণুর অস্ত্রে ব্যবহার তাহলে এরপর আর করা যাবে না। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের পাঁচ ভেটো ক্ষমতার রাষ্ট্র সহ প্রায় সকলে এই কনভেনশনে স্বাক্ষরদান করে ফেলেছে। ফলে কারই আর যে সুবিধা নাই এবং সবাই স্বাক্ষর দিয়ে প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ যে আর পারমানবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। তাহলে কীসের ভিত্তিতে কেন আমেরিকা বা এদের কারো সহয়তাতেই অস্ত্র বানানো ও প্রয়োগের ভারতের একা সুবিধা থাকবে? এবং থাকবে সেটা আমেরিকার হাত দিয়ে, সুপারিশে? ভারত কী আশা করে দুনিয়ায় এনপিটি স্বাক্ষর না-কারি রাষ্ট্র হবে একমাত্র ভারত! যাকে আবার তোলা তোলা করে বিশেষ খাতিরে আমেরিকা পরমাণু টেকনোলজি ও মালামালও দিবে। কারণ আমেরিকার চীনের উত্থানের এতই ঠেকেছে! আর এই সুবিধা আর কারো থাকবে না। তবে একা ভারত ঐ টেকনোলজি ও মালামাল দিয়ে অস্ত্র বানানোর দিকেও চাইলে চলে যেতেও পারবে! কী তামশা! বলা বাহুল্য ভারত স্বপ্নের ঘোরে আছে। আর কেউ স্বপ্নে খেলে পোলাও খাওয়াই উচিত!

 

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের ৩০মে ২০১৬ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও বর্ধিত আকারে ও এডিট করে ছাপা হল।]

বিহারে মোদির বিজেপির পরাজয় কী টার্নিং পয়েন্ট হবে

বিহারে মোদির পরাজয় কী ভারতের রাজনীতিতে টার্নিং পয়েন্ট হবে
গৌতম দাস
১১ নভেম্বর ২০১৫

https://wp.me/p1sCvy-cU

ভারতের বিহারে মোদির বিজেপি শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়েছে। বিহারের প্রাদেশিক নির্বাচন যেটাকে ভারতের কনস্টিটিউশনের ভাষায় বিধানসভা বলা হয়, সেই রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে পাঁচ পর্বে নেয়া এ ভোটের ফল ০৮ নভেম্বর সকাল থেকে প্রকাশিত হওয়া শুরু হয়েছিল। ফলাফলের খুঁটিনাটি বিস্তার আসতে সারা দিন লেগে যায়। সেসব বাদ দিয়ে মোটা দাগে কোন দল কতটা আসন পেয়েছে, এরই মধ্যে সে তথ্য এসে গেছে। মোট আসন সংখ্যা ২৪৩ বলে সরকার গঠনের জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা ১২২। আর ভোটের ফল হলো বিজেপি- বিরোধীদের মহাজোট পেয়েছে ১৭৮ আসন, বিজেপি পেয়েছে ৫৮ এবং অন্যরা ৭ আসন। ফল দেখে এরই মধ্যে পরাজয় স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী মোদি বিরোধী জোটের নেতা নীতিশ কুমারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বিরোধী মহাজোট মূলত তিন দলের জোট, এর মধ্যে আছে দুই আঞ্চলিক দল লালু প্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (এ নির্বাচনে যার প্রাপ্ত আসনসংখ্যা ৮০) এবং চলতি মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড (আসনসংখ্যা ৭১), আর এদের সঙ্গে সোনিয়া গান্ধীর কংগ্রেস দল (আসনসংখ্যা ২৭)। আমাদের লেখার প্রসঙ্গ এই হারের ফলে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে এর সম্ভাব্য প্রতিফলন প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে। ফলে এ লেখার জন্য নির্বাচন বিষয়ক আপাতত এতটুকু তথ্যই যথেষ্ট। এখন থেকে মোদি সরকারের নতুন অভিমুখে কী হওয়ার সম্ভাবনা, তা নিয়ে কথা বলব। কী সে সম্ভাবনা?
মোদি প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন যে নির্বাচন থেকে, ভারতের ভাষায় লোকসভার সে নির্বাচন শেষে ওর ফল হয়েছিল ২০১৪ সালের মে মাসে। ওই নির্বাচনে মোদির দল হিন্দুত্ববাদী বিজেপি হওয়া সত্ত্বেও হিন্দুত্ব নয়, মোদির মুখ্য শ্লোগান ছিল “বিকাশ”, মানে উন্নয়ন। উন্নয়ন কথাটা ভেঙে বললে ওর মানে হল অর্থনীতিতে ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন। মূলত উন্নয়ন খাতে মূলত বিদেশি (তবে সরকারিও) বিপুল বিনিয়োগ ঘটানো হবে – এটাই বলতে চাওয়া হচ্ছে। কিন্তু তাতেই বা কী হবে? সে বর্ধিত অর্থ হল,  বিকশিত অবকাঠামোর সুবিধা নিয়ে, সুবিধা নিতে প্রলুব্ধ হয়ে কারখানা-ইন্ডাস্ট্রি খাতে এবার প্রাইভেট, পাবলিক এবং দেশি-বিদেশি ব্যাপক বাণিজ্যিক বিনিয়োগ ঘটবে। আর এসব কিছুর নিট ফল গরিব মানুষের জন্য বিপুল পরিমাণ কাজ সৃষ্টি, কাজ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এক কথায় ব্যাপারটা হল, দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ ঘাটতিতে ধুঁকে মরা ভারতের অর্থনীতিকে দুনিয়ার মধ্যে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগের লোভনীয় স্থান করে সাজানো। এ পুরো বিষয় বা প্রক্রিয়াটাকে এককথায় প্রতীকীভাবে উন্নয়ন শব্দে বা হিন্দিতে বিকাশ শব্দের ভেতর ধরা হয়েছে।
কিন্তু বিজেপির মতো এক হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিক দলের প্রধানমন্ত্রীর মুখে মুখ্য শ্লোগান “বিকাশ” হওয়ার তাৎপর্য ব্যাপক। কেন? প্রথমত, মোদির “বিকাশ” শ্লোগান নেহাত কথার কথা নয়। বরং ব্যক্তি হিসেবে এ পর্যন্ত দেখা ভারতের রাজনীতিকদের মধ্যে সত্যি সত্যিই তিনি এটা মিন করেন এবং সবচেয়ে অর্থপূর্ণভাবে এ কথা বলছেন।  এবং এরই মধ্যে গুজরাট রাজ্যে তিনবার মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় এমনটা করে দেখিয়েছেন তিনিই। এমন রেকর্ড একমাত্র তাঁরই আছে। এছাড়া এরই মধ্যে মোদির ১৮ মাসের প্রধানমন্ত্রিত্বের কালে এরই মধ্যে অনেক অর্থনৈতিক নীতি-সংস্কার তিনি করেছেন, উদ্যোগের ঝড় তুলেছেন, তা উল্লেখযোগ্য এবং সাহসী। দেশে-বিদেশে সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে। জিডিপির বাড়ার বিচারেও তা যথেষ্ট ভাল, গেল বছর সাড়ে সাত ভাগের পর এখন অবশ্য সাত ভাগ। বিগত কংগ্রেস সরকারের শেষ সময়ে যা সাড়ে ছয়ে বা কখনও পাঁচে নেমে গিয়েছিল।
এখন একটা ইমাজিনড চোখে কিছু বলা যাক। ধরা যাক “বিকাশ” শ্লোগানের মোদির ভারত সরকার ৫ বছর সমাপ্তিতে উল্লেখযোগ্য সফলতা নিয়ে হাজির হল এবং তা এমনভাবে যে, বাস্তবে এটা যে কাজ করেছে, ফল দেখানো শুরু করছে তা সাধারণ মানুষের নজরে এবং দেশি-বিদেশি এক্সপার্টের চোখেও স্বীকৃতি পেতে শুরু করল। সেক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে বলা যায়, মোদির সামগ্রিক রাজনীতির ভিত্তি এর পর আর বিজেপি-হিন্দুত্ব না থেকে এর বদলে ‘বিকাশ’ হয়ে যেতে বাধ্য। মূল কারণ হিন্দুত্বের জিগিরের চেয়ে “বিকাশ” বেশি জনপ্রিয় হয়ে গেলে দল “বিকাশ” মুখ্য শ্লোগান করে রাজনীতি করবে।  পরের নির্বাচনে মোদি আরও জোর দিয়ে বিকাশের কথা বলে ভোট চাইবেন। আর দলের হিন্দুত্ত্বের বয়ান ঠিক ততটাই অগুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিজেপি মুসলমান বা ‘অ-হিন্দু’ বিদ্বেষী রাজনীতিকে অন্তত সেকেন্ডারি করে পেছনে ফেলে বিকাশের সাফল্যকে প্রধান ও একমাত্রভাবে হাজির করতে বাধ্য হবে। এমনিতেই ক্যাপিটালিজমের এক কমন স্বভাব হল, ক্যাপিটালিজম যেন এক বিরাট মেল্টিং পট, সবকিছু গালিয়ে ঘুটা দেয়ার পাত্র। এই পাত্র যে পড়ে এর আগের তার কোন বৈশিষ্ঠ আর অবশিষ্ট থাকে না, লোপ পায়। নানা ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পদার্থকে এক পাত্রে নিয়ে একটা ঘুটা দেয়ায় এরা এরপর সবাই পুরনো আলাদা বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলা এক নতুন বস্তুর ঘুটা। তবে এর পর হয়তো নতুন বৈশিষ্ট্যের কোন দ্বন্দ্ব তাতে হাজির হতে পারে। কিন্তু পুরনো ধরনের ভিন্নতা ভেদ-বিভক্তি আর কারও মধ্যে থাকে না। ফলে সফল “বিকাশ” রাজনীতির সাফল্যের মানে সার কথায় বললে ‘অ-হিন্দু’বিদ্বেষী, হিন্দুত্বের রাজনীতি করার বাস্তব পরিস্থিতি বাস্তবতা নিজে নিজেই লোপাট হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। এটা বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি স্বেচ্ছায় ত্যাগ করা নয়; বরং বিকাশের রাজনীতিতে সাফল্যের সামনে পড়ে অনিচ্ছায় হিন্দুত্বের রাজনীতির বাস্তবতা শুকিয়ে যাওয়া; ফোকাস হারিয়ে নিদেনপক্ষে সেকেন্ডারি দুর্বল হয়ে যাওয়া; কথার কথা হয়ে থাকা এক দশা।
এটাই হলো বিকাশের সাফল্যে পড়ে বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি টিকে থাকার সম্ভাবনা্কে নিজেই নাকচ করা এবং রূপান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনা।
ইমাজিনেশন ছেড়ে এবার বাস্তব মূল্যায়ন আসা যাক। মুল্যায়ন করলে দেখা যায় বিকাশের রাজনীতির দিক থেকে মোদির সরকারের প্রথম বছর খুবই সফল। এমনকি প্রথম পাঁচ মাসের মধ্যে দুনিয়ার মুখ্য ইকোনমিক প্লেয়ার হিসেবে চীন, জাপান ও আমেরিকার সঙ্গে বিনিয়োগ বিষয়ক চুক্তি এবং সেই সঙ্গে রাজনৈতিক বিষয়ে ডিল সম্পন্ন করা দ্রুততম সময়ের দিক থেকে উদাহরণ। এজন্য হোমওয়ার্ক, নীতি পরিকল্পনা, হার্ড ওয়ার্ক ও কমিটমেন্ট এসবই ‘বিকাশ’ এর ব্যাপারে মোদি সিরিয়াসনেসের প্রকাশ ঘটিয়ে দেখানোর প্রমাণ। যদিও বছর শেষের আগেই মতাদর্শিক গুরু সংগঠন আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ধরনের প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা “ঘর ওয়াপসি” বা চার্চে হামলা ইত্যাদির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থান ও অ্যাকশন মোদিকে দেখাতেই হয়। মোদি পেরেছিলেন। মনে হয়েছিল, মোদি ‘বিকাশ’ রাজনীতি থেকে ফোকাস সরিয়ে নষ্ট হতে পারে অথবা অন্য কিছুর ছায়া এর ওপর পড়তে পারে, এমন কিছু থেকে একে রক্ষা করার ব্যাপারে তখনও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতাদের প্রকাশ্যে সমালোচনাও করেছিলেন। আর যে কোনো নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষা করতে তার সরকার নীতিগতভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ – প্রকাশ্যে তা জানিয়েছিলেন।
কিন্তু তার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম বছর পার হতে না হতেই তার আগের দৃঢ়তায় ঢিলা পড়তে দেখা যায়। এবছরের এপ্রিলে শুরুতে তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে হয়েছিল। ঘটনার শুরু গোমাংস ইস্যুতে।  মহারাষ্ট্র
রাজ্যের বিজেপির সরকার গরু জবাই করার বিরুদ্ধে আইন তৈরি করে প্রয়োগ শুরু করেছিল। এতদিন প্রধানমন্ত্রী মোদি সবসময় কোনো রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত থেকে অথবা নিজ বিজেপি বা আরএসএসের কার্যকলাপ থেকে তার কেন্দ্রীয় সরকার ভিন্ন – এ কথা প্রচার করেছেন ও মেনে চলেছেন। আইনত এ কথা সত্যিও বটে। ফলে ওদের সিদ্ধান্ত বা ততপরতার কোনো দায়দায়িত্বও নেননি, পৃষ্ঠপোষকতাও দেননি। “ঘর ওয়াপসি” বা চার্চে হামলার বিরুদ্ধে যে কোন নাগরিক ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষার তাঁর সরকারের নীতি ঘোষণা এর প্রমাণ।  মোদির কাছে – দল ও সরকার ভিন্ন – এভাবে মেনে চলা নীতি অনুসারে গরু জবাই তাঁর সরকারের সিদ্ধান্ত নয়। ফলে এর কোনো দায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর বা তাঁর সরকারের বা মন্ত্রীর নয়; সংশ্লিষ্টতা থাকার কথাও নয়। কিন্তু আমরা দেখলাম, তাঁর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশের সীমান্তে এসে বিএসএফের সঙ্গে মিটিংয়ে গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিয়ে গেলেন। বললেন, বাংলাদেশে যাতে গরু পাচার হয়ে না যায়, বাংলাদেশ যেন দামবৃদ্ধির ঠেলায় গরুর মাংস খাওয়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এভাবে নাকি হিন্দু ভারতের গরুপ্রীতি রক্ষা করতে হবে। বক্তৃতায় এত দূর গেলেন। অথচ গরু জবাইয়ের বিরুদ্ধে তার কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো আইনই নেই। অর্থাৎ ভারতের সব রাজ্যে গরু জবাই নিষিদ্ধ নয়। মহারাষ্ট্র রাজ্যের সিদ্ধান্ত ও আইন অন্য রাজ্যে বা কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর প্রযোজ্যও নয়। অথচ এ অসামঞ্জস্য ততপরতা প্রকাশ্যে ঘটতে শুরু করল।
কেন এটা হলো? নাগরিকের নিজ নিজ ধর্ম বাধাহীন পালন করার সুযোগকে মোদির যেচে এটা অ-হিন্দু নাগরিকেরও অধিকার বলে স্বীকার করে নেয়া এবং ওই অধিকার রক্ষা নিজ সরকারের নীতি বলে ঘোষণা দেয়ার কথা যেটা আগে বলেছিলাম। মোদির এমন সিদ্ধান্ত পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে বিস্ময়কর ও সাহসী ছিল বটে, আমরাও আগে মোদির এমন কঠোর ঘোষণাকে আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ওপর মোদির নিয়ন্ত্রণ বা লাগাম টেনে দেয়া বলে বুঝলেও এখন বুঝা যাচ্ছে সেটা ছিল বাইরের একটা প্রকাশ্য দিক। অন্তরের দিক ঠিক এমন নয়। অন্তরের দিকে খুব সম্ভব মোদির “নাগরিকের ধর্ম পালন রক্ষার দায়িত্ব নেয়া” ঘোষণার পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় মোদি সরকার আরএসএস ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়ে পড়েন। যার ফলাফল তিনি হেরে যাওয়ায় তাকে আঁতাত সমঝোতায় যেতে হয়। এরই বাইরের পয়লা প্রকাশ্য দিক হলো গরু ইস্যুকে কোন ঘোষণা ছাড়াই উহ্য রেখে নিজের বলে মোদি সরকারের হাতে তুলে নিয়েছিল। মনে রাখতে হবে, নরেন্দ্র মোদি ছোট বেলা থেকেই আরএসএসের ভেতরেই বড় হয়েছেন এমন কোর সদস্য। ফলে মোদি ও আরএসএস পরস্পর পরস্পর থেকে দূরের কেউ নয়। তাই একসঙ্গে বসে পরস্পরের কনসার্নগুলো পরস্পরের কাছে তুলে ধরে
কমন এক  সিদ্ধান্তে আসার তাগিদবোধ ও সম্ভাবনা দূরের কোনো বিষয় হয়নি। যদিও ২০১৩ সালে মোদির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদন করাতে মোদি সফল হয়েছিলেন আরএসএস বা বিশ্ব হিন্দু পরিষদকে নিজের পক্ষে সমর্থনে নিয়ে। আর বিপরীতে  বিজেপির এলকে আদভানি, মুরলি মনোহর যোশী, অরুণ সুরী, যশবন্ত সিংসহ ৭০ বছরের বেশি বয়সের বয়স্ক যত নেতা আছে, তাদের কোণঠাসা করে। এদের তিনি (দল নয়) সরকারে অংশগ্রহণে বদলে অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়াতে সক্ষম হন। সে সময় এভাবেই  বুড়াদের প্রভাব খর্ব করে মোদি দল বিজেপিকে নিজের একক কর্তৃত্বাধীনে আনেন। একমাত্র কেবল বাজপেয়িকে নিজের পক্ষে মুরব্বি পরামর্শক রেখেছিলেন মোদি। এই হল “কেন এটা হল” এসম্পর্কে পুরানা কিছু ব্যাকগ্রাউন্ড ফ্যাক্টস। তবে আরও কিছু আছে।
সম্প্রতি দিল্লীতে ৪- ৬ সেপ্টেম্বর প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে আরএসএস ও মোদি সরকারের মধ্যে এক বিশেষ সাক্ষাত-বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে। সবাইকে পাবলিকলি জানিয়ে তবে একান্তে এই বৈঠক হয়েছে। এনডিটিভি, দ্য হিন্দু ইত্যাদি মিডিয়ার গোপন সোর্সের খবর অনুসারে এটা নাকি ছিল মোদি সরকারের প্রথম বছরের পারফরম্যান্সের মূল্যায়ন বৈঠক। সরকারের শীর্ষ নীতি বিষয়ে মুরব্বি আরএসএসের পরামর্শ নিয়ে তা সমন্বয় করা হয় সেখানে। মাস তিনেক আগে  গুজরাটের এক অখ্যাত হৃদ্দিক প্যাটেল তার নিজের প্যাটেল বা পতিদার সম্প্রদায়কে অবহেলা এবং এর পক্ষে সরকারি সুযোগ-সুবিধার কোটা দিবার দাবিতে গুজরাটের বিভিন্ন শহরে ব্যাপক দাঙ্গা-হাঙ্গামা সৃষ্টি করে সারা ভারতের দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছিলেন। এখন মিডিয়ায় কানাঘুষা চলছে, এর পেছনে ছিলেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের সভাপতি পারভীন তোগোদিয়া এবং বিজেপির সভাপতির দূর থেকে সমর্থনের কথাও সেখানে উঠেছে। সবশেষে বর্তমানে হৃদ্দিক প্যাটেল জেলখানায় ডিটেইন্ড। তাই এমন মনে করার কারণ আছে যে, এটা কি তবে আরএসএস এফিলিয়েটেড সংগঠনের সঙ্গে (হয়ত ঠিক আরএসএসের প্রধান নেতারা নয়) মোদি ক্ষমতা প্রদর্শনের লড়াই ছিল, যে কারণেই কি প্রকাশ্যে দিল্লিতেই আরএসএস ও মোদি সরকার মধ্যে সমন্বয় বৈঠক! এখানে মনে রাখতে হবে, ওখানে মোদি ও তার মন্ত্রীরা বৈঠক করেছেন বিজেপির নেতা হিসেবে নয়, খোদ সরকারের প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রী হিসেবে। তবে এতে সরকারী নীতির গোপনীয়তা যারা রাষ্ট্রের শপথ নেননি, এমন লোকজনের সঙ্গে শেয়ার করার অসাংবিধানিক কাজ করেছে বলে কংগ্রেস অভিযোগ তুলেছিল।
এতসব কথার সারকথা, মোদি সরকার গঠনের পর থেকে জানিয়ে ও মেনে আসছিলেন যে, সরকার ও বিজেপি দুটি আলাদা সত্তা তিনি মেনে চলবেন। এরই সর্বশেষ প্রকাশ হলো, মোদির যে কোনো নাগরিকের ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষা তার সরকারের কর্তব্য বলে ঘোষণা করা। কিন্তু এর পর থেকে শুরু হয় আভ্যন্তরীণ সংগ্রাম এবং মোদির হার শুরু হয়। ফলে পরিণতি একেবারে উল্টো। এখন আরএসএসের নির্দেশ-পরামর্শ শুনতে অধীনস্থ হয়েছে এবং জবাবদিহিতা নেয়ার উচ্চ কর্তা হিসাবেও আরএসএস হাজির হয়েছে। এটাই কার্যত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

এজন্য গরু জবাই, মাংস খাওয়া ইস্যুটা মোদি সরকারই আরও সবলভাবে সর্বত্র হাজির করেছে। বিজেপি দল আর সরকার বলে কোনো ফারাক সেখানে আর নেই। বিহারের নির্বাচনেও দ্বিধা ঝেড়ে এবং বিচ্ছিন্নভাবে নয়, দলের দায়দায়িত্বে গরুপ্রীতি, গরু জবাই, মাংস খাওয়া ইত্যাদি সরাসরি দলের প্রচার-প্রোপাগান্ডায় ইস্যু করা হয়েছিল। এমনকি বিহারে গরুপ্রীতি ও ভক্তি দেখিয়েএক পোস্টার ছাপানো হয়েছে যেখানে দেখা যাচ্ছে,  গরুকে জড়িয়ে ধরে এক মেয়ে আদর করছে। ার ঐ পোস্টারে  বিরোধীরা (যারা বিহার নির্বাচনে সদ্য জিতে গেল) এরা কেন গরু বিষয়ে বিজেপির মতো অবস্থান নিচ্ছে না, জনগণকে এর জন্য জবাবদিহিতা চাইতে বলা হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে যারাই বিজেপির বিরুদ্ধে ‘অসহিষ্ণুতার’ অভিযোগ তুলছেন, অভিনেতা শাহরুখ খানসহ সবার বিরুদ্ধেই দল ও সরকারের মন্ত্রীরা তাকে পাকিস্তানের এজেন্ট বলে পাল্টা অভিযোগ ও আক্রমণ করেছেন। একই সূত্রে নেপালের কনস্টিটিউশন ইস্যুতে নেপালকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দেয়ার দাবি বিহার বিজেপি থেকে করা হয়েছিল। নেপাল-ভারত সীমান্ত বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত; ফলে কিছু অংশ সীমান্ত এখানেও শেয়ার হয়েছে।


যে কথা নিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, বিকাশের রাজনীতি বনাম বিজেপির হিন্দুত্বঃ যেখানে প্রথম বছর আশাবাদ রেখেছিলাম, ‘বিকাশের’ রাজনীতি মুখ্য ফোকাসে থেকে সাফল্য দেখাতে পারলে হিন্দুত্ব ভুলে বা হিন্দুত্বকে পেছনে ফেলে বা চাপা দিয়ে ভারতের হিন্দুত্ব রাজনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় আড়ালে চলে যেতে পারে। কিন্তু ঘটনা আকস্মিক সেদিকে না গিয়ে এর বদলে এক ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়িয়ে মোদিই কার্যত হেরে গেছেন দেখা যাচ্ছে। ফলে মোদি সরকারের ১৮ মাসেই দেখা যাচ্ছে, কী ভয়াবহভাবে মোদি ক্রমেই হিন্দুত্বের রাজনীতির তলে হারিয়ে যাচ্ছেন।
৮ নভেম্বর নির্বাচনের ফল প্রকাশের দিন শেষে ভারতের মিডিয়ায় প্রধান আলাপ উঠেছে এখন বিহারে বিজেপির হারের পর মোদি নিশ্চয়ই তার নীতিতে ‘কারেকশন’ আনবেন, ‘সহিষ্ণুতায়’ ফিরিয়ে আনবেন ইত্যাদি। উপরের আলোচনা থেকে এটা মনে করাই স্বাভাবিক যে, এমন আশাবাদ ভিত্তিহীন। মোদি, বিজেপি অথবা আরএসএস এখন কি পিছু হটে আসার কথা ভাববেন? মনে হয় না। অন্তত আজকের টিভি টকশো দেখে মনে হয়নি। বরং মোদি সরকারের বাকি সাড়ে ৩ বছর কীভাবে কাটবে, সে শঙ্কাই প্রবল হবে। স্বভাবতই এর আঁচ পড়শিদেরও ভোগাবে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি ও প্রতিক্রিয়াঃ
উপরে বয়স্ক নেতা যাদের কথা বলছিলাম এদের চারজন এলকে আদভানি, মুরলি মনোহর যোশী, যশবন্ত সিং এবং শান্তা কুমার প্রকাশ্যে সরকারকে চিঠি দিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন। মিডিয়ায় সে চিঠি প্রকাশিত হয়েছে। ওর সারকথা হল, এর আগে দিল্লীতে হেরে যাবার পরও কোন শিক্ষা নেয়া হয় নায়। আর কাদের জন্য এই ব্যর্থতা তা চিহ্নিত ও দায়ী না করে আগের মতই এবারও চেপে যাওয়া হয়েছে। চিঠির পুর্ণ টেক্সট এখানে আগ্রহিরা দেখতে পারেন।

শেষ কথাঃ বিকাশের রাজনীতি বনাম বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি এই লড়াইয়ে শুরু থেকেই বিকাশ বিষয়টা মোদির এক ব্যক্তিগত সাফল্যের শখ বা অবসেশন এর বিষয় যেন এমনই থেকে গেছিল। অপরদিকে হিন্দুত্বের রাজনীতি – এটা জনগোষ্টির উগ্র হিন্দুত্ব-জাতীয়তাবাদের আবেগ তুলে সেই আবেগের উপর ভর করে ক্ষমতা তৈরি এবং এটা ক্ষমতায় যাওয়ার বেশ কাজের বিরাট হাতিয়ার – এই বোধও প্রবল। যেমন মোদি প্রথমবার গুজরাটে মুখ্যমন্ত্রী হবার পরে ২০০২ সালে দাঙ্গাটা করেছিলেন। এতে পরপর আরও দুবার মোট তিনবার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু এরপরে আর দাঙ্গার পথে যান নাই। আবার লোকসভা ২০১৪ নির্বাচনে যেখান থেকে মোদি প্রধানমন্ত্রী হলেন, ঐ নির্বাচনে কেবল উত্তর প্রদেশ রাজ্যে একই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ঘটিয়েছিলেন কিন্তু ফলাফল (মোট আশির মধ্যে বাহাত্তর আসন) নিজের পক্ষে আনতে পেরেছিলেন। ঐ ঘটনায় বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ এক মামলায় প্রধান আসামি, তবে মামলা পেন্ডিং। আবার মোদী সরকার গঠনের পর ১৮ মাসে আরও দাঙ্গার ব্যাপারে চুপচাপ। তবে দলের ভিতর দুই লাইনের লড়াই আছে। এতে ইচ্ছা বা উভয় পক্ষ যেখানে একমত হয় যে দুটাই – বিকাশ ও হিন্দুত্ব – করতে হবে। সম্ভবত “বিকাশ” পক্ষে দ্রুত কাজ ততপরতার করলেও ফল দেখাতে বা সাধারণ মানুষ পর্যন্ত তাদের চোখে ও মাঠে হাজির হতে সময় লাগতে পারে। তাই হিন্দুত্বের লাইন ততপরতা এই অপশনটা সমান্তরালে রেখে দিচ্ছে। কিন্তু এমন যুক্তি বা ভাবনা ভিত্তিহীন। কারণ ২০১৪ নির্বাচনে মোদির “বিকাশ” শ্লোগানের অর্থ বুঝতে তো গরীব মানুষের কোন অসুবিধা হয় নাই। তাঁরা হয়ত ফিগার ডাটা অথবা তত্ত্ব দিয়ে বুঝে না কিন্তু বুঝে নিজের কায়দায়। নইলে গত ৩০ বছরের নির্বাচনে যেখানে কেন্দ্রে কোন একক সংখ্যাগরিষ্টের সরকার আসে নাই। কংগ্রেস বা বিজেপির মত কোন সর্বভারতীয় দল একক সংখ্যাগরিস্টতা (অর্ধেক আসনের চেয়ে এক বেশি) পায় নাই।  সেই ট্রেন্ড থমকে দাড় করিয়ে মোদির জোটকে না কেবল একা বিজেপিকে জনগণ একক সংখ্যাগরিষ্টের দল হিসাবে ক্ষমতায় আনল। এবং খুব সম্ভবত জনগণকে মোদি ব্যর্থ করে দিলে জনগণ আবার বিগত দিনের ট্রেন্ডে ফিরে যাবে। আর কোন দিন ফিরে আসবে না। যে জনগণ শুধু শ্লোগান শুনেই অর্থ বুঝতে পারে তারা সরকারের সুদ্ধান্ত, ততপরতার অগ্রগিতি বুঝবে না এটা গ্রহণযোগ্য নয়।

আবার আসলে, বিকাশ বনাম হিন্দুত্ব এর মধ্যে সম্পর্কটাই এমন বিরোধী যে দুটা একসাথে থাকতে চলতে পারে না। কারণ বিকাশ কার্যকর হতে গেলে সেখানে হিন্দুত্ত্বের দাঙ্গা অনিরাপত্তা অথবা ভারতের চলতি হালের ভাষায়, “অসহিষ্ণুতা” থাকতে পারবে না। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহনের মোদিকে  পরামর্শের ভাষায়  “অসহিষ্ণুতা” চললে যেসব বিদেশী পুঁজি, সম্পর্ক, আস্থা তৈরি তিনি করেছেন এগুলো সব ফিরে চলে যাবে। ওবামাও কমবেশি তাকে একই কথা বলেছিলেন। ঘর ওয়াপসি বা চার্চে হামলা দেখে প্রকাশ্যে তবে পরামর্শের ভাষায় সাবধান করেছিলেন বলেই মোদি সময় একেবারে শেষ হবার আগেই নিজের নীতি ঘোষণা করেছিলেন, “নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার করা তাঁর সরকারের প্রতিশ্রুতি” – তা বলতে পেরেছিলেন।  লক্ষণীয় যে আধুনিকতার চিন্তা ফ্রেমে এটা ইউরোপের কোন রাষ্ট্রের ভাষা নয়; আমেরিকার কনষ্টিটিউশনের ভাষা। বলা বাহুল্য উগ্রজাতিয়তাবাদী  হিন্দুত্বের বিজেপির রাজনীতির সাথে “নাগরিকের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি” সামজ্ঞস্যপুর্ণ নয়। তবু মোদি এটাকেই তাঁর সরকারের নীতি বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন।  কিন্তু এতে উত্থিত সংঘাত সামলাতে পারেন নাই। যেখান থেকে পরবর্তি নতুন আরও বিরোধ সংঘাতের মুখোমুখি তিনি।

এনডিটিভি এই মিডিয়া প্রশ্ন তুলেছিল বিহারের নির্বাচনে গরু আদর করা মেয়ের ছবির পোস্টার করার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে বলছিলেন, মোদি যদি বিকাশের” কথাই বলবেন রাজনীতি করবেন তাহলে এই পোস্টারের সাথে বিকাশের যোগসুত্র কী?

আসলেই মোদি এদুটোর মধ্যে সম্পর্ক কী তা কখনই দেখাতে পারবেন না। দলের আভ্যন্তরীণ গঠন প্রকৃতির জন্য আগামিতেও নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারবেন – এমন আশা করার সুযোগও খুবই কম। বিশেষ করে গরুর মাংস আর বিহারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপির বয়ানের যে মান হাজির হয়েছে। 

ওদিকে মোদির “বিকাশ” রাজনীতি ব্যর্থ হবার অর্থ হল, ভারতের ভবিষ্যত, ভারতের রাজনীতি অতলে হারিয়ে যাবার এক প্রবল সম্ভাবনা। বাংলাদেশের দিক থেকে দেখলে – “বিকাশের”, মানে এক বিকশিত ভারত আমাদের জন্য কাম্য। না, এটা ভাবভালবাসার উইশ বা ফর্মালিটির কথা নয়। কারণ এর অর্থ হিন্দুত্বের রাজনীতির দিন শেষ হবে। এটা এই অঞ্চলের জন্যও কাম্য।

[এই লেখাটা গতকাল দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় সংক্ষিপ্ত রূপে ছাপা হয়েছিল। এখানে পুরা ভার্সান ছাপা হল। ]

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক