ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ আইন আদালতে স্থগিত, তবে ফিরে আসবে

ভারতে গরু জবাই নিষিদ্ধ আইন আদালতে স্থগিত, তবে ফিরে আসবে

গৌতম দাস

২৬ জুলাই ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2gz

 

কখন কোন জিনিষ যে কার প্রতীক হয়ে উঠে বলা মুশকিল। যেমন, ভারতের গরু প্রীতি ও পূজা। এটাই এখন ভারতের হিন্দুত্ব-ভিত্তিক রাষ্ট্র ও মোদির বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতি দুটোরই মুখ্য প্রকাশ ও প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রায় দুই মাস আগে গত ২৫ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি, ভারতের গ্রাম বা শহরের কোন হাট-বাজারে  জবাইর উদ্দেশ্যে নিয়ে গরু কেনাবেচা করা যাবে না; এটা নিষিদ্ধ বলে এক আইন জারি করেছিলেন। গরু কেনাবেচার আগে ক্রেতা ও বিক্রেতাকে এক কমিটি বিস্তর ফর্ম পুরণ করে নেয়, তাতে প্রায় শপথ করিয়ে নেওয়ার মত যে ঐ গরু জবাই করার জন্য কেনাবেচা হচ্ছে না; কৃষিকাজ বা অন্যকিছুর জন্য কেনাবেচা হচ্ছে। সেই আইনে (ঐ আইনের এক পিডিএফ কপি আগ্রহিরা এখানে দেখতে পারেন) গরু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সমাজের এর প্রবল প্রভাব পড়েছিল মুখ্যত  দুই জায়গায়। চামড়া ও মাংস সংশ্লিষ্ট দীর্ঘ দিনের সব ধরনের ব্যবসা বাণিজ্যে (রপ্তানি বাণিজ্যসহ) এবং এসব সংশ্লিষ্ট কসাইসহ নানান পেশাজীবিদের জীবনে। আর অপর সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া হয়েছিল যে, এক পাবলিক লিঞ্চিং উন্মাদনা দেখেছিল সারা ভারত। পাবলিক লিঞ্চিং যাকে আমরা গণপিটুনি, হাটুরে মার ইত্যাদি বলি। যার সার কথা হল মানুষ খেপিয়ে কাউকে কাউকে বিচার বহিবহির্ভুতভাবে পিটিয়ে হত্যা করা।

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অথবা আরএসএসের সমর্থক হিন্দুত্ববাদী নানান ব্রান্ডের সংগঠনের সদস্যদেরকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়া হয় এই আইন বাস্তবায়ন হচ্ছে কী না এর তদারকি বা ভিজিলেন্সের নামে। স্বভাবতই গরু অথবা মাংস নিয়ে চলাচলকারি কেউ এদের হাতে পড়লে সে পাবলিক লিঞ্চিং তাণ্ডবের শিকার হবেই। ভিজিলেন্স শব্দটা ইংরাজি পত্রিকা আর মোদির বক্তৃতার ভাষ্য থেকে এসেছে।  মোদির ঘোষিত জবাই নিষিদ্ধ আইন বাস্তবায়িত কারি দলীয় ক্যাডারদের ভাষায় এই ভিজিলেন্স টিমের সদস্যদের আদর করে এরা ‘গোরক্ষক’ ডাকত। এই নামে তারা শুরুতে হাজির হয়েছিল। এক কথায় বললে, এরা ছিল এক ফ্যাসিজমের তাণ্ডব বাহিনী। ‘আইনকানুন হীনতা’র এক চরম প্রকাশ। এতে যে কেউ যখন তখন একদল লোকের হাতে পরিকল্পিতভাবে আক্রান্ত, নিগৃহীত বা নিহত হয়ে যেতে পারেন; বিশেষ করে তিনি যদি মুসলমান নাগরিক হন অথবা কোনো মুসলমান ধর্মীয় চিহ্ন শরীরে প্রকাশিত থাকে। ভারতের নিউজ টিভিমিডিয়া এনডিটিভির হিসাবে গত ২২ মাসে ১৭ ব্যক্তি হত্যা অথবা আক্রান্ত হয়েছে এই গোরক্ষক বা ভিজিলেন্স টিমের হাতে। প্যাসেঞ্জার ট্রেনের ভিতর বসে থেকেও রক্ষা পাওয়া যায় নাই, নিহত হয়েছেন।

গত দুই মাস ধরে এই পরিস্থিতি চলে আসার পর এখন সাময়িক হলেও এক ইতিবাচক খবর হল, মোদির ওই আইন গত ১১ জুলাই ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ‘স্থগিত’ ঘোষণা করেছে। এর সাথে সরকারি সলিসিটর জেনারেল আদালতকে জানিয়েছেন, সরকার আদালতে উঠা আপত্তিগুলোকে আমলে নিয়ে সংশোধিতরূপে আইনটা আবার চালু করবে।

এখানে আদালতের আদেশটা পরিস্কার করে বলা ভাল। এটা ছিল সুপ্রীম কোর্টের আদেশ। আর এর আগে গরুজবাই নিষিদ্ধ আইন প্রথমে মাদ্রাজ হাইকোর্টের রায়ে স্থগিতাদেশ পেয়েছিল। সে আদেশ এরপর সুপ্রীম কোর্টে আপিলের জন্য এসে এবার সর্বভারতীয় স্তরে প্রযোজ্য বলে মোদির আইন স্থগিতাদেশ পেল। তবে এবার আদালতে উঠা আপত্তিগুলো আমলে নিয়ে পুরান আইনটাকেই ঝেড়েপিছে মোদি যে  আবার নতুন করে আনবেন এটা পরিস্কার।

শুরুতে বলেছিলাম, মোদির জবাই নিষিদ্ধ আইনটা ২৫ মে ২০১৭ চালু হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটা ১৯৬০ সালের একটা আইনকেই (Prevention of Cruelty to Animals Act, 1960) নতুন করে মোদির হাতে ঝেড়ে মুছে হাজির করা আইন; ঠিক নতুন আইন নয়। অর্থাৎ বলার অপেক্ষা রাখে না, এই আইনটা ১৯৬০ সালে কংগ্রেসের শাসন আমলে করা হয়েছিল এবং খুবই চতুরভাবে, পশুদের কষ্ট নিবারণের উদ্যোগ হিসেবে। ‘পশুদের অনেক কষ্ট, তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা করা হচ্ছে, মানুষ (মুসলমান) নিষ্ঠুর’ …… এসব বয়ানের আড়ালে এই আইন সেকালে প্রণয়ন করা হয়েছিল। এখন কংগ্রেসের কাঁধে চড়ে মোদি সেটাতেই একালে নতুন শব্দ বাক্য সংযোজন করে নিয়ে বলছেন – জবাই করার উদ্দেশ্যে গরু কোনো হাটে কিনতে পাওয়া যাবে না; জবাইয়ের এর কাজে গরু কিনবে এমন কোন হাটবাজারই আর কার্যকর নাই অথবা নিষিদ্ধ।

এখন কথা হল, এই বছরে মোদি এই আইন করতে উৎসাহী হলেন কেন? অথবা আদালতে সদ্য স্থগিত হওয়া আইন আবার নতুন করে আপত্তিগুলো সামলিয়ে চালু করার তাড়া বা তাগিদ বিজেপির কেন?
এককথায় বললে, এর পেছনের মূল বিষয়, সবচেয়ে বড় রাজ্য উত্তরপ্রদেশের রাজ্য বা প্রাদেশিক নির্বাচন। সদ্য অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া ঐ নির্বাচনে, গত মার্চ মাসে বিজেপি বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেছিল। ওই নির্বাচনের পর থেকেই বিজেপির নীতিনির্ধারকেরা বলা শুরু করেছিলেন ‘আমরা এতদিন যে নির্বাচনী ফর্মুলা খুঁজে ফিরছিলাম সেটা এবার পেয়ে গেছি’। যেমন গত ১৯ মার্চ আনন্দবাজার লিখেছিল, “বিজেপি সূত্রের মতে, এ বার উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা ভোটে প্রমাণ হয়ে গিয়েছে, মেরুকরণের তাস খেলেই জাত-পাতের অঙ্ককে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া গিয়েছে। হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে একজোট করা গিয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে সেটিকেই আরও কাজে লাগাতে চাইছে দল”।  কিভাবে সেটা? বাইরে থেকে দেখতে শুনতে ভারতে হিন্সদু জনগোষ্ঠির সবাইকে একাট্টা হিন্দু মনে হলেও আসলে ভেতরে জাত-পাতের বিভক্তি, ছোঁয়াছুঁয়ি, ক্ষমতা কাঠামোতে অবস্থান ইত্যাদির বিভক্তিতে একাট্টা হিন্দু-স্বার্থ বলে ভোটের বাজারে সব না হলেও মেজরিটি ভোট এক জায়গায় করা বিজেপির জন্য সবসময় খুবই কঠিন কাজ মনে করা হয়ে এসেছে। এবং আসলেই তা কঠিন। বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের মতো এত বড় অঞ্চল (ভারতের কেন্দ্রীয় সংসদ ৫৪১ টা এর মধ্যে একাই উত্তরপ্রদেশ ৮০ টি আসনের) যা নানা জাত-উপজাত, এর ওপর আবার রয়েছে মুসলমান কনস্টিটুয়েন্সিতে (কোন কোন কনষ্টিটুয়েন্সিতে ৩০% পর্যন্ত মুসলমান ভোটার) এর বিভক্ত হয়ে থাকা।  উত্তর প্রদেশে এছাড়া আবার অব্রাক্ষ্মণ যাদব, মুসলমান, দলিত এবং  ব্রাহ্মণ ইত্যাদি সব বড় বড় ভাগের জনগোষ্ঠীর নিজস্ব রাজনৈতিক দল আছে। এর মধ্যে মুসলমান বাদে অভিন্ন সব জাতের দল হিসেবে বিজেপিকে কেবল সব হিন্দুদের দল হিসেবে হাজির করার ফর্মুলাটাই বিজেপি খুঁজছিল। তাই বিজেপি এবার দাবি করছে যে তারা সেটা এবার পেয়ে গেছে। ফলে এরই প্রকাশ দেখেছি আমরা। তা হল, যেমন দাঙ্গাবাজ যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কিন্হতু এর চেয়েও তাতপর্লেযের ঘটনা হল সাথে উপ-মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিয়েছিলেন দু’জন। দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী কেশব প্রসাদ মৌর্য এবং দীনেশ শর্মা। এদের একজন ব্রাহ্মণ আর একজন দলিত। অর্থাৎ সব হিন্দু্দের মধ্যেই কিছু না কিছু সুবিধা বা  ক্ষমতা বিতরণ, এটাকেই বিজেপি সম্ভবত ‘সেই ফর্মুলা পেয়ে যাওয়া’ মনে করেছিল। এটাকে বলা যায়, সব জাতের সব হিন্দু ভোটকে একই বিজেপি প্রার্থীর পক্ষে জড়ো করা, তারা এভাবেই উত্তর প্রদেশে জিতেছে- এটাই হল বিজেপির দাবি।

কিন্ততু বিজেপির এই দাবি সত্ত্বেও আমরা আগের মতোই বর্ণহিন্দুদের অত্যাচারে দলিতদের ধর্মান্তরিত হয়ে বৌদ্ধ হয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে আমরা দেখিনি।  বরং ওই নির্বাচনের পরেও তা বন্ধ হয়নি। দলিতদের পালটা সংগঠন ভীমসেনার ততপরতা নিয়ে রিপোর্টটা দেখুন।   তবু বিজেপির উপলব্ধি হল, এটা তাদের জন্য গরু রক্ষার রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সব উথাল পাথাল করে ফেলার সময়। এতে সহজেই মুসলমানকে শত্রু হিসেবে তুলে ধরে ভোটবাক্স ভরাট করার রাজনীতি খোলাখুলি করতে হবে। এই বিচার থেকেই এখন গরু জবাই নিষেধ বা হাটে গরু কেনাবেচা নিষিদ্ধের আইন; মোদিকে এমন আইন চালু করতে হয়েছিল। বিশেষ করে এখন ছয়টা রাজ্যসরকার বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান, হরিয়ানা, মহারাষ্ট্র, ঝাড়খণ্ড। এসব এলাকায় আইনের তৎপরতা সবচেয়ে বেশি। ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এই ছয় রাজ্যকে চিহ্নিত করেছে যাতে এখানে বাড়তি কিছু পদক্ষেপ আদালত নিতে বাধ্য করতে পারে ভিজিলেন্সের বিরুদ্ধে। আদালতে আইনটা স্থগিত হয়ে এক্সাবার পরও এবার আনন্দবাজার লিখছে, “গো-রক্ষকদের তাণ্ডব কী করে বন্ধ করা যায়, তা নিয়ে কেন্দ্র ও ছ’টি বিজেপি শাসিত রাজ্যের কাছে জবাব চাইল সুপ্রিম কোর্ট”।

তার মানে সবখানে যে সমস্যা দেখা দিয়েছিল জবাই নিষিদ্ধ আইন স্থগিতের আগে অথবা পরে, তা হল ‘ভিজিলেন্স’। গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলের ভিজিলেন্স টিম আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে পাবলিক লিঞ্চিং (গণনির্যাতন) শুরু করাতে এটা এমন বড় হইচই সৃষ্টি করে যে, এনডিটিভির মতে, গত ২২ মাসে ১৭ জন নিহত বা আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। উপায়ন্তর না দেখে ২৯ জুন প্রধানমন্ত্রী মোদি তখন নিজেই ভিজিলেন্সের দায়দায়িত্ব অস্বীকার করা শুরু করেন। নিজেই এদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি, নিন্দা শুরু করে দেন। হাত-পা ধুয়ে ফেলা শুরু করেছিলেন। এছাড়া গত ১৬ জুলাই দ্বিতীয়বার তিনি একইভাবে এসবের বিরুদ্ধে আবার হুঁশিয়ারি দেন।   কারণ ততদিনে আদালতে তিনি হেরে গেলেছে ফলে সর্বদলীয় বৈঠক করছেন। মূলত  রাস্তায় রাস্তায় মুসলমান জনগোষ্ঠীর সদস্যকে হয়রানি জনমত বিগড়ে সরকারের বিরুদ্ধে যেতে সাহায্য করেছিল। আর ঠিক এ সময়ই সুপ্রিম কোর্টে শুনানিগুলো চলছিল বলে আদালতের পরিস্থিতি জবাই নিষিদ্ধ আইনটির বিপক্ষে চলে যায়। ওদিকে আদালতে শুনানি চলাকালে তথাকথিত ভিজিলেন্স কমিটিকে নিয়ন্ত্রণ করা কার দায়িত্ব? কেন্দ্র না রাজ্য- এই প্রশ্নে মোদি সরকার দাবি করেছে, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রাজ্যসরকারের, কেন্দ্রের নয়। এই কথা বলে নিজের দায় এড়ানোর সুযোগ করে নিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকার। এ কথা সত্যি, ভারতে প্রাথমিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কর্তব্য রাজ্যের। আর রাজ্য সেকাজ  নিজে না পারলে সে কেন্দ্রের কাছে বাড়তি ফোর্স চাইবে। তাতে কেন্দ্রীয় ফোর্স বাড়তি হিসেবে এলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায় আসলে রাজ্যের।

এদিকে সব ভিজিলেন্স টিমের তাণ্ডবের দায় আদালতের চোখ এড়িয়ে মোদি সরকার রাজ্যের ওপর চাপিয়ে দিতে সফল হলেও আসলেই কি মোদি সরকার দায়শূন্য? হাত-পা ধোয়া?
একেবারেই না। কারণ প্রথমত, যাদেরকে ভিজিলেন্স টিম বলা হচ্ছে, যতই তাদেরকে উৎসাহী সাধারণ মানুষ হিসেবে দেখানো হোক না কেন, এরা মূলত বিজেপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। কিন্তু তাতেো মোদির দায় কি অতটুকুই যে, মোদি বিজেপি দলের নেতা, তাই? না অতটুকু নয়, বরং ওই টুক দায়িত্ব মোদি কাঁধ ঝাঁকিয়ে ফেলে দিতেই পারেন। কারণ ওর চেয়েও মোদির বড় পরিচয় হলো, উনি সরকারের প্রধানমন্ত্রী।

মোদি প্রধানমন্ত্রী। এবং তার সরকারের আনা আইনের কারণেই এককভাবে মোদিকে ভিজিলেন্স টিমের জন্য দায়ী করা যায়। কিভাবে? মোদির ‘গরু জবাই নিষিদ্ধ’ আইনের পিডিএফ কপি নেটে পাওয়া যায়। উপরে লিঙ্ক দিয়েছি। ঐ আইনে একটা শব্দ আছে Society for Prevention of Cruelty to Animals (SPCA)। এটাই এর প্রমাণ। আসলে এই আইন বাস্তবায়নের সময় জনসম্পৃক্ততার অজুহাতে একটা ‘গণকমিটি’ গড়ে নেয়ার কথা আছে যাদের কাজ হবে ওই আইন বাস্তবায়নে সরকারি কর্মচারীদের সহযোগিতা করা। অর্থাৎ ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এলাকার জনগণ নিয়ে ওই SPCA গঠন করে নিতে হবে। আর বাস্তবে বিজেপির অঙ্গসংগঠনের লোকজন নিয়েই গঠিত হয় ওই SPCA কমিটি। আর এই কমিটিই কার্যত ‘ভিজিলেন্স টিম’; এভাবেই আইনটি বাস্তবায়নের সব ক্ষমতা দলীয় লোকদের হাতে।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা আর একটু পরিষ্কার হবে। আমাদের দেশে সরকার যদি বলে, কাল থেকে পুলিশ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নামবে আর তাদেরকে জনগণের পক্ষ থেকে সহায়তা করবে ছাত্রলীগ, এ কথা বললে যা হবে তাই হয়েছে ওখানে। আর স্বভাবতই গণপিটুনির নামে ওখানে লীগের পিটুনিই হবে।
অতএব, ওই আইনের সবচেয়ে বড় ফাঁদ হলো এই ‘SPCA কমিটি’। এটাই কার্যত সেই পাবলিক লিঞ্চিং কমিটি। ভারতের একজন একাডেমিক শিক্ষক লিখছেন, Public lynching, a barbaric form of political expression, seems to have become the new norm in India since the Modi government came to power at the centre. কিন্তু মোদি যদি আইনেই ওই লিঞ্চিং কমিটি গড়ার বৈধ ব্যবস্থা রেখে দেন, তবে পিটুনি ঠেকাবে কে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ জুলাই ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২৫ জুলাই তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

মোদির রাজনীতি, গরু নিষেধাজ্ঞা

মোদির রাজনীতি, গরু নিষেধাজ্ঞা

২০ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার

গৌতম দাস

http://wp.me/p1sCvy-2go

 হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গড়া ও দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র হল ভারত। এই রাষ্ট্র গঠনের সময় মনে করে করা হয়েছিল যে, বিভিন্ন প্রাদেশিক বৈশিষ্টে বিভক্ত রাজ্যের (এখন ২৯ রাজ্যে বিভক্ত) ভারতকে ‘হিন্দুত্ব’ এই আঠা না থাকলে একে এক রাখার আর কোনো উপায় নেই; এই ধারণাটা ভুল যদিও। ভারতের উগ্র হিন্দুসমাজ মুসলমানসমাজকে নিজের অধীনে আনা ও চাপে রাখার জন্য কী না করতে পারে, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি এরই আদর্শ নমুনা। ভারতে গরুর (মহিষ উট গবাদিসহ সব পশু) গোশত খাওয়া নিষিদ্ধ। [The notification covers bulls, bullocks, cows, buffaloes, steers, heifers and calves, as well as the camel trade.] মানে, বেচাবিক্রি, জবাই ও খাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এর আসল উদ্দেশ্য হল, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের দিক থেকে আধিপত্যে থাকা সংখ্যাগুরু কমিউনিটির পছন্দসই বিধিব্যবস্থার অধীনে মুসলমান কমিউনিটিকে আনা, দাবড়ানো। কিন্তু এই নিষেধাজ্ঞা সরাসরি নয়, জারি করা হয়েছে এক অদ্ভুত কায়দায়। কংগ্রেসের নেহরু আমলে তারা এর প্রথম কায়দাটা বের করেছিলেন। তা হল ভারতীয় রাষ্ট্র “পশু-প্রেমী” হয়ে গিয়েছিল। তারা ‘প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেল অ্যাক্ট ১৯৬০’ নামে এক আইন পাস করে ফেলেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই আইন বাস্তবায়নের জন্য ‘সোসাইটি ফর প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলিটি টু অ্যানিমেলস’ নামে সমিতি গড়ার ব্যবস্থাও করেছিলেন। মুল কথা ছিল, “পশুকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যথা বা কষ্ট দেয়ার মতো নিষ্ঠুরতা করা যাবে না” এর ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এই আইনটা লেখা হয়েছিল। আইনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সব জায়গায় একই কথা বলা হয়েছিল যে, ‘পশুকে অপ্রয়োজনীয় ব্যথা ও কষ্ট দেয়া রোধ’ করাই উদ্দেশ্য। আইনটি কেমন তা বোঝার সবচেয়ে ভালো এক উপায় হল, এতে ব্যবহৃত কয়েকটি শব্দ লক্ষ করতে হবে। যেমন ‘পশুর কল্যাণ, ‘পশুর ব্যথা’, ‘পশুর কষ্ট’, ‘পশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা’ ইত্যাদি। অর্থাৎ বোধ বা অনুভূতিগুলো (ফলে শব্দগুলো) আসলে মানুষের, মানুষ সম্পর্কিত। কিন্তু সেগুলোকে অবলীলায় পশুর ওপর প্রয়োগ করে ধারণাগুলো তৈরি করা হয়েছে। আর এখানে সবচেয়ে তামাশার শব্দ হল, ‘পশুর কল্যাণ বা ওয়েলফেয়ার’। বিগত ১৯৬০ সালের ভারতে তো বটেই, এখনকার ভারতেও কোনো কোনো আম-মানুষের অবস্থা এমন যে, পশুর ওপর তো বটেই, আপন সন্তান বা স্ত্রীসহ পরিবারের আপন সদস্যদের ওপর “ব্যথা, কষ্ট বা নিষ্ঠুরতা” দেখানো ছাড়া নিজের পেটের ভাত জোগাড়ের আর কোনো উপায় থাকে না। অথচ সেই দেশে মানুষের বদলে পশুর ওয়েলফেয়ার নিয়ে আইন করা হয়েছিল, চিন্তা করতে বলা হয়েছিল। আসলে আইনটি করেছিল অবস্থাপন্ন শ্রেণী। করেছিল মুসলমান কমিউনিটিকে হেয় করে দেখাতে যে, তারা ‘ব্যথা ও কষ্ট দিয়ে বা নিষ্ঠুরতা করে’ গরুর গোশত খায়। অতএব এটা বন্ধ করতে হবে। এক কথায় একটা ধর্মবিদ্বেষ বা ইসলামবিদ্বেষ তৈরি করার জন্য এটা করা হয়েছিল। তবে অবশ্য এটা ছিল এক ইনডাইরেক্ট ফ্রি-কিক, এক পরোক্ষ আইন। কারণ এই আইনের সেকশন ২৮-এ এক ফাঁকে একটা ছাড় দেয়া ছিল। [Section 28 of the Act 1960, mandates that “nothing contained in this Act (1960 Act) shall render it an offence to kill any animal in a manner required by the religion of any community.”]। বাংলা করলে বলা হয়েছিল, “কোনো কমিউনিটির ধর্মীয় আচার হিসেবে বিধান মতে যদি জবাই করা হয়, পশুকে ব্যথা, কষ্ট বা নিষ্ঠুরতা দেখানো হয়, তবুও সে ক্ষেত্রে এই আইন প্রযোজ্য হবে না”।

কিন্তু গত ১৯৬০ সালের সেই আইনের ওপরে এবং সেই আইনের সীমার মধ্যে থেকে নতুন করে দু’টি বিধি তৈরি করেছে মোদি সরকার। এর একটা হল,
Prevention of Cruelty to Animals (Regulation of Livestock Markets) Rules, 2017, &
Prevention of Cruelty to Animals (Care and Maintenance of Case Property Animals) Rules, 2017

সোজা বাংলায় বললে, প্রথমটা মুল অর্থ হল, পশুর হাট বা মার্কেট ভেঙে দেয়া। অর্থাৎ জবাই করার উদ্দেশ্যে মার্কেটে থেকে কোন পশু কেনা অথবা বেচা যাবে না- এরই আইন এটা। কারণ দেখা গেছে, প্রায় ৯০ ভাগ ক্ষেত্রে জবাইয়ের গরুটা হাট/মার্কেট হয়ে আসে। তাই প্রথম আইনটার ২২ (৩) ধারায় বলা হয়েছে “জবাইয়ের উদ্দেশ্যে বিক্রির জন্য কোনো পশু কোনো মার্কেটে তোলা, কেনাবেচা করা যাবে না’। [22 (iii) stating that the cattle has not been brought to market for sale for slaughter;] আর সাথে এই কথাটাই হাটে যে কোন গরু উঠানোর পর  ‘রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে আর সেখানে শপথ করে বলতে হবে” ইত্যাদি তো আছেই। আর দ্বিতীয় আইন হলটা হল কেয়ার মেন্টেনেন্স না করলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে সেসব সংক্রান্ত।

হাটে পশু উঠবে, রেজিস্ট্রেশন হবে, কানে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার লাগবে, কেনাবেচা হবে; তবে তা কেবল পশু কৃষিকাজের ব্যবহারের উদ্দেশ্য। গরুর ক্রেতা ও বিক্রেতা এই লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েই কেবল হাটে গরু বেচা ও ক্রয় করতে পারবে।  তাহলে মূল কথাটা হল,  গরুর গোশতের জন্য গরু কেনাবেচা করা যাবে না। এমনকি পশু মারা গেলে বা পশু অসুস্থ হয়ে মরা অথবা আয়ু শেষে মরা যা-ই হোক, সব ক্ষেত্রেই মরা গরু একেবারে সোজা মাটিতে পুঁতে ফেলতে হবে। কোন ভাবেই মরা গরুর বা মারা গরুর চামড়া ছিলানো যাবে না। অথবা মারা বা কাটা গরুর হাড়গোড়সহ কোনো অবশেষই সংগ্রহ ও বিক্রি করা যাবে না। চামড়াও বিক্রি করা যাবে না।

এই হলো মোটা দাগে আইনটি সম্পর্কে ধারণা দেয়া যেখানে দেখা যাচ্ছে শুরু থেকেই এই আইনের উদ্দেশ্য প্রশ্নবোধক। ফলে কথাটা এভাবে বলা যায়, “পশুর উপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানোর” নামে কংগ্রেস আমলেই মুসলমানের প্রতি বৈষম্যটা করা হয়েছিল, কিন্তু দুর্বলভাবে। আর সেটাকেই এখন সবলভাবে করতে চাইছেন বিজেপি-আরএসএসের নেতা মোদি। গত ২৩ মে গেজেটেড বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই নতুন আইন সম্পর্কে মোদি সরকার সবাইকে “নোটিফাই করে” জানিয়েছে। আর এই আইন জারি করে তা সেই পুরনো আইনের ওপর দাঁড় করানো বলে এটা কংগ্রেসকেও বেকায়দায় ফেলতে পেরেছে, যাতে কংগ্রেস মোদির সমালোচনা করতে গিয়ে থেমে যায়। কারণ তাতে ১৯৬০ সালের নেহরুকেই সমালোচনা করা হয়ে যায়। আবার ‘পশুর ওপর নিষ্ঠুরতা ঠেকানো’র নামে এবার সবলভাবে ইসলামবিদ্বেষটা মোদি সফলভাবে দেখাতে পারেন। তবে আরো কারণও আছে।

একটা কথা পরিস্কার রাখা দরকার। এতদিন গরু জবাই দেয়া, বেচাকেনা ও খাওয়া সম্পর্কে যেসব খবর আমরা শুনে আসছিলাম তা কেন্দ্রীয় বা মোদি সরকারের কোনো আইন ছিল না। এমনকি ২০১৫ সালে মোদির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বাংলাদেশের সীমান্তে এসে বিএসএফকে ‘বাংলাদেশের গরু খাওয়া বন্ধ করা’র যে তাতানো বক্তব্য দিয়েছিলেন সেটাও আসলে মন্ত্রীর অনধিকারচর্চা ছিল। কারণ গরু জবাই বন্ধ করা কেন্দ্রের বা রাজনাথদের মন্ত্রিসভার কোনো সিদ্ধান্ত বা আইন ছিল না, আবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারেরও কোনো আইন ছিল না সেটা। তবে দুই বছর আগে মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সেখানে এ আইন পাস করা হয়েছিল। আর তা সবচেয়ে বেশি প্রচার পেয়েছিল বা বিজেপি প্রচার করেছিল। এজন্য এটা যে কোন কেন্দ্রিয় মন্ত্রীর জন্য অনধিকার ছিল।  তবে এবার প্রথম কেন্দ্র নিজেই আইন জারি করা হলো। কিন্তু এতে বিভিন্ন অ-বিজেপি রাজ্যসহ বিভিন্ন বিজেপি-শাসিত রাজ্য থেকেও বিরোধিতা প্রবল হয়ে উঠেছে। কৃষিকাজ সংশ্লিষ্ট এই বিষয় ‘রাজ্যসরকারের এখতিয়ার’ এমন দাবি বা এই প্রশ্ন উঠিয়েছে কেরালা ও পশ্চিমবঙ্গ। কথা সত্য ইস্যুটায় রাজ্য সরকারের সিদ্ধান্ত নিবার এক্তিয়ার।  মমতা ব্যানার্জি এই আইনকে কঠোর সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন। অন্যান্য রাজ্যকেও তারা আপত্তি তোলার আহ্বান রেখেছিলেন। শেষে গত ২ জুন ‘মোদির সেনাপতি’ অরুণ জেটলি বলেন, ‘নতুন বিজ্ঞপ্তি রাজ্যসরকারের এখতিয়ারে হস্তক্ষেপ নয়।’ দৈনিক আনন্দবাজার এই কথার অর্থ করেছে, ‘গবাদিপশু জবাইয়ের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার রাজ্যের হাতেই থাকছে’। মোদির খাস লোক তার অর্থমন্ত্রী জেটলির মন্তব্যের একটা ব্যাখ্যা আনন্দবাজার হাজির করে বলছে, ‘এখন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে যে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে, তাতে রাজ্যের আইনে হস্তক্ষেপ হচ্ছে না। এটি শুধু গবাদিপশুর কেনাবেচার স্থানসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি। কৃষকেরা গবাদিপশু শুধু বাজারে বেচতে পারবেন নাকি বাজারের বাইরে থেকেও কেনা যাবে, বিজ্ঞপ্তি শুধু সেটি নিয়েই। কিন্তু তাদের জবাই করার জন্য রাজ্যের আইনই বলবৎ থাকবে”।

কিন্তু আইনগত দিক থেকে মোদির এই আইন কি আদালতে টিকবে, নাকি কনস্টিটিউশনের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘন করেছে বলে বাতিল হয়ে যাবে? গুজরাটের হাইকোর্টের (ময়ূর) বিচারপতি গোমূত্র পানে ও প্রশংসায় বেহুঁশ, তা আমরা জেনেছি। কিন্তু শক্ত তর্ক উঠেছে দক্ষিণে তামিলনাড়–তে মাদ্রাজ হাইকোর্টের মাদুরাই বেঞ্চে। সেখানকার রিট পিটিশনের পয়েন্ট খুবই শক্তিশালী। যেমন তারা বলছেন, “নতুন আইনটা প্যারেন্ট আইনের বাইরে যেতে পারে না”। ১৯৬০ সালের আইনে যেকোনো কমিউনিটির ধর্মীয় শরিয়ত বা রিচুয়াল হিসেবে পশু কেনাবেচা, কোরবানি এবং গোশত খাওয়ার ওপরে এই আইন প্রযোজ্য করা হয় নাই, বাইরে ছাড় দিয়ে রাখা হয়েছিল। কাজেই এখনও কেন্দ্রের কোনো এখতিয়ার নেই সেটা লঙ্ঘন করার। এ ছাড়া ভারতীয় কনস্টিটিউশনে নাগরিকদের মৌলিক অধিকারবিষয়ক ২৫ ধারায় ‘অবাধে ধর্মপালন নাগরিকের অধিকার’ এবং ২৯ ধারায় ‘সংখ্যালঘুর স্বার্থরক্ষা’ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এই দুই অধিকারই মোদির নতুন আইনে লঙ্ঘন করা হয়েছে। এ ছাড়া আর একটা পয়েন্ট আনা হয়েছে তা হলো, ভারতীয় কনস্টিটিউশনের অনুচ্ছেদ ১৯ (১)(জি) অনুসারে কোনো পেশার লোককে বেকার করে দেয়া যাবে না। এখানে কসাইসহ চামড়া ইত্যাদির প্রক্রিয়াজাত করা যাদের পেশা তাদেরকে কাজ-পেশাহীন করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটাও অভিযোগের একটি জোরালো যুক্তি।
ওদিকে ভারতের সুপ্রিম কোর্টেও একটা জনস্বার্থ বা পাবলিক লিটিগেশনের মামলা হয়েছে। সেখানেও উপরের পয়েন্টগুলো ছাড়াও একটা বাড়তি পয়েন্ট হল, পুরনো আইনের ১১ অনুচ্ছেদ। সেখানে গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে পশু জবাইকে খাদ্য জোগাড় হিসেবে দেখা হয়েছিল, নিষ্ঠুরতা হিসেবে দেখা হয়নি। তবে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল যে, প্রয়োজনের অতিরিক্ত কষ্ট দেয়া ও নিষ্ঠুরতা না করা সাপেক্ষে তা করতে হবে। তাই এবার সুপ্রিম কোর্ট আগামী ১১ জুলাই শুনানির দিন ধার্য করেছেন আর সরকারকে জবাব তৈরি করে আসতে বলেছেন। এই মামলার বাদি হলো হায়দরাবাদের এক এনজিও, বাদির দাবি- মোদির দুই নতুন আইন অসাংবিধানিক ঘোষণা করে তা বাতিল করে দিতে হবে।

তবে আগেই বলেছিলাম মোদির আইনে ‘পশুর ওয়েলফেয়ার’ কথাটার সত্যিই বিষ্ময়কর। এক ধরনের ওয়েলফেয়ার সংগঠনের কথা আইনে অনেকবার রেফার করা হয়েছে। আর এটাই হল, বিজেপি- আরএসএসের লোকাল ‘পশুর ওয়েলফেয়ার কমিটি’ যাদের হাতে পশু ব্যবসায়ীরা নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, এরা আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে এবং তারা পাবলিক লিঞ্চিং বা প্রকাশ্যে হত্যার ঘটনাও ঘটাচ্ছে। আশা করা যায়, এ বিষয়গুলোও আদালত আমলে নেবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, মোদির আইন দু’টি আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে বাতিল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি তা হয়, তবে এটা ভারত রাষ্ট্রকে বাড়তি কিছু আয়ু দেবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৮ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ১৯ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]