চীন কী চায়, চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়

চীন কী চায়, চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়

গৌতম দাস

০৭ জুলাই ২০১৮, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2sw

 

রাষ্ট্রসংঘসহ শীর্ষ চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায় – ছবি : সংগৃহীত বাংলানিউজ থেকে

বাংলাদেশ জুলাই মাসটা শুরু করেছে গ্লোবাল মিডিয়ায় ব্যানার হেডলাইন হয়ে, কারণ রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেলসহ পাঁচ সংগঠনের প্রধান একসাথে একই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তেনিও গুতেরেস (Antonio Guterres), বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম (Jim Yong Kim) ও আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রেসিডেন্ট পিটার মরা (Peter Maurer) এবং সাথে রাষ্ট্রসঙ্ঘের বৃহত্তর অধীনেই কাজ করা আরো দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর -এর হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি (Filippo Grandi ) ও মিয়ানমারের মানবাধিকার-বিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ের ইয়াংহি লি বাংলাদেশে গত ৩০ জুন তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে পৌঁছে গেছিলেন। বলাবাহুল্য হবে না যে রোহিঙ্গা  ইস্যুতে এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান হল, মূলত তিন বিষয়ে। এক : রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে সাময়িক অবস্থানের সময়ে দেখভালের ন্যূনতম ব্যবস্থার সব বিষয় নিশ্চিত করতে কাজ করা। দুই : রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদরের সাথে বার্মায় ফেরত পাঠানোর একটা ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করা। আর তিন : যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও ধর্ষণসহ মানবেতর অবস্থার জন্য দায়ী তাদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা। সারকথায় এ সফরে তাই মূল উদ্দেশ্য বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের এবং আশ্রয়দাতা দেশ বাংলাদেশকে রাজনৈতিক সমর্থন জানানো, পাশে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা। এছাড়া আশ্রয় দেয়ার অর্থনৈতিক দায় গ্লোবালি শেয়ার করা, তাই বিশ্বব্যাংক নিজেই ৪৮০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনার কথা জানাল। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তাই বলছেন ইতোমধ্যেই “উদার জনগোষ্ঠি বাংলাদেশিরা” রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে “বিপুল বোঝা নিজের কাধে” নিয়েছে। “তাদেরকে আর শাস্তি না দিয়ে তাদের বোঝা আমাদের শেয়ার করা উচিত”। ইংরাজি দৈনিক ডেইলি স্টার লিখেছে, “Generous humane country like Bangladesh shouldn’t be punished: WB”।

দুনিয়ায় মানুষ, সাধারণভাবে সব মানুষের জন্য ও পক্ষে কাজ করবে এমন “বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন” (Multi-lateral) গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত চলে আসা দুনিয়াতে মানুষের অর্জন কম নয়। এমন অনেক প্রতিষ্ঠানই আজকাল পাওয়া যাবে যারা সাফল্যের সাথে দুনিয়ার মানুষের সম্ভাবনা, মানুষের সাফল্যের ও অর্জনের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। বহুরাষ্ট্রীয় শব্দটাকে ইংরাজিতে মাল্টি-ল্যাটারেল (Multi-lateral) বলা হয়। কারণ তা, এ কথা মনে রেখে যে, আধুনিক যেকোনো ছোট বা বড় রাষ্ট্র মাত্রই সার্বভৌম রাষ্ট্র; যার সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের উপরে ক্ষমতাশালী অন্য কেউ থাকতে পারে না, পারবে না। ফলে ‘রাষ্ট্রগুলোর অ্যাসোসিয়েশন’ ধরনের অন্য কোনো সংগঠনও এর উপরে থাকতে পারে না, কর্তৃত্বাধীন করতে পারে না। তাই ‘রাষ্ট্রগুলোর অ্যাসোসিয়েশন’ ধরনের সংগঠন যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, রেডক্রস ইত্যাদির মতো সংগঠনগুলোর জন্ম হয়েছে এমনভাবে, যেন এসব সংগঠনের সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সুপ্রীম, তা অলঙ্ঘনীয় এ মূলনীতিকে মাথায় রেখে। তাই ল্যাটারাল ধারণাটা পাশাপাশির, কেউ কারো ওপরে নয়; না কোনো সদস্য আর এক সদস্য রাষ্ট্র, না কোনো অ্যাসোসিয়েশন সংগঠন নিজে সদস্য রাষ্ট্রের ওপরে কর্তৃত্ববান। এই কারণেই ল্যাটারাল শব্দটা যার আক্ষরিক বাংলাটা হল “বহু বাহু” বিশিষ্ট।

তবু বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন গড়ার বেলায় সার্বভৌমত্বও এখানে ঠিক মূল বিষয় নয়। বরং মূল বিষয় মূল্যবোধ (values)। ঠিক কিসের বা কী সংক্রান্ত মূল্যবোধ? এককথায় বললে মানুষ সংক্রান্ত। মানুষ কে, কারা, কী এসব বিষয়ে মৌলিক ধারণা সংক্রান্ত মূল্যবোধ।

লক্ষ্য করার মতো একটি বিষয় হল, মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন যেমন রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে “রাষ্ট্রসংঘ”, যুদ্ধে দুতয়ালি, ত্রাণ আশ্রয় সুরক্ষা চিকিৎসা সেবা দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ক এবং যুদ্ধকেই কিছু নীতি কনভেনশনের অধীনে আনার সংগঠন “রেডক্রস” ইত্যাদির জন্ম বেশি দিন আগের নয়। মাত্র গত শতাব্দীতে, তাও বিশেষত ১৯০০-১৯৫০ এই প্রথম অর্ধের মধ্যে। এর মূল কারণ একটি অভিন্ন মূল্যবোধের উপরে দুনিয়ার সবাইকে নিয়ে একমতে দাঁড়ানো সহজ ছিল না। কেন? কারণ, দুনিয়ার নিয়ম যখন থাকে অপর রাষ্ট্রকে সরাসরি জবর দখল ও কলোনি করে রাখা, সেখানে মানুষের আর মূল্য কী? মূল্যবোধই বা কী? তবু গত ১৯১৯ সালে রেডক্রসের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল।

তবে বুঝার সুবিধার জন্য একটা কথা আগে বলে রাখা ভাল। বুঝার সূত্র। কলোনি দখল যুগের শুরু হয়েছিল মোটামুটি ১৭০০ সালের পর থেকে ফলে সেটা ঐ কলোনি দখলের যুগের কারণেই সম্ভবত মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে কোনো অভিন্ন মূল্যবোধ দাঁড়ানোর সম্ভাবনা সেকালে নেই। কিন্তু মজার কথা এর প্রথম দুই শ’ বছর যুদ্ধবিগ্রহ চলেছিল কলোনি দখল মাস্টারদের মধ্যে তবে সেটা তাদের নিজ  ইউরোপীয় দেশে নয়। বরং যে দেশ-রাষ্ট্র দখল করা হবে এশিয়া, আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার সেসব প্রান্তীয় অঞ্চলে সেখানে, কলোনি দখলকারদের মধ্যে। ফলে এসব গরীব দেশের লোক মরলে তা দেখে দুঃখ মনোকষ্ট পাওয়ার কেউ ছিল না। কিন্তু দিন একভাবে যায়নি। হঠাৎ ১৯০০ সালের পরে এসে দেখা গেল যুদ্ধ এবার হানা দিয়েছে ঘরের মধ্যে, খোদ ইউরোপের কলোনি দখলের মাস্টারদের নিজ দেশে, দেশগুলোর মধ্যে। তাই এবার এটাকে বিশ্বযুদ্ধ বলা হচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল ১৯১৪-১৮ সাল। ইউরোপের সেই যুদ্ধ যার মূল বিষয় ছিল আসলে কলোনি দখলদার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কামড়াকামড়ি, তবে মরণ কামড়াকামড়ি। কিন্তু যেহেতু ঘটনায় এবারের ভিকটিম খোদ মালিক মহাজনের ঘর ফলে এবার এখান থেকে সুফল এসেছিল। কলোনি মাস্টার ভিকটিম ফলে এলিট, তাই অমানবিক, মানবেতর, নৃশংস, ঘৃণিত ইত্যাদি এসব মূল্যবোধযুক্ত শব্দের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। তবে আর একটা বিষয় অবশ্যই বিরাট প্রভাব রেখেছিল বলা যায়। তাহলো ইতোমধ্যে সারা ইউরোপে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট মানব-অধিকারের ধারণা ও মূল্যবোধের ব্যবহার ও চর্চা অন্তত নিজ ঘর থেকে শুরু হয়ে গেছিল। ফলে মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা, বেঁচে থাকা, জীবিকা নির্বাহ, ইনসাফ পাওয়া ইত্যাদির অধিকার এবং সাধারণভাবে মানুষের অধিকার ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রিপাবলিক এবং মানুষ নিজেই, অন্য কেউ না, একমাত্র নিজেই নিজেকে শাসন করার হকদার এসব মূূূল্যবোধগুলো গেড়ে বসা শুরু হয়ে গিয়েছে। ফলে ঘটনাবলির শেষে রাষ্ট্রসংঘ, এসব মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর রাষ্ট্রসংঘ জন্ম নিয়েছিল ১৯৪৪ সালে।

একটি ডিসক্লেমার জানিয়ে রাখার সময় বোধহয় পেরিয়ে যাচ্ছি। তাহলো, এখানে সাধারণভাবে সব পরিচয় ভিন্নতার ঊর্ধ্বে যেকোনো মানুষের জন্য ও পক্ষে কাজ করবে এমন বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন গড়ে তোলা প্রসঙ্গে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলছি। এর মানে এই নয় যে এসব সংগঠনগুলো সব আদর্শ ও ধোয়া তুলসীপাতা ও চরম সব অর্জনের সংগঠন এরা। না এমন আগাম অনুমান ধরে নেয়া ভুল ও তা ভিত্তিহীন। তবে, জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান “এটা এক চরম অর্জনের” – এ কথা মারাত্মক ভুল। আবার এর কোনো অর্জনই নেই এটাও মারাত্মক ভুল। বাস্তবতা হল, তাদের অনেক অর্জন থাকলেও এর বিরাট বিরাট ঘাটতি ও খামতি আছে সেগুলো পূরণের জন্য কাজ করতে হবে, লড়তে হবে এখনো অনেক, এটাই হল সঠিক মূল্যায়ন। এখানে জাতিসংঘ বলতে মানবাধিকার সনদ ১৯৪৮ সহ যত আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, নিয়ম রেওয়াজ ইত্যাদি মানব-অধিকার ও মূল্যবোধ যা এ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে সেসব ধরে নিয়ে কথা বলেছি।

সেকালে এসব যা কিছু অর্জন এর পেছনে এক শীর্ষ ভূমিকা ছিল আমেরিকার। যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ গড়া এটা আমেরিকারই এক দ্বিতীয় উদ্যোগ প্রচেষ্টা ছিল, আর তা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের। আর রাষ্ট্রসঙ্ঘ গড়ার প্রথম তবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া প্রচেষ্টাটা ছিল যার নাম হল “লিগ অব নেশন”, (রাষ্ট্রসঙ্ঘের আগের উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানের নাম )। সেকালে এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের সময়কালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন। এছাড়া, মনে রাখতে হবে কোনো জনগোষ্ঠী নিজেই নিজেকে একমাত্র শাসন করবে অর্থাৎ কলোনি শাসকের শাসন নয়, এই ভিত্তিতেই সদস্য রাষ্ট্রদের নিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘ গঠিত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলো গড়তে আমেরিকা নিজের অবদান ও ভূমিকা যা রাখা সঠিক ও সম্ভব মনে করেছিল অথবা যা পারেনি করেছে, আর এভাবে আমেরিকা দুনিয়া শাসন ও নেতৃত্ব দিয়ে যেতে পেরেছিল গত প্রায় ৭০ বছর। কিন্তু সময় এখন পালাবদলের। অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এবার এখন নতুন নেতা চীনা।

কিন্তু সেই সাথে আমরা কী দেখছি?
একটা উদ্যোগ যদি হয় জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবসহ পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সফর। তাহলে অপর দিকে এক উদ্যোগ, প্রায় সমান্তরাল আর এক তৎপরতা আছে চীনের নেতৃত্বে। স্পষ্ট করে বললে, বার্মা, বাংলাদেশ ও চীনের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রয়ের চীনে বৈঠক হয়েছে। এ তৎপরতাটা বিপরীত উদ্যোগ হিসেবে হাজির আছে।

এমনিতেই আন্তর্জাতিক অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তৎপরতায় মানুষের মর্যাদা রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সবসময় প্রধান বাধা এসে যা হাজির হয় তাহল, সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের বৈশ্বিক স্বার্থ অথবা  ঐ রাষ্ট্র পরিচালক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ক্ষমতায় থাকার স্বার্থ। বাংলাদেশের ভূমিকা কী তাই হতে যাচ্ছে?
এ ছাড়া স্বভাবতই মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা চীনকে বিপক্ষীয় ক্যাম্পে দেখতে পছন্দ করব না হয়ত। কিন্তু আমরা অপছন্দ করলেও চীন আমাদের হতাশ করার দিকে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। অর্থাৎ চীন মনে করছে এ ব্যাপারে সে আমেরিকার আমলের স্টান্ডার্ডও ধরে রাখার চেষ্টা করবে বা, নিচে পড়ে থাকবে। অথচ দুনিয়ার নেতা হওয়ার খায়েশ চীনের ষোলোআনা। এটা স্ববিরোধী। এ বিষয়ে, এককথায় এখনই বলা যায় –  গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ত হতে পারবে কিন্তু  দুনিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্বে চীনের আসা অসম্ভব। এমনিতেই কমিউনিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ড হওয়ার কারণে চীনের পক্ষে ‘পলিটিকস’ ও ‘রাইট’ শব্দগুলো অর্থ তাৎপর্য বুঝার ক্ষেত্রে তা এক বিরাট প্রতিবন্ধক। কারণ এখানে কমিউনিস্ট চিন্তার দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর প্রচুর। ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অধিকার’ কথার অর্থ তাৎপর্য বুঝতে কার্ল মার্কসের ঘাটতি আছে কি না সে প্রশ্ন না তুলেও বলা যায় ৭০ বছরের পরিচিত চর্চার “মার্কসবাদ”, সেই মার্কসবাদ এর অর্থ তাতপর্য বুঝতে অক্ষম। সে এখনো অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান এগুলোর বাইরে ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অধিকার’ শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে অক্ষম। অথচ ঐ শব্দগুলো সবই বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক সুবিধা সংক্রান্ত। রাজনৈতিক ক্যাটাগরির শব্দ বা ধারণাই নয় ওগুলো। যেমন মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের অধিকার নয় বরং এগুলোর বাইরে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছে, বঞ্চিত করেছে।

এছাড়াও, কথা পরিস্কার রাখতে হবে; রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের এক্ষেত্রে তার সুনির্দিষ্ট স্বার্থ আছে তা হল, রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বার্মার রাখাইনে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা। একবার ও শেষবারের মতো। আর সেক্ষেত্রে, বাংলাদেশের সরকার নিজের কোনো এক সঙ্কীর্ণ স্বার্থে এর বিরুদ্ধে গেলে বা এই স্বার্থকে রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। আজ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশ প্রশংশিত হচ্ছে। আমরা ভুলতে পারি না আর ঠিক সেই কারণেই এর আগের বছর কোন রোহিঙ্গা যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সে কথা ভুলে যেতে পারি না। পরের বছরও শুরুতে ভারতের প্ররোচনায় সীমান্ত সিল করে দিবার নীতি নীতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আভ্যন্তরীন নিজ জনগণের সহানুভুতি ও আশ্রয় না দিবার ক্ষোভ আঁচ করে পরে সীমান্ত খুলে দেয়াওয়া হয়।

এমনিতেই, বল গড়ানো শুরু করেছে দুইটা জায়গা থেকে। এক সাংগ্রিলা বৈঠক। সাংগ্রিলা মূলত এশিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক এক রাষ্ট্রজোট। সিঙ্গাপুরের  “সাংগ্রিলা নামের এক হোটেলে” তা প্রতিবছর আয়োজিত হয়ে থাকে। যেখানে সদস্য হিসেবে আমেরিকাও আছে, চীনও আছে। ইউরোপের মাতব্বর রাষ্ট্রেরা আছে, আছে মিয়ানমারও। গত জুন ২ তারিখের এবারের সিঙ্গাপুরের বার্ষিক বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করতে আসেন মিয়ানমার সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাউং তুন (National Security Adviser Thaung Tun)। মায়ানমার বা বার্মার গলার স্বর নামা শুরু হয় সেখান থেকে। তিনি সাত লাখ রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত নিতে নিজে প্রস্তাব দেন ও সম্মতি জানান। তিনি আবেদনের স্বরে সেখানে প্রশ্ন রেখেছেন, “স্বেচ্ছায় যদি ৭ লাখকে ফেরত পাঠানো যায় তাহলে আমরা মায়ানমার তাদের গ্রহণে আগ্রহী। এরপরেও এটাকে কি জাতিগত নিধনযজ্ঞ বলা যায়”?

“Myanmar is willing to take back all 700,000 Rohingya Muslim refugees who have fled to Bangladesh if they volunteer to return, the country’s National Security Adviser Thaung Tun said on Saturday”.

এবিষয়ে রয়টার্সের  এক ডিটেলড রিপোর্ট দেখা যেতে পারে এখানে। দেখা যাচ্ছে, তিনি এ প্রস্তাব দেন কারণ ওই সাংগ্রিলা সম্মেলনে মিয়ানমারের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি কি মিয়ানমারকে জাতিসঙ্ঘের আরটুপি (রেসপন্সিভিলিটি টু প্রটেক্ট) ফ্রেমওয়ার্ক চালুর দিকে নিয়ে যাবে? কথিত এই আরটুপি ফ্রেমওয়ার্কটি ২০০৫ সালে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব সম্মেলনে গ্রহণ করা হয়। [Shangri-La Dialogue, a regional security conference in Singapore, where he was asked if the situation in Myanmar’s Rakhine state, where most Rohingya live, could trigger use of the Responsibility to Protect framework of the United Nations.]

এর মধ্য দিয়ে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে নিজ দেশের জনগণকে রক্ষা এবং এই প্রতিশ্রুতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে ব্যর্থ হলে এক দেশ অন্য দেশকে সহযোগিতা করবে। [The so-called R2P framework was adopted at the 2005 U.N. World Summit in which nations agreed to protect their own populations from genocide, war crimes, ethnic cleansing and crimes against humanity and accepted a collective responsibility to encourage and help each other uphold this commitment.]

আর ওদিকে দ্বিতীয় ব্যাপারটা হল, এই মুহূর্তে জোকের মুখে নুনের মতো এক উদ্যোগ। সেটা হল, আইসিসির  ( International Criminal Court, ICC) প্রধান প্রসিকিউটর ফাতোহ বেনসুদার উদ্যোগ। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের কারণে তিনি যে অভিযোগের তদন্ত করতে চাইছেন তা হচ্ছে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়-‘জনগোষ্ঠীকে বিতাড়ন বা জোর করে অন্যত্র ঠেলে সরিয়ে দেয়া’ (অনুচ্ছেদ ৭ [১] [ডি])। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে তিনি অভিযোগ দায়ের করতে চান। আপাতদৃষ্টে অভিযোগটি হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বা লুটপাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে না হলেও এর তাৎপর্য এবং গুরুত্ব কম নয়, কেননা এই অভিযোগের শাস্তি ওইসব অভিযোগের চেয়ে কম নয়, প্রায় একই।

অর্থাৎ মিয়ানমারের জেনারেলদেরকে আইসিসির আদালতে তুলতে সক্ষম হতে পারার ইঙ্গিত। এই উদ্যোগের বিশেষ দিকটা হল, এতদিন  চীন বা রাশিয়ার দেয়া সবকিছুতে ভেটো মেরে মিয়ানমারের জেনারেলদেরকে আইনের আওতায় আনার সব কিছুকে আটকে ফেলা যত সহজ মনে হচ্ছিল এই প্রথম বার দেখা যাচ্ছে সেটা সম্ভবত এবার অকেজো হবে।

এমনিতেই শুরু থেকেই (ARSA) আরসা জঙ্গিদের গল্প বার্মার জেনারেলেরা সবাই কে খাইয়েছিল। আর তা ভারত, চীন এবং আমেরিকাসহ সবাই আনন্দের সাথে খেয়েছিল। কারো অরুচি লাগেনি।  বার্মার দেয়া বৈষয়িক সুবিধা বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টের লোভে সবার কাপড় উদোম হয়ে গেছিল। সবাই জেনারেলদের ভক্ত হয়ে উঠেছিল। তাদের বানানো (ARSA) আরসা জঙ্গিদের গল্প কার আগে কে বেশি বিশ্বাস করবে সে এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছিল।  সবাই গল্প সহজেই মেনে নিয়েছিল যে আরসা সন্ত্রাসীদের হামলাই সব কিছুর জন্য দায়ী। কিন্তু  কেউ নিজেকে প্রশ্ন করে নাই যে তাহলে হত্যা ও ধর্ষণের ভিতর দিয়ে  সাত লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়া হতে হল কেন? বার্মার সেনাবাহিনীকেই বা কেন রোহিঙ্গাদেরকে বিতাড়ন করতে হবে – এই প্রশ্ন চীন বা আমেরিকাসহ কেউই তখন তুলতে চায়নি। কিন্তু আগে যেমন অসহায়ভাব দেখা যাচ্ছিল, যে কেউ একটা জঙ্গি হামলার গল্প রান্না করলেই দুনিয়ার মা-বাপ যারা তারা সবাই তাকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেয়, কোনো প্রশ্ন করে না। এখন দেখা যাচ্ছে সেসব গল্প সবার এবার বদহজম হয়ে গেছে।

চীনের গ্লোবাল টাইমসে দাবি করা হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে, ‘চীনের নীতি ধারাবাহিকতায় সুসামঞ্জস্যপূর্ণ’। [On the issue of the Rakhine State, China’s position is consistent]। আসলে এটা একটা মুখরক্ষার কথা, কিন্তু অসত্য কথা। তাই যদি হয় তবে চীন তখন (২০১৭ সালে) কথিত আরসা জঙ্গি হামলাকে দায়ী করে জেনারেলদের গণহত্যা ও ধর্ষণ ও বিতারণ কাজের পক্ষে সাফাই দিয়েছিল কেন? আর এখন সে সাফাই কোথায়? এখন জেনারেলেরা আপস করতেই বা রাজি কেন? কেন অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে, এই ইস্যুতে চীন নিঃশ্চুপ?

[We believe that the issue should be solved through dialogue and consultations between Myanmar and Bangladesh, and the international community should act according to the two countries’ wishes,]

এ ছাড়া এখন রোহিঙ্গাদের তাদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদরের সাথে বার্মায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করা। এ ছাড়া যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও ধর্ষণসহ মানবেতর অবস্থার জন্য দায়ী তাদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা চীন কী এ দুই কাজ ও তৎপরতার বিরোধী? তাহলে কেন মায়ানমার আর বাংলাদেশের ডায়লগে সব সমাধা করতে চায় চীন?

গত চল্থ্বালিশ বছরে বার্মার সামরিক শাসকদের এই একই নিরবিচ্ছিন্ন নীতি চলে আসছে তাদের সাথে নতুন করে ডায়লগের ভিত্তি ও ভরসা কী?

বার্মার চরম মানবাধিকারের লঙ্ঘনকে আড়াল করতে চীন জেনারেলদেরকে আইনের আওতায় আনার কথা উঠলেই বার্মায় বাইরের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মনে করছে কেন? চীন অপরাধীদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনতে চায় না, না করলে কেন তা স্পষ্ট ভাষায় চীনের বলা উচিত।

চীন কী মনে করে বার্মায় মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটা কী সেখানে চীনের বৈশ্বিক স্বার্থের নিচে, কম গুরুত্বপুর্ণ? দেখা যাচ্ছে প্রশ্নটাকে চীন বরং দানব শাসকের ব্যক্তি ইচ্ছায় পর্যবসিত করে রাখবে, আর ওই ব্যক্তিশাসকের ইচ্ছাই রাষ্ট্রের (বার্মা বা বাংলাদেশ) সার্বভৌমত্ব বলে চালিয়ে দেবে তবে, এ চীন অচিরেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে অপসৃত হবে তা আগাম বলা যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
৫ জুলাই ২০১৮
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) জাতিসঙ্ঘসহ শীর্ষ চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

গৌতম দাস
১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2oJ

ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেন অথবা বলা যায় তাদের ভাষ্য দরকার-মত মিডিয়ায় হাজির করে দেন এমন এক ভারতীয় ব্যক্তিত্ব হলেন সুবীর ভৌমিক। এ সার্ভিস দিতে তিনি বাংলাদেশ অথবা পড়শি কোনো দেশের প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়ায় প্রায়ই বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট বয়ান লিখে নিয়ে হাজির পাওয়া যায় তাঁকে। এমন ধরনের এক নিবন্ধ লিখেছেন সুবীর ভৌমিক গত ৫ ডিসেম্বর, হংকংয়ের প্রভাবশালী এক অনলাইন মিডিয়া ‘এশিয়া টাইমস’ ম্যাগাজিনে। এ লেখাটিকে বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যু কিভাবে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের নির্বাচন জেতার উপায় হিসেবে হাজির হয়েছে। ফলে শেখ হাসিনা একে কিভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তিনি সেই পরামর্শ দিচ্ছেন।

সবার কাছে আজ স্পষ্ট, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত হল শেখ হাসিনা সরকারকে চাপের মুখে রাখা সেই পরামর্শদাতা, যার প্রভাবে পড়ে  শুরুর দিকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেটা আবার শুধু এবার ২০১৭ সালেই নয়, গত ২০১২ সালেও মিয়ানমার থেকে একইভাবে জাতিগত নির্মূল অভিযানের মুখে রোহিঙ্গা খেদানোর সময়ও বাংলাদেশ সরকার নিজ সীমান্ত সিল করে রাখার নীতি নিয়েছিল। সে সময় বলা হত, এটা ভারতের পরামর্শে করা হয়েছিল। ঠিক যেমন এবারেরটা, যদিও এবারের (শুরুর দিকের) বাংলাদেশের সীমান্ত বন্ধ রাখার পক্ষের নীতির প্রতি ভারতের অবস্থান একেবারেই প্রকাশ্য। আর এবারের আরও বিশেষত্ব হল, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের পক্ষে প্রবল আভ্যন্তরীণ জনমতের চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষেমেশে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তাতে ভারতকেও প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নিজের রোহিঙ্গা নীতি ও মোদীর বার্মা সফরকালীন  বিবৃতি সংশোধন করে নিতে হয়েছিল। তবে ততদিনে মোদীর মিয়ানমার সফর, গণহত্যার পক্ষে সু চি-কে দেয়া মোদীর সার্ভিস সমাপ্ত করে তিনি নিজ দেশে ফিরে গেছেন। ফলে মোদীর ফেরার পরে  বাংলাদেশের ওই সিদ্ধান্তে সীমান্ত খুলে দেয়ায় মোদীকে সু চির কাছে তেমন বেইজ্জতি হতে হয়নি বলে ভারত মনে করে। মনে রাখতে হবে, ভারতের রাজনীতিক আর আমলা-গোয়েন্দার প্রশাসন মিয়ানমারের কাছে সব সময় ক্রেডিট নিয়ে থাকে যে, বাংলাদেশের নেয়া সিদ্ধান্তগুলো যেন মিয়ানমারের পক্ষে থাকে এভাবে আনার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে সার্ভিস দিতে ভারতই একমাত্র সাপ্লায়ার; মানে ভারত বলতে চায় এখানে চীনের কোনো শেয়ার নেই। আর যেহেতু বাংলাদেশকে যেন ভারতই চালায় অথবা বাংলাদেশের ওপর ভারতের বিরাট প্রভাব আছে, এ কথা বলে ভারত মিয়ানমারের কাছে নিয়মিত ক্রেডিট নিয়ে থাকে আর নিজের দাম বাড়ায়।

তবে ভৌমিকের এবারের লেখায় তিনি নিজের সাথে নিজেই এক ভাল তামাশা করেছেন আমরা দেখতে পাই। যেমন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের নীতি যে সব সময় ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার’ পক্ষে, আর ভারতের এই নীতির পক্ষে থাকতে ‘বাংলাদেশকে ঠেসে ধরা’ – এ কথা বেশ কায়দা করে ভৌমিক ভুলে থাকতে চেয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার নীতির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে  উল্টো এবার ভৌমিক দাবি করছেন – শেখ হাসিনা হলেন একমাত্র রোহিঙ্গা আশ্রয় দেয়ার পক্ষের নেত্রী, এই বলে প্রশংসা শুরু করেছে। ফলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার পক্ষে ২০১২ সালে আর এবারের শুরুতে কারা বাংলাদেশকে প্ররোচিত করেছিল ও মিয়ানমারের কাছ থেকে এর ক্রেডিট নিয়েছিল, তা আর এখন ভৌমিকের লেখায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার পক্ষে নেত্রীর সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে কী কী ফজিলত সৃষ্টি হয়েছে, শেখ হাসিনার জন্য কী কী পাকা ফল তৈরি হয়েছে তা জানাতেই তিনি এ লেখা লিখেছেন। এ ধরনের লোকদের বলা হয় অনৈতিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সুযোগসন্ধানী। সব দিকেই তারা সব সময় লাভের ভেতর থাকতে চায়। এ হলো সেই তামাশার দিক। এরা শেখ হাসিনাকে তাদের স্বার্থের পক্ষে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। অথচ সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি, দায়দায়িত্ব বা ক্ষয়ক্ষতি এসব দিকগুলোর দায় কেবল শেখ হাসিনা বা বাংলাদেশের। আর ভৌমিকের ভারত ঝাড়া হাত-পা; তার কোনোই দায় নেই। কোনো দিক বিবেচনায় এটা কোনো দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাজ বা আচরণ হতে পারে না।

তবু সুবীরের ধারণা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের এই কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
গত ২৫ আগস্ট কথিত এক সশস্ত্র হামলাকে উছিলা করে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্মূল ও খেদানো শুরু হয়েছিল। এর মাত্র ১০ দিনের মাথায় মোদী মিয়ানমার সফরে যান এ জন্য যে, এই সময় তিনি ‘সু চির পাশে থাকতে চান’ সে কথার প্রচার-প্রপাগান্ডা ও ক্রেডিট নিতে চান। আমরা স্মরণ করতে পারি, গত সেপ্টেম্বরে মোদীর ঐ সফরকালে সেই সময় সুবীর ভৌমিকের অ্যাসাইনমেন্ট কী ছিল? ছিল খোলাখুলি ভাষায় গায়ে পড়ে এ কথা মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া যে, চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করে ভারত দেখাতে চায়, সে বেশি মিয়ানমার-ঘনিষ্ঠ। মোদীর মিয়ানমার সফর ছিল ৫-৭ সেপ্টেম্বর, সু চির সাথে সাক্ষাতের শিডিউল ছিল ৬ সেপ্টেম্বর। আর ৫ তারিখ দিন শেষে তিনি মিয়ানমার পৌঁছেছিলেন। অন্য দিকে মোদীর পৌঁছানোর আগে ৫ সেপ্টেম্বর সকালেই বিবিসি বাংলায় একটি রিপোর্ট ছেপেছিল।  “রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কেন মিয়ানমারের পাশে?” – এই শিরোনামের ঐ রিপোর্টের পুরোটাই ছিল সুবীর ভৌমিকের ভাষ্যে লিখিত। আর সুবীর তাতে যেচে পড়ে মোদীর সফরের অর্থ তাতপর্য, ভারতের প্রশাসন যা দিতে চায় তাই দিয়ে সাজিয়েছিল।

যেমন বিবিসি লিখেছিল – “কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক, যিনি বর্তমানে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে রয়েছেন, বলছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য-বিবৃতির মূল উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা।’ [এখানে ঐ বিবৃতি বলতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দেয়া বিবৃতি যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারত সব সময় মিয়ানমারের পাশে থাকবে – এটা বুঝানো হয়েছিল।]  …… “সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মিজদের রোহিঙ্গাবিরোধী কট্টর মনোভাবের সাথে একাত্ম হতে চাইছে ভারত। মি ভৌমিক বলেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার। …সুবীর ভৌমিক বলেছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাববলয়ে ফাটল ধরানো”। এভাবে প্রতিটি বাক্য একেকটি ওই রিপোর্ট থেকে তুলে আনা বাক্য।

এককথায় সুবীর বলেছিলেন, মোদির সফরের উদ্দেশ্য চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে মিয়ানমারের অধিকতর ঘনিষ্ঠতা অর্জন, এটাই ভারতের উদ্দেশ্য।
আর তাহলে এখন কী বলছেন সুবীর ভৌমিক?

ভোল পাল্টে ভৌমিক এখন বলছেন – এক. রোহিঙ্গা ক্রাইসিস সামলাতে গিয়ে নাকি শেখ হাসিনা ‘ভুল জায়গায় পা দিয়ে’ ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন। [The Rohingya crisis initially caught the Awawi League on the wrong foot, presenting a political opportunity to BNP to criticize its handling of the massive influx refugees………]
কিন্তু ঘটনা হল এই যে, ভারতের চাপে ও পরামর্শে শেখ হাসিনা সীমান্ত বন্ধ রেখেছিলেন আর সুবীর এখন সেসব কথা ভুলে সে সিদ্ধান্তকে হাসিনার “ভুল জায়গায় পা” বলেছেন। কিন্তু এই ভুলটা আসলে কার? এমনকি ভারতেও আশ্রিত কথিত ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকেও ভারত সু চির মন পেতে  ভারতও নিজেকে মুসলমান-বিদ্বেষী দানব তা প্রমাণ করেছিল; তাই ভারতও  সে সময় কথিত রোহিঙ্গা বের করে দেয়ার প্রক্রিয়া চালিয়েছিল। আর, যা থেকে ভারতের নীতি কী ছিল তা পরিষ্কার। এ ছাড়া এই একই নীতি বাংলাদেশেও পালিত হোক, তাহলে সু চির কাছে ভারতের ইমেজ বাড়বে – এই ছিল ভারতের নীতি ও আকাঙ্খা। এ’হল কে কত সু চির মতই মুসলমান-বিদ্বেষী এর প্রতিযোগিতা করে তাঁর মন পাওয়ার চেষ্টা।  সুবীর এখন সে ‘ভুলের’ দায় পু্রাটাই শেখ হাসিনার কাঁধে তুলে দিচ্ছেন। সুবীর নিজের ও ভারতের কোনো দোষ তো দেখলেনই না, উল্টা আবার বিএনপি কেন শেখ হাসিনাকে ‘রোহিঙ্গা ইস্যু সামলানোর ব্যর্থতা নিয়ে’ সমালোচনার সুযোগ নিল – দায় সেদিকে ঠেলে দিয়েছেন।

০২.  মোদীর বার্মা সফরের সময়ে সুবীর ৫ সেপ্টেম্বরে খুবই জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো।’ [সুবীর ভৌমিক বলছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো” – বিবিসি]  তো সে উদ্দেশ্য এখন কোথায়, কদ্দূর সফল হলো, তা কী অবস্থায়? অল্পকথায় তা বুঝবার জন্য ভাল উপায় হবে আনন্দবাজার পত্রিকা।  এ’প্রসঙ্গে গত ২৪ নভেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার লিখেছে – ‘রোহিঙ্গায় গোল চীনের, সুযোগ হারিয়ে পেছনের সারিতে দিল্লি।’ এই এক শিরোনামের মধ্যেই সব আছে। অর্থাৎ মিয়ানমার-চীন সম্পর্কে ফাটল ধরানো দূরে থাক এখন ভারত নিজেই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, আর তা নিজেরাই বলছে। গায়ে মানে না আপনি মোড়লদের এ দশাই হওয়ার কথা। সু চির মন পেতে মোদী নিজেকে সবচেয়ে বড় মুসলমান-বিদ্বেষী নির্মম দানব প্রমাণ করার পরেও এ হল ফলাফল; তবে শুধু তাই নয় আরো আছে।

ঘটনা হল, আমেরিকা মিয়ানমার জেনারেলদের গণহত্যার অভিযোগে কাঠগড়ায় তোলার হুমকি দেয়া এবং কিছুটা তৎপর হওয়ার পর আমেরিকার ওই বক্তব্য ও পদক্ষেপের প্রভাবকে ঠাণ্ডা ও লঘু করতে চীন এগিয়ে এসেছিল। চীনের লক্ষ্য নিজের আপন ক্লায়েন্ট বার্মার জেনারেলদের পিঠ বাঁচানোর জন্য কিছু উদ্যোগ নেয়া।  নামকাওয়াস্তে হলেও চীনের মধ্যস্থতায় জেনারেলরা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশের সাথে এক চুক্তি করেছে। এনিয়ে বিস্তারে যাওয়ার আগে আমাদের একটা কথা পরিস্কার থাকতে হবে। চীনের প্রস্তাবের সারকথা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে জেনারেলদের রাজি করানো। কিন্তু কোনভাবেই এটা যারা রোহিঙ্গাদের উপরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে তাদের সেই অপরাধকে লঘু করবে না। কারণ দুটা দুই জিনিষ। এককথায়, এখন রোহিঙ্গাদের সকলকে পুরা ফেরত নিলেও তাতে গণহত্যার অভিযোগে কেটে যাবে না, লঘু হবে না। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই চুক্তির কোনো সুফল হিসেবে রোহিঙ্গারা আদৌও কী ফেরত যাবে? জেনারেলেরা  কোন দিন রোহিঙ্গাদের ফেরত নিবে কি না, এই ব্যাপারটাই এখনো পুরাপুরি  সন্দেহজনক হয়েই আছে। ফলে আস্থা রাখার কোন বিশেষ কিছু এখনও তৈরিই হয় নাই। বিশেষ করে এ চুক্তি দায়সারা, এটা বাস্তবায়নের কোনো সময়সীমা নেই। আর অসংখ্য ফাঁকফোকরে ভর্তি; ‘যদি কিন্তু’তে ভরপুর। যেমন সব কিছুতে মূল ব্যাপারটা হল রোহিঙ্গাদেরকে ডকুমেন্টে নাগরিক প্রমাণ করতে হবে আগে। কেউ আগে বার্মিজ নাগরিক প্রমাণ হলে “তবেই”…। এই হল সেই বিরাট যদি কিন্তু…। তো নাগরিক প্রমাণ হলে তবেই না এরপর ফেরতের প্রসঙ্গ।

যা হোক, খোদ সুবীর ভৌমিক বা ভারত এখন প্রমাণ করেছে রোহিঙ্গা বা মিয়ানমার ইস্যুতে ভারতের সু চিকে তেলানির ফলাফল শুন্য। এরপর ভারতের আর কোনো পদক্ষেপ বা ভূমিকা এখন শূন্য। তাই চীন-মিয়ানমার সম্পর্ককে ‘ফাটল ধরাতে’ চাওয়া সেই ভারতই এখন উপায়ন্ত হারিয়ে পল্টি মেরে চীনা মধ্যস্থতায় তৈরি ওই চুক্তির একনিষ্ঠ সমর্থক বনে গেছে। অর্থাৎ মিয়ানমার বা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফাটল ধরাতে আসা ভারত এখন রামভক্ত হনুমানের মত ‘চীন-ভক্ত হনুমান’ হয়েছে।

শুধু তাই না, ভৌমিক এখন দাবি করছেন, এই পুরো ঘটনায় হাসিনার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া আর চীনা মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন চুক্তি করে ফেলায় তাঁর ইমেজ এখন এত বেড়েছে যে, সেটা কাজে লাগিয়ে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতে আসতে পারেন। এই হলো সুবীর ভৌমিকের লেটেস্ট টাউটারি বা ইমেজ বাড়ছে এই লোভ দেখানোর হকারিতে নেমে পড়া। [Hasina now winning praise both in the West and Islamic countries for her comparatively compassionate approach to a crisis that has hit Myanmar’s global image while lifting Bangladesh’s.]। অর্থাৎ সুবীর এখন উলটা বার্মাবিরোধী সার্টিফিকেট বিলি করে বলছেন, বার্মার গ্লোবাল ইমেজ ডুবতেছে আর বাংলাদেশেরটা বাড়ছে। বুঝা যাচ্ছে এটা এখন সুবীরের নতুন প্রজেক্ট। সে জানে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তির কোন ভবিষ্যত নাই। তবু সে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি ও এর ‘সুফল’ ফেরি করতে নেমেছে।অন্যদের কথা বাদ দিয়ে খোদ আনন্দবাজার চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি নিয়ে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসনের আস্থাহীন ও বাঁকা মন্তব্য কীভাবে পড়েছে তা দেখা যাক। আনন্দবাজার লিখছে, “যদিও চিনের এই প্রস্তাব নিয়ে সন্দিহান মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন বিদেশ দফতর বিবৃতিতে বলেছে— চিনের বিদেশমন্ত্রীর প্রস্তাব রাখাইনের জটিল পরিস্থিতির তুলনায় খুবই সহজ-সরল। সামরিক অভিযানের নামে রাখাইনে ‘জাতি নিধন’ চলছে বলে বিদেশসচিব রেক্স টিলারসন যে আগেই মন্তব্য করেছেন, বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে তা-ও বলা হয়েছে।” অর্থাৎ আনন্দবাজার স্পষ্ট বুঝলেও সুবীর এখন ‘সুফল’ ফেরি করার মুডে আছে ।

সুবীর নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে আর এক উদ্যোগ নিয়েছে; এক ভারতীয় থিংকট্যাংকের কিছু ব্যক্তিত্ব ও এর কিছু তৎপরতার তথ্য আমাদের দিয়েছেন। কলকাতাভিত্তিক সেই ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানের নাম ইন্ডিয়ান সোস্যাল কালচারাল স্টাডিজ (আইএসসিএস) আর  থিঙ্কট্যাঙ্ক-সংশ্লিষ্ট সেই ব্যক্তির নাম অরিন্দম মুখার্জি। তিনি বলছেন, “China, India, Japan and the Asean countries all seem to agree that solving the Rohingya crisis is a must for regional stability and both Hasina and Suu Kyi are crucial to make that happen,” said Arindam Mukherjee ।  সুবীর আমাদের আরও জানাচ্ছেন, সম্প্রতি আইএসসিএস মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে এক সেমিনার করেছে, যেখানে ভারত সরকারের বিদেশে গোয়েন্দাগিরির প্রতিষ্ঠান ‘র’-এর সাবেক প্রধান রাজিন্দর খান্না গিয়েছিলেন।

খান্না সেখানে বলেছেন, বাংলাদেশের হাসিনা সরকার ও মিয়ানমারের সু চি দুই নেতাকে আগলে রাখতে হবে কারণ এরা এই রিজিয়নে দুটা খোটা (stake) টিকে গেছে। রাখাইনকে আমরা আফগানিস্তান হতে দিতে পারি না। [“The region has developed a stake in seeing these two regimes survive. We don’t want Rakhine to be another Afghanistan,” said Rajinder Khanna] এ কথা থেকে খান্নাকে এক আপাদমস্তক মুসলিমবিদ্বেষী অন্ধ-বোকা ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা ও তাদের খেদিয়ে রিফিউজি বানানোর ঘটনা কোন দিক থেকে আফগানিস্তানের সাথে তুলনীয়? মুসলমান বলে? তাই তাঁর চোখে আফগানের সাথে তুল্য উদাহরণ মনে হল?  যেখানে খোদ আমেরিকা মনে করছে এটা গণহত্যার ঘটনা। য়ামেরিকা দেখছে, “সেখানে গণহত্যা হয়েছে, ফলে যারা এটা করেছে সেসব ব্যক্তি ও জেনারেলদের কাঠগড়ায় তুলতে” হবে। জাতিসঙ্ঘও কমবেশি তাই মনে করে। বিশেষ মানবাধিকার সম্মেলনের সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমতে প্রকাশিত বক্তব্য কমবেশি এমনই। অর্থাৎ এখানে ঘটনা ব্যাখ্যার মুখ্য শব্দ রোহিঙ্গাদের উপর চালানো ‘গণহত্যা’। স্বপ্নে দেখা কোন টেররিজম না। তাহলে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুকে কিভাবে তার চোখে তিনি দেখলেন, এটা আফগান ইস্যুর সমতুল্য?

বর্মী জনগোষ্ঠির মধ্যে ইসলাম-ফোবিয়া, ঘৃণা জাগানোর চেষ্টা বার্মার জেনারেলদের আছে। এটাই তাদের রাজনীতি বলে তারা সাব্যস্ত করেছে। আর  সু চি -সহ সেই জেনারেলদের মন পেতে, মন যোগাতে তাদের এই বীভৎস ইসলাম-ফোবিয়াকে নিন্দা করার বদলে চীন আর ভারত তারা উভয়েই বর্মীজ শাসকদের ‘টেররিজমের গল্প’ ফেরি করছে, তাল দিয়ে বেড়াচ্ছে।  যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে রোহিঙ্গারা টেররিস্ট তবুও যে প্রশ্নের জবাব নাই তা হল –  কোনটা আগে ঘটেছে – রোহিঙ্গা নিধন, দেশ থেকে বের করে দেওয়া, নির্যাতন ইত্যাদি আগে ঘটেছে নাকি রোহিঙ্গারা আগে কোন প্রতিরোধে আগিয়ে এসেছে? রোহিঙ্গা নিধন, রিফুইজি করা আগে না ঘটলে তারা কী প্রতিরোধ করতে এসেছিল? এই সহজ প্রশ্নের উত্তর খুজলে যে কেউ নিজেই জানতে পারে। কাজেই বলা বাহুল্য রোহিঙ্গা নিধন, খেদানোর ইসলাম বিদ্বেষ – এগুলোই সবার আগে ঘটানো ঘটনা। এমনকি এখনও রোহিঙ্গা নিধন, খেদানো এসবের প্রতিবাদে রোহিঙ্গাদের তেমন কোন প্রতিরোধ ঘটে নাই যাকে পশ্চিমাভাষায় ‘টেররিজম’ বলা যায়। আফগানের মত রাখাইনে আগে থেকে কোন আল-কায়েদা ছিল না যে সেটার কারণে এটাকে টেররিজম বলার সুযোগ নেয়া যাবে। এখানকার ইস্যু গণহত্যা, ক্লিনজিং। রোহিঙ্গারা যার ভিকটিম। তবে ভিকটিককে নির্যাতনে প্রতিকারহীন ফেলে রাখলে এমন হতেই পারে,  সেই ক্ষেত্রে এটা বড় জোর একটা ‘হবু (would-be) টেররিজম’ পরিস্থিতি, এখনও মানে হয় নাই । কিন্তু তা বলে আগাম একে টেররিজম বলে ডাকছেন কেন?  আসলে রোহিঙ্গাদের দুর্দশাকে আফগান পরিস্থিতির তুল্য ঘটনা বলে খান্না সাহেবও বর্মী জেনারেলদের ও সু চির মত করে তাদেরই মন পেতে তাদেরই ইসলাম-ফোবিয়াকে নিজের ভিতর লালন করা শুরু করছেন দেখা যাচ্ছে; হয়ত জেনে বা না জেনে।

তবে এটা ঠিক যে মুসলমান-নিধনের ইচ্ছা, নিজের ‘অপর’ হলেই খান্না সাহেবকে এই ভিন্নতা নিরসন করতেই হবে এবং তা করতে হবে নিধন করেই – এটাই খাঁটি জাতবিদ্বেষ, রেসিজম। এগুলো যার মাথায় গিজগিজ করে তিনিই কল্পনা করেন যে রোহিঙ্গাদেরকে  ‘আফগানিস্তানের মত করে দেখানোর’ সুযোগ পেয়ে গেলে তাঁর কাজ কত সহজ হয়ে যেত। বর্মী জেনারেলেরা নব-উদ্যোগে এই কাজ ১৯৮২ সাল থেকে করে আসছে যাতে রোহিঙ্গাদের জঙ্গী প্রমাণ করে নিজের ক্লিনজিং এর পক্ষে সাফাই যোগাড় করা যায়। মনে হচ্ছে খান্না সাহেব তাদেরই আর একজন হতে চাইছেন এই শেষ বেলায়।

মানুষ ঘুমিয়ে থাকতে পারে, ভুলে থাকতে পারে বড়জোর মনে মনে দেখাটাকেই চোখের দেখা ভাবতে পারে। কিন্তু ভারত-মিয়ানমার মিলে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার ঐক্য – এটা এক বর্ণবাদী ঐক্য। ‘অপর’ যে আপনার চেয়ে দেখতে ভিন্ন সেই জনগোষ্ঠিকে সাফা করে ফেলার ঐক্য। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে আজ অথবা কাল এটা তাদের জন্য খুবই চড়ামূল্যের হবে, তা এখনই বলে দেয়া যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের নৌকায় ভারত’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ধরতে পারবে

 

মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ফিরে ধরতে পারবে
গৌতম দাস
০৭ নভেম্বর ২০১৭, রাত ০০ঃ৪৩
https://wp.me/p1sCvy-2kC

আমেরিকা কি ফেল করা ট্রেন আবার ধরতে পারবে? কোন ট্রেন? বার্মা ট্রেন, নাকি মিয়ানমার ট্রেন? আসলে এসব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলে লাভ নেই; কথা হলো এটা রোহিঙ্গা-ট্রেন! অর্থাৎ আমেরিকা কি ফেল করা রোহিঙ্গা-ট্রেন আবার ফিরে ধরতে পারবে? আবার ধরার জন্য কতদুর সিরিয়াস যাবে? রোহিঙ্গা-ট্রেন  – একথারই বা মানে কী? কী বলতে চাওয়া হচ্ছে? রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার একটা খুবই ক্ষুদ্র অংশ, মাত্র চার পারসেন্ট। কিন্তু মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গা-মানুষের মর্যাদা এতই পর্যুদস্ত, এতই নিচে অমানুষের বা ঊন-মানুষের স্তরে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ নিয়ে গেছে যে, দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে গেছে রোহিঙ্গা পারসিকিউশন বা অত্যাচার নিষ্পেষণ। সেই সাথে বার্মিজ জেনারেলদের নাম নৃশংসতার ওস্তাদ হিসেবেও ছড়িয়ে পড়েছে। এরা নির্মূল ক্লিনজিংয়ে কত দক্ষ এর স্বাক্ষর-চিহ্ন ব্যাপক ছড়াছড়ির মুখে জাতিসঙ্ঘকে বলতেই হয়েছে যে, ‘দুনিয়ার সবচেয়ে পারসিকিউটেড বা নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা’। অতেব আমাদের সামনে এখন প্রশ্ন হল, আমেরিকা কি বর্মি জেনারেলদের একটা শিক্ষা দিতে পারবে? কতদুর পর্যন্ত সিরিয়াসলি যাবে?

আগে আমরা দেখছি, আমেরিকা ভুলে গিয়েছিল মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে, জেনোসাইড বা ক্লিনজিংয়ের বিষয়ে দুনিয়ার কাছে তার কমিটমেন্ট কী? দুনিয়ার কাছে কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে গ্লোবাল লিডার হয়েছিল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গ্লোবাল ইকনোমিক ব্যবস্থায় একটা অর্ডার বা নিয়ম শৃঙ্খলা কায়েম করেই আমেরিকা আজকের ওয়ার্ল্ড লিডার হয়েছিল। তবে  শুধু এতটুকু করেই হতে পারেনি। এটা সে হতে পেরেছিল কারণ সাথে কিছু পলিটিক্যাল কমিটমেন্টও তাকে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির প্রতিশ্রুতি। যদিও তাতে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। বিভিন্ন সময়ে আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার  বিষয়টাকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করেছে, নিজ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ‘রেজিম চেঞ্জের’ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নজির স্থাপন করেছে। এখনো এই সমস্যা দুনিয়াতে আছে যে, সুদানের বশির একটা গণহত্যা চালালেও চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ যদি উদ্ধার হয় তবে বলা হবে গণহত্যা হয়নি, বরং ‘গণহত্যার কাছাকাছি’ কিছু একটা হয়েছে। কারণ চীনের এ কথা না মানলে চীন ভেটো দিয়ে দিবে; একই উদাহরণ আমেরিকারও আছে। ফলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিচার বিবেচনা মুল্যায়নে একটা গণহত্যা ঘটেছে কি না তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে দুনিয়ায় এখনো বহু সীমাবদ্ধতা আছে। আসলে তাই দরকার আবার এক রুজভেল্টের, আবার এক নতুন প্রতিশ্রুতিতে নতুন করে জাতিসঙ্ঘ গড়া। অথচ আমেরিকা নিজেরই সেসব ইতিহাস ভুলে বসে আছে। আর বাস্তবে হারার আগেই মনে মনে হেরে গেছে।

এ কথা ঠিক যে, ২০০৭-০৮ সাল থেকেই এটা জানা গিয়েছিল যে, দুনিয়ার অন্তত অর্থনৈতিক পরাশক্তি ও লিডার অর্থে চীনের কাছে আমেরিকার কাঁধবদলের সময় হয়ে গেছে। আমেরিকার জায়গায় সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থিত হচ্ছে চীন। এ কথাও সত্যি যে, কারো অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে উত্থিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে এটা তখন থেকে কেবল সময়ের ব্যাপার যে, সেই রাষ্ট্র এখন ক্রমে ক্রমে সব অর্থেই গ্লোবাল পরাশক্তি হিসেবে হাজির হবে। কিন্তু তাই বলে একথাও ভুলে যাওয়া যাবে না যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আমেরিকা কেবল অর্থনৈতিক আর সামরিক শক্তির জোরে গ্লোবাল পরাশক্তি বা গ্লোবাল লিডার হয়নি। সাথে রাজনৈতিক শক্তি হতে হয়েছে আগে, কিছু গ্লোবাল রাজনৈতিক মুল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে আগে;  তবেই আমেরিকার গ্লোবাল লিডার হওয়া গেছে। এমনি এমনি আমেরিকা দুনিয়াকে নিজের এম্পায়ার বানাতে সক্ষম হয়নি। পলিটিক্যাল আইডিয়া, এর উপযোগী গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আর সর্বোপরি কমিটমেন্ট – এসব প্রতিটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণভাবে হাজির করাতে হয়েছিল আমেরিকাকে। আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি? সেটা বাইরে কাউকে না খোদ নিজের কাছে নিজেকে দিতে হয়েছিল যে – মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা কেবল আমেরিকাতে করলেই হবে না, সারা দুনিয়ার ব্যাপারেও অন্তত নীতি-অবস্থানগত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এতকিছু বলার পরেও এ কথাও সত্য যে, ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস চার্টার যেটা রচিত হয়েছিল বটে কিন্তু ওখানের ‘ইনডিভিজুয়ালিজম’ ধারণায় ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা আছে, তাই তা নিয়ে দুনিয়াকে আরো অনেক কাজ করতে হবে। সারকথা কোনো ‘রাজনৈতিক’ নীতি-অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া আমেরিকা গ্লোবাল লিডার হয়নি, হতে পারেনি। আজকের জায়গায় আমেরিকা এমনি এমনি উঠে আসেনি। তাই আগেই বলে দেয়া যায় এই নুন্যতম শর্তপুরণ ছাড়া  আগামিতে অন্য কেউও হতে পারবে না।

অথচ এই শতকে এসে  আমেরিকা সত্যি সত্যি হেরে যাওয়ার আগেই ২০০৮ সালে সব ছেড়েছুড়ে আগেই হার স্বীকার করে নিয়েছিল। এর আগে নানা সিরিয়াস হিউম্যান রাইটস ভঙ্গের কারণে ২০০৮ সালের আগের বার্মা ছিল আমেরিকান অবরোধে ডুবে থাকা, বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় একঘরে হয়ে থাকা এক বার্মা। অথচ চীনের দেখানো রাস্তায় সেই মতনই বার্মায় বিনিয়োগ ও ট্রেড আর ব্যবসার ভাগ পেতে মরিয়া লোভী হয়ে আমেরিকা চীনের পথ অনুসরণ করে বসেছিল। বর্মি জেনারেলদের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রেসিজমে নির্মূল ক্লিনজিং দেখেও না দেখার ভান করার দিন দুনিয়াতে যেন আবার ফিরে এসেছিল – চীনের দেখানো সর্টকাট রাস্তার লোভে পরে আমেরিকাও এই শর্টকাট পথ নেয়ার লোভে পড়েছিল। আমেরিকা মনে করে নিয়েছিল যেন দুনিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক নীতি অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া দুনিয়া এ পর্যন্ত আসতে পেরেছিল। আর আমেরিকা কোনো কমিটমেন্ট ছাড়াই বোধহয় সে এই দুনিয়ার নেতা হয়েছিল। ২০০৮ সালের বার্মার কনস্টিটিউশন চালুর পরেও সেই একই দানব ও কোটারি এক সামরিক রাষ্ট্রই ছিল বার্মা। অথচ বলা হচ্ছিল বার্মা নাকি ‘গণতন্ত্রের পথে’ যাত্রা শুরু করেছে, গণতন্ত্রের পথে নাকি ট্রানজিশনে বা অন্তর্বর্তি রাস্তায় আছে বার্মা। আর সু চি নাকি শান্তির নোবেল মানুষ ইত্যাদি। এসব ভুয়া সার্টিফিকেট বিতরণ করেছিল আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিম।  চলতি আগষ্টে বার্মায় ফিরে গণহত্যা শুরুর পরে সু চি তাঁর সাফাই ভাষণে গণহত্যার অভিযোগের জবাবে মিয়ানমারের ‘শিশু গণতন্ত্রের’ যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তা শুনে প্রখ্যাত মার্কিন জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ ড. গ্রেগরি এইচ স্ট্যানটন যথার্থই বলেছেন, “এটা গতানুগতিক অজুহাত। অভিযোগ প্রত্যাখ্যানকারীদের দিক থেকে এটা বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল। তারা বলে থাকেন, গণহত্যা বন্ধের দিকে নজর দেয়ার চেয়ে শান্তিপ্রক্রিয়া বজায় রাখাটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। অং সান সু চি তাই করেছেন”।

অথচ আমেরিকা ট্রেন মিস করেছিল। রাজনৈতিক কর্তব্য ভুলে সস্তা ব্যবসাব ও বৈষয়িকতার লোভের ফাঁদে বর্মি জেনারেলদের কাছে নিজেকে ধরা দিয়েছিল। নিজেকে সস্তা করে তুলে, সস্তায় বিক্রি করে দিয়েছিল। নিজের দাম নিজে বোঝেনি। যার দায় ওবামা প্রশাসনেরও কম নয়। চীনের কাছে দুনিয়ার নেতৃত্ব হারানোর আগেই আমেরিকা উলটো নিজেকে চীনের পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছিল।

আচ্ছা আমেরিকা কী কখনও খেয়ালই করেনি দুনিয়াতে কোথাও রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কমিউনিস্টদের কোনো রাজনৈতিক সিরিয়াস প্রতিশ্রুতিই নেই। এরা নিজ নিজ বিপ্লবের পরে রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ বলে একটা শব্দ রেখেছে, ইংরেজির একটা ‘আর’ অক্ষর সেখানে আছে বা ছিল। লুপ্ত হয়ে যাওয়া সোভিয়েত মানে ওর ‘ইউএসএসআর’ (USSR) নামে ‘আর’ অক্ষরটা ছিল। এখনও বর্তমান মাও এর চীনের নাম ‘পিআরসি’ (PRC) তেও ‘আর’ অক্ষরটা আছে। এই ‘আর’  এর অর্থ হল ‘রিপাবলিক’। রাজতন্ত্র উতখাত করে পিপলস রিপারলিক প্রতিষ্ঠা ছাড়াও মর্ডান রিপাবলিকের আরও অর্থ হল রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কমিউনিস্টদের কাছে  এসব কথার সাথে কোনো ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ অ্যাক্ট’ তৎপরতা তাদের কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের করণীয় নাই। সেখানে কনস্টিটিউশনের কোনো গুরুত্ব নেই, কী লেখা আছে সেখানে তাও তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা সেটা তো কোনো সিরিয়াস কিছু নয়। কারণ এসব কথার কথার নাকি নেহাতই ভোটের হিসাব; যেমন কোনো করপোরেট চেয়ারম্যানেরও এক ভোট, এক ফকিরেরও এক ভোট। তাই মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির কথাবার্তার কোন মুল্য কমিউনিস্টদের কাছে নাই। মৌলিক মানবাধিকার ইস্যুটা নাকি কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে আমেরিকার ষড়যন্ত্র। যদিও একথা সত্য রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা নয়। ফলে এটা যথেষ্ট নয়। কিন্তু তাই বলে এটা কোন অর্জনই নয়, এটা মারাত্মক ভুল ধারণা। ফলে মর্ডান রিপাবলিকে মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য  ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা কমিউনিস্টদের কাজই নয়, এর কোন গুরুত্ব নাই, এটা কারও কাজে লাগে না, এগুলো মানুষের কোন অর্জন নয় – এটা মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা শুধু না। খুবই নিম্ন বোধের – মানুষ কেবল জীব, এই অনুমানে বলা বক্তব্য। মানুষকে রিডিউসড নীচা গণ্য করা বক্তব্য।

তাই চীনের বুঝ হল, তারা যে দানব বর্মি জেনারেলদের পা-চুমে বিনিয়োগ ব্যবসা খাচ্ছে – এর পাশেই লাখ লাখ রোহিঙ্গা ঐ জেনারেলদের হাতেই কচুকাটা ক্লিন হয়ে গেলে তাতে চীনের কী দায়! তার কোনো দায় নেই। সেই, ১৯৭০-এর দশক থেকেই চীন নিজের কাছে পরিষ্কার যে, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের দুনিয়ায় সে যাচ্ছে বটে কিন্তু কোনো গ্লোবাল ইউনিভার্সাল রাজনৈতিক মুল্যবোধ প্রতিষ্ঠা হওয়া বা থাকা না থাকার দায়দায়িত্ব সে নেবে না। কেবল কোন ব্যবসাটা সে পাবে সেই ভাগ সে ঠিকই গ্লোবাল প্লেয়ারদের ভাগ থেকে নিজেরটা বুঝে নেবে। এই নীতিতেই চীনের বিদেশনীতির ডিপলোম্যাসি এত দিন চলে এসেছিল। আর প্রমাণ হয়েছে এটা অচল। রোহিঙ্গারা প্রমাণ করে দিয়েছে   এই চীন ব্যর্থ। এই চীন গড়ে তোলা অর্থহীন, খামোখা। মানুষ কেবল জীব নয়, সে কেবল একটা বৈষয়িক জীব-জীবন নয়। মানুষের জীবনের আরও অর্থ উদ্দেশ্য লক্ষ্য আছে; দায় কর্তব্য আছে। স্পিরিচুয়ালিটির দিক আছে। জীব জীবন ছাড়িয়ে মানুষের তাই আরও উন্মেষ দরকার হয়। সেকথাটাই আর ভাবে বললে হয়, মানুষের রাষ্ট্রের তাই রাজনৈতিক কমিটমেন্ট দরকার থাকে। মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক ইনসাফ, মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ার স্তরে তাই মানুষের নুন্যতম দায়। এসব পুরণের পথে নুন্যতম দায় কর্তব্যবোধ নাই চীনের। ফলে আগেই বলা যায় কোন গ্লোবাল নেতা হওয়ার খায়েশ চীনের পূরণ হবার সুযোগই নাই। আসলে সে ধরা খেয়েছে। কিভাবে?

আগেই বলেছি আমেরিকা লোভে পড়ে হুঁশ হারিয়েছিল। নিজের গৌরব নিজের অবদান ভুলতে বসেছিল। এমনকি এবারের আগষ্টের পর থেকে নবউদ্যোগে নির্মূল অভিযান শুরুর পরে, ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে বক্তব্যে বিষয়ে আমেরিকার উপমন্ত্রী মার্ফি সাহেবের কথাবার্তা লক্ষ্য করা যাক। তিনি তখনও কেবল সতর্ক কী বলতে কী বলে ফেললে আবার বর্মি জেনারেলদের মন উঠে যায়, অখুশি হয়ে যায় – সেদিকে খুবই সতর্ক থেকে ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে কথা বলছেন। জেনারেলদের মন জোগাতে মার্ফি বলার চেষ্টা করছিলেন যে এটা নাকি রোহিঙ্গা বা মুসলমান নির্মূল ক্লিনজিংয়ের ইস্যু নয়, এটা নাকি রাখাইন স্টেটের দুই জাতিগোষ্ঠীর ঝগড়া, অর্থাৎ বার্মা রাষ্ট্র বা মিলিটারির কোন ভূমিকা নেই। তার এই অবস্থা দেখে সিবিএস নিউজের সাংবাদিক সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করায় জবাবে মার্ফি সাহেব আবার সে কথা কনফার্ম করেছিলেন। কিন্তু এরপরেও সব চিতপট হয়ে যায়, সব কিছু ঘুরে যায়। গত ২ অক্টোবর মিয়ানমারে অবস্থিত ২০টি দেশের রাষ্ট্রদূত একসাথে রাখাইন প্রদেশ সরেজমিন সফর করে এসে এরপরে তা নিয়ে মিয়ানমারে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত যে বিবৃতি দেন তাতে পরিস্থিতি উলটে যায়। যার মূল কথা হল, বার্মার জেনারেলদেরকে অধিকার সংরক্ষণে রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বে স্মরণ করিয়ে দেয়া, আর বারে বারে চাপ দিয়ে বলা যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে, জাতিসঙ্ঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন আসতে দেয়া ইত্যাদি। এসব নিয়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

অর্থাৎ তখন থেকে আমেরিকা সুর পালটিয়ে ফেলেছিল। নিজ শক্তি, তুচ্ছ করে ফেলে রাখা হারানো গৌরবের কথা মনে পড়ে গেছিল। ফলে এরপর থেকে আর এটাকে ‘রাখাইন প্রদেশের জাতিগোষ্ঠীর নিজেদের ঝগড়া’ বলে আড়াল করতে চাইছে না। এটাকে বলা যায় আমেরিকান বার্মা নীতিতে মেজর শিফট পটপরিবর্রতন।  এরপরে ২৩ অক্টোবর এসে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতি – এটা একেবারে কঠোর অ্যাকশনের দলিল নির্দেশনামা যেন। সাথে আগের মতো যে দায়ী ইনভেস্টিগেট করো, তাকে ধরে নিয়ে আসো সেসব কথা তো আছেই। তবে মূল কথা হল, ২০০৮ সালের আগে আরোপিত আমেরিকার দেয়া যেসব অবরোধ উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল সেগুলো আবার কার্যকর করা হয়েছে বলে ঘোষণা করে দেওয়া। বিশেষত বর্তমান ও সাবেক সামরিক অফিসারদের ওপর ট্রাভেল ব্যান আবার বলবৎ করা, বার্মা থেকে রুবিসহ দামি পাথর আমেরিকায় পাঠানো ব্যবসার ওপর নিষেধাজ্ঞা ফিরে আরোপ, আর সামরিক বাহিনীর জন্য নেয়া আমেরিকার স্পন্সরড যেকোনো কর্মসূচি স্থগিত করে দেয়া। এক কথায় আমেরিকান রাষ্ট্রের সাথে বর্মি আর্মি সদস্যদের সব ধরনের যেকোনো সংশ্লিষ্টতা ও যৌথ তৎপরতা স্থগিত।
তবে এবারের সারকথায় গুরুত্বপুর্ণ দিক হল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতে দেখতে চায় আমেরিকা এই দাবিটা ছিল মুখ্য। আর, একথা শুনে জেনারেলদের কাপড় নষ্ট করে ফেলার জন্য যথেষ্ট। ভারতের মিডিয়া ভাষ্যকারদের মতে, ‘ভারত নাকি প্লট হারিয়ে চীনের কাছে হেরে হাত গুটিয়ে’ নিয়েছে। তাই বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া’ নিয়ে আলাপে বসতে আয়োজন করে দিয়েছে নাকি চীন। কিন্তু তাতে আমাদের মন্ত্রী দেশে ফিরতে-না-ফিরতেই যাকে বলে দু’জনে দুই মন্ত্রী দু’দিকে দুই ধরনের কথাতে হয়ে পড়েছেন একেবারে ‘ফল এপার্ট’। তাতে বোঝা গেল যে বর্মি জেনারেলদের শায়েস্তা করা চায়নিজ কূটনীতির কাজ নয়। এ ব্যাপারে চায়নিজরা চাইলে আমেরিকানদের কাছে মধ্যস্থতাকারীর কাজে কূটনৈতিক কিছু শিক্ষা নিতে পারে। আচ্ছা এটা কি জানা কথা না যে, পিছলা বার্মিজ জেনারেল ভাষ্য বদলে দেবে। অতএব আগে থেকেই চীনাদের ‘দুটা মানে হয়’ এমন সুযোগ যাতে না থাকে এমন শব্দ বা কথা না রাখা – সেই ফুটা বন্ধ করার ব্যাপারে চীনাদের সাবধান হওয়া দরকার ছিল!

কিন্তু এরও আগে যে কথা বলতে হবে, তা হলো- ১৯৭০-এর দশক থেকে নেয়া চীনাদের পলিটিক্যাল দায় বা সংশ্লিষ্টতা না নিয়ে গ্লোবাল পলিটিক্যাল-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে কেবল অর্থনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্টতায় থেকে মাখন খেয়ে যাবো খালি, চীনাদের এই বুদ্ধি অচল-অকেজো এটাই প্রমাণ হয়েছে। কারণ আমরা দেখছি, আমেরিকানদের সামান্য একটু নাড়াচাড়াতেই ভয় পেয়ে বর্মি জেনারেলদের কী করে চীন রক্ষা করবে তা নিয়ে চীনকে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। চীনাদের হাতে ভেটো ক্ষমতা থাক আর না থাক কিছু যায় আসে না তাতে। এথেকে চীন কী শিক্ষা নিয়েছে যে,  দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। অর্থনৈতিক শক্তি বা মুরোদ আপনার অঢেল থাকতে পারে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক শক্তির বিকল্প নয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক কমিটমেন্ট, নীতি-অবস্থান থাকতেই হবে, এসব দিক- তো আছেই। বাংলাদেশ-মিয়ানমারকে একসাথে বসানোর কাজে চীনাদের নামা প্রমাণ করেছে রাজনৈতিক সমাধানের পথ কী জিনিস। এটা রোহিঙ্গারা মরুক যা হোক, আর্মি জেনারেলদের কাছ থেকে বিনিয়োগ আর ব্যবসা বাগানোর কাজটা ভালো জানলেই চলবে – চীনের অনুমান যে মিথ্যা ছিল তা চীনকে বুঝিয়ে দিয়েছে। এই ধারণার যে ভিত্তি নেই, এটা মিথ্যা ও অচল তা বুঝিয়ে দিলেও কী চীন সে শিক্ষা নিয়েছে আমরা নিশ্চিত না। কারণ চীনকে ‘রাজনৈতিক কমিটমেন্ট নেগোসিয়েশন’ এর গুরুত্বের কথা মেনে নিতে হয়েছে। আর আসলে রোহিঙ্গারা সব অত্যাচার নিষ্পেশন সহ্য করতে হয়েছে কথা ঠিক কিন্তু তা করে  সারা দুনিয়াকে রোহিঙ্গা ইস্যু দেখিয়ে দিয়েছে যে দুনিয়া চলে দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। রাজনৈতিক কমিটমেন্ট তাতে লাগবেই। আর তা নাই বলে, চীনাদের দুনিয়ার গ্লোবাল নেতা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

উপরের এসব কথার উপর দাঁড়িয়ে আর একটা কথা বলে দেয়া যায়।  কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র দুনিয়াকে অ্যাম্পায়ার হিসেবে নিজের নেতৃত্বে চালাতে কখনই পারবে না, কখনোই সম্ভব হবে না। এর মূল কারণ রাজনৈতিক কমিটমেন্ট না দেখিয়ে, হিউম্যান রাইটসকে নিজের ইস্যু গণ্য না করে দুনিয়া চালানো অসম্ভব। রিপাবলিক রাষ্ট্র আর তাতে মানুষের  মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য ইনসাফ কায়েম ইত্যাদিতে মানবাধিকার সুরক্ষার ইস্যু আগামীতে আরো সিরিয়াস ইস্যু হয়ে উঠবে দুনিয়াতে। কমিউনিস্ট জগতে যার কোনো ন্যূনতম ধারণা বা আমলই নেই। কমিউনিস্টদের এখনো ধারণা, ‘তাদের বেইজ্জতি করতেই’ নাকি আমেরিকা এই ইস্যুটা হাজির রাখে। এর চেয়ে অজ্ঞতার আর কী হতে পারে! এর মানে কি কমিউনিস্ট বলতে চাইছে দুনিয়াতে গণহত্যা ক্লিনজিং রেসিজম – এগুলো চলবেই? তাই কি? তবে আমি শিউর মাফিয়া রাষ্ট্র রাশিয়ার পুতিন অথবা চীনে নতুন জেঁকে বসা শি জিনপিংয়ের ‘মডার্ন সমাজতন্ত্র’ নামে সোনার পাথরের বাটি ধারণার ভেতর এর কোনো জবাব পাওয়া যাবে না।

কিন্তু আমেরিকানরা কত দূর যাবে? রোহিঙ্গারা কি ঘরে ফিরবে? আমেরিকানরা কতটা সিরিয়াস? অর্থাৎ উপরে আমেরিকার সৎ পথে রওনা হবার অনেক ইঙ্গিত দিবার পরেও আমি সন্দেহ রাখছি যে  আমেরিকা শেষ মাথা পর্যন্ত যাবে কীনা? কতদুর যাবে?  বাংলাদেশের মানুষদের জন্য এসব মাপার দ্রুত একটা মাপকাঠি দেই।

‘এশিয়ায় আমেরিকান (নিরাপত্তা) স্বার্থ আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে’ এই নীতিতে ২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বুশ প্রশাসন চালু করে দিয়ে গেছে। এই কথার একটা ইম্পিকেশন অর্থে সারার্থ হল, সেই থেকে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক দিয়ে রেখে গেছিল। সেটা এখনও ওরকমই আছে। ট্রাম্প হয়ত ব্যাপারটা নিয়ে ভোকাল ততপর নয়। কিন্তু রুটিন প্রসাশনের গাইডিং প্রিন্সিপাল এখনও সেটাই। এখন এই সপ্তাহ ট্রাম্পসহ স্টেট ডিপার্টমেন্টের মন্ত্রী মুরুব্বিরা মানে রেক্স টিলারসন এবং আন্ডার সেক্রেটারিসহ এভাবে সবাই আমাদের দেশ বা পড়শি দেশে থাকবে। এগুলো যত যা-ই ঘটুক যতক্ষণ না আমেরিকা আমাদেরকে ভারতের কাছে দিয়ে রাখা  বন্ধকদশা থেকে ছুটিয়ে আমাদের সাথে সরাসরি ডিল না করবে, এই ব্যাপারে স্পষ্ট অবস্থান নিবে তত দিন অন্য যাই কিছু আমরা দেখি না কেন আমেরিকার ওপর আমাদের আস্থা রাখার কোনো কারণ সৃষ্টি হয়নি এটাই বুঝতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

সুষমার সফরে মতভেদ প্রকট হয়েছে

সুষমার সফরে মতভেদ প্রকট হয়েছে

গৌতম দাস

২৮ অক্টোবর ২০১৭, শনিবার

http://wp.me/p1sCvy-2kx

 

গত ২২-২৩ অক্টোবর ২০১৭ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। এক দিক থেকে দেখলে, এটা একটা বকেয়া সফর এই অর্থে যে, গত আগস্ট মাস থেকেই হবু এই সফর নিয়ে কথা হচ্ছিল; কিন্তু নানান কারণে হতে পারছিল না। অবশেষে অক্টোবর মাসে এসে এটা হতে পেরেছে। আর রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থানের ভিন্নতা যখন প্রকটভাবে স্পষ্ট কিন্তু এক দেখানোর চেষ্টাও সমান ততপর চলছে, সে পটভূমিতে এ সফর হয়েছে। তাই বলা যায়, সুষমা স্বরাজের এবারের সফর হলো ভারত ও বাংলাদেশের মতভিন্নতা রেকর্ড করে রাখার সফর।

ভারতের অবস্থান বার্মার রোহিঙ্গা নির্মূলের নীতি ও বর্বরোচিত তৎপরতার পক্ষে  এবং এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার। কিন্তু এর কারণ কী? এশিয়াতে ভারতের প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সাথেই চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্যভাবে। এই সম্পর্কগুলোকে ঠেকানো অসম্ভব। কারণ ভারতের পড়শি দেশগুলোতে দীর্ঘ দিন ধরে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ উপেক্ষিত হয়ে আছে। অবহেলায় এগুলোকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফেলে রাখায় এসব পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রে বিনিয়োগ পাওয়ার আকাঙ্খা উঠেছে চরমে। অন্য দিকে, একালের চীনের বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা এসব দেশের দোরগড়ায় হাজির। তাই, এই দুইয়ের মিলন ঠেকানো অসম্ভব। কিন্তু ভারত চাচ্ছে এসব দেশ বিকশিত না হয়ে ভারতের ক্ষুদ্র সামর্থ্য মোতাবেক এর সাথে তাল মিলিয়ে বামন হয়ে থাকুক; যেটা ভারতের সীমিত মাত্রার অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তুল্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্রই নিজ অর্থনীতিকে বামন করে রাখতে পারে না। ফলে ভারতের এহেন নীতির শেষ ফলাফল হচ্ছে – ওসব রাষ্ট্রে ভারতের ভাগে বড়জোর ছোট কোনো অবকাঠামো প্রকল্প ভাগে পাওয়া। বার্মাতে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতার ফলও তাই হয়েছে। কিন্তু বার্মিজ সেনাবাহিনী খুবই সাফল্যের সাথে চীন ও ভারত – এই দুই রাষ্ট্রকে রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে সমর্থক হিসেবে হাজির হতে বাধ্য করেছে। চীন ও ভারত উভয়েই প্রতিযোগিতা করে বার্মা সরকারের রোহিঙ্গাদেরকে নির্মূল করে ধুয়েমুছে সাফ করার কাজের স্বপক্ষে  সমর্থন নিয়ে হাজির হয়ে গেছে। ভারত ও চীন উভয়েরই রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে দাঁড়ানোর পেছনে খোঁড়া যুক্তি একটাই, ২৫ আগস্ট আরসা গোষ্ঠী নাকি ‘সন্ত্রাসবাদী’ আক্রমণ চালিয়েছে। তাই ভারত ও চীনের সরকার বার্মিজ সরকারের বিরুদ্ধে কথিত  ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা’কে সমর্থন করছে। এ থেকে স্পষ্ট, কথিত ‘আরসা আক্রমণ’ এই অজুহাত চীন, ভারত এবং বার্মার সরকার সবার জন্যই রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে খুবই প্রয়োজনীয় এক সাফাই দাতা। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কথিত আরসা (ARSA) আক্রমণ তাহলে আসলে কার পক্ষে সহায়তা করেছে, আরসা কী রোহিঙ্গাদের পক্ষের সংগঠন? নাকি এটা কাদের কাজে লাগছে? আরসা কাদের সংগঠন? নাকি আরসা বলে সক্ষম কোন সংগঠন কী আদৌও আছে?

এর আগে ২০১২ সালের রোহিঙ্গা নির্মূলের সময় ভারত বার্মিজ সরকারের কাছে ‘কৃতিত্ব’ জাহির করেছিল যে, ভারত বাংলাদেশের সরকারকে প্রভাবিত করেছে এমনভাবে যে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে সে দেশে আশ্রয় নিতে দেয়নি। বাংলাদেশ নিজ সীমান্ত রোহিঙ্গাদের জন্য খুলে দেয় নাই। ফলে রোহিঙ্গাদের সীমান্ত পার হয়ে প্রবেশ করতে দেয়নি এবং এ জন্য দুর্যোগের সেই পুরাটা সময় সীমান্ত বন্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছিল। একইভাবে ২০১৭ সাল এবারও শুরুর দিকে একই কৃতিত্ব নিতে পেরেছিল ভারত। আমাদের সরকারও প্রথম সপ্তাহে সীমান্ত বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু এরপর আর পারেনাই। আভ্যন্তরীণ নিজ জনমতের চাপে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে ছিল যে, সীমান্ত বন্ধ রাখার চাপ হয়ে গিয়েছিল সরকারের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য গণবিস্ফোরণের চাপ। সীমান্ত না খুলে দিলে বাংলাদেশ সরকার যেন হয়ে দাঁড়াত রোহিঙ্গাদের ওপর সব নির্যাতনের মূল হোতা। এই বাস্তবতা ভারত বা বার্মিজ সরকারের ইচ্ছামতো বয়ান দেয়া অসম্ভব করে তোলে। অথচ ২০১২ সালে এরাই “রোহিঙ্গারা জঙ্গী” এই বয়ানের সাফাই তুলে সীমান্ত বন্ধ রাখা সম্ভব করেছিল। কিন্তু এবার নিজের বয়ান নিজে গিলে খেয়ে ভুলে গিয়ে বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত খুলে দিয়েছিল শরণার্থীদের জন্য। উলটা “মানবাধিকার রক্ষাকর্তা মা” বলে ক্রেডিট দাবি করতে ছুটেছিল। অথচ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের অবস্থানের মৌলিক ভিন্নতা সেই থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ৬ সেপ্টেম্বর বার্মা সফরে গিয়ে সামরিক বাহিনীর রোহিঙ্গা নির্মূলকে ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা’র কাজ বলে বাহবা দিয়ে এসেছিলেন। বার্মার এই কথিত সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের কাজে মোদি গভীর উদ্বেগ দেখিয়ে এসেছিলেন। (Prime Minister Narendra Modi said on Wednesday that India shared Myanmar’s concern about “extremist violence” in its Rakhine state, …) এটাই হল রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের প্রকৃত অবস্থান।

অনেকে সুষমা স্বরাজের এবারের বাংলাদেশ সফর থেকে ‘আবিষ্কার’ করছেন, সুষমা তো এবার এই সফরে এসে ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ দাবি জানিয়েছেন। ফলে এটা ভারতের অবস্থানের বিরাট পরিবর্তন। যেমন ফলাও করে বিবিসি লিখছে, “……বিবৃতিতে সুষমা স্বরাজ রোহিঙ্গা শব্দটি উল্লেখ না করেই বলেন, ‘আমরা কোফি আনান কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে সেগুলোর বাস্তবায়নকেও সমর্থন করি’।” যেন এটা ভারতের এক বিরাট অগ্রগতির অবস্থান।

 

বাস্তবে মোটেও তা নয়। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ ইচ্ছা তো খোদ সু চিরও আছে বলে তিনি বহু আগেই জানাচ্ছেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সু চির কথায় সাথে একটা ‘যদি বা কিন্তু’ আছে। তা হল, যারা নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারবে তিনি কেবল তাদেরই ফেরত নেবেন বা কেবল তাদের বেলায় আনান কমিশনের রিপোর্ট ‘বাস্তবায়ন’ করবেন। সু চি ভাল করেই জানেন যে,  লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিজ নাগরিকত্বের প্রমাণ তো দিতে পারবেন না। ফলে সু চিকে ‘সাত মণ ঘিও ঢালার দরকার হবে না এবং রাধাও নাচবে না।’ অতএব ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ খায়েশ প্রচার করতে খোদ সু চি নিজের কোনই সমস্যা দেখেন নাই।

আর ঠিক একইভাবে সুষমা স্বরাজও বলেছেন, আমরাও ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন’ সমর্থন করি। এটা বলায় তারও কোনো সমস্যা নেই। কারণ তিনি জানেন, খোদ সু চি যে কথা বলেছেন, সে কথা বলতে সুষমার নিজের বলতেও কোনো অসুবিধা নেই। এ ব্যাপারে বরং ভারতের ‘নীতি’ খুবই সোজাসাপ্টা। খোদ বার্মা যে ভাষায় ও বয়ানে যা অবস্থান নেবে, ভারতও সেটা করবে। এটাই হলো ভারতের বাস্তব অবস্থান। বার্মা সরকার ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ ব্যবহার করে না, কেউ করুক তাও চায় না। ফলে সুষমা স্বরাজের সফরে ভারতের লিখিত ভাষ্য হল, ‘রাখাইন প্রদেশের ডিসপ্লেসড বা বাস্তুচ্যুত’ জনগোষ্ঠীকে ফেরত নিতে হবে। এক কথায় বললে, বার্মার অবস্থানই ভারতের অবস্থান। এটা বোঝাতে অস্পষ্টতা রাখেনি ভারত।
ভারত তার অবস্থান যে একচুল বদলায়নি রোহিঙ্গা ইস্যুতে এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, সুষমা স্বরাজের সফর উপলক্ষে ভারতের পররাষ্ট্র দফতর থেকে যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে সেখানে লেখা একটি পুরনো বাক্য হলো- ’I may add that India is deeply concerned at the spate of violence in Rakhine State of Myanmar. We have urged that the situation be handled with restraint, keeping in mind the welfare of the population’. এর প্রথম বাক্যটা পয়দা হয়েছিল গত ৬ সেপ্টেম্বর মোদির বার্মা সফরকালে, আর দ্বিতীয় বাক্যটা যোগ করা হয়েছিল মোদি সফর শেষ করে ভারতে ফিরে আসার পরে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার পরে।

আমরা বরং সুষমা স্বরাজের সফরকালে বলা, নতুন আর এক বাক্যের কথা মনে রাখতে পারি। সুষমা বলেছেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হলো, রাখাইন প্রদেশের ব্যাপক আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন যা ওই প্রদেশে বসবাসকারী সব কমিউনিটির জনজীবনে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে’। সুষমার এবারের সফরে নতুন যোগ হওয়া বাক্য এটা। কিন্তু ভারত যে রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সমাধান চায় না, বরং বার্মা সরকারের চোখেই দেখে সঙ্কটটিকে, এর প্রমাণ হচ্ছে এই বাক্যগুলো। রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের সমূলে নির্মূল করা হচ্ছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার এ কারণে হচ্ছে না যে, কোনো অসম সুযোগ-সুবিধা তাদের দেয়া হয়েছে। তারা অন্য জনগোষ্ঠীর চেয়ে কম অথবা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, সঙ্কট সে জন্য নয়। বরং আদৌ রোহিঙ্গারা বার্মার নাগরিক হিসেবে বসবাস করতে পারবে কি না, কোনো মুসলমান জনগোষ্ঠী বৌদ্ধদের পাশাপাশি রাখাইন প্রদেশে বাস করতে পারবে কি না, এবং নাগরিক হয়ে থাকতে পারবে কি না, এটাই মূল ইস্যু।
লক্ষণীয় যেটা বিষয় নয়, ইস্যু নয় সেসব কথা সুকৌশলে তুলে আনছেন সুষমা স্বরাজ। আর এভাবেই উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কে প্রশ্রয় দেয়া এবং এর বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষকে আড়াল করে দেয়ার চেষ্টা করছেন।

বাংলাদেশের দিক থেকে যেটা এখন অবশ্য করণীয় হয়ে গেছে তা হল, রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশের একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট  অবস্থান স্থির করা এবং সে অনুযায়ে অবস্থান নেয়া। যাতে একেবারে নিজের জাতীয় স্বার্থে এই অবস্থানের পক্ষে বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন এক সাথে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের স্বার্থ একমাত্র এভাবেই অটুট থাকতে পারে। এরপর দেশে-বিদেশে ও জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন ফোরামে এর পক্ষে তৎপরতা চালানো হতে পারে আমাদের সঠিক অবস্থান। একমাত্র সে ক্ষেত্রেই আমরা বার্মার সরকারের ওপর যে চাপ বাড়ছে এর সুবিধা নিতে পারব।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ অক্টোবর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ভারতের সাপ ও ওঝার কুটনীতি

ভারতের সাপ আর ওঝার কূটনীতি

গৌতম দাস

১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭,মঙ্গলবার, ১২ঃ৩৫

http://wp.me/p1sCvy-2i4

 

সাপ ও ওঝা কুটনীতি। .মানে সাপ হয়ে কাউকে কামড়ানোর পরে আবার ওঝা হয়ে সেই বিষ নামাতে আসার ভান করা। কিন্তু এটা কী কূটনীতি হতে পারে? কুটনীতির মধ্যে বুদ্ধি, শঠতা, দুরদর্শীতা, কাছে ও দুরের স্বার্থ ইত্যাদি সবই থাকে। কিন্তু অন্তত সকাল বিকাল মিছা বলে ধরা খাওয়া বেকুব কেউ হয় না।  অথচ ভারত তাই হয়েছে। এটা কে বলে কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব। আর এর সাগরেদ হয়েছে বাংলাদেশ সরকার। আমাদের সরকার বলেছিল, বার্মার সাথে যৌথ ট্হল দিতে চাই যাতে রোহিঙ্গার বাপও না আসতে পারে। আবার এখন বলছে, ১৬ কোটি লোক খাওয়াতে পারলে ওদের খাওয়াতে পারব না কেন।  এরা সকলে ধরে নিয়েছে যে মানুষ এতই বোকা যে তারা কিছুই দেখবে না, বুঝতেও পারবে না? অথচ এটা অসম্ভব! এটা হয় না, হতে পারে না। তবু লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে অসহায় ভারত এই কাজই করেছে, বাংলাদেশকেও সাথে নিয়ে ডুবেছে।  সব হারিয়ে দুস্থ ভারত এখন সাপ-ওঝার কূটনীতিতে নেমে গেছে।

মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের উপর বার্মার সেনাবাহিনী ও সরকারের নির্মুল অভিযান বহু পুরানা কাল সেই ১৯৭৭ সাল থেকেই চলে আসছে। কেবল কিছুদিন পর পর এই এথনিক ক্লিনজিং বা নির্মুল অভিযানের জোয়ার উঠতে দেখা যায়। এবারের পর্বে মায়ানমারে রোহিঙ্গা মারা ও খেদানো শুরু হয়েছিল ২৫ আগষ্ট রাত থেকে। প্রত্যেক বারের মত এবারও বার্মা সেনাবাহিনীকে এক নতুন অজুহাত দিতে দেখি আমরা। এবারের অজুহাত হল, আরসা নামে রোহিঙ্গাদের এক সামরিক সংগঠন বার্মার নিরাপত্তা বাহিনীর উপর নাকি কিছু আক্রমণ চালিয়েছে। কিন্তু তাতে পরিণতি বা ফলাফল কী হয়েছে? এখন আমরা দেখছি তাতে ফলাফল হল, বর্মীজ সামরিক বাহিনী এপর্যন্ত চার লাখের মত রাখাইন রোহিঙ্গাদের উপর নির্মুল অত্যাচার নিপীড়ন করেছে আর হাজার চারেক হত্যা করেছে। তাহলে কে কার পক্ষে কাজ করল? মায়ানমার তাদের উদ্বাস্তু করল কেন? ইন্টার নাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ অবশ্য একটা সাফাই টেনে উল্লেখ করেছে, আরসা সংগঠনের হামলার প্রতিক্রিয়ায় নাকি সেনাবাহিনী একটা “ক্লিয়ারেন্স অপারেশন” চালিয়েছে। [In response, the military is conducting “clearance operations” across ……] । কিন্তু আরসা সংগঠন হামলা চালালেই বর্মী সেনাবাহিনী কোন “ক্লিয়ারেন্স অপারেশন” কী  চালাতে পারে এই প্রশ্ন কেউ তুলছে না। কে কাকে কী ক্লিয়ার করল? মানুষ ক্লিয়ার করল মানে কী? ক্রাইসিস গ্রুপ এই রিপোর্ট কী আসলে সেনাবাহিনীর স্বীকার করে নেওয়া যে তারা রোহিঙ্গা নির্মুল করেছে! ক্লিনজিং!

আবার ২৭ আগষ্টের রয়টার্স পরিবেশিত খবরে দেখা যাচ্ছে বার্মা সেনাবাহিনীর এক বিবৃতি পাঠিয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে প্রায় “৮০০ বাঙালী টেররিস্ট” (রোহিঙ্গা উচ্চারণ না করে বর্মীজ সরকার তাদের বাঙালী বলে) কে তারা ‘মোকাবিলা’ করেছে। সেনাবাহিনীর ‘মোকাবিলা’ মানে বুঝতে হবে মেরে ধরে হত্যা নির্যাতন ধর্ষণ করে ঘরছাড়া উদ্বাস্তু করা। কিন্তু সেনাবাহিনী যে ৮০০ সংখ্যা উল্লেখ করে যতই আরসার (ARSA) কথিত হামলাকে অজুহাত হিসাবে দেখাক না কেন, বাস্তবে আমরা দেখছি, চার লাখের উপর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে উদ্বাস্তু করা আর প্রায় চার হাজারের মত হত্যা করা হয়েছে। ফলে ৮০০ সংখ্যার উল্লেখ এরপরেও এই অত্যাচারের ফিগারগুলোর পক্ষে ন্যায্যতা তৈরি করতে পারে না। ফ্যাক্টস হল, বরং এতে এখানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ঘটেছে তা প্রমাণিত হয়। আসলে শাহবাগী একটা যুক্তি আছে এখানে। যুক্তিটা ামরা শাহবাগের রমরমা যুগেও দেখেছি যে বলা হত, কোথাও হয়ত পুলিশের উপরও কিছু পালটা  হামলা হয়েছে। এইবার সেটাকে অজুহাত হিসাবে নিয়ে এরা সাফাই গাইত যে এজন্যই পুলিশ এবার নির্বিচারে হত্যা, বলপ্রয়োগ নির্যাতন, পায়ে গুলি করা ইত্যাদি সবই করেছে এবং পুলিশ এমন সবকিছু করতে পারে এবং এটা জায়েজ। অথচ ফ্যাক্টস ও আইনের কথা হল, এটাকে পুলিশী ভাষাতেই বলে ‘একসেস বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ বলে। অর্থাৎ পুলিশ বা নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে যখন কোন সিভিল গ্রুপ মুখোমুখি হয় বা মারামারি হয় তখন সেটা জমি নিয়ে দুপক্ষের লড়াই বা পাড়ার দুই পক্ষের পোলাপানের মারামারির মত না; যেখানে উভয় পক্ষই যথেচ্ছাচার অপরপক্ষের উপর যেকোন মাত্রায় বলপ্রয়োগ করতে পারে। কারণ আলোচ্য ক্ষেত্রে এখানে একপক্ষ আইন শৃঙ্খলা বাহিনী। তার কাজ কখনই অপরপক্ষকে নির্মুল বা ঘরছাড়া করা নয়; এবং এই লক্ষ্যে সে ইচ্ছামত মাত্রার বলপ্রয়োগ একেবারেই সে করতে পারে না। বরং যতটুকু বলপ্রয়োগ করলে সে অপরপক্ষকে কাবু করতে পারবে ঠিক ততটুকুই সে বলপ্রয়োগ বা  “ওভার-পাওয়ার” করবে। এর বেশি না। কোন প্রতিহিংসা তো নয়ই। আর এর বেশি হলে বরং ঐ নিরাপত্তা বাহিনী উলটা ফৌজদারি অপরাধ করেছে বলে গণ্য হবে। এটাকেই একসেস বা “অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ” এর অপরাধ বলে। আর এটাই হল যে কোন ফোর্সের ‘ফোর্স এনগেজমেন্ট রুল’, ‘বলপ্রয়োগে সংশ্লিষ্ট’ হবার পক্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর পালনীয় শর্ত। এতে পরিস্কার যে বর্মীজ বাহিনীর নিজেরই দেয়া তথ্য ও কথিত  যুক্তিকে সত্যি হিসাবে যদি ধরি তবুও নিরাপত্তা বাহিনী অবশ্যই অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করেছে। ফলে এখানে স্পষ্টত সেনাবাহিনীই অপরাধ করেছে। মানবাধিকার বা হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন হয়েছে। ওদিকে গণতন্ত্রের নোবেল নেত্রী সু চি আবার দাবি করে বিবিসিকে বলেছেন, “রাখাইনে রোহিঙ্গা জঙ্গীরাই নাকি রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে আগুন দিয়েছে”। এখন কার কথা আমরা বিশ্বাস করব এও আর এক মুসিবত!

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি বার্মা সফরে ছিলেন গত ৫-৭ সেপ্টেম্বর।  বিবিসি লিখেছিল, এই সফরে ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। আর “সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা” করা। অর্থাৎ নিজে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়া অথবা কাউকে হারানোর জন্য কোন রাষ্ট্র কারও গণহত্যা ও নির্মূলকরণে সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছিল মোদির ভারত। সুচির সাথে মিডিয়ার সামনে সাক্ষাতে মোদি বলেছিলেন তিনি সুচির ‘পাশে আছেন’। আর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ হল, তিনিও বর্মী সেনাবাহিনীর উপর সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানান। আর সু চি সাথে তাল মিলিয়ে মনে করেন, এটা রোহিঙ্গাদের নির্যাতন বা নির্মুল করে ফেলার ইস্যু না বরং এটা হল,একটা “ইসলামি টেররিজমের” ইস্যু। ফলে মোদি তা সঠিক মনে করেন ও সু চি কে সমর্থন জানান। সুনির্দিষ্ট করে বললে এটা ছিল ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। অবশ্য মোদির এই সফর শুরুর আগের সপ্তাহে ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হঠাত করে বলা শুরু করেছিলেন ভারতে নাকি ৪০ হাজার রোহিঙ্গা আছে (জাতিসংঘের উদ্বাস্তু কমিশনারের মতে ১৬ হাজার), এবং তাদের বের করে দেয়া হবে বলে প্রচার শুরু করেছিলেন। এটাও বার্মার সেনাবাহিনী ও সু চির মন পাবার জন্য ভারতের কাতর এক প্রচেষ্টা তা বলাই বাহুল্য।

কিন্তু মোদির এই সফর শেষে তিনদিন পরে ১০ সেপ্টেম্বর ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এক রিপোর্ট করেছে। রিপোর্টে শুরুতেই লিখছে যে মোদি তার সফরে রোহিঙ্গা ইস্যুটাকে দেখেছেন চরম সন্ত্রাসবাদের ঘটনা হিসাবে এবং তিনি নিরাপত্তা বাহিনীর উপরে হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অথচ রোহিঙ্গাদের উপর পরিচালিত ক্লিনজিং – নির্যাতন ও উদ্বাস্তু হবার দিকটা নিয়ে কিছুই বলেন নাই। অথচ ঐ সফর শেষে আচমকা ১০ সেপ্টেম্বর এই বিবৃতিতে বলেছেন, “আমরা আবেদন রাখব রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি ‘সামালে আর পরিপক্কতার’ সাথে যেন নাড়াচাড়া করা হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর পাশাপাশি ‘বেসামরিক নাগরিকের কল্যাণের’ দিকটাও যেন দেখা হয়”। বেশির ভাগ অন্যান্য পত্রিকা শুধু এতটুকুওই ছেপেছে, আর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এছাড়াও এক বাড়তি বাক্য ছেপেছে, ‘পিছনের কারণ’ বলে। তা হল, ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার তিনি নাকি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের সাথে দেখা করার পরেই ভারত এই মত বদলিয়ে ফেলে। আসলে এটা হল ভারতের নিজের ইউ-টার্ণের পক্ষে এক সাফাই নিজ উদ্যোগে বাজারে ছেড়ে রাখা। আর এই উলটা মোড় যে কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব তা পরোক্ষে স্বীকার করে নেয়া। ব্যাপারটা হল, যদি বাংলাদেশের ঐ হাইকমিশনার এতই বুদ্ধিমান, কার্যকর ও করিতকর্মা হয়ে থাকেন আর ভারতের কূটনৈতিকদের কাজের ভুল সংশোধনের মূল ব্যক্তি হয়ে থাকেন তবে ভারতের উচিত তাকে স্থায়ীভাবে ভারতের কূটনৈতিক উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া, যাতে ভবিষ্যতে এমন বেকুবি আর দেউলিয়া সিদ্ধান্ত ভারত আর না নিয়ে বসতে হয়। তাই নয় কী!

ব্যাপারটা হল সকালে মোদি যাকে “রোহিঙ্গা টেরর” বলছেন বিকেলে তারই সুরক্ষার জন্য আবার সু চিকে “বেসামরিক নাগরিকের কল্যাণের দিকটা সামলাতে” বলছেন। নিঃসন্দেহে ভারতের কূটনীতিতে একইসঙ্গে সাপ আর ওঝার ভুমিকা পালনের এক ক্লাসিক উদাহরণ।

কিন্তু আসলেই কী ভারতের কূটনীতিকেরা এতই বেকুব যে তাঁরা নিজেদের এই স্ববিরোধিতাটা দেখতেই পায় নাই? না, বরং এটা আসলে জেনেশুনে নিজেকে বেকুব বলে হাজির করা এবং মনে করা যে এতে বেশি লাভ হবে। অনেক পত্রিকাতেই ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মন্তব্যে আরও একটা বাক্য আছে। তা হল, “এটা বুঝাই যাচ্ছে যে সহিংসতা শেষ হয়েছে, রাজ্যে স্বাভাবিক অবস্থা দ্রুত ফিরে আসছে”।  অর্থাৎ ভারতের ফরেন অফিস বলতে চাইছে যে হা কথা সত্য, তাদের অফিস সকাল বিকেল  ভোল বদলিয়েছে। তবে বদলেছে কারণ রাখাইনে দাঙ্গা থেমে গেছে। কিন্তু এমন বাক্য ভারত লিখতে গেল কেন? সেপ্রসঙ্গের আগে বলতেই হয়, এটা খুবই অকূটনীতিক ভাষা। কারণ মায়ানমারে দাঙ্গা পরিস্থিতি ভাল বা উন্নতি হয়েছে কী না তা নিয়ে ভারত কথা বলার কে? এটা তার বলার কথা না, এক্তিয়ার নয়। এমনকি ভারত এটা জানলেও তা ওরবলা উচিত না বা বলার কথা না। কারণ তাতে ব্যাপারটা ভিন রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপের মত হয়ে যায়। তাই একমাত্র মায়ানমার বলতে পারে, আর এরপরেই সে ভাষ্য ভারত ব্যবহার করতে পারে মাত্র, এর আগে না। তাহলে ভারত এই কুটনীতিক রীতিভঙ্গ করল কেন?

কারণ, এবারে বার্মা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল কোন এক উছিলায় বাধ্য করে রোহিঙ্গাদের দেশ থেকে বের করে দেওয়া, যাতে  প্রায় চার লাখের উপরে এরা এরপর থেকে শরনার্থী ষ্টাটাস পায়। তাতে বার্মার লাভ হল যে,  বার্মা দাবি করছিল এরা বার্মার নাগরিক নয়। কিন্তু ওরা দেশের ভিতরে বসবাস করছিল বলে সেই বার্মার সে দাবি হালে পানি পাচ্ছিল না। তাই এবার ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বার্মার অর্জন হল, মূল জনগোষ্ঠির রোহিঙ্গাদের বের করে দেয়া সফল হয়ে গেছে। যদিও এতে কিছু পকেটে কিছু রোহিঙ্গা এরপরেও থেকে যেতে পারে কিন্তু মুল অংশ বের করে দেয়া গেছে। সুতরাং লক্ষ্য অর্জিত। তাই, এখন ভারত অবস্থান বদলালে তেমন অসুবিধা নাই। তাই ভারত নিজ উদ্যোগে দাবি করছে ‘দাঙ্গা থেমে গেছে’, ফলে তাদের অবস্থান বদল। তাহলে মূল কথা, সু চিকে ভারতীয় সার্ভিস পুরা মাত্রায় দেয়া হয়ে গেছে বলে ভারত অবস্থান বদলিয়ে নিয়েছে, তাতে যতই কূটনীতিক বেইজ্জতিই ভারতের হোক না কেন! অতএব এখন সময় হাসিনা-সুষমা গলা জড়াজড়ি করা। ত্রাণ পাঠানোর ছবি তোলা, আর মহড়া করার।

কেউ কম যায় নাই। চীনের গ্লোবাল টাইমস লিখেছে, বার্মার নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গীদের বিরুদ্ধে লড়ছে আর তাতে নিজের  উদ্বেগের কথা চীন জানিয়েছে। [backs Myanmar’s efforts to “safeguard peace and stability,”]। অথচ রোহিঙ্গাদের নির্মুল নির্যাতন ও উদ্বাস্তু হওয়াকে চীনের কাছে ইস্যু নয়। এর কোন উল্লেখ চীন করে নাই।  অর্থাৎ সবার রোগ একই। আর চীনের ঐ খবরের শিরোনাম হল, মায়ানমার নাকি “শান্তি আর স্থিতিশীলতা সুরক্ষা করছে” বলে চীন মনে করে। ফলে ভারতের মত চীনও পিছিয়ে না থেকে এখন ত্রাণ পাঠাতে ব্যস্ত।

আমেরিকাও তাই; সেও পিছিয়ে নাই। আমেরিকান উপ-সহকারী পররাষ্ট্র মন্ত্রী প্যাট্রিক মার্ফি গত ৮ সেপ্টেম্বর তিনিও নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। আর তিনি মনে করেন রাখাইনে রাজ্যে একা মুসলমানেরা নির্যাতিত নয়, মুসলমানদের হাতে অন্যেরাও নির্যাতিত। এটাই সু চির এর লাইন। সু চি চায় সবাই ‘এটা বিভিন্ন জনগোষ্ঠির মধ্যে জাতিগত দাঙ্গা’ এটা প্রচার করুক। আর সেনাবাহিনীর রোহিঙ্গা ক্লিনজিং বা সাফা করা আড়াল করুক।

 

গৌতম দাস

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – দুই

প্রথম পর্বের জন্য এখানে ক্লিক করুন।

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – দুই

গৌতম দাস
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার

দ্বিতীয় পর্বঃ
কেন বার্মা ও এর শাসকেরা এরকমঃ পটভুমি

http://wp.me/p1sCvy-2hE

 

দ্বিতীয় পর্বঃ
কেন বার্মা ও এর শাসকেরা এরকমঃ পটভুমি

১৯৪৮ সালের বৃটিশ কলোনি শাসকমুক্ত মায়ানমারের জন্মের আগে থেকেই দমন নির্মুল আর নির্বিচারে হত্যা, এই রাষ্ট্রকে ধরে রাখার একমাত্র উৎস হয়ে গেছে ও আছে। বার্মা বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যায় আকর্ণ ডুবে থাকার সমস্যা ওর জন্মের সময় থেকেই।  মায়ানমারের সবচেয়ে বড় এথিনিক জনগোষ্ঠি হল  ‘বার্মান’ বা ‘বর্মীজ’; এরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ ভাগ। এই বর্মী জনগোষ্ঠির রাষ্ট্র জন্মের পর থেকেই এর মূল সংকট হল অভ্যন্তরীণ অন্যান্য এথিনিক জনগোষ্ঠির সাথে সংঘাত;  অন্যভাবে বললে, বর্মীছাড়া অন্য এথিনিক জনগোষ্ঠিকে বর্মীজদের নিজেদের কর্তৃত্বের নিচে দাবায় রাখাকেই একমাত্র পথ হিসাবে বেছে নেওয়া – এটাই সব বৈরীতা ও সংঘাতের উতস। অথচ এক ফেডারেল ব্যবস্থা হতে পারত এর সহজ সমাধান। বৃটিশ শাসনামলেও মায়ানমারে কোথাও কোথাও স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ ছিল।  কিন্তু ১৯৪৮ সালে জন্মের পর থেকে মায়ানমারে কোন ফেডারেল ব্যবস্থা  চেষ্টা না করে বরং পুরানা স্বায়ত্বশাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে সবকিছু বর্মীজদের অধীনে আনার জবরদস্তির চেষ্টা করা হয়েছে। আর তা থেকেই শুরু হয়েছে Bamar. Chin. Kachin. Kayin. Kayah. Mon. Rakhine. Shan ইত্যাদি জনগোষ্ঠির বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র ততপরতা। পরে সামরিক ক্যু করে জেনারেল নে উইনের বিগত ১৯৬২ সালে ক্ষমতা দখলের পরও সেই বিচ্ছিন্নতাবাদে আকর্ণ ডুবে থাকা  অবস্থা থেকে বের হতে মায়ানমারের সরকারগুলো  “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” চর্চাকে উপায় হিসাবে হাজির করেছে। এই “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” এর আর নাম  “মায়ানমারিজম”। ফলে মায়ানমার রাষ্ট্রের আকার পরিচয় হয়েছে, “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী” ভিত্তিতে গড়া এক রাষ্ট্র। একমাত্র এতেই তারা ‘এক’ থাকতে পারবে  এমন আঠা বা গ্লু এর নাম হয়েছে “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ”, আর এর জিগির। যদিও এই নামের আড়ালে আসলে এক তীব্র ইসলাম বিদ্বেষ চর্চা করে এসেছে তারা।  ব্যাপারটা পরিস্কার হবে মায়ানমারকে ধর্মীয় জনসংখ্যার দিক থেকে দেখলে। গত ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে মায়ানমারের প্রায় ৮৮ ভাগ বৌদ্ধ,  ৬ ভাগ খ্রীশ্চান ও ৪ ভাগ মুসলমান। জনগোষ্ঠির বড় অংশ বৌদ্ধ বলে, এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের বয়ান তৈরি করে ফেলা হয়েছে যা আবার ইসলাম বিদ্বেষী করে সাজানো – একে নিজের রাজনীতিক ভিত্তি হিসাবে বেছে নিয়েছিল নে উইন সরকার। নে উইনের অনুমান ছিল এতে মুসলমান বাদে সব বিচ্ছিন্নতাবাদী জনগোষ্ঠিগুলোকে (প্রায় সবাই আবার বৌদ্ধ বলে ) “বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” এর পরিচয়ে বেধে রাখতে। এতে  পুরান বর্মীজ আধিপত্যটা উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের (ইসলাম বিদ্বেষ) আড়ালে থেকে শাসনকাজ চালাতে পারবে। আবা ইসলাম বিদ্বেষী এই বয়ানটা  “বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে” উগ্র আর গাঢ় হতে সাহায্য করবে। মুসলমানেরা সব বৌদ্ধ জনগোষ্টির কাছে এক ইমাজিনড কমন শত্রু হিসাবে হাজির করবে।  এটাই অনেকে মায়ানমারিজম বলে। এই মায়ানমারিজম তৈরি করতে পারার প্রথম সফলতা আসে ১৯৭৭ সালে। একারণে ১৯৭৭ সাল থেকে নে উইন তৈরি রোহিঙ্গা সমস্যার প্রথম প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছিল এবং বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থী আসর জোয়ার দেখা গিয়েছিল। পরে ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় মায়ানমার বেশীর ভাগ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলেও, আবার ১৯৮২ সালের নতুন ইমিগ্রেশন আইন সবকিছুকে আগের চেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় নিয়ে যায়।  এরপর ২০০১ সালে আমেরিকার ওয়ার অন টেরর এর যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত থেমে থেমে সামরিক সরকারের রোহিঙ্গা নির্মুল অপারেশন বিভিন্ন সময় চলেছে। এরপর আগের ‘মায়ানমারিজম’ সাথে এবার বয়ানে ‘ইসলামি সন্ত্রাসের’ অভিযোগ তুলার সুযোগ যুক্ত হয়েছিল। ফলে তা নিজের দানবীয় উগ্রতার পক্ষে আরও সাফাই নিয়ে হাজির হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে এক বৃটিশ সাংবাদিক ১৯৭১ সালের প্রথমার্ধে অভিযোগ করেছিলেন আপনি পুর্ব-বাংলার শরনার্থী লোকদেরকে সন্ত্রাসী হতে সাহায্য করছেন। ইন্দিরার জবাব ছিল, ওরা কোনটা আগে হয়েছে, শরনার্থী না মুক্তিযোদ্ধা? একথার মধ্যে সব জবাব আছে। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গারা বুশ-ব্লেয়ারের ২০০১ সালে ওয়ার অন টেররের যুদ্ধ শুরু আগে থেকেই রোহিঙ্গারা শরনার্থী হয়েছে। কাজেই একথাটা মোদি-সুচির সন্ত্রাসের বয়ান ও অভিযোগকে ভিত্তিহীন করে দেয়।

তাই বলা যায়, মায়ানমারের মুল সংকট রোহিঙ্গা বা মুসলমান ছিল না, নয়। বরং ‘মায়ানমানিজম’ এই বয়ান হাজির করার দরকারে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যা তৈরি করা হয়েছে। আর এটা বলা বাহুল্য ৮৮% বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির দেশে ৪% মুসলমান নিজে ভিকটিমই হয়, অত্যাচারিত মজলুমই হয়। অন্যের উপর অত্যাচার নির্যাতনকারি বা অন্যকে নির্মুলের কর্তা সে হতে পারে না, সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যে সে সুযোগ বিরাজ করে না।

মায়ানমান পরিস্থিতি ২০০৬ -৭ সাল থেকে এক নতুন মাত্রা পায়। আর ততদিনে মায়ানমার ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনে জাতিসংঘের নিন্দা ও অভিযোগের মধ্যে আর  আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ভয়াবহ রকমের অবরোধের অধীনে। এমনিতেই জেনারেল নে উইনের শাসনামলে (১৯৬২-৮৮) বার্মা ছিল বাকশালী সমাজতন্ত্রের মত এক ‘নে উইনি সমাজতন্ত্রের’ অধীনে;  আর এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ঠ ছিল জেনোফোবিয়া বা বিদেশি-বিদ্বেষ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত মায়ানমার এমন হওয়ার পিছনে ওর দুটা গঠন বৈশিষ্ট উল্লেখযোগ্য।

এর একটা হল জেনোফেবিক যার উৎস হল ভারতবিরোধীতা। ১৮২৪ সালে বৃটিশদের বার্মা দখল নিবার পর থেকে,  বার্মাকে ভারতের এক প্রদেশ (১৮২৪-১৯৩৭) বানিয়ে কলোনি শাসকেরা শাসন চালাত। [১৯৩৭ সালের পর থেকে বার্মা সরাসরি বৃটিশ শাসিত কলোনি হয়েছিল।] এতে ভারতীয় নেটিভদের মাধ্যমে বৃটিশরা শাসন করত, ফলে ভারতীয় কর্মচারি বা ব্যবসায়ীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সেখানে ইত্যাদি। আর এখান থেকে একধরণের ভারতবিদ্বেষী জেনোফোবিক বৈশিষ্ট বার্মার জনমানসে ও  রাজনীতিবিদদের মধ্যে গেড়ে বসেছিল। ফলে বৃটিশেরা ১৯৪৮ সালে বার্মা ছেড়ে যাবার পর পর বহু ভারতীয় বার্মা ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর একই কারণে, ১৯৬২ সালে নে উইন সামরিক ক্যুতে ক্ষমতা দখলের পরে প্রায় চার লাখ ভারতীয় বার্মা ত্যাগ করেছিল অথবা মারা গিয়েছিল। (see Thant Myint-U’s recent fine historical travelogue, Where China meets India).

আর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট হল, ১৯৪২ সালের আগে সেকালের জাপান – কলোনি সাম্রাজ্যের মালিক জাপান – এই কলোনি মাস্টারের হাতে সেকালের বার্মার স্বাধীনতা- যোদ্ধাদের সামরিক ট্রেনিং হওয়া। বৃটিশদের হাত থেকে বার্মাকে কেড়ে নিবার পরিকল্পনায়, জাপানিজ কলোনি মাস্টার  মার্শাল তেজোর বাহিনীর হাতে, বেছে নেওয়া ত্রিশজন রাজনৈতিক তরুণ সামরিক ট্রেনিং পেয়েছিল। যারা পরে দেশ ফিরে প্রথম সামরিক সংগঠন ‘বার্মীজ ইন্ডেপেন্ডেন্ট আর্মি’ বানিয়েছিল আর ১৯৪২ সালে জাপানিজ বাহিনীর সহায়তায় এরাই বৃটিশদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। সু কি বাবা অং সান (Aung San) এর নেতৃত্বে উ নু (U Nu) আর নে  উইন (Ne win) ও রাখাইন রোহিঙ্গা আব্দুর রশিদ – টপ এদের নেতৃত্বে ছিল সেই ত্রিশজনের দল। এদের নেতৃত্বেই নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে বার্মার সামরিক বাহিনীর ‘বার্মীজ ইন্ডেপেন্ডেন্ট আর্মি’  (Burma Independence Army (BIA) গড়া হয়েছিল। বলা হয় জাপানিজদের দেয়া নির্মমতার ট্রেনিং, নির্যাতনের টেকনিক সেই থেকে বর্মীজ সেনাবাহিনীতে বৈশিষ্ট হয়ে যায়। পরে অবশ্য ১৯৪৫ সা্লে এসে এরা সবাই জাপান এম্পায়ারকে ছেড়ে বৃটিশ এম্পায়ারের পক্ষে সুইচ করেছিল। আর পরে এই ত্রিশ কমরেড এরাই ১৯৪৮ সালে নিগোশিয়েশন করে বৃটিশদের হাত থেকে বার্মাকে স্বাধীন করেছিল। আজও মায়ানমারে সব রাজনৈতিক সামাজিক গোষ্ঠির মধ্যে তাদের চিন্তা ও বয়ানে (সস্তাবুঝের) দেশপ্রেম ও জাতীবাদের উদাহরণ বা হিরো হয়ে আছে ঐ ত্রিশ জন। গেড়ে বসা ঐ ত্রিশজন সম্পর্কে নানান মিথ এবং তাদের চিন্তা ও বয়ান ভেঙ্গে নতুন করে তা ভেবে দেখা, ফিরে দেখা আর নতুন করে মুল্যায়নের সাহস না হওয়া পর্যন্ত মায়ানমারের রাষ্ট্র ও রাজনীতি তার নির্মমতা, নির্মুলের সামরিকতা থেকে মুক্ত হতে পারবে না।
কিন্তু এখনকার মূল প্রসঙ্গ হল, কলোনি শাসক জাপানিজদের হাতে জন্ম হবার কারণে ‘রাজনীতি’ বিষয়টাকে এই ‘ত্রিশ জেনারেল’ যতটা ক্ষমতা, সামরিকতার দিক থেকে বুঝেছিলেন ঠিক ততটাই যেন রাজনীতি বলতে একই সাথে আইডিয়া বা চিন্তাও – এদিকটা বুঝতে ব্যর্থ ছিলেন।  রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা ও সামরিকতা নয়, এর অন্যদিকও আছে। অন্যভাবে বলা যায়, একারণে বলা যায় মর্ডান রিপাবলিক স্টেট অথবা আধুনিকতা সম্পর্কে ততটাই তাদের জানাশুনার অভাব দেখা যায় বা তারা কম আগ্রহী ছিলেন। এই ঘাটতির কারণে পরবর্তিকাল  ঐ ত্রিশজনকে দেখা যায় দুটা ঝোঁকের পক্ষে ভাগ হয়ে যেতে; যারা রাজনীতিতে গেলেন আর যারা সামরিক বাহিনীতে গেলেন, এভাবে। সামরিক ধারায় যারা ছিলেন যেমন এদের শিরোমনি জেনারেল নে উইন, তার অভিযোগ রাজনীতিবিদ ধারার শিরোমনি উ নু এর প্রতি যে এরা কম দেশপ্রেমিক, এরা নিজেকে নিয়ে বেশি ভাবে, এরা ক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাখতে জানে না (অর্থাৎ কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমন) ইত্যাদি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বার্মার রাজনৈতিক ইতিহাস হল ঐ ত্রিশজন ও তাদের অনুসারীর – যারা রাজনীতিতে গেল আর যারা সামরিক বাহিনীতে গেলে এই দুভাগ হয়ে যাওয়া – আর পরস্পর পরস্পরের খামতি পুরণে দুপক্ষই অযোগ্য হিসাবে থেকে যাওয়া। যা একালেও রাজনীতিক বনাম সামরিক অফিসার এভাবে ভাগ হয়ে থেকে গেছে। মায়ানমার রাষ্ট্রের বৈশিষ্টেও এর বিরাট ছাপ রয়ে আছে।  মায়ানমারই সম্ভবত একমাত্র উদাহরণ যেখানে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা কমান্ডার ইন চিফ আর রাজনীতিক রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভাগ হয়ে আছে। এতে যেন খোদ রাষ্ট্রটাই ভাগ হয়ে আছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র এক ঠিকই কিন্তু তার আবার দ্বৈত-নির্বাহী।  এক ঘরে দুই পীর যেমন বসবাস করে থাকতে পারে না, দ্বৈত-নির্বাহীও তাই। নির্বাহী বা একজিকিউটিভ একজনই হয়, হতে হয়। নইলে সেটা ক্ষমতাই নয়। তাই কার্যত মায়ানমারে প্রধান একজিকিউটিভ হয়ে আছে সামরিক বাহিনী। যেমন ১৯৬২ সাল থেকে  সর্বেসর্বা হয়ে আছে এক মেলেটারী কাউন্সিল। এই কাউন্সিল হল আসলে পিছনে এক সামরিক বাহিনী আছে, যার মধ্যকার ক্ষমতার বিন্যাস বা সাজানো কাঠামোর শীর্ষ স্থানটাই হল কাউন্সিল। এরপর এর কাউন্সিলের অধীনে আবার একটা রাষ্ট্রও আছে। অর্থাৎ যেমন আমরা দেখতে অভ্যস্ত যে, রাষ্ট্রের ভিতরে সামরিক বাহিনী বলে এক প্রতিষ্ঠান থাকে। এখানে এর উলটা; সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানটা হল কাউন্সিল, আর সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটা রাষ্ট্রও আছে।  এখানে আবার  কমান্ডার ইন চীফ আর কাউন্সিল কথাটা সময়ে পাল্টাপাল্টি করে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যখন সামরিক ক্ষমতার একটা অংশ সিভিলিয়ান ফেসে হাজির রাখার অবস্থা তৈরি হয় তখন সামরিক বাহিনীর আবার একটা রাজনৈতিক দলও আছে। বাহিনীতে সক্রিয় চাকরিতে আছে এমন অফিসার আর অবসর নেয়া বুড়া জেনারেলরা এই দলের সদস্য হয়।  এর নাম Union Solidarity and Development Party (USDP)।  গত ২০১০ সালের আগে এটা সামরিক বাহিনীর এক এসোসিয়েশন নামে ছিল। এখন সেটাই এক রেজিষ্টার্ড রাজনৈতিক দল। আর সবচেয়ে বড় কথা হল,  কমান্ডার ইন চীফ চাইলে যে কোন নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভেটো দিতে পারে। গত ২০১৫ সালে সংসদ ঐ  USDP দলের দখলে ছিল, তখন একটা প্রস্তাব উঠেছিল ভেটো ক্ষমতা রদ করা হবে কী না এনিয়ে। যদিও বাহিনী শেষ এই প্রস্তাব বাতিল করে দেয়।  তা নিয়ে বিবিসির ২০১৫ জুনের এই রিপোর্টটা আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
দ্বৈত- নির্বাহী ক্ষমতার কথা উঠেছিল, মায়ানমারের  কমান্ডার ইন চিফ নিজেই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র  ও সীমান্তরক্ষা এই তিন মন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে থাকেন আর প্রেসিডেন্ট প্রধান নির্বাহি তিনি বটে, কিন্তু তিনি ঐ তিন মন্ত্রীকে মেনে নিয়ে এবার বাকী মন্ত্রী নিয়োগ দেন। ফলে নে উইনের হাতে আর্মির সেট করে দেওয়া এই বিশেষ রাষ্ট্র বৈশিষ্ট – ইসলাম বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ -এর  ভিতরে অধীনে থেকে সু কি কে নোবেল প্রাইজের ধ্বজাধারী হতে থাকতে হয়, কাজ করতে হয়। এব্যাপারটা সুকি চায় কী চায় না তাতে কোন ফারাক আসে না। অর্থাৎ কার্যত সুকিও এই মায়ানমারিজম চায়। এজন্য গত সপ্তাহে বিবিসি লিখেছে, “মিয়ানমারে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত মার্ক ক্যানিং  বিবিসিকে বলেছেন তিনি (সু চি) রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন। ‘বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ’ সেদেশ যেভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তাকে সমর্থন না করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে”। আবার একই কারণে সু চি এর জীবনীকার উইন্টেলের বরাতে বিবিসি ঐ রিপোর্টেই লিখছে,” ………তিনি (সু চি) এখন সেনা বাহিনীর পকেটে”। ………”মিস সু চি হাড়ে মজ্জায় বার্মিজ। আমার বলতে খারাপ লাগছে – কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারের পশ্চিমে রাখাইনে যা ঘটছে তা চরম জাতিবিদ্বেষী। সেখানে মুসলিম রোহিঙ্গাদের প্রতি সমন্বিত বিদ্বেষ রয়েছে”।

তাহলে ২০০৬ -৭ সাল থেকে মায়ানমার পরিস্থিতি নতুন কী মাত্রা পেয়েছিল? গণবিক্ষোভের মুখে ১৯৮৮ সালে নে উইন দৃশ্যত পদত্যাগ করলেও ক্ষমতা নেন তারই শিষ্য জেনারেলেরাই। ক্ষমতা ও রাজনীতি বলতে যারা একটাই জানে  – দমন ও নির্মুল – ফলে সেই পুরানা অভিজ্ঞতায় প্রায় কয়েক হাজার লোক মেরে দমিয়ে ‘রাষ্ট্রীয় আইন শৃঙ্খলা উদ্ধার কাউন্সিল’ এই নতুন নামে ক্ষমতা নেন এবার জেনারেল স মং (Saw Maung)। পরবর্তিতে অবশ্য তিনি নিজেই মাত্র ৫০০ জন ‘দুষ্ট লোক’ সরিয়ে ফেলার কথা নিজেই গর্ব করে পাবলিককে বলেছিলেন।  এই সময় থেকে কথিত ‘নে উইনি সমাজতন্ত্র’ তিনি নিজেই ও তার সরকারকে সরে যেতে, গড় হাজির হতে শুরু করিয়েছিলেন। আর  ১৯৯০ সালে এক সাধারণ নির্বাচন দেয়া হয়, কিন্তু বিরোধীরা জিতলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বরং সে নির্বাচন বাতিল বলে ঘোষণা করে দেয় জেনারেলেরা।  পরবর্তিতে ১৯৯৭ সালের পর থেকে মায়ানমার একের পর এক পশ্চিমের (আমেরিকা ও ইউরোপের) স্যাংসন বা বাণিজ্য লেনদেন অবরোধের মুখে পড়ে যায়। এই অবস্থায় বাইরের প্রায় সব রাষ্ট্রের সাথে মায়ানমারের বাণিজ্য বিনিয়োগ লেনদেন বন্ধ হয়ে পড়ে। একমাত্র ব্যতিক্রম থেকে যায় পড়শি চীন। ফলে একমাত্র চীনের ভিতর দিয়ে যতটুকু বাইরের দুনিয়ার সাথে বার্মার সংযোগ সম্পর্ক বজায় ছিল। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে মায়ানমারে চীনা বিনিয়োগ শুরু হয়েছে ২০০২-৩ সালের পর থেকে। এমন অবস্থায় ২০০৬ -৭ সালের দিকে এশিয়ার দুই রাইজিং অর্থনীতি হিসাবে  চীন ও ভারত নিজ নিজ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেকেই মায়ানমারের গ্যাস কেনার (বুকিং ও চুক্তি) জন্য প্রবল আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। এই সময় থেকেই অবরোধের ব্যাপারটাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা শুরু হয়।

ততদিনে আবার, আমেরিকা নীতি পলিসিতে এশিয়ায় ভারতকে কাছে টেনে চীন ঠেকানোর চর্চা পোক্ত নির্দিষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে ভারতের মাধ্যমে বার্মার অবরোধ তুলে নেওয়ার এক ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। এই অবস্থানের পিছনে যে মুল্যায়ন কাজ করেছিল তা হল মায়ানমারের উপর অবরোধ দেওয়াতে কোন লাভ হচ্ছে না। বরং পশ্চিমের অবরোধের সুফল চীন একা খাচ্ছে। তাই ভারতের মধ্যস্থতায় অবরোধ তুলে নেওয়ার নতুন ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। পশ্চিম পরিস্কার জানত, মায়ানমার কোন গণপ্রজাতন্ত্রী নয়, সামরিক বাহিনীর পকেটের রাষ্ট্র। তা সত্ত্বেও  সু চি কে কেবল ঐ কাঠামোর উপরে এক সিভিলিয়ান ফেস হিসাবে সামনে রেখে সামরিক ক্ষমতাটাই চালু রাখার পক্ষে নাম কা ওয়াস্তে এক সংস্কার করার পক্ষে কাজ শুরু হয়েছিল। এই হল সেই ফর্মুলা। কেন “দ্বৈত নির্বাহী” এই ভুতুড়ে ধারণার ক্ষমতার রাষ্ট্র হিসাবে আমরা এখনও মায়ানমারকে দেখছি – এর মূল কারণ এটা। যেমন এর আর এক বৈশিষ্টবলছিলাম যে, এই রাষ্ট্রে কমান্ডার ইন চীফ সরকারের কোন নির্বাহী সিদ্ধান্তের উপর ভেটো প্রয়োগ করতে পারে। অর্থাৎ নির্বাহী সরকার একমাত্র বা একক নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী নয়, এটা এক সতীনি ক্ষমতা বলেই এমন বাক্য রচনা এখানে সম্ভব হচ্ছে। আর ২০০৮ সাল থেকে চালু যে কনষ্টিটিউশনে এসব কথা লেখা আছে তা সংশোধন করতে গেলে ওতে শর্ত দেওয়া আছে যে, ৭৫% এর বেশী ভোটের সমর্থন থাকতে হবে। কিন্তু ৭৫% কেন? কারণ প্রাদেশিক অথবা কেন্দ্র সংসদে ২৫% আসন সব সময় বাহিনীর জন্য রিজার্ভ করে রাখা আছে। অর্থাৎ সারকথায় কমান্ডার ইন চিফ রাজী না থাকলে ঐ ২৫% এর একটু সমর্থনও পাবার কোন সম্ভাবনা নাই, ফলে কোন সংশোধনীও সম্ভব নয়।

আসলে সব কথার এক কথা বা সেই মূল কথাটা হল, ২০০৮ সালে চালু করা হয়েছিল এই কনষ্টিটিউশন। আর তা একা মনের মাধুরি মিশিয়ে সামরিক বাহিনীই এককভাবে নিজের খাতিরে লিখেছিল। কিন্তু যারা কনষ্টিটিউশন লিখেছে এরা কারা? এদের হাতে ক্ষমতা দিল কে, কী তাদের ক্ষমতার ভিত্তি – এসব প্রশ্নের ভিতরে সব জবাব আছে। যার সোজা অর্থ মায়ানমার এখনও প্রি-ষ্টেট মানে রাষ্ট্রগঠনের আগের অবস্থায় বা কোন গণপরিষদ বা সংবিধান সভা বসার আগের অবস্থায় আছে।  এই অর্থে মায়ানমার এখনও কোন মর্ডান রিপাবলিকই নয়।

ফলে এই রাষ্ট্রের কাছে মানবাধিকার, জনগণের মৌলিক অধিকার এসব কথা অর্থহীন। আর ‘ডেমোক্রাসির নেতা সু চি’ এই শব্দ আর বাক্যগুলো তো আরও হাস্যকর।

অতএব পশ্চিম সংস্কারের নামে যেটা করেছে সেটা হল ঐ সামরিক স্বৈরক্ষমতাকে সিভিলিয়ান সু চির টোপর পরিয়ে ঐ ক্ষমতাকে উদ্ভোধন বা হালাল করে দিয়েছিল। বিনিময়ে তারা নিজের ব্যবসা বিনিয়োগের করার সুযোগ বুঝে নিয়েছিল। এমনকি এই লক্ষ্যে কোন ধরণের সংস্কারের কাজ শুরু হবার আগেই এমনকি তা আসলেই কতটুকু কী সংস্কার হয় তা দেখার আগেই ২০১০ সালেই আমেরিকাসহ সারা পশ্চিম নিজের বিনিয়োগ নিয়ে  মায়ানমারে ঢুকে পড়েছিল। তবে এটা নিয়ে চীনের সাথে মায়ানমারের জান্তার কোন বিরোধ দেখা দেয় নাই। চীনের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক অটূট রেখে আপোষেই তা হয়েছিল। জেনারেলেরা বিশেষ করে প্রাক্তন জেনারেল ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি থেন সিন (যিনি ২০১৬ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন) চীনকে বুঝাতে পেরেছিল যে পশ্চিমের অবরোধ উঠে যাওয়া মায়ানমারের জন্য কতটা জরুরি। ফলে চীন যেন জায়গা ছেড়ে দেয়।  চীনও সেটা সহজেই মেনে নিয়ে জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল। আর এসবের ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই হঠাত কেবল ২০১০ সালেই মায়ানমারে বিদেশি ডাইরেক্ট বিনিয়োগ হয়েছে ২০ বিলিয়ন, আর এর অর্ধেক হল একা চীনের।

কিন্তু ভারতের অর্জন কী এতে? না তেমন কোন বৈষয়িক বিনিয়োগ ব্যবসা, না প্রভাব – কোনটাই অর্জন হয় নাই ভারতের।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি গত ৬ সেপ্টেম্বর তিনদিনের মায়ানমার সফরে গিয়েছিলেন। চলতি রোহিঙ্গা গণহত্যা ও শরনার্থী হওয়া প্রসঙ্গে,   সু চি বলেছেন,  “অসত্য খবর প্রচার করে রাখাইনে উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছে”। সু চি হামলাকারিদের “টেররিস্ট” বলেছেন। আর মোদি বলেছেন, “তিনি সু চি এর পাশে আছেন”।  কিন্তু এই সাফাই যুগিয়ে দেয়ায় ভারতের কোন লাভ হয় নাই। তবে মায়ানমার সফর থেকে মোদি কী অর্জন করতে চান এই প্রশ্নে বিবিসি কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিককে সাক্ষী মেনে অনেক কথা বলিয়ে নিয়েছেন। সুবীর ভৌমিক এই কথাগুলো ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর তরফ থেকে আমাদের কাছে পৌছাতে চেয়েছেন, এটাও ধরে নিতে পারি। সুবীর বিবিসিকে বলছেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য বিবৃতির মূল্য উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা”। মি ভৌমিক বলছেন, “রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার”। “মুসলিমদের প্রশ্নে বার্মিজ জাতীয়তাবাদী এবং কট্টর বৌদ্ধরা মি মোদি এবং তার দল বিজেপির সাথে একাত্ম বোধ করে”। ভারত যে সম্প্রতি বিশেষ অভিযানের জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলেছেন, সেটাকেও দেখা হচ্ছে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনা অভিযানের প্রতি দিল্লির সমর্থন হিসাবে”। উপরে সি রাজামোহনের লেখায় দেখেছিলাম ভারতের বিনিয়োগ মুরোদহীনতার কথা। অর্থাৎ ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রশ্নে কোন অর্জন নাই। বরং বর্মীজ জেনারেলদের ইসলামবিদ্বেষী উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়ার জন্য ভারত কাজ করছে। এই কাজটাই ২০০৮ সাল থেকে ভারত করে জেনারেলদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করে আসছে। এ কারণে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা হত্যার বড় ঘটনাগুলো ঘটতে পেরেছে বলে মনে করা হয়।

এবারের নতুন সংযোজন মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে মায়ানমার মাইন পুতে রেখেছে। মায়ানমার অল্প কিছু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটা যে মাইন ব্যবহার নিষিদ্ধ জাতিসংঘের কনভেনশন স্বাক্ষর না করা দেশ। বাংলাদশ এখন পর্যন্ত এনিয়ে জাতিসংঘে নালিশ বা সদস্যদের মধ্যে প্রচার করতে যায় নাই। পলায়নপর আশ্রয়প্রার্থিদের জন্য মাইন পুতে রাখা হয়েছে, এরা কী কোন বিদ্রোহী? অর্থাৎ নিরীহ সাধারণ মানুষ কোন আশ্রয়ও না পাক, মায়ানমারের হাতেই তাকে মরতে হবে এই স্যাডিজম এখানে কাজ করছে।  আর এই স্যাডিজমকে মোদি বলেছেন, “তিনি সু চি এর পাশে আছেন”। তার মানে ব্যাপারটা দাড়াল যেহেতু ভারতের নিজ বিনিয়োগের সক্ষমতায় প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাড়ানোর মুরোদ নাই, তাই তাকে নিজের নাক কেটে হলেও অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে হবে। বর্মী জেনারেলরা গণহত্যার ক্লিনজিং অপারেশনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে থাকছেন ক্রমাগত, ভারতের এই মনোরঞ্জনে কোন জেনারেলের দায় কী কমছে? অথবা বার্মার সাথে চীনের সম্পর্কে কোন ফাটল? ভারতের উতসাহে বার্মার জেনারেলরা গত ফেব্রুয়ারির রোহিঙ্গা হত্যা অপারেশন ঘটানোর পরেও কী, এই এপ্রিলে চীনের সাথে বর্মার প্রেসিডেন্ট ১০ বিলিয়ন ডলারের বন্দর নির্মাণ চুক্তি করেন নাই?  তাহলে ভারতের রাজনৈতিক নেতারা তাদের অর্জন কোনটাকে ধরেন? স্যডিজমে অন্যের শরীরে কষ্টের পিন ফুটানোতে সুখ?

[এই লেখা এপর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হয়েছে। তবে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। সেটা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

গৌতম দাস

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০১:৪৫

http://wp.me/p1sCvy-2hx

 

গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে এবারের পর্যায়ে, রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল ক্রমে বেড়েই চলেছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে জাতিসংঘের হিসাবে, শুধু এই ক’দিনেই তা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে রাখাইন (আগের নাম আরাকান রাজ্য)  রাজ্যের  রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে অত্যাচার নির্যাতন ও গণহত্যায় আরো নৃশংস হয়ে উঠেছে। জাতিসঙ্ঘের ভাষায়, দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত ও নির্মূল হয়ে যাওয়া সহ্য করা জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা। একালে মানে ২০১২ সাল থেকে নতুন করে শুরু নির্মুল ততপরতার এই পর্যায়ে এমন অভিযান বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ হল, মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগে সেখানে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় ভারতের অস্বস্তি। আর তা কাটাতে ভারত নীতি নিয়েছে, মিয়ানমার সরকারকে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়ে এই হত্যাযজ্ঞকে বাড়িয়ে বার্মা বা মায়ানমারে সুনির্দিষ্ট করে রাখাইন প্রদেশকে অস্থিতিশীল করে দেওয়া। অজুহাত রোহিঙ্গা ‘মুসলমান মাত্রই এরা সন্ত্রাসী’। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ নির্মুলের আড়ালে ফেলে বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠির উপর ক্লিনজিং বা সাফা অভিযান পরিচালনা করতে সাহায্য করা।

এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি মিয়ানমার সফরে এসে আক্ষরিকভাবেই সু চির পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছেন, “তিনি সু চির পাশে আছেন”। সম্প্রতি বার্মা ভ্রমণরত বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। ‘সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা।’  অর্থাৎ অর্থনৈতিক সুবিধা হারানোর জন্য অথবা অন্যের পাওয়াতে কেউ গণহত্যা ও নির্মূল অভিযানের সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ভারত।

অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে চীনের উত্থান ঘটেছে চলতি এই শতক থেকে। ফলে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বদলে গিয়ে নতুন গ্লোবাল লিডার হিসাবে চীনা নেতৃত্বে তা আবার সাজানো আসন্ন হয়ে উঠেছে।  উত্থিত এই চীনের বার্মায় (মিয়ানমারে আগের নাম)  চীনা বিনিয়োগের দৃশ্যমান ভাবে শুরু ২০০৩ সাল থেকে। কিন্তু আরও পরে সম্প্রতিকালে চীনের বিনিয়োগ সুনির্দিষ্ট করে ঘটেছে বার্মার রাখাইন রাজ্যে। কারণ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশেরই পড়শি হল, চীনের ল্যান্ডলকড প্রদেশ ইউনান যার রাজধানী কুনমিং। এ রাজ্যে বৌদ্ধ রাখাইন আর মুসলিম রোহিঙ্গাদের বসবাস।  সমুদ্র উপকূলব্যাপী বিস্তৃত রাখাইন রাজ্য কুনমিংকে ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্ত করবে – এজন্য রাখাইন রাজ্যে চীনের এই বড় বিনিয়োগ।  এখানে চীনের বড় বিনিয়োগ প্রজেক্ট যেগুলো এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – কিয়াকপিউতে (Kyaukpyu) এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা বা শিল্পপার্ক স্থাপন যেখানে কম্পোজিট টেক্সটাইল ও তেল শোধনাগারের মতো ভারী শিল্প স্থাপন করা যায়। এছাড়া ঐ বন্দর থেকে চীনের কুনমিংয়ে তেল শোধনাগার পর্যন্ত ৭৭০ কিলোমিটার লম্বা তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন ইতোমধ্যেই চালু হয়ে গেছে। রাখাইন সমুদ্র উপকুলে সম্ভাব্য ঐ গভীর সমুদ্রবন্দরের অবস্থান যেখানে ওর নাম কিয়াকপিউ বা Kyaukpyu ।

চীনের কাছে এই প্রজেক্টগুলো আরো গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, এই পাইপলাইন হবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল চীনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নৌজাহাজে মালাক্কা প্রণালী ও সিঙ্গাপুর ঘুরে পূর্ব চীন সাগরের বন্দর মানে চীনের মুল বন্দরে যাওয়ার বদলে বিকল্প ও শর্টকাট পথ। কারণ এই বিকল্প পথ কয়েক হাজার কিলোমিটার নৌপথই বাচাবে না, এতে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাওয়ায় এই তেলের ল্যান্ডিং কস্ট অনেক কম হবে। এ ছাড়া স্ট্রাটেজিক নিরাপত্তার দিক আছে। এতে তেলবাহী জাহাজকে আর ব্যস্ত ও সঙ্কীর্ণ বা চিকন গলার মালাক্কা প্রণালী পার হতে হবে না বলে পাইপলাইনে নেয়া তেলের নিরাপত্তা বেশি হবে। চলতি ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্টের চীন সফরকালে মায়ানমারকে প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এনিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের অবসান করে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আসলে বিগত ১০ বছর ধরে ঝুলে ছিল এই পরিকল্পিত প্রকল্প। নানান সেসব বাধা কাটিয়ে পাইপলাইন পাতার চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল এবং তেল পাইপলাইন পাতার কাজ গত ২০১৫ সালের সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হলেও তা এতদিন চালু হয় নাই কারণ, হুইল চার্জ বা বার্মার ভুমি ব্যবহারের জন্য বার্ষিক প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এই নিয়ে বিতর্ক ছিল। যদিও আবার  তেল পাইপলাইন এই বছর চালু হলেও মিয়ানমারের নিজস্ব গ্যাস ২০০৯ সাল থেকেই ওই তেল পাইপলাইনের প্যারালাল করে পাতা আলাদা গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে কুনমিংয়ে ইতোমধ্যে যাচ্ছে, চালু আছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের ২০১৭ এপ্রিলের ওই সফরেই কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের আর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ২.৩ বিলিয়ন – এভাবে মোট প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়।

নির্মিতব্য বন্দরের ৮৫ ভাগ মালিকানা চীনা কোম্পানি (China International Trust and Investment )  বা CITIC কে দিতে মিয়ানমার রাজি হয়েছে। চীনের নিজস্ব সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট “বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ”; এতে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬৫টি দেশজুড়ে তা বয়ে যাবে। ঐ নৌ-সড়ক মেগা-অবকাঠামোর সাথে কিয়াকপিউ বন্দরও যুক্ত হওয়ার কথা।
২০১৭ সালের মে মাসে চীনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের’ প্রথম সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারত সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি, এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। কিন্তু কী দিয়ে সে বাধা দিবে? কারণ এটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার আর এথেকে জাত প্রভাবের। ফলে  চীনের উত্থানকে ভারতের অমান্য করা সম্ভব যদি পাল্টা একমাত্র অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া না হলেও অন্তত সমান্তরাল অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ভারত পৌঁছাতে পারে।

কিন্তু সেপথ ভারতের জন্য আপাতত দুরস্ত; সময় সাপেক্ষ এবং যদি কিন্তু ব্যাপার। সারকথায় এখনকার ইস্যুই না। কিন্তু ব্যাপারটাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় হলেও আর সে সক্ষমতা আমার আপাতত না থাকলেও স্যাবোটাজ করে হলেও বাধা দেওয়া – এই চুলকানি তো তোলাই যায়।  ব্যাপারটা নিয়ে আমেরিকার অস্বস্তিও কম না। যেমন আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল মেরিটাইম বাণিজ্য বিনিয়োগের যে কমিউনিটি আছে, সে কমিউনিটিতে চালু এমন এক ম্যাগাজিন হল মেরিটাইম-একজিকিউটিভ। ঐ পত্রিকা চীনের কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রজেক্টকে কিভাবে দেখছে তা নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে; এর শিরোনাম “মায়ানমারে স্ট্রাটেজিক পোর্টের নিয়ন্ত্রণ খুজছে চীন” ( China Seeks Control of Strategic Port in Myanmar)। ষ্ট্রাটেজিক শব্দটার সোজা ভাবার্থ “একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনা” করা যেতে পারে। বিনিয়োগ প্রকল্প যত বড় ধরণের হয় যেমন গভীর সমুদ্র বন্দর ততই ব্যাপারটা শুধু অর্থনৈতিক না থেকে ঐ প্রকল্প সেফ বা নিরাপদ থেকে করতে পারারবিষয়টাও মুখ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ সামরিক নিরাপত্তার দিকটাও প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। সব মিলিয়ে একটা ‘একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনার’ দিক তৈরি হয়।  এর প্রতিক্রিয়ায় এখন পুরান কুতুব আমেরিকা অথবা ভুয়া কুতুব ভারত (এমনকি সত্যিকারের কোন হবু কুতুব) সবারই ব্যাপারটায় ঈর্ষা অস্বস্তি হয়। মেরিটাইম-একজিকিউটিভ এর ঐ রিপোর্টকে সে জায়গা থেকে দেখা যায়। সে বলছে,
The deal would give China control over an oil receiving terminal that feeds a cross-border pipeline to Yunnan province, bypassing the Strait of Malacca, the strategic choke-point between the Indian Ocean and the Western Pacific. ………In addition, the ongoing unrest in Rakhine – including alleged human rights abuses perpetrated by the Myanmar government against the region’s Rohingya Muslim minority – brings added uncertainty and controversy to the proposal.

এতে প্রথম বাক্য অংশটাতে, চীনের নতুন জ্বালানি তেল পরিবহণ পথ এখানে সিঙ্গাপুরে মালাক্কা প্রণালী এই স্ট্রাটেজিক চোকপয়েন্ট এড়িয়ে যাওয়াতে, চীনের গলা চেপে ধরার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার একটা দুঃখ আমরা লক্ষ্য করতে পারি। কিন্তু পরের বাক্য বেশি গুরুত্বপুর্ণ। বলছে, “চলমান রাখাইন অসন্তোষ – যেখানে ঐ অঞ্চলের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর পরিচালিত বার্মা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে – এটা ঐ চীনা প্রকল্পে বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ করেছে”।  তার মানে  “বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ” করার স্বার্থ যাদের তাদের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সম্প্রতি  গত মে মাসে চীনের বেল্ট এন্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সম্মেলন হয়ে যাবার পর থেকে ভারত এবার সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধীতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়ের’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধ্মান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। যদিও ভারতের এই সিদ্ধান্ত আসলে অর্থহীন। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যা থেকে চীনের এসব প্রভাব উতসারিত তা ভারতসহ কারও মানা না মানার বিষয় নয়, কারণ এটা বস্তুগত বাস্তবতা কোন সাবজেকটিভ বা ব্যক্তির ইচ্ছাপ্রসুত কিছু না। ফলে অন্যের বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতার পালটা হতে পারে নিজে বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন। অর্থাৎ এটা বস্তুগতভাবে অর্জন করে ভারতকে দেখাতে হবে। এমনকি চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে কোন ঈর্ষার চর্চা, কোন স্যাবোটোজ, কাউন্টার ইন্টেজেন্স, অন্তর্ঘাতমূলক কাজ, বিদ্রোহ বা এনার্কিতে উস্কানি অথবা গণহত্যা ও ক্লিনজিংয়ে ‘আমরা পাশি আছি’ বলে দাঁড়ানো ইত্যাদি এগুলোর কোনটা দিয়েই তা ভারতের অর্জিত হবে না, পথও নয়। বরং এটা ভারতের জন্য খুবই বিপদজনক ও আত্মঘাতি রাস্তা।

প্রো-আমেরিকা ভারতের একাদেমিক, প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক  ব্যক্তিত্ব ও ষ্ট্রাটেজিক থিঙ্কার সি রাজামোহন, বিষয়টাকে তিনিও মানেন। তিনি এবিষয়ে তার লেখা সাপ্তাহিক কলামে (চীনের সাথে ভারতের সক্ষমতার গ্যাপটা খেয়াল কর শিরোনামে ) ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করে ভারতের রাজনীতিবিদদের সাবধান করেছেন। তিনি দশ বিলিয়ন ডলারের চীনের এই কিয়াকপিউ বন্দর প্রজেক্ট সম্পর্কে সরাসরিই বলেছেন,  “দিল্লীর আসলে কিয়াকপিউ প্রজেক্টে চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়  যাওয়ার মুরোদ নাই। একনকি অন্য কোন আন্তর্জাতিক খেলোয়ারও চীনের বিকল্প হয়ে হাজির হতে পারবে না।……  যদি চীন যেভাবে কথা দিয়েছে তা মেনে কিয়াকপিউ বন্দরকে সে সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মত বাণিজ্যিক হাব হিসাবে গড়ে তুলতে থাকে তবে ভারতের নীতি নির্ধারকদেরকে এনিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্টই করতে হবে। বিশেষত এখানকার বাণিজ্যিক স্বার্থ নিশ্চিত করা ও বিনিয়োগকে  নিরাপদ করতে ভবিষ্যতে চীনকে প্রয়োজনীয় সমতুল্য মেরিন ও সামরিক শক্তি সমাবেশ ঘটাতেও হবে”। কিন্তু তবু চীনের সাথে ভারতের সামর্থের ফারাকের কথা খেয়াল রেখে পথচলার পরামর্শ রেখেছেন তিনি। কিন্তু সেকথায় কান দিবার অবস্থায় মোদি সরকার অথবা ভারতের হামবড়া আমলা-গোয়েন্দাদের নাই। এই অবস্থায় বিনিয়োগ সক্ষমতা না থাকা ভারতের যদিও গোয়েন্দা সংগঠন দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ  আর দাঙ্গায় উস্কানি, গণহত্যায় নির্মুল করা দিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলা ছাড়া ভারতের হাতে অন্য কিছু নাই। মোদি এই পথেই হাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের পর্যায়ে আবার নতুন করে প্রায় তিন লাখ হতে যাওয়া রোহিঙ্গাকে শরনার্থী বানানো সে পরিকল্পনারই ফলাফল।

গতকালকে সু চির সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিডিয়াতে দাবি করে বলেছে রোহিঙ্গারা নাকি “নিজেরা নিজের বসত ঘর পাড়ায় আগুন দিয়ে স্বেচ্ছায় রিফিউজি হতে বাংলাদেশ সীমান্তে গিয়েছে। বাংলাদেশের নিউজ২৪ টিভিতে ঐ উপদেষ্টার বক্তব্যের ক্লিপ দেখিয়েছে। সব দোষের দোষী, “জাত খারাপ” রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পর্কে আর কত হাস্যকর আজীব অভিযোগ শুনতে হবে কে জানে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের হিন্দুদেরকেও কেন উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা উতখাত করল?  তারাও যে বাংলাদেশে রিফিউজি হয়ে এসেছে এটা সম্পর্কে বাংলাদেশের হিন্দু খ্রীশ্চান বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাসগুপ্তের সাক্ষ্য ও অভিযোগের ভিডিও মিডিয়াতে আমরা দেখেছি। এরা কী কেন কোন সুখে (নিজের ঘরে!) আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন আমাদের জানার বাইরে, যদিও সু চির দাবি সে এটা জানে।। ভারতের মোদির চোখে এরাও তাহলে সন্ত্রাসবাদী! অর্থাৎ মানে দাড়াল, “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী” মোদি-সুচির সস্তা ফর্মুলার উপর দাঁড়ানো এই  বয়ান – এবার এরা নিজেরাই মিথ্যা ও অচল বলে প্রমাণ করছেন। মায়ানমারের বৌদ্ধ মং দের সংগঠন মা-বা-থা গোষ্ঠি এরা বিজেপি-আরএসএস শিবসেনার মত তবে এরা বার্মার সামরিক বাহিনীর প্রচন্ড পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সংগঠন; চরম ইসলাম বিদ্বেষী এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী। সারাক্ষণ রাখাইন রাজ্যে এরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিষ উগলে যাচ্ছে। সরকার ও সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় এই গোষ্ঠি তৈরি করা হয়েছে। এরাই রাখাইন রাজ্যের স্বল্প হিন্দু জনগোষ্ঠিকেও রেহাই দেয় নাই। রাখাইন রাজ্যের খুবই সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠির পাঁচশ এর মত হিন্দুর শরনার্থী হওয়ার এই ঘটনা মোদি-সু চির ইসলাম বিদ্বেষী ঘৃণ্য এলায়েন্সকে ফুটা করে দিয়েছে। মোদি-সু চি কে অবশ্যই ব্যাখ্যা দিতে হবে কারা কোন সুখে হিন্দু-মুসলমান রাখাইনরা  নিজের ঘরে আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন!

[প্রথম পর্ব এখানে শেষ করা হল। দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হয়েছে  ইতোমধ্যে। এখানে দেখুন। এই পর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হল। তাতে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। তা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]