মোদির ‘বুকের ছাতি’ কী এবার শুকিয়ে যাবে

মোদির ‘বুকের ছাতি’ কী এবার শুকিয়ে যাবে
গৌতম দাস
১৪ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার ১৮:০০
https://wp.me/p1sCvy-2kR

DECLINING

গত বছর ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি ভারতের সবচেয়ে বড় মানের দুই নোট (হাজার ও পাঁচ শ’ রুপির নোট) “ডি-মনিটাইজ’ করা হলো” বলে আকস্মিক এক সরকারি ঘোষণা দিয়েছিলেন।  টিভি ঘোষণার সে বক্তৃতার সময়, অতি-আস্থাশীল মোদী সেদিন দাবি করে বলেছিলেন কয়েক ঘন্টার মধ্যে নাকি ৮৬% ভারতীয় নোট যে অর্থহীন তা কয়েক ঘন্টার মধ্যে প্রমাণ হয়ে যাবে। অথচ বাস্তবে ফল হয়েছে উলটা। অতি-আত্মআস্থার মোদি এক বোকায় পরিণত হয়ে গেছে, এই স্বভাব  কাউন্টার প্রডাকটিভ। আজ এক বছরে এটা প্রমাণিত যে নিজের উপর অতি আস্থাশীলতা ভাল না, এবং মোদি ও তাঁর “ডি-মনিটাইজেশন ব্যার্থ। মোদির দাবি অনুসারে ৮৬% ভারতীয় নোট যে অর্থহীন  নয় তাই প্রমাণ করে ছেড়েছে, আর উলটা এটা এখন মোদি-পতনের ইঙ্গিত।

ডি-মনিটাইজ শব্দটি অনেক পাঠকের কাছে অদ্ভুত লাগতে পারে। লাগারই কথা। কারণ, আমরা যাকে টাকা বলি, মানে টাকার নোট, এর মধ্যে একটা অদ্ভুত কনসেপ্ট কাজ করে থাকে। যেমন, ছাপানো টাকা্র নোট প্রেসে ছাপার পরও ওটা নাকি আর পাঁচটা ছাপা কাগজের মতো নেহায়েতই একটা চিরকুট থেকে যায়। কেন? কারণ ওতে তখনো বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের আনুষ্ঠানিক স্বীকারোক্তি নাই, মানে বোধন বা উদ্বোধন তো তখনও হয় নাই। বাংলাদেশ ব্যাংক যখন কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে তা রিলিজ করবে, মানে কারো পাওনা পরিশোধ করা হিসেবে রিলিজ বা হস্তান্তর করবে; অন্যভাবে বললে যখন থেকে এর অর্থ হবে এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘স্বীকৃত বৈধ টাকা’ তখন থেকেই কেবল ওটা ‘টাকা’। এ ঘটনাকে বলে মনিটাইজেশন। যার অর্থ নেহায়েতই এক ছাপা কাগজের টুকরার উপর তখন থেকে মুদ্রার গুরুত্বও আরোপিত হবে বা স্বীকৃতি পাবে। এরই ইংরেজি শব্দ হল মনিটাইজ (monetize) করা। ফলে এমনকি এরপর উল্টাপথে পরবর্তীকালে কখনো যদি বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো দিন এক ‘পাবলিক ঘোষণা’ দিয়ে বলে যে ওই সুনির্দিষ্ট নাম্বারের নোটটা অথবা বাজারে চালু সব বা ওমুক ওমুক নোট এখন থেকে আর আমার স্বীকৃত বৈধ নোট নয়, অচল নোট তাহলে সে ঘটনাটাকে এইবার বলা হবে ডি-মনিটাইজ করা। যার বাংলা অর্থ হল, আগের দেয়া স্বীকৃত বা নোটের মুদ্রাগুণ তখন থেকে কেড়ে নেয়া হল। তাহলে সার কথায় নোট ছাপা হয়ে গেলেই সেটা তখনও নোট হবে না। নোট বৈধ হতে গেলে নোট হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান অথবা প্রত্যাহার – এদুটাই ওর আসল জিনিষ। তবে চলতি শব্দ হিসেবে ‘ডি-মনিটাইজ’ – এই কাজকে আমরা ‘নোট বাতিল’ও বলি। যদিও তা বললেও সব রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক ভাষায় এটাকে ডি-মনিটাইজেশন অথবা মনিটাইজেশন বলা হবে।

তবে কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাধারণত তার সবচেয়ে বড় মানের মুদ্রাগুলোকে মানে যেমন বাংলাদেশের বেলায় ধরা যাক হাজার টাকা, অথবা এর সব চালু নোট যদি ডি-মনিটাইজ করার ঘোষণা দেয় তবে সব নোটগুলো বদলে নেয়ার একটা সময়ও সেই সাথে ঘোষণা করে দেয়া হয়ে থাকে। তাতে ঘোষিত কেবল ওই শেষ দিন পর্যন্ত আর সাথে বদলে নেয়ার ব্যাংকেই কেবল ঐ নোট তখনো বৈধ নোট বলে গ্রহণ করা হবে। এর বাইরে, অন্য কোনো পণ্য লেনদেনে, মুল্যা পরিশোধের ক্ষেত্রে দুই মানুষের মধ্যে দেয়া-নেয়ায় ওই নোটের আর গ্রহণযোগ্যতা থাকবে না।

গত বছর মোদি এই ডি-মনিটাইজই করেছিলেন। ওদিকে কোনো রাষ্ট্রের ডি-মনিটাইজ পদক্ষেপের প্রধানতম কারণগুলো সাধারণত হল, ডি-মনিটাইজ ঘোষণার পরে বাতিল টাকা বদলাতে পাবলিককে ব্যাংকে আসতেই হবে।  আর টাকা বদলাতে গেলে ঐ টাকা কার, কার নামে ঐ টাকা দেখাতে হবে ব্যাংককে তা বলেই কেবল বদল সম্ভব হবে। আর আসলে তাতেই ধরা পড়ে যায় যে কার নামে কী পরিমাণ নোট বা অর্থ আছে ও জমা হল। এটা আনুষ্ঠানিকভাবে জানাজানি বা রেজিস্টার হয়ে যাওয়ার ঘটনা হয়ে যায় তাতে। ফলে এরপর অত টাকার আয়কর সে দিয়েছে কি না সেটা মিলিয়ে দেখলে ওই নোট আয়কর পরিশোধ করে দেয়া অর্থে বৈধ না অবৈধ আয় (কালো না সাদা আয় বলি অনেক সময় আমরা) তা ধরা পড়ে যায়। এ ছাড়া দেশে নকল নোটে ছেয়ে গেলে পরে ডি-মনিটাইজ ঘোষণা হলে তাতে নোট বদলাতে এলে কেবল আসল নোটওয়ালারাই আসবে। কারণ নকল নোট নিয়ে আসলে ধরা পড়তে হবে। ফলে এভাবে নকল নোটকে বাজারছাড়া করে দেয়া যায়। তাই মূল কথা বা চাবিকাঠি হল  – নোট বদলাতে আসতে হয়, কার নামের নোট তা বলতে হয়, আর এতেই আনুষ্ঠানিকভাবে জানাজানি বা রেজিস্টার হয়ে যায় বলে পরবর্তিতে  প্রমাণিত এই সত্যের ওপর ভিত্তি করে রাষ্ট্র অনেক অ্যাকশন নিতে পারে।

মোদির ক্ষমতায় আসার পরবর্তিতে বর্তমানে এটা  সাড়ে তিন বছর চলছে; অর্থাৎ নোট ডি-মনিটাইজেশনের সময় মোদির সরকারের আয়ু পার হয়েছিল মাত্র আড়াই বছর। আর এই হিসাবে মোদি সরকারের আয়ু বাকি আছে আর মাত্র দেড় বছরের মত। ভারতে পরের কেন্দ্রীয় নির্বাচন ২০১৯ সালে মে মাসের কাছাকাছি সময়ে। কিন্তু ইতোমধ্যেই ‘পপুলার মোদির’ দিন ফুরিয়েছে,  রব উঠে গেছে চার দিকে যে মোদির শাসন খারাপ ছিল বা খারাপ কেটেছে। অথবা মোদি সরকারের আর জোশ নেই দম ফুরাইছে – এই ধরনের কথা উঠে গেছে। এটা শুধু বাইরে বা বিরোধী শিবিরে নয়, খোদ বিজেপি বা আরএসএসের ভেতর থেকেও কাছাকাছি এমন সমালোচনা ওঠা শুরু হয়েছে। যেমন বিজেপি বা আরএসএসের যারা সরকারের বাইরে আছেন বা বয়স্ক, এমনদের সাথে মোদির মন্ত্রীদের প্রকাশ্য বাদানুবাদ, মিডিয়ায় লিখিত সমালোচনা পাল্টাপাল্টি শুরু হয়ে গেছে। এসব সমালোচনার সারার্থ হল, ২০১৯ সালের নির্বাচনে মোদি আর পপুলার প্রার্থী নন, তিনি জিতবেন না। সাধারণ মানুষও হতাশ হয়ে পড়েছে।

মোদির সরকারের আয়ু আড়াই বছর কেটে যাওয়ার পর নোট ডি-মনিটাইজেশন কালের আগ পর্যন্ত তিনি অবশ্যই জনপ্রিয় ছিলেন, যেটা ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে কম সময়ে দেখা গেছে। এসব সময়গুলোতে মিডিয়ায় প্রায়ই তিনি তার ‘৩৬ ইঞ্চি বুকের ছাতি আছে’ অর্থাৎ তিনি শক্ত ও ক্ষমতাশালী মানুষ – এভাবে রেফারেন্স দিয়ে কথা বলতেন। সে কথা এখন মনে করিয়ে দিয়ে অনেকেই একে পাল্টা ঠাট্টার প্রসঙ্গ হিসেবে তুলছেন যে, মোদির সেই ছাতি এখন কোথায় গেল। তবুও এসব বিচারে এখন আর পরিস্থিতি যাই হোক, অনেকগুলো বিচারে তিনি যে জনপ্রিয় ছিলেন তা মানতেই হয়। অবশ্য আবার ব্যতিক্রম এই যে, বিহারেসহ কিছু রাজ্য-নির্বাচনে ছাড়া প্রায় সব নির্বাচনেই মোদির দল নিয়মিত জিতে আসছিল। এই অর্থেও তিনি খুবই জনপ্রিয় ছিলেন। অপর দিকে সরকারের বিরুদ্ধে তেমন দুর্নীতির বড় অভিযোগ ছিল না, এই বিচারে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। অর্থনীতিবিষয়ক নীতি বা আইনে বড় বড় সংস্কার তিনি খুবই দ্রুততার সাথে এনেছেন, প্রচুর বিনিয়োগ এনেছেন; জিডিপি অর্থে অর্থনীতিতে অগ্রগতি এসেছিল, বিদেশের বাজারেও তিনি শোরগোল তুলতে পেরেছিলেন যে, ভারত একটা ‘রাইজিং অর্থনীতি’।

মোদির সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার পরে তাতে ভুল হয়েছে বা কিছু ভুল আছে এমন মনে হলে তিনি কোনো কোনো সময় সহজেই আগে নেয়া কোন সিদ্ধান্ত রদবদল করে নিতে পারতেন। এমন সক্রিয়তা তার সরকারের ছিল। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হবে, প্রবল হিন্দুত্বের জোয়ার তোলা বিজেপির ‘ঘর ওয়াপসি’ ( ধর্মীয়ভাবে কনভার্টেড হিন্দু মানুষকে আবার হিন্দুতে বা  ঘরে ফিরিয়ে আনা) কর্মসূচি। বিজেপি দলের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন শুরুর পরে সবচেয়ে বড় প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় ভারতের ক্রিশ্চিয়ান কমিউনিটি থেকে। এই কর্মসূচির অর্থ যারা ক্রিশ্চিয়ান হয়ে গেছে এদের আবার হিন্দুধর্ম পালনে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে প্রপাগান্ডা করা। যদিও বাস্তবে এর সারকথা গিয়ে দাঁড়িয়েছিল চার্চ বা চার্চসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে বিজেপির হামলা ও আক্রমণ। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকে নানান সময় হিন্দু বা মুসলমান কমিউনিটি আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু ক্রিশ্চিয়ানরা কখনো নয়। তবে দুনিয়ায় যে ক্রিশ্চিয়ানরা রুল করে, সেদিন আরেকভাবে তা বোঝা গিয়েছিল। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে ওবামা ভারতে এসেছিলেন। ওবামা এ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তবে পাবলিকের অপ্রকাশ্যে। তবে ফিরে গিয়ে তিনি ‘ঘর ওয়াপসি’  নিয়ে সরাসরি ভারত সরকারের কঠোর না হলেও হুঁশিয়ারি ধরনের প্রকাশ্য সমালোচনা করেছিলেন।

আমেরিকানদের কমন যে কথা তারা বলে থাকে, এটা ‘প্লুরালিজম (Pluralism) বা বহুত্ববাদি মতামতের সমাজ হলো না’; সে কথাসহ ওবামা আরো কিছু কথা তুলে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, আর তাতেই কাজ হয়েছিল। ওবামা বলেছিলেন – এ কাজ ভারতের ‘রাইজিং ইকোনমির’ আকাঙ্খা সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এতেই সরকারের টনক নড়েছিল। ফলে এর কয়েক দিন পরই মোদি ধর্মীয় সহনশীলতা বিষয়ে তার সরকারের (বিজেপির নয়) নীতি ঘোষণা করেছিলেন। কেরালা-ভিত্তিক এক শতবর্ষী পুরনো চার্চের (তবে দিল্লিতে অনুষ্ঠিত) এক ধর্মীয় নেতার স্মরণসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়ে, সেখানে। মনে রাখতে হবে মোদি সেকুলার নন, বরং হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিক। তাহলে ক্রিশ্চিয়ানিটিকে জায়গা দিয়েছিলেন তিনি কী করে? তিনি সেকুলারিজম প্রসঙ্গে সোজা আমেরিকান অবস্থান নিয়েছিলেন। সেটা হল, ইউরোপ যেখানে বলে রাষ্ট্র ও ধর্মের তথাকথিত সেপারেশনের কথা, আমেরিকা এ প্রসঙ্গটা বলে উল্টা করে। বলে, মানুষের ধর্ম পালনের অধিকার একটা মৌলিক অধিকার। ফলে যেকোনো নাগরিক মাত্রই তার ধর্ম পালনের অধিকার রক্ষা করা আমেরিকা রাষ্ট্রের কর্তব্য।

সারকথায়, মোদি ঠিক এভাবেই, এটা তার সরকারের নীতি বলে ঘোষণা করেছিলেন সেখানে। স্বভাবতই তাতে বিজেপি দল এরপর সরকারের নীতির সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল, যদিও সেটা হার স্বীকার করে নয়, বরং চুপচাপ ও ধীরে ধীরে। অপর দিকে এরপর আবার উত্তর প্রদেশের নির্বাচনকে মাথায় রেখে, গরু জবাই নিষিদ্ধ আইন আর মাংস বহন নিয়ে দাঙ্গা, পাবলিক ন্যুইসেন্স ও হয়রানি চরমে উঠিয়েছিলেন মোদি। কিন্তু তবু সরকারের জনপ্রিয়তা এসবের কারণে তেমন কমেনি যতটা প্রথম বিরাট ধাক্কা হিসেবে এসেছিল – নোট বাতিল বা ডি-মনিটাইজেশন। বলা যায়, মোদির জনপ্রিয়তার বিরুদ্ধে সেটাই প্রথম সবল আঘাত। যদিও প্রথম ৯ মাস তিনি সেটা অস্বীকার করে চলতেন। প্রমাণ লুকিয়ে রেখেছিলেন যে ডি-মনিটাইজেশনের কারণে ভারতের অর্থনীতিতে ধস নেমেছে। কিন্তু বিশেষ করে দুটো প্রমাণ বা নির্ণায়ক মোদিকে আর পরিস্থিতি লুকিয়ে রাখতে দেয়নি। এর প্রথমটি হলঃ সাধারণভাবে ডি-মনিটাইজেশনের পদক্ষেপ সঠিক ও সফল হয়েছিল কি না তা মাপার একটা নির্ণায়ক আছে। তা হল, বাজারে ছাড়া থাকা বাতিল নোটের কত পার্সেন্ট পাবলিক বদলে নিয়ে গেল সেই গণনা। মোদির টার্গেট ও আশা অনুমান ছিল এটা ৮৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। যার তাৎপর্য হল, বাকি ১৫ শতাংশ নোট হবে সে ক্ষেত্রে আয়কর না দেয়া আয় ধরে রাখা হয়েছে এই নোট। এছাড়া কিছু নকল নোটও হয়ত, যেটা ধরা পড়ার ভয়ে তা বদলে নিতে ব্যাংকে কেউ আসেনি। আর ওই ১৫ শতাংশ নোটের অর্থ এটাই হবে সরকারের নীট অর্জন। কারণ এতে বাজারে ছাড়া থাকা আগের মোট নোটের ১৫ শতাংশ সরকারকে আর ফেরত বা বদলে দিতে হলো না। এটাই ডি-মনিটাইজেশনের সাফল্য।

মোদি সরকার তাই বদলে দেয়া নোটের মোট পরিমাণ কত, এত তথ্য বাজারে প্রকাশে যত সম্ভব দেরি করেছিল। ফেরত আসা নোটের মোট হিসাব এখনো জড়ো করা যায়নি এই অজুহাতে। অবশেষে ৯ মাসের মাথায় জানাজানি হয়েই গেছিল যে ফেরত আসা এই নোটের পরিমাণ প্রায় ৯৯ শতাংশের কাছাকাছি। যার সোজা অর্থ ডি-মনিটাইজেশন ও এর উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে গেছে। স্বভাবতই মোদি সেটা টের পেয়ে আগে থেকেই গোলপোস্ট সরিয়ে ফেলার চেষ্টা করছিলেন। তিনি দাবি করতে শুরু করেছিলেন, আসলে কালো টাকা উদ্ধার নয়, নগদ টাকায় লেনদেন কমানো নাকি ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। কিন্তু কেন ডি-মনিটাইজেশন ব্যর্থ হল, পণ্ডিতদের মধ্যে এনিয়ে জবাব একটাই দেখা গেছে। তা হলো ‘জনধন’ প্রকল্প। এটা মোদি সরকারের ঢাকঢোল পিটিয়ে করা এক প্রকল্পের নাম। যা সারকথায় বললে, প্রান্তিক আয়ের মানুষেরও একটা ১০ টাকায় খোলা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে হবে। যেমন এই একাউন্ট থাকলে, বিশেষত চাষিকে কোনো সরকারি ভর্তুকি বা এমন কিছু পৌঁছাতে সরকার সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবে এতে। সরাসরি যোগাযোগ আর সঞ্চয় এটাই ছিল ‘জনধন একাউন্ট খুলানোর’ মূল লক্ষ্য। কিন্তু বলা হচ্ছে, এটাই ডি-মনিটাইজেশনকে ব্যর্থ করেছে। কারণ, গরিব মানুষ বড়লোকের আয়কর না দেয়া কালো টাকা নিজের অ্যাকাউন্টে রেখে সাদা করে দিয়েছে কমিশনের লোভে ও বিনিময়ে। এ কথার একেবারে সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করা মুশকিল, তবে এখন পর্যন্ত এটাই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা।

তবে ব্যাখ্যা যাই হোক, বাস্তবতা হলো ৯৮ শতাংশের বেশি বাতিল নোট ফিরে আসায় সব কিছুই আসলে ব্যর্থ প্রমাণিত। (বাতিল হওয়া ৫০০-১০০০ টাকার নোটের প্রায় ৯৮.৯৬ শতাংশই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে ফেরত এসেছে।) অথচ নোট বদলনো নিয়ে  সারা ভারতে গণ-দুর্ভোগের অন্ত ছিল না, বিশেষত গরীব স্বল্প আয়ের মানুষদের ক্ষেত্রে ও তাদের আয় রোজগারে।  অপর দিকে দ্বিতীয় নির্ণায়ক কী? যা দিয়ে এই ব্যর্থতা প্রমাণিত হয়েছিল?
মোদির আগে টানা দুই টার্মে ১০ বছর (২০০৪-১৪) ক্ষমতায় ছিল কংগ্রেসের জোট সরকার। কংগ্রেস তার প্রথম টার্মের পর থেকে ভারতের অর্থনীতিকে এই প্রথম রাইজিং অর্থনীতিতে ডাকা শুরু হয় গ্লোবাল জগৎ থেকে। যেমন, ২০০৯ সাল থেকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের পাল্টা গ্লোবাল উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ততকালে চিহ্নিত ‘রাইজিং ইকোনমির’ পাঁচ রাষ্ট্রকে নিয়ে ব্রিকস (BRICS) ব্যাংক উদ্যোগ, ভারত যার অন্যতম। কিন্তু আবার সেকেন্ড টার্মে জিতে এসে ওর মাঝামাঝি সময়ে, ঠিক মোদি সরকারের মতই আড়াই বছরের মাথায় ভারতের জিডিপি নেমে ৫ শতাংশের কাছে চলে গিয়েছিল। অথচ কংগ্রেস দ্বিতীয়বারেও জিতে সরকার গড়েছিল ভোটের বাজারে আগের টার্মের চাঙ্গা অর্থনীতি দেখিয়েই। এ কারণে ২০১৪ সালের নির্বাচনে মোদি নির্বাচনী ইস্যু করেছিল ‘কাজ সৃষ্টি’ এই বক্তব্যকে ঘিরে; মোদির ভাষায় ‘সবকা বিকাশ সবকা সাথ’। আর এতেই কংগ্রেসের ওপর হতাশাগ্রস্ত মানুষ (এখানে এই মানুষ বলতে গরিব বেকার থেকে ২০ হাজার রুপির চাকরি করা মধ্যবিত্ত পর্যন্ত) সবাই আবার আশায় বুক বেঁধেছিল যে, মোদি হয়তো অর্থনীতিকে ফিরিয়ে আনতে পারবে। এটাই ভোটের ফলাফলে ধরা পড়েছিল, মোদি ক্রেজ, উত্থান এখান থেকেই। অর্থাৎ ভারতের অর্থনীতিতে জিডিপির অর্থ সমাজের সাধারণ মানুষের কাছেও ট্রান্সলেটেড বা অর্থপূর্ণ। এমনিতে ‘বিকাশ’ শব্দের সমতুল্য অর্থ ‘উন্নয়ন’। আমরা যেটাকে ‘উন্নয়নের রাজনীতি’ বলি। যার আসল অর্থ ‘অবকাঠামোতে বিনিয়োগ’। স্বভাবতই অবকাঠামোগত বিনিয়োগ হল যে এটা ইন্ডাস্ট্রিজ বা নতুন কাজ সৃষ্টির জন্য পূর্বশর্ত। যদিও অবকাঠামোগত বিনিয়োগ ঘটার পরে আবার শিল্পে আলাদা বিনিয়োগ (ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট) লাগবে, তবেই মূল ‘কাজ সৃষ্টি’ হবে বলে মনে করা হয়। তাই ভারতে হিন্দিতে বিকাশ শব্দের অর্থ আমাদের চেয়ে অনেক সোজাসাপ্টা। এর অর্থ উন্নয়ন হলেই শেষ না, বরং ইন্ডাস্ট্রিতে মূল কাজ সৃষ্টি করতে হবে, এই অর্থে বিকাশ।

তাহলে এখন কথা স্পষ্ট। ডি-মনিটাইজেশনের পর থেকে ৯ মাসের মধ্যে চলতি বছরের দ্বিতীয় তিন মাস (এপ্রিল-জুনের)  যখন ভারতের প্রকাশিত জিডিপি ফিগার হাজির হল, দেখা গেল সেটা ৫.৭ শতাংশে নেমে গেছে (অথচ এটা মোদির আমলেই ৭.৫% থেকে ধীরে ধীরে এজায়গায় নেমে আসা)। তখন থেকে ডি-মনিটাইজেশনের নেতিফল মোদি আর লুকিয়ে বা অস্বীকার করে থাকতে পারেননি। আর ভোটের বাজারে এই তথ্যের তাৎপর্য হল, তাহলে ২০১৯ সালে মোদি আর দ্বিতীয়বার জিতে আসতে পারছেন না, এরই স্পষ্ট ইঙ্গিত এটা।

আগেই বলেছি, এসব তথ্য ইতোমধ্যে সাধারণ্যে হতাশা নামিয়েছে। শুধু তাই নয়, গ্লোবাল বাজারেও এই খবর হতাশার হয়ে পৌচেছে। আর দেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলেরা এটাকে তাদের নিজেদের জন্য ক্ষমতা পাবার ইঙ্গিত বলে দেখছে।

অপর দিকে বিজেপি-আরএসএসে গৃহদাহ শুরু হয়েছে। কিন্তু বিরোধী বলতে কি কংগ্রেস? না এখানে কংগ্রেসের জায়গায় ‘আঞ্চলিক দলগুলোর জোট’ পড়তে হবে। যেমন মমতার পশ্চিম বাংলা, আর ওইদিকে বিহার ও উড়িষ্যা তো বটেই, আরো এমন আঞ্চলিক দলগুলোর জোট কংগ্রেসের চেয়ে পপুলার সম্ভাবনার দল হয়ে আছে বলে ধরা হচ্ছে। তবে কংগ্রেস যেভাবে যে কোন এক আঞ্চলিক  দলের চেয়েও তুলনায় গুরুত্ব হারিয়েছিল, সেখান থেকে এর রেটিং কিছুটা ওপরে উঠেছে এখন। আগামী মাসে মোদির শহর গুজরাটের রাজ্য-নির্বাচন, সেখানে কংগ্রেসের কোলে সাফল্য আসতেছে বলে কথা বাজারে ভাসছে এখন। অপর দিকে একাডেমিক পরিসরে ও মিডিয়ায় এ কথা আলোচনা শুরু হয়েছে যে, আগের মনমোহন সরকারের চেয়ে মোদির অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স খারাপ, কেউ কেউ এই তুলনা ও দাবি করা শুরু করেছে। তর্ক শুরু হয়েছে একথা কত সঠিক তা নিয়ে। (The policies, such as demonetisation and restriction on cattle markets, are the result of Modi government’s flawed understanding of economics.) বোঝাই যাচ্ছে, মোদির কপাল পুড়েছে।

ভারতের বাইরে গ্লোবের এই আঞ্চলিক এলাকায় প্রভাব হিসেবে সবার আগে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে যদি বলি আমাদের জন্য কাম্য হবে ভারতের আঞ্চলিক দলগুলোর কোন জোট সরকার জিতুক, সরকার গঠন করুক। ফলে স্বভাবতই আগামী মাসের নির্বাচন থেকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি বা নির্বাচনের দিকে বাংলাদেশের চোখ পড়ে থাকবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

সুষমার সফরে মতভেদ প্রকট হয়েছে

সুষমার সফরে মতভেদ প্রকট হয়েছে

গৌতম দাস

২৮ অক্টোবর ২০১৭, শনিবার

http://wp.me/p1sCvy-2kx

 

গত ২২-২৩ অক্টোবর ২০১৭ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফর করে গেলেন। এক দিক থেকে দেখলে, এটা একটা বকেয়া সফর এই অর্থে যে, গত আগস্ট মাস থেকেই হবু এই সফর নিয়ে কথা হচ্ছিল; কিন্তু নানান কারণে হতে পারছিল না। অবশেষে অক্টোবর মাসে এসে এটা হতে পেরেছে। আর রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও বাংলাদেশের অবস্থানের ভিন্নতা যখন প্রকটভাবে স্পষ্ট কিন্তু এক দেখানোর চেষ্টাও সমান ততপর চলছে, সে পটভূমিতে এ সফর হয়েছে। তাই বলা যায়, সুষমা স্বরাজের এবারের সফর হলো ভারত ও বাংলাদেশের মতভিন্নতা রেকর্ড করে রাখার সফর।

ভারতের অবস্থান বার্মার রোহিঙ্গা নির্মূলের নীতি ও বর্বরোচিত তৎপরতার পক্ষে  এবং এটা দিবালোকের মতো পরিষ্কার। কিন্তু এর কারণ কী? এশিয়াতে ভারতের প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সাথেই চীনের ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠছে অপ্রতিরোধ্যভাবে। এই সম্পর্কগুলোকে ঠেকানো অসম্ভব। কারণ ভারতের পড়শি দেশগুলোতে দীর্ঘ দিন ধরে অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ উপেক্ষিত হয়ে আছে। অবহেলায় এগুলোকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফেলে রাখায় এসব পিছিয়ে পড়া রাষ্ট্রে বিনিয়োগ পাওয়ার আকাঙ্খা উঠেছে চরমে। অন্য দিকে, একালের চীনের বিপুল বিনিয়োগ সক্ষমতা এসব দেশের দোরগড়ায় হাজির। তাই, এই দুইয়ের মিলন ঠেকানো অসম্ভব। কিন্তু ভারত চাচ্ছে এসব দেশ বিকশিত না হয়ে ভারতের ক্ষুদ্র সামর্থ্য মোতাবেক এর সাথে তাল মিলিয়ে বামন হয়ে থাকুক; যেটা ভারতের সীমিত মাত্রার অর্থনৈতিক সামর্থ্যরে সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। তুল্য সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কোনো রাষ্ট্রই নিজ অর্থনীতিকে বামন করে রাখতে পারে না। ফলে ভারতের এহেন নীতির শেষ ফলাফল হচ্ছে – ওসব রাষ্ট্রে ভারতের ভাগে বড়জোর ছোট কোনো অবকাঠামো প্রকল্প ভাগে পাওয়া। বার্মাতে চীন ও ভারতের প্রতিযোগিতার ফলও তাই হয়েছে। কিন্তু বার্মিজ সেনাবাহিনী খুবই সাফল্যের সাথে চীন ও ভারত – এই দুই রাষ্ট্রকে রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে সমর্থক হিসেবে হাজির হতে বাধ্য করেছে। চীন ও ভারত উভয়েই প্রতিযোগিতা করে বার্মা সরকারের রোহিঙ্গাদেরকে নির্মূল করে ধুয়েমুছে সাফ করার কাজের স্বপক্ষে  সমর্থন নিয়ে হাজির হয়ে গেছে। ভারত ও চীন উভয়েরই রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে দাঁড়ানোর পেছনে খোঁড়া যুক্তি একটাই, ২৫ আগস্ট আরসা গোষ্ঠী নাকি ‘সন্ত্রাসবাদী’ আক্রমণ চালিয়েছে। তাই ভারত ও চীনের সরকার বার্মিজ সরকারের বিরুদ্ধে কথিত  ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা’কে সমর্থন করছে। এ থেকে স্পষ্ট, কথিত ‘আরসা আক্রমণ’ এই অজুহাত চীন, ভারত এবং বার্মার সরকার সবার জন্যই রোহিঙ্গা নির্মূলের পক্ষে খুবই প্রয়োজনীয় এক সাফাই দাতা। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, কথিত আরসা (ARSA) আক্রমণ তাহলে আসলে কার পক্ষে সহায়তা করেছে, আরসা কী রোহিঙ্গাদের পক্ষের সংগঠন? নাকি এটা কাদের কাজে লাগছে? আরসা কাদের সংগঠন? নাকি আরসা বলে সক্ষম কোন সংগঠন কী আদৌও আছে?

এর আগে ২০১২ সালের রোহিঙ্গা নির্মূলের সময় ভারত বার্মিজ সরকারের কাছে ‘কৃতিত্ব’ জাহির করেছিল যে, ভারত বাংলাদেশের সরকারকে প্রভাবিত করেছে এমনভাবে যে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আনুষ্ঠানিকভাবে সে দেশে আশ্রয় নিতে দেয়নি। বাংলাদেশ নিজ সীমান্ত রোহিঙ্গাদের জন্য খুলে দেয় নাই। ফলে রোহিঙ্গাদের সীমান্ত পার হয়ে প্রবেশ করতে দেয়নি এবং এ জন্য দুর্যোগের সেই পুরাটা সময় সীমান্ত বন্ধ রাখতে সক্ষম হয়েছিল। একইভাবে ২০১৭ সাল এবারও শুরুর দিকে একই কৃতিত্ব নিতে পেরেছিল ভারত। আমাদের সরকারও প্রথম সপ্তাহে সীমান্ত বন্ধ রেখেছিল। কিন্তু এরপর আর পারেনাই। আভ্যন্তরীণ নিজ জনমতের চাপে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে ছিল যে, সীমান্ত বন্ধ রাখার চাপ হয়ে গিয়েছিল সরকারের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য গণবিস্ফোরণের চাপ। সীমান্ত না খুলে দিলে বাংলাদেশ সরকার যেন হয়ে দাঁড়াত রোহিঙ্গাদের ওপর সব নির্যাতনের মূল হোতা। এই বাস্তবতা ভারত বা বার্মিজ সরকারের ইচ্ছামতো বয়ান দেয়া অসম্ভব করে তোলে। অথচ ২০১২ সালে এরাই “রোহিঙ্গারা জঙ্গী” এই বয়ানের সাফাই তুলে সীমান্ত বন্ধ রাখা সম্ভব করেছিল। কিন্তু এবার নিজের বয়ান নিজে গিলে খেয়ে ভুলে গিয়ে বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত খুলে দিয়েছিল শরণার্থীদের জন্য। উলটা “মানবাধিকার রক্ষাকর্তা মা” বলে ক্রেডিট দাবি করতে ছুটেছিল। অথচ রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের সাথে বাংলাদেশের অবস্থানের মৌলিক ভিন্নতা সেই থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত ৬ সেপ্টেম্বর বার্মা সফরে গিয়ে সামরিক বাহিনীর রোহিঙ্গা নির্মূলকে ‘সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা’র কাজ বলে বাহবা দিয়ে এসেছিলেন। বার্মার এই কথিত সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের কাজে মোদি গভীর উদ্বেগ দেখিয়ে এসেছিলেন। (Prime Minister Narendra Modi said on Wednesday that India shared Myanmar’s concern about “extremist violence” in its Rakhine state, …) এটাই হল রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের প্রকৃত অবস্থান।

অনেকে সুষমা স্বরাজের এবারের বাংলাদেশ সফর থেকে ‘আবিষ্কার’ করছেন, সুষমা তো এবার এই সফরে এসে ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ দাবি জানিয়েছেন। ফলে এটা ভারতের অবস্থানের বিরাট পরিবর্তন। যেমন ফলাও করে বিবিসি লিখছে, “……বিবৃতিতে সুষমা স্বরাজ রোহিঙ্গা শব্দটি উল্লেখ না করেই বলেন, ‘আমরা কোফি আনান কমিশন যেসব সুপারিশ করেছে সেগুলোর বাস্তবায়নকেও সমর্থন করি’।” যেন এটা ভারতের এক বিরাট অগ্রগতির অবস্থান।

 

বাস্তবে মোটেও তা নয়। আমাদের মাথায় রাখতে হবে, ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ ইচ্ছা তো খোদ সু চিরও আছে বলে তিনি বহু আগেই জানাচ্ছেন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সু চির কথায় সাথে একটা ‘যদি বা কিন্তু’ আছে। তা হল, যারা নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারবে তিনি কেবল তাদেরই ফেরত নেবেন বা কেবল তাদের বেলায় আনান কমিশনের রিপোর্ট ‘বাস্তবায়ন’ করবেন। সু চি ভাল করেই জানেন যে,  লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিজ নাগরিকত্বের প্রমাণ তো দিতে পারবেন না। ফলে সু চিকে ‘সাত মণ ঘিও ঢালার দরকার হবে না এবং রাধাও নাচবে না।’ অতএব ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়নের’ খায়েশ প্রচার করতে খোদ সু চি নিজের কোনই সমস্যা দেখেন নাই।

আর ঠিক একইভাবে সুষমা স্বরাজও বলেছেন, আমরাও ‘আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন’ সমর্থন করি। এটা বলায় তারও কোনো সমস্যা নেই। কারণ তিনি জানেন, খোদ সু চি যে কথা বলেছেন, সে কথা বলতে সুষমার নিজের বলতেও কোনো অসুবিধা নেই। এ ব্যাপারে বরং ভারতের ‘নীতি’ খুবই সোজাসাপ্টা। খোদ বার্মা যে ভাষায় ও বয়ানে যা অবস্থান নেবে, ভারতও সেটা করবে। এটাই হলো ভারতের বাস্তব অবস্থান। বার্মা সরকার ‘রোহিঙ্গা’ শব্দ ব্যবহার করে না, কেউ করুক তাও চায় না। ফলে সুষমা স্বরাজের সফরে ভারতের লিখিত ভাষ্য হল, ‘রাখাইন প্রদেশের ডিসপ্লেসড বা বাস্তুচ্যুত’ জনগোষ্ঠীকে ফেরত নিতে হবে। এক কথায় বললে, বার্মার অবস্থানই ভারতের অবস্থান। এটা বোঝাতে অস্পষ্টতা রাখেনি ভারত।
ভারত তার অবস্থান যে একচুল বদলায়নি রোহিঙ্গা ইস্যুতে এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, সুষমা স্বরাজের সফর উপলক্ষে ভারতের পররাষ্ট্র দফতর থেকে যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়েছে সেখানে লেখা একটি পুরনো বাক্য হলো- ’I may add that India is deeply concerned at the spate of violence in Rakhine State of Myanmar. We have urged that the situation be handled with restraint, keeping in mind the welfare of the population’. এর প্রথম বাক্যটা পয়দা হয়েছিল গত ৬ সেপ্টেম্বর মোদির বার্মা সফরকালে, আর দ্বিতীয় বাক্যটা যোগ করা হয়েছিল মোদি সফর শেষ করে ভারতে ফিরে আসার পরে, বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত খুলে দেয়ার পরে।

আমরা বরং সুষমা স্বরাজের সফরকালে বলা, নতুন আর এক বাক্যের কথা মনে রাখতে পারি। সুষমা বলেছেন, ‘আমাদের দৃষ্টিতে এই সমস্যার দীর্ঘস্থায়ী সমাধান হলো, রাখাইন প্রদেশের ব্যাপক আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন যা ওই প্রদেশে বসবাসকারী সব কমিউনিটির জনজীবনে ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে’। সুষমার এবারের সফরে নতুন যোগ হওয়া বাক্য এটা। কিন্তু ভারত যে রোহিঙ্গা সমস্যার কোনো সমাধান চায় না, বরং বার্মা সরকারের চোখেই দেখে সঙ্কটটিকে, এর প্রমাণ হচ্ছে এই বাক্যগুলো। রাখাইন প্রদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের সমূলে নির্মূল করা হচ্ছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার এ কারণে হচ্ছে না যে, কোনো অসম সুযোগ-সুবিধা তাদের দেয়া হয়েছে। তারা অন্য জনগোষ্ঠীর চেয়ে কম অথবা বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে, সঙ্কট সে জন্য নয়। বরং আদৌ রোহিঙ্গারা বার্মার নাগরিক হিসেবে বসবাস করতে পারবে কি না, কোনো মুসলমান জনগোষ্ঠী বৌদ্ধদের পাশাপাশি রাখাইন প্রদেশে বাস করতে পারবে কি না, এবং নাগরিক হয়ে থাকতে পারবে কি না, এটাই মূল ইস্যু।
লক্ষণীয় যেটা বিষয় নয়, ইস্যু নয় সেসব কথা সুকৌশলে তুলে আনছেন সুষমা স্বরাজ। আর এভাবেই উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কে প্রশ্রয় দেয়া এবং এর বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষকে আড়াল করে দেয়ার চেষ্টা করছেন।

বাংলাদেশের দিক থেকে যেটা এখন অবশ্য করণীয় হয়ে গেছে তা হল, রোহিঙ্গা ইস্যুতে দেশের একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট  অবস্থান স্থির করা এবং সে অনুযায়ে অবস্থান নেয়া। যাতে একেবারে নিজের জাতীয় স্বার্থে এই অবস্থানের পক্ষে বাংলাদেশের সামরিক-বেসামরিক প্রশাসন এক সাথে কাজ করতে পারে। বাংলাদেশের স্বার্থ একমাত্র এভাবেই অটুট থাকতে পারে। এরপর দেশে-বিদেশে ও জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন ফোরামে এর পক্ষে তৎপরতা চালানো হতে পারে আমাদের সঠিক অবস্থান। একমাত্র সে ক্ষেত্রেই আমরা বার্মার সরকারের ওপর যে চাপ বাড়ছে এর সুবিধা নিতে পারব।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ অক্টোবর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বাংলাদেশে “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতি” মাপার ডাক্তার পাওয়া গেছে

বাংলাদেশে “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতি” মাপার ডাক্তার পাওয়া গেছে

গৌতম দাস

২২ মে ২০১৭, ০০ঃ ০৪

http://wp.me/p1sCvy-2fz

প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান,  বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত” ব্যক্তি কিনা সেই সন্দেহ রেখেছেন। ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত’! কী দুর্দান্ত ভাষা! আর সেই বিশেষ ‘অনুভুতি’ মাপার ডাক্তার হয়েছেন মিজান। বাহ! বাহ! এটা কি রাজনীতি পর্যালোচনার ভাষা  নাকি যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা জাতীয় মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ? অথবা ‘ব্যাটলিং বেগামস’ এবং ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার ভিত্তিতে প্রথম-আলো-ডেইলি স্টার গ্রুপের এক এগারোর রাজনীতির নতুন ড্রিল? গত ১১ মে ২০১৭ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো মিজানুর রহমান খানের ‘জিয়া-যাদু গোপন চুক্তিটি কি প্রকাশ করবেন খালেদা জিয়া?’ লেখাটি প্রকাশ করে। শিরোনামের স্টাইল খেয়াল করলেই সন্দেহ জাগে এর মতলব ভালো না। যাদু মিয়ার সঙ্গে জিয়াউর রহমান নাকি একটি গোপন চুক্তি করেছিলেন । আর এখন ১০ মেবুধবার খালেদা জিয়া তাঁর ভিশান ২০৩০ পেশ করবার পরপরই দৈনিক প্রথম আলোর একটাই বিশাল রহস্যমিশ্রিত আবদার, সেই ‘গোপন’ চুক্তি খালেদা জিয়া প্রকাশ করুক!

বিএনপি এবং ও তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির যেকোন সমালোচনা পর্যালোচনা হতেই পারে। কিন্তু বলুন তো খালেদা জিয়ার মধ্যে  গণতন্ত্র মনস্ক অনুভূতিসম্পন্ন “উপলব্ধি” আছে কিনা সেটা বিচার করবার ডাক্তার কোথায় পাবেন? দ্বিতীয়ত একটি দেশ বা সমাজের রাজনীতি স্রেফ একজন ব্যক্তির উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না। যে সকল রাজনৈতিক বর্গ কেন্দ্র করে সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠি নিজ নিজ ক্ষমতা  এবং নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক সম্মতি তৈয়ার করে তার সঙ্গে সেই বর্গটি সম্পর্কে সমাজের বিভিন্ন বয়ানের ভূমিকা থাকে। থাকবেই। সেই ক্ষেত্রে ‘গণতন্ত্র’ সম্পর্কে  যে সকল বয়ান সমাজে হাজির এবং সেই সকল বয়ান কেন্দ্র করে তর্কবিতর্ক সমালোচনা পর্যালোচনা ছাড়া জাতীয় রাজনীতির কোন গুণগত পরিবর্তন ঘটে না। তার মধ্য দিয়েই জনগণের রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনার বিকাশ ঘটে। এই গোড়ার কথা যখন আমরা মনে রাখি না, তখন হলুদ সংবাদ মাধ্যমগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার সমাধান হিসাবে ‘মাই নাস টু’ ফর্মুলা তৈয়ার এবং তা কার্যকর করবার কাজে অনায়াসেই লেগে পড়তে পারে। গত এক-এগারোর সময় এটাই আমরা দেখেছি। “মাইনাস টু” রাজনীতির মূল তত্ত্ব ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য দুইজন “ব্যাটলিং বেগাম” – অর্থাৎ খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দায়ী। অতএব করণীয় হচ্ছে এদের দুইজনকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া। চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ পাঠক আপনার নিজের মতো করে বুঝে নিন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য যখন আমাদের বিচারের মানদণ্ড খালেদা কিম্বা শেখ হাসিনার ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত উপলব্ধি’ থাকা না থাকার বিচার হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমরা মূলত মাইনাস টুর তত্ত্বই আর এক ভাবে আওড়াই। কিন্তু এবার সুনির্দিষ্ট ভাবে খালেদা জিয়া সম্পর্কে এই বোম্বাস্টিক বিশেষণ প্রয়োগের চেষ্টা দেখে আন্দাজ করা যায়  এবার মাইনাস-টু না সম্ভবত মাইনাস ওয়ান এটা।

যাক্‌,  তবুও বাংলাদেশে তাহলে ‘গণতন্ত্রমনস্ক’ এবং গণতন্ত্রের ‘অনুভূতি প্রসূত উপলব্ধি্র’ ধারক মহানুভব   একজন ব্যক্তি পাওয়া গিয়েছে।  বিএনপি একটা ভাল দল কীনা, ওর রাজনীতি ভাল কীনা এমন কিছু প্রমাণ মিজানুর রহমান খান করবেন আমরা তা আশা করি না। যদিও পর্যালোচনায় ভালমন্দ উভয় দিকটাই তুলে ধারা্র কথা। মুল্যায়নে বসলে বিএনপির একগাদা ত্রুটি, সীমাবদ্ধতা অনেকেই খুজে পেতেই পারেন। তবে মিজানুর রহমান খান  ব্যক্তিগতভাবে একজন বাকশাল-প্রেমি ও ‘বাঙালী জাতীবাদ”-প্রেমিও তিনি বটে। যদিও তাতেও আমাদের সমস্যা নাই।   কিন্তু সমস্যা হয় তখন যখন চরম প্রিজুডিস বা নিজের বাকশালপ্রীতি ও সাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিবাদকে পাশে সরিয়ে না রেখে উলটা তা দিয়েই  রাজনীতির মুল্যায়ন করতে বসেন। সেটা দৈনিক প্রথম আলোর মতো তথিকথিত সাংবাদিকতার আড়ালে মূলত ‘বাকশালী’ অপপ্রচারের অধিক কিছু হয়ে ওঠে না।

কোন রাজনীতি বা রাষ্ট্রের ভালমন্দ বিচার করবেন কী দিয়ে? সে বিচার কাজে ক্রুশিয়াল বৈশিষ্টগুলো কী কী ?  সেগুলো জেনে রাখার বদলে নিজের বাকশালপ্রীতির উপর ভরসা করে বিচারে বসলে তাতে সেটা ঘোরতর অন্ধ দলবাজীই হবে। প্রথম আলোতে প্রকাশ্যে ঘোষিত মিজানসহ তিনজন বাকশাল সমর্থককে এডিটর আমরা দেখে থাকি।  বিশেষ করে মিজানের লেখায়, যেমন আলোচ্য এই কলামের শিরোনাম পড়ে যেকারও মনে হবে পাপীতাপী বিএনপির বিরাট এক গোপন দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসে মিজান কথা বলছেন। তাই কী? আসেন তাহলে দেখা যাক!

বাংলাদেশের ‘প্রগতিশীলরা’ কেউ কোনদিন শেখ মুজিবের বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীর কোন রিভিউ, সমালোচনা করেছেন জানা যায় না। তবু অনেকের মনে পড়বে হয়ত, একদলীয় শাসন অথবা মাত্র চারটি সংবাদপত্র ইত্যাদির কথা। কিন্তু এগুলো সেই সংশোধনী কার্যকর করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের যে  বৈশিষ্ট্যগত  ত্রুটি ঘটেছে তার আসল বিচার নয়। অর্থাৎ কনষ্টিটিউশানাল বা রাষ্ট্রের গঠনতান্ত্রিক সমালোচনা নয়। অথচ মিজানুর রহমান খান অনবরত নিজেকে মহা সংবিধান বিশারদ জ্ঞান করে আমাদের আলোকিত করে থাকেন!

গঠন প্রক্রিয়া কিম্বা বৈশিষ্ট্য কোন দিক থেকেই বাহাত্তরের সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে গড়া বাংলাদেশ রাষ্ট্র আদর্শ মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। সেটা ইতিহাসের ফলাফল, আমরা তা মেনে নিয়ে যতটুকু পেয়েছিলাম তাই নিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারতাম। সেই ক্ষেত্রে তার যতটুকু ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য আছে তা অক্ষুণ্ণ রাখাই ছিল প্রধান কাজ। কিন্তু বাকশাল সংশোধনীর ফলে এরপরের বাংলাদেশ আর কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় বরং এক  দানব বা স্বৈরশাসন আনয়নকারি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনস্টিটিউশন বদলানোর ফলে সেই দানবীয় চরিত্র  কিভাবে ঘটেছে তা নিয়ে খুব কমই পর্যালোচনা দেখা যায়।  তবু বাকশালী মিজানুর রহমান খানের একটা সহজ ফর্মুলা হল অপ্রাসঙ্গিকভাবে জিয়াউর রহমানকে গালি গালাজ করা। বাকশাল সম্পর্কে টুঁ শব্দ না করে সারাক্ষণ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গালমন্দ পাড়া। সব সমস্যার কারণ হিসাবে সামরিক শাসনকে দেখানো। সামরিক  শাসন সামরিকতন্ত্র খারাপ, অবশ্যই। কিন্তু বাকশালকে মহৎ প্রমাণ  করবার সুবিধা না পেয়ে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান কতো খারাপ ছিলেন সেটা প্রমাণ করে বাকশালের মহিমা গোপনে জারি রাখাই বাংলাদেশের নব্য বাকশালিদের কাজ। মিজানুর রহমানকে তাদের সর্দার বলা যায়। সেটা বাকশালিদের পক্ষে সহজ হয়েছে কারণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি বুদ্ধিজ্ঞানহীন বোকাদের দল, যারা নব্য বাকশালিদের রাজনীতি মোকাবিলা করবার ন্যূনতম হিম্মত রাখে না।

মিজান তাঁর লিখায় নিজেকে বারবার   রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক ক্ষমতা পুঞ্জীভুত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার ব্যক্তিত্ব হিসাবে তুলে ধরেন।  কিন্তু আজীব ব্যাপার হল, আমাদের সংবিধানে সর্বপ্রথম যে সংশোধনীতে রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে প্রায় সব ধরণের ক্ষমতা সঞ্চিত করা হয়েছিল সেটা বাকশাল চতুর্থ সংশোধনী। তা সত্ত্বেও এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে মিজানুরের কলম জাগে না। বরং তিনি কথিত ‘গোপন চুক্তি’ বলে এক রহস্য তৈরি করতে গিয়েছেন, ১১ মে এর ঐ কলামে। কথিত সেই গোপন চুক্তি নাকি অপ্রকাশিত, মিজান জানাচ্ছেন। কিন্তু অপ্রকাশিত হলেও মিজানুর আবার এর পুরাটা জানেন ও এবং সেটা তার আবার মুখস্থ। তাঁর কথিত মতে, শেখ মুজিবের বাকশালী সংশোধনীতে প্রেসিডেন্টের হাতে সীমাহীন যে একক ক্ষমতা দিয়ে রেখেছিলেন, জিয়া নাকি এরচেয়েও আরও ক্ষমতা চেয়েছিলেন। যদিও মিজান নিজেই জানাচ্ছেন জিয়া শেষে এমন ক্ষমতা নেনই নাই। সেই না নেওয়ার দলিলই হল মিজান কথিত যাদু মিয়ার সাথে ‘গোপন চুক্তি’। তাহলে  সেক্ষেত্রে কথিত সেই দলিল বলে যদি কিছু আদৌ থেকেও থাকে তবে তা  বিএনপি বা জিয়ার কোন কলঙ্কের দলিল হয় কেমন করে? কিন্তু তবু মিজানুর রহমান খানের দাবি কথিত ঐ গোপন দলিল ‘কলঙ্কিত’ এবং তা “খালেদা জিয়াকেই প্রকাশ করতে হবে”।

মিজানুরের চরম বিনোদনমূলক তামাসাটা হল, তিনিই বলছেন ঐ গোপন দলিল আসলে জিয়াউর রহমানের বাড়তি ক্ষমতা না নেওয়ার দলিল বা রাজনীতিবিদ যাদু মিয়ার সাথে  “সন্ধি-পত্র”  – অথচ এই কথিত চুক্তি নিয়ে রহস্য সৃষ্টি  আর জিয়া এবং  বিএনপিকে ‘পাপীতাপী’ ‘অভিশপ্ত’ বলে ইঙ্গিত তৈরি করছেন তিনি। এই সুযোগ মিজানুর কোথায় পাচ্ছেন? বরং মিজানুর যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক সীমাহীন ক্ষমতা সঞ্চিত করার বিরুদ্ধের সোচ্চার প্রবক্তা হতে চান তবে সেক্ষেত্রে শেখ মুজিবের এবং বাকশাল সংশোধনীর কঠোর সমালোচনা দিয়েই তাকে শুরু করতেই হবে। এক্ষেত্রে যদি তার প্রগতিশীলতা-বোধ, বাঙালী জাতিয়তাবোধ কিংবা বাকশালপ্রীতি বাধা হয়ে দাড়ায় তবে তা তাকেই পেরিয়ে আসতে হবে। এপর্যন্ত যা তিনি কখনও পেরেছেন আমরা দেখিনি।

এই প্রসঙ্গে বলে নেয়া যায় যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস বিচারে – বিশেষত কনষ্টিটিউশনের চতুর্থ সংশোধনী কী কী কারণে কালোদাগের এবং ক্ষতিকর এমন কোন একাদেমিক মুল্যায়ন আমরা ‘প্রগতিশীলদের’ ঘর থেকে বের হয়েছে দেখি নাই। রাজনৈতিক দলগুলোর পরিসরেও এবিষয়ে আর যা দেখা যায় সেগুলোকে বড়জোর পার্টিজান বা দলকানাদের সমালোচনা। এই অবস্থায় বাকশালের আসল মুল্যায়ন হল – এককথায় বললে – এই সংশোধনী্র মধ্য দিয়ে আসলে বাংলাদেশ  রাষ্ট্রের খোদ কনষ্টিটিউশনকেই নাই করে দেয়া হয়েছে।  সোজা কথায় ভাঙাচোরা হোক বাহাত্তরের সংবিধানের মধ্য দিয়ে একটা রাষ্ট্র বানানো গঠন হয়েছিল, আর সেটাকেই বাকশালী চতুর্থ সংশোধনী পুরাটাই ভেঙ্গে দিয়েছিল। চতুর্থ সংশোধনী এই অর্থে রাষ্ট্র নিরাকরণের একটি ঐতিহাসিক দলিল, যে অভিজ্ঞতা থেকে বারবার আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্র নাই অবস্থার মধ্যে ফেলে দেওয়ার দলিল এটা।

কেন? এর মূল কারণ এই সংশোধনীতে রাষ্ট্রের  নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিকের আদালতে  রিট করার ক্ষমতা [আর্টিকেল ৪৪] কেড়ে নেয়া হয়েছিল। শুধু তাই না, জুডিশিয়ারির বা আদালতের রিট শোনার যে আলাদা নিজস্ব ক্ষমতা দেয়া ছিল [আর্টিকেল ১০২ (১)] সেটাও চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। [চতুর্থ সংশোধনীর পিডিএফ কপিতে এখানে দেখুন, সংশোধনীর ইংরাজী অংশে প্রথম পাতায় ৩ নম্বর সংশোধনী আর ১৭ নম্বর সংশোধনী দেখুন হলুদ মার্কার দেয়া আছে।।] আর প্রেসিডেণ্ট জিয়ার সামরিক অধ্যেদেশ বলেই, আবার বলছি ১৯৭৬ সালের সামরিক অধ্যাদেশ বলেই  ঐ বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল হওয়া [আর্টিকেল ৪৪] এবং [আর্টিকেল ১০২ (১)]  ফেরত নিয়ে আসেন। একথার সবচেয়ে ভাল প্রমাণ এবং কথাগুলো সবচেয়ে সহজে স্পষ্ট বুঝা যায় কনষ্টুটিটিশনের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের আপিল কোর্টের রায়ে। ঐ রায় ১৮৪ পৃষ্টার। ঐ রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল বলে জানানো হলেও একই সাথে পঞ্চম সংশোধনীর যেসব অংশ বাতিল হবে না, বরং ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জীবিত থাকবে সেসবের একটা তালিকা দেয়া আছে ওর ১৮৩ পৃষ্ঠায়। সেখানে লেখা আছে জিয়ার আনা সংশোধনীর কথা। [দেখুন পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়, আপিল কোর্ট জাজমেন্ট ২০১০,  ১৮৩ পৃষ্ঠায় 3e এর (iii, iv & v)]    শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনীর ফলে এভাবেই প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতার দানব বানিয়েছিল, এর বিরুদ্ধে আদালতে কোন প্রতিকার চাইবার সুযোগ ছিল না। ফলে বাংলাদেশ  আর কোন প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে নাই। যে রাষ্ট্রে রিট করার সুযোগ নাই, সেটা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে না। এই দিকটা নিয়ে কোন জজ-উকিল বা কোন রাজনীতিবিদকে আমরা পয়েন্ট তুলতে শুনি নাই। এটাও এখন প্রমাণিত যে রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনষ্টিটিউশনের ভাল-মন্দ বিচার কী করে করব, কী করে এটা কাজ করে তা বুঝার ক্ষেত্রেও আমরা এখনও যথেষ্ট লায়েক হই নাই। এখনও কেবল দলবাজি আর প্রগতিশীলতার ভাণ ও ভণ্ডামির মধ্যে আটকে আছি। অথচ আমরা আবার আওয়ামি লীগ বা বিএনপির এবং রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট বুঝার বিচারক হতে চাচ্ছি।

‘৭৫ পরবর্তি সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতা
মিজানুর রহমান খানের আর এক প্রবল পছন্দের বয়ান হল ‘৭৫ পরবর্তি সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার’ তুলনা। এটাতে  তাঁর চিন্তা করার কাঠামোটাও ধরা পরে। অবশ্য এটা তাঁর একার না, বাকশালের পক্ষে সাফাই যারাই দেন তাদের সাধারণ বয়ান এটা। মিজান সে বয়ান পরিপাটি করেন মাত্র। এই বয়ান দিয়ে তিনি বলতে চান বাকশাল দানব ক্ষমতার রাষ্ট্র তৈরি করলেও যেহেতু এটা বেসামরিক শাসন, আর বেসামরিক শাসন মানেই বৈধ শাসন, তাই দানব বাকশাল হলেও এটা বৈধ, ফলে গ্রহণীয়। আর তাই বিপরীত যুক্তিতে সামরিক শাসন অবৈধ। দারুন বাকশালী যুক্তি। বিএপির বিরুদ্ধে এটাই  প্রধান বাকশালী অস্ত্র, কিন্তু বিএনপির সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা এই বাকশালী কৌশলের মর্ম ধরতে পারে না বলে এর কোন উত্তর দেবার হিম্মত দেখাতে পারে না।

আসলে এভাবে বৈধ-অবৈধ এর ভাগাভাগির লাইন টানা – এটা নগ্ন  শঠতা। মিজান বলতে চান বাকশাল সংশোধনীর ভিতরে যত খারাপ কিছুই থাক তবু এটা বৈধ কারণ তা সিভিলিয়ান ক্ষমতা। এটাই শঠতা। উপরে দেখিয়েছি, কনষ্টিটিউশনে চতুর্থ সংশোধনী এনে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে চাইলে কোন নাগরিকের আইনিভাবে আদালতে নালিশ জানাতে যাবার সুযোগ কেড়ে নেয়া হয়েছে। ফলে এরপরের বাংলাদেশ, এটা দেখতে তখনও একই দেশ বা আধুনিক রাষ্ট্র মনে হলেও কার্যত এটা আর তখন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। এটা আসলে নির্বাহী প্রেসিডেন্ট – নামে “এক সম্রাটের  প্রি-রিপাবলিক বাংলাদেশ” হয়ে গেছিল। আমি নিশ্চিত মিজানসহ কোন ‘প্রগতিশীল’, ‘বাঙালী জাতিবাদীর” চিন্তায় এটা ধরা পড়বে না। এভাবে তারা চিন্তা করে দেখতে অভ্যস্ত নয়। এমনকি বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও নয়। বেসামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক শাসন মানেই মন্দ গল্প তারা বাকশালিদের কাছ থেকে ভালোই হজম করে। হয়তো নীরবে মেনেও নেয়।  চতুর্থ সংশোধনী যেখানে রাষ্ট্রের রিপাবলিক বৈশিষ্টই নষ্ট করে দেয় এরপর সেই বাকশালী রাষ্ট্রটা বৈধ নাকি অবৈধ –  সামরিক নাকি বেসামরিক – সেটা  কী আর কোন তর্ক? কিন্তু মিজান মার্কা এই বাকশালী মিথ্যা আর চাতুর্য প্রপাগান্ডার তোড়ে বিএনপিই  ঘায়েল হয়ে গিয়েছে। কারণ রিপাবলিক রাষ্ট্রের ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য সুরক্ষা বিএনপির রাজনীতি নয়। এর ফলে তারা জিয়াউর রহমানকেও স্রেফ একজন সামরিক শাসকের বেশী বুঝতে অক্ষম। অথচ বাকশালী রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব আসলে আমাদেরই এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতায়, “পোস্ট-বাকশাল পরিস্থিতিতে আবার ট্রাকে উঠার উদ্যোগ” এটা বোঝার ক্ষমতা বিএনপির বুদ্ধিজীবীদের নাই।

এমনিতেই বৈধ-অবৈধের তর্ক আর এই ক্রাইটেরিয়া দিয়ে রাষ্ট্রের ভাল-মন্দ বিষয়কে বুঝার চেষ্টা একটা খুবই নাবালকের কাজ। মনে রাখতে হবে একটা কালাকানুন বা কালো আইন – চরম দমনমূলক ও নিপীড়ন আইন হলেও সেটা বিদ্যমান সংবিধানের কারণে  ‘বৈধ’ আইন হতে পারে; কোন অসুবিধা ছাড়াই।  তাই, এই বৈধ-অবৈধ জাতীয় শঠ প্রশ্ন তুলে বাকশালের কুকীর্তি আড়াল করে বলেই মিজানুর রহমান খানকে বাকশালের দলবাজ সমর্থক বলছি।

আবার বিপরীতে সেসময়ের জিয়ার সামরিক ক্ষমতা সেটাও সামরিক নাকি বেসামরিক সেবিচারে যাওয়াও একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কারণ সেটা যাই হোক না কেন সেসময়ের ঐ ক্ষমতাটা ছিল এক অন্তর্বর্তী ধরণের ক্ষমতা মাত্র। এটাই ঐ ক্ষমতার মূল বৈশিষ্ট। আর ওর ভাল মন্দ নির্ধারিত হবে নতুন যে ক্ষমতা কাঠামো সে তৈরি করবে বা হবে ওর গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে। তাতে যারা নির্বাচিত হয়ে নতুন ক্ষমতায় আসবেন সেসব অনেক কিছুর গ্রহনযোগ্যতার উপরে। আর প্রি-কনষ্টিটিউশনাল সরকার মাত্রই অন্তর্বর্তী সরকার। বাকশাল করে রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা এবং  শেখ মুজিব খুন হবার পর যা আমরা পেয়েছি তাতে সেটা আবার একটা প্রজাতান্ত্রিক কনষ্টিটিউশনের ফিরে যাবার আগের অন্তবর্তী অবস্থা।

তবু মিজানুরের মনে হতে পারে যে না, “ক্যান্টনমেন্টে বসে” যারা দল বানালো তাদেরকে হাতে নাতে ধরার একটা সুযোগ হাতছাড়া হতে দেয়া যায় না। ওকে নো প্রবলেম, আসুন মিজান তাহলে এবার আপনারই বিচার করি। ১/১১ এর সরকার কী সামরিক সরকার ছিল না? আর এই সামরিক সরকারের সাথে খোদ আপনি মিজান আর আপনার বস  মতি-মাহফুজদের  সম্পর্ক কী ছিল তা  নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নিবেন? আপনি মিজান কী তখন সে কালের “ক্যান্টনমেন্টে বসে” রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কারের নামে মহৎ কাজে  লিপ্ত হন নাই? ঐ কাজ আর ঐ সামরিক সরকার কী “বৈধ” হয়ে গেছিল আপনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে?   আরও ভিতরে যাবেন?  আসেন!
১/১১ এর ক্ষমতায় ইচ্ছামত যা মনে চায় করে যে রাজনৈতিক সংস্কার আপনারা করেছিলেন – কী তার পরিণতি? বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও এর কাঠামো এমন কিছু অথবা কী ছাপ আপনারা রেখে গেছিলেন যার সুফল এই আট বছরের হাসিনা সরকারের থেকে আমরা পাচ্ছি? বলেন, কোনটা  আপনাদের অবদান? কোন সে সুফল? আপনাদের সংস্কারের ফসল কী খোদ হাসিনার শাসনটাই নয়? নিঃসন্দেহে এখন কোন দায়ই নিতে চাইবেন না, আপনি। আমরা জানি। কিন্তু ইতিহাস সবাইকে একদিন না একদিন জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। আপনারাও ব্যতিক্রম নন।

কনষ্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ
মিজান আর এক বিরাট অভিযোগ করেছেন প্রায়ই করেন, “সংবিধানের সবচেয়ে বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ, যা পার্লামেন্টকে একটি রাবার স্ট্যাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী বা সংসদ নেত্রীর বশংবদ করে রেখেছে,সে বিষয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি”।  তিনি এটা প্রায়ই বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আর এর রাজনৈতিক নেতাদের গায়ে কালি লাগায় দিবার জন্য করে থাকেন।  তো মিজানের এই কথা পড়লে সকলেরই মনে হবে হা, তাই তো!  মিজান এই মোক্ষম জায়গায় ধরেছেন। হা, অবশ্যই এক মোক্ষম জায়গা। কিন্তু মিজান কাকে ধরেছেন? খালেদা জিয়া? নাকি এখানে অনুল্লেখ থাকা শেখ হাসিনাকে? মোটেও না। মিজান আসলে ধরেছে নিজেকেই।  বাইরের মানুষ – হাসিনা, খালেদাকে দোষারোপের আগে মিজান আপনি নিজেকে কাঠগড়ায় তুলার হিম্মত দেখান। পারবে্ন?
যতদিন মিজানুরসহ মতি-মাহফুজের মিডিয়া গ্রুপের মত লোকের সক্রিয় সমর্থনে, ১/১১ ঘটবার সম্ভাবনা আর বিশেষ করে বিদেশী স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসব গ্রুপের লোকেদেরকে ব্যবহারে ভাড়া খাটা মিজানুর রহমান খানেরা লুপ্ত না হবেন ততদিন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ থাকতে থাকবে। কারণ এই ৭০ অনুচ্ছেদই বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবজ। মিজানদের মত লোকেদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবজ। আমরা বরং  মিজানের এসব স্বীকার করার সৎসাহস দেখতে চাইতে পারি। হাসিনা খালেদারা খারাপ রাজনীতির ধারক বাহক, এটা কে না জানে, এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু এখান থেকে বের হতে, তা পরিস্কার করতে, পালটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া লাগবে। বিদেশী স্বার্থে সংস্কারের নামে পরাশক্তির  স্বার্থরক্ষা নয়। এই স্বার্থ রক্ষার্থে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে কলঙ্কের দাগ দেখিয়ে নয়।

মিজান আরও অভিযোগ তুলেছেন, বিএনপির গঠনতন্ত্রও দলের প্রেসিডেন্টের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা আছে, আর সেজন্য খালেদা জিয়াকে দায়ী করেছেন। ফলে এরও সংস্কার দাবি করেছেন তিনি। মিজান নিশ্চয় ভুলে যান নাই – মান্নান ভুঁইয়াকে দিয়ে কীভাবে বাধ্য করে সংস্কার ধারার বিএনপি তৈরি করা হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বেচারা দেলোয়ার হোসেনকে  কিভাবে ছেঁচা  দেয়া হয়েছিল, এর কষ্ট মৃত দেলোয়ার হোসেনই জানতেন। তবু তার গৌরব, তিনি পতাকা ছাড়েন নাই। শামসুল হুদার ভুঁইফোড়  নির্বাচন কমিশন কোনটা “আসল বিএনপি” সেই রায় দিয়েছিল। আর পরে তিনি নিজেই তার এই কাজ অন্যায় হয়েছে বলে স্বীকার করে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।  এটা যেন আমরা কেউ না ভুলি। তাহলে দাঁড়াল এই যতদিন বিদেশী স্বার্থে আপনি মিজান ও আপনাদের পত্রিকা  বাইরে থেকে ইচ্ছামত কোনটা বৈধ দল, কোনটা বিএনপি ঠিক করতে থাকবেন, সে সম্ভাবনা থাকবে, ততদিন হাসিনা-খালেদা কনস্টিটিউশানে ৭০ অনুচ্ছেদ রাখবে এবং অবশ্যই রাখবেন। ‘গণতন্ত্র’ শিখাতে আসবেন না। মনে রাখবেন, হাসিনা বা খালেদা সেসব কম বুঝে না। তাঁরা দলের সব ক্ষমতা সভাপতি হিসাবে অবশ্যই নিজের হাতেই রাখবেন। কোনটা আওয়ামী লীগ আর কোনটা বিএনপি এটা যদি বিদেশীরা নির্ধারণ করতে থাকে তবে এমন ব্যবস্থা ও সুযোগ যতদিন থাকবে ততদিন এই শকুনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে  হাসিনা-খালেদার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদের পক্ষে থাকা এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থান। দুনিয়ার হুঁশজ্ঞান ওয়ালা মানুষ মাত্রই এটাই করবে।  তাই বাইরে  অন্যদের দিকে না, সৎসাহসে নিজের দিকে তাকান। নিজেকেই কাঠগড়ায় দেখতে পাবেন।

অতএব, কনষ্টিটুশনে ৭০ অনুচ্ছেদ থাকার জন্য আপনারা মিজানেরাই মূলত দায়ী। নিজেরা যা করেছিলেন এর রিভিউ করেন, আবেদন করি ভাল হয়ে যান আগে। এরপর ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আপত্তি তুলেন।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গতকাল ২১ মে দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। তবে সেটা খুবই সংক্ষিপ্ত ভার্সান; চল্লিশ ভাগ ফেলে ষাট ভাগ ছাপা ভার্সান বলা যায়। এছাড়া  অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও আর এক ভার্সান ছাপা হয়েছে আজ ২২ মে ২০১৭, তাতে অনেকাংশেই পুর্ণ ভার্সান সেটা। কিন্তু তবু ফুল ভার্সান নয়। এখানে আরও বহু সংযোজন ও এডিটের পর সর্বশেষ ভার্সান এটাই।  ]

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

গৌতম দাস
০২ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-1Vh

কোল্ড ওয়ারের শুরুর দিকের পটভুমিতে একাত্তর বছর আগে জন্ম নেয়া এক সম্পর্ক হল ফিলিপাইন-আমেরিকার সম্পর্ক। সম্পর্কের এমন ঘনিষ্ঠতার পিছনে একটা বড় কারণ ছিল সেকালের ফিলিপাইনে সশস্ত্র কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মোকাবিলা। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সেই থেকে ফিলিপাইনে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি স্থাপনা পর্যন্ত গড়ায়। সেই থেকে একাল পর্যন্ত আমেরিকা ফিলিপাইনের এক নম্বর বন্ধু হিসাবেই ছিল। ছিল বলছি এজন্য যে এই সম্পর্কে ভাল রকমের চির ধরেছে। ফিলিপিনো সদ্য নির্বাচিত বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন রডরিগো দুতের্তে। সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর ২০১৬, তিনি চীন সফরে গিয়ে আমেরিকাকে প্রকাশ্যে “বাই বাই” বলেছেন। না এটা ভাবা ভুল হবে যে তিনি নিজ ভাষায় না ইংরাজিতে বলেছেন ফলে কোন ভাষান্তর সমস্যা হয়েছে কিনা। কারণ তিনি জানিয়েছেন তিনি নিজ মাতৃভাষার চেয়ে ইংরাজিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। সেকথার সাথে নিচের ইংরাজি উদ্ধৃতি দেখুন।

Duterte did not hesitate to say that America, which is part of the New World Order, “has lost now. I’ve realigned myself in your ideological flow [China], and maybe I will also go to Russia to talk to Putin and tell him that there are three of us against the world—China, the Philippines, and Russia. It’s the only way.”

Keep in mind that Duterte is not against the West’s achievement in science, medicine, and even in language. Duterte admitted to a reporter that “I am more articulate in English than in my own dialect.”

তো দীর্ঘ এত পুরানা বন্ধু হঠাত উলটা বইতেছেন কেন তা এখানে জানব। ফিলিপাইন সম্পর্কে বিশেষ করে ওর আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গঠন ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের দেশে খুব বেশী জানাশুনা নাই। তাই প্রেসিডেন্ট দুতের্তের চিন্তা বা কর্মসুচীর মুল ফিচারগুলো কী তা বলবার উছিলায় আগে ফিলিপিনো রাজনীতি জনগণ সম্পর্কে পটভুমির দিক থেকে কিছু বলে নিব। তাই লেখাটার দুই অংশ। দ্বিতীয় অংশ আলাদা পোষ্ট হিসাবে আসবে। সেখানে আমেরিকার সঙ্গে ফিলিপাইনের সম্পর্কের অবনতির বিস্তারিত দিকটা জানা যাবে।

প্রথম ভাগঃ ক্রসফায়ার : বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তে। নির্বাচনে জিতে চলতি বছর, ২০১৬ সালের জুন থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আর এর আগে ছিলেন দক্ষিণ ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের সবচেয়ে অগ্রসর শহর ডাভাও এর মেয়র। দুতের্তের নিজ ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রাজনৈতিক ফ্যামিলির সন্তান। বাবা ভিনসেন্ট গনজালেস দুতের্তে ছিলেন ফিলিপাইনের ডাভাও প্রদেশের গভর্নর এবং সিনেটর।  নিজে আইনে গ্র্যাজুয়েট, আইনজীবী ও প্রাক্তন সরকারি প্রসিকিউটর। প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতায় আসার পর তিনি এক কঠিন কর্মসূচি নিয়েছেন। ফিলিপাইনে ড্রাগ ব্যবসার দাপট আর ড্রাগ এডিক্টেট মানুষ ও পরিবারের সংখ্যা দুইই  সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যার এক বিরাট ইস্যু। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে বলছিলেন, পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে এমন ড্রাগগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এও সংখ্যা তার আমলসহ ধরে।  ড্রাগের সাথে সম্পর্কিত সমস্যা ও অপরাধের ব্যাপকতা বা সংখ্যা – এটাই দুতের্তের বিচার-বহির্ভুত হত্যা করে অপরাধীদের মেরে ফেলার পক্ষে একমাত্র যুক্তি। (যারা আরও ডিটেল চান তাদের জন্য। এমন পাঠকেরা এবিষয়ে তাঁর পয়েন্টগুলো ডিটেইল শুনতে আগ্রহী হলে গত ১৫ অক্টোবর আলজাজিরা টিভির নেয়া দুপর্বের সাক্ষাতকার ইউটিউবে দেখুন।) দুতের্তের আমলের মাত্র প্রায় তিন মাস – এর মধ্যেই প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোক বিচার বহির্ভুতভাবে নহত হয়েছেন।  তবে অন্য যে কোন কারও চেয়ে দুতের্তে স্পষ্ট করে বলেন, “আমি যদি এখন সবল হস্তক্ষেপ না করি আমাদের পরবর্তি প্রজন্মের ভবিষ্যত শুন্য হয়ে যাবে। অতএব এই ক্রিমিনাল এরা আমার বৈধ টার্গেট  আমি তাদের হত্যা করব”।  বুঝা যাচ্ছে আইনী দিক থেকে ব্যাপারটা অ-অনুমোদনের সন্দেহ নাই। কিন্তু এধরণের মরিয়া কথা থেকে  ফিলিপিনো সমাজে ড্রাগের ভয়াবহতার রূপ প্রকাশ পায় হয়ত। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট দুতের্তের পক্ষে জনমতের সমর্থন নিয়ে এক জরিপে দেখা গেছে তাঁর রেটিং ৭৬ ভাগ। অর্থাৎ সেই পুরানা কথা যা পপুলার তা আইন সম্মত বা সমর্থিত নাও হতে পারে।

আমাদের দেশে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ওয়্যার অন টেরর কর্মসূচিতে প্রেসিডেন্ট বুশের আমেরিকার দেয়া ফর্দ ও টার্গেটের বাধ্যবাধকতা পূরণ ও পালন। যদিও স্থানীয়ভাবে সে কথা মানুষকে বলার নয় বলে সেকথা আড়ালেই থেকে গেছে। অপর দিকে ফেলে যাওয়া এর আগের মানে হাসিনার প্রথম আওয়ামী সরকারের (১৯৯৬) আমলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষজন অতিষ্ঠ ছিল। ফলে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে র‌্যাবের হাতেই বিচার বহির্ভুত হত্যার সংস্কৃতি বা ‘ক্রসফায়ার’ ফেনোমেনা শুরু হয়েছিল। এতে র‌্যাব বিশাল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেন ত্রাতা। যেন ক্রসফায়ার করার জন্যই র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল, এমন আড়ালও এসে যায় এতে। ক্ষমতায় আসার পর দুতের্তেও এমন জনপ্রিয় একটি কর্মসূচি নেন, যে ড্রাগ ডিলার বা ব্যবসায়ী অথবা ড্রাগ সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত যে কেউ, এদের দেখামাত্র গ্রেফতার ও গুলি। যার আনুষ্ঠানিক আর আইনি আড়াল দেয়ার নাম ক্রসফায়ার, তা চালু করেন। তবে একটু সংশোধন দরকার। এর আগে থেকেই দুতের্তে আসলে বিখ্যাত হয়ে এসেছেন ড্রাগ অপরাধীদের ক্রসফায়ার করেই। ফলে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নতুন না, বরং মেয়র থাকার সময় এটাই ছিল প্রথম  তাঁর মুখ্য কাজ ও পরিচিতি। দুতের্তে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন এ বছর, ২০১৬ সালের ৩০ জুন। এরপর প্রথম দুই মাসেই এমন মৃত্যুর সংখ্যা হয় ২৪০০-এর বেশি, এটা সরকার-ঘোষিত সংখ্যা। অর্থাৎ গড়ে বিরতিহীনভাবে প্রতিদিন নিয়মিত ৪০ জন করে হত্যা করা হয়েছে। (উপরে বলা আলজাজিরাকে দেয়া ঐ সাক্ষাতকারে আপডেটেড সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার বলে প্রথম স্বীকৃত হয়)
ক্রসফায়ার, সোজা কথায় এটা হল খুন করে মেরে ফেলার পর যে শব্দ দিয়ে খুনটা আড়াল করা হয়। মানবাধিকার ও আইনের চোখে এ ধরনের ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে। সমাজে কোনো অপরাধের বিচারের দায়িত্ব দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্র পুলিশকে দেয় না। অপরাধের বিচারের দায়দায়িত্ব বিচার বিভাগের, মানে একমাত্র আদালতের। আর সেখানে ঐ আদালতে পুলিশের কাজ হল যাকে পুলিশের অপরাধী মনে হবে, সন্দেহ হবে, তাকে আদালতের সামনে হাজির করে, অভিযোগ এনে তা প্রমাণের চেষ্টা করতে পারে তাঁরা। এতটুকুই। সে অপরাধী কি না সে সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার পুলিশের নেই। এই এখতিয়ার একমাত্র আদালতের এবং আদালতও সে রায় দিতে পারেন একমাত্র বিচার-আচার মূল্যায়ন পরীক্ষার সবশেষে। কিন্তু এসবের পাল্টা ক্রসফায়ারকারী পুলিশ বা সরকারের পাল্টা বক্তব্য হল – এমন বিচার-আচারের পথ, এটা অনেক লম্বা সময়ের ব্যাপার, আসামি জামিন নিয়ে বের হয়ে যায় ইত্যাদি। তবে একথাও তো সত্য যে আবার অনেক সময় জেনুইন অপরাধ আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, উপযুক্ত প্রমাণ ও আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের অভাবে। এ দিকে সমাজে অপরাধী বেড়েই চলে। অতএব আমরা নিজেরাই কাউকে অপরাধী বলে শনাক্ত করি ও সিদ্ধান্ত নেই। তাকে শাস্তি হিসেবে মেরে ফেলি। আর আইনের চোখে বিষয়টিকে ন্যায্যতা দিতে ক্রসফায়ারের গল্প বানিয়ে এভাবে বলি যে, আমার হেফাজতের আসামিই আমাকে আক্রমণ করাতে আত্মরক্ষার্থে তাকে গুলি করে মেরেছি।ীসব পালটা যুক্তির পরও দেশি বা আন্তর্জাতিক আইন এমন হত্যার পক্ষে কোনভাবেই সমর্থন দেয় না।  আর সবচেয়ে বড় কথা হল, ক্রসফায়ারের বিচারবহির্ভূত দিক ছাড়াও আরো বড় এক অপরাধ হল, সরকার যাকে তাকে এই পদ্ধতিতে মেরে ফেলতে পারে। তাকে ‘জঙ্গি’ বা ‘ড্রাগ ডিলার’ অথবা যেকোন কিছু বলে সাজিয়ে। সরকারের অপছন্দ, রাজনৈতিক বিরোধী, প্রতিদ্বন্দ্বী যে কাউকে মেরে সরিয়ে দেয়া সহজ হয়ে যায়। মূল ত্রুটি বা সমালোচনার কথা হল, নিহত ব্যক্তি  যে কথিত অপরাধেই অপরাধী ছিল তা তো কোন আদালতের মত প্রক্রিয়া পদ্ধতিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাবে পরীক্ষা করা হয় নাই। এটাই সরকারের হাতে যাকে তাকে খুন করার লাইসেন্স হিসাবে হাজির হয়।

ফলে স্বভাবতই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ও অপরাধকে মানবাধিকার ও আইনের চোখে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলা হয়। অর্থাৎ পুলিশের দায়িত্ব হল যেখানে অপরাধীকে কেবল বিচারের আওতায় আনা, বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা, সেখানে পুলিশই তাকে কোন বিচার ছাড়াই মেরে ফেলেছে। ফলে এখানে বিচার বা শাস্তি প্রক্রিয়া সেটা ব্যাহত হয়েছে বলে এটা বিচারবহির্ভূত এবং তা সাদা এক হত্যাকাণ্ড। যদিও সারা দুনিয়ায় বিভিন্ন দেশে যত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, এর গল্প কিন্তু একই- ক্রসফায়ার। যেমন ভারতে একই অর্থে তবে অন্য প্রচলিত শব্দ হল – এনকাউন্টার। যা হোক শব্দে কিছু যায় আসে না, ঘটনাটা সারমর্মে একই।

বিগত অক্টোবর মাসের ১ তারিখে এক মার্কিন উপসহকারী মন্ত্রী (ডেমোক্র্যাসি, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার শাখা) রবার্ট বারশিনস্কি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে আলাপকালে ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান ব্যক্ত করছিলেন। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্টো ফল দিতে পারে।’ এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্যের বিস্তার গত ০৪ অক্টোবর প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল। আমি সেখান থেকে একটু লম্বা অংশ টুকে আনছি। রবার্ট বারশিনস্কি বলেন, “৯/১১-এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ, মানবাধিকার সংস্থা ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে নানা বিতর্ক হয়ে আসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ খুবই বিপজ্জনক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দায়িত্বরত অবস্থায় পুলিশ নিহত হয়। কিন্তু তার পরও দোষী ব্যক্তির ক্ষতি করা বা তাকে আঘাত করার বিষয়টি কখনোই মেনে নেয়া হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখনই সম্ভব, তখনই দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়। কারণ, তাহলেই ওই নেটওয়ার্কের সবাইকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের অবস্থান হলো, প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও স্বচ্ছ তদন্ত হতে হবে”।
তিনি আরও বলেন, “ক্রসফায়ার’ বা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ কারণ হিসেবে প্রায়ই বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করা হয়। এতে সুবিচার নিশ্চিত করা যায় না, আসামি জামিনে বের হয়ে যান বলে বিভিন্ন যুক্তি দেয়া হয়। এ সম্পর্কে রবার্ট বারশিনস্কির মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এ দেশের সাক্ষ্য আইন ঔপনিবেশিক আমলের। শুধু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর ওপর নির্ভর করায় বিচারপ্রক্রিয়ায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে আসামির ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি জানান, আইনগুলোর আধুনিকায়নে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা দিচ্ছে”। আশা করি পাঠক যা বোঝার বুঝেছেন। আমেরিকান মন্ত্রীর বক্তব্য মিথ্যা নয়। তবে তাঁর বক্তব্য তুলে আনায় তাঁকে ও আমেরিকাকে কোন ‘ন্যায়ের আদর্শ প্রতীক’ বলে ধারণা করা ভুল হবে। আর নেপথ্যে বলে রাখি, আমেরিকার এত সাধু সাজার সুযোগ নেই। কারণ র‌্যাব তাদের সরাসরি পরামর্শে আর তাদের আসামিকে বাংলাদেশে এনে টর্চার করে স্বীকারোক্তি বের করার জন্যই গঠন করা হয়েছিল। কারণ তাদের দেশে রেখে টর্চার করলে তা সংশ্লিষ্ট ওই অফিসারের জন্য বেআইনি ও ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য হবে। আমেরিকান পরিভাষায় এটাকে রেনডিশন বলে। ওবামা রেনডিশন করার প্রশাসনিক অভ্যাস তুলে দেয়ার প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, কিন্তু রাখতে পারেননি।
তবে আরেক বাস্তবতা হল, উপরে বাংলাদেশের ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে আমেরিকান বক্তব্য সঠিক। আবার সরকারের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের কথা তুলে এমন বক্তব্যের ভেতর দিয়ে আমেরিকা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর একটা যেন অথরিটি হিসেবে হাজির হওয়ার সুযোগ নেয়। এটাও আরেক সত্যি। আর তা নেয়ার সুযোগ থাকে এ জন্য যে, জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস তদারকির প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।
ফলে হিউম্যান রাইটস ইস্যুটি দু’ধারী তলোয়ারের মতো আমেরিকার হাতে অস্ত্র হিসেবে হাজিরও হয়। এক দিকে আমাদের সরকারগুলো ক্রসফায়ার করার দোষে দোষী। ফলে আমেরিকা সে অভিযোগ সঠিকভাবে তুলে আনে ঠিকই। আবার সেটা তুলে বাংলাদেশের ওপর নিজের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিতে একে ব্যবহার করে এ কথাও সত্যি।

প্রেসিডেন্ট দুতের্তের ক্ষেত্রে তার ড্রাগ-ডিলারের হত্যার বেলায় একই ঘটনা ঘটেছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামা এ প্রসঙ্গে তার সাথে দেখা করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও তার উদ্বিগ্নতা ইত্যাদি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এর আগে দীর্ঘ দিন ধরেই ম্যানিলার ক্যাথলিক চার্চ, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংগঠন ও অন্যান্য দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু সেগুলোকে দুতের্তে সবলে উড়িয়ে দিতে আর উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন। দুতের্তের সাথে প্রেসিডেন্ট ওবামার সাক্ষাতের কথা ছিল গত ৫ সেপ্টেম্বর, লাওসের ভিয়েনতিয়েনে আসিয়ান জোটের সভায় দুই প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের সময়ে, সাইডলাইনে বসে। কিন্তু ওবামার সাথে কথিত সেই সাক্ষাতের আগেই দুতের্তে এক কাণ্ড করে বসেন। লাওস রওনা দেয়ার আগেই তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে সেই কান্ড করেন। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন যে, “ওবামা কি তাঁকে বিচারবহির্ভূত ড্রাগ-ডিলার হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলবেন না”- এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি রাগে ফেটে পড়েন। সম্ভবত দুতের্তে ওবামার সাথের ওই সাক্ষাৎ এড়াতে চেয়েছিলেন তাই ওই রকম জবাব। তিনি অকথ্য ও অশ্লীল ভাষায় ওবামার মাকে বেশ্যা বলে গালি দিয়ে কথা বলেছিলেন; যেটা স্বভাবতই কোনো প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদার সাথে মানানসই নয়। তবে কোন প্রেসিডেন্ট অবশ্যই ক্ষুব্ধ হতে পারেন। এমনকি সে ক্ষেত্রে যদি “তিনি ক্ষুব্ধ” একথাটাই মুখে বা আচরণে এতটুকুই প্রকাশ করেন- এটাই তার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট হত। কিন্তু তিনি বলেন, “তার (ওবামার) সম্মান বজায় রেখে কথা বলা উচিত। আমার ওপর যেন যা মনে চায় প্রশ্ন আর স্টেটমেন্ট ছুড়ে না দেয়। এমন হলে, বেশ্যার ছেলে, ওই ফোরামে আমি তাকে ছিঁড়ে ফেলব। উনি যদি তা করেন তবে আমরা তাকে শুয়োরকে যেমন করে কাদায় পুঁতে তেমন করে পুঁতে ফেলব”।

আচ্ছা, দুতের্তে কি হঠাৎ এমন কথা বলছেন; নাকি তিনি এমনই? তা বুঝতে পেছনের কিছু তথ্য দেখা যাক। এর আগে তিনি ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের দাভাও শহরের মেয়র ছিলেন। ড্রাগের সমস্যা আর খুনোখুনি সেখানে লাগাতার ছিল। সেখানেও তিনি ড্রাগ ডিলারদের সম্পর্কে বলতেন তারা “আরো মরবে। অনেকে মরবে। যতক্ষণ না শেষ মাদকপাচারকারীকে বের করা সম্ভব হবে, ততক্ষণ আমরা কাজ চালিয়ে যাবো”। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সেকালের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, তিনি বলছিলেন, ‘যদি আমার সিটিতে আপনি অবৈধ কাজ করেন, যদি আপনি ক্রিমিনাল হন, কোনো সিন্ডিকেটের অংশ হন, যারা শহরের নিরীহ লোকদের শিকার বানায়, তবে যতক্ষণ আমি মেয়র আছি ততক্ষণ আপনি আমার হত্যার বৈধ টার্গেট।’ এটা ২০০৯ সালে মেয়র হিসেবে তার বয়ান। শেষ বাক্যটি মারাত্মক আপত্তিকর। এখানে আইনি লুকোছাপা তিনি রাখেননি। একেবারে প্রকাশ্যে স্পষ্ট ভাষায় সরাসরি হত্যা করার কথা বলছেন। এই বাক্যটাই তার অভিযুক্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। ওদিকে প্রায় একই ভাষায়, একই কারণে ইইউকে এবং জাতিসঙ্ঘকেও তিনি গালাগালি করেন।
স্বভাবতই দুতের্তের খারাপ গালাগালির পরে ওবামা সেই সাক্ষাৎ বাতিল করেন। কিন্তু পরের দিন পরিস্থিতি রিভিউ করার পর (খুব সম্ভবত তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পরামর্শকদের কারণে) দুতের্তে সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে স্যরি বলে ক্ষমা চেয়ে নেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রায় ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিলিপাইনের সাথে নিরবচ্ছিন্ন কৌশলগত মিত্র ছিল আমেরিকা। ফিলিপাইন-আমেরিকান সেই সম্পর্ক এখন খারাপ থেকে চরম খারাপ হয়ে এখন প্রায় পুরো বিচ্ছিন্ন হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা দুই আলাদা দিনে দুই অংশ ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় – ২৩ অক্টোবর ২০১৬ প্রথম বা চলতি পর্ব অনলাইনে (প্রিন্টে ২৪ অক্টোবর)। এখানে সেই লেখা পর পর দুই পোষ্ট আকারে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল। এটা প্রথম পর্ব।] পরের পর্ব আগামিকাল পরশুর মধ্যে।

লিবারেল স্পেস ও ক্ষমতা

লিবারেল স্পেস ও ক্ষমতা

গৌতম দাস
২৫ অক্টোবর ২০১৬,সোমবার
http://wp.me/p1sCvy-1S5

আধুনিক রাষ্ট্রধারণার গুরুত্বপূর্ণ এক অনুষঙ্গী ধারণা হল ‘লিবারেল স্পেস’। রাষ্ট্রধারণার সাথে জড়াজড়ি করে আছে এই ধারণা। ইংরেজি স্পেস শব্দের সাধারণ বা আক্ষরিক অর্থ জায়গা। তবে সুনির্দিষ্ট পটভূমিতে বললে এর অর্থ জায়গা দেয়া। ‘জায়গা’ কী অর্থে? রাষ্ট্র তার নিয়মকানুন, আইন ও ক্ষমতার কারণে ও প্রয়োজনে জনগণকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখবে না। একটু ঢিলেঢালা রাখবে, এই অর্থে জায়গা। মানে হল, রাষ্ট্র, আমি তোমার নিয়মকানুনের মধ্যেই আছি। কিন্তু আমাকে একটু জায়গা দাও খোলামেলা শ্বাস নেয়ার জন্য, ভালোভাবে দাঁড়ানোর জন্য কিংবা মুক্ত অনুভব করার জন্য, যাতে করে আরামে দাঁড়াতে ও নড়াচড়া করতে পারি। তবে এর সাথে অব্যক্ত ও অনুল্লেখ থাকে আর এক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা অংশ। তা হল – তাতে আমি তোমার ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করব না, করছি না। অথবা উল্টো করে বলা যায়, তোমার ক্ষমতা যাতে চ্যালেঞ্জ না হয়ে পড়ে ওই পর্যায়ে পৌঁছানোর আগের মাত্রা পর্যন্ত আমাকে একটু মুক্ত জায়গা দাও। সারকথায়, এটা এক রিলেটিভ মানে তুলনামূলক বা সাপেক্ষ অবস্থা; ক্ষমতা চ্যালেঞ্জ করা হবে না এই ‘সাপেক্ষে মুক্ত’ থাকতে চাই, এটাই এর সূক্ষ্মতর ও অনুল্লেখিত দিক। ওদিক স্পেস এর আগের শব্দ লিবারেল, ইংরেজি ‘লিবারেল’ কথাটার অর্থ মুক্ত। ‘লিবার্টি’ শব্দ থেকে এসেছে এটা।
তাহলে পুরো কথা দাঁড়াল, লিবারেল স্পেস কথার ভেতর লিবারেল শব্দটি ঠিক অবাধ অর্থে ‘মুক্ত’, এমন ধারণা বহন করে না, বরং ‘সাপেক্ষে মুক্ত’- এই ধারণা ও অর্থ বহন করে। যেমন কোনো স্বামী-স্ত্রীর বেলায় আমরা প্রায়ই এমন শুনি, এদের কোনো একজন অপরজনের বিরুদ্ধে অনুযোগ করছেন, সে স্পেস দেয় না। অর্থাৎ এখানে অনুযোগ করে বলা ‘স্পেস’ শব্দের আদর্শ অর্থ হল, প্রথমজন বলতে চাচ্ছেন তার আকাঙ্খা হল, তাদের দাম্পত্য সম্পর্কের ওপর প্রভাব না পড়ে অথবা দাম্পত্য সম্পর্কের জন্য কোনো ক্ষতিকর না হয় ইত্যাদি দিক খেয়াল রেখে বা এই সাপেক্ষে সে তৃতীয় লোকজনের সাথে ওঠাবসা, মেশামিশি ও চলাফেরা করতে চায়। এতে অন্যজন সেটা অনুমোদন করছে না। এই অর্থে এখানে স্পেস কথার মানে, ‘সাপেক্ষে মুক্ত’ থাকতে চাওয়ার এক আকাঙ্ক্ষা।

রাজনীতিতে লিবারেল স্পেস
আমরা সমাজ বা পরিবারের মধ্যে ‘লিবারেল স্পেস’ শব্দের অর্থের দিক আলোচনা করলাম। রাজনীতিতে লিবারেল স্পেস ধারণা পরিবারের ভেতরের মতো সরল নয়। রাজনীতির একটা অর্থ হল, আইডিয়া বা মতাদর্শ। অন্য আর এক অর্থ হল, ক্ষমতা। এই ক্ষমতা সম্পর্কিত ধারণা লিবারেল স্পেস কথার সাথে আরো স্পষ্ট করে সম্পৃক্ত ও ঘনিষ্ঠ। আমরা অনেকে ‘লিবারেল ধারার’ রাজনীতি বলে একধরনের রাজনীতির কথা শুনে থাকি। এ ছাড়া, পশ্চিমা জগতের রাষ্ট্র এবং ওই জগতের প্রায় সব রাজনৈতিক ধারা প্রত্যেকেই নিজেকে লিবারেল রাজনীতিক ধারার রাজনীতি, এমন নাম-পরিচয় ও বৈশিষ্ট্যে চেনাতে পছন্দ করে। যদিও পশ্চিমের ট্র্যাডিশনাল বা যারা চিন্তাভাবনা সহজে বদলাতে চায় না, এমন অর্থ ও বৈশিষ্ট্যের রাজনৈতিক দল বুঝতে বলা হয়, রক্ষণশীল (ইংরেজিতে কনজারভেটিভ, যেমন ইংল্যান্ডের টোরি দল, যার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডেভিড ক্যামেরন) দল বলা হয়। আর এই দলের বিপরীত বুঝাতে ‘লিবারেল’ শব্দ ব্যবহার করে লিবারেল দল বলার রেওয়াজও আছে। তবে এগুলো দাবি করা অর্থে। মূলত উভয় ধারাই মোটা দাগে লিবারেল ধারার রাজনীতি করে। সোজা কথায়, রাজনৈতিক দলকে লিবারেল বলার ভেতরেও একধরনের বাড়াবাড়ি দাবি সেখানে থাকে। যেমন পশ্চিমের লিবারেল ধারা মুখে যা-ই বলুক, আসলে সে যে ক্ষমতায় আছে, এটা অটুট থাকা সত্ত্বেও সে একটা মিথ্যা ভাব বজায় রাখতে চায় যে, তার ‘অপর’ বা বিরোধী যারা- এরা ঠিক যেন ‘তার ক্ষমতাসাপেক্ষে শুধু মুক্তই’ না, তার সমাজ-রাষ্ট্রে যেন সবাই পুরোপুরি ও অবাধভাবেই মুক্ত। ফলে যেন দাবি করা হয়, ঐ সমাজ ও রাষ্ট্রে ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। ফলে যেন কোনো ক্ষমতার সাপেক্ষে লিবারেল স্পেস নয়, অথবা যেন কোনো বলপ্রয়োগ সেখানে অনুপস্থিত। অতএব ওই সমাজে সবাই মুক্ত এবং সবাই কোনো বাধাহীন অর্থে এক লিবারেল স্পেসে বসবাস করে। অর্থাৎ সমাজে জলজ্যান্ত ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগের উপস্থিতি সত্ত্বেও তাকে আড়াল করে দাবি করা যে, সবাই পুরো স্বাধীন বা মুক্ত। এটাই সেই বাড়াবাড়ি মিথ্যা দাবি। এই অর্থে, এটাকে পশ্চিমের ছলনা বলছি। তাহলে সারকথা হল, লিবারেল ধারার রাজনীতি যত লিবার্টি বা মুক্তসমাজের কথার প্রপাগান্ডা চালাক, অথবা এমন ছলনা করুক না কেন- সব সময় মনে রাখতে হবে, আসলে এখানে মুক্ত মানে অটুট একটা ক্ষমতার সাপেক্ষে মুক্ত, যদি আপনি ওই ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ না করেন, এই সাপেক্ষে এই শর্তে ও সীমায় আপনি অবশ্যই মুক্ত। যতক্ষণ না ক্ষমতাকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ করেন ততক্ষণ আপনি মুক্ত। পশ্চিমের লিবারেল ধারার এমন রাজনীতিরই ব্রান্ড নাম ‘গণতন্ত্র’- এই ব্র্যান্ডেই এটা প্যাকেটজাত হয়ে আমাদের দেশেও হাজির আছে।

রাজনৈতিক আইডিয়া বা মতাদর্শে লিবারেল স্পেস
সব সমাজেই রাজনীতিতে নানা আদর্শ বা আইডিওলজি সদর্পে আছে ও থাকে। এভাবেই এটা কাজ করে এবং থাকবেই। এমন নানান রাজনৈতিক আইডিয়ার ধারাগুলোকে মোটা দাগে তিনটি ভাগ বা প্রকরণে ফেলতে পারি – কমিউনিস্ট, গণতান্ত্রিক (পশ্চিমা অথবা লিবারেল) আর ইসলামি। লিবারেল স্পেস ধারণাটির প্রতি এই তিন ধারারই মনোভাব কেমন অথবা কিভাবে এরা দেখে, সেদিক থেকে এখন কথা তুলব। যেকোনো রাজনৈতিক আইডিয়ায় কোনো লিবারেল স্পেস ধারণা আছে কি না, কেমন করে আছে আর থাকলে কিভাবে কতটুকু কী অর্থে আছে, তাই পরখ করব। এ কাজটি করার একটা সহজ উপায় নিব তা হল, তিন রাজনৈতিক ধারারই প্রত্যেক প্রবক্তাকে জিজ্ঞেস করা, তার রাজনৈতিক ধারার বিরোধীদের প্রতি তার মনোভাব কী? যারা তার বিরোধী বা ‘অপর’, তাদের তিনি কিভাবে দেখেন? যারা তার আইডিয়া বা বয়ানের সাথে একমত হবে না, একমত নয় বলে জানাবে, তাদেরকে তিনি কী করবেন? কোথায় রাখবেন?
প্রথমে কমিউনিস্ট ধারা- দেখা যাক এ ক্ষেত্রে কী বের হয়। এরা বলবে, লিবারেল স্পেস, সেটা  আবার কী? সমাজ মাত্রই শ্রেণী বিভক্ত সমাজ। শ্রেণী বিভক্ত সমাজে, শ্রমিক-কৃষক শ্রেণীর প্রতিনিধি হয়ে আমরা এখন ক্ষমতায় আছি (অথবা যাব)। আমার বিরোধী ‘অপর’ মানে, সে তো আমার শ্রেণী-শত্রু। তাকে আবার ‘লিবারেল স্পেস’ দেয়ার কী আছে? বরং শত্রু-শ্রেণীকে দাবড়ের উপর তটস্থ রাখাই তো আমার কাজ। সঠিক শ্রেণী সংগ্রাম। অর্থাৎ লিবারেল স্পেস বলে ছোটখাটো ছলনা অথবা অবাধ ও লিবার্টিতে মুক্ত দাবি করে বড় কোনো ছলনা – কমিউনিস্টরা এমন কোনটারই ধার ধারতে চায় না। এ জন্য এদেরকে ঘোষিত ‘নো লিবারেল স্পেস’ ধারা গোত্রের বলা যায়।
এবার পশ্চিমা লিবারেল গণতন্ত্রের ধারা- এর ক্ষেত্রে দেখা যাক। প্রথমত এরা বলবে মানে ভুয়া হলেও দাবি করবে, আমার সব ‘অপরই’ মুক্ত। ওরা মুক্ত থাকবে; আমাকে সমালোচনা ও প্রতিবাদ করবে, মানি না বলে স্লোগান দেবে, আমার বিরুদ্ধে আর্টিকেল লিখবে- কোনো অসুবিধা নেই। কেবল একটা খালি ‘কিন্তু’ আছে। সেটা হল, খালি আমি যদি বুঝি যে, ওরা আমার ক্ষমতার জন্য বিপদ, আমাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে বা করছে, তাহলে কিন্তু রাষ্ট্রের আইনে থাকুক আর না-ই থাকুক, আইন ছাড়াই অথবা নতুন আইন বানিয়ে নিয়ে (আমেরিকায় যেমন প্যাট্রিয়ট ল, হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইত্যাদি এবং বাংলাদেশে বিশেষ ক্ষমতা আইন) অথবা নানান নিবর্তনমূলক নির্যাতনের আইনের মাধ্যমে আমি তাদের কোনো ধরনের খাতির না করে,  একেবারে নির্বিশেষে সরাসরি নির্মূল করব। দেখা যাচ্ছে, এরা প্রকৃতপক্ষে লিবারেল না, বরং কিছু শর্তসাপেক্ষে লিবারেল। অবশ্য মুখে এরা দাবি করে যাবে, তারা অবাধ ও লিবারেল।

এবার পরের ধারার যাবার আগে বর্তমান সরকারকে একটু মূল্যায়ন করা যাক। উপরের দুই ক্যাটাগরি অনুসারে বর্তমান সরকারকে  কোন ক্যাটাগরিতে ফেলব? অবশ্যই প্রথমটা। তবে একটা জায়গায় একটু বদল হবে। কমিউনিস্টদের বেলায় তারা বলে তারা শ্রমিক-কৃষক শ্রেণীর ক্ষমতা। এখানে সে জায়গায় হবে – মুক্তিযোদ্ধা-শ্রেণী অথবা চেতনা-শ্রেণীর ক্ষমতা। যেমন সরকার বলছে এই সরকারের চেতনার মানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকার। ফলে এই শ্রেণীর অথবা সরকারের বিরোধী বা শত্রু যারা, তারা তাহলে রাজাকার। ক্ষমতাসীন সরকারের দৃষ্টিতে এই সরকারের বিরোধী বা ‘অপর’ যারা তারা যেহেতু রাজাকার অতএব তাদের তাদের দমন ও দাবড়ে রাখাই তো সরকারের কাজ। অতএব তাদের জন্য আবার স্পেস কী?

এবার ইসলামি ধারার ক্ষেত্রে দেখা যাক- বাংলাদেশে হয়ত অনেককে পাওয়া যাবে, যাদের এমন ধারার ক্যাটাগরিতে ফেলা যায়। কিন্তু সবার আগে একটা কথা বলে নেয়া দরকার। এই রচনার পুরো অংশজুড়ে এটা ধরে নেয়া হয়েছে যে, এখানে ক্ষমতা বলতে, গণ-আন্দোলনের পথে বা কনষ্টিটিউশন মেনে নির্বাচিত হতে – এভাবে ক্ষমতা পেতে যারা আগ্রহী তাদেরকেই ধরে নেয়া হয়েছে। যেসব ক্ষমতা কনষ্টিটিউশন মেনে নির্বাচিত নয়, সেগুলো নিয়ে আলোচনার সুযোগ এই রচনার বাইরে। তাই নির্বাচিত ক্ষমতাগুলোর ক্ষেত্রে সবার সাধারণ দিকটি আমল করে কথা বলব। এদের অনেকে হতে পারে যারা নিজের রাজনীতি ইসলামি বলে মনে করে ও দাবি করে। এখন তারা যদি নির্বাচিত হয় তবে নিজেদের ক্ষমতাকে তাদের কেউ কেউ ইসলামি ক্ষমতা বা ইসলামি শাসন বলে দাবি করবে। অবশ্য কেউ কেউ নাও করতে পারে। তবে যারা তাদের ক্ষমতাকে আল্লাহর শাসন বা কুরআনের শাসন বলে দাবি করবে, তাদের কথা বলছি। নির্বাচিত নিজের ক্ষমতাকে আল্লাহর শাসন অথবা ইসলামি রাজনীতির শাসন বলার বা দাবি করার ক্ষেত্রে নতুন জটিলতা আছে। কারণ, যেকোনো ক্ষমতা মাত্রই কেউ না কেউ এর বিরোধিতাকারীও হবে, থাকবেই এবং এটা স্বাভাবিক। জটিলতা দেখা দেবে সে ক্ষেত্রে। এ জন্য যে, ওই নির্বাচিত ক্ষমতার বিরোধিতা করলে সেটা আল্লাহর শাসন বা কুরআনের শাসনের বিরোধিতা করা হচ্ছে কি না, এই প্রশ্ন উঠতে পারে। অথচ যে বিরোধিতা করছে, তার এমন কোনো সচেতন ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য না-ও থাকতে পারে। ফলে একটা জটিলতা দেখা দেবে। তাই এ দিকটি নিয়ে ভাবার দরকার আছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় পাকিস্তান আমলে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকেরা পুর্ব-পাকিস্তানের বৈষম্য-বিরোধী যে কোন বক্তব্য বয়ানকে নিজেদের শাসনের বিরোধী ফলে তা ইসলামি রাজনীতির বিরোধী বলে পাল্টা প্রপাগান্ডা হাজির করত। স্বায়ত্ত্বশাসনের দাবি ইসলামি শাসনের বিরোধীতা বলে চিনানোর চেষ্টা করত। এটা কনষ্টিটিউশনে কী লেখা আছে বা ছিল সে মামলা নয়। যেমন বর্তমানে কনষ্টিটিউশনে যাই লেখা থাক ফ্যাক্টস হল, বাস্তবে এই ক্ষমতার বিরোধী হবার সুযোগ খুবই সীমিত। একইভাবে নিজেকে ইসলামি ক্ষমতা বলে দাবি করতে চায় যারা তারা নিজেদের সম্ভাব্য ক্ষমতার বিরোধী বা সমালোচককে কিভাবে দেখা হবে, এই প্রশ্নেও চিন্তা করার দরকার আছে। ইসলামি রাজনীতিতে লিবারেল স্পেস ধারণা নিয়ে খুব বেশি চিন্তাভাবনা করা হয়নি। এটা করা উচিত। পুরনো উদাহরণ যেগুলো আছে, সেগুলোর বেশির ভাগই ‘নো লিবারেল স্পেস’ ক্যাটাগরির।

পাবলিক পারসেপশনে রাজনৈতিক দল
রাজনৈতিক দল কেমন হবে? একালের পাবলিক পারসেপশনে মানে – ঠিক বাস্তবের কথা নয়, বাস্তবে সেটা কী ঠিক তা নয় তবে পাবলিক সেটা সম্পর্কে কী মনে করে ধারণা করে। আবার পাবলিকের মনে আঁকা ছবিতে থাকা আকাঙ্খা বা গণ-অনুমিত আকাঙ্খাটা কেমন? সেটা বোঝার চেষ্টা করব। কিন্তু ‘একালের’ কেন? বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের পর থেকে রাজনৈতিক শাসনে এক বিশেষ ধারার বৈশিষ্ট্যের শাসন যুক্ত হয়েছে। অবশ্য মাঝের দুই বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক শাসন- এই ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে পপুলার ভাষায় বললে, একটা দ্বিদলীয় রাজনীতির শাসন শুরু হয়েছিল। আর এই দ্বিদল স্বীকার করে নিয়েছিল, লিবারেল স্পেস আছে বা রাখতে হবে। সেটা যেমন চেহারার বা ছলনার হোক না কেন, একটা লিবারেল স্পেসের ধারণার অন্তত মৌখিক স্বীকৃতি সেখানে ছিল।অবশ্য এটা হওয়া সম্ভব হয়েছিল, এর মূল কারণ হল সোভিয়েত ইউনিয়ন বা সোভিয়েত ব্লকের পতন। েই ঘটনার সাথে সম্পর্কিত করেই কেউ দেখতে পারে। তবুও ১৯৯১ সাল থেকে পরের তিন টার্মের বেশি আমরাও ক্ষমতার বিরোধীদের লিবারেল স্পেস আর দিতে পারিনি।
মাঝের দুই বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক শাসনে তো বটেই এবং এরপর থেকে যে শাসন খাড়া হল, তা যেন পরিকল্পনা করেই নিজেকে লিবারেল ‘স্পেস রাখার দরকার কী’ বলে সাজিয়েছে। “এর কোন দরকার নেই”- এই ধারার ক্ষমতা হিসেবে নিজেকে হাজির করেছে। বিশেষত ২০১৪ সাল থেকে তৈরি করা ক্ষমতা। আগেই বলেছি এটা কমিউনিস্ট উদাহরণের ‘নো লিবারেল স্পেস’ ধারণাটিকে অনুসরণ করে বেড়ে উঠেছে। যার ভয়ানক জায়গা হল, যারা ‘চেতনার বিরোধী’, তাদের জন্য আবার সরকার বিরোধিতার অধিকার বা ‘লিবারেল স্পেস কী’- এই ধারণার ওপর দাঁড়ানো।

অনেকের মনে হতে পারে আমি ১৯৯১ সাল কেন রেফারেন্স হিসাবে টানছি? এরশাদের পতন আর এরপর পরপর তিনি নির্বাচিত সরকার গঠন হয়েছিল – সেজন্য। এককথায় বললে শুধু সেজন্য তা একেবারেই না। আরও বড় গ্লোবাল পটভুমি একটা আছে। পুরান সোভিয়েত ইউনিয়নে ১৯৯০ সাল থেকেই নিজেই ভেঙে যাওয়ার এক প্রক্রিয়া শুরুর ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। যা আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যায় ১৯৯২ সালে। ফলে শুরু থেকেই এর আর আগের নিজ প্রভাবিত দুনিয়া অংশকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলায় এর মুঠি আলগা হতে শুরু করেছিল। আর এর ফলে আমেরিকা এক মেরুর এক দুনিয়া পেয়ে যায়। ফলে এটাই আমেরিকার পক্ষে এবার দুনিয়ায় নতুন করে (সামরিক শাসন দিয়ে সরকার চালানোর বদলে ) “লিবারেল দ্বিদলীয় শাসনের” সূত্রপাত করার মতো নতুন শর্ত হিসেবে উপস্থিত হয়। আমেরিকা সেটাকে আমল করে কাজে লাগিয়ে বাস্তব করে তুলেছিল। আমাদের মতো দেশে এরই মধ্যে আবার এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত জনগণ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এখান থেকেই একালে রাজনীতি সম্পর্কে পাবলিক পারসেপশনে বা গণ-অনুমিত আকাঙ্ক্ষাটা হলো রাজনৈতিক দলমাত্রই সেটা তো এক ‘লিবারেল’ দলই হবে। আমাদের পপুলার ভাষায় ভোটের রাজনীতির দল।

অন্য আর একটা বিষয়, কনষ্টিটিউশনাল রাজনৈতিক দল, বা আইনী রাজনৈতিক দল কথার মানে আসলে কী? কথাটাকে বুঝতে হবে মোটা দাগে রাজনৈতিক দল দুই ধরণের হয়। মানে তার ঘোষিত লক্ষ্য হাসিলের জন্য শুরু থেকেই সশস্ত্র অথবা নিরস্ত্র পথের দল হতে হয়। নিরস্ত্র পথের দল মানেই ‘মাস লাইন’ বা গণ-আন্দোলনের দল। এই ‘মাস লাইন’ বা গণ-আন্দোলনের দলকেই কনষ্টিটিউশনাল রাজনৈতিক দল, বা আইনী রাজনৈতিক দল বলা যায়। কারণ সে সশস্ত্র নয় বলে অন্তত কৌশল্গত কারণে আর দলের লিখিত দলিলে সে ঐ দেশের কনষ্টিটিউশন মেনে চলে। সম্ভব হয়। তাই এটাকে আইনি দল বলা যেতে পারে। সশস্ত্র দল মানেই তা কনষ্টিটিউশনের চোখে বেআইনি দল হবেই। সে হিসাবে যেমন, সর্বশেষ ৮০’র দশকেও কমিউনিস্টদের মধ্যে রাজনৈতিক তর্কের এক বড় ইস্যু ছিল পার্টি কেমন হবে ‘মাস লাইনের’ না ‘সশস্ত্র লাইনের’। একালের ভোকাবুলারিতে ‘মাস লাইন’ কথাটাও পরিচিতি হারিয়ে ফেলেছে। এখন অচল, হারিয়ে যাওয়া ধারণা। ইংরেজি রাজনৈতিক পরিভাষায় ‘মাস’ মানে, জনগণ বা ‘গণ’ বলতে যা বুঝি তাই। তাই মাস লাইন মানে হল, দলকে আগানোর জন্য দলের তৎপরতা ‘গণ-আন্দোলনে’ সংগঠিত করে ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে আগাবে। সবকিছুই হবে প্রকাশ্য তৎপরতার মাধ্যমে; জনগণকে আকৃষ্ট করে সরাসরি অংশগ্রহণ করানোর এক প্রকাশ্য ‘পপুলার উইল’, ‘রাজনৈতিক পরিসর’ ‘কমিউনিটি’  তৈরি করার মাধ্যমে। এমন দলকে কনস্টিটিউশনাল দলও বলা হয়। কারণ অন্তত মুখে ও পার্টির প্রকাশ্য কাগজপত্র দল দেশের কনস্টিটিউশন মানে বলে স্বীকার করে সে তৎপর থাকে। এছাড়া মনে বা রাজনৈতিক চিন্তায় যাই থাক, সে ভাব ধরে যে, উপস্থিত রাজনৈতিক শাসন ক্ষমতাকে সে চ্যালেঞ্জ করছে না। ফলে লিবারেল স্পেসে নড়াচড়া তৎপরতার সুযোগ সে চায় এবং পায়। এমনকি নির্বাচন কমিশনে দলের নাম রেজিস্ট্রেশন নেয়ার সুযোগও নিয়ে থাকতে পারে। তবে চলতি হাসিনা সরকারের আমলে এ লিবারেল স্পেস ক্রমেই নাই হতে চলেছে।

তবে একালের পাবলিক পারসেপশন বা গণ-আকাঙ্ক্ষায় এটা এখন স্পষ্ট- জনগণের আকাঙ্খা হল, আপনি যে ধারার রাজনীতি নিয়ে আসেন না কেন – একটা লিবারেল স্পেস দেওয়ার বিষয়টা আপনার রাজনৈতিক চিন্তার প্যাকেজে থাকতেই হবে। লিবারেল স্পেস থাকা বিষয়ে জনগণের আকাঙ্খা এবং পারসেপশন আপনাকে পুরণ করেই একমাত্র আপনি হাজির হতে পারেন। চিন্তার একটা লিবারেল স্পেস থাকতেই হবে। লিবারেল স্পেসে নড়াচড়া, তৎপরতার সুযোগ থাকতেই হবে, এ আকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়ে উঠছে ক্রমেই।

আসলে আপনি আপনার ক্ষমতার বিরোধীকে কী করতে চান, বিরোধী অপরের বিরোধিতা কীভাবে মোকাবিলা বা হ্যান্ডেল করতে চান সেকথা আপনাকে আগাম বলতেই হবে। আর এর ভিতর দিয়েই আপনার চিন্তা-রাজনীতি কেমন – তা ধরা পড়ে যাবে। আপনাকে চিনা যাবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
Goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০৮ অক্টোবর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার নতুন কিছু সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল। লেখাটা এরও আগে একেবারেই ভিন্ন কোণ থেকে গত বছর দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশেও ছাপা হয়েছিল।   ]