নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

গৌতম দাস
১৯ ডিসেম্বর ২০১৭, রবিবার, ০০:২১

https://wp.me/p1sCvy-2oW

 

অবশেষে এখন এ’কথা বলা যায় যে, নেপাল এখন নিজ রাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কায়েম করতে পেরেছে এবং তা এগিয়ে যেতে পারবে। নেপালের প্রধান তিন দলের মধ্যকার দুটোই কমিউনিস্ট পার্টি। দুই কমিউনিস্ট পার্টি এবারের নির্বাচনে এক কমিউনিস্ট  জোট (‘লেফট অ্যালায়েন্স’) গড়ে নির্বাচনে লড়ে জিতেছে। অ্যালায়েন্স গঠনের ঘোষণা দেয়ার সময় এক কমিউনিস্ট, মাওবাদী দলের চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহাল বলেছিলেন, এই অ্যালায়েন্স তাঁরা করছেন নেপালের রাজনীতিকে স্থিতিশীলতা দেয়ার জন্য, স্থিতিশীল সরকার দেয়ার জন্য [grand Left alliance will “end Nepal’s elongated political instability” ]। নেপাল গত ৯ বছরে বিপুল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ভেতর দিয়ে গেছে। এখন দাহালের আকাঙ্খা ও অনুমান সঠিক প্রমাণ হল। নেপালের এই নির্বাচনে কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স সংসদে ৭১ শতাংশের মতো আসন লাভ করেছে।

গত ১৯৯৬ সাল থেকে যদি ধরি, সশস্ত্র রাজনৈতিক লাইনে চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহালের ‘মাওবাদী সেন্টার’ দল অথবা CPN (Maoist Centre)  প্রথম যখন রাজতন্ত্র উৎখাত ও ক্ষমতা দখলের লড়াই ঘোষণা দিয়ে শুরু করেছিল। সেই থেকে হিসাব কষতে বসলে গত ২০ বছরের বেশি সময়, এটা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে অবশ্যই নেপালের জনগণের এক বিরাট লম্বা পথপরিক্রমা। আর কে না জানে লক্ষ্যে পৌঁছানোতে পথ যত লম্বা হয়ে যায়, ততই সেখানে আরো বেশি অনিশ্চয়তা হাজির হয়ে যায়, আর তা বিপজ্জনক হয়। তবুও আজ প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম শেষে এক কথায় বললে নেপালের সাফল্য অনেক। আর এতে অন্তত তিনটি বড় অর্জন আছে।

এক. শত বছরেরও বেশি পুরনো নেপালি রাজতন্ত্রের শাসনকে উৎখাত ও অবসান ঘটানো। দুই. দুইবারের চেষ্টায় অনিশ্চয়তার সাত বছরের শেষে নেপালকে সর্বপ্রথম একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ রাজতান্ত্রিকতার বিপরীতে রিপাবলিক বা লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন সফল হয়। কনস্টিটিউশন রচনার কাজ সফলভাবে সমাপ্ত করা এবং এই কাজ শেষে প্রথম কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন – ২০১৫ ঘোষণা দিতে নেপাল সফল হয়। আর তিন. নতুন কনস্টিটিউশনের অধীনে প্রথমবার সাধারণ নির্বাচন বা সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। শুধু তাই নয়, ভোটের ফলাফলে নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের কিছু কম (গণনার প্রাথমিক পর্যায়ের ১৬৫ আসনের মধ্যে ৮০ আসন) পেয়েছে। এই দল হল, চেয়ারম্যান খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির কমিউনিস্ট পার্টি (CPN-UML)  । আর এরা অপর কমিউনিস্ট ‘মাওবাদী সেন্টার’ দলের সাথে মিলে প্রায় ৭১ শতাংশ আসন পেয়েছে। অর্থাৎ এই তৃতীয় অর্জন সম্পর্কে বলা যায়, এখন সহজেই একটি স্থিতিশীল সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির নেতৃত্বে নেপাল এক নতুন ও স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবে।

প্রায় ২০ বছর পরের নেপাল এই প্রথম স্থিতিশীলভাবেই পূর্ণ সময়কালের সরকার কায়েম করতে পারবে, আর সেই সরকার দৃঢ়তার সাথে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবে। এর পিছনের প্রধান কারণ হল, অপর কমিউনিস্ট পার্টি  ‘মাওবাদী সেন্টার’-এর সাথে ইতোমধ্যে গত অক্টোবরে এরা যে জোটটা গঠন করেছে, সেটা শুধু কোনো নির্বাচনী জোট নয়,  বরং একটা এক দলে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটা জোট। [The two parties also said they would work for their formal merger……]।   ফলে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঘাটতি মিটানো নয়, সরকারের নানান রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নীতি সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মতের অমিলগুলো সামলে এক সিদ্ধান্ত পৌছানোর সুযোগ এখানে বেশি থাকবে। এই নির্বাচনে মাওবাদীরা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনপ্রাপ্ত দল (১৬৫ আসনের মধ্যে ৩৬ আসন), আর তৃতীয় নেপালি কংগ্রেস (১৬৫ আসনের মধ্যে ২৩ আসন)। তবে নতুন গঠিত এই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্সে আরো একটা দল আছে। সেটা বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি পার্টি, এই দলের একা তিনি জিতেছেন। তিনি আসলে ছিলেন মাওবাদী দলের সাবেক দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা, রাজতন্ত্রের পরাজয়ের পর ২০১১ সালের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন, পরে দল ছেড়ে বের হয়ে যান। এখন জোটে ফিরে আসলেন। প্রথম কনষ্টিটিউশন গঠনকালীন সরকারের (২০০৮-২০১১) সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সরকার গঠন করে ছিল মাওবাদীরা। ফলে ঐ সময়ে ভারতের সাথে স্বার্থ বিরোধের বিষয়গুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংঘাতের মুখোমুখি হওয়া ও চাপ সামলানোর বিপদের ঝড়ঝাপ্টা গুলো সবচেয়ে তাদের উপর দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয়দের চাপের মুখে তা মোকাবিলা করতে গিয়ে বাবুরাম  “ভারতীয়দের সাথে পারা যাবে না” ফলে “নরম পথে আগাতে হবে” ধরণের অবস্থানের কারণে দাহালের সাথে বিরোধে, শেষে দল থেকে বিচ্ছিন্নই হয়ে যান। পরে আলাদা দল করেন, তিনি এবার জোটে ফিরে এসেছেন। তাহলে অল্পকথায় তিনটি গুরুত্বপুর্ণ অর্জন হলঃ রাজতন্ত্রের উৎখাত, নতুন লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা আর শেষে এক স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার গঠন পথে এসে পৌছানো।

নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো তিন স্তর বিশিষ্ট – ফেডারল (কেন্দ্র), প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকার – এভাবে এবং এভাবেই নতুন কনস্টিটিউশন অনুসারে গঠিত। বিশেষ দিকটা হল, তিন স্তরের নির্বাচন এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা এক বিরাট সাফল্য। কারণ গত বছরের এই সময়েও নেপালের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এত চরম অবস্থায় ছিল যে, এক বছর পরে সরকারের আয়ু শেষ হবার পরে এই সময়ে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অর্জন আজ এই উচ্চতায় উঠবে তা তখন বিশ্বাস করা যেত না।

আচ্ছা, গত ২০ বছরের পথপরিক্রমায় কারা নেপালের গণস্বার্থের দিক থেকে বিচারে এর রাজনীতিক-ভিলেন ছিল? এই প্রশ্নের জবাব হবে, ২০০৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বভাবতই সেই ভিলেন, তিনি ছিলেন নেপালের রাজা জ্ঞানেন্দ্র। তবে এরপর রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে  পাল্টা মাওবাদীসহ নেপালের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নিয়ে জোট বাঁধা ও এর উপরে ভারত ও আমেরিকার সমর্থন আনা ইত্যাদি – এই ঘটনাগুলো ঘটার সময় নির্ধারক ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল ভারত। হ্যা, ইতিবাচক। তা সত্ত্বেও নতুন সরকারের আমলে কনস্টিটিউশন গঠনের কাল থেকে ক্রমেই ভারত নেতিবাচক বিরাট ভিলেনের ভূমিকায় হাজির হতে থাকে। সেই থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বাজে এক ভিলেন হয়ে আছে ভারত। গানের ভাষায় বললে- ‘ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়’। ভারত চাইতেই জানে না। নেপালের কাছে ‘কিভাবে’ আর ‘কী’ চাইতে হয় – কী চাওয়া যায় না – তা জানে না। নেহরুর হাতে ভিত্তি পাওয়া ও গড়া স্বাধীন ভারত, আর এ থেকে সবচেয়ে বাজে ও ভুল শিক্ষা পাওয়া আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভারত, এরাই মূলত সেই ভিলেন। নেহরু ভেবেছিলেন কলোনি-উত্তর স্বাধীন ভারত, একালে ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া সুবিধাগুলো তিনি ব্রিটিশদের মতই নিজেও ব্যবহার করবেন। এটা তার প্রিরোগেটিভ (prerogative) বা পড়ে পাওয়া চারআনা বিশেষ সুবিধা, প্রাধিকার। তিনি বুঝতেই পারেননি যে, এর অর্থ হল, তাতে ভারত এক কলোনিয়াল ক্ষমতা বলে আগাম কল্পনা করে নিতে হবে বা করা হয়ে যায়। এর চেয়েও আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিক। তিনি সে সময়কে মানে এর তাতপর্যকেও বুঝতে পারেন নাই। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যে নতুন দুনিয়া গড়ে তোলা হচ্ছিল, সেটা আর যুদ্ধের আগের মত কলোনি-শাসিত দুনিয়া নয়, কোনো ইউরোপীয় কলোনি-শাসকের দুনিয়া নয়। বরং এক বিরাট ভিন্নতায় আমেরিকার  নেতৃত্বের এক নতুন দুনিয়া। মৌলিকভাবে এটা বরং খোদ পুরনো কলোনি-অর্থনৈতিক-সম্পর্কেরই অবসান। আর আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের-অর্থনীতিক-সম্পর্কের দুনিয়া। কলোনি শাসনমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ আমেরিকার গড়ে তোলা এটা নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি সম্পর্কের দুনিয়া। যেখানে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক জাতিসংঘ ও বিশ্ববাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান – ইত্যাদির মত বহুরাষ্ট্রীয় (মাল্টিলেটারাল) প্রতিষ্ঠান এবারের নতুন দুনিয়ায় আছে।

মূল কথায় এখানে অপর রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব ও সম্পর্ক রাখা এবং সুবিধা নেয়া ও কিছু দেয়ার তরিকাই আলাদা। এখানে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিনিময় সম্পর্ক আর পুরান কলোনিয়াল একেবারেই নয়, বরং আলাদা। নেহরু এর খবর নেন নাই বা রাখেননি। এ কথার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, নেহরুর করা ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’। যেটা আসলে এর আগে ব্রিটিশদের করা ‘নেপাল-ব্রিটেন চুক্তি ১৯২৩’ এর কার্বন কপি। এই চুক্তি থেকে এটা পরিষ্কার, নেহেরু ভারতকে কলোনি-শাসকের ভূমিকায় নামিয়েছিলেন, দেখেছিলেন। আগে ব্রিটিশ কলোনির এক ভেসেল রাষ্ট্র বা করদরাজ্য ছিল নেপাল। ব্রিটিশদের নেপালকে সরাসরি কলোনি না করে ভেসেল রাষ্ট্র করে সুবিধা দেয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। পরবর্তিতে যোগ হওয়া নতুন এক কারণ হল, সিপাহী বিদ্রোহ কালে নেপালের রাজাদের বৃটিশের পক্ষে গোর্খা সৈন্য নিয়ে অবস্থান নেওয়া। এই বিদ্রোহের আগে পুরো নেপাল ব্রিটিশরা দখলে নিয়েছিল। কিন্তু সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশদের পক্ষ নেয়াতে বিদ্রোহ পরাজিত করার শেষে এই ভেসেল রাষ্ট্রের জন্ম আরও পাকাপোক্ত হয়। তাই নেপাল-ব্রিটেন এর মধ্যে আগের অনেক চুক্তি ছিল, আমরা জানতে পাই। বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশরা তাতে নতুন নতুন অনেক ছাড় যোগ করেছিল। এমন সর্বশেষের চুক্তিটিই হল, ১৯২৩ সালের চুক্তি। কিন্তু নেপালের ল্যান্ডলকড অবস্থার সুযোগ নিয়ে, পুরান সেই চুক্তি অনুসরণ বা অনুকরণ করে একই দাসত্ব চুক্তি করেছিল নেহরুর ‘রিপাবলিক ভারত’। ওই চুক্তিটিই এখনো বহাল আছে। প্রশ্নটা আসলে, একালে কারও দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে দাস বানানোর সুযোগ পেলেও আপনি তা নেবেন কি না? নেহরু সেটা দাবির সাথে নিয়ে নিয়েছিলেন। কারণ নেহরুর মৌলিক আগাম অনুমান হল, “স্বাধীন ভারত সেটা বৃটিশ কলোনি ভারতেরই উত্তরসুরি ও ধারাবাহিকতা”। অর্থাৎ ভারত নিজে স্বাধীন তবে এটা এখন নিজেই এক কলোনি শাসক। ফলে কন্টিনিউয়েশন বা ধারাবাহিকতা।  তাই, এই কলোনি ওরিয়েন্টেশনে বা ধাঁচে নিজ নতুন আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভিত গড়েছিলেন নেহেরু। নেহেরুর সেট করে দেওয়া ‘সেই ট্রাডিশন’ এখনও চলছে।

গত অক্টোবরে কমিউনিস্টদের লেফট অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর তাদের যৌথ নির্বাচনী ম্যানুফেস্টো প্রকাশিত হয়। জাপান থেকে প্রকাশিত ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন ১ ডিসেম্বর বলছে, ঐ ম্যানুফেস্টোতে বলা হয়েছে – লেফট অ্যালায়েন্স নির্বাচনে জিতলে পরে তাদের দ্বারা গঠিত অ্যালায়েন্স সরকার এরপর ‘ইন্ডিয়া-নেপাল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি-১৯৫০’ বাতিল করবে এবং একটা নতুন চুক্তি করবে। এখন নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ওই আকাঙ্খা মত অ্যালায়েন্সের পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল এসেছে। ফলে এখন স্বভাবতই ঐ চুক্তি বাতিলের প্রসঙ্গ উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভারতের সাথে সংঘাতে আর এক পর্ব শুরু হবে, আর এক খাতা খোলা হবে।

এই নির্বাচনের শুরু থেকে নয়াদিল্লি খুবই অস্বস্তিতে ছিল। আর ফল প্রকাশের পর সেটা আরো বেশি হয়ে এখন উলটা অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে। এমনিতেই গত অক্টোবরে নেপালের দুই কমিউনিস্ট পার্টির অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর থেকে নয়াদিল্লি আসন্ন নির্বাচনে নিজের জন্য নানান বিপদ আসন্ন বলে আঁচ করতে শুরু করেছিল। যেমন সুবীর ভৌমিকের নেপালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ‘সাউথ এশিয়ান মনিটর’ অনলাইনে তার লেখা দিয়েছেন। সেই লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘নেপালের নির্বাচনকে ভারতের নিজের পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত!’  তবে সুবীরের এবারের লেখাটি ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে সান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে লেখা। তাই সম্ভবত ভারতের অনেক ভুলত্রুটি এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ভারতকে আমল না করে ২০১৫ সালের অক্টোবরে নেপালের কনস্টিটিউশন ঘোষণা করে দেওয়াতে টানা ছয় মাস ল্যান্ডলক নেপালে সকল ‘পণ্য  আমদানি অবরোধ’ করে রেখেছিল নয়াদিল্লি। নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নার গ্যাস থেকে যানবাহনের জ্বালানিসহ সব কিছু ছয়মাস বন্ধ রাখলে গরীব মানুষের জীবনে এর প্রভাব কী হতে পারে তা অনুমেয়। তাই বলা বাহুল্য ভারতের দিক থেকে এটা কাউন্টার-প্রডাকটিভ হয়েছে।  প্রচ্ছন্নে সুবীরের লেখায় ভারতের সিদ্ধান্ত ভুল এটা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ঐ ঘটনাই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষকে ভারতের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও কঠোরভাবে বিমুখ করে তোলে, যার প্রভাব এখনো প্রবল।  আর খুব সম্ভবত, এসব ভোটারদেরই নিজের ব্যাগে তুলে নিতে পেরেছে,  চরম ভারত-বিরোধিতার লাইনের চেয়ারম্যান অলির কমিউনিস্ট দল। মোট ১৬৫ এর মধ্যে ৮০ আসন – এভাবে বিপুল সংখ্যার আসন পেয়েছে এই নির্বাচনে।ওদিকে সুবীর তাঁর লেখায়, আবার শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচন ও এর পরবর্তী পরিস্থিতির সাথে নয়াদিল্লি এখন নেপালকে তুলনা করে দেখছে সে খবর জানিয়েছে। শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে তাদের এখনকার মূল্যায়ন নাকি – শেষ বিচারে শ্রীলঙ্কায় সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও অন্যান্য ইস্যুতে চীনকে আসলে ঠেকানো যায়নি। নেপালেও গেল না। তাই সুবীর যেন শিরোনামে বলছেন, হতাশ হয়েন না 

শ্রীলঙ্কার মত নেপালের বেলায় কোন সমুদ্রবন্দর নির্মাণ তার ইস্যু ছিল না। শ্রীলঙ্কার হাম্মনটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ২০১০ সালে শেষ হবার পরও তা ভারত চালু না করতে দিয়ে পাঁচ বছর আটকে রাখতে পেরেছিল, নির্বাচন রাজনীতিতে, সরকার গঠনে হাত ঢুকিয়ে। কিন্তু শেষ বিচারে বন্দর চালু হওয়া ভারত ঠেকাতে পারে নাই। ভারত ঘেঁষা চলতি সরকারই চীনের সাথে সংশোধিত চুক্তি করে বন্দর চালু করে ফেলেছে। তাই ভারত এখন এটাকে নিজের হার মনে করে, সেকথাই সুবীর তুলে এনেছে। তুলনায় নেপালে বন্দর না হলেও চীনের সাথে বাঁধ নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের আড়াই বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প আছে বা ছিল। যে সরকারের অধীনে চলতি নির্বাচন সমাপ্ত হল সেটা নেপালি কংগ্রেস দলের। তবে তা মাওবাদী দলের সমর্থনে গড়া এক কোয়ালিশন সরকার। নেপালে পানিবিদ্যুতের প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুবীর বলছেন, এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় মাত্র ৭৫৩ মেগাওয়াটের মত। ২০১৫ সালের শেষে কমিউনিস্ট অলির সরকারের আমলে চীনের সাথে তিনি ১২০০ মেগাওয়াটের ঐ বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি করেছিলেন, সেটাই আড়াই বিলিয়ন ডলারের চুক্তির। কিন্তু চলতি নেপালের প্রথমপর্যায়ের নির্বাচন শুরুর কয়েক দিন মা্ত্র আগে গত নভেম্বরে নেপালি কংগ্রেস সরকার ঐ চুক্তি বাতিল করে দেয়। তাই আইনত সেই চুক্তি ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে। অজুহাত উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক টেন্ডার করা হয় নাই। এতে নেপালকে ঘিরে চীন-ভারত রেষারেষি আরো সরাসরি নির্বাচনে হাজির হয়ে পড়ে তখন থেকেই। স্বভাবতই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স এখন নির্বাচনে বিজয় লাভ করাতে ওই প্রকল্প ও চুক্তি আবার জীবিত হবে বলে সবাই অনুমান করছেন। মজার কথা হচ্ছে, সুবীর ভৌমিক ওই চুক্তি জীবিত করার পক্ষে কথা বলেছেন। বলছেন এটাই নেপালের স্বার্থ। এই প্রকল্প চীনের চীনের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে অংশ বলে ঘোষণা করা ছিল। এমনকি তা সত্ত্বেও চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হয়ে আরো অবকাঠামো প্রকল্প নেপালের আনার পক্ষে তিনি কথা বলছেন।

নয়াদিল্লি ঘোরতরভাবে চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পের বিরোধী। এটা ভারতের প্রকাশ্য বিদেশ নীতি ও অবস্থান। ভারতের কোনো ‘বন্ধু’ বা পড়শি রাষ্ট্র বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত থাকুক এটা দেখতে বা সহ্য করতে সে একেবারেই রাজি নয় (ফলে বাংলাদেশের সাথেও এটা এক অনৈক্যের বিরাট ইস্যু)। কিন্তু নেপালের বেলায় সুবীর বলতে চাইছেন, নেপালের এখন দরকার বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত খাতে প্রচুর বিনিয়োগ। না হলে নেপালের অর্থনীতি দাঁড়াবে না। ইতোমধ্যে সদ্যগঠিত নেপালে জয়লাভ করা কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স, আগামী ১০ বছরের মধ্যে নেপালকে মাথাপিছু পাঁচ হাজার ডলার আয়ের অর্থনীতির দেশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে চীনের মতই ভারতকেও নেপাল কিছু বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করতে দিয়েছিল ২০১৫ সালের শুরুর দিকে। কিন্তু আজও সেসব প্রকল্পের কোনো কাজই শুরু হয়নি বলে সুবীর জানাচ্ছেন। অর্থাৎ একদিকে ভারতের সক্ষমতা দক্ষতা সামর্থ্য নেই, অন্য দিকে চীনের আছে, সুবীর এই তুলনা আনছেন। আবার চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতার তুলনায় ভারত যে কিছুই না, সেটা শ্রীলঙ্কাতেও দেখা গেছে। ফলে সুবীর ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের কাছে ‘স্মার্ট হতে’ পরামর্শ রেখেছেন। আসলে সুবীরেরই খুবই স্মার্ট পরামর্শ এটা। কারণ তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলছেন, প্রশাসনের উচিত চীন-নেপালের বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাধা না দিয়ে বরং সহযোগিতা করা। পরামর্শ খুবই অ-ভারতীয় অথবা অ-চিরাচরিত ভারতীয় পরামর্শ। কিন্তু সেক্ষেত্রে সুবীর বুদ্ধি দিচ্ছেন, এইবার যে বাড়তি বিদ্যুৎ তৈরি হবে তা যেন ভারত কিনে নেয়। আর এইবার ইঙ্গিত দিয়েছেন ওই বিদ্যুৎ বাংলাদেশ বিক্রি করে দিবার টাউটারি নিতে, নগদ লাভ এখানেই। অর্থাৎ ভারত যে উতপাদন আয়োজনে অক্ষম তা স্বীকার করে নিয়ে সুবীর টাউটারিতে নামতে বলছেন, তাই কী? তবে টাউট মারচেন্ডাইজ (tout merchandise ) খারাপ ব্যবসা নয়, ভারত যেটুকু ভাল পারে। এখানে আমাদের জানা থাকা ভাল যে, ভারত নেপালকে এমন ‘কলোনি-চুক্তির’ মধ্যে রেখেছে যে, ভারতের অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে নেপাল নিজ উতপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে না।

তবে আমাদের মতো দেশের বেলায় পাল্টা আরেকটা কথা সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চীনের নেয়া অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে (যেমন বাংলাদেশেও) এক বিরাট কালো দাগ আছে। কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজার যাচাই, কোনো ওপেন টেন্ডার হয় না। শুধু তাই না প্রকল্পের কোনো টেন্ডার করতে যাতে না হয়, বালাই যেন না থাকে, টেন্ডার করার আইনি বাধ্যবাধকতা যাতে এড়ানো যায়; তাই প্রকল্পগুলো জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট)-এর অধীনে সম্পন্ন করার চুক্তি করা হয়। আর এতে টেন্ডার ডাকার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যায় বলে স্বভাবতই প্রকল্প মূল্যের কোনো মা-বাপ থাকে না। এ ছাড়া লোকাল এজেন্টের নামে অর্থ সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা বা সুযোগও থাকে। বিশ্বব্যাংকের অনেক বদনাম আছে বা ছিল। তা সত্ত্বেও তুলনায় বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প অন্তত কোনো ওপেন আন্তর্জাতিক টেন্ডার ছাড়া সেক্ষেত্রে কো্ন প্রকল্প নিতে দেয়না।  বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে এটুকু অগ্রগতি তাদের ঝুলিতে আছে। এমনকি জাপান সরকার দাতা হলেও জাপানি ঠিকাদারকেই কাজ দেয়ার কোনোই বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই নীতি কার্যকর করার সক্ষমতা তাদের আছে, ইতোমধ্যেই সেটা দেখিয়েছে। চীনের বিশ্বব্যাংক AIIB গঠনের প্রাক্কালে একে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাবি করাতে এর বিরুদ্ধে মোক্ষম এই অভিযোগই তুলেছিল আমেরিকা। যদিও আমেরিকা নিজের বিরাট স্বার্থক্ষুন্ন হওয়ার কারণে নিয়মিতভাবে AIIB গঠনের বিরোধিতা করে গেছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও আমেরিকান অভিযোগ মিথ্যা ছিল না, তা বাস্তব।

তবে সেটা যাই হোক, সুবীরের লেখায় এই প্রথম ভারতের অভ্যন্তরীণ আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে নিজেদের দুর্বলতা ও সক্ষমতা-দক্ষতা সামর্থের অযোগ্যতা বা ঘাটতির দিকে নজর ফেরাতে তাগিদ দিতে দেখা গেল। সুবীরের এই লেখা থেকে মনে করার কারণ আছে যে, ভারতের প্রশাসন বিপদে আছে বলে অন্তত কেউ কেউ মনে করছেন, এ নিয়ে টনক নড়ারও কেউ কেউ আছে। আসলে ভারত বিপদ দেখছে; একের পর এক ভারতের পড়শি রাষ্ট্রে চীন প্রকল্প নিয়ে ঢুকে পড়ছে, আর ভারতের কিছু করার থাকছে না। এটা না দেখতে পাবার কারণ নাই, তবে স্বীকার করতে দেখা যায় না। সুবির তাই পরিস্কার করেই বলছে, ভারত এখন শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও আসলে শেষে কিছু ঠেকানো যায়নি বলে তারা মনে করে। অর্থাৎ ভারতের বিদেশ নীতিতে করণীয় – “শ্রীলঙ্কা মডেল বলেও কিছু দাড়ালো না।

কিন্তু আসলেই ব্যাপারটি এমন হওয়ার কথা নয় কি? ভারতের যদি সক্ষমতা-দক্ষতা-সামর্থ্য না থাকে, আর তা থেকে সৃষ্ট নানা দুর্বলতা তাকে ঘিরে রাখে, তবে এমনই কি হওয়ার কথা নয়। আসলে প্রথম প্রশ্ন করা উচিত যে, ভারত কেন অর্থনৈতিক বা বৈষয়িক সক্ষমতার দিক থেকে নিজেকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য বলে বিবেচনা করছে? কিসের ভিত্তিতে?

দেখা যাচ্ছে, ভিত্তিহীন সব অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসন পড়শিদের উপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে আর ধপাধপ পড়ছে – শ্রীলঙ্কা আর এরপর নেপাল…। সুবীর ভৌমিকই বলছেন, শ্রীলঙ্কার পর নেপালেও নাকি নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কার ভূত দেখতে পাচ্ছে। [But again, the ghosts of Sri Lanka may return to haunt Delhi…] তা হলে? এরপর কোথায়?

পাঠকের জন্য একটা সতর্কতা দিয়ে শেষ করব। বাইরের মিডিয়ার মত দেশেরও অনেক মিডিয়া – নেপালে একটা কমিউনিস্ট এলায়েন্স তৈরি হয়েছে আর চীন (মানে সেটাও তো কমিনিস্ট) – এভাবে সব মিলিয়ে বিষয়টাকে “চীনপন্থী”, বা “কমিউনিস্ট” ঘটনা বলে ইঙ্গিত হাজির করার চেষ্টা করছে। এই অনুমান ইঙ্গিত শতভাগ ভুল, ভিত্তিহীন। যে চিন্তা কাঠামোতে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলা হচ্ছে তা কোল্ড ওয়ারের যুগের; যেন ষাটের দশকের দুনিয়ায় আমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছি – এই ভিত্তিহীন অনুমানে বলা কথা। আমরা এখন একুশ শতকে, সকল রাষ্ট্র যখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে পরস্পরের সাথে গভীর বিনিময় সম্পর্কে লেপ্টে গেছি ও আছি। সবচেয়ে বড় কথা এই লেপ্টে যাওয়া আর কখনও  কোল্ড ওয়ারের মত আগের যুগে ফেরত যাবে না। তাই পুরানা চিন্তা কাঠামো আর বাস্তবতায় পুরানি টার্ম ব্যবহার করে কথা বলা আর সঠিক নয়। তাই এই ঘটনা কোনভাবেই আর “নেপালি কমিউনিস্ট আর চীনের” কোন বামপন্থা ততপরতা একেবারেই নয়। যেমন আগামিতে নেপালে দুই কমিউনিস্টকেই বাদ দিয়ে নেপালি কংগ্রেসের সাথে চীনের ঘনিষ্ট হওয়া খুবই সম্ভব। আসলে একালে ‘বামপন্থা’ বা ‘ডানপন্থা’ বলে কোন কিছুকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা অর্থহীন।

আর একটা তথ্যঃ নেপালের কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য নির্বাচন শেষ হয় নাই। মোট আসন ২৭৫ যার মধ্যে ১৬৫ আসন আসবে সরাসরি প্রত্যেক আসনের ভোট কাউন্টে, একজনকে নির্বাচিত ঘোষণা করে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে প্রাপ্ত ১৬৫ আসনের ফলাফলের ভিত্তিতে।  আর বাকি ১১০ আসনের ফলাফল পুরণ হবে দলগুলোর আনুপাতিক ভোট প্রাপ্তি থেকে। অর্থাৎ সব আসন মিলিয়ে একটা দল মোট ভোটারের কত পার্শেন্ট ভোট পেয়েছে সে অনুপাতে এই ১১০ আসন ভাগ করে দেয়া হবে। অর্থাৎ কোন দল একটা আসনেও সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জিততে না পারে যদি, তাহলেও এবার আনুপাতিক ১১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার সুযোগ আছে।  আনুপাতিক ১১০ আসনের গণনা এটা ঘরে বসে গণনা করে কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে দিবে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে ১৬৫ আসনের ভিত্তিতে বলে আনুপাতিক আসন এরপর যোগ হলে আনুপাতিক ভাবেই সব দলের আসন বাড়বে, তাই তেমন কোন হরফের হবে না। এভাবে নেপালের (ফেডারেল) সংসদে মোট আসন বা সংসদ সদস্য ২৭৫ জনেরই নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ‘নেপালে নির্বাচনের ফলাফল : শ্রীলঙ্কার ভূত দেখছে নয়াদিল্লি’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

নেপালের চলতি সাধারণ নির্বাচনের তাতপর্য

নেপালের চলতি সাধারণ নির্বাচনের তাতপর্য

গৌতম দাস
০৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহষ্পতিবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lW

 

নতুন করে রাষ্ট্রগড়া বা একটা মর্ডান রিপাবলিক গঠন কালে এর গঠনসভা, একে ইংরাজিতে কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি (Constituent Assembly) বলা হয়; বাংলাদেশের বেলায় ১৯৭২ সালে ধারণাটাকে বাংলায়  “গণপরিষদ” – এই বাংলাটা নেয়া হয়েছিল। আম-ধারণা হিসাবে নির্বাচন বলতে বা ‘ভোট আসছে’ বলে আমরা যা বুঝি ও বুঝাই সেটাই “সাধারণ নির্বাচন”। আবার কোন নতুন রাষ্ট্র গঠনসভারও সদস্য কারা কিভাবে নির্বাচিত হবেন এর জন্যও একটা নির্বাচন হয়। তবে সেটাকে “সাধারণ নির্বাচন” নয় বরং একে “গঠনসভার সদস্য নির্বাচন” বলে। যদিও বাইরে থেকে দেখতে সেটা সাধারণ নির্বাচনের মতই মনে হতে পারে।

‘গঠনসভার নির্বাচন’ আর ‘সাধারণ নির্বাচন’ এর মধ্যে মৌলিক ফারাক হল –  উদ্দেশ্য। ‘গঠনসভার নির্বাচন’ এর উদ্দেশ্য হল ওখানে ঐ নির্বাচিত কমিটি একটা কনষ্টিটিউশন রচনা করতে বসে, সেকাজ শেষ হলে নিজেরা  অনুমোদন দেয়। পরে এক গণভোটে তা পাশ করিয়ে আনে। আর ফাইনালি  ‘নতুন কনষ্টিটিউশন চালু হল’ বলে এক প্রোক্লেমশন বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। মূলত এই কাজটাকেই আরেক ভাষায় বলে ‘রাষ্ট্রগঠন সম্পন্ন’ হল। আর গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হল ‘রাষ্ট্রগঠন সম্পন্ন’ হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরে নির্বাচিত ঐ গঠনসভার অস্তিত্ব ঐ পর্যন্তই, এরপরে সে নিজে নিজেই আপনাতেই ভেঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ধরা হয়। এইবার রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে গঠিত নতুন কনষ্টিটিউশন মোতাবেক। যার প্রথম পদক্ষেপ হল, কনষ্টিটিউশনে যেভাবে লেখা আছে সে মোতাবেক  কারা জাতীয় সংসদের সদস্য হবেন নির্বাচন কমিশন এর নির্বাচন আয়োজন করতে থাকে, প্রতি পাঁচ বছর পরপর। এই নির্বাচনকে ‘সাধারণ নির্বাচন’ বলা হয়। মনে রাখতে হবে “সাধারণ নির্বাচন” ঘটার ক্ষেত্রে সবসময় আগে থেকে একটা অনুমোদিত কনষ্টিটিউশন  থাকে আর সে মোতাবেক ঐ সাধারণ নির্বাচন আয়োজিত হয়ে থাকে।  ‘গঠনসভার নির্বাচন’ এর উদ্দেশ্য একটা কনষ্টিটিউশন লেখা আর এই নির্বাচন একবারই হয়; বিপরীতে সাধারণ নির্বাচনের বেলায় আগে থেকে থাকা একটা অনুমোদিত কনষ্টিটিউশন মোতাবেক সাধারণ নির্বাচন প্রতি পাঁচ বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়।

তবে কনষ্টিটুয়েন্সির দিক বিচারে এই দুই ধরণের নির্বাচনের কনষ্টিটুয়েন্সি অনেক রাষ্ট্রের বেলায় ভিন্ন দুরকম হয়, অনেক ক্ষেত্রে আবার একই থাকে। কনষ্টিটুয়েন্সি বা প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকা মানে হল কোন কোন প্রশাসনিক এলাকা অর্থাৎ কোন কোন ইউনিয়ন বা উপজেলার ভোটারদের নিয়ে একেকটা কনষ্টিটুয়েন্সি বা প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকা নির্ধারিত হবে। অনেক সময় এটাকে নির্বাচনী আসন এলাকাও বলতে দেখা যায়। যেমন বাংলাদেশে এমন কনষ্টিটুয়েন্সি মোট ৩০০ টা। তবে  অনেক দেশে ‘গঠনসভার নির্বাচন’ আর ‘সাধারণ নির্বাচন’ – দুই ক্ষেত্রে কনষ্টিটুয়েন্সি বা আসন এলাকা ভিন্ন ভিন্ন হতে দেখা যায়। সাধারণত দেখা যায়, ‘গঠনসভার নির্বাচনে’ আসন সংখ্যা বা নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা তুলনায় বেশি থাকে। যেমন নেপালে ‘গঠনসভার নির্বাচনে’ মোট আসন ছিল ৬০১, আর সাধারণ নির্বাচনে মোট আসন সংখ্যা হল ২৭৫। এছাড়া ‘গঠনসভার নির্বাচনের’ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষে প্রক্লেমেশন আর এরও পরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র থাকে ও পরিচালিত হয় এক অন্তর্বর্তিকালীন বা অস্থায়ী সরকারের অধীনে।  গঠনসভার নির্বাচিত সদস্যরাই ঐ অস্থায়ী সরকার গঠন করে থাকে। এই হল ভেঙ্গে বিস্তার করে বলা একটা নতুন রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়া অথবা পুরা কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস।

আমাদের পড়শি নেপাল তাদের প্রাচীন রাজতান্ত্রিক শাসন উতখাত শেষে (২০০৬ সালে),  দীর্ঘ প্রায় ১০ বছরে কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস সম্পন্ন করার পরে, এখন নেপালে এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন চলছে। কিন্তু প্রায় দশ বছর লাগল কেন? এটা তো বরং চার-পাঁচ বছর বা তারও আগে (বাংলাদেশ একবছরেরও কম সময়ে হয়েছিল) শেষ করে ফেলার কথা। আর কনস্টিটিউশন মেকিং শেষ করতে কোন জনগোষ্ঠি যত লম্বা সময় নিবে পুরা জনগোষ্ঠিকে ততদিন ভয়ঙ্কর সব বিপদের মধ্যে থাকতে হবে। এ যেন অন্যের হাতে ধর্ষিত হওয়ার বা খুবলে খাওয়ার বিপদে থাকা। আমরা রাজনৈতিক বিপ্লব করব, নতুন রাষ্ট্রগঠন করব ইত্যাদি অনেকের স্বপ্ন আমাদের থাকে। কিন্তু এর জন্য সবচেয়ে বিপদজনক অধ্যায় হল  একটা কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস শুরু করেও শেষ না করতে পারা বা প্রক্লেমশন না দিতে পারা। ব্যাপারটা অনেকটা যেন রোগীকে অপারেশন টেবিলে তোলা হয়েছে, পেট কাটা হয়েছে কিন্তু কিছুতেই এবার নানান জটিলতায় পরে সেলাই দিয়ে পেট আর বন্ধ করা যায় নাই। এমন বাজে অবস্থা আর কারও হয় না। স্বভাবতই সেক্ষেত্রে তখন রোগীর জীবন চলে যাওয়ার বিপদ মাথার উপর টিকটিক করবে। নেপাল হল সেই দুর্ভাগ্যের জনগোষ্ঠি যারা প্রথমবার  কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি গঠনসভা নির্বাচিত করেও (২৮ মে ২০০৮ থেকে, ২৮ মে ২০১২ সাল সময়কালের মধ্যে) ঐ নির্ধারিত চার বছরের মধ্যে কনস্টিটিউশন মেকিং শেষ করতে পারে নাই। এদিকে সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি নিজেই আয়ু শেষ করে ভেঙ্গে যায়। ফলে পুরা জনগোষ্ঠি দেশবাসী এক লিম্ব বা ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল। এরপর উপায়ন্ত না দেখে সব রাজনৈতিক দল মিলে সুপ্রীম কোর্টের কাছে আদালতকে সাক্ষী রেখে বিশেষ পরিস্থিতি ও বিবেচনার দোহাই দিয়ে আবেদন করেছিল আর একটা সুযোগ দিতে; আর নিজ জনগোষ্ঠির কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে এবার আর ব্যর্থ হবে না। এথেকেই আর একবার কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি গঠনসভা নির্বাচনের বৈধতার ভিত্তি তৈরি করেছিল নেপাল। এটা সৌভাগ্য যে নেপাল যে সুযোগ পেয়েছিল। ফলে দ্বিতীয়বার কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি নির্বাচন হয়েছিল নভেম্বর ২০১৩ সালে। পড়শি কারও হাতে ধর্ষিত হওয়ার বা খুবলে খাওয়ার বিপদ পেরিয়ে বড় কোন ক্ষতি ছাড়াই ঐ নির্বাচন শেষে নেপাল আবার নতুন করে রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার ফেরা ও কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি্তে কনষ্টিটিউশান রচনার কাজ  শুরু করার সুযোগ পেয়েছিল। তবে  নেপালি জনগোষ্ঠির জন্য এরচেয়েও বড় সৌভাগ্য হল এবার দ্বিতীয় সুযোগে শত বাধা সত্ত্বেও (বিশেষ করে ভারতের বাধা) ‘কনষ্টিটিশন গঠন কাজ শেষ’ হয়েছে বলে সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে তারা প্রক্লেমশন জারিতে সফল  হয়েছিল। আর তা সম্ভব হওয়ার পিছনে প্রধান কারণ ছিল নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল  (দাহালের মাওবাদী দল, আর বাকি দু দল হল,  আমাদের সিপিবির মত নির্বাচনমুখি কমিউনিস্ট দল ইউএমএল আর নেপালি কংগ্রেস) একজোটে পরস্পরের কাছে দেয়া প্রতিজ্ঞা যে তারা ভারতের কোন প্ররোচনায়  না পড়ে প্রথম সুযোগেই কনষ্টিটিউশনাল রচনার কাজ শেষ করবে। দুবছরের মধ্যে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তারা সক্ষম হয়েছিল, যদিও ভারত শেষ চেষ্টা করেছিল মাধোসি জনগোষ্ঠিকে উস্কে পরিস্থিতি নিজের পক্ষে নিতে, কনষ্টিটিউশনাল  প্রক্লেমশন জারিতে বাধা দিতে। কিন্তু সেসব কার্যকর করতে ভারত শেষে ব্যার্থ হয়। তবে নেপালে প্রদেশ কয়টা হবে, কিভাবে ৭৭টা জেলা কোন প্রদেশে কিভাবে  অন্তর্ভুক্ত হবে এটা অমীমাসিত রেখেই ঐ তিন দল কনষ্টিটিউশনাল  প্রক্লেমশন জারি করে দিয়েছিল। আর পরবর্তিতে ঐ অমীমাংসিত কাজ শেষ করা হয়েছিল।

এখন নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এর অর্থ গত দুবছরে সেসব জনগোষ্ঠিগত স্বার্থবিরোধ মিটিয়ে তারা অসমাপ্ত অংশগুলোও পুর্ণ করে ফেলেছে। এটাই নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যাওয়ার সফলতার আসল  তাতপর্য।

এটা সাধারণ নির্বাচন, এখানে ‘সাধারণ’ শব্দটা সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। কারণ এটা জানাচ্ছে  নেপালে কনষ্টিটিউশন রচনার কাজ পুরাটাই সমাপ্ত হয়েছে। তবে এই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুই পর্বে। কারণ এই শীতের সিজনে দুর্গম পাহাড়ে চলাচলের অসুবিধার কারণে মাঝে দুসপ্তাহের ফারাকে দুই আলাদা দিনে ভোট নেওয়া হচ্ছে।  দুই পর্বের ভোটগ্রহণের প্রথম পর্ব ২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে আর দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ৭ ডিসেম্বর।

সাধারণভাবে বললে, নেপাল সম্পর্কে ভারতের কল্পনা হল – এটা ‘নিজের বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ি’ বা তালুক যেন। ফলে সেখানে যা হবে তা ভারতকে তার ইচ্ছাকে অমান্য করে হতে পারবে না। এই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে এখন বাস্তব পুরোটাই উল্টেপাল্টে ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ভারতের বিদেশনীতির বিরাট পরাজয়ের আজ সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়েছে নেপাল। আর এতে  ভারতের রাজনীতিক ও বিশেষ করে তার আমলা-গোয়েন্দাগোষ্ঠি যেন খোদ ভারতের স্বার্থের শত্রু।

নেপালকে ভারত নিজের বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ি মনে করার পটভূমি হাজির হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া ছেড়ে ব্রিটিশ শাসকের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে। ১৯৪৭-পূর্ব যুগে একদিকে খোদ বৃটিশ-ইন্ডিয়া আর অন্যদিকে রাজতান্ত্রিক নেপাল – দুটোই ব্রিটিশ কলোনি ছিল, তবে দুই অর্থে। আর এতে বিরাট তফাতটা হল, ১৯৩৭ সালের পর থেকে ভারতে ধীরে ধীরে নেটিভরা অন্তত স্থানীয় বা প্রাদেশিক পর্যায়ের সরকার নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনে নিয়ে যেতে পেরেছিল। এর বিপরীতে নেপাল তখন নিজস্ব এক রাজতান্ত্রিক সরকার ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা ব্রিটিশ সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ এক করদরাজ্য। নেপালের সাথে বৃটিশদের “নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি ১৯২৩”, এটাই ছিল দ্বিতীয় ও শেষ চুক্তি, যার মেয়াদ উল্লেখ ছিল ১৯৫০ সাল পর্যন্ত। যদিও সেটা নেপালের রাজাদের স্বার্থের দিক থেকে খারাপ চলছিল না, কিন্তু ব্রিটিশ শাসকেরা ১৯৪৭ সালে ভারত ত্যাগ করে চলে যাওয়ায় নেহরুর-ভারত যেন ‘নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি ১৯২৩’-এর ব্রিটিশ অংশের উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠে। ফলে আগের ওই চুক্তিই এবার ১৯৫০ সালে নতুন করে, ব্রিটিশ সরকারের জায়গায় ভারতের নাম বসিয়ে ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’ নামে পুনর্লিখিত  করা হয়েছিল। সেই থেকে নেহরুর-ভারতের দৃষ্টিতে ও মনোভাবে রিপাবলিক ভারত যেন আসলে নতুন এক ‘কলোনি মাস্টার’।

সুনির্দিষ্ট করে নেপালের বেলায় বললে, নেহরুর-ভারত এমন ভাববার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। কারণ নেপাল ল্যান্ডলকড রাষ্ট্র। ভারতের ওপর দিয়ে ছাড়া তার বাইরে বের হওয়ার বা পণ্য আমদানি-রফতানির উপায় নেই। তিন দিকে ভারত আর উত্তরে চীন। কিন্তু চীনের দিকের অংশে তা আরো দুর্গম উঁচু পর্বতে ঢাকা ফলে পুরাটাই অগম্য এলাকা। কেবল একালে এসে রাইজিং চীন বিপুল বিনিয়োগ করে পাহাড় ডিঙিয়ে নেপালের সাথে স্থল যোগাযোগ (বিশেষ করে হাজারের দুয়েকের কিমি বেশি দীর্ঘ রেল লাইন পেতে) স্থাপনে রত হয়েছে। যদিও তা ঠিক নেপালের জন্য না, চীনের নিজের ঐ অঞ্চলও ল্যান্ডলকড, ওর বিকাশের জন্য।

রিপাবলিক ভারতরাষ্ট্র তার কোনো পড়শি বা বিদেশ-রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক করা মানেই সেটা ভারতের কলোনি বানানোর বা কলোনি-সম্পর্কের চেষ্টা করে যেতে হবে – নয়াদিল্লির এই মনোভাব, এই অনুমান ও বোধ স্বাধীন ভারত জন্ম হওয়ার সময় থেকেই। ভারতের এই অনুমান যে মারাত্মক ভুল, আত্মঘাতি, আর এর জন্য ভারতকে উলটা কাফফারা দিতে হবে, এটাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্রমান্বয়ে শিক্ষা পেয়ে চললেও তা থেকে কোনো শিক্ষা ভারত নিচ্ছে – এমন চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ভারতের পড়শি প্রায় সব রাষ্ট্রের সাথে একটা কলোনি সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করার যুগ যে এটা আর নয়, তা বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে- এই শিক্ষা পেলেও তা গ্রহণ করার অবস্থায় ভারত গিয়েছে তা এখনো জানা যায়নি।

তাই ২০০৬ সালের পর থেকে ক্রমেই রাজনৈতিক পরিক্রমায় নেপালে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয়ে গেলে এবং যদিও তাতে ভারত নির্ধারক ভূমিকায় নেপালকে ইতি-সহায়তা দিয়েছিল তা সত্ত্বেও নেপালের এই বিরাট পরিবর্তনের তাৎপর্য কী তা ভারত কখনো ধরতে পারেনি। কারণ ভারতের রাজনীতিক ও আমলা-গোয়েন্দা এই স্টাবলিশমেন্ট-চক্র আসলে, পড়শি রাষ্ট্র-সম্পর্ক বলতে কলোনি-সম্পর্ক ছাড়া আর কিছু হতে পারে তা এখনো কল্পনা করে না। তাই এক দিকে কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস শেষে নেপালের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে নিজেকে স্থিতিশীল রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হওয়া  – এটা নেপালের জন্য একটা বিরাট বিজয়। আর ভারত ততই অযথা নেপালের জন্য এক নম্বর ভিলেনের ভূমিকায় ক্রমান্বয়ে হাজির হওয়া – এটা ভারতের বিরাট পরাজয়। একালে অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব রাখার একমাত্র উপায়, ওর ওপর কলোনি সম্পর্ক চাপিয়ে দেয়া নয়, বরং এটা কাউন্টার প্রডাক্টিভ; মানে উল্টো ফল দেয়া কাজ। এটা ভারতের স্টাবলিশমেন্ট-চক্রের এন্টেনায় ধরা পড়া, হুশ  ও নতুন মুল্যায়নে আসার আগে পর্যন্ত, সে নিজেও শান্তি পাবে না, পড়শিদেরও শান্তি দিবে না।

ভিন রাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে কলোনি নয় বরং মর্যাদার সম্পর্ক হিসাবে দেখা আর একে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দেখে আগানো – এমন অবজেক্টিভ অ্যাপ্রোচ, এটাই অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব রাখার সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে এই বোধের  -পানি ভারতের কানে ঢোকা – দুরঅস্ত। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের ‘কলোনি অ্যাপ্রোচ’ যে তার আদি সমস্যা এটা ভারত এখনো উপলব্ধি করে না। আর এখন তো ভারতের এমন বেকুবিপনার নীতির পক্ষে আরো বড় সাফাই এসে গেছে। তা হচ্ছে রাইজিং অর্থনৈতিক প্রভাবের চীন। যেমন নেপালের ক্ষেত্রেও ভারত হয়তো সাফাই দিতে চাইবে, নেপালে ভারতের এমন দুর্দশা হয়েছে চীনের প্রভাব মোকাবেলার করতে গিয়ে – এসব বাজে কথার সাফাই গাইবে। যদিও ভারতও জানে, এটা ১০০ ভাগ মিথ্যা। নেপালের বেলায় চীনের প্রভাব বা চীনকে ভারতের বিকল্প হিসেবে নেপালের নেয়া এটা একেবারেই নতুন ‘ফেনোমেনা’, মাত্র ২০১৫ সাল বা এর পর থেকে। অথচ নেপাল যেন একটা নতুন কনস্টিটিউশনের ভেতর দিয়ে নতুন করে রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করে থিতু হতে না পারে, বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে এর সপক্ষে নেতিবাচক তৎপরতায় প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল ভারত। দু-দু’বার কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সভার নির্বাচন করতে হয়েছে নেপালকে, তবু ভারতের নেতিবাচক ভূমিকা শেষ হয়নি। অবশেষে দ্বিতীয়বারের (২০১৩) কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সভার নির্বাচনের পর নেপালের তিন প্রধান রাজনৈতিক দল এক হয়ে ভারতের বাধা মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে গেলে, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে রিপাবলিক নেপাল হিসেবে নতুন কনস্টিটিউশনের ঘোষণা দিতে নেপাল সক্ষম হয়। লজ্জার মাথা খেয়ে কূটনীতিতে পরাজিত ভারত ঐ ঘোষণারও বিরোধিতা করেছিল। এরপর ভারতের শেষ অবলম্বন হয়েছিল, নেপাল-ভারত সীমান্তের নেপাল অংশের সমতলভূমির বাসিন্দা মাধেসি জনগোষ্ঠীর ত্রাতা সাজার।

ভারতের মূল উদ্দেশ্য ছিল নেপালের সমতলি-পাহাড়ি স্বার্থবিরোধ যেন কোনো মীমাংসায় না পৌঁছায় – এভাবে কাজ করে গেছিল ভারত। নেপালকে কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্র বলে ২০১৫ সালে ঘোষণা দেয়া হলেও এর অভ্যন্তরে প্রদেশগুলো কিভাবে বিভক্ত করার কাজ অসমাপ্ত ছিল মানে, অভ্যন্তরীণ সীমানা টানার কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোও এতদিন আয়োজন করাও যায়নি। বিগত দুই বছরে প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারত বাধা দিয়ে একাজগুলো যেন শেষ না নয়, পাহাড়ি-সমতলি জনগোষ্ঠীগুলো যেন তাদের স্বার্থের ঝগড়ার ব্যাপারে আলোচনা করে কোন একটা মীমাংসায় না পৌঁছাতে পারে, এ ক্ষেত্রে নেপালকে ঠেকিয়ে রাখার সব চেষ্টা করা ছিল ভারতের কূটনৈতিক লক্ষ্য।

এই পটভূমিতে চলতি সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের তাৎপর্য হল, ভারতের সব প্রচেষ্টাকে নেপালের জনগণ পরাজিত করে বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা নিজেদের সব বিতর্ক-বিবাদ নিরসন করে নেপাল নিজেকে সাত প্রদেশে ভাগ করে  ও প্রদেশ গঠন সম্পন্ন করেছে। এটা একটা বিরাট অর্জন। বিগত ২০ বছর নেপালে কোথাও (আমাদের ইউপি ও উপজেলার মত) স্থানীয় নির্বাচন হয়নি। অনেকটা, সীমানা টানা বা চিহ্নিত করা হয়নি বলে আমাদের উপজেলার নির্বাচন না করতে পারলে যেমন হত তাই। এই বছরে এসে কনস্টিটিউশনের অসমাপ্ত এসব কাজ সমাপ্ত হয়েছে। আর সব কিছুই হয়েছে ইতিবাচকভাবে। তাই বলা হচ্ছে, ২০১৭ সাল ছিল নেপালের জন্য ‘নির্বাচনের বছর’; ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় এই তিন নির্বাচনই এবছর সম্পন্ন হয়েছে। অথচ এক বছর আগেও এটা আদৌ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে প্রায় সবার মনে সংশয় ছিল। কোনো আশার আলো কোথাও ছিল না। আমাদের অনুমান, নেপালের জনগণ এ জন্য সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট দেবে সম্ভবত নেপালি মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্ডকে। না, এটা তার রাজনৈতিক আদর্শ ভাল কি মন্দ তা বিচার করে বলা কোন কথা নয়। নেপালের সর্বশেষ সংসদে ৬০০ আসনের মধ্যে মাওবাদীদের ছিল মাত্র ৮০ আসন। আর ওদিকে নেপালি কংগ্রেসের ছিল ১৯৬ আসন আর কমিউনিস্ট নেতা অলির ইউএমএলের ১৭৫ আসন। ফলে নেপালের প্রধান তিন দলের কারোই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। তবে সব মিলিয়ে একসাথে মোট আসনের কমপক্ষে ৭৫ ভাগ আসন তাদের দখলে ছিল। ফলে গত পাঁচ বছরে তিনবার এই তিন দলের তিন ধরনের কম্বিনেশনে সরকার গঠিত হয়েছিল। তবে সেটা সব সময় আগাম আপস আলোচনাতেই সম্পন্ন হয়েছিল বলে কোনো অচলাবস্থার মধ্যে তাদের যেতে হয়নি। এ ক্ষেত্রে দাহালের কৃতিত্ব হল, তিনি ছিলেন সেই আশার আলো; প্রতিটি বিবাদের ইস্যুতে সমঝোতা টানার উদ্যোক্তা।  আর বাকি দুই দল – আমাদের সিপিবি দলের মতো নির্বাচনী কমিউনিস্ট দল ইউএমএল আর নেপালি কংগ্রেস এদের ভূমিকা ছিল যে এরা নিজেদের রাজনৈতিক বিবাদের সমাধানে নিজেরা উদ্যোক্তা হতে না পারলেও দাহালের প্রদত্ত সমাধান প্রস্তাবগুলোতে সমর্থন এবং ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে তা সফল করা। বিশেষ করে ভারতের কোনো প্ররোচনার ফাঁদে বা লোভে না পড়া। অবশ্য পুরো নেপালের জনগোষ্ঠী বিশেষ করে গরিব মানুষের কাছে ভারতের কোনো ইতিবাচক ইমেজ আর নেই। কারণ, ২০১৫ সালে ভারতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ার ‘শাস্তি’ হিসেবে ভারত একনাগাড়ে পাঁচ মাস ল্যান্ডলকড নেপালে ভারত থেকে যেকোনো পণ্য আমদানি ভারত বন্ধ করে রেখেছিল। বিশেষ করে সব ধরনের জ্বালানি আমদানি, যার ফলে কষ্ট সবচেয়ে বেশি পোহাতে হয়েছিল  নেপালের গরিব জনগণকে।

সমঝোতার সরকার হিসেবে বর্তমানে নেপালে শেষ বা তৃতীয় কোয়ালিশন চলছে  এটা নেপালি কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার, যার পার্টনার দাহালের মাওবাদী দল। এটাই শেষ ১১ মাসের সরকার, যার আগের ১১ মাসে দাহালের প্রধানমন্ত্রিত্বে সরকার ছিল। নেপালে সাত না আটটি প্রদেশ থাকবে, কোন কোন জেলা কোন প্রদেশে থাকবে- এ বিষয়টিকে মোটা দাগে বললে প্রদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণ ছিল স্বার্থবিরোধ বিবাদের সবচেয়ে জটিল ইস্যু। আর ভারত এই বিবাদে মাধেসিদের কান ভারী করে বিবাদ আরো বড় করে তা লাগিয়ে রেখেছিল যেন সমাধান না মেলে – এটাকেই ভারত নিজের কূটনৈতিক স্বার্থ বলে নির্ধারণ করে পথ রেখেছিল। গত ২২ মাসে নেপালের বিরাট অর্জন হল – প্রদেশ ইস্যুতে অমীমাংসিত বিরোধ মিটিয়ে এগুলোর সীমানা নির্ধারণ শেষ করা। এর পরপরই শুধু প্রাদেশিক নয়, স্থানীয় সরকারগুলোর নির্বাচন আয়োজনের সব বাধা খুলে যায়। ফলে ২০ বছর পরে এই প্রথম ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এরপর দুই পর্বে প্রাদেশিক (সরকার) ও ফেডারেল (কেন্দ্রীয় সরকার)- এ দুই ক্ষেত্রে নির্বাচন এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনে যা হবে তা হল, নেপাল মোট ৭৭টি জেলা আর সাতটি প্রদেশে আপোষে বিভক্ত হয়ে থাকবে।

চলতি সাধারণ নির্বাচনে নেপালে সারা দেশ থেকে মোট ২৭৫ জন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ (আমাদের ভাষায় কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য) নির্বাচিত হয়ে আসবেন। তারা একটি ফেডারেল সংসদ গঠন করবেন। এই সংসদের সংখ্যাগরিস্ট দলের সদস্যরা একটি কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকার গঠন করে নেবেন। এ ছাড়াও সাতটি প্রদেশে আলাদা আলাদা প্রাদেশিক সংসদ গঠনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেকাজে সাত প্রদেশে মোট প্রাদেশিক সদস্য নির্বাচিত হবেন ৫৫০ জন। নেপালের সাফল্য হল নেপাল রাষ্ট্রের ক্ষমতার তিন স্তর ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় এর অমীমাংসিত অংশগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা। আর সেই সাথে এ বছরই তিন স্তরের নির্বাচন সফলভাবে শেষ করা। ফলে এখন নেপাল দাবি করতে পারবে, সাংবিধানিক রাষ্ট্রগঠন পর্ব সফলভাবে শেষ করে সে এখন একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র। স্বভাবতই এটা নেপালের জনগণের জন্য যতটা সফলতা ও অর্জনের বিষয়, ঠিক ততটাই ভারতের সরকারের জন্য একধরনের পরাজয়ের বিষয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক অবস্থান নেয়ায় ভারতের নেপালনীতি আজ পরাজিত। নেপালের নির্বাচন কাভার করা ভারতের মিডিয়াগুলোর সম্পাদকীয় দেখলে বোঝা যায় যে, অন্তত তারা পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। আর নেপালের জনগণের কাছেও ভারত যে একটা প্রবল নেতি-শক্তি এবং নেপালের গরিব মানুষের জীবনকেও দুর্বিষহ, আরো কঠিন ও কষ্টকর করে দিতে পিছপা হয় না, তা প্রমাণিত করে গেছে। ১০ বছরেরও বেশি সময়জুড়ে নেপালের কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেসে ভারত এক বিরাট নেতিবাচক শক্তি হিসেবে হাজির হয়েছে, যা থেকে ভারতের জন্য পরাজয় আর নেপালি জনগণের ধিককার কুড়ানো ছাড়া কোনো অর্জন নেই। এর ফাঁকে ভারতের নেতি-রাজনীতির বিকল্প হিসেবে সুযোগ পাওয়ায় নেপালি জনগণের কাছে অনেকটা অপরিচিত চীন, আজ নেপালি জনজীবনের কষ্ট লাঘবে বহুল আকাঙ্খিত অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগকারী ‘ত্রাতা’ হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকেরা নির্বাচনের ফলাফলে কমিউনিস্টদেরকে আগিয়ে রাখছেন। এই নির্বাচন হচ্ছে মূলত দুই পক্ষের মধ্যে। এক পক্ষে মাওবাদী, অন্য পক্ষে কমিউনিস্ট ইউএমএল আর বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি। ভট্টরায়, তিনি রাজতন্ত্র উৎখাতের সময় মাওবাদী দলের সাথে দ্বিতীয় প্রধান হিসাবে ছিলেন। এ তিন কমিউনিস্ট দলের জোট বনাম নেপালি কংগ্রেস এবং এর সাথে ছোটখাটো দলের গণতন্ত্রী জোট। এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলকে যদি জনগণের মন-মেজাজের ইঙ্গিত বলে আমরা মানতে চাই তবে কমিউনিস্ট জোট বিপুল ভোটে জিতবে, বলা হচ্ছে। [Based on the results of Nepal’s recently concluded local level polls, there is a better chance that the left alliance of CPN-UML and CPN (Maoist Center) will gain a majority and form the government] এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে অবশ্য প্রকৃত ফলাফল জানা যাবে না। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সে পর্যন্ত।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে নির্বাচন আয়োজনে সফলতা’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

বাংলাদেশে “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতি” মাপার ডাক্তার পাওয়া গেছে

বাংলাদেশে “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতি” মাপার ডাক্তার পাওয়া গেছে

গৌতম দাস

২২ মে ২০১৭, ০০ঃ ০৪

http://wp.me/p1sCvy-2fz

প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান,  বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত” ব্যক্তি কিনা সেই সন্দেহ রেখেছেন। ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত’! কী দুর্দান্ত ভাষা! আর সেই বিশেষ ‘অনুভুতি’ মাপার ডাক্তার হয়েছেন মিজান। বাহ! বাহ! এটা কি রাজনীতি পর্যালোচনার ভাষা  নাকি যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা জাতীয় মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ? অথবা ‘ব্যাটলিং বেগামস’ এবং ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার ভিত্তিতে প্রথম-আলো-ডেইলি স্টার গ্রুপের এক এগারোর রাজনীতির নতুন ড্রিল? গত ১১ মে ২০১৭ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো মিজানুর রহমান খানের ‘জিয়া-যাদু গোপন চুক্তিটি কি প্রকাশ করবেন খালেদা জিয়া?’ লেখাটি প্রকাশ করে। শিরোনামের স্টাইল খেয়াল করলেই সন্দেহ জাগে এর মতলব ভালো না। যাদু মিয়ার সঙ্গে জিয়াউর রহমান নাকি একটি গোপন চুক্তি করেছিলেন । আর এখন ১০ মেবুধবার খালেদা জিয়া তাঁর ভিশান ২০৩০ পেশ করবার পরপরই দৈনিক প্রথম আলোর একটাই বিশাল রহস্যমিশ্রিত আবদার, সেই ‘গোপন’ চুক্তি খালেদা জিয়া প্রকাশ করুক!

বিএনপি এবং ও তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির যেকোন সমালোচনা পর্যালোচনা হতেই পারে। কিন্তু বলুন তো খালেদা জিয়ার মধ্যে  গণতন্ত্র মনস্ক অনুভূতিসম্পন্ন “উপলব্ধি” আছে কিনা সেটা বিচার করবার ডাক্তার কোথায় পাবেন? দ্বিতীয়ত একটি দেশ বা সমাজের রাজনীতি স্রেফ একজন ব্যক্তির উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না। যে সকল রাজনৈতিক বর্গ কেন্দ্র করে সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠি নিজ নিজ ক্ষমতা  এবং নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক সম্মতি তৈয়ার করে তার সঙ্গে সেই বর্গটি সম্পর্কে সমাজের বিভিন্ন বয়ানের ভূমিকা থাকে। থাকবেই। সেই ক্ষেত্রে ‘গণতন্ত্র’ সম্পর্কে  যে সকল বয়ান সমাজে হাজির এবং সেই সকল বয়ান কেন্দ্র করে তর্কবিতর্ক সমালোচনা পর্যালোচনা ছাড়া জাতীয় রাজনীতির কোন গুণগত পরিবর্তন ঘটে না। তার মধ্য দিয়েই জনগণের রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনার বিকাশ ঘটে। এই গোড়ার কথা যখন আমরা মনে রাখি না, তখন হলুদ সংবাদ মাধ্যমগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার সমাধান হিসাবে ‘মাই নাস টু’ ফর্মুলা তৈয়ার এবং তা কার্যকর করবার কাজে অনায়াসেই লেগে পড়তে পারে। গত এক-এগারোর সময় এটাই আমরা দেখেছি। “মাইনাস টু” রাজনীতির মূল তত্ত্ব ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য দুইজন “ব্যাটলিং বেগাম” – অর্থাৎ খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দায়ী। অতএব করণীয় হচ্ছে এদের দুইজনকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া। চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ পাঠক আপনার নিজের মতো করে বুঝে নিন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য যখন আমাদের বিচারের মানদণ্ড খালেদা কিম্বা শেখ হাসিনার ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত উপলব্ধি’ থাকা না থাকার বিচার হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমরা মূলত মাইনাস টুর তত্ত্বই আর এক ভাবে আওড়াই। কিন্তু এবার সুনির্দিষ্ট ভাবে খালেদা জিয়া সম্পর্কে এই বোম্বাস্টিক বিশেষণ প্রয়োগের চেষ্টা দেখে আন্দাজ করা যায়  এবার মাইনাস-টু না সম্ভবত মাইনাস ওয়ান এটা।

যাক্‌,  তবুও বাংলাদেশে তাহলে ‘গণতন্ত্রমনস্ক’ এবং গণতন্ত্রের ‘অনুভূতি প্রসূত উপলব্ধি্র’ ধারক মহানুভব   একজন ব্যক্তি পাওয়া গিয়েছে।  বিএনপি একটা ভাল দল কীনা, ওর রাজনীতি ভাল কীনা এমন কিছু প্রমাণ মিজানুর রহমান খান করবেন আমরা তা আশা করি না। যদিও পর্যালোচনায় ভালমন্দ উভয় দিকটাই তুলে ধারা্র কথা। মুল্যায়নে বসলে বিএনপির একগাদা ত্রুটি, সীমাবদ্ধতা অনেকেই খুজে পেতেই পারেন। তবে মিজানুর রহমান খান  ব্যক্তিগতভাবে একজন বাকশাল-প্রেমি ও ‘বাঙালী জাতীবাদ”-প্রেমিও তিনি বটে। যদিও তাতেও আমাদের সমস্যা নাই।   কিন্তু সমস্যা হয় তখন যখন চরম প্রিজুডিস বা নিজের বাকশালপ্রীতি ও সাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিবাদকে পাশে সরিয়ে না রেখে উলটা তা দিয়েই  রাজনীতির মুল্যায়ন করতে বসেন। সেটা দৈনিক প্রথম আলোর মতো তথিকথিত সাংবাদিকতার আড়ালে মূলত ‘বাকশালী’ অপপ্রচারের অধিক কিছু হয়ে ওঠে না।

কোন রাজনীতি বা রাষ্ট্রের ভালমন্দ বিচার করবেন কী দিয়ে? সে বিচার কাজে ক্রুশিয়াল বৈশিষ্টগুলো কী কী ?  সেগুলো জেনে রাখার বদলে নিজের বাকশালপ্রীতির উপর ভরসা করে বিচারে বসলে তাতে সেটা ঘোরতর অন্ধ দলবাজীই হবে। প্রথম আলোতে প্রকাশ্যে ঘোষিত মিজানসহ তিনজন বাকশাল সমর্থককে এডিটর আমরা দেখে থাকি।  বিশেষ করে মিজানের লেখায়, যেমন আলোচ্য এই কলামের শিরোনাম পড়ে যেকারও মনে হবে পাপীতাপী বিএনপির বিরাট এক গোপন দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসে মিজান কথা বলছেন। তাই কী? আসেন তাহলে দেখা যাক!

বাংলাদেশের ‘প্রগতিশীলরা’ কেউ কোনদিন শেখ মুজিবের বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীর কোন রিভিউ, সমালোচনা করেছেন জানা যায় না। তবু অনেকের মনে পড়বে হয়ত, একদলীয় শাসন অথবা মাত্র চারটি সংবাদপত্র ইত্যাদির কথা। কিন্তু এগুলো সেই সংশোধনী কার্যকর করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের যে  বৈশিষ্ট্যগত  ত্রুটি ঘটেছে তার আসল বিচার নয়। অর্থাৎ কনষ্টিটিউশানাল বা রাষ্ট্রের গঠনতান্ত্রিক সমালোচনা নয়। অথচ মিজানুর রহমান খান অনবরত নিজেকে মহা সংবিধান বিশারদ জ্ঞান করে আমাদের আলোকিত করে থাকেন!

গঠন প্রক্রিয়া কিম্বা বৈশিষ্ট্য কোন দিক থেকেই বাহাত্তরের সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে গড়া বাংলাদেশ রাষ্ট্র আদর্শ মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। সেটা ইতিহাসের ফলাফল, আমরা তা মেনে নিয়ে যতটুকু পেয়েছিলাম তাই নিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারতাম। সেই ক্ষেত্রে তার যতটুকু ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য আছে তা অক্ষুণ্ণ রাখাই ছিল প্রধান কাজ। কিন্তু বাকশাল সংশোধনীর ফলে এরপরের বাংলাদেশ আর কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় বরং এক  দানব বা স্বৈরশাসন আনয়নকারি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনস্টিটিউশন বদলানোর ফলে সেই দানবীয় চরিত্র  কিভাবে ঘটেছে তা নিয়ে খুব কমই পর্যালোচনা দেখা যায়।  তবু বাকশালী মিজানুর রহমান খানের একটা সহজ ফর্মুলা হল অপ্রাসঙ্গিকভাবে জিয়াউর রহমানকে গালি গালাজ করা। বাকশাল সম্পর্কে টুঁ শব্দ না করে সারাক্ষণ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গালমন্দ পাড়া। সব সমস্যার কারণ হিসাবে সামরিক শাসনকে দেখানো। সামরিক  শাসন সামরিকতন্ত্র খারাপ, অবশ্যই। কিন্তু বাকশালকে মহৎ প্রমাণ  করবার সুবিধা না পেয়ে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান কতো খারাপ ছিলেন সেটা প্রমাণ করে বাকশালের মহিমা গোপনে জারি রাখাই বাংলাদেশের নব্য বাকশালিদের কাজ। মিজানুর রহমানকে তাদের সর্দার বলা যায়। সেটা বাকশালিদের পক্ষে সহজ হয়েছে কারণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি বুদ্ধিজ্ঞানহীন বোকাদের দল, যারা নব্য বাকশালিদের রাজনীতি মোকাবিলা করবার ন্যূনতম হিম্মত রাখে না।

মিজান তাঁর লিখায় নিজেকে বারবার   রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক ক্ষমতা পুঞ্জীভুত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার ব্যক্তিত্ব হিসাবে তুলে ধরেন।  কিন্তু আজীব ব্যাপার হল, আমাদের সংবিধানে সর্বপ্রথম যে সংশোধনীতে রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে প্রায় সব ধরণের ক্ষমতা সঞ্চিত করা হয়েছিল সেটা বাকশাল চতুর্থ সংশোধনী। তা সত্ত্বেও এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে মিজানুরের কলম জাগে না। বরং তিনি কথিত ‘গোপন চুক্তি’ বলে এক রহস্য তৈরি করতে গিয়েছেন, ১১ মে এর ঐ কলামে। কথিত সেই গোপন চুক্তি নাকি অপ্রকাশিত, মিজান জানাচ্ছেন। কিন্তু অপ্রকাশিত হলেও মিজানুর আবার এর পুরাটা জানেন ও এবং সেটা তার আবার মুখস্থ। তাঁর কথিত মতে, শেখ মুজিবের বাকশালী সংশোধনীতে প্রেসিডেন্টের হাতে সীমাহীন যে একক ক্ষমতা দিয়ে রেখেছিলেন, জিয়া নাকি এরচেয়েও আরও ক্ষমতা চেয়েছিলেন। যদিও মিজান নিজেই জানাচ্ছেন জিয়া শেষে এমন ক্ষমতা নেনই নাই। সেই না নেওয়ার দলিলই হল মিজান কথিত যাদু মিয়ার সাথে ‘গোপন চুক্তি’। তাহলে  সেক্ষেত্রে কথিত সেই দলিল বলে যদি কিছু আদৌ থেকেও থাকে তবে তা  বিএনপি বা জিয়ার কোন কলঙ্কের দলিল হয় কেমন করে? কিন্তু তবু মিজানুর রহমান খানের দাবি কথিত ঐ গোপন দলিল ‘কলঙ্কিত’ এবং তা “খালেদা জিয়াকেই প্রকাশ করতে হবে”।

মিজানুরের চরম বিনোদনমূলক তামাসাটা হল, তিনিই বলছেন ঐ গোপন দলিল আসলে জিয়াউর রহমানের বাড়তি ক্ষমতা না নেওয়ার দলিল বা রাজনীতিবিদ যাদু মিয়ার সাথে  “সন্ধি-পত্র”  – অথচ এই কথিত চুক্তি নিয়ে রহস্য সৃষ্টি  আর জিয়া এবং  বিএনপিকে ‘পাপীতাপী’ ‘অভিশপ্ত’ বলে ইঙ্গিত তৈরি করছেন তিনি। এই সুযোগ মিজানুর কোথায় পাচ্ছেন? বরং মিজানুর যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক সীমাহীন ক্ষমতা সঞ্চিত করার বিরুদ্ধের সোচ্চার প্রবক্তা হতে চান তবে সেক্ষেত্রে শেখ মুজিবের এবং বাকশাল সংশোধনীর কঠোর সমালোচনা দিয়েই তাকে শুরু করতেই হবে। এক্ষেত্রে যদি তার প্রগতিশীলতা-বোধ, বাঙালী জাতিয়তাবোধ কিংবা বাকশালপ্রীতি বাধা হয়ে দাড়ায় তবে তা তাকেই পেরিয়ে আসতে হবে। এপর্যন্ত যা তিনি কখনও পেরেছেন আমরা দেখিনি।

এই প্রসঙ্গে বলে নেয়া যায় যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস বিচারে – বিশেষত কনষ্টিটিউশনের চতুর্থ সংশোধনী কী কী কারণে কালোদাগের এবং ক্ষতিকর এমন কোন একাদেমিক মুল্যায়ন আমরা ‘প্রগতিশীলদের’ ঘর থেকে বের হয়েছে দেখি নাই। রাজনৈতিক দলগুলোর পরিসরেও এবিষয়ে আর যা দেখা যায় সেগুলোকে বড়জোর পার্টিজান বা দলকানাদের সমালোচনা। এই অবস্থায় বাকশালের আসল মুল্যায়ন হল – এককথায় বললে – এই সংশোধনী্র মধ্য দিয়ে আসলে বাংলাদেশ  রাষ্ট্রের খোদ কনষ্টিটিউশনকেই নাই করে দেয়া হয়েছে।  সোজা কথায় ভাঙাচোরা হোক বাহাত্তরের সংবিধানের মধ্য দিয়ে একটা রাষ্ট্র বানানো গঠন হয়েছিল, আর সেটাকেই বাকশালী চতুর্থ সংশোধনী পুরাটাই ভেঙ্গে দিয়েছিল। চতুর্থ সংশোধনী এই অর্থে রাষ্ট্র নিরাকরণের একটি ঐতিহাসিক দলিল, যে অভিজ্ঞতা থেকে বারবার আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্র নাই অবস্থার মধ্যে ফেলে দেওয়ার দলিল এটা।

কেন? এর মূল কারণ এই সংশোধনীতে রাষ্ট্রের  নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিকের আদালতে  রিট করার ক্ষমতা [আর্টিকেল ৪৪] কেড়ে নেয়া হয়েছিল। শুধু তাই না, জুডিশিয়ারির বা আদালতের রিট শোনার যে আলাদা নিজস্ব ক্ষমতা দেয়া ছিল [আর্টিকেল ১০২ (১)] সেটাও চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। [চতুর্থ সংশোধনীর পিডিএফ কপিতে এখানে দেখুন, সংশোধনীর ইংরাজী অংশে প্রথম পাতায় ৩ নম্বর সংশোধনী আর ১৭ নম্বর সংশোধনী দেখুন হলুদ মার্কার দেয়া আছে।।] আর প্রেসিডেণ্ট জিয়ার সামরিক অধ্যেদেশ বলেই, আবার বলছি ১৯৭৬ সালের সামরিক অধ্যাদেশ বলেই  ঐ বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল হওয়া [আর্টিকেল ৪৪] এবং [আর্টিকেল ১০২ (১)]  ফেরত নিয়ে আসেন। একথার সবচেয়ে ভাল প্রমাণ এবং কথাগুলো সবচেয়ে সহজে স্পষ্ট বুঝা যায় কনষ্টুটিটিশনের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের আপিল কোর্টের রায়ে। ঐ রায় ১৮৪ পৃষ্টার। ঐ রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল বলে জানানো হলেও একই সাথে পঞ্চম সংশোধনীর যেসব অংশ বাতিল হবে না, বরং ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জীবিত থাকবে সেসবের একটা তালিকা দেয়া আছে ওর ১৮৩ পৃষ্ঠায়। সেখানে লেখা আছে জিয়ার আনা সংশোধনীর কথা। [দেখুন পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়, আপিল কোর্ট জাজমেন্ট ২০১০,  ১৮৩ পৃষ্ঠায় 3e এর (iii, iv & v)]    শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনীর ফলে এভাবেই প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতার দানব বানিয়েছিল, এর বিরুদ্ধে আদালতে কোন প্রতিকার চাইবার সুযোগ ছিল না। ফলে বাংলাদেশ  আর কোন প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে নাই। যে রাষ্ট্রে রিট করার সুযোগ নাই, সেটা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে না। এই দিকটা নিয়ে কোন জজ-উকিল বা কোন রাজনীতিবিদকে আমরা পয়েন্ট তুলতে শুনি নাই। এটাও এখন প্রমাণিত যে রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনষ্টিটিউশনের ভাল-মন্দ বিচার কী করে করব, কী করে এটা কাজ করে তা বুঝার ক্ষেত্রেও আমরা এখনও যথেষ্ট লায়েক হই নাই। এখনও কেবল দলবাজি আর প্রগতিশীলতার ভাণ ও ভণ্ডামির মধ্যে আটকে আছি। অথচ আমরা আবার আওয়ামি লীগ বা বিএনপির এবং রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট বুঝার বিচারক হতে চাচ্ছি।

‘৭৫ পরবর্তি সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতা
মিজানুর রহমান খানের আর এক প্রবল পছন্দের বয়ান হল ‘৭৫ পরবর্তি সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার’ তুলনা। এটাতে  তাঁর চিন্তা করার কাঠামোটাও ধরা পরে। অবশ্য এটা তাঁর একার না, বাকশালের পক্ষে সাফাই যারাই দেন তাদের সাধারণ বয়ান এটা। মিজান সে বয়ান পরিপাটি করেন মাত্র। এই বয়ান দিয়ে তিনি বলতে চান বাকশাল দানব ক্ষমতার রাষ্ট্র তৈরি করলেও যেহেতু এটা বেসামরিক শাসন, আর বেসামরিক শাসন মানেই বৈধ শাসন, তাই দানব বাকশাল হলেও এটা বৈধ, ফলে গ্রহণীয়। আর তাই বিপরীত যুক্তিতে সামরিক শাসন অবৈধ। দারুন বাকশালী যুক্তি। বিএপির বিরুদ্ধে এটাই  প্রধান বাকশালী অস্ত্র, কিন্তু বিএনপির সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা এই বাকশালী কৌশলের মর্ম ধরতে পারে না বলে এর কোন উত্তর দেবার হিম্মত দেখাতে পারে না।

আসলে এভাবে বৈধ-অবৈধ এর ভাগাভাগির লাইন টানা – এটা নগ্ন  শঠতা। মিজান বলতে চান বাকশাল সংশোধনীর ভিতরে যত খারাপ কিছুই থাক তবু এটা বৈধ কারণ তা সিভিলিয়ান ক্ষমতা। এটাই শঠতা। উপরে দেখিয়েছি, কনষ্টিটিউশনে চতুর্থ সংশোধনী এনে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে চাইলে কোন নাগরিকের আইনিভাবে আদালতে নালিশ জানাতে যাবার সুযোগ কেড়ে নেয়া হয়েছে। ফলে এরপরের বাংলাদেশ, এটা দেখতে তখনও একই দেশ বা আধুনিক রাষ্ট্র মনে হলেও কার্যত এটা আর তখন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। এটা আসলে নির্বাহী প্রেসিডেন্ট – নামে “এক সম্রাটের  প্রি-রিপাবলিক বাংলাদেশ” হয়ে গেছিল। আমি নিশ্চিত মিজানসহ কোন ‘প্রগতিশীল’, ‘বাঙালী জাতিবাদীর” চিন্তায় এটা ধরা পড়বে না। এভাবে তারা চিন্তা করে দেখতে অভ্যস্ত নয়। এমনকি বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও নয়। বেসামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক শাসন মানেই মন্দ গল্প তারা বাকশালিদের কাছ থেকে ভালোই হজম করে। হয়তো নীরবে মেনেও নেয়।  চতুর্থ সংশোধনী যেখানে রাষ্ট্রের রিপাবলিক বৈশিষ্টই নষ্ট করে দেয় এরপর সেই বাকশালী রাষ্ট্রটা বৈধ নাকি অবৈধ –  সামরিক নাকি বেসামরিক – সেটা  কী আর কোন তর্ক? কিন্তু মিজান মার্কা এই বাকশালী মিথ্যা আর চাতুর্য প্রপাগান্ডার তোড়ে বিএনপিই  ঘায়েল হয়ে গিয়েছে। কারণ রিপাবলিক রাষ্ট্রের ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য সুরক্ষা বিএনপির রাজনীতি নয়। এর ফলে তারা জিয়াউর রহমানকেও স্রেফ একজন সামরিক শাসকের বেশী বুঝতে অক্ষম। অথচ বাকশালী রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব আসলে আমাদেরই এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতায়, “পোস্ট-বাকশাল পরিস্থিতিতে আবার ট্রাকে উঠার উদ্যোগ” এটা বোঝার ক্ষমতা বিএনপির বুদ্ধিজীবীদের নাই।

এমনিতেই বৈধ-অবৈধের তর্ক আর এই ক্রাইটেরিয়া দিয়ে রাষ্ট্রের ভাল-মন্দ বিষয়কে বুঝার চেষ্টা একটা খুবই নাবালকের কাজ। মনে রাখতে হবে একটা কালাকানুন বা কালো আইন – চরম দমনমূলক ও নিপীড়ন আইন হলেও সেটা বিদ্যমান সংবিধানের কারণে  ‘বৈধ’ আইন হতে পারে; কোন অসুবিধা ছাড়াই।  তাই, এই বৈধ-অবৈধ জাতীয় শঠ প্রশ্ন তুলে বাকশালের কুকীর্তি আড়াল করে বলেই মিজানুর রহমান খানকে বাকশালের দলবাজ সমর্থক বলছি।

আবার বিপরীতে সেসময়ের জিয়ার সামরিক ক্ষমতা সেটাও সামরিক নাকি বেসামরিক সেবিচারে যাওয়াও একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কারণ সেটা যাই হোক না কেন সেসময়ের ঐ ক্ষমতাটা ছিল এক অন্তর্বর্তী ধরণের ক্ষমতা মাত্র। এটাই ঐ ক্ষমতার মূল বৈশিষ্ট। আর ওর ভাল মন্দ নির্ধারিত হবে নতুন যে ক্ষমতা কাঠামো সে তৈরি করবে বা হবে ওর গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে। তাতে যারা নির্বাচিত হয়ে নতুন ক্ষমতায় আসবেন সেসব অনেক কিছুর গ্রহনযোগ্যতার উপরে। আর প্রি-কনষ্টিটিউশনাল সরকার মাত্রই অন্তর্বর্তী সরকার। বাকশাল করে রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা এবং  শেখ মুজিব খুন হবার পর যা আমরা পেয়েছি তাতে সেটা আবার একটা প্রজাতান্ত্রিক কনষ্টিটিউশনের ফিরে যাবার আগের অন্তবর্তী অবস্থা।

তবু মিজানুরের মনে হতে পারে যে না, “ক্যান্টনমেন্টে বসে” যারা দল বানালো তাদেরকে হাতে নাতে ধরার একটা সুযোগ হাতছাড়া হতে দেয়া যায় না। ওকে নো প্রবলেম, আসুন মিজান তাহলে এবার আপনারই বিচার করি। ১/১১ এর সরকার কী সামরিক সরকার ছিল না? আর এই সামরিক সরকারের সাথে খোদ আপনি মিজান আর আপনার বস  মতি-মাহফুজদের  সম্পর্ক কী ছিল তা  নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নিবেন? আপনি মিজান কী তখন সে কালের “ক্যান্টনমেন্টে বসে” রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কারের নামে মহৎ কাজে  লিপ্ত হন নাই? ঐ কাজ আর ঐ সামরিক সরকার কী “বৈধ” হয়ে গেছিল আপনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে?   আরও ভিতরে যাবেন?  আসেন!
১/১১ এর ক্ষমতায় ইচ্ছামত যা মনে চায় করে যে রাজনৈতিক সংস্কার আপনারা করেছিলেন – কী তার পরিণতি? বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও এর কাঠামো এমন কিছু অথবা কী ছাপ আপনারা রেখে গেছিলেন যার সুফল এই আট বছরের হাসিনা সরকারের থেকে আমরা পাচ্ছি? বলেন, কোনটা  আপনাদের অবদান? কোন সে সুফল? আপনাদের সংস্কারের ফসল কী খোদ হাসিনার শাসনটাই নয়? নিঃসন্দেহে এখন কোন দায়ই নিতে চাইবেন না, আপনি। আমরা জানি। কিন্তু ইতিহাস সবাইকে একদিন না একদিন জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। আপনারাও ব্যতিক্রম নন।

কনষ্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ
মিজান আর এক বিরাট অভিযোগ করেছেন প্রায়ই করেন, “সংবিধানের সবচেয়ে বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ, যা পার্লামেন্টকে একটি রাবার স্ট্যাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী বা সংসদ নেত্রীর বশংবদ করে রেখেছে,সে বিষয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি”।  তিনি এটা প্রায়ই বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আর এর রাজনৈতিক নেতাদের গায়ে কালি লাগায় দিবার জন্য করে থাকেন।  তো মিজানের এই কথা পড়লে সকলেরই মনে হবে হা, তাই তো!  মিজান এই মোক্ষম জায়গায় ধরেছেন। হা, অবশ্যই এক মোক্ষম জায়গা। কিন্তু মিজান কাকে ধরেছেন? খালেদা জিয়া? নাকি এখানে অনুল্লেখ থাকা শেখ হাসিনাকে? মোটেও না। মিজান আসলে ধরেছে নিজেকেই।  বাইরের মানুষ – হাসিনা, খালেদাকে দোষারোপের আগে মিজান আপনি নিজেকে কাঠগড়ায় তুলার হিম্মত দেখান। পারবে্ন?
যতদিন মিজানুরসহ মতি-মাহফুজের মিডিয়া গ্রুপের মত লোকের সক্রিয় সমর্থনে, ১/১১ ঘটবার সম্ভাবনা আর বিশেষ করে বিদেশী স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসব গ্রুপের লোকেদেরকে ব্যবহারে ভাড়া খাটা মিজানুর রহমান খানেরা লুপ্ত না হবেন ততদিন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ থাকতে থাকবে। কারণ এই ৭০ অনুচ্ছেদই বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবজ। মিজানদের মত লোকেদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবজ। আমরা বরং  মিজানের এসব স্বীকার করার সৎসাহস দেখতে চাইতে পারি। হাসিনা খালেদারা খারাপ রাজনীতির ধারক বাহক, এটা কে না জানে, এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু এখান থেকে বের হতে, তা পরিস্কার করতে, পালটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া লাগবে। বিদেশী স্বার্থে সংস্কারের নামে পরাশক্তির  স্বার্থরক্ষা নয়। এই স্বার্থ রক্ষার্থে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে কলঙ্কের দাগ দেখিয়ে নয়।

মিজান আরও অভিযোগ তুলেছেন, বিএনপির গঠনতন্ত্রও দলের প্রেসিডেন্টের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা আছে, আর সেজন্য খালেদা জিয়াকে দায়ী করেছেন। ফলে এরও সংস্কার দাবি করেছেন তিনি। মিজান নিশ্চয় ভুলে যান নাই – মান্নান ভুঁইয়াকে দিয়ে কীভাবে বাধ্য করে সংস্কার ধারার বিএনপি তৈরি করা হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বেচারা দেলোয়ার হোসেনকে  কিভাবে ছেঁচা  দেয়া হয়েছিল, এর কষ্ট মৃত দেলোয়ার হোসেনই জানতেন। তবু তার গৌরব, তিনি পতাকা ছাড়েন নাই। শামসুল হুদার ভুঁইফোড়  নির্বাচন কমিশন কোনটা “আসল বিএনপি” সেই রায় দিয়েছিল। আর পরে তিনি নিজেই তার এই কাজ অন্যায় হয়েছে বলে স্বীকার করে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।  এটা যেন আমরা কেউ না ভুলি। তাহলে দাঁড়াল এই যতদিন বিদেশী স্বার্থে আপনি মিজান ও আপনাদের পত্রিকা  বাইরে থেকে ইচ্ছামত কোনটা বৈধ দল, কোনটা বিএনপি ঠিক করতে থাকবেন, সে সম্ভাবনা থাকবে, ততদিন হাসিনা-খালেদা কনস্টিটিউশানে ৭০ অনুচ্ছেদ রাখবে এবং অবশ্যই রাখবেন। ‘গণতন্ত্র’ শিখাতে আসবেন না। মনে রাখবেন, হাসিনা বা খালেদা সেসব কম বুঝে না। তাঁরা দলের সব ক্ষমতা সভাপতি হিসাবে অবশ্যই নিজের হাতেই রাখবেন। কোনটা আওয়ামী লীগ আর কোনটা বিএনপি এটা যদি বিদেশীরা নির্ধারণ করতে থাকে তবে এমন ব্যবস্থা ও সুযোগ যতদিন থাকবে ততদিন এই শকুনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে  হাসিনা-খালেদার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদের পক্ষে থাকা এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থান। দুনিয়ার হুঁশজ্ঞান ওয়ালা মানুষ মাত্রই এটাই করবে।  তাই বাইরে  অন্যদের দিকে না, সৎসাহসে নিজের দিকে তাকান। নিজেকেই কাঠগড়ায় দেখতে পাবেন।

অতএব, কনষ্টিটুশনে ৭০ অনুচ্ছেদ থাকার জন্য আপনারা মিজানেরাই মূলত দায়ী। নিজেরা যা করেছিলেন এর রিভিউ করেন, আবেদন করি ভাল হয়ে যান আগে। এরপর ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আপত্তি তুলেন।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গতকাল ২১ মে দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। তবে সেটা খুবই সংক্ষিপ্ত ভার্সান; চল্লিশ ভাগ ফেলে ষাট ভাগ ছাপা ভার্সান বলা যায়। এছাড়া  অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও আর এক ভার্সান ছাপা হয়েছে আজ ২২ মে ২০১৭, তাতে অনেকাংশেই পুর্ণ ভার্সান সেটা। কিন্তু তবু ফুল ভার্সান নয়। এখানে আরও বহু সংযোজন ও এডিটের পর সর্বশেষ ভার্সান এটাই।  ]

রাষ্ট্র কী কাউকে জামিনদার রেখে গড়ার কাজ

রাষ্ট্র কী কাউকে জামিনদার রেখে গড়ার কাজ

ভারতকে জামিনদার রেখে নেপালি রাষ্ট্র গড়ার খায়েস
৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬,বুধবার

গৌতম দাস
http://wp.me/p1sCvy-Fa

গত প্রায় চার মাস ধরে ল্যান্ড লকড নেপালে পণ্য প্রবেশ ও যাতায়াত রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এটা মূলত ভারতের আরোপ করে অবরোধ। জ্বালানি তেল, রান্নার গ্যাসসহ ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল সব কিছুর সরবরাহ এতে ব্যাহত হচ্ছে। এক কথায় বললে ভারত থেকে নেপালে যাওয়া সব পণ্যের চালানের উপর অবরোধ চলছে। নেপাল ল্যান্ড লকড ভূখণ্ড বলে সে ভারতের মধ্য দিয়ে পণ্য আনা-নেয়ায় নির্ভরশীল।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ নেপাল তার নতুন রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন ও রচনার সমাপ্তিতে তা কার্যকর-চালুর ঘোষণা দিয়েছিল। প্রত্যেক রাষ্ট্রের জন্য এটা এক গুরুত্বপুর্ণ প্রক্লেমেশন। এই প্রক্লেমশনে ভিন-রাষ্ট্রের খুশি বা দুঃখ পাবার কো বিষয় নয়। কিন্তু সেই থেকে অখুশি অসন্তুষ্ট ভারত পণ্য অবরোধের রাস্তা ধরেছিল। ভারতের ব্যাখ্যা অনুসারে, দেশটি স্বীকার করে না যে- ভূমি আবদ্ধ নেপালে পণ্য সরবরাহের একমাত্র পথ ভারত অবরুদ্ধ করেছে। যদিও এটা প্রমাণিত যে ভারতীয় কাস্টম এবং বর্ডার গার্ড বিএসএফ স্পষ্ট বলছে যে ‘ওপরের নির্দেশে’ তারা এটা বন্ধ রেখেছে। তবু ভারতের ব্যাখ্যা হলো, নেপাল-ভারত সীমান্তের অধিবাসী যারা সমতলীয় ‘ত্বরাই’ অঞ্চলের বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এদেরই বড় অংশ হলো মাধেসি জনগোষ্ঠী। যারা মনে করে নতুন কনস্টিটিউশনে তাদের প্রতিনিধিত্ব সঠিক ভাবে হয় নাই, কম করে রাখা হয়েছে। এজন্য তারা অসন্তুষ্ট হয়ে নেপাল-ভারত সীমান্ত অবরোধ করে রেখেছে। ভারত থেকে পণ্য আসা বন্ধ করেছে। ব্যাখ্যা যার যাই হোক, বাস্তবতা হল এটা কার্যত নেপালের জন্য সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক অবরোধ। আর সেই সূত্রে তা নেপালের রাজনীতিতে রাজনৈতিক স্থবিরতা তৈরি করেছিল। সম্প্রতি এই স্থবিরতা কাটার লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
নেপালের জনগোষ্ঠী গঠনের মধ্যে এমনিতেই সমতল-পাহাড়ি এমন ভূবৈশিষ্ট্যগত বিভেদ আগে থেকে ছিল। কিন্তু একালে নেপাল-ভারত সীমান্তের জনগোষ্ঠী সমতলী অঞ্চলের মাধেসি নেতারা তাদের স্বার্থ নেপালে ভারতের স্বার্থের সাথে মাখিয়ে গাঁটছড়া বেঁধে তুলে ধরাতে নিজ নেপালিদের জনগোষ্ঠীগত স্বাভাবিক বিভেদকে অস্বাভাবিক ও বড় করে ফেলা হয়েছে।

নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৮ সালে ঐতিহাসিক পাশ ফেরার মতো প্রধান ঘটনা হল গত ২৪০ বছরের নেপালের শাসক ‘শাহ’ রাজবংশের শাসনের পরিসমাপ্তি। যেটাকে আমরা রাজনৈতিকভাবে নতুন এক বিপ্লবী গণরাজনৈতিক ক্ষমতার উত্থানের ফলে রাজতন্ত্রের শাসনের অবসান ও রাজতন্ত্র ব্যবস্থার সমূলে উচ্ছেদের ঘটনা হিসেবে দেখতে পারি। ব্যাপারটাকে প্রতীকী দিক থেকে বললে এতে রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে একটা রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে, এর বদলে এক প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনাবলির ভেতর দিয়ে প্রকাশিত আরেক ঐতিহাসিক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সত্য হল, নেপালের রাজতন্ত্র ব্যবস্থা উচ্ছেদের লড়াইয়ে ভারতের ভূমিকা ছিল আমেরিকার সহায়তায় কেবল ইতিবাচক সহযোগী বা সমর্থকের নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারকের। রাজতন্ত্র উচ্ছেদের লড়াই – শুরু করার দিক থেকে এতে একক নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিল নেপালের নতুন মাওবাদী রাজনৈতিক ধারার দল ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী) বা ইউসিপিএন (মাওবাদী)। যারা এ লড়াইকে কেবল নিজ মাওবাদীদের নয়, সারা নেপালি জনগোষ্ঠীর লড়াই এবং এটা নেপালিদের সাধারণ ও প্রধান স্বার্থ হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর নেপালের সব সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে এর পক্ষে সমর্থক হিসেবে সংগঠিত করা- কাজের এই শেষের অংশে আরো দুই প্রচলিত রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ছিল। এরা হলো আমাদের সিপিবির মতো কনস্টিটিউশনাল কমিউনিস্ট দল- কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড এমএল ) এবং নেপালি কংগ্রেস। নেপালের রাজনীতিতে মাওবাদীরাসহ এ তিনটি দলই সেই থেকে ৮০-৮৫ শতাংশ নেপালি জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। বলা যায়, রাজতন্ত্র-উত্তর রাজনৈতিক ক্ষমতা ও শক্তির নিয়ন্ত্রক হল এই তিনটি দল, যাদের মধ্যে তা ভাগাভাগি হয়ে আছে। আর এ তিনটি দলের জোটের পেছনেই ভারত পূর্ণ সমর্থন জুগিয়ে নেপালের রাজতন্ত্রে সমাপ্তিতে ইতিবাচক ও নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিল।
কিন্তু রাজতন্ত্র উৎখাত হলেও নেপালে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করা যায়নি। নেপালের প্রধান রাজনৈতিক সমস্যা এখানেই। প্রধান কারণ, নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে উত্থিত ক্ষমতায় ভারতের কোনো ভাগ বা স্টেক নেই। নেপালি রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারতের স্বার্থের প্রতিনিধি কেউ নয়, নেই। কারণ রাজতন্ত্র উৎখাতে নির্ধারক পর্যায়ের ভূমিকা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে ভারত এটা নিজগুণে বিষাক্ত করে ফেলেছে। ভারতের ট্র্যাজেডি হল সে ঠিক কী চায়, কিভাবে চায় এ ব্যাপারে হোমওয়ার্ক করা সুনির্দিষ্ট ও উপযুক্ত – নেপালের স্বার্থের ভেতর দিয়ে তা ভারতেরও স্বার্থ এভাবে এমন কোনো নীতি-পলিসি পেশ করা ও এর পক্ষে সমর্থন আদায় করতে না পারার কারণে সে নেপালের ক্ষমতার স্টেক থেকে বিচ্ছিন্ন। মনে রাখা যেতে পারে, মাওবাদীদের ১৯৯৬ সালে ৪০ দফার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলনের শুরুর সময় তারা নেপাল-ভারত কলোনিয়াল চুক্তির (১৯৫০ সালের চুক্তি) বিরুদ্ধে আঙুল তুলে এবং ভারতকে নেপালের প্রধান শত্রু বলে চিহ্নিত করে ওই আন্দোলন শুরু করেছিল। ফলে খুব সম্ভবত ঐ চুক্তি ও ভারত সম্পর্কে এই মূল্যায়ন প্রসঙ্গে এ তিন দলের কিছু অভিন্ন মূল্যায়ন, অলিখিত সমঝোতা আছে। তৈরি হয়েছে। ফলে এই তিন দল যাদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও নেপালের বর্তমান নতুন শক্তি ক্ষমতা তাদের হাতে ও নিয়ন্ত্রণে। সব ক্ষমতা এ তিন দলের হাতে ভাগাভাগি হয়ে আছে। আর এরই প্রতীকী প্রকাশ তারা ঘটিয়েছে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দিয়ে ও পরবর্তীকালে সরকার গঠন করে। নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ার পর থেকে মাওবাদী দলের সমর্থনে অপর কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) এখন সরকার গঠন করে ক্ষমতায়, যার প্রধানমন্ত্রী খার্গা প্রসাদ শর্মা অলি। আর এই সরকার গঠনের আগে সংসদের ভোটাভুটিতে নেপালি কংগ্রেস এ’দুই কমিউনিস্ট দলের জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছে হেরে গিয়ে বিরোধী দলে আসন নিয়ে আছে।
আর এটাই ভারতের রাজনীতিবিদ ও আমলাদের ব্যর্থতা-অযোগ্যতাকে রেজিস্টার্ডভাবে প্রমাণিত করেছে যে, এ তিন দলের হাতে ভারতের স্বার্থ উপেক্ষিত। এ তিন দল ভারতকে দায় মনে করে, ব্যাগেজ হিসাবে দেখে। ভারতের ব্যাগেজ বইতে এরা কেউ এখনো রাজি নয়। ফলে নেপালের তৈরি হওয়া নতুন ক্ষমতায় ভারতের কোনো স্টেক নেই। উপায়ান্তর না দেখে ভারতকে এখন ভরসা করতে হচ্ছে নেপালের অ-প্রধান ধারার জনগোষ্ঠী, সমতলীয় ত্বরাই অঞ্চলসহ অন্যান্য অধিবাসী মূলত মাধেসিদের রাজনীতির ওপর।
এককথায় বললে এই রাজনৈতিক উপস্থাপন সেকটারিয়ান, বাংলায় আমরা যেটা সাম্প্রদায়িক বিভক্তির রাজনীতি বলে চিনি। যদিও ভারতে – এরা ভারতের সব মিডিয়া এই রাজনীতিকে হাজির করছে, যেন নেপালি সংখ্যালঘুদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর জন্য ভারত এটা করছে। অথচ সত্যিকার ঘটনা হলো ২০০৬-২০০৯ সাল, যেটা নেপালের রাজনীতির মৌলিক বদলের দিক থেকে টার্নিং পয়েন্ট- এটাই আনুষ্ঠানিকভাবে নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উঠে যাওয়ার তাৎক্ষণিক আগের ও পরের সময় – সে সময়ে নেপালের রাজনীতিতে মাধেসি বলে কোনো ইস্যু কোনো কিছু ছিল না।
নেপালের জনসংখ্যার বিন্যাসের দিক থেকে এটা বলা হয়, পাহাড়ি-সমতলি হিসেবে জনসংখ্যা প্রায় সমান দু’ভাগে বিভক্ত। আবার কেবল মাধেসিদের নিয়ে রাজনীতি করে নেপালে এমন আঞ্চলিক দলের প্রায় শেষ নেই। আর এমন আঞ্চলিক দল খোলার হিড়িক লেগেছিল ২০০৯ সালে, যখন ‘মাধেসি’ ইস্যু হতে শুরু করে। এর আগে মাধেসিরা সবাই প্রধান ধারার ওই তিন দলের কোনো একটা করত, বেছে নিত। আর এর মধ্য দিয়েই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব পেত। অর্থাৎ ওই তিন প্রধান রাজনৈতিক দল দুই কমিউনিস্ট ও নেপালি কংগ্রেস এর আগে মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর পুরোটাকেই প্রতিনিধিত্ব করত। তবে মাধেসিদের নানান আঞ্চলিক দল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও যারা প্রো-ইন্ডিয়ান অবস্থান নিয়েছে এরা ছাড়াও  মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর একটা বড় অংশকে এখনো ঐ তিন দলই প্রতিনিধিত্ব করে।
যেমন যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম অবরোধে আটকে থাকা নেপাল বা নেপাল-ভারত সম্পর্ক, এর জট খোলার আলামত দেখা যাচ্ছে। সংসদে নেপালের কনস্টিটিউশনে প্রথম সংশোধনী আনা হয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি তা পাস হয়েও গেছে। মোট ৬০১ মোট সদস্যের এই সংসদে প্রো-ইন্ডিয়ান অবস্থানের মাধেসি সদস্য যারা ভোটাভুটির সময়ের আগেই ওয়াকআউট করে গেছে, এরা হলো মাত্র ৩৫ জন। সংশোধনীটা পাস হয়েছে মোট ৬০১ সদস্যের মধ্যে ৪৬১ সদস্যের পক্ষ ভোটে। সাত সদস্যের বিপক্ষ ভোটে। আর ঐদিনের সভায় অনুপস্থিত সদস্য মোট ১২৮ জন, যার মধ্য মাধেসি  ঐ ৩৫ জনও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ যারা অবরোধের পক্ষে এমন মাধেসি সংসদ সদস্য মাত্র ৩৫ জন। ফলে ভারত প্রচার চালাবার সময় মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠি গুলো জনসংখ্যার অর্ধেক বলে প্রপাগান্ডা করলেও ফ্যাক্টস হল, মাধেসি জনগোষ্ঠি আঞ্চলিক প্রো-ইন্ডিয়ান দলগুলোকে ভোট দেয় নাই। এজন্য তারা মোট ৬০০ জনের মধ্যে মাত্র ৩৫ জন।
প্রো-ভারত মাধেসি দলগুলোকে নিয়ে আঞ্চলিক সবচেয়ে বড় জোট হলো ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্ট। গত চার মাসের অবরোধে রাজনীতিতে তারা শুধু শাসক ক্ষমতাসীনদের থেকেই নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেনি ও বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি, বরং একই সাথে নেপালের সাধারণ মানুষ, প্রধান ধারার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী থেকেও নিজেদের দূরে দাঁড় করিয়েছে। নিজেদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শত্রুর কাতারে দাঁড় করিয়েছে। একই ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানান ধরনের স্বার্থবিরোধ থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বার্থবিরোধ থাকা এক জিনিস, আর সেই বিরোধকে শত্রুতায় রূপ দেয়া আরেক জিনিস। গত পাঁচ মাসে এই বিপজ্জনক শত্রুতার আগুন নিয়ে খেলার কাজটা ভারতের প্ররোচনায় মাধেসিরা করেছে।
নেপালের কনস্টিটিউশনে প্রথম সংশোধনী আনার পরের পরিস্থিতিকে ভারতের হিন্দুস্থান টাইমস বর্ণনা করছে এভাবে, বলছে “এর পরও ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্ট এই সংশোধনী প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলছে এটা তাদের কিছু দাবি মেনেছে, সব নয়। কিন্তু নেপালের এই নতুন অবস্থান নেপাল ও ভারতকে কাছাকাছি এনেছে”। হিন্দুস্থান টাইমসের এই মন্তব্যে অনেক কিছুর ইঙ্গিত আছে। যেমন- এখনকার এক নম্বর বাস্তবতা হলো পাঁচ মাস ধরে অবরোধ চালানোর পরে মাধেসিদের পক্ষে এই আন্দোলন আর চালানোর অবস্থায় নেই। এমন ধারণা ভারত দিতে চাইছে। গত ২৬ জানুয়ারি রয়টার্সের এক রিপোর্টে এ বিষয়ে এক ডিটেইল নিউজ এসেছে। ওদিকে নেপালি সংসদে সংশোধনী পাস হওয়ার পর ভারত একে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও আসলে ভারত ও প্রো-ভারত মাধেসিদের অবস্থান হল, তারা সম্ভবত অবরোধ একেবারে না তুলে ধীরেসুস্থে তুলতে চাচ্ছে। কারণ, এত দিন তারা আন্দোলন এমনভাবে পরিচালিত করেছে, যেন তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করছে, নেপাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। ফলে সে চিন্তায় বিচ্ছিন্নতার জায়গা থেকে ফেরত আসতে সময় লাগবে। এ ছাড়া আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কথা চলছে। ওই সফর শেষে অবস্থা বুঝে এরপর পরিস্থিতি আস্তে ধীরে সহজ হতে পারে। যদিও লিখিতভাবে ভারতের স্বাগত জানানো বিবৃতিতে অবরোধ পরিস্থিতি এখন থেকে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো সংবিধানে সংশোধনী আনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রো-ভারত ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্টের নেতা রাজেন্দ্র মাহাতোর দাবি। তিনি দুটো অদ্ভুত দাবি করেছেন। যার ভেতর দিয়ে নেপালের নতুন ক্ষমতায় স্টেক হারানো ভারতের করুণ দুর্গতিই প্রকাশ করে। আবার এই দাবির ভেতর দিয়ে একই সাথে মাধেসি সেক্টরিয়ান বা বিভক্তির রাজনীতির আগুন নিয়ে খেলার বিপজ্জনক দিকটি উদোম হয়েছে। যে আগুন ভারতের জন্যও সমান বিপদের হতে পারে। মাহাতোর দাবি, ভারতকে তিনি নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িত হোক বা হস্তক্ষেপ করুক দেখতে চান। আর দ্বিতীয়ত, নেপাল সরকার যেসব আইনি সংশোধনী যা আনছেন তা বাস্তবায়নে তিনি ভারতকে জামিনদার বা গ্যারান্টার হিসেবে দেখতে চান।

সত্যিই এমন তামাশা সহজে খুব একটা দেখা মেলে না। ভারতের সেক্টরিয়ান রাজনীতির মহিমা এমনই যে, মাধেসি নেতারা এখন বলছেন নেপাল সরকারকে বিশ্বাস নেই, ভারতকে জামিনদার হিসেবে চাই! খবরটা ১৮ জানুয়ারির ভারতের দি হিন্দু পত্রিকার বরাতে একই দিন ১৮ জানুয়ারি আমাদের দৈনিক বণিক বার্তা ছেপেছে। অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, মাধেসি নেতাদের কী বলা উচিত আর কী নয়, এসব শিখিয়ে-পড়িয়ে আনার ব্যাপারেও ভারত একেবারেই নাদান। মাহাতোর এই কথা প্রমাণ করেছে তিনি রাষ্ট্র সম্পর্কে মৌলিক ধারণাও রাখেন না। তিনি রাষ্ট্র কী তা-ই বোঝেননি। ফলে তার এমন দাবি। অথচ রাষ্ট্র গঠন করা ভিনরাষ্ট্রকে জামিনদার রেখে করার জিনিস নয়। আবার রাষ্ট্র গঠনের কাজ নিজে করার কাজ; বাইরের কাউকে হস্তক্ষেপ করতে ডেকে করার কাজও নয়। নিজ জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভিন্ন নাগরিক ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হয়। আর ঐ ভিত্তির গাঠনিক দলিল হল কনস্টিটিউশন। বাইরের জামিনদার নয়। তাই রাজেন্দ্র মাহাতো তিনি আসলেই বড়জোর নেপাল রাষ্ট্রে ভারতের স্বার্থের এজেন্ট হয়েই থাকতে চান। এতটুকুর জন্যই তিনি যোগ্য। এটা যেন বাবাকে জামিনদার রেখে কেউ বিয়ে করতে চাওয়ার শখ প্রকাশ করছে। অথচ যেখানে জামিনদার রাখার কথা ভাবতে হয় সেটা কি বিয়ে!
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে ৩১ জানুয়ারি দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এর প্রিন্ট পত্রিকায় এবং পরের দিন ০১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক নয়া দিগন্ত প্রিন্ট পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। খানে তা আবার পরিমার্জন সংযোজন এবং এডিট করে ছাপা হল।]