নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

নেপালে শ্রীলঙ্কার ভুত দেখছে নয়াদিল্লি

গৌতম দাস
১৯ ডিসেম্বর ২০১৭, রবিবার, ০০:২১

https://wp.me/p1sCvy-2oW

 

অবশেষে এখন এ’কথা বলা যায় যে, নেপাল এখন নিজ রাষ্ট্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কায়েম করতে পেরেছে এবং তা এগিয়ে যেতে পারবে। নেপালের প্রধান তিন দলের মধ্যকার দুটোই কমিউনিস্ট পার্টি। দুই কমিউনিস্ট পার্টি এবারের নির্বাচনে এক কমিউনিস্ট  জোট (‘লেফট অ্যালায়েন্স’) গড়ে নির্বাচনে লড়ে জিতেছে। অ্যালায়েন্স গঠনের ঘোষণা দেয়ার সময় এক কমিউনিস্ট, মাওবাদী দলের চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহাল বলেছিলেন, এই অ্যালায়েন্স তাঁরা করছেন নেপালের রাজনীতিকে স্থিতিশীলতা দেয়ার জন্য, স্থিতিশীল সরকার দেয়ার জন্য [grand Left alliance will “end Nepal’s elongated political instability” ]। নেপাল গত ৯ বছরে বিপুল রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার ভেতর দিয়ে গেছে। এখন দাহালের আকাঙ্খা ও অনুমান সঠিক প্রমাণ হল। নেপালের এই নির্বাচনে কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স সংসদে ৭১ শতাংশের মতো আসন লাভ করেছে।

গত ১৯৯৬ সাল থেকে যদি ধরি, সশস্ত্র রাজনৈতিক লাইনে চেয়ারম্যান পুষ্প কমল দাহালের ‘মাওবাদী সেন্টার’ দল অথবা CPN (Maoist Centre)  প্রথম যখন রাজতন্ত্র উৎখাত ও ক্ষমতা দখলের লড়াই ঘোষণা দিয়ে শুরু করেছিল। সেই থেকে হিসাব কষতে বসলে গত ২০ বছরের বেশি সময়, এটা রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে অবশ্যই নেপালের জনগণের এক বিরাট লম্বা পথপরিক্রমা। আর কে না জানে লক্ষ্যে পৌঁছানোতে পথ যত লম্বা হয়ে যায়, ততই সেখানে আরো বেশি অনিশ্চয়তা হাজির হয়ে যায়, আর তা বিপজ্জনক হয়। তবুও আজ প্রায় ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম শেষে এক কথায় বললে নেপালের সাফল্য অনেক। আর এতে অন্তত তিনটি বড় অর্জন আছে।

এক. শত বছরেরও বেশি পুরনো নেপালি রাজতন্ত্রের শাসনকে উৎখাত ও অবসান ঘটানো। দুই. দুইবারের চেষ্টায় অনিশ্চয়তার সাত বছরের শেষে নেপালকে সর্বপ্রথম একটি রিপাবলিক রাষ্ট্র হিসেবে গঠন করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ রাজতান্ত্রিকতার বিপরীতে রিপাবলিক বা লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন সফল হয়। কনস্টিটিউশন রচনার কাজ সফলভাবে সমাপ্ত করা এবং এই কাজ শেষে প্রথম কনস্টিটিউশন প্রক্লেমেশন – ২০১৫ ঘোষণা দিতে নেপাল সফল হয়। আর তিন. নতুন কনস্টিটিউশনের অধীনে প্রথমবার সাধারণ নির্বাচন বা সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন করা হয়। শুধু তাই নয়, ভোটের ফলাফলে নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের কিছু কম (গণনার প্রাথমিক পর্যায়ের ১৬৫ আসনের মধ্যে ৮০ আসন) পেয়েছে। এই দল হল, চেয়ারম্যান খাড়গা প্রসাদ শর্মা অলির কমিউনিস্ট পার্টি (CPN-UML)  । আর এরা অপর কমিউনিস্ট ‘মাওবাদী সেন্টার’ দলের সাথে মিলে প্রায় ৭১ শতাংশ আসন পেয়েছে। অর্থাৎ এই তৃতীয় অর্জন সম্পর্কে বলা যায়, এখন সহজেই একটি স্থিতিশীল সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে সম্ভাব্য নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে অলির নেতৃত্বে নেপাল এক নতুন ও স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে পারবে।

প্রায় ২০ বছর পরের নেপাল এই প্রথম স্থিতিশীলভাবেই পূর্ণ সময়কালের সরকার কায়েম করতে পারবে, আর সেই সরকার দৃঢ়তার সাথে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম হবে। এর পিছনের প্রধান কারণ হল, অপর কমিউনিস্ট পার্টি  ‘মাওবাদী সেন্টার’-এর সাথে ইতোমধ্যে গত অক্টোবরে এরা যে জোটটা গঠন করেছে, সেটা শুধু কোনো নির্বাচনী জোট নয়,  বরং একটা এক দলে পৌঁছানোর লক্ষ্যে একটা জোট। [The two parties also said they would work for their formal merger……]।   ফলে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ঘাটতি মিটানো নয়, সরকারের নানান রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নীতি সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে মতের অমিলগুলো সামলে এক সিদ্ধান্ত পৌছানোর সুযোগ এখানে বেশি থাকবে। এই নির্বাচনে মাওবাদীরা দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনপ্রাপ্ত দল (১৬৫ আসনের মধ্যে ৩৬ আসন), আর তৃতীয় নেপালি কংগ্রেস (১৬৫ আসনের মধ্যে ২৩ আসন)। তবে নতুন গঠিত এই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্সে আরো একটা দল আছে। সেটা বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি পার্টি, এই দলের একা তিনি জিতেছেন। তিনি আসলে ছিলেন মাওবাদী দলের সাবেক দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা, রাজতন্ত্রের পরাজয়ের পর ২০১১ সালের প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন, পরে দল ছেড়ে বের হয়ে যান। এখন জোটে ফিরে আসলেন। প্রথম কনষ্টিটিউশন গঠনকালীন সরকারের (২০০৮-২০১১) সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সরকার গঠন করে ছিল মাওবাদীরা। ফলে ঐ সময়ে ভারতের সাথে স্বার্থ বিরোধের বিষয়গুলো নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংঘাতের মুখোমুখি হওয়া ও চাপ সামলানোর বিপদের ঝড়ঝাপ্টা গুলো সবচেয়ে তাদের উপর দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভারতীয়দের চাপের মুখে তা মোকাবিলা করতে গিয়ে বাবুরাম  “ভারতীয়দের সাথে পারা যাবে না” ফলে “নরম পথে আগাতে হবে” ধরণের অবস্থানের কারণে দাহালের সাথে বিরোধে, শেষে দল থেকে বিচ্ছিন্নই হয়ে যান। পরে আলাদা দল করেন, তিনি এবার জোটে ফিরে এসেছেন। তাহলে অল্পকথায় তিনটি গুরুত্বপুর্ণ অর্জন হলঃ রাজতন্ত্রের উৎখাত, নতুন লোকতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কনস্টিটিউশন রচনা ও ঘোষণা আর শেষে এক স্থিতিশীল ও নির্বাচিত সরকার গঠন পথে এসে পৌছানো।

নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতা কাঠামো তিন স্তর বিশিষ্ট – ফেডারল (কেন্দ্র), প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকার – এভাবে এবং এভাবেই নতুন কনস্টিটিউশন অনুসারে গঠিত। বিশেষ দিকটা হল, তিন স্তরের নির্বাচন এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়েছে, যা এক বিরাট সাফল্য। কারণ গত বছরের এই সময়েও নেপালের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা এত চরম অবস্থায় ছিল যে, এক বছর পরে সরকারের আয়ু শেষ হবার পরে এই সময়ে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতির অর্জন আজ এই উচ্চতায় উঠবে তা তখন বিশ্বাস করা যেত না।

আচ্ছা, গত ২০ বছরের পথপরিক্রমায় কারা নেপালের গণস্বার্থের দিক থেকে বিচারে এর রাজনীতিক-ভিলেন ছিল? এই প্রশ্নের জবাব হবে, ২০০৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বভাবতই সেই ভিলেন, তিনি ছিলেন নেপালের রাজা জ্ঞানেন্দ্র। তবে এরপর রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে  পাল্টা মাওবাদীসহ নেপালের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে নিয়ে জোট বাঁধা ও এর উপরে ভারত ও আমেরিকার সমর্থন আনা ইত্যাদি – এই ঘটনাগুলো ঘটার সময় নির্ধারক ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছিল ভারত। হ্যা, ইতিবাচক। তা সত্ত্বেও নতুন সরকারের আমলে কনস্টিটিউশন গঠনের কাল থেকে ক্রমেই ভারত নেতিবাচক বিরাট ভিলেনের ভূমিকায় হাজির হতে থাকে। সেই থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বাজে এক ভিলেন হয়ে আছে ভারত। গানের ভাষায় বললে- ‘ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়’। ভারত চাইতেই জানে না। নেপালের কাছে ‘কিভাবে’ আর ‘কী’ চাইতে হয় – কী চাওয়া যায় না – তা জানে না। নেহরুর হাতে ভিত্তি পাওয়া ও গড়া স্বাধীন ভারত, আর এ থেকে সবচেয়ে বাজে ও ভুল শিক্ষা পাওয়া আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভারত, এরাই মূলত সেই ভিলেন। নেহরু ভেবেছিলেন কলোনি-উত্তর স্বাধীন ভারত, একালে ব্রিটিশদের ফেলে যাওয়া সুবিধাগুলো তিনি ব্রিটিশদের মতই নিজেও ব্যবহার করবেন। এটা তার প্রিরোগেটিভ (prerogative) বা পড়ে পাওয়া চারআনা বিশেষ সুবিধা, প্রাধিকার। তিনি বুঝতেই পারেননি যে, এর অর্থ হল, তাতে ভারত এক কলোনিয়াল ক্ষমতা বলে আগাম কল্পনা করে নিতে হবে বা করা হয়ে যায়। এর চেয়েও আর একটা গুরুত্বপুর্ণ দিক। তিনি সে সময়কে মানে এর তাতপর্যকেও বুঝতে পারেন নাই। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে যে নতুন দুনিয়া গড়ে তোলা হচ্ছিল, সেটা আর যুদ্ধের আগের মত কলোনি-শাসিত দুনিয়া নয়, কোনো ইউরোপীয় কলোনি-শাসকের দুনিয়া নয়। বরং এক বিরাট ভিন্নতায় আমেরিকার  নেতৃত্বের এক নতুন দুনিয়া। মৌলিকভাবে এটা বরং খোদ পুরনো কলোনি-অর্থনৈতিক-সম্পর্কেরই অবসান। আর আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের-অর্থনীতিক-সম্পর্কের দুনিয়া। কলোনি শাসনমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোসহ আমেরিকার গড়ে তোলা এটা নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি সম্পর্কের দুনিয়া। যেখানে আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক জাতিসংঘ ও বিশ্ববাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের প্রতিষ্ঠান – ইত্যাদির মত বহুরাষ্ট্রীয় (মাল্টিলেটারাল) প্রতিষ্ঠান এবারের নতুন দুনিয়ায় আছে।

মূল কথায় এখানে অপর রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব ও সম্পর্ক রাখা এবং সুবিধা নেয়া ও কিছু দেয়ার তরিকাই আলাদা। এখানে রাষ্ট্রে রাষ্ট্রে বিনিময় সম্পর্ক আর পুরান কলোনিয়াল একেবারেই নয়, বরং আলাদা। নেহরু এর খবর নেন নাই বা রাখেননি। এ কথার সবচেয়ে ভালো প্রমাণ হল, নেহরুর করা ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’। যেটা আসলে এর আগে ব্রিটিশদের করা ‘নেপাল-ব্রিটেন চুক্তি ১৯২৩’ এর কার্বন কপি। এই চুক্তি থেকে এটা পরিষ্কার, নেহেরু ভারতকে কলোনি-শাসকের ভূমিকায় নামিয়েছিলেন, দেখেছিলেন। আগে ব্রিটিশ কলোনির এক ভেসেল রাষ্ট্র বা করদরাজ্য ছিল নেপাল। ব্রিটিশদের নেপালকে সরাসরি কলোনি না করে ভেসেল রাষ্ট্র করে সুবিধা দেয়ার পেছনে অনেক কারণ আছে। পরবর্তিতে যোগ হওয়া নতুন এক কারণ হল, সিপাহী বিদ্রোহ কালে নেপালের রাজাদের বৃটিশের পক্ষে গোর্খা সৈন্য নিয়ে অবস্থান নেওয়া। এই বিদ্রোহের আগে পুরো নেপাল ব্রিটিশরা দখলে নিয়েছিল। কিন্তু সিপাহি বিদ্রোহে ব্রিটিশদের পক্ষ নেয়াতে বিদ্রোহ পরাজিত করার শেষে এই ভেসেল রাষ্ট্রের জন্ম আরও পাকাপোক্ত হয়। তাই নেপাল-ব্রিটেন এর মধ্যে আগের অনেক চুক্তি ছিল, আমরা জানতে পাই। বিভিন্ন সময়ে ব্রিটিশরা তাতে নতুন নতুন অনেক ছাড় যোগ করেছিল। এমন সর্বশেষের চুক্তিটিই হল, ১৯২৩ সালের চুক্তি। কিন্তু নেপালের ল্যান্ডলকড অবস্থার সুযোগ নিয়ে, পুরান সেই চুক্তি অনুসরণ বা অনুকরণ করে একই দাসত্ব চুক্তি করেছিল নেহরুর ‘রিপাবলিক ভারত’। ওই চুক্তিটিই এখনো বহাল আছে। প্রশ্নটা আসলে, একালে কারও দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে দাস বানানোর সুযোগ পেলেও আপনি তা নেবেন কি না? নেহরু সেটা দাবির সাথে নিয়ে নিয়েছিলেন। কারণ নেহরুর মৌলিক আগাম অনুমান হল, “স্বাধীন ভারত সেটা বৃটিশ কলোনি ভারতেরই উত্তরসুরি ও ধারাবাহিকতা”। অর্থাৎ ভারত নিজে স্বাধীন তবে এটা এখন নিজেই এক কলোনি শাসক। ফলে কন্টিনিউয়েশন বা ধারাবাহিকতা।  তাই, এই কলোনি ওরিয়েন্টেশনে বা ধাঁচে নিজ নতুন আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের ভিত গড়েছিলেন নেহেরু। নেহেরুর সেট করে দেওয়া ‘সেই ট্রাডিশন’ এখনও চলছে।

গত অক্টোবরে কমিউনিস্টদের লেফট অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর তাদের যৌথ নির্বাচনী ম্যানুফেস্টো প্রকাশিত হয়। জাপান থেকে প্রকাশিত ডিপ্লোম্যাট ম্যাগাজিন ১ ডিসেম্বর বলছে, ঐ ম্যানুফেস্টোতে বলা হয়েছে – লেফট অ্যালায়েন্স নির্বাচনে জিতলে পরে তাদের দ্বারা গঠিত অ্যালায়েন্স সরকার এরপর ‘ইন্ডিয়া-নেপাল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি-১৯৫০’ বাতিল করবে এবং একটা নতুন চুক্তি করবে। এখন নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ওই আকাঙ্খা মত অ্যালায়েন্সের পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল এসেছে। ফলে এখন স্বভাবতই ঐ চুক্তি বাতিলের প্রসঙ্গ উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভারতের সাথে সংঘাতে আর এক পর্ব শুরু হবে, আর এক খাতা খোলা হবে।

এই নির্বাচনের শুরু থেকে নয়াদিল্লি খুবই অস্বস্তিতে ছিল। আর ফল প্রকাশের পর সেটা আরো বেশি হয়ে এখন উলটা অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে। এমনিতেই গত অক্টোবরে নেপালের দুই কমিউনিস্ট পার্টির অ্যালায়েন্স গঠন হওয়ার পর থেকে নয়াদিল্লি আসন্ন নির্বাচনে নিজের জন্য নানান বিপদ আসন্ন বলে আঁচ করতে শুরু করেছিল। যেমন সুবীর ভৌমিকের নেপালের নির্বাচন প্রসঙ্গে ‘সাউথ এশিয়ান মনিটর’ অনলাইনে তার লেখা দিয়েছেন। সেই লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘নেপালের নির্বাচনকে ভারতের নিজের পরাজয় হিসেবে দেখা উচিত!’  তবে সুবীরের এবারের লেখাটি ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে সান্ত্বনা দেয়ার ভঙ্গিতে লেখা। তাই সম্ভবত ভারতের অনেক ভুলত্রুটি এখানে স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ভারতকে আমল না করে ২০১৫ সালের অক্টোবরে নেপালের কনস্টিটিউশন ঘোষণা করে দেওয়াতে টানা ছয় মাস ল্যান্ডলক নেপালে সকল ‘পণ্য  আমদানি অবরোধ’ করে রেখেছিল নয়াদিল্লি। নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নার গ্যাস থেকে যানবাহনের জ্বালানিসহ সব কিছু ছয়মাস বন্ধ রাখলে গরীব মানুষের জীবনে এর প্রভাব কী হতে পারে তা অনুমেয়। তাই বলা বাহুল্য ভারতের দিক থেকে এটা কাউন্টার-প্রডাকটিভ হয়েছে।  প্রচ্ছন্নে সুবীরের লেখায় ভারতের সিদ্ধান্ত ভুল এটা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। ঐ ঘটনাই নেপালের গরীব সাধারণ মানুষকে ভারতের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ও কঠোরভাবে বিমুখ করে তোলে, যার প্রভাব এখনো প্রবল।  আর খুব সম্ভবত, এসব ভোটারদেরই নিজের ব্যাগে তুলে নিতে পেরেছে,  চরম ভারত-বিরোধিতার লাইনের চেয়ারম্যান অলির কমিউনিস্ট দল। মোট ১৬৫ এর মধ্যে ৮০ আসন – এভাবে বিপুল সংখ্যার আসন পেয়েছে এই নির্বাচনে।ওদিকে সুবীর তাঁর লেখায়, আবার শ্রীলঙ্কার গত নির্বাচন ও এর পরবর্তী পরিস্থিতির সাথে নয়াদিল্লি এখন নেপালকে তুলনা করে দেখছে সে খবর জানিয়েছে। শ্রীলঙ্কা প্রসঙ্গে তাদের এখনকার মূল্যায়ন নাকি – শেষ বিচারে শ্রীলঙ্কায় সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও অন্যান্য ইস্যুতে চীনকে আসলে ঠেকানো যায়নি। নেপালেও গেল না। তাই সুবীর যেন শিরোনামে বলছেন, হতাশ হয়েন না 

শ্রীলঙ্কার মত নেপালের বেলায় কোন সমুদ্রবন্দর নির্মাণ তার ইস্যু ছিল না। শ্রীলঙ্কার হাম্মনটোটা গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ ২০১০ সালে শেষ হবার পরও তা ভারত চালু না করতে দিয়ে পাঁচ বছর আটকে রাখতে পেরেছিল, নির্বাচন রাজনীতিতে, সরকার গঠনে হাত ঢুকিয়ে। কিন্তু শেষ বিচারে বন্দর চালু হওয়া ভারত ঠেকাতে পারে নাই। ভারত ঘেঁষা চলতি সরকারই চীনের সাথে সংশোধিত চুক্তি করে বন্দর চালু করে ফেলেছে। তাই ভারত এখন এটাকে নিজের হার মনে করে, সেকথাই সুবীর তুলে এনেছে। তুলনায় নেপালে বন্দর না হলেও চীনের সাথে বাঁধ নির্মাণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের আড়াই বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প আছে বা ছিল। যে সরকারের অধীনে চলতি নির্বাচন সমাপ্ত হল সেটা নেপালি কংগ্রেস দলের। তবে তা মাওবাদী দলের সমর্থনে গড়া এক কোয়ালিশন সরকার। নেপালে পানিবিদ্যুতের প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সুবীর বলছেন, এখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় মাত্র ৭৫৩ মেগাওয়াটের মত। ২০১৫ সালের শেষে কমিউনিস্ট অলির সরকারের আমলে চীনের সাথে তিনি ১২০০ মেগাওয়াটের ঐ বাঁধ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি করেছিলেন, সেটাই আড়াই বিলিয়ন ডলারের চুক্তির। কিন্তু চলতি নেপালের প্রথমপর্যায়ের নির্বাচন শুরুর কয়েক দিন মা্ত্র আগে গত নভেম্বরে নেপালি কংগ্রেস সরকার ঐ চুক্তি বাতিল করে দেয়। তাই আইনত সেই চুক্তি ‘ছিল’ বলতে হচ্ছে। অজুহাত উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক টেন্ডার করা হয় নাই। এতে নেপালকে ঘিরে চীন-ভারত রেষারেষি আরো সরাসরি নির্বাচনে হাজির হয়ে পড়ে তখন থেকেই। স্বভাবতই কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স এখন নির্বাচনে বিজয় লাভ করাতে ওই প্রকল্প ও চুক্তি আবার জীবিত হবে বলে সবাই অনুমান করছেন। মজার কথা হচ্ছে, সুবীর ভৌমিক ওই চুক্তি জীবিত করার পক্ষে কথা বলেছেন। বলছেন এটাই নেপালের স্বার্থ। এই প্রকল্প চীনের চীনের বেল্ট-রোড মেগা প্রকল্পে অংশ বলে ঘোষণা করা ছিল। এমনকি তা সত্ত্বেও চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত হয়ে আরো অবকাঠামো প্রকল্প নেপালের আনার পক্ষে তিনি কথা বলছেন।

নয়াদিল্লি ঘোরতরভাবে চীনের বেল্ট-রোড প্রকল্পের বিরোধী। এটা ভারতের প্রকাশ্য বিদেশ নীতি ও অবস্থান। ভারতের কোনো ‘বন্ধু’ বা পড়শি রাষ্ট্র বেল্ট-রোড প্রকল্পে যুক্ত থাকুক এটা দেখতে বা সহ্য করতে সে একেবারেই রাজি নয় (ফলে বাংলাদেশের সাথেও এটা এক অনৈক্যের বিরাট ইস্যু)। কিন্তু নেপালের বেলায় সুবীর বলতে চাইছেন, নেপালের এখন দরকার বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত খাতে প্রচুর বিনিয়োগ। না হলে নেপালের অর্থনীতি দাঁড়াবে না। ইতোমধ্যে সদ্যগঠিত নেপালে জয়লাভ করা কমিউনিস্ট অ্যালায়েন্স, আগামী ১০ বছরের মধ্যে নেপালকে মাথাপিছু পাঁচ হাজার ডলার আয়ের অর্থনীতির দেশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। এদিকে চীনের মতই ভারতকেও নেপাল কিছু বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করতে দিয়েছিল ২০১৫ সালের শুরুর দিকে। কিন্তু আজও সেসব প্রকল্পের কোনো কাজই শুরু হয়নি বলে সুবীর জানাচ্ছেন। অর্থাৎ একদিকে ভারতের সক্ষমতা দক্ষতা সামর্থ্য নেই, অন্য দিকে চীনের আছে, সুবীর এই তুলনা আনছেন। আবার চীনের বিনিয়োগ সক্ষমতার তুলনায় ভারত যে কিছুই না, সেটা শ্রীলঙ্কাতেও দেখা গেছে। ফলে সুবীর ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের কাছে ‘স্মার্ট হতে’ পরামর্শ রেখেছেন। আসলে সুবীরেরই খুবই স্মার্ট পরামর্শ এটা। কারণ তিনি যুক্তি তুলে ধরে বলছেন, প্রশাসনের উচিত চীন-নেপালের বিদ্যুৎ প্রকল্পে বাধা না দিয়ে বরং সহযোগিতা করা। পরামর্শ খুবই অ-ভারতীয় অথবা অ-চিরাচরিত ভারতীয় পরামর্শ। কিন্তু সেক্ষেত্রে সুবীর বুদ্ধি দিচ্ছেন, এইবার যে বাড়তি বিদ্যুৎ তৈরি হবে তা যেন ভারত কিনে নেয়। আর এইবার ইঙ্গিত দিয়েছেন ওই বিদ্যুৎ বাংলাদেশ বিক্রি করে দিবার টাউটারি নিতে, নগদ লাভ এখানেই। অর্থাৎ ভারত যে উতপাদন আয়োজনে অক্ষম তা স্বীকার করে নিয়ে সুবীর টাউটারিতে নামতে বলছেন, তাই কী? তবে টাউট মারচেন্ডাইজ (tout merchandise ) খারাপ ব্যবসা নয়, ভারত যেটুকু ভাল পারে। এখানে আমাদের জানা থাকা ভাল যে, ভারত নেপালকে এমন ‘কলোনি-চুক্তির’ মধ্যে রেখেছে যে, ভারতের অনুমতি ছাড়া অন্য কাউকে নেপাল নিজ উতপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারে না।

তবে আমাদের মতো দেশের বেলায় পাল্টা আরেকটা কথা সমান গুরুত্ব দিতে হবে। চীনের নেয়া অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে (যেমন বাংলাদেশেও) এক বিরাট কালো দাগ আছে। কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে এখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজার যাচাই, কোনো ওপেন টেন্ডার হয় না। শুধু তাই না প্রকল্পের কোনো টেন্ডার করতে যাতে না হয়, বালাই যেন না থাকে, টেন্ডার করার আইনি বাধ্যবাধকতা যাতে এড়ানো যায়; তাই প্রকল্পগুলো জিটুজি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট)-এর অধীনে সম্পন্ন করার চুক্তি করা হয়। আর এতে টেন্ডার ডাকার বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যায় বলে স্বভাবতই প্রকল্প মূল্যের কোনো মা-বাপ থাকে না। এ ছাড়া লোকাল এজেন্টের নামে অর্থ সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা বা সুযোগও থাকে। বিশ্বব্যাংকের অনেক বদনাম আছে বা ছিল। তা সত্ত্বেও তুলনায় বিশ্বব্যাংকের প্রকল্প অন্তত কোনো ওপেন আন্তর্জাতিক টেন্ডার ছাড়া সেক্ষেত্রে কো্ন প্রকল্প নিতে দেয়না।  বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে এটুকু অগ্রগতি তাদের ঝুলিতে আছে। এমনকি জাপান সরকার দাতা হলেও জাপানি ঠিকাদারকেই কাজ দেয়ার কোনোই বাধ্যবাধকতা থাকে না। এই নীতি কার্যকর করার সক্ষমতা তাদের আছে, ইতোমধ্যেই সেটা দেখিয়েছে। চীনের বিশ্বব্যাংক AIIB গঠনের প্রাক্কালে একে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাবি করাতে এর বিরুদ্ধে মোক্ষম এই অভিযোগই তুলেছিল আমেরিকা। যদিও আমেরিকা নিজের বিরাট স্বার্থক্ষুন্ন হওয়ার কারণে নিয়মিতভাবে AIIB গঠনের বিরোধিতা করে গেছিল কিন্তু তা সত্ত্বেও আমেরিকান অভিযোগ মিথ্যা ছিল না, তা বাস্তব।

তবে সেটা যাই হোক, সুবীরের লেখায় এই প্রথম ভারতের অভ্যন্তরীণ আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনকে নিজেদের দুর্বলতা ও সক্ষমতা-দক্ষতা সামর্থের অযোগ্যতা বা ঘাটতির দিকে নজর ফেরাতে তাগিদ দিতে দেখা গেল। সুবীরের এই লেখা থেকে মনে করার কারণ আছে যে, ভারতের প্রশাসন বিপদে আছে বলে অন্তত কেউ কেউ মনে করছেন, এ নিয়ে টনক নড়ারও কেউ কেউ আছে। আসলে ভারত বিপদ দেখছে; একের পর এক ভারতের পড়শি রাষ্ট্রে চীন প্রকল্প নিয়ে ঢুকে পড়ছে, আর ভারতের কিছু করার থাকছে না। এটা না দেখতে পাবার কারণ নাই, তবে স্বীকার করতে দেখা যায় না। সুবির তাই পরিস্কার করেই বলছে, ভারত এখন শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও আসলে শেষে কিছু ঠেকানো যায়নি বলে তারা মনে করে। অর্থাৎ ভারতের বিদেশ নীতিতে করণীয় – “শ্রীলঙ্কা মডেল বলেও কিছু দাড়ালো না।

কিন্তু আসলেই ব্যাপারটি এমন হওয়ার কথা নয় কি? ভারতের যদি সক্ষমতা-দক্ষতা-সামর্থ্য না থাকে, আর তা থেকে সৃষ্ট নানা দুর্বলতা তাকে ঘিরে রাখে, তবে এমনই কি হওয়ার কথা নয়। আসলে প্রথম প্রশ্ন করা উচিত যে, ভারত কেন অর্থনৈতিক বা বৈষয়িক সক্ষমতার দিক থেকে নিজেকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী বা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার যোগ্য বলে বিবেচনা করছে? কিসের ভিত্তিতে?

দেখা যাচ্ছে, ভিত্তিহীন সব অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসন পড়শিদের উপর ছড়ি ঘোরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে আর ধপাধপ পড়ছে – শ্রীলঙ্কা আর এরপর নেপাল…। সুবীর ভৌমিকই বলছেন, শ্রীলঙ্কার পর নেপালেও নাকি নয়াদিল্লি, শ্রীলঙ্কার ভূত দেখতে পাচ্ছে। [But again, the ghosts of Sri Lanka may return to haunt Delhi…] তা হলে? এরপর কোথায়?

পাঠকের জন্য একটা সতর্কতা দিয়ে শেষ করব। বাইরের মিডিয়ার মত দেশেরও অনেক মিডিয়া – নেপালে একটা কমিউনিস্ট এলায়েন্স তৈরি হয়েছে আর চীন (মানে সেটাও তো কমিনিস্ট) – এভাবে সব মিলিয়ে বিষয়টাকে “চীনপন্থী”, বা “কমিউনিস্ট” ঘটনা বলে ইঙ্গিত হাজির করার চেষ্টা করছে। এই অনুমান ইঙ্গিত শতভাগ ভুল, ভিত্তিহীন। যে চিন্তা কাঠামোতে দাঁড়িয়ে এমন কথা বলা হচ্ছে তা কোল্ড ওয়ারের যুগের; যেন ষাটের দশকের দুনিয়ায় আমরা এখনও দাঁড়িয়ে আছি – এই ভিত্তিহীন অনুমানে বলা কথা। আমরা এখন একুশ শতকে, সকল রাষ্ট্র যখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে পরস্পরের সাথে গভীর বিনিময় সম্পর্কে লেপ্টে গেছি ও আছি। সবচেয়ে বড় কথা এই লেপ্টে যাওয়া আর কখনও  কোল্ড ওয়ারের মত আগের যুগে ফেরত যাবে না। তাই পুরানা চিন্তা কাঠামো আর বাস্তবতায় পুরানি টার্ম ব্যবহার করে কথা বলা আর সঠিক নয়। তাই এই ঘটনা কোনভাবেই আর “নেপালি কমিউনিস্ট আর চীনের” কোন বামপন্থা ততপরতা একেবারেই নয়। যেমন আগামিতে নেপালে দুই কমিউনিস্টকেই বাদ দিয়ে নেপালি কংগ্রেসের সাথে চীনের ঘনিষ্ট হওয়া খুবই সম্ভব। আসলে একালে ‘বামপন্থা’ বা ‘ডানপন্থা’ বলে কোন কিছুকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা অর্থহীন।

আর একটা তথ্যঃ নেপালের কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য নির্বাচন শেষ হয় নাই। মোট আসন ২৭৫ যার মধ্যে ১৬৫ আসন আসবে সরাসরি প্রত্যেক আসনের ভোট কাউন্টে, একজনকে নির্বাচিত ঘোষণা করে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে প্রাপ্ত ১৬৫ আসনের ফলাফলের ভিত্তিতে।  আর বাকি ১১০ আসনের ফলাফল পুরণ হবে দলগুলোর আনুপাতিক ভোট প্রাপ্তি থেকে। অর্থাৎ সব আসন মিলিয়ে একটা দল মোট ভোটারের কত পার্শেন্ট ভোট পেয়েছে সে অনুপাতে এই ১১০ আসন ভাগ করে দেয়া হবে। অর্থাৎ কোন দল একটা আসনেও সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে জিততে না পারে যদি, তাহলেও এবার আনুপাতিক ১১০ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবার সুযোগ আছে।  আনুপাতিক ১১০ আসনের গণনা এটা ঘরে বসে গণনা করে কয়েকদিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করে দিবে। এই রচনাটা লেখা হয়েছে ১৬৫ আসনের ভিত্তিতে বলে আনুপাতিক আসন এরপর যোগ হলে আনুপাতিক ভাবেই সব দলের আসন বাড়বে, তাই তেমন কোন হরফের হবে না। এভাবে নেপালের (ফেডারেল) সংসদে মোট আসন বা সংসদ সদস্য ২৭৫ জনেরই নির্বাচন সম্পন্ন হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ‘নেপালে নির্বাচনের ফলাফল : শ্রীলঙ্কার ভূত দেখছে নয়াদিল্লি’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

নেপালের চলতি সাধারণ নির্বাচনের তাতপর্য

নেপালের চলতি সাধারণ নির্বাচনের তাতপর্য

গৌতম দাস
০৭ ডিসেম্বর ২০১৭, বৃহষ্পতিবার ০০:০৪

https://wp.me/p1sCvy-2lW

 

নতুন করে রাষ্ট্রগড়া বা একটা মর্ডান রিপাবলিক গঠন কালে এর গঠনসভা, একে ইংরাজিতে কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বলি (Constituent Assembly) বলা হয়; বাংলাদেশের বেলায় ১৯৭২ সালে ধারণাটাকে বাংলায়  “গণপরিষদ” – এই বাংলাটা নেয়া হয়েছিল। আম-ধারণা হিসাবে নির্বাচন বলতে বা ‘ভোট আসছে’ বলে আমরা যা বুঝি ও বুঝাই সেটাই “সাধারণ নির্বাচন”। আবার কোন নতুন রাষ্ট্র গঠনসভারও সদস্য কারা কিভাবে নির্বাচিত হবেন এর জন্যও একটা নির্বাচন হয়। তবে সেটাকে “সাধারণ নির্বাচন” নয় বরং একে “গঠনসভার সদস্য নির্বাচন” বলে। যদিও বাইরে থেকে দেখতে সেটা সাধারণ নির্বাচনের মতই মনে হতে পারে।

‘গঠনসভার নির্বাচন’ আর ‘সাধারণ নির্বাচন’ এর মধ্যে মৌলিক ফারাক হল –  উদ্দেশ্য। ‘গঠনসভার নির্বাচন’ এর উদ্দেশ্য হল ওখানে ঐ নির্বাচিত কমিটি একটা কনষ্টিটিউশন রচনা করতে বসে, সেকাজ শেষ হলে নিজেরা  অনুমোদন দেয়। পরে এক গণভোটে তা পাশ করিয়ে আনে। আর ফাইনালি  ‘নতুন কনষ্টিটিউশন চালু হল’ বলে এক প্রোক্লেমশন বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। মূলত এই কাজটাকেই আরেক ভাষায় বলে ‘রাষ্ট্রগঠন সম্পন্ন’ হল। আর গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হল ‘রাষ্ট্রগঠন সম্পন্ন’ হওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পরে নির্বাচিত ঐ গঠনসভার অস্তিত্ব ঐ পর্যন্তই, এরপরে সে নিজে নিজেই আপনাতেই ভেঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে গেছে ধরা হয়। এইবার রাষ্ট্র পরিচালিত হতে থাকে গঠিত নতুন কনষ্টিটিউশন মোতাবেক। যার প্রথম পদক্ষেপ হল, কনষ্টিটিউশনে যেভাবে লেখা আছে সে মোতাবেক  কারা জাতীয় সংসদের সদস্য হবেন নির্বাচন কমিশন এর নির্বাচন আয়োজন করতে থাকে, প্রতি পাঁচ বছর পরপর। এই নির্বাচনকে ‘সাধারণ নির্বাচন’ বলা হয়। মনে রাখতে হবে “সাধারণ নির্বাচন” ঘটার ক্ষেত্রে সবসময় আগে থেকে একটা অনুমোদিত কনষ্টিটিউশন  থাকে আর সে মোতাবেক ঐ সাধারণ নির্বাচন আয়োজিত হয়ে থাকে।  ‘গঠনসভার নির্বাচন’ এর উদ্দেশ্য একটা কনষ্টিটিউশন লেখা আর এই নির্বাচন একবারই হয়; বিপরীতে সাধারণ নির্বাচনের বেলায় আগে থেকে থাকা একটা অনুমোদিত কনষ্টিটিউশন মোতাবেক সাধারণ নির্বাচন প্রতি পাঁচ বছর পরপর অনুষ্ঠিত হয়।

তবে কনষ্টিটুয়েন্সির দিক বিচারে এই দুই ধরণের নির্বাচনের কনষ্টিটুয়েন্সি অনেক রাষ্ট্রের বেলায় ভিন্ন দুরকম হয়, অনেক ক্ষেত্রে আবার একই থাকে। কনষ্টিটুয়েন্সি বা প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকা মানে হল কোন কোন প্রশাসনিক এলাকা অর্থাৎ কোন কোন ইউনিয়ন বা উপজেলার ভোটারদের নিয়ে একেকটা কনষ্টিটুয়েন্সি বা প্রার্থীর নির্বাচনী এলাকা নির্ধারিত হবে। অনেক সময় এটাকে নির্বাচনী আসন এলাকাও বলতে দেখা যায়। যেমন বাংলাদেশে এমন কনষ্টিটুয়েন্সি মোট ৩০০ টা। তবে  অনেক দেশে ‘গঠনসভার নির্বাচন’ আর ‘সাধারণ নির্বাচন’ – দুই ক্ষেত্রে কনষ্টিটুয়েন্সি বা আসন এলাকা ভিন্ন ভিন্ন হতে দেখা যায়। সাধারণত দেখা যায়, ‘গঠনসভার নির্বাচনে’ আসন সংখ্যা বা নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা তুলনায় বেশি থাকে। যেমন নেপালে ‘গঠনসভার নির্বাচনে’ মোট আসন ছিল ৬০১, আর সাধারণ নির্বাচনে মোট আসন সংখ্যা হল ২৭৫। এছাড়া ‘গঠনসভার নির্বাচনের’ প্রক্রিয়ার শুরু থেকে শেষে প্রক্লেমেশন আর এরও পরে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্র থাকে ও পরিচালিত হয় এক অন্তর্বর্তিকালীন বা অস্থায়ী সরকারের অধীনে।  গঠনসভার নির্বাচিত সদস্যরাই ঐ অস্থায়ী সরকার গঠন করে থাকে। এই হল ভেঙ্গে বিস্তার করে বলা একটা নতুন রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়া অথবা পুরা কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস।

আমাদের পড়শি নেপাল তাদের প্রাচীন রাজতান্ত্রিক শাসন উতখাত শেষে (২০০৬ সালে),  দীর্ঘ প্রায় ১০ বছরে কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস সম্পন্ন করার পরে, এখন নেপালে এই প্রথম সাধারণ নির্বাচন চলছে। কিন্তু প্রায় দশ বছর লাগল কেন? এটা তো বরং চার-পাঁচ বছর বা তারও আগে (বাংলাদেশ একবছরেরও কম সময়ে হয়েছিল) শেষ করে ফেলার কথা। আর কনস্টিটিউশন মেকিং শেষ করতে কোন জনগোষ্ঠি যত লম্বা সময় নিবে পুরা জনগোষ্ঠিকে ততদিন ভয়ঙ্কর সব বিপদের মধ্যে থাকতে হবে। এ যেন অন্যের হাতে ধর্ষিত হওয়ার বা খুবলে খাওয়ার বিপদে থাকা। আমরা রাজনৈতিক বিপ্লব করব, নতুন রাষ্ট্রগঠন করব ইত্যাদি অনেকের স্বপ্ন আমাদের থাকে। কিন্তু এর জন্য সবচেয়ে বিপদজনক অধ্যায় হল  একটা কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস শুরু করেও শেষ না করতে পারা বা প্রক্লেমশন না দিতে পারা। ব্যাপারটা অনেকটা যেন রোগীকে অপারেশন টেবিলে তোলা হয়েছে, পেট কাটা হয়েছে কিন্তু কিছুতেই এবার নানান জটিলতায় পরে সেলাই দিয়ে পেট আর বন্ধ করা যায় নাই। এমন বাজে অবস্থা আর কারও হয় না। স্বভাবতই সেক্ষেত্রে তখন রোগীর জীবন চলে যাওয়ার বিপদ মাথার উপর টিকটিক করবে। নেপাল হল সেই দুর্ভাগ্যের জনগোষ্ঠি যারা প্রথমবার  কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি গঠনসভা নির্বাচিত করেও (২৮ মে ২০০৮ থেকে, ২৮ মে ২০১২ সাল সময়কালের মধ্যে) ঐ নির্ধারিত চার বছরের মধ্যে কনস্টিটিউশন মেকিং শেষ করতে পারে নাই। এদিকে সময় শেষ হয়ে যাওয়ায় কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি নিজেই আয়ু শেষ করে ভেঙ্গে যায়। ফলে পুরা জনগোষ্ঠি দেশবাসী এক লিম্ব বা ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে গিয়েছিল। এরপর উপায়ন্ত না দেখে সব রাজনৈতিক দল মিলে সুপ্রীম কোর্টের কাছে আদালতকে সাক্ষী রেখে বিশেষ পরিস্থিতি ও বিবেচনার দোহাই দিয়ে আবেদন করেছিল আর একটা সুযোগ দিতে; আর নিজ জনগোষ্ঠির কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে এবার আর ব্যর্থ হবে না। এথেকেই আর একবার কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি গঠনসভা নির্বাচনের বৈধতার ভিত্তি তৈরি করেছিল নেপাল। এটা সৌভাগ্য যে নেপাল যে সুযোগ পেয়েছিল। ফলে দ্বিতীয়বার কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি নির্বাচন হয়েছিল নভেম্বর ২০১৩ সালে। পড়শি কারও হাতে ধর্ষিত হওয়ার বা খুবলে খাওয়ার বিপদ পেরিয়ে বড় কোন ক্ষতি ছাড়াই ঐ নির্বাচন শেষে নেপাল আবার নতুন করে রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার ফেরা ও কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি্তে কনষ্টিটিউশান রচনার কাজ  শুরু করার সুযোগ পেয়েছিল। তবে  নেপালি জনগোষ্ঠির জন্য এরচেয়েও বড় সৌভাগ্য হল এবার দ্বিতীয় সুযোগে শত বাধা সত্ত্বেও (বিশেষ করে ভারতের বাধা) ‘কনষ্টিটিশন গঠন কাজ শেষ’ হয়েছে বলে সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে তারা প্রক্লেমশন জারিতে সফল  হয়েছিল। আর তা সম্ভব হওয়ার পিছনে প্রধান কারণ ছিল নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দল  (দাহালের মাওবাদী দল, আর বাকি দু দল হল,  আমাদের সিপিবির মত নির্বাচনমুখি কমিউনিস্ট দল ইউএমএল আর নেপালি কংগ্রেস) একজোটে পরস্পরের কাছে দেয়া প্রতিজ্ঞা যে তারা ভারতের কোন প্ররোচনায়  না পড়ে প্রথম সুযোগেই কনষ্টিটিউশনাল রচনার কাজ শেষ করবে। দুবছরের মধ্যে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তারা সক্ষম হয়েছিল, যদিও ভারত শেষ চেষ্টা করেছিল মাধোসি জনগোষ্ঠিকে উস্কে পরিস্থিতি নিজের পক্ষে নিতে, কনষ্টিটিউশনাল  প্রক্লেমশন জারিতে বাধা দিতে। কিন্তু সেসব কার্যকর করতে ভারত শেষে ব্যার্থ হয়। তবে নেপালে প্রদেশ কয়টা হবে, কিভাবে ৭৭টা জেলা কোন প্রদেশে কিভাবে  অন্তর্ভুক্ত হবে এটা অমীমাসিত রেখেই ঐ তিন দল কনষ্টিটিউশনাল  প্রক্লেমশন জারি করে দিয়েছিল। আর পরবর্তিতে ঐ অমীমাংসিত কাজ শেষ করা হয়েছিল।

এখন নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এর অর্থ গত দুবছরে সেসব জনগোষ্ঠিগত স্বার্থবিরোধ মিটিয়ে তারা অসমাপ্ত অংশগুলোও পুর্ণ করে ফেলেছে। এটাই নেপালে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে যাওয়ার সফলতার আসল  তাতপর্য।

এটা সাধারণ নির্বাচন, এখানে ‘সাধারণ’ শব্দটা সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ। কারণ এটা জানাচ্ছে  নেপালে কনষ্টিটিউশন রচনার কাজ পুরাটাই সমাপ্ত হয়েছে। তবে এই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুই পর্বে। কারণ এই শীতের সিজনে দুর্গম পাহাড়ে চলাচলের অসুবিধার কারণে মাঝে দুসপ্তাহের ফারাকে দুই আলাদা দিনে ভোট নেওয়া হচ্ছে।  দুই পর্বের ভোটগ্রহণের প্রথম পর্ব ২৬ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে আর দ্বিতীয় পর্ব অনুষ্ঠিত হবে ৭ ডিসেম্বর।

সাধারণভাবে বললে, নেপাল সম্পর্কে ভারতের কল্পনা হল – এটা ‘নিজের বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ি’ বা তালুক যেন। ফলে সেখানে যা হবে তা ভারতকে তার ইচ্ছাকে অমান্য করে হতে পারবে না। এই ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিয়ে এখন বাস্তব পুরোটাই উল্টেপাল্টে ভারতের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ভারতের বিদেশনীতির বিরাট পরাজয়ের আজ সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে হাজির হয়েছে নেপাল। আর এতে  ভারতের রাজনীতিক ও বিশেষ করে তার আমলা-গোয়েন্দাগোষ্ঠি যেন খোদ ভারতের স্বার্থের শত্রু।

নেপালকে ভারত নিজের বাড়ির পেছনের বাগানবাড়ি মনে করার পটভূমি হাজির হয়েছিল ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশ-ইন্ডিয়া ছেড়ে ব্রিটিশ শাসকের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে। ১৯৪৭-পূর্ব যুগে একদিকে খোদ বৃটিশ-ইন্ডিয়া আর অন্যদিকে রাজতান্ত্রিক নেপাল – দুটোই ব্রিটিশ কলোনি ছিল, তবে দুই অর্থে। আর এতে বিরাট তফাতটা হল, ১৯৩৭ সালের পর থেকে ভারতে ধীরে ধীরে নেটিভরা অন্তত স্থানীয় বা প্রাদেশিক পর্যায়ের সরকার নিজেদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অধীনে নিয়ে যেতে পেরেছিল। এর বিপরীতে নেপাল তখন নিজস্ব এক রাজতান্ত্রিক সরকার ছিল ঠিকই, কিন্তু সেটা ব্রিটিশ সরকারের সাথে চুক্তিবদ্ধ এক করদরাজ্য। নেপালের সাথে বৃটিশদের “নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি ১৯২৩”, এটাই ছিল দ্বিতীয় ও শেষ চুক্তি, যার মেয়াদ উল্লেখ ছিল ১৯৫০ সাল পর্যন্ত। যদিও সেটা নেপালের রাজাদের স্বার্থের দিক থেকে খারাপ চলছিল না, কিন্তু ব্রিটিশ শাসকেরা ১৯৪৭ সালে ভারত ত্যাগ করে চলে যাওয়ায় নেহরুর-ভারত যেন ‘নেপাল-ব্রিটিশ চুক্তি ১৯২৩’-এর ব্রিটিশ অংশের উত্তরাধিকারী হয়ে ওঠে। ফলে আগের ওই চুক্তিই এবার ১৯৫০ সালে নতুন করে, ব্রিটিশ সরকারের জায়গায় ভারতের নাম বসিয়ে ‘নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০’ নামে পুনর্লিখিত  করা হয়েছিল। সেই থেকে নেহরুর-ভারতের দৃষ্টিতে ও মনোভাবে রিপাবলিক ভারত যেন আসলে নতুন এক ‘কলোনি মাস্টার’।

সুনির্দিষ্ট করে নেপালের বেলায় বললে, নেহরুর-ভারত এমন ভাববার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিল। কারণ নেপাল ল্যান্ডলকড রাষ্ট্র। ভারতের ওপর দিয়ে ছাড়া তার বাইরে বের হওয়ার বা পণ্য আমদানি-রফতানির উপায় নেই। তিন দিকে ভারত আর উত্তরে চীন। কিন্তু চীনের দিকের অংশে তা আরো দুর্গম উঁচু পর্বতে ঢাকা ফলে পুরাটাই অগম্য এলাকা। কেবল একালে এসে রাইজিং চীন বিপুল বিনিয়োগ করে পাহাড় ডিঙিয়ে নেপালের সাথে স্থল যোগাযোগ (বিশেষ করে হাজারের দুয়েকের কিমি বেশি দীর্ঘ রেল লাইন পেতে) স্থাপনে রত হয়েছে। যদিও তা ঠিক নেপালের জন্য না, চীনের নিজের ঐ অঞ্চলও ল্যান্ডলকড, ওর বিকাশের জন্য।

রিপাবলিক ভারতরাষ্ট্র তার কোনো পড়শি বা বিদেশ-রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক করা মানেই সেটা ভারতের কলোনি বানানোর বা কলোনি-সম্পর্কের চেষ্টা করে যেতে হবে – নয়াদিল্লির এই মনোভাব, এই অনুমান ও বোধ স্বাধীন ভারত জন্ম হওয়ার সময় থেকেই। ভারতের এই অনুমান যে মারাত্মক ভুল, আত্মঘাতি, আর এর জন্য ভারতকে উলটা কাফফারা দিতে হবে, এটাই ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্রমান্বয়ে শিক্ষা পেয়ে চললেও তা থেকে কোনো শিক্ষা ভারত নিচ্ছে – এমন চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ভারতের পড়শি প্রায় সব রাষ্ট্রের সাথে একটা কলোনি সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করার যুগ যে এটা আর নয়, তা বহু আগেই ফুরিয়ে গেছে- এই শিক্ষা পেলেও তা গ্রহণ করার অবস্থায় ভারত গিয়েছে তা এখনো জানা যায়নি।

তাই ২০০৬ সালের পর থেকে ক্রমেই রাজনৈতিক পরিক্রমায় নেপালে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ হয়ে গেলে এবং যদিও তাতে ভারত নির্ধারক ভূমিকায় নেপালকে ইতি-সহায়তা দিয়েছিল তা সত্ত্বেও নেপালের এই বিরাট পরিবর্তনের তাৎপর্য কী তা ভারত কখনো ধরতে পারেনি। কারণ ভারতের রাজনীতিক ও আমলা-গোয়েন্দা এই স্টাবলিশমেন্ট-চক্র আসলে, পড়শি রাষ্ট্র-সম্পর্ক বলতে কলোনি-সম্পর্ক ছাড়া আর কিছু হতে পারে তা এখনো কল্পনা করে না। তাই এক দিকে কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেস শেষে নেপালের সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করে নিজেকে স্থিতিশীল রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হওয়া  – এটা নেপালের জন্য একটা বিরাট বিজয়। আর ভারত ততই অযথা নেপালের জন্য এক নম্বর ভিলেনের ভূমিকায় ক্রমান্বয়ে হাজির হওয়া – এটা ভারতের বিরাট পরাজয়। একালে অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব রাখার একমাত্র উপায়, ওর ওপর কলোনি সম্পর্ক চাপিয়ে দেয়া নয়, বরং এটা কাউন্টার প্রডাক্টিভ; মানে উল্টো ফল দেয়া কাজ। এটা ভারতের স্টাবলিশমেন্ট-চক্রের এন্টেনায় ধরা পড়া, হুশ  ও নতুন মুল্যায়নে আসার আগে পর্যন্ত, সে নিজেও শান্তি পাবে না, পড়শিদেরও শান্তি দিবে না।

ভিন রাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে কলোনি নয় বরং মর্যাদার সম্পর্ক হিসাবে দেখা আর একে ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে দেখে আগানো – এমন অবজেক্টিভ অ্যাপ্রোচ, এটাই অন্য রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব রাখার সবচেয়ে ভালো উপায়। তবে এই বোধের  -পানি ভারতের কানে ঢোকা – দুরঅস্ত। পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতের ‘কলোনি অ্যাপ্রোচ’ যে তার আদি সমস্যা এটা ভারত এখনো উপলব্ধি করে না। আর এখন তো ভারতের এমন বেকুবিপনার নীতির পক্ষে আরো বড় সাফাই এসে গেছে। তা হচ্ছে রাইজিং অর্থনৈতিক প্রভাবের চীন। যেমন নেপালের ক্ষেত্রেও ভারত হয়তো সাফাই দিতে চাইবে, নেপালে ভারতের এমন দুর্দশা হয়েছে চীনের প্রভাব মোকাবেলার করতে গিয়ে – এসব বাজে কথার সাফাই গাইবে। যদিও ভারতও জানে, এটা ১০০ ভাগ মিথ্যা। নেপালের বেলায় চীনের প্রভাব বা চীনকে ভারতের বিকল্প হিসেবে নেপালের নেয়া এটা একেবারেই নতুন ‘ফেনোমেনা’, মাত্র ২০১৫ সাল বা এর পর থেকে। অথচ নেপাল যেন একটা নতুন কনস্টিটিউশনের ভেতর দিয়ে নতুন করে রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করে থিতু হতে না পারে, বিশেষ করে ২০০৯ সালের পর থেকে এর সপক্ষে নেতিবাচক তৎপরতায় প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল ভারত। দু-দু’বার কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সভার নির্বাচন করতে হয়েছে নেপালকে, তবু ভারতের নেতিবাচক ভূমিকা শেষ হয়নি। অবশেষে দ্বিতীয়বারের (২০১৩) কনস্টিটিউশন প্রণয়ন সভার নির্বাচনের পর নেপালের তিন প্রধান রাজনৈতিক দল এক হয়ে ভারতের বাধা মোকাবেলায় দাঁড়িয়ে গেলে, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে রিপাবলিক নেপাল হিসেবে নতুন কনস্টিটিউশনের ঘোষণা দিতে নেপাল সক্ষম হয়। লজ্জার মাথা খেয়ে কূটনীতিতে পরাজিত ভারত ঐ ঘোষণারও বিরোধিতা করেছিল। এরপর ভারতের শেষ অবলম্বন হয়েছিল, নেপাল-ভারত সীমান্তের নেপাল অংশের সমতলভূমির বাসিন্দা মাধেসি জনগোষ্ঠীর ত্রাতা সাজার।

ভারতের মূল উদ্দেশ্য ছিল নেপালের সমতলি-পাহাড়ি স্বার্থবিরোধ যেন কোনো মীমাংসায় না পৌঁছায় – এভাবে কাজ করে গেছিল ভারত। নেপালকে কনস্টিটিউশনাল রাষ্ট্র বলে ২০১৫ সালে ঘোষণা দেয়া হলেও এর অভ্যন্তরে প্রদেশগুলো কিভাবে বিভক্ত করার কাজ অসমাপ্ত ছিল মানে, অভ্যন্তরীণ সীমানা টানার কাজ শেষ করা যায়নি। ফলে প্রাদেশিক ও স্থানীয় সরকারের নির্বাচনগুলোও এতদিন আয়োজন করাও যায়নি। বিগত দুই বছরে প্রতিটি ক্ষেত্রে ভারত বাধা দিয়ে একাজগুলো যেন শেষ না নয়, পাহাড়ি-সমতলি জনগোষ্ঠীগুলো যেন তাদের স্বার্থের ঝগড়ার ব্যাপারে আলোচনা করে কোন একটা মীমাংসায় না পৌঁছাতে পারে, এ ক্ষেত্রে নেপালকে ঠেকিয়ে রাখার সব চেষ্টা করা ছিল ভারতের কূটনৈতিক লক্ষ্য।

এই পটভূমিতে চলতি সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের তাৎপর্য হল, ভারতের সব প্রচেষ্টাকে নেপালের জনগণ পরাজিত করে বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। তারা নিজেদের সব বিতর্ক-বিবাদ নিরসন করে নেপাল নিজেকে সাত প্রদেশে ভাগ করে  ও প্রদেশ গঠন সম্পন্ন করেছে। এটা একটা বিরাট অর্জন। বিগত ২০ বছর নেপালে কোথাও (আমাদের ইউপি ও উপজেলার মত) স্থানীয় নির্বাচন হয়নি। অনেকটা, সীমানা টানা বা চিহ্নিত করা হয়নি বলে আমাদের উপজেলার নির্বাচন না করতে পারলে যেমন হত তাই। এই বছরে এসে কনস্টিটিউশনের অসমাপ্ত এসব কাজ সমাপ্ত হয়েছে। আর সব কিছুই হয়েছে ইতিবাচকভাবে। তাই বলা হচ্ছে, ২০১৭ সাল ছিল নেপালের জন্য ‘নির্বাচনের বছর’; ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় এই তিন নির্বাচনই এবছর সম্পন্ন হয়েছে। অথচ এক বছর আগেও এটা আদৌ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে কি না তা নিয়ে প্রায় সবার মনে সংশয় ছিল। কোনো আশার আলো কোথাও ছিল না। আমাদের অনুমান, নেপালের জনগণ এ জন্য সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট দেবে সম্ভবত নেপালি মাওবাদী দলের প্রধান পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্ডকে। না, এটা তার রাজনৈতিক আদর্শ ভাল কি মন্দ তা বিচার করে বলা কোন কথা নয়। নেপালের সর্বশেষ সংসদে ৬০০ আসনের মধ্যে মাওবাদীদের ছিল মাত্র ৮০ আসন। আর ওদিকে নেপালি কংগ্রেসের ছিল ১৯৬ আসন আর কমিউনিস্ট নেতা অলির ইউএমএলের ১৭৫ আসন। ফলে নেপালের প্রধান তিন দলের কারোই সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না। তবে সব মিলিয়ে একসাথে মোট আসনের কমপক্ষে ৭৫ ভাগ আসন তাদের দখলে ছিল। ফলে গত পাঁচ বছরে তিনবার এই তিন দলের তিন ধরনের কম্বিনেশনে সরকার গঠিত হয়েছিল। তবে সেটা সব সময় আগাম আপস আলোচনাতেই সম্পন্ন হয়েছিল বলে কোনো অচলাবস্থার মধ্যে তাদের যেতে হয়নি। এ ক্ষেত্রে দাহালের কৃতিত্ব হল, তিনি ছিলেন সেই আশার আলো; প্রতিটি বিবাদের ইস্যুতে সমঝোতা টানার উদ্যোক্তা।  আর বাকি দুই দল – আমাদের সিপিবি দলের মতো নির্বাচনী কমিউনিস্ট দল ইউএমএল আর নেপালি কংগ্রেস এদের ভূমিকা ছিল যে এরা নিজেদের রাজনৈতিক বিবাদের সমাধানে নিজেরা উদ্যোক্তা হতে না পারলেও দাহালের প্রদত্ত সমাধান প্রস্তাবগুলোতে সমর্থন এবং ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে তা সফল করা। বিশেষ করে ভারতের কোনো প্ররোচনার ফাঁদে বা লোভে না পড়া। অবশ্য পুরো নেপালের জনগোষ্ঠী বিশেষ করে গরিব মানুষের কাছে ভারতের কোনো ইতিবাচক ইমেজ আর নেই। কারণ, ২০১৫ সালে ভারতের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ার ‘শাস্তি’ হিসেবে ভারত একনাগাড়ে পাঁচ মাস ল্যান্ডলকড নেপালে ভারত থেকে যেকোনো পণ্য আমদানি ভারত বন্ধ করে রেখেছিল। বিশেষ করে সব ধরনের জ্বালানি আমদানি, যার ফলে কষ্ট সবচেয়ে বেশি পোহাতে হয়েছিল  নেপালের গরিব জনগণকে।

সমঝোতার সরকার হিসেবে বর্তমানে নেপালে শেষ বা তৃতীয় কোয়ালিশন চলছে  এটা নেপালি কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রিত্বের সরকার, যার পার্টনার দাহালের মাওবাদী দল। এটাই শেষ ১১ মাসের সরকার, যার আগের ১১ মাসে দাহালের প্রধানমন্ত্রিত্বে সরকার ছিল। নেপালে সাত না আটটি প্রদেশ থাকবে, কোন কোন জেলা কোন প্রদেশে থাকবে- এ বিষয়টিকে মোটা দাগে বললে প্রদেশগুলোর সীমানা নির্ধারণ ছিল স্বার্থবিরোধ বিবাদের সবচেয়ে জটিল ইস্যু। আর ভারত এই বিবাদে মাধেসিদের কান ভারী করে বিবাদ আরো বড় করে তা লাগিয়ে রেখেছিল যেন সমাধান না মেলে – এটাকেই ভারত নিজের কূটনৈতিক স্বার্থ বলে নির্ধারণ করে পথ রেখেছিল। গত ২২ মাসে নেপালের বিরাট অর্জন হল – প্রদেশ ইস্যুতে অমীমাংসিত বিরোধ মিটিয়ে এগুলোর সীমানা নির্ধারণ শেষ করা। এর পরপরই শুধু প্রাদেশিক নয়, স্থানীয় সরকারগুলোর নির্বাচন আয়োজনের সব বাধা খুলে যায়। ফলে ২০ বছর পরে এই প্রথম ২০১৭ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন হয়। এরপর দুই পর্বে প্রাদেশিক (সরকার) ও ফেডারেল (কেন্দ্রীয় সরকার)- এ দুই ক্ষেত্রে নির্বাচন এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সব মিলিয়ে এই নির্বাচনে যা হবে তা হল, নেপাল মোট ৭৭টি জেলা আর সাতটি প্রদেশে আপোষে বিভক্ত হয়ে থাকবে।

চলতি সাধারণ নির্বাচনে নেপালে সারা দেশ থেকে মোট ২৭৫ জন হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ (আমাদের ভাষায় কেন্দ্রীয় সংসদ সদস্য) নির্বাচিত হয়ে আসবেন। তারা একটি ফেডারেল সংসদ গঠন করবেন। এই সংসদের সংখ্যাগরিস্ট দলের সদস্যরা একটি কেন্দ্রীয় বা ফেডারেল সরকার গঠন করে নেবেন। এ ছাড়াও সাতটি প্রদেশে আলাদা আলাদা প্রাদেশিক সংসদ গঠনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেকাজে সাত প্রদেশে মোট প্রাদেশিক সদস্য নির্বাচিত হবেন ৫৫০ জন। নেপালের সাফল্য হল নেপাল রাষ্ট্রের ক্ষমতার তিন স্তর ফেডারেল, প্রাদেশিক ও স্থানীয় এর অমীমাংসিত অংশগুলোর সীমানা নির্ধারণ করা। আর সেই সাথে এ বছরই তিন স্তরের নির্বাচন সফলভাবে শেষ করা। ফলে এখন নেপাল দাবি করতে পারবে, সাংবিধানিক রাষ্ট্রগঠন পর্ব সফলভাবে শেষ করে সে এখন একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র। স্বভাবতই এটা নেপালের জনগণের জন্য যতটা সফলতা ও অর্জনের বিষয়, ঠিক ততটাই ভারতের সরকারের জন্য একধরনের পরাজয়ের বিষয়।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক অবস্থান নেয়ায় ভারতের নেপালনীতি আজ পরাজিত। নেপালের নির্বাচন কাভার করা ভারতের মিডিয়াগুলোর সম্পাদকীয় দেখলে বোঝা যায় যে, অন্তত তারা পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেন। আর নেপালের জনগণের কাছেও ভারত যে একটা প্রবল নেতি-শক্তি এবং নেপালের গরিব মানুষের জীবনকেও দুর্বিষহ, আরো কঠিন ও কষ্টকর করে দিতে পিছপা হয় না, তা প্রমাণিত করে গেছে। ১০ বছরেরও বেশি সময়জুড়ে নেপালের কনস্টিটিউশন মেকিং প্রসেসে ভারত এক বিরাট নেতিবাচক শক্তি হিসেবে হাজির হয়েছে, যা থেকে ভারতের জন্য পরাজয় আর নেপালি জনগণের ধিককার কুড়ানো ছাড়া কোনো অর্জন নেই। এর ফাঁকে ভারতের নেতি-রাজনীতির বিকল্প হিসেবে সুযোগ পাওয়ায় নেপালি জনগণের কাছে অনেকটা অপরিচিত চীন, আজ নেপালি জনজীবনের কষ্ট লাঘবে বহুল আকাঙ্খিত অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগকারী ‘ত্রাতা’ হয়ে উঠছে।

বিশ্লেষকেরা নির্বাচনের ফলাফলে কমিউনিস্টদেরকে আগিয়ে রাখছেন। এই নির্বাচন হচ্ছে মূলত দুই পক্ষের মধ্যে। এক পক্ষে মাওবাদী, অন্য পক্ষে কমিউনিস্ট ইউএমএল আর বাবুরাম ভট্টরায়ের নয়াশক্তি। ভট্টরায়, তিনি রাজতন্ত্র উৎখাতের সময় মাওবাদী দলের সাথে দ্বিতীয় প্রধান হিসাবে ছিলেন। এ তিন কমিউনিস্ট দলের জোট বনাম নেপালি কংগ্রেস এবং এর সাথে ছোটখাটো দলের গণতন্ত্রী জোট। এ বছরই অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলকে যদি জনগণের মন-মেজাজের ইঙ্গিত বলে আমরা মানতে চাই তবে কমিউনিস্ট জোট বিপুল ভোটে জিতবে, বলা হচ্ছে। [Based on the results of Nepal’s recently concluded local level polls, there is a better chance that the left alliance of CPN-UML and CPN (Maoist Center) will gain a majority and form the government] এ মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের আগে অবশ্য প্রকৃত ফলাফল জানা যাবে না। আমাদের অপেক্ষা করতে হবে সে পর্যন্ত।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) নেপালে নির্বাচন আয়োজনে সফলতা’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

গৌতম দাস

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

http://wp.me/p1sCvy-2hU

আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
“Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

বাংলাদেশে “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতি” মাপার ডাক্তার পাওয়া গেছে

বাংলাদেশে “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতি” মাপার ডাক্তার পাওয়া গেছে

গৌতম দাস

২২ মে ২০১৭, ০০ঃ ০৪

http://wp.me/p1sCvy-2fz

প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খান,  বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া “গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত” ব্যক্তি কিনা সেই সন্দেহ রেখেছেন। ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত’! কী দুর্দান্ত ভাষা! আর সেই বিশেষ ‘অনুভুতি’ মাপার ডাক্তার হয়েছেন মিজান। বাহ! বাহ! এটা কি রাজনীতি পর্যালোচনার ভাষা  নাকি যাকে দেখতে নারি তার চলন বাঁকা জাতীয় মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ? অথবা ‘ব্যাটলিং বেগামস’ এবং ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার ভিত্তিতে প্রথম-আলো-ডেইলি স্টার গ্রুপের এক এগারোর রাজনীতির নতুন ড্রিল? গত ১১ মে ২০১৭ তারিখে দৈনিক প্রথম আলো মিজানুর রহমান খানের ‘জিয়া-যাদু গোপন চুক্তিটি কি প্রকাশ করবেন খালেদা জিয়া?’ লেখাটি প্রকাশ করে। শিরোনামের স্টাইল খেয়াল করলেই সন্দেহ জাগে এর মতলব ভালো না। যাদু মিয়ার সঙ্গে জিয়াউর রহমান নাকি একটি গোপন চুক্তি করেছিলেন । আর এখন ১০ মেবুধবার খালেদা জিয়া তাঁর ভিশান ২০৩০ পেশ করবার পরপরই দৈনিক প্রথম আলোর একটাই বিশাল রহস্যমিশ্রিত আবদার, সেই ‘গোপন’ চুক্তি খালেদা জিয়া প্রকাশ করুক!

বিএনপি এবং ও তার নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতির যেকোন সমালোচনা পর্যালোচনা হতেই পারে। কিন্তু বলুন তো খালেদা জিয়ার মধ্যে  গণতন্ত্র মনস্ক অনুভূতিসম্পন্ন “উপলব্ধি” আছে কিনা সেটা বিচার করবার ডাক্তার কোথায় পাবেন? দ্বিতীয়ত একটি দেশ বা সমাজের রাজনীতি স্রেফ একজন ব্যক্তির উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না। যে সকল রাজনৈতিক বর্গ কেন্দ্র করে সমাজে বিভিন্ন শ্রেণি ও গোষ্ঠি নিজ নিজ ক্ষমতা  এবং নিজেদের পক্ষে রাজনৈতিক সম্মতি তৈয়ার করে তার সঙ্গে সেই বর্গটি সম্পর্কে সমাজের বিভিন্ন বয়ানের ভূমিকা থাকে। থাকবেই। সেই ক্ষেত্রে ‘গণতন্ত্র’ সম্পর্কে  যে সকল বয়ান সমাজে হাজির এবং সেই সকল বয়ান কেন্দ্র করে তর্কবিতর্ক সমালোচনা পর্যালোচনা ছাড়া জাতীয় রাজনীতির কোন গুণগত পরিবর্তন ঘটে না। তার মধ্য দিয়েই জনগণের রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনার বিকাশ ঘটে। এই গোড়ার কথা যখন আমরা মনে রাখি না, তখন হলুদ সংবাদ মাধ্যমগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার সমাধান হিসাবে ‘মাই নাস টু’ ফর্মুলা তৈয়ার এবং তা কার্যকর করবার কাজে অনায়াসেই লেগে পড়তে পারে। গত এক-এগারোর সময় এটাই আমরা দেখেছি। “মাইনাস টু” রাজনীতির মূল তত্ত্ব ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য দুইজন “ব্যাটলিং বেগাম” – অর্থাৎ খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দায়ী। অতএব করণীয় হচ্ছে এদের দুইজনকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়া। চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার অর্থ পাঠক আপনার নিজের মতো করে বুঝে নিন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দুর্দশার জন্য যখন আমাদের বিচারের মানদণ্ড খালেদা কিম্বা শেখ হাসিনার ‘গণতন্ত্রমনস্ক অনুভূতিপ্রসূত উপলব্ধি’ থাকা না থাকার বিচার হয়ে দাঁড়ায়, তখন আমরা মূলত মাইনাস টুর তত্ত্বই আর এক ভাবে আওড়াই। কিন্তু এবার সুনির্দিষ্ট ভাবে খালেদা জিয়া সম্পর্কে এই বোম্বাস্টিক বিশেষণ প্রয়োগের চেষ্টা দেখে আন্দাজ করা যায়  এবার মাইনাস-টু না সম্ভবত মাইনাস ওয়ান এটা।

যাক্‌,  তবুও বাংলাদেশে তাহলে ‘গণতন্ত্রমনস্ক’ এবং গণতন্ত্রের ‘অনুভূতি প্রসূত উপলব্ধি্র’ ধারক মহানুভব   একজন ব্যক্তি পাওয়া গিয়েছে।  বিএনপি একটা ভাল দল কীনা, ওর রাজনীতি ভাল কীনা এমন কিছু প্রমাণ মিজানুর রহমান খান করবেন আমরা তা আশা করি না। যদিও পর্যালোচনায় ভালমন্দ উভয় দিকটাই তুলে ধারা্র কথা। মুল্যায়নে বসলে বিএনপির একগাদা ত্রুটি, সীমাবদ্ধতা অনেকেই খুজে পেতেই পারেন। তবে মিজানুর রহমান খান  ব্যক্তিগতভাবে একজন বাকশাল-প্রেমি ও ‘বাঙালী জাতীবাদ”-প্রেমিও তিনি বটে। যদিও তাতেও আমাদের সমস্যা নাই।   কিন্তু সমস্যা হয় তখন যখন চরম প্রিজুডিস বা নিজের বাকশালপ্রীতি ও সাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিবাদকে পাশে সরিয়ে না রেখে উলটা তা দিয়েই  রাজনীতির মুল্যায়ন করতে বসেন। সেটা দৈনিক প্রথম আলোর মতো তথিকথিত সাংবাদিকতার আড়ালে মূলত ‘বাকশালী’ অপপ্রচারের অধিক কিছু হয়ে ওঠে না।

কোন রাজনীতি বা রাষ্ট্রের ভালমন্দ বিচার করবেন কী দিয়ে? সে বিচার কাজে ক্রুশিয়াল বৈশিষ্টগুলো কী কী ?  সেগুলো জেনে রাখার বদলে নিজের বাকশালপ্রীতির উপর ভরসা করে বিচারে বসলে তাতে সেটা ঘোরতর অন্ধ দলবাজীই হবে। প্রথম আলোতে প্রকাশ্যে ঘোষিত মিজানসহ তিনজন বাকশাল সমর্থককে এডিটর আমরা দেখে থাকি।  বিশেষ করে মিজানের লেখায়, যেমন আলোচ্য এই কলামের শিরোনাম পড়ে যেকারও মনে হবে পাপীতাপী বিএনপির বিরাট এক গোপন দুর্বলতা সামনে নিয়ে এসে মিজান কথা বলছেন। তাই কী? আসেন তাহলে দেখা যাক!

বাংলাদেশের ‘প্রগতিশীলরা’ কেউ কোনদিন শেখ মুজিবের বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীর কোন রিভিউ, সমালোচনা করেছেন জানা যায় না। তবু অনেকের মনে পড়বে হয়ত, একদলীয় শাসন অথবা মাত্র চারটি সংবাদপত্র ইত্যাদির কথা। কিন্তু এগুলো সেই সংশোধনী কার্যকর করার মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের যে  বৈশিষ্ট্যগত  ত্রুটি ঘটেছে তার আসল বিচার নয়। অর্থাৎ কনষ্টিটিউশানাল বা রাষ্ট্রের গঠনতান্ত্রিক সমালোচনা নয়। অথচ মিজানুর রহমান খান অনবরত নিজেকে মহা সংবিধান বিশারদ জ্ঞান করে আমাদের আলোকিত করে থাকেন!

গঠন প্রক্রিয়া কিম্বা বৈশিষ্ট্য কোন দিক থেকেই বাহাত্তরের সংবিধানের ওপর ভিত্তি করে গড়া বাংলাদেশ রাষ্ট্র আদর্শ মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। সেটা ইতিহাসের ফলাফল, আমরা তা মেনে নিয়ে যতটুকু পেয়েছিলাম তাই নিয়ে অনেকদূর এগিয়ে যেতে পারতাম। সেই ক্ষেত্রে তার যতটুকু ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য আছে তা অক্ষুণ্ণ রাখাই ছিল প্রধান কাজ। কিন্তু বাকশাল সংশোধনীর ফলে এরপরের বাংলাদেশ আর কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র নয় বরং এক  দানব বা স্বৈরশাসন আনয়নকারি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনস্টিটিউশন বদলানোর ফলে সেই দানবীয় চরিত্র  কিভাবে ঘটেছে তা নিয়ে খুব কমই পর্যালোচনা দেখা যায়।  তবু বাকশালী মিজানুর রহমান খানের একটা সহজ ফর্মুলা হল অপ্রাসঙ্গিকভাবে জিয়াউর রহমানকে গালি গালাজ করা। বাকশাল সম্পর্কে টুঁ শব্দ না করে সারাক্ষণ সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গালমন্দ পাড়া। সব সমস্যার কারণ হিসাবে সামরিক শাসনকে দেখানো। সামরিক  শাসন সামরিকতন্ত্র খারাপ, অবশ্যই। কিন্তু বাকশালকে মহৎ প্রমাণ  করবার সুবিধা না পেয়ে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান কতো খারাপ ছিলেন সেটা প্রমাণ করে বাকশালের মহিমা গোপনে জারি রাখাই বাংলাদেশের নব্য বাকশালিদের কাজ। মিজানুর রহমানকে তাদের সর্দার বলা যায়। সেটা বাকশালিদের পক্ষে সহজ হয়েছে কারণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি বুদ্ধিজ্ঞানহীন বোকাদের দল, যারা নব্য বাকশালিদের রাজনীতি মোকাবিলা করবার ন্যূনতম হিম্মত রাখে না।

মিজান তাঁর লিখায় নিজেকে বারবার   রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক ক্ষমতা পুঞ্জীভুত করার বিরুদ্ধে সোচ্চার ব্যক্তিত্ব হিসাবে তুলে ধরেন।  কিন্তু আজীব ব্যাপার হল, আমাদের সংবিধানে সর্বপ্রথম যে সংশোধনীতে রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে প্রায় সব ধরণের ক্ষমতা সঞ্চিত করা হয়েছিল সেটা বাকশাল চতুর্থ সংশোধনী। তা সত্ত্বেও এই সংশোধনীর বিরুদ্ধে মিজানুরের কলম জাগে না। বরং তিনি কথিত ‘গোপন চুক্তি’ বলে এক রহস্য তৈরি করতে গিয়েছেন, ১১ মে এর ঐ কলামে। কথিত সেই গোপন চুক্তি নাকি অপ্রকাশিত, মিজান জানাচ্ছেন। কিন্তু অপ্রকাশিত হলেও মিজানুর আবার এর পুরাটা জানেন ও এবং সেটা তার আবার মুখস্থ। তাঁর কথিত মতে, শেখ মুজিবের বাকশালী সংশোধনীতে প্রেসিডেন্টের হাতে সীমাহীন যে একক ক্ষমতা দিয়ে রেখেছিলেন, জিয়া নাকি এরচেয়েও আরও ক্ষমতা চেয়েছিলেন। যদিও মিজান নিজেই জানাচ্ছেন জিয়া শেষে এমন ক্ষমতা নেনই নাই। সেই না নেওয়ার দলিলই হল মিজান কথিত যাদু মিয়ার সাথে ‘গোপন চুক্তি’। তাহলে  সেক্ষেত্রে কথিত সেই দলিল বলে যদি কিছু আদৌ থেকেও থাকে তবে তা  বিএনপি বা জিয়ার কোন কলঙ্কের দলিল হয় কেমন করে? কিন্তু তবু মিজানুর রহমান খানের দাবি কথিত ঐ গোপন দলিল ‘কলঙ্কিত’ এবং তা “খালেদা জিয়াকেই প্রকাশ করতে হবে”।

মিজানুরের চরম বিনোদনমূলক তামাসাটা হল, তিনিই বলছেন ঐ গোপন দলিল আসলে জিয়াউর রহমানের বাড়তি ক্ষমতা না নেওয়ার দলিল বা রাজনীতিবিদ যাদু মিয়ার সাথে  “সন্ধি-পত্র”  – অথচ এই কথিত চুক্তি নিয়ে রহস্য সৃষ্টি  আর জিয়া এবং  বিএনপিকে ‘পাপীতাপী’ ‘অভিশপ্ত’ বলে ইঙ্গিত তৈরি করছেন তিনি। এই সুযোগ মিজানুর কোথায় পাচ্ছেন? বরং মিজানুর যদি সত্যি সত্যি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের হাতে একক সীমাহীন ক্ষমতা সঞ্চিত করার বিরুদ্ধের সোচ্চার প্রবক্তা হতে চান তবে সেক্ষেত্রে শেখ মুজিবের এবং বাকশাল সংশোধনীর কঠোর সমালোচনা দিয়েই তাকে শুরু করতেই হবে। এক্ষেত্রে যদি তার প্রগতিশীলতা-বোধ, বাঙালী জাতিয়তাবোধ কিংবা বাকশালপ্রীতি বাধা হয়ে দাড়ায় তবে তা তাকেই পেরিয়ে আসতে হবে। এপর্যন্ত যা তিনি কখনও পেরেছেন আমরা দেখিনি।

এই প্রসঙ্গে বলে নেয়া যায় যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রগঠনের ইতিহাস বিচারে – বিশেষত কনষ্টিটিউশনের চতুর্থ সংশোধনী কী কী কারণে কালোদাগের এবং ক্ষতিকর এমন কোন একাদেমিক মুল্যায়ন আমরা ‘প্রগতিশীলদের’ ঘর থেকে বের হয়েছে দেখি নাই। রাজনৈতিক দলগুলোর পরিসরেও এবিষয়ে আর যা দেখা যায় সেগুলোকে বড়জোর পার্টিজান বা দলকানাদের সমালোচনা। এই অবস্থায় বাকশালের আসল মুল্যায়ন হল – এককথায় বললে – এই সংশোধনী্র মধ্য দিয়ে আসলে বাংলাদেশ  রাষ্ট্রের খোদ কনষ্টিটিউশনকেই নাই করে দেয়া হয়েছে।  সোজা কথায় ভাঙাচোরা হোক বাহাত্তরের সংবিধানের মধ্য দিয়ে একটা রাষ্ট্র বানানো গঠন হয়েছিল, আর সেটাকেই বাকশালী চতুর্থ সংশোধনী পুরাটাই ভেঙ্গে দিয়েছিল। চতুর্থ সংশোধনী এই অর্থে রাষ্ট্র নিরাকরণের একটি ঐতিহাসিক দলিল, যে অভিজ্ঞতা থেকে বারবার আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। রাষ্ট্র নাই অবস্থার মধ্যে ফেলে দেওয়ার দলিল এটা।

কেন? এর মূল কারণ এই সংশোধনীতে রাষ্ট্রের  নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে নাগরিকের আদালতে  রিট করার ক্ষমতা [আর্টিকেল ৪৪] কেড়ে নেয়া হয়েছিল। শুধু তাই না, জুডিশিয়ারির বা আদালতের রিট শোনার যে আলাদা নিজস্ব ক্ষমতা দেয়া ছিল [আর্টিকেল ১০২ (১)] সেটাও চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল করে দেয়া হয়েছিল। [চতুর্থ সংশোধনীর পিডিএফ কপিতে এখানে দেখুন, সংশোধনীর ইংরাজী অংশে প্রথম পাতায় ৩ নম্বর সংশোধনী আর ১৭ নম্বর সংশোধনী দেখুন হলুদ মার্কার দেয়া আছে।।] আর প্রেসিডেণ্ট জিয়ার সামরিক অধ্যেদেশ বলেই, আবার বলছি ১৯৭৬ সালের সামরিক অধ্যাদেশ বলেই  ঐ বাকশাল চতুর্থ সংশোধনীতে বাতিল হওয়া [আর্টিকেল ৪৪] এবং [আর্টিকেল ১০২ (১)]  ফেরত নিয়ে আসেন। একথার সবচেয়ে ভাল প্রমাণ এবং কথাগুলো সবচেয়ে সহজে স্পষ্ট বুঝা যায় কনষ্টুটিটিশনের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের আপিল কোর্টের রায়ে। ঐ রায় ১৮৪ পৃষ্টার। ঐ রায়ে পঞ্চম সংশোধনী বাতিল বলে জানানো হলেও একই সাথে পঞ্চম সংশোধনীর যেসব অংশ বাতিল হবে না, বরং ধারাবাহিকতা বজায় রেখে জীবিত থাকবে সেসবের একটা তালিকা দেয়া আছে ওর ১৮৩ পৃষ্ঠায়। সেখানে লেখা আছে জিয়ার আনা সংশোধনীর কথা। [দেখুন পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের রায়, আপিল কোর্ট জাজমেন্ট ২০১০,  ১৮৩ পৃষ্ঠায় 3e এর (iii, iv & v)]    শেখ মুজিবের চতুর্থ সংশোধনীর ফলে এভাবেই প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতার দানব বানিয়েছিল, এর বিরুদ্ধে আদালতে কোন প্রতিকার চাইবার সুযোগ ছিল না। ফলে বাংলাদেশ  আর কোন প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে নাই। যে রাষ্ট্রে রিট করার সুযোগ নাই, সেটা আর রিপাবলিক রাষ্ট্র থাকে না। এই দিকটা নিয়ে কোন জজ-উকিল বা কোন রাজনীতিবিদকে আমরা পয়েন্ট তুলতে শুনি নাই। এটাও এখন প্রমাণিত যে রাষ্ট্রগঠনের প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রের গঠনতন্ত্র বা কনষ্টিটিউশনের ভাল-মন্দ বিচার কী করে করব, কী করে এটা কাজ করে তা বুঝার ক্ষেত্রেও আমরা এখনও যথেষ্ট লায়েক হই নাই। এখনও কেবল দলবাজি আর প্রগতিশীলতার ভাণ ও ভণ্ডামির মধ্যে আটকে আছি। অথচ আমরা আবার আওয়ামি লীগ বা বিএনপির এবং রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট বুঝার বিচারক হতে চাচ্ছি।

‘৭৫ পরবর্তি সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতা
মিজানুর রহমান খানের আর এক প্রবল পছন্দের বয়ান হল ‘৭৫ পরবর্তি সামরিক-বেসামরিক ক্ষমতার’ তুলনা। এটাতে  তাঁর চিন্তা করার কাঠামোটাও ধরা পরে। অবশ্য এটা তাঁর একার না, বাকশালের পক্ষে সাফাই যারাই দেন তাদের সাধারণ বয়ান এটা। মিজান সে বয়ান পরিপাটি করেন মাত্র। এই বয়ান দিয়ে তিনি বলতে চান বাকশাল দানব ক্ষমতার রাষ্ট্র তৈরি করলেও যেহেতু এটা বেসামরিক শাসন, আর বেসামরিক শাসন মানেই বৈধ শাসন, তাই দানব বাকশাল হলেও এটা বৈধ, ফলে গ্রহণীয়। আর তাই বিপরীত যুক্তিতে সামরিক শাসন অবৈধ। দারুন বাকশালী যুক্তি। বিএপির বিরুদ্ধে এটাই  প্রধান বাকশালী অস্ত্র, কিন্তু বিএনপির সুবিধাভোগী বুদ্ধিজীবীরা এই বাকশালী কৌশলের মর্ম ধরতে পারে না বলে এর কোন উত্তর দেবার হিম্মত দেখাতে পারে না।

আসলে এভাবে বৈধ-অবৈধ এর ভাগাভাগির লাইন টানা – এটা নগ্ন  শঠতা। মিজান বলতে চান বাকশাল সংশোধনীর ভিতরে যত খারাপ কিছুই থাক তবু এটা বৈধ কারণ তা সিভিলিয়ান ক্ষমতা। এটাই শঠতা। উপরে দেখিয়েছি, কনষ্টিটিউশনে চতুর্থ সংশোধনী এনে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের কোন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পেতে চাইলে কোন নাগরিকের আইনিভাবে আদালতে নালিশ জানাতে যাবার সুযোগ কেড়ে নেয়া হয়েছে। ফলে এরপরের বাংলাদেশ, এটা দেখতে তখনও একই দেশ বা আধুনিক রাষ্ট্র মনে হলেও কার্যত এটা আর তখন মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। এটা আসলে নির্বাহী প্রেসিডেন্ট – নামে “এক সম্রাটের  প্রি-রিপাবলিক বাংলাদেশ” হয়ে গেছিল। আমি নিশ্চিত মিজানসহ কোন ‘প্রগতিশীল’, ‘বাঙালী জাতিবাদীর” চিন্তায় এটা ধরা পড়বে না। এভাবে তারা চিন্তা করে দেখতে অভ্যস্ত নয়। এমনকি বিএনপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও নয়। বেসামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সামরিক শাসন মানেই মন্দ গল্প তারা বাকশালিদের কাছ থেকে ভালোই হজম করে। হয়তো নীরবে মেনেও নেয়।  চতুর্থ সংশোধনী যেখানে রাষ্ট্রের রিপাবলিক বৈশিষ্টই নষ্ট করে দেয় এরপর সেই বাকশালী রাষ্ট্রটা বৈধ নাকি অবৈধ –  সামরিক নাকি বেসামরিক – সেটা  কী আর কোন তর্ক? কিন্তু মিজান মার্কা এই বাকশালী মিথ্যা আর চাতুর্য প্রপাগান্ডার তোড়ে বিএনপিই  ঘায়েল হয়ে গিয়েছে। কারণ রিপাবলিক রাষ্ট্রের ‘গণতান্ত্রিক’ বৈশিষ্ট্য সুরক্ষা বিএনপির রাজনীতি নয়। এর ফলে তারা জিয়াউর রহমানকেও স্রেফ একজন সামরিক শাসকের বেশী বুঝতে অক্ষম। অথচ বাকশালী রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব আসলে আমাদেরই এক ঐতিহাসিক অনিবার্যতায়, “পোস্ট-বাকশাল পরিস্থিতিতে আবার ট্রাকে উঠার উদ্যোগ” এটা বোঝার ক্ষমতা বিএনপির বুদ্ধিজীবীদের নাই।

এমনিতেই বৈধ-অবৈধের তর্ক আর এই ক্রাইটেরিয়া দিয়ে রাষ্ট্রের ভাল-মন্দ বিষয়কে বুঝার চেষ্টা একটা খুবই নাবালকের কাজ। মনে রাখতে হবে একটা কালাকানুন বা কালো আইন – চরম দমনমূলক ও নিপীড়ন আইন হলেও সেটা বিদ্যমান সংবিধানের কারণে  ‘বৈধ’ আইন হতে পারে; কোন অসুবিধা ছাড়াই।  তাই, এই বৈধ-অবৈধ জাতীয় শঠ প্রশ্ন তুলে বাকশালের কুকীর্তি আড়াল করে বলেই মিজানুর রহমান খানকে বাকশালের দলবাজ সমর্থক বলছি।

আবার বিপরীতে সেসময়ের জিয়ার সামরিক ক্ষমতা সেটাও সামরিক নাকি বেসামরিক সেবিচারে যাওয়াও একেবারেই অপ্রয়োজনীয়। কারণ সেটা যাই হোক না কেন সেসময়ের ঐ ক্ষমতাটা ছিল এক অন্তর্বর্তী ধরণের ক্ষমতা মাত্র। এটাই ঐ ক্ষমতার মূল বৈশিষ্ট। আর ওর ভাল মন্দ নির্ধারিত হবে নতুন যে ক্ষমতা কাঠামো সে তৈরি করবে বা হবে ওর গ্রহণযোগ্যতা দিয়ে। তাতে যারা নির্বাচিত হয়ে নতুন ক্ষমতায় আসবেন সেসব অনেক কিছুর গ্রহনযোগ্যতার উপরে। আর প্রি-কনষ্টিটিউশনাল সরকার মাত্রই অন্তর্বর্তী সরকার। বাকশাল করে রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা এবং  শেখ মুজিব খুন হবার পর যা আমরা পেয়েছি তাতে সেটা আবার একটা প্রজাতান্ত্রিক কনষ্টিটিউশনের ফিরে যাবার আগের অন্তবর্তী অবস্থা।

তবু মিজানুরের মনে হতে পারে যে না, “ক্যান্টনমেন্টে বসে” যারা দল বানালো তাদেরকে হাতে নাতে ধরার একটা সুযোগ হাতছাড়া হতে দেয়া যায় না। ওকে নো প্রবলেম, আসুন মিজান তাহলে এবার আপনারই বিচার করি। ১/১১ এর সরকার কী সামরিক সরকার ছিল না? আর এই সামরিক সরকারের সাথে খোদ আপনি মিজান আর আপনার বস  মতি-মাহফুজদের  সম্পর্ক কী ছিল তা  নিজেকে জিজ্ঞাসা করে নিবেন? আপনি মিজান কী তখন সে কালের “ক্যান্টনমেন্টে বসে” রাষ্ট্রের রাজনৈতিক সংস্কারের নামে মহৎ কাজে  লিপ্ত হন নাই? ঐ কাজ আর ঐ সামরিক সরকার কী “বৈধ” হয়ে গেছিল আপনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন বলে?   আরও ভিতরে যাবেন?  আসেন!
১/১১ এর ক্ষমতায় ইচ্ছামত যা মনে চায় করে যে রাজনৈতিক সংস্কার আপনারা করেছিলেন – কী তার পরিণতি? বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা ও এর কাঠামো এমন কিছু অথবা কী ছাপ আপনারা রেখে গেছিলেন যার সুফল এই আট বছরের হাসিনা সরকারের থেকে আমরা পাচ্ছি? বলেন, কোনটা  আপনাদের অবদান? কোন সে সুফল? আপনাদের সংস্কারের ফসল কী খোদ হাসিনার শাসনটাই নয়? নিঃসন্দেহে এখন কোন দায়ই নিতে চাইবেন না, আপনি। আমরা জানি। কিন্তু ইতিহাস সবাইকে একদিন না একদিন জবাবদিহি করতে বাধ্য করে। আপনারাও ব্যতিক্রম নন।

কনষ্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ
মিজান আর এক বিরাট অভিযোগ করেছেন প্রায়ই করেন, “সংবিধানের সবচেয়ে বিতর্কিত ৭০ অনুচ্ছেদ, যা পার্লামেন্টকে একটি রাবার স্ট্যাম্প এবং প্রধানমন্ত্রী বা সংসদ নেত্রীর বশংবদ করে রেখেছে,সে বিষয়ে তিনি (খালেদা জিয়া) একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি”।  তিনি এটা প্রায়ই বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া আর এর রাজনৈতিক নেতাদের গায়ে কালি লাগায় দিবার জন্য করে থাকেন।  তো মিজানের এই কথা পড়লে সকলেরই মনে হবে হা, তাই তো!  মিজান এই মোক্ষম জায়গায় ধরেছেন। হা, অবশ্যই এক মোক্ষম জায়গা। কিন্তু মিজান কাকে ধরেছেন? খালেদা জিয়া? নাকি এখানে অনুল্লেখ থাকা শেখ হাসিনাকে? মোটেও না। মিজান আসলে ধরেছে নিজেকেই।  বাইরের মানুষ – হাসিনা, খালেদাকে দোষারোপের আগে মিজান আপনি নিজেকে কাঠগড়ায় তুলার হিম্মত দেখান। পারবে্ন?
যতদিন মিজানুরসহ মতি-মাহফুজের মিডিয়া গ্রুপের মত লোকের সক্রিয় সমর্থনে, ১/১১ ঘটবার সম্ভাবনা আর বিশেষ করে বিদেশী স্বার্থে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এসব গ্রুপের লোকেদেরকে ব্যবহারে ভাড়া খাটা মিজানুর রহমান খানেরা লুপ্ত না হবেন ততদিন বাংলাদেশের কনষ্টিটিউশনের ৭০ অনুচ্ছেদ থাকতে থাকবে। কারণ এই ৭০ অনুচ্ছেদই বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবজ। মিজানদের মত লোকেদের হাত থেকে বাঁচবার জন্য হাসিনা-খালেদাদের কিছু রক্ষাকবজ। আমরা বরং  মিজানের এসব স্বীকার করার সৎসাহস দেখতে চাইতে পারি। হাসিনা খালেদারা খারাপ রাজনীতির ধারক বাহক, এটা কে না জানে, এতে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু এখান থেকে বের হতে, তা পরিস্কার করতে, পালটা রাজনৈতিক প্রক্রিয়া লাগবে। বিদেশী স্বার্থে সংস্কারের নামে পরাশক্তির  স্বার্থরক্ষা নয়। এই স্বার্থ রক্ষার্থে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে কলঙ্কের দাগ দেখিয়ে নয়।

মিজান আরও অভিযোগ তুলেছেন, বিএনপির গঠনতন্ত্রও দলের প্রেসিডেন্টের হাতে সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা আছে, আর সেজন্য খালেদা জিয়াকে দায়ী করেছেন। ফলে এরও সংস্কার দাবি করেছেন তিনি। মিজান নিশ্চয় ভুলে যান নাই – মান্নান ভুঁইয়াকে দিয়ে কীভাবে বাধ্য করে সংস্কার ধারার বিএনপি তৈরি করা হয়েছিল। খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে বেচারা দেলোয়ার হোসেনকে  কিভাবে ছেঁচা  দেয়া হয়েছিল, এর কষ্ট মৃত দেলোয়ার হোসেনই জানতেন। তবু তার গৌরব, তিনি পতাকা ছাড়েন নাই। শামসুল হুদার ভুঁইফোড়  নির্বাচন কমিশন কোনটা “আসল বিএনপি” সেই রায় দিয়েছিল। আর পরে তিনি নিজেই তার এই কাজ অন্যায় হয়েছে বলে স্বীকার করে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।  এটা যেন আমরা কেউ না ভুলি। তাহলে দাঁড়াল এই যতদিন বিদেশী স্বার্থে আপনি মিজান ও আপনাদের পত্রিকা  বাইরে থেকে ইচ্ছামত কোনটা বৈধ দল, কোনটা বিএনপি ঠিক করতে থাকবেন, সে সম্ভাবনা থাকবে, ততদিন হাসিনা-খালেদা কনস্টিটিউশানে ৭০ অনুচ্ছেদ রাখবে এবং অবশ্যই রাখবেন। ‘গণতন্ত্র’ শিখাতে আসবেন না। মনে রাখবেন, হাসিনা বা খালেদা সেসব কম বুঝে না। তাঁরা দলের সব ক্ষমতা সভাপতি হিসাবে অবশ্যই নিজের হাতেই রাখবেন। কোনটা আওয়ামী লীগ আর কোনটা বিএনপি এটা যদি বিদেশীরা নির্ধারণ করতে থাকে তবে এমন ব্যবস্থা ও সুযোগ যতদিন থাকবে ততদিন এই শকুনি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে  হাসিনা-খালেদার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদের পক্ষে থাকা এটাই সবচেয়ে স্বাভাবিক অবস্থান। দুনিয়ার হুঁশজ্ঞান ওয়ালা মানুষ মাত্রই এটাই করবে।  তাই বাইরে  অন্যদের দিকে না, সৎসাহসে নিজের দিকে তাকান। নিজেকেই কাঠগড়ায় দেখতে পাবেন।

অতএব, কনষ্টিটুশনে ৭০ অনুচ্ছেদ থাকার জন্য আপনারা মিজানেরাই মূলত দায়ী। নিজেরা যা করেছিলেন এর রিভিউ করেন, আবেদন করি ভাল হয়ে যান আগে। এরপর ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে আপত্তি তুলেন।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গতকাল ২১ মে দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। তবে সেটা খুবই সংক্ষিপ্ত ভার্সান; চল্লিশ ভাগ ফেলে ষাট ভাগ ছাপা ভার্সান বলা যায়। এছাড়া  অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও আর এক ভার্সান ছাপা হয়েছে আজ ২২ মে ২০১৭, তাতে অনেকাংশেই পুর্ণ ভার্সান সেটা। কিন্তু তবু ফুল ভার্সান নয়। এখানে আরও বহু সংযোজন ও এডিটের পর সর্বশেষ ভার্সান এটাই।  ]

দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের আদি কথা

দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী আদিত্যনাথের আদি কথা

গৌতম দাস

মার্চ ২৪, ২০১৭ ভোর ছয়টা

http://wp.me/p1sCvy-2dU

 

 

জন্মের সময় থেকে ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক ভিত্তি হিন্দুত্ব। ভারত রাষ্ট্রের প্রদেশগুলো যেগুলোকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্য বলে। এগুলাকে আমরা রাজ্য সরকার পরিচালিত প্রদেশ বলে চিনতে পারি। এমন সম্ভবত প্রায় ২৯টা রাজ্য নিয়েই এখনকার ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নামের রাষ্ট্র গঠিত। এই রাষ্ট্রের জন্ম বা গঠনের সময় এর সংগঠকেরা চিন্তাভাবনা করতেই পারেনি যে, এই রাজ্যগুলোকে একজায়গায় বেঁধে ভারত বানিয়ে রাখার সেই সুপার গ্লুটা ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে।  এককথায় বললে এটা হিন্দু (জাতীয়তা) আইডেনটিটির উপর দাঁড়ানো বা আইডেনটিটি পলিটিকসের উপর দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র হয়ে আছে। কোন সমাজের সকলে অন্তর্ভুক্ত কোন ‘পলিটিক্যাল কমিউনিটি’ এর এক সাম্যের রাষ্ট্র ‘রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া’ নয়। যদিও মুখে এতটুকু বলা হয়েছিল এটা রিপাবলিক বা হিন্দিতে ‘সাধারণতন্ত্র’ হবে। ফলে হিন্দুত্ব ছাড়া অন্য কোন কিছুর উপর তাদের নিজেদের কোন আস্থাই ছিল না। তাই বাস্তবে ও কাজে হিন্দুত্বের গ্লু-এর ভরসা ছাড়া অন্য কিছু বোঝেনি।

রিপাবলিক রাষ্ট্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য- নাগরিক সাম্য ও মানবিক অধিকার, মর্যাদা অথবা এককথায় ইগালেটারিয়ান রাষ্ট্র গড়তে হবে। কিন্তু এসব বানাবার বিষয়গুলো রাষ্ট্র গঠনের কর্তারা পড়েছে হয়ত তবে তাত্ত্বিক কথার কথা হয়েই বইতে রয়ে গেছে। আর বাস্তব কাজে এরা ভরসা মেনেছে ‘হিন্দুত্ব’-এর জাতিবাদ। আর তত্ত্বকথার উপর ইমান কম বলে বাস্তবে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে বাড়তি এক কথা আনতে হয়েছিল তাদের। যদিও আরও অনেক পরে ‘সেকুলারিজম’ বলে বাড়তি আরও এক অর্থহীন কথা এনেছিল। দুটোই চাপাবাজির অর্থহীন শব্দ। রিপাবলিক রাষ্ট্রের তিন মৌলিক বৈশিষ্ঠের অর্থ তাতপর্য বুঝলে ও বাস্তবায়ন করলে তো আর এই দুই ফালতু শব্দের (‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘সেকুলারিজম’ ) দরকার দেখা যেত না। ইগালেটারিয়ান রাষ্ট্র নয় বলেই মুসলমানেরা হিন্দুদের মত সমান নয় বলেই মুসলমানদের সে প্রশ্ন চাপা দিতে বাড়তি এবং অর্থহীন ‘অসাম্প্রদায়িক’ ও ‘সেকুলারিজম’ শব্দ দু্যটো আনা হয়েছে। এই হল হিন্দুত্বের ভারত। এই হিন্দুত্বের ভারতে আবার দুই প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও বিজেপি যাদের কারও হিন্দুত্ব নিয়ে কোনো আপত্তি বা সমস্যা নেই, বরং তারা কোনো সমস্যাই দেখে না। তবে ফারাক হল কংগ্রেস মনে করে ‘হিন্দুত্ব’ কথাটা বা এই পরিচয়টা লুকাতে সেকুলার জামার আড়াল নেওয়া উচিত। আর বিপরীতে বিজেপি মনে করে এই হিন্দুত্ব পরিচয়ের লুকোছাপার ‘দরকার কী’ । বরং বুক ফুলিয়ে বলতে পারলে ভিন্ন লাভ আছে, ভোট বেশি পাওয়া যাবে। এই ভাবেই চলে ভারতের রাজনীতি, চলে আসছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে মোদির বিজেপি প্রথম একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসে। এর আগে ১৯৯৮-২০০৪ আমলে বিজেপির বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী থাকলেও সেটা ছিল এক কোয়ালিশন, এনডিএ-এর সরকার। তাই বিজেপির প্রথম একক দলীয় সংখ্যাগরিষ্ট বা একার তৈরি সরকার হল ২০১৪ সালেরটা।  তবুও ২০১৪ সালের বিরাট এক মোদি-জ্বর সৃষ্টি করতে পারলেও মোদি নিশ্চিত ছিলেন না যে হিন্দুত্বকেই খোলাখুলি এবং একমাত্র নির্বাচনী বয়ান করা ঠিক হবে কিনা। মোদি সরকারের প্রায় তিন বছরের মাথায় উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী ফলাফল আসার পরে মোদি এই প্রথম এখন নিশ্চিত যে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ‘হিন্দুত্বই’ হবে বিজেপির একমাত্র মূল মন্ত্র। এখন কেন?

কারণ সদ্যসমাপ্ত ভারতের সবচেয়ে বড় আসনের রাজ্য উত্তর প্রদেশ নির্বাচনে বিজেপির প্রায় ৭৮ ভাগ আসন (৩১২/৪০৩) পেয়ে জয়লাভ করেছে। এর সাথে অবশ্য অন্য চার রাজ্যের নির্বাচনও হয়েছে। আর সেগুলোর ফলাফলে এক পাঞ্জাব ছাড়া অন্য তিন রাজ্যে কোয়ালিশনে হলেও বিজেপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। উত্তর প্রদেশের ফলাফল বিজেপির বিপুল বিজয় এসেছে কথা সত্য; কিন্তু এর তাৎপর্য ছাপিয়ে আরও বড় বিষয় হলো বিজেপির টিকেটে বিজয়ী ওই ৩১২ রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের সবাইকে ফেলে, এক কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করা হয়েছে। কে এই যোগী আদিত্যনাথ?

তার আসল নাম ছিল অজয় সিং বিসত। উত্তর প্রদেশের গোরক্ষনাথ জেলায় প্রাচীন নাথপন্থীদের এক মঠ-মন্দির আছে। কালক্রমে ব্রিটিশ আমলেই এটা ‘হিন্দু মহাসভার’ এক আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। সেই মঠের প্রধান পুরোহিত ও হিন্দু মহাসভা নেতা ছিলেন মোহান্ত অবৈদ্যনাথ। এছাড়া বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে মন্দির নির্মাণ আন্দোলনের রাজনীতিতে ১৯৪৯ সালের নেতা হলেন এই মোহান্ত। অজয় সিং গুরু মোহান্তের শিষ্যত্ব নিয়ে তাকে পিতা ডাকেন আর নিজে এক নতুন নাম নেন – যোগী আদিত্যনাথ। হিন্দু মহাসভা হলো বিজেপিরও পেরেন্ট সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের আগের নাম। সে সময় হিন্দু মহাসভা নামের সংগঠন একইসঙ্গে হিন্দু ধর্মতাত্ত্বিক সাংগঠনিক তৎপরতা আর হিন্দু রাজনৈতিক সাংগঠনিক তৎপরতা দুটাই একই নামে চালাত। পরে ধর্মতাত্ত্বিকসহ সব ততপরতার মূল সংগঠন হয় আরএসএস। আর ১৯৮০ সালে রাজনৈতিক ক্ষমতার আলাদা সংগঠন হয়  বিজেপি। যদিও  হিন্দু মহাসভার গান্ধী হত্যায় দায় ঘাড়ে এসে পড়ায় গুরুত্বপুর্ব সদস্যরা ১৯৫১ সাল থেকেই হিন্দু মহাসভা ত্যাগ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। গত ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে এই মঠগুরু, আরএসএস ও বিজেপি ইত্যাকার সংশ্লিষ্ট সকলে ‘হিন্দু কর সেবক’ এই কমন নামে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের তৎপরতায় সামিল হয়েছিলেন। যোগী আদিত্যনাথের গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ আগে হিন্দু মহাসভা থেকেই নির্বাচিত এমপি হতেন। সেবার ১৯৯১ সালের নির্বাচন থেকে তিনি বিজেপি থেকে নির্বাচনে এমপি হয়েছিলেন। আর এরপর তিনি ১৯৯৪ সালেই তরুণ শিষ্য যোগী আদিত্যনাথকে আনুষ্ঠানিকভাবে গোরক্ষনাথ মঠের মোহান্ত বা প্রধান পুরোহিত হিসেবে নিজের স্থানে প্রতিষ্ঠা করে দিয়ে যান। আর ১৯৯৮ সালের নির্বাচন থেকেই যোগী আদিত্যনাথ গুরুর আসন থেকে নির্বাচন করা শুরু করে এ পর্যন্ত পরপর পাঁচ বার কেন্দ্রীয় সংসদের এমপি নির্বাচিত হন। প্রথমবার তিনি এমপি হন মাত্র ২৬ বছর বয়সে। গত ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে গুরু মোহান্ত অবৈদ্যনাথ মারা যান। এদিকে গুরু এবং শিষ্য, ১৯৯১ সাল থেকে বিজেপির টিকেটে নির্বাচন করা শুরু করলেও সবসময় বিজেপির সাংগঠনিক কাঠামোর বাইরে স্বাধীনই থাকতেন। সে অর্থে তাদের ব্যবহারিক নিজস্ব সাংগঠনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হতো খোদ গোরক্ষনাথ মঠ ও মঠের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত গোরক্ষনাথ কলেজ। এছাড়া এরপরে, ২০০২ সালে যোগী আদিত্যনাথ বিজেপির প্রভাবের বাইরে নিজস্ব সংগঠন হিসেবে কলেজের ছাত্রদের নিয়ে “হিন্দু যুব বাহিনী” গঠন করেন। তিন বছরের মাথায় ২০০৫ সালে একভয়াবহ দাঙ্গায় অংশ নেয়ার জন্য এই বাহিনীর সিনিয়র নেতারা অভিযুক্ত হয়েছিল।  এছাটা ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে মুম্বাই-গোরক্ষপুর গোধন এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুন লাগানোর ঘটনা যেটার লেজ  ধরে পরে  গুজরাতের দাঙ্গা শুরু হয়েছিল, সেই মানুষ সহ ট্রেন পুরানা মামলাতেই এই সংগঠনের সদস্যরা সংশ্লিষ্টতায় অভিযুক্ত হয়েছিলেন। দক্ষিণ ভারতভিত্তিক ইংরেজি মিডিয়া ‘দি হিন্দু’ এই সংগঠনের পরিচয় বলেছে- ‘এক ভয়ঙ্কর যুব শক্তির সংগঠন যারা বহুবার মুসলমানদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণে অংশ নিয়েছে’।  আদিত্যনাথ ও তার বাহিনী প্রায়ই যে ভাষায় কথা বলে তা হলো- মুসলমানেরা ভারতে থাকতে পারবে না, পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেবে। আদিত্যনাথের প্রকাশ্য জনসভায় বক্তৃতার ভাষা শুনা ও দেখার জন্য এই ইউটিউব ভিডিও ক্লিপ দেখতে পারেন যেখানে তিনি বলছেন,  “একজন হিন্দু খুন হলে পরে আগামি দিনে আমরা প্রশাসনের কাছে এফআরআই মামলা দর্জ করব না। বরং পালটা এমন দশ ব্যক্তিকে খুন করাব ……”। এছাড়া সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বাংলাদেশেকে জড়িয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন, বলছেন মুসলমান অনুপ্রবেশকারিরা ভারতে এসেছে এরকম সরাসরি উস্কানিমূলক বক্তব্য এখানে দেখতে পারেন।  এছাড়া নিয়মিতভাবে ‘লাভ জিহাদ’ বা ‘ঘর উয়াপসি’ বা গোমাংস খাওয়া বা বহন করা যাবে না ইত্যাদি কর্মসূচিতে নিয়মিত মুসলমানদের দাবড়িয়ে রাখা তার প্রতিদিনের রুটিন কাজ। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হয়েই ৭৫ ঘন্টার মধ্যে কসাইখানা বন্ধের আর গরু চলাচলে তার ভাষায় উত্তরপ্রদেশে গরু পাচার করে আনা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব ঘটনাবলিতে হিন্দুত্ব ভিত্তিক কনষ্টিটিউশনে যেমন  “ভদ্র লোকেরা” কোন সমস্যা দেখে নাই, এখানেও তেমন কেউ অসুবিধা দেখে নাই। তবে নিরাপদ দুরত্বে প্রতিষ্ঠা করেছেন।

যেমন প্রধানমন্ত্রী মোদির যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণার পর আনন্দবাজার পত্রিকা যোগীর পরিচয় করিয়ে দেওয়ার রিপোর্টে লিখেছে – ২০০৫ সালের সংসদে যোগী বলেছেন, ‘উত্তরপ্রদেশসহ গোটা ভারতকে হিন্দু মহারাষ্ট্র না বানানো পর্যন্ত আমি ক্ষান্ত হব না।…’ দিন দিন তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছে। আর তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে ভোট বাক্সে। ২০০৭ সালে গোরক্ষপুর দাঙ্গায় তাঁকে প্রধান অভিযুক্ত করে প্রশাসন। তাঁকে গ্রেফতার করে ফৌজদারি মামলা রুজু করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধারায় মামলা রয়েছে’।

আবার ২০০৭ সাল থেকেই প্রতিবার নির্বাচনের আগের মত তার বাহিনীর প্রার্থীকে বিজেপির টিকেট দেওয়া নিয়ে বিরোধ তিনি বিজেপিকে অস্বীকার করা পর্যন্ত গড়াত। যেটা একমাত্র মধ্যস্থতা করে দিতে আরএসএস পর্যায়ে যেতে হত। এবারের নির্বাচনেও যোগীর ‘বাহিনীর’ ১৬ জনকে বিজেপির প্রার্থী করার দাবি জানিয়েছিল; কিন্তু সভাপতি অমিত শাহ আপোস করেননি। এই নির্বাচনে জিতলে কে মুখ্যমন্ত্রী হবে তা উহ্য রেখে নির্বাচন করেছিল মোদি।  ‘ফলে পরিচয়’ না করিয়ে মোদির নামে তাকে সামনে রেখে বিজেপি নির্বাচনে গিয়েছিল। নির্বাচনে বিপুল বিজয় দেখার পরে যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করা হয়। সাথে দুই উপ-মুখ্যমন্ত্রী করা হয় (দুজনই উত্তরপ্রদেশ বিজেপির নেতা, একজন উঁচু জাতের অন্যজন নিচু জাতের।) যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী বলে বিজেপির ঘোষণা আসায় সবচেয়ে অস্বস্তি দেখা যাচ্ছে মিডিয়ায়। ভারতের কনস্টিটিউশন আর রাজনীতির সবটা ‘হিন্দুত্বে’র হলেও তারা এতদিন অন্যকে সেকুলারিজমের সবক দিতে পারত। কিন্তু মোদি আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী করায় মিডিয়ার অস্বস্তির কারণ অনুমান করা যায়। যেমন গতকাল আনন্দবাজার লিখছে, ‘ভোটে বিপুল জয়ের পরেই তাঁর (মোদির) আস্তিন থেকে বেরিয়ে এল হিন্দুত্বের আসল তাস। গেরুয়া বসনধারী যোগী আদিত্যনাথ মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মনোনীত হওয়ার পরে মুখে যতই উন্নয়নের কথা বলুন না কেন, তাঁকে বাছাইয়ের পেছনে যে হিন্দুত্বের অঙ্কই কাজ করছে সেটা স্পষ্ট করে দিয়েছেন মোদী-অমিতরা’। অর্থাৎ আনন্দবাজারের চোখে ‘হিন্দুত্ব যদি আস্তিনের সাপই হয়’ তবে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার আগে কী মোদির আস্তিনে সাপ ছিল না? আনন্দবাজারই যোগী সম্পর্কে পুরাণ তথ্য এনে লিখছে, ওই বছরই (২০১৫ সালে) বারাণসীর একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেন, ‘যারা সূর্য নমস্কার করে না তাদের দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত কিংবা সমুদ্রে ডুবিয়ে মারা উচিত। আর তা না হলে বাকি জীবনটা তাদের অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখা উচিত।’ অর্থাৎ যোগী যারা ভারতীয় মুসলমান বা খিস্ট্রান তাদের ধরে ধরে তিনি তাঁর ‘ঘর ওয়াপাসি’ মানে হিন্দুতে ফিরিয়ে আনতে খায়েস করেন। তবে এবারের নির্বাচনের জনসভায় যোগীর আর এক মন্তব্য হলো- নির্বাচনী প্রচারে তিনি বলেছিলেন, ‘সমাজবাদী পার্টি ক্ষমতায় এলে শুধু কবরস্থানের উন্নতি হবে আর বিজেপি ক্ষমতায় এলে অনেক বেশি রামমন্দির হবে।’ সমাজবাদী পার্টি মানে যারা মূলত নীচু জাতের ‘যাদব’ আর মুসলমান কনস্টিটিউয়েন্সির রাজনৈতিক দল এবং এর আগে যারা সরকারে ছিল। তাদের উদ্দেশ্য করে বলছেন। কিন্তু কবরস্থানের সঙ্গে মন্দিরের তুলনা কী, কেমনে তা হয়? আর কবরস্থানের প্রয়োজনীয়তা শুধু মুসলমানের ব্যাপার তো নয়। সিটির একই মহল্লায় কবর দেওয়ার জায়গা না পেলে তা একই কমিউনিটিতে হওয়ার কারণে হিন্দু জীবন-যাপনকেও ব্যাহত করে। তাই নয় কী? ফলে এক কথায় যোগী গদ্গদে একটা ঘৃণা আছে বোঝা গেলেও তিনি এর সাফাইটা বলতে পারেননি।

এই নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বিজেপির প্রতিনিধি বা পর্যবেক্ষক ছিলেন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী ভেঙ্কটেশ নাইডু। মুখ্যমন্ত্রীর শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় তিনি বলেন, এটা নাকি এক বিজেপির জন্য এক ‘ওয়াটারশেড মোমেন্ট’। ওয়াটারশেড কথার মানে হলো, যেখান থেকে সুনির্দিষ্ট করে চেনা যায় এমন পথ আলাদা হয়ে গেছে। তো নাইডু নিজে এর অর্থ করছেন এভাবে যে, এখন থেকে নাকি বিজেপি এই প্রথম ‘সাধারণ মানুষের দলে’ পরিণত হয়েছে। তারা উন্নয়নের পক্ষে এবং দুর্নীতি ও কালোটাকার বিরুদ্ধে পরিষ্কার রায় দিয়েছে’। কিন্তু কথা হলো আদিত্যনাথ এগুলো একটারও প্রতীক নন। তিনি হিন্দুত্বের রাজনৈতিক প্রতীক। এটা বিজেপিও জানে। বিজেপি আসলে আগামী ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত উন্নয়ন পেছনে ফেলে হিন্দুত্বের রাজনীতি করে দাবড়াবে তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত বা রায় হিসেবে দেখেছে নাইডুর বিজেপি।

ওদিকে আনন্দবাজারের অনলাইন সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় খুব দুঃখ ব্যাথা পেয়ে আছেন। তিনি এক সম্পাদকীয় লিখেছেন যার শিরোনাম হলো, ‘বহুত্ববাদী এই দেশের মেরুদণ্ডে হিমস্রোত এখন’। অর্থাৎ আগে যেন ভারত বহুত্ববাদি ছিল, এখন থেকে যোগীকে মুখ্যমন্ত্রী করার পর থেকে নেই। আমি যে এই প্রশ্নটা তুলেছি তা তিনি নিজে সাফাই দিয়ে বলছেন। যেমন পরে তিনি লিখছেন, ‘যোগী আদিত্যনাথ মানে বিতর্ক, অসহিষ্ণুতা ও মুসলিমবিদ্বেষ’ এই বক্তব্যটি তিনি নিজেও কোনো দিন খারিজ করেননি। বস্তুত এই ভাবমূর্তিটি সযত্নে লালন করে এসেছেন কয়েক দশক ধরে। এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন। এ বারের ভোটেও তাঁর কট্টর বক্তব্যের ঘোষণার ডেসিবেল বরং বাড়িয়েই গিয়েছেন এক পর্যায় থেকে আর এক পর্যায়ে। তাঁকেই মুখ্যমন্ত্রী পদে বসিয়ে পুরস্কার দিল দল’। অর্থাৎ তিনি নিজেই বলছেন, আদিত্যনাথ এগুলো অন্তত গত দশক ধরেই করে আসছেন। অঞ্জনই বলছেন, ‘এমনটা নয় যে, সম্প্রতি তিনি পাল্টেছেন’। আসলে তিনি আদিত্যনাথের কাজগুলোকে ঠিক বন্ধ নয়, একটু ঢাকাঢুকা দিয়ে রাখতে চান এই আর কী? যাতে অস্বস্তি, মেরুদণ্ডে হিমশ্রোতের অস্বস্তিটা না লাগে! আসলে ভারতের কনস্টিটিউশনের প্রিএম্বেলের লেখার মতো সত্য সামনে আসতে দেওয়াই ভালো নয় কী!

গৌতম দাস : লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

রাষ্ট্র কী কাউকে জামিনদার রেখে গড়ার কাজ

রাষ্ট্র কী কাউকে জামিনদার রেখে গড়ার কাজ

ভারতকে জামিনদার রেখে নেপালি রাষ্ট্র গড়ার খায়েস
৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬,বুধবার

গৌতম দাস
http://wp.me/p1sCvy-Fa

গত প্রায় চার মাস ধরে ল্যান্ড লকড নেপালে পণ্য প্রবেশ ও যাতায়াত রুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এটা মূলত ভারতের আরোপ করে অবরোধ। জ্বালানি তেল, রান্নার গ্যাসসহ ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল সব কিছুর সরবরাহ এতে ব্যাহত হচ্ছে। এক কথায় বললে ভারত থেকে নেপালে যাওয়া সব পণ্যের চালানের উপর অবরোধ চলছে। নেপাল ল্যান্ড লকড ভূখণ্ড বলে সে ভারতের মধ্য দিয়ে পণ্য আনা-নেয়ায় নির্ভরশীল।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৬ নেপাল তার নতুন রাষ্ট্র গঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন ও রচনার সমাপ্তিতে তা কার্যকর-চালুর ঘোষণা দিয়েছিল। প্রত্যেক রাষ্ট্রের জন্য এটা এক গুরুত্বপুর্ণ প্রক্লেমেশন। এই প্রক্লেমশনে ভিন-রাষ্ট্রের খুশি বা দুঃখ পাবার কো বিষয় নয়। কিন্তু সেই থেকে অখুশি অসন্তুষ্ট ভারত পণ্য অবরোধের রাস্তা ধরেছিল। ভারতের ব্যাখ্যা অনুসারে, দেশটি স্বীকার করে না যে- ভূমি আবদ্ধ নেপালে পণ্য সরবরাহের একমাত্র পথ ভারত অবরুদ্ধ করেছে। যদিও এটা প্রমাণিত যে ভারতীয় কাস্টম এবং বর্ডার গার্ড বিএসএফ স্পষ্ট বলছে যে ‘ওপরের নির্দেশে’ তারা এটা বন্ধ রেখেছে। তবু ভারতের ব্যাখ্যা হলো, নেপাল-ভারত সীমান্তের অধিবাসী যারা সমতলীয় ‘ত্বরাই’ অঞ্চলের বাসিন্দা ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী এদেরই বড় অংশ হলো মাধেসি জনগোষ্ঠী। যারা মনে করে নতুন কনস্টিটিউশনে তাদের প্রতিনিধিত্ব সঠিক ভাবে হয় নাই, কম করে রাখা হয়েছে। এজন্য তারা অসন্তুষ্ট হয়ে নেপাল-ভারত সীমান্ত অবরোধ করে রেখেছে। ভারত থেকে পণ্য আসা বন্ধ করেছে। ব্যাখ্যা যার যাই হোক, বাস্তবতা হল এটা কার্যত নেপালের জন্য সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক অবরোধ। আর সেই সূত্রে তা নেপালের রাজনীতিতে রাজনৈতিক স্থবিরতা তৈরি করেছিল। সম্প্রতি এই স্থবিরতা কাটার লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
নেপালের জনগোষ্ঠী গঠনের মধ্যে এমনিতেই সমতল-পাহাড়ি এমন ভূবৈশিষ্ট্যগত বিভেদ আগে থেকে ছিল। কিন্তু একালে নেপাল-ভারত সীমান্তের জনগোষ্ঠী সমতলী অঞ্চলের মাধেসি নেতারা তাদের স্বার্থ নেপালে ভারতের স্বার্থের সাথে মাখিয়ে গাঁটছড়া বেঁধে তুলে ধরাতে নিজ নেপালিদের জনগোষ্ঠীগত স্বাভাবিক বিভেদকে অস্বাভাবিক ও বড় করে ফেলা হয়েছে।

নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০০৮ সালে ঐতিহাসিক পাশ ফেরার মতো প্রধান ঘটনা হল গত ২৪০ বছরের নেপালের শাসক ‘শাহ’ রাজবংশের শাসনের পরিসমাপ্তি। যেটাকে আমরা রাজনৈতিকভাবে নতুন এক বিপ্লবী গণরাজনৈতিক ক্ষমতার উত্থানের ফলে রাজতন্ত্রের শাসনের অবসান ও রাজতন্ত্র ব্যবস্থার সমূলে উচ্ছেদের ঘটনা হিসেবে দেখতে পারি। ব্যাপারটাকে প্রতীকী দিক থেকে বললে এতে রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে একটা রাজতন্ত্রকে উচ্ছেদ করে, এর বদলে এক প্রজাতান্ত্রিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া এসব ঘটনাবলির ভেতর দিয়ে প্রকাশিত আরেক ঐতিহাসিক ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী সত্য হল, নেপালের রাজতন্ত্র ব্যবস্থা উচ্ছেদের লড়াইয়ে ভারতের ভূমিকা ছিল আমেরিকার সহায়তায় কেবল ইতিবাচক সহযোগী বা সমর্থকের নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারকের। রাজতন্ত্র উচ্ছেদের লড়াই – শুরু করার দিক থেকে এতে একক নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিল নেপালের নতুন মাওবাদী রাজনৈতিক ধারার দল ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (মাওবাদী) বা ইউসিপিএন (মাওবাদী)। যারা এ লড়াইকে কেবল নিজ মাওবাদীদের নয়, সারা নেপালি জনগোষ্ঠীর লড়াই এবং এটা নেপালিদের সাধারণ ও প্রধান স্বার্থ হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিল। এরপর নেপালের সব সামাজিক ও রাজনৈতিক শক্তিকে এর পক্ষে সমর্থক হিসেবে সংগঠিত করা- কাজের এই শেষের অংশে আরো দুই প্রচলিত রাজনৈতিক দলের ভূমিকা ছিল। এরা হলো আমাদের সিপিবির মতো কনস্টিটিউশনাল কমিউনিস্ট দল- কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফায়েড এমএল ) এবং নেপালি কংগ্রেস। নেপালের রাজনীতিতে মাওবাদীরাসহ এ তিনটি দলই সেই থেকে ৮০-৮৫ শতাংশ নেপালি জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে। বলা যায়, রাজতন্ত্র-উত্তর রাজনৈতিক ক্ষমতা ও শক্তির নিয়ন্ত্রক হল এই তিনটি দল, যাদের মধ্যে তা ভাগাভাগি হয়ে আছে। আর এ তিনটি দলের জোটের পেছনেই ভারত পূর্ণ সমর্থন জুগিয়ে নেপালের রাজতন্ত্রে সমাপ্তিতে ইতিবাচক ও নির্ধারক ভূমিকা রেখেছিল।
কিন্তু রাজতন্ত্র উৎখাত হলেও নেপালে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করা যায়নি। নেপালের প্রধান রাজনৈতিক সমস্যা এখানেই। প্রধান কারণ, নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে উত্থিত ক্ষমতায় ভারতের কোনো ভাগ বা স্টেক নেই। নেপালি রাষ্ট্রক্ষমতায় ভারতের স্বার্থের প্রতিনিধি কেউ নয়, নেই। কারণ রাজতন্ত্র উৎখাতে নির্ধারক পর্যায়ের ভূমিকা সত্ত্বেও পরবর্তীকালে ভারত এটা নিজগুণে বিষাক্ত করে ফেলেছে। ভারতের ট্র্যাজেডি হল সে ঠিক কী চায়, কিভাবে চায় এ ব্যাপারে হোমওয়ার্ক করা সুনির্দিষ্ট ও উপযুক্ত – নেপালের স্বার্থের ভেতর দিয়ে তা ভারতেরও স্বার্থ এভাবে এমন কোনো নীতি-পলিসি পেশ করা ও এর পক্ষে সমর্থন আদায় করতে না পারার কারণে সে নেপালের ক্ষমতার স্টেক থেকে বিচ্ছিন্ন। মনে রাখা যেতে পারে, মাওবাদীদের ১৯৯৬ সালে ৪০ দফার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলনের শুরুর সময় তারা নেপাল-ভারত কলোনিয়াল চুক্তির (১৯৫০ সালের চুক্তি) বিরুদ্ধে আঙুল তুলে এবং ভারতকে নেপালের প্রধান শত্রু বলে চিহ্নিত করে ওই আন্দোলন শুরু করেছিল। ফলে খুব সম্ভবত ঐ চুক্তি ও ভারত সম্পর্কে এই মূল্যায়ন প্রসঙ্গে এ তিন দলের কিছু অভিন্ন মূল্যায়ন, অলিখিত সমঝোতা আছে। তৈরি হয়েছে। ফলে এই তিন দল যাদের নিজেদের মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা সত্ত্বেও নেপালের বর্তমান নতুন শক্তি ক্ষমতা তাদের হাতে ও নিয়ন্ত্রণে। সব ক্ষমতা এ তিন দলের হাতে ভাগাভাগি হয়ে আছে। আর এরই প্রতীকী প্রকাশ তারা ঘটিয়েছে নেপালের নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দিয়ে ও পরবর্তীকালে সরকার গঠন করে। নতুন কনস্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ার পর থেকে মাওবাদী দলের সমর্থনে অপর কমিউনিস্ট দল সিপিএন (ইউএমএল) এখন সরকার গঠন করে ক্ষমতায়, যার প্রধানমন্ত্রী খার্গা প্রসাদ শর্মা অলি। আর এই সরকার গঠনের আগে সংসদের ভোটাভুটিতে নেপালি কংগ্রেস এ’দুই কমিউনিস্ট দলের জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছে হেরে গিয়ে বিরোধী দলে আসন নিয়ে আছে।
আর এটাই ভারতের রাজনীতিবিদ ও আমলাদের ব্যর্থতা-অযোগ্যতাকে রেজিস্টার্ডভাবে প্রমাণিত করেছে যে, এ তিন দলের হাতে ভারতের স্বার্থ উপেক্ষিত। এ তিন দল ভারতকে দায় মনে করে, ব্যাগেজ হিসাবে দেখে। ভারতের ব্যাগেজ বইতে এরা কেউ এখনো রাজি নয়। ফলে নেপালের তৈরি হওয়া নতুন ক্ষমতায় ভারতের কোনো স্টেক নেই। উপায়ান্তর না দেখে ভারতকে এখন ভরসা করতে হচ্ছে নেপালের অ-প্রধান ধারার জনগোষ্ঠী, সমতলীয় ত্বরাই অঞ্চলসহ অন্যান্য অধিবাসী মূলত মাধেসিদের রাজনীতির ওপর।
এককথায় বললে এই রাজনৈতিক উপস্থাপন সেকটারিয়ান, বাংলায় আমরা যেটা সাম্প্রদায়িক বিভক্তির রাজনীতি বলে চিনি। যদিও ভারতে – এরা ভারতের সব মিডিয়া এই রাজনীতিকে হাজির করছে, যেন নেপালি সংখ্যালঘুদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর জন্য ভারত এটা করছে। অথচ সত্যিকার ঘটনা হলো ২০০৬-২০০৯ সাল, যেটা নেপালের রাজনীতির মৌলিক বদলের দিক থেকে টার্নিং পয়েন্ট- এটাই আনুষ্ঠানিকভাবে নেপাল থেকে রাজতন্ত্র উঠে যাওয়ার তাৎক্ষণিক আগের ও পরের সময় – সে সময়ে নেপালের রাজনীতিতে মাধেসি বলে কোনো ইস্যু কোনো কিছু ছিল না।
নেপালের জনসংখ্যার বিন্যাসের দিক থেকে এটা বলা হয়, পাহাড়ি-সমতলি হিসেবে জনসংখ্যা প্রায় সমান দু’ভাগে বিভক্ত। আবার কেবল মাধেসিদের নিয়ে রাজনীতি করে নেপালে এমন আঞ্চলিক দলের প্রায় শেষ নেই। আর এমন আঞ্চলিক দল খোলার হিড়িক লেগেছিল ২০০৯ সালে, যখন ‘মাধেসি’ ইস্যু হতে শুরু করে। এর আগে মাধেসিরা সবাই প্রধান ধারার ওই তিন দলের কোনো একটা করত, বেছে নিত। আর এর মধ্য দিয়েই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব পেত। অর্থাৎ ওই তিন প্রধান রাজনৈতিক দল দুই কমিউনিস্ট ও নেপালি কংগ্রেস এর আগে মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর পুরোটাকেই প্রতিনিধিত্ব করত। তবে মাধেসিদের নানান আঞ্চলিক দল হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও যারা প্রো-ইন্ডিয়ান অবস্থান নিয়েছে এরা ছাড়াও  মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর একটা বড় অংশকে এখনো ঐ তিন দলই প্রতিনিধিত্ব করে।
যেমন যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম অবরোধে আটকে থাকা নেপাল বা নেপাল-ভারত সম্পর্ক, এর জট খোলার আলামত দেখা যাচ্ছে। সংসদে নেপালের কনস্টিটিউশনে প্রথম সংশোধনী আনা হয়েছে। গত ২৩ জানুয়ারি তা পাস হয়েও গেছে। মোট ৬০১ মোট সদস্যের এই সংসদে প্রো-ইন্ডিয়ান অবস্থানের মাধেসি সদস্য যারা ভোটাভুটির সময়ের আগেই ওয়াকআউট করে গেছে, এরা হলো মাত্র ৩৫ জন। সংশোধনীটা পাস হয়েছে মোট ৬০১ সদস্যের মধ্যে ৪৬১ সদস্যের পক্ষ ভোটে। সাত সদস্যের বিপক্ষ ভোটে। আর ঐদিনের সভায় অনুপস্থিত সদস্য মোট ১২৮ জন, যার মধ্য মাধেসি  ঐ ৩৫ জনও অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ যারা অবরোধের পক্ষে এমন মাধেসি সংসদ সদস্য মাত্র ৩৫ জন। ফলে ভারত প্রচার চালাবার সময় মাধেসিসহ ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠি গুলো জনসংখ্যার অর্ধেক বলে প্রপাগান্ডা করলেও ফ্যাক্টস হল, মাধেসি জনগোষ্ঠি আঞ্চলিক প্রো-ইন্ডিয়ান দলগুলোকে ভোট দেয় নাই। এজন্য তারা মোট ৬০০ জনের মধ্যে মাত্র ৩৫ জন।
প্রো-ভারত মাধেসি দলগুলোকে নিয়ে আঞ্চলিক সবচেয়ে বড় জোট হলো ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্ট। গত চার মাসের অবরোধে রাজনীতিতে তারা শুধু শাসক ক্ষমতাসীনদের থেকেই নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেনি ও বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি, বরং একই সাথে নেপালের সাধারণ মানুষ, প্রধান ধারার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী থেকেও নিজেদের দূরে দাঁড় করিয়েছে। নিজেদের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শত্রুর কাতারে দাঁড় করিয়েছে। একই ভূখণ্ড ও রাষ্ট্রের জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানান ধরনের স্বার্থবিরোধ থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বার্থবিরোধ থাকা এক জিনিস, আর সেই বিরোধকে শত্রুতায় রূপ দেয়া আরেক জিনিস। গত পাঁচ মাসে এই বিপজ্জনক শত্রুতার আগুন নিয়ে খেলার কাজটা ভারতের প্ররোচনায় মাধেসিরা করেছে।
নেপালের কনস্টিটিউশনে প্রথম সংশোধনী আনার পরের পরিস্থিতিকে ভারতের হিন্দুস্থান টাইমস বর্ণনা করছে এভাবে, বলছে “এর পরও ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্ট এই সংশোধনী প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলছে এটা তাদের কিছু দাবি মেনেছে, সব নয়। কিন্তু নেপালের এই নতুন অবস্থান নেপাল ও ভারতকে কাছাকাছি এনেছে”। হিন্দুস্থান টাইমসের এই মন্তব্যে অনেক কিছুর ইঙ্গিত আছে। যেমন- এখনকার এক নম্বর বাস্তবতা হলো পাঁচ মাস ধরে অবরোধ চালানোর পরে মাধেসিদের পক্ষে এই আন্দোলন আর চালানোর অবস্থায় নেই। এমন ধারণা ভারত দিতে চাইছে। গত ২৬ জানুয়ারি রয়টার্সের এক রিপোর্টে এ বিষয়ে এক ডিটেইল নিউজ এসেছে। ওদিকে নেপালি সংসদে সংশোধনী পাস হওয়ার পর ভারত একে স্বাগত জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও আসলে ভারত ও প্রো-ভারত মাধেসিদের অবস্থান হল, তারা সম্ভবত অবরোধ একেবারে না তুলে ধীরেসুস্থে তুলতে চাচ্ছে। কারণ, এত দিন তারা আন্দোলন এমনভাবে পরিচালিত করেছে, যেন তারা বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন করছে, নেপাল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। ফলে সে চিন্তায় বিচ্ছিন্নতার জায়গা থেকে ফেরত আসতে সময় লাগবে। এ ছাড়া আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নেপালের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কথা চলছে। ওই সফর শেষে অবস্থা বুঝে এরপর পরিস্থিতি আস্তে ধীরে সহজ হতে পারে। যদিও লিখিতভাবে ভারতের স্বাগত জানানো বিবৃতিতে অবরোধ পরিস্থিতি এখন থেকে স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো সংবিধানে সংশোধনী আনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রো-ভারত ইউনাইটেড ডেমোক্র্যাটিক মাধেসি ফ্রন্টের নেতা রাজেন্দ্র মাহাতোর দাবি। তিনি দুটো অদ্ভুত দাবি করেছেন। যার ভেতর দিয়ে নেপালের নতুন ক্ষমতায় স্টেক হারানো ভারতের করুণ দুর্গতিই প্রকাশ করে। আবার এই দাবির ভেতর দিয়ে একই সাথে মাধেসি সেক্টরিয়ান বা বিভক্তির রাজনীতির আগুন নিয়ে খেলার বিপজ্জনক দিকটি উদোম হয়েছে। যে আগুন ভারতের জন্যও সমান বিপদের হতে পারে। মাহাতোর দাবি, ভারতকে তিনি নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জড়িত হোক বা হস্তক্ষেপ করুক দেখতে চান। আর দ্বিতীয়ত, নেপাল সরকার যেসব আইনি সংশোধনী যা আনছেন তা বাস্তবায়নে তিনি ভারতকে জামিনদার বা গ্যারান্টার হিসেবে দেখতে চান।

সত্যিই এমন তামাশা সহজে খুব একটা দেখা মেলে না। ভারতের সেক্টরিয়ান রাজনীতির মহিমা এমনই যে, মাধেসি নেতারা এখন বলছেন নেপাল সরকারকে বিশ্বাস নেই, ভারতকে জামিনদার হিসেবে চাই! খবরটা ১৮ জানুয়ারির ভারতের দি হিন্দু পত্রিকার বরাতে একই দিন ১৮ জানুয়ারি আমাদের দৈনিক বণিক বার্তা ছেপেছে। অর্থাৎ এখানে দেখা যাচ্ছে, মাধেসি নেতাদের কী বলা উচিত আর কী নয়, এসব শিখিয়ে-পড়িয়ে আনার ব্যাপারেও ভারত একেবারেই নাদান। মাহাতোর এই কথা প্রমাণ করেছে তিনি রাষ্ট্র সম্পর্কে মৌলিক ধারণাও রাখেন না। তিনি রাষ্ট্র কী তা-ই বোঝেননি। ফলে তার এমন দাবি। অথচ রাষ্ট্র গঠন করা ভিনরাষ্ট্রকে জামিনদার রেখে করার জিনিস নয়। আবার রাষ্ট্র গঠনের কাজ নিজে করার কাজ; বাইরের কাউকে হস্তক্ষেপ করতে ডেকে করার কাজও নয়। নিজ জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক বোঝাপড়ার অভিন্ন নাগরিক ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠিত হয়। আর ঐ ভিত্তির গাঠনিক দলিল হল কনস্টিটিউশন। বাইরের জামিনদার নয়। তাই রাজেন্দ্র মাহাতো তিনি আসলেই বড়জোর নেপাল রাষ্ট্রে ভারতের স্বার্থের এজেন্ট হয়েই থাকতে চান। এতটুকুর জন্যই তিনি যোগ্য। এটা যেন বাবাকে জামিনদার রেখে কেউ বিয়ে করতে চাওয়ার শখ প্রকাশ করছে। অথচ যেখানে জামিনদার রাখার কথা ভাবতে হয় সেটা কি বিয়ে!
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে ৩১ জানুয়ারি দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এর প্রিন্ট পত্রিকায় এবং পরের দিন ০১ ফেব্রুয়ারি দৈনিক নয়া দিগন্ত প্রিন্ট পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। খানে তা আবার পরিমার্জন সংযোজন এবং এডিট করে ছাপা হল।]

“মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামাত-মুক্ত বিএনপির” রাজনীতি

“মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামাত-মুক্ত বিএনপির” রাজনীতি
গৌতম দাস
২৬ আগষ্ট ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-bf

গত জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। সে সফরের পর দেশের সরকার বা বিরোধী দল অথবা কোন বিদেশী কূটনীতিক কেউ দায়িত্ব নিয়ে বলেনি নরেন্দ্র মোদি কী মেসেজ রেখে গেলেন। কিন্তু কানাঘুষা,আর অনুষঙ্গী ঘটনাবলিতে ক্ষমতাসীনদের আচরণ বক্তব্য থেকে দিনে দিনে এটা স্পষ্ট হচ্ছে যে, মোদি-হাসিনা এবং মোদি-খালেদা আলোচনায় একটা নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার বিষয় ইস্যু হিসাবে উঠেছিল। অনুমানে ধরে নেয়া এই আলোচনার পক্ষে সাক্ষ্য দেয় এমন দু’টি শব্দ এরপর থেকে রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত হয়ে উঠতে দেখা যায় – “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি”। এই ব্যাপারটাকে উল্টো করে বলা যায় যে, “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” এই দু’টি বাক্য চালু হওয়া থেকে বোঝা যায় মোদির সফরে নির্বাচন বিষয়ে একটা ইস্যু সেখানে উঠেছিল। আর একটু স্পষ্ট করে বলা যায়, নির্বাচন বিষয়ে অনুমান করা ঐ আলাপের সারকথা সম্ভবত এরকম যে, “সকলকে নিয়ে একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা দরকার কারণ রাজনৈতিক সঙ্কট এভাবে ফেলে রাখাটা আমাদের সবার জন্যই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে”। মোদির সফর- উত্তরকালে মোদির এই মেসেজের অর্থ কী অথবা কেমনে কী অর্থ দাঁড়িয়ে যায় সেসব সম্ভাবনার আগেই সম্ভবত শেখ হাসিনার সরকার এবং ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা নিজেই এর অর্থ নিজের মত করে সাজানো শুরু করে দেয়। সে অর্থটাই সম্ভবত “মধ্যবর্তী নির্বাচন” এবং “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” এই দু’টি বাক্য চালু করেছে। তবে এথেকে “মধ্যবর্তী নির্বাচন” কথাটার অর্থ কমবেশি সহজে বোঝা যায় কিন্তু “জামায়াতমুক্ত বিএনপি” কথাগুলোর অর্থ তাৎপর্য কী?

এখানে তামাশার দিকটা হল, বিএনপির রাজনীতি কেমন হবে জামায়াত ছাড়া না জামায়াত সহ এই শর্ত আওয়ামী লীগের মুখ থেকে আসছে। এক্ষেত্রে এমন একটা ভাব তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে যেন এখানে আওয়ামী লীগ দাতা আর বিএনপি গ্রহীতা। কিন্তু আওয়ামী লীগ বিএনপির ক্ষমতাদাতা নয়। আওয়ামি লীগ নিজে বড়জোর নিজের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে আবার নিজের মত করে একটা নির্বাচন দিতে পারে, তাই নয় কি? কারণ এটা কারো না বুঝতে পারার কারণ নেই যে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে অনেক কিছু হয়ত দিতে পারে কিন্তু এর পরেও যা কখনই দিতে পারে না তা হল ক্ষমতা। আর যাই হোক, আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতাদাতা হতে পারে না। হওয়ার কথাও নয়।
তবু এই সরল কথাটা আড়াল করে একটা ভাব ছড়ানো হয়েছে যেন এক শর্ত সাপেক্ষে ক্ষমতাসীন সরকার বিএনপির ক্ষমতাদাতা হতেও পারে। কি শর্তে? যে, বিএনপি যদি জামাতমুক্ত হয় তবে যেন সে লীগের কাছে থেকে ক্ষমতাও পেয়ে যেতে পারে! তাই আওয়ামি লীগ এখান থেকেই বিএনপিকে নির্দেশদাতা হবার ভান ধরেছে, বলছে যে জামাতমুক্ত হয়ে যাও তুমি!

এ’এক সত্যি বিরাট তামশা। শুধু তাই না। এছারা এখানে এভাবে আর একটা ইঙ্গিত তৈরি করা হয়েছে যেন ৫ জানুয়ারিতে কোনো নির্বাচন না করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এর পক্ষে সাফাই দিচ্ছে এমন যেন নেহায়ত বাধ্য হয়ে ৫ জানুয়ারিতে কোনো নির্বাচন না করা সত্ত্বেও আওয়ামি লীগ নিজেকে বৈধ সরকার বলে দাবি করেছে। যেমন, লীগের হস্তক্ষেপ ছাড়া একটা ফেয়ার নির্বাচন হলে তাতে বিএনপি নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় এসে পড়লেও যেন আওয়ামী লীগের আপত্তি ছিল না,থাকত না। কিন্তু লীগের হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে এজন্য যে, ওই নির্বাচনে বিএনপি জামায়াতযুক্ত থেকে যাবার কারণে সহযোগী জামায়াত ক্ষমতায় চলে আসবে আর কেবল ঠিক এখানেই আওয়ামী লীগের আপত্তি। জামাত ঠেকানোর মহান কর্তব্য সম্পন্ন করার জন্যই যেনবা জবরদস্তিতে আওয়ামি লীগ নির্বাচন না হতে দিয়েও নিজেকে নির্বাচিত দাবি করছে! তাই কী? আওয়ামী লীগের এমন সাফাই, এমন ইঙ্গিত অবশ্য কেউই বিশ্বাস করে না, এমনকি তারা নিজেরাও না। এটা যে ছলনামূলক মিথ্যা কথা, কেউ বিশ্বাস করবে না জেনেও মুখরক্ষার জন্য বলা কথা তা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সবাই জানে, মানে। তবু তাদের এই কথা বলা ছাড়া মুখরক্ষার সাফাই হিসেবে আর কিছু বলার নেই। এই হল, “জামাতমুক্ত বিএনপি দেখতে চাওয়া” আওয়ামি লীগের আবদারের সারকথা।
তবে এ বিষয়ে আরও করুণ অবস্থা ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের। গত ৫ জানুয়ারি ২০১৪ নির্বাচনের আগের ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব সুজাতা সিং বাংলাদেশে এসেছিলেন। সেখানেও হবু নির্বাচনের পক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়ানো এবং এরশাদকেও হবু নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য যে যুক্তি তিনি এরশাদকে দিয়েছিলেন এরশাদের সাথে সুজাতার মিটিং শেষে তা গরম থাকতে থাকতেই এরশাদ নিজেই মিডিয়াকে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন। সুজাতা সিং বলেছিলেন জামায়াত ক্ষমতায় এসে যাবে তা ঠেকানোটা এরশাদের আসল কাজ। মহান দায়িত্ত্ব। আর জামায়াত ঠেকাতে হবে সে জন্য এরশাদকে হাসিনার সাথে নির্বাচনে যেতে হবে। আর এই মহৎ কাজের জন্যই বিএনপি-জামায়াতকে বাইরে রাখার যে সুযোগ পাওয়া গেছে তা ব্যবহার করতে এরশাদের নির্বাচনে যেতে যেন দ্বিধা না করেন। সুজাতার যুক্তির সারকথা ছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাকে “জামাতমুক্ত” দেখতে যাওয়ার খায়েশ। বুঝা যাচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ আওয়ামি লীগকে ভোট না দিলেও জবরদস্তিতে লীগকে ক্ষমতায় দেখতে চাওয়ার ভারতের ব্যকুলতা কত তীব্র ছিল যে একটা ভাল সাফাই যুক্তি যোগাড় করতে না পারলেও বাংলাদেশে এমন ন্যাংটা হস্তক্ষেপের পক্ষে কথা বলতে সুজাতা কত ডেসপারেট ছিলেন।
সুজাতা সিং সেসময়ের ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের মধ্যে শীর্ষ কূটনীতিক। এই শীর্ষ কূটনীতিকের এটা নিঃসন্দেহে তার করুণ দুর্দশার চিত্র। তিনি তার হস্তক্ষেপের কাজকে,এরশাদের সাথে মিটিংয়ের বক্তব্যের স্বপক্ষে পাবলিকলি কোন সাফাই হাজির করতে পারেন নাই। এর ফলে তাঁর কথা হয়ে গেছে এমন যে, বাংলাদেশের মানুষ যদি চায়ও বিএনপি-জামায়াতকে ভোট দেবে, নিজেদের প্রতিনিধি বলে নির্বাচন করবে তবু সুজাতার ভারত তা হতে দিতে পারে না। আচ্ছা, এটা কি কোনো অতিথি পররাষ্ট্র সচিব বলতে পারেন? সেটা কি বাংলাদেশের জনগণ কাকে নির্বাচন করবে, নেতা প্রতিনিধি মানবে এর বিরুদ্ধে সুজাতার সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং বাধা দেয়ার সফর ছিলো না? সম্ভবত সে জন্য এর পর থেকে তিনি আর কখনো বাংলাদেশে মিডিয়ার মুখোমুখি হননি।
সেই থেকে এবারও ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের একই দুর্দশা দেখা যাচ্ছে। তারা তাদের বক্তব্যের পক্ষে এবারও র‍্যাশানালিটি বা যুক্তি-বুদ্ধি হাজির করতে পারছে না। তাদের সব যুক্তির প্রধান কথা সবসময় যা থাকে তা হচ্ছে, বাংলাদেশের “ইসলামি সন্ত্রাসবাদ বা তাদের উত্থান” – এই বিষয়ে তারা উদ্বিগ্ন। খুবই ভালো কথা। ফ্যাকটস হিসেবে ভারতের এমন উদ্বিগ্নতার পক্ষে সত্যতা আছে কি না সে তর্ক না তুলেই ভারতের উদ্বিগ্নতা স্বীকার করে নেয়া যাক।
কিন্তু সে জন্য তারা বাংলাদেশের জনগণ কাকে ভোট দেবে তা কি ঠিক করে দিতে পারে? একটা হস্তক্ষেপের নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়াতে পারে? জনগণ কোন দলকে কোন নেতাকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা তাতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে? ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের পছন্দের দল ও নেতার পক্ষে যদি জনমত না থাকে,তাদের পছন্দের নেত্রীর পাবলিক রেটিং যদি না থাকে তারপরও কি তাদের জিতিয়ে আনার পক্ষে কিছু করার সুযোগ থাকে?
আমরা এখানে খুবই সাধারণ একটা প্রশ্ন তুলেছি। প্রশ্নটা হলো, ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের পছন্দের দল ও নেতার পক্ষে যদি জনমত না থাকে, নেত্রীর নিজ গুণেই যদি নিজেদের পাবলিক রেটিং ধরে রাখতে না পারেন, না থাকে তাহলে কি তারা বাংলাদেশে একটা হস্তক্ষেপবিহীন নির্বাচন হতে দেবে না? এসব বিষয় মোটেও কোনো বিশাল কিছু নয়। এসব প্রশ্ন তো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ১৯৪১ সালে রুজভেল্ট-চার্চিলের বিখ্যাত আটলান্টা চার্টারে সমাধা হয়ে গেছে, সেকালেই। এটা এখনও যারা মানতে পারে না তারা নিশ্চয় এখনো কলোনি শাসনের পক্ষের লোক। অথচ সে সময়ই এটা দুনিয়াতে সমাধা হয়ে গেছিল যে, জনগণকে পছন্দের নেতা প্রতিনিধি নির্বাচন করতে না দেয়া, নেতা বেছে নিতে না দেয়া মারাত্মক অপরাধ। অন্য রাষ্ট্রের এমন কাজের কোনো অধিকারই নেই। ভিন রাষ্ট্র বা পড়শি রাষ্ট্র প্রতিবেশী দেশের নির্বাচিত কোনো নেতাকে বড় জোর প্রভাবিত করার চেষ্টা করতে পারেন। কিন্তু কোন নেতাকে নির্বাচিত হতে,বেছে নিতে জনগণকে কোনোক্রমেই বাধা দিতে পারে না। ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের একালে এমন অধপতিত দশায় পড়তে হয়েছে যে তারা প্রত্যক্ষ বাধা দিচ্ছেন। আবার তাদের কাজের পক্ষে যুক্তিবুদ্ধি সাজিয়েও দাঁড়াতে পারছেন না। খোলাখুলি হাসিনার গায়ের জোরের পক্ষে গিয়ে দাঁড়াতে হচ্ছে।
তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গোড়ার সঙ্কট হলো, হাসিনার আওয়ামী লীগ পাবলিক রেটিং নেই। অথচ ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা সেই হাসিনার ওপর সব বাজি ধরে বসতে চান। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন একটা করিয়ে নিয়েছেন,কিন্তু শান্তি নেই। নতুন নির্বাচনের প্রয়োজন এটা এখন স্বীকার না করে পারছেন না। রা নির্বাচন না দিলে আরো বড় বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। ঘটনা পরিস্থিতি সেক্ষেত্রে হাতছুট হয়ে যেতে পারে সে সম্ভাবনার রিস্ক নিতে হবে।
তাই লজ্জার মাথা খেয়ে আওয়ামী লীগ নিজেকেই মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামায়াতমুক্ত বিএনপির কথা পাড়তে হচ্ছে। অথচ বুঝতে চাইছেন না যে আওয়ামী লীগের মুখ দিয়ে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপির’ শর্ত আওড়ানোর কোনো মানে হয় না। কারণ এর মানে কী বিএনপি জামায়াতমুক্ত হলে আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ক্ষমতা দেবে? ক্ষমতায় এনে দিবে? আর বিএনপি যদি জামাতমুক্ত না হয় তাহলে লীগ কোন ফেয়ার বা হস্তক্ষেপহীন নির্বাচন হতে দিবে না? এটাই কী ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের অবস্থান বক্তব্যের স্বপক্ষে যুক্তি? ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ কথাটার পক্ষে সাফাই?

অন্য আর একদিক থেকে বললে, জামায়াতমুক্ত বিএনপির বাসনা অবশ্য আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের থাকতেই পারে – যদি সেটা তাদের বাসনা মাত্র হয়। কারণ আইনগতভাবে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’র শর্ত আরোপ করতে পারে জনগণ অনুসমর্থিত কনস্টিটিউশনাল একটা রেফারেন্ডাম। দেশের ভিতর কে কেমন পার্টি হবে এটা বিএনপির আওয়ামী লীগের উপর কিংবা আওয়ামী লীগের বিএনপির উপর আরোপ করার বিষয় নয়। ঠিক যেমন বিএনপি আওয়ামী লীগকে বা ভাইসভারসা কেউ কাউকে ক্ষমতায় আনতে পারে না,এমনটা অবাস্তব ঠিক তেমনই শর্ত দিতে কিংবা শর্ত পূরণ করলে তবেই অন্যকে ক্ষমতায় আনব এটাও অবাস্তব। অর্থহীন কথাবার্তা। এ ছাড়াও মনে রাখতে হবে এ বিষয়ে কথা বলার দিক থেকে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা কেউ না, কোনো পার্টিই নয়।
এ কারণে বিএনপির কোনো নেতা অথবা কোনো সুশীল বুদ্ধিজীবী অথবা প্রথম আলোর উপসম্পাদকের মতো কোনো মিডিয়া কর্মী যখন এমন কথা ছড়ায় যে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ হতে হবে এটা হাস্যকর। অবাস্তব। এক্ষেত্রে তারা অবশ্যই আদতে আওয়ামী কর্মী না হলে ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দার স্বার্থ পালনকারী।

এখানে বলে রাখা ভাল, আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা “জামায়াতমুক্ত” অথবা “জামায়াত বিরোধিতা” এমন কথা বলে বা লিখে কেবল জামায়াত রাজনৈতিক দলকে বুঝায় না। তারা আসলে বুঝাতে চায় যেকোনো ইসলামি রাজনীতি বা রাজনীতির সমর্থক; এক কথায় বললে ইসলামি ফেনোমেনা বা পুরা ইসলামি কনস্টিটুয়েন্সি। এখন আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দারা তারা সবাই আসলে বুঝাতে চায় তারা বাংলাদেশে কোনো ইসলামিক রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ, রাজনীতিতে কোনো ইসলামি ফেনোমেনা তারা দেখতে চায় না। যদি তাদের চাওয়াটা ন্যায্য বলে ধরেও নেই তবু এটা বাস্তবায়ন করার উপায় লীগ-বিএনপির এক দল অপর দলকে শর্ত দেয়া নয় বরং জনসমর্থিত (রেফারেন্ডাম বা তুল্য কোনো কিছুর মাধ্যমে) এমন একটা কনস্টিটিউশন হাজির করে তা নিশ্চিত করা। কারণ এক দল অন্য দলকে ক্ষমতায় আনার কেউ নয়। কোন রাজনীতি কে করতে পারবে তা একে অপরকে ডিকটেক্ট করার তারা পরস্পরকে বলার কেউ নয়।
আবার বাংলাদেশে কোনো “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতি থাকতে পারবে না” আর বাংলাদেশে কোনো “ইসলামিক রাজনৈতিক অভিপ্রকাশ,রাজনীতিতে কোনো ইসলামি ফেনোমেনা থাকতে পারবে না” বলা এক কথা নয়। প্রথম বক্তব্যটা কনস্টিটিউশনে বলার পরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু দ্বিতীয় বক্তব্যটার বেলায় ইসলামি নাম নিয়ে আইনত কিছুই থাকতে পারবে না। তবে অবশ্যই নাম না নিয়েও তা থেকে যাবে। কারণ আইন করে একটা রাজনৈতিক চিন্তাকে স্তব্ধ করা যায় না। আবার প্রথম কথাটা পড়শি ভারতসহ যেকোনো বিদেশী আশা করতে পারবে। মানে “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির” বিরুদ্ধে বলতে পারবে, আশা করতে পারবে। কিন্তু এরপরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকলে তা নিয়ে বলার ক্ষেত্রে বিদেশীরা কিছু বলার কেউ নয়।
আমাদের এখানকার প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ওপরের শেষ বাক্যটা। অর্থাৎ ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপি’ বলে কিছু হবে কি না এ নিয়ে ভারতের কিছু বলার নেই। ভারত বলার কেউ নয়। ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতি থাকতে পারবে না’ এমন ধরনের কথা বাংলাদেশের কনস্টিটিউশনে বলার পরও দেশে সাংবিধানিক ইসলামি রাজনৈতিক দল থাকতে পারে কোনো অসুবিধা নেই। আর এ নিয়ে ভারতের কথা বলার কোনো সুযোগ নেই।
কিন্তু এসব আইনি সাংবিধানিক কাজের দিক দিয়ে না এগিয়ে আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের মুখ দিয়ে ‘জামায়াতমুক্ত বিএনপির’ কথা বলানো খুবই বিপজ্জনক। কারণ একটা কথা মনে রাখতে হবে, বাস্তবতা হলো, “সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির” বিরুদ্ধে মেজরিটি মানুষের একটা কনসেনসাস জনমত আছে। জনমত জরিপেও সেটা প্রতিফলিত হবে। কিন্তু যদি বলা যায় “কোনো ইসলামি রাজনৈতিক দলই বা ফেনোমেনাই বাংলাদেশে থাকতে পারবে না” সে ক্ষেত্রে দেখা যাবে এই একই জনগোষ্ঠী বা জনমতের মেজরিটি উল্টো রায় দেবে। শুধু তাই নয়,চাপাচাপি করতে যাওয়ার জন্য নিজের দেশ ভূমি জমিতে ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখতে চায় না এর সপক্ষের মেজরিটির ঐকমত্যের জনমতটাও এরপর আর থাকবে না। হত্যা করা হবে।
এ ছাড়া একটা কথা সুনির্দিষ্ট করে বলার সময় হয়েছে যে বাংলাদেশে ‘সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা বা রাজনীতির’ হতে পারে বা থাকতে পারে এটা ভারতের স্বার্থের বা উদ্বিগ্নতার বিষয় নয়। ভারত বরং এসব বিষয়ে তত সিরিয়াস নয়। বিষয়টাও তত সিরিয়াস নয়। রাষ্ট্রের রুটিন তৎপরতাতে সেসব দিক নিয়ন্ত্রণ করে রাখা সম্ভব এবং তাই হচ্ছেই। বরং ভারতের সিরিয়াস প্রসঙ্গ হলো, ক. বিনা শুল্কে, বিনা বিনিয়োগে, বিনিয়োগের দায় না নিয়ে ট্রানজিট হাসিল করা খ. বাংলাদেশ চীনের সাথে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সম্পর্কে কতটা পক্ষে বা দূরে থাকবে তা বাংলাদেশকে নিজের স্বার্থে নির্ধারণ করার বদলে ভারতের স্বার্থে নির্ধারণ করতে বাধ্য করা। ভারত তার নিরাপত্তার উদ্বিগ্নতার কথা বলে এর আড়ালে এসব অর্থনৈতিক রাজনৈতিক স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে হাসিল করতে জবরদস্তি করে চলছে। এ কাজে কোনো পাবলিক রেটিংয়ে দুর্বল রাজনৈতিক দলই তার জন্য বেশি উপযুক্ত। কারণ যত জনসমর্থন বেশি ভারতের কথা তত সে শুনবে না।

দুই.
গত এক সপ্তাহে খালেদা জিয়ার কথিত এক মন্তব্যকে নিয়ে দু’টি প্রপাগান্ডা রিপোর্ট বের হয়েছে। প্রথমটি ভারতের ‘দি হিন্দু’ (THE HINDU) পত্রিকার খোদ সম্পাদকীয়। দ্বিতীয়টি স্টাটফোর (STRATFOR) নামে আমেরিকান গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স পত্রিকার এনালাইসিস রিপোর্ট। দু’টি রিপোর্টের প্রসঙ্গ একই এবং এটা পরিষ্কার যে, ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের প্রভাবে এই রিপোর্ট দু’টি তৈরি। বাংলাদেশে তারা যে অবস্থান বা নীতিতে পরিচালিত সেই নীতির পক্ষে এ দুটোই প্রপাগান্ডা রিপোর্ট। হিন্দু সম্পাদকীয় বের হয়েছে ২৮ জুলাই আর স্টাটফোরেরটা বের হয়েছে ৩০ জুলাই। দু’টি রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘খালেদা জিয়া নাকি নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি থেকে সরে এসেছেন। ফলে তাতে নাকি বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।’

হিন্দু দাবি করছে, ‘BNP’s decision to drop its demand for the formation of a caretaker government। আর স্টাটফোর দাবি করছে, Khaleda Zia has indicated that parts of the opposition might be willing to drop some of their demands — such as imposing a neutral caretaker government to oversee elections.
প্রথমত তথ্য হিসেবে এটা মিথ্যা যে, খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি ছেড়ে দিয়েছেন, বা সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। গত ২৫ জুলাই খালেদা জিয়া তার গুলশানের অফিসে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আইনজীবীদের সাথে সাক্ষাতের সময় নাকি এ কথা বলেছেন। বিডিনিউজ২৪ পত্রিকার রাজনৈতিক লাইন বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক লাইনের সবচেয়ে কাছাকাছি। ফলে এখানে পর্যবেক্ষণ হল, সরকার আর ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাদের কমন অবস্থানটাই সবচেয়ে ভালো প্রতিফলিত হয় এই পত্রিকার রিপোর্টে। সেই বিডিনিউজ ঐদিনের প্রসঙ্গে খালেদার কথা কী বুঝেছে তা দেখা যাক। বিডিনিউজ২৪ ইংরাজী শিরোনাম করেছে, Khaleda says fairness is the key, caretaker or no caretaker’। আর ভেতরে কোট আনকোট লিখছে, ‘It is not necessary that elections should be under a caretaker government. Whatever it is called, we want a neutral government to ensure free and fair elections’। এতটুকু পড়ে যে কারো নিশ্চিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট যে, খালেদা কেয়ারটেকারের দাবি ত্যাগ করেছেন এমন বুঝ এখান থেকে বের করার সুযোগ নেই। কারণ সারকথা হলো, খালেদা জিয়া ‘কেয়ারটেকার’ শব্দ নিয়ে আঁকড়ে বসে থেকে ঝোলাঝুলি না করে ‘হস্তক্ষেপবিহীন নির্বাচন’ দাবি তার মূল কথা এটাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ বিডিনিউজ অন্তত ভুল বা উল্টো বোঝেনি। তবু হিন্দু আর স্টাটফোর বুঝেছে।
তবু কি আর করা যাবে এবার তাদের বোঝার যুক্তিবুদ্ধি বা লজিকটা কী তা পরখ করা যাক।

খালেদা জিয়া কেয়ারটেকার দাবিটা যদি ত্যাগ করেই থাকেন তো সেটা ইতিবাচক বা তার মধ্যে আশার আলো দেখার কি আছে?
গত দু-তিন বছরে শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনগুলোর ন্যূনতম ফেয়ারনেস বা গ্রহণযোগ্যতা প্রসঙ্গে যদি এই দুই মিডিয়া রিপোর্টারের ধারণা না থাকে তবে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাদের এমন সম্পাদকীয় বা বিশেষণ লেখার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সুতরাং ধরে নিতে হবে শেখ হাসিনার অধীনে যেকোনো নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার গুরুতর সঙ্কট যে আছে এটা তারা জানেন। আর কে না জানে হাসিনার অধীনে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নেই এ জন্য নয় যে বিরোধীরা তাতে অংশগ্রহণ করেনি। অংশগ্রহণ করলেও সেখানে আরো মারাত্মক সঙ্কট আছে। সর্বশেষ ঢাকা সিটি নির্বাচন এর সাক্ষী যেখানে খোদ খালেদার গাড়িতে নিয়মিত আক্রমণ করতেও শেখ হাসিনা দ্বিধা করেনি। ভোট কারচুপির ডেস্পারেটনেস দেখার মতো। তাহলে এ অবস্থায় খালেদা কেয়ারটেকারের দাবি ছেড়ে দিয়েছে সুতরাং এটা ভালো খবর হিসেবে উদযাপন করা উচিত, তাই কী? তার মানে এই পত্রিকা দু’টি একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন হওয়াটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না, গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন খালেদার কথিত কেয়ারটেকারের দাবি ছেড়ে দেয়া, এটাকে আবার তাদের ভালো এক ‘আপসরফাও’ মনে হয়।

পত্রিকায় রিপোর্ট লিখতে গেলে ন্যূনতম কিছু এথিকসের ওপর দাঁড়াতেই হয়। একটা বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে সব পত্রিকা দাঁড়াবে এটাও তো স্বাভাবিক। আমরা এখানে দেখছি পত্রিকা দুটো বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে দাঁড়ানো দরকার মনে করছে না। এর চেয়ে বরং না করে কথিত আপসরফা করে ফেললে আমাদেরকে খুশি হতে তাগিদ দিচ্ছে। পত্রিকা দুটো নিজেরাও দেখা যাচ্ছে এ খবরে খুশি হয়েছে। নির্বাচনটা এখন বিশ্বাসযোগ্য না হলেই বরং এই দুই পত্রিকা খুশি দেখা যাচ্ছে। এ কেমন খুশি? কেমন এথিকসবোধ?

স্টাটফোরের নামে সম্প্রতিকালে দাগ লেগেছে। সম্প্রতি উইকিলিকস সিআইএর সাথে তাদের অনৈতিক যোগাযোগের ফাইল ফাঁস করে দিয়েছে। নইলে এর আগে এটা যথেষ্ট সম্মানজনক পত্রিকা ছিল। কিন্তু ‘হি্ন্দু’ (১৮৭৮ থেকে প্রকাশিত) মাদ্রাজ থেকে বের হওয়া প্রায় দেড় শ’ বছরের পুরানো ইংরেজি পত্রিকা। যেকোনো পত্রিকা তার দেশে-বিদেশের রিপোর্ট করতে গিয়ে তার সরকারের অবস্থান তাকে কাঁধে করে ঘুরতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, যদি না মনিকাঞ্চন বা অনুগ্রহ লাভের কোনো ব্যাপার না থাকে। এ ছাড়া এটা সম্ভবও নয়। কারণ সরকার অনেক সময় অনেক অবস্থান নেয় অনেক কারণে, অনেক স্বার্থে। এর সবগুলো সবসময় ওই পত্রিকারও স্বার্থ হবে এমন কোনো কারণ নেই। বরং না হওয়াই স্বাভাবিক। যেমন নিজের দেড় শ’ বছরের ইমেজ রাখার স্বার্থ আর আমলা-গোয়েন্দা বাহিনীর প্রপাগান্ডা রিপোর্ট এই দুই স্বার্থ স্ববিরোধী হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে তা আত্মঘাতী হয়েছে।

এক বিচারে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা সফল যে তারা দুটো পত্রিকাকে তাদের প্রপাগান্ডায় শামিল করতে পেরেছে। এতে পত্রিকা দুটো যে এথিক্যাল সঙ্কটে জড়িয়ে গেছে এর দায় ক্ষতি তাদের নিজেদেরই বহন করতে হবে। তবে স্টাটফোর আবার হিন্দুর থেকে এককাঠি সরেস। স্টাটফোর দাবি করছে শেখ হাসিনা নাকি গত দু-তিন বছরে যা করেছেন এটা নাকি বিরোধী দল দমন নয়, সন্ত্রাসবাদ দমন। তাই যদি হয় তাহলে আবার খালেদার সাথে আলোচনা, কম্প্রোমাইজ এসবের মানে কি? যে সন্ত্রাসী তার সাথে আবার আলোচনা নিগোশিয়েশন কম্প্রোমাইজ কি হতে পারে? তাকে তো দমন ও নির্মূল করারই কথা। এই প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে স্টাটফোরের মাথায় আসেনি। এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে একটা স্পেস ভাড়া দেয়ার রিপোর্ট তারা করছে এটা তাদের কাছেও পরিষ্কার।

তাহলে, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং জামায়াতমুক্ত বিএনপি’র রাজনীতির অর্থ হলো এক আকাক্সক্ষা যে আশা করছে বিএনপি যেমন-তেমন এক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে আওয়ামী লীগকে পুনর্বার যেভাবে হোক বিজয়ী ঘোষণা করে দেয়ার জন্য। মানুষের আকাঙ্খার রকমফেরের আসলে কোনো শেষ নেই।

[লেখাটার প্রথম ভার্সান সংক্ষিপ্ত আকারে আগে ছাপা হয়েছিল গত ০৯ আগষ্ট ২০১৫, মাসিক অন্যদিগন্ত পত্রিকায়। এখানে আবার নতুন করে লিখে, এডিট করে ছাপা হল।]

মমতার বাংলাদেশ সফর ও প্রত্যাশা

মমতার বাংলাদেশ সফর ও প্রত্যাশা

গৌতম দাস
২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-9n

mamota

পশ্চিম বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ঢাকা সফরে এসেছেন। এমন সময়ে তার আসা যখন আমরা বিরাট রাজনৈতিক সংকট, অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। এই সংকটে ভারতের অবস্থান কোন দিকে এ’সম্পর্কে জানতে আমরা আগ্রহী, বিশেষত দিল্লি আর কলকাতার অবস্থানের ঐক্য ও পার্থক্য আমরা বুঝতে চাই। বলা বাহুল্য, এখানে ভুল করার বিশেষ কোন অবকাশ নাই যে মমতা একটা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কোন প্রতিনিধি তিনি নন, প্রতিনিধিত্ব তিনি করছেনও না, করার সুযোগও নাই। তাহলে মমতার এই সফরের প্রয়োজন দেখা দিল কেন?
এর দুটো দিক আছে। এক, হাসিনা সরকার কেন মমতার সফরে আগ্রহ দেখালেন? আর দুই, মমতা এই সফর কেন প্রয়োজন মনে করলেন? এই দুটো বিষয় নিয়ে আমরা এখানে কথা তুলব।
বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কের দিক থেকে বিচারে ভারতের কোন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা থাকতে পারে তবে দিল্লির নীতি নির্ধারক শক্তি হিসাবে মনেকরে তাকে গণনায় নেবার কোন কারণ নাই। না রাষ্ট্রীয় প্রটোকল হিসাবে না ব্যবহারিক সুবিধার কারণে। ভারতের যে কোন রাজ্য সরকারের সাথে আমাদের সৌজন্যমূলক সম্পর্ক থাকাটাই যথেষ্ট, কারণ খামাখা সম্পর্ক খারাপ করার কোন মানে হয় না। ভারতের কনষ্টিটিউশনে কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক অনুসারে যেসব প্রাকৃতিক সম্পদ রাজ্যের ভাগে পড়েছে সে বিষয়ে কোন বৈদেশিক চুক্তির ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে হলে রাজ্য সরকারের মতামতের সঙ্গে সমন্বয় করার বাধ্যবাধকতা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আছে। তবে আবার কোন বিদেশি কোম্পানীকে কারখানার জমি বরাদ্দ দেবার ক্ষেত্রে রাজ্যের ভুমিকাই প্রধান, কেন্দ্র সেই ক্ষেত্রে পিছনে। ইত্যাদি। কিন্তু বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজ্যগুলোকে নিয়েই যে ভারত ইউনিয়ন সেই সমগ্র ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করার এখতিয়ার একমাত্র কেন্দ্রীয় সরকারের। কেন্দ্রীয় সরকার কি করে রাজ্য সরকারকে নিজের প্রতিনিধিত্বের অধীনে আনবে সেটা নিশ্চিত করবার দায়ও কেন্দ্রীয় সরকারের। যেমন কেন্দ্রীয় সরকার নদীর পানি নিয়ে বাংলাদেশের সাথে কোন চুক্তি করার সময় রাজ্য সরকারকে কেমন করে দিল্লির সিদ্ধান্ত-বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করে সেটা তাদের ব্যাপার। আমাদের সাথে চুক্তি করতে আসবে কেন্দ্রীয় সরকার, তার দায়দায়িত্বও কেন্দ্রীয় সরকারের । তবে বুদ্ধিমানের মত “ইনফরমালি” আমাদের জেনে রাখা জরুরি ও ভাল যে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি রাজ্যের সম্মতি রয়েছে কিনা। ঐ সম্মতি সাথে নিয়ে কেন্দ্রের প্রতিনিধি এসেছেন কি না। অর্থাৎ ঐ ইস্যুতে ভারতের যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী-আমলা কথা বলতে এসেছেন ‘বাস্তবে’ তিনি রাজ্যেরও প্রতিনিধিত্ব সত্যিই করছেন কিনা সেটা আমাদের জানা থাকা দরকার। কেন্দ্র-রাজ্যের মধ্যে কোন মতদ্বৈততা থাকতে পারে যা না জানলে দিল্লির সঙ্গে কোন বিষয়ে চুক্তি এক হাওয়াই চুক্তি হয়ে থেকে যেতে পারে। এমন রেকর্ডও আছে যেমন, কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী-আমলা জানতেন যে তারা রাজ্যকে সহমতে না নিয়েই বাংলাদেশে চুক্তি করতে আসছেন। তবু তারা এসেছেন আর আসার আগে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে বলে এসেছেন যে চুক্তিটা হয়ে যাবার পরে আপনার আপত্তি আমাদের কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়ে চিঠি দিলে আমরা এরপর চুক্তির বাস্তবায়ন না করে ফেলে রাখব। ফলে আপনার অসুবিধা হবে না। এতে সত্যমিথায় যাই থাকুক দিল্লি এটা করে এবং দুর্বল প্রতিবেশির সঙ্গে তাদের এ ধরনের অসৎ সম্পর্ক চর্চা অস্বাভাবিক কিছু নয় বাংলাদেশে এই বিশ্বাস বেশ প্রবল। গত তিস্তাচুক্তির সময় এমন কথা শোনা গেছিল। এরপর আমাদেরকে জানানো হল যে মমতার জন্যই নাকি ঐ চুক্তিটা হয় নাই। অথচ এটা তো আমাদের জানার বা শোনার কথা নয়। কারণ আমাদেরকে যদি এমন কথা শুনতেই হয় তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলে যারা আমাদের কাছে এসেছিলেন সেই মনমোহন সিং বা প্রণব মুখার্জি আসলে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কেউ ছিলেন না, তারা প্রতিনিধি ছিলেন না। ভারতের প্রতিনিধিত্বের ম্যান্ডেট বাস্তবে তাদের ছিল না। সরকারে থেকেও তারা সরকারি নন। ব্যাপারটা এমন দাঁড়িয়েছিল যেন যার গোডাউনে মাল নাই অথবা যে মাল আছে সেটা তাঁর নিজের নয় সেই পার্টির সাথে পণ্য বিনিময় চুক্তি করতে গিয়েছিলাম আমরা। এই পরিস্থিতিতে আমরা কি দেখলাম? দেখলাম যে চুক্তি হতে গিয়েছে দিল্লির সঙ্গে, কিন্তু তার কোন খবর নাই, আর অন্যদিকে কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, খাতির জমানোর চেষ্টা করতে থাকলাম। অর্থাৎ যেটা ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দায় এবং কাজ উভয়ই আমরা নিজের কাঁধে নিলাম। সেই থেকে বাংলাদেশে কলকাতার মুখ্যমন্ত্রীর গুরুত্ব আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেতে শুরু করেছি কিম্বা ভারতের রাজনীতিবিদরা আমাদের প্রতারিত করবার জন্য কি ধরনের ছুতা ব্যবহার করে তার বৈশিষ্ট্য ও মাত্রা সম্পর্কে আমাদের ভালই অভিজ্ঞতা হয়েছে।
ভারতের এই কপট কূটনীতি প্রসঙ্গে আরও দুটো কথা বলা জরুরি। এমনিতেই হাসিনার এই ভারত-খাতিরের জমানায় আমরা ভারতের সাথে বাংলাদেশের অমীমাংসিত বিষয়গুলো যেন কেবল তিস্তা আর ল্যান্ড বাউন্ডারির দুই ইস্যু সেই স্তরে নামিয়ে এনে দিয়েছিলাম। সীমান্ত হত্যা, বাকি নদীর পানি বন্টন ইত্যাদি আর কোন ইস্যু যেন আমাদের আর নাই। ওদিকে ল্যান্ড বাউন্ডারি – আমাদের সাধারণ্যের প্রচলিত ভাষায় ছিটমহল বিনিময় চুক্তি – তা মুলত ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরার মধ্যে সেকালে স্বাক্ষরিত হওয়া এক চুক্তি। ফলে সেকালের ঐ চুক্তিতেই তা শেষ হবার কথা। কিন্তু সেকালে চুক্তি একটা হয়েছিল বটে কিন্তু বাস্তবায়নের খবর আজও হয় নাই। অর্থাৎ আজও কাগজে কলমে মীমাংসিত বিষয়টা আসলে একটা অমীমাংসিত ইস্যু হয়ে আছে। ছিটমহল বিনিময় চুক্তির শর্ত অনুসারে দুই রাষ্ট্রের সংসদে ঐ স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুসম্মতি জানিয়ে অনুমোদন দেবার কথা ছিল। বাংলাদেশে আমরা তা সততার সঙ্গে করেছিলাম সেকালেই, কিন্তু ভারতের পার্লামেন্ট এখনও তা করেনি। আদালতে মামলা আছে এই অজুহাতে এখনও সেটা পেন্ডিং। যদিও ভারতের সর্বোচ্চ আদালতে ঐ চুক্তি হতে পারে বলে রায় দিয়ে মামলা চূড়ান্ত নিস্পত্তি করে দিয়েছে গত ১৯৯৪ সালেই। সেই থেকে ইস্যুটা ঝুলে ছিল। এদিকে এখনকার পার্লামেন্টে চুক্তির বিপক্ষে দেওয়া আপত্তির যুক্তি বেশ অদ্ভুত। ভারতের বিগত পার্লামেন্টে আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি বা মমতার দলের আপত্তি ছিল এরকম যে, যেহেতু এখানে সমান পরিমাণ ছিটমহলের জমি বিনিময় হবে না, ভারত কম পাবে তাই এই চুক্তি তারা পার্লামেন্টে পাশ করবে না। প্রথম ধাক্কায় শুনতে অনেকের মনে হতে পারে যে এই কথায় বোধহয় যুক্তি আছে। কিন্তু সে ধারণা ভিত্তিহীন। অল্পকথায় ভারতের সুপ্রীম কোর্ট চুক্তিটা হতে পারে বলে রায় দিয়েছিল ওর যুক্তিটা শুনলে আমরা বুঝব যে এসব কথা ঈর্ষাকাতর এক পেটি-মনের চিন্তা ও  ছলনা মাত্র।
যেকোন আধুনিক রাষ্ট্রের গঠনের ভিত্তিগত ধারণা বা পিছনের চিন্তা হল, নতুন রাষ্ট্র ঘোষণা মানেই ওর ভুখণ্ডগত সীমারেখাসহ তা উল্লেখ করে তার ওপর ঐ রাষ্ট্রের সার্বভৌম এখতিয়ার ঘোষণা। পরবর্তিতে রাষ্ট্রের কোন নির্বাহী (প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা পার্লামেন্ট) ঐ ঘোষিত রাষ্ট্রীয় ভুখন্ডের কোন অংশ অন্য কোন রাষ্ট্রকে দিয়ে দিতে বা বিনিময় করার ক্ষমতা রাখে না। এই যুক্তিতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার ঐ চুক্তি অবৈধ এবং পার্লামেন্ট ঐ চুক্তির পক্ষে অনুসিদ্ধান্ত জানাতে পারে না বলে আদালতে মামলা করা হয়েছিল। এর বিপরীতে এই মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে নিস্পত্তি করার যুক্তি হল – ঠিকভাবে দেখলে এটা ভারতের ভূখন্ড বাংলাদেশকে দিয়ে দেওয়া বা বিনিময় করার মত কোন চুক্তি নয়। মূলত এটা, ১৯৪৭ সালে তৎকালীন ভারত-পাকিস্তান দুটো আলাদা রাষ্ট্র গঠনের সময় উল্লেখিত ভুখণ্ডের কোন অদল-বদলও নয়। বরং চুক্তিটা হল, ঐ গঠন-ঘোষণা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে মাঠপর্যায়ে সীমা চিহ্নিত করণের পর্যায়ে দীর্ঘকালীন বিষয়টি অমীমাংসিত ফেলে রাখা বিষয়ের মীমাংসা। অতএব এই চুক্তি হতে পারে। অর্থাৎ এটা মাঠ পর্যায়ে সীমা চিহ্নিত করণের মামলা মাত্র। কোন জমি অদলবদলের চুক্তি নয়।
একই যুক্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এখন একমাত্র সমান পরিমাণ জমির বিনিময়ই কেবল এই চুক্তি হতে পারে বা হতে হবে এমন কথার কোন ভিত্তি নাই। তাহলে বিনিময় বলা হচ্ছে কেন? কারণ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশ ঘেরা ভুখন্ডে অথবা বাংলাদেশের নাগরিকের বেলায় উলটা ভারতের ভুখন্ডে এই অবস্থায় আছে। ফলে উভয় পক্ষেই নাগরিকেরা নিজ নিজ মুল রাষ্ট্র ও ভুখন্ডের সাথে যুক্ত হবে তাই বিনিময় ধরণের একটা ধারণা এখানে প্রচলিত হয়েছে। কিন্তু আইনী ভাষায় এটা মূলত উভয় রাষ্ট্রের অমীমাংসিত সীমানা চিহ্নিত করণের মামলা। এখানে চিহ্নিতকরণের পরের হিসাবে কারও ভাগে জমি কম বেশি হতেই পারে। কিন্তু সেই হিসাবটা চুক্তির ভিত্তি নয়, সেটা চুক্তির জন্য কোন বিবেচ্য বিষয়ই নয়। অতএব ভারতের পার্লামেন্টের বিরোধীদের যুক্তি ভিত্তিহীন। এছাড়া বাংলাদেশের চোখে দেখলে, এটা মমতার বা তার রাজ্য সরকারের বিষয় নয়। এটা সমগ্র ভারতের প্রতিনিধিত্ত্ব করে বলে দাবিদার কেন্দ্রীয় সরকারের বিষয়। তাদেরই আইনী বাধ্যবাধকতা। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার আপত্তি কি এটা শোনা বা দেখার দায়দায়িত্ত্ব আমাদের নয়। ফলে মমতার কাছে আমাদের দেনদরবার করার কোন যুক্তিই নাই। রাষ্ট্র হিসাবে আমরা চিনি কোন রাজ্য সরকার নয় কেবল কেন্দ্রীয় সরকারকে, যে ভারতকে প্রতিনিধিত্ব করে দাবি করে আমাদের সাথে চুক্তি করতে আসে বা এসেছিল।
দ্বিতীয় প্রসঙ্গটা হল পানি চুক্তি, বিশেষ করে তিস্তা পানি চুক্তি। মমতাসহ যারা এই চুক্তির বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছিল তাদের যুক্তির প্রসঙ্গে যাব। এ প্রসঙ্গে প্রায়ই একটা কথা শুনতে পাই যে, নদীতে পানিই নাই ভারত দিবে কোথা থেকে। অথবা প্রাকৃতিক পানি এখন কমে আসছে তাই আমরা কতদুর কি করতে পারি। অথবা মমতার ক্লাসিক যুক্তি – তিস্তার পশ্চিমবঙ্গ অংশের অববাহিকা অঞ্চলের লোকেরাই চাষাবাদের পানি পাচ্ছে না, আমরা আর কি দিব। ইত্যাদি। অর্থাৎ পানি চুক্তির প্রসঙ্গটা যেন ভারতের প্রয়োজন মিটানোর পর আমাদের দিবার মত পানি থাকে কি না এর ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া এই “প্রয়োজন” কথাটাকে কি দিয়ে ব্যাখ্যা করব? বুঝব? পশ্চিমবঙ্গের মানুষের পানির ‘প্রয়োজন’-এর সীমা কিভাবে কোথায় টানব? মানুষের প্রয়োজনও অসীম। এখানে পুরা তর্কটাকে পর্যবসিত করা হয়েছে আগে পশ্চিমবঙ্গের “প্রয়োজন” মিটাতে হবে এরপর বাংলাদেশ। না থাকলে নাই। ভারতের দিক থেকে এটা একটা ম্যানেজমেন্টের প্রশ্ন। কিভাবে তারা তাদের “প্রয়োজনের” সমস্যাটাকে আগে মিটিয়ে নেবে তারপর বাংলাদেশের জন্য কি করতে পারে সেটা বিবেচনা করবে। অর্থাৎ ভারত সদয় পানিদাতা আর আমরা ঐ দাতার ভিক্ষাপ্রার্থী। আন্তরাষ্ট্রীয় কমন নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশ আমরা, উজানের দেশ ভারত পানি আটকে রেখে দিয়েছে আর আমরা তার ভিক্ষা প্রার্থী? তাই কি? আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কের দেনাপাওনা ভিক্ষা বা দয়ার উপর দাঁড়ায় না। বিশেষত স্বার্থের প্রশ্নে দয়া বা ভিক্ষা চলে না। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতি ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি দয়াদাক্ষিণ্য প্রদর্শনে পর্যবসিত হয়।
না আমরা মোটেই পানিভিক্ষাপ্রার্থী না। আন্তর্জাতিক নদী আইন বলছে, উজান দেশের মত ভাটির দেশও সমান কমন নদীর পানির ভাগীদার। এটা তার হক। এছাড়াও উজানের দেশ নদীর মুল ধারা থেকে খাল কেটে বা বাঁধ দিয়ে পানি সরিয়ে নিতে সে পারে না। তিস্তা নদীর ক্ষেত্রে নদীর সিকিম অংশে তাই করা হয়েছে। তাহলে দাঁড়ালো, পানি ভাগাভাগির আসল ভিত্তি হল, ভাটির দেশের হক ও অধিকার। উজানের দেশের কাছে সে পানির জন্য ভিক্ষাপ্রার্থী নয়। আগে উজানের দেশের পানির প্রয়োজন মিটানো এরপর যদি থাকে তবে বাংলাদেশ পাবে এই সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার আন্তর্জাতিক আইনে দিল্লিকে দেয়া হয় নি, দেয় না। অতএব ভারতের পানির প্রয়োজন কত তা জানারও কোন প্রয়োজন আমাদের নাই। অথচ পানি ভাগাভাগির আলাপ উঠলেই ভাগের ভিত্তি কি এটা অস্পষ্ট থেকে যায়। ভাগের ভিত্তি কি তা অস্পষ্ট রেখে মিডিয়াসহ সব জায়গার আলাপ শুরু হয়ে যায় ভারতের প্রয়োজনের গল্প। আজ পর্যন্ত কোন পানির আলোচনায় পানি ভাগের ভিত্তি কি এনিয়ে কোন কথা আমরা শুনি নাই। সব খানে বয়ানটা হল ভারত পানির সদয় দাতা। আশা করি মমতার এই সফরেও আমরা এই একই গান শুনতে পাব। মমতা দির দয়ার ওপর তিস্তার পানি পাওয়া না পাওয়া নির্ভর করছে গণমাধ্যমগুলো এই বাজে তর্ক করে যাবে।

দুই
মমতার দিক থেকে তাঁর বাংলাদেশ সফরের তাগিদটা কি? আমার আগের লেখায় বলেছিলাম, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য নির্বাচন আগামি বছর ২০১৬ সালের মে মাসে। ইতোমধ্যে মমতা এক বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছেন। ৩৪ বছরের বামফ্রন্টকে পরাজিত করে গত ২০১১ সালে নির্বাচনে রাজ্য সরকার দখলের চেয়েও প্রভাবের দিক থেকে এটা আরো বড় বিপ্লব। বড় তার তাৎপর্য। কে কি ধরণের মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করে ভোটে জিতেন সেই ভোটারদেরকে বলা হয় কনস্টিটুয়েন্সী। আমরা এই ধারণাকে নামিয়ে ক্ষুদ্র করে অর্থ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এমপি কোন এলাকা থেকে জিতে এসেছেন ঐ “এলাকার” অর্থে আমরা কনস্টিটুয়েন্সী শব্দটাকে নামিয়ে এনেছি। যদিও এর মূল অর্থ এমপি কাদের প্রতিনিধি, কোন ভোটাররা তাকে ভোট দিয়েছেন তারাই ঐ এমপির কনস্টিটুয়েন্সী – এটাই এর অর্থ।
তো এই অর্থে মমতার দল তৃণমুলের মূল কনস্টিটুয়েন্সী এখন পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটাররা। যেখানে মুসলমান ভোটার মোট ভোটারের ২৮%। যারা এরআগে প্রথমে কংগ্রেস ও পরে বামফ্রন্টের ভোটার ছিল। এখন মমতার অবদান তিনি মুসলমান ভোটারদের মুসলমান হিসাবেই মুক্তি দিয়েছেন, তাদের এখন আর “সেকুলার” ভোটার বলে অকেজো ধারণার আড়ালে লুকানোর দরকার নাই। তারা যা তাই। পিছিয়ে পড়া দশা থেকে বের হতে তাঁরা এখন কেন্দ্র ও রাজ্যের রিসোর্স বরাদ্দে নিজের অংশ দাবি করতে পারে। আগামি দিনে কতদুর এর বাস্তবে পারবে কি দাঁড়াবে সেসব আলাদা প্রশ্ন। অর্থাৎ এসবের প্রতি রাজনৈতিক স্বীকৃতির প্রসঙ্গ এখন সামনে এসে গেছে। একধরণের রাজনৈতিক স্বীকৃতি এসেছে, এখন দেখার বিষয় অর্থনৈতিক অর্থে এটা কতটা কতদিনে বাস্তবায়িত হয়। মুসলমান ভোটারদের ইস্যু বাকি সব কলকাতা কেন্দ্রিক দল যেমন বিজেপি, বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জন্য বিরাট মাথাব্যাথার ইস্যু হয়ে গেছে।
এর অর্থ বাকি ৭২% ভোট এখন তৃণমূল সহ চারটা দলের মধ্যে ভাগ হবে, ভোটের সংখ্যার এই সংখ্যাতত্ত্ব পশ্চিমবঙ্গের আগামি নির্বাচনে মূল নির্ধারক, মূল নির্বাচনি ইস্যু। এখান থেকেই দলগুলোর রাজনৈতিক বয়ানের ভিন্নতা এবং মিল। যেমন ইদানিং বিজেপি ও বামফ্রন্টের বয়ানের ফারাক খুজে পাওয়া মুশকিল হয়ে গেছে। কারণ এখন মূল বয়ান হতে হবে এন্টি-মুসলমান যেটা এন্টি-তৃণমূল হয়ে কাজ করবে, তৃণমূলকে কাটবে। কিন্তু সরাসরি এন্টি-মুসলমান বয়ান তো দেয়া যায় না, এতে সেকুলারদের সেকুলার জামা আর গায়ে থাকে না, আপনাতেই খুলে পড়ে। আবার ভারতের নির্বাচনী আইনে ধরা খাওয়ার সম্ভাবনা আছে। তাই বয়ানটা কিছুটা বদলে হয়েছে – আড়াল করতে করা হয়েছে ‘জঙ্গী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বয়ান’। জঙ্গী-সন্ত্রাসী মানেই তো মুসলমান এই সূত্রে। শুধু তাই নয় পড়শি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ মানে একটা হিন্দু-মনের চোখে মুসলমান, হিন্দুর ‘অপর’ — এ ছাড়া কলকাতা ভিন্ন কিছু ভাবতে পারে তার প্রমাণ খুবই কম। আর কি! বাংলাদেশকে এটাতে জড়াতে পারলে বয়ান আরও পোক্ত হবে। ফলে এই হল, বাংলাদেশ-জঙ্গী-সন্ত্রাস বয়ানের সুত্র। মমতা বাদে বাকি তিন দলের আসন্ন নির্বাচনে প্রপাগান্ডার কৌশলও তাই মুসলমানদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে।
মমতার বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদীদের প্রচার। বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের সময় শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের তুষ্ট করার চেষ্টা করবেন মমতা। কলকাতায় হিন্দুত্ববাদীদের প্রচারের বিপরীতে একদিকে মুসলমানদের ভোটের ক্ষেত্রে একচেটিয়া সমর্থন ধরে রাখা, অন্যদিকে বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের সঙ্গে অতিরিক্ত মৈত্রী প্রদর্শন করে কলকাতার হিন্দুদের অভিমান হ্রাস করা — এই দোদুল্যমান রাজনীতি মমতা ব্যানার্জির। বাংলাদেশ সফরে নিজের ভাবমূর্তি ধরে রাখাই তার প্রধান উদ্দেশ্য। আমাদের ইমপ্রেস হবার কিছু নাই। এখনকার সফরে বাংলাদেশের ইসলাম বিদ্বেষী সেকুলারদের প্রতি তাঁর অতিরিক্ত আগ্রহ বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বিরক্তি উৎপাদন করলেও পশ্চিম বঙ্গের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার সহমর্মিতার প্রয়াস বাংলাদেশের জনগণ সমর্থন করবে। ধর্মান্ধতা, সাম্প্রদায়িকতা এবং ইসলাম বিদ্বেষী রাজনীতির বিপরীতে সীমান্তের দুই পাশের জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া বাড়ানোর ক্ষেত্রে মমতা ব্যানার্জি কী ভূমিকা রাখেন তা দেখার জন্য নজরে এই দেশের জনগণের আগ্রহ আছে।
বর্ধমান জেলায় একটা বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছিল গত বছর অক্টোবরে। সেটা কাজে লাগিয়ে এই প্রপাগান্ডায় আলো-বাতাস লাগানো হয়েছে। ওদিকে সারদা কেলেঙ্কারি নামে এক অর্থ কেলেঙ্কারিতেও মমতার দল অভিযুক্ত হয়ে আছে। (সারদা কেলেঙ্কারি হল আমাদের ‘ডেসটিনি” কেলেঙ্কারির মত সমতুল্য ঘটনা।) এই দুইয়ে মিলে প্রপাগান্ডার গল্প জমিয়ে তোলা হয়েছে। এই গল্পকে আরও সুনিপুণ করতে বাংলাদেশের জামাতকেও টেনে আনা হয়েছে। যাতে মূলত এন্টি-মুসলমান ক্যাম্পেনটাকে জামাত-জঙ্গী-সন্ত্রাসী এসব শব্দের মোড়কে হাজির করা যায়। সেটা জায়েজ এমন একটা ন্যায্যতাও টানা যায়। জামাত পর্যন্ত প্রসঙ্গ টানা শুরুর কারিগর মূলত পশ্চিমবঙ্গ বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর। গত ২০১৪ মে মাসের কেন্দ্রীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচন উপলক্ষ্যে কলকাতা বামফ্রন্টের প্রধান সমাবেশ থেকে তিনি এই বয়ান দিয়েছিলেন। মুসলমান কনস্টিটুয়েন্সী মমতার কাছে হারানোর দুঃখের তীব্রতা আমাদের এভাবেই তিনি জানিয়েছিলেন। তখনও বর্ধমান ইস্যু হাজির হয় নাই। পরে এই ইস্যু হাজির হলে বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি অমিত শাহ — যিনি পশ্চিমবঙ্গের আগামি নির্বাচনে দলকে জিতানোর মূল দায়িত্বে এখন আসীন — তিনি বিমান বসুর বয়ানটাকেই এবার বাড়তি আকার দেন। ফলে পশ্চিমবঙ্গে আগামি নির্বাচনে তখন থেকে অনেকবার উচ্চারিত শব্দ হয়েছে বাংলাদেশ, আগামিতেও থাকবে, নির্বাচন পর্যন্ত। কিন্তু অমিত শাহের এসব কারবারে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে মোদী সরকার নিজেকে দূরে রাখতে চান। যদিও তার বিশ্বস্ত প্রধান অমিত শাহকে তিনিই পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে দলকে ক্ষমতাসীন করার এসাইমেন্ট সঁপেছেন। তবু নিজের হাত ধুয়ে রাখতে, আর তা রেকর্ডে রাখতে মোদী ইতোমধ্যেই ভারতীয় পার্লামেন্টে নিজের এক মন্ত্রীর লিখিত বিবৃতি পাঠ করিয়ে পরিস্কার করেছেন যে, বাংলাদেশ-বর্ধমান-সারদা ইস্যু এসব মিলিয়ে যে বয়ান তার পক্ষে  তদন্তকারি গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএ এর রিপোর্টে প্রমাণ করার মত তথ্য মিলেনি। অমিত শাহ ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রশাসন, র কে আর সেই সাথে এনআইএ-এর বাংলাদেশ সফর, পালটা বাংলাদেশ থেকেও আমাদের গোয়েন্দাদের সফর ইত্যাদিতে প্রশাসন পর্যায়ে অনেকদুর ব্যবহার করেছেন। মোদী সরকারের বিবৃতির পরে তবুও পশ্চিমবঙ্গ পর্যায়ে প্রপাগান্ডা এখনও একই রকম রয়ে গেছে। কারণ জঙ্গী-সন্ত্রাসের ভীতিটা রয়েই গেছে।

মমতার প্রত্যাশা
এই পটভুমিতেই মমতা বাংলাদেশে এসেছেন। তিনি কি চাইবেন হাসিনার কাছে?
মমতা চাইবেন, হাসিনা যেন পশ্চিমবঙ্গের চলতি নির্বাচনী প্রপাগান্ডার লড়াইয়ে, বাংলাদেশকে জড়িয়ে যে জঙ্গী-সন্ত্রাসের বয়ান চলছে একে পরিপুষ্ট না করেন। হাসিনা নিজে এমন কোন বয়ান যোগ না করেন যেটা এই বয়ানকে পরিপুষ্ট করে। বরং বাংলাদেশের নাম যতই উঠুক তিনি যেন এটা ভারতের এক আঞ্চলিক এবং একেবারেই নির্বাচনী রেঠরিক সেদিক থেকে দেখেন। যার বিপরীতে কলকাতার বয়ানের বিরুদ্ধে যায় হাসিনার নিজস্ব পালটা বয়ানে যদি তেমন কিছু হাসিনা যোগ করতে রাজি হন তাহলে সেটা মমতার চরম পাওয়া হবে। আর যদি তা না-ই পারেন, তবে যেন চুপ থাকেন, তাহলেও মমতার জন্য এটা ভাল কাজে লাগবে। এই হবে মমতার চাওয়া। এটাই তার বাংলাদেশ সফরের মুল উদ্দেশ্য। অবশ্য সেটা যাই হোক এই সফর থেকে একটা বাড়তি সুবিধা তিনি পাবেন। মমতা যে বাংলাদেশ থেকে “যাওয়া” জঙ্গী সন্ত্রাসীর আশ্রয় প্রশ্রয় দেবার নেত্রী নন — যে প্রপাগান্ডা কলকাতায় তাঁর বিরোধীরা জারি রেখেছে – তার প্রমাণ তিনি এবার করতে পারবেন। সেটা হবে এরকম যে, তিনি বাংলাদেশ সফরে এসেছেন এবং হাসিনার দ্বারা ভাল আপ্যায়িত হয়েছেন। তিনি জঙ্গী সন্ত্রাসীর আশ্রয় প্রশ্রয়দাত্রী হলে কি এই মর্যাদা পেতেন!
কিন্তু মমতা যেভাবে যা চাইবেন তাই হাসিনা দিবেন এমন কোন কারণ নাই। তাহলে হাসিনা কিসের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিবেন? তাঁর সিদ্ধান্ত নিবার ভিত্তি হবে মমতা কি দিতে পারেন যা তার ক্ষমতাকে পোক্ত করতে কাজে লাগতে পারে। হাসিনার সরকারের পক্ষে মোদীর সমর্থন আনার ক্ষেত্রে মমতা সঠিক লোক নন, বরং উলটা। তবে তিস্তার পানি বা ল্যান্ড বাউন্ডারি ইস্যুতে তিনি আপত্তি করবেন না এমন ধারণা মমতা ঘোষণা করতে পারেন। যদিও এমন ঘোষণা মানেই এগুলো সরাসরি বাংলাদেশের পেয়ে যাওয়া নয়। যদিও ল্যান্ড বাউন্ডারি ইস্যু আগামি ২৩ মার্চের মধ্যে ভারতের পার্লামেন্টে চুড়ান্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে এবং তা মোদীর ক্রেডিটে আসবে। তার চেয়েও বড় কথা হাসিনার কাছে এর মূল্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটে সরাসরি তাকে সাহায্য করে এমন কোন ইস্যু নয়। বাংলাদেশের চলতি সংকটের যাত্রায় যদি হাসিনা ক্ষমতায় টিকে যেতে পারেন তবে এরপরে হয়ত প্রপাগান্ডায় এটা তাঁর কাজে লাগতে পারে। সারকথায় মমতা যা দিতে পারেন তা হাসিনার চলতি ক্ষমতা-সংকটকে সরাসরি সাহায্য করতে পারে এমন কিছু নয়। ফলে মমতার অফার হাসিনার জন্য বড়জোর অপ্রত্যক্ষ এক সুবিধা মাত্র। আগামিতে কাজে দিবে এমন। এধরণের বিচারের প্রেক্ষিত থেকে হাসিনার সিদ্ধান্ত পরিচালিত হবে বলে অনুমান করা যায়। এই সফরের বাকিটা হবে হাসিনা ও মমতার উভয়ের জন্যই শো-আপ এর লাভালাভ।
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৫।
[এই লেখাটা গত ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার সামান্য এডিট করে ছাপা হল।]

অপহরণ গুম ও খুনের বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবার পিছনের গুরুতর সত্য

অপহরণ গুম ও খুনের বাংলাদেশ রাষ্ট্র হবার পিছনের গুরুতর সত্য

গৌতম দাস

অপহরণ, গুম ও খুনের ভিতর ভাসছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যু হিসাবে এটা এক চরম অবস্থানে এসে ঠেকেছে। হয়ত আরও কোন চরমে তা পৌছাবে। আতংক সমাজের প্রায় সব অংশকেই তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ব্যাপারটা এমন নয় যে এর আগে অপহরণ গুম ও খুন ঘটেনি, কিম্বা এখনকার মতো চরম আকার ধারণ করে নি । গত এক দেড় বছরে তো বটেই এমনকি গত ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনের পর অপহরণ, গুম ও খুনের সংখ্যা ভীতিকর জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছিল। অথচ এখনকার তুলনায় অপহরণ গুম ও খুন তখন গণমাধ্যমে আসে নি। যারা এর শিকার হয়েছিল তাদের প্রতি গণমাধ্যম সদয় ছিল না। এখনও সাতক্ষীরায় যে অপহরণ, গুম বা খুনের ঘটনা চলছে তা নারায়নগঞ্জের মত একইভাবে সামাজিক-রাজনৈতিকভাবে প্রতিক্রিয়া তৈরি করছে না। বিচারবহির্ভূতভাবে এদের ‘নির্মূল’ করবার ইচ্ছাটাও সমাজের একাংশের মধ্যে প্রবল হয়ে আছে। ফলে সেই সময়ের অপহরণ, গুম ও খুনের মিডিয়া রিপোর্টিং না হবার কারণে বিষয়টাকে সরকার আড়ালে রাখতে পেরেছিল এখনও “বিশেষ বিশেষ” অপহরণ, গুম বা খুনের বেলায় পারছে। যারা অপহরণ গুম ও খুন হচ্ছে তারা “জামাত-হেফাজত-বিএনপি” ফলে রাষ্ট্রের দিক থেকে এদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও হত্যাকান্ড চালিয়ে যাওয়া জায়েজ -গণমাধ্যম খুব সফলভাবেই এই বিকৃত মানসিকতার চর্চা জারি রাখতে পেরেছিল ও পারছে। যে র্যা ব-১১ এর কমান্ডারের নামে এত অভিযোগ, শীর্ষে তিনি, নারায়নগঞ্জে বদলি হয়ে আসার আগে তিনি লক্ষীপুর জেলায় ছিলেন। সেখানকার বিএনপি ও জামাত নেতা কর্মীদের হত্যার অভিযোগ নিয়মিত আমরা দেখেছি। একবার তো ঢাকা থেকে হেলিকপ্টার পাঠিয়ে জনরোষ থেকে স্থানীয় র্যা ব বাহিনীকে উদ্ধার করতে হয়েছিল। কিন্তু লক্ষীপুরের সেসব ঘটনায় আজকের মত আমরা সামাজিক-রাজনৈতিক কোন প্রতিক্রিয়া দেখিনি। অর্থাৎ বিচার ও আইনবহির্ভুতভাবে অপহরণ, গুম বা খুনের এক রাজনৈতিক-সামাজিক স্বীকৃতি আমরা দিয়েছি। অথচ সেই মিডিয়া ও সেই রাজনীতি আজকে অপহরণ, গুম বা খুনের বিরুদ্ধে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুলতে চাইছে। বড়ই তাতপর্যপুর্ণ।
রাষ্ট্রের সন্ত্রাসী ভূমিকা ও আইন শৃংখলা বাহিনীর আইন বহির্ভূতভাবে হত্যার পক্ষে দাড়ানো লোকের অভাব হয়নি, আর তাদের যুক্তির অভাব ঘটে নি। যেমন, এমন যুক্তিও আমরা শুনেছি যে, সর্বসাধারণের জান ও মাল রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের; অতএব রাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নাগরিকদের পঙ্গু কিম্বা হত্যা করতেই পারে। খুবই মজার যুক্তি এটা। কিন্তু সমাজের ভেতর থেকেই রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, কিন্তু গড়ে ওঠে সমাজেরই উর্ধে সমাজের ওপর চেপে বসে থাকা ‘দানব’ হিসাবে – এটা অতি পরিচিত পুরানকাল থেকেই চলে আসা বামপন্থি এক সবল চিন্তা ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রকে দেখবার এই পুরানা বামপন্থি চিন্তার জায়গাটা বামপন্থিদের মধ্যেও খুব একটা অবশিষ্ট আছে কিনা সন্দেহ।
সেটা দূরে থাকুক, এখন ‘রাষ্ট্র’ নামক এই দানবকেই এক স্বাভাবিক সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান হিসাবে গণ্য করবার মতাদর্শই বাংলাদেশে প্রবল। রাষ্ট্র হাজির আছে বলেই এই প্রতিষ্ঠানটি ন্যায্য, তার গঠনের সুনির্দিষ্ট ইতিহাস ও চরিত্রের হদিস নেবার দরকার নাই, এই চিন্তা থেকে মুক্তি সহজ নয়। রাষ্ট্র আছে বলেই তার আর ন্যায্যতা প্রমাণের দরকার নাই, অতএব কোন নাগরিকের অধিকারের বালাই রাষ্ট্রের না করলেও চলে, এই চিন্তার প্রাবল্যের কারণেই ভিন্ন মতাদর্শের নাগরিকদের রাষ্ট্র যখন নিপীড়ন ও হত্যা করে তখন সমাজে কোন বড় ধরনের আলোড়ন তৈরি হয় না। এমনকি তথাকথিত সুশীল বা লিবারেল কিম্বা প্রগতিশীলরাও নিশ্চুপ থাকা শ্রেয় মনে করে, সমর্থন যোগায়।
এমনকি যারা মুখে নাগরিক ও মানবিক অধিকারের কথা বলেন, তাদেরও সে ক্ষেত্রে বলতে শুনি যে মৌলিক অধিকার বা অন্য সবকিছু দেখবার আগে দেখতে হবে রাষ্ট্রের দ্বারা নিপীড়িত বা আইন শৃংখলা বাহিনীর হাতে খুন হওয়া নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ কি? যদি উনি ইসলামি রাজনীতির হন, কি ইসলামি চিন্তার উপর ঠেস দিয়ে আছেন বলে মনে হয়, তবে তিনি মৌলবাদি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী। তখন রাষ্ট্রের নিপীড়ন ও হত্যার সমালোচনা দূরে থাকুক, বরং প্রয়োজনে ‘রুখে দাঁড়াও বাংলাদেশ’ বলে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও হত্যার পাশাপাশি তাদের নির্মূল করতে নেমে পড়তে হবে। এই হল তাদের দশা। এরা মনে করে “ইসলামপন্থি মৌলবাদি বা সন্ত্রাসীরা” রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কর্মাকান্ডে অপহরণ গুম ও খুন হয়ে গেলে দানব রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার কিছু নাই। কারণ তারা “জামাত-হেফাজত-বিএনপি” এর মত রাজনৈতিক আদর্শের নাগরিক। এরা বলতে চান, এই নাগরিকদের নাগরিক অধিকার জান মাল মারাত্মক হুমকির মধ্যে পড়লেও অথবা রাষ্ট্র তার উপর নিপীড়ন, নির্যাতনের মতো অপরাধ করলেও আগে বিবেচনায় নিতে হবে তাদের রাজনৈতিক আদর্শ কি। ক্ষমতাসীন সরকারের পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শ কেউ ধারণ না করলে কোন নাগরিক ব্যক্তির নাগরিক অধিকার নাই – এই হোল তাদের সারকথা।
বাংলাদেশে এই ধরণের নাগরিক ও মানবিক অধিকার বিরোধীদের সম্পর্কে একটা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা শেয়ার করি। গত জানুয়ারির শেষে অপহরণ গুম ও খুনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রচারণার অংশ হিসাবে এক মানবাধিকার সংগঠনের সভার কাজে এক জেলা শহরে যেতে হয়েছিল। মূল প্রবন্ধ পড়ার পর সেখানে প্রথম বক্তা ছিলেন জেলা শহরেরই কমিউনিস্ট পার্টির প্রাক্তন সভাপতি; জেলা আইনজীবী সমিতির বর্তমান সভাপতিও তিনি। তিনি কথা শুরু করলেন এভাবে, মানবাধিকারের কথা বইপুস্তকে অনেক ভাবে থাকে। সেটা সেখানে থাক। খোদ ওবামাও সেগুলো মানতে পারেন না। ফলে আমাদের সরকারের বিরুদ্ধেও যে অপহরণ গুম ও খুনের অভিযোগ হচ্ছে সেগুলো নিয়ে বিচারে সবার আগে দেখতে হবে যারা অপহরণ গুম ও খুনের ভিকটিম তাদের রাজনৈতিক আদর্শ কি। এটাই মুখ্য বিবেচনা। ইস্যুটাকে সেভাবেই দেখতে হবে।

“রাজনৈতিক আদর্শের” ভিত্তিতে রাষ্ট্র নাগরিককে তার নাগরিক মানবিক অধিকার বিতরণ করবে কথার অর্থ কি
কথাটার সার কথা কি? আমার পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শ কেউ ধারণ না করলে তাঁর নাগরিক অধিকার রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানো বা ক্ষুন্ন হবার বিপক্ষে সোচ্চার হওয়া যাবে না। বলা বাহুল্য, আমার খুবই বেগ পেতে হয়েছিল ঐ প্রকাশ্য সামাজিক সভায় সেই বক্তার মারাত্মক বিপদজনক ও আত্মঘাতি বক্তব্যের পরিণতি কি হতে পারে তা উপস্থিত সকলকে বুঝিয়ে বলতে। এখানে একটা কথা বলে রাখা ভাল। আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাটা ঘটনাচক্রে কমিউনিষ্ট পার্টি বা সিপিবি কেন্দ্রিক। কিন্তু এর অর্থ এমন নয় যে এই বিশেষ চরিত্রের “নাগরিক অধিকার” ধারণাটা কেবল সিপিবির পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। বরং একটা ক্যাটাগরি করে বলা যেতে পারে যে, যারা নিজেদের “প্রগতিশীল” বা “চেতনার সৈনিক” মনে করেন নিজেকে মোটামুটি তাদের প্রায় সবারই অবস্থান এটা। তাই আমরা এখন দেখছি। একই বাহিনী কমান্ডারের ততপরতা লক্ষীপুরে ঘটলে কোন সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে না। কিন্তু এবার নারায়নগঞ্জে ঘটলে প্রতিক্রিয়া হয়।
কোন “যদি” বা “কিন্তুর” আড়ালে বা কোন যুক্তিতেই রাষ্ট্র নাগরিকদের জানমালের ক্ষতি করবে এটা মেনে নেওয়া যায় না। এতে সমাজ বা রাষ্ট্র কোনটাই টেঁকে না। নতুন কোন রাষ্ট্রও এমন ভিত্তিতে গড়ে উঠতে পারে না। সমাজের রক্তাক্ত বিভক্তি কিম্বা রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে চাইলে এই অতি গোড়ার নীতি আমাদের আত্মস্থ করতে হবে। একে উপেক্ষা বা গাফিলতি মেনে নেওয়ার কোন সুযোগ নাই। অথচ এই ন্যূনতম নীতির অভাব তাদের মধ্যেই প্রবল যাদের কাছে আমরা এই নৈতিক প্রশ্নে দৃঢ়তা আশা করি। অথচ এরাই একই নিশ্বাসে নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করেন।
আদর্শ যাই হোক কোন রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশ নিতে গিয়ে কোন নাগরিক যদি কোন ক্রিমিনাল অপরাধ করে বসেন তবে অবশ্যই তার অপরাধ আমলে নিতে হবে এবং বিচার করতে হবে। আদালতে অপরাধ প্রমাণ সাপেক্ষে তিনি কেবল ঐ ক্রি্মিনাল অপরাধের জন্যই শাস্তি ভোগ করবেন। কোন ক্রমেই তার রাজনৈতিক বিশ্বাস বা তৎপরতার জন্য নয়। এটাই মূল কথা। এছাড়া আমরা ভুলে যাই রাষ্ট্রের নির্বাহি বিভাগ বিচার বিভাগ নয়। যার সোজা মানে নাগরিকের কোন কথিত অপরাধের বিচার সরকার করতে পারে না। সরকার বিচারক নয়, বড়জোর আদালতে অভিযোগ আনয়নকারী হতে পারে। অথচ সে জায়গায় আমরা রাষ্ট্রের নির্বাহী সরকারকেই অপরাধের বিচারক বানিয়ে ফেলছি। শুধু তাই নয় সরকারকেও কোন নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ তাঁর পছন্দসই কিনা সেই বিচারের ভার দিয়েছি। অথচ কোন নাগরিকের রাজনৈতিক আদর্শ কেমন তা কোন আদালতের বিচারকের পছন্দসই কিনা তা বিচারের এক্তিয়ার বিচার আদালতেরও নাই। আসলে, কোন রাজনীতি ভাল না মন্দ তা একমাত্র রাজনৈতিক পাড়ায় বিচার হয় অথবা জনগণ বিচার করে। আদালত পাড়ায় কোন রাজনীতির বিচার করা যায় না, চলে না; বিচারকের সেই এক্তিয়ার কনষ্টিটিউশন দেয় না। তবে কোন রাজনীতি কনষ্টিটিউশন ভঙ্গ করলে অথবা বিরোধী হলে সেটা অন্য কথা। যেটা কোনভাবেই রাষ্ট্রের নির্বাহী অথবা বিচারকের কোন দলের রাজনৈতিক আদর্শ পছন্দ করা না করার বিষয় নয়। অর্থাৎ কোন রাজনৈতিক দলের আদর্শ বা গঠনতন্ত্র রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনের সাথে সংঘাতপুর্ণ বা বিরোধ তৈরি করে এমন প্রমাণিত না হলেই হল। এরপর ঐ রাজনীতি আর রাষ্ট্রের নির্বাহী অথবা বিচারকের কোনভাবেই পছন্দ অপছন্দের বিষয় নয়, এক্তিয়ার নাই। তবে যে কোন নাগরিক ঐ রাজনীতিকে (আদালতে আইনীভাবে নয় কেবল রাজনৈতিক পাড়ায়) পছন্দ করতে পারেন, বিরোধীতাও করতে পারেন। অথচ আমরা খোদ রাষ্ট্রকেই রাজনৈতিক আদর্শ বিবেচনার ভয়ংকর ও অদ্ভুত কথা বলে অবলীলায় সরকারকেই অপহরণ গুম ও খুনের ঘটনা ঘটাতে দিচ্ছি শুধু না, এর পক্ষে সাফাই যুক্তি দিচ্ছি।

দুই

নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম সহ সাতজনের অপহরণ গুম ও খুনের ঘটনায় সমাজের ব্যাপক প্রতিক্রিয়া ঘটছে। এটা তাৎপর্যপুর্ণ। আমার অভিজ্ঞতার জেলা আইনজীবী সমিতির ঐ সভাপতির মত আমরা অনেকেই এই সরকারের শুধু শেষের গত তিন বছরে অপহরণ গুম ও খুন করতে দিয়ে একটু একটু করে এমন দানব বানিয়েছি। যুক্তি তুলতে দেখেছি, যে পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শ কেউ ধারণ না করলে তাকে তো সরকারের হাতে অপহরণ গুম ও খুনই হতে হবে। এই বেহুঁশ ও আত্মঘাতি চিন্তা নিয়েই আমরা দিন কাটাচ্ছিলাম। আমাদের অনেকের কাছে তা খুবই স্বাভাবিক মনে হচ্ছিল। কিন্তু নারায়নগঞ্জের ঘটনা কি আমাদের হুঁশ ফিরিয়েছে, ফেরাতে সক্ষম হবে? এটা নির্ণয় করবার সময় এখনও আসে নি। যদিও রাজনৈতিক আদর্শ নির্বিশেষ সবারই অন্তত এটুকু হুঁশ হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে যে, খারাপ কিছু একটা ঘটে গিয়েছে, যার ফল আমরা ভোগ করছি। কেউ বলছেন রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়ছে, রাষ্ট্রের একটা মারাত্মক ব্যাত্যয় ঘটে গেছে কোথাও ইত্যাদি।
রাষ্ট্র কোন না কোন আদর্শের ওপর দাঁড়ায়, রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও না থাকাও সেই আদর্শের ওপর নির্ভর করে। তবে আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে বলা হয় রাষ্ট্রকে টিকে থাকতে হলে মূল বিষয় নাগরিক ও মানবিক অধিকারের ওপরই রাষ্ট্রকে দাঁড়াতে হবে। অর্থাৎ নাগরিকেরা সবাই একই রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী এমন কখনই থাকেন না। থাকার কথাও না। এমনকি মোটা দাগে অনেককে একই রাজনৈতিক আদর্শের কোন দলে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও তাদের মধ্যে মতপার্থক্য ও মতাদর্শিক দ্বন্দ্বও থাকে। কিভাবে একটি রাজনৈতিক দল বা রাষ্ট্র তাদের মতাদর্শিক দ্বন্দ্বের মীমাংসা করে তার ওপর নির্ভর করে সেই দল কিম্বা রাষ্ট্রের টিকে থাকা ও না থাকা।
যে কোন রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠি বা প্রবণতার অধিকার আছে তাদের মতাদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়বার। কিন্তু সেকাজে বিরোধী রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করেই একমাত্র সেটা করা যেতে পারে। ক্ষুন্ন করে নয়। মোটা দাগে গণতান্ত্রিক শ্রেণিগুলো অগণতান্ত্রিক শ্রেণিগুলোর বিরুদ্ধে লড়েই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কায়েম করে, কিন্তু গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র কারো নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ করে গণতন্ত্র কায়েম করে না, বরং সকল নাগরিকের নাগরিক ও মানবিক অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করেই অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিস্ট মতাদর্শের ওপর নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে অগণতান্ত্রিক শ্রেণির তৎপরতা বন্ধ করার একমাত্র উপায় হচ্ছে গণতন্ত্র চর্চার জন্য উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান ও সংস্কৃতি গড়ে তোলা। বিচার বিভাগ এই ক্ষেত্রে একটা মুখ্য ভূমিকায় থাকে। এটাই গণতন্ত্র নিশ্চিত ও দীর্ঘস্থায়ী করবার পথ। এর কোন শর্টকা্ট রাস্তা নাই। প্রতিপক্ষকে ‘নির্মূল’ করাই যদি নীতি হয়, তাহলে প্রতিপক্ষও পালটা নির্মূলের নীতিই গ্রহণ করবে। এটা মনে রাখতে হবে। এটা দেশকে টুকরা টুকরা করবার নীতি, গড়বার বা গঠন করবার নীতি হতে পারে না।
আবার যার যার প্রত্যেকের রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে রাষ্ট্র কায়েম দেখতে চাইলে বাস্তবে সেটা অসংখ্য রাষ্ট্রে টুকরা হয়ে যাবে। উদার গণতন্ত্র ভাল কি মন্দ সেই তর্কে না গিয়ে বলা যায়, বরং বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি চর্চার অধিকার রাষ্ট্র ক্ষুণ্ণ করে না। মূলত নাগরিকের জানমাল সুরক্ষা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রাষ্ট্র; আবার রাষ্ট্র নাগরিকের সুরক্ষা করতে ব্যর্থ হবে না, কিম্বা নিরাপত্তা ভঙ্গের কারণ হবে না -রাষ্ট্রের এই দৃঢ় প্রতিশ্রুতির বিনিময়েই নাগরিকরা রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব মানে বা মানাটা তার স্বার্থের অনুকুল বলে মনে করে। নাগরিকরা ভিন্ন ভিন্ন বা নানান রাজনৈতিক মতাদর্শ চর্চা করতে পারবে এটা সেখানে স্বীকৃত থাকে। ফলে সরকার বা ক্ষমতাসীন কোন গোষ্ঠির পছন্দসই রাজনৈতিক মতাদর্শ না হলে রাষ্ট্র তাকে অপহরণ গুম ও খুন করতে পারবে এই বিকৃত চিন্তা কোন সমাজে বা রাষ্ট্রে এসে গেলে সেটা ভয়াবহ নৈরাজ্যরই ইঙ্গিত বহন করে। একালে যে রাষ্ট্র নাগরিক ও মানবিক অধিকার স্বীকার করে না তার পরিণতি কী দাঁড়ায়? এককথায় এর জবাব হল আজ হোক কাল হোক রাষ্ট্র ভেঙ্গে যাবে। বাংলাদেশে যেটা এখন ক্রমশ ঘটছে। অর্থাৎ যারা এতদিন সরকারী দলের পছন্দসই রাজনৈতিক আদর্শের বিরোধীদের অপহরণ গুম ও খুনের পক্ষে সাফাই গেয়ে গেছেন তারাই জেনে না জেনে নিজদের আত্মঘাতি চিন্তার কারণে রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার মারাত্মক বিপদ দাওয়াত দিয়ে ঘরে তুলেছেন। এখন আর সামলাতে পারছেন না। যে বিপদ ডেকে এনেছেন তাকে বিদায়ও দিতে পারছেন না। পারবেনও না।
অন্যদিকে, আধুনিক রাষ্ট্র মানেই সম্পত্তি বা সম্পত্তি-সম্পর্ক রক্ষার জন্য কাঙ্খিত কার্যকর ও সুপ্রিম প্রতিষ্ঠান। এখানে নাগরিক মানেই সম্পত্তির মালিক, সম্পত্তি আগলে বসে থাকা নাগরিক। এটা শুধু যে প্রচুর সম্পত্তির মালিক কেবল তার বেলায় নয়, যার এক কানি জমি বা ভিটেমাটি আছে এটা তার বেলায়ও সত্য। এমনকি যার কিছুই নাই, সেও সম্পত্তির মালিক। সেই শ্রম হচ্ছে তার শ্রম শক্তি। সেই শক্তি বাজারে বেচাকেনার অধিকার তার নিজের। তাকে দাসের মতো জোর করে কোথাও খাটানো যায় না। অর্থাৎ সেও কোন না কোন সম্পত্তি আগলে থাকা নাগরিক। আমরা বলি, রাষ্ট্রের দায়িত্ত্ব নাগরিকদের “জান ও মাল অথবা জানমাল” রক্ষা। অর্থাৎ কেবল জান বা জীবন সুরক্ষাই নিরাপত্তা নয়, একই সঙ্গে মাল বা সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথাও শুনি আমরা।
তাহলে রাষ্ট্র যদি কেবল বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধী হয়ে বাকি সব ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিক অপহরণ গুম ও খুন জারি রাখে তাহলে সেই রাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। রাষ্ট্র ও সরকার কেবল বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকদের “জান ও মাল” সুরক্ষা করবে, অন্যদের নয়, এটা হতে পারে না। অথচ এই নীতির ভিত্তিতেই হাসিনা সরকারের বিগত ছয় বছর বিশেষ করে শেষ তিন বছর চলছে। “জামাত-বিএনপি-হেফাজত” অপহরণ গুম ও খুন চলছে নিরন্তর। যাদের কাছে মনে হয়েছে “জামাত-বিএনপি-হেফাজত” এর রাজনীতি ও আদর্শ তার পছন্দসই নয় তারা এতে চুপ থেকেছে, খুশি হয়েছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে সমর্থন জানিয়েছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে সমর্থন ও যুক্তি তুলেছে যে হাসিনার সরকারের কাজ হচ্ছে ভিন্ন মতাদর্শীদের নির্মূল করা। নাগরিকদের মৌলিক ও মানবিক অধিকার নয় বরং রাজনৈতিক আদর্শ সবার আগে বিবেচনায় রেখে অপহরণ গুম ও খুন চালিয়ে যাওয়া। হাসিনা সরকারের সবল ও এখনও টিকে যাবার পিছনে এটাই প্রধান মতাদর্শগত ভিত্তি।

আসলেই কি হাসিনা “চেতনার” আদর্শের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার বিলি করেছেন
নারায়ণগঞ্জের নজরুল ইসলাম সহ সাতজনের অপহরণ গুম ও খুনের ঘটনা নতুন এক উপাদান যুক্ত করেছে। “রাজনৈতিক আদর্শ” দিয়ে বিচার করলে নজরুল ইসলাম, তার সাথে খুন হওয়া আইনজীবি চন্দন সরকারসহ বাকি ছয় জন, হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত অপর কাউন্সিলর নূর হোসেন, শামীম ওসমান এবং খোদ হাসিনা এদের সকলের একই “রাজনৈতিক আদর্শ” – সকলেই আওয়ামী লীগে অন্তর্ভুক্ত। এমনকি র্যাদবের কমান্ডারসহ নারায়নগঞ্জ প্রশাসন সবাই একই “রাজনৈতিক আদর্শ” ধারণ করে কিম্বা তার পরোক্ষ সমর্থক। ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের নাগরিকদের জান মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব নয়, এই নীতির ভিত্তিতেই তারা প্রশাসন পরিচালনা করেছে। এভাবেই এরা হাসিনার অপহরণ গুম ও খুনের রাজনীতিতে পরিচালিত হতে স্বচ্ছন্দবোধ করে গেছে।
তবে নারায়নগঞ্জের ঘটনায় দেখা যাচ্ছে ঘটনা ভিন্ন ভাবে ঘটেছে। খুনাখুনি হয়েছে শেখ হাসিনার মতাদর্শের ব্যক্তিদের মধ্যে। এটা সুস্পষ্ট ভাবেই রাষ্ট্রের ভাঙ্গন ও সরকার পতনের লক্ষণ। কারন যে নীতির ভিত্তিতে প্রশাসন এতোদিন চলছিল, সেই নীতি প্রশাসনকে অপ্রতিরোধ্য করে তুলেছে, যা সরকারকেই এখন গ্রাস করতে উদ্যত। যারা ভেবেছিলেন জামাত-বিএনপি-হেফাজত এর রাজনৈতিক আদর্শ না করে আওয়ামি লীগের রাজনৈতিক আদর্শ করলেই জানমাল সুরক্ষিত ও নিশ্চিত থাকবে, হাসিনার সরকার তা নিশ্চিত করবে সেটা এখানে একেবারেই ঘটে নাই। যারা মারা গিয়েছেন তারা আওয়ামি লীগে নাম লিখিয়েও নিজের জানমাল রক্ষা করতে পারেনি। ওদিকে যারা হাসিনার এই দানব রাষ্ট্রের তান্ডব আচরণকে সরাসরি বা প্রচ্ছন্নে সমর্থন করে গেছেন, হয়ত ভেবেছেন তিনি রাজনৈতিক আদর্শ হিসাবে জামাত-বিএনপি-হেফাজত ধারণ করেন না ফলে তিনি সুরক্ষিত ও নিরাপদ তাদের এখন হঠাৎ মানবাধিকারের কথা মনে পড়েছে। তারা রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করছেন। এরা শঙ্কিত যে নজরুল ইসলাম সহ সাতজন ‘অপর’ কেউ নয় আসলে ওটা তারা প্রত্যেকে, খোদ নিজেই। নজরুলের ভাগ্য সবারই আগামি ভাগ্য, অপেক্ষমান পরিণতি। ওটা নজরুল নয় নিজেরই খুড়ে রাখা আপন কবর। এই কবর তো দীর্ঘদিন ধরেই খুঁড়ছিলেন, তখন তাদের হুঁশ ছিলনা।
একই রাজনৈতিক আদর্শ আওয়ামি লীগে অন্তর্ভুক্ত থাকি আর নাই থাকি,- সম্পত্তি বা বিভিন্ন ধরণের স্বার্থ নিয়ে নিজের আপন ভাই, আত্মীয়, আপন বা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্যবসায় পার্টনার ইত্যাদিদের সাথে নানান স্বার্থ বিরোধ নিয়েই আমরা সমাজে থাকি। সমাজের মুখ্য প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের অধীনে থাকি। কিন্তু এর মানে এই না যে স্বার্থ বিরোধের ফয়সালা আমরা নিজে অপরের উপর রুস্তমিতে করি বা কেউ আমার উপর করুক। রাষ্ট্র একছত্র রুস্তম হয়ে থাকবে, আর অভ্যন্তরে একে অন্যের উপর রুস্তমি করতে দিবে না এই শর্তে নাগরিক রাষ্ট্রের রুস্তমি মেনে নেয়। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের ঘটনা প্রমাণ করেছে হাসিনার রাষ্ট্র এই শর্ত ভেঙ্গেছে। সে নূর হোসেনকে রুস্তমি করতে সাহায্য সহযোগিতা করেছে, প্রশ্রয় দিয়েছে। প্রতিটা নাগরিক চায় রুস্তমি বলপ্রয়োগে খুনোখুনি প্রতিপক্ষকে নির্মুলের পথে না, স্বার্থবিরোধ ‘বিচার’ বা আইন কানুনের নিয়মে ফয়সালা হো্ক। নারায়নগঞ্জের ঘটনায় রাষ্ট্র শর্ত ভঙ্গ করায় সকলের মনে আশঙ্কা জাগিয়েছে যে হাসিনার রাজনৈতিক আদর্শে অন্তর্ভুক্ত থাকলেও আপন ভাই বা আপন দলের বিরোধী স্বার্থের প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের হাতে অপহরণ গুম ও খুন হয়ে যাওয়াটাও খুবই স্বাভাবিক। এককথায় রাষ্ট্র নাগরিক নির্বিশেষে জানমালের রক্ষক আর নয়। যে কোন সময় সরকার যে কোন গ্রুপকে সমর্থন দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের জানমাল বিপন্ন করে ফেলতে পারে। এবং কখন কোন গ্রুপকে হাসিনা সরকার আর্শিবাদ জানাবে তারও কোন দিশা নাই। এক্ষেত্রে নির্ণায়ক হচ্ছে কখন কোন গ্রুপকে হাসিনা নিজের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপুর্ণ মনে করে। অর্থাৎ একমাত্র বিবেচনা হাসিনার নিজের ক্ষমতায় টিকে থাকা।
তাহলে দেখা যাচ্ছে আমার সেই জেলার আইনজীবি বন্ধু যেভাবে বলছিলেন, কারও রাজনৈতিক আদর্শ পছন্দসই লাগে কি না এই ভিত্তিতে রাষ্ট্র তার জানমালের নিরাপত্তা দিবে এই ভিত্তিতেও হাসিনা তার দানব রাষ্ট্র সাজায় নি। হাসিনার কাছেও রাজনৈতিক আদর্শ গুরুত্বপুর্ণ কিছু নয়। আসলে তাঁর একমাত্র বিবেচনা নিজে দানব ক্ষমতায় টিকে থাকা।
নারায়নগঞ্জের ঘটনা কেন্দ্রিক গণক্ষোভকে আমি এভাবে ব্যাখ্যা করছি ঠিকই। কিন্তু গণমন নিয়ে আমার এই অনুমান কতটা সঠিক সত্য নাকি একেবারেই সাময়িক ও বিচ্ছিন্ন তা জানা যাবে এই ঘটনার শেষ হয় কি করে তা দেখতে পাবার পর। এটা হতেও পারে আশঙ্কিত নাগরিকেরা তাদের ক্ষোভ বিক্ষোভকে কোন পরিণতির দিকে নিতে অবিচল থাকলেন না; আর ব্যাপারটা একটা সাময়িক ক্ষোভ হিসাবে থেকেই চাপা পড়ে গেল। সেটা যাই হোক, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সেই কমিউনিষ্ট নেতা যেভাবে রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার জানমালের রক্ষার পক্ষে যুক্তি তুলে হাসিনার রাষ্টকে দানব হতে পুষ্ট করছিলেন তার সেই আকাঙ্খার অন্তত একটা পরিণতি হল এই সাত অপহরণ গুম ও খুন।
উপরের কথাগুলো বর্তমানের হাসিনার সরকারকে সামনে রেখে বলছি মানে এই নয় এটা কেবল আওয়ামি লীগ বা হাসিনার জন্য সত্য। অপহরণ গুম ও খুন কমবেশি স্বাধীনতার পর থেকেই সবসময়ই বজায় ছিল। কিন্তু এর মাত্রার ভিন্নতার দেখা গেছে বিভিন্ন সময়। আজকে এই কথাগুলো আগামি যে কোন সরকার, বিএনপি অথবা জামাতের অথবা অন্য রাজনৈতিক দলের ক্ষেত্রেও সমান প্রযোজ্য এবং সত্য। এব্যাপারে আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা খুবই খারাপ সন্দেহ নাই। তথাকথিত রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে নাগরিক মানবিক অধিকার বিতরণের রাষ্ট্র এটা যে কোন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বেলায়ই সমান বিপদজনক। আমাদের কি এই শিক্ষা যথেষ্ট হয়েছে? আগামির ভরসায়!

মার্কিন বিবৃতি: বাংলাদেশের প্রতি ভারত ও মার্কিন অবস্থানের ভিন্নতা

মার্কিন বিবৃতি: বাংলাদেশের প্রতি ভারত ও মার্কিন অবস্থানের ভিন্নতা

গৌতম দাস

প্রসঙ্গ একঃ আমেরিকা ভারতের কথা শুনল না

ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে স্থানীয় মিডিয়ার জন্য একটা প্রেস রিলিজ পাঠানো হয়েছে ০৯ নভেম্বর সন্ধ্যায়। ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের ওয়েবসাইটে ইংরাজীর সাথে বাংলাতেও বিবৃতিটি দেয়া হয়েছে। বেশ কয়েকটি নিউজ পোর্টালে খবরটি ছাপা হয়েছে, প্রিন্ট পত্রিকাতেও এসেছে। প্রথম আলোর ১০ নভেম্বর প্রিন্ট কিম্বা অনলাইন সংস্করণেও তাদের নিজেদের করা বাংলা অনুবাদ দেয়া আছে।আমি সেটাই এখানে ব্যবহার করব।ওর কিছু অংশ এরকমঃ

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত কয়েক দিনের ঘটনাবলি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পথ খুঁজে বের করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। আমরা দুই দলকে সহিংসতা এড়িয়ে চলতে বলছি। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের সহিংসতার স্থান নেই এবং তা গ্রহণযোগ্যও নয়।’  বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অবশ্যই এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ থাকতে হবে যেখানে সব দল অবাধে ও শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ করতে পারে। সহায়ক রাজনৈতিক পরিবেশ গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। নির্বাচনের দিনক্ষণ খুব দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। তাই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনে সমাধানের পথ খুঁজে নিতে প্রধান দলগুলোকে অবশ্যই ইতিবাচক আলোচনায় যুক্ত হওয়া উচিত

সাদা চোখে  এই বিবৃতি তাৎপর্যহীন রুটিন কূটনৈতিক বক্তব্য মনে হতে পারে। তবে বাংলাদেশের ঘটমান রাজনীতির দিক থেকে এর তাৎপর্য বেশ গভীর। শুধু কূটনৈতিক বক্তব্য হিসাবে নয়, এটা প্রকাশ্য বা পাবলিক স্টেটমেন্ট হবার কারণে। এই বিবৃতি কেন্দ্র করে আমাদের কিছু নিরীক্ষণ এখানে পেশ করছি।

গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশ বিষয়ে আমেরিকা ও ভারতের মতভিন্নতা বিভিন্ন খবর ও বিশ্লেষণে চারদিকে ছেয়ে আছে। এটা মনে করার কারণ নাই যে বাংলাদেশের রাজনীতির গতিমুখ একমাত্র দিল্লী কিম্বা ওয়াশিংটন ঠিক করবে। পরাশক্তি যতই চেষ্টা করুক তারা কখনই সব কিছুর নির্ধারক নয়। এটা অসম্ভব। আমাদের ভাগ্য বিদেশীরা ঠিক করে দেয় এই প্রপাগাণ্ডা তারাই করে যারা চায় না অথবা আগেই হাল ছেড়ে দিতে চায় কিছু না করে যে, জনগণ তাদের নিজেদের সামষ্টিক স্বার্থের জায়গা থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় হোক। এই ধরণের প্রপাগাণ্ডা রাজনীতিতে জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ বা সামষ্টিক স্বার্থ রক্ষার জায়গা থেকে সচেতন ও সক্রিয় ভূমিকাকে ম্লান করে দেওয়া বা নিরুৎসাহিত করবারই প্রচেষ্টা। রাজনীতির বর্তমান অভিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখনও বাংলাদেশের জনগণই নির্ধারক হবে। তবে জনগণকে সঠিক তথ্য ও সম্ভাব্য বিশ্লেষণ ধরিয়ে দেওয়া এখনকার খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার কুটনৈতিক সম্পাদক  ইন্দ্রাণী বাগচীর ৩০ অক্টোবরের রিপোর্ট, আর পরবর্তিতে তা নিয়ে একই পত্রিকায় সুবীর ভৌমিকের ১ নভেম্বরের কলামের কথা মার্কিন বিবৃতিটি বিশ্লেষণের আগে স্মরণ করা যেতে পারে। ইন্দ্রাণী বাগচী তাঁর লেখার শিরোনামেই বাংলাদেশ সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণের প্রশ্নে মার্কিন ও ভারতের মতভিন্নতার কথা বলেছেন। (India, US at odd over Bangladesh policy – ইন্ডিয়া আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ নীতিতে দুই মেরুতে)। সুবীর ভৌমিক বলছেন, বাংলাদেশ এক সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যে আছে, ভারতকে তাদের বন্ধুপ্রতিম সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্য যা কিছু করার দরকার সব করতে হবে (Bangladesh is in a violent phase and India must do all it can to see a friendly regime return to power)এরপর রয়েছে বীণা সিক্রির বিবিসিতে সাক্ষাৎকারআর এছাড়া গত পুরা সপ্তাহ ধরে রয়েছে প্রথম আলোর এই বিষয়ে প্রায় প্রতিদিনের রিপোর্ট আর মিজানুর রহমান খানের নিয়মিত কলাম এভাবে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে বাংলাদেশ নীতির প্রশ্নে দিল্লী ওয়াশিংটনের টানাপড়েনের খবর। খবরটা মিডিয়াতে তাতিয়ে ওঠা ও দীর্ঘায়িত হবার মুল কারণ হাসিনাকে ক্ষমতার রাখবার জন্য ভারতীয় খায়েস ও প্রচেষ্টা – তা নয়। বরং দিল্লীর আশংকা যে, মতভিন্নতার ফলে ভারতের খায়েসকে (ভারতের তিন চাহিদাপত্র বলে আগের লেখা দেখুন) উপেক্ষা করে আমেরিকা বাংলাদেশে নিজেদের স্বাধীন পদক্ষেপ নিয়ে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমের মধ্যে ভারতপন্থীদের দাপট অজানা কিছু নয়। তারা এর বিপদ ভালই বুঝে। তারা এতদিন মার্কিন ছাতার তলে আড়ালে দিল্লীর স্বার্থ রক্ষা করে চলত। সেই ছাতা সরে গেলে ইচ্ছামত দিল্লীর স্বার্থ ও এজেন্সি রক্ষা করে চলা বাংলাদেশে তাদের জন্য কঠিনই হবে। বাংলাদেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাদের আওয়ামি সংশ্লিষ্টতাকেও তারা অসাম্প্রদায়িক”, “লিবারেলরাজনীতির দোহাই দিয়ে ঢেকে ঢুকে রাখতে পারত, সেটাও কঠিন হয়ে যেতে পারে ভেবে ব্যাপারটাকে একয়দিন মোটামুটি তাতিয়েই রেখেছে।

আমেরিকা ও ভারতের বাংলাদেশ বিষয়ক মতভিন্নতা চলছে কূটনৈতিক ভাষায়।আমেরিকান অবস্থানের প্রকাশিত ভাষার সুরটা হচ্ছে, সবাইকে নিয়ে (ইনক্লুসিভ)মুক্ত, সুষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। বিপরীতে ভারতীয় অবস্থানের ভাষা হলো, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হতে হবে। উভয়ের মতভিন্নতা এই দুই ধরণের কূটনৈতিক ভাষা ব্যবহারের লড়াই হিসাবেও পর্যালোচনা করা যায়।

ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে দেওয়া তাদের বিবৃতিটির দিকে তাকালে আমরা দেখব, তারা কুটনৈতিক ভাষা বদল করে নাই,  “সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনলেখে নাই। বরং সংবিধানশব্দটাই নাই। ফলে দিল্লীর সঙ্গে অন্তত মতভিন্নতার মূল পয়েন্টই তারা বজায় রেখেছে। এটা তাৎপর্যপূর্ণ। আমরা বলতে পারি গতমাসের ২৩ অক্টোবর তারিখে মজিনার ভারত সফরের পর থেকে শুরু করে এই বিবৃতি দেবার সময় অবধি অর্থাৎ ১৮ দিন পরেও আমেরিকা তার অবস্থান বদলায় নি। কূটনৈতিক ভাষার মধ্যে বাহ্যিক কিছু আমরা দেখছিনা যাতে তাদের অবস্থান বদল হয়েছে বলে শনাক্ত করা যায়। প্রকারান্তরে এই বিবৃতির এই মানেই আমরা করতে পারি যে ভারতের অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও নাকচ করে চলেছে।

এই নাকচ করার অর্থ অবশ্য আবার দুটো অবস্থানের একটি হতে পারে।এক, হয়তো এটা শুধু আমেরিকার বক্তব্য নয়, ভারতের ইচ্ছাও এর মধ্যে ইনক্লুডেড বা অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ হতে পারে যে এটাই বাংলাদেশ প্রশ্নে দুই দেশেরই কমন অবস্থান। যদি তাই হয় ভারত কি তার শক্ত অবস্থান ছেড়ে দিচ্ছে? হাসিনার আচরণ দেখে তা মনে হয় না। দুই, এটা আমেরিকার নিজের শক্ত অবস্থান, যেখানে ভারতের অবস্থান সম্পুর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ নীতির প্রশ্নে দিল্লীর ওপর ঠিক আগের মতো নির্ভরশীল হতে চায় না। দিল্লীর বাইরে নিজের স্বাধীন নীতি অনুসরণ করতে চায়। শুধু তাই নয়। এই মতভিন্নতা পাবলিকলি স্পষ্টও করতে চায়।

প্রসঙ্গ দুইঃ কর্তৃত্ত্ব নিজের হাতে নেবার উদ্যোগ আমেরিকার

ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের দেওয়া বিবৃতি যদি ওয়াশিংটনের নতুন নীতির প্রতিফলন হয় তাহলে এর আরও অর্থ হলো, হাসিনার পঞ্চদশ সংশোধনীর কন্সটিটিউশন অনুযায়ী নির্বাচনের পক্ষে আমেরিকা নাই। অর্থাৎ সবাইকে নিয়ে নির্বাচন করার বিষয়টার সুরাহা হবার আগে, নির্বাচন আপাতত স্থগিত বা বাতিলের পক্ষে আমেরিকা। নির্বাচন বাতিল বা স্থগিত করা এবং পরবর্তিতে নির্বাচন কোন মেকানিজমে হবে তার কোন ইশারা বিবৃতিতে নাই। তবে এর ইঙ্গিতপুর্ণ জবাব পাওয়া যেতে পারে ০৯নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটার একুশে টিভিতে, এরশাদের এক বিরল সাক্ষাৎকারে। ওখানে এরশাদ বলেছেন একটা আর্মিব্যাকড সিভিল সরকার নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তীসরকার পরিচালনা করতে পারে। অর্থাৎ তিনি এক এগারোর সেনা সমর্থিত ধরণের সুশীল-সামরিক সরকারের কথাই বলছেন। সেই সাথে তিনি এও বলেছেন যে যদি করতে হয় তবে সেই সিদ্ধান্তও কনস্টিটিউশনে অনুমোদিত করিয়ে নিতে হবে। এই ক্ষেত্রে ঠিক হুবহু তিনি কী বলেছেন, সেটা আশা করি ক্লিপ দেখে নিলে জানা যাবে। তবে সার কথা এটাই। ওদিকে লন্ডনের সাপ্তাহিক ইকোনমিষ্টের রিপোর্টের শেষপ্যারাটাও এরকমই ইঙ্গিতপুর্ণ – ‘Sheikh Hasina has no interest in alienating it’সেনা সমর্থিত সুশীল সরকার আসবার সম্ভাবনা থাকলেও তাদের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকে দূরে সরিয়ে দেবার কোন আগ্রহ শেখ হাসিনার নাই।

“If a boycott takes place, then elections could be delayed and street violence is likely in the next few months. If so, the army, which also has the job of providing security at polling stations, would play a decisive political role. Sheikh Hasina has no interest in alienating it.”

আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে মার্কিন এই বিবৃতি বিএনপির পক্ষে থাকা মার্কিনিদের কুটিল চেষ্টা। যেন, মজিনার সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকে কূটনৈতিক ভাষায় নাকচ করে দিয়ে ইনক্লসিভনির্বাচনের পরামর্শ সেই চেষ্টারই প্রতিফলন। সন্দেহ নাই, এমন ভাবা একটা ভুল পাঠ হবে। সুবীর ভৌমিক সেই ভুল পাঠ করে এর বিপদ দেখেছেন। এরই প্রতিক্রিয়ায় এক অনামী ভারতীয় কুটনীতিকের বরাতে সুবীর ভৌমিক মজিনা যেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য”  বলে তাকে তুচ্ছ করার দিকে মেতে উঠেছেন। অথচ এতে তিনি বুঝে উঠতেই পারলেন না যে তিনিই, দিল্লীর বাংলাদেশ নীতি প্রণেতাদের মতই আঞ্চলিক মুদি দোকানদারির চরিত্র নিয়ে নিয়ে হাজির হয়েছেন। বাংলাদেশকে ভারতের বাজার ভাবা অথবা নিজেরই আর একটা রাজ্য ভাবা ছাড়া আর অধিক কিছু ভাববার সামর্থ দিল্লীর যেমন নাই, সুবীর ভৌমিকের মতো ক্ষুদ্র বুদ্ধির লোকদেরও নাই। যদি থাকত তার লেখা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারত বিরোধী সেন্টিমেন্ট কিভাবে উসকে দিতে পারে সেই হুঁশ তাঁর থাকত। যেমন তাঁর শিরোনামই ছিল মারাত্মক উস্কানিমূলক। এভাবে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে মর্যাদা না দিয়ে দিল্লী নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনছে। বাংলাদেশের জনগণ কাকে নির্বাচিত করবে কি না করবে সেটা দিল্লীর মাথাব্যথার কারণ হওয়া উচিত ছিল না। গত পাঁচ বছরে শেখ হাসিনার নীতি ভারতীয় রুস্তমি দেখানোর জায়গা আর তার ব্যবসায়ীদের মুনাফার পরিমাণ বাড়িয়েছে বটে, কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কে যে অবনতি ঘটিয়েছে তা পুনরুদ্ধার করা সহজ হবে না। দিল্লীর উচিত ছিল প্রতিবেশীর আভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য নীতিগ্রহণ। কিন্তু দিল্লী বাংলাদেশকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আটকে রেখে স্রেফ লুটতরাজ করতে চায়। গায়ের জোর ও দম্ভের রুস্তমি দেখাতে চায়, শেখ হাসিনার সরকার সে জন্যই তাদের দরকার। দিল্লীর এই লুন্ঠন নীতি একটি বৃহৎ দেশ হিসাবে উপমহাদেশে উলটা তাদের রাজনৈতিক আধিপত্যকেই খর্ব করবে, সন্দেহ নাই। অথচ দিল্লীতে দুরদর্শী কোন নেতৃত্ব থাকলে ক্ষুদে দোকানদারী মানসিকতা নয়, নিদেনপক্ষে আমদানি-রফতানির ব্যবসায়ীর মতো হলেও আরও একটু বড় চোখে আদান-প্রদানের মানসিকতা দেখা যেতো। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক করতে হবে একতরফা লুন্ঠন নয়, দেওয়া নেওয়ার। আর দিল্লী যদি মাড়োয়ারি মানসিকতা বাদ দিয়ে উপমহাদেশের সাধারণ স্বার্থ তার নিজের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য জরুরী মনে করত তাহলেএকসাথে বেড়ে উঠারনীতিই অনুসরণ করত। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য রোধ করা, কিম্বা চিনের অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের সংকট কাটিয়ে তোলা সহজ হোত। বহু কিছু করার সুযোগ ছিল আমাদের। কিন্তু যতটুকু খোঁজখবর রাখি ভারতের এমন নেতৃত্ব ও নীতি আগামি বছরগুলোতে দেখার কোন সম্ভাবনা দেখি নাই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে গত ৫ মের ঘটনার পর ঘটনার মধ্যে সবার আগে মার্কিন  দূতাবাস তাদের বিপদটা টের পেয়েছে। ঢাকার কূটনৈতিক মহলের কাছে ক্রমে তা পরিষ্কার হয়েছে। বিপদটা হলো, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাদের ভাষায় রেডিক্যাল এলিমেন্টহাজির হবার সম্ভাবনা। শাহবাগকে চ্যালেঞ্জ করে শাপলা চত্বরের আবির্ভাব বাংলাদেশে শ্রেণী ও শক্তির ভারসাম্য যে বদল ঘটিয়ে দিয়েছে, তা আর পাঁচই মের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে না। এই পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপযোগী শ্রেণি ও শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখার দিকেই মার্কিন নীতি ঝুঁকবে তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নাই। সেই উদ্বেগ নিরসন ও ভারসাম্য বজায় রাখার দিক থেকে আওয়ামি লীগের চেয়ে বিএনপিই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছের মিত্র হতে পারে। সেক্ষেত্রে  ‘রেডিক্যাল এলিমেন্টগুলোকেআঠারো দলীয় জোটের মধ্যে ধারণ বা আটক রেখে, জোটকে সামনে রেখে দেশে একটা নির্বাচনী লিবারেল রাজনীতি টিকিয়ে রাখা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের জন্য জরুরী হয়ে পড়েছে। কারণ রেডিক্যাল এলিমেন্টসামলানোর এটা খুবই উপাদেয় ও কার্যকরী উপায় হতে পারে।

ভারতের এই অঞ্চলকে মধ্যপ্রাচ্যের মতো সহিংস পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেওয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার স্বার্থের জন্য অনুকুল মনে করে না। আফগানিস্থান থেকেও আগামি বছর শেষে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হবে। বাংলাদেশ প্রশ্নে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে সঠিক অবস্থানই নিতে হবে। মার্কিন দূতাবাসের কাজ হচ্ছে বাংলাদেশে এই রেডিকাল সম্ভাবনাকে মোকাবিলা করা। আর দিল্লির এখনকার ভূমিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে উলটা উস্কানি দিয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে আরও অস্থির ও সহিংসতার দিকে নিয়ে যাওয়া্। যেন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের মার্কিন নীতিকে জোর করে আরও উগ্র ও আগ্রাসী জায়গায় নিয়ে গিয়ে ইসলামী জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা যায়। এ কারণেই দিল্লী বাংলাদেশে শেখ হাসিনাকে দিয়ে লিবারেল নির্বাচনী রাজনীতির পরিমণ্ডল পরিকল্পিত ভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে, বাংলাদেশকে সহিংস ও বিপর্যয়গ্রস্ত করে তুলেছে। দিল্লী ও ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্র নীতির মধ্যে এই টানাপড়েন অনিবার্য ভাবেই দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। সামনের দিনগুলোতে আমরা আরও সহিংসতা দেখব।

মধ্যপ্রাচ্যের অভিজ্ঞতার কারণে ওয়াশিংটন সম্ভবত এই পরিস্থিতি এড়াতে চায়। বিএনপিকে সামনে রেখে সম্ভাব্য রেডিক্যাল ইসলামী শক্তিগুলোকে লিবারেল রাজনীতির মধ্যে আটকে রেখেই সেটা সম্ভব। এতে রেডিক্যাল ঝোঁক সামলানো সহজ। এছাড়া এডেড ফ্যাক্টর, পপুলার পারসেপশন বা ভোটের জনমতও এখন বিএনপিরই দিকে। ফলে পরিকল্পনাটা সফল হবার ভাল সম্ভাবনা আছে। তাহলে মজিনার কাছে মুল উৎকন্ঠা সম্ভাব্য রেডিক্যাল রাজনীতি সামলানোর উপায় খুজে পাওয়া। সেই ইচ্ছাপুরণের ক্ষেত্রে বিএনপির জায়গায় আওয়ামি লীগকে রাখলে যদি তা সম্ভব হোত সম্ভবত তিনি সেটাই করতেন। আমেরিকান উদ্বেগটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের স্বার্থের দিক থেকে সাম্রাজ্যবাদের সাধারণ রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার উদ্বেগ। আন্তর্জাতিক পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশকে পুরাপুরি সম্পৃক্ত করার প্রক্রিয়া যেন ব্যাহত না হয় বাংলাদেশে মার্কিন নীতির ভরকেন্দ্র সেই দিকেই। এই অঞ্চলকে সেই আলোকেই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ বিচার করে। এই ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বার্থও অবশ্যই নিহিত রয়েছে। ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কথা তো আমরা জানি। কিন্তু বিশ্বসাম্রাজ্যবাদী ব্যবস্থার অন্তর্গত একটি গতিশীল পুঁজিতান্ত্রিক বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুকুল। অন্যদিকে এই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী ও একইসঙ্গে ইসলাম-বিদ্বেষী শক্তিশালী শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণী ও তাদের মতাদর্শের নিরন্তর পয়দাই ইসলামপন্থিদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মার্কিন রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারে।

বিপরীতে দিল্লীর উদ্বেগ, আগেই বলেছি, নিতান্তই ভারতের ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণস্বার্থ। বাংলাদেশকে রাজনৈতিক ভাবে শুধু নয়, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ভাবে উঠতে না দেওয়া। বাংলাদেশ ভারতের বাজার হোক, ভারতের আত্মঘাতি ইসলাম বিদ্বেষীও অকার্যকর নিরাপত্তা নীতির স্বার্থে নিজেকে বলি দিয়ে দেক দিল্লী শুধু তাই চায় না। অর্থনৈতিক ভাবে ভারতের প্রতিযোগী না হয়ে উঠুক দিল্লী তাও চায়। একেই বলছি গোঁয়ার ক্ষুদে দোকানদারীর মানসিকতা, একটি আঞ্চলিক শক্তির দূরদর্শিতা এখানে শোচনীয় ভাবে অনুপস্থিত। এই ক্ষুদে দোকানদারী মানসিকতা গায়ের জোরে সবকিছু মোকাবিলা করা সম্ভব মনে করে। যদি গায়ের জোরে আর রুস্তমিতে সবকিছু হত তবে বুশের ওয়ার অন টেরর পলিসি ব্যর্থ হত না, ওবামাকে বুশের নীতি থেকে সরে আসার চেষ্টা করার প্রয়োজন পড়ত না। গ্লোবাল ইকোনমিকে ২০০৭-৮ সালের রিসেশন দেখতে হত না। কোন ফল হাতে না নিয়েই ২০১৪ সালে খালি হাতে আফগানিস্তান থেকে উলটা দেনা নিয়ে ফিরার পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পড়তে হোত না।

এতদিন সাম্রাজ্যবাদীর বলয়ের অধীনস্থ বাংলাদেশের মত দেশে সরকারে কে থাকবে তা একচেটিয়া নির্ধারণ করাবার যাঁতাকাঠিটা ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। সেটা এক হিসাবে ২০০৮ সালে বাংলাদেশের উপর ব্যবহার করতে আমেরিকা ধার দিয়েছিল ভারতকে। ব্যাপারটা ক্ষুদে দোকানদারের পিঠে বড় ভাইয়ের হাত রাখার মত। যাঁতাকাঠির কথাটা কোন গল্প বা অনুমান নয়। একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে গবেষকের।

ডঃ ওয়াল্টার এন্ডারসন, জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এসোসিয়েট ডিরেক্টর। তাঁর এক গবেষণার বিষয় ছিল চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকা ও ভারতের নতুন সম্পর্ক এলায়েন্স গড়ার ভালমন্দের দিক খুজে দেখা। [আগ্রহিরা দেখুন, CONGRESSIONAL TESTIMONY:  India and the United States – A Different Kind of Relationship।] এরপর ২০০৮ সালে সেই কাজের ভিত্তিতে তৈরি রিপোর্ট তিনি আমেরিকান সিনেটের হাউস কমিটিতে পেশ করেছিলেন এবং কমিটির সদস্যদের প্রশ্নবানে জর্জরিত হয়ে সাক্ষ্যে (testimony) তিনি যা বলেছিলেন তা ঐ রিপোর্টে আছে। ঐ রিপোর্টে ব্যবহৃত একটা শব্দ ছিললিভারেজ। আমি সেটাকে এখানে বাংলায় যাঁতাকাঠি বলছি। এই যাঁতাকাঠির চাপে গত পাঁচ বছর আমরা সীমাহীন কষ্ট পাচ্ছি। মজিনা দুসপ্তাহের জন্য ওয়াশিংটনে গিয়েছেন ভারত সফরের পরেই। অনুমান করি এন্ডারসন সাহেব এখন নিজের যাঁতাকাঠি তত্ত্বের জন্য হাত কামড়াচ্ছেন, তওবা পড়ছেন। আমরা সবাই যাঁতাকাঠি তত্ত্বে ক্ষুদে দোকানদারের শিকার হয়ে আছি। একথাগুলো বললাম আমেরিকার দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়া নীতির কাফফারার দিকটা বুঝানোর জন্য। আমেরিকান স্বার্থ আমেরিকাকেই দেখতে হবে, ভুগতেও হবে। তা তারা ভুগুক অথবা লাভ খুঁজে পাক। কিন্তু আমাদেরটা আমাদেরকেই দেখতে হবে। ফলে আমেরিকা ও ভারতের মতভিন্নতাকে আমরা যেন এমন আনাড়ি ব্যাখ্যা না করি যে হাসিনার পক্ষে ভারত, সেজন্যই খালেদার পক্ষে আমেরিকা। সাম্রাজ্যবাদে অর্থনৈতিক দিক থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, আবার রাজনৈতিক দিক থেকে বিশ্বব্যাপী পুঁজির সাধারণ স্বার্থ রক্ষাও তার কাজ। মার্কিন নীতি সেই সাধারণ স্বার্থ দেখভাল করতে গিয়ে নিজের স্বার্থ ত্যাগ করেছে তা নয়, দিল্লীর সঙ্গে তার ভিন্নতার কারণ এই দুই স্তরেই নিহিত রয়েছে।

প্রসঙ্গ তিনঃ ভারত কি এখনও হাসিনার পক্ষে থাকবে?

এর উত্তর নির্ভর করছে মার্কিন বিবৃতি আমরা কিভাবে পাঠ করি। যদি মনে করি মার্কিন বিবৃতি একই সঙ্গে বাংলাদেশের সর্বশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে উভয়েরই এখনকার কমন অবস্থান তাহলে উভয়েই শেখ হাসিনাকে একটা বার্তা দিচ্ছে, পরিষ্কার ভাবেই। আমেরিকার বিবৃতিতে কি ভারত ইনক্লুডেড নাকি নয় সেটাই হচ্ছে মূল বিষয়। যা আমরা আজ না হলেও দ্রুতই বুঝব। যদি ইনক্লুডেড না হয় তাহলে ভারতের কাছে আমেরিকার এই সিদ্ধান্ত অগ্রহণযোগ্য। সেই ক্ষেত্রে হাসিনাকে ভারত শক্ত ভাবেই সমর্থন দেবেবা দিতে হবে যাতে গোঁয়ারের মতো একা নির্বাচনের পথে শক্ত ভাবে ক্ষমতাসীনরা এগিয়ে যেতে পারে। দিল্লী ও ঢাকাকে তখন মুখোমুখি সংঘাতের জন্য তৈরি হতে হবে। অন্যভাবে বলতে পারি, মাঠে চরম সংঘাতের পথে জিতে ফয়সালার রিস্ক নিতে হবে। অথবা হার। দিল্লী হাসিনাকে নিয়ে এতো বড় ঝুঁকি নেবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।

সংঘাত আসলে আবার একদিক থেকে আমেরিকার কাম্য। তবে সেটা অবশ্যই সীমিত আকারে যদি ঘটে। যেমন সংঘাত যেন আনুমানিক দুদিনের বেশি না গড়ায়, মোটকথা তা যেন নিয়ন্ত্রণে ও সীমিত থাকে। তবে অবশ্যই ঐ দুদিনে ভাল রক্তারক্তি প্রচুর হতে হবে। নইলে ব্যারাক ছেড়ে সেনাবাহিনী বাইরে বের করে আনার যুক্তিকে ন্যায্য প্রমাণ করা যাবে না। ওদিকে আবার যদি একে নিয়ন্ত্রণে ও সীমিত পর্যায়ে রাখা না যায় তবে আন্দোলন রেডিকেল মুড নিবে; গণভ্যুত্থানের দিকে মোড় নিয়ে নিতে পারে। আর গনঅভ্যুত্থানের দিকে মোড় নেয়া মানে এখন যেমন ১৮ দলকে মজিনার সাথে সম্পর্ক রেখে মুখ চেয়ে থাকতে হচ্ছে তখন হবে উলটা। মজিনাকেই বিজয়ী গণঅভ্যুত্থানের নায়কদের দিকে চেয়ে থাকতে হবে।

প্রসঙ্গ চারঃ কেন মজিনার আর্মি ব্যাকিং দরকার?

একথা ভাবা ভুল হবে যে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে ভারতের সাথে কুটনৈতিক বিরোধ আমেরিকা চরমে নিবে। বিরোধ আছে এটা সত্যি হওয়া সত্ত্বেও। আবার পরিস্কার মনে রাখতে হবে, মাইনাস হাসিনা আমেরিকান প্রভাবে একটা আর্মিব্যকড সরকার এমন সিনারিওতে অতি অবশ্যই সবচেয়ে বড় হারু পার্টি হবে ভারত। কারণ হাসিনা ক্ষমতায় নাই মানে আমেরিকার সাথে বাংলাদেশ বিষয়ে গলার আওয়াজ তুলে কথাবলার কার্ড ভারতের হাতে নাই। যেমন খালেদার প্রস্তাবের পরদিন সেটা উড়িয়ে দেবার জন্য সৈয়দ আশরাফের ডাকা প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করতে একা মজিনার অনুরোধ হাসিনা শুনতে রাজি হয়নি। ভারতের হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণের শরণাপন্ন হয়ে মজিনাকে তা বন্ধ করতে হয়েছিল। মজিনার এই দুর্দিনের কথা তাঁর ভুলে যাবার নয়।আবার একদিনের মধ্যে ভারত-আমেরিকার একটা কমন বাংলাদেশ নীতি বা দৃষ্টিভঙ্গি খুঁজে বের করতে মজিনা পারবে না। সময় লাগবে, কমপক্ষে ৬ মাস-একবছর। হয়ত আরও বেশি। অর্থাৎ বিরোধ চরমে নেয়া আমেরিকার লক্ষ্য বা স্বার্থ নয়। কারণ এই অঞ্চলে সম্ভাব্য চীন-ভারত টেনশন বিরোধের ফয়দা হিসাবে আমেরিকা ওদের মাঝখানে বসে থাকতে চায়। এর জন্য সবচেয়ে ভাল জায়গা বাংলাদেশ। আবার চীন-আমেরিকা বাণিজ্য-নৌপথ দখলের লড়াইয়ে আমেরিকা ভারতকে পাশে পেতে চায়। (এটাও ঐ এন্ডারসন সাহেবের রিপোর্টে পরামর্শ ছিল।) যদিও ভারত আমেরিকার মতিগতিতে চীনের চেয়ে আমেরিকাকে কম ভয় পায় বা কম সন্দেহ করে তাও নয়। বরং ভারতও মনে করে এই রিজিয়নের কোন সংঘাতে আমেরিকাকে পাশে না পেলে তার পক্ষে একা নিজের স্বার্থ নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত হবে না। ফলে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারত-আমেরিকার কমন নীতি বের করাই এর সমাধান। যদিও কাজটা সহজ নয়। এবং বলা বাহুল্য এই কমন নীতি আমাদেরকে ভারতের নাগপাশ থেকে বের হতে দিবে না। বরং ভারতের অন্যায় আবদার মেনে নেবার জন্য আমেরিকা আমাদের উপর চাপ অব্যাহতই রাখবে। ফলে এক কথায় বললে তাদের কোন কমন বাংলাদেশ নীতি সবসময় বাংলাদেশের বিপক্ষে যাবেই। ফলে বাংলাদেশের স্বার্থ, মুক্তি লুকিয়ে আছে পরিস্থিতিকে গণভ্যুত্থান ঘটানোর পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে শক্তিশালী গণসমর্থনের ওপর দাঁড়ানো একটি রাষ্ট্র ও সরকার ব্যবস্থা কায়েম।

: SolaimanLipi;”>প্রাসঙ্গিক নয় বলে চীনের বিষয় প্রসঙ্গ হিসাবে আনিনি। প্রয়োজনে সে আলোচনা আলাদা ভাবে করা যাবে।