কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

কম্বোডিয়াঃ গ্লোবাল রাজনীতিতে চীন কেন হেরে যাবে

গৌতম দাস
২১ নভেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার
https://wp.me/p1sCvy-2lz

বার্মার রোহিঙ্গার পর এবার কম্বোডিয়া। তবে এবার গ্লোবাল রাজনীতির প্রসঙ্গে সেদিক থেকে কথা বলা হচ্ছে, গ্লোবাল অর্থনীতি নয়। সচরাচর চীন মানেই গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের  অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শীর্ষ উঠার কথা তুলে বলে থাকি। কিন্তু এবার নয়, সেটা যেন পাঠকের মনোযোগ ফস্কে না যায়, নজরে থাকে সেটা আশা করব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই আমেরিকা দুনিয়ায় গ্লোবাল রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ক্রমশ নিজ সক্ষমতা দেখিয়ে দুনিয়াকে নিজের একক নেতৃত্বে নিয়েছিল। সেটা এখনও আছে, যদিও সময়ে এখন একটা ভাটার টান অনুভুত হওয়া শুরু হয়েছে। গ্লোবাল অর্থনীতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ দৃশ্যমানভাবে ঢিলা হতে শুরু হয়েছে অনেক আগেই, তুলনায় যদিও গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা তেমন একেবারেই নয়। এই পরিস্থিতিতে পাঠকের নজর টানব সত্তরের দশকের  কমিউনিস্ট বিপ্লবের ছোট দেশ কম্বোডিয়ার দিকে।

রাষ্ট্রের নাম কম্বোডিয়া, রাজধানী যার নম পেন। থাইল্যান্ড, লাওস ও ভিয়েতনামের পড়শি এই রাষ্ট্রের দেড় কোটি জনসংখ্যার প্রায় ৯৫ শতাংশ সবাই খেমার (Khmer) নামে এক এথনিক জনগোষ্ঠীর, তাদের ভাষার নামও খেমার। দেশের সাইজ বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বড়, এর জনগোষ্ঠি মূলত বৌদ্ধ-ধর্মীয়। প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো এক রাজতন্ত্রে শাসিত ছিল খেমাররা। কিন্তু এরপর নানা হাত ঘুরে কলোনি দখলের যুগে এসে শেষে, ফরাসি কলোনি রাজ্যে পরিণত হয় ১৮৬৩ সালে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৫৩ সালে, কিন্তু থিতু হতে পারেনি। ভিয়েতনাম যুদ্ধের (১৯৪৫-৭৫) সাথে ভাগ্য ক্রমশ বাধা পড়ে যায়। ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ শেষ হলে, কম্বোডিয়ান চীনাপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি খেমাররুজ (ফরাসি ভাষায় রুজ মানে লাল। অর্থাৎ কমিউনিস্ট লাল খেমার বা Khmer Rouge) নেতা পলপট কম্বোডিয়ায় ক্ষমতা দখল করেছিলেন। কিন্তু তার কুখ্যাত শাসনের তিন বছরে (১৯৭৫-৭৮) এই দল শ্রেণী-শত্রু হত্যা নৃশংসতার উদাহরণ হয়ে যায়; বলা হয় ঐ সময়কালে গ্রামে মালিকানা উচ্ছেদের নামে এরা ২০ লাখ লোককে গণহত্যা করেছিল।

প্রতিক্রিয়ায় এরপর অনেক ক্যু, পালটা ক্যু শেষ করে সেসব পেরিয়ে ১৯৯১ সালে সব বিবদমান পক্ষগুলোকে নিয়ে ‘প্যারিস শান্তিচুক্তিতে’ এক রাজনৈতিক আপোষনামা তৈরি হয়েছিল; এরও আরো পরে, কম্বোডিয়া থিতু হতে হতে ১৯৯৭ সাল লেগে যায়। আর সেসব প্রক্রিয়ারই আর এক অংশ, জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে ‘খেমাররুজের গণহত্যার’ বিচার এখনও চলছে। সেই থেকে সাজিয়ে রাখা মৃত মানুষের সাদা সাদা মাথায় খুলি হয়ে যায় কম্বোডিয়ার ব্যঙ্গপ্রতীক। তবে এই কম্বোডিয়া এখন এক কনষ্টিটিউশনাল রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র; অর্থাৎ এর নামকাওয়াস্তে রাজতন্ত্র বা এক রাজা আছে ঠিকই, তবে সব কিছুই জনগণ নির্বাচিত, এক কনস্টিটিউশনাল রিপাবলিক এটা। আর ১৯৮৫ সাল থেকে নানা কায়দা করে এর প্রধানমন্ত্রী হয়ে আছেন হুন সেন। একালে আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের এক অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী কম্বোডিয়া ও এর শ্রম। চীনের বিপুল বিনিয়োগের এক গন্তব্য এখন কম্বোডিয়া। চলতি বছরেও টার্গেট দুই বিলিয়ন ডলার। থাইল্যান্ড এর পড়শি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য-গঠনের দিক থেকে প্রায় একইরকম বলে ব্যাংককের মত ট্যুরিজমের আয় কম্বোডিয়ার এক বড় আয়ের খাত হয়ে উঠছে ক্রমেই। আর সমুদ্র সীমান্তে (অফসোরে) তেল গ্যাস পাওয়ায় তা অর্থনীতিতে এক বিশাল খাত হয়ে উঠছে। এই হল পুরনো দিক থেকে কম্বোডিয়ার বর্ণনা-পরিচিতি, এবার চলতি লেটেস্ট দিক থেকে আর এক পর্ব শুরু করা যাক।

আগামী বছর ২০১৮ সালে কম্বোডিয়ায় আবার সাধারণ নির্বাচন হবার কথা। আবার বলছি কারণ গত ২০১৩ সালের নির্বাচন ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে রাজনৈতিক অসন্তোষ দিয়ে তা শেষ হয়েছিল। স্বল্প ভোটে বিরোধী দল (কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টি, CNRP) হেরেছিল এভাবে দেখিয়ে ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। আর চলতি প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের দলকে (কম্বোডিয়ান পিপলস পার্টি, CPP) বিজয়ী ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে ‘বিরোধীদের সংসদ বয়কট’ – আমাদের পরিচিত এই ফেনোমেনায় কম্বোডিয়ার বিরোধী দল বেশির ভাগ সময়টা সংসদের বাইরে কাটায়। ওদিকে সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের হিউম্যান রাইট ভায়োলেশন, গুম, খুন করা, ইংরাজী দৈনিক পত্রিকা বন্ধ, রেডিও সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ এগুলো খুবই কমন। কিন্তু ওদিকে সরকারের সংসদে পাশ করা বড় অদ্ভুত কিছু আইন চালু আছে। যেমন একটা হল কুখ্যাত ‘কটূক্তি আইন’ (ডিফেমেশন ল), যা দিয়ে কোনো সরকারি কর্মচারী বা পদ ধারক কারও সমালোচনা করলে তাকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া সম্ভব। এরকম অদ্ভুত আরো কিছু আইন প্রচলিত আছে সেখানে। যেমন – সরকারের আইনি অধিকার আছে কোনো রাজনৈতিক দলকে সামান্য অজুহাতে নিষিদ্ধ করে দেয়ার। এই আইনে বর্তমান বিরোধীদলীয় প্রধান তিনি ফেসবুকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে স্টাটাস দিয়েছেন – এই অজুহাতে তাঁকে পাঁচ বছরের সাজা দেয়া হয়েছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে। তিনি বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন। এর পরে ফেব্রুয়ারি থেকে যিনি দলের নেতা হয়ে আসেন তিনিও গত কয়েক মাস থেকে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায়’ জেলে আছেন। আর উচ্চ আদালত এর পুরো বিচার শেষ নাই বটে, কিন্তু তা না করেই গত ৩১ অক্টোবর আদালত তাঁর জামিনের আবেদনে সাড়া না দিয়ে উলটা ডিটেনশন দিয়ে রেখেছে।

ঐ রায়ের বিচারক খিম পন তাঁর রায়ে লিখেছেন, ‘বিরোধীদলীয় এই নেতা কেম সোখাকে ডিটেনশন দেয়া হল, নতুন ক্রাইম ঠেকাতে আর যাতে জনশৃঙ্খলা রক্ষা আদালত গ্যারান্টি দিয়ে নিশ্চিত করতে পারে’ সেজন্য।  [The detention of Kem Sokha is to prevent new crimes and that the court can  guarantee public order, JUDGE KHIM PONN]  কম্বোডিয়ায় আরেকটা মজার আইন আছে। তা হল, রাজনৈতিক দলের প্রধানের নামে যদি আদালতে কোন ক্রিমিনাল অপরাধের অভিযোগ দায়ের করা হয় ও তা বিচারের শেষে আদালতের রায়ে যদি সাজা হয়, তবে এরপর পুরা ঐ দলকেই সরকার ‘বিলুপ্ত’ বলে ঘোষণা করে দিতে পারে। কম্বোডিয়ার প্রধান বিরোধী দলের বেলায় ঠিক তাই ঘটেছে।  প্রধান বিরোধী দল CNRP এর সর্বশেষ অবস্থা হল, এই দলের আগের প্রধান যে ছিলেন তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণে সাজা হয়ে গেছে, তিনি বিদেশে পালিয়ে আছেন। আর দলের চলতি প্রধান ডিটেনশনে আছেন। অভিযোগ হল সেই ২০১৩ সালে তিনি আমেরিকান সরকারি লোকের সাথে  তিনি কথা বলছেন এমন এক ভিডিও দেখিয়ে, তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়েছে। তাই ডিটেনশন দেয়া হয়েছে। আর গত ৬ অক্টোবর, তাই এইবার খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আদালতে  বিরোধী দলকেই বিলুপ্ত ঘোষণা করার আবেদন করেছিলেন। আর তাতে সুপ্রিম কোর্ট গত ১৬ নভেম্বর প্রধান বিরোধী দল কম্বোডিয়া ন্যাশনাল রেসকিউ পার্টিকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে রায় দেন। ঐ রায়ের ফলে সেই সাথে ওই দলের ১১৮ জন সিনিয়র সদস্য ও রাজনীতিক নিষিদ্ধ হবেন এবং গত চার বছরে  যে ৪৮৯টি কমিউন (স্থানীয়) নির্বাচনে CNRP দলের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছিলেন তারাও সবাই পদ হারাবেন। ওদিকে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা সংসদের ৫৫টি আসনই হারাবেন।

এই অবস্থায় তাহলে আগামী বছরের সংসদ নির্বাচনে কী হতে যাচ্ছে? যেখানে প্রধান বিরোধী দলকে ছলেবলে কৌশলে অযোগ্য ঘোষণা করে দেয়া হল, এর অর্থ তাৎপর্য না বোঝার কিছু নেই। আমাদের দেশের বিনা নির্বাচনে বিজয়ের মতো কিছু একটা সেখানে এখন হবে তা বলাই বাহুল্য। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নাই। বিগত ২০১৩ সালের নির্বাচনে এই বিরোধীরা হুন সেনকে বহু পেরেসান করেছিল। এবার তাই তিনি কোনো রিস্ক রাখলেন না। আর ওই ৫৫টি আসন এখন (আমাদের এরশাদের মত) খুচরা বিরোধী দলগুলো যারা সবাই মিলে গত নির্বাচনে মোট ভোটের মাত্র ৭ শতাংশ পেয়েছিল এদের মধ্যে বিতরণ করে দেয়া হবে। এসব ছোট দলের সদস্যদের মধ্যে তাই হুটোপুটি শুরু হয়েছে পদ-পদবি ও সুবিধাদি নেবার জন্য। আরো আছে। একই অভিযোগ এনে এখন আরো সম্ভাব্য ১০০ জন্য বিরোধী প্রার্থীকে নিষিদ্ধ করে রাখার তালিকা তৈরির কাজ চলছে।

সাবেক খেমাররুজ নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী হুন সেন ক্ষমতায় আছেন ১৯৮৫ সাল থেকে, একনাগাড়ে প্রায় ৩৩ বছর। সম্প্রতি তার দেশে এক বয়ান,  ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ এ কথা কয়টাক এক বিরাট ইস্যু বা অজুহাত হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেমন গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী হুন সেন এক পাবলিক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘দেশের স্থিতিশীলতার জন্য’ আরো এক যুগ তাকে ক্ষমতায় থাকতে হবে।

তাহলে এখন থেকে যা বোঝার বুঝে নেন। কিন্তু কোথাকার এক কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা ইতিহাস নিয়ে আমি কেন আপনাদের শুনাতে এলাম? বাংলাদেশের সরকার আর বিরোধী দল আর ওদিকে আমাদের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আকার ইঙ্গিতে কিছু বলার জন্য কী? না একেবারেই নয়। এই অনুমান ভুল। বরং আসল উদ্দেশ্য এতক্ষণ উপরে কোথাও লেখাই হয়নি। কী সেটা?
কম্বোডিয়ার সর্বশেষ রাজনৈতিক দশা পরিস্থিতি নিয়ে ইষ্ট এশিয়ার মিডিয়াগুলোর অনেকেই নানা আর্টিকেল ছেপেছে। এমনি একটা হল, হংকংভিত্তিক সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। ‘মর্নিং পোস্টে’ একটি কলাম ছাপা হয়েছে, লেখক এডোয়ার্ড মরটন।

তিনি বলছেন, “হুন সেন চীনের সাথে গাঁটছাড়া বেঁধে আমেরিকাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে নেমেছেন। কিন্তু হুন সেনের এই হিসাব ‘যা নয় তাই বাড়িয়ে ধরা’ অনুমান বলে প্রমাণিত হবে।” কিছু বিশ্লেষক, কিছু রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও জার্নালিস্টদের বক্তব্যের রেফারেন্সে তিনি এসব কথা বলেছেন। তার এসব মন্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায় হুন সেনের আরেক মন্তব্য থেকে। তিনি বলছেন, ‘আগামী বছরের নির্বাচনের ফলাফলে পশ্চিমাদের স্বীকৃতি জোগাড়ের প্রয়োজন হবে না।’ কিন্তু তবু এটাও আমার এই লেখার ফোকাস নয়। তবে এবার লিখছি ফোকাসটা কোথায় এবং তা কী? যা খুবই বিপজ্জনক ইঙ্গিত।

আলজাজিরা টিভি গত ১৭ নভেম্বর কম্বোডিয়া পরিস্থিতি নিয়ে ২৫ মিনিটের টকশোর মতো অনুষ্ঠান ‘ইনসাইড স্টোরি’ প্রচার করেছে। সেখানে তিন অতিথি ছিলেন ০১. মু সোচুয়া – তিনি সদ্য নিষিদ্ধ হওয়া বিরোধী দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট, পলাতক হয়ে প্যারিসে আশ্রয় নিয়ে আছেন। ০২, ভিকটর গাও – চায়না ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের পরিচালক। তিনি আসলে আবার ‘চায়না এনার্জি সিকিউরিটি ইন্সটিটিউটের’ চেয়ারম্যান। তার আরেক পরিচয় হল, তিনি বিখ্যাত চীনা নেতা দেং জিয়াও পিংয়ের অনুবাদক হিসাবে কাজ করেছেন। আর ০৩. হোসেক লি ম্যাকিয়ামা – তিনি ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল ইকোনমির পরিচালক। এই তিন প্যানেল বক্তার মধ্যে চীনা একাডেমিক মি: গাও – এর বক্তব্য আমার প্রসঙ্গ।

গাও তার পালা এলে তিনি স্পষ্ট করে হুন সেনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে কথা বলেছেন। হুন সেনের সরকার, তার গৃহীত পদক্ষেপ সব সমর্থন করলেন। এটা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। এমনকি রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের জেনারেলদের পক্ষেও এত স্পষ্ট করে পাবলিক মিডিয়ায় চীন কথা বলেনি। ১৯৭০-এর দশকে চীন-আমেরিকার সম্পর্ক পাকা হয়, আর সে সময়ে নিজেরা যার যার স্বার্থ বুঝাবুঝি, পারস্পরিক স্বীকৃতি বা দেনাপাওনাগুলো ঠিকঠাক হয়েছিল ১৯৭১-৭৮ সালের মধ্যে। আমেরিকান বিনিয়োগে চীনে এক ক্যাপিটালিজম জগত প্রবেশ করবে আর, এক নতুন অর্থনৈতিক পথে চীন যাবে সে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তখন থেকেই চীন নিজের জন্য আর একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে এর ফলে ক্রমশ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব সক্ষমতা ক্রমশ বেড়ে চললেও এর প্রভাবে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিষয়াদিতে নাক গলানোর বা গ্লোবাল প্রভাবের ভাগিদারি ভাগ পাওয়ার সুযোগ হাতে পেলেও চীন তাতে জড়িত হবে না। না এটা চীনের কোনো ভালো মানুষি নয়। বরং দুনিয়াজুড়ে আমেরিকান যে রাজনৈতিক প্রভাব বলয় তৈরি হয়ে আছে এর মধ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের ভাগিদারি এই খাতে চীন নিজেকে আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে অথবা প্রভাবের শেয়ার নিতেও সে যাবে না। বরং চীন যদি এতে পুরো ছাড় আমেরিকাকে দিয়ে দিলে, দুনিয়ার সব কোনা থেকে গ্লোবাল অর্থনৈতিক বিষয়াদির ভাগিদারি কর্তৃত্ব ও প্রভাব বিনা বাধায় পেতে সহজ হবে। ফলে আমেরিকার সাথে চীনের সম্পর্ক অ-সাংঘর্ষিকভাবে বিকশিত হতে পারবে। চীন চেয়েছিল গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের কোনো ভাগ আমেরিকার কাছে সে চাচ্ছে না। অথবা চীন সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী নয় এই বার্তা আমেরিকাকে  জানানো। আর সে কারণে সবার আগে অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের উত্থান পর্বকে প্রায় বাধাহীনভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে। যেটা  আসলে সহজে চীন বাস্তবে অর্জন করেছিল।

যেমন – ২০১৪ সালে আমাদের নির্বাচন ইস্যুতে দেখা গিয়েছিল কোন রাজনৈতিক স্টেক বা কেমনভাবে নির্বাচন হতে হবে তা নিয়ে কোনো বক্তব্য চীনের ছিল না। কিন্তু সরকারে যেই থাক বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসায় চীনের যা স্বার্থ যা সে চায় তা নিয়ে যেন কেউ বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এই প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সে পশ্চিমা অবস্থানের পক্ষে নীরব সমর্থন দিয়ে তা নিশ্চিত করেছিল। রাজনৈতিক প্রভাবে ভাগিদার সাজতে না চাওয়া চীনের এই নীতি অবশ্যই বেশ লম্বা সময়ের জন্য, তবুও তা আবার এক অর্থে সাময়িক। যেমন, যত দিন চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে পূর্ণতা নিয়ে হাজির হচ্ছে  ততদিন একই সাথে গ্লোবাল রাজনৈতিক প্রভাবের দিকে হাত বাড়াতে চীন যাবে না। তবে এর পরে অবশ্যই যাবে। এরই সোজা অর্থ সম্ভবত এবার রাজনৈতিক ইস্যুতেও আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চীন দুনিয়ায় হাজির হতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।

কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চীন সরাসরি হুন সেনের পক্ষ দাঁড়িয়েছে শুধু তাই নয়, হুন সেন একটি ন্যূনতম ভাবে ফেয়ার নির্বাচিত সরকার হয়ে থাক সেটার দরকার নেই – এ কথায় এতদূর গিয়ে প্রবক্তা হয়েছে। মি. গাও বলেছেন. কম্বোডিয়ায় একটা ‘গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গেলে যদি পুরনো অস্থিতিশীলতা আবার ফিরে এসে পড়ে’ তাই এর দরকার নেই। আর এতে অর্থ সম্পদও নষ্ট হতে পারে। তা ছাড়া ‘তথাকথিত গণতন্ত্র’ (তিনি তথাকথিত বা সোকল্ড শব্দটা ব্যবহার করেছেন) বাস্তবায়নকে দেখার অনেক ধরন আছে। অর্থাৎ হুন সেন বিরোধীদের মেরে ধরে গুম নির্যাতন করে, জবরদস্তি যদি নিজেকে ভুয়া নির্বাচিত হিসেবে দেখায় তবুও সেটা চীনের স্টাইলের নির্বাচন (গণতন্ত্রকে দেখার নানা পথ আছে) মনে করে এবং ‘স্থিতিশীলতার স্বার্থে’, ‘সম্পদ নষ্ট না করার স্বার্থে’ হুন সেনকেই নির্বাচিত মানতে হবে। চীনের নিজের রাজনৈতিক ব্যবস্থার রাষ্ট্রে নাগরিকের কোনো রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক অধিকার, মানবিক মৌলিক অধিকার বাস্তবায়ন- এগুলোকে সে নিজ করণীয় বলে মনে করে না। নিজে করেওনি। বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রাচুর্য অর্জন এগুলোই করণীয়। অর্থাৎ মানুষ বৈষয়িক বিষয়াদির ভোগকারি মাত্র। তার কোন স্পিরিচুয়াল ও রাজনৈতিক প্রতিজ্ঞা, করণীয়, দায়দায়িত্ব এসব কিছু নাই- এই হলো চীনা কল্পনায় দেখা মানুষ। মানুষ সম্পর্কে এই অনুমানের উপরে দাঁড়ানো আছে চীনের নেতৃত্ব।

তাহলে কী দাঁড়াল? চীন কী এখন থেকে আমেরিকার সাথে দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক প্রভাব এর ভাগিদার বা পুরা কতৃত্ব নেয়ার জন্য এখন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়া শুরু করবে? যার বাইরের দিকটা দেখে লাগবে কম্বোডিয়ায় মতই, কোনো বিরোধী দল সেখানে নেই অথবা একটা সুষ্ঠু নির্বাচন ব্যবস্থা থাকার দরকার আছে কিনা এই নিয়ে আমেরিকা ও চীনের লড়াই? নাকি কম্বোডিয়ার মত কিছু দেশের বেলায় (সব দেশের বেলায় নয়) চীন একক রাজনৈতিক প্রভাব হাসিলের জন্য এখন থেকে আমেরিকার সাথে লড়বে? এই দুইয়ের মধ্যে সেটা যেটাই হোক, চীন গোহারা হারবে সেটা আগেই বলে দেয়া যায়। কারণ মডার্নিটি পরবর্তী দুনিয়া ১৯৪৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যান রাইট চার্টার পর্যন্ত গিয়েছে। ওর অনেক খামতি আছে। কিন্তু তাই বলে সেটা ওর পেছনের সময়ে ফিরে যেতে পারে না। দুনিয়া এমনকি সত্তরের দশকে কমিউনিস্ট বুঝে আবার ফিরে যেতে পারে না।

অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে চীন যতই এগিয়ে যাক, চীনের রাজনৈতিক বুঝাবুঝিতে ব্যাপক ঘাটতি আছে। তবুও, আচ্ছা এটাই কী চীনের সদ্য সমাপ্ত দলীয় কংগ্রেসে উল্লেখিত ‘মডার্ন সমাজতন্ত্রের’ ব্যাখ্যা; আর এজন্য শি জিনপিংকে মাওয়ের সমতুল্য নেতা বলে দাঁড় করানো শুরু? সেটা যাই হোক, চীনের এই পদক্ষেপ খুবই বিপজ্জনক ও আত্মঘাতী পথে যাওয়ার ইঙ্গিত!

সর্বশেষঃ
 রয়টার্স এজেন্সির খবর,  ১৭ নভেম্বর চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রেগুলার বিফ্রিংয়ে প্রশ্নের উত্তরে জানায়, কম্বোডিয়ার চলতি রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরোধী দল ও নেতাদের নির্মুল ও শুন্য করা প্রসঙ্গে চীন বলছে, এটা “কম্বোডিয়ার নিজস্ব কায়দার উন্নয়নের রাস্তা অনুসরণ” করা বলে চীন মনে করে। [Cambodia in pursuing its own development path……)
আর এর পাল্টা আমেরিকা বলছিল, আমেরিকা নির্বাচন সম্পর্কিত সব ফান্ড প্রত্যাহার করে নিচ্ছে এবং আরও কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ [“concrete steps”] নিতে যাচ্ছে।  এর প্রতিক্রিয়ার হুন সেন গতকাল ১৯ নভেম্বর বলেছেন, তিনি  সমস্ত আমেরিকান এইড প্রত্যাহার করে নিতে স্বাগত জানায়। [“Hun Sen … welcomes and encourages the U.S. to cut all aid.”]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com   

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৯ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

গৌতম দাস

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

http://wp.me/p1sCvy-2hU

আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
“Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছেন

ট্রাম্প কি আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে নিতে যাচ্ছে্ন

গৌতম দাস

২৯ আগস্ট ২০১৭,মঙ্গলবার, ০০:০১

http://wp.me/p1sCvy-2hm

 

ডোনাল্ড ট্রাম্প জানাচ্ছেন তিনি আমেরিকাকে আবার  নতুন করে আফগানিস্তানের যুদ্ধে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।  গত সপ্তাহে ২১ আগষ্ট তিনি নতুন করে দেয়া তার আফগান পলিসি ঘোষণা করেছেন, আর তাতে  নতুন করে আবার আরও সৈন্য পাঠানোর ইচ্ছা জানিয়েছেন।  স্বভাব সুলভ হামবড়া ভাবে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্প প্রায়শই নিজেকে এক মশকরার পাত্র বানিয়ে ফেলেন। এখানেও ট্রাম্প তার নতুন ‘আফগান নীতি’ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “আমরা এবার সেখানে আর আফগান রাষ্ট্র গড়তে যাচ্ছি না, আমরা যাচ্ছি টেররিস্ট মারতে”। [“We are not nation building again. We are killing terrorists.”] বেশির ভাগ আন্তর্জাতিক মিডিয়া ট্রাম্পের আফগান যুদ্ধে নবপ্রবেশকে ঠাট্টা তামাশা করে বা খোঁচা দিয়ে হাজির ধরেছে। প্রকারন্তরে যার অর্থ তারা কেউই যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারটা সিরিয়াসলি দেখছেন না।

“I provide my input through the chain of command,” Gen. John Nicholson said during a news conference in Kabul on Thursday. Credit Rahmat Gul/Associated Press

তাহলে কী খোদ ট্রাম্পের কথার ভিতর সিরিয়াস-নেসের অভাব আছে? হা, সম্ভবত তাই। আর সেজন্য এই প্রশ্নও জাপানের  থিঙ্কট্যাঙ্ক  ম্যাগাজিন ডিপ্লোমেটিক পত্রিকার এক আর্টিকেলে তোলা হয়েছে। এই পত্রিকায় ছাপা হওয়া দুটা আর্টিকেলই ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে নেতিবাচকভাবে নিয়েছে। ফলে সবমিলিয়ে  আবার আমেরিকাকে আবার আফগানিস্তানে নিবার ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত – এর মানে আফগানিস্তান কী টেররিজমের ইস্যু না ব্যবসা বাগিয়ে নিবার ইস্যুই সে প্রশ্নও উঠেছে।

গত ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে আফগান যুদ্ধ থেকে সব সৈন্য ফিরিয়ে নিবার প্রেসিডেন্ট ওবামার সিদ্ধান্ত ও তা বাস্তবায়নের পরেও ফেলে ছড়িয়ে আফগানিস্তানে এখনও আসাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। আমেরিকান এক জেনারেল জন নিকলসনের নেতৃত্বে এই সৈন্যরা সেখানে আছেন। ওদিকে  ট্রাম্পের ক্ষমতাগ্রহণও অষ্টম মাসে পড়েছে। অথচ এখন পর্যন্ত  ঐ জেনারেলের সাথে ট্রাম্পের কোন সাক্ষাত ঘটে নাই। যদিও ট্রাম্প নতুন আফগান নীতি দিয়ে দিলেন। ব্যাপারটাকে নিয়ে তাই নিউইয়র্ক টাইমসের প্রচ্ছদে ঐ জেনারেলের ছবি দিয়ে প্রশ্ন রেখেছে, এমন আফগান নীতিতে – “এ’এক আজীব সম্পর্ক!” সিএনএনও এক মশকরা রিপোর্ট ছেপেছে, “আফগানিস্তান সম্পর্কে ট্রাম্পের চিন্তার ইতিহাস” এই শিরোনামে।  গত ২০১১ সাল থেকে চলতি সময় পর্যন্ত ট্রাম্প আফগানিস্তান নিয়ে যত মন্তব্য করেছেন তার ক্রমিক ইতিহাস এটা।  সেখানে ট্রাম্পের মন্তব্যগুলো হল যেমন,  ‘অর্থ বরবাদের জায়গা আফগানিস্তানে’ বা  ‘আফগানিস্তান এক বিপর্যয়ের নাম’, অথবা ‘আমাদের  এখনই আফগানিস্তান ছেড়ে আসা উচিত’ ইত্যাদি থেকে শুরু হয়ে শেষে ২০১৭ সালে এসে গত ১৯ আগষ্ট তিনি টুইট লিখছেন, “ট্যালেন্টড জেনারেলদের সাথে ভাল সময় কেটেছে আফগানিস্তানসহ অনেক ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি”। অথচ এই ট্রাম্প নিজেকে এতদিন ন্যাশনালিস্ট অবস্থান নিয়েছেন মনে করে তিনি আফগানিস্তানে আমেরিকান সৈন্যের যুদ্ধ করাসহ এমনকি বিভিন্ন দেশে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে) আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি বজায় রাখবার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, এসব রাষ্ট্রিয় খরচের উদ্দেশ্য- ন্যায্যতা জানতে চেয়ে এসেছেন। তার আগেকার টুইটগুলোই সেসবের প্রমাণ। তাই তিনি নিজের ‘আফগান পলিসি’ ঘোষণা করতে গিয়েও স্বীকার করছেন যে নিজের ব্যক্তি অবস্থানের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি এটা করছেন।

আমেরিকার আফগানিস্তানে হামলার আর ‘ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের নেতা ছিলেন জর্জ বুশ। কিন্তু এতে তিনি আমেরিকাকে এক অসীম এবং কখনও শেষ হবে না এমন যুদ্ধের ভিতর ঢুকিয়ে ফেলেছিলেন। নিজেও আটকে পড়েছিলেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান হামলার মুল লক্ষ্য কি ছি তা স্মরণ করিয়ে দিতে সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের এক কমেন্টেটর পন্ডিত লিখছেন মূলত, “আফগানিস্তান থেকে আলকায়েদা ততপরতা ও তাদের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা, তাদের শীর্ষ নেতাদেরকে হত্যা করা, তাদের অর্থ সরবরাহ ও লেনদেনের নেটওয়ার্ক উপড়ে ফেলা ইত্যাদি ছিল আফগানিস্তানে আমেরিকান সামরিক হামলার মৌলিক লক্ষ্য উদ্দেশ্য”। কিন্তু ১৬ বছরের এই যুদ্ধে সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্যের কিছুই অর্জিত হয় নাই। অথচ ইতোমধ্যে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ জীবন দিয়ে ফেলেছে ২৪০০ আমেরিকান সৈন্য, এই পর্যন্ত ১৬ বছর ধরে  বহণ করা হয়েছে ঐ যুদ্ধের খরচ, আর তাতে মোট ব্যয় হয়ে গেছে প্রায় ১.০৭ ট্রিলিয়ন বা ১০৭০ বিলিয়ন ডলার। শুধু তাই নয় আমেরিকান অর্থনীতির যে বিরাট ক্ষতি হয়েছিল যেটার আঁচ গ্লোবাল অর্থনীতিতে গিয়ে লেগেছিল তাতে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দাও দেখা দিয়েছিল।  এর আগে বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ১৯৩০ সালে ঘটা প্রথম গ্লোবাল মহামন্দার পরে সেটাই ছিল দ্বিতীয়বার ২০০৭-৮ সালের মহামন্দা। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল ইউরোপ আমেরিকা। ফলে পুরা পশ্চিমাসহ এর প্রভাবে দুনিয়ার অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো মহামন্দায় কম-বেশি ডুবে গেলেও তখনও আলোর বাতি হয়ে টিকেছিল চীন; যদিও চীনের ডাবল ডিজিটের জিডিপি সেখান থেকে নেমে সিঙ্গেল ডিজিটে, অর্থাৎ কম হারে এসে গেলেও তা ভালর দিকে অর্থাৎ তখনও চীনের অর্থনৈতিক গ্রোথ ছিল ইতিবাচক। অবশ্য  ততদিনে আমেরিকান এক সরকারি গবেষণা, এক সার্ভে ষ্টাডিতে এটা পরিস্কার হয়ে গেছিল যে আমেরিকা আর একক পরাশক্তি থাকতে পারছে না। তবে অন্য আর চার বা পাঁচ পরাশক্তির অন্যতম একটা হতে যাচ্ছে মাত্র। আর চীনের অর্থনীতি এবার আমেরিকান অর্থনীতিকে ছাড়িয়ে চলে যাবে। এসব আগাম অনুমানগুলোর বাস্তব লক্ষণ দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল আমেরিকান অর্থনীতির ঐ পতন শুরুর কালে। ফলে বুশকে যদি বলা হয় আমেরিকাকে এক অনন্ত যুদ্ধে প্রবেশের রূপকার তবে এথেকে আমেরিকাকে বের করা আনার ত্রাতা হলেন বারাক ওবামা। গত ২০০৭ সাল মানে বুশের আমল থেকেই যুদ্ধ করে কী লাভ-ক্ষতি হল এর নানান মুল্যায়ন শুরু হয়েছিল। বলা বাহুল্য অর্জন বা লাভক্ষতির এসব মুল্যায়ন হিসাবগুলোতে এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে আমেরিকা অর্থহীন ততপরতার এক বিশাল ফাঁদে আটকা পড়েছে। কোন লক্ষ্যই মূলত অর্জিত হয় নাই। ফলে  এখান থেকে আমেরিকাকে বের করা উদ্ধার করার সিদ্ধান্ত আসে বা তা নিতে হয় ততদিনে নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে। তিনি আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনার জন্য উলটা হিসাব করে আগে একটা তারিখ ঠিক করেছিলেন। না সেটা, আর কত দিনের যুদ্ধে বা কবে কবের মধ্যে  কী কী অর্জন করতে হবে এর তালিকা না। তিনি মাপলেন যুদ্ধ চালিয়ে যাবার সামর্থ  আমেরিকান অর্থনীতির আর কতদিন আছে যাতে সেফ থেকে অর্থনীতির বড় ক্ষতি না করে যুদ্ধ সমর্থন করেও সহি সালামতে ফিরে আসা যাবে। সেই হিসাবে ২০১২ সালেই তিনি যুদ্ধের কাট-অফ তারিখ ঘোষণা করে দিয়েছিলেন; আর সে তারিখ হল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর। অর্থাৎ এই তারিখের মধ্যে যুদ্ধের লক্ষ্য কিছু অর্জিত হলে ভাল; কিন্তু তা না হলেও সৈন্যরা বাড়ি ফিরে আসবেই – এটা নির্ধারিত করে ফেলেন তিনি। তবে কেবল সামরিক কাঠামোটা ধরে রাখার জন্য আর কেবল কিছু ট্রেনিং এর উদ্দেশ্যে সর্বোচ্চ দশ হাজার আমেরিকান সৈন্য আফগানিস্তানে রেখে দিবার সিদ্ধান্ত নেন। বাস্তবে সেটাই হয়ে আছে, এখন সাড়ে আট হাজার সৈন্য আছে। এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারার জন্য ওবামা সেই থেকে বুশের ত্রাতা হয়ে আছেন। এই প্রেক্ষিতে বলা যায় ট্রাম্পের ত্রাতা কে হবেন তা কী তিনি আগে ঠিক করেছেন?

গত ১০ জুলাই রয়টার্স এক মন্তব্য প্রতিবেদন ছেপেছিল। কারণ ততদিনে ট্রাম্পের নতুন আফগান নীতি কেন আসছে না তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়ে গেছিল। ঐ রিপোর্টর তার প্রথম বাক্যে লিখেছে, “বিদেশ নীতি সার্কেলে প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ম্যাকমাস্টার আর সেক্রেটারি অফ স্টেট টিলারসন – ট্রাম্প প্রশাসনের এই তিনমুর্তি যে  আফগানিস্তান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আবার সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেক, এই নীতির পক্ষে প্রেসিডেন্টকে প্রভাবিত করার বড় মুরুব্বি, এটা সবাই জানে। মাত্র তিন বছরের মাথায় এরা চায় আমেরিকা তার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলুক”। অর্থাৎ এরা হলেন যুদ্ধের দামামা বাজানোর পক্ষে মুল হোতা।  রয়টার্সের ঐ রিপোর্টে লিখছে একমাত্র ট্রাম্পের প্রাক্তন চীফ ষ্ট্রাটেজিষ্ট স্টিভ ব্যানন যাকে গ্লোবালাইজেশন বিরোধী ন্যশনালিস্ট, ‘সাদাচামড়া্দের শ্রেষ্ঠত্বতা ফেরি করার  নেতা ইত্যাদি বলা হয় একমাত্র তিনি ছিলেন সঠিক নীতির লোক।  কারণ তিনিই একমাত্র ছিলেন এর বিপক্ষে। তিনিই ট্রাম্পকে আফগানিস্তানে ফিরে যাবার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সাবধান করেছিলেন। আসলে ঐ রিপোর্ট বলতে চাইছে যে ট্রাম্পের এই আফগান নীতি ঠিক হয় নাই। স্টিভ ব্যাননকে অনেক আগেই ট্রাম্প হোয়াইট হাউস থেকে বের করে দিয়েছেন। ফলে ঐ রিপোর্টের ভাষ্য হল আমরা স্টিভ ব্যাননের বাকি সব ইস্যুতে একমত না হতে পারি কিন্তু তিনিওই পারতেন প্রেসিডেন্টকে আফগানিস্তানে ফেরত যাবার সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থাকতে।

আসলে যুদ্ধবাজদের প্রেসিডেন্টকে  প্রভাবিট করে ফেলার  ঘটনার স্পষ্ট হতে শুরু হয়েছিল বর্তমান আমেরিকান ‘সিনেটের আর্মস সার্ভিস কমিটির’ শুনানি বৈঠকে গত জুন মাসে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিস সেখানে সাক্ষ্য দিতে আসার সময় থেকে।  আফগানিস্তানে আমেরিকার সৈন্যদের নেতা জেনারেল নিকলসন তিনি ঐ শুনানিতে স্পষ্ট করে বলেন যে, “সামর্থের অভাবে আমরা সেখানে ‘স্টেলমেটে’ মানে কেউ জিতে নাই এমন একটা স্থবিরতার মধ্যে আটকে আছি”। ফলে একথার পরে  সেখানে প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাট্টিসও তার স্বাক্ষ্যে বলা সহজ হয়ে যায় যে “আমরা আফগানিস্তানে জিততে পারছি না। তবে আমরা এটা সংশোধন করব”। এই সংশোধন করার কথা  থেকেই ঐ সিনেট কমিটি চেয়ারম্যান ম্যাককেইন ম্যাট্টিসকে ধরে বসেন যে জেনারেলদেরকে তাহলে এখন যুদ্ধের একটা নতুন স্ট্রাটেজি দিতে বলেন; না হলে তো সিনেট থেকে কোন থিতু মিলিটারি বাজেট দেয়া সম্ভব না। কিন্তু জেনারেলদের জন্য আসল সমস্যা হল অন্যখানে। এই যুদ্ধের মূল যে লক্ষ্য ছিল যে “আলকায়েদার সব কিছু উপড়ে ফেলা বা সমাপ্তি ঘটানো” সেটা কী জেনারেলদের পক্ষে দিন তারিখ দিয়ে বলা ও করা সম্ভব যে কবে এই লক্ষ্য অর্জিত হবে! যেই লক্ষ্য বিগত ১৬ বছরে কিছুই অর্জিত হল না তা এখন জেনারেলদের পক্ষে কী দিন তারিখ আর যুদ্ধকৌশলসহ বয়ান করে বলা সম্ভব। সেকথা এখানে আমল করা হয় নাই। যেমন  একটা কথা। আফগানিস্তানে আমেরিকার সর্বোচ্চ সেনাবাহিনী একসময় ছিল একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার। অথচ এখন যে সৈন্য বাড়ানোর কথা বলা হচ্ছে আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্প বলছেন এটা তারা প্রকাশ করবেন না। কিন্তু ইনফরমালি সেই সংখ্যা হল আগের সাড়ে আট হাজারের উপর আরও বড়জোর মাত্র পাঁচ হাজার। তাহলে তাতে হবে সাড়ে তের হাজার। অথচ এই সাড়ে তের হাজার সৈন্য এরা কী একলাখ চুয়াল্লিশ হাজার সৈন্যের সমতুল্য ফলাফল  আনতে পারে? পারা সম্ভব? তা ভেবে দেখা হচ্ছে না। তাহলে এখনই নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজানো হচ্ছে কেন? ব্যাপারটা কী এমন যে, খুব সম্ভবত যুদ্ধ শুরু হলে ছোটবড় যে সব ঠিকাদারি কাজ বা সরকারি ব্যয় সচল হয়ে উঠবে তার সুফলভোগী সংশ্লিষ্ট লোকজনের স্বার্থের ততপরতা এগুলা। তাই এপ্রসঙ্গে জাপানের ডিপ্লোম্যট ম্যাগাজিনের এক আর্টকেল প্রশ্ন রেখেছে যুদ্ধের লক্ষ্য কী, আর এর টাইমটেবিল ও বাজেট কী সে সম্পর্কে যথেষ্ট যাচাই না করে কেন এই অনুমোদন দেয়া হচ্ছে।[the President “has given in to the Pentagon’s incessant demand of ceaseless war in Afghanistan and linking troop drawdown to conditions rather than an arbitrary timeline”.]

সবশেষে ট্রাম্পের এই প্রসঙ্গে পাকিস্তানকে দেয়া এক হুমকি কথা বলে শেষ করব। ট্রাম্প পাকিস্তানকে অনেকটা ‘ভাল হয়ে যেতে’ বলেছেন। আর বলা বাহুল্য তা শুনে ভারত খুবই খুশি হয়েছে, স্বাগত জানিয়েছে। বিষয়টা হল, হাক্কানি নেটওয়ার্ক এই আফগানি তালেবানদের ব্যাপারে নাকি পাকিস্তান কঠোর না – এই অভিযোগ তুলেছে আমেরিকা। ব্যাপারটা অনেক পুরানা এবং গভীর। যদিও এপ্রসঙ্গে ভারতের সহজ ব্যাখ্যাটা হল এরকম যে, পাকিস্তান বা এর জেনারেলেরা সব সময় জঙ্গীবাদকে প্রশ্রয় দেয় সেটা এবার ট্রাম্পও বুঝেছে ও তিনি সরব হয়েছে। কিন্তু খুব সম্ভবত ব্যাপারটা এত সরল না। আর এসব বিষয়ের জট মোকাবোলা করার পথ এটা নয়।  আফগানিস্তানের তালেবানের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নন-একশন থাকার অভিযোগ তা সত্য হলে খুজে দেখতে ও পরিস্কার করে বুঝতে হবে যে পাকিস্তানের কোন কৌশলগত কারণে ও স্বার্থে সে এমন করছে। এব্যাপারে আমেরিকার স্বার্থ যা তাই পাকিস্তানেরও স্বার্থ হতেই হবে তা ধরে নেয়া ঠিক নয়।  পাকিস্তানের স্বার্থ বলেও তো আলাদা কিছু থাকতে পারে, আছে এবং থাকাটাই স্বাভাবিক। প্রত্যেক রাষ্ট্রেরই ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ ফলে তা থেকে ভিন্ন ভিন্ন ষ্ট্রাটেজি থাকে। তবে চাইলে সেগুলো একসাথে  সমন্নিত করে একটা একই কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব যার ভিতর সবাইকে নিয়ে আসা সম্ভব। কিন্তু এই সমস্যা হুমকি দিয়ে মিটবে না। স্ট্রাটেজিক স্বার্থের ফারাক তো ধমক দিয়ে মিটবে না।  আর আমেরিকার এক পুরান খাসলত হল আমেরিকার সাথে পাকিস্তানের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থের বিরোধ আমেরিকা এতদিন পাকিস্তানকে অর্থ সাহায্যের লোভ দেখিয়ে ভুলে থাকতে বলেছিল। কিন্তু  এবার পাকিস্তান সে অর্থও নেয় নাই, স্বার্থও ছাড়ে নাই। মোট বরাদ্দ ছিল ৮০০ মিলিয়ন। এপর্যন্ত ৫০০ মিলিয়ন বতরণের পরে বতর্ক লেগে আর বাকিটা পাকিস্তান নেয় নাই বা আমেরিকা আর ছাড় করে নাই। আর মূল কারণের কথা যা জানা যায় তা হল, পাক-আফগান সীমান্তে  কলোনি বৃটিশ যে ডুরান্ড লাইন টেনেছিল তা নিয়ে আফগান আপত্তি আছে বলে প্রায়ই কথা উঠে।  ফলে তালেবান ইস্যু ঠান্ডা হয়ে গেলে আফগানিস্তান সীমান্ত ইস্যুতে পাকিস্তানের সাথে বিরোধে মনোযোগি হয়ে উঠবে বলে পাকিস্তানের আশঙ্কা আছে। তাই সে আফগান তালেবান পুরাপুরি ঝেটিয়ে বিদায় করতে আগ্রহি নয়। এমন এক ব্যাখ্যা ইনফরম্যালি জানা যায়। ঘটনা যদি এটা হয় তাহলে আমেরিকার উচিত হবে সীমান্ত চিহ্নিত করা প্রসঙ্গে পাক-আফগান বিরোধ নিয়ে কথা তোলা। অন্কাতত একটা মোটাদাগের ডিলে পৌছানোর চেষ্টা করতে মধ্যস্থতার পথে যেতে পারে।   এটা ছাড়া আমেরিকার কখনই পাকিস্তানকে পুরাপরি নিজের ষ্পট্ক্ষেরাটেজির পক্ষে পাবে না। এটা কোনভাবেই পাকিস্তানী জেনারেলদের জঙ্গীবাদ ভালবাসার ব্যাপার নয়।

আবার ট্রাম্প এক মজার আবদার রেখেছেন ভারতের কাছে। বা বলা উচিত আলকায়েদা বা তালেবান ইস্যুটা আমেরিকার কাছে আসলে যে ব্যবসার ইস্যু তাই যেন এতে স্পষ্ট হয়েছে।  ট্রাম্প বলেছে, ভারত আমেরিকার সাথে ব্যবসা করে প্রচুর ডলার কামিয়েছে ফলে আমেরিকা চায় ভারত সে অর্থ আফগানিস্তানে ব্যয় করুক। কিন্তু ভারত আফগানিস্তানে এই ব্যয় কিসে করবে ব্যবসায় না যুদ্ধে? নামকাওয়াস্তে না হয়ে যদি আফগানিস্তানে অর্থপুর্ণ অবকাঠামো উন্নয়নে ভারতের ব্যয়ের কথা ট্রাম্প বলে থাকেন তাহলে বুঝা গেল ট্রাম্প আসলে সিরিয়াস না। কারণ ভারত সেই সামর্থের অর্থনীতি কোথায়, তা তো সে এখনও নয়। আর যদি ব্যবসা বুঝিয়ে থাকেন তার অর্থ  আফগানিস্তান ট্রাম্পের কাছে আসলে টেররিজমের ইস্যু নয়। ব্যবসার ইস্যু।

মূলকথা ট্রাম্পকে সবার আগে সিদ্ধান্ত নিতে হবে আফগানিস্তান তার কাছে কী ইস্যু – টেররিজম না ব্যবসা!  ট্রাম্প ভারতকে সংশ্লিষ্ট করবে ব্যবসায় আর পাকিস্তানকে ধমক দিবে, আবার খোদ নিজে আফগানিস্তানে কেন সৈন্য পাঠাবে এব্যাপারে দিশেহারা নন-সিরিয়াস থাকবে ফলে এগুলা একটাও তো আসলে কোন কাজের কথা নয়। যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট কিছু লোকের পেটি স্বার্থ ছাড়া, আর কিছু নয়। ফলে স্বভাবতই  ট্রাম্পের আমেরিকার যুদ্ধের নামে আর একবার অনন্ত খরচের মধ্যে জড়িয়ে বিপদে পড়ার সম্ভাবনা। আবার ট্রাম্পকে মনে রাখতে হবে ইরান ও রাশিয়ার সাথে তালেবানদের সম্পর্কে দিনকে দিন ভাল হচ্ছে।  এই আফগানিস্তান অথবা এই তালেবান আর আগের আফগানিস্তান অথবা তালেবান নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২৮ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন : চীন আরেক ধাপ আগালো

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত
চীন আরেক ধাপ আগালো

গৌতম দাস

মে ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2fm

চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ (Belt & Road Initiative)। এটা এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকা মহাদেশকে এক সাথে জুড়ে এমন এক যোগাযোগ অবকাঠামো প্রকল্প। যোফাযোগ সড়ক পথে ও সমুদ্র পথে এবং দুটাকে মিশিয়ে ব্যবহার করা হবে। এখানে তাই দুটা প্রকল্পের সমাহার। সড়ক প্রকল্পের নাম  Silk Road Economic Belt আর সমুদ্র পথ (যেটাতে জায়গায় জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের সুবিধা থাকবে আর ঐ বন্দরগুলো থেকে অন্তত ছয়টা সড়ক যোগাযোগের করিডোর বেল্ট রোডে গিয়ে যুক্ত হবে) এই প্রকল্পের নাম  Maritime Silk Road। এই দুই মেগা প্রকল্পকে একসাথে বেল্ট ও রোড উদ্যোগ নাম দেয়া হয়েছে।

চীনা উদ্যোগে ও বিনিয়োগে নেয়া এই প্রকল্প যেসব দেশের উপর দিয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট সেসব ৬৫ টা রাষ্ট্র এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে – এটা এমন এক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে এশিয়ার কোন রাষ্ট্রকে বাদ রাখা হয় নাই। তবে যদি না কেউ নিজে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, সেকথা আলাদা। বলা ভাল এখানে এশিয়ান রাষ্ট্রগুলোরই প্রাধান্য; তবে অবশ্যই সাথে ইউরোপ, সেন্ট্রাল এশিয়া আর আফ্রিকার কিছু দেশও অন্তর্ভুক্ত। এর ভৌগলিক ধারণাটা হল, বাংলাদেশ থেকেই যদি ধরি, এখান থেকে মূল হাইওয়ে সড়ক পথে (যেটাকে Silk Road Economic Belt বলা হচ্ছে)  চীন হয়ে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে, পুর্ব ইউরোপ হয়ে পশ্চিম ইউরোপে যাওয়া সম্ভব। এটাই মূল হাইওয়ে। আর পথের দুপাশের সব রাষ্ট্রকে এই অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নেয়া হবে। ওদিকে এই পথের শেষ হচ্ছে ইউরোপের রটারডাম (নেদারল্যান্ড) গিয়ে। সেখান থেকে আবার একই রোডে না ফিরে  ফিরতি সমুদ্র পথ নিবার সুযোগ আছে। সে হিসাবে এবার ইতালি হয়ে নৌপথে অথবা কখনও কোস্টাল সড়ক ঘুরে বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব। তবে ঐ মূল হাইওয়েতে সময়ে সময়ে করিডর হিসাবে অন্তত ছয় জায়গায় ছয়টা করিডর-সংযোগ সড়ক  থাকবে মূল হাইওয়ে সড়কে।  আর ঐ নৌপথের মধ্যে মধ্যে অন্তত দশটা জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের যোগাযোগ আছে/ থাকবে যেখান দিয়ে নৌপথ ছেড়ে কোন একটা করিডর ধরে মূল হাইওয়ে সড়কে উঠা সম্ভব।

২০১৩ সালের শেষের দিকে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নামে এই আইডিয়া প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিলেন চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাই এই প্রকল্পকে শি জিনপিং এর মাথা থেকে আসা প্রকল্পও বলে থাকেন অনেকে। গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ (আগের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’কে কেন্দ্র করে এই সম্মেলনের নাম এটা) এই মেগাপ্রকল্পের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ খবর মতে, মোট ৩০টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান এতে যোগদান করেছিলেন জানা গেল। এছাড়া মোট ১০০টারও বেশী রাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।  এদের মধ্যে ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধান বলতে রাশিয়ার পুতিন ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ অনেকে রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। আর দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যাদের এমন ওপর দিক থেকে সাতটা বড় রাষ্ট্র হিসেবে তাদের ক্লাব জি-৭ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রীই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তাই বলে ব্রিটেন, জার্মানি বা ফ্রান্স – ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই তিন মূল মাতবর এই সম্মেলন ঠিক বর্জন করছেন তা নয়, তবে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী হাজির ছিলেন।

আসলে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির চলতি দুনিয়ায় এবার নতুন করে চীনা নেতৃত্বে নতুন পোলারাইজেশনে ঢেলে সাজিয়ে খাড়া হতে চাচ্ছে; দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি এই শতকের শুরু থেকে সে দিকে। বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ সে পথে অগ্রসর হওয়ার দিক থেকে আর এক ধাপ উদ্যোগ বলা যায়। বিশেষ করে চীনের নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক যাকে বলা হয়, সেই এআইআইবি বা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) গঠনের সময় যেমন পশ্চিমের নেতি প্রতিক্রিয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এবার বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের সম্মেলন এর সময়ও অনেকটা সে মাত্রার না হলেও সেরকম কিছু নেতি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এবার ভারতের দিক থেকে। আর ওদিকে নেতি প্রতিক্রিয়ার নেতা খোদ আমেরিকা এবং এশিয়ায় আমেরিকার ঘনিষ্ঠ অংশীদার জাপান, এই দুই রাষ্ট্র বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর কথা সম্মেলনের আগে শুনা গেছিল।
তবে সম্মেলন শেষ পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে যাকিছু ছিল জল্পনাকল্পনা এখন সেসব সত্যি হয়েছে। আমেরিকান সরকারী  দলের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রেসিডেন্টের এডভাইজার (White House adviser Matt Pottinger)।  ভারতীয় মিডিয়া গত ১৩ মে থেকে প্রবলভাবে দাবি করছিল যে আমেরিকা ইউটার্ন নিয়েছে। সে এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছিল। আবার ব্যাপারটা একেবারে আকস্মিক বা হতেই পারে না তাও ছিল না। কারণ গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর থেকে ট্রাম্প শিবিরের এক্সপার্টরা বলতে শুরু করেছিলেন যে ওবামা এআইআইবি ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ এবং বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ এই দুটোর বিরোধিতা করে ঠিক করেননি।
ওদিকে ভারত অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কী নিয়েছে তা সম্মেলন শুরুর আগের সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পষ্ট জানা যায়নি। তবে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, ‘আমেরিকার ইউটার্ন ভারতের ওপর চাপ তৈরি করেছে’। কিন্তু ঠিক কী কারণে ভারত এই সম্মেলন বর্জন করছে এ বিষয়ে দুটো মিডিয়া দুই রকম জবাব দিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, ‘চীন বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প নিয়ে ভারতের জন্য যথেষ্ট আস্থার পরিবেশ তৈরি করেনি’ (…”China has not created an environment of trust to carry out the belt and road projects”.) তাই সে যাচ্ছে না। তবে ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসির কোন জুনিয়র প্রতিনিধি দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল। বিপরীতে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস লিখছিল, সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করে একটা মেসেজ দেয়া দরকার। কারণ তারা আমাদের সার্বভৌমত্ব ইস্যুকে হালকা করে দেখেছে। (India is set to skip China’s ambitious One Belt One Road summit over sovereignty issues related to the latter’s involvement in the China-Pakistan Economic Corridor (CPEC), news agency PTI reported. ) অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে ভারতের অংশগ্রহণ এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে সরকার ঠিক কী কারণ দেখাবে তা সম্ভবত এখনো অফিসিয়ালি সাব্যস্ত হয়নি। যার অর্থ দাড়ায়, সার্বভৌমত্বের অভিযোগটা নিয়ে ভারতই সিরিয়াস নয়। ব্যাপারটা আসলে এমনই এটা মনে করার কারণও আছে। কিন্তু ভারত অভিযোগটা উঠাল কোন সূত্রে?
পাকিস্তানের গোয়াদরে (আরব সাগরের মুখে, ইরানের সাথে সীমান্তে) গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের বুক চিরে দক্ষিণ থেকে উত্তর পেরিয়ে হাইওয়ে (চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর) সড়কপথ চালু করা হয়েছে। এটা পাকিস্তান পেরিয়ে চীনের ল্যান্ডলকড জিংজিয়ান প্রদেশের খাসগড়ে গিয়ে মিলেছে। তবে চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর এই করিডোর-সড়ক বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের মূল হাইওয়ে সড়ক আগে ক্রস করে নিয়েছে। অর্থাৎ গোয়াদর থেকে আসা সড়কই চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর। চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর। কিন্তু আবার পাকিস্তান পেরোনোর আগে এই সড়কের কিছুটা অংশে পাকিস্তানের আওতাধীন কাশ্মির পেরিয়ে এসেছে। আর এটাকেই ভারত ইস্যু করতে চাইছে। বাস্তবতা না থাকলেও ‘কাশ্মিরের পুরোটাই ভারতের অংশ’ বলে ভারতের এক অফিসিয়াল দাবি আছে। অতএব চীন পাকিস্তান-কাশ্মির ব্যবহার করে এই সড়ক তৈরি করে ভারতের সার্বভৌমত্ব হালকা করে দেখেছে -এই হল ভারতের উছিলা, ভারতের যুক্তি। অর্থাৎ এটা কোনোমতে মেলানো এক দাবি মাত্র। আগেই বলেছি ভারতের দুই মিডিয়ার দুই ধরনের বক্তব্য প্রমাণ করে ভারত সরকার নিজেই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে সিরিয়াস নয়। বরং চীন আরো কত তেল মারলে ভারত নিজেই এই সম্মেলনে যোগদান করবে যেন এরই অপেক্ষা। এ দিকটাতে তাকিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, “এবার এখনই সম্মেলনে প্রতিনিধি না পাঠালে ভারতের বস্তুগত লাভালাভের দিক থেকে ক্ষতি বৃদ্ধি নেই, কারণ ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প কোনো সদস্যপদভিত্তিক সংস্থা নয়’। অর্থাৎ আরো দেরি করে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে নিজের দাম আরো বাড়ে কি না তা পরখে নামতে চায় ভারত। তবে যোগদান না করার ব্যাপারে ভারত অবশ্যই বেপরোয়া নয়, কারণ এটা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং তা ফিজিক্যালিই গ্লোবাল। (There may not be any immediate material loss to India if it goes unrepresented because OBOR is not a membership-based organisation)। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় ভারত কখনোই চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সম্মেলনে যোগদান করবে না তা বলে নাই। অর্থাৎ আগেই একেবারে না করে দেয়নি। তবে এই প্রকল্পের প্রতি আমেরিকা নীতি অবস্থান, মতামত বদলে ছিল বলে নয়, এই সম্মেলন যে ইতোমধ্যে গ্লোবাল আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে এর আর এক ভালো প্রমাণ হল, এতে অংশগ্রহণ করছেন জাতিসঙ্ঘের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তেনিও গুতারেস এবং  বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের নির্বাহী প্রধানরা। এর অর্থ গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প একটা ফ্যাক্টর এর পক্ষে স্বীকৃতি এসেছে। আর তা হওয়ার কোন কারণ নাই। কারণ, পুরা প্রজেক্ট মানে ৬৫ টা রাষ্ট্রের তরফে সব বিনিয়োগ যোগ করলে শেষে সেটা ৯০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে এক অনুমিত হিসাব দেখিয়েছে।

তবে শুরুতে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে, তা ইতোমধ্যেই রেডী। এর জবাবে চীন বলছে ৪০ বিলিয়ন ডলার চীন নিজের উন্নয়ন ব্যাংক থেকে জোগান দেবে। আর তাতক্ষণিক বাকিটা আসবে সদ্য গঠিত এআইআইবি ব্যাংক থেকে। এ ছাড়া ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের ভেতরে যে আরো একটা অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক আছে (নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে, সম্প্রতি যেখানে বাংলাদেশসহ ১৫ এশিয়া দেশকে সদস্য করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে) সেখান থেকেও জোগানো হতে পারে। মোট ৬৫টি রাষ্ট্র এই প্রকল্পে যোগ দেয়া আর নিজের নিজের রাষ্ট্রকে মূল অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নিতে গেলেও প্রত্যেক রাষ্ট্রকেও কিছু সংযোগ-অবকাঠামো করে নিতে হবেই। আর সে কাজেও যা বিনিয়োগ লাগবে সে ঋণের বড় অংশ  চীন জোগান দিতে রাজি। আবার বিশ্বব্যাংকো কী বিনিয়োগের সুযোগ নিবে না? আর পশ্চিমা জগতের যেখান থেকে বিনিয়োগ আসুক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে বিনিয়োগের মুল উৎস হবে আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট। অতেওব আমেরিকাসহ সাড়া পশ্চিম এতে অংশগ্রহণে ঝাপিয়ে পড়বে এতাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা চীনা বিনিয়োগ পাব বেশ বড় অঙ্কে, সেটা অনেক বেশি পরিমাণ হবে। তাহলে ভারত কী দূরে গোসা ঘরে খিল লাগিয়ে বসে থাকবে, পারবে? নাকি পোষাবে?

কলকাতা থেকে বাংলাদেশ, মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং – যেটা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে বিসিআইএম (BCIM) প্রকল্প বলা হয়- সেই হাইওয়ে সড়ক কুনমিং চীন হয়ে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা, পরিকল্পনা মোতাবেক। এই সড়কের আর একটা অংশ হবু সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত থা্কার কথা। সোনাদিয়া-বিসিআইএমের মাধ্যমে এটাই আর একটা করিডোর হিসেবে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হবে। এই হল পরিকল্পনা। এখন ভারতের ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পে যোগ না দিতে ইচ্ছা জানানোর অর্থ হবে ভারত বিসিআইএম প্রকল্পে নেই। কলকাতা-বাংলাদেশ অংশটা নাই। এমন ইচ্ছা করতে ভারত চাইতেই পারে। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না এমন ইচ্ছার কাফফারাও আছে তা ভারতের অজানা নয়। তবু একটা কথা এবার স্পষ্ট যে এতদিন বিসিআইএম নিয়ে গড়িমসি করা, মিয়ানমারকে নিরাসক্ত করে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা, বাংলাদেশে বন্দরের স্থান নির্বাচন নিয়ে হাসিনার উপর অর্থহীন হস্তক্ষেপ ও সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি যা কিছুতে ভারত ভূমিকা রাখতে পেরেছিল, এবার সেসবের দিন শেষ। ভারতের পড়শি কোনো রাষ্ট্র এই সম্মেলনে যোগ দিতে বাকি নেই, মিয়ানমার নেপালসহ, ব্যতিক্রম শুধু ভুটান।এটা এখন সবার কাছে স্বচ্ছ যে ভারত, ভুটান আর ওদিকে জাপান ছাড়া এশিয়ার আর কোন রাষ্ট্র বাকী নাই। সবাই ভারতকে ছেড়ে চলে গেছে।
এক কথায় বললে ভারতের পক্ষে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী না সম্ভবত বলা যায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ভারতের পক্ষে অসম্ভব। যেমন সেক্ষেত্রে এর একটা অর্থ হবে, ৬৫টি রাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে বা একই পদক্ষেপে একই অবকাঠামো সুবিধায় যুক্ত হওয়া – যেকোন রাষ্ট্রের জন্য এ’এক বিরাট সুযোগ। এথেকে ভারত নিজেকে বাইরে রাখবে? যদি জিদ করে রাখেই (যদিও জিদ করে রাষ্ট্র চলে না) তবে সেটা হবে দেখার মত ঘটনা। কারণ সেটা হবে রীতিমত নিজেই নিজের ওপর অবরোধ ডাকার শামিল। সবার থেকে একঘরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ফলে ভারতের এমন সিদ্ধান্ত নেয়া অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, কিছুটা দেরি করতে পারে। কিন্তু তাতেও নিজের ক্ষতি, পিছিয়ে পড়ায় ঘটবে।

আগেই বলেছি  গ্লোবাল অর্থনীতির চীনের নতুন নেতা হওয়ার দিক থেকে বিচারে,  বিশ্বব্যাংকের সমান্তরালে এআইআইবি ব্যাংক চালু করে ফেলতে পারা – এটা যদি নতুন নেতা হবার পথে একটা অগ্রপদক্ষেপ হয়ে থাকে, তবে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ হবে প্রায় সমান্তরাল তবে বেশী গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় পদক্ষেপ। আর এক ধাপ আগানো। যদিও প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক থেকে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের ইমপ্যাক্ট হবে এআইআইবি ব্যাংকের চেয়ে বেশি। কারণ এটা অবকাঠামো, মানে ফিজিক্যাল পদক্ষেপ। আর এই ফিজিক্যাল পদক্ষেপের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকার কারণে গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের ওজন ও গুরুত্ব হবে আরো দৃশ্যমান এবং এটা হবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গ্লোবাল অর্থনীতিতে ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছর ডাবল ডিজিট গ্রোথের কাল মানা হয়, বর্তমানে যা তুলনামূলক শ্লথভাবে চলছে। মনে রাখতে হবে সে অর্থনীতিতে আবার এক গতির সঞ্চার করার সম্ভাবনা রাখে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ।
আজকের ভারত হল, সেই ডাবল ডিজিট গ্রোথের কালের এক অন্যতম বেনিফিশিয়ারি। আবার এআইআইবি ব্যাংক গড়ার কালে ভারত ছিল সঠিকভাবেই চীনের সমর্থক, প্রধান সাগরেদ। ওই ব্যাংকের মালিকানায় চীনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ, এরপরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারতের প্রায় ১০ শতাংশ, অন্যদের মধ্যে ৫ শতাংশর ওপরে কেউ নেই। আমেরিকার শত প্ররোচনাতেও ভারত চীনের ওই ব্যাংক উদ্যোগে সাথ ছাড়েনি।

তাহলে ভারত ঠিক কিসের বিরোধিতা করছে, কী পেতে সেটা করছে? আমরা আশা করি না এসব ক্ষেত্রে ভারতের কোনো সিদ্ধান্ত ঈর্ষাপ্রসূত, ভুল ভিত্তির এক্সপেকটেশন বা ওভার এস্টিমেশনের দোষে দুষ্ট হবে। দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম জেঁকে বসার পর থেকে দেখা গেছে এক এক কালে কোনো এক রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডে ওই কালের সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ভূমি হয়ে হাজির হয়েছে। যার অর্থ এরপরের নতুন বিনিয়োগ বা নতুন যেকোনো উদ্যোগ নেয়ার সুবিধা ওই রাষ্ট্র এককভাবে পেয়েছে। এখন সে সুবিধা ভোগের  দিন চলছে চীনের। এটা অবজেকটিভ, ফলে এর সাথে লড়ার বা একে মানতে না চাওয়ার কিছু নেই। কারণ এই সঞ্চিত উদ্বৃত্ত এটাই যেকোনো রাষ্ট্রের পরাশক্তি, রুস্তমি, প্রভাব বিস্তারসহ সব ধরনের ভূমিকায় হাজির হওয়ার আসল উৎস। এটা অবজেকটিভ বলে তা না মানাও মুশকিল। ফলে দুটি কথা ভারতকে মানতেই হবে। এক. আমেরিকা ভারতের ভবিষ্যৎ নয়। ভারতের পক্ষের শক্তি নয়, বড়জোর অস্ত্রের সরবরাহকারী হতে পারে। তা হোক, তাতে সমস্যা নেই। তবে গ্লোবাল অর্থনীতির আগামী নেতৃত্বের ভাগ অর্থে ভারতের পক্ষের শক্তি হল চীন। এটা শুনতে অনেকের ঈর্ষা মনে কটু লাগতে পারে কিন্তু এটা বাস্তবতা। ফলে চীনের সাথে সীমানা বিরোধসহ যা কিছু বিরোধ আছে তা নিগোসিয়েশনের সুযোগ নেয়া হবে ভারতের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।কিসের ভিত্তিতে ভারত ধরেই নিয়েছে চীনের সাথে তার য়াগামি দিন হবে সংঘাত ও বিরোধে? পিছন ফিরে বা আশেপাশে তাকালে এটা দেখতে পাওয়া মোটেই কঠিন নয় যে এই ধারণার উৎস ও সরবরাহকারি হল খো আমেরিকা। আর তার পরিচালিত নানান থিঙ্কট্যাংক-গুলো। আজকে এসব ঠিঙ্ক-ট্যাংকগুলো আমেরিকার প্রতিনিধি পাঠানোর এই ইউ-টার্ণ এর কী ব্যাখ্যা দিবে? চীন নাকি খালি ভারতকে ঘিরে ধরার মতলবে আছে? তাহলে সেই ভারতকে ফেলে আমেরিকা কোথায় ছুটছে? আসলে কারও প্ররোচিত বক্তব্যে, বুলিতে থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক হয়না। চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। আর এর প্রধান শর্ত অন্তত দেশীয় অর্থে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়।

এ ছাড়া এশিয়াতে কার ভূমিকা প্রধান হবে ভারতের না চীনের? এই তর্ক কী ভারতের ইচ্ছাধীন নাকি ভারতের অর্থনৈতিক সামর্থের উপর নির্ভরশীল? ভারতের সামর্থ এশিয়ায় চীনের চেয়ে বেশি হলে ভারত বাড়তি সুবিধা পাবে, নইলে নয়। তাই নয় কী?  এটা তো বাংলাদেশে একজন বসিয়ে, ল্যান্ডলক নেপালে ঐতিহ্যবাহী নিয়ন্ত্রণ আগের মতই বজায় থাকবে ধরে নিয়ে, শ্রীলঙ্কায় নতুন সরকার কায়েম করে চীনের প্রভাব কমাতে হবে ইত্যাদিতে যা কিছু করা হয়েছে তাতে কোনো কিছুই সামলানো যায়নি, যাবে না। এছাড়া এটা আর কলোনি সাম্রাজ্যের যুগ নয়। এ যুগে “চীনের সাথে ভারতের পড়শিরা সম্পর্ক রাখতে পারবে না” ভারত সবাইকে চীনমুক্ত দেখতে পাবে –  এটা ভারতের কোনো মুরোদের ওপর ভরসা করে নেয়া বিদেশনীতি? এর চেয়েও অবাক কাণ্ড এই বাস্তবতাহীন নীতিকে প্রশ্ন করার লোকজন ভারতে ক্রমশ  দুষ্প্রাপ্য হচ্ছে। যার মূল কারণ সম্ভবত এরা আমেরিকার পে-রোলে নাম লিখিয়েছে। অথচ খোদ আমেরিকাই পল্টি মেরেছে! তাই নয় কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। চীনে শীর্ষ সম্মেলন যা এই লেখার বিষয়বস্তু তা ছিল ১৪-১৫ মে। ফলে লেখাটা শেষ করা হয়েছিল সম্মেলন শুরুর আগে। আর এখানে এখন যখন আবার প্রকাশ করা হচ্ছে তখন ঐ সম্মেলন শেষ হয়ে গেছে। ফলে আপডেট করার মত বহু তথ্য এখন জমা হয়ে গেছে। তার বহু তথ্য এখানে যতটা সম্ভব আপডেট করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটা আগের লেখার থেকে বহুলাংশে সংযোজিত এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্প-শি এর ‘ভাল কেমিস্ট্রি’ তবু কোরিয়া হামলা কী আসন্ন

ট্রাম্প-শি এর ‘ভাল কেমিস্ট্রি’ তবু কোরিয়া হামলা কী আসন্ন

গৌতম দাস

২৬ এপ্রিল ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2eM

 

Trump and Xi get down to talks in Mar-a-Lago. Photo: AFP

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি, গত ৬-৭ এপ্রিল ছিল বহু প্রতীক্ষিত তাদের প্রথম সামিট বা শীর্ষ প্রধানদ্বয়ের সাক্ষাৎ। ট্রাম্পের সাথে প্রেসিডেন্ট শি-এর সাক্ষাতের আয়োজন করা হয়েছিল ফ্লোরিডা স্টেটে ট্রাম্পের আবাসে, পাল্ম বিচ শহরে  মার-আ-লাগো এস্টেটে। [Trump’s Mar-a-Lago estate in Palm Beach, Florida]। এই সফর সবার খুব মনোযোগের বিষয় হয়ে উঠেছিল। কারণ নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ট্রাম্প নিয়মিত চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঝড় তুলে যাচ্ছিলেন যে, চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলছে, চীন নিজ মুদ্রার মান কারসাজিতে কমিয়ে রেখে নিজের পক্ষে মার্কিন বাজার ধরে রাখছে, চীন পরিবেশবাদীদের পক্ষে গিয়ে তাদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ক্ষেপিয়ে তুলছে ইত্যাদি। সেই চীন এরই শীর্ষ ব্যক্তির সাথে খোদ ট্রাম্পের বৈঠক হতে যাচ্ছিল তাই স্বভাবতই এটা সবার মনোযোগের কারণ। এছাড়া  আমেরিকা আর চীন এই  রাষ্ট্র-জোড়ার অর্থ তাতপর্য হল, প্রথমটা এখনও দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হয়ে আছে তবে হারিয়ে যাচ্ছে, আর দ্বিতীয়টা সে জায়গা নিতে উঠে আসছে। তবে ঐ সাক্ষাত থেকে এটা সবার জন্য আরও বড় মনোযোগের কারণ হয়ে যায় আরও অন্য কিছু কারণে। ঐ সাক্ষাতে বড় ইস্যু ছিল মূলত পাঁচটা। চীনের সাথে আমেরিকার ১. বাণিজ্য ও বিনিয়োগে দেনা-পাওনার ঝগড়া নরম করা, ২. তাইওয়ান ইস্যু বা একচীন নীতির পক্ষে অবস্থান স্থায়ী করে জানানো, ‘৩. সাউথ চায়না সি’ দ্বীপ বিতর্ক অন্তত থিতু করা, ৪. চীন মুদ্রা ম্যানিপুলেটর না (নিজ মুদ্রামানের কারসাজি করে না) [চীনা মুদ্রা ইউয়ানের গড় মান, নিচে ফুট নোটে দেখুন, ১৯৮১-২০১৭ এই সময়ের মধ্যে ], ফলে আমেরিকার সে অভিযোগ প্রত্যাহার করেছে জানানো, আর উত্তর কোরিয়া ইস্যু সামলানো। এসবের মধ্যে প্রথমটা আর শেষেরটা মুখ্য। বাকিগুলো বর্তমানে দুর্বল হয়ে গেছে অথবা আধা মিটে গেছে এমন।
প্রথম ইস্যুর ক্ষেত্রে  – চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলছে,অথবা চীন নিজ মুদ্রার মান কারসাজিতে কমিয়ে রেখেছে –  ট্রাম্প প্রশাসন এগুলা তার অভিযোগ বলে হাজির করে আসছিল। কিন্তু সমাধানে ঠিক কী চায়, দাবি কী সুনির্দিষ্ট করে তা জানে না বা বলতে পারছিল না।  হোমওয়ার্কে সে দুর্বলতা ছিল। কেবল ‘ট্যাক্স বসাবে’ ইত্যাদি বলে ট্রেড ওয়্যার বা বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি দিত। অথচ এমনকি ওবামার দ্বিতীয় টার্মে নির্বাচনের আগে ২০১২ সালেও, একই পথ নিয়েছিলেন। কিন্তু টিকাতে পারেননি, বুমেরাং প্রভাব পড়েছিল তাই। অথচ বিপরীতে চীনের দিকে, তাদের বড় হোমওয়ার্ক করে আসা করিতকর্মা লোকজন ছিল। আর বাস্তবতা সম্পর্কে চীন সরকারের স্পষ্ট মূল্যায়ন তার ছিল। ফলে আমেরিকাকে সে কী দিতে চায়, কেন দিতে চায়, কতটুকু দিতে হবে পারবে ইত্যাদি সব বিষয়ে সে নিজে পরিষ্কার ছিল। তাই আমেরিকার নাকি কান্না বন্ধ করিয়ে কাজের টেবিলে নিয়ে বসিয়ে যখন কী কী চীন দিবে, সে ঝাঁপি মেলে ধরল তাতে ট্রাম্পসহ তার দল বেজার হয়ে থাকার বদলে অভিভূত হয়ে যায়। চীনের এমন আচরণের মূল কারণ আমেরিকাকে অর্থনৈতিকভাবে ঠিক মেরে ফেলা – এটা চীনা-স্বার্থ নয়। চীনের কাছে আমেরিকা এখনও এক বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ বাজার। আমেরিকার সাথে তার সম্পর্ক এখনও বড় বিনিয়োগ-দাতার। আমেরিকান উতপাদক ও বাজারজাতকারী কোম্পানী চীনে গিয়ে ফ্যাক্টরি খলে সে পণ্য নিজে দেশে বাজারে বিক্রি করে। কখনও চীনা উতপাদক স্রেফ কেবল কমিশন মার্জিন ধার্যকারি উতপাদক, বাকী সবকিছু আমেরিকান কোম্পানীর।  আমেরিকা চীনের কাছে কেন  প্রয়োজনীয়, গুরুত্বপুর্ণ সে সম্পর্কে চীনা মূল্যায়ন এটাই। এ জন্য এই সামিট আয়োজনের বহু আগে থেকেই চীনা প্রেসিডেন্ট বলে যাচ্ছিলেন, আমেরিকা ও চীনের ভাগ্য একসুতায় গাঁথা। ট্রাম্প যেন সে দিকটার গুরুত্ব আমল করে আর নাকি-কান্না শুরু না করে কথা বলেন। গত ৩৩ বছর চীন বিষয়ক অর্থনৈতিক নানা পলিসি-নীতি নিয়ে একাদেমিক কাজে জড়িয়ে আছেন কানাডার এমন এক অবসরপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে  অধ্যাপক কেন মোক (KEN MOAK), বর্তমানে সিঙ্গাপুরের এশিয়ান টাইমসে লিখেন; তার ভাষায় বললে,  ‘ট্রাম্পের এই ইউটার্ন এক বিরাট কাজের কাজ হয়েছে’। এ যেন নিজাম ডাকাতের সাধু হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা। কারণ ট্রাম্প মন্তব্য করে বসেছেন, “প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে”।

আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, ‘প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে প্রথম বৈঠক নির্ধারিত ছিল ১৫ মিনিটের; সেটা বর্ধিত হয়ে গিয়ে ঠেকে ৩ ঘণ্টায়।’ এ এক বিরাট ওলট-পালট ঘটনা। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প নিজেই আমাদের আরো জানাচ্ছেন, ‘সাক্ষাতের দ্বিতীয় দিনে আর এক সভা ছিল মাত্র ১০ মিনিটের যেটা ২ ঘণ্টা ধরে চলেছিল’। ট্রাম্পের ভাষায় …‘আসলে আমাদের দু’জনের রসায়নটা জমে গিয়েছে’। অর্থাৎ তিনি যে শুধু বিগলিত হয়ে গিয়েছিলেন তাই নয়। সেটা আবার তিনি সবার কাছে প্রকাশ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
খুব সম্ভবত চীন-আমেরিকা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ক ইস্যুতে আলাপের ‘রসায়ন যতই জমে যায়’, ততই উত্তর কোরিয়া বিষয়ে চীনের ভূমিকা আছে, চীনের করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে ট্রাম্পের আশা আকাঙ্খা আরো বড় হয়ে যায়। সেটা এতই বড় হয়ে যায় যে, প্রেসিডেন্ট শি ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের অতিথি থাকা অবস্থায় ট্রাম্প সিরিয়ার ওপর বোমা হামলা করে বসেন; সিরিয়া কেমিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার করছে – এই অভিযোগে। দু’দিন পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন এই হামলার আরও একটা কারণ বলছেন। বলছেন, উত্তর কোরিয়াকে শিক্ষা দিতে আর একটা মেসেজ দিতেও এই বোমা হামলা করা হয়েছিল। এ ছাড়া এরপর ট্রাম্প নিয়মিত এই প্রসঙ্গে নানান কথা বলে চলেছেন। যেমন টুইট করে বলছেন, ‘চীনা প্রেসিডেন্টকে ব্যাখ্যা করে বলেছি, উত্তর কোরিয়া সমস্যাটা তারা (চীন) মিটিয়ে দিতে পারলে আমরা অনেক ভালো এক বাণিজ্য সম্পর্ক করতে পারতাম’।

ইরাকের হাতে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র (WMD) আছে- এই মিথ্যা অজুহাতে ২০০৩ সালে বুশ-ব্লেয়ার ইরাকে হামলা করেছিল। অতীতে (১৯৫০-৩ সালে) ঠিক একই রকম ‘কোরিয়ায় কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানো’ এই অজুহাতে পঞ্চাশের দশকে শুরুতে আমেরিকা কোরিয়ায় হামলা করেছিল। কিন্তু সে যুদ্ধ কোন জয়-পরাজয়ের লড়াই দিয়ে মীমাংসা হয়নি। বরং কোরিয়া দুই ভাগ করে একটা যুদ্ধবিরতি টানা হয়েছিল। আমেরিকা পালিয়ে বেঁচেছিল। আর ওই ঘটনার লেজ ধরে পরে ভিয়েতনামকেও আমেরিকা হামলা ও দুভাগ করেছিল। যেটা ১৯৭৫ সালে একক ভিয়েতনামের স্বাধীনতায় সমাপ্ত হয়েছিল। আর কোরিয়ার বেলায়, কোরিয়া দুই ভাগ করে একটা যুদ্ধবিরতি ওই অঞ্চলে তখনকার মত যুদ্ধ থামাতে পারলেও যুদ্ধের টেনশন সেই থেকে এখন পর্যন্ত কখনই মিটানো যায়নি। বরং সেই থেকে আমেরিকা দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে স্থায়ী সেনাঘাঁটি করে বসে যায়। এর পালটা হিসেবে, বিশেষ করে উত্তর কোরিয়া নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজেকে সুরক্ষা করতে গিয়ে পারমাণবিক বোমা সংগ্রহ করে ফেললে ঐ অঞ্চলের ভারসাম্য বদলে পরিস্থিতি সেই থেকে আরো জটিল হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে একালে চীনের সমাধান প্রস্তাব হল,ওই অঞ্চলের সবাইকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে যেতে হবে। আর আমেরিকান এখনকার প্রস্তাবের মূল কথা হল, বলপ্রয়োগে কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র-ছাড়া করানো সম্ভব।’ এটা সম্ভবত মুখে বলা কথা। কিন্তু মনে মনে চায় চীন উত্তর কোরিয়াকে আমেরিকার সাথে টেবিলে আলোচনায় এনে বসিয়ে দেক। একটা রফা হোক।  ট্রাম্পের কথায় সে ইঙ্গিতও আছে যদিও। ফলে চীন-আমেরিকার উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে নীতির মূল ফারাক হল – চীন কোরিয়াকে টেবিলে ডেকে আনবে, আমেরিকাসহ সকলে বল প্রয়োগের পথ ছেড়ে সবাই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে যাবে। নাকি আমেরিকা বোমা মারতে যাবে – এই হলো মূল তর্ক।

এখনকার এই সময় উত্তর কোরিয়া সুনির্দিষ্ট করে ইস্যু হয়ে উঠার পিছনের মূল কারণ অবশ্য আলাদা। দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপান  উত্তর কোরিয়ার হামলার আয়ত্ত-সীমার ভেতর বহুদিন থেকেই আছে। তা থাকলেও খোদ আমেরিকা থেকে গেছে উত্তর কোরিয়ার নাগাল-সীমার বাইরে অনেক দূরে অন্য মহাদেশে। ফলে উত্তর কোরিয়ার  খায়েশ হামলার জন্য  আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল জোগাড় করা। সে বিষয়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সফলতা উত্তর কোরিয়া নাকি পেতে চেষ্টা করছে, কিছু একটা পেয়েছে যা এখন পরীক্ষা করতে পারে, দেখতে চায় – এমন জল্পনা কল্পনার তথ্য এই হলো এখনকার টেনশনের উৎস। অবশ্য অনেকে এমন তত্ত্ব দিচ্ছেন যে, এটা আসলে  ট্রাম্পের আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে জড়ানোর খায়েস বা উছিলা। একটা যুদ্ধ লাগিয়ে নিজ অর্থনীতির দশা ফিরানোর আকাঙ্খা ট্রাম্পের নাকি আছে। এসব ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ সত্য-মিথ্যা যাই হোক, নিউ ইয়র্ক টাইমস অন্য এক তথ্য জানিয়ে লিখছে, প্রেসিডেন্ট শি-এর সঙ্গের এই সফরে দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে কিছু একটা সমঝোতা হয়েছে, যেটা আস্তে ধীরে সামনে আসবে। [the Chinese have agreed to crack down on their second-tier banks that have helped finance the North’s trade.] অনুমিত এই খবর সত্যতা স্বীকার-অস্বীকার কোনটাই কেউ করে নাই। তবে চীনা প্রেসিডেন্ট শি এর ট্রাম্প সাক্ষাতের মাত্র দশদিনের মাথায় ইতোমধ্যেই দুবার তাদের দুজনের ফোনালাপ হয়েছে।

তবে কার্যত ও বাস্তবে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হল, স্টিল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে প্রয়োজন হয় বিশেষ গুণসম্পন্ন এক কয়লা, সে কয়লার খনি উত্তর কোরিয়ার আছে। চীন দীর্ঘদিন ধরে এর বড় ব্যবহারকারী। এমন কয়লাভর্তি প্রায় ১০টা জাহাজ চীনা বন্দর থেকে ফেরত দেয়া হয়েছে এবং উত্তর কোরিয়ায় তা ফিরিয়ে এনেছে। বার্তা সংস্থা রয়টারের জাহাজ চলাচলবিষয়ক বিশেষ স্যাটেলাইট মনিটরিং সার্ভিস এই তথ্য দিয়েছে। অর্থাৎ চীন উত্তর কোরিয়া থেকে এই কয়লা আমদানি এবার প্রথম বন্ধ করল। যদিও এ সম্পর্কে কোন কিছুই সাংবাদিকদের প্রশ্নে্র জবাবে  চীন এখনও কিছু জানায় নাই। এছাড়া  কিছুদিন আগে জাতিসঙ্ঘের উত্তর কোরিয়া বিরোধী অর্থনৈতিক অবরোধের সিদ্ধান্তের পক্ষে চীন অবস্থান জানিয়েছিল; বলে সেই থেকে উত্তর কোরিয়ার সাথে চীনের সম্পর্ক ঝুলেই আছে। অর্থাৎ যেটা অনুমানের তা হল, উত্তর কোরিয়ার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকরভাবে প্রয়োগে জন্য  চীনের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে  আমেরিকার ট্রাম্প।

ওদিকে উত্তর কোরিয়ার শাসকের অবস্থান হল, পরিস্থিতি কোনো আলোচনার টেবিল পর্যন্ত গেলেও শর্তসাপেক্ষে তা কেবল পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের চুক্তি টুক্তির মধ্যেই সবকিছু যেন সীমাবদ্ধ থাকে। অনুষঙ্গীভাবে কোনো পণ্অয বিনিময়, বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠুক সবার সাথে, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে, তা সে একেবারেই চায় না। কারণ সে ক্ষেত্রে তার সরকার চিরতরে ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা বাড়বে। আবার চলতি পরিস্থিতিতে আমেরিকার জন্য এর নেতিবাচক দিকটা হল, সে দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের প্রতিরক্ষা-দাতা হলেও (এই দুই দেশেই আমেরিকার সেনাঘাঁটি আছে) এই দেশ দুটার কেউ আমেরিকার সাথে মিলে যুদ্ধে শামিল হতে রাজি নয়। এককথায় বললে,আমেরিকা ছাড়া ঐ অঞ্চলের কেউই যুদ্ধের পথে যেতে আগ্রহী নয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন  প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আসন্ন। তাই সব প্রার্থীই দাবি জানিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার মতামত না নিয়ে যেন আমেরিকা কোনো যুদ্ধ ঘোষণা না করে বসে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি আরো একটু খোলাখুলি। তিনি বলছেন, ‘ছোড়া গুলির প্রতিটার ঐতিহাসিক দায়দায়িত্ব ক্ষয়ক্ষতি ও শাস্তির কথা মনে রেখে যেন সবাই আচরণ করে’।  [they must shoulder that historical culpability and pay the corresponding price for this,”]  চীনা হুশিয়ারির মূল কথা হল, এরকম উত্তেজনার মধ্যে দীর্ঘ সময় বসবাস করার ক্ষেত্রে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়া কোন ভুলবশত “(accidental conflict)’ সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে যেতে পারে। চীন এদিকটা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন।  বিশেষ করে চীন মনে করে ‘উত্তর কোরিয়ার সাথে আবার অস্ত্র কর্মসূচিতে নিগোসিয়েশন হতে পারে বলে চীন আস্থা রাখে এখনও’। কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চল কী এ যাত্রায় যুদ্ধ এড়াতে পারবে, সে উদ্বিগ্নতায় এশিয়ার সবাই। যুদ্ধ মানে এশিয়ায় উদীয়মান অর্থনীতিতে যার যেটুকু অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সমৃদ্ধি হয়ে আছে তা ধুলিস্যাত হয়ে যাওয়া। ফলে মাথা গরম নয়, নিগোশিয়েশন।

সর্বশেষ হল, ট্রাম্প আমেরিকার সিনেটের সকলকে কংগ্রেসে ডেকেছেন, যৌথভাবে সকলকে উত্তর কোরিয়া বিষয়ে প্রেসিডেন্টের বিফ্রিং জানানোর জন্য।  স্বভাবতই ট্রাম্পের এই  সিদ্ধান্ত উত্তর কোরিয়ায় আমেরিকার হামলা আসন্ন – এমন জল্পনা-কল্পনাকেই আরও বাড়িয়ে তুলল।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে ২৩ এপ্রিল ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় (প্রিন্ট পত্রিকায় পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন আপডেট ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

ফুট নোটঃ চীনা মুদ্রার নাম ইউয়ান (RMB) । এক আমেরিকান ডলার=৬.৮৮ ইউয়ান। [অর্থাৎ এক ইউয়ান মানে আমাদের প্রায় ১২ টাকা।]  ঐতিহাসিকভাবে গত ১৯৮১-২০১৭ এই সময়ের মধ্যে, ডলার-ইউয়ান এর মান সবচেয়ে বেশি ছিল ১৯৯৪ সালে ৮.৭৩ ইউয়ান, আর সর্বনিম্ন ১৯৮১ সালে ১.৫৩ ইউয়ান। 

Historically, the Chinese Yuan reached an all time high of 8.73 in January of 1994 and a record low of 1.53 in January of 1981.

ট্রাম্পের পাগলামি সহনীয় করার উপায়

ট্রাম্পের পাগলামি সহনীয় করার উপায়

গৌতম দাস

১৭ মার্চ ২০১৭,  শুক্রবার

http://wp.me/p1sCvy-2dA

 

 

 

আপনি যদি  ক্ষমতাবান কিন্তু পাগলা মানে আপনি কখন কী করে বসেন আগাম অনুমান করা যায় না এমন এক প্রেসিডেন্ট হন, তবে আপনার প্রয়োজন আসলে সাথে একজন বুঝমান জামাই থাকা বা রাখা। যেটা হবে আপনার স্টাবিলাইজিং ফ্যাক্টর বা আপনাকে থিতু রাখার উপায়।  আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেলায় কথাটা সম্ভবত এক কঠিন সত্যি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম স্ত্রীর ঘরের বড় মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প (Ivanka Trump) আর তাঁর স্বামী জেরাড কুশনার (Jared Kushner)। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার শুরু থেকেই আমেরিকান মিডিয়া ট্রাম্পের তৃতীয় ও বর্তমান স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প আর প্রথম স্ত্রীর ঘরের মেয়ে ইভানকা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবনকাহিনী নানান স্পট টেনে এনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পেরেশান করে ছেড়েছিল। এ দিকে মেলানিয়া ফার্স্টলেডি বলে আখ্যায়িত হলেও তিনি তাদের ১০ বছরের একমাত্র সন্তানকে নিয়ে নিউ ইয়র্কের পুরানা বাসায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্টের সাথে মানে বাবার সাথে তাঁর আবাসস্থলে বসবাস করা শুরু করছেন বড় মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প তাঁর স্বামী কুশনারকে সাথে নিয়ে । সেখানে ইভানকা কার্যত ফার্স্টলেডির ভূমিকা নিয়েছেন, বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের অতিথিদের আপ্যায়িত করার ভূমিকা ও দেখাশুনার ভার নিয়েছেন তিনি। ওদিকে ইভানকার স্বামী কুশনারও শ্বশুরের মতোই হাউজিং ডেভেলপার ব্যবসায়ী হলেও নিজের ব্যবসার সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে তিনি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একজন সিনিয়র অ্যাডভাইজার। তবে অবৈতনিক।  মিডিয়ায় যদিও শুরু থেকেই কুশনারের ইহুদি পরিচয়টা কখনোই মুখ্য করতে ভোলে না। প্রথম দিকে মিডিয়ায় মেয়ে-জামাইয়ের ব্যাপারটাকে কোনো ধান্ধাল জামাইয়ের কাণ্ডকারখানা হিসেবে ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু ইদানীং অন্তত দুটো ঘটনার-ইস্যুতে মিডিয়ায় ইভানকা-কুশনার এদের ভূমিকা নিয়ে খুবই ইতিবাচক রিপোর্ট আসতে দেখা যাচ্ছে।
অনেকেই জানেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবেশবিষয়ক অবস্থান ও নীতি খুবই বিতর্কিত বললেও কম বলা হবে। এমনিতেই ট্রাডিশনালি রিপাবলিকান রাজনীতি মানেই – সমাজের দীর্ঘমেয়াদী কমন স্বার্থের ইস্যুই বা কী, কিংবা পাবলিক ইন্টারেস্ট বা গণ স্বার্থের বিষয়গুলোর বেলায় সবার উপরে ব্যবসাদারের বা ব্যবসায়িক স্বার্থকে জায়গা প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া এদের খাসিলত। ফলে রিপাবলিকান ট্রাম্পের বেলায় এক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। ট্রাম্পের পরিবেশনীতি যা দুনিয়ার কোন পরিবেশবিদের উদ্বেগের সাথেই তিনি একমত নয়। তাঁর এমন নীতি যারা ঘিরে আগলে রেখেছে এরা হলেন– ট্রাম্পের শুরুর দিকের পরিবেশমন্ত্রী (পরামর্শক) হলেন পরিবেশের ক্ষতি অস্বীকারকারি Myron Ebell, বর্তমান এনার্জি মন্ত্রী (পরামর্শক) রিক পেরি Rick Perry, এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন কর্তৃপক্ষের প্রধান স্কট প্রুরিট Scott Pruitt এবং জেফ সেশন Jeff Sessions, যাকে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়েছে আর সেক্রেটারি অব স্ট্রেট রেক্স টিলারশন Rex Tillerson, যিনি এক্সন-মোবাইল তেল কোম্পানির সাবেক প্রধান নির্বাহী – এমন সব মার্কামারা লোকজন তাঁরা। এরা মনে করেন, কার্বনডাই-অক্সাইডে দুনিয়ার তাপ বেড়ে যায় এটা তাঁরা মানেন না এবং তাতে পরিবেশ ধ্বংস হয় এর প্রমাণ কী? তাঁরা বলে থাকেন, পরিবেশ ধ্বংসের আলাপ তোলাটা আসলে চীনা প্রচারণা মাত্র। আমেরিকান ব্যবসায়ের ওপর চীনকে সুবিধা দিতে এই মিথ্যা প্রচারণা চলছে। এই হলো তাদের ভয়াবহ সব সার-বক্তব্য। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের মেয়ে ইভানকা ও জামাই কুশনার এদের ভুমিকা উলটা, তাঁরা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরিবেশ বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে ইতিবাচক দিকে প্রভাবিত করেছেন। পরিবেশবিষয়ক এক বিখ্যাত পত্রিকা ইকোওয়াচ জানাচ্ছে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সূত্রে এক খবর হল, পরিবেশ বিষয়ে ট্রাম্পের এক এক্সিকিউটিভ অর্ডারে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সব রাষ্ট্রের মিলিত দলিল – ‘প্যারিস ঐকমত্য’কে সরাসরি নিন্দা-সমালোচনা করে কোনো কথা ট্রাম্প সেখান থেকে বাদ দিয়েছেন, বলছেন না। ট্রাম্পের মেয়ে-জামাই তাঁকে এব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছেন।

দ্বিতীয় গুরুত্বপুর্ণ বিষয়, যেখানে ট্রাম্পের পাগলামি অবস্থান সিদ্ধান্তকে ঠাণ্ডা ও থিতু করার ক্ষেত্রে জামাই কুশনার ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা যাচ্ছে তা হল – চীন ইস্যু। আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেন তিনি। ফলে ‘ইনফরমাল’ আলাপে ‘গঠনমূলক’ পথে চীনা-আমেরিকান স্বার্থবিরোধের সব ইস্যুতে উত্তেজনা নামিয়ে আনতে নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন কুশনার। এ ব্যাপারে যেমন প্রথম ব্রেক-থ্রু বা বাদাম ভাঙার কাজটা ছিল, ট্রাম্পকে এক-চীন নীতি মানতে ফেরত আনা। ফলে শপথ নেয়ার পর দীর্ঘ প্রায় তিন সপ্তাহ পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ০৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ফোন করেন। সেটা ছিল এমন এক পরিস্থিতি যখন  ট্রাম্পের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর থেকে বাস্তবে চীনের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের সব ধরণের যোগাযোগ ও ততপরতা স্থবির হয়ে পড়ে ছিল। কারণ প্রার্থী হওয়া থেকে নির্বাচিত হয়ে যাবার পরও চীন ইস্যুতে  ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল – চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলছে, চীনা পণ্য আমেরিকায় প্রবেশ ঠেকাতে ৪৫ শতাংশ ট্যাক্স বসাবো, দুনিয়ার তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে বলে পরিবেশবাদীদের হইচই আসলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনা প্রপাগান্ডা, একচীন নীতি মেনে চলার ক্ষেত্রে আমেরিকানদের বাধ্যবাধকতা নেই ইত্যাদিতে ট্রাম্পের এসব রেটরিক বাকোয়াজে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে রুটিন কূটনৈতিক সম্পর্ক কাজ চালিয়ে নিতে যেসব তৎপরতা লাগে ট্রাম্পের প্রশাসন দিকনির্দেশনার অভাবে তাও চালিয়ে রাখতে পারছিল না। ফলে জামাই কুশনার এক্ষেত্রে আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে অনানুষ্ঠানিক আলাপ এগিয়ে নিয়ে সম্পর্কের পুনর্গঠন ও অভিমুখ ঠিক করতে ভুমিকা নিয়েছিল। যদিও এক্ষেত্রে আমরা অনুমান করতে পারি এমন পদক্ষেপের পক্ষে  ট্রাম্পের দিক থেকে আগাম সম্মতি ও আস্থা কুশনার আদায় করতে সক্ষম হয়ে নিয়েছিলেন। কুশনারের বিপরীতে চীনা অবস্থান ছিলও খুবই ইতিবাচক ও ঠাণ্ডামাথায় পরিচালিত। ফলে ট্রাম্পের ওই ফোনালাপে কুশনার-চীনারাষ্ট্রদুতের আগাম স্থির হওয়া এক টার্গেট ছিল যে, উভয় শীর্ষ নেতা কুশল বিনিময়ের পরে ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের একচীন নীতির পক্ষে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করবেন। আর এতে বিনিময়ে চীন বলবে, চীন-আমেরিকার বাণিজ্য-বিরোধ পারস্পরিক বসে আপস আলোচনায় মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। আর সব শেষে এর পর থেকে নিজ নিজ পক্ষের কূটনীতিকেরা বসে কাজ-সম্পর্ক এগিয়ে নেবে এ ব্যাপারে একমত প্রকাশ করে আলাপ শেষ হবে। এই ছিল কুশনার ও চীনা রাষ্ট্রদূত তাদের একমত পরিকল্পনা। সুন্দরভাবে সম্পর্কের এই প্রথম পর্ব সমাপ্ত হয়েছিল। এটা সম্ভব করতে কুশনারের এক বড় ভুমিকা ছিল। এবার দ্বিতীয় পর্বেও উভয়ের এক একমত টার্গেট হল, শি-ট্রাম্পের এক শীর্ষ বৈঠক আয়োজন করা। এই লক্ষ্যে কুশনার ও চীনা রাষ্ট্রদূত কাজ করছেন। মনে রাখতে হবে, আসলে বাইরে থেকে যেটাকে কোনো দুই রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ বৈঠক বলে আমরা যে দিনক্ষণটা দেখি সে দিনটা আসলে উভয়ের আগেই একমত হয়ে থাকে (ছোটখাট ব্যতিক্রমী কিছু টুকটাক বিষয় বাদে ) সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের দিন। অর্থাৎ আলোচনায় কী কী ইস্যু আসবে আর তাতে উভয়ে কোথায় একমত হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই দীর্ঘ দিন ধরে আলাপ ও বোঝাবুঝি নেগোসিয়েশন সবই আগেই চলতে থাকে। চীন-আমেরিকার ক্ষেত্রেও এই কাজটাই বর্তমানে চলছে। এরই কাজে চীনের দিক থেকে প্রভাবশালী সিনিয়র এক কূটনীতিক প্রতিনিধি ইয়াং জিচি (Yang Jiechi ) দুই দিনের আমেরিকা সফর করে গেলেন। ইয়াং জিচির সফরের প্রধান লক্ষ্য ছিল, আগামী এপ্রিলে না হলেও যেন মে মাসের মধ্যে শি-ট্রাম্পের শীর্ষ সফর আয়োজনে করা যায়, এরই ভিত্তি স্থাপন করে যাওয়া। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক এক থিংকট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর প্রধান মাইকেল গ্রিনের উদ্ধৃতি দিয়ে হংকংয়ের পত্রিকা সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানাচ্ছে, সম্ভবত আগামী মাসে মানে এপ্রিলে এই শীর্ষ সফর হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ইয়াং জিচির ওয়াশিংটন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও বৈঠকে ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং ট্রাম্পের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে কুশনারও ওই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। আসলে আগামী জুলাইয়ে এবারের জি২০-এর মিটিং আয়োজিত আছে জার্মানিতে। ওই মিটিংয়ে মুখোমুখি সাক্ষাতের আগেই উভয় পক্ষই শি-ট্রাম্পের শীর্ষ সফর শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে আগাচ্ছেন। সেই লক্ষ্যে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়েন নিজে যেচে বাণিজ্য-বিরোধ বিতর্কগুলো আলাপ-আলোচনায় মিটিয়ে ফেলা সম্ভব বলে বক্তব্য রেখেছেন। চীনা বাণিজ্যমন্ত্রী গাও এ নিয়ে বিস্তর কথা বলে আশাবাদ রেখেছেন। অর্থাৎ চীনের দিক থেকে একটা প্রস্তুতি হোমওয়ার্ক করা আছে যে কী কী বিষয়ে ছাড় দিলে আপোষে এ যাত্রায় ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে একটা রফায় পৌঁছানো সম্ভব।

এখানে একটা তুলনামূলক ছবি আঁকা যায়। ট্রাম্পের নীতির এই আমলে ভারতের সাথেও আমেরিকার বড় স্বার্থবিরোধ রয়েছে। ভারত আমেরিকানদের কাজ খেয়ে ফেলছে বলে বিশাল বিতর্ক ট্রাম্প প্রশাসনে শুধু নয়, কংগ্রেস ও সিনেটেও অভিযোগ বিতর্ক উঠেছে। চীনের বিরুদ্ধেও ট্রাম্প প্রশাসনের ঠিক একই অভিযোগ করছে। কিন্তু ফারাক একটা জায়গায়। ভারতের বেলায় এক দিকে ভারতের কূটনীতিক বা বিদেশসচিবদের সাথে প্রত্যক্ষ আলোচনায় ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে আমরা ভারতের মিডিয়ায় শুনছি, কিন্তু একই সাথে বাস্তবে দেখছি ভারতের কূটনীতিক বা বিদেশসচিবেরা ভারতে ফেরা মাত্র আমেরিকান কংগ্রেসে দেশেই চাকরি ঠেকানোর পক্ষে নতুন নতুন আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে অথবা আইন জারি করা হচ্ছে। যেমন বর্তমানে ভারতে কল সেন্টার বসিয়ে তাদের দিয়ে আমেরিকায় কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস দেয়া যেটা এতদিন চলে আসছে সেই ব্যবসার বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। যাতে আমেরিকার কল সেন্টার ব্যবসা আমেরিকায় বসেই করা হয়। আউটসোর্সিং না করা হয়।  ফলে অভিমুখ হিসেবে দেখলে ভারতের বেলায় ট্রাম্প প্রশাসন মতানৈক্য ও প্রকাশ্য সংঘাতের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। আর এদিকে চীনের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ একটা আপসরফার সম্ভাবনা উজ্জ্বল যতটুকুই হোক, চীনের বিরুদ্ধে অন্তত প্রতিরোধমূলক আইন প্রণয়ন চীনের বেলায় আপাতত এখনই হচ্ছে না তা বলা যায়। যদিও এটা কতদুর কোন দিকে যাবে, মোড় নিবে সেটা শিং জিনপিন ও ট্রাম্পের আসন্ন শীর্ষ বৈঠকের ফলাফল থেকে পরিস্কার বুঝা যাবে।
এসব তৎপরতা দেখে পাগলা ট্রাম্পের জন্য একজন ঠাণ্ডা মাথার জামাই থাকা খুব জরুরি সমাধান, অ্যান্টিডোট বলে হাজির হয়েছে।

 

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনের ১২ মার্চ ২০১৭ সংখ্যায় (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল। ]]

ট্রাম্পের প্রথম আপোষ

ট্রাম্পের প্রথম আ্পোষ

গৌতম দাস

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2cS

 

 

 

হাওয়া কি এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে? অনানুষ্ঠানিক আলাপে আমরা কাউকে যেমন পাগলা বলি, ঠিক তেমন আমেরিকান নতুন প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে নিজের নামের আগে আমাদের দেশী ভাষায় এই ‘পাগলা’ বিশেষণ লাগিয়ে ফেলার মত কাজ করেছেন – পাগলা ট্রাম্প। তো সেই ব্যক্তি কি এত তাড়াতাড়ি চীনের ইস্যুতেই ঠাণ্ডা আর থিতু হয়ে গেলেন? কিভাবে? হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতি থেকে জানা যাচ্ছে, ৯ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ফোন করেছিলেন এবং তার সাথে কথা বলেছেন। যে সে কথা নয়; ঐ বিবৃতির ভাষা অনুযায়ী,  “এক ‘দীর্ঘ ফোনালাপ’ [“a lengthy telephone conversation”] করেছেন। বিস্ময়কর তথ্য আরো আছে।

একই বিবৃতির আরো ভাষ্য বা বক্তব্য হল, “The two leaders discussed numerous topics and President Trump agreed, at the request of President Xi, to honor our “one China” policy.  Representatives of the United States and China will engage in discussions and negotiations on various issues of mutual interest”.
বাংলায় অনুবাদ করে বললে, “চীনা প্রেসিডেন্ট শি’র অনুরোধে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘একচীন নীতি’কে সম্মান জানাতে একমত হয়েছেন। … চীন ও আমেরিকা উভয় রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা এখন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ও দরকষাকষিতে বসবেন”। এ থেকে বোঝা গেল, অন্তত এই একটা ইস্যুতে ট্রাম্পের অপরিপক্ক হম্বিতম্বি এমনভাবে শেষ হল যে,  ট্রাম্পের আমেরিকাকে মেনে নিতে হল যে গত সত্তরের দশক থেকে তাদের পুর্বপুরুষ নেতৃত্ব যে ‘একচীন নীতি’ স্বাক্ষর করেছিলেন, মেনে চলেছিলেন নিজ নিজ প্রশাসনের আমলে তারা গবেট ছিলেন না। আর এটাই ট্রাম্পের প্রথম পিছু হটা এবং আপসরফা। এমন নাকে-খতের পথ তাকে আরও নিতে হবে।

একচীন নীতি মানে হলো, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এটা স্বীকার করা। এই পূর্বশর্ত পূরণ করার পরই এর ভিত্তিতে চীন যেকোনো রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করে থাকে। আমেরিকার সাথে মাওয়ের চীন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল গোপনে অন্তত ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে। পরের বছর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেকালের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফর দিয়ে সেটা প্রকাশ্যে ঘটেছিল। আর এসব ঘটনার পরম্পরায় শেষে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত এক পারস্পরিক চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পারস্পরিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও সম্পর্ক শুরু করেছিল চীন-আমেরিকা। বলা বাহুল্য, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ এই শর্ত মেনেই আমেরিকা তাতে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প ১১ ডিসেম্বর ২০১৬ ফক্স নিউজ কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন বয়ান দেয়া শুরু করেছিলেন যে, আমেরিকা কেন সেই ‘পুরনো কমিটমেন্টে আটকে’ থাকবে। প্রশ্নের ভঙ্গিতে তিনি কথাটা তুলেছিলেন। এর আগে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট তাকে স্বাগত জানানোর উছিলায় ফোনকল করেছেন বলে তাতে ট্রাম্প সাড়া দিয়ে কথা বলেছিলেন। এ রকম অন্তত আরো তিনটি ঘটনা আছে যেখানে ‘একচীন নীতি’ ট্রাম্প মানতে চান না অথবা মানবেন না কিংবা দরকার হলে চীনের সাথে ট্রাম্প সংঘাতে যেতে চাইতে পারেন, তা প্রকাশ পেয়েছিল। যেমন ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেকস টিলারসন তার প্রার্থিতা সিনেটে অনুমোদনের শুনানিতে জবাবে, সাউথ চায়না সি থেকে চীনাদের তাড়ানোর জন্য সামরিক বলপ্রয়োগের কথা বলেছিলেন। জন বোল্টন জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মে (২০০১-২০০৫) জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাইওয়ানের পক্ষে লবি করার এক বড় প্রবক্তা মনে করা হয় তাকে। কূটনীতিতে বলপ্রয়োগ বা চাপে ফেলে আমেরিকান নীতির পক্ষে অন্য রাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ে সিদ্ধহস্ত এই কূটনীতিক। ট্রাম্পের বিজয়ের পর তিনি সরব হয়ে উঠেছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, তিনি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বা সেক্রেটারি অব স্টেট) হতে যাচ্ছেন হয়ত। কারণ ট্রাম্পের বিজয়ের পরে তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎও করেছিলেন। এছাড়া, স্টেফান ইয়েটস, বুশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির ডেপুটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। তিনিও ট্রাম্পের পরোক্ষ দূত হিসেবে আন-অফিসিয়ালি তাইওয়ান সফরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরেই তিনিই প্রথম তর্ক উঠান যে, ‘একচীন নীতি’তে দেয়া প্রতিশ্রুতিতে আমেরিকাকে আটকে থাকতে হবে কেন?
এই তিন ঘটনা ছাড়াও, চীনের অর্থনীতির উত্থানের কারণে আমেরিকানদের কাজ ও চাকরি নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। পুরা নির্বাচনী প্রচারণা জুড়ে এটাই ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল। ফলে ট্রাম্প আমেরিকার বাজারে চীনা পণ্য প্রবেশের উপর  ৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে তা ঠেকাবেন- এজাতীয় সস্তা জাতীয়তাবাদী স্লোগান ছিল নির্বাচনে ভোটের বাক্স ভরতে ট্রাম্পের পপুলার দাবি। এসব মিলিয়ে সত্তরের দশক থেকে ক্রমশ দাঁড়ানো চীন-আমেরিকার গভীর সম্পর্ক ট্রাম্পের আমলে এক বিরাট ধাক্কা খেতে যাচ্ছে মনে করে দুনিয়ার সংশ্লিষ্ট সবাই শঙ্কিত হয়ে উঠছিলেন। টলারশন সামরিক হুমকি দিয়েছেন আর ট্রাম্প চীনের সাথে সংঘাতে যেতে চান এমন ধারণাগুলো প্রচার করা সত্ত্বেও আমেরিকার কোনো ব্যবসায়ী, ওয়াল স্ট্রিট অথবা কোনো করপোরেট গ্রুপ – কেউই ট্রাম্পের সামরিক পথে অবস্থানের ইচ্ছা বা সঙ্ঘাতমূলক পন্থা গ্রহণকে সমর্থন করতে পারেনি, তাতে চীন-আমেরিকান কোন সম্ভাব্য সংঘাতে তাদের অবস্থানের যে দিকেই থাকুক। কিন্তু কেউই নিশ্চিত থাকতে পারছিলেন না যে, এই পাগলা প্রেসিডেন্ট শেষে হঠাৎ না কী করে বসেন। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে  ট্রাম্প আর শি জিনপিংয়ের ফোনালাপ তাই সবাইকে একধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।

ব্যাপারটাকে চীনের দিক থেকে দেখলে, এ প্রসঙ্গে চীনা অবস্থান শুরু থেকেই ছিল খুবই পরিপক্ব ও মাপা। ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের তারিখ ছিল ২০ জানুয়ারি। ফলে ওই তারিখের আগে মিডিয়ায় যতই নতুন নতুন উসকানিমূলক খবর নিয়মিত প্রকাশ পাক না কেন, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সব সময় এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিল। কেবল বলেছিল,  ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার আগে সব মিডিয়া রিপোর্টই জল্পনাকল্পনামূলক, আনুষ্ঠানিক কিছু নয়। তাই অনুমাননির্ভর বিষয়ে চীন কথা বলবে না। তবে, কেবল ৮ নভেম্বর ২০১৬  ট্রাম্প নির্বাচনে জিতেছিল। তাই এই ফল প্রকাশের পর থেকে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের মূলনীতি বিষয়ক একটা কথা চীন বলে এসেছে যে, গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে চীন-আমেরিকার ভবিষ্যৎ ভাগ্য এক সুতায় বাঁধা পড়েছে। ফলে একমাত্র পরস্পর ডায়লগ করেই এক সাথে হাঁটতে হবে। চীন এ কথা ক্রমাগত প্রচার করে গেছে। ওদিকে আবার নির্বাচনে বিজয়ের পর ট্রাম্পের একচীন নীতি নিয়েও আবার দরকষাকষি করতে চাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করার পর প্রতিক্রিয়ায় চীন পরিষ্কার করে বলেছে, ‘চীনের একচীন নীতি কোনো দরকষাকষির বিষয়ই নয়’।

তবে ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর থেকে দুটো কারণে চীন প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হতে শুরু করেছিল।  সাধারণভাবে বললে তখন থেকে, চীন গাজর-লাঠি (হয় গাজর খাও, না হলে লাঠির বাড়ি) নীতিতে চলে যায়। তা হল, আমেরিকান লোকদের কাজ বা চাকরির সমস্যা নিয়ে চীনের সাথে বসে আলোচনায় সমাধান সম্ভব। চীন সেখানে ছাড় দিতেও রাজি। ওবামা আমলে ২০১১ সালে এমন এক আপসরফা হয়েছিল। কিন্তু চাকরির সমস্যাকে উছিলা করে সঙ্ঘাতের রাস্তায় সামরিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনার পথ ধরলে মুখোমুখি মোকাবেলার পথে যাওয়া হবে – এই ছিল চীনের ম্যাসেজ। এটা হলো অনেকটা এক জামাইয়ের বড়লোক শ্বশুরের মেয়ে বিয়ে করার অবস্থা। বিয়ের পর বউ-সন্তান নিয়ে জামাইয়ের দিন-খারাপ কাটছিল না। কিন্তু হঠাৎ করে জামাইয়ের মনে হল, বিয়ের আগের তুলনায় এখন তাঁর সংসার খরচ বেড়ে গেছে। তাই সে বউ তালাক দিতে চায়। এ কথা শুনে শ্বশুর প্রথমে জামাইকে তোষামোদ করে আর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাকে তালাকের সিদ্ধান্ত থেকে সরানোর চেষ্টা করছিলেন। শেষে না পেরে একপর্যায়ে শ্বশুর বললেন, হয় তুমি আলাপ আলোচনায় আস, তাতে সংসার চালানোর অর্থে টান পড়লে ভর্তুকিও দেয়া হতে পারে। কিন্তু তুমি যদি না মানো, তবে তোমাকে লাঠিপেটা করা হবে।’ এই গাজর-লাঠির নীতিতে কাজ হয়েছিল। জামাই আলোচনার টেবিলে বসে সব সমস্যার সমাধান করেছিল। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে,  ট্রাম্প বিরতিহীন গরম কথা বলতে বলতে তাথেকে এই প্রথম অন্তত একটা ইস্যুতে তাঁকে  পিছু হটতেই হল। কারণ ট্রাম্পের এখন সেই জামাইয়ের দশা। ইতোমধ্যে চীন দক্ষিণ চীন সাগর রক্ষা নিয়ে সামরিক মহড়াসহ পালটা প্রস্তুতি হিসাবে অনেক কিছুই তাকে আমরা করতে দেখেছি। তবে সেটা যা-ই করুক আর না করুক, চীনের মূল উদ্বিগ্নতা ছিল আরো ব্যবহারিক। কী সেটা?
কয়েক দিন আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ট্রাম্পের ফোনালাপ মাঝপথে হঠাৎ থেমে যায়। নির্ধারিত সময় অর্ধেক শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প ফোন রেখে দিয়েছিলেন এবং ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় হঠাৎ থেমে যাওয়া সেই ফোনালাপের ঘটনা কী পরিস্থিতিতে থেমে যায় তা ফাঁস হয়ে যায়। এই ঘটনার কথা চিন্তা করে চীনা সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল। ‘পাগলা’ ট্রাম্পের সাথে চীনা প্রেসিডেন্ট কিভাবে কথা বলবেন – ট্রাম্প যদি সেখানেও অর্ধেক কথা বলেই ফোন রেখে দেন? এরপর যদি একইভাবে সবকিছু মিডিয়ায়  ফাঁস হয়ে যায় তবে তো তিনিও বিব্রত হবেন, এই ভয় পেয়ে বসেছিল শিং জিনপিংকে। ফলে কূটনৈতিক পর্যায়ে চীন-আমেরিকার পররাষ্ট্র বিভাগ বসে আগেই সব কিছু ঠিক করে নেন। প্রেসিডেন্ট-দ্বয় কে কিভাবে কথা বলবেন, কতটুকু কোথায় রাজি হবেন ইত্যাদি নিয়ে আগেই কথা বলে নিয়েছিলে উভয় পক্ষ। অর্থাৎ আগে স্ক্রিপ্ট আর পরে সেই স্ক্রিপ্ট মোতাবেক শুটিং। এই ফরম্যাট মোতাবেক আগের দিন মানে বুধবার ট্রাম্পের অফিস সংবাদমাধ্যমকে জানায় যে, পরের দিন তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে কথা বলবেন। এরপর তাদের ফোনালাপ শেষে দুই পররাষ্ট্র অফিস থেকে দুটো আলাদা পূর্বনির্ধারিত বিবৃতি যায়। সব কিছু আগেই আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করে নেয়া হয়েছিল। সবই পাগলা ট্রাম্পের মহা কৃতিত্ব।

একটা বাড়তি পাওয়া প্রসঙ্গ আছে – তাইওয়ানের প্রতিক্রিয়া। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখছে,
“Taiwan’s presidential office spokesman Alex Huang said in a statement that the island’s government and the United States “both maintain close contact and communication so as to keep a ‘zero accident’ approach” to their relationship”.
“হাতছুট কোন দুর্ঘটনা শুণ্যে নামিয়ে রাখা – এই এপ্রোচ নিয়ে  দ্বীপ (তাইওয়ান) সরকার ও আমেরিকা দুই পক্ষ ঘনিষ্ট সংযোগ ও যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে”। কারণ চীন-আমেরিকার কোন উত্তেজনায় প্রথম বোমাটা তাইওয়ানেরই খাবার সম্ভাবনা।

এখন পুরা ঘটনা থেকে অন্তত একটা জিনিস পরিষ্কার হল যে, এখনো ট্রাম্পের প্রশাসনের কিছু লোক আছেন যারা ট্রাম্পকে পরামর্শ শুনতে বাধ্য করতে পারেন। ট্রাম্প কি এখন থেকে থিতু হয়ে কথা বলবেন? যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে করে কথা বলবেন?

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

 

ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

গৌতম দাস

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2cF

 

 

 

বলার অপেক্ষা রাখে না দুনিয়াজুড়ে সবার উপরে এক ট্রাম্প-জ্বর চেপে বসেছে। ট্রাম্প মানে, গেল মাসে শপথ নেয়া আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প। ট্রাম্পের আগমণের মুল ম্যাসেজ হল, আমেরিকার সাথে সম্পর্কিত দুনিয়াজুড়ে যত ঘটনা আছে তা আর আগের মতো করেই আগের নিয়মে, অভ্যাসে বা আইনে ঘটবে না এটাই আজকে ধরে নিতে হবে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তবে এর চেয়ে বড় কথা ‘ট্রাম্প কেন এমন’ গভীরে গিয়ে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। যদিও বলা হচ্ছে ট্রাম্প আনপ্রেডিক্টেবল লোক। মানে লোকটা কখন কী করে তা আগে বলা যায় না, এর তালঠিকানা নেই। কিন্তু যে লোক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তার তালঠিকানা নেই এটা বুঝতে হবে, সেটা আবার কেমন কথা? হ্যাঁ, তা ঠিক। ব্যাপারটা হল, আসলে আমরা বলতে চাচ্ছি, কোনো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের যেসব কাজ যেভাবে করা্র কথা না বা যেভাবে বলার কথা না বা অথবা যেসব নীতি নেয়া অসম্ভব অথবা হওয়ার কথা নয় বলে আমরা মনে করতাম; ট্রাম্পকে আমরা তেমন কাজ করা ও সিদ্ধান্ত নিতেই  দেখছি। ফলে কাম্য অর্থে আমরা বলছি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তালঠিকানা নেই। ব্যাপারটা যেন এ রকম যেমন, আমেরিকা এক এম্পায়ার, মানে এক মোড়ল বলে ধরতে পারি। এখন যে লোক মোড়ল তার বাসায় সারা দিন বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের লোকের আসা লেগেই থাকবে। ফলে স্বভাবতই তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও মোড়লকে করতে হবে। এই আপ্যায়ন বলতে ন্যূনতম চা-নাশতা আর এর চেয়েও প্রধান বিষয় যথেষ্ট বসার জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন মোড়ল যদি হঠাৎ বলে এখন থেকে আর বসার কোনো ব্যবস্থাই থাকবে না, দাঁড়িয়ে কথা শেষ করতে হবে তাহলে সমাজ বলবে এই মোড়লের তালঠিকানা নেই।

ট্রাম্পের নীতি কেমন এই প্রশ্নে মিডিয়া বলছে সে প্রটেকশনিস্ট, মানে সংরক্ষণবাদী। সংরক্ষণবাদী মানে কী? মানে হল যে নিজ বাজার বিশেষত অন্য অনেক কিছুর সাথে নিজ জনগণের চাকরির বাজার সংরক্ষণ করে আগলে রাখতে চায়। সাধারণ অর্থে এটা দোষের কিছু নয়। সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হল কী ভাবে? যেভাবে করতে চাওয়া হচ্ছে তা কী কাজ করবে? অন্য কোন পথ কী নাই?  ট্রাম্প নিজে তার এই নীতির দিকটা ঠিক ‘সংরক্ষণবাদী’ বলে পরিচয় করান না। বলছেন, এটা নাকি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, মানে সবকিছুতে সবার আগে আমেরিকা – এই নীতি। তার শপথ নেয়ার পরবর্তী বক্তৃতার প্রথম প্রসঙ্গ ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বয়ান।
আবার অনেকে  বলছেন,  ট্রাম্পের নীতি অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন। সংরক্ষণবাদী মানে এর আর এক অর্থ ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন’ ত বটেই।  সেই সত্তরের দশক থেকে আমেরিকা এত দিন সবাইকে গ্লোবালাইজেশন যোগ দিয়ে নিজ নিজ বাজার খুলে দিতে প্ররোচিত করত চাপ দিত। আজ, সেই আমেরিকা ট্রাম্পের জমানায় এসে উল্টো দিকে চলা শুরু করেছে। যেমন সে ওবামার আমলে সে চীন বাদে ১২ রাষ্ট্রের বাণিজ্য জোট – টিপিপি করেছিল। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে প্রথম সপ্তাহেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমেরিকাকে ওই বাণিজ্য জোট থেকে বের করে এনেছে।

কিন্তু গ্লোবালাইজেশন আর বাজার এর সম্পর্ক কী – এসম্পর্কে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে।  গ্লোবালাইজেশন মানে অবশ্যই নিজ বাজার খুলে দেওয়া। কিন্তু এটাই এর একমাত্র অর্থ বা দিক বৈশিষ্ট নয়। বাজার খোলা মানে অন্যের বাজার খোলা পাওয়াও বটে। অন্যের বাজার খোলা পেয়েছি বলেই ত গার্মেন্ট বেচে বছরে ৩২-৩৮ বিলিয়ন ডলার কামাতে পারি। যদিও আমেরিকার মাতব্বরি তাই গ্লোবালাইজেশনে এসে কম অথবা অকার্যকরও হয়ে যায় নাই। আমাদের বাজার খুলে দিবার মানে গ্লোবালাইজেশনের অংশ হবার আগেও যেমন আমাদের উপর আমেরিকান দাদাগিরি ছিল এখনও প্রায় তেমন কার্যকর আছে। এমনকি গার্মেন্টস নিয়ে আমেরিকার বাজারে সব পণ্য কোডে ঢুকতে যাতে না পারি সেজন্য কোটার নিয়ন্ত্রণ দেয়া আছে। এতসব কিছুর পরও ব্যাপারটা হল – কিছু কিছু ছিদ্র আছে, শর্ত পরিস্থিতি আছে, ক্যাপিটালিজমের লজিক আছে, স্ববিরোধীতা আছে  যেখানে আমেরিকা মুরুব্বির ক্ষমতা থাকলেও তা প্রয়োগ করতে পারে না। কাজে লাগে না। তাদের আরো বড় ক্ষতি হবে বলে। এদিকে আমাদের নিজ সক্ষমতা আছে, দক্ষতা আছে, নিজ শ্রমের বাজারমুল্য বিদেশের তুলনায়  সস্তা এবং দক্ষ (নুন্যতম মজুরি বাড়িয়ে দিলেও তা সস্তা থাকবে) – এই ধরণের আরও অনেক তুলনামূলক-সুবিধা (কমপিটিটিভ এডভ্যানটেজ) আছে – এগুলো আমেরিকা চাইলেও ঠেকায় রাখতে পারে না। আমাদের এসব সুবিধার দিক গুলো নিয়ে –  লেগে থাকা স্টাডি, আর বুদ্ধি খরচ করে চলতে পারলে আমাদের জন্য বন্ধ বাজার (প্রটেকশনিজম) এর  চেয়ে তুলনায় গ্লোবালাইজেশন এর সুবিধা বেশি। ফলে আজকের যুগের লড়াইটা  – গ্লোবাল বাজারে নিজের শেয়ার বাড়ানোর, এটা ঠিক নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়, বা অন্যের প্রবেশ ঠেকানো নয়

চলতি শতকের শুরু থেকেই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে বুশের দ্বিতীয় টার্ম (২০০৫ সাল) থেকে শুরু করে ওবামার দুই টার্ম এই পুরা সময় ধরে আমেরিকা এশিয়ায় চীনা কনটেনমেন্ট নীতি বা ‘চীন ঠেকানোর আমেরিকার নীতি’ চালু রেখেছিল। এই নীতির সার কথা হল – চায়না ঠেকানো ( China Containment)। মানে দুই রাইজিং ইকোনমির (ভারত ও চীন) একটাকে কাছে টেনে ফেবার করে, সুযোগ সুবিধা দিয়ে অন্যটার বিরুদ্ধে লাগা ও লাগানো। ভারতকে কাছে টেনে কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে, নিজের মোড়লি-শক্তির কিছু ভাগ ভারতকে দিয়ে তাকেও চীন ঠেকানোয় কাজে লাগানো। গত প্রায় ১০-১২ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি এটাই।   কিন্তু এই ব্যাপারে ট্রাম্পের নীতি সম্ভবত ভিন্ন হতে যাচ্ছে, না চাইতেও। যেমন চীন বা ভারতের সাথে ট্রাম্প যে আমেরিকা সাজাতে চাইছে তাতে এই দুই রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তি হবে – আমেরিকান কাজের বাজার এই চীন বা ভারত কে কোথায় নষ্ট করছে সেটা দেখা ও ঝগড়া করে ঠেকানো। যে যেখানে আমেরিকান কাজের বাজার নষ্ট করছে সেখানে তার সাথে বিরোধিতা চরমে নেওয়ার নীতি এটা। এজন্য যদিও ট্রাম্প পরিষ্কার করে বলেননি যে চীন ঠেকানোর পুরনো নীতি তার আমলে কী হবে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, আমেরিকান কাজের বাজার কেউ নষ্ট না করুক এটাই ট্রাম্পের ফোকাস। আর সেটাকে বাধা দেয়াকে মুখ্য করে বিদেশ নীতি সাজানো ট্রাম্পের নীতি।

তাহলে সার কথা দাঁড়াল, চীনের বিরোধিতা ওবামারও ছিল। অর্থাৎ  ‘চীন ঠেকানোর’ “এশিয়াতে আমেরিকা পিভোট বা ভারসাম্য আনয়নকারী হয়ে থাকবে” এই নীতি ওবামা চালিয়ে গিয়েছেন। মানে সেটা এশিয়ায় চীনা প্রভাব ঠেকানো অর্থে। এদিকে ট্রাম্পও চীন-বিরোধী তবে সেটা আমেরিকার কাজের বাজার কতটা চীন ধ্বংস করছে সেটা ঠেকানো অর্থে। আর ওদিকে ভারতের বেলায়, ওবামা (এবং তারও আগে বুশও ছিল) ভারত-তোয়াজের পক্ষে, চীন ঠেকানো তত্ত্বের কারণে। কিন্তু ট্রাম্প ইতোমধ্যে ভারত-বিরোধী অবস্থান নিয়েছে, তবে সম্পুর্ণ ভিন্ন ভাবে। কারণ ভারতের আইটি শিল্প এই টেকনোলজি আমেরিকান নাগরিকের চাকরি খাচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। প্রসঙ্গটাকে আমরা ‘H1-B ভিসা কর্মসূচি’ দিয়ে বুঝতে পারি। এটা একটা বিশেষ ক্যাটাগরির ভিসা কর্মসূচির নাম। আমেরিকার আইটি শিল্প বা সফটওয়্যার ব্যবসার বাজারটা মোটামুটি ১২০-১৫০ বিলিয়ন ডলারের। এর প্রায় ৭০ ভাগ বাজার ভারতের দখলে। ভারতীয় মালিকানার তবে আমেরিকায়ও রেজিষ্টার্ড তিন-চারটা কোম্পানী এই বাজার দখল করেছে। আমেরিকায় রেজিস্টার্ড ভারতীয় মালিকানা কোম্পানিগুলো ওই ভিসা ক্যাটাগরিতে ভারত থেকে প্রোগ্রামারদের এনে আমেরিকার প্রোগ্রামারের থেকে কম বেতনে কাজে নিয়োগ করে আসছিল। যদিও ওই ভিসা ক্যাটাগরির পেছনের আইনে বলা ছিল যে এই ক্যাটাগরিতে ভারতীয় বা বিদেশীদের আনতে গেলে তাদের ন্যূনতম বেতন বছরে ৬০ হাজার ডলার বা এর বেশি হতে হবে। শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর সাফাই ছিল যে, যেসব দক্ষ ও মেধাবী শ্রমগুলো (যাদের বেতন ৬০ হাজার ডলার এই মাপকাঠির ) আমেরিকায় যথেষ্ট পাওয়া যায় না আর সেকারণে তারা বিদেশ থেকে আনতে চাইছে। এই কথা আরো পোক্ত করতে বলা হত যে, ভারতীয়দের মাস্টার্সও আছে, আমেরিকানদের বেলায় মাস্টার্স করা চাকরিপ্রার্থী থাকে খুব কম জনের।
ট্রাম্প এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিপক্ষে তবে সেটা সে করতে চায় শর্তগুলোকে আরও কঠিন করে দিয়ে। তবে আরও শর্ত আরোপ করে এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিরুদ্ধে কেবল ট্রাম্প নয়; এমনকি কংগ্রেসে ও সিনেটে এখন সংখ্যাগরিস্ট রিপাবলিকান – ট্রাম্পের দল শুধু এই রিপাবলিকানরাও নয়, এই দলে অনেক ডেমোক্র্যাটও আছেন। তাই ট্রাম্পের শপথ নেয়ার আগেই গত ৫ জানুয়ারি থেকে কংগ্রেসে ‘হাই-স্কিল্ড ইনটিগ্রিটি অ্যান্ড ফেয়ারনেস অ্যাক্ট, ২০১৭’ নামে বিল আনার তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। এই কাজে এখনই চার থেকে পাঁচটা প্রস্তাবিত আইন কংগ্রেসে ঘোরাফেরা করছে। সেগুলোর অন্তত একটা বাই-পার্টিজান মানে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দুই দলের দুই সদস্যের যৌথ প্রস্তাব। শুরুর দিকের প্রস্তাবগুলোতে সংশোধিত  ‘H1-B ভিসা কর্মসূচিতে’ মুখ্য দুই পরিবর্তনের মধ্যে ছিল ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ডলার করা; আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা। এমন প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি হল, বছরে এক লাখ ডলার মানে মাসে আট হাজার ডলারের বেশি দিয়ে বিদেশী-ভারতীয় লোক আনতে গেলে সেটা আর আমদানিকারক কোম্পানীর কাছে লাভজনক থাকবে না। কারণ ওর চেয়ে কম বেতনে আমেরিকা থেকেই স্থানীয়ভাবে প্রোগ্রামার পাওয়া যাবে। আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকার শর্ত উঠিয়ে দেয়া মানে স্থানীয়ভাবে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামাররা ওই চাকরির আবেদন করতে পারবে ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হতে পারবে। এদিকে ট্রাম্পের শপথের পরে আরো যেসব নতুন বিল বা আইনের প্রস্তাব কংগ্রেসে উঠেছে সেগুলোতে ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ত্রিশ হাজার রাখা হয়েছে। বলা বাহুল্য ভারতীয়দের মাথায় হাত। ইতোমধ্যে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর ভারতে রেজিস্টার্ড অংশে শেয়ার বাজারে দরপতন হয়েছে গড়ে শতকরা ৯ ভাগ। আমেরিকান শেয়ারবাজারের এক অ্যানালিস্ট হিসাব করে বলছেন ভারতীয় তিন শীর্ষ কোম্পানিকে [টিসিএস (টাটা), ইনফোসিস ও উইপ্রো] নতুন হবু আইনে ৬০-৭০ ভাগ বেশি বেতন গুনতে হবে। ফলে আনুপাতিক মুনাফা কমে যাবে। অর্থাৎ অবস্থা খুবই বেগতিক। এসব কোম্পানির এক মালিক সমিতি আছে নাম ন্যাসকম (NASSCOM)। তারা খুবই তৎপর হয়ে লবিং করছে। তাদের কোম্পানীগুলো আমেরিকায় ব্যবসা করে কত ট্যাক্স দেয়, কত নতুন আনুষঙ্গিক কাজ সৃষ্টি করেছে এর এক স্টাডির ফিরিস্তি দিয়ে ট্রাম্পের দলবলের মনগলানোর চেষ্টা করছে। ওদিকে মজার কথা হল, মোদি সরকার নিশ্চুপ, প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অথচ গত নভেম্বরে ট্রাম্পের বিজয়ের পর থেকে এই বিপদ যে আসছে তা সরকার ও সংশ্লিষ্টরা সবাই জানে। তাহলে? বিষয়টা হল, কৌশল আর এক পুরনো বিশ্বাস। প্রকাশ্যে আপত্তি হইচইয়ের থেকে গোপনে যেভাবে সে আমেরিকার বিশেষ নজরের বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছিল এতদিন, সেটার অপেক্ষায় থাকা আর সে দিকে চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মোদি সরকার। আনন্দবাজার পত্রিকার এমনই এক রিপোর্টের শিরোনাম, ‘ট্রাম্পের শরণার্থী বিতর্ক এড়িয়ে আপন স্বার্থে নজর ভারতের’।  ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার পর মোদি পঞ্চম রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। এরপরে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ শেষে ২৫ জানুয়ারি সরকারপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ফোনে কথা বলেছেন। কিন্তু সেখানে কী আলাপ হয়েছে কোন আশার আলো আছে কিনা এসব বিষয়ে তেমন কোনো ব্রিফিং নাই।  ভারতের উদ্বিগ্নতার ইস্যুগুলো নিয়ে কোনো আলাপ হয়েছে কি না তেমন কোন কিছু জানা যায়নি। তবে কয়েকজন আমেরিকান বিশেষজ্ঞের মতামত হল, ভারত আমেরিকানদের চাকরি খেয়েছে – এই জায়গা থেকে কোনো ছাড় দেয়া অথবা সরে আসার কোন সম্ভাবনা তারা দেখেন না।

অনেক পাঠকের মনে হতে পারে যে, ট্রাম্প বা যেকোনো জাতীয়তাবাদী তো এমন সংরক্ষণবাদী অবস্থান নেবেই, ফলে এই সিদ্ধান্ত সঠিক। সরি, আসলে ব্যাপারটা তা নয়, এত সরলও নয়। বরং সস্তা জাতীয়তাবাদ, তাই এটা এযুগে অচল। যদিও আপাতদৃষ্টিতে তা সঠিক মনে হচ্ছে। কেন?
মূল বিতর্ক হল – শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর যুক্তি হল, যেমন একজন বলছেন –

Mr. Levie said, “When you have incredible talent that wants to work in your organization but you are preventing them from doing so, that is disastrous to innovation and competition.”

বাংলা করলে, ‘এক দিকে বিরাটসংখ্যক ট্যালেন্ট আমাদের সংগঠনের সাথে কাজ করতে চাইছে আর আমরা তাদের আটকে রাখতে চাইছি, এটা উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার দিক থেকে ধ্বংসাত্মক’। ইমোশনাল না হয়ে দেখলে আসলে, এখানে ট্যালেন্ট বলে ডেকে কোম্পানীগুলোর অবস্থানের পক্ষে এই সাফাই তৈরি করা হয়েছে। যার পিছনের সত্যি কথাটা হল, এই ‘ট্যালেন্টদের’ ভারত থেকে সস্তায় কম বেতনে পাওয়া যায় বলেই তাদেরকে গৌরবান্বিত করে এমন ট্যালেন্ট ডাকা হচ্ছে। কোনো কারণে যদি আমেরিকাতেই তুল্য দক্ষ শ্রম সস্তায় পাওয়া যেত, তবে সেসব আমেরিকানরাই সেক্ষেত্রে আবার ট্যালেন্ট হয়ে যেত। আসল কথা আমাদেরকে ক্যাপিটালিজমের স্বভাব বৈশিষ্ট্য খেয়াল রাখতে হবে। সে অবশ্যই সস্তা শ্রমের পক্ষে সব ধরনের যুক্তি-সাফাই গাইবেই। এখন প্রশ্ন হল, ক্যাপিটালিজমের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে আইন বানিয়ে ট্রাম্পের পক্ষে জয়লাভ করতে পারা সম্ভব কি না?

না, পারার কথা নয়। কেন? এই আইন কার্যকর হলে বিদেশী নয় আমেরিকানদের চাকরি হবে। কথা সত্য। কারণ সে ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা কোম্পানীগুলোর ভারতীয়দের চেয়ে স্থানীয়দের নিয়োগ দিলে বেতনের বিবেচনায় লাভজনক হবে। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এটাই একমাত্র বিবেচনার বিষয় নয়, আরও দিক আছে। মূলকথা এই স্থানীয় নিয়োগের বেলার এদের বেতন কিন্তু এখনকার তুলনায় ৬০-৭০ ভাগ বেশি হবে।  যার অর্থ এই সেক্টরের সফটওয়ার প্রডাক্টে ক্রেতাদেরকে  বেশি মূল্যে সফটওয়্যার ও সার্ভিস কিনতে হবে। অর্থাৎ আমেরিকানদের চাকরি দিতে গিয়ে – এই জাতীয়তাবাদ দেখাতে গিয়ে রাষ্টের পুরা সবাইকে  আমেরিকান – জাতিকে বেশি মূল্যে পণ্য কিনতে হবে। কিন্তু সে বাড়তি মূল্য দেয়া অপ্রয়োজনীয়, এই অর্থে কারো ভোগে লাগবে না। পুরোটাই লস। ব্যাপারটা হলো যেন সব আমেরিকান মিলে চাঁদা দিয়ে পকেট থেকে পয়সা গুনে বেকার আমেরিকান আইটি গ্র্যাজুয়েটদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াল। এর চেয়ে বেকারভাতা দেয়া কি সহজ ছিল না? এটা কি ন্যাশনাল প্রডাকশন বাড়ল না ন্যাশনাল লস? কোন খাতে ফেলব? প্রশ্নটা কাজ দেওয়ার, নাগরিকের পকেট কাটা নয়।  অতএব বলে দেয়া যায় – এই সস্তা জাতীয়তাবাদ টিকবে না।

এক গোড়ার সত্য বলি। সত্য এক. আমাদের মতো গরিব ছোট অর্থনীতির দেশের শ্রম (দক্ষ বা অদক্ষ দু’টিই) উন্নত বা বড় অর্থনীতির দেশের শ্রমের চেয়ে সস্তা ও প্রতিদ্বন্দ্বী হবেই। এখনো অনেক দিন এটা হবে। আর সত্য দুই. ক্যাপিটালিজমের সাধারণ ঝোঁক হবে এই সস্তা শ্রমের পক্ষ নেয়া, কারণ ওখানে মুনাফা বেশি হবে। এই সত্য অস্বীকার করে কেউ টিকবে না।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস আমেরিকা যায় – এর তাৎপর্য হল, এতে আমেরিকার শ্রমের বাজারে শ্রমের ন্যূনতম মূল্য তুলনীয় বিচারে কম রাখা সম্ভব হয়, হবে। কেন? আমেরিকান ঐসব শ্রমজীবিরা আমেরিকান বাজারে তাদের পোশাকের চাহিদা মিটাতে পারবে তুলনামূলক কম পয়সায়, এর ফলে আমেরিকায় ন্যূনতম মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব। আবার অন্যদিকে,  বাংলাদেশের কৃষিতে ভর্তুকি দেয়া মানে বাংলাদেশের গার্মেন্টসে মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব করা।

তাহলে সোজা কথাটা হল, অল্প কিছু যেসব পণ্যে আমরা আমেরিকার চেয়ে দামে ও মানে প্রতিদ্বন্দ্বী ও যোগ্য এসবের বাজার আমাদের হাতে আজ অথবা কাল তাদেরকে ছাড়তেই হবে। এ কথা যে যত তাড়াতাড়ি বুঝবে সে ভালো টিকবে। তবে সস্তা জাতীয়তাবাদের সুড়সুড়ি দিয়ে ভোট জোগাড় সেটা হয়ত ফাঁকফোকরে চলতেই থাকবে। রাজনীতিতে মিথ্যা ব্লাফ তো থাকেই।

ঘটনার আরেক মাত্রা আছে। ট্রাম্পের আমলে খুব সম্ভবত আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব ওবামা আমলের মতো আর থাকছে না। কারণ এখন পর্যন্ত ওবামার ‘চীন ঠেকানোর নীতি’ ট্রাম্প চালু রাখবেন কি না, ওবামার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করবেন কি না এর সপক্ষে ট্রাম্পের কোনো অ্যাকশন, নীতি বা কোনো আলামত দেখা যায়নি। বরং এশিয়ায় চীনবিরোধী কোনো জোট গড়ার ওবামার নীতির পথে ট্রাম্প হাঁটছেন না, ইচ্ছাও নাই – তাই স্পষ্ট হচ্ছে। এটাই প্রকাশিত। যেমন যত সহজে ট্রাম্প অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপ ‘গেট লস্ট’ বলে শেষ করলেন সেখানে এর ইঙ্গিত আছে। অথচ ওবামার এই আমলে তার এশিয়া নীতিতে একমাত্র অস্ট্রেলিয়াতেই আমেরিকান মেরিন ঘাঁটি গাড়া হয়েছে। এই অঞ্চলে আমেরিকান নীতি স্ট্রাটেজির সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল অষ্ট্রেলিয়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

 

ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” এর ভিতর বাংলাদেশী টুপি

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এর ভিতরে বাংলাদেশী টুপি

গৌতম দাস

২৪ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2cx

 

 

 

আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিয়ম মোতাবেক গত ২০ জানুয়ারি শপথ নিয়েছেন। শপথ নেয়ার দিন রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে দাঙ্গাহাঙ্গামা প্রতিবাদ বিক্ষোভ যেমন হয়েছে, তেমনি ট্রাম্পের শপথের সব আনুষ্ঠানিকতাও সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা ও দায়িত্বভার বুঝে নেয়ার জন্য গঠিত ট্রাম্পের দলবল গত দুই মাসে তাদের সব কাজের মধ্যে একধরনের প্রতিহিংসা মাখানো পদক্ষেপের চিহ্ন রেখেছে। সেই সাথে প্রবল চাপাবাজি, আর প্রপাগান্ডায় সব কাজে “আমরাই শ্রেষ্ট, আমরাই একমাত্র” ধরনের লোক-দেখানো কর্মতৎপরতায় ভরপুর। সেসব আচরণ শপথ নেয়ার সময় পর্যন্ত বজায় ছিল। এমনকি ট্রাম্পের প্রশাসনের হবু উপদেষ্টারা (আমাদের ভাষায় মন্ত্রী) যাদেরকে ট্রাম্প বেছে নিয়েছেন কিন্তু সিনেটের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছেন, তারাও সিনেটের শুনানিতে প্রশ্নের জবাবের সময়ও একই প্রপাগান্ডা, চাপাবাজি আর জনপ্রিয়তাবাদি ভাষায় কথা বলা চালিয়ে গেছেন। যেমন ট্রাম্পের হবু পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) হলেন শীর্ষ তেল কোম্পানী Exxon Mobil Corp এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী রেক্স টিলারসন। তিনি সিনেটের শুনানি চাপাবাজি হুঙ্কার দিয়ে বলছেন সাগরপথে  চীনের প্রবেশপথ “দক্ষিণ চীন সাগরে বিতর্কিত দ্বীপে প্রবেশ করতে দেয়া হবে না”। কিন্তু কিভাবে তিনি এই আওয়াজ বাস্তবায়ন করবেন তা নিয়ে তিনি বা ট্রাম্পের মুখপাত্ররা কেউ আর মুখ খুলতে নারাজ। ওদিকে এসব ছাড়া ট্রাম্পসহ সবাই এমন একটা ভাব বজায় রেখে কথা বলে গেছেন, যেন ট্রাম্পের আগে রিপাবলিকান বা ডেমোক্রাট নির্বিশেষে ওবামাসহ যত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ছিলেন এরা স্কলে ছিলেন এক একজন বিদেশি শোষক, বিদেশীদের স্বার্থের প্রতীক। বিশেষ করে ওবামা হল ট্রাম্পের বিশেষ টার্গেট। তাই শপথ অনুষ্ঠানের বক্তৃতার শুরুতেই ট্রাম্প বলছেন, “আজকের এই ক্ষমতা হস্তান্তর বিশেষ অর্থপূর্ণ। কারণ দীর্ঘ দিন ধরে আমাদের এক ক্ষুদ্র অংশ রাজধানীতে বসে সব মাখন খেয়েছে। ওয়াশিংটন ঝলমল করে উঠেছে কিন্তু জনগণের সাথে তারা সম্পদ শেয়ার করেনি। রাজনীতিবিদরা উন্নতি করেছেন আর ওদিকে চাকরি হারিয়ে গেছে, ফ্যাক্টরি বন্ধ হয়ে গেছে। এটা একদল আর একদলকে অথবা এক সরকার আর এক সরকারকে ক্ষমতা হস্তান্তর করার দিন নয়। আজ জনগণের ক্ষমতা জনগণকে ফিরিয়ে দেয়ার দিন”। যেন ট্রাম্প হয়ে গেছেন শ্রমিকের দুঃখ বেচে সহানুভুতি জড়ো করা ট্রেড ইউনিয়ন কমিউনিস্ট নেতা। আর টাম্পের সবকথার শেষ কথা হল, “এখন ট্রাম্প নির্বাচিত হয়ে এসে গেছেন, ফলে সব ঠিক হয়ে যাবে”। এ কারণেই যেন তিনি দেখাতে চাচ্ছেন, ওবামার নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসক ও কর্মচারীরা যেন খুবই দ্রুত বিদায় নেন, পারলে ওবামা চলে যাওয়ার পরপরই আর তাদের কাউকে দেখা না যায়। তিনি ইঙ্গিত দিতে চান যেন, এরা সবাই গণস্বার্থবিরোধী তৎপরতার প্রতীক । । ট্রাম্পের এই বক্তৃতা শুনে মনে হয়েছে ব্রিটিশ কলোনি আমলে নেটিভ কোনো নেতা বক্তৃতা দিচ্ছে যেখানে ওবামা যেন লর্ড ক্লাইভ। আর ট্রাম্প হলেন জনদরদি একমাত্র দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী।

এগুলো নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি রকমের লোকরঞ্জন ততপরতা। ট্রাম্প আর এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ওবামা আমলের যত আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ছিলেন বিশেষ করে যারা পেশাদার কূটনীতিক নন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নিয়োগপ্রাপ্ত, তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশ পাঠানো হয়েছিল যেন তারা ২০ জানুয়ারির আগেই বিদেশে চাকরির দায়িত্ব ছেড়ে দেশে ফিরে আসেন। এই নির্দেশনা প্রতিহিংসার উদাহরণ। এই রাষ্ট্রদূতেরা এক-দুই মাস অথবা অন্তত দুই সপ্তাহ স্বপদে বেশি থেকে গেলে তাতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কিছু নেই। আমেরিকার প্রশাসনিক রেওয়াজও এটাই। অর্থাৎ রেওয়াজ ভাঙার অপ্রয়োজনীয় এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ইঙ্গিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে যে- ওবামাসহ পুরনো রাজনীতিবিদেরা সব বিদেশী চর। তাই তাদের ছায়া যেন ট্রাম্পের ওপর না পড়ে। এ নিয়ে অনেক কার্টুন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প একটা বড় খেলনা রঙের পিচকারি বন্দুক নিয়ে ওবামার অফিসে ঢুকে ওবামাসহ সবাইকে তাড়া করছেন, রঙ ছিটাচ্ছেন আর বলছেন অফিস থেকে বের হয়ে যেতে।
এখানে ট্রাম্পের বক্তৃতা থেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্ধারক অংশ হুবহু অনুবাদ হাজির করব যেখানে ট্রাম্পের সস্তা জাতিবাদী বুঝ এবং সুড়সুড়ি কত ভয়ানক হতে যাচ্ছে তা বোঝা যাবে, এ’থেকে। ট্রাম্প বলছেন, “বহু যুগ ধরে আমরা আমেরিকান শিল্পের ঘাড়ে চড়ে বিদেশী শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছি। অন্য দেশের সেনাবাহিনীকে ভর্তুকি দিয়ে পালছি আর আমাদের বাহিনী শুকিয়ে মেরেছি। বিদেশী অবকাঠামোর পেছনে ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেছি আর আমেরিকার বেলায় সেগুলো রিপেয়ার না করায় ক্ষয়ে গেছে। আমরা অন্য দেশকে সমৃদ্ধ করেছি অথচ তা করতে গিয়ে নিজেদের সম্পদ, সামর্থ্য, আস্থা সব লোপাট করেছি। একটা একটা করে আমাদের ফ্যাক্টরি ভেঙে পড়ছে, আমাদের উপকূল ছেড়ে গেছে আর আমাদের লাখ লাখ শ্রমিককে বেকার ফেলে রেখে গেছে। আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ঘর থেকে তাদের সব সম্পদ টেনে বের করে সাড়া দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু এই দিন শেষ। এগুলো এখন অতীত। আমরা এখন শুধু ভবিষ্যতের দিকে তাকাব। আমরা আজ এখানে সমবেত হয়েছি এবং এক ডিক্রি জারি করছি, যা দুনিয়ার সব রাজধানীতে প্রতিটা ক্ষমতার কেন্দ্রে শোনা যাবে। আজ থেকে এক নতুন স্বপ্ন আমাদের ভূমিকে শাসন করবে। এখন এই মুহূর্ত থেকে সবসময় “সবার আগে আমেরিকা, আমেরিকার স্বার্থ”। বাণিজ্য, ট্যাক্স, ইমিগ্রেশন, বিদেশনীতি ইত্যাদি সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে তা আমেরিকার শ্রমিক ও আমেরিকান পরিবারের বেনিফিটের দিকে তাকিয়ে নেয়া হবে”।

এখানে তামাশার দিকটা হল, কমবেশি এই বক্তৃতাটাই এত দিন আমাদের মতো কম আয়ের বিভিন্ন রাষ্ট্রে জাতিবাদী বা কমিউনিস্টরা “আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ”-এর বিরুদ্ধে দিয়ে এসেছে। আজ ট্রাম্প তা নিজ দেশের রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে উগড়িয়েছেন।

আসলে ট্রাম্প নির্বাচনে দাঁড়ানোর শুরু থেকে পুরো ব্যাপারটাই এমন। যেমন, ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারের মূল স্লোগান – “Making America Great Again” বা অনুবাদ করে বললে, “আমাদের আমেরিকাকে আবার মহান বানাব”- এটাই সবচেয়ে বড় চাপাবাজি; অর্থহীন কথাবার্তা। খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রফেসর প্রশ্ন তুলেছেন, ট্রাম্পের শ্লোগান – এখানে যে গ্রেট বলা হয়েছে, এই গ্রেট মানে কী? কী হলে তা গ্রেট হবে, এর সংজ্ঞাই বা কী? যদি এ শব্দ দিয়ে সম্পদ বা সম্পদের দিক থেকে গ্রেট বোঝানো হয়ে থাকে তবে তিনি এক পরিসংখ্যান দেখিয়ে বলছেন, ‘১৯৮০ থেকে ২০১৪, মাত্র এই ৩৪ বছরেই আমেরিকার সম্পদ বেড়েছে ২১ গুণ। এর অর্থ আবার আমেরিকান ধনী মাত্র এক শতাংশ, এদের সম্পদের ১৯৪ গুণ বৃদ্ধি পাওয়া। তার অর্থ আমেরিকা গ্রেট ছিল না, এ কথা তো সত্যি নয়। কিন্তু সে আর কত গ্রেট হবে! তাই ধরে নেয়া যায়, সম্পদের চেয়েও ভিন্ন, সম্পদ ছাড়িয়ে আরো বড় কিছুর দিক থেকে গ্রেট হওয়ার কথা ট্রাম্প বলছেন। তা হল, সম্পদের সঞ্চয় নয়, সম্পদের বিতরণ। ওই প্রফেসর বলছেন, এ কথা দিয়ে আসলে ব্যাখ্যা করা যায় ট্রাম্প কাদের পটিয়ে ভোট নিয়েছেন; কলেজ-না-পৌঁছানো যে শ্রমগোষ্ঠী আছে প্রকারান্তরে তাদের কথা বলছেন। যাদের কথা বলছেন তাদের বেলায় হয়ত  কথা ঠিক কিন্তু তাদের জন্য তিনি তা আনতে পারবেন না। কারণ বিষয়টা এত সহজ-সরল নয়।’
কোল্ড ওয়্যার যুগের সস্তা জাতিবাদী বুঝি। সব ধরনের আমদানি করা পণ্যের ওপর ৪৫ শতাংশ হারে কর আরোপ করলেই সব কিছু আমেরিকায় উৎপাদন করা আবার শুরু হয়ে যাবে এটা বোকার মতো কথাবার্তা। যদি তা-ই হতো তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সত্তর দশকের মধ্যে, এর আগে সুন্দর দিন কাটানোর আমেরিকা ভেঙে গ্লোবালাইজেশনে যাওয়া হয়েছিল কেন? খামোখা? নিজের পায়ে কুড়াল মারার জন্য? আমেরিকা নিশ্চয় বাংলাদেশ নয়। ফলে কে এবং কী তাকে বাধ্য করেছিল? নাকি আসলে প্রলুব্ধ করেছিল?
আঙুর ফল মিঠা হলেও সময়ে তা হয় উল্টা, আঙুর ফল খাট্টা বলার সময় হয়ে যায় একটা সময়। আপনি অন্যকে বাজারে প্রবেশে বাধা দেয়া মানে, সেও তার বাজারে অন্য পণ্যে আপনাকে প্রবেশে বাধা দেবে। আবার খুব সাবধান, এখানে বাজার বলতে শুধু ‘তৈরী ভোগ্যপণ্যের বাজার’ বুঝানো হয় নয়। ‘বাজার’ মানে আসলে বিনিয়োগপুঁজি, কাঁচামাল, টেকনোলজি, মেশিনারি, শ্রম ইত্যাদি সব কিছুরই বাজার। ‘বাজার’ মানে শুধু প্রান্তিক ভোগ্যপণ্য যা কনটেইনার জাহাজে ভরে আনা-নেয়া করে শুধু তা-ই নয়  – বরং সব কিছুই। এমনকি পুঁজি এবং শ্রমও। ফলে আমেরিকা শুধু সে তার নিজ দেশে বিদেশী পণ্য রফতানি হতে দেবে না, তা বাস্তবে করা সম্ভব নয়। কারণ যে দেশ পণ্য রফতানি করবে সে পুঁজিবিনিয়োগও করবে। এটা ঠেকানো যাবে না সবকিছুই করবে – এর ব্যতয় ঘটানো এক কথায় অসম্ভব। যেমন আমেরিকা সরকারের আয়-ব্যয়ের এক বড় উৎস সরকারি বন্ড। দেশি বা বিদেশিরা এই বন্ড কিনে। আজ যেখানে চীন ও জাপান প্রত্যেকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি (চীনেরটা আরো বেশি) করে বন্ড কিনে রেখেছে, সেখানে পণ্য প্রবেশ বন্ধ করার যুদ্ধ কতটা বাস্তবায়ন সম্ভব?

তত্ত্ব দিয়ে এই প্রসঙ্গে আলোচনা অনেক করা যায়। দেখানো যায়, এটা কেন অসম্ভব। তবে এর চেয়ে বরং ট্রাম্পের শপথের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা ট্রাম্পের সমর্থক তরুণ যারা নানান রাজ্য পেরিয়ে ট্রাম্পের ‘ভোট দেয়ার বিপ্লবে’ যোগ দিতে ওয়াশিংটনে এসেছিলেন তাদের কিছু অভিজ্ঞতা তুলে ধরা যাক। সংবাদ সংস্থা ‘রয়টার্স’ ট্রাম্পের নির্বাচনে নানা ইস্যুতে শুরু থেকেই সমালোচক। বিশেষ করে, ট্রাম্পের ভোটে জয়লাভের পর থেকে যেসব ক্যারিকেচারও স্ববিরোধিতা ফুটে বের হচ্ছে সেগুলো তুলে আনার ক্ষেত্রে। শপথ নেয়ার দিনে রয়টার্সের এমন এক নিউজ হল, ‘ট্রাম্প রেড ক্যাপ’ প্রচার অভিযান নিয়ে। ‘ট্রাম্প রেড ক্যাপ’ বা লাল টুপির ঘটনা হল, উগ্র জাতিবাদী ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণীর বাস্তবায়ন করতে যাওয়া হয়েছে লাল টুপি পরে। রয়টার্স ওই তরুণদের টুপি খুলিয়ে দেখাচ্ছে যে, তাদের সব টুপিই বিদেশে তৈরি, হয় বাংলাদেশের, না হয় ভিয়েতনামের, না হয় চীনের। কেন? কারণ ট্রাম্পের টুপি প্রচারাভিযানের মূল প্রপাগান্ডা অফিসে যেসব টুপি বিক্রির জন্য রাখা ছিল ওগুলো খোদ আমেরিকায় তৈরি ফলে এর দাম বেশী, কমপক্ষে ত্রিশ ডলার বা তারও বেশি। কত বেশি? বিদেশী (বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম বা চীনের) টুপির  তুলনায় বেশি, বিদেশী ওই তিন দেশের টুপির দাম বিশ ডলার বা এর নিচে। ফলে স্বভাবতই ঐ প্রচারাভিযানে সবাই সস্তা নামে পাওয়া টুপি পড়েই এসেছে – বাজারের স্বভাব অনুসারে। অর্থাৎ আমেরিকার তৈরি টুপি নিজ সমর্থকেরাই কম পরেছে। এই হলো ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট”-এর তামাশা এবং পরিণতি।

মনে রাখতে হবে, ট্রাম্পের এই আমেরিকাই গত সত্তরের দশক থেকে দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশন যেতে বাধ্য করেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক-আইএমএফ আমাদেরকে নিজ বাজারের রক্ষণশীলতা ছেড়ে গ্লোবালাইজেশনে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাপাচাপির মাধ্যমে বাধ্য করে এসেছিল। আজ ট্রাম্প নিজেই গ্লোবালাইজেশন ছেড়ে উলটা সংরক্ষণবাদিতা বা প্রোটেকশনিজমে যাওয়ার কথা বলছেন।

আজ সোজা কথাটা হল, গ্লোবাল বাণিজ্য বেচাকেনা বিনিময়ের মাধ্যমে একটা পরস্পর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়ে গেছে এবং তা যে স্তরে যে জায়গায় চলে গেছে, এ থেকে আগের জায়গায় ফিরে যাওয়া কঠিন। চাল-ডাল মিশে গেলে যেমন এগুলোকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া কঠিন। ট্রাম্পের জয়লাভের পর গত দুমাসে গ্লোবাল অর্থনীতির সমন্বয় আর গ্লোবাল বাণিজ্যবিষয়ক দু’টি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। প্রথমটা ল্যাটিন আমেরিকার পেরুর লিমা শহরে ‘এপেক’ (বাণিজ্য) সম্মেলন। আর দ্বিতীয়টা সুইজারল্যান্ডের ডাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলন, যেটার অংশগ্রহণকারি গ্লোবাল। তবে দুটোতেই সুর পরিষ্কার, আমেরিকা সংরক্ষণবাদী হতে চাইলে তাকে পেছনে ফেলে বা উপায়ান্তে তার হাত ছেড়ে দিয়ে হলেও চীনের নেতৃত্বেই দুনিয়া গ্লোবালাইজেশনে এগিয়ে যাবে। যেতে হবে। জাপান ট্রাম্পের ওপর হতাশ হয়ে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করতে চাচ্ছে। চীন-ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক উষ্ণ হতে যাচ্ছে। দুনিয়া সাজানোর সব হিসাব নতুন করে সাজতে বাধ্য। আসলে বিষয়টা হল- গ্লোবাল বাজার নিজের শেয়ার বাড়ানোর, নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ২২ জানুয়ারী ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে যেকোন যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

ট্রাম্পের টুইট – তাঁর নিউক্লিয়ার জ্ঞান

ট্রাম্পের টুইট – তাঁর নিউক্লিয়ার জ্ঞান

গৌতম দাস
০৫ জানুয়ারি ২০১৭,  বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-2aU

রাজনীতিবিদ অথবা সরকারপ্রধান বা মন্ত্রীদের আজকাল সোস্যাল মিডিয়াতে পাওয়া খুবই সহজ বিষয় হয়ে গেছে। বিশেষ করে রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট অনেক খ্যাতিমানেরা প্রায়ই টুইটার ব্যবহার করেন। তুলনায় তারা অবশ্য ফেসবুকে কমই আসেন। তাদের টুইটার ব্যবহারে বেশি আগ্রহের মূল কারণ সম্ভবত টুইটারের ১৪০ অক্ষরের সীমা। এমন কোন সীমা ফেসবুকে নাই। টুইটারে অক্ষরের সীমা থাকার কারণে ফেসবুক থেকে এর বৈশিষ্ট অনেক দিক থেকে আলাদা হয়ে গেছে। যেমন- প্রথমত, এটাকে ব্লগ থেকে পৃথক ক্যাটাগরি ‘মাইক্রো-ব্লগ’ বা ছোট ব্লগ বলে আলাদা করা যায়। দ্বিতীয়ত, যে কথা লিখা হবে তা আগে চিন্তা করে গুছিয়ে এরপর লিখতে হবে। তবেই অল্পে কথা হবে। ফলে টুইটারের লেখা সাধারণত কম্প্যাক্ট হয়। তৃতীয়ত, টুইটার ইন্টারেকটিভ নয়, মানে মন্তব্য কথোপকথন এর মত করে সে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করে তৈরি করা হয়নি। এই অর্থে টুইটারকে আসলে ওয়ান ওয়ে বা একপক্ষীয় মিডিয়া বলা যায়। টিভির মতো যে একাধারে নিজে বলেই যায়, শ্রোতাকে বলতে দেয় না। এ দিকে অবশ্য এটাও ঠিক, সেলিব্রিটি বা খ্যাতিমানেরা কাউকে বলতে দিতে চান না, কেবল শোনাতে চান। আর তাদের শোনার সে সময় কই?
এভাবে টুইটারের বৈশিষ্ট নিয়ে আরো অনেক পয়েন্ট লেখা যায় হয়ত। থাক সে কথা। আসল কথা হল – ১৪০ অক্ষর। ফলে এখানে অল্প লিখে ফাঁকি দেয়াও যায়। কিন্তু টুইটারের বিষয়ে আলাপ তুললাম কেন? আর তার সাথে ফাঁকির কী সম্পর্ক? সম্পর্কের নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। টুইট লিখলে যেহেতু কম কথা লিখতে হয়, ফলে লেখার সাথে আবার কোনো ছোট বা বড় ব্যাখ্যা লিখতে হয় না ফলে পাঠল কেউ আশা করে না। কারণ ব্যাখ্যা লেখার সুযোগ বা জায়গা নেই। এ এক বিরাট অজুহাত। ফলে যা লিখছি এর ব্যাখ্যা জানি আর না-ই জানি, তা ব্যাখ্যা করার দরকার হয় না বলে অজ্ঞদের জন্য টুইট খুবই কাজের জিনিস। না, আমি এটা বলছি না যে- যারা টুইট করেন তারা সব অজ্ঞ। তবে বলছি, অজ্ঞদের টুইট লেখার বিশেষ সুযোগ আছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউক্লিয়ার বা পারমাণবিক যুদ্ধের অস্ত্র বিষয়ে একটি টুইট লিখেছেন এভাবেঃ “The United States must greatly strengthen and expand its nuclear capability until such time as the world comes to its senses regarding nukes”। এখান থেকে আমার অনুমান অচিরেই হয়ত বেইজ্জতি এড়াতে ট্রাম্পকে টুইট লেখা বন্ধ করে দিতে হবে। কেন?
টুইটের বক্তব্য বাংলা করে লিখলে হবে, “আমেরিকাকে অবশ্যই বেশ বিশাল করে তার নিউক্লিয়ার সক্ষমতা শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করা উচিত, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না দুনিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কে হুঁশ আসে।” – এই ছিল বিদ্যাধর ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইট – ১৪০ অক্ষর।
অনুবাদ লেখকের; যারা মূল খবরের উৎস থেকে পড়তে চান তারা দুই দিন আগে ২২ ডিসেম্বরের রয়টার নিউজ এজেন্সির রিপোর্ট দেখে নিতে পারেন। ট্রাম্পের টুইটের কয়েক ঘণ্টা পরই ওই রিপোর্ট লিখে প্রকাশিত হয়েছিল।

সময়ের বিচারে দুনিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাস বা আয়ু খুবই স্বল্প। যুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে দুনিয়াতে এর প্রথম জোড়া ব্যবহারটাই শেষ ব্যবহার হয়েছিল। আর স্বল্প তিন দিনের গ্যাপে এই জোড়া ব্যবহার, দুটোই ঘটেছিল জাপানের ওপর; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট আমেরিকার হাতে এই তিন দিনের ব্যবধানে। তাও সেটা ওই যুদ্ধে শত্রু জাপানের বিরুদ্ধে আমেরিকার জয়-পরাজয় নির্ধারণের জন্য নয়, বরং জয় নিশ্চিত হয়ে গেলে পরেও, এ সুযোগে বোমা ব্যবহারের পরীক্ষা করে এর পরিণতি জেনে রাখার জন্য করা হয়েছিল। আর তাতেই – এর মারাত্মক ভয়াবহতা যা বোঝাবুঝি তা শেষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের চতুর্থ টার্মের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন হ্যারি ট্রুম্যান। ১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাসে চতুর্থবার প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়ার কয়েক মাসের মধ্যে, ১২ এপ্রিল ১৯৪৫ রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে পরে ওই দিন থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ৩৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। আর এর প্রায় চার মাসের মাথায় ঐ ৬ আগস্ট ও ৯ আগস্ট ১৯৪৫ ট্রুম্যান জাপানের ওপর পারমাণবিক বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত দেন এবং তা পালিত হয়।

কিন্তু এরপরই হ্যারি ট্রুম্যান মূলত এই বোমা ব্যবহারের বিরোধী হয়ে যান। যদিও কোরিয়া যুদ্ধে (১৯৫০-৫৩) আমেরিকার জড়িয়ে যাওয়ার পটভূমিতে ১৯৫০ সালের ৩০ নভেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্নের মুখে তাকে স্বীকার করতে হয় যে ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের জন্য তৈরি’। কিন্তু পরের বাক্য যোগ করে তিনি বলেন, ‘এই অস্ত্র দ্বিতীয়বার তিনি ব্যবহার করতে চান না’। এটাকে ‘এক ভয়ঙ্কর অস্ত্র’, এটা ‘কারো ব্যবহার করা উচিত না’ বলে কথা শেষ করেন। আর ১৯৫৩ সালে ১৫ জানুয়ারি (তিনি দুই টার্মে প্রেসিডেন্ট ছিলেন) কংগ্রেস বা আমেরিকান সংসদে তার বিদায় ভাষণে যিশুর নামে কসম কেটে তাকে কৃতকর্মের পক্ষে সাফাই-মূলক প্রচুর কথা খরচ করতে হয়। কেন তিনি পারমাণবিক বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন এর একটি দুর্বল সাফাই তার ছিল। যেমন- “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকানোর জন্য” নাকি তাকে এটা করতে হয়েছিল। এ ছাড়া আর এক দুর্বল সাফাই ছিল তাঁর যে, ইতোমধ্যে আমেরিকার বোমা ফেলার আট বছর পার হয়ে গেছে ইতোমধ্যে অন্যান্য রাষ্ট্রও (ব্রিটেন ১৯৫২, সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯) এমন বোমার অধিকারী হয়ে গেছে। অর্থাৎ তিনি আর একা দোষী নন যেন এটাই বুঝে নিতে বলছিলেন। আর সেই সাথে তিনি বুঝেছিলেন তার সাফাই যথেষ্ট নয়। আর তাই প্রকারান্তরে তা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘স্টার্টিং আ অ্যাটমিক ওয়ার ইজ টোটালি আনথিঙ্কেবল ফর এ র‌্যাশনাল ম্যান’। বাংলা বললে, ‘যুক্তিবুদ্ধিতে চলা মানুষের পক্ষে একটা পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু করা অচিন্তনীয়’। মডার্ন যুগ মানে, আধুনিক রাষ্ট্র-কায়েমের কালে আধুনিক দুনিয়ায় পশ্চিমের পৌঁছানোর পর থেকে, সেই সমাজের মাপকাঠিতে ‘র‌্যাশনাল’ মানুষ মানে আল্লাহর ভয় থাকুক আর না-ই থাকুক কিন্তু ‘সর্বোচ্চ যুক্তিবুদ্ধিতে হুঁশজ্ঞানওয়ালা মানুষ’ মনে করা হয় যাকে।
পরবর্তীকালে ১৯৬০ সালের মধ্যে চীন আর ফ্রান্সসহ আমেরিকা, ব্রিটেন আর সোভিয়েত ইউনিয়ন এই মোট পাঁচ রাষ্ট্র পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়ে যায়। যদিও ট্রুম্যান সেই ১৯৪৬ সাল থেকেই জাতিসঙ্ঘের অধীনে এই অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিষিদ্ধ করার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু অন্য চার রাষ্ট্র বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে বিশ্বাস করেনি। করার কারণও ছিল না। কারণ ট্রুম্যানের প্রস্তাবের মূল সমস্যা ছিল, তিনি এমন প্রস্তাব দিচ্ছেন যখন ইতোমধ্যে আমেরিকা বোমা প্রস্তুত ও ব্যবহারকারী এবং সব টেকনিক্যাল ও ব্যবহারিক ডাটা একমাত্র নিজ রাষ্ট্রের হেফাজতে। ফলে তিনি সব রাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়েই আছেন। মানে সে বাদে ওই পাঁচ রাষ্ট্র একেবারে বোমা হাসিল করে আমেরিকার সমান হওয়ার আগে এই বোমা নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণের পথ ধরা সঠিক মনে করার কোনো কারণ নেই। ইতিহাসে পাওয়া যায়, এ দিকটাও ট্রুম্যান প্রশাসনের মন্ত্রী-উপদেষ্টারা চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু তারা নিজেরাই বিভক্ত হয়ে পড়েন এভাবে যে, একদল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে এই টেকনোলজির সব কিছু শেয়ার করার পক্ষে ছিল। অন্য পক্ষ মনে করে- সব কিছু শেয়ার করার পর এই বোমা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবে সোভিয়েতরা যদি উল্টে যায়, আমেরিকা যদি প্রতারিত হয় তাহলে কী হবে? সারকথায় বিশ্বাসের অভাব ছিল মারাত্মক। এ ছাড়া প্রত্যেকে বোমা হাতে পেলেই (মানে আসলে টেকনোলজি করায়ত্ত হওয়া) একমাত্র আমেরিকার সমান হবে এই ভাবনার কারণে বোমার নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার জন্য সমঝোতা হয়নি।
কিন্তু তবু প্রস্তাব চালাচালি অব্যাহত ছিল। যেমন ট্রুম্যানের পরের প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ারও ১৯৫৩ সালের সাধারণ পরিষদের বক্তৃতায় প্রস্তাব রেখেছিলেন। ১৯৫৪ সালে লিখিত প্রস্তাবও রেখেছিলেন। তবে দুনিয়াব্যাপী পারমাণবিক বোমাবিরোধী মনোভাব বাড়ছিল। এটা ধরা পড়ে ১৯৫৮ সালে সারা দুনিয়ার ১০ হাজার বিজ্ঞানী একসাথে স্বাক্ষর করে জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারির দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক আবেদন পাঠিয়েছিলেন। তবে ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেই বোমার অধিকারী হয়ে যাওয়াতে আর অনেক নিগোসিয়েশনের পর ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে প্রথম জাতিসঙ্ঘের অধীনে বোমা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘আন্তর্জাতিক অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন’ গঠিত হয়। এরপরও প্রায় ১০ বছর পরে ১৯৫৮ সালে প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা পারমাণবিক বোমাবিরোধী আন্তর্জাতিক সমঝোতা চুক্তি এনপিটি বা নন প্রোলিফারেশন ট্রিটি তে স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুসারে এটা ২৫ বছর পরে রিভিউ হওয়ার কথা ছিল। ১৯৯৫ সালে এটা আবার রিভিউ হয়ে নতুন করে গৃহীত হয়। এবং সংযোজিত আর এক নতুন চুক্তিতে আরো পোক্ত হয়। এবার শুধু বোমা বানানো নয়, পারমাণবিক বোমা পাওয়ার লক্ষ্যে ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বোমা বানিয়ে বাস্তবে টেস্ট করাও নিষিদ্ধ করার চুক্তি ‘সিটিবিটি’ নতুন সংযোজন হিসেবে এবার এটাও স্বাক্ষরিত হয়। অবশ্য ১৯৯১-৯২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া ও কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি এ ক্ষেত্রে এসব চুক্তি করতে পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করেছিল। ওদিকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বাইরে বোমা বানানোতে নিজে স্বীকৃত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভারত পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া যুক্ত হয়েছে। ভারত ১৯৭৪ সালে, পাকিস্তান ১৯৯৮ সালে সফল পরীক্ষাকারীর দলভুক্ত হয়। গত ১৯৯৮ সালে ভারত নতুন করে বোমা বানিয়ে সফল পরীক্ষা করার পর ক্লিনটনের আমেরিকা ভারতের ওপর অবরোধ আরোপ করেছিল। একইভাবে পাকিস্তানের ওপরও। কিন্তু এখনো এনপিটিতে স্বাক্ষর না করা রাষ্ট্র হিসেবে ভারত-পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া বহাল আছে। যদিও এই টেকনোলজি ও ম্যাটেরিয়াল পাওয়ার ক্ষেত্রে সরবরাহকারী রাষ্ট্রগুলোর ক্লাব নিউক্লিয়ার সাপ্লাই গ্রুপ (বা এনএসজির) সভায় ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তাদের শর্ত আরো কঠিন হয়ে আছে।
সারসংক্ষেপে এটাই পারমাণবিক বোমার জন্ম ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ ইতিহাস। বললাম কেন? বললাম এ জন্য যে ট্রাম্প এক টুইট করে এই ৬৬ বছরের ইতিহাস মুছে ফেলে আবার যেন ১৯৫০ সালে আমেরিকায় ফেরত যেতে চান, তা-ই বলছেন। তিনি আমেরিকার নিউক্লিয়ার সক্ষমতা শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করা দরকারের কথা অবলীলায় মাত্র ১৪০ অক্ষরের মধ্যে খুবই সহজে সেরে ফেলেছেন। এটা তাদের দ্বারাই সম্ভব, যারা পারমাণবিক বোমার জন্ম ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পৌঁছানোর ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ। কারণ অজ্ঞদের সুবিধা সবার চেয়ে বেশি। আমরা কল্পনা করতে পারি, এক খোশমেজাজি পার্টির কথা, যেখানে রাজনীতিবিদ বন্ধুদের সাথে সহপাঠী ব্যবসায়ী বন্ধুদের অনেক দিন পরে দেখা হয়েছে। তো ব্যবসায়ী বন্ধুরা যেভাবে সহজেই সরকার চালানো বন্ধুদের বিভিন্ন ইস্যুতে সবক দিয়ে থাকে তেমনই আর কী! যেন বলছে ও তোরা ওমুক জিনিসটা কন্ট্রোল করতে পারলি না? আমাকে একবার প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দে, দেখো আমি দুই দিনে করে সব ঠিক করে দেখাচ্ছি!
এমন কথা আমরা অনেকেই বলতে শুনেছি ও দেখেছি। অন্তত ‘এক দিনের মুখ্যমন্ত্রী’ এই কল্পনায় তৈরি হিন্দি সিনেমা ‘নায়ক’ দেখেছেন অনেকেই। তখন একজন ট্রাম্প হওয়া সহজেই সম্ভব। কিন্তু যেসব ইস্যু দুনিয়ার রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর নানা লড়াই-ঝগড়া আর আপসের ফলাফলে সবসময় নির্মিত হয়ে চলে এগুলো নিয়ে তুড়ি বাজিয়ে পার্টিতে সমাধান বাতলানো তখনই সম্ভব, যখন আমরা ইতিহাসের ঘটনাবলি সম্পর্কে বেখবর থাকি। কারণ অজ্ঞতা এক বিশাল বাড়তি সুবিধা দেয়। কিন্তু ব্যবসায়ী ট্রাম্প যে এখন আর কোনো পার্টির চাপাবাজ নন, বাস্তবেই তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট? তাহলে এখন কী হবে?
ওপরে যে পারমাণবিক বোমার ধারাবাহিকতা আমরা দেখেছি তা আসলে এ বোমার উদ্ভব, তৈরি, ব্যবহার এবং পরিণতিতে এর ভয়াবহতা বোঝার পর সেই ১৯৪৫ সাল থেকে এ টেকনোলজিকে নিয়ন্ত্রণ এবং পরে সম্পূর্ণ বন্ধের দিকে গেছে। এখন এ গ্রাফের ঝোঁক হলো এ টেকনোলজি লুপ্ত করে ফেলা। এটা এ ইতিহাস দেখে যে কারো বোঝার কথা। আমেরিকার মতো দেশের যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তার কী এতটুকু আক্কেলজ্ঞান নেই, যে টেকনোলজি গ্লোবাল ঝোঁক লুপ্তপ্রায়ের দিকে তাকে আবার জাগাতে চাওয়াটা কী সম্ভব, না করা উচিত? যেখানে এমনকি এ টেকনোলজির বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারও জার্মানি ও জাপানের মতো দেশ ২০২৫ সালের পর সম্পূর্ণ বন্ধ করার পরিকল্পনা করে ফেলেছে সেখানে এ টেকনোলজির ‘সক্ষমতা শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করা উচিত’ এ কথা কী করে একজন হবু প্রেসিডেন্ট বলেন?
প্রেসিডেন্টের মুখ ও লিখিত নির্দেশ কোনো (পার্টির চাপাবাজি ধরনের) বেফাঁস কথা বলে বিপর্যয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ। কারণ প্রেসিডেন্টকে সাহায্য করতে প্রত্যেক বিষয়ে অজস্র মন্ত্রী-উপদেষ্টা এক্সপার্ট নিয়োগ দেয়া থাকে। তাদের ব্রিফিং সব নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। কিন্তু টুইট করা? প্রেসিডেন্ট উপদেষ্টার পরামর্শ নিয়ে টুইট করবেন? না এটা খুবই হাস্যকর। কিন্তু কী আর করা। রয়টার জানাচ্ছে, এখনই ট্রাম্পের নিয়োজিত এক মুখপাত্র আছে। যাকে নিয়মিত মিডিয়ার চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। কারণ বোকা বোকা টুইট লিখে ট্রাম্প যেন খুব মজা উপভোগ করেন। মজার খেলা একটা তিনি পেয়েছেন আর ওদিকে মুখপাত্রের প্রাণ যায়। রয়টার্স বলছে, ওই মুখপাত্র নানাভাবে ট্রাম্পের টুইট খেলাকে গুরুগম্ভীর দিকে অর্থ টানার কসরত করেই চলছেন। তিনি এবার বলেছেন, ট্রাম্পের ওই টুইটকে যেন ‘এ বিষয়ে আমেরিকার কোনো নতুন পলিসি বদল হিসেবে কেউ না দেখে, প্লিজ’। আচ্ছা এ কথাটাই কী ট্রাম্প মজা করা এক বালক মাত্র, তাই বলছেন না?
এখন একটাই পথ বাকি আছে। ট্রাম্প যদি টুইট করা বন্ধ না করেন, তবে শপথ নেয়ার পরের কয়েক মাসের মধ্যে তিনি ইজ্জত নিয়ে টানাটানির মুখোমুখি হবেন, সম্ভবত।
ওদিকে ট্রাম্পের এ টুইটের বক্তব্য স্ববিরোধী। তিনি বলছেন, একালে আমেরিকার আসল শত্রু ‘টেররিজম’। ফলে কোল্ড ওয়ারে শত্রুতা সোভিয়েতের কথা ভেবে এখনো ন্যাটো টিকিয়ে রাখা অপ্রয়োজনীয়। এ ছাড়া জার্মানিতে বা জাপানের মতো যেখানে এখনো আমেরিকান মিলিটারি ব্যারাক আছে, তাদের খরচ নিজ নিজ রাষ্ট্র বহন করুক। তাহলে সেই ট্রাম্প আবার পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জা বাড়ানোর পক্ষে কথা বলেন কী করে? পোলাপান কখন কী করলে সে যে মজা পায়, সে নিজেও জানে না! তাই কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ২৫ ডিসেম্বর অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার এডিট করে আবার ছাপা হল।]