চীন-ভারত ডোকলামে মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

চীন-ভারত ডোকলাম মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

গৌতম দাস

০১ আগষ্ট ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2gF

 

ডোকলাম ভুটানের এক উপত্যকা। উপরে ছবিতে দেখুন নেপাল ও ভুটানের মাঝে কা্লো অংশ, যেটা আসলে সিকিম, যা এখন ভারতের অংশ। এই অর্থে নেপাল-ভুটানের মাঝে ভারত আছে। কিন্তু পুরাটাই ভারত নয়। এর কিছু অংশ আবার চীনের ভুখন্ড। চীনের ঐ ভুখন্ডের লাগোয়া এক অংশ হল ভুটানের ডোকলাম উপত্যকা। অর্থাৎ সারকথায় ডোকলাম ভুখন্ডের বিতর্ক মূলত ভুটান-চীনের মধ্যে সীমান্তের বিতর্ক। ভারতের কোন ভুখন্ড এটা নয়। এটা তাই কোনো মতেই চীন-ভারতের কোনো সীমান্ত-ভুখন্ডই নয়। চীন সেই সীমান্ত বরাবর থাকা কাঁচা রাস্তাকে ৪০ টন ভারবহনে সক্ষম এমন পাকা রাস্তায় উন্নীত করার কাজ শুরু করতে গেলে বিতর্ক শুরু হয়।

ভুটানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুসারে গত ১৬ জুন ২০১৭ ডোকলামের ডোকলা থেকে সীমান্তবর্তি যে রাস্তা যোমপেলরিতে ভুটানিজ আর্মি ক্যাম্পের দিকে গেছে, সীমান্তবর্তি সে রাস্তার পাশেই কাজ করতেই চীনারা এসেছিল। চীনা ভাষ্যও প্রায় এরকমই যে, সীমান্ত বরাবর ওই রাস্তাতেই চীনের পরবর্তী সীমান্ত ক্যাম্প পর্যন্ত রাস্তা তৈরি ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাদের সামনে কাজে বাধা সৃষ্টি করে বসে যায়।

তবে ভারতীয় সেনা কেন? সীমান্ত বিতর্ক তো ভুটান-চীনের মধ্যে। এ ব্যাপারে ভারতের যুক্তি হল, ভুটান স্বাধীন রাজার রাষ্ট্র (যা এখন কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র) বটে। কিন্তু ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার পর ১৯৪৯ সালে ভূমিবেষ্টিত ভুটানের বিদেশনীতির বিষয়াদি দেখার জন্য ভারত-ভুটান এক চুক্তি হয়েছে। এ ধরনের দাসখত চুক্তিগুলোর গালভরাভাবে নাম রাখা হয় ‘শান্তিচুক্তি’ বা ‘বন্ধুত্বচুক্তি’; এখানেও তাই হয়েছিল। এটা হল অন্যের ভূমিবেষ্টিত অবস্থার প্যাঁচে পড়াকে কেন্দ্র করে তার দুরবস্থার সুযোগ নেয়া। নেহেরুর ভারত ল্যান্ডলকড ভুটানের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে ঐ চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল।  ১৯৪৯ সালের ওই চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ভুটানের বিদেশনীতি ভারতের পরামর্শে গাইডেড হতে হবে। [“……Bhutan agrees to be guided by the advice of the Government of India in regard to its external relations.”]

যদিও ১৯৭৯ সালে ভুটানের রাজার এক সাক্ষাৎকারের রেফারেন্সে অনেকে দাবি করেন যে, ভুটানের রাজা মনে করেন ওই অনুচ্ছেদে বলা ভারতের পরামর্শ ভুটানের জন্য ‘অবশ্য পালনীয়’ এমন কথা লেখা নেই। [“India’s advice in the conduct of foreign affairs was welcome but “not binding” on Bhutan, he said.] তবে ডোকলাম ইস্যুতে ভারতীয়রা ওই চুক্তির অজুহাতে “ভুটানের অনুরোধে” সেখানে সেনা হাজির করেছে বলে জানায়। ফলে স্বভাবতই চীনারাও পরে সেখানে পাল্টা সেনা সমাবেশ ঘটায়। দুই সেনাবাহিনী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।   আর সেই থেকে ব্যাপারটা চীন-ভারত সম্ভাব্য সীমান্তযুদ্ধের টেনশন হয়ে হাজির হয়ে পড়েছে। স্বভাবতই চীনের দিক থেকে জানানো হয় তারা নিজ ভূখণ্ডেই তৎপরতা করছে; ফলে নিঃশর্তভাবে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করার দাবি করে চীনারা।

অবস্থা এখন এমনই যে ভারতেরই এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কূটনীতিক পি স্তবগান (P stobdan) লিখছেন, ভারতের ভুটান নীতি একটা কলোনিয়াল চিন্তা ভাবনা। ভারতের আসল সমস্যা তার ভুটান নীতি, ভুটানের সীমান্ত নয়।  নী  শিরোনামে একটা উপসম্পাদকীয় লিখে বলছেন,  ভারতের ভুটান নীতি কলোনিয়াল কাঠামো চিন্তা। এটা কাজ করবে না, টিকবে না, এটা বুদ্ধিমান বিদেশনীতির চিহ্ন নয়। (This approach was not sustainable; nor was it a sign of prudent foreign policy.) সে তুলনায় গত কয়েক বছরে চীন অনেক বেশি গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে ফেলেছে।

তবে এই প্রথম চীনের দিক থেকে এক তাৎপর্যপূর্ণ যুক্তিও দেয়া হয়। বলা হয়, চীন-ভুটান সীমানা বিতর্কে যদি ‘শান্তিচুক্তির’ অজুহাতে ভারত নাকগলায় তবে কাশ্মির ইস্যুতেও পাকিস্তানের পক্ষে তৃতীয় রাষ্ট্র (মানে ইঙ্গিতে চীনের কথা বলা হলো) নিজের সেনা নিয়ে হাজির হয়ে যেতে পারে। চীনের এই যুক্তিতে দম আছে বলতেই হয়। এই বয়ানে মধ্যে ভারতের জন্য বিপদের কথা বুঝে ভারত অন্য এক যুক্তির দিকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ভারত এবার যুক্তি তুলে যে শিলিগুড়ির নিজের ‘চিকেন-নেক’ এলাকার নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারত ঐ  রাস্তা পাকা করার কাজ করতে চীনকে বাধা দিয়েছে।

চিকেন-নেক সম্পর্কে সংক্ষেপে বলে নেয়া দরকারঃ ব্যাপারটা হল, ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান মানে আজকের বাংলাদেশ ভারত থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণে ধরা যাক কলকাতা থেকে কোনো ভারতীয় আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ইত্যাদি ভারতের উত্তর-পুর্ব অঞ্চলের রাজ্যে যেতে চাইলে তার আর (ভিন্ন রাষ্ট্র বলে) বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকল না। তাদের যেতে হবে পুরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত একটা চক্কর ঘুরে। যেন বেনাপোল থেকে যে কুমিল্লা যেতে চায় তাকে বেনাপোল থেকে দিনাজপুর তেঁতুলিয়া, রংপুর, সিলেট হয়ে এরপরে কুমিল্লা- এভাবে। সরাসরি বেনাপোল থেকে ঢাকা হয়ে কুমিল্লা নয়। শুধু তাই নয়, তাঁকে যেতে হবে ভারতীয় ভূখণ্ড ধরে যা পাহাড়ি দুর্গম শুধু নয় এরচেয়ে এক বড় বিপদ আছে।  কলকাতা থেকে সাত রাজ্যে যেতে যাত্রাপথে শিলিগুড়িতে সবচেয়ে চিকন (চওড়া মাত্র ১৮-২০ কিলোমিটার, যার একদিকে নেপাল অন্যদিকে বাংলাদেশ) এক অংশ পাড় হতে হয়। ওই অংশকেই চিকেন-নেক বলা হচ্ছে। কারণ কম চওড়া বলে ওই চিকন অংশ রুদ্ধ করে দেয়া গেলে (কয়েকটা নষ্ট গাড়ি বা ভারী কিছু ফেলে রাস্তাগুলো ব্লক করে দিলেই হল) ভারতের, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের সাথে সাত রাজ্য যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে যাবে। উপরে ছবিতে চিকেন নেককে  ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখন  এই ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ এর অজুহাত তুলে ডোকলাম ইস্যুতে ভারত বলতে চাচ্ছে, ডোকলাম ভারতের ভূখণ্ড না হলেও সে চীনকে রাস্তা তৈরিতে বাধা দিয়েছে নিজের ঐ ‘চিকেন-নেকের’ নিরাপত্তার কথা ভেবে। এটাও খুবই দুর্বল যুক্তি, প্রায় যুক্তিহীন ভাসাভাসা কথার মত। শিলিগুড়ির চিকেন-নেক ভারতের জন্য ষ্ট্রাটেজিক অর্থে দুর্বল জায়গা সে কথা বুঝা যায়। কিন্তু ওই রাস্তা তা ভুটানের বা চীনের যারই অংশ হোক না কেন, আর তা পাকা বা কাঁচা রাস্তা যাই থাকুক, ‘চিকেন-নেক’ অংশ ভারতের সবসময় জন্য দুর্বলতা। রাস্তাটা পাকা হয়ে যাওয়াতে এরপর ওটা ভারতের জন্য দুর্বলতা হয়ে দাড়ায় তা তো নয়।

আচ্ছা আরেকটা প্রশ্ন : ভারত কি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমেরিকার সাথে গলাগলি করে চীনে সমুদ্রপথে প্রবেশের পথের ‘চিকেন-নেক’ সিঙ্গাপুরের ‘মালাক্কা প্রণালি’ কোথায় আছে তা খুঁজে বের করেনি? এটা ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথ তুলনামূলক চিকন হয়ে আসা একটা অংশ। এই ইস্যুতে আমেরিকান সিনেটের শুনানিতে প্রফেসরদের সাক্ষ্য দিয়ে বলা পিডিএফ নোট এখনো নেটে যে কেউ পেতে পারে।  [ US CONGRESS HEARING ON INDIA-US RELATIONSHIP  – চোদ্দ পৃষ্ঠার এই ডকুমেন্টে ষষ্ঠ পৃষ্টায় ‘চিকেন-নেক’ ‘মালাক্কা প্রণালির’ ছবি দিয়ে চিনানো আছে।  এখানে কোনো জাহাজ ডুবিয়ে দিলেও এই সমুদ্রপথ (চীনে প্রবেশপথ) ব্লক হয়ে যেতে পারে। প্রণালি বা ইংরেজিতে strait মাত্রই সমুদ্রপথে এটা চিকন গলার সমস্যা। কিন্তু মালাক্কা প্রণালি ভারতের ত্রিসীমানার কোনো স্থান নয়। তবু আমেরিকার প্ররোচনায় ভারত কী আমেরিকার কৌশলগত পরিকল্পনায় শামিল হয়নি? গত ২০০৫ সাল থেকে ভারত আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ কাজে শামিল হয়েছে। তখন থেকেই কে কার চিকন গলা ধরতে পারে বা এর মজা কি সে কথা আমরা শুনে আসছি। কাজেই ‘কারো চিকন গলা চেপে ধরা কোন খারাপ কাজ না’- এমন নৈতিকতা বা আইন তো ভারতই মানে নাই। এমন পদক্ষেপ সে চীনের আগেই চীনের বিরুদ্ধে অভ্যাস নিয়ে ফেলেছে।  কাজেই চীন যদি ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরে চিকন গলা চেপে ধরে আসে সেটাকে অন্যায় বলার নৈতিকতা ভারতের নাই।  তবুও আমরা মনে করি এসব কাজ সবার ছেড়ে দেয়া উচিত। কোনো রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পণ্য চলাচলে অন্য রাষ্ট্রের বাধা তৈরি করা অন্যায়, নীতিগতভাবে সবার এই অবস্থান বাস্তবায়নে আসা উচিত।

ইতোমধ্যে এখানে আর এক মজার কাণ্ড ঘটে গেছে। ডোকলাম বিরোধ ঘটনার তিন সপ্তাহের মধ্যে খোদ ভারতেই মোদি সরকার নিজের সিদ্ধান্তের কারণে একঘরে হয়ে যায়। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ভারতের মিডিয়ার রিপোর্ট। এমন একটা রিপোর্ট হল, ১৫ জুলাইয়ের আনন্দবাজার পত্রিকা; যার শিরোনাম ‘ভুটানের আর্জিতে দুশ্চিন্তা, দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’। ওর সারকথা ছিল, ডোকলামে সৈন্য সমাবেশের দায়, সামরিক উত্তেজনা তৈরির দায় একা মোদি ও তার সরকারের বলে সব বিরোধী দল আর একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে এক বড় অংশ সবাই হাত ধুয়ে ফেলেছিল। মোদি সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন পরামর্শ নেয়ার জন্য সেখানকার ঘটনা এটা। অথবা বলা যায়, সম্মানজনক পশ্চাত-অপসারণের উপায় খুঁজতে সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন মোদি। ওই সভার সিদ্ধান্ত, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে সেখানে একটাই কথা, সৈন্য প্রত্যাহার করে কূটনীতির পথ হাতড়ানোতেই সমাধান।

কিন্তু সবাই বলতে চেয়েছে বিশেষ করে কংগ্রেস নেতা রাহুল  ও তৃণমুলের মমতা যে, মোদি উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করেছেন তিনি। কিছু সুনির্দিষ্ট শব্দ ও বাক্য নেয়া যাক ঐ রিপোর্ট থেকে। খোদ আনন্দবাজারই মোদির নীতিকে “দাদাগিরি” বলেছে। লিখেছে, “হিমালয়ের কোলের এই একমুঠো রাষ্ট্রকে তার তাঁবে থাকা দেশ বলেই মনে করে দিল্লি”। এতদিন এসব কথা আমরাই সবসময় আমাদের মূল্যায়নে বলে এসেছি, এখন আনন্দবাজারও বলছে বাধ্য হয়ে; এটা আমাদের মুল্যায়নকে স্বীকৃতি দেয়। আসলে, নেহরুর হাতে আকার পাওয়া, ভারতের আমলা-গোয়েন্দাদের চিন্তা কাঠামো মূলত কলোনিয়াল। ফলে ভিন্ন দুই জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রের মধ্যে কলোনি ধরনের অধীনতার বাইরে আর কোনো ধরনের সম্পর্কের কথা এরা চিন্তা করতে পারে না। এজন্য যেকোন বিদেশনীতি বিষয়ক চিন্তায় এটা প্রতিফলিত, প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

নেহরু নিজেকে একটা স্বাধীন রিপাবলিকের প্রধানমন্ত্রী এটা অনুভবের চেয়ে নিজেকে যেন কোন ব্রিটিশ ভাইসরয় ভাবতে বেশি পছন্দ করতেন। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ নেপাল বা ভুটানের সাথে ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের তথাকথিত ‘শান্তিচুক্তিগুলো’। এরই আলোকে একালে ভারত তার প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়ে এসেছে, এখনো করে যাচ্ছে। যার ফলাফলে ভারতের সব প্রতিবেশীর সাথে তার সম্পর্ক অন্তত আনন্দবাজার ভাষায় বললে, ‘দাদাগিরির’। আমাদের এই দাবির পক্ষে প্রমাণ হলো খোদ আনন্দবাজারেরই শিরোনাম- ‘দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’।

ওই একই রিপোর্টের ভেতরে আনন্দবাজার আরও লিখছে, ‘১৯৪৯ সালে ভুটানের সাথে শান্তিচুক্তি করেছিলেন জওয়াহের লাল নেহরু। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, বিদেশনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভুটান ভারতের পরামর্শ মতোই চলবে। ২০০৭ সালে ভুটান যখন পুরোদস্তুর রাজতন্ত্র থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে হাঁটে, তখন চুক্তিপত্র থেকে এই ধারাটি বাদ দেয়া হয়। যদিও কার্যক্ষেত্রে থিম্পুর ওপর দিল্লির প্রভাব খুব একটা খর্ব হয়নি। ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান। তার পরেও তার এই বেসুর সাউথ ব্লকের কানে বাজছে।’

এখানে দেয়া দুটো তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভুটান এখন এক কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, সেখানে আইন প্রণয়নের এখন জননির্বাচিত সংসদ আছে। কিন্তু আনন্দবাজারই সাক্ষ্য দিয়ে বলছে, ভুটান সংসদীয় সরকার হওয়ার পর ২০০৭-এর সংশোধিত চুক্তিপত্রে আগের মতো ভারতের ‘দাদাগিরির অনুচ্ছেদটা’ নেই। অথচ দাদাগিরি চলছে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, ‘ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান’। এখানে একটু ব্যাখ্যা করে বলা দরকার। ডিমার্শে হল কূটনৈতিক ইংরেজি শব্দ démarche; যার বাংলা অর্থ হল, আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোন আপত্তি অভিযোগ বা মনোভাব জানানো। ভুটান ডোকলাম ইস্যুতে চীনের কাছে আপত্তি জানিয়েছে ‘ভারতের চাপে পড়ে’, নিজে থেকে নয়। এটাই আনন্দবাজারের দাবি। তাই এখন খোদ ভুটান ভারতকেই সৈন্য প্রত্যাহার করতে বলাতে ভারত প্রমাদ গুনছে। এটাই আনন্দবাজারের রিপোর্ট। ওদিকে, ভারত সবার আগে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে; তাই চীন, সবার আগে ভারতের সেনা প্রত্যাহারের শর্ত রেখেছে। আর এ অবস্থায় ভারতের সব বিরোধী দল মোদির সাথে দূরত্ব তৈরি করেছে। মোদিকে উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করা লোক বলেছে। সুযোগ বুঝে কংগ্রেস নেতা রাহুল প্রশ্ন তুলেছে,  ভারতের বন্ধু অনেক রাষ্ট্র ছিল (সম্ভবত রাশিয়ার কথা বলতে চাইছেন) তারা কেন এখন দূরে- এই প্রশ্ন তুলেছে। তবে শেষে ‘সৈন্য প্রত্যাহার আর কূটনীতিক আলাপ’ এই সীমায় মোদি্র ফিরে আসার শর্তে সমর্থন জানিয়েছে। আর, সব মিডিয়া ‘কূটনীতি চাই’ বলে সম্পাদকীয় লিখেছে। যেমন আনন্দবাজারের ১৯ জুলাইয়ের রিপোর্টের শিরোনাম, ‘যুদ্ধ নয়, চাই কূটনীতি’। বেচারা!

মোদির অবস্থা একঘরে শুধু নয়, একেবারে বেইজ্জতি হওয়ার দশা। কারণ চীনের কঠোর অবস্থানে দাঁড়িয়ে দাবি করেছে আগে এককভাবে ভারতের সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। আর মোদির সরকার উঠেপড়ে লেগেছে যে, একসাথে প্রত্যাহার টাইপের একটা কথা যদি চীনের কাছ থেকে বের করা যায়। গত ২৭-২৮ জুলাই ছিল চীনে ব্রিকস রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা কাউন্সিল বা উপদেষ্টা স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক। ভারত চেষ্টা করছিল ওই সভার সাইড লাইনে চীনের প্রতিনিধি স্টেট কাউন্সিলরের (Chinese state councillor Yang Jiechi) সাথে যদি একটা বৈঠকের সুযোগ করে নিতে পারেন। মাত্র গত ২৯ জুলাই দুপুরে ভারতের কোনো কোনো মিডিয়া খবর দিচ্ছে যে, ওই মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কী কথা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো রিপোর্ট কোথাও ছাপা হয়নি।

ইতোমধ্যে রাশিয়ান ডিপ্লোম্যাট সূত্রে অনেক খবর আসছে, যেগুলোর ফরমাল ভার্সান এখনো রিলিজ হয়নি। সেখানে বলা হচ্ছে- ১. অন্তত দু’সপ্তাহ আগে চীন ভারতকে জানিয়েছিল যে তারা নতুন রাস্তা বানাতে নয়, রাস্তা আগে থেকেই যেটা ছিল সেটা চওড়া করতে যাচ্ছে। কিন্তু ভারত সে নোটিফিকেশন উপেক্ষা করেছে। ২. চীনারা যেখানে অবস্থান ও কাজ করছিল সেটা ইতোমধ্যে ভুটানের সাথে আলোচনায় বিবাদ নিরসিত হিসেবে চিহ্নিত চীনের অংশ। ৩. তাই চীন এখনো প্রমাণ চাচ্ছে ও দাবি করছে যে ভুটান কখনোই ভারতকে কোনো সামরিক অ্যাকশন নিতে অনুরোধ জানায়নি।

ভারতের কোনো কোনো জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তাই প্রস্তাব রেখেছেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের উচিত এখনই, আসলে কী ঘটেছে তার ঘটনাক্রম কী সে বিষয়ে ভারতে অবস্থিত সব কূটনীতিকদের কাছে ব্রিফিং দিয়ে ভারত অবস্থান পরিষ্কার করুক। এমন একজন হলেন ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাঈদ নকভি। তিনি দাবি করছেন, তার জানা মতে ভারতীয় সরকার এক আমেরিকান কূটনীতিক ছাড়া আর কাউকেই এখন পর্যন্ত আসলে কী ঘটেছে তা জানিয়ে কোনো ব্রিফিং কাউকেই দেননি।

চীন-ভারত সংঘাতে  সময়ে সময়ে আমরা বিভিন্ন ইস্যুতে তা হাজির হতে দেখি। তা সত্ত্বেও যদি বলা হয় এগুলোর মধ্যে খটর মটর লাগার সবচেয়ে অমসৃণ বিষয়টা কী? সে প্রসঙ্গে সংক্শেষেপে কিছু বলে শেষ করব।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেটেল হওয়া চলতি গ্লোবাল অর্ডার আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে চালু হয়েছিল। সেটা তার আয়ুর শেষ করতে যাচ্ছে। আর একই সাথে ধীরে ধীরে চীন উঠে আসছে সে জায়গা নিতে। গ্লোবাল পরিবর্তনের এই অভিমুখকে স্বীকার করে নিয়েও মানতে ইচ্ছা করে না দশা আমেরিকার। ফলে কম করে হলেও যতটা সম্ভব সে আসন্ন পরিবর্তনকে দেরি করিয়ে দেয়ার নীতি নিয়েছে আমেরিকা। তবে কম-বেশির ফারাক আছে। ওবামা  প্রশাসন যতটা এব্যাপারে এগ্রেসিভ হয়ে ততপর ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন ততটা চেয়ে বলা ভাল একই কৌশলে ততপর নয়। যদিও ঘটনা শুরু করে দিয়ে গিয়েছিল  সেকেন্ড টার্মের (2005-9) বুশ প্রশাসন। মূল ব্যাপারটা হল আমেরিকা ভারতকে প্রলুব্ধ করে, লোভে ফেলে নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থার নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন AIIB, BRICS, SCO ইত্যাদি) গড়ে উঠতে দেরি করিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। কারণ নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থাগুলো তৈরিতে চীন ভারতকে সাথে নিতে চায়, আর একাজে চীনের প্রধান সহযোগী পুতিনের রাশিয়া। কিন্তু ভারত গাছেরও খেতে চায় আবার তলার গুলোও কুড়িতে নিতে চায় – নীতি নিয়েছে। সে চীন, রাশিয়ার সাথে মিলে নতুন ব্যবস্থা গড়তে ভাল অবস্থানগুলো নিতে চায় আবার আমেরিকার দেয়া লোভের অফারগুলোও পেতে চায়। ভারতের এই দ্বৈততা, দ্বিমুখি ঝোঁক – এটাই সব সমস্যা সংকটের উতস এখানে।

এর ফলে ভারত তার যেসব বিরোধে কোন সংঘাত  তৈরি না করে সমাধান করার কথা তা মুখ্য সংঘাত বানিয়ে ফেলছে। আর যেখানে বড় সংঘাতই হবার কথা তা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্যই করছে না।  আর এর সাথে যুক্ত হয়েছে সস্তা জাতীয়তাবাদের চিন্তা। অথচ কমিউনিস্ট বা জাতীয়তাবাদীরা যাকে ‘জাতীয়তাবাদ’ বলে মনে করে আসছিল সেটা আসলে কোল্ড ওয়ার কালে বুঝের জাতীয়তাবাদ, যা একালে অচল। যেমন দেশের ব্যবহার্য সব পণ্য দেশেই বানাতে হবে এমন গোঁ ধরা জাতীয়তাবাদ কীনা নিজ জনগোষ্ঠির তাতে আসলে একালেও লাভ হয় কীনা ভেবে দেখতে হবে। নিজ মুদ্রার অবমুল্যায়ন একালে সময়ে ইতিবাচক হতে পারে। নাহলে আমেরিকার বিষয়টাকে  অভিযোগ আকারে আনত না যে চীন নিজের মুদ্রা অবমুল্যায়িত রেখেছে। ইত্যাদি।

আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ভারতের বর্তমান স্বার্থ হলে চীন-রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ভারতের ভবিষ্যত। ফলে ভারতের  বুদ্ধিমান অবস্থান হল, এদুইয়ের মধ্যে এক সুক্ষ হিসাব করা ভারসাম্য রচনা করে পা ফেলা। কিন্তু কথাটা ভারত প্রায়ই ইচ্ছা করে ভুলে যায়। অনেক বাচ্চা নিজ অভিভাবককে ব্লাকমেল করে পকেটমানি বাড়িয়ে নেয় – বাচ্চারা এভাবে অনেক সময় দায়িত্বজ্ঞানহীন  আচরণ করে সাময়িক সুবিধার মজা উপভোগ করতে চায়। ভারতের অবস্থা এরকম। কিন্তু বাস্তবে ভারত কোন বাচ্চাসন্তান নয়, আবার চীন বা রাশিয়া (নতুন ব্যবস্থার মূল উদ্যোক্তা কারিগরেরা) এরাও ভারতের অভিভাবক কেউ নয়। ফলে ভারতেরও উদ্যোক্তাদেরকে এমন জায়গায় ঠেলে দেওয়া উচিত না যে উদ্যোক্তারা ভারতের আশা ছেঁড়ে ভিন্ন পরিকল্পনা করে বসে। ভারতের উপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যায়।

চীনের গ্লোবাল টাইমস যেখানে চীনের সরকারি অবস্থান কড়া ভাষায় কিন্তু ইনফরমালি চীন প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়, সেখানে ডোকলাম ইস্যুটাকে শিরোনাম লিখা হয়েছে, ভারতের সাংহাই কর্পরেশন সংস্থার (SCO) সদস্যপদ পেয়ে পশ্চিম চীনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে চাইছে। (India’s SCO membership threatens West China security)। চীন শান্তিপুর্ণ অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করতে  শিকাগোর এক আমেরিকান প্রফেসরের তত্ত্ব যে, চীন নাকি ভারতকে মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলেছে, চীন ভারতের জন্য হুমকি  এইসব  তত্ত্ব আঊরায়।   আসলে মোটাদাগে বললে ভারতের চীন বিরোধী সংঘাত এটা আসলে আমেরিকার চীনা নীতির আলোকে সাজানো। ইন্ডিয়া শুধু আমেরিকার সাথে সামরিক অস্ত্রের চুক্তি করেছে তাই নয়, বরং চীন-ভারত সীমান্ত বরাবর সামরিক ঘাটি বানিয়েছে। (In fact, India’s confrontation with China is, by and large, backed by America’s China policy. India has not only sealed arms deals with the US, but also established strategic military bases along the China-India border. ) সে নিজ জনগণকে চীন বিরোধী প্রপাগান্ডায় সামিল করেছে।

এটাকে আমরা বলতে পারি চীনের  দুঃখ করে বলা (আবার হুমকিরও)  কথা যা খুব সম্ভবত রাশিয়াকে স্মরণ করিয়ে দিবার উছিলায় সবাইকে জানানো। কারণ রাশিয়ার উতসাহেই চীন ভারতকে এই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিষয়ক জোটে (পাকিস্তানসহ) ভারতকেও সদস্যপদ দিতে রাজি হয়েছে কয়েকমাস আগে।

ভারতের অজিত ডোভাল চীন থেকে ফিরেছেন, কিন্তু ভারতের মিডিয়ার গান সম্পুর্ণ ভিন্ন। এখানে কেবল কিছু শিরোনাম আনছি যার ভিতরে অনেক ইঙ্গিত আছে। চীনে ভারত কী শিক্ষা পেয়েছে  সম্ভবত এর ইঙ্গিত আছে এখানে। আনন্দবাজার পত্রিকা ২৯ জুলাই,  “বেজিংকে না চটাতে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী মোদীর”। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ২৯ জুলাই,  “Doklam is not about a road”।  অর্থাৎ ভারতের মিডিয়ার আর ডোকলাম অচলাবস্থার কারণ ডোকলামে না, বাইরে খুজতে শুরু করেছে। একটু দেরি হয়ে গেছে অবশ্য।  মনে হচ্ছে মোদি ভুলে মাটি খেয়ে ফেলেছেন বা মুখে মাটি গেছে। খুব সম্ভবত গাছের খাওয়া আর তলেরও কুড়ানোর দিন ভারতের জন্য শেষ হয়ে আসছে। কোন একটা বেছে নিতে হবে। এশিয়ায় পড়শিদের উপর ভারতের প্রভাব দাবরানি আর কূটচাল দিয়ে, কলোনি চিন্তা কাঠামো দিয়ে, বৃটিশ বাপ-দাদাদের ছিল ফলে একই স্টাইলে তা আমারও শাসনে থাকবে এই যুক্তিতে এখন টিকানো অসম্ভব, তাই সেগুলো সবই শেষ হয়ে আসছে, যাবে। সে জায়গায় চীনের যে প্রভাব বাড়ছে তা চীনা অর্থনীতির সক্ষমতার কারণে, এই অর্থে এটা অবজেকটিভ। চীনের সাবজেকটিভ ইচ্ছার কারণে এটা হয় নাই, হচ্ছে না এবং  হয় না। এই অর্থে আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে ভারতের বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এর মাসুলও দিতে হবে চড়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩০ জুলাই ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ৩১ জুলাই তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে

পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে, দুনিয়া মজলুমের পক্ষেই দাঁড়াবে

গৌতম দাস

১৩ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার ০০ঃ০৪

http://wp.me/p1sCvy-2g5

 

ট্রাম্পের সৌদি সফরে (২০-২১ মে ২০১৭) সৌদি ড্যান্সের তিন সপ্তাহের মধ্যে সৌদি আরব আবার খবরের প্রধান শিরোনাম। যদিও এবার সাথে নিয়েছে বা বলা ভাল এবারের সৌদি টার্গেট কাতার। কাতারকে সাইজ করা। সংক্ষিপ্ত করে বললে খবরটা হল, মধ্যপ্রাচ্যের রাজাতন্ত্রী ছয় রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্র-জোট আছে নাম GCC জিসিসি বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল।  কাতার, সৌদি আরব, ইউএই (এটা আবার দুবাই ও আবুধাবিসহ সাত আমির-শাসিত রাষ্ট্র বা আমিরাতের এক ফেডারেশন), ওমান, কুয়েত, বাহরাইন এই ছয় রাষ্ট্রকে নিয়ে জিসিসি গঠিত। হঠাৎ করে গত ৫ জুন ২০১৭ এর খবর হল,  জিসিসির সৌদি আরব, ইউএই, বাহরাইন আর জিসিসির বাইরের মিসর, এই চার রাষ্ট্র কাতারের সাথে সব ধরণের কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা করেছিল। আর, নৌ, আকাশ ও সড়ক পথ ও সীমান্ত বন্ধ করে সব বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।  কাতারি কূটনীতিকদেরকে এই চার রাষ্ট্র, তারা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তাদের প্রত্যেকের রাষ্ট্র ত্যাগ করে চলে যেতে বলেছিল।  প্রাথমিক খবর হিসাবে প্রথম কয়েক ঘন্টা আমরা শুনেছিলাম যে, সরকারি ‘কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাক হয়ে গিয়ে সেখান থেকে সৌদি বাদশাকে নিন্দা করে কিছু খবর প্রচার করা হয়েছিল। তা থেকেই নাকি ক্ষুব্ধ সৌদি প্রতিক্রিয়া এটা। গত ২৩ মে, সেঘটনার ধোঁয়া থেকে সব শুরু। খুব সংক্ষেপে মুল ঘটনাটা বললে, ট্রাম্পের সৌদি সফরের পরের দিন কাতারের আমির শেখ তামিম আল থানি কাতারের মিলিটারি একাদেমি সফর করতে গিয়েছিলেন। সেখানে নাকি ট্রাম্পের ঐ সফর আর সৌদি বাদশার সমালোচনা করে তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন আর সেটাই সরকারী কাতার নিউজ এজেন্সী প্রচার করেছিল। আর এই খবরকে রেফার করে সৌদি আরব ও দুবাইয়ে খবর প্রচার করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পালটা বার্তা দিয়ে কাতারের আমির জানায়, এটা সম্পুর্ণ মিথ্যা। হ্যাকারের হাতে কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাকড হয়ে এটা একটা মিথ্যা খবর প্রচার করা থেকে এটা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা রয়টার নিউজ এজেন্সীকে কাতারী আমীর জানিয়েছিলেন যে তিনি মিলিটারি একাদেমিতে গেছিলেন কথা সত্য কিন্তু তিনি সেখানে কোন বক্তৃতাই সেখানে দেন নাই, অথবা কোন বিবৃতিও দেন নাই।  এদিকে জুনের ঐ ৫ তারিখেই কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমরা আল জাজিরার মাধ্যমে শুনলাম ‘কাতার নিউজ এজেন্সীর ওয়েব সাইট হ্যাকের ঘটনার সাথে – আমেরিকায় দুবাইয়ের রাষ্ট্রদুতের ইমেল একাউন্ট – এর সংশ্লিষ্টতা আছে এর প্রমাণ মিলেছে।  কিন্তু আরও কয়েক ঘন্টার মধ্যে কাতারের বিরুদ্ধে ঐ চার রাষ্ট্রের সরব অভিযোগ যেমন – কাতার নিউজ এজেন্সীর কথিত খবর, কাতারের আমীরের সৌদি বাদশার নিন্দা ইত্যাদি সব ছেড়ে এবার সৌদিসহ অভিযোগকারিরা তাদের ‘আসল’ অভিযোগ দায়ের করতে শুরু করে।

সার কথায় সেসব অভিযোগ হল, কাতার এক “সন্ত্রাসী রাষ্ট্র”, কারণ সে সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়। যেমন বিবিসি [যদিও বিবিসির রিপোর্ট ও ভুমিকা বড়ই তামাসাময়  ও খুবই নিচা স্টান্ডার্ডের। কাতারের আমীরের কোন বক্তব্যই না দিয়ে কেবল সৌদি বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে পুরা স্টোরি তৈরি করে হয়েছে।] তারা কেবল সৌদি বয়ানের উপর ভর করে এসম্পর্কে সৌদি সরকারি এজেন্সীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল,”সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিপদ থেকে সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থসংরক্ষণকে নিরাপদ করতে তারা কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে”। ঐ একই বিবিসি রিপোর্টে আবুধাবিও একই রকম মন্তব্যে জানিয়েছিল, “তারা মনে করে কাতারের দোহা সরকার, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা নিয়ে চলে ও তাদেরকে সমর্থন ও অর্থ দিয়ে তাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে”। অর্থাৎ কে কী প্রচার করেছে সেটা আর প্রসঙ্গ নয়। কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন, অর্থ দেয়া প্রশ্রয় দেয়া ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এটাই আসল ইস্যু, আর তা সামনে এসে গেছে।

কিন্তু কাতার ‘সন্ত্রাসবাদী’, এটা আবার কোন সন্ত্রাসবাদ? কাছকাছি সময়ের ঘটনায় “এই সন্ত্রাসবাদের” স্পষ্ট হদিস রেফারেন্স পাওয়া যায় গত ২০-২১ মে ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরকালে। “ইরান সন্ত্রাসবাদ করে” আর এর বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তৃতা করেছিলেন তিনি। আর এটা বলতেই যেন সৌদি বাদশা তাকে হায়ার করে এনেছিলেন। আর এই সন্ত্রাসবাদ বলতে – প্যালেস্টাইনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও মিসরের ব্রাদারহুড এদের ততপরতাকে ট্রাম্পের আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে। এটা আমেরিকার অনেক পুরানা বয়ান, [যদিও মাঝে “আরব স্প্রিংয়ের চলার সময়” আমেরিকা ও সৌদি আরব উভয়েই ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করা ভুলে গেছিল, বলা যায় সন্ত্রাসী মনে করতে বিরতি বা ক্ষমা দিয়েছিল। তারা ব্রাদারহুডকে মিসরে ক্ষমতায় আনতে একসাথে কাজ করেছিল। যাই হোক, সৌদি আরবের যারে দেখতে নারি তার চলন বাকা ফর্মুলায় আমেরিকাকে অনুসরণ করে যাকে পছন্দ হয় না, হুমকি মনে হয় তার গায়ে সন্ত্রাসীর ট্যাগ লাগায় দেয় তারা। ফলে ইরান সন্ত্রাসী, আর কাতার সন্ত্রাসী। এই “বাড়তি সন্ত্রাসবাদ”  ধারণা, সৌদি আরব ট্রাম্পকে তাল দিতে নিজে দেশে ডেকে এনে উচ্চারণ করিয়ে নিয়েছিল। ইরান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হলে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ রাষ্ট্র + জার্মানি এই (পি৫+১) এরা একসাথে এবং জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যে ‘সন্ত্রাসী’ ইরানের সাথে কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি করেছিল কী করে?

কিন্তু কাতার জিসিসির সদস্য হয়েও এসব প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠনকে, বিশেষ করে হামাসকে সর্বতভাবে সমর্থন করে, তাদের ততপরতার  প্রতি সহমর্মিতা দেখায়, সমর্থন দেয়, আশ্রয় দেয় সহযোগিতা করে। এই সুত্রে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদিদের “সন্ত্রাসবাদের” অভিযোগ। আমেরিকান “সন্ত্রাসবাদ” ধারণাকেও নিজের সংকীর্ণ স্বার্থ মোতাবেক টেনে লম্বা করে নেওয়া।

এখন তাহলে পুরা ঘটনায় একেবারে আসল, মূল বিষয়টা কী? এক শব্দে বললে, বিষয়টা হল, সৌদি রাজতন্ত্রের আয়ু সমস্যা। এখানে রাষ্ট্র বা ভুখন্ড হিসাবে সৌদি আরবের আয়ুর কথা বলা হচ্ছে না। ঐ রাষ্ট্র পরিচালনের সিস্টেম হিসাবে “রাজতন্ত্র” – এর ভবিষ্যত বা আয়ুর কথা বলা হচ্ছে। সম্ভবত আরও সঠিক ভাষ্য হবে – সৌদি রাজ-সরকার নিজের ভবিষ্যত, আয়ূ বা হুমকি প্রসঙ্গে নিজের পারসেপশন বা ধারণা কী সেটাই এখানে মূল ইস্যু বা সমস্যা।

সৌদি আরব মনে করে তার রাজতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ইরান, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরের ইরান। দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ইসলামি জনগোষ্ঠি নিজেদের মাঝে ইসলামের নানা ফ্যাকড়ায় তাদের বিভক্তি বা ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সব জনগোষ্ঠিই তাদের স্ব স্ব রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রথম আর সবচেয়ে কমন অবস্থান হল – কাম্য সিস্টেম হিসাবে তারা রাজতন্ত্রকে নাকচ করা। আর খুবই সহজে ইরান এই কথাটাই তাদের মনে করিয়ে দেবার কাজ করে ফেলতে পারে — এটাই সৌদি আরবের চোখে সবচেয়ে বড় “সন্ত্রাসী” কাজ। সবাই জানেন ইরান সুন্নি নয়, তাসত্ত্বেও হামাস, হিজবুল্লাহ ও ব্রাদারহুডের মত দলের রাজনৈতিক প্রতিরোধ  লড়াই সংগ্রামের প্রতি ইরানের সক্রিয় সমর্থন অবস্থান এটা ইরান মুল্যায়নে খুবই নির্ধারক।  কারও ইরানের ব্যাপারে রিজার্ভেশন থাকলেও তাসত্ত্বেও ইরানের সারা দুনিয়ার মজলুমদের প্রতিরোধ আন্দোলনকে সক্রিয়  সমর্থন দেয় এই কারণে – এই ভুমিকাকে মুসলমানেরা অন্তর থেকে ইতিবাচক মনে করে।

তবে সৌদি আরবের ইরান মুল্যায়ন শেষে তার দ্ব্যার্থহীন অবস্থান হল,

একঃ যে কেউ শিয়া বা সুন্নি যাই হোক, ইরানের সাথে যে কোন ধরণের সম্পর্ক রাখে সে সৌদি আরবের শত্রু। তাকে কোন ধরণের সহানুভুতি বা সমর্থন, অনুমোদন কিছুই দেয়া যাবে না। শুধু তাই নয় তাকে উচ্ছেদ করে দেওয়াতেই সৌদি আরবের শান্তি, এটাই তার নীতি।

দুইঃ সৌদি রাজতন্ত্রের ফাস্ট লাইন অব ডিফেন্স স্বভাবতই তার নিজ সেনা বাহিনী। আর এর পরের বলয় হল জিসিসি; যার মূল পরিচয় এরা সৌদির  মতই মধ্যপ্রাচ্য ভুগোলের রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র। এছাড়া জিসিসি কেবল সাধারণ কোন রাজনৈতিক জোট নয়, বরং এই ছয় রাষ্ট্র নিজেদের সামরিক সক্ষমতাগুলোকে একপাত্রে নিয়ে কমন একটা অবস্থান থেকে পরস্পরকে রক্ষায় তা ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য জিসিসির স্টিয়ারিং হাতে রাখা সৌদি আরব  – মূলত সৌদি প্রভাবে, ইয়েমেনে হুতিদের দমনে কাতারের ভিন্নমত দৃষ্টিভঙ্গী থাকলেও নিজের যুদ্ধবিমান নিয়ে যোগ দিতে সেও বাধ্য হয়েছে। তাতে বিষয়টাতে কাতারের যতই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থাক। আর ওদিকে জিসিসির পরের লাইন অব ডিফেন্স হল, একদিকে অন্যান্য মুসলিম জনসংখ্যা-প্রধান রাষ্ট্রগুলো (তবে খোদ জনগোষ্ঠি নয়, কেবল সরকার) আর অন্যদিকে বড় কুতুব আমেরিকা।

তিনঃ সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন অস্বস্তিকর দুস্থবোধ এনে দিয়েছিল ওবামা, ২০১৪ সাল থেকে। এবিষয়ে আরও বিস্তারিতের জন্য আগের লেখা  এখানে দেখুন।  সে বছর থেকে ইরান বিপ্লবের পরে এই প্রথম প্রকাশ্য সমঝোতায়  ইরান-আমেরিকা ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’ (পি+৫) করার আলাপ শুরু হয়েছিল। যদিও ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের এতদিন পরে ওবামা প্রশাসনের হঠাত এই মতি বদলের পিছনে প্রধান কারণ ছিল ইরাকে আইএস ততপরতা বৃদ্ধি আর তা নিজে সামলাতে গেলে আমেরিকাকে আবার মাঠে আমেরিকান মেরিন নামানোর সিদ্ধান্ত নিতে হত। যে খরচ বিতে সে অপারগ। তাই এই কাজটা সে ইরান এবং ইরান প্রভাবিত ইরাক এবং শিয়া মিলিশিয়া ইত্যাদি দিতে করাতে চাওয়ার আমেরিকান  স্বার্থ এটাই ইরানের সাথে ওয়ার্কেবল সম্পর্ক পাতানোর তাগিদ অনুভবের  মূল কারণ ছিল। তাই ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’  মানে নিউক্লিয়ার অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা সে আর করবে না – এই প্রতিশ্রুতি আর তা মনিটরিং করতে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের উপর থেকে আমেরিকাসহ পশ্চিম এবার সব অর্থনৈতিক অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নিবে এই নিগোশিয়েশন শুরু হয়েছিল। এই সফল নিগোশিয়েশন  আলাপের সমাপ্তিতে গত  ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তা স্বাক্ষরিত ও কার্যকর হয়ে যায়। মনিটরিংসহ নানা শর্ত সাপেক্ষে হলেও এতে অবরোধ তুলে নেওয়াতে ইরান বিরাট শক্তি সঞ্চয় করে আবার ফিরে উঠে আসতে থাকে। অর্থনীতি আবার প্রাণ পায়। আর তাই উলটা দিকে সৌদি আরবের ভালনারেবল অবস্থা ভীতি অস্বস্তি বোধ – সেখান থেকে।  গত ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পরও সৌদি আরব এমন দুস্থ অসহায় বোধ করে নাই। অথচ এই চুক্তির কারণে, ইরানের সাথে আমেরিকার নীতি অবস্থান স্বার্থবিরোধ কিছু কিন্তু মিটে যায় নাই। কেবল একটা একসাথে সহবস্থানের একটা ওয়ার্কেবল অবস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র। যা আবার স্থায়ী নয়, প্রতি বছর মনিটরিং মুল্যায়নের অধীনে ও ভাল রিপোর্ট সাপেক্ষে চালু থাকবে, আছে। তবু এটাও সহ্য করা সৌদি আরবের কাছে অসম্ভব, অগ্রহণযোগ্য।
আমেরিকা-ভিত্তিক ‘সৌদি-আমেরিকান পাবলিক রিলেশন এফেয়ার্স কমিটি’  – এটা এক লবিষ্ট ফার্ম এর নাম। এর সভাপতি  সালমন আল-আনসারি। তিনি তাঁর ক্লায়েন্ট সৌদি আরবের পক্ষে এক ক্ষুব্ধ মন্তব্য করে বলেছেন, “কাতারের আমীর – সন্ত্রাসবাদী ইরান সরকারের পক্ষে তোমার অবস্থান আর কাস্টডিয়ান অব টু হলি মস্ক – তাকে অপমান করেছ। আমি তোমাকে মনে করায় দিয়ে চাই মিসরের মোরসি ঠিক একই কাজ করেছিল আজ সে খতম হয়ে গেছে, জেলে পচতেছে”।   আনসারির এই কথা গুলো খুবই প্রতীকী, সৌদি মনোভাব অবস্থানের আসল প্রতিফলন। এভাবে বলা কথাটা ‘সহি কিনা’ সেটা এখানে একেবারেই বিচার্য নয়।

চারঃ সৌদি আরব যা বলতে চাইছে এর সারকথা হল,  কাতারে বিদেশনীতি আমার চেয়ে ভিন্ন হতে পারবে না। কাতার নুন্যতম ভিন্ন চোখে ইরানকে দেখতে পারবে না।  কাতার সেটা করার চেষ্টা করেছে তাই সে কাতারকে আসলে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ না, কাতারকে সে সাধারণ খাদ্য ও পণ্যেও সরবরাহের বিরুদ্ধে অবরোধ করবে। কোন ব্যবসা করতেও দিব না। আমার কথা না শুনলে এমনকি তোমাকে সরিয়ে তোমার কোন জ্ঞাতি ভাইকেও ক্ষমতার আনার চেষ্টা করব।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল আল-যুবেইর প্যারিস সফরে ছিলেন। সেখান থেকে রয়টারের সংগৃহিত তাঁর বক্তব্য পরের দিন ছয় জুন ছাপা হয়। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে সৌদিদের মনের অনেক কথা বলে দিয়েছেন।  তার সোজা কথা, আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক রাখতে গেলে কাতারকে অবশ্যই হামাস এবং ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ক ছিন্নসহ আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। [Qatar must take several steps, including ending its support for the Palestinian group Hamas and the Muslim Brotherhood, to restore ties with other Arab states.]  তিনি আরও বলছেন, “সন্ত্রাসবাদী চরমপন্ন্থা (এটা বলতে হামাস, ব্রাদারহুড বুঝতে হবে),  হোস্টাইল বা বেয়াদব মিডিয়াকে সোজা করা (আল জাজিরা পড়তে হবে) আর ভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ (এটা বলতে বাহারাইনের আন্দোলনকারিদের প্রতি সহানুভুতি বুঝতে হবে) বন্ধ করবে“ – বিগত কয়েক বছরে আমরা এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলছি আর কাতার তাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন কাতার এগুলো বাস্তবায়ন করেছে আমরা দেখতে চাই”। এই বক্তব্য রয়টার থেকে কোট-আনকোট নেয়া। সরাসরি ইংরাজিটা তুলে দিচ্ছি, “We want to see Qatar implement the promises it made a few years back with regard its support of extremist groups, regards its hostile media and interference in affairs of other countries,” Jubeir told reporters in Paris.

যুবেইরের এসব মন্তব্যের সবচেয়ে মজার অংশ হল, তিনি বলছেন কাতার “প্যালেস্টাইন অথরিটি আর মিসর সরকারকে আন্ডারমাইন” করেছে বা নীচা দেখিয়েছে।  আসলে তিনি বলতে চাইছেন আমাদের ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে অবস্থানের ফলে পরে পাওয়া সুবিধায় মিসরের সিসি এখন আরামে ক্ষমতায় আছে। আর আমরা সেই সুবিধা তৈরি করে দেওয়ার বিনিময়ে সিসির চোখ বন্ধ করা সমর্থন আমাদের পক্ষে পেয়েছি। আসলে  তিনি স্পষ্ট করেই বলছেন, হামাসের নেতা মিশেল অথবা ব্রাদারহুডের কোন নেতা-কর্মীকে ভাত-কাপড়-আশ্রয় কিছু দেয়া যাবে। বাস্তবে আসলে চাপে পড়ে, কাতারের আমীর  অনেক আগেই সবাইকে বের করে দিতে হয়েছে। সম্ভবত এখন ইসলামি স্কলার কারযাভিকেই একমাত্র আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। কিন্তু তাতেও সৌদিরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করতে পারছেন না। বেচারা থানি, তিনি কাতারের আমীর হলেও তার একটা শক্ত নীতি হল, কোন মানুষ সে যেই হোক সে আশ্রয় চাইলে তাকে তিনি ভাত-কাপড় আশ্রয় দিতে নিজের কাছেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু আমীর থানির মেহমানেরা সৌদি চাপে আশ্রয়দাতার দুরবস্থা দেখে আমীর তাদেরকে কিছুই না বললেও  নিজেই নিজের করণীয় হিসাবে কাতার ত্যাগ করে চলে গিয়েছেন।  এরপরেও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঐ বক্তব্য শেষে হুমকি দিয়ে বলছেন,   “সঠিক পথ নিতে কাতারের ‘কমন সেন্স ও লজিক’ জাগবে। আর যদি না হয় তবে আমার মনে হয় না কাতারিরা এর মুল্য পরিশোধ করতে পারবে”। আসলে পুরা পরিস্থিতিতে সৌদি-ইচ্ছার সারকথা এখানে আছে।

কিন্তু বিরাট একটা লিগ্যাল প্রশ্ন আছে। যুবেইরের ফরমাল এই অবস্থান এটা সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, ফলে একারণে সৌদি আরবকেই অভিযুক্ত করা সম্ভব। কাতার কী বিদেশ নীতি নিবে তা করতে বাধ্য করার চেষ্টা এটা কাতারের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন। এছাড়া সৌদি ইচ্ছায় বিদেশনীতি না সাজালে কাতারের বাসিন্দাদেরকে খাদ্য পাণীয়ের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হবে – এটাও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। WTO এর আইন অনুযায়ী না-হক কাজ।  উপরে ম্যাপের ছবির দিকে তাকালে আমরা দেখবে কাতার আসলে ঠিক ল্যান্ড-লকড দেশ নয়। বরং সৌদি আরবের তীরে, পারস্য উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত। ফলে কাতারের চারদিকের প্রায় ৮০ ভাগ  সীমানা এলাকাই উপসাগরের স্পর্শে। অর্থাৎ পোর্ট সুবিধা চাইলে তৈরি করা সম্ভব। আর ২০ ভাগ এলাকা সরাসরি ভুমিতে সৌদি আরবের সাথে সীমান্ত। সম্ভবত নিজ জনসংখ্যা মাত্র ২৩ লাখ (2.235 million (2015) World Bank) বলে নিজ খরচে আলাদা এক্সক্লুসিভ নিজ ভুখন্ডে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে যায় নাই। এর চেয়ে খুবই চালু  গভীর সমুদ্র বন্দর পাশের দুবাইয়ে বলে, সেই পোর্টে মালামাল নামিয়ে ট্রাকে করে সৌদি আরব হয়ে সে পণ্য নিজ দেশে প্রবেশ করে নেয়।  কিন্তু এখন  সৌদি ভুমি দিয়ে ট্রাক প্রবেশ এটাকেই চাপ দিবার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে – এই সুবিধা নিয়ে সৌদি আরব ট্রাক চলাচল আটকে পণ্য পরিবহণে বাধা তৈরি করার সুবিধা নিচ্ছে। যাহোক, তবে দেরিতে হলেও এই পয়েন্টটা তুলে ধরে আল জাজিরা কিছু প্কিরচার রিপোর্ছুট তৈরি করাতে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষন করতে পেরেছে। এমেনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ইস্যুতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তাতে  খোদ ট্রাম্প সৌদি আরবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন।  কাতারে বসবাসকারি দেশি বিদেশি সাধারণ মানুষের স্বার্থে ট্রাম্প নিজেই শিথিলভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আহবান জানাতে বাধ্য হয়েছেন। আসলে এটা ছিল ট্রাম্পের সৌদি সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব থেকে নিজেকে আলাদা করে নেয়া। অর্থাৎ আইন লঙ্ঘনের দায় তিনি সৌদিদের কাধে ফেলায় দিলেন। ট্রাম্প এটা কেন করলেন? কারণ ইতোমধ্যে তিনি এক বিরাট কেলেঙারির

পাঁচঃ ট্রাম্পের আমেরিকা; অনেকেই বিভ্রান্ত আমেরিকার অবস্থান ঠিক কোথায়? এনিয়ে। হা ট্রাম্প, নিজ অবস্থানের সবচেয়ে উপর পর্দা দিয়ে সেটা বিভ্রান্ত করে রেখেছেন। সব আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা আমেরিকান রাজনীতিতে   “লবি ব্যবসা” (বিভিন্ন বিদেশী রাষ্ট্রের স্বার্থে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রশাসনে লবি করে দেওয়ার জন্য ভাড়া খাটার ব্যবসা”) এর স্বার্থের ভিতরেই বসবাস করেন ও আর এর মধ্যেই কাজ করে থাকেন। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে সেটা খুবই এক বাড়াবাড়ি জায়গায় গিয়েছে দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের দোস্ত-বেরাদরেরা  বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে  লবির ফি এর নামে কমিশন নিয়েছেন (আমেরিকান আইনে এটা আইন বিভাগের রক্ষিত খাতায় নিজে গিয়ে লিখিত বলে দিতে হয় এবং তাহলে এটা আর অবৈধ না। ইতোমধ্যে ১৪০ মিলিয়ন ডলারের কাহিনী আমরা নিইয়র্ক টাইমসে দেখেছি।)  এমন দোস্ত-বেরাদরেরা ট্রাম্পের একদম চারপাশে ও কোলের মধ্যে বসে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেজন্য  এমনকি মনে হয়, ট্রাম্প তাঁর মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকেও বলে দিয়েছেন যে, এডমিনিষ্ট্রেশনের অবস্থান-বক্তব্যেরও থেকে দূরে তিনি ভান করে কখনও কখনও সরে যাবেন, কখনও ভুয়া কথার কথায় “লিপ-সার্ভিস” দিবেন। যেন ট্রাম্পের দোস্ত বেরাদরেরা যে ফি নিয়েছেন তা কাভার দিয়ে যায়েজ করে নিতে পারেন – তা বলে দিয়েছেন তিনি। তবে  মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকে তিনি বলতে চাচ্ছেন  কিন্তু তাসত্ত্বেও তোমরা তোমাদের এডমিনিষ্ট্রেশনের মুল অবস্থান-বক্তব্যের মধ্যেই থেকে যাবা, কাজ করে যাবা। এখানে মজার কথা হল, এতদিন আমেরিকান রাজনীতির ভোকাবুলারিতে – ‘এডমিনিষ্ট্রেশন’ বলতে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির ফরমাল নীতি-অবস্থান বুঝাত। যেমন ‘ওবামা প্রশাসন’ কথাটার মানে ওবামার নিজের কথা আর তাঁর আমলা, নীতি-নির্ধারকদেরসহ সবারই ফরমাল অবস্থান – এটা  বুঝাত। তবে যদিও এই ফরমাল অবস্থানের নিচে আবার ‘আন্ডারকারেন্ট’ হিসাবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর পেন্টাগণের অবস্থানের লড়াই ঝগড়ায় খুচরা নানা অবস্থান ভিন্নতাও থাকতে দেখা যেত। কিন্তু এখন ট্রাম্পের আমলে এসে আমরা দেখছি,  ট্রাম্পের বক্তব্য (লিপ সার্ভিস) আর ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান-বক্তব্য এই দুটা এক নাও হতে পারে। ফলে ট্রাম্প – এটা ভুয়া কথা বলে লবি ব্যবসা ধরার এক স্বর্ণযুগ তৈরি করেছেন বলা যায়।
তাই এর আরেক তামাসার দিকটা হল, সৌদি আরবেরও সেটা অজানা নয়। তাঁরা ট্রাম্পের লিপ-সার্ভিসও জেনে শুনে কিনতে চায়। সেটাই তাদের কাছে নাকি অনেক। গত মাসে ট্রাম্প সৌদি সফরে এসে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” – এই ফাঁপা বাড়তি বা এক্সটেনডেড মিথ্যা সংজ্ঞা আউড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অথচ এটা আমেরিকা প্রশাসনের অবস্থান নয়। যেমন ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যেই ওবামা আমলের শেষ বছরে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সাথে করা ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ – এটা “সঠিকভাবেই চুক্তির শর্ত মোতাবেক কোন ব্যার্তয় না ঘটিয়ে” আগিয়ে যাচ্ছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারশনের লিখিত স্বাক্ষ্য- রিপোর্ট তিনি কংগ্রেসকে  জানিয়েছেন ইতোমধ্যেই। অর্থাৎ নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের যে চাপাবাজি ছিল যে নির্বাচিত হলে তিনি ‘ইরান ‘নিউক্লিয়ার ডিল’  বাতিল করে দিবেন। কিন্তু তিনি এখন ইতোমধ্যেই ঐ চুক্তি “ঠিকঠাক” চলছে, মানে তিনি এটা গ্রহণ করেছেন বলে স্বাক্ষ্য-রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছেন কংগ্রেসকে।
ফলে ট্রাম্পের ইরান বিরোধী চাপাবাজি নির্বাচনের আগের অবস্থান যাই থাক তিনি এখন ওবামার ইরানী “নিউক্লিয়ার ডিল” সহি বলে অনুমোদন করে দিয়েছেন। এটা গত ১৮ মে এর খবর। তাই, ২০ মে সৌদি আরবে গিয়ে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” বলে যা কিছু চাপাবাজি করেছেন সেটা তাহলে আসলে লিপ সার্ভিস ছাড়া কিছু ছিল না। আর এটাই সৌদি আরব ‘কিনেছে’।

এমনকি কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার পর সৌদি আরব আবার লিপ সার্ভিস কিনতে এসেছে, দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের এবারের চাপাবাজি হল তিনি টুইট করছেন আর এই ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিজে নিবার চেষ্টা করছেন।  টুইট করতে আমোদ পাওয়া ট্রাম্প এক টুইট করে  বলছেন যে, “আমার সৌদি সফর ফল দেওয়া শুরু করেছে। কাতারের দিকে আঙ্গুল তুলে টেররিষ্ট ফান্ডিং এর বিরুদ্ধে তারা সবাই শক্ত অবস্থান নিয়েছে, অচিরেই টেররিজমের ভীতিকর দিন শেষ হবে”। “So good to see the Saudi Arabia visit with the King and 50 countries already paying off. They said they would take a hard line on funding extremism, and all reference was pointing to Qatar. Perhaps this will be the beginning of the end to the horror of terrorism!” Trump wrote on Twitter.     একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কত নিচে নামতে পারে এর উদাহরণ হয়ে থাকল এটা। কিন্তু এটাও ট্রাম্পের নীচা হবার শেষ নয়। তিনি ঐদিক শুধু টুইট নয়, বক্তৃতা করে বলেছিলেন, কাতারকে নাকি টেররিজম ফাইন্যান্সিং করে আর এটা তাকে ছাড়তেই হবে। কিন্তু পরের দিনই তার একেবারে উলটা মুর্তি। সিএনএনের ভাষায় অলিভ গাছের ডাল মাথায় বেধে নিয়ে (এটা শত্রু বা বিরোধীকে ইঙ্গিত দেয়া যে বিরোধীর সাথে আপনি এখন আপোষ করতে চান।) ট্রাম্প কাতারের আমীরকে ফোন করেছেন। নানান মিঠা কথা বলেছেন কারণ এক বিলিয়ন ডলার খরচ করে বানানো ঐ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আমেরিকান সামরিক ঘাটি আছে কাতারে। এছাড়া আর এক কারণ হল, ঐদিক তিনি যখন কাতারকে ধুয়ে ফেলতেছিলেন, সৌদিদের কোলে উঠে প্রশংসা করতেছিলেন, ঠিক সেই সময় তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলার সন ঠিক তার উলটা কথা বলছিলেন, যে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বে আরবদের অবরোধ শেষ করা উচিত কারণ এতে ঐ “সামরিক ঘাটির ততপরতা ব্যহত হচ্ছে”। অর্থাৎ টিলারসন কাতার ক্রাইসিস থেকে আমেরিকাকে নিউট্রাল জোনে নিতে চাচ্ছেন। আর ট্রাম্প সেখানে কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিচ্ছেন। এই স্ববিরোধীতা সামলে নিতে, বেকুবি আড়াল করতে ট্রাম্প তাই মিষ্ট কথায় ফোন করেছেন কাতারের আমীরকে। এছাড়া রয়টার্স লিখছে,  ট্রাম্প যখন কাতার ইস্যুতে এভাবে আরবদের পিঠ চাপড়াচ্ছিলেন, পেন্টাগন ঠিক তখন  কাতারের সাথে ফোনে ছিলেন আর প্রশংসা করছিলেন যে, “কাতার সরকার আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে কাতারে আমেরিকান সামরিক ঘাটির হোস্ট হিসাবে নিরলস খেদমত করে যাচ্ছেন আমরা এর প্রশংসা করি”। এভাবেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাতারি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে আমেরিকান মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন। [U.S. Defense Secretary Jim Mattis spoke on Tuesday by phone with his Qatari counterpart, a Pentagon spokesman said, without disclosing the details of their discussion] রয়টার্স আমেরিকান এক কূটনৈতিকের বরাতে জানাচ্ছে, “ট্রাম্পের টুইট একটু অস্বস্তিকর হলেও আমেরিকা নিরবে সৌদি আর কাতারের উত্তেজনা ঠান্ডা করার পক্ষে কাজ করছে কারণ কাতার আমাদের কাছে সামরিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপুর্ণ”।

এই হল লিপ সার্ভিসের কথা। তবু কাতার সরকারকে সৌদিরা উঠিয়ে ফেলে দিতে পারে, নিজ পছন্দের যে কাউকে আমীর বানাতে পারে। এককথাট বললে সৌদিরা কাতারে সামরিক হস্তক্ষেপ করে বসতে পারে সে সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু, তা মিটিয়ে নষ্ট করে দিয়েছে তুরস্কের এরদোগান। প্রথম দিন তিনি এক বিবৃতি দিয়ে বয়ানে নিজের পক্ষে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেন। বলেন যে কাতারের বিরুদ্ধে ‘টেররিজমের অভিযোগ সত্য’ হলে তিনি নিজেই আগে ব্যক্তিগতভাবে আমল ও হস্তক্ষেপ করতেন। [ “Presenting Qatar as a supporter of terrorism is a serious accusation,” the Turkish leader said. “I know [Qatar’s leaders] well and if that had been the case, I would have been the first head of state to confront them.”] অর্থাৎ তিনি আসলে বলছেন, টেররিজমের অভিযোগ ছাড়েন, কাতারকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে আমি দিব না।

এটাকে বলা যায়, সৌদিরাই কী দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির প্রধান নেতা হবেন? নাকি নাকি তিনি কেউ নন?  – এই প্রশ্নে এরদোগানের জিত হয়েছে। তিনি আসলে বলেছেন আমি দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির মনঃকামনা পুরণের নেতা।  আর তাই পরেরদিন তুরস্ক ২০১৪ সালের এক চুক্তি মোতাবেক কাতারে এক সামরিক ঘাটি স্থাপন করেছে, জানতে পারি।  তুরস্কের পার্লামেন্ট এটা অনুমোদন দিয়েছে।  আর এটাই সম্ভাব্য যে কোন সৌদি সেনা পাঠানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এক বিরাট ডিটারেন্ট, পাল্টা অবস্থান যা সৌদিদের যে কোন গোপন-প্রকাশ্য ইচ্ছাকে একাবারে নাকচ করে ফেলেছে। তাই এক কথায় বলা পরিস্থিতি এখন স্টেলমেট। অর্থাৎ গায়ের জোর বা সামরিক মাসল দেখানোর আর সুযোগ নাই। এখন খুব সম্ভবত পরিস্থিতি বাতচিত ডায়লগ এই লাইনে আগাবে ও শেষ হবে – বিবদমান সবপক্ষের জন্য এটাই একমাত্র খোলা পথ।  ওদিকে জার্মানীর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক সাক্ষাতকারে ট্রাম্পকে কাতার পরিস্থিতির জন্য এক হাত নিয়েছেন। তিনি অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করাসহ ট্রাম্পের এই নীতিকে কঠোর সমালোচনা করেছেন। এটাও কম তাতপর্যপুর্ণ নয়।

খুব সম্ভবত সৌদিদের হার এখন ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকবে। রাশিয়া সফররত কাতারি পররাষ্ট্র মন্ত্রী (সন্তান থানি) যখন মিডিয়া সাক্ষাতে বলেন “হামাস রাজনৈতিকভাবে এক বৈধ  প্রতিরোধ আন্দোলন” – এই বয়ানের ওজন ভয়ানক। মজলুমের পক্ষে দুনিয়াব্যাপী মুসলমান জনগোষ্ঠি এই বয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে ও যাবে, যা অপ্রতিরোধ্য।

এঘটনায় সবচেয়ে বড় সুযোগ এসেছে সৌদি বাদশার। তিনি চাইলে ছেলের বুদ্ধিসুদ্ধির ব্যাপারে কিছু শিক্ষা নিতে পারেন। নাকি ২০৩০ সালে সব শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে চান! আমরা অপেক্ষা করব হয়ত দেখার জন্য।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন : চীন আরেক ধাপ আগালো

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত
চীন আরেক ধাপ আগালো

গৌতম দাস

মে ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2fm

চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ (Belt & Road Initiative)। এটা এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকা মহাদেশকে এক সাথে জুড়ে এমন এক যোগাযোগ অবকাঠামো প্রকল্প। যোফাযোগ সড়ক পথে ও সমুদ্র পথে এবং দুটাকে মিশিয়ে ব্যবহার করা হবে। এখানে তাই দুটা প্রকল্পের সমাহার। সড়ক প্রকল্পের নাম  Silk Road Economic Belt আর সমুদ্র পথ (যেটাতে জায়গায় জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের সুবিধা থাকবে আর ঐ বন্দরগুলো থেকে অন্তত ছয়টা সড়ক যোগাযোগের করিডোর বেল্ট রোডে গিয়ে যুক্ত হবে) এই প্রকল্পের নাম  Maritime Silk Road। এই দুই মেগা প্রকল্পকে একসাথে বেল্ট ও রোড উদ্যোগ নাম দেয়া হয়েছে।

চীনা উদ্যোগে ও বিনিয়োগে নেয়া এই প্রকল্প যেসব দেশের উপর দিয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট সেসব ৬৫ টা রাষ্ট্র এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে – এটা এমন এক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে এশিয়ার কোন রাষ্ট্রকে বাদ রাখা হয় নাই। তবে যদি না কেউ নিজে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, সেকথা আলাদা। বলা ভাল এখানে এশিয়ান রাষ্ট্রগুলোরই প্রাধান্য; তবে অবশ্যই সাথে ইউরোপ, সেন্ট্রাল এশিয়া আর আফ্রিকার কিছু দেশও অন্তর্ভুক্ত। এর ভৌগলিক ধারণাটা হল, বাংলাদেশ থেকেই যদি ধরি, এখান থেকে মূল হাইওয়ে সড়ক পথে (যেটাকে Silk Road Economic Belt বলা হচ্ছে)  চীন হয়ে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে, পুর্ব ইউরোপ হয়ে পশ্চিম ইউরোপে যাওয়া সম্ভব। এটাই মূল হাইওয়ে। আর পথের দুপাশের সব রাষ্ট্রকে এই অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নেয়া হবে। ওদিকে এই পথের শেষ হচ্ছে ইউরোপের রটারডাম (নেদারল্যান্ড) গিয়ে। সেখান থেকে আবার একই রোডে না ফিরে  ফিরতি সমুদ্র পথ নিবার সুযোগ আছে। সে হিসাবে এবার ইতালি হয়ে নৌপথে অথবা কখনও কোস্টাল সড়ক ঘুরে বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব। তবে ঐ মূল হাইওয়েতে সময়ে সময়ে করিডর হিসাবে অন্তত ছয় জায়গায় ছয়টা করিডর-সংযোগ সড়ক  থাকবে মূল হাইওয়ে সড়কে।  আর ঐ নৌপথের মধ্যে মধ্যে অন্তত দশটা জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের যোগাযোগ আছে/ থাকবে যেখান দিয়ে নৌপথ ছেড়ে কোন একটা করিডর ধরে মূল হাইওয়ে সড়কে উঠা সম্ভব।

২০১৩ সালের শেষের দিকে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নামে এই আইডিয়া প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিলেন চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাই এই প্রকল্পকে শি জিনপিং এর মাথা থেকে আসা প্রকল্পও বলে থাকেন অনেকে। গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ (আগের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’কে কেন্দ্র করে এই সম্মেলনের নাম এটা) এই মেগাপ্রকল্পের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ খবর মতে, মোট ৩০টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান এতে যোগদান করেছিলেন জানা গেল। এছাড়া মোট ১০০টারও বেশী রাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।  এদের মধ্যে ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধান বলতে রাশিয়ার পুতিন ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ অনেকে রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। আর দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যাদের এমন ওপর দিক থেকে সাতটা বড় রাষ্ট্র হিসেবে তাদের ক্লাব জি-৭ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রীই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তাই বলে ব্রিটেন, জার্মানি বা ফ্রান্স – ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই তিন মূল মাতবর এই সম্মেলন ঠিক বর্জন করছেন তা নয়, তবে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী হাজির ছিলেন।

আসলে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির চলতি দুনিয়ায় এবার নতুন করে চীনা নেতৃত্বে নতুন পোলারাইজেশনে ঢেলে সাজিয়ে খাড়া হতে চাচ্ছে; দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি এই শতকের শুরু থেকে সে দিকে। বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ সে পথে অগ্রসর হওয়ার দিক থেকে আর এক ধাপ উদ্যোগ বলা যায়। বিশেষ করে চীনের নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক যাকে বলা হয়, সেই এআইআইবি বা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) গঠনের সময় যেমন পশ্চিমের নেতি প্রতিক্রিয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এবার বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের সম্মেলন এর সময়ও অনেকটা সে মাত্রার না হলেও সেরকম কিছু নেতি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এবার ভারতের দিক থেকে। আর ওদিকে নেতি প্রতিক্রিয়ার নেতা খোদ আমেরিকা এবং এশিয়ায় আমেরিকার ঘনিষ্ঠ অংশীদার জাপান, এই দুই রাষ্ট্র বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর কথা সম্মেলনের আগে শুনা গেছিল।
তবে সম্মেলন শেষ পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে যাকিছু ছিল জল্পনাকল্পনা এখন সেসব সত্যি হয়েছে। আমেরিকান সরকারী  দলের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রেসিডেন্টের এডভাইজার (White House adviser Matt Pottinger)।  ভারতীয় মিডিয়া গত ১৩ মে থেকে প্রবলভাবে দাবি করছিল যে আমেরিকা ইউটার্ন নিয়েছে। সে এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছিল। আবার ব্যাপারটা একেবারে আকস্মিক বা হতেই পারে না তাও ছিল না। কারণ গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর থেকে ট্রাম্প শিবিরের এক্সপার্টরা বলতে শুরু করেছিলেন যে ওবামা এআইআইবি ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ এবং বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ এই দুটোর বিরোধিতা করে ঠিক করেননি।
ওদিকে ভারত অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কী নিয়েছে তা সম্মেলন শুরুর আগের সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পষ্ট জানা যায়নি। তবে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, ‘আমেরিকার ইউটার্ন ভারতের ওপর চাপ তৈরি করেছে’। কিন্তু ঠিক কী কারণে ভারত এই সম্মেলন বর্জন করছে এ বিষয়ে দুটো মিডিয়া দুই রকম জবাব দিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, ‘চীন বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প নিয়ে ভারতের জন্য যথেষ্ট আস্থার পরিবেশ তৈরি করেনি’ (…”China has not created an environment of trust to carry out the belt and road projects”.) তাই সে যাচ্ছে না। তবে ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসির কোন জুনিয়র প্রতিনিধি দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল। বিপরীতে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস লিখছিল, সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করে একটা মেসেজ দেয়া দরকার। কারণ তারা আমাদের সার্বভৌমত্ব ইস্যুকে হালকা করে দেখেছে। (India is set to skip China’s ambitious One Belt One Road summit over sovereignty issues related to the latter’s involvement in the China-Pakistan Economic Corridor (CPEC), news agency PTI reported. ) অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে ভারতের অংশগ্রহণ এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে সরকার ঠিক কী কারণ দেখাবে তা সম্ভবত এখনো অফিসিয়ালি সাব্যস্ত হয়নি। যার অর্থ দাড়ায়, সার্বভৌমত্বের অভিযোগটা নিয়ে ভারতই সিরিয়াস নয়। ব্যাপারটা আসলে এমনই এটা মনে করার কারণও আছে। কিন্তু ভারত অভিযোগটা উঠাল কোন সূত্রে?
পাকিস্তানের গোয়াদরে (আরব সাগরের মুখে, ইরানের সাথে সীমান্তে) গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের বুক চিরে দক্ষিণ থেকে উত্তর পেরিয়ে হাইওয়ে (চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর) সড়কপথ চালু করা হয়েছে। এটা পাকিস্তান পেরিয়ে চীনের ল্যান্ডলকড জিংজিয়ান প্রদেশের খাসগড়ে গিয়ে মিলেছে। তবে চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর এই করিডোর-সড়ক বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের মূল হাইওয়ে সড়ক আগে ক্রস করে নিয়েছে। অর্থাৎ গোয়াদর থেকে আসা সড়কই চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর। চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর। কিন্তু আবার পাকিস্তান পেরোনোর আগে এই সড়কের কিছুটা অংশে পাকিস্তানের আওতাধীন কাশ্মির পেরিয়ে এসেছে। আর এটাকেই ভারত ইস্যু করতে চাইছে। বাস্তবতা না থাকলেও ‘কাশ্মিরের পুরোটাই ভারতের অংশ’ বলে ভারতের এক অফিসিয়াল দাবি আছে। অতএব চীন পাকিস্তান-কাশ্মির ব্যবহার করে এই সড়ক তৈরি করে ভারতের সার্বভৌমত্ব হালকা করে দেখেছে -এই হল ভারতের উছিলা, ভারতের যুক্তি। অর্থাৎ এটা কোনোমতে মেলানো এক দাবি মাত্র। আগেই বলেছি ভারতের দুই মিডিয়ার দুই ধরনের বক্তব্য প্রমাণ করে ভারত সরকার নিজেই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে সিরিয়াস নয়। বরং চীন আরো কত তেল মারলে ভারত নিজেই এই সম্মেলনে যোগদান করবে যেন এরই অপেক্ষা। এ দিকটাতে তাকিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, “এবার এখনই সম্মেলনে প্রতিনিধি না পাঠালে ভারতের বস্তুগত লাভালাভের দিক থেকে ক্ষতি বৃদ্ধি নেই, কারণ ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প কোনো সদস্যপদভিত্তিক সংস্থা নয়’। অর্থাৎ আরো দেরি করে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে নিজের দাম আরো বাড়ে কি না তা পরখে নামতে চায় ভারত। তবে যোগদান না করার ব্যাপারে ভারত অবশ্যই বেপরোয়া নয়, কারণ এটা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং তা ফিজিক্যালিই গ্লোবাল। (There may not be any immediate material loss to India if it goes unrepresented because OBOR is not a membership-based organisation)। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় ভারত কখনোই চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সম্মেলনে যোগদান করবে না তা বলে নাই। অর্থাৎ আগেই একেবারে না করে দেয়নি। তবে এই প্রকল্পের প্রতি আমেরিকা নীতি অবস্থান, মতামত বদলে ছিল বলে নয়, এই সম্মেলন যে ইতোমধ্যে গ্লোবাল আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে এর আর এক ভালো প্রমাণ হল, এতে অংশগ্রহণ করছেন জাতিসঙ্ঘের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তেনিও গুতারেস এবং  বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের নির্বাহী প্রধানরা। এর অর্থ গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প একটা ফ্যাক্টর এর পক্ষে স্বীকৃতি এসেছে। আর তা হওয়ার কোন কারণ নাই। কারণ, পুরা প্রজেক্ট মানে ৬৫ টা রাষ্ট্রের তরফে সব বিনিয়োগ যোগ করলে শেষে সেটা ৯০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে এক অনুমিত হিসাব দেখিয়েছে।

তবে শুরুতে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে, তা ইতোমধ্যেই রেডী। এর জবাবে চীন বলছে ৪০ বিলিয়ন ডলার চীন নিজের উন্নয়ন ব্যাংক থেকে জোগান দেবে। আর তাতক্ষণিক বাকিটা আসবে সদ্য গঠিত এআইআইবি ব্যাংক থেকে। এ ছাড়া ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের ভেতরে যে আরো একটা অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক আছে (নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে, সম্প্রতি যেখানে বাংলাদেশসহ ১৫ এশিয়া দেশকে সদস্য করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে) সেখান থেকেও জোগানো হতে পারে। মোট ৬৫টি রাষ্ট্র এই প্রকল্পে যোগ দেয়া আর নিজের নিজের রাষ্ট্রকে মূল অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নিতে গেলেও প্রত্যেক রাষ্ট্রকেও কিছু সংযোগ-অবকাঠামো করে নিতে হবেই। আর সে কাজেও যা বিনিয়োগ লাগবে সে ঋণের বড় অংশ  চীন জোগান দিতে রাজি। আবার বিশ্বব্যাংকো কী বিনিয়োগের সুযোগ নিবে না? আর পশ্চিমা জগতের যেখান থেকে বিনিয়োগ আসুক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে বিনিয়োগের মুল উৎস হবে আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট। অতেওব আমেরিকাসহ সাড়া পশ্চিম এতে অংশগ্রহণে ঝাপিয়ে পড়বে এতাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা চীনা বিনিয়োগ পাব বেশ বড় অঙ্কে, সেটা অনেক বেশি পরিমাণ হবে। তাহলে ভারত কী দূরে গোসা ঘরে খিল লাগিয়ে বসে থাকবে, পারবে? নাকি পোষাবে?

কলকাতা থেকে বাংলাদেশ, মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং – যেটা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে বিসিআইএম (BCIM) প্রকল্প বলা হয়- সেই হাইওয়ে সড়ক কুনমিং চীন হয়ে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা, পরিকল্পনা মোতাবেক। এই সড়কের আর একটা অংশ হবু সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত থা্কার কথা। সোনাদিয়া-বিসিআইএমের মাধ্যমে এটাই আর একটা করিডোর হিসেবে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হবে। এই হল পরিকল্পনা। এখন ভারতের ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পে যোগ না দিতে ইচ্ছা জানানোর অর্থ হবে ভারত বিসিআইএম প্রকল্পে নেই। কলকাতা-বাংলাদেশ অংশটা নাই। এমন ইচ্ছা করতে ভারত চাইতেই পারে। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না এমন ইচ্ছার কাফফারাও আছে তা ভারতের অজানা নয়। তবু একটা কথা এবার স্পষ্ট যে এতদিন বিসিআইএম নিয়ে গড়িমসি করা, মিয়ানমারকে নিরাসক্ত করে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা, বাংলাদেশে বন্দরের স্থান নির্বাচন নিয়ে হাসিনার উপর অর্থহীন হস্তক্ষেপ ও সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি যা কিছুতে ভারত ভূমিকা রাখতে পেরেছিল, এবার সেসবের দিন শেষ। ভারতের পড়শি কোনো রাষ্ট্র এই সম্মেলনে যোগ দিতে বাকি নেই, মিয়ানমার নেপালসহ, ব্যতিক্রম শুধু ভুটান।এটা এখন সবার কাছে স্বচ্ছ যে ভারত, ভুটান আর ওদিকে জাপান ছাড়া এশিয়ার আর কোন রাষ্ট্র বাকী নাই। সবাই ভারতকে ছেড়ে চলে গেছে।
এক কথায় বললে ভারতের পক্ষে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী না সম্ভবত বলা যায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ভারতের পক্ষে অসম্ভব। যেমন সেক্ষেত্রে এর একটা অর্থ হবে, ৬৫টি রাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে বা একই পদক্ষেপে একই অবকাঠামো সুবিধায় যুক্ত হওয়া – যেকোন রাষ্ট্রের জন্য এ’এক বিরাট সুযোগ। এথেকে ভারত নিজেকে বাইরে রাখবে? যদি জিদ করে রাখেই (যদিও জিদ করে রাষ্ট্র চলে না) তবে সেটা হবে দেখার মত ঘটনা। কারণ সেটা হবে রীতিমত নিজেই নিজের ওপর অবরোধ ডাকার শামিল। সবার থেকে একঘরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ফলে ভারতের এমন সিদ্ধান্ত নেয়া অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, কিছুটা দেরি করতে পারে। কিন্তু তাতেও নিজের ক্ষতি, পিছিয়ে পড়ায় ঘটবে।

আগেই বলেছি  গ্লোবাল অর্থনীতির চীনের নতুন নেতা হওয়ার দিক থেকে বিচারে,  বিশ্বব্যাংকের সমান্তরালে এআইআইবি ব্যাংক চালু করে ফেলতে পারা – এটা যদি নতুন নেতা হবার পথে একটা অগ্রপদক্ষেপ হয়ে থাকে, তবে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ হবে প্রায় সমান্তরাল তবে বেশী গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় পদক্ষেপ। আর এক ধাপ আগানো। যদিও প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক থেকে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের ইমপ্যাক্ট হবে এআইআইবি ব্যাংকের চেয়ে বেশি। কারণ এটা অবকাঠামো, মানে ফিজিক্যাল পদক্ষেপ। আর এই ফিজিক্যাল পদক্ষেপের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকার কারণে গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের ওজন ও গুরুত্ব হবে আরো দৃশ্যমান এবং এটা হবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গ্লোবাল অর্থনীতিতে ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছর ডাবল ডিজিট গ্রোথের কাল মানা হয়, বর্তমানে যা তুলনামূলক শ্লথভাবে চলছে। মনে রাখতে হবে সে অর্থনীতিতে আবার এক গতির সঞ্চার করার সম্ভাবনা রাখে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ।
আজকের ভারত হল, সেই ডাবল ডিজিট গ্রোথের কালের এক অন্যতম বেনিফিশিয়ারি। আবার এআইআইবি ব্যাংক গড়ার কালে ভারত ছিল সঠিকভাবেই চীনের সমর্থক, প্রধান সাগরেদ। ওই ব্যাংকের মালিকানায় চীনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ, এরপরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারতের প্রায় ১০ শতাংশ, অন্যদের মধ্যে ৫ শতাংশর ওপরে কেউ নেই। আমেরিকার শত প্ররোচনাতেও ভারত চীনের ওই ব্যাংক উদ্যোগে সাথ ছাড়েনি।

তাহলে ভারত ঠিক কিসের বিরোধিতা করছে, কী পেতে সেটা করছে? আমরা আশা করি না এসব ক্ষেত্রে ভারতের কোনো সিদ্ধান্ত ঈর্ষাপ্রসূত, ভুল ভিত্তির এক্সপেকটেশন বা ওভার এস্টিমেশনের দোষে দুষ্ট হবে। দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম জেঁকে বসার পর থেকে দেখা গেছে এক এক কালে কোনো এক রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডে ওই কালের সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ভূমি হয়ে হাজির হয়েছে। যার অর্থ এরপরের নতুন বিনিয়োগ বা নতুন যেকোনো উদ্যোগ নেয়ার সুবিধা ওই রাষ্ট্র এককভাবে পেয়েছে। এখন সে সুবিধা ভোগের  দিন চলছে চীনের। এটা অবজেকটিভ, ফলে এর সাথে লড়ার বা একে মানতে না চাওয়ার কিছু নেই। কারণ এই সঞ্চিত উদ্বৃত্ত এটাই যেকোনো রাষ্ট্রের পরাশক্তি, রুস্তমি, প্রভাব বিস্তারসহ সব ধরনের ভূমিকায় হাজির হওয়ার আসল উৎস। এটা অবজেকটিভ বলে তা না মানাও মুশকিল। ফলে দুটি কথা ভারতকে মানতেই হবে। এক. আমেরিকা ভারতের ভবিষ্যৎ নয়। ভারতের পক্ষের শক্তি নয়, বড়জোর অস্ত্রের সরবরাহকারী হতে পারে। তা হোক, তাতে সমস্যা নেই। তবে গ্লোবাল অর্থনীতির আগামী নেতৃত্বের ভাগ অর্থে ভারতের পক্ষের শক্তি হল চীন। এটা শুনতে অনেকের ঈর্ষা মনে কটু লাগতে পারে কিন্তু এটা বাস্তবতা। ফলে চীনের সাথে সীমানা বিরোধসহ যা কিছু বিরোধ আছে তা নিগোসিয়েশনের সুযোগ নেয়া হবে ভারতের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।কিসের ভিত্তিতে ভারত ধরেই নিয়েছে চীনের সাথে তার য়াগামি দিন হবে সংঘাত ও বিরোধে? পিছন ফিরে বা আশেপাশে তাকালে এটা দেখতে পাওয়া মোটেই কঠিন নয় যে এই ধারণার উৎস ও সরবরাহকারি হল খো আমেরিকা। আর তার পরিচালিত নানান থিঙ্কট্যাংক-গুলো। আজকে এসব ঠিঙ্ক-ট্যাংকগুলো আমেরিকার প্রতিনিধি পাঠানোর এই ইউ-টার্ণ এর কী ব্যাখ্যা দিবে? চীন নাকি খালি ভারতকে ঘিরে ধরার মতলবে আছে? তাহলে সেই ভারতকে ফেলে আমেরিকা কোথায় ছুটছে? আসলে কারও প্ররোচিত বক্তব্যে, বুলিতে থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক হয়না। চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। আর এর প্রধান শর্ত অন্তত দেশীয় অর্থে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়।

এ ছাড়া এশিয়াতে কার ভূমিকা প্রধান হবে ভারতের না চীনের? এই তর্ক কী ভারতের ইচ্ছাধীন নাকি ভারতের অর্থনৈতিক সামর্থের উপর নির্ভরশীল? ভারতের সামর্থ এশিয়ায় চীনের চেয়ে বেশি হলে ভারত বাড়তি সুবিধা পাবে, নইলে নয়। তাই নয় কী?  এটা তো বাংলাদেশে একজন বসিয়ে, ল্যান্ডলক নেপালে ঐতিহ্যবাহী নিয়ন্ত্রণ আগের মতই বজায় থাকবে ধরে নিয়ে, শ্রীলঙ্কায় নতুন সরকার কায়েম করে চীনের প্রভাব কমাতে হবে ইত্যাদিতে যা কিছু করা হয়েছে তাতে কোনো কিছুই সামলানো যায়নি, যাবে না। এছাড়া এটা আর কলোনি সাম্রাজ্যের যুগ নয়। এ যুগে “চীনের সাথে ভারতের পড়শিরা সম্পর্ক রাখতে পারবে না” ভারত সবাইকে চীনমুক্ত দেখতে পাবে –  এটা ভারতের কোনো মুরোদের ওপর ভরসা করে নেয়া বিদেশনীতি? এর চেয়েও অবাক কাণ্ড এই বাস্তবতাহীন নীতিকে প্রশ্ন করার লোকজন ভারতে ক্রমশ  দুষ্প্রাপ্য হচ্ছে। যার মূল কারণ সম্ভবত এরা আমেরিকার পে-রোলে নাম লিখিয়েছে। অথচ খোদ আমেরিকাই পল্টি মেরেছে! তাই নয় কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। চীনে শীর্ষ সম্মেলন যা এই লেখার বিষয়বস্তু তা ছিল ১৪-১৫ মে। ফলে লেখাটা শেষ করা হয়েছিল সম্মেলন শুরুর আগে। আর এখানে এখন যখন আবার প্রকাশ করা হচ্ছে তখন ঐ সম্মেলন শেষ হয়ে গেছে। ফলে আপডেট করার মত বহু তথ্য এখন জমা হয়ে গেছে। তার বহু তথ্য এখানে যতটা সম্ভব আপডেট করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটা আগের লেখার থেকে বহুলাংশে সংযোজিত এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

গৌতম দাস

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2cF

 

 

 

বলার অপেক্ষা রাখে না দুনিয়াজুড়ে সবার উপরে এক ট্রাম্প-জ্বর চেপে বসেছে। ট্রাম্প মানে, গেল মাসে শপথ নেয়া আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প। ট্রাম্পের আগমণের মুল ম্যাসেজ হল, আমেরিকার সাথে সম্পর্কিত দুনিয়াজুড়ে যত ঘটনা আছে তা আর আগের মতো করেই আগের নিয়মে, অভ্যাসে বা আইনে ঘটবে না এটাই আজকে ধরে নিতে হবে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তবে এর চেয়ে বড় কথা ‘ট্রাম্প কেন এমন’ গভীরে গিয়ে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। যদিও বলা হচ্ছে ট্রাম্প আনপ্রেডিক্টেবল লোক। মানে লোকটা কখন কী করে তা আগে বলা যায় না, এর তালঠিকানা নেই। কিন্তু যে লোক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তার তালঠিকানা নেই এটা বুঝতে হবে, সেটা আবার কেমন কথা? হ্যাঁ, তা ঠিক। ব্যাপারটা হল, আসলে আমরা বলতে চাচ্ছি, কোনো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের যেসব কাজ যেভাবে করা্র কথা না বা যেভাবে বলার কথা না বা অথবা যেসব নীতি নেয়া অসম্ভব অথবা হওয়ার কথা নয় বলে আমরা মনে করতাম; ট্রাম্পকে আমরা তেমন কাজ করা ও সিদ্ধান্ত নিতেই  দেখছি। ফলে কাম্য অর্থে আমরা বলছি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তালঠিকানা নেই। ব্যাপারটা যেন এ রকম যেমন, আমেরিকা এক এম্পায়ার, মানে এক মোড়ল বলে ধরতে পারি। এখন যে লোক মোড়ল তার বাসায় সারা দিন বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের লোকের আসা লেগেই থাকবে। ফলে স্বভাবতই তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও মোড়লকে করতে হবে। এই আপ্যায়ন বলতে ন্যূনতম চা-নাশতা আর এর চেয়েও প্রধান বিষয় যথেষ্ট বসার জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন মোড়ল যদি হঠাৎ বলে এখন থেকে আর বসার কোনো ব্যবস্থাই থাকবে না, দাঁড়িয়ে কথা শেষ করতে হবে তাহলে সমাজ বলবে এই মোড়লের তালঠিকানা নেই।

ট্রাম্পের নীতি কেমন এই প্রশ্নে মিডিয়া বলছে সে প্রটেকশনিস্ট, মানে সংরক্ষণবাদী। সংরক্ষণবাদী মানে কী? মানে হল যে নিজ বাজার বিশেষত অন্য অনেক কিছুর সাথে নিজ জনগণের চাকরির বাজার সংরক্ষণ করে আগলে রাখতে চায়। সাধারণ অর্থে এটা দোষের কিছু নয়। সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হল কী ভাবে? যেভাবে করতে চাওয়া হচ্ছে তা কী কাজ করবে? অন্য কোন পথ কী নাই?  ট্রাম্প নিজে তার এই নীতির দিকটা ঠিক ‘সংরক্ষণবাদী’ বলে পরিচয় করান না। বলছেন, এটা নাকি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, মানে সবকিছুতে সবার আগে আমেরিকা – এই নীতি। তার শপথ নেয়ার পরবর্তী বক্তৃতার প্রথম প্রসঙ্গ ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বয়ান।
আবার অনেকে  বলছেন,  ট্রাম্পের নীতি অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন। সংরক্ষণবাদী মানে এর আর এক অর্থ ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন’ ত বটেই।  সেই সত্তরের দশক থেকে আমেরিকা এত দিন সবাইকে গ্লোবালাইজেশন যোগ দিয়ে নিজ নিজ বাজার খুলে দিতে প্ররোচিত করত চাপ দিত। আজ, সেই আমেরিকা ট্রাম্পের জমানায় এসে উল্টো দিকে চলা শুরু করেছে। যেমন সে ওবামার আমলে সে চীন বাদে ১২ রাষ্ট্রের বাণিজ্য জোট – টিপিপি করেছিল। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে প্রথম সপ্তাহেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমেরিকাকে ওই বাণিজ্য জোট থেকে বের করে এনেছে।

কিন্তু গ্লোবালাইজেশন আর বাজার এর সম্পর্ক কী – এসম্পর্কে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে।  গ্লোবালাইজেশন মানে অবশ্যই নিজ বাজার খুলে দেওয়া। কিন্তু এটাই এর একমাত্র অর্থ বা দিক বৈশিষ্ট নয়। বাজার খোলা মানে অন্যের বাজার খোলা পাওয়াও বটে। অন্যের বাজার খোলা পেয়েছি বলেই ত গার্মেন্ট বেচে বছরে ৩২-৩৮ বিলিয়ন ডলার কামাতে পারি। যদিও আমেরিকার মাতব্বরি তাই গ্লোবালাইজেশনে এসে কম অথবা অকার্যকরও হয়ে যায় নাই। আমাদের বাজার খুলে দিবার মানে গ্লোবালাইজেশনের অংশ হবার আগেও যেমন আমাদের উপর আমেরিকান দাদাগিরি ছিল এখনও প্রায় তেমন কার্যকর আছে। এমনকি গার্মেন্টস নিয়ে আমেরিকার বাজারে সব পণ্য কোডে ঢুকতে যাতে না পারি সেজন্য কোটার নিয়ন্ত্রণ দেয়া আছে। এতসব কিছুর পরও ব্যাপারটা হল – কিছু কিছু ছিদ্র আছে, শর্ত পরিস্থিতি আছে, ক্যাপিটালিজমের লজিক আছে, স্ববিরোধীতা আছে  যেখানে আমেরিকা মুরুব্বির ক্ষমতা থাকলেও তা প্রয়োগ করতে পারে না। কাজে লাগে না। তাদের আরো বড় ক্ষতি হবে বলে। এদিকে আমাদের নিজ সক্ষমতা আছে, দক্ষতা আছে, নিজ শ্রমের বাজারমুল্য বিদেশের তুলনায়  সস্তা এবং দক্ষ (নুন্যতম মজুরি বাড়িয়ে দিলেও তা সস্তা থাকবে) – এই ধরণের আরও অনেক তুলনামূলক-সুবিধা (কমপিটিটিভ এডভ্যানটেজ) আছে – এগুলো আমেরিকা চাইলেও ঠেকায় রাখতে পারে না। আমাদের এসব সুবিধার দিক গুলো নিয়ে –  লেগে থাকা স্টাডি, আর বুদ্ধি খরচ করে চলতে পারলে আমাদের জন্য বন্ধ বাজার (প্রটেকশনিজম) এর  চেয়ে তুলনায় গ্লোবালাইজেশন এর সুবিধা বেশি। ফলে আজকের যুগের লড়াইটা  – গ্লোবাল বাজারে নিজের শেয়ার বাড়ানোর, এটা ঠিক নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়, বা অন্যের প্রবেশ ঠেকানো নয়

চলতি শতকের শুরু থেকেই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে বুশের দ্বিতীয় টার্ম (২০০৫ সাল) থেকে শুরু করে ওবামার দুই টার্ম এই পুরা সময় ধরে আমেরিকা এশিয়ায় চীনা কনটেনমেন্ট নীতি বা ‘চীন ঠেকানোর আমেরিকার নীতি’ চালু রেখেছিল। এই নীতির সার কথা হল – চায়না ঠেকানো ( China Containment)। মানে দুই রাইজিং ইকোনমির (ভারত ও চীন) একটাকে কাছে টেনে ফেবার করে, সুযোগ সুবিধা দিয়ে অন্যটার বিরুদ্ধে লাগা ও লাগানো। ভারতকে কাছে টেনে কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে, নিজের মোড়লি-শক্তির কিছু ভাগ ভারতকে দিয়ে তাকেও চীন ঠেকানোয় কাজে লাগানো। গত প্রায় ১০-১২ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি এটাই।   কিন্তু এই ব্যাপারে ট্রাম্পের নীতি সম্ভবত ভিন্ন হতে যাচ্ছে, না চাইতেও। যেমন চীন বা ভারতের সাথে ট্রাম্প যে আমেরিকা সাজাতে চাইছে তাতে এই দুই রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তি হবে – আমেরিকান কাজের বাজার এই চীন বা ভারত কে কোথায় নষ্ট করছে সেটা দেখা ও ঝগড়া করে ঠেকানো। যে যেখানে আমেরিকান কাজের বাজার নষ্ট করছে সেখানে তার সাথে বিরোধিতা চরমে নেওয়ার নীতি এটা। এজন্য যদিও ট্রাম্প পরিষ্কার করে বলেননি যে চীন ঠেকানোর পুরনো নীতি তার আমলে কী হবে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, আমেরিকান কাজের বাজার কেউ নষ্ট না করুক এটাই ট্রাম্পের ফোকাস। আর সেটাকে বাধা দেয়াকে মুখ্য করে বিদেশ নীতি সাজানো ট্রাম্পের নীতি।

তাহলে সার কথা দাঁড়াল, চীনের বিরোধিতা ওবামারও ছিল। অর্থাৎ  ‘চীন ঠেকানোর’ “এশিয়াতে আমেরিকা পিভোট বা ভারসাম্য আনয়নকারী হয়ে থাকবে” এই নীতি ওবামা চালিয়ে গিয়েছেন। মানে সেটা এশিয়ায় চীনা প্রভাব ঠেকানো অর্থে। এদিকে ট্রাম্পও চীন-বিরোধী তবে সেটা আমেরিকার কাজের বাজার কতটা চীন ধ্বংস করছে সেটা ঠেকানো অর্থে। আর ওদিকে ভারতের বেলায়, ওবামা (এবং তারও আগে বুশও ছিল) ভারত-তোয়াজের পক্ষে, চীন ঠেকানো তত্ত্বের কারণে। কিন্তু ট্রাম্প ইতোমধ্যে ভারত-বিরোধী অবস্থান নিয়েছে, তবে সম্পুর্ণ ভিন্ন ভাবে। কারণ ভারতের আইটি শিল্প এই টেকনোলজি আমেরিকান নাগরিকের চাকরি খাচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। প্রসঙ্গটাকে আমরা ‘H1-B ভিসা কর্মসূচি’ দিয়ে বুঝতে পারি। এটা একটা বিশেষ ক্যাটাগরির ভিসা কর্মসূচির নাম। আমেরিকার আইটি শিল্প বা সফটওয়্যার ব্যবসার বাজারটা মোটামুটি ১২০-১৫০ বিলিয়ন ডলারের। এর প্রায় ৭০ ভাগ বাজার ভারতের দখলে। ভারতীয় মালিকানার তবে আমেরিকায়ও রেজিষ্টার্ড তিন-চারটা কোম্পানী এই বাজার দখল করেছে। আমেরিকায় রেজিস্টার্ড ভারতীয় মালিকানা কোম্পানিগুলো ওই ভিসা ক্যাটাগরিতে ভারত থেকে প্রোগ্রামারদের এনে আমেরিকার প্রোগ্রামারের থেকে কম বেতনে কাজে নিয়োগ করে আসছিল। যদিও ওই ভিসা ক্যাটাগরির পেছনের আইনে বলা ছিল যে এই ক্যাটাগরিতে ভারতীয় বা বিদেশীদের আনতে গেলে তাদের ন্যূনতম বেতন বছরে ৬০ হাজার ডলার বা এর বেশি হতে হবে। শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর সাফাই ছিল যে, যেসব দক্ষ ও মেধাবী শ্রমগুলো (যাদের বেতন ৬০ হাজার ডলার এই মাপকাঠির ) আমেরিকায় যথেষ্ট পাওয়া যায় না আর সেকারণে তারা বিদেশ থেকে আনতে চাইছে। এই কথা আরো পোক্ত করতে বলা হত যে, ভারতীয়দের মাস্টার্সও আছে, আমেরিকানদের বেলায় মাস্টার্স করা চাকরিপ্রার্থী থাকে খুব কম জনের।
ট্রাম্প এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিপক্ষে তবে সেটা সে করতে চায় শর্তগুলোকে আরও কঠিন করে দিয়ে। তবে আরও শর্ত আরোপ করে এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিরুদ্ধে কেবল ট্রাম্প নয়; এমনকি কংগ্রেসে ও সিনেটে এখন সংখ্যাগরিস্ট রিপাবলিকান – ট্রাম্পের দল শুধু এই রিপাবলিকানরাও নয়, এই দলে অনেক ডেমোক্র্যাটও আছেন। তাই ট্রাম্পের শপথ নেয়ার আগেই গত ৫ জানুয়ারি থেকে কংগ্রেসে ‘হাই-স্কিল্ড ইনটিগ্রিটি অ্যান্ড ফেয়ারনেস অ্যাক্ট, ২০১৭’ নামে বিল আনার তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। এই কাজে এখনই চার থেকে পাঁচটা প্রস্তাবিত আইন কংগ্রেসে ঘোরাফেরা করছে। সেগুলোর অন্তত একটা বাই-পার্টিজান মানে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দুই দলের দুই সদস্যের যৌথ প্রস্তাব। শুরুর দিকের প্রস্তাবগুলোতে সংশোধিত  ‘H1-B ভিসা কর্মসূচিতে’ মুখ্য দুই পরিবর্তনের মধ্যে ছিল ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ডলার করা; আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা। এমন প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি হল, বছরে এক লাখ ডলার মানে মাসে আট হাজার ডলারের বেশি দিয়ে বিদেশী-ভারতীয় লোক আনতে গেলে সেটা আর আমদানিকারক কোম্পানীর কাছে লাভজনক থাকবে না। কারণ ওর চেয়ে কম বেতনে আমেরিকা থেকেই স্থানীয়ভাবে প্রোগ্রামার পাওয়া যাবে। আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকার শর্ত উঠিয়ে দেয়া মানে স্থানীয়ভাবে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামাররা ওই চাকরির আবেদন করতে পারবে ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হতে পারবে। এদিকে ট্রাম্পের শপথের পরে আরো যেসব নতুন বিল বা আইনের প্রস্তাব কংগ্রেসে উঠেছে সেগুলোতে ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ত্রিশ হাজার রাখা হয়েছে। বলা বাহুল্য ভারতীয়দের মাথায় হাত। ইতোমধ্যে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর ভারতে রেজিস্টার্ড অংশে শেয়ার বাজারে দরপতন হয়েছে গড়ে শতকরা ৯ ভাগ। আমেরিকান শেয়ারবাজারের এক অ্যানালিস্ট হিসাব করে বলছেন ভারতীয় তিন শীর্ষ কোম্পানিকে [টিসিএস (টাটা), ইনফোসিস ও উইপ্রো] নতুন হবু আইনে ৬০-৭০ ভাগ বেশি বেতন গুনতে হবে। ফলে আনুপাতিক মুনাফা কমে যাবে। অর্থাৎ অবস্থা খুবই বেগতিক। এসব কোম্পানির এক মালিক সমিতি আছে নাম ন্যাসকম (NASSCOM)। তারা খুবই তৎপর হয়ে লবিং করছে। তাদের কোম্পানীগুলো আমেরিকায় ব্যবসা করে কত ট্যাক্স দেয়, কত নতুন আনুষঙ্গিক কাজ সৃষ্টি করেছে এর এক স্টাডির ফিরিস্তি দিয়ে ট্রাম্পের দলবলের মনগলানোর চেষ্টা করছে। ওদিকে মজার কথা হল, মোদি সরকার নিশ্চুপ, প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অথচ গত নভেম্বরে ট্রাম্পের বিজয়ের পর থেকে এই বিপদ যে আসছে তা সরকার ও সংশ্লিষ্টরা সবাই জানে। তাহলে? বিষয়টা হল, কৌশল আর এক পুরনো বিশ্বাস। প্রকাশ্যে আপত্তি হইচইয়ের থেকে গোপনে যেভাবে সে আমেরিকার বিশেষ নজরের বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছিল এতদিন, সেটার অপেক্ষায় থাকা আর সে দিকে চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মোদি সরকার। আনন্দবাজার পত্রিকার এমনই এক রিপোর্টের শিরোনাম, ‘ট্রাম্পের শরণার্থী বিতর্ক এড়িয়ে আপন স্বার্থে নজর ভারতের’।  ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার পর মোদি পঞ্চম রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। এরপরে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ শেষে ২৫ জানুয়ারি সরকারপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ফোনে কথা বলেছেন। কিন্তু সেখানে কী আলাপ হয়েছে কোন আশার আলো আছে কিনা এসব বিষয়ে তেমন কোনো ব্রিফিং নাই।  ভারতের উদ্বিগ্নতার ইস্যুগুলো নিয়ে কোনো আলাপ হয়েছে কি না তেমন কোন কিছু জানা যায়নি। তবে কয়েকজন আমেরিকান বিশেষজ্ঞের মতামত হল, ভারত আমেরিকানদের চাকরি খেয়েছে – এই জায়গা থেকে কোনো ছাড় দেয়া অথবা সরে আসার কোন সম্ভাবনা তারা দেখেন না।

অনেক পাঠকের মনে হতে পারে যে, ট্রাম্প বা যেকোনো জাতীয়তাবাদী তো এমন সংরক্ষণবাদী অবস্থান নেবেই, ফলে এই সিদ্ধান্ত সঠিক। সরি, আসলে ব্যাপারটা তা নয়, এত সরলও নয়। বরং সস্তা জাতীয়তাবাদ, তাই এটা এযুগে অচল। যদিও আপাতদৃষ্টিতে তা সঠিক মনে হচ্ছে। কেন?
মূল বিতর্ক হল – শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর যুক্তি হল, যেমন একজন বলছেন –

Mr. Levie said, “When you have incredible talent that wants to work in your organization but you are preventing them from doing so, that is disastrous to innovation and competition.”

বাংলা করলে, ‘এক দিকে বিরাটসংখ্যক ট্যালেন্ট আমাদের সংগঠনের সাথে কাজ করতে চাইছে আর আমরা তাদের আটকে রাখতে চাইছি, এটা উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার দিক থেকে ধ্বংসাত্মক’। ইমোশনাল না হয়ে দেখলে আসলে, এখানে ট্যালেন্ট বলে ডেকে কোম্পানীগুলোর অবস্থানের পক্ষে এই সাফাই তৈরি করা হয়েছে। যার পিছনের সত্যি কথাটা হল, এই ‘ট্যালেন্টদের’ ভারত থেকে সস্তায় কম বেতনে পাওয়া যায় বলেই তাদেরকে গৌরবান্বিত করে এমন ট্যালেন্ট ডাকা হচ্ছে। কোনো কারণে যদি আমেরিকাতেই তুল্য দক্ষ শ্রম সস্তায় পাওয়া যেত, তবে সেসব আমেরিকানরাই সেক্ষেত্রে আবার ট্যালেন্ট হয়ে যেত। আসল কথা আমাদেরকে ক্যাপিটালিজমের স্বভাব বৈশিষ্ট্য খেয়াল রাখতে হবে। সে অবশ্যই সস্তা শ্রমের পক্ষে সব ধরনের যুক্তি-সাফাই গাইবেই। এখন প্রশ্ন হল, ক্যাপিটালিজমের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে আইন বানিয়ে ট্রাম্পের পক্ষে জয়লাভ করতে পারা সম্ভব কি না?

না, পারার কথা নয়। কেন? এই আইন কার্যকর হলে বিদেশী নয় আমেরিকানদের চাকরি হবে। কথা সত্য। কারণ সে ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা কোম্পানীগুলোর ভারতীয়দের চেয়ে স্থানীয়দের নিয়োগ দিলে বেতনের বিবেচনায় লাভজনক হবে। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এটাই একমাত্র বিবেচনার বিষয় নয়, আরও দিক আছে। মূলকথা এই স্থানীয় নিয়োগের বেলার এদের বেতন কিন্তু এখনকার তুলনায় ৬০-৭০ ভাগ বেশি হবে।  যার অর্থ এই সেক্টরের সফটওয়ার প্রডাক্টে ক্রেতাদেরকে  বেশি মূল্যে সফটওয়্যার ও সার্ভিস কিনতে হবে। অর্থাৎ আমেরিকানদের চাকরি দিতে গিয়ে – এই জাতীয়তাবাদ দেখাতে গিয়ে রাষ্টের পুরা সবাইকে  আমেরিকান – জাতিকে বেশি মূল্যে পণ্য কিনতে হবে। কিন্তু সে বাড়তি মূল্য দেয়া অপ্রয়োজনীয়, এই অর্থে কারো ভোগে লাগবে না। পুরোটাই লস। ব্যাপারটা হলো যেন সব আমেরিকান মিলে চাঁদা দিয়ে পকেট থেকে পয়সা গুনে বেকার আমেরিকান আইটি গ্র্যাজুয়েটদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াল। এর চেয়ে বেকারভাতা দেয়া কি সহজ ছিল না? এটা কি ন্যাশনাল প্রডাকশন বাড়ল না ন্যাশনাল লস? কোন খাতে ফেলব? প্রশ্নটা কাজ দেওয়ার, নাগরিকের পকেট কাটা নয়।  অতএব বলে দেয়া যায় – এই সস্তা জাতীয়তাবাদ টিকবে না।

এক গোড়ার সত্য বলি। সত্য এক. আমাদের মতো গরিব ছোট অর্থনীতির দেশের শ্রম (দক্ষ বা অদক্ষ দু’টিই) উন্নত বা বড় অর্থনীতির দেশের শ্রমের চেয়ে সস্তা ও প্রতিদ্বন্দ্বী হবেই। এখনো অনেক দিন এটা হবে। আর সত্য দুই. ক্যাপিটালিজমের সাধারণ ঝোঁক হবে এই সস্তা শ্রমের পক্ষ নেয়া, কারণ ওখানে মুনাফা বেশি হবে। এই সত্য অস্বীকার করে কেউ টিকবে না।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস আমেরিকা যায় – এর তাৎপর্য হল, এতে আমেরিকার শ্রমের বাজারে শ্রমের ন্যূনতম মূল্য তুলনীয় বিচারে কম রাখা সম্ভব হয়, হবে। কেন? আমেরিকান ঐসব শ্রমজীবিরা আমেরিকান বাজারে তাদের পোশাকের চাহিদা মিটাতে পারবে তুলনামূলক কম পয়সায়, এর ফলে আমেরিকায় ন্যূনতম মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব। আবার অন্যদিকে,  বাংলাদেশের কৃষিতে ভর্তুকি দেয়া মানে বাংলাদেশের গার্মেন্টসে মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব করা।

তাহলে সোজা কথাটা হল, অল্প কিছু যেসব পণ্যে আমরা আমেরিকার চেয়ে দামে ও মানে প্রতিদ্বন্দ্বী ও যোগ্য এসবের বাজার আমাদের হাতে আজ অথবা কাল তাদেরকে ছাড়তেই হবে। এ কথা যে যত তাড়াতাড়ি বুঝবে সে ভালো টিকবে। তবে সস্তা জাতীয়তাবাদের সুড়সুড়ি দিয়ে ভোট জোগাড় সেটা হয়ত ফাঁকফোকরে চলতেই থাকবে। রাজনীতিতে মিথ্যা ব্লাফ তো থাকেই।

ঘটনার আরেক মাত্রা আছে। ট্রাম্পের আমলে খুব সম্ভবত আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব ওবামা আমলের মতো আর থাকছে না। কারণ এখন পর্যন্ত ওবামার ‘চীন ঠেকানোর নীতি’ ট্রাম্প চালু রাখবেন কি না, ওবামার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করবেন কি না এর সপক্ষে ট্রাম্পের কোনো অ্যাকশন, নীতি বা কোনো আলামত দেখা যায়নি। বরং এশিয়ায় চীনবিরোধী কোনো জোট গড়ার ওবামার নীতির পথে ট্রাম্প হাঁটছেন না, ইচ্ছাও নাই – তাই স্পষ্ট হচ্ছে। এটাই প্রকাশিত। যেমন যত সহজে ট্রাম্প অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপ ‘গেট লস্ট’ বলে শেষ করলেন সেখানে এর ইঙ্গিত আছে। অথচ ওবামার এই আমলে তার এশিয়া নীতিতে একমাত্র অস্ট্রেলিয়াতেই আমেরিকান মেরিন ঘাঁটি গাড়া হয়েছে। এই অঞ্চলে আমেরিকান নীতি স্ট্রাটেজির সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল অষ্ট্রেলিয়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

 

বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনায় …………

বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনায় …………
গৌতম দাস
০৬ ডিসেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2ah

বাংলাদেশ সর্বপ্রথম দুটা সাবমেরিন কিনে নিজের প্রতিরক্ষা নৌবহর সক্ষমতাকে কিছুটা ওপরের স্তরে উন্নীত করেছে। এগুলো চীননির্মিত। বাংলাদেশ তুলনায় ছোট অর্থনীতির মানে, তুলনা বিচারে স্বল্প রাজস্ব আহরণের রাষ্ট্র। এমন রাষ্ট্র যে বিপদে থাকে, তা হল নিজের  প্রাকৃতিক সম্পদ ও সীমানা সুরক্ষা ও সংরক্ষণ করতে প্রয়োজনীয় ন্যূনতম স্থায়ী সেনাবাহিনীর চাহিদা-খরচ পূরণে সব সময় টানাটানির মধ্যে থাকে। একারণে অর্থনীতি বড় ও সমৃদ্ধ হবার সাথে সাথে রাজস্ব আয় বাড়ে আর বহু জট খুলার রাস্তা দেখা যায়। সামরিক বাজেট বড় করার সক্ষমতা বাড়ে, পুরানা চাপাপড়া অভাব মিটানোর সক্ষমতা হাজির হয়। এছাড়া অর্থনীতি বড় হলে শত্রুও বাড়ে – সযন্তে রক্ষা করা মত নতুন অনেক স্টাটেজিক স্বার্থ (যেমন,  সমুদ্রপথে পণ্য আনা-নেয়ার প্রবেশপথ সুরক্ষা, সমুদ্র চলাচলের খোলা-জলরাশি (blue water) অবাধ রাখা ইত্যাদি) জলন্ত হাজির হয়ে যায় ফলে নতুন অর্থনীতিক সক্ষমতাসহ সবকিছুর সুরক্ষা এক বাড়তি প্রতিরক্ষা চাহিদা উপস্থিত হয়। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের ইন্টেলেক্ট বা চিন্তাভাবনার জগত আস্তে আস্তে লায়েক হচ্ছে। আগের মত “আমাদের সেনাবাহিনীর কী দরকার” ধরণের  যে যেটা বুঝে না তা নিয়ে ফালতু কথা বলার চেষ্টা একেবারেই বন্ধ হয়ে না গেলেও অন্তত নিজেদের অযোগ্যতা খামতি অনেকেই বুঝতে পারছে বলেই মনে হয়। আবার সেনাবাহিনী প্রসঙ্গে এই বয়ান যে কোল্ড ওয়ারের কালে আমেরিকার বিরুদ্ধে সোভিয়েত প্রপাগান্ডা বৈ অন্য কিছু ছিল না, বিষয়টা যে নিজের বিচারবুদ্ধি খরচ করে বুঝবার বিষয় তা সম্ভবত অনেকেই ইদানিং হুশে আসছেন। যদিও ব্যারাক-ভিত্তিক বাহিনীই প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তার একমাত্র উপায় নয়, জনগণ ও সেনাবাহিনীর দূরত্ব ঘুচানোর ভালো উপায় কী অথবা প্রতিরক্ষায় খরচ কতটা করা উচিত, তা কী কাজে লাগে ইত্যাদি নিয়ে প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় এখনও তর্ক-বিতর্ক আছে। তা পাশে সরিয়ে রেখেও বলা যায়- বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ ও সীমানা রক্ষার জন্য উপযুক্ত সরঞ্জামনির্ভর একটা বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা সবাই স্বীকার করবেন। ব্যাপারটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোয়, যাদের তা দেখে বোঝার কথা, তারা বুঝে গিয়েছিলেন- বিশেষ করে বিগতকালে বার্মা বা মিয়ানমারের সাথে আমাদের স্থলসীমান্তে টেনশন এবং সমুদ্রসীমানায় আমাদের অংশে ২০০৮ সালে মিয়ানমারের তেল অনুসন্ধানের কার্যকলাপে বাংলাদেশে বাধা দেয়ার সময় থেকে। ফলে অন্ততপক্ষে মিয়ানমারের সাথে পেরে ওঠার পর্যায়ে আমাদের বাহিনীগুলোকে উন্নীত করা একটা তাগিদ তখন থেকে ছিল। ইতোমধ্যে সমুদ্রসীমানা নিয়ে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে বিরোধ জাতিসঙ্ঘে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে এখন বলা হচ্ছে, এতে স্থলভাগের চেয়েও দ্বিগুণ বড় সমুদ্র-অঞ্চল এখন বৈধ আন্তর্জাতিক সীমানা হিসাবেই আমাদের ভাগে এসেছে। এগুলো বুঝেশুনে নেয়ার ও অন্তত ধরে রাখার কাজ সম্ভব করতে গেলে উন্নত নতুন স্তরে সশস্ত্রবাহিনীগুলোকে সাজানো খুবই প্রয়োজন। আরেক তাৎপর্যপূর্ণ উল্লেখযোগ্য দিক – বিকশিত হওয়া নতুন ঘটনা হল, বঙ্গোপসাগর নিয়ে আমেরিকা-চীন-ভারতের কাড়াকাড়ির টেনশন দিন দিন বাড়ছে। অনুমান করা যায়, সামনে আরো বাড়বে। এতে কারো দিকে ঝুঁকে না পড়া, কোনো পক্ষ না নিয়ে নিরপেক্ষ থাকতে হলেও আর শুধু নিজের সীমানা রক্ষা করতে গেলেও ন্যূনতম সামরিক সক্ষমতা থাকা জরুরি। ফলে অনুমান করাই যায়, এসব প্রয়োজন পূরণের পরিকল্পনার অংশ হল সাবমেরিন কেনা। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আমাদের প্রতিরক্ষা নীতি তা যতই অস্পষ্ট থাক না কেন তা আসলে কাউকে যেচে আক্রমণাত্মক নয়, নিজেকে সুরক্ষামূলক।
কিন্তু ভারত-চীনের সম্পর্ক নিয়ে ভারতের মিডিয়া সব সময় আধা সত্য-মিথ্যা মেশানো তথ্য আর উগ্র দেশপ্রেমের সুড়সুড়ি দিয়ে সবসময় ভারতের মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে খামাখা উত্তেজিত করে রাখে। কারণ এগুলোই তাদের ভোটের বাজারকে প্রভাবিত করার দিক থেকে খুবই ‘গুরুত্বপূর্ণ’ উপাদান। অনেক সময়, এই ভোট-বাজারে দেখিয়ে বেড়ানোর নির্বাচনী স্বার্থে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বহু মন্ত্রী পর্যায়ের সফরও ঘটানো হয়। সীমান্তে যুদ্ধাবস্থার ভাব টেনশন তৈরি করা হয় ইত্যাদি। ঠিক তেমনি, আমাদের সাবমেরিন ডেলিভারি পাওয়ার পর এর সাথে সম্পর্কিত ঘটনা নাকি ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পাররিকর এর এবার বাংলাদেশ সফর। ভারতীয় বিশ্লেষকেরাই বলছেন, এমন সফর নাকি স্বাধীন বাংলাদেশের গত ৪৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম। অনলাইন বাংলাট্রিবিউনে গত ১৬ নভেম্বর ভারতের সাংবাদিক রঞ্জন বসুর এ নিয়ে একটি আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। টিপিক্যাল আনন্দবাজারি প্রপাগান্ডা স্টাইলের এক রিপোর্ট এটা। পড়লে মনে হবে যেন, যা মনে চায় এমন মিথ্যা আর বাড়ানো-চড়ানো কথা বলে হাটে গামছা বেচতে এসেছেন। এর একটা নমুনা দেখুন, ঐ লেখার প্রথম বাক্য হল, “চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের নৌবাহিনী দুইটি সাবমেরিন হাতে পাওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে নতুন করে ঝালিয়ে নিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পাররিকর এ মাসের শেষে বাংলাদেশ সফরে যাবেন”। মনে হচ্ছে, পাররিকর আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনীগুলোকে বকা দিতে আসছেন। আর যেন বকা দিয়ে বলবেন – ‘কী, তোমরা আমাদের না জানিয়ে সাবমেরিন কিনে ফেললে কেন?’। সেজন্য সাবমেরিন হাতে পাওয়ার ঠিক ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পাররিকর এ দেশে আসতে হচ্ছে। আচ্ছা, এটা কি শিশুদের বাজারে  গিয়ে চুপে চুপে চকোলেট কেনা? তাই বড় ভাইয়ের বকা দিয়ে আসা? রঞ্জন বসু সাবমেরিনকে শিশুর চকোলেট কেনা ভেবেছেন! অথচ এটা সাবমেরিন – তাই কিনতে চাইলে অনেক আগে অর্ডার দিতে হয়। সে মোতাবেক ২০১৩ সালে এর অর্ডার দেয়া হয়েছিল। ফলে তখন থেকে দুনিয়াসুদ্ধ লোক যারা জানতে চায় সবাই প্রকাশ্যেই জানে এটা। তাই এ সাবমেরিন কেনা নিয়ে বাংলাদেশকে যদি জেনুইন কনসার্নে ভারতের কিছু বলার থাকে, তা তিন বছর আগে থেকেই ছিল। বাংলাদেশের সাবমেরিন হাতে পাওয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সিদ্ধান্ত নেয়ার কিছু নেই এখানে। তাহলে, ‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ভারত সিদ্ধান্ত নিয়েছে’ বলে রঞ্জন বসু কী বোঝাতে চাইলেন? যেন বোঝাতে চাইলেন, ভারতের হুকুম ছাড়া বাংলাদেশের গাছের পাতারও নড়ার কথা নয়। সেই পাতা নড়ল কেন, এর জবাব চাইতে পারিকর এসেছিলেন।
রঞ্জন বসুর বোঝাবুঝির দৌড় হাস্যকর বললেও কম হবে। এ যেন রাস্তার ধারের চা দোকানে বসে আদার ব্যাপারীর আলাপের চেয়েও নিচু মানের। তিনি লিখছেন- “কিন্তু এ সপ্তাহের গোড়ায় চীন যেভাবে তাদের লিয়াওনিং প্রদেশের ডালিয়ান সমুদ্রবন্দরে সফররত বাংলাদেশের নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নিজামুদ্দিন আহমেদের হাতে দু’টি ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিন তুলে দিয়েছে, তাতে ভারত মনে করছে পাররিকর এর সফর নিয়ে আর এতটুকুও দেরি করার কোনো অবকাশ নেই”। এখানে চীন ‘যেভাবে… সাবমেরিন তুলে দিয়েছে’- এই ‘যেভাবে’ কথার মানে কী? তাহলে, চীন সাবমেরিন বিক্রি করায় ভারতের অসুবিধা হয়নি; শুধু ‘যেভাবে… সাবমেরিন তুলে দিয়েছে’ তাতেই আপত্তি? ব্যাপারটা কি এ রকম? কিভাবে সাবমেরিন তুলে দিলে আপত্তি হতো না? এ ছাড়া পারিকরের আর ‘এতটুকুও দেরি করার কোনো অবকাশ নেই’- এ কথাটিরও মানে কী? চীন সাবমেরিন বিক্রি করে ভারতের নাকি ক্ষতি করে ফেলেছে, তাহলে পারিকর ‘এতটুকুও দেরি করার কোনো অবকাশ’ না রেখে বাংলাদেশে এলে কী হবে? বাংলাদেশ বকা খাবে? সাবমেরিন ফেরত দিয়ে দিতে ধমক দেবে? লেনদেন বিষয়ে একজন মুদি দোকানদারও যতটা বাস্তবজ্ঞান রাখেন, দেখা যাচ্ছে রঞ্জন বসু সেটাও রাখেন না।

সবাই জানে, এমনকি বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রীরাও বিভিন্ন সময়ে নিজেদের মনোবল বাড়ানোর জন্য বলে থাকেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন থেকে শুরু করে আজও ভারতের সমর্থন তাদের সরকারের পিছনে আছে; সেই সমর্থনে সরকার টিকে আছে ইত্যাদি। কিন্তু সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতের সমর্থন লেনদেন এক জিনিস, আর তাকে বাংলাদেশের সামরিক ক্রয় সিদ্ধান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত বলে বোঝানো, আরেক জিনিস। বলতে গেলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি বা বড় ধরনের সামরিক কেনাকাটা- এসব বিষয়ের পরিকল্পনা করা বা প্রস্তাব তোলা, এটা এখনো সিভিলিয়ান বা রাজনীতিকেরা করার, অভ্যাস বা চর্চা বাংলাদেশে শুরু হয়নি। কাজেই ভারতের ইচ্ছামত যদি আমাদের সামরিক ক্রয় সম্পন্ন হতে হয়, এর ফলাফল হবে জটিল ও মারাত্মক। বুদ্ধিমান মানুষ এ কথা মনে রেখে মুখ খুলার কথা। জনগণের ভোট বা সমর্থনে নয় ভারতের সমর্থনে সরকার টিকে আছে এর মানে তারা প্রতিরক্ষা ক্রয়ে হস্তক্ষেপ করা পর্যন্ত ক্ষমতাবান – এটা নিজেকে ওভার-এস্টিমেট করা। ফলে অতি-মুল্যায়নের বিপদ তাদের অজানা থাকার কথা নয়।
আরেক কঠিন সত্য হল, সাবমেরিন আমাদের (ভারতের কথিত জান-ই দুশমন) চীন থেকেই কিনতে হবে, ব্যাপারটা মোটেও সে রকম ছিল না। রাশিয়াও এর সাপ্লায়ার হতে পারত। কিন্তু রাশিয়ান কিলো সাবমেরিনের মূল্য এক বিলিয়ন ডলার চাওয়াতে এবং তার বিপরীতে চীনা অফার ৪৫০ মিলিয়ন হওয়াতে এটাই কেনা হয়।
তবে খুশির কথা, ভারতের সবাই রঞ্জন বসু নন। বাস্তব জ্ঞানবুদ্ধির লোক ভারতে কম থাকার কথাও নয়। তেমনই একজন এম কে ভদ্রকুমার। গত প্রায় ৩০ বছরের কেরিয়ার কূটনীতিক ভদ্রকুমার ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত। এখন অবসরে গিয়ে, বিভিন্ন দেশী-বিদেশী পত্রিকায় কলাম লেখেন। তিনি অনলাইন স্ক্রোল (Scroll.com) পত্রিকায় বাংলাদেশের সাবমেরিন কেনা নিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছেন। বলা ভাল মন শয়তানিতে ভরপুর এমন কিছু ভারতীয় ডিপ্লোম্যাটকে তিনি যেন চাবকে দিয়েছেন। কথিত এসব পণ্ডিতদের চিন্তাভাবনার দুরবস্থাকে তিনি তুলোধুনা করেছেন। এদের বেশির ভাগই আসলে আমেরিকার ফান্ডে চালানো প্রতিষ্ঠানের কর্মী। এই ক্যাতাগরিতে আছে কিছু আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের ভারতীয় শাখা অথবা ভারতেই রেজিষ্টার্ড আমেরিকা ফান্ডেড এনজিও, অথবা আমেরিকার উচ্চ শিক্ষার জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইত্যাদি ধরণের। এককথায় বললে এগুলো আসলে বেশির ভাগই ভারতের স্বার্থের কোন থিঙ্কট্যাঙ্ক নয়। এদের পিছনে আমেরিকা পয়সা খরচ করে ভারতের কিছু ইন্টেলেক্টদেরকে আমেরিকার চওখে চীন-বিরোধী করে সাজানো যাতে ভারতীয় নীতি আর শহুরে মধ্যবিত্তকে প্রভাবিত করা যায়। একই কথা বলতে বলতে তিতা করে ফেলা আমেরিকার শিখানো এদের ক্লিশে বয়ানটা হল – “চীন ভারতকে ঘিরে ফেলেছে”,  “মুক্তামালার মত চীন ভারতকে ঘিরে ফেলছে”। সব জায়গায় এরা ঘিরে ফেলা দেখে। যেমন মুক্তমালার মত ভারতের চারদিকে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ে (পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও সম্ভাব্য বাংলাদেশ) চীন নাকি ভারতকে ঘিরে ধরার পরিকল্পনা করছে। এ’এক মহা আবিস্কার! এরা নিজের বোধশক্তি বুদ্ধি ব্যবহাস্র করা ভুলে আমেরিকার শিখানো চীন-বিরোধী বয়ান আউড়াচ্ছে। মনে মনে প্রবোধ নিচ্ছে তারা আমেরিকান স্কলারশিপে উচ্চশিক্ষা করছে। কত রাজা উজির মারছে। একএকটা গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে আর নুন্যতম অনুষঙ্গি বিদ্যুতগ্যাস টার্মিনাল রাস্তাঘাট সহ অবকাঠামো  মিলিয়ে বিনিয়োগ লাগে কমপক্ষে ৫ বিলিয়ন থেকে ৫০ বিলিয়ন। সে খবর এদের আছে। তো এই বিনিয়োগ কী সামরিক স্টাটেজিক প্রজেক্ট নাকি পুরাপুরি বাণিজ্যিক অর্থনৈতিক প্রজেক্ট? যেমন বাংলাদেশের জন্য গভীর সমুদ্র বন্দর কী  সামরিক স্টাটেজিক প্রজেক্ট? এমন স্বপ্ন-দোষ! এটা তো স্বপ্নে বা জ্ঞানতও ভাবা কী উচিত? এরা কী ভাত খাওয়া রক্তমাংসের মানুষ? কিন্তু আমেরিকা এমন মানুষই বানিয়েছে। অন্য আর একটা নমুনা দেখাই। এটা আমাদের সাবমেরিন কিনাতে ভারতের এক প্রাক্তন নেভি অভিসারের প্রতিক্রিয়ায় এক ম্যাগাজিন ডিফেন্স নিউজ-এ এমনই এক দিগগজ লিখছে, “নিঃসন্দেহে এই (সাবমেরিন) হস্তান্তর ক্লায়েন্ট রাষ্ট্রকে (বাংলাদেশ চীনের ক্লায়েন্ট মানে ধামাধরা রাষ্ট্র) দিয়ে ভারতকে ঘিরে ফেলারই চীনা স্টাটেজি” (“Obviously this transfer is a step further in China’s strategy of encircling India with its client states,” Prakash added.)।

যাহোক অনলাইন স্ক্রোল (Scroll.com) এর ভদ্রকুমারের কথায় ফিরে আসি। তিনি পাররিকরের সফর প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে এসব দিগগজদের পরোক্ষে জবাব দিয়েছেন। প্রথমত, তিনি পাররিকরের সফরকে ‘বিস্ময়কর’ বলছেন। এরপর বলছেন, ১. “বাংলাদেশের জন্মের সময় ভারতের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল সেকারণে ভারত-বাংলাদেশ মিলিটারি টু মিলিটারি সম্পর্ক অবশ্যই ভাল হতে হবে এটা মোটেও অবশ্যম্ভাবী কোন ব্যাপার নয়। মুখ্যত এর দু’টি কারণ। “প্রথমত, আমাদের (মানে ভারতীয়দের) এক আজব ভুয়া ধারণা হল, পাকিস্তান আর্মির সাথে বাংলাদেশের আর্মি নাকি এক নাভীমূল নাড়ির সম্পর্কের সুতায় বাঁধা আছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ আর্মিও তাদের দেশের উপর ভারতের কালোছায়া ধরনের ইচ্ছা-মনোভাব সম্পর্কে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত ধরণের এক সন্দেহ পোষণ করে”। এটা ফ্যাক্টস। “আসলে দুটা রাষ্ট্রের মধ্যে এ ধরনের মানসিক বাধা বা দূরত্ব কাটাতে সময় লাগে। তাহলে পাররিকরের এই সফরের মানে কি, সেই ‘কালোছায়া’ কেটে গেছে?” – ভদ্রকুমার প্রশ্ন রেখেছেন।
আসলে ভদ্রকুমার নিজ দেশের অনেকের মুখের ওপর অনেক কথাই খাড়াভাবে বলেছেন। এর মূল কারণ সম্ভবত তিনি আমেরিকান সাপোর্টেড কোন থিঙ্কট্যাঙ্কের কেউ নন। তবে  এরপরেও যেসব কথাগুলো কোন কারণে তিনি বলেননি তা হল –

রাষ্ট্রতত্ত্ব বলে, কোন রাষ্ট্র মানেই  তার নিজ জনগোষ্ঠীর স্বার্থকে ঐ রাষ্ট্রের বাইরের সবার স্বার্থের ওপরে বলে মনে করা হয় যেখানে। ফলে নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ অন্য সব রাষ্ট্রস্বার্থের চেয়ে উপরে প্রাধান্য পাবে – এই ভিত্তিতেই কেবল কোন রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, থাকে। তাহলে দুই দেশের মিলিটারি টু মিলিটারি কোন ভাল সম্পর্ক মানে কী? এটা অ্যাবসার্ড, সোনার-পাথর বাটি ধরণের এক আকাশকুসুম। অথবা বড়জোড় একটা ডিপলোমেটিক (বলে এক মানে হয় আর এক) ধরণের কথা। দু’টি আলাদা রাষ্ট্রস্বার্থের মধ্যে বড়জোর ঘটনাচক্রে, তাও সাময়িক কিছু বিষয়ে মিল হতে পারে। আর যদি তা না ভাল লাগে কারও তাহলে আরেক একমাত্র পথ হল, দুই রাষ্ট্র এক হয়ে যাওয়া- একমাত্র তখন দু’টি আলাদা রাষ্ট্রস্বার্থ বলে আর কিছু থাকবে না। একাকার হয়ে যাবে। অন্তত মুখে দাবি করা যাবে। অতএব, দুই সেনাবাহিনী এই শর্ত-সীমার মধ্যেই কেবল যতটুকু সম্ভব ততটুকুই ‘ভাল’ সম্পর্কের অধিকারী হতে পারে।

২. ভদ্রকুমার তুরস্কে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি নিজ দেশের সহকর্মীদের সমালোচনা করেছেন। ভদ্রকুমার বলছেন, “ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা মনে করেন, সাবমেরিন বিক্রি চীনের এক অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ। তাই পাররিকর ভারতের তিন বাহিনীর উপপ্রধানদের নিয়ে চীনবিরোধী সফরে বেরিয়ে পড়েছেন। অন্ততপক্ষে ভারতীয় বিশ্লেষকের বরাতে বাংলাদেশের মিডিয়া তাই বলছে। এটা খুব দুর্ভাগ্যের যে, আমরাই আমাদের পড়শিদেরকে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে খাড়া করার বুদ্ধি দিচ্ছি। ভারতীয় বিশ্লেষকদেরই সিদ্ধান্ত হল – চীন ভারতকে ঘিরে ধরতেই সাবমেরিন বিক্রি করেছে। এগুলো এক আজব ব্যাখ্যা”। এই বলে তিনি এবার অনেকগুলো কারণ তুলে ধরে ভারতীয় বিশ্লেষকদের এমন সব ধারণা নাকচ করেছেন। আগ্রহিরা সেসব বিস্তারে জানতে পুরা লেখাটা পড়তে পারেন এখানে।  সেখান থেকে তাঁর এমন দুটো পয়েন্ট হল, তিনি বলছেন, ক. সাবমেরিন কেনা চীনের দেয়া কোনো দান-ধ্যান নয়, এটা বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত এবং তারা অর্থ দিয়ে কিনছেন। তাহলে এটা চীনের কাজ আর অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ হলো কী করে? খ. বাংলাদেশের কাছে সম্ভাব্য বিক্রেতা ছিল রাশিয়া ও চীন। একা চীন নয়। বাংলাদেশ বেছে নিয়েছে চীনকে প্রধানত প্রায় অর্ধেক দামে দিচ্ছে বলে। আর চীনের বেশির ভাগ অস্ত্র সরঞ্জাম বিক্রির সময় কোন লুকানো শর্ত থাকে না (উটের সঙ্গে বিড়াল নিতে হবে ধরণের)। তাহলে এটা ‘চীনের অসৎ উদ্দেশ্যে করা কাজ’ তা প্রমাণ হয় কী করে?
আমাদের বরং বাংলাদেশ কিসের তাগিদে সাবমেরিন কিনল, সেটা খুঁজে দেখা দরকার”।

অর্থাৎ এর মানেটা সোজা। আগামিতে এই আমেরিকান সাপোর্টেড ভারতীয় দিগগজেরা আমাদেরকে আরও জ্বালাবে। এসব ফালতু ঈর্ষা আর প্রলাপের মোকাবিলায় পালটা বয়ান প্রস্তুতি আমাদের লাগবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে ০৪ ডিসেম্বর ২০১৬ অনলাইন দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকা (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার তবে নতুন ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন ও এডিট করে এবং নতুন শিরোনামে ছাপা হল।]

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে আলী রিয়াজের ইসলামবিদ্বেষ
গৌতম দাস
২৮ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1yl

গুলশান হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পশ্চিমের “সন্ত্রাসবাদ” প্রসঙ্গে পুরান অকেজো আর ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তাগুলো আবার সচল হতে শুরু করতে দেখা যাচ্ছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স আমেরিকার “সম্ভ্রান্তজনদের” পত্রিকা। আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে এমন পত্রিকা। সেখানে গত ৬ জুলাই এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স হোমগ্রোন প্রবলেম, ঢাকা অ্যান্ড টেররিস্ট থ্রেট’। আর এর যুগ্ম লেখক, আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি। লেখার দুটো বড় সমস্যা। এ ধরনের লেখা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের সুপরামর্শ দেয়ার বদলে মিথ্যা ভিত্তিহীন ধারণা দিয়ে বিভ্রান্তই করবে। এছাড়া কিছু জনস্বার্থবিরোধী বেকুবি কাজ খোদ আমেরিকানরাই অনেক সময় করে থাকে। [ফরেন এফেয়ার্সের মূল আর্টিকেলটা এখানে কপি করে রাখা আছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন। ]
প্রথমত, যে চিন্তা-ফ্রেমের আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখকদ্বয় কথা বলছেন তা হলো “সেকুলারিজম”। সেটা যেন আমাদের নজর না এড়ায় সে জন্য লেখায় দু’বার  শক্তভাবে সেকুলারিজমকে রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখও করেছেন। লেখকেরা আওয়ামী লীগকে মিষ্টি ধমক দিয়েছেন এই বলে যেন বলছেন, “তোমরা না সবচেয়ে বড় সেকুলার দল। তোমাদের কী এমন করা সাজে?”- এ রকম। অথচ বাস্তবতা হল, আওয়ামি লীগই সবচেয়ে ভাল বুঝে – কী করে, কখন সেকুলারিজম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। আবার কেন লেখকদ্বয়ের ‘সেকুলার-বোধের’ ভেতরেই আমাদেরকে সমাধান খুঁজতে হবে এটাকে প্রশ্ন করা যায়। এমন প্রশ্ন কখনো তারা নিজেদের করেছেন কি না তাও জানা যায় না। ঐ বোধের ভিতরে, সেখানেই কোনো সমস্যা আছে কি না আগে সেটা তাদের যাচাই করা উচিত। সেকুলারিজমের অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমরা তাদেরটার কথাই বলছি। এমনিতেই ভারতীয় উপমহাদেশে যে সেকুলারিজম ধারণা দেখতে পাওয়া যায় সেটা আসলে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
ইসলামের বিরুদ্ধের তাদের ঘৃণা-বিদ্বেষকে আড়াল করতেই সেকুলার শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি মনে ঘৃণা পুষে রাখে আর দাবি করতে থাকে যে তার বুঝের সেকুলারিজমের ভেতরই সমাধান হতে হবে- সে ক্ষেত্রে এখান থেকে আর কী বের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা ঘটনাগুলোর জন্য সরকার আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করছে না, বিএনপি-জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে- এমন এক গিভেন বা আগাম অনুমিত কাঠামোর ওপর লেখাটা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এটা স্টার্টিং পয়েন্ট। উল্টো করে বললে লেখাটার ভাষ্যটা এমন নয় যেমন সরকারি ভাষ্যে বলা হয় যে, আইএস বা ইসলামি চরমপন্থীরা এগুলো করছে বটে তবে বিএনপি-জামায়াতই আইএস বা আলকায়েদা। অথবা ইসলামি চরমপন্থীরা আসলে ছদ্মবেশী বিএনপি-জামায়াত অথবা সহযোগী – তা-ও নয়। লেখায় একেবারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘হাসিনা বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর এক রাজনৈতিক সহযোগী দল জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ (Instead, Hasina has passed the blame onto the principal opposition party, the Bangladesh Nationalist Party (BNP) and one of its allies, the Islamist Jamaat-i-Islami.)। এই পরিষ্কার চিরকুট সার্টিফিকেট বাক্যটা ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ সরকারের বয়ানের কিছুই লেখকেরা শেয়ার করছে না, মানছেন না। আর বলতে চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ বা দায়ী করা ঠিক নয়। এগুলো


Islamophobia বা ইসলাবিদ্বেষ  বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছিঃ
কারও বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী  বলা হয়। এখানে ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা ঘৃণা বা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। এর ধরণের রেসিজম।


জেনুইন এবং এর আলাদা কর্তা আছে। তাহলে বাকি থাকল সরকারের আইএস বা আলকায়েদার উপস্থিতি স্বীকার করছে না কেন তা নিয়ে আলী রীয়াজের অভিযোগ। তবে অবশ্যই বলা যায়, সরকার এটা কেন করছে না তা অন্তত আলি রিয়াজের জানা থাকার কথা। কথাটা বলছি এ জন্য যে, এক কথায় বলা যায়, সরকারের স্বীকার না করার জন্য আমেরিকার পুরানো কিছু কৃতকর্ম দায়ী। বুশের আমলের বিশেষ করে বিগত ২০০৪-০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের ওপর মুসলমান। শুধু এই ফিগারটাই তখন থেকে হয়ে গিয়েছিল দোষের। কারণ বুশের ওয়ার অন টেরর – এর লাইনের বোঝাবুঝি অনুসারে,  মুসলমান=টেররিস্ট। এখানে মুসলমান বলতে লিবারেলসহ যে কোন মুসলমান বুঝতে হবে, কারণ সেসময় তাই বুঝানো হয়েছিল ও হত। অতএব ৯০ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ মানেই এক ভয়ঙ্কর যায়গা। মুসলমানের বাংলাদেশ নিশ্চয় সব টেররিস্টে ভর্তি, গিজগিজ করছে। যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কমবেশি সবসময় ছিল। আর ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বুশের আমলে এর সাথে যোগ দেয় বুশ প্রশাসন। আসলে এটাই হল গোড়ার ইসলামবিদ্বেষ। আর তাদের নিজেদেরই ধারণ করা ইসলামবিদ্বেষ সমস্যার সমাধান হল টোটকা বিশেষ সেকুলারিজম। টোটকা বিশেষ বলা হল এজন্য যে, যা নিজ বিশেষ ‘হিন্দু’ ধারণার ‘অপর’ – সেই অপর মুসলমানকে বুঝার বদলে একটি বিদ্বেষ, একটা বিদ্বেষের এপ্রোচ থেকে এর জন্ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম সম্পর্কে আমরা জানি এটা সেই সেকুলারিজম নয়। যেমন মডার্ন স্টেট মানেই একধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যের স্টেট এই ধারণা থেকে এর জন্ম নয়।
যা-ই হোক, সেকালে বাংলাদেশের মত যে কোনো মুসলমান জন-আধিক্যের রাষ্ট্র-সমাজ মাত্রই – যারাই বুশের মুখোমুখি হয়েছিল তারা দেখেছিল – বুশের অজানা ভয় ও ইসলামবিদ্বেষমূলক ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় ওয়ার অন টেরর। ফলে সে সময় বুশ প্রশাসন বারবার বিএনপি সরকারকে চাপ দিয়েছিল দেশে আলকায়েদা বা সন্ত্রাসী উপস্থিতি আছে স্বীকার করে নিতে। মুল কথা ছিল দেশে “সন্ত্রাসী” থাক আর না থাক, বুশের প্রেসক্রিপশন বা করণীয় তালিকা অনুসরণ করে যে কোন মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজাতে হবে।  গ্লোবাল ইসলামবিদ্বেষের পোয়াবারো অবাধ চর্চা শুরু হয় তখন থেকে।
কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হল, আলকায়েদার উপস্থিতি আছে কি না আছে সেটা নয়, বরং আছে এই অজুহাত তুলে হস্তক্ষেপ করে শেষে বিষয়টাকে ভিন্নদিকে নিয়ে আমেরিকা দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করেছিল আর ‘মাইনাস টু’ করার চেষ্টা নিয়েছিল। এটা সত্যি যে, ওই পরিস্থিতিতে হাসিনা নিজের নগদ লাভের বিবেচনায় ঐ সময় আমেরিকান সেই অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সায় দিয়েছিল এবং আমেরিকানদের তালে তালে একই প্রচারে গিয়েছিল। অর্থাৎ সেকালের আলকায়েদা (বা একালের আইএস) আছে স্বীকার করিয়ে নেয়া ব্যাপারটা ঠিক স্বীকার অস্বীকারের ইস্যুতে বা এর মধ্যে আটকে থাকেনি – বরং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতা দখল করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম আর মাইনাস টুর ইস্যু হাজির করা। হাসিনার কাছে একালে তাই ব্যাপারটা একই আলোকে দেখবার, এমনই আমেরিকার ইচ্ছা কী না, আগের মতই করবে এমন ভাবা – এ্টাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই হাসিনার সরকারের আমলে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করতে তাঁর এত অনীহা। কারণ করলে কী হয় সেটা সে আগে দেখে ফেলেছে। সে ফল খেয়েই সে আজ ক্ষমতায়। অতএব একালে আমেরিকানদের পক্ষে আগের আলকায়েদার জায়গায় এবার আইএস স্বীকার করাতে গেলে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হাসিনার অনীহা ও বাধার মুখোমুখি তো তাদের হতেই হবে।
আবার আরো কতগুলো নতুন দিক আছে এবারের পরিস্থিতিতে। হাসিনার পক্ষে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করার অর্থ কী হবে? কী দাঁড়াবে? এর সোজা অর্থ হবে ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট বিদেশী-দেশী রাষ্ট্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিরোধে কমিটি না হলেও মনিটরিং ধরণের কিছু কমিটি তৈরি হয়ে যাবে বা করতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে একটি মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি ধরনের কিছু একটা হবে। এর মানে হবে এখন যেমন কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে তাকে ক্রসফায়ার করে দেওয়া অথবা কী করা হবে বা হল এর ব্যাখ্যাদাতা একক কর্তা সরকার। এখানে সে যা মনে চায় ব্যাখ্যা দিতে পারে, আর সেটা নিজের একক এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে থাকে ও আছে। কিন্তু মনিটরিং কমিটি একটি হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে বিষয়টা তখন মনিটরিং ও সমন্বয় ধরণের কমিটির সাথে শেয়ার করতে হবে। এবং অন্তত সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই কমিটিতে ‘সন্ত্রাস’ দমন করেছি বলে সরকারের দাবি করা যে কোন কাজ- ততপরতার ব্যাখ্যা ঐ কমিটির কাছে হাজির করতে হবে। যেটা এখনকার সিস্টেম অনুসারে, জনগণের কাছে দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকার বোধ করে না, নাই। যেমন ক্রসফায়ার করলে ওই ধরনের কমিটির কাছে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। ফলে পরিণতিতে এক কথায় বললে এখন যেভাবে সরকারের বিরোধী বিএনপি-জামাত ধরণেরসহ সব রাজনৈতিক দলের যে-কাউকে যা খুশি করার বা ভয় দেখিয়ে দাবড়ে রাখার সুযোগ আছে, তা পুরোটা না হারালেও অনেকখানি  সীমিত হয়ে যাবে। এই অর্গল খুলে দিলে বা ঢিলা হয়ে গেলে আবার রাস্তার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। এ সবকিছু মিলিয়েই সরকার আইএসের উপস্থিত আছে এটা স্বীকার করার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। উলটা দেশের মানুষ অথবা সরকার নিজে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, তাকে  বলে যেতে হচ্ছে যে “বিএনপি-জামাত সব জঙ্গী কার্যক্রম করছে”।
বিএনপি আমলে যে পথে আমেরিকা একবার আকাম করেছে সেটা এখন উদোম হয়ে গেছে। তাই সেই একই পথে হাসিনা সরকারকে এবার পরিচালিত করা বা ঠেলে দেওয়া আমেরিকার জন্য কঠিন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে তামাশার দিক হলো আলি রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি এখন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল মানে যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। শব্দটা ব্যবহার করেছেন ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’, মানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। (Meanwhile, a widely criticized International Criminal Tribunal has sentenced as many as nine key Jamaat-i-Islami members to the death penalty. Four have already died.) মানে সমালোচিত হওয়ার বিষয়টাকে আমলে নিচ্ছেন লেখকদ্বয়। অর্থাৎ ঐ ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়ার কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। আর এ কথা তুলেছেন, ডেইলিস্টার ও প্রথম আলোর সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি অপব্যবহার ও হয়রানি করা হয়েছে অথবা পলিটিসাইজড জুডিশিয়ারি ব্যবহার করা হয়েছে এর উদাহরণের সাথে। কারা এই “ব্যাপকভাবে সমালোচিতকারী” সমালোচক?  এই সমালোচকদের দলে তো আমরা এই লেখকদ্বয়কে দেখিনি।অথবা  তাঁরা আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টকে এমন কোনো কী পরামর্শ রেখেছিলেন অথবা কোনো প্রকাশ্য আর্টিকেল? আমরা দেখিনি, জানা যায় না। বরং আমরা লক্ষ করেছিলাম ‘জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হলে ইসলামি রাজনীতি নাকি বাংলাদেশে নির্মুল হয়ে যাবে’ এরই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। অতএব এখন সেসব কথা বলে লাভ কী? কারণ এই প্রশ্নবিদ্ধ বা ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’ বিচারের মধ্য দিয়ে পুরা বিচার বিভাগকেও পলিটিসাইজ করে ফেলার কাজটা হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সর্বশেষ রিপোর্টে (এশিয়া রিপোর্ট নং ২৭৭। ১১ এপ্রিল ২০১৬) বাংলাদেশের সংকট মিটানোর প্রথম কাজ হিসাবে এই পলিটিসাইজ বিচার বিভাগকে ডিপলিটিসাইজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে কথাটা আমার না। কিন্তু এর দায় কার?  আজ আমেরিকা যদি মনে করে থাকে ওই বিচার বিতর্কিত ছিল তবে এর এমন কোনো প্রকাশ আমরা ‘যুদ্ধাপরাধবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টেফান জে র‌্যাপের তৎপরতায় দেখিনি কেন? সে প্রশ্ন তো লেখকদ্বয় তুলছেন না। ওই বিচারের পদ্ধতিগত দিকে কোনো মেজর ত্রুটির ব্যাপারে তিনি কখনো কথা তুলেছিলেন, আমরা দেখিনি। কেবল ফাঁসির বিরুদ্ধে তারা, মানে ফাঁসি ছাড়া অন্য যে কোন শাস্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা তো বিচারের ত্রুটির ইস্যু নয়। তাহলে আজ আমেরিকা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘ব্যাপকভাবে সমালোচিত’ বিচার মনে করলে এর দায় থেকে আমেরিকাও বাইরে নয়। অন্তত আলী রীয়াজও এসব দায়ের কতটুকু বাইরে সে বিচারও তাকে নিজেই করতে হবে।

এখনকার আইএসের উপস্থিতির স্বীকারোক্তি করা না করা নিয়ে আলী রীয়াজ এত কথা তুলছেন। এটা সবাই জানে আইএস সশস্ত্র ও রক্তাক্ত ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতাই তার প্রধান কাজ। আমরা যদি প্রকাশ্য গণতৎপরতা আর গোপন সশস্ত্রতা এদুইয়ের মাঝে মোটা দাগে একটা ফারাক বুঝতে পারি তাহলে ২০১৩ সালেই হেফাজতের প্রকাশ্য গণতৎপরতা দেখে অস্থির হওয়ার কী ছিল। ওটা নিশ্চয় আরযাই হোক  অন্তত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছিল না। ওটা ছিল একটা গণক্ষোভ। প্রধান কথা, ওটা মাস অ্যাকটিভিটি, কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ঘটনা নয়। যদি ওটাকে সন্ত্রাসবাদ বলেন, তাহলে আইএসকে কিছু বলার থাকে না। অথচ হেফাজতের তৎপরতাকে ভয়ঙ্করই মনে করা হয়েছিল। ভেবেছিলেন তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখছেন। এই গণক্ষোভকে মিস হ্যান্ডলিং করার দোষেই কী আসল “সন্ত্রাসবাদ” আইএস এখন হাজির হয়নি? মিস ান্ডিলিংয়ের একটা প্রধান কারণ কী ইসলামবিদ্বেষ নয়? তাই মিস হ্যান্ডলিংয়ের কারণেই সরকার ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় য়ার স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের গণবিচ্ছিন্নতা বেড়ে চরম হয়েছে।
আর কে না জানে যেকোনো সরকারের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ পরিচয় আর ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এগুলোই আইএস ধরনের সংগঠনকে ডেকে আনে। তাদের হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেবারেবল, লোভনীয় পরিস্থিতি মনে করে তাঁরা। এগুলোই পাঁচজন আঠারো বছরের ছেলে ১০ ঘণ্টা ধরে সরকার  কাপিয়ে দিয়ে গেল এমন হিরোইজম দেখতে সাধারণ মানুষকে একবার উদ্বুদ্ধ করে ফেলতে পারলেই
সব শেষ।

আলী রীয়াজের সেকুলার বুঝের ব্লাসফেমি ভুত দেখা
আলি রিয়াজ বিগত ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের আন্দোলনে “ব্লাসফেমি আইনের নাকি দাবি” করা হয়েছে একথা মুখস্থের মত বলে যাচ্ছেন, অথচ এটা আর একটা মিথ্যা ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। আর সবচেয়ে বড় কথা ব্লাসফেমি আইনের দাবি কখনোই হেফাজত করেনি। অথচ এটা যাচাই না করেই কেউ আগাম হেফাজতকে খারাপ দেখতে চাইলে যা হয় তাই হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেই ব্রিটিশ আমল ১৮৬০ সাল থেকেই পেনাল কোডে এই আইনটা আছে। পেনাল কোডের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ সম্পর্কে তিনি জানেন, পাতা উল্টিয়েছেন মনে হয় না। অতএব হেফাজত দাবি করে থাকুক কী না থাকুক ব্লাসফেমি বা ধর্মের অবমাননা সংক্রান্ত আইন বৃটিশ আমলেই পেনাল কোডে রাখা আছে। আর তাই ব্লাসফেমি আইন করার জন্য বৃটিশরা নিশ্চয় বড় মৌলবাদী গোষ্ঠী? না কী?

দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ব্লাসফেমি ইংরেজি শব্দ। ফলে কওমি আলেমরা এমন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেন কেন? আসলে, তাদের দাবি ছিল তাদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তাকে অপমান করা হয়েছে, বেইজ্জতি করা হয়েছে। ফলে এর প্রতিকার চান তারা; আইন ও শাস্তি চান। যেকোনো গণক্ষোভের (বা সিভিল ডিস-অবিডিয়েন্সের) বেলায়  ব্যাপারটা এমনই হয়, এভাবেই গড়ায়। বরং তারা কোনো সশস্ত্র তৎপরতায় নয়, আইনসঙ্গতভাবে মাস তৎপরতায় সমাবেশ ডেকে সরকারের কাছে আইন দাবি করেছিলেন, শাস্তি চেয়েছিলেন। নিজেই কোনো ধর্মীয় আইন বা ফতোয়া জারি করেননি। সে আইন প্রয়োগ করেননি, কাউকে দায়ী করে কোতল করেন নাই। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – হেফাজত কোন কল্পিত কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের কাঠামোতে নয়, একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেই একটি আইন চাইছিলেন। অতএব দুইটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট হল – এক.  হেফাজত আইএস এর মত কোন গোপন ও সশস্ত্র কায়দার সংগঠন নয়, ফলে অমন কোন সংগঠন হয়ে  সে  ঢাকায় হাজির হয় নাই, আসে নাই। গণবিক্ষোভ জানাতে পাবলিক সমাবেশ করেছে। সবাইকে জানিয়ে, সবাইকে নিয়ে এবং প্রকাশ্যে। অথচ আমরা তাকে ট্রিট করেছি ওকে ‘সন্ত্রাসী’ দাবি করে। আমাদের সরকার ও জনগণের একাংশের গভীর ইসলামবিদ্বেষ থেকে তাঁরা প্ররোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পয়েন্টঃ হেফাজত দাবি করেছে একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতে একটা আইন করে সমাধান। কিন্তু সেকুলারিজমের নামে আমাদের ইসলামি বিদ্বেষী মন সেটা দেখতেই পায় নাই। কারণ কী দেখে কী চিনতে হয় আমরা জানি না, আমরা এমনই দিগগজ! কিন্তু আমাদের মন ভর্তি হয়ে আছে ঘৃণা আর বিদ্বেষে। তাই জবরদস্তিতে দাবী করছি হেফাজত না কী ব্লাসফেমি আইন চাইছে!    এখন নিশ্চয় আমাদের সেকুলাররা পরিস্কার ভাবে মানবেন যে হেফাজতকে মিসহান্ডলিং করা হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষের কারণে তারা তা করেছেন। সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরকার গণবিচ্ছিন্নতার শুরু। এর তলানীতে ঠেকা অবস্থায় আজ এভাবেই কী বাংলাদেশকে  আইএস ধরণের রাজনীতি বিকাশের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র বানায়ে হাজির করা হয় নাই? যেটা আসলে আইএস ততপরতাকে দাওয়াত দেয়ার সামিল। অথচ আমরা কিছুই লক্ষই করিনি, বুঝতেই পারিনি। কারণ, কী লক্ষ্য করতে হবে আমরা তাই জানি না। আমরা খালি নাকি সেকুলারিজম বুঝি।

আসলেই কী বুঝি? বিগত ২০১৩ সাল থেকে দেখছি আমাদের যাদের মন ইসলামিবিদ্বেষী তারা হেফাজত ঘটনার মিডিয়া রিপোর্ট করার সময় হুবহু কওমি আলেমদের দাবিটা উল্লেখ না করে নিজের বিদ্বেষের জ্ঞান জাহির করতে আলেমদের ভাবনাকে খ্রিষ্টীয় অনুবাদ করে লিখে দিলেন- “আলেমরা ব্লাসফেমি আইন চেয়েছে”। আলী রীয়াজ যাদের একজন। ওই রিপোর্টাররা কী জানেন ব্লাসফেমি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অবমাননাবিষয়ক শব্দ। এই শব্দ ইসলামের আলেমদের নয়, হতেই পারে না। অতএব এটা তাদের শব্দই নয়। এটা অবুঝ ও বেকুবদের শব্দ। আমরা সেটা আলেমদের মুখে জবরদস্তি সেঁটে দিতে দেখেছি। বিশেষ করে যারা ইংরেজি মিডিয়া রিপোর্ট করলেন তাদের কেউ কেউ গোলামি মনের সমস্যায় ভাবলেন নিশ্চয় ব্লাসফেমি শব্দ ব্যবহার করলে ইংরেজিতে ব্যাপারটা সঠিকভাবে ইংরেজিভাষী বা বিদেশীদের বুঝানো যাবে। আর কেউ কেউ ভাবলেন এটাকে সরকারের পক্ষে ক্রেডিট আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেশে বিদেশে সবাইকে জানালেন যে, ব্লাসফেমি আইনের জন্য নাকি বাংলাদেশে ইসলামি ‘পশ্চাৎপদ’ হুজুরদের সমাবেশ হয়েছিল। আর এতে সরকারকে হিরো হিসেবেও তুলে ধরা গেল যে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ হিসেবে সরকার কওমি আলেমদের ঠেঙিয়েছে। অথচ কোথায় আলেমদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে খারাপ কথার শাস্তি দেয়ার আইনের দাবি আর কোথায় একে ব্লাসফেমি আইন বলে হাজির করে তুচ্ছ পশ্চাৎপদ অচল পুরানা মাল বলে তাদের হাজির করা হল। এছাড়াও আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই ব্যাপারটাকে ‘ডিফেমেশন অব রিলিজিয়নের” বিষয় হিসেবে দেখা ও সে অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিকারের প্রতিশ্রুতির বিষয় হিসেবে দেখে এর সমাধান দেয়া সম্ভব ছিল। আমার ধারণা ছিল না অন্তত আলী রীয়াজ ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের সময় থেকে আলেমররা ‘ব্লাসফেমি আইনের’ দাবি করেছে বলার ভুলটা এত দিনেও তিনি লালন করছেন। এই ভুলটা কাটানোর জন্য সেসময় থেকেই নানা আর্টিকেল বাজারে এসেছে।  তাহলে এমন ভুল ধারণা লালন যারা করেন তাদের কী ‘অবস্কিউরানিস্ট’ বা স্থবির অচল, যারা নতুন গ্রহণ করে না- বলা চলে! আলী রীয়াজ এই ‘অবস্কিউরানিস্ট’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন হেফাজতের আলেমদের বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘অবস্কিউরানিস্ট’ রিলিজিয়াস গ্রুপ দ্যাট ডিম্যান্ডেড দা ইন্ট্রোডাকশন অফ এন অ্যান্টি-ব্লাসফেমি ল ইন ২০১৩।’ (Hefazat-e-Islam, an obscurantist religious group that demanded the introduction of an anti-blasphemy law in 2013)
সোজা কথায় বললে আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলির মতো আমেরিকান বন্ধুদের ও খোদ আমেরিকাকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী চান। সফল ইসলামবিদ্বেষ চাইলে অথবা আলেমদের অচল মাল বা পশ্চাৎপদ হিসেবে দেখানো, এগুলো খুবই সহজ কাজ। আমরা কেউ কাউকে আমার পছন্দের ধর্ম অথবা নিধর্মের সমাজ নাস্তিকতায় নিয়ে যেতে পারব না। কারো ধর্ম খারাপ প্রমাণ করে কিছুই আগাতে পারব না। এর প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের কমন সুন্দর দিকগুলার গৌরব তুলে ধরে এক রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়ে অনেক দূর যেতে পারি। নাইলে আমাদের জন্যই হয়ত অপেক্ষা করছে আইএস অর্থাৎ আলকায়েদার পথ। আমরা যদি ওইটারই যোগ্য হই তবে তাই হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সান হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অন লাইনে ১৮ জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় (প্রিন্টে ১৯ জুলাই) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার তা নানা সংযোজন ও এডিটের পর ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

মোদীর ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (২)

মোদীর ভারত এবং বিশ্বে শক্তির ভারসাম্যে বদল (২)

গৌতম দাস
ছোট লিঙ্কঃ http://wp.me/p1sCvy-91

২৩ জানুয়ারি ২০১৫।

পরাশক্তি হওয়ার নির্ণায়ক
কোন রাষ্ট্রের পরাশক্তি (সুপার পাওয়ার অথবা গ্লোবাল পাওয়ার বলে যেটা আমরা বুঝাই) খেতাব পাবার নির্ণায়ক কি? অনেকের মনে হতে পারে পারমাণবিক বোমা বানানোর ক্ষমতা আর সে বোমা কোন রাষ্ট্রের সংগ্রহে থাকলেই তাকে বোধহয় পরাশক্তি বলা যায়। আসলে এই ধারণার কোন ভিত্তি নাই। তবু কারও কারও এমন ধারণা থাকে। সেটা তৈরি হবার পিছনের কারণটা হল – কোন রাষ্ট্রের পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতা এটা নিঃসন্দেহে তার সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতার একটা মাত্রা ও সেই মাত্রাকে প্রকাশ করা মাত্র। কিন্তু শুধু ঐ একটা মাত্র দিয়ে ঐ রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা প্রকাশ পায় একথা সত্যি না – ভুল অনুমান এখানে। অর্থাৎ সার কথাটা হল, কেবল পারমাণবিক অস্ত্রের সক্ষমতাকে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বলে বুঝা – এটা ভুল। আবার পরাশক্তি ধারণা মানে  কেবল কোন সামরিক সক্ষমতার প্রশ্নও নয়, বরং সামরিকের সাথে ষ্ট্রাটেজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন এবং সর্বোপরি সব ধরণের সক্ষমতার মূল ভিত্তি হল ঐ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন। কারণ কারও পরাশক্তি হয়ে উঠার প্রথম শর্ত নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতা। অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল হলে, উদ্বৃতের অর্থনীতিতে পৌছালে তা বাকি সামরিক, স্ট্রাটেজিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার পুর্বশর্ত বলে এরপর পরাশক্তি হয়ে উঠা কিছু সময়ের ব্যাপার কেবল। যদিও, এটা ঠিক যে নিজের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র হাতে থাকলে শত্রুর কাছ থেকে বড় বা সর্বাত্মক ধরণের হামলা বা আক্রমণ আসার সম্ভাবনা এটা কমায় মাত্র। আবার শত্রুর উপর এই বোমা ব্যবহার করে পাল্টা হামলা চালানোর সুযোগও একই কারণে খুবই সীমিত হয়ে যায়। যেমন ভারত-পাকিস্তান কখনও কোন বড় বা সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়ায় না একারণেই। দুদেশের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র আছে বলে কেউই যুদ্ধকে বড় করতে বা ছড়াতে চায় না – সীমিত স্তরে রাখতে চায়। কারণ কোন পক্ষ অপর পক্ষের হাতে চরম নাস্তানাবুদ হয়ে গেলে সে অপমাণিত বোধ থেকে এটা তাকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারে উস্কানি দেয়া হয়ে যেতে পারে। এছাড়া এই অস্ত্র ব্যবহারের আগে প্রকৃতি ও মানুষের উপর বিকিরণ বিষয়ে পার্মানেন্ট ক্ষতির কথাও বিবেচনায় নিতে হয়। না নিয়ে গত্যন্তর থাকে না। কারণ বিকিরণের প্রভাব তার নিজ ভুখন্ডেও আসতে পারে। ফলে সামগ্রিক বিবেচনায় পারমাণবিক বোমা মূলত আত্মরক্ষামূলক; এবং তাও সীমিত অর্থে।
আত্মরক্ষামূলক কথার আরও মানে হল সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা যাই থাক না কেন, কোন রাষ্ট্রের সে সক্ষমতা তার প্রতিপক্ষের তুলনায় ছাড়িয়ে গেলেও হামলা করার সময় আক্রমণকারী যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করবে। করবে এই ভয়ে যে সেক্ষেত্রে উপায়হীন দেখে আক্রান্ত প্রতিপক্ষ, দুর্বল হলেও, নিজের কাছে মজুদ থাকা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা ভেবে বসতে পারে, সেদিকে যেন উস্কানি দেয়া না হয়। আবার আক্রমণকারী শত্রুরও যদি পারমাণবিক সক্ষমতা থাকে সেক্ষেত্রে উভয় পক্ষই যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করে থাকে, উভয়কেই কড়া সর্তক থাকতে হয় যেন কেউ কাউকে পারমাণবিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে না দেয়। সর্বশেষ ভারত-পাকিস্তান কারগিল যুদ্ধে এই প্রবণতাই দেখা গিয়েছিল। ফলে নিট ফলাফল হচ্ছে পারমাণবিক বোমা সংগ্রহে থাকার কারণে উভয় পক্ষকেই যুদ্ধ সীমিত স্তরে রাখার চেষ্টা করতে হয়, উভয়কেই একটা স্ব-আরোপিত সীমা তৈরি করে ও তা মানতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ পারমাণবিক বোমা প্রয়োগ করে শত্রুকে ঘায়েল বা ক্ষতি করার জন্য নয়, বরং ভয় দেখানো এবং ভয় পাবার দিক থেকে এটা আত্মরক্ষামূলক ভূমিকা পালন করে।
আবার ২০০১ সালের পরে আমেরিকার আফগানিস্তান বা ইরাক হামলার বেলায় ব্যাপারটা কিছুটা ভিন্ন; ঐক্ষেত্রে ব্যাপারটা এমন নয় যে আমেরিকার পারমাণবিক সক্ষমতা আছে বলেই সে সহজে ঐ দুই দেশকে আক্রমণ করে পদানত ও দখল জারি করতে পেরেছিল। যদিও আফগানিস্তান বা ইরাকের হাতে পারমানবিক বোমা থাকলে ফারাক কিছু হতেও পারত। পারমাণবিক বোমা মূলত ভয় দেখানোর অস্ত্র, যতটা ঠেকিয়ে রাখার অস্ত্র ততটাই তা ব্যবহারের নয়। এসব কারণে, জাপানে ১৯৪৫ সালে এই বোমা ব্যবহারের পর বিশ্বে কোন যুদ্ধ সংঘাতে আর কোথাও এর ব্যবহার হয় নাই। এছাড়া ইদানীং বোমা কেন, পরমাণু এনার্জির ব্যাপারেও প্রত্যেক দেশেই জনগণ যেভাবে শঙ্কিত হয়ে উঠেছে, ব্যবহার-বিরোধী জনমত প্রবল হচ্ছে তাতে বোমা সংগ্রহে থাকলেও তা ব্যবহারের বিরুদ্ধে খোদ নিজ জনগণেরই মনোভাব প্রবল বাধা হয়ে উঠতে পারে, এটা নাকচ করা যায় না। অতএব বাস্তবে এই অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োগ সম্ভাবনা খুবই সীমিত।
আবার আর একদিক থেকে দেখলে, পারমাণবিক সক্ষমতা মানে নুইসেন্স করার ক্ষমতাও বটে; যেমন উত্তর কোরিয়া। সে তার পারমাণবিক সক্ষমতাকে ব্যবহার করছে দেশের ভিতরে ও বাইরে একটা ভয়ের রাজত্ব তৈরির কাজে। একদিক থেকে মনে হতে পারে উত্তর কোরিয়ার শাসক এই বোমার জোরে নিজ সার্বভৌমত্ত্ব রক্ষা করতে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু আবার অন্যদিক থেকে যদি প্রশ্ন করি, সার্বভৌমত্ব রক্ষা মানে কি? এর অর্থ খুঁজতে ভিতরে ঢুকলে দেখা যাবে, উত্তর কোরিয়ায় এর আসল অর্থ হয়ে আছে নিজ অর্থনীতিকে ক্ষুদ্র বামন করে রাখা, এমনকি বর্তমান ক্ষমতার অধীনেই ন্যূনতম সংস্কার করার আগ্রহ না দেখানো, জনগণের উদ্যমকে দাবিয়ে রাখা, জীবনের মান অচলায়তনে আটকে ধুঁকে ধুঁকে মরা ইত্যাদি। ফলে এগুলো করে কার সার্বভৌমত্ব রক্ষা হচ্ছে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হই আমরা। সবমিলিয়ে দেশের ভিতরে বাইরে সবার কাছেই উত্তর কোরিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীনদের হাতে পারমাণবিক সক্ষমতা অন্যদের চোখে ‘নুইসেন্স’ হিসাবেই হাজির হয়ে আছে। অতএব এখানেও আমরা দেখছি, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক বোমার অধিকারী বলেই পরাশক্তি হিসাবে গণ্য নয়।
যদিও পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়ে উঠাকেই পরাশক্তির হয়ে উঠা বলে ভুল অনুমানের ধারণা এক সময় বেশ প্রকট হয়েছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে নতুন বিশ্ব বাস্তবতায় কোন রাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা বলতে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হওয়া বাদে অন্যান্য দিক বিকশিত করবার দিকে ঝোঁক ক্রমশ বেড়েছে। আগের কিস্তিতে বলেছিলাম সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কোন রাষ্ট্রের কেমন থাকবে কি থাকবে না অথবা তা কতটা হবে এটা মূলত নির্ভর করে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও শক্তি অর্জনের উপর। পারমাণবিক সক্ষমতা তো নয়ই এমনকি সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কথাটাও ঠিক কারও পরাশক্তি হবার পরিমাপক অথবা নির্দেশক নয়। কারণ সামরিক খরচ বইবার মত একটা সামঞ্জস্যপুর্ণ উপযুক্ত ও যোগ্য অর্থনীতি সবার আগে থাকতে হবেই। এর উপরই দাঁড়াতে পারে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা কথাটার অর্থ। এক্ষেত্রে এখনকার রাশিয়া এক আদর্শ উদাহরণ। সোভিয়েত ইউনিয়ন নামে থাকার সময় এর যে সামরিক সক্ষমতা ছিল এখন রাশিয়ান ফেডারেশন হয়ে যাবার পর সে নিজ অর্থনীতির মাপে নিজের আগের সামরিক সক্ষমতাকে ছেঁটে কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে। সেটাও বহাল রাখতে পারছে অর্থনীতির ইন্ডাষ্টিয়াল সক্ষমতা্র ভিত্তি দিয়ে নয়, মাটির নিচের তেল-গ্যাস বিক্রির অর্থনীতি দিয়ে, ধুঁকে ধুঁকে।
অতএব, নতুন পুঁজিতান্ত্রিক বিশ্বব্যবস্থায় যে কোন রাষ্ট্রের জন্য সবার আগে দরকার একটা দ্রুত প্রবৃদ্ধির অর্থনীতি অর্জনের সক্ষমতা নীতি গ্রহণ করা। এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে সম্পদ বিতরণ ও বণ্টনের নীতি ও কার্যকর ব্যবস্থা যেন আভ্যন্তরীণ সংকট রাষ্ট্রের সক্ষমতাকে ভেতর থেকে দুর্বল করতে না পারে। এই দুটো দিক অর্জিত হলে সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা আসা কোন ব্যাপারই নয়। কিন্তু তারপরও কোন দেশ নিজেকে পরাশক্তি বলে গণ্য নাও করতে চাইতে পারে। অর্থাৎ গণ্য হওয়াটা ঠিক অনিবার্য বা জরুরিও নয়।
মনে রাখতে হবে পরাশক্তি ধারণাটা মূলত ঐতিহাসিক। অর্থাৎ দুনিয়ায় একটা বিশেষ সময়ে বিশেষ শর্তে এই ফেনোমেনা হাজির হয়েছে যেটা ভিন্ন সময় শর্ত পরিস্থিতি এটা উধাও হতে পারে। ফলে অনিবার্য বা চিরন্তন কিছু নয়। দুনিয়ায় কলোনি শাসনের আবির্ভাবের কাল থেকে ধারণাটার উদ্ভব। ধারণাটা মূলত কোন রাষ্ট্রের গ্লোবাল প্রভাব আধিপত্য কেমন এরই এক নির্দেশক। আবার অন্যদিক থেকে নেতিবাচক। আন্তঃরাষ্ট্রীয় লেনদেন বিনিময় সম্পর্ককে কেবল জবরদস্তি খাটানো বিনিময় সম্পর্ক হিসাবে জারি রাখা, জবরদস্তিতে নিজের মতাদর্শগত দিকটা দুনিয়ার অন্য জনগোষ্ঠীর উপর চাপিয়ে দেওয়া, নিজেকেই একমাত্র সভ্যতার ধারক-বাহক, আদর্শ বিবেচনা করা -এগুলো হল পরাশক্তি ধারণাটার ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য। পরাশক্তির এটা খারাপ অর্থ। তবে আগামী দিনের নতুন কোন গ্লোবাল অর্ডারে যদি পরাশক্তি ধারণার প্রত্যক্ষ ও খারাপ অর্থগুলো কমতে কমতে নাই হয়ে যায় তবু এরপর কোন রাষ্ট্রের নিজ অর্থনৈতিক সক্ষমতার উপর ভর করে সামরিক সক্ষমতার সূত্রে গ্লোবাল প্রভাব রাখার বিষয়টা থেকে যাবে, সম্ভবত সহসাই উবে যাবে না।

সম্ভাবনা সম্পন্ন হয়তো, কিন্তু ভারত পরাশক্তি নয়
পরাশক্তি শব্দটার এই স্বল্প ব্যবচ্ছেদ থেকে আমরা এতটুকু স্পষ্ট হতে পারি যে, পরাশক্তি ধারণার বিচারে ভারত কোন পরাশক্তি এখনও নয়। কিন্তু তবু আমরা দেখতে পাচ্ছি, ভারতকে পরাশক্তি বিবেচনা করার কথা উঠেছে। এর কিছু কারণ নিশ্চয় আছে, সেদিক যাব। যেমন, ২০০৪ সালের মে মাসে কংগ্রেসের ইউপিএ সরকারের প্রথম টার্মে ক্ষমতায় আসার পরের বছর ২৭ জুন ২০০৫, ভারত-আমেরিকা একটা “ডিফেন্স প্যাক্ট” সই করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকার সহায়তায় ভারতের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো। এ উপলক্ষে টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৯ জুন ২০০৫ এর রিপোর্টিং এর প্রথম বাক্যটা এরকম, “India and the United States have signed a 10-year defence relationship agreement that gives credence to the Bush administration’s pledge to help India become a major world power in the 21st century.” এই বাক্যের ভিতরের পরের অংশটা ইন্টারেস্টিং। বলছে, “ভারতকে ২১ শতকে ‘মেজর ওয়ার্ল্ড পাওয়ার’ বা পরাশক্তি হতে সাহায্য করার যে প্রতিশ্রুতি আমেরিকা দিয়েছিল এই চুক্তি তার পক্ষে সাক্ষ্য দিচ্ছে”। এখন পরাশক্তি কথার আমরা আসল যে অর্থ, গ্লোবাল অর্থনীতিতে ন্যূনতম শীর্ষ তিন-চার জনের একজন হওয়া -এমন অর্থবোধে গত দশ বছরেও ভারত পরাশক্তি হয়েছে এমন কোন রিপোর্ট অথবা দাবি আমরা কোথাও দেখি নাই। তাহলে এই মিডিয়া রিপোর্টটা এমন কেন? এটা পড়ে অনুমান করা যায় যে অর্থে ভারতের পরাশক্তি হওয়া মানে করা হয়েছে, তাও আবার আমেরিকার সহায়তায়, এটা কারো পরাশক্তি হওয়া বুঝায় কি না? অন্য রাষ্ট্রের সহায়তায় কেউ পরাশক্তি হতে পারে কি না এমন প্রশ্ন বা সন্দেহ এই রিপোর্টে নাই। এছাড়া এই রিপোর্টটা মূলত ভারতকে আমেরিকার সামরিক হার্ডওয়ার ও টেকনোলজি সরবরাহ সংক্রান্ত। অর্থাৎ এতে ভারতের বড়জোর সামরিক সক্ষমতা বাড়বে। কিন্তু তাতে ওয়ার্ল্ড পাওয়ার বা পরাশক্তি হবার সম্পর্ক কি – সে প্রশ্ন করতে মিডিয়া ভুলে গেছে। রিপোর্টের এসব ভুয়া অনুমান উদোম করতে এই রিপোর্ট থেকে আরও কিছু প্রসঙ্গ তুলে আনব।
প্রথমত রিপোর্ট জানাচ্ছে, “Hugely ambitious in its size and scope, the agreement envisages a broad range of joint activities, including collaborating in multinational operations ‘when it is in their common interest,’ ”। অর্থাৎ ঐ ডিফেন্স প্যাক্টে আছে, দুই রাষ্ট্রের কমন স্বার্থ বলে উভয়ে মনে করলেই ‘টেররিজম ধ্বংস’ জাতীয় কোন কিছুর উছিলা তুলে ভারত আমেরিকার সাথে বহুজাতিক বাহিনীতে যোগ দিয়ে ঐ “টেররিষ্ট” দেশের বিরুদ্ধে লড়তে সম্মতি জানাচ্ছে। এই পত্রিকার রিপোর্ট নিজে অবশ্য চুক্তিতে কেবল এমন অনুচ্ছেদ থাকাকে ভারতের “উচ্চাকাঙ্ক্ষা” হিসাবে দেখছে। আর এই চুক্তি অনুমান করছে এভাবেই নাকি “two militaries to promote security” তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পক্ষে আগিয়ে যাবে। রিপোর্টের আর এক অংশ বলছে, “The framework agreement also envisages what is tantamount to the U.S and India jointly policing the world.”। এখানে পত্রিকা প্রতিরক্ষা চুক্তিটা সম্পর্কে নিজস্ব মন্তব্য লিখে বলছে, যেন ভারত-আমেরিকা যৌথভাবে বিশ্ব-পুলিশের ভূমিকায় নামতে যাচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্ব-পুলিশী করার খায়েস রাখার বিপদের দিকটা নিয়ে পত্রিকা আপত্তি তুলছে। তৃতীয়ত, ঐ ডিফেন্স প্যাক্টে সই করেছিলেন, যুদ্ধবাজ বুশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফিল্ড আর ভারতের তৎকালীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী প্রণব মুখার্জি। চুক্তি স্বাক্ষর শেষে সাংবাদিক সম্মেলনে প্রণবকে এক রিপোর্টার প্রশ্ন করেছিলেন, এটা “playing a subservient role to a unipolar US agenda” অর্থাৎ ভারতের দিক থেকে দুনিয়াতে এক মেরুর মাতবর আমেরিকার এজেন্ডার অধীনস্থ হওয়া হয়ে যাচ্ছে কি না। এর জবাবে প্রণব আমেরিকাকে বিশাল ঠকান ঠকিয়ে এই চুক্তি জিতে এনেছে এমন এক মিচকি হাসি দিয়ে বলেছেন, “This is the real deal…we have both put down what we want for the next decade… “he didn’t expect convergence or agreement on all issues at all times.”। তর্জমা করলে, “এটাই তো আসল খেলা, … পরের দশক পর্যন্ত আমরা কি চাই তা উভয়েই ওখানে লিখে রেখেছি।… সব ইস্যুতে সবসময় আমাদের উভয়ের একমত হতে বা মিলতে হবে এটা আমি আশা করি না”। প্রণবের এমন আস্থাবাচক মুচকি হাসির কারণ, ঐ প্যাক্টের আর এক অনুচ্ছেদ হল এরকম, “এই চুক্তি ভারতের স্বতন্ত্র অবস্থান নেয়ার অধিকার খর্ব করে না”। “ The agreement does not preclude India’s right to its independent views.”। এই হোল প্রণবের “ভারত পরাশক্তি” নামক প্রপাগান্ডার ফানুস। তবে ফানুস উড়িয়ে একটা ভাব তো ছড়ানোই যায় যে আমরা এই তো চাঁদে চলে যাচ্ছি। সে যাক, কিন্তু ‘আমেরিকাকে মহা ঠকিয়েছে’ ভাবটা প্রণব বেশিদিন ধরে রাখতে পারেন নি। ভারত প্রথম ধাক্কা খায়, ২০১১ সালের প্রথম অর্ধে যখন বঙ্গোপসাগরে আমেরিকার সপ্তম নৌবহর রাখার পরিকল্পনা প্রকাশ হয়ে পড়ে। স্বভাবতই ওবামার এই ইচ্ছার ভিতরে ভারত এবার খোদ নিজেরই নিরাপত্তার জন্য হুমকি আর বিপদের দিকটা দেখেছিল। ভারত আমেরিকান পরাশক্তির যাঁতাকাঠি ধার পেয়েছিল ২০০৬ সালের শেষ থেকে; বাংলাদেশে কে সরকারে আসবে থাকবে, কি শর্তে থাকবে তা ঠিক করার কর্তা হওয়ার ভিতর দিয়ে। এটাও প্রণবের চোখে পরাশক্তি ভাবার সুখবোধ হতে পারে।

দুই হাজার চৌদ্দ সালের সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে কথাবার্তার পর নরেন্দ্র মোদী ভারতের প্রতিরক্ষা খাতে মার্কিন কম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন। ভারতে প্রতিরক্ষা খাতে বিদেশি বিনিয়োগের সীমা ছিল ২৬%, সেটা এখন বাড়িয়ে ৪৯% করা হয়েছে। দুই হাজার পনেরো সালে ভারত ও মার্কিন প্রতিরক্ষা চুক্তি শেষ হবার কথা ছিল। মোদীর মার্কিন সফরের পর সেটা আরও দশ বছর বাড়ানো হয়েছে।

কিন্তু ধরাকে সরা জ্ঞান করার ভারতের সেই সুখবোধে টান পড়তে শুরু করে প্রায় একই সময় ২০১১ সাল থেকে। এরই এক প্রকাশ্য রূপ হল, বাংলাদেশের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে ভারত-আমেরিকার দুই মেরুতে অবস্থান। অর্থাৎ আমেরিকার বিদেশনীতি আর ভারতের বিদেশনীতি হরিহরাত্মার মত একই আত্মা না হলেও “নিরাপত্তা”, “টেররিজম” এসব শব্দের আড়ালে উভয় রাষ্ট্র উভয়কে এভাবে ফাঁকি দিয়ে চলছিল। এই হরিহর মিলনের মধ্যে কোন খটমটর নাই, আসবে না এই ভাব ছড়ানো হয়েছিল। এমন মিথ্যা ধারণাটা উন্মোচিত হয়ে যেতে শুরু করেছিল ২০১১ সাল থেকে। অথচ ভারত ও আমেরিকা দুজনেই জানত যে মূলত আমেরিকার চীন ঠেকানোর ইচ্ছা থেকে এসব ঘটছে এবং ঘটানো হচ্ছে। যদিও আসলে চীন ঠেকানো অসম্ভব এটাই অবজেক্টিভ বাস্তবতা। একেই আগের কিস্তিতে “উদ্বৃত্ত বাস্তবতা” বলেছিলাম। এই বাস্তবতা অস্বীকার করে যতটুকু ও যতদিন আমেরিকা পরাশক্তি হিসাবে নিজের উঁচু জায়গা জাগিয়ে রাখতে পারে সেই উদ্দেশ্য সাধনে সাময়িক সে ভারতের পিঠে হাত রেখেছিল। কিন্তু উভয়েই এই জানা জিনিষটা লুকানোর ভাব ধরেছিল। বিশেষত ভারত ভাব ধরে ছিল যে সাদা চোখে ধরা পড়া জিনিষটাও সে দেখেও দেখে নাই। যেন এটাই তার পরাশক্তি হবার পথ, যেন আমেরিকা তাকে পরাশক্তি হতে সহায়তা করছে, এই ধারণা প্রণবের সরকারই মিডিয়াতে ছড়িয়েছিল।

আজকের দুনিয়ার মুল দ্বন্দ্ব
আজকে চীন আমেরিকার প্রতিযোগিতা দ্বন্দ্বের মুল বিষয় হল, আগামি গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার কে নিয়ন্ত্রণ করবে? একালেও ব্রিটেনের সাথে আমেরিকার ছোটখাটো স্বার্থবিরোধ দ্বন্দ্ব আছে কিন্তু এই দ্বন্দ্ব তুলনায় তেমন একেবারেই কিছু নয়। তবে এককালে, ব্রিটেন ও আমেরিকার সত্যিকারের একটা বড় দ্বন্দ্ব ছিল, যা ক্রমশ চরমে উঠা আর ফয়সালার সময়কাল ছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝের সময়টা (১৯১৪-১৯৪৪), এই ত্রিশ বছর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপনিবেশিক সাম্রাজ্যের কর্তা হিসাবে ব্রিটেনের পতন ও পরাজয় নিশ্চিত করে আমেরিকার মাতব্বরিতে নতুন গ্লোবাল অর্ডার সাজিয়ে নেয়া হয়েছিল। যদিও বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কে হাজারো বই-পুস্তক সিনেমায় হাজির বয়ান আছে। যেখানে যুদ্ধের মুল প্রতিপাদ্য হল হিটলারের জার্মানি, ইটালি বনাম বাকি পশ্চিমা শক্তি – যেন এমন এক “ন্যায়ের যুদ্ধ” সেটা। জেনারেলদের বীরত্বের এক এক গাথা সেগুলো। কিন্তু কোন বর্ণনায় যেটা বলে না তা হল, ঐ যুদ্ধের সবচেয়ে নির্ধারক তাতপর্য। তা হল, সারা দুনিয়াকে উপনিবেশ বা কলোনিতে ভাগ করে নেয়া, এক একটা সাম্রাজ্যের অধীন করে রেখে দেয়া আর শিরোমনি হিসাবে থাকা বৃটিশ সাম্রাজ্যের অধীনে থাকা সীমিত বিকশিত গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডারটা ঐ বিশ্বযুদ্ধ শেষে হস্তান্তর হয়ে আমেরিকার হাতে চলে যাওয়া। সেটা ছিল আমেরিকার দিক থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণে -এই প্রথম জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক ইত্যাদি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিকতা দিয়ে এক নতুন গ্লোবাল অর্ডার সাজিয়ে নেয়া আর নিজের পরাশক্তিগত উত্থান। অর্থাৎ আগে বৃটিশ সাম্রাজ্যের নেতৃত্বে নড়বড়ে অবিকশিত এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার ছিল কিন্তু এর কোন আন্তর্জাতিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ তো ছিলই না। এমনকি কোন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানও ছিল না, ছিল Rothschild family এর পারিবারিক ব্যাংকের মত কিছু প্রতিষ্ঠান মাত্র। এসবের বিপরীতে কায়েম হয়েছিল আমেরিকার নেতৃত্বে এক প্রাতিষ্ঠানিক গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার। তবে তা ছিল তখনকার “উদ্বৃত্ত বাস্তবতায়” আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতার জোরে, সামরিক বা গায়ের জোর দেখিয়ে নয়। আর, ব্রিটেন সেকালের উদীয়মান শক্তি আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজের পুরানা কলোনি ব্যবস্থা অর্থাৎ তখনকার গ্লোবাল অর্ডারকে টিকানো বাস্তবত অসম্ভব ছিল বলে কিছুই করতে পারে নাই। তবে পরাজিত হবার পর ব্রিটেন আবার আমেরিকার নেতৃত্বে যে নতুন গ্লোবাল অর্ডারটা খাড়া হল সেখানে আমেরিকার খুবই ছোট পার্টনার হয়ে আমাদের মত ছোট অর্থনীতির উপর রুস্তমির ভাগ যতদূর পায় তা টুকিয়ে সেই থেকে দিন চালাচ্ছে।

আজ চীন আমেরিকার প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব ১৯৪৪ সালের ব্রিটিশ-আমেরিকান প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বড় দ্বন্দ্বের মতই। দ্বন্দ্বটা একই ধরণের, পুরান ঢলে পড়া গ্লোবাল অর্ডার বনাম আসন্ন নতুন গ্লোবাল অর্ডার; এর নিয়ন্ত্রণ করবে কে –সেটাকেই আমরা আর এক অর্থে মাতবর বা পরাশক্তি হবার লড়াই বলছি। আজ চীন আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্ডারটা চ্যালেঞ্জ করে ফেলেছে। এটা ভেঙ্গে দিয়ে নিজের নেতৃত্বে নতুন গ্লোবাল অর্ডার কায়েম করতে চাইছে। দ্বন্দ্বের সারকথা এটাই। ফলে চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব লড়াইয়ের মুখে আমেরিকা ভারতকে পাশে রাখতে চায় যাতে ভারত চীনের সাথে নতুন গ্লোবাল অর্ডার খাড়া করবার সহযোগী সাথী না হয়ে ওঠে। সে লক্ষ্য হাসিল করতে আমেরিকা ভারতকে পরাশক্তি হবার মিথ্যা লোভ দেখিয়েছে। মিথ্যা এজন্য যে, পরাশক্তি হওয়াটা কারও সহযোগিতায় পাওয়া না পাওয়ার উপর নয় বরং আপন অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করার উপর নির্ভর করে। ফলে বিষয়টা দাঁড়িয়েছে আমেরিকা প্রলুব্ধ করেছে আর প্রণবের কংগ্রেস সে লোভে মশগুল থেকেছে। এভাবেই স্বপ্ন দেখতে দেখতে কংগ্রেস ইউপিএ সরকারের দশ বছর পার হয়েছে। আর সেই থেকে ভারত একটা পরাশক্তি এমন ভুয়া ধারণা মিডিয়ায় খামাখা চালু হয়ে রয়েছে।

আগে বলেছি ভারতের সামরিক শক্তিতে শ্রীবৃদ্ধি হলেও এর মানে তার পরাশক্তি হওয়া নয়। তাছাড়া মুল কথা, কোন রাষ্ট্র কাউকে সহযোগিতা দিয়ে পরাশক্তি বানিয়ে দিতে পারে না। তবু সামরিক হার্ডওয়ার টেকনোলজির আকাঙ্ক্ষা ও লোভে ভারত আমেরিকার এই প্ররোচনায় পা দিয়েছে। তাও হয়ত হতে পারে। কিন্তু, আমেরিকা কি চীন ঠেকাতে গিয়ে ভারতকে পরাশক্তি হবার সম্ভাবনা বাস্তব করে তুলতে পারে? অর্থাৎ আমেরিকা যদি চীনের পরাশক্তি হওয়া খর্ব করতে চায় সেই আমেরিকা আবার আর এক পরাশক্তি হতে ভারতেকে কি সহযোগিতা আদৌ করতে পারে? কেন করবে? জবাব হল করতে পারে না, কোন কারণ নাই। তবু ভারত সেটা বিশ্বাস করে যে সে পরাশক্তির হতে চলেছে বা হয়ে গয়েছে। এমন স্বপ্নে দিল্লী বিভোর থেকেছে।

তাহলে সারকথা, ভারতের পরাশক্তি হবার আকাঙ্ক্ষা থাকতেই পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সঠিক মৌলিক করণীয় কাজ হল সবার আগে অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করা, সবার আগে অর্থনীতি ফোকাস করে এগিয়ে যাবার নীতি গ্রহণ করা। “নিরাপত্তার” নামে বাকচাতুরি, আমেরিকাকে ফাঁকি দিতে পারছে মনে করা -এগুলো আসলে নিজেকেই ফাঁকি দেওয়া, সদর রাস্তা থুয়ে ব্যাকডোরে কাজ হাসিল করার মত শর্টকাট কাজ – পণ্ডশ্রম। আবার অন্যদিকে প্রণবের কংগ্রেসের দশ বছরে সর্বোচ্চ জিডিপি ছিল একমাত্র ২০১০ সালের প্রথম দুই মাস, ডাবল ডিজিটে। এরপর এটা পড়তে পড়তে কংগ্রেসের বাকি আমল ছিল পাঁচের নিচে। গত বছর কংগ্রেসের পতনের পরে, এসবের বিপরীতে যা কিছু বুঝে বা মনে করেই হোক মোদীর ভারতের উত্থান অর্থাৎ অর্থনীতি ফোকাস করে নিজের আগানোর নীতি নির্ধারণ স্বভাবতই সঠিক পদক্ষেপ। যদিও মোদী আমেরিকার সাথে ডিল করবে কি করে সে প্রশ্ন এখনও অমীমাংসিতই রয়েই গেছে।

জুন-সেপ্টেম্বর মোদীর ক্ষমতার প্রথম চার মাসের পরে
আগের কিস্তিতে বলেছিলাম বিগত কংগ্রেসের শেষ কাল থেকে আমেরিকার সরে গেলেও ‘পরাশক্তি ভাব’ ধরা ভারতের তিতে বলেছিলাম বিগত কংগ্রেসের শেষ কাল থেকে আমেরিকার সরে গেলেও ‘পরাশক্তি ভাব’ ধরা ভারতের গোয়েন্দা-আমলাদের মানসিক আমোদ, আদর্শ এবং সুখবোধের উৎস হয়ে থেকে গেছে। আমলাদের এমন মনোগাঠনিক প্রভাব সত্ত্বেও মোদি নিজেকে পরিচালিত করতে সুযোগ পেয়েছিলেন প্রথম চার মাস। এর মধ্যেই ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ওবামার সাথে শীর্ষ বৈঠকের সময় ঘনিয়ে আসে। ফলে আমেরিকার সাথে ভারতের সামরিক হার্ডওয়ার পাবার বিষয়সহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সামনে আসে, গোয়েন্দা-আমলাদের মনোগাঠনিক প্রভাবের বাইরে মোদি আর থাকতে পারেন নাই। এর সম্ভাব্য কারণ, মোদী এবং তাঁর টিম ভারতকে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাব্য যে পথে পরিচালিত করতে চান এনিয়ে স্বপ্ন পরিকল্পনায় যতটা হোমওয়ার্ক করেছেন ততটা সময় আমেরিকার সাথে ডিলিং এর বিষয়ে দিতে পারেন নাই। এর কারণ ভারত-আমেরিকার দেনাপাওনার ফোকাস সিম্পল অর্থনৈতিক নয়। এছাড়া ভারতের চাওয়াগুলো কি করে আদায় করবেন, এমনকি তা কোন জায়গায় রেখে কংগ্রেস সরকার বিদায় নিয়েছে সেখান থেকে এর বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং উত্তরণের পথ কি হতে পারে এনিয়ে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো তার টিমকে স্টাডির কাজ দিয়ে হয়ত শুরু করতে হত। আর মুখ্য বিষয় কংগ্রেসের অকেজো “নিরাপত্তা” লাইনের বদলে নিজের “অর্থনীতি” লাইনে চলতে চাইলেও আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের সামরিক হার্ডওয়ার পাবার বিষয়সহ অমীমাংসিত ইস্যুগুলো সেই একই রয়ে গেছে।
ওদিকে নতুন গ্লোবাল অর্ডার যা ভারতেরও অর্থনৈতিক স্বার্থ, তা নির্মাণে BRICS ও AIIB মত প্রতিষ্ঠানগুলো গড়তে মোদী কি চীনের মতই পাশে থেকে সক্রিয় উদ্যোগ নিবেন? নাকি আমেরিকার প্ররোচনায় সেই উদ্যোগে গড়িমসি করে বিনিময়ে আমেরিকার থেকে নিজের অমীমাংসিত স্বার্থগুলো আদায়ে একে ব্যবহার করবেন? বিগত কংগ্রেস এই বিনিময়ের লাইন বজায় রেখে এগিয়েছিল, যদিও বাস্তবে তাতে ভারতের কোন স্বার্থই হাসিল হয়নি, কোনদিকে তেমন ফল দেয় নাই।

সমান মালিকানা শেয়ার, সমান ভোট ফলে মতামতের সমান ওজন
দ্বিতীয় আর এক দোনোমনা অবস্থা ভারতের রয়ে গেছিল। BCIM অথবা BRICS গড়ার প্রশ্নে। যেসব প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামোগত বা নতুন সিস্টেম গড়ার প্রাইমারি মূলধন বিনিয়োগের প্রশ্ন ছিল সেখানেই চীনের শেয়ার যাতে কোনভাবেই বেশি না হয় তা ঠেকানোর বিষয়টাকে মুখ্য বিবেচনা করে এগিয়েছে। অন্যভাবে বললে ভারত এমন নিয়ম আরোপের পক্ষে কাজ করেছে যাতে উদ্যোক্তাদের সবার বিনিয়োগ সমান হতে হবে, এই নিয়ম আরোপের পক্ষে যুক্তি তুলেছিল। বাস্তবে যে কথার মানে হল, BCIM অথবা BRICS প্রতিষ্ঠানগুলো আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের প্যারালাল প্রতিদ্বন্দ্বী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসাবে দাঁড়াতে নিজস্ব প্রাইমারি মূলধন চাহিদা যাই থাক এবং তা পূরণের চাহিদা সম্মিলিতভাবে থাক আর না থাক, তাকে ছেঁটে ভারতের নিজের নিচু বিনিয়োগ ক্ষমতার মাপের সীমায় আটকে বামন ও অকার্যকর করে রাখা। ফলাফলে এগুলো প্রভাবশালী কার্যকর প্রতিষ্ঠান হোক না হোক তা ভারতের বিবেচনার বিষয় নয়। অথবা সেকেন্ডারি বিবেচনা। একথা ঠিক আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন নীতি অনুসারে, ওসব প্রতিষ্ঠানে আমেরিকান শেয়ার সবার চেয়ে বেশি বলে, যে কোন বাণিজ্যিক ব্যাংকের সাধারণ মালিকানা নীতি অনুসারে মালিকানা শেয়ার যার বেশি মানে ভোটের ক্ষমতা তার বেশি, মানে তার নিজের অবস্থান মতামতের ওজন অন্য সবার চেয়ে বেশি। এর ফলাফলে এগুলো হয়েছে আমেরিকান স্বার্থে কান্নি মারা প্রতিষ্ঠান। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের গঠন নীতি অনুসরণে নতুন করে BCIM অথবা BRICS গড়তে গেলে তা একই সমস্যার জন্ম দিবে। ফলে ভারতের উদ্বেগ জেনুইন। কিন্তু এই উদ্বেগের সমাধান করবার ফর্মুলা কোনভাবেই উদ্যোক্তা মালিকানা সবার শেয়ার সমান করে দেয়া হতে পারে না। কারণ এর অর্থ তাতে প্রতিষ্ঠানগুলো বামন ও অকার্যকর করে রাখা হবে। ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতার মাপ মানে ততোধিক নিচু মূলধন বিনিয়োগের ক্ষমতা। মনে রাখতে হবে আমরা এই প্রাইমারি মূলধন বিনিয়োগ বলতে বাণিজ্যিক বিনিয়োগের কথা বলছি না। এটা অবকাঠামোগত অথবা নতুন অর্থনৈতিক সিস্টেম গড়ার প্রাইমারি বীজ-পুঁজির কথা বলছি। যে বিনিয়োগের লক্ষ্য মুনাফা নয়, এই বিনিয়োগ থেকে মুনাফা আসবে আধা পার্সেন্টের নিচে অথবা হয়ত কোন মুনাফাই নয় এমন। ফলে ভারতের এমন বিনিয়োগ সক্ষমতা বাণিজ্যিক বিনিয়োগ সক্ষমতার চেয়েও কম হবে। তাহলে আমাদের এই পথে নয়, অন্য সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। অর্থাৎ ভারতের উদ্বেগ অস্বস্তি জেনুইন, কিন্তু সমাধানের প্রস্তাবনা নয়। কি হতে পারে সম্ভাব্য সমাধান?
মালিকানা শেয়ার ভিত্তিতে ভোট বা বক্তব্যের ওজন – সিদ্ধান্ত ও পরিচালনা নীতি এমন না করে সদস্যদের মালিকানা শেয়ার অবশ্যই অসমান হবে আর তা যার যাই হোক, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি যদি হয় কনসেনসাস বা ঐক্যমত্য এবং অবজেক্টিভ টেকনিক্যাল সিদ্ধান্ত বিবেচনা তাহলে সহজেই এই সমস্যার একটা সম্ভাব্য সমাধান হতে পারে। অর্থাৎ কারও মালিকানা ভোটকে তার অবস্থান বক্তব্যের ওজন থেকে বিচ্ছিন্ন করা। অবস্থান মতামতকে নিজ মেরিটে গুরুত্বপূর্ণ বা প্রভাবশালী হতে হবে, ভোটের ক্ষমতার জোরে নয়। এটা করতে পারলে প্রধান সুবিধা যা পাওয়া যাবে তা হল, চীনের হাজির প্রবল বিনিয়োগ সক্ষমতাকে BCIM অথবা BRICS ধরণের প্রতিষ্ঠান গড়তে পরিপূর্ণভাবে সদ্ব্যবহার করা। যেটা BCIM অথবা BRICS বা AIIB এসব প্রতিষ্ঠানকে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের মত প্যারালাল সমতুল্য প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে হাজির করতে পারে। ঠিক এরকম অন্য কারও কোন প্রস্তাবও হতে পারে। কিন্তু মূলকথা, মালিকানা ভোটের ভয়ে নব প্রতিষ্ঠানগুলোকে বামন করে রাখা যাবে না। আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বিপরীতে নতুন কিন্তু বামন প্রতিষ্ঠান করা আর না করা সমান। কোন অর্থ হয় না তাতে।
প্রণবের বিপরীতে মোদীর ভারত কি এসব দিকে ভাবতে রাজি? আমরা একেবারেই নিশ্চিত নই। আমরা অপেক্ষা করছি। মোদী সম্পর্কে মূল্যায়নে শেষকথা বলার সময় এখনও আসেনি। আর তাঁর “অর্থনীতি” ফোকাসের নীতির কারণে এই নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মোদীর পক্ষে এমন চিন্তা করা অবশ্যই সম্ভব হলেও তিনি তা করবেন, তাঁর গোয়েন্দা-আমলাদেরকে পিছনে ফেলে আগাতে পারবেন এতদূর এখনই বলা ঠিক হবে না। তবে আরও কিছু ফেভারেবল দিক আছে; যেমন, চীনের প্রতি তাঁর সাধারণ মনোভাব অন্তত প্রণবের মত নয়। আমেরিকার প্রতি সাধারণ মনোভাবও অন্তত প্রণবের কংগ্রেস বা ভারতের গোয়েন্দা-আমলাদের মত নয়। আমেরিকা ভারতকে একটা “পরাশক্তি ভাব” দিবার সক্ষমতা বাস্তবতায় থাক আর না থাক তাকে ঢলে পড়তে হবে, না দিলে আবদার অথবা আকাঙ্ক্ষার সুখবোধে বিভোর থাকতে হবে – এমন একেবারেই নয়। তবুও মোদীর অবস্থান দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ওবামার সাথে মুলাকাতের প্রথম পর্ব মোদীর শেষ হয়েছে গত বছরের সেপ্টেম্বরে। তাতে মোদীর ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের অমীমাংসিত এবং জট পাকিয়ে যাওয়া ইস্যুগুলোর সাথে সাক্ষাত বাস্তবতার সাথে পরিচিত হয়েছেন। আমরা অনুমান করতে পারি, আমেরিকার সামরিক হার্ডওয়ার টেকনোলজি পাবার বিষয়ে তিনি যতদূর নমনীয় হওয়া সম্ভব হবেন। কিন্তু সেটা BRICS বা AIIB এসব প্রতিষ্ঠানকে অকেজো করে রাখার বিনিময়ে নয়। এই ভরসা রাখছি এজন্য যে শেষ বিচারে মোদী তাঁর অর্থনীতি” ফোকাস থেকে সম্ভবত কোনভাবেই সরবেন না। কারণ তাঁর “অর্থনীতি” ফোকাস আকাঙ্ক্ষাকে জীবিত রাখতে চাইলে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব তাঁর চেয়ে ভাল আর কে বুঝে। এই পটভূমিতে ওবামা এমাসেই ভারত সফরে আসছেন বিশেষ দাওয়াতি হিসাবে। ভারতের “প্রজাতন্ত্র দিবস” মানে কনষ্টিটিউশন গৃহীত হবার দিন, ২৬ জানুয়ারি উৎযাপনে, প্রধান অতিথি হিসাবে। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক অবজারভার হিসাবে খ্যাত সি রাজামোহন এটাকে বলছেন ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের দিক থেকে মোড় ঘুরার সফর। অর্থাৎ ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে যে দোলাচল আছে তা অনেকটা থিতু হবার সফর। তিনি একটা বিশেষ দিকে নজর এনেছেন যার সারকথা হল, গত সেপ্টেম্বরের মোদীর সফরের সময় ওবামা-মোদী উভয়ে তাদের আমলা প্রশাসনের অবস্থান মতামতকে পিছনে ফেলে বাণিজ্য বিষয়ে ঝগড়ার মীমাংসা করেছিলেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, পত্রিকায় তিনি লিখছেন, … suggests that the two leaders had personally driven their bureaucracies to bring the dispute on trade facilitation to an end.। ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মধ্যে সামরিক ইস্যু ছাড়াও অন্য মুল ইস্যু হল WTO সম্পর্কিত বাণিজ্য সুবিধাদি নিয়ে বিতর্ক। অর্থাৎ আমলা প্রশাসনের মতামতের ভিত্তিতে পুরাপুরি পরিচালিত না হয়ে বরং এর উপরে নিজেদের রাজনৈতিক বিবেচনাকে স্থান দেবার একটা চল মোদী-ওবামা উভয়ের মধ্যে আছে। এই বিচারে ওবামার এই সফর থেকে ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক কোথায় গিয়ে থিতু হচ্ছে এর আরও কিছু অগ্রগতি এখানে আমাদের দেখতে পাবার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। যদিও রাজামোহনের দৃষ্টিতে এই সফরকে দেখার করার দরকার নাই। মনে রাখতে হবে, তিনি ভারতকে আমেরিকার “ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার” হিসাবে দেখতে চাইবার লোক। এখানে “ষ্ট্রাটেজিক পার্টনার” কথাটা ভাঙলে এর সারার্থ, চীন বিরোধী হয়ে ভারত-আমেরিকার আগানোর ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ জোট।

নতুন বিশ্বব্যবস্থার প্রতি প্রণব মুখার্জির দৃষ্টিভঙ্গী
প্রণবের বিপরীতে মোদীর ভারত কি এসব দিকে ভাবতে রাজি? সে প্রসঙ্গে যাবার আগে পুরানা গ্লোবাল অর্ডারের প্রতি প্রণবের মনোভাব সম্পর্কে কিছু কথা বলে নেয়া যাক। এটা শুধু প্রণবের মনোভাব নয় বরং বিগত কংগ্রেসের সরকার যে রাজনৈতিক লাইন অনুসরণ করেছে তা হল – ভারত চীনের সাথে এসব প্রতিষ্ঠান গড়তে চলে যেতে পারে আমেরিকাকে এই ভয় দেখিয়ে এটাকে জিম্মির বুটি বানিয়ে এ থেকে সুবিধা আদায়ের চেষ্টা। সারকথায় পুরানা গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারটার আয়ু আরও লম্বা করে দেওয়া। যেমন, ভারতের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি হয় নি সেটা বিবেচ্য না, কিন্তু ভারতের লোভ বর্তমান জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে চীন বা আমেরিকার মতই ভেটো মেম্বার কিভাবে হওয়া যায়। আর এই লোভের কথা টের পেয়ে আমেরিকারও তাকে মুলা ঝুলিয়ে নাচিয়ে বেড়াচ্ছে। এই মিথ্যা লোভের তীব্রতা বুঝার জন্য ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে হাসিনার প্রথম ভারত সফরে মনমোহন-হাসিনার যে ৫১ দফা যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষর হয়েছিল এর ৪৮ নম্বর দফা দেখা যেতে পারে। ঐ দফা বলছে, “ভারতের ভেটো মেম্বার হবার খায়েসে বাংলাদেশ ভারতকে সমর্থন করে”। অর্থাৎ এর অর্থ হল, প্রণবের ভারত কল্পনায় নিজেকে এমন এক আগামী দুনিয়ার স্বপ্ন দেখে যেখানে আদতে পুরানা গ্লোবাল অর্ডারটাই থাকবে আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতকে চীন ঠেকানোর পুরস্কার হিসাবে তাদের স্বার্থে সাজানো গ্লোবাল অর্ডারকে টিকিয়ে রাখে এমন জাতিসংঘের মত প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের মতই সমান গ্লোবাল ক্ষমতায় ভারতকে পাশে বসাবে। এভাবে পুরান ময়লার ভিতরে প্রণবের ভারত নিজের ভবিষ্যৎ দেখে, এর বেশি ভাবতে পারে না। এটা ভারতের কংগ্রেস নেতৃত্বের চিন্তা-প্রতিবন্ধতার সমস্যা, তারা স্বপ্ন দেখতেও শিখেনি। তারা জানতে শিখতে খবর করতে এখনও অক্ষম যে ১৯৪৪ সালে কোন শর্ত বা পরিস্থিতিতে পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক এসব গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো আমেরিকা গঠন করে নিতে পেরেছিল। কাদের মধ্যে ভেটো ক্ষমতা ভাগ করে নেয়া হয়েছিল, কেন তা সম্ভব হয়েছিল। এ সম্পর্কে স্টাডি করে সেটা না বুঝলে এটা বুঝা যাবে না এই অর্ডার ভেঙ্গে পড়বে কেন এবং কখন। কোন্‌ আলামত দেখলে তা বুঝা যাবে। অথবা কেন তারা আজ গ্লোবাল অর্ডারের পড়তি দশায় ভারতকে তাদের সমান আসনে বসাবে অথবা আদৌ বসিয়ে দিতে পারে কি না। একদম মৌলিক প্রশ্ন – জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতা কি কেউ কাউকে অনুগ্রহ করে অথবা চীনকে জিম্মি করার বুটি হিসাবে দিবার বিষয়? নাকি নিজেই নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়ে নিজেই তা নিবার বিষয়? প্রণবের কংগ্রেস চিন্তা কতবড় নাবালক এরই প্রমাণ এগুলো। ভারতের ভেটো সদস্য হবার স্বপ্ন দেখাটা শুধু স্বপ্ন অর্থ কোন সমস্যার নয়। কিন্তু চিন্তার দেউলিয়াত্ব বা সমস্যা হল, নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়ে উঠার উদ্যোগে সামিল না হয়ে বরং আমেরিকার অনুগ্রহে পাবার চেষ্টা আর পুরান অর্ডারের ময়লা ঘেঁটে এর মধ্যেই নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের উপায় মনে করা। তারা ভুলে থাকতে চায় অথবা খেয়াল করেই হয়ত দেখেনি যে, আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম ভারতকে তাদের সমমর্যাদা দিবার লোভ দেখানোর অর্থ কি? এটা কি পশ্চিমের নিজেদেরই ঢলে পড়া গ্লোবাল অর্ডারে নিজেদের গুরুত্ব বা মর্যাদাকে চ্যুত করা নয়? সারকথায় পশ্চিমের উপস্থিত সমস্যা হল, পুরান গ্লোবাল অর্ডারের পড়ে যাওয়াটাকে কি করে ঠেকানো যায় অথবা অন্ততপক্ষে দেরি করিয়ে দেয়া যায়। সেই দশায় সে কাকে কি দিতে পারে? কেন দিবে? আমাদের সৌভাগ্য যে প্রণবের এসব এবসার্ড স্বপ্ন তাদের সরকার ক্ষমতা থাকা অবস্থাতেই অকেজো, ফলহীন বৃক্ষ হয়ে হাজির হয়ে গিয়েছিল। তাসের ঘরের মত প্রণবের স্বপ্নের ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক নন-ফাংশনাল হয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এটা আজ প্রমাণিত যে এই লাইন অনুসরণ করে ভারতের পাতে কিছুই আসেনি। আমেরিকার সাথে তার জমে উঠা দূরে থাক, এশিয়ায় আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থকে জায়গা করে দিতে গেলে এখন খোদ ভারতের মৌলিক স্বার্থ জলাঞ্জলি যায় এটা আজকের বাস্তবতা। ফলাফলে আমেরিকার সাথে মনোমালিন্য আর ঝগড়া তুঙ্গে নিয়ে কংগ্রেস ভারতের ক্ষমতাকাল শেষ করেছিল।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, প্রণবের এই অবাস্তব ও অকেজো আমেরিকান অনুগ্রহ পাবার স্বপ্নের বলয়ের মধ্যেই বাংলাদেশে শেখ হাসিনার রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে। হাসিনা-প্রণব সম্পর্কের গভীরতা বাংলাদেশকে দিল্লি হয়ে মার্কিন অনুগ্রহের মধ্যে রাখা সম্ভব হয়েছিল, ঢাকা ওয়াশিংটনের বিভিন্ন ইস্যুতে দূরত্ব থাকা সত্ত্বেও। প্রণবের দিল্লি বোঝাতে চেয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবার দায় দিল্লির, বাংলাদেশের সঙ্গে মার্কিন মনোমালিন্য সেই ক্ষেত্রে বড় কোন সংকট হয়ে ওঠে নি। প্রশ্ন হচ্ছে দিল্লীর মার্কিন অনুগ্রহ পাবার মধ্যে বাংলাদেশের স্বার্থ কি? সেটা বোঝা যাবে ভারতের মনমোহনের সাথে শেখ হাসিনার যৌথ ঘোষণার মধ্যে। ২০১০ সালের জানুয়ারিতে যা স্বাক্ষরিত হয়েছে। অর্থাৎ হাসিনার ক্ষমতায় আসার প্রায় ঠিক একবছর পর। এটা ভারতের সমর্থনে হাসিনার ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার স্বপ্ন, হাসিনা মানে দিয়েছিলেন যে তার স্বার্থই বাংলাদেশের স্বার্থ। এমনকি দল হিসাবে এটা আওয়ামী লীগের স্বার্থ এটাও অনিবার্য ধরে নেয়ার কারণ নাই। প্রণবের সরকারের আয়ু-দশাতেই এটা প্রমাণিত যে প্রণব ও কংগ্রেসের স্বপ্নটাই অবাস্তব। ইতোমধ্যে ভারতে সরকারই বদলে গিয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা এখনও সে পথেই আছেন। ভারতের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে সকল বিষয় ভারতের স্বার্থে যায় তাকেই হাসিনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মানদণ্ড মেনে সিদ্ধান্ত দিয়ে যাচ্ছেন।। এই ভরসায় যে দিল্লী তাতে অনুরাগ বোধ করবে এবং মূল্য হিসাবে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখা ভারতের স্বার্থ হয়ে উঠবে। প্রণব যেমন ছিলেন, এখন মোদীও যেন হাসিনার পক্ষে ভারতের সমর্থন নিয়ে হাজির হন বা হবেন। কিন্তু এর মিসিং লিঙ্ক হল, প্রণব বা কংগ্রেস সরকার ক্ষমতাচ্যুত। যদিও একই চিন্তার লাইনের গোয়েন্দা-আমলারা রয়ে গেছেন। কিন্তু মোদী কি গোয়েন্দা-আমলাদের দ্বারা প্ররোচিত প্রভাবিত হবেন? এখনও কিছুই স্পষ্ট নয়। আপাতত এতটুকু বলা যায় যে মোদীর সরকার পরিচালনা নীতি স্পষ্টতই সেদিকে নয়। মোদী প্রণবও নন।

[এই রচনা প্রথমে ছাপা হয়েছিল এখানে গত সপ্তাহে। এখন এখানে আরো আপডেটসহ আবার এডিট করে ছাপা হল।]

 

ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি (দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব)

গৌতম দাস

প্রথম পর্ব এখানে দেখুন

রবার্ট ডি কাপলান। তাঁকে আমেরিকার এক প্রভাবশালী নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মনে করা হয়। প্রভাবশালী Stratfor ম্যাগাজিনের চীফ ভুরাজনৈতিক বিশ্লেষক তিনি। আমেরিকান রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক পরামর্শক কমিটির সদস্যও তিনি। “Beijing’s Caribbean Logic” শিরোনামে গত মার্চ ২০১৪ তিনি এক আর্টিকেল (আসলে তাঁর নতুন বইয়ের এক আর্টিকেল) লিখেছেন। ওখানকার সারকথা হলঃ বৃটিশ বা ফরাসী সাম্রাজ্য যখন দুনিয়াকে লূট দখলের কলোনী রাজত্ত্ব করে রেখেছিল এর শেষের দিকে আর বিপরীতে আমেরিকার যখন অর্থনৈতিকভাবে ক্রমশ পরাক্রমশালী হয়ে উঠছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধেরও আগের সেই সময়ে আমেরিকা প্রথম ক্যারেবিয়ান সাগরের কর্তৃত্ত্ব নিয়েছিল কলোনী মাষ্টার বৃটিশ সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে। ক্যারেবিয়ান সাগর হল, মার্কিন দেশের দক্ষিণ দিকে যেখানে আমেরিকা মানে উত্তর আমেরিকা আর দক্ষিণ (বা ল্যাটিন) আমেরিকা বিভক্ত হয়েছে সেই বিস্তৃর্ণ সাগর জলরাশি। ক্যারেবিয়ানের উত্তরদিকে আমেরিকার মিয়ামি, মেক্সিকো আর ছোট দ্বীপ রাষ্ট্র পানামা, কিউবা জামাইকা ইত্যাদি আর দক্ষিণদিকে কলম্বিযা, ব্রাজিল ইত্যাদি রাষ্ট্র – সেই অঞ্চল। এটাই উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকাকে এক চিকন ভুখন্ডগত (সবচেয়ে চিকন অংশটাই পানামা রাষ্ট্র) সংযোগে ধরে রেখেছে। আবার বলা যায় ঐ চিকন ভুখন্ড পুবে আটলান্টিক মহাসাগর অঞ্চল আর পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চল এভাবে মহাসাগর দুটোকে বিভক্ত করে রেখেছে। আমেরিকা নিজের অর্থনৈতিক পরাশক্তিগত উত্থানের যুগে প্রথমেই সে তার নিজ ভুন্ডের দক্ষিণের ক্যারেবিয়ান সাগরের দখল নিয়েছিল, বৃটিশদের থাকতে দেয়নি। এখন কাপলান ঐ লেখায় যুক্তি দিচ্ছেন, তাহলে আজকের রাইজিং ইকোনমির চীন কেন এশিয়ায় জলরাশিতে আমেরিকাকে ঢুকতে দিবে? চীন তো আসলে আমেরিকার “ক্যারেবিয়ান লজিকই” প্রয়োগ করছে। তাই কাপলানের লেখার শিরোনাম “বেইজিং এর ক্যারেবিয়ান লজিক”।
কাপলানের কথার এক ধরণের গুরুত্ত্ব আছে সন্দেহ নাই। তবে তিনি এম্পেয়ার বা সাম্রাজ্যবাদের নষ্টামির পিছনের ভাবাদর্শগত ন্যায্যতা খুজতে গিয়েছেন। কিন্তু এতে যেদিকটা আড়ালে পড়ে গিয়েছে তা হল, চীন নিজে প্রথমে কাউকে হটিয়ে এশিয়ার জলরাশিতে নিজের কর্তৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে যায় নাই। উত্তেজনাহীন নিঃতরঙ্গ এশিয়ার জলরাশিতে জাহাজ নৌরুটে পণ্য আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহার করে চীন তার অর্থনীতিতে বিকাশ সাধন করে যাচ্ছিল। তার পড়শিরাও যার যার মত নিজের অর্থনীতিতে মশগুল ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে চীনের পড়শিদেরকে আমেরিকার নৌ-সামরিক শক্তি অফার করা, নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ করার উস্কানি থেকে। স্বভাবতই এটা চীনের দিক থেকে বিরাট হুমকি মনে করারই বিষয়। বিশেষত তার নৌবাণিজ্য বা পণ্য আনা-নেয়ার প্রধান রুট এশিয়ার জলরাশি বিশেষত সাউথ চায়না সি অবাধ চলাচল এলাকা রাখার স্বার্থে, এই কারণে। দাবার পালটা চালের মত, আমেরিকার ঐ পদক্ষেপের ফলে চীনের এতদিনের -দুনিয়ার কারো সাথে সামরিক সংঘাতের সম্পর্কে সে নাই – এই নীতি থেকে সরে গিয়ে চীনের এখনকার নীতি হয়ে দাড়িয়েছে – যারাই আমেরিকার কাছে আশ্রয় খুজছে, সামরিক জোটে আবদ্ধ হতে চাইছে বা হয়ে আছে এমন সব দেশের প্রতি চীনের ভুমিকা মাসল দেখানোর। যেমন উদাহরণ হিসাবে জাপানের প্রসঙ্গঃ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের জাপান ঐ অঞ্চলের সকলের কাছেই এক কলোনী মাষ্টার হিসাবে পরিচিত; চীনসহ দুই কোরিয়াকে সে কলোনী দখল করে রেখেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর মৃত এবং জীবিত জাপানী যারা যুদ্ধাপরাধী হিসাবে ফাঁসি সাজাপ্রাপ্ত এদের সহ সকলের উদ্দেশ্য নির্মিত স্মৃতিসৌধে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে কখনই প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ফুল দিতে যান নাই। কিন্তু এবার গিয়েছেন। এঘটনাটা চীন ও কোরিয়াকে বিক্ষুব্ধ করেছে। এরচেয়ে হাস্যকর হল তিনি নিজের ফুল দিতে যাওয়ার পক্ষে যে যুক্তি দিয়েছেন। তিনি বলছেন, দুনিয়ার সব রাজনৈতিক নেতারাই নিজ দেশের জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তাদের সকলের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকেন তাই তিনি গিয়েছেন। বিপরীতে চীনের প্রতিক্রিয়া হল, পিছনের ইতিহাস না ঘেটে যখন আমরা সামনের দিন নির্মাণের জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বার উন্মোচনের চেষ্টা করছি তখন এই আচরণ খুবই বিভেদমূলক ও শত্রুতা উস্কে দেয়ার। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ক্ষোভ জানিয়ে বলেছে এটা কোরিয়ান জনগণের অনুভুতিকে পায়ে মাড়ানো। এছাড়া ছোট্ট যে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে জাপান-চীনের বিবাদ সেটাও কলোনী দখল যুগের মালিকানার বিবাদ। স্পস্টতই জাপানের ভুমিকা মাসল ফোলানোর, খুচিয়ে পুরান ঘা তাজা করার, টেনশন তৈরি করার। এর পিছনের কারণ হল, আমেরিকার সাথে বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানের সামরিক চুক্তি আছে যে জাপান আক্রান্ত হলে সেটাকে আমেরিকা নিজের উপর আক্রমণ মনে করবে, ফলে জাপানের শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিবে। এসব কিছু মিলিয়ে এককথায় বললে, চীন বর্তমান অবস্থান নিয়েছে, এশিয়ার জলরাশিতে আমেরিকার কোন ভুমিকা সে দেখতে চায় না – এটাই তার নীতি ও আকাঙ্খা।

সাংগ্রিলা ডায়লগঃ
এশিয়ায় জলরাশিতে উস্কানি তৈরি করে আমেরিকার নিজের কদর বাড়ানো, বিপরীতে চীন আমেরিকান জোট পাকানোর বিরোধীতা তার বর্তমান নীতি, এর ফলে এখনকার সময়টাকে বলা যায় এটা এশিয়ার জন্য মাসল দেখানো, টেনশনের পিঠে টেনশন তৈরি করার এক সময় চলছে। কিন্তু এটা কোথায় গিয়ে শেষ হতে পারে বা কিভাবে থিতু হতে পারে – সেই ছবিটাকে ধরার জন্য গতমাসের শেষদিকে ৩০ মে থেকে তিনদিন সিঙ্গাপুরের সাংগ্রিলা হোটেলে এশিয়ার বার্ষিক (১৩তম) নিরাপত্তা সম্মেলন হয়ে গেল, সেখানকার রিপোর্টিং কে ব্যবহার করব।
বৃটিশ থিঙ্কট্যাঙ্ক International Institute for Strategic Studies (IISS)এর দায়িত্ত্বে পরিচালিত সাংগ্রিলা ডায়লগ মূলত এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলের ২৮ দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদেরকে নিয়ে বার্ষিক আলোচনাসভা বা ডায়লগের স্থান। থিঙ্কট্যাঙ্ক IISS এটাকে “The IISS Asia Security Summit” বলে পরিচিত করিয়ে থাকে। শুরুতে মূল উদ্যোক্তা ছিল আমেরিকা; থাইল্যাণ্ডকে সাথে নিয়ে এর আয়োজক হয়েছিল ২০০২ সালে। উদ্দেশ্য পরাশক্তিগত স্বার্থগুলো ডায়লগ আলোচনার মাধ্যমে যতটা সম্ভব বুঝে শুনে নেয়া। ঐ ২৮ দেশের মধ্যে আমেরিকা বৃটেন রাশিয়া চীন জাপান কোরিয়া ভারত পাকিস্তান অষ্ট্রেলিয়া ইত্যাদি প্রায় সকলেই অন্তর্ভুক্ত। এটাকে বলা যায় গ্লোবাল অর্থনীতি এশিয়ামুখি ভারকেন্দ্রে চলে আসার আর এক প্রতিক্রিয়া। “সাংগ্রিলা ডায়লগ” (Shangri-La Dialogue বা সংক্ষেপে SLD) নাম হবার পিছনের কারণ এটা শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক চেন হোটেল সাংগ্রিলার “সিঙ্গাপুর সাংগ্রিলায়” আহুত হয় বলে সেখান থেকে এই নেয়া নাম।
Shangri-La Dialogue 2014 সভার এবার উদ্বোধনী বক্তৃতা করেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। খুবই আক্রমাণাত্মক তাঁর বক্তৃতার সারকথা হল, রুল অব ল এট সি অর্থাৎ সমুদ্র বিষয়ে আইনের শাসনে চলতে হবে সবাইকে। মানে সীমানা বিবাদ মীমাংসায় চীনকে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন ইত্যাদির মধ্যে আসতে হবে। “আইনের শাসন” কথাটা শুনলে সকলের সহজেই আকৃষ্ট হবার ইচ্ছা জাগে, তাই তাঁর এই শব্দ দিয়ে বলা। সেকথায় পরে আসছি। শিনজোর পরে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল তাঁকে সমর্থন করে বক্তৃতা উত্তেজনা আরও এক ধাপ সুরে চড়িয়ে দেন। চাক হেগেল চীনকে অভিযুক্ত করেন,“অস্থিতিশীল করার দেশ” “আগ্রাসী শক্তি” ইত্যাদি বলে। মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, আগে থেকেই আমেরিকা ও জাপানের উপর ক্ষিপ্ত ছিল বলে চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর নেতৃত্ত্ব চীনাদল আসেনি, এর বদলে এসেছে চীনা সামরিক জেনারেলদের নেতৃত্বে এক চীনাদল। সেই জেনারেলও বক্তৃতায় পালটা জাপানের দানবীয় সামরিক অতীতের কথা তুলে মুখ ছুটিয়েছিল। বলেছেন, “চীন যে কোন “নির্মম ফ্যাসিষ্ট এবং সামরিক দাঙ্গাবাজ আগ্রাসনকারীর আসরে ফিরে আসা প্রতিহত করবে”। আর আমেরিকা সম্পর্কে বলেছে্ন, “চীনের বিরুদ্ধে ঘোট পাকাচ্ছে, সকলকে খেপিয়ে তুলছে”। চাক হেগেলের বক্তৃতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে বলেছে এটা “কল্পনাতীত”, “আধিপত্যসুলভ, হুমকির মত এবং হস্তক্ষেপমূলক” বক্তব্য। এবিষয়ের সারকথাটা বলবার জন্য পশ্চিমা সাপ্তাহিক “ইকোনমিষ্ট” থেকে ধার নিব। সাংগ্রিলা ডায়লগ শুরুর দিন তিনেক আগে ওবামা “ওয়েষ্ট পয়েন্ট” বলে খ্যাত আমেরিকার এক মিলিটারি একাডেমিতে বক্তৃতায় ক্যাডেটদের আশ্বস্ত করার ছলে বলেছিলেন, ”আমেরিকা অবশ্যই বিশ্ব পরিসরে নেতৃত্ত্ব দিয়ে যাবে” এবং “আমেরিকার জোট-বন্ধুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সে এক-পক্ষীয়ভাবে সামরিক বল প্রয়োগ করবে”। ইকোনমিষ্ট বলছে,এসব কথা চীনের নজরে না আসার কারণ নাই, তাই সম্ভবত চীনা জেনারেলের এমন প্রতিক্রিয়া। এছাড়া ইকোনমিষ্টের রিপোর্টের কিছু শেষকথা চীনা অবস্থান ভাবনাকে সঠিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে মনে করা যেতে পারে। অনুবাদ করে বললে তা দাঁড়ায়,- “…… চীন আমেরিকা জাপানের এসব কথাবার্তা, এক ‘পুরানা বিশ্বব্যবস্থার’ মাতবরদের কথা হিসাবে দেখছে যা তার কাছে গ্রহনীয় নয়। চীনের দিক থেকে দেখলে ‘পুরানা বিশ্বব্যবস্থা’ মানে পশ্চিমের স্বার্থে বিশেষত আমেরিকার নেতৃত্ত্বে জারি করা অর্ডার, এক নিয়ম-কানুন শৃঙ্খলা। যা নিজ শাসন-শৃঙ্খলার বাসার ভিতর উত্থিত চীনকে অন্তর্ভুক্ত হতে দেয় অবশ্যই, কিন্তু ততটুকুই যতটুকুতে চীন ঐ বাসাতে আগে থেকে সেট করা নিয়ম-শৃঙ্খলা অনুগত হয়ে মেনে নেয় আর ওদিকে অন্য দেশগুলো ঘোট পাকিয়ে চীনের বিরুদ্ধে সমালোচনা জারি রাখে। এসব তারা করে এই বিশ্বাসে যে এভাবে চীনের বিরাট শক্তি হিসাবে উত্থানকে দমায়ে রাখতে পারবে”।

এশিয়া নীতির সম্ভাব্য পরিণতি
“সাংগ্রিলা ডায়লগে” কি ঘটেছে সে প্রসঙ্গে এরপরে নিউইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট থেকে নেয়া কিছু কথা বলে শেষ করব। এই লেখার পরের নিচের অংশ বেশিরভাগই টাইমসের রিপোর্ট থেকে টুকে নেয়া ছোট ছোট ঘটনা বর্ণনা, সাথে নতুন কিছু ব্যাখ্যামূলক পয়েন্ট তাতে যোগ করে লেখা হবে। টাইমসের মূল ইংরাজি রিপোর্ট এখানে আগ্রহীরা দেখে নিতে পারেন।
টাইমসের রিপোর্টের শিরোনামটাই মজার,“জোটবন্ধুরা চীনা চ্যালেঞ্জের মুখে, আমেরিকা কাপাকাপি দশায় এশিয়ায় ডুবতে বসেছে” । শিরোনাম থেকেই যথেষ্ট সরাসরি কথাবার্তার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সম্প্রতিকালে পড়শিদের সাথে চীন যেসব বিরোধে জড়িয়ে পড়েছে বিশেষ করে ভিয়েতনাম ও জাপানের সাথে; যেমন, ভিয়েতনামের এক মাছধরা নৌকা ডুবিয়ে দেয়া ও সাগরের নিচের তেল তোলার রিগ বসানো নিয়ে ভিয়েতনামের সাথে বিরোধ আর জাপানের সাথে এক ছোট দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ, জাপান গোয়েন্দা সার্ভিলেন্স স্থাপনার খুব কাছে দিয়ে চীনা যুদ্ধজেট বিমানের উড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ঐ অঞ্চলে। অন্যদিকে আগেই বলেছি, ঐ অঞ্চলে চীনের পড়শিদের সাথে আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং পার্টনারশীপ ডায়লগ প্রোগ্রামে আমেরিকা নিরাপত্তা ফেরি বিক্রির চেষ্টায় রত; যাতে এশিয়ায় চীনের বিরুদ্ধে এক শক্ত জোট খাড়া করে আমেরিকা নিজের পরাশক্তিগত উপস্থিতির ন্যায্যতা তৈরি করতে পারে। এসব বিষয়কে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায় তা নিয়ে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং প্রাক্তন এক অষ্ট্রেলিয়ান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা হলেন Hugh White। ওয়াশিংটনের সাথেও তাঁর ঘনিষ্টভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে। তাঁর বরাতে টাইমস পত্রিকা লিখছে, চীনের লক্ষ্য আমেরিকাকে দেখানো যে সে যদি এশিয়ায় এভাবে এন্টি-চীন শক্তিজোট খাড়া করতে চায় তবে তাকে চীনের সাথে মুখোমুখি লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ার রিস্ক নিতে হবে। White বলছেন, “চীন উদ্দেশ্যপুর্ণভাবে দেখতে চায় যে আমেরিকা চীনের সাথে ভাল সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তার পড়শিদের সাথে জোট বাধার চেষ্টা – এভাবে এই অঞ্চলে আমেরিকার নেতৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা -এটা টিকাতে পারবে না”। চীন যেন বাজি ধরে বসেছে সবশেষে ক্লান্ত ও ঘরমুখে গুটানো আমেরিকা পিছু হটবেই আর এতে এশিয়াতে নিজের প্রভাব যতটুকু আছে তা খুইয়ে প্রকারন্তরে এটা চীনের শক্তিকেই বাড়িয়ে তুলবে।
টাইমস আরও জানাচ্ছে, ওবামা প্রশাসনের কর্তাব্যাক্তিরা ব্যক্তিগতভাবে ভিতরের অনেক খবর দিচ্ছেন। বলছেন, চাক হেগেল ও আমেরিকা প্রশাসন জনসমক্ষে জাপানের পিছনে সমর্থনে দিয়ে যাবার কথা বলে চলবে এমনকি কিছুটা মাত্রায় ফিলিপাইন, ভিয়েতনামের মত অন্য দেশগুলোর ক্ষেত্রেও তা করে যাবে। কিন্তু প্রশাসন আসলে নিজেকে চীনের সাথে মুখোমুখি সংঘাত অবস্থাতেই দেখছে। এটা দেখে প্রশাসনে হতাশা বাড়ছে যে নিজে সকলকে নিয়ে এমন এক খেলার প্যাচে জড়িয়ে যাচ্ছে যা যুদ্ধের পরিণতি ডেকে আনতে পারে। টাইমস ম্যাগাজিন আরও লিখছে, প্রশাসনের আর এক সিনিয়র কর্মকর্তা আমেরিকান নীতির সমস্যাগুলো নিয়ে মন খুলে কথা বলতে নাম প্রকাশ না করে বলছেন, “দেশগুলোর (বিবদমান চীনের পড়শিরা) কেউ বিষয়টা সামলাতে সাহায্য করছে না”; জাপানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির বাধ্যবাধকতার কারণে আমেরিকা যদিও জনসমক্ষে সবসময় জাপানকে সমর্থনের কথা বলে যাবে কিন্তু প্রশাসনের কর্মকর্তারা সমপর্যায়ের জাপানী কর্মকর্তাদেরকে ব্যক্তিগতভাবে বারবার বুঝাচ্ছেন যে যে কোন পদক্ষেপ নেবার আগে সাতবার ভাবতে; আর তারা যেন কোনভাবেই চীনকে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দেয়ার অবস্থায় না নেয়।
ওদিকে আর এক কর্মকর্তা বিক্রম জে সিং, গত ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত যিনি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পুর্ব এশিয়ার দায়িত্ত্বের আমেরিকার উপ-সহকারী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন তিনি বলছেন, “ তাদেরকে যদি স্কুলের বাচ্চা ধরি তাহলে বলতে হয় তারা আসলে হাতে কাঁচি নিয়ে চারিদিকে খেলা করে বেড়াচ্ছে”। “ছোটখাট জিনিষ থেকেই দুর্ঘটনায় বা হিসাবের ভুলের ফলে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। যেমন যুদ্ধপ্লেন চলতে চলতে খামোখা বিপদজনক গোত্তামারা মোড় নেয়া থেকে দুর্ঘটনা বা আগ্রাসী মনোভাবের প্রকাশের ফলে অযাচিত পালটা সামরিক প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখিতে পড়তে হতে পারে”।
সাংগ্রিলা ডায়লগের সভায় চাক হেগেল ও তার সাথী সামরিক বাহিনীর অনুগামি দল জয়েন্ট চীফ অব ষ্টাফের চেয়ারম্যানসহ বাঘা জেনারেলরা খুবই ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন ব্যাডমিন্টন খেলার কর্কের মত দৌড়াদৌড়ি করে। কেন? কারণ, ঐ সভায় প্রধান উস্কানিদাতা বক্তা ছিলেন জাপানী প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে। প্রধান বক্তা হিসাবে তার বক্তৃতার পর ডায়াসে থাকা অবস্থায় তিনি এক প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। এক তরুণ চীনা অফিসার তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন, দ্বীপের মালিকানা বিরোধকে কেন্দ্র করে তিনি কি চীনের সাথে যুদ্ধে যাওয়ার কথা ভাবতে রাজি আছেন? প্রশ্নের সরাসরি জবাব এড়িয়ে ছুপা জবাবে তিনি বলেছেন, “আমরা সবাই মিলে উদ্যোগ নিয়ে রাখাটা জরুরী” যাতে কোন “অজানা, যদি ঘটে যায় এমন ঘটনাকে ঠেকানো যায়”। আমেরিকান জেনারেলরা তাই দৌড়াদৌড়ি করে সবার কাছে গিয়ে নিশ্চয়তা নিচ্ছিলেন “অজানা, যদি ঘটে যায় ঘটনা” যেন কোনভাবেই না ঘটে।
এক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর ও পুর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ Andrew L. Oros বলেছেন,”কোন বিরোধ সংঘাতের মুখোমুখিতে ওর রেফারি হওয়ার চেয়ে বরং যেকোন ভাল শিক্ষক জানেন বাচ্চাদেরকে সব কিছুর আগে ডিসিপ্লিন আচরণ শিখিয়ে নিতে হয়”। এখানে “রেফারি” প্রসঙ্গে টিটকিরি করে বলা হয়েছে। এমন হওয়ার কারণ,ওবামার প্রথম টার্মে তার নতুন “এশিয়া পলিসি” হাজির করেন যেখানে রেফারি মানে “এশিয়ায় আমেরিকার pivot বা ভারকেন্দ্র ভুমিকা” থাকবেই একথা বারবার উচ্চারিত হয়েছিল। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন আমেরিকান ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনে অক্টোবর ২০১১ সালে নিজে এনিয়ে এক আর্টিকেল লিখেছিলেন, America’s Pacific Century শিরোনামে। ঐ আর্টিকেলের প্রথম বাক্য ছিল “As the war in Iraq winds down and America begins to withdraw its forces from Afghanistan, the United States stands at a pivot point”. ফলে এখান থেকেই ওবামার এশিয়া পলিসি মানেই শব্দটা কয়েন হয় নতুন শব্দে “এশিয়াতে আমেরিকার পিভোটাল রোল” বা রেফারি ভুমিকা – এভাবে। আমেরিকান একাদেমিকরা সেকথার সুত্র ধরে এখন ঠাট্টা মশকরা করে বলছেন, “ওবামার রেফারি ভুমিকা”। কারণ অনেকেই সন্দেহ প্রকাশ করেন যে, ওবামার এশিয়া পলিসির অর্থ এন্টি চীন মাতবরির আমেরিকান জোট এভাবে না ব্যাখ্যা দাঁড়িয়ে যায়। এবং সেক্ষেত্রে এই নীতি অকার্যকরে হয়ে যাবে।

ওবামা্র মানে গ্লোবাল পুঁজির স্ববিরোধ
উপরে এন্ডারসন সাহেবের রিপোর্টের ম্যাপে দেখিয়েছিলাম লাল গোল দাগ দেয়া “চোকিং পয়েন্ট”। চোকিং পয়েন্ট এর আক্ষরিক মানে শ্বাসরুদ্ধ করে চেপে ধরার এমন সহজ জায়গা। অর্থাৎ চীনের অর্থনীতির শ্বাসরুদ্ধ করে দেবার মত সহজ জায়গা কোনটা – চীনের পণ্য বাণিজ্য জাহাজের নৌচলাচল পথে এমন দুটো জায়গা যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই চিকন হয়ে থাকা কিছু অংশ পার হতে হয়। এর একটা ইরানের নৌসীমায় হরমুজ প্রণালী (সমুদ্র নৌপথের চিকন অংশকে বাংলায় প্রণালী আর ইংরাজিতে strait বলা হয়ে থাকে) আর অন্যটা ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ভুখন্ডের মাঝে মালাক্কা প্রণালী। প্রণালীতে কোন যুদ্ধজাহাজ আড়াআড়িভাবে রেখে দিলে অথবা ঠিক প্রণালীর উপর কোন বাণিজ্যিক জাহাজও ডুবিয়ে দিতে পারলে ঐ নৌচলাচল পথকে সহজেই কয়েক মাসের জন্য স্থবির রুদ্ধ করা সম্ভব। ফলাফল এটা চীনের অর্থনীতিকে অকেজো করে দেয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়। তাই টুটি চেপে ধরার চোকিং পয়েন্ট।
আমেরিকার সাথে চীনের ১৯৭১ সালে প্রথম সম্পর্ক স্থাপনের সময় দেনা-পাওনার মৌলিক যেদিকটা নিয়ে রফা হয়েছিল তা হল, চীন আমেরিকার ওয়াল ষ্ট্রিটের পুঁজি নিজ ভুখন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ করে দিবে, পুঁজিকে প্রয়োজনীয় আইনী সুরক্ষা দিবে। বিদেশী পুঁজি রাষ্ট্রায়ত্ত্ব করে নেয়ার মত কোন পদক্ষেপ নিবে না। (এগুলো আজকাল আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের ঋণ পাবার ক্ষেত্রে প্রাথমিক শর্ত হয়ে গেছে।) বিনিময়ে আমেরিকান রাষ্ট্র চীনকে জাতিসংঘে ভেটো ক্ষমতাওয়ালা সদস্যপদ পাবার সহযোগিতা থেকে শুরু করে চীনের বিকাশে অর্থনৈতিক, ষ্ট্রাটেজিক,পণ্যবাজার সুবিধা ইত্যাদি চীনা স্বার্থের দিকগুলোতে বাধা তো হবেই না বরং সহযোগিতা করবে। এটা চীনের দিক থেকে খুব স্বাভাবিক চাওয়া। কারণ চীনে বিদেশী পুঁজি এসে উতপাদন বাণিজ্য করতে গেলে এগুলো তার স্বাভাবিক অনুষঙ্গ চাওয়া। কারণ মূলত তা ওয়াল ষ্ট্রিটের পুঁজির স্বার্থেই, কারবার ভায়াবল হওয়া, তার মুনাফাসহ আরও স্ফীত হওয়ার স্বার্থেই। কিন্তু সে প্রসঙ্গটা এখানে এখন তোলার কারণ আছে। আমেরিকা-চীনের প্রথম সম্পর্কের সময়ের মৌলিক দিকটা খুবই সংক্ষেপে এখানে বলা হলেও তবু এটুকু থেকে একটা জিনিষ পরিস্কার যে এই রফার ভিতর আমেরিকান রাষ্ট্রের জন্যই এক বড় বিপদ লুকিয়ে ছিল, এখনও আছে। বিশাল ভুখন্ড ও জনসংখ্যার চীন মানে বিশাল আভ্যন্তরীণ বাজার আর ওদিকে সস্তা শ্রমে প্রতি জোড়া হাতে সস্তায় রপ্তানিযোগ্য ও কমপিটিটিভ পণ্য উতপাদন – এতে চীনের দুনিয়া কাপানোর কথা সন্দেহ নাই। এতে এক বিশাল অর্থনৈতিক উত্থান চীনকে সবদিক থেকেই পরাশক্তি করে তুলবে, তা সকলেরই জানা ছিল। যেটা আবার খোদ আমেরিকা রাষ্ট্রের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বী ও হুমকি। কিন্তু শুরু থেকেই এটা টের পাবার পরও আমেরিকান রাষ্ট্রের কিছুই করার ছিল না। কারণ এটাই গ্লোবাল পুঁজির আপন স্ববিরোধীতা। যেমন, একদিকে ওয়াল ষ্ট্রিটের স্বার্থ হল সবসময় নতুন নতুন অফুরান বিনিয়োগের বাজার তাকে পেতেই হবে,ওটাই তার প্রাণভোমরা। যেভাবেই হোক অফুরান বিনিয়োগের বাজার তাকে পেতেই হবে। অন্যদিকে ওয়াল ষ্ট্রিট পুঁজির নিজেরই আকার দেয়া দানব এমপায়ার বা দুনিয়ায় সবাইকে পিটায় ধমকায় বেড়ানো “সাম্রাজবাদ” রাষ্ট্র। কিন্তু আমেরিকান রাষ্ট্রের এমন কিছু নিজস্ব স্বার্থ আছে যা সব সময় তারই ওয়াল ষ্ট্রিটের স্বার্থের সাথে হাত ধরাধরি করে চলে না, চলতে পারে না। এমনিতেই ওয়াল ষ্ট্রিটের মালিক রাষ্ট্র নয় ব্যক্তিবর্গ, যার মুনাফা লাভালাভে আকার বৃদ্ধিতে রাষ্ট্রের এর উপর কোন নগদ লাভ নাই কর্তৃত্ত্ব নাই। ফলে ওয়াল ষ্ট্রিটের একান্ত নিজ স্বার্থে খোদ আমেরিকান রাষ্ট্রকে বিপদে হুমকির মুখে ফেলে হলেও তার বিনিয়োগ বাজার চাই। ফলে রাষ্ট্র টিকে থাকার স্বার্থ আর ওয়াল ষ্ট্রিটের টিকে থাকার স্বার্থ এখানে এক নয়, এক তালে নয়। এজন্য একদিকে চীনে প্রবাহিত গ্লোবাল পুঁজি (ওয়াল ষ্ট্রিট যার কেন্দ্র বা প্রতীকী নাম) এর ফুলেফলে বেড়ে উঠা সুরক্ষা করতে ওবামা কমিটেড ও বাধ্য আবার বিপরীতে রাইজিং চীন রাষ্ট্র আমেরিকান রাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে ওর চেয়েও বড় পরাশক্তি হয়ে উঠার বিপদে নিজেই হুমকিতে, দুনিয়ায় নিজের একছত্র সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার ভুমিকার মুকুট যায় যায় অবস্থা। তাই একদিকে ওবামা চীনের চোকিং পয়েন্ট মানে টুটি টিপে ধরার জায়গাটা খুজে বেড়ায় আবার ওর খুজে বেড়ানো দেখে রাইজিং চীনের খারাপ প্রতিক্রিয়া হুমকিতে তটস্থ হয়ে যায় সে। নিজেই জাপানকে উস্কানি দেয় আবার নিজেই তাকে জোরে চিৎকার করতে না করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের (জাতিসংঘ,আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউটিও ইত্যাদি) গড়ে এগুলো নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্ত্বের মাধ্যমে আমেরিকান রাষ্ট্র দুনিয়ায় তার সাম্রাজ্যের রুস্তমি চালায়, আমেরিকান মাতবরিতে সাজানো তৈরি এসব প্রতিষ্ঠানে ঢুকার চেয়ে চীন বরং আবার নতুন করে নতুন ভারসাম্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তুলতে চায়। এর ভিতরই নিজের স্বার্থ দেখে স্বস্তিবোধ করে। BRICS যার সবচেয়ে ভাল উদাহরণ। ওদিকে ওয়াল ষ্ট্রিটের এক বিশাল মোড়ল “গোল্ডম্যান স্যাসে” কোম্পানী তাই নিজেই BRICS গড়তে পরামর্শ উতসাহ জুগিয়েছে কারণ এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলেই তা তাকে নতুন আয়ু দিবে। তাতে আমেরিকান রাষ্ট্র ডুবে মরল না বাচল এটা তার কাছে গৌণ, মুখ্য হল কে তাকে অফুরন্ত নতুন নতুন বিনিয়োগ বাজার এনে দিচ্ছে। ওয়াল ষ্ট্রিটের বাইরে আফ্রিকাকে মাথায় রেখে দুবাই আর চীনকে মাথায় রেখে সিঙ্গাপুরে পুঁজি বাজার ক্রমশ বড় ও বিকশিত কেন্দ্র হয়ে উঠছে। ওবামা তাই একদিকে এশিয়ায় এন্টি চীন নয়, এশিয়ায় নিজের পিভোট বা ভারকেন্দ্র অথবা রেফারির ভুমিকা দেখে। আবার একইসাথে এখনও দুনিয়াকে নিজ রাষ্ট্রের সাম্রাজ্য নেতৃত্ত্ব চালিয়ে যাবার স্বপ্নে চীনের চোকিং পয়েন্ট হাতড়ে বেড়ায়। গ্লোবাল পুঁজির স্ববিরোধীতা স্বভাব এভাবে চারদিক থেকে ফুটে উঠে।
এখন ফলাফল? টাইমসের ঐ রিপোর্টের শেষ অংশে চীনের সাঙহাইয়ের ফুদান ইউনিভার্সিটির ‘আমেরিকান ষ্টাডি সেন্টার’ এর ডিরেক্টর Wu Xinbo এর উধৃতি দিয়ে বলছে, “ওবামা প্রশাসন সম্ভবত এশিয়ার আকাশ ও নৌ-সীমা বিষয়ক বিবাদ্গুলোকে হাওয়া দিয়ে জাগিয়েছে আমেরিকার এশিয়া নীতির দিকে মনোযোগ দিবার কথা তুলে”। সে আসলে চীনের নার্ভ পরীক্ষা করতে গেছিল। “একারণে চীন আর কখনও এশিয়ায় আমেরিকার নেতৃত্ত্বে শক্তিজোট পাকানোর বিষয়্টাকে স্বাগত জানাবে তা যেন কেউ আর আশা না করে। চীনের স্বার্থের দিকটাই এরা উপেক্ষা করেছে”। অবস্থা দেখে ওদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট গত মাসের ১৯ মে তারিখে “নতুন এশিয়ার নিরাপত্তা কৌশলের” রূপরেখা হাজির করেছেন এক আন্তর্জাতিক সভায়। ওখানে আহুত সম্মেলনে উপস্থিত দেশগুলো ছিল চীন রাশিয়া ও অন্যান্য এশিয়ান দেশ। কিন্তু আমেরিকাকে বাইরে রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছে, এটা চীনের জেনেবুঝে নেয়া সিদ্ধান্ত।

কয়েনের উলটা দিক
কিন্তু কয়েনের আর একটা দিক থেকে কিছু কথা বলা দরকার। আমেরিকার সাথে এই টানাপোড়েন করতে গিয়ে চীন সাগরের পড়শি বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলোর কাছে চীন একটা খারাপ ম্যাসেজ পাঠিয়ে ফেলেছে। আকাশ বা নৌপথ অথবা সাধারণভাবে সীমানা বিষয়ক কোন বিবাদ বিতর্ক উঠলে এর সমাধান কি তবে সামরিক পথেই লাঠির জোরে করতে চায় নতুন রাইজিং চীন? নাকি জাতিসংঘের আনক্লজ পদ্ধতি পছন্দ না হলে আরও ভাল কোন আন্তর্জাতিক সালিসের পথে করতে চায়? এদিকটা নিয়ে চীনকে অবশ্যই ভাবতে হবে। যদিও মূলত চীন ও রাশিয়ার নেতৃত্ত্বে আর এক পলিটিক্যাল জোট হাজির হয়েছে দেখা যাচ্ছে, নামঃ Conference on Interaction and Confidence Building Measures in Asia (CICA)। এর নামের মধ্যে ইন্টার-একশন আর কনফিডেন্স বিল্ডিং মানে “পারস্পরিক আলাপ আলোচনা” ও “পরস্পরের আস্থা অর্জন” শব্দ দুটোর তাতপর্য আছে অনুমান করা যায়। কারণ CICA এর সিদ্ধান্ত নেবার প্রক্রিয়া জানা গেল, ওখানে সব সিদ্ধান্ত হতে হবে সকলের সর্বসম্মতিক্রমে। জাতিসংঘ জন্ম দেবার আগের ৫-৭ বছর ধরে এমনিভাবেই বিভিন্ন ধরণের নানান জোটের জন্ম হয়েছিল, সবগুলো টিকে নাই বটে তবে সবগুলো উদ্যোগের মিলিত পরিণতি্তে জন্ম হয়েছিল জাতিসংঘ। বলা বাহুল্য, একদিকে CICA উদ্যোগের আর অন্যদিকে চীনের পড়শিদের সাথে চীনের বিরোধ মীমাংসার পথ – এদুটো পরস্পর অসামঞ্জ্যপুর্ণ। আমরা আশা করব এদিকগুলোতে চীন মনোযোগী হবে।

ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি (প্রথম পর্ব)

ওবামার এশিয়া নীতির মুখ থুবড়ানো পরিণতি

গৌতম দাস

[এক]
পুর্ব চীন সাগরে চীন ও জাপানের দ্বন্দ্ব আর দক্ষিণ চীন সাগরে পড়শিদের সাথে চীনের দ্বন্দ্ব এশিয়ায় এক বড় ইস্যু। এর ভিতরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলী এন্টি-চীন অবস্থানের মধ্যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীন ও জাপান দেশ দুটি সফর করে এলেন। বলা বাহুল্য, চীন-জাপান দ্বন্দ্বের মধ্যে আমরা কারও কোন শর্ত বা লোভে পরে কারও পক্ষ না নিয়ে একমাত্র নিজের স্বার্থের মধ্যে থেকে দুদেশের সাথেই ভারসাম্যপুর্ণ সম্পর্ক গড়াই একমাত্র সঠিক অবস্থান। কুটনৈতিক ভাষায় যাকে ব্যালেন্সিং বলা হয়। এশিয়া ভারকেন্দ্রিক গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন পরিস্থিতিতে ছোট বা বড় কোন শক্তির দ্বন্দ্বে শুধু বাংলাদেশ তো অবশ্যই (এবং সম্ভবত সকল রাষ্ট্রই) নিজস্ব স্বার্থমুখি একটা ব্যালেন্সিং অবস্থানে থেকে কূটনৈতিক দক্ষতা দেখানোর যুগে আমরা সবাই প্রবেশ করেছি। অর্থাৎ পুরানা রাশিয়া-আমেরিকার ঠান্ডাযুদ্ধের সময়ের ব্লকে ভাগ অবস্থান নেয়া একালে ঘটতে দেখা যাবে না। অথবা একালে চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কহীন ভারত ও আমেরিকার কোন জোট অথবা আমেরিকার সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কহীন ভারত ও চীনের জোট এমনটা দেখতে পাবার কোন সম্ভাবনা নাই। এমন অবস্থা আর ফিরে আসছে না। পরস্পরের সবার সাথে সবার অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতার সম্পর্ক থাকবেই। এটা থাকার পরেও স্বার্থের সংঘাত বিরোধগুলোও চলতে থাকবে। গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন বিন্যাস এই নব উত্থানের সময়ের বার্তা এটাই। তবু সব রাষ্ট্রের ব্যালেন্সিং অবস্থানের মধ্যে মোটা দাগে কেবল একটাই ভাগ জ্বলজ্বলে দৃশ্যমানভাবে ভেসে থাকবে। এই ভাগের ভিত্তি হবে – কে কে পুরানো ভঙ্গুর গ্লোবাল অর্ডার ধরে রাখার পক্ষে আর কে কে নতুন অর্ডার কায়েম করতে চায়। পুরানো গ্লোবাল অর্ডার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতিতে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউটিও ইত্যাদি বিভিন্ন নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যা কায়েম করা হয়েছিল এবং বাকি দুনিয়ার উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে টিকে আসছে, বর্তমানে শেষ জীবন পার করছে সেই গ্লোবাল অর্ডার। মাতব্বরির এই নিয়ম-শৃঙ্খলার নামে এই অর্ডার ভাঙ্গা গড়ার এই লড়াই এখনকার মুখ্য বিষয় যা প্রবলভাবে হাজির ও ক্রমে স্পষ্ট থেকে ষ্পষ্টতর হয়ে উঠছে। বলার অপেক্ষা রাখে না পুরানা অর্ডারের যাতায় পড়ে বাংলাদেশের মত যারা এত যুগ নিগৃহীত হয়ে আসছে তা্রা এই ভাঙ্গাগড়া থেকে, আলগা দুর্বল হয়ে পড়া পরিস্থিতি থেকে নিজেকে যতটা সম্ভব তুলনামূলক মুক্ত করার চেষ্টা করা, আর বুদ্ধিমানের মত এথেকে সর্বোচ্চ সুবিধা বের করে নিবার চেষ্টা করা – এটা যে যত আগে বুঝবে, হোমওয়ার্ক করে সে প্রস্তুতি নেয়ায় এখনকার কাজ। তবে একটা সাবধানবানী খেয়াল রাখা দরকার পুরানা অর্ডার আর নতুন অর্ডার বলে যে ভাগের কথা বললাম এর মানে এমন নয় যে যারা পুরানোর পক্ষে তাদের সাথে যারা নতুনের পক্ষে এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক, অর্থনৈতিক লেনদেন বিনিময় নির্ভরশীলতা এগুলো ছিন্ন করে নিয়ে তা করতে হবে। সম্পর্ক বজায় রেখেই সে সম্পর্কের ভিতর এক নতুন বিন্যাস বা সাজানো, নতুন ভারসাম্য তৈরির প্রক্রিয়া হিসাবে ঘটবে এটা। ফলে জবরদস্তিতে সম্পর্ক ছিন্ন করে আগাতে হবে এমন করে আমরা যেন না ভেবে বসি।
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্যপদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা জাপানের পক্ষে ছেড়ে দেয়া ও ভোট দেয়ার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী আসলে কি হাসিল করতে চেয়েছেন কি পেয়েছেন তা আমরা এখনও স্পষ্ট কিছু জানি না। যদিও বিশাল অংকের ঋণের প্রতিশ্রুতির কথা আমরা শুনছি। অপরদিকে চীন সফরে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ প্রসঙ্গে সমঝোতা চুক্তির বিষয়টা ঝুলে গেছে তা বুঝা যাচ্ছে। পদ্দা সেতুতে কোন বিদেশী বিনিয়োগ থাকছে না এটা এখন পরিস্কার। কেবল নির্মাণ ঠিকাদার হিসাবে এবং একমাত্র ঠিকাদার হিসাবে চীনা কোম্পানীর কথা শুনা যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এটা কোথায় গিয়ে দাড়াবে তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। যদিও নিজের অর্থে সেতু নির্মাণের একটা সোজা অর্থ হল, ১% এর নিচের সুদের জায়গায় আমাদেরকে এখন কমপক্ষে ১২% সুদের অর্থে এই সেতু নির্মাণ দায় নিতে হচ্ছে। এতে শেষ চাপটা গিয়ে পড়বে সেতু পারাপারের টোলের অর্থে। প্রতি পারাপারে টোলের অর্থ কত দাঁড়াবে সেটার অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি কি হবে, থাকবে কি না এনিয়ে কোন ষ্টাডি কোথাও হয়েছে আমরা জানতে পারি নাই। কারণ সেতু নির্মাণ বিষয়টা এখন যেভাবে দাড়িয়েছে এর মূল বিবেচ্য অর্থনৈতিক ভায়াবিলিটি নয়, বরং সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের ইজ্জত বাঁচানো। ওদিকে চীন সফরে যে ৫টি চুক্তির কথা শোনা যাচ্ছে এগুলোরও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবেচনা কতটুকু তা আমরা জানতে আগ্রহী, জানা দরকারও। হাসিনার জাপান ও চীন সফরে যা কিছু বিনিয়োগ চুক্তি হচ্ছে তা সরকারের ন্যায্যতার পক্ষে স্বীকৃতি ও পলিটিক্যাল লিভারেজ হিসাবে দেখানোর চেষ্টা থাকবে বলা বাহুল্য। কিন্তু সেদিকে না গিয়ে এটাকে বাংলাদেশের সাথে তাদের চুক্তি হিসাবে বুঝলে সঠিক হবে। ইতোমধ্যেই এটাকে সরকারের পলিটিক্যাল লিভারেজ বা স্বীকৃতি হিসাবে মিডিয়া প্রচার হতে দেখেছি আমরা। তবে আগেই বলা যায় এতে কোনভাবেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বৈধতার সঙ্কট কাটাবে না।

[দুই]
পরাশক্তিগত ঝগড়া বিবাদ এমনকি যুদ্ধ দুনিয়ায় নতুন কিছু নয়। নতুন হল, যারা পরাশক্তি হয়ে ছিল বা আছে তাদের সাইজ ছোট হয়ে আগের গুরুত্ত্ব হারাবে আর নতুন অনেকের পরাশক্তিগত উত্থান ঘটবে – এবিষয়গুলো ক্রমশ আসন্ন হয়ে উঠছে। আলামত ফুটে উঠছে চারদিকে। আর এসব উলটাপালটের ভিতরে আবার যেটা একবারেই নতুন এবং যেদিকটায় আমাদের অপলক দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে তা হল, পরাশক্তিগুলোর মধ্যেকার সম্পর্ক। এখনকার দুনিয়াতে হবুসহ পুরানো পরাশক্তিগুলো সকলে গভীরভাবে অর্থনীতি, বাণিজ্য, লেনদেন ইত্যদিতে এক পরস্পর নির্ভরশীলতার সম্পর্কে ক্রমশ সবাই ডুবে যাচ্ছে এবং তা আরও গভীর হতে থাকবে। থাকতেই হবে, কারণ কারও ইচ্ছা-অনিচ্ছা পছন্দ-অপছন্দের উর্ধে এ’এক অবজেকটিভিটি বা বাস্তবতা। দুনিয়া জুড়ে একক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম আরও প্রবলভাবে বিস্তারি হয়ে উঠছে, পরাশক্তিসহ সকল রাষ্ট্র বা অর্থনীতিকে যা ধরে রেখেছে, সকলেই সেখানে অন্তর্ভুক্ত। পরস্পর নির্ভরশীলতার এই সম্পর্কের দিকটাই একেবারেই নতুন। এখানে কেন্দ্রীয় বিষয় “পরস্পর নির্ভরশীলতা” এবং গ্লোবাল একটা ক্যাপিটালিজম অর্ডার। এর আগের ল্যান্ডমার্ক সময় হিসাবে যদি দুটো বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে রাখি, যখন আজকের চলমান অর্ডারের জন্ম হয়েছিল সে সময়গুলোতেও “পরস্পর নির্ভরশীলতার” এমন বাস্তবতা হাজির ছিল না। এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পঞ্চাশের দশক থেকে আমেরিকা-সোভিয়েত ঠান্ডাযুদ্ধের রেষারেষির কালে দুনিয়ায় প্রথম পরিকল্পিতভাবে যে দুটা আলাদা আলাদা (পরস্পর নির্ভরশীলতাহীন ভাবে) অর্থনীতির ধারা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল, তাও টিকে নাই। বদলে যাওয়া ১৯৭১ সাল থেকে চীনের নতুন ধারা এবং ১৯৯১ সাল থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙ্গে পড়ার ভিতর দিয়ে সে উদ্যোগের সমাপ্তি ঘটেছে। তারচেয়েও বড় কথা সেটাও আর ফিরে আসছে না, আসবে না। বরং আগামিতেও “পরস্পর নির্ভরশীলতা” দুনিয়ায় মুখ্য হয়ে থাকছে। আর নতুন এই দিকটাতে আমাদের অপলক দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে।
কিন্তু এমন প্রশ্ন আমাদের অনেক্র মনের আছে যেমন, চীনের বদলে যাওয়া বা সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙ্গে পড়া কি ভাল হয়েছে? এমনভাবে বা এমনদিক থেকে প্রশ্ন করে যেন আজকের আগামি ব্যাপারটাকে আমরা বুঝতে না যাই। কারণ এটা উচিত-অনুচিত অথবা ভাল-খারাপের প্রশ্ন নয়। আবার দুনিয়াব্যাপী শ্রম-পুঁজির দ্বন্দ্ব আকারে দুনিয়াকে বুঝতে যাওয়া কি ভুল ছিল? না একেবারেই তা নয়। ক্যাপিটালিজমের ভিতরে অনেকেরই দুনিয়ার এম্পেয়ারের ভুমিকায় হাজির হওয়া, কমিউনিষ্টরা যেটাকে “সাম্রাজ্যবাদ” শব্দ দিয়ে ধরে ব্যাখ্যা করতে চায় তা এখনও আগের মতই সমান বিপদজনক শত্রু হয়ে আছে। ফলে এদিক থেকে বুঝার মধ্যে আমাদের কোন ভুল নাই। কারণ লড়াই সংগ্রামের মৌলিক বিষয় একই আছে। তাহলে ঘটল কি? আসলে ঘটেছে যা তা হলঃ কোর্স বা গতিপথে বদল। অথবা বলা যায় লড়াই সংগ্রামের মূল বিষয় বা নীতি নয় কৌশলে বদল। যেমন, আগে মনে করা হয়েছিল লড়াইটা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের এম্পেরিয়াল প্রকাশের বিরুদ্ধে আলাদা প্যারালাল এক গ্লোবাল (“কমিউনিষ্ট”) অর্থনীতি কায়েম করে লড়াটাই উপযুক্ত ও সঠিক কৌশল। কিন্তু সেটা খুব কার্যকর হয় নাই, কাজের হয় নাই। আকাঙ্খিত ফল দেয় নাই। ফল দেয় নাই এই অর্থে যে এটা শত্রু পরাস্ত হওয়ার দিক থেকে যত না তারচেয়ে বেশি হল নিজেরই অর্থনৈতিক বিকাশ, নিজের জনগণকে ভাল অর্থনীতিক জীবন দেয়া, কাজের সংস্থান ইত্যাদি করা যায়নি। আসলে একাজে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম থেকে আলাদা ও প্যারালাল অর্থনীতি কায়েমের চেষ্টা, এটা অনেকটা পুরানা আগে থেকে হাজির ক্লাবে যোগ দিয়ে তাদের সাথে খেলব না, আলাদা নিজেই ক্লাব বানিয়ে নিজের নিয়মে খেলা এধরণের ঘটনা ছিল সেটা। আর আজকের নতুন পরিস্থিতিতে যা হতে দেখছি, চলতি ক্রমশ পরাশক্তিগত উলটাপালট নতুন বিন্যাস পরিবর্তনের ভিতর যে অভিমুখ এখানে নতুন কৌশলটা হল, পুরানা ক্লাবে যোগ দিয়ে তাদের সাথে খেলতে খেলতেই ক্লাবের কর্তৃত্ত্বে ভাগ বসিয়ে আগের খেলার নিয়ম বদলে দেয়া। একথা বলে আবার এমন দাবি করা নয় যে কৌশলের এই বদলটা খুব ভেবেচিন্তে পরিকল্পনা করে নেয়া হয়েছে। বরং আগের কোর্স বা পথ কাজ করে নাই বা ফলদায়ক হচ্ছিল না বলে সেই পরিস্থিতিতে বাস্তবে বিকল্প কি করা যায় সে বিবেচনা থেকে নেয়া। এর পিছনে তত্ত্বগত স্বচ্ছতা ছিল কি ছিল না বা আছে কিনা আমরা হদিস পাই না। ফলে কথাগুলো বলা হচ্ছে নতুন আসন্ন অবজেকটিভ বাস্তবতাকে যেমন দেখা যাচ্ছে এর অর্থ তাতপর্যের দিককে ব্যাখ্যা করে।
তাহলে যেকথা বলছিলাম আসন্ন বা পুরানা পরাশক্তিগুলোর নতুন বিন্যাস এবং গুরুত্বপুর্ণ বিষয় তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক – সেটা গভীর পরস্পর নির্ভরশীলতার এক সম্পর্ক। কিন্তু গভীর পরস্পর নির্ভরশীলতা সম্পর্ক পরাশক্তিগত বিন্যাস নতুন আকার নিচ্ছে একথা বলার অর্থ এমন নয় যে আগের মত পরাশক্তিগত ঝগড়া বিবাদ প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন উবে গেছে। বরং সবলভাবে বহাল আছে। সর্বশেষ ইউক্রেন প্রসঙ্গে পরিস্থিতি ও এর গতিপ্রকৃতির দিকে নজর দিলেই আমরা তা বুঝব। এবং এটা কোনভাবেই আগের ঠান্ডাযুদ্ধের কালের লড়াই এর মত নয়। সেটা আর ফিরে আসবে না। উপরের এই পটভুমিতে এবারের লেখার প্রসঙ্গ “সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর”।

সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর
চীনের অর্থনৈতিক উত্থানে পুরানা এম্পেরিয়াল মোড়ল আমেরিকা ক্রমশ অগুরুত্বপুর্ণ হয়ে পড়ছে ফলে চীনের সাথে পারস্পরিক ঘোরতর বাণিজ্য অর্থনীতির সম্পর্কের ভিতরেও একইসাথে নানান গুরুতর ঝগড়া মনকষাকষির পরিস্থিতিতে সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর এখন এক গুরুত্ত্বপুর্ণ ইস্যু। এই শতক থেকে ক্রমশ গ্লোবাল অর্থনীতি বা আরও সঠিকভাবে বললে গ্লোবাল পুজিতান্ত্রিক অর্ডারের ভারকেন্দ্র হয়ে উঠছে এশিয়া। ওবামার “এশিয়া নীতি”এই নতুন এশিয়ায় ঝগড়া বিবাদের ভারকেন্দ্র করতে চাইছে সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর এলাকাকে। এটা আসলে আমেরিকার নেতৃত্ত্বে সারা পশ্চিমের দুনিয়ার উপর একক পরাশক্তির গুরুত্ত্ব হারানোরই এক প্রতিক্রিয়া। অবজেকটিভ এই বাস্তবতা যতই আসন্ন হয়ে উঠুক – বিনা যুদ্ধে না দিব সুচাগ্র মেদিনী – এই দশায় কেউই নিজের একক পরাশক্তির মুকুট ও ভুমিকা বাধ্য না হলে হারাতে চায় না। অতএব সাউথ চায়না সি অর্থাৎ চীনে পণ্য-জাহাজ আসা যাওয়ার মুল নৌরুটকে কেন্দ্র করে -আমেরিকা চাইলে এই গুরুত্ত্বপুর্ণ নৌরুট বাধাগ্রস্থ করতে পারে – এমন অবস্থা তৈরি করে নিজের গুরুত্ত্ব জাহির করার উপায় করতে চাইছে এই এলাকাকে। আমেরিকার দিক থেকে এটা নিঃসন্দেহে এক আগাম সামরিক উস্কানি পদক্ষেপ। ঢলে পড়া নিজের পরাশক্তিগত অবস্থানের ক্রমশ অগুরুত্ত্বপুর্ণ হয়ে পড়া দশাকে, অসুস্থ বুড়া শুয়ে পড়া ঘোড়াকে চাবুক মেরে খাড়া করার মত চেষ্টা এটা। এটাকে আমেরিকার এক শেষ চেষ্টাও বলা যেতে পারে। কিন্তু কতদুর আমেরিকা যেতে পারবে? সেদিকটা বুঝাবুঝির জন্যই এই আলোচনা।
শুরুটা হয়েছিল আমেরিকান একক সিদ্ধান্তে, ২০০৮ সালের দিকে, যখন সাউথ চায়না সি কে নিয়ে দুনিয়ার কোথাও এমনকি মিডিয়াতেও কোন কোনায় কোন উত্তেজনা, কোন খবর ছিল না। তবে সরব ছিল কেবল আমেরিকার সামরিক ষ্ট্রাটেজিক প্রস্তুতির দলিলগুলোতে। এমনই এক গুরুত্ত্বপুর্ণ প্রকাশ্য দলিল হল, এক আমেরিকান প্রফেসর ডঃ ওয়াল্টার এন্ডারসনের আমেরিকান কংগ্রেসের পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির (আমেরিকান প্রতিনিধি পরিষদ বা আমাদের হিসাবে আমেরিকান পররাষ্ট্র বিষয়ক সংসদীয় কমিটি) কাছে সাক্ষ্য দিয়ে বলবার জন্য তৈরি দলিল। (সাউথ চায়না সি সম্পর্কে পাঠককে এক ভৌগলিক ধারণা দেবার জন্য নিচে এক প্যারায় এক সংক্ষিপ্ত পরিচয় দিয়েছি। সেখানে ব্যবহৃত ছবি এন্ডারসন সাহেবের ঐ দলিল-রিপোর্ট থেকে নেয়া।) দলিল-রিপোর্টটা মূলত ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক মানে এশিয়ার দুই “রাইজিং ইকোনমির” একটা, ভারতের ঘাড়ে চড়ে বা পিঠে হাত রেখে দ্বিতীয়টা মানে চীনকে ঘিরে ধরা – এই বুদ্ধিতে সাজানো। আমেরিকান নির্বাহী প্রেসিডেন্টের সাউথ চায়না সি তাক করে সাজানো বিদেশনীতি আরও কয়েক বছর আগেই নিয়েছিল। আমেরিকান নির্বাহী প্রেসিডেন্টের বিদেশনীতির বিস্তারিত মূল দলিল প্রকাশ্যে প্রায় না পাওয়া যাওয়ার মত। তবে মুল দলিলে কি আছে তার কিছু ধারনা পাওয়া যায় আমেরিকান কংগ্রেস কমিটি বা প্রতিনিধি পরিষদ বা কখনও সিনেট কমিটির শুনানীগুলোতে। কারণ এই শুনানীগুলো প্রকাশ্য পাবলিক দলিল। এটা নির্বাহী প্রেসিডেন্ট কি করছেন তার একটা সংসদীয় স্ক্রটিনী বা নিরীক্ষার চোখ রাখা, আর আমেরিকান রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ক্ষমতার চেক এন্ড ব্যালেন্স। আলোচ্য যে দলিলের কথা বলছি তা ভারত আমেরিকান নতুন সম্পর্কের ছক কেন সঠিক সে সম্পর্কে মাষ্টার মানুষ হিসাবে এন্ডারসন সাহেবের ২০০৮ সালের জুন মাসে আমেরিকান প্রতিনিধি পরিষদকে দেয়া লিখিত সাক্ষ্য। প্রতিনিধি পরিষদের সেটা স্বাধীনভাবে বুঝে নিবার উদ্যোগ। আর এন্ডারসন সাহেব সেখানে মাষ্টারি এক্সপার্টে কমিটির কাছে সাক্ষ্য দিয়ে কি বলেছিলেন সেই দলিল এটা।

চীনের চোকিং পয়েন্টSouth china sea1

এটা চীনের উপকুলীয় সীমান্ত সম্পর্কে এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। ম্যাপে চীনা ভুখন্ডের দিকে তাকালে আমরা দেখব চীনের দক্ষিণ-পুর্ব থেকে পুর্বে বিস্তৃত ভুখন্ডের প্রায় পুরাটাই সমুদ্রে উন্মুক্ত। আর অন্য বাকি সবদিকের সীমান্ত ভুখন্ডগতভাবে আবদ্ধ বা ল্যান্ডলকড। অর্থাৎ এটাই চীনের বাইরের সাথে নৌ যোগাযোগের প্রবেশ দ্বার। ছোটবড় মিলিয়ে অন্তত ছয়টা আন্তর্জাতিক নৌবন্দর এই দক্ষিণ-পুর্ব তীরে। এই অর্থে দক্ষিণ-পুর্ব ভুখন্ড আসলে এক লম্বা উপকুলীয় অঞ্চল, দক্ষিণ চীন সাগর এবং পুর্ব চীন সাগর নামে মোটা দাগে যা আলাদা যদিও এটা অবিচ্ছিন্ন এক উপকুল অঞ্চল। এদুটোর মধ্যে বাণিজ্য গুরুত্ত্বের দিক থেকে আবার সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগর সবচেয়ে চালু। মধ্যপ্রাচ্য থেকে এশিয়া পেরিয়ে চীনের উপকুলে প্রবেশের দিক থেকে প্রথমে পড়বে দক্ষিণ চীন সাগর, ফলে পুর্ব চীন সাগরের চাইতে দক্ষিণ চীন সাগর উপকুল বাণিজ্যের দিক থেকে চীনে প্রবেশের প্রধানদ্বার। আর মধ্যপ্রাচ্য মানে আরব সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত এই নৌরুট চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য – পণ্য বা কাঁচামালের জাহাজ আসা যাওয়ার জন্য সবচেয়ে গুরুত্ত্বপুর্ণ। চীনের আমদানি জ্বালানি তেলের ৬০ ভাগ এই নৌরুট (Sea line of communication) ব্যবহার করে এসে থাকে। ফলে সে অনুপাতে চীনের উতপাদিত রপ্তানি পণ্যের জাহাজ বহর যাতায়াত করে এই নৌরুটেই। আবার দক্ষিণ চীন উপকুলে প্রবেশের মুখে সবচেয়ে বেশি পড়শি রাষ্ট্রের সমাহার। চীন থেকে বেড়িয়ে লাগোয়া পড়শি ভিয়েতনামকে পেরিয়ে যতই দক্ষিণে যাওয়া যাবে (ম্যাপ জুম বড় করে দেখুন) ততই মুখোমুখি হবে – ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া (পিছনে অষ্ট্রেলিয়া), ব্রুনাই, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি রাষ্ট্রের উপকুল – এর পরে বঙ্গোপসাগর। আর ওদিকে পুর্ব চীন সাগরের আশাপাশে পড়শি রাষ্ট্র হল কেবল দুই কোরিয়া আর জাপান।

এন্ডারসনের সাক্ষ্য দলিল
মোটা দাগে বললে US Congress hearing on India-US relationship দুইটা অংশে বিভক্ত। প্রথমভাগে, কেন আমেরিকার ভারতকে পারমাণবিক অস্ত্র সহযোগিতাসহ আধুনিক ও সুক্ষ্ম অস্ত্রশস্ত্রের সরবরাহ করা উচিত সে সম্পর্কে ন্যায্যতা দিচ্ছেন এন্ডারসন। আর সেই সাথে কেন আমেরিকান যাতার চাপে বাকা হয়ে থাকা আমাদের মত দেশের উপর এপর্যন্ত ব্যবহার করা আমেরিকান যাতাকাঠিটা আমাদের এই অঞ্চলে সবার উপর ব্যবহারের জন্য ভারতকে ধার দেয়া দরকার সেই সুপারিশ রাখছেন তিনি। এর আগে আমার অনেক লেখায় “যাতাকাঠি তত্ত্বের” রেফারেন্স আনতে এন্ডারসনের এই দলিলের কথা বলেছি। কিন্তু এবার আজকের এই লেখায় ঐ রিপোর্টের দ্বিতীয় ভাগকে উদ্ধৃতিতে আনছি। প্রথমভাগকে যদি বলা হয় আমেরিকা ভারতকে কি কি দিবে এর তালিকা বিষয়ক তবে দ্বিতীয়ভাগটা হল আমেরিকা কি কি নিবে সে বিষয়ক। দ্বিতীয় ভাগে আমেরিকার প্রত্যক্ষ চাওয়া হল এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে ভারত যেন সমর্থন জানায়, চীন ঠেকানোর আমেরিকান স্বার্থের ভিতরে ভারত যেন তারও আঞ্চলিক ভুকৌশলগত স্বার্থ হিসাবে দেখে, নেয়। তবে কথাটা বললাম প্রত্যক্ষ ভাষায়। কিন্তু “এশিয়ায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে ভারতের সমর্থন” আমেরিকার এই স্বার্থ পরিকল্পনাকে খোলাখুলি তো বলা যায় না। তাই সেটা এখানে উপস্থাপিত হয়েছিল অন্য শব্দাবলিতে আড়াল করে। এন্ডারসনের রিপোর্টের ভাষায় এটা তাই “managing the rise of China”,মানে চীন ঠেকানো বা মোকাবিলা। কথাগুলো টুকে এনেছি এন্ডারসন ভারতের সাথে আমেরিকার বিশেষ সম্পর্ক কেন হবে -কমন স্বার্থগত মৌলিক দিকগুলো কি তা আমেরিকান কংগ্রেসকে মানাতে গিয়ে কি বলছেন সেখান থেকে নেয়া। বলছেন, “This is based on the strong fundamentals of a convergence of interests on key issues, such as curbing religiously-inspired radicalism, managing the rise of China, defeating the Taliban in Afghanistan, and working towards stability in South Asia and beyond”. নিজ দায়িত্ত্বে করা এর অনুবাদ হলঃ (ভারত আমেরিকার আলাদা আলাদা স্বার্থগুলো) মৌলিকভাবে যেসব জায়গায় মিলেছে তা হল, ধর্ম-অনুপ্রাণিত উগ্রতা ঠেকানো, চীনের উত্থানকে মোকাবিলা, আফগানিস্তানে তালেবানদের পরাজিত করা এবং দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার লক্ষ্যে কাজ করা; আরও সামনে আগানো। অর্থাৎ আমেরিকা নিজের পরাশক্তিগত স্বার্থ আড়াল করে আলকায়েদা তালেবানের উপর দোষ চাপিয়ে এক ইতিবাচক ভঙ্গি তৈরি করে কথাগুলো বলা হয়েছে। কিন্তু যতই কথার ফুলঝুড়িতে আলকায়েদা তালেবানের উপর দোষ চাপিয়ে বলা হোক, প্রথমভাগে আমেরিকার ভারতকে পারমাণবিক অস্ত্রে সহযোগিতাসহ আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সরবরাহ করার যে কথা বলা হয়েছে এগুলো কোনযুক্তিতেই আলকায়েদা তালেবান মোকাবিলার অস্ত্র নয় এটা সবাই সহজেই বুঝবেন, মানবেন। ফলে যেটা বলা হচ্ছে, দুই রাষ্ট্রের সম্পর্কটা নাকি মূলত ভারত-আমেরিকার “সিকিউরিটি এলায়েন্স” –প্রশ্ন করা যায় এই সিকিউরিটি এলায়েন্স কার বিরুদ্ধে? আলকায়েদা তালেবান নাকি উদিয়মান চীনের বিরুদ্ধে? বলা বাহুল্য এটা চীন। ফলে এখান থেকে চীন ঠেকানোর আমেরিকার মুখ্য স্বার্থটা স্পষ্ট বুঝা যায়। কিন্তু ভারতের দিক থেকে দেখলে ভারত কি বুঝে একই ভাষায় এটাকে মুলত সিকিউরিটি এলায়েন্সের ভারত-আমেরিকার সম্পর্ক বলে বুঝেছিল? “সিকিউরিটি এলায়েন্স” এর প্রসঙ্গটা যথেষ্ট পুরানা ২০০১-২০০৮ সালের বুশ আমলের;যেমন,বুশের “natural partners” (President Bush in 2006), “strategic allies” (Prime Minister Vajpayee in 2004), and in 2005 Prime Minster Manmohan Singh declared that it is a relationship with “no limits” ইত্যাদি। তার মানে আসলে উভয় রাষ্ট্র উভয়কে ফাঁকি দিয়ে চলছিল। এটা ঠিক যে ভারত আমেরিকার সাথে “চীন বিরোধী” কোন সামরিক বা নিরাপত্তা জোটে ভিড়তে চায় না আবার, একই সাথে এশিয়া কোন একক পরাশক্তির সামরিক প্রভাব দখলে চলে যাক এটাও ভারত চায় না – একথা আমেরিকাকে সে আগেই জানিয়ে রেখেছিল। এন্ডারসনের রিপোর্টও এর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। তিনি বলেছেন, “……no single power (i.e., China) should dominate Asia, but India will not support an anti-Chinese alliance and rather will seek ways to integrate China more closely into a larger Asian context.”। তবু ভারত ভান করেছিল যেন আমেরিকার চীন ঠেকানোর নামে এশিয়ায় সাউথ চায়না সি তে সামরিক উত্তেজনা তৈরির স্বার্থটা সে ধরতেই পারে নাই। ভারতের ভান বলছি একারণে যে এন্ডারসনের রিপোর্টের দ্বিতীয়ভাগ পরিস্কার করেই একেবারে ম্যাপ এঁকে (যেট আমি এখানে ব্যবহার করেছি) সাউথ চায়না সি পর্যন্ত চীনের নৌবাণিজ্যের রুট কি করলে আটকে বা বাধা তৈরি করা সম্ভব (এন্ডারসনের ম্যাপে যাকে চোকিং পয়েন্ট বলে লাল কালিতে চিহ্নিত করেছে) তার উল্লেখ আছে। অথচ এটা তো চীনের বাণিজ্য জাহাজের (সামরিক নয়) অবাধে নৌরুটে চলাচলের মত সাধারণ বিষয়। যা সরাসরি ভারতের অর্থনীতি বা সামরিক কোন সমস্যা নয়, কোনভাবেই সমস্যার ইস্যু নয়, চীনের এশিয়ায় একক সামরিক কর্তৃত্ত্ব নেয়া রুস্তমি হুমকিও এটা নয়। ওদিকে আমেরিকান সংসদীয় কমিটির কাছে এন্ডারসনের এই স্বাক্ষ্য কোন গোপন দলিল নয় বরং এটা দুনিয়ার পাবলিকের কাছে খোলা ফলে ভারতেরও অজানা বিষয় নয়। আবার অন্যদিকে আমেরিকাও ভান করেছিল। ভারতের কাশ্মীর বা উত্তর-পুর্বের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন নির্মুল সে আমেরিকার “টেররিজম” শব্দের আড়ালে করতে চাইছে আমেরিকা যেন এটা বুঝতেই পারে নাই। কিন্তু এই পারস্পরিক ছলনার সম্পর্ক নেংটা হতে সময় লাগে নাই। আমেরিকা বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর রাখতে চায়। এই খায়েস ২০১২ সালে প্রকাশ হওয়া মাত্র ভারত নিজের বিপদ টের পায় যে এটা আসলে চীন ঠেকানো বা চীনের জন্য বিপদ নয়, আসলে খোদ ভারতের জন্যও সমান বিপদ। ফলে ভারত-আমেরিকার হানিমুনের সম্পর্কে টান ধরে, আস্থা বিশ্বাসের ছলনার পর্দা সরে গিয়ে সন্দেহ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। এন্ডারসনের এই রিপোর্টের পরের তিন বছরের মাথায় ২০১২ সালের শুরুতে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের পরিকল্পনা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। এরপরের কাহিনী আমরা সবাই জানি। কুটনীতিক খেবড়াগোরে আর বাংলাদেশের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারত-আমেরিকার বিবাদ আরও চরমে পৌছায়।
বিপরীতে চীনের দিকে তাকালে আমরা দেখব পরাশক্তিগত মাসল দেখিয়ে চীনের উত্থান ঘটে নি। অন্তত এখনও ঘটছে না। সত্তরের দশকে ভিয়েতনামের বিপ্লবের পরের চীন দুনিয়ার কোন বিরোধ বিবাদে আর সামরিকভাবে অংশগ্রহণ করে নাই। আসলে পরাশক্তি ভাব যতটা না মাসল ফুলিয়ে দেখাবার বিষয় তারচেয়ে -অর্থনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ত্ব অর্জন করা পরাশক্তি হবার পুর্বশর্ত -এই নীতিতে সমস্ত মনোযোগ চীন নিজের অর্থনৈতিক বিকাশের দিকেই ঢেলেছে। কেবল নিজের ভুখন্ডগত বিষয় (তাইওয়ানকে নিজের ভুখন্ড মনে করে ফলে তাইওয়ানসহ) ছাড়া দুনিয়ার অন্য কোন বিবাদের ইস্যুতে চীন সামরিক সংশ্লিষ্টতা রাখেনি। তাই চীন তার অর্থনৈতিক নৌচলাচল ও প্রবেশ রুট সাউথ চায়না সি তে নিজে যেচে কোন সামরিক উত্তেজনা তৈরির কোন কারণ নাই, করেও নাই,উঠেও নাই। কিন্তু এখন উঠেছে। কেন?
আমেরিকা নিজে ক্ষয়িষ্ণু ও ক্রমশ অগুরুত্ত্বপুর্ণ হয়ে পড়া হলেও তার পরাশক্তিগত দাপটের এখনও অন্যের দরকার আছে, এশিয়ার অনেকেই তাকে চায় এই অবস্থা তৈরি করতে তার নেয়া প্রথম সিদ্ধান্ত হল ২০১০ সালে। তার মোট সামরিক শক্তির ৬০ ভাগ এশিয়ামুখি বা প্রশান্ত মহাসাগরে সমাবেশের সিদ্ধান্ত নেয় আমেরিকা, বাকি চল্লিশ ভাগ সামর্থ আটল্যান্টিক মহাসাগরে। এর আগে এটা সমান পঞ্চাশ ভাগে ছিল। একই সাথে নিজ মিলিটারি বাজেট মোটের উপর দশ ভাগ ছাটাই করেছিল। কারণ আফগানিস্থান ও ইরাক যুদ্ধের খরচ সামলাতে গিয়ে গ্লোবাল মহামন্দায় আমেরিকান রাষ্ট্র ও অর্থনীতি আর নতুন করে সামরিক ব্যয় বইতে অপারগ হয়ে গিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত প্যাকেজেরই অংশ হল, ইরাক থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার আর ২০১৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার। অর্থাৎ প্রত্যাহারের এই সিদ্ধান্তের কারণ যুদ্ধ মিশন সম্পন্ন হয়েছে তা নয় বরং যুদ্ধের খরচ যোগাতে রাষ্ট্রের অপারগতা। কিন্তু এশিয়ায় এক আগাম অনুমানের ভীতি ছড়ানোও সে শুরু করেছিল। ভীতির বয়ানটা হল, চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে উঠলে পড়শি রাষ্ট্রগুলোর জন্য তা হুমকি হয়ে উঠবে। ফলে পড়শিদের আমেরিকান সামরিক সহায়তার দরকার হবে। আর তাই এই সহায়তা বিক্রির দোকান খুলে আগেই এশিয়ায় বসে পড়া আমেরিকার দরকার।
গত ছয় মাস ধরে সাউথ চায়না সি বা দক্ষিণ চীন সাগরের সীমানা অথবা নিচের সম্পদের দখল নিয়ে উত্তেজনা চলছে পড়শি ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইনের সাথে। ওদিকে পুর্ব চীন সাগরে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে বিরোধ জাপানের সাথে। এতে অসুস্থ বুড়া শুয়ে পড়া ঘোড়াকে চাবুক মেরে খাড়া করার চেষ্টায় রত আমেরিকার পরাশক্তিগত ভুমিকার ন্যায্যতা হাজির হতে শুরু করেছে। আমেরিকান পরিকল্পনা সফল বলতে হয়। কিন্তু ঘটনা শুরু হচ্ছে কোথা থেকে সেদিক থেকে আমাদের নজর যেন না সরে যায়। আমেরিকার ২০১০ সাল থেকেই তার এশিয়ামুখি করে সামরিক শক্তির পুনর্গঠন আর একইসাথে “পার্টনারশীপ ডায়লগ” এর নামে চীনের পড়শি দেশগুলোকে ভড়কিয়ে নিজের সামরিক নৌকায় তোলার চেষ্টা শুরু করে,চীনের পড়শিদেরকে সামরিক নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ করতে থাকে। এই ঘটনা থেকে এশিয়ায় সামরিক উত্তেজনার শুরু। যাদের সাথে আগে থেকেই চুক্তি আছে যেমন জাপান, তাও ঝালাই করে নেয়।
চীনের দিক থেকে দেখলে আমেরিকার এই পদক্ষেপ নিজের জন্য হুমকি মনে না করার কারণ নাই। কারণ এটা তার সামরিক না বাণিজ্য জাহাজ অবাধ চলাচলের ইস্যু। এমনিতেই এশিয়ার মহাসাগর প্রত্যক্ষভাবে আমেরিকার নিজ ভুখন্ডের উপকুলীয় কোন উন্মুক্ত নীল জলরাশি অঞ্চল নয়। তাহলে সে কেন এখানে? এর ন্যায্যতা কি?
[বাকি অংশ দ্বিতীয় ও শেষ পর্বে সমাপ্ত]