ভুটানের এক বুদ্ধিমান রাজা

ভুটানের এক বুদ্ধিমান রাজা

গৌতম দাস

২৯ অক্টোবর ২০১৮, ০০:১৩

https://wp.me/p1sCvy-2vc

Paro locals question project DANTAK welcome sign, kuenselonline

ভুটানের পার্লামেন্ট নির্বাচন শেষ হয়েছে, দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি বা DNT) – এই দল বিজয়ী হয়েছে। এই দলের নেতা মেডিক্যাল ডাক্তার লোটে শেরিং প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।
গত ১৮ অক্টোবরে অনুষ্ঠিত হওয়া এটা ছিল ভুটানের দ্বিতীয় ও শেষ রাউন্ডের নির্বাচন। ভুটানের কনষ্টিটিউশন অনুসারে এর নির্বাচন পদ্ধতি দুই স্তরে সম্পন্ন হতে হয়। প্রথম পর্বের সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া কেবল প্রথম ও দ্বিতীয় দলকে নিয়ে আবার নির্বাচনে নির্ধারিত হয় কে বিজয়ী বা কোন দল ক্ষমতাসীন হবে। এর আগে গত ১৫ সেপ্টেম্বর প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনের ফলাফলে আমরা জেনেছিলাম ক্ষমতাসীন পিডিপি শোচনীয়ভাবে হেরে গিয়েছে। ‘শোচনীয়’ বলা হচ্ছে এ জন্য যে, প্রথম পর্বের ফলাফলেই পিডিপি তৃতীয় অবস্থানে চলে যায়। প্রথম রাউন্ডেই তৃতীয় অবস্থানে চলে যাওয়া দলের আর দ্বিতীয় রাউন্ডে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না।
ভুটানের মোট জনসংখ্যা প্রায় আট লাখ, যার মধ্যে এবারের ভোটদানে যোগ্য ভোটার ছিল প্রায় তিন লাখ। প্রথম রাউন্ডে এমন মোট ভোটগুলা প্রধান তিন দলের মধ্যে ভাগ হয়েছিল এভাবে – দ্রুক নিয়ামরুপ শোগপা (ডিএনটি) ৯২ হাজার ৭২২ ভোট, দ্রুক ফুয়েনসাম শোগপা (ডিপিটি) ৯০ হাজার ২০ ভোট আর পিউপুলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (পিডিপি) ৭৯ হাজার ৮৮৩ ভোট। তৃতীয় হওয়ায় ভারতমুখী দল পিডিপি প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে যায়। আর প্রথম রাউন্ডে প্রথম হয়েছিল ডিএনটি; সেই দলটি এবার শেষ রাউন্ডের নির্বাচনেও সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছে। ভুটানের পার্লামেন্টে মোট আসন ৪৭। এর মধ্যেই ডা: লোটে শেরিংয়ের বিজয়ী দল ডিএনটি, এরা পায় ৩০টি আসন, আর বিরোধী ডিপিটি পায় ১৭টি। ইতোমধ্যে এটাও নির্ধারিত হয়ে গেছে যে, বাংলাদেশ থেকে পাস করে যাওয়া ডাক্তার শেরিং-ই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন।

কিন্তু ভারতমুখী দল পিডিপি প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়ে গেছে  এই কথার লেজ ধরে  নতুন ইঙ্গিত কী এই যে, তাহলে এখন এর বদলে হবু ক্ষমতার দল যেটা আসছে সে চীনমুখী? না, তা নয়। মজার কথা হল, তা কেউ বলছে না। এমনকি আগ্রাসী আচরণের কোনো ভারতীয় ব্যক্তি বা মিডিয়াও এ কথা বলছেন না। যেমন ভারতের সবচেয়ে বড় আর প্রভাবশালী বেসরকারি থিঙ্কট্যাঙ্ক, [বিদেশি পয়সার এনজিও নয়, নিজ ব্যবসায়ীদের পয়সায় চলা দাতব্য প্রতিষ্টান (ORF), Observer Research Foundation] ওআরএফ। এর এক ফেলো মনোজ যোশির এই প্রসঙ্গে তাঁর লেখার শিরোনাম লিখেছেন, “ভুটানের হবু সরকারের ভারতের প্রতি মনোভাব অস্পষ্ট। এটা ভারতের উদ্বেগের কারণ হতে পারে”। [New Bhutan government’s attitude towards India is not clear, this should worry India]।

একথা আবার তিনি লিখেছেন আগ্রাসী নয় বরং দুঃখ করার মুডে। তার এই পুরা লেখাটাই এক হারুপার্টি বা পরাজিতের ভঙ্গিতে লেখা, আর একটা ক্ষমা চাওয়ার ইঙ্গিতে তো বটেই। প্রথমেই নিজেদেরকে আত্মদোষী করে বলছেন, ‘ভুটানের নির্বাচন ভারতের জন্য ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, অথচ ভারতের মিডিয়া সেটা আমল করতে পারেনি। এ থেকে, পড়শির প্রতি আমরা কেমন গুরুত্ব দেই আমাদের সেই মনোভাবেরই প্রতিফলন এটা”।

হারুপার্টি বা পরাজিত কথাটা এখানে আক্ষরিক অর্থেই বলা হয়েছে। কারণ ঘটনা হল, গত ২০১৩ সালের ভুটানের নির্বাচনের আগের দিন ততকালীন মনমোহন সরকার ভুটানে ভারতের সরবরাহ করা তেল গ্যাস জ্বালানির ওপর থেকে ভর্তুকি প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। সেবার এতে ভারতমুখি দল পিডিপির জয়লাভ আর প্রতিদ্বন্দ্বি ডিপিটি দলের হারের কারণ মনে করা হয়। আর ডিপিটি দলের উপর ভারতের এমন বিরাগ ও সাজা দিবার কারণ তার নেতা ২০১২ সালে চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাত করেছিল। তাই ভর্তুকি প্রত্যাহার করে যেন এটা বুঝাতে যে ভারতের কত ক্ষমতা বা ভারতের ইচ্ছার দাম কত, তাই তা ভুটানিজদের কতটা গুরুত্ব দিয়ে আমল করতে হবে। এদিকে প্রায় এমন একই ঘটনা, তবে আরো ভয়াবহভাবে ঘটেছিল নেপালে; ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে মোদী সরকারের সিদ্ধান্তে। ভারতের অপছন্দকে আমলে না নিয়ে নেপাল তার নতুন কনষ্টিটিউশন চালুর ঘোষণা দেয়ায়, ভারত জ্বালানি তেল, গ্যাসসহ সব পণ্যের ভারতের উপর দিয়ে নেপালে আমদানির সব সড়ক ভারত অবরোধ করে রেখেছিল দীর্ঘ ছয়মাস ধরে। নেপাল ও ভুটানকে মূলত ভারতের ওপর দিয়ে বাইরে বের হতে হয়, এমন ল্যান্ডলকড রাষ্ট্র। আর এর সুযোগ নিয়ে নেহরু ১৯৪৯-৫০ সালে এ দুই রাষ্ট্রকে আলাদা দুই কলোনি সম্পর্কের চুক্তিতে বেঁধে ফেলে। যার সার কথা হল, নেপাল বা ভুটান দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের সব সুযোগ এককভাবে ভারতকে দিতে হবে।
যেমন – নেপাল বা ভুটান তাদের উৎপাদিত পানিবিদ্যুৎ ভারত ছাড়া তৃতীয় আর কোনো বিদেশী রাষ্ট্রে বিক্রি করা যাবে না; অথবা ভারতীয় কোম্পানির মাধ্যমে তৃতীয় রাষ্ট্রে বিক্রি করতে হবে, নিজে পারবে না। ভৌগলিকভাবে উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত বলে ঐ উচ্চতার পাহাড়ি নদী বা পানি ঢলকে ব্যবহার করে নেপাল ও ভুটানে খুব সহজেই পানি-বিদ্যুৎ উতপাদন করা যায়। আর পানিবিদ্যুত বলে এর উতপাদন খরচ সবচেয়ে কম, ২৫-৫০ পয়সা প্রতি ইউনিট। তাই বিদেশি মুদ্রা আয়ের এই বড় উৎস পানিবিদ্যুত হলেও ভারতের একচেটিয়া আর অযাচিত আধিপত্যের কারণে এর সুফল নেপাল বা ভুটানের ঘরে ঠিকমত উঠে না। আর আসলে এই লুটে নেয়া সুবিধার কিঞ্চিত ফেরৎ হিসাবে (তথাকথিত রেসিপ্রোকাল, reciprocal) ভূটানে জ্বালানি তেল ও সিলিন্ডার গ্যাসের সরবরাহ ভারতের অভ্যন্তরীণ দরে ভর্তুকিতে ভারত দিয়ে আসছিল। ভারত এটা দেয়, যাতে ভুটানে ঋণ ও বিনিয়োগ নিয়ে ভারত ছাড়া অন্য কাউকে হাজির হতে না দেয়া যায়। ব্যবসা কেবল নিজের হাতে আর প্রভাবে বজায় থাকে। এই ঘটনাটার সবচেয়ে বেশি প্রতিফলন দেখতে পাব আমরা যে, ভুটানের ঋণগ্রস্ততা এখন বিশাল আর এর পরিমাণ ভুটানের জিডিপির ১১৮%। আর এই মোট ঋণের ৬৪% এর দাতা, ঋণ-মহাজন হল ভারত। ভুটানের বৈদেশিক আয়ের প্রধান উৎস পানিবিদ্যুৎ। তাই ভুটানের অর্থনৈতিক নুয়ে পড়া দশার বড় উৎস এখানেই।  ভারতের কাছে নেয়া ও পরিশোধ না হওয়া বৈদেশিক (মূলত পানিবিদ্যুতের জন্য) ঋণ ব্যাপারটা এত ভয়াবহ যায়গায় পৌচেছে যে ভারতের প্রাচীন পত্রিকার  দ্যা হিন্দু  বৈদেশিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার লিখছেন, ভারত যদি কিছু না করে তবে খোদ ভারতই এবার ভুটানকে “ঋণের ফাঁদে” ফেলার পরিকল্পনা আটছে বলা হবে; যে অভিযোগের প্রপাগান্ডা ভারত এতদিন চীনের বিরুদ্ধে করে আসছে।   [……And unless India finds ways to help, it will be accused of the same sort of “debt-trapping” that China is accused of today.]

কিন্তু পালটা সুযোগ ভুটানের দোরগোড়ায় সম্ভবত টোকা দিচ্ছে। ভারতের দিক থেকে ভুটানকে এভাবে বেঁধে রাখা, এটাই একালে ভেঙে পড়তে যাচ্ছে। এর প্রধান অবজেকটিভ কারণ মানে ভারত চাইলেও ঠেকিয়ে রাখতে পারে না এমন কারণ হল, চীনের কাছ থেকে আমাদের মত দেশের ঋণ বা বিনিয়োগপ্রাপ্তি সহজলভ্য হয়ে গেছে একালে; তাই “আমার বাড়ির পিছন বাগানে (মানে পড়শি দেশে) অন্যকে ঢুকতে দেবো না” বলে অক্ষম ভারতের প্রবল নাকিকান্না দেখছি আমরা।

কিন্তু এবিষয়টা ভারতের বদলে চীন মানে চীন “ভাল” আর ভারত ‘খারাপ’ – অতএব এখন আমাদের সবাইকে চীন-ভক্ত হয়ে যেতে হবে, এখন চীনের পক্ষে ঢোল পিটাতে হবে – এমন ভাড়ামো বা দালালির বিষয় নয় একেবারেই। বরং একচেটিয়া ভারত ভুটানে ব্যবসা ও বিনিয়োগের একমাত্র উৎস হয়ে থাকার বদলে পাশে চীনও আরেক উৎস হয়ে থাকলে, ভারতের একচেটিয়াত্ব ভাঙবে। ভুটান তুলনা করে দেখতে সুযোগ পাবে। এখান থেকে দেখতে হবে। মূলকথা, ভুটানকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া যে সে কোনটা নেবে, কাকে কোন ব্যবসা দিবে কিংবা আদৌও দিবে না – এগুলো বেছে নেয়ার সুযোগ পেতে হবে তাকে। এটা ভুটানের অধিকার।
এ ছাড়া ভারতের পাশাপাশি চীনও যদি ভুটানকে ট্রানজিট দেয়, (নেপাল যেমন সম্প্রতি পেয়ে নিয়েছে) আর সেই ট্রানজিট ব্যবহার করতে ভুটানে নতুন অবকাঠামোতে বিনিয়োগ ও তা গড়ে দেয় সেটা হবে ভুটানবাসীর ভাগ্য খুলে যাওয়া। সবচেয়ে বড় পাওনা হবে ভারতের একচেটিয়া নাগপাশ থেকে  ভুটান অন্তত একটু মুক্ত, সেই বাধন ঢিলা হবে এতে।

একালে ভুটানের জনগণ বিশেষ করে কাজ-চাকরিপ্রার্থী তরুণেরা, এদের কাছে বিষয়গুলো তাদের না বুঝার বা আমল না করার কিছু নেই। সহজেই তারা বুঝতে পারে। এছাড়া পেটের তাগিদ বাড়ছে। এক হিশাবে বলা হচ্ছে তরুণ জনসংখ্যার প্রায় ১০% বেকার। এছাড়া বিশেষ করে নেপাল তাদের সামনে এক মুক্তির মডেল হয়ে যেখানে হাঁটছে। আমরা মনে রাখতে পারি যে ‘ভারত-নেপাল’ আর ‘ভারত-ভুটান’ এই দুই কলোনি-দাসত্ব চুক্তি একই ছাঁচ বা ড্রাফটের উপর করা হয়েছে। আসলে ২০১৩ সালে ভারতের ভর্তুকি তুলে নেয়ার পর থেকে ভুটানের জনমনে প্রথমে ভীতি জন্মায়। পরে তা থেকে ক্ষোভ আর শেষে এক তোলপাড়-বুঝাবুঝি-সচেতনতা ছড়িয়ে পড়া শুরু হয়ে যায়। ভুটানের সরব তরুণদের টগবগে ফেসবুক পেজ বা গ্রুপ দেখলে তা বুঝা যায়।

এককথায় ভুটান বদলে যাচ্ছে। স্থবির ভুটান যেন সামনে আলো দেখছে। একটা ছোট ঘটনার বর্ণনা দেই। ভুটানের আকাশ থেকে নামলেই আপনি বিমান বন্দরে একটা স্বাগতম বোর্ড দেখতে পেতেন। এই লেখায় শুরুতে যে ছবিটা ব্যবহার করা হয়েছে, সেটা খেয়াল করতে পারেন। এটা গতবছর ২০১৭ এপ্রিল ১১ এর আগের ছবি। এই সাইনবোর্ড নিয়ে আপত্তি-বিতর্কের ফলাফলে সেটার বদলে এখন নতুন সাইনবোর্ড দেয়া হয়েছে। নতুন সাইনবোর্ডের লিঙ্ক এখানে। এটা স্রেফ একটা সাইনবোর্ড বদল নয়, প্রতীকীভাবে এটা ভারতের হাত থেকে ভুটানের হারানো সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার লড়াই। ভুটানের অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ মূলত ভারত নিজের হাতে রেখে দিয়েছে। ঠিক যেমন ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ রেখে দিয়েছে। এই অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ ভারত যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে করে থাকে সেই ১৯৬১ সাল থেকে সেটা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধীনস্ত এক প্রতিষ্ঠান যার নাম Border Roads Organisation। এক ভারতীয় ব্রিগেডিয়ারকে চীফ ইঞ্জিনিয়ার করে এর অধীনেই নেয়া কনষ্ট্রাকশন প্রজেক্টের নাম Dantak। ফলে সংক্ষেপে একে  DANTAK-BRO অথবা Dantak (ড্যানটক) বলা হয়ে থাকে। শুরুতে দেয়া ছবিতে দেখা যাচ্ছে ভুটানের প্রধান এয়ারপোর্ট, “পারো এয়ারপোর্টে” ভিজিটরদেরকে স্বাগত জানাচ্ছে ড্যানটক। এটা নিয়ে স্থানীয় পাবলিক জনমনে ঘোরতর অস্বস্তি আপত্তি তৈরি হয়েছে। এদের মধ্যে মিডিয়ায় যারা কথা বলেছেন তাদের মধ্যে আছেন স্থানীয় রাজনীতিবিদ, ট্যুর গাইড, প্রাক্তন আমলা  ইত্যাদি। তাদের বক্তব্য হল ড্যানটক ভারতীয় আর্মির সংগঠন ফলে তারা ভুটানের ভিজিটরদের স্বাগত জানানোর কেউ না; আর রাস্তার সাইনবোর্ড টাঙ্গানোর  অথরিটিও তারা নয়। বরং রাস্তায় “পথচারি সাইন” টাঙ্গানোর ভূটানিজ স্থানীয় যে আইন তা ভঙ্গ করে ভারত একাজ করেছে। মূলকথা হল, ভুটানে কেউ আসলে সেই ভিজিটরদের ভারতীয় কেউ স্বাগত জানাবে এটা ভুটানিজরা পছন্দ করছে না। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা বছর খানেক আগে ভুটানের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ক্স মন্ত্রণালয় এই সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলতে চিঠি দিলেও ড্যানটক তা উপেক্ষা করে চলেছে তো বটেই এমনকি স্থানীয় এক ইংরাজি পত্রিকাকে সাক্ষাতকার দিয়ে ঐ ভারতীয় বিগ্রেডিয়ার যিনি ড্যানটকের চীফ ইঞ্জিনিয়ার, খোলাখুলি বলছেন যে এনিয়ে বিরূপ পাবলিক সেন্টিমেন্ট তিনি “অগুরুত্বপুর্ণ” মনে করে উপেক্ষা করেছেন।  এছাড়া তিনি উদ্ধতের সঙ্গে বলছেন “ড্যানটক-কে অন্যান্য বিদেশি দাতা সংস্থার সঙ্গে তুলনা করাতে উলটা তিনিই ক্ষুব্ধ। কারণ ড্যানটক অবিচ্ছেদ্য অংশ [DANTAK has been an integral part of the infra-structure development ……]”। যেন ভুটান ভারতেরই অংশ। গতবছরের এপ্রিলে সেবার অসন্তোষের প্রকাশটা এই সাক্ষাতকারের কারণে  তুঙ্গে উঠেছিল। আর তা থেকে এবার ছয়দিনের মাথায় এপ্রিলে ভুটানের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবার নিজেই সাইনবোর্ড সরিয়ে ফেলে নিজেদের সাইনবোর্ড স্থাপন করেছিল। সারা পারো শহরে এধরণের বিলবোর্ড বহু জায়গায় ছড়িয়ে ছিল, আর রাস্তার পেভমেন্টেও ভারতীয় পতাকার তে-রং দিয়ে রাঙিয়ে রাখা হয়েছিল।

মূল কথাটা হল এখানে প্রদর্শিত এটিচ্যুড, আর কূটনৈতিক মনোভাব বা শিষ্টাচারের অভাব অথবা ভুটানের সার্বভৌমত্বকে  সম্মান  না জানানো – এগুলোর কোনকিছুই এখানে কাজ করে নাই। যেন ড্যানটক নিজেই অবকাঠামো গড়ার কাজ করতে ভুটানে এসেছে, ভুটানের সরকারের কেউ তাকে “ওয়ার্ক-অর্ডার” দেয় নাই। এর পিছনের ভারতের ধরে নেয়া ভয়ঙ্কর অনুমানটা হল, খোদ ভুটান তো ভারতেরই। ভারতের এই ভয়ঙ্কর এবং বেকুবি অনুমান বাকা-করে বলা কথা নয়।

যেমন প্রথমত, গত বছর ২০১৭ সালের চীন-ভারতের কথিত “ডোকলাম সঙ্কট”। ডোকলাম ভুটানের ভুমি, এটা ভারতও অস্বীকার করে না। ভুটানের সঙ্গে চীনের অচিহ্নিত সীমানা বিতর্ক দীর্ঘদিনের, সেই কলোনি আমলের। একালে তা আপোষে মীমাংসার জন্য উভয় রাষ্ট্রই তাদের বিভিন্ন স্থানের “ভুখন্ড বিনিময়” করে এই বিতর্ক মিটানোর চেষ্টা করছে। এখন এর ২৫তম রাউন্ডের আলোচনা বৈঠক চলছে। এরই অংশ হিশাবে ডোকলামের কিছু অংশ চীনের সাথে বিনিময়ে দিয়ে দেওয়াতে এরপর, চীনে সেখানে রাস্তা নির্মাণ করতে গেলে  ভারত সামরিকভাবেই তাতে বাধা দেয়। পরবর্তিতে হুমকি-আলোচনা শেষে, ৭৩ দিন পরে ভারত সৈন্য ফিরিয়ে নেওয়াতে ঐ সঙ্কট দৃশ্যত মিটে যায়। তাহলে ব্যাপার হল, ভুটানের ভুমিকে ভারত নিজের মনে করে, চীনকে বাধা দিতে গিয়েছিল। এছাড়া দ্বিতীয়ত, ভূটান এখন মোট ৫৩ রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রদুত বিনিময়ে কূটনৈতিক সম্পর্কে স্বীকৃতিতে আবদ্ধ। ভুটানের মাত্র দুই পড়শি – ভারত ও চীন। ভৌগলিকভাবে ভারতেরই সমানতুল্য আর এক প্রতিবেশি চীন হলেও ভুটানের সাথে চীনের কুটনৈতিক স্বীকৃতি নাই। গুরুত্বপুর্ণ হল এই কুটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করতে, এখানে দেশি-বিদেশি আইনি কোন বাধা নাই। কারণ সার্বভৌম ভুটান কোন রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করবে এটা ভারতের নাকগলানোর বিষয় নয়। কিন্তু বাধা হল বড়ভাই, বড়ভাই মাইন্ড করবে। ভারত অসন্তুষ্ট হবে এটাই আকারে-প্রকারে বুঝিয়ে ঠেকায়, চাপ তৈরি করে রাখা হয়েছে।

আসলে ভারত ভূটানের ৫৩ রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রদুত বিনিময়ের বেলায় আপত্তি না করলেও চীনের ব্যাপারে ছুপা আপত্তি কেন? এককথায় বললে, অন্যান্য রাষ্ট্র কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময় করার পরে, ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ যে সম্পর্কই করুক তা ভারতের ভুমি দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। ফলে তা বাধাগ্রস্থ করা না করা ভারতের ইচ্ছাধীনে থাকে। মানে ভারতের অনুমতি সাপেক্ষেই কেবল কোন কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু চীন –  সে ভুটানের  অপর পড়শি বলে ভারতের কোন বাধাই পরোয়া না করে সরাসরি চীন থেকে ভুটানে সব ধরণের যোগাযোগ  স্থাপন করতে পারে। অর্থাৎ ভুটানকে চুক্তিতে আটকিয়ে কলোনি করে রাখার ভারতের কূট-বুদ্ধি এখানে অচল। একারণেই, সারকথায় ভুটানকে ভারতের নিজেরই ভুখন্ড মনে করে চলা – এই ভয়ঙ্কর এবং বেকুবি অনুমান চীনের কারণ বাস্তবতা হারাবে, এটা ভারত ভালই বুঝে। এই কারণে, চীন-ভূটান কূটনৈতিক স্বীকৃতি বিনিময়ে ভারতের ছুপা আপত্তি।

এসব কিছু মিলিয়ে ভুটানের জনমনে বিশেষ করে তরুণদের মনে যে ক্ষোভ তা এখন প্রবল এবং সংগঠিত হয়ে উঠার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে। তাদের ক্ষোভের একটা বড় পয়েন্ট হল, ভুটান কেন নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্তে চীনের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক করবে কি না সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সম্প্রতি ভুটানিজ স্থানীয় বিশেষ করে তরুণদের প্রতিরোধী মনোভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি একটা রিপোর্ট করেছে যেটা হংকং থেকে প্রকাশিত  সাউথ চায়না মর্ণিং পোষ্টে ছাপা হয়েছে। সেখান থেকে টুকছিঃ  “থ্রিম্পুতে ২১ বছর বয়স্ক কলেজ ছাত্র বিমলা প্রধান বলেন, ভারত ও ভুটান যদি ভালো বন্ধু হয়, তবে আমাদের বন্ধুত্ব অন্য দেশের সাথে সম্পর্কের কারণে প্রভাবিত হবে না। কিন্তু মনে হচ্ছে, সবকিছুর জন্যই ভারতের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হয় ভুটানকে। ভারত সবসময়ই অন্যদের আগে আসবে। কিন্তু ভারতের উচিত হবে না ঈর্ষান্বিত বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করা”। ঠিক এমনই আর অনেক কথোপকথন আছে সেখানে। [এর এক বাংলা অনুবাদ ছাপা হয়েছে এখানে] এএফপি আরও লিখছে, ” ট্যাক্সি ড্রাইভার কিংজাং দর্জি ভুটানের কূটনীতি সম্পর্কে মাথা ঘামাতে চান না। তবে তিনি বিদেশী বিনিয়োগের মূল্য বোঝেন। তিনি বলেন, ভুটানের উচিত হবে অন্যান্য দেশের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করা। তিনি বলেন, অনেক চীনা পর্যটক এখানে আসতে শুরু করেছে। তারা অনেক টাকা নিয়ে আসে”।

এই ব্যাপারটা ইদানিং এতই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে তা টের পায় মানে স্বীকার করে ভারতের কিছু মিডিয়া। গত মাসে প্রথম রাউন্ডের নির্বাচনে ভারত-মুখি পিডিপির শোচনীয় হার দেখার পরে,  টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টার সরাসরি ভারত সরকারকে  ভুটানে জ্বালানিতে ভর্তুকি তুলে নেয়ার এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের দায়ে অভিযুক্ত করেছিল।
উপরে থিঙ্কট্যাঙ্ক ফেলো মনোজ যোশির ‘পরাজিত মনোভঙ্গির’ কথা বলছিলাম। অনুমান করা যায়, তাঁরও এদিকগুলো আমল না করতে পারার কথা নয়। এর পরও তিনি আক্ষেপ করছেন যে এই নির্বাচনের ইস্যু হিশাবে ভারত বা ভুটান-ভারত সম্পর্ক কোন প্রকাশ্য বিষয় ছিল না। তিনি লিখে চলেছেন, “এর আগের ভারতমুখী পিডিপির সরকার থাকাতে ও সে সহযোগিতা করাতে ভারত তখন চীনের সাথে ‘ডোকলাম সঙ্কট’ আরামে মেটাতে পেরেছিল”। [The defeat of the incumbent government headed by Tshering Tobgay could not have been comfortable for New Delhi. This is especially because along with the Bhutanese government, New Delhi had managed the crisis over Doklam successfully last year.] এটা আসলেই যোশির কল্পনা আর আক্ষেপের কথা; বাস্তবতা নয়। এই অর্থে এটা একটা চাপাবাজি, ভিত্তিহীন কথা।

কারণ, প্রথম কথা ভারতীয় সৈন্য প্রায় স্থায়ীভাবে ভুটানে এখনো আছে। আর ভুটানের অপর পাড়ে চীনের সীমান্ত শুরু হবার আগে  পর্যন্ত সেটা ভুটানের আর ভুটানের যেহেতু অতএব তা, যেন ভারতেরই ভূমি ও সীমান্ত – এমন চিন্তার অভ্যাস ও বিশ্বাস জন্মে গেছে ভারতের। ঘটনা হল – সীমান্ত নিয়ে বিতর্ক কলোনির সেকাল থেকে যখন কলোনি শাসক ব্রিটিশ, চীনের সেকালের রাজারা আর নেপাল-ভুটানের করদ রাজা – এদেরই রাজ্য-সাম্রাজ্যের অমীমাসিত সীমানা। এদের পারস্পরিক সীমান্তের বহু অংশ সেকাল থেকেই বিতর্কিত ছিল, যা ভিন্ন ভিন্ন দাবির সীমানা হয়েই তখন থেকে এখনো রয়ে গেছে। চীন-ভারত সীমান্তের বিতর্ক এমনই উদাহরণ। তেমনিভাবে, চীন-ভুটানের এমন বিতর্কিত সীমান্ত একালে চীন ও ভুটান পরস্পর এক অংশের দাবি ত্যাগ করে অপর অংশ পেয়ে নিয়ে তারা আপস মিটানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। আয়তনের দিক থেকে সেখানে চীন ভুটানকে বেশি এলাকা দিয়ে দিতে চায়। কারণ ভুটান থেকে পাওয়া ভূমির কৌশলগত মূল্য চীনের কাছে বেশি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে চীন-ভুটানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক এখনো নাই; বড়ভাই ভারত আইনি বাধা না দিতে পারলেও সে অখুশি হবে, তার অস্বস্তি হবে এগুলো চিন্তা করে ভুটান এই সম্পর্ক করতে আগাতে পারে নাই।
তাসত্বেও চীনের ভাইস পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত জুলাইয়ে ভুটান সফর করে গেছেন। এছাড়া তৃতীয় দেশে চীন-ভুটান পরস্পরের কূটনৈতিক অফিস তারা ভিজিট করে থাকে। এমনকি ভারতে চীন-ভুটান পরস্পরের কূটনৈতিক অফিস নিয়মিত ভিজিট করে থাকেন। বিশেষ কারণ, দিল্লিতে চীনের এমবেসি ভুটানেরও প্রক্সি এমবেসি বা কুটনৈতিক অফিস হিশাবে কাজ করে থাকে। এই বিষয়গুলো চীন-ভূটান যোগাযোগ ও নানান স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে এক বিরাট বাধা। এসব কারণ সবাই শেরিংয়ের হবু সরকারের আমলে এ বাধা অপসারণ হবে এটা সংশ্লিষ্ট সবার প্রধান এজেন্ডা ও প্রবল কামনা। মনোজ যোশি লিখছেন, “ডোকলাম যেটা চীনের দাবি করা, কিন্তু দৃশ্যত ভুটানের জায়গা”। [Doklam, which was ostensibly about Bhutanese territory claimed by China, did not figure in the elections.] কিন্তু ডোকলামকে ভুটান কেন নির্বাচনে ইস্যু করেনি এই তাঁর আপত্তি বা অবজারভেশন। যোশি এখানে প্রকারন্তরে স্বীকার করছেন ডোকলাম ভারতের নয়। ফলে তা চীনের হোক কিংবা ভুটানের তাতে ভারতের কী? এর কোন জবাব যোশি কথায় পাওয়া যায় না। অথচ “ডোকলাম ভুটানের” ভারতের এই ভুয়া অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে সৈন্য হাঁকিয়েছিল ভারতই। আর তাতে তো ভারত নিজের জন্য তা সমস্যা সৃষ্টি করেছিল। পরে ডোকলাম ভুটান-চীনের ইস্যু – এটা স্বীকার করে সৈন্য প্রত্যাহারের ফলেই ভারতের ইজ্জত বেচেছিল। তাই এখন সেসময়ে “ভুটানে পিডিপির দলের সরকার ছিল বলে” ভারত ডোকলাম সমস্যা সহজে মিটাতে পেরেছিল, এ কথা ভিত্তিহীন, মুখরক্ষার কথা। বরং সেসময়ে ভুটান ভারতের ওপর প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে একেবারেই নিশ্চুপ নির্বাক ছিল। অনাহূত ভারত সেসময়ে “ভুটানের ডোকলাম রক্ষার নামে”  চীনকে বাধা দিতে গেছে, এটা ভুটান একেবারেই পছন্দ করেনি।
আসলে তখন থেকেই ভারত বুঝেছিল দিন বদলে যাচ্ছে। এটা আর আগের ভুটান নয়। ‘বৌদ্ধ নিশ্চুপতা’ এক বিরাট শক্তি। দুর্বলের “নির্বাক থাকা” সময়ে এক বিশাল শক্তি হয়ে উঠে। এটা ভারত দ্রুত বুঝলেই তার জন্য ভাল। কেন?

কারণ, “ভুটান ভারতের যেন কলোনি। যেন ভুটানের মালিক অথবা মা-বাবা সে।” এই ভুয়া অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে ভারতের ছড়ি ঘুরানো আর কত? জনসচেতনতা, ক্ষোভের কারণে তা এখন ক্রমেই অসম্ভব হয়ে উঠছে। এটাই মূল ইস্যু হলেও ভারত খোড়া যুক্তিতে হয়ত বলতে চাইবে, আমার ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ কোনো যুদ্ধাবস্থার সময় চীন দখল নিতে পারে। হা, হয়তো পারে। কিন্তু সে কারণে ভুটানকে ভারতের কলোনি (১৯৪৯ সালের চুক্তি) হয়ে থাকতে হবে, কেন? এটাই কি ভারত বলতে চাইছে? চাইলে খুলে বলুক! এ কারণেই কি ভুটান-চীন কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে পারবে না? আসলে ডোকলাম ভূটানের নির্বাচনি ইস্যু কেন হতে হবে? ভারত চাইলে সে নিজেই এটাকে ভারতের নির্বাচনী ইস্যু বানাক!

আবার বলা হচ্ছে, হবু-ক্ষমতাসীন বিজয়ী ডিএনটি দল খুবই বোকা। যোশি বলতে চাইছেন। কারণ, “তাদের নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে কোনো ফরেন পলিসির চ্যাপ্টার ছিল না”। [The DNT had no section on external affairs in its manifesto.] ফলে “চীন-ভারত বা ডোকলাম ইস্যুতে দলগুলার কোনো বক্তব্য রাখার সুযোগ ছিল না। অবশ্যই তা সত্যি। কিন্তু এনিয়ে, অন্ধের হস্তি দেখার মত কেউ বলছেন, DNT এই দলটা আসলে নাকি রাজার অনুগত দল। তাই তাদের বিদেশনীতি নেই। ওরা নাকি অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে, অর্থনীতির উন্নতি নিয়ে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছড়িয়ে দিতে চায় ইত্যাদি নিয়েই কেবল নির্বাচনে ব্যস্ত ছিল। ভারতের ইমেরিটাস প্রফেসর এস ডি মুনি তারও [হংকংয়ের scmp পত্রিকায়] এক আর্টিকেলে এমনটা দাবি করা হয়েছে। বলছেন, Foreign and security policy issues were left out। তিনি বলছেন, “ধনী-গরীবের সম্পদের গ্যাপ কমাতে হবে” এমন অর্থনৈতিক শ্লোগান দিয়ে ডিএনটি দলের শেরিং নির্বাচন করেছেন। হা অবশ্যই, দৃশ্যত একথা সত্য। কিন্তু তবু তারা সবটা দেখতে পায়নি অথবা দেখেও ভিন্ন কথা বলছেন।কেন? একথার মানে কী?

ব্যাপার হল, সামরিক ক্ষমতাই একমাত্র ক্ষমতা নয়। যারা সামরিক অথবা লোকবলের দিক থেকে দুর্বল তাদেরকে অন্য যেকোন কিছু যেমন “চার চোখের ক্ষমতা” বা “বুদ্ধি খাটিতে” চলতে হয়। ২০০৭ সালে ভুটানের পশ্চিমা শিক্ষিত রাজা বুঝে গিয়েছিলেন ভুটানকে ভারতের হাত থেকে টিকানো ও বাঁচানো জন্য অন্য রাস্তা ধরতে হবে। “রাজকীয়” রাষ্ট্র কাঠামো দিয়ে আট লাখ জনগণের রাষ্ট্র ভারতের হাত থেকে বাচানো কঠিন। তাই তিনি  যেচে রাজার শাসন বা মনার্কিজম ছেড়ে নিজেই সোজা ভুটানকে রিপাবলিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেন। এক কথায় বললে, ক্ষমতায় জনগণকে সংশ্লিষ্ট করা, জনগণের ভেতর দিয়ে এক গণক্ষমতা তৈরি করা। এগুলোই একটি রাষ্ট্রকে টিকাতে পারে। ভারতের কলোনি চক্ষুকে উপেক্ষা করতে পারে। জনগণ নিজের রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষক নিজেই হতে পারে।  ছোট আট লাখ জনসংখ্যার রাষ্ট্রে এটা এক উপযুক্ত ও বিরাট অগ্র-পদক্ষেপ ছিল।

খেয়াল করলে আমরাও সকলেই জানব যে, ভারতের কৌশল হল পড়শি দেশে এক বা একাধিক রাজনৈতিক দলকে নিজের ভাঁড় বানানো। ক্ষমতায় রাখার নামে ঐ দল বা ব্যক্তিকে ভারতের দালাল বানানো, পুতুল বানানো। গত ২০১৩ সালে ভারতের ভর্তুকি উঠানো থেকে ভুটান এ বিষয়ে শিক্ষা নিয়েছে। ভুটানে রাজার প্রভাব এখনো অনেক। রাজা এখন রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনাল প্রধানও বটে।  তিনি ভারতের কৌশল অকেজো করে দিয়েছেন। সে কারণে এই নির্বাচনে কোনো বিদেশনীতি বিশেষত ভারত অথবা চীন সম্পর্কিত ইস্যু নিয়ে তর্ক-বিতর্ক তোলা যাবে না – এই নীতিতে সকল দলকে আসতে রাজি করিয়েছেন। এটাই এখন নির্বাচনী আইন এবং এটা কেউ ভঙ্গ করলে নির্বাচন কমিশন জরিমানা করতে পারবে, এই নিয়ম জারি করেছে। [গত নির্বাচনে দুটা দলকে ২০০ ডলার করে ফাইন-ও করেছিল কমিশন।]  আর আসলে ওদিকে রাজার মধ্যস্থতা বা সভাপতিত্বে চীন-ভারত বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মিলে একটা অভিন্ন অবস্থান তৈরি করবে, যেটা ক্ষমতাসীন দল সে অনুযায়ী চলবে, এই হলো সেই কৌশল। অর্থাৎ চীন-ভারত ইস্যুতে পপুলার প্রপাগান্ডা চলবে না। কেবল সুনির্দিষ্ট ফোরামে বসে সিরিয়াস তর্কবিতর্ক করতে হবে। আর এতে এক বড় লক্ষ্য হল ভারত যেন কোনো একটা দলকে তার দালাল বা পুতুল বানাতে যাতে না পারে। ফলে এই অর্থে এখন সব দলই দৃশ্যত “রাজার অনুগত”।  নতুন হবু প্রধানমন্ত্রী শেরিং বলছেন, বিদেশ নীতি প্রসঙ্গ নিয়ে তারা না, রাজা বলবেন। অতএব অচিরেই, হবু ক্ষমতাসীন ডিএনটি দলই চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনসহ ভারতের কলোনি নিগড় ছিন্ন করে ভুটান বিদেশনীতি সাজাচ্ছে – খুব সম্ভবত এটাই দেখব আমরা।

এছাড়া ওদিকে লক্ষ্য করলে দেখব, আসলেই কী হবু প্রধানমন্ত্রী শেরিং কেবল অর্থনৈতিক ইস্যুতে নির্বাচন করলেন? শেরিংয়ের দল  ডিএনটি বলছে, ভুটানের অর্থনীতি অতিমাত্রায় পানিবিদ্যুৎ উতপাদন ও বেচাকেন্দ্রিক। বৈদেশিক ঋণের ৮০% এর কারণ এই অব্যবস্থাপনার পানিবিদ্যুত। ভূটানে এটা বদলাতে হবে। নতুন বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ বের করতে হবে। এর অর্থ – ভারতের নিয়ন্ত্রিত এই পানিবিদ্যুৎ আর সীমিত বিনিয়োগের ও বৈচিত্রহীন বিনিয়োগের ভারতীয় খাঁচা থেকে ভুটানকে বের হতে হবে। তাহলে এখন এটা কি আর অভ্যন্তরীণ নীতির নির্বাচন থাকল?

এসবের কিছু খবর অন্তত ‘হিন্দুস্তান টাইমস’ পেয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। ভারত সরকারকে কড়া সাবধান করে তার এক সম্পাদকীয় ছাপিয়েছে,  আগ্রহীরা পড়ে দেখতে পারেন। ওর শিরোনাম হল – “ভারতকে ভুটানের আকাঙ্খার সাথে নিজের কৌশলগত স্বার্থ ভারসাম্যপূর্ণ করে গড়তে হবে”। এসব ব্যাপার, এগুলো কিসের লক্ষণ? এরা বলতে চাচ্ছেন, ভুটান-চীনের কূটনৈতিকসহ সব সম্পর্ক হওয়া একেবারে নেপালের মত ভারতের বিকল্প চীনের ভিতর দিয়ে ট্রানজিট পাওয়া পর্যন্ত আরও কিছু হওয়া ঠেকানো আর অসম্ভব। আর একভাবে বললে, এএফপির ভুটানিজ তরুণদের মনোভাব নিয়ে রিপোর্ট যেটা হংকংয়ের scmp পত্রিকায় ছাপা হয়েছে এটারই স্বপক্ষে ভারতের অধ্যাপক এস ডি মুনি র লেখা সেটাও হংকংয়ের scmp পত্রিকায় ছাপানো ছিল পালটা, তবে ইতিবাচক জবাব। প্রফেসর মুনি লিখছেন, “এটা বিশ্বাস না করার কারণ নাই যে আগামিতে চীন-ভূটানের কূটনৈতিক সম্পর্ক হওয়া ভারত কাছে অগ্রহণীয় হবে, যদি নিরাপত্তা, শান্তি ও ইতিবাচক ব্যবসার পরিবেশ বজায় রাখার বিষয়ে ভারতের কোর স্বার্থকে তা ক্ষতিগ্রস্থ না করে”। [There is no reason to believe India would not accept Bhutan’s establishment of diplomatic relations with China in future if its core interests of preserving security, peace and a positive business climate are not disturbed.] অর্থাৎ শর্ত সাপেক্ষে [খুব সম্ভবত শিলিগুড়ি করিডোর মাথায় রেখে] তিনি রাজি হচ্ছেন। তবে একটা মজার দিক হল দুটো রিপোর্টেরই শিরোনামে বলতে চাইছে ভারতের কপাল পুরেছে, ভারতকে আগের অবস্থানে ছাড় দিতে হবে। যেমন এএফপি লিখছে “at the expense of rival India”। আর কমিউনিস্ট প্রফেসর মুনি অহেতুক ন্যাশনালিস্ট হয়ে লিখছেন, “with India’s blessing”। মানে বলতে চাচ্ছেন যে, “মহান দাতা ভারতের আশীর্বাদ” পেলে পরে, চীন-ভুটান মিলতে পারবে।  মানে একজন খই খাচ্ছিল, তার কিছু খই বাতাসে উড়ে গেলে সেটা ঠাকুর গোবিন্দের নামে দান করে দেয়া হল বলে চালিয়ে দেয়া।

একটা তথ্য দিয়ে শেষ করা যাক। সার্ক (BBIN) Motor Vehicles Agreement চুক্তি বলে একটা বিষয় ছিল যেটার সারকথা হল, পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে সার্ক দেশগুলোর মধ্যে একই মটরযান নিয়ে ভ্রমণের চুক্তি। সেই সময়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ভুটানের পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তে নিজেকে তারা ঐ চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিল। কারণ বলা হয়েছিল, প্রচুর যানবাহনের হাঙ্গামায় শান্ত বৌদ্ধ ভুটানিজ ধ্যানে বাধাগ্রস্থ হতে পারে একারণে আর তাদের অত যানবাহন সামলানোর মত অবকাঠামো নাই বলে। খেয়াল করতে হবে সেটা সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল না। কিন্তু পার্লামেন্টের। মানে বিরোধীদের বাধা, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ছিল তাই সরকার পিছু হটে ছিল। কিন্তু এর পিছনের আসল কারণ এখন বলা হচ্ছে।  বিরোধীরা তারাই আসলে ঐ সময় থেকেই ভারতের বিরুদ্ধে তারা সংগঠিত হতে শুরু করেছিল এবং এরই প্রথম বিজয়ী পদক্ষেপ ছিল সেটা। সব ব্যাপারে “ভারতের অনুমতি নিতে হয়”  – এই অনুমতিদানের ভারত একে প্রতিহত করে স্বাধীন ইচ্ছার সিদ্ধান্তের ভুটান, এর কায়েমই ছিল তাদের কমন লক্ষ্য।

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ভুটানে সব ভারতের হাতছূটে চলে যাচ্ছে, এটা আমল হওয়া শুরু হয়েছে।
ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি সুজন হয়, একমাত্র তবেই এর বিপদ বুঝবে।

এদিকে মাত্র আট লাখ জনসংখ্যার ভুটান যদি নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করতে পারে, আমাদের মধ্যে কী কেউ কেউ নিশ্চয় বুদ্ধিমান হবেন, এমন পাওয়া যাবে না!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৭ অক্টোবর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভুটানের বুদ্ধিমান রাজা  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

গৌতম দাস

২ জুন ২০১৮, ০০:০৩, শনিবার

https://wp.me/p1sCvy-2rS

 

 


Illustration: Ajit Ninan, Times of India – মোদীও সওয়ার হওয়ার কথা ভাবছেন!

 

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের পয়লা টার্গেট ছিল চীন, তবে সেই সাথে দ্বিতীয় বা সহ-টার্গেট ছিল ভারতও। এই নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমেরিকা হয়ে পড়ে একা। অন্যদিকে, এই নতুন পরিস্থিতি চীন-ভারতকে কাছাকাছি এনে ফেলেছে। উল্টো করে বলা যায়, আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতির খেদমতে ও সমর্থনে ভারতেরও আর আমেরিকান ঐ নীতি পো-ধরে আগিয়ে চলার  বাস্তবতা লোপ পায়। ফলে মোদী ও ভারতের চীন নীতিও আমূল বদলে যাচ্ছে। আগে যতই উসকানিমূলক অবস্থান থাকুক না কেন, ভারত এবার থুক্কু বলে সব ভুলে চীনের সাথে সহযোগী সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবেই ২৭ এপ্রিল মোদির চীন যাত্রা ঘটেছিল। চীনে মাওয়ের অবসর যাপনের শহর য়ুহানে (Wuhan), চীন-ভারত “ইনফরমাল শীর্ষ সামিট” বা মোদী-জিনপিং এই দুই শীর্ষ রাষ্ট্র নির্বাহীর অনানুষ্ঠানিক কিন্তু ওজনদার ও গুরুত্বপূর্ণ আলাপের শুরু হয় সেখান থেকে।

ট্রাম্পের আমেরিকা হল এখন এক ‘একাকী আমেরিকা’ হতে রওনা দিয়েছে। এই অবস্থায় মানে “এন্টি গ্লোবাইজেশন” আর “সবার আগে আমেরিকা” এ দুই নীতিতে চলে যাওয়ার পর চাইলেও আর ভারতের পক্ষে আমেরিকার কোলে বসে আর কোনো কৌশলগত বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগের মতো চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া উদীয়মান ভারতের অর্থনীতির প্রবল ও বিপুল বিনিয়োগ চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও দেখা গেল, আমেরিকা এক্ষেত্রে ভারতের জন্য দরকারি কেউই না। অথচ চীন-ভারত সম্পর্ককে মোদী সংঘাতময় করে ফেলে রাখা সত্ত্বেও চীনই ছিল ভারতের জন্য একমাত্র উপযুক্ত বিনিয়োগদাতা। ফলে য়ুহান সম্মেলনে অন্তত ভারতের বিনিয়োগ সম্পর্কের দিক বা বিনিয়োগ প্রয়োজনের গুরুত্ব মোদি ভালোভাবেই বুঝেছিলেন।

গত ২৭ এপ্রিল ভারত ত্যাগের আগে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, এই সম্মেলন থেকে ‘চীন-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জোরদার করা’ তার বিশেষ লক্ষ্য। [“Modi stresses on strengthening economic ties]

আগামী বছর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা ক্ষমতার নির্বাচন। ফলে ক্ষমতার আকাঙ্খী বিরোধী অপর দল কংগ্রেসে এবার মা সোনিয়া গান্ধী ছেলে রাহুল গান্ধীকে দলের নতুন নেতা করে নামিয়েছেন। রাহুলও তৎপর হয়ে প্রায় প্রত্যেক ইস্যুতেই প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আক্রমণ ও সমালোচনা করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে চলেছেন। ফলে মোদীর য়ুহান যাত্রার আগেও ব্যতিক্রম করেননি। কিন্তু হায়! গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অভিমুখ সম্পর্কে রাহুল গান্ধীর মত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্ভবত যথেষ্ট সচেতন হন নাই, হোমওয়ার্ক করেন না – এমন আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করলেন রাহুল এক টুইট বার্তা দিয়ে। য়ুহান যাত্রার প্রাক্কালে তিনি মোদীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে লিখলেন – তিনি যেন “ডোকলাম ইস্যু” ও “চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তির” কথা তুলে ধরতে ভুলে না যান।

এর সোজা অর্থ মোদি-জিনপিং শীর্ষ বৈঠকের পিছনের কথা বা ব্যাকগ্রাউন্ড এবং গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে এই সম্মেলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং ভারতের অর্থনীতির জন্য তা কেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ আশীর্বাদ হয়ে আসবে সেসব সম্পর্কে একেবারেই বেখবর রাহুল। প্রথমত, মোদির কাছে বা ভারতের দিক থেকে এই সফর হল বিগত দুই বছরে চীন-ভারতের সম্পর্ক যে সঙ্ঘাত ও বৈরিতার পথে চলে গিয়েছিল, তা ছেড়ে পারস্পরিক সহযোগিতার পথে উঠে আসার জন্য ভারতের সুযোগ নেয়ার সফর। ফলে এই সফর থেকে ভুটানের ডোকলাম সীমান্ত নিয়ে নতুন করে সঙ্ঘাত তুলে আনা কোনোভাবেই মোদির বা ভারতের লক্ষ্য নয়। বরং ডোকলামের সঙ্ঘাত যা মূলত ডেড ইস্যু যা মোদী শেষে সফলভাবে চাপা দিতে পেরেছিল; চীনের সাথে কোনো বড় সঙ্ঘাতের দিকে তা চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল, এটাই মোদীর বিরাট অর্জন ছিল। ফলে ডোকলাম ভারতের কাছে, অন্তত মোদীর জন্য কোন অমীমাংসিত ইস্যু নয়, ভালভাবে ও কমপক্ষে আপাত হলেও মীমাংসিত ইস্যু। অথচ রাহুল মোদীকে ডোকলাম ইস্যুতে চীনের সাথে আলাপ তুলে পুরান ঘা খোঁচাখুচি করতে মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

[Congress president Rahul Gandhi said the PM looked tense in the live TV feed of the China visit. “Saw the live TV feed of your “No Agenda” China visit. You look tense! A quick reminder: 1. Doklam. 2. China Pakistan Economic Corridor passes through PoK. That’s Indian territory. India wants to hear you talk about these crucial issues. You have our support,” Rahul Gandhi said on Twitter.]

রাহুল দ্বিতীয় প্রসঙ্গ তুলছেন, চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তি নিয়ে। এই দাবিও অপ্রাসঙ্গিক। মোদী য়ুহান সামিটে যাচ্ছেন মূলত চীন-ভারত সামগ্রিক অর্থে অর্থনৈতিক ও বিশেষ করে বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে এর ভিত্তিমূলক আলাপ করতে। বোঝা যাচ্ছে, এর খবর রাহুলের কাছে নেই। মোদীর এই উদ্যোগ সরকার বিরোধী নেতা বলে রাহুলের তো তা ভন্ডুল করে দেয়া বা বেখবর থাকা কোন দায়ীত্ববান লোকের কাজ না।  অথচ তিনি ভেবেছেন যেন মোদী চীন যাচ্ছেন চীন-ভারত সীমান্ত বিতর্কে কোনো অমীমাংসিত ইস্যুতে ভারতের স্বার্থ আদায় করতে। দেখা যাচ্ছে রাহুল তো ইস্যুই বুঝেন নাই!

আসলে চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এক বিনিয়োগ প্রকল্প। এটা মূলত চীনের নিজের স্বার্থের অবকাঠামো প্রকল্প। পশ্চিম বা দক্ষিণ-পশ্চিম চীন যেটা পাহাড় পর্বতমালায় পুরোপুরি ল্যান্ডলক্ড অবস্থায়; সেই অঞ্চলকে  গভীর সমুদ্রবন্দরে প্রবেশসহ সব আবদ্ধতা ভেঙে ফেলে উন্মুক্ত করার অবকাঠামো প্রকল্প। এটা পাকিস্তানের উত্তর-দক্ষিণ বরাবর পুরা পাকিস্তানের বুকচিরে চলা এক হাইওয়ে যোগাযোগব্যবস্থা, যার একদিকে গভীর সমুদ্র বন্দর গোয়াদর আর অন্য প্রান্তে শেষে এটা চীনের অবরুদ্ধ পশ্চিম চীনের ভেতরে পর্যন্ত ঢুকে গেছে। এ ছাড়া এটাই চীনের ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিআরআই (BRI) এর অংশ; যা দুনিয়ার ৬৫টি রাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে এমন অবকাঠামো প্রকল্প।

ভারত এই প্রকল্পে অংশ নিতে চায় না – একথা বলে ভারত এখন নিজের দাম বাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টার মোডে আছে; এই স্তরে আছে। এরই অজুহাত হিসেবে ভারত এখন এক নন-সিরিয়াস অভিযোগ তুলে রেখেছে যে এই করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে গেছে। আর ভারতের চোখে কাশ্মীর এক বিতর্কিত ভূমি এবং দাবি যে কাশ্মীর পুরোটাই ভারতের। ফলে এই সুত্র এটা ভারতের সার্বভৌমত্বের রক্ষার প্রশ্ন। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এই আপত্তি তুলে রেখেছে সত্য কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার মনের আসল ইচ্ছা হল, ভারতকে বিআরআই (BRI) প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে চীন ভারতকে আরো কী কী ছাড় ও সুবিধা দেয় তার দরকষাকষি করা। এ ব্যাপারে চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন অশোক কান্থা; তিনি অবসরে যাওয়ার পরে গণমাধ্যমে নিজেই এক বয়ান দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্ষমতাবান ‘ক্রমবর্ধমান ধেয়ে আসা চীনের প্রভাব’ মোকাবেলা করাই হলো ‘ভারতের কূটনীতির জন্য আগামীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’। আর এই কাজে চীনকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দিতেই ভারত বিআরআই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত না হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। [……”how to deal with an increasingly assertive China… in an uncertain, fluid international environment, this is going to be possibly the biggest challenge in India’s foreign policy in years to come,” ]

তিনি মূলত বলেছিলেন BRI/OBOR প্রকল্পে যোগ দিলে ভারত চীনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে যাবে। তাই ভারতের যোগদানের সম্ভাবনা নাই। [……joining OBOR, which is going to have strategic agenda for China, as a junior partner is highly unlikely for India. It might work for smaller countries, but for India it is a difficult proposition,”]

এই কথাগুলো কান্থাসহ প্রো-আমেরিকান ধারার আমলারা যখন বলছিলেন, ভারত আমেরিকায় ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি নিজ ভর্তুকির পণ্য রফতানির সুযোগ তখনও বজায় ছিল। বিনিময়ে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতি নিজেরও নীতি, ভারতকে এটা আমল করে নিজ মুকুটে পালক হিসেবে লাগিয়ে রাখতে হয়েছিল। অশোক কান্থাসহ আমলাদের এই আমেরিকান ধারা এখন পরাজিত বলেই গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে চীন-ভারত য়ুহান সম্মেলন হতে পেরেছিল। বোঝা যাচ্ছে কংগ্রেসের রাহুল একেবারেই এতই নাদান যে বাস্তবের এসব ঘটনার কোনো ন্যূনতম তথ্যও তার কাছে নেই। তাই তিনি চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের সার্বভৌমত্বের আপত্তি নিয়ে কথা বলতে মোদীকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। যেন মোদী চীন সফরে যাচ্ছিলেন, পাকিস্তান অংশের কাশ্মীরে ভারতের নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই করতে।

ভারতের আরেক রাজনীতিক কাপিল সিবাল। তারও দল হল, সোনিয়া-রাহুলের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। মূলত তিনি দিল্লির চাঁদনী চক নির্বাচনী এলাকা থেকে সাধারণত নির্বাচনে দাঁড়ান। কিন্তু গত ২০১৪ সালের কেন্দ্র-নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে দাড়িয়ে হেরে গিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি ভারতীয় সংসদের দ্বিতীয় কক্ষ, রাজ্যসভার সদস্য। পেশাগতভাবে তার মূল পরিচয় মূলত তিনি হলেন দিল্লি সুপ্রিম কোর্টের উকিল, যিনি দিল্লি বার অ্যাসোসিয়েশনের তিনবারের সভাপতি। বিগত কংগ্রেস সরকারের দুই টার্মের তিনি অনেক মন্ত্রণালয়ের যেমন আইনমন্ত্রী, টেলিকমমন্ত্রী, মানবসম্পদমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। তাকে কংগ্রেসের সিনিয়র রাজনীতিবিদদের একজন মানা হয়।
কাপিল গত ২১ মে টাইমস অব ইন্ডিয়া নিজের এক মতামত ছেপেছেন। এটা ছিল টাইমস অব ইন্ডিয়ার ব্লগে কাপিল সিবালের লেখা। এই লেখাটাকে পড়া যেত হয়ত রাহুল গান্ধীর তথ্য ও চিন্তার খামতি পূরণের একটা উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু তা যায়নি এ জন্য যে, এটা কাপিল সিবালের ব্যক্তিগত মতামত বলে উল্লেখ করেই ছাপা হয়েছে।

কাপিলের এই লেখা বরং মোদিকে সার্টিফিকেট দেয়া বা এগিয়ে যেতে বাহবা দেয়া বলে মনে করা যায়। যেমন শিরোনামটাই তেমন বিনয়ের যদিও তা খোঁচা দেয়ারও। [Modi gets real on China: Wuhan summit demonstrated that a weak economy gives India few cards to deal]

এতদিন আমেরিকার কথায় নেচে ফাঁপা হামবড়া দেখানো যে ভুল ছিল কাপিল তা স্বীকার করছেন। কিন্তু স্বীকার করেও এর দায় কেবল মোদীর ওপর ফেলতে চাচ্ছেন। বাংলায় কাপিলের লেখার শিরোনামটা হল, “আসল চীনের সামনে মোদী এখন বুঝছেঃ য়ুহান সম্মেলন দেখাল নিজের দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে চীনকে মোকাবেলা করতে যাওয়া ভারতের হাতে কার্ড খুব কমই আছে”। মোদী এখন বুঝুক – টাইপের কাপিলের এই বয়ান পুরাপুরি অন্যায্য। যেন মোদী একাই আমেরিকার প্ররোচনায় চীনের সাথে মিথ্যা হামবড়া করে বা এমন হামবড়া দেখিয়ে চলেছিল। অথচ সোনিয়া-প্রণবের কংগ্রেসের আমলেও (২০০৪-১৪) চীন মোকাবেলার ক্ষেত্রে তারাও কি আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর উসকানিতে’ তাল দিয়ে একই মিথ্যা হামবড়া করে চলেনি? আর কাপিল কি সেই দুই টার্মের কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রী ছিলেন না? তাহলে একা মোদীকে দায় দেয়া কেন?

যা হোক কাপিল তার লেখায় এবার সোজা দেনা পাওনার আলাপে চলে এসেছেন। বলছেন, “বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, বার্মা, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা – এসব দেশে চীন প্রায় দেড় শ’ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভারতের অর্থনীতিতেও প্রধান সেক্টরগুলোতে চীন আমাদের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ করবে। আমাদের ১৮টা বড় শহরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে সব বিনিয়োগ চীনাদের”। ইত্যাদি সব কথাই আছে সেখানে।
কিন্তু এবার তিনি এক মজার আলাপ তুলেছেন।  চীনের বিরুদ্ধে কংগ্রেস সরকার যেসব অভিযোগ করত বা এখনো যেসব অভিযোগ, তিনি তার সব ফিরিয়ে নিচ্ছেন আর মোদীকেও তা ফিরিয়ে নিতে সুপারিশ করছেন। এটাই খুবই ইন্টারেস্টিং, স্রোত বদলের সরাসরি ইঙ্গিত।  “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে” – এই শিরোনাম দিয়ে তিনি এক তালিকা দিয়েছেন।

বলছেন, “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে”।
“চীন কখনো পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব ছাড়বে না। জাতিসঙ্ঘের উচ্চ আসনে চীনারা আমাদের প্রার্থিতা সমর্থন করবে না। [এই কাগুজে প্রার্থিতা  চীনের সমর্থন করার কোন কথা কোথায় হয় নাই। বুশ_ ওবামা দুজনের আশ্বাস দিয়েছিল। ] আবার নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে সদস্য হিসেবে ঐ সংগঠনে আমাদের অন্তর্ভুক্তি চীনারা মেনে নেবে না। আমাদের বাজারে চীনের প্রবেশাধিকার থাকলেও প্রতিদানে আইটি সেক্টরসহ তাদের বাজারে আমাদের তারা প্রতিদান দেবে না। যদিও চীনারা সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে আমাদের তৈরী ওষুধ চীনা বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। এরকম অনেক তালিকা আছে। কিন্তু এখানে মূল কথাটা হলো, নিজে মেনে নেয়া এবং সবাইকে মেনে নিতে সুপারিশ করা”।

আসলে ব্যাপার হল, এগুলো চীনের বিরুদ্ধে ঠিক ভারতের তোলা অভিযোগ নয়। বরং ভারতকে আমেরিকার দেয়া মিথ্যা আশ্বাসের তালিকা। যেমন জাতিসঙ্ঘ বা সাপ্লায়ার্স গ্রুপে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে দেবে, এই আলাপ ছিল ভারতকে দেয়া আমেরিকার মিথ্যা আশ্বাস।  আসলে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বও ছিল এতটাই নাদান যে, তারা এটা বিশ্বাস করেছিল। ধরে নিয়েছিল আ-মে-রি-কা; এই আমেরিকা চাইলে সবই যেন সে কাউকে দিতে পারে। তবে মূল কথা কাপিলের এসব বক্তব্য তাদের দলের নাদান সভাপতি রাহুলের বক্তব্যের চেয়ে অনেক বাস্তবে পা দিয়ে চলা – এমন কথা। অন্তত বক্তব্যের পটভূমি বুঝে তিনি কথা বলেছেন।

তবে এই প্রসঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশেষ করে আমাদের কাকাবাবু প্রণব মুখার্জির গ্লোবাল ইতিহাসবোধের উদাহরণ না তুলে ধরে পারছি না। বুশ এবং ওবামার আমলেও  (বিশেষ করে ২০০৯ সালে ওবামা ক্ষমতায় আসার পর) ভারতকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার সদস্যপদ ভারতকে এনে দেয়া হবে। আর প্রণব মুখার্জির মত নীতি নির্ধারকেরা তা বিশ্বাস করেছিল। এমনকী ভেটো ক্ষমতা পেলে সবার আগে পাবার সম্ভাবনা একালে মার্কেলের জার্মানী। সেই জর্মানি রাষ্ট্রও কেমন (P5+1) হয়ে ঝুলে আছে সেটাও লক্ষ্য করতে ভারত ভুলে গেছে। আর এর চেয়েও বড় কথা হল কেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে ভেটোক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাব করে, এর জন্ম দিতে হয়েছিল সে ইতিহাস জানলে যে কেউ বুঝবে কেন এখন পাঁচ ভেটো ক্ষমতাধর সদস্য একালে বাড়াতে যাবার সোজা মানে হল রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একক ক্ষমতাধর আমেরিকা এখন একালে আর  সেই ক্ষমতাধর নয় অথবা কখনই ফিরে আসবে না। ফলে রাষ্ট্রসংঘ পুনর্গঠনের মুরোদ আর আমেরিকার নাই। আগামিতে ঠিক কার বা কার কার এই মুরোদ হতে পারে সবটাই আবছা। এছাড়া “রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন” এর জন্য কী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটবার প্রয়োজনীয় পুর্বশর্তের মত এবারও একটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগবে, তাই কী! বিশেষত যখন আমেরিকার এক নম্বর ক্ষমতাধর জায়গা থেকে বিদায়ের আলামত চারিদিকে ফুটে উঠেছে। অথচ সেই ঢলে যাওয়া লোলচর্ম  আমেরিকার পকেটেই যেন গ্লোবাল ক্ষমতা ধরা আছে এই হল কাকাবাবুদের গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে রিডিং।

তবে আসল তামাশার কথা বলাটা এখনও বাকি। গত ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি শেষ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রথম ভারত সফর করেছিলেন। সেখানে হাসিনাকে দিয়ে পঞ্চাশেরও বেশি পয়েন্টে হাসিনাকে দিয়ে স্বাক্ষরিত এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল। ওর ৪৭ নম্বর দফা ছিল এরকমঃ

Responding to the Prime Minister of India, the Prime Minister of Bangladesh conveyed her country’s support in principle for India’s candidature for the permanent membership of the United Nations Security Council as and when the reform of the UN Security Council is achieved. Bangladesh conveyed its support to the Indian Candidature for a non-permanent seat in the UNSC for the term 2011-2012. India also conveyed its support to the Bangladesh’s candidature for a non-permanent seat in UNSC for the term 2016-2017.

অর্থাৎ ঐ ঘোষণার ৪৭ নম্বর পয়েন্ট ছিল এরকম, “বাংলাদেশ ভারতের ভেটো সদস্যপদের দাবি সমর্থন করছে”। মানে বাংলাদেশকে দিয়ে যা মনে চায় তাই স্বাক্ষর করে নেয়া যায় বলে কাকাবাবু এটাও ছাড়তে রাজি হয় নাই। তার কোন মুল্য থাক আর নাই থাক। যদি লাইগা যায়! আসল কথাটা হল রাষ্ট্রসংঘের ভেটো সদস্যপদ ভারত আমেরিকার কাছে আবদার করেছিল। অথচ এটা আমেরিকার কাছে আবদার করে পাবার জিনিষ নয়, আমেরিকাও তা একক ইচ্ছায় কাউকে দান করার কখনই কেউ নয়, কেউ ছিলও না। এটাই কাকাবাবুরা বুঝেন না!

এবার সবশেষে সুবীর ভৌমিকের দেয়া এক তথ্য। বিসিআইএম (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোর কথাটা গণমাধ্যমে অনেক দিন উচ্চারিত হয়নি। উচ্চারিত হওয়া বন্ধই হয়ে গিয়েছিল ভারতের আপত্তি, অনাগ্রহের কারণে। বিসিআইএম হল, বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার এই চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে লেখা নাম। এই নাম দেয়া হয়েছে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে এরপর বার্মার গুমদুম হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত এক অর্থনৈতিক করিডোর অবকাঠামো প্রকল্প, যার নাম বিসিআইএম (BCIM)। সুবীর বলছেন, “য়ুহানে মোদি-শি জিংপিংয়ের বৈঠকের একটা ইতিবাচক ফল মনে হচ্ছে আসন্ন হয়ে উঠেছে”। কলকাতায় চীনা দূতাবাসের এক কনসাল জেনারেল লেবেলের অফিস আছে। সেই কনসাল জেনারেল  (Ma Jhanwu ) মা ঝানয়ু-এর বরাত দিয়ে সুবীর জানাচ্ছেন, তিনি এক প্রেস কনফারেন্সে বলেছেন, বিসিআইএম প্রকল্প এখন শুরু হবে কারণ এ দুই শীর্ষ নেতা একমত হয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়া সামনে এগিয়ে নিতে হবে।’ [……”BCIM would take off now because the two leaders had agreed to take the process forward”. ]

খুবই তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি, যদিও খুবই কম তথ্য এটা সন্দেহ নেই। বিশেষ করে সড়ক ও রেল যোগাযোগের বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর ব্যবস্থা চালু হয়ত হয়ে যাবে কখনও। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর, যেটা ছিল বিসিআইএম প্রকল্পের সাথে সংযুক্ত, এক গভীর সমুদ্রবন্দর অবকাঠামো। এ ছাড়া আরেকটা দিক আছে। বন্দর সুবিধাসহ সব মিলিয়ে বিসিআইএম প্রকল্পও চীনা ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ একটা অংশ হওয়ার কথা। ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সুবিধা থাকার কথা, বিসিআইএম প্রকল্প তার একটি। তাহলে ভারত কি আস্তে ধীরে বেল্ট-রোড উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার পথে?

না এটা এখনই অতিরিক্ত আশা। যদিও তা কোনো দিন হবে হয়ত, এমন অনুমান করা অবাস্তব হবে না। তবে খুব সম্ভবত আমরা অনেক আগেই এবং বেশি দ্রুত তা অনুমান করছি। যদিও একটা বিষয় এখনই পরিষ্কার করে রাখা যায়।

য়ুহান সম্মেলনের কোনো ফলাফল যদি আসতে শুরু করে, তবে তা হবে সবার আগে শুরু হবে, ভারতের একান্ত নিজের জন্য নেয়া চীনা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো থেকে। চীন-ভারত সম্পর্ক সবার আগে এদিক দিয়ে উন্মুক্ত হবে। কিন্তু এর অর্থ বাংলাদেশেরও চীনা অবকাঠামো প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় বর্তমান যে আপত্তিগুলো আছে তা আপনাতেই সরে যাওয়া নয়। ভারতীয় কূটনীতিতে এ দুটো আলাদা বিষয়। বাংলাদেশে চীনা অবকাঠামো প্রকল্প ভারতের আপত্তি এখনও সক্রিয় আছে বলেই সম্ভবত এবার প্রধানমন্ত্রীর শান্তিনিকেতন সফরের সময়, কথিত ভারতের কাছ থেকে “প্রতিদান” পাওয়ার আলাপ উঠতে আমরা দেখেছি। সেই সাথে আমরা দেখেছি, কথিত “প্রতিদান” পাওয়ার জন্য সরকারের বেপরোয়া কাছাখোলা ও মরিয়া অবস্থা। যদিও এ ব্যাপারে আবার সরকারের সর্বশেষ অবস্থান হল, নিজের মরিয়া দুর্দশা সে আর বাইরে দেখাতে চাচ্ছে না। গত বুধবারের প্রেস কনফারেন্সে তাই বোধহয় একটু ইউ-টার্ণ। যদিও আগের দিন ২৮ মে সরকারি প্যানেল সাংবাদিক নেতাদের আলোচনা সভা ছিল অভুতপুর্ব, দেখার মত।  খুব সম্ভবত, প্রতিদান পাবার বেপরোয়া দেখালেও কোনো ফল আসবে না বা আসছে না, এমন হয়ত তাদের অনুমান।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩১ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিচ্ছে ভারত!”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

“পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” – সেই বিউগল বেজে গেছে

“পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” – সেই বিউগল বেজে গেছে

গৌতম দাস

০৩ এপ্রিল ২০১৮,  মঙ্গলবার, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2r9

কথা সত্য। চীন-ভারত সম্পর্ক আগে যেখানে যা অবস্থায় ছিল এর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে, ভারতের ভাষায় এটা রি-সেট (“reset”) হয়ে গেছে। মানে ‘ফির সে শুরু’ হয়ে গেছে। এটা হতে ১৬ বছর লাগল। তাই আজ কথা শেষের দিক থেকে শুরু করে বলব। প্রায় ষোলো বছর পর ভারত মেনে নিল যে এই অঞ্চলে চীনের ক্ষমতা ও প্রভাব ঠেকানোর সক্ষমতা ভারতের নেই। সে হার স্বীকার করে নিচ্ছে। তাই সে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করছে না, বরং মাঠ ছেড়ে যাচ্ছে। ভারত মালদ্বীপ থেকেও নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে চীন যেন ভারতের দিকটাও একটু খেয়াল রাখে। অর্থাৎ প্রকারান্তরে ভারত স্বীকার করে নিল যে, আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’ অথবা চীন ঠেকানো বৈদেশিক নীতির যে ঠিকা আমেরিকার কাছ থেকে ভারত এত দিন নিয়ে খেদমত দিয়ে গেছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত এখন তা পরিত্যাগ করছে, ক্ষেমা দিচ্ছে। ফলে চীন যেন ভারতকে এর প্রতিদান দেয় (“it is clear that Delhi expects Beijing to reciprocate”)।

‘পরাজয়ের সংবাদ বাহক’ যাকে এককথায় ভগ্নদূত বলে তা কেউ হতে চায় না। তাই ভারতের এই ‘মেনে নেয়ার’ ঘটনাটা ঘটেছে খুবই নীরবে। এমনকি তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে, আবার বেনামে তা স্বীকার করে নিয়ে, ঘোষণা ছাড়া সাংবাদিক ডেকে ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে, এভাবে। গত ২৮ মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটা বিশেষ রিপোর্ট হিসেবে এটা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে ‘এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে’ এটা বলেছে। Stepping back from Maldives, India tells China – এই শিরোনামে এই খবরটা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনলাইনে যে কেউ পড়ে নিতে পারেন।

সেখানে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঠিক কী বলেছে তা নিয়ে ওই রিপোর্টের অন্তত দুটি প্যারার কোটেড বক্তব্য আছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটা নিচে বাংলা অনুবাদ করা হল – “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংবেদনশীলতা ও বৈধতার সীমাবোধ (lines of legitimacy) সম্পর্কে তাদের জানাতে পারি। যদি এর পরেও তারা তা অতিক্রম করে তবে আমাদের পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা (strategic trust) নষ্ট করার দায় বেইজিংয়ের ওপর বর্তাবে”।

“India cannot claim sole proprietorship of the region. We can’t stop what the Chinese are doing, whether in the Maldives or in Nepal, but we can tell them about our sensitivities, our lines of legitimacy. If they cross it, the violation of this strategic trust will be upon Beijing,” the official said.

এখানে শেষের রঙিন বাক্যে রঙ দিয়েছি আমি। এই বক্তব্যের অর্থ ও ইঙ্গিতে খুবই করুণ ও অসহায়। ভারত যেন বলতে চাইছে, “এই দুনিয়ার লড়াইয়ে শক্তি আর মুরোদে আমরা হেরে গেছি, তবে পরকালে যেন বিচার হয় তেমন একটা বিচার দিছি”।’ এ ছাড়া দ্বিতীয় গুরুত্বপুর্ণ ভারতের কোটেড প্যারাগ্রাফের বক্তব্য হল এ রকমঃ – “যেদিন ভারত দেখেছে সে আর দক্ষিণ এশিয়াকে প্রভাবিত করে রাখতে ও চীনের মতো শক্তিকে  এখানে ক্ষমতার বিস্তার দেখাতে আসা বন্ধ করতে পারছে না সেদিন সে বুঝে গেছে এসব কিছু নিজের প্রভাববলয়ের বাইরে চলে গেছে”।

“The days when India believed that South Asia was its primary sphere of influence and that it could prevent other powers, such as China, from expanding its own clout are long gone,” a senior government official told The Indian Express. 

খুবই পরিস্কার ভাষায় বলা অক্ষম অসহায়ত্বের বক্তব্য। যদিও এতদিন এসব প্রসঙ্গে ভারত চাপাবাজি করে বলে রেড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়া তার প্রভাবাধীন এলাকা, এখানে চীন আসতে পারে না।

এ ছাড়া মালদ্বীপ নিয়ে খুবই পরিস্কার ভাষায় ভারতের আর এক তৃতীয় বক্তব্য আছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্টার দাবি করছেন, ওই সিনিয়র অফিসার তাকে বলেছেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলের গত ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি চীন সফরের সময় তিনি চীনকে জানিয়ে দিয়েছেন, “ভারত মালদ্বীপ থেকে সরে যাচ্ছে। ফলে মালদ্বীপে ভারতের  হস্তক্ষেপের কোনো সম্ভাবনা নেই”। আর এই বাক্যটাকেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তার রিপোর্টের শিরোনাম করেছে। On the Maldives, for example, the unusual overture to China was made by none other than Foreign Secretary Vijay Gokhale during his trip to Beijing in February,

অনুমান করা যায়, এখানে ভারতীয় এই স্বীকারোক্তির অ্যারেঞ্জমেন্ট করা হয়েছে এভাবে যে, সবার আগে এটা ‘সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল’-এভাবে পরিচয় লুকানো এক বরাতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস খবরটা ছাপবে। এরপর বাকি প্রায় সব লিডিং দৈনিকগুলো সবাই এবার তা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে ছাপবে। তাই-ই হয়েছে। তবে এভাবে এখানে ছাপা হওয়ার মধ্যে লক্ষণীয় দুটো দিক হল, কোনো মিডিয়াই কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট বা এর রেফারেন্সকে অস্বীকার অথবা অবিশ্বাস করেনি। এমনকি তারা এই খবরের সত্যতা যাচাই করতে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বা কোন মুখপা্ত্রকে জিজ্ঞাসা করতে যায়নি। এটাই খুবই  ইন্টারেস্টিং। এর অর্থ  হল বাকি সব পত্রিকা বরং নিজেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে এই খবর ছেপে বলতে চাইছে যে, তারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে এই খবর সত্য, তারাও ব্যাপারটা জানে। এ ছাড়া অন্যদিকে ভারত সরকারও মিডিয়াগুলোতে এই রিপোর্ট ছাপা হয়ে গেছে অথচ এই খবরকে অস্বীকার করে কোনো বিবৃতিও দেয়নি। এর অর্থ তারাও পরোক্ষে স্বীকার করছে যে হা এটাই তাদের বক্তব্য।

এদিকে আরেক ইংরেজি দৈনিক – ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’, সবার মতো সেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতের রিপোর্ট  ছেপেছিল । তবে সেটা ছাড়াও রয়টার্সের বরাতে সে পরের দিন আরেকটা রিপোর্ট করেছে। শিরোনাম ‘Dalai Lama faces cold shoulder as India looks to improve China ties”। এখানে বলতে চাওয়া হয়েছে দালাইলামাকে ‘শীতল কাঁধ দেখানোর’ কারণ ভারত বুঝিয়ে বলাতে তিনি ব্যাপারটাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন, মনে কোনো ক্ষোভ বা আকাঙ্খা নিয়ে দেখেননি। আসলে ঘটনা হল, বেচারা দালাইলামা তার সব কর্মসূচিতে ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা বাতিল করে দিয়েছে। আসলে এটা ছিল দালাইলামাদের চীনের বিরুদ্ধে ব্যর্থ বিদ্রোহের ৬০তম বার্ষিকী পালনের দিন। কিন্তু দিল্লীতে যত অনুষ্ঠান নেয়া হয়েছিল মোদী সব কিছুর পালনের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।  এমনকি ভারত তাদের থাকতে দিয়েছে এজন্য দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য  সরকারকে “ধন্যবাদ জানাবার কর্মসূচিও” বাতিল করে তা তিব্বতের ধর্মশালায় সরিয়ে নিতে দালাইলামাকে বাধ্য করা হয়েছে। আর সাথে মোদীর সরকারের সার্কুলার জারি করা হয়েছে যে কোনো মন্ত্রী বা সরকারি কর্মচারী যেন এদের সাথে কোনো সম্পর্ক না রাখে। কারণ চীন মনে করে, দালাইলামা চীনের জন্য খুবই বিপজ্জনক এক বিচ্ছিন্নতাবাদী। এককথায় বললে চীনকে খুশি করতে, রাখতে ভারত চরমতম মরিয়া অবস্থান নিয়েছে। গত ছাপান্ন বছরে এমন “চীন তোষামোদী” ভারত কেউ আগে দেখেনি। দালাইলামা সম্পর্কে  চীনের মূল্যায়ন ও মনোভাবকে পবিত্র আমানত জ্ঞান ও আমল করে আগলে রাখতে ভারত এখন ভীষণ ব্যস্ত। কিন্তু টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই রিপোর্টের সাথেও নাম প্রকাশ না করে আরও এক সোর্সের বরাতে টাইমস অব ইন্ডিয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছাপিয়েছে। প্রথমত সেখানে বলা হয়েছে, নাম গোপন রাখা এই সোর্স তিনি নাকি ভারতের চীননীতির সাথে সংশ্লিষ্ট কোন উচু ব্যক্তি। তিনি জানাচ্ছেন, “চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর করে নিয়ে এগিয়ে যেতে আমাদের আইডিয়া হল, ২০১৭ সাল পর্যন্ত যা যা ঘটে গেছে তা ভুলে গিয়ে পেছনে ফেলে রাখতে চাই আমরা”। “We are moving forward with this relationship, the idea is to put the events of 2017 behind us,” a government source involved in China policy said. অর্থাৎ আর পরিস্কার নিশ্চিত করা বক্তব্য আমরা এখানে পাচ্ছি।

তবে রিপোর্টে প্রত্যক্ষ সরকারি স্বীকৃতি এখনো না দিলেও ভারতের অপর পক্ষ চীন, মানে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের রেগুলার ব্রিফিং থেকেও এ বিষয়ে অনেক কিছুর স্বীকৃতি মিলছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে মুখপাত্রকে (Foreign Ministry Spokesman Lu Kang) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তাঁঁর সেই বয়ানে। “চীন কি সাম্প্রতিক ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের (দালাই লামার সাথে দূরত্ব তৈরিসহ) প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানায়?” – এই ছিল সেই প্রশ্ন, মুখপাত্র এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেলেন। মুখপাত্র  দালাই লামা শব্দটা এড়িয়ে উচ্চারণ না করে বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিত থেকে জবাবে দেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, তিনি বলেছেন, “সাম্প্রতিক কালে তাদের উভয় পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়ে বলেন, চীন-ভারত সম্পর্ক বাধাহীন গতিতে (‘সাউন্ড মোমেন্টাম’ বা ‘sound momentum’) বিকশিত হয়ে চলেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা এর সাফল্য দেখতে পাচ্ছি”।

আসলে আগামী জুন মাস পর্যন্ত চীন-ভারত তাদের বিভিন্ন মন্ত্রিপর্যায়ে (গড়ে সম্ভবত প্রতি মাসে প্রায় দু’টি করে) মিটিং আছে। আর সর্বশেষ জুন মাসে সাংহাই করপোরেশন সংস্থার (SCO, http://eng.sectsco.org/about_sco/) চীনে অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক সভার সাইড লাইনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাক্ষাৎ হবে।  আর আগামী মাসে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর চীন সফর দিয়ে বৈঠকগুলো শুরু হবে। এরপর আছে, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, বাণিজ্য ইত্যাদি।

আগামী জুন মাস পর্যন্ত তৎপরতায় ভারতের লক্ষ্য কী এ দিকে তাকিয়ে বললে এর এক কথায় জবাব হল, মুখ্যত চীনে ভারতের রফতানির বাজার লাভ করতে চায়। ভারত এত দিন চীনের সাথে সম্পর্ককে তিক্ত করে রেখেছিল, আমেরিকার চীন ঠেকানোর নীতি নিজের কাঁধে নিয়েছিল বলে। আর তা নিজের কাঁধে নিয়েছিল বিনিময়ে আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাজার পেয়েছিল বলে। কথাটা ভেঙ্গে সার কথাটা বললে, ভারতীয় পণ্য মূলত রফতানিতে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে একে আমেরিকার পণ্যের চেয়ে সস্তা ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে নেয়া ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের আগের দুই প্রেসিডেন্টের দুই দুই করে টার্মে (মোট ষোলো বছরে) সবসময় আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের ওপর রাজনৈতিক স্বার্থকে (চায়না কনটেইনমেন্ট) প্রাধান্য দিয়ে বিদেশনীতি সাজানো ছিল। তাই তখন ভারতকে ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নেশন’ ঘোষণা করে ভারতের ভর্তুকির রফতানিকেও অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তবে শর্ত ছিল যে ভারতের গড় মাথাপিছু আয় কেবল এক হাজার ডলার না হওয়া পর্যন্ত এই বিশেষ সুবিধা বজায় থাকবে। কিন্তু গত ২০১৫ সালে এই শর্ত পূরণ হয়ে গেলেও রফতানি সুবিধা ভারত পেয়ে চলছিল। মোটা দাগে বললে, ট্রাম্পের সাথে আগের দুই আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ভারত-বিষয়ক নীতির ভিন্নতা কী – এভাবে কথাটা তুললে তার জবাব হবে – ট্রাম্প আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের ওপর রাজনৈতিক স্বার্থকে আর কোনো প্রাধান্য না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি উল্টো ‘বাণিজ্য স্বার্থ সবার ওপরে সব ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে’ এই নীতিতে চলতে চাইছেন (যদিও কতটা পারবেন পারছেন সেটা অন্য কথা)। ঠিক এ কারণেই ভারতের “ট্রাম্প রিডিং” হল, ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের আর বাণিজ্য সুবিধা কিছুই পাওয়ার নেই। তাই ভারতের উল্টো দ্রুত চীনের দিকে ও কাছে যেতে পথ বদল ঘটেছে। আর বাণিজ্য সুবিধা এবার চীনের কাছ থেকে পাওয়ার আশায়, ভারত চীনের মন জোগাতে নিজের সর্বস্ব ঢেলে দেয়ার নীতি নিয়ে আগাচ্ছে। চীন-ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি  ৫০ বিলিয়ন ডলারের, (এখন চীনের ভারতে রফতানি ৬০ বিলিয়ন ডলার, ভারতের চীনে ১০ বিলিয়ন)। ভারতের লক্ষ্য চীন থেকে কমপক্ষে ৩০ বিলিয়নের রফতানি বাজার লাভ করা। মূলত কৃষিজাত পণ্য রফতানি ভারতের লক্ষ্য।

আমার লেখায় সবসময় বলে আসছি, চলতি আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির দুনিয়া ক্রমেই চীনের নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি হয়ে বদলে যাওয়ার অভিমুখী হয়ে আগাচ্ছে। এই বিচারে চীন হল ‘রাইজিং অর্থনীতি’ এই নতুন অভিমুখের নেতা, বিপরীতে আমেরিকার অর্থনীতি পড়তি দশার। আর এই পরিস্থিতিতে ভারতের ন্যাচারাল অবস্থান ও অভিমুখ হল – চীনের সাথে ও পক্ষে, আমেরিকার বিপক্ষে। আমেরিকা হল অতীত যেখানে চীন হল আগামি – এই সুত্রের মধ্যে ভারতের ভবিষ্যত হল চীনের সাথে মিলে নতুন করে গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক অর্ডার শৃঙ্খলা তৈরি।  কিন্তু এতদিন সে কাজ না করে ভারত রিভার্স খেলে বাড়তি নগদ সুবিধা যা পায় তা কুড়িয়ে নিচ্ছিল। যেন কোন বালক তার নির্ধারিত খেলাধুলার বাল্য বয়েস এক্সটেন্ডেড করে নিয়ে হাসিখেলা আর মজা করে কাটাচ্ছিল। সেটারই এবার পরিসমাপ্তি ঘটল, এভাবে বলা যায়। গ্লোবাল অর্থনীতিতে নতুন সিস্টেম নতুন ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রশ্নে ট্রাম্পের হাতে ও উদ্যোগে ভারত-আমেরিকার আর একসাথে কাজ করার দিন সম্ভবত এখান থেকে পরিসমাপ্তি লাভ করবে। বাস্তব শর্তগুলো (যেমন ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নেশন’ ঘোষণা) ট্রাম্পের হাতে চির নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার পথ নেবে। ওদিকে ভারতের ইচ্ছা ও আকাঙ্খা যে ভারতের আমেরিকায় হারানো রফতানি টার্গেট বা বাজার ঘাটতি যা হয়েছে তা চীন পূরণ করে দিক, চীনে রফতানির বাজার দিক। মূলত এজন্যই ভারতের চীনের সামনে মরিয়া ও হাটুগাড়া অবস্থায় নিজেকে উপস্থাপন।   চীনও খুব সম্ভবত কিছু বাজার দেবে, বিশেষত ভারতকে আমেরিকা থেকে আলাদা করার তাগিদ চীনেরও আছে। আর ভারত এতই মরিয়া যে, চীনের সামনে ‘নীলডাউন’ অবস্থা। তবে আপাতত সফররত চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী কোনো চুক্তি ছাড়া গতকাল ভারত সফর শেষ করে চীনে ফিরে গেছেন। তবে ভারতকে রফতানি বাজার দেয়ার ‘প্রমিজ’ করেছেন, ভারতের মিডিয়া বলছে। চীনের প্রমিজ বা ওয়াদা সত্যিকারের ওয়াদা, ভারত আস্থা রাখতে পারে, রাখবে। কিন্তু ভারতের কাল থেকেই যেন এটা পেতে চায়।

স্বাভাবিকভাবেই এখন ভারতকে মুখোমুখি হতে হবে চীনের “বেল্ট-রোড উদ্যোগ” (http://english.gov.cn/beltAndRoad/) – এই ইস্যুতে। সত্যি কথাটা হল, এবার সত্যিকার অবস্থানটা ভারতকে বলতে হবে। সম্ভবত আর ভ্যানিটি  বা মিছা লোক দেখানো অবস্থান আর নয় যে ভারত একনম্বর অর্থনীতি হতে যাচ্ছে এরকম নয়, বাস্তব সত্য অবস্থান অর্থাৎ তা প্রকাশ করার বিনিময়েই খুব সম্ভবত চীনের কাছ থেকে ভারতকে রফতানি বাজার সুবিধা পেতে হবে। কারণ ভারত নিজেই নিজের মিথ্যা ভ্যানিটি- ‘আমেরিকা আমার পিঠে হাত রেখেছে’, ‘মুই কী হনুরে’- এগুলো তার ভুয়া পরিচয়, ভারত নিজেই তা ভেঙে ফেলে এখন চীনের সামনে নীলডাউন। কাজেই ভুয়া মিথ্যা চাপাবাজির দিন শেষ। সত্যি কথাটা হল আজ শেখ হাসিনা ভোটের কথা চিন্যেতা করে যে উন্নয়ন বা “মধ্য আয়ের দেশের”  তর্ক  তুলেছেন ভারত সেই “লোয়ার মধ্য আয়ের দেশের” (“lower-middle-income” economy ) হয়েছে মাত্র ২০১৬ সালের জুনে। ভারতেরই এক মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, The World Bank has dropped the use of developing nation tag for India in its specialized reports and instead classifies it as a “lower-middle-income” economy in South Asia, a top official has said. ফলে সে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি এই হল বলে, অথবা চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগে যোগ দিলে সে “চীনের সাবরডিনেট বা অধস্থন অবস্থায় চলে যাবে” এসব কল্পিত গল্পের জগত ফেলে ভারতকে বাস্তবে নেমে আসতে হবে। কারণ বেসিক কথাটা হল, কোন  রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা জিনিষটা অবজেকটিভ। একে কেউ চাইলেই সাবজেকটিভলি দাবায় বা অস্বীকার করতে পারবে না। কাজেই স্বপ্নে পোলাও খাওয়া অথবা গল্প প্রচার একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।

তবে মিথ্যা ভ্যানিটি বা গর্বের কী দশা হয় এর এক আদর্শ ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। আমেরিকা বা চীনের মত থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান খুলে ভারতের স্বার্থ কী হতে পারে তার ষ্ট্রাট্রজিক বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা ও পরামর্শ তৈরি করার শখ ভারতেরও। কিন্তু এর খরচ?  ২০০৫ সালে বুশের প্রস্তাবে এর খরচের দায় আমেরিকা নিয়েছে। ভারতের ধারণা সে আমেরিকাকে মহাঠকিয়ে থিঙ্কট্যাঙ্ক চালানোর খরচ আমেরিকার উপর চাপিয়ে দিতে সফল হয়েছে। আপনার স্ত্রী-সন্তান মানে সংসার প্রতিপালনের খরচ অন্যের উপর চাপিয়ে নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে করতে পারেন আপনি। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন ঐ সংসার আর অচিরেই আপনার থাকবে না। ফলে থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো গজিয়েছে হয় ভারতে এনজিও রূপে যার ফান্ড করছে আমেরিকান কোন ফাউন্ডেশন অথবা আমেরিকান কোন থিঙ্কট্যাঙ্ক এক্সটেন্ডেড হয়ে ভারতে শাখা খুলেছে। আর এতে সবচেয়ে খুশি হয়েছে তরুণ একাদেমিক কেরিয়ারিস্ট্রা যারা ভারতের স্বার্থের চেয়ে নিজের কেরিয়ারে আগ্রহ রাখে বেশি। আর এতে ভারেতের প্রায় সব থিঙ্কট্যাঙ্কঅগুলো আসলে আমেরিকান বিদেশনীতিই ভারতে প্রচার করার কাজএ লিপ্ত হয়েছে। আমেরিকান অর্থ উসুল হয়েছে এভাবে।  মুক্তমালার মত চীনের ভারতকে ঘিরে ফেলার তত্ব তারাই খাইয়েছে ভারতকে, সয়লাব করে ফেলেছে। এমনকি যে দুএকটা ভারতের ডিফেন্সের নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোতেও আমেরিকান বিদেশনীতির প্রভাব ঢুকাতে পেরেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে IDSA নামে এমন এক প্রতিষ্ঠানের “চীন-ভারতঃ নতুন ভারসাম্য” শিরোনামের থিম নিয়ে বার্ষিক কনফারেন্স করতে অনাপত্তি-পত্র দেয় নাই ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়।  অনুমান করা যায় আমেরিকার চোখে দেখা চীনা সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিত সেখানে ছিল বা থাকতে পারে – তা চীনের মন জয়ে ভারতের  জন্য বাধা হিতে পারে আশঙ্কায়, চীন অখুশি হতে পারে  – তাই এই অনুমতি প্রদান না দেওয়া্র ঘটনা ঘটেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে,  Meanwhile, the MEA has refused clearance to an annual conference by the ministry of defence-sponsored think tank, Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) whose theme was “India-China: a new equilibrium”. The conference slated for this week has been “deferred” said people familiar with developments. এথেকে বুঝা যায় ভারতকে এখন কত গভীর পর্যায়ে চীন-বিরোধীতার খোলনলচে বদলাতে হবে।

ওদিকে ট্রাম্পের ‘বাণিজ্য স্বার্থ সবার উপরে প্রায়োরিটি’ এই নীতি তিনি যদি ধরে রেখে এগিয়ে যান (যেটা এখনও পর্যন্ত এর ভিন্ন কিছু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ) কারণ ট্রাম্প মনে করেন তার ‘বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি’ এই নীতির প্রশ্নে তিনি – এতটাই সিরিয়াস যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে  এই প্রথম ইউরোপের সাথেও আমেরিকার ভিন্ন অবস্থান হতে বা তা নিয়ে লড়তে তিনি পিছপা নন। এমনকি আমেরিকা দুনিয়ার এক ‘এম্পায়ার’ অথবা রাষ্ট্রসঙ্ঘ আমেরিকার প্রভাবে চলে  – এসব কথাগুলোও বাদ দিতে বা বদলাতে হলেও ট্রাম্পের আমেরিকা এসব ভ্যানিটি ছাড়তে রাজি। তবু ‘বাণিজ্য প্রায়োরিটি’ নীতির জায়গা থেকে তিনি সরবেন না বলেই মনে হচ্ছে। দেখা যাক কোথায় দাঁড়ায়।

এবার এই সূত্রে বলা যায়, আমেরিকার ভারতের কাছে ‘বাংলাদেশকে বন্ধক দেয়া’- সে বাস্তবতারও একই সাথে অবসান হতে চলেছে বা ঘটবেই। যদিও সেটা বাস্তবায়িত হতে, কার্যকর হতে – বাস্তবে এর প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগবে। তবে পরিবর্তনের আগমনী ‘ঘণ্টা বাজিয়ে’ দেয়া হয়ে গেছে। এ ছাড়াও এখন থেকে ভারতের নতুন নীতি, নতুন বন্ধু, মিত্র এগুলো থিতু হয়ে বসতে, সমন্বিত হয়ে বসতে কিছু সময় লাগবে। আবার ওদিকে আমেরিকা দিক থেকে বললে, তার “ভারত-বিবেচনার দায়” ছুটে যাচ্ছে অর্থাৎ ভারত আর আমেরিকার হয়ে চীন ঠেকানোর খেদমত করবে কিনা তা নিয়ে আর কোন ভরসা ট্রাম্পের আছে বলে মনে হয় না। এই কারণে অবশ্যই আমেরিকা নিজেই “ইন্ডিপেন্ডেন্টলি” বাংলাদেশ নিয়ে কিছু সরাসরি ভূমিকা বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে এর শর্ত তৈরি হয়ে গেছে, সে কথাও সত্যি। ফলে ভারতের পরামর্শ, মতামত সমন্বয় এগুলো আমেরিকার কাছে আর আগের মতো নেই, থাকবে না। বলাই বাহুল্য। তবে এমন পরিবর্তন যদিও শুরু হয়েছে মাত্র। ফলে ফল দেখতে পেতে ধীর লয়ের কারণে দেরি হতে পারে বা দ্রুতও হতে পারে।  কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। সারকথা “পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” সেই বিউগল বেজে গেছে। এতে কে কার কাছে আসবে, কোলে উঠবে নাকি চিরতরে সুদূরে চলে যাবে এমন ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পাব আমরা।

লেখক : রাজনৈতিক বিশেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০১ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীনকে কোথায় বসতে দেয় সেই অস্থিরতায় ভারত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

“চীন-ভারতের পাওয়ার গ্যাপের দিকে তাকান”

“চীন-ভারতের পাওয়ার গ্যাপের দিকে তাকান”

গৌতম দাস

১৭ আগস্ট ২০১৭,  বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-2h7

 

 

চীন-ভারত সামরিক সংঘর্ষ কী আসন্ন? সারা দুনিয়ার মিডিয়ায় এটা নিয়েই জল্পনা-কল্পনা চলছে। ভুটানের  ডোকলাম উপত্যকায় মুখোমুখি হয়ে থাকা ভারতীয় ও চীনা সেনাদের এই অবস্থান আরো উত্তেজনাময় হয়ে উঠেছে। এখন পর্যন্ত মুখোমুখি অবস্থান ছেড়ে কেউ ফেরত যায় নাই। যদিও সৈন্য সমাবেশের সংখ্যা কমানো-বাড়ানো ঘটেছে সময়ে। কুটনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে চীনা দাবি হল, ভারতীয় সেনাদেরকে সবার আগে ঐ অবস্থান ছেড়ে  ফিরে যেতে হবে। এরপর ভারতের সাথে কথা হতে পারে, এর আগে নয়।  কারণ চীনের ব্যাখ্যা হল, বৃটিশ ও চীনা রাজশক্তির ১৮৯০ সালের  সীমান্ত চুক্তি  অনুসারে সেই থেকে ঐ স্থান আর কোন বিতর্কিত ভুখন্ড নয়, বরং চিহ্নিত ভাবে চীনের ভুখন্ড। তাই ভারত চীনা ভুখন্ডে ‘অনুপ্রবেশকারি’। এই প্রসঙ্গে গত ১১ আগষ্ট আনন্দবাজার লিখেছে, “চিন দাবি করছে, অতীতে ভুটান লিখিত ভাবে তাদের জানিয়েছে ডোকলামের ভূখণ্ডটি চিনের অধীনে। সুতরাং ডোকলামে ভারতীয় সেনা পাঠানো সম্পূর্ণ অবৈধ। বিষয়টি যখন চিনের সঙ্গে ভুটানের তখন ভারত নাক গলাচ্ছে কেন, সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে”।

বিপরীতে ভারতীয় কুটনৈতিক অবস্থান হল, ঐ স্থান চিহ্নিত নয় বিতর্কিত, এবং তা ভুটানের দাবিকৃত ভুখন্ড। ভারত ভুটানের পক্ষ থেকে চীনাদেরকে বাধা দিয়েছে। কিন্তু এরপর ভারত আরও বলতে চাইছে, আসলে ওগুলো কথা আর ভারতের জন্যও আর কোন গুরুত্বপুর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপুর্ণ হল, ‘আসেন চীনা ভাইয়েরা’, “একসাথে” বরং সেনা প্রত্যাহার করি। ভারতের এই বদল অবস্থান কেন?

চীনা অবস্থান কত কড়া তা  বুঝা যায় গত জুলাই মাসে জর্মানিতে জি-২০ শীর্ষ সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদী চিনের প্রেসিডেন্ট শি চিনফিং-এর সঙ্গে আলোচনা করতে চাইলেও চীন রাজি হয়নি। এমনকি এখনও চীন তার নিজের অবস্থান থেকে একচুল সরে নাই।  ওদিকে আনন্দবাজার আরও লিখেছে, “তাতপর্যপুর্ণ ভাবে আজ ডোকলামকে চিনা এলাকা বলে মেনে নেওয়ার কথা (এখন) অস্বীকার করেছে ভুটান। থিম্পু জানিয়েছে, ডোকলাম তাদেরই এলাকা। সেখানে রাস্তা তৈরি করে চিনা সেনা ভুটানের সার্বভৌমত্বে হাত দিয়েছে। ভারতের চাপেই ভুটান এই পদক্ষেপ করেছে বলে ধারণা কূটনীতিকেরা”। অর্থাৎ ভারত চেষ্টা করছে নিজের অন্যের ভুখন্ডে “অনুপ্রবেশকারি” হওয়ার যে আন্তর্জাতিক আইনি দায় তা থেকে নিজের নাম কাটাতে।

আর ওদিকে এখন আর রাস্তা তৈরিতে চীনকে বাধা দেয়া ভারতের কাছে কোন ইস্যু নয়। ভারত চাইছে যত দ্রুত মানুষ ভুলে যাক যে ভারত চীনকে বাধা দিতে গিয়েছিল। ভারতের মূল ইস্যু এখন ‘সম্মানজনক পশ্চাৎ অপসারণ করা’। এর সুযোগ সে পেতে চাচ্ছে। অর্থাৎ ভারতীয় সেনা যে এখনই ফিরে যেতে চায়, এ ব্যাপারে তারা একপায়ে রাজি। কিন্তু চুপচাপ ফিরে গেলে নিজের বেইজ্জতি হয়, তাই ভারতের মুখ রক্ষার স্বার্থে ভারত-চীন একসাথে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে  ভারত চীনকে যে প্রস্তাবে  রেখেছে,  চীন তাতে রাজি হলে ভারতের ইজ্জত বাঁচে। বিপরীতে চীনের অনড় ভূমিকা এবং তারা অনবরত হুমকি দিয়ে বলে চলছে, ভারতীয়রা বিতর্কহীন চীনা ভূখণ্ডে বেআইনি অনুপ্রবেশকারী। অতএব সবার আগে তাদেরকে চুপচাপ ফিরে যেতে হবে। সারকথায়, সব বাদ দিয়ে ভারত এখন মরিয়া হয়ে একটা সম্মানজনক পশ্চাৎ অপসারণের সুযোগ খুঁজে ফিরছে। কিন্তু তাদের দশা এমন দুস্থ অবস্থায় পৌঁছল কেন?

কারণ এক. নির্বাচনী অভ্যন্তরীণ ইমেজ তৈরির কথা ভেবে মোদি সরকার পরিকল্পনা করেছিল, আগের যেকোনো সরকারের চেয়ে চীনের বিরুদ্ধে মোদি বেশি তৎপর – এটা দেখানো। এই উগ্র জাতীয়তা প্রদর্শন করাই মোদির লক্ষ্য ছিল। এমনটা দেখাতে পারলে আগামী ভোটে এটা তাকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশি সুবিধা দেবে বা আগিয়ে রাখবে, এই ছিল বিজেপি এবং মোদির হিসাব। ভুটান-চীন সীমান্তে চীন রাস্তা তৈরি করতে গেলে তাই মোদি সরকার অন্য কোনো উপায়ে প্রতিক্রিয়া প্রকাশের পথ না খুঁজে এটাকে সুযোগ হিসাবে নিয়ে  সরাসরি নিজ সৈন্য পাঠিয়ে উগ্রতা প্রদর্শন করতে গিয়েছিল। কিন্তু মোদি সরকারের এই সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনা এতটাই কাঁচা ছিল যে, ঘটনা তিন সপ্তাহে না গড়াতেই তৈরী করা টেনশন সামলাতে না পেরে আপসের পথে যেতে অস্থির হয়ে উঠেছে। এ কারণে, মোদি ভারতীয় সংসদের সব দলকে ডেকে এক সর্বদলীয় পরামর্শ বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন। ওই সভায় সবার কাছে এটা পরিষ্কার হয়ে যায়, মোদি সরকার সেনা পাঠিয়ে অযথা সামরিক টেনশন তৈরি করেছে অথচ, কূটনৈতিক পদক্ষেপে হিসাবে সম্ভাব্য বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে তেমন কোন প্রস্তুতি নেয়নি। যেমন জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে যদি ডোকলাম প্রসঙ্গ উঠে বা ইস্যু হয়ে যায় তবে সেখানে রাশিয়া কি ভারতের পক্ষে অবস্থান নেবে – এমন কোনো আগাম প্রস্তুতি বা রাশিয়ার সাথে আলোচনা করে কোন নিশ্চয়তা নেয় নাই , মোদির সরকার। বরং অনুমান করা যায়,  সে পরিস্থিতিতে রাশিয়া সম্ভবত চীনের দিকে তাকিয়ে অবস্থান নেবে।

অপর দিকে এত আশা-ভরসাস্থল, বন্ধু মনে করা আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসন কি ভারতের পক্ষে অবস্থান নেবে? এরও কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। নেয়া হয় নাই। আর আমেরিকা সম্ভবত ‘নিরপেক্ষ’ অবস্থান নিয়ে দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে। ইতোমধ্যেই নানা উছিলায় প্রকাশিত আমেরিকান অবস্থান এটাই। সারকথায় আমেরিকা দূরে দাঁড়িয়ে বলবে, তারা মিটসাট করে নেক।  ফলে ভারতের বিরোধী দল, বিশেষ করে কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী মোদিকে এই বলে অভিযুক্ত করেন, তার আমলে এসে আমাদের ট্র্যাডিশনাল বন্ধুরা দূরে অনিশ্চিত অবস্থানে চলে গেছে। এসব মিলিয়ে ওই সর্বদলীয় মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত হয় সরকার যেন সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেয়। এতে অবশ্য মোদির লাভের গুড় ঠিক থেকেছে। অন্তত সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের অবস্থান নেয়ার দায় একা মোদির নয়, সবার বা সর্বদলীয় – তাই হয়ে গেছে। আসলে মোদির লক্ষ্য ছিল, নিজের আগামি নির্বাচনের জন্য অভ্যন্তরীণ ইমেজ তৈরি। সে কাজ ইতোমধ্যে যা অর্জন  হবার তা হয়েই গেছে। যদিও এখন বিরাট সমস্যা হল, চীন তাকে সম্মানজনক সেনা প্রত্যাহারের অবস্থান নিতে দিচ্ছে না, বরং এর বদলে সীমিত আকারে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে অনবরত চীনা হুমকি দিয়ে।

ভারতের থিংকট্যাংক ডোকলাম ইস্যুকে কিভাবে দেখছে?
প্রত্যেক সামর্থ্যবান রাষ্ট্র, মানে এমন রাষ্ট্র যে এক বা একাধিক থিঙ্কট্যাঙ্ক চালানোর খরচ জোগাতে সক্ষম –  তার জন্য একাধিক থিংকট্যাংক গড়ে তোলা খুবই প্রয়োজনীয় কাজ বলে বিবেচিত হয় একালে। থিঙ্কট্যাঙ্কের মানে হল, এ কালের রাষ্ট্রের কৌশলগত বহুবিধ স্বার্থ থাকে, সেসব স্বার্থসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে কোন খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত না, বরং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা চালানো এবং এতে পাওয়া ফলাফল ব্যবহার করা হয়। ঐ গবেষণার ফলাফল সমাজে একাদেমিক দুনিয়ায় খোলা থাকে, চর্চা আলোচনায় আরও সমৃদ্ধ হয়। এসব থেকে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা ওই গবেষণার ফলাফল বা সুপারিশের আলোকে সঠিক নীতি গ্রহণে তা ব্যবহার করতে পারে। যেহেতু রাষ্ট্রস্বার্থে এই গবেষণা ফলে এসব থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রীয় বা দাতব্যভাবে সাধারণত নিজের খরচ জুগিয়ে থাকে। কিন্তু কখনই তা রাষ্ট্রের বাইরের অর্থের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গড়ে উঠতে পারে না বলে সাধারণত মনে করা হয়। যেমন আমেরিকার রেওয়াজ হল, বেশির ভাগ থিঙ্কট্যাঙ্ক  অভ্যন্তরীণ দান দাতব্যে অর্থ সংগ্রহ করে চলে।

কিন্তু এ ক্ষেত্রে ভারত এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে। সে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের পয়সায় নিজের থিঙ্কট্যাঙ্কের এক্সপার্ট ও গবেষক তৈরি করছে। অর্থাৎ এখানে ধরে নেয়া হয়েছে, আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ভারতের স্বার্থে কাজ করতে পারে। এটা কি সম্ভব? খরচ অন্যের উপর চাপিয়ে দিবার নেশায় তা এখন সম্ভব-অসম্ভবের উর্ধে এক বাস্তবতা। গত  ২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফর থেকে  আমেরিকা-ভারত প্রথম পারস্পরিক কৌশলগত স্বার্থের প্রয়োজনে কাছে আসা শুরু হয়েছিল। যদিও আমেরিকার তাগিদে ‘ওয়ার অন টেরর’ ইস্যুতে তা শুরু হয়েছিল, কিন্তু খুব দ্রুত আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ ইস্যুতেও ভারতের সাগরেদ হয়ে যাওয়ায় এটাই মুখ্য ইস্যু হয়ে যায়। ‘চীন ঠেকাও ইস্যুতে দোস্তালির’ দিন শুরু হয়ে যায়।  সেকালে অবশ্য থিঙ্কট্যাঙ্কের ধারণাই ভারতে তেমন একটা প্রতিষ্ঠিত ছিল না; কেবল যুদ্ধ-কৌশল অর্থে গবেষণার কিছু প্রতিষ্ঠান ছিল। কিন্তু বুশের ওই সফরের ফলে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো তাদের ভারতীয় শাখা খুলতে শুরু করে দেয়। সত্যি সে এক আজব ঘটনা। না আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর শাখা বাংলাদেশে নাই তা নয়। অথবা আমেরিকান সরকার বা  এনজিও ফান্ডেড লোকাল থিঙ্কট্যাঙ্ক বাংলাদেশে নাই, ব্যাপারটা এমন নয়। কিন্তু সেগুলোর ভুমিকা বাংলাদেশের সরকারকে গবেষণা দিয়ে নীতি নিতে সাহায্য করা নয়। বরং বাংলাদেশে আমেরিকান নীতি কী হলে আমেরিকান স্বার্থের জন্য সঠিক হবে  তা আমেরিকান সরকারকে বুঝতে বা তথ্য সংগ্রহ করে দিতে কার্যকর থাকাই এদের লক্ষ্য।

প্রেম, রোমান্স – এগুলো কি করে করতে হয় থেকে তা নিয়ে কারও কাছ থেকে কোচিং বা ট্রেনিংয়ে তা শিখার বিষয় কখনও নয়। কারণ সেক্ষেত্রে নিজের প্রেমিক বা প্রেমিকার সাথে না, বরং ঐ কোচ বা ট্রেনারের সাথে প্রেম রোমান্স হয়ে যাবার সম্ভাবনা।  তাই প্রেমিক-প্রেমিকারা বাইরের কারো কাছ থেকে কোনো ট্রেনিং নেয়া ছাড়াই এটা নিজেরা নিজেরা ‘সরাসরি স্টেজে পারফর্ম করতে করতে ব্যাপারটা শিখে ফেলার বিষয়। এ জন্যই নিজ রাষ্ট্রস্বার্থের কৌশলগত নীতি-পলিসি কী হবে, সে গবেষণার খরচ রাষ্ট্রের অভ্যন্তর থেকেই সংগ্রহ করতে হয়। কিন্তু তা না করে নানান আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কের অর্থ ও গাইডে ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক গড়ে তোলা হয়েছে। আমেরিকানরা খরচ বহন করছে, ভারতীয় মধ্যবিত্তকে আমেরিকায় নিয়ে যাচ্ছে পিএইচডি, মাস্টার্স করাতে- এতেই তারা খুশি। আর ভাবছে, আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠান যেন ভারতের কৌশলগত স্বার্থ দেখবে। ব্যাপারটা দাঁড়ায় এমন, যেন আমেরিকার স্বার্থচোখ দিয়ে কেউ ভারতের কৌশলগত স্বার্থ দেখছে। এ’এক সোনার পাথরের বাটি! ফলাফল হয়েছে যে আমেরিকান শিখানো বুলিই তারা প্রায়ই আউড়ায়।

গত ১০-১২ বছর আগে থেকে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক ভারতে গড়ে তোলা শুরু হওয়ার পর এ ব্যাপারে প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। ভারতীয় থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক এর অন্যতম প্রভাবশালী এমন এক ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজামোহন। বর্তমানে তিনি আমেরিকান থিংকট্যাংক ‘কার্নেগি ইন্ডিয়া’র ডিরেক্টর। এ ছাড়া ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায় ‘রাজা মন্ডলা’ (Raja Mandala) শিরোনামে তিনি নিয়মিত কলাম লিখে থাকেন। এক্সপার্ট হিসেবে তিনি বাংলাদেশেও আসেন। ডোকলাম ইস্যুতে তার লেখা কয়েকটি কলাম  আছে। এর একটি হল – ‘মাইন্ড দ্যা পাওয়ার গ্যাপ’ (Mind the power gap)। অর্থাৎ প্রভাব-ক্ষমতার দিক থেকে চীনের সাথে ভারতের তুলনীয় সক্ষমতার অর্থে, ভারত পিছিয়ে পড়া দেশ, এক বিরাট পাওয়ার গ্যাপ আছে দুই দেশের মধ্যে, ফলে সাবধানে পা ফেলো! এটাই বলতে চাইছেন তিনি।

তার এই কলামের প্রথম বাক্য হল, “উপমহাদেশে একের পর একটি ক্ষেত্রে চীনের ঢুকে পড়ার বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার নবাবি চিন্তা করার অবস্থায় ভারত নেই”। (As India settles into an extended military standoff with China in the Himalayas, it can’t afford to take its eyes off Beijing’s maritime forays in the Indian Ocean….। India no longer has the luxury of contesting Chinese strategic incursions into the Subcontinent one piece at a time.)   তিনি শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার আর ভুটানের ডোকলাম, এ তিন ইস্যুতে চীনের সাথে ভারতের নিজেকে তুলনা করার কথা ভাবাকে “নবাবি চিন্তা” বলছেন। সম্প্রতি শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটায় নির্মিত গভীর সমুদ্রবন্দর চীনা মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণে এসেছে। অপর দিকে মিয়ানমারও চীনা সহযোগিতায় একটা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করতে যাচ্ছে; উদ্দেশ্য ওই পোর্ট থেকে চীনের কুনমিং পর্যন্ত পাইপলাইনে জ্বালানি সরবরাহ করা হবে। এটাই এর মূল উদ্দেশ্য, তবে মায়ানমারও তা ব্যবহার করবে।

রাজামোহন বলতে চাইছেন, ওই দুই পোর্টের মাধ্যমে চীনা প্রভাব যেভাবে ভারতের পড়শি রাষ্ট্রের ওপর বাড়বে, সে তুলনায় ডোকলামে কিছু জায়গাজমির মারামারি খুবই তুচ্ছ ঘটনা। অর্থাৎ পোর্ট ইস্যু ভারতের অনেক বড় স্বার্থ হারানোর বিষয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোর কাজ হল – নিজেদের ‘চীন ঠেকাও’ বুলি ভারতীয় শাখায় জড়ো হওয়া ইন্টেলেক্টদের মনে গেঁথে দেয়া। সে কাজে যেসব বয়ান ভারতীয়দের মনে তারা গেঁথে দিয়েছে, সেটা হল অবাস্তব কিছু হাহাকার। যেমন – ‘সব চীন নিয়ে গেল’, ‘চীন ভারতকে ঘিরে ধরছে’ ইত্যাদি। ভারত যেন চাইলেই চীনা অর্থনৈতিক প্রবল প্রভাব উপেক্ষা বা অস্বীকার করতে পারে। এটা যেন ভারতের সাবজেকটিভ ‘ব্যক্তি ইচ্ছার’ ব্যাপার।  অথচ চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব বা সক্ষমতা এগুলো অবজেকটিভ, বাস্তবতা। চীনের কিছু ব্যক্তি এমন দাবি করেন বলেই এটা সত্য, তা এমন একেবারেই নয়। এটা হল অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

ধরা যাক, চীনের “সব নিয়ে যাওয়া” বা “ঘিরে ধরা” বয়ান শতভাগ সত্য। কিন্তু এসব তৎপরতা কি বেআইনি, অবৈধ কাজ? মোটেও তা না। এমনকি ভারতও তা দাবি করে বলতে পারছে না। অর্থাৎ অভিযোগ করছে না। কিন্তু তাহলে অভিযোগটা কী? বাস্তবতা হল, চীনের পরাশক্তিগত সক্ষমতার সাথে ভারতের সক্ষমতা তুলনাযোগ্য নয়। কিন্তু সেটা তো চীনের অপরাধ নয়। পরাশক্তিগত সক্ষমতা মানে যার মূল ভিত্তি হল, নিজ অর্থনৈতিক অগ্রসরতা।

রাজামোহনেরই ওই লেখায় তিনি স্বীকার করে বলছেন, ‘চীনের বর্তমান জিডিপির আকার ভারতের চেয়ে পাঁচগুণ বড় এবং চীনের সামরিক খাতে ব্যয়ও ভারতের চেয়ে চারগুণ বেশি”। অর্থাৎ গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের শেয়ার সবচেয়ে বড়, চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত সবার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। ফলে তার বিনিয়োগ সক্ষমতার সাথে কেউ তুলনীয় নয়। ফলে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, এশিয়ায় চীনের প্রভাব ভারতের চেয়ে অনেক বেশি হবে এবং এটা স্বাভাবিক। এমনকি যারা ভারতের পড়শি রাষ্ট্র তাদের ওপর চীনা প্রভাব, তাদের অর্থনীতিতে চীনের বিনিয়োগ অনেক বেশি হবে এবং তা বিরাট ভূমিকা নিবে। কিন্তু এরপরই আবার রাজামোহনসহ ভারতীয়দের আহাজারি আমরা শুনতে পাবো – “ভারতের প্রভাবাধীন এলাকায়”, ভারতের ‘পড়শি রাষ্ট্রে’ চীন ঢুকে পড়ছে।

এখানে ভারতের প্রভাবাধীন এলাকা কথাটি বড়ই তামাশার। এর অর্থ কী? যেন এর অর্থ হল, সেটা ভারতেরই তালুক। আসলে তারা বোঝাতে চান, ভারতের বাপ-দাদা হল ব্রিটিশেরা। আর ওইসব এলাকা ১৯৪৭ সালের আগে ব্রিটিশদেরই তো ‘তালুক’ ছিল, কাজেই ভারতের বাপ-দাদা বৃটিশদেরগুলাই এখন ওগুলো যেন ভারতের তালুক!  এছাড়া আর এর অন্য মানে কী?  একই ব্রিটিশ শাসকের অধীনে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও মিয়ানমার ছিল। কিন্তু সে জন্য কি ১৯৪৭ সালের পর এসব দেশের ওপর নেহরুর ভারতের কোনো মৌরসি তালুক-প্রভাব বর্তায়? অথচ ভারতের ইঙ্গিত এমন যেন কলোনিয়াল ব্রিটিশ-প্রভাবের উত্তরসূরি হল নেহরুর ভারত। ব্রিটেন যেন ভারতের বাপ-দাদা। অথচ ‘প্রভাবাধীন এলাকা’ কথাটির একটিই মানে হতে পারে আর তা হল, অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রভাব আশপাশে যতটুকু। এটা লিগ্যাল প্রভাব না, কোনো বৈধ মালিকানাবোধও এখানে নাই, থাকে না।

এছাড়া আরও বলা যায়, আজ আমার অর্থনীতি প্রভাবশালী বলে এর প্রভাব থাকলেও কাল যদি অর্থনৈতিক সক্ষমতা কমে যায়, তবে প্রভাব কমে আবার শূন্যও হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া অন্য কেউ আমার চেয়ে অর্থনীতিতে বড় প্রভাবশালী হিসেবে হাজির হয়ে গেলে স্বভাবতই আমার প্রভাব নেমে যাবে, শূন্য হয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারতের কাছে তার পড়শি মানেই ব্রিটিশ কলোনি সূত্রে নেহরুর ভারতের কল্পিত “স্থায়ী প্রভাবাধীন এলাকা’ বলে কিছু একটা। সবচেয়ে আজব ব্যাপার হল, এত যুক্তিবুদ্ধি নিজেই দেয়ার পরও খোদ রাজামোহন একইভাবে চীনের বিরুদ্ধে হা-হুতাশ করার বাইরে না। অথচ ব্যাপারটা হল, আগামীতে যদি ভারতের অর্থনৈতিক সক্ষমতা চীনের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে কখনো, তবে ‘ভারতের প্রভাবাধীন’ কথাটি অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেটা এখনই আগেই হয়ে গেছে, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই। এসব বালক- সুলভ আবদার করার মানে হয় না।

এ ছাড়া আর একটা গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট আছে। যখন দুনিয়া কলোনি দখলের প্রতিযোগিতার যুগে ছিল, আর ব্রিটিশরা অর্থনৈতিক সক্ষমতায় সবার শ্রেষ্ঠ ছিল, সে যুগের পড়তি দিকে ১৮৮০-এর দশকে আমেরিকা প্রথম অর্থনৈতিকভাবে ব্রিটিশ অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু খেয়াল করতে হবে, তবু দুনিয়ার মাতবর হয়ে উঠতে আমেরিকার আরো ৬০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। কার্যত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৫ সালের পর আমেরিকা দুনিয়াকে নিজের নেতৃত্বের অধীনে নিতে পেরেছিল। আরো লক্ষণীয়, এই ৬০ বছরে আমেরিকানরা কোনো বড় যুদ্ধে নিজেকে বিরাটভাবে জড়ায়নি। তবে যুদ্ধ একবারই করেছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেটা নির্ধারক যুদ্ধ, যার শেষে আমেরিকা ‘দুনিয়ার রাজা’ হয়েছে। এর মাঝে আমেরিকা কোনো নাকি কান্না করেনি, সব নিয়ে গেল বলে হাত-পা ছোড়েনি। আজকের চীনের কাছে তার উত্থানের মডেল সেই আমেরিকা, তাকেই অনুসরণ করে।

কিন্তু ভারত? আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতির সমর্থক হওয়ায় বড় ভাই পিঠ চাপড়ে দিয়েছে আর ভারত মনে করছে – সে পরাশক্তি হয়ে গেছে। অর্থনৈতিক সক্ষমতা গায়ে-গতরে খেটে অর্জন করার জিনিস। বড় ভাই পিঠে হাত রাখলেই এটা অর্জিত হয়ে যায় না, কখনও যাবে না। অতএব ভারতের একেবারে পড়শির ওপর চীনের লংটার্ম কোনো অর্থনৈতিক প্রভাব যদি এসে হাজিরও হয়, তবে এ নিয়ে নাকিকান্নার সুযোগ নেই। এছাড়া এটা বেআইনি বা অবৈধও নয়। আর চীনের এই প্রভাব ছুটানোর জন্য ভারতের একটাই করণীয়, চীনের চেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি করে ফিরে আসতে পারা। কিন্তু পড়শি দেশের রাজনীতিতে, নির্বাচনে হাত ঢুকিয়েও এই পাল্টা প্রভাব অর্জন করা যায় না। যা প্রায় প্রত্যেকটা পড়শি দেশ নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ সবখানে ভারত করে যাচ্ছে, আর ঘৃণা অর্জন করছে। এমন শর্টকাটে কিছুই অর্জন হয় না, বরং এই কূটকৌশল পুরোটাই ভারতের বিরুদ্ধে যেতে বাধ্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ১৬ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন-ভারত ডোকলামে মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

চীন-ভারত ডোকলাম মুখোমুখি দশার কারণ রাস্তার বাইরে!

গৌতম দাস

০১ আগষ্ট ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2gF

 

ডোকলাম ভুটানের এক উপত্যকা। উপরে ছবিতে দেখুন নেপাল ও ভুটানের মাঝে কা্লো অংশ, যেটা আসলে সিকিম, যা এখন ভারতের অংশ। এই অর্থে নেপাল-ভুটানের মাঝে ভারত আছে। কিন্তু পুরাটাই ভারত নয়। এর কিছু অংশ আবার চীনের ভুখন্ড। চীনের ঐ ভুখন্ডের লাগোয়া এক অংশ হল ভুটানের ডোকলাম উপত্যকা। অর্থাৎ সারকথায় ডোকলাম ভুখন্ডের বিতর্ক মূলত ভুটান-চীনের মধ্যে সীমান্তের বিতর্ক। ভারতের কোন ভুখন্ড এটা নয়। এটা তাই কোনো মতেই চীন-ভারতের কোনো সীমান্ত-ভুখন্ডই নয়। চীন সেই সীমান্ত বরাবর থাকা কাঁচা রাস্তাকে ৪০ টন ভারবহনে সক্ষম এমন পাকা রাস্তায় উন্নীত করার কাজ শুরু করতে গেলে বিতর্ক শুরু হয়।

ভুটানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুসারে গত ১৬ জুন ২০১৭ ডোকলামের ডোকলা থেকে সীমান্তবর্তি যে রাস্তা যোমপেলরিতে ভুটানিজ আর্মি ক্যাম্পের দিকে গেছে, সীমান্তবর্তি সে রাস্তার পাশেই কাজ করতেই চীনারা এসেছিল। চীনা ভাষ্যও প্রায় এরকমই যে, সীমান্ত বরাবর ওই রাস্তাতেই চীনের পরবর্তী সীমান্ত ক্যাম্প পর্যন্ত রাস্তা তৈরি ছিল তাদের উদ্দেশ্য। কিন্তু ভারতীয় সেনাবাহিনী আমাদের সামনে কাজে বাধা সৃষ্টি করে বসে যায়।

তবে ভারতীয় সেনা কেন? সীমান্ত বিতর্ক তো ভুটান-চীনের মধ্যে। এ ব্যাপারে ভারতের যুক্তি হল, ভুটান স্বাধীন রাজার রাষ্ট্র (যা এখন কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র) বটে। কিন্তু ব্রিটিশেরা চলে যাওয়ার পর ১৯৪৯ সালে ভূমিবেষ্টিত ভুটানের বিদেশনীতির বিষয়াদি দেখার জন্য ভারত-ভুটান এক চুক্তি হয়েছে। এ ধরনের দাসখত চুক্তিগুলোর গালভরাভাবে নাম রাখা হয় ‘শান্তিচুক্তি’ বা ‘বন্ধুত্বচুক্তি’; এখানেও তাই হয়েছিল। এটা হল অন্যের ভূমিবেষ্টিত অবস্থার প্যাঁচে পড়াকে কেন্দ্র করে তার দুরবস্থার সুযোগ নেয়া। নেহেরুর ভারত ল্যান্ডলকড ভুটানের দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে তাকে ঐ চুক্তি করতে বাধ্য করেছিল।  ১৯৪৯ সালের ওই চুক্তির দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে লেখা আছে, ভুটানের বিদেশনীতি ভারতের পরামর্শে গাইডেড হতে হবে। [“……Bhutan agrees to be guided by the advice of the Government of India in regard to its external relations.”]

যদিও ১৯৭৯ সালে ভুটানের রাজার এক সাক্ষাৎকারের রেফারেন্সে অনেকে দাবি করেন যে, ভুটানের রাজা মনে করেন ওই অনুচ্ছেদে বলা ভারতের পরামর্শ ভুটানের জন্য ‘অবশ্য পালনীয়’ এমন কথা লেখা নেই। [“India’s advice in the conduct of foreign affairs was welcome but “not binding” on Bhutan, he said.] তবে ডোকলাম ইস্যুতে ভারতীয়রা ওই চুক্তির অজুহাতে “ভুটানের অনুরোধে” সেখানে সেনা হাজির করেছে বলে জানায়। ফলে স্বভাবতই চীনারাও পরে সেখানে পাল্টা সেনা সমাবেশ ঘটায়। দুই সেনাবাহিনী মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়।   আর সেই থেকে ব্যাপারটা চীন-ভারত সম্ভাব্য সীমান্তযুদ্ধের টেনশন হয়ে হাজির হয়ে পড়েছে। স্বভাবতই চীনের দিক থেকে জানানো হয় তারা নিজ ভূখণ্ডেই তৎপরতা করছে; ফলে নিঃশর্তভাবে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করার দাবি করে চীনারা।

অবস্থা এখন এমনই যে ভারতেরই এক প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত কূটনীতিক পি স্তবগান (P stobdan) লিখছেন, ভারতের ভুটান নীতি একটা কলোনিয়াল চিন্তা ভাবনা। ভারতের আসল সমস্যা তার ভুটান নীতি, ভুটানের সীমান্ত নয়।  নী  শিরোনামে একটা উপসম্পাদকীয় লিখে বলছেন,  ভারতের ভুটান নীতি কলোনিয়াল কাঠামো চিন্তা। এটা কাজ করবে না, টিকবে না, এটা বুদ্ধিমান বিদেশনীতির চিহ্ন নয়। (This approach was not sustainable; nor was it a sign of prudent foreign policy.) সে তুলনায় গত কয়েক বছরে চীন অনেক বেশি গ্রাউন্ড ওয়ার্ক করে ফেলেছে।

তবে এই প্রথম চীনের দিক থেকে এক তাৎপর্যপূর্ণ যুক্তিও দেয়া হয়। বলা হয়, চীন-ভুটান সীমানা বিতর্কে যদি ‘শান্তিচুক্তির’ অজুহাতে ভারত নাকগলায় তবে কাশ্মির ইস্যুতেও পাকিস্তানের পক্ষে তৃতীয় রাষ্ট্র (মানে ইঙ্গিতে চীনের কথা বলা হলো) নিজের সেনা নিয়ে হাজির হয়ে যেতে পারে। চীনের এই যুক্তিতে দম আছে বলতেই হয়। এই বয়ানে মধ্যে ভারতের জন্য বিপদের কথা বুঝে ভারত অন্য এক যুক্তির দিকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। ভারত এবার যুক্তি তুলে যে শিলিগুড়ির নিজের ‘চিকেন-নেক’ এলাকার নিরাপত্তার কথা ভেবে ভারত ঐ  রাস্তা পাকা করার কাজ করতে চীনকে বাধা দিয়েছে।

চিকেন-নেক সম্পর্কে সংক্ষেপে বলে নেয়া দরকারঃ ব্যাপারটা হল, ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান মানে আজকের বাংলাদেশ ভারত থেকে আলাদা হয়ে যায়। এই আলাদা হয়ে যাওয়ার কারণে ধরা যাক কলকাতা থেকে কোনো ভারতীয় আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ইত্যাদি ভারতের উত্তর-পুর্ব অঞ্চলের রাজ্যে যেতে চাইলে তার আর (ভিন্ন রাষ্ট্র বলে) বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকল না। তাদের যেতে হবে পুরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত একটা চক্কর ঘুরে। যেন বেনাপোল থেকে যে কুমিল্লা যেতে চায় তাকে বেনাপোল থেকে দিনাজপুর তেঁতুলিয়া, রংপুর, সিলেট হয়ে এরপরে কুমিল্লা- এভাবে। সরাসরি বেনাপোল থেকে ঢাকা হয়ে কুমিল্লা নয়। শুধু তাই নয়, তাঁকে যেতে হবে ভারতীয় ভূখণ্ড ধরে যা পাহাড়ি দুর্গম শুধু নয় এরচেয়ে এক বড় বিপদ আছে।  কলকাতা থেকে সাত রাজ্যে যেতে যাত্রাপথে শিলিগুড়িতে সবচেয়ে চিকন (চওড়া মাত্র ১৮-২০ কিলোমিটার, যার একদিকে নেপাল অন্যদিকে বাংলাদেশ) এক অংশ পাড় হতে হয়। ওই অংশকেই চিকেন-নেক বলা হচ্ছে। কারণ কম চওড়া বলে ওই চিকন অংশ রুদ্ধ করে দেয়া গেলে (কয়েকটা নষ্ট গাড়ি বা ভারী কিছু ফেলে রাস্তাগুলো ব্লক করে দিলেই হল) ভারতের, অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের সাথে সাত রাজ্য যোগাযোগ বিছিন্ন হয়ে যাবে। উপরে ছবিতে চিকেন নেককে  ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এখন  এই ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ এর অজুহাত তুলে ডোকলাম ইস্যুতে ভারত বলতে চাচ্ছে, ডোকলাম ভারতের ভূখণ্ড না হলেও সে চীনকে রাস্তা তৈরিতে বাধা দিয়েছে নিজের ঐ ‘চিকেন-নেকের’ নিরাপত্তার কথা ভেবে। এটাও খুবই দুর্বল যুক্তি, প্রায় যুক্তিহীন ভাসাভাসা কথার মত। শিলিগুড়ির চিকেন-নেক ভারতের জন্য ষ্ট্রাটেজিক অর্থে দুর্বল জায়গা সে কথা বুঝা যায়। কিন্তু ওই রাস্তা তা ভুটানের বা চীনের যারই অংশ হোক না কেন, আর তা পাকা বা কাঁচা রাস্তা যাই থাকুক, ‘চিকেন-নেক’ অংশ ভারতের সবসময় জন্য দুর্বলতা। রাস্তাটা পাকা হয়ে যাওয়াতে এরপর ওটা ভারতের জন্য দুর্বলতা হয়ে দাড়ায় তা তো নয়।

আচ্ছা আরেকটা প্রশ্ন : ভারত কি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমেরিকার সাথে গলাগলি করে চীনে সমুদ্রপথে প্রবেশের পথের ‘চিকেন-নেক’ সিঙ্গাপুরের ‘মালাক্কা প্রণালি’ কোথায় আছে তা খুঁজে বের করেনি? এটা ইন্দোনেশিয়া-মালয়েশিয়ার মধ্যে সমুদ্রপথ তুলনামূলক চিকন হয়ে আসা একটা অংশ। এই ইস্যুতে আমেরিকান সিনেটের শুনানিতে প্রফেসরদের সাক্ষ্য দিয়ে বলা পিডিএফ নোট এখনো নেটে যে কেউ পেতে পারে।  [ US CONGRESS HEARING ON INDIA-US RELATIONSHIP  – চোদ্দ পৃষ্ঠার এই ডকুমেন্টে ষষ্ঠ পৃষ্টায় ‘চিকেন-নেক’ ‘মালাক্কা প্রণালির’ ছবি দিয়ে চিনানো আছে।  এখানে কোনো জাহাজ ডুবিয়ে দিলেও এই সমুদ্রপথ (চীনে প্রবেশপথ) ব্লক হয়ে যেতে পারে। প্রণালি বা ইংরেজিতে strait মাত্রই সমুদ্রপথে এটা চিকন গলার সমস্যা। কিন্তু মালাক্কা প্রণালি ভারতের ত্রিসীমানার কোনো স্থান নয়। তবু আমেরিকার প্ররোচনায় ভারত কী আমেরিকার কৌশলগত পরিকল্পনায় শামিল হয়নি? গত ২০০৫ সাল থেকে ভারত আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ কাজে শামিল হয়েছে। তখন থেকেই কে কার চিকন গলা ধরতে পারে বা এর মজা কি সে কথা আমরা শুনে আসছি। কাজেই ‘কারো চিকন গলা চেপে ধরা কোন খারাপ কাজ না’- এমন নৈতিকতা বা আইন তো ভারতই মানে নাই। এমন পদক্ষেপ সে চীনের আগেই চীনের বিরুদ্ধে অভ্যাস নিয়ে ফেলেছে।  কাজেই চীন যদি ভারতের শিলিগুড়ি করিডোরে চিকন গলা চেপে ধরে আসে সেটাকে অন্যায় বলার নৈতিকতা ভারতের নাই।  তবুও আমরা মনে করি এসব কাজ সবার ছেড়ে দেয়া উচিত। কোনো রাষ্ট্রের স্বাভাবিক পণ্য চলাচলে অন্য রাষ্ট্রের বাধা তৈরি করা অন্যায়, নীতিগতভাবে সবার এই অবস্থান বাস্তবায়নে আসা উচিত।

ইতোমধ্যে এখানে আর এক মজার কাণ্ড ঘটে গেছে। ডোকলাম বিরোধ ঘটনার তিন সপ্তাহের মধ্যে খোদ ভারতেই মোদি সরকার নিজের সিদ্ধান্তের কারণে একঘরে হয়ে যায়। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হল জুলাই মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে ভারতের মিডিয়ার রিপোর্ট। এমন একটা রিপোর্ট হল, ১৫ জুলাইয়ের আনন্দবাজার পত্রিকা; যার শিরোনাম ‘ভুটানের আর্জিতে দুশ্চিন্তা, দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’। ওর সারকথা ছিল, ডোকলামে সৈন্য সমাবেশের দায়, সামরিক উত্তেজনা তৈরির দায় একা মোদি ও তার সরকারের বলে সব বিরোধী দল আর একাডেমিশিয়ানদের মধ্যে এক বড় অংশ সবাই হাত ধুয়ে ফেলেছিল। মোদি সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন পরামর্শ নেয়ার জন্য সেখানকার ঘটনা এটা। অথবা বলা যায়, সম্মানজনক পশ্চাত-অপসারণের উপায় খুঁজতে সর্বদলীয় সভা ডেকেছিলেন মোদি। ওই সভার সিদ্ধান্ত, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে সেখানে একটাই কথা, সৈন্য প্রত্যাহার করে কূটনীতির পথ হাতড়ানোতেই সমাধান।

কিন্তু সবাই বলতে চেয়েছে বিশেষ করে কংগ্রেস নেতা রাহুল  ও তৃণমুলের মমতা যে, মোদি উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করেছেন তিনি। কিছু সুনির্দিষ্ট শব্দ ও বাক্য নেয়া যাক ঐ রিপোর্ট থেকে। খোদ আনন্দবাজারই মোদির নীতিকে “দাদাগিরি” বলেছে। লিখেছে, “হিমালয়ের কোলের এই একমুঠো রাষ্ট্রকে তার তাঁবে থাকা দেশ বলেই মনে করে দিল্লি”। এতদিন এসব কথা আমরাই সবসময় আমাদের মূল্যায়নে বলে এসেছি, এখন আনন্দবাজারও বলছে বাধ্য হয়ে; এটা আমাদের মুল্যায়নকে স্বীকৃতি দেয়। আসলে, নেহরুর হাতে আকার পাওয়া, ভারতের আমলা-গোয়েন্দাদের চিন্তা কাঠামো মূলত কলোনিয়াল। ফলে ভিন্ন দুই জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রের মধ্যে কলোনি ধরনের অধীনতার বাইরে আর কোনো ধরনের সম্পর্কের কথা এরা চিন্তা করতে পারে না। এজন্য যেকোন বিদেশনীতি বিষয়ক চিন্তায় এটা প্রতিফলিত, প্রকাশিত হয়ে পড়ে।

নেহরু নিজেকে একটা স্বাধীন রিপাবলিকের প্রধানমন্ত্রী এটা অনুভবের চেয়ে নিজেকে যেন কোন ব্রিটিশ ভাইসরয় ভাবতে বেশি পছন্দ করতেন। এর সবচেয়ে ভালো উদাহরণ নেপাল বা ভুটানের সাথে ১৯৪৭ পরবর্তী ভারতের তথাকথিত ‘শান্তিচুক্তিগুলো’। এরই আলোকে একালে ভারত তার প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে চেয়ে এসেছে, এখনো করে যাচ্ছে। যার ফলাফলে ভারতের সব প্রতিবেশীর সাথে তার সম্পর্ক অন্তত আনন্দবাজার ভাষায় বললে, ‘দাদাগিরির’। আমাদের এই দাবির পক্ষে প্রমাণ হলো খোদ আনন্দবাজারেরই শিরোনাম- ‘দাদাগিরির মাশুল গুনছে দিল্লি’।

ওই একই রিপোর্টের ভেতরে আনন্দবাজার আরও লিখছে, ‘১৯৪৯ সালে ভুটানের সাথে শান্তিচুক্তি করেছিলেন জওয়াহের লাল নেহরু। সেই চুক্তিতে বলা হয়েছিল, বিদেশনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভুটান ভারতের পরামর্শ মতোই চলবে। ২০০৭ সালে ভুটান যখন পুরোদস্তুর রাজতন্ত্র থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে হাঁটে, তখন চুক্তিপত্র থেকে এই ধারাটি বাদ দেয়া হয়। যদিও কার্যক্ষেত্রে থিম্পুর ওপর দিল্লির প্রভাব খুব একটা খর্ব হয়নি। ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান। তার পরেও তার এই বেসুর সাউথ ব্লকের কানে বাজছে।’

এখানে দেয়া দুটো তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভুটান এখন এক কনস্টিটিউশনাল রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র, সেখানে আইন প্রণয়নের এখন জননির্বাচিত সংসদ আছে। কিন্তু আনন্দবাজারই সাক্ষ্য দিয়ে বলছে, ভুটান সংসদীয় সরকার হওয়ার পর ২০০৭-এর সংশোধিত চুক্তিপত্রে আগের মতো ভারতের ‘দাদাগিরির অনুচ্ছেদটা’ নেই। অথচ দাদাগিরি চলছে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল, ‘ডোকলাম নিয়ে ভারতের চাপের মুখে চীনকে ডিমার্শেও পাঠিয়েছে ভুটান’। এখানে একটু ব্যাখ্যা করে বলা দরকার। ডিমার্শে হল কূটনৈতিক ইংরেজি শব্দ démarche; যার বাংলা অর্থ হল, আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় কোন আপত্তি অভিযোগ বা মনোভাব জানানো। ভুটান ডোকলাম ইস্যুতে চীনের কাছে আপত্তি জানিয়েছে ‘ভারতের চাপে পড়ে’, নিজে থেকে নয়। এটাই আনন্দবাজারের দাবি। তাই এখন খোদ ভুটান ভারতকেই সৈন্য প্রত্যাহার করতে বলাতে ভারত প্রমাদ গুনছে। এটাই আনন্দবাজারের রিপোর্ট। ওদিকে, ভারত সবার আগে সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে; তাই চীন, সবার আগে ভারতের সেনা প্রত্যাহারের শর্ত রেখেছে। আর এ অবস্থায় ভারতের সব বিরোধী দল মোদির সাথে দূরত্ব তৈরি করেছে। মোদিকে উসকানিদাতা, খুঁচিয়ে ঘা করা লোক বলেছে। সুযোগ বুঝে কংগ্রেস নেতা রাহুল প্রশ্ন তুলেছে,  ভারতের বন্ধু অনেক রাষ্ট্র ছিল (সম্ভবত রাশিয়ার কথা বলতে চাইছেন) তারা কেন এখন দূরে- এই প্রশ্ন তুলেছে। তবে শেষে ‘সৈন্য প্রত্যাহার আর কূটনীতিক আলাপ’ এই সীমায় মোদি্র ফিরে আসার শর্তে সমর্থন জানিয়েছে। আর, সব মিডিয়া ‘কূটনীতি চাই’ বলে সম্পাদকীয় লিখেছে। যেমন আনন্দবাজারের ১৯ জুলাইয়ের রিপোর্টের শিরোনাম, ‘যুদ্ধ নয়, চাই কূটনীতি’। বেচারা!

মোদির অবস্থা একঘরে শুধু নয়, একেবারে বেইজ্জতি হওয়ার দশা। কারণ চীনের কঠোর অবস্থানে দাঁড়িয়ে দাবি করেছে আগে এককভাবে ভারতের সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। আর মোদির সরকার উঠেপড়ে লেগেছে যে, একসাথে প্রত্যাহার টাইপের একটা কথা যদি চীনের কাছ থেকে বের করা যায়। গত ২৭-২৮ জুলাই ছিল চীনে ব্রিকস রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষা কাউন্সিল বা উপদেষ্টা স্তরের প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠক। ভারত চেষ্টা করছিল ওই সভার সাইড লাইনে চীনের প্রতিনিধি স্টেট কাউন্সিলরের (Chinese state councillor Yang Jiechi) সাথে যদি একটা বৈঠকের সুযোগ করে নিতে পারেন। মাত্র গত ২৯ জুলাই দুপুরে ভারতের কোনো কোনো মিডিয়া খবর দিচ্ছে যে, ওই মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কী কথা হয়েছে সে বিষয়ে কোনো রিপোর্ট কোথাও ছাপা হয়নি।

ইতোমধ্যে রাশিয়ান ডিপ্লোম্যাট সূত্রে অনেক খবর আসছে, যেগুলোর ফরমাল ভার্সান এখনো রিলিজ হয়নি। সেখানে বলা হচ্ছে- ১. অন্তত দু’সপ্তাহ আগে চীন ভারতকে জানিয়েছিল যে তারা নতুন রাস্তা বানাতে নয়, রাস্তা আগে থেকেই যেটা ছিল সেটা চওড়া করতে যাচ্ছে। কিন্তু ভারত সে নোটিফিকেশন উপেক্ষা করেছে। ২. চীনারা যেখানে অবস্থান ও কাজ করছিল সেটা ইতোমধ্যে ভুটানের সাথে আলোচনায় বিবাদ নিরসিত হিসেবে চিহ্নিত চীনের অংশ। ৩. তাই চীন এখনো প্রমাণ চাচ্ছে ও দাবি করছে যে ভুটান কখনোই ভারতকে কোনো সামরিক অ্যাকশন নিতে অনুরোধ জানায়নি।

ভারতের কোনো কোনো জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তাই প্রস্তাব রেখেছেন ভারতের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের উচিত এখনই, আসলে কী ঘটেছে তার ঘটনাক্রম কী সে বিষয়ে ভারতে অবস্থিত সব কূটনীতিকদের কাছে ব্রিফিং দিয়ে ভারত অবস্থান পরিষ্কার করুক। এমন একজন হলেন ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের সাঈদ নকভি। তিনি দাবি করছেন, তার জানা মতে ভারতীয় সরকার এক আমেরিকান কূটনীতিক ছাড়া আর কাউকেই এখন পর্যন্ত আসলে কী ঘটেছে তা জানিয়ে কোনো ব্রিফিং কাউকেই দেননি।

চীন-ভারত সংঘাতে  সময়ে সময়ে আমরা বিভিন্ন ইস্যুতে তা হাজির হতে দেখি। তা সত্ত্বেও যদি বলা হয় এগুলোর মধ্যে খটর মটর লাগার সবচেয়ে অমসৃণ বিষয়টা কী? সে প্রসঙ্গে সংক্শেষেপে কিছু বলে শেষ করব।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সেটেল হওয়া চলতি গ্লোবাল অর্ডার আমেরিকার নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বে চালু হয়েছিল। সেটা তার আয়ুর শেষ করতে যাচ্ছে। আর একই সাথে ধীরে ধীরে চীন উঠে আসছে সে জায়গা নিতে। গ্লোবাল পরিবর্তনের এই অভিমুখকে স্বীকার করে নিয়েও মানতে ইচ্ছা করে না দশা আমেরিকার। ফলে কম করে হলেও যতটা সম্ভব সে আসন্ন পরিবর্তনকে দেরি করিয়ে দেয়ার নীতি নিয়েছে আমেরিকা। তবে কম-বেশির ফারাক আছে। ওবামা  প্রশাসন যতটা এব্যাপারে এগ্রেসিভ হয়ে ততপর ছিল, ট্রাম্প প্রশাসন ততটা চেয়ে বলা ভাল একই কৌশলে ততপর নয়। যদিও ঘটনা শুরু করে দিয়ে গিয়েছিল  সেকেন্ড টার্মের (2005-9) বুশ প্রশাসন। মূল ব্যাপারটা হল আমেরিকা ভারতকে প্রলুব্ধ করে, লোভে ফেলে নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থার নতুন গ্লোবাল প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন AIIB, BRICS, SCO ইত্যাদি) গড়ে উঠতে দেরি করিয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছে। কারণ নতুন গ্লোবাল ব্যবস্থাগুলো তৈরিতে চীন ভারতকে সাথে নিতে চায়, আর একাজে চীনের প্রধান সহযোগী পুতিনের রাশিয়া। কিন্তু ভারত গাছেরও খেতে চায় আবার তলার গুলোও কুড়িতে নিতে চায় – নীতি নিয়েছে। সে চীন, রাশিয়ার সাথে মিলে নতুন ব্যবস্থা গড়তে ভাল অবস্থানগুলো নিতে চায় আবার আমেরিকার দেয়া লোভের অফারগুলোও পেতে চায়। ভারতের এই দ্বৈততা, দ্বিমুখি ঝোঁক – এটাই সব সমস্যা সংকটের উতস এখানে।

এর ফলে ভারত তার যেসব বিরোধে কোন সংঘাত  তৈরি না করে সমাধান করার কথা তা মুখ্য সংঘাত বানিয়ে ফেলছে। আর যেখানে বড় সংঘাতই হবার কথা তা নিয়ে কোন উচ্চবাচ্যই করছে না।  আর এর সাথে যুক্ত হয়েছে সস্তা জাতীয়তাবাদের চিন্তা। অথচ কমিউনিস্ট বা জাতীয়তাবাদীরা যাকে ‘জাতীয়তাবাদ’ বলে মনে করে আসছিল সেটা আসলে কোল্ড ওয়ার কালে বুঝের জাতীয়তাবাদ, যা একালে অচল। যেমন দেশের ব্যবহার্য সব পণ্য দেশেই বানাতে হবে এমন গোঁ ধরা জাতীয়তাবাদ কীনা নিজ জনগোষ্ঠির তাতে আসলে একালেও লাভ হয় কীনা ভেবে দেখতে হবে। নিজ মুদ্রার অবমুল্যায়ন একালে সময়ে ইতিবাচক হতে পারে। নাহলে আমেরিকার বিষয়টাকে  অভিযোগ আকারে আনত না যে চীন নিজের মুদ্রা অবমুল্যায়িত রেখেছে। ইত্যাদি।

আমেরিকার সাথে সম্পর্ক ভারতের বর্তমান স্বার্থ হলে চীন-রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ভারতের ভবিষ্যত। ফলে ভারতের  বুদ্ধিমান অবস্থান হল, এদুইয়ের মধ্যে এক সুক্ষ হিসাব করা ভারসাম্য রচনা করে পা ফেলা। কিন্তু কথাটা ভারত প্রায়ই ইচ্ছা করে ভুলে যায়। অনেক বাচ্চা নিজ অভিভাবককে ব্লাকমেল করে পকেটমানি বাড়িয়ে নেয় – বাচ্চারা এভাবে অনেক সময় দায়িত্বজ্ঞানহীন  আচরণ করে সাময়িক সুবিধার মজা উপভোগ করতে চায়। ভারতের অবস্থা এরকম। কিন্তু বাস্তবে ভারত কোন বাচ্চাসন্তান নয়, আবার চীন বা রাশিয়া (নতুন ব্যবস্থার মূল উদ্যোক্তা কারিগরেরা) এরাও ভারতের অভিভাবক কেউ নয়। ফলে ভারতেরও উদ্যোক্তাদেরকে এমন জায়গায় ঠেলে দেওয়া উচিত না যে উদ্যোক্তারা ভারতের আশা ছেঁড়ে ভিন্ন পরিকল্পনা করে বসে। ভারতের উপর ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে যায়।

চীনের গ্লোবাল টাইমস যেখানে চীনের সরকারি অবস্থান কড়া ভাষায় কিন্তু ইনফরমালি চীন প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়, সেখানে ডোকলাম ইস্যুটাকে শিরোনাম লিখা হয়েছে, ভারতের সাংহাই কর্পরেশন সংস্থার (SCO) সদস্যপদ পেয়ে পশ্চিম চীনের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে চাইছে। (India’s SCO membership threatens West China security)। চীন শান্তিপুর্ণ অর্থনৈতিক উত্থানের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা করতে  শিকাগোর এক আমেরিকান প্রফেসরের তত্ত্ব যে, চীন নাকি ভারতকে মুক্তামালার মত ঘিরে ফেলেছে, চীন ভারতের জন্য হুমকি  এইসব  তত্ত্ব আঊরায়।   আসলে মোটাদাগে বললে ভারতের চীন বিরোধী সংঘাত এটা আসলে আমেরিকার চীনা নীতির আলোকে সাজানো। ইন্ডিয়া শুধু আমেরিকার সাথে সামরিক অস্ত্রের চুক্তি করেছে তাই নয়, বরং চীন-ভারত সীমান্ত বরাবর সামরিক ঘাটি বানিয়েছে। (In fact, India’s confrontation with China is, by and large, backed by America’s China policy. India has not only sealed arms deals with the US, but also established strategic military bases along the China-India border. ) সে নিজ জনগণকে চীন বিরোধী প্রপাগান্ডায় সামিল করেছে।

এটাকে আমরা বলতে পারি চীনের  দুঃখ করে বলা (আবার হুমকিরও)  কথা যা খুব সম্ভবত রাশিয়াকে স্মরণ করিয়ে দিবার উছিলায় সবাইকে জানানো। কারণ রাশিয়ার উতসাহেই চীন ভারতকে এই নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক বিষয়ক জোটে (পাকিস্তানসহ) ভারতকেও সদস্যপদ দিতে রাজি হয়েছে কয়েকমাস আগে।

ভারতের অজিত ডোভাল চীন থেকে ফিরেছেন, কিন্তু ভারতের মিডিয়ার গান সম্পুর্ণ ভিন্ন। এখানে কেবল কিছু শিরোনাম আনছি যার ভিতরে অনেক ইঙ্গিত আছে। চীনে ভারত কী শিক্ষা পেয়েছে  সম্ভবত এর ইঙ্গিত আছে এখানে। আনন্দবাজার পত্রিকা ২৯ জুলাই,  “বেজিংকে না চটাতে নির্দেশ প্রধানমন্ত্রী মোদীর”। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ২৯ জুলাই,  “Doklam is not about a road”।  অর্থাৎ ভারতের মিডিয়ার আর ডোকলাম অচলাবস্থার কারণ ডোকলামে না, বাইরে খুজতে শুরু করেছে। একটু দেরি হয়ে গেছে অবশ্য।  মনে হচ্ছে মোদি ভুলে মাটি খেয়ে ফেলেছেন বা মুখে মাটি গেছে। খুব সম্ভবত গাছের খাওয়া আর তলেরও কুড়ানোর দিন ভারতের জন্য শেষ হয়ে আসছে। কোন একটা বেছে নিতে হবে। এশিয়ায় পড়শিদের উপর ভারতের প্রভাব দাবরানি আর কূটচাল দিয়ে, কলোনি চিন্তা কাঠামো দিয়ে, বৃটিশ বাপ-দাদাদের ছিল ফলে একই স্টাইলে তা আমারও শাসনে থাকবে এই যুক্তিতে এখন টিকানো অসম্ভব, তাই সেগুলো সবই শেষ হয়ে আসছে, যাবে। সে জায়গায় চীনের যে প্রভাব বাড়ছে তা চীনা অর্থনীতির সক্ষমতার কারণে, এই অর্থে এটা অবজেকটিভ। চীনের সাবজেকটিভ ইচ্ছার কারণে এটা হয় নাই, হচ্ছে না এবং  হয় না। এই অর্থে আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে ভারতের বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এর মাসুলও দিতে হবে চড়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩০ জুলাই ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ৩১ জুলাই তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]