ঝুঁকে কান্নি মারার না, এটা ভারসাম্যের যুগ

ঝুঁকে কান্নি মারার না, এটা ভারসাম্যের যুগ

গৌতম দাস

১৫ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার,

আপডেটেড ১৭ জুলাই, ২০১৯ ১৭:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2CP

একালে আপনি কার দিকে? চীন, আমেরিকা নাকি ভারতের? সাথে রাশিয়ার নামটা নিলাম না, সেটা একটু পেছনে পড়েছে বলে। তো চীন, আমেরিকা নাকি ভারত – এই প্রশ্নের জবাব হল – একটাও না। আর সরাসরি বললে, জবাবে এখানে বিকল্প শব্দটা হল “ভারসাম্য”। কারও দিকে ঝুঁকে পড়া না, কান্নি মারাও না – বরং একটা ভারসাম্য। নিজের স্বার্থের পক্ষে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একটা ভারসাম্য। এই অর্থে এটা ভারসাম্যের যুগ।  চীন, আমেরিকা নাকি ভারত কারো সাথে নয়, এক ভারসাম্য অবস্থান বা ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট- এমন পজিশন নেয়া।

এককালে আপনি কোন দিকে? অথবা আপনার রাষ্ট্র কোন দিকে – আমেরিকা না সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া) কোন দিকে অবস্থান নিয়েছে? এটা খুবই ভ্যালিড প্রশ্ন ছিল। এভাবে ‘আপনি কোন দিকে’ বলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে বা কলোনি-উত্তরকালে ১৯৪৫ সালের পর থেকে দুনিয়ায় চলতে শুরু করেছিলেন। বলা বাহুল্য, সেটা আমেরিকার নেতৃত্বে সেকালের নতুন দুনিয়া। তখনো পরাশক্তি বা দুই মেরুতে বিভাজন শুরু হয়নি। সেটা হয়েছিল ১৯৫৩ সাল থেকে। শুরু হয়েছিল গ্লোব-জুড়েই এক ব্লক রাজনীতিঃ সোভিয়েত ব্লক না আমেরিকান ব্লক। এভাবে সেই থেকে ৭০ বছর আমরা পার করে দিয়েছি। ফলে আমাদের মতো দেশের ভাগ্য সেকালে লুকিয়ে ছিল ‘কোন দিকে’ বলে যার যার মতে, এক ভাল ব্লক খুঁজে নেয়ার ভিতরে। আর এই ছিল আমাদের “কোন দিকের” ধারণার জন্ম কাহিনী। এভাবেই চলছিল একনাগাড়ে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যায়। আর লোকে বলতে শুরু করেছিল যে, দুনিয়া এবার এক মেরু, আমেরিকান মেরুর দুনিয়া হয়ে গেল। কথা হয়তো আপতিকভাবে সত্য, অন্তত সাদা চোখে সবার তো তাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু আসলেই তাই কী?

ওদিকে চীনের উত্থানঃ  শুরু হিসাবে ধরলে চীনের উত্থানে আজকের চীন হয়ে উঠার শুরুটা বলা যায় সেই ১৯৬৮ সাল থেকে, যদি না ১৯৫৮ সালের তথাকথিত “সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে” এর শুরু বলে কেউ কেউ না-ই ধরতে চান। না, তথাকথিত লিখেছি, “সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা” ভুয়া ছিল বা মনে করি কিনা সেজন্য না। লিখেছি কারণ, আসলে সেটা ছিল দলের চিন্তার মূল খোলনলচা বদলে দেয়া এক বদল।  কিন্তু সেটা করা হয়েছিল “সাংস্কৃতিক বিপ্লবের” নামের আড়ালে। ফলে এটা দলের পলিটবুরোর নেতাদের সাথে তৃণমুল কর্মীদের সাংস্কৃতিক ফারাক দূর করার আন্দোলন একেবারেই নয়। বরং সেটা ছিল, পলিটবুরোর নেতাদের সাথে নেতাদের লড়াই। দলের পুরানা অবস্থানের সাথে নতুন রাজনৈতিক অবস্থানের লড়াই। আজকের চীন বলে যেটা দেখছি আমরা এটাই ছিল সেই নতুন রাজনৈতিক অবস্থান। এমনকি মাওও ছিলেন এটারই পক্ষে।
যাহোক, “সাংস্কৃতিক বিপ্লবটা” ভাল না মন্দ সে তর্ক এখানের নয় বলে সেটা এখন এড়াতেই মূলত ১৯৬৮ বলেছি। যেখানে ১৯৬৮ সাল হল যখন আসলে “সাংস্কৃতিক বিপ্লব” শেষে তা বিজয়ী ও মোটামুটি থিতু হবার কাল। তবুও দুনিয়া জুড়ে চীন আজকের এজায়গায় যেতে রওয়ানার এটা কোন ইঙ্গিত কিনা এমন আলোচনা কোথাও ছিল না। এর চেয়েও তখন মুল আলোচ্য ছিল কথিত “চীনা সমাজতন্ত্র” কোথায় যাচ্ছে।
এমনকি ১৯৬৮ সালই বা কেন, ১৯৭১ বা ১৯৭৮ সালেও খুবই কম একেবারেই হাতেগোনা কিছু লোক ছাড়া কেউ বুঝেনি যে, সেটাই আজকের চীন হওয়ার শুরু। অথচ চীনের কাছে ১৯৭১ সাল মানে আমেরিকার সাথে গোপন চুক্তি অনুসারে, ওর সাহায্যে চীন মানে মাও সে তুংয়ের চীন, সেই প্রথম জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ লাভ করেছিল। আর এটা ছিল ভেটো দেয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটা সদস্যপদ। অনেকের কাছে তথ্যটা আজব লাগতে পারে কিন্তু এই তথ্য শতভাগ সত্য। কারণ, জাতিসংঘে এই সদস্যপদ এত দিন (চীন বলতে) তাইওয়ানকে দিয়ে রাখা ছিল। আর সেটাই ১৯৭১ সালে সেবার তাইওয়ানকে বাদ দিয়ে মাওয়ের চীনের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল, আমেরিকার সাথে চীনের গোপন আলাপের ফলাফল অনুসারে। গোপন বলছি এজন্য যে ১৯৭১ সালেই কিসিঞ্জার [Henry Kissinger] গোপনে প্রথম “মাওয়ের  চীন” সফর করেছিলেন, আর সেখানেই ভেটোওয়ালা সদস্যপদ ফেরত পাবার বুঝাবুঝিটা তৈরি হয়েছিল।

আরও ওদিকে ১৯৭৮ সালঃ এটা উল্লেখযোগ্য এ জন্য যে, মোটাদাগের সব দেনা-পাওনা [চীন আমেরিকান পুঁজি, বিনিয়োগ ও পণ্য ইত্যাদি নিজ বাজারে প্রবেশ করতে দিবে। এতে বিনিময়ে কী কী নিবে এরই দেনা-পাওনা] ডিল সম্পন্ন করে চীন-আমেরিকা উভয় রাষ্ট্র পরস্পর পরস্পরকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়ে উভয়ে একে অন্যের দেশে অফিস খুলে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ সাল থেকে। এভাবে পরবর্তিতে ১৯৯০ পর্যন্ত চীন ছিল আসলে আমেরিকান পুঁজি ও টেকনোলজি কিভাবে ব্যবহার করবে এর, আর গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অর্থনীতি ও গ্লোবাল বাজারে প্রবেশ করে চীনের নিজেকে অভ্যস্ত, সাজানো ও খাপ খাইয়ে নেয়ার প্রস্তুতিকাল। আর এরও পরের প্রায় ২০ বছর ধরে চলে চীনের অর্থনৈতিক ডাবল ডিজিট (বা সময়ে এর চেয়েও বেশি) উত্থানের পর্ব। তবে ২০০৭ সালে গ্লোবাল রিসেশন শুরু হলে তা কমতে থাকে। তত দিনে আমেরিকা বুঝে গেছিল যে, চীন গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ে উঠার দিকে, তাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
তাই ব্যাপারটা এমন নয় যে, আমেরিকা আগে তা জানত না বা অনুমান করেনি। আসলে বিষয়টা ছিল জেনেও কিছুই করার নেই ধরণের পরিস্থিতি। গ্লোবাল পুঁজির এক আপন স্ববিরোধী স্বভাব এটা। চীনের জনসংখ্যার শত কোটির ওপরে (২০১৮ সালের হিসাবে ১৪২ কোটি)। এমন দেশে সত্তরের দশকেও সে ভার্জিন এই অর্থে যে তখনও সেখানে কোন বিদেশি বিনিয়োগ যায় নাই। তাই এর বাজার খুলে দিলে এর বিদেশি পুঁজি পাবার আকাশচুম্বি চাহিদা পুরণ করতে বাইরের সকলে ঝাপিয়ে পড়বে। মানে উলটা করে বললে ওয়ালস্ট্রিটের চোখে এত বড় ক্রেতা সে জীবনেও কল্পনা করে নাই। তাই চীনে বিদেশি বিনিয়োগে বাজার চাহিদা ধরতে আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট একে উপেক্ষা করা কথা চিন্তাও করতে পারে না।  তাই আমেরিকান পুঁজিতে চীন ফুলে-ফেঁপে উঠতে থেকেছিল ১৯৯০ সালের আগেও,  তবে ১৯৯০ সালের পরে আরও প্রবলভাবে। এটা জানা সত্বেও যে এই পুঁজি চীনে ব্যবহৃত হবার পরে যে নতুন উদ্বৃত সঞ্চয় ও সম্পদ তৈরি করবে তা বলাই বাহুল্য আমেরিকাকে পিছনে ফেলে দিবে এবং চ্যালেঞ্জ করবে, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু এই ভবিষ্যতের কথা ভেবে চীনে প্রবেশের সুযোগ আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট উপেক্ষাও করতে পারে নাই কারণ উপেক্ষা করলে তাতে তার নিজের মরণ। মূল কথা, সব সময় নতুন নতুন বিনিয়োগের সুযোগের ভিতরই কেবল আমেরিকার ওয়ালস্ট্রিট এর জীবন। তাই নতুন শতকের শুরু থেকেই আমেরিকা জেনে যায় চীন উঠে আসতেছে। এটা দেখেই বুশের আমলে, ২০০৪ সাল থেকে শুরু হয়েছিল এবার চীন ঠেকানোর [China Containment] কৌশলের তোড়জোড়। প্রেসিডেন্ট বুশের ভারত সফর (২০০৬ মার্চ) থেকে ভারত আমেরিকার হয়ে চীন ঠেকানোর কাজ হাতে নেওয়ার ব্যাপারটা আর একধাপ আগিয়েছিল। আর তখন থেকেই ধীরে ধীরে আপনি কোন দিকে অথবা আপনার রাষ্ট্র কোন দিকে, সেটা বুঝতে পারা ও জবাব দেয়া আর আগের মত সহজ থাকেনি। কেন?

আপনি কোন দিকে, এর জবাব দেয়া শুরুর সেকালে সহজ ছিল। কারণ, আমেরিকা নাহলে সোভিয়েত – এদুটোর কোন একটা মেরু বা পরাশক্তি আপনি বেছে নিলেই হত। কিন্তু একালে ব্যাপারটা আর মেরু বা পরাশক্তি-কেন্দ্রিক বিষয় নয়। যেমন – আপনি কোন দিকে চীন, আমেরিকা নাকি ভারত? এই প্রশ্নের মধ্যে চীন, আমেরিকা বা ভারত এদের কাউকে পরাশক্তি গণ্য করা নাই বা হয়নি। একালে কেউ পরাশক্তি কি না তা এখানে মুখ্য বিষয়ই নয়। মুখ্য বিষয় গ্লোবাল অর্থনীতিতে নেতা বা নেতৃত্ব কার, সেখানে। ফলে তা আসলে এখন মূলত পুরনো নেতা আমেরিকার জায়গায় নতুন হবু নেতা চীনের যোগ্য হয়ে দখল নেয়ার ইস্যু।

এই হিসাবে এখানে নেতা বা কেন্দ্র দুইটা – চীন ও আমেরিকা। তাহলে, সাথে ভারতের নামও আসছে কেন? কারণ, ভারত আমেরিকার হয়ে সে “চীন ঠেকানোর” কাজে ভাড়া খাটত। প্রতিদান হিসেবে পেয়ে গেছিল বাংলাদেশের ওপর আমেরিকান ছড়ি ঘুরিয়ে মাতবরি। এছাড়াও আর একটা দিক হল, চীনের প্রায় কাছাকাছি জনসংখ্যার দেশ হল ভারত। ফলে এখনই না হলেও ভারত পটেনশিয়াল বা আগামীর সম্ভাবনা ভাল, এমন অর্থনৈতিক হবু শক্তি; এতটুকুই। তাতে সব মিলিয়ে ভারত ভেবেছিল এভাবেই দিন যাবে “চীন ঠেকানোর” বোলচালের মধ্যে থাকবে আবার চীনের নেতৃত্বে নতুন বিশ্বব্যাংক ‘এআইআইবি’ খুললে তাতে চীনের পরই বড় মালিকানা শেয়ারটা চীন ভারতকেই দিবে। ব্যাপারটা সেই কবিতার মতো যেন বলছে – “এভাবে কি দিন যাবে তোমার কোলে মাথা রেখে শুয়ে অথচ তোমার কথা না ভেবে!’ ভারত আগামি গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা চীনের কোলে শুয়ে অথচ আমেরিকার কথা ভেবেই দিন কাটিয়ে দিতে পারবে – তাই ভেবেছিল।
কিন্তু না একালে দিন তেমনভাবে যায়নি। যাওয়ার কথাও ছিল না। এখন ফলাফল হল বাংলাদেশ আমেরিকার হাতছাড়া, উল্টা বাংলাদেশ এখন ভারতের কোলে, সেটা সত্য। কিন্তু ওদিকে আবার ট্রাম্পের আমলে এসে ভারতকে “চীন ঠেকানোর” কাজে ভাড়া খাটাতে ট্রাম্পের আমেরিকাই আর আগ্রহী নয়। উল্টো চীনের মত ভারতের বিরুদ্ধেও ট্রাম্প বাড়তি শুল্ক আরোপের বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে দিয়েছে। যেখান থেকে ভারত আবার মোচড় দিয়ে নিজের আত্মগরিমা আর ট্রমা-ভীতি পেছনে ফেলে চীনের কোলে য়ুহান সামিটে হাজির। বলা হচ্ছে, ওই য়ুহান সম্মেলন সেখানে এমন কিছু মৌলিক বোঝাবুঝির ভিত্তি নাকি তৈরি হয়ে গেছে, যা আরো বিকশিত বা বাড়তে না পারলেও নাকি পিছাবে না। আমেরিকার সাথে ভারতের পরস্পরের পণ্য অন্যের যার যার বাজারে ঢুকার বিরুদ্ধে উভয়েরই বাড়তি বাণিজ্য শুল্ক আরোপের ফলে – এটা দুদেশেরই রপ্তানি প্রায় স্থবির করে ফেলেছে। গতমাসে জাপানে জি২০ এর বৈঠকের ফাঁকে সাইডলাইনে ট্রাম্পের চাপ বা হুমকি – মার্কিন পণ্যের ওপর ভারতের উচ্চ শুল্কারোপ গ্রহণযোগ্য নয় – এসবই একালের পরিণতি।

কিন্তু ট্রমা- ভারতের ট্রমা [Trauma] সে ব্যাপারটা কী? বিষয়টা হল, ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের হার, এটাই তাকে বারবার বেচাইন অস্থির করে যে যদি একালে আবার সেটা হয়, এটি ভীতিই ভারতকে বারবার আমেরিকার দিকে টেনে নিয়ে যায়। চীন আগামির ফ্রেশ গ্লোবাল নেতা, তুলনায় আমেরিকা ক্রমশ ডুবে যাওয়া নেতা – এটা ভারতের অজানা নয়। তাই আমেরিকার চেয়ে আগামি নেতা চীনের সাথে আগেই গাটছাড়া বাধলে গ্লোবাল অর্থনীতিতে প্রভাব প্রতিপত্যি আগেই বাড়বে শুধু তাই না, আগামি দুনিয়ার যা কিছু নতুন রুল তৈরি হবে তা তৈরিতে নিজের ভুমিকা মতামত আগেই চীনের পাশাপাশি জোরদার করে রাখতে সুবিধা পাবে।  কিন্তু ট্রমার জন্য ভারত আমেরিকার দিকেই বারবার ফিরে আসে, কান্নি মেরে পরে থাকে। অর্থাৎ বলা যায়, ভারত আমেরিকার সাথে তার সম্পর্ককে ভারসাম্যের জায়গা থেকে দেখে না, দেখতে পারে না। বরং আমেরিকাকে পুরনো পরাশক্তির আলোকে দেখতে চায়। কিন্তু চীন-আমেরিকার দ্বন্দ্ব তো পরাশক্তিগত নয়। তবু ভারত আমেরিকার দিকেই কেবল ছুটে যায়। এছাড়া সবখানেই ভারতের গাছের খাওয়া আবার তলারও খেতে চাওয়ার নীতি তো আছেই। আবার তাতে সময়ে ধরাও খায়। যেমন ২০১৮ সালের মাঝামাঝি ট্রাম্প নিজের আফগান পলিসি প্রকাশ করেছিলেন। এতে পাকিস্তানকে সন্ত্রাস প্রশ্রয় দেবার অভিযোগ দিয়ে সাজানোতে ভারত আবার তাতে ছুটে গিয়েছিল মোহে। কিন্তু না! ছয় মাস যেতেই জানা গেল ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে শেষ হাজার দশেক আমেরিকান সৈন্য, তাও এবার ফেরত আনতে চান। অথচ আফগান নীতিতে এর কোনো ইঙ্গিতও ছিল না। যা হোক, সৈন্য ফেরতের চিন্তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন দেখল, পাকিস্তানের সহায়তা ছাড়া তা অসম্ভব। ফলে যে পাকিস্তানকে আমেরিকা চীনের কোলে ঠেলে ফেলে দিয়েছিল, তাকেই আবার কুড়িয়ে নেয়া শুরু করেছিল।

আমেরিকার আফগানিস্তান-বিষয়ক বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ [U.S. envoy Zalmay Khalilzad ] এই সেই বিশেষে দুত যিনি ট্রাম্পের আফগান নীতি প্রকাশের সময় পাকিস্তানের কঠোর সমালোচক, উঠতে বসতে সন্ত্রাস লালনকারী বলেছিল। সেই তিনি এবার সৈন্য ফেরানোর উপায় হিসেবে তালেবানদের সাথে কথা বলা আর রফাচুক্তি করার চেষ্টায় পাকিস্তানের সহায়তা কামনায়  এসে এবার পাকিস্তানকেই প্রায় বাপ ডাকা বাকি রেখেছে।  এরই সর্বশেষ হল আজ ১৫ জুলাই টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে “আফগান শান্তি আলোচনা থেকে ভারতকে কুনুই মেরে বের করে দেয়া হয়েছে” [India elbowed out of Afghanistan peace talks]।

আবার, সাম্প্রতিককালে আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান “ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স” [Financial Action Task Force (FATF)] প্রবল সক্রিয় হতে দেখা গেছে। এই সংগঠন মূলত মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার যার একটা বড় অংশ জঙ্গিসংগঠনের অর্থ যোগানদাতা বলে অনুমানে এরই কাউন্টার করতে নানান পদক্ষেপ নিয়ে থাকে ও তা মনিটর করে। এতে আমেরিকার উদ্যোগে পাকিস্তানকে চেপে ধরাতে [পাকিস্তানের অনেকগুলো পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ছিল, কিন্তু প্রতিশ্রুতিমত তা নেয় নাই। তারিখ মিস করেছে।] ভারত খুবই খুশি ছিল। নিজ মনকে আশ্বস্ত করেছিল ভারত যে, হ্যাঁ অন্তত এই টেররিজম ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার এই অ্যালায়েন্স, এটাই তো ভারত চায়। এটা খুব দরকারি আর কাজেরও। এবং তারা দুই-রাষ্ট্র কত ভাল এবং তার টেররিজম ইস্যুতে একটা ন্যায্য লড়াইয়ে সংশ্লিষ্ট হয়ে আছে। তাই তারা পাকিস্তানের মত নয়। অনেক ভাল। কিন্তু ঘটনার বাস্তবতা হল, এমন টেররিজম ইস্যু বলে আসলে বাস্তব দুনিয়াতে সত্যিকারের কিছুই নেই। টেররিজম কী, কোনটাকে বলবে, কী হলে বলবে এর এমন সংজ্ঞাই নাই – না আমেরিকার নিজের কাছে, না জাতিসংঘের। কেবল এক তালিকা আছে, কাদেরকে বা কোন সংগঠনকে তারা টেররিস্ট মনে করে। আর সেই থেকে বরং টেররিজম বলতে ভারত-আমেরিকা নিজেরা কী বুঝবে ও বুঝাবে, এ নিয়ে তাদের মধ্যে “গভীর বোঝাবুঝি” আছে অবশ্যই। কাকে টেররিজম বলে চালিয়ে দিবে – সেটাই আসল সেখানে। যেমন- ২০০৭ সালে যা বলা হয়েছিল ওর সারকথা ছিল যে, বাংলাদেশকে টেররিজম মোকাবেলার যোগ্য করে সাজাতে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিচ্ছে। অথচ এই “টেররিজম” কথাটি ছিল এক সাইনবোর্ড মাত্র। ভারতের মূল স্বার্থ ছিল আসামের বিচ্ছিন্নতাবাদ ঠেকাতে, তা ভেঙ্গে দিতে বাংলাদেশকে ব্যবহার করা আর কলকাতা থেকে নর্থ-ইস্ট সরাসরি যোগাযোগের নানান করিডোর হাসিল করা।  সেকাজে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বিনা পয়সায় সব ধরণের করিডোর এককভাবে হাসিল করেছে ভারত। এখানে এককভাবে কথাটার মানে হল, করিডোর কেবল ভারতই ব্যবহার করবে, চীন পারবে না। এছাড়া সেই সাথে ভারত পুরা বাংলাদেশের বাজার দখল পেয়ে নিবে।  সার কথা ভারত কেবল “কানেকটিভিটি” “কানেকটিভিটি” বলে চিৎকার করবে, মুখে ফেনা তুলে ফেলবে। কিন্তু এর মানে হবে বাংলাদেশের উপর দিয়ে কেবল ভারতই যাবে। কিন্তু ভারতের উপর দিয়ে কেউ যদি বাংলাদেশে আসতে চায়, আমরা যেতে চাই – না সেটা সে পারবে না। সেটা নেপাল, ভুটান কিংবা চীন এমন পড়শি কেউ যেই হোক তারা বাংলাদেশে আসতে পারবে না বা আমরাও যেতে পারব না। আর ভারত সব পাবার বিনিময়ে  আমেরিকার স্বার্থে ভারত এবার  “চীন ঠেকানোর” কাজে অবস্থান নিয়ে ভাড়া খাটবে। তাহলে দাঁড়াল যে এই হল ভারত-আমেরিকার টেররিজমের সংজ্ঞা ও বিশেষ বুঝাবুঝি। আর সেই সাথে সীমান্তে বাংলাদেশি মেরে শেষ করে চলবে। কিন্তু? হা আরও বিরাট “কিন্তু” তৈরি হয়েছে এখন।

ভারত-আমেরিকার এই “বিশেষ টেররিজম-বুঝের” সাইনবোর্ড তাদেরকে অনেক কিছু এনে দিয়েছিল, বিশেষ করে তাতে ভারতের  আস্থা ছিল দৃঢ় ও গভীর। কিন্তু টেররিজম-বুঝের সাইনবোর্ড এখন তা করলার চেয়েও তিতা। কেন? বালুচিস্তান!

বালুচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন বা পাকিস্তান থেকে আলাদা স্বাধীন হতে চাওয়ার আন্দোলন অনেক পুরনো। কিন্তু এতে পাকিস্তান সরকারের সাথে কোনো নেগোসিয়েশন বা রফা-পরিণতিতে না যেতে পারার পেছনে একটা বড় কারণ হল – ভারতের গোয়েন্দা বিভাগের এই আন্দোলনের দলকে [(বিএলএ), Baluchistan Liberation Army (BLA)) প্রায় খোলাখুলি সহায়তা ও সমর্থন। কিন্তু এবার এক বিরাট কিন্তু হল,  গত ২ জুলাই আমেরিকা পররাষ্ট্র দফতর বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে (বিএলএ) স্পেশালি ডেজিগনেটেড গ্লোবাল টেররিস্ট [Specially Designated Global Terrorists (SDGTs)] বলে ঘোষণা দিয়েছে। ট্রাম্পের এক নির্বাহী নির্দেশে এটা জারি করা হয়েছে গত সপ্তাহে, ০২ জুলাই।

পাকিস্তানে সাধারণ নাগরিক ও নিরাপত্তারক্ষীদের বিরুদ্ধে (বিএলএ) বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান সরকার ২০০৬ সালে এই সশস্ত্র গ্রুপটিকে নিষিদ্ধ করেছিল। বলাই বাহুল্য, এবারের ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তকে চীন ও পাকিস্তান উভয়ে স্বাগত জানিয়েছে। অথচ চিপায় আটকা পড়ে ‘কোথাও নেই’ হয়ে গেছে ভারত। বিএলএ-কে টেররিস্ট বলায় এতে চীনেরও স্বার্থ ছিল সরাসরি। কারণ, পাকিস্তানের পেট চিরে পাকিস্তানের সব প্রদেশ ছুয়ে তাদের উপর দিয়ে টানা “চীন-পাকিস্তান করিডোর” [CPEC] স্থাপনার কাজে চীনা ঠিকাদারের কর্মীরা বারবার বিএলএ’র হাতে অপহরণের বা চাঁদা দানের শিকার হয়েছে বহুবার, চলতি শতকের শুরু থেকেই। সেসময় মনে করা হত, চীন-পাকিস্তানের এমন সহায়তার সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে ভারত  (বিএলএ)কে সহায়তা দিয়ে গিয়েছে। কিন্তু ট্রাম্পের এই নির্বাহী নির্দেশের পরে? আরও আছে!

ট্রাম্পের বিএলএ-কে শুধু টেরর ঘোষণা করা নয়, আগামী ২২ জুলাই ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-ইমরানের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার এক ঘোষণাও দিয়েছে হোয়াইট হাউজ, গত ১১ জুলাই। মানে ব্যাপারটা এক কথায় বললে আমেরিকার নিজের কৌশলগত অন্য কোনো স্বার্থে – এককালে আচারের আঁটির মতো চুষে রস খেয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়া পাকিস্তানকে আবার এবার সমাদরে কোলে তুলতে চাইছে আমেরিকা। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, এখানেও (বিএলএ)কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেয়া আসলে কোন টেররিজম ইস্যু নয়, সাইনবোর্ড মাত্র; আমেরিকার কৌশল্গত স্বার্থ মাত্র, যা আগে বাংলাদেশের মতোই। তাহলে ভারতের এখন এতে বাকশূন্য বোকা হয়ে যাওয়া কেন? যাকে কেউ কেউ বলছে তিতা ওষুধ খাওয়া। কারণ হল, ভারতের কাশ্মিরে সরকারি টেররিজমের নিপীড়ন ও হত্যার পক্ষে এতদিন ভারতের পক্ষে একটা ন্যায্যতা বা সাফাই জোগাড় করে দেয়া হয়ে যেত এই বলে যে, টেররিজমের একক হোতা হল পাকিস্তান বা মুসলমানরা। কিন্তু আমেরিকার বিএলএ-কে টেররিস্ট ঘোষণা করাতে এবং  ঘোষিত সেই দলকে খোদ ভারতই সমর্থন করত বলে ভারত হয়ে গেল এখন টেররিস্ট-সমর্থক রাষ্ট্র ; আমেরিকা পরোক্ষে এবার তাই বলে বসল।

তাহলে এখান থেকে কী শিক্ষা? শিক্ষাটা হল, চলতি এযুগ গ্লোবাল নেতৃত্বের বিশেষত, অর্থনৈতিক নেতৃত্বের নেতা বদলের যুগ এটা। আবার খেয়াল রাখতে হবে, এটা সোভিয়েত-আমেরিকার দুই ব্লকে ভাগ হয়ে থাকার যুগ নয়। ব্লকে ভাগ হয়ে থাকা কথাটা বুঝতে হবে। সেকালে এর মানে ছিল এক ব্লকের কোনো রাষ্ট্রেরই অপর ব্লকের কারো সাথে পণ্য, পুঁজি বিনিয়োগ বাজার ইত্যাদিতে কোনো লেনদেন-বাণিজ্য সম্পর্ক রাখত না, হারাম মনে করত, তাই সম্পর্ক বলতে কিছুই ছিল না।

অথচ এ কালে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে যতই ঝগড়া বা রাষ্ট্রস্বার্থবিরোধই থাক না কেন- সেখানে একই সাথে উভয় রাষ্ট্রের মধ্যে পণ্য, পুঁজি বিনিয়োগ বাজার ইত্যাদিতে সব বিনিময় লেনদেন-বাণিজ্যও সমানে চলে থাকে। অতএব, এ কালের ফর্মুলা হল সবার সাথেই নিজস্বার্থ মুখ্য করে এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করে লেপটে থাকা। তাই চীন, না আমেরিকা, নাকি ভারত এভাবে কারও দিকেই এককভাবে কান্নি মেরে থাকা যাবে না। এটা আবার শর্টকাট কোনো ন্যাশনালিজমের মত তা ভেবে বসাও ভুল হবে।

কাজেই আপনি ভারতের দালাল – নিজভূমিতে অন্যকে করিডোর দিয়েছেন, বাজারসহ সব খুলে দিয়েছেন এমন ভারতের দালাল, নাকি আপনি চীনের বিনিয়োগ এনে সয়লাব করেছেন সেই চীনা দালাল- এ দুটোই ভুল পথ। এমনকি এ দুইয়ের ভয়ে আমেরিকার কোলে গিয়ে উঠেছেন, এটাও ভুল। বরং তিনের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে হবে কিন্তু ভারসাম্যপূর্ণভাবে। এককভাবে কারো সাথে সম্পর্ক [এক্সক্লুসিভ বা বিশেষ সম্পর্ক, বন্ধুরাষ্ট্র ইত্যাদি সব] একালে হারাম, বরং কার সাথে কতটুকু যাবেন তা আগেই নিজ বোঝাবুঝি ঠিক করে রাখতে হবে। প্রয়োজনে তা বলা যেতে পারে, কখনো বলা যাবে না, কাজে দেখাতে হবে। কিন্তু নিজে কী করবেন সেই নিজ হোমওয়ার্ক অবশ্যই আগে করে রাখতে হবে।

সোনাদিয়ায় বন্দরসহ বিসিআইএম করিডোর নির্মাণ আমাদের কৌশলগত মৌলিক স্বার্থ। অথচ ভারতের স্বার্থকে প্রাধান্যে রাখতে এটা কমপক্ষে ১০ বছর ধরে উপেক্ষায় ফেলে রাখা হয়েছিল। আমাদের ‘নিশীথ ভোটের’ পরবর্তীকালে এ থেকে পরে পাওয়া দিকটা হল, এটা উন্মোচিত হয়ে গেছে যে, ক্ষমতায় আসার জন্য কারোই আর ভারতের সমর্থন জরুরি বা এসেনশিয়াল নয়। আবার আমেরিকাও এখন বিষহীন ঢোঁড়া সাপে পরিণত। আর বিরোধী দলসহ সারা দেশের মানুষ আজ ভারতকে আমাদের ঘাড়ে চেপে বসা দানব মনে করছে। ফলে তারা ভারতবিরোধী। লক্ষ্যনীয় যে এবারই প্রথম এই ভারতবিরোধিতা পুরাপুরি রাজনৈতিক, এ টু জেড রেখা টানতে পারবেন। তাই এটাই তো হাসিনার জন্য ছিল সব উপেক্ষা করে নিজস্বার্থে চীন সফরের সবচেয়ে ভালো সময়। শেখ হাসিনা যা বুঝেই নিয়ে থাকেন না কেন, এক সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। ওদিকে এতে চীনা প্রতিক্রিয়া বা সাড়া ব্যাপক। তারা আশাতীত খুশি যে, বাংলাদেশ নিজের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে। চীনা গ্লোবাল টাইমস তিনটারও বেশি আর্টিকেল ছেপে উচ্ছসিত। হাসিনাকে উদ্ধৃত করে লিখেছে, বাংলাদেশ বেল্ট-রোড আর বিসিআইএম [BCIM-EC] করিডোরে অংশ নিতে খুবই আগ্রহী। এই রিপোর্টের শিরোনাম হল, Hasina in balancing act between China, India। [এই রিপোর্টের শেষেই সবগুলো খবরের লিঙ্ক পেতে পারেন]।

তারা আসলে আরও খুশি এ জন্য যে, বিসিআইএম প্রকল্প জেগে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এখন এতে বা বেল্ট রোডে ভারত যোগ দেবে হয়তো কোনো এক কালে, আমেরিকার হাতে কোনো পরিস্থিতিতে চরম নাকানি-চুবানি খাওয়ায় বিধ্বস্ত হওয়ার পরে। কিন্তু কথাটা তারা ইতিবাচকভাবে লিখেছে।  সেকথা আমাদের ইউএনবি বার্তা সংস্থার বরাতে ভারতের দ্যা হিন্দু পত্রিকা বিরাট করে লিখেছে [“the initiative would have to be revived working together with India,” the United News of Bangladesh (UNB) reported on its website.]।

প্রথম আলোতে চীন সফরঃ
তবে হাসিনার চীন সফর প্রসঙ্গে প্রথম আলোর ভুমিকা খুবই নেতিবাচক। প্রায় সময় সে আমেরিকান অবস্থান নিয়ে খবর হাজির করে থাকে। এবার আমেরিকার হাসান ফেরদৌস যে লেখাটা লিখেছে সেটা অর্ধ সত্য বা পুরাই অসত্য। আর তা আমেরিকার তো বটেই, ভারতেরও কৌশলগত অবস্থানে দাঁড়িয়ে লেখা। মূলত তিনি কোন যুক্তি বলা ছাড়াই, চীনবিরোধী। এই খামতি তিনি পুরণ করতে, আশির দশকের চিন্তায় ও তথ্যের উপর দাঁড়িয়ে কথা বলে গেছেন। আবার ভারতীয় প্রপাগান্ডা খেয়ে লিখছেন, ভারত নাকি আমাদের চীনের মতই ঋণ দিয়ে অবকাঠামো গড়ে দেওয়ার সঙ্গী। যেমন লিখছেন, “চীন ও ভারত দুই দেশই আমাদের অবকাঠামো খাতে বড় রকমের ভূমিকা রাখছে”। কিন্তু ভারত কোন অবকাঠামো আমাদের গড়ে দিয়েছে? নিজস্বার্থে করিডোরের কিছু অবকাঠামো গড়ে নেয়া ছাড়া? তা আমাদের জানা নাই। যেমন ভারতের বহরমপুর জেলা থেকে বাংলাদেশ হয়ে আসাম – এই তেল পাইপ লাইন স্থাপন কী বাংলাদেশের স্বার্থে্র অবকাঠামো? ভারতের টাটা আর লিলেন্ড গাড়ি, আমাদের বিআরটিসি- এর ঘাড়ে ডাম্প করতে কোন প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ছাড়াই এটা করা হচ্ছে। আর এতে দেখানো হয় যে ভারত আমাদের ঋণ দিয়েছে এই গাড়ি কিনতে। অথচ ব্যাপারটা উলটা, ভারতের রুগ্ন ইস্পাত শিল্পকে বাঁচাতে ভারত সরকার ওসব গাড়ির দাম আগেই শোধ করে কোম্পানিগুলোকে বাঁচায়। এরপর কেনা সেই গাড়ি ভারত সরকার আমাদেরকে ঋণে বিক্রি করেছে বলে কাগজপত্রে দেখায়। এই হল “অবকাঠামো ঋণ”!
এছাড়া ভারত কী কাউকে অবকাঠামো ঋণ দিতে সক্ষম এমন অর্থনীতির রাষ্ট্র? নাকি ভারত এখনো মূলত ঋণ নেওয়ার রাষ্ট্র? কাজেই ভারত আমাদের অবকাঠামো গড়ে দেয়, এসব আজগুবি তথ্য তিনি কোথায় পেলেন? এগুলো তো ভারতের প্রপাগান্ডা দালালি! আজীব! এছাড়া লেখার শিরোনামসহ তিনি হাসিনা সম্পর্কে আনন্দবাজারি স্টাইলে লিখছেন, হাসিনা নাকি “চীনা তাস” খেলতে গেছেন। যেন এক বিনোদন রিপোর্ট লিখতে বসেছেন।
সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে সম্পর্কে লিখছেন, “বাংলাদেশ যে চীন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চায়” সেজন্যই নাকি এই বন্দর নির্মাণ হয় নাই। আবার নিজেই বলছেন, “ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তিতে সে (সোনাদিয়া) উদ্যোগ ভেস্তে যায়”। এই তথ্যও ভিত্তিহীন কারণ, যুক্তরাষ্ট্রকে হাসিনার “বিকল্প কিছু” দেওয়াতে সোনাদিয়া নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এতে কোন আপত্তি নাই। আপত্তি একমাত্র ভারতের।  আবার “বাংলাদেশ যে চীন থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে চায়” – এই কথা সত্যি হলে তাহলে আর হাসিনা চীন সফরে গেলেন কেন? কী বিনোদন কাটাতে গেছিলেন? তাহলে চীনে গিয়ে আবার [BCIM-EC] প্রকল্প শুরু করতে আলাপ তুললেন কেন? সে ব্যাখ্যা কই?
আর [BCIM-EC] প্রকল্পতে যদি বন্দরসহ প্রকল্প এটা নাই হয় তবে এটাকে বেল্ট-রোড মহাপ্রকল্পে যুক্ত হবার এক “করিডোর” ভাববার তো কোন সুযোগই নাই। কাজেই বন্দর-ছাড়াই BCIM-EC প্রকল্প, এমন ভাবনা তো আসলে ভারতের অবস্থান। তাও পুরানা অবস্থান। সম্প্রতিকালে সেঅবস্থান থেকে ভারতের নড়াচড়ার আলামত দেখাচ্ছে। আসলে হাসিনার চীন সফর নিয়ে কিছু বলার জন্য নুন্যতম তথ্য নিয়ে পড়াশুনা বা নাড়াচাড়ার দরকার তা ফেরদৌসের কাছে নাই, ফাঁকিবাজ ছাত্রের মত যার হোমওয়ার্ক নাই।

আরও আজিব কান্ড তিনি পায়রা বন্দরকে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরের বিকল্প বলে ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। পায়রা চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে একটু বড় মাত্র। এছাড়া ড্রাফট বা গভীরতার লিমিটেশন, মানে বড় জাহাজ ঢুকানোর লিমিটেশন আছে, তাই একে গভীর সমুদ্র বন্দর বলতে অনেকের দ্বিধা আছে। আরও পরিকল্পনাগত বিরাট ত্রুটি হল,  সারা বছর এই বন্দরের প্রবেশ অংশকে নাব্য রাখতে হলে সারা বছরই একে ড্রেজিং করে যেতে হবে। সোনাদিয়া লোকেশনে ড্রাফট যেখানে প্রাকৃতিকভাবেই ১৮ মিটার। তাই আমেরিকার চোখেই বাংলাদেশের দুটা বিস্ময়কর অবকাঠামো বিনিয়োগ প্রকল্প হল, পায়রা আর রূপপুর। এককথায় বললে, চীন ঠেকানী মুডের ভারতের মান-মন রাখতে ‘পায়রা’ আসলে এক অর্থহীন, টাকা পানিতে ফেলা প্রকল্প।

হাসান ফেরদৌসের আজগুবি তথ্য আরও আছে। তিনি বলেছেন, এবার এপ্রিলে চীনে “বেল্ট-রোড সামিটে নাকি প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম নেতৃত্ব দিতে” গিয়েছিলেন। এটা ভুল তথ্য। বরং প্রতিনিধি দলের নেতা হিসাবে গেছিলেন কোন প্রতিমন্ত্রী না বরং ফুল মন্ত্রী। আর সেই মন্ত্রী হলেন, শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ুন । যেটা গওহর রিজভিও নিশ্চিত করেছেন পাবলিকলি। আর হংকংয়ের পত্রিকায় সাক্ষাতকার শাহরিয়ার আলম দিয়েছিলেন কথা সত্য কিন্তু, কোথায় বসে তা অস্পষ্ট। ঢাকায় বসেই খুব সম্ভবত, এবং তা ভারতের আয়োজনে। খুব সম্ভবত ঠিক সেসময়ের দ্বিধাগ্রস্থ হাসিনাকে চাপ দিয়ে কাজে লাগিয়ে। যেটার পুরা পরিস্থিতি বদলে যায় চীনা রাষ্ট্রদুতের উদ্যোগে ফলে, বিশেষ করে বিএনপিকে -সহ  স্থানীয়ভাবে সরকার, রাজনীতিক, সাংবাদিক ইত্যাদি নানান ব্যক্তিত্বদের নিয়ে “বাংলাদেশ-চীন সিল্ক রোড ফোরাম” গঠন করে ফেলার পরে; হাসিনা তখন থেকেই সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যান।
এখন কথা হল, প্রথম আলো এমন আধা-সিদ্ধ লেখা ছাপাচ্ছে কেন? লেখকের পরিচয় হিসাবে তাঁর লেখার নিচে লেখা থাকে, ” হাসান ফেরদৌস, যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি”। অর্থাৎ এটা অপিনিয়ন বা কোন গেস্ট লেখকের কলামও নয়, প্রথম আলোর নিজের স্টাফ রিপোর্ট। তাহলে প্রথম আলো, সে কার পক্ষে থাকতে চায়? ভারত বা আমেরিকার সমর্থনে ভারতের পক্ষে? প্রথম আলোর ম্যানেজমেন্ট কী এগুলো দেখে নাই, জানে না? অদ্ভুত ব্যাপার! তবে একটা জিনিষ আমরা পরিস্কার থাকতে পারি। এমনটা চলতে থাকলে আগামিতে বড় কাফফারা দিতে হবে।

কিন্তু কথা হল, তাতে চীন ভারতকে যতই সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ডালি চীন বা বাংলাদেশ যতই সাজিয়ে রাখুক না কেন অথবা বিসিআইএম প্রকল্পে ভারতের যোগদানের দরজা খুলে রাখুক না কেন – এতে ভারতের অন্তর্ভুক্তি খুব সহজ নয়। আবার তা অসম্ভবও নয় নিশ্চয়। আবার এটা হতেও পারে যে, দেখা গেল ট্রাম্পের বাকি আমলের (জানুয়ারি ২০২১) মধ্যেও মোদী সিদ্ধান্ত নিতেই পারলেন না। [একটু আগের খবর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের ভারত সফরের (এটা গত বছর চীনে মোদীর “য়ুহান সামিটের” পাল্টা সমতুল্য সফর)] তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও তা সেই অক্টোবর ১২ তারিখে। অর্থাৎ বুঝা গেল মোদীর তেমন তাড়া নাই।  যদিও অনেকে অবশ্য বলছেন, গত জুন মাসে কাজাখস্তানে সাংহাই করপোরেশনের [SCO] শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানে ঐ সম্মেলনের এক যৌথ ঘোষণা থেকে বেল্ট রোড প্রকল্পের ব্যাপক প্রশংসা করা হয়। আগে এমন হলে, তাতে ভারতের আপত্তি আছে বা অংশগ্রহণে ভিন্নমত আছে বলে তা সাথে উল্লেখ থাকত। এবার তেমন কিছুই দেখা যায়নি। অনেকে এর অর্থ করছে যে, ভারত সম্ভবত এখন থেকে এতটুকু সরেছে যে সে বেল্ট-রোডের প্রসঙ্গটা গ্রহণও করেনি আবার বিরোধিতাও করেনি, এমন অবস্থায় এসেছে – আগের আপত্তির জায়গা থেকে সরে এসে।

তবুও এতে তেমন আশাবাদী না হওয়ার অন্য কারণ হল, যে হিন্দুত্বের ঝাণ্ডা তুলে মোদি আবার ক্ষমতায় এসেছেন তা হলো চরম মুসলমান বিরোধিতা, যেটা পারলে ভারত থেকে প্রায় মুসলমান জনগোষ্ঠিকে মুছে নির্মুল করে ফেলার এক আকাঙ্খা যেন, যার মানে মুসলমানের কারণে পাকিস্তান বিরোধিতাও। কিন্তু এই ডিভিডেন্ড বা বাড়তি লাভ মোদী সহসাই লঘু করতে চাইছেন না। আগামী পাঁচ বছরজুড়েই ভারতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় পাঁচ রাজ্য করে নির্বাচন হবে। তাই এই একই মুসলমানবিদ্বেষী হিন্দুত্ব মোদীকে ব্যবহার করে যেতে হবে। এ ছাড়া বাবরি মসজিদ মন্দির বানানো, আসামসহ সারা দেশে নাগরিকত্ব পরীক্ষার নামে মুসলমান খেদানো, পশ্চিমবঙ্গসহ যেসব রাজ্যে বিরোধীরা ক্ষমতায় আছে সেসব রাজ্যসরকার দখল, কাশ্মিরে চরম বলপ্রয়োগে একে  কনষ্টিটিউশনালি ভারতের অঙ্গ করে নেয়া; এমন অনেক কিছু মোদির কর্মপরিকল্পনার তালিকায় আছে।

এদিকে যদিও ঐ সাংহাই করপোরেশন মানে হল, যেখানে চীন, রাশিয়া, সেন্ট্রাল এশিয়া আর, ভারত-পাকিস্তানও এর সদস্য। কিন্তু পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের ‘টোন-ডাউন’ করা মোদীর পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ পাকিস্তানে বোমা মেরে আসা বীর হলেন মোদী – এই বোলচাল মিথ্যা হলেও নিজের এই নির্বাচনী ইমেজে তিনি জিতেছেন তাই এটা তিনি আবছা হতে দেবেন না। যদিও ওদিকে আবার মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে এবার আমেরিকা ভারতের ধর্মপালনের স্বাধীনতা নাই এটা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ নিয়ে মুখোমুখি।

অতএব, ভারতকে বাদ রেখে বন্দরসহ বিসিআইএম প্রকল্পকে এগিয়ে নেয়ার কথাও ভাবা যেতে পারে। ভারতের জন্য অপশন খোলা থাকবে, যার ফাইন্যান্সিয়াল দায়ভারসহ যুক্ত হতে চাইলে ভারত সে সুযোগ নিতে পারবে। কারণ, ভারত সহসাই প্রকল্পে যোগ দিচ্ছে, এমন আশাবাদী হওয়া বেশ কঠিন।

শ্রীলঙ্কা ড্রামাঃ
অন্যদিকে শ্রীলঙ্কা এক নতুন ড্রামার মঞ্চস্থল হয়ে উঠেছে। এম ভদ্রকুমার হলেন ভারতের একজন সাবেক কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত। তিনি তার কলামে হাসিনার চীন সফর সফল ও বিরাট অর্জন বলে প্রভুত প্রশংসা করেছেন। কিন্তু আবার  লিখেছেন, ” শ্রীলঙ্কায় ২০১৫ সালেই, অ্যাঙলো-আমেরিকান ‘রেজিম বদল’ প্রকল্পে সঙ্গ দিয়ে ভারতের কূটনীতি ইতোমধ্যেই হাতে রক্ত লাগিয়ে ফেলেছে [“In Sri Lanka (2015), Indian diplomacy tasted blood by collaborating with the Anglo-American project at ‘regime change.”] …… আর এখন যা হচ্ছে তাতে ভারতকে পাপোষের মতো ব্যবহার করে আমেরিকা শ্রীলঙ্কায় ঢুকে পড়েছে। শ্রীলঙ্কাকে সামরিক চুক্তিতে জড়িয়ে নিচ্ছে, অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ধন্য আমেরিকান হস্তক্ষেপ নীতি। [Meanwhile, the US used India as a door mat to make inroads into Sri Lanka. And the result is Sri Lanka has been seriously destabilized, thanks to intrusive US policies]। আসলে ওখানে রাষ্ট্রপতি সিরিসেনা আমেরিকাকে ডেকে আনার নায়ক। তিনি প্রেসিডেন্টের ক্ষমা প্রয়োগ করে এক উগ্র বৌদ্ধ ধর্মীয় নেতা [নাম Galagoda Aththe Gnanasara], নানাসারা বলে পরিচিত এই নেতাকে অপহরণের অভিযোগে ছয় বছরের ও আদালত অবমাননার সাজার জেল থেকে ছুটিয়ে এনেছেন। রাজনৈতিক দলের মত তাঁর এক ধর্মীয় সংগঠন আছে – নাম Bodu Bala Sena (BBS) or “Buddhist Power Force”। মানে কথিত অহিংস বৌদ্ধ ধর্মের এই নেতা নিজ সংগঠনের নাম রেখেছে “পাওয়ার ফোর্স”। বুঝা যাচ্ছে তিনি শিকারির “খুবই অহিংস”। এরপর তাঁর সম্পর্কে আর কিইবা বলার বাকি আছে। তিনি সম্প্রতি স্থানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ উগড়ানো এক পাবলিক মিটিং করেছেন। শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধদের এই ধারাই মিয়ানমারে ক্ষমতাসীন রোহিঙ্গাবিদ্বেষী একই বৌদ্ধ ধারা। অর্থাৎ তাহলে ফলাফল হল, শ্রীলঙ্কায় চীনের প্রভাব দমাতে গিয়ে ভারত ব্যাপক রক্তপাত ঘটানোর পর এখন এর মাখন উঠিয়ে দিচ্ছে বা তা নিয়ে যেতে এসেছে আমেরিকা।

তা হলে এশিয়ায় মূল বিষয়টি হচ্ছে, না চীনের কোলে না ভারতের – এটাই বাঁচার উপায়। ভারসাম্যের নীতিতে, কারো দিকে কান্নি না মেরে থাকা। আর কেবল নিজের স্বার্থের দিকে ফোকাসের নীতি – এভাবে হোমওয়ার্ক করে আগানো, এই নীতিই একমাত্র বাঁচোয়া। কিন্তু ভারত ভারসাম্যের নীতি না মেনে চলার দেশ। বরং উলটা, আমেরিকার দিকে কান্নি মেরে থাকার নীতি ভারতের। যে আমেরিকা আবার চলে নিজের একক স্বার্থে। আমেরিকার বেলায়, বালুচদের টেররিস্ট ঘোষণা করে দেয়া অথবা শ্রীলঙ্কায় (SOFA সহ) সামরিক চুক্তি করে ঢুকে পড়া, এগুলো এর উদাহরণ হলেও এসব বিষয় ভারতকে হুঁশে আনবে, এমন ভরসা করা কঠিন।

তবে যারাই চীনের বদলে ভারত অথবা চীনের বিরুদ্ধে ভারতের প্রভাব বলয় বাড়ানোর জন্য খুনখারাবি পর্যন্ত যাবে, সম্পর্কের ব্যাপারটা যারা এভাবে দেখবে বা এই ভুল করে বসবে – এরাই সবশেষে সব খুইয়ে নিজের সব অর্জন আমেরিকার হাতে তুলে দিয়ে থাকে। হাসিনার জন্য এটাও এক বিরাট শিক্ষা হতে পারে যে, যদি না তিনিও আবার শেষে সব হারিয়ে, আমেরিকাকে ডেকে নিয়ে না আসেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) এটা ভারসাম্যের যুগ এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

‘মালদ্বীপে মুরোদহীন ভারত ফাঁপা ইগো সামলাও’

গৌতম দাস

৩০ জুন ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2sr

 

থিংক ট্যাংক ধারণাটা আমেরিকান, ইউরোপীয় নয়। যে অর্থে আমেরিকা ইউরোপ নয় তবে ইউরোপেরই এক নবপ্রজন্ম, যাদের আবার ইউরোপকে আমেরিকার কলোনি শাসক হিসেবে দেখার অভিজ্ঞতা আছে এবং সশস্ত্রভাবে লড়ে ইউরোপকে পরাজিত করে নিজে কলোনিমুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। এই অর্থে আমেরিকা এক নতুন ধারার পোস্ট-ইউরোপীয়ান প্রজন্ম। ফলে বহু নতুন নতুন আইডিয়ার জন্মদাতাও। যার বেশির ভাগটাই ঘটেছে বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী আমেরিকার নেতৃত্বে দুনিয়া পরিচালিত হওয়ার কালে। তবে থিংক ট্যাংক ধারণাটার আবার আমাদের অঞ্চলে একালে এক নতুন অর্থে হাজির করেছে সেই আমেরিকাই। কিন্তু কপাল খারাপ। টাইমিং প্রবলেম!

কোকিল কাকের ঘরে ডিম পেড়ে রেখে আসে, নিজের ডিম ফুটিয়ে নেয় কাককে দিয়ে। আমেরিকা সেই পদ্ধতি কপি করে নিজের থিংক ট্যাংকের ইন্ডিয়ান শাখা খুলে ইন্ডিয়ানদের দিয়ে ইন্ডিয়ায় বসে চালায়। এমনকি ছোট-বড় কিছু স্কলারশিপ অথবা হায়ার স্টাডি বা পিএইচডি করার সুযোগ অফার করে। আর সার বিচারে এতে এক বিরাটসংখ্যক আমেরিকার নীতি পলিসির বাহক ও চোখ-কান যেন এমন এক দঙ্গল ভারতীয় একাডেমিক পেয়ে যায় আমেরিকা। মানে নামে ইন্ডিয়ান কিন্তু ফলে ও কাজে আমেরিকান। আর ভারতীয় প্রশাসকরা ভাবল আমেরিকানদের ভালই ঠকিয়েছি। আমেরিকানদের ঘাড়ে চড়ে তাদের পয়সায় থিংক ট্যাংক খুলে নিয়েছি। কিন্তু এতে কে যে কাকে ঠকিয়েছে তা বুঝমান লায়েক না হলে বুঝা যাবে না! যাই হোক, মূল কথাটা হল, ঠিক যেমন বাংলাদেশে একটা “আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের” কিংবা আমেরিকান “হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের” শাখা খুললে সেটা আমেরিকান চোখ-কান খোলা এক আমেরিকান থিংক ট্যাংকই থাকে; বাংলাদেশের চোখ-কান হয়ে যাবে না।

যা হোক, প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংকের এরাই ভারতজুড়ে এবং বাইরে ছড়িয়ে আছে – তারা ভারতীয় কিন্তু আমেরিকান নীতি পলিসির পক্ষে প্রচারক। অর্থাৎ ভারতীয় কাকের ঘরে আমেরিকান কোকিলের ডিম। এভাবে গত তেরো-চোদ্দ বছর ধরে এদের জমানা চলে আসছিল, তাদের জন্য তা খারাপ চলছিল না। কিন্তু এখন হঠাৎ বিধি বাম! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সব উলটে দিয়েছেন। গত ষোলো বছর ধরে বুশ আর ওবামা প্রশাসনের মিলিত আমল ধরে ভারতে যে আমেরিকান থিংক ট্যাংক বিস্তার লাভ করেছিল তা এখন চরম দুর্দিনে। এর মূল কারণ হল, আমেরিকান চোখ, কান ও মন হিসেবে লোকাল ভারতীয় একাডেমিক তৈরি সবই ঠিক ছিল; কিন্তু সমস্যা হলো তাদের “প্রডাক্ট শো” করার সুযোগ আর নেই, বন্ধ হয়ে গেছে। ‘প্রডাক্ট শো’ মানে? থিংক ট্যাংক অ্যাকাডেমিকদের প্রডাক্ট মানে হলো ঘরোয়া সভা, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি আয়োজন ও বয়ান প্রেজেন্টেশন এবং প্রচারণা। প্রো-আমেরিকান নীতি পলিসি চিন্তার পক্ষে প্রচারণা। ভারত সরকার এর আগে আমেরিকান প্রভাবিত এসব থিংক ট্যাংকগুলো খুলতে ও চলতে অনুমতি দিয়েছিল স্থায়ীভাবেই। কিন্তু প্রত্যেকবার তারা কোনো “প্রডাক্ট শো” করতে গেলে তাদের ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় থেকে আগাম একটা “নো অবজেকশন” লিখিত পত্র পেতে লাগত, যেটা খুবই স্বাভাবিক। কারণ ধরা যাক, কোনো এক থিংক ট্যাংক চীনবিরোধী এক কড়া একাডেমিক বক্তব্য নিয়ে প্রচারে হাজির হয়ে গেলে, মিডিয়াতেও ব্যাপক প্রচার হয়ে যেতে পারে ওই সভার বক্তব্য – অথচ ওই প্রসঙ্গে ভারতের চীননীতি হয়ত এত কড়া হতে চায় না। এই ভুল বুঝাবুঝি বা নিয়ন্ত্রণ-বিহীন প্রভাব ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় পছন্দ না করাটাই স্বাভাবিক। তাই এই ব্যবস্থা। যেমন, গত মার্চে টাইমস অব ইন্ডিয়ার  ডিপ্লোমেটিক এডিটর ইন্দ্রানি বাগচী জানিয়েছিল যে  থিংক ট্যাংক Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) এরকম এক বার্ষিক কনফারেন্স বিদেশ মন্ত্রণালয় অনুমতি না দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে। যেখানে আলোচনার থিম ছিল “India-China: a new equilibrium”.

এতদিন প্রো-আমেরিকান ভারতীয় থিংক ট্যাংকগুলো আরামে আমেরিকার “চীন ঠেকাও” নীতির অধীনে চলত বলে তাদের সভা সেমিনার থেকে যা খুশি চীনবিরোধী বলে চলতে পারত। কিন্তু ট্রাম্পের বাণিজ্য যুদ্ধ চীন থেকে শুরু হয়ে এখন ভারত আর ইউরোপের বিরুদ্ধ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। দিনকে দিন অনেকের আশাকে ব্যর্থ করে দিয়ে চীনের সাথে কোনো রফা হয়ে যাওয়ার বদলে বিরোধ স্থায়ী রূপ নেয়ার দিকে যাচ্ছে। ফলে এই অবস্থায় ভারতের সাথে আমেরিকার আগের রফতানি বাণিজ্য সম্পর্কের অবস্থায় ফেরার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ ট্রাম্পের নীতির মূল কথা হল, সবার আগে আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি, (তাতে অবশ্য ট্রাম্প যেভাবে যেটাকে আমেরিকার “বাণিজ্য স্বার্থ বলে” বুঝবে সেটাই বুঝতে হবে)। ফলে আমেরিকার যে পুরান “চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত ভারত করত আর বিনিময়ে  আমেরিকায় রফতানি বাজার ভোগ করত, তা ট্রাম্প এবার বন্ধ করে দিয়েছে। আর তা স্থায়ীভাবেই বন্ধ হয়েছে এটাই ধরে নিতে হবে। এমনকি আগামী আড়াই বছর পরেই কেবল তখন আমেরিকার কোনো নতুন প্রেসিডেন্ট এলেও তখনকার হবু আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাণিজ্যের দিন আবার ফেরত না আসার সম্ভাবনা খুবই বেশি- সে এক অনিশ্চিত অবস্থা। অতএব মূল কথা আমেরিকার যে ‘চীন ঠেকাও’ নীতির পক্ষে খেদমত করার সুযোগ ভারতের ছিল বলেই সে কারণে, আমেরিকান থিংক ট্যাংক ভারতে বিস্তার লাভ করেছিল। এখন খেদমতের সুযোগ নেই, রফতানি বাণিজ্য নেই ফলে থিংক ট্যাংক তৎপরতা ও এর বিস্তারের সুযোগ নেই।

আমেরিকায় থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানগুলো চালানোর ফান্ডের সংস্থান হিসাবে চিন্তা করা হয়েছিল দাতব্য প্রতিষ্ঠান। ফলে এখনও এগুলো চলে প্রায় একচেটিয়াভাবে বিভিন্ন দাতব্য ফিলেন্থোপিক প্রতিষ্ঠানের অর্থে। আমেরিকানরা প্রতিষ্ঠান গড়তে জানে, প্রতিষ্ঠানের কদর বুঝে ফলে, করপোরেট হাউজগুলোর কাছ থেকে স্থায়ীভাবে নিয়মিত ফান্ড তারা পায়। এভাবে চলা অসংখ্য দাতব্য প্রতিষ্ঠানও আছে। যদিও অভ্যন্তরে এরা আবার সেটা রিপাবলিকান না ডেমোক্র্যাট প্রতিষ্ঠান এমন সুপ্ত ভাগ রেষারেষিও আছে। কিন্তু এই বিভেদ কোনোভাবেই সুস্পষ্ট বা প্রকট নয়।
ভারত তার মাটিতে থিংক ট্যাংক ধরনের প্রতিষ্ঠান খুলতে দেখেছিল আমেরিকান ‘চীন ঠেকানো’ খেদমতের প্রোগ্রামে তৎপর প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠান হিসেবে। প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক প্রতিষ্ঠানের বাইরে ভারতের ট্রাডিশনাল থিংক ট্যাংক বলতে ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে সংশ্লিষ্ট থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর কথা বলা যায় (যেমন (IDSA) ), যেগুলো সরকারি প্রতিরক্ষা ফান্ড শেয়ার করে চলে। ফলে সীমিত ফান্ডের এমন প্রতিষ্ঠানগুলোও ছিল এবং আছে। তবে এসবেরও বাইরে এক বড় ব্যতিক্রম প্রতিষ্ঠান হল, ‘অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন’ (ওআরএফ)। ব্যতিক্রম এজন্য কারণ এর যাত্রা শুরু হয়েছিল ভারতীয় করপোরেট ব্যবসায়ী রিলায়েন্স গ্রুপের দাতব্যে দেয়া অর্থে। ওআরএফ (ORF), এটা এখন এক দাতব্য ট্রাস্ট সংগঠন। অর্থাৎ এটা সরকারিও না, আবার প্রো-আমেরিকান থিংক ট্যাংক নয়। আবার কোনো রাজনৈতিক দলীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানও না। এসব অর্থে এটা বেশ ব্যতিক্রম। এখনো এর চলতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ বার্ষিক ফান্ডের জোগানদার রিলায়েন্স গ্রুপ। আর বাকিটা অন্যান্য দেশী-বিদেশী সবার কাছ থেকেই নিয়ে থাকে।

এটা স্বাভাবিক যে, কোনো থিংক ট্যাংকের পক্ষে সরকারি পলিসির সরাসরি ও প্রকাশ্য সমালোচনা করা সহজ কাজ নয়। এ ছাড়া তা ভালো ফল দেবেই সবসময় তা এমনও মনে করে নেওয়া যায় না। তবে অভ্যন্তরীণভাবে সরকারি নীতি পলিসির সমালোচনা, মূল্যায়ন বা ভিন্নমত ইত্যাদি সেগুলো তো অবশ্যই চলবে, তবে এগুলো আলাদা বিষয়।
ওআরএফ নামের থিংক ট্যাংকের এক গুরুত্বপূর্ণ ফেলো হলেন মনোজ যোশী। তিনি মূলত দিল্লির জওহর লাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি এবং ওআরএফে যোগ দেয়ার আগে প্রায় তিন দশক ধরে সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। ভারতের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকগুলোর অনেকগুলোতে রাজনৈতিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে।

সম্প্রতি বিএনপির এক প্রতিনিধিদলের ভারতের সরকার ও নীতিনির্ধারকদের সাথে সাক্ষাৎ করতে যাওয়ার কথা জানা যায়। তারা এই মনোজ যোশীর সাথেই সাক্ষাৎ করেছিলেন। ভারতের বাংলাদেশ নীতি কী হবে তাতে ভারতের স্বার্থের কী সম্ভাবনা ও বাধা এসব নিয়ে গত ১৮ এপ্রিল মনোজ যোশীর একটা লেখা প্রকাশ হয়েছিল। শিরোনাম ছিল।  “Bangladesh polls pose a challenge to regional stability”। সেই সুত্রে মনে করা যায় ভারতের আমলা-গোয়েন্দা ও রাজনীতিবিদদের সাথে সরকারের নীতি পলিসি বিষয়ে কথাবার্তায় থিংক ট্যাংক ওআরএফের পক্ষ থেকে মনোজ যোশীই দেখে থাকেন। তাই সম্ভবত তার গুরুত্ব। যদিও ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত চেয়ার তারেক জিয়া এবং ভারতের জন্যও এই বিপর্যয়কর অভিজ্ঞতা হয়ে শেষ হয়। কারণ মা খালেদা জিয়া তার “মুখপাত্রকে”  দিয়ে ঐ প্রতিনিধিদল কারা, তাদের ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকেই প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করে দিয়েছেন।

সে যাই হোক আমাদের এখানে ইস্যু, মালদ্বীপ। দক্ষিণ এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ মনোযোগের ইস্যু হয়ে উঠেছে মালদ্বীপ। এটা নতুন শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হয়েছে। ব্যাপারটা হল,  ভারত তার পড়শি রাষ্ট্রগুলোকে আপন বাড়ির পিছনে নিজেরই বাগানবাড়ির অংশ যেন এমনভাব করে চলেছে এতদিন। এই অভিযোগ অনেক পুরানা। ভারত সুযোগ পরিস্থিতিতে একটা শব্দ এখানে ব্যবহার করে – “area of influence। যার বাংলা করলে হবে সম্ভবত, “আমার প্রভাবাধীন এলাকা”। যার খাস মানে হল “আমার তালুক”। যদিও  বৃটিশ-বাপ অথবা ভারতের কোন শ্বশুর এই তালুক কিনেছিল কি না জানা যায় না। তো ব্যাপার হল দাবিকৃত সেই তালুকগিরি এখন নাই হতে লেগেছে।  তবে মনোজ যোশীর ভাষায় পড়শি দেশ যেমন “শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল ও এখন মালদ্বীপ” আর আগের মতো থাকছে না। ভারতের ছোট পড়শি ম্যানেজ করা কঠিন হয়ে গেছে। কারণ ক্রমাগত বিনিয়োগের অভাবে ধুকতে থাকা ভারতের পড়শি সকল্বর দরজায় এখন ব্যাপক উদ্বৃত্ব বিনিয়োগের অর্থ নিয়ে চীন  হাজির, সবার দরজায় নক করছে সে।
ব্রিটিশরা এশিয়া ত্যাগ করার পর ভারত সেই নেহরুর সময় থেকে সবসময় পড়শিদের সাথে ভাব করেছে যে, সে যেন এবার নতুন কলোনি মাস্টার, আর নেহরু যেন এর ভাইসরয়। সেখান থেকেই এই পড়শিদের নিজ বাগানবাড়ি মনে করার শুরু। ফলে এখান থেকে ভারতের পড়শিদেরও ভারত সম্পর্কে মূল্যায়ন নির্ভুল হতে আর কোনো অসুবিধা হয়নি। তবে সবাই আসলে অপেক্ষায় ছিল সঠিক সময়ের। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে হাজিরা স্বভাবতই ভারতের পড়শিদের সবাইকে এনে দিয়েছে  নিজেদের দিন ফেরার সুযোগ। এটাই স্বাভাবিক যে  ধুঁকে মরা এই পড়শিরা সবাই এখন তুলনামূলক বেশি স্বাধীন মুক্ত হওয়ার সুযোগ চাইবে। আর সেই সাথে আগের দুঃপ্রাপ্য বিনিয়োগ  এখন যদি সহজলভ্য হয়ে যায় তা তো অবশ্যই সোনায় সোহাগা। বিপরীতে তাদের সকলের স্মরণে আছে যে ভারতের ইতিহাস আছে অন্তত দুটো পড়শি রাষ্ট্রে (শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে) নিজ সৈন্য পাঠিয়ে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করার।

চীনের উত্থানের আগে পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়া যে ভারতকে দেখেছে তা হল, সে কখনও নিজেরই তৈরি কোনো নীতি পলিসি মেনে চলে নাই। অর্থাৎ ভারত কী কী করতে পারে, আর কী কী সে করে না, করবে না, কখনত,তার করা উচিত হবে না মনে করে – এমন কোন গাইডলাইন, সেটা ভারতেরই নিজের জন্য সাব্যস্ত করা কোনো নীতিতে সে কখনও পরিচালিত হয়নি। অথচ ভারতের অপর মানে পড়শি; মানে আর একটা রাষ্ট্র। ফলে অন্তত সেখানে এক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আছে, যা ভারতের সম্মান করে চলা উচিত। এটা স্বাভাবিক ও নুন্যতম হওয়ার কথা। কোনো হস্তক্ষেপ করা থেকে ভারতের সাবধান থাকা উচিত। অথচ ভারত এখন বিশাল পরাশক্তির ভাব করে চলে। সে এখন বাংলাদেশের মানুষ নিজের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও সরকার গঠন করা সেটাই হতে না দেয়া এবং জনগণকে ভোট না দিতে দেয়াতে ভূমিকা রাখা – এটা ভারতের জন্য কতবড় মারাত্মক সুদূরপ্রসারি নেতি পদক্ষেপ তা ভারতের কেউ বুঝেছে বলে মনে হয় না। আর এই নীতি পলিসিহীন ছেচড়ামির ভারতই আমরা দেখে এসেছি, আসছি।

মনোজ যোশী মালদ্বীপ নিয়ে এক রচনা লিখেছেন,  ভারতীয় ইংরেজি স্ক্রোল ম্যাগাজিনে; যেটা আরো অনেক পত্রিকাও ছেপেছে। লেখার শিরোনামটাই ইন্টারেস্টিং “India is losing the plot in the Maldives – and New Delhi’s self-goals and inflated ego are to blame”। [রাঙানো আমার করা] এই লেখার বিশেষত্ব হল, এই প্রথম আমরা দেখতে পাচ্ছি, কড়া শব্দ ব্যবহার করে এখানে ভারতের নীতি পলিসির সমালোচনা করা হয়েছে। তাও একেবারে শিরোনামেই এই সমালোচনা করা হয়েছে। লেখার ওই শিরোনামের বাংলা করলে দাঁড়ায়, “মালদ্বীপে তাল-নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে ভারত এবং নয়াদিল্লির আত্মগর্বে নির্ধারিত লক্ষ্য (self-goals) ও ফুলানো ফাঁপানো ইগো (inflated ego) এর জন্য দায়ী”। ইংরেজিটাও সাথে উল্লেখ করেছি, এমন শব্দ দুটাকে বেশ কড়া বললেও কম বলা হয়। সোজা বাংলায় বললে ব্যাপারটা হল শিরোনামটা বলতে চাইছে, “মুরোদহীন ভারতকে ফাঁপা ইগো সামলাতে হবে”।

মনোজ যোশী এই লেখায় মালদ্বীপে গত এক বছরের  নতুন সব যা ডেভেলপমেন্ট ঘটেছে তার সবের উল্লেখ আছে এবং তা আছে চীনকে কোন রকম দায়ী না করে, নৈর্ব্যক্তিকভাবে। এমনকি তিনি লিখছেন, “চীনারা সেখানে যৌথভাবে এই মহাসাগরে পর্যবেক্ষণ স্টেশন তৈরিতে সাহায্য করছে, (The Chinese are also helping build a Joint Ocean Observation Station)”। অর্থাৎ মনোজ, মালদ্বীপে কোনো সামরিক স্থাপনা চীন করছে এমন কোনো অভিযোগ তিনি করছেন না। বরং তিনিই লিখছেন, “এখনো পর্যন্ত ভারতের বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে চীনা তৎপরতার কোনো সামরিক অভিপ্রায়গগত দিক আছে’ (As of now, India has no reason to believe that the Chinese activities have military implications)”। বলা বাহুল্য, এটা দেখা যায় না এমন এক বিরাট সার্টিফিকেট।  তবে তিনি বলছেন, “চীনের অর্থনৈতিক উত্থান এবং এই অঞ্চলে চীনের হাজিরা ভারতের জন্য কাজ কঠিন করে দিয়েছে”।  এবং সেটাই কী স্বাভাবিক নয়!
এছাড়া যেকথা উপরে বলা হচ্ছিল, ভারত এতদিন কোনো নীতি মেনে পড়শিদের সাথে চলেইনি। এর কিছু কিছু মূল্য এখন না চাইলেও ভারতকে দিতে তো হবেই। মনোজ লিখছেন, “ভারতের নিজ মুরোদে, পড়শিদের কাছে বেচার মতো কোনো অস্ত্র তার নিজের নেই। তাই সে চীনের সাথে পারছে না”। বলা বাহুল্য, এটা চীন বা ভারতের পড়শিদের কোনো অপরাধ অবশ্যই নয়।

তাহলে মনোজ কেন এই রচনা লিখলেন? তিনি আসলে ভারতকে চীনের সাথে স্বার্থবিরোধ অনুভব করতে গিয়ে “আত্মগরিমায়”, নিজ ক্ষমতাকে “ফুলায় ফাঁপায় দেখে” যেন আগের মতো  মালদ্বীপে কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের কথা যেন চিন্তা না করে বসে এটাই বলতে চাইছেন। সাবধান করছেন।
তিনি লিখছেন, গত ফেব্রুয়ারিতে খবর বেরিয়েছিল যে “চীনা নেভাল কমব্যাট ফোর্স ভারতের সম্ভাব্য মালদ্বীপে সামরিক হস্তক্ষেপ ঠেকাতে ভারত মহাসাগরে হাজির আছে”। আমরা স্মরণ করতে পারি সেসময়ের কথা।  সে কারণে সে সময় পররাষ্ট্র সচিব গোখলেকে যেচে চীনে গিয়ে জানিয়ে আসতে হয়েছিল যে ভারতের এমন কোনো হস্তক্ষেপ পরিকল্পনা নেই। এক সিনিয়র গভর্মেন্ট অফিসিয়ালের বরাতে ২৮ মার্চ সকালে ‘Stepping back from Maldives, India tells China’- এই শিরোনামে খবরটা এসেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়।

তাহলে মনোজের শঙ্কাটা কী থেকে? কারণ ইতোমধ্যে কিছু খুচাখুচি ঘা বানানোর চেষ্টা দেখা গিয়েছে। ভারতের ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও আমলা-গোয়েন্দারা তাদের inflated ego এর খাসলত এখনও যায় নাই। সেই ইগোর ঠেলায় তারা এবার আবার কোনো সামরিক হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করেনি বটে কিন্তু এক খাউজানির কূটনৈতিক লবি করেছে।  আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্টকে দিয়ে একটা বিবৃতি দেয়াইয়েছে যে “মালদ্বীপে মানবাধিকার লঙ্ঘন” চলছে। ঐ বিবৃতির শিরোনাম, [“Conviction of Maldives Supreme Court Justices and Former President”]।  ঐ বিবৃতিতে আমেরিকার দাবি হল – “মালদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, সাবেক প্রধান বিচারপতি ও অন্য একজন বিচারপতিকে সাজা দেয়ার ক্ষেত্রে বিচারে তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের যথেষ্ট সুযোগ দেয়া হয়নি। এতে ‘আইনের শাসনে ব্যত্যয় ঘটেছে এবং আগামী সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট ‘নির্বাচন ফ্রি ও ফেয়ার’ হওয়ার ক্ষেত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।” [This outcome casts serious doubt on the commitment of the Government of Maldives to the rule of law and calls into question its willingness to permit a free and fair presidential election in September that reflects the will of the Maldivian people”. ] আর আমেরিকার এই বিবৃতির পরে ভারতও এই একই লাইনে নিজে এক বিবৃতি দিয়েছে।

এখানে মজার বিষয়টা হল, আমরা এই বিবৃতি খুবই পছন্দ করেছি। আর দাবি করছি, এই একই বিবৃতি বাংলাদেশের বেলায় ভারত কেন দেবে না? জনগণের জনপ্রতিনিধি নির্বাচন ও পছন্দের সরকার গঠনের অধিকারের প্রশ্নে বাংলাদেশ ও মালদ্বীপ কী একই জায়গায় কেন নয়? কিন্তু ভারত কেন বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ অভিযোগ তুলবে না? আমরা জানতে চাই।

আগেই বলেছি, ভারত তার পড়শির বেলায় কোনো নীতি পলিসি মেনে চলা রাষ্ট্র নয়। এক হাভাতে খাই খাই পেট নিয়ে চলে ভারত। ফলে পেট ভরানোর উপরে অন্য চিন্তার জগতে সে এখনও উঠতে পারে নাই। আর এখানে যোশীর সাবধানবাণীর কারণ সম্ভবত এই যে, ভারত যেন আমেরিকার কথায় না নাচে। কারণ কোনো সম্ভাব্য ও ন্যূনতম সামরিক সঙ্ঘাত পরিস্থিতিতে আমেরিকার ওপর ভারতের ভরসা করার সুযোগ নেই। ভারত পক্ষে আপাতত ওই এক বিবৃতি পাওয়া গেছে এটাই খুব। কারণ য়ামরা মনে রাখতে পারি যে ডোকলাম ইস্যুতে আমেরিকা ভারতের পক্ষে একটা বিবৃতিও দেয়নি। এটা তাদের সবার মনে আছে নিশ্চয়। ফলে ভারত যেন মালদ্বীপ ইস্যুতে কেবল কূটনৈতিক এপ্রোচের মধ্যে থাকে এবং আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করে – এটাই মনোজ যোশীর আবেদন।

ভারত সব হারাচ্ছে, আরো হারাবে। কারণ ভারত কোনো নীতিগত জায়গায় দাঁড়ায়ে তার পড়শি নীতি পলিসি মেনে চলে না, চলছে না। তবে সারকথাটা হল, মালদ্বীপ পরিস্থিতি আমাদের আশ্বস্ত করছে যে আগামীতে অন্তত আর কোনো পড়শি দেশের রাজনৈতিক ইস্যুতে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগ সম্ভাবনা নাই হয়ে গেল। কারণ, মালদ্বীপে চীন সেখানে এক বিরাট বাধা হিসেবে উপস্থিত ও হাজির হয়ে গেছে, এটা প্রায় এক স্থায়ী রূপ নিয়েছে ও নেবে। কারণ মালদ্বীপের মতো ভারতের প্রত্যেক পড়শি রাষ্ট্রে চীনের বিনিয়োগ স্বার্থ বর্তমান এবং তা স্থায়ী।

সবশেষে, এই ইস্যুতে মনোজ যোশীর মত আর এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া মিডিয়ায় দেখা গেছে। এম কে ভদ্রকুমার ভারতের এক অবসরপ্রাপ্ত প্রাক্তন রাষ্ট্রদুত। এক কমিউনিস্ট পরিবারের সন্তান। ভারতের প্রাক্তন কূটনীতিকরা বেশির ভাগই “ভারতে আমেরিকান থিংক ট্যাংক” এর খেপ ধরতে গিয়ে প্রো-আমেরিকান হয়ে জড়িয়ে পরেছেন। যে দুচারজন এমন পেটভরানো চক্রের এর বাইরে আছেন ভদ্রকুমার তাদের একজন। মালদ্বীপ ইস্যুতে ভারত ও আমেরিকার “মানবাধিকার লঙ্ঘনের” বিবৃতিতে তিনি প্রচন্ড ক্ষিপ্ত। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই সপ্তাহেই  ভারতের কাশ্মিরে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য খোদ জাতিসংঘ কাউন্সিল কঠোর সমালোচনা করেছে – তা কী ভারত ভুলে গেছে?  তিনি লিখেছেন,

Ironically, Delhi’s tough statement on the democracy deficit in Maldives coincides with an unprecedented report by the United Nations Human Rights Council condemning India’s track record in Kashmir. The UN report demands the constitution of an impartial international commission to investigate India’s alleged human rights violations in Kashmir.

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৮ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “মালদ্বীপে ভারতের ইগো”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

“পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” – সেই বিউগল বেজে গেছে

“পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” – সেই বিউগল বেজে গেছে

গৌতম দাস

০৩ এপ্রিল ২০১৮,  মঙ্গলবার, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2r9

কথা সত্য। চীন-ভারত সম্পর্ক আগে যেখানে যা অবস্থায় ছিল এর সবকিছু ওলটপালট হয়ে গেছে, ভারতের ভাষায় এটা রি-সেট (“reset”) হয়ে গেছে। মানে ‘ফির সে শুরু’ হয়ে গেছে। এটা হতে ১৬ বছর লাগল। তাই আজ কথা শেষের দিক থেকে শুরু করে বলব। প্রায় ষোলো বছর পর ভারত মেনে নিল যে এই অঞ্চলে চীনের ক্ষমতা ও প্রভাব ঠেকানোর সক্ষমতা ভারতের নেই। সে হার স্বীকার করে নিচ্ছে। তাই সে আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করছে না, বরং মাঠ ছেড়ে যাচ্ছে। ভারত মালদ্বীপ থেকেও নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে। তবে চীন যেন ভারতের দিকটাও একটু খেয়াল রাখে। অর্থাৎ প্রকারান্তরে ভারত স্বীকার করে নিল যে, আমেরিকার ‘চায়না কনটেইনমেন্ট’ অথবা চীন ঠেকানো বৈদেশিক নীতির যে ঠিকা আমেরিকার কাছ থেকে ভারত এত দিন নিয়ে খেদমত দিয়ে গেছিল পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভারত এখন তা পরিত্যাগ করছে, ক্ষেমা দিচ্ছে। ফলে চীন যেন ভারতকে এর প্রতিদান দেয় (“it is clear that Delhi expects Beijing to reciprocate”)।

‘পরাজয়ের সংবাদ বাহক’ যাকে এককথায় ভগ্নদূত বলে তা কেউ হতে চায় না। তাই ভারতের এই ‘মেনে নেয়ার’ ঘটনাটা ঘটেছে খুবই নীরবে। এমনকি তা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করে, আবার বেনামে তা স্বীকার করে নিয়ে, ঘোষণা ছাড়া সাংবাদিক ডেকে ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে, এভাবে। গত ২৮ মার্চ সকাল ৮টার দিকে ভারতের ইংরেজি দৈনিক ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ একটা বিশেষ রিপোর্ট হিসেবে এটা প্রকাশ করেছে। বলা হয়েছে ‘এক সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে’ এটা বলেছে। Stepping back from Maldives, India tells China – এই শিরোনামে এই খবরটা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনলাইনে যে কেউ পড়ে নিতে পারেন।

সেখানে গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে ঠিক কী বলেছে তা নিয়ে ওই রিপোর্টের অন্তত দুটি প্যারার কোটেড বক্তব্য আছে যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলোর মধ্যে প্রথমটা নিচে বাংলা অনুবাদ করা হল – “এই রিজিয়নের ওপর ভারত একক মালিকানা দাবি করে না। এই অঞ্চলে চীনারা যা করতেছে তা আমরা ঠেকাতে পারব না, তা সে নেপালে কী মালদ্বীপে যেখানেই করুক। তবে এ বিষয়ে আমরা আমাদের সংবেদনশীলতা ও বৈধতার সীমাবোধ (lines of legitimacy) সম্পর্কে তাদের জানাতে পারি। যদি এর পরেও তারা তা অতিক্রম করে তবে আমাদের পারস্পরিক কৌশলগত আস্থা (strategic trust) নষ্ট করার দায় বেইজিংয়ের ওপর বর্তাবে”।

“India cannot claim sole proprietorship of the region. We can’t stop what the Chinese are doing, whether in the Maldives or in Nepal, but we can tell them about our sensitivities, our lines of legitimacy. If they cross it, the violation of this strategic trust will be upon Beijing,” the official said.

এখানে শেষের রঙিন বাক্যে রঙ দিয়েছি আমি। এই বক্তব্যের অর্থ ও ইঙ্গিতে খুবই করুণ ও অসহায়। ভারত যেন বলতে চাইছে, “এই দুনিয়ার লড়াইয়ে শক্তি আর মুরোদে আমরা হেরে গেছি, তবে পরকালে যেন বিচার হয় তেমন একটা বিচার দিছি”।’ এ ছাড়া দ্বিতীয় গুরুত্বপুর্ণ ভারতের কোটেড প্যারাগ্রাফের বক্তব্য হল এ রকমঃ – “যেদিন ভারত দেখেছে সে আর দক্ষিণ এশিয়াকে প্রভাবিত করে রাখতে ও চীনের মতো শক্তিকে  এখানে ক্ষমতার বিস্তার দেখাতে আসা বন্ধ করতে পারছে না সেদিন সে বুঝে গেছে এসব কিছু নিজের প্রভাববলয়ের বাইরে চলে গেছে”।

“The days when India believed that South Asia was its primary sphere of influence and that it could prevent other powers, such as China, from expanding its own clout are long gone,” a senior government official told The Indian Express. 

খুবই পরিস্কার ভাষায় বলা অক্ষম অসহায়ত্বের বক্তব্য। যদিও এতদিন এসব প্রসঙ্গে ভারত চাপাবাজি করে বলে রেড়িয়েছে দক্ষিণ এশিয়া তার প্রভাবাধীন এলাকা, এখানে চীন আসতে পারে না।

এ ছাড়া মালদ্বীপ নিয়ে খুবই পরিস্কার ভাষায় ভারতের আর এক তৃতীয় বক্তব্য আছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস রিপোর্টার দাবি করছেন, ওই সিনিয়র অফিসার তাকে বলেছেন, ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় গোখলের গত ২৩-২৪ ফেব্রুয়ারি চীন সফরের সময় তিনি চীনকে জানিয়ে দিয়েছেন, “ভারত মালদ্বীপ থেকে সরে যাচ্ছে। ফলে মালদ্বীপে ভারতের  হস্তক্ষেপের কোনো সম্ভাবনা নেই”। আর এই বাক্যটাকেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস তার রিপোর্টের শিরোনাম করেছে। On the Maldives, for example, the unusual overture to China was made by none other than Foreign Secretary Vijay Gokhale during his trip to Beijing in February,

অনুমান করা যায়, এখানে ভারতীয় এই স্বীকারোক্তির অ্যারেঞ্জমেন্ট করা হয়েছে এভাবে যে, সবার আগে এটা ‘সিনিয়র গভর্নমেন্ট অফিসিয়াল’-এভাবে পরিচয় লুকানো এক বরাতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস খবরটা ছাপবে। এরপর বাকি প্রায় সব লিডিং দৈনিকগুলো সবাই এবার তা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে ছাপবে। তাই-ই হয়েছে। তবে এভাবে এখানে ছাপা হওয়ার মধ্যে লক্ষণীয় দুটো দিক হল, কোনো মিডিয়াই কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের রিপোর্ট বা এর রেফারেন্সকে অস্বীকার অথবা অবিশ্বাস করেনি। এমনকি তারা এই খবরের সত্যতা যাচাই করতে সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বা কোন মুখপা্ত্রকে জিজ্ঞাসা করতে যায়নি। এটাই খুবই  ইন্টারেস্টিং। এর অর্থ  হল বাকি সব পত্রিকা বরং নিজেই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতে এই খবর ছেপে বলতে চাইছে যে, তারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে এই খবর সত্য, তারাও ব্যাপারটা জানে। এ ছাড়া অন্যদিকে ভারত সরকারও মিডিয়াগুলোতে এই রিপোর্ট ছাপা হয়ে গেছে অথচ এই খবরকে অস্বীকার করে কোনো বিবৃতিও দেয়নি। এর অর্থ তারাও পরোক্ষে স্বীকার করছে যে হা এটাই তাদের বক্তব্য।

এদিকে আরেক ইংরেজি দৈনিক – ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’, সবার মতো সেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের বরাতের রিপোর্ট  ছেপেছিল । তবে সেটা ছাড়াও রয়টার্সের বরাতে সে পরের দিন আরেকটা রিপোর্ট করেছে। শিরোনাম ‘Dalai Lama faces cold shoulder as India looks to improve China ties”। এখানে বলতে চাওয়া হয়েছে দালাইলামাকে ‘শীতল কাঁধ দেখানোর’ কারণ ভারত বুঝিয়ে বলাতে তিনি ব্যাপারটাকে ইতিবাচকভাবে নিয়েছেন, মনে কোনো ক্ষোভ বা আকাঙ্খা নিয়ে দেখেননি। আসলে ঘটনা হল, বেচারা দালাইলামা তার সব কর্মসূচিতে ভারত সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা বাতিল করে দিয়েছে। আসলে এটা ছিল দালাইলামাদের চীনের বিরুদ্ধে ব্যর্থ বিদ্রোহের ৬০তম বার্ষিকী পালনের দিন। কিন্তু দিল্লীতে যত অনুষ্ঠান নেয়া হয়েছিল মোদী সব কিছুর পালনের উপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।  এমনকি ভারত তাদের থাকতে দিয়েছে এজন্য দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য  সরকারকে “ধন্যবাদ জানাবার কর্মসূচিও” বাতিল করে তা তিব্বতের ধর্মশালায় সরিয়ে নিতে দালাইলামাকে বাধ্য করা হয়েছে। আর সাথে মোদীর সরকারের সার্কুলার জারি করা হয়েছে যে কোনো মন্ত্রী বা সরকারি কর্মচারী যেন এদের সাথে কোনো সম্পর্ক না রাখে। কারণ চীন মনে করে, দালাইলামা চীনের জন্য খুবই বিপজ্জনক এক বিচ্ছিন্নতাবাদী। এককথায় বললে চীনকে খুশি করতে, রাখতে ভারত চরমতম মরিয়া অবস্থান নিয়েছে। গত ছাপান্ন বছরে এমন “চীন তোষামোদী” ভারত কেউ আগে দেখেনি। দালাইলামা সম্পর্কে  চীনের মূল্যায়ন ও মনোভাবকে পবিত্র আমানত জ্ঞান ও আমল করে আগলে রাখতে ভারত এখন ভীষণ ব্যস্ত। কিন্তু টাইমস অব ইন্ডিয়ার এই রিপোর্টের সাথেও নাম প্রকাশ না করে আরও এক সোর্সের বরাতে টাইমস অব ইন্ডিয়া কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছাপিয়েছে। প্রথমত সেখানে বলা হয়েছে, নাম গোপন রাখা এই সোর্স তিনি নাকি ভারতের চীননীতির সাথে সংশ্লিষ্ট কোন উচু ব্যক্তি। তিনি জানাচ্ছেন, “চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠতর করে নিয়ে এগিয়ে যেতে আমাদের আইডিয়া হল, ২০১৭ সাল পর্যন্ত যা যা ঘটে গেছে তা ভুলে গিয়ে পেছনে ফেলে রাখতে চাই আমরা”। “We are moving forward with this relationship, the idea is to put the events of 2017 behind us,” a government source involved in China policy said. অর্থাৎ আর পরিস্কার নিশ্চিত করা বক্তব্য আমরা এখানে পাচ্ছি।

তবে রিপোর্টে প্রত্যক্ষ সরকারি স্বীকৃতি এখনো না দিলেও ভারতের অপর পক্ষ চীন, মানে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের রেগুলার ব্রিফিং থেকেও এ বিষয়ে অনেক কিছুর স্বীকৃতি মিলছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে মুখপাত্রকে (Foreign Ministry Spokesman Lu Kang) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তাঁঁর সেই বয়ানে। “চীন কি সাম্প্রতিক ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে ভারতের (দালাই লামার সাথে দূরত্ব তৈরিসহ) প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানায়?” – এই ছিল সেই প্রশ্ন, মুখপাত্র এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেলেন। মুখপাত্র  দালাই লামা শব্দটা এড়িয়ে উচ্চারণ না করে বৃহত্তর পরিপ্রেক্ষিত থেকে জবাবে দেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে, তিনি বলেছেন, “সাম্প্রতিক কালে তাদের উভয় পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানিয়ে বলেন, চীন-ভারত সম্পর্ক বাধাহীন গতিতে (‘সাউন্ড মোমেন্টাম’ বা ‘sound momentum’) বিকশিত হয়ে চলেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা এর সাফল্য দেখতে পাচ্ছি”।

আসলে আগামী জুন মাস পর্যন্ত চীন-ভারত তাদের বিভিন্ন মন্ত্রিপর্যায়ে (গড়ে সম্ভবত প্রতি মাসে প্রায় দু’টি করে) মিটিং আছে। আর সর্বশেষ জুন মাসে সাংহাই করপোরেশন সংস্থার (SCO, http://eng.sectsco.org/about_sco/) চীনে অনুষ্ঠিতব্য বার্ষিক সভার সাইড লাইনে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সাক্ষাৎ হবে।  আর আগামী মাসে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর চীন সফর দিয়ে বৈঠকগুলো শুরু হবে। এরপর আছে, পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা, বাণিজ্য ইত্যাদি।

আগামী জুন মাস পর্যন্ত তৎপরতায় ভারতের লক্ষ্য কী এ দিকে তাকিয়ে বললে এর এক কথায় জবাব হল, মুখ্যত চীনে ভারতের রফতানির বাজার লাভ করতে চায়। ভারত এত দিন চীনের সাথে সম্পর্ককে তিক্ত করে রেখেছিল, আমেরিকার চীন ঠেকানোর নীতি নিজের কাঁধে নিয়েছিল বলে। আর তা নিজের কাঁধে নিয়েছিল বিনিময়ে আমেরিকায় ভারতের রফতানি বাজার পেয়েছিল বলে। কথাটা ভেঙ্গে সার কথাটা বললে, ভারতীয় পণ্য মূলত রফতানিতে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে একে আমেরিকার পণ্যের চেয়ে সস্তা ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে নেয়া ছিল। কিন্তু ট্রাম্পের আগের দুই প্রেসিডেন্টের দুই দুই করে টার্মে (মোট ষোলো বছরে) সবসময় আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের ওপর রাজনৈতিক স্বার্থকে (চায়না কনটেইনমেন্ট) প্রাধান্য দিয়ে বিদেশনীতি সাজানো ছিল। তাই তখন ভারতকে ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নেশন’ ঘোষণা করে ভারতের ভর্তুকির রফতানিকেও অনুমতি দেয়া হয়েছিল। তবে শর্ত ছিল যে ভারতের গড় মাথাপিছু আয় কেবল এক হাজার ডলার না হওয়া পর্যন্ত এই বিশেষ সুবিধা বজায় থাকবে। কিন্তু গত ২০১৫ সালে এই শর্ত পূরণ হয়ে গেলেও রফতানি সুবিধা ভারত পেয়ে চলছিল। মোটা দাগে বললে, ট্রাম্পের সাথে আগের দুই আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ভারত-বিষয়ক নীতির ভিন্নতা কী – এভাবে কথাটা তুললে তার জবাব হবে – ট্রাম্প আমেরিকার বাণিজ্য স্বার্থের ওপর রাজনৈতিক স্বার্থকে আর কোনো প্রাধান্য না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি উল্টো ‘বাণিজ্য স্বার্থ সবার ওপরে সব ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে’ এই নীতিতে চলতে চাইছেন (যদিও কতটা পারবেন পারছেন সেটা অন্য কথা)। ঠিক এ কারণেই ভারতের “ট্রাম্প রিডিং” হল, ট্রাম্পের আমেরিকার কাছ থেকে ভারতের আর বাণিজ্য সুবিধা কিছুই পাওয়ার নেই। তাই ভারতের উল্টো দ্রুত চীনের দিকে ও কাছে যেতে পথ বদল ঘটেছে। আর বাণিজ্য সুবিধা এবার চীনের কাছ থেকে পাওয়ার আশায়, ভারত চীনের মন জোগাতে নিজের সর্বস্ব ঢেলে দেয়ার নীতি নিয়ে আগাচ্ছে। চীন-ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি  ৫০ বিলিয়ন ডলারের, (এখন চীনের ভারতে রফতানি ৬০ বিলিয়ন ডলার, ভারতের চীনে ১০ বিলিয়ন)। ভারতের লক্ষ্য চীন থেকে কমপক্ষে ৩০ বিলিয়নের রফতানি বাজার লাভ করা। মূলত কৃষিজাত পণ্য রফতানি ভারতের লক্ষ্য।

আমার লেখায় সবসময় বলে আসছি, চলতি আমেরিকান নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির দুনিয়া ক্রমেই চীনের নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি হয়ে বদলে যাওয়ার অভিমুখী হয়ে আগাচ্ছে। এই বিচারে চীন হল ‘রাইজিং অর্থনীতি’ এই নতুন অভিমুখের নেতা, বিপরীতে আমেরিকার অর্থনীতি পড়তি দশার। আর এই পরিস্থিতিতে ভারতের ন্যাচারাল অবস্থান ও অভিমুখ হল – চীনের সাথে ও পক্ষে, আমেরিকার বিপক্ষে। আমেরিকা হল অতীত যেখানে চীন হল আগামি – এই সুত্রের মধ্যে ভারতের ভবিষ্যত হল চীনের সাথে মিলে নতুন করে গ্লোবাল অর্থনীতিতে এক অর্ডার শৃঙ্খলা তৈরি।  কিন্তু এতদিন সে কাজ না করে ভারত রিভার্স খেলে বাড়তি নগদ সুবিধা যা পায় তা কুড়িয়ে নিচ্ছিল। যেন কোন বালক তার নির্ধারিত খেলাধুলার বাল্য বয়েস এক্সটেন্ডেড করে নিয়ে হাসিখেলা আর মজা করে কাটাচ্ছিল। সেটারই এবার পরিসমাপ্তি ঘটল, এভাবে বলা যায়। গ্লোবাল অর্থনীতিতে নতুন সিস্টেম নতুন ব্যবস্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রশ্নে ট্রাম্পের হাতে ও উদ্যোগে ভারত-আমেরিকার আর একসাথে কাজ করার দিন সম্ভবত এখান থেকে পরিসমাপ্তি লাভ করবে। বাস্তব শর্তগুলো (যেমন ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নেশন’ ঘোষণা) ট্রাম্পের হাতে চির নিঃশেষিত হয়ে যাওয়ার পথ নেবে। ওদিকে ভারতের ইচ্ছা ও আকাঙ্খা যে ভারতের আমেরিকায় হারানো রফতানি টার্গেট বা বাজার ঘাটতি যা হয়েছে তা চীন পূরণ করে দিক, চীনে রফতানির বাজার দিক। মূলত এজন্যই ভারতের চীনের সামনে মরিয়া ও হাটুগাড়া অবস্থায় নিজেকে উপস্থাপন।   চীনও খুব সম্ভবত কিছু বাজার দেবে, বিশেষত ভারতকে আমেরিকা থেকে আলাদা করার তাগিদ চীনেরও আছে। আর ভারত এতই মরিয়া যে, চীনের সামনে ‘নীলডাউন’ অবস্থা। তবে আপাতত সফররত চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী কোনো চুক্তি ছাড়া গতকাল ভারত সফর শেষ করে চীনে ফিরে গেছেন। তবে ভারতকে রফতানি বাজার দেয়ার ‘প্রমিজ’ করেছেন, ভারতের মিডিয়া বলছে। চীনের প্রমিজ বা ওয়াদা সত্যিকারের ওয়াদা, ভারত আস্থা রাখতে পারে, রাখবে। কিন্তু ভারতের কাল থেকেই যেন এটা পেতে চায়।

স্বাভাবিকভাবেই এখন ভারতকে মুখোমুখি হতে হবে চীনের “বেল্ট-রোড উদ্যোগ” (http://english.gov.cn/beltAndRoad/) – এই ইস্যুতে। সত্যি কথাটা হল, এবার সত্যিকার অবস্থানটা ভারতকে বলতে হবে। সম্ভবত আর ভ্যানিটি  বা মিছা লোক দেখানো অবস্থান আর নয় যে ভারত একনম্বর অর্থনীতি হতে যাচ্ছে এরকম নয়, বাস্তব সত্য অবস্থান অর্থাৎ তা প্রকাশ করার বিনিময়েই খুব সম্ভবত চীনের কাছ থেকে ভারতকে রফতানি বাজার সুবিধা পেতে হবে। কারণ ভারত নিজেই নিজের মিথ্যা ভ্যানিটি- ‘আমেরিকা আমার পিঠে হাত রেখেছে’, ‘মুই কী হনুরে’- এগুলো তার ভুয়া পরিচয়, ভারত নিজেই তা ভেঙে ফেলে এখন চীনের সামনে নীলডাউন। কাজেই ভুয়া মিথ্যা চাপাবাজির দিন শেষ। সত্যি কথাটা হল আজ শেখ হাসিনা ভোটের কথা চিন্যেতা করে যে উন্নয়ন বা “মধ্য আয়ের দেশের”  তর্ক  তুলেছেন ভারত সেই “লোয়ার মধ্য আয়ের দেশের” (“lower-middle-income” economy ) হয়েছে মাত্র ২০১৬ সালের জুনে। ভারতেরই এক মিডিয়া রিপোর্ট বলছে, The World Bank has dropped the use of developing nation tag for India in its specialized reports and instead classifies it as a “lower-middle-income” economy in South Asia, a top official has said. ফলে সে দুনিয়ার এক নম্বর অর্থনীতি এই হল বলে, অথবা চীনের বেল্ট-রোড উদ্যোগে যোগ দিলে সে “চীনের সাবরডিনেট বা অধস্থন অবস্থায় চলে যাবে” এসব কল্পিত গল্পের জগত ফেলে ভারতকে বাস্তবে নেমে আসতে হবে। কারণ বেসিক কথাটা হল, কোন  রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা জিনিষটা অবজেকটিভ। একে কেউ চাইলেই সাবজেকটিভলি দাবায় বা অস্বীকার করতে পারবে না। কাজেই স্বপ্নে পোলাও খাওয়া অথবা গল্প প্রচার একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।

তবে মিথ্যা ভ্যানিটি বা গর্বের কী দশা হয় এর এক আদর্শ ঘটনা ইতোমধ্যে ঘটে গেছে। আমেরিকা বা চীনের মত থিঙ্কট্যাঙ্ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান খুলে ভারতের স্বার্থ কী হতে পারে তার ষ্ট্রাট্রজিক বিষয়াদি নিয়ে গবেষণা ও পরামর্শ তৈরি করার শখ ভারতেরও। কিন্তু এর খরচ?  ২০০৫ সালে বুশের প্রস্তাবে এর খরচের দায় আমেরিকা নিয়েছে। ভারতের ধারণা সে আমেরিকাকে মহাঠকিয়ে থিঙ্কট্যাঙ্ক চালানোর খরচ আমেরিকার উপর চাপিয়ে দিতে সফল হয়েছে। আপনার স্ত্রী-সন্তান মানে সংসার প্রতিপালনের খরচ অন্যের উপর চাপিয়ে নিজেকে খুব বুদ্ধিমান মনে করতে পারেন আপনি। কিন্তু নিশ্চিত থাকতে পারেন ঐ সংসার আর অচিরেই আপনার থাকবে না। ফলে থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো গজিয়েছে হয় ভারতে এনজিও রূপে যার ফান্ড করছে আমেরিকান কোন ফাউন্ডেশন অথবা আমেরিকান কোন থিঙ্কট্যাঙ্ক এক্সটেন্ডেড হয়ে ভারতে শাখা খুলেছে। আর এতে সবচেয়ে খুশি হয়েছে তরুণ একাদেমিক কেরিয়ারিস্ট্রা যারা ভারতের স্বার্থের চেয়ে নিজের কেরিয়ারে আগ্রহ রাখে বেশি। আর এতে ভারেতের প্রায় সব থিঙ্কট্যাঙ্কঅগুলো আসলে আমেরিকান বিদেশনীতিই ভারতে প্রচার করার কাজএ লিপ্ত হয়েছে। আমেরিকান অর্থ উসুল হয়েছে এভাবে।  মুক্তমালার মত চীনের ভারতকে ঘিরে ফেলার তত্ব তারাই খাইয়েছে ভারতকে, সয়লাব করে ফেলেছে। এমনকি যে দুএকটা ভারতের ডিফেন্সের নিজস্ব গবেষণা প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোতেও আমেরিকান বিদেশনীতির প্রভাব ঢুকাতে পেরেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানাচ্ছে IDSA নামে এমন এক প্রতিষ্ঠানের “চীন-ভারতঃ নতুন ভারসাম্য” শিরোনামের থিম নিয়ে বার্ষিক কনফারেন্স করতে অনাপত্তি-পত্র দেয় নাই ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়।  অনুমান করা যায় আমেরিকার চোখে দেখা চীনা সমালোচনার পরিপ্রেক্ষিত সেখানে ছিল বা থাকতে পারে – তা চীনের মন জয়ে ভারতের  জন্য বাধা হিতে পারে আশঙ্কায়, চীন অখুশি হতে পারে  – তাই এই অনুমতি প্রদান না দেওয়া্র ঘটনা ঘটেছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছে,  Meanwhile, the MEA has refused clearance to an annual conference by the ministry of defence-sponsored think tank, Institute for Defence Studies and Analysis (IDSA) whose theme was “India-China: a new equilibrium”. The conference slated for this week has been “deferred” said people familiar with developments. এথেকে বুঝা যায় ভারতকে এখন কত গভীর পর্যায়ে চীন-বিরোধীতার খোলনলচে বদলাতে হবে।

ওদিকে ট্রাম্পের ‘বাণিজ্য স্বার্থ সবার উপরে প্রায়োরিটি’ এই নীতি তিনি যদি ধরে রেখে এগিয়ে যান (যেটা এখনও পর্যন্ত এর ভিন্ন কিছু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ) কারণ ট্রাম্প মনে করেন তার ‘বাণিজ্য স্বার্থ প্রায়োরিটি’ এই নীতির প্রশ্নে তিনি – এতটাই সিরিয়াস যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে  এই প্রথম ইউরোপের সাথেও আমেরিকার ভিন্ন অবস্থান হতে বা তা নিয়ে লড়তে তিনি পিছপা নন। এমনকি আমেরিকা দুনিয়ার এক ‘এম্পায়ার’ অথবা রাষ্ট্রসঙ্ঘ আমেরিকার প্রভাবে চলে  – এসব কথাগুলোও বাদ দিতে বা বদলাতে হলেও ট্রাম্পের আমেরিকা এসব ভ্যানিটি ছাড়তে রাজি। তবু ‘বাণিজ্য প্রায়োরিটি’ নীতির জায়গা থেকে তিনি সরবেন না বলেই মনে হচ্ছে। দেখা যাক কোথায় দাঁড়ায়।

এবার এই সূত্রে বলা যায়, আমেরিকার ভারতের কাছে ‘বাংলাদেশকে বন্ধক দেয়া’- সে বাস্তবতারও একই সাথে অবসান হতে চলেছে বা ঘটবেই। যদিও সেটা বাস্তবায়িত হতে, কার্যকর হতে – বাস্তবে এর প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগবে। তবে পরিবর্তনের আগমনী ‘ঘণ্টা বাজিয়ে’ দেয়া হয়ে গেছে। এ ছাড়াও এখন থেকে ভারতের নতুন নীতি, নতুন বন্ধু, মিত্র এগুলো থিতু হয়ে বসতে, সমন্বিত হয়ে বসতে কিছু সময় লাগবে। আবার ওদিকে আমেরিকা দিক থেকে বললে, তার “ভারত-বিবেচনার দায়” ছুটে যাচ্ছে অর্থাৎ ভারত আর আমেরিকার হয়ে চীন ঠেকানোর খেদমত করবে কিনা তা নিয়ে আর কোন ভরসা ট্রাম্পের আছে বলে মনে হয় না। এই কারণে অবশ্যই আমেরিকা নিজেই “ইন্ডিপেন্ডেন্টলি” বাংলাদেশ নিয়ে কিছু সরাসরি ভূমিকা বা সিদ্ধান্ত নিতে পারে এর শর্ত তৈরি হয়ে গেছে, সে কথাও সত্যি। ফলে ভারতের পরামর্শ, মতামত সমন্বয় এগুলো আমেরিকার কাছে আর আগের মতো নেই, থাকবে না। বলাই বাহুল্য। তবে এমন পরিবর্তন যদিও শুরু হয়েছে মাত্র। ফলে ফল দেখতে পেতে ধীর লয়ের কারণে দেরি হতে পারে বা দ্রুতও হতে পারে।  কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। সারকথা “পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা” সেই বিউগল বেজে গেছে। এতে কে কার কাছে আসবে, কোলে উঠবে নাকি চিরতরে সুদূরে চলে যাবে এমন ব্যাপক পরিবর্তন দেখতে পাব আমরা।

লেখক : রাজনৈতিক বিশেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০১ এপ্রিল ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) চীনকে কোথায় বসতে দেয় সেই অস্থিরতায় ভারত”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]