ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

ভারত কী চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিতে যাচ্ছে!

গৌতম দাস

২ জুন ২০১৮, ০০:০৩, শনিবার

https://wp.me/p1sCvy-2rS

 

 


Illustration: Ajit Ninan, Times of India – মোদীও সওয়ার হওয়ার কথা ভাবছেন!

 

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের পয়লা টার্গেট ছিল চীন, তবে সেই সাথে দ্বিতীয় বা সহ-টার্গেট ছিল ভারতও। এই নীতি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমেরিকা হয়ে পড়ে একা। অন্যদিকে, এই নতুন পরিস্থিতি চীন-ভারতকে কাছাকাছি এনে ফেলেছে। উল্টো করে বলা যায়, আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতির খেদমতে ও সমর্থনে ভারতেরও আর আমেরিকান ঐ নীতি পো-ধরে আগিয়ে চলার  বাস্তবতা লোপ পায়। ফলে মোদী ও ভারতের চীন নীতিও আমূল বদলে যাচ্ছে। আগে যতই উসকানিমূলক অবস্থান থাকুক না কেন, ভারত এবার থুক্কু বলে সব ভুলে চীনের সাথে সহযোগী সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবেই ২৭ এপ্রিল মোদির চীন যাত্রা ঘটেছিল। চীনে মাওয়ের অবসর যাপনের শহর য়ুহানে (Wuhan), চীন-ভারত “ইনফরমাল শীর্ষ সামিট” বা মোদী-জিনপিং এই দুই শীর্ষ রাষ্ট্র নির্বাহীর অনানুষ্ঠানিক কিন্তু ওজনদার ও গুরুত্বপূর্ণ আলাপের শুরু হয় সেখান থেকে।

ট্রাম্পের আমেরিকা হল এখন এক ‘একাকী আমেরিকা’ হতে রওনা দিয়েছে। এই অবস্থায় মানে “এন্টি গ্লোবাইজেশন” আর “সবার আগে আমেরিকা” এ দুই নীতিতে চলে যাওয়ার পর চাইলেও আর ভারতের পক্ষে আমেরিকার কোলে বসে আর কোনো কৌশলগত বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগের মতো চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এ ছাড়া উদীয়মান ভারতের অর্থনীতির প্রবল ও বিপুল বিনিয়োগ চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রেও দেখা গেল, আমেরিকা এক্ষেত্রে ভারতের জন্য দরকারি কেউই না। অথচ চীন-ভারত সম্পর্ককে মোদী সংঘাতময় করে ফেলে রাখা সত্ত্বেও চীনই ছিল ভারতের জন্য একমাত্র উপযুক্ত বিনিয়োগদাতা। ফলে য়ুহান সম্মেলনে অন্তত ভারতের বিনিয়োগ সম্পর্কের দিক বা বিনিয়োগ প্রয়োজনের গুরুত্ব মোদি ভালোভাবেই বুঝেছিলেন।

গত ২৭ এপ্রিল ভারত ত্যাগের আগে তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, এই সম্মেলন থেকে ‘চীন-ভারত অর্থনৈতিক সম্পর্ককে জোরদার করা’ তার বিশেষ লক্ষ্য। [“Modi stresses on strengthening economic ties]

আগামী বছর ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বা ক্ষমতার নির্বাচন। ফলে ক্ষমতার আকাঙ্খী বিরোধী অপর দল কংগ্রেসে এবার মা সোনিয়া গান্ধী ছেলে রাহুল গান্ধীকে দলের নতুন নেতা করে নামিয়েছেন। রাহুলও তৎপর হয়ে প্রায় প্রত্যেক ইস্যুতেই প্রধানমন্ত্রী মোদীকে আক্রমণ ও সমালোচনা করে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়ে চলেছেন। ফলে মোদীর য়ুহান যাত্রার আগেও ব্যতিক্রম করেননি। কিন্তু হায়! গ্লোবাল অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অভিমুখ সম্পর্কে রাহুল গান্ধীর মত ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্ভবত যথেষ্ট সচেতন হন নাই, হোমওয়ার্ক করেন না – এমন আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করলেন রাহুল এক টুইট বার্তা দিয়ে। য়ুহান যাত্রার প্রাক্কালে তিনি মোদীকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে লিখলেন – তিনি যেন “ডোকলাম ইস্যু” ও “চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তির” কথা তুলে ধরতে ভুলে না যান।

এর সোজা অর্থ মোদি-জিনপিং শীর্ষ বৈঠকের পিছনের কথা বা ব্যাকগ্রাউন্ড এবং গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে এই সম্মেলনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য এবং ভারতের অর্থনীতির জন্য তা কেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ আশীর্বাদ হয়ে আসবে সেসব সম্পর্কে একেবারেই বেখবর রাহুল। প্রথমত, মোদির কাছে বা ভারতের দিক থেকে এই সফর হল বিগত দুই বছরে চীন-ভারতের সম্পর্ক যে সঙ্ঘাত ও বৈরিতার পথে চলে গিয়েছিল, তা ছেড়ে পারস্পরিক সহযোগিতার পথে উঠে আসার জন্য ভারতের সুযোগ নেয়ার সফর। ফলে এই সফর থেকে ভুটানের ডোকলাম সীমান্ত নিয়ে নতুন করে সঙ্ঘাত তুলে আনা কোনোভাবেই মোদির বা ভারতের লক্ষ্য নয়। বরং ডোকলামের সঙ্ঘাত যা মূলত ডেড ইস্যু যা মোদী শেষে সফলভাবে চাপা দিতে পেরেছিল; চীনের সাথে কোনো বড় সঙ্ঘাতের দিকে তা চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল, এটাই মোদীর বিরাট অর্জন ছিল। ফলে ডোকলাম ভারতের কাছে, অন্তত মোদীর জন্য কোন অমীমাংসিত ইস্যু নয়, ভালভাবে ও কমপক্ষে আপাত হলেও মীমাংসিত ইস্যু। অথচ রাহুল মোদীকে ডোকলাম ইস্যুতে চীনের সাথে আলাপ তুলে পুরান ঘা খোঁচাখুচি করতে মনে করিয়ে দিচ্ছেন।

[Congress president Rahul Gandhi said the PM looked tense in the live TV feed of the China visit. “Saw the live TV feed of your “No Agenda” China visit. You look tense! A quick reminder: 1. Doklam. 2. China Pakistan Economic Corridor passes through PoK. That’s Indian territory. India wants to hear you talk about these crucial issues. You have our support,” Rahul Gandhi said on Twitter.]

রাহুল দ্বিতীয় প্রসঙ্গ তুলছেন, চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের আপত্তি নিয়ে। এই দাবিও অপ্রাসঙ্গিক। মোদী য়ুহান সামিটে যাচ্ছেন মূলত চীন-ভারত সামগ্রিক অর্থে অর্থনৈতিক ও বিশেষ করে বিনিয়োগ সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে এর ভিত্তিমূলক আলাপ করতে। বোঝা যাচ্ছে, এর খবর রাহুলের কাছে নেই। মোদীর এই উদ্যোগ সরকার বিরোধী নেতা বলে রাহুলের তো তা ভন্ডুল করে দেয়া বা বেখবর থাকা কোন দায়ীত্ববান লোকের কাজ না।  অথচ তিনি ভেবেছেন যেন মোদী চীন যাচ্ছেন চীন-ভারত সীমান্ত বিতর্কে কোনো অমীমাংসিত ইস্যুতে ভারতের স্বার্থ আদায় করতে। দেখা যাচ্ছে রাহুল তো ইস্যুই বুঝেন নাই!

আসলে চীন-পাকিস্তানের করিডোর প্রকল্প প্রায় ৬০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি এক বিনিয়োগ প্রকল্প। এটা মূলত চীনের নিজের স্বার্থের অবকাঠামো প্রকল্প। পশ্চিম বা দক্ষিণ-পশ্চিম চীন যেটা পাহাড় পর্বতমালায় পুরোপুরি ল্যান্ডলক্ড অবস্থায়; সেই অঞ্চলকে  গভীর সমুদ্রবন্দরে প্রবেশসহ সব আবদ্ধতা ভেঙে ফেলে উন্মুক্ত করার অবকাঠামো প্রকল্প। এটা পাকিস্তানের উত্তর-দক্ষিণ বরাবর পুরা পাকিস্তানের বুকচিরে চলা এক হাইওয়ে যোগাযোগব্যবস্থা, যার একদিকে গভীর সমুদ্র বন্দর গোয়াদর আর অন্য প্রান্তে শেষে এটা চীনের অবরুদ্ধ পশ্চিম চীনের ভেতরে পর্যন্ত ঢুকে গেছে। এ ছাড়া এটাই চীনের ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো প্রকল্প ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিআরআই (BRI) এর অংশ; যা দুনিয়ার ৬৫টি রাষ্ট্রকে সংযুক্ত করে এমন অবকাঠামো প্রকল্প।

ভারত এই প্রকল্পে অংশ নিতে চায় না – একথা বলে ভারত এখন নিজের দাম বাড়িয়ে নেয়ার চেষ্টার মোডে আছে; এই স্তরে আছে। এরই অজুহাত হিসেবে ভারত এখন এক নন-সিরিয়াস অভিযোগ তুলে রেখেছে যে এই করিডোর প্রকল্প পাকিস্তানের কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে গেছে। আর ভারতের চোখে কাশ্মীর এক বিতর্কিত ভূমি এবং দাবি যে কাশ্মীর পুরোটাই ভারতের। ফলে এই সুত্র এটা ভারতের সার্বভৌমত্বের রক্ষার প্রশ্ন। ভারত আনুষ্ঠানিকভাবে এই আপত্তি তুলে রেখেছে সত্য কিন্তু এ ক্ষেত্রে তার মনের আসল ইচ্ছা হল, ভারতকে বিআরআই (BRI) প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে চীন ভারতকে আরো কী কী ছাড় ও সুবিধা দেয় তার দরকষাকষি করা। এ ব্যাপারে চীনে ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত ছিলেন অশোক কান্থা; তিনি অবসরে যাওয়ার পরে গণমাধ্যমে নিজেই এক বয়ান দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ক্ষমতাবান ‘ক্রমবর্ধমান ধেয়ে আসা চীনের প্রভাব’ মোকাবেলা করাই হলো ‘ভারতের কূটনীতির জন্য আগামীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ’। আর এই কাজে চীনকে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না দিতেই ভারত বিআরআই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত না হতে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। [……”how to deal with an increasingly assertive China… in an uncertain, fluid international environment, this is going to be possibly the biggest challenge in India’s foreign policy in years to come,” ]

তিনি মূলত বলেছিলেন BRI/OBOR প্রকল্পে যোগ দিলে ভারত চীনের জুনিয়র পার্টনার হয়ে যাবে। তাই ভারতের যোগদানের সম্ভাবনা নাই। [……joining OBOR, which is going to have strategic agenda for China, as a junior partner is highly unlikely for India. It might work for smaller countries, but for India it is a difficult proposition,”]

এই কথাগুলো কান্থাসহ প্রো-আমেরিকান ধারার আমলারা যখন বলছিলেন, ভারত আমেরিকায় ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি নিজ ভর্তুকির পণ্য রফতানির সুযোগ তখনও বজায় ছিল। বিনিময়ে আমেরিকার ‘চীন ঠেকাও’ নীতি নিজেরও নীতি, ভারতকে এটা আমল করে নিজ মুকুটে পালক হিসেবে লাগিয়ে রাখতে হয়েছিল। অশোক কান্থাসহ আমলাদের এই আমেরিকান ধারা এখন পরাজিত বলেই গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে চীন-ভারত য়ুহান সম্মেলন হতে পেরেছিল। বোঝা যাচ্ছে কংগ্রেসের রাহুল একেবারেই এতই নাদান যে বাস্তবের এসব ঘটনার কোনো ন্যূনতম তথ্যও তার কাছে নেই। তাই তিনি চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর প্রকল্পে ভারতের সার্বভৌমত্বের আপত্তি নিয়ে কথা বলতে মোদীকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলেন। যেন মোদী চীন সফরে যাচ্ছিলেন, পাকিস্তান অংশের কাশ্মীরে ভারতের নিজের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই করতে।

ভারতের আরেক রাজনীতিক কাপিল সিবাল। তারও দল হল, সোনিয়া-রাহুলের ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। মূলত তিনি দিল্লির চাঁদনী চক নির্বাচনী এলাকা থেকে সাধারণত নির্বাচনে দাঁড়ান। কিন্তু গত ২০১৪ সালের কেন্দ্র-নির্বাচনে তিনি এই আসন থেকে দাড়িয়ে হেরে গিয়েছিলেন। তবে বর্তমানে তিনি ভারতীয় সংসদের দ্বিতীয় কক্ষ, রাজ্যসভার সদস্য। পেশাগতভাবে তার মূল পরিচয় মূলত তিনি হলেন দিল্লি সুপ্রিম কোর্টের উকিল, যিনি দিল্লি বার অ্যাসোসিয়েশনের তিনবারের সভাপতি। বিগত কংগ্রেস সরকারের দুই টার্মের তিনি অনেক মন্ত্রণালয়ের যেমন আইনমন্ত্রী, টেলিকমমন্ত্রী, মানবসম্পদমন্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন। তাকে কংগ্রেসের সিনিয়র রাজনীতিবিদদের একজন মানা হয়।
কাপিল গত ২১ মে টাইমস অব ইন্ডিয়া নিজের এক মতামত ছেপেছেন। এটা ছিল টাইমস অব ইন্ডিয়ার ব্লগে কাপিল সিবালের লেখা। এই লেখাটাকে পড়া যেত হয়ত রাহুল গান্ধীর তথ্য ও চিন্তার খামতি পূরণের একটা উদ্যোগ হিসেবে। কিন্তু তা যায়নি এ জন্য যে, এটা কাপিল সিবালের ব্যক্তিগত মতামত বলে উল্লেখ করেই ছাপা হয়েছে।

কাপিলের এই লেখা বরং মোদিকে সার্টিফিকেট দেয়া বা এগিয়ে যেতে বাহবা দেয়া বলে মনে করা যায়। যেমন শিরোনামটাই তেমন বিনয়ের যদিও তা খোঁচা দেয়ারও। [Modi gets real on China: Wuhan summit demonstrated that a weak economy gives India few cards to deal]

এতদিন আমেরিকার কথায় নেচে ফাঁপা হামবড়া দেখানো যে ভুল ছিল কাপিল তা স্বীকার করছেন। কিন্তু স্বীকার করেও এর দায় কেবল মোদীর ওপর ফেলতে চাচ্ছেন। বাংলায় কাপিলের লেখার শিরোনামটা হল, “আসল চীনের সামনে মোদী এখন বুঝছেঃ য়ুহান সম্মেলন দেখাল নিজের দুর্বল অর্থনীতি নিয়ে চীনকে মোকাবেলা করতে যাওয়া ভারতের হাতে কার্ড খুব কমই আছে”। মোদী এখন বুঝুক – টাইপের কাপিলের এই বয়ান পুরাপুরি অন্যায্য। যেন মোদী একাই আমেরিকার প্ররোচনায় চীনের সাথে মিথ্যা হামবড়া করে বা এমন হামবড়া দেখিয়ে চলেছিল। অথচ সোনিয়া-প্রণবের কংগ্রেসের আমলেও (২০০৪-১৪) চীন মোকাবেলার ক্ষেত্রে তারাও কি আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর উসকানিতে’ তাল দিয়ে একই মিথ্যা হামবড়া করে চলেনি? আর কাপিল কি সেই দুই টার্মের কংগ্রেস সরকারের মন্ত্রী ছিলেন না? তাহলে একা মোদীকে দায় দেয়া কেন?

যা হোক কাপিল তার লেখায় এবার সোজা দেনা পাওনার আলাপে চলে এসেছেন। বলছেন, “বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, বার্মা, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা – এসব দেশে চীন প্রায় দেড় শ’ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। ভারতের অর্থনীতিতেও প্রধান সেক্টরগুলোতে চীন আমাদের বিনিয়োগ চাহিদা পূরণ করবে। আমাদের ১৮টা বড় শহরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণে সব বিনিয়োগ চীনাদের”। ইত্যাদি সব কথাই আছে সেখানে।
কিন্তু এবার তিনি এক মজার আলাপ তুলেছেন।  চীনের বিরুদ্ধে কংগ্রেস সরকার যেসব অভিযোগ করত বা এখনো যেসব অভিযোগ, তিনি তার সব ফিরিয়ে নিচ্ছেন আর মোদীকেও তা ফিরিয়ে নিতে সুপারিশ করছেন। এটাই খুবই ইন্টারেস্টিং, স্রোত বদলের সরাসরি ইঙ্গিত।  “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে” – এই শিরোনাম দিয়ে তিনি এক তালিকা দিয়েছেন।

বলছেন, “কিছু সত্য আমাদের মেনে নিতে হবে”।
“চীন কখনো পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব ছাড়বে না। জাতিসঙ্ঘের উচ্চ আসনে চীনারা আমাদের প্রার্থিতা সমর্থন করবে না। [এই কাগুজে প্রার্থিতা  চীনের সমর্থন করার কোন কথা কোথায় হয় নাই। বুশ_ ওবামা দুজনের আশ্বাস দিয়েছিল। ] আবার নিউক্লিয়ার সাপ্লায়ার্স গ্রুপে সদস্য হিসেবে ঐ সংগঠনে আমাদের অন্তর্ভুক্তি চীনারা মেনে নেবে না। আমাদের বাজারে চীনের প্রবেশাধিকার থাকলেও প্রতিদানে আইটি সেক্টরসহ তাদের বাজারে আমাদের তারা প্রতিদান দেবে না। যদিও চীনারা সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে আমাদের তৈরী ওষুধ চীনা বাজারে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। এরকম অনেক তালিকা আছে। কিন্তু এখানে মূল কথাটা হলো, নিজে মেনে নেয়া এবং সবাইকে মেনে নিতে সুপারিশ করা”।

আসলে ব্যাপার হল, এগুলো চীনের বিরুদ্ধে ঠিক ভারতের তোলা অভিযোগ নয়। বরং ভারতকে আমেরিকার দেয়া মিথ্যা আশ্বাসের তালিকা। যেমন জাতিসঙ্ঘ বা সাপ্লায়ার্স গ্রুপে ভারতকে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে দেবে, এই আলাপ ছিল ভারতকে দেয়া আমেরিকার মিথ্যা আশ্বাস।  আসলে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বও ছিল এতটাই নাদান যে, তারা এটা বিশ্বাস করেছিল। ধরে নিয়েছিল আ-মে-রি-কা; এই আমেরিকা চাইলে সবই যেন সে কাউকে দিতে পারে। তবে মূল কথা কাপিলের এসব বক্তব্য তাদের দলের নাদান সভাপতি রাহুলের বক্তব্যের চেয়ে অনেক বাস্তবে পা দিয়ে চলা – এমন কথা। অন্তত বক্তব্যের পটভূমি বুঝে তিনি কথা বলেছেন।

তবে এই প্রসঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশেষ করে আমাদের কাকাবাবু প্রণব মুখার্জির গ্লোবাল ইতিহাসবোধের উদাহরণ না তুলে ধরে পারছি না। বুশ এবং ওবামার আমলেও  (বিশেষ করে ২০০৯ সালে ওবামা ক্ষমতায় আসার পর) ভারতকে আশ্বাস দেয়া হয়েছিল রাষ্ট্রসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতার সদস্যপদ ভারতকে এনে দেয়া হবে। আর প্রণব মুখার্জির মত নীতি নির্ধারকেরা তা বিশ্বাস করেছিল। এমনকী ভেটো ক্ষমতা পেলে সবার আগে পাবার সম্ভাবনা একালে মার্কেলের জার্মানী। সেই জর্মানি রাষ্ট্রও কেমন (P5+1) হয়ে ঝুলে আছে সেটাও লক্ষ্য করতে ভারত ভুলে গেছে। আর এর চেয়েও বড় কথা হল কেন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে ভেটোক্ষমতা সম্পন্ন রাষ্ট্রসংঘের প্রস্তাব করে, এর জন্ম দিতে হয়েছিল সে ইতিহাস জানলে যে কেউ বুঝবে কেন এখন পাঁচ ভেটো ক্ষমতাধর সদস্য একালে বাড়াতে যাবার সোজা মানে হল রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একক ক্ষমতাধর আমেরিকা এখন একালে আর  সেই ক্ষমতাধর নয় অথবা কখনই ফিরে আসবে না। ফলে রাষ্ট্রসংঘ পুনর্গঠনের মুরোদ আর আমেরিকার নাই। আগামিতে ঠিক কার বা কার কার এই মুরোদ হতে পারে সবটাই আবছা। এছাড়া “রাষ্ট্রসংঘের পুণর্গঠন” এর জন্য কী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটবার প্রয়োজনীয় পুর্বশর্তের মত এবারও একটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ লাগবে, তাই কী! বিশেষত যখন আমেরিকার এক নম্বর ক্ষমতাধর জায়গা থেকে বিদায়ের আলামত চারিদিকে ফুটে উঠেছে। অথচ সেই ঢলে যাওয়া লোলচর্ম  আমেরিকার পকেটেই যেন গ্লোবাল ক্ষমতা ধরা আছে এই হল কাকাবাবুদের গ্লোবাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে রিডিং।

তবে আসল তামাশার কথা বলাটা এখনও বাকি। গত ২০১০ সালের ১০ জানুয়ারি শেষ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসাবে প্রথম ভারত সফর করেছিলেন। সেখানে হাসিনাকে দিয়ে পঞ্চাশেরও বেশি পয়েন্টে হাসিনাকে দিয়ে স্বাক্ষরিত এক যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়েছিল। ওর ৪৭ নম্বর দফা ছিল এরকমঃ

Responding to the Prime Minister of India, the Prime Minister of Bangladesh conveyed her country’s support in principle for India’s candidature for the permanent membership of the United Nations Security Council as and when the reform of the UN Security Council is achieved. Bangladesh conveyed its support to the Indian Candidature for a non-permanent seat in the UNSC for the term 2011-2012. India also conveyed its support to the Bangladesh’s candidature for a non-permanent seat in UNSC for the term 2016-2017.

অর্থাৎ ঐ ঘোষণার ৪৭ নম্বর পয়েন্ট ছিল এরকম, “বাংলাদেশ ভারতের ভেটো সদস্যপদের দাবি সমর্থন করছে”। মানে বাংলাদেশকে দিয়ে যা মনে চায় তাই স্বাক্ষর করে নেয়া যায় বলে কাকাবাবু এটাও ছাড়তে রাজি হয় নাই। তার কোন মুল্য থাক আর নাই থাক। যদি লাইগা যায়! আসল কথাটা হল রাষ্ট্রসংঘের ভেটো সদস্যপদ ভারত আমেরিকার কাছে আবদার করেছিল। অথচ এটা আমেরিকার কাছে আবদার করে পাবার জিনিষ নয়, আমেরিকাও তা একক ইচ্ছায় কাউকে দান করার কখনই কেউ নয়, কেউ ছিলও না। এটাই কাকাবাবুরা বুঝেন না!

এবার সবশেষে সুবীর ভৌমিকের দেয়া এক তথ্য। বিসিআইএম (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোর কথাটা গণমাধ্যমে অনেক দিন উচ্চারিত হয়নি। উচ্চারিত হওয়া বন্ধই হয়ে গিয়েছিল ভারতের আপত্তি, অনাগ্রহের কারণে। বিসিআইএম হল, বাংলাদেশ, চীন, ইন্ডিয়া ও মিয়ানমার এই চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে লেখা নাম। এই নাম দেয়া হয়েছে কলকাতা থেকে বাংলাদেশ হয়ে এরপর বার্মার গুমদুম হয়ে চীনের কুনমিং পর্যন্ত এক অর্থনৈতিক করিডোর অবকাঠামো প্রকল্প, যার নাম বিসিআইএম (BCIM)। সুবীর বলছেন, “য়ুহানে মোদি-শি জিংপিংয়ের বৈঠকের একটা ইতিবাচক ফল মনে হচ্ছে আসন্ন হয়ে উঠেছে”। কলকাতায় চীনা দূতাবাসের এক কনসাল জেনারেল লেবেলের অফিস আছে। সেই কনসাল জেনারেল  (Ma Jhanwu ) মা ঝানয়ু-এর বরাত দিয়ে সুবীর জানাচ্ছেন, তিনি এক প্রেস কনফারেন্সে বলেছেন, বিসিআইএম প্রকল্প এখন শুরু হবে কারণ এ দুই শীর্ষ নেতা একমত হয়েছেন যে, এই প্রক্রিয়া সামনে এগিয়ে নিতে হবে।’ [……”BCIM would take off now because the two leaders had agreed to take the process forward”. ]

খুবই তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি, যদিও খুবই কম তথ্য এটা সন্দেহ নেই। বিশেষ করে সড়ক ও রেল যোগাযোগের বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডোর ব্যবস্থা চালু হয়ত হয়ে যাবে কখনও। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের সোনাদিয়ার গভীর সমুদ্রবন্দর, যেটা ছিল বিসিআইএম প্রকল্পের সাথে সংযুক্ত, এক গভীর সমুদ্রবন্দর অবকাঠামো। এ ছাড়া আরেকটা দিক আছে। বন্দর সুবিধাসহ সব মিলিয়ে বিসিআইএম প্রকল্পও চীনা ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ একটা অংশ হওয়ার কথা। ‘বেল্ট-রোড উদ্যোগে’ বিভিন্ন স্থানে পাঁচটি গভীর সমুদ্রবন্দরের সংযোগ সুবিধা থাকার কথা, বিসিআইএম প্রকল্প তার একটি। তাহলে ভারত কি আস্তে ধীরে বেল্ট-রোড উদ্যোগের অংশীদার হওয়ার পথে?

না এটা এখনই অতিরিক্ত আশা। যদিও তা কোনো দিন হবে হয়ত, এমন অনুমান করা অবাস্তব হবে না। তবে খুব সম্ভবত আমরা অনেক আগেই এবং বেশি দ্রুত তা অনুমান করছি। যদিও একটা বিষয় এখনই পরিষ্কার করে রাখা যায়।

য়ুহান সম্মেলনের কোনো ফলাফল যদি আসতে শুরু করে, তবে তা হবে সবার আগে শুরু হবে, ভারতের একান্ত নিজের জন্য নেয়া চীনা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো থেকে। চীন-ভারত সম্পর্ক সবার আগে এদিক দিয়ে উন্মুক্ত হবে। কিন্তু এর অর্থ বাংলাদেশেরও চীনা অবকাঠামো প্রকল্প নেয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় বর্তমান যে আপত্তিগুলো আছে তা আপনাতেই সরে যাওয়া নয়। ভারতীয় কূটনীতিতে এ দুটো আলাদা বিষয়। বাংলাদেশে চীনা অবকাঠামো প্রকল্প ভারতের আপত্তি এখনও সক্রিয় আছে বলেই সম্ভবত এবার প্রধানমন্ত্রীর শান্তিনিকেতন সফরের সময়, কথিত ভারতের কাছ থেকে “প্রতিদান” পাওয়ার আলাপ উঠতে আমরা দেখেছি। সেই সাথে আমরা দেখেছি, কথিত “প্রতিদান” পাওয়ার জন্য সরকারের বেপরোয়া কাছাখোলা ও মরিয়া অবস্থা। যদিও এ ব্যাপারে আবার সরকারের সর্বশেষ অবস্থান হল, নিজের মরিয়া দুর্দশা সে আর বাইরে দেখাতে চাচ্ছে না। গত বুধবারের প্রেস কনফারেন্সে তাই বোধহয় একটু ইউ-টার্ণ। যদিও আগের দিন ২৮ মে সরকারি প্যানেল সাংবাদিক নেতাদের আলোচনা সভা ছিল অভুতপুর্ব, দেখার মত।  খুব সম্ভবত, প্রতিদান পাবার বেপরোয়া দেখালেও কোনো ফল আসবে না বা আসছে না, এমন হয়ত তাদের অনুমান।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ৩১ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “চীনের বেল্ট-রোডে যোগ দিচ্ছে ভারত!”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

চীনের কাছে আসার দৌড়ঝাঁপ

চীনের কাছে আসার দৌড়ঝাঁপ

গৌতম দাস
০৫ মে ২০১৮, শনিবার, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2ry

 

 

চীন-ভারত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হওয়ার পথে এগিয়ে চলেছে। ব্যাপারটাকে সম্ভবত এভাবে বলা যায় যে, চীন ও ভারতের সম্পর্ক যেটা এত দিন ভাসতে ভাসতে ক্রমেই বড় দূরত্বে এবং বিচ্ছিন্ন ও সঙ্ঘাতপূর্ণ পথ ধরছিল; তা হঠাৎ করেই এবার উল্টো এক পথ তালাশ করতে নেমেছে। সেটা হল, পরস্পর কাছে আসার উত্তম পথ কী হতে পারে তা দ্রুত খুঁজে বের করা। ব্যাপারটা যেন উভয়ে মিলে স্থায়ী ও শক্ত কোনো ভিতের ঠিকানা খুঁজে ফেরা। কারণ, তারা তাদের সম্পর্ককে এবার স্থায়ী ভিতের উপর ও ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড় করাতে অধীর হয়ে পড়েছে। গত মাসে ৩ এপ্রিল “পরিবর্তনের আগমনী ঘণ্টা- সেই বিউগল বেজে গেছে” শিরোনামে আমার লেখায় এই পরিবর্তন শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, চীন-ভারত সম্পর্ক আগে যেখানে যে অবস্থায় ছিল, এর সব কিছু ওলটপালট হয়ে গেছে; ভারতের ভাষায় এটা ‘রিসেট’ (reset) হয়ে গেছে। এটা হতে অবশ্য ১৬ বছর লাগল।

কিন্তু দূরত্ব ও সঙ্ঘাতের পথ হঠাৎ ত্যাগ করে চীন ও ভারতের সম্পর্ক উল্টো শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানোর উদ্যোগ কেন, এর পেছনের কারণ কী? তা সবাই তা পাশ কাটিয়ে যেতে চাইলেও সে কারণটি হল – মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করা। আমেরিকার সেই মূল বাণিজ্য লড়াই চীনের সাথে হলেও, তা ভারতের বিরুদ্ধেও পরিচালিত। এত দিন আমেরিকার কাছ থেকে এক ‘বিশেষ রাজনৈতিক সুবিধা’ বা ‘চীন ঠেকানোর জন্য আমেরিকার দেয়া ঘুষ’ প্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে ভারত নিজের সরকারি ভর্তুকি দেয়া পণ্য আমেরিকায় রফতানি করে চলেছিল। এ ‘বিশেষ’ সুযোগটাই ট্রাম্পের বাণিজ্যযুদ্ধের শুরুতে সবার আগে বাদ করে দিয়েছে। আর ঠিক ততোধিক বেগে ভারতের চীনমুখী রাস্তা খুঁজে বের করতে ঝাঁপিয়ে পড়া এখান থেকেই।

সম্ভাব্য এই ইউটার্ন বা উল্টো পথ যে ধরতে হতে পারে, তা ভারতের অজানা ছিল না, বিশেষ করে ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতি; যেটা ট্রাম্প ২০১৭ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার সময় থেকেই বলতে শুরু করেছিলেন। কথাটির ব্যবহারিক অর্থ যদিও অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন। গত আশির দশক থেকে, পণ্য বিনিময় (সেই সাথে পুঁজিও) দুনিয়াব্যাপী ছড়িয়ে এক গ্লোবাল অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রবক্তা আমেরিকা নিজেই এখন রক্ষণশীল, সবার আগে নিজ পণ্যবাজার সংরক্ষণ করতে হবে – এই উল্টো লাইনে চলে যাওয়া। এটাই ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতির সারকথা।  ফলে ‘ফরেন পলিসি’ নামে আমেরিকার নামকরা এক ম্যাগাজিনের মতামত কলামে লেখা হয়েছে, ‘চীন-ভারতের কাছাকাছি আসতে চাইবার পেছনে একটা থার্ড পার্টি বা তৃতীয় পক্ষ আছে; যার নাম ডোনাল্ড ট্রাম্প। [But there’s an unacknowledged third party — U.S. President Donald Trump.] অর্থাৎ ট্রাম্পের নীতি এদের পরস্পরের কাছে আসতে বাধ্য করেছে।

তবে সম্ভাব্য এই পরিস্থিতির কিছু গ্রাউন্ডওয়ার্ক করে রেখেছিলেন এখনকার ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিজয় কেশব গোখলে। এ বছর ৩০ জানুয়ারি তিনি নতুন পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। এর মাত্র তিন মাস আগে অক্টোবর ২০১৭ মাস পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রায় দুই বছর ধরে চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত। মোদী ও তাঁর ‘খামাখা শক্ত লাইন’ পথের মুখ্য সঙ্গী নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের অনুসৃত নীতির কারণে ভারত যখন ভুটানের ডোকলাম সঙ্কটে নাকানি-চুবানি খেয়ে আটকে যায়; তখন যারা যারা মোদিকে সেখান থেকে উদ্ধার করে বাঁচিয়ে ফিরিয়ে এনেছিলেন; তাদের মূল লোক ধরা হয় সে সময়ের ভারতের পররাষ্ট্র সচিব জয়শঙ্করকে। আর ভারতের পত্রিকা ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের মতে, [দেখুনঃ Who is Vijay Keshav Gokhale] জয়শঙ্করের সাথে চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে এই গোখলেও বিরাট ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই সঙ্কটকালে সফট পাওয়ারের ব্যবহার করে সব কিছুকে স্বাভাবিক করতে নিয়ামক ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।

জানুয়ারির শেষে পররাষ্ট্র সচিব হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে গোখলে চীন সফরে যান, যেখান থেকে বলা হয় চীন-ভারতের সম্পর্কের নতুন ধারার শুরু। আর এতে বিগত দুই মাসেই চীনের বাণিজ্যমন্ত্রীর ভারত সফর এবং ভারতের দিক থেকে তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চীন সফর শেষ হয়েছে। এর শেষেই নেয়া হয়েছিল মোদির চীন সফরসূচি, ২৭-২৮ এপ্রিল। এই সফরের ফরম্যাট দেখলে আর কোথায় কোন পটভূমিতে মোদির এই সফর হয়েছে, তা বিচার করলে অনেক বিষয় আমাদের কাছে পরিষ্কার হবে।

মিডিয়া রিপোর্ট অনুসারে – মোদির এই ‘বিশেষ’ চীন সফর যেমন ভারতের দিক থেকে আশা করা হয়েছিল, সেভাবে শেষ হয়েছে। মে মাসের শুরুতে আমাকে একজন জিজ্ঞেস করেছিলেন, মোদীর সফরে কী চীন-ভারত সম্পর্ক নতুন অগ্রগতি ও আকার পাবে? আমার জবাব ছিল, এটা আর পাবে কি না, সে পর্যায়ে নেই। বরং নতুন আকারে একটা বিরাট ‘ডিল’ হতে যাচ্ছে, এটা নিশ্চিত। এখন কী কী বোঝাবুঝির উপর দাঁড়িয়ে আর দেনা-পাওনার বিষয় সেটেল করে তা হবে, সেটাই নির্ধারণের কথাবার্তা চলছে। মোদীর চীন সফরের আগের সপ্তাহে ২২ এপ্রিল ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ চীনে গিয়ে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে মিটিংয়ে মোদীর সফরের বাকি খুঁটিনাটি সম্পন্ন করেন।

সেখান থেকে তারা দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য টেনে মোদী-শি’র সামিটকে বোঝার চেষ্টা করা যেতে পারে, কিন্তু মোদী তার চীন সফরের শুরুতে একটা বিবৃতি প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে মোদী বলেন, “প্রেসিডেন্ট শি ও আমি এক গুচ্ছ দ্বিপক্ষীয় ও গ্লোবাল গুরুত্বের ইস্যু নিয়ে মতবিনিময় করব। আমরা আমাদের প্রত্যেকের জাতীয় উন্নয়ন, বিশেষ করে চলতি ও আগামী আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলব”। [“President Xi and I will exchange views on a range of issues of bilateral and global importance. We will discuss our respective visions and priorities for national development, particularly in the context of current and future international situation,” PM Modi said in a statement.]

এই দুই বাক্য অনেক ডিপ্লোমেটিক ভঙ্গি ও ভাষায় ভরপুর, সন্দেহ নেই। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল ‘গ্লোবাল গুরুত্বের’ বিষয় তাদের আলোচনার ইস্যু – এই শব্দ দুটো। এ ছাড়া “চলতি ও আগামী বিশ্বপরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতের প্রসঙ্গ” টেনে কথা বলাও তাৎপর্যপূর্ণ। এসব কথার অর্থ হল – মোদি বলতে চাইছেন,  ট্রাম্পের অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন ও নিজ বাজারে রক্ষণশীল ‘আমেরিকা ফাস্ট’ নীতি চলতি গ্লোবালাইজড (দুনিয়াব্যাপী এক ব্যাপক পুঁজি ও পণ্যবিনিময় ব্যবস্থায় ছড়িয়ে পড়ায় সবার তাতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া) বিশ্ব- অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়াতে – এই অর্থে এই দুই রাষ্ট্রকে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলতে ও ঘনিষ্ঠ হতে বাধ্য করেছে। কথা অবশ্যই সত্য, আর চীন ও ভারতের জনসংখ্যা মেলালে তা দুনিয়ার ৪০ শতাংশ, এ কথা স্মরণ করলে তা আরো ভালো বোঝা যায়। অনেক এক্সপার্ট মনে করেন, চীন-ভারতের সম্পর্ক ইতিবাচক দিকে যদি মোড় নেয়, তবে ৩০ বছর ধরে তা আগামী দুনিয়াকে আকার দেয়ার সামর্থ্য রাখে। [“The relationship between New Delhi and Beijing has the potential to shape the world for the next 30 years,” says political commentator Einar Tangen.]

আসলে এক কথায় বললে, সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন বা এসসিও (SCO) এর বৈঠকে যোগ দিতে নরেন্দ্র মোদি চীন সফর করছেন, এ কথা কেবল এক উসিলা। প্রথমত, এটা ছিল এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক।  এসসিও’র সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রধানদের কোন বৈঠক নয়। আর এর মূল উদ্দেশ্য ছিল, আগামী ৯-১০ জুন চীনে এসসিও’র মূল বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে, তারই প্রস্তুতি বৈঠক করা। তবে এবারের এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের এক বাড়তি অনুষঙ্গ ছিল। তা হল, পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ওই বৈঠকের আগে এসসিও সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের ২৩-২৪ এপ্রিল এক বৈঠকে বসা। আর এরপরেই এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ওই বৈঠকের অফিসিয়াল সুচি ছিল ২৫-২৬ এপ্রিল। তাই, ভারতের পরারাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ এর দিন কয়েক আগে ২২ এপ্রিল বেইজিংয়ে গিয়েই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ঘোষণা করেন যে, চীনের য়ুহান শহরে নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে ‘ঘরোয়া সামিট’ হবে। বিবিসি-বাংলার ভাষায় এই ঘোষণা ‘কূটনৈতিক মহলে ছিল রীতিমতো অভাবিত’। তাই ক্রিটিক্যালি দেখলে এসসিও’র কোনো বৈঠকের সাথে প্রধানমন্ত্রী মোদীর প্রত্যক্ষ কোন লেনদেন ছিলই না। এমনকি মোদী এবং হোস্ট চীনের প্রেসিডেন্ট ছাড়া আর কোনো এসসিও’র সদস্য রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধান ঐ সময়কালে চীন সফরেই আসেন নাই।

দ্বিতীয়ত, য়ুহান (Wuhan) বাইরের মিডিয়ায় খুবই অপরিচিত এক শহর; যদিও চীনের ভেতরে এর আলাদা গুরুত্ব আছে। কারণ, য়ুহান হল,  মূলত মাও সে তুংয়ের ছুটি কাটানোর প্রিয় শহর। ফলে এটা এখন মাওয়ের স্মৃতিবাহী এক মিউজিয়ামের শহর। খরস্রোতা ইয়াংসি নদীর তীরে এই শহর, যে নদীতে অবসরে সাঁতার কাটতে ভালোবাসতেন মাও। আর সেখানে এক বিখ্যাত ‘ইস্ট লেক’ আছে, যার তীরে এক ভিলায় মোদি-শি’র থাকা ও বৈঠকের স্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এই শীর্ষ সামিটের নাম দেখেছি আমরা “ঘরোয়া সামিট” বলে। ‘ঘরোয়া’ শব্দটি বিবিসি বাংলার করা বাংলা। মূল শব্দটি ইংরেজিতে ছিল ‘ইনফরমাল’। অর্থাৎ এখানে তারা যে যাই দু’জনে দু’জনকে বলবে তা আনুষ্ঠানিক সরকারি অবস্থান বলে বিবেচনা করা হবে না। ফলে এক ধরনের দায়শূন্যতার সুবিধা থাকবে এবং মনখুলে কথা বলা যাবে। শুধু তাই নয়, তারা দু’জন অনুবাদক ছাড়া কোনো সরকারি বা মন্ত্রণালয়ের কোনো মন্ত্রী বা সহযোগীকে সাথে রাখার কথা ছিল না, নেনও নাই তাই সব অর্থেই এটা ‘ইনফরমাল’। কিন্তু ‘ইনফরমাল’ রাখা হল কেন?
কারণ, ইনফরমাল বলে ঘোষণা করে রাখলে আসল কথা সরাসরি তারা বলে নিতে পারেন – পারস্পরিক স্বার্থ, অসুবিধা, সুবিধা ইত্যাদি সব সেগুলো হয়ত ফরমাল সভায় কেউ কখনও বলবেন না, বলেন না। আর এখানকার কথা, মানে এর কোনো রেফারেন্স পরবর্তি কোনো আনুষ্ঠানিক সভায় উঠবেই না। তাহলে এখন আসি, সেখানে মোদি আসলে কী খুঁজতে গিয়েছেন?

মোদি বলতে চাইছেন, এখান থেকে তারা ‘চীন-ভারত সম্পর্কের এক পুনর্মূল্যায়ন এবং নতুন সম্ভাবনা বের করতে চাইছেন, যাতে তাদের নতুন স্ট্র্যাটেজিক নীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থ কী হতে পারে’ [Modi said he and Chinese President Xi Jinping will review the developments in Sino-Indian relations from a strategic and long-term perspective during a two-day informal summit at Wuhan in China from tomorrow.] সে সম্পর্কে উভয়েই পরিষ্কার হতে পারেন। এটা বিজনেস টুডে থেকে নেয়া।  এসব কারণে ভারতের ‘বিজনেস টুডে’ পত্রিকা এটাকে ‘হার্ট-টু-হার্ট সামিট’ নামে ডাকছে। এই বিজনেস টুডে ছাড়াম আমাদের প্রথম আলো বা বিবিসি বাংলা এবং ভারতের যতগুলো মিডিয়া এই সফরের রিপোর্ট কাভার করেছে, সবাই আসলে আন্দাজে হাতড়েছে যে, এই সামিটে আসলে কী হচ্ছে, কী হবে, কেন ইত্যাদি। এসব প্রসঙ্গে সবাই একেকটা মনগড়া ব্যাখ্যার কথা লিখেছেন। এমনকি ভারতের কথিত থিংকট্যাংকগুলো মিডিয়াকে আরও বিভ্রান্ত করেছে। যেমন, বিবিসি বাংলা কথিত এক চীন-বিশেষজ্ঞ অলকা আচারিয়ার বরাতে লিখেছে,  আচারিয়া বলেছেন, ” দুই দেশের সম্পর্ককে এখন যে আবার ‘রিসেট’ করার কথা বলা হচ্ছে, ডোকলাম সঙ্কটের তলানিই কিন্তু তাকে গতি দিয়েছে। আমার মতে, ডোকলাম দুই দেশের জন্যই ছিল একটা ওয়েকআপ কল। সম্পর্কটি যাতে আরো খারাপের দিকে না গড়ায়, দুই নেতাই সেই সুযোগ নিয়েছেন বলে মনে হচ্ছে”। এমন আন্দাজি কথা বলার মূল কারণ হল, ভারতের থিংকট্যাংক একাডেমিকরা আসলে একেকজন “আমেরিকান স্বার্থের চোখে”, মানে তাঁরা আমেরিকান স্বার্থের ‘চায়না কন্টেনমেন্টের ভেতরেই’ সব কিছুকে দেখতে অভ্যস্ত। তাই সত্যি কথাটা হল, ভারতের এসব ‘আমেরিকান চোখগুলো’রই সবার আগে ‘রিসেট’ দরকার। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, একাডেমিক জগতের এই প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল – এরা মারাত্মকভাবে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল।

অপর দিকে মিডিয়া বিভ্রান্ত হওয়ার সম্ভবত আরো একটা কারণ আছে। তা রয়টারের এক ডিটেল রিপোর্ট। সেটা হলো, এসসিও’র পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে এক প্রস্তাব নেয়া হয়েছিল। তাতে ভারত ছাড়া এসসিও’র সব সদস্য রাষ্ট্রই চীনের OBOR প্রকল্পে নিজেদের অংশগ্রহণ ও সমর্থনের কথা জানিয়েছে। একারণে মোদি-শি’র বৈঠকের আগে রয়টারের ঐ রিপোর্টের শিরোনাম হলও, ‘OBOR প্রকল্পে চীন ভারতের সমর্থন জোগাড়ে ব্যর্থ হয়েছে।’ [China fails to get Indian support for Belt and Road ahead of summit] কিন্তু সেটাই তো হওয়ার কথা। SCO এর ঐ বৈঠক তো ভারতকে মানানোর কোন বৈঠক ছিল না। বরং SCO এর যেকোন বৈঠকের বাইরে মোদী-শি’র ওই শীর্ষ বৈঠকে, ভারতের সাথে চীনের সামগ্রিক সম্পর্কের বিষয়ই ছিল মোদি-শি’র ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য। তাই কেউ যদি SCO এর কোন বৈঠকের ভিতর চীনের ‘আকাঙ্ক্ষা’ আগে থেকেই ছিল, এ কথা সামনে ঝুলিয়ে দেন  এর তো কোন মানে হয় না। একারনেই, এমন রিপোর্ট অর্থপূর্ণ। চীনের (এবং ভারতেরও) সব আকাঙ্খার মূল জায়গা এসসিও’র কোনো সভা নয়, বরং মোদি-শি’র শীর্ষ ঘরোয়া বৈঠক। তাই রয়টারের রিপোর্ট মোদি-শি’র শীর্ষ বৈঠককে প্রধান গুরুত্ব না দেয়ায় এই বিভ্রান্তি।

এখন তাহলে, শীর্ষ বৈঠকের ফলাফল নিয়ে কী করা হবে, মানে, তা প্রকাশিত হবে কোথায়? কীভাবে? সেটাও নির্ধারিত। আগেই বলেছি, এসসিও’র সভা আসলে মোদি-শি’র শীর্ষ ইনফরমাল বৈঠক ঘটানোর ক্ষেত্রে এক উসিলা মাত্র। তাই সেই বৈঠকের ফলাফল প্রকাশের নির্ধারিত স্থান হল, পরবর্তিতে আগামি জুন মাসে আবার এসসিও’র শীর্ষ বৈঠক আছে চীনেই; সেই সময় তবে আলাদা করে সভা করে তা তুলে ধরা বা মূল্যায়নের সমাপ্তি টানা হবে। সম্ভবত এসসিও’র সম্মেলন শুরুর আগে বা পরের অবশ্যই কোনো আলাদা সময়ে মোদী-শি’র আবার কোন শীর্ষ বৈঠক থেকে তা প্রকাশ করা হবে। তত দিন আরো দৌড়ঝাঁপ আমাদের দেখতে হবে।

সবশেষে, ভারতের সম্পর্কের প্রভাব ও ভূমিকা বাংলাদেশে কী হতে পারে? প্রথমত, সহসাই এর কোনো প্রভাব আমরা কোথাও পড়তে দেখব না। এমনকি মোদী-শি’র শীর্ষ বৈঠকের ফলাফলে চীন-ভারত সবচেয়ে কাছাকাছি চলে এলেও এখন সহসাই কোন প্রভাব পড়বে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ চীনের প্রভাব বলয়ে যেন না যায়, সেটা তো বটেই, এমনকি বাংলাদেশে যেন চীনা বিনিয়োগ না ঢুকে – ভারতের এখনকার এই অবস্থানই বজায় থাকবে। তবে হয়ত অনেক দীর্ঘ সময় পরে কখনো তা বদলাতে পারে। এ ছাড়া, বাংলাদেশে চীন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বদলানোর তাৎক্ষণিক কারণ নেই। এছাড়াও, গত সপ্তাহে পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ প্রকল্পের ঋণচুক্তি (প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এটা মনে রাখা যেতে পারে।

আসলে এখনও মুখ্য বিষয় হল – ভারত চীনের কাছ থেকে কী পাবে, মূলত এই প্রসঙ্গকে ঘিরে। এসব দিকের সুরাহা হলে এরপরে এশিয়ায় অন্য দেশে প্রভাব বিস্তারের প্রসঙ্গে যেমন বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগে ভারতের আপত্তি বন্ধ হবে কি না, নাকি একই রকম থাকবে; হলে কিভাবে, কী শর্তে, সেসব প্রসঙ্গ উঠতে পারে। এর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশে চীন ইস্যুতে ভারতের অবস্থান বদলানোর কোন কারণ দেখা যাচ্ছে না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৩ মে ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “কাছে আসার দৌড়ঝাঁপ”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]