বিবিসির মূল্যায়নে দেখা বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’

বিবিসির মূল্যায়নে দেখা বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন

গৌতম দাস

১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৭

https://wp.me/p1sCvy-2wt

সম্প্রতি বিবিসি বাংলা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এক দীর্ঘ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে; যার শিরোনাম হল, “সংসদ নির্বাচন: গত দশ বছরের যে পাঁচটি পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে”। সেখানে গত ২০০৮ সালের সাথে এখনকার বাংলাদেশের একটা তুলনা টানা হয়েছে- পাঁচটা ইস্যুতে। দাবি করা হয়েছে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে এই পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। বিবিসির চোখে ১০ বছর পরে বাংলাদেশে ঘটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো হল – ১. কর্তৃত্ববাদী শাসন, ২. সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ, ৩. বিকাশমান অর্থনীতি, ৪. নয়া প্রযুক্তি ও সোস্যাল মিডিয়ার বিস্তার, ৫. বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার। তাদের অনুমান হল আমাদের আসন্ন নির্বাচনে এই পরিবর্তগুলো গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চোখে পড়ার মত ঘটনা হল, এক ফাইন মর্নিং বা সুবহে সাদেকে যেন বিবিসি চোখ কচলে ‘আবিষ্কার’ করেছে, বাংলাদেশে নাকি ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। আর এরপর রিপোর্টের বাকি অংশ হল, এই ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ নিয়েই কচকচানি। এসব তৎপরতা দেখে মনে হয়েছে, বাংলাদেশে “কর্তৃত্ববাদী শাসন” চলছে বলে একটা স্বীকারোক্তিকে প্রাধান্যে আনা হয়েছে যেন এতে সংশ্লিষ্টরা এখন এতে নিজেদের দায় ধুয়ে ফেলতে পারেন। এমনকি ১০ বছর ধরে এই শাসন আনা ও চলার ক্ষেত্রে যেন বিবিসিরও কোনো দায় নেই!এমনকি বিবিসি যার রেফারেন্সে বুঝতে পেরেছে বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে চলে গেলে সেটা হল এক জার্মান থিঙ্কট্যাঙ্ক সংগঠন বার্টেলসমান ফাউন্ডেশন [[Bertelsmann Stiftung]; কিন্তু তাদের রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছিল গত মার্চ ২০১৮ সালে। এরা গ্লোবে সব রাষ্ট্রের শাসন কেমন সে বিষয়ে স্টাডি করে সুচক তৈরি করে প্রকাশ করে থাকে। তাদের করা স্টাডিও ২০১৫-১৭ সালের। এই দুই বছর ধরে মাঠে সংগ্রহ করে এরপর তা থেকে স্টাডি করে তৈরি রিপোর্ট। দুনিয়ার ১২৯ রাষ্ট্রের উপর করা স্টাডিতে বাংলাদেশের শাসন অবস্থান ছিল ৮০ তম খারাপ অর্থাৎ ৮০ টা রাষ্ট্রের নিচে।

এখানে যদিও বলা হচ্ছে এই পরিবর্তনের সময়কাল “দশ বছর”; অর্থাৎ হাসিনার শাসন কাল। কিন্তু যেকেউ নির্মোহ মুল্যায়ন করতে চাইলে মানবেন যে সত্যিকার ভাবে সাথে জড়িয়ে আছে আর দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক শাসন, ফলে এটা মোট ১২ বছরের। কারণ আসলে পরের ১০ বছর বা হাসিনার কালে যা কিছু হয়েছে, এর সব কিছুর ভিত গাঁথা, অভিমুখ ঠিক করে দেয়া হয়েছিল ওই দুই বছরের আমলে। কেউ অস্বীকার করবে না যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর ওই দুই বছর আমেরিকার ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও যেকোন গভীরে সীমাহীন। তাই সুবিবেচনা করতে চাইলে, লজ্জা বা দ্বিধা ভুলে মোট ১২ বছরের হিসাবই করতে হবে।

ঐ রিপোর্টের এক তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, তারা (মানে বিবিসি ও রিপোর্টে ইনপুট দাতারা) কেবল তত্ত্বাবধায়ক শাসনের দুই বছরসহ হাসিনার প্রথম পাঁচ বছরের দায় বহন করেন। মানে, ওই সাত বছর যেন তাদের খানিকটা দায় সংশ্লিষ্টতা আছে – সেটা ভাবভঙ্গিতে ও প্রচ্ছন্নে হলেও সেটি কবুল করে কথা বলেছেন। তবে সেটা বুঝা গেলেও বুঝবার কোনো উপায় রাখেননি যে, ঠিক প্রথম কবে থেকে তারা ঠাহর করলেন যে, বাংলাদেশে এক ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। সেটা একেবারে যত্ন করে উহ্য রেখে দিয়েছেন। তবে মূল কথা – বিবিসির এই রিপোর্ট পড়ে আমরা নিশ্চিত যে, তত্ত্বাবধায়কের দুই বছরের ‘মজা’ ও দায় তারা অন্তত অস্বীকার করছেন না। তবে আসলে মুল কথা যে প্রশ্নের জবাব দূরে থাক প্রশ্নটাই তারা পুরাই লুকিয়ে ফেলেছে তা হল, এই কর্তৃত্ববাদী শাসন কেন জন্ম নিল – কারা কারা দায়ী? তত্ববধায়কের গাঁথা ভিত ও ঠিক করা অভিমুখ থেকে কেন “কর্তৃত্ববাদী শাসন কেন জন্ম” হল – এই প্রশ্নটাই তারা গায়েব করে দিয়েছে।

বিবিসির চোখে ঐ পাঁচ পরিবর্তনের যা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, তা হল – বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” ঘটে যাওয়া। আসলে প্রথম পরিবর্তন ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনের’ সাথে দ্বিতীয়টি সহ-সম্পর্কিত বা কো-রিলেশনাল। এখানে বিবিসি এবং যাদের সাথে আলাপ করে বা ইনপুট নিয়ে তারা রিপোর্টটা তৈরি করেছেন, উভয়ের চোখে ‘ইসলামীকরণ’ – একটা নেতিবাচক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ‘ইসলামীকরণ’ করে বা হয়ে গিয়ে খুব খারাপ হয়েছে – এই আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা সবাই কথা বলে গেছেন। কিন্তু আমরা যখন এই ইস্যুতে পাল্টা কথা বলব, তখন শব্দটি ব্যবহার করলেও তা নেতি ধরে নেওয়া জরুরি নয়, বরং বর্ণনামূলক অর্থে এর ব্যবহার করব।

আর শব্দটাকে কখনও লিখব ‘ইসলামিস্ট’। যেমন – “বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব বেড়েছে” – সেটা এই অর্থে যে “রাজনীতিতে ইসলাম” দেখতে চাওয়া সব ধারার সকলে মিলে যারা এরা এখন সবচেয়ে এক বড় গোষ্ঠী; আর এরই বর্ণনামূলক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ শব্দটি ব্যবহার করে বলা যায়, বাংলাদেশে এমন ‘ইসলামিস্টদের’ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে। একথাতার সম-উদাহরণ হতে পারে যেমন, সত্তর-আশির দশকে বাংলাদেশে নানা ফ্যাঁকড়ার ‘কমিউনিস্ট’, তারা সেযুগে সংখ্যায় ছিল সবচেয়ে বেশি – ঠিক তেমনি একালে ইসলামিস্ট। আবার কমিউনিস্টদের মতই ইসলামিস্টরাও তারা আসলে কী চান, এ ব্যাপারে সবাই একই কথা বলবেন, ব্যাপারটা তা না হলেও – বাংলাদেশের রাজনীতি ইসলাম ছুঁয়ে থাকলে, কি ঠেস দিয়ে দাঁড়ালে তা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে, তা দরকার – এ রকম একটা কথার পক্ষে এরা সবাই একমত হবেন – এমন অনুমান করা যায়। যাই হোক, আমাদের বর্ণনাত্মক ও অ-নেতিবাচক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ বুঝ নিয়েই আমরা নেতিবাচক ‘ইসলামীকরণ’ ধারণা নিয়ে কথা বলব।

আমেরিকার নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশে ১/১১-এর ক্ষমতা দখল পছন্দ বা সমর্থন করেছিলেন কেন? কী সে কারণ ছিল? নীতি নির্ধারকদের পলিসি-চিন্তাকে নিয়ে এই প্রশ্ন করা বা বুঝবুঝির জগতে আলোচনা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এ নিয়ে আমেরিকার অবস্থান কী ছিল – এর ফরমাল অথবা ইনফরমাল ভাষ্য অথবা উইকিলিকস থেকে জানা ভাষ্য ইত্যাদি নানা কিছু থাকলেও বাস্তবে আমরা যা দেখেছি, সেখান থেকে তেমন এক অভিন্ন ভাষ্য মোটামুটি যা দাঁড়াতে পারে, তাই এখানে বলা হবে। মোটাদাগে আমেরিকার দিক থেকে সে অনুমিত ভাষ্যটা হবে এরকমঃ বাংলাদেশ তার নিজ ভূখণ্ডে গ্লোবাল টেররিজমের প্রভাব প্রতিরোধে, বিএনপি তার শাসন আমলে অনেক করলেও যথেষ্ট করেনি বা সিরিয়াস ছিল নয়। আমেরিকার মত করে সিরিয়াসলি দেখে নাই। এছাড়া, প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশকেও প্রতিরোধের রাষ্ট্র হিশাবে সেভাবে গুছিয়ে তৈরি করে নেয়নি। ‘সীমাহীন’ দুর্নীতিও ছিল। তাই দুর্নীতি তাড়ানোর অজুহাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দিতে বাংলাদেশে ঐ সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেছিল, যা আমেরিকার পছন্দ ও সমর্থিত। আলোচনার করার সুবিধার্থে এই ভাষ্যটা ধরে নিয়েই কথা আগাবো।

মানে, খোলাখুলি বলার সুযোগ থাকলে বা আইনি বিপদ ও সমস্যা না থাকলে, ১/১১-এর পক্ষে আমেরিকার অবস্থানের সাফাই মোটামুটি এমনই হত। [এটা আমেরিকার সাফাই ফলে বিএনপিকে এর সাথে একমত হতেই হবে তা নয়।] তার মানে দাঁড়াল, বিবিসির এই রিপোর্টে বাংলাদেশের ১০ বছরকে মূল্যায়ন করে পাঁচ ফ্যাক্টর বা বিপদ নিয়ে কথা বলতে বসেছে, সেই ১০ বছর হল আসলে এরও আগের দুবছরে আমেরিকার ‘তৈরি করে দেয়া’, রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দেয়ার পরের বাংলাদেশ। আর সেই সাথে ওই সাজানো রাষ্ট্র কে চালাবে, তেমন একজন শাসকও আমেরিকা পছন্দ করে তার পিঠে হাত রেখেছিল। ওই শাসক বা পরিচালক ছিল দল হিসেবে হাসিনার [RATS নয়] আওয়ামী লীগ। তবে এটা হতে পারে যে, আমেরিকা শেখ হাসিনার শাসনের ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় পাঁচ বছরের দায় নিয়ে আপত্তি করলেও প্রথম পাঁচ বছরের দায় আমেরিকার; সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, এটা স্পষ্ট।

এবার আমরা দেখব, তাহলে বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুট দেয়া আলোচকদের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ”, এর আসল অর্থ তাৎপর্য কী? এর সোজা মানে হল, আমেরিকা বাংলাদেশের জন্য যে সাজানো রাষ্ট্র আর শাসক ঠিক করে দিয়েছিল, পরবর্তীকালে তাদের ১০ বছরের শাসনে হাসিনা সরকারের ‘টেররিজম মোকাবেলা’ করায় তা খামোশ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এর বদলে ফলাফলে উল্টো ব্যাপক “ইসলামীকরণ” হয়েছে- এটাই বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুটদাতাদের পর্যবেক্ষণ – তাই নয় কি? নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” হয়ে যাওয়া, এই ফেনোমেনা তাদের অপছন্দের; কিন্তু অপছন্দ করলেও এটাই আমেরিকার বেধে নেওয়া নীতি-পলিসি আর বেছে দেয়া শাসক – এসব মিলিয়ে তাদের ঐ শাসনের প্রডাক্ট বা ফলাফল। লক্ষ করতে হবে, ইসলামীকরণ তাদের অপছন্দের ফেনোমেনা কি না সেটার চেয়েও বড় বাস্তবতা হল, এই ‘ইসলামীকরণ’ আমেরিকার নীতি আর মনোনীত শাসকের শাসনেরই (অন্তত প্রথম পাঁচ বছরের) প্রডাক্ট। কিন্তু কেন এমন প্রডাক্ট বা ফলাফল প্রসব করল আমেরিকার নীতি-পলিসি? সেই প্রশ্ন আর পাল্টা মূল্যায়নে যাওয়া উচিত নয় কী বিবিসি ও তার ইনপুটদাতা আলোচকদের? কিন্তু তারা এদিকে একেবারেই আগ্রহী নয়।

DEEP STATE

What does Deep State mean?

The Deep State is believed to be a clandestine network entrenched inside the government, bureaucracy, intelligence agencies, and other governmental entities. The Deep State supposedly controls state policy behind the scenes, while the democratically-elected process and elected officials are merely figureheads.

এছাড়া, বিবিসি জানিয়েছে আলী রিয়াজের ভাষ্যে বললে ‘ডীপ স্টেট’ হল, “যে কোন পরিস্থিতিতে যখনই রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়, তখন শক্তিপ্রয়োগের ধারা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। তখন যাদেরকে ‘ডীপ স্টেট’ বলে চিহ্ণিত করা হয়, তাদের ভূমিকা বাড়াটা স্বাভাবিক”। পাঠকের সুবিধার জন্য সেটাও এখানে দেয়া হল।

অধ্যাপক আলী রিয়াজ বাংলাদেশের ‘ডিপ স্টেটে’ চলে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাকে ওয়েলকাম! কিন্তু এই উপলব্ধি কবে থেকে তা তিনি স্পষ্ট করেননি। অথচ শুরু থেকেই হাসিনার ক্ষমতার ট্রেন্ড ছিল “ডিপ স্টেটে” বা দানব হওয়ার পথে রওনা দেওয়ার, এটা তো দেখাই যাচ্ছিল। তাই এই যাওয়া আমাদের অনুমান শুরু থেকেই, এটাই তো “মুক্তিযুদ্ধের চেতনার” নামে ফ্যাসিজম। “মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনা-শ্রেণীর’ একনায়কতন্ত্র”। এই জয়ধ্বনিতে, ক্ষমতার বিরোধী বাকি “সকল শ্রেণীকে” গুম-খুন-পঙ্গুতে পিষে দাবড়ে রাখা।

গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ শাসনের একটা মূল বৈশিষ্ট্য – তা হল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে, যেন যুদ্ধাপরাধের বিচার করছেন তিনি এই আড়ালে থেকে এইবার – ইসলামের নামে প্রকাশিত বাংলাদেশের – সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং ততপরতাকে “নির্মুল” করতে গেছে এরা। এই ছিল মুল রাজনৈতিক লাইন। সশস্ত্র অথবা নিরস্ত্র, রাজনৈতিক দলীয় অথবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক যেকোন ইসলামের নামে প্রকাশিত যেকোন ততপরতাকে “নির্মুল” করতে হবে – এই ছিল লাইন। এটাকেই “যুদ্ধাপরাধের বিচার” করা হচ্ছে এই আড়ালে সম্পন্ন করতে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে এই আড়ালে বসে – ইসলামের নামে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং তৎপরতাকে ‘নির্মূল’ করতে চেয়েছে। কিন্তু ঘটনা হল, এটাই তো বুশ প্রশাসনের (২০০১-৯) ‘টেররিজম’ মোকাবেলা যে, ইসলামের নামে প্রকাশিত ও তৎপর যেকোন ফেনোমেনাকে দমন-নির্মূল করো। আর পরবর্তিতে ২০০৭ সালে এসে কী লাভালাভ হল এই মুল্যায়নে নীতি-নির্ধারকেরা দেখল সব-ভুল। তেমন কিছু অর্জিত হয় নাই। শত্রু কিছুই মরে নাই। উলটা রাষ্ট্র অন্তহীন যুদ্ধে ঢুকে গেছে, মানে যুদ্ধের খরচ বইবার দাইয়ে আটকে গেছে। আর বাড়তি উপহার গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা। তাই বুশ প্রশাসনের টেররিজম নীতি ছিল পরাজয়ের ও অকেজো – সকলে একমত হয়। এরপর থিংকট্যাংক র‌্যান্ডের [RAND] গবেষণা প্রস্তাব [ইতোমধ্যে ২০০৭ সালের শুরুতেই হাতে আসা] অনুসরণ করে বুশ প্রশাসনের শেষ আমলে পুরানা নীতির পথ থেকে সরে ২০০৮ সাল থেকেই বুশ প্রশাসন নতুন ‘টেররিজম’ মোকাবিলার নীতি চালু হয়। পরে ২০০৯ সাল থেকে আরও ভালোভাবে ওবামা প্রশাসন টেররিজম প্রসঙ্গে তাদের নীতি-পলিসিতে বড় সংশোধন আনে। যদিও ইসলামের ‘সশস্ত্র’ ধারাগুলোর বেলায় নীতি মোটা দাগে আগেরটাই থাকে। তবে অন্যান্য ধারা, নিরস্ত্র বা আইনি রাজনৈতিক ধারা – এদের প্রতি সহনশীল এবং একসাথে কাজ করতে হবে। মিসরে হোসনি মোবারককে সরিয়ে নির্বাচনে শাসক ও শাসন বদলানো এবং তাদের সাথে আমেরিকার কাজ করা, এটাই নতুন নীতির (র‍্যান্ড প্রস্তাবের) বৈশিষ্ট্য। টেররিজম নিয়ে আমেরিকার বদলে যাওয়া এই নীতি, এটাই ‘আরব স্প্রিং’ পলিসি বলে পপুলারলি পরিচিত। এসবের বিপরীতে বুশ প্রশাসনের টেররিজমের ‘বাংলাদেশ ভার্সন’ হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে থেকে ইসলামের নামে প্রকাশিত সকল সক্রিয় ফেনোমেনাকে নির্মুল ও দমন। আর সুকৌশলে যেকোনো বিরোধী রাজনীতি যেটা ক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ তাকে ‘জঙ্গি’ ট্যাগ লাগিয়ে দমন-নির্মূল করা। মানে দাঁড়ালো জর্জ বুশের আমেরিকা যে নীতিকে ভুল মেনে সংশোধন করে সরে গেছে বাংলাদেশে সরকার সেই নীতিতে চলেছে। আর ২০০৯ সালের পর থেকে আমেরিকা সেটি উপেক্ষা করে গেছে, দেখেও না দেখে।

আমেরিকার এই অভিজ্ঞতাগুলো তো সকলেরই জানা ছিল। তার মানে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা যে গত ২০০৯ সালের শুরু থেকেই হাসিনার বাংলাদেশ সরকারে এই পথই যে নিবে তা আমেরিকার অজানা ছিল না। আর তা মনে করার কোনো কারণও নাই। অথচ তামাশার দিকটি হল – বুশ প্রশাসনের পুরান নীতিটা অনুসরণেই হাসিনার বাংলাদেশ সরকার পথ নিয়েছিল ।

সেই থেকে ক্ষমতাসীনেরা নিজ দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে – উদ্দেশ্য ও কাজে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ‘ডিপ স্টেটে’ নিয়ে গেছেন। আজ আলী রিয়াজ অভিযোগ করে লিখছেন, “ডিপ স্টেটে” চলে যাবার কথা। বলছেন, বাংলাদেশে “গুম কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যা’র ব্যাপক বিস্তার এক ধরনের ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি করেছে”। অথচ সরকার কি এটা ২০০৯ সাল থেকেই শুরু করেনি? শুরুতে এটা কেবল জামায়াত-শিবিরের ওপর বেশি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে মনকে প্রবোধ দিয়ে আমেরিকান নীতিনির্ধারক বা থিংকট্যাংকগুলো অন্য দিকে তাকিয়ে এ বিষয়কে উপেক্ষা করে গেছে। কিন্তু এটা কার অজানা যে, হিটলারও শুরুতে তার নাজিজমে নির্মূল তৎপরতা কেবল ইহুদিদের ওপর চালিয়েছিলেন। আর যারা ইহুদি নির্মূল করাকে দেখেও উপেক্ষা করেছিলেন, পরবর্তিতে তারাসহ যাকে হিটলারের শত্রু মনে হত সকলে একইভাবে সকলকে, তাদের সবাইকে নির্মূল করা হয়েছিল। শাসন ‘ডিপ স্টেটে’ চলে গেলে এটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই হয়ে থাকে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুরু থেকেই আমেরিকার অজানা ছিল না, বাংলাদেশ সরকারের নীতি-পলিসি কী, সে কোথায় যাবে ও যাচ্ছে। আসল কথাটা হল, ১/১১ ঘটানোর প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই বাংলাদেশকে কোন গন্তব্যে, কোন অভিমুখে যাবে – অর্থাৎ বাংলাদেশের টেররিজম পরিস্থিতি নিয়ে আমেরিকা আর সিরিয়াস থাকে নাই। আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। আমেরিকার কাছে তা অ-গুরুত্বপূর্ণ বা কিছু আসে-যায় না, এমন হয়ে গেছিল। কিন্তু কেন? কারণ, আমেরিকার তার স্বার্থের দিক থেকে আরও গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ দেখতে পেয়েছিল।

বাংলাদেশের টেররিজম ইস্যুর চেয়েও আমেরিকার গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ হাজির হয়েছিল। আমেরিকার যেটাকে দুনিয়াব্যাপী “ওয়ার অন টেরর” বা “টেররিজম ঠেকানো” বলে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর লক্ষ্যে কাজ করার চেয়েও আমেরিকার কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল আরেক ইস্যু। সেটা হল, ‘চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকানো’ এই মার্কিন নীতির পক্ষে ভারতকে কাজ করতে রাজি করানো। বাংলাদেশের টেররিজম নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় এর প্রতি ভারতের সমর্থন চাইতে গিয়ে আমেরিকার জন্য নতুন দুয়ার খুলে যায়। ‘চীন ঠেকানো’ হয়ে যায় মুল আলাপের ইস্যু। আর ভারতকে তাতে রাজি করাতে বিনিময় আমেরিকা সওদা করেছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে। এর সাথে অবশ্য ভারত আরও কিছু আদায় করে নিয়েছিল। আমেরিকায় বাজারে নিজের রফতানি পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে আমেরিকার ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত’ দেশের তালিকায় নিজের নাম উঠিয়েছিল। অবশ্য এই সুবিধা ২০১৭ সালের শুরুতে ট্যারিফ আরোপ ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন প্রত্যাহার করে নিয়েছে; চুক্তিতেও তাই ছিল।

বাংলাদেশ-ভারত-আমেরিকা কী গত দশ বছর সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজম ইস্যুতে একসাথে কাজ করেছে? না সরি; এটা ধরে নেয়া যাচ্ছে না। কারণ, তাহলে এই টেররিজম ইস্যুর সাথে ভারতকে বাংলাদেশের ‘বিনা পয়সা’য় ট্রানজিট দেয়ার কী সম্পর্ক? তা বলতে বা দেখাতে পারতে হবে আগে। কেন ভারত যা চায় তা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে, বাংলাদেশের এই নীতি কেন? এটা বাংলাদেশের কোন টেররিজমের, কার টেররিজমের পক্ষে থাকা? কোন বলিদান?
টেররিজমের ইস্যুর আড়ালে আমেরিকা নিজের চীন ঠেকানো ইস্যুতে ভারতকে পাওয়া হাসিল করেছিল। আর আমরা এই সওদার বুটি হয়েছি, আর ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ভারতকে সব ধরণের ট্রানজিট দেয়া আর ভারতের দিকে ঝুকে থাকা সরকার কায়েম ইত্যাদি……

আমেরিকা গত ১০ বছর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ে একরকম অন্ধ ও উদাসিন হয়ে থেকেছে। আর আমাদের সরকার ‘চেতনার’ শাসনের আড়ালে ইসলাম জঙ্গি দমনের নামে তার ক্ষমতার বিরোধীদের নির্মুল করে চলেছে। রাষ্ট্র তার ফাংশনাল সব প্রতিষ্ঠানগুলোসহ ভেঙ্গে পড়েছে। ব্যাঙ্ক প্রশাসন আদালত সব। তাই এখন বিবিসি ও এর আলোচকেরা গত ১০ বছরে বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” বলে যে প্রশ্ন ও অভিযোগ তুলছেন তা যদি কিছু হয়ে থাকে বা যা যা কিছু হয়েছে – প্রথমত এটা তো হওয়ার কথা নয়। কারণ আমেরিকা ত টেররিজম মোকাবিলাযোগ্য করে রাষ্ট্র তৈরি করে দিয়েছিল সাথে শাসকও ঠিক করে দিয়েছিল। তাহলে দশ বছর পরে ইসলামিকরণ প্রডাক্ট আসবে না। আর যদি আসে এর জন্য দায়ী কে? এটা কী আমেরিকার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রশ্রয়েই ঘটেছে তা বলা যাবে না! অথচ এরা কেউ বাংলাদেশ সরকার বা আমেরিকার নীতিকে দায়ী করছেন না। আজ হঠাৎ বাংলাদেশ ডিপ স্টেটে চলে গেছে বলে আঙুল তুললেও যেন এর দায় অন্য কারও বলে ব্যাখ্যা দেয়া্র চেষ্টা করছেন। কেন? এটা কি সঠিক? নাকি আমেরিকান পলিসিকে প্রশ্ন করতে হবে, মুরোদ থাকলে পলিসি নির্মাতাদের দায়ী করতে হবে। অর্থাৎ, সত্যিকার পুনঃমূল্যায়নে যেতে হবে।

মূলকথাটা হল, ভারতের আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’র ঠিকাদারি নেয়াতেই বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে গেল না কোথায় গেল তা নিয়ে আমেরিকার অনাগ্রহের শুরু। আর এসবের ফলাফলেই কালক্রমে আজ আমেরিকাকে পাত্তা না দিয়ে বাংলাদেশের শাসন ভারত-হাসিনার, দুজনে দুজনার, এমন শাসন হয়ে যাওয়ার গ্রাউন্ড হয়ে দাড়িয়েছিল।

অথচ এক শুভ সকালে বসে আলী রিয়াজ ডিপ স্টেটে চলে যাওয়া বা ইসলামিকরণ – এসব লক্ষ করেছেন করছেন কিন্তু আমেরিকান নীতি ও পদক্ষেপের সাথের এর সম্পর্কের দিকে দেখতে পাচ্ছেন না। যতক্ষণ বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে যাওয়ার জন্য দায়ী কী এবং কেন – তা না বলতে পারবেন ততদিন এসব আবিস্কার অর্থহীন। যদিও তাতে ইসলামিস্টরা কত খারাপ তা প্রমাণে একে ব্যবহার করা যাবে অবশ্যই।

ওদিকে আর এক বড় কথা, বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করতে চাইছেন। কিন্তু কার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করবেন? শুরু থেকেই হাসিনা লাগাতর এক অপ্রয়োজনীয় ইসলামবিদ্বেষী নীতি চালিয়ে গিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে। অথচ ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ এ দু’টির মধ্যে ১৯৭১ সালেও কোনো বিরোধ ছিল না। কেউ বিচার এড়ানো যুদ্ধাপরাধী হলে তাকেও সুস্থ পক্ষপাতহীন বিচারপ্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে কাঠগড়ায় নেয়া যেত। কিন্তু তা বলে যুদ্ধাপরাধীর সাথে ইসলামের কী সম্পর্ক? জামাতের কোন অপরাধ দোষত্রুটি মানে সেটাকে ইসলামের ত্রুটি হিসাবে দেখানো্র ইঙ্গিত করা – এটা তো চরম অসততা। এভাবে কী ইসলামের গায়ে কালি লাগিয়ে দেওয়া যাবে? এটা কী কোন পথ হতে পারে? এর সাথে ইসলামপন্থী রাজনীতি মোকাবিলার পথ ও উপায় হিসাবে একে ব্যবহার করা – এটাই তো চরম ইসলামবিদ্বেষী কাজ। এরচেয়ে আত্মঘাতি কাজ আর কী হতে পারে? এই রাজনীতি তো আজ অথবা কাল নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ ও পরাজিত হবেই।

আর এসব অবিবেচক তৎপরতারই সামাজিক পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঘটেছে। মানুষ এটাকে সরকারের জুলুম আর চরম বে-ইনসাফি হিশাবে দেখেছে। উলটা ইসলামের প্রতি আরও আগ্রহি ও সহানুভুতিশীল হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটা যেন রোমের মত। ঠিক এইভাবেই রোম সাম্রাজ্যে ক্রিশ্চানিটির প্রভাব উতখাতে লড়তে গিয়ে শেষে তা সামলাতে না পেরে সম্রাট কনস্টানটিনসহ নাগরিকেরা ক্রিশ্চান হয়ে গিয়ে রোমকে সেই প্রথম ৩৩২ খ্রীষ্টাব্দে ‘ক্রিশ্চান রোমে’ পরিণত করেছিল। আর এখানে গত দশ বছরের হাসিনার শাসনে কার্যত বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা আগের চেয়েও আরো বেশি থাকার পক্ষে মানুষ ঝুঁকে গেছে। এটাকেই বিবিসি ও তার বন্ধুরা বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” ঘটেছে বলে আক্ষেপ করছে।

বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ ঘটে গেছে বলে কারো দিকে আঙুল তোলার আগে তাদের উচিত হবে, আমেরিকার বিদেশ নীতি আর সেই সূত্রে ভারতের নীতির পুনঃমূল্যায়ন থেকে দেখা শুরু করতে হবে। আর সম্ভবত তাতে দেখা যাবে যে, কথিত ‘ইসলামীকরণ’ আসলে আর কিছু নয়, আমেরিকান ফরেন পলিসি, তা থেকে ভারতের পলিসির অপর পীঠ। তাদের পলিসির কারণে ঢাকার সরকার কী করছে তা সকলেই উপেক্ষা করে গিয়েছে। আর ঢাকার সরকারের সবার ওপরে ডিপ স্টেট কায়েম আর চরম ইসলামবিদ্বেষী পলিসির চর্চা যা কিছু করেছে এসবের ফলাফলের অপর পিঠ হচ্ছে কথিত “ইসলামিকরণ”। আর আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, এখনকার বাংলাদেশের এই অবস্থাটা শেষ বিচারে আমেরিকার বা ভারতের কোন স্বার্থের পক্ষে যায় নাই। বরং তাদেরকে এর কাফফারা চুকাইতে এখন রেডি থাকতে হবে!

এই পরিস্থিতিতে যারা বাংলাদেশ এক্সপার্ট হয়ে বিদেশি রাষ্ট্রের কাজে নিজের নাম কামাতে চায় তাদের প্রথম কাজ হবে “ইসলামীকরণ” ঘটেছে বলে অস্পষ্ট নেতিবাচক অবস্থান ত্যাগ করা। বরং আমেরিকার নীতির কোন ভুলে এটা ঘটল তা পুনঃমূল্যায়িত করা এবং সেই পুনঃমূল্যায়িত নীতি, সংশোধিত নীতি নিয়ে এখনও ইতিবাচকভাবে আগালে, পুরান নীতিতে জমে যাওয়া আবর্জনা সাফসুতারা করতে বাংলাদেশের মানুষ এখনও তার পক্ষে সাড়া দেয়ার সুযোগ আছে। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমেরিকার কি নিজের পলিসি পুনঃমূল্যায়নের সাহস আছে? এই ট্রাম্প আমলে এসে সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। আমাদের আস্থায় কমে গেছে।

বিবিসির আলোচ্য রিপোর্টে নির্বাচনে প্রভাব রাখার মতো পাঁচটা পরিবর্তন উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আসল এক ফ্যাক্টরের কথাটাই তারা বলতে পারেননি। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? মানুষ অবাধে ভোট দিতে পারবে কী বা সুস্থ নির্বাচন কে নিশ্চিত করবে? এটাই তো সবচেয়ে বড় আর নির্ধারক ফ্যাক্টর। আর সবচেয়ে বড় এই ফ্যাক্টরের ব্যাপারে বিবিসির রিপোর্ট বেখবর।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বিবিসির মূল্যায়নে বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

জেরুসালেমঃ সমাধান, মজলুম ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো

জেরুসালেমঃ সমাধান, মজলুম ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়ানো

গৌতম দাস
২৬ ডিসেম্বর ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:২৩

https://wp.me/p1sCvy-2pc

গত ৬ ডিসেম্বর ২০১৭ অর্থাৎ চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউজ থেকে এক ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বলে স্বীকৃতি দেয়ার সময় হয়েছে।’ কিন্তু কেন তিনি এমন বললেন? এখনইবা বললেন কেন? এছাড়া, ট্রাম্পের এই ঘোষণার ফলে দুনিয়ার কোথায় কোথায় কী কী ইস্যুতে এর ইতি অথবা নেতি প্রভাব পড়বে? আর তাতে আমরা বাংলাদেশীরা কোথায় কোথায় ক্ষতিগ্রস্ত হবো? সবচেয়ে বড় কথা ন্যায়-অন্যায়ের আলোকে এতে অন্যায়টা কী করছেন ট্রাম্প? এবিষয়গুলো নিয়ে বুঝাবুঝি করতে হবে আমাদের।

ওদিকে আর এক প্রশ্ন আমাদের মনে জাগা স্বাভাবিক যে ইসরাইলের জন্মের (১৪ মে ১৯৪৮) প্রায় ৭০ বছর পরে এসে এখন ট্রাম্পকে কেন স্বীকৃতির ঘোষণা দিতে হচ্ছে কোনটা ইসরাইলের রাজধানী? কারণ আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের রেজুলেশন অনুসারে, জেরুসালেম একটা অকুপায়েড বা অবৈধ দখলি এলাকা। অথবা আরও বলা যায়, ১৯৪৭ সাল থেকেই জেরুজালেম কোন রাষ্ট্রের অংশ হবে সেই বিচারে এটা অমীমাংসিত এলাকা, ফলে কারও না।  জাতিসংঘের আইনি ভাষায় “corpus separatum”। যার অর্থ, জেরুসালেম একটা আন্তর্জাতিক জোন। তাই আইনত এটা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে থাকা এলাকা । ১৯৪৭ সালের জাতিসঙ্ঘের ১৮১ নম্বর রেজুলেশন অনুসারে জেরুসালেম একটা আন্তর্জাতিক জোন (corpus separatum — a separate entity under international jurisdiction)। এই রেজুলেশন বা গৃহিত প্রস্তাব অনুসারে – ওর PART III অংশে,  ‘City of Jerusalem’ শিরোনামের অধীনে উপশিরোনাম হল – A. SPECIAL REGIME।
সেখানে লেখা আছে,
“The City of Jerusalem shall be established as a corpus separatum under a special international regime and shall be administered by the United Nations. The Trusteeship Council shall be designated to discharge the responsibilities of the Administering Authority on behalf of the United Nations.” ….  দেখুন A. SPECIAL REGIME, City of Jerusalem, PART III.

এ ছাড়া পরবর্তীকালে ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধে, বিশেষ করে যেটাকে পূর্ব জেরুসালেম বলা হচ্ছে সে ক্ষেত্রেঃ ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল পূর্ব জেরুসালেম পুরো অংশ (ঐ যুদ্ধের আগে পর্যন্ত সেটা জর্ডানের অংশ ছিল) দখল করে নেয়। তাই এ নিয়ে পরে জাতিসঙ্ঘের পাস করা প্রস্তাব হল, এটা দখল করা এলাকা। ইসরাইল তার সংসদে পুরো জেরুসালেমকে নিজের রাষ্ট্রের অংশ-ভূমি বলে দেখিয়েছে। এর বিরুদ্ধেই জাতিসঙ্ঘ রেজুলেশনটা হয়েছিল। কারণ জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত অমান্য করে ইসরাইল তাঁর সংসদ, প্রেসিডেন্ট হাউজ, প্রধানমন্ত্রীর অফিসসহ বহু কিছু জেরুসালেমে বানিয়ে নেয়ার বিরুদ্ধে  জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত ছিল – জাতিসংঘের ঐ রেজুলেশন, নম্বর ৪৭৮, ২০ আগষ্ট ১৯৮০।   ১৯৮০ সালের জাতিসংঘের ঐ সিদ্ধান্তে, বিদেশী সব মিশন বা অ্যাম্বাসির অফিস  জেরুসালেমের বাইরে নিতে সব সদস্য রাষ্ট্রকে বলা হয়।

  1. Decides not to recognize the “basic law” and
    such other actions by Israel that, as a result of this law,
    seek to alter the character and status of Jerusalem and
    calls upon:
    (a) All Member States to accept this decision;
    (b) Those States that have established diplomatic
    missions at Jerusalem to withdraw such missions from
    the Holy City;

এখানে “বেসিক ল” মানে হল ইসরায়েলি সংসদ নেসেটে, ঐ “বেসিক ল” বলে পুরা জেরুজালেমকে ইসরায়েলের দখল করা এলাকা বলে জায়েজ করা হয়েছে। তাই জাতিসংঘ গৃহিত ঐ প্রস্তাবে “বেসিক ল” এর ধারণাকে স্বীকৃতি দেয়া হয় নাই বলা হচ্ছে। তাই 5(b) অনুচ্ছেদে, সকল সদস্য রাষ্ট্রকে জেরুজালেমে কেউ ইতোমধ্যে অফিস খুলে থেকে থাকলে তা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে।

বাস্তবে তাই এই কারণেই ইসরাইলে অন্য সব রাষ্ট্রের অ্যাম্বাসি জেরুসালেম থেকে ৬৫ কিমি দূরে তেল আবিবে স্থাপিত। অর্থাৎ আমেরিকাসহ কোনো রাষ্ট্রই ইসরাইলের দখলি এলাকায় নিজের অফিস খুলে নিজেকে বিতর্কিত করতে চায়নি।

এবার সর্বশেষে,  ট্রাম্পের এই নতুন ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদে আমেরিকার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে গত ১৮ ডিসেম্বর প্রস্তাব আনা হয়েছিল। স্বভাবতই ভেটোদানের ক্ষমতাবান সদস্য হিসেবে আমেরিকার সেই প্রস্তাবকে ভেটো দিয়ে স্থগিত করে দেয়। ওই ভেটো দেয়ার আগে জাতিসঙ্ঘে আমেরিকান স্থায়ী প্রতিনিধি নিকি নিম্রতা হ্যালির (হা, তিনি মাইগ্রেটেড ভারতীয় শিখ পরিবারের সন্তান, শিখ অরিজিন আমেরিকান ও রিপাবলিকান) দেয়া বক্তৃতায় বলেন, “সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমেরিকা নিজের অ্যাম্বাসি কোথায় বানাবে, আদৌ বানাবে কিনা তা নিজে ঠিক করবে। ফলে যারা প্রস্তাব এনেছিল তারা আমেরিকাকে অপমান করতেই এই প্রস্তাব তোলার চেষ্টা করেছিল”। নিকির এই মন্তব্য শুনে পাঠকেরা অনেকে বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারেন যে, হ্যাঁ, তাই তো আমেরিকান সাবভৌমত্বের কথা তো ঠিক মনে হচ্ছে। না বিভ্রান্ত হওয়ার কিছু নেই। কারণ জেরুসালেম হলো অন্যের ভূমি, যা ইসরাইলের দখল করা। কারো কোনো দখলি ভূমিতে অ্যাম্বাসি খোলার অধিকার আমেরিকা বা ইসরাইলেরও নেই। আরো বিশেষ করে জাতিসঙ্ঘের সিদ্ধান্ত হলো ওটা দখলি ভূমি, corpus separatum। অর্থাৎ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ইসরাইল ও আমেরিকার এমন বহু সিদ্ধান্ত আছে। সিএনএনকে দেয়া ৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় নিকির সাক্ষাতকার দেখুন, কিছু নমুনা পাবেন এই ক্লিপে। সে জাতিসংঘের কোন রেজুলেশন যে আছে তা লুকিয়ে কথা বলে যাচ্ছে।  তাহলে মূলকথা হলো জর্ডান-ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে নিয়ে তা নিজের (‘বেসিক ল’) বলে দাবি করে সেখানে ইসরাইল তার রাজধানী গড়েছে। আর ওদিকে এবার কথা ঘুরিয়ে বলছে, ইসরাইলের রাজধানী কোথায় হবে এটা ঠিক করার অধিকার ইসরাইলের সার্বভৌম অধিকার। হ্যাঁ, অবশ্যই তার অধিকার যদি সেটা কোনো দখলি জমিতে না হয়।

ঠিক একই মিথ্যা যুক্তিতে জাতিসঙ্ঘ রেজুলেশন অমান্য করে, ১৯৯৫ সালে আমেরিকায় একটি আইন পাস হয়েছিল। তার নাম ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট ১৯৯৫’, এই পিডিএফ লিঙ্ক থেকে আগ্রহিরা তা নামিয়ে নিতে পারেন। এই আইন আমেরিকান সিনেট ও সংসদে ১৯৯৫ সালে পাস হয়ে ও পরে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরে আইনে পরিণত হয়েছিল। ওই আইনের সেকশন দুইয়ের ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ‘১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধে জেরুসালেমের দুই অংশ এক হয়ে যায়।’ [(6) In 1967, the city of Jerusalem was reunited during the conflict known as the Six Day War.]

কিন্তু কীভাবে এটা ঘটেছিল? দুই অংশ নিজেরাই হেঁটে হেঁটে দুই বোনের মিলনের মত? নাকি যুদ্ধে মানুষ মেরে, খেদিয়ে দখল করে নেয়াতে? এ কথা সেখানে বলা নেই। এই আইনটি হল (মূল কথায় বললে), আমেরিকা যেন ১৯৯৯ সালের ৩১ মের মধ্যে ইসরাইলে তাদের অ্যাম্বাসি তেল আবিব থেকে সরিয়ে জেরুসালেমে নেয় সেজন্য আমেরিকার নির্বাহী রাষ্ট্রপতিকে আইনগত বাধ্যবাধকতায় আনার জন্য প্রণীত আইন এটা। তবে একটি ছাড় আছে সেখানে যে, প্রেসিডেন্ট এটা করতে ব্যর্থ হতে পারবেন কেবল এক শর্তে; যদি তিনি আগাম কংগ্রেসকে জানান যে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার কারণে তিনি এটা নির্ধারিত সময়ে করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আর এভাবে তিনি ছয় মাস ছয় করে বার বার সময় বাড়িয়ে চলতেই থাকতে পারবেন। গত ১৯৯৫ সালে বিল ক্লিনটনের আমলে এই আইন করা হয়েছিল। কিন্তু ১৯৯৫ সালে ক্লিনটনের পরের ডেমোক্র্যাট অথবা রিপাবলিকান উভয় প্রেসিডেন্টই ওই আইনের সেকশন সাত-এর ‘প্রেসিডেন্টের ওয়েভার’ বা ছাড় [SEC. 7. PRESIDENTIAL WAIVER.] এর সুবিধা নিয়ে ওই আইন বাস্তবায়ন না করে ছাড় ছয় মাস করে করে বাড়িয়েই চলে আসছেন। এবার ট্রাম্প বলছেন তিনি ছাড় না নিয়ে আইনটা সরাসরি বাস্তবায়ন করবেন, এই হল ঘটনা।

১৯৪৮ সালে ইসরাইল জন্মের সময় থেকে রাষ্ট্র হিসেবে ইসরাইল তার স্বপক্ষে জাতিসঙ্ঘের স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া ছিল সবচেয়ে প্রয়োজনীয়। সেটা ইসরায়েলের কাছে একেবারে “না হলে নয় এর মতো প্রয়োজনীয়” ছিল, ফলে কঠিন বিষয়। কিন্তু তা সফল হয়েছিল আমেরিকার সমর্থনে। সেই থেকে আমেরিকান জনমত নিজের পক্ষে রাখা হয়ে আছে ইসরাইলের ধ্যানজ্ঞান। ট্রাম্পের তাই নিজে কেন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন এর স্বপক্ষে সাফাই যুক্তি দিচ্ছেন এভাবে যে, আগের প্রেসিডেন্টরা সবাই নির্বাচনের সময় ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট’ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেছেন, তাই তিনি হচ্ছেন সেই সাচ্চা বীর যে এটা বাস্তবায়ন করছেন।

স্বভাবতই ট্রাম্পের এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়া হয়েছে দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে। জাতিসঙ্ঘের ভেতরের প্রতিক্রিয়া হিসেবে, নিরাপত্তা কাউন্সিলের আমেরিকাবিরোধী প্রস্তাবে আমেরিকা ভেটো দিয়ে বন্ধ করে দিতে পারলেও এরপর প্রস্তাব সাধারণ পরিষদে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে শোচনীয়ভাবে আমেরিকা হেরে যায়। আমেরিকার জেরুসালেমকে ইসরাইলের রাজধানী বলে মানা- এটা ‘null and void’ বলে বাতিল করে দেয়া হবে কিনা এ নিয়ে ভোটাভুটি নেয়া হয়। তোলা এই প্রস্তাবের পক্ষে ১২৮ রাষ্ট্র ভোট দিয়ে প্রস্তাবকে জিতিয়ে দেয়। ওদিকে মাত্র ০৯ রাষ্ট্র বিপক্ষে আর ৩৫ রাষ্ট্র বিরত থেকে ভোটদান সম্পন্ন করেছিল। [The United Nations has voted by a huge majority to declare a unilateral US recognition of Jerusalem as Israel’s capital “null and void”.]

এখানে নিউ ইয়র্ক টাইমস ব্যতিক্রমি আমেরিকান মিডিয়া হিসাবে একটা সততার কাজ করেছে। তাঁর এক বিশেষ রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত জেরুজালেম নিয়ে জাতিসংঘের গৃহিত প্রস্তাব অমান্য করেছে” [Trump’s Move Departs From U.N. Resolutions on Jerusalem]। এই রিপোর্টের তাতপর্য হল, সমস্ত আমেরিকান মিডিয়া এবং প্রশাসন যখন জেরুজালেম যে দখলি এলাকা সেকথা লুকিয়ে যাচ্ছে, এর বিরুদ্ধে জাতিসংঘের রেজুলেশনের অস্তিত্ব লুকিয়ে কথা বলে যাছে; সেখানে ট্রাম্পের ঘোষণার পরের দিন নিউ ইয়র্ক টাইমস  ০৭ ডিসেম্বরে এসে সরাসরি এক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এখানে আমেরিকা জাতিসংঘের মোট নয়টা রেজুলেশন (UN Resolution UN Resolution 1073 Sep 1996UN Resolution 1322 Oct 2000UN Resolution 1397 Mar 2002UN Resolution 181UN Resolution 2334 Dec 2016UN Resolution 242 Nov. 1967UN Resolution 252 May 1968UN Resolution 465 Mar 1980UN Resolution 478 Aug 1980UN Resolution 672 Oct 1990,) ভঙ্গ করেছে এর একটা তালিকা করে দেয়া হয়েছে।

ওদিকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে, তাঁর সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের পক্ষে ইউরোপের বন্ধুদের মন পাওয়ার চেষ্টায় সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন সফরে বের হয়ে একেবারে খালি হাতে ফিরে আসেন। কোনো ইউরোপীয় রাষ্ট্র ট্রাম্পকে সমর্থন করতে রাজি হয়নি। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকেও কোনো সমর্থক রাষ্ট্র পাওয়া যায়নি। সারাক্ষণ ইরান-ভীতিতে থাকা সৌদি আরব ও তার বন্ধুরা ইসরাইলকে বাস্তবে কাছের ও নিজের মনে করলেও, সৌদি আরব বা তার বন্ধুরা কেউই এ ক্ষেত্রে ট্রাম্পের পক্ষে দাঁড়ায়নি। বরং সৌদি আরবও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তকে ‘নিন্দা করে গভীর উদ্বেগ’ প্রকাশ করেছে। ট্রাম্পের এই দুরবস্থার চিত্র ফুটে উঠেছিল সাধারণ পরিষদের ভোটেও। বলা যায় সারা দুনিয়া ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেয়ে প্রস্তাব নিয়েছে।  নিকি হ্যালির মতো রিপাবলিকান জন বোল্টনও বুশের আমলে (২০০৫-৬) জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। যে কোন ভোটাভুটিতে ছোট রাষ্ট্রগুলোকে ভয় দেখিয়ে আমেরিকার পক্ষে রাখার ও পক্ষে ভোট নেয়ার আবিষ্কারক তিনি। এবার নিকি হ্যালিও সেই জন বোল্টনের পুরনো পথে নেমেছেন। তবে এবার এর বিশেষত্ব হল, এটা খুবই ন্যাংটা। কারণ তিনি প্রকাশ্যেই হুমকি দিয়েছেন যেটা বোল্টন কখনো করেননি। অথচ নিকি বলেছেন, ভোট না দিলে এইড বন্ধ হয়ে যাবে, দেখে নেবো ইত্যাদি। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি, উল্টো আমেরিকার ইজ্জত গেছে। নিকি আসলে ভুলে গেছেন এটা আর সেই আমেরিকার রুস্তমির দিন নয়, তা শেষ। তাই এক ইসরাইল ছাড়া আমেরিকার পক্ষে বাস্তবে ন্যূনতম গুরুত্ব দেবার মতো কোনো রাষ্ট্র দাঁড়ায়নি।

ট্রাম্পের ইউরোপের সমর্থন না পাওয়ার মূল কারণ কী? আমেরিকা জাতিসংঘ রেজুলেশন অমান্য করে  ‘জেরুসালেম অ্যাম্বাসি অ্যাক্ট ১৯৯৫’ আইন করেছে।  বলা যায় সেটা ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পুর্ব জেরুজালেমকে অবৈধ ও গায়ের জোরে জমিদখলকে স্বীকৃতি দিয়ে এর উপর দাঁড়িয়ে বানানো। কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান তা নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান জাতিসঙ্ঘের রেকর্ড অনুসরণ করে নেয়া  অবস্থান। শুধু তাই না এটা যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান তাও ইসরায়েলকে আনুষ্ঠানিক পত্র দিয়ে জানিয়েছে বহু আগেই ।  সে মোতাবেক, ১৯৯৯ সালের ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক রেজুলেশন হলো যে জেরুসালেম corpus separatum।

এছাড়া এদিকে ইউরোপের বিবেচনায় এখন ট্রাম্পের এই প্রস্তাব কোনো জরুরি অথবা রাজনৈতিক লাভালাভের ইস্যু ছিল না। এ ছাড়া, বেশির ভাগ ইউরোপীয় বন্ধুরা বলছেন, তারা মনে করছে এতে আমেরিকার ফিলিস্তিন-ইসরাইল দ্বন্দ্ব মেটাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে, যেটা হবে এক কাউন্টার প্রডাকটিভ কাজ। আসলে বেশির ভাগ রাষ্ট্রই “দ্বন্দ্ব মেটাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা হারিয়ে ফেলা” ভুল হবে এই যুক্তিকেই বেশি সামনে আনছেন। কারণ এই অবস্থানটা আসলে ‘জেরুসালেম ইসরাইলের রাজধানী কিনা’ এই বিতর্কে কোনো অবস্থান না নিয়ে থাকার অবস্থান। এ ছাড়াও এতে জেরুসালেম ইস্যুটা আলোচনা নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে নিরসিত হোক, এই আকাঙ্খার অবস্থানে থাকা যায়। তবে সার কথা, আমেরিকা এখন পুরাপুরি একঘরে হয়ে গেছে, সেটা আনন্দবাজারেরও নজরে এসেছে

তাহলে ট্রাম্প এমন অবস্থান তিনি নিজেকে নিয়ে গেলেন কেন? যেখানে এমনকি এটাও এখন জানা যাচ্ছে যে, এই সিদ্ধান্ত নিতে ট্রাম্পের মতামতদানের বৈঠকে প্রতিরক্ষা বা পররাষ্ট্রসহ সব উপদেষ্টারা সবাই তাকে না করেছিলেন। তিনি কারও কথা শোনেননি। এ অবস্থার একটি ব্যাখ্যা বা উত্তর দিয়েছে, আমেরিকার শতবর্ষী পুরনো এক গবেষণা থিংকট্যাংক প্রতিষ্ঠান – ব্রুকিংস (Brookings)। তাদের এক রিপোর্ট এর শিরোনাম হল, মূলত খ্রিষ্টান ইভানজেলিকদের খুশি করতে বা তাদের বিজয়ী করতে ট্রাম্প এটা করেছেন। [Trump’s Jerusalem decision is a victory for Evangelical politics] কথাটা ব্যাখ্যা করতে ‘খ্রিষ্টান-জায়নিস্ট’ বলে একটা টার্ম এনেছে ব্রুকিংস। [লিখেছে, in particular the views of Christian Zionists, who believe that the return of the Jews to the Holy Land is in accordance with God’s will, and biblical prophecy.] এছাড়া, এ প্রসঙ্গে তারা বেশ কিছু জনমত সার্ভেও করেছে, যার হদিস আছে ওদের রিপোর্টে সেখানে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।

ট্রাম্পের আমেরিকা কী আসলে সন্ত্রাস-দমন চায়?
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল, ট্রাম্পের এই ‘ইসরাইলি’ সিদ্ধান্ত – বলতে গেলে আসলে সারা পশ্চিমকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গত ১৭ বছর ধরে পশ্চিমের নাম্বার ওয়ান গ্লোবাল কর্মসূচি হল, ‘ওয়ার অন টেরর’ বা সন্ত্রাস-দমন। কাউকে সন্ত্রাসী মনে হলে পশ্চিম তাকে অস্তিত্বহীন করে দিতেও দ্বিধাহীন থাকে। এদিকে এটা বুঝতে কাউকে গবেষকও হতে হয় না যে, পশ্চিম যাকে ‘গ্লোবাল টেররিজম’ বলছে এই ফেনোমেনা আসলে এই বেইনসাফির প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়া। যেখানে হয়ত কাম্য ধরণের প্রতিক্রিয়া এটা নয়। কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়া  হাজির হবার পিছনে সবচেয়ে বড় এক কারণ হল, আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, ভূমি দখল, অবাধ্য ইসরাইল- ফলে ফিলিস্তিদের প্রতি বে-ইনসাফ, উদাসীন্য, তাদের দীর্ঘ মানবেতর জীবনে ফেলে রাখা ইতাদি। তাই এই ‘গ্লোবাল টেররিজম’ ফেনোমেনার একমাত্র ও আল্টিমেট জবাব ও করণীয় হল, মজলুমের পক্ষে সবলে দাঁড়ানো ও ইনসাফ দেয়া। অথচ ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন উল্টো। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে সারা দুনিয়াতে মানুষ বে-ইনসাফিতে তাদের অসহায়বোধ আরও চরমে উঠছে। উল্টা বললে, তাহলে ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত, এটা কি গ্লোবাল টেররিজম’ বাড়িয়ে তোলার কর্মসূচি নয়? ‘গ্লোবাল টেররিজম’ বাড়িয়ে তোলার কর্তা কি তাহলে ট্রাম্প হতে চাচ্ছেন? এ প্রশ্নের জবাব ট্রাম্পকে দিতে হবে, আজ অথবা কাল।

অন্যের জমি দখলের ও একাজের পক্ষে সাফাইদানে ওস্তাদ ইসরায়েল
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের ফলে আমরা বেশ কিছু প্রো-ইসরাইলি ভাষ্য ও ভাষ্যদাতাদের চিনতে পেরেছি। প্রায় দেড়শ’ বছরের পুরনো বোস্টনের ‘দা আটল্যান্টিক’, মাসিক এই ম্যাগাজিন ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে খুবই খুশি। কেন তা নিয়ে এক আর্টিকেল ছেপেছে তারা, শিরোনাম- ‘অবশেষে এই প্রেসিডেন্টকে পাওয়া গেল যে ইসরাইলকে লজিক্যালি দেখেছে’। [Finally, a President Who Looks at Jerusalem Logically]। তারা ট্রাম্পের কাজের মধ্যে এই প্রথম যুক্তি খুঁজে পেয়েছে, কী আর করা!

এছাড়া, আর সবচেয়ে ভয় পাওয়া এক আর্টিকেল দেখা গেছে হংকং থেকে প্রকাশিত অনলাইন ‘এশিয়া টাইমসে’। পশ্চিমের বাইরে এশিয়ায় দু’টি ব্যাপক কাভারেজের উঠতি পত্রিকার একটা হলো এটা। এর কলামিস্ট হলেন ডেভিড পি গোল্ডম্যান যিনি  SPENGLER ছদ্মনামে লেখেন। অথচ তার লেখা কলামের শিরোনাম হলো, ‘অমর্যাদা করে মুখ ঠেসে ধরা : মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির একমাত্র পথ’ (Humiliation – the only path to peace for the Middle East)।

ডেভিডের যুক্তি খুব সহজ। তিনি যুদ্ধের মাধ্যমে বিরোধের ফয়সালাকেই দুনিয়ার সব বিতর্ক বিবাদের সঠিক ও ন্যায্য ফয়সালা মনে করেন। কিন্তু তাঁর সমস্যা হল, ‘হারু পার্টি আরবরা হেরেও ইসরাইলের কাছে হার স্বীকার করে না এমন নাছোড়বান্দা’। তাই তিনি এবার নতুন ওষুধের প্রেসক্রপশন হিসেবে বলছেন, “যুদ্ধে পরাস্তের পরে আরেক ধাপ হল ওদেরকে মানে হারু পার্টিকে মুখ মাটিতে ঠেসে ধরার মতো চরম অমর্যাদার অবস্থায় ফেলে দিতে হবে, তাহলে এবার তাঁরা হার মানবে। আর ঝামেলা করবে না। দেখেন না জাপানে কী হয়েছিল! দুটি আণবিক বোমা মেরে দেয়াতে মাটিতে ওদের মুখ চেপে ধরা হয়েছিল। তাই চুপ মেরে গেছে…।” এই হল ডেভিড পি গোল্ডম্যান। ‘এখন আমরা সুজনেরা বুঝে ফেলেন কী বলতে চাইলেন ডেভিড। ডেভিড আমাদেরকে যেটা বুঝাতে চাচ্ছেন তা হল – দুনিয়ায় ন্যায়-অন্যায়, ন্যায্য-অন্যায্য, মানে ইনসাফের ধারণা এগুলো খামোখা, কিছু না। ফলে কেউ যুদ্ধে হারলে বুঝতে হবে সে অন্যায়কারী, অন্যায্য। অর্থাৎ যার গায়ের জোর বেশি সেই সঠিক ও ন্যায্য।

এটাই জায়নিস্ট বুঝ। তা আমরা আগেও দেখেছি। যে অন্যের জমিতে তারা ইসরাইল রাষ্ট্র গড়েছে তা তাদের হল কী করে, কিসের ভিত্তিতে? এটা বুঝাতে এরা সবসময় ‘গায়ের জোরের ন্যায্যতার কথা আনে’ আমরা দেখেছি। যেহেতু গায়ের জোরে তারা অন্যের ভূমি দখল করেছে, ফলে তা ন্যায্য। এই তত্ত্বই তারা কপচাতে থাকে। ফলে সেটাই সঠিক ও ন্যায্য। হিটলারের হাতে নির্মম মার খেয়ে এরা ইনসাফের ওপর আস্থাহীন বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তবু ইনসাফ ফিরে আসবেই। আমাদের তা লাগবে। ইনসাফ কায়েম করতেই হবে। সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে ইনসাফের ওপর। ইনসাফের ওপর সমাজের আয়ু, শ্রীবৃদ্ধি ও টিকে থাকা নির্ভর করে। যদিও আবার সাময়িক বে-ইনসাফিও দেখা দিতে পারে। তবে তারও একমাত্র সমাধান ও স্থিতিশীলতা আনার জাদুকাঠি হল ইনসাফ কায়েম। আমেরিকার পরাশক্তি অবস্থান একটু ঢিলা হতে শুরু করলে ‘গায়ের জোরের ন্যায্যতার’ তত্ত্ব আর ইসরাইলকে বাঁচাতে পারবে না; তারা তা আর কপচাবেও না। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) জেরুসালেম : একমাত্র সমাধান ইনসাফ’, শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সব হারা ভারত এখন চীন-ভক্ত!

গৌতম দাস
১৩ ডিসেম্বর ২০১৭, বুধবার, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2oJ

ভারতের আমলা-গোয়েন্দা প্রশাসনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলেন অথবা বলা যায় তাদের ভাষ্য দরকার-মত মিডিয়ায় হাজির করে দেন এমন এক ভারতীয় ব্যক্তিত্ব হলেন সুবীর ভৌমিক। এ সার্ভিস দিতে তিনি বাংলাদেশ অথবা পড়শি কোনো দেশের প্রিন্ট বা অনলাইন মিডিয়ায় প্রায়ই বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্ট বয়ান লিখে নিয়ে হাজির পাওয়া যায় তাঁকে। এমন ধরনের এক নিবন্ধ লিখেছেন সুবীর ভৌমিক গত ৫ ডিসেম্বর, হংকংয়ের প্রভাবশালী এক অনলাইন মিডিয়া ‘এশিয়া টাইমস’ ম্যাগাজিনে। এ লেখাটিকে বলা যায়, রোহিঙ্গা ইস্যু কিভাবে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের নির্বাচন জেতার উপায় হিসেবে হাজির হয়েছে। ফলে শেখ হাসিনা একে কিভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তিনি সেই পরামর্শ দিচ্ছেন।

সবার কাছে আজ স্পষ্ট, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত হল শেখ হাসিনা সরকারকে চাপের মুখে রাখা সেই পরামর্শদাতা, যার প্রভাবে পড়ে  শুরুর দিকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেটা আবার শুধু এবার ২০১৭ সালেই নয়, গত ২০১২ সালেও মিয়ানমার থেকে একইভাবে জাতিগত নির্মূল অভিযানের মুখে রোহিঙ্গা খেদানোর সময়ও বাংলাদেশ সরকার নিজ সীমান্ত সিল করে রাখার নীতি নিয়েছিল। সে সময় বলা হত, এটা ভারতের পরামর্শে করা হয়েছিল। ঠিক যেমন এবারেরটা, যদিও এবারের (শুরুর দিকের) বাংলাদেশের সীমান্ত বন্ধ রাখার পক্ষের নীতির প্রতি ভারতের অবস্থান একেবারেই প্রকাশ্য। আর এবারের আরও বিশেষত্ব হল, বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গাদের পক্ষে প্রবল আভ্যন্তরীণ জনমতের চাপ সহ্য করতে না পেরে শেষেমেশে সীমান্ত খুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। তাতে ভারতকেও প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে নিজের রোহিঙ্গা নীতি ও মোদীর বার্মা সফরকালীন  বিবৃতি সংশোধন করে নিতে হয়েছিল। তবে ততদিনে মোদীর মিয়ানমার সফর, গণহত্যার পক্ষে সু চি-কে দেয়া মোদীর সার্ভিস সমাপ্ত করে তিনি নিজ দেশে ফিরে গেছেন। ফলে মোদীর ফেরার পরে  বাংলাদেশের ওই সিদ্ধান্তে সীমান্ত খুলে দেয়ায় মোদীকে সু চির কাছে তেমন বেইজ্জতি হতে হয়নি বলে ভারত মনে করে। মনে রাখতে হবে, ভারতের রাজনীতিক আর আমলা-গোয়েন্দার প্রশাসন মিয়ানমারের কাছে সব সময় ক্রেডিট নিয়ে থাকে যে, বাংলাদেশের নেয়া সিদ্ধান্তগুলো যেন মিয়ানমারের পক্ষে থাকে এভাবে আনার ক্ষেত্রে মিয়ানমারকে সার্ভিস দিতে ভারতই একমাত্র সাপ্লায়ার; মানে ভারত বলতে চায় এখানে চীনের কোনো শেয়ার নেই। আর যেহেতু বাংলাদেশকে যেন ভারতই চালায় অথবা বাংলাদেশের ওপর ভারতের বিরাট প্রভাব আছে, এ কথা বলে ভারত মিয়ানমারের কাছে নিয়মিত ক্রেডিট নিয়ে থাকে আর নিজের দাম বাড়ায়।

তবে ভৌমিকের এবারের লেখায় তিনি নিজের সাথে নিজেই এক ভাল তামাশা করেছেন আমরা দেখতে পাই। যেমন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের নীতি যে সব সময় ‘রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার’ পক্ষে, আর ভারতের এই নীতির পক্ষে থাকতে ‘বাংলাদেশকে ঠেসে ধরা’ – এ কথা বেশ কায়দা করে ভৌমিক ভুলে থাকতে চেয়েছেন। তিনি রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার নীতির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে  উল্টো এবার ভৌমিক দাবি করছেন – শেখ হাসিনা হলেন একমাত্র রোহিঙ্গা আশ্রয় দেয়ার পক্ষের নেত্রী, এই বলে প্রশংসা শুরু করেছে। ফলে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার পক্ষে ২০১২ সালে আর এবারের শুরুতে কারা বাংলাদেশকে প্ররোচিত করেছিল ও মিয়ানমারের কাছ থেকে এর ক্রেডিট নিয়েছিল, তা আর এখন ভৌমিকের লেখায় খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বরং রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার পক্ষে নেত্রীর সিদ্ধান্ত নেয়ার কারণে কী কী ফজিলত সৃষ্টি হয়েছে, শেখ হাসিনার জন্য কী কী পাকা ফল তৈরি হয়েছে তা জানাতেই তিনি এ লেখা লিখেছেন। এ ধরনের লোকদের বলা হয় অনৈতিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও সুযোগসন্ধানী। সব দিকেই তারা সব সময় লাভের ভেতর থাকতে চায়। এ হলো সেই তামাশার দিক। এরা শেখ হাসিনাকে তাদের স্বার্থের পক্ষে যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে। অথচ সেই সিদ্ধান্তের পরিণতি, দায়দায়িত্ব বা ক্ষয়ক্ষতি এসব দিকগুলোর দায় কেবল শেখ হাসিনা বা বাংলাদেশের। আর ভৌমিকের ভারত ঝাড়া হাত-পা; তার কোনোই দায় নেই। কোনো দিক বিবেচনায় এটা কোনো দায়িত্বশীল নেতৃত্বের কাজ বা আচরণ হতে পারে না।

তবু সুবীরের ধারণা, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের এই কূটনৈতিক দেউলিয়াত্ব আমরা দেখতে পাচ্ছি না।
গত ২৫ আগস্ট কথিত এক সশস্ত্র হামলাকে উছিলা করে মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা নির্মূল ও খেদানো শুরু হয়েছিল। এর মাত্র ১০ দিনের মাথায় মোদী মিয়ানমার সফরে যান এ জন্য যে, এই সময় তিনি ‘সু চির পাশে থাকতে চান’ সে কথার প্রচার-প্রপাগান্ডা ও ক্রেডিট নিতে চান। আমরা স্মরণ করতে পারি, গত সেপ্টেম্বরে মোদীর ঐ সফরকালে সেই সময় সুবীর ভৌমিকের অ্যাসাইনমেন্ট কী ছিল? ছিল খোলাখুলি ভাষায় গায়ে পড়ে এ কথা মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেয়া যে, চীনের সাথে প্রতিযোগিতা করে ভারত দেখাতে চায়, সে বেশি মিয়ানমার-ঘনিষ্ঠ। মোদীর মিয়ানমার সফর ছিল ৫-৭ সেপ্টেম্বর, সু চির সাথে সাক্ষাতের শিডিউল ছিল ৬ সেপ্টেম্বর। আর ৫ তারিখ দিন শেষে তিনি মিয়ানমার পৌঁছেছিলেন। অন্য দিকে মোদীর পৌঁছানোর আগে ৫ সেপ্টেম্বর সকালেই বিবিসি বাংলায় একটি রিপোর্ট ছেপেছিল।  “রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কেন মিয়ানমারের পাশে?” – এই শিরোনামের ঐ রিপোর্টের পুরোটাই ছিল সুবীর ভৌমিকের ভাষ্যে লিখিত। আর সুবীর তাতে যেচে পড়ে মোদীর সফরের অর্থ তাতপর্য, ভারতের প্রশাসন যা দিতে চায় তাই দিয়ে সাজিয়েছিল।

যেমন বিবিসি লিখেছিল – “কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক, যিনি বর্তমানে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে রয়েছেন, বলছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য-বিবৃতির মূল উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা।’ [এখানে ঐ বিবৃতি বলতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের দেয়া বিবৃতি যে, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ভারত সব সময় মিয়ানমারের পাশে থাকবে – এটা বুঝানো হয়েছিল।]  …… “সংখ্যাগরিষ্ঠ বার্মিজদের রোহিঙ্গাবিরোধী কট্টর মনোভাবের সাথে একাত্ম হতে চাইছে ভারত। মি ভৌমিক বলেছেন, রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার। …সুবীর ভৌমিক বলেছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাববলয়ে ফাটল ধরানো”। এভাবে প্রতিটি বাক্য একেকটি ওই রিপোর্ট থেকে তুলে আনা বাক্য।

এককথায় সুবীর বলেছিলেন, মোদির সফরের উদ্দেশ্য চীনের বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করে মিয়ানমারের অধিকতর ঘনিষ্ঠতা অর্জন, এটাই ভারতের উদ্দেশ্য।
আর তাহলে এখন কী বলছেন সুবীর ভৌমিক?

ভোল পাল্টে ভৌমিক এখন বলছেন – এক. রোহিঙ্গা ক্রাইসিস সামলাতে গিয়ে নাকি শেখ হাসিনা ‘ভুল জায়গায় পা দিয়ে’ ফাঁদে পড়ে গিয়েছিলেন। [The Rohingya crisis initially caught the Awawi League on the wrong foot, presenting a political opportunity to BNP to criticize its handling of the massive influx refugees………]
কিন্তু ঘটনা হল এই যে, ভারতের চাপে ও পরামর্শে শেখ হাসিনা সীমান্ত বন্ধ রেখেছিলেন আর সুবীর এখন সেসব কথা ভুলে সে সিদ্ধান্তকে হাসিনার “ভুল জায়গায় পা” বলেছেন। কিন্তু এই ভুলটা আসলে কার? এমনকি ভারতেও আশ্রিত কথিত ৪০ হাজার রোহিঙ্গাকেও ভারত সু চির মন পেতে  ভারতও নিজেকে মুসলমান-বিদ্বেষী দানব তা প্রমাণ করেছিল; তাই ভারতও  সে সময় কথিত রোহিঙ্গা বের করে দেয়ার প্রক্রিয়া চালিয়েছিল। আর, যা থেকে ভারতের নীতি কী ছিল তা পরিষ্কার। এ ছাড়া এই একই নীতি বাংলাদেশেও পালিত হোক, তাহলে সু চির কাছে ভারতের ইমেজ বাড়বে – এই ছিল ভারতের নীতি ও আকাঙ্খা। এ’হল কে কত সু চির মতই মুসলমান-বিদ্বেষী এর প্রতিযোগিতা করে তাঁর মন পাওয়ার চেষ্টা।  সুবীর এখন সে ‘ভুলের’ দায় পু্রাটাই শেখ হাসিনার কাঁধে তুলে দিচ্ছেন। সুবীর নিজের ও ভারতের কোনো দোষ তো দেখলেনই না, উল্টা আবার বিএনপি কেন শেখ হাসিনাকে ‘রোহিঙ্গা ইস্যু সামলানোর ব্যর্থতা নিয়ে’ সমালোচনার সুযোগ নিল – দায় সেদিকে ঠেলে দিয়েছেন।

০২.  মোদীর বার্মা সফরের সময়ে সুবীর ৫ সেপ্টেম্বরে খুবই জোর দিয়ে বলেছিলেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো।’ [সুবীর ভৌমিক বলছেন, ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো” – বিবিসি]  তো সে উদ্দেশ্য এখন কোথায়, কদ্দূর সফল হলো, তা কী অবস্থায়? অল্পকথায় তা বুঝবার জন্য ভাল উপায় হবে আনন্দবাজার পত্রিকা।  এ’প্রসঙ্গে গত ২৪ নভেম্বর কলকাতার আনন্দবাজার লিখেছে – ‘রোহিঙ্গায় গোল চীনের, সুযোগ হারিয়ে পেছনের সারিতে দিল্লি।’ এই এক শিরোনামের মধ্যেই সব আছে। অর্থাৎ মিয়ানমার-চীন সম্পর্কে ফাটল ধরানো দূরে থাক এখন ভারত নিজেই গুরুত্বহীন হয়ে গেছে, আর তা নিজেরাই বলছে। গায়ে মানে না আপনি মোড়লদের এ দশাই হওয়ার কথা। সু চির মন পেতে মোদী নিজেকে সবচেয়ে বড় মুসলমান-বিদ্বেষী নির্মম দানব প্রমাণ করার পরেও এ হল ফলাফল; তবে শুধু তাই নয় আরো আছে।

ঘটনা হল, আমেরিকা মিয়ানমার জেনারেলদের গণহত্যার অভিযোগে কাঠগড়ায় তোলার হুমকি দেয়া এবং কিছুটা তৎপর হওয়ার পর আমেরিকার ওই বক্তব্য ও পদক্ষেপের প্রভাবকে ঠাণ্ডা ও লঘু করতে চীন এগিয়ে এসেছিল। চীনের লক্ষ্য নিজের আপন ক্লায়েন্ট বার্মার জেনারেলদের পিঠ বাঁচানোর জন্য কিছু উদ্যোগ নেয়া।  নামকাওয়াস্তে হলেও চীনের মধ্যস্থতায় জেনারেলরা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাংলাদেশের সাথে এক চুক্তি করেছে। এনিয়ে বিস্তারে যাওয়ার আগে আমাদের একটা কথা পরিস্কার থাকতে হবে। চীনের প্রস্তাবের সারকথা রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে জেনারেলদের রাজি করানো। কিন্তু কোনভাবেই এটা যারা রোহিঙ্গাদের উপরে যারা গণহত্যা চালিয়েছে তাদের সেই অপরাধকে লঘু করবে না। কারণ দুটা দুই জিনিষ। এককথায়, এখন রোহিঙ্গাদের সকলকে পুরা ফেরত নিলেও তাতে গণহত্যার অভিযোগে কেটে যাবে না, লঘু হবে না। এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা এই চুক্তির কোনো সুফল হিসেবে রোহিঙ্গারা আদৌও কী ফেরত যাবে? জেনারেলেরা  কোন দিন রোহিঙ্গাদের ফেরত নিবে কি না, এই ব্যাপারটাই এখনো পুরাপুরি  সন্দেহজনক হয়েই আছে। ফলে আস্থা রাখার কোন বিশেষ কিছু এখনও তৈরিই হয় নাই। বিশেষ করে এ চুক্তি দায়সারা, এটা বাস্তবায়নের কোনো সময়সীমা নেই। আর অসংখ্য ফাঁকফোকরে ভর্তি; ‘যদি কিন্তু’তে ভরপুর। যেমন সব কিছুতে মূল ব্যাপারটা হল রোহিঙ্গাদেরকে ডকুমেন্টে নাগরিক প্রমাণ করতে হবে আগে। কেউ আগে বার্মিজ নাগরিক প্রমাণ হলে “তবেই”…। এই হল সেই বিরাট যদি কিন্তু…। তো নাগরিক প্রমাণ হলে তবেই না এরপর ফেরতের প্রসঙ্গ।

যা হোক, খোদ সুবীর ভৌমিক বা ভারত এখন প্রমাণ করেছে রোহিঙ্গা বা মিয়ানমার ইস্যুতে ভারতের সু চিকে তেলানির ফলাফল শুন্য। এরপর ভারতের আর কোনো পদক্ষেপ বা ভূমিকা এখন শূন্য। তাই চীন-মিয়ানমার সম্পর্ককে ‘ফাটল ধরাতে’ চাওয়া সেই ভারতই এখন উপায়ন্ত হারিয়ে পল্টি মেরে চীনা মধ্যস্থতায় তৈরি ওই চুক্তির একনিষ্ঠ সমর্থক বনে গেছে। অর্থাৎ মিয়ানমার বা রোহিঙ্গা ইস্যুতে ফাটল ধরাতে আসা ভারত এখন রামভক্ত হনুমানের মত ‘চীন-ভক্ত হনুমান’ হয়েছে।

শুধু তাই না, ভৌমিক এখন দাবি করছেন, এই পুরো ঘটনায় হাসিনার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়া আর চীনা মধ্যস্থতায় মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তন চুক্তি করে ফেলায় তাঁর ইমেজ এখন এত বেড়েছে যে, সেটা কাজে লাগিয়ে শেখ হাসিনা নির্বাচনে জিতে আসতে পারেন। এই হলো সুবীর ভৌমিকের লেটেস্ট টাউটারি বা ইমেজ বাড়ছে এই লোভ দেখানোর হকারিতে নেমে পড়া। [Hasina now winning praise both in the West and Islamic countries for her comparatively compassionate approach to a crisis that has hit Myanmar’s global image while lifting Bangladesh’s.]। অর্থাৎ সুবীর এখন উলটা বার্মাবিরোধী সার্টিফিকেট বিলি করে বলছেন, বার্মার গ্লোবাল ইমেজ ডুবতেছে আর বাংলাদেশেরটা বাড়ছে। বুঝা যাচ্ছে এটা এখন সুবীরের নতুন প্রজেক্ট। সে জানে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তির কোন ভবিষ্যত নাই। তবু সে চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি ও এর ‘সুফল’ ফেরি করতে নেমেছে।অন্যদের কথা বাদ দিয়ে খোদ আনন্দবাজার চীনের এই প্রত্যাবর্তন চুক্তি নিয়ে মার্কিন সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসনের আস্থাহীন ও বাঁকা মন্তব্য কীভাবে পড়েছে তা দেখা যাক। আনন্দবাজার লিখছে, “যদিও চিনের এই প্রস্তাব নিয়ে সন্দিহান মার্কিন প্রশাসন। মার্কিন বিদেশ দফতর বিবৃতিতে বলেছে— চিনের বিদেশমন্ত্রীর প্রস্তাব রাখাইনের জটিল পরিস্থিতির তুলনায় খুবই সহজ-সরল। সামরিক অভিযানের নামে রাখাইনে ‘জাতি নিধন’ চলছে বলে বিদেশসচিব রেক্স টিলারসন যে আগেই মন্তব্য করেছেন, বিদেশ মন্ত্রকের বিবৃতিতে তা-ও বলা হয়েছে।” অর্থাৎ আনন্দবাজার স্পষ্ট বুঝলেও সুবীর এখন ‘সুফল’ ফেরি করার মুডে আছে ।

সুবীর নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে আর এক উদ্যোগ নিয়েছে; এক ভারতীয় থিংকট্যাংকের কিছু ব্যক্তিত্ব ও এর কিছু তৎপরতার তথ্য আমাদের দিয়েছেন। কলকাতাভিত্তিক সেই ভারতীয় থিঙ্কট্যাঙ্ক প্রতিষ্ঠানের নাম ইন্ডিয়ান সোস্যাল কালচারাল স্টাডিজ (আইএসসিএস) আর  থিঙ্কট্যাঙ্ক-সংশ্লিষ্ট সেই ব্যক্তির নাম অরিন্দম মুখার্জি। তিনি বলছেন, “China, India, Japan and the Asean countries all seem to agree that solving the Rohingya crisis is a must for regional stability and both Hasina and Suu Kyi are crucial to make that happen,” said Arindam Mukherjee ।  সুবীর আমাদের আরও জানাচ্ছেন, সম্প্রতি আইএসসিএস মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে এক সেমিনার করেছে, যেখানে ভারত সরকারের বিদেশে গোয়েন্দাগিরির প্রতিষ্ঠান ‘র’-এর সাবেক প্রধান রাজিন্দর খান্না গিয়েছিলেন।

খান্না সেখানে বলেছেন, বাংলাদেশের হাসিনা সরকার ও মিয়ানমারের সু চি দুই নেতাকে আগলে রাখতে হবে কারণ এরা এই রিজিয়নে দুটা খোটা (stake) টিকে গেছে। রাখাইনকে আমরা আফগানিস্তান হতে দিতে পারি না। [“The region has developed a stake in seeing these two regimes survive. We don’t want Rakhine to be another Afghanistan,” said Rajinder Khanna] এ কথা থেকে খান্নাকে এক আপাদমস্তক মুসলিমবিদ্বেষী অন্ধ-বোকা ছাড়া অন্য কিছু ভাবা যাচ্ছে না। রোহিঙ্গাদের উপর গণহত্যা ও তাদের খেদিয়ে রিফিউজি বানানোর ঘটনা কোন দিক থেকে আফগানিস্তানের সাথে তুলনীয়? মুসলমান বলে? তাই তাঁর চোখে আফগানের সাথে তুল্য উদাহরণ মনে হল?  যেখানে খোদ আমেরিকা মনে করছে এটা গণহত্যার ঘটনা। য়ামেরিকা দেখছে, “সেখানে গণহত্যা হয়েছে, ফলে যারা এটা করেছে সেসব ব্যক্তি ও জেনারেলদের কাঠগড়ায় তুলতে” হবে। জাতিসঙ্ঘও কমবেশি তাই মনে করে। বিশেষ মানবাধিকার সম্মেলনের সংখ্যাগরিষ্ঠের অভিমতে প্রকাশিত বক্তব্য কমবেশি এমনই। অর্থাৎ এখানে ঘটনা ব্যাখ্যার মুখ্য শব্দ রোহিঙ্গাদের উপর চালানো ‘গণহত্যা’। স্বপ্নে দেখা কোন টেররিজম না। তাহলে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুকে কিভাবে তার চোখে তিনি দেখলেন, এটা আফগান ইস্যুর সমতুল্য?

বর্মী জনগোষ্ঠির মধ্যে ইসলাম-ফোবিয়া, ঘৃণা জাগানোর চেষ্টা বার্মার জেনারেলদের আছে। এটাই তাদের রাজনীতি বলে তারা সাব্যস্ত করেছে। আর  সু চি -সহ সেই জেনারেলদের মন পেতে, মন যোগাতে তাদের এই বীভৎস ইসলাম-ফোবিয়াকে নিন্দা করার বদলে চীন আর ভারত তারা উভয়েই বর্মীজ শাসকদের ‘টেররিজমের গল্প’ ফেরি করছে, তাল দিয়ে বেড়াচ্ছে।  যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই যে রোহিঙ্গারা টেররিস্ট তবুও যে প্রশ্নের জবাব নাই তা হল –  কোনটা আগে ঘটেছে – রোহিঙ্গা নিধন, দেশ থেকে বের করে দেওয়া, নির্যাতন ইত্যাদি আগে ঘটেছে নাকি রোহিঙ্গারা আগে কোন প্রতিরোধে আগিয়ে এসেছে? রোহিঙ্গা নিধন, রিফুইজি করা আগে না ঘটলে তারা কী প্রতিরোধ করতে এসেছিল? এই সহজ প্রশ্নের উত্তর খুজলে যে কেউ নিজেই জানতে পারে। কাজেই বলা বাহুল্য রোহিঙ্গা নিধন, খেদানোর ইসলাম বিদ্বেষ – এগুলোই সবার আগে ঘটানো ঘটনা। এমনকি এখনও রোহিঙ্গা নিধন, খেদানো এসবের প্রতিবাদে রোহিঙ্গাদের তেমন কোন প্রতিরোধ ঘটে নাই যাকে পশ্চিমাভাষায় ‘টেররিজম’ বলা যায়। আফগানের মত রাখাইনে আগে থেকে কোন আল-কায়েদা ছিল না যে সেটার কারণে এটাকে টেররিজম বলার সুযোগ নেয়া যাবে। এখানকার ইস্যু গণহত্যা, ক্লিনজিং। রোহিঙ্গারা যার ভিকটিম। তবে ভিকটিককে নির্যাতনে প্রতিকারহীন ফেলে রাখলে এমন হতেই পারে,  সেই ক্ষেত্রে এটা বড় জোর একটা ‘হবু (would-be) টেররিজম’ পরিস্থিতি, এখনও মানে হয় নাই । কিন্তু তা বলে আগাম একে টেররিজম বলে ডাকছেন কেন?  আসলে রোহিঙ্গাদের দুর্দশাকে আফগান পরিস্থিতির তুল্য ঘটনা বলে খান্না সাহেবও বর্মী জেনারেলদের ও সু চির মত করে তাদেরই মন পেতে তাদেরই ইসলাম-ফোবিয়াকে নিজের ভিতর লালন করা শুরু করছেন দেখা যাচ্ছে; হয়ত জেনে বা না জেনে।

তবে এটা ঠিক যে মুসলমান-নিধনের ইচ্ছা, নিজের ‘অপর’ হলেই খান্না সাহেবকে এই ভিন্নতা নিরসন করতেই হবে এবং তা করতে হবে নিধন করেই – এটাই খাঁটি জাতবিদ্বেষ, রেসিজম। এগুলো যার মাথায় গিজগিজ করে তিনিই কল্পনা করেন যে রোহিঙ্গাদেরকে  ‘আফগানিস্তানের মত করে দেখানোর’ সুযোগ পেয়ে গেলে তাঁর কাজ কত সহজ হয়ে যেত। বর্মী জেনারেলেরা নব-উদ্যোগে এই কাজ ১৯৮২ সাল থেকে করে আসছে যাতে রোহিঙ্গাদের জঙ্গী প্রমাণ করে নিজের ক্লিনজিং এর পক্ষে সাফাই যোগাড় করা যায়। মনে হচ্ছে খান্না সাহেব তাদেরই আর একজন হতে চাইছেন এই শেষ বেলায়।

মানুষ ঘুমিয়ে থাকতে পারে, ভুলে থাকতে পারে বড়জোর মনে মনে দেখাটাকেই চোখের দেখা ভাবতে পারে। কিন্তু ভারত-মিয়ানমার মিলে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করার ঐক্য – এটা এক বর্ণবাদী ঐক্য। ‘অপর’ যে আপনার চেয়ে দেখতে ভিন্ন সেই জনগোষ্ঠিকে সাফা করে ফেলার ঐক্য। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যে আজ অথবা কাল এটা তাদের জন্য খুবই চড়ামূল্যের হবে, তা এখনই বলে দেয়া যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১২ ডিসেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের নৌকায় ভারত’ শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ধরতে পারবে

 

মিস করা রোহিঙ্গা-ট্রেন কী আমেরিকা ফিরে ধরতে পারবে
গৌতম দাস
০৭ নভেম্বর ২০১৭, রাত ০০ঃ৪৩
https://wp.me/p1sCvy-2kC

আমেরিকা কি ফেল করা ট্রেন আবার ধরতে পারবে? কোন ট্রেন? বার্মা ট্রেন, নাকি মিয়ানমার ট্রেন? আসলে এসব ঘুরিয়ে ফিরিয়ে কথা বলে লাভ নেই; কথা হলো এটা রোহিঙ্গা-ট্রেন! অর্থাৎ আমেরিকা কি ফেল করা রোহিঙ্গা-ট্রেন আবার ফিরে ধরতে পারবে? আবার ধরার জন্য কতদুর সিরিয়াস যাবে? রোহিঙ্গা-ট্রেন  – একথারই বা মানে কী? কী বলতে চাওয়া হচ্ছে? রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের মোট জনসংখ্যার একটা খুবই ক্ষুদ্র অংশ, মাত্র চার পারসেন্ট। কিন্তু মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গা-মানুষের মর্যাদা এতই পর্যুদস্ত, এতই নিচে অমানুষের বা ঊন-মানুষের স্তরে উগ্র বর্মি জাতীয়তাবাদ নিয়ে গেছে যে, দুনিয়াজুড়ে ব্যাপকভাবে আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে গেছে রোহিঙ্গা পারসিকিউশন বা অত্যাচার নিষ্পেষণ। সেই সাথে বার্মিজ জেনারেলদের নাম নৃশংসতার ওস্তাদ হিসেবেও ছড়িয়ে পড়েছে। এরা নির্মূল ক্লিনজিংয়ে কত দক্ষ এর স্বাক্ষর-চিহ্ন ব্যাপক ছড়াছড়ির মুখে জাতিসঙ্ঘকে বলতেই হয়েছে যে, ‘দুনিয়ার সবচেয়ে পারসিকিউটেড বা নিষ্পেষিত জনগোষ্ঠী হলো রোহিঙ্গারা’। অতেব আমাদের সামনে এখন প্রশ্ন হল, আমেরিকা কি বর্মি জেনারেলদের একটা শিক্ষা দিতে পারবে? কতদুর পর্যন্ত সিরিয়াসলি যাবে?

আগে আমরা দেখছি, আমেরিকা ভুলে গিয়েছিল মানবাধিকার রক্ষার বিষয়ে, জেনোসাইড বা ক্লিনজিংয়ের বিষয়ে দুনিয়ার কাছে তার কমিটমেন্ট কী? দুনিয়ার কাছে কী প্রতিশ্রুতি দিয়ে সে গ্লোবাল লিডার হয়েছিল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গ্লোবাল ইকনোমিক ব্যবস্থায় একটা অর্ডার বা নিয়ম শৃঙ্খলা কায়েম করেই আমেরিকা আজকের ওয়ার্ল্ড লিডার হয়েছিল। তবে  শুধু এতটুকু করেই হতে পারেনি। এটা সে হতে পেরেছিল কারণ সাথে কিছু পলিটিক্যাল কমিটমেন্টও তাকে রাখতে সক্ষম হয়েছিল। মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির প্রতিশ্রুতি। যদিও তাতে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। বিভিন্ন সময়ে আমেরিকা মানবাধিকার রক্ষার  বিষয়টাকে অজুহাত হিসাবে ব্যবহার করেছে, নিজ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ‘রেজিম চেঞ্জের’ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের নজির স্থাপন করেছে। এখনো এই সমস্যা দুনিয়াতে আছে যে, সুদানের বশির একটা গণহত্যা চালালেও চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থ যদি উদ্ধার হয় তবে বলা হবে গণহত্যা হয়নি, বরং ‘গণহত্যার কাছাকাছি’ কিছু একটা হয়েছে। কারণ চীনের এ কথা না মানলে চীন ভেটো দিয়ে দিবে; একই উদাহরণ আমেরিকারও আছে। ফলে ইন্ডিপেন্ডেন্ট বিচার বিবেচনা মুল্যায়নে একটা গণহত্যা ঘটেছে কি না তা সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে দুনিয়ায় এখনো বহু সীমাবদ্ধতা আছে। আসলে তাই দরকার আবার এক রুজভেল্টের, আবার এক নতুন প্রতিশ্রুতিতে নতুন করে জাতিসঙ্ঘ গড়া। অথচ আমেরিকা নিজেরই সেসব ইতিহাস ভুলে বসে আছে। আর বাস্তবে হারার আগেই মনে মনে হেরে গেছে।

এ কথা ঠিক যে, ২০০৭-০৮ সাল থেকেই এটা জানা গিয়েছিল যে, দুনিয়ার অন্তত অর্থনৈতিক পরাশক্তি ও লিডার অর্থে চীনের কাছে আমেরিকার কাঁধবদলের সময় হয়ে গেছে। আমেরিকার জায়গায় সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে উত্থিত হচ্ছে চীন। এ কথাও সত্যি যে, কারো অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে উত্থিত হওয়ার অর্থ হচ্ছে এটা তখন থেকে কেবল সময়ের ব্যাপার যে, সেই রাষ্ট্র এখন ক্রমে ক্রমে সব অর্থেই গ্লোবাল পরাশক্তি হিসেবে হাজির হবে। কিন্তু তাই বলে একথাও ভুলে যাওয়া যাবে না যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আমেরিকা কেবল অর্থনৈতিক আর সামরিক শক্তির জোরে গ্লোবাল পরাশক্তি বা গ্লোবাল লিডার হয়নি। সাথে রাজনৈতিক শক্তি হতে হয়েছে আগে, কিছু গ্লোবাল রাজনৈতিক মুল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হয়েছে আগে;  তবেই আমেরিকার গ্লোবাল লিডার হওয়া গেছে। এমনি এমনি আমেরিকা দুনিয়াকে নিজের এম্পায়ার বানাতে সক্ষম হয়নি। পলিটিক্যাল আইডিয়া, এর উপযোগী গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আর সর্বোপরি কমিটমেন্ট – এসব প্রতিটি জিনিস গুরুত্বপূর্ণভাবে হাজির করাতে হয়েছিল আমেরিকাকে। আর রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি? সেটা বাইরে কাউকে না খোদ নিজের কাছে নিজেকে দিতে হয়েছিল যে – মানুষের মর্যাদা রক্ষা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা, মানবাধিকার রক্ষা কেবল আমেরিকাতে করলেই হবে না, সারা দুনিয়ার ব্যাপারেও অন্তত নীতি-অবস্থানগত প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। এতকিছু বলার পরেও এ কথাও সত্য যে, ১৯৪৮ সালে জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস চার্টার যেটা রচিত হয়েছিল বটে কিন্তু ওখানের ‘ইনডিভিজুয়ালিজম’ ধারণায় ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা আছে, তাই তা নিয়ে দুনিয়াকে আরো অনেক কাজ করতে হবে। সারকথা কোনো ‘রাজনৈতিক’ নীতি-অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া আমেরিকা গ্লোবাল লিডার হয়নি, হতে পারেনি। আজকের জায়গায় আমেরিকা এমনি এমনি উঠে আসেনি। তাই আগেই বলে দেয়া যায় এই নুন্যতম শর্তপুরণ ছাড়া  আগামিতে অন্য কেউও হতে পারবে না।

অথচ এই শতকে এসে  আমেরিকা সত্যি সত্যি হেরে যাওয়ার আগেই ২০০৮ সালে সব ছেড়েছুড়ে আগেই হার স্বীকার করে নিয়েছিল। এর আগে নানা সিরিয়াস হিউম্যান রাইটস ভঙ্গের কারণে ২০০৮ সালের আগের বার্মা ছিল আমেরিকান অবরোধে ডুবে থাকা, বাইরের দুনিয়া থেকে প্রায় একঘরে হয়ে থাকা এক বার্মা। অথচ চীনের দেখানো রাস্তায় সেই মতনই বার্মায় বিনিয়োগ ও ট্রেড আর ব্যবসার ভাগ পেতে মরিয়া লোভী হয়ে আমেরিকা চীনের পথ অনুসরণ করে বসেছিল। বর্মি জেনারেলদের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের রেসিজমে নির্মূল ক্লিনজিং দেখেও না দেখার ভান করার দিন দুনিয়াতে যেন আবার ফিরে এসেছিল – চীনের দেখানো সর্টকাট রাস্তার লোভে পরে আমেরিকাও এই শর্টকাট পথ নেয়ার লোভে পড়েছিল। আমেরিকা মনে করে নিয়েছিল যেন দুনিয়ায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক নীতি অবস্থান এবং এসবের প্রতি প্রতিশ্রুতি ছাড়া দুনিয়া এ পর্যন্ত আসতে পেরেছিল। আর আমেরিকা কোনো কমিটমেন্ট ছাড়াই বোধহয় সে এই দুনিয়ার নেতা হয়েছিল। ২০০৮ সালের বার্মার কনস্টিটিউশন চালুর পরেও সেই একই দানব ও কোটারি এক সামরিক রাষ্ট্রই ছিল বার্মা। অথচ বলা হচ্ছিল বার্মা নাকি ‘গণতন্ত্রের পথে’ যাত্রা শুরু করেছে, গণতন্ত্রের পথে নাকি ট্রানজিশনে বা অন্তর্বর্তি রাস্তায় আছে বার্মা। আর সু চি নাকি শান্তির নোবেল মানুষ ইত্যাদি। এসব ভুয়া সার্টিফিকেট বিতরণ করেছিল আমেরিকার নেতৃত্ব পশ্চিম।  চলতি আগষ্টে বার্মায় ফিরে গণহত্যা শুরুর পরে সু চি তাঁর সাফাই ভাষণে গণহত্যার অভিযোগের জবাবে মিয়ানমারের ‘শিশু গণতন্ত্রের’ যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। তা শুনে প্রখ্যাত মার্কিন জেনোসাইড বিশেষজ্ঞ ড. গ্রেগরি এইচ স্ট্যানটন যথার্থই বলেছেন, “এটা গতানুগতিক অজুহাত। অভিযোগ প্রত্যাখ্যানকারীদের দিক থেকে এটা বহুল ব্যবহৃত একটি কৌশল। তারা বলে থাকেন, গণহত্যা বন্ধের দিকে নজর দেয়ার চেয়ে শান্তিপ্রক্রিয়া বজায় রাখাটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। অং সান সু চি তাই করেছেন”।

অথচ আমেরিকা ট্রেন মিস করেছিল। রাজনৈতিক কর্তব্য ভুলে সস্তা ব্যবসাব ও বৈষয়িকতার লোভের ফাঁদে বর্মি জেনারেলদের কাছে নিজেকে ধরা দিয়েছিল। নিজেকে সস্তা করে তুলে, সস্তায় বিক্রি করে দিয়েছিল। নিজের দাম নিজে বোঝেনি। যার দায় ওবামা প্রশাসনেরও কম নয়। চীনের কাছে দুনিয়ার নেতৃত্ব হারানোর আগেই আমেরিকা উলটো নিজেকে চীনের পর্যায়ে নামিয়ে ফেলেছিল।

আচ্ছা আমেরিকা কী কখনও খেয়ালই করেনি দুনিয়াতে কোথাও রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় কমিউনিস্টদের কোনো রাজনৈতিক সিরিয়াস প্রতিশ্রুতিই নেই। এরা নিজ নিজ বিপ্লবের পরে রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ বলে একটা শব্দ রেখেছে, ইংরেজির একটা ‘আর’ অক্ষর সেখানে আছে বা ছিল। লুপ্ত হয়ে যাওয়া সোভিয়েত মানে ওর ‘ইউএসএসআর’ (USSR) নামে ‘আর’ অক্ষরটা ছিল। এখনও বর্তমান মাও এর চীনের নাম ‘পিআরসি’ (PRC) তেও ‘আর’ অক্ষরটা আছে। এই ‘আর’  এর অর্থ হল ‘রিপাবলিক’। রাজতন্ত্র উতখাত করে পিপলস রিপারলিক প্রতিষ্ঠা ছাড়াও মর্ডান রিপাবলিকের আরও অর্থ হল রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। কমিউনিস্টদের কাছে  এসব কথার সাথে কোনো ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ অ্যাক্ট’ তৎপরতা তাদের কমিউনিস্ট রাষ্ট্রের করণীয় নাই। সেখানে কনস্টিটিউশনের কোনো গুরুত্ব নেই, কী লেখা আছে সেখানে তাও তত গুরুত্বপূর্ণ নয়। ফলে রাষ্ট্রে রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা সেটা তো কোনো সিরিয়াস কিছু নয়। কারণ এসব কথার কথার নাকি নেহাতই ভোটের হিসাব; যেমন কোনো করপোরেট চেয়ারম্যানেরও এক ভোট, এক ফকিরেরও এক ভোট। তাই মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ইত্যাদির কথাবার্তার কোন মুল্য কমিউনিস্টদের কাছে নাই। মৌলিক মানবাধিকার ইস্যুটা নাকি কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে আমেরিকার ষড়যন্ত্র। যদিও একথা সত্য রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা সমাজে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা নয়। ফলে এটা যথেষ্ট নয়। কিন্তু তাই বলে এটা কোন অর্জনই নয়, এটা মারাত্মক ভুল ধারণা। ফলে মর্ডান রিপাবলিকে মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য  ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা কমিউনিস্টদের কাজই নয়, এর কোন গুরুত্ব নাই, এটা কারও কাজে লাগে না, এগুলো মানুষের কোন অর্জন নয় – এটা মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা শুধু না। খুবই নিম্ন বোধের – মানুষ কেবল জীব, এই অনুমানে বলা বক্তব্য। মানুষকে রিডিউসড নীচা গণ্য করা বক্তব্য।

তাই চীনের বুঝ হল, তারা যে দানব বর্মি জেনারেলদের পা-চুমে বিনিয়োগ ব্যবসা খাচ্ছে – এর পাশেই লাখ লাখ রোহিঙ্গা ঐ জেনারেলদের হাতেই কচুকাটা ক্লিন হয়ে গেলে তাতে চীনের কী দায়! তার কোনো দায় নেই। সেই, ১৯৭০-এর দশক থেকেই চীন নিজের কাছে পরিষ্কার যে, গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের দুনিয়ায় সে যাচ্ছে বটে কিন্তু কোনো গ্লোবাল ইউনিভার্সাল রাজনৈতিক মুল্যবোধ প্রতিষ্ঠা হওয়া বা থাকা না থাকার দায়দায়িত্ব সে নেবে না। কেবল কোন ব্যবসাটা সে পাবে সেই ভাগ সে ঠিকই গ্লোবাল প্লেয়ারদের ভাগ থেকে নিজেরটা বুঝে নেবে। এই নীতিতেই চীনের বিদেশনীতির ডিপলোম্যাসি এত দিন চলে এসেছিল। আর প্রমাণ হয়েছে এটা অচল। রোহিঙ্গারা প্রমাণ করে দিয়েছে   এই চীন ব্যর্থ। এই চীন গড়ে তোলা অর্থহীন, খামোখা। মানুষ কেবল জীব নয়, সে কেবল একটা বৈষয়িক জীব-জীবন নয়। মানুষের জীবনের আরও অর্থ উদ্দেশ্য লক্ষ্য আছে; দায় কর্তব্য আছে। স্পিরিচুয়ালিটির দিক আছে। জীব জীবন ছাড়িয়ে মানুষের তাই আরও উন্মেষ দরকার হয়। সেকথাটাই আর ভাবে বললে হয়, মানুষের রাষ্ট্রের তাই রাজনৈতিক কমিটমেন্ট দরকার থাকে। মানুষের মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক ইনসাফ, মানুষের মৌলিক মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা রিপাবলিক রাষ্ট্র গড়ার স্তরে তাই মানুষের নুন্যতম দায়। এসব পুরণের পথে নুন্যতম দায় কর্তব্যবোধ নাই চীনের। ফলে আগেই বলা যায় কোন গ্লোবাল নেতা হওয়ার খায়েশ চীনের পূরণ হবার সুযোগই নাই। আসলে সে ধরা খেয়েছে। কিভাবে?

আগেই বলেছি আমেরিকা লোভে পড়ে হুঁশ হারিয়েছিল। নিজের গৌরব নিজের অবদান ভুলতে বসেছিল। এমনকি এবারের আগষ্টের পর থেকে নবউদ্যোগে নির্মূল অভিযান শুরুর পরে, ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে বক্তব্যে বিষয়ে আমেরিকার উপমন্ত্রী মার্ফি সাহেবের কথাবার্তা লক্ষ্য করা যাক। তিনি তখনও কেবল সতর্ক কী বলতে কী বলে ফেললে আবার বর্মি জেনারেলদের মন উঠে যায়, অখুশি হয়ে যায় – সেদিকে খুবই সতর্ক থেকে ৮ সেপ্টেম্বর প্রেসের সাথে কথা বলছেন। জেনারেলদের মন জোগাতে মার্ফি বলার চেষ্টা করছিলেন যে এটা নাকি রোহিঙ্গা বা মুসলমান নির্মূল ক্লিনজিংয়ের ইস্যু নয়, এটা নাকি রাখাইন স্টেটের দুই জাতিগোষ্ঠীর ঝগড়া, অর্থাৎ বার্মা রাষ্ট্র বা মিলিটারির কোন ভূমিকা নেই। তার এই অবস্থা দেখে সিবিএস নিউজের সাংবাদিক সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করায় জবাবে মার্ফি সাহেব আবার সে কথা কনফার্ম করেছিলেন। কিন্তু এরপরেও সব চিতপট হয়ে যায়, সব কিছু ঘুরে যায়। গত ২ অক্টোবর মিয়ানমারে অবস্থিত ২০টি দেশের রাষ্ট্রদূত একসাথে রাখাইন প্রদেশ সরেজমিন সফর করে এসে এরপরে তা নিয়ে মিয়ানমারে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত যে বিবৃতি দেন তাতে পরিস্থিতি উলটে যায়। যার মূল কথা হল, বার্মার জেনারেলদেরকে অধিকার সংরক্ষণে রাষ্ট্রের দায়দায়িত্বে স্মরণ করিয়ে দেয়া, আর বারে বারে চাপ দিয়ে বলা যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য দায়ীদের আইনের আওতায় আনতে হবে, জাতিসঙ্ঘ ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন আসতে দেয়া ইত্যাদি। এসব নিয়ে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

অর্থাৎ তখন থেকে আমেরিকা সুর পালটিয়ে ফেলেছিল। নিজ শক্তি, তুচ্ছ করে ফেলে রাখা হারানো গৌরবের কথা মনে পড়ে গেছিল। ফলে এরপর থেকে আর এটাকে ‘রাখাইন প্রদেশের জাতিগোষ্ঠীর নিজেদের ঝগড়া’ বলে আড়াল করতে চাইছে না। এটাকে বলা যায় আমেরিকান বার্মা নীতিতে মেজর শিফট পটপরিবর্রতন।  এরপরে ২৩ অক্টোবর এসে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের বিবৃতি – এটা একেবারে কঠোর অ্যাকশনের দলিল নির্দেশনামা যেন। সাথে আগের মতো যে দায়ী ইনভেস্টিগেট করো, তাকে ধরে নিয়ে আসো সেসব কথা তো আছেই। তবে মূল কথা হল, ২০০৮ সালের আগে আরোপিত আমেরিকার দেয়া যেসব অবরোধ উঠিয়ে নেয়া হয়েছিল সেগুলো আবার কার্যকর করা হয়েছে বলে ঘোষণা করে দেওয়া। বিশেষত বর্তমান ও সাবেক সামরিক অফিসারদের ওপর ট্রাভেল ব্যান আবার বলবৎ করা, বার্মা থেকে রুবিসহ দামি পাথর আমেরিকায় পাঠানো ব্যবসার ওপর নিষেধাজ্ঞা ফিরে আরোপ, আর সামরিক বাহিনীর জন্য নেয়া আমেরিকার স্পন্সরড যেকোনো কর্মসূচি স্থগিত করে দেয়া। এক কথায় আমেরিকান রাষ্ট্রের সাথে বর্মি আর্মি সদস্যদের সব ধরনের যেকোনো সংশ্লিষ্টতা ও যৌথ তৎপরতা স্থগিত।
তবে এবারের সারকথায় গুরুত্বপুর্ণ দিক হল, মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতে দেখতে চায় আমেরিকা এই দাবিটা ছিল মুখ্য। আর, একথা শুনে জেনারেলদের কাপড় নষ্ট করে ফেলার জন্য যথেষ্ট। ভারতের মিডিয়া ভাষ্যকারদের মতে, ‘ভারত নাকি প্লট হারিয়ে চীনের কাছে হেরে হাত গুটিয়ে’ নিয়েছে। তাই বাংলাদেশ-মিয়ানমার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে ‘রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার প্রক্রিয়া’ নিয়ে আলাপে বসতে আয়োজন করে দিয়েছে নাকি চীন। কিন্তু তাতে আমাদের মন্ত্রী দেশে ফিরতে-না-ফিরতেই যাকে বলে দু’জনে দুই মন্ত্রী দু’দিকে দুই ধরনের কথাতে হয়ে পড়েছেন একেবারে ‘ফল এপার্ট’। তাতে বোঝা গেল যে বর্মি জেনারেলদের শায়েস্তা করা চায়নিজ কূটনীতির কাজ নয়। এ ব্যাপারে চায়নিজরা চাইলে আমেরিকানদের কাছে মধ্যস্থতাকারীর কাজে কূটনৈতিক কিছু শিক্ষা নিতে পারে। আচ্ছা এটা কি জানা কথা না যে, পিছলা বার্মিজ জেনারেল ভাষ্য বদলে দেবে। অতএব আগে থেকেই চীনাদের ‘দুটা মানে হয়’ এমন সুযোগ যাতে না থাকে এমন শব্দ বা কথা না রাখা – সেই ফুটা বন্ধ করার ব্যাপারে চীনাদের সাবধান হওয়া দরকার ছিল!

কিন্তু এরও আগে যে কথা বলতে হবে, তা হলো- ১৯৭০-এর দশক থেকে নেয়া চীনাদের পলিটিক্যাল দায় বা সংশ্লিষ্টতা না নিয়ে গ্লোবাল পলিটিক্যাল-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা থেকে কেবল অর্থনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্টতায় থেকে মাখন খেয়ে যাবো খালি, চীনাদের এই বুদ্ধি অচল-অকেজো এটাই প্রমাণ হয়েছে। কারণ আমরা দেখছি, আমেরিকানদের সামান্য একটু নাড়াচাড়াতেই ভয় পেয়ে বর্মি জেনারেলদের কী করে চীন রক্ষা করবে তা নিয়ে চীনকে ছোটাছুটি করতে হচ্ছে। চীনাদের হাতে ভেটো ক্ষমতা থাক আর না থাক কিছু যায় আসে না তাতে। এথেকে চীন কী শিক্ষা নিয়েছে যে,  দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। অর্থনৈতিক শক্তি বা মুরোদ আপনার অঢেল থাকতে পারে কিন্তু সেটা রাজনৈতিক শক্তির বিকল্প নয়। এ ছাড়া রাজনৈতিক কমিটমেন্ট, নীতি-অবস্থান থাকতেই হবে, এসব দিক- তো আছেই। বাংলাদেশ-মিয়ানমারকে একসাথে বসানোর কাজে চীনাদের নামা প্রমাণ করেছে রাজনৈতিক সমাধানের পথ কী জিনিস। এটা রোহিঙ্গারা মরুক যা হোক, আর্মি জেনারেলদের কাছ থেকে বিনিয়োগ আর ব্যবসা বাগানোর কাজটা ভালো জানলেই চলবে – চীনের অনুমান যে মিথ্যা ছিল তা চীনকে বুঝিয়ে দিয়েছে। এই ধারণার যে ভিত্তি নেই, এটা মিথ্যা ও অচল তা বুঝিয়ে দিলেও কী চীন সে শিক্ষা নিয়েছে আমরা নিশ্চিত না। কারণ চীনকে ‘রাজনৈতিক কমিটমেন্ট নেগোসিয়েশন’ এর গুরুত্বের কথা মেনে নিতে হয়েছে। আর আসলে রোহিঙ্গারা সব অত্যাচার নিষ্পেশন সহ্য করতে হয়েছে কথা ঠিক কিন্তু তা করে  সারা দুনিয়াকে রোহিঙ্গা ইস্যু দেখিয়ে দিয়েছে যে দুনিয়া চলে দুনিয়া চলে রাজনৈতিক শক্তির মুরোদে। রাজনৈতিক কমিটমেন্ট তাতে লাগবেই। আর তা নাই বলে, চীনাদের দুনিয়ার গ্লোবাল নেতা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

উপরের এসব কথার উপর দাঁড়িয়ে আর একটা কথা বলে দেয়া যায়।  কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্র দুনিয়াকে অ্যাম্পায়ার হিসেবে নিজের নেতৃত্বে চালাতে কখনই পারবে না, কখনোই সম্ভব হবে না। এর মূল কারণ রাজনৈতিক কমিটমেন্ট না দেখিয়ে, হিউম্যান রাইটসকে নিজের ইস্যু গণ্য না করে দুনিয়া চালানো অসম্ভব। রিপাবলিক রাষ্ট্র আর তাতে মানুষের  মর্যাদা, রাজনৈতিক সাম্য ইনসাফ কায়েম ইত্যাদিতে মানবাধিকার সুরক্ষার ইস্যু আগামীতে আরো সিরিয়াস ইস্যু হয়ে উঠবে দুনিয়াতে। কমিউনিস্ট জগতে যার কোনো ন্যূনতম ধারণা বা আমলই নেই। কমিউনিস্টদের এখনো ধারণা, ‘তাদের বেইজ্জতি করতেই’ নাকি আমেরিকা এই ইস্যুটা হাজির রাখে। এর চেয়ে অজ্ঞতার আর কী হতে পারে! এর মানে কি কমিউনিস্ট বলতে চাইছে দুনিয়াতে গণহত্যা ক্লিনজিং রেসিজম – এগুলো চলবেই? তাই কি? তবে আমি শিউর মাফিয়া রাষ্ট্র রাশিয়ার পুতিন অথবা চীনে নতুন জেঁকে বসা শি জিনপিংয়ের ‘মডার্ন সমাজতন্ত্র’ নামে সোনার পাথরের বাটি ধারণার ভেতর এর কোনো জবাব পাওয়া যাবে না।

কিন্তু আমেরিকানরা কত দূর যাবে? রোহিঙ্গারা কি ঘরে ফিরবে? আমেরিকানরা কতটা সিরিয়াস? অর্থাৎ উপরে আমেরিকার সৎ পথে রওনা হবার অনেক ইঙ্গিত দিবার পরেও আমি সন্দেহ রাখছি যে  আমেরিকা শেষ মাথা পর্যন্ত যাবে কীনা? কতদুর যাবে?  বাংলাদেশের মানুষদের জন্য এসব মাপার দ্রুত একটা মাপকাঠি দেই।

‘এশিয়ায় আমেরিকান (নিরাপত্তা) স্বার্থ আমেরিকা ভারতের চোখ দিয়ে দেখবে’ এই নীতিতে ২০০৭ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বুশ প্রশাসন চালু করে দিয়ে গেছে। এই কথার একটা ইম্পিকেশন অর্থে সারার্থ হল, সেই থেকে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের কাছে বন্ধক দিয়ে রেখে গেছিল। সেটা এখনও ওরকমই আছে। ট্রাম্প হয়ত ব্যাপারটা নিয়ে ভোকাল ততপর নয়। কিন্তু রুটিন প্রসাশনের গাইডিং প্রিন্সিপাল এখনও সেটাই। এখন এই সপ্তাহ ট্রাম্পসহ স্টেট ডিপার্টমেন্টের মন্ত্রী মুরুব্বিরা মানে রেক্স টিলারসন এবং আন্ডার সেক্রেটারিসহ এভাবে সবাই আমাদের দেশ বা পড়শি দেশে থাকবে। এগুলো যত যা-ই ঘটুক যতক্ষণ না আমেরিকা আমাদেরকে ভারতের কাছে দিয়ে রাখা  বন্ধকদশা থেকে ছুটিয়ে আমাদের সাথে সরাসরি ডিল না করবে, এই ব্যাপারে স্পষ্ট অবস্থান নিবে তত দিন অন্য যাই কিছু আমরা দেখি না কেন আমেরিকার ওপর আমাদের আস্থা রাখার কোনো কারণ সৃষ্টি হয়নি এটাই বুঝতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫ নভেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে।  ফলে  নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফ করা – তিন

গৌতম দাস

১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  বুধবার, ১৫ঃ১৭

http://wp.me/p1sCvy-2hU

আগের পর্বে বলেছিলাম, বার্মার হিউম্যান রাইট পরিস্থিতির অবনতিতে আমেরিকা অবরোধ আরোপ শুরু করেছিল  ১৯৯৩ সাল থেকেই। এরপর বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম অবরোধ আরোপিত ছিল। কিন্তু ২০০৬-৭ সালের দিকে ব্যাপারটাকে প্রথম ভিন্ন দিক থেকে দেখা বা নতুন মুল্যায়ন আসতে শুরু করেছিল।  ভারতের দুতায়ালি মধ্যস্থতা আর আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমের সমর্থনে অবরোধ তুলে নেয়ার নতুন ফর্মুলা তৈরি শুরু হয়েছিল। আর তাতে সুচি কে ‘সামরিক কর্তাদের রাষ্ট্রের উপর সিভিলিয়ান ফেস এর প্রলেপ’ – সম্ভবত এটাই হবে এর সঠিক মুল্যায়ন, এই নীতিতে বার্মার সামরিক রাষ্ট্রকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে কোন সংস্কারই তাতে হয় নাই, ছিল না তা বলা ভুল হবে। কিন্তু খোদ বার্মা রাষ্ট্রকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া; ওর কর্তৃত্ব সার্বভৌমত্ব জনগণের কাছে ফিরিয়ে দেয়া অর্থে এক নুন্যতম মর্ডান রিপাবলিক হয়ে উঠা – না এটা ঐ ফর্মুলাতে ছিলই না। বরং সামরিক বাহিনীর একা নিজের মনের মাধুরি মিশিয়ে লেখা ২০০৮ সালের কনষ্টিটিউশনকে ভিত্তি করে নতুন রাষ্ট্র সাজানো হয়েছিল, এটাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। রাষ্ট্রের ভিতর সেনাবাহিনী বলে প্রতিষ্ঠান থাকে। কিন্তু এখনকার বার্মা হল, সেনাবাহিনীই সার্বভৌম যার অধীনে রাষ্ট্র বলে আবার একটা প্রতিষ্ঠানও আছে। সেটা বুঝা যায়, রাষ্ট্রের  সিভিল নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া যে কোন সিদ্ধান্তে ভেটো দিবার ক্ষমতা আছে সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফের। আবার তিনিই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র ও সীমান্তরক্ষার মত গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রণালয় মন্ত্রী নিয়োগ দেয়াসহ মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করেন, ২৫% সংসদীয় (কেন্দ্র ও প্রাদেশিক উভয় জায়গায়) আসন সেনাসদস্যদের জন্য এবং বিনাভোটে বরাদ্দ রাখা ইত্যাদি এগুলা হল সেই দগদগে চিহ্ন যা থেকে স্পষ্ট বুঝা যায় বার্মা কেমন ধরণের রাষ্ট্র। আর এটাই নাকি সংস্কার। আর এসব সংস্কারই তার প্রতিশ্রুত সবগুলো কাজ শেষ করার আগেই ২০১০ সালেই পশ্চিমা বিনোয়োগ হুড়মুড় করে ঢুকে পড়েছিল মায়ানমারে। পশ্চিমের সাথে ২০০৮ সালের আজীব কনষ্টিটিউশনের ভিত্তিতে নতুন মায়ানমারের হানিমুন শুরু হয়ে গেছিল এখান থেকে। কিন্তু জেনারেলেরা একটা কথা ভুলে যায় নাই, তা হলো মায়ানমারিজম। যেটা আসলে ইসলাম বিদ্বেষী মশলা দেয়া এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ; এর চর্চা, এবং একেই মায়ানমার রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসাবে সাজানো। ফলে ২০১২ সালে আবার নব উদ্যোগে শুরু হয়েছিল সেই পুরানো রোহিঙ্গা নিধন। যার মূল যুক্তি হল, নতুন নাগরিকত্ব আইন অনুসারে রোহিঙ্গারা মায়ানমারের নাগরিক নয় – এই গান। ফলে বাংলাদেশে শরণার্থীর ঢল নামানো। অনুমান করা হয় যে ভারত বার্মার জেনারেলদেরকে আশ্বস্ত করেছিল ও উতসাহ দিয়েছিল এই বলে যে এবার এই নব সাজের মায়ানমার যেখান থেকে পশ্চিমারা বিপুলভাবে বার্মায় বিনিয়োগ করতে পারার সুখ আর মাখন খাওয়াতে ব্যস্ত আছে, ফলে এবার তারা হিউমান রাইট ভায়োলেশন, গনহত্যা ইত্যাদি বলে আওয়াজ তেমন জোরালো না তুলে চেপে যাবে।  আমাদের এই অনুমান পোক্ত হয়, ২০১২ সালে  বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা নীতির বদলে যাওয়া দেখে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিবে না, প্রথম এই নীতি নেয়া হয়েছিল। ফলে বাংলাদেশ তখনও বর্ডার সীল করে রাখা এই বলে যে, আমরা অনেক নিয়েছি, ওথবা বলা যে রোহিঙ্গারা জঙ্গী ফলে জঙ্গীবাদ ছড়িয়ে পড়বে বলে কথা ছড়িয়ে আভ্যন্তরীণভাবে জনমানুষের মন বিষিয়ে দেওয়ার আওয়াজ  ইত্যাদি অজুহাতগুলো বাংলাদেশ সেকালে প্রথম তুলেছিল। কিন্তু যে মায়ানমারকে রোহিঙ্গা তাড়াতে ও নির্মুল করতে উতসাহ দিয়েছিল সেই ভারত বাংলাদেশকেও এর সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ এই নীতি নিতে প্ররোচিত করেছিল। ফলে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা গণহত্যার আর এক জোয়ার আমরা দেখেছিলাম। কিন্তু সেবারের ঘটনাবলীতে আন্তর্জাতিক হিউম্যান রাইট সংগঠনগুলোর মধ্যে হিউম্যান রাইট ওয়াচের রিপোর্ট ছিল ভয়াবহ, মায়ানমারের জেনারেলদের জন্য বড় রকমের অস্বস্তির। সমস্ত ভায়োলেশনগুলো লিগাল পয়েন্টে বিস্তারিত বর্ণনা সেখানে ছিল।  ওদিকে সময়টা ছিল বারাক ওবামার জন্য তার সেকেন্ড টার্মের নির্বাচন চলাকালীন সময়। ২০১২ সালের নভেম্বরের সাত তারিখের নির্বাচনে জয়লাভের পরই, আকস্মিক তাঁর মায়ানমার সফরের  প্রোগ্রাম ঘোষিত হয়।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে পরবর্তিকাল থেকে এপর্যন্ত বার্মা পশ্চিমের জন্য ‘নো গো’ এলাকা বা অগম্য স্থান হয়ে ছিল। অর্থাৎ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যতটুকু পশ্চিমাদেশের ছোয়া বার্মায় ছিল তা হল কেবল বৃটিশ কলোনি মাস্টারের সুত্রে যা ততটুকুই। কিন্তু তা ছিল কলোনি সম্পর্ক – অর্থাৎ উদ্বৃত্ব উঠিয়ে নিয়ে যাবার, বার্মায় পশ্চিমের বিনিয়োগ আনার নয়। আর সেই সাথে বৃটিশ আধুনিক মূল্যবোধের প্রভাবের ভাল দিক তা ঐ প্রথম আর সেই শেষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন বার্মা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কনষ্টিটিউশন রচনা ও নানান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল মত গড়ে তোলার আগেই সময় পাবার আগেই মাত্র ১০ বছরের মাথায় ১৯৫৮ সালে রাজনৈতিক সংকটে পড়ে, বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ সামলাতে সিটিং জেনারেল নে উইনকে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী বানানো হয়েছিল।  বিচ্ছিন্নতা বিদ্রোহ দমন সামলার পাশাপাশি আবার ঐ সময়টা ছিল আসলে বিদেশী বিরোধীতার মানে চরম জেনোফোবিয়া চর্চার যুগ, বিশেষত বিদেশী হিসাবে ভারত ছিল এক নম্বর তালিকায়। সেসব বিষয়ে এখানে বিস্তারে না গিয়ে কেবল একটা বাক্যে তা বলে রাখি। তা হল, জাতীয়তাবাদ আর ‘বিদেশী মাত্রই (অথবা বিদেশী বিনিয়োগ মানেই) তা আমাদের শত্রু – এই দুটা এক ধারণা নয়। তা সত্বেও এভাবে দুটাকে অনেকে ভুলে সমার্থক  জ্ঞান করেন বটে। কিন্তু এদুটো এক ধারণা বা সমার্থক ধারণা নয়। সেটা ছিল ঐ এমন জেনোফোবিয়ার যুগ। নে উইনের ঐ দুই বছর ছিল সেই লৌহ দানবীয় দমনের যুগ। ঐ দমন শেষে ১৯৬০ সালে তিনি সাধারণ নির্বাচন দেন। আর সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসেন উ নু (নে উইনের পুরান ৩০ কমরেডের একজন) যিনি নে উইনকে সামরিক প্রধান হওয়া সত্ত্বেও আগের সময়ে সাময়িক প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন। সে যাত্রায় উ নু সিভিল সরকার গড়েছিলেন কিন্তু  দুবছরের আগেই ১৯৬২ সালে  ঐ সিভিল নির্বাচিত ক্ষমতার বিরুদ্ধেই নে উইন ক্যু করে ক্ষমতা নেন, আর তাঁর ব্রান্ডের সমাজতন্ত্র কায়েম করেন; যা চলেছিল ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত। সারকথায় ১৯৪৮ সালের পরে, সারা দুনিয়া ততদিনে আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন করে সাজানো হয়ে গেলেও আমেরিকাসহ সারা পশ্চিমের কাছে বার্মা তখনও  ‘নো গো’ বা প্রবেশহীন হয়ে থেকে গেছিল। না পশ্চিমের কোন বাণিজ্য বিনিয়োগ, না কোন রাজনৈতিক চিন্তা মুল্যবোধ – কোনটারই ছোঁয়া মায়ানমার আর পায় নাই ২০১০ সালের আগে পর্যন্ত। দীর্ঘদিন পশ্চিমের ছোঁয়া না লাগা, পড়ে থাকা মাটির নিচের অফুরন্ত সম্ভাবনাময় সম্পদের বার্মা, এই অর্থে ভারজিন ল্যান্ড সেই বার্মায় সেবার প্রথম কোন আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সফরে এসেছিলেন। এই ছিল ওবামার সফরের এক গুরুত্বপুর্ণ তাতপর্য।  কিন্তু না আরও বড় এক তাতপর্য ছিল – হিউম্যান রাইট। আসলে বারাক ওবামা হিউম্যান রাইট ওয়াচের অভিযোগগুলো নিয়ে বার্মার শাসক জেনারেলদেরকে কড়কে দিতে এসেছিলেন। না ঠিক কেবল সেগুলোই নয়, সফরে এসে বক্তৃতায় প্রথমে বার্মা সংস্কার করতে রাজী হওয়ায় আর সেসবের কিছু করে দেখানোর জন্য প্রথমে প্রশংসা করেন তিনি শাসকদের আর এরপরে কঠোর সমালোচনা করেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের। এই ইস্যুতে আমেরিকার সাথে ভারত  পরস্পর বিরোধী নীতিতে চলে যায়; বার্মা নীতিতে একটা ফারাক হয়ে যায় তবে তা আন্ডারষ্ট্রীমে রাখতে সক্ষম হয়। ওদিকে আমেরিকার বিনিয়োগ মহল ওবামার সফরকে খুশিভাবে নেয় নাই। বরং বাণিজ্য বিনিয়োগের জন্য খারাপ সংকেত হিসাবে দেখেছিল। সেজন্য তারা সে অস্বস্তি ভিন্নভাষায় তুলে ধরেছিল এভাবে যে সামনে আরও কয়েক বছর ধরে সংস্কার হওয়ার পরে ওবামার সফরে আসা উচিত ছিল। যেন তারা বলতে চাচ্ছিল ওবামা উনি এখন জেনারেলদেরকে ধমকাধমকি করেন কেন, আমরা ভয় পাচ্ছি। এব্যাপারে আগ্রহীরা নুইয়র্ক টাইমসের ০৮ নভেম্বর ২০১২ সালের এই রিপোর্টটা দেখতে পারেন। তবে বার্মা সফরে গিয়ে ওবামার রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বিরাট হেদায়েতি বক্তব্য রেখেছিলেন। যেন রাষ্ট্র কী, তার ক্ষমতা কিভাবে কংগ্রেসের দ্বারা চেক এন্ড ব্যালেন্সড। এছাড়া হিউম্যান রাইট কী, নির্বাহী ক্ষমতার জবাবদীহীতা কী জিনিষ এসবের এক হেদায়েত করা বক্তৃতাটা করেছিলেন রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ে। রোহিঙ্গাদের ‘মর্যাদার’ প্রসঙ্গে তার শক্ত অবস্থানের কথা ওখানে জানা যায়। তিনি বলেছিলেন,
“Today, we look at the recent violence in Rakhine State that has caused so much suffering, and we see the danger of continued tensions there.  For too long, the people of this state, including ethnic Rakhine, have faced crushing poverty and persecution.  But there is no excuse for violence against innocent people.  And the Rohingya hold themselves — hold within themselves the same dignity as you do, and I do.
National reconciliation will take time, but for the sake of our common humanity, and for the sake of this country’s future, it is necessary to stop incitement and to stop violence.  And I welcome the government’s commitment to address the issues of injustice and accountability, and humanitarian access and citizenship.  That’s a vision that the world will support as you move forward”.
কিন্তু প্রশ্ন হল ওবামা ঠিক কেন ওমন সুর বদলিয়ে ছিলেন কেন?

হেনরি কিসিঞ্জার ও হিউম্যান রাইট
কিসিঞ্জার এখনও আমেরিকার ডিপ্লোমেটিক ও একাদেমিক জগতে খুব গুরুত্বপুর্ণ ব্যক্তিত্ব। কিসিঞ্জার হলেন চীনকে বাইরের দুনিয়ায় বের করে আনার মানে, যেমন  চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে আজকের জায়গায় আনার কারিগর। এই ‘জায়গায়’ বলতে, এর আগের চীনের কমিউনিস্ট-গিরির ব্লক বা ঘেরাটোপ ছেড়ে বের হয়ে আসা, আমেরিকার জন্য চীন বিপুল বিনিয়োগে ও বাজারের স্থান উঠা; আবার সেখান থেকে  পাল্টা চীন আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে নিজেই আমেরিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠা ইত্যাদি। সেই চীন প্রসঙ্গে  কিসিঞ্জারের এক অন্যতম সাবধানবাণী বা পরামর্শ আছে। তিনি বলছিলেন, ভবিষ্যতের আমেরিকার চীনকে আয়ত্বের মধ্যে রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় টুলস হল, হিঊম্যান রাইট; যা চীন সবসময় একটা ঘাটতিতে থাকবে। ফলে তা দিয়ে চীনকে বেকায়দা বা কাবু রাখা যাবে, অনেকটাই।  কিন্তু একটা শর্ত আছে। তা হল, আমেরিকাকে এই হাতিয়ার হাতে পেতে গেলে কিছু আগাম করণীয় আছে, যা করে রাখতে হবে। আমেরিকাকে দুনিয়া জুড়ে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ড স্থাপন ও তা ধরে রাখার পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়ে চর্চায় থাকতে হবে। কেবলমাত্র তাহলেই এই হিউম্যান রাইট হাতিয়ার আমেরিকার হাতে উঠে আসবে, নইলে নয়। মনে করা হয়ে থাকে, কিসিঞ্জারের এই বাণীর বাস্তব রূপ দেখতেই আমেরিকান দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ কে সাজানো হয়েছে। সেটা হল, কোন দেশে আমেরিকা কী বিদেশ নীতি অনুসরণ করে তা খেয়াল না করেই তা থেকে বরং স্বাধীনভাবে ‘রাইট ভায়োলেশনের’ রিপোর্টগুলো করে থাকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ । যেখানে ওর নিজের প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনেরা বেশিরভাগ সময় আমেরিকান প্রশাসনিক অবস্থান ও নীতির সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে চায়। না, একথা থেকে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ সম্পর্কে কোন ‘অভিযোগশুন্য আর ওর সবভালো’ এমন কোন সার্টিফিকেট দেয়া হচ্ছে না। বা সেজন্য কথাগুলো বলা হচ্ছে না। তবে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচের’  এভাবে তুলনামূলক স্বাধীন অবস্থান নিয়ে হাজির থাকার সুবিধাটা হল যে তাতে আমেরিকান প্রশাসন চাইলে ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ এর রিপোর্টের আলোকে  নিজেকে কারেক্ট করে নিতে পারে। মানে নিজেকে সংশোধন করে নিবার সুযোগ প্রশাসন চাইলে নিতে পারে।  কারণ আমেরিকান প্রশাসন অথবা ‘হিউম্যান রাইট ওয়াচ’ – এরা কেউ কারও অবস্থান একমাত্র স্বেচ্ছায় অনুসরণ ছাড়া কারও অবস্থান অন্যের জন্য বাধ্যবাধকতার নয়।  ফলে ওবামার ঐ বার্মা সফরকে তাঁর প্রশাসনের  কারেকশনের সফর ছিল বলে আমরা গণ্য করতে পারি। ঐ সফর নিয়ে রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনাম ছিল – “ওবামা ঐতিহাসিক মায়ানমার সফরে প্রশংসা করেছেন আবার চাপও দিয়েছেন” (Obama offers praise, pressure on historic Myanmar trip)। একদিকে প্রশংসা (অর্থাৎ অর্থনৈতিক স্বার্থ বজায় রাখতে) আবার অন্যদিকে চাপ (অর্থাৎ হিউম্যান রাইটের জন্য চাপ দেয়া, রোহিঙ্গা ইস্যুকে বক্তব্যের প্রসঙ্গ করা) – এই দুটোই আমরা দেখছি।

সে আমলে ইতোমধ্যে মায়ানমারের তথাকথিত সংস্কার যা হয়েছে তা হয়েছে সাবেক জেনারেল আগের রাষ্ট্রপতি থিন সিন (Thein Sein) এর হাতে। কিন্তু আমেরিকান প্রশাসন “রোহিঙ্গাদের মর্যাদা” নিয়ে চাপ আর বিপরীতে থিন সিনের উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ কায়েমের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের নাগরিকতে নাই বলে তাদেরকে নির্মুল করার স্বার্থ – এই দুটো অবস্থান কোথায় গিয়ে তাহলে রফা হবে? কীভাবে তারা এক পয়েন্ট মিলতে পারে?

প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট থিন সিন বলেছিলেন, রাখাইন রাষ্ট্রের রোহিঙ্গা যাদেরকে মায়ানমার সরকার বাঙালী বলে ডাকে তাদের উপর চলতি কমিউনাল দাঙ্গার সমাধান হল, হয় তাদের UNHCR এর রিফিউজি ক্যাম্পে অথবা তৃতীয় দেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। মায়ানমানের ইংলিশ দৈনিক মায়ানমার টাইমস লিখছে,  According to the president’s official website, U Thein Sein told Mr Guterres that the solution to communal violence in Rakhine State was to send the Rohingya – known in Myanmar as Bengalis – to either UNHCR refugee camps or a third country। তো একথা শুনে UNHCR এর প্রধান আন্তেনিও গুতাররেস থিন সিনের সাথে দেখা করে এক টেকনিক্যাল প্রশ্ন তুলেছিলেন। তিনি বলতে চাইছিলেন আমরা তো রিফিউজি নিয়ে কাজ করি। রিফিউজি মানে যারা নিজের দেশ ছেড়ে আর এক দেশে আশ্রয় প্রার্থী বা আশ্রয় নিয়েছেন, তারা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট থিন সিন তিনি কথা বলছেন মায়ানমানের রাখাইনে যারা এখন আছেন, বসবাস করছেন এমন রোহিঙ্গা মানুষদের কথা। ফলে তারা তো UNHCR এর কাজের এক্তিয়ারের বাইরের। অর্থাৎ এন্টেনিও বলতে চাইছিলেন যারা মায়ানমারের ভিতরে আছে তারা তো রিফিউজি নয়। ফলে সেই থেকে থিন সিনসহ বার্মিজ জেনারেলদের সমস্যার একমাত্র সমাধান হয়ে দাড়ায়, যারা ভিতর আছে এমন রোহিঙ্গাদেরকে মেরে ধরে সীমান্তের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া যাতে তাদের স্টাটাস তখন রিফিউজি হয়ে যায়। সেই ফর্মুলা থিন সিন চেষ্টা করে গেছেন। সেকাজেই তারা এতদিন চেষ্টা করেছে ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেওয়া এবং ২০১৪ সালে আদমশুমারিতে রোহিঙ্গাদের গণনা থেকে মানে নাগরিক গণ্য করা থেকে বাদ দেওয়া।
ইতোমধ্যে থিন সিনের আমল ২০১৬ সালে এপ্রিলে শেষ হয়ে যায়। এরপর সু চির পছন্দের নিয়োগ দেয়া প্রেসিডেন্টের আমল আসে; যেখানে সব সিভিল ক্ষমতা কার্যত স্টেট কাউন্সিলর নাম ধারণ করে থাকা সু চির হাতে। সেই সু চি এর অফিস ও কফি আনানের আনান ফাউন্ডেশনের মধ্যে করা চুক্তিতে রাখাইন রাজ্য বিষয়ে এক পরামর্শক কমিশন গঠন করা হয় সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে। এটা কোন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ছিল না, স্থানীয় জাতীয় প্রতিষ্ঠান যার মোট নয় সদস্যের মধ্যে ছয়জনই স্থানীয়। এছাড়া বার্মায় চলমান দাঙ্গা বা হত্যার বিষয়ে কে দায়ী সেসব বিবেচনা করাও এই কমিশনের এক্তিয়ার দেওয়া হয় নাই। তবে কমিশনের কাজ হল “রাখাইন রাজ্য যেসব জটিল সমস্যার মধ্যে আছে এর জন্য সমাধান কী হতে পারে তা প্রস্তাব করা”। এই কমিশন তার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল করেছে গত আগষ্টের ২৪, ২০১৭ সালে। কিন্তু এই রিপোর্টে যাই লেখা থাক রোহিঙ্গাদের ঘরছাড়া করা আর তাদের শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার কাজ কৌশলে কোন বাধা এই রিপোর্ট হতে পারে নাই। কারণ ইতোমধ্যে এবারের গণহত্যা ও ক্লিনজিং অপারেশনে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে শরণার্থী বানিয়ে দেওয়ার পর ও সু চির সিভিল সরকার ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জানিয়ে দিয়েছেন আনান কমিশন তারা অনুসরণ করবেন। আর, কেবল যারা নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারবে কেবল তাদেরকেই সরকার ফেরত নিবে। ফলে আনান কমিশনের রিপোর্টে যাউই থাক তা অনুসরণ করতে সু চি সরকারের কোন সমস্যা নাই।

ইতোমধ্যে আরসা (Arakan Rohingya Salvation Army, ARSA) নামে এক সশস্ত্র সংগঠনের খবর উঠে এসেছে। “জঙ্গী” অভিযোগ থেকে দূরে থাকতে আরসা বলেছে, “তাদের সশস্ত্র বিদ্রোহ জেহাদ নয় বরং তারা জাতিগত মুক্তিকামী। মিয়ানমারের মধ্যেই রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব এবং মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য”। গত “২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রতিক্রিয়া থেকেই আরসার জন্ম বলে বিশেষ সাক্ষাৎকারে জানান সংগঠনের প্রধান নেতার মুখপাত্র ‘আবদুল্লাহ’। তিনি বলেন, আরসা ধর্মভিত্তিক নয়, জাতিগত অধিকারভিত্তিক সংগঠন”। এই সংগঠনের নেতৃত্বে দাবি করা হয়েছে যে গত ২৫ আগষ্ট ২৫-৩০ টা পুলিশ চৌকি ও একটা সামরিক চৌকিতে হামলা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে “আগস্টের হামলা ছিল আত্মরক্ষামূলক এবং রোহিঙ্গাদের অধিকার ফিরে পাওয়া পর্যন্ত এ যুদ্ধ চলবে বলে তারা ঘোষণা করেছে”। এই খবরটা বাইরের দুনিয়ায় এসেছে হংকংভিত্তিক অনলাইন পত্রিকা এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আবদুল্লাহ এক সাক্ষাৎকারে। আমাদের প্রথম আলো যেটা আবার অনুবাদ করে ছেপেছে। এই প্রসঙ্গে আমেরিকার এক পুরানা নীতির কথা জানা যায় যে তারা ১৯৯০ এর দশকে এক স্বাধীন আরাকানি রাষ্ট্র গড়তে রোহিঙ্গাদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে সহায়তা দিতে আগ্রহী ছিল। ১৯৯১ সালের বিএনপি সরকারের প্রধানমন্ত্রী অফিসের সচিব ছিলেন এমন একজনও খবরটা নিশ্চিত করেছেন যে স্থানীয় এমবেসির আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে এব্যাপারে কথা বলেছিল। ফলে আরসা  এর ততপরতার পিছনে আমেরিকান ব্যাকিং থাকা অসম্ভব নয়, মনে করা যেতে পারে। এছাড়া শাহবাগের ইমরানের নেতৃত্ব শাহবাগ আন্দোলন এবার রোহিঙ্গাদের সমর্থনে মিছিল করেছে এটাও আমেরিকান সমর্থন থাকার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। কারণ ইমরান মূলত এখন আমেরিকান ‘ইয়ুথ মুভমেন্টের’ এর অংশ। এটাই তার মূল ততপরতা। ওদিকে  আমেরিকান প্রশাসনে সাউথইষ্ট এশিয়ার দায়িত্বে আছেন এমন ডেপুটি এসিটেন্ট সেক্রেটারি প্যাট্রিক মার্ফি ওয়াশিংটনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক “বার্মা পরিস্থিতি নিয়ে প্রেস ব্রিফিং” করেছেন।  তিনি আবার বার্মা বিষয়ে প্রশসনের বিশেষ প্রতিনিধি এবং পলিসি কো-অর্ডিনেটরও। সেখানে প্রথমে এই সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংএ তিনি জানান যে  মিডিয়া ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো যেন রাখাইন রাজ্যের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত প্রবেশ করতে পারে এব্যাপারে বার্মা সরকারকে চাপ দেয়া এটা একেবারেই তাদের আশু ও প্রথম কাজের ফোকাস। তিনি বলছেন এতে পরিস্থিতি সম্পর্ক সঠিক এসেসমেন্ট করার সুযোগ আসবে। কথা খুবই সঠিক। কিন্তু তিনি এক নিঃশ্বাসে বিবিধ ধরণের আক্রমণের নিন্দা জানিয়ে  আসলে সব কিছু জটিল করে ফেলেছেন। (তিনি বলেছেন, “We continue to condemn attacks of a variety of nature – attacks on security forces; attacks on civilians; attacks by civilians”)।  যেমন মিডিয়া  বলেছে আরসাও নিজেরা বলেছে যে  সুনির্দিষ্টভাবে তারা পুলিশ ও সামরিক চৌকিওতে আক্রমণ করেছে, কোন সিভিলিয়ান কিছুতেও বা কারও উপরে নয়। তাহলে বার্মা সরকারের বা সেনাবাহিনীর পালটা প্রতিক্রিয়ায় নিরীহ সিভিলিয়ান মারা হল কেন, তাদের বসতি জালিয়ে ঘরছাড়া করা হল কেন? আর তা এতই মারাত্মক যে এপর্যন্ত তিন হাজার জনকে হত্যা করা হয়েছে আর তিন লাখ বাংলাদেশেই শরণার্থী হয়েছেন? কেন? তাহলে মার্ফি যেভাবে বলছেন, কোন সিভিলিয়ান আর এক সিভিলিয়ানকে মেরেছে বলা হচ্ছে? কথা এভাবে তুলে পুরা ব্যাপারটাতে তিনি বার্মা সরকারকে বাচিয়ে আবছা ভুতুড়ে করে দিয়েছেন। তাই নয় কী! ব্যাপারটাতে এতই দৃষ্টিকটুভাবে আমেরিকার তোষামোদি অবস্থান প্রকাশ হয়ে পড়েছিল যে ঐ সংক্ষিপ্ত ব্রেফিং শেষে পাঁচ সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন। তাদের একজন সিবিএস নিউজের সাংবাদিক, (Kylie Atwood with CBS News ) ঠিক এটা নিয়েই প্রশ্ন করে বসেন। তিনি বলেন, “আমি পরিস্কার বুঝার জন্য কথাটা বলছি, তার মানে তুমি বলতে চাচ্ছ যে সুনির্দিষ্ট করে মুসলমানদেরকে এখানে টার্গেট করা হয় নাই। আর তুমি মনে কর রাখাইন রিজিয়নের সবাই এখানে টার্গেট (বা আক্রান্ত) হয়েছে?” (I just want to clarify that at this point you do not think that Muslims are being targeted specifically; you think it’s anyone in the Rakhine region?)

স্বভাবতই এই প্রশ্নের কোন সরাসরি জবাব মার্ফি দেন নাই। যদিও ঘুরায় পেচায় অনেক কথা বলেছেন। আগ্রহীরা পাঠেকেরা তা লিঙ্কে গিয়ে দেখে নিতে পারেন। কিন্তু মার্ফির কথার সবচেয়ে বিপদজনক অংশ হল,  “attacks on security forces” – এই কথা কয়টা খুবই বিপদজনক এবং আইনি বিবেচনায় তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কোন নিরাপত্তা বাহিনী আক্রান্ত হলেই তারা নিরীহ সিভিলিয়ানদেরকে হত্যা করতে অথবা তাদের ঘরছাড়া শরনার্থী করতে পারে না। এটা তার ফোর্স এনগেজমেন্টের শর্তাবলি নয়। এখানে বরং শর্ত ভঙ্গ হয়েছে।  এটা একসেসিভ বলপ্রয়োগের অভিযোগে ঐ বাহিনী অভিযুক্ত হবার মত অপরাধ করেছে। অথচ এই কাজকেই উতসাহ দেয়া হয়েছে ঐ ব্রিফিং। আমেরিকার এভাবে তোয়াজ করে চলা সেটা এখানে স্পষ্ট।  এটাই সামনে এনেছে আমেরিকান প্রশাসনের অবস্থান দুর্বলতা কোথায়, যা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। নুন্যতম হিউম্যান রাইট রক্ষার পক্ষে আমেরিকা দাঁড়াতেই পারছে না।

তাহলে ব্যাপারটা দাড়িয়েছে এই যে বার্মার সর্বেসর্বা জেনারেলেরা (সু চি যাদের পকেটের খেলনা) বার্মার প্রাকৃতিক সম্পদ, সেখানে বাণিজ্য বিনিয়োগের সুবিধা বা ব্যবসা কাকে দিবে না দিবে সেটা নিয়ে তারা একসাথে মূলত চীন-আমেরিকা-ভারতকে বেধে ফেলেছে আর নাচাচ্ছে। ফলে জেনারেলদের বাহিনী কাকে হত্যা খুন নির্মুল গায়েব করবে এর এক নৈরাজ্যকর ক্ষমতা বলয় তৈরি করে নিতে পেরেছে তারা। এতে আজ চীন-আমেরিকা-ভারত কারই জেনারেলেরা বিরাগ হয় এমন কথা তুলার অবস্থা নাই। এই তিন শক্তির এক অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এখানে দেখা যায়।  এতে আজ মুসলমানদেরকে বাগে পেয়েছে বলে সব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে রোহিঙ্গারা। এতে অন্যেরা নিজেকে আজ প্রবোধ দিতে পারে যে রোহিঙ্গারা আমার ধর্মের কেউ না, অথবা এটা আমার জনগোষ্ঠির উপর হচ্ছেনা। কিন্তু তাদের কী কেউ আশ্বাস নিশ্চয়তা দিয়েছে যে আগামিকাল তারা আক্রান্ত হবে না? মনে রাখতে হবে প্রশ্নটা নীতির, রাষ্ট্র রাজনীতিতে একটা স্টান্ডার্ডের। কিসিঞ্জার কথাটা যা ভেবেই বলে থাকুক না কেন সেটা অনুসরণ করে আমরা অন্তত কিছুটা গ্লোবাল স্টান্ডার্ড তৈরির পথে আগিয়ে যেতে পারতাম, পারি। দুনিয়াতে গ্লোবাল ষ্টান্ডার্ড বা রীতি কনভেনশন তৈরিতে অবদান আমেরিকার তো কম নয়।

একথা সত্যি যে হিউম্যান রাইট ইস্যুর মধ্যেও অনেক দুর্বলতা আছে, ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের পক্ষে এর অপব্যবহার হয়। কিন্তু তবু রাইটের ইস্যুটা ফেলনা হয়ে যায় নাই। ফলে দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠাও দরকার, সামনে আগানোর পথ সেটাই। আমেরিকা আজ এর পক্ষে দাড়ালে চীনকেও সে বাধ্য করতে পারত যে রাইট ভায়োলেট করে কোন ব্যবসা বিনিয়োগ নয় – এটাই গ্লোবাল স্টান্ডার্ড হয়ে উঠতে পারত। দুনিয়াকে টিকিয়ে রাখা, আমাদের প্রত্যেকের জনগোষ্ঠি হিসাবে টিকে থাকার কমন স্বার্থগুলো তো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় নাই। যাবে না। আজকে গ্লোবাল পরিবেশ ইস্যু নিয়ে এবং এর ষ্টান্ডার্ডের জন্য সকলের কাজ করা এর প্রমাণ। ট্রাম্প তা ভাঙ্গার চেষ্টা করে কঠোর সমালোচনার শিকার।

চীন আমাদের কারও খালু নয়। চীন সম্ভাবনাময় গ্লোবাল অর্থনীতির নতুন নেতা হয়ে উঠবে হয়ত, কিন্তু সেটা সম্ভাবনা মাত্র। যেটা আবার সম্ভাবনার কিন্তু পাথর হয়েই তা আটকে থেকে যেতে পারে। একালে চীন একটা নীতি অনুসরণ করে বুঝা যায় যে, অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীন নিজের জন্য কোন  পলিটিক্যাল ষ্টেক বা ভাগীদার  (আমেরিকার মত) সে হতে চায় না।  তবে অর্থনৈতিক স্টেক ভাগীদারি তার প্রবলভাবে থাকে। না, এটা চীনের কোন মহানুভবতার লক্ষণ নয়। তা বলা হচ্ছে না। আপাতত রাজনৈতিক ভাগিদার না হলেও চীনের চলে। অর্থনৈতিক ষ্টেকের ভাগীদারি পেলেই চীনের গ্লোবাল  শক্তি ও সক্ষমতার নেতা ভালভাবে সে হতে পারবে, কম জটিলতায়; এটাই চীনের এমন নীতি অবস্থান অনুসরণের কারণ। তাই সে আপাতত পলিটিক্যাল ষ্টেক না নিবার নীতি নিয়ে আছে। ভবিষ্যতে অন্য রাষ্ট্রের ভিতর চীনের রাজনৈতিক স্টেক স্বার্থগুলো চীনের ভিতরে কীভাবে উদয় হয়, আর চীন তাতে কী অবস্থান নেয় তা দেখার বিষয়। এছাড়া সবকিছুই আমেরিকার অনুকরণে এখনকার মতই  হবে এমন কোন কথাও অবশ্য নাই। বরং কোন অগ্রসর অর্থনীতি আর আমাদের মত কোন অর্থনীতির প্রত্যেকটা বিনিময় সম্পর্ক একালে আগের মত একপক্ষীয়, সাম্রাজ্যবাদী বলতাম যাকে তেমন না হয়ে আরও ভিন্ন, শিথিল এবং  উভয় পক্ষের জন্য লাভালাভেরও নতুন রূপের কিছু হতেই পারে।  কিন্তু তাই বলে চীনের নিজের অথবা যার সাথে সে ব্যবসা করছে তার হাতে “রাইট ভায়োলেশনের বিষয়ের দিকে চীনের কোন ভ্রুক্ষেপ নাই, থাকবে না। আর এতে চীনের কিছু আসে যায় না – এই নীতি অনুসরণ করে চীন গ্লোবাল অর্থনীতির নেতা হতে পারবে না, এটা হতেই পারে না; তা আগেই বলে দেওয়া যায়। তাই চীনের যত সম্ভাবনাই থাক, সেক্ষেত্রে সম্ভাবনা তার ছিল কিন্তু হতে পারে নাই, পাথর হয়েই থেকে যেতে পারে। প্রাণ শুধু জীব জীবন নয়, ওর আরও অনেক কিছু লাগে। পাশে গণহত্যা চলবে আর আমরা তা উপেক্ষা করে মনোযোগ দিয়ে ব্যবসা বাণিজ্য করব এটা মানুষের সম্ভাবনার কথা হতেই পারে না। আমাদের অবশ্যই সকলের পালনীয় নানান বিষয়ে একএকটা ষ্টান্ডার্ড লাগবেই। সেটা আমরা সকলে যত তাড়াতাড়ি বুঝি ততই আমাদের জন্য মঙ্গল। অতএব সমাধান একটাই আজ অথবা কাল, যুদ্ধে বাধ্য করে অথবা আপোষে হিউম্যান রাইটের একটা স্টান্ডার্ডের পক্ষে আমাদের সকলকে আসতে হবে।
বার্মা বৌদ্ধত্বের ভিত্তিতে রাষ্ট্র করতে চাচ্ছে। এটাই সমাধান ভাবছে। আর ভারত হিন্দুত্বের ভিত্তিতে নিজের রাষ্ট্র সাজিয়ে বার্মার সমর্থক হতে চাচ্ছে। আশা করি এখান থেকেও আমাদেরও অনেক কিছু বুঝবার আছে। [শেষ]

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – দুই

প্রথম পর্বের জন্য এখানে ক্লিক করুন।

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – দুই

গৌতম দাস
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার

দ্বিতীয় পর্বঃ
কেন বার্মা ও এর শাসকেরা এরকমঃ পটভুমি

http://wp.me/p1sCvy-2hE

 

দ্বিতীয় পর্বঃ
কেন বার্মা ও এর শাসকেরা এরকমঃ পটভুমি

১৯৪৮ সালের বৃটিশ কলোনি শাসকমুক্ত মায়ানমারের জন্মের আগে থেকেই দমন নির্মুল আর নির্বিচারে হত্যা, এই রাষ্ট্রকে ধরে রাখার একমাত্র উৎস হয়ে গেছে ও আছে। বার্মা বিচ্ছিন্নতাবাদের সমস্যায় আকর্ণ ডুবে থাকার সমস্যা ওর জন্মের সময় থেকেই।  মায়ানমারের সবচেয়ে বড় এথিনিক জনগোষ্ঠি হল  ‘বার্মান’ বা ‘বর্মীজ’; এরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ ভাগ। এই বর্মী জনগোষ্ঠির রাষ্ট্র জন্মের পর থেকেই এর মূল সংকট হল অভ্যন্তরীণ অন্যান্য এথিনিক জনগোষ্ঠির সাথে সংঘাত;  অন্যভাবে বললে, বর্মীছাড়া অন্য এথিনিক জনগোষ্ঠিকে বর্মীজদের নিজেদের কর্তৃত্বের নিচে দাবায় রাখাকেই একমাত্র পথ হিসাবে বেছে নেওয়া – এটাই সব বৈরীতা ও সংঘাতের উতস। অথচ এক ফেডারেল ব্যবস্থা হতে পারত এর সহজ সমাধান। বৃটিশ শাসনামলেও মায়ানমারে কোথাও কোথাও স্বায়ত্বশাসিত প্রদেশ ছিল।  কিন্তু ১৯৪৮ সালে জন্মের পর থেকে মায়ানমারে কোন ফেডারেল ব্যবস্থা  চেষ্টা না করে বরং পুরানা স্বায়ত্বশাসন ব্যবস্থা ভেঙ্গে সবকিছু বর্মীজদের অধীনে আনার জবরদস্তির চেষ্টা করা হয়েছে। আর তা থেকেই শুরু হয়েছে Bamar. Chin. Kachin. Kayin. Kayah. Mon. Rakhine. Shan ইত্যাদি জনগোষ্ঠির বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র ততপরতা। পরে সামরিক ক্যু করে জেনারেল নে উইনের বিগত ১৯৬২ সালে ক্ষমতা দখলের পরও সেই বিচ্ছিন্নতাবাদে আকর্ণ ডুবে থাকা  অবস্থা থেকে বের হতে মায়ানমারের সরকারগুলো  “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” চর্চাকে উপায় হিসাবে হাজির করেছে। এই “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” এর আর নাম  “মায়ানমারিজম”। ফলে মায়ানমার রাষ্ট্রের আকার পরিচয় হয়েছে, “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী” ভিত্তিতে গড়া এক রাষ্ট্র। একমাত্র এতেই তারা ‘এক’ থাকতে পারবে  এমন আঠা বা গ্লু এর নাম হয়েছে “উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ”, আর এর জিগির। যদিও এই নামের আড়ালে আসলে এক তীব্র ইসলাম বিদ্বেষ চর্চা করে এসেছে তারা।  ব্যাপারটা পরিস্কার হবে মায়ানমারকে ধর্মীয় জনসংখ্যার দিক থেকে দেখলে। গত ২০১৪ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে মায়ানমারের প্রায় ৮৮ ভাগ বৌদ্ধ,  ৬ ভাগ খ্রীশ্চান ও ৪ ভাগ মুসলমান। জনগোষ্ঠির বড় অংশ বৌদ্ধ বলে, এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের বয়ান তৈরি করে ফেলা হয়েছে যা আবার ইসলাম বিদ্বেষী করে সাজানো – একে নিজের রাজনীতিক ভিত্তি হিসাবে বেছে নিয়েছিল নে উইন সরকার। নে উইনের অনুমান ছিল এতে মুসলমান বাদে সব বিচ্ছিন্নতাবাদী জনগোষ্ঠিগুলোকে (প্রায় সবাই আবার বৌদ্ধ বলে ) “বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ” এর পরিচয়ে বেধে রাখতে। এতে  পুরান বর্মীজ আধিপত্যটা উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদের (ইসলাম বিদ্বেষ) আড়ালে থেকে শাসনকাজ চালাতে পারবে। আবা ইসলাম বিদ্বেষী এই বয়ানটা  “বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদকে” উগ্র আর গাঢ় হতে সাহায্য করবে। মুসলমানেরা সব বৌদ্ধ জনগোষ্টির কাছে এক ইমাজিনড কমন শত্রু হিসাবে হাজির করবে।  এটাই অনেকে মায়ানমারিজম বলে। এই মায়ানমারিজম তৈরি করতে পারার প্রথম সফলতা আসে ১৯৭৭ সালে। একারণে ১৯৭৭ সাল থেকে নে উইন তৈরি রোহিঙ্গা সমস্যার প্রথম প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছিল এবং বাংলাদেশ রোহিঙ্গা শরণার্থী আসর জোয়ার দেখা গিয়েছিল। পরে ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় মায়ানমার বেশীর ভাগ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলেও, আবার ১৯৮২ সালের নতুন ইমিগ্রেশন আইন সবকিছুকে আগের চেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় নিয়ে যায়।  এরপর ২০০১ সালে আমেরিকার ওয়ার অন টেরর এর যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত থেমে থেমে সামরিক সরকারের রোহিঙ্গা নির্মুল অপারেশন বিভিন্ন সময় চলেছে। এরপর আগের ‘মায়ানমারিজম’ সাথে এবার বয়ানে ‘ইসলামি সন্ত্রাসের’ অভিযোগ তুলার সুযোগ যুক্ত হয়েছিল। ফলে তা নিজের দানবীয় উগ্রতার পক্ষে আরও সাফাই নিয়ে হাজির হয়েছিল। ইন্দিরা গান্ধীকে এক বৃটিশ সাংবাদিক ১৯৭১ সালের প্রথমার্ধে অভিযোগ করেছিলেন আপনি পুর্ব-বাংলার শরনার্থী লোকদেরকে সন্ত্রাসী হতে সাহায্য করছেন। ইন্দিরার জবাব ছিল, ওরা কোনটা আগে হয়েছে, শরনার্থী না মুক্তিযোদ্ধা? একথার মধ্যে সব জবাব আছে। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গারা বুশ-ব্লেয়ারের ২০০১ সালে ওয়ার অন টেররের যুদ্ধ শুরু আগে থেকেই রোহিঙ্গারা শরনার্থী হয়েছে। কাজেই একথাটা মোদি-সুচির সন্ত্রাসের বয়ান ও অভিযোগকে ভিত্তিহীন করে দেয়।

তাই বলা যায়, মায়ানমারের মুল সংকট রোহিঙ্গা বা মুসলমান ছিল না, নয়। বরং ‘মায়ানমানিজম’ এই বয়ান হাজির করার দরকারে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সমস্যা তৈরি করা হয়েছে। আর এটা বলা বাহুল্য ৮৮% বৌদ্ধ জনগোষ্ঠির দেশে ৪% মুসলমান নিজে ভিকটিমই হয়, অত্যাচারিত মজলুমই হয়। অন্যের উপর অত্যাচার নির্যাতনকারি বা অন্যকে নির্মুলের কর্তা সে হতে পারে না, সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যে সে সুযোগ বিরাজ করে না।

মায়ানমান পরিস্থিতি ২০০৬ -৭ সাল থেকে এক নতুন মাত্রা পায়। আর ততদিনে মায়ানমার ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনে জাতিসংঘের নিন্দা ও অভিযোগের মধ্যে আর  আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর ভয়াবহ রকমের অবরোধের অধীনে। এমনিতেই জেনারেল নে উইনের শাসনামলে (১৯৬২-৮৮) বার্মা ছিল বাকশালী সমাজতন্ত্রের মত এক ‘নে উইনি সমাজতন্ত্রের’ অধীনে;  আর এর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ঠ ছিল জেনোফোবিয়া বা বিদেশি-বিদ্বেষ। সেই থেকে আজ পর্যন্ত মায়ানমার এমন হওয়ার পিছনে ওর দুটা গঠন বৈশিষ্ট উল্লেখযোগ্য।

এর একটা হল জেনোফেবিক যার উৎস হল ভারতবিরোধীতা। ১৮২৪ সালে বৃটিশদের বার্মা দখল নিবার পর থেকে,  বার্মাকে ভারতের এক প্রদেশ (১৮২৪-১৯৩৭) বানিয়ে কলোনি শাসকেরা শাসন চালাত। [১৯৩৭ সালের পর থেকে বার্মা সরাসরি বৃটিশ শাসিত কলোনি হয়েছিল।] এতে ভারতীয় নেটিভদের মাধ্যমে বৃটিশরা শাসন করত, ফলে ভারতীয় কর্মচারি বা ব্যবসায়ীদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছিল সেখানে ইত্যাদি। আর এখান থেকে একধরণের ভারতবিদ্বেষী জেনোফোবিক বৈশিষ্ট বার্মার জনমানসে ও  রাজনীতিবিদদের মধ্যে গেড়ে বসেছিল। ফলে বৃটিশেরা ১৯৪৮ সালে বার্মা ছেড়ে যাবার পর পর বহু ভারতীয় বার্মা ছেড়ে পালিয়ে যায়। আর একই কারণে, ১৯৬২ সালে নে উইন সামরিক ক্যুতে ক্ষমতা দখলের পরে প্রায় চার লাখ ভারতীয় বার্মা ত্যাগ করেছিল অথবা মারা গিয়েছিল। (see Thant Myint-U’s recent fine historical travelogue, Where China meets India).

আর দ্বিতীয় বৈশিষ্ট হল, ১৯৪২ সালের আগে সেকালের জাপান – কলোনি সাম্রাজ্যের মালিক জাপান – এই কলোনি মাস্টারের হাতে সেকালের বার্মার স্বাধীনতা- যোদ্ধাদের সামরিক ট্রেনিং হওয়া। বৃটিশদের হাত থেকে বার্মাকে কেড়ে নিবার পরিকল্পনায়, জাপানিজ কলোনি মাস্টার  মার্শাল তেজোর বাহিনীর হাতে, বেছে নেওয়া ত্রিশজন রাজনৈতিক তরুণ সামরিক ট্রেনিং পেয়েছিল। যারা পরে দেশ ফিরে প্রথম সামরিক সংগঠন ‘বার্মীজ ইন্ডেপেন্ডেন্ট আর্মি’ বানিয়েছিল আর ১৯৪২ সালে জাপানিজ বাহিনীর সহায়তায় এরাই বৃটিশদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছিল। সু কি বাবা অং সান (Aung San) এর নেতৃত্বে উ নু (U Nu) আর নে  উইন (Ne win) ও রাখাইন রোহিঙ্গা আব্দুর রশিদ – টপ এদের নেতৃত্বে ছিল সেই ত্রিশজনের দল। এদের নেতৃত্বেই নতুন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ডিসেম্বর ১৯৪১ সালে বার্মার সামরিক বাহিনীর ‘বার্মীজ ইন্ডেপেন্ডেন্ট আর্মি’  (Burma Independence Army (BIA) গড়া হয়েছিল। বলা হয় জাপানিজদের দেয়া নির্মমতার ট্রেনিং, নির্যাতনের টেকনিক সেই থেকে বর্মীজ সেনাবাহিনীতে বৈশিষ্ট হয়ে যায়। পরে অবশ্য ১৯৪৫ সা্লে এসে এরা সবাই জাপান এম্পায়ারকে ছেড়ে বৃটিশ এম্পায়ারের পক্ষে সুইচ করেছিল। আর পরে এই ত্রিশ কমরেড এরাই ১৯৪৮ সালে নিগোশিয়েশন করে বৃটিশদের হাত থেকে বার্মাকে স্বাধীন করেছিল। আজও মায়ানমারে সব রাজনৈতিক সামাজিক গোষ্ঠির মধ্যে তাদের চিন্তা ও বয়ানে (সস্তাবুঝের) দেশপ্রেম ও জাতীবাদের উদাহরণ বা হিরো হয়ে আছে ঐ ত্রিশ জন। গেড়ে বসা ঐ ত্রিশজন সম্পর্কে নানান মিথ এবং তাদের চিন্তা ও বয়ান ভেঙ্গে নতুন করে তা ভেবে দেখা, ফিরে দেখা আর নতুন করে মুল্যায়নের সাহস না হওয়া পর্যন্ত মায়ানমারের রাষ্ট্র ও রাজনীতি তার নির্মমতা, নির্মুলের সামরিকতা থেকে মুক্ত হতে পারবে না।
কিন্তু এখনকার মূল প্রসঙ্গ হল, কলোনি শাসক জাপানিজদের হাতে জন্ম হবার কারণে ‘রাজনীতি’ বিষয়টাকে এই ‘ত্রিশ জেনারেল’ যতটা ক্ষমতা, সামরিকতার দিক থেকে বুঝেছিলেন ঠিক ততটাই যেন রাজনীতি বলতে একই সাথে আইডিয়া বা চিন্তাও – এদিকটা বুঝতে ব্যর্থ ছিলেন।  রাজনীতি মানে কেবল ক্ষমতা ও সামরিকতা নয়, এর অন্যদিকও আছে। অন্যভাবে বলা যায়, একারণে বলা যায় মর্ডান রিপাবলিক স্টেট অথবা আধুনিকতা সম্পর্কে ততটাই তাদের জানাশুনার অভাব দেখা যায় বা তারা কম আগ্রহী ছিলেন। এই ঘাটতির কারণে পরবর্তিকাল  ঐ ত্রিশজনকে দেখা যায় দুটা ঝোঁকের পক্ষে ভাগ হয়ে যেতে; যারা রাজনীতিতে গেলেন আর যারা সামরিক বাহিনীতে গেলেন, এভাবে। সামরিক ধারায় যারা ছিলেন যেমন এদের শিরোমনি জেনারেল নে উইন, তার অভিযোগ রাজনীতিবিদ ধারার শিরোমনি উ নু এর প্রতি যে এরা কম দেশপ্রেমিক, এরা নিজেকে নিয়ে বেশি ভাবে, এরা ক্ষমতা নিরঙ্কুশ রাখতে জানে না (অর্থাৎ কঠোর হাতে বিদ্রোহ দমন) ইত্যাদি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত বার্মার রাজনৈতিক ইতিহাস হল ঐ ত্রিশজন ও তাদের অনুসারীর – যারা রাজনীতিতে গেল আর যারা সামরিক বাহিনীতে গেলে এই দুভাগ হয়ে যাওয়া – আর পরস্পর পরস্পরের খামতি পুরণে দুপক্ষই অযোগ্য হিসাবে থেকে যাওয়া। যা একালেও রাজনীতিক বনাম সামরিক অফিসার এভাবে ভাগ হয়ে থেকে গেছে। মায়ানমার রাষ্ট্রের বৈশিষ্টেও এর বিরাট ছাপ রয়ে আছে।  মায়ানমারই সম্ভবত একমাত্র উদাহরণ যেখানে রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা কমান্ডার ইন চিফ আর রাজনীতিক রাষ্ট্রপতির মধ্যে ভাগ হয়ে আছে। এতে যেন খোদ রাষ্ট্রটাই ভাগ হয়ে আছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র এক ঠিকই কিন্তু তার আবার দ্বৈত-নির্বাহী।  এক ঘরে দুই পীর যেমন বসবাস করে থাকতে পারে না, দ্বৈত-নির্বাহীও তাই। নির্বাহী বা একজিকিউটিভ একজনই হয়, হতে হয়। নইলে সেটা ক্ষমতাই নয়। তাই কার্যত মায়ানমারে প্রধান একজিকিউটিভ হয়ে আছে সামরিক বাহিনী। যেমন ১৯৬২ সাল থেকে  সর্বেসর্বা হয়ে আছে এক মেলেটারী কাউন্সিল। এই কাউন্সিল হল আসলে পিছনে এক সামরিক বাহিনী আছে, যার মধ্যকার ক্ষমতার বিন্যাস বা সাজানো কাঠামোর শীর্ষ স্থানটাই হল কাউন্সিল। এরপর এর কাউন্সিলের অধীনে আবার একটা রাষ্ট্রও আছে। অর্থাৎ যেমন আমরা দেখতে অভ্যস্ত যে, রাষ্ট্রের ভিতরে সামরিক বাহিনী বলে এক প্রতিষ্ঠান থাকে। এখানে এর উলটা; সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠানের শীর্ষস্থানটা হল কাউন্সিল, আর সামরিক বাহিনী প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটা রাষ্ট্রও আছে।  এখানে আবার  কমান্ডার ইন চীফ আর কাউন্সিল কথাটা সময়ে পাল্টাপাল্টি করে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। যখন সামরিক ক্ষমতার একটা অংশ সিভিলিয়ান ফেসে হাজির রাখার অবস্থা তৈরি হয় তখন সামরিক বাহিনীর আবার একটা রাজনৈতিক দলও আছে। বাহিনীতে সক্রিয় চাকরিতে আছে এমন অফিসার আর অবসর নেয়া বুড়া জেনারেলরা এই দলের সদস্য হয়।  এর নাম Union Solidarity and Development Party (USDP)।  গত ২০১০ সালের আগে এটা সামরিক বাহিনীর এক এসোসিয়েশন নামে ছিল। এখন সেটাই এক রেজিষ্টার্ড রাজনৈতিক দল। আর সবচেয়ে বড় কথা হল,  কমান্ডার ইন চীফ চাইলে যে কোন নির্বাহী ক্ষমতায় নেয়া সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভেটো দিতে পারে। গত ২০১৫ সালে সংসদ ঐ  USDP দলের দখলে ছিল, তখন একটা প্রস্তাব উঠেছিল ভেটো ক্ষমতা রদ করা হবে কী না এনিয়ে। যদিও বাহিনী শেষ এই প্রস্তাব বাতিল করে দেয়।  তা নিয়ে বিবিসির ২০১৫ জুনের এই রিপোর্টটা আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
দ্বৈত- নির্বাহী ক্ষমতার কথা উঠেছিল, মায়ানমারের  কমান্ডার ইন চিফ নিজেই প্রতিরক্ষা, স্বরাষ্ট্র  ও সীমান্তরক্ষা এই তিন মন্ত্রী নিয়োগ দিয়ে থাকেন আর প্রেসিডেন্ট প্রধান নির্বাহি তিনি বটে, কিন্তু তিনি ঐ তিন মন্ত্রীকে মেনে নিয়ে এবার বাকী মন্ত্রী নিয়োগ দেন। ফলে নে উইনের হাতে আর্মির সেট করে দেওয়া এই বিশেষ রাষ্ট্র বৈশিষ্ট – ইসলাম বিদ্বেষী উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ -এর  ভিতরে অধীনে থেকে সু কি কে নোবেল প্রাইজের ধ্বজাধারী হতে থাকতে হয়, কাজ করতে হয়। এব্যাপারটা সুকি চায় কী চায় না তাতে কোন ফারাক আসে না। অর্থাৎ কার্যত সুকিও এই মায়ানমারিজম চায়। এজন্য গত সপ্তাহে বিবিসি লিখেছে, “মিয়ানমারে সাবেক ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত মার্ক ক্যানিং  বিবিসিকে বলেছেন তিনি (সু চি) রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন। ‘বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ’ সেদেশ যেভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে তাকে সমর্থন না করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে”। আবার একই কারণে সু চি এর জীবনীকার উইন্টেলের বরাতে বিবিসি ঐ রিপোর্টেই লিখছে,” ………তিনি (সু চি) এখন সেনা বাহিনীর পকেটে”। ………”মিস সু চি হাড়ে মজ্জায় বার্মিজ। আমার বলতে খারাপ লাগছে – কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারের পশ্চিমে রাখাইনে যা ঘটছে তা চরম জাতিবিদ্বেষী। সেখানে মুসলিম রোহিঙ্গাদের প্রতি সমন্বিত বিদ্বেষ রয়েছে”।

তাহলে ২০০৬ -৭ সাল থেকে মায়ানমার পরিস্থিতি নতুন কী মাত্রা পেয়েছিল? গণবিক্ষোভের মুখে ১৯৮৮ সালে নে উইন দৃশ্যত পদত্যাগ করলেও ক্ষমতা নেন তারই শিষ্য জেনারেলেরাই। ক্ষমতা ও রাজনীতি বলতে যারা একটাই জানে  – দমন ও নির্মুল – ফলে সেই পুরানা অভিজ্ঞতায় প্রায় কয়েক হাজার লোক মেরে দমিয়ে ‘রাষ্ট্রীয় আইন শৃঙ্খলা উদ্ধার কাউন্সিল’ এই নতুন নামে ক্ষমতা নেন এবার জেনারেল স মং (Saw Maung)। পরবর্তিতে অবশ্য তিনি নিজেই মাত্র ৫০০ জন ‘দুষ্ট লোক’ সরিয়ে ফেলার কথা নিজেই গর্ব করে পাবলিককে বলেছিলেন।  এই সময় থেকে কথিত ‘নে উইনি সমাজতন্ত্র’ তিনি নিজেই ও তার সরকারকে সরে যেতে, গড় হাজির হতে শুরু করিয়েছিলেন। আর  ১৯৯০ সালে এক সাধারণ নির্বাচন দেয়া হয়, কিন্তু বিরোধীরা জিতলেও ক্ষমতা হস্তান্তর না করে বরং সে নির্বাচন বাতিল বলে ঘোষণা করে দেয় জেনারেলেরা।  পরবর্তিতে ১৯৯৭ সালের পর থেকে মায়ানমার একের পর এক পশ্চিমের (আমেরিকা ও ইউরোপের) স্যাংসন বা বাণিজ্য লেনদেন অবরোধের মুখে পড়ে যায়। এই অবস্থায় বাইরের প্রায় সব রাষ্ট্রের সাথে মায়ানমারের বাণিজ্য বিনিয়োগ লেনদেন বন্ধ হয়ে পড়ে। একমাত্র ব্যতিক্রম থেকে যায় পড়শি চীন। ফলে একমাত্র চীনের ভিতর দিয়ে যতটুকু বাইরের দুনিয়ার সাথে বার্মার সংযোগ সম্পর্ক বজায় ছিল। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে মায়ানমারে চীনা বিনিয়োগ শুরু হয়েছে ২০০২-৩ সালের পর থেকে। এমন অবস্থায় ২০০৬ -৭ সালের দিকে এশিয়ার দুই রাইজিং অর্থনীতি হিসাবে  চীন ও ভারত নিজ নিজ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেকেই মায়ানমারের গ্যাস কেনার (বুকিং ও চুক্তি) জন্য প্রবল আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। এই সময় থেকেই অবরোধের ব্যাপারটাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখা শুরু হয়।

ততদিনে আবার, আমেরিকা নীতি পলিসিতে এশিয়ায় ভারতকে কাছে টেনে চীন ঠেকানোর চর্চা পোক্ত নির্দিষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে ভারতের মাধ্যমে বার্মার অবরোধ তুলে নেওয়ার এক ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। এই অবস্থানের পিছনে যে মুল্যায়ন কাজ করেছিল তা হল মায়ানমারের উপর অবরোধ দেওয়াতে কোন লাভ হচ্ছে না। বরং পশ্চিমের অবরোধের সুফল চীন একা খাচ্ছে। তাই ভারতের মধ্যস্থতায় অবরোধ তুলে নেওয়ার নতুন ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল। পশ্চিম পরিস্কার জানত, মায়ানমার কোন গণপ্রজাতন্ত্রী নয়, সামরিক বাহিনীর পকেটের রাষ্ট্র। তা সত্ত্বেও  সু চি কে কেবল ঐ কাঠামোর উপরে এক সিভিলিয়ান ফেস হিসাবে সামনে রেখে সামরিক ক্ষমতাটাই চালু রাখার পক্ষে নাম কা ওয়াস্তে এক সংস্কার করার পক্ষে কাজ শুরু হয়েছিল। এই হল সেই ফর্মুলা। কেন “দ্বৈত নির্বাহী” এই ভুতুড়ে ধারণার ক্ষমতার রাষ্ট্র হিসাবে আমরা এখনও মায়ানমারকে দেখছি – এর মূল কারণ এটা। যেমন এর আর এক বৈশিষ্টবলছিলাম যে, এই রাষ্ট্রে কমান্ডার ইন চীফ সরকারের কোন নির্বাহী সিদ্ধান্তের উপর ভেটো প্রয়োগ করতে পারে। অর্থাৎ নির্বাহী সরকার একমাত্র বা একক নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী নয়, এটা এক সতীনি ক্ষমতা বলেই এমন বাক্য রচনা এখানে সম্ভব হচ্ছে। আর ২০০৮ সাল থেকে চালু যে কনষ্টিটিউশনে এসব কথা লেখা আছে তা সংশোধন করতে গেলে ওতে শর্ত দেওয়া আছে যে, ৭৫% এর বেশী ভোটের সমর্থন থাকতে হবে। কিন্তু ৭৫% কেন? কারণ প্রাদেশিক অথবা কেন্দ্র সংসদে ২৫% আসন সব সময় বাহিনীর জন্য রিজার্ভ করে রাখা আছে। অর্থাৎ সারকথায় কমান্ডার ইন চিফ রাজী না থাকলে ঐ ২৫% এর একটু সমর্থনও পাবার কোন সম্ভাবনা নাই, ফলে কোন সংশোধনীও সম্ভব নয়।

আসলে সব কথার এক কথা বা সেই মূল কথাটা হল, ২০০৮ সালে চালু করা হয়েছিল এই কনষ্টিটিউশন। আর তা একা মনের মাধুরি মিশিয়ে সামরিক বাহিনীই এককভাবে নিজের খাতিরে লিখেছিল। কিন্তু যারা কনষ্টিটিউশন লিখেছে এরা কারা? এদের হাতে ক্ষমতা দিল কে, কী তাদের ক্ষমতার ভিত্তি – এসব প্রশ্নের ভিতরে সব জবাব আছে। যার সোজা অর্থ মায়ানমার এখনও প্রি-ষ্টেট মানে রাষ্ট্রগঠনের আগের অবস্থায় বা কোন গণপরিষদ বা সংবিধান সভা বসার আগের অবস্থায় আছে।  এই অর্থে মায়ানমার এখনও কোন মর্ডান রিপাবলিকই নয়।

ফলে এই রাষ্ট্রের কাছে মানবাধিকার, জনগণের মৌলিক অধিকার এসব কথা অর্থহীন। আর ‘ডেমোক্রাসির নেতা সু চি’ এই শব্দ আর বাক্যগুলো তো আরও হাস্যকর।

অতএব পশ্চিম সংস্কারের নামে যেটা করেছে সেটা হল ঐ সামরিক স্বৈরক্ষমতাকে সিভিলিয়ান সু চির টোপর পরিয়ে ঐ ক্ষমতাকে উদ্ভোধন বা হালাল করে দিয়েছিল। বিনিময়ে তারা নিজের ব্যবসা বিনিয়োগের করার সুযোগ বুঝে নিয়েছিল। এমনকি এই লক্ষ্যে কোন ধরণের সংস্কারের কাজ শুরু হবার আগেই এমনকি তা আসলেই কতটুকু কী সংস্কার হয় তা দেখার আগেই ২০১০ সালেই আমেরিকাসহ সারা পশ্চিম নিজের বিনিয়োগ নিয়ে  মায়ানমারে ঢুকে পড়েছিল। তবে এটা নিয়ে চীনের সাথে মায়ানমারের জান্তার কোন বিরোধ দেখা দেয় নাই। চীনের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক অটূট রেখে আপোষেই তা হয়েছিল। জেনারেলেরা বিশেষ করে প্রাক্তন জেনারেল ও প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি থেন সিন (যিনি ২০১৬ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ছিলেন) চীনকে বুঝাতে পেরেছিল যে পশ্চিমের অবরোধ উঠে যাওয়া মায়ানমারের জন্য কতটা জরুরি। ফলে চীন যেন জায়গা ছেড়ে দেয়।  চীনও সেটা সহজেই মেনে নিয়ে জায়গা ছেড়ে দিয়েছিল। আর এসবের ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই হঠাত কেবল ২০১০ সালেই মায়ানমারে বিদেশি ডাইরেক্ট বিনিয়োগ হয়েছে ২০ বিলিয়ন, আর এর অর্ধেক হল একা চীনের।

কিন্তু ভারতের অর্জন কী এতে? না তেমন কোন বৈষয়িক বিনিয়োগ ব্যবসা, না প্রভাব – কোনটাই অর্জন হয় নাই ভারতের।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি গত ৬ সেপ্টেম্বর তিনদিনের মায়ানমার সফরে গিয়েছিলেন। চলতি রোহিঙ্গা গণহত্যা ও শরনার্থী হওয়া প্রসঙ্গে,   সু চি বলেছেন,  “অসত্য খবর প্রচার করে রাখাইনে উত্তেজনা ছড়ানো হচ্ছে”। সু চি হামলাকারিদের “টেররিস্ট” বলেছেন। আর মোদি বলেছেন, “তিনি সু চি এর পাশে আছেন”।  কিন্তু এই সাফাই যুগিয়ে দেয়ায় ভারতের কোন লাভ হয় নাই। তবে মায়ানমার সফর থেকে মোদি কী অর্জন করতে চান এই প্রশ্নে বিবিসি কলকাতায় বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিককে সাক্ষী মেনে অনেক কথা বলিয়ে নিয়েছেন। সুবীর ভৌমিক এই কথাগুলো ভারতীয় গোয়েন্দা বাহিনীর তরফ থেকে আমাদের কাছে পৌছাতে চেয়েছেন, এটাও ধরে নিতে পারি। সুবীর বিবিসিকে বলছেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফরের ঠিক আগে দিল্লির পক্ষ থেকে এসব বক্তব্য বিবৃতির মূল্য উদ্দেশ্য বৌদ্ধ অধ্যুষিত মিয়ানমারের সাথে অধিকতর ঘনিষ্ঠতা”। মি ভৌমিক বলছেন, “রোহিঙ্গা সঙ্কট নিয়ে চীনের মৌনতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে বিজেপি সরকার”। “মুসলিমদের প্রশ্নে বার্মিজ জাতীয়তাবাদী এবং কট্টর বৌদ্ধরা মি মোদি এবং তার দল বিজেপির সাথে একাত্ম বোধ করে”। ভারত যে সম্প্রতি বিশেষ অভিযানের জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলেছেন, সেটাকেও দেখা হচ্ছে রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের সেনা অভিযানের প্রতি দিল্লির সমর্থন হিসাবে”। উপরে সি রাজামোহনের লেখায় দেখেছিলাম ভারতের বিনিয়োগ মুরোদহীনতার কথা। অর্থাৎ ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রশ্নে কোন অর্জন নাই। বরং বর্মীজ জেনারেলদের ইসলামবিদ্বেষী উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়ার জন্য ভারত কাজ করছে। এই কাজটাই ২০০৮ সাল থেকে ভারত করে জেনারেলদের মনোরঞ্জনের চেষ্টা করে আসছে। এ কারণে ২০১২ সালে রোহিঙ্গা হত্যার বড় ঘটনাগুলো ঘটতে পেরেছে বলে মনে করা হয়।

এবারের নতুন সংযোজন মায়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তে মায়ানমার মাইন পুতে রেখেছে। মায়ানমার অল্প কিছু রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটা যে মাইন ব্যবহার নিষিদ্ধ জাতিসংঘের কনভেনশন স্বাক্ষর না করা দেশ। বাংলাদশ এখন পর্যন্ত এনিয়ে জাতিসংঘে নালিশ বা সদস্যদের মধ্যে প্রচার করতে যায় নাই। পলায়নপর আশ্রয়প্রার্থিদের জন্য মাইন পুতে রাখা হয়েছে, এরা কী কোন বিদ্রোহী? অর্থাৎ নিরীহ সাধারণ মানুষ কোন আশ্রয়ও না পাক, মায়ানমারের হাতেই তাকে মরতে হবে এই স্যাডিজম এখানে কাজ করছে।  আর এই স্যাডিজমকে মোদি বলেছেন, “তিনি সু চি এর পাশে আছেন”। তার মানে ব্যাপারটা দাড়াল যেহেতু ভারতের নিজ বিনিয়োগের সক্ষমতায় প্রতিদ্বন্দ্বীর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাড়ানোর মুরোদ নাই, তাই তাকে নিজের নাক কেটে হলেও অন্যের যাত্রা ভঙ্গ করতে হবে। বর্মী জেনারেলরা গণহত্যার ক্লিনজিং অপারেশনের অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে থাকছেন ক্রমাগত, ভারতের এই মনোরঞ্জনে কোন জেনারেলের দায় কী কমছে? অথবা বার্মার সাথে চীনের সম্পর্কে কোন ফাটল? ভারতের উতসাহে বার্মার জেনারেলরা গত ফেব্রুয়ারির রোহিঙ্গা হত্যা অপারেশন ঘটানোর পরেও কী, এই এপ্রিলে চীনের সাথে বর্মার প্রেসিডেন্ট ১০ বিলিয়ন ডলারের বন্দর নির্মাণ চুক্তি করেন নাই?  তাহলে ভারতের রাজনৈতিক নেতারা তাদের অর্জন কোনটাকে ধরেন? স্যডিজমে অন্যের শরীরে কষ্টের পিন ফুটানোতে সুখ?

[এই লেখা এপর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হয়েছে। তবে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। সেটা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদ জাগাতেই রোহিঙ্গা সাফা করা – এক

গৌতম দাস

১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০১:৪৫

http://wp.me/p1sCvy-2hx

 

গত ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে এবারের পর্যায়ে, রোহিঙ্গা শরণার্থীর ঢল ক্রমে বেড়েই চলেছে। গত প্রায় দুই সপ্তাহের মধ্যে জাতিসংঘের হিসাবে, শুধু এই ক’দিনেই তা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে চাচ্ছে। কয়েক বছর ধরে রাখাইন (আগের নাম আরাকান রাজ্য)  রাজ্যের  রোহিঙ্গাদের নির্মূল করতে অত্যাচার নির্যাতন ও গণহত্যায় আরো নৃশংস হয়ে উঠেছে। জাতিসঙ্ঘের ভাষায়, দুনিয়ার সবচেয়ে নির্যাতিত ও নির্মূল হয়ে যাওয়া সহ্য করা জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা। একালে মানে ২০১২ সাল থেকে নতুন করে শুরু নির্মুল ততপরতার এই পর্যায়ে এমন অভিযান বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ হল, মিয়ানমারে চীনা বিনিয়োগে সেখানে চীনের প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় ভারতের অস্বস্তি। আর তা কাটাতে ভারত নীতি নিয়েছে, মিয়ানমার সরকারকে উৎসাহ ও সমর্থন দিয়ে এই হত্যাযজ্ঞকে বাড়িয়ে বার্মা বা মায়ানমারে সুনির্দিষ্ট করে রাখাইন প্রদেশকে অস্থিতিশীল করে দেওয়া। অজুহাত রোহিঙ্গা ‘মুসলমান মাত্রই এরা সন্ত্রাসী’। অর্থাৎ সন্ত্রাসবাদ নির্মুলের আড়ালে ফেলে বার্মার রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠির উপর ক্লিনজিং বা সাফা অভিযান পরিচালনা করতে সাহায্য করা।

এমন পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি মিয়ানমার সফরে এসে আক্ষরিকভাবেই সু চির পাশে দাঁড়িয়ে জানিয়েছেন, “তিনি সু চির পাশে আছেন”। সম্প্রতি বার্মা ভ্রমণরত বিবিসির সাবেক সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘ভারতের মূল উদ্দেশ্য মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বলয়ে ফাটল ধরানো’। ‘সম্ভাব্য উদ্দেশ্য- ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ভাবাবেগ ব্যবহার করে বার্মিজ জাতীয়তাবাদীদের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা।’  অর্থাৎ অর্থনৈতিক সুবিধা হারানোর জন্য অথবা অন্যের পাওয়াতে কেউ গণহত্যা ও নির্মূল অভিযানের সমর্থক হতে পারে মিয়ানমারে এর উদাহরণ সৃষ্টি করেছে ভারত।

অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসাবে চীনের উত্থান ঘটেছে চলতি এই শতক থেকে। ফলে গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বদলে গিয়ে নতুন গ্লোবাল লিডার হিসাবে চীনা নেতৃত্বে তা আবার সাজানো আসন্ন হয়ে উঠেছে।  উত্থিত এই চীনের বার্মায় (মিয়ানমারে আগের নাম)  চীনা বিনিয়োগের দৃশ্যমান ভাবে শুরু ২০০৩ সাল থেকে। কিন্তু আরও পরে সম্প্রতিকালে চীনের বিনিয়োগ সুনির্দিষ্ট করে ঘটেছে বার্মার রাখাইন রাজ্যে। কারণ মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশেরই পড়শি হল, চীনের ল্যান্ডলকড প্রদেশ ইউনান যার রাজধানী কুনমিং। এ রাজ্যে বৌদ্ধ রাখাইন আর মুসলিম রোহিঙ্গাদের বসবাস।  সমুদ্র উপকূলব্যাপী বিস্তৃত রাখাইন রাজ্য কুনমিংকে ল্যান্ডলকড দশা থেকে মুক্ত করবে – এজন্য রাখাইন রাজ্যে চীনের এই বড় বিনিয়োগ।  এখানে চীনের বড় বিনিয়োগ প্রজেক্ট যেগুলো এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – কিয়াকপিউতে (Kyaukpyu) এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, বিশেষ অর্থনৈতিক এলাকা বা শিল্পপার্ক স্থাপন যেখানে কম্পোজিট টেক্সটাইল ও তেল শোধনাগারের মতো ভারী শিল্প স্থাপন করা যায়। এছাড়া ঐ বন্দর থেকে চীনের কুনমিংয়ে তেল শোধনাগার পর্যন্ত ৭৭০ কিলোমিটার লম্বা তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন ইতোমধ্যেই চালু হয়ে গেছে। রাখাইন সমুদ্র উপকুলে সম্ভাব্য ঐ গভীর সমুদ্রবন্দরের অবস্থান যেখানে ওর নাম কিয়াকপিউ বা Kyaukpyu ।

চীনের কাছে এই প্রজেক্টগুলো আরো গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে, এই পাইপলাইন হবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল চীনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে, নৌজাহাজে মালাক্কা প্রণালী ও সিঙ্গাপুর ঘুরে পূর্ব চীন সাগরের বন্দর মানে চীনের মুল বন্দরে যাওয়ার বদলে বিকল্প ও শর্টকাট পথ। কারণ এই বিকল্প পথ কয়েক হাজার কিলোমিটার নৌপথই বাচাবে না, এতে কয়েক হাজার কিলোমিটার দূরত্ব কমে যাওয়ায় এই তেলের ল্যান্ডিং কস্ট অনেক কম হবে। এ ছাড়া স্ট্রাটেজিক নিরাপত্তার দিক আছে। এতে তেলবাহী জাহাজকে আর ব্যস্ত ও সঙ্কীর্ণ বা চিকন গলার মালাক্কা প্রণালী পার হতে হবে না বলে পাইপলাইনে নেয়া তেলের নিরাপত্তা বেশি হবে। চলতি ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে মিয়ানমারের নতুন প্রেসিডেন্টের চীন সফরকালে মায়ানমারকে প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এনিয়ে দীর্ঘ বিতর্কের অবসান করে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আসলে বিগত ১০ বছর ধরে ঝুলে ছিল এই পরিকল্পিত প্রকল্প। নানান সেসব বাধা কাটিয়ে পাইপলাইন পাতার চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল এবং তেল পাইপলাইন পাতার কাজ গত ২০১৫ সালের সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু এই পাইপলাইন নির্মাণ শেষ হলেও তা এতদিন চালু হয় নাই কারণ, হুইল চার্জ বা বার্মার ভুমি ব্যবহারের জন্য বার্ষিক প্রদেয় রাজস্ব কত হবে এই নিয়ে বিতর্ক ছিল। যদিও আবার  তেল পাইপলাইন এই বছর চালু হলেও মিয়ানমারের নিজস্ব গ্যাস ২০০৯ সাল থেকেই ওই তেল পাইপলাইনের প্যারালাল করে পাতা আলাদা গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে কুনমিংয়ে ইতোমধ্যে যাচ্ছে, চালু আছে। মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের ২০১৭ এপ্রিলের ওই সফরেই কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে ৭.৩ বিলিয়ন ডলারের আর বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার ২.৩ বিলিয়ন – এভাবে মোট প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ চুক্তি হয়।

নির্মিতব্য বন্দরের ৮৫ ভাগ মালিকানা চীনা কোম্পানি (China International Trust and Investment )  বা CITIC কে দিতে মিয়ানমার রাজি হয়েছে। চীনের নিজস্ব সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট “বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ”; এতে সংশ্লিষ্ট প্রায় ৬৫টি দেশজুড়ে তা বয়ে যাবে। ঐ নৌ-সড়ক মেগা-অবকাঠামোর সাথে কিয়াকপিউ বন্দরও যুক্ত হওয়ার কথা।
২০১৭ সালের মে মাসে চীনা ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের’ প্রথম সম্মেলন হয়ে যাওয়ার পর থেকে ভারত সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধিতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি, এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। কিন্তু কী দিয়ে সে বাধা দিবে? কারণ এটা অর্থনৈতিক সক্ষমতার আর এথেকে জাত প্রভাবের। ফলে  চীনের উত্থানকে ভারতের অমান্য করা সম্ভব যদি পাল্টা একমাত্র অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে চীনকে ছাড়িয়ে যাওয়া না হলেও অন্তত সমান্তরাল অর্থনৈতিক সক্ষমতায় ভারত পৌঁছাতে পারে।

কিন্তু সেপথ ভারতের জন্য আপাতত দুরস্ত; সময় সাপেক্ষ এবং যদি কিন্তু ব্যাপার। সারকথায় এখনকার ইস্যুই না। কিন্তু ব্যাপারটাকে অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয় হলেও আর সে সক্ষমতা আমার আপাতত না থাকলেও স্যাবোটাজ করে হলেও বাধা দেওয়া – এই চুলকানি তো তোলাই যায়।  ব্যাপারটা নিয়ে আমেরিকার অস্বস্তিও কম না। যেমন আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল মেরিটাইম বাণিজ্য বিনিয়োগের যে কমিউনিটি আছে, সে কমিউনিটিতে চালু এমন এক ম্যাগাজিন হল মেরিটাইম-একজিকিউটিভ। ঐ পত্রিকা চীনের কিয়াকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর প্রজেক্টকে কিভাবে দেখছে তা নিয়ে এক রিপোর্ট করেছে; এর শিরোনাম “মায়ানমারে স্ট্রাটেজিক পোর্টের নিয়ন্ত্রণ খুজছে চীন” ( China Seeks Control of Strategic Port in Myanmar)। ষ্ট্রাটেজিক শব্দটার সোজা ভাবার্থ “একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনা” করা যেতে পারে। বিনিয়োগ প্রকল্প যত বড় ধরণের হয় যেমন গভীর সমুদ্র বন্দর ততই ব্যাপারটা শুধু অর্থনৈতিক না থেকে ঐ প্রকল্প সেফ বা নিরাপদ থেকে করতে পারারবিষয়টাও মুখ্য হয়ে উঠে। অর্থাৎ সামরিক নিরাপত্তার দিকটাও প্রবল হয়ে উঠতে থাকে। সব মিলিয়ে একটা ‘একান্ত রাষ্ট্রস্বার্থে নেয়া পরিকল্পনার’ দিক তৈরি হয়।  এর প্রতিক্রিয়ায় এখন পুরান কুতুব আমেরিকা অথবা ভুয়া কুতুব ভারত (এমনকি সত্যিকারের কোন হবু কুতুব) সবারই ব্যাপারটায় ঈর্ষা অস্বস্তি হয়। মেরিটাইম-একজিকিউটিভ এর ঐ রিপোর্টকে সে জায়গা থেকে দেখা যায়। সে বলছে,
The deal would give China control over an oil receiving terminal that feeds a cross-border pipeline to Yunnan province, bypassing the Strait of Malacca, the strategic choke-point between the Indian Ocean and the Western Pacific. ………In addition, the ongoing unrest in Rakhine – including alleged human rights abuses perpetrated by the Myanmar government against the region’s Rohingya Muslim minority – brings added uncertainty and controversy to the proposal.

এতে প্রথম বাক্য অংশটাতে, চীনের নতুন জ্বালানি তেল পরিবহণ পথ এখানে সিঙ্গাপুরে মালাক্কা প্রণালী এই স্ট্রাটেজিক চোকপয়েন্ট এড়িয়ে যাওয়াতে, চীনের গলা চেপে ধরার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার একটা দুঃখ আমরা লক্ষ্য করতে পারি। কিন্তু পরের বাক্য বেশি গুরুত্বপুর্ণ। বলছে, “চলমান রাখাইন অসন্তোষ – যেখানে ঐ অঞ্চলের রোহিঙ্গা মুসলিমদের উপর পরিচালিত বার্মা সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ আছে – এটা ঐ চীনা প্রকল্পে বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ করেছে”।  তার মানে  “বাড়তি অনিশ্চতা ও বিতর্ক যোগ” করার স্বার্থ যাদের তাদের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

সম্প্রতি  গত মে মাসে চীনের বেল্ট এন্ড রোড উদ্যোগের প্রথম সম্মেলন হয়ে যাবার পর থেকে ভারত এবার সরাসরি এশিয়ায় চীনের বিনিয়োগ প্রভাব বেড়ে যাওয়ার বিরোধীতা করার সিদ্ধান্ত নেয়। ভারতের যুক্তি এশিয়ায় তার ‘পড়শি প্রভাব বলয়ের’ অঞ্চলেও চীনের ক্রমবর্ধ্মান প্রভাব ও প্রবেশ সে মানবে না। যদিও ভারতের এই সিদ্ধান্ত আসলে অর্থহীন। চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যা থেকে চীনের এসব প্রভাব উতসারিত তা ভারতসহ কারও মানা না মানার বিষয় নয়, কারণ এটা বস্তুগত বাস্তবতা কোন সাবজেকটিভ বা ব্যক্তির ইচ্ছাপ্রসুত কিছু না। ফলে অন্যের বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতার পালটা হতে পারে নিজে বস্তুগত অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন। অর্থাৎ এটা বস্তুগতভাবে অর্জন করে ভারতকে দেখাতে হবে। এমনকি চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে কোন ঈর্ষার চর্চা, কোন স্যাবোটোজ, কাউন্টার ইন্টেজেন্স, অন্তর্ঘাতমূলক কাজ, বিদ্রোহ বা এনার্কিতে উস্কানি অথবা গণহত্যা ও ক্লিনজিংয়ে ‘আমরা পাশি আছি’ বলে দাঁড়ানো ইত্যাদি এগুলোর কোনটা দিয়েই তা ভারতের অর্জিত হবে না, পথও নয়। বরং এটা ভারতের জন্য খুবই বিপদজনক ও আত্মঘাতি রাস্তা।

প্রো-আমেরিকা ভারতের একাদেমিক, প্রভাবশালী থিঙ্কট্যাঙ্ক  ব্যক্তিত্ব ও ষ্ট্রাটেজিক থিঙ্কার সি রাজামোহন, বিষয়টাকে তিনিও মানেন। তিনি এবিষয়ে তার লেখা সাপ্তাহিক কলামে (চীনের সাথে ভারতের সক্ষমতার গ্যাপটা খেয়াল কর শিরোনামে ) ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করে ভারতের রাজনীতিবিদদের সাবধান করেছেন। তিনি দশ বিলিয়ন ডলারের চীনের এই কিয়াকপিউ বন্দর প্রজেক্ট সম্পর্কে সরাসরিই বলেছেন,  “দিল্লীর আসলে কিয়াকপিউ প্রজেক্টে চীনের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায়  যাওয়ার মুরোদ নাই। একনকি অন্য কোন আন্তর্জাতিক খেলোয়ারও চীনের বিকল্প হয়ে হাজির হতে পারবে না।……  যদি চীন যেভাবে কথা দিয়েছে তা মেনে কিয়াকপিউ বন্দরকে সে সিঙ্গাপুর বা হংকংয়ের মত বাণিজ্যিক হাব হিসাবে গড়ে তুলতে থাকে তবে ভারতের নীতি নির্ধারকদেরকে এনিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্টই করতে হবে। বিশেষত এখানকার বাণিজ্যিক স্বার্থ নিশ্চিত করা ও বিনিয়োগকে  নিরাপদ করতে ভবিষ্যতে চীনকে প্রয়োজনীয় সমতুল্য মেরিন ও সামরিক শক্তি সমাবেশ ঘটাতেও হবে”। কিন্তু তবু চীনের সাথে ভারতের সামর্থের ফারাকের কথা খেয়াল রেখে পথচলার পরামর্শ রেখেছেন তিনি। কিন্তু সেকথায় কান দিবার অবস্থায় মোদি সরকার অথবা ভারতের হামবড়া আমলা-গোয়েন্দাদের নাই। এই অবস্থায় বিনিয়োগ সক্ষমতা না থাকা ভারতের যদিও গোয়েন্দা সংগঠন দিয়ে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ  আর দাঙ্গায় উস্কানি, গণহত্যায় নির্মুল করা দিয়ে পরিস্থিতি অশান্ত করে তোলা ছাড়া ভারতের হাতে অন্য কিছু নাই। মোদি এই পথেই হাটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এবারের পর্যায়ে আবার নতুন করে প্রায় তিন লাখ হতে যাওয়া রোহিঙ্গাকে শরনার্থী বানানো সে পরিকল্পনারই ফলাফল।

গতকালকে সু চির সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মিডিয়াতে দাবি করে বলেছে রোহিঙ্গারা নাকি “নিজেরা নিজের বসত ঘর পাড়ায় আগুন দিয়ে স্বেচ্ছায় রিফিউজি হতে বাংলাদেশ সীমান্তে গিয়েছে। বাংলাদেশের নিউজ২৪ টিভিতে ঐ উপদেষ্টার বক্তব্যের ক্লিপ দেখিয়েছে। সব দোষের দোষী, “জাত খারাপ” রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পর্কে আর কত হাস্যকর আজীব অভিযোগ শুনতে হবে কে জানে। কিন্তু রাখাইন রাজ্যের হিন্দুদেরকেও কেন উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা উতখাত করল?  তারাও যে বাংলাদেশে রিফিউজি হয়ে এসেছে এটা সম্পর্কে বাংলাদেশের হিন্দু খ্রীশ্চান বৌদ্ধ ঐক্য পরিষদের নেতা রানা দাসগুপ্তের সাক্ষ্য ও অভিযোগের ভিডিও মিডিয়াতে আমরা দেখেছি। এরা কী কেন কোন সুখে (নিজের ঘরে!) আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন আমাদের জানার বাইরে, যদিও সু চির দাবি সে এটা জানে।। ভারতের মোদির চোখে এরাও তাহলে সন্ত্রাসবাদী! অর্থাৎ মানে দাড়াল, “মুসলমান মানেই সন্ত্রাসী” মোদি-সুচির সস্তা ফর্মুলার উপর দাঁড়ানো এই  বয়ান – এবার এরা নিজেরাই মিথ্যা ও অচল বলে প্রমাণ করছেন। মায়ানমারের বৌদ্ধ মং দের সংগঠন মা-বা-থা গোষ্ঠি এরা বিজেপি-আরএসএস শিবসেনার মত তবে এরা বার্মার সামরিক বাহিনীর প্রচন্ড পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া সংগঠন; চরম ইসলাম বিদ্বেষী এক উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী। সারাক্ষণ রাখাইন রাজ্যে এরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বিষ উগলে যাচ্ছে। সরকার ও সেনাবাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতায় এই গোষ্ঠি তৈরি করা হয়েছে। এরাই রাখাইন রাজ্যের স্বল্প হিন্দু জনগোষ্ঠিকেও রেহাই দেয় নাই। রাখাইন রাজ্যের খুবই সংখ্যালঘু এই জনগোষ্ঠির পাঁচশ এর মত হিন্দুর শরনার্থী হওয়ার এই ঘটনা মোদি-সু চির ইসলাম বিদ্বেষী ঘৃণ্য এলায়েন্সকে ফুটা করে দিয়েছে। মোদি-সু চি কে অবশ্যই ব্যাখ্যা দিতে হবে কারা কোন সুখে হিন্দু-মুসলমান রাখাইনরা  নিজের ঘরে আগুন দিয়ে শরনার্থী হয়েছেন!

[প্রথম পর্ব এখানে শেষ করা হল। দ্বিতীয় পর্ব প্রকাশ করা হয়েছে  ইতোমধ্যে। এখানে দেখুন। এই পর্যন্ত দুই পর্বের মধ্যে চীন ও ভারতের প্রসঙ্গই মূলত বিস্তারিত করে শেষ করা হল। তাতে আর একটা প্রসঙ্গ এখানে বাকি থেকে গেছে। সেটা হল, আমেরিকার ভুমিকা। তা নিয়ে আর এক পর্ব অর্থাৎ তৃতীয় ও শেষ পর্ব আলাদা করে লেখা হবে। আগামি দুদিনের মধ্যে তা আসবে।]

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  তথ্যসহ বহু আপডেট করে দেয়া হয়েছে, কয়েক পর্বে।  আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

মধ্যপ্রাচ্য এখন প্রিন্সদের কর্তৃত্বে, রাজতন্ত্রের সমাপ্তি কি আসন্ন

মধ্যপ্রাচ্য এখন প্রিন্সদের কর্তৃত্বে, রাজতন্ত্রের সমাপ্তি কী আসন্ন

গৌতম দাস

০৮ আগষ্ট ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2h3

 

ইউরোপের রাজতন্ত্রের (monarchy) শেষ যুগের দিকের এক ঘটনা হল, প্রিন্সরা ক্ষমতা ও রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে রেনেসাঁস (1350-1700) যুগের প্রিন্সেরা। বলা বাহুল্য রেনেসাঁস পিতার চেয়ে পুত্রকেই বেশি প্রভাবিত করবে। তাই পুত্রের সঙ্গে পিতার প্রায়শ তাদের দৃষ্টিভঙ্গীর ভিন্নতার কারণ  অথবা তাঁরা ‘ভাল বুঝে’ বলে অনেক মুরব্বিরা জায়গা ছেঁড়ে দেয়া – এসব থেকেই তারা নতুন ভিত্তির ক্ষমতা তৈরি করতে শুরু করেছিল। ইউরোপের রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হলঃ বিখ্যাত ‘ওয়েষ্টফেলিয়া চুক্তি ১৬৪৮’;  যা সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে প্রিন্সদের এক বড় ইতিবাচক ভুমিকা ছিল।  যদিও এই চুক্তি পরে রাজতন্ত্রের অবসানেই বেশি ভুমিকা রেখেছিল। আর প্রিন্সরা রেনেসাঁসের সমর্থক হয়েও রাজতন্ত্র টিকাতে পারে নাই, বিলুপ্তই হয়ে গিয়েছিল। আর একালের মধ্যপ্রাচ্য কোন রেনেসাঁসের কাল না হলেও, গুরুত্বপুর্ণ হল তারা পশ্চিমের “ওয়ার অন টেররের” কালে পড়েছে। তাই একালে মধ্যপ্রাচ্যের প্রিন্সরা তাদের সক্ষমতা যার যাই থাকুক রাজনীতি ও ক্ষমতা বিষয়ে তারা এখন খুবই সক্রিয়।  তাদের এই সক্রিয়তা কী শেষ পর্যন্ত আসলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রের অবসানের ইঙ্গিত বয়ে নিয়ে আসছে? এমনই কিছু বিষয় পরীক্ষা করব এখানে।

সৌদি আরবের বর্তমান বাদশা হলেন সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ, সংক্ষেপে সালমান। আর গত ২০ জুন ২০১৭ সালের আগে পর্যন্ত তাঁর উত্তরসুরি বাদশা হিসাবে ঘোষিত ক্রাউন প্রিন্স ছিলেন মোহম্মদ বিন নায়েফ। কিন্তু গত ২১ জুন সকালে সৌদি আরবসহ সারা দুনিয়া জানতে পারে যে উত্তরসুরি বাদশা হিসাবে ক্রাউন প্রিন্সের নাম বদল করা হয়েছে।  আগের ঘোষিত ক্রাউন প্রিন্স  মোহম্মদ বিন নায়েফ ছিলেন বাদশা সালমানের ভাইয়ের ছেলে। তার বদলে এখন উত্তরসুরি ক্রাউন প্রিন্স হয়েছেন মাত্র ৩১ বছর বয়সের মোহম্মদ বিল সালমান, (এখন থেকে এখানে সংক্ষেপে মোহম্মদ লিখা হবে), যিনি বর্তমান বাদশা সালমান এর আপন বড় ছেলে। এমনিতেই তিনি আগে (২০১৫ সালে বাদশা সালমান ক্ষমতাসীন হবাব সময় থেকেই) থেকেই ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। এবং একই সঙ্গে তিনি ক্ষমতাবান সৌদি ইকনমিক কাউন্সিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তা যে সংগঠনের প্রধান কাজ হল অধীনস্থ ‘সৌদি আরামকো’ দেখাশুনা করা। সৌদি আরবের সব তেলের মালিকানা যে রাজকীয় কোম্পানীর অধীনে তার নাম ‘সৌদি আরামকো’। সৌদি ট্রাডিশন অনুসারে চলতি বাদশা জীবিত থাকতেই, তিনি মারা গেলে পরের  বাদশা কে হবেন সেই, উত্তরসুরির নাম আগেই ঘোষিত করা থাকে। তিনিই ‘ক্রাউন প্রিন্স’ নামে ভুষিত হন। সে হিসাবে নায়েফের নাম ক্রাউন প্রিন্স হিসাবে ঘোষিতই ছিল। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে মধ্য টার্মে নতুন উত্তরসুরি হিসাবে বড় ছেলে মোহম্মদ বিন সালমান বা মোহম্মদ এর নাম ঘোষিত হল।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে এটা কী একেবারেই স্বাভাবিক ঘটনা, না কী আসলে এটা একটা প্রাসাদ আভ্যন্তরীণ, রক্তপাতহীন ক্যু। কারণ এই ঘটনার সাতদিন পর ২৮ জুন আমেরিকার নিউ ইয়র্ক টাইমস এক রিপোর্ট প্রকাশ করে যে এটা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। সেখানে বলা হয় ঐ ক্রাউন প্রিন্সের নাম বদলের পর থেকেই প্রিন্স নায়েফকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। প্রাসাদ থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না, ভিতরেরও তার নড়াচড়া সীমিত। টাইমসে এই খবরের উৎস হিসাবে বলা হয়েছিল রাজপরিবারের সাথে আগের বা বর্তমান আমেরিকান প্রশাসনের সম্পর্ক বা বন্ধুত্ত্ব আছে এমন চারজন আমেরিকান অফিসার এদের কাছ থেকে তারা পেয়েছেন। এই খবরের তিন সপ্তাহ পরে ১৮ জুলাই, নিউ ইয়র্ক টাইমস আবার আরও বিস্তারিত এবং খোলাখুলি রিপোর্ট করে জানায় যে ওটা আসলে এক রক্তপাতহীন ক্যু ছিল। ঐ খবরের শিরোনাম ছিল, “প্রতিদ্বন্দ্বিকে সরানোর জন্য সৌদি বাদশার ছেলের ষড়যন্ত্রের প্লট”। কীভাবে জোর করে ক্রাউন প্রিন্স নায়েফের (নায়েফ ও মোহম্মদ পরস্পর কাজিন) পদবি কেড়ে নেওয়া মেনে নিতে নাইফকে বাধ্য করা হয়, কেন তিনি চাপের মুখে রাজি হয়েছিলেন সে রাতের দীর্ঘ ও বিস্তারিত বর্ণনাও সেখানে দেয়া হয়।

কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা নিউ ইয়র্ক টাইমসের ঐ রিপোর্টে সিআইএর প্রসঙ্গ প্রথম আসে; পাঠককে জানানো হয় যে,এই পরিবর্তনে সিআইএ ‘খুবই অখুশি’। কেন? এর অনেক কারণ। তবে সেসব ঘটনার মূল প্রসঙ্গ হল ‘সন্ত্রাসবাদ’; অর্থাৎ আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ বলতে যা বুঝে তাই। আমেরিকা ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের শুরু সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে। তবে সেসময় সম্পর্কের ক্ষেত্র হয়েছিল জ্বালানি তেল (মানে আমেরিকা তেলের ভোক্তা আর সৌদিরা এর সরবরাহকারী), যেটা এখন আর তেমন ইস্যু নয়। কারণ মূলত আমেরিকার নিজেরই বিকল্প তেলের (fracking shale oil) উৎস পাওয়া গেছে প্রচুর। এ ছাড়া, গ্লোবাল ইকোনমিতে তেলের চাহিদা মারাত্মকভাবে পড়ে গেছে এবং দাম কমে গেছে। কিন্তু আমেরিকা ও সৌদি আরবের  সম্পর্কের মধ্যে আগের মতই প্রায় সমান গুরুত্বের জায়গা এখন  নিয়ে আছে, টেররিজম বা সন্ত্রাসবাদ। এই ইস্যুতে বিশেষ করে নাইন-ইলেভেনের পর থেকে, আমেরিকার একাজে খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করার দরকার হয়ে উঠেছে সৌদি আরবকে। অপসারিত প্রিন্স নায়েফ অবশ্য ছিলেন সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। আর তা থাকলেও, আমেরিকার কাছে তিনি ছিলেন খুব গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু।  মধ্যপ্রাচ্য কাউন্টার-টেররিজমে আমেরিকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল ব্যক্তিত্ব, আমেরিকার ভাষায় মূল ‘কনট্রাক্ট’ ছিলেন তিনি। কাউন্টার-টেররিজম মানে যাকে টেররিজম বলা হচ্ছে, ঠিক তার কায়দায় পাল্টা টেররাইজ বা সন্ত্রাস সৃষ্টি করে সব ভণ্ডুল করে দেয়া।  নায়েফকে আমেরিকা বহুবার কাউন্টার টেররিজম তৎপরতা প্রসঙ্গে নিজ দেশে নিয়ে ট্রেনিং দিয়ে এনেছে। আর শুধু তাই নয়, শুধু সৌদি আরবেও নয়, সারা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নানাবিধ কর্ম-পরিকল্পনায় আমেরিকা তাকে অংশীদার করে রেখেছিল, একসাথে কাজ করেছিল। সারকথায়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কাউন্টার-টেররিজম প্রোগ্রামের মূল ‘কনট্রাক্ট’ ছিলেন তিনি। নায়েফকে আমেরিকা এভাবেই গড়ে তুলেছিল। ফলে সেই নায়েফকে এখন সরিয়ে দেয়াতে সিআইএ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে কথা তারা হোয়াইট হাউজে রিপোর্ট করে বলেছে বলে নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট আমাদের জানিয়েছে। এছাড়া আরও আছে।

টাইমসের বর্ণনা অনুযায়ী নিউ ইয়র্কের একজন আমেরিকান অফিসিয়াল ও সৌদিরাজের একজন পরামর্শকের মতে, কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বে যে  অবরোধ আরোপ করা হয়েছে, প্রিন্স নায়েফ আসলে  এর বিরোধী ছিলেন। এটাও তাঁকে অপসারণের একটা কারণ। এ ছাড়া সিআইএ’র সংক্ষুব্ধ হওয়ার আর একটা বড় কারণ হল, নায়েফের সাথে তার অনুগত বহু সৌদি সিভিল এবং সামরিক অফিসার যাদের কাউন্টার টেররিজমের ট্রেনিং দিয়ে আমেরিকা একটা ওয়ার্কিং গ্রুপ বানিয়েছিল, নায়েফের অপসারণের সাথে সাথে তাদেরকেও চাকরিচ্যুত বা বন্দী করে রাখা হয়েছে। যেমন, নায়েফের খুবই ঘনিষ্ঠ সামরিক জেনারেল আবদুল আজিজ আলহুয়াইরিনিও বন্দী হয়ে আছেন।

এ তো গেল আমেরিকার তরফে খবর। কোল্ড ওয়ারের আমল থেকে সোভিয়েত ইনটেলিজেন্স সিআইএ এর পালটা দুনিয়ার সব জায়গাতেই ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে সেই অবকাঠামোর অনেকটাই ভেঙে গিয়েছিল, উত্তরসূরি রাশিয়া এর পরিচালনা খরচ আর জোগাতে না পারার কারণে। কিন্তু পুতিনের আমলে সেগুলো আবার খাড়া করা হয়েছে, আর পুতিন সেগুলোকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করেছেন। অথবা অন্যের কাছে নানা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইনটেলিজেন্স বিক্রি অথবা অন্য রাষ্ট্রের সাথে শেয়ার করে, অনেক সময় নিজ বহু স্বার্থ উদ্ধার করেছেন। যেমন গত বছর তুরস্কে, ‘গুলেন পার্টি’ আমেরিকায় ও তুরস্কে বসে এরদোগানের বিরুদ্ধে কী কী ষড়যন্ত্র করেছিল, আর আমেরিকারইবা তাতে কী ভূমিকা ছিল সেই সব ইনটেলিজেন্স পুতিন এরদোগানকে জানিয়েছিলেন। এতে করে এরদোগানের আস্থা অর্জন করে পুতিন তুরস্কের সাথে রাশিয়ার আগে ভেঙে থেকে যাওয়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরায় চালু করেছিলেন। তবে পুতিনের রাশিয়ার সংগৃহীত ইনটেলিজেন্স বিক্রি বা শেয়ার বহুভাবেই করা হয়ে থাকে, এমনকি অনেক সময় তা পুতিনের প্রপাগান্ডায়ও ব্যবহার করা হয় ও হয়েছে। আবার অনেক সময় কোন ইস্যুতে এক পাল্টা মিডিয়া রিপোর্ট করে দেয়া হয়, বাজারে ফ্যাক্টস জানিয়ে দেয়ার জন্য। এমন এক ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক, আমেরিকাবিরোধী এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত, কলাম লেখক হলেন পেপ এস্কোবার। তবে তিনি রাশিয়ার দিকে তাকিয়ে অনেক সময় ভাষ্য তৈরি করেন। যদিও এতে আমাদের মত পাঠকের সুবিধা হল, যেহেতু রাশিয়ান ইনটেলিজেন্সে ঘনিষ্ঠতা থাকায় তিনি নিজে সংগৃহীত ইনটেলিজেন্স পেতে বা দেখতে তার একসেস আছে, তিনি জানতে পারেন আর তা তিনি লেখায় শেয়ার করেন, ফলে তার লেখা পাঠ করায় আমরা মেন-স্ট্রিমের বিপরীত বহু তথ্য ও ভাষ্য পেয়ে থাকি।

সৌদি আরবের এ ঘটনায় এস্কোবার দুটো রিপোর্ট লিখেছেন। একটি রাশিয়ান স্পুটনিক পত্রিকা, অন্যটি সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত সিরিয়াস পত্রিকা ‘এশিয়া টাইমস’-এ। সৌদি আরবের ইস্যুতে প্রায় একই ধরনের রিপোর্ট তিনি লিখেছেন দুজায়গাতেই;কথিত ‘প্রাসাদ ক্যু’র রদবদলের চার দিনের মাথায় ২৪ জুন স্পুটনিকে। আর ‘এশিয়ান টাইমসে’ লিখেছিলেন প্রায় এক মাস পরে ২০ জুলাই

ওদিকে প্রকাশিত বিদেশি প্রায় সব মিডিয়া ভাষ্যে নতুন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান চিত্রিত হয়েছেন একজন কম বয়সী, বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন, উচ্চাভিলাষী, হামবড়াভাবের মানুষ ইত্যাদি হিসেবে। এসবের ভিতর তাদের মূল অভিযোগ হল,  তিনি কাজের গুরুত্ব ও দায়দায়িত্ব না বুঝেই সব কাজে মধ্যমণি থাকতে চান। সেদিকে ইঙ্গিত করে তাই,  গ্লোবাল বিনিয়োগ জগতের গুরুত্বপূর্ণ টিভি ও অনলাইন মিডিয়া ‘ব্লুমবার্গ’(Bloomberg) তার নাম দিয়েছে ‘মি. এভরিথিং’

এস্কোবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে দাবি করেছেন যে, সিআইএ নায়েফের অপসারণে প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট। কারণ তারা মনে করে নতুন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ নিজেই ‘টেররিজম স্পন্সর’ করেন। দাবি করা হচ্ছে আল-নুসরা সংগঠনের সাথে তিনি সম্পর্ক রেখেছেন। আর এসব কারণে,গত এপ্রিল ২০১৪ সালে টেররিজম ইস্যুতে আমেরিকার সিআইএ সৌদি আরব ও আমিরাতের (বিশেষ করে আবুধাবির প্রিন্স জায়েদ, তিনি মোহাম্মদের মেন্টর/বড়ভাই বলে কথিত আছে) ক্ষমতাসীনদের ওপর প্রচণ্ড নাখোস হয়ে পড়েছিল। এমনকি তাদের অপসারণের কথা পর্যন্ত ভেবেছিল। পরে এক আপস ফর্মুলায় সাব্যস্ত হয় যে, বাদশা বদল করে নায়েফকে ক্ষমতায় এনে এর সমাপ্তি টানা হবে। এস্কোবার তার ইনটেলিজেন্স সোর্সকে উদ্ধৃত করে দাবি করেছেন, ওই ফর্মুলা সাব্যস্ত হওয়ার আগে আমেরিকা বা সিআইএ একপর্যায়ে সৌদি বাদশাহ’র বিরুদ্ধে নাকি আমেরিকান সৈন্য পাঠানোর কথাও ভেবেছিল। এটা ভাবার কারণ আছে যে, ওই ফর্মুলাটাই প্রিন্স মোহাম্মদ ও তার বাবা বাদশাহ সালমানকে আরো মরিয়া হতে উৎসাহিত করেছিল। ইতোমধ্যে খবর বেরিয়েছে, প্রিন্স মোহাম্মদ ও আবুধাবির প্রিন্স জায়েদ মিলে ভাড়াটে আমেরিকান সৈন্য (ব্ল্যাকওয়াটার) দিয়ে কাতারের তরুণ আমির শেখ তামিম আল থানিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এটা সিআইএ নাকি টের পেয়ে ভণ্ডুল করে দিতে সমর্থ হয়। কিন্তু তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রিন্স মোহাম্মদ ও বাদশাহ সালমান সিআইএ ’র পছন্দের হবু বাদশা নায়েফকেই সরিয়ে ফেলে দিতে সক্ষম হলেন। এটাই হল এস্কোবারের ব্যাখ্যা।

এসব ব্যাখ্যা হয়ত সবটা সত্যি নয়,কিন্তু ফেলনাও নয়। নয়। গত ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের দুই তারিখে জার্মান ইন্টেলিজেন্স এর বরাতে লন্ডন টেলিগ্রাফ এক রিপোর্ট ছেপেছিল।  শিরোনাম ছিল ‘সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলছে’। সেখানে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদের নাম ও ছবিসহ উল্লেখ করে, তাকে এক মহা ‘গ্যাম্বলার’, বিপজ্জনক ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছিল যে, সিরিয়াতে আলকায়েদার সাথে সম্পর্ক রয়েছে তাঁর। সৌদি আরবকে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা আনার জন্য দোষারোপ করা হয়েছিল। এস্কোবার বলছেন, আসলে এই অভিযোগটাই পরে কাতার অবরোধের সময় সৌদি আরব ও অন্যরা কাতারের বিরুদ্ধে তুলেছিল। অথচ  এই অভিযোগের সবটাই আসলে সৌদি বাদশাহ ও বর্তমান ক্রাউন প্রিন্সের বিরুদ্ধে এনেছিল সিআইএ এবং জার্মান ইনটেলিজেন্স।

লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ০৭ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে

পরিস্থিতি কাতারের পক্ষে ঘুরে গেছে, দুনিয়া মজলুমের পক্ষেই দাঁড়াবে

গৌতম দাস

১৩ জুন ২০১৭, মঙ্গলবার ০০ঃ০৪

http://wp.me/p1sCvy-2g5

 

ট্রাম্পের সৌদি সফরে (২০-২১ মে ২০১৭) সৌদি ড্যান্সের তিন সপ্তাহের মধ্যে সৌদি আরব আবার খবরের প্রধান শিরোনাম। যদিও এবার সাথে নিয়েছে বা বলা ভাল এবারের সৌদি টার্গেট কাতার। কাতারকে সাইজ করা। সংক্ষিপ্ত করে বললে খবরটা হল, মধ্যপ্রাচ্যের রাজাতন্ত্রী ছয় রাষ্ট্রের এক রাষ্ট্র-জোট আছে নাম GCC জিসিসি বা গালফ কো-অপারেশন কাউন্সিল।  কাতার, সৌদি আরব, ইউএই (এটা আবার দুবাই ও আবুধাবিসহ সাত আমির-শাসিত রাষ্ট্র বা আমিরাতের এক ফেডারেশন), ওমান, কুয়েত, বাহরাইন এই ছয় রাষ্ট্রকে নিয়ে জিসিসি গঠিত। হঠাৎ করে গত ৫ জুন ২০১৭ এর খবর হল,  জিসিসির সৌদি আরব, ইউএই, বাহরাইন আর জিসিসির বাইরের মিসর, এই চার রাষ্ট্র কাতারের সাথে সব ধরণের কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা করেছিল। আর, নৌ, আকাশ ও সড়ক পথ ও সীমান্ত বন্ধ করে সব বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল।  কাতারি কূটনীতিকদেরকে এই চার রাষ্ট্র, তারা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে তাদের প্রত্যেকের রাষ্ট্র ত্যাগ করে চলে যেতে বলেছিল।  প্রাথমিক খবর হিসাবে প্রথম কয়েক ঘন্টা আমরা শুনেছিলাম যে, সরকারি ‘কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাক হয়ে গিয়ে সেখান থেকে সৌদি বাদশাকে নিন্দা করে কিছু খবর প্রচার করা হয়েছিল। তা থেকেই নাকি ক্ষুব্ধ সৌদি প্রতিক্রিয়া এটা। গত ২৩ মে, সেঘটনার ধোঁয়া থেকে সব শুরু। খুব সংক্ষেপে মুল ঘটনাটা বললে, ট্রাম্পের সৌদি সফরের পরের দিন কাতারের আমির শেখ তামিম আল থানি কাতারের মিলিটারি একাদেমি সফর করতে গিয়েছিলেন। সেখানে নাকি ট্রাম্পের ঐ সফর আর সৌদি বাদশার সমালোচনা করে তিনি বক্তব্য রেখেছিলেন আর সেটাই সরকারী কাতার নিউজ এজেন্সী প্রচার করেছিল। আর এই খবরকে রেফার করে সৌদি আরব ও দুবাইয়ে খবর প্রচার করা শুরু হয়েছিল। কিন্তু পালটা বার্তা দিয়ে কাতারের আমির জানায়, এটা সম্পুর্ণ মিথ্যা। হ্যাকারের হাতে কাতার নিউজ এজেন্সী হ্যাকড হয়ে এটা একটা মিথ্যা খবর প্রচার করা থেকে এটা হয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা রয়টার নিউজ এজেন্সীকে কাতারী আমীর জানিয়েছিলেন যে তিনি মিলিটারি একাদেমিতে গেছিলেন কথা সত্য কিন্তু তিনি সেখানে কোন বক্তৃতাই সেখানে দেন নাই, অথবা কোন বিবৃতিও দেন নাই।  এদিকে জুনের ঐ ৫ তারিখেই কয়েক ঘন্টার মধ্যে আমরা আল জাজিরার মাধ্যমে শুনলাম ‘কাতার নিউজ এজেন্সীর ওয়েব সাইট হ্যাকের ঘটনার সাথে – আমেরিকায় দুবাইয়ের রাষ্ট্রদুতের ইমেল একাউন্ট – এর সংশ্লিষ্টতা আছে এর প্রমাণ মিলেছে।  কিন্তু আরও কয়েক ঘন্টার মধ্যে কাতারের বিরুদ্ধে ঐ চার রাষ্ট্রের সরব অভিযোগ যেমন – কাতার নিউজ এজেন্সীর কথিত খবর, কাতারের আমীরের সৌদি বাদশার নিন্দা ইত্যাদি সব ছেড়ে এবার সৌদিসহ অভিযোগকারিরা তাদের ‘আসল’ অভিযোগ দায়ের করতে শুরু করে।

সার কথায় সেসব অভিযোগ হল, কাতার এক “সন্ত্রাসী রাষ্ট্র”, কারণ সে সন্ত্রাসবাদকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়। যেমন বিবিসি [যদিও বিবিসির রিপোর্ট ও ভুমিকা বড়ই তামাসাময়  ও খুবই নিচা স্টান্ডার্ডের। কাতারের আমীরের কোন বক্তব্যই না দিয়ে কেবল সৌদি বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে পুরা স্টোরি তৈরি করে হয়েছে।] তারা কেবল সৌদি বয়ানের উপর ভর করে এসম্পর্কে সৌদি সরকারি এজেন্সীকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছিল,”সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থার বিপদ থেকে সৌদি আরবের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্বার্থসংরক্ষণকে নিরাপদ করতে তারা কাতারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেছে”। ঐ একই বিবিসি রিপোর্টে আবুধাবিও একই রকম মন্তব্যে জানিয়েছিল, “তারা মনে করে কাতারের দোহা সরকার, সন্ত্রাসবাদ ও চরমপন্থা নিয়ে চলে ও তাদেরকে সমর্থন ও অর্থ দিয়ে তাদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছে”। অর্থাৎ কে কী প্রচার করেছে সেটা আর প্রসঙ্গ নয়। কাতারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন, অর্থ দেয়া প্রশ্রয় দেয়া ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এটাই আসল ইস্যু, আর তা সামনে এসে গেছে।

কিন্তু কাতার ‘সন্ত্রাসবাদী’, এটা আবার কোন সন্ত্রাসবাদ? কাছকাছি সময়ের ঘটনায় “এই সন্ত্রাসবাদের” স্পষ্ট হদিস রেফারেন্স পাওয়া যায় গত ২০-২১ মে ট্রাম্পের সৌদি আরব সফরকালে। “ইরান সন্ত্রাসবাদ করে” আর এর বিরুদ্ধে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বক্তৃতা করেছিলেন তিনি। আর এটা বলতেই যেন সৌদি বাদশা তাকে হায়ার করে এনেছিলেন। আর এই সন্ত্রাসবাদ বলতে – প্যালেস্টাইনের হামাস, লেবাননের হিজবুল্লাহ ও মিসরের ব্রাদারহুড এদের ততপরতাকে ট্রাম্পের আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ মনে করে। এটা আমেরিকার অনেক পুরানা বয়ান, [যদিও মাঝে “আরব স্প্রিংয়ের চলার সময়” আমেরিকা ও সৌদি আরব উভয়েই ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন মনে করা ভুলে গেছিল, বলা যায় সন্ত্রাসী মনে করতে বিরতি বা ক্ষমা দিয়েছিল। তারা ব্রাদারহুডকে মিসরে ক্ষমতায় আনতে একসাথে কাজ করেছিল। যাই হোক, সৌদি আরবের যারে দেখতে নারি তার চলন বাকা ফর্মুলায় আমেরিকাকে অনুসরণ করে যাকে পছন্দ হয় না, হুমকি মনে হয় তার গায়ে সন্ত্রাসীর ট্যাগ লাগায় দেয় তারা। ফলে ইরান সন্ত্রাসী, আর কাতার সন্ত্রাসী। এই “বাড়তি সন্ত্রাসবাদ”  ধারণা, সৌদি আরব ট্রাম্পকে তাল দিতে নিজে দেশে ডেকে এনে উচ্চারণ করিয়ে নিয়েছিল। ইরান সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হলে নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ রাষ্ট্র + জার্মানি এই (পি৫+১) এরা একসাথে এবং জাতিসংঘের কাঠামোর মধ্যে ‘সন্ত্রাসী’ ইরানের সাথে কোন আন্তর্জাতিক চুক্তি করেছিল কী করে?

কিন্তু কাতার জিসিসির সদস্য হয়েও এসব প্রতিরোধ আন্দোলন সংগঠনকে, বিশেষ করে হামাসকে সর্বতভাবে সমর্থন করে, তাদের ততপরতার  প্রতি সহমর্মিতা দেখায়, সমর্থন দেয়, আশ্রয় দেয় সহযোগিতা করে। এই সুত্রে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদিদের “সন্ত্রাসবাদের” অভিযোগ। আমেরিকান “সন্ত্রাসবাদ” ধারণাকেও নিজের সংকীর্ণ স্বার্থ মোতাবেক টেনে লম্বা করে নেওয়া।

এখন তাহলে পুরা ঘটনায় একেবারে আসল, মূল বিষয়টা কী? এক শব্দে বললে, বিষয়টা হল, সৌদি রাজতন্ত্রের আয়ু সমস্যা। এখানে রাষ্ট্র বা ভুখন্ড হিসাবে সৌদি আরবের আয়ুর কথা বলা হচ্ছে না। ঐ রাষ্ট্র পরিচালনের সিস্টেম হিসাবে “রাজতন্ত্র” – এর ভবিষ্যত বা আয়ুর কথা বলা হচ্ছে। সম্ভবত আরও সঠিক ভাষ্য হবে – সৌদি রাজ-সরকার নিজের ভবিষ্যত, আয়ূ বা হুমকি প্রসঙ্গে নিজের পারসেপশন বা ধারণা কী সেটাই এখানে মূল ইস্যু বা সমস্যা।

সৌদি আরব মনে করে তার রাজতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি ইরান, ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পরের ইরান। দুনিয়ায় ছড়িয়ে থাকা ইসলামি জনগোষ্ঠি নিজেদের মাঝে ইসলামের নানা ফ্যাকড়ায় তাদের বিভক্তি বা ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও সব জনগোষ্ঠিই তাদের স্ব স্ব রাজনৈতিক লড়াইয়ে প্রথম আর সবচেয়ে কমন অবস্থান হল – কাম্য সিস্টেম হিসাবে তারা রাজতন্ত্রকে নাকচ করা। আর খুবই সহজে ইরান এই কথাটাই তাদের মনে করিয়ে দেবার কাজ করে ফেলতে পারে — এটাই সৌদি আরবের চোখে সবচেয়ে বড় “সন্ত্রাসী” কাজ। সবাই জানেন ইরান সুন্নি নয়, তাসত্ত্বেও হামাস, হিজবুল্লাহ ও ব্রাদারহুডের মত দলের রাজনৈতিক প্রতিরোধ  লড়াই সংগ্রামের প্রতি ইরানের সক্রিয় সমর্থন অবস্থান এটা ইরান মুল্যায়নে খুবই নির্ধারক।  কারও ইরানের ব্যাপারে রিজার্ভেশন থাকলেও তাসত্ত্বেও ইরানের সারা দুনিয়ার মজলুমদের প্রতিরোধ আন্দোলনকে সক্রিয়  সমর্থন দেয় এই কারণে – এই ভুমিকাকে মুসলমানেরা অন্তর থেকে ইতিবাচক মনে করে।

তবে সৌদি আরবের ইরান মুল্যায়ন শেষে তার দ্ব্যার্থহীন অবস্থান হল,

একঃ যে কেউ শিয়া বা সুন্নি যাই হোক, ইরানের সাথে যে কোন ধরণের সম্পর্ক রাখে সে সৌদি আরবের শত্রু। তাকে কোন ধরণের সহানুভুতি বা সমর্থন, অনুমোদন কিছুই দেয়া যাবে না। শুধু তাই নয় তাকে উচ্ছেদ করে দেওয়াতেই সৌদি আরবের শান্তি, এটাই তার নীতি।

দুইঃ সৌদি রাজতন্ত্রের ফাস্ট লাইন অব ডিফেন্স স্বভাবতই তার নিজ সেনা বাহিনী। আর এর পরের বলয় হল জিসিসি; যার মূল পরিচয় এরা সৌদির  মতই মধ্যপ্রাচ্য ভুগোলের রাজতন্ত্রী রাষ্ট্র। এছাড়া জিসিসি কেবল সাধারণ কোন রাজনৈতিক জোট নয়, বরং এই ছয় রাষ্ট্র নিজেদের সামরিক সক্ষমতাগুলোকে একপাত্রে নিয়ে কমন একটা অবস্থান থেকে পরস্পরকে রক্ষায় তা ব্যবহার করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য জিসিসির স্টিয়ারিং হাতে রাখা সৌদি আরব  – মূলত সৌদি প্রভাবে, ইয়েমেনে হুতিদের দমনে কাতারের ভিন্নমত দৃষ্টিভঙ্গী থাকলেও নিজের যুদ্ধবিমান নিয়ে যোগ দিতে সেও বাধ্য হয়েছে। তাতে বিষয়টাতে কাতারের যতই ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থাক। আর ওদিকে জিসিসির পরের লাইন অব ডিফেন্স হল, একদিকে অন্যান্য মুসলিম জনসংখ্যা-প্রধান রাষ্ট্রগুলো (তবে খোদ জনগোষ্ঠি নয়, কেবল সরকার) আর অন্যদিকে বড় কুতুব আমেরিকা।

তিনঃ সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে নিরাপত্তাহীন অস্বস্তিকর দুস্থবোধ এনে দিয়েছিল ওবামা, ২০১৪ সাল থেকে। এবিষয়ে আরও বিস্তারিতের জন্য আগের লেখা  এখানে দেখুন।  সে বছর থেকে ইরান বিপ্লবের পরে এই প্রথম প্রকাশ্য সমঝোতায়  ইরান-আমেরিকা ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’ (পি+৫) করার আলাপ শুরু হয়েছিল। যদিও ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের এতদিন পরে ওবামা প্রশাসনের হঠাত এই মতি বদলের পিছনে প্রধান কারণ ছিল ইরাকে আইএস ততপরতা বৃদ্ধি আর তা নিজে সামলাতে গেলে আমেরিকাকে আবার মাঠে আমেরিকান মেরিন নামানোর সিদ্ধান্ত নিতে হত। যে খরচ বিতে সে অপারগ। তাই এই কাজটা সে ইরান এবং ইরান প্রভাবিত ইরাক এবং শিয়া মিলিশিয়া ইত্যাদি দিতে করাতে চাওয়ার আমেরিকান  স্বার্থ এটাই ইরানের সাথে ওয়ার্কেবল সম্পর্ক পাতানোর তাগিদ অনুভবের  মূল কারণ ছিল। তাই ‘নিউক্লিয়ার চুক্তি’  মানে নিউক্লিয়ার অস্ত্র পাওয়ার চেষ্টা সে আর করবে না – এই প্রতিশ্রুতি আর তা মনিটরিং করতে দেওয়ার বিনিময়ে ইরানের উপর থেকে আমেরিকাসহ পশ্চিম এবার সব অর্থনৈতিক অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নিবে এই নিগোশিয়েশন শুরু হয়েছিল। এই সফল নিগোশিয়েশন  আলাপের সমাপ্তিতে গত  ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে তা স্বাক্ষরিত ও কার্যকর হয়ে যায়। মনিটরিংসহ নানা শর্ত সাপেক্ষে হলেও এতে অবরোধ তুলে নেওয়াতে ইরান বিরাট শক্তি সঞ্চয় করে আবার ফিরে উঠে আসতে থাকে। অর্থনীতি আবার প্রাণ পায়। আর তাই উলটা দিকে সৌদি আরবের ভালনারেবল অবস্থা ভীতি অস্বস্তি বোধ – সেখান থেকে।  গত ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পরও সৌদি আরব এমন দুস্থ অসহায় বোধ করে নাই। অথচ এই চুক্তির কারণে, ইরানের সাথে আমেরিকার নীতি অবস্থান স্বার্থবিরোধ কিছু কিন্তু মিটে যায় নাই। কেবল একটা একসাথে সহবস্থানের একটা ওয়ার্কেবল অবস্থান তৈরি হয়েছে মাত্র। যা আবার স্থায়ী নয়, প্রতি বছর মনিটরিং মুল্যায়নের অধীনে ও ভাল রিপোর্ট সাপেক্ষে চালু থাকবে, আছে। তবু এটাও সহ্য করা সৌদি আরবের কাছে অসম্ভব, অগ্রহণযোগ্য।
আমেরিকা-ভিত্তিক ‘সৌদি-আমেরিকান পাবলিক রিলেশন এফেয়ার্স কমিটি’  – এটা এক লবিষ্ট ফার্ম এর নাম। এর সভাপতি  সালমন আল-আনসারি। তিনি তাঁর ক্লায়েন্ট সৌদি আরবের পক্ষে এক ক্ষুব্ধ মন্তব্য করে বলেছেন, “কাতারের আমীর – সন্ত্রাসবাদী ইরান সরকারের পক্ষে তোমার অবস্থান আর কাস্টডিয়ান অব টু হলি মস্ক – তাকে অপমান করেছ। আমি তোমাকে মনে করায় দিয়ে চাই মিসরের মোরসি ঠিক একই কাজ করেছিল আজ সে খতম হয়ে গেছে, জেলে পচতেছে”।   আনসারির এই কথা গুলো খুবই প্রতীকী, সৌদি মনোভাব অবস্থানের আসল প্রতিফলন। এভাবে বলা কথাটা ‘সহি কিনা’ সেটা এখানে একেবারেই বিচার্য নয়।

চারঃ সৌদি আরব যা বলতে চাইছে এর সারকথা হল,  কাতারে বিদেশনীতি আমার চেয়ে ভিন্ন হতে পারবে না। কাতার নুন্যতম ভিন্ন চোখে ইরানকে দেখতে পারবে না।  কাতার সেটা করার চেষ্টা করেছে তাই সে কাতারকে আসলে শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কচ্ছেদ না, কাতারকে সে সাধারণ খাদ্য ও পণ্যেও সরবরাহের বিরুদ্ধে অবরোধ করবে। কোন ব্যবসা করতেও দিব না। আমার কথা না শুনলে এমনকি তোমাকে সরিয়ে তোমার কোন জ্ঞাতি ভাইকেও ক্ষমতার আনার চেষ্টা করব।

সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল আল-যুবেইর প্যারিস সফরে ছিলেন। সেখান থেকে রয়টারের সংগৃহিত তাঁর বক্তব্য পরের দিন ছয় জুন ছাপা হয়। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে সৌদিদের মনের অনেক কথা বলে দিয়েছেন।  তার সোজা কথা, আরব রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক রাখতে গেলে কাতারকে অবশ্যই হামাস এবং ব্রাদারহুডের সাথে সম্পর্ক ছিন্নসহ আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে হবে। [Qatar must take several steps, including ending its support for the Palestinian group Hamas and the Muslim Brotherhood, to restore ties with other Arab states.]  তিনি আরও বলছেন, “সন্ত্রাসবাদী চরমপন্ন্থা (এটা বলতে হামাস, ব্রাদারহুড বুঝতে হবে),  হোস্টাইল বা বেয়াদব মিডিয়াকে সোজা করা (আল জাজিরা পড়তে হবে) আর ভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপ (এটা বলতে বাহারাইনের আন্দোলনকারিদের প্রতি সহানুভুতি বুঝতে হবে) বন্ধ করবে“ – বিগত কয়েক বছরে আমরা এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলছি আর কাতার তাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এখন কাতার এগুলো বাস্তবায়ন করেছে আমরা দেখতে চাই”। এই বক্তব্য রয়টার থেকে কোট-আনকোট নেয়া। সরাসরি ইংরাজিটা তুলে দিচ্ছি, “We want to see Qatar implement the promises it made a few years back with regard its support of extremist groups, regards its hostile media and interference in affairs of other countries,” Jubeir told reporters in Paris.

যুবেইরের এসব মন্তব্যের সবচেয়ে মজার অংশ হল, তিনি বলছেন কাতার “প্যালেস্টাইন অথরিটি আর মিসর সরকারকে আন্ডারমাইন” করেছে বা নীচা দেখিয়েছে।  আসলে তিনি বলতে চাইছেন আমাদের ব্রাদারহুডের বিরুদ্ধে অবস্থানের ফলে পরে পাওয়া সুবিধায় মিসরের সিসি এখন আরামে ক্ষমতায় আছে। আর আমরা সেই সুবিধা তৈরি করে দেওয়ার বিনিময়ে সিসির চোখ বন্ধ করা সমর্থন আমাদের পক্ষে পেয়েছি। আসলে  তিনি স্পষ্ট করেই বলছেন, হামাসের নেতা মিশেল অথবা ব্রাদারহুডের কোন নেতা-কর্মীকে ভাত-কাপড়-আশ্রয় কিছু দেয়া যাবে। বাস্তবে আসলে চাপে পড়ে, কাতারের আমীর  অনেক আগেই সবাইকে বের করে দিতে হয়েছে। সম্ভবত এখন ইসলামি স্কলার কারযাভিকেই একমাত্র আশ্রয় দিয়ে রেখেছে। কিন্তু তাতেও সৌদিরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করতে পারছেন না। বেচারা থানি, তিনি কাতারের আমীর হলেও তার একটা শক্ত নীতি হল, কোন মানুষ সে যেই হোক সে আশ্রয় চাইলে তাকে তিনি ভাত-কাপড় আশ্রয় দিতে নিজের কাছেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কিন্তু আমীর থানির মেহমানেরা সৌদি চাপে আশ্রয়দাতার দুরবস্থা দেখে আমীর তাদেরকে কিছুই না বললেও  নিজেই নিজের করণীয় হিসাবে কাতার ত্যাগ করে চলে গিয়েছেন।  এরপরেও সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঐ বক্তব্য শেষে হুমকি দিয়ে বলছেন,   “সঠিক পথ নিতে কাতারের ‘কমন সেন্স ও লজিক’ জাগবে। আর যদি না হয় তবে আমার মনে হয় না কাতারিরা এর মুল্য পরিশোধ করতে পারবে”। আসলে পুরা পরিস্থিতিতে সৌদি-ইচ্ছার সারকথা এখানে আছে।

কিন্তু বিরাট একটা লিগ্যাল প্রশ্ন আছে। যুবেইরের ফরমাল এই অবস্থান এটা সৌদি আরবের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন, ফলে একারণে সৌদি আরবকেই অভিযুক্ত করা সম্ভব। কাতার কী বিদেশ নীতি নিবে তা করতে বাধ্য করার চেষ্টা এটা কাতারের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন। এছাড়া সৌদি ইচ্ছায় বিদেশনীতি না সাজালে কাতারের বাসিন্দাদেরকে খাদ্য পাণীয়ের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হবে – এটাও চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন। WTO এর আইন অনুযায়ী না-হক কাজ।  উপরে ম্যাপের ছবির দিকে তাকালে আমরা দেখবে কাতার আসলে ঠিক ল্যান্ড-লকড দেশ নয়। বরং সৌদি আরবের তীরে, পারস্য উপসাগরের মধ্যে অবস্থিত। ফলে কাতারের চারদিকের প্রায় ৮০ ভাগ  সীমানা এলাকাই উপসাগরের স্পর্শে। অর্থাৎ পোর্ট সুবিধা চাইলে তৈরি করা সম্ভব। আর ২০ ভাগ এলাকা সরাসরি ভুমিতে সৌদি আরবের সাথে সীমান্ত। সম্ভবত নিজ জনসংখ্যা মাত্র ২৩ লাখ (2.235 million (2015) World Bank) বলে নিজ খরচে আলাদা এক্সক্লুসিভ নিজ ভুখন্ডে গভীর সমুদ্র বন্দর গড়তে যায় নাই। এর চেয়ে খুবই চালু  গভীর সমুদ্র বন্দর পাশের দুবাইয়ে বলে, সেই পোর্টে মালামাল নামিয়ে ট্রাকে করে সৌদি আরব হয়ে সে পণ্য নিজ দেশে প্রবেশ করে নেয়।  কিন্তু এখন  সৌদি ভুমি দিয়ে ট্রাক প্রবেশ এটাকেই চাপ দিবার অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করে – এই সুবিধা নিয়ে সৌদি আরব ট্রাক চলাচল আটকে পণ্য পরিবহণে বাধা তৈরি করার সুবিধা নিচ্ছে। যাহোক, তবে দেরিতে হলেও এই পয়েন্টটা তুলে ধরে আল জাজিরা কিছু প্কিরচার রিপোর্ছুট তৈরি করাতে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষন করতে পেরেছে। এমেনেষ্টি ইন্টারন্যাশনাল এই ইস্যুতে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তাতে  খোদ ট্রাম্প সৌদি আরবের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কথা বলতে বাধ্য হয়েছেন।  কাতারে বসবাসকারি দেশি বিদেশি সাধারণ মানুষের স্বার্থে ট্রাম্প নিজেই শিথিলভাবে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আহবান জানাতে বাধ্য হয়েছেন। আসলে এটা ছিল ট্রাম্পের সৌদি সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব থেকে নিজেকে আলাদা করে নেয়া। অর্থাৎ আইন লঙ্ঘনের দায় তিনি সৌদিদের কাধে ফেলায় দিলেন। ট্রাম্প এটা কেন করলেন? কারণ ইতোমধ্যে তিনি এক বিরাট কেলেঙারির

পাঁচঃ ট্রাম্পের আমেরিকা; অনেকেই বিভ্রান্ত আমেরিকার অবস্থান ঠিক কোথায়? এনিয়ে। হা ট্রাম্প, নিজ অবস্থানের সবচেয়ে উপর পর্দা দিয়ে সেটা বিভ্রান্ত করে রেখেছেন। সব আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা আমেরিকান রাজনীতিতে   “লবি ব্যবসা” (বিভিন্ন বিদেশী রাষ্ট্রের স্বার্থে বিভিন্ন ইস্যুতে প্রশাসনে লবি করে দেওয়ার জন্য ভাড়া খাটার ব্যবসা”) এর স্বার্থের ভিতরেই বসবাস করেন ও আর এর মধ্যেই কাজ করে থাকেন। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে সেটা খুবই এক বাড়াবাড়ি জায়গায় গিয়েছে দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের দোস্ত-বেরাদরেরা  বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে  লবির ফি এর নামে কমিশন নিয়েছেন (আমেরিকান আইনে এটা আইন বিভাগের রক্ষিত খাতায় নিজে গিয়ে লিখিত বলে দিতে হয় এবং তাহলে এটা আর অবৈধ না। ইতোমধ্যে ১৪০ মিলিয়ন ডলারের কাহিনী আমরা নিইয়র্ক টাইমসে দেখেছি।)  এমন দোস্ত-বেরাদরেরা ট্রাম্পের একদম চারপাশে ও কোলের মধ্যে বসে ঘুরপাক খাচ্ছে। সেজন্য  এমনকি মনে হয়, ট্রাম্প তাঁর মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকেও বলে দিয়েছেন যে, এডমিনিষ্ট্রেশনের অবস্থান-বক্তব্যেরও থেকে দূরে তিনি ভান করে কখনও কখনও সরে যাবেন, কখনও ভুয়া কথার কথায় “লিপ-সার্ভিস” দিবেন। যেন ট্রাম্পের দোস্ত বেরাদরেরা যে ফি নিয়েছেন তা কাভার দিয়ে যায়েজ করে নিতে পারেন – তা বলে দিয়েছেন তিনি। তবে  মন্ত্রী-উপদেষ্টাদেরকে তিনি বলতে চাচ্ছেন  কিন্তু তাসত্ত্বেও তোমরা তোমাদের এডমিনিষ্ট্রেশনের মুল অবস্থান-বক্তব্যের মধ্যেই থেকে যাবা, কাজ করে যাবা। এখানে মজার কথা হল, এতদিন আমেরিকান রাজনীতির ভোকাবুলারিতে – ‘এডমিনিষ্ট্রেশন’ বলতে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির ফরমাল নীতি-অবস্থান বুঝাত। যেমন ‘ওবামা প্রশাসন’ কথাটার মানে ওবামার নিজের কথা আর তাঁর আমলা, নীতি-নির্ধারকদেরসহ সবারই ফরমাল অবস্থান – এটা  বুঝাত। তবে যদিও এই ফরমাল অবস্থানের নিচে আবার ‘আন্ডারকারেন্ট’ হিসাবে স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর পেন্টাগণের অবস্থানের লড়াই ঝগড়ায় খুচরা নানা অবস্থান ভিন্নতাও থাকতে দেখা যেত। কিন্তু এখন ট্রাম্পের আমলে এসে আমরা দেখছি,  ট্রাম্পের বক্তব্য (লিপ সার্ভিস) আর ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান-বক্তব্য এই দুটা এক নাও হতে পারে। ফলে ট্রাম্প – এটা ভুয়া কথা বলে লবি ব্যবসা ধরার এক স্বর্ণযুগ তৈরি করেছেন বলা যায়।
তাই এর আরেক তামাসার দিকটা হল, সৌদি আরবেরও সেটা অজানা নয়। তাঁরা ট্রাম্পের লিপ-সার্ভিসও জেনে শুনে কিনতে চায়। সেটাই তাদের কাছে নাকি অনেক। গত মাসে ট্রাম্প সৌদি সফরে এসে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” – এই ফাঁপা বাড়তি বা এক্সটেনডেড মিথ্যা সংজ্ঞা আউড়িয়ে গিয়েছিলেন তিনি। অথচ এটা আমেরিকা প্রশাসনের অবস্থান নয়। যেমন ট্রাম্প প্রশাসন ইতোমধ্যেই ওবামা আমলের শেষ বছরে ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সাথে করা ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ – এটা “সঠিকভাবেই চুক্তির শর্ত মোতাবেক কোন ব্যার্তয় না ঘটিয়ে” আগিয়ে যাচ্ছে বলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলারশনের লিখিত স্বাক্ষ্য- রিপোর্ট তিনি কংগ্রেসকে  জানিয়েছেন ইতোমধ্যেই। অর্থাৎ নির্বাচনের সময় ট্রাম্পের যে চাপাবাজি ছিল যে নির্বাচিত হলে তিনি ‘ইরান ‘নিউক্লিয়ার ডিল’  বাতিল করে দিবেন। কিন্তু তিনি এখন ইতোমধ্যেই ঐ চুক্তি “ঠিকঠাক” চলছে, মানে তিনি এটা গ্রহণ করেছেন বলে স্বাক্ষ্য-রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছেন কংগ্রেসকে।
ফলে ট্রাম্পের ইরান বিরোধী চাপাবাজি নির্বাচনের আগের অবস্থান যাই থাক তিনি এখন ওবামার ইরানী “নিউক্লিয়ার ডিল” সহি বলে অনুমোদন করে দিয়েছেন। এটা গত ১৮ মে এর খবর। তাই, ২০ মে সৌদি আরবে গিয়ে “ইরান সন্ত্রাসবাদী” বলে যা কিছু চাপাবাজি করেছেন সেটা তাহলে আসলে লিপ সার্ভিস ছাড়া কিছু ছিল না। আর এটাই সৌদি আরব ‘কিনেছে’।

এমনকি কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার পর সৌদি আরব আবার লিপ সার্ভিস কিনতে এসেছে, দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের এবারের চাপাবাজি হল তিনি টুইট করছেন আর এই ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিজে নিবার চেষ্টা করছেন।  টুইট করতে আমোদ পাওয়া ট্রাম্প এক টুইট করে  বলছেন যে, “আমার সৌদি সফর ফল দেওয়া শুরু করেছে। কাতারের দিকে আঙ্গুল তুলে টেররিষ্ট ফান্ডিং এর বিরুদ্ধে তারা সবাই শক্ত অবস্থান নিয়েছে, অচিরেই টেররিজমের ভীতিকর দিন শেষ হবে”। “So good to see the Saudi Arabia visit with the King and 50 countries already paying off. They said they would take a hard line on funding extremism, and all reference was pointing to Qatar. Perhaps this will be the beginning of the end to the horror of terrorism!” Trump wrote on Twitter.     একজন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট কত নিচে নামতে পারে এর উদাহরণ হয়ে থাকল এটা। কিন্তু এটাও ট্রাম্পের নীচা হবার শেষ নয়। তিনি ঐদিক শুধু টুইট নয়, বক্তৃতা করে বলেছিলেন, কাতারকে নাকি টেররিজম ফাইন্যান্সিং করে আর এটা তাকে ছাড়তেই হবে। কিন্তু পরের দিনই তার একেবারে উলটা মুর্তি। সিএনএনের ভাষায় অলিভ গাছের ডাল মাথায় বেধে নিয়ে (এটা শত্রু বা বিরোধীকে ইঙ্গিত দেয়া যে বিরোধীর সাথে আপনি এখন আপোষ করতে চান।) ট্রাম্প কাতারের আমীরকে ফোন করেছেন। নানান মিঠা কথা বলেছেন কারণ এক বিলিয়ন ডলার খরচ করে বানানো ঐ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় আমেরিকান সামরিক ঘাটি আছে কাতারে। এছাড়া আর এক কারণ হল, ঐদিক তিনি যখন কাতারকে ধুয়ে ফেলতেছিলেন, সৌদিদের কোলে উঠে প্রশংসা করতেছিলেন, ঠিক সেই সময় তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিলার সন ঠিক তার উলটা কথা বলছিলেন, যে কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বে আরবদের অবরোধ শেষ করা উচিত কারণ এতে ঐ “সামরিক ঘাটির ততপরতা ব্যহত হচ্ছে”। অর্থাৎ টিলারসন কাতার ক্রাইসিস থেকে আমেরিকাকে নিউট্রাল জোনে নিতে চাচ্ছেন। আর ট্রাম্প সেখানে কাতার ক্রাইসিস তৈরি করার ক্রেডিট নিচ্ছেন। এই স্ববিরোধীতা সামলে নিতে, বেকুবি আড়াল করতে ট্রাম্প তাই মিষ্ট কথায় ফোন করেছেন কাতারের আমীরকে। এছাড়া রয়টার্স লিখছে,  ট্রাম্প যখন কাতার ইস্যুতে এভাবে আরবদের পিঠ চাপড়াচ্ছিলেন, পেন্টাগন ঠিক তখন  কাতারের সাথে ফোনে ছিলেন আর প্রশংসা করছিলেন যে, “কাতার সরকার আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি নিজের দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে কাতারে আমেরিকান সামরিক ঘাটির হোস্ট হিসাবে নিরলস খেদমত করে যাচ্ছেন আমরা এর প্রশংসা করি”। এভাবেই আমেরিকার প্রেসিডেন্টের প্রতিরক্ষামন্ত্রী কাতারি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সাথে ফোনে কথা বলেছেন বলে আমেরিকান মুখপাত্র নিশ্চিত করেছেন। [U.S. Defense Secretary Jim Mattis spoke on Tuesday by phone with his Qatari counterpart, a Pentagon spokesman said, without disclosing the details of their discussion] রয়টার্স আমেরিকান এক কূটনৈতিকের বরাতে জানাচ্ছে, “ট্রাম্পের টুইট একটু অস্বস্তিকর হলেও আমেরিকা নিরবে সৌদি আর কাতারের উত্তেজনা ঠান্ডা করার পক্ষে কাজ করছে কারণ কাতার আমাদের কাছে সামরিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের দিক থেকে খুবই গুরুত্বপুর্ণ”।

এই হল লিপ সার্ভিসের কথা। তবু কাতার সরকারকে সৌদিরা উঠিয়ে ফেলে দিতে পারে, নিজ পছন্দের যে কাউকে আমীর বানাতে পারে। এককথাট বললে সৌদিরা কাতারে সামরিক হস্তক্ষেপ করে বসতে পারে সে সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু, তা মিটিয়ে নষ্ট করে দিয়েছে তুরস্কের এরদোগান। প্রথম দিন তিনি এক বিবৃতি দিয়ে বয়ানে নিজের পক্ষে পরিস্থিতি ঘুরিয়ে দেন। বলেন যে কাতারের বিরুদ্ধে ‘টেররিজমের অভিযোগ সত্য’ হলে তিনি নিজেই আগে ব্যক্তিগতভাবে আমল ও হস্তক্ষেপ করতেন। [ “Presenting Qatar as a supporter of terrorism is a serious accusation,” the Turkish leader said. “I know [Qatar’s leaders] well and if that had been the case, I would have been the first head of state to confront them.”] অর্থাৎ তিনি আসলে বলছেন, টেররিজমের অভিযোগ ছাড়েন, কাতারকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে আমি দিব না।

এটাকে বলা যায়, সৌদিরাই কী দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির প্রধান নেতা হবেন? নাকি নাকি তিনি কেউ নন?  – এই প্রশ্নে এরদোগানের জিত হয়েছে। তিনি আসলে বলেছেন আমি দুনিয়ায় মুসলিম কমিউনিটির মনঃকামনা পুরণের নেতা।  আর তাই পরেরদিন তুরস্ক ২০১৪ সালের এক চুক্তি মোতাবেক কাতারে এক সামরিক ঘাটি স্থাপন করেছে, জানতে পারি।  তুরস্কের পার্লামেন্ট এটা অনুমোদন দিয়েছে।  আর এটাই সম্ভাব্য যে কোন সৌদি সেনা পাঠানোর পরিকল্পনার বিরুদ্ধে এক বিরাট ডিটারেন্ট, পাল্টা অবস্থান যা সৌদিদের যে কোন গোপন-প্রকাশ্য ইচ্ছাকে একাবারে নাকচ করে ফেলেছে। তাই এক কথায় বলা পরিস্থিতি এখন স্টেলমেট। অর্থাৎ গায়ের জোর বা সামরিক মাসল দেখানোর আর সুযোগ নাই। এখন খুব সম্ভবত পরিস্থিতি বাতচিত ডায়লগ এই লাইনে আগাবে ও শেষ হবে – বিবদমান সবপক্ষের জন্য এটাই একমাত্র খোলা পথ।  ওদিকে জার্মানীর পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এক সাক্ষাতকারে ট্রাম্পকে কাতার পরিস্থিতির জন্য এক হাত নিয়েছেন। তিনি অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করাসহ ট্রাম্পের এই নীতিকে কঠোর সমালোচনা করেছেন। এটাও কম তাতপর্যপুর্ণ নয়।

খুব সম্ভবত সৌদিদের হার এখন ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকবে। রাশিয়া সফররত কাতারি পররাষ্ট্র মন্ত্রী (সন্তান থানি) যখন মিডিয়া সাক্ষাতে বলেন “হামাস রাজনৈতিকভাবে এক বৈধ  প্রতিরোধ আন্দোলন” – এই বয়ানের ওজন ভয়ানক। মজলুমের পক্ষে দুনিয়াব্যাপী মুসলমান জনগোষ্ঠি এই বয়ানের পক্ষে দাঁড়িয়ে গেছে ও যাবে, যা অপ্রতিরোধ্য।

এঘটনায় সবচেয়ে বড় সুযোগ এসেছে সৌদি বাদশার। তিনি চাইলে ছেলের বুদ্ধিসুদ্ধির ব্যাপারে কিছু শিক্ষা নিতে পারেন। নাকি ২০৩০ সালে সব শেষ হওয়া পর্যন্ত তিনি অপেক্ষা করতে চান! আমরা অপেক্ষা করব হয়ত দেখার জন্য।

 

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ইরানের ঘাড়ে চড়ে ট্রাম্পের সৌদি সফর ও অস্ত্র ব্যবসা

ইরানের ঘাড়ে চড়ে ট্রাম্পের সৌদি সফর ও অস্ত্র ব্যবসা

গৌতম দাস

৩০ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:০৩

http://wp.me/p1sCvy-2fK

 

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম বিদেশ সফর সমাপ্ত করলেন। নয়দিন ব্যাপী এই সফর ট্রাম্পের সৌদি আরব সফর দিয়ে শুরু হয়ে বেলজিয়াম  সফর দিয়ে শেষ হয়েছে। বেলজিয়াম বলা হলেও এটা আসলে ছিল আমেরিকার ইউরোপের বন্ধুদের সাথে নীতি সমন্বয়ের সফর যেখানে অন্তর্ভুক্ত গ্রুপ সেভেন ( G7, মানে শীর্ষ সাত বড় অর্থনীতির রাষ্ট্রজোট বা ক্লাব)  এর মিটিং, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে মিটিং আর ন্যাটোর সাথে মিটিং।

চলতি মে মাসের ২০-২১ তারিখে ছিল ট্রাম্পের রাজকীয় সৌদি আরবে সফর। এটা সেই একই ট্রাম্প, যিনি গত ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েই তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘মুসলিম ব্যান’ বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, সব মুসলমানদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করবেন। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সেটা তাঁর মুরোদে না কুলালেও অন্তত সাত মুসলমান দেশ থেকে রওনা দিয়ে এসে আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন তিনি। তবে তিনি তার সেই আদেশও টিকাতে পারেননি। আমেরিকান আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে সেটা রদ হয়ে যায়, এবং পরপর তা দু’বার। সেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মুসলমানদের খুবই গুরুত্বপুর্ণ দেশ, সৌদি আরব সফরে গেছিলেন। তাঁকে যেতেই হয়েছিল, সবই ভাগ্যের পরিহাস! কারণ প্রেসিডেন্ট হিসাবে তার প্রথম বিদেশ সফর এই সৌদি আরবেই। আর আমেরিকান সরকারের জন্য খুবই লোভনীয় কিছু সেখানে হাজির হয়েছিল, তাই।  ফলে কী ছিল এই লোভনীয় সফরে?

মাত্র ২৫ বছর ব্যবধানের (১৯১৪ আর ১৯৩৯) দুনিয়া দুই বিশ্বযুদ্ধ দেখেছিল।  দুনিয়ার ইতিহাস ভুগোলের আগা-পাশ-তলার বহু কিছুই উল্টেপাল্টে দিয়েছিল সে যুদ্ধ। বিশেষ করে ইসলামি জনগোষ্ঠীর সর্বশেষ এক খলিফার শাসনাধীন অটোম্যান সাম্রাজ্যকে প্রথমে ভেঙে দুই বড় টুকরোয় ভাগ করে নিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী ততকালীন ব্রিটিশ আর ফরাসি সরকার। এরপর দুই অংশেরই তস্য টুকরো টুকরা করা শুরু করেছিল। ব্রিটিশ অংশ থেকে এক বড় টুকরা ভাগ নিয়ে আজকের রাজতান্ত্রিক সৌদি আরব রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা (আবদুল-আজিজ আল-সৌদ) ইবনে সৌদের হাতে ১৯৩২ সালে রাজতন্ত্রী সৌদি আরব রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল। অবশ্য তাহলেও আমেরিকার সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষে, ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষের দিকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট মিসর সফরে এসে কিছু আরব নেতার সাথে দেখা করেছিলেন। সে সময় বাদশাহ ইবনে সৌদ আর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে প্রথম শীর্ষ বৈঠক হয়েছিল সুয়েজ খালে নোঙর করা আমেরিকান যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কুইনসে বসে। সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক অনেক পুরনা, সৌদি আরবের জন্মের মাত্র ১৩ বছর পর থেকে যা এখনও বর্তমান। সিঙ্গাপুরের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘এশিয়ান টাইমস’ গত ১৮ মে সংখ্যায় এসব পুরনো ইতিহাস স্মরণ করেছে।
এক রাজকীয় রেওয়াজের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, সৌদি বাদশাহ এক কাপ কড়া সৌদি কফি পান করতে দিয়েছিলেন তার বিশেষ অতিথি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে। প্রেসিডেন্ট শান্তভাবে সে কফি পান করার পরে রাজা ওই কাপ মেঝেতে আছড়ে ভেঙে ফেলে বলেছিলেন, “আপনি আমার কাছে খুবই বিশেষ একজন। তাই এই কাপ আপনার পর আর কেউ যেন ব্যবহার করতে না পারে তাই ভেঙে ফেললাম”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই নায়ক রুজভেল্ট দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে ওই সফরের দু’মাসের মাথায় সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়ই মারা যান; তবু বলা যায়, এই রিচুয়াল দিয়ে সৌদি-আমেরিকান সম্পর্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা ভালোভাবেই কার্যকর হতে পেরেছিল। এশিয়ান টাইমস লিখছে, “ইবনে সৌদের সাথে রুজভেল্টের চুক্তি হয়েছিল যে, সৌদি তেলের বিনিময়ে আমেরিকা ইবনে সৌদ ও তার উত্তরাধিকারীদের সৌদি সরকারগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে”। (In exchange for Saudi oil, the Americans promised to support the kingdom, militarily and politically, under Ibn Saud and all of his successors. )। পরে এই সম্পর্ক আরেক উঁচুপর্যায়ে পৌঁছেছিল প্রেসিডেন্ট নিক্সনের আমলে ১৯৭৪ সালে। বলা ভালো, ১৯৭৩ সালের অক্টোবর শেষ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে আরবদের হার হয়েছিল আর এর প্রতিক্রিয়ায় পরের ছয় মাস ধরে তেল অবরোধ চলেছিল।
ইসরায়েল সমর্থক আমেরিকা ও তাদের বন্ধু অন্য রাষ্ট্রগুলোকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল এই তেল অবরোধে। এই অবরোধের সমাপ্তিতে নতুন চুক্তি করার ক্ষেত্রে সৌদি-আমেরিকা পরস্পরের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার হিসেবে অনুভব করেছিল। সৌদি আরব সফরে গিয়েছেন এমন  প্রথম আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি সফরে গিয়ে তাদের সেই সম্পর্ক আরো পাকা করেছিলেন। ফলে সৌদি আরবের মনে হয়েছিল আমেরিকান প্রটেকশনের প্রতিশ্রুতিতে সৌদি আরব শাসনে রাজতন্ত্র ব্যবস্থার আয়ু আরো দীর্ঘ হয়েছে এবং তা যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে থিতু অবস্থায়। কিন্তু সৌদি আরবের সেই সুখ অনুভব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায়, ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব আবার এক অনিশ্চয়তা হিসেবে সৌদি রাজ শাসনের উপর ছায়া ফেলেছিল। ইরানের বিপ্লব রাজতান্ত্রিক শাসনের ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্ন তুলে নড়বড়ে করে দেয়ার ক্ষমতা নিয়ে হাজির হয়েছিল। তবে আরেক দিক থেকে দেখলে ইরানের এই বিপ্লবে ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি আমেরিকাও। কারণ সে শাহের ইরান হারিয়েছিল এবং বিপ্লবের ফলে ইরানের সাথে আমেরিকার আবার সহসাই কোনো ধরনের সম্পর্ক ফিরে  তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। ওদিকে ইরান-সৌদি কূটনৈতিক সম্পর্ক সেই থেকে খারাপ থেকে আরো খারাপ হয়ে যায়। তবে উল্টা দিকে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের প্রায় স্থায়ী হয়ে যাওয়া খারাপ সম্পর্ক সৌদি আরবকে স্বস্তি দিয়েছিল। সৌদিরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, ইরান-আমেরিকার সম্পর্ক সঙ্ঘাতময়ই এবং এই সঙ্ঘাতের দীর্ঘস্থায়িত্বের মধ্যেই সৌদি আরব রাজতন্ত্রের ভাগ্য নিহিত। পরের ৩৫ বছর ধরে ইরান-আমেরিকার সম্পর্ক সঙ্ঘাতময় থেকেছে। তদুপরি, ইরানের ওপর আরোপিত পশ্চিমের অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানকে যথেষ্ট ভুগিয়েছে।
সবশেষে ২০১৫ সালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসনের আমলে এক ‘নিউক্লিয়ার ডিল’-এর বিনিময়ে, ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নেয়া শুরু হয়েছিল। আর সেই থেকে সৌদি আরবের অস্বস্তি আর অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। রাজপরিবার সৌদি আরবে রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম চিন্তিত হয়ে পড়ে।
ওবামা প্রশাসন ইরানের সাথে ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ কেন করতে গিয়েছিল এর প্রধান কারণ ছিল আইএস মোকাবেলায় ইরানকে পাশে পাওয়া এবং অনেক দায় ও খরচ ইরানের ওপর দেয়ার সুযোগ নেয়া। কারণ ইরাকের ওপর আইএসের আক্রমণ ও তৎপরতার চাপ বাড়ছিল। ওবামা প্রথম টার্মে তো বটেই, দ্বিতীয় টার্মেও সামগ্রিকভাবে ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে ‘আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহার’ আর বিশেষ করে ‘মাঠের সৈন্য প্রত্যাহার’ এই নীতিতে পরিচালিত হচ্ছিলেন। এর মূল কারণ ছিল, আমেরিকান অর্থনীতির যুদ্ধের খরচ মিটাতে অপারগতা হয়ে পড়েছিল। ফলে ২০১৪ ডিসেম্বরকে আগেই কাট-অফ ডেট ঘোষণা করা হয়েছিল। দ্বিতীয় কারণ এটাও ছিল যে, আমেরিকার জড়িয়ে যাওয়া অন্তহীন যুদ্ধে থেকে দেশকে বের করে আনা। অথচ ২০১৫ সালের আইএসের তৎপরতা সেখানে মাঠের সৈন্য বাড়াবার তাগিদ হাজির করছিল। এই অপারগ পরিস্থিতিতে ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী’ জোট তৎপরতায় ওবামা ইরানকেও অন্তর্ভুক্ত করে পেতে চাইলেন। বিশেষ করে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমেরিকার ইরাক দখলের পরের ইরাক ইরান প্রভাবিত মালেকী সরকারের হাতেই চলছিল। ফলে ওবামার হিসাব হলো, ইরাক সরকারের সাথে ইরান এসে যোগ দিয়ে তারাই ইরাকে আইএস তৎপরতা রোধের বাড়তি দায়িত্বে নিক। তাতে খরচের ও সামরিক দায়ের এক বড় অংশ ইরান সরকারই বহন করবে।
আর ওবামার এই নতুন নীতিকে সৌদি সরকার ঘোরতরভাবে নিজ স্বার্থবিরোধী এবং বিশেষ করে নিজ রাজতন্ত্রের আয়ূর দিক থেকে বড় বিপদ হিসেবে দেখেছিল। ফলে সেই থেকে আমেরিকার ওপর সৌদি ক্ষোভ আর হতাশা কত তীব্র হয়েছিল তা বুঝার একটা উপায় হলো সৌদি আরব রাশিয়ার পুতিনের সাথে নিজের সুরক্ষা নিয়ে কথা বলেছিল। আমেরিকার বদলে নিজের সুরক্ষার কাজ রাশিয়ার সাথে করা যায় কিনা, রাশিয়াকে দেয়া যায় কিনা সে আলোচনায় বসেছিল। তখনও রাশিয়া থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের অস্ত্র সৌদি আরবের দিক থেকে ক্রয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। কিন্তু শর্ত ছিল, সিরিয়াসহ পুরা ইরানি ব্লক থেকে রাশিয়াকে দূরে সরে আসতে হবে। কিন্তু রাশিয়ার কাছে স্থায়ী ও কৌশলগত সম্পর্কের দিক থেকে ইরান-সিরিয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার বলে গণ্য করে, দখল করে আছে। ফলে সেই প্রস্তাবিত রাশিয়ান ডিল কোনো ইতি পরিণতি পায়নি। ইতোমধ্যে আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রার্থিতার মধ্যে আশার আলো দেখেছিল সৌদি আরব। কারণ, যেটা বুঝা গিয়েছিল, কোন ডেমোক্রাট প্রেসিডেন্ট ফিরে এলে ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ উল্টে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে রিপাবলিকান হলে কিছু হলেও সম্ভাবনা আছে, যদি সবটা নেই। কারণ এটা শুধু ইরান-আমেরিকান সমঝোতা নয় বরং এটা জার্মানিসহ জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের (৫+১) সাথে একযোগে ইরানের ডিল।
তবু এক কথায় বললে, ট্রাম্পের এই সৌদি সফর ছিল এক পুরোপুরি আই ওয়াশ। দেখানো হয়েছে, সৌদি উদ্যোগে পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান রাহিলের নেতৃত্বে এক “আরব ন্যাটো” গঠন করা হয়েছে।আর আসলে  তা অপ্রকাশ্যে হল এক ইরানবিরোধী সুন্নি রাষ্ট্র জোট। আর কাজের সৌদি উদ্দেশ্য হল,  সুন্নিপ্রধান রাষ্ট্রগুলোর জনগণ না হোক অন্তত সরকারগুলোকে নিজের রাজতন্ত্রের পক্ষে ‘বুক’ করে রাখা। যাতে সৌদি আরবের রাজতন্ত্র ভিত্তি কোন ক্রাইসিসে পড়লে এই সরকারগুলোকে সৌদি আরব আগে থেকেই নিজের পক্ষে পাবে।  তামাশার দিকটা হলো এই ‘আরব ন্যাটো’ এটা করা হলো ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী ইসলামি রাষ্ট্রজোট’ বলে। আর এই জোটের উদ্বোধন আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে দিয়ে করিয়ে তার মুখ দিয়ে ইরানবিরোধী বুলি হাজির করা হলো। তার মানে এখানে “সন্ত্রাসবাদ” বলা হয়েছে ঠিকই কিন্তু এই সন্ত্রাসবাদী হল ইরান!
তাই এমন কোনো মিডিয়া দেখা যায়নি, আমেরিকা্নর ভিতরের বা বাইরের, যে ট্রাম্পের এই সফরকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে অথবা ফেসভ্যালুতেই সম্মেলন যা কিছু বলা হয়েছে তা বিশ্বাস করেছে। যেমন  সাপ্তাহিক লন্ডন ইকোনমিস্ট তার আর্টিকেলের শিরোনাম করেছে, “New tricks Donald Trump’s reset on Islam” যার ভিতরে প্রায় প্রতিটা বাক্যই ট্রাম্পের শঠতা প্রসঙ্গে লেখা। লিখেছে, ট্রাম্পের এই সফরকে ওবামার ২০০৯ সাল কায়রো সফরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ঐ সফরে ওবামা তার আগের প্রেসিডেন্ট বুশের ওয়ার অন টেররের নীতির কারণে ক্ষুব্ধ মুসলমানদের অভিযোগ শুনে তাদের মানায় নেবার চেষ্টায় বক্তৃতা করেছিলেন। আর এখন ট্রাম্প হাজির হয়েছেন নিজের ইসলামোফোবিক যতসব বকোয়াজ নিয়ে নিজেই এক বোঝা হিসাবে হাজির হয়েছেন। (“But whereas Mr Obama attempted to mend the damage wrought by the war in Iraq, Mr Trump was burdened by his own Islamophobic rhetoric)“। ইকোনমিস্ট আরো বলছে, ট্রাম্প এই সফরে চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়ার কথা বলেছেন। আবার বলেছেন এই যুদ্ধ বিভিন্ন ধর্মের মধ্যেকার লড়াই নয় এটা নাকি ভাল মানুষ আর শয়তানের লড়াই (“not a battle between different faiths”, but “between good and evil”)।  ট্রাম্প সেখানে ইরানের  মানবাধিকারের রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন বলেছেন, ইরানকে ঝাড়ি দিয়েছেন। অথচ ট্রাম্পের হোস্ট সৌদি আরব তার রেকর্ডই আরও বেশি খারাপ। আমেরিকায় আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে ইরানের চেয়ে সৌদি লোক বেশি।

ওদিকে নিউইয়র্ক টাইমস ২১ মে আর এক রিপোর্ট বের করেছে যার শিরোনাম হল, “ইরানের ঘাড়ে চড়ে ট্রাম্প সৌদি আরবে সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর কাছে পৌচেছেন” (In Saudi Arabia, Trump Reaches Out to Sunni Nations, at Iran’s Expense)। ঐ রিপোর্টে টাইমস লিখেছে ট্রাম্প তার বক্তৃতায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আরব স্বৈরশাসকদের সাথে আমেরিকার বিশেষ শখ্যতার যে পুরান নীতি আমেরিকার ছিল তাতে তিনি  ফিরে আসতে চলেছেন। তাতে এসব স্বৈরশাসকদের মানবাধিকার রেকর্ড যতই খারাপ হোক না কেন; আর এদের কারণে বিভিন্ন জায়গায় আমেরিকার বদনাম বা স্বার্থহানি যা কিছুই হোক না কেন – প্রেসিডেন্ট আরব রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। (In using the headline address of his first foreign trip as president to declare his commitment to Sunni Arab nations, Mr. Trump signaled a return to an American policy built on alliances with Arab autocrats, regardless of their human rights records or policies that sometimes undermine American interests.)

এসব ত গেল আরব স্বৈরশাসকের সাথে আমেরিকার মহান নেতা ট্রাম্প কী করবেন, কী শখ্যতা গড়বেন  আর নতুন তাদের বয়ানে ইরানই হল সন্ত্রাসবাদের নেতা – এসব পুরান ধান্দার কথা আমরা কমবেশি জানি। ফলে এই সফর আসলে ছিল ট্রাম্পের “ইরান ব্যাসিং” (ঝাড়ি মারা) করে আরব স্বৈরশাসকদের কোলে উঠে পড়া।  কিন্তু তাহলে ইরান-আমেরিকান যে “নিউক্লিয়ার ডিল”  ওবামা দুবছর আগে রচনা করে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী তা ফেলে দিয়েছেন? ঐ চুক্তিত স্টাটাস কি এখন?

ফ্যাক্টস হল এই সফরে ইরানের বিরুদ্ধে  ট্রাম্প যতই হম্বিতম্বি করুন চাপা মারুন না কেন, বাস্তবতা হল, ট্রাম্প ওবামার ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ থেকে একচুলও পিছু হটেন নাই। বরং আমেরিকার প্রভাবশালী রেডিও-এর ওয়েব সাইট এনপিআর (NPR,ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও) এর ১৭ মে-এর রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ট্রাম্প প্রশাসন (ইরান অবরোধ প্রয়োগ না করে ছাড় দেয়ার ওবামা নীতি বজায় রাখছেন, নিউক্লিয়ার ডিল্কে বাচিয়ে রাখছেন” (Trump Administration Upholds Iran Sanctions Waiver, Keeping Nuclear Deal Alive)। এরপর ঐ রিপোর্ট ব্যাখ্যা করেছে কেন ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের পথে। লিখেছে, “ইরানের সাথে এই চুক্তির অংশীদার একা আমেরিকা নয়, সাথে ইইউ রাশিয়া এবং চীনও। ফলে আসলে ট্রাম্প প্রশাসন এই ইরান নিউক্লিয়ার চুক্তি ভাঙ্গার দায় নিয়ে পারবে না। কারণ এরপর তাহলে আর  কোন পার্টনার খুজে বের করা অসম্ভব হবে। এবং সেসব পার্টনারেরা এখনও এই চুক্তি ধরে রাখার পক্ষে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে”।

ইরান নিউক্লিয়ার চুক্তি অনুসারে, ইরান তার উপর আরোপিত পশ্চিমের অর্থনৈতিক অবরোধ পশ্চিম শিথিল করবে আর এর বিনিময়ে ইরান নিজের নিউক্লিয়ার কর্মসুচি কাটছাট করে সীমিত করে আনবে। কিন্তু যেসব অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছে তা নিয়মিত সময় অন্তর পরীক্ষা করে দেখে সব ঠিক থাকলে তা রিনিউ করে দেয়া দরকার। গত ১৭ মে ছিল ট্রাম্পের আমলে এসে এর প্রথম ডেডলাইন।  এই পটভুমি  পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের আর এক গুরুত্বপুর্ণ পত্রিকা “মনিটর” জানাচ্ছে, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ফরেন সেক্রেটারী টিলারসন বলেছেন “১৮ এপ্রিল কংগ্রেসকে চিঠি দিয়ে তিনি সার্টিফাই করে জানিয়েছেন, ইরানি ডিলে ইরান সঠিকভাবে তার করণীয় শর্তাবলি মেনে চলছে”। (Secretary of State Rex Tillerson certified in an April 18 letter to Congress that Iran was adhering to the nuclear deal)।  আরেক কর্মকর্তা বলছেন, আমরা যদিও এখনো পর্যন্ত ইরানি ডিল পুরোটাই পর্যালোচনা করে দেখছি। কিন্তু এইদিন পর্যন্ত যা দেখেছি  তার সবকিছুই ইরান ঠিকঠাক পালন করেছে ফলে তারা চুক্তি বজায় রাখার পক্ষে থাকবে।

 

তাহলে পাগলা ট্রাম্প “উল্টা হাওয়া হয়ে” সৌদি আরবে গেল কেন? কারণ ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি হলে ক্রেতার সন্তুষ্টিতে কিছু তো করা দরকার! বোম্বাস্টিং চাপাবাজি কিছু অন্ততঃ! একটু তলোয়ার নাচ নেচে আসলেন – এই আর কী!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ২৮ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া ২৯ মে অনলাইন দুরবিন -এ তেও অন্সেয এক ভার্সান ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]