ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

ইজিপ্ট ১: মোরসির ক্ষমতা কতদূর প্রশ্ন কেন উঠছে?

গৌতম দাস || Wednesday 27 June 12 || বিষয় অনুসারে পড়ুন : ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য

https://wp.me/p1sCvy-2tI

 

[এই লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ২০১২ সালে। এখানে হুবহু সেটাই তুলে রাখা হয়েছে আর্কাইভ করে রাখার উদেশ্যে আগষ্ট ২০১৮ সালে। দুই পর্বে লেখাটার এটা প্রথম পর্ব।]

ইজিপ্টের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মানে দ্বিতীয় দফার রান-অফ নির্বাচন শেষ হবার পর, আরও তাৎপর্যপূর্ণ এই যে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় ২৫ জুন সন্ধ্যায় ব্রাদারহুডের প্রার্থী মোহম্মদ মোরসিকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছে। তবু দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় সব জায়গায় মূল আলোচনার বিষয় মোরসির ক্ষমতা কি কি, কত দিনের প্রেসিডেন্ট, কি তাঁর কাজ এবং কাজের সীমা ইত্যাদি। কোন রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী (প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট) বলতে প্রচলিত যে ধারণা দুনিয়ায় আছে সেই রকম একটা ভাবের মধ্য দিয়ে এই নির্বাচন ঘটেছে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কোন রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট বলতে দুনিয়াতে প্রচলিত ভাবটা কে কি বুঝে তা দিয়ে কোন কাজ চলতে পারে না, বরং ঐ সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বেলায় নির্বাহী প্রেসিডেন্ট-এর মানে কি, কি তাঁর ক্ষমতা, কোনটা তার নয়, কতদিনের জন্য ক্ষমতা ইত্যাদি স্পষ্ট করে বলা থাকতে হয়। তা বলা থাকতে হয় কনষ্টিটিউশনে এবং নির্বাচনের আয়োজন শুরুরও আগেই । একটা কনষ্টিটিউশন কোন রাষ্ট্রের থাকার মানে হল ঐ রাষ্ট্রের নাগরিক-জনগণ রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত (কনষ্টিটিউটেড) হয়েছে; এভাবে হলে, হয়ে গিয়ে থাকলে সেটাকে রাষ্ট্র বলা চলে। অন্যভাবে বললে জনগণ রাজনৈতিকভাবে কনষ্টিটিউটেড হওয়া আর রাষ্ট্রের জন্ম হয়ে যাওয়া একই কথা। আর সেই সাথে জনগণ কিসের ভিত্তিতে একত্র হলো, কনষ্টিটিউটেড হলো সেই ভিত্তি – জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার কোন ভিত্তি – সেকথার লিখিত দলিলটা হলো কনষ্টিটিউশন। ঐ কনষ্টিটিউশনে বলে দেয়া থাকে, রাষ্ট্র যে পরিচালনার করবে সেই নির্বাহী প্রধান রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী কাজ, ক্ষমতা কি, কতদিনের, রাষ্ট্র কিভাবে পরিচালনা হবে ইত্যাদি। এরপর সেই কনষ্টিটিউশনের অধীনস্ততা মেনে রাষ্ট্রের বাকি সমস্ত  প্রতিষ্ঠান এমনকি খোদ নির্বাহী প্রধান, পার্লামেন্ট অথবা বিচার বিভাগ সবাই আনুগত্য প্রকাশ করেই একমাত্র তারা যার যা ভুমিকা পালন করতে পারে। ফলে রাষ্ট্র দৃশ্যমান হয়। খেয়াল রাখতে হবে আমি রাষ্ট্রের কথা বলছি, দেশ না। দেশ বলতে ওর মাটি সীমানা মানুষ ইত্যাদি সবই থাকতে পারে – এতে দেশ হয়ে থাকলেও তা রাষ্ট্র নাও হতে পারে। সোমালিয়া একটা দেশ বটে কিন্তু রাষ্ট্র নয় সেটা। আবার কোন দেশ একই থাকে কিন্তু ওর রাষ্ট্র আবার কনষ্টিটিউট বা গঠন করে নেবার দরকার হতে পারে। দরকারের মূল কারণ, পুরানা রাষ্ট্র আর জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে না তাই। রাজনৈতিক শব্দে একে কোন দেশের নতুন করে রিপাবলিক গড়া বলে। আবার অনেকের মনে হতে পারে এতক্ষণ রাষ্ট্র বা রিপাবলিক (গণ)রাষ্ট্র বলতে আমি বোধহয় আগাম ধরেই নিয়েছি যে আমি “গণতন্ত্র” ধরনের রাষ্ট্রের কথাই বলছি। না আমি তা বলছি না। আমি  রাষ্ট্রের কথা বলছি, রিপাবলিক রাষ্ট্রের কথা বলছি। এই রাষ্ট্র ইসলামি, কমিউনিষ্ট, লিবারেল ইত্যাদি অথবা এসবেরও বাইরে নতুন কোন রাষ্ট্র হতে পারে। আর এসব রাষ্ট্র শব্দের আগে বিশেষণে রিপাবলিক কথাটা যোগ করেছি এজন্য যে এটা অন্তত রাজা, বাদশা সম্রাটের রাষ্ট্র বা সাম্রাজ্য নয়; এসবের বিপরীতে জনগণের কর্তৃত্বের রাষ্ট্র কেবল সেটা পরিস্কার রাখার জন্য।

  • ইজিপ্টের ক্ষেত্রে  রাষ্ট্রের কোন কনষ্টিটিউশন বর্তমানে নাই।  মোবারকের পুরানা কনষ্টিটিউশন বাতিল বলে ঘোষণা করা হয়েছে গত পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর, পার্লামেন্ট বসার আগে এবং SCAF (সুপ্রীম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্স)-এর ঘোষণায় নিজস্ব নির্বাহী ক্ষমতার জোরে ।
  • এর মানে ইজিপ্ট একটা অন্তর্বতীকালিন বা মধ্যবর্তী অবস্থায় আছে, পুরানা রাষ্ট্র নাই আবার নতুন রাষ্ট্র কনষ্টিটিউট করা হয়নি – এদুইয়ের মাঝামাঝি অবস্থা।
  • তাহলে নতুন কোন কনষ্টিটিউশনের আগেই একটা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ইজিপ্টে ঘটেছে, ঘোড়ার আগে গাড়ীর মত। আবার এর আগে একটা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেছে গত এপ্রিলে; ব্রাদারহুড যেখানে সংখ্যাগরিষ্ট আসন পেয়েছে। সাথে ইসলামি সালাফি রাজনীতির নূর পার্টি (২৫%) মিলিয়ে মোট ৫৪% আসন এই দুই ইসলামী ব্যকগ্রাউন্ডের রাজনীতিক দলের হাতে। সাধারণভাবে পার্লামেন্ট নির্বাচন মানে আগাম একটা কনষ্টিটিউশন আছে; সে কনষ্টিটিউশনের অধীনে সীমায় থেকে প্রতিদিনের নানান প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ওর কাজ। কিন্তু ইজিপ্টের বিশেষ ক্ষেত্রে নামে বলা হচ্ছে এটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট কিন্তু এর কাজ হবে একটা কনষ্টিটিউশন খাড়া করা। কিন্তু তাও আবার সরাসরি নয়। পার্লামেন্টের দ্বারা একশ মনোনিত (নির্বাচিত নয়) সদস্যের এক কমিটি ইজিপ্ট রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন (খসড়া বা প্রস্তাবিত) খাড়া করবে। যেটা পরে হয়ত পার্লামেন্ট পাশ বা অনুমোদন করলেই হবে; অথবা আবার গণভোটে দেয়া হবে।(“হয়ত” বলে আমাকে বাক্য লিখতে হচ্ছে এজন্য যে এগুলোর কোনটাই পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে পরিস্কার করা হয় নাই।) কিন্তু তাই যদি হয় তবে পুরানা বা নতুন কোন কনষ্টিটিউশনই না থাকা অবস্থায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের কাজ, উদ্দেশ্য লক্ষ্য কী? কেনই বা কথাটা সুরা কাউন্সিল বা পার্লামেন্ট বলা হচ্ছে; যেখানে হবার কথা একটা কনষ্টিটিউয়েন্ট এসেম্বী (কনষ্টিটিউশন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সভা) বা আমাদের বাংলায় সমতুল্য প্রতিশব্দ ‘গণ পরিষদ’; ফলে ঠিক পার্লামেন্ট মেম্বার বা নির্বাচন নয়, বরং গণ পরিষদের সদস্য কে হবেন তাঁর নির্বাচন – এটাই হবার কথা। এটা পার্লামেন্ট নির্বাচনেরও আগের কাজ। প্রথম কাজ কনষ্টিটিউশন বা রাষ্ট্র গঠন – জনগণের কনষ্টিটিউটেড হওয়া – সেটা ঘটানো। এরপর ঐ কনষ্টিটিউশনের অধীনে প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচন। ফলে বড় ধরনের এক গোজামিল এখানে চলছে আমরা দেখতে পাচ্ছি। উপরে বারবার দেখিয়েছি কোন কিছুই স্পষ্ট না করে পার্লামেন্ট নির্বাচনের আওয়াজে ঘটনা চলছে। এমনকি ঐ একশজন কারা কিভাবে মনোনিত হবেন তাও স্পষ্ট করে রাখা হয় নাই। ফলাফলে আমরা দেখেছি, ঐ পার্লামেন্ট এনিয়ে বিরোধ মীমাংসা শেষ করতে না পেরে ঝুলন্ত অবস্থায় ফেলে রাখে। ব্রাদারহুড সালাফি বাদে সমাজের বাকি সবাই পার্লামেন্ট থুয়ে আবার তাহরির স্কয়ারমুখী জমায়েত হয়। এই অবস্থা অবশ্য পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগেও হয়েছিল। নির্বাচন বর্জনের ডাক এসেছিল। কিন্তু এর ভিতরেই পার্লামেন্ট নির্বাচন ঘটেছিল। আর পরে দেখলাম পার্লামেন্টের বিরোধ মীমাংসা যখন হলো না তখন ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় এসে যাওয়ায় সবাই তাতেই মত্ত হয়ে গেল এই ভেবে যে কে প্রেসিডেন্ট হবে তা দিয়েই তারা সব বিরোধের মীমাংসা করে নিবেন।

গণ আন্দোলনে গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে বা যেকোন বিপ্লব সফল করতে গেলে কনষ্টিটিউশন থাকা আর না থাকার মাঝের অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার হাতে থাকছে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বলা যায় সব কিছুর নির্ধারক এবং লক্ষণও বটে। র‍্যাডিকাল কোন পরিবর্তন বিপ্লবের ভাব তুলে এর বদলে তা উদারতাবাদী লোক দেখানো কোন ঘটনা হিসাবে গণ আন্দোলনে পরিণত হয়ে যাবে কি না তা সহজে বুঝবার উপায় হলো অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতাটার দিকে লক্ষ্য রাখা। উপরে পার্লামেন্ট নির্বাচনের নামে তামাশা আর পরে একইভাবে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের নির্বাচনের নামে যে রহস্য ইজিপ্টের আমরা দেখছি – মোরসি নির্বাচিত এটা জানার পরও সাথে সাথে যে প্রশ্ন উঠছে যে তাঁর ক্ষমতা কি কি, আর সমানে পিছন থেকে SCAF সমানে প্রম্পট করছে, এক এক সময় এক এক ভাবে ফরমান জারি করে প্রেসিডেন্টকেই সাইজ করছে – এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করছে অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা কার এটা কত গুরুত্বপূর্ণ, সেন্ট্রাল পয়েন্ট। কিন্তু SCAF কিভাবে কেন অন্তর্বতীকালিন বা ইনটেরিম ক্ষমতা হয়ে গেল? এরমানে আরব জাগরণ আন্দোলন বা বিপ্লবের আওয়াজই কি  SCAF কে ক্ষমতায় আনে নাই? ঘটনা ১০০ ভাগ সত্যি। কিন্তু এই সত্যি ঘটনা ঘটতে পারল কেন? কেন এমন হলো, এদিকটা এখন বুঝাবুঝির দিকে যাব।

ইজিপ্টের ঘটনায় মূল তিন প্লেয়ার – ১) SCAF, ২) স্থানীয় ব্রাদারহুড আর ৩)পশ্চিমের লিবারেল ইসলাম (RAND প্রজেক্ট বা গ্লোবাল কারযাভি ধারা)। এর বাইরে সেকুলার, কমিউনিষ্ট বা লিবারেল ধারার ছোট টুকরা যারা আছে এরা ঠিক গোনায় ধরা প্লেয়ার হতে পারেনি তাই এদের নিয়ে বিশেষ আলোচনা না করে তাহরিরের মাঠের সাধারণ গণ আন্দোলনের কর্মীদের ভিতরে ধরেছি, সবমিলিয়ে যারা চতুর্থ ধারা বলতে পারি।

[এই লেখাটা শুরু করেছিলাম ১৬-১৭ জুনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে। লেখার প্রসঙ্গ ক্রমশ বিস্তার হতে থাকে কারণ, যেটাকে গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম বলছি – এই গুরুত্বপুর্ণ ফ্যাক্টরটা কোথাও আলোচনা হতে দেখিনি। “আরব স্প্রিং” বা গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম জিনিষটা কি কেন, এর প্রভাবে ইজিপ্টের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর সম্পর্কটা কি এটা বাদ  রেখেই সব আলোচনা চলছে। মিডিয়াগুলোর ফোকাস হলো ব্রাদারহুড ইসলাম নিয়ে তেড়ে আসছে এবার কপটিক খ্রীশ্চানদের কি দশা ঘটে এটাই যেন মূল বিষয়। অথচ তুলনায় এটা সবচেয়ে তুচ্ছ দিক। ফলে কেন তুচ্ছ বলছি সেকথাগুলো ব্যাখ্যা করে বলতে গিয়ে লেখা শেষ করতে পারিনি। এদিকে পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার দিকে গড়িয়ে যাচ্ছিল। এই দেখে ঐ ২৫ তারিখেই ঘন্টা দুইয়ের মধ্যে তাড়াহুড়া তবে আলাদা করে “কয়েক ঘন্টা পর ইজিপ্ট – কি ঘটতে পারে? কি হতে যাচ্ছে?” শিরোনামে লেখাটা দিয়ে দেই। এখন মুল লেখাটা আবার সাজিয়ে লেখার চেষ্টা করছি, কয়েক পর্বে। ]

 

বিপ্লবী রাজনীতি না উদারবাদী রাজনীতি

কোন গণঅভ্যুত্থান ঘটাতে, বিপ্লব সফল করতে গেলে পুলিশ-মিলিটারীর মার নির্যাতন সহ্য করা, অঙ্গ হারানো, নিহত বা গুম হয়ে যাওয়া ইত্যাদিতে দমনের সব পথ মোকাবিলায় পাড়ি দিয়েই একমাত্র সেটা ঘটতে পারে—এটা কমবেশি সবাই জানেন। কিন্তু কোন প্রতিরোধ আন্দোলন সেটা গণঅভ্যুত্থান, বিপ্লব হলো বা হবে কি না, পৌছাবে কি না তা – কতটা মাত্রার দমন নির্যাতন সহ্য করা হয়েছে তা মেপে ঠিক হয় না; বলা ভাল নির্যাতনের মাত্রা আর বিপ্লব – এদুটোর আসলে কোন সম্পর্কই নাই, সম্পর্ক আছে মনে করে কোন মনবুঝ দেয়াটাও বেকুবি, নিজেকে ধোকা দেয়া। বাংলাদেশেও তরুণ রাজনৈতিক কর্মীরা ১৯৯০ সালে নিজেদের সাথে এমন ধোকাবাজি করেছিল, দাবি করেছিল প্রেসক্লাবের রাস্তায় বসে বাদাম চিবাতে চিবাতে তারা নাকি এক গণঅভ্যুত্থান করে ফেলেছিল। ইজিপ্টের আরব জাগরণের বিপ্লবীরা একই সমস্যায় পড়েছে। গত আঠারো মাস ধরে আন্দোলনে তাদেরও ধারণা হয়েছিল তারা বিপ্লবের স্বাদ পেয়েছে, নিচ্ছে। আজ (১৬-১৭ জুন) প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দ্বিতীয় রাউন্ড মানে রান-অফ চলছে। দুমাস আগের নির্বাচিত পার্লামেন্ট সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল (সামরিক নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রিত এক ধরণের কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট) “অবৈধ” ঘোষণায় ভেঙ্গে দিয়েছে ঠিক এর দুদিন আগে ১৪ জুন। দিন দশেক আগে ঐ একই আদালত (প্রায় একই বিচারকেরা তবে কোর্টের নাম আলাদা) হোসেনী মুবারক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং ছয়জন সিনিয়র পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক আন্দোলনে নিহত ৮০০ এর মত আন্দোলনকারীকে হত্যার অভিযোগ থেকে “প্রমাণাভাবে” তাদের খালাস বলে রায় দিয়েছে। অর্থাৎ এই ৮০০ জনকে কারা মেরেছে, কাদের হুকুমে পুলিশ গুলি ছুড়েছে তা আইনের চোখে আন-আইডেনটিফায়েড”, তাই বেকসুর খালাস। কিন্তু সাথে এক তামাশা আছে এখানে। ঐ ৮০০ জনকে হত্যা রাষ্ট্র কেন প্রটেক্ট করতে পারেনি এই অভিযোগে কেবল প্রেসিডেন্ট ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জাবজ্জীবন সাজা দেয়া হয়েছে। এর আগে এতদিন ইজিপ্টের বিপ্লবী তরুণেরা খুশিতেই ছিল বিপ্লবের কিছু একটা হচ্ছে মনে করে। বিপ্লব প্রায় শেষ মনে করে, বিপ্লবের গাথা লিখাতেও তারা উদ্যোগী হয়ে গিয়েছিল। গান ছড়া, কার্টুন ডকুমেন্টারীতে সমাজ সয়লাব হচ্ছিল, যেমন হয়। কিন্তু এই রায়ের পরেই কেবল তারা প্রথম টের পাওয়া শুরু করে যে তারা প্রতারিত, ঠকেছে তারা। সবকিছু হাতছাড়া তাদের, আঙ্গুলের ফাঁক গলে সব বেরিয়ে গেছে। কবে কিভাবে বের হয়ে গেছে টেরও পায়নি। এতদিন খুশিতে আশা ভরশায় বুঁদ হয়ে মগ্ন থাকছিল আর ভেবে ছিল মোবারক আর তার সঙ্গী সাগরেদদের বিচার হচ্ছে, হবে। আসলে তরুণ আত্মত্যাগী রাজনৈতিক কর্মীরা নিজেদেরই ঠকিয়েছে; কারণ বিপ্লব কি, কি করে বুঝা যায় বিপ্লব হচ্ছে কি না, হবে কি না সে সম্পর্কে তাদের ভাবনা কত নাদান সে খবর রাখতে চায়নি। প্রতিরোধ আন্দোলন সময়ের নির্যাতন কম হয় নাই, ৮০০-৯০০ এর মত বিপ্লবী মারা গেছে এই ১৮ মাসে, ফলে অনুমান করে নেয়া যায় নিহতের সাথে আহত পঙ্গু হয়ে যাবার সংখ্যাটাও অনুপাতে কত হতে পারে এবং যারা নির্যাতনে ট্রমাটাইজ মানসিক বিকলাঙ্গ সদমা নিয়ে আছেন হয়েছেন এই সংখ্যাটাও। ফলে পুরা সমাজে উথাল পাথাল করা ১৮ মাসের এই আন্দোলন সংগ্রাম মানে সামাজিকভাবে গণ-মনকে ঝাকুনি দেয়ার ঘটনা এটা। এতেও ঝাকুনি খায়নি বাইরে রয়ে গেছে  এমন লোকজন সমাজে খুব কমই অবশিষ্ট আছে। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি নির্যাতন হত-নিহত হওয়া আর সবার উপরে সামাজিক ঝড়ের প্রভাব আন্দোলিত হয়ে যাওয়া এর সব শর্তই এখানে পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা এত কিছুর পরও সবাই টের পাচ্ছে এটা বিপ্লব হয় নাই; বিপ্লবের দেখা নাই। আর তরুণেরা সেটা টের পাচ্ছে এখন। এখানে তরুণ বলতে সবাই, এককথায় সামরিক কাউন্সিল SCAF বাদে রাজনৈতিক কমিউনিটি, সমাজের সব অংশে সব দল মতের সব জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বুঝিয়েছি। বিপ্লব যে ঘটেনি এটা আমি এখানে বলছি বলে না, ইজিপ্টের সবার মুখে আর মনের অনুভবের কথা, কারও বুঝতে বাকি নাই। সারা রাজনৈতিক কমিউনিটি হতাশ শুধু নয়,  নতুন করে সমাগত নির্যাতন নিপীড়নের দিন আবার ফিরে আসছে এটা ভেবে সবাই আতঙ্কিত হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে যেটা সবার আগে ঘটে রাজনৈতিক পাড়ায় পরস্পরকে ব্যর্থতায় দোষারোপ করা, বিভক্তি বড় হওয়া, যা আগেও ছিল এখন তা আরও বড় হতেও শুরু করেছে।

তাহলে মূল কথাটা, ব্যাপারটা কি এই যে, বুঝব কি করে ঘটনা বিপ্লবের দিকে হাটছে নাকি উদারবাদী রাজনীতির দিকে যাচ্ছে—এটা কেবল ঘটনা ঘটার শেষে  কি দাড়ালো সেটা দেখার পরে জানতে পারা ছাড়া আগাম বুঝবার কোন উপায়  নাই যে বিপ্লব হচ্ছে কি না? বিপ্লব কী আগে বুঝার কোন উপায় আছে?

অবশ্যই আছে। কিন্তু কি সেটা? লেনিন সাহেব বলেছিলেন, বিপ্লব করা নাকি একটা আর্ট। এবং অভুত্থান নাকি উপযুক্ত দিন তারিখের আগেও করা যায় না পরেও না। আরও এগিয়ে বলা কথাও আছে। পুরান রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি ভেঙ্গে না পরে তাহলে বুঝতে হবে বিপ্লব হয় নাই ইত্যাদি ইত্যাদি আনুষাঙ্গিক অনেক কথাবার্তা। তবু আমি সেদিকে যাব না, কোন চর্বিত চর্বন বা আপ্তকথা আউড়াব না, সেসব আশ্রয় করে আমার কথা সাজাব না। কিছু খাস কথা খাসভাবে বলার চেষ্টা করব।

 

Advertisements

ইজিপ্ট ২: ইসলামি রাজনীতিতে রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ভাবনার সঙ্কট

ইজিপ্ট ২: ইসলামি রাজনীতিতে রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ভাবনার সঙ্কট

গৌতম দাস || Sunday 01 July 12 || বিষয় অনুসারে পড়ুন : ফিলিস্তিন ও মধ্যপ্রাচ্য

https://wp.me/p1sCvy-2tF

 

[এই লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল চিন্তা ওয়েব পত্রিকায় ২০১২ সালে। এখানে হুবহু সেটাই তুলে রাখা হয়েছে আর্কাইভ করে রাখার উদেশ্যে আগষ্ট ২০১৮ সালে। দুই পর্বে লেখাটার এটা দ্বিতীয় পর্ব।]

 

আগের পর্বে বলেছিলাম, গণ-আন্দোলনের চাপে মোবারকের সরে যাওয়ার পর ট্রানজিশনাল বা অন্তর্বতীকালিন সরকার কে হচ্ছে এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বতীকালিন সরকার হিসাবে যা তৈরি হবে তা গঠন করার সময় ও পরে এর উপর রাস্তার আন্দোলনের যদি একক কোন নিয়ন্ত্রণ কর্তৃত্বই না থাকে তবে বুঝতে হবে গণ-আন্দোলন একটা গর্ভস্রাবে পরিণত হতে যাচ্ছে। অন্তর্বতীকালিন সরকারে কে থাকবে, কারা সদস্য হবে তা নিয়ে গণ-আন্দোলনের কাউকেই প্রকাশ্যে বা ড্রয়িং রুমে ডেকেও মতামত চাওয়া হয় নাই। অন্তর্বতীকালিন সরকার কিভাবে হচ্ছে সেই পুরা ব্যাপারটাই ঘটেছে, বলা ভাল ঘটতে সক্ষম হয়েছে মোবারক ও সামরিক কাউন্সিলের কর্তৃত্বে, নিয়ন্ত্রণে। মাঠের আন্দোলনের নেতাদেরকে গোনায়ও ধরা হয় নাই। আর একভাবে বলা যায় তাদেরকে গণায় ধরতে বাধ্য করা যায় মাঠের আন্দোলন নিজেকে সে তীব্রতায় এবং উচ্চতায় নিতে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে সামরিক কাউন্সিলের পক্ষে কেবল মোবারককে সরিয়ে দিয়ে পুরা ক্ষমতা ও ক্ষমতার প্রতিষ্ঠানগুলো (সামরিক কাউন্সিল SCAF আর এর দুই সহযোগী—আদালত কেন্দ্রিক সুপ্রীম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আর এরই বর্ধিত রূপ সুপ্রীম ইলেকশান কাউন্সিল) ঠিক যেমন ছিল সেভাবে অটুট রেখে নতুন করে পুরানা ক্ষমতাটাই আবার সাজিয়ে নেয়া সম্ভব হয়েছিল। পুরান ক্ষমতা অথবা এর নব উত্থানকে দমন করে এর উপর গণ-আন্দোলন নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নিবে এমন কোন কাজ, ইচ্ছা, আলামত কিছুই ঘটতে দেখা যায় নাই। কেবল মোবারকের সরে যাওয়া—এই দাবি আদায়ের খুশিতে জনগণকে মাতোয়ারা রাখার কাজেই গণ-আন্দোলনের শক্তিকে সীমিত রাখা হয়েছিল। গণ-আন্দোলন কেবল একটাই প্রতীকী কাজ করেছিল—মোবারকের রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল ডেমোক্রাটিক পার্টির সদর দপ্তর জ্বালিয়ে দেয়া। জনগণের এই ক্ষোভের প্রতিকী অর্থ হলো, কেবল একটা শত্রুকে চিনানো তা হলো, মোবারকের ছেলে গামালকে কেন্দ্র করে মোবারকের বউয়ের যে খায়েস, যে ছোট ছেলেকে প্রেসিডেন্ট বানাবে, সেই ইচ্ছার সম্ভাবনা চিরতরে নাকচ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই ইচ্ছা কেবল গণ-আন্দোলনের নয় এটা সামরিক কাউন্সিল SCAF-এরও ইচ্ছা ও স্বার্থ ছিল। ফলে সহজেই ঘটানো গিয়েছিল। ফলাফলে পুলিশ বাহিনী প্রত্যাহার করে ট্যাঙ্কে চড়ে সামরিক বাহিনী শহরের দখল নিয়েছিল। আর রাস্তার জনগণ তাদের স্বাগত জানিয়েছিল। এর অর্থ হলো গণ-আন্দোলনের কাঁধে সওয়ার হয়ে সামরিক কাউন্সিল SCAF নিজের খায়েস পূরণ করে নেয়া । এই অর্থে তথাকথিত বিপ্লবে সামরিক কাউন্সিল SCAF-এরও ভাগীদারী প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।

কেন এই পরিস্থিতি তৈরি হতে পেরেছিল

ক্ষমতা হস্তান্তরের আইনী বা লিগ্যাল দিক বিবেচনা করলে, মোবারকের কনষ্টিটিউশন অনুযায়ী প্রেসিডেন্টের অপারগতায় প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা হস্তান্তর হওয়ার কথা ভাইস-প্রেসিডেন্টের হাতে, তিনিই একটিং প্রেসিডেন্ট হবেন এবং মোবারকের মতই তার সব ক্ষমতা ব্যবহার করবেন। কিন্তু মোবারক কোনভাবেই কোন সামরিক কাউন্সিলের কাছে ক্ষমতা দিয়ে যেতে পারেন না। কনষ্টিটিশন তাকে সে ক্ষমতা ও এক্তিয়ার দেয় নাই। এটা হলো পুরানা কনষ্টিটিউশনের দিক থেকে ক্ষমতাকে বুঝা ও বিচারের মানদণ্ড, বলবৎ আইনী সীমার মধ্যে থাকছে কিনা তা বুঝার কষ্টিপাথর। কিন্তু কোন গণ-আন্দোলনের বিপ্লব হিসাবে নতুন স্তরে (গণ-আন্দোলন উদারবাদী সীমায় থাকবে না বিপ্লবী র্যা ডিক্যাল হবে তাঁর প্রথম পরীক্ষা এটা ) আবির্ভাবের ন্যূনতম শর্ত হলো, নিজেই নিজেকে নতুন ক্ষমতা হিসাবে হাজির করা, কোন পুরান কনষ্টিটিউশন থেকে তাঁর ক্ষমতা উৎসারিত হচ্ছে এমন কোন ধারণা তৈরি হতে দেয়া বা ভুলে তা মেনে নেওয়া মানেই গণ-আন্দোলনের বিপ্লবী সম্ভাবনার ইতি টেনে দেয়া। ক্ষমতা থেকে বা আয়ত্বে থাকলে কনষ্টিটিশনের জন্ম দেয়া যায় কিন্তু কোন তৈরি কনষ্টিটিশন থেকে ক্ষমতা ডিরাইভ করা যায় না, উৎস মনে করে ভুল করা যায় না, পাওয়া যায় না। ক্ষমতা বিষয়ক এই মৌলিক ধারণা হাতের কড়ায় গুনে সবসময় নিজের কাছে পরিস্কার রাখতে হয়। কিন্তু আমরা দেখেছি, মোবারক জেনারেল সোলায়মানকে ভাইস প্রেসিডেন্ট বলে ঘোষণা দিলেন বটে কিন্তু সুপ্রীম কাউন্সিল অফ আর্মড ফোর্স বা SCAF বলে কিছু একটা খাড়া হয়ে নির্বাহী প্রেসিডেন্টের সব ক্ষমতা নিয়ে জেঁকে বসে গেল। গণ-আন্দোলন নিজেই নিজেকে ট্রানজিশনাল ক্ষমতা বলে দাবি করার বদলে হয়ে গেল SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা নিয়ে নেয়া; আবার এটা অবশ্যই এক নতুন ক্ষমতা কারণ কার্যত সে আর পুরানা কনষ্টিটিউশন মেনে নিজেকে তৈরি করে নাই, নিজেই নিজেকে ক্ষমতা বলে দাবি করেছে। এটাই হলো তামাশার দিক। গণ-আন্দোলনের সম্ভাব্য ক্ষমতাটা ছিনতাই হয়ে যাওয়া। SCAF যে ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা দখলে নিল এটা তাঁর নিজের তৈরি না, ছিনতাই করে নেয়া ক্ষমতা, এটা SCAF-এর অজানা নয়। এর প্রমাণ হলো, টিভিতে ক্যামেরার সামনে মানে দেশবাসীর সামনে জেনারেল সোলায়মান একেবারে সামরিক কায়দায় তাহরির স্কয়ারকে বিশাল এক স্যালুট ঠুকে বিপ্লব বিপ্লব বলে চিৎকার শুরু করে দিতে দেখলাম আমরা। কারণ তারা বুঝে তাহরির স্কয়ারের কারণেই SCAF নামে তারা ক্ষমতায়। তারাই তাহরির স্কয়ারের (চোরাই করে আনা) ক্ষমতা। এটা SCAF-এর পক্ষে ক্ষমতা ছিনতাই করে আনার এক বিপ্লবই বটে। SCAF-এর ক্ষমতার ভিত্তি কোন পুরানা কনষ্টিটিউশন না, চুরি করে আনা ক্ষমতাটাই তাঁর ভিত্তি। আর নতুন ক্ষমতা তো কনষ্টিটিউশন থেকে আসে না, আসার কথাও না।

আমার এই লেখা পড়ে যারা ব্রাদারহুডের রাজনীতি ভালবাসেন তারা ফ্যাকচুয়াল যুক্তি তুলতে পারেন যে ব্রাদারহুড তো আন্দোলনের শুরু থেকে শামিল ছিল না। তারা বড়জোর বাইরে থেকে ধাত্রির ভূমিকায় ছিল যেন গন-আন্দোলনটা (বিপ্লব?) প্রসব করে, তারা আন্দোলনের আহতদের মেডিক্যাল সেবা বা খাবারদাবার সরবরাহের ভূমিকা নিয়েছিল, মোবারকের এনডিপি সদর দপ্তরে আগুন দিয়ে এটাকে গণক্ষোভের প্রতীকে প্রতিষ্ঠার কাজটা করেছিল, ঘোড়া উটে বা উটের গাড়ি চড়ে এনডিপি-সামরিক মদদে গুন্ডারা তাহরির স্কয়ারের জমায়েতের উপর দিয়ে বিপ্লব মাড়িয়ে দাবড়ানোর যে গুন্ডামী করতে এসেছিল তা প্রতিরোধের সময় ব্রাদারহুড নির্ধারক ভূমিকায় প্রতিরোধের দেয়াল তৈরি করেছিল। এছাড়া আর একটা যুক্তি তাদের হতে পারে, যে মোবারকের পতনের পর নির্বাচন দেবার ব্যাপারে ব্রাদারহুডের বাইরে আন্দোলনে যে সব রাজনৈতিক ধারা আছে [সেকুলার কমিউনিষ্ট ও আমেরিকার ফ্রিডম হাউস জাতীয় এনজিও এর উৎসাহ প্রভাবের লিবার্টির শ্লোগান দেয়া তরুণেরা, যেমন সিক্সথ এপ্রিল গ্রুপ ইত্যাদি; এছাড়া সাধারণ জনগণ] তাদের চাপেই SCAF ট্রানজিশনাল ক্ষমতা তৈরি করে জেঁকে বসার পরপরই নির্বাচন দাবি করা যায় নাই। তাদের ধারণা ছিল যত দ্রুত নির্বাচন হবে ততই ব্রাদারহুডের (আগে থেকেই সংগঠিত সংগঠন হয়ে থেকেছে বলে) জিতে আসার সম্ভবনা।

এই যুক্তির অসার দিকটা হলো, এটা ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা কে কিভাবে তৈরি করছে এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটা নজর করতে অক্ষম, এটা কোন বিষয়ই না এদের কাছে; বিষয় হলো মোবারকের সরে যাওয়া মানে একটা নির্বাচন আর নির্বাচন হলেই সেটা মোবারক বা SCAF-এর বিরুদ্ধে ও বাইরে একটা ক্ষমতা তৈরি করবে। এটাই ব্রাদারহুড এর দৃষ্টিতে ক্ষমতা পাবার ধারণা, ক্ষমতা ধারণা। ফলে ট্রানজিশনাল সময়ে ক্ষমতাটা কে নিচ্ছে কার হাতে যাচ্ছে তাতে কিছুই যায় আসে না। ক্ষমতা ধারণার কোন ন্যূনতম বুঝ না থাকার জন্য নির্বাচনে দেরি করিয়ে দেওয়াটাকে ক্ষমতা না পাওয়া, ক্ষমতা পেতে দেরি হওয়ার কারণ বলে মনে করছে।

উপরে আমি বারবার জোর দিয়েছি কেন ট্রানজিশনাল ক্ষমতা বিষয়টা গুরুত্বপূর্ণ, তার উপর। কারণ এই নতুন ক্ষমতাটাই ঘটনা পরবর্তী সমস্ত ঘটনার গতি, অভিমুখ ঠিক করে দিবে। এটা স্রেফ এক নতুন ক্ষমতা নয়, এটা আসলে সব ঘটনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। ইজিপ্টে আজ পর্যন্ত এটা তাই ঘটিয়েছে। SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা অর্থাৎ ক্ষমতাসীন হওয়াটাই আজ পর্যন্ত সব ঘটনা আর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক। এমনকি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কেউ হয়ে আসলেও সে ক্ষমতা নাও পেতে পারে, নির্বাচিত পার্লামেন্ট হলেও সে পার্লামেন্ট এক ঘোষণা দিয়ে তুড়ি মেরে অবৈধ বাতিল বলে দিতে পারে, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা কি হবে তা সে ঠিক করে দিতে পারে, প্রেসিডেন্ট নিজে সরকার গঠন—মন্ত্রীসভা গঠন করার আগেই SCAF নিজেকে নিজেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলে ঘোষণা দিতে পারে ইত্যাদি। এককথায় প্রেসিডেন্ট বা পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতার যে প্রাতিষ্ঠানিকতা তৈরি হবে সেটা SCAF ক্ষমতার অধীনস্ততা মেনেই ডিকটেশনে কেবল একটা সীমিত ক্ষমতা চর্চা করতে পারবে।

কথাগুলো সোজা-সিদা করে বললে, ক্ষমতা কি জিনিষ, এর কোন ধারণার বালাই এদের নাই। ট্রানজিশনাল ক্ষমতা বিষয়টাকেই বুঝতে পারেনি। আর তৃতীয়ত, ধরে নিয়েছে নির্বাচনের মাধম্যে ক্ষমতা পাওয়া যায়।

নির্বাচন ক্ষমতা তৈরি করে না। বরং নির্বাচনেরও আগে নির্বাচন আহবান করার মুরোদ—এটাই ক্ষমতা; [আলোচ্য ক্ষেত্রে SCAF যেটা আগেই হাসিল করে নিয়েছে।] গণ-অভ্যুত্থান বিপ্লবী এই ক্ষমতার উৎস, সেটাই ট্রানজিশনাল বা সাময়িক ক্ষমতা। সাময়িক কেন? এরপর নির্বাচন ইত্যাদিতে যেটা তৈরি হয় সেটা হলো এই ক্ষমতা কি করে বাস্তবে পরবর্তীকালে ব্যবহার করা হবে, বাইরের কেউ নয় বিপ্লবের ভিতরকার কেউঁ প্রতিনিধি হয়ে কেবল ঐ ক্ষমতা সবার পক্ষ থেকে প্রয়োগ করবে এরই নিয়ম, আইন কানুন ইত্যাদির জন্য প্রতিনিধি কে হবে তারই নির্বাচন। নির্বাচন নিজে ক্ষমতার উৎস নয়, ক্ষমতা সে জন্ম দিতে পারে না। ক্ষমতা থাকলে, অর্জিত হলে, নিয়ন্ত্রণে আসলে তবে নির্বাচন আয়োজন বা আহবান করা যায়। অর্জিত ক্ষমতা কি করে ব্যবহার প্রয়োগ করা হবে এরই নির্বাচন। ক্ষমতা এক্সারসাইজের পথে [প্রতিনিধি] নির্বাচন এক উপায় মাত্র, নির্বাচন নিজে ক্ষমতা নয়।

এই লেখা শুরু করেছিলাম এই প্রশ্ন রেখে যে কি করে বুঝা যাবে ঘটমান বিপ্লবের অভিমুখ ঠিক আছে কিনা? গণ-আন্দোলন যদি নিজেই ঐ দেশ বা রাষ্ট্রের প্রচলিত সব ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে নিজেকে একমাত্র প্রাধান্য বিস্তারি ক্ষমতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, পুরানা সব ক্ষমতা প্রতিষ্ঠানকে সবাইকে অধীনস্ত হতে বাধ্য করতে পারে তবে বুঝতে হবে অন্তত অভিমুখ ঠিক আছে। কিন্তু আর এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আছে, কাঠামোর দিক থেকে পুরানা ক্ষমতা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে যে কারণে দাড়িয়েছিল, ফাংশনাল থাকতে পেরেছিল [ সামরিক, আদালত, সংসদ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে] সেগুলো ভেঙ্গে দিতে হবে। এই ভেঙ্গে দেয়া মানে ব্যক্তিগতভাবে তাদের হত্যা করা একেবারেই নয়। প্রথম কথা, আগের মত করে নির্বাহী রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে আর ফাংশনাল থাকা নয়, তাঁরা তখন থেকে নতুন মাঠের ক্ষমতা [তাহরির স্কয়ার] কাছে আনুগত্য প্রকাশ করবে এবং সীমিতভাবে সাময়িক কাজ চালিয়ে যাবার মত ফাংশনাল থাকবে কিন্তু মাঠের নতুন ক্ষমতার ইচ্ছা সাপেক্ষে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, পুরান ক্ষমতার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান পুরানা কনষ্টিটিউশন ভেঙ্গে দিয়ে বাতিল ঘোষণা করে দিতে হবে। এতে মাঠের নতুন ক্ষমতা যেটাকে বলছি এটাই ট্রানজিশনাল ক্ষমতা। ট্রানজিশনাল ক্ষমতা নিজে ঘোষণায় কনষ্টিটিউশন সহ পুরানা সব ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠাঙ্গুলোকে নিজের আনুগত্যে নিতে পারতে হবে। তবেই জেনারেল সোলায়মান বা SCAF এর স্যলুট ঠুকে দেওয়াটা মিনিংফুল হবে। কিন্তু ইজিপ্টের ক্ষেত্রে এটা হয়েছে মাঠের ক্ষমতা হাইজাক করে SCAF নামে নিজেই নিজে ট্রানজিশনাল ক্ষমতা কায়েম করে ফেলেছে। ফলে স্যালুট নিজেই নিজেকে করেছে, ওর সাথে জনগণের কোন সম্পর্কই আর নাই।

মোরসির প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নেবার সময়ে প্রধান বিচারপতি শপথ পড়ানোর আগের উদ্বোধনী বক্তৃতায় একটা মন্তব্য করেছেন। বলেছেন, “এই অনুষ্ঠিতব্য শপথের পর থেকে ইজিপ্ট এক দ্বিতীয় রিপাবলিক হিসাবে জন্ম নিতে যাচ্ছে”। রাষ্ট্রতত্ত্বের দিক থেকে এটা একটা খুবই সঠিক উচ্চারণ। তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন একই ইজিপ্ট দেশ, নতুন করে এক রাষ্ট্রে [আগের একই দেশ কিন্তু একই রাষ্ট্র নয়] নিজেকে কনষ্টিটিউট করতে যাচ্ছে। রাষ্ট্রের রি-কনষ্টিটিউশন মানে জনগণের নিজের নতুন শপথ নতুন করে রি-কনষ্টিটিউশন পুনর্গঠন এবং নাগরিক-জনগণের এই পুনর্গঠিত হওয়া মানে রাষ্ট্রে পুনর্গঠিত হওয়া – একই কথা। এই হলো মোরসির শপথ কথার তাৎপর্য। কিন্তু এত তাত্ত্বিক তাৎপর্য থাকা এবং এর প্রকাশ্য উচ্চারণ সত্ত্বেও এটা একটা তামাশার বেশি কিছু নয়। কারণ, ঐ তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট যারা শপথ পড়াতে এসেছেন তারা কারা? মোরসি যদি নতুন রিপাবলিকের ক্ষমতা হয়ে থাকেন, নির্বাচিত নির্বাহী প্রেসিডেন্ট হয়ে থাকেন, তাহরিরের মাঠের ক্ষমতার প্রতিনিধি হয়ে থাকেন তবে ঐ তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্টের আনুগত্য সেই মাঠের ক্ষমতা, জনগণের ক্ষমতার কাছে নেই কেন? কেন তাঁর আনুগত্যের উৎস SCAF? SCAF-এর ক্ষমতায় বলীয়ান হয়ে তিনি তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্টে হয়ে হাজির আছেন, শপথ পড়াতে এসেছেন। তাদের তাহরির মাঠের ক্ষমতার প্রতি কোন আনুগত্য নাই। ফলে তাত্ত্বিক তাৎপর্যপূর্ণ কথা উচ্চারণের আগে ঐ তথাকথিত কনষ্টিটিউশনাল কোর্ট প্রধান বিচারকের নিজের আনুগত্য কোথায় সেই প্রশ্ন নিজেকে নিজে করতে হত। SCAF-এর আনুগত্য মেনে কোন বিচারক সেকেন্ড রিপাবলিক বলে তাত্ত্বিক তাৎপর্যপূর্ণ কথায় নিজের জনগণের সাথে ঐতিহাসিক গাদ্দারি ঢাকা দিতে পারবেন না। তাই এই তামাশার নাটক আমরা ওখানে মঞ্চস্থ হতে দেখেছি। এই পর্যায়ে এসে মোরসি বেচারা আসলে, ঘ্যাতঘোত করতে পারেন কিন্তু এর বাইরে কিছুই করার আর অবশিষ্ট তিনি নিজেই রাখেননি। কারণ তিনি আগেই জনগণের ক্ষমতা, ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা SCAF-এর হাতে তুলে দিয়েছেন, মেনে নিয়েছেন। তিনি একমাত্র SCAF অনুগ্রহেই প্রেসিডেন্ট হতে পারেন, এটা বহু আগেই মেনে নেয়া হয়ে আছে।

সে কথা থেকে শুরু করেছিলাম, ব্রাদারহুডের যুক্তি যে SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা কায়েমের পর বাম সেকুলারদের কারণে নির্বাচনটা তাড়াতাড়ি হতে পারে নাই, ফলে আজ মোরসির এই দুর্গতির কারণ সেটা। উপরের আলোচনায় আমরা দেখলাম সমস্যাটা নির্বাচন কত আগে ডাকা হবে তাতে কিছুই আসে যায় না, এমনকি SCAF-এর ট্রানজিশনাল ক্ষমতা কায়েমের পরেরদিন কোন নির্বাচন হলেও ওর পরিণতি আজকের মতই হত, বাস্তবতা থেকে আমাদের কারোই পালানোর কোন পথ নাই। মূল ট্রানজিশনাল ক্ষমতাটা SCAFকে দিয়ে দেয়া বা মেনে নেবার পর পরবর্তী সব অভিমুখ গতিপথ নির্ধারিত হয়ে গেছে ওখানেই। সারকথায় নির্বাচন কবে এটা বিষয়ই নয়, বিষয় হলো ক্ষমতা, ক্ষমতা কি তা আঙুলে গুণে বুঝা, মনে রাখা—এই কাজে অযোগ্যতা ব্যর্থতা। যেটা ব্রাদারহুড শুধু নয় ওর বাইরের সব রাজনৈতিক শক্তিরও অযোগ্যতা, ব্যর্থতা।

আমি বহু লেখায় এই দিকটা নিয়ে কথা তুলেছি যে ইসলামি রাজনীতি যেটা জাগছে এদের রাষ্ট্র ধারণা ও ক্ষমতা ধারণা নিয়ে চিন্তা ভাবনা হোম-ওয়ার্ক একেবারেই অপরিণত। সবটাই ষ্টেজে দেখা যাবে, উপস্থিত সময় কিছু একটা করে ফেলা যাবে ধরনের। আবার অনেকের ধারণা রাষ্ট্র ক্ষমতা ধারণাগুলো তো পশ্চিমের ঘরে জন্ম নিয়েছে, চর্চায় বড় হয়েছে। ইসলামি রাজনীতিতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়। সাধারণভাবে ইসলামি রাজনীতি বড় জোর একটা খেলাফত রাষ্ট্র করব [যেটা আসলে বৃটিশ সাম্রাজ্য-রাষ্ট্রের মত কলোনী মাষ্টারীর সাথে বেশি খাপ খায় ধরনের অটোমান সাম্রাজ্য-রাষ্ট্রের এক ভাসাভাসা ধারণার বাইরে গিয়ে কিছু বুঝায় কিনা সেটা স্পষ্ট করতে পারে না] ধরনের এক স্বপ্ন কাজ করে। এমনকি ঐ যুগে সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র জন্ম ও টিকিয়ে রাখার পূর্বশর্ত ছিল অন্য অনেক দেশকে ঐ সাম্রাজ্যের অধীনে কলোনী হয়ে থাকতে হবে। অর্থাৎ সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র নিজেই নিজ ক্ষমতায়, নিজ জনগণের এবং নিজ রাষ্ট্র সীমানার কোন রাষ্ট্র না। অন্য দেশ দখল ও তাদেরকে কলোনী বানিয়ে রাখা সাপেক্ষে একটা সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র এ যুগে আবার বাস্তবে কায়েম সম্ভব। তাঁর মানে কি ইসলামের নামে মুসলমান জনগোষ্ঠির দেশগুলো ইসলামি রাজনীতিতে কোন একটা রাষ্ট্রের সবাই কলোনী হয়ে যাবে? খুব জোরালো না হলেও এক খলিফার নেতৃত্বে [ইসলামি রাজনীতিতে এটাকে গাইডেন্স বলা হয়] খেলাফত কায়েমের ভাসাভাসা স্বপ্নটা এরকম বলেই আমার ধারণা হয়েছে। এসব দেখে পঞ্চাশের দশকে কমিউনিজমের শ্লোগানের আড়ালে দলে দলে সদ্য কলোনীমুক্ত দেশগুলোর সোভিয়েত ব্লকের সদস্য হয়ে যাওয়া আমরা দেখেছি সেই মিলের দিকটা মনে পড়ে যায়। আজ ইসলামি রাজনীতিতে যে সঙ্কট, রাষ্ট্র কি সে ধারণা বুঝবার চিন্তায় সঙ্কট সেই একই ঘাটতি কাজ করেছিল সদ্য কলোনীমুক্ত কমিউনিষ্ট প্রীতির ন্যাশনালিষ্ট রাজনীতির দেশগুলোতে। রাষ্ট্র কি সে ধারণা বুঝবার চিন্তার হোম-ওয়ার্ক কেউ করতে চায়নি। প্রায় সবাই যেটা মনে করেছিল, রাষ্ট্রভাবনা? সেটা আবার কি? এসব বুর্জোয়াদের গরীবদের দমিয়ে রাখার চাতুরি ব্যাপার স্যাপার। [তুলনায় ইসলামি রাজনীতিতে একই কথা তবে ভিন্ন ভাষায়, “রাষ্ট্র বা ক্ষমতা ধারণাগুলো তো পশ্চিমের ঘরে জন্ম নিয়েছে, চর্চায় বড় হয়েছে; ইসলামি রাজনীতিতে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়” ধরনের।] কমিউনিষ্টরা ভেবেছিল, “পুজিবাদ বা ধনিক শ্রেণী” কে মুছে ফেলতে পারলেই মোক্ষ লাভ হবে। আর এর পরিণতি হয়েছিল এক খোদ সোভিয়েত রাষ্ট্রকে সুরক্ষা, প্রতিরক্ষা দিয়ে টিকিয়ে রাখার কাজে ওর নিজস্ব ষ্ট্রাটেজিক বৈদেশিক স্বার্থ অনুযায়ী ব্লকের বাকি সব রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে, পিছনে ফেলে সোভিয়েত ইউনিয়নের এক স্যাটেলাইট রাষ্ট্র হিসাবে নিজেকে নামিয়ে নেয়া। পরবর্তীতে ষাটের দশকে নয়া-চীন এটাতে বিদ্রোহ করে বসল, অভিযোগ তুলল এটা সোভিয়েত রাষ্ট্রের “সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ” হয়ে যাওয়া। কিন্তু মজার কথা হলো, আবার সে নিজেই চীনা বলয়ের এক ব্লক তৈরি করে নিজের ব্রান্ডের কমিউনিজমের নামে একই চীনা রাষ্ট্রের ষ্ট্রাটেজিক বৈদেশিক স্বার্থ রক্ষার ভূমিকায় নেমে পড়েছিল । এর সবচেয়ে ভাল উদাহরণ, ১৯৭১ এর বাংলাদেশের নিজ স্বার্থ এভাবেই স্থানীয় চীনা কমিউনিষ্ট পার্টিগুলোর হাতে চীনা রাষ্ট্রের স্বার্থের নিচে চাপা পড়ে বলি হয়ে গিয়েছিল।

আমার সার কথা হলো, রাষ্ট্র ধারণা – কি রাষ্ট্র আমরা চাচ্ছি গ্লোবাল পরিস্থিতিতে সে ধারণার মানে কি দাঁড়ায় সেসব নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা হোমওয়ার্ক তত্ত্বীয় প্রস্তুতির কাজটা আমরা কেউ এড়াতে পারব না। এটা ষ্টেজে মেরে দেবার বিষয় না। ফলে ইসলামি রাজনীতিও কি একই “কমিউনিষ্ট” অভিজ্ঞতা ও পরিণতি নিতে যাচ্ছে? ইজিপ্টের পরিস্থিতি পরিণতি দেখে, ব্রাদারহুডের রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা বুঝবার অপরিণত রাজনীতি দেখে এই আশঙ্কা আমি দেখি। এমনিতেই ইসলামি রাজনীতিতে রাষ্ট্র প্রসঙ্গে এক অমীমাংসিত বিতর্ক আছে যে, কোন মুসলমান রাষ্ট্রের [রুলার বা শাসক অর্থে] আনুগত্য করতে পারে কি না? সংক্ষেপে একে “আনুগত্য বিতর্ক” নামে ডাকতে পারি। এটুকু বুঝি, যুগের পর যুগ ব্যাপারটাকে অমীমাংসিত করে ফেলে রাখতে পারি না। এটা আত্মঘাতি। তাই তর্ক-বিতর্ক উস্কে দেবার জন্য আমি মোরসির একটা বক্তৃতা যেটা গত শুক্রবার তাঁর শপথ নেবার আগের দিন তাহরির স্কয়ারের জমায়েতে তিনি দিয়েছিলেন সেটা সামনে আনতে চাই। এই বক্তৃতার গুরুত্ব অনুভব করে ফেসবুকে আমি এর ভিডিও লিঙ্ক দিয়েছি। যাতে বডি ল্যাঙ্গুয়েজসহ তা বুঝা যায়। আগ্রহীরা তা দেখতে পারেন। ওর সারকথা হলো,

In the context before sworn in as Egypt’s president Mohamed Morsi : “I am here because of you. No institution, no Authority none can be above this will, the will of you, your will. You are the source of power. The nation is the source of power. The nation is the one to decide, the nation is the one to give unity, nation is the one to give appoint and hire and the nation is the one to fire…….” – Historical speach in Tahrir square.

এই বক্তৃতায় মোরসি প্রতীকীভাবে তাহিরর স্কয়ার ও ঐ মাঠের জনগণকে তাঁর ক্ষমতার উৎস বলে সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তিনি জনগণের ক্ষমতার প্রেসিডেন্ট। জনগণের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক তিনি। ফলে যে রাষ্ট্রের তিনি প্রেসিডেন্ট সেই রাষ্ট্র জনগণের নিজেরই ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষা। ফলে “রাষ্ট্র মানে আনুগত্য” এই আনুগত্য কথার এক বিশেষ অর্থ তিনি দাড় করিয়ে ফেলেছেন ইতোমধ্যেই। ব্যাপারটা হয়ে গেছে নিজের ইচ্ছা আকাঙ্ক্ষার প্রতিরূপের প্রতি নিজের আনুগত্য প্রকাশ। যেটা মুসলমান পরিচয়ে বা ইসলামের চোখে অসঙ্গতির নয় এমন একটা মানে করা যায়। ফলে আনুগত্য বিতর্কের এক প্রাকটিক্যাল সমাধান মোরসি নিজে এবং তাঁর মুসলমান জনগণের সম্পর্ক আর এর ভিতর দিয়ে নিজেকে, নিজের ক্ষমতাকে ব্যাখ্যা করার উপায় বের করতে হয়েছে তাঁকে; বিতর্কের এক প্রাকটিক্যাল সমাধান, পথের ইঙ্গিত এখানে এসেছে আমরা দেখতে পাচ্ছি।

যদিও প্রশ্ন উঠতে পারে, এটা কি মোরসির কৌশলী কথা, নাকি ক্ষমতা রাষ্ট্র আনুগত্য প্রসঙ্গে তাঁর নীতিগত অবস্থান? আবার এই অবস্থান কি কেবল তাঁর নিজের? ব্যক্তিগত ও প্রেসিডেন্ট হিসাবে, বিশেষ পরিস্থিতি SCAF-এর অধীনের প্রেসিডেন্ট তিনি তাই? এর সাথে পার্টি ব্রাদারহুড এই অবস্থান নিজেরও বলে স্বীকার করে কি না? এসব বহু প্রশ্নের জবাব কি তা আমরা এখনও জানি না।

রাষ্ট্র ও ক্ষমতা প্রসঙ্গে ইসলামি রাজনীতির সঙ্কট নিয়ে মূল কথা আপাতত এতটুকুই। তবে একটা সহযোগী প্রশ্ন আছে। প্রশ্নটা হলো, ব্রাদারহুডের SCAF-এর হাতে ট্রানজিশনাল ক্ষমতা ছেড়ে দেয়া ও মেনে নেওয়া – এই ব্যাপারটা কি শ্রেফ রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ধারণা না বুঝা হোমওয়ার্ক না করার থেকে জন্ম নেয়া? আমার জবাব হবে, না; অন্য আরও বড় কারণ আছে। সেদিকটা এখানে এখনও আনিনি। সেটা গ্লোবাল দিক বা ফ্যাক্টর। সেটা আমরা খুজে পাব, আমেরিকান চলতি ষ্ট্রাটেজিক ও বৈদেশিক নীতি, ইসলাম ইস্যুটাকে নিজের নিরাপত্তার ইস্যু হিসাবে মনে করা (আগের বুশের আমল থেকে চলে আসা ওয়ার অন টেররের সেকুলারিজমের আড়ালে দুনিয়াকে নিজের পক্ষে নিয়ে নিজ রাষ্ট্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপায় করে নেবার লাইন – যেটা ছিল এর বিপরীত লাইন) সেই সুত্রে RAND এর ইসলামি প্রজেক্ট বা গ্লোবাল কারযাভি ইসলাম প্রসঙ্গের ভিতরে। এনিয়ে আলাপ করতে করতে পরের পর্ব শুরু করার ইচ্ছা রাখি।

 

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল

গৌতম দাস

২৮ জুলাই ২০১৮, ০০:০১

https://wp.me/p1sCvy-2t0

 

ইমরানের পাকিস্তান কী আরব বসন্তের নতুন মডেল হতে যাচ্ছে? – ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানে নির্বাচন সমাপ্ত হয়েছে। পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ দলের (Movement for Justice) নেতা প্রাক্তন ক্রিকেটার ইমরান সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন বলে খবর ছড়িয়ে পড়েছে। ২৭ জুলাই সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রকাশিত শেষ খবর পর্যন্ত পাকিস্তানের ডন পত্রিকা বলছে, ২৭২ আসনের পার্লামেন্টে ইমরানের যোগাড় করেছে ১১৫ আসন। [bagging 115 of the total 270 seats on which elections were held, according to the preliminary results announced by the Election Commission of Pakistan (ECP).]অর্থাৎ সরকার গঠনে প্রয়োজনীয় ১৩৭ আসনের থেকে ২২ আসন দূরে। যেটা তারা আশা করছে অন্য প্রধান দুই দল  ৬৩ আসন পাওয়া নওয়াজ-মুসলিম লীগ অথবা ৪৩ আসন পাওয়া ভুট্টো পরিবারের পিপিপির কোন সহযোগিতা ছাড়াই ছোট দলের সহযোগিতায় পূরণ করে নিতে পারবে। অর্থাৎ তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই) দলের প্রেসিডেন্ট ইমরান খান সরকার গঠন করতে যাচ্ছেন এটা প্রায় নিশ্চিত।

নির্বাচনের পরের দিন ২৬ জুলাই নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, “ইমরান খান ও মিলিটারি বসেরা ভাবতে শুরু করেছেন যে তারা একসাথে কাজ করবেন। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইমরান মিলিটারি বসদের একই দৃষ্টিভঙ্গি শেয়ার করেন যে, পাকিস্তানের আমেরিকার সাথে যো-হুজুর করে পড়ে থাকা অবস্থা কমিয়ে ফেলতে হবে আর তালেবান বা অন্যান্য চরমপন্থিদের সাথে ডায়লগে আরও কথা বলে দ্বন্দ্ব-বিরোধ কমিয়ে ফেলতে হবে”। [Mr. Khan, on the other hand, was someone the military bosses seemed to think they could work with. Analysts said he shared their worldview, in which Pakistan would kowtow less to the United States and talk more with the Taliban and other extremist groups.]

ইমরান মনে করেন, পাকিস্তানে চরমপন্থার রাজনীতি আছে কথা সত্য, কিন্তু মূল সমস্যা রাষ্ট্র শাসনের বা গভর্নেসের চরম ব্যর্থতা। [“In Pakistan, the main problem is not extremism,” he said in a recent interview with The New York Times. “We are a governance failure. And in any third world country, the moment the governance collapses, mafias appear.”]
এই হল মোটা দাগে সর্বশেষ, পাকিস্তানে কী হতে যাচ্ছে এর সংক্ষিপ্ত ধারণা। এবার মুল প্রসঙ্গে ফিরে যাই।

“পাকি” অথবা “পাকিস্তানে পাঠানো’
অন্য কারও মধ্যে নিজের অপছন্দের ধর্ম বা রাজনৈতিক বিশ্বাসের কিছু দেখলেই তাকে “পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার” হুমকি দিতে দেখা যায় আজকাল হামেশাই – সেই পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন বা পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ২৫ জুলাই। একালের বাংলাদেশেও ভারতের মতোই ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ হুমকি সমান হাজির; আর সেটা প্রায় সমান ভারতীয় অর্থে – প্রায় একই ভাষা ও বয়ানে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ থেকে হুমকিদাতা যেন বুঝানোর চেষ্টা করে যে ভারত, আমরা তো তোমাদের মতোই। কিন্তু এই ‘তোমাদের মতোই’ মানে আসলে কী? প্রগতিশীল? অবশ্যই না। সেটা এককালে ছিল। তাহলে কি একই রাষ্ট্রনীতির কারণে? সম্ভবত হ্যাঁ। বাংলাদেশের সরকারকে প্রবল সমর্থন করা ভারত, এ দুই সরকারের পাকিস্তাননীতি একই। বাস্তবে এই দুই সরকারের পাকিস্তাননীতি এক হোক আর নাই হোক, পাকিস্তান প্রশ্ন এলেই চলতি আমলে আমাদের সরকারের ঝোঁক থাকে এটা দেখানোর যে, আমাদের অবস্থান ভারতের মতোই। কিন্তু তাতেও আবার সেই কথা, ভারতের মতোই মানে কী?

প্রথমেই বলে নেয়া যায় যে, ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ বুলি এটা মূলত এক “হিন্দু জাতীয়তাবাদী” রাজনীতির বয়ান। যার প্রত্যক্ষ খাতক মোদীর বিজেপি। যদিও সেই সাথে বকলমে অন্য অনেক দলই। তবে তার চেয়েও বড় কথা এই বুলির বয়ান আদতে বর্ণবাদিতার বা রেসিজমের। অথবা বিশেষ করে কাউকে “পাকি” বলে ডাকা বা ব্যঙ্গ করা। কেন? কারণ, কোনো নির্দিষ্ট আমলের পাকিস্তান সরকারের নীতি পলিসি এখানে রেফারেন্স তো নয়ই, বরং পুরো পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীকেই অভিযুক্ত করা হয়, ঘৃণা-বিদ্বেষ প্রকাশ করা হয়ে থাকে এখানে এই ইঙ্গিত দিয়ে যে  ‘তাদের রক্তই খারাপ’। যেন তারা  “রক্ত খারাপ” এক জনগোষ্ঠি। এটা এক ধরনের হিটলারি বর্ণবাদী যুক্তির বয়ান। তাই তারা দোষী। আসলে এটা এক ভয়ঙ্কর প্রবল ঘৃণা ছড়ানোর কর্মসূচি। তবে অনেকে এতসব জেনে বা না জেনে সহজেই এতে সামিল হয়ে যান, আর রেসিস্ট উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদের শিকার হয়ে পড়েন। ভারতে একালে এই বয়ান প্রবল করেছে বিজেপি-আরএসএসের মোদি সরকার; যদিও এর আগেও এটা কম-বেশি ছিল। ফলে উঠতি তরুণ যারা রেসিজমের রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে চান তাদের এ ব্যাপারে সচেতন হতেই হবে। আমার অপছন্দের কিছু হলেই আমরা কাউকে ‘পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার’ কথা বলতে পারি না। কারণ এটা রেসিজম। বরং কোন পাকিস্তান সরকারের সুনির্দিষ্ট সেই নীতি বা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরাসরি সমালোচনা নিন্দা করাই সঙ্গত হবে। অজান্তে প্রগতিবাদিতার নামে হিন্দুত্বের পৃষ্ঠপোষক হয়ে যাওয়াটাই কোনো কাজের কথা নয়।

“পাকিস্তান মানেই সামরিক শাসন”
পাকিস্তান- এই শব্দটা দিয়ে এছাড়াও এই অঞ্চলে আমরা আরও অনেক কিছু ইঙ্গিতে মানে করি। যেমন পাকিস্তান মানেই সামরিক শাসন- এটা সমার্থক। একজন ‘প্রগতিশীল’ রাইটার আজ লিখছেন, ‘পাকিস্তানে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হল।’ অর্থাৎ তার আগাম অনুমানটা হল পাকিস্তান মানে তো সেখানে ‘সামরিক অভ্যুত্থান হবারই কথা’, সেটা না হয়ে নির্বাচন হয়েছে। কেন? কারণ, জুড়ে দেয়া ট্যাগিং অর্থটা হল, পাকিস্তানের জেনারেলরা নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করা ছাড়া থাকতেই পারে না। এখানেও আগাম ধরে নেয়া অনুমানটা হল যে, জেনারেলরা যেন খুবই ক্ষমতালোভী, সে কারণেই নিজ ইচ্ছায় তারা অভ্যুত্থান করে থাকেন। আর ঘটা এ ধরনের অভ্যুত্থানগুলোতে বোধহয় পাকিস্তানের বাইরের গ্লোবাল পরিস্থিতির ও পরাশক্তি রাষ্ট্রের কোনো সংযোগ ও ভূমিকা নেই। সবই যেন স্থানীয় জেনারেলরা লোভী বলেই কেবল তারা ক্ষমতা নিয়ে নেন। এই হল প্রপাগান্ডা অনুমানগুলো।

এসব অনুমান বাস্তবতা বিবর্জিত ও ভিত্তিহীন। ফ্যাক্টস হল, পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলগুলো হয়েছে আমেরিকান ইচ্ছায়, ঐ রাষ্ট্রের নীতি-পলিসির কারণে। জেনারেলদের নিজের ইচ্ছায় মানে, আমেরিকার ইচ্ছা অমান্য করে পাকিস্তানে ক্ষমতা দখল একবারই হয়েছে; সেটা ১৯৯৯ সালে জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বেলায়। তাও সেটার পিছনে বিশেষ কারণ আছে। শ্রীলংকা থেকে দেশে ফিরতে  বাণিজ্যিক বিমানে রওনা করেছেন মোসাররফ। আর ঠিক এর পরেই ভ্রমণরত অবস্থায় মোশাররফকে সেনাপ্রধান থেকে সরানো এবং তার বিমান মাটিতে নামতে না দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা জারি করেন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ। এর বিরুদ্ধে সেনা সদস্যদের মিলে পালটা যৌথ অবস্থান নিয়ে ক্ষমতা দখল করেন। মাত্র পাঁচ মিনিটের জ্বালানি থাকা অবস্থায় বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তারা মোসাররফের বিমান মাটিতে নামিয়ে আনেন।  কোন বাণিজ্যিক বিমানকে নামতে না দেওয়ার নির্দেশ জারি এটা ক্রিমিনাল অফেন্স। মূলত ভারত-পাকিস্তানের কারগিল যুদ্ধের দায় প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের অপ্রয়োজনীয়ভাবে আর্মিকে দায়ী করা এবং বিশেষত মোশাররফের ওপর তা চাপানো আর প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের তাতে মৌন সম্মতিতে ঘটেছিল এমন হাতছুট ঘটনা ও এর পরিণতি। তাও এর দু’বছর পরে ২০০১ সালের নাইন-ইলেভেন, টুইনটাওয়ার হামলার পরের দিনই আমেরিকা মোশাররফ সরকারকে মেনে নিয়েছিল। আর দ্বিতীয় ঘটনাটা হল, সদ্য স্বাধীন সেকালের পাকিস্তানে, ১৯৫১ সালে প্রথম যে সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টা করেছিল তা করেছিল পাকিস্তানের কমিউনিস্টরাই। “রাওয়ালপিন্ডি কন্সপিরেসি” নামে যা পরিচিত। ফলে জন্ম থেকেই, ইসলাম-পাকিস্তান-সামরিক ক্যু, এগুলো সব সমার্থক শব্দ, এ কথা বলে যে প্যারালাল টানা হয় এই কথারও কোন ভিত্তি নাই।

আসল কথাটা অর্থাৎ যে জায়গায় বসে পাকিস্তান বা সামরিক বিষয়টাকে দেখতে হবে তা হল কোল্ড ওয়ার; মানে ১৯৫০-১৯৯১ সাল, এই সময়কাল ধরে চলা আমেরিকা বনাম সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে লড়াইয়ের যুগ। এইকালে এশিয়ার বেশির ভাগ দেশ ক্যু হয়েছে আমেরিকান ইচ্ছায় ও নীতিতে সামরিক শাসনে চলেছে। মূলত কমিউনিস্টদের পপুলার প্রভাবে আমেরিকার পক্ষে এসব দেশে কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সরকার দূরে থাক, নামকাওয়াস্তে কোনো লিবারেল দুর্বল সরকারও টিকিয়ে রাখতে পারেনি সেকালে। ফলে আমেরিকার প্রভাব-স্বার্থ টিকাতে সামরিক ক্ষমতা দখলই ওর একমাত্র ভরসা ছিল ।

কোল্ড ওয়ার মানে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে (১৯৪৫) কলোনি উত্তর সময়ে কলোনিমুক্ত দেশগুলোকে নিজ বলয়ে নিতে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের পাল্টাপাল্টি প্রভাব বিস্তারের লড়াই, তাদের নিজ নিজ রাষ্ট্র-ব্লকে স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে আসার টানাপড়েন – এটাই কোল্ড ওয়ার যুগ-বৈশিষ্ট্য। এবং অবশ্যই সেগুলো কমিউনিস্ট ও এন্টি-কমিউনিস্ট মতাদর্শের মধ্যকার লড়াই, এই উছিলায় ঘটেছিল। এতে কে সঠিক ছিল, সেটা আমরা যার যার পছন্দের মতাদর্শের ভিত্তিতে জবাব দেব আর এভাবে বিভক্ত হয়ে যাবো কোন সন্দেহ নেই। ফলে সেদিকে না গিয়ে, বরং সেই সময়ের আমেরিকান নীতি সম্পর্কে চলতি শতকে এসে আমেরিকানদের ব্যাখ্যা বা মূল্যায়ন কী- সেই প্রসঙ্গে কিছু কথা তুলব। তবে মূল কথা হলো, অনেক হয়েছে আর কত, পাকিস্তানের ঘটনাবলি বুঝতে কোল্ড ওয়ারের চিন্তা-ফ্রেম তো লাগবেই  সাথে লাগবে আমাদের পরিপক্কতা। হিন্দু অথবা মুসলমান জাতীয়তাবাদের বাইরেও দুনিয়া আছে। ফলে বাইরে যেতে হবে। পাকিস্তানের ঘটনাবলির কারণ সেখানেও দেখতে হবে। অন্তত, দুই জাতীয়তাবাদের কোনো একটার ঘরে বসে অন্যটাকে কোপানো – এগুলোর দিন শেষ করতে হবে। পারস্পরিক ঘৃণা ছড়ানো বন্ধ করতে হবে।

RAND ও আরব স্প্রিং
র‌্যান্ড করপোরেশন (RAND Corporation) – এটা আমেরিকান আর এক থিঙ্কট্যাঙ্কের নাম। বহু পুরানা, বিশ্বযুদ্ধের সময়ে এর জন্ম। যখন সে আমেরিকান এয়ার ফোর্সকে নিজের নীতি গবেষণার কাজ দিয়ে সহায়তা দিত। কারণ, যুদ্ধবিমান তৈরি করে এয়ারফোর্সকে বিক্রি করে এমন এক কোম্পানি থেকে র‍্যান্ডের চলার ফান্ড আসত। বর্তমানে (১৯৪৮ সালের পর থেকে) এটা নিজেই এক থিঙ্কট্যাঙ্ক হিসাবে রেজিষ্টার্ড। এই দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অধীনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ই আছে, পিএইচডি প্রোগ্রাম অফার করে থাকে। যেখান থেকে এর বিস্তর একাডেমিক তৎপরতা – স্টাডি, গবেষণার কাজ চলে। স্বভাবতই এর মূল লক্ষ্য হল, অ্যাকাডেমিক তৎপরতা- স্টাডি, গবেষণার মাধ্যমে আমেরিকান সরকারগুলোকে সম্ভাব্য তার পলিসি কী হওয়া উচিত, তা ঠিক করতে সহায়তা করা। এই অর্থে আমেরিকান রাষ্ট্র ও সরকারের স্বার্থ দেখাটাই তার কাজ। তার অনেক কাজের মধ্যে একালে এক প্রভাবশালী কাজ – পপুলারলি যেটাকে ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ নামে চেনানো যায়। বড় পরিসর থেকে বললে, ২০০১ সালে টুইনটাওয়ার হামলার পরে বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নীতিটা ছিলঃ মুসলমানমাত্রই শক্ত হাতে দমন, তাদের ধর আর মার। এই নীতি নিষ্ফলা পরাজিত হয় ও অনন্ত সমাপ্তিহীন এক যুদ্ধের ভেতর আমেরিকাকে টেনে নিয়ে যায়। সেই থেকে, আমেরিকান অর্থনীতির পতনের পিছনে এটা মূল কারণ।  ২০০৬ সালের মধ্যে আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের গবেষণা মূল্যায়নে পাওয়া ফল হিসেবেই এই নিষ্ফলা পরাজয় আর অর্থনীতির পতনের ঘটনাবলি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। আর এই ফলাফল থেকে শিক্ষা নিয়ে আর আগে থেকে চলে আসা র‌্যান্ডের এক গবেষণার ফলাফল – মূলত এই দুই থেকে তৈরি নীতি হল ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’। ওবামা প্রশাসন ২০০৯ সালে ক্ষমতা নিলে এটা স্থায়ী ও রুটিন বিদেশ নীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছিল।

সার কথায় বললে, এটা হল নির্বিচারে আর মারধর-দমন নয়, ইসলামের সাথে আমেরিকার এনগেজমেন্ট বা সংশ্লিষ্ট করার নীতি। সশস্ত্র ইসলামি ধারাগুলোর সাথে আমেরিকার আগেরই মারধর-দমন চলেছে তা বাদে ওর বাইরে বাকি সব ইসলামি ধারার সাথে আমেরিকার রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়া, রাষ্ট্র-সরকারে তাদের আসতে অংশগ্রহণে সহায়তা, সহযোগিতা করা। এরই প্রথম সবল প্রচেষ্টা ছিল মিসরে মোবারকের পতন ও পপুলার নির্বাচিত এক সরকার সৃষ্টি – আরব স্প্রিং। আর এই কাজে ইসলামি ব্রাদারহুডের সাথে কাজ করা, এটাই ছিল আমেরিকার ইসলামের সাথে এনগেজমেন্টের প্রথম উদ্যোগ। দুঃখজনক হল এটা ফেল করে যায় বা কাজ করেনি। না করলেও ওবামা আরো কিছু চেষ্টা করতে রাজি ছিলেন। কিন্তু মূলত ব্রাদারহুড সম্পর্কে সৌদিরাজের ভীতি, বিশেষত প্রেসিডেন্ট মুরসির ইরান সফর করা থেকে সেই ভীতি আরো ট্রিগার করে প্রবল হওয়া থেকে, এরপর সৌদি উদ্যোগে জেনারেল সিসির আগমন উত্থানে ওবামা এতে নীরব বা উপায়হীন সমর্থকে পরিণত হয়েছিল। ফলে মুরসির পতন ঘটে। মিসর এক্সপেরিমেন্টের এখানেই সমাপ্ত হয়ে যায়। কিন্তু মনে রাখতে হবে ইজিপ্ট ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’-এর একটা মাত্র। এই প্রজেক্ট মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার সব দেশেই চালু তো আছেই, ফলে বাংলাদেশেও আছে। এমনকি ইন্ডিয়াতেও আছে। কারণ এটা সাধারণভাবে ২০০৯ সাল থেকে আমেরিকান ফরেন পলিসির চলমান অন্যতম মুখ্য বৈশিষ্ট্য।

আমেরিকার যুদ্ধের ময়দান পাকিস্তান
যুদ্ধটা শতভাগ আমেরিকার। নিজ দেশের ভুমিতে সে যুদ্ধ না করে পাকিস্তানকে যুদ্ধের ময়দান বানানো ও ব্যবহার করা, পাকিস্তানকে এক গজব বানিয়ে ফেলার শতভাগ দায় আমেরিকার। সশস্ত্র ইসলামি রাজনীতির সাথে আমেরিকান যুদ্ধের ময়দান হল পাকিস্তান। পাকিস্তানকে আমেরিকার হয়ে এই ময়দান হতেই হবে। নইলে পাকিস্তানকে বোমা মেরে মাটির সাথে মিটিয়ে ‘পুরান প্রস্তর যুগে’ ফেরত পাঠানো হবে – এটাই ছিল আমেরিকান প্রতিরক্ষা উপমন্ত্রী রিচার্ড আর্মিটেজের প্রেসিডেন্ট মোশাররফকে টেলিফোন কথোপকথনে দেয়া পরামর্শ বা হুমকি। মোশাররফের ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইতে এর বিস্তারিত বয়ান আছে। তাই জেনারেলদের সিদ্ধান্তের পাকিস্তানের সব ‘টেররিজম’ ঘটনা ঘটছে- এ কথাগুলো অর্থহীন। আমেরিকান ওয়ার অন টেরর যুদ্ধের প্রেক্ষিতে পাকিস্তানকে বাধ্য হয়ে নিজেদেরকে ব্যবহৃত হতে দেওয়া এই বৃহত্তর দিক বাদ দিয়ে কেবল জেনারেলদের দায়ী করার সংকীর্ণ চোখ – এটা ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের ফরেন পলিসি।  তা যাই হোক, আমেরিকান রুটিন পলিসি হিসেবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যার রাষ্ট্র বলে পাকিস্তান ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’-এর এক বড় খাতক, এই প্রকল্পের শুরু থেকেই।

আমরা বেশির ভাগই না আরব স্প্রিং পলিসির যথেষ্ট খবর নেই না পাকিস্তানের। এই প্রচারণার কাছে পাকিস্তান মানে হল ঘৃণা। এটা হিন্দু জাতীয়তাবাদের চোখে দেখা ১৯৪৭ এর দেশভাগ অথবা সত্য সত্যই ১৯৭১ এর পাকিস্তানি শাসকদের গণহত্যা নৃশংসতাও এর কারণ বটে। যদিও এরপর এরা আবার জিয়াউল হকের আমলে এসে থেমে যায়।  বুঝতে চায়না অথবা দেখতে পায়না ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল – এই ট্রিগার পয়েন্ট সব ঘটনার আরম্ভ-বিন্দুকে। যেখানে মুল বিষয় হল, রাশিয়ান জার-সাম্রাজ্য সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিজ বিস্তারের প্রকল্প হিসেবে নিজ সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্ত করে আর এরপর তা রক্ষা করতে গিয়ে ১৮৮৯ সালে আফগানিস্তানের মাটিতে ব্রিটিশ-জার এ দুই সাম্রাজ্য লড়াই করেছিল। এরই পুনরাবৃত্তি হল, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখল। যার আবার পিছনের মূল কারণ ১৯৭৯ সালে ইরানে বিপ্লব হয়ে যাওয়ায় এর প্রভাব-ভীতি। ইরান বিপ্লব ছিল এক গ্লোবাল ঐতিহাসিক তাতপর্যময় ঘটনা এই অর্থে যে সোভিয়েত ব্রেজনেভ-আফগানিস্তান-আমেরিকা-পাকিস্তান-টেরর-আলকায়েদা-তালেবান-আইএস ইত্যাদি সব শব্দাবলীতে এরপর থেকে এক চেন রিয়াকশন ঘটে গেছে এখান থেকে। একালের দুনিয়ার সবঘটনার আরম্ভ বিন্দু এখানে। । মূলত ইরান বিপ্লবের প্রভাবে মুসলিম সেন্ট্রাল এশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের হাত ছাড়া হয়ে যায় কিনা আগাম সেই ভয় মনে এসেছিল সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের। আর তা থেকে তিনি ‘সমাজতন্ত্র নামের আড়ালে’  কলোনী দখলগিরিতে করতে নেমে পরেন। আফগানিস্তানের ভৌগলিক অবস্থান ইরান আর সেন্টাল এশিয়ার (সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ) প্রায় মাঝখানে। ফলে আফগানিস্তানকে বলি চড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন ব্রেজনেভ এই মনে করে যে বাফার হিসেবে আফগানিস্তান দখল করে আফগানিস্তানকে  বাফার রাষ্ট্র হিসাবে ব্যবহার করতে হবে।  পুরানাকালে রাশিয়ান জারের তৎপরতায় ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ভয় পেয়ে এর বিরুদ্ধে লড়েছিল, একালে সেই একই ভয় পায় পাকিস্তান। তবে পাকিস্তান যুদ্ধের দায়টা নিয়েছিল আমেরিকার হয়ে, কোল্ড ওয়ারের লড়াই লড়তে। যে যুদ্ধের শেষটায় এখান থেকেই আল-কায়েদা ও তালেবান উত্থান-পতনে, এখনও যা চলমান।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও তা ভেঙে গেলে এর আমেরিকার থিঙ্কট্যাঙ্ক একাদেমিক মহলে প্রধান তাৎপর্যময় বিষয় হয়ে উঠে যে “কোল্ড ওয়ারের” তাহলে এখন কী হবে! কারণ বাস্তবত সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও নাই মানে মাঠে এবং বাস্তবে কোল্ড ওয়ার নাই হয়ে যাওয়া। ফলে আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোতে প্রবল তর্কাতর্কি উঠেছিল যে কোল্ড ওয়ারের পুরা যুগে আমাদের মত দেশে আমেরিকা সামরিক ক্যু’র করানোর পথ অনুসরণ, সেটা এবার তাহলে ফরেন পলিসি থেকে বাদ দিতে হবে।

আমেরিকা কোল্ড ওয়ারের যুগে সামরিক ক্যু’র পথে যেত কেন
কিন্তু আমেরিকা কোল্ড ওয়ারের যুগে সামরিক ক্যু’র পথে যেত কেন? এ প্রসঙ্গে র‌্যান্ড রিপোর্টের দেয়া একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। তা হল, আমেরিকান পলিসি মেকারদের চোখে সমাজতন্ত্র এক এবসার্ড (বাস্তবায়ন অযোগ্য) আইডিয়া। না, এটা তাদের অপছন্দের মতাদর্শ বলে নয়। কারণ এটা এমন এক প্রজেক্ট যার সাথে আমেরিকানদের এনগেজমেন্ট বা কোনো দেয়া-নেয়া, রাষ্ট্র বা সরকারে পাশাপাশি থাকা, দুটো আলাদা দল হিসেবে থাকা, অথবা সরকারে বা বিরোধী হিসাবে থাকারও কোনো সুযোগ নেই। ব্যাপারটা হয় তারা না হলে আমরা। এছাড়া কমিউনিস্টদের “সব মালিকানা উচ্ছেদ করে দিতে হবে” – এটা মধ্যবিত্ত ও গরিবদের মধ্যে খুবই পপুলার দাবি। অথচ আমেরিকার চোখে এটা বাস্তবায়ন অযোগ্য এমন এক এবসার্ড দাবি। তবে এবসার্ড হলেও কিন্তু তা পপুলার দাবি বলে এর সামনে আমেরিকা অসহায় এবং উপায়ন্তহীন। তাই আমেরিকা এশিয়ায় আমাদের মতো দেশে কোল্ড ওয়ারের পুরা ৪২ বছরে কোনো লিবারেল সরকারও কায়েম করতে পারেনি। এরই পরিণতি হল সামরিক ক্যু ফেনোমেনা।

এই কথাগুলো এখানে বলা হল, আমেরিকান নীতি বুঝার জন্য কেবল। তা মেনে নেয়ার জন্য এটা কোনো সুপারিশ নয়। অথবা এটাকে সাফাই হিসেবে নেয়ার জন্য নয়, তা ভুল হবে। আমেরিকানদের ভালো বা মন্দ কাজের সাফাই দেয়ার দায় আমেরিকার।

তাই সোভিয়েত ভেঙ্গে পড়ার (১৯৯১) পরে এবার আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলোতে প্রবল তর্কাতর্কি উঠেছিল এবং শেষে নীতিগতভাবে আমেরিকা সিদ্ধান্ত অবস্থান নেয় যে আর সামরিক ক্ষমতা দখলকে নিজের স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে আর দেখা হবে না। সেটা ছিল প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন (১৯৯৩-২০০১) প্রশাসনের শুরুর আমল। বিল ক্লিনটনের ২০০০ সালের মার্চে বাংলাদেশ সফর ছিল সেই বার্তা পৌছানোর যে আমরা এখন থেকে আর সামরিক ক্যু নয় লিবারেল নির্বাচিত সরকারের পক্ষে।  আর ঠিক এই কারণে অর্থাৎ আমেরিকান ‘ক্যু-বিরোধী’ নতুন পলিসি কমিটমেন্টের পর জেনারেল মোশাররফের ক্যু এই সাময়িক দুর্ঘটনাটা ছাড়া পাকিস্তানে আর সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেনি। মূল কারণ আমেরিকান নীতিগতভাবে সামরিক পথে না যাওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত প্রতিশ্রুতি। ফলে যারা কিছু হলেই পাকিস্তানে সামরিক ক্ষমতা দখল নিয়ে শঙ্কা তোলেন তারা মুখস্থ বলেন। তারা আমেরিকার পলিসির হাল-হকিকত সম্পর্কে খোঁজ রাখেন তা মনে হয় না।

আবার আমরা বেশির ভাগই একালের পাকিস্তান, নতুন প্রজন্মের পাকিস্তান সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকেবহাল নই। বিশেষ করে আরব স্প্রিংয়ের প্রভাব পাকিস্তানে কেমন পড়েছিল। ঠিক যেমন বাংলাদেশে আমাদের সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এমনকি আমাদের বেসরকারি মেয়েদের স্কুল ভিকারুন্নিসা পর্যন্ত আরব স্প্রিং ছড়িয়ে আছে, আমরা কী জানি! মনে হয় না। অবশ্য ধরতে পারারও একটা ব্যাপার আছে। এই ততপরতাগুলোকে চেনার একটা সহজ উপায় হল, ‘ইয়ুথ’ বা ‘লিডারশিপ’ – এসব শব্দে প্রকাশিত কোনো তৎপরতা দেখতে পেলেই বুঝতে হবে এটাই সেই। বাইরে থেকে দেখতে এটা আমাদের পরিচিত ‘শিক্ষার্থীদের কোন ক্লাব’ (ডিবেটিং) ধরনের এমন নানা তৎপরতা, যেগুলো যে কোনো অ্যাকাডেমিতে এক্সট্রা কারিকুলাম এক্টিভিটি বলা হয় তেমনই ধরনের।
র‌্যান্ডের ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ঙ্গামেরিকান ফরেন পলিসি হিসাবে গৃহিত হওয়া আসলে আমেরিকারই সামরিক ক্যু’র পথে আর না যাওয়ারই আরেক পরিপূরক অবস্থান, আরেক এক্সটেনশন।

তাহলে মূল কথাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়াতে তাই আমেরিকাকে এরপর দেখানো জরুরি হয়ে পড়ল যে, এখন তাহলে রাষ্ট্র গঠনে, রাষ্ট্রীয় কনস্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠানগুলো গড়া, মৌলিক অধিকার সম্পর্কে মাস লেভেলে সচেতনতা তৈরি ইত্যাদি নিয়ে আমেরিকার এগিয়ে আসা উচিত। এ্টাই ‘আরব স্প্রিং প্রজেক্ট’ এর কোর লক্ষ্য । যুক্তির শুরু এখান থেকেই। তবে মূলত এর মাঝে টুইনটাওয়ার হামলা ঘটে যাবার কারণে, মূল প্রজেক্টকে মুসলমান জনসংখ্যার জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য এমন বিশেষ আর এক মাত্রা দিয়ে সাজিয়ে নেয়া হয়েছিল যাতে তা ‘ইসলামের সাথে আমেরিকার এনগেজমেন্টের ইচ্ছার’ প্রকাশ হিসাবেও কাজ করতে পারে।

টার্গেট হিসাবে এই প্রজেক্ট মূলত এটা তরুণদের মধ্যে বেশি কাজ করে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেন্দ্রিক তৎপরতা দিয়ে, পপুলারও হতে চায়। এটা মূলত আধুনিক রাষ্ট্র, কনস্টিটিউশন, প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের অধিকার প্রসঙ্গে এবং সমাজকে নেতৃত্ব দেয়া ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির আমেরিকান প্রকল্প।

“Youth leadership”
পাকিস্তানে এই প্রকল্প তৎপরতা খুব সম্ভবত ২০১০ সাল থেকে ব্যাপকতা লাভ করে। ইমরান খানের দলের নাম পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ, সংক্ষেপে পিটিআই। যার মানে হল (Movement for Justice) বা ইনসাফের লড়াই।  যদিও পিটিআইয়ের জন্ম ১৯৯৬ সালে আরব স্প্রিংয়েরও বহু আগে থেকে। তবে আরব স্প্রিংয়ের তৎপরতা ধীরে ধীরে জমে ওঠার পর গত ২০১৩ সালের নির্বাচনের আগে দিয়ে সমাজে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে থেকে তারা একটা দল বেছে নিয়েছিল। সেটা ইমরান খানের দলের সাথেই, সেখান থেকে তাদের বুঝাপড়া ও এক সাথে কাজ করার ঐক্য হয়েছিল। এমনিতে আরব স্প্রিংয়ের প্রকল্পগুলো মাঠে হাজির থাকে এনজিও প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা হিসেবে। তবে বাইরে আমরা দেখি কেবল তাদের সুবিধালাভ যারা যারা করে এমন শিক্ষার্থীদেরকেই। সরাসরি ইউএস এইডের সরকারি ফান্ড এটা; অন্য কোন সামাজিক দাতব্যের ফান্ড নয়। আমেরিকান প্রায় ৯টি এনজিও প্রতিষ্ঠান সাধারণত এ কাজ-ততপরতায় জড়িত।   ফলে তারা সরাসরি স্থানীয় কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে কাজ করতে পারে না, করেও না। তবে তাদের তৎপরতা থেকে সুবিধা-লাভকারি স্থানীয় জনগণ বা শিক্ষার্থী নিজেরা স্থানীয় রাজনৈতিক দলের সাথেও কাজ করতে পারে। তবে “youth leadership” নামে চলা কর্মসুচিগুলো কবে কখন স্থানীয় রাজনৈতিক দলের কর্মিদের সাথেও সম্পর্ক কাজ করবে এটা ভ্যরি করে। সাধারণত এটা অনেক দেরি করে ঘটে। মিসরের “সিক্সথ অক্টোবর লিডারশীপ গ্রুপ” শেষে নিজেই রাজনৈতিক দল হয়ে যায়। তবে কোন কারণে তা নির্বাচনের পরে হয়েছিল।

“youth leadership” ্ধরণের কাজের মাধ্যমে গত বিশ বছরে তরুণ পাকিস্তানিরা, পাকিস্তানের পরিচিতি অনেক বদলে দিয়েছে। এরা মূলত শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত।  ইমরানের দলের গত পাঁচ বছরের তৎপরতায় মনে করার কারণ আছে যে, এসব তরুণ নেতৃত্বেও কিছু যোগ্যতা অর্জন করেছে। পাকিস্তান সমাজের এই অংশটার কথাই বাইরের আমরা খুবই কম জানি কারণ আমাদের পরিচিত পাকিস্তান যেটা ছিল সেটা মূলত বড়জোর সত্তরের দশকের; সেটা দিয়েই একালের পাকিস্তানকে বুঝতে চাই বলে সমস্যা হয়। নিরন্তর যুদ্ধ, রিফুইজি, অস্ত্র  বোমা আর ইসলামের হরেক রক্ষণশীল বয়ান- ইত্যাদি এসবের পালটা এসব কিছুতে ত্যক্তবিরক্ত এসব তরুণেরা এক ব্যাপক মডার্নাইজেশন বা রুপান্তরের ভেতর দিয়ে পার হয়ে গেছে। যার প্রধান উপায় হিসেবে কাজ করেছে এনজিও তৎপরতা। এরই সবচেয়ে ভাল প্রকাশ হল ব্যাপক  ও একটিভ নারী ভোটার এর ততপরতা। পাকিস্তান রক্ষণশীল সমাজ তা সত্বেও নারীরা সক্রিয়ভাবে সবকিছুতে তাদের উপস্থিতি আজ দেখতে পাওয়া যায়। এই নির্বাচনে শিখ, হিন্দু, খ্রীশ্চান ও নারী এমনকি ট্রান্সজেন্ডারেরা প্রার্থী হয়েছে। কয়েকজন সম্ভবত নির্বাচিতও হয়েছেন। এর পিছনে মূল যে বাস্তবতা কাজ করেছে তা হল, নারীরা বাইরে বের না হওয়ার মানে কঠিন কষ্টকর জীবন সংগ্রামে পরিবারের আয়ের তাবত দায় কেবল পুরুষ সদস্যদের নিতে হবে। স্বভাবতই তা পরিমাণেও কম হবে। অনটন বাড়বে। ফলে এই কঠিন বাস্তবতার ফলাফল হল নারীদেরকে বাইরে দেখতে পাওয়া। সমাজে তা গ্রহণযোগ্যও করে নেয়া হয়েছে, হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি আমরা আফগানিস্থানের সাথে তুলনা করলে দেখি সেখানে নারীরা পুরুষ অভিভাবক ছাড়া (তা আটবছরের বালক হলেও) এখনও বাইরে বের হতেই পারেন না। এসব কিছু মিলিয়ে এক পরিবর্তন – পরিবর্তিত পাকিস্তান – এরই প্রতীক ইমরান।

এরা নিঃসন্দেহে একেবারেই নতুন প্রজন্ম, নতুন তাদের অভিজ্ঞতা। তাদের তৎপরতার প্রথম ফলাফল দেখার সময় সম্ভবত এই নির্বাচন।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের প্রকাশিত ফলাফলে দেখা যাচ্ছে পিটিআই সবার চেয়ে এগিয়ে। এর পেছনের একটা বড় কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী নওয়াজ শরিফ পরিবারসহ তার অর্থ পাচারের দুর্নীতির মামলার রাজনৈতিক তৎপরতা করার অযোগ্য ঘোষিত হয়ে যাওয়া, এর নৈতিক প্রভাব। মনে হচ্ছে পিটিআই অথবা তাদের নেতৃত্বের এক জোট, সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। রিগিংয়ের অভিযোগ আছে। বিদেশি অবজারভাররা নির্বাচন ভাল হয় নাই বলেছে কারণ নির্বাচনের আগে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ছিল না তারা বলছে। তবু সব কিছু যতটা সম্ভব আমল করে, প্রতিকার করে কাটিয়ে ইমরান খান সরকার গড়তে যাচ্ছেন – এটাই  ডমিনেটিং পাবলিক মনোভাব ও আকাঙ্খা। এই তথ্য আলজাজিরার পাকিস্থানের স্থায়ী সংবাদদাতা কামাল হায়দারের বরাতে বলছি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৬ জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) পাকিস্তানে আরব বসন্তের নতুন মডেল”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

আরব স্প্রিং

আরব স্প্রিং

http://wp.me/p1sCvy-1p

আরব স্প্রিং শব্দটা আমরা অনেকেই শুনেছি – আর এর অর্থ হতে দেখেছি একটা গণ-বিক্ষোভ বা গণ-আন্দোলন হিসাবে,কেবল এই দিকটাই নজরে রেখে। সেজন্য ২০১১ সালের শুরুর দিকে সেকুলারিস্ট আর ইসলামিষ্ট উভয়কেই আরব স্প্রিং এর সমর্থক হতে দেখা গিয়েছিল। আরব স্প্রিং শুরু হওয়া তিউনিশিয়া পরে মিশরের পরিস্থিতিও কেবল গণ-আন্দোলন দিক থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। আসলে বিশ্ব-অর্থনীতি ও ক্ষমতা কাঠামো কিম্বা মতাদর্শিক লড়াই-সংগ্রামের ক্ষেত্রে আদৌ কোন নতুন পরিবর্তন ঘটেছে কিনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা হয়ে ওঠে নি। কিন্তু আরও বিস্তারে লিবিয়া পেরিয়ে বিশেষ করে সিরিয়ান পরিস্থিতিতে এসে আরব স্প্রিং কথাটাকে যে আর কেবল গণ-আন্দোলন দিক থেকে ব্যাখ্যা বুঝাবুঝিতে কুলাচ্ছিল না তা সকলে টের পেতে শুরু করে। ইতোমধ্যে সকলে অন্তত বুঝতে পেরেছে এটা নেহায়েতই গণ-আন্দোলনের ঘটনা নয়। ফলে সেকুলারিস্ট আর ইসলামিষ্ট উভয়ের ক্ষেত্রেই আমরা দেখি সিরিয়ান প্রশ্নে এসে আরব স্প্রিং এর প্রতি ভালবাসা ও সমর্থন এবার ফিকে হয়ে গেছে; একটা জটিল গোলমেলে অবস্থায় সকলে। সেকুলারিষ্টদের কেউ কেউ অবশ্য এবার ৮০ দশকে ফেলে আসা রাশিয়া –আমেরিকার ঠান্ডাযুদ্ধের ব্লক ধারণা দিয়ে ঘটনা ব্যাখ্যার এক অক্ষম চেষ্টা করেছিল। ব্যাখ্যায় থই না পাওয়ার মুল কারণ আরব স্প্রিং কেবল গণ আন্দোলন নয়। তাহলে গণ-আন্দোলনের দিক ছাড়া আর কি কি দিক আছে যা জানতে হবে যা দিয়ে আরব স্প্রিংকে বুঝা যাবে সেদিকে যেতে হবে।

গত দুবছর ধরে চেষ্টা করেছি মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকা – দুনিয়ার এই ভুগোলের নানান দেশের আরব স্প্রিং এর ঘটনাবলী অনুসরণ করার। আমার অভিজ্ঞতা লেখার চেষ্টা করেছি,এর আগেও। কিন্তু পুরা ঘটনা — মানে সব দেশের ঘটনা একসাথে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা কখনও শেষ করতে পারি নাই। আগের লেখা দুটো কেন্দ্রিভুত হয়ে গেছে কেবল মিশরের ঘটনায় ভিতর দিয়ে আরব স্প্রিংকে যতটা স্পষ্ট করা যায়, সেদিকে। আমার লেখার ক্ষমতার (গাফিলতি কুঁড়েমিসহ)চেয়ে ঘটনা ঘটেছে দ্রুত, সেটাও এর মুল কারণ। গত কয়েক সপ্তাহে সিরিয়ান ফেনোমেনা নতুন মাত্রা লাভ করেছে, অভিমুখেও বদল ঘটছে। ঘটনা যদি তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণের চেয়ে দ্রূত ঘটতে থাকে তখনেই সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

প্রথম কথা হলো, বাইরে থেকে যেটা আরব স্প্রিং সেটা এর গণআন্দোলনমূলক প্রকাশ্য দিক। আর এর অন্তরে মোটা দাগে দুটা স্বার্থ বা দুটো রাজনীতি আছে। এক. আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি। দুই. নতুন ধরণের এক ইসলামী রাজনৈতিক ধারা। কিন্তু আরব স্প্রিং এর ইনিশিয়েটর বা প্রথম উদ্যোগটা এসেছে আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি –মার্কিন পরাষ্ট্র নীতির এই অন্তর্গত তাগিদ থেকে। আর দ্বিতীয় দিকটা হলো, নতুন ধরণের ইসলামী রাজনৈতিক ধারা। এখানে আমি এই ধারাকে কারযাভী (Sheikh Yusuf al-Qaradawi) ইসলাম বলে নামকরণ করব বা চেনাবো। তবে এই ইসলামী ধারা কেন হাজির হলো? এর জবাব হলো, আসলে আমেরিকান নতুন নীতির লক্ষ্য হলো, এক “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার” কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া। ফলে দ্বিতীয়টার জন্ম হচ্ছে আমেরিকার এই কৌশলগত প্রয়োজন থেকে ফলে মোটা দাগে কথা শুরু করব, মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকায় আমেরিকান নতুন পররাষ্ট্রনীতি থেকে।
মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকা বলে একটা আঞ্চলিক ভৌগলিক এলাকা চিনানোর চেষ্টা করলাম বটে। কিন্তু সেটাও মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকা এই অঞ্চলের গড়পরতা সব রাষ্ট্রের বেলায় ব্যাপারটা আবার তাও নয়। বরং এভাবে বললে ঠিক হবে যে, মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকার বেছে নেয়া কিছু দেশে। যেমন, মধ্যপ্রাচ্যের গালফ ষ্টেট অর্থাৎ দুবাই-সৌদি-বাহরাইন-কাতার-ওমান-কুয়েত এর মত আমির-বাদশার রাষ্ট্রগুলোর জোট (গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি) – এই বাদশাজোট ভুক্ত রাষ্ট্র হলে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির অনুমোদিত আরব স্প্রিং সেখানে নো-গো এরিয়া। কোন জিসিসি রাষ্ট্রে আরব স্প্রিং করবার চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে। কারা দমন করবে? ওসব দেশের স্ব স্ব বাদশা-শাসক একা অথবা সৌদি নেতৃত্বে যৌথভাবে জিসিসি। আর সেখানে আরব স্প্রিং ঘটলেও ওবামা সেখানকার বাদশা-শাসকদের পদত্যাগ করতে দাবী জানাবে না। ঠিক যেমন মিসরে মোবারকের বেলায় আমরা দেখেছি। অথচ মিসর, লিবিয়া বা সিরিয়ায় আরব স্প্রিং ঘটাবার জন্য সৌদি নেতৃত্বে অর্থ, লজিষ্টিক, ডিপলোমেটিক ইত্যাদির প্রধান পৃষ্টপোষক এরাই। আর নতুন উদিয়মান কাতার, এর বাদশা। তাহলে দেখা যাচ্ছে আরব স্প্রিং এর একটা গড়পরতা আঞ্চলিক ভুগোল পাওয়া মুস্কিল। বরং আমরা দেখছি আরব স্প্রিং ঘটছে বা ঘটানো হচ্ছে বেছে বেছে নেয়া কিছু মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকার রাষ্ট্রে। কেন? এর জবাব আমাদের জানতে হবে। সেখানে যাব। তবে ইনিশিয়েটর বা প্রথম উদ্যোগটা – আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখান থেকে কিছু কথা বলে নিব আগে।

আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি বলেছি; “নতুন” শব্দটা ঢুকিয়েছি এর মানে আগে একটা নীতি ছিল। হা, আগে ছিল “ওয়ার অন টেরর” – অর্থাৎআমেরিকায় ৯/১১ এর আলকায়েদা হামলার পর নেয়া ২০০১ সালের শেষে নেয়া যে নীতি। সেটা থেকে আলাদা মানে আগেরটা ঠিক বাদ দিয়ে নয়, বলা যেতে পারে বোলচাল (rhetoric) ব্যাপারটাকে আর -ওয়ার অন টেরর – না, তবে ওর সাথে নতুন কিছু কৌশলগত বৈশিষ্ট যুক্ত করা। তবে আগের সাথে পরের নীতির মুল তফাত একটা তো করা যায় অবশ্যই। সেটা হলো, ইসলাম প্রসঙ্গে। পুরানোটা অর্থাৎ বুশের নীতিকে বলা যায়, ইসলামের যেকোন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ। ক্রুসেড। এসব প্রকাশকে দমন ও নির্মুল করেই আমেরিকাকে নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মুল ফোকাস আলকায়েদা। বিপরীতে নতুন নীতির বৈশিষ্ট হলো, ১। আমেরিকান রাষ্ট্র ও গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য ইসলামকে মুখ্য হুমকি বলে মেনে নেওয়া, (It profoundly affects the security of the West)। ২। তাই করণীয় হিসাবে সব ধরণের ইসলামের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের বদলে মার্কিন বিরোধী কিম্বা রেডিক্যাল আলকায়েদার বাইরে এক “মডারেট ইসলাম” এর ধারা খুজে বের করা। আলকায়েদার বিপরীতে এক ‘মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” খাঁড়া করা যেটা আমেরিকাকে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
দুই নীতির তুলনা করে বৈশিষ্টগুলো আলাদা করে বুঝার কাজটা আর একভাবে করা যেতে পারে। যেমন, বুশের বোলচাল ছিল, আরব “স্বৈরাচারী রাষ্ট্র ও শাসকগুলো” থেকে তাদের জনগণকে তিনি “লিবার্টি”তে আনবেন, “ফ্রিডম” শিখাবেন। তাই তিনি ইরাক হামলা ও দখল করলেন। আর বিপরীতে এবার নতুন নীতির বৈশিষ্ট হলো – আগেরটা ছিল দেশ দখল করে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” রপ্তানী করার। আর এখন হলো, ওসব দেশের জনগণকে এক এনজিও কার্যক্রমের মাধ্যমে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” শিখাবেন আর উস্কানী দিয়ে তবে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রিত রেখে শাসকের পতন ঘটাবেন। আর সাধারণভাবে মুসলমান প্রধান দেশ আর বিশেষ করে বেছে বেছে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে এই কর্মসুচী নেবার কারণ – এসব দেশের শাসকেরা “prevalence of authoritarian political structures” অর্থাৎ “স্বৈরাচারী” কাঠামোতে থাকে বলে ঐ রাষ্ট্রগুলো আলকায়েদা আন্দোলনের গড়ে উঠার পটেনশিয়াল বা সম্ভাব্য রাষ্ট্র হয়ে থাকে। আর তা সহজেই জনগণের জনপ্রিয় সমর্থন জোগাড় করে ফেলে। ফলে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” এর কথা বলে নিয়ন্ত্রিতভাবে শাসকের পতন ঘটানোর এক পুরা প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে শেষে এক ”মডারেট ইসলাম” এর ধারা খুজে বের করার কাজটা ঘটাতে হবে। ফলে আলকায়েদার বিরোধী এক ‘মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়ে তোলা যাবে। এভাবে ”মডারেট ইসলাম” এর ধারা খুজে হাজির করা আর আলকায়েদার বিপরীতে এক ‘মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড় তোলা এই কাজটারই বাইরের ডাক নাম “আরব স্প্রিং”।
আমরা আরব স্প্রিং নামে কোন আমেরিকান ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বয়ান করছি না। এককথায় বললে এটা একদিকে আলকায়েদা ধরণের ইসলামী ফেনোমেনাকে দমন করা আর পছন্দসই এক ইসলামী ফেনোমেনার জন্ম দেয়ার নতুন মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি। এছাড়া মনে রাখতে হবে, আমেরিকান রাষ্ট্রনীতি কোন সিরিয়াস গবেষণা ছাড়া কারও এক মাথাগরম অথবা খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত থেকে জন্ম হয় না। বরং আমেরিকান নতুন এই রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমরা দেখছি – এর ব্যাকগ্রাউন্ড গবেষণার কাজটা করেছে RAND Corporation, যা পরে বিস্তর সেমিনার আলাপ আলোচনা আভ্যন্তরীণ তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদির পর ওবামা প্রশাসনের নীতি হিসাবে গৃহিত হয়েছে। এখানে ইংরাজিতে যেসব ব্রাকেটবদ্ধ কথা আছে তা RAND Corporation এর এক গবেষণা রিপোর্ট (RAND_MG574) থেকে নেয়া।

RAND Corporation সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
RAND Corporation সংগঠন হিসাবে নিজেকে এক নন-প্রফিট দাতব্য প্রতিষ্ঠান বলে পরিচয় দেয়। এটা অবশ্যই এক ধরণের বেসরকারী তবে আমেরিকার নীতিনির্ধারণী থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ধরণের প্রতিষ্ঠান। জন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে যখন এর মুল প্রতিষ্ঠান ছিল আমেরিকান বিমান বাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান তৈরির এক প্রাইভেট কোম্পানী, নাম Douglas Aircraft Company,। ডগলাস কোম্পানী পরবর্তিতে বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য বিভিন্ন বিমান কোম্পানীর সাথে মার্জ বা যুক্ত হতে হতে এটাই এখনকার আমেরিকান এয়ারবাস কোম্পানী, এক বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান কোম্পানী। মুল ডগলাস কোম্পানী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিমান বাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান তৈরি ও সরবরাহের সাথে সাথে আমেরিকার জন্য যুদ্ধনীতি বিষয়ে গবেষণার কাজও করত। তবে সেটা Douglas Aircraft Company এর অধীনেই ‘RAND প্রজেক্ট’ নামে শুরু করা হয়েছিল। আর যুদ্ধ শেষে, ১৯৪৮ সালে ‘RAND প্রজেক্ট’ নিজেই মুল বিমান কোম্পানী থেকে আলাদা প্রতিষ্ঠান RAND Corporation নামে ক্যালিফোর্নিয়ায় রেজিষ্টার্ড করা হয়। আগের মত আর কেবল যুদ্ধনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বদলে আমেরিকার জন্য সোশাল, পলিটিক্যাল, ষ্টাটেজিক ও ইকোনমিক নীতিনির্ধারণী গবেষণা কাজ করা নিজের লক্ষ্য বলে ঘোষণা করেছিল। এটা এখন নিজেই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও চালায়। আমি RAND এর যে রিপোর্টের রেফারেন্সে এখানে কথা বলছি সেটার শিরোনাম হলো, RAND_MG574 Building Modern Muslim Networks । ২১৭ পৃষ্টার এই ডকুমেন্ট অনেক বড় মনে হলে শুরুতে ১৩ পৃষ্টার সামারি পড়ে নেয়া যেতে পারে। আমার এই লেখায় আমি এটাকে “RAND ইসলাম প্রজেক্ট” বলে রেফার করব। এছাড়াও এই ওয়েব সাইটে সংশ্লিষ্ট আরও অন্তত ৫-৭টা রিপোর্ট পাওয়া যাবে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
তাহলে আমরা উপরে দেখলাম, আরব স্প্রিং এর পুরা কনসেপ্টই হলো, “RAND এর ইসলাম প্রজেক্ট” ওর গবেষণার সময়ের নাম। যা পরে আমেরিকান রাষ্ট্রের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতিতে আরও অনেক কম্পোনেন্ট বা উপাদানের মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্টপূর্ণ দিক। আর আরব স্প্রিং ওর ডাকনাম বা বাইরের নাম। “RAND ইসলাম প্রজেক্ট” আর পরে এটাই ওবামার হাতে আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি। বলা বাহুল্য, আমেরিকান সরকার কবে কোন দলিল্‌ কোন মিটিংয়ে “RAND এর ইসলাম প্রজেক্ট”কে নিজের পররাষ্ট্রনীতি বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিল এবং কিছু বাদ রাখলো না পুরাটাই নিল এর খুটিনাটি ও সুনির্দিষ্ট হদিস পাওয়া মুশকিল। কিন্তু আমরা যদি উল্লেখ্য রিপোর্টের কেবল সামারিটাই দেখি তবে সেখানে যেসব ধারনা ও শব্দ পাই যেমন, Democracy Promotion, Civil-Society Development, Public Diplomacy বা স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি – এই একই শব্দ ও ধারণাগুলো আমরা হিলারী ক্লিনটনের হাতে আকার নেয়া এখনকার আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্টসুচক নীতিতে পাই। এছাড়া যেসব আমেরিকান এনজিও এর মাধ্যমে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” শিখাবেন, নিয়ন্ত্রণ রাখবেন সেগুলো নাম হলো National Endowment for Democracy NED), the International Republican Institute (IRI), the National Democratic Institute (NDI), the Asia Foundation, and the Center for the Study of Islam and Democracy (CSID)। বাস্তবে মিশরের আরব স্প্রিং এর ক্ষেত্রে আমরা এই আমেরিকান এনজিও সংগঠনগুলোকেই পাই। তবে সাথে আরও কিছু আমেরিকান এনজিওকে পাই যেমন, ফ্রিডম হাউস, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর জার্নালিস্ট, আর জর্মনদের মধ্যে আছে রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান ডেমক্রাটিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান – কনরাড এডেনেওয়ার, ইত্যাদি। এসব আমেরিকান এনজিওগুলোর ফান্ডের উৎস আমেরিকান রাষ্ট্র, সরাসরি; এবং ফান্ড বিতরণ করা হয়েছে আমেরিকার বিদেশকে এইড বিতরণের সরকারি প্রতিষ্ঠান USAID এর মাধ্যমে।এই রিপোর্টে এই আমেরিকান এনজিওগুলোকে USAID এর implementation contractors বলা হয়েছে। এছাড়া রিপোর্টে American Federation of Labor (AFL) ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এটা ওবামার ডেমোক্রাট পার্টির প্রভাবান্বিত আমেরিকান স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোর রাজ্য ফেডারেশনগুলো আছে, এদেরই মুল ফেডারল বা কেন্দ্রিয় ফেডারেশন। American Federation of Labor বাংলাদেশে গার্মেন্টসে ট্রেড ইউনিয়নে নেত্রী কল্পনা আকতারের সংগঠনের মাদার সংগঠন। “RAND এর ইসলাম প্রজেক্টে” এধরণের সংগঠনগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের মত ইসলাম জনগোষ্ঠির দেশে আরব স্প্রিং ধরণের প্রভাব বিস্তারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বাস্তবে আমরা তাই দেখছি।
বাংলাদেশের মত দেশে শ্রমিকেরা ভাল আছে, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষিত আছে আর আমেরিকানরা কেবল সুস্থির এদেরকে অস্থির করে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে এমন মানে করাটাও ঠিক হবে না। বলা ভাল যে, বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়নকে কাজ করতে দেয়া হয় না, শ্রমিকদের সমস্ত অধিকার, স্বাভাবিক প্রতিবাদী তৎপরতা দাবিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে এই পরিস্থিতির সুযোগ আছে বলেই সেটার উপর ভরসা করেই AFL এর মাধ্যমে আমেরিকান পরিকল্পনা তৎপরতা আছে।

আসলে “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” পরিকল্পনা ও সুপারিশগুলো সাজানো হয়েছে ৬০-৮০ দশকে কোল্ড ওয়ার ডিপ্লোম্যাসির যুগে আমেরিকা-রাশিয়ার লড়াইয়ে রাশিয়া যেমন করে নিজের পররাষ্ট্র নীতি সাজিয়ে ছিল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে ও উপর সুবিধা পেত, নিত সেকথা মনে রেখে। তৃতীয় বিশ্বের যে কোন উপনিবেশ বিরোধী স্থানীয় জাতীয় সংগ্রাম আন্দোলন আমেরিকা বিরোধী হয়ে যেত, আর ব্যতিক্রমহীনভাবে তা রাশিয়ামুখী হত। এখনকার RAND গবেষকেরা কেন এমন হত, রাশিয়া কেন সুবিধা নিতে পারত এর মুল্যায়ন করেছেন। বলছেন, আমাদের মত দেশগুলোতে কমিউনিষ্টরা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদি নানান সংগঠন গড়ত (তুলনা করুন, কচিকাচার আসর থেকে শুরু করে, ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়ন সংগঠন, টিইউসি ট্রেড ইউনিয়ন, উদিচী সাংস্কৃতিক সংগঠন ইত্যাদি) আর একাজে সহায়তা হিসাবে রাশিয়ানরা টাকা দিত। ফলে তৃনমূল থেকে সামাজিক সবজায়গায় আমেরিকা বিরোধী কিন্তু স্থানীয় সংগঠন ভিত্তি হিসাবে কাজ করত। আর এগুলো গড়ে তোলাই রাশিয়ান বিদেশনীতি ছিল। অর্থাৎ আইডিয়া হিসাবে সেকালের রাশিয়ান বিদেশনীতিটাই তারা আদর্শ ধরে অনুসরণ করতে চায়। কিন্তু এবার সেই মডেলের আলোকে আমেরিকানদেরকে টাকা ও সংগঠন দিয়ে মুসলমান প্রধান দেশে আলকায়েদার প্রভাব খর্ব করতে আলকায়েদার বাইরে এক ইসলাম – “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়ার কাজে নেমে পড়তে হবে। একালে এই সংগঠন গড়ার কাজটাই “সিভিল সোসাইটি” গড়ার কাজ। আবার তুলনা করে আলকায়েদার দুটো সুবিধার কথা উল্লেখ করে বলছে, ওদের আছে অর্থ আর বিস্তার হয়ে থাকা সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক…(The first is money……..The radicals’ second advantage is organization. Radical groups have developed extensive networks over the years, which are themselves embedded in a dense net of international relationships)। [ফর্মাল রিপোর্টে আলকায়েদা না লিখে এর বদলে তারা radicals লিখে]। আরও বলছে যাদের নিয়ে তারা সম্ভাব্য “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়বে এদের নির্বাচনের ব্যাপারে প্রাথমিক ফোকাস হবে,( initially focus on a core group of reliable partners whose ideological orientation is known) নির্ভরযোগ্য পার্টনার যাদের আদর্শগত মনোভাব জানা। আর যাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে এরা হলো, সেকুলার ও লিবারেল মুসলমান একাডেমিক ও বুদ্ধিজীবি, মুসলিম স্কলার, কমিউনিটি এক্টিভিষ্ট নেতা, নারী সংগঠন, মিডিয়ার জার্নালিষ্ট, লেখক। ( Liberal and secular Muslim academics and intellectuals; Young moderate religious scholars; Community activists; Women’s groups engaged in gender equality campaigns; Moderate journalists and writers)। আর মডারেট নেটওয়ার্ক গড়তে আমেরিকান ভুমিকা কি হবে কারা কিভাবে তা গড়বে বলা হচ্ছে, Moderates, however, do not have the resources to create these networks themselves; they may require an external catalyst। অর্থাৎ একদল মডারেট মুসলিমরা এই নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে কিন্তু যেহেতু তাদের রিসোর্স নাই (টাকাপয়সা ও সংগঠন), তাই বাইরের ক্যাটালিষ্ট অনুঘটক বা উস্কানিদাতা হিসাবে আমেরিকানদেরকে লাগবে।

শেখ ইউসুফ আল-কারযাভী
আরব স্প্রিং বা “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য তালিকায় মুসলিম একাডেমিক বুদ্ধিজীবি বা স্কলার এর কথা বলা হয়েছে। “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়ার কাজে উপযুক্ত লোক হিসাবে যে স্কলারকে পাওয়া গেছে তার নাম শেখ ইউসুফ আল-কারযাভী (Sheikh Yusuf al-Qaradawi)। যার হাত দিয়ে নতুন ধরণের ইসলামী রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলা হবে। এখানে আমি এই ধারাকে কারযাভী (Sheikh Yusuf al-Qaradawi) ইসলাম বলে নামকরণ করব বা চেনাবো।
এটা কারযাভী কেন হলেন তা আমাদের ব্যাখ্যা পেতে হবে। তাই আগে তাঁর একটু সংক্ষিপ্ত ব্যাকগ্রাউন্ড ও পরিচয় পেতে হবে।

কারযাভী মুলত একজন মিশরীয় এবং এই সময়ের মুসলিম ব্রাদারহুডের সবচেয়ে প্রভাবশালী তাত্ত্বিক নেতা। জন্ম ১৯২৬ সালে। ছাত্র অবস্থা থেকে তিনি ব্রাদারহুডের সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশুনা বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে গ্রাজুয়েট হন। এরপর ১৯৫৮ সালে আরবী ভাষা ও সাহিত্যে ডিপ্লোমা ডিগ্রী নেন। এরপর ১৯৬০ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় মৌল দিক (Usul al-Din)ফ্যাকাল্টি থেকে কোরানিক ষ্টাডি বিষয়ে মাষ্টার ডিগ্রী নেন। এরপর ১৯৬২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে কাতারের Secondary Institute of Religious Studies এর প্রধান করে পাঠানো হয়। কারযাভীর কাতার নিবাস শুরু হয় এখান থেকে। এরপর ১৯৭৩ সালে তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে পিএইচডি শেষ করেন, তাঁর বিষয় ছিল Zakah and its effect on solving social problems। এরপর ১৯৭৭ সালে তাঁর হাত দিয়েই কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীয়া ও ইসলামী ষ্টাডিজ ফ্যাকাল্টি খুলা হয়। তিনি এর প্রথম ডিন হন। এরপর ১৯৯০ সাল থেকে তিনি কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে Director of the Seerah and Sunnah Center at Qatar University হয়ে আছেন এখনও পর্যন্ত।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি তিনবার জেল বন্দী থাকেন, ১৯৭০ সালে রাজনৈতিক কারণে তাঁর মিসরীয় নাগরিকত্ত্ব বাতিল করা হয়। সে কারণে এরপর থেকে তাঁর কাতারে বসবাস। মিশরীয় ব্রাদারহুড তাকে দুবার (১৯৭৬ ও ২০০৪ সালে) সংগঠনের প্রধান হয়ে আহবান জানায়। কিন্তু তিনি স্বাধীন একাডেমিক স্কলার জীবন যাপনে স্বস্তি পান বলে তা ফিরিয়ে দেন। তাঁর লেখা রচনা, কখনও ফতোয়া অথবা বক্তৃতা ব্রাদারহুডসহ দুনিয়া জুড়ে ইসলামী রাজনীতিতে বিশাল প্রভাব রাখে। ২০১১ সালে মোবারকের পতনের পর তিনি প্রথম আবার মিশরে বেড়াতে আসেন। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে খুতবা দেন। তাহরীর স্কয়ারে গণ সমাবেশে বক্তৃতা দেন।

নিজ দেশে থেকে বহিস্কারের পর কাতারই হয়ে উঠে কারযাভীর সেকেন্ড হোম। উলটো করে বলা যায়, কাতারের বাদশা থানি হয়ে উঠেন তাঁর প্রধান পৃষ্টপোষক। আরব স্প্রিং বা “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” নিয়ে আমেরিকান রাজনীতির নতুন পথ শুরুর পর কারযাভী এর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। কেন হলেন? তাঁর চিন্তার সাথে এর মিলের দিকটা কি? এদিক থেকে বললে আরব স্প্রিং এক রাষ্ট্র বদলের কর্মসুচি; রাষ্ট্রের রেডিক্যাল বদল না হলেও এটা আমেরিকার নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র বদল তো বটেই। কারযাভীর রাষ্ট্র-বোধ বিষয়ে জানা যায় তাঁর State-in-Islam বইতে পাওয়া যায়।
এই বইয়ে কারযাভী নিজের অবস্থানকে বুঝাতে বলছেন, The Moderate Islarnic trend comes in the middle between the deviated secularists and the narrow-minded ones. আর narrow-minded ones বলতে তিনি নাম করেছেন হিজরি অষ্ট শতকের মানে ১৪০০ খ্রী. এর ইমাম ইবনে আল কাইউম ও তার মত অনুসারিদের কথা যারা হিজরি পনেরো শতক অর্থাৎ এখনকার খ্রী. শতক পর্যন্ত অনুসরণ করছেন। বলছেন, Imam Ibn ul-Qayyim spo ke sadly of the narrow -minded j urists of his time (the 8″1 ce ntury AH) ……. Ironically. those narrow-minded jurists still have disciples in our time. who live in the 15th century AH] অর্থাৎ একদিকে তিন এদের সংকীর্ণমনা বলছেন আর বিপরীতে সেকুলারিষ্ট – এর মাঝে তাঁর মডারেট ইসলামী ট্রেন্ড। ফলে তাঁর এই অবস্থান থেকে আরব স্প্রিং বা “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” প্রতি আগ্রহ ও নিজ অবস্থান থেকে সমর্থন বলে বুঝার চেষ্টা করতে পারি।

কারযাভীর এই অবস্থানের কারণে, আরব স্প্রিংয়ের বাস্তবায়নের মুল কেন্দ্র এখন কাতার। RAND এর RAND Gulf States Policy Institute এখন আমেরিকার পরে নেমে এসেছে কাতারের রাজধানী দোহায়, নাম RAND – Qatar Policy Institute। কিন্তু কাতার কেন কারযাভীকে ঘিরে এই নতুন ইসলামের কেন্দ্র হিসাবে নিজেকে জাহির করা ঠিক মনে করল এর জবাব পাওয়া যাবে এখনকার কাতারি উদীয়মান অর্থনীতি, নতুন বিশাল বিনিয়োগের ভিতরে খুজতে হবে। আমরা আপাতত সেদিকে যাব না। কিন্তু তাতপর্যপুর্ণ মুল ব্যাপার হলো, সৌদি ওহাবি বা সালাফি ইসলামের কেন্দ্রের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে কারযাভী ইসলামের কেন্দ্র হিসাবে কাতারকে আমরা পাচ্ছি। তবে দুই ইসলামি ট্রেন্ডের সম্পর্ক বন্ধুত্ত্বপুর্ণ, যদিও ইদানিং সংঘাত দেখা দিচ্ছে। সার করে বললে, আরব স্প্রিং আমেরিকার নীতি কিন্তু বসবার কুশন দিয়েছে কাতার। আর যেসব দেশে আরব স্প্রিং ঘটছে বা ঘটানো হচ্ছে এর জন্য ফান্ড ও লজিষ্টিক সেন্টার কাতার। আর ওদিকে সৌদি বাদশা ওহাবি বা সালাফি হওয়া সত্ত্বেও গ্লোবাল পাওয়ার এলায়েন্সের কারণে কারযাভী ইসলামকে সমর্থন দিচ্ছে। মনে রাখতে হবে আরব স্প্রিং শুরু থেকেই অর্থাৎ ডিজাইন পরিকল্পনা রচনার সময় থেকেই শিয়া বা ইরান-সিরিয়া বিরোধী। অন্যভাবে বললে আরব স্প্রিং কর্মসুচি চালু করার আগেও আমেরিকান নেতৃত্ত্বে গ্লোবাল পাওয়ার এলায়েন্সের বৈশিষ্ট হলো তা শিয়া বিরোধী, যেটা সৌদি বাদশার বিশেষ আগ্রহের কারণ।

আরব-ইসরায়েল তৃতীয় যুদ্ধের (১৯৭৩) সংক্ষেপে একটু সালতামামি করব। এই যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে প্যান আরব জাতীয়তাবাদ শুকিয়ে মরতে থাকে এবং নিজ নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ মানে নিজ রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ যেমন, মিশরীয় জাতীয়তাবাদ, সিরীয় জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি মুখ্য বিবেচনার বিষয় হয়ে যায়। কমন প্যালেষ্টাইন স্বার্থকে পিছনে ফেলে আগে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ বাঁচাও, দরকার হলে অন্যকে বিক্রি করার বিনিময়ে; যেমন আমেরিকান মধ্যস্থতায় মিসর-ইসরায়েলের ক্যাম্প ডেভিড প্রতিরক্ষা চুক্তি। এই নতুন ফেনোমেনা দেখা দিতে শুরু করে। আর এর প্রতিক্রিয়ায় নতুন ফেনোমেনা, নতুন ধরণের আন্দোলন – প্যালেষ্টাইনে হামাস আর লেবাননে হিজবুল্লাহ – এদের জন্ম। পলিটিক্যাল ওরিয়েন্টেশন হিসাবে এই দুই আন্দোলন মিসরের ব্রাদারহুডের মত হলেও আবার অর্থ ও লজিষ্টিকের দিক থেকে এরা ইরান-সিরিয়ার উপর নির্ভরশীল ও সম্পর্কিত। আইডোলজির দিক থেকে এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ প্রতিষ্ঠাতা বান্নার আমল থেকেই ব্রাদারহুড শিয়া-সুন্নি বলে ভাগের রাজনীতি করেনি। বান্না নিজেও বলতেন, ব্রাদারহুড আন্দোলনের বৈশিষ্ট হলো একদিকে এটা সালাফি অন্যদিকে এটা সুফিজম। পরবর্তিতে কারযাভীর খুতবাগুলোতেও সুফিজমের প্রতি তাঁরও সহানুভুতি দেখতে পাওয়া যায়।

এই লেখা গত দুসপ্তাহ ধরে লেখার চেষ্টা করছি। ব্যকগ্রাউন্ড ম্যাটেরিয়াল পড়ে ঝালাই করে আপটুডেট হতে সময় নিয়ে ফেলেছি বেশি। ইতোমধ্যে গত রাত্রে মিশরীয় আর্মি সেকুলারদের আপাত সমর্থনে প্রেসিডেন্ট মরসিকে পদচ্যুত করে ক্ষমতা নিয়েছে। ওদিকে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সিরিয়ায় যুদ্ধকে আমেরিকান প্রশাসন সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ করে নেমে পড়ে যুদ্ধকে এক নির্ধারক দিকে নেবার চেষ্টা করছে; লেবাননের হিজবুল্লাহ সরাসরি প্রেসিডেন্ট আসাদ এর পক্ষে যুদ্ধে নামার প্রেক্ষিতে এতে নড়াচাড়া পড়েছে। কারযাভী এই প্রথম প্রকাশ্যে হিজবুল্লাহকে শয়তানের দল বলে ভিডিও বক্তৃতা করেছেন। এখানে দেখুন,
এসবের প্রেক্ষিতে “আরব স্প্রিং” এখন মারাত্মক ব্যর্থ ও ব্যাকফায়ার শুরুর আলামত বলে মনে করার কারণ আছে। তাই লেখাটা আপাত শেষ করব কেন আরব স্প্রিং ব্যর্থ হবে তার উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ আলোচনা করে।

আরব স্প্রিং কেন ব্যর্থ হবে, এর মৌলিক দুর্বলতাগুলো কি কি
১। কথিত স্বৈরাচারঃ মুসলমান প্রধান দেশগুলোতে কথিত “স্বৈরাচারী” শাসক চলতে দেয়ার অর্থ এটা আলকায়েদার ঘাটি হবার জন্য পটেনশিয়াল হবে। কারণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণের ন্যায্য ক্ষোভ বিক্ষোভকে পুজি করে আলকায়েদা নিজের রাজনীতির ন্যায্যতা যোগাড় করে ফেলবে। ফলে স্বৈরাচার রাখার আমেরিকান রাষ্ট্রের জন্য পটেনশিয়াল থ্রেট। তাই এনজিওর মাধ্যমে লিবার্টি, ফ্রিডমের আওয়াজ শিখিয়ে এক পপুলার আপরাইজিং তবে নিয়ন্ত্রিত রেখে স্বৈরাচারকে সরিয়ে দিতে হবে, একটা লিবারেল ইসলামী সরকার কায়েম করতে হবে। আর এর ভিতর দিয়ে আমেরিকার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন মডারেট ইসলামি নেটওয়ার্ক গড়ে নিতে হবে। এটাই আরব স্প্রিং। কিন্তু এই পরিকল্পনা চিন্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো – আর্মি। স্বৈরাচার মানে কী? যদি সুনির্দিষ্টভাবে মিসরের দিকে তাকাই – কাম্প ডেভিড চুক্তির কারণ মিসরের আর্মি মানে হলো, যে অসমাপ্ত আরব-ইস-রায়েল যুদ্ধ এবং ক্রমআগ্রাসী ভূমি লোভী ইসরায়েলি দস্যুতার বিরুদ্ধে আরবদের ক্ষোভ থেকে ইসরায়েলকে প্রতিরক্ষা করবে। আভ্যন্তরীণভাবে দেশে দমন করবে এবং সীমান্ত পার হতে দিবে না। এটাই ঐ চুক্তির শর্ত, এর বিনিময়েই মিসরের সিনাই উপত্যকা ইসরায়েল ছেড়ে যায়। আর এই প্রতিরক্ষার সার্ভিসের খরচ হিসাবে বছর বছর আমেরিকান তিন বিলিয়ন এইড পাবে মিসর। ইসরায়েলও পাবে ১০ বিলিয়ন করে। আমেরিকার দিক থেকে এটাই মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও তেলের দামের উপর কর্তৃত্ত্ব রাখার কাফফারা। অন্য ভাষায় আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতি, ১৯৭৯ সালের চুক্তি এই বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই হয়েছিল। এখন মিসরীয় আর্মিকে যে মহান দায়িত্ত্ব দেয়া হলো এটা স্রেফ আর্মি প্রতিষ্ঠানের ভিতরে সীমাবদ্ধের বিষয় নয়। বরং এটা হলো সামগ্রিকভাবে মিসরীয় রাষ্ট্রকে সাজিয়ে নেয়া, ইসরায়েলকে প্রতিরক্ষা দেয়ার মত যোগ্য দুর্দমনীয় মিলিটারী রাষ্ট্র করে গড়ে তোলা। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারলে ইসরায়েলের পক্ষে ভাড়া খাটা অসম্ভব। গত ৩২ বছর ধরে এরই প্রতিকী দিক হলো, আর্মি চীফ (একা ব্যক্তি না, এক কমান্ড কাউন্সিলের প্রধান তিনি) সবসময় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হয়েছেন। আবার বাহিনীর সবাইকে খুশি রাখতে হবে। ফলে আর্মি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স যার প্রধান আবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। আলাদা আয়ের ব্যবস্থা। আমেরিকাতেও বাহিনী পোষার খরচ কমাতে বাহিনীর যুদ্ধ বিমান বা অস্ত্র, কমিউনিকেশন ইত্যাদির টেকনোলজি কমার্সিয়াল কোম্পানীকে ভাড়া দেয়া থাকে। এটা তা নয়। এটা হলো, ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স এর আয় আর্মি প্রতিষ্ঠান চালাবার ইকুইপমেন্ট কেনার কাজে নয়, বরং বাহিনীর সদস্যদের জন্য বাড়তি নগদ আয় হিসাবে সরবরাহ বিতরণ করা হয়।
বলেছিলাম আরব স্প্রিং পরিকল্পনা চিন্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো – আর্মি। মানে নতুন আরব স্প্রিং ঘটবার পরের পরিস্থিতিতে আর্মির ভুমিকা তো বদলাতে হবে। কিনতি বদলে গিয়ে কি হবে সেটা সাধারণভাবে সব মুসলমান প্রধান দেশের বেলায় এক বিরাট প্রশ্ন। আর বিশেষ করে মিসরের বেলায় যেখানে আর্মি মানে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সার্ভিস দেয়া সেখানে আর্মির ভুমিকা বদল মানে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা এক্ষেত্রে কে দিবে? সে এক ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। “RAND ইসলাম প্রজেক্টে” এক্ষেত্রে নিরুত্তর।
আরব স্প্রিং এ লিবার্টি, ফ্রিডমের আওয়াজ তুলে পপুলার আপরাইজিংকে নিয়ন্ত্রিত রেখে স্বৈরাচার হঠানোর নাটক করা কাগুজে পরিকল্পনায় যত সহজ মনে হোক বাস্তবে তা ভীষণ রিস্কি। কোন গ্যারান্টি নাই যে তা আমেরিকার হাতে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। হাতছুট ঘটনা হিসাবে আলকায়েদা ধরণের রেডিক্যাল নয়, অন্য অর্থে এটা সাম্রাজ্যবাদ বা পশ্চিম স্বার্থ বিরোধী রেডিক্যাল দিকে দৌড়াবে না কোন নিশ্চয়তা নাই। সেই অযাচিত পরিস্থিতি সামলানোর জন্য আমেরিকার জন্য শেষ ভরসা হবে আর্মি প্রতিষ্ঠান। একথাগুলো “RAND ইসলাম প্রজেক্টে” লেখা নাই। কিন্তু এটা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। এজন্যই আর্মি প্রতিষ্ঠান শব্দটা স্পর্শ করে কোন বাক্য নাই এই দলিলে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট মিসরীয় পরিস্থিতিতে আর্মি (SCAF) এক নির্ধারক প্রসঙ্গ। এটা আরব স্প্রিং এর দলিলে উহ্য করে রাখা হয়েছে বলেই মিসরে আরব স্প্রিং অকেজো ও ব্যর্থ হবেই, হচ্ছে। এজন্য আর্মি কখনই সুপ্রীম জুডিশয়াল কাউন্সিল, সুপ্রীম নির্বাচন কাউন্সিল, সুপ্রীম কাউন্সিল অব আর্মড ফোর্স ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান যেগুলো ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির ছানাপোনা – এগুলো কখনই ভাঙ্গতে দেয়নি। ফলে গত দুবছর ধরে বারবার এই প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে আগের রাষ্ট্র নিজেকে পুনর্গঠিত করে নিতে পারছে। মিসরীয় আর্মির দিক থেকে আরব স্প্রিং এর প্রতি সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, প্রজেক্টের দলিলে আর্মির ভুমিকা কি হবে তা লেখা নাই, ভাবাই হয়নি। এজন্যই সে ৪২ দেশি, আমেরিকান এনজিও কর্মিকে আরব স্প্রিং করার দায়ে ৫ বছরের সাজা ও জরিমানা শুনিয়ে দিয়েছে। মোবারক, আগের আর্মি চীফ তানতাওই পদত্যাগ করেছেন, ইন্টিলিজেন্স চীফ আর্মি জেনারেল মারা গেছেন যাকে মোবারক উত্তর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল – সবাই চলে গেছেন কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও অটুট ও শক্তিশালী আছে। একটা সাবধানতার কথা বলব। উপরের কথাগুলো যেন আমাদের দেশের সস্তা সামরিক শাসন-বেসামরিক শাসনের কুতর্কের মত ভেবে বুঝবার চেষ্টা না করি। পিছনে আমেরিকান পরিকল্পনা না থাকলে, কোন জেনারেলের ব্যক্তিগত খায়েসে ক্ষমতা দখল ঘটায় না।

২। মুল বিরোধ সেকুলারিষ্ট বনাম ইসলামিষ্টঃ
“RAND ইসলাম প্রজেক্টের” দলিলে সম্ভাব্য যাদের নিয়ে আরব স্প্রিং বা নতুন রাষ্ট্রের আকার দেবার কথা বলা হয়েছে তার মুল দুই এলিমেন্ট সেকুলারিষ্ট এবং ইসলামিষ্ট। আবার ইসলামিষ্টদের প্রতি আগ্রহটা বেশি। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে এই দুই আদর্শের ঐক্য হবে বা এক পাত্রে দুটোকে ধারণ করা যাবে? এই বিষয়ে RAND প্রজেক্টের গবেষণা দলিল নিরুত্তর। বরং ওখানে সেকুলারিষ্ট এবং ইসলামিষ্ট উভয়কেই ধারনা দেয়া হয়েছে তারা “গণ আন্দোলনের ভিতর দিয়ে স্বৈরাচার উৎখাত করতে হবে। কিন্তু স্বৈরাচার উৎখাত এর মানে কি? উৎখাতের পরেই বা কি হবে? একটা লিবারেল রাষ্ট্র? তাহলেও তো আসলে তা একটা নতুন রাষ্ট্র। অর্থাৎ রাষ্ট্রগঠন, রাষ্ট্র কনষ্টিটিউট করা মামলা। যাতে একমাত্র একটা নতুন কনষ্টিটিউশনেই এর পরিণতি টানা যায়। এই প্রসঙ্গে সেকুলারিষ্টরা বিহবল। কোন চিন্তাগত প্রস্তুতি তাদের নাই। ফলে রাষ্ট্রগঠনের কাজটা আড়ালে ফেলে ইসলামিষ্টদের সাথে তাদের আদর্শগত দ্বন্দ্বের বাইরে কোন কিছুই তাদের মাথায় আসে না। একমাত্র সমাধান দেখে ইসলামিষ্টদের সেকুলার হয়ে যাওয়া। অথচ এর বাইরে রাষ্ট্রগঠনের কাজে এমন কি তার কাছে আছে যা সে ইসলামিষ্টদেরকে অফার করতে পারে যাতে আদর্শগত বিরোধ বা শ্রেণী বিরোধ থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগঠনে কোন মৌলিক সুত্রে তারা ঐক্যমত তৈরি করতে পারে – এটা তার জানা নাই। বিপরীতে ইসলামিষ্টরা, এদের একালের রাষ্ট্র সম্পর্কে এমপেরিক্যাল তথ্য সংগ্রহও নাই। যেমন, কারযাভী তাঁর “ষ্ট্রেট ইন ইসলাম” (State in Islam) বইতে (১৯৯৭) এক নিঃশ্বাসে তিনি নবীর আমলেও সেটাকে রাষ্ট্র বলছে, চার খলিফা আমলকেও, অটোম্যান সুলতানের আমলকেও। ফলে রাষ্ট্র বলতে আসলে তিনি ঠিক বুঝাচ্ছেন তা বুঝা মুশকিল। আবার সাধারণভাবে বললে, “ইসলামে রাষ্ট্র” নিয়ে তাঁর ধারণা বয়ান করতে গিয়ে একটা চেষ্টা দেখা যায় তিনি অবলীলায় মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণায় বিশেষ বিশেষ শব্দ ব্যবহার করছেন। যেমন, রাইট বা অধিকার, তিনি প্রায়ই ব্যবহার করছেন। রাইট বা অধিকার তো ইসলামের ধারণা নয়। আর রিপাবলিক রাষ্ট্রের ‘অধিকার’ ধারণা তো ইউরোপের সবকালের একই ধারণাও নয়। এছাড়া পশ্চিমে ব্যক্তি ও নাগরিক বলে ধারণাটার পিছনে একটা আগাম অনুমান আছে; যার উপর দাঁড়িয়ে আছে অধিকার ধারণা। ইসলাম কিভাবে ব্যক্তি ও নাগরিক ধারণাকে গ্রহণ করে, আদৌ গ্রহণ করে কি না, না করলে ইসলামে যে রাষ্ট্র তিনি দেখছেন সব জায়গায় কালোর্ধ হিসাবে সেখানে ধারণাগুলো কি ছিল এর একটা হিস্টোরিক্যাল অনুসন্ধান তো নিতেই হবে আগে। ফলে জবরদস্তি মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণাগুলোকে ইন্টারচেঞ্জিংলি ব্যবহারের একটা ঝোক তার মধ্যে দেখা যায়। এতে তিনি কি বুঝছেন, কি বুঝাচ্ছেন এর হদিস এক অসম্ভব কাজ। যেমন, শাসককে মেনে চলার (obey) প্রশ্ন তিনি তুলেছেন। বলছেন,
To obey the rulers stipulated that they are from among themselves. Allah put this obedience after obedience to Him and the Messenger (peace be upon him) and it ordained that in time of dispute the whole matter must be brought before Him and His Messenger, (i.e. the Glorious Quran and the Sunnah). This is based on the assumption that Muslims have a state that dominates and a ruler that is to be obeyed. Otherwise all this would be in vain.

কিন্তু রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণায়, শাসক সরকারের সাথে নাগরিকের সম্পর্কটা অন্তত obey করার না। আর এই সম্পর্ক কারযাভীর বর্ণনা তালাল আসাদের থেকে অনেক পিছনের। তালাল আসাদ এব্যাপারে obey ধারণার ভিতরে যান নি। তাছাড়া সম্পর্কটা রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের – এটা ঠিক পারশনিফায়েড শাসক ব্যক্তির সাথে নাগরিকের একেবারেই নয়। এছাড়া নাগরিক নিজে মুল ক্ষমতার উৎস। এটা তিনি কনষ্টিটিউশনে বলে রাখা নির্দিষ্ট বিষয়ে শর্ত সাপেক্ষে রাষ্ট্রকে সেই ক্ষমতা আমানত হিসাবে দেন।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রগঠন কনষ্টিটিউট ধারণায় (সে অনেক দুরের ব্যাপার যদিও) সেকুলারিষ্টের সাথে তিনি কি করে একসাথে রাষ্ট্র গড়বেন। সার কথায় সেকুলারিষ্ট ও ইসলামিষ্ট উভয়েই আসলে ওবামার আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি -মার্কিন পরাষ্ট্র নীতির এই অন্তর্গত ষ্ট্রটেজিক তাগিদের দিক থেকে আরব স্প্রিংকে বুঝবার চেষ্টা করেন নি। ফলে উভয়েই প্রতারিত।

৩। আরব স্প্রিং এর প্রথম সাফল্যের জমানায় ২০১১ সাল বছর জুড়ে আমেরিকান প্রশাসন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। তিউনিশিয়া, মিসর, ইয়েমেন, জর্দান, আলজেরিয়ার ঘটনায় সব দেশেই স্ব স্ব দেশের ব্রাদারহুডকে নিরুপদ্রব সঙ্গী হিসাবে তারা পেয়েছিল। পরিস্থিতি আমেরিকান হিসাব মত নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা পাওয়া গিয়েছিল। এতে আরও উতসাহিত হয়ে এবার আর মাস-মুভমেন্ট বা গণ আন্দোলনের তরিকা না। তা ছেড়ে লিবিয়ায় আরব স্প্রিং আন্দোলন সশস্ত্র দিকে নিতেও আমেরিকানদের বুক কাঁপেনি। রাশিয়া চীন নিজের ভাগের কথা বুঝে উঠার আগেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল থেকে লিবিয়ার আকাশে নো ফ্লাই জোন আরোপের সম্মতি পাশ করে আনা হয়েছিল। একই বা আরও প্রবল উতসাহে সিরিয়াতে আরব স্প্রিংকে আর লোক দেখানে গণ আন্দোলন না, দ্রুত একেবারে আন্দোলন সশস্ত্র দিকে নিতেও তাদের মধ্যে কোন দ্বিধা কাজ করতে দেখিনি।

আরব স্প্রিং আলকায়েদা বিরোধী আলাদা ইসলামী রাজনৈতিক ধারা জন্ম দেবার আমেরিকান প্রচেষ্টা হলেও এর প্রতি আলকায়েদা প্রতিক্রিয়া কি ছিল তা হয়ত আমরা অনেকেই খেয়াল করিনি। এপর্যন্ত আলকায়েদা কখনই আরব স্প্রিংয়ের বিরোধাতা করে বিবৃতি দিয়েছে নজরে আসেনি। বরং মোবারকের পতনের পর আলকায়েদা একে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু দুবছর ধরে সিরিয়ান যুদ্ধ চলার পর এখন পরিস্থিতি কি? আমেরিকান সিনেট কমিটি সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ করে সিরিয়ার মাঠে নামার সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেবার পরও এক মাস সেটা স্থগিত করে রেখেছিল। গত এক বছর ধরে আমেরিকান ইন্টিলেজিন্স সাবধান করে আসছে সিরিয়ার সশস্ত্রতা আলকায়েদার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আলকায়েদা সমর্থিত স্থানীয় Al-Nusra Front এখন সবার ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে। ওদিকে লিবিয়ার বেলায় মিডিয়া রিপোর্টে মনে করা হয়েছিল সশস্ত্র আরব স্প্রিং এর পরও লিবিয়া বুঝি আমেরিকান নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু বেনাগাজিতে আমেরিকান এমবাসেডরসহ সাতজন ষ্টাফ খুন হয়েছেন। রাজধানী ত্রিপোলীর বাইরে সশস্ত্রগ্রুপগুলো কেউ অস্ত্র ফেরত দেয়নি বরং তথাকথিত কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী এমন এক একটা বাহিনীকে অটুট রেখে স্বীকৃতি দিয়ে বাহিনীগুলোর স্বাধীন কাম কাজ স্বীকার করে নিয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো, লিবিয়ার ডামাডোলে সেখান থেকে ভারী অস্ত্রসহ আলকায়েদা নিয়ন্ত্রিত এক আফ্রিকান গ্রুপ মালিতে জড়ো হয়েছে। মালি দেশকে ভাগ করে ফেলেছে, যেটা পরবর্তিতে ফরাসী আর্মি পাঠিয়ে আফগানিস্তানের মত আফ্রিকার এক নতুন ফ্রন্ট খুলতে হয়েছে। এসব ফেনোমেনার সার লক্ষণ হলো, জোশের ঠেলায় যেখানে যেখানে আরব স্প্রিংকে সশস্ত্র করা হয়েছিল সেখানেই তা ক্রমশ আলকায়েদার নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। শেষ হাসি তারাই হাসছে, লাভের গুড় তাদের পকেটে। “RAND ইসলাম প্রজেক্টে” দলিলে কোথাও আরব স্প্রিংকে সশস্ত্র করার পরিকল্পনা এমনকি ইঙ্গিত নাই। ফলে লিবিয়ার ক্ষেত্রে এমপায়ারের চকচকে লোলুপ দৃষ্টি ছাপিয়ে উঠেছিল সেটাই পরিস্থিতিকে সশস্ত্রতার দিকে সহজেই টেনে নিয়ে গেছিল বলা যায়। আর সিরিয়ান পরিস্থিতি এখন যা তাতে আমেরিকান অবস্থান এখন যেদিকেই যাক না কেন ঐ পুরা জোন আলকায়েদার দখলে চলে যাচ্ছে। তাহলে যে উদ্দেশ্যে কারযাভী ইসলামকে সঙ্গি করে নেয়া হয়েছিল যে একটা – নন-রেডিক্যাল ইসলাম, কারযাভী ইসলাম সেভাবে হাজির হতে পুরাপুরি ব্যর্থ। শুধু তাই নয়, আরব স্প্রিংকে শিয়া বিরোধী হিসাবে হাজির করার যে সুপ্ত অভিমুখগুলো ছিল সেগুলো প্রকাশ হয়ে এখন খোদ কারযাভিকেই শিয়া বিরোধী বয়ান দিতে হচ্ছে। হিজবুল্লাহ (আল্লাহ দল) কে শয়তানের দল বলে বয়ান দিতে হচ্ছে। হামাসের সাথে হিজবুল্লাহর বিরোধ সংঘাত প্রকাশ্য হতে শুরু করেছে। কাতারি বাদশা প্যালেষ্টাইনে গিয়ে হামাসকে বলেছেন সিরিয়া –ইরানের উপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করতে। এখন থেকে অর্থ সরবরাহ তিনিই করবেন। কিন্তু অস্ত্র দিবে কে? তাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ কি বন্ধ হয়ে যাবে? সিরিয়ায় আসাদকে সরানোর ঘটনার শুরু থেকেই তো কারযাভীর এটা বুঝার কথা যে সিরিয়ায় “সশস্ত্র আরব স্প্রিং” জয়লাভ করলে তাতে হামাস ও হিজবুল্লাহ আন্দোলন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
[অসমাপ্ত]
এখানে অনেক ধারণা স্পর্শ করেছি, তুলে এনেছি, সময়াভাবে বিস্তার করতে পারিনি। আগামিতে সেগুলো করার ইচ্ছা রাখি। ফলে আপাতত একটা প্রাথমিক রচনা হিসাবে এটাকে পাঠ করার আবেদন রাখছি।