বিবিসির মূল্যায়নে দেখা বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’

বিবিসির মূল্যায়নে দেখা বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন

গৌতম দাস

১৭ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৭

https://wp.me/p1sCvy-2wt

সম্প্রতি বিবিসি বাংলা বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে এক দীর্ঘ রিপোর্ট প্রকাশ করেছে; যার শিরোনাম হল, “সংসদ নির্বাচন: গত দশ বছরের যে পাঁচটি পরিবর্তন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে”। সেখানে গত ২০০৮ সালের সাথে এখনকার বাংলাদেশের একটা তুলনা টানা হয়েছে- পাঁচটা ইস্যুতে। দাবি করা হয়েছে গত ১০ বছরে বাংলাদেশে এই পাঁচটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে গেছে। বিবিসির চোখে ১০ বছর পরে বাংলাদেশে ঘটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো হল – ১. কর্তৃত্ববাদী শাসন, ২. সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ, ৩. বিকাশমান অর্থনীতি, ৪. নয়া প্রযুক্তি ও সোস্যাল মিডিয়ার বিস্তার, ৫. বিপুলসংখ্যক তরুণ ভোটার। তাদের অনুমান হল আমাদের আসন্ন নির্বাচনে এই পরিবর্তগুলো গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চোখে পড়ার মত ঘটনা হল, এক ফাইন মর্নিং বা সুবহে সাদেকে যেন বিবিসি চোখ কচলে ‘আবিষ্কার’ করেছে, বাংলাদেশে নাকি ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। আর এরপর রিপোর্টের বাকি অংশ হল, এই ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ নিয়েই কচকচানি। এসব তৎপরতা দেখে মনে হয়েছে, বাংলাদেশে “কর্তৃত্ববাদী শাসন” চলছে বলে একটা স্বীকারোক্তিকে প্রাধান্যে আনা হয়েছে যেন এতে সংশ্লিষ্টরা এখন এতে নিজেদের দায় ধুয়ে ফেলতে পারেন। এমনকি ১০ বছর ধরে এই শাসন আনা ও চলার ক্ষেত্রে যেন বিবিসিরও কোনো দায় নেই!এমনকি বিবিসি যার রেফারেন্সে বুঝতে পেরেছে বাংলাদেশে স্বৈরতান্ত্রিক শাসনে চলে গেলে সেটা হল এক জার্মান থিঙ্কট্যাঙ্ক সংগঠন বার্টেলসমান ফাউন্ডেশন [[Bertelsmann Stiftung]; কিন্তু তাদের রিপোর্টও প্রকাশিত হয়েছিল গত মার্চ ২০১৮ সালে। এরা গ্লোবে সব রাষ্ট্রের শাসন কেমন সে বিষয়ে স্টাডি করে সুচক তৈরি করে প্রকাশ করে থাকে। তাদের করা স্টাডিও ২০১৫-১৭ সালের। এই দুই বছর ধরে মাঠে সংগ্রহ করে এরপর তা থেকে স্টাডি করে তৈরি রিপোর্ট। দুনিয়ার ১২৯ রাষ্ট্রের উপর করা স্টাডিতে বাংলাদেশের শাসন অবস্থান ছিল ৮০ তম খারাপ অর্থাৎ ৮০ টা রাষ্ট্রের নিচে।

এখানে যদিও বলা হচ্ছে এই পরিবর্তনের সময়কাল “দশ বছর”; অর্থাৎ হাসিনার শাসন কাল। কিন্তু যেকেউ নির্মোহ মুল্যায়ন করতে চাইলে মানবেন যে সত্যিকার ভাবে সাথে জড়িয়ে আছে আর দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক শাসন, ফলে এটা মোট ১২ বছরের। কারণ আসলে পরের ১০ বছর বা হাসিনার কালে যা কিছু হয়েছে, এর সব কিছুর ভিত গাঁথা, অভিমুখ ঠিক করে দেয়া হয়েছিল ওই দুই বছরের আমলে। কেউ অস্বীকার করবে না যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর ওই দুই বছর আমেরিকার ক্ষমতা ও প্রভাব ছিল সবচেয়ে প্রত্যক্ষ ও যেকোন গভীরে সীমাহীন। তাই সুবিবেচনা করতে চাইলে, লজ্জা বা দ্বিধা ভুলে মোট ১২ বছরের হিসাবই করতে হবে।

ঐ রিপোর্টের এক তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, তারা (মানে বিবিসি ও রিপোর্টে ইনপুট দাতারা) কেবল তত্ত্বাবধায়ক শাসনের দুই বছরসহ হাসিনার প্রথম পাঁচ বছরের দায় বহন করেন। মানে, ওই সাত বছর যেন তাদের খানিকটা দায় সংশ্লিষ্টতা আছে – সেটা ভাবভঙ্গিতে ও প্রচ্ছন্নে হলেও সেটি কবুল করে কথা বলেছেন। তবে সেটা বুঝা গেলেও বুঝবার কোনো উপায় রাখেননি যে, ঠিক প্রথম কবে থেকে তারা ঠাহর করলেন যে, বাংলাদেশে এক ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন’ কায়েম হয়েছে। সেটা একেবারে যত্ন করে উহ্য রেখে দিয়েছেন। তবে মূল কথা – বিবিসির এই রিপোর্ট পড়ে আমরা নিশ্চিত যে, তত্ত্বাবধায়কের দুই বছরের ‘মজা’ ও দায় তারা অন্তত অস্বীকার করছেন না। তবে আসলে মুল কথা যে প্রশ্নের জবাব দূরে থাক প্রশ্নটাই তারা পুরাই লুকিয়ে ফেলেছে তা হল, এই কর্তৃত্ববাদী শাসন কেন জন্ম নিল – কারা কারা দায়ী? তত্ববধায়কের গাঁথা ভিত ও ঠিক করা অভিমুখ থেকে কেন “কর্তৃত্ববাদী শাসন কেন জন্ম” হল – এই প্রশ্নটাই তারা গায়েব করে দিয়েছে।

বিবিসির চোখে ঐ পাঁচ পরিবর্তনের যা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, তা হল – বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” ঘটে যাওয়া। আসলে প্রথম পরিবর্তন ‘কর্তৃত্ববাদী শাসনের’ সাথে দ্বিতীয়টি সহ-সম্পর্কিত বা কো-রিলেশনাল। এখানে বিবিসি এবং যাদের সাথে আলাপ করে বা ইনপুট নিয়ে তারা রিপোর্টটা তৈরি করেছেন, উভয়ের চোখে ‘ইসলামীকরণ’ – একটা নেতিবাচক শব্দ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ‘ইসলামীকরণ’ করে বা হয়ে গিয়ে খুব খারাপ হয়েছে – এই আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে তারা সবাই কথা বলে গেছেন। কিন্তু আমরা যখন এই ইস্যুতে পাল্টা কথা বলব, তখন শব্দটি ব্যবহার করলেও তা নেতি ধরে নেওয়া জরুরি নয়, বরং বর্ণনামূলক অর্থে এর ব্যবহার করব।

আর শব্দটাকে কখনও লিখব ‘ইসলামিস্ট’। যেমন – “বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইসলামের প্রভাব বেড়েছে” – সেটা এই অর্থে যে “রাজনীতিতে ইসলাম” দেখতে চাওয়া সব ধারার সকলে মিলে যারা এরা এখন সবচেয়ে এক বড় গোষ্ঠী; আর এরই বর্ণনামূলক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ শব্দটি ব্যবহার করে বলা যায়, বাংলাদেশে এমন ‘ইসলামিস্টদের’ সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে। একথাতার সম-উদাহরণ হতে পারে যেমন, সত্তর-আশির দশকে বাংলাদেশে নানা ফ্যাঁকড়ার ‘কমিউনিস্ট’, তারা সেযুগে সংখ্যায় ছিল সবচেয়ে বেশি – ঠিক তেমনি একালে ইসলামিস্ট। আবার কমিউনিস্টদের মতই ইসলামিস্টরাও তারা আসলে কী চান, এ ব্যাপারে সবাই একই কথা বলবেন, ব্যাপারটা তা না হলেও – বাংলাদেশের রাজনীতি ইসলাম ছুঁয়ে থাকলে, কি ঠেস দিয়ে দাঁড়ালে তা বাংলাদেশের জন্য ভালো হবে, তা দরকার – এ রকম একটা কথার পক্ষে এরা সবাই একমত হবেন – এমন অনুমান করা যায়। যাই হোক, আমাদের বর্ণনাত্মক ও অ-নেতিবাচক অর্থে ‘ইসলামিস্ট’ বুঝ নিয়েই আমরা নেতিবাচক ‘ইসলামীকরণ’ ধারণা নিয়ে কথা বলব।

আমেরিকার নীতিনির্ধারকেরা বাংলাদেশে ১/১১-এর ক্ষমতা দখল পছন্দ বা সমর্থন করেছিলেন কেন? কী সে কারণ ছিল? নীতি নির্ধারকদের পলিসি-চিন্তাকে নিয়ে এই প্রশ্ন করা বা বুঝবুঝির জগতে আলোচনা প্রায় দেখা যায় না বললেই চলে। এ নিয়ে আমেরিকার অবস্থান কী ছিল – এর ফরমাল অথবা ইনফরমাল ভাষ্য অথবা উইকিলিকস থেকে জানা ভাষ্য ইত্যাদি নানা কিছু থাকলেও বাস্তবে আমরা যা দেখেছি, সেখান থেকে তেমন এক অভিন্ন ভাষ্য মোটামুটি যা দাঁড়াতে পারে, তাই এখানে বলা হবে। মোটাদাগে আমেরিকার দিক থেকে সে অনুমিত ভাষ্যটা হবে এরকমঃ বাংলাদেশ তার নিজ ভূখণ্ডে গ্লোবাল টেররিজমের প্রভাব প্রতিরোধে, বিএনপি তার শাসন আমলে অনেক করলেও যথেষ্ট করেনি বা সিরিয়াস ছিল নয়। আমেরিকার মত করে সিরিয়াসলি দেখে নাই। এছাড়া, প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশকেও প্রতিরোধের রাষ্ট্র হিশাবে সেভাবে গুছিয়ে তৈরি করে নেয়নি। ‘সীমাহীন’ দুর্নীতিও ছিল। তাই দুর্নীতি তাড়ানোর অজুহাতে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দিতে বাংলাদেশে ঐ সামরিক ক্ষমতা দখল ঘটেছিল, যা আমেরিকার পছন্দ ও সমর্থিত। আলোচনার করার সুবিধার্থে এই ভাষ্যটা ধরে নিয়েই কথা আগাবো।

মানে, খোলাখুলি বলার সুযোগ থাকলে বা আইনি বিপদ ও সমস্যা না থাকলে, ১/১১-এর পক্ষে আমেরিকার অবস্থানের সাফাই মোটামুটি এমনই হত। [এটা আমেরিকার সাফাই ফলে বিএনপিকে এর সাথে একমত হতেই হবে তা নয়।] তার মানে দাঁড়াল, বিবিসির এই রিপোর্টে বাংলাদেশের ১০ বছরকে মূল্যায়ন করে পাঁচ ফ্যাক্টর বা বিপদ নিয়ে কথা বলতে বসেছে, সেই ১০ বছর হল আসলে এরও আগের দুবছরে আমেরিকার ‘তৈরি করে দেয়া’, রাষ্ট্রকে টেররিজম মোকাবেলাযোগ্য করে সাজিয়ে দেয়ার পরের বাংলাদেশ। আর সেই সাথে ওই সাজানো রাষ্ট্র কে চালাবে, তেমন একজন শাসকও আমেরিকা পছন্দ করে তার পিঠে হাত রেখেছিল। ওই শাসক বা পরিচালক ছিল দল হিসেবে হাসিনার [RATS নয়] আওয়ামী লীগ। তবে এটা হতে পারে যে, আমেরিকা শেখ হাসিনার শাসনের ১০ বছরের মধ্যে দ্বিতীয় পাঁচ বছরের দায় নিয়ে আপত্তি করলেও প্রথম পাঁচ বছরের দায় আমেরিকার; সেটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, এটা স্পষ্ট।

এবার আমরা দেখব, তাহলে বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুট দেয়া আলোচকদের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ”, এর আসল অর্থ তাৎপর্য কী? এর সোজা মানে হল, আমেরিকা বাংলাদেশের জন্য যে সাজানো রাষ্ট্র আর শাসক ঠিক করে দিয়েছিল, পরবর্তীকালে তাদের ১০ বছরের শাসনে হাসিনা সরকারের ‘টেররিজম মোকাবেলা’ করায় তা খামোশ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু এর বদলে ফলাফলে উল্টো ব্যাপক “ইসলামীকরণ” হয়েছে- এটাই বিবিসি ও তার রিপোর্টে ইনপুটদাতাদের পর্যবেক্ষণ – তাই নয় কি? নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” হয়ে যাওয়া, এই ফেনোমেনা তাদের অপছন্দের; কিন্তু অপছন্দ করলেও এটাই আমেরিকার বেধে নেওয়া নীতি-পলিসি আর বেছে দেয়া শাসক – এসব মিলিয়ে তাদের ঐ শাসনের প্রডাক্ট বা ফলাফল। লক্ষ করতে হবে, ইসলামীকরণ তাদের অপছন্দের ফেনোমেনা কি না সেটার চেয়েও বড় বাস্তবতা হল, এই ‘ইসলামীকরণ’ আমেরিকার নীতি আর মনোনীত শাসকের শাসনেরই (অন্তত প্রথম পাঁচ বছরের) প্রডাক্ট। কিন্তু কেন এমন প্রডাক্ট বা ফলাফল প্রসব করল আমেরিকার নীতি-পলিসি? সেই প্রশ্ন আর পাল্টা মূল্যায়নে যাওয়া উচিত নয় কী বিবিসি ও তার ইনপুটদাতা আলোচকদের? কিন্তু তারা এদিকে একেবারেই আগ্রহী নয়।

DEEP STATE

What does Deep State mean?

The Deep State is believed to be a clandestine network entrenched inside the government, bureaucracy, intelligence agencies, and other governmental entities. The Deep State supposedly controls state policy behind the scenes, while the democratically-elected process and elected officials are merely figureheads.

এছাড়া, বিবিসি জানিয়েছে আলী রিয়াজের ভাষ্যে বললে ‘ডীপ স্টেট’ হল, “যে কোন পরিস্থিতিতে যখনই রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হয়, তখন শক্তিপ্রয়োগের ধারা অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তার ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়। তখন যাদেরকে ‘ডীপ স্টেট’ বলে চিহ্ণিত করা হয়, তাদের ভূমিকা বাড়াটা স্বাভাবিক”। পাঠকের সুবিধার জন্য সেটাও এখানে দেয়া হল।

অধ্যাপক আলী রিয়াজ বাংলাদেশের ‘ডিপ স্টেটে’ চলে যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। তাকে ওয়েলকাম! কিন্তু এই উপলব্ধি কবে থেকে তা তিনি স্পষ্ট করেননি। অথচ শুরু থেকেই হাসিনার ক্ষমতার ট্রেন্ড ছিল “ডিপ স্টেটে” বা দানব হওয়ার পথে রওনা দেওয়ার, এটা তো দেখাই যাচ্ছিল। তাই এই যাওয়া আমাদের অনুমান শুরু থেকেই, এটাই তো “মুক্তিযুদ্ধের চেতনার” নামে ফ্যাসিজম। “মুক্তিযুদ্ধের ‘চেতনা-শ্রেণীর’ একনায়কতন্ত্র”। এই জয়ধ্বনিতে, ক্ষমতার বিরোধী বাকি “সকল শ্রেণীকে” গুম-খুন-পঙ্গুতে পিষে দাবড়ে রাখা।

গত ১০ বছরে আওয়ামী লীগ শাসনের একটা মূল বৈশিষ্ট্য – তা হল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে, যেন যুদ্ধাপরাধের বিচার করছেন তিনি এই আড়ালে থেকে এইবার – ইসলামের নামে প্রকাশিত বাংলাদেশের – সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোন সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং ততপরতাকে “নির্মুল” করতে গেছে এরা। এই ছিল মুল রাজনৈতিক লাইন। সশস্ত্র অথবা নিরস্ত্র, রাজনৈতিক দলীয় অথবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক যেকোন ইসলামের নামে প্রকাশিত যেকোন ততপরতাকে “নির্মুল” করতে হবে – এই ছিল লাইন। এটাকেই “যুদ্ধাপরাধের বিচার” করা হচ্ছে এই আড়ালে সম্পন্ন করতে যাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে এই আড়ালে বসে – ইসলামের নামে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে যেকোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক প্রকাশ এবং তৎপরতাকে ‘নির্মূল’ করতে চেয়েছে। কিন্তু ঘটনা হল, এটাই তো বুশ প্রশাসনের (২০০১-৯) ‘টেররিজম’ মোকাবেলা যে, ইসলামের নামে প্রকাশিত ও তৎপর যেকোন ফেনোমেনাকে দমন-নির্মূল করো। আর পরবর্তিতে ২০০৭ সালে এসে কী লাভালাভ হল এই মুল্যায়নে নীতি-নির্ধারকেরা দেখল সব-ভুল। তেমন কিছু অর্জিত হয় নাই। শত্রু কিছুই মরে নাই। উলটা রাষ্ট্র অন্তহীন যুদ্ধে ঢুকে গেছে, মানে যুদ্ধের খরচ বইবার দাইয়ে আটকে গেছে। আর বাড়তি উপহার গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা। তাই বুশ প্রশাসনের টেররিজম নীতি ছিল পরাজয়ের ও অকেজো – সকলে একমত হয়। এরপর থিংকট্যাংক র‌্যান্ডের [RAND] গবেষণা প্রস্তাব [ইতোমধ্যে ২০০৭ সালের শুরুতেই হাতে আসা] অনুসরণ করে বুশ প্রশাসনের শেষ আমলে পুরানা নীতির পথ থেকে সরে ২০০৮ সাল থেকেই বুশ প্রশাসন নতুন ‘টেররিজম’ মোকাবিলার নীতি চালু হয়। পরে ২০০৯ সাল থেকে আরও ভালোভাবে ওবামা প্রশাসন টেররিজম প্রসঙ্গে তাদের নীতি-পলিসিতে বড় সংশোধন আনে। যদিও ইসলামের ‘সশস্ত্র’ ধারাগুলোর বেলায় নীতি মোটা দাগে আগেরটাই থাকে। তবে অন্যান্য ধারা, নিরস্ত্র বা আইনি রাজনৈতিক ধারা – এদের প্রতি সহনশীল এবং একসাথে কাজ করতে হবে। মিসরে হোসনি মোবারককে সরিয়ে নির্বাচনে শাসক ও শাসন বদলানো এবং তাদের সাথে আমেরিকার কাজ করা, এটাই নতুন নীতির (র‍্যান্ড প্রস্তাবের) বৈশিষ্ট্য। টেররিজম নিয়ে আমেরিকার বদলে যাওয়া এই নীতি, এটাই ‘আরব স্প্রিং’ পলিসি বলে পপুলারলি পরিচিত। এসবের বিপরীতে বুশ প্রশাসনের টেররিজমের ‘বাংলাদেশ ভার্সন’ হলো, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে থেকে ইসলামের নামে প্রকাশিত সকল সক্রিয় ফেনোমেনাকে নির্মুল ও দমন। আর সুকৌশলে যেকোনো বিরোধী রাজনীতি যেটা ক্ষমতার জন্য চ্যালেঞ্জ তাকে ‘জঙ্গি’ ট্যাগ লাগিয়ে দমন-নির্মূল করা। মানে দাঁড়ালো জর্জ বুশের আমেরিকা যে নীতিকে ভুল মেনে সংশোধন করে সরে গেছে বাংলাদেশে সরকার সেই নীতিতে চলেছে। আর ২০০৯ সালের পর থেকে আমেরিকা সেটি উপেক্ষা করে গেছে, দেখেও না দেখে।

আমেরিকার এই অভিজ্ঞতাগুলো তো সকলেরই জানা ছিল। তার মানে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা যে গত ২০০৯ সালের শুরু থেকেই হাসিনার বাংলাদেশ সরকারে এই পথই যে নিবে তা আমেরিকার অজানা ছিল না। আর তা মনে করার কোনো কারণও নাই। অথচ তামাশার দিকটি হল – বুশ প্রশাসনের পুরান নীতিটা অনুসরণেই হাসিনার বাংলাদেশ সরকার পথ নিয়েছিল ।

সেই থেকে ক্ষমতাসীনেরা নিজ দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে – উদ্দেশ্য ও কাজে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ‘ডিপ স্টেটে’ নিয়ে গেছেন। আজ আলী রিয়াজ অভিযোগ করে লিখছেন, “ডিপ স্টেটে” চলে যাবার কথা। বলছেন, বাংলাদেশে “গুম কিংবা বিচারবহির্ভূত হত্যা’র ব্যাপক বিস্তার এক ধরনের ভয়ের পরিস্থিতি তৈরি করেছে”। অথচ সরকার কি এটা ২০০৯ সাল থেকেই শুরু করেনি? শুরুতে এটা কেবল জামায়াত-শিবিরের ওপর বেশি প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে মনকে প্রবোধ দিয়ে আমেরিকান নীতিনির্ধারক বা থিংকট্যাংকগুলো অন্য দিকে তাকিয়ে এ বিষয়কে উপেক্ষা করে গেছে। কিন্তু এটা কার অজানা যে, হিটলারও শুরুতে তার নাজিজমে নির্মূল তৎপরতা কেবল ইহুদিদের ওপর চালিয়েছিলেন। আর যারা ইহুদি নির্মূল করাকে দেখেও উপেক্ষা করেছিলেন, পরবর্তিতে তারাসহ যাকে হিটলারের শত্রু মনে হত সকলে একইভাবে সকলকে, তাদের সবাইকে নির্মূল করা হয়েছিল। শাসন ‘ডিপ স্টেটে’ চলে গেলে এটা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই হয়ে থাকে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, শুরু থেকেই আমেরিকার অজানা ছিল না, বাংলাদেশ সরকারের নীতি-পলিসি কী, সে কোথায় যাবে ও যাচ্ছে। আসল কথাটা হল, ১/১১ ঘটানোর প্রথম ছয় মাসের মধ্যেই বাংলাদেশকে কোন গন্তব্যে, কোন অভিমুখে যাবে – অর্থাৎ বাংলাদেশের টেররিজম পরিস্থিতি নিয়ে আমেরিকা আর সিরিয়াস থাকে নাই। আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। আমেরিকার কাছে তা অ-গুরুত্বপূর্ণ বা কিছু আসে-যায় না, এমন হয়ে গেছিল। কিন্তু কেন? কারণ, আমেরিকার তার স্বার্থের দিক থেকে আরও গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ দেখতে পেয়েছিল।

বাংলাদেশের টেররিজম ইস্যুর চেয়েও আমেরিকার গুরুত্বপুর্ণ স্বার্থ হাজির হয়েছিল। আমেরিকার যেটাকে দুনিয়াব্যাপী “ওয়ার অন টেরর” বা “টেররিজম ঠেকানো” বলে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর লক্ষ্যে কাজ করার চেয়েও আমেরিকার কাছে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল আরেক ইস্যু। সেটা হল, ‘চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকানো’ এই মার্কিন নীতির পক্ষে ভারতকে কাজ করতে রাজি করানো। বাংলাদেশের টেররিজম নিয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া যায় এর প্রতি ভারতের সমর্থন চাইতে গিয়ে আমেরিকার জন্য নতুন দুয়ার খুলে যায়। ‘চীন ঠেকানো’ হয়ে যায় মুল আলাপের ইস্যু। আর ভারতকে তাতে রাজি করাতে বিনিময় আমেরিকা সওদা করেছিল বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়ে। এর সাথে অবশ্য ভারত আরও কিছু আদায় করে নিয়েছিল। আমেরিকায় বাজারে নিজের রফতানি পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে আমেরিকার ‘বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত’ দেশের তালিকায় নিজের নাম উঠিয়েছিল। অবশ্য এই সুবিধা ২০১৭ সালের শুরুতে ট্যারিফ আরোপ ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসন এখন প্রত্যাহার করে নিয়েছে; চুক্তিতেও তাই ছিল।

বাংলাদেশ-ভারত-আমেরিকা কী গত দশ বছর সন্ত্রাসবাদ বা টেররিজম ইস্যুতে একসাথে কাজ করেছে? না সরি; এটা ধরে নেয়া যাচ্ছে না। কারণ, তাহলে এই টেররিজম ইস্যুর সাথে ভারতকে বাংলাদেশের ‘বিনা পয়সা’য় ট্রানজিট দেয়ার কী সম্পর্ক? তা বলতে বা দেখাতে পারতে হবে আগে। কেন ভারত যা চায় তা দিয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে, বাংলাদেশের এই নীতি কেন? এটা বাংলাদেশের কোন টেররিজমের, কার টেররিজমের পক্ষে থাকা? কোন বলিদান?
টেররিজমের ইস্যুর আড়ালে আমেরিকা নিজের চীন ঠেকানো ইস্যুতে ভারতকে পাওয়া হাসিল করেছিল। আর আমরা এই সওদার বুটি হয়েছি, আর ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ভারতকে সব ধরণের ট্রানজিট দেয়া আর ভারতের দিকে ঝুকে থাকা সরকার কায়েম ইত্যাদি……

আমেরিকা গত ১০ বছর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক বিষয়ে একরকম অন্ধ ও উদাসিন হয়ে থেকেছে। আর আমাদের সরকার ‘চেতনার’ শাসনের আড়ালে ইসলাম জঙ্গি দমনের নামে তার ক্ষমতার বিরোধীদের নির্মুল করে চলেছে। রাষ্ট্র তার ফাংশনাল সব প্রতিষ্ঠানগুলোসহ ভেঙ্গে পড়েছে। ব্যাঙ্ক প্রশাসন আদালত সব। তাই এখন বিবিসি ও এর আলোচকেরা গত ১০ বছরে বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” বলে যে প্রশ্ন ও অভিযোগ তুলছেন তা যদি কিছু হয়ে থাকে বা যা যা কিছু হয়েছে – প্রথমত এটা তো হওয়ার কথা নয়। কারণ আমেরিকা ত টেররিজম মোকাবিলাযোগ্য করে রাষ্ট্র তৈরি করে দিয়েছিল সাথে শাসকও ঠিক করে দিয়েছিল। তাহলে দশ বছর পরে ইসলামিকরণ প্রডাক্ট আসবে না। আর যদি আসে এর জন্য দায়ী কে? এটা কী আমেরিকার প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রশ্রয়েই ঘটেছে তা বলা যাবে না! অথচ এরা কেউ বাংলাদেশ সরকার বা আমেরিকার নীতিকে দায়ী করছেন না। আজ হঠাৎ বাংলাদেশ ডিপ স্টেটে চলে গেছে বলে আঙুল তুললেও যেন এর দায় অন্য কারও বলে ব্যাখ্যা দেয়া্র চেষ্টা করছেন। কেন? এটা কি সঠিক? নাকি আমেরিকান পলিসিকে প্রশ্ন করতে হবে, মুরোদ থাকলে পলিসি নির্মাতাদের দায়ী করতে হবে। অর্থাৎ, সত্যিকার পুনঃমূল্যায়নে যেতে হবে।

মূলকথাটা হল, ভারতের আমেরিকার ‘চীন ঠেকানো’র ঠিকাদারি নেয়াতেই বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে গেল না কোথায় গেল তা নিয়ে আমেরিকার অনাগ্রহের শুরু। আর এসবের ফলাফলেই কালক্রমে আজ আমেরিকাকে পাত্তা না দিয়ে বাংলাদেশের শাসন ভারত-হাসিনার, দুজনে দুজনার, এমন শাসন হয়ে যাওয়ার গ্রাউন্ড হয়ে দাড়িয়েছিল।

অথচ এক শুভ সকালে বসে আলী রিয়াজ ডিপ স্টেটে চলে যাওয়া বা ইসলামিকরণ – এসব লক্ষ করেছেন করছেন কিন্তু আমেরিকান নীতি ও পদক্ষেপের সাথের এর সম্পর্কের দিকে দেখতে পাচ্ছেন না। যতক্ষণ বাংলাদেশে শাসন ডিপ স্টেটে চলে যাওয়ার জন্য দায়ী কী এবং কেন – তা না বলতে পারবেন ততদিন এসব আবিস্কার অর্থহীন। যদিও তাতে ইসলামিস্টরা কত খারাপ তা প্রমাণে একে ব্যবহার করা যাবে অবশ্যই।

ওদিকে আর এক বড় কথা, বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ করতে চাইছেন। কিন্তু কার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ করবেন? শুরু থেকেই হাসিনা লাগাতর এক অপ্রয়োজনীয় ইসলামবিদ্বেষী নীতি চালিয়ে গিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নামে। অথচ ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধ এ দু’টির মধ্যে ১৯৭১ সালেও কোনো বিরোধ ছিল না। কেউ বিচার এড়ানো যুদ্ধাপরাধী হলে তাকেও সুস্থ পক্ষপাতহীন বিচারপ্রক্রিয়া ও পদ্ধতিতে কাঠগড়ায় নেয়া যেত। কিন্তু তা বলে যুদ্ধাপরাধীর সাথে ইসলামের কী সম্পর্ক? জামাতের কোন অপরাধ দোষত্রুটি মানে সেটাকে ইসলামের ত্রুটি হিসাবে দেখানো্র ইঙ্গিত করা – এটা তো চরম অসততা। এভাবে কী ইসলামের গায়ে কালি লাগিয়ে দেওয়া যাবে? এটা কী কোন পথ হতে পারে? এর সাথে ইসলামপন্থী রাজনীতি মোকাবিলার পথ ও উপায় হিসাবে একে ব্যবহার করা – এটাই তো চরম ইসলামবিদ্বেষী কাজ। এরচেয়ে আত্মঘাতি কাজ আর কী হতে পারে? এই রাজনীতি তো আজ অথবা কাল নিশ্চিতভাবে ব্যর্থ ও পরাজিত হবেই।

আর এসব অবিবেচক তৎপরতারই সামাজিক পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঘটেছে। মানুষ এটাকে সরকারের জুলুম আর চরম বে-ইনসাফি হিশাবে দেখেছে। উলটা ইসলামের প্রতি আরও আগ্রহি ও সহানুভুতিশীল হয়ে উঠেছে। ব্যাপারটা যেন রোমের মত। ঠিক এইভাবেই রোম সাম্রাজ্যে ক্রিশ্চানিটির প্রভাব উতখাতে লড়তে গিয়ে শেষে তা সামলাতে না পেরে সম্রাট কনস্টানটিনসহ নাগরিকেরা ক্রিশ্চান হয়ে গিয়ে রোমকে সেই প্রথম ৩৩২ খ্রীষ্টাব্দে ‘ক্রিশ্চান রোমে’ পরিণত করেছিল। আর এখানে গত দশ বছরের হাসিনার শাসনে কার্যত বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে ইসলামের ভূমিকা আগের চেয়েও আরো বেশি থাকার পক্ষে মানুষ ঝুঁকে গেছে। এটাকেই বিবিসি ও তার বন্ধুরা বাংলাদেশের “সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ” ঘটেছে বলে আক্ষেপ করছে।

বাংলাদেশের ‘সমাজ ও রাজনীতির ইসলামীকরণ’ ঘটে গেছে বলে কারো দিকে আঙুল তোলার আগে তাদের উচিত হবে, আমেরিকার বিদেশ নীতি আর সেই সূত্রে ভারতের নীতির পুনঃমূল্যায়ন থেকে দেখা শুরু করতে হবে। আর সম্ভবত তাতে দেখা যাবে যে, কথিত ‘ইসলামীকরণ’ আসলে আর কিছু নয়, আমেরিকান ফরেন পলিসি, তা থেকে ভারতের পলিসির অপর পীঠ। তাদের পলিসির কারণে ঢাকার সরকার কী করছে তা সকলেই উপেক্ষা করে গিয়েছে। আর ঢাকার সরকারের সবার ওপরে ডিপ স্টেট কায়েম আর চরম ইসলামবিদ্বেষী পলিসির চর্চা যা কিছু করেছে এসবের ফলাফলের অপর পিঠ হচ্ছে কথিত “ইসলামিকরণ”। আর আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, এখনকার বাংলাদেশের এই অবস্থাটা শেষ বিচারে আমেরিকার বা ভারতের কোন স্বার্থের পক্ষে যায় নাই। বরং তাদেরকে এর কাফফারা চুকাইতে এখন রেডি থাকতে হবে!

এই পরিস্থিতিতে যারা বাংলাদেশ এক্সপার্ট হয়ে বিদেশি রাষ্ট্রের কাজে নিজের নাম কামাতে চায় তাদের প্রথম কাজ হবে “ইসলামীকরণ” ঘটেছে বলে অস্পষ্ট নেতিবাচক অবস্থান ত্যাগ করা। বরং আমেরিকার নীতির কোন ভুলে এটা ঘটল তা পুনঃমূল্যায়িত করা এবং সেই পুনঃমূল্যায়িত নীতি, সংশোধিত নীতি নিয়ে এখনও ইতিবাচকভাবে আগালে, পুরান নীতিতে জমে যাওয়া আবর্জনা সাফসুতারা করতে বাংলাদেশের মানুষ এখনও তার পক্ষে সাড়া দেয়ার সুযোগ আছে। তবে সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমেরিকার কি নিজের পলিসি পুনঃমূল্যায়নের সাহস আছে? এই ট্রাম্প আমলে এসে সব কিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেছে। আমাদের আস্থায় কমে গেছে।

বিবিসির আলোচ্য রিপোর্টে নির্বাচনে প্রভাব রাখার মতো পাঁচটা পরিবর্তন উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু আসল এক ফ্যাক্টরের কথাটাই তারা বলতে পারেননি। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে? মানুষ অবাধে ভোট দিতে পারবে কী বা সুস্থ নির্বাচন কে নিশ্চিত করবে? এটাই তো সবচেয়ে বড় আর নির্ধারক ফ্যাক্টর। আর সবচেয়ে বড় এই ফ্যাক্টরের ব্যাপারে বিবিসির রিপোর্ট বেখবর।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বিবিসির মূল্যায়নে বাংলাদেশের ‘কর্তৃত্ববাদী শাসন – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন

গৌতম দাস

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2tY

 

ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন – ছবি : সংগৃহীত

পাকিস্তানের নির্বাচিত নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিয়েছেন ইমরান খান। কিন্তু তাঁর বা পাকিস্তান নিয়ে এ সম্পর্কে কোন মিডিয়া রিপোর্ট ছাপা হলে তা পড়তে গিয়ে দেখা যাচ্ছে দেশী-বিদেশী রিপোর্টার কেউই কোন হোম-ওয়ার্ক বা কোন বাছবিচার ছাড়া পঞ্চাশ বছর আগের বা তারও পুরোনা সব গেঁথে বসা অতি ব্যবহারের ক্লিশে (cliché) ধারণা ব্যবহার করছেন। যদিও সুবিধা হল, কোনগুলা এরকম কোন রিপোর্ট তা চেনার কিছু নির্ণায়ক এখনই বলে দেয়া যায়। যেমন, কোন রিপোর্টে বাক্যের শুরুতে যদি লেখে – ” রাজনীতিবিদে রূপান্তরিত ক্রিকেটার” অথবা “ক্রিকেট তারকা থেকে প্রধানমন্ত্রী” অথবা “প্রাক্তন প্লেবয় ক্রিকেটার ইমরান”, অথবা “সেনাবাহিনীর পুতুল ইমরান” ইত্যাদি তাহলে বুঝতে হবে এই রিপোর্টারের কাছে একালের পাকিস্তান সম্পর্কে কোন তথ্য নাই, হোমওয়ার্কও কিছু করেন নাই। তাই অন্যের চাবানো পুরান জিনিসই আবার মাটি থেকে কুড়িয়ে নিয়া চাবানো শুরু করছেন। তবে এদেরই আরেক দলের আরেকটা সংস্করণ আছে। আর এদের বাক্য শুরু হবে এমন – “পাকিস্তানি মনোভাব”, “পাকি জেনারেল”, “ক্ষমতালোভী জেনারেল” ইত্যাদি শব্দে। এদেরও একালের কোন পাকিস্তান স্টাডি নাই, এই গ্রুপটা আসলে মূলত ইসলামবিদ্বেষ ও রেসিজম চর্চা করে থাকে। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে সেসময়ের পাকিস্তানের সরকার ও সেনাবাহিনীর হাতে হত্যা, ধর্ষণ ও নৃশংসতা হয়েছে, আমাদের এই দগদগে খারাপ স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা আছে, অবশ্যই। কিন্তু সে অজুহাতে সে সময়ের পাকিস্তানের শাসক সরকার ও সামরিক বাহিনীকে দায়ী-অভিযুক্ত না করে বরং সাধারণভাবে পাকিস্তানি নাগরিক মাত্রই দোষী অপরাধী, খারাপ লোক – এভাবে অভিযুক্ত করতে চায় এরা। আর হিটলারের মতো বলতে চায়, আসলে এই পাকিস্তানি “জাতটাই খারাপ”, ফলে যেন এটা তাদের “জন্ম দোষ”।

রেসিজমের একটা বড় লক্ষণ হল, এরা জাত মানে ইংরাজি রেস (race or racial) অর্থে নৃতাত্ত্বিক জাতের দোষ খুঁজে পায় সবখানে – আর এই অভিযোগের আঙুল তোলা ছাড়া কথা বলতে পারে না। আর ভুলে যায় যে সে নিজেই রেসিজম করছে; এটা রেসিজমের খপ্পরে পড়া! এরা জানে কীনা জানি না যে রেসিজম এর ঘৃণা ছড়ানো একটা আইনি অপরাধ, ক্রিমিনালিটি। যেমন এরা বলবে পাকিস্তানিরা খারাপ (মানে ঐ দেশের সবাই) – কেন? কারণ তাদের “জাতটা” খারাপ। আবার, তাদের জাতটা খারাপ কেন? কারণ তাদের ‘রক্ত’ খারাপ। অর্থাৎ খারাপ ‘রক্তের’ লোক তারা। Pure বা ‘খাঁটি’ রক্তের নয় তাঁরা। হিটলারি রেসিস্ট বয়ানের কমন বৈশিষ্ট্য এগুলা। আর যেমন এই ঘৃণার প্রতীক হল একটা ছোট শব্দ “পাকি”; এক রেসিস্ট অভ্যাস ও ঘৃণা চর্চা। আবার এটার পেছনে আছে এক খুঁটি – ভারতের ‘হিন্দুত্বের’ রাজনীতি, পাকিস্তান যার ‘আজন্ম শত্রু’। তাই আছে এই হিন্দুত্বেরই এক বয়ান বা চিন্তার এক কন্সট্রাক্টশন। হিন্দুত্বের রাজনীতি চায় বাংলাদেশের ‘প্রগতিবাদীদের’ উপর তাদের বয়ান যা মূলত মুসলমান-বিদ্বেষ, তা আধিপত্য বিস্তার করুক, ছেয়ে যাক। ফলে এই রেসিজমের আর এক ভাগীদার ও চর্চাকারি এরা।

তাই পাকিস্তান নিয়ে কোথাও কথা বলার ইস্যু থাকলেই এসব কমন বয়ানধারীরা সেখানে ছেয়ে হাজির হয়ে যায়। ফলে এই বিদ্বেষী বয়ান অতিক্রম করে টপকে কিছু করতে গেলে আগে এসব বাধাগুলো উপেক্ষায় পেরিয়ে যেতেই হয়। পরে কোনো বিচার-বিশ্লেষণ, তথ্য জানা বা বুঝার চেষ্টা বা মনোনিবেশ ঘটানোর কাজটা তাতে কঠিন হয়ে গেলও করতে হয়।

বিস্ময়কর ঘটনা হল, এই রেসিজম কত গভীরে বিস্তৃত তা বুঝা যায় বিবিসি বাংলার সর্বশেষ এক রিপোর্ট থেকে। যেমন এমনকি একজন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইমরান সম্পর্কে অবলীলায় এরা এক সাব-হেডিং লিখছে, “ইমরান খান আসলে কাদের লোক?”।

ওদিকে অনেক মিডিয়া নানা রিপোর্ট লিখছে, এসবের মধ্যে একটা কমন বাক্য পাওয়া যাবে যে, দল খোলার ২০ বছর পর ইমরান এবার সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু কী সে সাফল্য, আর এখন এত দিনেই বা সে কথা কেন- সে সম্পর্কে আমরা এখন খোঁজ করব।

উইকিলিকস ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জ
উইকিলিকস (WikiLeaks) ও এর পরিচালক জুলিয়ান এসাঞ্জের (Julian Assange) কথা রাজনীতি সচেতনদের অনেকেই জানে। তবু এসম্পর্কে সংক্ষেপে বললে, বিভিন্ন দেশে নিয়োগপ্রাপ্ত আমেরিকান রাষ্ট্রদূতেরা তাদের বসের অফিসে মানে আমেরিকান সরকারের স্টেট ডিপার্টমেন্টে (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে) নিয়মিত যে “সিচুয়েশন রিপোর্ট” পাঠায়, সেগুলোকে তারা “কেবল (Cable) পাঠানো” বলে। মানে মূল কথাকে নকল ভাষা ও শব্দে লুকিয়ে, ‘কোডিফাই’ (ছদ্মভাষায়) করে অনলাইনে পাঠানো হয় সেসব রিপোর্ট। কিন্তু এসাঞ্জ এগুলো হ্যাক করে এর কপির নকল-বেশ খুলে এরপর তা (উইকিলিকস নামে) নিজের ওয়েব থেকে প্রকাশ করে দিয়েছিল ও প্রায়ই দিয়ে থাকে। ফলে যেমন – বাংলাদেশ থেকে ১/১১-এর তত্ত্বাবধায়ক আমলে সেসময়ে আমেরিকায় আসলে কী রিপোর্ট গেছে, আমেরিকা বাংলাদেশে কী করেছিল তা এখন আমরাও জানি। এসাঞ্জ বর্তমানে রাশিয়া থেকে “জুলিয়ান এসাঞ্জ শো” নামে এক রেডিও প্রোগ্রাম পরিচালনা করে থাকেন।

গত ২০১২ সালে এসাঞ্জ ইমরান খানের একটা ইন্টারভিউ নিয়ে তা প্রচার করেছিল। সেটা পড়লে আমরা দেখব, ইমরান কী করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান হল, এর পটভুমি কী করে তৈরি হচ্ছে – আর সেসব থেকে এর গড়ে ওঠার অনেক কিছুই স্পষ্ট জানা যায়। তবে মনে রাখতে হবে ইমরানের এই কথোপকথন আজ ২০১৮ থেকে ছয় বছর আগের। এই সাক্ষাতকারের লিখিত ভাষ্য (transcript) এর লিঙ্ক দেয়া হল এখানে। এছাড়া আগ্রহীরা এর ইউটিউব ভার্সানও দেখতে পারেন, এখান থেকে

প্রথমত, এসাঞ্জ কেন ইমরানকেই বেছে নিয়েছিল? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে এসাঞ্জ সে কথা জানিয়েছেন এভাবে যে, পাকিস্তানের ইসলামি দলগুলোসহ প্রধান রাজনীতিবিদরা (অর্থাৎ বেনজির ভুট্টো পিপিপি বা নওয়াজ শরীফের পিএমএল-এম দলের নেতারা) আসলে দুমুখো-রাজনীতিবিদ, তুলনায় একেবারেই ব্যতিক্রম হলেন ইমরান।

কিভাবে তা এসাঞ্জ জানলেন আর কী অর্থে? তিনি বলছেন, ইমরানের পাবলিক বক্তৃতা আর আমেরিকান কূটনীতিকদের সাথে বলা কথার উইকিলিকস রেকর্ডগুলো নিয়ে তিনি স্টাডি করে দেখেছেন, দুজায়গাতেই ইমরান একই কথা বলছেন। বিপরীতে পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা জনসমক্ষে আমেরিকাকে তুলোধুনো করে যাই বলেন না কেন, রাষ্ট্রদূতের কাছে গিয়ে বলেন ঠিক তার উল্টা। আর ঠিক এ কারণে এসাঞ্জের কাছে ইমরান আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছিল ও তিনি ইমরানের ইন্টারভিউ নেন ও প্রচার করেন।

কিন্তু কী সে কথার প্রসঙ্গ যা নিয়ে তাদের দু’মুখো হয়ে কথা বলতে হয়? ইন্টারভিউয়ের শুরুতে, ইমরান এসাঞ্জের প্রশংসা করে বলছেন আপনি আমার কাজ অনেক সহজ করে দিয়েছেন। কারণ, উইকিলিকসকে উদ্ধৃতি করে এথেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে আমি আমার পাবলিক বক্তৃতা করে থাকি। যেখানে যথেষ্ট প্রমাণ দেখা যায় যে, আক্ষরিকভাবেই পাকিস্তানের প্রধান দলগুলোর রাজনীতিবিদরা আমেরিকানদের বলছেন, “দেখেন যদি আপনারা আমাকে সমর্থন করেন, ক্ষমতায় আনেন তবে আপনারা যা চাইবেন বিনিময়ে আমি তাই করে দেবো”। এই হল,  ইসলামিদলসহ আমাদের দু-মুখো রাজনীতিবিদেরা।

কিন্তু তাহলে ব্যাপারটা কি এতই সরল যেন বলা যে, “দেখ অন্যেরা সবাই কত খারাপ আর ইমরান কত ভাল” – এ ধরনের হয়ে গেল না? না ঠিক তা না। আসলে অন্যদের চেয়ে ইমরান কোথায় ভিন্ন সেটা দেখলেই ইমরান কেন তুলনায় ভাল ও সফল তা বোঝা যাবে। তবে সময় এত দিন ইমরানের ফেবারে মুখ তুলে চেয়েছে, এ কথাও সত্য।

কিন্তু মূল বিষয় হল, আমেরিকান ওয়ার অন টেরর। ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে সাহস করে আমেরিকার “ওয়ার অন টেরর নীতির” বিরোধীতা করেছে। একনাগাড়ে নিয়মিত আঠারো বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে কঠোর সমালোচনা করেছে। জনগণের মাঝে একনাগাড়ে এটা “পাকিস্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া অন্যের যুদ্ধ, আমেরিকার যুদ্ধ” আর এটা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন – এই কথাগুলা স্পষ্ট করে বলে মানুষের মনে ঢুকিয়েছেন। ফলে দল ছোট না বড় সেটা নয়; দলের ব্যাখ্যা বয়ান সঠিক কী না, সঠিক সময়ে ও কার্যকর কী না – সেটা করতে পারাই সাফল্যের চাবিকাঠি – এই নীতিতে নিজেকে পরিচালনা করে গেছেন তিনি। তাই তিনি ভিন্ন ও সফল। বুশ প্রশাসন আমেরিকায় ২০০১ সালে ৯/১১-এর টুইন টাওয়ার হামলার পরে ঐ হামলাকে এবার নিজ যুদ্ধের দামামা আফগানিস্তান জুড়ে ছড়িয়ে দেয়ার অজুহাত বা সুযোগ হিসেবে নিয়েছিল। আর একাজেরই লঞ্চিং প্যাড (launching Pad) মানে, নিরাপদে আমেরিকান সৈন্যদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার পাটাতন-ভূমি হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নিয়েছিল ও হুমকি দিয়ে পাকিস্তানকে বাধ্য করে এই ব্যবহার শুরু করেছিল। পাকিস্তানের সরকারের (সাথে বিরোধী দলগুলাকেও) উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে বলা হয়েছিল, তাঁরা রাজি না হলে বোমা মেরে পাকিস্তানকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হবে, যাতে মনে হয় পাকিস্তান যেন “পুরান প্রস্তর যুগের” কোনো বদ্ধভূমি। সেটা ২০০১ সালে জেনারেল মোশাররফের আমলের ঘটনা। সেই থেকে পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরা আমেরিকার এই পাহাড়সম চাপে পড়ে, যা মোকাবেলা করা তাদের জন্য অসম্ভব ছিল; ফলে তা করতে যাওয়ার চেয়ে বরং নিজের পেছনে আমেরিকান সমর্থন জোগাড় করে এক তোষামোদের রাজনীতি করাকেই পাকিস্তানের নিয়মিত রাজনীতির নিয়ম বানিয়ে নিয়েছিল।

তাহলে প্রথম সারকথাটা হচ্ছে, রাজনীতিবিদরা (ও সামরিক বাহিনীও) আমেরিকান চাপের মুখে প্রায় স্থায়ীভাবে নত হয়ে গিয়েছিল। সার্বভৌমত্ব রক্ষার কাজ ও কথা ভুলে গেছিল। ফলে উল্টা এ চাপকেই নিজের ও দলের সান-শওকত ও সাথে অর্থ আয়ের উপায় হিসেবে নিয়ে ফেলেছিল। এটাই ছিল মারাত্মক। অর্থাৎ পাকিস্তান “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা” শুরু করেছিল। আর এতে ভারতসহ প্রগতিবাদীরা প্রপাগান্ডা শুরু করেছিল যেন আমেরিকায় আলকায়েদা আক্রমণ যেন পাকিস্তান সরকারই করেছিল। দ্বিতীয় কথাটা হল, ইমরানই একমাত্র রাজনীতিবিদ যে “আমেরিকার হয়ে যুদ্ধ করা”- এই অবস্থাটারই কঠোর বিরোধিতা করে সেই থেকে তাঁর সব বক্তৃতায় তা আনা শুরু করেছিল। স্বভাবতই শুরুতে সে স্বর ছিল খুবই ক্ষীণ, যেন অবাস্তব আপ্তবাক্যের কিছু ভাল ভাল কথা তিনি আওড়াচ্ছেন। একারণে, যেমন দেখা যাচ্ছে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত নিজ দেশে “কেবল পাঠিয়ে” নিজেদের সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, “খান (ইমরান), আরে উনি তো আসলে উনার দল পাকিস্তান তেহরিকে ইনসাফ (পিটিআই) দলের একা  ‘এক ব্যক্তির শো” এর নেতা। তাই উনি যাই বলুক তাতে তো উনার হারানোর কিছু নাই। তাঁর রাজনৈতিক যোগ্যতা আর ভুমিকা হল, রাজনীতিতে তাঁর নিজের তৈরি এক আদর্শের নীতি আকঁড়ে খামাখা ঝুলে থাকা। তবে পাকিস্তানের শিক্ষিত-জন এবং যারা বিদেশে কষ্টকর শ্রম দিয়ে দেশে অর্থ পাঠায়, এদের মাঝে তিনি খুবই জনপ্রিয়। যদিও রাজনীতিক দল হিসাবে তিনি নিজের জন্য কোন সফলতা আনতে পারেন নাই। “Khan, whose PTI Party is effectively a one-man show has little to lose. His credibility rests in his self-created role as a politician who sticks to his principles and he is popular with the Pakistani intelligentsia here and elements of diaspora, but Khan has never been able to turn his starring role of captain of Pakistan’s only team to win the International Cricket Championship into an effective political party'”। এভাবেই তিনি ইমরানকে তুচ্ছ করেছেন।

কিন্তু ইমরানের এই শক্ত রাজনৈতিক ভুমিকা অবস্থান নিবার পরে তাতেও প্রথম দিকে ইমরানের পক্ষে বড় কোনো ব্যাপক প্রভাব পড়েনি। কারণ, তখনও পাকিস্তানের উপর আমেরিকান চাপ প্রচণ্ড। বরং বুশ প্রশাসনের দ্বিতীয় টার্মেও (২০০৫-৯), বুশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা (মন্ত্রী) কন্ডলিসা রাইসের এক বাড়তি চাপ আরোপের সময় সেটা। তিনি জেনারেল মোশাররফকে চাপে বাধ্য করছিলেন যেন তিনি সিভিলিয়ান মুখ হিসেবে বেনজির ভুট্টোকে ধুয়েমুছে ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। ধুতে হবে কারণ বেনজির ইতোমধ্যেই স্বামীসহ দুর্নীতিতে সাজাপ্রাপ্ত ও মধ্যপ্রাচ্যে পলাতক ছিলেন। মোশাররফ সে কারণে বেনজিরের দুর্নীতি “মাফ করে দেয়ার এক আপসনামা” বা ‘ন্যাশনাল রিকনসিলেশন অধ্যাদেশ’ (NRO), অক্টোবর ২০০৭ সালে জারি করেছিলেন। এক কথায় বললে, এটা ছিল প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ বেনজির ভুট্টো-জারদারিসহ ৩৪ জন রাজনীতিবিদিদের জন্য মোশারফের “সাধারণ ক্ষমা” ঘোষণা। কারণ কন্ডলিসা বুবু আদেশ করেছেন। কন্ডলিসা তার সম্প্রতি প্রকাশিত বইয়ে এ কাজের জন্য তিনি বুশের প্রশংসা পেয়েছিলেন, সে কথা স্বীকার করেছেন।

কিন্তু তবু ইমরান আপসহীনভাবে এগিয়ে গেছেন, বেনজিরকে ক্ষমতায় আনার ২০০৮ সালের সেই নির্বাচনেও অংশ নেননি। উল্টো মোশাররফ-বেনজির আঁতাতকে – এরা বুশ প্রশাসনের পাপেট বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি সাহস করে বলতেন, এই আঁতাত জোট বুশের আর এক পাপেট সরকার কায়েম করতে চায় যারা নিজ জনগণের ওপর বোমা ফেলে তাদের মারতে দ্বিধা করে না। অর্থাৎ নিয়মিতভাবে আমেরিকার ‘ওয়ার অন টেরর’ নীতির বিরোধিতা করা আর সাথে NRO অধ্যাদেশ ও বেনজিরের দুর্নীতির বিরোধিতা – এসবই ইমরান জারি রাখতেন। সে কারণেই আমেরিকান রাষ্ট্রদূত স্বীকার করছেন, ইমরান ওয়ান ম্যান শো হলেও “পাকিস্তানের পড়ালেখা জানা শ্রেণী আর বিদেশে কষ্ট করে আয় করে যারা দেশে অর্থ পাঠায় – এদের মাঝে ইমরানের বিপুল জনপ্রিয়তা’ আছে।

তবে এই জনপ্রিয়তা বাড়াতে ইমরান আসলে কাজে লাগিয়েছিলেন ২০০৩ সালের শেষে মোশাররফের টিভি সম্প্রচার নীতিকে। মোশাররফই পাকিস্তানে প্রথম শাসক যিনি পাকিস্তানে এক ডজন বেসরকারি টিভির স্রোত বইয়ে দেন, যদিও তা ভার্চ্যুয়াল। ভার্চুয়াল মানে? অর্থাৎ টিভি স্টেশনগুলো খোলা হত মূলত দুবাইয়ে, অথচ এর সম্প্রচার হত টার্গেট ভোক্তা পাকিস্তানে অবস্থিত নাগরিকরা, এ কথা মনে রেখে। এই এক অদ্ভুত নিয়ম। এতে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার হওয়াতে এর উপর পাকিস্তানে চালু কোনো ‘নিয়ন্ত্রক’ আইনের এক্তিয়ার ও কার্যকারিতা ছিল না। এমনকি এটা এত সহজ হয়ে উঠে ও সরকারের ঢিলেঢালা আইন প্রয়োগের মৌন সম্মতি পেয়ে যায় যে পরের দিকে, পাকিস্তানে বসেই ঐসব দুবাই-টিভিগুলা তাদের টক শো বা প্যানেল অনুষ্ঠান আয়োজন করতে পারত, ফলে রেকর্ডিংও পাকিস্তানে বসেই হত। পরে ঐসব রেকর্ড টিভির দুবাইয়ের অফিসের সার্ভারে ও লোকেদের কাছে আপলোড করে দেয়া হত। যদিও প্রেসিডেন্ট মোশাররফ পাকিস্তানে বসে কেবল টিভিতে ঐসব চ্যানেল বা অনুষ্ঠান পাকিস্তানের মানুষকে দেখতে দেবেন কি না – এটা অবশ্যই তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। কিন্তু পারলেও, তিনি এক উদার অবস্থান নিয়ে তা মুক্ত প্রচার হতে দেন। তবে দুবাইয়ে প্রোগ্রাম তৈরি ও সম্প্রচার ব্যবস্থা স্থাপন করা আর সেখানেই রেখে দেওয়ার আসল মানে হল, মূল্যবান মেশিনপত্রও সেখানে রাখা। এমনকাজের পিছনের মূল কারণ হল যাতে পাকিস্তানে কোন সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি ও আরোপ হলেও তাতে টিভির দামি যন্ত্রপাতি ‘জব্দ হয়ে যাওয়ার’ সুযোগ না থাকে। তবে তখন সে আমলে মিডিয়াতেও মোশাররফের ইমেজও ছিল ভালই। আর এই “আপাত মুক্ত টিভির” সুযোগ নিয়ে ওসব “দুবাই টিভির” সবচেয়ে পপুলার অনুষ্ঠান ছিল – পলিটিক্যাল টকশো, প্যানেল আলোচনা সভা এগুলো। আর এরই হাত ধরে ইমরান খান নিজেকে তাঁর পপুলারিটি শিখরে এগিয়ে নিয়েছিলেন।

কিন্তু মোশাররফের সেই NRO এর সাধারণ ক্ষমা, যদিও পরে ডিসেম্বর ২০০৯ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে, তা বাতিল করে দেন। অর্থাৎ রাজনীতিতে ইমরানের বয়ান ও ভাষ্য যেন আদালতকেও ইনসাফের পথে থাকতে আবেদন করে ফেলেছিল।

এর সম্ভাব্য মূল কারণ হল, ইমরান শুধু ওয়ার অন টেররের “আমেরিকার যুদ্ধ” – এটা না লড়ার কথা বলে থেমে থাকতেন না। তিনি পাকিস্তানের জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জায়গা থেকে বিষয়টা তুলে ধরতেন যে, পাকিস্তানকে আমেরিকার তার নিজের যুদ্ধ লড়তে কেন বাধ্য করবে, এটা সে করতে পারে না। আমেরিকার সে অধিকার নাই। খুব সম্ভবত – জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছা বা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন – রাষ্ট্র ক্ষমতার পিছনের খুবই গুরুত্বপুর্ণ এই আইন ও অধিকারের প্রশ্ন – এটাই আদালতকে ইস্যুটা আমলে নিতে আর এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের দায়বোধ কর্তব্য পালনে সাহসী করেছিল।  ফলে আদালত NRO এর সাধারণ ক্ষমা আইনকে অবৈধ ঘোষণা ও তা বাতিল করে দেয়।

কিন্তু এতে মোশাররফের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আরও খারাপ। তিনি জরুরি অবস্থা জারি করে প্রধান বিচারপতিসহ অন্যান্য কয়েক বিচারপতিদের বরখাস্ত করেন এবং আদালতের সাথে সঙ্ঘাতে জড়িয়ে পরেছিলেন। আর সেই থেকে মোশাররফের পাবলিক ইমেজও দ্রুত মিলিয়ে খুবই নেতি হয়ে যায়। কিন্তু ইতোমধ্যে পাকিস্তানে প্রচলিত “ওয়ার অন টেররে” দেশী-বিদেশী ক্ষমতাধরদের বিরুদ্ধে পাল্টা এক আমেরিকা-বিরোধী পাবলিক সেন্টিমেন্ট জমা হতে থাকে। সেই সাথে প্রশ্রয় পাওয়া “দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদেরও” বিরোধী হয়ে উঠে পাবলিক সেন্টিমেন্ট। ফলে এটাই জনগণের মাঝে এক নতুন “রাজনৈতিক পরিসর”, এক গণ-ঐক্য তৈরি করে ফেলেছিল। তবে তা অগোচরে, সাধারণ চোখে কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন না রেখে, এক নতুন প্রজন্ম জন্ম নেয়া শুরু হয়েছিল এখান থেকেই। আর ইমরানের উত্থান এরই মাস্তুলে বসে থেকে।

ঘটনা আরো আছে। শুধু কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে জনমনে গভীরে ছাপ ফেলা কঠিন হয় যদি না সাথে অর্থনৈতিক তথ্য, ফ্যাক্টস ফিগারও  হাজির করে ওই বক্তব্যকে প্রমাণিত বক্তব্য হিসেবে পোক্ত করা যায়। ইমরান খান সে কাজটাই করেছিলেন। প্রথমত এবার তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যুদ্ধের খরচ” নিয়ে; যুদ্ধে পাকিস্তানের ক্ষয়ক্ষতির খরচের দায় আমেরিকার নেয়া ও আমেরিকার কাছ থেকে এর ক্ষতি উসুল নিয়ে কথা তুলেন। কেন এই প্রসঙ্গ তিনি তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন?

তিনি আওয়াজ তুলেছিলেন এভাবে যে, “ওয়ার অন টেরর” ৪০ হাজার পাকিস্তানির জীবন নিয়েছে, অথচ এটা তো আমাদের যুদ্ধ ছিল না। আর এছাড়া তিনি এক বোমসেল ফাটানোর মত ফিগার বলা শুরু করেন যে – “এই যুদ্ধে পাকিস্তানের ৭০ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ক্ষয়ক্ষতি বা বিনষ্ট হয়েছে। অথচ এর বিপরীতে এপর্যন্ত (২০১২) আমেরিকা দিয়েছে মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার”।
যদিও আমেরিকার এই অর্থটা দেওয়া, এটা পাকিস্তানকে কোন দয়া বা দান-অনুদান করা নয়। এমন অর্থ দেয়ার একটা খাত যা আমেরিকা সময়ে দিয়ে থাকে তা, “কোয়ালিশন সাপোর্ট ফান্ডের (সিএসএফ)” নামে এক প্রোগ্রামের আওতায়। সিএসএফ হচ্ছে ২০০২ সালে চালু করা একটা চুক্তি। এতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের নেয়া ব্যবস্থা, আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানি সেনা মোতায়েন এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার উপস্থিতি ও অভিযানের জন্য এবং পাকিস্তানের বিভিন্ন অবকাঠামো আমেরিকার ব্যবহার – এসবের কেবল অর্থনৈতিক ব্যয়ভার হিসেবে আমেরিকা পাকিস্তানসহ জড়িত অন্যসব পার্টনার রাষ্ট্রকেও এই ক্ষতিপুরণের অর্থ দিয়ে থাকে। প্রফেসর আলী রিয়াজের হিসেবে, ‘এভাবে ২০০২ সাল থেকে আমেরিকা পাকিস্তানকে ৩৩ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, তার মধ্যে ১৪ বিলিয়ন ডলার হচ্ছে এই (সিএসএফ) খাতে দেয়া অর্থ’ ( ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, প্রথম আলো)। মানে বুঝা গেল যে, ইমরানের দেয়া ফিগারটা মনগড়া নয়; তবে ইমরানের হিসাবটা ২০১২ সাল পর্যন্ত, একারণে ইমরানের মোট অর্থের হিসাবে সম্ভবত সেটা আলী রিয়াজের চেয়ে কম।

সারকথাটা হল ইমরানের এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের কাছে খুবই শক্ত যুক্তি হিসেবে হাজির হয়েছিল। ফলে ইমরানের দাবি করেছেন, এরপর থেকে তার যেকোন সভায় লাখের ওপর লোক-জনসমাবেশ হত। ইমরান এরপর একইভাবে দুর্নীতিতে রাষ্ট্রীয় আয় কত ক্ষতিগ্রস্ত হয় মুখে মুখে করা হিসাবেই তা তুলে ধরা শুরু করেন ও দেখান যে পাকিস্তানে বছরে প্রায় ২.২ ট্রিলিয়ন রুপি দুর্নীতিতে গায়েব হয়ে যায়। পাকিস্তান সরকারের বছরের বাজেট প্রায়  তিন ট্রিলিয়ন। অথচ প্রতি বছর ১.২ ট্রিলিয়ন রুপির মত ঘাটতি থেকে যায়। ফলে দেশ ক্রমশঃ ঋণে ডুবতে থাকে। অর্থাৎ একদিকে দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে তার আওয়াজ ইমরান তুলতে থাকেন আর এবার সাথে ফিগার উল্লেখ করে দেখান যে, পাকিস্তানের বিগত ৬০ বছরে মোট বিদেশি ঋণ নেয়া হয়েছিল পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার, আর মাত্র গত চার বছরে (মানে ২০০৮-১২ সালে) এটা এবার লাফিয়ে হয়ে যায় ১২ ট্রিলিয়ন। অর্থাৎ চুরি ও দুর্নীতির তীব্রতা এতই প্রকট যে এর সোজা এফেক্ট রাষ্ট্রের ব্যালেন্স অব পেমেন্টে ঘাটতি, বিদেশী মুদ্রার সঙ্কটে হাজির হয়। এই সঙ্কট প্রথম যাকে সাধারণত আক্রমণ করে থাকে তা হল, জ্বালানি তেল আমদানির মতো যথেষ্ট অর্থ আর রাষ্ট্রের নেই। তাই দিনে ১৪-১৮ ঘণ্টা লোডশেডিং শুরু হয়েছিল। এরই সোজা প্রভাবে মোট দেশজ উৎপাদনে ঘাটতি, অর্থনীতি ভেঙে পড়া। ইমরান হিসাব দিয়ে দেখাচ্ছেন, ঐ চার বছরে, ৬০ রুপির এক ডলার হয়ে যায় ৯১ রুপি। যা এখন ২০১৮ সালে আরও নেমে হয়েছে ১২৩ রুপি।

ইমরানের জন্য প্রথম জয়ের নির্বাচনঃ
নির্বাচন করার মত সিরিয়াস প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসাবে ইমরানের দল পিটিআই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিল, ২০১৩ সালের নির্বাচনে। অর্থাৎ এবারের পাঁচ বছর আগের, গত নির্বাচনে। সেখানের মূল দুটা ঘটনা ছিল। এক. পাকিস্তানি তালেবানদের প্রভাবাধীন এলাকায় তার দল পিটিআইয়ের জনপ্রিয় হয়ে উঠা। আর দুই. “পাকিস্তানের আরব স্প্রিংয়ের” অংশগ্রহণকারি তরুণেরা ঐ প্রথম ইমরানের দলের সাথে নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণ করেছিল। মানে নির্বাচনি প্রচারণায় পিটিআই দলের সাথে ক্যাম্পেইনে অংশগ্রহণ করেছিল। ফলাফলে সেই প্রথম পিটিআই পাখতুন (পুরা নাম খাইবার পাখতুন-খোয়া) প্রদেশে প্রাদেশিক সরকার গঠনের মত ভোট পেয়েছিল। পিটিয়াইয়ের নেতা সংখ্যাগরিষ্ঠতায় (১২৪ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৯ আসন পাওয়া দল) মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিল যদিও তা এক কোয়ালিশন ছিল।

কিন্তু কেন তা সম্ভব হয়েছিল? কারণ যেখানে সেখানে যথেচ্ছাচারে আমেরিকার ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে স্থানীয় জনগণের অতিষ্ঠ হয়ে প্রতিবাদি হয়ে উঠা। যে প্রতিবাদের ভাষা যুগিয়েছিল ইমরান। হয়ত কোন বিয়েবাড়িতে লোকজন জড়ো হয়েছে। কিন্তু সোর্সের ভুল তথ্যে সেটাকে জঙ্গি তালেবানি সমাবেশ মনে করে এর উপর ড্রোন হামলা করে শদুয়েক বাচ্চা-বুড়া হত্যা করা। ইমরান ২০১২ সাল থেকেই এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। তার শক্ত যুক্তি ছিল যে এটা একটা “বিনা বিচারে হত্যার” ঘটনা। কাউকে আপনি সত্যই বা মিথ্যা করে অপরাধ বা অন্যায়কারি মনে করলেই তাকে আপনি হত্যা করতে পারেন না। সে যে অন্যায়কারি সেটা আদালতে প্রমাণিত হতে হবে সবার আগে। তাও সরকারও নয়, একমাত্র রাষ্ট্রের আদালতই তাকে শাস্তি দিতে পারে। অথচ পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আমেরিকা পাকিস্তানের ভুমিতে ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। তাই বিদেশি আমেরিকা, তার যা ইচ্ছা তাই করে কোন ড্রোন হামলা অবশ্যই আমেরিকাকে বন্ধ করতে হবে, সরকারকে এই দাবিতে সোচ্চার হতে হবে।
পাখতুন প্রদেশই আসলে বেশির ভাগ যায়গা যেটা তালেবানের প্রতি জন-সমর্থন ও তাদের  প্রভাবাধীন এলাকা। ইমরান এই বক্তব্য ও অবস্থান ঐ তালেবান প্রভাবাধীন এলাকাগুলোতে সাধারণ মানুষের মাঝে যারা সহজেই অযথা নির্বিচারে ড্রোন হামলার স্বীকার হন – তাদের মাঝে আশার আলো হিসাবে হাজির হয়েছিল। তাই তারা ঐ নির্বাচনে ইমরানের দলকে সমর্থন করেছিল। নির্বিচার ড্রোন হামলায় অতিষ্ঠ ও ক্ষুব্ধ মানুষ, নিজেদের এলাকায় ইমরানকে জন্য নিজেরাই নির্বাচনি জনসভা আয়োজন করেছিল; যেখানে ইমরানকে দাওয়াত দিয়ে নিয়ে গিয়েছিল প্রধান বক্তা হিসাবে। অর্থাৎ আমেরিকান ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে, বিনা বিচারে হত্যার বিরুদ্ধে আওয়াজ উঠিয়ে স্থানীয় মানুষের সাথে নিজের সংযোগ গড়েছিল ইমরান। এরই ফলাফল হিসাবে ইমরানের দল ২০১৩ সালে প্রাদেশিক নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করেছিল।

সারকথাটা হল, ইমরানের এই উপস্থাপন সাধারণ মানুষকে সহজেই এই কার্যকারণ ও চক্রকে চেনাতে পেরেছিল। তার জনপ্রিয়তার কারণ এখানে। তিনি প্রায়শ তুলনা করে বলেছেন, তিনি সারা জীবন ক্রিকেট খেলে, বিদেশে কামিয়ে দেশে সে অর্থ এনেছেন। একারণে তার বিদেশে একাউন্ট বা কোন ব্যাংক ব্যালেন্স নাই। আর অন্যেরা উলটা অর্থ বিদেশে পাচার করে। তারা রাজনীতিতে আমেরিকান চাপের কথা বলে এর আড়ালে অজুহাতে আমেরিকাকে সেবা করেছেন আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থেকে নিজের নামে অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন। অন্য রাজনীতিবিদের সাথে ইমরানের এই রাজনৈতিক অবস্থানের মৌলিক ফারাক, এটাও সেনাবাহিনীকে ইমরানের কাছে আসতে ও আস্থা রাখতে অন্তত একটা কারণ হিসাবে সাহায্য করেছে। কারণ, এই ২০১৮ সালে এসে, আমেরিকার যুদ্ধ করতে করতে ইতোমধ্যে এই অবস্থার উপর পুরাই ক্ষুব্ধ ও হতাশ সেনাবাহিনী। অন্য রাজনীতিকরা সেনাদের হাতে ডিকটেটেড হত, আর ইমরানের অবস্থান তার উপর সেনাদের আস্থা ও তাদের মধ্যে এক অবস্থানগত ঐক্য তৈরি করেছে। পাকিস্তানের বিচার বিভাগও এক ভায়াবল সরকারের স্বপ্ন দেখছে।

আজ আফগান-পাকিস্তানে ১৮ বছরের টানা যুদ্ধের পরে অবস্থাটা সকলের জন্য খুবই শোচনীয়। ব্যাপারটা এমন যে সবাই আমেরিকার আফগানিস্থানে হামলা ভুল ছিল এখান থেকে বক্তব্য শুরু করে। আর যুদ্ধ অনন্তকালে গড়িয়ে যাওয়া, যুদ্ধের খরচে আমেরিকার অর্থনীতি ডুবে যাওয়া ইত্যাদিতে আমেরিকাও এখন পথ খুজছে কীভাবে এখান থেকে আমেরিকা নিজেকে বের করে নিতে পারে। আসলে বাকী তিন পক্ষ (আফগান ও পাকিস্তানি সরকার এবং এই দুই দেশের তালেবানেরা) সকলেই যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত ও হতাশ, সবকিছু তাদের কাছে উদ্দেশ্যহীন এক যাত্রা মনে হওয়া শুরু হয়েছে, ফলে সকলেই এই যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজছে। কিন্তু সমস্যা একটাই, আমেরিকাসহ সকল পক্ষই – এই যুদ্ধ থেকে নিজেকে বের করে নিবার পথ খুজছে বটে কিন্তু সকলেই তা খুঁজছে নিজ নিজ সুবিধাজনক শর্তে।
ওদিকে আমেরিকারও যুদ্ধে নিজের সব দায় পাকিস্তানের উপরে চাপিয়ে এখন যুদ্ধ থেকে একা পালাতে চাইছে। সে মধ্যস্ততাকারিও নয়, একমাত্র সফল মধ্যস্ততাকারি চীন যার উপর তালেবানেরা আস্থা রাখে । আমেরিকাও চায় চীন মধ্যস্ততা করে দিক। যদিও তা আমেরিকার শর্তে হলে ভাল। ফলে সকলেরই ভরসা একমাত্র চীনা উদ্যোগে তালেবানদের সাথে আপোষ আলোচনা। একারণেই পাকিস্তানের সেনাবাহিনীও সবার আগে আমেরিকার দায় ফেলে নিজ দেশের স্বার্থকে  প্রায়োরিটিতে রেখে বের হবার পথে খুজছে। আর একাজে তারা সবচেয়ে যোগ্য দল হিসাবে ইমরানের রাজনৈতিক অবস্থানকে আশ্রয় করে উঠতে চাইছে। এটাই ইমরানের সাথে সেনাবাহিনীর চিন্তা অবস্থানের এক ঐক্য তৈরি করেছে।

কিন্তু আজ ইমরান ক্ষমতায় এসেছেন এমন এক অবস্থায় যখন দুর্নীতিতে খোকলা হয়ে পড়া পাকিস্তানের অর্থনৈতিক অবস্থার দশা খুবই শোচনীয়। মানে দেশের খুবই খারাপ অর্থনৈতিক অবস্থা তাঁর বিপক্ষে। ১২ বিলিয়ন ডলার তাকে ঋণ নিতে হবে, আমেরিকা রাজি থাকলে আইএমএফের কাছ থেকে। আর ডাটফাট দেখালে এর বিকল্পও আছে। বাধ্য হয়ে পাকিস্তান সৌদিরাষ্ট্র ও রাজনীতির স্বার্থে ইয়েমেন যুদ্ধের দায় নিয়ে বিনিময়ে ঋণ পেতে হবে। সুবিধা একটাই, অর্থ নিয়ে বসে আছে সৌদিরা।  ইমরান যদিও সৌদিদের ইয়েমেন-যুদ্ধে পাকিস্তানের জড়ানো উচিত না বলে গত ৫-৭ বছর আগে শুরু থেকেই নিজের অবস্থান ব্যক্ত করে আসছিলেন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ইমরানকে সাময়িক সেই অবস্থান স্থগিত করে তুলে রাখতে হবে। সৌদি ঋণ পাবার স্বার্থে সাময়িক এই অবস্থান নিতে হবে। ওদিকে আর কিছু অংশ ঋণ চীনের কাছ থেকে পেতে হবে, তারাও রাজি, ইতোমধ্যে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রীর পাকিস্তান সফরে কথা হয়েছে।
তবু সবমিলিয়ে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষের বুকবাধা আশা – এটা নতুন এক পাকিস্তান হবে, তাদের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দিশা দেখাবেন। কঠিন পথ হলেও ইমরান নেতৃত্ব দিয়ে সবাইকে আগিয়ে নিবেন। নিঃসন্দেহে, এ’এক বিরাট চ্যালেঞ্জ!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ইমরান কেন প্রধানমন্ত্রী হতে পারলেন  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

“কাশেম বিন আবুবাকার” আসিতেছে

“কাশেম বিন আবুবাকার” আসিতেছে

গৌতম দাস
০২ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:০৫

http://wp.me/p1sCvy-2f6

কাশেম বিন আবুবাকার নিয়ে গত কয়েক দিন ধরে মিডিয়ায় মানে, টিভি টকশো, নিউজ, প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক মিডিয়া বা সোস্যাল মিডিয়া সবখানেই তোলপাড় চলছিল; এক বহুল উচ্চারিত নাম তিনি। তাও শুধু দেশে নয়, প্যারিসভিত্তিক সংবাদ সংস্থা এএফপির কল্যাণে কাশেম বিন আবুবাকারকে নিয়ে তাদের করা নিউজটা যেসব দেশের স্থানীয় মিডিয়া প্রকাশ করেছে সেসব দেশেও কাশেম বিন আবুবাকারের খবর ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু কী সে খবর? আবুবাকারের কী খবর? এখানে একটু দম ধরে থামতে হবে।
কয়েক বাক্যে মুল খবর হল, বাংলাদেশের ঔপন্যাসিক কাশেম বিন আবুবাকার ইসলামি মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লেখেন। শ’খানেক উপন্যাস লিখেছেন। আধুনিক জগতে অনেকের সন্দেহ থাকতে পারে যে মডার্নিটি বা আধুনিকতাকে শুধু গ্রহণ না করে নয়, রীতিমতো আলিঙ্গন না করে কোন উপন্যাস লেখা সম্ভব কিনা। সে জায়গায় দাঁড়িয়ে বিচার করলে মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে, মডার্নিটিকে পাশ কাটিয়ে সমান্তরালে ইসলামি মরালিটির ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লেখা কি সম্ভব? বিশেষ করে যখন ইউরোপের আধুনিকতার যেসব ভিত্তিগত ধারণা ও মূল্যবোধ বা সে মরালিটির ওপর ভর করে সাহিত্য উপন্যাস লেখা ও চর্চার ধারা গড়ে উঠেছে বহু আগেই এবং এর প্রভাবে দুনিয়াতে প্রায় সব শহরে প্রবল প্রভাব ছেয়ে গেছে! দুনিয়াতে নানা জায়গায় এর প্রভাব পড়েছে পশ্চিমা উপনিবেশবাদী শাসক সূত্রে; তাদের আধুনিকতা ও এনলাইটেনমেন্টের চিন্তা ও তৎপরতার প্রভাবে আমাদের মতো দেশে এরই প্রভাবিত ধারা ও এর চর্চা গড়ে উঠেছে। আর সেটাই প্রধান ধারা হওয়ার দাবিতে নিজের আসন পোক্ত করে নিয়েছে! এরপরে আর কি ইসলামি মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস বা ফিকশন সম্ভব নয়? [উপরের কথাগুলো লিখেছি এটা ধরে নিয়ে যে আধুনিকতার ভিত্তিগিত ধারণা ও এর উপর দাঁড়ানো মুল্যবোধ আর ইসলামি মুল্যবোধে বড় ফারাক আছে। যদিও সে ফারাক কী, কোথায় সে প্রসঙ্গের বিস্তারে এখানে যাই নাই।]

আধুনিকতার এমন বাস্তবতাতেও কাশেম বিন আবুবাকার হলেন সেই লোক যিনি আধুনিকতার ভিত্তিগত ধারণা ও মূল্যবোধের বাইরে সমান্তরালে (যদিও ক্রিটিক্যালি বললে আধুনিকতার  প্রভাবের বাইরে থাকা একালে কারো পক্ষেই আর সম্ভব নয়, ফলে তিনিও পুরোপুরি বা ঠিক বাইরে নন) ইসলামি মরালিটির ওপর দাঁড়িয়ে উপন্যাস লিখে যাচ্ছেন। নয়া ধারা সৃষ্টি করেছেন। এর চেয়েও বড় কথা তার উপন্যাস আবার যে সে উপন্যাস নয়, তাঁর একেবারে ৮৫ শতাংশ লেখা মূলত রোমান্টিক উপন্যাস। আধুনিক চিন্তায় লেখা উপন্যাসের মৌলিক বৈশিষ্ট্যের কথা খেয়াল রেখে বললে, আবুবাকার অবশ্যই মনোযোগ পাওয়ার দাবিদার। মনে হতে পারে অনেকেই তো অনেক কিছু লেখেন, লিখেছেন, কিন্তু তা হয়তো শেষে ঠাঁই পায় বালিশের তলায়, আবুবাকারকে কী এই অর্থে রোমান্টিক উপন্যাস লেখক বলা হচ্ছে? না অবশ্যই না, একেবারেই না। তবে উপন্যাসের সাহিত্য-মূল্য বিচার, এটা সেকুলার মডার্ন জগতেও যথেষ্ট জটিল, থিতু বা সেটেলড্ নয়। ফলে সে দিকটা এখানে উহ্য রেখেও বলা যায় – তার লেখার পাঠক আছে কিনা, সে পাঠকেরা ব্যাপক কিনা, সে পাঠকেরা আবুবাকারের উপন্যাসের সাথে নিজেকে সম্পর্কিত, যেন নিজেরই জীবনের ঘটনার প্রতিচ্ছবি দেখছেন বলে মনে করেন কিনা, এই বিচারে বলা যায় আবুবাকার একজন সফল ঔপন্যাসিক। তিনি তাঁর পাঠকপ্রিয় এবং প্রধান ধারার নাম কামানো ঔপন্যাসিকদের চেয়েও তার পাঠক সংখ্যা বেশি। তবে স্বভাবতই তার পাঠকরা ভিন্ন ক্যাটাগরির যাদেরকে ভিন্ন অর্থনৈতিক ভিত্তি, সামাজিক মর্যাদার স্তর ভিত্তি, মূল্যবোধের ভিত্তি ইত্যাদি অনেক কিছু দিয়েই আলাদা করা সম্ভব। আবার যারা প্রধান ধারার পাঠক সেই ক্যাটাগরিরও কিছু অংশ তারও পাঠক। এই বিচারে এক কথায় বলা যায়, আবুবাকার প্রতিষ্ঠিত ঔপন্যাসিক। তাঁর প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস ‘ফুটন্ত গোলাপ’ ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়েছিল আর, ২০১১ সালের খবর হলো সেটা ছিল ত্রিশতম সংস্করণ প্রকাশিত। যদিও টিভি সাক্ষাতকারে  তিনি বলেছেন এটা আরও বেশি হতে পারে। কারণ রয়েলিটি না দেওয়ার জন্য প্রকাশকেরা অনেক সংস্করণের খবর প্রিন্টে উল্লেখ করে না।  আর তাঁর দেয়া ধারণা মতে, প্রতি সংস্করণ বই প্রকাশ সংখ্যা ৩০০০-এর কম নয়।

একথা ঠিক যে মিডিয়া তাকে নিয়ে তোলপাড় করছে। কিন্তু যতগুলো মিডিয়া আলোচনা ও মন্তব্য শোনা, জানা বা কাউকে করতে দেখা গিয়েছে তাতে খুবই নগণ্য সংখ্যক (প্রায় কেউ নয়) দাবি করেছেন যে, তিনি আবুবাকারের কোনো উপন্যাস পড়েছেন। মূল কথা হল, মিডিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়েছে যে আবুবাকার তাঁর উপন্যাস পাঠক জগতে এত বিখ্যাত অথচ মিডিয়া সেটা জানে না কেন? ফলে খোদ মিডিয়া এবং সেকুলার পাঠক পেরেসান হয়ে গেছে যে তাদের কালচারাল নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তাদের প্রভাবকে তুচ্ছ করে ইতোমধ্যেই গজিয়ে যাওয়া হাজির কাশেম বিন আবুবাকার ফেনোমেনাকে তারা কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন।  উপায়ন্ত না পেয়ে তারা  তাঁকে নিচা দেখানো বা খাটো তুচ্ছ করে হাজির করতে চেষ্টা করছেন। যেমন তাদের ট্যাগ হল, তিনি “চটুল” লেখক, তিনি “ইসলামি যৌনতার” লেখক ইত্যাদি। আর সব তর্ক-বিতর্ক আলোচনা চলছে এসব মিথ্যা ভিত্তিহীন ট্যাগের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে। কিন্তু তাদের কালি লাগানোর সব প্রচেষ্টা ঢলে পড়েছে। এর মূল কারণ এরা সবাই স্বীকার যে তারা কেউই আবুবাকারের কোন উপন্যাসই কোনদিন পড়েন নাই। এছাড়া আরও বড় প্রশ্ন আছে, উপন্যাস পড়া এক জিনিষ আর উপন্যাসের মুল্যায়ন-সক্ষমতা কী সবার আছে? সাহিত্যের ভিতর থেকে প্রকাশিত সামাজিক মন, সমাজতত্ত্ব বের করে আনা, দেখতে পাওয়া, ট্রেন্ড ব্যাখ্যা  করা কিংবা লিখায় লেখকের লিখাকালীন সমসাময়িক রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাব কী কতটুকু – এসব কিছু যথেষ্ট সিরিয়াস ও পেশাদারি কাজ – এসব কাজ আমপাঠকের কাজ নয়। অতএব, এক কথায় বললে প্রায় প্রত্যেকেই নিজের অযোগ্যতা বা মনের ক্ষোভ মিটাতে ইচ্ছামতন মন্তব্য করছেন ট্যাগ লাগাচ্ছেন। কিন্তু কঠিন সত্যি হল, প্রথমত এরা কেউই আবুবাকারের কোন উপন্যাসই কোনদিন পড়েন নাই।  কোন উপন্যাসে এটা আছে এমন কোন রেফারেন্স উল্লেখ করে কেউ অভিযোগ করছেন না।  ৭১ টিভি টকশোতে এঙকর শুরুতেই খোদ আবুবাকারের সাথে কথা বলতে গিয়ে অবলীলায় এক বিশেষণ লাগিয়ে কথা বলছেন, “আপনার চটুল উপন্যাস”। আবুবাকার পাল্টা যখন জিজ্ঞাসা করলেন “চটুল উপন্যাস বলতে আপনি কী বুঝাচ্ছেন” এঙকর তখন আর তার ব্যবহৃত বিশেষণ এর পক্ষে কোন সাফাই পেশ করতে পারলেন না, চুপচাপ এড়িয়ে গেলেন। বলা বাহুল্য ঐ টকশোতে প্যানেলিস্ট কেউ ছিলেন না যে আবুবাকারের কোন উপন্যাস পাঠ করেছেন।

দৈনিক বাংলা ট্রিবিউন ২৭ এপ্রিল এক সাক্ষাতকার নিয়েছে। সেখানে, “আপনি কেন পাঠকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠলেন, এ প্রশ্নের জবাবে আবুবাকার বলছেন,   “আমি মানুষকে মানুষ করতে চেয়েছি লেখার মধ্য দিয়ে। মুসলমান হয়ে চরিত্রহীন হলে চলবে না। আল্লাহর কথা মতো যারা চলে না, তারা তো মুসলমান না। আমি মানুষের বিবেককে নাড়া দিতে চেয়েছি বলে আমি জনপ্রিয়”। কিন্তু প্রশ্নকর্তা এবার জানতে চান “ইসলামি উপন্যাস” ইসলাম অনুমোদন করে কি না। অর্থাত প্রশ্নকর্তা নিজেই আবুবাকারের উপন্যাসেকে “ইসলামি উপন্যাস” লেবাস বা নামকরণ দিয়ে দিলেন।  এর বিপদ বুঝতে পেরে আবুবাকার পরিস্কার করে দিলেন, ‘আমি তো ইসলামি উপন্যাস লিখিনি। আমি ইসলামি ভাবকে কাজে লাগিয়ে উপন্যাস লিখেছি। কোরআন-হাদিসের আলোকে রোমান্টিসিজমের কথা লিখেছি”।  এছাড়া অনেকে দ্বিধা করেন জটিলতা পাকায়  ফেলেন যে প্রেম ও ইসলাম এর সম্পর্ক কী, এরা কী পরস্পর বিরোধী অথবা প্রেম মানেই তা যৌনতা কীনা।  তিনি এসব ধারণা পরিস্কার করার চেষ্টা করে বললেন এভাবে,  “প্রেম তো থাকবেই — ভাইয়ের সঙ্গে, মায়ের সঙ্গে, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে, বিয়ের আগে প্রেমিকের সঙ্গে। কিন্তু সেই প্রেম ভেঙে গেলে প্রেমিকাকে এসিড ছুড়তে হলে সেটা তো প্রেম না, সেটাকে বলে মোহ। আমার বইয়ের মধ্য দিয়ে আমি এগুলোই শেখাতে চেয়েছিলাম পাঠকদের। আর আমার লেখা এই শিক্ষামূলক বই সবাই পড়তে চেয়েছে বলেই আমি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছি”। এছাড়া এই পত্রিকাও শুরুতে পরিচিতিমূলক বক্তব্য আবুবাকারার উপন্যাসকে বলছেন “প্রেমের চটুল গল্পের”। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি যারা চটুল শব্দ ব্যবহার করছেন তারা কেউ তার উপন্যস না পড়েই প্রিযুডিস (আগাম বিচারবিবেচনা করা ছাড়া ধারণা) থেকে সেকুলার নাক সিটকানো থেকে কথা বলছেন।  তিনি বলছেন শালীনতার কথা, শালীনতা রেখেও প্রেমের পথের কথা – ইসলামি মুল্যবোধের হেদায়েতের কথা আর এর বিপরীতে সেকুলার অভিযোগ হল তিনি নাকি চটুল গল্প লিখছেন, ইসলামি লেবাসে যৌনতা লিখছেন।

ওদিকে প্রেম ও ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে তিনি আরও পরিস্কার করে কথা বলেছেন আর এক অনলাইন পত্রিকায়। তিনি বলছেন, (প্রেম ও ইসলামের সম্পর্ক কী) “এ প্রশ্নের মুখোমুখি আমি বার বার হয়েছি। আমি ইসলামের কথা বলি প্রেমের উপন্যাসে। কেউ কেউ আমাকে বলেছেনও আমি অর্থ উপার্জনের জন্য এমন করেছি। কিন্তু আমার মন জানে আমি কেনো করেছি। আমি চিন্তা করেছি অন্য জায়গা থেকে। আমি প্রেমকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করেছি। কারণ, আমরা যতো বাধাই দেই না কেনো যুবকদের প্রেমবিমুখ করতে পারবো না। তাই আমি প্রেমকেই বাহক হিসেবে বেছে নিলাম এবং তাদের কাছে ইসলামের বার্তা পৌঁছে দিলাম। তাদের বোঝালাম, প্রেমের লাভ-ক্ষতি হিসেব কিন্তু আমি আমার উপন্যাসে দিয়েছি। বিশেষ করে সীমালঙ্ঘন যেনো না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক করেছি”। অর্থাৎ আমরা দেখছি এমন লোককে চটুল গল্প লেখক বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

পরের প্রসঙ্গে যাওয়ার আগেই খোদ এএফপির রিপোর্টে এক বিপজ্জনক মন্তব্য আছে তা নিয়ে কথা। আর তা থেকে এই রিপোর্ট এখন প্রকাশ করার উদ্দেশ্য কী তা কিছুটা আন্দাজ করা যায় সম্ভবত। বলা হয়েছে, “আবুবাকারের (কাজকে এখন নাকি) এক নবজাগরণের বা এক রেনেসাঁর মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে তা হল, যাতে বাংলাদেশের যুগ যুগ ধরে জারি থাকা মডারেট মুসলমান পরিচয় এখন থেকে এটা  ধর্মীয় কালামের আরো রক্ষণশীল ব্যাখ্যার দিকে ঢলে পড়ছে”।
Now his work is undergoing something of a renaissance as Bangladesh slides from the moderate Islam worshipped for generations to a more conservative interpretation of the scriptures.’

এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আবুবাকারের রোমান্টিক উপন্যাসের সাথে সাম্প্রতিককালের হেফাজতের (আওয়ামি লীগের ঘনিষ্ঠতার) সম্পর্ক আছে এবং এটা নেতিবাচক।
একাত্তর টিভির একটা টকশো হয়েছিল যার শিরোনাম ‘লেখক কাসেম বিন আবুবাকার লাইভে এসে লেখা ও নিজের সম্পর্কে যা বললেন’– এভাবে সেটা ইউটিউবে ২৮ এপ্রিল আপলোড হয়েছে। আলোচনায় প্যানেলে ছিলেন রবীন আহসান, প্রকাশক ও সম্পাদক বই নিউজ ২৪; তিনিই মুলত আবুবাকারের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগকারী, একমাত্র তিনি অভিযোগ তুলছিলেন। এএফপি কী বুঝাতে ওই রিপোর্ট করেছিল তা রবীন এহসানের অভিযোগ থেকে আঁচ করা যায়। রবীন একই কথা অনেক ব্তযাখ্বেযা করে বলার পেয়েছেন বা নিয়েছেন। তবে রবীনের বক্তব্যের উপস্থাপন ছিল একটা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের মত। বলতে চেয়েছেন, এএফপির রিপোর্ট ছিল যেন ‘বিদেশীদের ষড়যন্ত্র’। আর সে ষড়যন্ত্রের কথা বলতে চাওয়ার ছলে রবীন আঙুল তুলেছেন আবুবাকারের দিকে। বলছেন, আবুবাকার সেই ‘ষড়যন্ত্র প্রজেক্টে’ শামিল ।

রবীনের কিছু বক্তব্যের অংশ বিশেষ তুলে ধরছি এখানে: “তিনি ধর্মীয় মূল্যবোধ তৈরি করার জন্য উপন্যাস লিখেছেন। আমার যেটা মনে হয়েছে, এটা একটা প্রজেক্টের মতো। আবুবাকার একটা প্রজেক্টের মধ্যে ছিলেন। ত্রিশ বছরে তিনি যা লিখেছেন, এর প্রতিফলন সমাজের মধ্যে পড়েছে। তার উপন্যাসের নাম হচ্ছে ‘বোরখা পরা সেই মেয়েটি’ [ফ্যাক্টস হলো এই  উপন্যাস আবুবাকারের লেখা নয়]। তার উপন্যাসের ভেতর তার নায়ক-নায়িকারা যেভাবে কথা বলেন এবং বোরখা পরে, হিজাব পরে, এরকম সব চরিত্র হচ্ছে তার উপন্যাস এবং নিজেই যখন বলেছেন ইসলামি মূল্যবোধ তৈরি করার জন্যই তিনি লিখছেন। এজন্য কিন্তু তিনি সফল। মানে বাংলাদেশের যে সমাজ, যে সমাজের মধ্যে আমরা আছি, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এই যে ইসলামি মূল্যবোধ নিয়ে লেখা এবং ইসলামি মূল্যবোধকে সাহিত্যের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে সমাজের মধ্যে প্রয়োগ করা, এতে কিন্তু কাসেম সফল হয়েছেন। তার আজকে যে ঢালাও করে প্রচার প্রপাগান্ডা পশ্চিমা দেশে হয়েছে, সেটার কিন্তু প্রমাণ হচ্ছে যে, হঠাৎ করে নিউজটা হয়েছে যখন কোনো বইমেলা নেই; তখন দেখা যাচ্ছে ইসলামি বই লাখ লাখ বিক্রি হচ্ছে-এই রকম একটা সংবাদ হয়েছে। আমি বলব, সমাজে যখন হেফাজতে ইসলামের একটা গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, ইসলামি সব দলের একটা সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে এবং এই গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে আবুবাকারের একটা অবদান আছে। এই যে ত্রিশ বছর পর্যন্ত তিনি লিখেছেন যে ইসলামি মূল্যবোধ তৈরি করবেন, ইসলামি নায়ক বানাবেন, নায়িকা বানাবেন, বোরখা পরে চলাচল করবে, আমরা কিন্তু সেটাই সমাজে দেখছি।’
[এই অনুলিপি আমার করা, কাজ চালানোর জন্য। এতে দু-একটা শব্দ এদিক ওদিক হতে পারে। তাই একেবারে সঠিক স্ক্রিপ্টের জন্য মূল ইউটিউব নিজে দেখে নেবেন, অনলাইনে। উপরে লিঙ্ক দিয়েছি।]

এখন মূল কথা হল, রবীন এখানে আবুবাকারকে অভিযুক্ত করছেন উপন্যাসে ইসলামি মূল্যবোধ আনা, চর্চা বা জাগানোর চেষ্টা করার জন্য। যদি রবীনের একথাকে ফ্যাক্টস হিসাবে-একেবারে সত্যি বলে ধরেও নেই, তার পরেও বলতে হয়-ইসলামি মূল্যবোধ জাগানোর চেষ্টা করা কি অন্যায়? অপরাধ? ইসলামি বা আধুনিক যেকোন মুল্যবোধ প্রচার যে কেউ করতে পারে। আর তা বিচার বিবেচনা করে গ্রহণ -বর্জনের অধিকারও সকলের।  আবুবাকার এখানে ইসলামি এথিক্স / মরালিটির কথা বলছেন। একটা মরালিটির চর্চাকে অন্যায় বলবেন কি করে, একে অপরাধ বলবেন কী করে? আবুবাকার কারও কপালে বন্দুক ধরে মূল্যবোধের চর্চার কথা বলছেন না। তিনি এটা করতে আহ্বান রাখছেন কোন প্রবন্ধ লিখেও না- আরও নরম করে, একেবারে রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লিখে। অথচ এটাকেও রবীন আহসান অপরাধ মনে করছেন। ফলে এটা এক জাতীয় ইসলামবিদ্বেষ ছাড়া অন্য কিছু বলার সুযোগ দেখছি না। এটা হতেই পারে যে, রবীন ইসলামি মূল্যবোধ পছন্দ করেন না, তাই তিনি এই মূল্যবোধ বর্জন করতে পারেন, এমনকি এর ‘অসুবিধা’র দিক নিয়েও পাল্টা প্রচার করতে পারেন। এছাড়া তিনি অবশ্যই ইসলামি মূল্যবোধের চেয়েও ভিন্ন, ভালো এবং কার্যকর মূল্যবোধ নিয়ে এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারেন। কিন্তু তিনি এটা ইসলামি হওয়াটাই যেন অপরাধ, সে হিসেবে ধরে নিয়ে কথা বলেছেন। এটা তাঁর লাইন ক্রশ।

রবীন আহমদ হেফাজতসহ ইসলামি দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ আনছেন। সত্যি এ’এক তামাসা বলতেই হয়। কোন চিন্তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে গেলে কি কাউকে অভিযুক্ত করা যায়? এটা তো ওই চিন্তা প্রচারকারীদের গৌরব যে, মানুষ তাদের কথা শুনেছে। রবীনের উলটো এটাকে অভিযোগ হিসেবে নেয়া বা অন্যায় মনে করেই বরং এক ঘৃণা ও বিদ্বেষ পোষণ করা নয় কী? এটা আইনি বিচারি চোখেও অন্যায় কাজ।
এএফপি যেন আসলে ঠিক রবীনের মতোই সাজেশন রাখতে চেয়েছিল। অভিযুক্ত করতে চাইছিল যে কাসেম বিন আবুবাকার রোমান্টিক উপন্যাস লিখে দোষী। কারণ এতেই ইসলামি দলগুলোর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে, আর যেন ঠিক এ কারণেই হাসিনা হেফাজতের সাথে আপস করেছেন। এটা কাকতালীয় শব্দটার চেয়েও বেশি কাকতালীয় বক্তব্য সন্দেহ নেই। এমনকি ৭১ টিভির ওই টকশোতে অংশগ্রহণকারী আর এক প্যানেলিস্ট ভোরের কাগজের সম্পাদক শ্যামল দত্তকেও রবীন আহসান তার কাকতালীয় দাবি ‘খাওয়াতে’ পারেননি। শ্যামল দত্ত অন ক্যামেরা প্রকাশ্যে তার আপত্তির কথা জানিয়েছেন।

ওদিকে সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আরেক তথ্য জানা যাচ্ছে। উপরে এএফপির রিপোর্ট থেকে যে ইংরেজি উদ্ধৃতি দিয়েছি, যেটা ওই নিউজ মিডিয়া (কনসার্ন-বোধ করে) উদ্বেগ বোধ করেছিল – এভাবে জানিয়েছিল। পরবর্তিতে এই রিপোর্ট ফলে ঐ একই উদ্বৃতিও চোখে  পড়েছিল স্টিভ ব্যাননের।  তিনি হচ্ছেন, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের  প্রধান পরিকল্পনা প্রণয়নকারী ( চিফ স্ট্রাটেজিস্ট)। হকিস আগ্রাসী ভুমিকার যে ট্রাম্পকে আমরা দেখেছিলাম বছরের শুরুতে এই নীতি প্রণয়নকারীদের বস তিনি। তবে ছিলেন বলতে হবে কারণ সম্প্রতি তাকে সাইজ করা হয়েছে, বহু পদ-পদবি ও দায়ীত্ব থেকে তাকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।  স্টিভ ব্যাননও  ঐ উদ্বৃতি তুলে নিয়ে তার নিজের ওয়েবসাইটে সেটে দিয়ে  উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এটা সত্যিই মজাদার ব্যাপার যে, রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাসে লিখেও বাংলাদেশের আবুবাকারা “জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে” লড়াকুদেরও উদ্বেগের মুখে ফেলা দিতে পারেন!

বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান একাডেমিক, গবেষক ও বাংলাদেশ এক্সপার্ট ড. আলী রীয়াজ। তিনি আবুবাকার ইস্যুতে ফেসবুকে তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তাকে সম্ভাবত এই প্রথম একাডেমিকের ভঙ্গিতে দেখা গেল যে, কোনো ইস্যুতে তিনি সহজে কোনো পক্ষ না নিয়ে একাডেমিক অবজারভারের অবস্থান নিলেন। অবশ্য তার বক্তব্যের বেশ কিছু অংশ ফ্যাক্টস হিসেবে সত্যি নয়।

তিনি লিখেছেন, “বাংলাদেশের সোস্যাল মিডিয়ায় যারা সক্রিয় তাদের এক বড় অংশ শেষ পর্যন্ত ঔপন্যাসিক কাসেম বিন আবুবাকারকে ‘আবিষ্কার’ করতে সক্ষম হয়েছেন; সে জন্য তারা অবশ্যই পশ্চিমা গণমাধ্যমের, বিশেষত ব্রিটেনের ডেইলি মেইল-এর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন, অবশ্যই এএফপির কাছে। কিন্তু আবিষ্কারের পরে তাদের আলোচনা থেকে বোঝা যাচ্ছে, এই লেখকের বিষয়ে তারা কিছু না জানায় বিস্মিত এবং খানিকটা ক্ষুব্ধ”।
এটা আলী রীয়াজের স্টাটাসের প্রথম দুই বাক্য। কিন্তু … আবুবাকারকে ‘আবিষ্কার’ করতে সক্ষম হয়েছেন বলে… ‘সে জন্য তারা অবশ্যই পশ্চিমা গণমাধ্যমের, বিশেষত ব্রিটেনের ডেইলি মেইল-এর কাছে কৃতজ্ঞ থাকবেন’- এই বাক্যটা ফ্যাক্টস নয়। এটা বরং উলটো। কারণ এবারের আগে সোস্যাল মিডিয়ায় আবুবাকার ‘আবিষ্কৃত’ হয়েছিলেন অন্তত গত বছর ডিসেম্বরে। পরে এএফপিতে তিনি রিপোর্টেড হয়েছেন মাত্র সেদিন।
দ্বিতীয়ত, আলী রিয়াজ “ইসলামপন্থী জনপরিমণ্ডলব্যবস্থার” আলাপ তুলেছেন। অর্থাৎ এএফপির মতো আবুবাকারা আর হেফাজত-সরকারের সম্কাপর্কক নিয়ে কাকতালীয় উদ্বেগ জানাতে যাননি ঠিকই, তবে একাডেমিকভাবে আর খুবই নরমভাবে প্রায় একই কথা বলছেন। ‘জনপরিমণ্ডল’ খুবই খটমটে শব্দ মনে হতে পারে অনেকের কাছে তাই সারকথাটা বলে রাখি। তিনি বলছেন, বাংলাদেশ আরও ইসলামি মূল্যবোধের (আবুবাকারার রোমান্টিক উপন্যাসের মাধ্যমে) গভীরে ঢুকে গেলে এর যে সামাজিক প্রভাব তৈরি হবে (যা ভালো মন্দ বহু কিছু) এরপর আবার সেগুলোর পরোক্ষ ফলাফলে তা কতটা আমেরিকার বিরুদ্ধে যাবে, সেটা সমাজতত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যাবিশ্লেষণ করে বুঝতে হবে। ফলে সরাসরি আবুবাকারের রোমান্টিক উপন্যাস লেখা দেখে আমেরিকার জন্য কেঁদে উদ্বেগে হাহুতাশ করে ওঠা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

তিনি বলছেন, “এ ধরনের উপন্যাস জনপরিমণ্ডলের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। এ বিষয়ে মনোনিবেশ করা দরকার কাউকে নিন্দা করার (ভিলিফাই অর্থে) জন্য নয়, বরঞ্চ জনপরিসরের মধ্যে যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে তা বোঝার জন্য”।

এখানে তিনি বলেছেন, ‘জনপরিমণ্ডলের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ’- এখানে ‘ইসলামীকরণ’ শব্দের ব্যবহার না করলেই তিনি ভালো করতেন। যে দেশের ডেমোগ্রাফিক্যালি মুসলমানের, তাকে আর ‘ইসলামীকরণ’-এর অভিযোগ করা কি চলে? ও ন্যাচারালভাবে যাই করবে তার মধ্যে ইসলামই তো দেখা যাবে, ছাপ থাকবে। তাই নয় কী? তাহলে তিনি বলছেন ‘ইসলামীকরণ’ কিন্তু বুঝাতে চাইছেন সম্ভবত অন্য কিছু। আবুবাকার মুসলমান হিসাবে যদি প্রেমের উপন্যাস লিখে ইসলামি মরালিটির প্রচার এবং প্রদর্শন করেন তাহলে এটাই কী খুবই স্বাভাবিক নয়, স্বাভাবিক “ইসলামিকরণ” নয়? এর মধ্যে নেগেটিভ কী দেখলেন? এটা কী বেআইনী? মুসলমানের হাঁচি কাশিতেও নিজের বিপদ দেখলে, নিজের আধিপত্য কমে যাওয়ার সম্ভাবনা খুজে পেলে আমার মনে হয় না তাকে সাহায্য করতে পারবে? আর এখানে আধিপত্য হারানোর ট্রমা – এই মানসিক রোগে চিকিতসা ছাড়া সাহায্যেরই বা কী আছে?   বাংলাদেশের এক কমিউনিস্ট মুসলিম তরুণের বাবা মারা গিয়েছেন। তিনি দলের পত্রিকাও দেখাশুনা করেন। তো পত্রিকায় তিনি চার লাইনের এক কলামের সংবাদ লিখলেন, তার বাবা ওমুক মারা গিয়েছেন ইত্যাদি এবং ওমুক গোরস্থানে তার কবর হয়েছে। কিন্তু সম্পাদক ঐ খবরটার “কবর” শব্দটা এডিট করে লিখলেন – তার “সমাধি” হয়েছে। জিজ্ঞাসা করলে জানালেন “কবর সাম্প্রদায়িক শব্দ” তাই ছেটে দিয়েছেন। এই সম্পাদকও আধিপত্য ও নিয়ন্ত্রণ হারানোর ট্রমাতে ভুগছেন। তবে আমাদের বাড়তি লাভ হল, আমরা সাম্প্রদায়িক শব্দের আসল সংজ্ঞা জেনে নিলাম।

আর তবুও তিনি যদি অভিযোগ করতেই চান, এই যে ইসলামিকরণ হয়ে গেল কীনা বোধের ট্রমা,  এতে নন-ইসলামি পশ্চিমা সরকার ও জনগোষ্ঠীর কি দায় ভূমিকা নেই?

সংক্ষেপে আরো কিছু সিরিয়াস স্পষ্ট আপত্তির কথা জানিয়ে রাখা যায়। ঘটনা হল, কাসেম বিন আবুবাকার মূলত মুসলিম লীগ – এই ধারার প্রডাক্ট বা ফসল। যে অর্থে আমেরিকায় জঙ্গিবাদ শব্দ ব্যবহার করা হয় সে অর্থে মুসলিম লীগ আর আলকায়েদা দুটোই ইসলামি হলেও  দুটোই একই ফেনোমেনা নয়। যেমন আবুবাকার তার গল্পে কোথাও সশস্ত্র পন্থার পক্ষে বলেনি। তা সত্ত্বেও তাকে কি আমরা ইসলামি মূল্যবোধের পক্ষেও কথা বলতে দেব না?  আবুবাকার এক রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লেখাতে, এই “ইসলামিকরণে” যদি আমেরিকার গায়ে ফোস্কা পড়ে তাহলে, এই আমেরিকা লয়া আমরা কী করিব? ইহাকে কোথায় রাখিব?

শেষ পয়েন্ট : বলতে গেলে এই চলতি শতকে (২০০১ সালের পরে) আরও উপন্যাস লেখেন নাই। অর্থাৎ ৯/১১ এর পরে বাকার আর উপন্যাস লেখেননি। গত শতক ছিল মূলত জাতীয়তাবাদী ইসলামের। আর ইরানি বিপ্লবের অভিজ্ঞতা বাদ রাখলে গত শতকে পোস্ট-কলোনি সময়কালের ইসলাম মূলত জাতীয়তাবাদী ইসলামই; এবং তা আবার ‘এ প্রডাক্ট অব মডার্নিটি’ অর্থে।

আবুবাকারের সবচেয়ে বিখ্যাত রোমান্টিক উপন্যাস “ফূটন্ত গোলাপ”। আমাদের দুর্ভাগ্য যে বিখাত সব আলোচকদের বেশীর ভাগই এই “ফূটন্ত গোলাপ” সহ কোন উপন্যাসই পড়ে দেখেন নাই। পড়লে দেখতেন এটা (মোটাদাগে ১৯০০ সালের পরে কলোনিয়াল কিন্তু হিন্দু ডমিনেটেড ) কলকাতা কেন্দ্রিক টিপিকাল মধ্যবিত্তের মডেল এর আলোকে লেখা কিন্তু ঢাকার মধ্যবিত্ত। বড়লোক নায়ক গুলসানের ও নায়িকা পুরান ঢাকার, দুজনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডেন্ট। নায়িকার ফ্যামিলির মর্ডানসহ ইসলামি ভ্যালু দ্বারা পরিচালিত হতে অভ্যস্ত, আর নায়কের ফ্যামিলি মর্ডান কিন্তু নামাজ পড়তেও জানে না। এবং নায়িকার ব্যক্তিত্ব এবং নেতৃত্ব যা লেখক ফুটিয়ের তুলেছেন সেজন্য কাশেম বিন আবুবাকার আপনি আমার সালাম নিবেন। বহু প্রগতিশীল এমন ব্যক্তিত্ব ধারে কাছে নয়।  লেখককে ইসলামি মরালিটির ক্ষমতা দেখাতে হবে সেজন্য তিনি লিখতে বসেছেন। ফলে এখানে আবুবাকারের মডেল হল নায়িকা লাঈলি। এই হল কলোনির হাত ধরে উঠে আসা চেনা আধুনিকতা যা কলোনি উত্তরকালের জাতীয়তাবাদ – যার প্রতীক হল মুসলীম লীগ। তা অবশ্যই আধুনিকতার ফসল। তবে উপরে পাঞ্চ করা ইসলামি মরালিটি। এই গল্প এই পরিবার আর ইসলামি ভ্যালু। মনে রাখতে হবে গত শতকে আমেরিকার সাথে ইসলামের (মানে জাতীয়তাবাদি কলোনি মর্ডানিজমের) কোনই সমস্যা নাই, ছিল না। তারা বন্ধু। এমনকি আফগান মুজাহিদ এরা একটু ভিন্ন তবুও  তারা আমেরিকার স্ট্রাটেজিক বন্ধু। এর বিপরীতে, একালে চলতি শতকের আলকায়েদার  নিজে কোনো আর অফ প্রডাক্ট অথবা বাই প্রডাক্ট হিসেবেও কোন জাতিবাদী ইসলাম ওটা নয়।
তাহলে আবুবাকার ও তাঁর প্রেমের উপন্যাসকেও আমেরিকা সহ্য করতে পাচ্ছে না কেন? উদ্বিগ্ন হচ্ছে কেন? আসলে এই সমস্যাটা আমেরিকার, আমাদের না। ফলে বলতেই হয়, আবুবাকারাকে নিয়ে যারা এসব উদ্বেগ-ওয়ালারা এরা হয় হেজিমনি হারানোর ভয়ে  ট্রমাটিক না হয় ধান্দাবাজ। কিন্তু মুল কথা এই “উদ্বেগ”  ভুল জায়গায় ‘নক’ করে বেড়াচ্ছে। ভুয়া সেকুলারদের গলা জড়িয়ে অস্হিরতায় কান্নাকাটির রোল তুলতে চাইছে।

তাহলে ব্যাপারটা  হল, একটা রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস লেখাও সহ্য করতে না পারছে না, আমেরিকা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে, কেন? তাহলে আমাদেরই তো আমেরিকান জনপরিমণ্ডলের দিকে তাকাতে হবে, তাই তো না কী?

 সবশেষে পাঠকের কাছে একটা আবেদন রাখব, কাশেম বিন আবুবাকারের কোন একটা উপন্যাস অন্তত তার ফুটন্ত গোলাপ না পড়ে তাকে নিয়ে মন্তব্য করবেন না, অংশগ্রহণ করবেন না, কাউকে শুনবেনও না। এরপর নিজের মুল্যায়ন নিজে করেন। সেই মুল্যায়নের স্বপক্ষে তর্ক -বিতর্কের ঝড় তোলেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় ৩০ এপ্রিল ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন)। আজ এখানে তা আবার আপডেট, এডিট করে থিতু ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]