আরব স্প্রিং

আরব স্প্রিং

http://wp.me/p1sCvy-1p

আরব স্প্রিং শব্দটা আমরা অনেকেই শুনেছি – আর এর অর্থ হতে দেখেছি একটা গণ-বিক্ষোভ বা গণ-আন্দোলন হিসাবে,কেবল এই দিকটাই নজরে রেখে। সেজন্য ২০১১ সালের শুরুর দিকে সেকুলারিস্ট আর ইসলামিষ্ট উভয়কেই আরব স্প্রিং এর সমর্থক হতে দেখা গিয়েছিল। আরব স্প্রিং শুরু হওয়া তিউনিশিয়া পরে মিশরের পরিস্থিতিও কেবল গণ-আন্দোলন দিক থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছিল। আসলে বিশ্ব-অর্থনীতি ও ক্ষমতা কাঠামো কিম্বা মতাদর্শিক লড়াই-সংগ্রামের ক্ষেত্রে আদৌ কোন নতুন পরিবর্তন ঘটেছে কিনা সেটা গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা হয়ে ওঠে নি। কিন্তু আরও বিস্তারে লিবিয়া পেরিয়ে বিশেষ করে সিরিয়ান পরিস্থিতিতে এসে আরব স্প্রিং কথাটাকে যে আর কেবল গণ-আন্দোলন দিক থেকে ব্যাখ্যা বুঝাবুঝিতে কুলাচ্ছিল না তা সকলে টের পেতে শুরু করে। ইতোমধ্যে সকলে অন্তত বুঝতে পেরেছে এটা নেহায়েতই গণ-আন্দোলনের ঘটনা নয়। ফলে সেকুলারিস্ট আর ইসলামিষ্ট উভয়ের ক্ষেত্রেই আমরা দেখি সিরিয়ান প্রশ্নে এসে আরব স্প্রিং এর প্রতি ভালবাসা ও সমর্থন এবার ফিকে হয়ে গেছে; একটা জটিল গোলমেলে অবস্থায় সকলে। সেকুলারিষ্টদের কেউ কেউ অবশ্য এবার ৮০ দশকে ফেলে আসা রাশিয়া –আমেরিকার ঠান্ডাযুদ্ধের ব্লক ধারণা দিয়ে ঘটনা ব্যাখ্যার এক অক্ষম চেষ্টা করেছিল। ব্যাখ্যায় থই না পাওয়ার মুল কারণ আরব স্প্রিং কেবল গণ আন্দোলন নয়। তাহলে গণ-আন্দোলনের দিক ছাড়া আর কি কি দিক আছে যা জানতে হবে যা দিয়ে আরব স্প্রিংকে বুঝা যাবে সেদিকে যেতে হবে।

গত দুবছর ধরে চেষ্টা করেছি মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকা – দুনিয়ার এই ভুগোলের নানান দেশের আরব স্প্রিং এর ঘটনাবলী অনুসরণ করার। আমার অভিজ্ঞতা লেখার চেষ্টা করেছি,এর আগেও। কিন্তু পুরা ঘটনা — মানে সব দেশের ঘটনা একসাথে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা কখনও শেষ করতে পারি নাই। আগের লেখা দুটো কেন্দ্রিভুত হয়ে গেছে কেবল মিশরের ঘটনায় ভিতর দিয়ে আরব স্প্রিংকে যতটা স্পষ্ট করা যায়, সেদিকে। আমার লেখার ক্ষমতার (গাফিলতি কুঁড়েমিসহ)চেয়ে ঘটনা ঘটেছে দ্রুত, সেটাও এর মুল কারণ। গত কয়েক সপ্তাহে সিরিয়ান ফেনোমেনা নতুন মাত্রা লাভ করেছে, অভিমুখেও বদল ঘটছে। ঘটনা যদি তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণের চেয়ে দ্রূত ঘটতে থাকে তখনেই সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না।

প্রথম কথা হলো, বাইরে থেকে যেটা আরব স্প্রিং সেটা এর গণআন্দোলনমূলক প্রকাশ্য দিক। আর এর অন্তরে মোটা দাগে দুটা স্বার্থ বা দুটো রাজনীতি আছে। এক. আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি। দুই. নতুন ধরণের এক ইসলামী রাজনৈতিক ধারা। কিন্তু আরব স্প্রিং এর ইনিশিয়েটর বা প্রথম উদ্যোগটা এসেছে আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি –মার্কিন পরাষ্ট্র নীতির এই অন্তর্গত তাগিদ থেকে। আর দ্বিতীয় দিকটা হলো, নতুন ধরণের ইসলামী রাজনৈতিক ধারা। এখানে আমি এই ধারাকে কারযাভী (Sheikh Yusuf al-Qaradawi) ইসলাম বলে নামকরণ করব বা চেনাবো। তবে এই ইসলামী ধারা কেন হাজির হলো? এর জবাব হলো, আসলে আমেরিকান নতুন নীতির লক্ষ্য হলো, এক “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার” কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া। ফলে দ্বিতীয়টার জন্ম হচ্ছে আমেরিকার এই কৌশলগত প্রয়োজন থেকে ফলে মোটা দাগে কথা শুরু করব, মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকায় আমেরিকান নতুন পররাষ্ট্রনীতি থেকে।
মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকা বলে একটা আঞ্চলিক ভৌগলিক এলাকা চিনানোর চেষ্টা করলাম বটে। কিন্তু সেটাও মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকা এই অঞ্চলের গড়পরতা সব রাষ্ট্রের বেলায় ব্যাপারটা আবার তাও নয়। বরং এভাবে বললে ঠিক হবে যে, মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকার বেছে নেয়া কিছু দেশে। যেমন, মধ্যপ্রাচ্যের গালফ ষ্টেট অর্থাৎ দুবাই-সৌদি-বাহরাইন-কাতার-ওমান-কুয়েত এর মত আমির-বাদশার রাষ্ট্রগুলোর জোট (গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল বা জিসিসি) – এই বাদশাজোট ভুক্ত রাষ্ট্র হলে মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির অনুমোদিত আরব স্প্রিং সেখানে নো-গো এরিয়া। কোন জিসিসি রাষ্ট্রে আরব স্প্রিং করবার চেষ্টা করা হলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে। কারা দমন করবে? ওসব দেশের স্ব স্ব বাদশা-শাসক একা অথবা সৌদি নেতৃত্বে যৌথভাবে জিসিসি। আর সেখানে আরব স্প্রিং ঘটলেও ওবামা সেখানকার বাদশা-শাসকদের পদত্যাগ করতে দাবী জানাবে না। ঠিক যেমন মিসরে মোবারকের বেলায় আমরা দেখেছি। অথচ মিসর, লিবিয়া বা সিরিয়ায় আরব স্প্রিং ঘটাবার জন্য সৌদি নেতৃত্বে অর্থ, লজিষ্টিক, ডিপলোমেটিক ইত্যাদির প্রধান পৃষ্টপোষক এরাই। আর নতুন উদিয়মান কাতার, এর বাদশা। তাহলে দেখা যাচ্ছে আরব স্প্রিং এর একটা গড়পরতা আঞ্চলিক ভুগোল পাওয়া মুস্কিল। বরং আমরা দেখছি আরব স্প্রিং ঘটছে বা ঘটানো হচ্ছে বেছে বেছে নেয়া কিছু মধ্যপ্রাচ্য ও নর্থ আফ্রিকার রাষ্ট্রে। কেন? এর জবাব আমাদের জানতে হবে। সেখানে যাব। তবে ইনিশিয়েটর বা প্রথম উদ্যোগটা – আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি এখান থেকে কিছু কথা বলে নিব আগে।

আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি বলেছি; “নতুন” শব্দটা ঢুকিয়েছি এর মানে আগে একটা নীতি ছিল। হা, আগে ছিল “ওয়ার অন টেরর” – অর্থাৎআমেরিকায় ৯/১১ এর আলকায়েদা হামলার পর নেয়া ২০০১ সালের শেষে নেয়া যে নীতি। সেটা থেকে আলাদা মানে আগেরটা ঠিক বাদ দিয়ে নয়, বলা যেতে পারে বোলচাল (rhetoric) ব্যাপারটাকে আর -ওয়ার অন টেরর – না, তবে ওর সাথে নতুন কিছু কৌশলগত বৈশিষ্ট যুক্ত করা। তবে আগের সাথে পরের নীতির মুল তফাত একটা তো করা যায় অবশ্যই। সেটা হলো, ইসলাম প্রসঙ্গে। পুরানোটা অর্থাৎ বুশের নীতিকে বলা যায়, ইসলামের যেকোন রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক প্রকাশের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ। ক্রুসেড। এসব প্রকাশকে দমন ও নির্মুল করেই আমেরিকাকে নিজ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মুল ফোকাস আলকায়েদা। বিপরীতে নতুন নীতির বৈশিষ্ট হলো, ১। আমেরিকান রাষ্ট্র ও গ্লোবাল অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য ইসলামকে মুখ্য হুমকি বলে মেনে নেওয়া, (It profoundly affects the security of the West)। ২। তাই করণীয় হিসাবে সব ধরণের ইসলামের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধের বদলে মার্কিন বিরোধী কিম্বা রেডিক্যাল আলকায়েদার বাইরে এক “মডারেট ইসলাম” এর ধারা খুজে বের করা। আলকায়েদার বিপরীতে এক ‘মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” খাঁড়া করা যেটা আমেরিকাকে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।
দুই নীতির তুলনা করে বৈশিষ্টগুলো আলাদা করে বুঝার কাজটা আর একভাবে করা যেতে পারে। যেমন, বুশের বোলচাল ছিল, আরব “স্বৈরাচারী রাষ্ট্র ও শাসকগুলো” থেকে তাদের জনগণকে তিনি “লিবার্টি”তে আনবেন, “ফ্রিডম” শিখাবেন। তাই তিনি ইরাক হামলা ও দখল করলেন। আর বিপরীতে এবার নতুন নীতির বৈশিষ্ট হলো – আগেরটা ছিল দেশ দখল করে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” রপ্তানী করার। আর এখন হলো, ওসব দেশের জনগণকে এক এনজিও কার্যক্রমের মাধ্যমে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” শিখাবেন আর উস্কানী দিয়ে তবে পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রিত রেখে শাসকের পতন ঘটাবেন। আর সাধারণভাবে মুসলমান প্রধান দেশ আর বিশেষ করে বেছে বেছে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে এই কর্মসুচী নেবার কারণ – এসব দেশের শাসকেরা “prevalence of authoritarian political structures” অর্থাৎ “স্বৈরাচারী” কাঠামোতে থাকে বলে ঐ রাষ্ট্রগুলো আলকায়েদা আন্দোলনের গড়ে উঠার পটেনশিয়াল বা সম্ভাব্য রাষ্ট্র হয়ে থাকে। আর তা সহজেই জনগণের জনপ্রিয় সমর্থন জোগাড় করে ফেলে। ফলে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” এর কথা বলে নিয়ন্ত্রিতভাবে শাসকের পতন ঘটানোর এক পুরা প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে শেষে এক ”মডারেট ইসলাম” এর ধারা খুজে বের করার কাজটা ঘটাতে হবে। ফলে আলকায়েদার বিরোধী এক ‘মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়ে তোলা যাবে। এভাবে ”মডারেট ইসলাম” এর ধারা খুজে হাজির করা আর আলকায়েদার বিপরীতে এক ‘মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড় তোলা এই কাজটারই বাইরের ডাক নাম “আরব স্প্রিং”।
আমরা আরব স্প্রিং নামে কোন আমেরিকান ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বয়ান করছি না। এককথায় বললে এটা একদিকে আলকায়েদা ধরণের ইসলামী ফেনোমেনাকে দমন করা আর পছন্দসই এক ইসলামী ফেনোমেনার জন্ম দেয়ার নতুন মার্কিন পররাষ্ট্র নীতি। এছাড়া মনে রাখতে হবে, আমেরিকান রাষ্ট্রনীতি কোন সিরিয়াস গবেষণা ছাড়া কারও এক মাথাগরম অথবা খামখেয়ালি সিদ্ধান্ত থেকে জন্ম হয় না। বরং আমেরিকান নতুন এই রাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে আমরা দেখছি – এর ব্যাকগ্রাউন্ড গবেষণার কাজটা করেছে RAND Corporation, যা পরে বিস্তর সেমিনার আলাপ আলোচনা আভ্যন্তরীণ তর্ক-বিতর্ক ইত্যাদির পর ওবামা প্রশাসনের নীতি হিসাবে গৃহিত হয়েছে। এখানে ইংরাজিতে যেসব ব্রাকেটবদ্ধ কথা আছে তা RAND Corporation এর এক গবেষণা রিপোর্ট (RAND_MG574) থেকে নেয়া।

RAND Corporation সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
RAND Corporation সংগঠন হিসাবে নিজেকে এক নন-প্রফিট দাতব্য প্রতিষ্ঠান বলে পরিচয় দেয়। এটা অবশ্যই এক ধরণের বেসরকারী তবে আমেরিকার নীতিনির্ধারণী থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ধরণের প্রতিষ্ঠান। জন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে যখন এর মুল প্রতিষ্ঠান ছিল আমেরিকান বিমান বাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান তৈরির এক প্রাইভেট কোম্পানী, নাম Douglas Aircraft Company,। ডগলাস কোম্পানী পরবর্তিতে বিভিন্ন সময়ে অন্যান্য বিভিন্ন বিমান কোম্পানীর সাথে মার্জ বা যুক্ত হতে হতে এটাই এখনকার আমেরিকান এয়ারবাস কোম্পানী, এক বাণিজ্যিক যাত্রীবাহী বিমান কোম্পানী। মুল ডগলাস কোম্পানী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিমান বাহিনীর জন্য যুদ্ধবিমান তৈরি ও সরবরাহের সাথে সাথে আমেরিকার জন্য যুদ্ধনীতি বিষয়ে গবেষণার কাজও করত। তবে সেটা Douglas Aircraft Company এর অধীনেই ‘RAND প্রজেক্ট’ নামে শুরু করা হয়েছিল। আর যুদ্ধ শেষে, ১৯৪৮ সালে ‘RAND প্রজেক্ট’ নিজেই মুল বিমান কোম্পানী থেকে আলাদা প্রতিষ্ঠান RAND Corporation নামে ক্যালিফোর্নিয়ায় রেজিষ্টার্ড করা হয়। আগের মত আর কেবল যুদ্ধনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার বদলে আমেরিকার জন্য সোশাল, পলিটিক্যাল, ষ্টাটেজিক ও ইকোনমিক নীতিনির্ধারণী গবেষণা কাজ করা নিজের লক্ষ্য বলে ঘোষণা করেছিল। এটা এখন নিজেই একটা বিশ্ববিদ্যালয়ও চালায়। আমি RAND এর যে রিপোর্টের রেফারেন্সে এখানে কথা বলছি সেটার শিরোনাম হলো, RAND_MG574 Building Modern Muslim Networks । ২১৭ পৃষ্টার এই ডকুমেন্ট অনেক বড় মনে হলে শুরুতে ১৩ পৃষ্টার সামারি পড়ে নেয়া যেতে পারে। আমার এই লেখায় আমি এটাকে “RAND ইসলাম প্রজেক্ট” বলে রেফার করব। এছাড়াও এই ওয়েব সাইটে সংশ্লিষ্ট আরও অন্তত ৫-৭টা রিপোর্ট পাওয়া যাবে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।
তাহলে আমরা উপরে দেখলাম, আরব স্প্রিং এর পুরা কনসেপ্টই হলো, “RAND এর ইসলাম প্রজেক্ট” ওর গবেষণার সময়ের নাম। যা পরে আমেরিকান রাষ্ট্রের সামগ্রিক পররাষ্ট্রনীতিতে আরও অনেক কম্পোনেন্ট বা উপাদানের মধ্যে এক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্টপূর্ণ দিক। আর আরব স্প্রিং ওর ডাকনাম বা বাইরের নাম। “RAND ইসলাম প্রজেক্ট” আর পরে এটাই ওবামার হাতে আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি। বলা বাহুল্য, আমেরিকান সরকার কবে কোন দলিল্‌ কোন মিটিংয়ে “RAND এর ইসলাম প্রজেক্ট”কে নিজের পররাষ্ট্রনীতি বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিল এবং কিছু বাদ রাখলো না পুরাটাই নিল এর খুটিনাটি ও সুনির্দিষ্ট হদিস পাওয়া মুশকিল। কিন্তু আমরা যদি উল্লেখ্য রিপোর্টের কেবল সামারিটাই দেখি তবে সেখানে যেসব ধারনা ও শব্দ পাই যেমন, Democracy Promotion, Civil-Society Development, Public Diplomacy বা স্মার্ট ডিপ্লোম্যাসি – এই একই শব্দ ও ধারণাগুলো আমরা হিলারী ক্লিনটনের হাতে আকার নেয়া এখনকার আমেরিকান পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্টসুচক নীতিতে পাই। এছাড়া যেসব আমেরিকান এনজিও এর মাধ্যমে “লিবার্টি”, “ফ্রিডম” শিখাবেন, নিয়ন্ত্রণ রাখবেন সেগুলো নাম হলো National Endowment for Democracy NED), the International Republican Institute (IRI), the National Democratic Institute (NDI), the Asia Foundation, and the Center for the Study of Islam and Democracy (CSID)। বাস্তবে মিশরের আরব স্প্রিং এর ক্ষেত্রে আমরা এই আমেরিকান এনজিও সংগঠনগুলোকেই পাই। তবে সাথে আরও কিছু আমেরিকান এনজিওকে পাই যেমন, ফ্রিডম হাউস, ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর জার্নালিস্ট, আর জর্মনদের মধ্যে আছে রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান ডেমক্রাটিক ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান – কনরাড এডেনেওয়ার, ইত্যাদি। এসব আমেরিকান এনজিওগুলোর ফান্ডের উৎস আমেরিকান রাষ্ট্র, সরাসরি; এবং ফান্ড বিতরণ করা হয়েছে আমেরিকার বিদেশকে এইড বিতরণের সরকারি প্রতিষ্ঠান USAID এর মাধ্যমে।এই রিপোর্টে এই আমেরিকান এনজিওগুলোকে USAID এর implementation contractors বলা হয়েছে। এছাড়া রিপোর্টে American Federation of Labor (AFL) ধরণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এটা ওবামার ডেমোক্রাট পার্টির প্রভাবান্বিত আমেরিকান স্থানীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলোর রাজ্য ফেডারেশনগুলো আছে, এদেরই মুল ফেডারল বা কেন্দ্রিয় ফেডারেশন। American Federation of Labor বাংলাদেশে গার্মেন্টসে ট্রেড ইউনিয়নে নেত্রী কল্পনা আকতারের সংগঠনের মাদার সংগঠন। “RAND এর ইসলাম প্রজেক্টে” এধরণের সংগঠনগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশের মত ইসলাম জনগোষ্ঠির দেশে আরব স্প্রিং ধরণের প্রভাব বিস্তারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। বাস্তবে আমরা তাই দেখছি।
বাংলাদেশের মত দেশে শ্রমিকেরা ভাল আছে, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার সংরক্ষিত আছে আর আমেরিকানরা কেবল সুস্থির এদেরকে অস্থির করে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে এমন মানে করাটাও ঠিক হবে না। বলা ভাল যে, বাংলাদেশে ট্রেড ইউনিয়নকে কাজ করতে দেয়া হয় না, শ্রমিকদের সমস্ত অধিকার, স্বাভাবিক প্রতিবাদী তৎপরতা দাবিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে এই পরিস্থিতির সুযোগ আছে বলেই সেটার উপর ভরসা করেই AFL এর মাধ্যমে আমেরিকান পরিকল্পনা তৎপরতা আছে।

আসলে “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” পরিকল্পনা ও সুপারিশগুলো সাজানো হয়েছে ৬০-৮০ দশকে কোল্ড ওয়ার ডিপ্লোম্যাসির যুগে আমেরিকা-রাশিয়ার লড়াইয়ে রাশিয়া যেমন করে নিজের পররাষ্ট্র নীতি সাজিয়ে ছিল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে ও উপর সুবিধা পেত, নিত সেকথা মনে রেখে। তৃতীয় বিশ্বের যে কোন উপনিবেশ বিরোধী স্থানীয় জাতীয় সংগ্রাম আন্দোলন আমেরিকা বিরোধী হয়ে যেত, আর ব্যতিক্রমহীনভাবে তা রাশিয়ামুখী হত। এখনকার RAND গবেষকেরা কেন এমন হত, রাশিয়া কেন সুবিধা নিতে পারত এর মুল্যায়ন করেছেন। বলছেন, আমাদের মত দেশগুলোতে কমিউনিষ্টরা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদি নানান সংগঠন গড়ত (তুলনা করুন, কচিকাচার আসর থেকে শুরু করে, ছাত্র ইউনিয়ন ও যুব ইউনিয়ন সংগঠন, টিইউসি ট্রেড ইউনিয়ন, উদিচী সাংস্কৃতিক সংগঠন ইত্যাদি) আর একাজে সহায়তা হিসাবে রাশিয়ানরা টাকা দিত। ফলে তৃনমূল থেকে সামাজিক সবজায়গায় আমেরিকা বিরোধী কিন্তু স্থানীয় সংগঠন ভিত্তি হিসাবে কাজ করত। আর এগুলো গড়ে তোলাই রাশিয়ান বিদেশনীতি ছিল। অর্থাৎ আইডিয়া হিসাবে সেকালের রাশিয়ান বিদেশনীতিটাই তারা আদর্শ ধরে অনুসরণ করতে চায়। কিন্তু এবার সেই মডেলের আলোকে আমেরিকানদেরকে টাকা ও সংগঠন দিয়ে মুসলমান প্রধান দেশে আলকায়েদার প্রভাব খর্ব করতে আলকায়েদার বাইরে এক ইসলাম – “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়ার কাজে নেমে পড়তে হবে। একালে এই সংগঠন গড়ার কাজটাই “সিভিল সোসাইটি” গড়ার কাজ। আবার তুলনা করে আলকায়েদার দুটো সুবিধার কথা উল্লেখ করে বলছে, ওদের আছে অর্থ আর বিস্তার হয়ে থাকা সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক…(The first is money……..The radicals’ second advantage is organization. Radical groups have developed extensive networks over the years, which are themselves embedded in a dense net of international relationships)। [ফর্মাল রিপোর্টে আলকায়েদা না লিখে এর বদলে তারা radicals লিখে]। আরও বলছে যাদের নিয়ে তারা সম্ভাব্য “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়বে এদের নির্বাচনের ব্যাপারে প্রাথমিক ফোকাস হবে,( initially focus on a core group of reliable partners whose ideological orientation is known) নির্ভরযোগ্য পার্টনার যাদের আদর্শগত মনোভাব জানা। আর যাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে এরা হলো, সেকুলার ও লিবারেল মুসলমান একাডেমিক ও বুদ্ধিজীবি, মুসলিম স্কলার, কমিউনিটি এক্টিভিষ্ট নেতা, নারী সংগঠন, মিডিয়ার জার্নালিষ্ট, লেখক। ( Liberal and secular Muslim academics and intellectuals; Young moderate religious scholars; Community activists; Women’s groups engaged in gender equality campaigns; Moderate journalists and writers)। আর মডারেট নেটওয়ার্ক গড়তে আমেরিকান ভুমিকা কি হবে কারা কিভাবে তা গড়বে বলা হচ্ছে, Moderates, however, do not have the resources to create these networks themselves; they may require an external catalyst। অর্থাৎ একদল মডারেট মুসলিমরা এই নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে কিন্তু যেহেতু তাদের রিসোর্স নাই (টাকাপয়সা ও সংগঠন), তাই বাইরের ক্যাটালিষ্ট অনুঘটক বা উস্কানিদাতা হিসাবে আমেরিকানদেরকে লাগবে।

শেখ ইউসুফ আল-কারযাভী
আরব স্প্রিং বা “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” নেটওয়ার্কের সম্ভাব্য তালিকায় মুসলিম একাডেমিক বুদ্ধিজীবি বা স্কলার এর কথা বলা হয়েছে। “মডারেট মুসলিম নেটওয়ার্ক” গড়ার কাজে উপযুক্ত লোক হিসাবে যে স্কলারকে পাওয়া গেছে তার নাম শেখ ইউসুফ আল-কারযাভী (Sheikh Yusuf al-Qaradawi)। যার হাত দিয়ে নতুন ধরণের ইসলামী রাজনৈতিক ধারা গড়ে তোলা হবে। এখানে আমি এই ধারাকে কারযাভী (Sheikh Yusuf al-Qaradawi) ইসলাম বলে নামকরণ করব বা চেনাবো।
এটা কারযাভী কেন হলেন তা আমাদের ব্যাখ্যা পেতে হবে। তাই আগে তাঁর একটু সংক্ষিপ্ত ব্যাকগ্রাউন্ড ও পরিচয় পেতে হবে।

কারযাভী মুলত একজন মিশরীয় এবং এই সময়ের মুসলিম ব্রাদারহুডের সবচেয়ে প্রভাবশালী তাত্ত্বিক নেতা। জন্ম ১৯২৬ সালে। ছাত্র অবস্থা থেকে তিনি ব্রাদারহুডের সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশুনা বিখ্যাত আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে গ্রাজুয়েট হন। এরপর ১৯৫৮ সালে আরবী ভাষা ও সাহিত্যে ডিপ্লোমা ডিগ্রী নেন। এরপর ১৯৬০ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্মীয় মৌল দিক (Usul al-Din)ফ্যাকাল্টি থেকে কোরানিক ষ্টাডি বিষয়ে মাষ্টার ডিগ্রী নেন। এরপর ১৯৬২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে কাতারের Secondary Institute of Religious Studies এর প্রধান করে পাঠানো হয়। কারযাভীর কাতার নিবাস শুরু হয় এখান থেকে। এরপর ১৯৭৩ সালে তিনি আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে পিএইচডি শেষ করেন, তাঁর বিষয় ছিল Zakah and its effect on solving social problems। এরপর ১৯৭৭ সালে তাঁর হাত দিয়েই কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীয়া ও ইসলামী ষ্টাডিজ ফ্যাকাল্টি খুলা হয়। তিনি এর প্রথম ডিন হন। এরপর ১৯৯০ সাল থেকে তিনি কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে Director of the Seerah and Sunnah Center at Qatar University হয়ে আছেন এখনও পর্যন্ত।

রাজনৈতিক জীবনে তিনি তিনবার জেল বন্দী থাকেন, ১৯৭০ সালে রাজনৈতিক কারণে তাঁর মিসরীয় নাগরিকত্ত্ব বাতিল করা হয়। সে কারণে এরপর থেকে তাঁর কাতারে বসবাস। মিশরীয় ব্রাদারহুড তাকে দুবার (১৯৭৬ ও ২০০৪ সালে) সংগঠনের প্রধান হয়ে আহবান জানায়। কিন্তু তিনি স্বাধীন একাডেমিক স্কলার জীবন যাপনে স্বস্তি পান বলে তা ফিরিয়ে দেন। তাঁর লেখা রচনা, কখনও ফতোয়া অথবা বক্তৃতা ব্রাদারহুডসহ দুনিয়া জুড়ে ইসলামী রাজনীতিতে বিশাল প্রভাব রাখে। ২০১১ সালে মোবারকের পতনের পর তিনি প্রথম আবার মিশরে বেড়াতে আসেন। আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে খুতবা দেন। তাহরীর স্কয়ারে গণ সমাবেশে বক্তৃতা দেন।

নিজ দেশে থেকে বহিস্কারের পর কাতারই হয়ে উঠে কারযাভীর সেকেন্ড হোম। উলটো করে বলা যায়, কাতারের বাদশা থানি হয়ে উঠেন তাঁর প্রধান পৃষ্টপোষক। আরব স্প্রিং বা “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” নিয়ে আমেরিকান রাজনীতির নতুন পথ শুরুর পর কারযাভী এর প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন। কেন হলেন? তাঁর চিন্তার সাথে এর মিলের দিকটা কি? এদিক থেকে বললে আরব স্প্রিং এক রাষ্ট্র বদলের কর্মসুচি; রাষ্ট্রের রেডিক্যাল বদল না হলেও এটা আমেরিকার নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্র বদল তো বটেই। কারযাভীর রাষ্ট্র-বোধ বিষয়ে জানা যায় তাঁর State-in-Islam বইতে পাওয়া যায়।
এই বইয়ে কারযাভী নিজের অবস্থানকে বুঝাতে বলছেন, The Moderate Islarnic trend comes in the middle between the deviated secularists and the narrow-minded ones. আর narrow-minded ones বলতে তিনি নাম করেছেন হিজরি অষ্ট শতকের মানে ১৪০০ খ্রী. এর ইমাম ইবনে আল কাইউম ও তার মত অনুসারিদের কথা যারা হিজরি পনেরো শতক অর্থাৎ এখনকার খ্রী. শতক পর্যন্ত অনুসরণ করছেন। বলছেন, Imam Ibn ul-Qayyim spo ke sadly of the narrow -minded j urists of his time (the 8″1 ce ntury AH) ……. Ironically. those narrow-minded jurists still have disciples in our time. who live in the 15th century AH] অর্থাৎ একদিকে তিন এদের সংকীর্ণমনা বলছেন আর বিপরীতে সেকুলারিষ্ট – এর মাঝে তাঁর মডারেট ইসলামী ট্রেন্ড। ফলে তাঁর এই অবস্থান থেকে আরব স্প্রিং বা “RAND ইসলাম প্রজেক্টের” প্রতি আগ্রহ ও নিজ অবস্থান থেকে সমর্থন বলে বুঝার চেষ্টা করতে পারি।

কারযাভীর এই অবস্থানের কারণে, আরব স্প্রিংয়ের বাস্তবায়নের মুল কেন্দ্র এখন কাতার। RAND এর RAND Gulf States Policy Institute এখন আমেরিকার পরে নেমে এসেছে কাতারের রাজধানী দোহায়, নাম RAND – Qatar Policy Institute। কিন্তু কাতার কেন কারযাভীকে ঘিরে এই নতুন ইসলামের কেন্দ্র হিসাবে নিজেকে জাহির করা ঠিক মনে করল এর জবাব পাওয়া যাবে এখনকার কাতারি উদীয়মান অর্থনীতি, নতুন বিশাল বিনিয়োগের ভিতরে খুজতে হবে। আমরা আপাতত সেদিকে যাব না। কিন্তু তাতপর্যপুর্ণ মুল ব্যাপার হলো, সৌদি ওহাবি বা সালাফি ইসলামের কেন্দ্রের বাইরে মধ্যপ্রাচ্যে কারযাভী ইসলামের কেন্দ্র হিসাবে কাতারকে আমরা পাচ্ছি। তবে দুই ইসলামি ট্রেন্ডের সম্পর্ক বন্ধুত্ত্বপুর্ণ, যদিও ইদানিং সংঘাত দেখা দিচ্ছে। সার করে বললে, আরব স্প্রিং আমেরিকার নীতি কিন্তু বসবার কুশন দিয়েছে কাতার। আর যেসব দেশে আরব স্প্রিং ঘটছে বা ঘটানো হচ্ছে এর জন্য ফান্ড ও লজিষ্টিক সেন্টার কাতার। আর ওদিকে সৌদি বাদশা ওহাবি বা সালাফি হওয়া সত্ত্বেও গ্লোবাল পাওয়ার এলায়েন্সের কারণে কারযাভী ইসলামকে সমর্থন দিচ্ছে। মনে রাখতে হবে আরব স্প্রিং শুরু থেকেই অর্থাৎ ডিজাইন পরিকল্পনা রচনার সময় থেকেই শিয়া বা ইরান-সিরিয়া বিরোধী। অন্যভাবে বললে আরব স্প্রিং কর্মসুচি চালু করার আগেও আমেরিকান নেতৃত্ত্বে গ্লোবাল পাওয়ার এলায়েন্সের বৈশিষ্ট হলো তা শিয়া বিরোধী, যেটা সৌদি বাদশার বিশেষ আগ্রহের কারণ।

আরব-ইসরায়েল তৃতীয় যুদ্ধের (১৯৭৩) সংক্ষেপে একটু সালতামামি করব। এই যুদ্ধে পরাজয়ের পর থেকে প্যান আরব জাতীয়তাবাদ শুকিয়ে মরতে থাকে এবং নিজ নিজ রাষ্ট্রের স্বার্থ মানে নিজ রাষ্ট্রীয় জাতীয়তাবাদ যেমন, মিশরীয় জাতীয়তাবাদ, সিরীয় জাতীয়তাবাদ ইত্যাদি মুখ্য বিবেচনার বিষয় হয়ে যায়। কমন প্যালেষ্টাইন স্বার্থকে পিছনে ফেলে আগে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ বাঁচাও, দরকার হলে অন্যকে বিক্রি করার বিনিময়ে; যেমন আমেরিকান মধ্যস্থতায় মিসর-ইসরায়েলের ক্যাম্প ডেভিড প্রতিরক্ষা চুক্তি। এই নতুন ফেনোমেনা দেখা দিতে শুরু করে। আর এর প্রতিক্রিয়ায় নতুন ফেনোমেনা, নতুন ধরণের আন্দোলন – প্যালেষ্টাইনে হামাস আর লেবাননে হিজবুল্লাহ – এদের জন্ম। পলিটিক্যাল ওরিয়েন্টেশন হিসাবে এই দুই আন্দোলন মিসরের ব্রাদারহুডের মত হলেও আবার অর্থ ও লজিষ্টিকের দিক থেকে এরা ইরান-সিরিয়ার উপর নির্ভরশীল ও সম্পর্কিত। আইডোলজির দিক থেকে এটা সম্ভব হয়েছিল কারণ প্রতিষ্ঠাতা বান্নার আমল থেকেই ব্রাদারহুড শিয়া-সুন্নি বলে ভাগের রাজনীতি করেনি। বান্না নিজেও বলতেন, ব্রাদারহুড আন্দোলনের বৈশিষ্ট হলো একদিকে এটা সালাফি অন্যদিকে এটা সুফিজম। পরবর্তিতে কারযাভীর খুতবাগুলোতেও সুফিজমের প্রতি তাঁরও সহানুভুতি দেখতে পাওয়া যায়।

এই লেখা গত দুসপ্তাহ ধরে লেখার চেষ্টা করছি। ব্যকগ্রাউন্ড ম্যাটেরিয়াল পড়ে ঝালাই করে আপটুডেট হতে সময় নিয়ে ফেলেছি বেশি। ইতোমধ্যে গত রাত্রে মিশরীয় আর্মি সেকুলারদের আপাত সমর্থনে প্রেসিডেন্ট মরসিকে পদচ্যুত করে ক্ষমতা নিয়েছে। ওদিকে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে সিরিয়ায় যুদ্ধকে আমেরিকান প্রশাসন সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ করে নেমে পড়ে যুদ্ধকে এক নির্ধারক দিকে নেবার চেষ্টা করছে; লেবাননের হিজবুল্লাহ সরাসরি প্রেসিডেন্ট আসাদ এর পক্ষে যুদ্ধে নামার প্রেক্ষিতে এতে নড়াচাড়া পড়েছে। কারযাভী এই প্রথম প্রকাশ্যে হিজবুল্লাহকে শয়তানের দল বলে ভিডিও বক্তৃতা করেছেন। এখানে দেখুন,
এসবের প্রেক্ষিতে “আরব স্প্রিং” এখন মারাত্মক ব্যর্থ ও ব্যাকফায়ার শুরুর আলামত বলে মনে করার কারণ আছে। তাই লেখাটা আপাত শেষ করব কেন আরব স্প্রিং ব্যর্থ হবে তার উল্লেখযোগ্য কিছু কারণ আলোচনা করে।

আরব স্প্রিং কেন ব্যর্থ হবে, এর মৌলিক দুর্বলতাগুলো কি কি
১। কথিত স্বৈরাচারঃ মুসলমান প্রধান দেশগুলোতে কথিত “স্বৈরাচারী” শাসক চলতে দেয়ার অর্থ এটা আলকায়েদার ঘাটি হবার জন্য পটেনশিয়াল হবে। কারণ স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে জনগণের ন্যায্য ক্ষোভ বিক্ষোভকে পুজি করে আলকায়েদা নিজের রাজনীতির ন্যায্যতা যোগাড় করে ফেলবে। ফলে স্বৈরাচার রাখার আমেরিকান রাষ্ট্রের জন্য পটেনশিয়াল থ্রেট। তাই এনজিওর মাধ্যমে লিবার্টি, ফ্রিডমের আওয়াজ শিখিয়ে এক পপুলার আপরাইজিং তবে নিয়ন্ত্রিত রেখে স্বৈরাচারকে সরিয়ে দিতে হবে, একটা লিবারেল ইসলামী সরকার কায়েম করতে হবে। আর এর ভিতর দিয়ে আমেরিকার প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন মডারেট ইসলামি নেটওয়ার্ক গড়ে নিতে হবে। এটাই আরব স্প্রিং। কিন্তু এই পরিকল্পনা চিন্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো – আর্মি। স্বৈরাচার মানে কী? যদি সুনির্দিষ্টভাবে মিসরের দিকে তাকাই – কাম্প ডেভিড চুক্তির কারণ মিসরের আর্মি মানে হলো, যে অসমাপ্ত আরব-ইস-রায়েল যুদ্ধ এবং ক্রমআগ্রাসী ভূমি লোভী ইসরায়েলি দস্যুতার বিরুদ্ধে আরবদের ক্ষোভ থেকে ইসরায়েলকে প্রতিরক্ষা করবে। আভ্যন্তরীণভাবে দেশে দমন করবে এবং সীমান্ত পার হতে দিবে না। এটাই ঐ চুক্তির শর্ত, এর বিনিময়েই মিসরের সিনাই উপত্যকা ইসরায়েল ছেড়ে যায়। আর এই প্রতিরক্ষার সার্ভিসের খরচ হিসাবে বছর বছর আমেরিকান তিন বিলিয়ন এইড পাবে মিসর। ইসরায়েলও পাবে ১০ বিলিয়ন করে। আমেরিকার দিক থেকে এটাই মধ্যপ্রাচ্যের তেল ও তেলের দামের উপর কর্তৃত্ত্ব রাখার কাফফারা। অন্য ভাষায় আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতি, ১৯৭৯ সালের চুক্তি এই বোঝাপড়ার ভিত্তিতেই হয়েছিল। এখন মিসরীয় আর্মিকে যে মহান দায়িত্ত্ব দেয়া হলো এটা স্রেফ আর্মি প্রতিষ্ঠানের ভিতরে সীমাবদ্ধের বিষয় নয়। বরং এটা হলো সামগ্রিকভাবে মিসরীয় রাষ্ট্রকে সাজিয়ে নেয়া, ইসরায়েলকে প্রতিরক্ষা দেয়ার মত যোগ্য দুর্দমনীয় মিলিটারী রাষ্ট্র করে গড়ে তোলা। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারলে ইসরায়েলের পক্ষে ভাড়া খাটা অসম্ভব। গত ৩২ বছর ধরে এরই প্রতিকী দিক হলো, আর্মি চীফ (একা ব্যক্তি না, এক কমান্ড কাউন্সিলের প্রধান তিনি) সবসময় প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হয়েছেন। আবার বাহিনীর সবাইকে খুশি রাখতে হবে। ফলে আর্মি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স যার প্রধান আবার প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। আলাদা আয়ের ব্যবস্থা। আমেরিকাতেও বাহিনী পোষার খরচ কমাতে বাহিনীর যুদ্ধ বিমান বা অস্ত্র, কমিউনিকেশন ইত্যাদির টেকনোলজি কমার্সিয়াল কোম্পানীকে ভাড়া দেয়া থাকে। এটা তা নয়। এটা হলো, ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স এর আয় আর্মি প্রতিষ্ঠান চালাবার ইকুইপমেন্ট কেনার কাজে নয়, বরং বাহিনীর সদস্যদের জন্য বাড়তি নগদ আয় হিসাবে সরবরাহ বিতরণ করা হয়।
বলেছিলাম আরব স্প্রিং পরিকল্পনা চিন্তার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো – আর্মি। মানে নতুন আরব স্প্রিং ঘটবার পরের পরিস্থিতিতে আর্মির ভুমিকা তো বদলাতে হবে। কিনতি বদলে গিয়ে কি হবে সেটা সাধারণভাবে সব মুসলমান প্রধান দেশের বেলায় এক বিরাট প্রশ্ন। আর বিশেষ করে মিসরের বেলায় যেখানে আর্মি মানে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সার্ভিস দেয়া সেখানে আর্মির ভুমিকা বদল মানে ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা এক্ষেত্রে কে দিবে? সে এক ট্রিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। “RAND ইসলাম প্রজেক্টে” এক্ষেত্রে নিরুত্তর।
আরব স্প্রিং এ লিবার্টি, ফ্রিডমের আওয়াজ তুলে পপুলার আপরাইজিংকে নিয়ন্ত্রিত রেখে স্বৈরাচার হঠানোর নাটক করা কাগুজে পরিকল্পনায় যত সহজ মনে হোক বাস্তবে তা ভীষণ রিস্কি। কোন গ্যারান্টি নাই যে তা আমেরিকার হাতে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। হাতছুট ঘটনা হিসাবে আলকায়েদা ধরণের রেডিক্যাল নয়, অন্য অর্থে এটা সাম্রাজ্যবাদ বা পশ্চিম স্বার্থ বিরোধী রেডিক্যাল দিকে দৌড়াবে না কোন নিশ্চয়তা নাই। সেই অযাচিত পরিস্থিতি সামলানোর জন্য আমেরিকার জন্য শেষ ভরসা হবে আর্মি প্রতিষ্ঠান। একথাগুলো “RAND ইসলাম প্রজেক্টে” লেখা নাই। কিন্তু এটা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়। এজন্যই আর্মি প্রতিষ্ঠান শব্দটা স্পর্শ করে কোন বাক্য নাই এই দলিলে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট মিসরীয় পরিস্থিতিতে আর্মি (SCAF) এক নির্ধারক প্রসঙ্গ। এটা আরব স্প্রিং এর দলিলে উহ্য করে রাখা হয়েছে বলেই মিসরে আরব স্প্রিং অকেজো ও ব্যর্থ হবেই, হচ্ছে। এজন্য আর্মি কখনই সুপ্রীম জুডিশয়াল কাউন্সিল, সুপ্রীম নির্বাচন কাউন্সিল, সুপ্রীম কাউন্সিল অব আর্মড ফোর্স ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান যেগুলো ক্যাম্প ডেভিড চুক্তির ছানাপোনা – এগুলো কখনই ভাঙ্গতে দেয়নি। ফলে গত দুবছর ধরে বারবার এই প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করে আগের রাষ্ট্র নিজেকে পুনর্গঠিত করে নিতে পারছে। মিসরীয় আর্মির দিক থেকে আরব স্প্রিং এর প্রতি সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, প্রজেক্টের দলিলে আর্মির ভুমিকা কি হবে তা লেখা নাই, ভাবাই হয়নি। এজন্যই সে ৪২ দেশি, আমেরিকান এনজিও কর্মিকে আরব স্প্রিং করার দায়ে ৫ বছরের সাজা ও জরিমানা শুনিয়ে দিয়েছে। মোবারক, আগের আর্মি চীফ তানতাওই পদত্যাগ করেছেন, ইন্টিলিজেন্স চীফ আর্মি জেনারেল মারা গেছেন যাকে মোবারক উত্তর ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল – সবাই চলে গেছেন কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও অটুট ও শক্তিশালী আছে। একটা সাবধানতার কথা বলব। উপরের কথাগুলো যেন আমাদের দেশের সস্তা সামরিক শাসন-বেসামরিক শাসনের কুতর্কের মত ভেবে বুঝবার চেষ্টা না করি। পিছনে আমেরিকান পরিকল্পনা না থাকলে, কোন জেনারেলের ব্যক্তিগত খায়েসে ক্ষমতা দখল ঘটায় না।

২। মুল বিরোধ সেকুলারিষ্ট বনাম ইসলামিষ্টঃ
“RAND ইসলাম প্রজেক্টের” দলিলে সম্ভাব্য যাদের নিয়ে আরব স্প্রিং বা নতুন রাষ্ট্রের আকার দেবার কথা বলা হয়েছে তার মুল দুই এলিমেন্ট সেকুলারিষ্ট এবং ইসলামিষ্ট। আবার ইসলামিষ্টদের প্রতি আগ্রহটা বেশি। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে এই দুই আদর্শের ঐক্য হবে বা এক পাত্রে দুটোকে ধারণ করা যাবে? এই বিষয়ে RAND প্রজেক্টের গবেষণা দলিল নিরুত্তর। বরং ওখানে সেকুলারিষ্ট এবং ইসলামিষ্ট উভয়কেই ধারনা দেয়া হয়েছে তারা “গণ আন্দোলনের ভিতর দিয়ে স্বৈরাচার উৎখাত করতে হবে। কিন্তু স্বৈরাচার উৎখাত এর মানে কি? উৎখাতের পরেই বা কি হবে? একটা লিবারেল রাষ্ট্র? তাহলেও তো আসলে তা একটা নতুন রাষ্ট্র। অর্থাৎ রাষ্ট্রগঠন, রাষ্ট্র কনষ্টিটিউট করা মামলা। যাতে একমাত্র একটা নতুন কনষ্টিটিউশনেই এর পরিণতি টানা যায়। এই প্রসঙ্গে সেকুলারিষ্টরা বিহবল। কোন চিন্তাগত প্রস্তুতি তাদের নাই। ফলে রাষ্ট্রগঠনের কাজটা আড়ালে ফেলে ইসলামিষ্টদের সাথে তাদের আদর্শগত দ্বন্দ্বের বাইরে কোন কিছুই তাদের মাথায় আসে না। একমাত্র সমাধান দেখে ইসলামিষ্টদের সেকুলার হয়ে যাওয়া। অথচ এর বাইরে রাষ্ট্রগঠনের কাজে এমন কি তার কাছে আছে যা সে ইসলামিষ্টদেরকে অফার করতে পারে যাতে আদর্শগত বিরোধ বা শ্রেণী বিরোধ থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রগঠনে কোন মৌলিক সুত্রে তারা ঐক্যমত তৈরি করতে পারে – এটা তার জানা নাই। বিপরীতে ইসলামিষ্টরা, এদের একালের রাষ্ট্র সম্পর্কে এমপেরিক্যাল তথ্য সংগ্রহও নাই। যেমন, কারযাভী তাঁর “ষ্ট্রেট ইন ইসলাম” (State in Islam) বইতে (১৯৯৭) এক নিঃশ্বাসে তিনি নবীর আমলেও সেটাকে রাষ্ট্র বলছে, চার খলিফা আমলকেও, অটোম্যান সুলতানের আমলকেও। ফলে রাষ্ট্র বলতে আসলে তিনি ঠিক বুঝাচ্ছেন তা বুঝা মুশকিল। আবার সাধারণভাবে বললে, “ইসলামে রাষ্ট্র” নিয়ে তাঁর ধারণা বয়ান করতে গিয়ে একটা চেষ্টা দেখা যায় তিনি অবলীলায় মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণায় বিশেষ বিশেষ শব্দ ব্যবহার করছেন। যেমন, রাইট বা অধিকার, তিনি প্রায়ই ব্যবহার করছেন। রাইট বা অধিকার তো ইসলামের ধারণা নয়। আর রিপাবলিক রাষ্ট্রের ‘অধিকার’ ধারণা তো ইউরোপের সবকালের একই ধারণাও নয়। এছাড়া পশ্চিমে ব্যক্তি ও নাগরিক বলে ধারণাটার পিছনে একটা আগাম অনুমান আছে; যার উপর দাঁড়িয়ে আছে অধিকার ধারণা। ইসলাম কিভাবে ব্যক্তি ও নাগরিক ধারণাকে গ্রহণ করে, আদৌ গ্রহণ করে কি না, না করলে ইসলামে যে রাষ্ট্র তিনি দেখছেন সব জায়গায় কালোর্ধ হিসাবে সেখানে ধারণাগুলো কি ছিল এর একটা হিস্টোরিক্যাল অনুসন্ধান তো নিতেই হবে আগে। ফলে জবরদস্তি মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণাগুলোকে ইন্টারচেঞ্জিংলি ব্যবহারের একটা ঝোক তার মধ্যে দেখা যায়। এতে তিনি কি বুঝছেন, কি বুঝাচ্ছেন এর হদিস এক অসম্ভব কাজ। যেমন, শাসককে মেনে চলার (obey) প্রশ্ন তিনি তুলেছেন। বলছেন,
To obey the rulers stipulated that they are from among themselves. Allah put this obedience after obedience to Him and the Messenger (peace be upon him) and it ordained that in time of dispute the whole matter must be brought before Him and His Messenger, (i.e. the Glorious Quran and the Sunnah). This is based on the assumption that Muslims have a state that dominates and a ruler that is to be obeyed. Otherwise all this would be in vain.

কিন্তু রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণায়, শাসক সরকারের সাথে নাগরিকের সম্পর্কটা অন্তত obey করার না। আর এই সম্পর্ক কারযাভীর বর্ণনা তালাল আসাদের থেকে অনেক পিছনের। তালাল আসাদ এব্যাপারে obey ধারণার ভিতরে যান নি। তাছাড়া সম্পর্কটা রাষ্ট্রের সাথে নাগরিকের – এটা ঠিক পারশনিফায়েড শাসক ব্যক্তির সাথে নাগরিকের একেবারেই নয়। এছাড়া নাগরিক নিজে মুল ক্ষমতার উৎস। এটা তিনি কনষ্টিটিউশনে বলে রাখা নির্দিষ্ট বিষয়ে শর্ত সাপেক্ষে রাষ্ট্রকে সেই ক্ষমতা আমানত হিসাবে দেন।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রগঠন কনষ্টিটিউট ধারণায় (সে অনেক দুরের ব্যাপার যদিও) সেকুলারিষ্টের সাথে তিনি কি করে একসাথে রাষ্ট্র গড়বেন। সার কথায় সেকুলারিষ্ট ও ইসলামিষ্ট উভয়েই আসলে ওবামার আমেরিকার নতুন মধ্যপ্রাচ্য নীতি -মার্কিন পরাষ্ট্র নীতির এই অন্তর্গত ষ্ট্রটেজিক তাগিদের দিক থেকে আরব স্প্রিংকে বুঝবার চেষ্টা করেন নি। ফলে উভয়েই প্রতারিত।

৩। আরব স্প্রিং এর প্রথম সাফল্যের জমানায় ২০১১ সাল বছর জুড়ে আমেরিকান প্রশাসন আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল। তিউনিশিয়া, মিসর, ইয়েমেন, জর্দান, আলজেরিয়ার ঘটনায় সব দেশেই স্ব স্ব দেশের ব্রাদারহুডকে নিরুপদ্রব সঙ্গী হিসাবে তারা পেয়েছিল। পরিস্থিতি আমেরিকান হিসাব মত নিয়ন্ত্রণে রাখতে তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা পাওয়া গিয়েছিল। এতে আরও উতসাহিত হয়ে এবার আর মাস-মুভমেন্ট বা গণ আন্দোলনের তরিকা না। তা ছেড়ে লিবিয়ায় আরব স্প্রিং আন্দোলন সশস্ত্র দিকে নিতেও আমেরিকানদের বুক কাঁপেনি। রাশিয়া চীন নিজের ভাগের কথা বুঝে উঠার আগেই জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিল থেকে লিবিয়ার আকাশে নো ফ্লাই জোন আরোপের সম্মতি পাশ করে আনা হয়েছিল। একই বা আরও প্রবল উতসাহে সিরিয়াতে আরব স্প্রিংকে আর লোক দেখানে গণ আন্দোলন না, দ্রুত একেবারে আন্দোলন সশস্ত্র দিকে নিতেও তাদের মধ্যে কোন দ্বিধা কাজ করতে দেখিনি।

আরব স্প্রিং আলকায়েদা বিরোধী আলাদা ইসলামী রাজনৈতিক ধারা জন্ম দেবার আমেরিকান প্রচেষ্টা হলেও এর প্রতি আলকায়েদা প্রতিক্রিয়া কি ছিল তা হয়ত আমরা অনেকেই খেয়াল করিনি। এপর্যন্ত আলকায়েদা কখনই আরব স্প্রিংয়ের বিরোধাতা করে বিবৃতি দিয়েছে নজরে আসেনি। বরং মোবারকের পতনের পর আলকায়েদা একে স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু দুবছর ধরে সিরিয়ান যুদ্ধ চলার পর এখন পরিস্থিতি কি? আমেরিকান সিনেট কমিটি সরাসরি অস্ত্র সরবরাহ করে সিরিয়ার মাঠে নামার সিদ্ধান্ত অনুমোদন দেবার পরও এক মাস সেটা স্থগিত করে রেখেছিল। গত এক বছর ধরে আমেরিকান ইন্টিলেজিন্স সাবধান করে আসছে সিরিয়ার সশস্ত্রতা আলকায়েদার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। আলকায়েদা সমর্থিত স্থানীয় Al-Nusra Front এখন সবার ভয়ের কারণ হয়ে উঠেছে। ওদিকে লিবিয়ার বেলায় মিডিয়া রিপোর্টে মনে করা হয়েছিল সশস্ত্র আরব স্প্রিং এর পরও লিবিয়া বুঝি আমেরিকান নিয়ন্ত্রণে আছে। কিন্তু বেনাগাজিতে আমেরিকান এমবাসেডরসহ সাতজন ষ্টাফ খুন হয়েছেন। রাজধানী ত্রিপোলীর বাইরে সশস্ত্রগ্রুপগুলো কেউ অস্ত্র ফেরত দেয়নি বরং তথাকথিত কেন্দ্রীয় সেনাবাহিনী এমন এক একটা বাহিনীকে অটুট রেখে স্বীকৃতি দিয়ে বাহিনীগুলোর স্বাধীন কাম কাজ স্বীকার করে নিয়েছে। আর সবচেয়ে বড় ঘটনা হলো, লিবিয়ার ডামাডোলে সেখান থেকে ভারী অস্ত্রসহ আলকায়েদা নিয়ন্ত্রিত এক আফ্রিকান গ্রুপ মালিতে জড়ো হয়েছে। মালি দেশকে ভাগ করে ফেলেছে, যেটা পরবর্তিতে ফরাসী আর্মি পাঠিয়ে আফগানিস্তানের মত আফ্রিকার এক নতুন ফ্রন্ট খুলতে হয়েছে। এসব ফেনোমেনার সার লক্ষণ হলো, জোশের ঠেলায় যেখানে যেখানে আরব স্প্রিংকে সশস্ত্র করা হয়েছিল সেখানেই তা ক্রমশ আলকায়েদার নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। শেষ হাসি তারাই হাসছে, লাভের গুড় তাদের পকেটে। “RAND ইসলাম প্রজেক্টে” দলিলে কোথাও আরব স্প্রিংকে সশস্ত্র করার পরিকল্পনা এমনকি ইঙ্গিত নাই। ফলে লিবিয়ার ক্ষেত্রে এমপায়ারের চকচকে লোলুপ দৃষ্টি ছাপিয়ে উঠেছিল সেটাই পরিস্থিতিকে সশস্ত্রতার দিকে সহজেই টেনে নিয়ে গেছিল বলা যায়। আর সিরিয়ান পরিস্থিতি এখন যা তাতে আমেরিকান অবস্থান এখন যেদিকেই যাক না কেন ঐ পুরা জোন আলকায়েদার দখলে চলে যাচ্ছে। তাহলে যে উদ্দেশ্যে কারযাভী ইসলামকে সঙ্গি করে নেয়া হয়েছিল যে একটা – নন-রেডিক্যাল ইসলাম, কারযাভী ইসলাম সেভাবে হাজির হতে পুরাপুরি ব্যর্থ। শুধু তাই নয়, আরব স্প্রিংকে শিয়া বিরোধী হিসাবে হাজির করার যে সুপ্ত অভিমুখগুলো ছিল সেগুলো প্রকাশ হয়ে এখন খোদ কারযাভিকেই শিয়া বিরোধী বয়ান দিতে হচ্ছে। হিজবুল্লাহ (আল্লাহ দল) কে শয়তানের দল বলে বয়ান দিতে হচ্ছে। হামাসের সাথে হিজবুল্লাহর বিরোধ সংঘাত প্রকাশ্য হতে শুরু করেছে। কাতারি বাদশা প্যালেষ্টাইনে গিয়ে হামাসকে বলেছেন সিরিয়া –ইরানের উপর নির্ভরশীলতা ত্যাগ করতে। এখন থেকে অর্থ সরবরাহ তিনিই করবেন। কিন্তু অস্ত্র দিবে কে? তাদের প্রতিরোধ যুদ্ধ কি বন্ধ হয়ে যাবে? সিরিয়ায় আসাদকে সরানোর ঘটনার শুরু থেকেই তো কারযাভীর এটা বুঝার কথা যে সিরিয়ায় “সশস্ত্র আরব স্প্রিং” জয়লাভ করলে তাতে হামাস ও হিজবুল্লাহ আন্দোলন বিলুপ্ত হয়ে যাবে।
[অসমাপ্ত]
এখানে অনেক ধারণা স্পর্শ করেছি, তুলে এনেছি, সময়াভাবে বিস্তার করতে পারিনি। আগামিতে সেগুলো করার ইচ্ছা রাখি। ফলে আপাতত একটা প্রাথমিক রচনা হিসাবে এটাকে পাঠ করার আবেদন রাখছি।

Advertisements

Morsi’s speech in Tahrir square before sworn in as President

নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। এটা একটা ওয়ার্ড ফাইল, যার বডিতে একটা ভিডিও ক্লিপ আছে। ওয়ার্ড ফাইল খুলার পর বডির ক্লিপ একটিভ হতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগে, ফলে একটু অপেক্ষা করুন। এরপর ভিডিও ক্লিপ একটিভ হয়েছে দেখা গেলে প্লে ভিডিও বাটনে চাপ দিয়ে ভিডিওটা উপভোগ করুন।

https://goutamdas.files.wordpress.com/2012/07/300612-mohamed-morsi-sworn-in-as-egypts-president2.docx

ব্লক রাজনীতির যুগের সোভিয়েত নৌকা এখন ফুটা, ভেঙ্গে পড়েছে তবু ডান-বাম ক্যাটাগরিতে কোন নৌকায় তোলারচেষ্টা

এটা ২০১২ সাল। কিন্তু তবু এম এম আকাশ এখনও বাম অথবা ডান বলে ঘটনা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে চলেছেন সেই সত্তর দশকের মত। বাম মানে কি? তিনি কি বুঝেন সেটা এই লেখাতেও জারি রেখেছেন। সেটা হলো, সোভিয়েত ব্লকে ঢুকা, নৌকায় তুলে নেয়া আর ভুতুড়ে শব্দ “সমাজতন্ত্রের” নাম জপা। সোভিয়েত ব্লকে ঢুকা মানে সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্রটাকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ব্লকে ঢুকা বাকি সব রাষ্ট্রের স্বার্থকে বলি দেয়া, বিক্রি করে দেয়া। এর বাইরে ভুতুড়ে ফেটিস “সমাজতন্ত্র” শব্দের আর সে মানে সেটা হলো রাষ্ট্রীয় মালিকানা। অর্থাৎ ক্যাপিটালিজমের যে অজস্র সমস্যা, স্ববিরোধ আছে তাকে স্রেফ মালিকানার সমস্যা হিসাবে রিডুইস করে দেখা যেন রাষ্ট্রীয় মালিকানা কায়েম করলেই ধনন্তরির মত ক্যাপিটালিজম-ঘটিত সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সমস্যাটা মালিকানা দিয়ে ক্যাপিটালিজমকে বুঝবার মত তরল বা সরল না, এই বুঝের ভাত নাই, ফলে ব্যক্তি মালিকানা নির্বিচারে উৎখাত করে রাষ্ট্রীয় মালিকানা কায়েম করলেই ধনন্তরির মত ক্যাপিটালিজম-ঘটিত সব সমস্যার সমাধান কোথাও ঘটেনি, উলটা “সমাজতন্ত্র” এর বুঝ নিজেই এক অবুঝ কারবার, দুনিয়ায় টেকা অসম্ভব এটাই সে প্রমাণ করেছে। এই ভাবনার সবচেয়ে আদর্শ প্রয়োগস্থান খোদ সোভিয়েত ইউনিয়ন রাষ্ট্র ভেঙ্গে পড়েছে। আর সাথে রেখে গিয়েছে এই এক্সপেরিমেন্টের অজস্র করুন পরিণতি যার সম্ভবত সবচেয়ে লোমহর্ষক উদাহরণ হলো কম্বোডিয়া। ব্যাক্তি মালিক উচ্ছেদ করতে গিয়ে যে গণহত্যা করতে হয়েছে সেই ক্ষত মিটাতে এখন জেনোসাইড বিচার কমিশন, ট্রুথ কমিশন করেও কম্বোডিয়ার সামাজিক বিপর্যয় রোধের কুল পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য কমিউনিষ্ট রাষ্ট্রগুলো কমবেশি একই কান্ড করেছে, করে সামলিয়ে নিতে পেয়েছে। কিন্তু শেষের দিকে (১৯৭৫-৭৯) বলে ধরা খেয়েছে Red Khmers বা Communist Party of Kampuchea in Cambodia; খেমার রুজ আজ গণহত্যার আসামী। রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশের (চীন বা সোভিয়েত) কমিউনিষ্টরা কখনও ক্ষমতায় আসতে পারেনি। কিন্তু তাসত্ত্বেও একথা কঠিন সত্যি যে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে কমিউনিষ্ট চিন্তার অর্থনীতিক ব্যবহারে ভুতুড়ে সমাজতন্ত্র ভাবনায় সাজাবার সুযোগ ও কাজ হয়েছিল। ১৯৭৩ সালের বাজেট, প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, রেহমান সোবহান এন্ড গং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং অর্থ পরিকল্পনা ও পাট মন্ত্রী তাজউদ্দিনের আনুকুল্যে সেসব ঘটনা ঘটেছিল। শেখ মুজিব “তোরা অর্থনীতি ভাল বুঝিস” বলে উদারহাতে এদের সুযোগ দিয়েছিলেন। এর বিষময় ফলাফল ১৯৭৪ এর দুর্ভিক্ষ, অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়া আমরা দেখেছি, সইতে হয়েছে আমাদের। কিন্তু সেই রেহমান সোবহান আজও পিছন ফিরে দেখেন নি ৭৩-৭৪ এর তাঁর অর্থনীতিক ভাবনা চিন্তাগুলোর মধ্যে সমস্যা কি ছিল, কোন দায় তিনি বোধ করেন, এর কোন মুল্যায়ন তিনি কোথাও করেছেন আমরা দেখিনি। চুপচাপ বিআইডিএস হয়ে এখন সিপিডি করেছেন, যেটা ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের স্থানীয় সহযোগী গবেষণা ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের চিন্তা বদলাতেই পারে, ভুল থেকে মানুষ শিক্ষা নেয় তাই চোখকান খোলা রেখে নিজেকে বদলানোও দরকার হয় বটে। কিন্তু কেন কি বদলাচ্ছি এর ব্যাখ্যা দেয়া, দায় নেয়া গুরুত্ত্বপুর্ণ দিক। আমরা সৌভাগ্যবান যে এক দুর্ভিক্ষ উপহার দিয়েই সব সমাজতন্ত্র ভাবনা খামোশ হয়ে গিয়েছিল, মালিকানা উচ্ছেদের নেশায় মত্ত হওয়ার দিকে যাবার সুযোগ মেলেনি, নইলে হয়ত আজ আমরা দেখতাম একা শেখ মুজিবকে খেমার রুজের মত গণহত্যার কাঠগড়ায়। এজন্য আমরা ঐ দুর্ভিক্ষকে যথেষ্ট মনে করে ওর শুকরিয়া আদায় করতে পারি। দায় আমাদের সকলের, বিশেষ করে যারা কিঞ্চিত মাত্রায় হলেও ধনন্তরি হিসাবে সমাজতন্ত্র বুঝেছিলাম, আবার গ্লোবালভাবে দেখলে গ্লোবাল এক কমিউনিষ্ট ভাবনার মধ্যে আমাদের সেই কাল কেটেছিল, চাইলেই যার বাইরে আমরা চিন্তা করতে পারতাম না। তবু দায় আমাদের। এই দায়মুক্তি আমাদের তখনই ঘটতে পারে যদি আমরা পিছন ফিরে ভুলগুলো কি ছিল তা সনাক্ত মুল্যায়ন করা, তা থেকে শিক্ষা নেয়া, ক্যাপিটালিজম বা পুঁজি ফেনোমেনাটা কি, মৌলিক সমস্যাগুলো কি –এর চরম সমাধান কি তা আজও কোথাও হাজির নাই, আমাদের বের করার জন্য কাজ করতে হবে, এর আগে কাজ চলার জন্য কি কি করব না, কি কি ভুল মনে করি অন্তত তার একটা লিষ্ট লাগবে ইত্যাদি বহু কিছু। সেসবের আগে “তার আগে চাই সমাজতন্ত্র” বলে আর ঝাপিয়ে পড়ব না অন্তত সে প্রতিজ্ঞা লাগবে। এসব কাজের আগে – এখনও এই ২০১২ সালে আবারও বাম-ডান কাটাগরি দিয়ে অর্থনীতি ব্যাখ্যা করার মানে কি? সেই সাধের ব্লক সোভিয়েত ইউনিয়নই নাই। ফলে বাম ডান ভাগ করছেন তিনি কি আশার ছলনায়? এটা একটা রীতি মত ক্রাইম; ৮০ এর দশক যদি এম এম আকাশের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন ধরি তবে কম করে হলেও এখনকার তরুণেরা এর তৃতীয় প্রজন্মের, এদেরকে আমাদের অমুল্যায়িত ফেলে রাখা ভুলে বিভ্রান্ত করা অপরাধ বলে আমি মনে করি।

লেখার শেষে বিশ্বব্যাঙ্ক প্রসঙ্গে আকাশ লিখছেন, “বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের সবকিছু আমরা গ্রহণ করব–তাও না আবার সবকিছু বাদ দিব তাও না”।এটা চাল চুলাহীন এক ষ্টেটমেন্ট। পাঠককে বাম-ডান সমাজতন্ত্র বুঝিয়ে এরপর আচমকা বিশ্বব্যাঙ্ক নিয়ে এই ষ্টেটমেন্ট দেবার মানে হোল তিনি যেমন ক্যাপিটালিজমকে কেবল মালিকানা-বুঝ দিয়ে সর্টকাটে সমাজতন্ত্রের জামা গায়ে তুলে নিয়েছিলেন ঠিক একইভাবে বিশ্বব্যাঙ্কের জামা পড়তে বলছেন। গ্লোবাল কাপিটালিজমের অর্ডার শৃঙ্খলার মধ্যে বিশ্বব্যাঙ্ক এই প্রতিষ্ঠানটা আসলে কি? তিনি কিভাবে বুঝেছেন এর হদিস আমরা দেখিনি। সে সবের কোন ধারণা ছাড়া তাঁর চোখ দিয়ে কেন কিভাবে গ্রহণ বর্জনের বিষয়টা আমরা বুঝব? বিশ্বব্যাঙ্কের সাথে গ্রহণ-বর্জনের সম্পর্ক ঘটা যদি জায়েজ হয়ে থাকে তবে এই লেখায় এরশাদের উত্থানকে যেভাবে ব্যাখ্যা করলেন এর তালমিল পাওয়া মুস্কিল। এছাড়া বিশ্বব্যাঙ্কের সাথে সম্পর্ক যদি জায়েজ হয় তবে আবার লেখার শুরুতে ডান-বামের কথা তোলার মানে কি? মোস্তাক, জিয়ার বিরুদ্ধে ডানে ফেরার অভিযোগ তোলার মানে কি?আবার এমন এক সময় তিনি বিশ্বব্যাঙ্কের সাথে গ্রহণ-বর্জনের কথা তুলছেন যখন গ্লোবাল কাপিটালিজমের অর্ডার শৃঙ্খলা মারাত্মক সঙ্কটে। এমন সঙ্কটে যে বিশব্ব্যাঙ্ক এর পালটা ভাবনা শুরু হয়ে গিয়েছে, নতুন আর একটা গ্লোবাল কাপিটালিজমের অর্ডার শৃঙ্খলা দাড় করাবার প্রচেষ্টা চলছে। সফল হবে কি না, হলে কিভাবে হবে বর্তমান বিশ্বব্যাঙ্কের মত আর এক বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে তা দুনিয়াকে দেখতে হবে কিনা, কোন পথে কেউ জানে না।আওমরা যত দ্রুত সমাজতন্ত বুঝে গেছি বলে ভাবি এর একছটাক সময় যদি গ্লোবাল কাপিটালিজমের অর্ডার শৃঙ্খলার মধ্যে ক্যাপিটালিওজমকে মনোযোগে বুঝতে চেষ্টা করলাম তাহলে মনে হয় আমাদের এভাবে ডান-বাম করে বেরাতে হয়ত না। বহু সামাজিক বিপর্য্য় এড়িয়ে কিছু করতে পারতাম। একাজ যদি নাও পারি তবে ক্ষমা দেয়া উচিত। অন্তত পুরানো অকেজো চিন্তার আবর্জনা ঘেটে তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্তিতে ফেলা এটাকে আমি অপরাধ মনে করব।

আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে ইন্ডিয়া ও সপ্তম নৌবহর নিয়ে অস্বস্তি

আমেরিকান যাতাকাঠি হাতে ইন্ডিয়া ও সপ্তম নৌবহর নিয়ে অস্বস্তি

গৌতম দাস

সম্প্রতি হিলারির বাংলাদেশ সফরে হিলারি-হাসিনা আলাপে বাংলাদেশে সপ্তম নৌবহরের ঘাটি বানানোর আমেরিকান পরিকল্পনা নিয়ে কথা হয়েছে বা আগিয়েছে দাবী করে বাংলাদেশের মিডিয়ায় তোলপাড় করা খবর বের হয় গত ২ জুন। এই খবরের উৎস আগের দিনের ইন্ডিয়ার টাইমস অব ইন্ডিয়ার Times Now  টিভি নিউজের ওয়েব সাইটের খবর। [http://www.timesnow.tv/videoshow/4403322.cms] Times Now তার রিপোর্টের প্রথম লাইনে লিখেছে, “America’s threat to send its seventh fleet to stop liberation of Bangladesh in 1971 is a known fact. Now, 41 years later – it is America again – which wants to park its seventh fleet in the country – for its strategic interests”। এই একই  রিপোর্টের বরাতে আমাদের প্রথম আলো লিখছে,”বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের পক্ষে মার্কিন সপ্তম নৌবহর পাঠানোর হুমকি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পাল্টা হুমকিতে নৌবহর পাঠায়নি মার্কিন কর্তৃপক্ষ। সেই সপ্তম নৌবহর আবার আলোচনায় এসেছে”। প্রথম আলোর  ট্রীটমেন্ট দিয়ে লেখা রিপোর্টে প্রথম বাক্যে বাড়তি শব্দ হলো, “পাকিস্তানের পক্ষে” আর এরপরে একেবারে নতুন বাক্য, “পরে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের পাল্টা হুমকিতে নৌবহর পাঠায়নি মার্কিন কর্তৃপক্ষ”। এবং শেষে পাঠক-সাজেশনমূলক, পাঠককে মোল্ড করা বাক্য, “সেই সপ্তম নৌবহর আবার আলোচনায় এসেছে”। [http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-06-02/news/262647] Times Now এর রিপোর্টেটা ইন্ডিয়ার ষ্ট্রাটেজিক নিজস্ব স্বার্থের দিক থেকে লেখা, সেটা ১৯৭১ এর সময়ের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থও বটে আবার এই ২০১২ সাথের ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থও বটে। ফলে রিপোর্ট শেষ করেছে, “this base could cast a shadow on India’s own strategic interests”; অর্থাৎ সপ্তম নৌবহরকে কেন্দ্র করে Times Now  কেবল ইন্ডিয়ার দুই সময়ের নিজস্ব ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থ এর মিলের দিকটাই স্মরণ করেছে। Times Now এর ঐ রিপোর্ট যেসব কথা মনে করিয়ে দিতে চায়নি তা হলো, ১৯৭১ সালে ইন্ডিয়া সোভিয়েত ব্লক ছিল আর এখন ইন্ডিয়া এশিয়ার এই অঞ্চলে চীনের বিরুদ্ধে আমেরিকার এক নম্বর বন্ধু যেটার আনুষ্ঠানিক যাত্রা ২০০৭ সালে। অথচ প্রথম আলো,  এর রিপোর্টেটা অনুবাদ করে সাথে নিজস্ব শঠতার সাথে এই গুরুত্ত্বপুর্ণ বেমিল দিকটা আড়াল করে তার পাঠককে মটিভেট করার উদ্যোগ নিয়েছে। মটিভেশনটা হলো, ৭১ সালের সপ্তম নৌবহর আমাদের জন্য সেনসেটিভ; এটাকে ব্যবহার করে উস্কানি দিয়ে বলা হচ্ছে আমরা যেন এবারও সেই একই যুক্তিতে বিরোধীতা করি। যেন ১৯৭১ এর ইন্ডিয়া আর ২০১২ এর ইন্ডিয়া একই। প্রথম আলো আমাদেরকে ভুলিয়ে দিতে চায় ২০০৭ সাল থেকে আমেরিকার যাতাকাঠি হাতে পেয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করা ইন্ডিয়ার সাথে আমেরিকার বন্ধুত্ত্বের মুল্য আমরা কিভাবে পরিশোধ করেছি, এখনও করে চলছি। এই বন্ধুর তীব্রতা এতই যে সারা জীবন আমেরিকার যাতাকাঠির যাতা খেয়ে অস্থির, নিষ্পেষিত বাংলাদেশের আমরা আমাদের সরকারে কে থাকবে নাকি মারা যাবে এর নির্ধারক হিসাবে আমেরিকাকে দেখে এসেছি, এখন সেই যাতাকাঠি আমেরিকা অবলীলায় ভারতকে ব্যবহার করতে ধার দিয়ে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে আমেরিকা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা স্বার্থ নাকি এরপর থেকে তারা ইন্ডিয়ার চোখ দিয়ে দেখবে। বড় ভাইয়ের এই হাত ইন্ডিয়ার পিঠে রাখার মুল্য কী তা আমরা বাংলাদেশে বসে হাড়ে হাড়ে টের পেয়ে চলছি। আমাদের মঈন-ফকরু আজিব সামরিক সরকার থেকে শুরু করে এই লেজে লেজে ধারাবাহিকতায় যে হাসিনা সরকার কায়েম হলো, এটা ১৯৯৬ সালের  হাসিনা একেবারেই নয়। এর ম্যান্ডেট ভিন্ন। করিডোর, টিপাইমুখ, বর্ডারে ট্রিগার হ্যাপি হত্যা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি, ছিটমহল চুক্তি, একপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সুবিধা, নিজেই নিজের শত্রু তৈরি করে নিজের নিরাপত্তা স্বার্থ যেভাবে বুঝে তার দায়ে বাংলাদেশকে সাজানো সাইজ করা, নিজের ষ্ট্রাট্রেজিক স্বার্থানুযায়ী বাংলাদেশকে সাজানো ইত্যাদিতে বাংলাদেশকে ঘিরে ইন্ডিয়ার যত ধরণের স্বার্থ-সুবিধা বের করে নেয়া যায় তার সবকিছু নিশ্চিত করার ম্যান্ডেট এবারের হাসিনার। একালের এটাই রাইজিং ইন্ডিয়া; কোনভাবেই এটা ১৯৭১ সালের ইন্ডিয়া নয়, আকাশ-পাতালের ফারাক। ম্যান্ডেটের ক্ষমতা পেয়ে হাসিনার অবস্থা এখন এমন চাপে নিষ্পেশনে যাতা খেলেও সে প্রকাশ্যে কান্নাকাটি করতেও পারেনা, কাঁদতে হয় গোপনে, বড় জোর প্রণবের সামনে। এই পুরা সময়ে আমরা প্রথম আলোকে দেখেছি এই নিষ্ঠুর দানবীয় কারবার পাঠক জনগণের থেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টায় সর্বোচ্চ মনযোগী হতে। লঘু তরল করে উপস্থাপন। আমাদেরকে বলা হয়েছে, ইন্ডিয়ার এই যাতাকাঠির নিষ্পেশন এটা নাকি আমাদের “মনের বাঘ”, তাই আমরা চেচামেচি করে খামোখা কষ্ট পাচ্ছি, প্রকাশ করছি। শেষের দিকে চক্ষুলজ্জার খাতিরে ইন্ডিয়ার মিডিয়াই যখন লিখতে বাধ্য হয়েছে – টু মাচ, এখন বাংলাদেশের কিছু স্বার্থের দিকে সক্রিয় হওয়া দরকার, সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবু প্রথম আলো লজ্জা পায়নি। বরং আরও নতুন উতসাহে টাইমস অব ইন্ডিয়ার সাথে যৌথ উদ্যোগের প্রচারে লিপ্ত হয়েছে। যেন আমাদের কিছুই হয়নি, ভালই আছি। কেবল দুদেশের মিডিয়ার সাথে মিডিয়া বা সাহিত্যিকরা পরস্পরের পিঠচাপড়ে কিছু কথা বলে নাই – এটাই আমাদের সব দুঃখের কারণ। অরথম আলোর লজ্জা নাই, নিজ দেশের স্বার্থ বিরোধী হতে বেপরোয়া সে। আবারও খুব হিসাব করে আবার সেই যাতাকাঠিটাই লুকিয়ে ফেলা, আমাদের ভুলিয়ে রাখার শঠতা।

আমেরিকা যাতাকাঠি ধার দিয়ে পিঠে কেন হাত রেখেছিল – এতে ইন্ডিয়ান বর্তমান নেতৃত্ত্ব ভেবেছিল মুই কি হনু রে! গ্লোবাল পাওয়ারের স্বাদ এত মিঠা! যাতাকাঠি এত সহজলভ্য, কাজের। সর্টকাটে সব পাওয়া যায়! কিন্তু ভুলে গিয়েছিল ইন্ডিয়াকে যদি রাইজিং ইন্ডিয়া বলে বুঝতে হয় তবে অনিবার্যভাবে আমেরিকা তাঁর ষ্ট্রাটেজিক মিত্র হতেই পারে না। যে কেউই রাইজিং ইকোনমির দেশের সম্ভাবনাময় হতে চায় বা সম্ভাবনা দেখা দেক না কেন তার সাথে আমেরিকার সম্পর্ক অন্তত ষ্ট্রাটেজিক প্রশ্নে বিরোধাত্মক হবেই। মুল কারণ, রাইজিং ইকোনমি মানে আগামী দিনের দুনিয়ার অর্থনৈতিক শক্তি, প্রভাবশালী অর্থনীতি, গ্লোবাল অর্থনীতি বা ক্যাপিটালিজমের প্রেক্ষিতে নতুন ভাগীদার, শেয়ার হোল্ডার। এটা যেই মান-মাত্রায় শেয়ার হোল্ডার ঠিক সেই মাত্রায় সে গ্লোবাল সামরিক-রাজনৈতিক শক্তি, সেই মাত্রায় বিস্তৃত সাম্রাজ্য এম্পায়ার। এসবের মানে উপস্থিত এক মেরুর গ্লোবাল পাওয়ারের অচল দশা, ভাঙ্গন। গ্লোবাল অর্থনৈতিক অর্ডার আন্তর্জাতিক লেনদেন বাণিজ্যের নতুন মুদ্রা, গ্লোবাল রাজনৈতিক স্বার্থ বিরোধ নিষ্পত্তির যে নতুন নিয়ম শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠান খাড়া করে ফেলতে পেরেছিল (১৯৪৪),  যেটা এখনও বর্তমান, যা কলোনী যুগ থেকে বেরিয়ে দুনিয়াকে নতুন সাজিয়ে নিতে পেরেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) ধবংসাবেশ থেকে; এই গ্লোবাল অর্ডার তার শেষ জমানা পার করছে।
রাইজিং ইকোনমি কথাটা কয়েন বা চালু হয়েছে বা বলা ভাল ভিত্তি পেয়েছে আমেরিকার এক করুণ গোয়েন্দা গবেষণা প্রজেক্ট রিপোর্ট Global Trend: US National Intelligent Council’s 2025 Project  থেকে। [http://www.dni.gov/nic/NIC_2025_project.html] সারকথায়, আগামী ২০২৫ সালের দুনিয়াটায় গ্লোবাল পাওয়ার হিসাবে দেখব, কাদের মধ্যে ভাগাভাগি হয়ে থাকবে, দেখতে কেমন হবে তা নিয়ে গবেষণা করে এর ট্রেন্ড অভিমুখ বুঝাবুঝি। নতুন দুনিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে আর একক ও একচ্ছত্র শক্তি হিসাবে টিকিয়ে রাখতে পারছে না। নিজের অর্থনৈতিক দুর্দশা কাটিয়ে উঠতে যুক্তরাষ্ট্রকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পুঁজিতান্ত্রিক একমুখী প্রবাহ শুরু হয়েছে পশ্চিম থেকে পুর্বের দিকে এশিয়ায়, অর্থনৈতিক যজ্ঞের কেন্দ্র হয়ে উঠছে এশিয়া। এতে প্রতিযোগিতায় এক নম্বরে থাকা দূরে থাক,পাঁচ নম্বরে থাকতে পারবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত – এটাই যুক্তরাষ্ট্রের নিজেরই ঐ গোয়েন্দা গবেষণা প্রজেক্ট রিপোর্ট সারকথা। যারা নতুন প্লেয়ার হচ্ছে এখানে তারা হলো, Brazil, Russia, India and China যাদের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে সংক্ষেপে BRIC বলে চেনানো ভিত্তি পায়, আর এই দেশগুলোকে রাইজিং ইকোনমির দেশ বলবার রেওয়াজ চালু হয়। এই হিসাবে পরের জন বলে সাউথ আফ্রিকাকে গণ্য করে BRICS বলা শুরু হয়। তবে এখানে বলে রাখা ভাল শুধু রাইজিং ইকোনমির কারণে এই গ্লোবাল ওলটপালট লক্ষণ ত্বরান্বিত হয়েছে তা নয়। বরং এর সঙ্গে একই সময়ে ঘটে গেছে আফগানিস্থান, ইরাকে ওয়ার অন টেররে লিপ্ত আমেরিকার যুদ্ধের খরচ সামলাতে গিয়ে নিজ অর্থনীতিতে আয়-ব্যায়ের ভারসাম্যহীনতা ফলাফলে ২০০৭ সালের শেষে ভয়াবহ মন্দা দেখা দেয়া। এটাই সে যোগ হওয়া নতুন ফাক্টর। এই গবেষণা রিপোর্ট আনুষ্ঠানিক প্রকাশ পায়, জুন ২০০৮ সালে। তবে আমেরিকার জন্য ভয়াবহ সব প্রাথমিক ফাইন্ডিংস আসা শুরু হয় ২০০৬ সালের মাঝামাঝি থেকে, সন্তান বুশের আমলের শেষে। এখান থেকেই ঢেলে সাজানো আমেরিকার নতুন পররাষ্ট্রনীতি, নতুন উপাদান, নতুন ষ্ট্রাটেজি, সমরনীতি, নতুন ষ্টাটেজিক হিসাব। সারকথায়, এশিয়ার ইন্ডিয়াকে কাছে টেনে পিঠে হাত রেখে চীনকে যতটা সম্ভব দাবিয়ে প্রতিযোগিতায় নিজের পঞ্চম অবস্থান থেকে যতটা সম্ভব উপরে জায়গা করে নেয়া যায়, ধরে রাখা যায়।

যেকথা বলছিলাম, রাইজিং ইকোনমির দেশের সাথে আমেরিকার সম্পর্ক অন্তত ষ্ট্রাটেজিক প্রশ্নে বিরোধাত্মক হবেই। কারণ, রাইজিং ইকোনমি মানে নতুন গ্লোবাল অর্ডারের সম্ভাবনা, পুরানা অর্ডারের ভস্মছাইয়ের উপর দাঁড়িয়ে। পুরানা গ্লোবাল পাওয়ার মানে ১৯৪৫ সালে গড়ে উঠা গ্লোবাল অর্থনৈতিক নতুন অর্ডার, এর প্রতিষ্ঠান আইএমএফ (ডলারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মুল্য হিসাবের কমন মুদ্রা এবং কার ন্যাশনাল মুদ্রার মান কত তা নির্ধারণের পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠান), বিশ্বব্যাঙ্ক (পুজির বিচলন ও সর্বব্যাপী দেশ সীমান্ত ছাড়িয়ে বিস্তারের পুর্বশর্ত – কেন্দ্রীয়ভাবে অগ্রসর দেশগুলো রাষ্ট্রীয় দায়ে, কম সুদে  ইনফ্রাষ্টাকচারাল বিনিয়োগ, যার সুবিধা নিয়ে অগ্রসর দেশের কোম্পানীগুলো ছড়য়ে পরতে পারে), জাতিসংঘ (এসব কারবার করতে গিয়ে যুদ্ধ জড়িয়ে পুঁজিপাট্টা নষ্ট না করে যুদ্ধ এড়িয়ে না হলেও দেরি করিয়ে দিয়ে ক্ষতি কমানো, এর জন্য আন্তর্জাতিক সদস্যপদ ও নিয়মকানুন তৈরি, গ্লোবাল পাওয়ারগুলোকে ভেটো-ক্ষমতাসম্পন্ন করে পরস্পরকে নাল করে একটা ভারসাম্য আনা)। আর এর বাইরে OECD (বড়লোকদের ক্লাব, পুবের গরীব দেশগুলোর বিপক্ষে পশ্চিমের দেশগুলোর স্বার্থ বুঝে নিতে জয়েন্ট অবস্থান, কৌশল নির্ধারণের কাজে গবেষণা করা)। জন্মের সময় হিসাবে OECD উপরের তিনটা প্রতিষ্ঠানের কিছুটা পরে (১৯৪৮) এবং ভিন্ন নাম (OEEC) থাকলেও পরে ঐ তিনটা প্রতিষ্ঠান দাড়িয়ে গেলে ১৯৬১ সাল থেকে বর্তমান অবস্থানে (মোট ৩৪ সদস্য) নিজেকে গুছিয়ে সীমাবদ্ধ করে নেয়। এসব প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশেষত্ত্ব হলো, এগুলো, কলোনী পরবর্তী যুগের থেকে (১৯৪৫) আজ পর্যন্ত যে গ্লোবাল অর্থনৈতিক বা পুঁজিতান্ত্রিক যে অর্ডার নিয়ম শৃঙ্খলা তৈরি হয়ে আছে আমরা দেখি সেসব দাঁড়িয়ে আছে এই প্রতিষ্ঠান চারটার ভিত্তির উপরে। যদিও পরে আরও অনুষঙ্গ প্রতিষ্ঠান হিসাবে, (NATO, UNCTAD, WTO)এসবের নাম করা যায়।

তাহলে গ্লোবাল এই অর্ডারের বদল আসন্ন, মোড় বদল বলছি এজন্য না যে রাইজিং ইকোনমির দেশগুলো অর্থনৈতিক শক্তির কারণে গ্লোবাল পাওয়ারের নতুন ভাগীদার ষ্টেকহোল্ডার হয়ে উঠে আসছে তাই। মুল কারণ, এই প্রতিষ্টানগুলোর আমেরিকার কর্তৃত্ত্ব প্রভাবের উপরে দাঁড়িয়ে আছে, ফলে BRICS রাষ্ট্রগুলোর যে কেউ নিজ নতুন গ্লোবাল ক্ষমতার নিয়ে প্রবেশ করলেও পুরানা প্রতিষ্টানগুলোর উপর কখনই নিজের প্রভাব কতৃত্ত্ব নিজের আদল দিতে পারবে না, নিজের মত কাজে লাগাতে পারবে না। আর আমেরিকাও সহজেই হার মেনে এর কর্তৃত্ত্ব ছেড়ে দিবে না। তাই সোজা বক্তব্য দুনিয়ায় নতুন গ্লোবাল পাওয়ারগুলোর আবির্ভাব মানে নতুন গ্লোবাল অর্ডার, নতুন গ্লোবাল অর্ডারের সাথে ও হাতে তৈরি সামঞ্জস্যপুর্ণ প্রতিষ্টান। যদিও আসন্ন সে গ্লোবাল অর্ডারের রূপ আদল – ভিশনটা কি হবে, কেমন হবে তা এখনও যথেষ্ট পরিস্কার হয়নি। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মত কোন যুদ্ধের ফলাফল হিসাবে আমরা সেটা দেখতে পাব  না কি, আপসে হবে আমরা কেউ এখনও জানি না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্রে গ্লোবাল অর্ডারের ভিশনারি নায়ক ছিলেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট। এবারের রুজভেল্ট কে একজন নাকি অনেকে – আলামতেও তা কিছু জানা যায় না এখনও। কিন্তু নতুন অর্ডার যে আসন্ন তা নিয়ে বিশেষ করে মেনষ্ট্রীমে বড় রকমের তোলপাড় আলোচনা বহু আগেই শুরু হয়ে গেছে। ২০০৯ সাল থেকেই আইএমএফ চীনের নতুন গ্লোবাল ভুমিকাকে তার মুদ্রা ইঊয়ান সহ স্বাগত জানিয়ে প্রস্তুত বলে জানিয়ে রেখেছে। এনিয়ে বিশ্বব্যাঙ্কের গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। এরা তৈরি। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের স্বার্থ আর আমেরিকার স্বার্থ যে হুবহু এক না – একাডেমিকদের মধ্যে তা নিয়ে পরিস্কার দুরত্ত্ব বজায় রেখে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক ষ্ট্রাটেজিক পাড়ায়, আমেরিকান পুরানো পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিগনিউ ব্রেজনিস্কি চীনের আসন্ন ভুমিকা মেনে নিয়ে এরপর আমেরিকার ষ্ট্রাটেজিক অবস্থান কী হওয়া উচিত তা নিয়ে বই লিখে ফেলেছেন। দুটো ভাইটাল তথ্য দিয়ে এই প্যারা শেষ করব। চীন ওয়াল্ড ব্যাঙ্কের ভিতর দিয়ে না গিয়ে নিজেই একা যে ইনফ্রাষ্ট্রাকচারাল বিনিয়োগ নিয়ে আফ্রিকায় হাজির হয়েছে তা ইতোমধ্যেই ওয়ার্ড ব্যাঙ্কের সারা জীবনের মোট পুঁজি বিনিয়োগের চেয়ে বেশি। ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের কথা মাথায় রেখে ইতোমধ্যে চীন ইন্ডিয়াকে রাজি করিয়ে BRICS ব্যাঙ্ক খোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গত মাসে ইন্ডিয়ায় অনুষ্ঠিত BRICS সম্মেলনে। আকার সম্পন্ন হয়নি কাজ চলছে। আর সবচেয়ে মজার তথ্য ওয়াল ষ্ট্রিট ও হেজ ফান্ডের মালিকদের মাঝে এই অর্ডার পরিবর্তনের খবর ইঙ্গিত পৌছে গেছে শুধু নয়, তারাই নতুন অবস্থা পরিস্থিতি বুঝে BRICS ব্যাঙ্ক খোলার তাগিদ দিয়ে চলেছে। গ্লোবাল অর্ডারে আমেরিকান এম্পায়ার ভুমিকা নিয়ন্ত্রণের দিন শেষ বলে এর প্রতি এরা আগ্রহ কমিয়ে ফেলেছে। ওদিকে ইউরো বলে কিছু থাকবে কি না এর ভাগ্য আলামত পরিস্কার হতে শুরু করবে এই জুন মাসের মধ্যে গ্রীসের নির্বাচনে। এই ছোট্ট রচনায় যা বলতে চাচ্ছি, ইন্ডিয়া নিজেকে রাইজিং ইকোনমির দেশ হিসাবে যদি বুঝে তাহলে তাকে এটা মানতে হবে নতুন ভারসাম্যে নতুন গ্লোবাল অর্ডার গড়তে পুরানো গ্লোবাল অর্ডারের মাতব্বরি আগলে বসে থাকা আমেরিকার সাথে সব রাইজিং ইকোনমির সম্পর্কের ধরণ – এই প্রশ্ন হবে মুলত বিরোধাত্মক। এটা ইচ্ছা অনিচ্ছার ব্যাপার না, ইনহারেন্ট। আবার বিরোধ বলতে কেউ যেন না মনে করে আমি রাশিয়া-আমেরিকার কোল্ড ওয়ারের ব্লক রাজনীতির মত কিছু মিন করছি। সেটা হবার কোন সম্ভাবনা নাই। মুল কারণ, এখানে স্বার্থ বিরোধ থাকলেও তা যতই থাক শেষ বিচারে এরা সবাই একই পুজিতান্ত্রিক গ্লোবাল সিষ্টেম ওর্ডারের মধ্যেই আছে এবং নতুন অর্ডারটাও এই বড় পুজিতান্ত্রিক ফ্রেমের মধ্যে থাকবে। ঠিক যেমন ১৯৪৫ সালের অর্ডারটাও গড়ে উঠেছিল পরানো কলোনীয়াল সীমিত লেনদেনের পুজিতান্ত্রিক অর্ডারকে ভেঙ্গে কিন্তু পুজিতান্ত্রিক সম্পর্কের লেনদেনের ভিতরেই।

যেখান থেকে শুরু করেছিলাম। ইন্ডিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্ত্ব এত সব দিক বুঝেন না, বা খবর রাখেন না এটা মনে করা ভুল হবে। বুঝা সত্ত্বেও তারা আমেরিকান যাতাকাঠি পেয়ে সর্টকার্টে বাজিমাত করার পথে হাটার লোভে ছিলেন, হাটছিলেন, আছেন। কিন্তু আমেরিকান ষ্টাটেজিক স্বার্থ যে কোনভাবেই রাইজিং ইন্ডিয়ার স্বার্থ হতে পারে না, সেটাকে এখন থেকে আর গোপন (আমেরিকান দিক থেকে) ও সর্টকার্টের লোভী (ইন্ডিয়ায়) অবস্থায় ফেলে রাখার সুযোগ আর থাকল না, সব উদোম হয়ে গেল। এটাই ইন্ডিয়ার জন্য শকিং, বাস্তবতার ঝাকুনি খাওয়া।

Times Now এর ঐ রিপোর্ট এর শেষ বাক্য হলো, “this base could cast a shadow on India’s own strategic interests”; কিন্তু ইন্ডিয়ার ষ্ট্রাটেজিক ইন্টারেষ্ট টা আসলে কি তা জানা যায়নি। কি সেটা, সুনির্দিষ্ট করে আমাদের তা এখনও জানি না।

প্রথম আলো আমাদেরকে ৭১ সালের ধুয়ো তুলে নৌবহর ইস্যুতে বিরোধিতা করতে কানপড়া দিচ্ছে। এই বিরোধিতা করার সময়  আমরা কি ভুলে যাব ইন্ডিয়ার বাংলাদেশের উপর আমেরিকান যাতাকাঠি ব্যবহারের সদ্য কাহিনী? আমরা অবশ্যই আমেরিকান নৌঘাটির বিরোধিতা করব, কিন্তু প্রথম আলোর কানপড়ায় না, ভারতের স্বার্থে ভারতের মত করে না, নিজের ষ্ট্রেটেজিক স্বার্থ বিবেচনা, বিশ্লেষণ করে, সবদিক বুঝে এবং একমাত্র নিজের স্বার্থে। মনে রাখতে হবে উঁপস্থিত যে দুনিয়ায় আমরা প্রবেশ করে আছি এখানে তথাকথিত আন্তর্জাতিক আদর্শ যেমন কমিউনিজম অথবা ইসলামের নামে চিল্লা দিয়ে কারো পিছনে দাঁড়িয়ে গিয়ে তার রাষ্ট্র স্বার্থে নিজেকে বিক্রি করে ফেলার যুগ আমরা অনেক আগেই পিছনে ফেলে এসেছি।