ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

গৌতম দাস

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2cF

 

 

 

বলার অপেক্ষা রাখে না দুনিয়াজুড়ে সবার উপরে এক ট্রাম্প-জ্বর চেপে বসেছে। ট্রাম্প মানে, গেল মাসে শপথ নেয়া আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প। ট্রাম্পের আগমণের মুল ম্যাসেজ হল, আমেরিকার সাথে সম্পর্কিত দুনিয়াজুড়ে যত ঘটনা আছে তা আর আগের মতো করেই আগের নিয়মে, অভ্যাসে বা আইনে ঘটবে না এটাই আজকে ধরে নিতে হবে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তবে এর চেয়ে বড় কথা ‘ট্রাম্প কেন এমন’ গভীরে গিয়ে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। যদিও বলা হচ্ছে ট্রাম্প আনপ্রেডিক্টেবল লোক। মানে লোকটা কখন কী করে তা আগে বলা যায় না, এর তালঠিকানা নেই। কিন্তু যে লোক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তার তালঠিকানা নেই এটা বুঝতে হবে, সেটা আবার কেমন কথা? হ্যাঁ, তা ঠিক। ব্যাপারটা হল, আসলে আমরা বলতে চাচ্ছি, কোনো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের যেসব কাজ যেভাবে করা্র কথা না বা যেভাবে বলার কথা না বা অথবা যেসব নীতি নেয়া অসম্ভব অথবা হওয়ার কথা নয় বলে আমরা মনে করতাম; ট্রাম্পকে আমরা তেমন কাজ করা ও সিদ্ধান্ত নিতেই  দেখছি। ফলে কাম্য অর্থে আমরা বলছি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তালঠিকানা নেই। ব্যাপারটা যেন এ রকম যেমন, আমেরিকা এক এম্পায়ার, মানে এক মোড়ল বলে ধরতে পারি। এখন যে লোক মোড়ল তার বাসায় সারা দিন বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের লোকের আসা লেগেই থাকবে। ফলে স্বভাবতই তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও মোড়লকে করতে হবে। এই আপ্যায়ন বলতে ন্যূনতম চা-নাশতা আর এর চেয়েও প্রধান বিষয় যথেষ্ট বসার জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন মোড়ল যদি হঠাৎ বলে এখন থেকে আর বসার কোনো ব্যবস্থাই থাকবে না, দাঁড়িয়ে কথা শেষ করতে হবে তাহলে সমাজ বলবে এই মোড়লের তালঠিকানা নেই।

ট্রাম্পের নীতি কেমন এই প্রশ্নে মিডিয়া বলছে সে প্রটেকশনিস্ট, মানে সংরক্ষণবাদী। সংরক্ষণবাদী মানে কী? মানে হল যে নিজ বাজার বিশেষত অন্য অনেক কিছুর সাথে নিজ জনগণের চাকরির বাজার সংরক্ষণ করে আগলে রাখতে চায়। সাধারণ অর্থে এটা দোষের কিছু নয়। সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হল কী ভাবে? যেভাবে করতে চাওয়া হচ্ছে তা কী কাজ করবে? অন্য কোন পথ কী নাই?  ট্রাম্প নিজে তার এই নীতির দিকটা ঠিক ‘সংরক্ষণবাদী’ বলে পরিচয় করান না। বলছেন, এটা নাকি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, মানে সবকিছুতে সবার আগে আমেরিকা – এই নীতি। তার শপথ নেয়ার পরবর্তী বক্তৃতার প্রথম প্রসঙ্গ ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বয়ান।
আবার অনেকে  বলছেন,  ট্রাম্পের নীতি অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন। সংরক্ষণবাদী মানে এর আর এক অর্থ ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন’ ত বটেই।  সেই সত্তরের দশক থেকে আমেরিকা এত দিন সবাইকে গ্লোবালাইজেশন যোগ দিয়ে নিজ নিজ বাজার খুলে দিতে প্ররোচিত করত চাপ দিত। আজ, সেই আমেরিকা ট্রাম্পের জমানায় এসে উল্টো দিকে চলা শুরু করেছে। যেমন সে ওবামার আমলে সে চীন বাদে ১২ রাষ্ট্রের বাণিজ্য জোট – টিপিপি করেছিল। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে প্রথম সপ্তাহেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমেরিকাকে ওই বাণিজ্য জোট থেকে বের করে এনেছে।

কিন্তু গ্লোবালাইজেশন আর বাজার এর সম্পর্ক কী – এসম্পর্কে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে।  গ্লোবালাইজেশন মানে অবশ্যই নিজ বাজার খুলে দেওয়া। কিন্তু এটাই এর একমাত্র অর্থ বা দিক বৈশিষ্ট নয়। বাজার খোলা মানে অন্যের বাজার খোলা পাওয়াও বটে। অন্যের বাজার খোলা পেয়েছি বলেই ত গার্মেন্ট বেচে বছরে ৩২-৩৮ বিলিয়ন ডলার কামাতে পারি। যদিও আমেরিকার মাতব্বরি তাই গ্লোবালাইজেশনে এসে কম অথবা অকার্যকরও হয়ে যায় নাই। আমাদের বাজার খুলে দিবার মানে গ্লোবালাইজেশনের অংশ হবার আগেও যেমন আমাদের উপর আমেরিকান দাদাগিরি ছিল এখনও প্রায় তেমন কার্যকর আছে। এমনকি গার্মেন্টস নিয়ে আমেরিকার বাজারে সব পণ্য কোডে ঢুকতে যাতে না পারি সেজন্য কোটার নিয়ন্ত্রণ দেয়া আছে। এতসব কিছুর পরও ব্যাপারটা হল – কিছু কিছু ছিদ্র আছে, শর্ত পরিস্থিতি আছে, ক্যাপিটালিজমের লজিক আছে, স্ববিরোধীতা আছে  যেখানে আমেরিকা মুরুব্বির ক্ষমতা থাকলেও তা প্রয়োগ করতে পারে না। কাজে লাগে না। তাদের আরো বড় ক্ষতি হবে বলে। এদিকে আমাদের নিজ সক্ষমতা আছে, দক্ষতা আছে, নিজ শ্রমের বাজারমুল্য বিদেশের তুলনায়  সস্তা এবং দক্ষ (নুন্যতম মজুরি বাড়িয়ে দিলেও তা সস্তা থাকবে) – এই ধরণের আরও অনেক তুলনামূলক-সুবিধা (কমপিটিটিভ এডভ্যানটেজ) আছে – এগুলো আমেরিকা চাইলেও ঠেকায় রাখতে পারে না। আমাদের এসব সুবিধার দিক গুলো নিয়ে –  লেগে থাকা স্টাডি, আর বুদ্ধি খরচ করে চলতে পারলে আমাদের জন্য বন্ধ বাজার (প্রটেকশনিজম) এর  চেয়ে তুলনায় গ্লোবালাইজেশন এর সুবিধা বেশি। ফলে আজকের যুগের লড়াইটা  – গ্লোবাল বাজারে নিজের শেয়ার বাড়ানোর, এটা ঠিক নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়, বা অন্যের প্রবেশ ঠেকানো নয়

চলতি শতকের শুরু থেকেই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে বুশের দ্বিতীয় টার্ম (২০০৫ সাল) থেকে শুরু করে ওবামার দুই টার্ম এই পুরা সময় ধরে আমেরিকা এশিয়ায় চীনা কনটেনমেন্ট নীতি বা ‘চীন ঠেকানোর আমেরিকার নীতি’ চালু রেখেছিল। এই নীতির সার কথা হল – চায়না ঠেকানো ( China Containment)। মানে দুই রাইজিং ইকোনমির (ভারত ও চীন) একটাকে কাছে টেনে ফেবার করে, সুযোগ সুবিধা দিয়ে অন্যটার বিরুদ্ধে লাগা ও লাগানো। ভারতকে কাছে টেনে কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে, নিজের মোড়লি-শক্তির কিছু ভাগ ভারতকে দিয়ে তাকেও চীন ঠেকানোয় কাজে লাগানো। গত প্রায় ১০-১২ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি এটাই।   কিন্তু এই ব্যাপারে ট্রাম্পের নীতি সম্ভবত ভিন্ন হতে যাচ্ছে, না চাইতেও। যেমন চীন বা ভারতের সাথে ট্রাম্প যে আমেরিকা সাজাতে চাইছে তাতে এই দুই রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তি হবে – আমেরিকান কাজের বাজার এই চীন বা ভারত কে কোথায় নষ্ট করছে সেটা দেখা ও ঝগড়া করে ঠেকানো। যে যেখানে আমেরিকান কাজের বাজার নষ্ট করছে সেখানে তার সাথে বিরোধিতা চরমে নেওয়ার নীতি এটা। এজন্য যদিও ট্রাম্প পরিষ্কার করে বলেননি যে চীন ঠেকানোর পুরনো নীতি তার আমলে কী হবে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, আমেরিকান কাজের বাজার কেউ নষ্ট না করুক এটাই ট্রাম্পের ফোকাস। আর সেটাকে বাধা দেয়াকে মুখ্য করে বিদেশ নীতি সাজানো ট্রাম্পের নীতি।

তাহলে সার কথা দাঁড়াল, চীনের বিরোধিতা ওবামারও ছিল। অর্থাৎ  ‘চীন ঠেকানোর’ “এশিয়াতে আমেরিকা পিভোট বা ভারসাম্য আনয়নকারী হয়ে থাকবে” এই নীতি ওবামা চালিয়ে গিয়েছেন। মানে সেটা এশিয়ায় চীনা প্রভাব ঠেকানো অর্থে। এদিকে ট্রাম্পও চীন-বিরোধী তবে সেটা আমেরিকার কাজের বাজার কতটা চীন ধ্বংস করছে সেটা ঠেকানো অর্থে। আর ওদিকে ভারতের বেলায়, ওবামা (এবং তারও আগে বুশও ছিল) ভারত-তোয়াজের পক্ষে, চীন ঠেকানো তত্ত্বের কারণে। কিন্তু ট্রাম্প ইতোমধ্যে ভারত-বিরোধী অবস্থান নিয়েছে, তবে সম্পুর্ণ ভিন্ন ভাবে। কারণ ভারতের আইটি শিল্প এই টেকনোলজি আমেরিকান নাগরিকের চাকরি খাচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। প্রসঙ্গটাকে আমরা ‘H1-B ভিসা কর্মসূচি’ দিয়ে বুঝতে পারি। এটা একটা বিশেষ ক্যাটাগরির ভিসা কর্মসূচির নাম। আমেরিকার আইটি শিল্প বা সফটওয়্যার ব্যবসার বাজারটা মোটামুটি ১২০-১৫০ বিলিয়ন ডলারের। এর প্রায় ৭০ ভাগ বাজার ভারতের দখলে। ভারতীয় মালিকানার তবে আমেরিকায়ও রেজিষ্টার্ড তিন-চারটা কোম্পানী এই বাজার দখল করেছে। আমেরিকায় রেজিস্টার্ড ভারতীয় মালিকানা কোম্পানিগুলো ওই ভিসা ক্যাটাগরিতে ভারত থেকে প্রোগ্রামারদের এনে আমেরিকার প্রোগ্রামারের থেকে কম বেতনে কাজে নিয়োগ করে আসছিল। যদিও ওই ভিসা ক্যাটাগরির পেছনের আইনে বলা ছিল যে এই ক্যাটাগরিতে ভারতীয় বা বিদেশীদের আনতে গেলে তাদের ন্যূনতম বেতন বছরে ৬০ হাজার ডলার বা এর বেশি হতে হবে। শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর সাফাই ছিল যে, যেসব দক্ষ ও মেধাবী শ্রমগুলো (যাদের বেতন ৬০ হাজার ডলার এই মাপকাঠির ) আমেরিকায় যথেষ্ট পাওয়া যায় না আর সেকারণে তারা বিদেশ থেকে আনতে চাইছে। এই কথা আরো পোক্ত করতে বলা হত যে, ভারতীয়দের মাস্টার্সও আছে, আমেরিকানদের বেলায় মাস্টার্স করা চাকরিপ্রার্থী থাকে খুব কম জনের।
ট্রাম্প এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিপক্ষে তবে সেটা সে করতে চায় শর্তগুলোকে আরও কঠিন করে দিয়ে। তবে আরও শর্ত আরোপ করে এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিরুদ্ধে কেবল ট্রাম্প নয়; এমনকি কংগ্রেসে ও সিনেটে এখন সংখ্যাগরিস্ট রিপাবলিকান – ট্রাম্পের দল শুধু এই রিপাবলিকানরাও নয়, এই দলে অনেক ডেমোক্র্যাটও আছেন। তাই ট্রাম্পের শপথ নেয়ার আগেই গত ৫ জানুয়ারি থেকে কংগ্রেসে ‘হাই-স্কিল্ড ইনটিগ্রিটি অ্যান্ড ফেয়ারনেস অ্যাক্ট, ২০১৭’ নামে বিল আনার তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। এই কাজে এখনই চার থেকে পাঁচটা প্রস্তাবিত আইন কংগ্রেসে ঘোরাফেরা করছে। সেগুলোর অন্তত একটা বাই-পার্টিজান মানে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দুই দলের দুই সদস্যের যৌথ প্রস্তাব। শুরুর দিকের প্রস্তাবগুলোতে সংশোধিত  ‘H1-B ভিসা কর্মসূচিতে’ মুখ্য দুই পরিবর্তনের মধ্যে ছিল ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ডলার করা; আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা। এমন প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি হল, বছরে এক লাখ ডলার মানে মাসে আট হাজার ডলারের বেশি দিয়ে বিদেশী-ভারতীয় লোক আনতে গেলে সেটা আর আমদানিকারক কোম্পানীর কাছে লাভজনক থাকবে না। কারণ ওর চেয়ে কম বেতনে আমেরিকা থেকেই স্থানীয়ভাবে প্রোগ্রামার পাওয়া যাবে। আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকার শর্ত উঠিয়ে দেয়া মানে স্থানীয়ভাবে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামাররা ওই চাকরির আবেদন করতে পারবে ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হতে পারবে। এদিকে ট্রাম্পের শপথের পরে আরো যেসব নতুন বিল বা আইনের প্রস্তাব কংগ্রেসে উঠেছে সেগুলোতে ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ত্রিশ হাজার রাখা হয়েছে। বলা বাহুল্য ভারতীয়দের মাথায় হাত। ইতোমধ্যে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর ভারতে রেজিস্টার্ড অংশে শেয়ার বাজারে দরপতন হয়েছে গড়ে শতকরা ৯ ভাগ। আমেরিকান শেয়ারবাজারের এক অ্যানালিস্ট হিসাব করে বলছেন ভারতীয় তিন শীর্ষ কোম্পানিকে [টিসিএস (টাটা), ইনফোসিস ও উইপ্রো] নতুন হবু আইনে ৬০-৭০ ভাগ বেশি বেতন গুনতে হবে। ফলে আনুপাতিক মুনাফা কমে যাবে। অর্থাৎ অবস্থা খুবই বেগতিক। এসব কোম্পানির এক মালিক সমিতি আছে নাম ন্যাসকম (NASSCOM)। তারা খুবই তৎপর হয়ে লবিং করছে। তাদের কোম্পানীগুলো আমেরিকায় ব্যবসা করে কত ট্যাক্স দেয়, কত নতুন আনুষঙ্গিক কাজ সৃষ্টি করেছে এর এক স্টাডির ফিরিস্তি দিয়ে ট্রাম্পের দলবলের মনগলানোর চেষ্টা করছে। ওদিকে মজার কথা হল, মোদি সরকার নিশ্চুপ, প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অথচ গত নভেম্বরে ট্রাম্পের বিজয়ের পর থেকে এই বিপদ যে আসছে তা সরকার ও সংশ্লিষ্টরা সবাই জানে। তাহলে? বিষয়টা হল, কৌশল আর এক পুরনো বিশ্বাস। প্রকাশ্যে আপত্তি হইচইয়ের থেকে গোপনে যেভাবে সে আমেরিকার বিশেষ নজরের বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছিল এতদিন, সেটার অপেক্ষায় থাকা আর সে দিকে চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মোদি সরকার। আনন্দবাজার পত্রিকার এমনই এক রিপোর্টের শিরোনাম, ‘ট্রাম্পের শরণার্থী বিতর্ক এড়িয়ে আপন স্বার্থে নজর ভারতের’।  ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার পর মোদি পঞ্চম রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। এরপরে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ শেষে ২৫ জানুয়ারি সরকারপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ফোনে কথা বলেছেন। কিন্তু সেখানে কী আলাপ হয়েছে কোন আশার আলো আছে কিনা এসব বিষয়ে তেমন কোনো ব্রিফিং নাই।  ভারতের উদ্বিগ্নতার ইস্যুগুলো নিয়ে কোনো আলাপ হয়েছে কি না তেমন কোন কিছু জানা যায়নি। তবে কয়েকজন আমেরিকান বিশেষজ্ঞের মতামত হল, ভারত আমেরিকানদের চাকরি খেয়েছে – এই জায়গা থেকে কোনো ছাড় দেয়া অথবা সরে আসার কোন সম্ভাবনা তারা দেখেন না।

অনেক পাঠকের মনে হতে পারে যে, ট্রাম্প বা যেকোনো জাতীয়তাবাদী তো এমন সংরক্ষণবাদী অবস্থান নেবেই, ফলে এই সিদ্ধান্ত সঠিক। সরি, আসলে ব্যাপারটা তা নয়, এত সরলও নয়। বরং সস্তা জাতীয়তাবাদ, তাই এটা এযুগে অচল। যদিও আপাতদৃষ্টিতে তা সঠিক মনে হচ্ছে। কেন?
মূল বিতর্ক হল – শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর যুক্তি হল, যেমন একজন বলছেন –

Mr. Levie said, “When you have incredible talent that wants to work in your organization but you are preventing them from doing so, that is disastrous to innovation and competition.”

বাংলা করলে, ‘এক দিকে বিরাটসংখ্যক ট্যালেন্ট আমাদের সংগঠনের সাথে কাজ করতে চাইছে আর আমরা তাদের আটকে রাখতে চাইছি, এটা উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার দিক থেকে ধ্বংসাত্মক’। ইমোশনাল না হয়ে দেখলে আসলে, এখানে ট্যালেন্ট বলে ডেকে কোম্পানীগুলোর অবস্থানের পক্ষে এই সাফাই তৈরি করা হয়েছে। যার পিছনের সত্যি কথাটা হল, এই ‘ট্যালেন্টদের’ ভারত থেকে সস্তায় কম বেতনে পাওয়া যায় বলেই তাদেরকে গৌরবান্বিত করে এমন ট্যালেন্ট ডাকা হচ্ছে। কোনো কারণে যদি আমেরিকাতেই তুল্য দক্ষ শ্রম সস্তায় পাওয়া যেত, তবে সেসব আমেরিকানরাই সেক্ষেত্রে আবার ট্যালেন্ট হয়ে যেত। আসল কথা আমাদেরকে ক্যাপিটালিজমের স্বভাব বৈশিষ্ট্য খেয়াল রাখতে হবে। সে অবশ্যই সস্তা শ্রমের পক্ষে সব ধরনের যুক্তি-সাফাই গাইবেই। এখন প্রশ্ন হল, ক্যাপিটালিজমের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে আইন বানিয়ে ট্রাম্পের পক্ষে জয়লাভ করতে পারা সম্ভব কি না?

না, পারার কথা নয়। কেন? এই আইন কার্যকর হলে বিদেশী নয় আমেরিকানদের চাকরি হবে। কথা সত্য। কারণ সে ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা কোম্পানীগুলোর ভারতীয়দের চেয়ে স্থানীয়দের নিয়োগ দিলে বেতনের বিবেচনায় লাভজনক হবে। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এটাই একমাত্র বিবেচনার বিষয় নয়, আরও দিক আছে। মূলকথা এই স্থানীয় নিয়োগের বেলার এদের বেতন কিন্তু এখনকার তুলনায় ৬০-৭০ ভাগ বেশি হবে।  যার অর্থ এই সেক্টরের সফটওয়ার প্রডাক্টে ক্রেতাদেরকে  বেশি মূল্যে সফটওয়্যার ও সার্ভিস কিনতে হবে। অর্থাৎ আমেরিকানদের চাকরি দিতে গিয়ে – এই জাতীয়তাবাদ দেখাতে গিয়ে রাষ্টের পুরা সবাইকে  আমেরিকান – জাতিকে বেশি মূল্যে পণ্য কিনতে হবে। কিন্তু সে বাড়তি মূল্য দেয়া অপ্রয়োজনীয়, এই অর্থে কারো ভোগে লাগবে না। পুরোটাই লস। ব্যাপারটা হলো যেন সব আমেরিকান মিলে চাঁদা দিয়ে পকেট থেকে পয়সা গুনে বেকার আমেরিকান আইটি গ্র্যাজুয়েটদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াল। এর চেয়ে বেকারভাতা দেয়া কি সহজ ছিল না? এটা কি ন্যাশনাল প্রডাকশন বাড়ল না ন্যাশনাল লস? কোন খাতে ফেলব? প্রশ্নটা কাজ দেওয়ার, নাগরিকের পকেট কাটা নয়।  অতএব বলে দেয়া যায় – এই সস্তা জাতীয়তাবাদ টিকবে না।

এক গোড়ার সত্য বলি। সত্য এক. আমাদের মতো গরিব ছোট অর্থনীতির দেশের শ্রম (দক্ষ বা অদক্ষ দু’টিই) উন্নত বা বড় অর্থনীতির দেশের শ্রমের চেয়ে সস্তা ও প্রতিদ্বন্দ্বী হবেই। এখনো অনেক দিন এটা হবে। আর সত্য দুই. ক্যাপিটালিজমের সাধারণ ঝোঁক হবে এই সস্তা শ্রমের পক্ষ নেয়া, কারণ ওখানে মুনাফা বেশি হবে। এই সত্য অস্বীকার করে কেউ টিকবে না।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস আমেরিকা যায় – এর তাৎপর্য হল, এতে আমেরিকার শ্রমের বাজারে শ্রমের ন্যূনতম মূল্য তুলনীয় বিচারে কম রাখা সম্ভব হয়, হবে। কেন? আমেরিকান ঐসব শ্রমজীবিরা আমেরিকান বাজারে তাদের পোশাকের চাহিদা মিটাতে পারবে তুলনামূলক কম পয়সায়, এর ফলে আমেরিকায় ন্যূনতম মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব। আবার অন্যদিকে,  বাংলাদেশের কৃষিতে ভর্তুকি দেয়া মানে বাংলাদেশের গার্মেন্টসে মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব করা।

তাহলে সোজা কথাটা হল, অল্প কিছু যেসব পণ্যে আমরা আমেরিকার চেয়ে দামে ও মানে প্রতিদ্বন্দ্বী ও যোগ্য এসবের বাজার আমাদের হাতে আজ অথবা কাল তাদেরকে ছাড়তেই হবে। এ কথা যে যত তাড়াতাড়ি বুঝবে সে ভালো টিকবে। তবে সস্তা জাতীয়তাবাদের সুড়সুড়ি দিয়ে ভোট জোগাড় সেটা হয়ত ফাঁকফোকরে চলতেই থাকবে। রাজনীতিতে মিথ্যা ব্লাফ তো থাকেই।

ঘটনার আরেক মাত্রা আছে। ট্রাম্পের আমলে খুব সম্ভবত আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব ওবামা আমলের মতো আর থাকছে না। কারণ এখন পর্যন্ত ওবামার ‘চীন ঠেকানোর নীতি’ ট্রাম্প চালু রাখবেন কি না, ওবামার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করবেন কি না এর সপক্ষে ট্রাম্পের কোনো অ্যাকশন, নীতি বা কোনো আলামত দেখা যায়নি। বরং এশিয়ায় চীনবিরোধী কোনো জোট গড়ার ওবামার নীতির পথে ট্রাম্প হাঁটছেন না, ইচ্ছাও নাই – তাই স্পষ্ট হচ্ছে। এটাই প্রকাশিত। যেমন যত সহজে ট্রাম্প অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপ ‘গেট লস্ট’ বলে শেষ করলেন সেখানে এর ইঙ্গিত আছে। অথচ ওবামার এই আমলে তার এশিয়া নীতিতে একমাত্র অস্ট্রেলিয়াতেই আমেরিকান মেরিন ঘাঁটি গাড়া হয়েছে। এই অঞ্চলে আমেরিকান নীতি স্ট্রাটেজির সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল অষ্ট্রেলিয়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

 

Advertisements

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

গৌতম দাস

২৯ নভেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-29P

ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হয়েছেন প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলেছে। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর প্রশাসন কাদের নিয়ে সাজাবেন এর ঝাড়াই-বাছাইয়ের ব্যস্ততার মধ্যে আছেন। সেই নেয়া আর না-নেয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং নানান জল্পনা-কল্পনাও চলছে। রিপাবলিকান দলের কোন অংশ ও কারা ট্রাম্পের সঙ্গী হচ্ছেন, কেন হচ্ছেন তা নিয়েও মিডিয়ায় জল্পনা-কল্পনা্র অন্ত নাই। ইতোমধ্যে গত ২২ নভেম্বর ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার শপথ নিবার পরের প্রথম ১০০ দিনে করণীয় কাজ কী হবে এর তালিকা প্রকাশ করেছেন। এটাকে বলা যেতে পারে প্রথম বাস্তব প্রতিশ্রুতি; আর সেটা এই অর্থে যে, আগে যা কিছু তিনি বলেছিলেন, সেগুলো ভোট পাওয়ার আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সাধারণত বাড়িয়ে কথা বলার ফুলঝুরিতে ভরপুর থাকে। আবার বাস্তব প্রতিশ্রুতি যেগুলোকে বলছি, এর মানে এই নয় যে, এগুলো অবশ্যই ভালো ফল বয়ে আনবে বা ট্রাম্প এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেনই। মূলত বাস্তব প্রতিশ্রুতি বলতে আমরা বুঝব, নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর আগের দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো সংশোধন করে নেয়ার একটা সুযোগ পাওয়া এবং নেওয়া। ট্রাম্প সেটাই নিচ্ছেন। এর কতটুকু তিনি কাজে লাগানোর সুযোগ নিচ্ছেন, সেটাই দেখার বিষয়।

কয়েকটি মিডিয়া এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছে উলটা করে, কী কী নাই তা নিয়ে। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কী কী প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় নাই। যেমন- ২২ নভেম্বর ২০১৬ সিএনএন২২ নভেম্বর ২০১৬ বিজনেস ইনসাইডার রিপোর্ট করেছে, ওবামা প্রশাসনের করা বিখ্যাত স্বাস্থ্যসেবা আইন (অ্যাফোর্ডেবল হেলথ অ্যাক্ট) বিষয়টি নিয়ে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলেছিলেন এই আইন তিনি বাতিল করবেন। কিন্তু এই আইন বাতিল করা অথবা এর কোন সংশোধনী আনা – কোনটাই প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নাই। অবশ্য নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পরের দিন ওবামার সাথে ঝাকুনি-বিহীন ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে আলাপ করে ফিরে এসেই ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই আইন সম্ভবত তিনি বাতিল করছেন না, তবে কিছু সংশোধনী আনবেন। যদিও আমরা এমন বলতে পারি না যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় এ ইস্যুটি নেই মানে, ১০০ দিন পরে এটা আসবে না তা-ও নয়।
এবার দ্বিতীয় যে বিষয়টি ১০০ দিনের তালিকায় নাই তা হল, আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলে দেয়া প্রসঙ্গ। বলা হয়েছিল, ড্রাগ পাচারকারী বা অবৈধ অভিবাসীর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য সীমান্তে দেয়াল তুলে বাধা দেয়া হবে।
এ ছাড়া আরেকটি বহুল বিতর্কিত বিষয়, আমেরিকায় মুসলমানদের প্রবেশ ঠেকানো বা মুসলমানদের নাম রেজিস্ট্রি করা। এ বিষয়েও কোনো উল্লেখ ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নেই।
তবে ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় যা আছে, তা হল টিপিপি (বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) –  এই মুক্তবাণিজ্য জোট থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার। আর এটা আছে একেবারে এক নাম্বারে। টিপিপি আসলে ইচ্ছা করে চীনকে বাইরে রেখে আমেরিকাসহ ১২টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তি আমেরিকার জনগণের কাজের সংস্থান সীমিত বা নষ্ট করবে; তাই তিনি এটা বাতিলের পক্ষে। ওবামার এই উদ্যোগে মার্কিন কংগ্রেস এখনও অনুমোদন দেয়া শেষ করে নাই। বলেছিল ট্রাম্প বা নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত আসা পর্যন্ত স্থগিত করে রেখেছিল। আর এখন  ১০০ দিনের করণীয়তে ট্রাম্পের এই ঘোষণায় জাপান ইতোমধ্যে হতাশ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, “আমেরিকা না থাকলে আর টিপিপি করার কোনো অর্থ নেই”। (TPP ‘has no meaning’ without US, says Shinzo Abe)। বিশ্ববাণিজ্যের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য এই টিপিপি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় জানিয়েছেন, টিপিপি থেকে তিনি আমেরিকার নাম প্রত্যাহারের জন্য নোটিশ পাঠাবেন। এ থেকে স্পষ্ট যে, তিনি সত্যি সত্যিই গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে এবং প্রটেকশনিস্ট বা সংরক্ষণবাদী অর্থনীতির পথে হাঁটার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। টিপিপি থেকে নাম প্রত্যাহারকে কেন ট্রাম্পের গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী অবস্থান বলে অর্থ করছি? সেটা আমার নিজের বরাতে বলার চেয়ে আমেরিকা, চীন ও জাপান এর নেতাদের বরাতে বলা যাক। ট্রাম্পের বিজয়ের পরে পরেই অনুষ্ঠিত প্রথম এক বাণিজ্য জোটে এপেক (APEC, Asia-Pacific Economic Cooperation) গত ২০ নভেম্বর ২০১৬ পেরুর রাজধানী লিমাতে আগেই নির্ধারিত এবছরের শীর্ষ বৈঠকে মিলিতে হয়েছিল। আমেরিকা, চীন ও জাপান সহ অন্যান্যরা এপেকের সদস্য এবং এই তিন রাষ্ট্র প্রধান ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের বরাতে মানে এপেকের বরাতে কথা বলব। ট্রাম্পের বিজয়ে তাঁর হবু প্রশাসনের টিপিপি বা নাফটা (NAFTA, North American Free Trade Agreement) থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা-অবস্থান জানান। এই অবস্থানকে এপেকের নেতারাই সবার আগে এটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের “এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান” ফলে এটা তাঁর সংরক্ষণবাদী (Protectionist) অবস্থান – এভাবেই চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্পের অবস্থানে এই তিন নেতা এতই বিপদ দেখেছেন যে এপেকের সভায় শেষ দিনে গৃহীত এক ঘোষণা-প্রস্তাব পাস করেছেন। তাহল এরকম, “আমরা আমাদের বাজার খুলে রাখা এবং সব ধরণের প্রটেকশনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পক্ষে আমাদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি”। (We reaffirm our commitment to keep our markets open and to fight against all forms of protectionism -Members’ closing declaration)

এখানে বলে রাখা ভাল আমার আগের লেখায় বলেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্ব নিজের হাতে নিতে পেরেছিল। আর আগের সীমিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯) পর থেকে পরের ২৫ বছর প্রায় পুরাপুরি স্থবির হয়ে ছিল। আমেরিকা সেই স্থবিরতাই শুধু কাটায় নাই বরং  আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু হতে পুর্বশর্ত  আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে সর্ব-সম্মতিতে সেকালের একমাত্র যোগ্য ডলারকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা সাজায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই নতুন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা আর এর ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু করতে ১৯৪৪ সালে গঠন করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (IMF)। এরপর (১৯৪৫-১৯৭৩) এই সময়কালটাকে বলা যায় যুদ্ধপরবর্তি ইউরোপের পুনর্গঠন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গেড়ে বসার কাল। ১৯৭৩ সালে আইএমএফ আবার পুনর্গঠন করা হয়। এরপর থেকেই প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজ নিজ আভ্যন্তরীণ বাজার বিদেশের পণ্যের প্রবেশ থেকে বাধা দিয়ে রাখার সংরক্ষণবাদী বা প্রটেকশনিষ্ট অবস্থান যেটা দুনিয়ায় ক্যাপিটালিজমের শুরু থেকেই সবাই অনুসরণ করত, তা ভেঙ্গে “গ্লোবালাইজেশন” এর পথে চলা করেছিল গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আস্তে আস্তে গ্লোবালাইজেশন মূল ধারা হয়ে যায়। ভিন্ন ভাষায় এটাই “এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকনমি” বা রপ্তানী অভিমুখি করে অর্থনীতি সাজানোর যুগ। বাজার আগলে রাখার প্রটেকশনিষ্ট অবস্থানের সাথে তুলনায় এই নতুন পথে ভাল এবং মন্দ দুটা দিকই আছে। আবার ভাল-মন্দ সেটা যাই থাক করণীয় অপশন হিসাবে কী কী পথ খোলা আছে এর মধ্যে কম-খারাপটা বেছে নেয়া অর্থে গ্লোবালাইজেশন অবশ্যই ভাল অপশন। কারণ আমাদের মত রাষ্ট্রের সাথে অসম বাণিজ্য আছে এবং তা এমনি এমনি চলে যাবে না। মাথাব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যেমন কোন সমাধান বা অপশন নয় তেমনি। বাংলাদেশে এটা শুরু হয় মোটা দাগে বললে আশির দশকের শুরু থেকে, বিশেষ করে এরশাদের ক্ষমতা নিবার পর থেকে। সংরক্ষণবাদী হয়ে এক পাট-রপ্তানিতে আর আকড়ে না থেকে তৈরি পোষাক বা চামড়া ইত্যাদিতে ধরে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে প্রবেশ – এই হল ফেনোমেনাটা। আর বটম লাইন হল, অন্যের বাজারে প্রবেশ করতে গেলে অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিতে হবে। তবে অসম ক্ষমতা, অসম বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে সেটা অন্যকে বেশি দেয়া হয়ে যায়। কিন্ত সে জন্য কোন বাণিজ্য লেনদেনেই যাওয়া যাবে না এটাই মাথাব্যাথায় মাথাকাটার তত্ত্ব হয়ে যাবে। তবে মজার কথা হল,  সেই আমেরিকা এখন একালে ট্রাম্পের হাতে পরে মুক্তবাণিজ্য থেকে পালাইতে চাইতেছে।

দুইঃ
হেনরি কিসিঞ্জারের নাম বাংলাদেশে নানা কারণে পরিচিত। আমেরিকার অন্ত্যত দুজন প্রেসিডেন্টের সাবেক বহুলালোচিত পররাষ্ট্র সেক্রেটারি এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং আমেরিকান ফরেন সার্ভিসের অনেক আমলার তাত্ত্বিক গুরু তিনি। এখন বয়স প্রায় ৯৩ বছর, তবুও সক্রিয় কাজকর্ম করেন; ডিকটেশন দিয়ে বই ছাপান। বৈদেশিক নীতি ও তত্ত্ব দিয়ে বেড়ান এখনো। বর্তমানে “কিসিঞ্জার অ্যাসোসিয়েটস” নামে এক কনসাল্টিং ফার্ম বা পরামর্শদাতা কোম্পানি চালাচ্ছেন। বিগত আশির দশকের পর থেকে সব প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সাক্ষাৎ করে তাদেরকে নিজের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই কিসিঞ্জার ট্রাম্পের সাথেও দেখা করেছেন গত ২০ নভেম্বর।
অভ্যন্তরীণভাবে, আমেরিকাতেও ট্রাম্পকে নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ রক্ষার (এনভায়রণমেন্ট-বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সহ) সম্মেলনে আমেরিকার দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে ট্রাম্প সরে আসতে চান, একারণে। কারণ তিনি এগুলো সব ‘চীনাদের ভুয়া প্রচার’ বলে দাবিতে উড়িয়ে দিতে চান। শুধু তাই নয়, প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে আছে ওবামা প্রশাসনের দেয়া – নানান প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছিলেন – ট্রাম্প সেসব জায়গা থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করতে চান। এছাড়া ওবামা জ্বালানিবিষয়ক যেসব বিধিনিষেধ মেনে নিয়েছিল, গ্রিন হাউজ গ্যাস ২০৩০ সালের মধ্যে ৩২ শতাংশ কমিয়ে আনবেন বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; ট্রাম্প সেসব থেকে বেরিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যেতে চান। ট্রাম্পের যুক্তি হল, জ্বালানি উৎপাদনে এসব বিধিনিষেধ আরোপের কারণে আমেরিকান জনগণ চাকরি হারিয়েছে। এগুলো ‘জব-কিলিং’ বাধানিষেধ। অর্থাৎ ট্রাম্প বলতে চাইছেন, পরিবেশের চরম ক্ষতি করে হলেও নোংরা জ্বালানি উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট চাকরিগুলা চালু রাখতে হবে। তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার পথে হাঁটাকে প্রাধান্য দিয়ে চলতে চাইছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কিসিঞ্জার ট্রাম্পকে নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, অন্তত দুটা সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি কী বলেছেন, ট্রাম্পকেইবা কী পরামর্শ দিলেন আর আমাদেরই বা ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর কী মূল্যায়নের কথা জানাতে চান; এটা জানতে দেশে-বিদেশে আগ্রহ আছে। কিসিঞ্জার ট্রাম্পের কাছে গিয়ে দেখা করার পর সোজা চলে যান সিএনএনের অফিসে ফরিদ জাকারিয়ার কাছে; যেখানে তিনি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
সাধারণভাবে বললে, কিসিঞ্জার ট্রাম্প সম্পর্কে সহানুভূতির সাথে কথা বলেছেন। কেমন ট্রাম্পকে তিনি দেখলেন প্রথমেই এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “এমন ট্রাম্পকে তিনি দেখে এলেন যে নানা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয়ার অবস্থা থেকে বের হয়ে আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিতে বাস্তব সবচেয়ে ভালো নীতি-পলিসির কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি কী হতে পারে, তিনি তা হাতড়াচ্ছেন। এমন মধ্যবর্তী স্থানে ট্রাম্পকে আমি দেখে এলাম”। এরপর ট্রাম্পের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলছেন, তার দেখা প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্প “সবচেয়ে ইউনিক বা অনন্য”। কারণ ট্রাম্প আগে কখনো কোনো স্তরেরই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। সেজন্য তিনি সমাজের চেনা কোনো গোষ্ঠী প্রতিনিধি নন, তার পছন্দের নীতি-পলিসি সম্পর্কেও কোনো আগাম ধারণা-অনুমান বেশির ভাগেরই নেই। ফলে তিনি পুরনো কোনো দায়ভারহীন অথবা চিহ্নবিহীন। কিসিঞ্জার আরও বলেছেন, ট্রাম্পের কোনো ‘ব্যাগেজ নেই’। তা বটে; কথা সত্য। কিন্তু জাকারিয়া এবার চীন প্রসঙ্গে ট্রাম্পের রক্ষণশীল অবস্থানের কথা তুললেন। কিন্তু কিসিঞ্জার তাতে সরাসরি ব্যক্তি ট্রাম্প সম্পর্কে বলা এড়িয়ে গেলেন। আর, গিয়ে এবার তত্ত্বের দিক দিয়ে জবাব দিলেন। তিনি এক তত্ব-কথায় জবাব দিলেন। বললেন, “গ্লোবালাইজেশনের ফলে এর ফলে কেউ লুজার বা হারু পার্টি আর কেউ উইনার বা জেতা পার্টি হয়ে তো হাজির হবেই। ফলে হারু পার্টি তখন নানাভাবে নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ্যে আনবেন”।

কিসিঞ্জারের এমন জবাবের অর্থ কী? তিনি কী বলতে চাইছেন – ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশন করতে গিয়ে ওর ফলাফলে এখন হারু পার্টি? তাই ট্রাম্পের হাত ধরে আমেরিকা এখন গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী প্রটেকশনিস্ট অর্থনীতির ভূমিকায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাচ্ছে? আর সেজন্যই ট্রাম্পের এমন অবস্থানকে কিসিঞ্জার সহানুভুতির-সমর্থন দিচ্ছেন? তাই কি? এর জবাবে সম্ভবত বলা যায় – হ্যাঁ কিসিঞ্জার স্পষ্ট করে না বললেও এটাই, তার সহানুভূতি টাম্পের দিকে। আর প্রত্যক্ষভাবে না হলেও তত্ত্বের মাধ্যমে বলে তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন, আমেরিকা হারু পার্টি। এরপর তিনি এক গুরুতর কথা বলছেন। তিনি স্বগতোক্তি করে বলছেন, ‘ট্রাম্পকে ইতিবাচকভাবে লক্ষ্য খুঁজে নিতে আমাদের সুযোগ দেয়া উচিত।’

মাসিক ‘দ্য আটলান্টিক’ এর সাক্ষাতকার
আমেরিকার একটি মাসিক ম্যাগাজিনের নাম ‘দ্য আটলান্টিক’। সেই পত্রিকায় কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল আগে থেকেই। এক লম্বা আর বিভিন্ন সেশনে ভাগ করে, নতুন-পুরনো বহু ইস্যুতে কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল। নির্বাচনের পরের দিন ১০ নভেম্বরে নেয়া সাক্ষাৎকারে চলতি ‘গরম বিষয়’ ট্রাম্পের বিজয় প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। ঐ সাক্ষাতকারে রিপাবলিকান হেনরি কিসিঞ্জার স্বীকার করেন যে তিনি মনে করেছিলেন নির্বাচনে ট্রাম্প নয়, হিলারিই বোধহয় জিতবেন। ওখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নেও কিসিঞ্জার একইভাবে ‘ট্রাম্পকে সুযোগ দেয়া উচিত’ বলেছেন। প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকার করছেন আমেরিকা হারু পার্টি ইত্যাদি। যেমন দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ট্রাম্পের জেতার ফলে দুনিয়াকে আমেরিকার নেতৃত্ব দেয়ার ভূমিকা কী হবে বলে আপনি মনে করেন? কিসিঞ্জার বলেন, ‘আসলে, এই জেতাটা আমাদের বিদেশ নীতি আর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।’ [অর্থাৎ তিনি ‘সামঞ্জস্য নেই’ এটা ধরে নিয়ে কথাটা বলেছেন। পরের বাক্যেই তিনি সেটা স্পষ্ট করছেন। বলছেন, ‘আমেরিকার বৈদেশিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জনগণের ধারণা আর এলিটদের ধারণার মাঝে নিঃসন্দেহে গ্যাপ বা ফারাক আছে। আমার মনে হয়, নতুন প্রেসিডেন্ট আমাদের এই ফারাক ঘুচাতে সুযোগ নিতে পারেন। তিনি সুযোগ পাবেন; কিন্তু তা নিতে পারবেন কি না এটা তার ওপর নির্ভর করে।’
তৃতীয় প্রশ্নটি ছিল ট্রাম্পকে বেশ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। প্রশ্ন, ‘ট্রাম্পের যোগ্যতা, সক্ষমতা বা সিরিয়াসনেস সম্পর্কে কি আপনি আস্থা রাখেন?’ কিসিঞ্জার কিছুটা অথরিটির ভূমিকায় জোর দিয়ে জবাব দেন, ‘এ রকম তর্ক আমাদের বন্ধ করা উচিত। তিনি আমাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তার শাসন-দর্শন (ফিলোসফি) তৈরি করার জন্য আমাদের অবশ্যই তাকে সুযোগ দিতে হবে।’
‘ট্রাম্প আমাদের প্রেসিডেন্ট’ এ কথা বলে আসলে কিসিঞ্জার ধমকালেন কেন? এ জন্য যে, ট্রাম্পকে নিয়ে হিলারি-শিবিরসহ তথাকথিত লিবারেলরা হাসি-মশকারা করে কথা বলে, যেটা প্রশ্নকর্তার (তিনি নিজেই ওই পত্রিকার সম্পাদক) প্রশ্নের মধ্যেও ছিল। কিসিঞ্জার যেন বুঝাতে চাইছেন, গ্লোবালাইজেশনের প্রতিযোগিতায় পড়ে আমেরিকা হারু পার্টি হয়ে গেছে- যেটা বুঝতে আমেরিকান পাবলিক আর এলিট পারসেপশনে ফারাক আছে। ফলে আপাতত ট্রাম্পকে মফস্বলের মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু ট্রাম্প আসলে তা নন। উপায়ান্তর নেই বলে ট্রাম্প কিছুটা প্রটেকশনিস্ট হয়ে বিপদ কাটিয়ে আমেরিকাকে উঠে দাঁড় করাতে চাইছেন। এ দিকটা কিসিঞ্জার বুঝতে পারছেন বলেই ট্রাম্পকে নিয়ে হাসি-মশকারা তিনি কাউকে করতে দিতে রাজি নন। তাই কি? কিসিঞ্জার সাক্ষাৎকারে কথাগুলো এভাবে স্পষ্ট করে বলেননি, আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন- এমন অনুমান করার সুযোগ আছে।
একটা সমান্তরাল উদাহরণ টেনে শেষ করব। অনেকের প্রটেকশনিস্ট বা রক্ষণশীল কথাটি বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। অথচ ব্যাপারটা আমাদের কাছেরই। সত্তরের দশকে মোটাদাগে বললে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একমাত্র উপায় আমাদের ছিল পাট। এটা সেই প্রটেকশনিস্ট সময়। এর বিপরীতে, আশির দশকের শুরু থেকেই বিশেষ করে ১৯৮২ সাল থেকে আমরা গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশ করি। এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকোনমি, অকস্মাৎ রফতানিমুখী নারী মেশিন, মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট, আমেরিকা-ইউরোপের দয়ায় তাদের বাজারে তৈরী পোশাকের প্রবেশাধিকার, বিনিময়ে নিজের বাজার পুরো খুলে দেয়া, বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়া ইত্যাদি আমাদের গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের চিহ্ন। এ দুই দশার মধ্যে কোনটা আদর্শ বা ভালো, সে তুলনা করে বলা অপ্রয়োজনীয়। কারণ বিষয়টি হলো, যেসব অপশন আমাদের হাতে ছিল ও আছে, এমন অ্যাভেলেবল অপশনের মধ্যে তুল্য বিচার করা দরকার। এ বিচারে গ্লোবাইজেশনই ভালো। অবশ্য যে কারণে প্রশ্নটি তুলেছি, তাতে ভালো-মন্দ বিচার এখনকার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, গ্লোবালাইজেশনের ভেতরে একবার ঢুকে গেলে সে অর্থনীতি আর কি ফিরে প্রটেকশনিস্ট অবস্থানে যেতে পারে, সম্ভব? ব্যবহারিক বিবেচনার জায়গা থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এটা অসম্ভব। গ্লোবালাইজেশনের সারকথা হলো- বিপুলভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে দুনিয়াব্যাপী বিনিয়োগ, পণ্য, টেকনোলজি, কাঁচামাল বাজার ইত্যাদির পারস্পরিক লেনদেন ও বিনিময়ে একবারে জড়িয়ে পড়া এবং তাতে অসাম্য থাকলেও জড়িয়ে যাওয়া; কিন্তু একবার এমন লেনদেন বিনিময়ে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় না। অতএব প্রশ্নটা হল, ট্রাম্প আমেরিকাকে প্রটেকশনিষ্ট পথে নিয়ে যাবেন কীনা তা একেবারেই নয়, বরং একালে আমরা কী প্রটেকশনিষ্ট পথে আবার ফিরে যেতে পারব? সম্ভব? এককথায় অবশ্যই না।

তাহলে ট্রাম্প কেন প্রটেকশনিস্ট অবস্থান নিচ্ছেন বলে অন্তত দেখাচ্ছেন? তিনি বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চয়ই এর অর্থ বোঝেন। কারণ প্রটেকশনিস্ট জায়গায় ফেরা আর সম্ভব নয়। তাহলে? আসলে প্রটেকশনিস্ট মনে হওয়া এটা আপতিক। সম্ভবত গ্লোবালাইজেশনের মধ্যেই থেকে, কিন্তু প্রটেকশনিস্ট হওয়ার ভাবভঙ্গি করে নতুন করে এক লেনদেন-বাণিজ্য ‘বেটার ডিল’ পেতে চাইছেন ট্রাম্প। কিসিঞ্জারের অনুমান, ট্রাম্প এতে সফল হতে পারেন এবং সেটাকে ওবামাসহ পুরনো আমেরিকান প্রশাসনগুলোর ধারাবাহিকতা বলে হাজির করাও সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রথম ছয়-নয় মাসের পরে চীন-রাশিয়াও এতে আস্থা পাবে, এটাকে মানবে। কিসিঞ্জার এমনটিই মনে করেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ২৭ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও অনেক এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]

সাবধান, ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

সাবধান,  ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

গৌতম দাস
১৬ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-26g

গত সপ্তাহে আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডোনাল্ড জন ট্রাম্প । প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে ভোটে হারিয়ে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। এর চেয়েও বড় কথা, আমেরিকার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান- এই দুই দলেরই (বাইপার্টিজান) এলিটরা মিলিতভাবে নিজ নিজ দলের কথা চিন্তা বাদ দিয়ে ‘ট্রাম্প ঠেকাও’-এর কাজে নেমে পড়েছিলেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে ০২ নভেম্বর  সিএনএন রিপোর্ট করেছিল ৩৭০ জন অর্থনীতিবিদ (যাদের মধ্যে কয়েকজন নোবেল প্রাইজ পাওয়া অর্থনীতিবিদও আছেন), তারা সবাই এক বিবৃতিতে কেন ট্রাম্পকে ভোট দেয়া ঠিক হবে না, তা জানিয়েছিলেন। ফলে নির্বাচনের আগেই একটা আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল যে  ট্রাম্পের বোধ হয় আর কোনো সম্ভাবনা নেই; তাকে হারিয়ে হিলারিই জিতে যাইতেছেন। রয়টার্সের মতো মিডিয়া বলা শুরু করেছিল, হিলারি জিততেছেন এটা নাকি প্রায় ৯০ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে গেছে। ফলে ট্রাম্পের জেতার আর যেন কোনো সম্ভাবনা নেই, চার দিকে সে কথাই কেবল প্রচার হচ্ছিল। কিন্তু ফলাফল এখন সবাই জানেন, মিডিয়ার সবার সব অনুমান সেখানে উল্টে গেছে।  তাহলে এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল কেন, আর প্রপাগান্ডার সব কিছু আসলে এক মিথ্যা ফানুস ছিল – এমনইবা শেষে প্রমাণ হলো কেন?

এটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটা সেই আমেরিকা যে এখনো গ্লোবাল অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, নির্ধারক রাষ্ট্র – যদিও এটা শেষযুগে যৌবন ঢলে পড়ার কালে। সেই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট, তারই নির্বাচন এটি। ফলে এই নির্বাচনকে ঘিরে একে প্রভাবিত করতে সরব মুখ খোলার কথা সমগ্র দুনিয়ার নানান স্বার্থের গোষ্ঠী-মানুষের। তবে মনে রাখতে হবে, সামগ্রিক দিক বিচারে বললে এই নির্বাচনে আসলে মোটা দাগে তিনটি পক্ষ ছিল। এক পক্ষ হল আমেরিকার বাইরের গ্লোবাল স্বার্থ-সুত্রে সম্পর্কিত মানুষ। অন্য দিকে যারা আমেরিকার ভেতরের, এদের মধ্যে আবার আরও দুই পক্ষ। এভাবে মোট তিনটা পক্ষ। মুল প্রসঙ্গটা আমেরিকান ভোটারের, ফলে এখানে ভেতরের মানে আমেরিকান নাগরিক যে ভোটার আর, বাইরের অ-নাগরিক মানে না-ভোটারের। ভেতরের মধ্যে মোটা দুই পক্ষের এক পক্ষ – এই দলে পড়বেন যারা আমেরিকাকে চালায় এমন বড়লোক, এলিট, নীতিনির্ধারক, ইন্টেলেক্ট, ওয়াল স্ট্রিটসহ ব্যবসায়ী জগৎ প্রভৃতি, যাদেরকে এখানে বলার সুবিধার্থে এখন থেকে একসাথে অভ্যন্তরীণ ‘এলিট’ বলে ডাকব। এলিট অর্থাৎ আমেরিকার ভেতরের ‘আম-ভোটার’দের থেকে যারা আলাদা। এই এলিটরাই সবচেয়ে বেশি কথা বলার সুযোগ রাখেন। সাধারণ সময়ে আমেরিকার বাইরের অ-নাগরিক আর ভেতরের এই এলিট অংশ এরাই মূলত মিডিয়া দখল করে রাখেন, কেবল এদের বয়ানই মিডিয়ায় আসে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। সেটা একমাত্র নির্বাচনের সময়। এই সময় এই দুই কুতুবের বাইরে নিরব কুতুব যারা সবকিছুর নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।  মিডিয়ার বয়ান ও দৃষ্টিভঙ্গির বাইরেরও ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ ওদের বাইরেও তৃতীয় (অভ্যন্তরীণভাবে দেখলে দ্বিতীয়) পক্ষ, এঅংশটি হল ‘আম-ভোটার’। ভোটে এরাই নির্ধারক, প্রবল সংখ্যাধিক্যের কারণে। আর সবচেয়ে বড় এই অংশটাই  মিডিয়ার অগোচরেই থেকে যায়, বিশেষত আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। অতএব ভোটের সময় এরা স্থানীয় মিডিয়ায় যদি থেকে যায় সেকথা বাইরে থেকে আমরা জানতে পারি না। এই ‘আম-ভোটার’ অংশটি সবচেয়ে বড় বলে ভোট দেয়া ও গণনায় সময় তাদের ভূমিকা নির্ধারক। অন্য যেকোনো গ্রুপের চেয়ে এরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আর ভোটের সময়ের ঠিক এর উলটা দশা হল প্রথম দুই পক্ষের (বাইরের অনাগরিক আর ভেতরের এলিট)। কারণ এদের মধ্যে কেবল ভেতরের এলিটদের কিছু ভোট দেয়ার ক্ষমতা আছে, অন্যটার ভোট নেই। তাহলে দাঁড়াল, আমেরিকান নির্বাচনে একমাত্র নির্বাচনের সময়ই সবচেয়ে নির্ধারক হল – আম-ভোটার। অথচ আম-ভোটারদের চেয়ে যাদের ভোটই নেই অথবা ন্যূনতম কিছু ভোট আছে  এরাই নির্বাচনে পুরো মিডিয়া দখল করে রাখে এবং সেখানে কেবল তাদের স্বার্থের বা গ্লোবাল স্বার্থের কথা বয়ানগুলোকে মুখ্য করে রাখে। অতএব এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আম-ভোটারকে অ্যাড্রেস করতে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা কী ভাষায়, কী চাতুরীতে বা কী কৌশলে কথা বলবে, প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে এই আম-ভোটারের কাছে পৌঁছবে, প্রভাবিত করবে, এটা খুবই নির্ধারক। জিততে চাইলে প্রভাবিত করার সেই ভাষ্য অবশ্যই মিডিয়ার আমেরিকার বাইরের ও ভেতরের এলিটদের ভাষ্য থেকে ভিন্ন করাই হবে সহজ কৌশল। ট্রাম্প সম্ভবত তাই করেছেন। তিনি ব্যাপক আম-ভোটারের ভাষারপ্ত করে তাদের তাতিয়ে কথা বলেছেন। তার সেসব কথা মিডিয়া বা আন্তর্জাতিক মূল্যবোধের চোখে হয়তো অচল। তবুও তা পরোয়া না করে এই ভোটারদের জীবনধারায় দেখা দৃষ্টিভঙ্গি, চাওয়া-পাওয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ট্রাম্প ভোট চেয়ে কথা বলেছেন। কারণ মনে রাখতে হবে, আম-ভোটারদের কাছে তাদের নেতারা বিষয়ে তাদের মুখ্য বিবেচ্য একটাই – তা হল, সরকার তাদের জন্য অনেক কাজ আর ভাল বেতনের ব্যবস্থা করতে পারছেন কিনা, অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে পেরেছেন কিনা ইত্যাদি। যদি পারেন আর তা পারতে গিয়ে অন্য দেশের তেল লুট করে নাকি মানুষ খুন করে সব সাফা করে এনেছেন এসব তাদের বিবেচনার কোন বিষয় হয় না। কারণ তারা জানে এলিটরা হার-হারামজাদা। এলিটরা একমাত্র নিজের সংকীর্ণ স্বার্থের ধান্ধায় পরিচালিত। আর এটাই আম-ভোটারদেরকেও বিপরীত এক সংকীর্ণ স্বার্থের ভিতর দিয়ে নিজেদের দেখতে বাধ্য করে থাকে। ফলে ভিন দেশে গিয়ে আমেরিকান নেতা বা সরকার খারাপ বা অনৈতিক কী করছেন সে বিচারে বসার অবস্থায় তাঁরা থাকেন না। অন্তত নেতাদের আকামের বিচারে বসার চেয়ে বরং তাদের নিজের জন্য অনেক কাজ ও ভাল বেতনের বিষয় – এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। যেমন ট্রাম্প কেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বললেন; মেক্সিকো বা চীনের বিরুদ্ধে ট্রেড বেরিয়ার (আমদানি বাণিজ্যে বাধার নীতি) ইত্যাদিতে কথা বলেছেন। সে বিষয়গুলো আম-ভোটাররা নিজের স্বার্থের দিক থেকে দেখবেন, গ্লোবাল মিডিয়ার দিক থেকে নয়। এ ছাড়া আরেকটা বিরাট দিক আছে – মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী শ্রমিক। অথবা রিফিউজি নামে প্রবাসী বা বিদেশী শ্রমিক। এটা এমন এক জিনিস, যখন অর্থনীতি ভাল চলে তখন সরকার অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশী শ্রমিকও কাজের প্রাচুর্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুভব করে না। কোন সমস্যা দেখে না। বরং সুবিধার দিকটা দেখতে পায়। ফলে কে দেশের বাইরে থেকে এল, বিদেশী কিনা  তা তার কাছে বিবেচ্য হয় না। অর্থনীতি ভালো চললে, বাইরের শ্রম মানেই তুলনায় সস্তায় পাওয়া শ্রম, যে শ্রম তখন সবার দরকারও। তাই তা আদরণীয়। অথচ অর্থনীতি শ্লথ হয়ে গেলে ঠিক এর উল্টো। তখন মনে হয়, কালো বা বাদামি, বিদেশী বা মুসলমান সব খেদাও, এরাই নিয়ে গেল সব। জাতীয়তাবাদের জিগির উঠবে। এসব ক্রাইসিসের দিক খেয়াল রেখে নির্বাচনে ভোট পাওয়ার জন্য ট্রাম্প জেতার উপযুক্ত ভাষ্যটি সঠিক বানিয়েছিলেন। সেই ভাষায় কথা তুলে যিনি ভোট চাইবেন, স্বভাবতই তিনি সফল হবেন। নির্বাচনে ট্রাম্পের মূল শ্লোগান “মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন” (make America Great again) – ’। আম-ভোটারদের আকৃষ্ট করার ভাষ্য হিসাবে, এটাই সঠিক শ্লোগান। শেষের ঐ ‘এগেইন’ শব্দটা গুরুত্বপুর্ণ। হৃত-গৌরব মনে করিয়ে দিয়ে সুরসুরি দেয়া। আন্তর্জাতিক দিক নয়, জাতীয়তাবাদ।

কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্যখানে। আমরা ট্রাম্পের যত রকম কথা শুনেছি, সেগুলো আমরা আসলে ট্রাম্পের আম-ভোটারের চোখ দিয়ে না দেখে বরং ওর বাইরের অন্য দুই পক্ষের দিক থেকে দেখেছি। সমগ্র দুনিয়ার আমরা প্রথমত, আমাদের নিজ নিজ স্থানীয় প্রেক্ষিত থেকে অথবা গ্লোবাল প্রেক্ষিতে। আমরা ভুলে গেছি, আমেরিকার বাইরের যারা, তারা যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তারা তো ভোটার নন। আর এটা তো আসলে কেবল ভোটেরই লড়াই। ফলে যারা বাইরের লোক বা সংখ্যায় ক্ষুদ্র দেশি-এলিট এদের নিন্দা-মন্দ কথা আমল করার কী আছে? কিছু নেই। নিন্দা-মন্দ আমল করলে তাতে ভোট সংখ্যা বাড়বে না।  ট্রাম্প এটা ঠিকই ধরেছেন। আর তাঁর জয়লাভের মূল কারণ সম্ভবত এখানে। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, আমেরিকার বাইরের অনাগরিক বা ভেতরের এলিট এসব স্বার্থ সন্তুষ্ট করে ভাষ্য তৈরি করে কোনো লাভ নেই। ভোটের বাক্সে এর কোনো প্রভাব নেই। তাই এ’দুই পক্ষের দিকে তাকিয়ে তিনি কথা বলেননি। দ্বিতীয়ত, একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল, হাতির দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবায়ও না, খায়ও না। চিবানোর দাঁত আলাদা। অথচ আমরা দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবানো দেখতে চাচ্ছি। ট্রাম্প ভোটে জিতে যাবার পর আমরা এখন চাচ্ছি ট্রাম্প যেন ভোট চাইবার ভাষাতেই তার হবু সরকারের নীতি সাজাক। আর তাতে আমরা যেন আরামে ট্রাম্পের গুষ্ঠি উদ্ধাস্র করতে পারি। আমরা ভোট পাওয়ার জন্য দেয়া পপুলার শ্লোগান (বা বয়ান) আর জিতে যাবার পর তা ‘হুবহু’ সরকারের নীতি-পলিসি করা যেন বাধ্যবাধকতা! অথচ দেখানো আর চিবানোর দাঁত তো আলাদা, তা আলাদাও হতে পারে, হয়। এটা খেয়াল করে দেখি নাই।
আমেরিকা রাষ্ট্রের বাইরের মানুষ, ভিনদেশী আর সাথে ভিতরের কেউ কেউ এমন অনেকেই মনে করে যে ট্রাম্প খুবই খারাপ মানুষ – রেসিস্ট, রেপিস্ট ইত্যাদি ধরনের সব কিছু অভিযোগ যার বিরুদ্ধে আনা যায়, নির্বাচনে ট্রাম্পের হেরে যাওয়া উচিত। অর্থাৎ তারা এখানে এথিকস এবং স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন ভঙ্গের কথা তুলছেন, তুলবেন। এ কথাও ঠিক যে ট্রাম্পের অনেক কথায় এথিকস ও আইনের ফিল্টার পার হবে না, আটকে যাবে এবং তা আসলে খুবই অগ্রহণযোগ্য। তাহলে?

ট্রাম্পের বয়ান-অবস্থানের কী সমালোচনা করা যাবে না? সমালোচনা করা কি ভুল হবে? এক কথায় এর জবাব, অবশ্যই যাবে। তবে থিতু হতে একটু অপেক্ষা করেন। ইতোমধ্যে তিনি কী কী বলেছেন, সেগুলোর বিস্তারিত নোট নেন। কিন্তু কোনোভাবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না। নেয়া ঠিক হবে না। আগামী বছর ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নেবেন। এর আগেই ও পরে কিছু কিছু করে কয়েক মাসের মধ্যেই ট্রাম্পের ‘আসল’ (অর্থাৎ খাবার দাঁত) নীতি-পলিসি পরিষ্কার হয়ে যাবে। নির্বাচনে দেয়া তার বিভিন্ন বক্তব্যে কোথায় কোথায় এখন তিনি ফিল্টার দেবেন, ফাইন টিউন করে এরপর তা তার সরকারের নীতি-পলিসি হিসেবে ঘোষণা করবেন, তা বোঝা যাবে। এর আগে ট্রাম্প প্রসঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া ভুল হবে। এ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

যেমন, ইতোমধ্যে ট্রাম্প তাঁর মুসলিমবিরোধী বক্তব্য সেটা তিনি নির্বাচনী ওয়েবসাইট থেকে নামিয়ে ফেলেছেন। ওদিকে সর্বশেষ আর এক খবর হল – ওবামার স্বাস্থ্য বীমা পলিসি (অনেকে যেটা তামসা করে ওবামা-কেয়ার বলে), সেটা তিনি নির্বাচনী প্রচারের সময় ‘রিপিল’ করবেন বলেছিলেন। ইংরেজি রিপিল মানে ফিরিয়ে নেয়া, প্রত্যাহার করা বা উল্টো আইন করে বাতিল করে দেয়া। এখন তিনি জানাচ্ছেন, “আমি সম্ভবত রিপিল করছি না। তবে কিছু সংস্কার করব”। এই গুমোর খুলেছেন তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেয়া ট্রাম্পের প্রথম ইন্টারভিউয়ে। এর কিছু পরে ১২ নভেম্বর বৃটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট ঐ ইন্টারভিউয়ের উপর একটা রিপোর্ট করে বিস্তারিত। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাষায় এটা ট্রাম্পের ইউটার্ণ; খবরের শিরোনাম হল, “Donald Trump: I may not repeal Obamacare, President-elect says in major U-turn”।

একটা অবজারভেশন হিসাবে বলা যায়, নির্বাচনের সময় সমগ্র দুনিয়ায় প্রার্থীরা অনেক প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা চাঁছা-ছোলা খোলা কথা বলে থাকে। কিন্তু জিতলে পরে যেটার ওপর কম অথবা বেশি ফিল্টার চড়ানো হয়, টোপর পরানো হয় বা ফাইন টিউনে একে বিচার-বিবেচনা করে বদলে নেবার পরেই কেবল তা  সরকারের নীতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। দেখা গেছে, সময়ে কোন রাষ্ট্রের ক্রাইসিস যত তীব্র থাকে নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা তখন চাঁছা-ছোলা আনফিল্টার করে বলা হতে থাকে। আবার মনে রাখতে হবে নির্বাচনী কথার প্রতিশ্রুতির সাথে এরপর জিতে তা সরকারের নীতি হুবহু না হওয়াতে তা নিয়ে সমালোচনা করে নির্বাচনের ফল হবার পরে তা নিয়ে খুব বেশি আগানো যায় না বা কাজে লাগে না। আর একটা প্রশ্ন থেকেই যাই। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যাই তাই পরে সেটা তখনও কল্পনা তা সবাই মনে রাখে। তুলনায় পরে কংক্রিট ভাষায় সরকারের নীতিতে কী থাকছে সেটাই আসল, বাস্তব। ফলে নির্বাচন উত্তর পরিস্থিতিতে মানুষ কল্পনার চেয়ে বাস্তব নিয়েই কথা বলা অর্থপুর্ণ মনে করে। তবে হ্যা নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে  কোনো প্রার্থীর সমালোচনা একমাত্র তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাজে লাগে। এবং সেটা কেবলমাত্র নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে , পরে আর নয়।  তাই আমাদের উচিত, চোখ-কান খুলে অপেক্ষা করা।

তাহলে ট্রাম্পই কি প্রথম ব্যক্তি যিনি নির্বাচনে দেয়া ‘হুবহু’ প্রতিশ্রুতিতে চলেন না? বরখেলাপ করেন? না, তা একেবারেই নয়। লিবারেল সুশীলদের প্রতিভূ শ্রী ওবামার কথাই ধরা যাক। তিনি তাঁর নির্বাচন চলাকালীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জিতলে তিনি রেনডিশন প্রথা (আমাদের মতো দেশে তাদের আসামি পাঠিয়ে টর্চার করিয়ে আনা, কারণ ওমন টর্চার নির্যাতন করা আমেরিকান আইনে নিষিদ্ধ ) বন্ধ করে দেবেন, গুয়ানতানামো বে কুখ্যাত কারাগার উঠিয়ে দেবেন, আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করবেন ইত্যাদি। যার একটিও তিনি করেননি এবং পরবর্তিতে তিনি নিজে সরাসরি অপারগতা জানিয়েছেন। তবে আফগানিস্তানে ১০ হাজার আমেরিকান সৈন্য রেখে হলেও বাকিটা প্রত্যাহার করেছেন। আর এক উদাহরণঃ গত ২০১৪ সালে ভারতের নির্বাচন চলাকালীন সময়ে মোদি হুঙ্কার ও ভয় পাইয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তিনি জিতলে জেতার পরের দিন থেকে ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের’ বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত মোদির সে কথার পরবর্তী কথা কাজ বা তৎপরতা নেই। যেন এমন কথা তিনি কখনও বলেননি অথবা নিজেই ভুলে গেছেন।

তাহলে আমি কি বলতে চাইছি ট্রাম্পের ওবামা বা মোদীর মতই সব কথা ভুয়া, তাল ঠিক নেই? না, তাও একেবারেই সত্যি নয়। বরং ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ট্রাম্প দিচ্ছেন যে খুব সম্ভবত আমেরিকান রাষ্ট্রনীতিতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসন্ন। আজকের যে আমেরিকাকে আমরা দেখে অভ্যস্ত, চিনি এই আমেরিকার গড়ন আকার লাভ করে থিতু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে; আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়া নতুন অর্ডারে সাজিয়ে হাজির হয়ে আছে তখন থেকে। সে অবস্থাকে বলা হয় আমেরিকা দুনিয়ার এক এম্পায়ারের (সাম্রাজ্যবাদ নয়) ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছিল। এরপর থেকে তা সরাসরি আমেরিকার  নিজের প্রত্যক্ষ ভোগে বা কাজে লাগুক আর  নাই লাগুক – এমন বহু বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেম এরপর থেকে তা চলে এখনও টিকে আছে। আর এর পরিচালন চালিয়ে টিকিয়ে রাখার পুরা দায়ভার আমেরিকাকেই বইতে হয়ে আসছে। মুখস্ত বা অভ্যাসের মত, সেই থেকে কোন রিভিউ ছাড়াই এগুলো চলে আসছে। এমন সব প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেমের দায়দায়িত্ব এই প্রথম রিভিউ করে কাটছাঁট ও পুনর্গঠন করা হতে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে যেমন, ন্যাটো। এর ৭৩ শতাংশ খরচ আমেরিকা একা বহন করে। ট্রাম্প এটা রিভিউ করার পর ঠিক করতে চান, এটা নিয়ে কী করা হবে। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো কোল্ড ওয়ার লড়াইয়ের যুগ শুরুর শুরুতেই ১৯৪৯ সালে গঠন করা হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামরিক মোকাবোলায় ন্যাটোর সদস্য সকল রাষ্ট্রের একসাথে এক্ট করতে একটা বাধ্যবাধকতা চালু করা, যাতে তা বড় এক রক্ষাকবজ নয়। ট্রাম্প যাকে আমাদের পাগল বেতাল লোক বলে প্রমাণ করতে চাইছি, বা যা মনে চায় তা বলে নির্বাচনে জিতার লোক মনে হচ্ছে – এমন প্রপাগান্ডা হয়েছে হচ্ছে যার নামে  – সেই ট্রাম্প প্রশ্ন তুলছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই কবে ভেঙ্গে গেছে, দুনিয়াতে এখন সব রাষ্ট্রই এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে সম্পর্কিত হয়ে আছে – অর্থাৎ সেই শত্রুতাও আর তেমন নাই। উলটা এখনকার একমাত্র জলন্ত হুমকি হল “টেররিজম”। তাহলে ন্যাটোকে একইভাবে রেখে দেওয়ার মানে কী? ন্যায্যতা কোথায়? অন্তত এবিষয়ে একটা  রিভিউ  করে এটা ভেঙ্গে দেয়া যায় কী না তা দেখা উচিত। আর দরকার হলে “টেররিজমের” মোকাবোলায় উপযোগী কিছু প্রতিষ্ঠান জন্ম দেয়া হক।  ব্যাপারটা নিয়ে ইতোমধ্যেই ইউরোপের অনেকের সাথে বাকবিতন্ডা শুরু হয়ে গেছে। ট্রাম্পের কথা ফেলনা নয়, যুক্তি আছে।

একইভাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলছেন – ট্রেড ব্যারিয়ার বা অবাধ পণ্য চলাচলে বাধা প্রসঙ্গে। চীনের সাথে বাণিজ্যে তিনি সস্তা জাতীয়তাবাদী হয়ে বাধা দেবেন না। তবে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরায় নেগোশিয়েট করে একটা তুলনামূলক ভালো ডিল (আমেরিকানদের জন্য চাকরি বা আউটসোর্সিং) তিনি পেতে চাইবেন। স্বভাবতঅই এটাই নির্বাচন উত্তর থিতু ভাষ্য। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ভোটের লোভে এই বিষয়টাকেই তিনি চীনের বিরুদ্ধে হুঙ্কারের মত শোনায় একন ভাষাতেই বলেছিলেন।

আবার সিরিয়া প্রসঙ্গে এক নতুন অবস্থান নিতে যাচ্ছেন। তাতে আসাদ থাকল না গেল, সেখান থেকে সরে আসবেন। রাশিয়ার ওপর আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রের অবরোধ উঠানো নিয়ে কথা আগাবেন। আইএস মোকাবেলা ও দমনে রাশিয়ার সাথে দায় শেয়ার করবেন সম্ভবত। এগুলো সবই বিশ্বাযোগ্য কথা ও পদক্ষেপ তিনি নিতে যাচ্ছেন।  কেবল একটা জায়গায় ফাঁকি দিক ছিল। খুব সম্ভবত তিনি হিলারির বিরুদ্ধে পুতিনের দেয়া ইন্টেরলিজেন্স ব্যবহার করতে পুতিনের সাথে অপ্রমাণিত ডিল করেছিলেন। ট্রাম্প বলতে পারেন যে হিলারিও তো ওবামার প্রভাব ব্যবহার করে “সরকারী মেল ব্যক্তিগত সার্ভারে রেখে” তিনি ঠিক করেন নাই তবে নিরাপত্তা ভঙ্গ হয় এমন কিছু ঘটান নাই বলে ছাড়পত্র এনেছিলেন। অর্থাৎ ওবামা-হিলারি এসব তথাকথিত লিবারেলরা কোন ধোয়া তুলসিপাতা নয় এটা মনে রাখতে হবে।  ওবামা-হিলারিরা কোন স্টান্ডার্ড বা আদর্শ নয়।

সৌদি, জাপান, কোরিয়া, জার্মানি প্রভৃতি দেশে যেখানে যেখানে আমেরিকান ঘাঁটি আছে সে ঘাঁটি রাখার খরচ কে বইবে – এই প্রশ্নটা  ট্রাম্প সামনে আনতে চান।  অথবা রাখা আদৌ আমেরিকার জন্য কোনো লাভ হচ্ছে কি না এটা পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে চান। এটা খুবই জেনুইন প্রশ্ন। এককালে আমেরিকার অর্থভান্ডারের অবস্থা ভাল ছিল পরে নিজ খরচে ভিন দেশে ঘাঁটি পোষা হয়ত গায়ে লাগত না। এখন লাভ-ক্ষতি হিসাব করা, বাস্তববাদী হওয়া অবশ্যই জায়েজ।

আমরা যদি মনে রাখি, ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী, তাহলে ট্রাম্পকে বুঝতে আমাদের তা কাজে লাগতে পারে।  উপরের সবগুলো প্রসঙ্গের একটা কমন দিক আছে। সেই বিচারে সবগুলো ইস্যু সম্পর্কিত। আমেরিকার এম্পায়ার ভুমিকা খাটো হয়েও গেছে, শুকিয়েছে। ফলে সে বাস্তব পরিস্থিতি মোতাবেক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আবার নতুন করে সাজানোর সময় পার হয়ে গেছে।  সারকথায় আমেরিকার এখনকার মানে শুকানো ভুমিকা মোতাবেক বড় খরুচে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তত ঢেলে সাজানো যায়। এককথায় যেটাকে দক্ষ সরকার – ম্যানেজমেন্ট এবং খরচের দিক থেকে স্মার্ট চটপটে সরকার কায়েম করার উদ্যোগ – নিঃসন্দেহে অনেক সুদুর প্রসারি ও বাস্তব চিন্তা।

আর একটা প্রসঙ্গ বলে শেষ করব। ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা ইতোমধ্যে ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর এক মজার মন্তব্য করেছেন। তিনি চীনা নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক সমতুল্য ব্যাংক এআইআইবি (AIIB), এই ব্যাংক জন্মের সময় ওর গঠন উদ্যোগের বিরোধিতা করা আমেরিকার দিক থেকে  ‘স্ট্র্যাটেজিক মিসটেক’ বলে মন্তব্য করেছেন। এমন মন্তব্য খুবই উলটা বাওয়া মন্তব্য হলেও কথা মিছা না। বাস্তবতা হল এক আমেরিকা আর তাঁর পার্টনারস ইন ক্রাইম জাপান – এই দুই দেশ ছাড়া এখন AIIB সদস্য হতে কোন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপুর্ণ দেশ বাকী নাই। সর্বশেষ আমেরিকার পিছনে পিছনে চলা কানাডাও ঐ ব্যাঙ্কে যোগ দিয়েছে। আর সেই বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকার নেতৃত্ব মেনে পিছেপিছে চলা শুরু করেছিল ইউরোপ। এই প্রথম নিজের স্বার্থ আমেরিকার চেয়ে আলাদা বলে অনুভব ও দাবি করে এরাও (মানে ইউরোপের প্রধান তিন প্রভাবশালী – জর্মন, বৃটিশ ও ফরাসী) চীনের নেতৃত্বে AIIB উদ্যোগে পতাকা তুলতে দেরি করে নাই।  যদিও এই প্রসঙ্গে খোস ট্রাম্প কী অবস্থান নিবেন এখনও কিছুই জানা যায় নাই।

ওবামার এক আদরের নীতি হল বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি বা চুক্তি জোট গড়া। ওসব উদ্যোগে ওবামা মুখ্য বিশেষ্যত্ব হল ঐ চুক্তি বা বাণিজ্য জোট গুলোতে চীনকে বাদ রাখতে হবে।  চীনকে বাদ দিয়ে এরপর বাকিদের নিয়ে আমেরিকাসহ নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি (টিপিপি অথবা নাফটা) – এগুলো পুনর্গঠনের পক্ষে ট্রাম্প কথা বলছেন।খুব সম্ভবত চীনকে বাদ রাখা এটা খুব কাজের মানে কার্যকর সুবিধা আমেরিকাকে দিবে না অসুবিধা ডেকে আনবে – এটাই সম্ভবত ট্রাম্পের কাছে ইস্যু।

এক কথায় বললে চীনের উত্থানে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নতুন বিন্যাস ও অবস্থানের দিক থেকে আমেরিকার ভূমিকা কী? আর যাই হোক এতা নিশ্চয় আর আগের মত জায়গায় নাই। ফলে যে সব কোর বিশ্বাস বুঝাবুঝির উপরত আমেরিকার গত সত্তর বছর ধরে দাড়িয়ে ছিল তা বদলবার স্ময় হয়েছে।  ট্রাম্প সম্ভবত এ বিষয়গুলো এই প্রথম ঢেলে ভিন্ন দিক থেকে দেখে নতুন কিছু করতে চাইছেন। স্বভাবতই ট্রাম্পের প্রসঙ্গগুলো যত বিশাল, সে তুলনায় আমাদের কাছে তথ্য যেন আপাতত ততই কম। ফলে কোথায় তা কত দূর যেতে পারবে, আদৌ সম্ভব কি না তা দেখা-বোঝার জন্য আমাদের অনেক অপেক্ষা করতে হবে। তবে কোনোভাবেই বিষয়গুলোকে ট্রাম্পের নির্বাচনপূর্ব রেঠরিক মাত্র এই সংকীর্ণতা দিয়ে বুঝতে চাওয়া অর্থহীন হবে। একবাক্যে বললে, ট্রাম্প সম্ভবত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইছেন যেদিক থেকে আগে কখনই দেখা হয় নাই। যদিও বিষয়গুলো যথেষ্ট প্রকাধ্য হয় নাই এখনও।

এ প্রসঙ্গের লেজ ধরে আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাহলে সামনে উদয় হয়। চীন-আমেরিকার সম্পর্ককে এখন থেকে কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইলে স্বভাবতই ট্রাম্পের আমেরিকার সাথে ভারতের অথবা বাংলাদেশ নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। কারণ চীন দাবড়াতে হবে – এই অনুমানের উপরেই বর্তমান বহুপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক সম্পর্কগুলো সাজানো। অতএব ট্রাম্পের নতুন দৃষ্টভঙ্গীতে এর ভেতর কোনো বিশেষ এবং নতুন দিক থাকবে কি না সে বিষয় এশিয়ার ভারত বা বাংলাদেশ এই দুই দেশেই আপাতত ক্লুহীন। হাসিনার দ্বিধা মনে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোটা সে আলোকে দেখা যেতে পারে। তবে চীনের সাথে ট্রাম্পের নতুন সম্পর্ক সাজানোর দিকটি মাথায় রাখলে তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ওপর তার কিছু কিছু ছাপ, নতুন বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়ার কথা। সম্ভবত ওবামার ‘চীন ঠেকানো’ টাইপের অবস্থান – – এটাকেই  ট্রাম্প ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন। ট্রাম্প এ রকম বহু প্রসঙ্গ তুলেছেন তা চূড়ান্ত নয়, বরং এগুলো ডেভেলপিং বলাই ভাল। তাই এক কথায় সব কিছুই  – ওয়েট অ্যান্ড সি, ডোন্ট কনক্লুড।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল।  আজ ১৬ নভেম্বর ঐ লেখা আরো সংযোজন ও এডিট করে আবার এখানে ছাপা হল। ]

 

আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন

আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ
গৌতম দাস

২৬ জানুয়ারি ২০১৬,মঙ্গলবার
http://wp.me/p1sCvy-D3

আধুনিক রাষ্ট্রের জমানায় বাণিজ্য চুক্তি করার রেওয়াজ উঠেছিল আশির দশকের শুরু থেকে। অর্থাৎ যারা গরিব দেশ বা ছোট অর্থনীতির রাষ্ট্র বলা হয়, এদের সাথেও বাণিজ্য চুক্তি করার দরকার-বোধের শুরু তখন থেকে। বাণিজ্য চুক্তি বলে এটিকে বাড়িয়ে বলার অর্থ হয় না। সারকথায় বললে আমেরিকা তার নিজ বাজারে নিজ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় গরিব দেশগুলোকে পণ্য রফতানি করতে দেয়া শুরু করেছিল। কথাটিকে আরেকভাবে বলা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অনেক পর মূলত ইউরোপের বাজার বিনিয়োগ-পুঁজিতে পরিপূর্ণ সয়লাব হয়ে গেলে উন্নত অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো মনে করা শুরু করেছিল, তাদের কেবল গরিব দেশে নিজ পণ্য রফতানিকারকের এত দিনের একক ভূমিকায় থাকা বোকামি হচ্ছে। ইউরোপের বাজার স্যাচুরেটেড হওয়ার এর পরে কে? তাই এশিয়ায় আসতে সময় লেগেছিল। অন্তত গ্লোবাল বিনিয়োগ-পুঁজির খাতক হতে পুঁজিবাজারের ক্রেতা বা ঋণগ্রহীতা আরো বাড়াতে চাওয়া- এ দরকারি দিক থেকে দেখে মূলত আমেরিকা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফলে বিশ্বব্যাংকের মুখ্য স্লোগান হয়েছিল- গরিব দেশকে “রফতানিমুখী অর্থনীতি” করে ঢেলে সাজাতে হবে। বাংলাদেশে সে সময়ের এ’বিষয়টার  দুটো ঘটনায় চিহ্নিত করা আছে।

বাংলাদেশে ‘রফতানিমুখী অর্থনীতি’ করতে বিশ্বব্যাংক ১৯৮২ সালে এরশাদ দিয়ে ক্ষমতা দখল করিয়ে বিশ্বব্যাংকের সংস্কার কর্মসূচি চালু করে দিয়েছিল। এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন বা সংক্ষেপে ইপিজেড ধারণা সাথে আসে সেই থেকে। অন্যদিকে সে ঘটনা-সময়ের দ্বিতীয় চিহ্নটি সামাজিক সাংস্কৃতিক ধরনের। কবি ফরহাদ মজহারের এক কবিতার বই আছে ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারি বইমেলায় বেরিয়েছিল, বইটার নামই “অকস্মাৎ রপ্তানিমুখী নারী মেশিন”। বইয়ের তাতপর্যপুর্ণ এ’নামটাই অনেক কিছুর নির্দেশক। কলোনি আমল থেকেই আমাদের প্রচলিত রফতানি পণ্য ছিল পাট, কাঁচা পাট অথবা পাটজাত পণ্য। সে আমলে যাকে বলা হত অর্থকরি ফসল। বিশ্বব্যাংকের ওই সংস্কার কর্মসূচিতে এই প্রথম আমাদের সেখান থেকে সরিয়ে এনে মুখ্য রফতানি পণ্য করা হয় রেডিমেড গার্মেন্টস, আর আমাদের পরিচিতি দাঁড়ায় এরই রফতানিকারক দেশ। গার্মেন্ট রফতানির অর্থনীতিতে রূপান্তর করে দেয়া হয়।

এখানে একটা কথা স্পষ্ট করা দরকার। বাংলাদেশের মতো দেশের অর্থনীতিকে রফতানিমুখী করে সাজানো শুরুর আগে আমরা আমেরিকায় কোনো পণ্য রফতানি করতে চাইলে তাতে আইনগত কোনো বাধা ছিল তা নয়। তাহলে রফতানিমুখী করে সাজানো – এই পরিস্থিতিতে নতুন যে বিষয়টি তা হলো, আমেরিকাতে কোন কোন পণ্য রফতানিতে বাংলাদেশ কর মওকুফ বা ছাড় পাবে, এমন কিছু পণ্য সুনির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের জন্য সেই পণ্যই রেডিমেড গার্মেন্ট। আর এর সাথে কর মওকুফের এক কোটা ব্যবস্থা। এই হল আমাদের মতো দেশের সাথে প্রথমবারের মতো আমেরিকায় রফতানিকারকের ভূমিকা পালন করতে গিয়ে বাণিজ্য চুক্তিতে সংশ্লিষ্ট হওয়া। আমাদের মতো দেশের সাথে আমেরিকার বাণিজ্য চুক্তি করার ইতিহাসের শুরু। এর মূল বৈশিষ্ট্য হল, আমাদের মতো দেশকে আমেরিকা কতটা এবং কী কী পণ্য নিয়ে প্রবেশ করতে দেবে, এমন একপক্ষীয় করে নেয়া ব্যাপারের উপর আমেরিকার নিয়ন্ত্রণ।

তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ইস্যুতে ১৯৪৭ সাল থেকেই জাতিসঙ্ঘের ব্যানারে নানান বাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ শুরুল হয়েছিল। জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন ট্যারিফস এন্ড ট্রেড, গ্যাট (GATT) থেকে শুরু হয়ে ১৯৯৪ সালে ডব্লিউটিও-তে এসে যা শেষ হয়। এতে আমাদের দিক থেকে পড়ে পাওয়া কিছু সুবিধার রাস্তা তো অবশ্যই খুলেছিল। যেমন আমরা উন্নত দেশের তৈরি সব ধরনের পণ্যের ক্রেতা হওয়া সত্ত্বেও উল্টো খোদ আমেরিকায় কিছু পণ্যের রফতানিকারক হয়ে গিয়েছিলাম। স্বভাবতই তা শুধু সেসব রফতানি পণ্য, তুলনামূলকভাবে যা টেকনোলজির দিক থেকে কম জটিল আর একেবারেই কম দক্ষ শ্রম লাগে আর তা প্রচুর গা-গতরের শ্রম, এমন। কিন্তু সেটাও এমনি আসেনি। অবস্থা তৈরি করা হয়েছিল, যেন তারা আমাদের তাদের বাজারে মহান প্রবেশদাতা হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ বাজারে আমাদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ যেন আমেরিকার হাতে থাকে। কথাটা বলার কারণ বিষয়টি রেসিপ্রোকাল নয় বা পাল্টাপাল্টি ধরনের নয়। যেমন আমাদের বাজারে আমেরিকার প্রবেশের ক্ষেত্রে তো এটা খাটে না। আমরা সেখানে কোনো দাতা হিসেবে হাজির নই। আমাদের বাজারে প্রবেশে আমেরিকার ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণের বালাই নেই। যা হোক, এসবের ভেতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে সেই থেকে প্রবল কথাবার্তার জোয়ার উঠেছিল। ‘গ্রুপ-৭৭’ বা ‘উরুগুয়ে রাউন্ড’, ‘দোহা রাউন্ড’ ইত্যাদিতে সাতটি রাউন্ড বিস্তর আলোচনা দরকষাকষির পরে নতুন করে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তা বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও হিসেবে হাজির হয়েছিল। কিন্তু এভাবে হাজির হতে হতে আমেরিকা আবার এ ধরনের গ্লোবাল বাণিজ্য সংস্থায় আস্থা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল। এর মূল কারণ মনে করা হয়, ডব্লিউটিও’র কার্যকারিতা যত বাড়ছিল ততই অর্থনৈতিকভাবে গরিব এলডিসি বা লিস্ট ডেভেলপমেন্ট কান্ট্রিজসহ নানা ক্যাটাগরির জোটবদ্ধতা শুরু হতে দেখা যায়। আমেরিকার বিরুদ্ধে সবার জোটবদ্ধ হয়ে যাওয়া- এটাই আমেরিকার নিরুৎসাহিত হয়ে যাওয়ার কারণ। আর এর বদলে সেই সাথে আমেরিকার নতুন উৎসাহের বিষয় হয়ে ওঠে দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি- বাই-লেটারাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট। এর ভেতরে মুক্ত শব্দটি যত জ্বলজ্বল করে, ততটাই এটা বন্দিত্বের ফাঁদ।
আমেরিকার ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্টে নতুন উৎসাহের ফলে ডব্লিউটিও কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেনি ঠিকই; তবে আমেরিকার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে বিভিন্ন রাষ্ট্রের আমেরিকার সাথে বাই-লেটারাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট। দ্বিপক্ষীয় ধরনের চুক্তি আমেরিকার দিক থেকে সবচেয়ে উপযুক্ত বলে ধারণা প্রবল হতে থাকে। এর কারণ ভিন্ন এক পরিস্থিতি। যেকোনো বাণিজ্য চুক্তি আসলে আইডিয়ালি ‘উচিত অর্থে’- রাষ্ট্রস্বার্থের ভিত্তিতেই হওয়ার কথা। কিন্তু একটা চুক্তির মাধ্যমে ‘রাষ্ট্রস্বার্থে বাণিজ্য’ ঘটানো ব্যাপারটা বাস্তবে অলীক না বললেও খুবই কঠিন। ফলে গণস্বার্থের বদলে নামেই এখানে একটা কোটারি স্বার্থ তৈরির সম্ভাবনা থাকে সব সময়। মূলত পুঁজিমালিক বা ব্যবসায়ীর স্বার্থটাই জনস্বার্থের নামে হাজির হয়ে যায়। এ ছাড়া বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে আরেক বিপদ দেখা যায়।

যেমন- বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধরা যাক। এখানে সরকারের স্বার্থ মানে আসলে সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থ অথবা যেভাবেই হোক ক্ষমতায় থাকার স্বার্থ। জনস্বার্থের সাথে যার কোনো সম্পর্ক নেই। ফলে আমেরিকা বাংলাদেশের সাথে কোনো বাণিজ্য চুক্তির বেলায় ক্ষমতাসীন সরকারের দুর্বলতাগুলোকে কাজে লাগায়। বিশেষ করে জনগণের রাজনৈতিক মানবিক মৌলিক অধিকার রক্ষা না করা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার রক্ষা না করার মতো ব্যাপার থাকলে তা আড়াল, উপেক্ষা অথবা ন্যায্যতা আমেরিকার দেয়া অথবা না দেয়াকে ব্যবহার করে যেকোনো বাই-লেটারাল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করে নেয়া সম্ভব। কারণ, এখানে ক্ষমতাসীন সরকার নিজের সঙ্কীর্ণ দলীয় স্বার্থে অথবা নিজের ক্ষমতাসীন থাকার স্বার্থে খোদ রাষ্ট্রস্বার্থ বা গণস্বার্থকে বিক্রি করে দেয়া সম্ভব। কারণ আমাদের মত দেশের রাজনৈতিক সাংবিধানিক ব্যবস্থা, পাবলিক কন্ট্রোল ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। আর এটাই আমেরিকার জন্য সুযোগ। অথচ আমেরিকাকে একই বিষয়ে চুক্তি ডব্লিউটিও’র ভেতর জোটবদ্ধ এলডিসি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে করতে হলে, সেখানে কোনো একটা রাষ্ট্রের ‘সরকারের দুর্বলতা’কে ব্যবহার করা যেত না। কারণ সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রগুলোর সাধারণ স্বার্থের সাথে সমঝোতা চুক্তি, ফলে শুধু একটা রাষ্ট্রের ও শাসকের দুর্বলতাকে পুঁজি করার সুযোগ সেখানে নেই। তাহলে দাঁড়াল, আমেরিকার পছন্দ দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি। এটা হলো এমনই ফ্রি বা স্বাধীন যে, নিজে ক্ষমতায় থাকার স্বার্থে, দলবাজির স্বার্থে স্বাধীনভাবে দেশ বা গণস্বার্থ বেচে দেয়া যায়।
এখানে দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি বলতে তা শুধু দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যেই এটা হতে হবে এমন বোঝা ভুল হবে। এর আরেক রূপও আছে, যেটা প্রায় যেন একটা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি- ওই ফরম্যাটই কয়েক রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার – এভাবে একসাথে করা হয়ে থাকে। সাধারণত একই স্তর বা মানের অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর সাথে আমেরিকা এমন দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি জোট করে থাকে। অথবা অনেক সময় ভৌগোলিক এলাকা বা অঞ্চলের কয়েকটা রাষ্ট্রের সাথে এমন বাণিজ্য চুক্তি করেছে আমেরিকা। যেমন ল্যাটিন আমেরিকার এমন দু’টি বাণিজ্য চুক্তি হল- উত্তর আমেরিকা ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ১৯৯১ (নাফটা) এবং সেন্ট্রাল আমেরিকান ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ২০০৬ (সাফটা)। আমেরিকার করা এ ধরনের বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোকেও তারা বাই-লেটারেল ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট বা দ্বিপক্ষীয় এফটিএ বলে ক্যাটাগরি,  নামকরণ করে ফেলেছে।

এ ছাড়া একই ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট ধরনেরই ইদানীং আরেক সর্বশেষ ধাপ হলো, যেমন ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ বা সংক্ষেপে টিপিপি এবং ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ বা টিটিআইপি। তবে এখানে এবার ‘পার্টনারশিপ’ শব্দটি নামের শেষে রাখার একটা রেওয়াজ চালু হয়েছে।

পার্টনারশিপ
শব্দটির প্রতীকী কিন্তু এর গুপ্ত বা অনুচ্চারিত দিক হল, রাইজিং ইকোনমির চীন বা আগামী দিনের নতুন গ্লোবাল ইকোনমিক অর্ডারের নেতা চীনের বিরুদ্ধের রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে একসাথে আমেরিকার করা দ্বিপক্ষীয় ধরনের ফ্রি বাণিজ্য চুক্তি- এরই জোট এটা। এর আগে সাধারণভাবে আমেরিকা দ্বিপক্ষীয় ধরনের যেসব বাণিজ্য চুক্তি করে চলছিল, এমনকি চলতি শতকে এসেও সে একই কাজ করছিল; তবে একই ধরনের এবারের চুক্তিগুলোতে চীনবিরোধী এক বাড়তি বৈশিষ্ট্য আরোপ করা হয়েছে। যেমন- টিপিপি, এটা করা হয়েছে মূলত চীনে সমুদ্রপথে প্রবেশের চার পাশের পড়শি কাছে-দূরের রাষ্ট্রগুলোকে নিয়ে। মূলত এমন রাষ্ট্রগুলো হল- অস্ট্রেলিয়া, ব্রুনাই, জাপান, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম আর স্বাগতিক আমেরিকা। তবে ব্যতিক্রমভাবে এখানে কানাডা আর কিছু ল্যাটিন আমেরিকান দেশ, যেমন- চিলি, মেক্সিকো ও পেরুও আছে। এ ছাড়া অন্য যে দ্বিতীয় বাণিজ্য চুক্তি ট্রান্স-আটলান্টিক ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট পার্টনারশিপ বা টিটিআইপি – এটা হলো আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার হবু বাণিজ্য চুক্তি।

টিপিপি আর টিটিআইপি এ দুই চুক্তির মধ্যে নামের শেষ পার্টনার শব্দ যোগ হয়ে আছে সে কথা ছাড়াও এ দুই চুক্তির বড় মিলের দিক হল, এটা চীনবিরোধী বৈশিষ্ট্যের জোট। এ ছাড়া বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মিলের দিক হল বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যেমন- এ দুই চুক্তিরই প্রস্তুত প্রক্রিয়া চলছে অত্যন্ত সঙ্গোপনে। নিজ জনগণকে দূরে রেখে। লন্ডনের ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার ভাষায়, ‘এ গোপনীয় ধরনের অগণতান্ত্রিক চুক্তি প্রক্রিয়া এখনো চলছে এবং এ রিপোর্টে তুলে ধরা চুক্তিবিষয়ক প্রায় সব তথ্যই লিকেজ হয়ে আসা তথ্য অথবা তথ্য পাওয়ার অধিকার- ‘রাইট টু ইনফরমেশন’ আইনে অনুরোধ পাঠিয়ে সংগ্রহ করা তথ্য’। অন্য দিকে এ চুক্তির বিরুদ্ধে ব্রিটেনে জনমত সংগঠিত করার সংগঠন ‘ওয়ার অন ওয়ান্ট’-এর নির্বাহী পরিচালকের ভাষায়, তিনি মনে করেন এ হবু চুক্তি ইউরোপ ও আমেরিকান সমাজের সাধারণ মানুষের ওপর বহুজাতিক কোম্পানির আক্রমণ।

এই হলো সংক্ষেপে আমেরিকার করা ধারাবাহিক বাণিজ্য চুক্তির ইতিহাস। সাধারণভাবে বললে, আমেরিকার ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করার উদ্দেশ্য হল, বড় বড় বিজনেস হাউজ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে গিয়ে যেসব রাষ্ট্রীয় নিয়মকানুন-রীতি মেনে চলতে বাধ্য হয় এমন নিয়ন্ত্রণ আইনগুলোর যে আইনি বাধা আছে, সেগুলো আলগা করে দেয়া। চুক্তি করার আগে প্রায়ই আমেরিকার ‘পার্টনার’ রাষ্ট্র ওই চুক্তি করার খাতিরে নিজ আইনের নিয়ন্ত্রণ আলগা করে ফেলে থাকে। যেমন নিরাপদ খাদ্যবিষয়ক নিয়ন্ত্রণ আইন, পরিবেশবিষয়ক নিয়ন্ত্রণ আইন, ব্যাংকবিষয়ক নিয়ন্ত্রণ আইন অথবা রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষমতা বিষয়ক আইন- এগুলোকে পাশ কাটিয়ে ইচ্ছামতো ব্যবসা-বাণিজ্য করার সুবিধা নেয়া এসব চুক্তির সাধারণ উদ্দেশ্য। আর এই মূল উদ্দেশ্যের অধীনে অন্যান্য উপ-উদ্দেশ্যে যেমন চীনবিরোধী বাণিজ্য চুক্তি জোট অথবা আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে আমাদের মতো রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য চুক্তি (জিএসপি’র মতো) করা হয়ে থাকে।

নতুন ফেনোমেনা : মানবাধিকার
প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ বছর ধরে আমেরিকা এমন বাণিজ্য চুক্তি করে যাচ্ছিল, কোনো সমস্যা বা আপত্তি দেখা যায়নি। কিন্তু এবারই প্রথম এসবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলার এক পাল্টা প্রয়াস লক্ষ করা যাচ্ছে। এই প্রথম টিপিপি এবং টিটিআইপি- এ দুই চুক্তির বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে সাবধান করেছেন জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের (ইউএন-এইচআরসি) হেডকোয়ার্টার জেনেভা থেকে এর র‌্যাপোটিয়ারেরা বা র‌্যাপোরচারেরা। ফরাসি শব্দ ‘র‌্যাপোটিয়ার’-এর তুল্য ইংরেজি শব্দ ইনভেস্টিগেটর। অর্থাৎ নিরপেক্ষ তদন্ত অনুসন্ধান করে রিপোর্টদাতা। বিভিন্ন দেশের হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের ঘটনায় অথবা কোনো সদস্য রাষ্ট্রের হিউম্যান রাইটসের দশা পরিস্থিতি বিষয়ক ঘটনাকে সরেজমিন পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্ট করার জন্য জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের নিয়োগ দেয়া বিভিন্ন বিষয়ের র‌্যাপোটিয়ার আছেন। কাউন্সিল থেকে এরা এক ধরনের নিয়োগ নেন বটে, কিন্তু কোনো পারিশ্রমিক নেন না বা পান না। তবে কোনো ব্যক্তি সহকারী বা বস্তুগত লজিস্টিক সাপোর্ট লাগলে তা কাউন্সিল থেকে নিতে পারেন। সে জন্য এদের নিরপেক্ষ র‌্যাপোটিয়ার বলা হয়। যেকোনো ইস্যুতে এই র‌্যাপোটিয়ারদের সরজমিনে সংগ্রহ ও পেশ করা রিপোর্টকে মাঠের ফ্যাক্টস বা ভিত্তি মেনে এর ওপর এরপর সদস্যদের আলোচনা শুরু হয় ও সিদ্ধান্ত রেজুলেশনে পৌছানো হয়। এমন কাজ করে সুনাম কামিয়েছেন, এমন নামকরা ১০ জন র‌্যাপোটিয়ার উদ্বেগ জানিয়ে এক যৌথ বিবৃতি দিয়েছিলেন গত ২০১৫ সালের জুন মাসে। ওই বিবৃতিতে সবার আগে তারা স্পষ্ট করে নিয়েছেন যে, তারা যেকোনো বাণিজ্য চুক্তির প্রয়োজন বোঝেন। ফলে তাদের ইস্যু কোন বাণিজ্য চুক্তির বিরোধীতা করা নয় বরং ওই চুক্তি করতে গিয়ে করা মানবাধিকার লঙ্ঘন।

এ ছাড়া শুধু উদ্বেগ জানানো নয়, ওই বিবৃতিতে সবশেষে কী করা উচিত সে বিষয়েও কিছু পরামর্শ তাঁরা দিয়েছেন। যেমন- কাজ গোপনে না করে কাজে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা আনা, জনপ্রতিনিধিদের সামনে সব কিছু উন্মুক্ত রাখা, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে-পরে মানবাধিকারের ওপর এর প্রভাব কী হতে পারে তা বিবেচনায় নেয়া, যেকোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা কী থাকছে সেদিকে নজর দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া ইত্যাদি।

ওই বিবৃতির প্রায় ছয় মাস পরে গত ১২ জানুয়ারি ২০১৬ আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় হিউম্যান রাইটসবিষয়ক দাতব্য সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ বা সংক্ষেপে এইচআরডব্লিউ একই ইস্যুতে নিজেরই তৈরি আটটি প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ছলে টিপিপি’র কার্যক্রমকে প্রশ্ন করেছে। টিপিপি চুক্তিতে মানবাধিকার লঙ্ঘন বিষয়ে তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো জানিয়ে নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছে সেখানে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ যদিও দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং আমেরিকান কোনো সরকারি দান তারা গ্রহণ করে না বলে জানিয়েছে। এছাড়া এরা নিজ সরকারি নীতি অনুসরণ করে কাজ করে সিদ্ধান্ত নেয় এমন নয়। যেমন- মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা নিপীড়ন ইস্যুতে এইচআরডব্লিউ শক্ত সমালোচনামূলক অবস্থান নিয়েছিল। বিশেষত যেখানে ওবামা প্রশাসনসহ সারা পশ্চিম জগৎ ব্যবসার লকলকে লোভে এই ইস্যুতে চুপচাপ ছিল। পরবর্তীকালে ওবামা দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জেতার পরের সপ্তাহে প্রথম মিয়ানমার সফরে এসে মানবাধিকার বিষয়ে নিজ সরকারের অবস্থানের বদল ঘটিয়েছিলেন। তবে স্বভাবতই এই সংগঠন প্রত্যক্ষ সঙ্ঘাতের ভাষায় না বললেও স্পষ্ট আপত্তির ভাষায় টিপিপি ইস্যুতে নিজের আলাদা অবস্থান ব্যক্ত করেছে। ফলে সুযোগ রেখেছে যেন চাইলে ওবামা সরকার নীতি বদলিয়ে নিজেকে সংশোধন করে নিতে পারে। যেমন- দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরের শুরুতে এইচআরডব্লিউ বলছে, আমেরিকার ফ্রি টেড অ্যাগ্রিমেন্ট ভালো না মন্দ- এ বিষয়ে তাদের কোনো অবস্থান নেই। কিন্তু টিপিপি চুক্তিতে কিছু মারাত্মক হিউম্যান রাইটস লঙ্ঘনের ইস্যু উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে তারা মনে করে। বিশেষত “শ্রমিকের অধিকার, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ, সুস্বাস্থ্য থাকার অধিকার, মুক্তভাবে নিজেকে প্রকাশ এবং ইন্টারনেটে প্রাইভেসির অধিকার” বিষয়ে। তবে তাদের অবস্থান হল, টিপিপিতে হিউম্যান রাইটস বিষয়ক যে সমস্যা সৃষ্টি করেছে, তা সংশোধনযোগ্য। এছাড়া একটা হিউম্যান রাইটস ফ্রেন্ডলি টিপিপি কেমন হতে পারে এর একটা ধারণাও তারা রেখেছে। ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার স্বভাবতই। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা নিজেদের স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট রাজনীতির শক্তিতে সংগঠিত না করে কেবল মানবাধিকার সংগঠনের মুখ চেয়ে থাকা পরিস্থিতি তৈরি করে রাখলে তা আমেরিকার জন্য এমন আরো টিপিপি স্বাক্ষর করিয়ে নেয়া সহজ হয়ে যেতে পারে।

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক আলোকিত বাংলাদশ পত্রিকা ২৪ জানুয়ারি ২০১৬ প্রিন্টেড সংখ্যায় এবং দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকা ২৫ জানুয়ারি ২০১৬ প্রিন্টেড সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। তা এখানে আরও সংযোজন ও এডিট করে ফাইনাল ভার্সান আকারে আবার ছাপা হল। ]