ট্রাম্পের টুইট – তাঁর নিউক্লিয়ার জ্ঞান

ট্রাম্পের টুইট – তাঁর নিউক্লিয়ার জ্ঞান

গৌতম দাস
০৫ জানুয়ারি ২০১৭,  বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-2aU

রাজনীতিবিদ অথবা সরকারপ্রধান বা মন্ত্রীদের আজকাল সোস্যাল মিডিয়াতে পাওয়া খুবই সহজ বিষয় হয়ে গেছে। বিশেষ করে রাজনীতি-সংশ্লিষ্ট অনেক খ্যাতিমানেরা প্রায়ই টুইটার ব্যবহার করেন। তুলনায় তারা অবশ্য ফেসবুকে কমই আসেন। তাদের টুইটার ব্যবহারে বেশি আগ্রহের মূল কারণ সম্ভবত টুইটারের ১৪০ অক্ষরের সীমা। এমন কোন সীমা ফেসবুকে নাই। টুইটারে অক্ষরের সীমা থাকার কারণে ফেসবুক থেকে এর বৈশিষ্ট অনেক দিক থেকে আলাদা হয়ে গেছে। যেমন- প্রথমত, এটাকে ব্লগ থেকে পৃথক ক্যাটাগরি ‘মাইক্রো-ব্লগ’ বা ছোট ব্লগ বলে আলাদা করা যায়। দ্বিতীয়ত, যে কথা লিখা হবে তা আগে চিন্তা করে গুছিয়ে এরপর লিখতে হবে। তবেই অল্পে কথা হবে। ফলে টুইটারের লেখা সাধারণত কম্প্যাক্ট হয়। তৃতীয়ত, টুইটার ইন্টারেকটিভ নয়, মানে মন্তব্য কথোপকথন এর মত করে সে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা চিন্তা করে তৈরি করা হয়নি। এই অর্থে টুইটারকে আসলে ওয়ান ওয়ে বা একপক্ষীয় মিডিয়া বলা যায়। টিভির মতো যে একাধারে নিজে বলেই যায়, শ্রোতাকে বলতে দেয় না। এ দিকে অবশ্য এটাও ঠিক, সেলিব্রিটি বা খ্যাতিমানেরা কাউকে বলতে দিতে চান না, কেবল শোনাতে চান। আর তাদের শোনার সে সময় কই?
এভাবে টুইটারের বৈশিষ্ট নিয়ে আরো অনেক পয়েন্ট লেখা যায় হয়ত। থাক সে কথা। আসল কথা হল – ১৪০ অক্ষর। ফলে এখানে অল্প লিখে ফাঁকি দেয়াও যায়। কিন্তু টুইটারের বিষয়ে আলাপ তুললাম কেন? আর তার সাথে ফাঁকির কী সম্পর্ক? সম্পর্কের নাম ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। টুইট লিখলে যেহেতু কম কথা লিখতে হয়, ফলে লেখার সাথে আবার কোনো ছোট বা বড় ব্যাখ্যা লিখতে হয় না ফলে পাঠল কেউ আশা করে না। কারণ ব্যাখ্যা লেখার সুযোগ বা জায়গা নেই। এ এক বিরাট অজুহাত। ফলে যা লিখছি এর ব্যাখ্যা জানি আর না-ই জানি, তা ব্যাখ্যা করার দরকার হয় না বলে অজ্ঞদের জন্য টুইট খুবই কাজের জিনিস। না, আমি এটা বলছি না যে- যারা টুইট করেন তারা সব অজ্ঞ। তবে বলছি, অজ্ঞদের টুইট লেখার বিশেষ সুযোগ আছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিউক্লিয়ার বা পারমাণবিক যুদ্ধের অস্ত্র বিষয়ে একটি টুইট লিখেছেন এভাবেঃ “The United States must greatly strengthen and expand its nuclear capability until such time as the world comes to its senses regarding nukes”। এখান থেকে আমার অনুমান অচিরেই হয়ত বেইজ্জতি এড়াতে ট্রাম্পকে টুইট লেখা বন্ধ করে দিতে হবে। কেন?
টুইটের বক্তব্য বাংলা করে লিখলে হবে, “আমেরিকাকে অবশ্যই বেশ বিশাল করে তার নিউক্লিয়ার সক্ষমতা শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করা উচিত, ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ না দুনিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কে হুঁশ আসে।” – এই ছিল বিদ্যাধর ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইট – ১৪০ অক্ষর।
অনুবাদ লেখকের; যারা মূল খবরের উৎস থেকে পড়তে চান তারা দুই দিন আগে ২২ ডিসেম্বরের রয়টার নিউজ এজেন্সির রিপোর্ট দেখে নিতে পারেন। ট্রাম্পের টুইটের কয়েক ঘণ্টা পরই ওই রিপোর্ট লিখে প্রকাশিত হয়েছিল।

সময়ের বিচারে দুনিয়ায় পারমাণবিক অস্ত্রের ইতিহাস বা আয়ু খুবই স্বল্প। যুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে দুনিয়াতে এর প্রথম জোড়া ব্যবহারটাই শেষ ব্যবহার হয়েছিল। আর স্বল্প তিন দিনের গ্যাপে এই জোড়া ব্যবহার, দুটোই ঘটেছিল জাপানের ওপর; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট আমেরিকার হাতে এই তিন দিনের ব্যবধানে। তাও সেটা ওই যুদ্ধে শত্রু জাপানের বিরুদ্ধে আমেরিকার জয়-পরাজয় নির্ধারণের জন্য নয়, বরং জয় নিশ্চিত হয়ে গেলে পরেও, এ সুযোগে বোমা ব্যবহারের পরীক্ষা করে এর পরিণতি জেনে রাখার জন্য করা হয়েছিল। আর তাতেই – এর মারাত্মক ভয়াবহতা যা বোঝাবুঝি তা শেষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের চতুর্থ টার্মের ভাইস-প্রেসিডেন্ট ছিলেন হ্যারি ট্রুম্যান। ১৯৪৫ সালের জানুয়ারি মাসে চতুর্থবার প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়ার কয়েক মাসের মধ্যে, ১২ এপ্রিল ১৯৪৫ রুজভেল্টের স্বাভাবিক মৃত্যু হলে পরে ওই দিন থেকে ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান ৩৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। আর এর প্রায় চার মাসের মাথায় ঐ ৬ আগস্ট ও ৯ আগস্ট ১৯৪৫ ট্রুম্যান জাপানের ওপর পারমাণবিক বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত দেন এবং তা পালিত হয়।

কিন্তু এরপরই হ্যারি ট্রুম্যান মূলত এই বোমা ব্যবহারের বিরোধী হয়ে যান। যদিও কোরিয়া যুদ্ধে (১৯৫০-৫৩) আমেরিকার জড়িয়ে যাওয়ার পটভূমিতে ১৯৫০ সালের ৩০ নভেম্বর এক সাংবাদিক সম্মেলনে প্রশ্নের মুখে তাকে স্বীকার করতে হয় যে ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি পারমাণবিক বোমা ব্যবহারের জন্য তৈরি’। কিন্তু পরের বাক্য যোগ করে তিনি বলেন, ‘এই অস্ত্র দ্বিতীয়বার তিনি ব্যবহার করতে চান না’। এটাকে ‘এক ভয়ঙ্কর অস্ত্র’, এটা ‘কারো ব্যবহার করা উচিত না’ বলে কথা শেষ করেন। আর ১৯৫৩ সালে ১৫ জানুয়ারি (তিনি দুই টার্মে প্রেসিডেন্ট ছিলেন) কংগ্রেস বা আমেরিকান সংসদে তার বিদায় ভাষণে যিশুর নামে কসম কেটে তাকে কৃতকর্মের পক্ষে সাফাই-মূলক প্রচুর কথা খরচ করতে হয়। কেন তিনি পারমাণবিক বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন এর একটি দুর্বল সাফাই তার ছিল। যেমন- “তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকানোর জন্য” নাকি তাকে এটা করতে হয়েছিল। এ ছাড়া আর এক দুর্বল সাফাই ছিল তাঁর যে, ইতোমধ্যে আমেরিকার বোমা ফেলার আট বছর পার হয়ে গেছে ইতোমধ্যে অন্যান্য রাষ্ট্রও (ব্রিটেন ১৯৫২, সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৪৯) এমন বোমার অধিকারী হয়ে গেছে। অর্থাৎ তিনি আর একা দোষী নন যেন এটাই বুঝে নিতে বলছিলেন। আর সেই সাথে তিনি বুঝেছিলেন তার সাফাই যথেষ্ট নয়। আর তাই প্রকারান্তরে তা স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘স্টার্টিং আ অ্যাটমিক ওয়ার ইজ টোটালি আনথিঙ্কেবল ফর এ র‌্যাশনাল ম্যান’। বাংলা বললে, ‘যুক্তিবুদ্ধিতে চলা মানুষের পক্ষে একটা পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু করা অচিন্তনীয়’। মডার্ন যুগ মানে, আধুনিক রাষ্ট্র-কায়েমের কালে আধুনিক দুনিয়ায় পশ্চিমের পৌঁছানোর পর থেকে, সেই সমাজের মাপকাঠিতে ‘র‌্যাশনাল’ মানুষ মানে আল্লাহর ভয় থাকুক আর না-ই থাকুক কিন্তু ‘সর্বোচ্চ যুক্তিবুদ্ধিতে হুঁশজ্ঞানওয়ালা মানুষ’ মনে করা হয় যাকে।
পরবর্তীকালে ১৯৬০ সালের মধ্যে চীন আর ফ্রান্সসহ আমেরিকা, ব্রিটেন আর সোভিয়েত ইউনিয়ন এই মোট পাঁচ রাষ্ট্র পারমাণবিক বোমার অধিকারী হয়ে যায়। যদিও ট্রুম্যান সেই ১৯৪৬ সাল থেকেই জাতিসঙ্ঘের অধীনে এই অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিষিদ্ধ করার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু অন্য চার রাষ্ট্র বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে বিশ্বাস করেনি। করার কারণও ছিল না। কারণ ট্রুম্যানের প্রস্তাবের মূল সমস্যা ছিল, তিনি এমন প্রস্তাব দিচ্ছেন যখন ইতোমধ্যে আমেরিকা বোমা প্রস্তুত ও ব্যবহারকারী এবং সব টেকনিক্যাল ও ব্যবহারিক ডাটা একমাত্র নিজ রাষ্ট্রের হেফাজতে। ফলে তিনি সব রাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়েই আছেন। মানে সে বাদে ওই পাঁচ রাষ্ট্র একেবারে বোমা হাসিল করে আমেরিকার সমান হওয়ার আগে এই বোমা নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণের পথ ধরা সঠিক মনে করার কোনো কারণ নেই। ইতিহাসে পাওয়া যায়, এ দিকটাও ট্রুম্যান প্রশাসনের মন্ত্রী-উপদেষ্টারা চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু তারা নিজেরাই বিভক্ত হয়ে পড়েন এভাবে যে, একদল সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে এই টেকনোলজির সব কিছু শেয়ার করার পক্ষে ছিল। অন্য পক্ষ মনে করে- সব কিছু শেয়ার করার পর এই বোমা নিষিদ্ধ করার প্রস্তাবে সোভিয়েতরা যদি উল্টে যায়, আমেরিকা যদি প্রতারিত হয় তাহলে কী হবে? সারকথায় বিশ্বাসের অভাব ছিল মারাত্মক। এ ছাড়া প্রত্যেকে বোমা হাতে পেলেই (মানে আসলে টেকনোলজি করায়ত্ত হওয়া) একমাত্র আমেরিকার সমান হবে এই ভাবনার কারণে বোমার নিয়ন্ত্রণ বা নিষিদ্ধ করার জন্য সমঝোতা হয়নি।
কিন্তু তবু প্রস্তাব চালাচালি অব্যাহত ছিল। যেমন ট্রুম্যানের পরের প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ারও ১৯৫৩ সালের সাধারণ পরিষদের বক্তৃতায় প্রস্তাব রেখেছিলেন। ১৯৫৪ সালে লিখিত প্রস্তাবও রেখেছিলেন। তবে দুনিয়াব্যাপী পারমাণবিক বোমাবিরোধী মনোভাব বাড়ছিল। এটা ধরা পড়ে ১৯৫৮ সালে সারা দুনিয়ার ১০ হাজার বিজ্ঞানী একসাথে স্বাক্ষর করে জাতিসঙ্ঘের সেক্রেটারির দৃষ্টি আকর্ষণ করে এক আবেদন পাঠিয়েছিলেন। তবে ১৯৪৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন নিজেই বোমার অধিকারী হয়ে যাওয়াতে আর অনেক নিগোসিয়েশনের পর ১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে প্রথম জাতিসঙ্ঘের অধীনে বোমা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান ‘আন্তর্জাতিক অ্যাটমিক এনার্জি কমিশন’ গঠিত হয়। এরপরও প্রায় ১০ বছর পরে ১৯৫৮ সালে প্রথম সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা পারমাণবিক বোমাবিরোধী আন্তর্জাতিক সমঝোতা চুক্তি এনপিটি বা নন প্রোলিফারেশন ট্রিটি তে স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুসারে এটা ২৫ বছর পরে রিভিউ হওয়ার কথা ছিল। ১৯৯৫ সালে এটা আবার রিভিউ হয়ে নতুন করে গৃহীত হয়। এবং সংযোজিত আর এক নতুন চুক্তিতে আরো পোক্ত হয়। এবার শুধু বোমা বানানো নয়, পারমাণবিক বোমা পাওয়ার লক্ষ্যে ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বোমা বানিয়ে বাস্তবে টেস্ট করাও নিষিদ্ধ করার চুক্তি ‘সিটিবিটি’ নতুন সংযোজন হিসেবে এবার এটাও স্বাক্ষরিত হয়। অবশ্য ১৯৯১-৯২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়া ও কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি এ ক্ষেত্রে এসব চুক্তি করতে পরিবেশ তৈরিতে সহায়তা করেছিল। ওদিকে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বাইরে বোমা বানানোতে নিজে স্বীকৃত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভারত পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া যুক্ত হয়েছে। ভারত ১৯৭৪ সালে, পাকিস্তান ১৯৯৮ সালে সফল পরীক্ষাকারীর দলভুক্ত হয়। গত ১৯৯৮ সালে ভারত নতুন করে বোমা বানিয়ে সফল পরীক্ষা করার পর ক্লিনটনের আমেরিকা ভারতের ওপর অবরোধ আরোপ করেছিল। একইভাবে পাকিস্তানের ওপরও। কিন্তু এখনো এনপিটিতে স্বাক্ষর না করা রাষ্ট্র হিসেবে ভারত-পাকিস্তান ও উত্তর কোরিয়া বহাল আছে। যদিও এই টেকনোলজি ও ম্যাটেরিয়াল পাওয়ার ক্ষেত্রে সরবরাহকারী রাষ্ট্রগুলোর ক্লাব নিউক্লিয়ার সাপ্লাই গ্রুপ (বা এনএসজির) সভায় ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে তাদের শর্ত আরো কঠিন হয়ে আছে।
সারসংক্ষেপে এটাই পারমাণবিক বোমার জন্ম ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ ইতিহাস। বললাম কেন? বললাম এ জন্য যে ট্রাম্প এক টুইট করে এই ৬৬ বছরের ইতিহাস মুছে ফেলে আবার যেন ১৯৫০ সালে আমেরিকায় ফেরত যেতে চান, তা-ই বলছেন। তিনি আমেরিকার নিউক্লিয়ার সক্ষমতা শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করা দরকারের কথা অবলীলায় মাত্র ১৪০ অক্ষরের মধ্যে খুবই সহজে সেরে ফেলেছেন। এটা তাদের দ্বারাই সম্ভব, যারা পারমাণবিক বোমার জন্ম ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা পৌঁছানোর ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ। কারণ অজ্ঞদের সুবিধা সবার চেয়ে বেশি। আমরা কল্পনা করতে পারি, এক খোশমেজাজি পার্টির কথা, যেখানে রাজনীতিবিদ বন্ধুদের সাথে সহপাঠী ব্যবসায়ী বন্ধুদের অনেক দিন পরে দেখা হয়েছে। তো ব্যবসায়ী বন্ধুরা যেভাবে সহজেই সরকার চালানো বন্ধুদের বিভিন্ন ইস্যুতে সবক দিয়ে থাকে তেমনই আর কী! যেন বলছে ও তোরা ওমুক জিনিসটা কন্ট্রোল করতে পারলি না? আমাকে একবার প্রধানমন্ত্রী বানিয়ে দে, দেখো আমি দুই দিনে করে সব ঠিক করে দেখাচ্ছি!
এমন কথা আমরা অনেকেই বলতে শুনেছি ও দেখেছি। অন্তত ‘এক দিনের মুখ্যমন্ত্রী’ এই কল্পনায় তৈরি হিন্দি সিনেমা ‘নায়ক’ দেখেছেন অনেকেই। তখন একজন ট্রাম্প হওয়া সহজেই সম্ভব। কিন্তু যেসব ইস্যু দুনিয়ার রাষ্ট্রস্বার্থগুলোর নানা লড়াই-ঝগড়া আর আপসের ফলাফলে সবসময় নির্মিত হয়ে চলে এগুলো নিয়ে তুড়ি বাজিয়ে পার্টিতে সমাধান বাতলানো তখনই সম্ভব, যখন আমরা ইতিহাসের ঘটনাবলি সম্পর্কে বেখবর থাকি। কারণ অজ্ঞতা এক বিশাল বাড়তি সুবিধা দেয়। কিন্তু ব্যবসায়ী ট্রাম্প যে এখন আর কোনো পার্টির চাপাবাজ নন, বাস্তবেই তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট? তাহলে এখন কী হবে?
ওপরে যে পারমাণবিক বোমার ধারাবাহিকতা আমরা দেখেছি তা আসলে এ বোমার উদ্ভব, তৈরি, ব্যবহার এবং পরিণতিতে এর ভয়াবহতা বোঝার পর সেই ১৯৪৫ সাল থেকে এ টেকনোলজিকে নিয়ন্ত্রণ এবং পরে সম্পূর্ণ বন্ধের দিকে গেছে। এখন এ গ্রাফের ঝোঁক হলো এ টেকনোলজি লুপ্ত করে ফেলা। এটা এ ইতিহাস দেখে যে কারো বোঝার কথা। আমেরিকার মতো দেশের যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন তার কী এতটুকু আক্কেলজ্ঞান নেই, যে টেকনোলজি গ্লোবাল ঝোঁক লুপ্তপ্রায়ের দিকে তাকে আবার জাগাতে চাওয়াটা কী সম্ভব, না করা উচিত? যেখানে এমনকি এ টেকনোলজির বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারও জার্মানি ও জাপানের মতো দেশ ২০২৫ সালের পর সম্পূর্ণ বন্ধ করার পরিকল্পনা করে ফেলেছে সেখানে এ টেকনোলজির ‘সক্ষমতা শক্তিশালী ও বৃদ্ধি করা উচিত’ এ কথা কী করে একজন হবু প্রেসিডেন্ট বলেন?
প্রেসিডেন্টের মুখ ও লিখিত নির্দেশ কোনো (পার্টির চাপাবাজি ধরনের) বেফাঁস কথা বলে বিপর্যয়ে পড়া নিয়ন্ত্রণ করা খুব সহজ। কারণ প্রেসিডেন্টকে সাহায্য করতে প্রত্যেক বিষয়ে অজস্র মন্ত্রী-উপদেষ্টা এক্সপার্ট নিয়োগ দেয়া থাকে। তাদের ব্রিফিং সব নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে। কিন্তু টুইট করা? প্রেসিডেন্ট উপদেষ্টার পরামর্শ নিয়ে টুইট করবেন? না এটা খুবই হাস্যকর। কিন্তু কী আর করা। রয়টার জানাচ্ছে, এখনই ট্রাম্পের নিয়োজিত এক মুখপাত্র আছে। যাকে নিয়মিত মিডিয়ার চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। কারণ বোকা বোকা টুইট লিখে ট্রাম্প যেন খুব মজা উপভোগ করেন। মজার খেলা একটা তিনি পেয়েছেন আর ওদিকে মুখপাত্রের প্রাণ যায়। রয়টার্স বলছে, ওই মুখপাত্র নানাভাবে ট্রাম্পের টুইট খেলাকে গুরুগম্ভীর দিকে অর্থ টানার কসরত করেই চলছেন। তিনি এবার বলেছেন, ট্রাম্পের ওই টুইটকে যেন ‘এ বিষয়ে আমেরিকার কোনো নতুন পলিসি বদল হিসেবে কেউ না দেখে, প্লিজ’। আচ্ছা এ কথাটাই কী ট্রাম্প মজা করা এক বালক মাত্র, তাই বলছেন না?
এখন একটাই পথ বাকি আছে। ট্রাম্প যদি টুইট করা বন্ধ না করেন, তবে শপথ নেয়ার পরের কয়েক মাসের মধ্যে তিনি ইজ্জত নিয়ে টানাটানির মুখোমুখি হবেন, সম্ভবত।
ওদিকে ট্রাম্পের এ টুইটের বক্তব্য স্ববিরোধী। তিনি বলছেন, একালে আমেরিকার আসল শত্রু ‘টেররিজম’। ফলে কোল্ড ওয়ারে শত্রুতা সোভিয়েতের কথা ভেবে এখনো ন্যাটো টিকিয়ে রাখা অপ্রয়োজনীয়। এ ছাড়া জার্মানিতে বা জাপানের মতো যেখানে এখনো আমেরিকান মিলিটারি ব্যারাক আছে, তাদের খরচ নিজ নিজ রাষ্ট্র বহন করুক। তাহলে সেই ট্রাম্প আবার পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জা বাড়ানোর পক্ষে কথা বলেন কী করে? পোলাপান কখন কী করলে সে যে মজা পায়, সে নিজেও জানে না! তাই কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ২৫ ডিসেম্বর অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার এডিট করে আবার ছাপা হল।]

Advertisements

ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত

ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত

গৌতম দাস

২১ ডিসেম্বর ২০১৬ বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2aC

 

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী মাসে ২০ জানুয়ারি পরবর্তি চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। এই চার বছর পৃথিবীর ইতিহাস রুটিন ইতিহাস না হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। বরং মনে হচ্ছে, বিরাট উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলিতে পরিপূর্ণ হতে চলেছে। সে সম্ভাবনা এতই প্রবলতর হচ্ছে যে, যদি না মাঝপথে প্রেসিডেন্টকে ইমপিচের মতো কোনো ঘটনাতে সব কিছু থামিয়ে পথ বদলে যায়, তবে আমাদের পরিচিত দুনিয়া ও দুনিয়ার পরিবর্তন যেভাবে ও ধাপে ঘটে বলে আমাদের ধারণা বা অনুমান আছে, তা এবার ভেঙে যাবে। দুনিয়া অপরিচিত হয়ে উঠবে। এসব সম্ভাবনা বাড়ছে তো বাড়ছেই। ট্রাম্পের উত্থানের ফলে এমন উদাহরণ ও প্রমাণ হিসেবে অনেক ঘটনাই উল্লেখ করা যায়। আজ এখানে তেমনই এক বিষয় বা ইস্যু –  ট্রাম্প ও তাইওয়ানের চলতি প্রেসিডেন্টের (Tsai Ing-wen) ফোনালাপ নিয়ে আলোচনা করব। Continue reading “ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত”

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

কিসিঞ্জারের চোখে ট্রাম্প কেমন

গৌতম দাস

২৯ নভেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-29P

ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হয়েছেন প্রায় তিন সপ্তাহ হতে চলেছে। ইতোমধ্যে তিনি তাঁর প্রশাসন কাদের নিয়ে সাজাবেন এর ঝাড়াই-বাছাইয়ের ব্যস্ততার মধ্যে আছেন। সেই নেয়া আর না-নেয়া নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এবং নানান জল্পনা-কল্পনাও চলছে। রিপাবলিকান দলের কোন অংশ ও কারা ট্রাম্পের সঙ্গী হচ্ছেন, কেন হচ্ছেন তা নিয়েও মিডিয়ায় জল্পনা-কল্পনা্র অন্ত নাই। ইতোমধ্যে গত ২২ নভেম্বর ট্রাম্প তাঁর ক্ষমতার শপথ নিবার পরের প্রথম ১০০ দিনে করণীয় কাজ কী হবে এর তালিকা প্রকাশ করেছেন। এটাকে বলা যেতে পারে প্রথম বাস্তব প্রতিশ্রুতি; আর সেটা এই অর্থে যে, আগে যা কিছু তিনি বলেছিলেন, সেগুলো ভোট পাওয়ার আগে দেয়া প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি সাধারণত বাড়িয়ে কথা বলার ফুলঝুরিতে ভরপুর থাকে। আবার বাস্তব প্রতিশ্রুতি যেগুলোকে বলছি, এর মানে এই নয় যে, এগুলো অবশ্যই ভালো ফল বয়ে আনবে বা ট্রাম্প এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারবেনই। মূলত বাস্তব প্রতিশ্রুতি বলতে আমরা বুঝব, নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পর আগের দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো সংশোধন করে নেয়ার একটা সুযোগ পাওয়া এবং নেওয়া। ট্রাম্প সেটাই নিচ্ছেন। এর কতটুকু তিনি কাজে লাগানোর সুযোগ নিচ্ছেন, সেটাই দেখার বিষয়।

কয়েকটি মিডিয়া এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছে উলটা করে, কী কী নাই তা নিয়ে। অর্থাৎ নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির কী কী প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় নাই। যেমন- ২২ নভেম্বর ২০১৬ সিএনএন২২ নভেম্বর ২০১৬ বিজনেস ইনসাইডার রিপোর্ট করেছে, ওবামা প্রশাসনের করা বিখ্যাত স্বাস্থ্যসেবা আইন (অ্যাফোর্ডেবল হেলথ অ্যাক্ট) বিষয়টি নিয়ে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বলেছিলেন এই আইন তিনি বাতিল করবেন। কিন্তু এই আইন বাতিল করা অথবা এর কোন সংশোধনী আনা – কোনটাই প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নাই। অবশ্য নির্বাচনে জিতে যাওয়ার পরের দিন ওবামার সাথে ঝাকুনি-বিহীন ক্ষমতা হস্তান্তরের লক্ষ্যে আলাপ করে ফিরে এসেই ট্রাম্প জানিয়ে দিয়েছিলেন, এই আইন সম্ভবত তিনি বাতিল করছেন না, তবে কিছু সংশোধনী আনবেন। যদিও আমরা এমন বলতে পারি না যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় এ ইস্যুটি নেই মানে, ১০০ দিন পরে এটা আসবে না তা-ও নয়।
এবার দ্বিতীয় যে বিষয়টি ১০০ দিনের তালিকায় নাই তা হল, আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে দেয়াল তুলে দেয়া প্রসঙ্গ। বলা হয়েছিল, ড্রাগ পাচারকারী বা অবৈধ অভিবাসীর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য সীমান্তে দেয়াল তুলে বাধা দেয়া হবে।
এ ছাড়া আরেকটি বহুল বিতর্কিত বিষয়, আমেরিকায় মুসলমানদের প্রবেশ ঠেকানো বা মুসলমানদের নাম রেজিস্ট্রি করা। এ বিষয়েও কোনো উল্লেখ ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় নেই।
তবে ১০০ দিনের করণীয় তালিকায় যা আছে, তা হল টিপিপি (বা ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপ) –  এই মুক্তবাণিজ্য জোট থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার। আর এটা আছে একেবারে এক নাম্বারে। টিপিপি আসলে ইচ্ছা করে চীনকে বাইরে রেখে আমেরিকাসহ ১২টি প্রশান্ত মহাসাগরীয় রাষ্ট্রের মধ্যকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি। ট্রাম্পের দাবি, এই চুক্তি আমেরিকার জনগণের কাজের সংস্থান সীমিত বা নষ্ট করবে; তাই তিনি এটা বাতিলের পক্ষে। ওবামার এই উদ্যোগে মার্কিন কংগ্রেস এখনও অনুমোদন দেয়া শেষ করে নাই। বলেছিল ট্রাম্প বা নতুন প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত আসা পর্যন্ত স্থগিত করে রেখেছিল। আর এখন  ১০০ দিনের করণীয়তে ট্রাম্পের এই ঘোষণায় জাপান ইতোমধ্যে হতাশ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছে, “আমেরিকা না থাকলে আর টিপিপি করার কোনো অর্থ নেই”। (TPP ‘has no meaning’ without US, says Shinzo Abe)। বিশ্ববাণিজ্যের ৪০ শতাংশ বাণিজ্য এই টিপিপি রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে। ট্রাম্প ইতোমধ্যে প্রথম ১০০ দিনের করণীয়ের তালিকায় জানিয়েছেন, টিপিপি থেকে তিনি আমেরিকার নাম প্রত্যাহারের জন্য নোটিশ পাঠাবেন। এ থেকে স্পষ্ট যে, তিনি সত্যি সত্যিই গ্লোবালাইজেশনের বিরুদ্ধে এবং প্রটেকশনিস্ট বা সংরক্ষণবাদী অর্থনীতির পথে হাঁটার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। টিপিপি থেকে নাম প্রত্যাহারকে কেন ট্রাম্পের গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী অবস্থান বলে অর্থ করছি? সেটা আমার নিজের বরাতে বলার চেয়ে আমেরিকা, চীন ও জাপান এর নেতাদের বরাতে বলা যাক। ট্রাম্পের বিজয়ের পরে পরেই অনুষ্ঠিত প্রথম এক বাণিজ্য জোটে এপেক (APEC, Asia-Pacific Economic Cooperation) গত ২০ নভেম্বর ২০১৬ পেরুর রাজধানী লিমাতে আগেই নির্ধারিত এবছরের শীর্ষ বৈঠকে মিলিতে হয়েছিল। আমেরিকা, চীন ও জাপান সহ অন্যান্যরা এপেকের সদস্য এবং এই তিন রাষ্ট্র প্রধান ঐ সভায় উপস্থিত ছিলেন, তাঁদের বরাতে মানে এপেকের বরাতে কথা বলব। ট্রাম্পের বিজয়ে তাঁর হবু প্রশাসনের টিপিপি বা নাফটা (NAFTA, North American Free Trade Agreement) থেকে বের হয়ে আসার ঘোষণা-অবস্থান জানান। এই অবস্থানকে এপেকের নেতারাই সবার আগে এটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের “এন্টি-গ্লোবালাইজেশন অবস্থান” ফলে এটা তাঁর সংরক্ষণবাদী (Protectionist) অবস্থান – এভাবেই চিহ্নিত করেছেন। ট্রাম্পের অবস্থানে এই তিন নেতা এতই বিপদ দেখেছেন যে এপেকের সভায় শেষ দিনে গৃহীত এক ঘোষণা-প্রস্তাব পাস করেছেন। তাহল এরকম, “আমরা আমাদের বাজার খুলে রাখা এবং সব ধরণের প্রটেকশনিজমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পক্ষে আমাদের প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছি”। (We reaffirm our commitment to keep our markets open and to fight against all forms of protectionism -Members’ closing declaration)

এখানে বলে রাখা ভাল আমার আগের লেখায় বলেছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে আমেরিকা গ্লোবাল অর্থনীতির নেতৃত্ব নিজের হাতে নিতে পেরেছিল। আর আগের সীমিত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯) পর থেকে পরের ২৫ বছর প্রায় পুরাপুরি স্থবির হয়ে ছিল। আমেরিকা সেই স্থবিরতাই শুধু কাটায় নাই বরং  আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চালু হতে পুর্বশর্ত  আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসাবে সর্ব-সম্মতিতে সেকালের একমাত্র যোগ্য ডলারকে কেন্দ্র করে নতুন বাণিজ্য ব্যবস্থা সাজায়। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই নতুন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করা আর এর ভিতর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা চালু করতে ১৯৪৪ সালে গঠন করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ (IMF)। এরপর (১৯৪৫-১৯৭৩) এই সময়কালটাকে বলা যায় যুদ্ধপরবর্তি ইউরোপের পুনর্গঠন আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থা গেড়ে বসার কাল। ১৯৭৩ সালে আইএমএফ আবার পুনর্গঠন করা হয়। এরপর থেকেই প্রত্যেক রাষ্ট্র নিজ নিজ আভ্যন্তরীণ বাজার বিদেশের পণ্যের প্রবেশ থেকে বাধা দিয়ে রাখার সংরক্ষণবাদী বা প্রটেকশনিষ্ট অবস্থান যেটা দুনিয়ায় ক্যাপিটালিজমের শুরু থেকেই সবাই অনুসরণ করত, তা ভেঙ্গে “গ্লোবালাইজেশন” এর পথে চলা করেছিল গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম। আস্তে আস্তে গ্লোবালাইজেশন মূল ধারা হয়ে যায়। ভিন্ন ভাষায় এটাই “এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকনমি” বা রপ্তানী অভিমুখি করে অর্থনীতি সাজানোর যুগ। বাজার আগলে রাখার প্রটেকশনিষ্ট অবস্থানের সাথে তুলনায় এই নতুন পথে ভাল এবং মন্দ দুটা দিকই আছে। আবার ভাল-মন্দ সেটা যাই থাক করণীয় অপশন হিসাবে কী কী পথ খোলা আছে এর মধ্যে কম-খারাপটা বেছে নেয়া অর্থে গ্লোবালাইজেশন অবশ্যই ভাল অপশন। কারণ আমাদের মত রাষ্ট্রের সাথে অসম বাণিজ্য আছে এবং তা এমনি এমনি চলে যাবে না। মাথাব্যাথার জন্য মাথা কেটে ফেলা যেমন কোন সমাধান বা অপশন নয় তেমনি। বাংলাদেশে এটা শুরু হয় মোটা দাগে বললে আশির দশকের শুরু থেকে, বিশেষ করে এরশাদের ক্ষমতা নিবার পর থেকে। সংরক্ষণবাদী হয়ে এক পাট-রপ্তানিতে আর আকড়ে না থেকে তৈরি পোষাক বা চামড়া ইত্যাদিতে ধরে ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে প্রবেশ – এই হল ফেনোমেনাটা। আর বটম লাইন হল, অন্যের বাজারে প্রবেশ করতে গেলে অন্যকেও নিজের বাজারে প্রবেশ করতে দিতে হবে। তবে অসম ক্ষমতা, অসম বাণিজ্য সম্পর্কের কারণে সেটা অন্যকে বেশি দেয়া হয়ে যায়। কিন্ত সে জন্য কোন বাণিজ্য লেনদেনেই যাওয়া যাবে না এটাই মাথাব্যাথায় মাথাকাটার তত্ত্ব হয়ে যাবে। তবে মজার কথা হল,  সেই আমেরিকা এখন একালে ট্রাম্পের হাতে পরে মুক্তবাণিজ্য থেকে পালাইতে চাইতেছে।

দুইঃ
হেনরি কিসিঞ্জারের নাম বাংলাদেশে নানা কারণে পরিচিত। আমেরিকার অন্ত্যত দুজন প্রেসিডেন্টের সাবেক বহুলালোচিত পররাষ্ট্র সেক্রেটারি এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন এবং আমেরিকান ফরেন সার্ভিসের অনেক আমলার তাত্ত্বিক গুরু তিনি। এখন বয়স প্রায় ৯৩ বছর, তবুও সক্রিয় কাজকর্ম করেন; ডিকটেশন দিয়ে বই ছাপান। বৈদেশিক নীতি ও তত্ত্ব দিয়ে বেড়ান এখনো। বর্তমানে “কিসিঞ্জার অ্যাসোসিয়েটস” নামে এক কনসাল্টিং ফার্ম বা পরামর্শদাতা কোম্পানি চালাচ্ছেন। বিগত আশির দশকের পর থেকে সব প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সাক্ষাৎ করে তাদেরকে নিজের পরামর্শ দিয়েছেন। সেই কিসিঞ্জার ট্রাম্পের সাথেও দেখা করেছেন গত ২০ নভেম্বর।
অভ্যন্তরীণভাবে, আমেরিকাতেও ট্রাম্পকে নিয়ে বিতর্কও কম নয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিবেশ রক্ষার (এনভায়রণমেন্ট-বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো সহ) সম্মেলনে আমেরিকার দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো থেকে ট্রাম্প সরে আসতে চান, একারণে। কারণ তিনি এগুলো সব ‘চীনাদের ভুয়া প্রচার’ বলে দাবিতে উড়িয়ে দিতে চান। শুধু তাই নয়, প্রথম ১০০ দিনের করণীয় তালিকার দ্বিতীয় নম্বরে আছে ওবামা প্রশাসনের দেয়া – নানান প্রতিশ্রুতি ও চুক্তিতে সম্মতি দিয়েছিলেন – ট্রাম্প সেসব জায়গা থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করতে চান। এছাড়া ওবামা জ্বালানিবিষয়ক যেসব বিধিনিষেধ মেনে নিয়েছিল, গ্রিন হাউজ গ্যাস ২০৩০ সালের মধ্যে ৩২ শতাংশ কমিয়ে আনবেন বলে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন; ট্রাম্প সেসব থেকে বেরিয়ে আগের জায়গায় ফিরে যেতে চান। ট্রাম্পের যুক্তি হল, জ্বালানি উৎপাদনে এসব বিধিনিষেধ আরোপের কারণে আমেরিকান জনগণ চাকরি হারিয়েছে। এগুলো ‘জব-কিলিং’ বাধানিষেধ। অর্থাৎ ট্রাম্প বলতে চাইছেন, পরিবেশের চরম ক্ষতি করে হলেও নোংরা জ্বালানি উৎপাদন-সংশ্লিষ্ট চাকরিগুলা চালু রাখতে হবে। তিনি সস্তা জনপ্রিয়তার পথে হাঁটাকে প্রাধান্য দিয়ে চলতে চাইছেন।
এমন পরিস্থিতিতে কিসিঞ্জার ট্রাম্পকে নিয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন, অন্তত দুটা সাক্ষাতকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি কী বলেছেন, ট্রাম্পকেইবা কী পরামর্শ দিলেন আর আমাদেরই বা ট্রাম্প সম্পর্কে তাঁর কী মূল্যায়নের কথা জানাতে চান; এটা জানতে দেশে-বিদেশে আগ্রহ আছে। কিসিঞ্জার ট্রাম্পের কাছে গিয়ে দেখা করার পর সোজা চলে যান সিএনএনের অফিসে ফরিদ জাকারিয়ার কাছে; যেখানে তিনি এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন।
সাধারণভাবে বললে, কিসিঞ্জার ট্রাম্প সম্পর্কে সহানুভূতির সাথে কথা বলেছেন। কেমন ট্রাম্পকে তিনি দেখলেন প্রথমেই এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলছেন, “এমন ট্রাম্পকে তিনি দেখে এলেন যে নানা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দেয়ার অবস্থা থেকে বের হয়ে আমেরিকাকে নেতৃত্ব দিতে বাস্তব সবচেয়ে ভালো নীতি-পলিসির কৌশল বা স্ট্র্যাটেজি কী হতে পারে, তিনি তা হাতড়াচ্ছেন। এমন মধ্যবর্তী স্থানে ট্রাম্পকে আমি দেখে এলাম”। এরপর ট্রাম্পের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলছেন, তার দেখা প্রেসিডেন্টদের মধ্যে ট্রাম্প “সবচেয়ে ইউনিক বা অনন্য”। কারণ ট্রাম্প আগে কখনো কোনো স্তরেরই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। সেজন্য তিনি সমাজের চেনা কোনো গোষ্ঠী প্রতিনিধি নন, তার পছন্দের নীতি-পলিসি সম্পর্কেও কোনো আগাম ধারণা-অনুমান বেশির ভাগেরই নেই। ফলে তিনি পুরনো কোনো দায়ভারহীন অথবা চিহ্নবিহীন। কিসিঞ্জার আরও বলেছেন, ট্রাম্পের কোনো ‘ব্যাগেজ নেই’। তা বটে; কথা সত্য। কিন্তু জাকারিয়া এবার চীন প্রসঙ্গে ট্রাম্পের রক্ষণশীল অবস্থানের কথা তুললেন। কিন্তু কিসিঞ্জার তাতে সরাসরি ব্যক্তি ট্রাম্প সম্পর্কে বলা এড়িয়ে গেলেন। আর, গিয়ে এবার তত্ত্বের দিক দিয়ে জবাব দিলেন। তিনি এক তত্ব-কথায় জবাব দিলেন। বললেন, “গ্লোবালাইজেশনের ফলে এর ফলে কেউ লুজার বা হারু পার্টি আর কেউ উইনার বা জেতা পার্টি হয়ে তো হাজির হবেই। ফলে হারু পার্টি তখন নানাভাবে নিজেকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশ্যে আনবেন”।

কিসিঞ্জারের এমন জবাবের অর্থ কী? তিনি কী বলতে চাইছেন – ট্রাম্পের আমেরিকা গ্লোবালাইজেশন করতে গিয়ে ওর ফলাফলে এখন হারু পার্টি? তাই ট্রাম্পের হাত ধরে আমেরিকা এখন গ্লোবালাইজেশন-বিরোধী প্রটেকশনিস্ট অর্থনীতির ভূমিকায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাচ্ছে? আর সেজন্যই ট্রাম্পের এমন অবস্থানকে কিসিঞ্জার সহানুভুতির-সমর্থন দিচ্ছেন? তাই কি? এর জবাবে সম্ভবত বলা যায় – হ্যাঁ কিসিঞ্জার স্পষ্ট করে না বললেও এটাই, তার সহানুভূতি টাম্পের দিকে। আর প্রত্যক্ষভাবে না হলেও তত্ত্বের মাধ্যমে বলে তিনি স্বীকার করে নিচ্ছেন, আমেরিকা হারু পার্টি। এরপর তিনি এক গুরুতর কথা বলছেন। তিনি স্বগতোক্তি করে বলছেন, ‘ট্রাম্পকে ইতিবাচকভাবে লক্ষ্য খুঁজে নিতে আমাদের সুযোগ দেয়া উচিত।’

মাসিক ‘দ্য আটলান্টিক’ এর সাক্ষাতকার
আমেরিকার একটি মাসিক ম্যাগাজিনের নাম ‘দ্য আটলান্টিক’। সেই পত্রিকায় কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল আগে থেকেই। এক লম্বা আর বিভিন্ন সেশনে ভাগ করে, নতুন-পুরনো বহু ইস্যুতে কিসিঞ্জারের সাক্ষাৎকার নেয়া চলছিল। নির্বাচনের পরের দিন ১০ নভেম্বরে নেয়া সাক্ষাৎকারে চলতি ‘গরম বিষয়’ ট্রাম্পের বিজয় প্রসঙ্গ উঠে এসেছিল। ঐ সাক্ষাতকারে রিপাবলিকান হেনরি কিসিঞ্জার স্বীকার করেন যে তিনি মনে করেছিলেন নির্বাচনে ট্রাম্প নয়, হিলারিই বোধহয় জিতবেন। ওখানে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রশ্নেও কিসিঞ্জার একইভাবে ‘ট্রাম্পকে সুযোগ দেয়া উচিত’ বলেছেন। প্রচ্ছন্নভাবে স্বীকার করছেন আমেরিকা হারু পার্টি ইত্যাদি। যেমন দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ট্রাম্পের জেতার ফলে দুনিয়াকে আমেরিকার নেতৃত্ব দেয়ার ভূমিকা কী হবে বলে আপনি মনে করেন? কিসিঞ্জার বলেন, ‘আসলে, এই জেতাটা আমাদের বিদেশ নীতি আর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির মধ্যে সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করবে।’ [অর্থাৎ তিনি ‘সামঞ্জস্য নেই’ এটা ধরে নিয়ে কথাটা বলেছেন। পরের বাক্যেই তিনি সেটা স্পষ্ট করছেন। বলছেন, ‘আমেরিকার বৈদেশিক ভূমিকা সম্পর্কে আমাদের জনগণের ধারণা আর এলিটদের ধারণার মাঝে নিঃসন্দেহে গ্যাপ বা ফারাক আছে। আমার মনে হয়, নতুন প্রেসিডেন্ট আমাদের এই ফারাক ঘুচাতে সুযোগ নিতে পারেন। তিনি সুযোগ পাবেন; কিন্তু তা নিতে পারবেন কি না এটা তার ওপর নির্ভর করে।’
তৃতীয় প্রশ্নটি ছিল ট্রাম্পকে বেশ তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে। প্রশ্ন, ‘ট্রাম্পের যোগ্যতা, সক্ষমতা বা সিরিয়াসনেস সম্পর্কে কি আপনি আস্থা রাখেন?’ কিসিঞ্জার কিছুটা অথরিটির ভূমিকায় জোর দিয়ে জবাব দেন, ‘এ রকম তর্ক আমাদের বন্ধ করা উচিত। তিনি আমাদের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। তার শাসন-দর্শন (ফিলোসফি) তৈরি করার জন্য আমাদের অবশ্যই তাকে সুযোগ দিতে হবে।’
‘ট্রাম্প আমাদের প্রেসিডেন্ট’ এ কথা বলে আসলে কিসিঞ্জার ধমকালেন কেন? এ জন্য যে, ট্রাম্পকে নিয়ে হিলারি-শিবিরসহ তথাকথিত লিবারেলরা হাসি-মশকারা করে কথা বলে, যেটা প্রশ্নকর্তার (তিনি নিজেই ওই পত্রিকার সম্পাদক) প্রশ্নের মধ্যেও ছিল। কিসিঞ্জার যেন বুঝাতে চাইছেন, গ্লোবালাইজেশনের প্রতিযোগিতায় পড়ে আমেরিকা হারু পার্টি হয়ে গেছে- যেটা বুঝতে আমেরিকান পাবলিক আর এলিট পারসেপশনে ফারাক আছে। ফলে আপাতত ট্রাম্পকে মফস্বলের মনে হচ্ছে বটে, কিন্তু ট্রাম্প আসলে তা নন। উপায়ান্তর নেই বলে ট্রাম্প কিছুটা প্রটেকশনিস্ট হয়ে বিপদ কাটিয়ে আমেরিকাকে উঠে দাঁড় করাতে চাইছেন। এ দিকটা কিসিঞ্জার বুঝতে পারছেন বলেই ট্রাম্পকে নিয়ে হাসি-মশকারা তিনি কাউকে করতে দিতে রাজি নন। তাই কি? কিসিঞ্জার সাক্ষাৎকারে কথাগুলো এভাবে স্পষ্ট করে বলেননি, আকার-ইঙ্গিতে বলেছেন- এমন অনুমান করার সুযোগ আছে।
একটা সমান্তরাল উদাহরণ টেনে শেষ করব। অনেকের প্রটেকশনিস্ট বা রক্ষণশীল কথাটি বুঝতে অসুবিধা হতে পারে। অথচ ব্যাপারটা আমাদের কাছেরই। সত্তরের দশকে মোটাদাগে বললে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একমাত্র উপায় আমাদের ছিল পাট। এটা সেই প্রটেকশনিস্ট সময়। এর বিপরীতে, আশির দশকের শুরু থেকেই বিশেষ করে ১৯৮২ সাল থেকে আমরা গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশ করি। এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইকোনমি, অকস্মাৎ রফতানিমুখী নারী মেশিন, মাল্টিফাইবার এগ্রিমেন্ট, আমেরিকা-ইউরোপের দয়ায় তাদের বাজারে তৈরী পোশাকের প্রবেশাধিকার, বিনিময়ে নিজের বাজার পুরো খুলে দেয়া, বৈদেশিক বিনিয়োগ পাওয়া ইত্যাদি আমাদের গ্লোবালাইজেশনে প্রবেশের চিহ্ন। এ দুই দশার মধ্যে কোনটা আদর্শ বা ভালো, সে তুলনা করে বলা অপ্রয়োজনীয়। কারণ বিষয়টি হলো, যেসব অপশন আমাদের হাতে ছিল ও আছে, এমন অ্যাভেলেবল অপশনের মধ্যে তুল্য বিচার করা দরকার। এ বিচারে গ্লোবাইজেশনই ভালো। অবশ্য যে কারণে প্রশ্নটি তুলেছি, তাতে ভালো-মন্দ বিচার এখনকার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, গ্লোবালাইজেশনের ভেতরে একবার ঢুকে গেলে সে অর্থনীতি আর কি ফিরে প্রটেকশনিস্ট অবস্থানে যেতে পারে, সম্ভব? ব্যবহারিক বিবেচনার জায়গা থেকে আমরা সহজেই বুঝতে পারি, এটা অসম্ভব। গ্লোবালাইজেশনের সারকথা হলো- বিপুলভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে দুনিয়াব্যাপী বিনিয়োগ, পণ্য, টেকনোলজি, কাঁচামাল বাজার ইত্যাদির পারস্পরিক লেনদেন ও বিনিময়ে একবারে জড়িয়ে পড়া এবং তাতে অসাম্য থাকলেও জড়িয়ে যাওয়া; কিন্তু একবার এমন লেনদেন বিনিময়ে জড়িয়ে পড়লে তা থেকে আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া যায় না। অতএব প্রশ্নটা হল, ট্রাম্প আমেরিকাকে প্রটেকশনিষ্ট পথে নিয়ে যাবেন কীনা তা একেবারেই নয়, বরং একালে আমরা কী প্রটেকশনিষ্ট পথে আবার ফিরে যেতে পারব? সম্ভব? এককথায় অবশ্যই না।

তাহলে ট্রাম্প কেন প্রটেকশনিস্ট অবস্থান নিচ্ছেন বলে অন্তত দেখাচ্ছেন? তিনি বা তার পরামর্শকেরা নিশ্চয়ই এর অর্থ বোঝেন। কারণ প্রটেকশনিস্ট জায়গায় ফেরা আর সম্ভব নয়। তাহলে? আসলে প্রটেকশনিস্ট মনে হওয়া এটা আপতিক। সম্ভবত গ্লোবালাইজেশনের মধ্যেই থেকে, কিন্তু প্রটেকশনিস্ট হওয়ার ভাবভঙ্গি করে নতুন করে এক লেনদেন-বাণিজ্য ‘বেটার ডিল’ পেতে চাইছেন ট্রাম্প। কিসিঞ্জারের অনুমান, ট্রাম্প এতে সফল হতে পারেন এবং সেটাকে ওবামাসহ পুরনো আমেরিকান প্রশাসনগুলোর ধারাবাহিকতা বলে হাজির করাও সম্ভব। গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রথম ছয়-নয় মাসের পরে চীন-রাশিয়াও এতে আস্থা পাবে, এটাকে মানবে। কিসিঞ্জার এমনটিই মনে করেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ২৭ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও অনেক এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে প্রকাশিত হল।]

আমেরিকার উত্থান-পতনে অস্থিরতা

আমেরিকার উত্থান-পতনে অস্থিরতা
গৌতম দাস
২৬ নভেম্বর ২০১৬, শনিবার
http://wp.me/p1sCvy-26p

বড় এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন অস্থিরতা আবার এই প্রথম। সাম্প্রতিক নির্বাচনে অনেক উত্তেজনা ছড়ানোর পর আমেরিকা এক নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পেয়েছে, এ জন্যই কি অস্থিরতা? কিন্তু প্রেসিডেন্ট তো পেয়েই গেছে, তাহলে আর অস্থিরতা কেন? আসলে আমেরিকার নির্বাচনকে মাধ্যম করে অস্থিরতা এর ভেতর দিয়ে বাইরে প্রকাশ্যে এসেছে। তাহলে ভেতরের দিক, মানে অস্থিরতা উৎস কোথায় ও কেন? তাই এখন বোঝা দরকার।
যে প্রসঙ্গ ধরে এর জবাব খুঁজব তা হল, গ্লোবাল নেতৃত্ব। গ্লোবাল নেতৃত্বে এখন আছে কে, কবে থেকে? এবং কোন প্রক্রিয়ায় সে সমাসীন হয়েছিল এই দিকগুলো খুজে দেখে আগাব। আমাদের অনেকের হয়ত পছন্দ হবে না। বিশেষ করে যারা স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নের বয়ানের বাইরে আর কোন বয়ান এবং বিশেষত, ঐ বয়ানের সাথে মিলে না এমন কোন ফ্যাক্টস বা ইনফরমেশন থাকতেই পারে না বলে মনে করেন, তাদের কথা বলছি। তাদের পছন্দ না হলেও কথা সত্য যে , আমেরিকা বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার নেতৃত্ব নিয়েছে ও নেতৃত্ব দিয়ে আসছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল থেকে। তাতে আমাদের পছন্দ অনুযায়ী আমরা এ’ঘটনাকে ভাল অথবা মন্দ বলে যে যাই বিবেচনা করি না কেন, এটাই কঠিন সত্যি। আর মোটা দাগে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মাঝামাঝি ১৯৪১ সালের আগস্টে আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রত্যক্ষ পক্ষ নেয়ার, অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ততকালের পরপর চারবারের (১৯৩২-১৯৪৪) নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হলেন ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট (Franklin Delano Roosevelt, known as FDR)। আর বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উইলস্টন চার্চিল (Sir Winston Leonard Spencer-Churchill)। রুজভেল্ট-চার্চিল ১৯৪১ সালের ১৪ আগষ্ট স্বাক্ষরিত বিখ্যাত চুক্তির নাম আটল্যান্টিক চার্টার (Atlantic Charter 1941)। এই আটল্যান্টিক চুক্তিকে বলা যায় সেরা কলোনি মাস্টার ও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে লিখে দেওয়া দাসখত স্বাক্ষর। আর আর এক দিক থেকে বলা যায় ঐ চুক্তি হাতে পেয়ে রুজভেল্ট নিশ্চিত হন যে দুনিয়ায় তখন থেকে আমেরিকান নেতৃত্বে আসা নিশ্চিত হয়েছে। কেন এমন বলছি? ঐ চুক্তিকে দাসখত বলছি এজন্য যে ঐ চুক্তিতে আটটা পয়েন্ট আছে যার তৃতীয় পয়েন্টে হল যে, যে কোন রাষ্ট্রের নাগরিকের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (self government) এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব (sovereign rights) এই নাগরিক অধিকার ঐ দুই নেতা স্বীকার করেছিলেন ও সম্মান দেখাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমরা হয়ত এখনও বুঝি নাই তাতে কী? তাতে বিরাট কিছু। কারণ আমরা তখনও ছিলাম বৃটিশ কলোনি – কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়ার বাসিন্দা। তার মানে ঐ চুক্তিতে চার্চিল স্বীকার করে নিয়েছেন যে বৃটিশ-ইন্ডিয়ার নাগরিক আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (self government) এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব (sovereign rights) এই দুই নাগরিক অধিকার আছে। আর এই অধিকার থাকার অর্থ বৃটিশ সরকারের ইন্ডিয়াকে কলোনি করে রাখা অবৈধ। আর এটাই খোদ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী আটলান্টিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে স্বীকার করে নিয়েছেন।  কে স্বীকার করছেন? করছেন বৃটিশ মাস্টার। যে বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্য দম্ভ আর গর্ব  করে বলত, “বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্যের সুর্য নাকি কোনদিন অস্ত যাবে না”।আর এটাই ছিল রুজভেল্টের চার্চিলের বৃটেনকে যুদ্ধে সামরিক সাহায্য সহযোগিতা ও হিটলারের বিরুদ্ধে তাদের পক্ষ নেবার শর্ত। এজন্যই যুদ্ধের পর দুনিয়া জুড়ে  কলোনি-মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যেতে দেখেছিলাম। এর সাথে অবশ্য বৃটিশ বিরোধী বা কলোনি বিরোধী স্থানীয় জনগণের যেসব আন্দোলন ছিল এসবের ভুমিকাও ফেলনা নয়। অর্থাৎ কোনটাই অগুরুত্বপুর্ণ না, সংযুক্ত উপাদান।

তবে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল কেন রুজভেল্টের শর্তে আটল্যান্টিক চুক্তি করেছিলেন? আর তাতে কলোনি শব্দটা উচ্চারণ না করেও তবে ভিন্ন ভাষায় কোন রাষ্ট্রকে “কলোনি করে রাখা অবৈধ” – তা স্বীকার করেছিলেন কেন? এর প্রধান কারণ, হিটলারের জর্মানির হাতে ততদিনে ফ্রান্সের পরাজয় ঘটে গিয়েছে। মানে ফ্রান্স ১৯৪০ সালের জুন থেকে জর্মানির দখলে চলে গেছে। আর ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের মাঝে হল ইংলিশ চ্যানেল। অর্থাৎ বৃটেনের দিক থেকে দেখলে চার্চিল, বৃটেন থেকে ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে ফ্রান্সকে দেখছিলেন যে হিটলারের হাতে ইতোমধ্যে চলে গিয়েছে। যার মানে শত্রু ইংলিশ চ্যানেলের অপর পাড় পর্যন্ত এসে গিয়েছে। ওদিকে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই বৃটেনের গোলাবারুদসহ যুদ্ধের উপকরণের অভাব চলছিল। একমাত্র সাপ্লায়ার আমেরিকার নিজের “ক্যাশ এন্ড ক্যারি আইন ১৯৩৭”, আর “নিউট্রালিটি এক্ট ১৯৪০” (যে সে যুদ্ধে কোন পক্ষে জড়াবে না) – এই দুই আইনের কারণে কেবল নগদ সোনায় মুল্য পরিশোধের শর্তে তাও সীমিত পর্যায়ে সাপ্লাই বজায় রেখেছিল। বৃটেনের নগদ সোনার সামর্থও ১৯৪০ সালের শেষ নাগাদ ফুরিয়ে আসে। এই মরিয়া অবস্থাকে বাঁচার জন্য চার্চিলের একমাত্র পথ খোলা ছিল রুজভেল্টের শর্তে আটলান্টিক চার্টার স্বাক্ষরে রাজি হওয়া।

অতএব তখন থেকেই যুদ্ধের পরিণতি, যুদ্ধের বিজয়, বিজয়-পরবর্তী নতুন করে দুনিয়া সাজানো ইত্যাদি সব কিছুতে নির্ধারক ভূমিকা নিয়ে আমেরিকা নেতৃত্বে চলে আসার সুযোগ তৈরি হয়ে এসেছিল। কিন্তু রুজভেল্টের দিক থেকে কলোনি অবৈধ বা কলোনি মুক্তি শর্ত হল কেন?  আর তাতে আমেরিকার কী লাভ? প্রথমত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বব্যাপী একটা যুদ্ধ ছিল ঠিকই, তবে সেদিকের চেয়ে এর প্রধান গুরুত্ব হল- এই যুদ্ধের হাত ধরে তদানীন্তন দুনিয়ার এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়ায় প্রবেশ ঘটেছিল। কী সে নতুন সম্পর্ক? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫ সালে। ফলে ১৯৪৫ সালকে বেঞ্চমার্ক ধরলে তার আগের দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য ছিল, সেটা কলোনি শাসন সম্পর্কের দুনিয়া। ইউরোপের ব্রিটিশ ও ফরাসিরাসহ মোট পাঁচ-ছয়টি সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র সমগ্র দুনিয়ার বাকি রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিজেদের কারো না কারো ভাগের দখলি কলোনি করে নিয়ে রেখেছিল। এশিয়া ও আফ্রিকা দুটা পুরা মহাদেশকে উপনিবেশ বা কলোনি বানিয়ে রাখা কলোনিকর্তা ছিল ইউরোপ। কেবল আমেরিকা এসবের ভেতরে ছিল না, আলাদা অবস্থান ছিল তার। এই ছিল সেই কলোনি-সম্পর্কের দুনিয়ার শাসন চিত্র। আর এর বিপরীতে ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য হল – কলোনি শাসন-সম্পর্কের অবসান। দুনিয়া কলোনিমুক্ত হওয়ার যুগ। ফলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও তারা এরপর থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র; অন্তত প্রত্যক্ষ বিদেশী শাসনের অধীনে আর তারা রইল না। তবে এক নতুন সম্পর্ক – আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সম্পর্কের ভেতরে তাদের প্রবেশ ঘটে। বলা বাহুল্য, আগের কলোনি শাসন সম্পর্কের বদলে এটা তুলনামূলক অর্থে, অবশ্যই ভাল। কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র তারা বটে, তবে নিজের দুর্বল অর্থনীতি, অগ্রসর অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর সাথে অসম সম্পর্ক, দুর্বল চুক্তি করার ক্ষমতা, দুর্বল বিনিয়োগ সক্ষমতা ইত্যাদি এগুলো বৈশিষ্ট্য তাদের। এক ভিয়েতনাম (১৯৭৫) বাদ দিলে এশিয়ার কলোনিমুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হতে পুরো পঞ্চাশের দশক পার হয়ে যায়। আর আফ্রিকায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে (১৯৯৪) বাদ দিলে কলোনি শেষ হতে সেখানে সত্তরের দশক পর্যন্ত লেগে যায়। এভাবে বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটাই সেই আমেরিকার নেতৃত্বে ক্যাপিটালিজমের এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া। কলোনি-ক্যাপিটালিজমের সাথে তুলনায় বিপরীতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল-ক্যাপিটালিজমের এক নয়া দুনিয়া। ততকালে উঠে আসা ব্যাপক পুজি বিনিয়োগ সক্ষমতার গ্লোবাল পুজি বাজারের আড়ত – ওয়াল স্ট্রিট – এর স্বার্থ ছিল আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল-ক্যাপিটালিজম।
দ্বিতীয়ত, আমেরিকার পক্ষে এই নেতৃত্ব নেয়া বা দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেয়া কেন সম্ভব হয়েছিল, এ দিক থেকে ঘটনা ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, এর মৌলিক কারণ আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। বলা হয় ১৮৮০ সাল থেকেই অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় ও পুঞ্জীভবনের দিক থেকে আমেরিকা সেকালের সবচেয়ে বড় কলোনিমাস্টার, এম্পেরিয়াল ইংল্যান্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসিবিরোধী অ্যালায়েড ফোর্স – এই জোটের সব রাষ্ট্রকেই আমেরিকা এককভাবে সাহায্য করতে সক্ষম ছিল এবং তা করেছিল। অর্থাৎ মোট যুদ্ধখরচের এক প্রধান অংশ আমেরিকা একাই বহন করতে সক্ষম ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ নাৎসি ব্লক-বিরোধী সবাইকে আমেরিকা অর্থ (তৈরী পণ্য পাঠিয়ে যেমন- যুদ্ধজাহাজ, প্লেন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের খাদ্যদ্রব্য বা সেনা-ইউনিফর্মসহ সবকিছু) ধার দিয়েছিল। ধার লিখলাম বটে; কিন্তু কবে কিভাবে এটা পরিশোধ হবে, তা উহ্য রেখে এই সাহায্য দেয়া হয়েছিল। আমেরিকার ‘লেন্ড অ্যান্ড লিজ অ্যাক্ট’ নামে এক আইনের অধীনে এটা দেয়া হয়েছিল। এই আইনের অনেকগুলো ভার্সন আছে। আইনটি শুরু হয়েছিল ১৯৩৫ সাল থেকে cash & Carry act এবং  Neutrality act নামে বিভিন্ন সংশোধিত ভার্সান থেকে। এরপর Lend-Lease Act”  ১৯৩৯ আর শেষে ১৯৪১ সালের সংশোধিত ভার্সনই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কংগ্রেস ও সিনেটে পাস হওয়া এই আইনের মূল কথা- আমেরিকার নিরাপত্তার স্বার্থে প্রেসিডেন্টকে এক অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয়। যেমন- প্রেসিডেন্ট যদি মনে করেন অমুক রাষ্ট্রকে একটা নতুন যুদ্ধজাহাজ দেয়া কিংবা ১০০ টন চিনি পাঠিয়ে দেয়া আমেরিকা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি, তবে প্রেসিডেন্ট ওই রাষ্ট্রকে এই আইনে তা দিতে পারেন। অর্থাৎ মূল শর্ত হল, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ‘মনে করলেই’ (deem) যথেষ্ট। এখানে লক্ষণীয় হল, এটা অনুদান বলা হয় নাই। বরং সুনির্দিষ্ট করে আমেরিকা সরকারের দেয়া ধার অথবা লিজ। ফলে তা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু কবে কিভাবে, তা নিয়ে কোনো শর্ত নেই। উল্লেখও নাই। ইচ্ছা করে এ দিকটি উহ্য রাখার নিয়ম করা  হয়েছিল, যাতে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট সেটা পরে কোনো এক সময় উভয় রাষ্ট্রের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে তা ঠিক করতে পারেন। চাই কী মাফ করে দিতে পারেন। যুদ্ধ শেষে এক হিসাবে দেখা যায়, আমেরিকা এই আইনে ধার অথবা লিজ দেয়া মোট সম্পদ হস্তান্তর করে ফেলেছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের। (এখনকার ২০১০ সালের সমতুল্য মুল্যে এটা ৭৫০ বিলিয়ন ডলার)। ওর মধ্য কেবল সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেয়া হয়েছিল ১১ বিলিয়ন ডলারের (মোট ৫০ বিলিয়ন ডলারের ২২% ) সাহায্য-পণ্য। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আমেরিকার লেন্ড এন্ড লিজ আইনে করা সাহায্য চুক্তির প্রটোকল এখানে দেখা যেতে পারে। যুদ্ধ শেষে এই খরচের বেশির ভাগই মওকুফ করে দেয়া হয়। কোনো জাহাজ বা প্লেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হলে তা নিজেদের এলায়েড যুদ্ধজোটের  পক্ষ থেকে হয়েছে বলে তার কোনো দাম ধরা হয়নি। আর বাকিটা দীর্ঘ ৬০ বছরের কিস্তিতে ২ শতাংশ সুদে পরিশোধ করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই পরিশোধের চেয়েও তখন বড় প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছিল, সারা ইউরোপে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে বিনিয়োগ কে কোথা থেকে জোগাড় করবে? কে দেবে? সে সময় সক্ষম একমাত্র রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। ইতালিতে দুর্ভিক্ষাবস্থা সামলাতে অনুদান দেয়া থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটসহ সারা ইউরোপে ভেঙে পড়া অবকাঠামো আবার নির্মাণ, কারখানা পুনর্নির্মাণ এবং তা চালু করার পুঁজি, এভাবে সব কিছুতেই বিনিয়োগ ঢেলে দেয় একা আমেরিকাই। বলা হয়, যুদ্ধের খরচের প্রায় সমপরিমাণ বিনিয়োগ শুধু অবকাঠামো পুনর্নির্মাণেই ব্যয় করতে হয়েছিল। ইতোমধ্যে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ আর ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গঠন করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এই প্রথম সচল হতে শুরু করেছিল। অপর দিকে, ইউরোপের জার্মানি আর এশিয়ায় জাপানের যুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠনের জন্য আমেরিকা বিশেষ বিনিয়োগ প্রোগ্রামে ‘মার্শাল প্লান’ নিয়েছিল। এভাবেই আমেরিকার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম গড়ে উঠেছিল। সেই থেকে নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, জাতিসঙ্ঘ এবং ১৯৪৮ সালের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ইত্যাদির মাধ্যমে গ্লোবাল নিয়মশৃঙ্খলার এক অর্ডার কায়েম করেছিল আমেরিকার নেতৃত্ব। আর স্বভাবতই নিজের স্বার্থকে প্রাধান্যে রেখে একক দুনিয়া চালিয়ে আসছিল দেশটি।
ইউরোপের কলোনি ক্যাপিটালের ভেতরেই যেমন আমেরিকার অর্থনৈতিক উত্থান ঘটেছিল ১৮৮০ সালের দিকে, ঠিক তেমনি ১৯৭২ সাল থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে ফাইনালি চলতি একুশ শতক থেকে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন হাজির হয়েছে। আর ততটাই চীন আমেরিকান সক্ষমতার বিপরীতে চ্যালেঞ্জ আকারে হাজির হচ্ছে। আমেরিকার ক্রমেই সক্ষমতার দিক থেকে ঢলে পড়ছে। আর এই পথে সে যেতে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান (২০০১) ও ইরাকে(২০০৩) হামলা। এক দিকে সমাপ্তিহীন এ যুদ্ধ, আবার যুদ্ধের ফলাফল নিজের পক্ষে তেমন না আসা, আর সব কিছুর ওপর যুদ্ধের সীমাহীন ব্যয়- এসব কারণে আমেরিকার অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খায় সে এখান থেকে। এছাড়াও আবার এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা নেমে আসে ২০০৭ সালের শেষে। এভাবে অর্থনৈতিক দিক থেকে রাষ্ট্রকে পুরাপুরি বিপদে ফেলার কাজটি ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট বুশ তার দুই টার্মে (২০০১-০৮)। এরপর বারাক ওবামা। প্রথম টার্মে তিনি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েছিলেন জানুয়ারি ২০০৯ সালে। আর দ্বিতীয় টার্মে ২০১৩ সালে। এর মধ্যে সর্বপ্রথম ২০১১ সালে, আমেরিকার পুরাতন নীতি-পলিসিগুলো নতুন করে সাজানোর প্রথম সুযোগ পান ওবামা। ইতোমধ্যে তিনি যুদ্ধ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের সময়সীমা সাব্যস্ত করেছিলেন ২০১৪ সাল। কিন্তু দেশের অর্থনীতির শুকিয়ে যাওয়া দেখে তো বটেই, সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দেখে (আমেরিকান অহঙ্কারে ঘা লেগেছে) এগুলো যে আমেরিকার নেতৃত্ব ও সক্ষমতা ঢলে পড়ার ইঙ্গিত- এ নিয়ে দেশের ভেতরে আলোচনা প্রবল হতে থাকে। ওদিকে ২০১১ সালেই ওবামা প্রথম অনেকটা সরাসরি চীন ঠেকানোর “এশিয়া নীতি” (PIVOT to Asia Policy) ঘোষণা করেছিলেন। আর ঐ বছরেরই মে মাসে ওবামা একসাথে ইউরোপের ছয় রাষ্ট্র সফরে বের হয়েছিলেন।
প্রথমেই আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেন সফরের সময় থেকেই তিনি মনোবল বাড়ানো বা ফেরানোর জন্য বক্তৃতা শুরু করেছিলেন। ‘আমরাই এখনো দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেবো’, ‘পাশ্চাত্য এখনো দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেবে’, এই ছিল তার নতুন বয়ান। বৃটিশ পার্লামেন্টে বক্তৃতায় ওবামা যা বলেছেন তা নিয়ে ২৫ মে ২০১১ বিবিসির ভাষ্য ছিল এরকম,

“……But he rejected arguments that the rise of superpowers like China and India meant the end for American and European influence in the world.
“Perhaps, the argument goes, these nations represent the future, and the time for our leadership has passed. That argument is wrong. The time for our leadership is now,” he said.
“It was the United States, the United Kingdom, and our democratic allies that shaped a world in which new nations could emerge and individuals could thrive.”

এটা তিনি চালিয়ে গিয়েছিলেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত। আমেরিকার ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি অ্যাকাডেমির গ্র্যাজুয়েশনে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘উদাহরণ হয়ে আমেরিকাকে দুনিয়াতে নেতৃত্ব দিতে হবে।’ পরের সপ্তাহেই চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্যাপারটা নিয়ে ঠাট্টা করেন।  সে যাই হোক, কিন্তু আসল কথা তত দিনে সবাই বুঝে গেছে, আর কিছুই ফিরবে না। আমেরিকার অ্যাকাডেমিক, থিঙ্কট্যাঙ্ক ইত্যাদি সব জায়গায় একই বিতর্ক বিষয়, আমেরিকান নেতৃত্ব, সক্ষমতার ঢলে পড়া। ইতোমধ্যে ২০১১ সালে আমেরিকার ভেতরের চাকরি বা কাজের সুযোগ, উৎপাদন ও পড়ে যাওয়া বাজার ঠিক করতে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ককে পুনঃদরকষাকষিতে নিয়ে কিছু চাকরি এবং সুবিধা ফিরিয়েছিলেন ওবামা। কিন্তু খুব বেশি কিছু হয়নি বা আগায় নাই তাতে। আমেরিকান প্রডাক্ট অথবা লেবার, প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়েছে, এটা এখন প্রতিষ্ঠিত। এসব কিছুর প্রভাবে এক ব্যাপক সামাজিক হতাশা চার দিকে ছেয়ে বসেছে।

এইবারের (২০১৬) আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মূল ইস্যু ছিল আসলে এটাই। এ কাজে ‘রেগুলার পলিটিক্যাল অ্যাপ্রোচ’ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যারা গিয়েছেন সেই লিবারেলদের পক্ষে কোনো আবেদন ছিল না। তাই যার রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, কখনো কোনো স্তরে জনপ্রতিনিধি ছিলেন না যিনি, এমন এক ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পই নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের কাছে প্রধান ভরসা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। নির্বাচনে জেতার পর আমেরিকার এখন দরকার এক কল্পিত শত্রু – যার বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে অভ্যন্তরীণ গণসংহতি তৈরি করতে হবে। স্বভাবতই চাকরির দিক থেকে অবৈধ অভিবাসী, বিদেশী এবং ‘মুসলমান’ এদের বিরুদ্ধে লোক ক্ষেপানো তুলনামূলকভাবে সহজ ও ফলদায়ক বলে মনে করা হয়। অভ্যন্তরীণভাবে এই কৌশলকে যারা সঠিক ও উপযুক্ত মনে করেন, তাদের নতুন নামকরণ হয়েছে উগ্র ডানপন্থী অথবা বিকল্প ডানপন্থী বলে। এরা মনে করেন, এই পথ এখন সবচেয়ে কার্যকর। যেমন ট্রাম্প জিতে গেছেন এখন কে কে ট্রাম্পের সাথে প্রশাসনে বসবেন – তাদেরকে বেছে নিবার লড়াই চলছে। সে লড়াইয়ে এখনও কারা “মুসলমানদের আলাদা রেজিস্ট্রিতে নাম লেখাতে হবে” এর পক্ষে থাকতে চান এটা সেখানে ইস্যু। বিকল্প ডানপন্থীরা মনে করছে, এমন অবস্থান না নিলে নির্বাচিত হিসেবে ক্ষমতার জনভিত্তি দেয়া যাবে না। আবার উল্টো দিকে বিকল্প ডানপন্থীদেরই কারবার দেখে প্রচলিত রিপাবলিকান যারা আছেন, তারা রেসিজম বা ইসলামোফোবিয়ার অভিযোগ বিরোধীরা আনবেন এই ভয়ে বা লিবারেলদের প্রচারণার ভয়ে ভীত। তারা চাচ্ছেন, বিকল্প ডানপন্থীরা যেন ট্রাম্পের আশপাশে মন্ত্রী-উপদেষ্টা হয়ে না আসেন। এই লড়াইটাই এখন এ দু’পক্ষের।
অপর দিকে, ট্রাম্পের মাধ্যমে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার চাপের মুখোমুখি চীন হতে যাচ্ছে, তা তারা বুঝে গেছে। তাই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্বিগ্ন হয়ে আগেই বলে বেড়াচ্ছেন, (ট্রাম্পকে) মাথা ঠাণ্ডা করে মুখোমুখি বসতে হবে। ডায়ালগ ছাড়া আমাদের উভয়ের বিকল্প নেই। অর্থাৎ শঙ্কা, ট্রাম্পের কোনো গোঁয়ার্তুমিতে গ্লোবাল মন্দায় পড়ে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না। চার দিকে এক বিশাল অস্থিরতা বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট, সামনের পথ আরো অস্থিরতার, কোনো সহজ পথের আলো কোথাও নেই।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইন ২২ নভেম্বর সংখ্যায় (প্রিন্টে পরের দিন) কিছুটা ছোট করে ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার অনেক সংযোজন ও এডিট করে নতুন এডিশন হিসাবে আবার ছাপা হল।]

সাবধান, ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

সাবধান,  ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

গৌতম দাস
১৬ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-26g

গত সপ্তাহে আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডোনাল্ড জন ট্রাম্প । প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে ভোটে হারিয়ে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। এর চেয়েও বড় কথা, আমেরিকার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান- এই দুই দলেরই (বাইপার্টিজান) এলিটরা মিলিতভাবে নিজ নিজ দলের কথা চিন্তা বাদ দিয়ে ‘ট্রাম্প ঠেকাও’-এর কাজে নেমে পড়েছিলেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে ০২ নভেম্বর  সিএনএন রিপোর্ট করেছিল ৩৭০ জন অর্থনীতিবিদ (যাদের মধ্যে কয়েকজন নোবেল প্রাইজ পাওয়া অর্থনীতিবিদও আছেন), তারা সবাই এক বিবৃতিতে কেন ট্রাম্পকে ভোট দেয়া ঠিক হবে না, তা জানিয়েছিলেন। ফলে নির্বাচনের আগেই একটা আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল যে  ট্রাম্পের বোধ হয় আর কোনো সম্ভাবনা নেই; তাকে হারিয়ে হিলারিই জিতে যাইতেছেন। রয়টার্সের মতো মিডিয়া বলা শুরু করেছিল, হিলারি জিততেছেন এটা নাকি প্রায় ৯০ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে গেছে। ফলে ট্রাম্পের জেতার আর যেন কোনো সম্ভাবনা নেই, চার দিকে সে কথাই কেবল প্রচার হচ্ছিল। কিন্তু ফলাফল এখন সবাই জানেন, মিডিয়ার সবার সব অনুমান সেখানে উল্টে গেছে।  তাহলে এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল কেন, আর প্রপাগান্ডার সব কিছু আসলে এক মিথ্যা ফানুস ছিল – এমনইবা শেষে প্রমাণ হলো কেন?

এটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটা সেই আমেরিকা যে এখনো গ্লোবাল অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, নির্ধারক রাষ্ট্র – যদিও এটা শেষযুগে যৌবন ঢলে পড়ার কালে। সেই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট, তারই নির্বাচন এটি। ফলে এই নির্বাচনকে ঘিরে একে প্রভাবিত করতে সরব মুখ খোলার কথা সমগ্র দুনিয়ার নানান স্বার্থের গোষ্ঠী-মানুষের। তবে মনে রাখতে হবে, সামগ্রিক দিক বিচারে বললে এই নির্বাচনে আসলে মোটা দাগে তিনটি পক্ষ ছিল। এক পক্ষ হল আমেরিকার বাইরের গ্লোবাল স্বার্থ-সুত্রে সম্পর্কিত মানুষ। অন্য দিকে যারা আমেরিকার ভেতরের, এদের মধ্যে আবার আরও দুই পক্ষ। এভাবে মোট তিনটা পক্ষ। মুল প্রসঙ্গটা আমেরিকান ভোটারের, ফলে এখানে ভেতরের মানে আমেরিকান নাগরিক যে ভোটার আর, বাইরের অ-নাগরিক মানে না-ভোটারের। ভেতরের মধ্যে মোটা দুই পক্ষের এক পক্ষ – এই দলে পড়বেন যারা আমেরিকাকে চালায় এমন বড়লোক, এলিট, নীতিনির্ধারক, ইন্টেলেক্ট, ওয়াল স্ট্রিটসহ ব্যবসায়ী জগৎ প্রভৃতি, যাদেরকে এখানে বলার সুবিধার্থে এখন থেকে একসাথে অভ্যন্তরীণ ‘এলিট’ বলে ডাকব। এলিট অর্থাৎ আমেরিকার ভেতরের ‘আম-ভোটার’দের থেকে যারা আলাদা। এই এলিটরাই সবচেয়ে বেশি কথা বলার সুযোগ রাখেন। সাধারণ সময়ে আমেরিকার বাইরের অ-নাগরিক আর ভেতরের এই এলিট অংশ এরাই মূলত মিডিয়া দখল করে রাখেন, কেবল এদের বয়ানই মিডিয়ায় আসে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। সেটা একমাত্র নির্বাচনের সময়। এই সময় এই দুই কুতুবের বাইরে নিরব কুতুব যারা সবকিছুর নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।  মিডিয়ার বয়ান ও দৃষ্টিভঙ্গির বাইরেরও ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ ওদের বাইরেও তৃতীয় (অভ্যন্তরীণভাবে দেখলে দ্বিতীয়) পক্ষ, এঅংশটি হল ‘আম-ভোটার’। ভোটে এরাই নির্ধারক, প্রবল সংখ্যাধিক্যের কারণে। আর সবচেয়ে বড় এই অংশটাই  মিডিয়ার অগোচরেই থেকে যায়, বিশেষত আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। অতএব ভোটের সময় এরা স্থানীয় মিডিয়ায় যদি থেকে যায় সেকথা বাইরে থেকে আমরা জানতে পারি না। এই ‘আম-ভোটার’ অংশটি সবচেয়ে বড় বলে ভোট দেয়া ও গণনায় সময় তাদের ভূমিকা নির্ধারক। অন্য যেকোনো গ্রুপের চেয়ে এরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আর ভোটের সময়ের ঠিক এর উলটা দশা হল প্রথম দুই পক্ষের (বাইরের অনাগরিক আর ভেতরের এলিট)। কারণ এদের মধ্যে কেবল ভেতরের এলিটদের কিছু ভোট দেয়ার ক্ষমতা আছে, অন্যটার ভোট নেই। তাহলে দাঁড়াল, আমেরিকান নির্বাচনে একমাত্র নির্বাচনের সময়ই সবচেয়ে নির্ধারক হল – আম-ভোটার। অথচ আম-ভোটারদের চেয়ে যাদের ভোটই নেই অথবা ন্যূনতম কিছু ভোট আছে  এরাই নির্বাচনে পুরো মিডিয়া দখল করে রাখে এবং সেখানে কেবল তাদের স্বার্থের বা গ্লোবাল স্বার্থের কথা বয়ানগুলোকে মুখ্য করে রাখে। অতএব এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আম-ভোটারকে অ্যাড্রেস করতে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা কী ভাষায়, কী চাতুরীতে বা কী কৌশলে কথা বলবে, প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে এই আম-ভোটারের কাছে পৌঁছবে, প্রভাবিত করবে, এটা খুবই নির্ধারক। জিততে চাইলে প্রভাবিত করার সেই ভাষ্য অবশ্যই মিডিয়ার আমেরিকার বাইরের ও ভেতরের এলিটদের ভাষ্য থেকে ভিন্ন করাই হবে সহজ কৌশল। ট্রাম্প সম্ভবত তাই করেছেন। তিনি ব্যাপক আম-ভোটারের ভাষারপ্ত করে তাদের তাতিয়ে কথা বলেছেন। তার সেসব কথা মিডিয়া বা আন্তর্জাতিক মূল্যবোধের চোখে হয়তো অচল। তবুও তা পরোয়া না করে এই ভোটারদের জীবনধারায় দেখা দৃষ্টিভঙ্গি, চাওয়া-পাওয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ট্রাম্প ভোট চেয়ে কথা বলেছেন। কারণ মনে রাখতে হবে, আম-ভোটারদের কাছে তাদের নেতারা বিষয়ে তাদের মুখ্য বিবেচ্য একটাই – তা হল, সরকার তাদের জন্য অনেক কাজ আর ভাল বেতনের ব্যবস্থা করতে পারছেন কিনা, অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে পেরেছেন কিনা ইত্যাদি। যদি পারেন আর তা পারতে গিয়ে অন্য দেশের তেল লুট করে নাকি মানুষ খুন করে সব সাফা করে এনেছেন এসব তাদের বিবেচনার কোন বিষয় হয় না। কারণ তারা জানে এলিটরা হার-হারামজাদা। এলিটরা একমাত্র নিজের সংকীর্ণ স্বার্থের ধান্ধায় পরিচালিত। আর এটাই আম-ভোটারদেরকেও বিপরীত এক সংকীর্ণ স্বার্থের ভিতর দিয়ে নিজেদের দেখতে বাধ্য করে থাকে। ফলে ভিন দেশে গিয়ে আমেরিকান নেতা বা সরকার খারাপ বা অনৈতিক কী করছেন সে বিচারে বসার অবস্থায় তাঁরা থাকেন না। অন্তত নেতাদের আকামের বিচারে বসার চেয়ে বরং তাদের নিজের জন্য অনেক কাজ ও ভাল বেতনের বিষয় – এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। যেমন ট্রাম্প কেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বললেন; মেক্সিকো বা চীনের বিরুদ্ধে ট্রেড বেরিয়ার (আমদানি বাণিজ্যে বাধার নীতি) ইত্যাদিতে কথা বলেছেন। সে বিষয়গুলো আম-ভোটাররা নিজের স্বার্থের দিক থেকে দেখবেন, গ্লোবাল মিডিয়ার দিক থেকে নয়। এ ছাড়া আরেকটা বিরাট দিক আছে – মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী শ্রমিক। অথবা রিফিউজি নামে প্রবাসী বা বিদেশী শ্রমিক। এটা এমন এক জিনিস, যখন অর্থনীতি ভাল চলে তখন সরকার অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশী শ্রমিকও কাজের প্রাচুর্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুভব করে না। কোন সমস্যা দেখে না। বরং সুবিধার দিকটা দেখতে পায়। ফলে কে দেশের বাইরে থেকে এল, বিদেশী কিনা  তা তার কাছে বিবেচ্য হয় না। অর্থনীতি ভালো চললে, বাইরের শ্রম মানেই তুলনায় সস্তায় পাওয়া শ্রম, যে শ্রম তখন সবার দরকারও। তাই তা আদরণীয়। অথচ অর্থনীতি শ্লথ হয়ে গেলে ঠিক এর উল্টো। তখন মনে হয়, কালো বা বাদামি, বিদেশী বা মুসলমান সব খেদাও, এরাই নিয়ে গেল সব। জাতীয়তাবাদের জিগির উঠবে। এসব ক্রাইসিসের দিক খেয়াল রেখে নির্বাচনে ভোট পাওয়ার জন্য ট্রাম্প জেতার উপযুক্ত ভাষ্যটি সঠিক বানিয়েছিলেন। সেই ভাষায় কথা তুলে যিনি ভোট চাইবেন, স্বভাবতই তিনি সফল হবেন। নির্বাচনে ট্রাম্পের মূল শ্লোগান “মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন” (make America Great again) – ’। আম-ভোটারদের আকৃষ্ট করার ভাষ্য হিসাবে, এটাই সঠিক শ্লোগান। শেষের ঐ ‘এগেইন’ শব্দটা গুরুত্বপুর্ণ। হৃত-গৌরব মনে করিয়ে দিয়ে সুরসুরি দেয়া। আন্তর্জাতিক দিক নয়, জাতীয়তাবাদ।

কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্যখানে। আমরা ট্রাম্পের যত রকম কথা শুনেছি, সেগুলো আমরা আসলে ট্রাম্পের আম-ভোটারের চোখ দিয়ে না দেখে বরং ওর বাইরের অন্য দুই পক্ষের দিক থেকে দেখেছি। সমগ্র দুনিয়ার আমরা প্রথমত, আমাদের নিজ নিজ স্থানীয় প্রেক্ষিত থেকে অথবা গ্লোবাল প্রেক্ষিতে। আমরা ভুলে গেছি, আমেরিকার বাইরের যারা, তারা যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তারা তো ভোটার নন। আর এটা তো আসলে কেবল ভোটেরই লড়াই। ফলে যারা বাইরের লোক বা সংখ্যায় ক্ষুদ্র দেশি-এলিট এদের নিন্দা-মন্দ কথা আমল করার কী আছে? কিছু নেই। নিন্দা-মন্দ আমল করলে তাতে ভোট সংখ্যা বাড়বে না।  ট্রাম্প এটা ঠিকই ধরেছেন। আর তাঁর জয়লাভের মূল কারণ সম্ভবত এখানে। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, আমেরিকার বাইরের অনাগরিক বা ভেতরের এলিট এসব স্বার্থ সন্তুষ্ট করে ভাষ্য তৈরি করে কোনো লাভ নেই। ভোটের বাক্সে এর কোনো প্রভাব নেই। তাই এ’দুই পক্ষের দিকে তাকিয়ে তিনি কথা বলেননি। দ্বিতীয়ত, একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল, হাতির দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবায়ও না, খায়ও না। চিবানোর দাঁত আলাদা। অথচ আমরা দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবানো দেখতে চাচ্ছি। ট্রাম্প ভোটে জিতে যাবার পর আমরা এখন চাচ্ছি ট্রাম্প যেন ভোট চাইবার ভাষাতেই তার হবু সরকারের নীতি সাজাক। আর তাতে আমরা যেন আরামে ট্রাম্পের গুষ্ঠি উদ্ধাস্র করতে পারি। আমরা ভোট পাওয়ার জন্য দেয়া পপুলার শ্লোগান (বা বয়ান) আর জিতে যাবার পর তা ‘হুবহু’ সরকারের নীতি-পলিসি করা যেন বাধ্যবাধকতা! অথচ দেখানো আর চিবানোর দাঁত তো আলাদা, তা আলাদাও হতে পারে, হয়। এটা খেয়াল করে দেখি নাই।
আমেরিকা রাষ্ট্রের বাইরের মানুষ, ভিনদেশী আর সাথে ভিতরের কেউ কেউ এমন অনেকেই মনে করে যে ট্রাম্প খুবই খারাপ মানুষ – রেসিস্ট, রেপিস্ট ইত্যাদি ধরনের সব কিছু অভিযোগ যার বিরুদ্ধে আনা যায়, নির্বাচনে ট্রাম্পের হেরে যাওয়া উচিত। অর্থাৎ তারা এখানে এথিকস এবং স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন ভঙ্গের কথা তুলছেন, তুলবেন। এ কথাও ঠিক যে ট্রাম্পের অনেক কথায় এথিকস ও আইনের ফিল্টার পার হবে না, আটকে যাবে এবং তা আসলে খুবই অগ্রহণযোগ্য। তাহলে?

ট্রাম্পের বয়ান-অবস্থানের কী সমালোচনা করা যাবে না? সমালোচনা করা কি ভুল হবে? এক কথায় এর জবাব, অবশ্যই যাবে। তবে থিতু হতে একটু অপেক্ষা করেন। ইতোমধ্যে তিনি কী কী বলেছেন, সেগুলোর বিস্তারিত নোট নেন। কিন্তু কোনোভাবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না। নেয়া ঠিক হবে না। আগামী বছর ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নেবেন। এর আগেই ও পরে কিছু কিছু করে কয়েক মাসের মধ্যেই ট্রাম্পের ‘আসল’ (অর্থাৎ খাবার দাঁত) নীতি-পলিসি পরিষ্কার হয়ে যাবে। নির্বাচনে দেয়া তার বিভিন্ন বক্তব্যে কোথায় কোথায় এখন তিনি ফিল্টার দেবেন, ফাইন টিউন করে এরপর তা তার সরকারের নীতি-পলিসি হিসেবে ঘোষণা করবেন, তা বোঝা যাবে। এর আগে ট্রাম্প প্রসঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া ভুল হবে। এ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

যেমন, ইতোমধ্যে ট্রাম্প তাঁর মুসলিমবিরোধী বক্তব্য সেটা তিনি নির্বাচনী ওয়েবসাইট থেকে নামিয়ে ফেলেছেন। ওদিকে সর্বশেষ আর এক খবর হল – ওবামার স্বাস্থ্য বীমা পলিসি (অনেকে যেটা তামসা করে ওবামা-কেয়ার বলে), সেটা তিনি নির্বাচনী প্রচারের সময় ‘রিপিল’ করবেন বলেছিলেন। ইংরেজি রিপিল মানে ফিরিয়ে নেয়া, প্রত্যাহার করা বা উল্টো আইন করে বাতিল করে দেয়া। এখন তিনি জানাচ্ছেন, “আমি সম্ভবত রিপিল করছি না। তবে কিছু সংস্কার করব”। এই গুমোর খুলেছেন তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেয়া ট্রাম্পের প্রথম ইন্টারভিউয়ে। এর কিছু পরে ১২ নভেম্বর বৃটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট ঐ ইন্টারভিউয়ের উপর একটা রিপোর্ট করে বিস্তারিত। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাষায় এটা ট্রাম্পের ইউটার্ণ; খবরের শিরোনাম হল, “Donald Trump: I may not repeal Obamacare, President-elect says in major U-turn”।

একটা অবজারভেশন হিসাবে বলা যায়, নির্বাচনের সময় সমগ্র দুনিয়ায় প্রার্থীরা অনেক প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা চাঁছা-ছোলা খোলা কথা বলে থাকে। কিন্তু জিতলে পরে যেটার ওপর কম অথবা বেশি ফিল্টার চড়ানো হয়, টোপর পরানো হয় বা ফাইন টিউনে একে বিচার-বিবেচনা করে বদলে নেবার পরেই কেবল তা  সরকারের নীতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। দেখা গেছে, সময়ে কোন রাষ্ট্রের ক্রাইসিস যত তীব্র থাকে নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা তখন চাঁছা-ছোলা আনফিল্টার করে বলা হতে থাকে। আবার মনে রাখতে হবে নির্বাচনী কথার প্রতিশ্রুতির সাথে এরপর জিতে তা সরকারের নীতি হুবহু না হওয়াতে তা নিয়ে সমালোচনা করে নির্বাচনের ফল হবার পরে তা নিয়ে খুব বেশি আগানো যায় না বা কাজে লাগে না। আর একটা প্রশ্ন থেকেই যাই। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যাই তাই পরে সেটা তখনও কল্পনা তা সবাই মনে রাখে। তুলনায় পরে কংক্রিট ভাষায় সরকারের নীতিতে কী থাকছে সেটাই আসল, বাস্তব। ফলে নির্বাচন উত্তর পরিস্থিতিতে মানুষ কল্পনার চেয়ে বাস্তব নিয়েই কথা বলা অর্থপুর্ণ মনে করে। তবে হ্যা নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে  কোনো প্রার্থীর সমালোচনা একমাত্র তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাজে লাগে। এবং সেটা কেবলমাত্র নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে , পরে আর নয়।  তাই আমাদের উচিত, চোখ-কান খুলে অপেক্ষা করা।

তাহলে ট্রাম্পই কি প্রথম ব্যক্তি যিনি নির্বাচনে দেয়া ‘হুবহু’ প্রতিশ্রুতিতে চলেন না? বরখেলাপ করেন? না, তা একেবারেই নয়। লিবারেল সুশীলদের প্রতিভূ শ্রী ওবামার কথাই ধরা যাক। তিনি তাঁর নির্বাচন চলাকালীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জিতলে তিনি রেনডিশন প্রথা (আমাদের মতো দেশে তাদের আসামি পাঠিয়ে টর্চার করিয়ে আনা, কারণ ওমন টর্চার নির্যাতন করা আমেরিকান আইনে নিষিদ্ধ ) বন্ধ করে দেবেন, গুয়ানতানামো বে কুখ্যাত কারাগার উঠিয়ে দেবেন, আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করবেন ইত্যাদি। যার একটিও তিনি করেননি এবং পরবর্তিতে তিনি নিজে সরাসরি অপারগতা জানিয়েছেন। তবে আফগানিস্তানে ১০ হাজার আমেরিকান সৈন্য রেখে হলেও বাকিটা প্রত্যাহার করেছেন। আর এক উদাহরণঃ গত ২০১৪ সালে ভারতের নির্বাচন চলাকালীন সময়ে মোদি হুঙ্কার ও ভয় পাইয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তিনি জিতলে জেতার পরের দিন থেকে ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের’ বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত মোদির সে কথার পরবর্তী কথা কাজ বা তৎপরতা নেই। যেন এমন কথা তিনি কখনও বলেননি অথবা নিজেই ভুলে গেছেন।

তাহলে আমি কি বলতে চাইছি ট্রাম্পের ওবামা বা মোদীর মতই সব কথা ভুয়া, তাল ঠিক নেই? না, তাও একেবারেই সত্যি নয়। বরং ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ট্রাম্প দিচ্ছেন যে খুব সম্ভবত আমেরিকান রাষ্ট্রনীতিতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসন্ন। আজকের যে আমেরিকাকে আমরা দেখে অভ্যস্ত, চিনি এই আমেরিকার গড়ন আকার লাভ করে থিতু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে; আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়া নতুন অর্ডারে সাজিয়ে হাজির হয়ে আছে তখন থেকে। সে অবস্থাকে বলা হয় আমেরিকা দুনিয়ার এক এম্পায়ারের (সাম্রাজ্যবাদ নয়) ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছিল। এরপর থেকে তা সরাসরি আমেরিকার  নিজের প্রত্যক্ষ ভোগে বা কাজে লাগুক আর  নাই লাগুক – এমন বহু বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেম এরপর থেকে তা চলে এখনও টিকে আছে। আর এর পরিচালন চালিয়ে টিকিয়ে রাখার পুরা দায়ভার আমেরিকাকেই বইতে হয়ে আসছে। মুখস্ত বা অভ্যাসের মত, সেই থেকে কোন রিভিউ ছাড়াই এগুলো চলে আসছে। এমন সব প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেমের দায়দায়িত্ব এই প্রথম রিভিউ করে কাটছাঁট ও পুনর্গঠন করা হতে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে যেমন, ন্যাটো। এর ৭৩ শতাংশ খরচ আমেরিকা একা বহন করে। ট্রাম্প এটা রিভিউ করার পর ঠিক করতে চান, এটা নিয়ে কী করা হবে। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো কোল্ড ওয়ার লড়াইয়ের যুগ শুরুর শুরুতেই ১৯৪৯ সালে গঠন করা হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামরিক মোকাবোলায় ন্যাটোর সদস্য সকল রাষ্ট্রের একসাথে এক্ট করতে একটা বাধ্যবাধকতা চালু করা, যাতে তা বড় এক রক্ষাকবজ নয়। ট্রাম্প যাকে আমাদের পাগল বেতাল লোক বলে প্রমাণ করতে চাইছি, বা যা মনে চায় তা বলে নির্বাচনে জিতার লোক মনে হচ্ছে – এমন প্রপাগান্ডা হয়েছে হচ্ছে যার নামে  – সেই ট্রাম্প প্রশ্ন তুলছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই কবে ভেঙ্গে গেছে, দুনিয়াতে এখন সব রাষ্ট্রই এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে সম্পর্কিত হয়ে আছে – অর্থাৎ সেই শত্রুতাও আর তেমন নাই। উলটা এখনকার একমাত্র জলন্ত হুমকি হল “টেররিজম”। তাহলে ন্যাটোকে একইভাবে রেখে দেওয়ার মানে কী? ন্যায্যতা কোথায়? অন্তত এবিষয়ে একটা  রিভিউ  করে এটা ভেঙ্গে দেয়া যায় কী না তা দেখা উচিত। আর দরকার হলে “টেররিজমের” মোকাবোলায় উপযোগী কিছু প্রতিষ্ঠান জন্ম দেয়া হক।  ব্যাপারটা নিয়ে ইতোমধ্যেই ইউরোপের অনেকের সাথে বাকবিতন্ডা শুরু হয়ে গেছে। ট্রাম্পের কথা ফেলনা নয়, যুক্তি আছে।

একইভাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলছেন – ট্রেড ব্যারিয়ার বা অবাধ পণ্য চলাচলে বাধা প্রসঙ্গে। চীনের সাথে বাণিজ্যে তিনি সস্তা জাতীয়তাবাদী হয়ে বাধা দেবেন না। তবে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরায় নেগোশিয়েট করে একটা তুলনামূলক ভালো ডিল (আমেরিকানদের জন্য চাকরি বা আউটসোর্সিং) তিনি পেতে চাইবেন। স্বভাবতঅই এটাই নির্বাচন উত্তর থিতু ভাষ্য। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ভোটের লোভে এই বিষয়টাকেই তিনি চীনের বিরুদ্ধে হুঙ্কারের মত শোনায় একন ভাষাতেই বলেছিলেন।

আবার সিরিয়া প্রসঙ্গে এক নতুন অবস্থান নিতে যাচ্ছেন। তাতে আসাদ থাকল না গেল, সেখান থেকে সরে আসবেন। রাশিয়ার ওপর আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রের অবরোধ উঠানো নিয়ে কথা আগাবেন। আইএস মোকাবেলা ও দমনে রাশিয়ার সাথে দায় শেয়ার করবেন সম্ভবত। এগুলো সবই বিশ্বাযোগ্য কথা ও পদক্ষেপ তিনি নিতে যাচ্ছেন।  কেবল একটা জায়গায় ফাঁকি দিক ছিল। খুব সম্ভবত তিনি হিলারির বিরুদ্ধে পুতিনের দেয়া ইন্টেরলিজেন্স ব্যবহার করতে পুতিনের সাথে অপ্রমাণিত ডিল করেছিলেন। ট্রাম্প বলতে পারেন যে হিলারিও তো ওবামার প্রভাব ব্যবহার করে “সরকারী মেল ব্যক্তিগত সার্ভারে রেখে” তিনি ঠিক করেন নাই তবে নিরাপত্তা ভঙ্গ হয় এমন কিছু ঘটান নাই বলে ছাড়পত্র এনেছিলেন। অর্থাৎ ওবামা-হিলারি এসব তথাকথিত লিবারেলরা কোন ধোয়া তুলসিপাতা নয় এটা মনে রাখতে হবে।  ওবামা-হিলারিরা কোন স্টান্ডার্ড বা আদর্শ নয়।

সৌদি, জাপান, কোরিয়া, জার্মানি প্রভৃতি দেশে যেখানে যেখানে আমেরিকান ঘাঁটি আছে সে ঘাঁটি রাখার খরচ কে বইবে – এই প্রশ্নটা  ট্রাম্প সামনে আনতে চান।  অথবা রাখা আদৌ আমেরিকার জন্য কোনো লাভ হচ্ছে কি না এটা পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে চান। এটা খুবই জেনুইন প্রশ্ন। এককালে আমেরিকার অর্থভান্ডারের অবস্থা ভাল ছিল পরে নিজ খরচে ভিন দেশে ঘাঁটি পোষা হয়ত গায়ে লাগত না। এখন লাভ-ক্ষতি হিসাব করা, বাস্তববাদী হওয়া অবশ্যই জায়েজ।

আমরা যদি মনে রাখি, ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী, তাহলে ট্রাম্পকে বুঝতে আমাদের তা কাজে লাগতে পারে।  উপরের সবগুলো প্রসঙ্গের একটা কমন দিক আছে। সেই বিচারে সবগুলো ইস্যু সম্পর্কিত। আমেরিকার এম্পায়ার ভুমিকা খাটো হয়েও গেছে, শুকিয়েছে। ফলে সে বাস্তব পরিস্থিতি মোতাবেক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আবার নতুন করে সাজানোর সময় পার হয়ে গেছে।  সারকথায় আমেরিকার এখনকার মানে শুকানো ভুমিকা মোতাবেক বড় খরুচে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তত ঢেলে সাজানো যায়। এককথায় যেটাকে দক্ষ সরকার – ম্যানেজমেন্ট এবং খরচের দিক থেকে স্মার্ট চটপটে সরকার কায়েম করার উদ্যোগ – নিঃসন্দেহে অনেক সুদুর প্রসারি ও বাস্তব চিন্তা।

আর একটা প্রসঙ্গ বলে শেষ করব। ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা ইতোমধ্যে ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর এক মজার মন্তব্য করেছেন। তিনি চীনা নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক সমতুল্য ব্যাংক এআইআইবি (AIIB), এই ব্যাংক জন্মের সময় ওর গঠন উদ্যোগের বিরোধিতা করা আমেরিকার দিক থেকে  ‘স্ট্র্যাটেজিক মিসটেক’ বলে মন্তব্য করেছেন। এমন মন্তব্য খুবই উলটা বাওয়া মন্তব্য হলেও কথা মিছা না। বাস্তবতা হল এক আমেরিকা আর তাঁর পার্টনারস ইন ক্রাইম জাপান – এই দুই দেশ ছাড়া এখন AIIB সদস্য হতে কোন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপুর্ণ দেশ বাকী নাই। সর্বশেষ আমেরিকার পিছনে পিছনে চলা কানাডাও ঐ ব্যাঙ্কে যোগ দিয়েছে। আর সেই বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকার নেতৃত্ব মেনে পিছেপিছে চলা শুরু করেছিল ইউরোপ। এই প্রথম নিজের স্বার্থ আমেরিকার চেয়ে আলাদা বলে অনুভব ও দাবি করে এরাও (মানে ইউরোপের প্রধান তিন প্রভাবশালী – জর্মন, বৃটিশ ও ফরাসী) চীনের নেতৃত্বে AIIB উদ্যোগে পতাকা তুলতে দেরি করে নাই।  যদিও এই প্রসঙ্গে খোস ট্রাম্প কী অবস্থান নিবেন এখনও কিছুই জানা যায় নাই।

ওবামার এক আদরের নীতি হল বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি বা চুক্তি জোট গড়া। ওসব উদ্যোগে ওবামা মুখ্য বিশেষ্যত্ব হল ঐ চুক্তি বা বাণিজ্য জোট গুলোতে চীনকে বাদ রাখতে হবে।  চীনকে বাদ দিয়ে এরপর বাকিদের নিয়ে আমেরিকাসহ নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি (টিপিপি অথবা নাফটা) – এগুলো পুনর্গঠনের পক্ষে ট্রাম্প কথা বলছেন।খুব সম্ভবত চীনকে বাদ রাখা এটা খুব কাজের মানে কার্যকর সুবিধা আমেরিকাকে দিবে না অসুবিধা ডেকে আনবে – এটাই সম্ভবত ট্রাম্পের কাছে ইস্যু।

এক কথায় বললে চীনের উত্থানে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নতুন বিন্যাস ও অবস্থানের দিক থেকে আমেরিকার ভূমিকা কী? আর যাই হোক এতা নিশ্চয় আর আগের মত জায়গায় নাই। ফলে যে সব কোর বিশ্বাস বুঝাবুঝির উপরত আমেরিকার গত সত্তর বছর ধরে দাড়িয়ে ছিল তা বদলবার স্ময় হয়েছে।  ট্রাম্প সম্ভবত এ বিষয়গুলো এই প্রথম ঢেলে ভিন্ন দিক থেকে দেখে নতুন কিছু করতে চাইছেন। স্বভাবতই ট্রাম্পের প্রসঙ্গগুলো যত বিশাল, সে তুলনায় আমাদের কাছে তথ্য যেন আপাতত ততই কম। ফলে কোথায় তা কত দূর যেতে পারবে, আদৌ সম্ভব কি না তা দেখা-বোঝার জন্য আমাদের অনেক অপেক্ষা করতে হবে। তবে কোনোভাবেই বিষয়গুলোকে ট্রাম্পের নির্বাচনপূর্ব রেঠরিক মাত্র এই সংকীর্ণতা দিয়ে বুঝতে চাওয়া অর্থহীন হবে। একবাক্যে বললে, ট্রাম্প সম্ভবত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইছেন যেদিক থেকে আগে কখনই দেখা হয় নাই। যদিও বিষয়গুলো যথেষ্ট প্রকাধ্য হয় নাই এখনও।

এ প্রসঙ্গের লেজ ধরে আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাহলে সামনে উদয় হয়। চীন-আমেরিকার সম্পর্ককে এখন থেকে কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইলে স্বভাবতই ট্রাম্পের আমেরিকার সাথে ভারতের অথবা বাংলাদেশ নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। কারণ চীন দাবড়াতে হবে – এই অনুমানের উপরেই বর্তমান বহুপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক সম্পর্কগুলো সাজানো। অতএব ট্রাম্পের নতুন দৃষ্টভঙ্গীতে এর ভেতর কোনো বিশেষ এবং নতুন দিক থাকবে কি না সে বিষয় এশিয়ার ভারত বা বাংলাদেশ এই দুই দেশেই আপাতত ক্লুহীন। হাসিনার দ্বিধা মনে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোটা সে আলোকে দেখা যেতে পারে। তবে চীনের সাথে ট্রাম্পের নতুন সম্পর্ক সাজানোর দিকটি মাথায় রাখলে তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ওপর তার কিছু কিছু ছাপ, নতুন বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়ার কথা। সম্ভবত ওবামার ‘চীন ঠেকানো’ টাইপের অবস্থান – – এটাকেই  ট্রাম্প ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন। ট্রাম্প এ রকম বহু প্রসঙ্গ তুলেছেন তা চূড়ান্ত নয়, বরং এগুলো ডেভেলপিং বলাই ভাল। তাই এক কথায় সব কিছুই  – ওয়েট অ্যান্ড সি, ডোন্ট কনক্লুড।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল।  আজ ১৬ নভেম্বর ঐ লেখা আরো সংযোজন ও এডিট করে আবার এখানে ছাপা হল। ]