ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত

ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত

গৌতম দাস

২১ ডিসেম্বর ২০১৬ বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2aC

 

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত ডোনাল্ড ট্রাম্প আগামী মাসে ২০ জানুয়ারি পরবর্তি চার বছরের জন্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। এই চার বছর পৃথিবীর ইতিহাস রুটিন ইতিহাস না হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে। বরং মনে হচ্ছে, বিরাট উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলিতে পরিপূর্ণ হতে চলেছে। সে সম্ভাবনা এতই প্রবলতর হচ্ছে যে, যদি না মাঝপথে প্রেসিডেন্টকে ইমপিচের মতো কোনো ঘটনাতে সব কিছু থামিয়ে পথ বদলে যায়, তবে আমাদের পরিচিত দুনিয়া ও দুনিয়ার পরিবর্তন যেভাবে ও ধাপে ঘটে বলে আমাদের ধারণা বা অনুমান আছে, তা এবার ভেঙে যাবে। দুনিয়া অপরিচিত হয়ে উঠবে। এসব সম্ভাবনা বাড়ছে তো বাড়ছেই। ট্রাম্পের উত্থানের ফলে এমন উদাহরণ ও প্রমাণ হিসেবে অনেক ঘটনাই উল্লেখ করা যায়। আজ এখানে তেমনই এক বিষয় বা ইস্যু –  ট্রাম্প ও তাইওয়ানের চলতি প্রেসিডেন্টের (Tsai Ing-wen) ফোনালাপ নিয়ে আলোচনা করব। Continue reading “ট্রাম্পের তাইওয়ান ফোনালাপ, কেন তা সম্ভাব্য সংঘাতের ইঙ্গিত”

Advertisements

আমেরিকার উত্থান-পতনে অস্থিরতা

আমেরিকার উত্থান-পতনে অস্থিরতা
গৌতম দাস
২৬ নভেম্বর ২০১৬, শনিবার
http://wp.me/p1sCvy-26p

বড় এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন অস্থিরতা আবার এই প্রথম। সাম্প্রতিক নির্বাচনে অনেক উত্তেজনা ছড়ানোর পর আমেরিকা এক নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট পেয়েছে, এ জন্যই কি অস্থিরতা? কিন্তু প্রেসিডেন্ট তো পেয়েই গেছে, তাহলে আর অস্থিরতা কেন? আসলে আমেরিকার নির্বাচনকে মাধ্যম করে অস্থিরতা এর ভেতর দিয়ে বাইরে প্রকাশ্যে এসেছে। তাহলে ভেতরের দিক, মানে অস্থিরতা উৎস কোথায় ও কেন? তাই এখন বোঝা দরকার।
যে প্রসঙ্গ ধরে এর জবাব খুঁজব তা হল, গ্লোবাল নেতৃত্ব। গ্লোবাল নেতৃত্বে এখন আছে কে, কবে থেকে? এবং কোন প্রক্রিয়ায় সে সমাসীন হয়েছিল এই দিকগুলো খুজে দেখে আগাব। আমাদের অনেকের হয়ত পছন্দ হবে না। বিশেষ করে যারা স্টালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নের বয়ানের বাইরে আর কোন বয়ান এবং বিশেষত, ঐ বয়ানের সাথে মিলে না এমন কোন ফ্যাক্টস বা ইনফরমেশন থাকতেই পারে না বলে মনে করেন, তাদের কথা বলছি। তাদের পছন্দ না হলেও কথা সত্য যে , আমেরিকা বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুনিয়ার নেতৃত্ব নিয়েছে ও নেতৃত্ব দিয়ে আসছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল থেকে। তাতে আমাদের পছন্দ অনুযায়ী আমরা এ’ঘটনাকে ভাল অথবা মন্দ বলে যে যাই বিবেচনা করি না কেন, এটাই কঠিন সত্যি। আর মোটা দাগে বললে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৩৯-৪৫) মাঝামাঝি ১৯৪১ সালের আগস্টে আমেরিকা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রত্যক্ষ পক্ষ নেয়ার, অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। ততকালের পরপর চারবারের (১৯৩২-১৯৪৪) নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হলেন ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট (Franklin Delano Roosevelt, known as FDR)। আর বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উইলস্টন চার্চিল (Sir Winston Leonard Spencer-Churchill)। রুজভেল্ট-চার্চিল ১৯৪১ সালের ১৪ আগষ্ট স্বাক্ষরিত বিখ্যাত চুক্তির নাম আটল্যান্টিক চার্টার (Atlantic Charter 1941)। এই আটল্যান্টিক চুক্তিকে বলা যায় সেরা কলোনি মাস্টার ও বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে লিখে দেওয়া দাসখত স্বাক্ষর। আর আর এক দিক থেকে বলা যায় ঐ চুক্তি হাতে পেয়ে রুজভেল্ট নিশ্চিত হন যে দুনিয়ায় তখন থেকে আমেরিকান নেতৃত্বে আসা নিশ্চিত হয়েছে। কেন এমন বলছি? ঐ চুক্তিকে দাসখত বলছি এজন্য যে ঐ চুক্তিতে আটটা পয়েন্ট আছে যার তৃতীয় পয়েন্টে হল যে, যে কোন রাষ্ট্রের নাগরিকের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (self government) এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব (sovereign rights) এই নাগরিক অধিকার ঐ দুই নেতা স্বীকার করেছিলেন ও সম্মান দেখাতে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমরা হয়ত এখনও বুঝি নাই তাতে কী? তাতে বিরাট কিছু। কারণ আমরা তখনও ছিলাম বৃটিশ কলোনি – কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়ার বাসিন্দা। তার মানে ঐ চুক্তিতে চার্চিল স্বীকার করে নিয়েছেন যে বৃটিশ-ইন্ডিয়ার নাগরিক আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার (self government) এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ত্ব (sovereign rights) এই দুই নাগরিক অধিকার আছে। আর এই অধিকার থাকার অর্থ বৃটিশ সরকারের ইন্ডিয়াকে কলোনি করে রাখা অবৈধ। আর এটাই খোদ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী আটলান্টিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে স্বীকার করে নিয়েছেন।  কে স্বীকার করছেন? করছেন বৃটিশ মাস্টার। যে বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্য দম্ভ আর গর্ব  করে বলত, “বৃটিশ কলোনি সাম্রাজ্যের সুর্য নাকি কোনদিন অস্ত যাবে না”।আর এটাই ছিল রুজভেল্টের চার্চিলের বৃটেনকে যুদ্ধে সামরিক সাহায্য সহযোগিতা ও হিটলারের বিরুদ্ধে তাদের পক্ষ নেবার শর্ত। এজন্যই যুদ্ধের পর দুনিয়া জুড়ে  কলোনি-মুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যেতে দেখেছিলাম। এর সাথে অবশ্য বৃটিশ বিরোধী বা কলোনি বিরোধী স্থানীয় জনগণের যেসব আন্দোলন ছিল এসবের ভুমিকাও ফেলনা নয়। অর্থাৎ কোনটাই অগুরুত্বপুর্ণ না, সংযুক্ত উপাদান।

তবে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল কেন রুজভেল্টের শর্তে আটল্যান্টিক চুক্তি করেছিলেন? আর তাতে কলোনি শব্দটা উচ্চারণ না করেও তবে ভিন্ন ভাষায় কোন রাষ্ট্রকে “কলোনি করে রাখা অবৈধ” – তা স্বীকার করেছিলেন কেন? এর প্রধান কারণ, হিটলারের জর্মানির হাতে ততদিনে ফ্রান্সের পরাজয় ঘটে গিয়েছে। মানে ফ্রান্স ১৯৪০ সালের জুন থেকে জর্মানির দখলে চলে গেছে। আর ফ্রান্স আর ইংল্যান্ডের মাঝে হল ইংলিশ চ্যানেল। অর্থাৎ বৃটেনের দিক থেকে দেখলে চার্চিল, বৃটেন থেকে ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে ফ্রান্সকে দেখছিলেন যে হিটলারের হাতে ইতোমধ্যে চলে গিয়েছে। যার মানে শত্রু ইংলিশ চ্যানেলের অপর পাড় পর্যন্ত এসে গিয়েছে। ওদিকে ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু থেকেই বৃটেনের গোলাবারুদসহ যুদ্ধের উপকরণের অভাব চলছিল। একমাত্র সাপ্লায়ার আমেরিকার নিজের “ক্যাশ এন্ড ক্যারি আইন ১৯৩৭”, আর “নিউট্রালিটি এক্ট ১৯৪০” (যে সে যুদ্ধে কোন পক্ষে জড়াবে না) – এই দুই আইনের কারণে কেবল নগদ সোনায় মুল্য পরিশোধের শর্তে তাও সীমিত পর্যায়ে সাপ্লাই বজায় রেখেছিল। বৃটেনের নগদ সোনার সামর্থও ১৯৪০ সালের শেষ নাগাদ ফুরিয়ে আসে। এই মরিয়া অবস্থাকে বাঁচার জন্য চার্চিলের একমাত্র পথ খোলা ছিল রুজভেল্টের শর্তে আটলান্টিক চার্টার স্বাক্ষরে রাজি হওয়া।

অতএব তখন থেকেই যুদ্ধের পরিণতি, যুদ্ধের বিজয়, বিজয়-পরবর্তী নতুন করে দুনিয়া সাজানো ইত্যাদি সব কিছুতে নির্ধারক ভূমিকা নিয়ে আমেরিকা নেতৃত্বে চলে আসার সুযোগ তৈরি হয়ে এসেছিল। কিন্তু রুজভেল্টের দিক থেকে কলোনি অবৈধ বা কলোনি মুক্তি শর্ত হল কেন?  আর তাতে আমেরিকার কী লাভ? প্রথমত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিশ্বব্যাপী একটা যুদ্ধ ছিল ঠিকই, তবে সেদিকের চেয়ে এর প্রধান গুরুত্ব হল- এই যুদ্ধের হাত ধরে তদানীন্তন দুনিয়ার এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়ায় প্রবেশ ঘটেছিল। কী সে নতুন সম্পর্ক? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় ১৯৪৫ সালে। ফলে ১৯৪৫ সালকে বেঞ্চমার্ক ধরলে তার আগের দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য ছিল, সেটা কলোনি শাসন সম্পর্কের দুনিয়া। ইউরোপের ব্রিটিশ ও ফরাসিরাসহ মোট পাঁচ-ছয়টি সাম্রাজ্য-রাষ্ট্র সমগ্র দুনিয়ার বাকি রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিজেদের কারো না কারো ভাগের দখলি কলোনি করে নিয়ে রেখেছিল। এশিয়া ও আফ্রিকা দুটা পুরা মহাদেশকে উপনিবেশ বা কলোনি বানিয়ে রাখা কলোনিকর্তা ছিল ইউরোপ। কেবল আমেরিকা এসবের ভেতরে ছিল না, আলাদা অবস্থান ছিল তার। এই ছিল সেই কলোনি-সম্পর্কের দুনিয়ার শাসন চিত্র। আর এর বিপরীতে ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়ার বৈশিষ্ট্য হল – কলোনি শাসন-সম্পর্কের অবসান। দুনিয়া কলোনিমুক্ত হওয়ার যুগ। ফলে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও তারা এরপর থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র; অন্তত প্রত্যক্ষ বিদেশী শাসনের অধীনে আর তারা রইল না। তবে এক নতুন সম্পর্ক – আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সম্পর্কের ভেতরে তাদের প্রবেশ ঘটে। বলা বাহুল্য, আগের কলোনি শাসন সম্পর্কের বদলে এটা তুলনামূলক অর্থে, অবশ্যই ভাল। কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র তারা বটে, তবে নিজের দুর্বল অর্থনীতি, অগ্রসর অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলোর সাথে অসম সম্পর্ক, দুর্বল চুক্তি করার ক্ষমতা, দুর্বল বিনিয়োগ সক্ষমতা ইত্যাদি এগুলো বৈশিষ্ট্য তাদের। এক ভিয়েতনাম (১৯৭৫) বাদ দিলে এশিয়ার কলোনিমুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হতে পুরো পঞ্চাশের দশক পার হয়ে যায়। আর আফ্রিকায় দক্ষিণ আফ্রিকাকে (১৯৯৪) বাদ দিলে কলোনি শেষ হতে সেখানে সত্তরের দশক পর্যন্ত লেগে যায়। এভাবে বহু সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও এটাই সেই আমেরিকার নেতৃত্বে ক্যাপিটালিজমের এক নতুন সম্পর্কের দুনিয়া। কলোনি-ক্যাপিটালিজমের সাথে তুলনায় বিপরীতে আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল-ক্যাপিটালিজমের এক নয়া দুনিয়া। ততকালে উঠে আসা ব্যাপক পুজি বিনিয়োগ সক্ষমতার গ্লোবাল পুজি বাজারের আড়ত – ওয়াল স্ট্রিট – এর স্বার্থ ছিল আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল-ক্যাপিটালিজম।
দ্বিতীয়ত, আমেরিকার পক্ষে এই নেতৃত্ব নেয়া বা দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেয়া কেন সম্ভব হয়েছিল, এ দিক থেকে ঘটনা ব্যাখ্যা করলে দেখা যায়, এর মৌলিক কারণ আমেরিকার অর্থনৈতিক সক্ষমতা। বলা হয় ১৮৮০ সাল থেকেই অর্থনীতিতে উদ্বৃত্ত সঞ্চয় ও পুঞ্জীভবনের দিক থেকে আমেরিকা সেকালের সবচেয়ে বড় কলোনিমাস্টার, এম্পেরিয়াল ইংল্যান্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের নাৎসিবিরোধী অ্যালায়েড ফোর্স – এই জোটের সব রাষ্ট্রকেই আমেরিকা এককভাবে সাহায্য করতে সক্ষম ছিল এবং তা করেছিল। অর্থাৎ মোট যুদ্ধখরচের এক প্রধান অংশ আমেরিকা একাই বহন করতে সক্ষম ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নসহ নাৎসি ব্লক-বিরোধী সবাইকে আমেরিকা অর্থ (তৈরী পণ্য পাঠিয়ে যেমন- যুদ্ধজাহাজ, প্লেন থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের খাদ্যদ্রব্য বা সেনা-ইউনিফর্মসহ সবকিছু) ধার দিয়েছিল। ধার লিখলাম বটে; কিন্তু কবে কিভাবে এটা পরিশোধ হবে, তা উহ্য রেখে এই সাহায্য দেয়া হয়েছিল। আমেরিকার ‘লেন্ড অ্যান্ড লিজ অ্যাক্ট’ নামে এক আইনের অধীনে এটা দেয়া হয়েছিল। এই আইনের অনেকগুলো ভার্সন আছে। আইনটি শুরু হয়েছিল ১৯৩৫ সাল থেকে cash & Carry act এবং  Neutrality act নামে বিভিন্ন সংশোধিত ভার্সান থেকে। এরপর Lend-Lease Act”  ১৯৩৯ আর শেষে ১৯৪১ সালের সংশোধিত ভার্সনই এখানে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। কংগ্রেস ও সিনেটে পাস হওয়া এই আইনের মূল কথা- আমেরিকার নিরাপত্তার স্বার্থে প্রেসিডেন্টকে এক অবাধ ক্ষমতা দেয়া হয়। যেমন- প্রেসিডেন্ট যদি মনে করেন অমুক রাষ্ট্রকে একটা নতুন যুদ্ধজাহাজ দেয়া কিংবা ১০০ টন চিনি পাঠিয়ে দেয়া আমেরিকা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে জরুরি, তবে প্রেসিডেন্ট ওই রাষ্ট্রকে এই আইনে তা দিতে পারেন। অর্থাৎ মূল শর্ত হল, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ‘মনে করলেই’ (deem) যথেষ্ট। এখানে লক্ষণীয় হল, এটা অনুদান বলা হয় নাই। বরং সুনির্দিষ্ট করে আমেরিকা সরকারের দেয়া ধার অথবা লিজ। ফলে তা পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু কবে কিভাবে, তা নিয়ে কোনো শর্ত নেই। উল্লেখও নাই। ইচ্ছা করে এ দিকটি উহ্য রাখার নিয়ম করা  হয়েছিল, যাতে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট সেটা পরে কোনো এক সময় উভয় রাষ্ট্রের সুবিধা-অসুবিধা বিবেচনায় নিয়ে তা ঠিক করতে পারেন। চাই কী মাফ করে দিতে পারেন। যুদ্ধ শেষে এক হিসাবে দেখা যায়, আমেরিকা এই আইনে ধার অথবা লিজ দেয়া মোট সম্পদ হস্তান্তর করে ফেলেছে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের। (এখনকার ২০১০ সালের সমতুল্য মুল্যে এটা ৭৫০ বিলিয়ন ডলার)। ওর মধ্য কেবল সোভিয়েত ইউনিয়নকে দেয়া হয়েছিল ১১ বিলিয়ন ডলারের (মোট ৫০ বিলিয়ন ডলারের ২২% ) সাহায্য-পণ্য। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে আমেরিকার লেন্ড এন্ড লিজ আইনে করা সাহায্য চুক্তির প্রটোকল এখানে দেখা যেতে পারে। যুদ্ধ শেষে এই খরচের বেশির ভাগই মওকুফ করে দেয়া হয়। কোনো জাহাজ বা প্লেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত বা নষ্ট হলে তা নিজেদের এলায়েড যুদ্ধজোটের  পক্ষ থেকে হয়েছে বলে তার কোনো দাম ধরা হয়নি। আর বাকিটা দীর্ঘ ৬০ বছরের কিস্তিতে ২ শতাংশ সুদে পরিশোধ করার ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এই পরিশোধের চেয়েও তখন বড় প্রসঙ্গ হয়ে উঠেছিল, সারা ইউরোপে যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠনে বিনিয়োগ কে কোথা থেকে জোগাড় করবে? কে দেবে? সে সময় সক্ষম একমাত্র রাষ্ট্র ছিল আমেরিকা। ইতালিতে দুর্ভিক্ষাবস্থা সামলাতে অনুদান দেয়া থেকে শুরু করে রাস্তাঘাটসহ সারা ইউরোপে ভেঙে পড়া অবকাঠামো আবার নির্মাণ, কারখানা পুনর্নির্মাণ এবং তা চালু করার পুঁজি, এভাবে সব কিছুতেই বিনিয়োগ ঢেলে দেয় একা আমেরিকাই। বলা হয়, যুদ্ধের খরচের প্রায় সমপরিমাণ বিনিয়োগ শুধু অবকাঠামো পুনর্নির্মাণেই ব্যয় করতে হয়েছিল। ইতোমধ্যে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ আর ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গঠন করা হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এই প্রথম সচল হতে শুরু করেছিল। অপর দিকে, ইউরোপের জার্মানি আর এশিয়ায় জাপানের যুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠনের জন্য আমেরিকা বিশেষ বিনিয়োগ প্রোগ্রামে ‘মার্শাল প্লান’ নিয়েছিল। এভাবেই আমেরিকার নেতৃত্বে এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম গড়ে উঠেছিল। সেই থেকে নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, জাতিসঙ্ঘ এবং ১৯৪৮ সালের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ইত্যাদির মাধ্যমে গ্লোবাল নিয়মশৃঙ্খলার এক অর্ডার কায়েম করেছিল আমেরিকার নেতৃত্ব। আর স্বভাবতই নিজের স্বার্থকে প্রাধান্যে রেখে একক দুনিয়া চালিয়ে আসছিল দেশটি।
ইউরোপের কলোনি ক্যাপিটালের ভেতরেই যেমন আমেরিকার অর্থনৈতিক উত্থান ঘটেছিল ১৮৮০ সালের দিকে, ঠিক তেমনি ১৯৭২ সাল থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করে ফাইনালি চলতি একুশ শতক থেকে নতুন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে চীন হাজির হয়েছে। আর ততটাই চীন আমেরিকান সক্ষমতার বিপরীতে চ্যালেঞ্জ আকারে হাজির হচ্ছে। আমেরিকার ক্রমেই সক্ষমতার দিক থেকে ঢলে পড়ছে। আর এই পথে সে যেতে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনা হল, আমেরিকার আফগানিস্তান (২০০১) ও ইরাকে(২০০৩) হামলা। এক দিকে সমাপ্তিহীন এ যুদ্ধ, আবার যুদ্ধের ফলাফল নিজের পক্ষে তেমন না আসা, আর সব কিছুর ওপর যুদ্ধের সীমাহীন ব্যয়- এসব কারণে আমেরিকার অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খায় সে এখান থেকে। এছাড়াও আবার এরপর গ্লোবাল অর্থনৈতিক মন্দা নেমে আসে ২০০৭ সালের শেষে। এভাবে অর্থনৈতিক দিক থেকে রাষ্ট্রকে পুরাপুরি বিপদে ফেলার কাজটি ভালোভাবেই সম্পন্ন করেছিলেন প্রেসিডেন্ট বুশ তার দুই টার্মে (২০০১-০৮)। এরপর বারাক ওবামা। প্রথম টার্মে তিনি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েছিলেন জানুয়ারি ২০০৯ সালে। আর দ্বিতীয় টার্মে ২০১৩ সালে। এর মধ্যে সর্বপ্রথম ২০১১ সালে, আমেরিকার পুরাতন নীতি-পলিসিগুলো নতুন করে সাজানোর প্রথম সুযোগ পান ওবামা। ইতোমধ্যে তিনি যুদ্ধ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের সময়সীমা সাব্যস্ত করেছিলেন ২০১৪ সাল। কিন্তু দেশের অর্থনীতির শুকিয়ে যাওয়া দেখে তো বটেই, সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত দেখে (আমেরিকান অহঙ্কারে ঘা লেগেছে) এগুলো যে আমেরিকার নেতৃত্ব ও সক্ষমতা ঢলে পড়ার ইঙ্গিত- এ নিয়ে দেশের ভেতরে আলোচনা প্রবল হতে থাকে। ওদিকে ২০১১ সালেই ওবামা প্রথম অনেকটা সরাসরি চীন ঠেকানোর “এশিয়া নীতি” (PIVOT to Asia Policy) ঘোষণা করেছিলেন। আর ঐ বছরেরই মে মাসে ওবামা একসাথে ইউরোপের ছয় রাষ্ট্র সফরে বের হয়েছিলেন।
প্রথমেই আয়ারল্যান্ড ও ব্রিটেন সফরের সময় থেকেই তিনি মনোবল বাড়ানো বা ফেরানোর জন্য বক্তৃতা শুরু করেছিলেন। ‘আমরাই এখনো দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেবো’, ‘পাশ্চাত্য এখনো দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেবে’, এই ছিল তার নতুন বয়ান। বৃটিশ পার্লামেন্টে বক্তৃতায় ওবামা যা বলেছেন তা নিয়ে ২৫ মে ২০১১ বিবিসির ভাষ্য ছিল এরকম,

“……But he rejected arguments that the rise of superpowers like China and India meant the end for American and European influence in the world.
“Perhaps, the argument goes, these nations represent the future, and the time for our leadership has passed. That argument is wrong. The time for our leadership is now,” he said.
“It was the United States, the United Kingdom, and our democratic allies that shaped a world in which new nations could emerge and individuals could thrive.”

এটা তিনি চালিয়ে গিয়েছিলেন ২০১৪ সাল পর্যন্ত। আমেরিকার ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি অ্যাকাডেমির গ্র্যাজুয়েশনে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘উদাহরণ হয়ে আমেরিকাকে দুনিয়াতে নেতৃত্ব দিতে হবে।’ পরের সপ্তাহেই চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ব্যাপারটা নিয়ে ঠাট্টা করেন।  সে যাই হোক, কিন্তু আসল কথা তত দিনে সবাই বুঝে গেছে, আর কিছুই ফিরবে না। আমেরিকার অ্যাকাডেমিক, থিঙ্কট্যাঙ্ক ইত্যাদি সব জায়গায় একই বিতর্ক বিষয়, আমেরিকান নেতৃত্ব, সক্ষমতার ঢলে পড়া। ইতোমধ্যে ২০১১ সালে আমেরিকার ভেতরের চাকরি বা কাজের সুযোগ, উৎপাদন ও পড়ে যাওয়া বাজার ঠিক করতে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ককে পুনঃদরকষাকষিতে নিয়ে কিছু চাকরি এবং সুবিধা ফিরিয়েছিলেন ওবামা। কিন্তু খুব বেশি কিছু হয়নি বা আগায় নাই তাতে। আমেরিকান প্রডাক্ট অথবা লেবার, প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়েছে, এটা এখন প্রতিষ্ঠিত। এসব কিছুর প্রভাবে এক ব্যাপক সামাজিক হতাশা চার দিকে ছেয়ে বসেছে।

এইবারের (২০১৬) আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মূল ইস্যু ছিল আসলে এটাই। এ কাজে ‘রেগুলার পলিটিক্যাল অ্যাপ্রোচ’ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার যারা গিয়েছেন সেই লিবারেলদের পক্ষে কোনো আবেদন ছিল না। তাই যার রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, কখনো কোনো স্তরে জনপ্রতিনিধি ছিলেন না যিনি, এমন এক ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্পই নির্বাচনে সাধারণ ভোটারদের কাছে প্রধান ভরসা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। নির্বাচনে জেতার পর আমেরিকার এখন দরকার এক কল্পিত শত্রু – যার বিরুদ্ধে জনগণকে ক্ষেপিয়ে অভ্যন্তরীণ গণসংহতি তৈরি করতে হবে। স্বভাবতই চাকরির দিক থেকে অবৈধ অভিবাসী, বিদেশী এবং ‘মুসলমান’ এদের বিরুদ্ধে লোক ক্ষেপানো তুলনামূলকভাবে সহজ ও ফলদায়ক বলে মনে করা হয়। অভ্যন্তরীণভাবে এই কৌশলকে যারা সঠিক ও উপযুক্ত মনে করেন, তাদের নতুন নামকরণ হয়েছে উগ্র ডানপন্থী অথবা বিকল্প ডানপন্থী বলে। এরা মনে করেন, এই পথ এখন সবচেয়ে কার্যকর। যেমন ট্রাম্প জিতে গেছেন এখন কে কে ট্রাম্পের সাথে প্রশাসনে বসবেন – তাদেরকে বেছে নিবার লড়াই চলছে। সে লড়াইয়ে এখনও কারা “মুসলমানদের আলাদা রেজিস্ট্রিতে নাম লেখাতে হবে” এর পক্ষে থাকতে চান এটা সেখানে ইস্যু। বিকল্প ডানপন্থীরা মনে করছে, এমন অবস্থান না নিলে নির্বাচিত হিসেবে ক্ষমতার জনভিত্তি দেয়া যাবে না। আবার উল্টো দিকে বিকল্প ডানপন্থীদেরই কারবার দেখে প্রচলিত রিপাবলিকান যারা আছেন, তারা রেসিজম বা ইসলামোফোবিয়ার অভিযোগ বিরোধীরা আনবেন এই ভয়ে বা লিবারেলদের প্রচারণার ভয়ে ভীত। তারা চাচ্ছেন, বিকল্প ডানপন্থীরা যেন ট্রাম্পের আশপাশে মন্ত্রী-উপদেষ্টা হয়ে না আসেন। এই লড়াইটাই এখন এ দু’পক্ষের।
অপর দিকে, ট্রাম্পের মাধ্যমে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার চাপের মুখোমুখি চীন হতে যাচ্ছে, তা তারা বুঝে গেছে। তাই চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উদ্বিগ্ন হয়ে আগেই বলে বেড়াচ্ছেন, (ট্রাম্পকে) মাথা ঠাণ্ডা করে মুখোমুখি বসতে হবে। ডায়ালগ ছাড়া আমাদের উভয়ের বিকল্প নেই। অর্থাৎ শঙ্কা, ট্রাম্পের কোনো গোঁয়ার্তুমিতে গ্লোবাল মন্দায় পড়ে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় কি না। চার দিকে এক বিশাল অস্থিরতা বিরাজ করছে। সব মিলিয়ে এটা স্পষ্ট, সামনের পথ আরো অস্থিরতার, কোনো সহজ পথের আলো কোথাও নেই।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্তের অনলাইন ২২ নভেম্বর সংখ্যায় (প্রিন্টে পরের দিন) কিছুটা ছোট করে ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার অনেক সংযোজন ও এডিট করে নতুন এডিশন হিসাবে আবার ছাপা হল।]

ভারতের ব্যর্থ নেপাল-নীতির পরিণতি কী নির্দেশ করে

ভারতের ব্যর্থ নেপাল-নীতির পরিণতি কী নির্দেশ করে
গৌতম দাস
১০ নভেম্বর, ২০১৫

http://wp.me/p1sCvy-cG

নেপালে গত সাত বছরের মধ্যে দুই বারের কনষ্টিটিউশনাল এসেম্বলি বা সংবিধান সভার নির্বাচন ও সভা পরিচালনা শেষে গত ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ নতুন কনষ্টিটিউশন গৃহীত ও প্রণয়নের কাজ সমাপ্তির ঘোষণা দিতে সক্ষম হয়। এর মধ্য দিয়ে নেপাল এক রিপাবলিক জনরাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে। কিন্তু ভারত প্রকাশ্যেই এর বিরুদ্ধে নিজের আপত্তি অসন্তুষ্টি জানায়। কোন রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশন প্রণয়ন সমাপ্তি ও গৃহীত হবার ঘোষণা বিষয়গুলো একান্তই সে রাষ্ট্রের আভ্যন্তরীণ নিজস্ব ব্যাপার। এটা ভিন রাষ্ট্রের আপত্তির বিষয়ই নয়।  ফলে এনিয়ে ভিন রাষ্ট্রের আপত্তির এক উদাহরণ দেখলাম আমরা।

“নিজে গণতান্ত্রিক দেশ হিসাবে ভারত নিঃসন্দেহে সীমা ছাড়িয়ে পা ফেলেছে, শুধু তাই নয় পড়শি ছোট দেশের উপর নিজের খায়েস চাপানোর চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ভারত বারবার যে কোন রাষ্ট্রের আত্ম-নিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে আওয়াজ তুলে গেছে। দুর্ভাগ্যবশত এই নীতি ভারত নেপালের বেলায় প্রয়োগে ইচ্ছুক নয়” – ডিপ্লোম্যাট ৭ অক্টোবর ২০১৫।  ডিপ্লোম্যাট এশিয়া প্যাসিফিক জোনে ফোকাস করে  জাপান থেকে প্রকাশিত ওয়েব ম্যাগাজিন। এশিয়ায় আমেরিকা-জাপান মিলিত উদ্যোগে কমন ষ্ট্রাটেজিক স্বার্থে পরিচালিত এক থিঙ্কট্যাংকের মন্তব্য, বিশ্লেষণ প্রকাশ করে থাকে। এতে ভারতকেও সামিল করে নেয়া হয়। নিজেদের স্বার্থের দিক থেকে মূলত চীনের বিকাশ, উত্থানকে ষ্টাডি করা  এর মূল ফোকাস। এর এডিটরিয়াল ষ্টাফদের বেশির ভাগই ভারতীয়।

তো এই ডিপ্লোম্যাট পত্রিকার পক্ষেও ভারতের নেপাল নীতি ও পদক্ষেপকে কঠিন সমালোচনা না করে থাকা সম্ভব হয় নাই। নিরবে কিন্তু কঠিন শব্দের এই মন্তব্যে ভারতের মৌলিক নীতিগত বিচ্যুতি দিক ভুলে আঙুল তুলে এটাকে “ওভারষ্টেপিং” বলা হয়েছে। ডিপ্লোম্যাটের অবস্থান ও বিশ্লেষণ খুব ইন্টারেষ্টিং। ভারতের ইন্ডায়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা দাবি করেছে, নেপালের কনষ্টিটুশন সংবিধান সভায় অনুমোদিত হয়েছে এই ঘোষণা আসার পরও ভারত সাতটা অনুচ্ছেদে পুনরায় সংশোধন আনার জন্য অফিসিয়ালি এক তালিকা হস্তান্তর করে দাবি জানিয়েছে। ভারত এতই মরিয়াভাবে  হস্তক্ষেপ করেছে। ভারত এই রিপোর্ট অস্বীকার করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে থেকে অস্বীকার করলেও বিবৃতি দিলেও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নিজের দাবি থেকে এক চুলও পিছু হটে নাই।

নতুন নেপাল রাষ্ট্র বৈশিষ্ঠের দিক থেকে সাত প্রদেশে বিভক্ত এক ফেডারল কাঠামোর রাষ্ট্র। যদিও প্রদেশগুলোর সীমানা বিষয়ক বিতর্ক এখন জারি আছে, তা টানার কাজ এখনও চূড়ান্ত করা হয় নাই, হবে। কিন্তু এটা নিয়ে নেপাল-ভারত সীমান্তের মাধোসি (Madhesi) ও তরাই সমতলি অঞ্চলের বাসিন্দাদের অসন্তোষকে উস্কে দিয়ে যেন কনষ্টিটিউশন প্রনয়নের কাজ সমাপ্ত হয় নাই – এবং হয় নাই বলার ভিতর দিয়ে নেপালের রাষ্ট্রগঠন ও ক্ষমতা তৈরিতে ভারতের এক ভাগীদার বা স্টেক আছে তাই সে প্রমাণ রাখতে চেয়েছে। নেপালের প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের (মিলিত আসন সংখ্যা ৮৪%) এদের অভিযোগ ভারত মাধোসি ও তরাইদের মধ্যে অসন্তোষ ও উস্কানি ছড়াচ্ছে। পরিশেষে ভারত নেপালের বিরুদ্ধে অঘোষিত ভাবে বাস্তবে কার্যকর এক অবরোধ আরোপ করেছে। ল্যান্ড-লকড নেপাল, পণ্য চলাচলের দিক থেকে যা সম্পুর্ণত ভারতের উপর নির্ভরশীল, বিশেষত তেল-গ্যাস জ্বালানীর সরবরাহের দিক থেকে ১০০ ভাগ নির্ভরশীল নেপালের উপর এই অবরোধ আরোপ করে ভারতের নেপাল উপর নিজের নিয়ন্ত্রণ কত গভীর তা জাহির করতে গিয়েছিল। একথা ঠিক যে অবরোধের প্রথম ৪২ দিন ধরে নেপালের প্রতিটা নাগরিক তা হারে হারে নিজের জীবন দিয়ে বুঝেছিল যে ভারতের কত শক্তি । তবে ভারতের এই শক্তির ব্যবহার নেপালীদের কাছে অত্যাচারীর নির্যাতনকারির হিসাবেই হাজির হয়েছিল। এর প্রতিক্রিয়ার এতে ভারতের প্রাপ্তি পুরা জনগোষ্ঠির বদ-দোয়া। নেপালের জনগণ আশা করে না যে ভারত তাদের বসিয়ে খাওয়াবে। আবার এটাও আশা করে না যে ভারত তাদের স্বাভাবিক জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে।

প্রকৃতির নিয়ম কোন জায়গা খালি থাকে না। ফলে ভারত নেপালকে জ্বালানি সরবরাহ না দিয়ে মারবে এই সিদ্ধান্ত খোদ ভারতের জন্যই বিশাল বিপদ হয়ে হাজির হতে বেশি সময় লাগে নাই। জ্বালানি সরবরাহ-হীন পরিস্থিতি নেপালকে মরিয়া হয়ে বিকল্পের সন্ধানে নামতে বাধ্য করেছিল। গত সপ্তাহ ০২ নভেম্বর থেকে ভারতের মিডিয়ার মনে পড়েছিল যে ট্রাডিশনালি ভারত নেপালের একমাত্র জ্বালানীদাতা, যা এখন আর নয়। সে জায়গা পুরণে এখন চীন হাজির হয়ে গেছে। ভারতের মিডিয়া শিরোণাম এখন এই হারানোর ব্যাথা প্রকাশ করা শুরু করে দিয়েছে। ভারতের টাইমস অব ইন্ডিয়া শিরোনাম করে লিখেছিল, “চীন নেপালে তেল সরবরাহ পাঠানো শুরু করে দিয়েছে, ভারতের একচেটিয়া সরবরাহকারির ভুমিকা হারাল”।

নেপাল ভুখন্ড পুব-পশ্চিম দিক করে বিস্তৃত যার পুরা দক্ষিণ সীমান্ত জুড়ে আছে ভারত। আর ঠিক একইভাবে উত্তর সীমান্ত জুড়ে আছে চীন। নেপালের উত্তর দিক  দক্ষিণ দিকের চেয়ে আরও বেশি উচু পাহাড়ি, সমুদ্রের খবর দক্ষিণ দিকের চেয়ে উত্তর সীমান্ত দিকে আরও বেশি দূরে। এছাড়া ট্রাডিশনালি ভারতের সাথে ও দিক থেকে নেপালের বহিঃবাণিজ্যের আনা-নেওয়া চালু বেশি। এবারের ভারতের নেপাল অবরোধ বিপরীত ফল বয়ে আনতে শুরু করেছিল, ভারতের একচেটিয়ার অবসান ঘটাতে যাচ্ছে তা। নেপাল-চীনের সীমান্তে চলাচলের রাস্তা ও সড়ক কাস্টম দুয়ার চার স্থানে। এর মধ্যে সবচেয়ে চালু ও যোগাযোগ সুবিধাজনক “তাতোপানি” এবং “কেরুঙ” স্থল সীমান্ত। গত ভুমিকম্পে দুটা সীমান্তেই পাহাড়ের পাথর ধ্বস নেমে পুরা রাস্তা ব্লক হয়ে গিয়েছিল। জরুরি ভিত্তিতে তা পরিস্কার করে রাস্তা উন্মুক্ত করা হয়েছে এখন। জ্বালানী তেল সরবরাহের চুক্তি নিয়ে কথা চলছে, চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। দর আর বিস্তারিত বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে। এর আগে শুভেচ্ছা স্বরূপ অনুদান হিসাবে ১০০০ টন জ্বালানীর চালান আসা শুরু হয়ে গেছে গত ১ নভেম্বর থেকে। নেপালের মোট চাহিদার কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ নেপাল চীন থেকে আমদানির স্থায়ী চুক্তি করতে চায়। এই অবস্থা দেখে ভারতের মিডিয়ার সুর নরম ও হতাশার। নেপালকে চাপ দিয়ে ধরার অস্ত্র ভোতা অকেজো হয়েছে দেখে এখন উলটা তা ভারতের উপর চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেছে বলে। ভারতের ভুল নেপাল নীতি এখন সকলের কাছে পরিস্কার হতে শুরু করেছে। ফলে নেপালকে চীনের দিকে নিজেরাই ঠেলে দিয়েছে বলে ভারতীয় মিডিয়ায় এখন আত্মসমালোচনা শুরু হয়ে গেছে। এই অবস্থায় প্রতিযোগিতা অনুভব করে, দোষ কিছু কাটাতে ভারত কিছু কিছু সীমান্ত অবরোধ শিথিল করে তেল ট্যাঙ্কার নেপাল প্রবেশ করতে দেয়া শুরু হয়েছে।
সার করে বললে, ভারতের চাপের কৌশল ভাঙতে, অকেজো করতে নেপাল সরকার সফল হয়েছে। স্বভাবতই এখন ক্রমশ তা বাকি পণ্যে অবরোধ দুর্বল হতে থাকবে।
এই প্রেক্ষিতে ভারতের নেপাল নীতিতে যে সুরে পরিচালিত এর প্রাপ্তি কী তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে । ফলাফল ও ভবিষ্যত নিয়েও মুল্যায়ন শুরু হয়েছে।

ভারতের দিক থেকে ভারত-নেপালের সম্পর্ককে শুরু থেকেই এপর্যন্ত কলোনি অধস্তন সম্পর্ক হিসাবে দেখা হয়েছিল। ভারত সেখানে দাতা বড় ভাই। শুরু থেকে মানে ১৯৫০ সালের ৩১ জুলাই মাসে স্বাক্ষরিত ভারত-নেপাল শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের সময় থেকে। ভারতের বিরুদ্ধে এমন এক অভিযোগ করে কথা শুরু করতে হল কারণ এই চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল পুরানা আগের চুক্তির ধারাবাহিকতায়। আগের কলোনি মাস্টার বৃটিশ-ইন্ডিয়া ও নেপাল সরকারের মধ্যকার চুক্তির ধারাবাহিকতা রক্ষা করার প্রয়োজনে। কলোনী মাস্টারের সাথে নেপালের রাজার সর্বশেষ চুক্তিটা স্বাক্ষর হয়েছিল ১৯২৩ সালে, যেখানে ঐ চুক্তির কার্যকারিতা সমাপ্তির তারিখ উল্লেখ করা ছিল ৩১ জুলাই ১৯৫০। সেকারণেই স্বাধীন ভারতের নেহেরু ও নেপালের রানা রাজবংশে রাজার মধ্যে ঐ ৩১ জুলাই ১৯৫০ তারিখেই নতুন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে ভারতের সাথে নেপালকে চুক্তি করতে হবেই কেন? বাধ্যবাধকতাটা কোথায়? আর এটা আসলে কীসের বা কী বিষয়ক চুক্তি? সংক্ষেপে এর জবাব হল, পুরান কাল থেকেই নেপাল এক ল্যান্ড-লক ভুখন্ড; অর্থাৎ এভুখন্ড সমুদ্র যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, নেপালকে অন্য রাষ্ট্রের ভুমি মাড়িয়ে তবে সমুদ্রের নাগাল পেতে হয়। একমাত্র এভাবেই দুনিয়ার তৃতীয় যে কোন দেশের সাথে নেপালের বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় সম্ভব হয়। ফলে বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমল থেকেই ভারতের ভুমি ব্যবহার করে নেপালকে বৈদেশিক বাণিজ্য বিনিময় চালু রাখতে হয়েছে। আর তাই এই প্রয়োজনে সবসময়ই নেপালকে ভারতের সাথে ভুমি ব্যবহারের চুক্তির উপর নির্ভর করে, হাত জোর করে থাকতে হয়েছে। নির্ভর মানে আক্ষরিক অর্থেই বিষয়টা শুরু থেকেই সবসময় ভারতের ইচ্ছাধীন থেকেছে। প্রত্যেকবার চুক্তির ভারসাম্য ভারতের পক্ষে থেকেছে, এমন শর্ত লিখে চুক্তি করতে হয়েছে যেন নেপাল সমুদ্র বদরে প্রবেশ পেতে বিনিময়ে পুরা দেশ দাসখত হিসাবে লিখে দিয়েছে। বৃটিশ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে প্রথম চুক্তি হয়েছিল ১৮১৬ সালে (Treaty of Sugauli 1816)। সে সময় এই চুক্তি করা হয়েছিল নেপালের এক তৃতীয়াংশ ভূমি বৃটিশ-ভারত কলোনী মাস্টারকে দিয়ে দেয়ার বিনিময়ে। বৃটিশ রাজ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে সদয় সন্তুষ্ট হয়েই তুলনামূলক ছাড় দেয়া এক নতুন চুক্তি করেছিল ১৯২৩ সালে। সে চুক্তির পঞ্চম দফাতেও লেখা ছিল নেপাল সরকার অস্ত্র-শস্ত্রসহ সবকিছুই আমদানী করতে পারবে (“British Government is satisfied that the intentions of the Nepal Government are friendly”) যতক্ষণ বৃটিশ সরকার সন্দেহাতীতভাবে সন্তুষ্ট থাকবে। কিন্তু কী হলে বা বৃটিশ সরকার কীসে সন্তুষ্ট হবে এর কোন তালিকা বা তাল ঠিকানা দেয়া হয় নাই। অথবা সুনির্দিষ্ট করে কোন তালিকা করে কখনও বলা হয় নাই যে কী কী জিনিষ নেপাল আমদানী করতে পারবে। অর্থাৎ কিছুই স্পষ্ট করে উল্লেখ না করে পুরা ব্যাপারটা বৃটিশ সরকারের খেয়ালী ইচ্ছাধীন করে রাখা হয়েছিল।

কেন এরকম করে রাখা হয়েছিল, রাখতে পারে কী না – এমন প্রশ্ন করার সুযোগ ঐকালে ছিল না। অন্য রাষ্ট্রকে দখল করে কলোনি দাস বানিয়ে রাখা অন্যায় – এমন কোন আন্তর্জাতিক আইন বা কনভেনশন বলতে কোন কিছু ১৯৪৪-৪৫ সালে জাতিসংঘ গঠিত হবার আগে দুনিয়াতে ছিল না। ফলে বরং কলোনি দখলের পক্ষে এক ধরণের জোর-যার এর সাফাই এর ইঙ্গিত তখন কাজ করত। কিন্তু জাতিসংঘ গঠিত হয়েছিল আটলান্টা চার্টার চুক্তির উপর ভর করে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ও আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে ১৯৪১ সালে ঐ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। “দুনিয়ায়ে আর কলোনী শাসন চলবে না” – ঠিক এমন ভাষায় না লিখে তবে কলোনী শব্দটা এড়িয়ে আটলান্টা চুক্তির সার কথাটাই ছিল। লিখা হয়েছিল “প্রত্যেক জনগোষ্ঠী নিজের ইচ্ছাধীনের সরকার গঠন, কার অধীনে থাকবে তা নির্ধারণের সার্বভৌমত্ত্ব অধিকার থাকবে”– এই ভাষায়। অর্থাৎ যুদ্ধশেষে জাতিসংঘ গঠন হয়ে যাবার পরে যে কলোনি দখল ও শাসন বেআইনি ও নিন্দনীয় হয়ে যাবে সেটা বুঝা যাচ্ছিল। হয়েছিলও তাই।
কিন্তু তা সত্ত্বেও নেহেরুর ভারত ১৯৫০ সালে আগের কলোনী বৃটিশের অধীনস্ততা চুক্তিটাকেই রাস্তা দেখিয়ে দেয়া মডেল মনে করে, ধরে নিয়ে নেপাল-ভারতের মধ্যে নতুন আর এক দাসখত চুক্তি করেছিল।
দাসখত বলছি এজন্য যে ১৯২৩ সালের চুক্তিতে  তাল ঠিকানাহীন বৃটিশ সরকারের “সন্তুষ্টির” উপর দাড় করানো হয়েছিল। আর ১৯৫০ সালের চুক্তিতে দশ দফা শর্তের পঞ্চম দফায় সন্তুষ্টি কথাটা সরিয়ে আরও অস্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কী শর্তে নেপাল অস্ত্র-শস্ত্র আনতে পারবে তার প্রক্রিয়া কী হবে তা চুক্তির বাইরে কেস টু কেস ভিত্তিতে পরবর্তিতে দু সরকার বসে ঠিক করবে। এছাড়া ষষ্ঠ দফায় নেপালে ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরকে নেপালী নাগরিকের মতই সমান সুযোগ সুবিধা দেয়ার শর্ত আরোপ করা হয়। আর সপ্তম দফায় ভারতে নেপালীরা বসবাস, সম্পত্তির মালিক হওয়া, ব্যবসা করা, চলাচল ইত্যাদির সুবিধা পাবে বলে এর “রেসিপ্রোকাল” বা পালটা নেপালে ভারতীয়দেরও একই সুবিধা দেয়ার শর্ত রাখা হয়। েটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সুবিধা দেয়া আর তা নিতে পারা বা কাজে লাগানোর মধ্যে বিরাট ফারাক আছে। মূলত নেপালের অর্থনীতির ক্ষমতা ও সাইজ ভারতের তুলনায় নস্যি বলে শেষের ষষ্ঠ ও সপ্তম দফার মাধ্যমে রেসিপ্রোকাল সুবিধার কথা বললেও এর সুবিধা নিবার যোগ্যতার দিক থেকে ভারতীয়রাই এগিয়ে থাকবে, ভারতের ব্যবসায়ীরাই তা নিবার যোগ্য হবে। নেপালীরা পারবে না। ফলে কার্যত এটা বিরাট অসাম্য।  ফলে এই ছলে কৌশলে চুক্তিটাকে ভারতের পক্ষে কান্নি মারা ভাবে হাজির করা হয়েছে। এই কারণে ১৯৫০ সালে স্বাধীন ভারতে নেহেরুর করা চুক্তিটাকেও নতুন ধরনের এক কলোনি চুক্তি বলা যায়।
নেপালের দিক থেকে আইডিয়াল চুক্তি হতে পারে, নেপালকে সবকিছুই বাধাহীন আমদানি করতে দিবার বিনিময়ে ভারত বিনিময়ে ঠিক কি চায়, কী শর্তপূরণে তা দিতে চায় এর মধ্যে কোন অস্পষ্টতা না রাখা, ভারতের খেয়ালের উপর ছেড়ে না দেওয়া, সন্তুষ্টি-জাতীয় আবছা নন-কমিটনেন্টের শব্দ এড়ানো সঠিক উপায় হতে পারে। এছাড়া ভারতের দেয়া বিনিময় শর্তের ইকোনমিক মূল্য কত তা যাচাই করা এবং শর্তের পক্ষে ভারতের ন্যায্যতা কী তা শুনতে চাইতে হবে। যেমন ভারতে ব্যবসা করার সুযোগ নেপালীদের দরকার নাই। নেপালের দরকার সমুদ্রে প্রবেশের অধিকার। অথচ এটাকে কি যুক্তি র‍্যাশনালিতে ষষ্ঠ ও সপ্তম দফা হাজির করা হয়েছে তা অস্পষ্ট।
ভারতের দিক থেকে বললে প্রথমত, বৃটিশ উপনিবেশিক বাস্তবতায় সেকালে নেপালের সঙ্গে চুক্তিতে কলোনী দাসখতের বিষয়াদি থাকবে হয়ত এটা স্বাভাবিক।  কিন্তু সে চুক্তি ভারতের সাথে সম্পন্ন হবার কালে তখন বাস্তবতা ভিন্ন। কলোনি শাসন ইতোমধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে ভারতের পুরান বৃটিশ চুক্তিটাকে অনুসরণ করার কোন কারণ নাই। এটা ভালোমানুষি প্রশ্ন নয়। রাষ্ট্রস্বার্থ ভালমানুষির কাজ বা বিষয় নয়। বিষয়টা হল, পুরাণ বৃটিশ-নেপাল চুক্তিটাকে অনুসরণ করা মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভিতর দিয়ে দুনিয়াটা নতুন কী আকার নিল – এর সম্মক উপলব্দি করতে কোন বোধবুদ্ধি না থাকার প্রমাণ। দুনিয়ার এই পরিবর্তনের এর বৈশিষ্ঠসূচক দিক গুলো আঙ্গুলে গুণে নোট নিতে অক্ষমতার প্রমাণ রাখা। যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে দুনিয়াটা দেখতে কেমন হবে – ইমাজিন করে কল্পনায় একে দেখতে রুজভেল্ট চেয়েছিলেন যে, আগের কলোনি ধরণের দখল ও শাসনের কারণে বিশ্ববাণিজ্য বিনিময় খুবই সীমিত পর্যায়ে রয়ে গেলে। কলোনি সম্পর্কের উচ্ছেদ ঘটিয়ে রুজভেল্ট ব্যাপকতর বিশ্ববাণিজ্য বিনিময়, পণ্য ও পুঁজি চলাচলের এক নতুন দুনিয়া দেখতে চেয়েছিলেন। মূল এই বিষয়টা অর্থনের লক্ষ্য তিনি মেপে প্রতিটা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তবে শুরুর ইমাজিনেশন সবসময় ও সবটা পরবর্তিতে বাস্তবে হাজির হয় না। কিন্তু কলোনি সম্পর্ক উচ্ছেদের বিষয়টার ক্ষেত্রে তা হয়েছিল। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠানও অনেক সীমাবদ্ধতা, অকেজো, ঠুঠো হয়ে থাকা, কান্নি মেরে থাকা সত্ত্বেও অনেক আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, নর্মস হাজির করতে পেরেছে। শুধু তাই না ল্যান্ড লকড রাষ্ট্রগুলোর তৃতীয় রাষ্ট্র মাড়িয়ে সমুদ্রে প্রবেশ বিষয়টাকে কতগুলো বিশেষ আগাম শর্তে রাষ্ট্রগুলোর অধিকার হিসাবে আন্তর্জাতিক কনভেনশন ডেকে স্বীকৃতি দিবার পক্ষে এখন কাজ চলছে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘের সদস্য এমন ৩১টা ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্র এই উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের আঙ্কটার্ডের অধীনে সমবেত হয়েছে। ল্যান্ড-লকড রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ রক্ষার্থে তাদেরকে যেন পড়শী রাষ্ট্রের কলোনি-খায়েশের খোরাক না হতে হয় এর জন্য আইন কনভেনশন আনা – এটার এর মূল উদ্দেশ্য। এসব থেকে রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রস্বার্থ বিষয়ক আন্তর্জাতিক চিন্তা প্রকৃতির সাধারণ অভিমুখকে চিনিয়ে নেয়া সম্ভব। এবং বলা যায়, দুনিয়া অন্তত আর কলোনি দখল ও শাসনকে আইনি ন্যায্যতা দিবে না। এমনকি ল্যান্ড-লকড বলে পড়শীর কলোনি-খায়েশের শিকার না হতে হয়, সমুদ্র পর্যন্ত প্রবেশ যেন তারও অধিকার হিসাবে দেখা হয় সে চেষ্টা এখন চলছে।
কাজেই নেহেরু পুরান কলোনিচুক্তি সুত্রে নেপালের উপর আবার কলোনি চুক্তি চাপিয়ে দিবার সুযোগ পাওয়া গেছিল বলেই তা নিতে হবে, নিয়েছেন সেটা কোন দুরদৃষ্টিসম্পন্ন কাজের কথা নয়। এছাড়া, কলোনি সম্পর্কের বিরোধীতা প্রত্যেক জনগোষ্ঠির কাছে একটা নীতিগত ইস্যু। নিশ্চয় ভারতের বেলায় বৃটিশদের কলোনি খায়েশ খারাপ আর নেপালের বেলায় ভারতের কলোনি খায়েশ ভাল – এটা কোন নীতিগত অবস্থান হতে পারে না। তবে আবার একথাও ঠিক যে কোন রাষ্ট্রেরই পড়শী রাষ্ট্রের ভিতর নিজের স্বার্থ দেখতে পাওয়া দোষের নয়। কিন্তু তা পাবার চেষ্টা করতে হবে আন্তর্জাতিক আইন কনভেনশন এসবের সীমা বজায় রেখে। আর সবচেয়ে ভাল হবে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্সের ততপরতায় বল প্রয়োগে পাবার পথে না হেঁটে এর বিপরীতে সদিচ্ছায় পড়শি নাগরিকের মন জয় ক্তে হবে দেয়া-নেয়ার বিনিময় ও বাণিজ্যের মাধ্যমে।

বিগত ষাট বছরে ভারতের কূটনীতি চেয়েছে পরিচালিত হয়েছে নেপালে একটা বশংবদ দল ও নেতা তৈরি করে পুরান বৃটিশ কলোনি পথে নেপালকে নিজের অধীনে রেখে নিজের স্বার্থ আদায় করা। আজ নেপালে দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক দল্গুলো ভারতের হাত থেকে এক এক করে সবাই হাতছুটে চলে গেছে। সব হারিয়ে নেপালের একমাত্র মাধোশি-তরাই জনগোষ্ঠিই ভারতের ভরসা। ভারতের নীতির ভুলে অবস্থা এমন যায়গায় পৌচেছে যে নেপালী কংগ্রেসের পক্ষেও আজ নেপালে বসে ভারতের পক্ষে থাকা কথা বলার সুযোগ ভারতই রাখেনি। কারণ পুরা নেপাল আজ ভারত-বিরোধী হয়ে গেছে। অথচ বিগত ষাট বছরে রাজা ও নেপালী কংগ্রেসের কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে ভারত খেদমত পেয়েছে। রাজনীতি ও রাষ্ট্রস্বার্থ বিষয়ে আইন কনভেনশনের রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ক গ্লোবাল ট্রেন্ড বুঝবার ক্ষেত্রে ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা যে নাদানিতে আছে এব্যাপারে নেপাল একটা ভাল উদাহরণ। রাষ্ট্র হিসাবে এদের কাছে এমন মডেল হল বৃটিশ কলোনি এমপায়ার। অথচ একালটা  আর এমপায়ার হওয়ার না। না হয়েও বহু কিছু ভোগ অর্জন করা সম্ভব। বল থাকলেই বড়ভাই সেজে, ক্ষমতা দেখিয়ে তা ব্যবহার করতে হবে এই পথে সব কিছু আদায় করতে হবে – এটা খুবই আনকুথ একটা কাজ। এভাবেই আদায় করতে হবে এটা খুব কাজের কথা নয়।
ইতিহাস স্বাক্ষী নেপালের বিরাট তাতপর্যপুর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনে রাজতন্ত্র উচ্ছেদ ও একটা রিপাবলিক রাষ্ট্রের পক্ষে নেপালের রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সমবেত করে দেবার ক্ষেত্রে ভারতের ইতিবাচক ভুমিকা নির্ধারক ও অনুঘটকের এবং এক ইন্টারলকেটর হোস্ট এর। এমনকি আমেরিকার পক্ষেও ইতিবাচক ভুমিকা রাখা সম্ভব ও সহজ হত না ভারতের এমন ভুমিকা না নিলে। তাহলে এটা আজ জ্বলজ্বল করা প্রশ্ন সেই ভারতকে আজ নেপালের মূলধারার তিনসহ সব রাজনৈতিক দল বাদ একমাত্র ভরসা নাম ও যোগ্যতাহীন মাধোসী কেন? মাধোসি যারা নিজেদেরই এখনও কোন পরিপক্ক রাজনৈতিক শক্তি নয়, নেপালের রাজনৈতিক ক্ষমতা গঠনে গোনায় ধরে এমন স্টেকহোল্ডার মাধোসিরা কেউ নয়, হয়ে উঠতে পারে নাই। তাহলে কী বুঝে ২০০৫ সালে ভারত নিজের কোন স্বার্থের কথা ভেবে নেপালের রাজনীতিতে ভুমিকা রাখতে গিয়েছিল? অথচ প্রধান তিন রাজনৈতিক দলের ভারতের বড় প্রভাব রাখার সুযোগ কী সে সময়টাতেই ছিল না! নেপালে ভারতের যা জেনুইন স্বার্থ তা খোলাখুলি সৎ ভাবে এই দলগুলোর সাথে আলাপ করতে পারত। না কোন চুক্তির পুর্বশর্ত হাজির করার জন্য নয়। সে হিসাবে না। উদ্দেশ্য হত ভারতের জেনুইন স্বার্থ প্রসঙ্গে নেপালি রাজনীতিবিদদেরকে স্পষ্ট ধারণা দিয়ে রাখা। আগানোর এপ্রোচের ধরণ দেখে মনে হয় না ভারত এমনভাবে ভেবেছে। বরং আমরা দেখি ভারত সব সময় বশংবদ নেপালি রাজনৈতিক দল পালা-পুষে আগানোর পথে হেটেছে। চিন্তার এই ধারাটাই উপনিবেশিক ও পশ্চাতপদ। ফলে অযোগ্যতা। এই প্রশ্ন উঠছে তাহলে ভারত নেপালি কংগ্রেস আর দুই কমিউনিষ্ট পার্টিকে – প্রধান এই তিন দলকে কেন সাহায্য করেছিল, কী বুঝে করেছিল?
এটাই কী ভারতের রাজনীতিক, আমলা-গোয়েন্দাদের যোগ্যতার সঙ্কটের ইঙ্গিত নয়! এটা অবিশ্বাস্য যে ভারত ২০০৫ সালে নেপালকে আজকের নেপাল হতে নির্ধারক ভুমিকা রেখেছিল সেই তারা আজ নেপালের ধুলায় গড়াগড়ি যাওয়া ভিলেন কেন হবে? চিন্তার অযোগ্যতার পরিণতি এমন করুণই হয়!

[লেখাটা প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়া দিগন্ত ০৮ নভেম্বর ২০১৫ সংখ্যায়। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও সম্পাদনার পর ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

অন্যের বাড়িঘর দেশ দখল করে তাদেরই হত্যা করার ‘সেলফ ডিফেন্স’

অন্যের বাড়িঘর দেশ দখল করে তাদেরই হত্যা করার ‘সেলফ ডিফেন্স’

গৌতম দাস

http://wp.me/p1sCvy-7N

১৯ জুলাই ২০১৪।
জায়নিস্ট ইসরায়েলের হাতে গাজায় ফিলিস্তিনিদের হত্যার উৎসব চলছে। আর এ হত্যাযজ্ঞের পক্ষে ছদ্ম-ন্যায্যতার ইসরায়েলি বয়ান হল, ইসরায়েল নাকি নিজের ‘সেলফ ডিফেন্সের’ জন্য এটা করছে, সুতরাং এটা জায়েজ। ইসরায়েল রাষ্ট্রের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আমেরিকা, ব্রিটেন ইত্যাদির বয়ান হল, তারা ইসরায়েলের সেলফ ডিফেন্সের অধিকার সমর্থন করে। পশ্চিম র‍্যাশানাল, বুদ্ধির যুক্তি ছাড়া তারা কথা বলে না। তো তাদের সেলফ ডিফেন্সের শঠতা চাপাবাজি যদি মেনে নিই, তো তাহলে ফিলিস্তিনিদেরও সেলফ ডিফেন্সের অধিকার থাকার কথা। শুধু তা-ই না, অন্তত জায়নিস্টদের চেয়ে তা দ্বিগুণ বেশি হওয়ার কথা। কারণ ইসরায়েল এমন এক রাষ্ট্র, যে অন্যের বাড়িঘর খোদ রাষ্ট্রের ওপর দখলদার। এছাড়া এর রাষ্ট্রীয় সীমানা প্রতিদিন বাড়ে, এমন অদ্ভুত এক রাষ্ট্র। ফলে প্রথমত. ফিলিস্তিনিদের নিজের রাষ্ট্রভূমি রক্ষার জন্য সেলফ ডিফেন্স প্রতিরোধ সব আন্তর্জাতিক আইনে বৈধ ও স্বীকৃত। দ্বিতীয়ত. নিজের জান ও মাল রক্ষা, আত্মরক্ষার জন্য সেলফ ডিফেন্সে পাথর ছুড়ে মারা, গুলতি মারা, হাতে তৈরি রকেটসহ আরও কিছু সবই বৈধ ও স্বীকৃত। কিন্তু তা পশ্চিমা শঠতা হল এব্যাপারে তারা নিশ্চুপ।

রুজভেল্ট ও চার্চিলের আটলান্টিক চার্টার ১৯৪১
পরপর চারবারের (১৯৩৩-৪৫) আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে নাকে খত দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া দলিল হল, আটলান্টিক চার্টার ১৯৪১। না আমি এতটুকুও বাড়িয়ে বলছি না, এটা আসলেই নাকে খত দিয়ে স্বীকার করিয়ে নেয়া দলিল। এর প্রমাণ হল, ‘হিজ ম্যাজেস্টির’ ব্রিটেন মানে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য তখনো সবচেয়ে বড় রুস্তম কলোনি মাস্টার, আমরাও তখন ব্রিটিশ-ভারত কলোনির অধীন। অথচ ওই আটলান্টিক চার্টারে চার্চিল স্বীকার করে সই করছেন, যা বলে ওর সারকথা হলো কলোনি দখল করা যাবে না, কলোনি দখল অন্যায়। যেমন— ঐ চার্টার ছিল মূলত আমেরিকা ও ব্রিটেনের এক যৌথ ঘোষণা। ওখানে আটটা দফা আছে, যার প্রায় সবই দুনিয়ায় কলোনি দখল ও শাসন আর না চালানো সংক্রান্ত, যদিও কলোনি শব্দ উচ্চারণ না করে তা লেখা হয়েছে। প্রথম দফা বলছে “দুই রাষ্ট্র নিজ ভূখণ্ড বড় করতে কামনা করে না (seek no aggrandizement, territorial or other)”। দ্বিতীয় দফা বলছে, “তারা অন্যের ভূখণ্ড নিয়ে নিজ ভূখণ্ড বড় করার খায়েস রাখে না যদি সে ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের স্বাধীনভাবে প্রকাশিত হওয়ার ইচ্ছা না থাকে”। তৃতীয় দফা বলছে, “কোন ভূখণ্ডের বাসিন্দাদের নিজ পছন্দের সরকার বেছে নেয়ার অধিকারকে তারা সম্মান করে। তাদের সার্বভৌম নিজ সরকার যা জোর করে অন্যে উত্খাত করেছে, সেটা পুনঃস্থাপন করা হয়েছে দেখতে চাওয়া— ওই জনগোষ্ঠীর ‘অধিকার’ এবং আমাদের তা সম্মান জানাতে হবে”। অতএব দেখা যাচ্ছে, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় রুস্তম কলোনি মাস্টারকে দিয়ে এসব স্বীকার করিয়ে নেয়া নাকে খত দেয়া ছাড়া আর কি! আগ্রহীরা পুরা আটলান্টিক চার্টার ১৯৪১ দেখে নিতে পারেন এখানে। বাঘ ঘাস খায় না। তবে কখনও কখনও বাধ্য হয়ে খায়। কখন ও কেন ঘাস খায় তা কি পরিস্থিতিতে তৈরি হয়েছিল, রুজভেল্টের স্বপ্নের আগামী দুনিয়াটা কি ছিল, তা নিয়ে অন্য কোথাও আলোচনা করব। আপাতত দু-একটা বাক্য খরচ করব কেবল। ১৯৩৯ সালে অর্থাৎ আটলান্টা চুক্তির দেড়-দুই বছর আগে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছিল। হিটলারের জার্মানি ফ্রান্স দখল শেষ করে ফেলেছে। আর ইংলিশ চ্যানেলের ওপারে দাঁড়িয়ে এবার ব্রিটেন দখলের বুদ্ধি আঁটছিল। তাই চার্চিল এসেছিলেন রুজভেল্টের কাছে ভিক্ষা মাঙতে যেন তিনি পক্ষ নেন, পাশে দাঁড়ান। ফলে ব্রিটিশ এম্পায়ারের বিস্তর কলোনি যায় যাক, খোদ নিজ ভূখণ্ডটা যদি রক্ষা করা যায়, চার্চিলের কাছে সেই মামলা ছিল ওটা। আর রুজভেল্টের দিক থেকে দেখলে, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর আগামী দুনিয়াটা দেখতে কেমন হবে দেখা সে স্বপ্নের প্রথম দলিল ছিল আটলান্টা চার্টার। কলোনি সম্পর্কের দুনিয়া রুজভেল্টের চোখে হারাম ছিল। তিনি চেয়েছিলেন এক গ্লোবাল ক্যালিটালিজম, ওয়াল ষ্ট্রিটের চোখে দেখা সে স্বপ্নে দুনিয়াটা ছিল পুঁজি বিনিয়োগের বাজার আর বাজার। নিজের সেই স্বপ্নে সায় দেয়ার বিনিময়ের শর্তেই কেবল রুজভেল্টে ইউরোপকে উদ্ধারে রাজি হতে চেয়েছিলেন। তাই ওটা ইউরোপের কলোনি মাস্টারদের দাসখতের দলিল। পরের বছর ১৯৪২ সালের পয়লা জানুয়ারী তারিখে এই “আটলান্টিক চার্টারকেই ভিত্তি” মেনে জাতিসংঘ গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়। এই জাতিসংঘের কাজ কী হবে, সেসবের বিস্তারিত যা জাতিসংঘ চার্টার নামে খ্যাত সেসব লিখে, গৃহীত হয়ে জাতিসংঘ পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ১৯৪৫ সালে। সেলফ ডিফেন্স, রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড, সার্বভৌমত্ব, আত্ম-নিয়ন্ত্রণাধিকার কথাগুলোর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয়ার প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে জাতিসংঘ। কাজেই ইসরায়েল নিজের সেলফ ডিফেন্সের জন্য গাজায় রক্তের নদী বইয়ে দেয়া জায়েজ বলে দাবি পশ্চিমের র‍্যাশানাল মনের বুদ্ধির যুক্তিতেই নাজায়েজ এবং একশ ভাগ মিথ্যা; ভণ্ডামি হিপক্রাসি।

যেভাবে জায়নিস্ট ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ভূমিতে জবরদখল নিল
ফিলিস্তিনিদের দুঃখের শুরু শুধু না, তাদের ফোরফ্রন্টে রেখে সারা দুনিয়াকে বে-ইনসাফ, অনাচার অত্যাচার হত্যা নিপীড়নের দুনিয়া বানানোর কারবারের শুরু বলা যেতে পারে অটোমান সাম্রাজ্যের পতন থেকে। কলোনি লোভি ব্রিটিশের বাসনা ছিল যে, ভূমধ্যসাগর দিয়ে মিসর ফিলিস্তিন হয়ে আগেই দখল হয়ে থাকা ব্রিটিশ-ভারত পর্যন্ত ভূখণ্ডগতভাবে পুরাটাই নিজের কলোনি বিস্তার ছড়ানো। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের খলিফা ব্রিটিশ ও ফরাসি আক্রমণের মুখে সারা দুনিয়ার প্রতি যে আহ্বান (যেখান থেকে খেলাফত আন্দোলনের সূচনা) রেখেছিলেন, তা আংশিক হলেও আজ সত্যি হয়েছে। মিসর, ফিলিস্তিনসহ সারা মধ্যপ্রাচ্য ১৯১৮ সালের আগে ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন। সাম্রাজ্য রক্ষার প্রতিযোগিতায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিল তার প্রধান প্রতিযোগী ও শত্রু। ওদিকে লেট কামার উদীয়মান জার্মান ছিল তাই তার টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে ইউরোপীয় পার্টনার। সেই সূত্রে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (আগস্ট ১৯১৪-নভেম্বর ১৯১৮) পক্ষ-বিপক্ষ ভাগের দিক থেকে তুরস্ক ছিল জার্মানির পক্ষে আর ব্রিটিশ ও ফরাসিদের বিপক্ষে। সে যুদ্ধে জার্মানির সঙ্গে অটোমান তুরস্কেরও পতন হয়। যুদ্ধ শেষে অটোমান এম্পায়ার এলাকাগুলো ভাগ করে নেয় ব্রিটিশ ও ফরাসিরা। এই হলো মোটাদাগে ইতিহাসের ঘটনা। ব্রিটিশ ও ফরাসি দুই কূটনীতিকের (Sir Mark Szkes এবং Georges Picot) স্বাক্ষরিত ভাগবাটোয়ার গোপন চুক্তি হয়েছিল, যার নাম Szkes-Picot Agreement of 1916 অর্থাৎ চলমান যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে ১৯১৬ সালে এই চুক্তি হয়েছিল। এ চুক্তি অনুসারে একদিকে বাগদাদকে রাজধানী করে উত্তরে মসুল আর দক্ষিণে বসরা এ তিন অঞ্চলকে নিয়ে নতুন রাষ্ট্র ইরাকের জন্ম দেয় ব্রিটিশরা, সঙ্গে ভূমধ্যসাগরের তীরের মিসর ও ফিলিস্তিনকে নিজের ভাগে নেয়। অন্যদিকে এ দুয়ের মাঝখানে লেভান্ট অংশ দেয়া হয় ফরাসিদের। Levant ইতালি-ফরাসি উৎসের এ শব্দের আক্ষরিক অর্থ ইংরেজিতে রাইজিং অর্থাৎ উদিত হওয়া, মানে যেখানে সূর্য সবার আগে ওঠে, সেই অঞ্চল, এই অর্থে। একসময় ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরের গ্রিস থেকে মিসর পর্যন্ত সব দেশকেই এক শব্দে লেভান্ট অঞ্চল বলা হত। ভুমধ্যসাগরের পুর্ব তীরের দেশগুলোতে আগে সুর্য উঠে বলে এই নামের উতপত্তি। কালক্রমে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর তার শাসিত সিরিয়া, লেবানন এবং আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল উভয়ের কিছু অংশ, যা ফরাসিদের দিয়ে দেয়া হয়, ফরাসিরা একত্র এই ভূখণ্ডকে লেভেন্ট অঞ্চল নামে ডাকত। [নেপথ্যে বলে রাখি চলমান ইরাকে খলিফা রাষ্ট্র ঘোষণার সময়ে ISIL শব্দের অর্থ ইসলামিক স্টেট অব ইরাক অ্যান্ড লেভেন্ট। অর্থাৎ যারা ব্রিটিশ-ফরাসিদের ইরাক ও লেভেন্ট বলে কলোনি ভাগবাটোয়ারা মানেনা। এই হল লেভান্ট নামের তাতপর্য।] তবে অটোমান সাম্রাজ্য অঞ্চলকে ব্রিটিশ-ফরাসিরা ভাগ করে নিলেও এর আইনি কাগজপত্রের আনুষ্ঠানিকতায় একটা রাখঢাক ছিল। বলা হয়, ‘লীগ অব নেশান’-এর কাছ থেকে ব্রিটিশ-ফরাসিরা এ অঞ্চলগুলোয় ‘ম্যান্ডেট’ হিসেবে শাসন অধিকার পেয়েছিল। [লীগ অব নেশন হলো জাতিসংঘের আগের রূপ ও ভার্সন। গঠিত হয় ১৯২০ সালে, কিন্তু শুরুর দশ বছরের মধ্যে কার্যত অকেজো হয়ে পড়ে, ওর সদস্যদের একে অন্যকে কলোনি দখল করে নেয়ার বিরুদ্ধে বাকি সকলে ন্যূনপক্ষে নিন্দা করতে না পারার কারণে। এরপর তা অকার্যকর পড়েছিল ১৯৪১ সালে আটলান্টা চুক্তি স্বাক্ষরের আগ পর্যন্ত। এরপর লিগ অব নেশনের পুনর্জীবন ঘটে নতুন নামে নতুন চুক্তিতে। ১৯৪২ সালের এক ঘোষণায় এর নাম হয় জাতিসংঘ।] অর্থাৎ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগের তিনশ বছরে ব্রিটিশ ও ফরাসি সাম্রাজ্যের বিভিন্ন কলোনি দখল করে কেটেছে অথচ প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর এবার যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ আদায়ের উছিলার যুক্তিতে জার্মানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা করে আর অটোমান সাম্রাজ্যকে ভাগ করে নেয়। ওই ক্ষতিপূরণ আদায় এবং অটোমান সাম্রাজ্যের নতুন ভাগবন্দোবস্ত দেয়ার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ১৯২০ সালে লিগ অব নেশন গঠিত হয়েছিল। ম্যান্ডেট কথার কাগজপত্রের কনসেপ্টটা হলো, অটোমান সাম্রাজ্যের রাজ্যগুলো লীগ অব নেশানের ‘ট্রাস্টি পরিষদ’ নামের এক বিভাগের হাতে হাওলা করা হলো। এরপর ট্রাস্টি পরিষদ ওর নতুন বিলি বন্দোবস্ত দিল ব্রিটিশ ও ফরাসিদের। এ নতুন বিলিবন্দোবস্তের আইনি নাম ‘ম্যান্ডেট’। লীগ অব নেশন গঠনের আর্টিকেল ২২, এটা ম্যান্ডেট সংক্রান্ত আর্টিকেল।

ম্যান্ডেটঃ লীগ অব নেশন গঠনের আর্টিকেল ২২
আর্টিকেল ২২ বলছে, ‘গত যুদ্ধের ফলে যেসব কলোনি ও ভূখণ্ড, যেগুলো আগের রাষ্ট্রের সর্বভৌমত্বের শাসন অধীনে আর নেই, যেগুলোয় বসবাসকারী বাসিন্দারা শক্তি দেখানোর আধুনিক বিশ্বে (strenuous conditions of the modern world) নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে চলার উপযুক্ত হয়নি, এগুলোয় এ মূলনীতি প্রয়োগ করা হবে যে, এসব জনগণের ভালোমন্দ ও বিকাশ দেখাশোনার জন্য এক সভ্যতার বিশ্বস্ততা ট্রাস্ট (sacred trust of civilisation) গঠন করা হবে এবং তাদের নিরাপত্তা বিষয়টা এ ট্রাস্টের ওপর ন্যস্ত হবে আর ট্রাস্ট পরিষদ গঠন বিষয়টা লীগ অব নেশন উদ্যোগ চুক্তির অংশ গণ্য হবে”।
“এই মূলনীতিকে বাস্তবায়নের সবচেয়ে ভালো উপায় হবে, এসব জনগণকে কোনো অগ্রসর জাতির অভিভাবকত্বে (tutelage) হাওলা করে দেয়া, যারা তাদের সম্পদ, অভিজ্ঞতা অথবা তাদের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ দায়িত্ব পালনে সমর্থ হবে, যারা নিজ ইচ্ছায় এই দায়িত্ব নিতে ইচ্ছুক এবং লিগ অব নেশনের তরফ থেকে এ অভিভাবকত্ব ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হিসেবে দেয়া হবে ও তারা চর্চা করবে”।
“ম্যান্ডেট দায়িত্বপ্রাপ্তরা ট্রাস্টি কাউন্সিলের কাছে অর্পিত দায়িত্ব বিষয়ে এক বার্ষিক রিপোর্ট পেশ করবে। ম্যান্ডেট দায়িত্বপ্রাপ্তদের কর্তৃত্ব, নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রশাসন ক্ষমতা কীভাবে চর্চা করবে, তা এককভাবে ট্রাস্টি কাউন্সিল নির্ধারণ করে দেবে, যদি না এ বিষয়ে লিগের সদস্যদের দ্বারা আগে থেকেই একমতের কোনো সিদ্ধান্ত থাকে।
একটা স্থায়ী কমিশন গঠন করা হবে, যারা ম্যান্ডেট দায়িত্বপ্রাপ্তদের দেয়া বার্ষিক রিপোর্ট গ্রহণ ও নিরীক্ষা করবে এবং তাদের পর্যবেক্ষণের সব বিষয়ে ট্রাস্টি কাউন্সিলের কাছে পরামর্শ রাখবে”।
আগ্রহিরা মূল কপির বিস্তারিত এখানে পাবেন, এখানে সবচেয়ে বড় তামাশাটা হলো, পশ্চিমা ‘সভ্যতা’ কলোনি দখলটাকে নিজ সভ্যতার গৌরব বলে চালিয়ে দেয়া হলো। আবার নিজেই স্বীকার করছে, যে দুনিয়াটাকে তারা “শক্তি দেখানোর আধুনিক বিশ্ব” বানিয়েছে। মানে কলোনি মাস্টারের মাসল দেখানোর ঠেলায় অন্যের নিজ ভূখণ্ড, রাষ্ট্র ও জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার কাজটা তারাই অসম্ভব করে রেখেছে। এছাড়া স্টাডির বিষয় হলো, কথার চাতুরিতে কীভাবে ম্যান্ডেটের নামে আবার কলোনি দখলকে ন্যায্যতা দেয়া হয়েছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয় নভেম্বর ১৯১৮। কিন্তু এর অন্তত এক বছর আগে অর্থাৎ অটোমান সাম্রাজ্য তখনো বহাল, এ অবস্থায় ইসরায়েলি রাষ্ট্র গঠনের ভ্রূণ তৈরি করে রাখা হয়েছিল। দলিলের নাম বেলফোর ঘোষণা (Balfour Declaration 1917), বেলফোর (Arthur James Balfour) ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের তত্কালীন পররাষ্ট্র সচিব। তিনি একটা চিঠি লিখেছিলেন Walter Rothschildকে। ওয়াল্টার হচ্ছেন জার্মান ইহুদি বাবা লর্ড নাথন রথসচাইল্ডের (জার্মান উচ্চারণে রথশিল্ড) সন্তান, পুঁজি ব্যবসায়ী, সরকারি বন্ডের প্রধান ব্যবসায়ী। ইউরোপের চার দেশের চার শহরে চার ছেলে বসে সে সময় পারিবারিকভাবে তারা প্রতিদিনের আন্তর্জাতিক মুদ্রা বিনিময় হার ঠিক করতেন। আজকের হিসাবে ওই পরিবারটাকে সেসময়ের আইএমএফ বলা অত্যুক্তি হবে না। বেলফোরের চিঠিটা ঠিক কোনো সরকারি ঘোষণা নয়। তবে তিনি ইহুদিদের জায়নিস্ট রাষ্ট্রের স্বপ্নের পক্ষে তার সরকারের মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ও সহানুভূতির কথা জানাতে এ চিঠি লেখেন। পরে এ চিঠিকেই বেলফোর ঘোষণার দলিল হিসেবে আবির্ভূত ও দাবি করা হয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হলো এক. ফিলিস্তিনিদের ভূমির ওপরই একক জায়নিস্ট রাষ্ট্র কায়েমের স্বপ্ন অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ব্রিটিশ সরকার কে? কারণ ওই ভূখণ্ডের ওপর তখনও বৃটিশের কোনো কর্তৃত্ব নেই, এখতিয়ার নেই। তখনো তা অটোমান সাম্রাজ্যের অংশ। দুই. ঐ চিঠিতেই বেলফোর আবার বলছেন, “এতে ওই ভূমিতে বসবাস করছে, এমন অ-ইহুদিদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকারের বিরুদ্ধে যায়— এমন কিছু করা হবে না। অথবা অন্য দেশে বসবাসরত ইহুদিদের অধিকার ও রাজনৈতিক স্ট্যাটাস সেখানে যা ভোগ করছে, তা এখানেও অটুট রাখা হবে”। অর্থাৎ মুখে বলছেন, অ-ইহুদিদের ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবেন, কিন্তু বাস্তবে তা অসম্ভব কারণ তিনি এক জায়নিস্ট রাষ্ট্রের স্বপ্ন অনুমোদন করছেন। এছাড়া অন্যের ভূখণ্ডের ওপর কীভাবে এ স্বপ্ন বাস্তবায়ন করবেন, তাদের নির্মূল বা উত্খাত না করে। সুতরাং তারা আগেই জানতেন এটা কথার কথা। অর্থাৎ আজ তো এটা পরিষ্কার যে, বেলফোরের সরকারের নিজ প্রতিশ্রুতিও নিজে রক্ষা করেনি। দ্বিতীয়ত. অন্য দেশে বসবাসকারী ইহুদিদের তিনি মাইগ্রেট করে আনার পরিকল্পনা করছেন এটাও পরিষ্কার। শুধু তাই না, সেসব দেশে ইহুদিরা যেমন রুস্তম হয়ে ছিলেন, জায়নিষ্ট রাষ্ট্রে এখানেও তাদের তেমন রুস্তমি নিশ্চিত করবেন। বাস্তবে আজ সেটাই হয়েছে। কিন্তু এর আইনগত দিকটা আরো মারাত্মক। অন্যকে তাঁর নিজ বাড়িঘর জমিজমা এমনকি দেশ থেকে উত্খাত করে সেখানে কারো স্বপ্নের রাষ্ট্র বাস্তবায়ন করতে চাওয়া— আইনগতভাবে একথা চিঠিতে বলা এটাই মারাত্মক প্রমাণিত অপরাধ।
জায়নিস্ট ইসরায়েল রাষ্ট্র কায়েমের ঘোষণা করা হয় ১৯৪৮ সালে। দুনিয়ার সব রাষ্ট্রের ঘোষণার সময় ওর ভূখণ্ড কোনটা কতটুকু তা ওই ঘোষণার অঙ্গ। কিন্তু যতবার আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ হয়েছে, (১৯৬৭ বা ১৯৭৩) প্রত্যেকবার নতুন নতুন ভূমি দখল করে তাকেও নতুন সীমানা বলে দাবি করা হয়েছে। এসবই হয়েছে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক সব আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। আর পশ্চিমের পরাশক্তিগত দাপটই সেখানে একমাত্র রুস্তম কর্তা, নির্ধারক। আসলে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রগুলোর ওপর চাপ ধরে রাখতেই এমন নুইসেন্স টিকিয়ে রাখা হয়েছে। পশ্চিমের পরাশক্তিগত রুস্তমি হল জায়নিষ্ট ইসরায়েলি রাষ্ট্র টিকে থাকার উৎস। অতএব একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, গ্লোবাল পুঁজিতন্ত্রের ওপর বর্তমান পরাশক্তিগত রুস্তমির সমাপ্তি এবং ভারসাম্য উলট-পালট ও দুর্বল হয়ে গেলেই জায়নিষ্ট ইসরায়েল রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটবে। দুনিয়ায় যে কোনো জায়নিস্ট রাষ্ট্রের বিলুপ্তি অনিবার্য। প্যালেষ্টাইনী প্রতিরোধ, হামাসের প্রতিরোধ লড়াইয়ের বিজয় অনিবার্য।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। লেখাটা গত ১৯ জুলাই ২০১৪ দৈনিক বণিকবার্তা পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে আরও কিছু এডিট করে আবার ছাপা হল। এছাড়া চিন্তা ওয়েবেও একটা ভার্সান ছাপা হয়েছে।]