ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -২

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -২

গৌতম দাস
০৪ নভেম্বর ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1Zw

দ্বিতীয় ও শেষ পর্বঃ
গত পর্বে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তের প্রসঙ্গে বলেছিলাম, গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, তিনি প্রেসিডেন্ট ওবামাকে “বেশ্যার ছেলে” ( ‘son of a whore’) বলে প্রকাশ্যে গালি দিয়ে ছিলেন। এমন শব্দের ব্যবহার খুব ভালো কথা নয় নিশ্চয়ই। ফলে তা প্রশংসার বিষয় নয়। কিন্তু এসবের পেছনে অর্থাৎ আমেরিকার বিরুদ্ধে দুতের্তের ক্ষোভের কারণ ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়াগুলো বোঝার দরকার আছে। সাধারণভাবে বললে, গালি দেয়ার কারণ – প্রেসিডেন্ট দুতের্তে নিজ দেশে অবৈধ ড্রাগের বাড়াবাড়ি বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে ড্রাগ ডিলার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিচারবহির্ভূতভাবে শুধু গুলি করেই মারছে না। দুতের্তে প্রকাশ্যেই দাবি করে বলছেন, “ড্রাগ ডিলাররা তার বৈধ টার্গেট। এরা আরো মরবে”। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় চার্চ, মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর সবশেষে ওবামা মানবাধিকার লঙ্ঘনের আপত্তি তোলায় সবাইকে অশ্লীল ভাষায়, প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাষায় তিনি পাল্টা গালাগালি করেছেন। দুতের্তে বলতে চান, বিচারবহির্র্ভূতভাবে হত্যাকাণ্ডগুলোকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার দিক থেকে দেখে অথবা দেখার সুযোগ নিয়ে অন্য কারো আপত্তি বা সমালোচনা তিনি শুনতে চান না। “তিনি বা তার দেশ যেহেতু এখনো স্বাধীন সার্বভৌম এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রের উপনিবেশ নয়, তাই তাদের ডিকটেশন বা সমালোচনা তিনি শুনবেন না”। এ কথা ঠিক যে, যে কোন রাষ্ট্রের যে কোন উছিলায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ নাই, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনাকে ইস্যু করে আমেরিকার কাছে এমন মানবাধিকার ইস্যু ভিনদেশে হস্তক্ষেপ করার হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করা হয় সময়ে – এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। ফিলিপাইনে ড্রাগের সমস্যা সঙ্কট মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছেছে, তা সমাধানের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি, সে কথাও ঠিক। কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে বড় কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে, তাঁর যে কোন সমালোচককে অভদ্র ভাষায় বাপ-মা তুলে গালি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সবার মূল কথা তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই যে, অন্তত ভদ্রতার খাতিরে ভদ্র ভাষা ব্যবহার করেও তো দুতের্তে তার পয়েন্ট, তার সমস্যা ও বক্তব্য  তুলে ধরতে পারতেন। এমন না করার দোষে তিনি দুষ্ট।
যা হোক, গালাগালি করার এমন পরিস্থিতির ফলে স্বভাবতই ওবামা এরপরে দুতের্তের সাথে তাদের নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করে দেন। যদিও এর পরের দিন দুতের্তে সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে ‘স্যরি’বলে ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু তা কোন কিছুকেই আগের মত স্বাভাবিক করেনি; বরং তা ন্যূনতম একটি কাজ চালানোর মতো কার্যকর সম্পর্কের স্তরেও আর ফিরে আসেনি। এটা সেই থেকে আমেরিকা-ফিলিপাইন সম্পর্ককে পুরান গভীর ঘনিষ্টতার বিপরীতে বিরাট অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

ওবামা-দুতের্তে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, আঞ্চলিক জোট ‘আসিয়ান’-এর সভা, যা এবার আয়োজিত হয়েছিল লাওসে, সেখানেই সাইড লাইনে। মানে মূল অনুষ্ঠান সূচির ফাঁকে। ফলে দুতের্তে-ওবামা দ্বিপক্ষীয় সভা বাতিল হলেও পরোক্ষে তাদের দেখা হয়েছিল ওই আসিয়ান সম্মেলনে, সভার সদস্য হিসেবে। কিন্তু সরি বলার পরও কেন সম্পুরক-পরিস্থতিতে কোন উন্নতি হয় নাই এ বিষয়ে আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ম্যাগাজিন এক এক্সক্লুসিভ বিশেষ রিপোর্ট ছেপেছিল। কিছু ব্যক্তিগত রেফারেন্স থেকে পাওয়া এটা এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ঐ রিপোর্ট বলছে, দুতের্তে  সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে ‘স্যরি’ বলার পর দুতের্তে-ওবামা দ্বিপক্ষীয় সভা আবার আয়োজনের চেষ্টা হচ্ছিল। কিন্তু সম্মেলনেই এক ডিনারের টেবিলে এক ফাঁকে দুতের্তে ওবামার সাথে কথা বলতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করেছিলান। কিন্তু ওবামা দুতের্তের সাথে ঠিকমত কোনো মুখের কথাও বলেনি শুধু তাই নয় ওবামা উল্টো নিজের জুনিয়র স্তরের আমলা প্রতিনিধির সাথে দুতের্তেকে বৈঠকে বসতে প্রস্তাব করেছিলেন। (Mr. Obama said a follow-up would come from White House staff, not himself) এতেই দুতের্তে প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করেন এবং আমেরিকা-ফিলিপাইন গভীর সম্পর্ক এরপর একেবারে আরো খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ায়।

বলা হইয়ে থাকে, আমেরিকা-ফিলিপাইন এদুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিগত প্রায় সত্তর বছরের পুরনো এবং সেকালের আসন্ন কমিউনিস্ট বিপ্লব ঠেকাতে গিয়ে বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতা, আর সেই থেকে আমেরিকান সেনাঘাঁটি স্থাপন হয়ে আছে ফিলিপাইনে। সেই সম্পর্ককে একেবারেই ছিন্ন করে উল্টো পথে হাঁটতে চাইছেন দুতের্তে। অন্তত রাগের মাথায় তাই বলছেন তিনি। সে দিকে বিস্তারে যাওয়ার আগে কোন পশ্চাৎ পটভূমিতে এসব ঘটনাবলি ঘটছে, সেগুলোর একটু স্মরণ ও ঝালাই করে নেব।

একালে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীনের অর্থনৈতিক আসন্ন ও চলতি  উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন বিগত ২০১১ সালে এক ‘এশিয়া নীতি’ ঘোষণা করেছিল। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকাও, এই লক্ষ্যে সাজানো ওই নীতিতে আমেরিকা নিজের ভূমিকাকে কেন্দ্রীয় ত্রাতার (পিভোটাল রোল) জায়গায় দেখিয়ে প্রকাশ করেছিল। ভৌগোলিক দিক থেকে আমেরিকার এই এশিয়া নীতির কেন্দ্রীয় প্রসঙ্গ সমুদ্রপথে চীনা ভূখণ্ডে প্রবেশদ্বার- চীন সাগর; বিশেষত দক্ষিণ চীন সাগরের কথা মনে রেখে।।
চীনা মূল ভূখণ্ড থেকে সমুদ্রে অথবা সমুদ্র থেকে মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের প্রবেশদ্বার একটাই- চীনের পূর্ব দিকে। এই সাগর আসলে একই চীন সাগরের দুই দিক, দুই নামে তা দক্ষিণ চীন সাগর আর পূর্ব চীন সাগর নামে পরিচিত। এর মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরাঞ্চল আরো এগিয়ে তা মহাসাগরে মিশে যাওয়ার আগে চীনের প্রবেশদ্বারের চার দিকে ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ান- এসব দেশের সমুদ্রসীমান্ত। ফলে এসব দেশের সবার সাথে সমুদ্রসীমান্ত বিষয়ে চীনের অমীমাংসিত বিরোধ বিতর্ক আছে। বাইরে থেকে বলা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরের পানির নিচ, সেটা পুরোটাই তেলসহ নানান সমুদ্র সম্পদে সমৃদ্ধ। সে জন্যই এই বিরোধে সবাই সিরিয়াস। কিন্তু এসব সম্পদের হিসাবের কথাগুলো সত্যি না হলেও চীনের কাছে এর গুরুত্ব আলাদা ও বিশেষ ভাবে থাকে, আছে। কারণ, দক্ষিণ চীন সাগর চীনের কাছে নিজের একমাত্র সমুদ্রপথে চলাচল অবাধ রাখা, এবং তা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা – খুবই জরুরি ও নির্ধারক। কারণ নিজের মরা-বাঁচার মত ইস্যু এটা। এদিক তাক করেই আমেরিকা চীনকে বিরক্ত করার এশিয়া নীতি সাজিয়েছে। যার মধ্যে আমেরিকার ভান করার দিক হল, চীনের পড়শিদের স্বার্থ রক্ষা করতেই যেন আমেরিকার এই সুদূর এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতিতে আসার উদ্দেশ্য। নিজেকে পিভোটাল (pivotal বা ক্ষমতা কেন্দ্র) ত্রাতার ভূমিকায় দেখিয়ে হাজির করা। আমেরিকার তৎপরতার ভেতর এসব দিকের কথা চীনের পড়শি সব রাষ্ট্র জানতে পেরেছে সেই ২০১১ সাল থেকে। কিন্তু তারা কেউ সেসময়ই আমেরিকার কথায় মাতেনি। কেন? সারকথায় বললে, তারা আমেরিকার পক্ষে চীন-বিরোধী কোনো যুদ্ধপক্ষের জোট বা ঘোটের মধ্যে ঢুকে নিজেদের জড়াতে বা দেখতে চান না। যুদ্ধ রিস্কি জিনিষ -পুঁজিপাট্টা গায়েব হয়ে যায়। তবে নিজ নিজ ভুখন্ড সীমান্ত-সার্বভৌমত্ব রক্ষার করতে কোন আপোষ করতে তারা যায় না। তাই আশা করে কোনো নীতির ভিত্তিতে সব বিতর্ক সমাধান হয়ে যাক, এটা তারা চায়। এব্যাপারে শুরুতে সবচেয়ে ভোকাল ছিল ফিলিপাইন, যদিও ইতোমধ্যে আমেরিকার প্ররোচনায় সেই ফিলিপাইনই একমাত্র রাষ্ট্র, যে সমুদ্রসীমা বিরোধ মীমাংসার জাতিসঙ্ঘের ট্রাইব্যুনাল ‘আনক্লস’ ( UNCLOS, United Nations Convention on the Law of the Sea)-এ মামলা করেছিল। এই মামলায় আমেরিকার প্রভাবে ফিলিপাইন সম্প্রতি চীনের বিরুদ্ধে নিজের পক্ষে একটা রায় পেয়েছে। যদিও ওই আদালত গঠন নিয়ে আগেই চীনের আপত্তি ছিল আর তা উপেক্ষা করার কারণে চীন মামলা চলার সময়ে সক্রিয়ভাবে কনটেস্ট করেনি। তাই রায় প্রকাশের পরে চীন এই রায় গ্রহণ করেনি বলে জানিয়েছে। তবে রায় প্রকাশের পরে কোনো পক্ষ থেকেই তা সামরিক পদক্ষেপের দিকে যায়নি। তবে রায় প্রকাশের অনেক আগে থেকেই (২০১২ সালে) বাস্তব মাঠে, মাছ ধরার দিক থেকে ফিলিপাইনকে মাছ ধরা থেকে বিরত রেখে আসছিল চীন, সেটাও এখনও তেমনই আছে। এক কথায় বললে, রায় প্রকাশের পর ফিলিপাইনের দিক থেকে তারাও কোনো সামরিক দখল উদ্যোগের দিকে যায়নি বা যাওয়ার কোনো নীতি গ্রহণ করেনি। ইতোমধ্যে ২০১৬ সালের ৩০ জুন দুতের্তে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের শপথ নেন। এরপর থেকে সমুদ্রসীমা বিতর্কে ফিলিপাইনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে নিজ অবস্থানের কথা তিনি জানান। কিন্তু এ নিয়ে কোনো যুদ্ধে জড়ানোর আশঙ্কা তিনি নাকচ করে দেন। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে খোলা ভাষায় পরিষ্কার করে বলছিলেন, চীনের সাথে কোনো যুদ্ধের ব্যাপারে তিনি আগ্রহী নন; বরং দুতের্তে ক্ষমতা নেয়ার পর মাছ ধরার ইস্যু নিয়ে চীনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিল। এগুলো সবই ‘ওবামাসহ সবাইকে গালাগালির প্রসঙ্গ’ হাজির হওয়ার আগেকার ঘটনা। তাই গালাগালির প্রসঙ্গ এবার চীন-ফিলিপাইন সম্পর্ক, আমেরিকার এশিয়া নীতি, আমেরিকা-ফিলিপাইন সামরিক সম্পর্ক ইত্যাদি সব কিছুকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আসিয়ানের লাওস সম্মেলন ছিল গত ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ওখান থেকে দেশে ফিরে দুতের্তে খুব দ্রুত আমেরিকার সাথে পুরনো সম্পর্ক প্রায় ছিঁড়ে ফেলা আর বিপরীতে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করার উদ্যোগ নিতে থাকেন।

আমেরিকা বা ওবামার সাথে শুধু সম্পর্ক ছিন্ন নয়, বরং আমেরিকার সাথে নতুন বিরোধে জড়াতে গত ১৯ অক্টোবর ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট দুতের্তে নিজেই চীন সফরে যান। শুধু তাই নয়, ২০ অক্টোবর রয়টার্স জানাচ্ছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাকে আমরা ‘দুই ভাই’ বলে বরণ করে নিয়েছেন। রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনামই হল, ‘Brothers’ Xi and Duterte cement new-found friendship।  দুতের্তে সেখানে ঘোষণা করেছেন, পুরনো বন্ধু আমেরিকা বাই বাই, দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহল বাতিল, আর এখন থেকে রাশিয়া ও চীন থেকে অস্ত্র কিনবেন তিনি ইত্যাদি। তিনি আরো পরিষ্কার করে বলেছেন, ফিলিপাইন নিজেকে ঢেলে সাজিয়েছে। ফলে এখন ফিলিপাইন, চীন আর রাশিয়া এই হলো তাদের নতুন কৌশলগত অ্যালাইনমেন্ট ইত্যাদি। অর্থাৎ পুরো উল্টো দিকে বেয়ে চলছেন তিনি। তবে এটা সত্যি যে, দুতের্তের ভাষ্যে অনেক রেঠরিক বা বাকচাতুরির প্রপাগান্ডা শব্দ মেশানো আছে। তাই আমরা দুতের্তের নীতিকে ঠাণ্ডা মাথায় বুঝতে তার বদলে তাঁর অর্থনৈতিক উপদেষ্টার মন্তব্য শুনব। চীন সফর শুরু হওয়ার পর তিনি এক বিবৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘এশিয়ান অর্থনৈতিক সমন্বয়ের বিষয়টি অনেক দিন ধরেই ছিল, আপডেট করা হয়নি আমরা সেগুলোতে মনোযোগ দিয়েছি; এর মানে আমরা পশ্চিম থেকে পিঠ ফিরিয়ে নিচ্ছে ঠিক তা নয়।’ …(his top economic policymakers released a statement saying that, while Asian economic integration was “long overdue”, that did not mean the Philippines was turning its back on the West.)

অপর দিকে ফিলিপিনো অর্থসচিব কার্লোস ডোমিঙ্গোজ এবং অর্থপরিকল্পনা সচিব আর্নেস্তো পারনিয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমরা পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক আগের মতোই বজায় রাখব। কিন্তু আমরা প্রতিবেশীর সাথে গভীর সম্পর্কের সমন্বয় কামনা করছি। আমরা আমাদের অঞ্চলের প্রতিবেশীদের সাথে একই কালচার শেয়ার করি আর তাদের ভালো বুঝতে পারি।’ (“We will maintain relations with the West but we desire stronger integration with our neighbors,” said Finance Secretary Carlos Dominguez and Economic Planning Secretary Ernesto Pernia in a joint statement. “We share the culture and a better understanding with our region.”)

উপরে তিন সচিবের দুই বিবৃতি প্রথমত, এটা প্রেসিডেন্ট দুতের্তের গরম ভাষ্যগুলোর থিতু ভার্সন। তবে এটা আমেরিকার সাথে একেবারে সম্পর্ক ছিন্ন নয় অবশ্যই। কিন্তু এটা ফিলিপাইনের সত্যি সত্যিই, আমেরিকার কৌশলগত বলয় থেকে দূরে চলে যাওয়া নির্দেশ করে। ওদিকে এ বিষয়ে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভাষ্য ছিল, ফিলিপাইন আমাদের এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে আগামী সপ্তাহে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে আমেরিকার সেক্রেটারি ডেনিয়েল রাসেল ফিলিপাইন সফর করে নতুন ব্যাপারগুলোর ব্যাখ্যা চাইবেন।

এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে, আমেরিকা-ফিলিপাইনের সম্পর্কের শুরু সেই ষাটের দশকে সশস্ত্র কমিউনিস্ট গেরিলা বিপ্লব ঠেকাতে সরাসরি সামরিক উপস্থিতি দিয়ে সহযোগিতা করা থেকে এখনো ফিলিপাইনে আমেরিকান সামরিক উপস্থিতি আছে। সামরিক বাজেট খরচের অনেক কিছুই এখনো আমেরিকা শেয়ার করে। ফলে আমেরিকাকে ছাড়তে গেলে বহু কিছু এখন ঢেলে সাজাতে হবে। যদিও দুতের্তে প্রকাশ্য ঘোষণায় বলা শুরু করেছেন, তিনি দীর্ঘ সময় প্রেসিডেন্ট থাকলে ফিলিপাইনের সাথে আমেরিকার সামরিক ‘ডিফেন্স ডিল’-এর কথা আমেরিকাকে ভুলে যেতে হবে।

তাহলে মূল বিষয় চীন-ফিলিপাইন সমুদ্রসীমা বিতর্ক বা দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক- নতুন পরিস্থিতিতে এখন কী হবে? দুতের্তে জানাচ্ছেন, সমুদ্রসীমা বিতর্ককে আপাতত তিনি পেছনের বেঞ্চে ফেলে রাখতে চান। বিশেষত যত দিন চীনের সাথে বর্তমানে শুরু করা আলোচনা একটা নির্দিষ্ট আকার না নেয়। অথবা এরপর চীনারা নিজে এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী না হওয়া পর্যন্ত। (Duterte on Wednesday said the South China Sea arbitration case would “take the back seat” during talks, and that he would wait for the Chinese to bring up the issue rather than doing so himself.)

আর চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি-এর বরাতে তারা বলেছেন, যেসব বিতর্ক তাৎক্ষণিক সমাধান করা যাচ্ছে না, সেগুলো আপাতত সরিয়ে রাখা হবে। দুতের্তে জানাচ্ছেন এসবের অর্থ, তিনি “জাতিসঙ্ঘের হেগ ট্রাইব্যুনালে ফিলিপাইনের পক্ষে পাওয়া রায়কে ত্যাগ করছেন বা ছুড়ে ফেলে দিচ্ছেন না, অথবা ফিলিপাইনের সার্বভৌমত্ব কোথাও চীনের কাছে বন্ধকও রাখছেন না।’ আর চীন এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় বলছে, ‘তারা দুতের্তের এই সেন্টিমেন্টকে সমর্থন করেন”। (China has welcomed the Philippines approaches, even as Duterte has vowed not to surrender any sovereignty to Beijing, which views the South China Sea Hague ruling as null and void.)
তাহলে মাছ ধরার ব্যাপারটা কী হবে? গত ২০১২ সালে ‘স্কারবোর্গ শোল’ নামে দ্বীপ থেকে ফিলিপিনো জেলেদেরকে চীন বের করে দিয়ে দখল নিয়েছিল। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি এই শোল দ্বীপের বিষয়ে বা জেলেদের মাছ ধরার অধিকার বিষয়ে কিছু উল্লেখ না করে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন- আমরা উভয় দেশ কোস্টগার্ড ও জেলেদের বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে একমত হয়েছি। আর আমেরিকান সিএনএন দাবি করছে দুতের্তে বলেছেন, ‘মাছ ধরার বিষয়টি আমি চীনাদের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’

হেগ ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে আমার আলাদা বিস্তারে লেখার পরিকল্পনা আছে। তবে আপাতত একটা সারসংক্ষেপ করে বলা যায়, দক্ষিণ চীন সাগর সীমানা বিতর্ককে উসকে দিয়ে আমেরিকা তার এশিয়া পলিসি সাজিয়েছিল, যেখানে আমেরিকা নিজের ভূমিকা কেন্দ্রীয় বা পিভটাল বলে মনে করে। কিন্তু এটা এখন পরিষ্কার যে, আমেরিকার এশিয়া নীতি এই প্রথম মারাত্মক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেল। ফিলিপাইনের আমেরিকাকে ত্যাগ করা এটা আমেরিকার জন্য মারাত্মক থাপ্পড় খাওয়া। বিশেষ করে ফিলিপাইনের পথ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাকি সব রাষ্ট্রের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে – সেদিক থেকে দেখলে। কারণ আমেরিকান এশিয়া নীতি ঘোষণা করার আগে এদের সবার অবস্থান ছিল তারা কেউ কোনো সামরিক বিবাদে জড়াতে চায় না; বরং সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে চীনের সাথে যুক্ত থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদনে উন্নতি করতে চায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই দ্বিতীয় পর্ব আগে দৈনিক নয়াদিগন্তে ৩০ অক্টোবর ২০১৬ (প্রিন্টের পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। আজ এখন সেটা আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল। ]

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

গৌতম দাস
০২ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-1Vh

কোল্ড ওয়ারের শুরুর দিকের পটভুমিতে একাত্তর বছর আগে জন্ম নেয়া এক সম্পর্ক হল ফিলিপাইন-আমেরিকার সম্পর্ক। সম্পর্কের এমন ঘনিষ্ঠতার পিছনে একটা বড় কারণ ছিল সেকালের ফিলিপাইনে সশস্ত্র কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মোকাবিলা। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সেই থেকে ফিলিপাইনে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি স্থাপনা পর্যন্ত গড়ায়। সেই থেকে একাল পর্যন্ত আমেরিকা ফিলিপাইনের এক নম্বর বন্ধু হিসাবেই ছিল। ছিল বলছি এজন্য যে এই সম্পর্কে ভাল রকমের চির ধরেছে। ফিলিপিনো সদ্য নির্বাচিত বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন রডরিগো দুতের্তে। সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর ২০১৬, তিনি চীন সফরে গিয়ে আমেরিকাকে প্রকাশ্যে “বাই বাই” বলেছেন। না এটা ভাবা ভুল হবে যে তিনি নিজ ভাষায় না ইংরাজিতে বলেছেন ফলে কোন ভাষান্তর সমস্যা হয়েছে কিনা। কারণ তিনি জানিয়েছেন তিনি নিজ মাতৃভাষার চেয়ে ইংরাজিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। সেকথার সাথে নিচের ইংরাজি উদ্ধৃতি দেখুন।

Duterte did not hesitate to say that America, which is part of the New World Order, “has lost now. I’ve realigned myself in your ideological flow [China], and maybe I will also go to Russia to talk to Putin and tell him that there are three of us against the world—China, the Philippines, and Russia. It’s the only way.”

Keep in mind that Duterte is not against the West’s achievement in science, medicine, and even in language. Duterte admitted to a reporter that “I am more articulate in English than in my own dialect.”

তো দীর্ঘ এত পুরানা বন্ধু হঠাত উলটা বইতেছেন কেন তা এখানে জানব। ফিলিপাইন সম্পর্কে বিশেষ করে ওর আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গঠন ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের দেশে খুব বেশী জানাশুনা নাই। তাই প্রেসিডেন্ট দুতের্তের চিন্তা বা কর্মসুচীর মুল ফিচারগুলো কী তা বলবার উছিলায় আগে ফিলিপিনো রাজনীতি জনগণ সম্পর্কে পটভুমির দিক থেকে কিছু বলে নিব। তাই লেখাটার দুই অংশ। দ্বিতীয় অংশ আলাদা পোষ্ট হিসাবে আসবে। সেখানে আমেরিকার সঙ্গে ফিলিপাইনের সম্পর্কের অবনতির বিস্তারিত দিকটা জানা যাবে।

প্রথম ভাগঃ ক্রসফায়ার : বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তে। নির্বাচনে জিতে চলতি বছর, ২০১৬ সালের জুন থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আর এর আগে ছিলেন দক্ষিণ ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের সবচেয়ে অগ্রসর শহর ডাভাও এর মেয়র। দুতের্তের নিজ ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রাজনৈতিক ফ্যামিলির সন্তান। বাবা ভিনসেন্ট গনজালেস দুতের্তে ছিলেন ফিলিপাইনের ডাভাও প্রদেশের গভর্নর এবং সিনেটর।  নিজে আইনে গ্র্যাজুয়েট, আইনজীবী ও প্রাক্তন সরকারি প্রসিকিউটর। প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতায় আসার পর তিনি এক কঠিন কর্মসূচি নিয়েছেন। ফিলিপাইনে ড্রাগ ব্যবসার দাপট আর ড্রাগ এডিক্টেট মানুষ ও পরিবারের সংখ্যা দুইই  সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যার এক বিরাট ইস্যু। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে বলছিলেন, পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে এমন ড্রাগগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এও সংখ্যা তার আমলসহ ধরে।  ড্রাগের সাথে সম্পর্কিত সমস্যা ও অপরাধের ব্যাপকতা বা সংখ্যা – এটাই দুতের্তের বিচার-বহির্ভুত হত্যা করে অপরাধীদের মেরে ফেলার পক্ষে একমাত্র যুক্তি। (যারা আরও ডিটেল চান তাদের জন্য। এমন পাঠকেরা এবিষয়ে তাঁর পয়েন্টগুলো ডিটেইল শুনতে আগ্রহী হলে গত ১৫ অক্টোবর আলজাজিরা টিভির নেয়া দুপর্বের সাক্ষাতকার ইউটিউবে দেখুন।) দুতের্তের আমলের মাত্র প্রায় তিন মাস – এর মধ্যেই প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোক বিচার বহির্ভুতভাবে নহত হয়েছেন।  তবে অন্য যে কোন কারও চেয়ে দুতের্তে স্পষ্ট করে বলেন, “আমি যদি এখন সবল হস্তক্ষেপ না করি আমাদের পরবর্তি প্রজন্মের ভবিষ্যত শুন্য হয়ে যাবে। অতএব এই ক্রিমিনাল এরা আমার বৈধ টার্গেট  আমি তাদের হত্যা করব”।  বুঝা যাচ্ছে আইনী দিক থেকে ব্যাপারটা অ-অনুমোদনের সন্দেহ নাই। কিন্তু এধরণের মরিয়া কথা থেকে  ফিলিপিনো সমাজে ড্রাগের ভয়াবহতার রূপ প্রকাশ পায় হয়ত। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট দুতের্তের পক্ষে জনমতের সমর্থন নিয়ে এক জরিপে দেখা গেছে তাঁর রেটিং ৭৬ ভাগ। অর্থাৎ সেই পুরানা কথা যা পপুলার তা আইন সম্মত বা সমর্থিত নাও হতে পারে।

আমাদের দেশে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ওয়্যার অন টেরর কর্মসূচিতে প্রেসিডেন্ট বুশের আমেরিকার দেয়া ফর্দ ও টার্গেটের বাধ্যবাধকতা পূরণ ও পালন। যদিও স্থানীয়ভাবে সে কথা মানুষকে বলার নয় বলে সেকথা আড়ালেই থেকে গেছে। অপর দিকে ফেলে যাওয়া এর আগের মানে হাসিনার প্রথম আওয়ামী সরকারের (১৯৯৬) আমলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষজন অতিষ্ঠ ছিল। ফলে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে র‌্যাবের হাতেই বিচার বহির্ভুত হত্যার সংস্কৃতি বা ‘ক্রসফায়ার’ ফেনোমেনা শুরু হয়েছিল। এতে র‌্যাব বিশাল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেন ত্রাতা। যেন ক্রসফায়ার করার জন্যই র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল, এমন আড়ালও এসে যায় এতে। ক্ষমতায় আসার পর দুতের্তেও এমন জনপ্রিয় একটি কর্মসূচি নেন, যে ড্রাগ ডিলার বা ব্যবসায়ী অথবা ড্রাগ সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত যে কেউ, এদের দেখামাত্র গ্রেফতার ও গুলি। যার আনুষ্ঠানিক আর আইনি আড়াল দেয়ার নাম ক্রসফায়ার, তা চালু করেন। তবে একটু সংশোধন দরকার। এর আগে থেকেই দুতের্তে আসলে বিখ্যাত হয়ে এসেছেন ড্রাগ অপরাধীদের ক্রসফায়ার করেই। ফলে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নতুন না, বরং মেয়র থাকার সময় এটাই ছিল প্রথম  তাঁর মুখ্য কাজ ও পরিচিতি। দুতের্তে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন এ বছর, ২০১৬ সালের ৩০ জুন। এরপর প্রথম দুই মাসেই এমন মৃত্যুর সংখ্যা হয় ২৪০০-এর বেশি, এটা সরকার-ঘোষিত সংখ্যা। অর্থাৎ গড়ে বিরতিহীনভাবে প্রতিদিন নিয়মিত ৪০ জন করে হত্যা করা হয়েছে। (উপরে বলা আলজাজিরাকে দেয়া ঐ সাক্ষাতকারে আপডেটেড সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার বলে প্রথম স্বীকৃত হয়)
ক্রসফায়ার, সোজা কথায় এটা হল খুন করে মেরে ফেলার পর যে শব্দ দিয়ে খুনটা আড়াল করা হয়। মানবাধিকার ও আইনের চোখে এ ধরনের ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে। সমাজে কোনো অপরাধের বিচারের দায়িত্ব দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্র পুলিশকে দেয় না। অপরাধের বিচারের দায়দায়িত্ব বিচার বিভাগের, মানে একমাত্র আদালতের। আর সেখানে ঐ আদালতে পুলিশের কাজ হল যাকে পুলিশের অপরাধী মনে হবে, সন্দেহ হবে, তাকে আদালতের সামনে হাজির করে, অভিযোগ এনে তা প্রমাণের চেষ্টা করতে পারে তাঁরা। এতটুকুই। সে অপরাধী কি না সে সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার পুলিশের নেই। এই এখতিয়ার একমাত্র আদালতের এবং আদালতও সে রায় দিতে পারেন একমাত্র বিচার-আচার মূল্যায়ন পরীক্ষার সবশেষে। কিন্তু এসবের পাল্টা ক্রসফায়ারকারী পুলিশ বা সরকারের পাল্টা বক্তব্য হল – এমন বিচার-আচারের পথ, এটা অনেক লম্বা সময়ের ব্যাপার, আসামি জামিন নিয়ে বের হয়ে যায় ইত্যাদি। তবে একথাও তো সত্য যে আবার অনেক সময় জেনুইন অপরাধ আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, উপযুক্ত প্রমাণ ও আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের অভাবে। এ দিকে সমাজে অপরাধী বেড়েই চলে। অতএব আমরা নিজেরাই কাউকে অপরাধী বলে শনাক্ত করি ও সিদ্ধান্ত নেই। তাকে শাস্তি হিসেবে মেরে ফেলি। আর আইনের চোখে বিষয়টিকে ন্যায্যতা দিতে ক্রসফায়ারের গল্প বানিয়ে এভাবে বলি যে, আমার হেফাজতের আসামিই আমাকে আক্রমণ করাতে আত্মরক্ষার্থে তাকে গুলি করে মেরেছি।ীসব পালটা যুক্তির পরও দেশি বা আন্তর্জাতিক আইন এমন হত্যার পক্ষে কোনভাবেই সমর্থন দেয় না।  আর সবচেয়ে বড় কথা হল, ক্রসফায়ারের বিচারবহির্ভূত দিক ছাড়াও আরো বড় এক অপরাধ হল, সরকার যাকে তাকে এই পদ্ধতিতে মেরে ফেলতে পারে। তাকে ‘জঙ্গি’ বা ‘ড্রাগ ডিলার’ অথবা যেকোন কিছু বলে সাজিয়ে। সরকারের অপছন্দ, রাজনৈতিক বিরোধী, প্রতিদ্বন্দ্বী যে কাউকে মেরে সরিয়ে দেয়া সহজ হয়ে যায়। মূল ত্রুটি বা সমালোচনার কথা হল, নিহত ব্যক্তি  যে কথিত অপরাধেই অপরাধী ছিল তা তো কোন আদালতের মত প্রক্রিয়া পদ্ধতিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাবে পরীক্ষা করা হয় নাই। এটাই সরকারের হাতে যাকে তাকে খুন করার লাইসেন্স হিসাবে হাজির হয়।

ফলে স্বভাবতই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ও অপরাধকে মানবাধিকার ও আইনের চোখে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলা হয়। অর্থাৎ পুলিশের দায়িত্ব হল যেখানে অপরাধীকে কেবল বিচারের আওতায় আনা, বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা, সেখানে পুলিশই তাকে কোন বিচার ছাড়াই মেরে ফেলেছে। ফলে এখানে বিচার বা শাস্তি প্রক্রিয়া সেটা ব্যাহত হয়েছে বলে এটা বিচারবহির্ভূত এবং তা সাদা এক হত্যাকাণ্ড। যদিও সারা দুনিয়ায় বিভিন্ন দেশে যত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, এর গল্প কিন্তু একই- ক্রসফায়ার। যেমন ভারতে একই অর্থে তবে অন্য প্রচলিত শব্দ হল – এনকাউন্টার। যা হোক শব্দে কিছু যায় আসে না, ঘটনাটা সারমর্মে একই।

বিগত অক্টোবর মাসের ১ তারিখে এক মার্কিন উপসহকারী মন্ত্রী (ডেমোক্র্যাসি, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার শাখা) রবার্ট বারশিনস্কি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে আলাপকালে ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান ব্যক্ত করছিলেন। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্টো ফল দিতে পারে।’ এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্যের বিস্তার গত ০৪ অক্টোবর প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল। আমি সেখান থেকে একটু লম্বা অংশ টুকে আনছি। রবার্ট বারশিনস্কি বলেন, “৯/১১-এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ, মানবাধিকার সংস্থা ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে নানা বিতর্ক হয়ে আসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ খুবই বিপজ্জনক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দায়িত্বরত অবস্থায় পুলিশ নিহত হয়। কিন্তু তার পরও দোষী ব্যক্তির ক্ষতি করা বা তাকে আঘাত করার বিষয়টি কখনোই মেনে নেয়া হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখনই সম্ভব, তখনই দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়। কারণ, তাহলেই ওই নেটওয়ার্কের সবাইকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের অবস্থান হলো, প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও স্বচ্ছ তদন্ত হতে হবে”।
তিনি আরও বলেন, “ক্রসফায়ার’ বা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ কারণ হিসেবে প্রায়ই বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করা হয়। এতে সুবিচার নিশ্চিত করা যায় না, আসামি জামিনে বের হয়ে যান বলে বিভিন্ন যুক্তি দেয়া হয়। এ সম্পর্কে রবার্ট বারশিনস্কির মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এ দেশের সাক্ষ্য আইন ঔপনিবেশিক আমলের। শুধু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর ওপর নির্ভর করায় বিচারপ্রক্রিয়ায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে আসামির ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি জানান, আইনগুলোর আধুনিকায়নে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা দিচ্ছে”। আশা করি পাঠক যা বোঝার বুঝেছেন। আমেরিকান মন্ত্রীর বক্তব্য মিথ্যা নয়। তবে তাঁর বক্তব্য তুলে আনায় তাঁকে ও আমেরিকাকে কোন ‘ন্যায়ের আদর্শ প্রতীক’ বলে ধারণা করা ভুল হবে। আর নেপথ্যে বলে রাখি, আমেরিকার এত সাধু সাজার সুযোগ নেই। কারণ র‌্যাব তাদের সরাসরি পরামর্শে আর তাদের আসামিকে বাংলাদেশে এনে টর্চার করে স্বীকারোক্তি বের করার জন্যই গঠন করা হয়েছিল। কারণ তাদের দেশে রেখে টর্চার করলে তা সংশ্লিষ্ট ওই অফিসারের জন্য বেআইনি ও ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য হবে। আমেরিকান পরিভাষায় এটাকে রেনডিশন বলে। ওবামা রেনডিশন করার প্রশাসনিক অভ্যাস তুলে দেয়ার প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, কিন্তু রাখতে পারেননি।
তবে আরেক বাস্তবতা হল, উপরে বাংলাদেশের ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে আমেরিকান বক্তব্য সঠিক। আবার সরকারের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের কথা তুলে এমন বক্তব্যের ভেতর দিয়ে আমেরিকা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর একটা যেন অথরিটি হিসেবে হাজির হওয়ার সুযোগ নেয়। এটাও আরেক সত্যি। আর তা নেয়ার সুযোগ থাকে এ জন্য যে, জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস তদারকির প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।
ফলে হিউম্যান রাইটস ইস্যুটি দু’ধারী তলোয়ারের মতো আমেরিকার হাতে অস্ত্র হিসেবে হাজিরও হয়। এক দিকে আমাদের সরকারগুলো ক্রসফায়ার করার দোষে দোষী। ফলে আমেরিকা সে অভিযোগ সঠিকভাবে তুলে আনে ঠিকই। আবার সেটা তুলে বাংলাদেশের ওপর নিজের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিতে একে ব্যবহার করে এ কথাও সত্যি।

প্রেসিডেন্ট দুতের্তের ক্ষেত্রে তার ড্রাগ-ডিলারের হত্যার বেলায় একই ঘটনা ঘটেছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামা এ প্রসঙ্গে তার সাথে দেখা করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও তার উদ্বিগ্নতা ইত্যাদি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এর আগে দীর্ঘ দিন ধরেই ম্যানিলার ক্যাথলিক চার্চ, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংগঠন ও অন্যান্য দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু সেগুলোকে দুতের্তে সবলে উড়িয়ে দিতে আর উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন। দুতের্তের সাথে প্রেসিডেন্ট ওবামার সাক্ষাতের কথা ছিল গত ৫ সেপ্টেম্বর, লাওসের ভিয়েনতিয়েনে আসিয়ান জোটের সভায় দুই প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের সময়ে, সাইডলাইনে বসে। কিন্তু ওবামার সাথে কথিত সেই সাক্ষাতের আগেই দুতের্তে এক কাণ্ড করে বসেন। লাওস রওনা দেয়ার আগেই তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে সেই কান্ড করেন। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন যে, “ওবামা কি তাঁকে বিচারবহির্ভূত ড্রাগ-ডিলার হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলবেন না”- এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি রাগে ফেটে পড়েন। সম্ভবত দুতের্তে ওবামার সাথের ওই সাক্ষাৎ এড়াতে চেয়েছিলেন তাই ওই রকম জবাব। তিনি অকথ্য ও অশ্লীল ভাষায় ওবামার মাকে বেশ্যা বলে গালি দিয়ে কথা বলেছিলেন; যেটা স্বভাবতই কোনো প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদার সাথে মানানসই নয়। তবে কোন প্রেসিডেন্ট অবশ্যই ক্ষুব্ধ হতে পারেন। এমনকি সে ক্ষেত্রে যদি “তিনি ক্ষুব্ধ” একথাটাই মুখে বা আচরণে এতটুকুই প্রকাশ করেন- এটাই তার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট হত। কিন্তু তিনি বলেন, “তার (ওবামার) সম্মান বজায় রেখে কথা বলা উচিত। আমার ওপর যেন যা মনে চায় প্রশ্ন আর স্টেটমেন্ট ছুড়ে না দেয়। এমন হলে, বেশ্যার ছেলে, ওই ফোরামে আমি তাকে ছিঁড়ে ফেলব। উনি যদি তা করেন তবে আমরা তাকে শুয়োরকে যেমন করে কাদায় পুঁতে তেমন করে পুঁতে ফেলব”।

আচ্ছা, দুতের্তে কি হঠাৎ এমন কথা বলছেন; নাকি তিনি এমনই? তা বুঝতে পেছনের কিছু তথ্য দেখা যাক। এর আগে তিনি ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের দাভাও শহরের মেয়র ছিলেন। ড্রাগের সমস্যা আর খুনোখুনি সেখানে লাগাতার ছিল। সেখানেও তিনি ড্রাগ ডিলারদের সম্পর্কে বলতেন তারা “আরো মরবে। অনেকে মরবে। যতক্ষণ না শেষ মাদকপাচারকারীকে বের করা সম্ভব হবে, ততক্ষণ আমরা কাজ চালিয়ে যাবো”। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সেকালের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, তিনি বলছিলেন, ‘যদি আমার সিটিতে আপনি অবৈধ কাজ করেন, যদি আপনি ক্রিমিনাল হন, কোনো সিন্ডিকেটের অংশ হন, যারা শহরের নিরীহ লোকদের শিকার বানায়, তবে যতক্ষণ আমি মেয়র আছি ততক্ষণ আপনি আমার হত্যার বৈধ টার্গেট।’ এটা ২০০৯ সালে মেয়র হিসেবে তার বয়ান। শেষ বাক্যটি মারাত্মক আপত্তিকর। এখানে আইনি লুকোছাপা তিনি রাখেননি। একেবারে প্রকাশ্যে স্পষ্ট ভাষায় সরাসরি হত্যা করার কথা বলছেন। এই বাক্যটাই তার অভিযুক্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। ওদিকে প্রায় একই ভাষায়, একই কারণে ইইউকে এবং জাতিসঙ্ঘকেও তিনি গালাগালি করেন।
স্বভাবতই দুতের্তের খারাপ গালাগালির পরে ওবামা সেই সাক্ষাৎ বাতিল করেন। কিন্তু পরের দিন পরিস্থিতি রিভিউ করার পর (খুব সম্ভবত তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পরামর্শকদের কারণে) দুতের্তে সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে স্যরি বলে ক্ষমা চেয়ে নেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রায় ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিলিপাইনের সাথে নিরবচ্ছিন্ন কৌশলগত মিত্র ছিল আমেরিকা। ফিলিপাইন-আমেরিকান সেই সম্পর্ক এখন খারাপ থেকে চরম খারাপ হয়ে এখন প্রায় পুরো বিচ্ছিন্ন হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা দুই আলাদা দিনে দুই অংশ ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় – ২৩ অক্টোবর ২০১৬ প্রথম বা চলতি পর্ব অনলাইনে (প্রিন্টে ২৪ অক্টোবর)। এখানে সেই লেখা পর পর দুই পোষ্ট আকারে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল। এটা প্রথম পর্ব।] পরের পর্ব আগামিকাল পরশুর মধ্যে।