সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদঃ বয়ানের গরমিলে হেরে যাবে

সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদঃ বয়ানের গরমিলে হেরে যাবে

গৌতম দাস

২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yD

 

গত ২২ মার্চ ছিল শুক্রবার; অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডে গত ১৫ মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজের সময় এক জোড়া মসজিদে হামলায় ৫০ জনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ পরের শুক্রবার সেটা। এ দিন নিউজিল্যান্ডের প্রতিটি শহর দুপুরে, বিশেষ করে ঘটনাস্থল ক্রাইস্টচার্চ সিটিতে ‘হেডস্কার্ফ’ (Headscarf, ওড়না জড়িয়ে মাথা ঢাকা) লাগানো নারীদের পদচারণায় সরব হয়ে উঠেছিল। কারণ, ২২ মার্চ শুক্রবার ছিল নিউজিল্যান্ড জুড়ে আগের শুক্রবারে হামলায় নিহতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তাদের পরিবার এবং সাধারণভাবে মুসলমানদের সাথে নাগরিক সবাইকে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের সরকার ও প্রশাসনের সংহতি প্রকাশের দিন। এটা ছিল আসলে ধর্মীয় এবং সামাজিক ধরণের জমায়েতের এক মিশাল। ফলে তা মুসলমান ধর্মীয় আবার অন্যধর্মের লোকেদেরও সংশ্লিষ্ট হবার সুযোগ রাখা হয়েছে বা সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। যাতে সকলে মিলে সংহতি প্রকাশ করা যায়। আর “সংহতি” মানেই তো ধর্মসহ সব নির্বিশেষে সকলে মিলে যা পালন করা হয়। কিন্তু কিসের বিরুদ্ধে এই “সংহতি” সেকথাও মনে রাখা দরকার। “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী” [White Supremist] – এমন চিন্তা ও বয়ান আর এর চর্চার বিরুদ্ধে এই সংহতি। অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডের এক ব্যাপক জনসমাগমে প্রধান ধারা হিসাব এই বক্তব্য উঠে এসেছিল  যে তারা “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী-দের” বিরুদ্ধে এবং ধর্ম-নির্বিশেষে তাঁরা সংহত – এককাট্টা।  তাই এই আয়োজন করা হয়েছিল ঐদিনের জুমার নামাজের জমায়েতের সাথে একসাথে। আর সেই উপলক্ষে আয়োজনস্থল ছিল দুই মসজিদে হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি বা নিহত হওয়া আল নূর মসজিদের সামনের স্থানীয় ‘হাগলে পার্ক’ [Hagley Park ]। সেখানেই বয়স-নির্বিশেষে নারীরা সবাই মাথায় হেডস্কার্ফ পরে যোগ দেন, যাতে তা তাদের প্রকাশিত সংহতির প্রতীকে পরিণত হয়।

স্বভাবতই মসজিদে হামলায় একসাথে পঞ্চাশজন মেরে ফেলার পর এর একটা মানসিক যাতনার প্রভাব তৈরি হয়েছিল নিউজিল্যান্ড জুড়ে।  মুসলমান জনগোষ্ঠি বিশেষ করে নারীরা যাদের সাধারণত মুসলমান পরিচয় মানে ওড়নায় মাথা জড়ানো হয়েই বের হতে দেখা যায়, ফলে তারা চিহ্নিত – ফলে তারা আবার হামলা আক্রমণের শিকার হন কিনা এই ভয়বোধ জেকে-বসা খুবই স্বাভাবিক। মুসলমান সহকর্মি বা পড়শিদের কাছে তাদের এই ভয়ভীতিবোধের কথা জানতে পেরে নিউজিল্যান্ডের একই সাধারণ মানুষ যাদেরও গায়ের রঙ সাদা তারা এতে অস্বস্তি আর কিছুটা অপরাধবোধেও ভুগতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ মসজিদে হামলার ঘটনা কেবল নিউজিল্যান্ডের মাত্র ১% মুসলমান জনগোষ্ঠিকেই নয় প্রধান ধারার সাধারণ মানুষকেও আলোড়িত করে এক নেতি প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। আর সেখান থেকে সাদা-বাদীদের প্রত্যাখান করে মুসলমা্নদের ভয়বোধ আর সাধারণ মানুষের অস্বস্তি ও অপরাধবোধ – সবকিছু ঝেড়ে ফেলে একসাথে উঠে দাড়ানোর, রুখে উঠার প্রয়োজনীয়তা হাজির হয়েছিল। আর সেটাই ছিল হেডস্কার্ফে প্রকাশিত প্রতীকে “সংহতি” প্রদর্শনের কড়া বার্তা। এককথায় বললে, এই সংহতি প্রকাশের ফলে মসজিদে হামলার সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের যে উদ্দেশ্য ছিল যে নিউজিল্যান্ডের সাদাচামড়ার সাধারণ মানুষকে উস্কানি দেয়া, মুসলমান বা মাইগ্রেন্টদের বিরুদ্ধে তাদের শুড়শুড়ি দিয়ে ক্ষেপিয়ে তোলা ইত্যাদি সবকিছুই মাঠে মারা যায়। উলটা সাদাচামড়ার খ্রীশ্চান সাধারণ মানুষই মুসলমানদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বসে।

মাথায় স্কার্ফ লাগিয়ে মসজিদের ঘটনায় নিহত বা ভিকটিম পরিবারের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, সান্ত্বনা-সহানুভূতি জানানোর রেওয়াজ শুরু করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের নারী প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডেন [Jacinda Arden], হামলার ঘটনার পরের দিন থেকেই। এক আদর্শ প্রধানমন্ত্রীর মতই তিনি কাজটা করেছেন। এসব সময়ে ধর্ম-নির্বিশেষে ভিকটিমের পাশে দাঁড়ানো আর জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত হতে না দেয়া, ঐক্য ধরে রাখা – এটাই তো তার আসল কাজ। তাই স্বভাবতই সেটা দেশ-বিদেশে খুবই প্রশংসিত হয়েছে। আর সেখান থেকেই নিউজিল্যান্ড জুড়ে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা ধর্মনির্বিশেষে এক নাগরিক ঐক্য ও সহমর্মিতা বোধ তৈরিতে লেগে পড়েছিলেন এবং তিনি তাতে সফল তা বলা যায়। তিনি বারবার বক্তৃতায় বার্তা দিয়ে গেছেন যে, ‘হামলাকারী ব্রেনটন ও তার সাদারাই শ্রেষ্ঠ এই তত্ত্ব “অগ্রহণযোগ্য এবং স্বভাবতই তা আমাদের মধ্যে অনৈক্য, বিভেদ তৈরি করতে ব্যর্থ হবে, কারণ আমরা এক”। বলা যায় ব্রেনটন ও তার সাদাবাদিতাকে উপড়ে তুলে সমাজ-কমিউনিটি থেকে বাইরে ফেলে দিতে এখানেই তিনি এবার সক্ষম ও সফল হয়ে যান। তার এই শক্ত অবস্থান ও প্রচেষ্টা জনমনে ইতিবাচক আবেদন সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে। তাই সে্টাকেই আরো বড় করে ছড়িয়ে দিতে সোস্যাল মিডিয়ায় ‘হেডস্কার্ফ ফর হারমনি’ [Headscarf-for-Harmony] নামে হ্যাশট্যাগ গ্রুপ গঠন হয়ে যায়। বলা হচ্ছে অকল্যান্ড শহরের এক ডাক্তার তাঁর এক মুসলমান সহকর্মির কাছ থেকে তাঁর ভয়ভীতিবোধের ব্যাপারটা জেনে কিছু করার তাগিদ থেকে এই হ্যাশটাগ আন্দোলন আহবান জানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই গ্রুপের উদ্যোগেই জুমাবারে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে সমন্বয়ে ঐ ‘হেগল পার্কের’ সমাবেশে দুই মিনিটের নিস্তব্ধতা পালন করে সংহতি প্রকাশের প্রোগ্রাম সবাই মিলে বাস্তবায়ন করেছিল।

রাজনৈতিক-সামাজিক বড় ঘটনায় সবসময়ই কিছু অতি-বাদী এরাও হাজির থাকে। সবকিছুতেই অতিরিক্ত মানে, পরিস্থিতি যতটুকু দাবি করে তার চেয়ে বেশি করে ফেলা, এমন হয় এরা। এরা হতে পারে – অতি-বাম, নয়ত অতি-ইসলামি বা অতি-নারীবাদী ইত্যাদি ধারার কাউকে কাউকে পাওয়া যায়ই। এখানেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। যেমন সামাজিক মিডিয়ায় অনেককে দেখা গেছে এক “ষড়যন্ত্র তত্ব” নিয়ে হাজির হতে। এরা বলতে চাচ্ছেন যে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার স্কার্ফে নিজেকে প্রকাশ ও সহমর্মিতা প্রদর্শন – এটা “মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র”। এটা আসলে কেবল দেখানো জন্য। কেন? কারণ সাদা শ্রেষ্ঠ্ত্ববাদী খ্রীশ্চান ব্রেনটন= নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী খ্রীশ্চান জেসিন্ডা। অর্থাৎ খ্রীশ্চান সুত্রে ব্রেনটন=জেসিন্ডা। এতে মানে দাড়ালো যে জেসিন্ডাই ব্রেনটন। সেকারণে হামলা করে এসে এখন জেসিন্ডা কালো স্কার্ফ পড়ে হাজির হলেও তিনি আসলে মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। এদের এমন এই চিন্তার কাঠামোটা দাঁড়িয়ে আছে ১. খ্রীশ্চান সুত্রে ব্রেনটন=জেসিন্ডা। ২. খ্রিশ্চান মানেই সে এন্টি-মুসলমান। মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। ৩। খ্রীশ্চান কখন মুসলমানের জন্য ভাল কিছু করতে পারে না; ইত্যাদি এসব বক্তব্যের ভিত্তির উপর।

কিন্তু এমন চিন্তা যেকোন মুসলমানের জন্যই ভীষণ বিপদজনক। কেন? কারণ এই বক্তব্যের যুক্তির প্যাটার্ণ অনুসারে তাহলে সারা দুনিয়াতে ঘটা যত খুন খারাবি, রাজনৈতিক হত্যাকান্ড এমনকি সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য করা কাজসহ যাবতীয় কাজ আছে যা কোন না কোন মুসলমান জড়িয়ে আছে সেসবের জন্য দায়ী দুনিয়ার সব মুসলমানেরা – একথা মেনে নিতে হবে! আসলে এমন চিন্তা অতি-সরলিকরণ দোষে দুষ্ট। মুসলমান মানেই সে ভাল অথবা খ্রীশ্চান মানেই খারাপ – এটা অতি-সরলিকরণ এক ভিত্তিহীন চিন্তা। একইভাবে এক মুসলমানের কাজের দায় সব মুসলমানের – এমন চিন্তাও অতি-সরলিকরণ দোষে দুষ্ট। আসলে এগুলো খুবই কম চিন্তা করে বলে ফেলা কথা। যেমন, বলা হল এক মানুষের নাম রহিম। অতএব মানুষ মাত্রই তাঁর নাম রহিম – এমন মনে করা। এগুলো হল ‘সাধারণ’ আর ‘বিশেষ’ – এই দুই এর সম্পর্কে গুলিয়ে ফেলে একাকার করে দেখা। যেখানে মানুষ আমাদের সাধারণ নাম। আর রহিম বিশেষ নাম। তাই রহিম একই সাথে মানুষ হলেও মানুষ মাত্রই সে রহিম হবে তা কখনও নয়।  তবু চিন্তায় সতর্ক না থাকলে চিন্তার এমন এই পা-পিছলানি ঘটে।

মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করতে বিভিন্ন প্রতীক বা আচার-রিচুয়াল [ritual] ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে থাকে। ফলে সেখানে কোন জিনিসটি প্রতীক হয়ে উঠছে, এর চেয়েও কী উদ্দেশ্য মানুষের সবার সেই ঐক্য সংহতি প্রকাশ তারই ভাব-প্রভাব নিয়ে হাজির হয়ে যায় সেই প্রতীক। এখানে তা-ই হয়েছে। এখানেও যে স্কার্ফ যা মূলত ইসলামী নারীদের কারণে ইসলামের প্রতীক মনে করা যায় সেই স্কার্ফকেই এখানে নিউজিল্যান্ডবাসী ধর্ম-নির্বিশেষে সকলের প্রতীক হিসাবে – সেই সংহতির প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। হামলাকারি ব্রেনটন যদি নিউজিল্যান্ডের খ্রীশ্চানদের বার্তা দিয়ে থাকে যে স্কার্ফ বা মুসলমান দেখলেই তাদের “নির্মুল কর” তাহলে সেক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের খ্রীশ্চানেরা পালটা বার্তা তৈরি করেছে যে না তাঁরা বরং ব্রেনটন ও সাদা শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তাকে প্রত্যাখান করছে। শুধু তাই না। শোকে দুঃখে থাকা মুসলমানদের সাথে মিলে সহমর্মিতায় ঐ স্কার্ফকেই সংহতির প্রতীক হিসাবে তুলে ধরছে।

কিন্তু ঐদিনই স্কার্ফের বিরুদ্ধে আবার আপত্তি তুলে ধরেছেন কিছু অতি-নারীবাদী। এটা “সস্তা প্রতীকী প্রদর্শনী” বলেছেন। [In an unsigned opinion piece on Stuff.co.nz, a Muslim woman called the movement “cheap tokenism”.] তাদের দাবি স্কার্ফ হল নারীদেরকে ঘেরটোপের মধ্যে আটকে রাখার মুসলমানের ধর্মীয় ব্যবস্থা ও চিহ্ন। অতএব স্কার্ফ ধর্মনির্বিশেষে সংহতির প্রতীক হতে পারে না। আগেই বলেছি এটা অতি-নারীবাদী অবস্থান। প্রথমত, স্কার্ফকে সুনির্দিষ্টভাবে এই ঘটনায় ধর্মনির্বিশেষে সংহতির প্রতীক বলে গ্রহণ করতে কেউ কাউকে বাধ্য করে নাই। এমনকি মুসলমানেরাও নয়। সোশাল মিডিয়ায় কেউ একজন প্রস্তাব করেছিল আর তাতে ধর্মনির্বিশেষে সকলের তা মনে ধরেছিল – এত টুকুই। স্কার্ফের আর অন্য মানে যাই থাক সুনির্দিষ্ট এখানে এই সবচেয়ে ‘ওপেন চয়েজ’ এর মাধ্যমে যার যার বেছে নেয়া ও সাড়া দেওয়া – এটা বিরাট তাতপর্যময় এবং গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা। অতি-নারীবাদী অবস্থান এটা দেখতে মিস করেছে। এটা পরিস্কার যে এখানে স্কার্ফের অন্য কোন মানে/প্রতীক আছে কিনা অথবা যাই থাক তা এদের বিবেচনার বিষয়ই ছিল না। মুল বিষয় ছিল “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তা ও ব্রেনটনের বার্তাকে” নাকচ করা। এবং নিজেদের সংহতি জানানো। কিন্তু স্কার্ফ মাত্রই “গা-চুলকানি বোধ” এটা তো যাদের এমন অনুভব তাদের চিন্তায় অসর্তকতার সমস্যা। এখানে বরং সবচেয়ে কড়া মেসেজ ছিল – ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ চিন্তা ও নারকীয় খুনি ব্রেনটনের বার্তাকে নাকচ করা। অর্থাৎ স্কার্ফ ইসলামের প্রতীক কি না, ইসলাম ভাল অথবা মন্দ কিনা সেসব বিষয় উহ্য রেখে এবং একে ছাপিয়ে গিয়ে  ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ চিন্তা ও নৃশংস খুনের কাজকে কোন জায়গা না দেয়া, প্রত্যাখ্যান।
কিন্তু তবু স্কার্ফ কেন? এটা বুঝতে অনেকেই মারাত্মকভাবে মিস করেছেন। অনেক সময় বিরাট চিন্তাবিদ তাত্বিক হতে গিয়ে আমরা বাস্তবতা বা ব্যবহারিক দিক ভুলে যাই। সুনির্দিষ্ট বাস্তব দিকটা নজর দিতে গাফিলতি করে বসি। নিউজিল্যান্ডের মুসলমান মোট জনসংখ্যার ১% বলছেন অনেকে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক লাখ হয়ত। আমাদেরকে কল্পনা করতে হবে ্সেখানকার ঐ সংখ্যালঘু মুসলমান নারী-পুরুষের জায়গায় বসে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে হামলার পর থেকে এদের মনে কী তীব্র ভয়ভীতি নিরাপত্তাহীনতা  দানা বেধেছিল। অথচ বেচে থাকার স্বাভাবিক কাজ কর্মের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ নিজেই করতে হয় বলে সেজন্য মুসলমান নারী-পুরুষ সকলকেই ঐ শহরে বাইরে বের হতেই হবে। অথচ বাইরের বেশির ভাগ মানুষের গায়ের চামড়ার রঙ তো সাদা! তাহলে এরা সবাই কী মুসলমানদের জন্য ঘাতক, একেক জন মুসলমানদেরকে হামলার জন্য ওঁত পেতে বসে আছে? এমন যেন এই হামলে পড়ল বলে?  এটাই সেই ভয়ঙ্কর দুঃসহ ভীতি! এটা আমরা যারা দূরে বসি আছি আমাদের অনুভব করতে হবে। তাহলে বুঝব। না হলে সবই কারও ষড়যন্ত্র বলে মনে হবে।

সহকর্মি বা পড়শি যারা মুসলমানদের পাশে বসবাস করে দেখা হয় এদের মধ্যে যাদের কে তবু কাছের মনে হয় তাদের সাথে মুসলমানেরা স্বভাবতই তাদের অনুভব শেয়ার করবে। তাই ঘটেছিল। কিন্তু সেকথা শুনে ঐ খ্রীশ্চান পড়শির কী মনে হয়েছিল? ঐ খ্রীশ্চান পড়শিরা এই প্রথম টের পেয়েছিল যে মসজিদে হামলাকারি ব্রেনটন তাদের কী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে! অথচ মসজিদে হামলার ব্যাপারটা আগে হয়ত ঐ খ্রীশ্চান পড়শির কাছে অনেক দুরের ঘটনা মনে হচ্ছিল। কিন্তু খ্রীশ্চান পড়শি এবার টের পেল ব্রেনটন তাদের সবাইকেই পড়শি মুসলমানদের কাছে  একেকজন খ্রীশ্চান সন্দেহভাজন খুনি  বানিয়ে ছেড়েছে  – যে সম্ভাব্য খুনিরা এখনই বুঝিবা রাইফেল বের করে মুসলমানের উপর  ঝাপিয়ে পড়বে এমনই দানব!

স্বভাবতই যা সে নয় এমন পরিচয়ের দাগ তার গায়ে লাগাতে চিত্রিত হতে বেশির ভাগ মানুষই রাজি হবে না। এর সোজা মানেটা হল মুসলমানের মনে হামলা ভয়ভীতির দুঃস্বপ্ন আর সাধারণ খ্রীশ্চান পড়শিরা এদের সবার গায়ে একেকটা দানব এই পরিচয় লেপ্টে দেয়া একই কথা। অতএব একপক্ষের মনে ভীতি আর অপরপক্ষকে দানব পরিচয় লেপ্টে দেয়া – দুপক্ষই সবই এসব কিছু ঝেড়ে ফেলে একসাথে  উঠে দাড়াতে মনস্থ করা থেকেই স্কার্ফ প্রতীকের উদ্ভব। আর মুসলমান মেয়েরা স্কার্ফ ব্যবহার করে বলে না চাইতেই তারা মুসলমান বলে জনসমক্ষে চিহ্নিত। সম্ভবত সে থেকেই  ধর্মনির্বিশেষে সকলেই যদি প্রতিবাদের প্রতীক হিসাবে স্কার্ফ পড়ে তাহলে অন্তত মুসলমান নারীরা সেফ ফিল করবে – এমন ভাবনার উদ্ভব। অতএব এই স্কার্ফ প্রতিবাদের সারকথা ছিল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের প্রত্যাখ্যান। মুসলমান পড়শির মনে সাহস ফেরানো – এক কমিউনিটি ঐক্য। অতএব মুলত একেবারে ব্যবহারিক প্রয়োজন বোধ ছিল কমিউনিটিতে মুসলমান নারীদের ভয়ভীতি তাড়ানো আর নিরাপত্তাবোধ আনা।  আর সেই অভিযোগের দাগ থেকে সাদা চামড়ার সাধারণ মানুষকে মুক্ত করা। নিউজিল্যান্ডের মুসলমানেরা ভয়ভীতি দূর করে বাসা থেকে বের হবার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটা এক অগ্রপক্ষেপ।
সুতরাং একেবারেই মুল তাগিদ ছিল নিউজিল্যান্ডের কমিউনিটি-সমাজে এক ব্যবহারিক সমস্যা দূর করা। তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের মধ্যে  নানান কিসিমের অতি-বোধ তৈরি হচ্ছে ইস্যু বা সমস্যার ব্যবহারিক দিক থেকে তা দেখতে না পারা থেকে। অতি-ইসলামবাদীরা ভাবছেন সকলেই স্কার্ফ চাপালে তো বিপ্লবের জোশ কমে যাচ্ছে ফলে নিশ্চয় এটা ব্রেনটনের খ্রীশ্চান বোন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার ষড়যন্ত্র। অথচ তারা দেখতে পাচ্ছেন না ভয়ভীতিতে নিরাপত্তার অভাববোধে ঘরবন্দী মুসলমান নারী-পুরুষ বাইরে বের হবার পক্ষে নির্বিশেষ কমিউনিটি-সাহসের জন্ম হোক, উঠে দারাক – সেটা খুঁজে ফেরা থেকেই এই স্কার্ফ সংহতির জন্ম। এমনকি মুসলমানদের মনে সাহস আনার জন্য জেসিন্ডা নিউজিল্যান্ডের মত হামলা ঘটবার দেশ-শহরে পালটা অত্যন্ত দৃঢতা দেখিয়ে ঐ শুক্রবারে টিভিতে জুমার আজান প্রচারের ব্যবস্থা করেন। 

প্রায় একই ধরণের এক ব্যাখ্যা ও এর প্রয়োগ করতে গিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান নিজের বিপদ ডেকে আনতে গিয়েছিলেন। তবে তাঁর সৌভাগ্য যে তিনি তা সামলে নিতে, নিজেকে কারেক্ট করে নিতে সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তিনি সাহসের সাথে তা নিয়েছেন। তুরস্কের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আসন্ন। কোন নির্বাচনে আভ্যন্তরীণ বহু হিসাবকিতাব থাকে, বুদ্ধিমানেরা সে হিসাবের সব বক্তৃতা বিবৃতিকে সেগুলা যেন দেশের বাইরে না যায় সেদিকে খেয়াল রেখে কথা বলেন, ব্যবস্থা করে রাখেন। এরদোগান ব্রেনটনের হামলায় নিজেকে এর প্রতিরোধের বীর হিসাবে দেখাতে বক্তৃতা করেছিলেন, হামলার ভিডিওও দেখিয়েছেন। বাইরের দুনিয়া এসব  জানলেও প্রথমদিকে  উপেক্ষার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এরদোগান একবার সীমা ছাড়িয়ে অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ডকে খামোখা হুমকি দিয়ে বসেন। তিনি বলেন ব্রেনটনের বিচার যদি অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড না করতে সক্ষম হয় তবে যেভাবেই হোক তিনি এর বিচার করবেন [“If New Zealand fails to hold the attacker accountable, one way or another we will hold him to account.”]। এটা তো বিনা মেঘে বজ্রপাত। কারণ অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ব্রেনটনের বিচার করতে চাইছে না বা পারছে না – এমন কোনকিছুর অন্তত ইঙ্গিতও তো আগে থাকতে হবে! এরপরে না বিচার করার “অন্য কারও” সুযোগ আসবে? তাই এটা গায়ে পড়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য হিসাবে হাজির হয়েছিল। স্বভাবতই এই বেহিসাবি বক্তব্য অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে খারাপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। তবে এরদোগানের সৌভাগ্য যে অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড গঠনমূলক ভাবে আগায়, এরদোগানকে পিছনে ফিরে যাবার সুযোগ তৈরি করে দেয়  – এমনভাবে কথা বলেন। এরদোগান সেই সুযোগটা নিয়ে পরেরদিন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে বক্তৃতা দিয়ে সে উত্তেজনার সমাপ্তি টানেন [Turkey’s President Erdoğan praises Jacinda Ardern in an op-ed for the Washington Post]। ভিতরে কূটনৈতিক দৌড়ঝাপও ব্যবপ ছিল স্বভাবতই যেমন এরদোগানের এক অফিস কর্তা পরিস্থতি নরম করতে বলছেন, [“President #Erdogan’s words were unfortunately taken out of context,” ]। এরদোগান বিশাল পা-পিছলানি ঘটনার প্রধান দিকটা হল, তিনিও – ব্রেনটন= সাদাবাদী খ্রীশ্চান= জেসিন্ড, এই ভুল ও ভিত্তিহীন সাজানো অনুমানের সমীকরণ টেনে এর উপর দাঁড়িয়ে কল্পিত শত্রু খাড়া করে কথা বলে গেছেন। অথচ হামলার ঘটনার পর প্রথম সুযোগ থেকেই শেষ পর্যন্ত জেসিন্ডা বলে আসছেন [‘We are one’] ও অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী, ব্রেনটন ও তাঁর রাজনীতিকে কোন প্রশ্রয় নয় বরং নিন্দা করছেন; সমাজচ্যুত করতে কথা বলে গেছেন।

এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, খ্রীশ্চান ইউরোপের অনেক দোষত্রুটি বা স্বার্থ আছে অবশ্যই। কিন্তু নতুন করে আবার কোন ক্রুসেডে খ্রীশ্চান-মুসলমানের লড়াই – এমন ভাষ্য তুলে এনে কোন বিতর্ক তাদের রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতাসীনরা (সাদা শ্রেষ্টত্ববাদী পকেট গ্রুপেরা না) আর কখনও তুলবে না, তাদের সামাজিক অভিমুখ সেদিকে নয়। কারণ এতে বড় ক্ষতিটা তাদেরই। কারণ তাদের আভ্যন্তরীণ সমাজে কোন ধর্মতাত্বিক বিতর্কে বা এর আবহ খোদ তাদের রাজনৈতিকতাকেই [Polity] আড়াল করুক বা পেছনে ফেলে দিক, এটা তাদের স্বার্থ নয়। খ্রীশ্চান বিভিন্ন ধারা বা ফেকড়াতে পড়ে এতে দগদগে ঘৃণা লড়াই মারামারির বহু কষ্টকর পথ পেরিয়ে, তারা সেসব বিভক্তিতে তা থেকে গৃহযুদ্ধ শেষে  আজ তারা এক থিতু সমাজের অবস্থায় পৌচেছে। রাজনীতিকরা নিজের স্বার্থে সহজেই এটা ভাঙতে দিবে না।

যদিও আজ আমরা দেখছি, মসজিদে নামাজিদের ওপর হামলাকারী ব্রেন্টন- ‘সাদারাই শ্রেষ্ঠ ও ক্ষমতাবান’ এই বক্তব্যের পূজারী। যাদের নিজের ইতিহাস-পাঠ খুবই দুর্বল, আর গোঁজামিলের। একথাও সত্য যে, গ্লোবাল ইতিহাসের পুরো দুই-আড়াই শ’ বছরের কলোনি শাসনামলও দাঁড়িয়ে ছিল  সাদাদের এমনই এই সাফাই-বয়ানের ওপর। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, সব রেসিজমই কোনো-না-কোনো কিছু নিয়ে তথাকথিত এক “শ্রেষ্ঠত্বের” একটা বয়ান খাড়া করে তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আলোচ্য ক্ষেত্রেও সেই তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান হল- ‘আমরা সাদা, তাই আমরা শ্রেষ্ঠ।’ হামলাকারী ব্রেন্টন ট্যারান্টের দাবি – পুরনো কলোনি আমলের জবরদস্তি বা সাদা শ্রেষ্ঠত্বের সেই রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে।

ঘটনা হল, যেকোনো রেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা কখনো নিজের দাবির পক্ষে (মানুষ মানে এমন) ঠিকঠাক সাফাই হাজির করে কথা বলতে পারে না। কারণ, তারা বয়ানের জোরে অথবা সততা, ন্যায় বা ইনসাফের জোরে কথা বলতে পারে না; তারা গায়ের জোরে কথা বলে। অথচ কেউ সাদা চামড়ার লোক হলেই তাকে আমাদের শ্রেষ্ঠ মানতে হবে কেন? এ কথার ভিত্তি কই? অথবা ধরা যাক সাদারাই মূলত দুনিয়াজুড়ে অন্যের দেশ-সম্পদ দখল করে কলোনি শাসন করে গেছে। কিন্তু এই কারণে এই জবরদস্তি এখনও মেনে নিতে হবে, ফিরিয়ে আনতে হবে কেন? এসব সহজ, ছোটখাটো সাদা প্রশ্নের জবাবই তাদের কাছে নেই। বিশেষত যখন একালে রিপাবলিক রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট হল “নাগরিক বৈষম্যহীনতা”, যেটাকে ইতিবাচক দিক থেকে নাগরিক সাম্য [equality] বলা হয়। কিন্তু নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা বা সুযোগ কই?  এছাড়া এর সাথে আছে ইনসাফ আর মানুষের মর্যাদার ভিত্তির কথা।  এর মানে হল, যারা তাদের তাত্বিক [mentor] মানে যারা ব্রেন্টনদেরকে সাদা-শ্রেষ্ঠবাদী হতে উসকানি দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে তারা খুবই নাবালক-চিন্তার লোক।

দ্বিতীয়ত, আরো বড় প্রশ্ন হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আর পরের দুনিয়া তো আর এক ছিল না; আকাশ-পাতাল ফারাক হয়ে গেছিল। এটা সাদা চোখেই জানা-বুঝা যায়। যেমন প্রথম ফারাক হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের চার-পাঁচটা কলোনি মালিক দেশের দখলদারিত্বে দুনিয়ার বাকি সব (এশিয়ার, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা) দেশই দখল ও কলোনি হয়ে গেছিল। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে উল্টো চিত্রঃ কলোনি দখলদার ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফরাসিরাসহ সকলেই একের পর এক কলোনি ছেড়ে চলে গেছিল। এতে উপনিবেশগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গেছিল। কেন?

কারণ, ব্রিটেন-ফ্রান্সের মতো ইউরোপ কলোনি মালিক-দখলদারেরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে জিততে হলে এর একমাত্র নির্ধারক বাস্তবতা ছিল আমেরিকাকে নিজেদের পক্ষে পাওয়া – এর উপরে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমেরিকান শর্ত ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে ইউরোপের জিতে যাওয়ার পরে ইউরোপের সবাইকে কলোনি দখলগিরি ছেড়ে দিতে হবে। ইউরোপ এই শর্ত মেনেছিল উপায়হীন হয়ে। এই শর্তের কারণেই দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে যায়। শুধু তাই নয়, গায়ের জোর থাকলেই অন্যের দেশ ও সম্পদ দখল করা যাবে না, সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব মেনে চলতে হবে, – এসব আমেরিকান শর্তও মেনে নিতে হয়েছিল। যা তদারকের প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসঙ্ঘের জন্ম (১৯৪৪) হয়ে যায়। এ ছাড়া ইচ্ছামত মারধর নৃশংতা হত্যার যুদ্ধ করা যাবে না, বরং যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন তৈরি হয়ে যায়, যেগুলো মেনে চলতে হবে। জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ সালে এর জন্ম, আর এর আগে ১৯৪৮ সালের হিউম্যান রাইট চার্টার রচিত হয়ে যায়। এ ছাড়া, আরো পরে ১৯৬৬ সালের জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক সিভিল ও পলিটিক্যাল রাইট (ICCPR) রচিত হয়ে যায়। সংক্ষেপে বললে, এ সবগুলো আইন, কনভেনশন বা চুক্তির সারকথা হল, গায়ের জোর থাকলেই আর সবকিছু করা যাবে না।
কাজেই অন্যের স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব অমান্য, দেশ দখল, নাগরিক মানুষের অধিকার না মানা- এসব ইত্যাদি পেরিয়ে এসে গ্লোবাল ইতিহাস আজকের দুনিয়াতে দাঁড়িয়ে – ফলে কেবল ‘আমি সাদা তাই আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নাও”- বলে একালে শুধু এই সাদাবাদীরা কতদুর যাবে; এ কথা বলে কতটুকু তারা আগাতে পারবে? তবে হ্যাঁ পরোক্ষ শাসন সম্ভব, যদিও তা দূর থেকে প্রভাব রাখা প্রভাবিত করা অর্থে হতে হবে। একালে আমেরিকা ইরাক দখল করেছে, ছেড়েও দিয়েছে। পুতুল শাসক রেখে শাসন করেছে- এসব পরোক্ষ কাজ সম্ভব। যদিও কফি আনানের মুখ থেকে – ইরাকে আমেরিকা ‘দখলদার বাহিনী’- এই রায় শুনেও ক্ষমতাধর আমেরিকাকেও চুপচাপ সেকথা হজম করে থাকতে হয়েছে।

এসবের সারকথা হল, যে কলোনি শাসন আমলের সাদা শ্রেষ্ঠত্বের স্বপ্ন এরা এখন আঁকছে; অথচ সেই শাসন বহাল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, পরে নয়। দুনিয়া এখন সে জায়গায় নেই। খোদ ইউরোপের সব রাষ্ট্রকেই কলোনি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। পরবর্তিতে সাদা চামড়ার গরম বা শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকেই তারা কিছু রক্ষা করতে পারেনি। তাই প্রধান প্রশ্ন – ইউরোপের এখন যেসব রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আছে বা থাকবে, তাদের সকলকেই এসব হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট রাজনৈতিক ধারাগুলোকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। করতে বাধ্য নইলে, জাতিসঙ্ঘে জবাবদিহি করতে হবে। সভ্যতার গরম ফুটা হয়ে যাবে। হয়ত এর আগে বিরাট একদল লোক এই আত্মগ্লানিতেই মারা যাবে।

তার মানে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া আবার কায়েমের যে উসকানি দেয়া হচ্ছে, এর মেনটর যারা, তারা হয় নাদান আর নাহলে নরেন্দ্র মোদির মতো চিন্তা্ আর দলের লোক এরা। অর্থাৎ তাদের উদ্দেশ্য হল, সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া আবার কায়েমের উসকানি – এই ন্যাশনালিজমের আওয়াজ তুলে আসলে ভোটের বাক্স ভর্তি আর ক্ষমতা পাওয়া। সাদা শ্রেষ্ঠত্বের কোন দুনিয়া কায়েম এদের আসল লক্ষ্য নয়, কম্মো না। সে মুরোদ নাই তা তারা জানে। ঠিক যেমন মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির মূল লক্ষ্য হল ভোটের বাক্স ভর্তি ও সরকারে আসা – আর এক হিন্দুত্বের ফ্যাসিজম কায়েম করে বিরোধী নির্মূল করা। তবে ইউরোপ নিশ্চয়ই ভারত নয়। স্বাধীন মর্ডান রিপাবলিক ইউরোপের নাগরিক্দেরকে তাদের চিন্তার উপর সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া কায়েমের স্বপ্ন ও লোভ দেখিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে এক ফ্যাসিজম কায়েম- সেটা বেশ কষ্ট কল্পিত অবশ্যই।

এ ছাড়া আর একটা দিক আছে। একালের ক্যাপিটালিজম মানে কোনো একটা রাষ্ট্রের মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ এমন কোনো ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটালিজম’ বলে কিছুই আর নেই। এক এবসার্ড কল্পনা মাত্র। ক্যাপিটালিজম মাত্রই গ্লোবাল। অন্য রাষ্ট্রের সাথে লেনদেন- পণ্য, পুঁজি, বাজার, বিনিয়োগ ইত্যাদি সব কিছুই এখন গভীরভাবে সম্পর্কিত থেকে বিনিময় এক্সচেঞ্জ করতে আমরা সবাই বাধ্য। এ অবস্থায় কোনো ‘সাদাদের ক্যাপিটালিজম’- এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। বরং উল্টো, সাদা লোকদের উৎপাদিত পণ্য প্রডাক্টের ক্রেতা কেবল সাদা চামড়ার লোকেরাই হোক, সেটা সাদা মানুষের চাওয়া হতেই পারে না।

তার মানে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারদের বয়ানের সাফাইয়ের ঠিক-ঠিকানা নেই। অসঙ্গতিতে পরিপূর্ণ। যদিও উসকানি আছে চরমে। তবে এমন যেকোনো দাবিদারদের বয়ানে একটা কমন জিনিস আমরা দেখতে পেয়ে থাকি। তা হলো যে আইডেনটিটি বা পরিচয় (যেমন- এখানে আমরা সাদা চামড়ার খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী পরিচয়) তারা দাঁড় করাক না কেন, তা তারা করবে এর কোনো অতীত অর্জনকে টেনে এনে। আর সেকালের এমন অর্জন বলে কোন কিছু থাক বা না থাক ঐ জনগোষ্ঠীর অতীতে অনেক শান-শওকত ছিল, প্রভাবশালী ছিল এমন গল্পগাথা তৈরি করে প্রচার করবেই তারা। এটাই সাদা-বাদী সুড়সুড়ি।

দেখা যাচ্ছে, ব্রেন্টনের মেন্টর-পীরেরা গল্পগাথা তৈরির এ কাজে ক্রুসেডকেও তুলে এনেছে। কিন্তু ঘটনা হল, খ্রিষ্টান ইউরোপ তো ক্রুসেড জিতেনি। এ ছাড়া ক্রুসেড মূলত বারো-তেরো শতাব্দীর পরে ইউরোপেই আর কখনও জাগেনি। বরং পনেরো শতাব্দীর পর থেকে প্রধান শাসকগোষ্ঠী বা শ্রেণী বলতে ইউরোপ তা আর ধর্মতাত্ত্বিক-ভিত্তির কোনো শাসকগোষ্ঠীর হাতে থাকেনি; বরং ম্যানুফাকচারার, জাহাজ ব্যবসায়ী, কলোনি দখলকারি মাস্টার – এসব, আর ওদিকে আরেক চিত্র, মোটের ওপর যারা ছিল রাজতন্ত্রবিরোধী। এসব বৈশিষ্ট্যের মডার্ন রিপাবলিক রাজনৈতিক ধারার শাসন কায়েম হয়ে যায়। ক্রুসেডের সাথে যারা স্বার্থ আর বয়ানের দিক থেকে যোজন যোজন দূরে। তাহলে একালে এসে আবার ফিরে ত্রুুসেডের গর্ব তুলে অথবা হেরে যাওয়ার সহানুভূতি সে কার কাছে বেচবে? কার থেকে পাবে বলে আশা করে? মডার্নিস্ট ইউরোপের জনগণ কি ক্রুসেডের গর্ব অথবা মুসলমানদের হাতে হেরে যাওয়ার সহানুভূতির ভেতর আশ্রয় নিতে রাজি হবে? আসলে এটাকে এক কষ্ট-কল্পিত ফ্যান্টাসি বললেও কম বলা হয়।

আর এক চরম স্ববিরোধিতাঃ সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারদের বয়ানের আর এক বৈশিষ্ট্য হল, মাইগ্রেন্টবিরোধিতা [অভিবাসী=migrant]। যেটা আসলে ‘অপর’ বা বিদেশী ভীতি ও বিরোধিতা; যাকে বলা যায় জেনোফোবিয়া [Xenophobia]। এটা অবশ্য সব ধরনের জাতিবাদেরই কমন ফিচার যে, তারা বিদেশী-বিরোধী হয়। তবুও ইউরোপের কোনো ধারার বয়ানধারীদের একালে মাইগ্রেন্টবিরোধী হওয়ার ক্ষেত্রে তা অবশ্যই শক্ত সাফাই তৈরিতে ব্যর্থ হবে। কারণ, যে ইউরোপের উত্থান বা ওর তরুণ বয়স কেটেছে অন্যের দেশ দখল করে, কলোনি শাসন করে সেই পুরান কলোনি-দেশ থেকে কয়েকজন নেটিভ মাস্টারের দেশে এসে বসবাস শুরু করলে তা না জায়েজ, এমন কথা সে কিসের ভিত্তিতে বলবে? সে কারণে এদের এই তথাকথিত মাইগ্রেন্টবিরোধিতার বয়ান বর্ণনা তৈরির ভিত্তি দেয়া মুশকিল হবেই। তা ছাড়া, মাইগ্রেন্টরা তো নিজে জোর করে ইউরোপে ঢুকে যায়নি। ইউরোপের অর্থনীতি ভালো চললে বাড়তি লেবার দরকার, তাই মাইগ্রেন্টদের স্বাগত জানানোর নীতি নিয়েছিল তারা, বলেই মাইগ্রেন্টরা এসেছে। অর্থনীতি খারাপ গেলে এখন এদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে খেদিয়ে দিতে চাইলেই ব্যাপারটা তত সরল হবে না, এতাই স্বাভাবিক।

তবুও আচ্ছা ধরা যাক। সাদা শ্রেষ্ঠত্বের বয়ানদাতাদের অভিবাসীবিরোধিতা জায়েজ। সে ক্ষেত্রে তারা আসলে  ত সাধারণভাবে বিদেশীবিরোধী হওয়ার কথা। আর সেই বিদেশী কোন ধর্মের তাতে কিছু এসে যায় না, এমনই হওয়ার কথা। কিন্তু তাহলে ব্রেনটনেরা মুসলমানদের ওপর হামলা করছে কেন? মুসলমানবিদ্বেষী কেন? এটা তো সাদাবাদীদের বয়ানের সাথে মিলল না! যেমন- হিন্দু ভারতীয় এমন নাগরিকেরা ইউরোপে ঢুকেছে এমন ক্ষেত্রে তারাও কি সাদা শ্রেষ্ঠত্বের বয়ানের চোখে মাইগ্রেন্ট বলে গণ্য হবে? আমরা নিশ্চিত, মনে হয় না। আসলে সাদাবাদীরা কি অভিবাসীবিরোধী নাকি মুসলমানবিরোধী – সে ফয়সালা তাদের আগে করতে হবে। কারণ – দু’টার সাফাই তো দুই রকম হতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মুখে তারা অভিবাসীবিরোধী কিন্তু কাজে ইসলামোফোবিক। তাদের বয়ান এমনই সব গরমিলে ভর্তি। তবে খুব সম্ভবত ওয়ার অন টেররের কারণে পাশ্চাত্য একালে সঙ্গোপনে অথবা প্রকাশ্যে মূলত ইসলামোফোবিক। এই ফোবিয়ার তেলে নিজেদের মাছ ভাজতে সাদাবাদীরা বাস্তবে ইসলামোফোবিক হয়ে উঠছে।

তবে এই প্রথম আমরা দেখছি সাদা চামড়ার প্রধান ধারা (সাদাবাদী নয় যারা) এমন আমপাবলিকেরা অপরাধবোধে ভুগছে। কারণ, সাদাবাদীদের নৃশংসতার দায় তাদের উপরও এসে পড়ছে। সেটাই নিউজিল্যান্ডে আমরা ঘটতে দেখছি। তাই সাদাবাদীদের থেকে নিজেদের আলাদা করে দেখাতে তাদের এই হেডস্কার্ফ প্রতীক নিয়ে সংহতি প্রকাশ। আপাতত এতটুকু বিচার করেই বলা যায়, সাদাবাদীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বিশেষত নিউজিল্যান্ডের মত প্রধানমন্ত্রীর  নুন্যতম অবস্থান যদি সে দেশে থাকে। বাকিটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা এ ভাবটাই পৌঁছে দিতে শতভাগ সফল হয়েছেন বলে প্রশংসিত। আমাদের স্বার্থেই জেসিন্ডার পাশে, প্লুরালিজমের [Pluralism] পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে।

যে কোন শ্রেষ্ঠত্ববাদই বিপদজনক, যা আপনাকে কোন না কোন একটা রেসিজমে পৌছে দিবে। ফলে সাবধান!

তবে তামাসা উপভোগের জন্য বলিতেছি – উগ্র জাতিবাদী আনন্দবাজারও জেসিন্ডার পক্ষে দাঁড়িয়ে মূল এক সম্পাদকীয় লিখিয়াছে – আগ্রহিরা ইহার সাধু-ভাষার মজা উপভোগ করিতে পারেন; যার শিরোনাম অ-স্বীকার।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা বয়ানের গরমিলে হারবে – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

পেটসর্বস্ব হলে বুদ্ধিজীবিতা হয় না

পেটসর্বস্ব হলে বুদ্ধিজীবিতা হয় না

গৌতম দাস

১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2wo

 

[সার-কথাঃ বুদ্ধিজীবিতা করতে গেলে চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। এটা প্রি-রিকুইজিট বা আগাম শর্ত। পেটের স্বার্থ তীব্র হয়ে গেলে অথবা আপনি নিজেই পেটসর্বস্ব চিন্তাবিদ হয়ে গেলে বুদ্ধিজীবিতা আর আপনার জন্য নয়। কারণ আপনার চিন্তার আর স্বাধীন হবার সুযোগ নাই। পেটের-স্বার্থ চিন্তার উপর আধিপত্য নিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশের রাজনীতি প্রসঙ্গে ভারতের সরকার অথবা প্রাক্তন কূটনীতিক বা বুদ্ধিবৃত্তি জগতের কেউ কোনদিন কোন মুল্যবোধ নীতি-নৈতিকতার উপর দাঁড়িয়ে কথা বলে নাই। নাগরিক মৌলিক মানবিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক বা জাতিসংঘের গৃহীত মুল্যবোধের উপরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে না পারলে ভারতের সেসব কথা আন্ডার-স্টেটমেন্ট বা নিম্নতলের খাটো-কথা হয়েই থেকে যাবে; পেটসর্বস্ব কথা যাকে বলে।]

এক প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় (MEA) কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে ঐ অনুষ্ঠান ছিল নিয়মিত ব্রিফিং, বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষ কোনো কিছু নয়। বাংলাদেশের দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলোয় ৬ ডিসেম্বর তাদের নয়াদিল্লি প্রতিনিধি প্রেরিত এমন রিপোর্টে এটা  ছাপা হয়েছে। তিনি লিখেছেন, “এর আগে নানা সময় বিভিন্ন প্রতিবেশী দেশের ভোট নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আগ্রহ দেখিয়েছে। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মুখপাত্র রবীশ কুমার এড়িয়ে যান”।

তার মানে, ভারত অন্য দেশের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করে না এমন নয়; করেই থাকে এবং সেটা এখানেও তারা অস্বীকার করে নাই। তার পরও কোনো মন্তব্য করেননি মুখপাত্র। কিন্তু তবুও যে কথার অর্থ হয় না, কথার কথা – এমন কথা হিসেবে বলেছেন, “বাংলাদেশের ভোট একান্তই ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমার মনে হয় না, প্রতিবেশী বন্ধুদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে”।

গত ১৭ নভেম্বর প্রথম আলোতে এমনই আর এক রিপোর্ট ছাপা হয়েছিল। তবে সেটা ছিল মূলত একই প্রতিনিধিরই নিজ উদ্যোগে বাংলাদেশের নির্বাচন সম্পর্কে নেয়া কিছু মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াসংবলিত একটি রিপোর্ট। আর সেই মন্তব্য-প্রতিক্রিয়াদাতা ছিলেন ভারতের কিছু সাবেক এবং বর্তমান রাষ্ট্রদূতও। এ ছাড়া, আরো ছিলেন এক থিংকট্যাংক ব্যক্তিত্ব।

১৭ নভেম্বরের রিপোর্ট লিখার আগে বাংলাদেশে ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রদূত হর্ষবর্ধন শ্রিংলার সাথে সরাসরি সে প্রতিনিধির কথা হয়নি। তবে অন্য কোথাও তিনি যেসব কথা বলেছেন, এমন রেফারেন্সে কিছু কথা সেখানে আছে। যেমন – বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, এটা দেখে নাকি ভারত “উৎফুল্ল”। এছাড়া, ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য না করলেও তারা মনে করেন, “সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে ঠিক সময়েই ভোট হবে এবং সেই ভোট হবে “অংশগ্রহণমূলক”; বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত থাকবে” ইত্যাদি।

কিন্তু ঘটনা হল, আমাদের নির্বাচন নিয়ে ভারতের এ’ধরনের প্রতিক্রিয়া পড়তে গিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় যে সমস্যায় পড়তে হয় তা হল, আমাদের কোনো ইস্যুতে ভারতের “সরকারি অবস্থান” অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট (Intellect) বা সাবেক ডিপ্লোম্যাটের বক্তব্য কখনোই কোনো “নীতিগত অবস্থানে” অথবা কোনো “মরালের” ওপর দাঁড়িয়ে তারা বলছেন – তা আমরা সাধারণত দেখিনা।

তাদের মন্তব্যগুলো অনেকটা – “মেরা ভারত মহান হ্যায়” ধরনের “জাতিবাদী দেশপ্রেমিকে” (State Interest) বক্তব্যের মত। যেকোন জাতিবাদী শ্লোগান কখনই কোন নৈতিকতা বা নীতির উপর দাঁড়াতেই পারে না যেটা অন্য রাষ্ট্রস্বার্থের ক্ষেত্রেও কাজ করবে, মানে কমন। এজন্য বলা হয় জাতিবাদী শ্লোগান মাত্রই এমন যে, তা সব সময় কোন কমন মরালিটি-ভিত্তিক হয় না। ফলে তা ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম’ সর্বস্ব বক্তব্য। আর যা ভারতের ‘জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমিকতা’ সর্বস্ব, তাতে ভিন্ন রাষ্ট্র বাংলাদেশের কী স্বার্থ? তাই এর সোজা মানে, এগুলা ভারতের সরাসরি একান্ত স্বার্থের দিক থেকে বলা কথা। অর্থাৎ কমন ইন্টেলেক্ট ভ্যালুজ বা “বুদ্ধিবৃত্তিক অভিন্ন মূল্যবোধ” – এর ওপর দাঁড়িয়ে বলা কোনো কথা নয়। ভারতের সরকারী অবস্থান বা কোন  ইন্টেলেক্ট বা সাবেক ডিপ্লোম্যাটের বক্তব্য কোন “বুদ্ধিবৃত্তিক অভিন্ন মূল্যবোধ” দাঁড়াতে এখনও কোনদিন পারে নাই। শিখেনি বা পারেনি।

আসলে নীতিগত অবস্থানের উপরে দাঁড়ানো মানে কী? এর মানে হল, এমন এক অবস্থান যার পেছনে কিছু ভ্যালুজ বা মূল্যবোধ বা মরাল কাজ করে আছে। আর “বুদ্ধিবৃত্তিক কমন মূল্যবোধ” বলতে যেমন – যেকোন রাষ্ট্রের নাগরিক মৌলিক স্বার্থ (Human values) বা আন্তর্জাতিক মানবিক নাগরিক অধিকার (Civil & political Right)। সব রাষ্ট্রেরই করণীয় ‘নাগরিক অধিকার রক্ষার’ ন্যূনতম কর্তব্য আছে। সেকারণে চাইলে সহজেই, চেষ্টা করলে যেকোনো দু’টি রাষ্ট্রের “বুদ্ধিবৃত্তিক কমন মূল্যবোধের” কিছু ভিত্তি দাঁড় করানো সম্ভব। কিন্তু  উলটা দিকে – এর অনুপস্থিতি মানে, কমন কোন ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে বলা কথা যদি না-ই থাকে, তবে ভারতের সরকারি অবস্থান অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট বা সাবেক কূটনীতিকসহ যে কারো মন্তব্যের কোনো অর্থ-তাৎপর্য বা ভিত্তি থাকে না। যেমন – বাংলাদেশের নির্বাচনে ‘নাগরিকদের স্বাধীনভাবে ভোট দেয়ার অধিকার’ থাকতে হবে। এটা মানার মত কী ভারতের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তিত্ব সত্যিই কী আছেন? অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে না!

সব রাষ্ট্রেরই কৌশলগত নানা স্বার্থ থাকে, যার ফলে সব সময় সত্যি কথাটা সরাসরি বলতে পারে না। তবে মিথ্যা না বলে, মানে সত্য-মিথ্যার মাঝখানে নিজ অবস্থান অস্পষ্ট, রেখে কথা বলার ধরণ, এটাই যেন কূটনৈতিক ভাষার এক বড় বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এ তো গেল রাষ্ট্রীয় অবস্থান; তাহলে কোন বুদ্ধিবৃত্তিক ব্যক্তি যিনি সরকারি পদে নেই, তার কোন ‘বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যবোধ’-এর ওপর দাঁড়িয়ে কথা বলতে না পারার কোন কারণ নাই। আর এই না পারাটা অগ্রহণযোগ্য। বরং এতে তিনি আসলে একরকম করুণার পাত্র হয়ে যান। আর সোজা ভাষায় বললে তা হয়ে দাঁড়ায় – পেটসর্বস্ব এক লোকের অযাচিত বা গায়ে পড়া কিছু কথা। এর চেয়ে বড় কথা, এতে তাঁর ধান্ধাবাজি ও পেটিস্বার্থের দিকটিও উদোম হয়ে যায়। তবে আমাদের অবজারভেশন বলে, ভারতের প্রায় সব প্রাক্তন কূটনীতিক যেখানে চাকরি শেষে প্রো-আমেরিকান অথবা সরকারি শুভ-দৃষ্টিপ্রাপ্ত থিঙ্কট্যাঙ্কে নিয়োজিত হয়েছেন। খুব সম্ভবত চাকরি শেষের এই নিয়োগের স্বার্থেই তাদের কোন স্বাধীন অবস্থান আমরা দেখি নাই। সারা জীবন দল নির্বিশেষে ‘সরকারি অবস্থানের’ তাবেদারি করতে থাকেন। অতএব এটা পেট সর্বস্ব অবস্থান বলতে পারি, তাই কোন নীতিগত অবস্থানের কোন সুযোগ নাই।

একথা সত্য, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ (State Interest) জিনিসটার গুঢ় দিকটা অনেক সময় মরালিটি দিয়ে গঠিত ও উদ্ভূত হয় না। তাই অনেকের কাছে তা রক্ষা করা কঠিন। এর পরও রাষ্ট্র-সরকারের নীতি-পলিসিগত কিছু ন্যূনতম দিক সেখানে থাকে। চাইলে তা রাখাও সম্ভব; আর তা বজায় রাখতেও হবে যদি নুন্যতম কিছু মৌলিক নীতি নৈতিকতা মেনে চলতে নিজের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকেন। কিন্তু এই মাপকাঠিতে ব্যক্তির, বিশেষত বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে জড়িতদের বেলায় এমন ছাড়ের কথা বলা হচ্ছে না। সে সুযোগও থাকার কথা নয়।

আবার ‘রাষ্ট্রস্বার্থ’ বলেই তার ক্ষেত্রে সব ছাড়, ব্যাপারটা তেমনও নয়। বাংলাদেশে দিল্লির স্বার্থ আছে, থাকবে। কিন্তু অবশ্যই সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিষয়ক ন্যূনতম কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে এরপর সেই স্বার্থ প্রকাশিত হতে  হবে। জাতিসঙ্ঘের বা আন্তর্জাতিক নীতি কনভেনশনের কিছু নৈতিকতা ও মূল্যবোধ এবং মানবাধিকার হতে হবে এসবের ভিত্তি। আসলে এমন ভিত্তির ওপর যদি দাঁড়াতে পারি, তবে সেই কারণে আপনাতেই সেখান থেকে বাংলাদেশ নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে মন্তব্য করার ভিত্তি ও সাফাই তৈরি হতে পারে। কারণ, উভয় রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থের পক্ষের কিছু নৈতিকতা বা মূল্যবোধের অভিন্নতা, এটাই সেই ভিত্তি তৈরি করে দিতে পারে।

যেমন – “জনগণের ভোট দেয়ার সুযোগ অবাধ হতে হবে”। আর সেই অবাধে দেয়া ভোট থেকেই “একমাত্র রাষ্ট্রক্ষমতার ম্যান্ডেট প্রাপ্ত” বলে কোন দল বিবেচিত হতে পারে – এটা একটা কমন মুল্যবোধের ভিত্তি হতে পারে। কারণ এই কথাটা কেবল বাংলাদেশের বেলায় নয়, ভারত ত বটেই যেকোন রাষ্ট্রের বেলায়ও সমান ভাবে সত্য। আর এটা যেকোন মডার্ন রিপাবলিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম বৈশিষ্ট্য। অতএব এটা হতে পারে  অভিন্ন নৈতিকতা বা মূল্যবোধ। কিন্তু ভারতের রাষ্ট্রস্বার্থ এমনই “দুস্থঃ আর হাভাতে” অবস্থায় পৌঁছেছে যে, বাংলাদেশের জনগণের “ভোট দেয়ার অধিকার”- ন্যূনতম এ দিকটি উপেক্ষা করে হলেও যেকোন উপায়ে ভারতকে বাংলাদেশ থেকে নিজের রাষ্ট্রস্বার্থ উদ্ধার করতে হয়! ভারত এমনই দুস্থঃ! এমন জায়গায় পৌঁছে গেছেন ভারতের নীতিনির্ধারক মহল।

গত সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের বাংলাদেশে আসা আর তাঁর খোলাখুলি হস্তক্ষেপ, এখনও এক রেকর্ড হয়ে আছে। তিনি বলেছিলেন, “সবচেয়ে বেশিসংখ্যক দল নিয়ে” মানে, বিএনপির জোটকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করতে হবে। এছাড়া এরশাদের সাথে মিটিংয়ে সুজাতা এরশাদকে নির্বাচনে  যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা এরশাদ গণমাধ্যমে প্রকাশও করে দিয়েছিলেন। এরশাদ বলেছিলেন, তাকে ‘পাতানো’ বিরোধী দল হয়ে যেতে বলা হচ্ছে, তা না হলে নাকি ‘বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায়’ এসে যাবে।

আমরা সবাই বিস্ময়ে লক্ষ করেছি সুজাতার সে হস্তক্ষেপমূলক পদক্ষেপ নিয়ে ভারতের কোনো বুদ্ধিজীবী, সাবেক কূটনীতিক বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কেউ কখনো নিন্দা বা সমালোচনা করেননি। নিজেরা লজ্জিত ও বিব্রতও হননি। অন্তত ভারত-সরকারের এই ভূমিকার প্রশ্নে তাদের কোনো ভিন্ন মত আছে, এমনটি দেখা যায়নি। এই হল ভারতের বুদ্ধিজীবীতা!

বাংলাদেশে আবার জাতীয় সংসদ নির্বাচন এসেছে। আর তাঁরা এই নির্বাচন নিয়ে আবার মন্তব্য করতে এসেছেন। রাষ্ট্র, নির্বাচন, সরকার ইত্যাদি বিষয়ে তারা কী বলবেন? কাকে ভালো, কাকে মন্দ বলবেন? কিসের ভিত্তিতে বলবেন? ভারতের ইন্টেলেক্ট, সাবেক ডিপ্লোম্যাট বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব কখনোই যে ভিত্তি তৈরি করা পর্যন্ত পৌঁছতেই পারেননি! এটা তো তাই একধরনের পেটসর্বস্ব বা স্বার্থসর্বস্ব হয়েই আছে সব কিছুতে। এ অবস্থায় এবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমার যখন বলেন, ‘বাংলাদেশের ভোট একান্তই ওই দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমার মনে হয় না প্রতিবেশী বন্ধুদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করা উচিত হবে”- তখন এই অট্টহাসি দেয়া ছাড়া আর কী করা যায়!  স্বভাবতই এগুলো হাস্যকর ‘অনর্থক কথা’ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে এবং হতে থাকবে।

কিন্তু তবু ঘটনার আর এক ভিন্ন সুক্ষ্ম কোণও সম্ভবত আছে। ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রবীশ কুমারের এবারের মন্তব্য করতে না চাওয়া – এরও অর্থ আছে অবশ্যই; তাহলে সেটাই বা কী? যে অর্থ না লিখলেও প্রকাশিত হয়ে যায়, সেই অর্থটা কী? এর সোজা অর্থ হল, বাংলাদেশে যা হচ্ছে, এ পর্যন্ত সেটাই ঠিকঠাক; অর্থাৎ যা যা হবে বলে তারা জেনেছে সেটিই ভারতের স্বার্থ ও অবস্থান এর পক্ষেই আছে। দ্বিতীয়ত, এর আর এক অর্থ হল – খুব সম্ভবত ভারত মনে করে এবারের নির্বাচন নিয়ে যদি ভারত প্রকাশ্যে তার “অনুমোদনের কথা” ২০১৪ সালের নির্বাচনের মত প্রকাশ করে ফেলে, তবে সমস্যা হবে। অবশ্যই মূল কারণ এবার বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন। যেকোন ভাবে আওয়ামী লীগ আবার জিতেছে এটা দেখতে চাওয়া – এটা তাদের প্রথম চয়েজ বা কাম্য হলেও যদি কোন কারণে প্রধান বিরোধী “জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট” কোনো ‘বিপর্যয়’ ঘটিয়ে ফেলে, তখন কী হবে? এই দুশ্চিন্তা থেকেই সম্ভবত, মূলত তাদের এইসব “অনর্থক কথা” বলে রাখা। এমন অর্থই রবীশ কুমারের ‘না বলা কথা’ প্রকাশ করেছে।

বোঝা যাচ্ছে, ভারত সরকারের মুখপাত্র অথবা ভারতের কোনো ইন্টেলেক্ট, সাবেক কূটনীতিক বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সবাই এখনও এমনই কঠিনভাবেই দুস্থ-হাভাতে অবস্থায় আছেন যে, তাদের পক্ষে বাংলাদেশের নাগরিকদের মৌলিক ভোটের অধিকার প্রসঙ্গে কোনো নৈতিক অবস্থান নেয়া অসম্ভব। এ কারণেই ভারতের সরকার বা কোনো ইন্টেলেক্টের বিবৃতি-মন্তব্যের কোনো গুরুত্ব তাদের কাছেও নেই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “পেটসর্বস্ব বুদ্ধিজীবিতা – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

চীন কী চায়, চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়

চীন কী চায়, চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়

গৌতম দাস

০৭ জুলাই ২০১৮, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2sw

 

রাষ্ট্রসংঘসহ শীর্ষ চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায় – ছবি : সংগৃহীত বাংলানিউজ থেকে

বাংলাদেশ জুলাই মাসটা শুরু করেছে গ্লোবাল মিডিয়ায় ব্যানার হেডলাইন হয়ে, কারণ রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেলসহ পাঁচ সংগঠনের প্রধান একসাথে একই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তেনিও গুতেরেস (Antonio Guterres), বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম (Jim Yong Kim) ও আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রেসিডেন্ট পিটার মরা (Peter Maurer) এবং সাথে রাষ্ট্রসঙ্ঘের বৃহত্তর অধীনেই কাজ করা আরো দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর -এর হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি (Filippo Grandi ) ও মিয়ানমারের মানবাধিকার-বিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ের ইয়াংহি লি বাংলাদেশে গত ৩০ জুন তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে পৌঁছে গেছিলেন। বলাবাহুল্য হবে না যে রোহিঙ্গা  ইস্যুতে এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান হল, মূলত তিন বিষয়ে। এক : রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে সাময়িক অবস্থানের সময়ে দেখভালের ন্যূনতম ব্যবস্থার সব বিষয় নিশ্চিত করতে কাজ করা। দুই : রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদরের সাথে বার্মায় ফেরত পাঠানোর একটা ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করা। আর তিন : যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও ধর্ষণসহ মানবেতর অবস্থার জন্য দায়ী তাদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা। সারকথায় এ সফরে তাই মূল উদ্দেশ্য বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের এবং আশ্রয়দাতা দেশ বাংলাদেশকে রাজনৈতিক সমর্থন জানানো, পাশে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা। এছাড়া আশ্রয় দেয়ার অর্থনৈতিক দায় গ্লোবালি শেয়ার করা, তাই বিশ্বব্যাংক নিজেই ৪৮০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনার কথা জানাল। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তাই বলছেন ইতোমধ্যেই “উদার জনগোষ্ঠি বাংলাদেশিরা” রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে “বিপুল বোঝা নিজের কাধে” নিয়েছে। “তাদেরকে আর শাস্তি না দিয়ে তাদের বোঝা আমাদের শেয়ার করা উচিত”। ইংরাজি দৈনিক ডেইলি স্টার লিখেছে, “Generous humane country like Bangladesh shouldn’t be punished: WB”।

দুনিয়ায় মানুষ, সাধারণভাবে সব মানুষের জন্য ও পক্ষে কাজ করবে এমন “বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন” (Multi-lateral) গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত চলে আসা দুনিয়াতে মানুষের অর্জন কম নয়। এমন অনেক প্রতিষ্ঠানই আজকাল পাওয়া যাবে যারা সাফল্যের সাথে দুনিয়ার মানুষের সম্ভাবনা, মানুষের সাফল্যের ও অর্জনের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। বহুরাষ্ট্রীয় শব্দটাকে ইংরাজিতে মাল্টি-ল্যাটারেল (Multi-lateral) বলা হয়। কারণ তা, এ কথা মনে রেখে যে, আধুনিক যেকোনো ছোট বা বড় রাষ্ট্র মাত্রই সার্বভৌম রাষ্ট্র; যার সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের উপরে ক্ষমতাশালী অন্য কেউ থাকতে পারে না, পারবে না। ফলে ‘রাষ্ট্রগুলোর অ্যাসোসিয়েশন’ ধরনের অন্য কোনো সংগঠনও এর উপরে থাকতে পারে না, কর্তৃত্বাধীন করতে পারে না। তাই ‘রাষ্ট্রগুলোর অ্যাসোসিয়েশন’ ধরনের সংগঠন যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, রেডক্রস ইত্যাদির মতো সংগঠনগুলোর জন্ম হয়েছে এমনভাবে, যেন এসব সংগঠনের সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সুপ্রীম, তা অলঙ্ঘনীয় এ মূলনীতিকে মাথায় রেখে। তাই ল্যাটারাল ধারণাটা পাশাপাশির, কেউ কারো ওপরে নয়; না কোনো সদস্য আর এক সদস্য রাষ্ট্র, না কোনো অ্যাসোসিয়েশন সংগঠন নিজে সদস্য রাষ্ট্রের ওপরে কর্তৃত্ববান। এই কারণেই ল্যাটারাল শব্দটা যার আক্ষরিক বাংলাটা হল “বহু বাহু” বিশিষ্ট।

তবু বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন গড়ার বেলায় সার্বভৌমত্বও এখানে ঠিক মূল বিষয় নয়। বরং মূল বিষয় মূল্যবোধ (values)। ঠিক কিসের বা কী সংক্রান্ত মূল্যবোধ? এককথায় বললে মানুষ সংক্রান্ত। মানুষ কে, কারা, কী এসব বিষয়ে মৌলিক ধারণা সংক্রান্ত মূল্যবোধ।

লক্ষ্য করার মতো একটি বিষয় হল, মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন যেমন রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে “রাষ্ট্রসংঘ”, যুদ্ধে দুতয়ালি, ত্রাণ আশ্রয় সুরক্ষা চিকিৎসা সেবা দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ক এবং যুদ্ধকেই কিছু নীতি কনভেনশনের অধীনে আনার সংগঠন “রেডক্রস” ইত্যাদির জন্ম বেশি দিন আগের নয়। মাত্র গত শতাব্দীতে, তাও বিশেষত ১৯০০-১৯৫০ এই প্রথম অর্ধের মধ্যে। এর মূল কারণ একটি অভিন্ন মূল্যবোধের উপরে দুনিয়ার সবাইকে নিয়ে একমতে দাঁড়ানো সহজ ছিল না। কেন? কারণ, দুনিয়ার নিয়ম যখন থাকে অপর রাষ্ট্রকে সরাসরি জবর দখল ও কলোনি করে রাখা, সেখানে মানুষের আর মূল্য কী? মূল্যবোধই বা কী? তবু গত ১৯১৯ সালে রেডক্রসের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল।

তবে বুঝার সুবিধার জন্য একটা কথা আগে বলে রাখা ভাল। বুঝার সূত্র। কলোনি দখল যুগের শুরু হয়েছিল মোটামুটি ১৭০০ সালের পর থেকে ফলে সেটা ঐ কলোনি দখলের যুগের কারণেই সম্ভবত মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে কোনো অভিন্ন মূল্যবোধ দাঁড়ানোর সম্ভাবনা সেকালে নেই। কিন্তু মজার কথা এর প্রথম দুই শ’ বছর যুদ্ধবিগ্রহ চলেছিল কলোনি দখল মাস্টারদের মধ্যে তবে সেটা তাদের নিজ  ইউরোপীয় দেশে নয়। বরং যে দেশ-রাষ্ট্র দখল করা হবে এশিয়া, আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার সেসব প্রান্তীয় অঞ্চলে সেখানে, কলোনি দখলকারদের মধ্যে। ফলে এসব গরীব দেশের লোক মরলে তা দেখে দুঃখ মনোকষ্ট পাওয়ার কেউ ছিল না। কিন্তু দিন একভাবে যায়নি। হঠাৎ ১৯০০ সালের পরে এসে দেখা গেল যুদ্ধ এবার হানা দিয়েছে ঘরের মধ্যে, খোদ ইউরোপের কলোনি দখলের মাস্টারদের নিজ দেশে, দেশগুলোর মধ্যে। তাই এবার এটাকে বিশ্বযুদ্ধ বলা হচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল ১৯১৪-১৮ সাল। ইউরোপের সেই যুদ্ধ যার মূল বিষয় ছিল আসলে কলোনি দখলদার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কামড়াকামড়ি, তবে মরণ কামড়াকামড়ি। কিন্তু যেহেতু ঘটনায় এবারের ভিকটিম খোদ মালিক মহাজনের ঘর ফলে এবার এখান থেকে সুফল এসেছিল। কলোনি মাস্টার ভিকটিম ফলে এলিট, তাই অমানবিক, মানবেতর, নৃশংস, ঘৃণিত ইত্যাদি এসব মূল্যবোধযুক্ত শব্দের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। তবে আর একটা বিষয় অবশ্যই বিরাট প্রভাব রেখেছিল বলা যায়। তাহলো ইতোমধ্যে সারা ইউরোপে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট মানব-অধিকারের ধারণা ও মূল্যবোধের ব্যবহার ও চর্চা অন্তত নিজ ঘর থেকে শুরু হয়ে গেছিল। ফলে মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা, বেঁচে থাকা, জীবিকা নির্বাহ, ইনসাফ পাওয়া ইত্যাদির অধিকার এবং সাধারণভাবে মানুষের অধিকার ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রিপাবলিক এবং মানুষ নিজেই, অন্য কেউ না, একমাত্র নিজেই নিজেকে শাসন করার হকদার এসব মূূূল্যবোধগুলো গেড়ে বসা শুরু হয়ে গিয়েছে। ফলে ঘটনাবলির শেষে রাষ্ট্রসংঘ, এসব মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর রাষ্ট্রসংঘ জন্ম নিয়েছিল ১৯৪৪ সালে।

একটি ডিসক্লেমার জানিয়ে রাখার সময় বোধহয় পেরিয়ে যাচ্ছি। তাহলো, এখানে সাধারণভাবে সব পরিচয় ভিন্নতার ঊর্ধ্বে যেকোনো মানুষের জন্য ও পক্ষে কাজ করবে এমন বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন গড়ে তোলা প্রসঙ্গে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলছি। এর মানে এই নয় যে এসব সংগঠনগুলো সব আদর্শ ও ধোয়া তুলসীপাতা ও চরম সব অর্জনের সংগঠন এরা। না এমন আগাম অনুমান ধরে নেয়া ভুল ও তা ভিত্তিহীন। তবে, জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান “এটা এক চরম অর্জনের” – এ কথা মারাত্মক ভুল। আবার এর কোনো অর্জনই নেই এটাও মারাত্মক ভুল। বাস্তবতা হল, তাদের অনেক অর্জন থাকলেও এর বিরাট বিরাট ঘাটতি ও খামতি আছে সেগুলো পূরণের জন্য কাজ করতে হবে, লড়তে হবে এখনো অনেক, এটাই হল সঠিক মূল্যায়ন। এখানে জাতিসংঘ বলতে মানবাধিকার সনদ ১৯৪৮ সহ যত আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, নিয়ম রেওয়াজ ইত্যাদি মানব-অধিকার ও মূল্যবোধ যা এ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে সেসব ধরে নিয়ে কথা বলেছি।

সেকালে এসব যা কিছু অর্জন এর পেছনে এক শীর্ষ ভূমিকা ছিল আমেরিকার। যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ গড়া এটা আমেরিকারই এক দ্বিতীয় উদ্যোগ প্রচেষ্টা ছিল, আর তা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের। আর রাষ্ট্রসঙ্ঘ গড়ার প্রথম তবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া প্রচেষ্টাটা ছিল যার নাম হল “লিগ অব নেশন”, (রাষ্ট্রসঙ্ঘের আগের উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানের নাম )। সেকালে এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের সময়কালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন। এছাড়া, মনে রাখতে হবে কোনো জনগোষ্ঠী নিজেই নিজেকে একমাত্র শাসন করবে অর্থাৎ কলোনি শাসকের শাসন নয়, এই ভিত্তিতেই সদস্য রাষ্ট্রদের নিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘ গঠিত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলো গড়তে আমেরিকা নিজের অবদান ও ভূমিকা যা রাখা সঠিক ও সম্ভব মনে করেছিল অথবা যা পারেনি করেছে, আর এভাবে আমেরিকা দুনিয়া শাসন ও নেতৃত্ব দিয়ে যেতে পেরেছিল গত প্রায় ৭০ বছর। কিন্তু সময় এখন পালাবদলের। অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এবার এখন নতুন নেতা চীনা।

কিন্তু সেই সাথে আমরা কী দেখছি?
একটা উদ্যোগ যদি হয় জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবসহ পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সফর। তাহলে অপর দিকে এক উদ্যোগ, প্রায় সমান্তরাল আর এক তৎপরতা আছে চীনের নেতৃত্বে। স্পষ্ট করে বললে, বার্মা, বাংলাদেশ ও চীনের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রয়ের চীনে বৈঠক হয়েছে। এ তৎপরতাটা বিপরীত উদ্যোগ হিসেবে হাজির আছে।

এমনিতেই আন্তর্জাতিক অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তৎপরতায় মানুষের মর্যাদা রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সবসময় প্রধান বাধা এসে যা হাজির হয় তাহল, সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের বৈশ্বিক স্বার্থ অথবা  ঐ রাষ্ট্র পরিচালক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ক্ষমতায় থাকার স্বার্থ। বাংলাদেশের ভূমিকা কী তাই হতে যাচ্ছে?
এ ছাড়া স্বভাবতই মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা চীনকে বিপক্ষীয় ক্যাম্পে দেখতে পছন্দ করব না হয়ত। কিন্তু আমরা অপছন্দ করলেও চীন আমাদের হতাশ করার দিকে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। অর্থাৎ চীন মনে করছে এ ব্যাপারে সে আমেরিকার আমলের স্টান্ডার্ডও ধরে রাখার চেষ্টা করবে বা, নিচে পড়ে থাকবে। অথচ দুনিয়ার নেতা হওয়ার খায়েশ চীনের ষোলোআনা। এটা স্ববিরোধী। এ বিষয়ে, এককথায় এখনই বলা যায় –  গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ত হতে পারবে কিন্তু  দুনিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্বে চীনের আসা অসম্ভব। এমনিতেই কমিউনিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ড হওয়ার কারণে চীনের পক্ষে ‘পলিটিকস’ ও ‘রাইট’ শব্দগুলো অর্থ তাৎপর্য বুঝার ক্ষেত্রে তা এক বিরাট প্রতিবন্ধক। কারণ এখানে কমিউনিস্ট চিন্তার দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর প্রচুর। ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অধিকার’ কথার অর্থ তাৎপর্য বুঝতে কার্ল মার্কসের ঘাটতি আছে কি না সে প্রশ্ন না তুলেও বলা যায় ৭০ বছরের পরিচিত চর্চার “মার্কসবাদ”, সেই মার্কসবাদ এর অর্থ তাতপর্য বুঝতে অক্ষম। সে এখনো অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান এগুলোর বাইরে ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অধিকার’ শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে অক্ষম। অথচ ঐ শব্দগুলো সবই বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক সুবিধা সংক্রান্ত। রাজনৈতিক ক্যাটাগরির শব্দ বা ধারণাই নয় ওগুলো। যেমন মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের অধিকার নয় বরং এগুলোর বাইরে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছে, বঞ্চিত করেছে।

এছাড়াও, কথা পরিস্কার রাখতে হবে; রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের এক্ষেত্রে তার সুনির্দিষ্ট স্বার্থ আছে তা হল, রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বার্মার রাখাইনে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা। একবার ও শেষবারের মতো। আর সেক্ষেত্রে, বাংলাদেশের সরকার নিজের কোনো এক সঙ্কীর্ণ স্বার্থে এর বিরুদ্ধে গেলে বা এই স্বার্থকে রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। আজ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশ প্রশংশিত হচ্ছে। আমরা ভুলতে পারি না আর ঠিক সেই কারণেই এর আগের বছর কোন রোহিঙ্গা যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সে কথা ভুলে যেতে পারি না। পরের বছরও শুরুতে ভারতের প্ররোচনায় সীমান্ত সিল করে দিবার নীতি নীতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আভ্যন্তরীন নিজ জনগণের সহানুভুতি ও আশ্রয় না দিবার ক্ষোভ আঁচ করে পরে সীমান্ত খুলে দেয়াওয়া হয়।

এমনিতেই, বল গড়ানো শুরু করেছে দুইটা জায়গা থেকে। এক সাংগ্রিলা বৈঠক। সাংগ্রিলা মূলত এশিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক এক রাষ্ট্রজোট। সিঙ্গাপুরের  “সাংগ্রিলা নামের এক হোটেলে” তা প্রতিবছর আয়োজিত হয়ে থাকে। যেখানে সদস্য হিসেবে আমেরিকাও আছে, চীনও আছে। ইউরোপের মাতব্বর রাষ্ট্রেরা আছে, আছে মিয়ানমারও। গত জুন ২ তারিখের এবারের সিঙ্গাপুরের বার্ষিক বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করতে আসেন মিয়ানমার সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাউং তুন (National Security Adviser Thaung Tun)। মায়ানমার বা বার্মার গলার স্বর নামা শুরু হয় সেখান থেকে। তিনি সাত লাখ রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত নিতে নিজে প্রস্তাব দেন ও সম্মতি জানান। তিনি আবেদনের স্বরে সেখানে প্রশ্ন রেখেছেন, “স্বেচ্ছায় যদি ৭ লাখকে ফেরত পাঠানো যায় তাহলে আমরা মায়ানমার তাদের গ্রহণে আগ্রহী। এরপরেও এটাকে কি জাতিগত নিধনযজ্ঞ বলা যায়”?

“Myanmar is willing to take back all 700,000 Rohingya Muslim refugees who have fled to Bangladesh if they volunteer to return, the country’s National Security Adviser Thaung Tun said on Saturday”.

এবিষয়ে রয়টার্সের  এক ডিটেলড রিপোর্ট দেখা যেতে পারে এখানে। দেখা যাচ্ছে, তিনি এ প্রস্তাব দেন কারণ ওই সাংগ্রিলা সম্মেলনে মিয়ানমারের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি কি মিয়ানমারকে জাতিসঙ্ঘের আরটুপি (রেসপন্সিভিলিটি টু প্রটেক্ট) ফ্রেমওয়ার্ক চালুর দিকে নিয়ে যাবে? কথিত এই আরটুপি ফ্রেমওয়ার্কটি ২০০৫ সালে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব সম্মেলনে গ্রহণ করা হয়। [Shangri-La Dialogue, a regional security conference in Singapore, where he was asked if the situation in Myanmar’s Rakhine state, where most Rohingya live, could trigger use of the Responsibility to Protect framework of the United Nations.]

এর মধ্য দিয়ে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে নিজ দেশের জনগণকে রক্ষা এবং এই প্রতিশ্রুতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে ব্যর্থ হলে এক দেশ অন্য দেশকে সহযোগিতা করবে। [The so-called R2P framework was adopted at the 2005 U.N. World Summit in which nations agreed to protect their own populations from genocide, war crimes, ethnic cleansing and crimes against humanity and accepted a collective responsibility to encourage and help each other uphold this commitment.]

আর ওদিকে দ্বিতীয় ব্যাপারটা হল, এই মুহূর্তে জোকের মুখে নুনের মতো এক উদ্যোগ। সেটা হল, আইসিসির  ( International Criminal Court, ICC) প্রধান প্রসিকিউটর ফাতোহ বেনসুদার উদ্যোগ। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের কারণে তিনি যে অভিযোগের তদন্ত করতে চাইছেন তা হচ্ছে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়-‘জনগোষ্ঠীকে বিতাড়ন বা জোর করে অন্যত্র ঠেলে সরিয়ে দেয়া’ (অনুচ্ছেদ ৭ [১] [ডি])। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে তিনি অভিযোগ দায়ের করতে চান। আপাতদৃষ্টে অভিযোগটি হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বা লুটপাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে না হলেও এর তাৎপর্য এবং গুরুত্ব কম নয়, কেননা এই অভিযোগের শাস্তি ওইসব অভিযোগের চেয়ে কম নয়, প্রায় একই।

অর্থাৎ মিয়ানমারের জেনারেলদেরকে আইসিসির আদালতে তুলতে সক্ষম হতে পারার ইঙ্গিত। এই উদ্যোগের বিশেষ দিকটা হল, এতদিন  চীন বা রাশিয়ার দেয়া সবকিছুতে ভেটো মেরে মিয়ানমারের জেনারেলদেরকে আইনের আওতায় আনার সব কিছুকে আটকে ফেলা যত সহজ মনে হচ্ছিল এই প্রথম বার দেখা যাচ্ছে সেটা সম্ভবত এবার অকেজো হবে।

এমনিতেই শুরু থেকেই (ARSA) আরসা জঙ্গিদের গল্প বার্মার জেনারেলেরা সবাই কে খাইয়েছিল। আর তা ভারত, চীন এবং আমেরিকাসহ সবাই আনন্দের সাথে খেয়েছিল। কারো অরুচি লাগেনি।  বার্মার দেয়া বৈষয়িক সুবিধা বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টের লোভে সবার কাপড় উদোম হয়ে গেছিল। সবাই জেনারেলদের ভক্ত হয়ে উঠেছিল। তাদের বানানো (ARSA) আরসা জঙ্গিদের গল্প কার আগে কে বেশি বিশ্বাস করবে সে এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছিল।  সবাই গল্প সহজেই মেনে নিয়েছিল যে আরসা সন্ত্রাসীদের হামলাই সব কিছুর জন্য দায়ী। কিন্তু  কেউ নিজেকে প্রশ্ন করে নাই যে তাহলে হত্যা ও ধর্ষণের ভিতর দিয়ে  সাত লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়া হতে হল কেন? বার্মার সেনাবাহিনীকেই বা কেন রোহিঙ্গাদেরকে বিতাড়ন করতে হবে – এই প্রশ্ন চীন বা আমেরিকাসহ কেউই তখন তুলতে চায়নি। কিন্তু আগে যেমন অসহায়ভাব দেখা যাচ্ছিল, যে কেউ একটা জঙ্গি হামলার গল্প রান্না করলেই দুনিয়ার মা-বাপ যারা তারা সবাই তাকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেয়, কোনো প্রশ্ন করে না। এখন দেখা যাচ্ছে সেসব গল্প সবার এবার বদহজম হয়ে গেছে।

চীনের গ্লোবাল টাইমসে দাবি করা হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে, ‘চীনের নীতি ধারাবাহিকতায় সুসামঞ্জস্যপূর্ণ’। [On the issue of the Rakhine State, China’s position is consistent]। আসলে এটা একটা মুখরক্ষার কথা, কিন্তু অসত্য কথা। তাই যদি হয় তবে চীন তখন (২০১৭ সালে) কথিত আরসা জঙ্গি হামলাকে দায়ী করে জেনারেলদের গণহত্যা ও ধর্ষণ ও বিতারণ কাজের পক্ষে সাফাই দিয়েছিল কেন? আর এখন সে সাফাই কোথায়? এখন জেনারেলেরা আপস করতেই বা রাজি কেন? কেন অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে, এই ইস্যুতে চীন নিঃশ্চুপ?

[We believe that the issue should be solved through dialogue and consultations between Myanmar and Bangladesh, and the international community should act according to the two countries’ wishes,]

এ ছাড়া এখন রোহিঙ্গাদের তাদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদরের সাথে বার্মায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করা। এ ছাড়া যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও ধর্ষণসহ মানবেতর অবস্থার জন্য দায়ী তাদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা চীন কী এ দুই কাজ ও তৎপরতার বিরোধী? তাহলে কেন মায়ানমার আর বাংলাদেশের ডায়লগে সব সমাধা করতে চায় চীন?

গত চল্থ্বালিশ বছরে বার্মার সামরিক শাসকদের এই একই নিরবিচ্ছিন্ন নীতি চলে আসছে তাদের সাথে নতুন করে ডায়লগের ভিত্তি ও ভরসা কী?

বার্মার চরম মানবাধিকারের লঙ্ঘনকে আড়াল করতে চীন জেনারেলদেরকে আইনের আওতায় আনার কথা উঠলেই বার্মায় বাইরের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মনে করছে কেন? চীন অপরাধীদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনতে চায় না, না করলে কেন তা স্পষ্ট ভাষায় চীনের বলা উচিত।

চীন কী মনে করে বার্মায় মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটা কী সেখানে চীনের বৈশ্বিক স্বার্থের নিচে, কম গুরুত্বপুর্ণ? দেখা যাচ্ছে প্রশ্নটাকে চীন বরং দানব শাসকের ব্যক্তি ইচ্ছায় পর্যবসিত করে রাখবে, আর ওই ব্যক্তিশাসকের ইচ্ছাই রাষ্ট্রের (বার্মা বা বাংলাদেশ) সার্বভৌমত্ব বলে চালিয়ে দেবে তবে, এ চীন অচিরেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে অপসৃত হবে তা আগাম বলা যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
৫ জুলাই ২০১৮
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) জাতিসঙ্ঘসহ শীর্ষ চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]