সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদঃ বয়ানের গরমিলে হেরে যাবে

সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদঃ বয়ানের গরমিলে হেরে যাবে

গৌতম দাস

২৫ মার্চ ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yD

 

গত ২২ মার্চ ছিল শুক্রবার; অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডে গত ১৫ মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজের সময় এক জোড়া মসজিদে হামলায় ৫০ জনকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার ঠিক এক সপ্তাহ পরের শুক্রবার সেটা। এ দিন নিউজিল্যান্ডের প্রতিটি শহর দুপুরে, বিশেষ করে ঘটনাস্থল ক্রাইস্টচার্চ সিটিতে ‘হেডস্কার্ফ’ (Headscarf, ওড়না জড়িয়ে মাথা ঢাকা) লাগানো নারীদের পদচারণায় সরব হয়ে উঠেছিল। কারণ, ২২ মার্চ শুক্রবার ছিল নিউজিল্যান্ড জুড়ে আগের শুক্রবারে হামলায় নিহতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও তাদের পরিবার এবং সাধারণভাবে মুসলমানদের সাথে নাগরিক সবাইকে নিয়ে নিউজিল্যান্ডের সরকার ও প্রশাসনের সংহতি প্রকাশের দিন। এটা ছিল আসলে ধর্মীয় এবং সামাজিক ধরণের জমায়েতের এক মিশাল। ফলে তা মুসলমান ধর্মীয় আবার অন্যধর্মের লোকেদেরও সংশ্লিষ্ট হবার সুযোগ রাখা হয়েছে বা সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। যাতে সকলে মিলে সংহতি প্রকাশ করা যায়। আর “সংহতি” মানেই তো ধর্মসহ সব নির্বিশেষে সকলে মিলে যা পালন করা হয়। কিন্তু কিসের বিরুদ্ধে এই “সংহতি” সেকথাও মনে রাখা দরকার। “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী” [White Supremist] – এমন চিন্তা ও বয়ান আর এর চর্চার বিরুদ্ধে এই সংহতি। অর্থাৎ নিউজিল্যান্ডের এক ব্যাপক জনসমাগমে প্রধান ধারা হিসাব এই বক্তব্য উঠে এসেছিল  যে তারা “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী-দের” বিরুদ্ধে এবং ধর্ম-নির্বিশেষে তাঁরা সংহত – এককাট্টা।  তাই এই আয়োজন করা হয়েছিল ঐদিনের জুমার নামাজের জমায়েতের সাথে একসাথে। আর সেই উপলক্ষে আয়োজনস্থল ছিল দুই মসজিদে হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি বা নিহত হওয়া আল নূর মসজিদের সামনের স্থানীয় ‘হাগলে পার্ক’ [Hagley Park ]। সেখানেই বয়স-নির্বিশেষে নারীরা সবাই মাথায় হেডস্কার্ফ পরে যোগ দেন, যাতে তা তাদের প্রকাশিত সংহতির প্রতীকে পরিণত হয়।

স্বভাবতই মসজিদে হামলায় একসাথে পঞ্চাশজন মেরে ফেলার পর এর একটা মানসিক যাতনার প্রভাব তৈরি হয়েছিল নিউজিল্যান্ড জুড়ে।  মুসলমান জনগোষ্ঠি বিশেষ করে নারীরা যাদের সাধারণত মুসলমান পরিচয় মানে ওড়নায় মাথা জড়ানো হয়েই বের হতে দেখা যায়, ফলে তারা চিহ্নিত – ফলে তারা আবার হামলা আক্রমণের শিকার হন কিনা এই ভয়বোধ জেকে-বসা খুবই স্বাভাবিক। মুসলমান সহকর্মি বা পড়শিদের কাছে তাদের এই ভয়ভীতিবোধের কথা জানতে পেরে নিউজিল্যান্ডের একই সাধারণ মানুষ যাদেরও গায়ের রঙ সাদা তারা এতে অস্বস্তি আর কিছুটা অপরাধবোধেও ভুগতে শুরু করেছিল। অর্থাৎ মসজিদে হামলার ঘটনা কেবল নিউজিল্যান্ডের মাত্র ১% মুসলমান জনগোষ্ঠিকেই নয় প্রধান ধারার সাধারণ মানুষকেও আলোড়িত করে এক নেতি প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। আর সেখান থেকে সাদা-বাদীদের প্রত্যাখান করে মুসলমা্নদের ভয়বোধ আর সাধারণ মানুষের অস্বস্তি ও অপরাধবোধ – সবকিছু ঝেড়ে ফেলে একসাথে উঠে দাড়ানোর, রুখে উঠার প্রয়োজনীয়তা হাজির হয়েছিল। আর সেটাই ছিল হেডস্কার্ফে প্রকাশিত প্রতীকে “সংহতি” প্রদর্শনের কড়া বার্তা। এককথায় বললে, এই সংহতি প্রকাশের ফলে মসজিদে হামলার সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের যে উদ্দেশ্য ছিল যে নিউজিল্যান্ডের সাদাচামড়ার সাধারণ মানুষকে উস্কানি দেয়া, মুসলমান বা মাইগ্রেন্টদের বিরুদ্ধে তাদের শুড়শুড়ি দিয়ে ক্ষেপিয়ে তোলা ইত্যাদি সবকিছুই মাঠে মারা যায়। উলটা সাদাচামড়ার খ্রীশ্চান সাধারণ মানুষই মুসলমানদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে বসে।

মাথায় স্কার্ফ লাগিয়ে মসজিদের ঘটনায় নিহত বা ভিকটিম পরিবারের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, সান্ত্বনা-সহানুভূতি জানানোর রেওয়াজ শুরু করেছিলেন নিউজিল্যান্ডের নারী প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডেন [Jacinda Arden], হামলার ঘটনার পরের দিন থেকেই। এক আদর্শ প্রধানমন্ত্রীর মতই তিনি কাজটা করেছেন। এসব সময়ে ধর্ম-নির্বিশেষে ভিকটিমের পাশে দাঁড়ানো আর জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত হতে না দেয়া, ঐক্য ধরে রাখা – এটাই তো তার আসল কাজ। তাই স্বভাবতই সেটা দেশ-বিদেশে খুবই প্রশংসিত হয়েছে। আর সেখান থেকেই নিউজিল্যান্ড জুড়ে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা ধর্মনির্বিশেষে এক নাগরিক ঐক্য ও সহমর্মিতা বোধ তৈরিতে লেগে পড়েছিলেন এবং তিনি তাতে সফল তা বলা যায়। তিনি বারবার বক্তৃতায় বার্তা দিয়ে গেছেন যে, ‘হামলাকারী ব্রেনটন ও তার সাদারাই শ্রেষ্ঠ এই তত্ত্ব “অগ্রহণযোগ্য এবং স্বভাবতই তা আমাদের মধ্যে অনৈক্য, বিভেদ তৈরি করতে ব্যর্থ হবে, কারণ আমরা এক”। বলা যায় ব্রেনটন ও তার সাদাবাদিতাকে উপড়ে তুলে সমাজ-কমিউনিটি থেকে বাইরে ফেলে দিতে এখানেই তিনি এবার সক্ষম ও সফল হয়ে যান। তার এই শক্ত অবস্থান ও প্রচেষ্টা জনমনে ইতিবাচক আবেদন সৃষ্টি করতে সফল হয়েছে। তাই সে্টাকেই আরো বড় করে ছড়িয়ে দিতে সোস্যাল মিডিয়ায় ‘হেডস্কার্ফ ফর হারমনি’ [Headscarf-for-Harmony] নামে হ্যাশট্যাগ গ্রুপ গঠন হয়ে যায়। বলা হচ্ছে অকল্যান্ড শহরের এক ডাক্তার তাঁর এক মুসলমান সহকর্মির কাছ থেকে তাঁর ভয়ভীতিবোধের ব্যাপারটা জেনে কিছু করার তাগিদ থেকে এই হ্যাশটাগ আন্দোলন আহবান জানানোর উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এই গ্রুপের উদ্যোগেই জুমাবারে প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে সমন্বয়ে ঐ ‘হেগল পার্কের’ সমাবেশে দুই মিনিটের নিস্তব্ধতা পালন করে সংহতি প্রকাশের প্রোগ্রাম সবাই মিলে বাস্তবায়ন করেছিল।

রাজনৈতিক-সামাজিক বড় ঘটনায় সবসময়ই কিছু অতি-বাদী এরাও হাজির থাকে। সবকিছুতেই অতিরিক্ত মানে, পরিস্থিতি যতটুকু দাবি করে তার চেয়ে বেশি করে ফেলা, এমন হয় এরা। এরা হতে পারে – অতি-বাম, নয়ত অতি-ইসলামি বা অতি-নারীবাদী ইত্যাদি ধারার কাউকে কাউকে পাওয়া যায়ই। এখানেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। যেমন সামাজিক মিডিয়ায় অনেককে দেখা গেছে এক “ষড়যন্ত্র তত্ব” নিয়ে হাজির হতে। এরা বলতে চাচ্ছেন যে প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার স্কার্ফে নিজেকে প্রকাশ ও সহমর্মিতা প্রদর্শন – এটা “মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র”। এটা আসলে কেবল দেখানো জন্য। কেন? কারণ সাদা শ্রেষ্ঠ্ত্ববাদী খ্রীশ্চান ব্রেনটন= নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী খ্রীশ্চান জেসিন্ডা। অর্থাৎ খ্রীশ্চান সুত্রে ব্রেনটন=জেসিন্ডা। এতে মানে দাড়ালো যে জেসিন্ডাই ব্রেনটন। সেকারণে হামলা করে এসে এখন জেসিন্ডা কালো স্কার্ফ পড়ে হাজির হলেও তিনি আসলে মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। এদের এমন এই চিন্তার কাঠামোটা দাঁড়িয়ে আছে ১. খ্রীশ্চান সুত্রে ব্রেনটন=জেসিন্ডা। ২. খ্রিশ্চান মানেই সে এন্টি-মুসলমান। মুসলমানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারী। ৩। খ্রীশ্চান কখন মুসলমানের জন্য ভাল কিছু করতে পারে না; ইত্যাদি এসব বক্তব্যের ভিত্তির উপর।

কিন্তু এমন চিন্তা যেকোন মুসলমানের জন্যই ভীষণ বিপদজনক। কেন? কারণ এই বক্তব্যের যুক্তির প্যাটার্ণ অনুসারে তাহলে সারা দুনিয়াতে ঘটা যত খুন খারাবি, রাজনৈতিক হত্যাকান্ড এমনকি সন্ত্রাস সৃষ্টির জন্য করা কাজসহ যাবতীয় কাজ আছে যা কোন না কোন মুসলমান জড়িয়ে আছে সেসবের জন্য দায়ী দুনিয়ার সব মুসলমানেরা – একথা মেনে নিতে হবে! আসলে এমন চিন্তা অতি-সরলিকরণ দোষে দুষ্ট। মুসলমান মানেই সে ভাল অথবা খ্রীশ্চান মানেই খারাপ – এটা অতি-সরলিকরণ এক ভিত্তিহীন চিন্তা। একইভাবে এক মুসলমানের কাজের দায় সব মুসলমানের – এমন চিন্তাও অতি-সরলিকরণ দোষে দুষ্ট। আসলে এগুলো খুবই কম চিন্তা করে বলে ফেলা কথা। যেমন, বলা হল এক মানুষের নাম রহিম। অতএব মানুষ মাত্রই তাঁর নাম রহিম – এমন মনে করা। এগুলো হল ‘সাধারণ’ আর ‘বিশেষ’ – এই দুই এর সম্পর্কে গুলিয়ে ফেলে একাকার করে দেখা। যেখানে মানুষ আমাদের সাধারণ নাম। আর রহিম বিশেষ নাম। তাই রহিম একই সাথে মানুষ হলেও মানুষ মাত্রই সে রহিম হবে তা কখনও নয়।  তবু চিন্তায় সতর্ক না থাকলে চিন্তার এমন এই পা-পিছলানি ঘটে।

মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করতে বিভিন্ন প্রতীক বা আচার-রিচুয়াল [ritual] ইত্যাদির আশ্রয় নিয়ে থাকে। ফলে সেখানে কোন জিনিসটি প্রতীক হয়ে উঠছে, এর চেয়েও কী উদ্দেশ্য মানুষের সবার সেই ঐক্য সংহতি প্রকাশ তারই ভাব-প্রভাব নিয়ে হাজির হয়ে যায় সেই প্রতীক। এখানে তা-ই হয়েছে। এখানেও যে স্কার্ফ যা মূলত ইসলামী নারীদের কারণে ইসলামের প্রতীক মনে করা যায় সেই স্কার্ফকেই এখানে নিউজিল্যান্ডবাসী ধর্ম-নির্বিশেষে সকলের প্রতীক হিসাবে – সেই সংহতির প্রতীক হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। হামলাকারি ব্রেনটন যদি নিউজিল্যান্ডের খ্রীশ্চানদের বার্তা দিয়ে থাকে যে স্কার্ফ বা মুসলমান দেখলেই তাদের “নির্মুল কর” তাহলে সেক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ডের খ্রীশ্চানেরা পালটা বার্তা তৈরি করেছে যে না তাঁরা বরং ব্রেনটন ও সাদা শ্রেষ্ঠত্বের চিন্তাকে প্রত্যাখান করছে। শুধু তাই না। শোকে দুঃখে থাকা মুসলমানদের সাথে মিলে সহমর্মিতায় ঐ স্কার্ফকেই সংহতির প্রতীক হিসাবে তুলে ধরছে।

কিন্তু ঐদিনই স্কার্ফের বিরুদ্ধে আবার আপত্তি তুলে ধরেছেন কিছু অতি-নারীবাদী। এটা “সস্তা প্রতীকী প্রদর্শনী” বলেছেন। [In an unsigned opinion piece on Stuff.co.nz, a Muslim woman called the movement “cheap tokenism”.] তাদের দাবি স্কার্ফ হল নারীদেরকে ঘেরটোপের মধ্যে আটকে রাখার মুসলমানের ধর্মীয় ব্যবস্থা ও চিহ্ন। অতএব স্কার্ফ ধর্মনির্বিশেষে সংহতির প্রতীক হতে পারে না। আগেই বলেছি এটা অতি-নারীবাদী অবস্থান। প্রথমত, স্কার্ফকে সুনির্দিষ্টভাবে এই ঘটনায় ধর্মনির্বিশেষে সংহতির প্রতীক বলে গ্রহণ করতে কেউ কাউকে বাধ্য করে নাই। এমনকি মুসলমানেরাও নয়। সোশাল মিডিয়ায় কেউ একজন প্রস্তাব করেছিল আর তাতে ধর্মনির্বিশেষে সকলের তা মনে ধরেছিল – এত টুকুই। স্কার্ফের আর অন্য মানে যাই থাক সুনির্দিষ্ট এখানে এই সবচেয়ে ‘ওপেন চয়েজ’ এর মাধ্যমে যার যার বেছে নেয়া ও সাড়া দেওয়া – এটা বিরাট তাতপর্যময় এবং গুরুত্বপুর্ণ ঘটনা। অতি-নারীবাদী অবস্থান এটা দেখতে মিস করেছে। এটা পরিস্কার যে এখানে স্কার্ফের অন্য কোন মানে/প্রতীক আছে কিনা অথবা যাই থাক তা এদের বিবেচনার বিষয়ই ছিল না। মুল বিষয় ছিল “সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী চিন্তা ও ব্রেনটনের বার্তাকে” নাকচ করা। এবং নিজেদের সংহতি জানানো। কিন্তু স্কার্ফ মাত্রই “গা-চুলকানি বোধ” এটা তো যাদের এমন অনুভব তাদের চিন্তায় অসর্তকতার সমস্যা। এখানে বরং সবচেয়ে কড়া মেসেজ ছিল – ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ চিন্তা ও নারকীয় খুনি ব্রেনটনের বার্তাকে নাকচ করা। অর্থাৎ স্কার্ফ ইসলামের প্রতীক কি না, ইসলাম ভাল অথবা মন্দ কিনা সেসব বিষয় উহ্য রেখে এবং একে ছাপিয়ে গিয়ে  ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী’ চিন্তা ও নৃশংস খুনের কাজকে কোন জায়গা না দেয়া, প্রত্যাখ্যান।
কিন্তু তবু স্কার্ফ কেন? এটা বুঝতে অনেকেই মারাত্মকভাবে মিস করেছেন। অনেক সময় বিরাট চিন্তাবিদ তাত্বিক হতে গিয়ে আমরা বাস্তবতা বা ব্যবহারিক দিক ভুলে যাই। সুনির্দিষ্ট বাস্তব দিকটা নজর দিতে গাফিলতি করে বসি। নিউজিল্যান্ডের মুসলমান মোট জনসংখ্যার ১% বলছেন অনেকে। অর্থাৎ মাত্র কয়েক লাখ হয়ত। আমাদেরকে কল্পনা করতে হবে ্সেখানকার ঐ সংখ্যালঘু মুসলমান নারী-পুরুষের জায়গায় বসে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে হামলার পর থেকে এদের মনে কী তীব্র ভয়ভীতি নিরাপত্তাহীনতা  দানা বেধেছিল। অথচ বেচে থাকার স্বাভাবিক কাজ কর্মের জন্য প্রয়োজনীয় সব কাজ নিজেই করতে হয় বলে সেজন্য মুসলমান নারী-পুরুষ সকলকেই ঐ শহরে বাইরে বের হতেই হবে। অথচ বাইরের বেশির ভাগ মানুষের গায়ের চামড়ার রঙ তো সাদা! তাহলে এরা সবাই কী মুসলমানদের জন্য ঘাতক, একেক জন মুসলমানদেরকে হামলার জন্য ওঁত পেতে বসে আছে? এমন যেন এই হামলে পড়ল বলে?  এটাই সেই ভয়ঙ্কর দুঃসহ ভীতি! এটা আমরা যারা দূরে বসি আছি আমাদের অনুভব করতে হবে। তাহলে বুঝব। না হলে সবই কারও ষড়যন্ত্র বলে মনে হবে।

সহকর্মি বা পড়শি যারা মুসলমানদের পাশে বসবাস করে দেখা হয় এদের মধ্যে যাদের কে তবু কাছের মনে হয় তাদের সাথে মুসলমানেরা স্বভাবতই তাদের অনুভব শেয়ার করবে। তাই ঘটেছিল। কিন্তু সেকথা শুনে ঐ খ্রীশ্চান পড়শির কী মনে হয়েছিল? ঐ খ্রীশ্চান পড়শিরা এই প্রথম টের পেয়েছিল যে মসজিদে হামলাকারি ব্রেনটন তাদের কী ক্ষতি করে দিয়ে গেছে! অথচ মসজিদে হামলার ব্যাপারটা আগে হয়ত ঐ খ্রীশ্চান পড়শির কাছে অনেক দুরের ঘটনা মনে হচ্ছিল। কিন্তু খ্রীশ্চান পড়শি এবার টের পেল ব্রেনটন তাদের সবাইকেই পড়শি মুসলমানদের কাছে  একেকজন খ্রীশ্চান সন্দেহভাজন খুনি  বানিয়ে ছেড়েছে  – যে সম্ভাব্য খুনিরা এখনই বুঝিবা রাইফেল বের করে মুসলমানের উপর  ঝাপিয়ে পড়বে এমনই দানব!

স্বভাবতই যা সে নয় এমন পরিচয়ের দাগ তার গায়ে লাগাতে চিত্রিত হতে বেশির ভাগ মানুষই রাজি হবে না। এর সোজা মানেটা হল মুসলমানের মনে হামলা ভয়ভীতির দুঃস্বপ্ন আর সাধারণ খ্রীশ্চান পড়শিরা এদের সবার গায়ে একেকটা দানব এই পরিচয় লেপ্টে দেয়া একই কথা। অতএব একপক্ষের মনে ভীতি আর অপরপক্ষকে দানব পরিচয় লেপ্টে দেয়া – দুপক্ষই সবই এসব কিছু ঝেড়ে ফেলে একসাথে  উঠে দাড়াতে মনস্থ করা থেকেই স্কার্ফ প্রতীকের উদ্ভব। আর মুসলমান মেয়েরা স্কার্ফ ব্যবহার করে বলে না চাইতেই তারা মুসলমান বলে জনসমক্ষে চিহ্নিত। সম্ভবত সে থেকেই  ধর্মনির্বিশেষে সকলেই যদি প্রতিবাদের প্রতীক হিসাবে স্কার্ফ পড়ে তাহলে অন্তত মুসলমান নারীরা সেফ ফিল করবে – এমন ভাবনার উদ্ভব। অতএব এই স্কার্ফ প্রতিবাদের সারকথা ছিল সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীদের প্রত্যাখ্যান। মুসলমান পড়শির মনে সাহস ফেরানো – এক কমিউনিটি ঐক্য। অতএব মুলত একেবারে ব্যবহারিক প্রয়োজন বোধ ছিল কমিউনিটিতে মুসলমান নারীদের ভয়ভীতি তাড়ানো আর নিরাপত্তাবোধ আনা।  আর সেই অভিযোগের দাগ থেকে সাদা চামড়ার সাধারণ মানুষকে মুক্ত করা। নিউজিল্যান্ডের মুসলমানেরা ভয়ভীতি দূর করে বাসা থেকে বের হবার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে এটা এক অগ্রপক্ষেপ।
সুতরাং একেবারেই মুল তাগিদ ছিল নিউজিল্যান্ডের কমিউনিটি-সমাজে এক ব্যবহারিক সমস্যা দূর করা। তাহলে দেখা যাচ্ছে আমাদের মধ্যে  নানান কিসিমের অতি-বোধ তৈরি হচ্ছে ইস্যু বা সমস্যার ব্যবহারিক দিক থেকে তা দেখতে না পারা থেকে। অতি-ইসলামবাদীরা ভাবছেন সকলেই স্কার্ফ চাপালে তো বিপ্লবের জোশ কমে যাচ্ছে ফলে নিশ্চয় এটা ব্রেনটনের খ্রীশ্চান বোন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার ষড়যন্ত্র। অথচ তারা দেখতে পাচ্ছেন না ভয়ভীতিতে নিরাপত্তার অভাববোধে ঘরবন্দী মুসলমান নারী-পুরুষ বাইরে বের হবার পক্ষে নির্বিশেষ কমিউনিটি-সাহসের জন্ম হোক, উঠে দারাক – সেটা খুঁজে ফেরা থেকেই এই স্কার্ফ সংহতির জন্ম। এমনকি মুসলমানদের মনে সাহস আনার জন্য জেসিন্ডা নিউজিল্যান্ডের মত হামলা ঘটবার দেশ-শহরে পালটা অত্যন্ত দৃঢতা দেখিয়ে ঐ শুক্রবারে টিভিতে জুমার আজান প্রচারের ব্যবস্থা করেন। 

প্রায় একই ধরণের এক ব্যাখ্যা ও এর প্রয়োগ করতে গিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান নিজের বিপদ ডেকে আনতে গিয়েছিলেন। তবে তাঁর সৌভাগ্য যে তিনি তা সামলে নিতে, নিজেকে কারেক্ট করে নিতে সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তিনি সাহসের সাথে তা নিয়েছেন। তুরস্কের স্থানীয় সরকার নির্বাচন আসন্ন। কোন নির্বাচনে আভ্যন্তরীণ বহু হিসাবকিতাব থাকে, বুদ্ধিমানেরা সে হিসাবের সব বক্তৃতা বিবৃতিকে সেগুলা যেন দেশের বাইরে না যায় সেদিকে খেয়াল রেখে কথা বলেন, ব্যবস্থা করে রাখেন। এরদোগান ব্রেনটনের হামলায় নিজেকে এর প্রতিরোধের বীর হিসাবে দেখাতে বক্তৃতা করেছিলেন, হামলার ভিডিওও দেখিয়েছেন। বাইরের দুনিয়া এসব  জানলেও প্রথমদিকে  উপেক্ষার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এরদোগান একবার সীমা ছাড়িয়ে অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ডকে খামোখা হুমকি দিয়ে বসেন। তিনি বলেন ব্রেনটনের বিচার যদি অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড না করতে সক্ষম হয় তবে যেভাবেই হোক তিনি এর বিচার করবেন [“If New Zealand fails to hold the attacker accountable, one way or another we will hold him to account.”]। এটা তো বিনা মেঘে বজ্রপাত। কারণ অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড ব্রেনটনের বিচার করতে চাইছে না বা পারছে না – এমন কোনকিছুর অন্তত ইঙ্গিতও তো আগে থাকতে হবে! এরপরে না বিচার করার “অন্য কারও” সুযোগ আসবে? তাই এটা গায়ে পড়ে উস্কানিমূলক বক্তব্য হিসাবে হাজির হয়েছিল। স্বভাবতই এই বেহিসাবি বক্তব্য অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে খারাপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল। তবে এরদোগানের সৌভাগ্য যে অষ্টেলিয়া-নিউজিল্যান্ড গঠনমূলক ভাবে আগায়, এরদোগানকে পিছনে ফিরে যাবার সুযোগ তৈরি করে দেয়  – এমনভাবে কথা বলেন। এরদোগান সেই সুযোগটা নিয়ে পরেরদিন প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডার কাজের ভূয়সী প্রশংসা করে বক্তৃতা দিয়ে সে উত্তেজনার সমাপ্তি টানেন [Turkey’s President Erdoğan praises Jacinda Ardern in an op-ed for the Washington Post]। ভিতরে কূটনৈতিক দৌড়ঝাপও ব্যবপ ছিল স্বভাবতই যেমন এরদোগানের এক অফিস কর্তা পরিস্থতি নরম করতে বলছেন, [“President #Erdogan’s words were unfortunately taken out of context,” ]। এরদোগান বিশাল পা-পিছলানি ঘটনার প্রধান দিকটা হল, তিনিও – ব্রেনটন= সাদাবাদী খ্রীশ্চান= জেসিন্ড, এই ভুল ও ভিত্তিহীন সাজানো অনুমানের সমীকরণ টেনে এর উপর দাঁড়িয়ে কল্পিত শত্রু খাড়া করে কথা বলে গেছেন। অথচ হামলার ঘটনার পর প্রথম সুযোগ থেকেই শেষ পর্যন্ত জেসিন্ডা বলে আসছেন [‘We are one’] ও অষ্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী, ব্রেনটন ও তাঁর রাজনীতিকে কোন প্রশ্রয় নয় বরং নিন্দা করছেন; সমাজচ্যুত করতে কথা বলে গেছেন।

এখানে আমরা মনে রাখতে পারি, খ্রীশ্চান ইউরোপের অনেক দোষত্রুটি বা স্বার্থ আছে অবশ্যই। কিন্তু নতুন করে আবার কোন ক্রুসেডে খ্রীশ্চান-মুসলমানের লড়াই – এমন ভাষ্য তুলে এনে কোন বিতর্ক তাদের রাজনৈতিক দল বা ক্ষমতাসীনরা (সাদা শ্রেষ্টত্ববাদী পকেট গ্রুপেরা না) আর কখনও তুলবে না, তাদের সামাজিক অভিমুখ সেদিকে নয়। কারণ এতে বড় ক্ষতিটা তাদেরই। কারণ তাদের আভ্যন্তরীণ সমাজে কোন ধর্মতাত্বিক বিতর্কে বা এর আবহ খোদ তাদের রাজনৈতিকতাকেই [Polity] আড়াল করুক বা পেছনে ফেলে দিক, এটা তাদের স্বার্থ নয়। খ্রীশ্চান বিভিন্ন ধারা বা ফেকড়াতে পড়ে এতে দগদগে ঘৃণা লড়াই মারামারির বহু কষ্টকর পথ পেরিয়ে, তারা সেসব বিভক্তিতে তা থেকে গৃহযুদ্ধ শেষে  আজ তারা এক থিতু সমাজের অবস্থায় পৌচেছে। রাজনীতিকরা নিজের স্বার্থে সহজেই এটা ভাঙতে দিবে না।

যদিও আজ আমরা দেখছি, মসজিদে নামাজিদের ওপর হামলাকারী ব্রেন্টন- ‘সাদারাই শ্রেষ্ঠ ও ক্ষমতাবান’ এই বক্তব্যের পূজারী। যাদের নিজের ইতিহাস-পাঠ খুবই দুর্বল, আর গোঁজামিলের। একথাও সত্য যে, গ্লোবাল ইতিহাসের পুরো দুই-আড়াই শ’ বছরের কলোনি শাসনামলও দাঁড়িয়ে ছিল  সাদাদের এমনই এই সাফাই-বয়ানের ওপর। কিন্তু দুর্ভাগ্য হল, সব রেসিজমই কোনো-না-কোনো কিছু নিয়ে তথাকথিত এক “শ্রেষ্ঠত্বের” একটা বয়ান খাড়া করে তার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। আলোচ্য ক্ষেত্রেও সেই তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান হল- ‘আমরা সাদা, তাই আমরা শ্রেষ্ঠ।’ হামলাকারী ব্রেন্টন ট্যারান্টের দাবি – পুরনো কলোনি আমলের জবরদস্তি বা সাদা শ্রেষ্ঠত্বের সেই রাজত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে।

ঘটনা হল, যেকোনো রেসিস্ট বা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা কখনো নিজের দাবির পক্ষে (মানুষ মানে এমন) ঠিকঠাক সাফাই হাজির করে কথা বলতে পারে না। কারণ, তারা বয়ানের জোরে অথবা সততা, ন্যায় বা ইনসাফের জোরে কথা বলতে পারে না; তারা গায়ের জোরে কথা বলে। অথচ কেউ সাদা চামড়ার লোক হলেই তাকে আমাদের শ্রেষ্ঠ মানতে হবে কেন? এ কথার ভিত্তি কই? অথবা ধরা যাক সাদারাই মূলত দুনিয়াজুড়ে অন্যের দেশ-সম্পদ দখল করে কলোনি শাসন করে গেছে। কিন্তু এই কারণে এই জবরদস্তি এখনও মেনে নিতে হবে, ফিরিয়ে আনতে হবে কেন? এসব সহজ, ছোটখাটো সাদা প্রশ্নের জবাবই তাদের কাছে নেই। বিশেষত যখন একালে রিপাবলিক রাষ্ট্রের প্রধান বৈশিষ্ট হল “নাগরিক বৈষম্যহীনতা”, যেটাকে ইতিবাচক দিক থেকে নাগরিক সাম্য [equality] বলা হয়। কিন্তু নাগরিক বৈষম্যহীন রাষ্ট্রে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের জায়গা বা সুযোগ কই?  এছাড়া এর সাথে আছে ইনসাফ আর মানুষের মর্যাদার ভিত্তির কথা।  এর মানে হল, যারা তাদের তাত্বিক [mentor] মানে যারা ব্রেন্টনদেরকে সাদা-শ্রেষ্ঠবাদী হতে উসকানি দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেছে তারা খুবই নাবালক-চিন্তার লোক।

দ্বিতীয়ত, আরো বড় প্রশ্ন হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে আর পরের দুনিয়া তো আর এক ছিল না; আকাশ-পাতাল ফারাক হয়ে গেছিল। এটা সাদা চোখেই জানা-বুঝা যায়। যেমন প্রথম ফারাক হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ইউরোপের চার-পাঁচটা কলোনি মালিক দেশের দখলদারিত্বে দুনিয়ার বাকি সব (এশিয়ার, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা) দেশই দখল ও কলোনি হয়ে গেছিল। অথচ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে উল্টো চিত্রঃ কলোনি দখলদার ইউরোপের ব্রিটিশ বা ফরাসিরাসহ সকলেই একের পর এক কলোনি ছেড়ে চলে গেছিল। এতে উপনিবেশগুলো স্বাধীন রাষ্ট্র হয়ে গেছিল। কেন?

কারণ, ব্রিটেন-ফ্রান্সের মতো ইউরোপ কলোনি মালিক-দখলদারেরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে জিততে হলে এর একমাত্র নির্ধারক বাস্তবতা ছিল আমেরিকাকে নিজেদের পক্ষে পাওয়া – এর উপরে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আমেরিকান শর্ত ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারের বিরুদ্ধে ইউরোপের জিতে যাওয়ার পরে ইউরোপের সবাইকে কলোনি দখলগিরি ছেড়ে দিতে হবে। ইউরোপ এই শর্ত মেনেছিল উপায়হীন হয়ে। এই শর্তের কারণেই দুনিয়া থেকে কলোনি উঠে যায়। শুধু তাই নয়, গায়ের জোর থাকলেই অন্যের দেশ ও সম্পদ দখল করা যাবে না, সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব মেনে চলতে হবে, – এসব আমেরিকান শর্তও মেনে নিতে হয়েছিল। যা তদারকের প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতিসঙ্ঘের জন্ম (১৯৪৪) হয়ে যায়। এ ছাড়া ইচ্ছামত মারধর নৃশংতা হত্যার যুদ্ধ করা যাবে না, বরং যুদ্ধের আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন তৈরি হয়ে যায়, যেগুলো মেনে চলতে হবে। জেনেভা কনভেনশন ১৯৪৯ সালে এর জন্ম, আর এর আগে ১৯৪৮ সালের হিউম্যান রাইট চার্টার রচিত হয়ে যায়। এ ছাড়া, আরো পরে ১৯৬৬ সালের জাতিসঙ্ঘের আন্তর্জাতিক সিভিল ও পলিটিক্যাল রাইট (ICCPR) রচিত হয়ে যায়। সংক্ষেপে বললে, এ সবগুলো আইন, কনভেনশন বা চুক্তির সারকথা হল, গায়ের জোর থাকলেই আর সবকিছু করা যাবে না।
কাজেই অন্যের স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্ব অমান্য, দেশ দখল, নাগরিক মানুষের অধিকার না মানা- এসব ইত্যাদি পেরিয়ে এসে গ্লোবাল ইতিহাস আজকের দুনিয়াতে দাঁড়িয়ে – ফলে কেবল ‘আমি সাদা তাই আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নাও”- বলে একালে শুধু এই সাদাবাদীরা কতদুর যাবে; এ কথা বলে কতটুকু তারা আগাতে পারবে? তবে হ্যাঁ পরোক্ষ শাসন সম্ভব, যদিও তা দূর থেকে প্রভাব রাখা প্রভাবিত করা অর্থে হতে হবে। একালে আমেরিকা ইরাক দখল করেছে, ছেড়েও দিয়েছে। পুতুল শাসক রেখে শাসন করেছে- এসব পরোক্ষ কাজ সম্ভব। যদিও কফি আনানের মুখ থেকে – ইরাকে আমেরিকা ‘দখলদার বাহিনী’- এই রায় শুনেও ক্ষমতাধর আমেরিকাকেও চুপচাপ সেকথা হজম করে থাকতে হয়েছে।

এসবের সারকথা হল, যে কলোনি শাসন আমলের সাদা শ্রেষ্ঠত্বের স্বপ্ন এরা এখন আঁকছে; অথচ সেই শাসন বহাল ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, পরে নয়। দুনিয়া এখন সে জায়গায় নেই। খোদ ইউরোপের সব রাষ্ট্রকেই কলোনি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। পরবর্তিতে সাদা চামড়ার গরম বা শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে সেই পঞ্চাশ-ষাটের দশকেই তারা কিছু রক্ষা করতে পারেনি। তাই প্রধান প্রশ্ন – ইউরোপের এখন যেসব রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আছে বা থাকবে, তাদের সকলকেই এসব হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট রাজনৈতিক ধারাগুলোকে কঠোর হাতে দমন করতে হবে। করতে বাধ্য নইলে, জাতিসঙ্ঘে জবাবদিহি করতে হবে। সভ্যতার গরম ফুটা হয়ে যাবে। হয়ত এর আগে বিরাট একদল লোক এই আত্মগ্লানিতেই মারা যাবে।

তার মানে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া আবার কায়েমের যে উসকানি দেয়া হচ্ছে, এর মেনটর যারা, তারা হয় নাদান আর নাহলে নরেন্দ্র মোদির মতো চিন্তা্ আর দলের লোক এরা। অর্থাৎ তাদের উদ্দেশ্য হল, সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া আবার কায়েমের উসকানি – এই ন্যাশনালিজমের আওয়াজ তুলে আসলে ভোটের বাক্স ভর্তি আর ক্ষমতা পাওয়া। সাদা শ্রেষ্ঠত্বের কোন দুনিয়া কায়েম এদের আসল লক্ষ্য নয়, কম্মো না। সে মুরোদ নাই তা তারা জানে। ঠিক যেমন মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির মূল লক্ষ্য হল ভোটের বাক্স ভর্তি ও সরকারে আসা – আর এক হিন্দুত্বের ফ্যাসিজম কায়েম করে বিরোধী নির্মূল করা। তবে ইউরোপ নিশ্চয়ই ভারত নয়। স্বাধীন মর্ডান রিপাবলিক ইউরোপের নাগরিক্দেরকে তাদের চিন্তার উপর সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দুনিয়া কায়েমের স্বপ্ন ও লোভ দেখিয়ে অভ্যন্তরীণভাবে এক ফ্যাসিজম কায়েম- সেটা বেশ কষ্ট কল্পিত অবশ্যই।

এ ছাড়া আর একটা দিক আছে। একালের ক্যাপিটালিজম মানে কোনো একটা রাষ্ট্রের মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ এমন কোনো ‘ন্যাশনাল ক্যাপিটালিজম’ বলে কিছুই আর নেই। এক এবসার্ড কল্পনা মাত্র। ক্যাপিটালিজম মাত্রই গ্লোবাল। অন্য রাষ্ট্রের সাথে লেনদেন- পণ্য, পুঁজি, বাজার, বিনিয়োগ ইত্যাদি সব কিছুই এখন গভীরভাবে সম্পর্কিত থেকে বিনিময় এক্সচেঞ্জ করতে আমরা সবাই বাধ্য। এ অবস্থায় কোনো ‘সাদাদের ক্যাপিটালিজম’- এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। বরং উল্টো, সাদা লোকদের উৎপাদিত পণ্য প্রডাক্টের ক্রেতা কেবল সাদা চামড়ার লোকেরাই হোক, সেটা সাদা মানুষের চাওয়া হতেই পারে না।

তার মানে সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারদের বয়ানের সাফাইয়ের ঠিক-ঠিকানা নেই। অসঙ্গতিতে পরিপূর্ণ। যদিও উসকানি আছে চরমে। তবে এমন যেকোনো দাবিদারদের বয়ানে একটা কমন জিনিস আমরা দেখতে পেয়ে থাকি। তা হলো যে আইডেনটিটি বা পরিচয় (যেমন- এখানে আমরা সাদা চামড়ার খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠী পরিচয়) তারা দাঁড় করাক না কেন, তা তারা করবে এর কোনো অতীত অর্জনকে টেনে এনে। আর সেকালের এমন অর্জন বলে কোন কিছু থাক বা না থাক ঐ জনগোষ্ঠীর অতীতে অনেক শান-শওকত ছিল, প্রভাবশালী ছিল এমন গল্পগাথা তৈরি করে প্রচার করবেই তারা। এটাই সাদা-বাদী সুড়সুড়ি।

দেখা যাচ্ছে, ব্রেন্টনের মেন্টর-পীরেরা গল্পগাথা তৈরির এ কাজে ক্রুসেডকেও তুলে এনেছে। কিন্তু ঘটনা হল, খ্রিষ্টান ইউরোপ তো ক্রুসেড জিতেনি। এ ছাড়া ক্রুসেড মূলত বারো-তেরো শতাব্দীর পরে ইউরোপেই আর কখনও জাগেনি। বরং পনেরো শতাব্দীর পর থেকে প্রধান শাসকগোষ্ঠী বা শ্রেণী বলতে ইউরোপ তা আর ধর্মতাত্ত্বিক-ভিত্তির কোনো শাসকগোষ্ঠীর হাতে থাকেনি; বরং ম্যানুফাকচারার, জাহাজ ব্যবসায়ী, কলোনি দখলকারি মাস্টার – এসব, আর ওদিকে আরেক চিত্র, মোটের ওপর যারা ছিল রাজতন্ত্রবিরোধী। এসব বৈশিষ্ট্যের মডার্ন রিপাবলিক রাজনৈতিক ধারার শাসন কায়েম হয়ে যায়। ক্রুসেডের সাথে যারা স্বার্থ আর বয়ানের দিক থেকে যোজন যোজন দূরে। তাহলে একালে এসে আবার ফিরে ত্রুুসেডের গর্ব তুলে অথবা হেরে যাওয়ার সহানুভূতি সে কার কাছে বেচবে? কার থেকে পাবে বলে আশা করে? মডার্নিস্ট ইউরোপের জনগণ কি ক্রুসেডের গর্ব অথবা মুসলমানদের হাতে হেরে যাওয়ার সহানুভূতির ভেতর আশ্রয় নিতে রাজি হবে? আসলে এটাকে এক কষ্ট-কল্পিত ফ্যান্টাসি বললেও কম বলা হয়।

আর এক চরম স্ববিরোধিতাঃ সাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদারদের বয়ানের আর এক বৈশিষ্ট্য হল, মাইগ্রেন্টবিরোধিতা [অভিবাসী=migrant]। যেটা আসলে ‘অপর’ বা বিদেশী ভীতি ও বিরোধিতা; যাকে বলা যায় জেনোফোবিয়া [Xenophobia]। এটা অবশ্য সব ধরনের জাতিবাদেরই কমন ফিচার যে, তারা বিদেশী-বিরোধী হয়। তবুও ইউরোপের কোনো ধারার বয়ানধারীদের একালে মাইগ্রেন্টবিরোধী হওয়ার ক্ষেত্রে তা অবশ্যই শক্ত সাফাই তৈরিতে ব্যর্থ হবে। কারণ, যে ইউরোপের উত্থান বা ওর তরুণ বয়স কেটেছে অন্যের দেশ দখল করে, কলোনি শাসন করে সেই পুরান কলোনি-দেশ থেকে কয়েকজন নেটিভ মাস্টারের দেশে এসে বসবাস শুরু করলে তা না জায়েজ, এমন কথা সে কিসের ভিত্তিতে বলবে? সে কারণে এদের এই তথাকথিত মাইগ্রেন্টবিরোধিতার বয়ান বর্ণনা তৈরির ভিত্তি দেয়া মুশকিল হবেই। তা ছাড়া, মাইগ্রেন্টরা তো নিজে জোর করে ইউরোপে ঢুকে যায়নি। ইউরোপের অর্থনীতি ভালো চললে বাড়তি লেবার দরকার, তাই মাইগ্রেন্টদের স্বাগত জানানোর নীতি নিয়েছিল তারা, বলেই মাইগ্রেন্টরা এসেছে। অর্থনীতি খারাপ গেলে এখন এদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে খেদিয়ে দিতে চাইলেই ব্যাপারটা তত সরল হবে না, এতাই স্বাভাবিক।

তবুও আচ্ছা ধরা যাক। সাদা শ্রেষ্ঠত্বের বয়ানদাতাদের অভিবাসীবিরোধিতা জায়েজ। সে ক্ষেত্রে তারা আসলে  ত সাধারণভাবে বিদেশীবিরোধী হওয়ার কথা। আর সেই বিদেশী কোন ধর্মের তাতে কিছু এসে যায় না, এমনই হওয়ার কথা। কিন্তু তাহলে ব্রেনটনেরা মুসলমানদের ওপর হামলা করছে কেন? মুসলমানবিদ্বেষী কেন? এটা তো সাদাবাদীদের বয়ানের সাথে মিলল না! যেমন- হিন্দু ভারতীয় এমন নাগরিকেরা ইউরোপে ঢুকেছে এমন ক্ষেত্রে তারাও কি সাদা শ্রেষ্ঠত্বের বয়ানের চোখে মাইগ্রেন্ট বলে গণ্য হবে? আমরা নিশ্চিত, মনে হয় না। আসলে সাদাবাদীরা কি অভিবাসীবিরোধী নাকি মুসলমানবিরোধী – সে ফয়সালা তাদের আগে করতে হবে। কারণ – দু’টার সাফাই তো দুই রকম হতে হবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, মুখে তারা অভিবাসীবিরোধী কিন্তু কাজে ইসলামোফোবিক। তাদের বয়ান এমনই সব গরমিলে ভর্তি। তবে খুব সম্ভবত ওয়ার অন টেররের কারণে পাশ্চাত্য একালে সঙ্গোপনে অথবা প্রকাশ্যে মূলত ইসলামোফোবিক। এই ফোবিয়ার তেলে নিজেদের মাছ ভাজতে সাদাবাদীরা বাস্তবে ইসলামোফোবিক হয়ে উঠছে।

তবে এই প্রথম আমরা দেখছি সাদা চামড়ার প্রধান ধারা (সাদাবাদী নয় যারা) এমন আমপাবলিকেরা অপরাধবোধে ভুগছে। কারণ, সাদাবাদীদের নৃশংসতার দায় তাদের উপরও এসে পড়ছে। সেটাই নিউজিল্যান্ডে আমরা ঘটতে দেখছি। তাই সাদাবাদীদের থেকে নিজেদের আলাদা করে দেখাতে তাদের এই হেডস্কার্ফ প্রতীক নিয়ে সংহতি প্রকাশ। আপাতত এতটুকু বিচার করেই বলা যায়, সাদাবাদীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। বিশেষত নিউজিল্যান্ডের মত প্রধানমন্ত্রীর  নুন্যতম অবস্থান যদি সে দেশে থাকে। বাকিটা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা এ ভাবটাই পৌঁছে দিতে শতভাগ সফল হয়েছেন বলে প্রশংসিত। আমাদের স্বার্থেই জেসিন্ডার পাশে, প্লুরালিজমের [Pluralism] পাশে আমাদের দাঁড়াতে হবে।

যে কোন শ্রেষ্ঠত্ববাদই বিপদজনক, যা আপনাকে কোন না কোন একটা রেসিজমে পৌছে দিবে। ফলে সাবধান!

তবে তামাসা উপভোগের জন্য বলিতেছি – উগ্র জাতিবাদী আনন্দবাজারও জেসিন্ডার পক্ষে দাঁড়িয়ে মূল এক সম্পাদকীয় লিখিয়াছে – আগ্রহিরা ইহার সাধু-ভাষার মজা উপভোগ করিতে পারেন; যার শিরোনাম অ-স্বীকার।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৩ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা বয়ানের গরমিলে হারবে – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

আমেরিকার চোখে ‘ফরাসি রাজনৈতিক কালচার’ দায়ী

আমেরিকার চোখে ফরাসি রাজনৈতিক কালচার’ দায়ী
গৌতম দাস
২৯ এপ্রিল ২০১৬, শুক্রবার, ১২:০০ রাত

http://wp.me/p1sCvy-14w

এক তামাশার স্টাডি রিপোর্ট ছাপা হয়েছে সম্প্রতি ফরেন এফেয়ার্স পত্রিকায়। দ্বিমাসিক এই পত্রিকা ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ আমেরিকান সমাজে খুবই মান্যগণ্য পত্রিকা মনে করা হয়। সেখানে  এক গবেষণা রিপোর্টের ফলাফল নিয়ে একটা লেখা ছাপা হয়েছে গত ২৪ মার্চ, ২০১৬।  পশ্চিমা সমাজের নেতা বা যারা পশ্চিমা রাষ্ট্র চালান অথবা নীতিনির্ধারক, এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চিন্তার অলিগলি মতিগতি পাঠের জন্য জরুরি হচ্ছে এই ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ জার্নাল, এমনটা মনে করা হয়।

 ফরেন অ্যাফেয়ার্সে চলতি এই লেখার শিরোনাম, ‘দুনিয়াজুড়ে সুন্নি জঙ্গিতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করে এমন ফরাসি সংযোগ-সূত্র’। ইংরেজিতে ‘The French Connection Explaining Sunni Militancy Around the World”। এই লেখার সারকথা হল, অন্য সব কিছুর চেয়ে ‘ফরাসি কালচার’- এর মধ্যে বিচুটি-মার্কা জলুনির এমন আলাদা কিছু আছে যে জন্য অন্য দেশের চেয়ে ‘ফরাসি ভাষাভাষী’ দেশে ‘সুন্নি মিলিট্যান্সি’ বেশি। কথাগুলো সাম্প্রতিককালে ইউরোপের দুই রাজধানী প্যারিস (ফ্রান্স) ও ব্রাসেলসে (বেলজিয়াম) কয়েক মাসের ব্যবধানে পরপর আইএস হামলার কথা স্মরণ করেই বলা হয়েছে। আর এর মধ্য দিয়ে দুনিয়ায় ২০০১ সালের পর থেকে আলকায়েদা ফেনোমেনার আবির্ভাব ঘটা, ৯/১১ টুইন টাওয়ারে হামলা, সেই থেকে আমেরিকান “ওয়ার অন টেরর” নীতি অনুসরণ করা ও তার ভয়াবহ ফলাফলে এলোমেলো হয়ে যাওয়া দুনিয়া ইত্যাদি এই ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে আমেরিকার যেন কোনই হাত নাই এমন একটা ভাব, সাজেশন হাজির করা হয়েছে। তামশা করে বলা হয়েছে, আমেরিকার এসব “মহান অবদান” নয়, মনোভাব দৃষ্টিভঙ্গী নীতি নয় দুনিয়াজুড়ে আজ যাকে সন্ত্রাসবাদ বলছে, ‘সুন্নি মিলিট্যান্সি’ বলছে এর জন্য ফরাসী ভাষাভাষী রাষ্ট্রগুলো দায়ী। একেবারে গবেষণা করে নাকি তারা এই প্রমাণ পেয়েছে। নায়ক হয়ে ঘটনা ঘটিয়ে এরপর সামলাতে না পেরে এখন হাত ধুয়ে ফেলার জন্য সত্যিই এটা আমেরিকার দেখানো এ’এক চতুর রাস্তা!
বলা বাহুল্য, এটা সুই আর চালুনির কুতর্কের মতো যারা পরস্পর পরস্পরকে পেছনে ফুটা থাকার কারণে খোঁটা দেয়- সে জাতীয়।  আমেরিকা ফরাসি ভাষাভাষীদের পেছনে ফুটা থাকার জন্য অভিযোগ করছে। যাহোক, এই অর্থে এই পত্রিকার রিপোর্ট বেশ তামাশার তা বলতেই হবে।

এখানে আগেই বলে নেয়া হয়েছে একটা ‘এম্পেরিক্যাল স্টাডি’ মানে অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা উপর ভিত্তি করে তারা এসব কথা বলছেন। অর্থাৎ সংখ্যাবাচক প্রাপ্ত তথ্য থেকে খোজাখুজিতে পাওয়া ধারণাকে ব্যাখ্যা করে তারা কথাগুলো বলছে।  গত ২০০১ সাল থেকে  আলকায়েদা ফেনোমেনার দুনিয়ায় হাজির হওয়া পর থেকে এর সর্বশেষ প্রভাবশালী রূপ হলো আইএস  (আইএসআইএল)- এর খলিফা রাষ্ট্র ও তৎপরতা। আলকায়েদার সাথে আইএসের মধ্যে অনেক ফারাক আছে সেগুলোর মধ্যে অন্তত একটা ভিন্নতা হল, পশ্চিমা দেশ বিশেষত ইউরোপ থেকে তরুণদের আইএস এ যোগদানের হিড়িক। আর সেই সাথে ‘কেন তরুণেরা কিসে আকৃষ্ট হয়ে এই যুদ্ধে যাচ্ছে’ এ নিয়ে গবেষণা স্টাডিরও পাল্লা দিয়ে কমতি দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই স্টাডির তথ্য থেকে সব দোষ ফরাসি ভাষাভাষীদের বা যারা ফরাসী ভাষায় কথা বলে তাদের – এ কথা বলে আমেরিকার দায় এড়িয়ে এখন কেটে পড়ার তাল করছে। তবে আর যাই হোক  এ দেখে অন্তত আমাদের মেতে ওঠার কোনো কারণ নেই।

এখানে এই স্টাডির মূল বিষয়টি কী ছিল তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রিপোর্টটা বলছে, “ইউরোপের কোন দেশ থেকে কতজন বিদেশী যোদ্ধা হিসেবে আইএসে যোগ দিতে গেছে আর সে দেশ কয়টি আইএস হামলা খেয়েছে এই দুই তথ্য থেকে ওই দেশে সুন্নি রেডিক্যাল ও সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার মাত্রাকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে এমন তত্ত্বটা কী’হতে পারে তা খোঁজ করা। এভাবে, খুঁজতে গিয়ে আমরা যা পেলাম তাতে আমরাই আশ্চর্যান্বিত। বিশেষত যখন আমরা বিদেশী যোদ্ধাদের রেডিক্যাল হয়ে ওঠার প্রসঙ্গে গেলাম। দেখা গেল, বিদেশী যোদ্ধাদের রেডিক্যাল হয়ে ওঠার কারণ একটা দেশের সম্পদ কেমন তা নয়। এমনকি এর নাগরিকেরা কেমন কী মাত্রায় শিক্ষিত অথবা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তাও নয়। বরং আমরা দেখলাম বিদেশী যোদ্ধাদের রেডিক্যাল হয়ে ওঠা কিসের ওপর নির্ভর করে এ বিষয়টিকে যা সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে তা হল যে, ওই দেশটা ফরাসি ভাষাভাষী কি না”। এখানে ফরাসী ভাষাভাষী বলতে যেমন ওই রাষ্ট্রের ঘোষিত জাতীয় ভাষা (ন্যাশনাল ল্যাংগুয়েজ) আগে অথবা এখন ফরাসি কি না – সেটাকে ভিত্তি হিসাবে ধরা হয়েছে। কিন্তু “অদ্ভুত ব্যাপারটা দেখা গেল, সবচেয়ে বেশি সুন্নি রেডিক্যাল হয়ে উঠেছে এমন পাঁচটা দেশের মধ্যে চারটাই ফ্রাঙ্কোফোন, মানে ফরাসি ভাষাভাষী, যার মধ্যে আবার ইউরোপের প্রধান এমন দুই দেশ হল – ফ্রান্স ও বেলজিয়াম”।
ইংরেজি ভাষাভাষী যুক্তরাজ্য যেমন ফরাসি ভাষাভাষী বেলজিয়ামের চেয়ে অনেক বেশি বিদেশী যোদ্ধার জন্ম দিয়েছে। এবং এটা সৌদি যোদ্ধাদের চেয়েও সংখ্যায় কয়েক হাজার বেশি। কিন্তু এভাবে সংখ্যাগুলোর দিকে তাকালে তা বিভ্রান্তিতে ফেলবে। বরং আমরা যদি কোনো দেশের জন্ম দেয়া বিদেশী যোদ্ধাদের সংখ্যা ওই দেশের মোট মুসলিম জনসংখ্যার শতকরা কত ভাগÑ এ দিক থেকে দেখি তাহলে আসল ছবিটা আমরা পাবো। প্রত্যেক মুসলিম বাসিন্দাপিছু কতজন বিদেশী যোদ্ধা জন্মেছে এই হিসাবের বিচারে বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য বা সৌদি আরবের চেয়েও অনেক বেশি বিদেশী যোদ্ধার জন্ম দিয়েছে।

এখন ফরাসি ভাষাভাষী বলতে এখানে ঠিক কী বুঝব বা কী বোঝানো হয়েছে? ফরেন অ্যাফেয়ার্সের লেখা এর জবাব দিচ্ছে। বলছে, ফরাসি ভাষাভাষী বলতে বোঝানো হচ্ছে, “ফরাসি রাজনৈতিক কালচার”। এরপর ফরাসি রাজনৈতিক কালচার কথাটাকেই আরও ব্যাখ্যা করে দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, “ফরাসি কায়দার সেকুলারিজম ব্রিটিশ কায়দার সেকুলারিজমের চেয়েও বড় আগ্রাসী। যেমন- ইউরোপের মাত্র দু’টি দেশ (ফ্রান্স ও বেলজিয়াম) পাবলিক স্কুলে বোরখা নিষিদ্ধ করেছে। এ ছাড়া ইউরোপের বিচারে এরাই সেই দুই রাষ্ট্র যেখানে গণতন্ত্রের মান বা মাত্রা সবার নীচে”।
এককথায় বললে, ফরেন অ্যাফেয়ার্সের বক্তব্যের মূল পয়েন্টটা হল ফ্রান্সের সেকুলারিজম ব্রিটিশদের সেকুলারিজমের চেয়েও খারাপ। এটা ছাড়া বাকি সব কথাই চর্বিত চর্বণ। আবার খুব কৌশলে আমেরিকার এই জার্নাল ফরাসিদের তুলনা করেছে আর অন্য ইউরোপীয় দেশের সাথে। সচেতনে নিজেদের, মানে আমেরিকার সাথে তুলনা করেনি।

কিন্তু আসল কথা হল,বিষয়টা কোনভাবেই স্রেফ ব্রিটিশ আর ফরাসিদের মধ্যকার ভালো বা খারাপ সেকুলারিজমের তর্ক নয়। এ প্রসঙ্গটা এর আগে আমার এই সাইটে এক লেখায় এনেছিলাম এই লিঙ্কে যার শিরোনাম ছিল, ‘মাল্টিকালচারালিজম বনাম অ্যাসিমিলিয়েশন’ । বলেছিলাম, ‘মাল্টিকালচারালিজম বলতে ব্রিটিশ বুঝটা হল ব্রিটিশ সমাজটাকে সে নানা কমিউনিটির সহযোগে এক বড় কমিউনিটি হিসেবে রাখতে চায়। কলোনি মাস্টারের দেশ ও সমাজে সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্ত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগোলিক ইত্যাদি পরিচয় বজায় রেখেই আবার এক বৃহত্তর ব্রিটিশ সমাজে এক ব্রিটিশ পরিচয়ে তবে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে বড় হোক। বিপরীতে ফরাসি পছন্দের অ্যাসিমিলেশন। শুনতে ভালো কিন্তু আসলে এখানে অনেক বেশি বলপ্রয়োগে জবরদস্তির ব্যবহার দেখাক যায়। এভাবে বল ব্যবহার করে সব ধরণের নাগরিক বিশেষ করে “অ-সাদা” সবাইকে বাধ্য করে এক রকম করার প্রচেষ্টা এটা। অর্থাৎ ফরাসি কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে যারা নিজের পুরানা সব কিছু ফেলে এসেছে এমনদের বেলায় তাদের সেসব নৃতাত্ত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগোলিক ইত্যাদি পরিচয়ের স্বীকৃতি নেই। সব ভুলে যেতে হবে, বাদ দিতে হবে। এ জন্য বাধ্য করা হবে। কিন্তু এই বাধ্যবাধকতার দিকটা আড়াল করে ‘সুন্দর’ ইউনিফর্মভাবে এক রকম করার নামে (ইংরেজি সিমিলার বা এককরণ থেকে অ্যাসিমিলিয়েশন) আসলে জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে, ফরাসি কালচারই একমাত্র চর্চার কালচার হতে, করতে বাধ্য করা হয়েছে।
কিন্তু এরপরও ওই লেখায় এই প্রশ্ন সেখানে সেখানে তুলেছিলাম যে, ফরাসিরা ব্রিটিশদের মতো মাল্টিকালচারালিজমের বদলে অ্যাসিমিলিয়েশনের পথ ধরল কেন? এর ব্যাখ্যায় বলেছিলাম,  ঘটনাচক্রে ফরাসিদের ভাগে যেসব কলোনি পেয়েছিল সেই সব জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই মুসলমান জনসংখ্যার। কলোনি-পূর্ব থেকেই এরা তাই, বিশেষত আলজেরিয়া থেকে পশ্চিম আফ্রিকা পুরোটাই, মুসলমান। আর এ অঞ্চল থেকেই মাস্টার দেশ ফ্রান্স নিজ দেশের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক সে এনেছিল। েই বাস্তবতার কারণে, এরপর ফ্রান্স মাল্টিকালচারের লাইনে থাকলে আফ্রিকার মুসলমানদের ধর্মসহ কালচারাল বৈশিষ্ট্য জিইয়ে এবং ডমিনেটিং থেকে যেতে দিতে হত। এটাকে তারা রিস্কি কাজ মনে করেছিল। বিশেষত নিজ দেশেযেখানে  সাদা চামড়ার জনসংখ্যা কমতির দিকে, আর কালো এবং মুসলমান আফ্রিকান জনসংখ্যা বাড়তির। তাই নিজ কালচারাল ডমিনেন্সির বজায় অটুট রাখার তাগিদে অ্যাসিমিলিয়েশনের লাইন বা জবরদস্তি ফরাসি কালচার চাপিয়ে রাখাটাই ফরাসিরা উত্তম মনে করেছিল। আর সেটাকেই ফরেন এফেয়ার্স এই রচনায় ব্রিটিশ সেকুলারিজমের থেকে ফরাসিদেরটা ভিন্ন বলে চেনাতে চেয়েছে।

এখানে আর একটা মৌলিক তথ্য মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নির্বিচার হত্যা ও সন্ত্রাস শুরু হয়েছিল ২০০১ সালে আফগানিস্তানে হামলা দিয়ে এবং এই হামলার পক্ষে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ও সম্মতি পকেটে রেখে এবং সেই সুত্রে একাট্টা সারা ইউরোপকে পাশে নিয়ে। কিন্তু পরে ইরাক হামলার সময় ২০০৩ সালে ঘটনা আর একই রকম থাকেনি। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের হাতে মানব বিধ্বংসী মারণাস্ত্র (ডব্লিউএমডি) আছে এই মিথ্যা ও অপ্রমাণিত অভিযোগ তুলে এই হামলা চালানো হয়েছিল। কিন্তু সেই জাতিসঙ্ঘের চোখেই এবার বুশ-ব্লেয়ারের জোট ইরাকে দখলদার বাহিনী বলে পরিচিত হয়েছিল। কারণ এই হামলার পক্ষে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ও সম্মতি বুশ-ব্লেয়ার জোগাড় করতে পারেনি। বরং বুশ-ব্লেয়ারের বিপক্ষে সোচ্চার থেকে নির্ধারক ভোট দিয়েছিল ফরাসি ও জার্মানি। সেকারণে, পরে  ইরাক হামলায় ফরাসিরা অংশগ্রহণ করেনি। তবে অংশগ্রহণ করেনি সম্ভবত দুটা জিনিস চিন্তা করে। এক, ব্রিটিশদের সাথে ফরাসিদের বহু প্রচলিত পুরনো এক প্রতিযোগিতা হল  কে কত বেশি আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠ তা হওয়া ও দেখানো। আর এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা বেশির ভাগ সময়ে জিতেছে। ফলে এটাকে ফ্রান্সের টনি ব্লেয়ারের উল্টো অবস্থান নিয়ে আমেরিকান তোয়াজ পাওয়ার চেষ্টা হিসাবে অনেকে মনে করে। আর দ্বিতীয় কারণ হলো, এভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে গেলে এই যাওয়ার মানে হবে মধ্যপ্রাচ্যের স্থানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা আর তা থেকে নিজ দেশের অ-সাদা চামড়া ও মুসলমান জনগোষ্ঠীর সম্ভাব্য রোষের মধ্যে পড়া। এটা ফ্রান্স এড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু পরের পাঁচ বছরের মধ্যে ফ্রান্স বুঝে যায় যে, ইরাকের তেলের খনি বা অবকাঠামো প্রজেক্ট আর ফরাসিদের ভাগে কখনও কিছুই আসবে না। তাই অবস্থান বদল করে ২০০৮ সালের পর থেকে আবার ফরাসি সৈন্য ন্যাটো নামের আড়ালে অংশগ্রহণ করেছিল। আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওঁলাদের আমলে ফ্রান্স আমেরিকান সক্ষমতার ঘাটতি মেটাতে একাই মালিতে ‘ইসলামি জঙ্গি’দের বিরুদ্ধে  যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। সুবিধা করতে না পেরে তা এখন আছে জাতিসঙ্ঘ বাহিনী নামের আড়ালে। যেন ইরাক হামলায় ফ্রান্সর অংশগ্রহণ না করাটা পুষিয়ে দিতে এার সে একাই মালিতে লড়তে গিয়েছিল। গাদ্দাফির পতন ঘটিয়ে এই ইসলামি গ্রুপটাই পরে মালিতে গিয়ে নিজেদের আইএস বলে পরিচিতি দেয়। আর মূল কথা হল, পরবর্তিতে মালিতে ও সিরিয়ায় আইএস বেধরকভাবে ফরাসি বোমা হামলা শিকার হয়েছিল। তাই ঐ আক্রমণের প্রতিক্রিয়াতেই ফরাসিরা প্যারিসে আইএসের হামলার শিকার হয়েছিল। তাহলে সার কথায় এটা সত্য যে, ইউরোপের মাত্র দু’টি দেশ ফ্রান্স ও বেলজিয়াম পাবলিক স্কুলে বোরকা নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু সেটা ফরাসি সেকুলারিজম ব্রিটিশের সেকুলারিজম থেকে বেশি আগ্রাসী, কারণটা এমন নয়। বরং তা অ্যাসিমিলিয়েশনের লাইনের জন্য, বা জবরদস্তি ফরাসি কালচার চাপিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে।

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় গত ১০ এপ্রিল ২০১৬ ছাপা হয়েছিল। সেই লেখা আরও এডিট সংযোজন করে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।  ]

 

ইউরোপের মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন

ইসলামবিদ্বেষের ছায়ায় দেখা
মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন

গৌতম দাস
http://wp.me/p1sCvy-qH

২০১৫ ডিসেম্বর ২৯

আইএস কারা, কোথা থেকে কোন দেশ থেকে এসেছে; কী ধরণের মানুষ এরা যারা আইএস সংগঠনে এসে যোগ দিচ্ছে ইত্যাদি প্রশ্নে আমরা জানি মূলত এদের এক বিশাল অংশ পশ্চিমা সমাজগুলো থেকে। কিন্তু পশ্চিমা সমাজের কারা কারা কোন ধরণের সামাজিক, অর্থনৈতিক বা পারিবারিক ব্যকগ্রাউন্ডের সন্তানেরা আইএসে যোগ দিচ্ছে এনিয়ে পশ্চিমা সমাজগুলোর অভ্যন্তরে বিশেষত ইউরোপের দেশগুলোতে পরিচালিত সামাজিক গবেষণার শেষ নাই। কী ধরণের মানুষেরা বিশেষ করে আইএস সংগঠনে যোগ দিচ্ছে এবিষয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো মিথ্যা দাবি করে – আমেরিকান উচু কদরের দ্বিমাসিক জর্নাল “ফরেন এফেয়ার্স” এর চলতি ডিসেম্বরে প্রকাশিত জানু-ফেব্রু ২০১৬ সংখ্যায় – এক রিপোর্ট করেছে। যারা পশ্চিমা নেতা দেশ- দুনিয়া চালায় ও নীতি নির্ধারক, এমন গুরুত্বপুর্ণ লোকেদের চিন্তা ও পাঠের জন্য জরুরি বলে মনে করা হয় এই জর্নালকে – এই অর্থে এটা প্রেস্টিজিয়াস জর্নাল বলেন কেউ কেউ। যেমন হিলারি ক্লিনটন, ওবামা সরকারের সেক্রেটারি অব স্টেট থাকা অবস্থাতে এখানে লেখা ছেপেছেন। সেই জর্নালে আলোচ্য আর্টিকেলটা লিখেছেন ভারতে জন্ম বৃটিশ নাগরিক কেনান মালিক ()।
মানুষ কেন সন্ত্রাসবাদী ভাবাদর্শ (র‍্যাডিক্যালিজম) আপন করে নেয় এবিষয়ে মোটা দাগে প্রচলিত চারটা তত্ত্বের কথা তুলেছেন লেখক কেনান মালিক।  সেগুলোর “প্রথম তত্ত্ব বলে – লোকে জঙ্গী হয় কারণ তারা ধর্মীয় অনুমোদন পিছনে আছে  এমন কিছু জঙ্গীবাদী ভাবাদর্শ সহজে তাদের  নাগালে আসে, তাই। কেনান বলছেন, কিন্তু বৃটিশ আভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা বিভাগ ২০০৮ সালে MI5 পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে (লিক হয়ে বেরিয়ে পড়া রিপোর্ট) “ধর্মীয় জোশ উন্মাদনায় উজ্জীবিত হওয়া দূরে থাক বরং যোগদানকারীদের বিরাট এক অংশ নিয়মই ধর্মকর্ম পালন করে না”। (• Far from being religious zealots, a large number of those involved in terrorism do not practice their faith regularly. Many lack religious literacy and could actually be regarded as religious novices. ) ওদিকে দ্বিতীয় তত্ত্ব বলে, অন্যান্য জঙ্গীবাদী ভাবাদর্শ সাধারণত যেভাবে মানুষে অর্জন করে তা থেকে ভিন্ন ভাবে এরা ভাবাদর্শ লাভ করে। প্রচলিত ধরে নেয়া ধারণা হল এদের ভাবাদর্শ ঘৃণা-ছড়ানী-প্রচারকদের থেকে এসেছে “ideology comes from hate preachers”, তাই। গবেষণায় এর পক্ষেও সমর্থন মিলেনি। তৃতীয় তত্ত্ব বলে, এটা যেন ভারী কিছুকে যান্ত্রিকভাবে বইবার এক কনভেয়ার বেল্ট এর মত; যার শুরু হয়  ক্ষোভ অসন্তোষে মানুষের ঐ বেল্টের উপর উঠে বসা থেকে। এরপর তা এক ধর্মভাবের ভিতর দিয়ে পার হয়ে এমন এক রেডিকেল বিশ্বাসের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয় যা পরিণতিতে সন্ত্রাসবাদে পৌছায়। কেনান বলছেন কিন্তু ২০১০ সালের আর এক বৃটিশ গবেষণা রিপোর্টও কনভেয়ার বেল্ট তত্ত্বকে নাকচ করে বলেছে এটা ভাবাদর্শ বিষয়টাকে অযথা ফুলিয়ে ফাপিয়ে দেখিয়েছে। ……conveyor belt thesis “seems to both misread the radicalization process and to give undue weight to ideological factors.”। আর চতুর্থ তত্ত্ব , এরা বারেবারে বলে মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায় সন্ত্রাসবাদে যোগদানকারীরা হল সমাজের সেই গ্রুপ যারা সামাজিক অসাম্য ও সমাজের সাথে অ-সম্পৃক্ততার সমস্যার শিকার। ফলে মানুষ অমন সন্ত্রাসবাদী ভাবাদর্শকে আপন করে নেয়। কিন্তু কেনান বলছেন, লন্ডনের কুইন মেরী কলেজের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, “সন্ত্রাসবাদীওরা আর যাই হোক এরা সামাজিক অসাম্য ও সমাজের সাথে অ-সম্পৃক্ততার সমস্যার ভুগা ব্যাকগ্রাউন্ডের জনগোষ্ঠী থেকে আসা কেউ নয়। বরং যারা জিহাদী্ গ্রুপে যোগ দিয়েছে এরা  বয়সে আঠারো থেকে বিশ বছরের মধ্যে, এরা অবস্থাপন্ন পরিবারের সন্তান, বাসায় ইংরাজিতে কথা বলে, হাইস্কুল শিক্ষায় শিক্ষিত; কখন কখনো তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েরও। আসলে  তারুণ্য, অর্থসম্পদ ও শিক্ষিত – এ’তিনটাই গুরুত্ত্বপুর্ণ নির্ণায়ক; এমন ক্যটাগরিই সন্তানদের বেশি বিপদজনক”।

কেনান মালিক এভাবে সামাজিক গবেষণার ক্রিটিকগুলো জড়ো করে দাবি করে বলছেন, “পশ্চিমের সমস্যা হল, তারা এইসব পুর্ব-অনুমানের উপর দাঁড়িয়ে তাদের আভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী নীতি সাজিয়েছে; যেগুলোর সবই ভুল”। ইউরোপে পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক গবেষণার বরাতে কেনান মালিক এবার নিজ বরাতে এর কারণ বলছেন এভাবেঃ “দেখা গেছে যোগ দেয়া বেশির ভাগ তরুণ টিনএজ বয়সের – এই to little interaction with others in the society. Theirs is a much more existential form of alienation. তরুণেরা জিহাদী সন্ত্রাসে যোগ দিবার কারণ হল কিছু একটা তারা খুঁজে ফেরে যেগুলো খুব বেশি বর্ণনা করা যায় না তবু সেগুলো যেমনঃ পরিচয় খুঁজে ফেরা, অর্থ খোঁজ করা, সামিল বোধ করা, সম্মানবোধ করা। আর এটা মোটেও সত্যি না যে হবু জিহাদীরা মুল সমাজের সাথে দুর্বলভাবে যুক্ত থাকে এই অর্থে যে তারা স্থানীয়ভাষা বলতে পারে না অথবা স্থানীয় আদব-কায়দা রপ্ত নাই অথবা সমাজের অন্যান্যদের সাথে আলাপ আলোচনায় অংশ নিতে পারে না বা নেয় না। কিন্তু তাদের অস্তিত্ত্বমানতাবোধ বিষয়ক এক বিচ্ছিন্নতাবোধ আছে”।

শেষের এই বাক্যটা বলার জন্য লেখক কেনান মালিকের এতক্ষণকার কসরত। “বিচ্ছিন্নতাবোধ”। এই শব্দ ও ধারণা মার্কসবাদীদের মধ্যে বহুল প্রচলিত। বিশেষত সাহিত্যের এস্থেটিকস বা সৌন্দর্যতত্ত্ব চর্চায়। “বিচ্ছিন্নতাবোধ” ধারণাটা সার কথায় বললে, ক্যাপিটালিজম উতপাদন সম্পর্কের মধ্যেকার এক নতুন ফেনোমেনা হল, এখানে শ্রমিক নিজের উতপাদ্য বা প্রডাক্ট থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন বোধ করে। নিজ উতপাদ্য, নিজের সৃষ্টির ভিতর  নিজে কোথায় সে অস্তিত্ত্বমান আছে তা খুজে পায় না। অন্তত কোনটা তাঁর শ্রমের অংশ বা ক্রেডিট তা চিনতে পারে না। এথেকে  অর্থাৎ উতপাদন থেকে উতপাদকের বিচ্ছিন্নতাবোধ, এক বিরহ সৃষ্টি হয়। এই অর্থে যে, উতপাদনের আগে বাজার দরে শ্রমিককে শ্রমমুল্য দিলেও তা উতপাদিত পণ্যে হাজির হবার পর ওর বাজার মুল্য আগের মোট সব খরচের চেয়ে বেশি হবে – যেটাকে আমরা মুনাফা বলে ধরে নেই। অর্থাৎ পণ্যের আসল এডেড ভ্যালু  ওর কাঁচামাল, মেশিনারিস ই্ত্যাদির উপর পরিশোধিত শ্রমমুল্য এসবের যোগফলের সমানের চেয়ে বেশি হবে। প্রতিটা উতপাদিত পণ্যের সাথে তৈরি হয় এই বাড়তি মুল্য। এটাই মার্কসের সারপ্লাস ভ্যালু বা “বাড়তি মুল্য তত্ত্ব”। বাড়তি মুল্য থেকে প্রমিক বঞ্চিত হয়ে চলেছে সব সময়। এটাই মুল্য হিসাবে  তা না পাবার কারণে তাঁর বিচ্ছিন্নতাবোধ  অথবা বলা যায় উতপাদিত পণ্যকে নিজের মনে না করতে পারার বিচ্ছিন্নতাবোধ। এছাড়া, কাঁচামাল থেকে  ফিনিশ প্রডাক্ট যত জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসবে  ততই প্রডাক্টের কোন অংশটা কোন শ্রমিকের শ্রমে তৈরি তা আলাদা করা মশকিল হয়ে যাবে। সবমিলিয়ে এক বিচ্ছিন্নতা বা বিরহ বোধের সৃষ্টি হবে। অনেকা যেন বাচ্চা জন্ম দিবার পর কোন কারণে মা বাচ্চার সাথে সম্পর্কিত বা টান বোধ না জাগা ধরণের সমস্যা। মানুষের মৌলিক স্বভাব বৈশিষ্ঠগুলোকে মুখ্য করে সিনেমা বানানো বা সিনেমায় সেগুলোকে আনার ক্ষেত্রে  Rainer Werner Fassbinder নামের এক জর্মন ফিল্মমেকারের কথা অনেকেই জানেন; যিনি এনিলিয়েশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধের উপর সিনেমা বানিয়ে খ্যাত।

বুঝা যাচ্ছে, আমাদের আলোচনার কেনান মালিক  আসলে এই বিচ্ছিন্নতাবোধ তত্ত্বের একজন খাতক। সার করে বললে, কেনান মনে করেন পশ্চিমকে রেডিক্যাল ইসলামি বিপ্লবীর সমস্যার মুখোমুখি  হতে হয়েছে তাদের জিহাদী ভাবাদর্শের জন্য – একথা তিনি মানতে নারাজ। ইসলামি রেডিক্যালিজম এর কোন কারণ নয়। এজন্য নানান গবেষণা ফলাফল হাজির করে তিনি তা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। তবে তিনি মানেন এক ধরণের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, অপরের প্রতি টান বা আগ্রহ কমে যাবার সমস্যা পশ্চিমা সমাজে আছে, তৈরি হয়ে আছে  এটা তিনি মানেন।আসলে তিনি ইউরোপসহ পশ্চিমকে এসবের খাস জবাব বিচ্চিন্নতাবোধ দিয়ে দিতে চান, দেয়া সম্ভব দাবি জানাতেই এই রচনা।

তিনি বলছেন,  ইতোমধ্যেই হবু জিহাদীরা প্রধান ধারার সংস্কৃতি, ভাব এবং আচারনিয়ম ইত্যাদিতে ভালভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকা সত্ত্বেও তা ত্যাগ করেছে আর এর বিকল্প দৃষ্টিভঙ্গীর খোঁজে নেমেছে। এটা মোটেই বিস্ময়কর নয় যে, জিহাদী হতে ইচ্ছুক অনেকে হয় নতুন করে ইসলামে ধর্মান্তরিত নয়ত, মুসলিম যারা দেরিতে নিজেদের ধর্মের দিকে নজর ফিরিয়েছে এমনও আছে। তবে উভয় ক্ষেত্রে তাদের সমাজ নিরাসক্ততা, বিচ্ছিন্নতা তাদেরকে সাদা-কালো ভাবে মরাল কোডের চরম ইসলামিজমের দিকে ঝুকিয়ে ফেলেছে। ফলে “এটা ঠিক কোন রেডিক্যাল ভাবাদর্শের বিষাক্ত করে ফেলা নয় বরং এটা অবশ্যই সমাজের প্রচলিত প্রধান ধারার মরাল কাঠামোর প্রতি অনাস্থা এবং একই সাথে এক বিকল্পের খোঁজে লেগে পরা”। কেনন বলছেন, “অতীতে সমাজের প্রধান ধারা থেকে বিচ্ছিন্ন সহানুভুতিহীন মানুষ রাজনৈতিক রূপান্তরের আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, চরম বাম ধারা থেকে শ্রমিক আন্দোলন অথবা কোন রেসিজম- বিরোধী আন্দোলন এমন অনেক কিছুতেই যোগ দিয়েছেন”। ফলে কেনন বলছেন, স্বভাবতই সামিল থাকাহীনতা, সংশ্লিষ্টহীনতা বোধ, “এটা কোন মুসলিম সমস্যা নয়”। মুসলিম সমস্যা বলে ালিয়ে দেয়া যাবে না।

কেননের মুখে মুসলমানেদের দায়ী না করে দেখে – এটা দেখে আমাদের ঠিক খুশি হবার কিছু নাই। আর কেনন কারণ মূল প্রশ্ন হচ্ছে, কেন পশ্চিমের বিশেষত ইউরোপের শত শত মুলত টিনএজ তরুণ আইএস এর মত সংগঠনে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। এটা আশির দশকে পপুলার বিচ্ছিন্নতাবোধ বা এলিনিয়েশন বা (মানুষ বা শ্রম তার উৎপাদিত উৎপন্নের ভিতর নিজেকে খুজে পায় না) তত্ব দিয়ে একালে আর ব্যাখ্যা করা যাবে না। কারণ এই দৃষ্টিভঙ্গি খুবই সস্তা একপেশে এবং বস্তুবাদী। এটা অর্থনীতিবাদী বা স্টালিনিস্ট ধারণাও বটে। কারণ ‘আধুনিক রাষ্ট্রে’ মানুষ (বা তাঁর শ্রম) যেমন নিজের বস্তুগত সৃষ্টির থেকে বিচ্ছিন্নতা বোধ করে, এক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয় ঠিক একইভাবে মানুষের প্রতি মানুষের স্পিরিচুয়াল টান অনুভব, সকলের সাথে একই তৌহিদে মিলিত হবার আকুতি ও আকাঙ্খাও তাঁর ভিতর কাজ করে। এরও এক অভাব বোধ হয়। কারণ মানুষ শুধু শ্রমের এক আধার, বৈষয়িক অর্থনীতির এলিমেন্ট মাত্র নয়; বরং একই সাথে সে স্পিরিচুয়াল বিয়িং। সকল অপরের সাথে সম্পর্কহীনতা – এই অভাব মানুষের মধ্যে এক হাহাকারের জন্ম দেয়, সে অস্থির হয়ে উঠে, দমবন্ধ লাগে। এটাও আর এক চরম বিচ্ছিন্নতাবোধ। অতএব বিচ্ছিন্নতাবোধ মানেই কেবল বস্তুগত বিচ্ছিন্নতা্বোধ নয়; স্পিরিচুয়াল বিচ্ছিন্নতাবোধ সম্ভবত প্রভাবে এর দিক থেকে বস্তুগত বিচ্ছিন্নতা্বোধ এর চেয়েও বড়। এদিকটাই কেনান মিস করেছেন। তিনি আশির দশকে পড়ে থাকতে চাইছেন। কেননের এই দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে আমাদের এই সমালোচনা আরো জায়েজ মনে হয় এজন্য যে তিনি এরপরে লিখছেন, “একালের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় মধ্যে মানুষের নিরাশক্তবোধ, রাজনৈতিকভাবে স্বরবিহীন থাকা অবস্থা ছেয়ে গেছে। এধরনের উদ্বেগ ও অভাবগুলোকে কোন চার্চ বা ট্রেড ইউনিয়ন বুঝবে না”। অর্থাৎ কেনান একালে ২০১৫ সালে এসে এখনও বস্তবাদ-সর্বস্ব “এলিনিয়েশন বা বিচ্ছিন্নতাবোধ” তত্ত্ব আউড়িয়ে সব রোগ সারানোর ধনন্তরি ওষুধ মনে করতে চাইছেন। বিচ্ছিন্নতা্বোধ চার্চ, মসজিদ মন্দির – বলে নজর আন্দাজ করতে চাইছেন। আমাদের দেশে “বিরহ” বলে গানের ধারা আছে; ময়মনসিংহ থেকে মানিকগঞ্জ, কুষ্টিয়া ইত্যাদি। যারা আমাদের এলিনিয়েশন ত্ত্ত্ব বুঝবার নাগাল পাবার অনেক আগে থেকে স্পিরিচুয়াল আবহে “বিরহ” গান করে আসছে।

কেননের এই রচনার ছোট শিরোনাম “ইউরোপের বিপদজনক মাল্টিকালচারালিজম”। অর্থাৎ ভারতীয় অরিজিনের বৃটিশ  নাগরিক হলেও তিনি বৃটিশ মাল্টিকালচারালিজম নীতির সমালোচক। আবার এটাই তাঁর একই নিশ্বাসে ইউরোপের ফ্রান্সের ক্ষেত্রে ফরাসি এসিমিলিয়েশন বা ‘সবাইকে একরকম করণ’ নীতির পক্ষে দাঁড়ানো। আসলে মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন – কথা দুটোরই কোন সারবত্তা নাই। তবুও বুঝবার জন্য শব্দদুটোর অর্থ খোলসা করা দরকার। মাল্টিকালচারালিজম বলতে বৃটিশ বুঝটা হল – বৃটিশ সমাজটাকে সে নানান কমিউনিটির মিলিত এক বড় কমিউনিটি হিসাবে রাখতে, দেখতে চায়। বৃটিশ কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে কলোনি প্রজা দেশ থেকে আসা সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি পরিচয় বজায় রেখেই “উপরি এক বৃহত্তর বৃটিশ সমাজের”নিচে এক বৃটিশ পরিচয়ে বড় হোক; এটাই চায়। বিপরীতে ফরাসী পছন্দের এসিমিলিয়েশন (এক ছাঁচে ঢালাই করার নীতি) শুনতে ভাল লাগলেও কিন্তু আসলে অনেক বেশী বলপ্রয়োগে জবরদস্তি করে নাগরিক সবাইকে একরকম করণের প্রচেষ্টা এটা। অর্থাৎ এখানে আর ফরাসি কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি পরিচয়ের স্বীকৃতি নাই। বরং সব ভুলে যেতে হবে, বাদ দিতে হবে। বাধ্য করা হবে। কিন্তু এই বাধ্যবাধকতার দিকটা ফরাসীরা আড়ালে রাখতে চায় বা থেকে যায়। সবাইকে “সুন্দর” ইউনিফর্ম একরকম করার নামে (ইংরাজি সিমিলার বা একরকমকরণ থেকে এসিমিলিয়েশন ) জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে, ফরাসি কালচারই একমাত্র চর্চার কালচার হতে, করতে বাধ্য করা। যতটুকু ও যেভাবে বর্ণনা করলাম তা থেকে মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন এর ভিন্নতা্র সবটা বুঝা বা বুঝানো যাবে না। কারণ এসব ভারি কথার আড়ালে মুল আরও এক বিষয়কে লুকিয়ে রাখা হয়েছে।

প্রথম কথা হল, পশ্চিম মাইগ্রেন্ট শ্রমিকের আমদানি ঘটায় একেবারে একমাত্র নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থে, সস্তা শ্রম পাবার স্বার্থে, সবসময় এটাই সে করে এসেছে। নইলে লো-স্কিল না নো-স্কিল লেবার নিতে হত কেবল নিজ দেশীয় চামড়া থেকে ফলে এর মুল্য কমপক্ষে দ্বিগুণ তাদের যোগাতে হত। ফলে একমাত্র সস্তা মাইগ্রেন্ট শ্রমিক পাবার স্বার্থেই তাকে নিজের সমাজে এসব “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” বলে বকোওয়াজের জন্ম দিতে হয়েছে। এটা প্রথম সত্য। তবে নিজ অর্থনীতি সমৃদ্ধিতে ভাল চলা অথবা মন্দা হয়ে চলার সাথে সামঞ্জস্য বিধানের জন্য অন্য চামড়ার শ্রমিক কতজনকে আসতে সে অনুমতি দিবে এটা সময়ে সময়ে তাকে কড়া নিয়ন্ত্রণে করতে যেতে হয়। অর্থনীতি ভাল মানে বেশি শ্রমিক প্রয়োজন নইলে উলটা হলে সব খেদাও – এটাই হল আসল নীতি। সবারই নীতি তবে দোষ দেয়া হয় তথাকথিত ডানপন্থি্র।

এরপর দ্বিতীয় আর এক আজব সত্য হল, কলোনি দখলের ফেলে আসা বছরগুলোতে  কপাল গুণে বৃটিশের কলোনির তুলনায় ফরাসি কলোনির বাসিন্দারা বেশির ভাগই মুসলমান বা ইসলাম ধর্মপালনকারী। এরফলে কলোনি প্রজা দেশ থেকে সস্তা শ্রমের মধ্যে মুসলমান প্রজার হার ফ্রান্সের বেলায় বেশি। তাই সস্তা শ্রম ঢুকার অনুমতি দিতে গিয়ে একই ইউরোপে বৃটিশ ও ফরাসী হয়েও তাদের নীতি ও অভিজ্ঞতা একই রকম নয়। এভাবে ফ্রান্সে মুসলমানের সংখ্যা বলা হয় ৫০ লাখ। এসব তথ্যের দিকে নজর করে আগাম ব্যবস্থা হিসাবে ফরাসী সরকার পছন্দ করেছে – এসিমিলিয়েশন নীতি। কারণ এসিমিলিয়েশনের কথা বলে স্কার্ফ হিজাব বা কোন মুসলমান চিহ্ন প্রকাশিত হওয়া ঠেকিয়ে দেয়া যায়। ফেলে আসা নৃতাত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগলিক ইত্যাদি যেকোন পরিচয় বা চিহ্ন ভুলে গিয়ে সব কিছু ফরাসি হতেই হবে বলে বাধ্য করা যায়। অতএব “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” – ফরাসি না বৃটিশ কোনটা ভাল – এসব কথা তাই আসল কথা লুকিয়ে বকোওয়াজ।

তাহলে কথা দাড়ালো, সস্তা শ্রম থেকে বেশি মুনাফার লোভে ক্যাপিটালজম কলোনি প্রজা দেশ থেকে শ্রম আনতে বাধ্য। আবার সেই শ্রম কে কীভাবে ম্যানেজ করার সুবিধা দেখে সে ভিত্তিতে “মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন” এর কূটতর্কও সে হাজির করবে। কারণ নইলে আসল কথাগুলো সরাসরি বলতে হবে। কেনান মালিক তবু “মাল্টিকালচারালিজম বনাম এসিমিলিয়েশন” এর ভুয়া তর্কের মধ্যে “মাল্টিকালচারালিজমকে বেশি বিপদজনক বলছেন। কারণ বৃটিশরা নাকি “মাল্টিকালচারালিজমের কথা বলে মুসলমান ধর্মীয় নেতাদেরকে কমিউনিটির প্রতিনিধি মনে করেন ভুল করে, বেশি গুরুত্ব দেন; ইত্যাদি। কেনানের কথা শুনে বৃটিশদেরকে বোকা ভাবার কোন অর্থ নাই। আবার বৃটিশদের নীতিটা বেশি ভাল তাও নয়। ব্যাপারটা হল ম্যানেজমেন্ট। নাগরিকদের বা অপজিশনকে লিবারেল স্পেসের মধ্যে রাখলে তাদের কথা বলতে দেয়া, বিরোধীতা করতে দেয়ার আইনি সুযোগ যতটা সম্ভব বেশি রাখলে তাদের সকলের বিরোধীতা সামলে রাখা তুলনামুলক সহজ হবে বলে মনে করা হয়। বৃটিশ প্রশাসন মনে করে এই লিবারেল নীতি তাদের জন্য বেশি ফলদায়ক হচ্ছে। আর ধর্মীয় নেতার প্রসঙ্গটা হল, ধর্মীয় নেতারা যদি প্রতিদ্বন্দ্বী কোন নেতার চেয়ে বেশি প্রভাবশালি হন তাহলে বৃটিশ প্রশাসন কী তা অস্বীকার করার মত বোকামি করতে পারে? বরং একথা বলাতে কেনানের কথায় ইসলাম বিদ্বেষের ছায়া দেখা যাচ্ছে। কেনান মালিক নিজেই বলেছেন “মাল্টিকালচারালিজম বা এসিমিলিয়েশন” দুটোর মধ্যেই ভাল মন্দ দুটাই আছে। তবু কোন ব্যাখ্যা ছাড়াই তিনি শিরোনামে “মাল্টিকালচারালিজমকে” বেশি বিপদজনক বললেন। এথেকেও মনে করার কারণ রয়েছে যে তিনি ফরাসিদের মত ইসলাম-বিদ্বেষ জারি রাখার সুযোগটা হারাতে চান না।

গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ২১ ডিসেম্বর তারিখে। অনেক জায়গায় অপুষ্ট বা সংক্ষিপ্ত রেখেই তা ছাপতে হয়েছিল। এখানে সেসবের অনেক কিছু পরিপূরণ করে, সংযোগ ও সম্পাদনা করে আবার এখানে ছাপা হল। ]