শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা

শতাব্দী পুরানা ইউরোপের আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা
গৌতম দাস
০২ আগষ্ট  ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1lk

তুরস্কের সামরিক ক্যু নিয়ে এর পক্ষে-বিপক্ষে তর্কবিতর্ক চার দিকে চলছে,মোটামুটি তা দুনিয়াজুড়েই। তবে তুরস্ককে ইউরোপের সাথে জড়িয়ে দেখলে মানতে হবে এই বিতর্কের শুরু আজকের নয়,অনেক পুরনো। বলা চলে অন্তত প্রথম বিশ্বযুদ্ধ (১৯১৪-১৯১৮) অথবা তারও আগের সময় থেকে এই ঝগড়া বা বিতর্ক। তবে একেবারে মূল সংশ্লিষ্ট যে ঘটনা যা থেকে এই তর্কবিতর্ক উৎসারিত তা হল, দুনিয়ায় যখন সাম্রাজ্যের যুগ চলছিল সেখান থেকে। সাম্রাজ্যের যুগ মানে সারা দুনিয়া যখন ৫-৭ টা সাম্রাজ্য শাসকের হাতে ভাগ হয়ে শাসিত ছিল। সেকালে এমন প্রায় সব সাম্রাজ্যই ছিল খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর বড় হওয়া দুনিয়ায়। আর এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল অটোমান এম্পায়ার, যা ইসলামি সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার অংশ। নিঃসন্দেহে এই অংশটা ছিল এক গুরুত্বপুর্ণ ব্যতিক্রম যা খ্রিষ্টান সমাজ সভ্যতার ভেতর দিয়ে যাওয়া অভিজ্ঞতার বাইরে। যদিও বয়সকাল বিচারের দিক থেকেও অটোমান সুলতান এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যের অভিজ্ঞতা ইউরোপের ক্রিশ্চান অভিজ্ঞতার সাম্রাজ্যের দিক থেকে অনেক দীর্ঘ।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে থাকার কাল ধরা হয় ১৪৯৭ সাল থেকে,আয়ারল্যান্ডে কলোনি বসানো বা ‘প্লানটেশন অব আয়ারল্যান্ড’ থেকে। আর এটা টিকেছিল এর পরের ৪৫০ বছর বা কিছু বেশি কাল অবধি। এককথায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের (১৯৪৫) সাথে বৃটিশ সাম্রাজ্য যুগেরও সমাপ্তি। সে তুলনায় অটোমান সুলতানের এম্পায়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২৯৯ সাল থেকে শুরু হয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এর পরাজয়ের (১৯১৮) আগে পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ছয়শ’ বছর টিকে ছিল। আজকের তর্কবিতর্কের শুরু সেই এম্পায়ার বা সাম্রাজ্য যুগ থেকে। প্রবল পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান ইউরোপের সব সাম্রাজ্য শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা করে নিজ যোগ্যতা ও সফলতায় টিকে ছিল। আর একটা কথা বলা দরকার। দুনিয়া এম্পায়ার বা সাম্রাজ্যে ভাগ হয়ে শাসিত হওয়া,শাসনের সেই কালে ইউরোপের প্রথম পাঁচটি সাম্রাজ্য শাসক ছিল- ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ-ওলন্দাজ। এরা সবই খ্রিষ্টীয় সমাজ সভ্যতার অভিজ্ঞতার ভিতরে বড় হওয়া অংশ। আগে বলেছি যার বিপরীতে ছিল একমাত্র সুলতানের এম্পায়ার। ফলে পাঁচ সাম্রাজ্য শাসকের পরস্পরের মধ্যেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতা থাকলেও সুলতানের এম্পায়ারের সাথে প্রত্যেক এম্পায়ারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে সবার রেষারেষিতে অতিরিক্ত এক ভিন্ন মাত্রা ছিল। তবে মনে রাখতে হবে এটা মূলত এম্পায়ারের লড়াই। এই লড়াইকে কোনো ‘সভ্যতার সঙ্ঘাতের’ বা সিভিলাইজেশনের লড়াই বলে ইঙ্গিত করা হচ্ছে না, করছি না। এটা এম্পায়ার টিকানোর লড়াই – ইউরোপের সাম্রাজ্যবাদী শাসকগুলোর সাথে সেয়ানে সেয়ানে লড়াই করে নিজ সাম্রাজ্য টিকিয়ে ছিলেন পরাক্রমী অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা। সভ্যতার লড়াই বড় জোর এমন এম্পায়ার টিকানোর অধীনস্ত কিছু একটা।
কিন্তু অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানেরা এত কিছু করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। কিছুটা কপাল খারাপ ছিল বলা যায় সে কারণে,আর কিছুটা নিজের পক্ষে কাজটা ফল দেয়নি- তাদের নেয়া এমন কিছু সিদ্ধান্ত। যেমন প্রথমত,সেকালের ইউরোপে উল্লেখযোগ্য একমাত্র জার্মানির সাথে দীর্ঘ ও পুরনো অ্যালায়েন্স ছিল সুলতানদের। সেসব সূত্রে,প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ-ফরাসি জোটের বিরুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নিয়েছিল তুরস্ক। ফলে যুদ্ধে জার্মানির হারের সাথে তুরস্কের এম্পায়ারেরও পরাজয় ঘটে। যুদ্ধ শেষে ব্রিটিশ ও ফরাসিরা পুরো অটোমান এম্পায়ার নিজেদের মধ্যে ভাগ বন্টন করে নেয়। তবে প্রথম কারণ যেটা বলেছি,জার্মানির সাথে মৈত্রী – এটা অটোমান সুলতানেরা এড়াতে পারতেন বলে মনে হয় না। আর দ্বিতীয় কারণ যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেয়া ও যুদ্ধ করা – এটা কষ্ট করে হলেও এড়াতে পারলে হয়ত ইতিহাস আজ অন্য দিকে যেত। তবে ইতিহাস যদি বা কিন্তু দিয়ে চলে না।
খেয়াল রাখতে হবে,তুরস্কের সুলতানের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ইউরোপের যে পাঁচ ‘কুতুব’ – সাম্রাজ্য শাসকের কথা বলেছি তাদের মধ্যে কিন্তু জার্মানি নেই। এটাই ইউরোপের মধ্যে কেবল জার্মানির সাথে অটোমান তুরস্কের অ্যালায়েন্সের কারণ। ঘনিষ্ঠ লেনদেন,পণ্য বিনিময় আর বিশেষ করে জার্মান টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্ট জ্ঞান শেয়ার করত অটোমান তুরস্ক। অন্যভাবে বললে, ইউরোপের সাম্রাজ্য বা এম্পায়ার শক্তি হিসাবে জার্মানির আবির্ভাবকে ব্যাখ্যা করতে বলা হয়, জর্মানরা লেট কামার; মানে সবার শেষে আসা। জার্মান ক্যাপিটালিজমের এক দারুণ পূর্ণতা আসা ও এরপর কলোনি মালিক হয়ে ওঠার দিক থেকে – ইউরোপের মধ্যে জার্মানিতে ক্যাপিটালিজম এসেছে, পুষ্ট হয়েছে সবার চেয়ে দেরিতে।
বলা হয়ে থাকে, ইউরোপে – আধুনিক রাষ্ট্র কায়েম, ক্যাপিটালিজম গড়ে তোলা ও কলোনি সাম্রাজ্য গড়া – এই তিন বৈশিষ্ট্যের নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা উঠে আসার ব্যাপারটা তিন রকমভাবে তিন কালে ঘটেছে। প্রথমে অর্থনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে আধুনিক বিপ্লব ঘটেছিল ব্রিটেনে,এর পরে রাজনৈতিক দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল ফ্রান্সে আর সবশেষে এবং দেরিতে দর্শনগত দিকটা মুখ্য অবদান করে তা ঘটেছিল জার্মানিতে। তবে দেরিতে হলেও জার্মানি টেকনোলজি ও ম্যানেজমেন্টের দিক থেকে দ্রুত তারা শীর্ষে আসতে পেরেছিল। জার্মানির কখনও এম্পায়ার হয়ে উঠা হয় নাই,তবে হয়ে ওঠার পথে ছিল বলে অটোমানের সাথে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা মুখ্য ছিল না। আর ঠিক এ কারণেই অটোমান সুলতানের তুরস্কের সাথে জার্মানির গভীর সখ্য হয়েছিল। আর এই দুই সখা তাদের কমন শত্রু ও প্রতিদ্বন্দ্বী যারা ছিল এরা হল – ব্রিটিশ,ফরাসি,স্প্যানিশ,পর্তুগিজ ও ডাচ। এই পাঁচ কুতুবের মধ্যে আবার ব্রিটিশদের সাথেই সুলতানের তুরস্কের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিল। কিন্তু পরাক্রমী সুলতানের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পেরে না ওঠে ব্রিটিশসহ সবাইকেই সুলতানের ক্ষমতাকে সালাম করে চলতে হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর প্রথম চোটে তাই ব্রিটিশ-ফরাসি গোপন আঁতাতে তারা আর দেরি করেনি- পুরো অটোমান সাম্রাজ্যই নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছিল।

শুধু তাই নয়, ছোট বড় মিলিয়ে যে আটটি ক্রুসেডে ইউরোপ এতদিন বারবার হেরে যাওয়ার ভেতরে ছিল, সর্বশেষ ১২৮৯ সালে (আজকের লিবিয়া) ত্রিপোলী জয়ের মধ্য দিয়ে শেষ ক্রুসেডেও পরাজয় ঘটেছিল ইউরোপের। সেই পটভূমিতেই অটোমান সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল। কিন্তু অবশেষে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিতে ১৯১৮ সালে এর প্রতিশোধ নেয় ব্রিটেন। জেরুসালেমসহ আজকের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল ভূখণ্ড পুরোটাই ব্রিটেন নিজের ভাগ দখলে নিয়েছিল। আর আরেক বড় তামাশা হল, যুদ্ধে পরাজয়ের পর তুরস্ক কার্যত ব্রিটিশদের ভাগ দখলে চলে যায়। অথচ সামরিক অফিসার মোস্তফা কামাল আতাতুর্ককে দিয়ে ব্রিটিশরা তাদের দখলি-তুরস্কতেই একটা ক্যু করিয়েছিল। উদ্দেশ্য,তাকে দিয়ে অটোমান সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘোষণা করানো। কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা,তখন থেকে ‘বিশেষ সেকুলারিজমে’ তুরস্ককে এক আধুনিক রাষ্ট্রের আদলের ক্ষমতা বলে ঘোষণা দেয়ানো হয়। এটা ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম ধারণা, সেটা নয়। এটা একেবারে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
আরেক দিক থেকে,এটা চেঙ্গিস খানের দোস্ত ইউরোপীয়দের অক্ষম খ্রিষ্টীয় ক্রুসেডারের স্বপ্ন পূরণ। সেই থেকে ‘ইউরোপের ইচ্ছা’ কথাটা ট্রান্সেলেট করলে ওর একনাম হবে ‘তুরস্কের সেকুলারিজম’। এই সেকুলারিজম শব্দ তুরস্কের জনগণের মুখে সেটে দেয়া হয়। এরপর থেকে “সেকুলার নামের আড়ালে” ইউরোপের শাসন -এই শাসন সবসময় গণ-ম্যান্ডেটের বদলে ক্যুর ওপর ভর করে চলেছে। আজ আবার এরদোগান ও তুরস্কের জনগণ সেই একই পথ- ক্যুর মুখোমুখি।

না, এখানে ইতিহাস বলতে বসিনি। এতক্ষণ পুরানো এসব কথা তুলে আনার কারণ ভিন্ন। জার্মানির স্থানীয় ভাষার এক পত্রিকায় (বাংলায় বললে যার নাম ফ্রাঙ্কফুর্টের সাময়িক পত্রিকা) তুরস্কের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। এর লেখক জনাথন লরেন্স। তিনি ‘টেররিজমের ওপর ইসলামের প্রভাব আছে’ শিরোনামে এক কলামের প্রতিক্রিয়ায় পালটা বিতর্ক তুলেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন,একালে ইউরোপের ইসলাম নিয়ে যে প্যাথলজি বা রোগগ্রস্ততায় পেরেশানি – এটা আসলে ইউরোপের শতাব্দী পুরনো এক আত্মঘাতী কাণ্ডের কাফফারা- যেন এক ভূমিকম্পের পরবর্তী ঝাঁকুনি-ঝটকা। এটাকে এক ‘সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিতে নেয়া এক পলিসিও বলা যায়’।

মজার ব্যাপার হল,স্থানীয় ভাষায় লেখা বলে এটা আমরা পাঠকদের নজরে আসার কথা নয়, পড়েও নাই। কিন্তু সেই আর্টিকেলটাকে আমাদের নজরে এনেছে লন্ডনের সাপ্তাহিক ‘ইকোনমিস্ট’, ২৬ জুলাই সংখ্যায়। ইকোনমিস্ট জনাথনের বক্তব্যকে ‘টনক নড়ার মত করে’ খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। ইকোনমিস্ট লিখছে, “১৯১৬ সালের বসন্তকাল (প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন, তবে শেষ হওয়ার দুই বছর আগে) থেকে ব্রিটিশ সরকার অটোমান সুলতানের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও বিশেষ করে স্পিরিচুয়াল কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে একটি আরব বিদ্রোহ ঘটানোর জন্য উসকানি দিয়েছে। এ থেকেই শেষে ব্রিটিশদের নেতৃত্বে জেরুসালেম দখল ঘটেছিল এবং লেভান্ট অথবা সৌদি আরবে ইসলামের পবিত্রতম স্থানগুলোর ওপর অটোমানের যে দেখভাল নিয়ন্ত্রণ ছিল,তা ভেঙে দিয়েছিল। এরাই আরবদের ওপর অটোমানের শাসনের বিকল্প হিসেবে শুরুতে হাশেমি রাজতন্ত্রকে প্রশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে খাড়া করেছিল, যা এখনো জর্ডান শাসন করে যাচ্ছে। অবশ্য এর শেষ সুবিধাভোগী হচ্ছে সৌদ রাজপরিবার,যারা ১৯২৪ সালে মক্কা ও মদিনা দখল করেছিলেন”।

[এখানে ফুটনোটের মত করে বলে রাখি, লেভান্ট মানে হল – প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে পরাজিত হওয়া অটোমান সাম্রাজ্য ব্রিটিশ ও ফরাসিরা আগে থেকে করা গোপন চুক্তির শর্তে নিজেদের মধ্যে ভাগ করাতে এতে ফরাসিদের ভাগে পড়েছিল ভুমধ্যসাগরের পুর্ব উপকুলীয় অঞ্চল এলাকা। এই অঞ্চলকে লেভান্ট বলা হত। লেভান্ট শব্দের আক্ষরিক অর্থ হল, যেখানে সুর্য সবার আগে উদয় হয়। এছাড়া আইএস বা আজকের ইসলামি স্টেট – এর আগের নেয়া সাংগঠনিক নাম হল ইসলামি স্টেট অব ইরাক এন্ড লেভান্ট, সংক্ষেপে আইএসআইএল। অর্থাৎ বৃটিশ-ফরাসির ভাগ করে নিবার আগের একক অটোমান সাম্রাজ্য – তার ইরাক ও লেভান্ট অঞ্চল পুনরুদ্ধার প্রকল্প ]

লেখক জনাথন লরেন্স বোস্টন কলেজের একজন প্রফেসর। জনাথন আসলে বলতে চাইছেন,সাম্রাজ্য চালানোর দিক থেকে সুলতান ইউরোপের সবার চেয়ে বেশি অভিজ্ঞ এবং সুলতানের ৭০০ বছরের (ইউরোপের চেয়ে আড়াইশ বছর বেশি) পুরনো তুরস্ক অটোমান সাম্রাজ্য সৌদি রাজতন্ত্রের চেয়ে মুসলমানদের নেতা ও শাসক হিসেবে অনেক পরিপক্ব অগ্রসর ও যোগ্য ছিল। অথচ সুলতানের সেই তুরস্ক সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দুনিয়ায় ইসলামের কেন্দ্র হিসেবে তুরস্কের ভুমিকার বদলে ব্রিটিশরা সৌদি রাজপরিবারকে খাড়া করেছিল। অথচ আগের তুরস্ক সাম্রাজ্য ছিল ইসলামের প্রায় সব ধারার মিলনস্থল; সুলতান ইসলামের কোনো সুনির্দিষ্ট ফেকড়াকে প্রশ্রয় দিতেন, সমর্থন করতেন তা বলা যায় না। ফলে সুলতানের তুরস্কের হাতে ইসলাম একটা ধারাবাহিক ও স্বাভাবিক ও ইনক্লুসিভ বিকাশের পথ চলার যে সম্ভাবনা ছিল সৌদি আরবের হাতে গিয়ে,পরে সে গতি রুদ্ধ হয়ে যায়। এটা ইউরোপের পক্ষে যায় নাই। শুধু তাই নয়, সুলতানের পতনের পর সেকুলারিজমের নামে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষের মোহর তুরস্কের জনগণের কপালে সেঁটে দেয়া হয়। এক দমবন্ধ অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হল। এতে ক্রুসেডে হারার জিঘাংসা হয়ত মিটেছে কিন্তু তাতে পরের ঘটনাবলি ইউরোপের পক্ষে বা স্বার্থে গিয়েছে এমন দুরদৃষ্টির সিদ্ধান্ত এটা ছিল না। তুরস্ককে যুদ্ধে হারানো এক জিনিষ আর পরাজয়ের পর ধর্মীয় প্রতিশোধের নামে যা কিছু করা হয়েছে তাতে মনে জিঘাংসার শান্তি এনেছে হয়ত সেকুলারিজমের নামে এরপর থেকে ইউরোপের ইসলামবিদ্বেষ আজ স্পষ্ট হয়ে গেছে, পুরা পরিস্থিতি আজ ইউরোপের বিরুদ্ধে খাড়া হয়ে গেছে। এটাকেই জনাথন লরেন্স এক শ’ বছর আগের পুরনো ভুল,আত্মঘাতী কাণ্ডের কুকর্ম মনে করছেন।

সবশেষে জনাথন এক মারাত্মক মন্তব্য করেছেন। জনাথনের বরাতে সে কথা ইকোনমিস্ট লিখেছে এভাবে, “মিস্টার লরেন্স যেভাবে ব্যাপারটাকে দেখেছেন, আসলে সবচেয়ে প্রাচীন খলিফাকে উৎখাত করে একটা শূন্যতা সৃষ্টি করা হয়েছিল। এরপর শতকজুড়ে সে শূন্যতা পূরণ করা হয় আরো কালো বিকল্প দিয়ে এবং তাতে অন্তর্ভুক্ত আছে সর্বশেষ নিজেকে ইসলামি স্টেটের নতুন খলিফা দাবিকারী আবু বকর আল-বাগদাদি পর্যন্ত।’

এই ভুলের মাশুল এখন পশ্চিমকে গুনতে হচ্ছে। তবে হয়ত এটা কিছু ভালো দিক যে,কোথাও অন্তত এই ভুলের উপলব্ধি দেখা দিতে শুরু করেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সন হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে ৩০ জুলাই (প্রিন্টে ৩১ জুলাই ২০১৬) ছাপা হয়েছিল। এবার তা আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ওয়ার্ডপ্রেস ভার্সন হিসাবে আবার এখানে ছাপা হল। ]

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে ইসলামবিদ্বেষ

‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনে আলী রিয়াজের ইসলামবিদ্বেষ
গৌতম দাস
২৮ জুলাই ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1yl

গুলশান হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর পশ্চিমের “সন্ত্রাসবাদ” প্রসঙ্গে পুরান অকেজো আর ইসলামবিদ্বেষী কথাবার্তাগুলো আবার সচল হতে শুরু করতে দেখা যাচ্ছে। ফরেন অ্যাফেয়ার্স আমেরিকার “সম্ভ্রান্তজনদের” পত্রিকা। আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করে এমন পত্রিকা। সেখানে গত ৬ জুলাই এক আর্টিকেল ছাপা হয়েছে। যার শিরোনাম ‘বাংলাদেশ’স হোমগ্রোন প্রবলেম, ঢাকা অ্যান্ড টেররিস্ট থ্রেট’। আর এর যুগ্ম লেখক, আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি। লেখার দুটো বড় সমস্যা। এ ধরনের লেখা আমেরিকান নীতিনির্ধারকদের সুপরামর্শ দেয়ার বদলে মিথ্যা ভিত্তিহীন ধারণা দিয়ে বিভ্রান্তই করবে। এছাড়া কিছু জনস্বার্থবিরোধী বেকুবি কাজ খোদ আমেরিকানরাই অনেক সময় করে থাকে। [ফরেন এফেয়ার্সের মূল আর্টিকেলটা এখানে কপি করে রাখা আছে। আগ্রহিরা দেখতে পারেন। ]
প্রথমত, যে চিন্তা-ফ্রেমের আগাম অনুমানের ওপর দাঁড়িয়ে লেখকদ্বয় কথা বলছেন তা হলো “সেকুলারিজম”। সেটা যেন আমাদের নজর না এড়ায় সে জন্য লেখায় দু’বার  শক্তভাবে সেকুলারিজমকে রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখও করেছেন। লেখকেরা আওয়ামী লীগকে মিষ্টি ধমক দিয়েছেন এই বলে যেন বলছেন, “তোমরা না সবচেয়ে বড় সেকুলার দল। তোমাদের কী এমন করা সাজে?”- এ রকম। অথচ বাস্তবতা হল, আওয়ামি লীগই সবচেয়ে ভাল বুঝে – কী করে, কখন সেকুলারিজম নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে হয়। আবার কেন লেখকদ্বয়ের ‘সেকুলার-বোধের’ ভেতরেই আমাদেরকে সমাধান খুঁজতে হবে এটাকে প্রশ্ন করা যায়। এমন প্রশ্ন কখনো তারা নিজেদের করেছেন কি না তাও জানা যায় না। ঐ বোধের ভিতরে, সেখানেই কোনো সমস্যা আছে কি না আগে সেটা তাদের যাচাই করা উচিত। সেকুলারিজমের অনেক ব্যাখ্যা আছে। আমরা তাদেরটার কথাই বলছি। এমনিতেই ভারতীয় উপমহাদেশে যে সেকুলারিজম ধারণা দেখতে পাওয়া যায় সেটা আসলে খাঁটি ইসলামবিদ্বেষ।
ইসলামের বিরুদ্ধের তাদের ঘৃণা-বিদ্বেষকে আড়াল করতেই সেকুলার শব্দটা ব্যবহার করা হয়। কেউ যদি মনে ঘৃণা পুষে রাখে আর দাবি করতে থাকে যে তার বুঝের সেকুলারিজমের ভেতরই সমাধান হতে হবে- সে ক্ষেত্রে এখান থেকে আর কী বের হতে পারে তা বলাই বাহুল্য। ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা ঘটনাগুলোর জন্য সরকার আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করছে না, বিএনপি-জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে- এমন এক গিভেন বা আগাম অনুমিত কাঠামোর ওপর লেখাটা শুরু হয়েছে। অর্থাৎ এটা স্টার্টিং পয়েন্ট। উল্টো করে বললে লেখাটার ভাষ্যটা এমন নয় যেমন সরকারি ভাষ্যে বলা হয় যে, আইএস বা ইসলামি চরমপন্থীরা এগুলো করছে বটে তবে বিএনপি-জামায়াতই আইএস বা আলকায়েদা। অথবা ইসলামি চরমপন্থীরা আসলে ছদ্মবেশী বিএনপি-জামায়াত অথবা সহযোগী – তা-ও নয়। লেখায় একেবারে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে, ‘হাসিনা বরং প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং এর এক রাজনৈতিক সহযোগী দল জামায়াতের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ (Instead, Hasina has passed the blame onto the principal opposition party, the Bangladesh Nationalist Party (BNP) and one of its allies, the Islamist Jamaat-i-Islami.)। এই পরিষ্কার চিরকুট সার্টিফিকেট বাক্যটা ইন্টারেস্টিং। অর্থাৎ সরকারের বয়ানের কিছুই লেখকেরা শেয়ার করছে না, মানছেন না। আর বলতে চাচ্ছেন সন্ত্রাসী ঘটনাগুলোর জন্য বিএনপি-জামায়াতকে দোষারোপ বা দায়ী করা ঠিক নয়। এগুলো


Islamophobia বা ইসলাবিদ্বেষ  বলতে ঠিক কী বুঝিয়েছিঃ
কারও বক্তব্য ইসলাম-ফোবিক বা ইসলাম-বিদ্বেষী  বলা হয়। এখানে ইংরাজী শব্দ ‘ফোবিয়া’ বা বিদ্বেষী হওয়া ব্যাপারটা ভেঙ্গে বলা দরকার। আপনি কুকুর পছন্দ করেন না বলে কুকুর পালেন না – এটা হতেই পারে। অর্থাৎ আপনি কুকুর নিয়ে মাতেন না। ফলে এটা কোন ফোবিয়া সমস্যা না। তবে ‘কুকুর ফোবিয়া’ যাকে আমরা জলাতঙ্ক বলি সেটা আলাদা জিনিষ। এটা ঘৃণা বা বিদ্বেষের স্টেজ। এটা কিন্তু এক ধরণের রোগ, অসুস্থতা। ইসলাম আপনার চায়ের কাপ না – এটা হতে পারে। কোন সমস্যাই নয় সেটা । কিন্তু ইসলাম বিদ্বেষী হলে তা বিপদের কথা। এটা আর একটা ধাপ পেরোনো স্টেজ। এর ধরণের রেসিজম।


জেনুইন এবং এর আলাদা কর্তা আছে। তাহলে বাকি থাকল সরকারের আইএস বা আলকায়েদার উপস্থিতি স্বীকার করছে না কেন তা নিয়ে আলী রীয়াজের অভিযোগ। তবে অবশ্যই বলা যায়, সরকার এটা কেন করছে না তা অন্তত আলি রিয়াজের জানা থাকার কথা। কথাটা বলছি এ জন্য যে, এক কথায় বলা যায়, সরকারের স্বীকার না করার জন্য আমেরিকার পুরানো কিছু কৃতকর্ম দায়ী। বুশের আমলের বিশেষ করে বিগত ২০০৪-০৬ সালের কথা মনে করিয়ে দেয়া যায়। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের ওপর মুসলমান। শুধু এই ফিগারটাই তখন থেকে হয়ে গিয়েছিল দোষের। কারণ বুশের ওয়ার অন টেরর – এর লাইনের বোঝাবুঝি অনুসারে,  মুসলমান=টেররিস্ট। এখানে মুসলমান বলতে লিবারেলসহ যে কোন মুসলমান বুঝতে হবে, কারণ সেসময় তাই বুঝানো হয়েছিল ও হত। অতএব ৯০ ভাগ মুসলমানের বাংলাদেশ মানেই এক ভয়ঙ্কর যায়গা। মুসলমানের বাংলাদেশ নিশ্চয় সব টেররিস্টে ভর্তি, গিজগিজ করছে। যদিও এই দৃষ্টিভঙ্গি ভারতের কমবেশি সবসময় ছিল। আর ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বুশের আমলে এর সাথে যোগ দেয় বুশ প্রশাসন। আসলে এটাই হল গোড়ার ইসলামবিদ্বেষ। আর তাদের নিজেদেরই ধারণ করা ইসলামবিদ্বেষ সমস্যার সমাধান হল টোটকা বিশেষ সেকুলারিজম। টোটকা বিশেষ বলা হল এজন্য যে, যা নিজ বিশেষ ‘হিন্দু’ ধারণার ‘অপর’ – সেই অপর মুসলমানকে বুঝার বদলে একটি বিদ্বেষ, একটা বিদ্বেষের এপ্রোচ থেকে এর জন্ম। আর সবচেয়ে বড় কথা, ইউরোপের ইতিহাসের যে সেকুলারিজম সম্পর্কে আমরা জানি এটা সেই সেকুলারিজম নয়। যেমন মডার্ন স্টেট মানেই একধরনের সেকুলার বৈশিষ্ট্যের স্টেট এই ধারণা থেকে এর জন্ম নয়।
যা-ই হোক, সেকালে বাংলাদেশের মত যে কোনো মুসলমান জন-আধিক্যের রাষ্ট্র-সমাজ মাত্রই – যারাই বুশের মুখোমুখি হয়েছিল তারা দেখেছিল – বুশের অজানা ভয় ও ইসলামবিদ্বেষমূলক ভাবনা থেকে উৎসারিত হয় ওয়ার অন টেরর। ফলে সে সময় বুশ প্রশাসন বারবার বিএনপি সরকারকে চাপ দিয়েছিল দেশে আলকায়েদা বা সন্ত্রাসী উপস্থিতি আছে স্বীকার করে নিতে। মুল কথা ছিল দেশে “সন্ত্রাসী” থাক আর না থাক, বুশের প্রেসক্রিপশন বা করণীয় তালিকা অনুসরণ করে যে কোন মুসলমান প্রধান রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজাতে হবে।  গ্লোবাল ইসলামবিদ্বেষের পোয়াবারো অবাধ চর্চা শুরু হয় তখন থেকে।
কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা তা হল, আলকায়েদার উপস্থিতি আছে কি না আছে সেটা নয়, বরং আছে এই অজুহাত তুলে হস্তক্ষেপ করে শেষে বিষয়টাকে ভিন্নদিকে নিয়ে আমেরিকা দুই বছরের তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম করেছিল আর ‘মাইনাস টু’ করার চেষ্টা নিয়েছিল। এটা সত্যি যে, ওই পরিস্থিতিতে হাসিনা নিজের নগদ লাভের বিবেচনায় ঐ সময় আমেরিকান সেই অবস্থানের পক্ষে প্রকাশ্যে সায় দিয়েছিল এবং আমেরিকানদের তালে তালে একই প্রচারে গিয়েছিল। অর্থাৎ সেকালের আলকায়েদা (বা একালের আইএস) আছে স্বীকার করিয়ে নেয়া ব্যাপারটা ঠিক স্বীকার অস্বীকারের ইস্যুতে বা এর মধ্যে আটকে থাকেনি – বরং হয়ে দাঁড়িয়েছিল ক্ষমতা দখল করে কোনো দীর্ঘস্থায়ী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কায়েম আর মাইনাস টুর ইস্যু হাজির করা। হাসিনার কাছে একালে তাই ব্যাপারটা একই আলোকে দেখবার, এমনই আমেরিকার ইচ্ছা কী না, আগের মতই করবে এমন ভাবা – এ্টাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। তাই হাসিনার সরকারের আমলে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করতে তাঁর এত অনীহা। কারণ করলে কী হয় সেটা সে আগে দেখে ফেলেছে। সে ফল খেয়েই সে আজ ক্ষমতায়। অতএব একালে আমেরিকানদের পক্ষে আগের আলকায়েদার জায়গায় এবার আইএস স্বীকার করাতে গেলে প্রত্যক্ষ সাক্ষী হাসিনার অনীহা ও বাধার মুখোমুখি তো তাদের হতেই হবে।
আবার আরো কতগুলো নতুন দিক আছে এবারের পরিস্থিতিতে। হাসিনার পক্ষে আইএসের উপস্থিতি স্বীকার করার অর্থ কী হবে? কী দাঁড়াবে? এর সোজা অর্থ হবে ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতা রোধে সংশ্লিষ্ট বিদেশী-দেশী রাষ্ট্র প্রতিনিধির সমন্বয়ে প্রতিরোধে কমিটি না হলেও মনিটরিং ধরণের কিছু কমিটি তৈরি হয়ে যাবে বা করতে হবে। অন্ততপক্ষে দেশী-বিদেশীদের নিয়ে একটি মনিটরিং ও সমন্বয় কমিটি ধরনের কিছু একটা হবে। এর মানে হবে এখন যেমন কাউকে সন্ত্রাসী বলে ধরে তাকে ক্রসফায়ার করে দেওয়া অথবা কী করা হবে বা হল এর ব্যাখ্যাদাতা একক কর্তা সরকার। এখানে সে যা মনে চায় ব্যাখ্যা দিতে পারে, আর সেটা নিজের একক এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণে থাকে ও আছে। কিন্তু মনিটরিং কমিটি একটি হয়ে গেলে সেক্ষেত্রে বিষয়টা তখন মনিটরিং ও সমন্বয় ধরণের কমিটির সাথে শেয়ার করতে হবে। এবং অন্তত সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ওই কমিটিতে ‘সন্ত্রাস’ দমন করেছি বলে সরকারের দাবি করা যে কোন কাজ- ততপরতার ব্যাখ্যা ঐ কমিটির কাছে হাজির করতে হবে। যেটা এখনকার সিস্টেম অনুসারে, জনগণের কাছে দেয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা সরকার বোধ করে না, নাই। যেমন ক্রসফায়ার করলে ওই ধরনের কমিটির কাছে সৎ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাখ্যা হাজির করতে হবে। ফলে পরিণতিতে এক কথায় বললে এখন যেভাবে সরকারের বিরোধী বিএনপি-জামাত ধরণেরসহ সব রাজনৈতিক দলের যে-কাউকে যা খুশি করার বা ভয় দেখিয়ে দাবড়ে রাখার সুযোগ আছে, তা পুরোটা না হারালেও অনেকখানি  সীমিত হয়ে যাবে। এই অর্গল খুলে দিলে বা ঢিলা হয়ে গেলে আবার রাস্তার আন্দোলন চাঙ্গা হয়ে যেতে পারে। এ সবকিছু মিলিয়েই সরকার আইএসের উপস্থিত আছে এটা স্বীকার করার বিরোধিতা করে যাচ্ছে। উলটা দেশের মানুষ অথবা সরকার নিজে বিশ্বাস করুক আর নাই করুক, তাকে  বলে যেতে হচ্ছে যে “বিএনপি-জামাত সব জঙ্গী কার্যক্রম করছে”।
বিএনপি আমলে যে পথে আমেরিকা একবার আকাম করেছে সেটা এখন উদোম হয়ে গেছে। তাই সেই একই পথে হাসিনা সরকারকে এবার পরিচালিত করা বা ঠেলে দেওয়া আমেরিকার জন্য কঠিন হচ্ছে। তবে সবচেয়ে তামাশার দিক হলো আলি রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলি এখন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল মানে যুদ্ধাপরাধের বিচার নাকি বিতর্কিত ও ত্রুটিপূর্ণ ছিল। শব্দটা ব্যবহার করেছেন ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’, মানে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। (Meanwhile, a widely criticized International Criminal Tribunal has sentenced as many as nine key Jamaat-i-Islami members to the death penalty. Four have already died.) মানে সমালোচিত হওয়ার বিষয়টাকে আমলে নিচ্ছেন লেখকদ্বয়। অর্থাৎ ঐ ট্রাইবুনালের বিচার প্রক্রিয়ার কোয়ালিটি নিয়ে প্রশ্ন তুলে এখন হাত ধুয়ে ফেলতে চাইছেন। আর এ কথা তুলেছেন, ডেইলিস্টার ও প্রথম আলোর সম্পাদকদের বিরুদ্ধে কী কী আইনি অপব্যবহার ও হয়রানি করা হয়েছে অথবা পলিটিসাইজড জুডিশিয়ারি ব্যবহার করা হয়েছে এর উদাহরণের সাথে। কারা এই “ব্যাপকভাবে সমালোচিতকারী” সমালোচক?  এই সমালোচকদের দলে তো আমরা এই লেখকদ্বয়কে দেখিনি।অথবা  তাঁরা আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টকে এমন কোনো কী পরামর্শ রেখেছিলেন অথবা কোনো প্রকাশ্য আর্টিকেল? আমরা দেখিনি, জানা যায় না। বরং আমরা লক্ষ করেছিলাম ‘জামায়াত নেতাদের ফাঁসি হলে ইসলামি রাজনীতি নাকি বাংলাদেশে নির্মুল হয়ে যাবে’ এরই উচ্ছ্বাস উদ্দীপনা। অতএব এখন সেসব কথা বলে লাভ কী? কারণ এই প্রশ্নবিদ্ধ বা ‘ওয়াইডলি ক্রিটিসাইজড’ বিচারের মধ্য দিয়ে পুরা বিচার বিভাগকেও পলিটিসাইজ করে ফেলার কাজটা হয়ে গিয়েছে। ইন্টারনাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের সর্বশেষ রিপোর্টে (এশিয়া রিপোর্ট নং ২৭৭। ১১ এপ্রিল ২০১৬) বাংলাদেশের সংকট মিটানোর প্রথম কাজ হিসাবে এই পলিটিসাইজ বিচার বিভাগকে ডিপলিটিসাইজ করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। ফলে কথাটা আমার না। কিন্তু এর দায় কার?  আজ আমেরিকা যদি মনে করে থাকে ওই বিচার বিতর্কিত ছিল তবে এর এমন কোনো প্রকাশ আমরা ‘যুদ্ধাপরাধবিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টেফান জে র‌্যাপের তৎপরতায় দেখিনি কেন? সে প্রশ্ন তো লেখকদ্বয় তুলছেন না। ওই বিচারের পদ্ধতিগত দিকে কোনো মেজর ত্রুটির ব্যাপারে তিনি কখনো কথা তুলেছিলেন, আমরা দেখিনি। কেবল ফাঁসির বিরুদ্ধে তারা, মানে ফাঁসি ছাড়া অন্য যে কোন শাস্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সেটা তো বিচারের ত্রুটির ইস্যু নয়। তাহলে আজ আমেরিকা যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘ব্যাপকভাবে সমালোচিত’ বিচার মনে করলে এর দায় থেকে আমেরিকাও বাইরে নয়। অন্তত আলী রীয়াজও এসব দায়ের কতটুকু বাইরে সে বিচারও তাকে নিজেই করতে হবে।

এখনকার আইএসের উপস্থিতির স্বীকারোক্তি করা না করা নিয়ে আলী রীয়াজ এত কথা তুলছেন। এটা সবাই জানে আইএস সশস্ত্র ও রক্তাক্ত ‘সন্ত্রাসী’ তৎপরতাই তার প্রধান কাজ। আমরা যদি প্রকাশ্য গণতৎপরতা আর গোপন সশস্ত্রতা এদুইয়ের মাঝে মোটা দাগে একটা ফারাক বুঝতে পারি তাহলে ২০১৩ সালেই হেফাজতের প্রকাশ্য গণতৎপরতা দেখে অস্থির হওয়ার কী ছিল। ওটা নিশ্চয় আরযাই হোক  অন্তত ‘সন্ত্রাসবাদ’ ছিল না। ওটা ছিল একটা গণক্ষোভ। প্রধান কথা, ওটা মাস অ্যাকটিভিটি, কোনো ‘সন্ত্রাসবাদী’ ঘটনা নয়। যদি ওটাকে সন্ত্রাসবাদ বলেন, তাহলে আইএসকে কিছু বলার থাকে না। অথচ হেফাজতের তৎপরতাকে ভয়ঙ্করই মনে করা হয়েছিল। ভেবেছিলেন তারা ‘সন্ত্রাসবাদ’ দেখছেন। এই গণক্ষোভকে মিস হ্যান্ডলিং করার দোষেই কী আসল “সন্ত্রাসবাদ” আইএস এখন হাজির হয়নি? মিস ান্ডিলিংয়ের একটা প্রধান কারণ কী ইসলামবিদ্বেষ নয়? তাই মিস হ্যান্ডলিংয়ের কারণেই সরকার ইসলামবিদ্বেষী পরিচয় য়ার স্পষ্ট হয়েছে, সরকারের গণবিচ্ছিন্নতা বেড়ে চরম হয়েছে।
আর কে না জানে যেকোনো সরকারের ‘ইসলামবিদ্বেষী’ পরিচয় আর ‘গণবিচ্ছিন্নতা’ এগুলোই আইএস ধরনের সংগঠনকে ডেকে আনে। তাদের হাজির হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ফেবারেবল, লোভনীয় পরিস্থিতি মনে করে তাঁরা। এগুলোই পাঁচজন আঠারো বছরের ছেলে ১০ ঘণ্টা ধরে সরকার  কাপিয়ে দিয়ে গেল এমন হিরোইজম দেখতে সাধারণ মানুষকে একবার উদ্বুদ্ধ করে ফেলতে পারলেই
সব শেষ।

আলী রীয়াজের সেকুলার বুঝের ব্লাসফেমি ভুত দেখা
আলি রিয়াজ বিগত ২০১৩ সাল থেকে হেফাজতের আন্দোলনে “ব্লাসফেমি আইনের নাকি দাবি” করা হয়েছে একথা মুখস্থের মত বলে যাচ্ছেন, অথচ এটা আর একটা মিথ্যা ও ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য। আর সবচেয়ে বড় কথা ব্লাসফেমি আইনের দাবি কখনোই হেফাজত করেনি। অথচ এটা যাচাই না করেই কেউ আগাম হেফাজতকে খারাপ দেখতে চাইলে যা হয় তাই হয়েছে। মজার ব্যাপার হল, সেই ব্রিটিশ আমল ১৮৬০ সাল থেকেই পেনাল কোডে এই আইনটা আছে। পেনাল কোডের ধারা ২৯৫ থেকে ২৯৮ সম্পর্কে তিনি জানেন, পাতা উল্টিয়েছেন মনে হয় না। অতএব হেফাজত দাবি করে থাকুক কী না থাকুক ব্লাসফেমি বা ধর্মের অবমাননা সংক্রান্ত আইন বৃটিশ আমলেই পেনাল কোডে রাখা আছে। আর তাই ব্লাসফেমি আইন করার জন্য বৃটিশরা নিশ্চয় বড় মৌলবাদী গোষ্ঠী? না কী?

দ্বিতীয় পয়েন্ট হল, ব্লাসফেমি ইংরেজি শব্দ। ফলে কওমি আলেমরা এমন ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করবেন কেন? আসলে, তাদের দাবি ছিল তাদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো হয়েছে, তাকে অপমান করা হয়েছে, বেইজ্জতি করা হয়েছে। ফলে এর প্রতিকার চান তারা; আইন ও শাস্তি চান। যেকোনো গণক্ষোভের (বা সিভিল ডিস-অবিডিয়েন্সের) বেলায়  ব্যাপারটা এমনই হয়, এভাবেই গড়ায়। বরং তারা কোনো সশস্ত্র তৎপরতায় নয়, আইনসঙ্গতভাবে মাস তৎপরতায় সমাবেশ ডেকে সরকারের কাছে আইন দাবি করেছিলেন, শাস্তি চেয়েছিলেন। নিজেই কোনো ধর্মীয় আইন বা ফতোয়া জারি করেননি। সে আইন প্রয়োগ করেননি, কাউকে দায়ী করে কোতল করেন নাই। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল – হেফাজত কোন কল্পিত কোনো ধর্মীয় রাষ্ট্রের কাঠামোতে নয়, একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতেই একটি আইন চাইছিলেন। অতএব দুইটা খুবই গুরুত্বপুর্ণ পয়েন্ট হল – এক.  হেফাজত আইএস এর মত কোন গোপন ও সশস্ত্র কায়দার সংগঠন নয়, ফলে অমন কোন সংগঠন হয়ে  সে  ঢাকায় হাজির হয় নাই, আসে নাই। গণবিক্ষোভ জানাতে পাবলিক সমাবেশ করেছে। সবাইকে জানিয়ে, সবাইকে নিয়ে এবং প্রকাশ্যে। অথচ আমরা তাকে ট্রিট করেছি ওকে ‘সন্ত্রাসী’ দাবি করে। আমাদের সরকার ও জনগণের একাংশের গভীর ইসলামবিদ্বেষ থেকে তাঁরা প্ররোচিত হয়েছে। দ্বিতীয় পয়েন্টঃ হেফাজত দাবি করেছে একেবারে মডার্ন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোতে একটা আইন করে সমাধান। কিন্তু সেকুলারিজমের নামে আমাদের ইসলামি বিদ্বেষী মন সেটা দেখতেই পায় নাই। কারণ কী দেখে কী চিনতে হয় আমরা জানি না, আমরা এমনই দিগগজ! কিন্তু আমাদের মন ভর্তি হয়ে আছে ঘৃণা আর বিদ্বেষে। তাই জবরদস্তিতে দাবী করছি হেফাজত না কী ব্লাসফেমি আইন চাইছে!    এখন নিশ্চয় আমাদের সেকুলাররা পরিস্কার ভাবে মানবেন যে হেফাজতকে মিসহান্ডলিং করা হয়েছে। ইসলাম বিদ্বেষের কারণে তারা তা করেছেন। সেখান থেকে আস্তে আস্তে সরকার গণবিচ্ছিন্নতার শুরু। এর তলানীতে ঠেকা অবস্থায় আজ এভাবেই কী বাংলাদেশকে  আইএস ধরণের রাজনীতি বিকাশের জন্য সবচেয়ে উর্বর ক্ষেত্র বানায়ে হাজির করা হয় নাই? যেটা আসলে আইএস ততপরতাকে দাওয়াত দেয়ার সামিল। অথচ আমরা কিছুই লক্ষই করিনি, বুঝতেই পারিনি। কারণ, কী লক্ষ্য করতে হবে আমরা তাই জানি না। আমরা খালি নাকি সেকুলারিজম বুঝি।

আসলেই কী বুঝি? বিগত ২০১৩ সাল থেকে দেখছি আমাদের যাদের মন ইসলামিবিদ্বেষী তারা হেফাজত ঘটনার মিডিয়া রিপোর্ট করার সময় হুবহু কওমি আলেমদের দাবিটা উল্লেখ না করে নিজের বিদ্বেষের জ্ঞান জাহির করতে আলেমদের ভাবনাকে খ্রিষ্টীয় অনুবাদ করে লিখে দিলেন- “আলেমরা ব্লাসফেমি আইন চেয়েছে”। আলী রীয়াজ যাদের একজন। ওই রিপোর্টাররা কী জানেন ব্লাসফেমি খ্রিষ্টীয় ধর্মীয় অবমাননাবিষয়ক শব্দ। এই শব্দ ইসলামের আলেমদের নয়, হতেই পারে না। অতএব এটা তাদের শব্দই নয়। এটা অবুঝ ও বেকুবদের শব্দ। আমরা সেটা আলেমদের মুখে জবরদস্তি সেঁটে দিতে দেখেছি। বিশেষ করে যারা ইংরেজি মিডিয়া রিপোর্ট করলেন তাদের কেউ কেউ গোলামি মনের সমস্যায় ভাবলেন নিশ্চয় ব্লাসফেমি শব্দ ব্যবহার করলে ইংরেজিতে ব্যাপারটা সঠিকভাবে ইংরেজিভাষী বা বিদেশীদের বুঝানো যাবে। আর কেউ কেউ ভাবলেন এটাকে সরকারের পক্ষে ক্রেডিট আনার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। দেশে বিদেশে সবাইকে জানালেন যে, ব্লাসফেমি আইনের জন্য নাকি বাংলাদেশে ইসলামি ‘পশ্চাৎপদ’ হুজুরদের সমাবেশ হয়েছিল। আর এতে সরকারকে হিরো হিসেবেও তুলে ধরা গেল যে ‘ইসলামি সন্ত্রাসবিরোধী’ কাজ হিসেবে সরকার কওমি আলেমদের ঠেঙিয়েছে। অথচ কোথায় আলেমদের প্রাণের নবীর বিরুদ্ধে খারাপ কথার শাস্তি দেয়ার আইনের দাবি আর কোথায় একে ব্লাসফেমি আইন বলে হাজির করে তুচ্ছ পশ্চাৎপদ অচল পুরানা মাল বলে তাদের হাজির করা হল। এছাড়াও আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যেই ব্যাপারটাকে ‘ডিফেমেশন অব রিলিজিয়নের” বিষয় হিসেবে দেখা ও সে অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রতিকারের প্রতিশ্রুতির বিষয় হিসেবে দেখে এর সমাধান দেয়া সম্ভব ছিল। আমার ধারণা ছিল না অন্তত আলী রীয়াজ ২০১৩ সালে হেফাজতের আন্দোলনের সময় থেকে আলেমররা ‘ব্লাসফেমি আইনের’ দাবি করেছে বলার ভুলটা এত দিনেও তিনি লালন করছেন। এই ভুলটা কাটানোর জন্য সেসময় থেকেই নানা আর্টিকেল বাজারে এসেছে।  তাহলে এমন ভুল ধারণা লালন যারা করেন তাদের কী ‘অবস্কিউরানিস্ট’ বা স্থবির অচল, যারা নতুন গ্রহণ করে না- বলা চলে! আলী রীয়াজ এই ‘অবস্কিউরানিস্ট’ শব্দটাই ব্যবহার করেছেন হেফাজতের আলেমদের বিরুদ্ধে। তিনি লিখেছেন, ‘অবস্কিউরানিস্ট’ রিলিজিয়াস গ্রুপ দ্যাট ডিম্যান্ডেড দা ইন্ট্রোডাকশন অফ এন অ্যান্টি-ব্লাসফেমি ল ইন ২০১৩।’ (Hefazat-e-Islam, an obscurantist religious group that demanded the introduction of an anti-blasphemy law in 2013)
সোজা কথায় বললে আলী রীয়াজ ও সুমিত গাঙ্গুলির মতো আমেরিকান বন্ধুদের ও খোদ আমেরিকাকে আগে ঠিক করতে হবে তারা আসলে কী চান। সফল ইসলামবিদ্বেষ চাইলে অথবা আলেমদের অচল মাল বা পশ্চাৎপদ হিসেবে দেখানো, এগুলো খুবই সহজ কাজ। আমরা কেউ কাউকে আমার পছন্দের ধর্ম অথবা নিধর্মের সমাজ নাস্তিকতায় নিয়ে যেতে পারব না। কারো ধর্ম খারাপ প্রমাণ করে কিছুই আগাতে পারব না। এর প্রয়োজনও নেই। বরং আমাদের কমন সুন্দর দিকগুলার গৌরব তুলে ধরে এক রাজনৈতিক কমিউনিটি গড়ে অনেক দূর যেতে পারি। নাইলে আমাদের জন্যই হয়ত অপেক্ষা করছে আইএস অর্থাৎ আলকায়েদার পথ। আমরা যদি ওইটারই যোগ্য হই তবে তাই হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে প্রথম ভার্সান হিসাবে দৈনিক নয়াদিগন্ত অন লাইনে ১৮ জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় (প্রিন্টে ১৯ জুলাই) ছাপা হয়েছিল। এখানে আবার তা নানা সংযোজন ও এডিটের পর ফাইলান ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।]

আমেরিকার চোখে ‘ফরাসি রাজনৈতিক কালচার’ দায়ী

আমেরিকার চোখে ফরাসি রাজনৈতিক কালচার’ দায়ী
গৌতম দাস
২৯ এপ্রিল ২০১৬, শুক্রবার, ১২:০০ রাত

http://wp.me/p1sCvy-14w

এক তামাশার স্টাডি রিপোর্ট ছাপা হয়েছে সম্প্রতি ফরেন এফেয়ার্স পত্রিকায়। দ্বিমাসিক এই পত্রিকা ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ আমেরিকান সমাজে খুবই মান্যগণ্য পত্রিকা মনে করা হয়। সেখানে  এক গবেষণা রিপোর্টের ফলাফল নিয়ে একটা লেখা ছাপা হয়েছে গত ২৪ মার্চ, ২০১৬।  পশ্চিমা সমাজের নেতা বা যারা পশ্চিমা রাষ্ট্র চালান অথবা নীতিনির্ধারক, এমন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের চিন্তার অলিগলি মতিগতি পাঠের জন্য জরুরি হচ্ছে এই ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ জার্নাল, এমনটা মনে করা হয়।

 ফরেন অ্যাফেয়ার্সে চলতি এই লেখার শিরোনাম, ‘দুনিয়াজুড়ে সুন্নি জঙ্গিতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করে এমন ফরাসি সংযোগ-সূত্র’। ইংরেজিতে ‘The French Connection Explaining Sunni Militancy Around the World”। এই লেখার সারকথা হল, অন্য সব কিছুর চেয়ে ‘ফরাসি কালচার’- এর মধ্যে বিচুটি-মার্কা জলুনির এমন আলাদা কিছু আছে যে জন্য অন্য দেশের চেয়ে ‘ফরাসি ভাষাভাষী’ দেশে ‘সুন্নি মিলিট্যান্সি’ বেশি। কথাগুলো সাম্প্রতিককালে ইউরোপের দুই রাজধানী প্যারিস (ফ্রান্স) ও ব্রাসেলসে (বেলজিয়াম) কয়েক মাসের ব্যবধানে পরপর আইএস হামলার কথা স্মরণ করেই বলা হয়েছে। আর এর মধ্য দিয়ে দুনিয়ায় ২০০১ সালের পর থেকে আলকায়েদা ফেনোমেনার আবির্ভাব ঘটা, ৯/১১ টুইন টাওয়ারে হামলা, সেই থেকে আমেরিকান “ওয়ার অন টেরর” নীতি অনুসরণ করা ও তার ভয়াবহ ফলাফলে এলোমেলো হয়ে যাওয়া দুনিয়া ইত্যাদি এই ধারাবাহিকতা সৃষ্টি করার ক্ষেত্রে আমেরিকার যেন কোনই হাত নাই এমন একটা ভাব, সাজেশন হাজির করা হয়েছে। তামশা করে বলা হয়েছে, আমেরিকার এসব “মহান অবদান” নয়, মনোভাব দৃষ্টিভঙ্গী নীতি নয় দুনিয়াজুড়ে আজ যাকে সন্ত্রাসবাদ বলছে, ‘সুন্নি মিলিট্যান্সি’ বলছে এর জন্য ফরাসী ভাষাভাষী রাষ্ট্রগুলো দায়ী। একেবারে গবেষণা করে নাকি তারা এই প্রমাণ পেয়েছে। নায়ক হয়ে ঘটনা ঘটিয়ে এরপর সামলাতে না পেরে এখন হাত ধুয়ে ফেলার জন্য সত্যিই এটা আমেরিকার দেখানো এ’এক চতুর রাস্তা!
বলা বাহুল্য, এটা সুই আর চালুনির কুতর্কের মতো যারা পরস্পর পরস্পরকে পেছনে ফুটা থাকার কারণে খোঁটা দেয়- সে জাতীয়।  আমেরিকা ফরাসি ভাষাভাষীদের পেছনে ফুটা থাকার জন্য অভিযোগ করছে। যাহোক, এই অর্থে এই পত্রিকার রিপোর্ট বেশ তামাশার তা বলতেই হবে।

এখানে আগেই বলে নেয়া হয়েছে একটা ‘এম্পেরিক্যাল স্টাডি’ মানে অভিজ্ঞতালব্ধ ধারণা উপর ভিত্তি করে তারা এসব কথা বলছেন। অর্থাৎ সংখ্যাবাচক প্রাপ্ত তথ্য থেকে খোজাখুজিতে পাওয়া ধারণাকে ব্যাখ্যা করে তারা কথাগুলো বলছে।  গত ২০০১ সাল থেকে  আলকায়েদা ফেনোমেনার দুনিয়ায় হাজির হওয়া পর থেকে এর সর্বশেষ প্রভাবশালী রূপ হলো আইএস  (আইএসআইএল)- এর খলিফা রাষ্ট্র ও তৎপরতা। আলকায়েদার সাথে আইএসের মধ্যে অনেক ফারাক আছে সেগুলোর মধ্যে অন্তত একটা ভিন্নতা হল, পশ্চিমা দেশ বিশেষত ইউরোপ থেকে তরুণদের আইএস এ যোগদানের হিড়িক। আর সেই সাথে ‘কেন তরুণেরা কিসে আকৃষ্ট হয়ে এই যুদ্ধে যাচ্ছে’ এ নিয়ে গবেষণা স্টাডিরও পাল্লা দিয়ে কমতি দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু সেই স্টাডির তথ্য থেকে সব দোষ ফরাসি ভাষাভাষীদের বা যারা ফরাসী ভাষায় কথা বলে তাদের – এ কথা বলে আমেরিকার দায় এড়িয়ে এখন কেটে পড়ার তাল করছে। তবে আর যাই হোক  এ দেখে অন্তত আমাদের মেতে ওঠার কোনো কারণ নেই।

এখানে এই স্টাডির মূল বিষয়টি কী ছিল তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে রিপোর্টটা বলছে, “ইউরোপের কোন দেশ থেকে কতজন বিদেশী যোদ্ধা হিসেবে আইএসে যোগ দিতে গেছে আর সে দেশ কয়টি আইএস হামলা খেয়েছে এই দুই তথ্য থেকে ওই দেশে সুন্নি রেডিক্যাল ও সন্ত্রাসী হয়ে ওঠার মাত্রাকে সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে এমন তত্ত্বটা কী’হতে পারে তা খোঁজ করা। এভাবে, খুঁজতে গিয়ে আমরা যা পেলাম তাতে আমরাই আশ্চর্যান্বিত। বিশেষত যখন আমরা বিদেশী যোদ্ধাদের রেডিক্যাল হয়ে ওঠার প্রসঙ্গে গেলাম। দেখা গেল, বিদেশী যোদ্ধাদের রেডিক্যাল হয়ে ওঠার কারণ একটা দেশের সম্পদ কেমন তা নয়। এমনকি এর নাগরিকেরা কেমন কী মাত্রায় শিক্ষিত অথবা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী তাও নয়। বরং আমরা দেখলাম বিদেশী যোদ্ধাদের রেডিক্যাল হয়ে ওঠা কিসের ওপর নির্ভর করে এ বিষয়টিকে যা সবচেয়ে ভালোভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে তা হল যে, ওই দেশটা ফরাসি ভাষাভাষী কি না”। এখানে ফরাসী ভাষাভাষী বলতে যেমন ওই রাষ্ট্রের ঘোষিত জাতীয় ভাষা (ন্যাশনাল ল্যাংগুয়েজ) আগে অথবা এখন ফরাসি কি না – সেটাকে ভিত্তি হিসাবে ধরা হয়েছে। কিন্তু “অদ্ভুত ব্যাপারটা দেখা গেল, সবচেয়ে বেশি সুন্নি রেডিক্যাল হয়ে উঠেছে এমন পাঁচটা দেশের মধ্যে চারটাই ফ্রাঙ্কোফোন, মানে ফরাসি ভাষাভাষী, যার মধ্যে আবার ইউরোপের প্রধান এমন দুই দেশ হল – ফ্রান্স ও বেলজিয়াম”।
ইংরেজি ভাষাভাষী যুক্তরাজ্য যেমন ফরাসি ভাষাভাষী বেলজিয়ামের চেয়ে অনেক বেশি বিদেশী যোদ্ধার জন্ম দিয়েছে। এবং এটা সৌদি যোদ্ধাদের চেয়েও সংখ্যায় কয়েক হাজার বেশি। কিন্তু এভাবে সংখ্যাগুলোর দিকে তাকালে তা বিভ্রান্তিতে ফেলবে। বরং আমরা যদি কোনো দেশের জন্ম দেয়া বিদেশী যোদ্ধাদের সংখ্যা ওই দেশের মোট মুসলিম জনসংখ্যার শতকরা কত ভাগÑ এ দিক থেকে দেখি তাহলে আসল ছবিটা আমরা পাবো। প্রত্যেক মুসলিম বাসিন্দাপিছু কতজন বিদেশী যোদ্ধা জন্মেছে এই হিসাবের বিচারে বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য বা সৌদি আরবের চেয়েও অনেক বেশি বিদেশী যোদ্ধার জন্ম দিয়েছে।

এখন ফরাসি ভাষাভাষী বলতে এখানে ঠিক কী বুঝব বা কী বোঝানো হয়েছে? ফরেন অ্যাফেয়ার্সের লেখা এর জবাব দিচ্ছে। বলছে, ফরাসি ভাষাভাষী বলতে বোঝানো হচ্ছে, “ফরাসি রাজনৈতিক কালচার”। এরপর ফরাসি রাজনৈতিক কালচার কথাটাকেই আরও ব্যাখ্যা করে দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, “ফরাসি কায়দার সেকুলারিজম ব্রিটিশ কায়দার সেকুলারিজমের চেয়েও বড় আগ্রাসী। যেমন- ইউরোপের মাত্র দু’টি দেশ (ফ্রান্স ও বেলজিয়াম) পাবলিক স্কুলে বোরখা নিষিদ্ধ করেছে। এ ছাড়া ইউরোপের বিচারে এরাই সেই দুই রাষ্ট্র যেখানে গণতন্ত্রের মান বা মাত্রা সবার নীচে”।
এককথায় বললে, ফরেন অ্যাফেয়ার্সের বক্তব্যের মূল পয়েন্টটা হল ফ্রান্সের সেকুলারিজম ব্রিটিশদের সেকুলারিজমের চেয়েও খারাপ। এটা ছাড়া বাকি সব কথাই চর্বিত চর্বণ। আবার খুব কৌশলে আমেরিকার এই জার্নাল ফরাসিদের তুলনা করেছে আর অন্য ইউরোপীয় দেশের সাথে। সচেতনে নিজেদের, মানে আমেরিকার সাথে তুলনা করেনি।

কিন্তু আসল কথা হল,বিষয়টা কোনভাবেই স্রেফ ব্রিটিশ আর ফরাসিদের মধ্যকার ভালো বা খারাপ সেকুলারিজমের তর্ক নয়। এ প্রসঙ্গটা এর আগে আমার এই সাইটে এক লেখায় এনেছিলাম এই লিঙ্কে যার শিরোনাম ছিল, ‘মাল্টিকালচারালিজম বনাম অ্যাসিমিলিয়েশন’ । বলেছিলাম, ‘মাল্টিকালচারালিজম বলতে ব্রিটিশ বুঝটা হল ব্রিটিশ সমাজটাকে সে নানা কমিউনিটির সহযোগে এক বড় কমিউনিটি হিসেবে রাখতে চায়। কলোনি মাস্টারের দেশ ও সমাজে সবাই যে যার ফেলে আসা নৃতাত্ত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগোলিক ইত্যাদি পরিচয় বজায় রেখেই আবার এক বৃহত্তর ব্রিটিশ সমাজে এক ব্রিটিশ পরিচয়ে তবে ব্রিটিশদের নিয়ন্ত্রণে বড় হোক। বিপরীতে ফরাসি পছন্দের অ্যাসিমিলেশন। শুনতে ভালো কিন্তু আসলে এখানে অনেক বেশি বলপ্রয়োগে জবরদস্তির ব্যবহার দেখাক যায়। এভাবে বল ব্যবহার করে সব ধরণের নাগরিক বিশেষ করে “অ-সাদা” সবাইকে বাধ্য করে এক রকম করার প্রচেষ্টা এটা। অর্থাৎ ফরাসি কলোনি মাস্টারের দেশ সমাজে যারা নিজের পুরানা সব কিছু ফেলে এসেছে এমনদের বেলায় তাদের সেসব নৃতাত্ত্বিক জাত, ধর্মীয়, ভৌগোলিক ইত্যাদি পরিচয়ের স্বীকৃতি নেই। সব ভুলে যেতে হবে, বাদ দিতে হবে। এ জন্য বাধ্য করা হবে। কিন্তু এই বাধ্যবাধকতার দিকটা আড়াল করে ‘সুন্দর’ ইউনিফর্মভাবে এক রকম করার নামে (ইংরেজি সিমিলার বা এককরণ থেকে অ্যাসিমিলিয়েশন) আসলে জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে, ফরাসি কালচারই একমাত্র চর্চার কালচার হতে, করতে বাধ্য করা হয়েছে।
কিন্তু এরপরও ওই লেখায় এই প্রশ্ন সেখানে সেখানে তুলেছিলাম যে, ফরাসিরা ব্রিটিশদের মতো মাল্টিকালচারালিজমের বদলে অ্যাসিমিলিয়েশনের পথ ধরল কেন? এর ব্যাখ্যায় বলেছিলাম,  ঘটনাচক্রে ফরাসিদের ভাগে যেসব কলোনি পেয়েছিল সেই সব জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগই মুসলমান জনসংখ্যার। কলোনি-পূর্ব থেকেই এরা তাই, বিশেষত আলজেরিয়া থেকে পশ্চিম আফ্রিকা পুরোটাই, মুসলমান। আর এ অঞ্চল থেকেই মাস্টার দেশ ফ্রান্স নিজ দেশের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক সে এনেছিল। েই বাস্তবতার কারণে, এরপর ফ্রান্স মাল্টিকালচারের লাইনে থাকলে আফ্রিকার মুসলমানদের ধর্মসহ কালচারাল বৈশিষ্ট্য জিইয়ে এবং ডমিনেটিং থেকে যেতে দিতে হত। এটাকে তারা রিস্কি কাজ মনে করেছিল। বিশেষত নিজ দেশেযেখানে  সাদা চামড়ার জনসংখ্যা কমতির দিকে, আর কালো এবং মুসলমান আফ্রিকান জনসংখ্যা বাড়তির। তাই নিজ কালচারাল ডমিনেন্সির বজায় অটুট রাখার তাগিদে অ্যাসিমিলিয়েশনের লাইন বা জবরদস্তি ফরাসি কালচার চাপিয়ে রাখাটাই ফরাসিরা উত্তম মনে করেছিল। আর সেটাকেই ফরেন এফেয়ার্স এই রচনায় ব্রিটিশ সেকুলারিজমের থেকে ফরাসিদেরটা ভিন্ন বলে চেনাতে চেয়েছে।

এখানে আর একটা মৌলিক তথ্য মনে করিয়ে দেয়া যেতে পারে। বুশের ‘ওয়ার অন টেরর’-এর নির্বিচার হত্যা ও সন্ত্রাস শুরু হয়েছিল ২০০১ সালে আফগানিস্তানে হামলা দিয়ে এবং এই হামলার পক্ষে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ও সম্মতি পকেটে রেখে এবং সেই সুত্রে একাট্টা সারা ইউরোপকে পাশে নিয়ে। কিন্তু পরে ইরাক হামলার সময় ২০০৩ সালে ঘটনা আর একই রকম থাকেনি। ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের হাতে মানব বিধ্বংসী মারণাস্ত্র (ডব্লিউএমডি) আছে এই মিথ্যা ও অপ্রমাণিত অভিযোগ তুলে এই হামলা চালানো হয়েছিল। কিন্তু সেই জাতিসঙ্ঘের চোখেই এবার বুশ-ব্লেয়ারের জোট ইরাকে দখলদার বাহিনী বলে পরিচিত হয়েছিল। কারণ এই হামলার পক্ষে জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত ও সম্মতি বুশ-ব্লেয়ার জোগাড় করতে পারেনি। বরং বুশ-ব্লেয়ারের বিপক্ষে সোচ্চার থেকে নির্ধারক ভোট দিয়েছিল ফরাসি ও জার্মানি। সেকারণে, পরে  ইরাক হামলায় ফরাসিরা অংশগ্রহণ করেনি। তবে অংশগ্রহণ করেনি সম্ভবত দুটা জিনিস চিন্তা করে। এক, ব্রিটিশদের সাথে ফরাসিদের বহু প্রচলিত পুরনো এক প্রতিযোগিতা হল  কে কত বেশি আমেরিকার সাথে ঘনিষ্ঠ তা হওয়া ও দেখানো। আর এ ক্ষেত্রে ব্রিটিশরা বেশির ভাগ সময়ে জিতেছে। ফলে এটাকে ফ্রান্সের টনি ব্লেয়ারের উল্টো অবস্থান নিয়ে আমেরিকান তোয়াজ পাওয়ার চেষ্টা হিসাবে অনেকে মনে করে। আর দ্বিতীয় কারণ হলো, এভাবে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধে গেলে এই যাওয়ার মানে হবে মধ্যপ্রাচ্যের স্থানীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা আর তা থেকে নিজ দেশের অ-সাদা চামড়া ও মুসলমান জনগোষ্ঠীর সম্ভাব্য রোষের মধ্যে পড়া। এটা ফ্রান্স এড়াতে চেয়েছিল। কিন্তু পরের পাঁচ বছরের মধ্যে ফ্রান্স বুঝে যায় যে, ইরাকের তেলের খনি বা অবকাঠামো প্রজেক্ট আর ফরাসিদের ভাগে কখনও কিছুই আসবে না। তাই অবস্থান বদল করে ২০০৮ সালের পর থেকে আবার ফরাসি সৈন্য ন্যাটো নামের আড়ালে অংশগ্রহণ করেছিল। আর বর্তমান প্রেসিডেন্ট ওঁলাদের আমলে ফ্রান্স আমেরিকান সক্ষমতার ঘাটতি মেটাতে একাই মালিতে ‘ইসলামি জঙ্গি’দের বিরুদ্ধে  যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। সুবিধা করতে না পেরে তা এখন আছে জাতিসঙ্ঘ বাহিনী নামের আড়ালে। যেন ইরাক হামলায় ফ্রান্সর অংশগ্রহণ না করাটা পুষিয়ে দিতে এার সে একাই মালিতে লড়তে গিয়েছিল। গাদ্দাফির পতন ঘটিয়ে এই ইসলামি গ্রুপটাই পরে মালিতে গিয়ে নিজেদের আইএস বলে পরিচিতি দেয়। আর মূল কথা হল, পরবর্তিতে মালিতে ও সিরিয়ায় আইএস বেধরকভাবে ফরাসি বোমা হামলা শিকার হয়েছিল। তাই ঐ আক্রমণের প্রতিক্রিয়াতেই ফরাসিরা প্যারিসে আইএসের হামলার শিকার হয়েছিল। তাহলে সার কথায় এটা সত্য যে, ইউরোপের মাত্র দু’টি দেশ ফ্রান্স ও বেলজিয়াম পাবলিক স্কুলে বোরকা নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু সেটা ফরাসি সেকুলারিজম ব্রিটিশের সেকুলারিজম থেকে বেশি আগ্রাসী, কারণটা এমন নয়। বরং তা অ্যাসিমিলিয়েশনের লাইনের জন্য, বা জবরদস্তি ফরাসি কালচার চাপিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে।

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় গত ১০ এপ্রিল ২০১৬ ছাপা হয়েছিল। সেই লেখা আরও এডিট সংযোজন করে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল।  ]

 

মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত

মোদীর পাকিস্তান সফর আচমকা না পরিকল্পিত
মোদির পাকিস্তান সফরের অর্থ কী
গৌতম দাস 

http://wp.me/p1sCvy-tV
৩১ ডিসেম্বর ২০১৫

 

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী চমক দিতে ভালোবাসেন। বিশেষ করে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। ‘বন্ধু রাষ্ট্র’ ধরনের ফালতু ও অবাস্তব শব্দ ও বাজে ধারণাগুলো বাদ দিয়ে সরিয়ে রাখলে যে কোনো দুইটি রাষ্ট্র মানেই দুইটি আলাদা আলাদা স্বার্থ এবং যে সম্পর্ক আসলে আবার মৌলিকভাবে স্বার্থ-সংঘাতমূলক। কিন্তু তবু এরই ভেতর সাময়িক কোনো কোনো ইস্যুতে এক কমন অবস্থান হাজির করার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তার সুযোগ নিতে হয়, দরকার হয়ে পড়ে। তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক মাত্র এক জটিল বিষয়। হয়তো দেখা যাবে, ৯০ ভাগ বিষয়ে দুই রাষ্ট্রের অবস্থান ফাটাফাটি সংঘাতের, কিন্তু বাকি ১০ ভাগের কমননীতি-অবস্থানের (তবে তা সাময়িক) কারণে কোনো উদ্যোগ নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার অবস্থায় তাকে আনতে হতে পারে, আনা হয়। তো সারকথা হলো, তাই আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্কমাত্রই এক জটিল জিনিস। কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে মোদির এ চমক সৃষ্টি করার ঝোঁক সবসময়; মোদির এই ঝোঁক একদিক থেকে যেন পরোক্ষে তাঁর স্বীকার করে নেয়া যে, কূটনৈতিক সম্পর্ক জিনিসটা জটিল বলেই চমক সৃষ্টি করে মোদি একে সহজ করার কিছু সুবিধা পাওয়ার চেষ্টা করে থাকে। আবার আরেক দিক থেকে এ জটিল জিনিসটিকে সামলাতেই শীর্ষ নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, পারস্পরিক এক গুড ইম্প্রেশন তৈরির চেষ্টা থাকে। যেটাকে আমরা ব্যক্তিগত ইমোশন শেয়ার বা ভাবের সম্পর্ক তৈরি ইত্যাদি বলি, মোদি বলতে চান এগুলো জটিল কূটনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখে। কথা সত্যি, জটিল স্বার্থ-সংঘাতের ইস্যুকে নরম করতে, অন্তত ডায়ালগ শুরু করার দিক থেকে পারস্পরিক বোঝাবুঝি ভালো থাকলে তা একটা ইতিবাচক ভূমিকা অবশ্যই রাখে। অতএব এ কথাটাকেই আমরা ভিন্নভাবে বলি যে, মোদি চমক তৈরি করতে ভালোবাসেন।

মোদি আসলে গিয়েছিলেন পুতিনের রাশিয়া সফরে। সেখান থেকে ফেরার পথে তিনি হঠাৎ পাকিস্তানে থেমেছিলেন। দুই দিনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সফরে গত বুধবার ২৩ ডিসেম্বর তিনি রাশিয়া পৌঁছেছিলেন। কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ, সেই ’৫০-এর দশক থেকেই রাশিয়া বা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতে ভারী অস্ত্র, যুদ্ধ টেকনোলজির সরবরাহকারী। তবে মাঝে ২০০৫ সাল থেকে প্রথম আমেরিকান অস্ত্র; বিশেষত পারমাণবিক টেকনোলজি পাওয়াসহ ভারী অস্ত্র কেনা, একসাথে যৌথ উদ্যোগে নানানভাবে ভারতে এর স্থানীয় উৎপাদন ইত্যাদি অনেক বিষয়ে সম্পর্কের দুয়ার খুলেছে। কিন্তু তা খুললেও এখনো অস্ত্রবিষয়ক সম্পর্ক ও যৌথ উদ্যোগে উৎপাদন ও সরবরাহের বিষয়ে অর্থসহ সব ধরনের অঙ্ক বা ফিগারের দিক থেকে এখনো রাশিয়া সবার চেয়ে আগে এবং একমাত্র।
ফলে গুরুত্বপূর্ণ এবার যৌথভাবে লাইট কার্গো হেলিকপ্টার উৎপাদন, যৌথভাবে ট্যাংক তৈরি, যৌথভাবে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান উৎপাদন, পারমাণবিক ক্ষমতায় চলা অ্যাটাক সাবমেরিন লিজ বা ভাড়া নেয়া এবং শত্রুর ছোড়া মিসাইল আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য রাশিয়ান মিসাইল শিল্ড কেনা ইত্যাদি বিষয়ে চুক্তি শেষ করে দিল্লি ফেরার পথে শুক্রবার কয়েক ঘণ্টার জন্য মোদির আফগানিস্তানের কাবুল যাওয়ার কথা ছিল। আবার আফগানিস্তান কেন? অনেকেই জানেন, আফগানিস্তান সরকারের সাথে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পাশাপাশি ভারতের সাথেও প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক আফগানিস্তানের আছে। এ দিকটা জানতে আগ্রহীরা ছাড়া এর বাইরের লোকেরা খুব কমই জানেন। আফগানিস্তানে আমেরিকান স্বার্থ ও প্রভাবের কারণে এর ফায়দা যেন শুধু পাকিস্তান না তোলে, ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বাড়তি সুবিধা হিসাবে না হাজির হয়ে যায়, ভারতের ভাষায় তা যেন ভারসাম্যহীন না হয়, তা ঠেকাতে এর বাস্তব পদক্ষেপ হিসেবে ভারতের এমন সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করেছে আমেরিকা। আফগানিস্তানের সঙ্গে এসব রাজনৈতিক-বাণিজ্যিক সম্পর্ক সূত্রে মান রাখার জন্য ভারত ৯০ মিলিয়ন ডলার অনুদান হিসেবে খরচ করে আফগানিস্তানের জন্য এক নতুন পার্লামেন্ট ভবন তৈরি করে দিয়েছে। ওই ভবন উদ্বোধন করতেই মোদির সংক্ষিপ্ত কাবুল সফর। এই সফরের খবর নিরাপত্তার কারণে খুব সীমিত বা লো-প্রোফাইল রাখাতে অনেকেই জানতেন না মোদি আসবেন। আর কাবুলে কর্মসূচির শেষে ওই দিনই বিকেলে তার দিল্লি ফিরে যাওয়ার কথা।
কিন্তু চমক ঘটল কাবুল কর্মসূচি সমাপ্তিতে। মোদি এ ধরনের চমকের খবর সবার আগে নিজেই টুইট করে ঘোষণা বা প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। ফেরার পথে তিনি টুইট করলেন যে, ভারতে ফিরে যাওয়ার আগে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথে দেখা করতে লাহোর যাচ্ছেন। শুক্রবার নওয়াজ শরিফের জন্মদিন, তাই তিনি শুভেচ্ছা জানাতে যাচ্ছেন আর একই সাথে শরিফের নাতির বিয়ে, ফলে শরিফের লাহোরের বাসায় তিনি যাবেন।
ব্যাপারটাকে মানুষের শরীরের সাথে তুলনা করা যায় যে, এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন মানুষ তৎক্ষণাৎ সেই কাজ করার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে, যেন সেই ব্যাথা যা তাকে তাড়িত করছে তা রিলিজ বা উপশমের জন্য। ভারত-পাকিস্তান এ দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ককে নিয়ে কেচ্ছা-কাহিনীর শেষ নেই। বেশির ভাগ সময় সেটা ঝগড়া-বিবাদের, চরম ও গরমের। তবুও ভারত-পাকিস্তান এখন এমনই এক পরিস্থিতিতে পড়েছে; কোনো এক ব্যথা তাদের এমন তাড়িত করছে যে, তারা পরস্পরের কাছাকাছি আসতে, পুরনো কিছু বিবাদ প্রসঙ্গে মারমুখী হওয়ার বদলে তা লঘু করতে দিল্লি তৎপর হওয়া খুবই জরুরি মনে করছে। অতএব ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কাবুল সফর থেকে দিল্লি ফেরার পথে আচমকা পাকিস্তানে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। অন্তত তার মুখে বলা উদ্দেশ্য হলো, ২৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের জন্মদিন ছিল। ফলে মোদি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর জন্য পথে শরিফের লাহোরের বাসায় এক ঘণ্টা কাটিয়ে (পাকিস্তানে মোট ব্যয়িত সময় আড়াই ঘণ্টা) দিল্লি ফিরে গেলেন। কিন্তু এমন কী সেখানে ঘটেছে, যা এ দুই শীর্ষ নেতাকে এমন বেচাইন করছে? ভারতের মোদীকে বেচাইন করেছে আইএস। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার এক রিপোর্টের শিরোনাম থেকে ধার করা ভাষায়, “ঘাড়ে নিশ্বাস এবার, আইএস এখানে অপারেশনে নামছে”।

সেটা আজকের প্রসঙ্গ!
এতক্ষণ চমকের দিক থেকে ধারাবর্ণনা করলেও আসলে মোদির পাকিস্তান ইস্যু নিয়ে তাগিদবোধ অনেক আগে থেকেই। সুনির্দিষ্ট করে বললে, আইএসের প্যারিস হামলা বা আক্রমণের পর প্যারিসের জলবায়ু সম্মেলনে শরিফের সাথে দেখা হওয়াকে পরিকল্পিতভাবে মোদি নতুন করে মিলিত হয়ে কথা বলার কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন ও লাগিয়েছিলেন।

আসল টেররিজম এর পানি কানে ঢুকছে
ভারত ও পাকিস্তানের সম্পর্কের মধ্যে পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পরের আপত্তি ও মতবিরোধের শেষ নেই। এবং এর প্রায় প্রতিটি ইস্যু আজন্ম। ফলে পুরানা সেসব দিকে না গিয়ে একালের বিরোধের মূল ইস্যু নিয়ে কথা তুললে বলতে হয়, ভারত মনে করে, ভারতে আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা ইতোমধ্যেই ঘটেছে, অ্যাকশন প্রস্তুতি চলছে ধরনের অবস্থায় আছে। এ বিষয়টা মোদীর কাছে পাকিস্তানের সাথে দ্রুত ডায়লগ শুরু করতে নগদ তাগিদ হিসেবে হাজির হয়। অর্থাৎ ২০০১ সাল আলকায়েদা ফেনোমেনা উত্থানের পর থেকে ভারতে এরা সরাসরি হাজির ও তৎপর না হলেও কাশ্মির-কেন্দ্রিক সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতা রাজনৈতিক তৎপরতাগুলোকেই ভারত আলকায়েদার ‘টেররিজম’ বলে চালিয়ে এসেছে। কিন্তু এখন এই প্রথম ভারতকে আলকায়েদা বা একালের আইএস বিষয়ে মানে প্রকৃত “টেররিজম” মোকাবিলার জন্য তৈরি হতে হচ্ছে। ভার্তের দাবি করা এতদিন যাকে সে ছলনা করে টেরিজম বলে এসেছে তা অন্ততপক্ষে সেটা “গ্লোবাল টেররিজম” ছিল না,অথবা আমেরিকার ভাষায় যা “টেররিজম” তা এটা ছিল না। এবার আইএসের টেররিজম, “গ্লোবাল টেররিজম” – একে মোকাবেলার জন্য মোদী ভারতকে উপযুক্ত করে সাজাতে তৎপর হয়েছেন। সম্ভবত মোদি সরকারের ইচ্ছা ও অনুভব হলো, এত দিন ধরে টেররিজম বলে চালিয়ে দেয়া বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন আর আইএসের ‘টেররিজম’এ দুইয়ের সাথে একসাথে লড়তে গেলে ভারতের সক্ষমতা ও রিসোর্সে টান পড়তে পারে, তাতে উপযুক্তভাবে মোকাবিলার কাজে নাও করা যেতে পারে। এর বদলে প্রথমটার বিষয়ে পাকিস্তানের সাথে বা পাকিস্তানের মাধ্যমে কোনো রফা করতে পারলে অথবা কমপক্ষে একে তুলনামূলক কম ভয়ঙ্কর হিসেবে হাজির রাখতে পারলেও তা ভারত সরকার ও রাষ্ট্রের সুবিধা হয়। হয়ত এটাই মোদির জন্য স্বাভাবিক ও সঠিক অনুমান। কিন্তু গোল বেধেছে তাহলে কাশ্মির ইস্যুকে সুরাহা করতে ভারতকে কোনো একটা ফর্মুলা প্রস্তাব করতেই হবে এমনকি তা কেবল নিজ পছন্দমত কান্নি মারা করে হলেও। সেটা ভারত চায় না বলে মনে করার কারণ আছে। ফলে ভারতের ইচ্ছা কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে আইএসের টেররিজম মোকাবেলার ইস্যুতে পাকিস্তানকে যতটা সম্ভব পাশে পাওয়া চেষ্টা করে যাওয়া। পাকিস্তানের সাথে মোদীর প্রবল তাগিদের উৎস এখানে। এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান পাল্টা বলতে চায়, ডায়লগ সেও অবশ্যই করতে চায় কিন্তু কাশ্মির ইস্যু পাশ কাটিয়ে শুধু টেররিজম নিয়ে ডায়লগ সে চায় না। এটাই ছিল এতদিন ভারত-পাকিস্তানের একালের মতবিরোধের মূল বিষয়। তাহলে সার বিতর্ক হলো, “টেররিজম বিষয়ে আলাপ হবে” না “কাশ্মীর ইস্যুসহ টেররিজম নিয়ে আলাপ হবে”।
এই বিরোধে দীর্ঘ দিন এভাবে নন-ডায়লগ হয়ে পড়ে থাকার পর মোদি এবার পাকিস্তানের সাথে মতবিরোধের স্থবিরতা কাটাতে উদগ্রীব হয়েছেন। এ বিষয়ে, গত ২৫ ডিসেম্বরের নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখছে, মোদি বুঝেছেন, “তিনি যে পাকিস্তানের সাথে ডায়লগে যুক্ত হচ্ছেন, এটা দেখানো তার দরকার, কারণ তিনি আমেরিকা ও সৌদিদের চাপে আছেন”। টাইমস এ কথাগুলো লিখছে এক ভারতীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক অশোক মালিকের বরাতে। মালিক অবশ্য আরেক কথা বলেছেন যে, “পাকিস্তানের আগের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সম্প্রতি বদল করে সেখানে সেনাপ্রধানের পছন্দের লোক আনা হয়েছে। কিন্তু মোদি এটাকে তার জন্য সুবিধা হিসেবে দেখেছেন, কারণ তিনি সরাসরি পাকিস্তান সেনাদের সাথে কাজ করতে চান”। অনেকে খোঁচা দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের প্রকৃত ক্ষমতা সেনাদের হাতে। নওয়াজের ভুল পদক্ষেপের কারণে নিজের আগের সরকারের আমলে তাঁর সেনাদের সাথে সম্পর্কের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না; যেটা জেনারেল মোশাররফের বিমান আকাশে আটকে রাখা আর পাল্টা তাদের ক্যু-এর ক্ষমতা দখল পর্যন্ত গিয়েছিল। তাই এবারো এমন কোনো জটিলতা যেন না সৃষ্টি হয়, সেজন্য নওয়াজের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নেয়ার আগের সময়ের ইনফরমাল ডিল হলো, কেবল সামরিক সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সেনাদের অবস্থান বেশি গুরুত্ব পাবে, বাকি অন্য সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজের। এ বিষয়টাকে অনেকে খোঁচা দেয়ার কাজে ব্যবহার করে। তবে মোদী জানেন, পাকিস্তান থেকে তিনি যা চান তা পেতে গেলে তার জন্য সরাসরি সেনাদের সাথে ডিল করা ভাল, কারণ শেষ বিচারে তারাই তা দিতে পারে।
এসব পটভূমি মাথায় রেখে মোদি প্যারিস জলবায়ু মিটিংয়ে নওয়াজ শরিফের সাথে সমঝোতা করে ডায়লগ ওপেন করেন যে, দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা টেররিজম ইস্যুতে সহযোগিতা নিয়ে ডায়লগ করবে। আর পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে একই সাথে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ চলবে। যদিও এটা মনে করার কোন কারণ নাই যে সব আলাপ প্যারিসের ঐ সাইড-টকে শুরু হয়েছিল। পাকিস্তানে ভারতের রাষ্ট্রদুতের মাধ্যমে পুর্বপ্রস্তুতিমূলক আলাপ অনেক আগে থেকেই চলছিল। নওয়াজের সাথে মুখোমুখি আলাপের মাধ্যমে দুই প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাতে তা একধরণের ফরমাল বা চুড়ান্ত আকার পেয়েছিল। সেই রফা অনুযায়ী ৬ ডিসেম্বর ব্যাংককে দুই দেশের নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যায়ে টেররিজম ইস্যুতে ডায়লগ হয়। আর এর দুই দিন পর ৮ ডিসেম্বর পাকিস্তানে সুষমা স্বরাজের সফরে কাশ্মির ইস্যুতে ডায়লগ হয়।
বলা যায়, মোদি ভারতে আইএস তৎপরতা ছড়ানোর সম্ভাবনা ও তা মোকাবেলাকে মাথায় রেখে, এটাকে সব বিবেচনার মূল কেন্দ্রে রাখার কারণে তিনি পাকিস্তানের সাথে আলোচনা করতে সিরিয়াস হয়েছিলেন। যদিও ভারতে কাশ্মির ইস্যুতে কিন্তু পাকিস্তান-কেন্দ্রিক যেসব সশস্ত্র ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা আছে, এগুলো ২০০১ সালে আলকায়েদা ফেনোমেনা হাজির হওয়ার আগে থেকেই আছে বা ছিল।
ফলে  আভ্যন্তরীণ মুল্যায়নে ভারতের কখনই ধরে নিবার কারণ নাই যে, এরা আর আলকায়েদা ফেনোমেনা এক। কিন্তু তবুও ভারত কাশ্মীর-কেন্দ্রিক ইসলামি বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতাকেই কল্পিত জঙ্গিবাদ ও টেররিজম বলে, নিজের ভূমিতে অনুপ্রবেশ ইত্যাদি কথার প্রচার চালিয়ে গেছে। উদ্দেশ্য, কল্পিত টেররিজমের সরবরাহকারীর অজুহাতে বাংলাদেশকে কব্জার মধ্যে রাখা, ভারতের জন্য বাংলাদেশের ওপরে বাণিজ্য সুবিধা আদায় করা আর ট্রানজিট করিডোর আদায় করে নেয়ার কাজে ব্যবহার করে নেওয়া। সম্প্রতি আইএস ভারত ও বাংলাদেশে উপস্থিত হয়ে থাকতে পারে, এটা তারা স্বীকার করছে। ফলে বাংলাদেশ সরকারের ভাষ্যের সাথে ভারতের রাষ্ট্রের ভাষ্যের এ প্রথম অমিল দেখা গেছে। এমনকি আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ অমিল-গরমিলকে স্বীকার করে নিয়ে গত সপ্তাহে বলেছেন, তারা ভারতের পাওয়া তথ্যের সাথে নিজের বোঝাবুঝি ও অমিলের কারণ খুঁজছে। তাহলে এ কথা মনে করার কারণ আছে যে, মোদির পাকিস্তান সফর কোনো চমক বা কারিশমা দেখানো নয়। নিউইয়র্ক টাইমসের ২৫ ডিসেম্বরের রিপোর্টে ভারতের ইংরেজি একটি দৈনিকের ডব্লিউআইআরই (WIRE)-এর সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারাদ্বারজনের এক মন্তব্য তুলে এনেছে। “In a way, he is sending a signal to everyone that there will be no more U-turns,” said Siddharth Varadarajan, a founding editor at The Wire, an Indian news site. “He is putting his personal political brand on this process. He can’t walk away that easily now.”
মোদী সম্পর্কে ভারাদ্বারজন বলছেন, “একভাবে দেখলে চমকের পাকিস্তান গমন করে মোদি আসলে সবার কাছে এক বার্তা দিয়ে ফেলেছেন, যা থেকে তিনি আর সরে আসতে পারবেন না। তিনি আসলে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক ইমেজ এই প্রক্রিয়ার মধ্যে জড়িয়ে ফেলেছেন। ফলে তিনি এখন আর সহজে এখান থেকে সরে যেতে পারবেন না”।

“সমালোচকদের পাকিস্তা্ন পাঠিয়ে দিবার রাজনীতি” – ভারত আর বাংলাদেশে একই
বিজেপি তার সমালোচককে বাংলাদেশের মতই কিছু হলেই পাকিস্তান পাঠিয়ে দেয়। বিজেপি ও কংগ্রেস উভয়েই যে যখন যেভাবে সুবিধা মনে করেছে পাকিস্তান ইস্যুকে অ্যান্টি-পাকিস্তানি হিন্দুত্বের জাতীয়তাবাদ – এক উগ্র বর্ণবাদ প্রচার করে থাকে ভোটের বাক্স ভরার দিকের নজর থেকে। কিন্তু রাষ্ট্র সরকার চালাতে গেলে তার তো একটা পাকিস্তান নীতি, পাকিস্তানের সাথে সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলো কিভাবে ডিল করবে তা থাকতেই হবে। আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নির্বাচনী বক্তৃতায় ভোট পাবার জন্য পাকিস্তান-বিরোধী উস্কানি, সুড়সুড়ি জাগিয়ে ভোটের বাক্স ভড়তে যা বলা হয় তার সাথে বৈদেশিক পাকিস্তান নীতির কোন সম্পর্ক নাই। ফলে সবসময় তাদের যার যার সরকারের পাকিস্তান নীতিতে আর তাদের স্ব স্ব কালে যেকোনো নির্বাচনে পাকিস্তানবিরোধী ঝড় তুলে ভোটের বাক্স ভরার রাজনীতির মধ্যে কখনো মিল-সামঞ্জস্য রাখতে পারেনি। বরং সময়ে স্থানীয় নির্বাচনে জেতার বিষয়টিকে মুখ্য বিবেচ্য রাখতে গিয়ে বেশির ভাগ সময়ে সরকারের পাকিস্তান নীতিতে ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি। এসব সমস্যার কথা খেয়াল করে ভারাদ্বারজন ওই মন্তব্য করেছেন।
কম-বেশি প্রায় এই একই সমস্যা আমাদের দেশেও হয়ে আছে। সরকারের সক্ষমতা ও মনোযোগ এরই মধ্যে (নকলভাবে) জঙ্গি বলে সাংবিধানিক রাজনীতির জামায়াত-বিএনপি দমনের কাজে সরকার ব্যবহার করে চলেছে। আবার সাম্প্রতিককালে আসল ‘টেররিজম’ আইএস বা জেএমবি দমনের কাজেও এটা ব্যবহার করছে। অর্থাৎ সরকারের মোট সক্ষমতাটা তাদেরকে দুইভাবে ভাগ করে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এভাবে কত দিন চলতে পারবে, সক্ষম থাকবে কি না জানি না। তবে কেবল জেএমবি দমনের কাজে মনোযোগী থাকার জন্য সক্ষমতা কেবল সেদিকে নিবদ্ধ রাখতে আপাতত সাংবিধানিক রাজনীতিতে বিরোধীদের সাথে কোনো ডায়লগ, আঁতাত, বোঝাবুঝি কোনো কিছুর আলামত দেখা যাচ্ছে না, যাতে সরকার সব রিসোর্স সক্ষমতা একমুখী করতে পারে।

মোদির পাকিস্তান সফরে ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিক্রিয়া
মোদির সফরে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতিক্রিয়া হয়েছে অদ্ভুত ও মারাত্মক; তবে এককথায় এবং দূরে সেভ জায়গায় দাঁড়িয়ে বললে বলতে হবে, মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তো এমন প্রতিক্রিয়াগুলোকে কয়েকটা খোপে ভাগ করে বললে, প্রথম খোপ  হল তারা যারা সরাসরি শুধু ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় লাভালাভের দিক চেয়ে প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। এরা হলো খোদ কংগ্রেস, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ও তার জনতা দল ইউনাইটেড। খোপ দুই, যারা জম্মু ও কাশ্মীর অথবা পাকিস্তান-ভারতের জন্মের সময় থেকেই লম্বা বিবাদে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত। যেমন এককথায় বললে, ভারতীয় কাশ্মীরকেন্দ্রিক সব ধরনের দল মোদির পাকিস্তান সফরকে ইতিবাচক বলেছেন। এছাড়া এদের সবার একই কথা “ডায়ালগ”; নিরবচ্ছিন্ন ডায়ালগই প্রধান কার্যকর করণীয় মনে করেন সবাই। এমনকি যারা কাশ্মীড় ইস্যুতে বিচ্ছিন্নতাবাদী লাইন অনুসরণ করে তারাও মোদিকে স্বাগত জানিয়েছেন। শ্রীনগরের মডারেট দল হুরিয়াত এটাকে সরকারের নেয়া “ইতিবাচক সঠিক পদক্ষেপ” বলেছে। আর হার্ডলাইনের আলী শাহ জিলানি বলছেন, “ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টার বিরুদ্ধে তাদের কোনো আপত্তির কিছু নেই”। বর্তমানে ভারতীয় কাশ্মীর রাজ্যে বিজেপির সঙ্গে চলতি জোট সরকার গঠনের পার্টনার স্থানীয় মডারেট দল পিডিপির নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী মুফতি মোহাম্মদ সাঈদও খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে এটাকে ‘সঠিক দিকে পদক্ষেপ’ বলেছেন। ওদিকে হায়দ্রাবাদকেন্দ্রিক এমআইএম দলের নেতা ও কেন্দ্রীয় লোকসভার সদস্য ব্যারিস্টার আসাদুদ্দিন ওয়ার্সীও মোদির সফরের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে ডায়ালগ চালিয়ে যাওয়ার কথা তুলেছেন। কাশ্মীরের স্থানীয় দল ন্যাশনাল কংগ্রেসের শেখ আবদুল্লাহর নাতি ওমর আবদুল্লাহও স্বাগত জানিয়েছেন; তবে এমন পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয় না, ছুটে যায় বলেও আক্ষেপ করেছেন। ওদিকে বাম কমিউনিস্টদেরও (সিপিএম, আরএসপি) এই খোপে ফেলা যায়, একই ধরনের স্বাগত জানানোর কারণে। তবে এদের বাড়তি কিছু শব্দ আছে। যেমন তারা ‘টেররিজমও নিপাত যাক’ সঙ্গে যোগ করে তাদের কথা বলেছেন।

এই সফরের খবর ভারতীয় মিডিয়ায় আসার পর কংগ্রেস প্রতিক্রিয়ায় বলেছিল, “এই সফরের কোন তালমিল প্রটোকল রাখা হয়নাই। ফলে এটা একটা ফালতু তামশা ব্যাপার হয়েছে। এর খারাপ পরিণতি হবে। এর আগে বাজপেয়ির এমন সফরের পরে কারগিল যুদ্ধ এসেছিল”। যেমন, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভি, দি হিন্দু,। কংগ্রেস এমন মন্তব্য করার সময় ধরেই নিয়েছে যেন আগে কোন ইনফরমাল আলাপ ছাড়াই মোদী পাকিস্থান সফরে গিয়েছেন। এর আর এক অর্থ আইএস ইস্যুতে মোদীর সরকার কী করে তাতে তাদের কোন মাথাব্যাথা নাই। আভ্যন্তরীণ ইস্যুতে নিজ দলের সুবিধাই আসল কথা।  সোনিয়ার কংগ্রেসকে কেবল ভোটের রাজনীতির বিবেচনায় বক্তব্য অবস্থান নেয়া ও প্রকাশের দলে বা খোপে ফেলাতে অনেকে বিস্মিত হতে পারেন। কিন্তু ব্যাপারটা ইদানীং এমন অবস্থাতেই ঠেকেছে। বিশেষ করে লোকসভা ২০১৪-এর নির্বাচনে কংগ্রেস শোচনীয়ভাবে হেরে মোট আসনের মাত্র ১০ ভাগেরও নিচে আসন সংখ্যা হয়ে যাওয়ার পর। যেমন মোদি সরকারের ‘ল্যান্ড বিল’ বা জমি অধিগ্রহণ আইন নামে একটি আইনের প্রস্তাব করেও বিরোধীদের বিরোধীতায় তা শেষ পর্যন্ত পাস করাতে পারেনি, পক্ষে-বিপক্ষে ভাগ হয়ে গেছে। শেষে মোদী বিলটা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন বা বলা যায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাস হয়নি বলে এমনিতেই এটা প্রত্যাহার হয়ে গেছে ধরতে হবে। ওই বিলের সারকথা ছিল একদিকে চাষাবাদের জন্য জমি, অন্যদিকে অবকাঠামো উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বা শিল্প-কারখানার জন্য জমি এ দুই ধরনের প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্যের লাইনটা কোথায় টানা হলে সঠিক হবে, সব কুল রক্ষা পাবে। এ বিলের ইস্যুতে কংগ্রেসের অবস্থান খুবই সঙ্কীর্ণ বিরোধিতার। সিদ্ধান্তের পেছনে তাদের মূল বিবেচনা ছিল, কোনো চটকদার পপুলার কথা বললে তাতে দল চাঙা হবে। অথচ বিষয়টা একালের সব রাষ্ট্রের জন্যই খুব নির্ধারক এক নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। পার্লামেন্টে আলোচনার সময় রাহুল গান্ধী দলের মূল অবস্থান-বক্তব্য রেখেছিলেন। রাহুলের বক্তৃতার পর মিডিয়াসহ কংগ্রেসের নিজের দলের আলোচনার বিষয় ছিল, ‘রাহুলের পারফরম্যান্স’। রাহুল ‘কী বলেছেন’ সেটা নয়, ‘কোন অভিনয়ে’ বলেছেন সেটাই বিবেচ্য ও চর্চার বিষয় হয়েছিল। দল কি অবস্থান নিয়েছে, সেদিক নিয়ে কারও কোনো আগ্রহ ছিল না। কথাগুলো তুলে আনলাম, ভারতের এখনকার বিরোধী দল কংগ্রেসের রাজনীতির কোয়ালিটি বোঝানোর জন্য। তবে একথাও ঠিক, বিজেপি যখন বিরোধী অবস্থানে ছিল, তখনও কমবেশি এসব সমস্যা একই ছিল। সরকার ও বিরোধী দল এভাবে ভাগ করে দেখা ছাড়াও যদি একই ক্ষমতাসীন বিজেপির নির্বাচনীর রাজনীতির অবস্থান আর সরকারের নীতি বা সংসদে আনা বিলের বেলায় অবস্থান এভাবে ভাগ করে দেখি তো সেখানেও বিশাল ফারাক আর ছলচাতুরিতে ভরা অবস্থান দেখতে পাব। নভেম্বরের বিহার নির্বাচনে বিজেপির মধ্যে পাকিস্তান-বিরোধী ঘৃণা ছড়ানো কাড়াকাড়ি ছড়াছড়ি গেছে। এছাড়া ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘বিজয় দিবসে’ প্রচারণায় নামতে ভারতীয় বাহিনীকে খোদ মোদির টুইট বার্তার আহ্বান জানিয়েছিল। বিজেপির এগুলো সবই ভোটের রাজনীতি। সস্তা ইসলামবিদ্বেষ ছড়ালে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে এ বিশ্বাসে কাজে নেমেছিল। আবার সেই মোদিই এখন পাকিস্তান সফরের মাধ্যমে চমক সৃষ্টি করার চেষ্টা থাকলেও এক সিরিয়াস বিজনেসে পাকিস্তানের সঙ্গে জড়াতে চান, একথা শতভাগ সত্যি।

সারকথায় দেখা যাচ্ছে, ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশেই আইএস ইস্যুটা এখনও মুখ্য ইস্যু হতে এবং যথাযথ গুরুত্ব পাবার ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনদের বিরোধী কোনঠাসার আভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারণে  বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।

[এই একই প্রসঙ্গে আমার দুটো লেখা কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন দিক থেকে এবং ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্ট তুলে  দুটি দৈনিকে ছাপা হয়েছিল। প্রথমটা ২৬ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ পত্রিকায় আর দ্বিতীয়টা ২৭ ডিসেম্বর ২০১৫ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এখানে ঐ লেখা দুটোর পয়েন্টগুলোকে একসাথে করে এরপর নতুন করে পরিবর্ধন ও এডিট করে এখানে আবার ফাইনাল ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

goutamdas1958@hotmail.com

কানে পানি গেছে, এবার কী সত্যিই বাঘ এসেছে!

কানে পানি গেছে,
এবার কি সত্যিই বাঘ এসেছে!

গৌতম দাস
০১ ডিসেম্বর ২০১৫
http://wp.me/p1sCvy-hR

বাংলাদেশে “আইএস এসেছে, আইএস আসে নাই” মনে হচ্ছে এই ছুপাছুপি খেলার অবসান ঘটতে শুরু করেছে। ২৮ নভেম্বর শুরুর প্রথম প্রহরে চ্যানেল আইয়ের টকশোতে এসেছিলেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত। আলোচনার এক ফাঁকে তিনি সরাসরি উপস্থাপক মতিউর রহমান চৌধুরীকে বলেই ফেললেন,”দাবিক” ম্যাগাজিনটা দেখেছেন নিশ্চয়! বলা বাহুল্য, দৈনিক মানবজমিনের মালিক সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীই সম্ভবত সবার আগে তাঁর পত্রিকায় দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্টের রিপোর্ট ছাপিয়েছিলেন। বলা যায়, “আইএস আছে” দাবির পক্ষে প্রথম স্থানীয় মিডিয়ার স্বীকারোক্তি সেটা।

আইএসের মুখপত্র বলা হয়ে থাকে বা স্বীকৃত মাসিক ম্যাগাজিন হলো দাবিক। বিদেশী গোয়েন্দা ইনটেলিজেন্স জগতে দাবিককে আইএসের মাসিক মুখপত্র মনে করা হয়। আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্কগুলো থেকেও স্বীকারোক্তি মিলা শুরু হয়েছে। ওদিকে ভারতের অবস্থান বেশ তামাশার। অথবা বলা যায়, ‘দাবিক আইএসের মুখপত্র নয়’এমন উল্টা দাবি কোনো মহল থেকেই এখনো কাউকে করতে দেখা যায়নি। বিশেষত দাবিকের ১২তম সংখ্যায় প্রকাশিত ‘দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল’ রিপোর্ট ছাপা হবার পর। তবে মাস খানেক আগে “আইএস বলে কিছু নাই। সব জামাত এর কাজ।” এই ভাষ্যে ভারতীয় গোয়েন্দা এজেন্সীর বরাতে বহু রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। যেমন টাইমস অব ইন্ডিয়া ০৬ অক্টোবর সংখ্যা। বাংলাদেশের ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো এই রিপোর্টের বরাতে নিজ নিজ পত্রিকায় পরের দিন লেখা ছাপিয়েছে। টাইম অব ইন্ডিয়া ভারতের ইন্টেলিজেন্স সুত্রের বরাতে আমাদেরকে ‘নিশ্চিত করছে’ বলে পত্রিকাটা দাবি করেছিল যে দুই বিদেশী হত্যায় আইএসের সংশ্লিষ্টতা নেই। সেই সাথে আমাদের জানিয়েছিল বাংলাদেশ সরকারের মতোই বরং একাজের জন্য তারা জামায়াতে ইসলামিকে দায়ী মনে করে।  ভারতের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল (অব.) সৈয়দ আতা হাসনাইন দক্ষিণ এশিয়ায় উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে একটি উপস্থাপনা দেন। তারপর প্রশ্নোত্তর পর্বে উপস্থিত একজন জানতে চান, বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি আছে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বিস্তৃতভাবে আইএস নেই। ভারত ও পাকিস্তানেও একইভাবে আইএসের বিস্তৃত উপস্থিতি নেই। হাসনাইন সাহেব ন্যদের চেয়ে একটু বুদ্ধিমান দেখা যাচ্ছে। তিনি যেন অস্বীকার করলেন না তবে বিস্তৃত উপস্থিতি নাই।  অথচ এক মাসও যায়নি, মনে হচ্ছে এবার কানে পানি ঢুকেছে। হিন্দুস্থান টাইমস ২৮ নভেম্বর লিখছে, বগুড়ায় হামলার ঘটনায় আইএস-সংশ্লিষ্টতা নেই, সরকারি এই দাবিকে সন্দেহের মুখোমুখি করেছে। এছাড়া ভারতের দি হিন্দু পত্রিকা দাবিক পত্রিকায় আইএসের বক্তব্য সিরিয়াসলি নিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে “বেঙ্গল” নামে ঢাক দেয়াটাকে। এককথায় বললে ভারতে বড় সব প্রিন্টেড মিডিয়া আইএসের উপস্থিতি প্রসঙ্গে আগের অস্বীকার অবস্থান ছেড়ে স্বীকার করে রিপোর্ট করা শুরু করেছে।
ভারতের মিডিয়ার অবস্থান তামশার বলছি আর এক কারণে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার ভারতী জৈন নামের সাংবাদিক  ০৬ অক্টোবর (যে নিউজটা প্রথম আলো অনুবাদ করে ছেপেছে পরের দিন ০৭ অক্টোবর) ভারতের জ্যেষ্ঠ গোয়েন্দা কর্মকর্তারা লিখছেন, “জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের কার্যক্রম সারা বিশ্বেই আছে। দুই বিদেশি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে চরমপন্থীদের সম্পৃক্ততা আছে—এমনভাবে প্রচার চালাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী; যেন কাজটি করেছে আইএস। এটি করা হচ্ছে তাৎক্ষণিকভাবে পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। জামায়াতে ইসলামীর এর পরের পরিকল্পনা হতে পারে, এটা দেখানো যে ‘হাসিনা সরকার বাংলাদেশে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ।” অথচ ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়া গত ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতীয় জামাতে ইসলামির আর এক রিপোর্ট ছেপেছে। এম পি প্রশান্ত নামের সাংবাদিক লিখছেন, ভারতের জামাতে ইসলাম আইএসের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নামতে যাচ্ছে। “Jamaat-e-Islami to launch campaign against ISIS” – এই হল ঐ রিপোর্টের শিরোনাম। কারণ ভারতীয় জামাত মনে করে আইএস ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছে।  কারণ তারা অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। আর আইএসের খলিফাগিরিও এক নকল কারবার”। তাহলে এই রিপোর্ট থেকে বুঝা যাচ্ছে আইএস কে জামাত কিভাবে মুল্যায়ন জানা যাচ্ছে। তাহলে ভারতের গোয়েন্দা রিপোর্টের বরাতে ঐ একই টাইমস অব ইন্ডিয়ার – “বাংলাদেশে জামাতই আইএস” এই প্রপাগান্ডার মানে কী?

সিরিয়ার উত্তরে আলেপ্পো প্রদেশের এক শহরের নাম দাবিক। এই নামের গুরুত্ব হল, বলা হয়ে থাকে কোনো এক হাদিসে এই শহরের নামের উল্লেখ আছে যে, এই শহরে রোমান অর্থাৎ খ্রিষ্টানদের সাথে মদিনা থেকে আসা সৈন্যদের শেষ লড়াই হবে। এবং ক্রুসেডাররা পরাজিত হবে। হাদিসের মত ওল্ড স্ক্রিপ্টে এই শহরের নামের রেফারেন্স থেকে সম্ভবত সে কথা স্মরণ করে আইএসের পত্রিকার নাম দাবিক রাখা হয়েছে। এর আগে দাবিকের প্রথম সংখ্যায় তাঁরা নিজেদেরকে পরিচিত করার প্রতীকী স্লোগান হিসেবে লেখা হয়েছিল, ‘আনটিল ইট বার্নস দি ক্রুসেডর আর্মিস ইন দাবিক অর্থাৎ “প্রত্যাদেশ মোতাবেক দাবিক শহরে খ্রিষ্টান ক্রুসেডর সেনাদের পুড়িয়ে শেষ করার আগে পর্যন্ত”।
দাবিক যে কারণেই নাম রাখা হোক না কেন আমাদের প্রসঙ্গের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হল এই ১২তম সংখ্যাতেই প্রথম ‘বেঙ্গল’ নাম উল্লিখিত হয়েছে। মোট ৬৫ পৃষ্ঠার এই সংখ্যায় ৩৭ নম্বর পৃষ্ঠায় কোনো এক আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির রচিত একটা লেখা ছাপা হয়েছে। আবু আব্দির রহমান আল বাঙালির ওই লেখার শিরোনাম “দি রিভাইভাল অব জিহাদ ইন বেঙ্গল”। ঐ রিপোর্টের লক্ষণীয় ব্যাপার হল, নামের মধ্যে বাঙালি ও বেঙ্গল শব্দের বহুল ব্যবহার। বাংলাদেশকে কেন “বেঙ্গল” নামে তারা ডাকছে এর একটা সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা বা নোট দিয়েছে। বলছে ১৯৭১ এর আগের (সম্ভবত বুঝাতে চেয়েছে বৃটিশ আমলের বাংলা) ন্যাশনালিষ্ট বাংলাকে বুঝাতে তারা “বেঙ্গল” নামটা নিয়েছে। এথেকে আমরা আবার “তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি” বলে মিলিয়ে যেন ভুল না বুঝি। তাদের আপত্তিটা প্রো-পাকিস্তানি ধরণের মোটেও নয়। বরং যেকোন ন্যাশনালিজম বা জাতীয়তাবাদে তাদের আপত্তি সেজন্য।

যাহোক সেটা, শুধু তা-ই নয় বাংলাদেশে আইএসের এফিলিয়েশন বা স্বীকৃতি দেয়া সংগঠন হিসেবে জেএমবির কথা উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে। আর বিএনপি (ন্যাশনালিস্ট মুরতাদ্দিন) এবং জামায়াতকে (পার্লামেন্টারি মুরতাদ্দিন) সংগঠন আর আওয়ামী লীগকে ‘তাগুতি সরকার’ হিসেবে চিহ্নিত ও ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়া জেএমবির মূল নেতা আদালতের রায়ে ফাঁসিতে মৃত্যু হওয়া শায়েখ আব্দুর রহমানকে বীর শহীদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ভাষ্যে দাবিক ম্যাগাজিনের বক্তব্যের সত্যতা বা এর অস্তিত্ব স্বীকার করে এমন বক্তব্য দেখা যায়নি। অর্থাৎ সরকারি ভাষ্য “বাংলাদেশে কোনো আইএস জঙ্গি নেই” এই বয়ান এখনো অটুট আছে। বাংলাদেশে নিরাপত্তাবিষয়ক এক গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটিজ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামান অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি থাকার পক্ষে সম্ভাবনার কথা বলে গেছেন। এমনকি কাজের ধরন হিসেবে আইএস স্থানীয়ভাবে গড়ে ওঠা কোনো প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের এফিলিয়েটেড হিসেবে ঘোষণা করে ওই সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ভেতর দিয়ে নিজেরা হাজির থাকে সে কথাও বলেছিলেন। দাবিকের ১২তম সংখ্যা সম্পর্কে বাংলা দৈনিক মানবজমিনের রিপোর্টের পর আমেরিকার এনবিসি টিভি নেটওয়ার্কের বরাতে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকাও এক রিপোর্ট করেছে। মেজর জেনারেল (অব:) মনিরুজ্জামানের বরাতে প্রথম আলো ওখানেও লিখছে যে তিনি বলেছেন,‘যেহেতু আইএসের নিজস্ব প্রকাশনায় (দাবিক) বাংলাদেশ সম্পর্কে এত বিস্তারিতভাবে লেখা হয়েছে। তাই বিষয়টি আরো গভীরভাবে অনুসন্ধান করে দেখতে হবে। যদি এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়, সে ক্ষেত্রে এদের প্রতিহত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।’

বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মিথ্যাগুলো অদ্ভুত। সরকার নিজেও জানে এটা মিথ্যা, আমরাও যে জানি সরকার এটা মিথ্যা বলছে, সেটাও সরকার জানে। কিন্তু এর পরেও সরকার নিজের মিথ্যা বয়ানটাকে আঁকড়ে থাকবে। আর আমাদেরকে বলতে থাকবে‘বুঝোই তো আমার বয়ান মিথ্যা, তবু আমাকে মিথ্যা বলতে সুযোগ দাও।’ তেমনই এক বয়ান হলো, ‘এই দেশে আইএস বলে কিছু নোই।’ দাবিকের ১২তম সংখ্যা প্রকাশের পর সরকারের এই মূল বয়ানে কোনো বদল আসেনি। তবে এখন কেবল বাড়তি যে কথাগুলো সরকারি বয়ানে যোগ হয়েছে তা হলো, কখনো বলে জামায়াত বা কখনো বিএনপি এগুলো করছে। কখনো বলে জামায়াত জেএমবির নামে করছে। কখনো বলে জামায়াত আইএস নাম দিয়ে করছে। প্রথম আলোর ওই রিপোর্টেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “এ দেশে আইএস বলে কিছু নেই। ইতালীয় নাগরিক তাবেলাকে বিএনপি নেতা কাইয়ুম তার ভাইকে দিয়ে শুটার ভাড়া করে হত্যা করেছে। তাদের কয়েকজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। এসব ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তারাই আইএসের নামে এসব প্রচার করছে। এসব প্রচারণাকে আমরা গুরুত্ব দিই না”। অর্থাৎ আইএস নেই এখনো সে কথা আঁকড়ে ধরে আছে। তবে বাড়তি স্বীকারোক্তি হল, এক. আইএসের নাম দিয়ে অন্যেরা কেউ করছে। দুই. জামায়াত-বিএনপি এগুলো করেছে। এ কথা ঠিক যে জামায়াত-বিএনপিকে জড়িয়ে মিথ্যা বয়ান দেয়ার ক্ষেত্রে সরকারের আর একধরনের উদ্দেশ্য আছে। তা হলো, সরকারবিরোধী সাংবিধানিক ধারার বিরোধী দল জামায়াত-বিএনপির ওপর দমনপীড়ন বা চলতি গণগ্রেফতারের পক্ষে এক ন্যায্যতার বয়ান খাড়া করা। ফলে “আইএস আছে” স্বীকার করে নিলে জামায়াত-বিএনপির ওপর নিপীড়নের পক্ষে বয়ানের ভিত্তি থাকে না। এমনিতেই এ বয়ান জনগণ বা খোদ সরকার কেউ বিশ্বাস করে না। সবাই বোঝে এটা সরকারের মুখরক্ষার বয়ান মাত্র।
তবে এ কথাও সত্যি যে, কিছু টেকনিক্যাল সমস্যাও আছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতা বিষয়ে সরকার কোনো স্বীকারোক্তি বয়ান দিয়ে দিলে কতকগুলো অসুবিধা ও জটিলতা সৃষ্টি হবে যেগুলো সরকার এড়াতে চায়। যেমন, কোনো দেশে ‘সন্ত্রাসবাদী’ তৎপরতা ও উপস্থিতি আছে, এমন অফিসিয়াল স্বীকৃতি থাকলে হয়ত বিদেশী দূতাবাস বা প্রতিষ্ঠানকে কিছু রুটিন নিরাপত্তা বিষয়ক করণীয় এমন পদক্ষেপ নিতেই হবে। যেমন, অতি জরুরি স্টাফ ছাড়া বাকিদের দেশে পাঠিয়ে দেয়া, ইমারজেন্সি উন্নয়ন কর্মসূচি ছাড়া বাকি সব তৎপরতা বন্ধ করে দেয়া, স্ব স্ব দেশের যেসব নাগরিক বাংলাদেশে সরকারি বা বেসরকারি প্রকল্পে নিয়োজিত আছে নিরাপত্তার জন্য তাদেরকে দেশে ফিরে যাওয়ার পরামর্শ ও চাপ দিতে হবে ইত্যাদি। আর এরই সার প্রভাবটা পড়বে বাংলাদেশের ব্যবসা বাণিজ্যে অর্থনীতিতে। তাই সরকার এসব বিপর্যয় হয়ত এড়াতে চায়। তবে অবশ্যই এমন স্বীকারোক্তি না দেয়ার সুযোগ নিয়ে বিরোধী দলকে দমনের কাজে এই বয়ানকে খারাপ উদ্দেশ্যে ব্যবহার মারাত্মক বিপজ্জনক এবং অগ্রহণযোগ্য।

দুই.
ইসলামি রাজনীতির পক্ষে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই কি তাকে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন বলা ঠিক হবে? এমনিতেই পশ্চিমের “টেররিজম” – এর সংজ্ঞাও কোন স্পষ্ট ভিত্তি নাই। এককথায় তা সাবজেকটিভ; আমি চাই তাই ধরনের। অনেকটা যেন আমি অমুক সংগঠনকে টেররিস্ট বলতে চাই তাই – এরকম। কিন্তু কেন বলতে চাই – এর কোন জবাব নাই,  বলব না, নিরুত্তর।  বিভিন্ন দলিলে বলা হয়েছে টেররিস্ট দল কারা এক তালিকা আছে। ঐ তালিকায় যাদের নাম আছে ওরাই টেররিষ্ট। এভাবে আসলে কোন সংজ্ঞা না দিয়েই টেররিজম কোনটা বা টেররিষ্ট কারা এর ছদ্ম ভিত্তি দাঁড় করানো হয়েছে। এটা আমেরিকান কায়দা। আবার ঠিক এই কায়দা অনুসরণ করে জাতিসংঘেরও এক নিজস্ব টেররিস্ট তালিকা ও কায়কারবার।
তো যে কথা বলছিলাম, পশ্চিমা সংজ্ঞার দিক থেকে বিচারেও ব্যাপারটা সম্ভবত ঠিক তা নয় যে কেউ সশস্ত্র তৎপরতা করলেই সে পশ্চিমের চোখে জঙ্গি বা টেরর সংগঠন। বরং সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কার ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার কোথায় এই প্রশ্ন বিচারে আমরা ভিন্ন এক ভাগ-বিচার দাঁড় করতে পারি। যেমন, যেগুলো পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর যেগুলো তা নয় এমন দুইয়ের ভাগ-বিচারের মধ্যে বড় ফারাক হল, পাকিস্তানের ভূমিতে ট্রেনিং গ্রাউন্ড বা হেড কোয়ার্টার আছে, এমন সংগঠন সম্পর্কে একটা অনুমান আমরা করতে পারি যে এসব সংগঠন নিজেদের এজেন্ডা যা-ই থাক, মাঝে মধ্যে পাকিস্তান সরকার বা এর গোয়েন্দা বাহিনীর দেয়া অ্যাসাইনমেন্টও সম্পন্ন না করে দিলে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে ওসব সংগঠনের তৎপরতা পাকিস্তানের চলতে দেয়ার কথা নয়। যেটাকে আমরা বলতে পারি ট্যাক্স দিয়ে চলা। কারণ, সশস্ত্র সংগঠন মানেই যেকোনো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক আইনের চোখে তা বেআইনি তৎপরতাই হবে। ফলে সেই বেআইনি দিক উপেক্ষা করে কাজ করতে দিতে পারে একমাত্র সরকার বা এর কোনো এজেন্সি। কথাটা আরেকভাবে বলা যায়, সশস্ত্র ওসব সংগঠনের কোনো তৎপরতা যদি সরাসরি পাকিস্তান রাষ্ট্রের ইচ্ছার সাথে সংঘাতের বিষয় হয়, তাহলে পাকিস্তান সরকার এসব সশস্ত্র সংগঠনকে নিজ ভূমিতে থেকে তৎপরতা চালাতে দিবে না। দিতে পারে না। এই বিচারে আলকায়েদা ও আইএস ছাড়া বাকি প্রায় সব সংগঠন পাকিস্তানভিত্তিক। ফলে পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠন আর পাকিস্তানভিত্তিক নয়, এভাবে দুটো ভাগ আমরা করতে পারি।
আবার পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোর আর এক সাধারণ বৈশিষ্ট্য হল, এরা দুনিয়াব্যাপী তৎপরতার সংগঠন নয়। এমনকি এরা ঠিক আঞ্চলিক সংগঠনও নয়। মানে আমাদের অঞ্চলের সব রাষ্ট্রেই সংগঠনের শাখা ও তৎপরতা আছে তা নয় এবং সব সরকারের বিরুদ্ধে তৎপর এ কথাও সঠিক নয়। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রে তৎপর এবং এই অর্থে বলা যায়, বেশির ভাগই কাশ্মির ইস্যু কেন্দ্রিক সংগঠন। এটাই তাদের মূল কাজের এলাকা। তবে উপচে পড়া এফেক্ট হিসেবে বাংলাদেশেও এদের তৎপরতা থাকতে পারে। কিন্তু মূল কথা আলকায়েদা বা আইএসের সাথে সম্পর্ক বা এফিলিয়েটেড সংগঠন এরা কেউ নয়।
তাহলে পাকিস্তানভিত্তিক আর আন্তর্জাতিক- এভাবে ভাগ দেখানোর আর এক কারণ হল, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো ৯/১১-এর আগেও হাজির ও তৎপর ছিল। এরা মূলত ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের নিজ নিজ স্বার্থে পরস্পরের বিরুদ্ধে এবং অপর রাষ্ট্রের ভেতর কাউন্টার ইনটেলিজেন্স বা অন্তর্ঘাতমূলক তৎপরতা চালানোর বহু পুরনো রেওয়াজের ধারাবাহিকতা সংগঠন। পশ্চিমা বা আমেরিকানরা যে অর্থে সন্ত্রাসবাদী বা টেরর সংগঠন বলতে বোঝে, পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলো এর পুরো অর্থ বহন করে না। অটল বিহারি বাজপেয়ির বিজেপি সরকার ২০০৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত  ভারতে ক্ষমতাসীন ছিল। পাকিস্তানভিত্তিক সংগঠনগুলোকে এরা সে সময় এক নতুন নামে ডাকত, বলত  “সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদ”। অর্থাৎ সীমান্তের অপর পাড় থেকে মানে পাকিস্তান থেকে যারা আতঙ্ক বা সন্ত্রাস ছড়াতে এসেছে। এই নাম খুবই অর্থপূর্ণ। পশ্চিম তাঁর সংজ্ঞায় সন্ত্রাসবাদী বলতে যাদেরকে বোঝাতে চায় ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদীরা’ ঠিক সে সংগঠন এরা নয়।
এসব বিচারে এবার স্পষ্ট করে বলা যায়, আলকায়েদা বা আইএসের সন্ত্রাসবাদ ভারত অথবা বাংলাদেশ এপর্যন্ত কখনও দেখে নাই। এর আগে কখনোই অভিজ্ঞতা নেয়া বা মোকাবেলা করতে হয়নি। মনে হচ্ছে, এবারই প্রথম করতে হবে। তাহলে এত দিন ভারতের ভোকাবুলারিতে সর্বক্ষণ যে জঙ্গিবাদের কথা শুনে এসেছি সেগুলো কী ছিল? দু’টি পয়েন্টের দিক থেকে তা ব্যাখ্যা করা যায়। প্রথমত, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে রেওয়াজি অন্তর্ঘাতী তৎপরতা যেগুলো ছিল, আফগান যুদ্ধফেরত যোদ্ধাদের ফেরার কারণে যেটা আরো বড় মাত্রা পেয়েছিল; সেকালে নাইন ইলেভেন আমেরিকায় হামলার পর আমেরিকা ভারতের সমর্থন চাওয়াতে ভারত তার নিজ অভিজ্ঞতার ‘সীমাপাড়কে আতঙ্কবাদকে’ আমেরিকান বুঝের ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ বলে চালানোর সুযোগ পেয়েছিল এবং নিয়েছিল। কিন্তু তবু ভারত অভ্যন্তরীণভাবে নিজস্ব মূল্যায়নে পাকিস্তানভিত্তিক সশস্ত্র তৎপরতা আর আন্তর্জাতিকভাবে আলকায়েদা ও আইএসের তৎপরতাকে পরিষ্কার আলাদা ভাগ করেই বুঝে থাকে। তবে এত দিন সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সে তৎপরতায় ভারতের নিষ্ঠা আছে, অথবা বাংলাদেশে তার সিকিউরিটি স্বার্থ আছে এসব কথা ছড়িয়ে সে বাংলাদেশে নিজের পছন্দের সরকার রাখাকে জায়েজ করেছে। বিনিময়ে ভারতের বাণিজ্যিক স্বার্থ আদায় করা আর সবচেয়ে বড় স্বার্থ বাংলাদেশ থেকে মাগনা ট্রানজিট আদায় করা এগুলো চালু রেখেছে। আজ সম্ভবত সময় ঘনিয়েছে। কানে পানি ঢুকতে শুরু করেছে। আইএসের উপস্থিতি ও তৎপরতার বিপক্ষে ভারতের নড়াচড়া প্রস্তুতি নিতেই বা  করতেই হচ্ছে তাকে। আইএস তৎপরতার উপস্থিতি, হোক না তা স্থানীয় সংগঠনকে এফিলিয়েশন দেয়া তৎপরতা, এটা ভারতের পক্ষে আর কোনোভাবেই খাটো করে দেখা সম্ভব হচ্ছে না। এই জায়গায় এসে বাংলাদেশ সরকারের স্বার্থের পক্ষে ‘আইএস নেই’ সে কথা বলবার অবস্থায়  ভারত আর নেই। যদিও সর্বশেষ গত অক্টোবর মাসে বাংলাদেশে দুই বিদেশী হত্যার পরেও শেখ হাসিনা সরকারের সাথে তাল মিলিয়ে ও নিজের গোয়েন্দা তথ্যের সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল আইএস নেই। একই সাথে এবার ভারতীয় মিডিয়াগুলোর ভোল বদলও লক্ষণীয়। অন্তত নিরাপত্তার প্রশ্নে এই ইস্যুতে হাসিনার বয়ান ও স্বার্থকে ভারত আর নিজের স্বার্থের সাথে মিলিয়ে দেখতে ও চলতে পারছে না।
বলা বাহুল্য, ভারতের নিজ রাষ্ট্রস্বার্থ, নিরাপত্তাবিষয়ক জেনুইন কোনো হুমকি ইত্যাদি – এসবকে অন্য সব কিছুর ওপর তাকে স্থান দিতেই হয়। সবার আগে চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা।

goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গতকাল ৩০ নভেম্বর দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এরই ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন এডিট করে এখানে আজ আবার ছাপা হল।]

সর্বশেষ এডিটঃ ০১ ডিসেম্বর, ভোর ০২ঃ৫২