চীন কী চায়, চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়

চীন কী চায়, চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়

গৌতম দাস

০৭ জুলাই ২০১৮, ০০:০৫

https://wp.me/p1sCvy-2sw

 

রাষ্ট্রসংঘসহ শীর্ষ চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায় – ছবি : সংগৃহীত বাংলানিউজ থেকে

বাংলাদেশ জুলাই মাসটা শুরু করেছে গ্লোবাল মিডিয়ায় ব্যানার হেডলাইন হয়ে, কারণ রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেলসহ পাঁচ সংগঠনের প্রধান একসাথে একই উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন। রাষ্ট্রসঙ্ঘের সেক্রেটারি জেনারেল এন্তেনিও গুতেরেস (Antonio Guterres), বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম (Jim Yong Kim) ও আন্তর্জাতিক রেডক্রসের প্রেসিডেন্ট পিটার মরা (Peter Maurer) এবং সাথে রাষ্ট্রসঙ্ঘের বৃহত্তর অধীনেই কাজ করা আরো দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব জাতিসঙ্ঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর -এর হাইকমিশনার ফিলিপ্পো গ্রান্ডি (Filippo Grandi ) ও মিয়ানমারের মানবাধিকার-বিষয়ক বিশেষ র‌্যাপোর্টিয়ের ইয়াংহি লি বাংলাদেশে গত ৩০ জুন তিন দিনের বাংলাদেশ সফরে পৌঁছে গেছিলেন। বলাবাহুল্য হবে না যে রোহিঙ্গা  ইস্যুতে এসব প্রতিষ্ঠানের অবস্থান হল, মূলত তিন বিষয়ে। এক : রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে সাময়িক অবস্থানের সময়ে দেখভালের ন্যূনতম ব্যবস্থার সব বিষয় নিশ্চিত করতে কাজ করা। দুই : রোহিঙ্গাদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদরের সাথে বার্মায় ফেরত পাঠানোর একটা ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করা। আর তিন : যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও ধর্ষণসহ মানবেতর অবস্থার জন্য দায়ী তাদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা। সারকথায় এ সফরে তাই মূল উদ্দেশ্য বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের এবং আশ্রয়দাতা দেশ বাংলাদেশকে রাজনৈতিক সমর্থন জানানো, পাশে দাঁড়িয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা। এছাড়া আশ্রয় দেয়ার অর্থনৈতিক দায় গ্লোবালি শেয়ার করা, তাই বিশ্বব্যাংক নিজেই ৪৮০ মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনার কথা জানাল। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তাই বলছেন ইতোমধ্যেই “উদার জনগোষ্ঠি বাংলাদেশিরা” রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে “বিপুল বোঝা নিজের কাধে” নিয়েছে। “তাদেরকে আর শাস্তি না দিয়ে তাদের বোঝা আমাদের শেয়ার করা উচিত”। ইংরাজি দৈনিক ডেইলি স্টার লিখেছে, “Generous humane country like Bangladesh shouldn’t be punished: WB”।

দুনিয়ায় মানুষ, সাধারণভাবে সব মানুষের জন্য ও পক্ষে কাজ করবে এমন “বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন” (Multi-lateral) গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত চলে আসা দুনিয়াতে মানুষের অর্জন কম নয়। এমন অনেক প্রতিষ্ঠানই আজকাল পাওয়া যাবে যারা সাফল্যের সাথে দুনিয়ার মানুষের সম্ভাবনা, মানুষের সাফল্যের ও অর্জনের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। বহুরাষ্ট্রীয় শব্দটাকে ইংরাজিতে মাল্টি-ল্যাটারেল (Multi-lateral) বলা হয়। কারণ তা, এ কথা মনে রেখে যে, আধুনিক যেকোনো ছোট বা বড় রাষ্ট্র মাত্রই সার্বভৌম রাষ্ট্র; যার সার্বভৌম কর্তৃপক্ষের উপরে ক্ষমতাশালী অন্য কেউ থাকতে পারে না, পারবে না। ফলে ‘রাষ্ট্রগুলোর অ্যাসোসিয়েশন’ ধরনের অন্য কোনো সংগঠনও এর উপরে থাকতে পারে না, কর্তৃত্বাধীন করতে পারে না। তাই ‘রাষ্ট্রগুলোর অ্যাসোসিয়েশন’ ধরনের সংগঠন যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ, বিশ্বব্যাংক, রেডক্রস ইত্যাদির মতো সংগঠনগুলোর জন্ম হয়েছে এমনভাবে, যেন এসব সংগঠনের সদস্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব সুপ্রীম, তা অলঙ্ঘনীয় এ মূলনীতিকে মাথায় রেখে। তাই ল্যাটারাল ধারণাটা পাশাপাশির, কেউ কারো ওপরে নয়; না কোনো সদস্য আর এক সদস্য রাষ্ট্র, না কোনো অ্যাসোসিয়েশন সংগঠন নিজে সদস্য রাষ্ট্রের ওপরে কর্তৃত্ববান। এই কারণেই ল্যাটারাল শব্দটা যার আক্ষরিক বাংলাটা হল “বহু বাহু” বিশিষ্ট।

তবু বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন গড়ার বেলায় সার্বভৌমত্বও এখানে ঠিক মূল বিষয় নয়। বরং মূল বিষয় মূল্যবোধ (values)। ঠিক কিসের বা কী সংক্রান্ত মূল্যবোধ? এককথায় বললে মানুষ সংক্রান্ত। মানুষ কে, কারা, কী এসব বিষয়ে মৌলিক ধারণা সংক্রান্ত মূল্যবোধ।

লক্ষ্য করার মতো একটি বিষয় হল, মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন যেমন রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে “রাষ্ট্রসংঘ”, যুদ্ধে দুতয়ালি, ত্রাণ আশ্রয় সুরক্ষা চিকিৎসা সেবা দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ক এবং যুদ্ধকেই কিছু নীতি কনভেনশনের অধীনে আনার সংগঠন “রেডক্রস” ইত্যাদির জন্ম বেশি দিন আগের নয়। মাত্র গত শতাব্দীতে, তাও বিশেষত ১৯০০-১৯৫০ এই প্রথম অর্ধের মধ্যে। এর মূল কারণ একটি অভিন্ন মূল্যবোধের উপরে দুনিয়ার সবাইকে নিয়ে একমতে দাঁড়ানো সহজ ছিল না। কেন? কারণ, দুনিয়ার নিয়ম যখন থাকে অপর রাষ্ট্রকে সরাসরি জবর দখল ও কলোনি করে রাখা, সেখানে মানুষের আর মূল্য কী? মূল্যবোধই বা কী? তবু গত ১৯১৯ সালে রেডক্রসের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল।

তবে বুঝার সুবিধার জন্য একটা কথা আগে বলে রাখা ভাল। বুঝার সূত্র। কলোনি দখল যুগের শুরু হয়েছিল মোটামুটি ১৭০০ সালের পর থেকে ফলে সেটা ঐ কলোনি দখলের যুগের কারণেই সম্ভবত মানুষের মর্যাদা সম্পর্কে কোনো অভিন্ন মূল্যবোধ দাঁড়ানোর সম্ভাবনা সেকালে নেই। কিন্তু মজার কথা এর প্রথম দুই শ’ বছর যুদ্ধবিগ্রহ চলেছিল কলোনি দখল মাস্টারদের মধ্যে তবে সেটা তাদের নিজ  ইউরোপীয় দেশে নয়। বরং যে দেশ-রাষ্ট্র দখল করা হবে এশিয়া, আফ্রিকা ল্যাটিন আমেরিকার সেসব প্রান্তীয় অঞ্চলে সেখানে, কলোনি দখলকারদের মধ্যে। ফলে এসব গরীব দেশের লোক মরলে তা দেখে দুঃখ মনোকষ্ট পাওয়ার কেউ ছিল না। কিন্তু দিন একভাবে যায়নি। হঠাৎ ১৯০০ সালের পরে এসে দেখা গেল যুদ্ধ এবার হানা দিয়েছে ঘরের মধ্যে, খোদ ইউরোপের কলোনি দখলের মাস্টারদের নিজ দেশে, দেশগুলোর মধ্যে। তাই এবার এটাকে বিশ্বযুদ্ধ বলা হচ্ছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল ১৯১৪-১৮ সাল। ইউরোপের সেই যুদ্ধ যার মূল বিষয় ছিল আসলে কলোনি দখলদার ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে কামড়াকামড়ি, তবে মরণ কামড়াকামড়ি। কিন্তু যেহেতু ঘটনায় এবারের ভিকটিম খোদ মালিক মহাজনের ঘর ফলে এবার এখান থেকে সুফল এসেছিল। কলোনি মাস্টার ভিকটিম ফলে এলিট, তাই অমানবিক, মানবেতর, নৃশংস, ঘৃণিত ইত্যাদি এসব মূল্যবোধযুক্ত শব্দের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। তবে আর একটা বিষয় অবশ্যই বিরাট প্রভাব রেখেছিল বলা যায়। তাহলো ইতোমধ্যে সারা ইউরোপে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্র এবং সংশ্লিষ্ট মানব-অধিকারের ধারণা ও মূল্যবোধের ব্যবহার ও চর্চা অন্তত নিজ ঘর থেকে শুরু হয়ে গেছিল। ফলে মানুষের মর্যাদা, নিরাপত্তা, বেঁচে থাকা, জীবিকা নির্বাহ, ইনসাফ পাওয়া ইত্যাদির অধিকার এবং সাধারণভাবে মানুষের অধিকার ধারণা প্রতিষ্ঠা পেয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে রিপাবলিক এবং মানুষ নিজেই, অন্য কেউ না, একমাত্র নিজেই নিজেকে শাসন করার হকদার এসব মূূূল্যবোধগুলো গেড়ে বসা শুরু হয়ে গিয়েছে। ফলে ঘটনাবলির শেষে রাষ্ট্রসংঘ, এসব মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে এই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর রাষ্ট্রসংঘ জন্ম নিয়েছিল ১৯৪৪ সালে।

একটি ডিসক্লেমার জানিয়ে রাখার সময় বোধহয় পেরিয়ে যাচ্ছি। তাহলো, এখানে সাধারণভাবে সব পরিচয় ভিন্নতার ঊর্ধ্বে যেকোনো মানুষের জন্য ও পক্ষে কাজ করবে এমন বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠন গড়ে তোলা প্রসঙ্গে বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে কথা বলছি। এর মানে এই নয় যে এসব সংগঠনগুলো সব আদর্শ ও ধোয়া তুলসীপাতা ও চরম সব অর্জনের সংগঠন এরা। না এমন আগাম অনুমান ধরে নেয়া ভুল ও তা ভিত্তিহীন। তবে, জাতিসঙ্ঘ ধরনের প্রতিষ্ঠান “এটা এক চরম অর্জনের” – এ কথা মারাত্মক ভুল। আবার এর কোনো অর্জনই নেই এটাও মারাত্মক ভুল। বাস্তবতা হল, তাদের অনেক অর্জন থাকলেও এর বিরাট বিরাট ঘাটতি ও খামতি আছে সেগুলো পূরণের জন্য কাজ করতে হবে, লড়তে হবে এখনো অনেক, এটাই হল সঠিক মূল্যায়ন। এখানে জাতিসংঘ বলতে মানবাধিকার সনদ ১৯৪৮ সহ যত আন্তর্জাতিক আইন, কনভেনশন, নিয়ম রেওয়াজ ইত্যাদি মানব-অধিকার ও মূল্যবোধ যা এ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে সেসব ধরে নিয়ে কথা বলেছি।

সেকালে এসব যা কিছু অর্জন এর পেছনে এক শীর্ষ ভূমিকা ছিল আমেরিকার। যেমন রাষ্ট্রসঙ্ঘ গড়া এটা আমেরিকারই এক দ্বিতীয় উদ্যোগ প্রচেষ্টা ছিল, আর তা প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের। আর রাষ্ট্রসঙ্ঘ গড়ার প্রথম তবে ব্যর্থ হয়ে যাওয়া প্রচেষ্টাটা ছিল যার নাম হল “লিগ অব নেশন”, (রাষ্ট্রসঙ্ঘের আগের উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানের নাম )। সেকালে এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষের সময়কালে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন। এছাড়া, মনে রাখতে হবে কোনো জনগোষ্ঠী নিজেই নিজেকে একমাত্র শাসন করবে অর্থাৎ কলোনি শাসকের শাসন নয়, এই ভিত্তিতেই সদস্য রাষ্ট্রদের নিয়ে রাষ্ট্রসঙ্ঘ গঠিত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক বা বহুরাষ্ট্রীয় সংগঠনগুলো গড়তে আমেরিকা নিজের অবদান ও ভূমিকা যা রাখা সঠিক ও সম্ভব মনে করেছিল অথবা যা পারেনি করেছে, আর এভাবে আমেরিকা দুনিয়া শাসন ও নেতৃত্ব দিয়ে যেতে পেরেছিল গত প্রায় ৭০ বছর। কিন্তু সময় এখন পালাবদলের। অন্তত অর্থনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে এবার এখন নতুন নেতা চীনা।

কিন্তু সেই সাথে আমরা কী দেখছি?
একটা উদ্যোগ যদি হয় জাতিসঙ্ঘের মহাসচিবসহ পাঁচ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও প্রতিষ্ঠানের রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ সফর। তাহলে অপর দিকে এক উদ্যোগ, প্রায় সমান্তরাল আর এক তৎপরতা আছে চীনের নেতৃত্বে। স্পষ্ট করে বললে, বার্মা, বাংলাদেশ ও চীনের এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ত্রয়ের চীনে বৈঠক হয়েছে। এ তৎপরতাটা বিপরীত উদ্যোগ হিসেবে হাজির আছে।

এমনিতেই আন্তর্জাতিক অভিন্ন মূল্যবোধের ওপর দাঁড়ানো বহুরাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের তৎপরতায় মানুষের মর্যাদা রক্ষার পক্ষে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সবসময় প্রধান বাধা এসে যা হাজির হয় তাহল, সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রের বৈশ্বিক স্বার্থ অথবা  ঐ রাষ্ট্র পরিচালক ব্যক্তির ব্যক্তিগত ক্ষমতায় থাকার স্বার্থ। বাংলাদেশের ভূমিকা কী তাই হতে যাচ্ছে?
এ ছাড়া স্বভাবতই মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে আমরা চীনকে বিপক্ষীয় ক্যাম্পে দেখতে পছন্দ করব না হয়ত। কিন্তু আমরা অপছন্দ করলেও চীন আমাদের হতাশ করার দিকে যাচ্ছে মনে হচ্ছে। অর্থাৎ চীন মনে করছে এ ব্যাপারে সে আমেরিকার আমলের স্টান্ডার্ডও ধরে রাখার চেষ্টা করবে বা, নিচে পড়ে থাকবে। অথচ দুনিয়ার নেতা হওয়ার খায়েশ চীনের ষোলোআনা। এটা স্ববিরোধী। এ বিষয়ে, এককথায় এখনই বলা যায় –  গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতা হয়ত হতে পারবে কিন্তু  দুনিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্বে চীনের আসা অসম্ভব। এমনিতেই কমিউনিস্ট ব্যাকগ্রাউন্ড হওয়ার কারণে চীনের পক্ষে ‘পলিটিকস’ ও ‘রাইট’ শব্দগুলো অর্থ তাৎপর্য বুঝার ক্ষেত্রে তা এক বিরাট প্রতিবন্ধক। কারণ এখানে কমিউনিস্ট চিন্তার দুর্বলতা ও ফাঁকফোকর প্রচুর। ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অধিকার’ কথার অর্থ তাৎপর্য বুঝতে কার্ল মার্কসের ঘাটতি আছে কি না সে প্রশ্ন না তুলেও বলা যায় ৭০ বছরের পরিচিত চর্চার “মার্কসবাদ”, সেই মার্কসবাদ এর অর্থ তাতপর্য বুঝতে অক্ষম। সে এখনো অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান এগুলোর বাইরে ‘রাজনৈতিক’ ও ‘অধিকার’ শব্দগুলোর অর্থ বুঝতে অক্ষম। অথচ ঐ শব্দগুলো সবই বৈষয়িক ও অর্থনৈতিক সুবিধা সংক্রান্ত। রাজনৈতিক ক্যাটাগরির শব্দ বা ধারণাই নয় ওগুলো। যেমন মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থানের অধিকার নয় বরং এগুলোর বাইরে রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক অধিকার হরণ করেছে, বঞ্চিত করেছে।

এছাড়াও, কথা পরিস্কার রাখতে হবে; রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের এক্ষেত্রে তার সুনির্দিষ্ট স্বার্থ আছে তা হল, রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে বার্মার রাখাইনে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখা। একবার ও শেষবারের মতো। আর সেক্ষেত্রে, বাংলাদেশের সরকার নিজের কোনো এক সঙ্কীর্ণ স্বার্থে এর বিরুদ্ধে গেলে বা এই স্বার্থকে রক্ষার ক্ষেত্রে কোনো আপস করলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। আজ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশ প্রশংশিত হচ্ছে। আমরা ভুলতে পারি না আর ঠিক সেই কারণেই এর আগের বছর কোন রোহিঙ্গা যেন বাংলাদেশে প্রবেশ করতে না পারে সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। সে কথা ভুলে যেতে পারি না। পরের বছরও শুরুতে ভারতের প্ররোচনায় সীমান্ত সিল করে দিবার নীতি নীতি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আভ্যন্তরীন নিজ জনগণের সহানুভুতি ও আশ্রয় না দিবার ক্ষোভ আঁচ করে পরে সীমান্ত খুলে দেয়াওয়া হয়।

এমনিতেই, বল গড়ানো শুরু করেছে দুইটা জায়গা থেকে। এক সাংগ্রিলা বৈঠক। সাংগ্রিলা মূলত এশিয়ার নিরাপত্তাবিষয়ক এক রাষ্ট্রজোট। সিঙ্গাপুরের  “সাংগ্রিলা নামের এক হোটেলে” তা প্রতিবছর আয়োজিত হয়ে থাকে। যেখানে সদস্য হিসেবে আমেরিকাও আছে, চীনও আছে। ইউরোপের মাতব্বর রাষ্ট্রেরা আছে, আছে মিয়ানমারও। গত জুন ২ তারিখের এবারের সিঙ্গাপুরের বার্ষিক বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করতে আসেন মিয়ানমার সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাউং তুন (National Security Adviser Thaung Tun)। মায়ানমার বা বার্মার গলার স্বর নামা শুরু হয় সেখান থেকে। তিনি সাত লাখ রোহিঙ্গাদেরকে ফেরত নিতে নিজে প্রস্তাব দেন ও সম্মতি জানান। তিনি আবেদনের স্বরে সেখানে প্রশ্ন রেখেছেন, “স্বেচ্ছায় যদি ৭ লাখকে ফেরত পাঠানো যায় তাহলে আমরা মায়ানমার তাদের গ্রহণে আগ্রহী। এরপরেও এটাকে কি জাতিগত নিধনযজ্ঞ বলা যায়”?

“Myanmar is willing to take back all 700,000 Rohingya Muslim refugees who have fled to Bangladesh if they volunteer to return, the country’s National Security Adviser Thaung Tun said on Saturday”.

এবিষয়ে রয়টার্সের  এক ডিটেলড রিপোর্ট দেখা যেতে পারে এখানে। দেখা যাচ্ছে, তিনি এ প্রস্তাব দেন কারণ ওই সাংগ্রিলা সম্মেলনে মিয়ানমারের নিরাপত্তা উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি কি মিয়ানমারকে জাতিসঙ্ঘের আরটুপি (রেসপন্সিভিলিটি টু প্রটেক্ট) ফ্রেমওয়ার্ক চালুর দিকে নিয়ে যাবে? কথিত এই আরটুপি ফ্রেমওয়ার্কটি ২০০৫ সালে জাতিসঙ্ঘের বিশ্ব সম্মেলনে গ্রহণ করা হয়। [Shangri-La Dialogue, a regional security conference in Singapore, where he was asked if the situation in Myanmar’s Rakhine state, where most Rohingya live, could trigger use of the Responsibility to Protect framework of the United Nations.]

এর মধ্য দিয়ে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে নিজ দেশের জনগণকে রক্ষা এবং এই প্রতিশ্রুতিকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে ব্যর্থ হলে এক দেশ অন্য দেশকে সহযোগিতা করবে। [The so-called R2P framework was adopted at the 2005 U.N. World Summit in which nations agreed to protect their own populations from genocide, war crimes, ethnic cleansing and crimes against humanity and accepted a collective responsibility to encourage and help each other uphold this commitment.]

আর ওদিকে দ্বিতীয় ব্যাপারটা হল, এই মুহূর্তে জোকের মুখে নুনের মতো এক উদ্যোগ। সেটা হল, আইসিসির  ( International Criminal Court, ICC) প্রধান প্রসিকিউটর ফাতোহ বেনসুদার উদ্যোগ। মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়নের কারণে তিনি যে অভিযোগের তদন্ত করতে চাইছেন তা হচ্ছে, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়-‘জনগোষ্ঠীকে বিতাড়ন বা জোর করে অন্যত্র ঠেলে সরিয়ে দেয়া’ (অনুচ্ছেদ ৭ [১] [ডি])। এই অনুচ্ছেদ অনুসারে তিনি অভিযোগ দায়ের করতে চান। আপাতদৃষ্টে অভিযোগটি হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ বা লুটপাটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে না হলেও এর তাৎপর্য এবং গুরুত্ব কম নয়, কেননা এই অভিযোগের শাস্তি ওইসব অভিযোগের চেয়ে কম নয়, প্রায় একই।

অর্থাৎ মিয়ানমারের জেনারেলদেরকে আইসিসির আদালতে তুলতে সক্ষম হতে পারার ইঙ্গিত। এই উদ্যোগের বিশেষ দিকটা হল, এতদিন  চীন বা রাশিয়ার দেয়া সবকিছুতে ভেটো মেরে মিয়ানমারের জেনারেলদেরকে আইনের আওতায় আনার সব কিছুকে আটকে ফেলা যত সহজ মনে হচ্ছিল এই প্রথম বার দেখা যাচ্ছে সেটা সম্ভবত এবার অকেজো হবে।

এমনিতেই শুরু থেকেই (ARSA) আরসা জঙ্গিদের গল্প বার্মার জেনারেলেরা সবাই কে খাইয়েছিল। আর তা ভারত, চীন এবং আমেরিকাসহ সবাই আনন্দের সাথে খেয়েছিল। কারো অরুচি লাগেনি।  বার্মার দেয়া বৈষয়িক সুবিধা বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্টের লোভে সবার কাপড় উদোম হয়ে গেছিল। সবাই জেনারেলদের ভক্ত হয়ে উঠেছিল। তাদের বানানো (ARSA) আরসা জঙ্গিদের গল্প কার আগে কে বেশি বিশ্বাস করবে সে এক প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছিল।  সবাই গল্প সহজেই মেনে নিয়েছিল যে আরসা সন্ত্রাসীদের হামলাই সব কিছুর জন্য দায়ী। কিন্তু  কেউ নিজেকে প্রশ্ন করে নাই যে তাহলে হত্যা ও ধর্ষণের ভিতর দিয়ে  সাত লাখ রোহিঙ্গাকে দেশ ছাড়া হতে হল কেন? বার্মার সেনাবাহিনীকেই বা কেন রোহিঙ্গাদেরকে বিতাড়ন করতে হবে – এই প্রশ্ন চীন বা আমেরিকাসহ কেউই তখন তুলতে চায়নি। কিন্তু আগে যেমন অসহায়ভাব দেখা যাচ্ছিল, যে কেউ একটা জঙ্গি হামলার গল্প রান্না করলেই দুনিয়ার মা-বাপ যারা তারা সবাই তাকে বিশ্বাসযোগ্যতা দেয়, কোনো প্রশ্ন করে না। এখন দেখা যাচ্ছে সেসব গল্প সবার এবার বদহজম হয়ে গেছে।

চীনের গ্লোবাল টাইমসে দাবি করা হয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে, ‘চীনের নীতি ধারাবাহিকতায় সুসামঞ্জস্যপূর্ণ’। [On the issue of the Rakhine State, China’s position is consistent]। আসলে এটা একটা মুখরক্ষার কথা, কিন্তু অসত্য কথা। তাই যদি হয় তবে চীন তখন (২০১৭ সালে) কথিত আরসা জঙ্গি হামলাকে দায়ী করে জেনারেলদের গণহত্যা ও ধর্ষণ ও বিতারণ কাজের পক্ষে সাফাই দিয়েছিল কেন? আর এখন সে সাফাই কোথায়? এখন জেনারেলেরা আপস করতেই বা রাজি কেন? কেন অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে, এই ইস্যুতে চীন নিঃশ্চুপ?

[We believe that the issue should be solved through dialogue and consultations between Myanmar and Bangladesh, and the international community should act according to the two countries’ wishes,]

এ ছাড়া এখন রোহিঙ্গাদের তাদের মর্যাদা, সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আদরের সাথে বার্মায় ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থার পক্ষে কাজ করা। এ ছাড়া যারা রোহিঙ্গাদের গণহত্যা ও ধর্ষণসহ মানবেতর অবস্থার জন্য দায়ী তাদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনা চীন কী এ দুই কাজ ও তৎপরতার বিরোধী? তাহলে কেন মায়ানমার আর বাংলাদেশের ডায়লগে সব সমাধা করতে চায় চীন?

গত চল্থ্বালিশ বছরে বার্মার সামরিক শাসকদের এই একই নিরবিচ্ছিন্ন নীতি চলে আসছে তাদের সাথে নতুন করে ডায়লগের ভিত্তি ও ভরসা কী?

বার্মার চরম মানবাধিকারের লঙ্ঘনকে আড়াল করতে চীন জেনারেলদেরকে আইনের আওতায় আনার কথা উঠলেই বার্মায় বাইরের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মনে করছে কেন? চীন অপরাধীদেরকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় আনতে চায় না, না করলে কেন তা স্পষ্ট ভাষায় চীনের বলা উচিত।

চীন কী মনে করে বার্মায় মানুষের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নটা কী সেখানে চীনের বৈশ্বিক স্বার্থের নিচে, কম গুরুত্বপুর্ণ? দেখা যাচ্ছে প্রশ্নটাকে চীন বরং দানব শাসকের ব্যক্তি ইচ্ছায় পর্যবসিত করে রাখবে, আর ওই ব্যক্তিশাসকের ইচ্ছাই রাষ্ট্রের (বার্মা বা বাংলাদেশ) সার্বভৌমত্ব বলে চালিয়ে দেবে তবে, এ চীন অচিরেই গ্লোবাল নেতৃত্ব থেকে অপসৃত হবে তা আগাম বলা যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
৫ জুলাই ২০১৮
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৫জূলাই ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) জাতিসঙ্ঘসহ শীর্ষ চার সংস্থার প্রধান যখন ঢাকায়”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা

শাঙ্গরি-লা ডায়লগ : আমেরিকার ঠাণ্ডা পানি ঢালা
গৌতম দাস
১৮  জুন ২০১৬

http://wp.me/p1sCvy-1jc

 

‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’ বা Shangri-La Dialogue। এটা প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয় এমন একটি নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলনের নাম। পুরা নাম IISS Shangri-La Dialogue। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রায়.৫০ রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের নিয়ে সিঙ্গাপুরে এর আয়োজন হয়। তাদের মধ্যে আমেরিকা, চীন, জাপান, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারত ইত্যাদি ছাড়াও এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্য অনেক রাষ্ট্রও এতে অন্তর্ভুক্ত থাকে। শাঙ্গরি-লা নামটা মূলত ইন্ট্যারনাশনাল এক চেইন হোটেল গ্রুপের। আর ওদিকে আইআইএসএস- ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। এটা ইংল্যান্ড ভিত্তিক এক থিঙ্কটাংক বা গবেষণা স্টাডি ধরনের প্রতিষ্ঠান। ব্রিটিশ আইআইএসএস ও সিঙ্গাপুর সাংরিলা হোটেলের যৌথ উদ্যোগে ২০০২ সালে জন্মের পর থেকে সিঙ্গাপুরের শাঙ্গরি-লা হোটেলে প্রতি বছর এই নিরাপত্তাবিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজন হয়ে থাকে। আর শাঙ্গরি-লা হোটেলে নাম থেকে শাঙ্গরি-লা শব্দটা ধার নিয়ে এই সম্মেলনের নামকরণ করা হয়েছে ‘শাঙ্গরি-লা ডায়লগ’। সে হিসাবে একইভাবে এবারের সম্মেলন শুরু হয়েছিল ৩ জুন ২০১৬ থেকে। চলেছিল রোববার ৫ জুন পর্যন্ত।

হংকংয়ের সবচেয়ে পুরানা এক দৈনিক পত্রিকা হল, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট। শাঙ্গরি-লা ডায়লগ প্রসঙ্গে তারা বিরাট রিপোর্ট ছেপেছে। যার মূল বক্তব্য হল, সম্মেলনের এবারেরও ফোকাস আবার সেই দক্ষিণ চীন সাগর। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে চীন ও আমেরিকা উভয়পক্ষ চাচ্ছে কোনো রেটরিক বা উচ্চবাচ্য থেকে যেন উত্তেজনা না ছড়িয়ে যায়। উভয় পক্ষ কোনোভাবেই চায় না যে সমুদ্রসীমা বিতর্ক চীন-আমেরিকান সম্পর্ককে অচল ও তেতো বানিয়ে ফেলে।
যেমন ওয়াশিংটনভিত্তিক এক থিঙ্কট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারনাশনাল স্ট্রাডিজ’-এর ড. বন্নি গ্লসার মনে করেন দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্ক ইস্যুতে চীন ও আমেরিকা প্রত্যেকেই নিজ অবস্থানে শক্ত হয়ে দাঁড়াবেন। কিন্তু কোনোভাবেই তারা উভয়েই এই মিটিংকে তাদের বিরোধ প্রকাশ বা প্রদর্শনের জায়গা বানাবেন না। গ্লসার বলছেন, “এ কথা সত্যি যে দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে আমাদের মৌলিক কিছু স্বার্থ সঙ্ঘাত আছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কোনোভাবেই শাঙ্গরি-লা ডায়লগ আমাদের বিরোধে কোনো ফয়সালা আনার স্থান নয়”।
ঐ রিপোর্ট লিখছে, “আমেরিকা চায় এই অঞ্চল শান্তি, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্য বন্ধু হিসেবে তাকে বিবেচনা করুক ও তার ওপর আস্থা রাখুক। কিন্তু একইসাথে এ অঞ্চল চীন-আমেরিকার সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রভূমি হয়ে উঠুক এটাও চায় না। এটা আমেরিকা বুঝে। তাই শাঙ্গরি-লা ডায়লগে আমেরিকার প্রচেষ্টা থাকার কথা এ দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখা”। একারণে আমরা দেখছি এই রিপোর্টের শুরুতে উপরে উধৃত এই লম্বা বাক্যটা আছে। কিন্তু তাতে একটা ছোট শব্দ আছে বাংলায় বললে তা হলো ‘আগলে ধরে রাখা’ বা ইংরাজিতে contain। বলা হচ্ছে চীন ও আমেরিকা দক্ষিণ চীন সাগর প্রসঙ্গে উত্থিত যেকোনো টেনশন আগলে ধরে রাখার পক্ষে পদক্ষেপ নিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে একমত হয়েছে।

ঐ রিপোর্ট সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও চীন-আমেরিকার সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হুয়াঙ জিং কে উদ্ধৃত করেছে। তিনি বলছেন, “চীন-আমেরিকার বিরোধ নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে, এটা দাঁড়িয়ে দেখা উভয়ের কারও স্বার্থের পক্ষে যায় না”। হুয়াঙ শাঙ্গরি-লা ডায়লগের অর্গানাইজিং কমিটির একজন সদস্যও। তিনি ভিতরের তথ্য জানাচ্ছেন, “আসলে দক্ষিণ চীন সাগর টেনশনের ইস্যু সম্মেলনের তিন দিনের পাঁচ সেশনে কখনই আনা হবে না। এর বদলে বরং শেষের দুই দিনের অনুষ্ঠিতব্য যে ছয়টা সাইড মিটিং হওয়ার কথা তার কোন একটাতে এনিয়ে কথা হবে”। অর্থাৎ মূল আলোচনায় নয় পার্শ্ব-আলোচনার বিষয় হিসেবে সাউথ চায়না সি বিতর্ক রাখা হয়েছে। হুয়াঙ বলছেন, “চীন ও আমেরিকা উভয়েই চায় তাদের অবস্থানের মতভেদকে নিচুস্বরে নামিয়ে রাখতে এবং শাঙ্গরি-লা ডায়লগের হোস্ট সিঙ্গাপুরও চায় না যে তার আয়োজিত এই সভা দক্ষিণ চীন সাগরে ইস্যুর ভেতরে হাইজাক হয়ে যাক”। অবশ্য এখানে আর এক মজার তথ্য তিনি শেয়ার করেছেন। হুয়াঙ জিং বলছেন, দিনকে দিন নিজের দাবিনামা নিয়ে চীন যেভাবে সরব অগ্রসর হচ্ছে তাতে সেটাকে আমেরিকা কী করে মোকাবেলা করবে, মুখোমুখি হবে – এ প্রশ্নে আসলে খোদ আমেরিকাতেই ‘হোয়াইট হাউজ বনাম পেন্টাগনের’ মধ্যে বিতর্ক ও মতভেদ আছে। তবে সেই বিতর্ক ও মতভেদ থাকা সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কোনোভাবেই চীন-আমেরিকার পরস্পরের দিকে থুথু ছিটিয়ে ঝগড়া করুক তা হতে দেবেন না। কারণ আগামী সপ্তাহ থেকে চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক “স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ” অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এটা উভয় রাষ্ট্রের নেয়া সিদ্ধান্তগুলোর সমন্বয়ের লক্ষ্যে প্রতিবছর নিয়মিত হয়ে আসছে। সেটার পরিবেশ নষ্ট হয়ে যাক ওবামা তা হতে দিতে পারেন না।
তাই হুয়াঙ ও গ্লসার উভয়েই নিশ্চিত করে বলছেন, শাঙ্গরি-লা ডায়লগ অনুষ্ঠানে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী এস্টন কার্টার যে নির্ধারিত বক্তৃতা রাখার কথা আছে সেখানেও এস্টনের স্বভাবসুলভ গরম বক্তব্যও নিচুস্বরে হাজির করা হবে। যেমন এস্টন কার্টার এর আগে – চীন তার দাবির পক্ষে জোরাজুরি করতে গিয়ে ‘বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার এক গ্রেট ওয়াল’ রিস্ক নিচ্ছে বলে মন্তব্য করেছিলেন। চীন এই শাঙ্গরি-লা মিটিংয়ে কোন মন্ত্রী নয় বরং এক সামরিক কর্তা এডমিরাল সান জিয়াঙগুয়ের নেতৃত্বে যোগ দিয়েছে। ফলে এমন প্রশ্নের জবাবে, এডমিরাল সান সম্ভবত নিজেদের পুরানা অবস্থানই রক্ষা করে চলবেন। এসব দিক বিবেচনা করে গ্লসার বলছেন, ‘আমি মনে করি না যে, চীনা পক্ষের আগামীকালের বক্তৃতায় আমরা নতুন কোন কথা শুনব’। এই “সাংরিলা মঞ্চ নিজের পার্থক্য নিয়ে কথা বলার একটা খুবই ভালো জায়গা, কিন্তু আসলে একটা ভারসাম্য অবস্থা বের করে আনার পক্ষেই আমাদের কাজ। সে জন্য আমি মনে করি না যে এই সভা থেকে কোনো শক্ত কথার মার বা ধারালো রেটরিক কিছুই শুরু হবে না। বিশেষত যখন চীন-আমেরিকার মধ্যেকার গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক ‘স্ট্রাটেজিক ও অর্থনৈতিক ডায়লগ’ অনুষ্ঠান যখন পরের সপ্তাহে”।
এমন ঠাণ্ডা বাতাবরণ যে ইতোমধ্যে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এর আর এক লক্ষণ হল, ভিয়েতনামের ততপরতা। দক্ষিণ চীন সাগর সমুদ্রসীমা বিতর্কে চীনের সাথে একমাত্র ভিয়েতনামের সম্ভবত সবচেয়ে তিক্ত সম্পর্কটা হয়ে গেছে। সেই ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির নৌবহরকে ভিয়েতনামের কোনো এক পোর্টে নোঙর করে অতিথির বেড়ানো বেড়িয়ে যেতে দাওয়াত দিয়েছে। ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা দফতরের মুখপাত্র সুত্রে এটা জানা গেছে।
সাউথ চাইনা মর্নিং পোষ্ট এই রিপোর্টের শেষে কিছু ছোট মজার মন্তব্য করেছে। যেমন ওই রিপোর্টে তথ্য দিয়ে বলেছে, “ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াত দিয়েছে এমন সময় যখন ভারতের দুইটা যুদ্ধজাহাজ ভিয়েতনামের ‘ক্যাম রণ বে’ বন্দর গত বৃহস্পতিবার ত্যাগ করে গেছে। এ ছাড়া পোস্টের আর একটা মন্তব্য বাক্য, ‘দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্কে কিন্তু আমেরিকার মত ভারতেও কোনো দাবি বা স্টেক নেই; ফলে বিরোধ-বিবাদের সে কোনো পক্ষও নয়’।
পোষ্টের এই মন্তব্যে অনেক কথা লুকানো আছে। সময়ের অভাবে সব এখানে আনার সম্ভব হবে না। শুধু ভিয়েতনাম চীনা নৌবহরকে দাওয়াতের এক ঘটনাই আবহাওয়া সম্পর্কে অনেক কিছুর নির্দেশক। অর্থাৎ গুমট পরিস্থিতির ভেতরে কোথাও থেকে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। না হলে এটা দাওয়াতপত্র পর্যন্ত গিয়েছে তা হতো না।
তবে এখানে আমরা গত বছরের শাঙ্গরি-লা ডায়লগের কথা স্মরণ করতে পারি। সে সময়কাল প্রায় একই ছিল, ২৯-৩১ মে ২০১৫ সাল। ইস্যুও প্রায় একই। দক্ষিণ চীন সাগরের পূর্ব দিক পূর্ব চীন সাগর চীন সীমান্তের যার অপর পাড়েই জাপান। পূর্ব চীন সাগর  নিয়ে চীন ও জাপানের সমুদ্র সীমা বিতর্ক আছে। আমেরিকার উস্কানিতে জাপান  গতবার পূর্ব চীন সাগর ইস্যুকে তেতে উঠেছিল।  গত বছরের প্রথম থেকেই এই ইস্যু নিয়ে চীন-জাপানের বিরোধ বিবাদকে তাতিয়ে তুলে চলছিল আমেরিকা । কিন্তু এবারের মত একইভাবে গতবারও আমেরিকা জাপানকে গাছে তুলে দিয়ে মই কেড়ে নেয়ার অবস্থা করেছিল। বছরের শুরু থেকেই জাপানকে দিয়ে চীনের সাথে  ঝগড়ার মুখোমুখি করিয়ে যেন এখনই যুদ্ধ লেগে যাচ্ছে এমন এক অবস্থায় এনে শেষে শাঙ্গরি-লা ডায়লগে যখন উভয়ের মুখোমুখি হয়ে গেল তখন এখানে এসে পূর্ব চীন সাগর ইস্যুতে আমেরিকার পুরা উল্টো অবস্থান। ভোল পালটে মিটিংয়ে আমেরিকানরা এবার জাপানিজদের খালি জামা টেনে ধরা শুরু করেছিল। কি জানি যদি জাপানিজরা চীনাদের সাথে যদি ঝগড়া বাধিয়েই ফেলে তবে সেটা তো আমেরিকাকেও জাপানের সাথে মিলে চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লড়তে যাওয়ার অবস্থায় গিয়ে পৌঁছাতে পারে। আর পৌঁছালে তখন কী হবে? এই আসল বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছিল আমেরিকা। অর্থাত এশিয়ায় আমেরিকার এই নীতির মূল কথা হলো যেন, কোন রাষ্ট্র বিরোধ ও স্বার্থসঙ্ঘাত দেখা দিলেই সেটাকে যুদ্ধের দিকে নিতে হবে, ঠেলে দিতে হবে। অথচ এটা তো কোনো কাজের কথা নয়। একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ভিতরে এমন নীতি বাস্তবায়ন অসম্ভব বলে একেবারে না করে দেয়া যাবে না। তবে এটা খুবই এক্সষ্ট্রীম পথ, সর্বশেষ অবলম্বন; সব পথ ফেল করার পর যা করা হয়। তাই গতবারের সাংরিলার পর আজ পর্যন্ত আমরা দেখছি খোদ জাপানসহ সবাই যেন ভুলে গেছে যে পূর্ব চীন সাগরে দ্বীপের মালিকানা নিয়ে চীনের সাথে জাপানের কোন ইস্যু ছিল।
পাঠক কেউ যেন বুঝতে ভুল না করেন। তাই কিছু কথা পরিস্কার করে বলে রাখা ভাল। তা হল, এখানে উপস্থাপিত বক্তব্যে এটা বলা হচ্ছে না যে চীন এক মহাপরাক্রমশালী হয়ে গেছে ফলে জাপান ভিয়েতনাম ইত্যাদিরা যেন চীনকে ‘লাড়তে’ না যায়! এমন ওকালতি আমরা এখানে করতে বসিনি। চীনের পক্ষে এমন খেয়ে না খেয়ে এজেন্ট বা চীনের বিদেশনীতির ব্যাগ বহনকারী দালাল সাজার আগ্রহ আমাদের নেই। এর কোনো অর্থও হয় না।
বিষয়টা হল, যুদ্ধ সম্পর্ক আমাদের দেখা বা জানা পুরানা ইতিহাসের অভিজ্ঞতার ভিতর ইতোমধ্যে এক ব্যাপক বদল ঘটে গেছে। বিশেষ করে এই সদ্য পেছনে ফেলা কোল্ড ওয়ারের কালের (১৯৫০-৯২) যুদ্ধ ধারণা। ঐ সময়ের যেকোনো দুই রাষ্ট্রের বিরোধ মানেই শেষ বিচারে আসলে তা সোভিয়েত-আমেরিকান মতাদর্শিক, রাজনীতি বা অর্থনৈতিকসহ সবকিছুতে স্বার্থবিরোধ সঙ্ঘাত। কিন্তু তবু কেবল একটা বিষয় ছাড়া সেসব বিরোধের অন্য সব দিক প্রায় সবই এখনকার মতোই । সে অমিলের দিকে সবার মনোযোগ দিতে বলব। কোল্ড ওয়ারের ওই সময়কালে যেকোনো সঙ্ঘাতের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল সেই স্বার্থবিরোধে সোভিয়েত অথবা আমেরিকা পরস্পর পরস্পরকে যুদ্ধের মাঠেই একমাত্র ফয়সালা করবে এভাবে ঠেলে দিতে পারত, সম্ভব ছিল। অর্থাৎ শত্রু মানেই নির্মূল। যেন একই কথা। নির্মুল ছাড়া শত্রু মোকাবিলা বলে আর কিছুই হতে পারেনা, এমন ধরেই নেয়া হত।  এটাই ছিল একমাত্র পথ ও লক্ষ্য। এর মাধ্যমেই যেকোনো বিরোধের মীমাংসা করতে হবে এটা সহজেই ভাবা যেত। কোনো স্বার্থবিরোধ দেখা দিলেই কূটনীতি বা ডায়লগের ন্যূনতম কথা বলার চেষ্টাও না করে তাকে শত্রু নিশ্চিহেৃর লাইনে ভাবা সম্ভব ছিল।
এমন ভাবনার মূল কারণ, দুনিয়ায় তখন ছিল দুটো অর্থনীতি। যাদের মধ্যে আবার কোনো লেনদেন বিনিময় বলতে কিছু ছিল না, এমনিভাবে দুনিয়া দুই ধরণের অর্থনীতি ও পরস্পর সম্পর্কহীন হয়ে বিরাজ করত। কেউ কারও সাথে লেনদেন বিনিময়েওর সম্পর্কে নাই। কেবল দুইটা অর্থনীতি অভ্যন্তরীণ নিজ নিজ ব্লকের ভিতর আলাদা আলাদা বিনিময় ব্যবস্থার এমন দুই জোটে বিভক্ত ছিল। ফলে একের বোমা হামলায় অপরের অর্থনীতি ও প্রাণসহ বৈষয়িক সব কিছু নিশ্চিহৃ হয়ে গেলেও তাতে বোমা আক্রমণকারীর কোনোই ক্ষতি ছিল না। যেমন, আমেরিকা পক্ষের কোনো পুঁজি পণ্য লেনদেন বিনিয়োগ অপর সোভিয়েত ইউনিয়নে কোথাও বি-নিয়োজিত ছিল না। ফলে সারা সোভিয়েত ইউনিয়ন ধ্বংস হয়ে গেলেও তাতে এর লেনদেন বিনিয়োগ প্রভাব আমেরিকায় পড়বে না। রাশিয়ায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগকারীই ছিল না বলে আমেরিকারই ফেলা বোমায় কোনো আমেরিকান বিনিয়োগ নষ্ট হবে এমন কোনো সম্ভাবনা ছিল না। আর একালে ঠিক এর উলটা। দুটো অর্থনীতি বলতে দুনিয়ায় এখন কিছু নেই, বরং আছে একটাই, একই গ্লোবাল পুজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা। ফলে এখন চীনে আমেরিকা বোমা ফেললে তাতে অবশ্যই কোনো না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ওপরই সে বোমা পড়বে। একারণে রাষ্ট্র স্বার্থবিরোধে একমাত্র যুদ্ধই করতে হবে, যুদ্ধে ফয়সালা করতে হবে অথবা এটাই একমাত্র সমাধানের পথ একথা আর সত্য নয়, বাস্তবতাও নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের (১৯৯২) পরে অথবা কোল্ড ওয়ার যুগের সমাপ্তিতে এটাই আমাদের যুদ্ধ ও স্বার্থ ধারণায় ইতোমধ্যেই এক বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে। যদিও তা আমরা অনেকেই টের পাইনি অথবা কিছু হলেও অনেকেই পেয়েছেন।
অথচ এই নতুন বাস্তবতাতেও সবাই আমাদের চোখে পট্টি পড়াতে চাচ্ছে। সবাই আমরা একালের স্বার্থ বিরোধকে সেকালে কোল্ড ওয়ার কালের চোখ দিয়ে দেখগাতে চাচ্ছে। পুরনো চশমায় যুদ্ধ পরিস্থিতি বুঝার কল্পনা করার চেষ্টা করছি। অথচ এটা ভুল, অবাস্তব। বরং এভাবে আমেরিকা যুদ্ধের ভয় দেখিয়ে নিজের যুদ্ধ বা স্ট্রাটেজিক জোটের খোলে ছোটবড় দেশকে তুলে নিতে চাচ্ছে। আর বুঝে না বুঝে এতে তাল ধরেছে ভারত। চীনের সাথে যেন ভারতের যেন একটাই সম্ভাব্য সম্পর্ক  – যুদ্ধ। আমেরিকা প্রতিবারই সারাবছর চীনের বিরুদ্ধে সে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর জন্য খুবই একটা দরকারি শক্তি এটা প্রমাণ করতে গরম অবস্থা তৈরি করে থাকে। কিন্তু শেষে শাঙ্গরি-লা সম্মেলন এলেই তাকে ক্ষেমা দিতে হয়। কারণ এটা ডায়লগের আসর। ডায়লগের আসরে হুমকি চলে না। আর যদি যুদ্ধ লেগে যায় সেটা হবে – দেশ ভিন্ন, কিন্তু  সেই ভিন দেশের কোন না কোন আমেরিকান বিনিয়োগ এর উপরে তাহলে আমেরিকাকেই বোমা মারার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমেরিকা জানে এটা এবসার্ড, এটা সে করতে পারে না। এখন কথা হল শাঙ্গরি-লা ডায়লগ এলেই সব ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দেয়া হয় কেন? ঠাণ্ডা পানিই যদি বাস্তবতা হয় তবে ভুয়া গরম সৃষ্টি করা আমেরিকার ও তার সাগরেদদের দিক থেকে এক মারাত্মক দায়িত্বহীনতা। আর এমন সাগরেদ হয়ে ভারতের নিজ জনগণকে মিথ্যা বলছে, প্রতারণা করে চলছে – কোল্ড ওয়ার যুগের মত মিডিয়া গরম করে বলে যাচ্ছে – চীন এই নিয়ে গেল সেই নিয়ে গেল। চীন ভারতের সব উন্নতির পথে বাধা! অথচ কে না জানে এটা কোল্ড ওয়ার যুগের (১৯৫০-১৯৯২) দুই অর্থনীতির সম্পর্কহীন  লেনদেন হীন সময় নয়। এখানে দুই রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধ প্রতিযোগিতা প্রতিদ্বন্দ্বীতা সবই আছে।, আবার চীন-ভারতের ঘনিষ্ঠ  বছরে ৭৩ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন আছে। কারণ তারা একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের অন্তর্গত একই অর্থনীতির দুই অংশ মাত্র। যে কারণে ঐ চীনকেই আবার মোদির “বিকাশের প্রোগ্রামের” ভারত , নিজেরর আগামির জন্য নতুন পাচ শহরের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য দায়িত্ব দিয়ে চুক্তি করেছে। আমরা নতুন ধরণে যুগে প্রবেশ করে গেছি। একে বুঝতে আমরা যেন অন্তত আশির দশকের কোল্ড ওয়ারের ধারণা ব্যবহার করে ব্যাখ্যা করতে না যাই। কারণ ওটা অচল, আনফিট।
লেখক : আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে ০৬ জুন (প্রিন্টে ০৭ জুন) ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় ওয়েবে প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার পরিবর্ধিত ও এডিট করে আবার ছাপা হল।]