সাংহাই গ্রুপ ও আফগান তালেবানদের সাথে প্রথম অস্ত্রবিরতি

সাংহাই গ্রুপ ও আফগান তালেবানদের প্রথম অস্ত্রবিরতি

গৌতম দাস

২৩ জুন ২০১৮, ০০:০২

https://wp.me/p1sCvy-2sl

 

 

SCO, সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন – এই সংগঠন শুরুর ইতিহাস বহু পুরনো। এর আজকের জায়গায় আসার পেছনে কয়েকটা ঘটনা পটভূমি হয়ে আছে। সেখান থেকে জানা যায়, এসসিও বা সাংহাই গ্রুপের আজকের ভূমিকা এবং এর সম্ভাবনা ও অভিমুখ। এসসিও (SCO) বা সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন কী ও কেন?

এমনিতেই পুরনো ইতিহাস অর্থে সাধারণভাবে বললে, সেন্ট্রাল এশিয়ার (মধ্য এশিয়া বলতে পাঁচ রাষ্ট্র বুঝায় কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান, কিরঘিজস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। যদিও এর বাইরে মঙ্গোলিয়াসহ অন্যান্য অনেক রাষ্ট্রের অংশকেও মধ্য এশিয়া বলতে বুঝানো হয়ে থাকে।) সবচেয়ে বড় প্রভাবশালী ঘটনা ঘটেছিল ইসলাম যখন বাগদাদ কেন্দ্রিক আব্বাসীয় (abbasid dynasty) খলিফা শাসন (৭৫০-১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) আমলে। আগের শাসক চীনা ‘তাং রাজবংশ’ (Tang dynasty) আব্বাসীয়দের হাতে পরাজিত হলে সেন্ট্রাল এশিয়া সদলবলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। আর দ্বিতীয় বড় প্রভাবের ঘটনা হল, কলোনি দখলদারি যখন দুনিয়ার মুল অভিমুখ ও সাম্রাজ্য শাসনের স্টাইল সেই আমলে রাশিয়ান জার এম্পায়ারের। সে আমলে ১৮৩৯-৮৫ খ্রিস্টাব্দ মধ্যে নানান যুদ্ধে রাশিয়ার প্রাচীন জার সাম্রাজ্যের সেন্ট্রাল এশিয়াকে নিজের সাম্রাজ্যের অংশ করে নেয়। যতক্ষণ না এর পালটা বৃটিশ এম্পায়ার বৃটিশ-ইন্ডিয়ার দিক থেকে পাকিস্তানের পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্থানে না পৌছেছিল।

আর একালের প্রথম ঘটনা হল, সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া (১৯৯১) যে সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য ছিল রাশিয়াসহ সেন্ট্রাল এশিয়ার ঐ পাঁচ রাষ্ট্রই। তবে রাশিয়াসহ কাজাখস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও কিরঘিজস্তান এরা সবাই এখন সাংহাই গ্রুপের সদস্য। আসলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে রাশিয়া ও চীনের উদ্যোগে এক জোট গঠন তাদের হাতে শুরু হয়েছিল ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ- এই নাম দিয়ে ১৯৯৬ সালে; তবে তখনো উজবেকিস্তান এতে যোগ দেয়নি বলে তখন ছিল পাঁচ রাষ্ট্র, তাই ‘সাংহাই ফাইভ’।

দ্বিতীয় ঘটনাটা হল, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পরে রাশিয়াকে সবচেয়ে বড় যে ভয়ে সবসময় দিন কাটাতে হত তা হল, আমেরিকা বা ইউরোপ অর্থে, পশ্চিমা শক্তি যেন ভেঙে যাওয়া সোভিয়েত থেকে আলাদা হয়ে পড়া ১৫ রাষ্ট্র বিশেষ করে, সেন্ট্রাল এশিয়ার কোন রাষ্ট্রে বন্ধুত্ব ও খাতির জমিয়ে ঢুকে না পড়ে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক বা বাণিজ্যিক ধরণের সম্পর্ক জমিয়ে এগিয়ে যেতে না শুরু করে। যদি তা পারে তাহলে প্রায় ১৮৮৫ সালের পর থেকে নিশ্চিত থাকা রাশিয়ার এশিয়ার দিক থেকে নিরাপত্তা এবার হুমকির মুখে পড়বে। তাই সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলেও রাশিয়া সবসময় চেষ্টা করে গেছে নানা উছিলা, নানান জোট, সামাজিক বা বাণিজ্যিক সম্পর্ক করে এর মধ্য দিয়ে সেন্ট্রাল এশিয়ার সাথে জড়িয়ে থাকতে। [তবে সেন্ট্রাল এশিয়া বলতে একটা রাষ্ট্রের কথা এতক্ষণ বাদ পড়ে যাচ্ছে, তা হলো তুর্কমেনিস্তান। কারণ, দেশটি সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশনের সদস্য নয় বলে উল্লেখ করা হচ্ছে না।]

এখন গুরুত্বপূর্ণ কথা, সেন্ট্রাল এশিয়ার নিজের সবচেয়ে বড় দুর্বল দিক হল এটা ল্যান্ডলকড এবং চার দিকে পাহাড় পর্বতের ভেতর ডুবে থাকা, এক কথায় বদ্ধ। এশিয়ার সর্বোচ্চ উত্তরে, গহীন পাহাড়ি অঞ্চল। ফলে যত বিদেশী শাসক এর জীবনে এসেছে শেষ বিচারে সে কলোনিপ্রভু এ যেমন সত্য, ততোধিক সত্য হয়ে যে, সেইই তার বদ্ধ-দশা বিশেষত বদ্ধ অর্থনৈতিক জীবনে প্রাণ সঞ্চারের ভূমিকা ও গতি আনার ক্ষেত্রে, ত্রাতা হয়ে কম বেশি ভূমিকা রেখেছে। সেন্ট্রাল এশিয়া গহীন পাহাড় ঘেরা অঞ্চল বলে সেকালের পশ্চিমা শক্তি ইউরোপও এদের দখলে নিতে আসতে পারেনি অথবা এটা তাদের পোষায়নি। তবু শেষ দিকে ব্রিটিশেরা একবার উঁকি মেরেছিল। কিন্তু ব্রিটিশ এম্পায়ার তার উপনিবেশ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে আজকের পাকিস্তান তথা পাঞ্জাব হয়ে আফগানিস্তানে প্রবেশের চেষ্টা চালাতেই সেন্ট্রাল এশিয়া আরো নিশ্চিতভাবে রাশিয়ার জার সাম্রাজ্যের অধীনে পোক্ত হয়ে যায়।

বলা যায়, সেই থেকে জার সম্রাটের উপনিবেশ হয়ে গিয়েছিল সেন্ট্রাল এশিয়া। এই সত্য পূর্ণ স্বীকার করেও বলা যায়, এই সম্রাট ও সাম্রাজ্যই ছিল তার একমাত্র আশার বাতি। কেন? কারণ ল্যান্ডলকড সেন্ট্রাল এশিয়ার আবদ্ধতা ঘোচানোর ক্ষেত্রে তিনিই একটু সম্ভাবনা। এখান থেকে বের করে সমুদ্রে পৌঁছানোর রাস্তা অথবা অন্য রাষ্ট্রের ভূমি পেরোনোর পর সমুদ্রে পৌঁছানোর সুযোগ কেউ যদি দেখাতে পারেন, তিনি হলেন ঐ উপনিবেশবাদী শাসক জার সম্রাট। ইতোমধ্যে জার সম্রাটের উচ্ছেদ ঘটিয়ে লেনিনের বিপ্লব (১৯১৭) হয়ে গেলেও ‘সেন্ট্রাল এশিয়া হল পুরনো জারের কলোনি’- এই সম্পর্কটাই থেকে যায় কিছুটা নতুন সোভিয়েত কাঠামোতেও। যা হোক, আজো সেন্ট্রাল এশিয়ায় যা কিছু কলকারখানা তা সোভিয়েত সূত্রের এবং তার সমুদ্র দর্শনও। আর অনেক কথার এক কথা হিসেবে বলা যায়, সোভিয়েত ভেঙে যাওয়ার পরে, এখনো সেন্ট্রাল এশিয়ার পাঁচ রাষ্ট্রের শিক্ষিত জনগোষ্ঠী অনবরত রাশিয়ান ভাষায় কথা বলতে পারেন। এটা তাদের লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা। হয়তো নিজ নিজ স্কুলগুলোতে রুশ ভাষা শেখার সুযোগ আগের মতোই তারা এখনও চালু রেখেছেন।

আর একাল? পুতিনের রাশিয়ার উদ্বেগের মূল কথা উপরে বলেছি। কিন্তু সামর্থ্য বা মুরোদ পুতিনের নেই। সেন্ট্রাল এশিয়ায় আমেরিকাসহ পশ্চিমের কোনো প্রভাব ঠেকাতে হলে আগেই ব্যাপক অর্থনৈতিক অবকাঠামো ব্যয় ও বিপুল বিনিয়োগের সামর্থ্য থাকতে হবে। তা হলেই হয়ত সেন্ট্রাল এশিয়ায় পশ্চিমা প্রভাব ঠেকানো সম্ভব। এই বিবেচনা থেকেই পুতিনের সব সামর্থের মূল উৎস হল চীন। পুতিনকে সাথে নিয়ে চীন ১৯৯৬ সালে ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ’ তৈরি করেছিল। এটা একই সাথে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং নিরাপত্তাবিষয়ক জোট হিসেবে হাজির হয়েছিল। তুলনায় আর অন্য সব জোটের কথা আমরা শুনি এরা মূলত সবগুলোই অর্থনৈতিক জোট। এছাড়া এই জোটের ক্ষেত্রে কয়েক বছরের মধ্যে আরো সহজেই আগানোর সুযোগ এর হাতে আসে।

নাইন-ইলেভেনের (২০০১) হামলার পর আমেরিকার আফগানিস্তান ও ইরাক হামলা সাংহাই উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে প্রথম ধাক্কায় মনে হলেও পরে (২০১১) বুঝা যায়, এটা আসলে আশীর্বাদ হয়েই এসেছে। তবে মনে রাখতে হবে, নাইন-ইলেভেনের আগেই ২০০১ সালের জুন মাসে আগের ‘সাংহাই ফাইভ গ্রুপ’ নিজেকে SCO, (সাংহাই করপোরেশন অরগানাইজেশন)- এই নতুন নামে ও ম্যান্ডেটে নিজেদের পুনর্গঠিত করে নিয়েছিল। এই লেখায় সংক্ষেপে এরপর থেকে একে ‘সাংহাই গ্রুপ’ লিখব।

ওবামার আমেরিকার ২০১১ সালে এসে আফগানিস্তান থেকে হাত গুটিয়ে এ দেশকে বিধস্ত করে ফেলে পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। মূল কারণ ওই যুদ্ধ অনন্তকাল অমীমাংসিত থেকে যাওয়ার দিকে চলে গিয়েছিল। এ ছাড়াও যুদ্ধের ব্যয় বেড়েই চলেছিল। এ এক বিরাট জগাখিচুড়ি। জট পাকানো এই দশা থেকে বের হওয়ার সব উপায় আমেরিকা হারিয়ে ফেলেছিল। ওদিকে যুদ্ধের ব্যয় বহন করতে গিয়ে আমেরিকা অপারগ হয়ে শুধু নিজ অর্থনীতি ভেঙে ফেলা নয়, বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দাও ডেকে এনেছিল। এই পরিস্থিতিই SCO -এর জন্য বড় আশীর্বাদ হিসেবে দেখা দেয়।

লক্ষণীয় ব্যাপার হল, ভৌগোলিক অবস্থান হিসেবে সাংহাই গ্রুপের সদস্য সবাই আফগানিস্তানের পড়শি এবং আফগানিস্তানের সাথে তাদের সীমান্ত আছে। ফলে আমেরিকা নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার পরের পরিস্থিতিতে কারা তালেবান ও প্রো-আমেরিকান আফগান সরকারকে সহায়তা করবে, কে শান্তি স্থিতিশীলতার দিকে নেবে, এছাড়া সবচেয়ে বড় কথা কারা তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনার কোন রফায় পৌঁছাতে পারবে – এমন শক্তির অনুপস্থিতি ও অভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। বলা বাহুল্য, ওই অঞ্চলের সবকিছুকে গভীর সঙ্কটে হ-য-ব-র-ল করে ফেলা আমেরিকা নিজেরও স্বার্থ ছিল এখানে। কিন্তু সে কাজে তার নিজের কোনো ভূমিকার গ্রহণযোগ্যতা কোথাও ছিল না।

স্বভাবত এই পরিস্থিতিতে চীনের নেতৃত্বে সাংহাই গ্রুপ দুনিয়াজুড়ে সবার কাছেই ‘একমাত্র ত্রাতা’ হয়ে হাজির হয়। কারণ আফগানিস্তানে পশ্চিমা শক্তির তুলনায় যে কারো চেয়ে চীন হল সবচেয়ে বড় গ্রহণযোগ্য শক্তি। এর মূল কারণ, আফগানিস্তানে একমাত্র চীনের হাতেই কোনো অস্ত্র নেই। ফলে অসহায় আমেরিকা প্রকাশ্যে চেয়েছে এবং স্বীকার করেছে চীন আফগানিস্তানে ভূমিকা নিক। সাংহাই গ্রুপ ভূমিকা রাখুক। অন্তত যুদ্ধে ভেঙে পড়া আফগানিস্তানের পুনর্গঠনে, অবকাঠামো গড়তে।

মোটামুটি ২০১৫ সাল থেকেই চীন আফগান তালেবানদের সাথে ডায়লগে এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে শুরু করেছিল। তবে এর আগেও এবং পাশাপাশি, আফগানিস্তানে সামাজিক পুনর্বাসন, পুনর্গঠনসহ বহু অর্থনৈতিক অবকাঠামো খাতে চীন বিনিয়োগ নিয়ে তৎপর হয়ে গেছিল। এ ছাড়াও আফগানিস্তানকে এখন সাংহাই গ্রুপের ‘অবজারভার সদস্য’ করে নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত ও পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রই এ বছর থেকে এর পূর্ণ সদস্য। ফলে সব মিলিয়ে আফগানিস্তান বুঝে গিয়েছিল আমেরিকার মতো চীনের হাতে অস্ত্র নেই, অথচ চীনের হাতে আছে পলিটিক্যাল নেগোসিয়েশনের সামর্থ্য ও যোগ্যতা। আর শান্তি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে যা প্রধান উপাদান, মানুষকে পুনরায় অর্থনৈতিক জীবন ও তৎপরতায় ফিরিয়ে নেয়ার বাস্তব শর্ত- বিনিয়োগ সক্ষমতা, যা একমাত্র চীনের এবং সে তা দিতে অপেক্ষা করছে।  ফলে চীনা উদ্যোগ এবং তার মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা – সহজেই কাজ করতে শুরু করেছিল। এখন শুধু কাজ করতে নয়, ফল দিতেও শুরু করেছে।

এটা টাইমস অব ইন্ডিয়ার একটা রিপোর্ট। এখানে মূল ঘটনাটা হল চীনের তালেবান ইস্যুতে অর্জন। ঘটনাটা হচ্ছে, সদ্য শেষ হওয়া এই ঈদে তালেবান বনাম সরকার যুদ্ধে এই প্রথম উভয় পক্ষ তিন দিনের অস্ত্রবিরতি পালন করেছে। তাই খবরের শিরোনাম, “Taliban agrees to unprecedented Eid ceasefire with Afghan forces”।  ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে এই প্রথম এক সত্যিকারের ঈদ অনুভব। তাঁরা এই প্রথম আত্মীয়স্বজনে মিলে ঈদ পালন করেছে। ওই রিপোর্ট লিখছে, ‘তালেবানেরা ২০০১ সালের পর এই প্রথম আফগান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে এক অস্ত্রবিরতি ঘোষণা করে। চিন্তাও করা যায় না এমন ঘোষণাটা আসে আফগান সেনাবাহিনী তালেবানদের বিরুদ্ধে তাদের তৎপরতা সপ্তাহব্যাপী স্থগিত ঘোষণা করার দু’দিন পরে। [“The Taliban announced its first ceasefire in Afghanistan since the 2001 US invasion today against the country’s security forces.  The unexpected move came two days after the Afghan government’s own surprise announcement of a week-long halt to operations against the Taliban.] তবে তালেবানদের শর্ত ছিল, এই বিরতি ‘বিদেশী দখলদার’ [আমেরিকা বা তার বন্ধুদের বুঝানো হয়েছে] জন্য প্রযোজ্য হবে না।
ইতোমধ্যে পাকিস্তানের মিডিয়া রিপোর্ট হল, পাকিস্তান ও চীনের প্রবল তৎপরতার কারণেই কেবল তালেবানেরা যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। [Afghan Eid truce ‘backed by Pakistan, China’] কারণ এব্যাপারে তালেবান নেতাদের স্পষ্ট বক্তব্য ছিল যে, “কেবল চীন ও পাকিস্তান গ্যারান্টার হলে তবেই আমরা যুদ্ধবিরতিতে যাবো। কারণ আমরা বাকিদের (আমেরিকা) বিশ্বাস করি না”।

ডিপ্লোম্যাট মহলে এখন এমন আলোচনা উঠেছে, চীন এমন এক ক্ষমতাবান মধ্যস্থতাকারীর আস্থা অর্জন করেছে যে, চাইলে এক দিকে আফগান সরকারের ওপর চাপ খাটাতে পারে, অন্য দিকে সে কারণে চাপ খাটাতে পারে তালেবানদের ওপরেও। কেন এবং কী করে এটা সম্ভব হয়েছে? কারণ, গত ডিসেম্বর থেকে আফগান-পাক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে চীন নিয়মিত ডায়লগ অনুষ্ঠান করে আসছে। ফলে স্বভাবতই এখন যেকোনো সময় আফগানিস্তানে অস্ত্রবিরতি ডাকা, নেগোসিয়েশনে বসানো আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে চীন ঘন ঘন দেখতে পা্রবে বলে সবাই আশা করছে। নিঃসন্দেহে, এটা এক বিরাট আশার আলো।

এখন এর পাল্টা ঘটনাটা স্মরণ করা যেতে পারে। ঘটনাটা হল, গত বছরের আগস্টে ট্রাম্পও তাঁর আফগান পলিসি দিয়েছিলেন। সেখানে ভারতকে আফগানিস্তানে ব্যবসার সুবিধা নিতে ডাকা হয়েছিল আর পাকিস্তানকে তালেবানদের (হাক্কানি গ্রুপ) সহায়তার দায়ে অভিযুক্ত করে সাবধান করা হয়েছিল। সাথে আমেরিকান ৮০০ মিলিয়ন ডলারের সাহায্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছিল। আসল ঘটনা ছিল অন্য।

পাক-আফগান সীমান্ত চিহ্নিতকরণ নিয়ে বিতর্ক সেই ১৮৯৩ সালের আফগান যুদ্ধ-পরবর্তী “ডুরান্ড লাইন” টানা থেকে। এটা অবাস্তাবায়িত থেকে যাওয়ার মূল কারণ মূল পশতুন বা পাঠান জনগোষ্ঠিকে ভাগ করে ফেলে এই লাইন। ফলে লাইন ফেলে রেখে সীমান্ত পোস্ট বৃটিশ আমল থেকেও বৃটিশ-ভারতের [বর্তমান পাকিস্তান] ভিতরে গাড়া হয়, তাতেও সুরাহা আসে নাই।  এ ছাড়া একালের কয়েক লাখ আফগান উদ্বাস্তু হয়ে পাকিস্তানে এসেছে, এখন তারা প্রায় স্থায়ী। ফেরার নাম নাই।  স্থানীয় পাকিস্তানিদের মতোই সব ব্যবসায় ওরা জড়িত। এসব খুবই স্পর্শকাতর ইস্যু। এর বিতর্ক খুবই গভীর কিন্তু তালেবান ইস্যু সামনে থাকাতে এর আড়ালে তা কাজ করে থাকে।  খুব সম্ভবত আগাম পদক্ষেপ হিসেবে পাকিস্তান আফগানিস্তানে নিজ প্রভাব তৈরির কথা ভেবে কিছু তৎপরতা পরিচালনা করে থাকে। তাই আফগান তালেবানদের হাক্কানি গ্রুপের সাথে পাকিস্তান বিশেষ সম্পর্ক রাখে। এটাকেই ট্রাম্প প্রচার করেছেন যেন ‘পাকিস্তানের প্ররোচনাতেই তালেবানেরা তালেবান হয়েছে’- এমন প্রপাগান্ডায় শামিল হয়ে। অপর দিকে, এটাই ট্রাম্পের সাথে ভারতের নীতির মিল। ‘পাকিস্তান মানে তালেবান’- এই প্রপাগান্ডা ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে মাইলেজ দেয়। ট্রাম্পের এই প্রপাগান্ডা যেন বলতে চায়, পাকিস্তানই টুইন টাওয়ারে হামলা করেছিল। পাকিস্তানই তালেবানের জনক। অথচ কঠিন বাস্তব তা হল, ১৯৭৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের আফগানিস্তান দখলের প্রতিক্রিয়া থেকে পাকিস্তান আমেরিকার ইচ্ছায় বাধ্য হয়ে তালেবান দায় নিয়ে আমেরিকার প্রক্সি যুদ্ধ করে গেছে, যাচ্ছে।

যা হোক, ট্রাম্পের আমেরিকার পাশাপাশি চীনা কূটনীতির অ্যাপ্রোচ লক্ষণীয়। চীন শুরু করেছে পাক-আফগান অমীমাংসিত বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা থেকে এবং তাদের ডায়লগ এখান থেকেই। ট্রাম্পের মত পাকিস্তানকে তালেবান বলে গালি দিয়ে, সব দায় চাপিয়ে ওরা শেষ করেনি।
এ ঘটনা থেকে এটা স্পষ্ট, গ্লোবাল এম্পায়ার বা লিডারের কিছু ভূমিকায় ইতোমধ্যেই চীন আমেরিকাকে সরিয়ে জায়গা নিয়ে ফেলেছে, ক্রমশ আগিয়ে আসছে চীন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২১ জুন ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “সাংহাই গ্রুপ ও তালেবানের প্রথম অস্ত্রবিরতি”  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

আমেরিকার উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে স্বাগত জানানো উচিত

গৌতম দাস

২২ আগস্ট ২০১৭,  মঙ্গলবার, ০০ঃ১১

http://wp.me/p1sCvy-2hc

 

সম্প্রতিকালে সামগ্রিকভাবে চীনের সামরিক শক্তি বিশেষত নৌশক্তি চোখ টাটানোর মত বেড়েছে। আর তা নিয়ে আমেরিকার মধ্যে উদ্বিগ্নতা তৈরি করেছে। সাপ্তাহিক লন্ডন টাইমসের ভাষায়, চীনের শক্ত নেভি সক্ষমতা গড়ে তোলা আমেরিকার অফিসিয়ালদের উদ্বিগ্ন করেছে। “China’s naval build-up worries American officials”। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে ইকোনমিস্ট বলছে, আমেরিকার এতে উদ্বিগ্ন না হয়ে চীনকে বরং স্বাগত জানানো উচিত। কেন?

ব্যাপারটা হল, গ্লোবাল পরিসরে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র- এ তিন শক্তির মাঝে পারস্পরিক শত্রুতা আছে। আবার সেই সাথে বন্ধুত্ব না হলেও কে কার কতটুকু কাজে আসে, আসছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইতোমধ্যে চীনের পিএলএ মানে ‘পিপলস লিবারেশন আর্মির’ ৯০ বর্ষপূর্তি খুবই ঘটা করে পালিত হলো গত ৩০ জুলাই। এই পিএলএ (PLA) হল চীনের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর নাম। বিগত ১৯২৭ সাল থেকে ক্ষমতা দখলের জন্য চীনা কমিউনিস্ট পার্টির গঠিত সশস্ত্র রাজনৈতিক সংগঠনই হল এই পিএলএ। জন্মের ২২ বছর পরে ১৯৪৯ সালে চীনা কমিউনিস্ট বিপ্লবের বিজয়ের পরে ঐ সংগঠনই নয়াচীনের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী হিসেবে জায়গা নেয়। সেই পিএলএ’র ৯০তম বার্ষিকী এবার খুবই ঘটা করে পালন করা হল।

এর প্রধান উদ্দেশ্য, চীনের এতদিনের অর্থনৈতিক উত্থান নিশ্চিত হওয়ার পর সে ফলাফল ও সক্ষমতা ব্যবহার করে একটু একটু করে চীনের সামরিক সক্ষমতাও বাড়ানো হচ্ছিল। কিন্তু এই নিজের সামরিক সক্ষমতা কী কী অর্জিত হয়েছে, এরই এক প্রদর্শনী করা হল। এর বিশেষ তাৎপর্য আছে। ইতোমধ্যে যুদ্ধবিমান বহনকারীর কোন যুদ্ধজাহাজ চীনের ছিল না, যেটা সে অর্জন করেছে। এরকম আরও বহু কিছু যেগুলো আগে আমেরিকার আছে দেখে নিজেদেরও একদিন হবে বলে চীনারা স্বপ্ন দেখেছিল।  আসলে পিএলএ এবারের ৯০তম বার্ষিকী জাঁকজমক করে পালন করে এটাই দেখাতে চেয়েছে যে, গত ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তারা চীন অর্থনৈতিক পরাশক্তি হওয়ার দিকে মনোযোগ নিবদ্ধ রেখেছিল  এবং ইতোমধ্যেই তা অর্জিত হয়েছে। এবার সেই সামর্থ্য খরচ করে সামরিক শক্তি কতটুকু হয়েছে তাই প্রদর্শন করতে নেমেছে তারা।

গত ২৯ জুলাই লন্ডনের ইকোনমিস্ট সাময়িকী এসব বিষয় নিয়ে দুটো বিশেষ আর্টিকেল ছেপেছে।  যার প্রথমটা মূলত এই ইস্যুতে তবে চীন-আমেরিকা সম্পর্কে ফোকাস করে। আর পরেরটা চীন-রাশিয়ার সম্পর্কের দিক থেকে।  ইকোনমিস্ট লিখেছে, ‘ চীনা নেভির এই সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আমেরিকা উদ্বিগ্ন। কখনো কোনো একটা সপ্তাহ বাদ যায়নি যে, চীনাদের একটা না একটা সামরিক সক্ষমতার অগ্রগতির খবর সেখানে নেই। গত এপ্রিলে তারা স্থানীয়ভাবে তৈরী এয়ারক্র্যাফট ক্যারিয়ার যুদ্ধজাহাজ ভাসিয়েছে। আর জুনে আমেরিকার সমতুল্য ১০ হাজার টনের এক ডেস্ট্রয়ার ভাসিয়েছে। আর এ মাসে চীনা সৈন্য বোঝাই করে যুদ্ধজাহাজ সুদূর আফ্রিকার জিবুতি রওনা হয়েছে। জিবুতিতে জায়গাজমি লিজ নিয়ে এই প্রথম নিজ সীমানার বাইরে চীনা এক সামরিক ঘাঁটি চালু করা হল। আর এই সপ্তাহে রাশিয়ার সাথে যৌথভাবে বাল্টিক সাগরে (সুইডেন, ডেনমার্ক বা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো যার উপকূলে) যৌথ সামরিক মহড়া করেছে চীন।’ ইকোনমিস্টের মতে, স্বভাবতই এটা চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির মহড়া প্রদর্শন। [নিচের এক প্যারা জিবুতি সম্পর্কে নোটটা বাড়তি আগ্রহিদের জন্য। যারা সময় বাঁচাতে চান তাদের না পড়লেও চলবে।]

[জিবুতি প্রসঙ্গে একটা ছোট নোট দিয়ে রাখা ভাল। জিবুতি (Djibouti) আফ্রিকা মহাদেশের অংশ। লোহিত সাগর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেকে ভাগ করেছে, মাঝখান দিয়ে প্রবাহিত হয়ে। মধ্যপ্রাচ্য অংশে ইয়েমেন আর এপারে জিবুতি। আফ্রিকার অংশ সোমালিয়ার উপরের জিবুতির অবস্থান। প্রাচীন সোমালিয়ার আরব মুসলিম জনগোষ্ঠির অংশ ছিল জিবুতি, পরে ফরাসী উপনিবেশ হয়। আর তা থেকে স্বাধীন হয় ১৯৭৭ সালে। খুবই ছোট ভুখন্ড জিবুতির, বাংলাদেশের চারভাগের একভাগ।  আর জনসংখ্যা মাত্র নয় লাখ। মধ্যপ্রাচ্যের মরুভুমির মত গরমের দেশ বলে দুপুরে সব কাজকর্ম ১২টা থেকে বিকেল চারটা বন্ধ রাখতে হয়, পরে আবার সব খুলে। গুরুত্বপুর্ণ যেটা তা হল এই জিবুতিতে একা চীনের ঘাঁটি নাই, বরং চীনের ঘাটিটাই সবার শেষে স্থাপিত হল। সবার বড় আর আগের ঘাটি যাদের তারা হল, আমেরিকার ও ফ্রান্সের। পরে একালে সৌদি আরবের আর শেষে চীনের। এককথায় বললে এই ঘাঁটি স্থাপন নিয়ে চীনের উদ্দেশ্যে নিজের নৌ-চলাচল – এই বাণিজ্য স্বার্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।  তা নৌদস্যু বা জলদস্যু হতে পারে কিংবা অন্য রাষ্ট্র এসে চীনের নৌ-চলাচল পথ অবরোধ করতে চাইতে পারে। অর্থনৈতিক পরাশক্তি হয়ে গেলে এসব সামরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন বাণিজ্য স্বার্থের অংশ হয়ে যায়। আমেরিকা জিবুতিতে তার ঘাঁটি রাখার জন্য জিবুতিকে  বছরে লিজের ভাড়া দেয় ৮০ মিলিয়ন ডলার, আর চীনারা একালে চুক্তি করেছে বলে সে দেয় ১০০ মিলিয়ন ডলার। ওদিকে সোদিরা ইরানের ভয়ে ভীত হয়ে ঐ জিবুতিতে ছোট ঘাটি তৈরি করেছে একালে। ইয়েমেনের হুতিদের সাথে ইরানের যোগাযোগ স্থাপন সাথে রসদ এবং নানান টেক ইকুইপমেন্ট পাঠানো হচ্ছিল এই পথে তা রুখে দিতে সৌদি অবস্থান।  আর আমেরিকার ইরাক-আফগানিস্তানের যুদ্ধে অনেক যুদ্ধবিমান জিবুতি থেকে অপারেট করিয়েছিল। ওদিকে ইথিওপিয়া-ইরিত্রিয়া এক রাষ্ট্র ছিল ১৯৯৩ সালের আগে পর্যন্ত। প্রতিশ্রুতি অনুসারে ইথিওপিয়া আপোষে ইরিত্রিয়াকে আলাদা হতে দিলে তাদের দুইটা বন্দরই ইরিত্রিয়ার ভুখন্ড ভাগে পড়ে। ক্যাচালে না থাকতে চেয়ে ইথিওপিয়া দুইটা সমুদ্র বন্দরের দাবি ছেড়ে দেয়। আর জিবুতির বন্দর ব্যবহারের জন্য জিবুতি-ইথিওপিয়া  এক স্থায়ী চুক্তি করে। জিবুতি ইথিওপিয়াকে পেশাদার পোর্ট সার্ভিস দেওয়ার জন্য নিজের পোর্ট পরিচালনার দায়িত্বে দুবাই পোর্ট অথরিটিকে ভাড়া করে এনেছে। সব মিলিয়ে এতে জিবুতির ভালই আয় হয়। এই হল সংক্ষেপে জিবুতি।]

কোল্ডওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা স্বদেশপ্রেম একালে অচল কেন?
সাধারণত আমাদের মধ্যে যে জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম কাজ করে, তা গড়ে উঠেছে গান্ধীবাদীদের ‘বিদেশী কাপড়ে আগুন লাগাও আর দেশী চরকায় সুতা কাটো’ এর অনুসরণে। অর্থাৎ মনে করা হয়, বিদেশী মানে খারাপ, দেশী মানেই ভালো বা কাম্য। কোন জটিল জিনিষ নয়, ব্যাপারটা সহজেই বুঝা যায়।  এই চিন্তা কাঠামোতেই কোল্ড ওয়ার যুগেও (১৯৫০-১৯৯২) জাতীয়তাবাদী স্বদেশপ্রেম চর্চা হয়েছে। আর ওদিকে  কোল্ড ওয়ার মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে দুনিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকা এই দুই পরাশক্তির দুই ব্লকে ভাগ করে সব রাষ্ট্রকেই কোন না কোন ব্লকের সমর্থক হতে বাধ্য করা। আর এরপর পরস্পর ঠিক যুদ্ধ নয়, কিন্তু সব সময় একটা যুদ্ধের রেষারেষি জীবন্ত রেখে তারা চলত, ফলে তা এক ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’ যেন। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে এই ব্লক পরিস্থিতির অবসান হয় এবং দুনিয়া আমেরিকার ‘একক’ পরাশক্তির কবলে চলে যায়। ফলে এর পর থেকে স্বজাতিবোধ ও দেশপ্রেম আর কোল্ড ওয়ারের পটভূমিতে তৈরি নয়, হয় নাই। আর তাতে আগে ও পরের জাতীয়তাবোধ, স্বদেশপ্রেম মধ্যে বহু ফারাক এসে গেছে।

যেমন- কোল্ড ওয়ারে কেউ যদি  শত্রুরাষ্ট্র হয়, এর মানে তার সাথে আর কোনো সম্পর্ক নাই; অর্থনৈতিক বাণিজ্যসহ কোনো ধরনের সামাজিক লেনদেন নেই। কোল্ড ওয়ারে দুনিয়া মূলত তা বিভক্ত হয়ে থাকত দুনিয়া ব্যাপী দু’টি আলাদা অর্থনীতির ব্লকে। কিন্তু যখন থেকে কোল্ড ওয়ার ভেঙ্গে গেছে, এমন দুনিয়ায় আমরা বাস করতে শুরু করেছি, তখন থেকে  অর্থনীতির দুই ব্লকও ভেঙ্গে গেছে। বদলে সব রাষ্ট্রের অর্থনীতিই  একই- ‘এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমে’ অন্তর্ভুক্ত ও কানেকটেড হয়ে গেছে। ফলে সেই থেকে বাণিজ্য বিনিয়োগের কেনাবেচাসহ সব ধরনের লেনদেনের এক গ্লোবাল সমাজে আমরা ঢুকে গিয়েছি, বাস করছি। ফলে একালে অন্য কোন রাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য বিনিয়োগে খুব ভাল সম্পর্কের পাশাপাশি ঐ রাষ্ট্রের সাথে আবার যুদ্ধ লাগার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে বটে।

তবে সে ক্ষেত্রে স্বভাবতই যুদ্ধ বড় বাস্তবতা হয়ে উঠলে বাকি সব সম্পর্ক অন্তত সাময়িকভাবে স্থগিত ও চাপা পড়ে যাবে, সব বন্ধ হয়ে যাবে। তবে ভবিষ্যতে যদি তা থিতু হলে আবার সব সম্পর্ক শুরু হতে পারে। আবার একালে কোনো যুদ্ধ লেগে যাওয়া পরিস্থিতি দেখা দিলে ঐ সম্ভাব্য যুদ্ধকে  দেরি করিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে বাণিজ্য বিনিয়োগ সম্পর্ক একটা  ভুমিকা থাকতে পারে, উছিলা হিসাবে দাঁড়ায় যেতে পারে। এছাড়া যে দেশে বোমা ফেলা দরকার মনে করছি, সে দেশে আমার নিজেরই ব্যবসা-বাণিজ্য বিনিয়োগ থাকলে বোমা ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হতে হবে। এসব সমস্যাগুলো কোল্ড ওয়ারের যুগে ছিল না। ফলে যুদ্ধ লড়ার সিদ্ধান্ত নেয়া তখন সহজ ছিল। একালে যুদ্ধ লাগিয়ে দিব নাকি বাণিজ্য স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে দেখব, কোনটা আসলে নিজের জন্য উত্তম, এসব বিবেচনা করে তবেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে একালে এবং স্বভাবতই তা জটিল কাজও; অনেক চিন্তাভাবনা করে সে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। একালে নিজ দেশের স্বার্থ কোনটা তা ঠিক ঠিকভাবে বুঝতে পারা সহজ হয় না। অনেক চিন্তাভাবনা করার দরকার হয়। আমরা সবাই এখন এমন দুনিয়াতে বসবাস করি। ফলে পুরনো বোধ নিয়ে চলে দেশের ভাল করতে চেয়ে উল্টো খারাপ করে ফেলারও সম্ভাবনা আছে। তাই কোল্ড ওয়ারের জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম একালে অচল।

অতএব একালে চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার সম্পর্ক এক দিকে বাণিজ্য বিনিয়োগের, একই সাথে তা সম্ভাব্য যুদ্ধেরও হতে পারে- এই আলোকে দেখতে ও বুঝতে হবে। এখানে একই সম্ভাব্য শত্রুর সাথে গভীর বাণিজ্য-স্বার্থের সম্পর্ক হয়, থাকতে পারে এবং থাকাই সবচেয়ে স্বাভাবিক। ইকোনমিস্ট বলছে, চীন-রাশিয়ার কমন শত্রু হল পশ্চিমা স্বার্থ, বিশেষ করে কমন শত্রু হল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা এখনও গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের পুরনো বা চলতি যে ব্যবস্থা, এর নেতা, তুলনায় চীন নতুন সাজানো হবে যে ব্যবস্থা ধীরে ধীরে জাগছে যে এর নেতা। ফলে আমেরিকার নেতৃত্ব-কর্তৃত্ব চ্যালেঞ্জকারী হলো চীন ও তার সহযোগী রাশিয়া। তবে আমেরিকাকে চ্যালেঞ্জের মুরোদ রাশিয়ার অর্থনীতির নিজের নয়, নেইও। তবে চীন বিজয়ী হলে তাতেই রাশিয়ারও লাভ, এই হলো সূত্র। ফলে এক ‘কমন এনিমি’র ধারণা। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমের অবরোধ চলছে, তা জারি আছে; এখানে ইকোনমিস্ট সে বাস্তবতার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।

পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকার অভিযোগ, রাশিয়া জবরদস্তি করে ইউক্রেনের ভূমি দখল করে আছে। তাই আমেরিকার নেতৃত্বে পশ্চিম জগৎ রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে রেখেছে। অবশ্য এখানে ইউক্রেনের ভূমি বলতে তা সরাসরি ইউক্রেন নয়, এ ক্ষেত্রে আসলে ক্রিমিয়া বলে আলাদা প্রদেশের কথা বলা হচ্ছে। সোভিয়েত ভেঙে (১৯৯১) যাওয়ার পরে আপোষ আলোচনায় ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের সাথে যোগ করে দেয়া হয়েছিল, যদিও সেটি স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ থাকবে বলা হয়। ফলে আইনি সম্পর্কের দিক থেকে ক্রিমিয়া ইউক্রেন রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। পরে ইউক্রেন ন্যাটোতে যোগ দিলেও কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু পশ্চিমারা জোর দেয়, প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে রাশিয়া বাদে যে ১৪টি রাষ্ট্র হয়েছে, সেগুলোর ওপর রাশিয়ার প্রভাব শূন্য করে দিতে হবে। আমেরিকা ও ইউরোপের এই কৌশলগত অবস্থান সব জটিলতা তৈরি করেছে।  এই নীতির ফাঁদে ইউক্রেন ঝুঁকতে চাইলে রাশিয়া ক্রিমিয়া উপদ্বীপ নিজের দখলে নিয়ে নেয়। আর রাশিয়া নিজের পক্ষে ক্রিমিয়ায় একটা কথিত গণভোট করিয়ে নেয়। ফলে সারকথায় অন্যের ভুমি দখল বলতে যা বুঝায় এটা তেমন কোন সোজাসাপ্টা ‘ইউক্রেনের ভূমি’ দখল নয়।

কিন্তু ইকোনমিস্ট বলছে, রাশিয়াকে পশ্চিমের অবরোধ আরোপ করে রাখার এক পালটা কাফফারার দিক আছে। এটাই রাশিয়াকে চীনের সাথে লেপ্টে থেকে যেতে বাধ্য করেছে। কারণ চীনের সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাশিয়ার গ্যাস-তেল চীনকে বিক্রি করা আর চীনা বিনিয়োগ নিয়ে আসা- এভাবেই রাশিয়া সেই থেকে অর্থনৈতিকভাবে টিকে আছে। কিন্তু ইকোনমিস্ট ‘ চীন কেন ইউক্রেন নিয়ে কথা বলে না’, অপর দিকে ‘রাশিয়া কেন দক্ষিণ চীন সাগর চীনা দখলে রাখার বিরুদ্ধে কথা বলে না’, এগুলো উল্লেখ করে  একটা ‘নৈতিকতা ভঙ্গ হয়েছে’ বলে পশ্চিমের স্বার্থের পক্ষে সাফাই দিতে চেয়েছে। ব্যাপারটাকে পুরান কমিউনিস্টদের উপরে ইকোনমিস্টের  পুরান রাগ-বিরাগ অথবা আমেরিকার নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্থনীতি ব্যবস্থার প্রতি তার পক্ষপাতিত্ব – এর বেশি অন্য কোনভাবে ব্যাখ্যা করার মত কিছু পাওয়া যায় না।

এভাবে ইকোনমিস্ট চীন, রাশিয়া ও আমেরিকার পারস্পরিক সম্পর্ক ও দ্বন্দ্বকে ব্যাখ্যা করেছে। কিন্তু সবশেষে আপাত উল্টো এক কথা বলেছে। বলছে, চীনের সামরিক সক্ষমতা বিশেষ করে নেভির সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং তা প্রদর্শনে আমেরিকার ভীত হওয়া উচিত নয়। কেন? অনেকের কাছে ব্যাপারটা স্ববিরোধী মনে হতে পারে। কিন্তু ইকোনমিস্টের যুক্তি কী? আর কেনই বা এ কথা বলছে?

ইকোনমিস্ট নিজেই সাফাই দিয়ে বলছে, ‘রাশিয়া চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে কথা সত্য, কিন্তু একই ধরনের অস্ত্র চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকেও বিক্রি করে। আবার চীনা প্রেসিডেন্ট রাশিয়ার ওপর পশ্চিমের আরোপিত অবরোধ উপেক্ষা করে রাশিয়াকে সাহায্য, বাণিজ্য সম্পর্ক করে থাকেন। কিন্তু তা তিনি করেন কারণ চীনের পুরনো বড় পড়শি রাশিয়ার সাথে চীন একটা থিতু সম্পর্ক চায় বলে।  অতএব চীন কোন সুদূরে ইউরোপের বাল্টিক সাগরে রাশিয়ার সাথে নৌ-মহড়া করেছে বলে তাতে ভয় না পেয়ে আমেরিকার বরং স্বাগত জানানো উচিত। চীনের যুদ্ধজাহাজ কোন সুদূরে গিয়ে অপারেট করলেো তা এক সম্পূর্ণ সঠিক কাজ। কারণ “গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ার” হিসেবে এটা চীনের এক বৃহত্তর ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া; বাণিজ্যের নৌচলাচল পথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে চীনেরও কিছু গ্লোবাল ভূমিকা ও দায় নেয়া উচিত। কারণ এই নিরাপত্তা প্রদানের ওপরই গ্লোবাল অর্থনীতি বাণিজ্য নির্ভর করছে।

ইকোনমিস্ট নিজেই আরও সাফাই দিয়ে বলছে যেমন – “চীন ইতোমধ্যেই জিবুতির ঘাঁটি থেকে জলদস্যুবিরোধী অভিযান পরিচালনা করে আসছে। এভাবে এডেন উপসাগরের আশপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে”। ইকোনমিস্ট তার লেখায় এই অংশের উপশিরোনাম দিয়েছে ‘দায়িত্ববোধের চর্চা’  বা (Exercising responsibility)। তবে সবশেষে ইকোনমিস্ট আমেরিকার এম্পায়ার ভূমিকার পক্ষে থেকেছে। বলেছে, “চীন  এখন এই সুদূরে নৌবহর নিয়ে এসেছে। ফলে এখন আমেরিকা কেন এশিয়ায় নৌ-উপস্থিতি রেখেছে বা রাখে, তা এখন চীনারা সহজে বুঝবে। গ্লোবাল বাণিজ্য বিনিয়োগের বৃহত্তর দিক এই স্বার্থরক্ষার দায় তো নিতেই হবে”।

তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? ইকোনমিস্ট আসলে কী বলতে চায় ? কথা খুব সহজ। প্রথমত, তারা আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে কথা বলছেন না।

আমাদের অনেকের কাছে ব্যাপারটা আজব লাগছে হয়ত। কারণ আমরা ধরে নিয়েছি, ইকোনমিস্ট ত আমেরিকান রাষ্ট্রস্বার্থে কথা বলছে ও বলবে। না তা বলছে না।  তাহলে কার পক্ষে কথাগুলো বলছে?  ইকোনমিস্ট এখানে  দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কার্যকর ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে কথা বলছে। এটা সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রস্বার্থ নয়। এ জন্য সে বারবার ‘বৃহত্তর’ বা ‘গ্লোবাল ইকোনমিক পাওয়ারের লার্জার পার্টের’ ভূমিকার কথা টানছে।

একই ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ ভেতরে এখানে কাছাকাছি বা দেখতে একই মনে হয়, কিন্তু তা নয় এমন তিনটা  আলাদা স্বার্থ আছে। সেগুলো হল যেমন – রাষ্ট্রস্বার্থ (যেমন আমেরিকান রাষ্ট্র), কোনো সুনির্দিষ্ট করপোরেশন বা ব্যক্তি পুঁজি মালিকের স্বার্থ আর সাধারণভাবে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম এই ব্যবস্থার স্বার্থ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সাধারণভাবে নিজস্ব অভিন্ন এই স্বার্থ, যেটা অনেকটাই গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থের ভেতর দিতে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়। অর্থাৎ আমেরিকার রাষ্ট্রস্বার্থ আর ওয়াল স্টিটের গ্লোবাল পুঁজিবাজারের স্বার্থ সব সময় এক নয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিটের  নেতা বড় প্রভাবশালী কোম্পানী গোল্ডম্যান স্যাসে (Goldman Sachs) এর  পরামর্শেই চীন (আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের প্রতিদ্বন্দ্বী) ব্রিক ব্যাংক (BRICS) চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল।

ওয়াল স্ট্রিট তাই আসলে আমেরিকায় অবস্থিত হলেও সে কোনো রাষ্ট্রস্বার্থের পক্ষে নয়; এমনকি রাষ্ট্রস্বার্থ, সীমানা, সার্বভৌমত্ব ইত্যাদি সব উবে যাক যাতে পুঁজি অবাধ চলাচল করতে পারে – এটাই এর মনোভাব।

ইকোনমিস্ট ‘গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের’ স্বার্থের পক্ষে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। তার এই স্বার্থ, চীন পাহারা দিচ্ছে না আমেরিকা, তাতে তার কিছু আসে-যায় না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ২১ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]