ইরানের ঘাড়ে চড়ে ট্রাম্পের সৌদি সফর ও অস্ত্র ব্যবসা

ইরানের ঘাড়ে চড়ে ট্রাম্পের সৌদি সফর ও অস্ত্র ব্যবসা

গৌতম দাস

৩০ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:০৩

http://wp.me/p1sCvy-2fK

 

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম বিদেশ সফর সমাপ্ত করলেন। নয়দিন ব্যাপী এই সফর ট্রাম্পের সৌদি আরব সফর দিয়ে শুরু হয়ে বেলজিয়াম  সফর দিয়ে শেষ হয়েছে। বেলজিয়াম বলা হলেও এটা আসলে ছিল আমেরিকার ইউরোপের বন্ধুদের সাথে নীতি সমন্বয়ের সফর যেখানে অন্তর্ভুক্ত গ্রুপ সেভেন ( G7, মানে শীর্ষ সাত বড় অর্থনীতির রাষ্ট্রজোট বা ক্লাব)  এর মিটিং, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে মিটিং আর ন্যাটোর সাথে মিটিং।

চলতি মে মাসের ২০-২১ তারিখে ছিল ট্রাম্পের রাজকীয় সৌদি আরবে সফর। এটা সেই একই ট্রাম্প, যিনি গত ২০ জানুয়ারি প্রেসিডেন্টের শপথ নিয়েই তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘মুসলিম ব্যান’ বাস্তবায়নে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, সব মুসলমানদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করবেন। কিন্তু বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সেটা তাঁর মুরোদে না কুলালেও অন্তত সাত মুসলমান দেশ থেকে রওনা দিয়ে এসে আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছিলেন তিনি। তবে তিনি তার সেই আদেশও টিকাতে পারেননি। আমেরিকান আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে সেটা রদ হয়ে যায়, এবং পরপর তা দু’বার। সেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মুসলমানদের খুবই গুরুত্বপুর্ণ দেশ, সৌদি আরব সফরে গেছিলেন। তাঁকে যেতেই হয়েছিল, সবই ভাগ্যের পরিহাস! কারণ প্রেসিডেন্ট হিসাবে তার প্রথম বিদেশ সফর এই সৌদি আরবেই। আর আমেরিকান সরকারের জন্য খুবই লোভনীয় কিছু সেখানে হাজির হয়েছিল, তাই।  ফলে কী ছিল এই লোভনীয় সফরে?

মাত্র ২৫ বছর ব্যবধানের (১৯১৪ আর ১৯৩৯) দুনিয়া দুই বিশ্বযুদ্ধ দেখেছিল।  দুনিয়ার ইতিহাস ভুগোলের আগা-পাশ-তলার বহু কিছুই উল্টেপাল্টে দিয়েছিল সে যুদ্ধ। বিশেষ করে ইসলামি জনগোষ্ঠীর সর্বশেষ এক খলিফার শাসনাধীন অটোম্যান সাম্রাজ্যকে প্রথমে ভেঙে দুই বড় টুকরোয় ভাগ করে নিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিজয়ী ততকালীন ব্রিটিশ আর ফরাসি সরকার। এরপর দুই অংশেরই তস্য টুকরো টুকরা করা শুরু করেছিল। ব্রিটিশ অংশ থেকে এক বড় টুকরা ভাগ নিয়ে আজকের রাজতান্ত্রিক সৌদি আরব রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা (আবদুল-আজিজ আল-সৌদ) ইবনে সৌদের হাতে ১৯৩২ সালে রাজতন্ত্রী সৌদি আরব রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়েছিল। অবশ্য তাহলেও আমেরিকার সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের শুরু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষে, ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বিশ্বযুদ্ধের প্রায় শেষের দিকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট মিসর সফরে এসে কিছু আরব নেতার সাথে দেখা করেছিলেন। সে সময় বাদশাহ ইবনে সৌদ আর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের মধ্যে প্রথম শীর্ষ বৈঠক হয়েছিল সুয়েজ খালে নোঙর করা আমেরিকান যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস কুইনসে বসে। সৌদি-মার্কিন সম্পর্ক অনেক পুরনা, সৌদি আরবের জন্মের মাত্র ১৩ বছর পর থেকে যা এখনও বর্তমান। সিঙ্গাপুরের প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘এশিয়ান টাইমস’ গত ১৮ মে সংখ্যায় এসব পুরনো ইতিহাস স্মরণ করেছে।
এক রাজকীয় রেওয়াজের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, সৌদি বাদশাহ এক কাপ কড়া সৌদি কফি পান করতে দিয়েছিলেন তার বিশেষ অতিথি প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টকে। প্রেসিডেন্ট শান্তভাবে সে কফি পান করার পরে রাজা ওই কাপ মেঝেতে আছড়ে ভেঙে ফেলে বলেছিলেন, “আপনি আমার কাছে খুবই বিশেষ একজন। তাই এই কাপ আপনার পর আর কেউ যেন ব্যবহার করতে না পারে তাই ভেঙে ফেললাম”। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এই নায়ক রুজভেল্ট দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে ওই সফরের দু’মাসের মাথায় সিটিং প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায়ই মারা যান; তবু বলা যায়, এই রিচুয়াল দিয়ে সৌদি-আমেরিকান সম্পর্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা ভালোভাবেই কার্যকর হতে পেরেছিল। এশিয়ান টাইমস লিখছে, “ইবনে সৌদের সাথে রুজভেল্টের চুক্তি হয়েছিল যে, সৌদি তেলের বিনিময়ে আমেরিকা ইবনে সৌদ ও তার উত্তরাধিকারীদের সৌদি সরকারগুলোর সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করবে”। (In exchange for Saudi oil, the Americans promised to support the kingdom, militarily and politically, under Ibn Saud and all of his successors. )। পরে এই সম্পর্ক আরেক উঁচুপর্যায়ে পৌঁছেছিল প্রেসিডেন্ট নিক্সনের আমলে ১৯৭৪ সালে। বলা ভালো, ১৯৭৩ সালের অক্টোবর শেষ আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে আরবদের হার হয়েছিল আর এর প্রতিক্রিয়ায় পরের ছয় মাস ধরে তেল অবরোধ চলেছিল।
ইসরায়েল সমর্থক আমেরিকা ও তাদের বন্ধু অন্য রাষ্ট্রগুলোকে জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে রাখা হয়েছিল এই তেল অবরোধে। এই অবরোধের সমাপ্তিতে নতুন চুক্তি করার ক্ষেত্রে সৌদি-আমেরিকা পরস্পরের প্রয়োজন পূরণের ক্ষেত্রে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার হিসেবে অনুভব করেছিল। সৌদি আরব সফরে গিয়েছেন এমন  প্রথম আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি সফরে গিয়ে তাদের সেই সম্পর্ক আরো পাকা করেছিলেন। ফলে সৌদি আরবের মনে হয়েছিল আমেরিকান প্রটেকশনের প্রতিশ্রুতিতে সৌদি আরব শাসনে রাজতন্ত্র ব্যবস্থার আয়ু আরো দীর্ঘ হয়েছে এবং তা যেকোনো সময়ের চেয়ে সবচেয়ে থিতু অবস্থায়। কিন্তু সৌদি আরবের সেই সুখ অনুভব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র পাঁচ বছরের মাথায়, ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব আবার এক অনিশ্চয়তা হিসেবে সৌদি রাজ শাসনের উপর ছায়া ফেলেছিল। ইরানের বিপ্লব রাজতান্ত্রিক শাসনের ধর্মীয় ও নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্ন তুলে নড়বড়ে করে দেয়ার ক্ষমতা নিয়ে হাজির হয়েছিল। তবে আরেক দিক থেকে দেখলে ইরানের এই বিপ্লবে ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি আমেরিকাও। কারণ সে শাহের ইরান হারিয়েছিল এবং বিপ্লবের ফলে ইরানের সাথে আমেরিকার আবার সহসাই কোনো ধরনের সম্পর্ক ফিরে  তৈরি হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। ওদিকে ইরান-সৌদি কূটনৈতিক সম্পর্ক সেই থেকে খারাপ থেকে আরো খারাপ হয়ে যায়। তবে উল্টা দিকে আমেরিকার সঙ্গে ইরানের প্রায় স্থায়ী হয়ে যাওয়া খারাপ সম্পর্ক সৌদি আরবকে স্বস্তি দিয়েছিল। সৌদিরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছিল, ইরান-আমেরিকার সম্পর্ক সঙ্ঘাতময়ই এবং এই সঙ্ঘাতের দীর্ঘস্থায়িত্বের মধ্যেই সৌদি আরব রাজতন্ত্রের ভাগ্য নিহিত। পরের ৩৫ বছর ধরে ইরান-আমেরিকার সম্পর্ক সঙ্ঘাতময় থেকেছে। তদুপরি, ইরানের ওপর আরোপিত পশ্চিমের অর্থনৈতিক অবরোধ ইরানকে যথেষ্ট ভুগিয়েছে।
সবশেষে ২০১৫ সালে আমেরিকার ওবামা প্রশাসনের আমলে এক ‘নিউক্লিয়ার ডিল’-এর বিনিময়ে, ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ ধাপে ধাপে তুলে নেয়া শুরু হয়েছিল। আর সেই থেকে সৌদি আরবের অস্বস্তি আর অস্থিরতা শুরু হয়ে যায়। রাজপরিবার সৌদি আরবে রাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম চিন্তিত হয়ে পড়ে।
ওবামা প্রশাসন ইরানের সাথে ‘নিউক্লিয়ার ডিল’ কেন করতে গিয়েছিল এর প্রধান কারণ ছিল আইএস মোকাবেলায় ইরানকে পাশে পাওয়া এবং অনেক দায় ও খরচ ইরানের ওপর দেয়ার সুযোগ নেয়া। কারণ ইরাকের ওপর আইএসের আক্রমণ ও তৎপরতার চাপ বাড়ছিল। ওবামা প্রথম টার্মে তো বটেই, দ্বিতীয় টার্মেও সামগ্রিকভাবে ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে ‘আমেরিকান সৈন্য প্রত্যাহার’ আর বিশেষ করে ‘মাঠের সৈন্য প্রত্যাহার’ এই নীতিতে পরিচালিত হচ্ছিলেন। এর মূল কারণ ছিল, আমেরিকান অর্থনীতির যুদ্ধের খরচ মিটাতে অপারগতা হয়ে পড়েছিল। ফলে ২০১৪ ডিসেম্বরকে আগেই কাট-অফ ডেট ঘোষণা করা হয়েছিল। দ্বিতীয় কারণ এটাও ছিল যে, আমেরিকার জড়িয়ে যাওয়া অন্তহীন যুদ্ধে থেকে দেশকে বের করে আনা। অথচ ২০১৫ সালের আইএসের তৎপরতা সেখানে মাঠের সৈন্য বাড়াবার তাগিদ হাজির করছিল। এই অপারগ পরিস্থিতিতে ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী’ জোট তৎপরতায় ওবামা ইরানকেও অন্তর্ভুক্ত করে পেতে চাইলেন। বিশেষ করে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমেরিকার ইরাক দখলের পরের ইরাক ইরান প্রভাবিত মালেকী সরকারের হাতেই চলছিল। ফলে ওবামার হিসাব হলো, ইরাক সরকারের সাথে ইরান এসে যোগ দিয়ে তারাই ইরাকে আইএস তৎপরতা রোধের বাড়তি দায়িত্বে নিক। তাতে খরচের ও সামরিক দায়ের এক বড় অংশ ইরান সরকারই বহন করবে।
আর ওবামার এই নতুন নীতিকে সৌদি সরকার ঘোরতরভাবে নিজ স্বার্থবিরোধী এবং বিশেষ করে নিজ রাজতন্ত্রের আয়ূর দিক থেকে বড় বিপদ হিসেবে দেখেছিল। ফলে সেই থেকে আমেরিকার ওপর সৌদি ক্ষোভ আর হতাশা কত তীব্র হয়েছিল তা বুঝার একটা উপায় হলো সৌদি আরব রাশিয়ার পুতিনের সাথে নিজের সুরক্ষা নিয়ে কথা বলেছিল। আমেরিকার বদলে নিজের সুরক্ষার কাজ রাশিয়ার সাথে করা যায় কিনা, রাশিয়াকে দেয়া যায় কিনা সে আলোচনায় বসেছিল। তখনও রাশিয়া থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থের অস্ত্র সৌদি আরবের দিক থেকে ক্রয়ের প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। কিন্তু শর্ত ছিল, সিরিয়াসহ পুরা ইরানি ব্লক থেকে রাশিয়াকে দূরে সরে আসতে হবে। কিন্তু রাশিয়ার কাছে স্থায়ী ও কৌশলগত সম্পর্কের দিক থেকে ইরান-সিরিয়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ পার্টনার বলে গণ্য করে, দখল করে আছে। ফলে সেই প্রস্তাবিত রাশিয়ান ডিল কোনো ইতি পরিণতি পায়নি। ইতোমধ্যে আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের প্রার্থিতার মধ্যে আশার আলো দেখেছিল সৌদি আরব। কারণ, যেটা বুঝা গিয়েছিল, কোন ডেমোক্রাট প্রেসিডেন্ট ফিরে এলে ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ উল্টে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে রিপাবলিকান হলে কিছু হলেও সম্ভাবনা আছে, যদি সবটা নেই। কারণ এটা শুধু ইরান-আমেরিকান সমঝোতা নয় বরং এটা জার্মানিসহ জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের (৫+১) সাথে একযোগে ইরানের ডিল।
তবু এক কথায় বললে, ট্রাম্পের এই সৌদি সফর ছিল এক পুরোপুরি আই ওয়াশ। দেখানো হয়েছে, সৌদি উদ্যোগে পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান রাহিলের নেতৃত্বে এক “আরব ন্যাটো” গঠন করা হয়েছে।আর আসলে  তা অপ্রকাশ্যে হল এক ইরানবিরোধী সুন্নি রাষ্ট্র জোট। আর কাজের সৌদি উদ্দেশ্য হল,  সুন্নিপ্রধান রাষ্ট্রগুলোর জনগণ না হোক অন্তত সরকারগুলোকে নিজের রাজতন্ত্রের পক্ষে ‘বুক’ করে রাখা। যাতে সৌদি আরবের রাজতন্ত্র ভিত্তি কোন ক্রাইসিসে পড়লে এই সরকারগুলোকে সৌদি আরব আগে থেকেই নিজের পক্ষে পাবে।  তামাশার দিকটা হলো এই ‘আরব ন্যাটো’ এটা করা হলো ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী ইসলামি রাষ্ট্রজোট’ বলে। আর এই জোটের উদ্বোধন আমেরিকান প্রেসিডেন্টকে দিয়ে করিয়ে তার মুখ দিয়ে ইরানবিরোধী বুলি হাজির করা হলো। তার মানে এখানে “সন্ত্রাসবাদ” বলা হয়েছে ঠিকই কিন্তু এই সন্ত্রাসবাদী হল ইরান!
তাই এমন কোনো মিডিয়া দেখা যায়নি, আমেরিকা্নর ভিতরের বা বাইরের, যে ট্রাম্পের এই সফরকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে অথবা ফেসভ্যালুতেই সম্মেলন যা কিছু বলা হয়েছে তা বিশ্বাস করেছে। যেমন  সাপ্তাহিক লন্ডন ইকোনমিস্ট তার আর্টিকেলের শিরোনাম করেছে, “New tricks Donald Trump’s reset on Islam” যার ভিতরে প্রায় প্রতিটা বাক্যই ট্রাম্পের শঠতা প্রসঙ্গে লেখা। লিখেছে, ট্রাম্পের এই সফরকে ওবামার ২০০৯ সাল কায়রো সফরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। ঐ সফরে ওবামা তার আগের প্রেসিডেন্ট বুশের ওয়ার অন টেররের নীতির কারণে ক্ষুব্ধ মুসলমানদের অভিযোগ শুনে তাদের মানায় নেবার চেষ্টায় বক্তৃতা করেছিলেন। আর এখন ট্রাম্প হাজির হয়েছেন নিজের ইসলামোফোবিক যতসব বকোয়াজ নিয়ে নিজেই এক বোঝা হিসাবে হাজির হয়েছেন। (“But whereas Mr Obama attempted to mend the damage wrought by the war in Iraq, Mr Trump was burdened by his own Islamophobic rhetoric)“। ইকোনমিস্ট আরো বলছে, ট্রাম্প এই সফরে চরমপন্থার বিরুদ্ধে লড়ার কথা বলেছেন। আবার বলেছেন এই যুদ্ধ বিভিন্ন ধর্মের মধ্যেকার লড়াই নয় এটা নাকি ভাল মানুষ আর শয়তানের লড়াই (“not a battle between different faiths”, but “between good and evil”)।  ট্রাম্প সেখানে ইরানের  মানবাধিকারের রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন বলেছেন, ইরানকে ঝাড়ি দিয়েছেন। অথচ ট্রাম্পের হোস্ট সৌদি আরব তার রেকর্ডই আরও বেশি খারাপ। আমেরিকায় আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে ইরানের চেয়ে সৌদি লোক বেশি।

ওদিকে নিউইয়র্ক টাইমস ২১ মে আর এক রিপোর্ট বের করেছে যার শিরোনাম হল, “ইরানের ঘাড়ে চড়ে ট্রাম্প সৌদি আরবে সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর কাছে পৌচেছেন” (In Saudi Arabia, Trump Reaches Out to Sunni Nations, at Iran’s Expense)। ঐ রিপোর্টে টাইমস লিখেছে ট্রাম্প তার বক্তৃতায় ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আরব স্বৈরশাসকদের সাথে আমেরিকার বিশেষ শখ্যতার যে পুরান নীতি আমেরিকার ছিল তাতে তিনি  ফিরে আসতে চলেছেন। তাতে এসব স্বৈরশাসকদের মানবাধিকার রেকর্ড যতই খারাপ হোক না কেন; আর এদের কারণে বিভিন্ন জায়গায় আমেরিকার বদনাম বা স্বার্থহানি যা কিছুই হোক না কেন – প্রেসিডেন্ট আরব রাষ্ট্রগুলোকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। (In using the headline address of his first foreign trip as president to declare his commitment to Sunni Arab nations, Mr. Trump signaled a return to an American policy built on alliances with Arab autocrats, regardless of their human rights records or policies that sometimes undermine American interests.)

এসব ত গেল আরব স্বৈরশাসকের সাথে আমেরিকার মহান নেতা ট্রাম্প কী করবেন, কী শখ্যতা গড়বেন  আর নতুন তাদের বয়ানে ইরানই হল সন্ত্রাসবাদের নেতা – এসব পুরান ধান্দার কথা আমরা কমবেশি জানি। ফলে এই সফর আসলে ছিল ট্রাম্পের “ইরান ব্যাসিং” (ঝাড়ি মারা) করে আরব স্বৈরশাসকদের কোলে উঠে পড়া।  কিন্তু তাহলে ইরান-আমেরিকান যে “নিউক্লিয়ার ডিল”  ওবামা দুবছর আগে রচনা করে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কী তা ফেলে দিয়েছেন? ঐ চুক্তিত স্টাটাস কি এখন?

ফ্যাক্টস হল এই সফরে ইরানের বিরুদ্ধে  ট্রাম্প যতই হম্বিতম্বি করুন চাপা মারুন না কেন, বাস্তবতা হল, ট্রাম্প ওবামার ‘ইরান নিউক্লিয়ার ডিল’ থেকে একচুলও পিছু হটেন নাই। বরং আমেরিকার প্রভাবশালী রেডিও-এর ওয়েব সাইট এনপিআর (NPR,ন্যাশনাল পাবলিক রেডিও) এর ১৭ মে-এর রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ট্রাম্প প্রশাসন (ইরান অবরোধ প্রয়োগ না করে ছাড় দেয়ার ওবামা নীতি বজায় রাখছেন, নিউক্লিয়ার ডিল্কে বাচিয়ে রাখছেন” (Trump Administration Upholds Iran Sanctions Waiver, Keeping Nuclear Deal Alive)। এরপর ঐ রিপোর্ট ব্যাখ্যা করেছে কেন ট্রাম্প এই সিদ্ধান্তের পথে। লিখেছে, “ইরানের সাথে এই চুক্তির অংশীদার একা আমেরিকা নয়, সাথে ইইউ রাশিয়া এবং চীনও। ফলে আসলে ট্রাম্প প্রশাসন এই ইরান নিউক্লিয়ার চুক্তি ভাঙ্গার দায় নিয়ে পারবে না। কারণ এরপর তাহলে আর  কোন পার্টনার খুজে বের করা অসম্ভব হবে। এবং সেসব পার্টনারেরা এখনও এই চুক্তি ধরে রাখার পক্ষে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছে”।

ইরান নিউক্লিয়ার চুক্তি অনুসারে, ইরান তার উপর আরোপিত পশ্চিমের অর্থনৈতিক অবরোধ পশ্চিম শিথিল করবে আর এর বিনিময়ে ইরান নিজের নিউক্লিয়ার কর্মসুচি কাটছাট করে সীমিত করে আনবে। কিন্তু যেসব অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছে তা নিয়মিত সময় অন্তর পরীক্ষা করে দেখে সব ঠিক থাকলে তা রিনিউ করে দেয়া দরকার। গত ১৭ মে ছিল ট্রাম্পের আমলে এসে এর প্রথম ডেডলাইন।  এই পটভুমি  পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের আর এক গুরুত্বপুর্ণ পত্রিকা “মনিটর” জানাচ্ছে, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ফরেন সেক্রেটারী টিলারসন বলেছেন “১৮ এপ্রিল কংগ্রেসকে চিঠি দিয়ে তিনি সার্টিফাই করে জানিয়েছেন, ইরানি ডিলে ইরান সঠিকভাবে তার করণীয় শর্তাবলি মেনে চলছে”। (Secretary of State Rex Tillerson certified in an April 18 letter to Congress that Iran was adhering to the nuclear deal)।  আরেক কর্মকর্তা বলছেন, আমরা যদিও এখনো পর্যন্ত ইরানি ডিল পুরোটাই পর্যালোচনা করে দেখছি। কিন্তু এইদিন পর্যন্ত যা দেখেছি  তার সবকিছুই ইরান ঠিকঠাক পালন করেছে ফলে তারা চুক্তি বজায় রাখার পক্ষে থাকবে।

 

তাহলে পাগলা ট্রাম্প “উল্টা হাওয়া হয়ে” সৌদি আরবে গেল কেন? কারণ ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি হলে ক্রেতার সন্তুষ্টিতে কিছু তো করা দরকার! বোম্বাস্টিং চাপাবাজি কিছু অন্ততঃ! একটু তলোয়ার নাচ নেচে আসলেন – এই আর কী!
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ২৮ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া ২৯ মে অনলাইন দুরবিন -এ তেও অন্সেয এক ভার্সান ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন : চীন আরেক ধাপ আগালো

বেল্ট ও রোড উদ্যোগের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত
চীন আরেক ধাপ আগালো

গৌতম দাস

মে ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2fm

চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগ (Belt & Road Initiative)। এটা এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকা মহাদেশকে এক সাথে জুড়ে এমন এক যোগাযোগ অবকাঠামো প্রকল্প। যোফাযোগ সড়ক পথে ও সমুদ্র পথে এবং দুটাকে মিশিয়ে ব্যবহার করা হবে। এখানে তাই দুটা প্রকল্পের সমাহার। সড়ক প্রকল্পের নাম  Silk Road Economic Belt আর সমুদ্র পথ (যেটাতে জায়গায় জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের সুবিধা থাকবে আর ঐ বন্দরগুলো থেকে অন্তত ছয়টা সড়ক যোগাযোগের করিডোর বেল্ট রোডে গিয়ে যুক্ত হবে) এই প্রকল্পের নাম  Maritime Silk Road। এই দুই মেগা প্রকল্পকে একসাথে বেল্ট ও রোড উদ্যোগ নাম দেয়া হয়েছে।

চীনা উদ্যোগে ও বিনিয়োগে নেয়া এই প্রকল্প যেসব দেশের উপর দিয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট সেসব ৬৫ টা রাষ্ট্র এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে – এটা এমন এক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প। এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করতে এশিয়ার কোন রাষ্ট্রকে বাদ রাখা হয় নাই। তবে যদি না কেউ নিজে না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়, সেকথা আলাদা। বলা ভাল এখানে এশিয়ান রাষ্ট্রগুলোরই প্রাধান্য; তবে অবশ্যই সাথে ইউরোপ, সেন্ট্রাল এশিয়া আর আফ্রিকার কিছু দেশও অন্তর্ভুক্ত। এর ভৌগলিক ধারণাটা হল, বাংলাদেশ থেকেই যদি ধরি, এখান থেকে মূল হাইওয়ে সড়ক পথে (যেটাকে Silk Road Economic Belt বলা হচ্ছে)  চীন হয়ে সেন্ট্রাল এশিয়া হয়ে, পুর্ব ইউরোপ হয়ে পশ্চিম ইউরোপে যাওয়া সম্ভব। এটাই মূল হাইওয়ে। আর পথের দুপাশের সব রাষ্ট্রকে এই অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নেয়া হবে। ওদিকে এই পথের শেষ হচ্ছে ইউরোপের রটারডাম (নেদারল্যান্ড) গিয়ে। সেখান থেকে আবার একই রোডে না ফিরে  ফিরতি সমুদ্র পথ নিবার সুযোগ আছে। সে হিসাবে এবার ইতালি হয়ে নৌপথে অথবা কখনও কোস্টাল সড়ক ঘুরে বাংলাদেশে ফেরা সম্ভব। তবে ঐ মূল হাইওয়েতে সময়ে সময়ে করিডর হিসাবে অন্তত ছয় জায়গায় ছয়টা করিডর-সংযোগ সড়ক  থাকবে মূল হাইওয়ে সড়কে।  আর ঐ নৌপথের মধ্যে মধ্যে অন্তত দশটা জায়গায় গভীর সমুদ্র বন্দরের যোগাযোগ আছে/ থাকবে যেখান দিয়ে নৌপথ ছেড়ে কোন একটা করিডর ধরে মূল হাইওয়ে সড়কে উঠা সম্ভব।

২০১৩ সালের শেষের দিকে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নামে এই আইডিয়া প্রথম প্রকাশ্যে এনেছিলেন চীনের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তাই এই প্রকল্পকে শি জিনপিং এর মাথা থেকে আসা প্রকল্পও বলে থাকেন অনেকে। গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ (আগের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’কে কেন্দ্র করে এই সম্মেলনের নাম এটা) এই মেগাপ্রকল্পের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সর্বশেষ খবর মতে, মোট ৩০টি দেশের রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান এতে যোগদান করেছিলেন জানা গেল। এছাড়া মোট ১০০টারও বেশী রাষ্ট্র মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।  এদের মধ্যে ইউরোপের রাষ্ট্রপ্রধান বলতে রাশিয়ার পুতিন ছাড়াও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত, তবে কম গুরুত্বপূর্ণ অনেকে রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন। আর দুনিয়ার বড় অর্থনীতি যাদের এমন ওপর দিক থেকে সাতটা বড় রাষ্ট্র হিসেবে তাদের ক্লাব জি-৭ রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একমাত্র ইতালির প্রধানমন্ত্রীই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে তাই বলে ব্রিটেন, জার্মানি বা ফ্রান্স – ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই তিন মূল মাতবর এই সম্মেলন ঠিক বর্জন করছেন তা নয়, তবে তাদের রাষ্ট্রপ্রধানের বদলে অন্য কোনো মন্ত্রী হাজির ছিলেন।

আসলে আমেরিকার নেতৃত্বের গ্লোবাল অর্থনীতির চলতি দুনিয়ায় এবার নতুন করে চীনা নেতৃত্বে নতুন পোলারাইজেশনে ঢেলে সাজিয়ে খাড়া হতে চাচ্ছে; দুনিয়ার গতিপ্রকৃতি এই শতকের শুরু থেকে সে দিকে। বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ সে পথে অগ্রসর হওয়ার দিক থেকে আর এক ধাপ উদ্যোগ বলা যায়। বিশেষ করে চীনের নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক যাকে বলা হয়, সেই এআইআইবি বা এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) গঠনের সময় যেমন পশ্চিমের নেতি প্রতিক্রিয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, এবার বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের সম্মেলন এর সময়ও অনেকটা সে মাত্রার না হলেও সেরকম কিছু নেতি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এবার ভারতের দিক থেকে। আর ওদিকে নেতি প্রতিক্রিয়ার নেতা খোদ আমেরিকা এবং এশিয়ায় আমেরিকার ঘনিষ্ঠ অংশীদার জাপান, এই দুই রাষ্ট্র বাদে প্রায় সব রাষ্ট্রই এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর কথা সম্মেলনের আগে শুনা গেছিল।
তবে সম্মেলন শেষ পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে যাকিছু ছিল জল্পনাকল্পনা এখন সেসব সত্যি হয়েছে। আমেরিকান সরকারী  দলের প্রতিনিধিত্ব করেন প্রেসিডেন্টের এডভাইজার (White House adviser Matt Pottinger)।  ভারতীয় মিডিয়া গত ১৩ মে থেকে প্রবলভাবে দাবি করছিল যে আমেরিকা ইউটার্ন নিয়েছে। সে এই সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস এ বিষয়ে রিপোর্ট করেছিল। আবার ব্যাপারটা একেবারে আকস্মিক বা হতেই পারে না তাও ছিল না। কারণ গত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে  ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর থেকে ট্রাম্প শিবিরের এক্সপার্টরা বলতে শুরু করেছিলেন যে ওবামা এআইআইবি ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ এবং বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ এই দুটোর বিরোধিতা করে ঠিক করেননি।
ওদিকে ভারত অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কী নিয়েছে তা সম্মেলন শুরুর আগের সন্ধ্যা পর্যন্ত স্পষ্ট জানা যায়নি। তবে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখেছিল, ‘আমেরিকার ইউটার্ন ভারতের ওপর চাপ তৈরি করেছে’। কিন্তু ঠিক কী কারণে ভারত এই সম্মেলন বর্জন করছে এ বিষয়ে দুটো মিডিয়া দুই রকম জবাব দিয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, ‘চীন বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ প্রকল্প নিয়ে ভারতের জন্য যথেষ্ট আস্থার পরিবেশ তৈরি করেনি’ (…”China has not created an environment of trust to carry out the belt and road projects”.) তাই সে যাচ্ছে না। তবে ইন্ডিয়ান অ্যাম্বেসির কোন জুনিয়র প্রতিনিধি দিয়ে প্রতিনিধিত্ব করা হতে পারে বলে আভাস দিয়েছিল। বিপরীতে ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস লিখছিল, সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করে একটা মেসেজ দেয়া দরকার। কারণ তারা আমাদের সার্বভৌমত্ব ইস্যুকে হালকা করে দেখেছে। (India is set to skip China’s ambitious One Belt One Road summit over sovereignty issues related to the latter’s involvement in the China-Pakistan Economic Corridor (CPEC), news agency PTI reported. ) অর্থাৎ বুঝা যাচ্ছে ভারতের অংশগ্রহণ এড়িয়ে যাওয়া নিয়ে সরকার ঠিক কী কারণ দেখাবে তা সম্ভবত এখনো অফিসিয়ালি সাব্যস্ত হয়নি। যার অর্থ দাড়ায়, সার্বভৌমত্বের অভিযোগটা নিয়ে ভারতই সিরিয়াস নয়। ব্যাপারটা আসলে এমনই এটা মনে করার কারণও আছে। কিন্তু ভারত অভিযোগটা উঠাল কোন সূত্রে?
পাকিস্তানের গোয়াদরে (আরব সাগরের মুখে, ইরানের সাথে সীমান্তে) গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পাকিস্তানের বুক চিরে দক্ষিণ থেকে উত্তর পেরিয়ে হাইওয়ে (চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর) সড়কপথ চালু করা হয়েছে। এটা পাকিস্তান পেরিয়ে চীনের ল্যান্ডলকড জিংজিয়ান প্রদেশের খাসগড়ে গিয়ে মিলেছে। তবে চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর এই করিডোর-সড়ক বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের মূল হাইওয়ে সড়ক আগে ক্রস করে নিয়েছে। অর্থাৎ গোয়াদর থেকে আসা সড়কই চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোর। চীনকে দেয়া পাকিস্তানের করিডোর। কিন্তু আবার পাকিস্তান পেরোনোর আগে এই সড়কের কিছুটা অংশে পাকিস্তানের আওতাধীন কাশ্মির পেরিয়ে এসেছে। আর এটাকেই ভারত ইস্যু করতে চাইছে। বাস্তবতা না থাকলেও ‘কাশ্মিরের পুরোটাই ভারতের অংশ’ বলে ভারতের এক অফিসিয়াল দাবি আছে। অতএব চীন পাকিস্তান-কাশ্মির ব্যবহার করে এই সড়ক তৈরি করে ভারতের সার্বভৌমত্ব হালকা করে দেখেছে -এই হল ভারতের উছিলা, ভারতের যুক্তি। অর্থাৎ এটা কোনোমতে মেলানো এক দাবি মাত্র। আগেই বলেছি ভারতের দুই মিডিয়ার দুই ধরনের বক্তব্য প্রমাণ করে ভারত সরকার নিজেই সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে সিরিয়াস নয়। বরং চীন আরো কত তেল মারলে ভারত নিজেই এই সম্মেলনে যোগদান করবে যেন এরই অপেক্ষা। এ দিকটাতে তাকিয়ে টাইমস অব ইন্ডিয়া লিখছে, “এবার এখনই সম্মেলনে প্রতিনিধি না পাঠালে ভারতের বস্তুগত লাভালাভের দিক থেকে ক্ষতি বৃদ্ধি নেই, কারণ ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প কোনো সদস্যপদভিত্তিক সংস্থা নয়’। অর্থাৎ আরো দেরি করে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে নিজের দাম আরো বাড়ে কি না তা পরখে নামতে চায় ভারত। তবে যোগদান না করার ব্যাপারে ভারত অবশ্যই বেপরোয়া নয়, কারণ এটা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প এবং তা ফিজিক্যালিই গ্লোবাল। (There may not be any immediate material loss to India if it goes unrepresented because OBOR is not a membership-based organisation)। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় বিষয় ভারত কখনোই চীনের বেল্ট ও রোড উদ্যোগের সম্মেলনে যোগদান করবে না তা বলে নাই। অর্থাৎ আগেই একেবারে না করে দেয়নি। তবে এই প্রকল্পের প্রতি আমেরিকা নীতি অবস্থান, মতামত বদলে ছিল বলে নয়, এই সম্মেলন যে ইতোমধ্যে গ্লোবাল আগ্রহ তৈরি করতে পেরেছে এর আর এক ভালো প্রমাণ হল, এতে অংশগ্রহণ করছেন জাতিসঙ্ঘের বর্তমান সেক্রেটারি জেনারেল অ্যান্তেনিও গুতারেস এবং  বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের নির্বাহী প্রধানরা। এর অর্থ গ্লোবাল অর্থনীতিতে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্প একটা ফ্যাক্টর এর পক্ষে স্বীকৃতি এসেছে। আর তা হওয়ার কোন কারণ নাই। কারণ, পুরা প্রজেক্ট মানে ৬৫ টা রাষ্ট্রের তরফে সব বিনিয়োগ যোগ করলে শেষে সেটা ৯০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে এক অনুমিত হিসাব দেখিয়েছে।

তবে শুরুতে এই প্রকল্পে বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে, তা ইতোমধ্যেই রেডী। এর জবাবে চীন বলছে ৪০ বিলিয়ন ডলার চীন নিজের উন্নয়ন ব্যাংক থেকে জোগান দেবে। আর তাতক্ষণিক বাকিটা আসবে সদ্য গঠিত এআইআইবি ব্যাংক থেকে। এ ছাড়া ব্রিক ব্যাংক উদ্যোগের ভেতরে যে আরো একটা অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক আছে (নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক নামে, সম্প্রতি যেখানে বাংলাদেশসহ ১৫ এশিয়া দেশকে সদস্য করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে) সেখান থেকেও জোগানো হতে পারে। মোট ৬৫টি রাষ্ট্র এই প্রকল্পে যোগ দেয়া আর নিজের নিজের রাষ্ট্রকে মূল অবকাঠামোর সাথে যুক্ত করে নিতে গেলেও প্রত্যেক রাষ্ট্রকেও কিছু সংযোগ-অবকাঠামো করে নিতে হবেই। আর সে কাজেও যা বিনিয়োগ লাগবে সে ঋণের বড় অংশ  চীন জোগান দিতে রাজি। আবার বিশ্বব্যাংকো কী বিনিয়োগের সুযোগ নিবে না? আর পশ্চিমা জগতের যেখান থেকে বিনিয়োগ আসুক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে বিনিয়োগের মুল উৎস হবে আমেরিকান ওয়াল স্ট্রিট। অতেওব আমেরিকাসহ সাড়া পশ্চিম এতে অংশগ্রহণে ঝাপিয়ে পড়বে এতাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও আমরা চীনা বিনিয়োগ পাব বেশ বড় অঙ্কে, সেটা অনেক বেশি পরিমাণ হবে। তাহলে ভারত কী দূরে গোসা ঘরে খিল লাগিয়ে বসে থাকবে, পারবে? নাকি পোষাবে?

কলকাতা থেকে বাংলাদেশ, মিয়ানমার হয়ে চীনের কুনমিং – যেটা চার দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়ে বিসিআইএম (BCIM) প্রকল্প বলা হয়- সেই হাইওয়ে সড়ক কুনমিং চীন হয়ে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হওয়ার কথা, পরিকল্পনা মোতাবেক। এই সড়কের আর একটা অংশ হবু সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সাথে যুক্ত থা্কার কথা। সোনাদিয়া-বিসিআইএমের মাধ্যমে এটাই আর একটা করিডোর হিসেবে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের হাইওয়ের সাথে যুক্ত হবে। এই হল পরিকল্পনা। এখন ভারতের ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ প্রকল্পে যোগ না দিতে ইচ্ছা জানানোর অর্থ হবে ভারত বিসিআইএম প্রকল্পে নেই। কলকাতা-বাংলাদেশ অংশটা নাই। এমন ইচ্ছা করতে ভারত চাইতেই পারে। তবে বলার অপেক্ষা রাখে না এমন ইচ্ছার কাফফারাও আছে তা ভারতের অজানা নয়। তবু একটা কথা এবার স্পষ্ট যে এতদিন বিসিআইএম নিয়ে গড়িমসি করা, মিয়ানমারকে নিরাসক্ত করে রাখার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখা, বাংলাদেশে বন্দরের স্থান নির্বাচন নিয়ে হাসিনার উপর অর্থহীন হস্তক্ষেপ ও সময়ক্ষেপণ ইত্যাদি যা কিছুতে ভারত ভূমিকা রাখতে পেরেছিল, এবার সেসবের দিন শেষ। ভারতের পড়শি কোনো রাষ্ট্র এই সম্মেলনে যোগ দিতে বাকি নেই, মিয়ানমার নেপালসহ, ব্যতিক্রম শুধু ভুটান।এটা এখন সবার কাছে স্বচ্ছ যে ভারত, ভুটান আর ওদিকে জাপান ছাড়া এশিয়ার আর কোন রাষ্ট্র বাকী নাই। সবাই ভারতকে ছেড়ে চলে গেছে।
এক কথায় বললে ভারতের পক্ষে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভে যুক্ত না হওয়ার সিদ্ধান্তকে আত্মঘাতী না সম্ভবত বলা যায় এমন সিদ্ধান্ত নেয়া ভারতের পক্ষে অসম্ভব। যেমন সেক্ষেত্রে এর একটা অর্থ হবে, ৬৫টি রাষ্ট্রের সাথে তাল মিলিয়ে বা একই পদক্ষেপে একই অবকাঠামো সুবিধায় যুক্ত হওয়া – যেকোন রাষ্ট্রের জন্য এ’এক বিরাট সুযোগ। এথেকে ভারত নিজেকে বাইরে রাখবে? যদি জিদ করে রাখেই (যদিও জিদ করে রাষ্ট্র চলে না) তবে সেটা হবে দেখার মত ঘটনা। কারণ সেটা হবে রীতিমত নিজেই নিজের ওপর অবরোধ ডাকার শামিল। সবার থেকে একঘরে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। ফলে ভারতের এমন সিদ্ধান্ত নেয়া অসম্ভব। তবে হ্যাঁ, কিছুটা দেরি করতে পারে। কিন্তু তাতেও নিজের ক্ষতি, পিছিয়ে পড়ায় ঘটবে।

আগেই বলেছি  গ্লোবাল অর্থনীতির চীনের নতুন নেতা হওয়ার দিক থেকে বিচারে,  বিশ্বব্যাংকের সমান্তরালে এআইআইবি ব্যাংক চালু করে ফেলতে পারা – এটা যদি নতুন নেতা হবার পথে একটা অগ্রপদক্ষেপ হয়ে থাকে, তবে ‘বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ’ হবে প্রায় সমান্তরাল তবে বেশী গুরুত্বপূর্ণ দ্বিতীয় পদক্ষেপ। আর এক ধাপ আগানো। যদিও প্রভাব-প্রতিপত্তির দিক থেকে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভের ইমপ্যাক্ট হবে এআইআইবি ব্যাংকের চেয়ে বেশি। কারণ এটা অবকাঠামো, মানে ফিজিক্যাল পদক্ষেপ। আর এই ফিজিক্যাল পদক্ষেপের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ ও ভূমিকার কারণে গ্লোবাল অর্থনীতিতে চীনের ওজন ও গুরুত্ব হবে আরো দৃশ্যমান এবং এটা হবে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। গ্লোবাল অর্থনীতিতে ১৯৯০-২০১০ এই ২০ বছর ডাবল ডিজিট গ্রোথের কাল মানা হয়, বর্তমানে যা তুলনামূলক শ্লথভাবে চলছে। মনে রাখতে হবে সে অর্থনীতিতে আবার এক গতির সঞ্চার করার সম্ভাবনা রাখে বেল্ট ও রোড ইনিশিয়েটিভ।
আজকের ভারত হল, সেই ডাবল ডিজিট গ্রোথের কালের এক অন্যতম বেনিফিশিয়ারি। আবার এআইআইবি ব্যাংক গড়ার কালে ভারত ছিল সঠিকভাবেই চীনের সমর্থক, প্রধান সাগরেদ। ওই ব্যাংকের মালিকানায় চীনের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ, এরপরে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভারতের প্রায় ১০ শতাংশ, অন্যদের মধ্যে ৫ শতাংশর ওপরে কেউ নেই। আমেরিকার শত প্ররোচনাতেও ভারত চীনের ওই ব্যাংক উদ্যোগে সাথ ছাড়েনি।

তাহলে ভারত ঠিক কিসের বিরোধিতা করছে, কী পেতে সেটা করছে? আমরা আশা করি না এসব ক্ষেত্রে ভারতের কোনো সিদ্ধান্ত ঈর্ষাপ্রসূত, ভুল ভিত্তির এক্সপেকটেশন বা ওভার এস্টিমেশনের দোষে দুষ্ট হবে। দুনিয়াতে ক্যাপিটালিজম জেঁকে বসার পর থেকে দেখা গেছে এক এক কালে কোনো এক রাষ্ট্র বা ভূখণ্ডে ওই কালের সর্বোচ্চ উদ্বৃত্ত সঞ্চয়ের ভূমি হয়ে হাজির হয়েছে। যার অর্থ এরপরের নতুন বিনিয়োগ বা নতুন যেকোনো উদ্যোগ নেয়ার সুবিধা ওই রাষ্ট্র এককভাবে পেয়েছে। এখন সে সুবিধা ভোগের  দিন চলছে চীনের। এটা অবজেকটিভ, ফলে এর সাথে লড়ার বা একে মানতে না চাওয়ার কিছু নেই। কারণ এই সঞ্চিত উদ্বৃত্ত এটাই যেকোনো রাষ্ট্রের পরাশক্তি, রুস্তমি, প্রভাব বিস্তারসহ সব ধরনের ভূমিকায় হাজির হওয়ার আসল উৎস। এটা অবজেকটিভ বলে তা না মানাও মুশকিল। ফলে দুটি কথা ভারতকে মানতেই হবে। এক. আমেরিকা ভারতের ভবিষ্যৎ নয়। ভারতের পক্ষের শক্তি নয়, বড়জোর অস্ত্রের সরবরাহকারী হতে পারে। তা হোক, তাতে সমস্যা নেই। তবে গ্লোবাল অর্থনীতির আগামী নেতৃত্বের ভাগ অর্থে ভারতের পক্ষের শক্তি হল চীন। এটা শুনতে অনেকের ঈর্ষা মনে কটু লাগতে পারে কিন্তু এটা বাস্তবতা। ফলে চীনের সাথে সীমানা বিরোধসহ যা কিছু বিরোধ আছে তা নিগোসিয়েশনের সুযোগ নেয়া হবে ভারতের জন্য সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।কিসের ভিত্তিতে ভারত ধরেই নিয়েছে চীনের সাথে তার য়াগামি দিন হবে সংঘাত ও বিরোধে? পিছন ফিরে বা আশেপাশে তাকালে এটা দেখতে পাওয়া মোটেই কঠিন নয় যে এই ধারণার উৎস ও সরবরাহকারি হল খো আমেরিকা। আর তার পরিচালিত নানান থিঙ্কট্যাংক-গুলো। আজকে এসব ঠিঙ্ক-ট্যাংকগুলো আমেরিকার প্রতিনিধি পাঠানোর এই ইউ-টার্ণ এর কী ব্যাখ্যা দিবে? চীন নাকি খালি ভারতকে ঘিরে ধরার মতলবে আছে? তাহলে সেই ভারতকে ফেলে আমেরিকা কোথায় ছুটছে? আসলে কারও প্ররোচিত বক্তব্যে, বুলিতে থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক হয়না। চিন্তার স্বাধীনতা লাগে। আর এর প্রধান শর্ত অন্তত দেশীয় অর্থে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হয়।

এ ছাড়া এশিয়াতে কার ভূমিকা প্রধান হবে ভারতের না চীনের? এই তর্ক কী ভারতের ইচ্ছাধীন নাকি ভারতের অর্থনৈতিক সামর্থের উপর নির্ভরশীল? ভারতের সামর্থ এশিয়ায় চীনের চেয়ে বেশি হলে ভারত বাড়তি সুবিধা পাবে, নইলে নয়। তাই নয় কী?  এটা তো বাংলাদেশে একজন বসিয়ে, ল্যান্ডলক নেপালে ঐতিহ্যবাহী নিয়ন্ত্রণ আগের মতই বজায় থাকবে ধরে নিয়ে, শ্রীলঙ্কায় নতুন সরকার কায়েম করে চীনের প্রভাব কমাতে হবে ইত্যাদিতে যা কিছু করা হয়েছে তাতে কোনো কিছুই সামলানো যায়নি, যাবে না। এছাড়া এটা আর কলোনি সাম্রাজ্যের যুগ নয়। এ যুগে “চীনের সাথে ভারতের পড়শিরা সম্পর্ক রাখতে পারবে না” ভারত সবাইকে চীনমুক্ত দেখতে পাবে –  এটা ভারতের কোনো মুরোদের ওপর ভরসা করে নেয়া বিদেশনীতি? এর চেয়েও অবাক কাণ্ড এই বাস্তবতাহীন নীতিকে প্রশ্ন করার লোকজন ভারতে ক্রমশ  দুষ্প্রাপ্য হচ্ছে। যার মূল কারণ সম্ভবত এরা আমেরিকার পে-রোলে নাম লিখিয়েছে। অথচ খোদ আমেরিকাই পল্টি মেরেছে! তাই নয় কী?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ মে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। চীনে শীর্ষ সম্মেলন যা এই লেখার বিষয়বস্তু তা ছিল ১৪-১৫ মে। ফলে লেখাটা শেষ করা হয়েছিল সম্মেলন শুরুর আগে। আর এখানে এখন যখন আবার প্রকাশ করা হচ্ছে তখন ঐ সম্মেলন শেষ হয়ে গেছে। ফলে আপডেট করার মত বহু তথ্য এখন জমা হয়ে গেছে। তার বহু তথ্য এখানে যতটা সম্ভব আপডেট করে দেয়া হয়েছে। ফলে এটা আগের লেখার থেকে বহুলাংশে সংযোজিত এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

ট্রাম্পের ১০০ দিনের মূল্যায়ন

ট্রাম্পের ১০০ দিনের মূল্যায়ন

গৌতম দাস

০৯ মে ২০১৭, মঙ্গলবার, ০০:৪০

http://wp.me/p1sCvy-2fj

আমেরিকার চলতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের ১০০ দিন পূর্ণ হয়ে গেল। তিনি শপথ গ্রহণ করেছিলেন গত ২০ জানুয়ারি। গত ২৯ এপ্রিল সে ক্ষমতার ১০০ দিন পূর্ণ হল। লন্ডনভিত্তিক সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট (২৮ এপ্রিল ২০১৭) বলছে, “আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ১০০ দিনের কাজ ও তৎপরতা মাপার ব্যাপারটা প্রায়ই খুব চাতুর্যপূর্ণ হয়”। (Measuring the performance of presidents is often tricky. ) কথা সঠিক। আসলে এটা যেন নির্বাচনী প্রচারণা শেষ হয়ে গেলেও এর এক সর্বশেষ অংশ। ঐ প্রচারণায় সত্য-মিথ্যা বহু কিছু বলা হয়, আমাদের ঘরোয়া ভাষায় যাকে আমরা চাপাবাজি বলি, এর চূড়ান্ত মাত্রা ঘটতে দেখা যায়। এ ছাড়া, এটাকে কথা বিকৃত (টুইষ্ট) করা অথবা কায়দা করে মিথ্যা বলার এক চূড়ান্ত মহড়াও বলা যায়। আর ‘ক্ষমতার ১০০ দিন হল’ অনেকটা এমন বলা যে, আমরা বেশি মিথ্যা বলিনি। তা আমরা ক্ষমতা পেলেই প্রথমে কী কী করব বলছি, এর তালিকা দেখে বুঝতে পারবেন। বলা যায়, এটা হল – নির্বাচনের মিথ্যা আর চাপাবাজি থেকে প্রথম সংযত হয়ে বাস্তবে ফেরার প্রয়াস। সে জন্য ঐ ১০০ দিনে বেছে কিছু কাজ ও সিদ্ধান্তের তালিকাও প্রকাশ হতে আমরা দেখি।

তাই,  ট্রাম্প “আমেরিকাকে আবার মহান বানাবেন”  – এই লক্ষ্যে প্রথম ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনার তালিকা একটা ছিল যাতে ১৮ টা সিদ্ধান্ত-পদক্ষেপ নেবার কথা আর কংগ্রেসে ১০টা নতুন আইনের প্রস্তাব আনার কথা লেখা ছিল। এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপুর্ণ তিনটা ইস্যুও ছিল – ১. আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে বাস্তবিকই কংক্রিটের দেয়াল তুলে বেআইনি অভিবাসীর অনুপ্রবেশ বন্ধ করবেন, সন্ত্রাস-প্রবণ মুসলমান দেশ থেকে প্রবেশকারীদের আমেরিকার প্রবেশ ঠেকাবেন। (যদিও এখানে কথাটা সন্ত্রাস আর মুসলমান শব্দ দিয়ে পরিচিত করে হাজির করা হয়েছিল। কিন্তু এর আসল উদ্দেশ্য ছিল সন্ত্রাসের কথা তুলে এর আড়ালে আরও কিছু অবৈধ ও চাকরিপ্রার্থী অভিবাসী ঠেকানো/কমানো)। আর চীনের নিজ মুদ্রামান কারসাজি করে আমেরিকার বাজারে নিজ পণ্য প্রবেশের সুবিধা গ্রহণকারী (ম্যানিপুলেটর) হিসেবে করা তৎপরতা বন্ধ করবেন- এমন বিষয়ও ওই ১৮ কাজের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু প্রকৃত অর্থে ১০০ দিনের ব্যাপারটা কী, তা নিয়ে  তার ঐ লেখায় ‘ইকোনমিস্ট’  কী মনে করে এমন এক ব্যাখ্যা দিয়েছে। সাময়িকী বলছে, “(১০০ দিন) এই সময়কাল আসলে সে বছর প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ব্যবহার কত উঁচুমাত্রায় উঠেছিল তা দেখার একটা সুযোগ। ওই সময়টা আসলে প্রেসিডেন্ট জনপ্রিয়তা উপভোগ করেন, আবার আগের প্রচারণা থেকে নির্বাচন পর্যন্ত পথ চলার পর বিজয়লাভ ঘটে গেলে তাতে তিনি যে জোশ পেলেন, তা ঐ ১০০ দিনে খরচ করেন যাতে এবার তিনি পরের চার বছরের কাজের এজেন্ডা কী হবে, তা ঠিক করেন আর কংগ্রেসকে কী কী আইন পাস করাতে চাপ দেবেন, সে পরিকল্পনা হাতে নেন”। ইকোনমিস্টের কথা একদিক থেকে সঠিক। তবে এর সার কথা হল, বিজয়লাভ করেছ এবার উচ্ছ্বাস থুয়ে বাস্তবের মাটিতে পা নামাও।

ইকোনমিস্ট বলছে, ১০০ দিনের ‘অগ্রগতি খুবই ধীর’ (progress has been slow. )। তবে এর চেয়েও আমাদের আগ্রহ জাগায়, এমন ব্যাপার হল, ইকোনমিস্ট নিজের উদ্যোগে ২২ এপ্রিলে করা, আমেরিকান নাগরিকের ওপর এক সার্ভের খবর দিয়েছে আমাদের। অবশ্য এটা ছোট স্যাম্পলের, ১৫০০ জন। আর ওখানে যাচাইয়ের বিষয় ছিল – “প্রেসিডেন্ট উত্তরদাতাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছেন কিনা”। জবাবদাতাদের মধ্যে ওখানে বড় একটা ভাগ হল, কারা নিজেদের ডেমোক্র্যাট/রিপাবলিকান হিসেবে অর্থাৎ কারা নিজের পার্টিজান পরিচয় দিয়েছেন আর কারা দেননি। সে হিসেবে কোনো না কোনো পার্টিজান পরিচয় যাদের আছে, তাদের মধ্যকার ৩০ শতাংশ মনে করেন, তাদের আশা পূরণ হয়েছে। কিন্তু যারা ওই ৩০ শতাংশের বাইরে (মানে বাকি ৭০ শতাংশ) তাদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি মূল্যায়ন দেখা গেছে। যেমন এই ৭০ শতাংশের ৪১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট আর ২৮ শতাংশ রিপাবলিকান, যারা সবাই পার্টিলাইনে মন্তব্য করেছেন। ডেমোক্র্যাটরা বলেছেন, তারা আকাঙ্খা যা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট তার চেয়ে খারাপ করেছেন। বিপরীতে রিপাবলিকানরা বলেছেন, তারা আকাঙ্খা যা করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ‘তার চেয়ে ভালো’ করেছেন। তবে ইকোনমিস্ট বলছে, এটা আসলে প্রেসিডেন্টের পক্ষে জনমত কেমন (যেটাকে রেটিং বলে) তার প্রকাশ। ট্রাম্প বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরের আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে কম রেটিংয়ের প্রেসিডেন্ট। তবে এই রেটিং একেবারে দলভিত্তিক। রিপাবলিকানদের মধ্যে ৮৮ শতাংশ রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টকে অনুমোদন করেছেন। ওদিকে ডেমোক্র্যাটদের ৮২ শতাংশ প্রেসিডেন্টকে অনুমোদন করেন নাই।

এখন এসবের বাইরে, আমেরিকার রাজনীতির প্রত্যেকটি ইস্যুভিত্তিক বিচারে যদি আসি, তবে এই ১০০ দিনে সেগুলোর হাল-দশা কী, এই বিচারে বলতে হয়,
০১. মেক্সিকো প্রাচীর : স্বভাবতই শুরুতেই ট্রাম্পের সাথে এই ইস্যুতে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের বিরোধ ঘটেছিল। যে দুই রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সাথে ট্রাম্পের প্রায় প্রকাশ্যে বিরোধ হয়েছে সে দুটো হল, অস্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকো। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সাথে ট্রাম্পের অন্য বিরোধের ইস্যুও আছে। ট্রাম্পের দাবি মতে, বলা বাহুল্য ওই প্রাচীর বানানোর খরচ দিতে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট অস্বীকার করেছিলেন। আর মেক্সিকান পাবলিকের দিক থেকে দেখলে তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিলেন; কারণ মাইগ্রেট করে আমেরিকায় প্রবেশের ওপর কড়াকড়ি তাদেরকেই ক্ষতিগ্রস্থ করে। এই বিরুদ্ধে চলে যাওয়া, এটাই আবার মেক্সিকার প্রেসিডেন্টের পক্ষে দেয়া নাগরিকদের সমর্থন হিসেবে হাজির হয়েছিল।  এ’ব্যাপারে সর্বশেষ হল, নিজ খরচে “প্রাচীর গড়ে পরে মেক্সিকোর কাছ থেকে অর্থ কেটে” নিবেন ট্রাম্প – এরও কোনো খবর নেই। কারণ কংগ্রেস এক ট্রিলিয়ন ডলারের যে বাজেট পাস করেছে, সেখানে পরিষ্কার উল্লেখ করে দিয়েছে, এর অর্থ দিয়ে ঐ প্রাচীর নির্মাণ করা যাবে না।

০২. মুসলিম নিষেধাজ্ঞা (মুসলিম ব্যান) : সবচেয়ে বেশি প্রচারিত ট্রাম্পের এই উদ্যোগ নেয়া এবং ব্যর্থ হওয়ার খবর আমরা প্রায় সবাই দেখেছি। ট্রাম্প এ বিষয়ে দু’বার নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। কিন্তু দু’বারই তা ফেডারেল আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে এর কার্যকারিতা স্থগিত হয়ে যায়। আদালতে তা চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবার পক্ষে  মূল যুক্তি ছিল “কেবল মুসলমানদের” টার্গেট করে এই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। ফলে তা বৈষম্যপুর্ণ, সুতরাং  কনস্টিটিউশন বিরোধী। অর্থাৎ এই ইস্যু এখন আদালতের হিমঘরে। মনে হয় না আর কখনো এটা জাগবে।

০৩. ন্যাটো একটা অচল প্রতিষ্ঠান : নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছিলেন, ন্যাটো কোল্ড ওয়ার যুগের প্রতিষ্ঠান; যখন সোভিয়েত ইউনিয়নকে পশ্চিম নিজের জাতশত্রু মনে করে এর বিরুদ্ধেই ন্যাটো বানানো হয়েছিল। কোল্ড ওয়ার আর সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটোই এখন ‘নাই’ হয়ে গেছে। ওদিকে, ‘গ্লোবাল ওয়ার অন টেরর’ এখন মুখ্য ইস্যু। ফলে এত পয়সা খরচ করে ন্যাটো রাখার কী দরকার! এই বুঝের ওপর দাঁড়িয়ে তাই শপথ নেয়ার মাত্র ১৩ দিনের মাথায় তিনি বলে বসেন, ন্যাটো একটি অচল প্রতিষ্ঠান। আর এই গত মাসে ১২ এপ্রিল তিনি উল্টা বলেন, “ন্যাটো আর অচল প্রতিষ্ঠান নয়”। কেন এমন করলেন? ব্যাপারটা পাবলিকলি আনা হয়নি। তবে ইউরোপের দিক থেকে ব্যাপক দেনদরবার হয়েছে বলে এই ‘উলটো কথা’। তবে ন্যাটোর সেক্রেটারী জেনারেলের সঙ্গে মিটিং শেষ করে প্রেসের সামনে ট্রাম্প বলেন, আপনারা (ন্যাটো সদস্যরা)  সিরিয়ায় আমার ৫৯ টা মিসাইল নিক্ষেপে হামলার কাজ ও সিদ্ধান্ত সমর্থন করেছেন সেজন্য ধন্যবাদ। এবং “ন্যাটো আর অচল প্রতিষ্ঠান নয়”
যদিও এমন ধরণের কথার পেছনে মূল কারণ হল – খরচের বিষয়, এসব প্রতিষ্ঠান চালানোর  সিংহভাগ  খরচ আমেরিকাকে একা বইতে হয়। এছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে অন্য রাষ্ট্রে যেখানেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আছে (জার্মানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া. অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি) এর খরচও আমেরিকা একা বহন করে থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেতর দিয়ে সেই থেকে আমেরিকা এক এম্পায়ার আমেরিকা, দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মাতব্বর হিসেবে উঠে এসেছিল। মাতব্বরদের বহু অতিরিক্ত অর্থ খরচ করতে হয়, কমিউনিটি-দুনিয়ার দায় একা বহন করতে হয়। ফলে এভাবেই এতদিন চলে আসছিল। এ ছাড়াও একটা এম্পায়ার- সাম্রাজ্য মোড়লিপনা চালানো বেশ জটিল। যেমন দক্ষিণ কোরিয়াকে উদাহরণ হিসাবে নেয়া যাক। সেখানে আমেরিকা নিজের (THAAD) থাড অ্যান্টি মিসাইল ব্যবস্থা বসিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার হাত থেকে দক্ষিণ কোরিয়াকে, অর্থাৎ নিজ মিত্রকে রক্ষার জন্য। কিন্তু এটা বসানোর জায়গা দেয়া ছাড়া অ্যান্টি মিসাইল ব্যবস্থা বসানোর আর কোনো খরচ কোরিয়া বহণ করে না, সব খরচ আমেরিকাই বহন করে। বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমেরিকা চাইছে, এই ‘ঐতিহাসিক’ দায় থেকে বেরিয়ে আসতে। কিন্তু একথার মানে কি, আমেরিকার মাতব্বরিও ত্যাগ করতে চাইছেন তিনি? অবশ্যই ঠিক তা নয়। তবে তাঁর প্রথম বিবেচনা হচ্ছে, আমেরিকাকে এই খরচের বোঝা কমাতে হবে। তাতে মাতব্বরি কিছু কমে যাবে কিনা সেটা পরে দেখা যাবে। মাতব্বরি কমলে কী হবে, সেটা যুক্তরাষ্ট্র মানতে তৈরি কিনা, তা দ্বিতীয় বিবেচনা। কিন্তু বাস্তবতা হল, চাইলেও ট্রাম্প সে খরচ তুলে আনতে পারছেন না। কারণ থাড অ্যান্টি মিসাইল ব্যবস্থার পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা এখন পুরাপুরি আমেরিকান বাহিনীর হাতে। ট্রাম্প সম্প্রতি এর এক বিলিয়ন ডলার দাম চেয়েছেন কোরিয়ার কাছে; কিন্তু এটা কি আমেরিকা বিক্রি করতে চাইছে, নাকি এটা বিক্রিযোগ্য বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে? জবাব হলো, না। এই সিরিয়াস টেকনোলজি আমেরিকা কোনো ঘনিষ্ঠ মিত্রকে বা আসলে কাউকেই বিক্রি করতে চায় না। এদিকে, দঃ কোরিয়া বলছে, আমরা চাইলেও তো অর্থ দিতে পারছি না। আগে তোমরা বিক্রির সিদ্ধান্ত নাও। তবেই না! এ ধরনের বহুবিধ টেকনিক্যাল সমস্যা আছে, যেসবের কারণে শুরু থেকেই আমেরিকা নিজে থেকেই যেচে এর খরচ বহন করে থাকে। তাই ট্রাম্পের আমেরিকা চাইলেই এখান থেকে আমেরিকাকে বের করে নিতে পারবে না। অন্তত সেটা একেবারে সহজ কোন কাজ নয়। তাই ট্রাম্পের ১০০ দিনের অন্যতম ব্যর্থ ইস্যু এটা।

০৪. চীন ইস্যু : চীনকে ‘ঝাড়ি’ মারতে গিয়ে ট্রাম্প এখন উলটো ‘কেঁচো’ হয়ে গেছেন। আসলে ট্রাম্প এখন উলটো চীনকে দেখছেন তার প্রেসিডেন্ট হিসেবে সাফল্য আনার এক উপায় হিসেবে। চীনকে যতটা সম্ভব পক্ষে নিয়ে উত্তর কোরিয়া ইস্যুর যদি একটা সুরাহা করা যায় তবে সেটা সত্যি সত্যিই আগের প্রেসিডেন্টদের তুলনায় ট্রাম্পের একটা বিরাট সাফল্য বলে বিবেচিত হবে। ট্রাম্প পাগলা হলেও এটা বুঝতে তাঁর দেরি হয় নাই। কিন্তু এটা তো ১০০ দিনের অর্জনের বিষয় নয়। সম্ভাব্য অর্জনের তালিকায় নাই। বরং ওখানে চীনকে যেভাবে ভিলেন হিসেবে হাজির করে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল, চীনের বিরুদ্ধে অ্যাকশনে উগ্র জাতীয়তাবাদী আমেরিকা খাড়া করানো হবে বলা হয়েছিল- সেটা তো একেবারেই হয়নি। করা যায়নি।  কারণ শত্রু ঠাহর করায় ভুল ছিল। ট্রাম্প এখন চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে তার সম্পর্কের ‘ভালো কেমিস্ট্রির’ কথা বলছেন। কিন্তু তবু তাতে তো এটা আর- ‘আমেরিকা ফাস্ট’-এর অবস্থান থাকল না। এটা হয়ে গেছে আসলে উলটা – ‘গ্লোবাল আমেরিকা’র পক্ষে অবস্থান। মানে, ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতির হার।

০৫. বাণিজ্য জোট (নাফটা, টিপিপি) ত্যাগ : ঘোষণা দিয়ে বাণিজ্য জোট ত্যাগের ঘটনা ঘটানো সহজ, আর তা ঘটেছে। ফলে ১০০ দিনের কাজ হিসেবে এই ইস্যু সফল। কিন্তু এর ফলাফল কি সুখপ্রদ? এর জবাব হল, না। আসলে এই তর্কে গোড়ার প্রশ্ন যদি করি, বিজয়ী ট্রাম্প জাতিবাদী আমেরিকা হিসেবে হাজির হয়েছিলেন। এর অর্থ, খোদ আমেরিকাই আর গ্লোবালাইজেশনের পক্ষে থাকবে না, এই সিদ্ধান্ত। এই বিচারে এখন বলা যায়, তিনি নিজে গ্লোবালাইজেশনের পক্ষেই থেকে গেছেন। অবস্থান তিনি একচুলও সরাতে পারেননি। বরং তার নীতির প্রায় সব ঝোঁক ওবামার নীতি অবস্থানে ফেরত যাওয়ার দিকে (বিশেষ কতগুলো ছাড়া)। সিএনএন মানি জানাচ্ছে,   নতুন করে নাফটা নিয়ে কথা বলা আর নতুন নিগোশিয়েশন শুরু করতে চাইছে ট্রাম্পের আমেরিকা। আর ট্রাম্পের উপদেষ্টারা এখন বিতর্ক করছেন কত দ্রুত নাফটা আলাপ শুরু করা যায়, এর সম্ভাব্য উপায় কী।  আর ‘বিশেষ কতগুলো’ কথাটা ভারতের সাথে বাণিজ্য-বিনিয়োগ সম্পর্কের দিকে তাকিয়ে এখানে উল্লেখ করা হয়েছে। ভারতের হাত থেকে আমেরিকানদের চাকরি উদ্ধার বা কাজ ফেরানো এবং সে লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন, তা কিন্তু এগিয়েই চলছে; আগের মতই। এজন্য মোদি আগামী মাসের মধ্যে ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাতের জন্য খুবই চেষ্টা করছেন।

০৬। গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা প্যারিস চুক্তি থেকে বের হয়ে আসা : বের হয়ে আসার প্রক্রিয়া চলছে বটে; তবে ধীরগতিতে আর ভাষা নরম করে। তবে কানাডা থেকে পাইপলাইনে (পরিবেশগতভাবে নোংরা এবং বিপর্যয়ের হুমকির কারণে বিপজ্জনক) তেল আনার বিষয়ে ট্রাম্প বলেছিলেন, পাইপ প্রস্তুতে আমেরিকান স্টিল সেখানে ব্যবহার করাবেনই। অর্থাৎ আমেরিকা ফাস্ট নীতি কার্যকর করবেনই তিনি এখানে। কিন্তু না, এখানে ট্রাম্প ব্যর্থ। তিনি আমেরিকান স্টিল ব্যবহার করাতে পারেননি। বরং এবিষয়ে নিজের নির্বাহী আদেশ বদলাতে হয়েছে তাঁকে।
আরো এমন অনেক পয়েন্ট তোলা যায় কিন্তু এখানেই শেষ করছি। এক কথায় বললে,  শপথ গ্রহণের দিনের বক্তৃতায়  ট্রাম্প যেভাবে পূর্বসূরি প্রেসিডেন্টদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বা বোকা ভেবে তাদের নীতির তুলোধুনা করেছিলেন, আর ক্ষমতা পেলেই সব বদলে ফেলার হুঙ্কার দিচ্ছিলেন, তা ১০০ দিন বা সাড়ে তিন মাসেই ফানুসের মতো চুপসে গেয়েছে। বলা যায়, চাপাবাজি আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবের মাটিতে পা দিতেই সব ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।

অনলাইন ‘মিডলইস্ট আই’ পত্রিকা ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলছে, ট্রাম্পের উল্টামুখিতার আংশিক ব্যাখ্যা হিসাবে বলা যায়-  এর কারণ হোয়াইট হাউজের ভেতরের রেডিক্যালেরা যেমন স্টিভ ব্যানন, মাইক ফ্লিন, কেটি ম্যাকফারল্যান্ড- এরা হয় পদত্যাগ করেছেন, না হলে সাইডলাইনে চলে গেছেন। ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে ম্যাকমাস্টার আসাতে তিনি বহু কিছুকেই ফ্যাক্টবেজ করে ফেলেছেন। ফলে “রেডিক্যাল বা রাইট উইং দের” এই পতনকেই আমরা ট্রাম্পের উল্টোমুখিতা হিসেবে বাইরে থেকে দেখছি। আর এর আর এক বিপরীতের ঘটনা হল, “ট্রাম্পের মেয়ে ইভাঙ্কা, ট্রাম্পের জামাই কুশনার আর শীর্ষ অর্থনৈতিক পরামর্শক গ্রে কোহেন যারা মূলত গ্লোবালিস্ট; এদের অবস্থান ক্রমেই উঁচুতে জেঁকে বসছে। তবে ট্রাম্প পরিবর্তনের এই অভিমুখ নেয়াতে তিনি রিপাবলিকান দলের ধূর্তদের বিরাগভাজন হওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন ওরাই কিন্তু তাকে নির্বাচনী লড়াইয়ে বিজয়ী হতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন”। খুবই খাটি কথা গুলো এখানে তুলে আনা হয়েছে। দেখা যাক এটা ট্রাম্পকে কোথায় নিয়ে যায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে প্রথম ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় ০৭ মে ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন)। আজ এখানে তা আবার আপডেট, এডিট করে থিতু ভার্সান হিসাবে ছাপা হল। ]

ট্রাম্প-শি এর ‘ভাল কেমিস্ট্রি’ তবু কোরিয়া হামলা কী আসন্ন

ট্রাম্প-শি এর ‘ভাল কেমিস্ট্রি’ তবু কোরিয়া হামলা কী আসন্ন

গৌতম দাস

২৬ এপ্রিল ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2eM

 

Trump and Xi get down to talks in Mar-a-Lago. Photo: AFP

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি, গত ৬-৭ এপ্রিল ছিল বহু প্রতীক্ষিত তাদের প্রথম সামিট বা শীর্ষ প্রধানদ্বয়ের সাক্ষাৎ। ট্রাম্পের সাথে প্রেসিডেন্ট শি-এর সাক্ষাতের আয়োজন করা হয়েছিল ফ্লোরিডা স্টেটে ট্রাম্পের আবাসে, পাল্ম বিচ শহরে  মার-আ-লাগো এস্টেটে। [Trump’s Mar-a-Lago estate in Palm Beach, Florida]। এই সফর সবার খুব মনোযোগের বিষয় হয়ে উঠেছিল। কারণ নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ট্রাম্প নিয়মিত চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঝড় তুলে যাচ্ছিলেন যে, চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলছে, চীন নিজ মুদ্রার মান কারসাজিতে কমিয়ে রেখে নিজের পক্ষে মার্কিন বাজার ধরে রাখছে, চীন পরিবেশবাদীদের পক্ষে গিয়ে তাদেরকে আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে ক্ষেপিয়ে তুলছে ইত্যাদি। সেই চীন এরই শীর্ষ ব্যক্তির সাথে খোদ ট্রাম্পের বৈঠক হতে যাচ্ছিল তাই স্বভাবতই এটা সবার মনোযোগের কারণ। এছাড়া  আমেরিকা আর চীন এই  রাষ্ট্র-জোড়ার অর্থ তাতপর্য হল, প্রথমটা এখনও দুনিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হয়ে আছে তবে হারিয়ে যাচ্ছে, আর দ্বিতীয়টা সে জায়গা নিতে উঠে আসছে। তবে ঐ সাক্ষাত থেকে এটা সবার জন্য আরও বড় মনোযোগের কারণ হয়ে যায় আরও অন্য কিছু কারণে। ঐ সাক্ষাতে বড় ইস্যু ছিল মূলত পাঁচটা। চীনের সাথে আমেরিকার ১. বাণিজ্য ও বিনিয়োগে দেনা-পাওনার ঝগড়া নরম করা, ২. তাইওয়ান ইস্যু বা একচীন নীতির পক্ষে অবস্থান স্থায়ী করে জানানো, ‘৩. সাউথ চায়না সি’ দ্বীপ বিতর্ক অন্তত থিতু করা, ৪. চীন মুদ্রা ম্যানিপুলেটর না (নিজ মুদ্রামানের কারসাজি করে না) [চীনা মুদ্রা ইউয়ানের গড় মান, নিচে ফুট নোটে দেখুন, ১৯৮১-২০১৭ এই সময়ের মধ্যে ], ফলে আমেরিকার সে অভিযোগ প্রত্যাহার করেছে জানানো, আর উত্তর কোরিয়া ইস্যু সামলানো। এসবের মধ্যে প্রথমটা আর শেষেরটা মুখ্য। বাকিগুলো বর্তমানে দুর্বল হয়ে গেছে অথবা আধা মিটে গেছে এমন।
প্রথম ইস্যুর ক্ষেত্রে  – চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলছে,অথবা চীন নিজ মুদ্রার মান কারসাজিতে কমিয়ে রেখেছে –  ট্রাম্প প্রশাসন এগুলা তার অভিযোগ বলে হাজির করে আসছিল। কিন্তু সমাধানে ঠিক কী চায়, দাবি কী সুনির্দিষ্ট করে তা জানে না বা বলতে পারছিল না।  হোমওয়ার্কে সে দুর্বলতা ছিল। কেবল ‘ট্যাক্স বসাবে’ ইত্যাদি বলে ট্রেড ওয়্যার বা বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি দিত। অথচ এমনকি ওবামার দ্বিতীয় টার্মে নির্বাচনের আগে ২০১২ সালেও, একই পথ নিয়েছিলেন। কিন্তু টিকাতে পারেননি, বুমেরাং প্রভাব পড়েছিল তাই। অথচ বিপরীতে চীনের দিকে, তাদের বড় হোমওয়ার্ক করে আসা করিতকর্মা লোকজন ছিল। আর বাস্তবতা সম্পর্কে চীন সরকারের স্পষ্ট মূল্যায়ন তার ছিল। ফলে আমেরিকাকে সে কী দিতে চায়, কেন দিতে চায়, কতটুকু দিতে হবে পারবে ইত্যাদি সব বিষয়ে সে নিজে পরিষ্কার ছিল। তাই আমেরিকার নাকি কান্না বন্ধ করিয়ে কাজের টেবিলে নিয়ে বসিয়ে যখন কী কী চীন দিবে, সে ঝাঁপি মেলে ধরল তাতে ট্রাম্পসহ তার দল বেজার হয়ে থাকার বদলে অভিভূত হয়ে যায়। চীনের এমন আচরণের মূল কারণ আমেরিকাকে অর্থনৈতিকভাবে ঠিক মেরে ফেলা – এটা চীনা-স্বার্থ নয়। চীনের কাছে আমেরিকা এখনও এক বিরাট ও গুরুত্বপূর্ণ বাজার। আমেরিকার সাথে তার সম্পর্ক এখনও বড় বিনিয়োগ-দাতার। আমেরিকান উতপাদক ও বাজারজাতকারী কোম্পানী চীনে গিয়ে ফ্যাক্টরি খলে সে পণ্য নিজে দেশে বাজারে বিক্রি করে। কখনও চীনা উতপাদক স্রেফ কেবল কমিশন মার্জিন ধার্যকারি উতপাদক, বাকী সবকিছু আমেরিকান কোম্পানীর।  আমেরিকা চীনের কাছে কেন  প্রয়োজনীয়, গুরুত্বপুর্ণ সে সম্পর্কে চীনা মূল্যায়ন এটাই। এ জন্য এই সামিট আয়োজনের বহু আগে থেকেই চীনা প্রেসিডেন্ট বলে যাচ্ছিলেন, আমেরিকা ও চীনের ভাগ্য একসুতায় গাঁথা। ট্রাম্প যেন সে দিকটার গুরুত্ব আমল করে আর নাকি-কান্না শুরু না করে কথা বলেন। গত ৩৩ বছর চীন বিষয়ক অর্থনৈতিক নানা পলিসি-নীতি নিয়ে একাদেমিক কাজে জড়িয়ে আছেন কানাডার এমন এক অবসরপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে  অধ্যাপক কেন মোক (KEN MOAK), বর্তমানে সিঙ্গাপুরের এশিয়ান টাইমসে লিখেন; তার ভাষায় বললে,  ‘ট্রাম্পের এই ইউটার্ন এক বিরাট কাজের কাজ হয়েছে’। এ যেন নিজাম ডাকাতের সাধু হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা। কারণ ট্রাম্প মন্তব্য করে বসেছেন, “প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে”।

আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে ট্রাম্প নিজেই জানিয়েছেন, ‘প্রেসিডেন্ট শি-এর সাথে প্রথম বৈঠক নির্ধারিত ছিল ১৫ মিনিটের; সেটা বর্ধিত হয়ে গিয়ে ঠেকে ৩ ঘণ্টায়।’ এ এক বিরাট ওলট-পালট ঘটনা। শুধু তাই নয়, ট্রাম্প নিজেই আমাদের আরো জানাচ্ছেন, ‘সাক্ষাতের দ্বিতীয় দিনে আর এক সভা ছিল মাত্র ১০ মিনিটের যেটা ২ ঘণ্টা ধরে চলেছিল’। ট্রাম্পের ভাষায় …‘আসলে আমাদের দু’জনের রসায়নটা জমে গিয়েছে’। অর্থাৎ তিনি যে শুধু বিগলিত হয়ে গিয়েছিলেন তাই নয়। সেটা আবার তিনি সবার কাছে প্রকাশ করার আগ্রহ দেখিয়েছেন।
খুব সম্ভবত চীন-আমেরিকা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বিষয়ক ইস্যুতে আলাপের ‘রসায়ন যতই জমে যায়’, ততই উত্তর কোরিয়া বিষয়ে চীনের ভূমিকা আছে, চীনের করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে ট্রাম্পের আশা আকাঙ্খা আরো বড় হয়ে যায়। সেটা এতই বড় হয়ে যায় যে, প্রেসিডেন্ট শি ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের অতিথি থাকা অবস্থায় ট্রাম্প সিরিয়ার ওপর বোমা হামলা করে বসেন; সিরিয়া কেমিক্যাল অস্ত্র ব্যবহার করছে – এই অভিযোগে। দু’দিন পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট রেক্স টিলারসন এই হামলার আরও একটা কারণ বলছেন। বলছেন, উত্তর কোরিয়াকে শিক্ষা দিতে আর একটা মেসেজ দিতেও এই বোমা হামলা করা হয়েছিল। এ ছাড়া এরপর ট্রাম্প নিয়মিত এই প্রসঙ্গে নানান কথা বলে চলেছেন। যেমন টুইট করে বলছেন, ‘চীনা প্রেসিডেন্টকে ব্যাখ্যা করে বলেছি, উত্তর কোরিয়া সমস্যাটা তারা (চীন) মিটিয়ে দিতে পারলে আমরা অনেক ভালো এক বাণিজ্য সম্পর্ক করতে পারতাম’।

ইরাকের হাতে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র (WMD) আছে- এই মিথ্যা অজুহাতে ২০০৩ সালে বুশ-ব্লেয়ার ইরাকে হামলা করেছিল। অতীতে (১৯৫০-৩ সালে) ঠিক একই রকম ‘কোরিয়ায় কমিউনিজমের বিস্তার ঠেকানো’ এই অজুহাতে পঞ্চাশের দশকে শুরুতে আমেরিকা কোরিয়ায় হামলা করেছিল। কিন্তু সে যুদ্ধ কোন জয়-পরাজয়ের লড়াই দিয়ে মীমাংসা হয়নি। বরং কোরিয়া দুই ভাগ করে একটা যুদ্ধবিরতি টানা হয়েছিল। আমেরিকা পালিয়ে বেঁচেছিল। আর ওই ঘটনার লেজ ধরে পরে ভিয়েতনামকেও আমেরিকা হামলা ও দুভাগ করেছিল। যেটা ১৯৭৫ সালে একক ভিয়েতনামের স্বাধীনতায় সমাপ্ত হয়েছিল। আর কোরিয়ার বেলায়, কোরিয়া দুই ভাগ করে একটা যুদ্ধবিরতি ওই অঞ্চলে তখনকার মত যুদ্ধ থামাতে পারলেও যুদ্ধের টেনশন সেই থেকে এখন পর্যন্ত কখনই মিটানো যায়নি। বরং সেই থেকে আমেরিকা দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে স্থায়ী সেনাঘাঁটি করে বসে যায়। এর পালটা হিসেবে, বিশেষ করে উত্তর কোরিয়া নিজের নিরাপত্তার কথা ভেবে নিজেকে সুরক্ষা করতে গিয়ে পারমাণবিক বোমা সংগ্রহ করে ফেললে ঐ অঞ্চলের ভারসাম্য বদলে পরিস্থিতি সেই থেকে আরো জটিল হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতিতে একালে চীনের সমাধান প্রস্তাব হল,ওই অঞ্চলের সবাইকে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে যেতে হবে। আর আমেরিকান এখনকার প্রস্তাবের মূল কথা হল, বলপ্রয়োগে কোরিয়াকে পারমাণবিক অস্ত্র-ছাড়া করানো সম্ভব।’ এটা সম্ভবত মুখে বলা কথা। কিন্তু মনে মনে চায় চীন উত্তর কোরিয়াকে আমেরিকার সাথে টেবিলে আলোচনায় এনে বসিয়ে দেক। একটা রফা হোক।  ট্রাম্পের কথায় সে ইঙ্গিতও আছে যদিও। ফলে চীন-আমেরিকার উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে নীতির মূল ফারাক হল – চীন কোরিয়াকে টেবিলে ডেকে আনবে, আমেরিকাসহ সকলে বল প্রয়োগের পথ ছেড়ে সবাই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের পথে যাবে। নাকি আমেরিকা বোমা মারতে যাবে – এই হলো মূল তর্ক।

এখনকার এই সময় উত্তর কোরিয়া সুনির্দিষ্ট করে ইস্যু হয়ে উঠার পিছনের মূল কারণ অবশ্য আলাদা। দক্ষিণ কোরিয়া বা জাপান  উত্তর কোরিয়ার হামলার আয়ত্ত-সীমার ভেতর বহুদিন থেকেই আছে। তা থাকলেও খোদ আমেরিকা থেকে গেছে উত্তর কোরিয়ার নাগাল-সীমার বাইরে অনেক দূরে অন্য মহাদেশে। ফলে উত্তর কোরিয়ার  খায়েশ হামলার জন্য  আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালেস্টিক মিসাইল জোগাড় করা। সে বিষয়ক পরীক্ষা-নিরীক্ষার সফলতা উত্তর কোরিয়া নাকি পেতে চেষ্টা করছে, কিছু একটা পেয়েছে যা এখন পরীক্ষা করতে পারে, দেখতে চায় – এমন জল্পনা কল্পনার তথ্য এই হলো এখনকার টেনশনের উৎস। অবশ্য অনেকে এমন তত্ত্ব দিচ্ছেন যে, এটা আসলে  ট্রাম্পের আমেরিকাকে আবার যুদ্ধে জড়ানোর খায়েস বা উছিলা। একটা যুদ্ধ লাগিয়ে নিজ অর্থনীতির দশা ফিরানোর আকাঙ্খা ট্রাম্পের নাকি আছে। এসব ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্ব’ সত্য-মিথ্যা যাই হোক, নিউ ইয়র্ক টাইমস অন্য এক তথ্য জানিয়ে লিখছে, প্রেসিডেন্ট শি-এর সঙ্গের এই সফরে দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে কিছু একটা সমঝোতা হয়েছে, যেটা আস্তে ধীরে সামনে আসবে। [the Chinese have agreed to crack down on their second-tier banks that have helped finance the North’s trade.] অনুমিত এই খবর সত্যতা স্বীকার-অস্বীকার কোনটাই কেউ করে নাই। তবে চীনা প্রেসিডেন্ট শি এর ট্রাম্প সাক্ষাতের মাত্র দশদিনের মাথায় ইতোমধ্যেই দুবার তাদের দুজনের ফোনালাপ হয়েছে।

তবে কার্যত ও বাস্তবে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি তা হল, স্টিল ম্যানুফ্যাকচারিংয়ে প্রয়োজন হয় বিশেষ গুণসম্পন্ন এক কয়লা, সে কয়লার খনি উত্তর কোরিয়ার আছে। চীন দীর্ঘদিন ধরে এর বড় ব্যবহারকারী। এমন কয়লাভর্তি প্রায় ১০টা জাহাজ চীনা বন্দর থেকে ফেরত দেয়া হয়েছে এবং উত্তর কোরিয়ায় তা ফিরিয়ে এনেছে। বার্তা সংস্থা রয়টারের জাহাজ চলাচলবিষয়ক বিশেষ স্যাটেলাইট মনিটরিং সার্ভিস এই তথ্য দিয়েছে। অর্থাৎ চীন উত্তর কোরিয়া থেকে এই কয়লা আমদানি এবার প্রথম বন্ধ করল। যদিও এ সম্পর্কে কোন কিছুই সাংবাদিকদের প্রশ্নে্র জবাবে  চীন এখনও কিছু জানায় নাই। এছাড়া  কিছুদিন আগে জাতিসঙ্ঘের উত্তর কোরিয়া বিরোধী অর্থনৈতিক অবরোধের সিদ্ধান্তের পক্ষে চীন অবস্থান জানিয়েছিল; বলে সেই থেকে উত্তর কোরিয়ার সাথে চীনের সম্পর্ক ঝুলেই আছে। অর্থাৎ যেটা অনুমানের তা হল, উত্তর কোরিয়ার উপর অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকরভাবে প্রয়োগে জন্য  চীনের ওপর চাপ প্রয়োগ করেছে  আমেরিকার ট্রাম্প।

ওদিকে উত্তর কোরিয়ার শাসকের অবস্থান হল, পরিস্থিতি কোনো আলোচনার টেবিল পর্যন্ত গেলেও শর্তসাপেক্ষে তা কেবল পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের চুক্তি টুক্তির মধ্যেই সবকিছু যেন সীমাবদ্ধ থাকে। অনুষঙ্গীভাবে কোনো পণ্অয বিনিময়, বিনিয়োগের অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠুক সবার সাথে, বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে, তা সে একেবারেই চায় না। কারণ সে ক্ষেত্রে তার সরকার চিরতরে ক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনা বাড়বে। আবার চলতি পরিস্থিতিতে আমেরিকার জন্য এর নেতিবাচক দিকটা হল, সে দক্ষিণ কোরিয়া আর জাপানের প্রতিরক্ষা-দাতা হলেও (এই দুই দেশেই আমেরিকার সেনাঘাঁটি আছে) এই দেশ দুটার কেউ আমেরিকার সাথে মিলে যুদ্ধে শামিল হতে রাজি নয়। এককথায় বললে,আমেরিকা ছাড়া ঐ অঞ্চলের কেউই যুদ্ধের পথে যেতে আগ্রহী নয়। দক্ষিণ কোরিয়ায় এখন  প্রেসিডেন্ট নির্বাচন আসন্ন। তাই সব প্রার্থীই দাবি জানিয়েছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার মতামত না নিয়ে যেন আমেরিকা কোনো যুদ্ধ ঘোষণা না করে বসে। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি আরো একটু খোলাখুলি। তিনি বলছেন, ‘ছোড়া গুলির প্রতিটার ঐতিহাসিক দায়দায়িত্ব ক্ষয়ক্ষতি ও শাস্তির কথা মনে রেখে যেন সবাই আচরণ করে’।  [they must shoulder that historical culpability and pay the corresponding price for this,”]  চীনা হুশিয়ারির মূল কথা হল, এরকম উত্তেজনার মধ্যে দীর্ঘ সময় বসবাস করার ক্ষেত্রে আমেরিকা ও উত্তর কোরিয়া কোন ভুলবশত “(accidental conflict)’ সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে যেতে পারে। চীন এদিকটা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন।  বিশেষ করে চীন মনে করে ‘উত্তর কোরিয়ার সাথে আবার অস্ত্র কর্মসূচিতে নিগোসিয়েশন হতে পারে বলে চীন আস্থা রাখে এখনও’। কোরিয়া উপদ্বীপ অঞ্চল কী এ যাত্রায় যুদ্ধ এড়াতে পারবে, সে উদ্বিগ্নতায় এশিয়ার সবাই। যুদ্ধ মানে এশিয়ায় উদীয়মান অর্থনীতিতে যার যেটুকু অর্থনৈতিক অগ্রগতি, সমৃদ্ধি হয়ে আছে তা ধুলিস্যাত হয়ে যাওয়া। ফলে মাথা গরম নয়, নিগোশিয়েশন।

সর্বশেষ হল, ট্রাম্প আমেরিকার সিনেটের সকলকে কংগ্রেসে ডেকেছেন, যৌথভাবে সকলকে উত্তর কোরিয়া বিষয়ে প্রেসিডেন্টের বিফ্রিং জানানোর জন্য।  স্বভাবতই ট্রাম্পের এই  সিদ্ধান্ত উত্তর কোরিয়ায় আমেরিকার হামলা আসন্ন – এমন জল্পনা-কল্পনাকেই আরও বাড়িয়ে তুলল।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে ২৩ এপ্রিল ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় (প্রিন্ট পত্রিকায় পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন আপডেট ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

ফুট নোটঃ চীনা মুদ্রার নাম ইউয়ান (RMB) । এক আমেরিকান ডলার=৬.৮৮ ইউয়ান। [অর্থাৎ এক ইউয়ান মানে আমাদের প্রায় ১২ টাকা।]  ঐতিহাসিকভাবে গত ১৯৮১-২০১৭ এই সময়ের মধ্যে, ডলার-ইউয়ান এর মান সবচেয়ে বেশি ছিল ১৯৯৪ সালে ৮.৭৩ ইউয়ান, আর সর্বনিম্ন ১৯৮১ সালে ১.৫৩ ইউয়ান। 

Historically, the Chinese Yuan reached an all time high of 8.73 in January of 1994 and a record low of 1.53 in January of 1981.

ট্রাম্প-ভক্তিতে খুশি থাকা ভারতীয় হিন্দু মন এখন বিপদে

ট্রাম্প-ভক্তিতে খুশি থাকা ভারতীয় হিন্দু মন এখন বিপদে

গৌতম দাস

০৯ এপ্রিল ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2en


ঘটনা বহুবিধ এবং বেশ তামাশার! যেন সেই বহু পুরান প্রবাদ যে, দাঁত থাকতে কেউ দাঁতের মর্ম বুঝে না। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প – তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী দাবিদার হয়ে বাজারে আসার পর থেকে এনিয়ে ভারতের বিজেপি শিবসেনা সমর্থক কিছু মানুষের খুশি ছিল দেখার মত। কেন? এতে ভারতের খুশি হবার জন্য আবার কী হল? ভারতের সরকারি ইঙ্গিতে প্রকাশিত অবস্থান ছিল তারা খুশিতে আহ্লাদিত। তাদের অনুমান ছিল যে ট্রাম্প ২০১৬ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে জিতার অর্থ হবে বিগত জুনিয়র বুশ আমলের (দুই টার্ম ২০০১-৮) মত ইসলাম কোপানো দাবড়ানোর – মজা আর মজা- আবার ফিরে আসবে। খালি মুসলিম ব্যাশিং, মুসলমান দেখলেই দাবড়ানো আর চাপে রাখার নীতি ফিরে আসতেছে। এমনকি ট্রাম্পের জয়লাভের পর এবং গত জানুয়ারি ২০১৭ সালেও তারা প্রচন্ড খুশি ছিল। সদ্য উত্তরপ্রদেশে যে কুখ্যাত দাঙ্গাবাজ মুখ্যমন্ত্রী হলেন আদিত্যনাথ তিনিও খুশি শুধু না উনি আরও এক কাঠি সরেস। তা হল এই মুসলমান ব্যাশিং কোপানো ব্যান ইত্যাদি এগুলো করা ট্রাম্প নাকি শিখেছেন  তাদের দলের কাছ থেকে। আবার ট্রাম্প নির্বাচনে জিতে যাওয়াতে মোদী সরকারের মধ্তেযেও এক ধরণের আশাবাদ তৈরি হয়েছিল কারণ এটাকে  তারা পাকিস্তানের উপর আমেরিকার চাপ বাড়ানোর দিন ফিরে আসতেছে বলে দেখত।  ওয়ার অন টেররে ভারতের প্রপাগান্ডা গুলোও বেশ অদ্ভুত। এই যুদ্ধের শুরু যেন আফগানিস্তানের আলকায়েদা বনাম আমেরিকা – এখান থেকে শুরু নয়। মুল বিষয় যেন আলকায়েদা-বিরোধী আমেরিকার লড়াই নয়, সেই লড়াইয়ে পাকিস্তান যেন আমেরিকার হয়ে লড়বার, লড়ে দিবার ফ্রন্টাল রাষ্ট্র নয়। আফগানিস্তানে আলকায়েদার উত্থান ও ততপরতা যেন পাকিস্তানের কারণেই, পাকিস্তানের ইচ্ছায় শুরু হয়েছে বা পাকিস্তানই এসব কিছু করেছে, এটা ভাবতে ও প্রপাগান্ডা করতে ভালবাসে। অথচ মূল ঘটনাটা হল আসলে, আলকায়েদা টাইপের রাজনীতির সঙ্গে আমেরিকার রাজনৈতিক লড়াই। পাকিস্তান-ইন্ডিয়া কাশ্মীর নিয়ে লড়াই ঝগড়া প্রক্সি যুদ্ধ সবই করছে। সেগুলো আমেরিকার ওয়ার অন টেররের বড় জোর আন্ডার কারেন্ট। যেটা ৯/১১ এর আগেও ছিল এখনও আছে।

আবার আমেরিকা তার এই ওয়ার অন টেররের লড়াইটা লড়তে চায় এক. প্রচ্ছন্ন এই বয়ানের আড়ালে যে শুধু আলকায়েদারা টেরিরিস্ট নয় মুসলমান মাত্রই টেররিস্ট। দুই. ‘টেররিস্ট’ শব্দটা এনে এই যুদ্ধে নিজের দায়ভার উলটে সে মুসলমানের উপর দিতে চায় এবং ‘ওরা’ খারাপ – এই দায়ভারে অভিযুক্ত করতে চায়। এর উপর আবার একালে আমেরিকান নির্বাচনে এসে ট্রাম্প আরও এক উলটা গান ধরতে চায়।  তা হল, “মুসলমানেরা দুনিয়ায় গন্ডগোল করছে” এই আগাম অনুমিত বয়ানের উপর দাঁড়িয়ে এইবার বলতে চায় যে, তাই ট্রাম্প মুসলমানেদের আমেরিকায় ঢুকা বন্ধ করে আমেরিকানদের জীবন সুরক্ষা করার পথে যেতে চায়। সেকারণে নির্বাচনে এক অভিনব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ট্রাম্প যে, সে নির্বাচিত হবার পর দুনিয়ার মুসলমানদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করবে। প্রমাণহীন এসব বয়ানের বাস্তবায়নের ঝামেলা এবং এতে ট্রাম্পের বর্ণবাদ ছড়ানোর বিপদ থাকা সত্ত্বেও ট্রাম্প এই ধারণাকেই ছড়িয়ে  পপুলার করার পথ ধরেছিল কেবল ভোটের স্বার্থে।

এদিকেও ভোটে জিতে শপথ নিবার পর তিনি এককথার লোক এটা দেখাতে, তিনি তাঁর কথা টুইস্ট করে কথার ফাঁক তৈরি করেন।  তাঁর বয়ানে প্রথমত তিনি দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই টেররিস্ট –এই ধারণা যেন তিনি বজায় রেখেছেন এই ভাব ধরলেন ঠিকই কিন্তু এনিয়ে সিদ্ধান্তের সময় কেবল সাত রাষ্ট্রের (সারা দুনিয়ার না) মুসলমানের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেন।  দ্বিতীয়ত, আবার ইমিগ্রেশনে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময় যে কোন দেশের মুসলমান মাত্রই কার্যত তাঁর উপর এই নিষেধাজ্ঞা ইমিগ্রেশনে ব্যবহার করতে চাইলেন। তিন. তিনি ভাব ধরতে চাইলেন যে তাঁর এই সিদ্ধান্ত যেন আজীবনের। কিন্তু আদেশে যে তিনি লিখলেন এই সিদ্ধান্ত তিন মাসের। অর্থাৎ এটা সাময়িক। ব্যাপারটা নির্বাহী আদেশের মধ্যে “সাময়িক” তা বলে রাখতে চান এজন্য যে তাহলে আসলে যে “দুনিয়ার মুসলমান মাত্রই টেররিস্ট” এবং “মুসলমানদের অমেরিকায় প্রবেশ বন্ধ করে দিলে আমেরিকানদের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে” এর কোন প্রমাণ বা স্টাডি ট্রাম্পের কাছে না থাকলেও তাঁর সিদ্ধান্তের পক্ষে কোন সাফাই তাকে দিতে হবে হবে না। কারণ তিনি বলতে চান এবিষয়ে আমেরিকান সরকারের নীতি কী হবে তা ঠিক করতে গিয়েই তার সরকার বুঝাবুঝির শেষ করার জন্য এই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা আরোপ তাঁর দরকার। এই ছিল ট্রাম্পের চাতুর্য ও সাফাই। আবার এই কাজটাও তিনি বর্ণবাদ ছড়িয়ে করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমান মাত্রই সে ‘অভিযুক্ত’ ও ‘টেররিস্ট’ – বয়ান  এমন বানানোটা তা বর্ণবাদী। তা হলেও এই বর্ণবাদ করার লোভ ট্রাম্প ছাড়তে চান না। এমনকি কোন মুসলমান আমেরিকান নাগরিক বা আমেরিকায় বসবাস ও চাকরি করতে অনুমতিপ্রাপ্ত গ্রীনকার্ড ধারী ব্যক্তির বেলায়ও কেবল তিনি মুসলমান হলেই তার উপর ইমিগ্রশন নিষেধাজ্ঞা বলবত করতে চান ট্রাম্প।  এইভাবে মুসলমান  অধিবাসীর উপর আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল ট্রাম্প। যদিও শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প তার সিদ্ধান্ত আমেরিকান আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়ে যায়। তিনি আর তা টিকাতে পারে নাই। বাতিল হয়ে যায়।  কিন্তু ট্রাম্পের এসব মিলিয়ে মুসলমান ব্যাশিং বা পিছনে লাগা – এটার ভিতরেই ভারত সরকার আর বিজেপি শিবসেনা সমর্থক দলীয় লোকেরা নিজেদের স্বার্থ দেখেছিল। কারণ এই মুসলমান ব্যাশিং ও বিদ্বেষ এর মধ্যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের কূটনৈতিক সুযোগ সম্ভাবনা আছে। আর এই নীতি বাস্তবায়নে আমেরিকাকে ভারতের উপর নির্ভরশীল করে ফেলার সুবর্ণ সুযোগ জুটে যাওয়া হিসাবে দেখেছিল ভারতের আমলা-গোয়েন্দা চক্র। এছাড়া মোদীর মত রাজনৈতিকরা মুসলমান বিরোধী রেঠরিক আওয়াজ তুলে আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ও ভোটের বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বীর উপর বিশেষ সুবিধা পাবার সুযোগ হিসাবে দেখেছিল। এসব কিছু মিলিয়ে আমরা ভারতের কোন অর্ধ-আরবান শহরেও রাস্তায় রাস্তায় ট্রাম্পের ছবি টাঙিয়ে ফুল আর ধুপধুনা দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘন্টা নেড়ে পুজা করা হতে দেখেছি আমরা। আগ্রহীরা এই ক্লিপটা খুলে দেখতে পারেন। স্বভাবতই এটা ঠিক আর পুজা ছিল না, থাকেনি। ইসলাম –বিদ্বেষ আর ঘৃণা ভারতে কত তীব্র ভাবে লালন পালন করা হচ্ছে এর কিছু নজির – তাই আমরা দেখেছিলাম।  অবলীলায় বর্ণবাদের খোলাখুলি এত প্রকাশ বোধহয় আর কিছুতে প্রকাশিত হতে দেখা যায় না। ভারতে  বর্ণবাদ-বিরোধী হুশজ্ঞানসম্পন্ন কোন মানুষ বসবাস করে মনে হয় নাই। সে যাই হোক কিন্তু ওদিকে আদালতের বাধায় ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা এক-দেড় সপ্তাহের বেশি কার্যকর থাকতে পারে নাই। কিন্তু অতটুকু সময়েই এমনকি ভারতীয়দের এমন তর্ক করতে আমরা দেখেছি যে তারা বলছে, ইসরায়েলে যেতে বাংলাদেশের পাসপোর্টে যেহেতু নিষেধাজ্ঞা জারি আছে অতএব এরই সমতুল্য ঘটনা নাকি ট্রাম্পের “আমেরিকায় প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা জারি” করা। অথচ বাংলাদেশ-ইসরায়েলের ব্যাপারটা হল, একটা  পারস্পরিক আইনী কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা। এর ফলে কেবল নিজ দেশের নাগরিকের উপর নিষেধাজ্ঞা। অথচ এই বিষয়টাকে ট্রাম্পের “মুসলিম ব্যানের” এর সাথে জবরদস্তিতে তুল্য ঘটনা বানিয়েছিল এরা ফেসবুকে। পারস্পরিক কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকা মানেই সেটা বর্ণবাদি সমস্যা নয়। চীনে মাওয়ের বিপ্লবের পর থেকে পরের ২২ বছর চীন-আমেরিকা কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল না। কিন্তু সেটা বর্ণবাদী সমস্যা নয়। ওদিকে ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞার ধরণ নিজ নাগরিক উপর নয়। বরং দুনিয়ার এক বিশেষ ধর্ম-সম্প্রদায়ের উপর (বর্ণবাদি কায়দায়)। এমনকি ঐ ধর্ম সম্প্রদায়ের  কোন দেশি বা বিদেশি নাগরিকের উপর নির্বিশেষে । তবু  ট্রাম্প-প্রেমিম ও  ইসলাম-বিদ্বেষী ভারতীয়দের এমন সাফাই গাইতে আমরা দেখেছি। ভারতের আমলা-গোয়েন্দার এই ইসরায়েল-প্রেম তাদেরকে কূটনৈতিক মাইলেজ দিবে বলে তারা বিশ্বাস করে।

কিন্তু বেশি দিন লাগে নাই। বেচারা ভারতের আমলা-গোয়েন্দা। আর ট্রাম্পকে আক্ষরিকভাবেই পুজা-কারী সেই প্যাথেটিক আরএসএস সমর্থক ও ভোটাররা। ট্রাম্পের ক্ষমতার শপথ নিবার মাত্র একমাস – এর মধ্যে ভারত টের পেতে শুরু করে যে ঘটনা কল্পনা মত আগাচ্ছে না। ট্রাম্প জুনিয়র বুশ না; যে আমেরিকার ইসলামবিদ্বেষী নীতি মানেই তা আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কোলে ভারতীয় হিন্দু রাজনীতির উঠে পড়ার দুয়ার খুলে যাওয়ার এক্সট্রা মাইলেজ নয়।  বুশের আমলের রমরমা সুযোগ ট্রাম্পের হাত ধরে ফিরে আসছে না। ভারতের আমলা-গোয়েন্দা ট্রাম্পকে পাঠ করেছিল খুবই সহজভাবে। “আমরা আমরাই তো মনে করে”, এক ইসলাম-বিদ্বেষী ক্রুক হিসাবে। হিন্দু রাজনৈতিক মন এখানে প্রায় শতভাগ ব্যর্থ হয়েছে।

তাঁরা প্রথম ধাক্কাটা খায় “ভারতীয়রা আমেরিকানদের চাকরি খাচ্ছে” – ট্রাম্পের এই ইস্যুতে। এটা আমলা-গোয়েন্দারা আগে খেয়াল করে নাই এমন না। তারা ভেবেছিল একটা ‘প্যাচ আপ’ বা রফা তারা বের করে ফেলতে পারবে। এখানটাতেই তাদের নজর আন্দাজ ঘটে গেছিল।  ট্রাম্প কী নিয়ে রাজনীতি করতে চাচ্ছে তারা এটা শুধু বুঝেই নাই তা নয় একে আন্ডার এস্টিমেট করেছিল। ট্রাম্পের এই নির্বাচনের সাথে সাথে আমেরিকান সংসদ (কংগ্রেস) ও সিনেটের নির্বাচনে সবই রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্টতায় চলে যায়। গত বছর নভেম্বরে নির্বাচনের ফল আসার পর থেকেই প্রথমত “আমেরিকানদের চাকরি খাওয়ার” ভারতীয় কোম্পানীর বিরুদ্ধে একশনে  যাওয়া – এটা  পাগলা ট্রাম্পের একার পাগলামি ইস্যু নয়। এর প্রমাণ হল, ট্রাম্পের শপথ নিবার  আগে থেকেই লিড নিয়ে রিপাবলিকান কংগ্রেস ও সিনেট ‘চাকরি খাওয়া ইস্যু’ নিয়ে পাল্টা নতুন আইন, চাকরি আমেরিকার বাইরে চলে যাওয়া ঠেকানো নিয়ে নানান আইন প্রণয়ন শুরু হয়। আর এই প্রক্রিয়া শুরুর আড়াই মাস পর ট্রাম্প শপথ নিয়ে এতে যোগ দিয়েছিল। এরচেয়েও বড় কথা নতুন আইনের প্রস্তাবে কেবল রিপাবলিকানই না, ডেমোক্রাটদেরও তাতে সমর্থন ছিল ও আছে। শুধু তাই না কোন কোন আইনের প্রস্তাবক বাই-পার্টিজান, মানে দুই দল মিলে। সারকথায় ট্রাম্প আমেরিকানদের চাকরি খাওয়াকে নিজের নির্বাচনি ইস্যু করেছিল কথাটা সত্যি হলেও  কংগ্রেস ও সিনেটে এই ইস্যুটা ছিল বাই-পার্টিজান।

আসলে এই ঘটনার আসল অর্থ তাতপর্য হল, আমেরিকা ক্রমশ পতন হইতেছে এমন এক পরাশক্তি – কানে পানি যাবার এই অনুভব আমাদের সকল রাজনীতিকের , সব দলের। ফলে সবাই চাইতেছে আমেরিকার ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা হিসাবে রিপাবলিকানদের লিডে সবাই একসাথে সমর্থনে খাঁড়ানো। ট্রাম্প লিড নিলেও অন্তত এই ব্যাপারটাতে াইনের প্পিরস্ছতাবের পিছনে দাড়ানোর বেলায় সব অবস্থান গুলো এরকম। এদিকটাই ভারতীয় আমলা-গোয়েন্দাসহ অনেকেই আন্ডার এস্টিমেট করেছে। ভেবেছে এটা কেবল পাগলা ট্রাম্পের ইস্যু। ফলে ট্রাম্পের মুসলমান ব্যাশিং-এ খুশি হওয়া ভারতীয় হিন্দু মন অচিরেই বুঝতে শুরু করে যে ট্রাম্প তাদের রাজনীতির ‘বাবাও’ নয় অথবা কোন ‘দেবতাও’ নয়। ভারতীয় যারা আমেরিকানদের চাকরি খায় তারা “এইচ-১ বি” ক্যাটাগরির ভিসায় আমেরিকা গিয়ে চাকরি করে। আর ভারতে বসে কল সেন্টার’ ব্যবসা করা অথবা সফটওয়ার তৈরির শ্রমঘন অংশটা ভারত থেকে করে আনা – এগুলোকেই আমেরিকান চাকরি বাইরে থেকে করে আনা বা আউটসোর্সিং  বলা হয়। এসব কিছুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধে আইন প্রণয়ন চলছে এখন। এসব খবর পেয়ে ভারতীয়দের টনক নড়া শুরু হয়। শেষ চেষ্টা হিসাবে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে ভারত সব ধরলনের লবি করা প্রায় শেষ করেছে। কিন্তু ফলাফল শুণ্য। ট্রাম্প বুশ নয়, এটা ট্রাম্পের আমল – দিন বদল গয়া। ভারত সরকার ইসলাম-বিদ্বেষী উচ্ছ্বাসে আমেরিকার এক নম্বর দোস্ত ally  – এই বুঝ,  বুশের আমলের সেই পুরান আলাপ ট্রাম্পের আমলে অচল। এটা বুঝতেই দেরি করে আন্ডার এস্টিমেট করে ভারত ধরা খেয়েছে। ট্রাম্পের ইসলাম-বিদ্বেষ আর বুশের ইসলাম বিদ্বেষ এক নয়। আসলে সোজা কথা হল,  ট্রাম্পের ইসলাম বিদ্বেষী ড্রাম-পিটানো মূলত বিদেশী খেদাও, ইমিগ্রেন্ট খেদাও দেশি মানুষের চাকরি বাঁচাও – এই লাইনের।

ঘটনা এক, ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিবসহ কূটনীতিকরা আমেরিকায় লবি সফর শেষ করে ভারতে পা  দিয়ে যেই না বলেছে ‘চাকরি ইস্যুতে’ আমেরিকার আশ্বাস দিয়েছে সেই বলা শেষ না করতেই কল সেন্টার বিরোধী বিল পেশ, অথবা “এইচ-১ বি” ক্যাটাগরির ভিসার সুযোগ সুবিধা একটার পর একটা ছেটে দেওয়ার খবর ভারতীয় মিডিয়ায় ছেয়ে গেছে।

ঘটনা দুই, আরও যে সব নেগেটিভ কাহিনী ভারতীয় মিডিয়া নিচু আলোতে ফেলে রেখে এতদিন লুকায়ে রাখতে চাইছিল সেগুলো এখন উথলে সামনে আসছেই। গত ০৬ মার্চ আনন্দবাজার এখন লিখছে,  “তালিকাটা দীর্ঘ হচ্ছে ক্রমশ। শ্রীনিবাস কুচিভোটলা, হার্নিশ পটেলের পরে দীপ রাই। আমেরিকায় ফের গুলিবিদ্ধ এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত”। ভারতীয়রা আমেরিকায় এসে আমেরিকানদের চাকরি খাচ্ছে – তাই ভারতীয়দের আক্রমণ বা খুন করে দেশে ফিরে যাবার “নকশালী চিরকুট প্রচার” শুরু হয়েছে, সেকথাই এখন ভারতীয় মিডিয়া বলছে। আনন্দবাজারের আর এক রিপোর্টের প্রথম বাক্য  এরকম, – “এক দিকে কূটনৈতিক স্তরে মার্কিন শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে দৌত্য। অন্য দিকে,ভারত-মার্কিন বিভিন্ন সংগঠনগুলোকে দিয়ে ট্রাম্প নেতৃত্বের উপর চাপ তৈরি করা। আমেরিকায় কর্মরত এবং বসবাসকারী ভারতীয়দের পেশা এবং নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে এই দু’টি মাধ্যমে সক্রিয়তা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাইছে নয়াদিল্লি” ।

এখআনে তামাশার দিকটা লক্অষ্থয করা যাক, এই তো কয়েক মাস আগেও মুসলিম ব্যানে আমরা ভারতীয় সরকার, দল ও সমর্থক ভোটারদের উচ্ছ্বাস দেখেছিলাম। আর এখন আনন্দবাজার সেই ট্রাম্পের হাতে “ভারতীয়দের পেশা এবং নিরাপত্তা” নিয়ে উদ্বিগ্নতা খুজে ফিরছে।  আর উপরে যে “ভারত-মার্কিন বিভিন্ন সংগঠনগুলোকে দিয়ে” কথাটা বলতে দেখলাম ভারতের আমলা-গোয়েন্দারা এদেরকে দিয়েই আমেরিকায় বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালিয়েছিল।  এছাড়াও আনন্দবাজার নিজের এক সম্পাদকীয় লিখে বসেছে। যেখানে এবার লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে সম্পাদকের  আত্মসমালোচনাও আছে। অনলাইন আনন্দবাজারের সম্পাদক অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের নামে লেখা ৬ মার্চ সম্পাদকীয়র শিরোনাম হল, “পড়শিরা যখন আক্রান্ত হচ্ছিলেন,তখন পাশ ফিরে শোওয়াটা উচিত হয়নি”।   অর্থাৎ যখন “মুসলিম ব্যান” চলছিল তখন এরাই হাততালি দিয়েছিল। ট্রাম্পের পুজা করছিল। আর আজ  মুসলমান ব্যশিং এর “আসল মজা” এখন টের পাচ্ছেন অঞ্জন। তাই দল ভারী করতে ‘উচিত হয়নি’ বলে নিজেরই সমালোচনা করছে। কিন্তু আর কী সে দিন আছে? নিজের বিশ্বাযোগ্যতা?

শেষ করব আর একটা তথ্য দিয়ে। আগেই বলেছি সোশাল মিডিয়াতে ভারতীয় বাঙালিরা, ট্রাম্পের মুসলিম ব্যানের নির্বাহী আদেশের আর ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়িয়ে আমাদের পাশপোর্টে ইসরায়েল ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করেছিল।  গতকাল ১০ মার্চের খবর, ট্রাম্পের মুসলিম ব্যানের নির্বাহী আদেশে সেকালে খুশি হওয়া ভারতীয়রা নিজেই জানতে পারছে  – ভারতীয়রাও এই ব্যান থেকে বাইরে নয়। আনন্দবাজারের খবর, ট্রাম্পের দেশ “আমেরিকায় ঢোকা বারণ মনপ্রীতেরও”। সবচেয়ে বিস্ময়কর শব্দ হল “ও”, মনপ্রীত নামটা  মুসলমান নয়, এমন ভারতীয় মেয়েটাও। কানাডীয় নাগরিক হয়েও ভারতীয় শিখ অরিজিন মনপ্রীত আমেরিকার ঢুকতে পারেনি। ভারতীয়দের হয়ে আনন্দবাজার এতে খুবই কষ্ট পেয়েছে। এরপরেও কী হিন্দু-মন ইসলাম বিদ্বেষ বা বর্ণবাদি অবস্থান ত্যাগী হবে? হিন্দুগিরি নয়, সাধারণভাবে যে কোন মানুষের অধিকারের পক্ষে  নীতিগত অবস্থান নিবার তাগিদ বুঝবে? আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি!

 

গৌতম দাস : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[[এই লেখাটা এর আগে মাসিক অন্যদিগন্ত প্রিন্ট পত্রিকায় ছাপার জন্য ১১ মার্চ লেখা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

ট্রাম্পের পাগলামি সহনীয় করার উপায়

ট্রাম্পের পাগলামি সহনীয় করার উপায়

গৌতম দাস

১৭ মার্চ ২০১৭,  শুক্রবার

http://wp.me/p1sCvy-2dA

 

 

 

আপনি যদি  ক্ষমতাবান কিন্তু পাগলা মানে আপনি কখন কী করে বসেন আগাম অনুমান করা যায় না এমন এক প্রেসিডেন্ট হন, তবে আপনার প্রয়োজন আসলে সাথে একজন বুঝমান জামাই থাকা বা রাখা। যেটা হবে আপনার স্টাবিলাইজিং ফ্যাক্টর বা আপনাকে থিতু রাখার উপায়।  আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেলায় কথাটা সম্ভবত এক কঠিন সত্যি। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম স্ত্রীর ঘরের বড় মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প (Ivanka Trump) আর তাঁর স্বামী জেরাড কুশনার (Jared Kushner)। ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার শুরু থেকেই আমেরিকান মিডিয়া ট্রাম্পের তৃতীয় ও বর্তমান স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্প আর প্রথম স্ত্রীর ঘরের মেয়ে ইভানকা ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জীবনকাহিনী নানান স্পট টেনে এনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পেরেশান করে ছেড়েছিল। এ দিকে মেলানিয়া ফার্স্টলেডি বলে আখ্যায়িত হলেও তিনি তাদের ১০ বছরের একমাত্র সন্তানকে নিয়ে নিউ ইয়র্কের পুরানা বাসায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আর ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্টের সাথে মানে বাবার সাথে তাঁর আবাসস্থলে বসবাস করা শুরু করছেন বড় মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প তাঁর স্বামী কুশনারকে সাথে নিয়ে । সেখানে ইভানকা কার্যত ফার্স্টলেডির ভূমিকা নিয়েছেন, বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের অতিথিদের আপ্যায়িত করার ভূমিকা ও দেখাশুনার ভার নিয়েছেন তিনি। ওদিকে ইভানকার স্বামী কুশনারও শ্বশুরের মতোই হাউজিং ডেভেলপার ব্যবসায়ী হলেও নিজের ব্যবসার সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে তিনি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের একজন সিনিয়র অ্যাডভাইজার। তবে অবৈতনিক।  মিডিয়ায় যদিও শুরু থেকেই কুশনারের ইহুদি পরিচয়টা কখনোই মুখ্য করতে ভোলে না। প্রথম দিকে মিডিয়ায় মেয়ে-জামাইয়ের ব্যাপারটাকে কোনো ধান্ধাল জামাইয়ের কাণ্ডকারখানা হিসেবে ইঙ্গিত দিচ্ছিল। কিন্তু ইদানীং অন্তত দুটো ঘটনার-ইস্যুতে মিডিয়ায় ইভানকা-কুশনার এদের ভূমিকা নিয়ে খুবই ইতিবাচক রিপোর্ট আসতে দেখা যাচ্ছে।
অনেকেই জানেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবেশবিষয়ক অবস্থান ও নীতি খুবই বিতর্কিত বললেও কম বলা হবে। এমনিতেই ট্রাডিশনালি রিপাবলিকান রাজনীতি মানেই – সমাজের দীর্ঘমেয়াদী কমন স্বার্থের ইস্যুই বা কী, কিংবা পাবলিক ইন্টারেস্ট বা গণ স্বার্থের বিষয়গুলোর বেলায় সবার উপরে ব্যবসাদারের বা ব্যবসায়িক স্বার্থকে জায়গা প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া এদের খাসিলত। ফলে রিপাবলিকান ট্রাম্পের বেলায় এক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। ট্রাম্পের পরিবেশনীতি যা দুনিয়ার কোন পরিবেশবিদের উদ্বেগের সাথেই তিনি একমত নয়। তাঁর এমন নীতি যারা ঘিরে আগলে রেখেছে এরা হলেন– ট্রাম্পের শুরুর দিকের পরিবেশমন্ত্রী (পরামর্শক) হলেন পরিবেশের ক্ষতি অস্বীকারকারি Myron Ebell, বর্তমান এনার্জি মন্ত্রী (পরামর্শক) রিক পেরি Rick Perry, এনভায়রনমেন্ট প্রটেকশন কর্তৃপক্ষের প্রধান স্কট প্রুরিট Scott Pruitt এবং জেফ সেশন Jeff Sessions, যাকে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়েছে আর সেক্রেটারি অব স্ট্রেট রেক্স টিলারশন Rex Tillerson, যিনি এক্সন-মোবাইল তেল কোম্পানির সাবেক প্রধান নির্বাহী – এমন সব মার্কামারা লোকজন তাঁরা। এরা মনে করেন, কার্বনডাই-অক্সাইডে দুনিয়ার তাপ বেড়ে যায় এটা তাঁরা মানেন না এবং তাতে পরিবেশ ধ্বংস হয় এর প্রমাণ কী? তাঁরা বলে থাকেন, পরিবেশ ধ্বংসের আলাপ তোলাটা আসলে চীনা প্রচারণা মাত্র। আমেরিকান ব্যবসায়ের ওপর চীনকে সুবিধা দিতে এই মিথ্যা প্রচারণা চলছে। এই হলো তাদের ভয়াবহ সব সার-বক্তব্য। কিন্তু এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের মেয়ে ইভানকা ও জামাই কুশনার এদের ভুমিকা উলটা, তাঁরা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরিবেশ বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত নিতে ইতিবাচক দিকে প্রভাবিত করেছেন। পরিবেশবিষয়ক এক বিখ্যাত পত্রিকা ইকোওয়াচ জানাচ্ছে, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সূত্রে এক খবর হল, পরিবেশ বিষয়ে ট্রাম্পের এক এক্সিকিউটিভ অর্ডারে জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সব রাষ্ট্রের মিলিত দলিল – ‘প্যারিস ঐকমত্য’কে সরাসরি নিন্দা-সমালোচনা করে কোনো কথা ট্রাম্প সেখান থেকে বাদ দিয়েছেন, বলছেন না। ট্রাম্পের মেয়ে-জামাই তাঁকে এব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছেন।

দ্বিতীয় গুরুত্বপুর্ণ বিষয়, যেখানে ট্রাম্পের পাগলামি অবস্থান সিদ্ধান্তকে ঠাণ্ডা ও থিতু করার ক্ষেত্রে জামাই কুশনার ভূমিকা রেখেছেন বলে জানা যাচ্ছে তা হল – চীন ইস্যু। আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেন তিনি। ফলে ‘ইনফরমাল’ আলাপে ‘গঠনমূলক’ পথে চীনা-আমেরিকান স্বার্থবিরোধের সব ইস্যুতে উত্তেজনা নামিয়ে আনতে নেপথ্যে ভূমিকা রাখছেন কুশনার। এ ব্যাপারে যেমন প্রথম ব্রেক-থ্রু বা বাদাম ভাঙার কাজটা ছিল, ট্রাম্পকে এক-চীন নীতি মানতে ফেরত আনা। ফলে শপথ নেয়ার পর দীর্ঘ প্রায় তিন সপ্তাহ পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ০৯ ফেব্রুয়ারি প্রথম চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ফোন করেন। সেটা ছিল এমন এক পরিস্থিতি যখন  ট্রাম্পের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর থেকে বাস্তবে চীনের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের সব ধরণের যোগাযোগ ও ততপরতা স্থবির হয়ে পড়ে ছিল। কারণ প্রার্থী হওয়া থেকে নির্বাচিত হয়ে যাবার পরও চীন ইস্যুতে  ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল – চীন আমেরিকানদের চাকরি খেয়ে ফেলছে, চীনা পণ্য আমেরিকায় প্রবেশ ঠেকাতে ৪৫ শতাংশ ট্যাক্স বসাবো, দুনিয়ার তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে বলে পরিবেশবাদীদের হইচই আসলে আমেরিকার বিরুদ্ধে চীনা প্রপাগান্ডা, একচীন নীতি মেনে চলার ক্ষেত্রে আমেরিকানদের বাধ্যবাধকতা নেই ইত্যাদিতে ট্রাম্পের এসব রেটরিক বাকোয়াজে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে রুটিন কূটনৈতিক সম্পর্ক কাজ চালিয়ে নিতে যেসব তৎপরতা লাগে ট্রাম্পের প্রশাসন দিকনির্দেশনার অভাবে তাও চালিয়ে রাখতে পারছিল না। ফলে জামাই কুশনার এক্ষেত্রে আমেরিকায় চীনা রাষ্ট্রদূতের সাথে অনানুষ্ঠানিক আলাপ এগিয়ে নিয়ে সম্পর্কের পুনর্গঠন ও অভিমুখ ঠিক করতে ভুমিকা নিয়েছিল। যদিও এক্ষেত্রে আমরা অনুমান করতে পারি এমন পদক্ষেপের পক্ষে  ট্রাম্পের দিক থেকে আগাম সম্মতি ও আস্থা কুশনার আদায় করতে সক্ষম হয়ে নিয়েছিলেন। কুশনারের বিপরীতে চীনা অবস্থান ছিলও খুবই ইতিবাচক ও ঠাণ্ডামাথায় পরিচালিত। ফলে ট্রাম্পের ওই ফোনালাপে কুশনার-চীনারাষ্ট্রদুতের আগাম স্থির হওয়া এক টার্গেট ছিল যে, উভয় শীর্ষ নেতা কুশল বিনিময়ের পরে ট্রাম্প তাঁর প্রশাসনের একচীন নীতির পক্ষে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করবেন। আর এতে বিনিময়ে চীন বলবে, চীন-আমেরিকার বাণিজ্য-বিরোধ পারস্পরিক বসে আপস আলোচনায় মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। আর সব শেষে এর পর থেকে নিজ নিজ পক্ষের কূটনীতিকেরা বসে কাজ-সম্পর্ক এগিয়ে নেবে এ ব্যাপারে একমত প্রকাশ করে আলাপ শেষ হবে। এই ছিল কুশনার ও চীনা রাষ্ট্রদূত তাদের একমত পরিকল্পনা। সুন্দরভাবে সম্পর্কের এই প্রথম পর্ব সমাপ্ত হয়েছিল। এটা সম্ভব করতে কুশনারের এক বড় ভুমিকা ছিল। এবার দ্বিতীয় পর্বেও উভয়ের এক একমত টার্গেট হল, শি-ট্রাম্পের এক শীর্ষ বৈঠক আয়োজন করা। এই লক্ষ্যে কুশনার ও চীনা রাষ্ট্রদূত কাজ করছেন। মনে রাখতে হবে, আসলে বাইরে থেকে যেটাকে কোনো দুই রাষ্ট্রপ্রধানের শীর্ষ বৈঠক বলে আমরা যে দিনক্ষণটা দেখি সে দিনটা আসলে উভয়ের আগেই একমত হয়ে থাকে (ছোটখাট ব্যতিক্রমী কিছু টুকটাক বিষয় বাদে ) সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরের দিন। অর্থাৎ আলোচনায় কী কী ইস্যু আসবে আর তাতে উভয়ে কোথায় একমত হবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই দীর্ঘ দিন ধরে আলাপ ও বোঝাবুঝি নেগোসিয়েশন সবই আগেই চলতে থাকে। চীন-আমেরিকার ক্ষেত্রেও এই কাজটাই বর্তমানে চলছে। এরই কাজে চীনের দিক থেকে প্রভাবশালী সিনিয়র এক কূটনীতিক প্রতিনিধি ইয়াং জিচি (Yang Jiechi ) দুই দিনের আমেরিকা সফর করে গেলেন। ইয়াং জিচির সফরের প্রধান লক্ষ্য ছিল, আগামী এপ্রিলে না হলেও যেন মে মাসের মধ্যে শি-ট্রাম্পের শীর্ষ সফর আয়োজনে করা যায়, এরই ভিত্তি স্থাপন করে যাওয়া। ওয়াশিংটন-ভিত্তিক এক থিংকট্যাংক ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর প্রধান মাইকেল গ্রিনের উদ্ধৃতি দিয়ে হংকংয়ের পত্রিকা সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট জানাচ্ছে, সম্ভবত আগামী মাসে মানে এপ্রিলে এই শীর্ষ সফর হতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে ইয়াং জিচির ওয়াশিংটন সফরের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও বৈঠকে ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এবং ট্রাম্পের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে কুশনারও ওই মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন। আসলে আগামী জুলাইয়ে এবারের জি২০-এর মিটিং আয়োজিত আছে জার্মানিতে। ওই মিটিংয়ে মুখোমুখি সাক্ষাতের আগেই উভয় পক্ষই শি-ট্রাম্পের শীর্ষ সফর শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে আগাচ্ছেন। সেই লক্ষ্যে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কুয়েন নিজে যেচে বাণিজ্য-বিরোধ বিতর্কগুলো আলাপ-আলোচনায় মিটিয়ে ফেলা সম্ভব বলে বক্তব্য রেখেছেন। চীনা বাণিজ্যমন্ত্রী গাও এ নিয়ে বিস্তর কথা বলে আশাবাদ রেখেছেন। অর্থাৎ চীনের দিক থেকে একটা প্রস্তুতি হোমওয়ার্ক করা আছে যে কী কী বিষয়ে ছাড় দিলে আপোষে এ যাত্রায় ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে একটা রফায় পৌঁছানো সম্ভব।

এখানে একটা তুলনামূলক ছবি আঁকা যায়। ট্রাম্পের নীতির এই আমলে ভারতের সাথেও আমেরিকার বড় স্বার্থবিরোধ রয়েছে। ভারত আমেরিকানদের কাজ খেয়ে ফেলছে বলে বিশাল বিতর্ক ট্রাম্প প্রশাসনে শুধু নয়, কংগ্রেস ও সিনেটেও অভিযোগ বিতর্ক উঠেছে। চীনের বিরুদ্ধেও ট্রাম্প প্রশাসনের ঠিক একই অভিযোগ করছে। কিন্তু ফারাক একটা জায়গায়। ভারতের বেলায় এক দিকে ভারতের কূটনীতিক বা বিদেশসচিবদের সাথে প্রত্যক্ষ আলোচনায় ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বলে আমরা ভারতের মিডিয়ায় শুনছি, কিন্তু একই সাথে বাস্তবে দেখছি ভারতের কূটনীতিক বা বিদেশসচিবেরা ভারতে ফেরা মাত্র আমেরিকান কংগ্রেসে দেশেই চাকরি ঠেকানোর পক্ষে নতুন নতুন আইনের খসড়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে অথবা আইন জারি করা হচ্ছে। যেমন বর্তমানে ভারতে কল সেন্টার বসিয়ে তাদের দিয়ে আমেরিকায় কাস্টমার কেয়ার সার্ভিস দেয়া যেটা এতদিন চলে আসছে সেই ব্যবসার বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। যাতে আমেরিকার কল সেন্টার ব্যবসা আমেরিকায় বসেই করা হয়। আউটসোর্সিং না করা হয়।  ফলে অভিমুখ হিসেবে দেখলে ভারতের বেলায় ট্রাম্প প্রশাসন মতানৈক্য ও প্রকাশ্য সংঘাতের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। আর এদিকে চীনের সাথে ট্রাম্প প্রশাসনের বিরোধ একটা আপসরফার সম্ভাবনা উজ্জ্বল যতটুকুই হোক, চীনের বিরুদ্ধে অন্তত প্রতিরোধমূলক আইন প্রণয়ন চীনের বেলায় আপাতত এখনই হচ্ছে না তা বলা যায়। যদিও এটা কতদুর কোন দিকে যাবে, মোড় নিবে সেটা শিং জিনপিন ও ট্রাম্পের আসন্ন শীর্ষ বৈঠকের ফলাফল থেকে পরিস্কার বুঝা যাবে।
এসব তৎপরতা দেখে পাগলা ট্রাম্পের জন্য একজন ঠাণ্ডা মাথার জামাই থাকা খুব জরুরি সমাধান, অ্যান্টিডোট বলে হাজির হয়েছে।

 

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনের ১২ মার্চ ২০১৭ সংখ্যায় (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল। ]]

ট্রাম্পের অচল জাতীয়তাবাদ

ট্রাম্পের অচল জাতীয়তাবাদ

গৌতম দাস

মার্চ ১৪, ২০১৭  মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2dv

 

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের প্রায় দেড় মাস পার হয়ে গেল। কিন্তু এই ক্ষমতার হামবড়া, মিথ্যা প্রপাগাণ্ডা আর ষাটের দশকের অনুকরণে সস্তা জাতীয়তাবাদী বোলচাল এখন ওশেষ হলো না। তবে এবার সেসব সিদ্ধান্তের কিছু ব্যাকফায়ার করা শুরু করেছে। ফলে একালে তা এক০ অচল জাতীয়তাবাদ হিসাবে তা হাজির হয়েছে।

ট্রাম্প শপথ নেওয়ার দিন, ২০ জানুয়ারিতেই তিনি তাঁর বক্তৃতায় এক স্লোগান এনেছিলেন  – ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক ছিল কলোনি-মুক্তির প্রথম দশক। কলোনি মাস্টারেরা কলোনি ছেড়েছে বলে সদ্য কলোনিমুক্ত দেশে কিছু ‘মুক্তির’ উচ্ছ্বাস আর দেশপ্রেমের নহর একটু-আধটু বইবে এটা স্বাভাবিক। ফলে এক দেশপ্রেমের ধারণা – সবার আগে দেশ, দেশের স্বার্থ আগে ইত্যাদিতে যা সত্য নয় তাই বলে আবেগের বাড়াবাড়িও সেখানে থাকবে, সেটাও হয়তো স্বাভাবিক। কিন্তু যে বিষয়টা কখনোই মেলেনি, পরিষ্কারও জানা হয়নি যে, ঠিক কী করলে কীভাবে করলে সেটা ‘সবার আগে দেশ’ অথবা ‘দেশের স্বার্থ আগে’ এই আবেগী স্লোগানগুলার বাস্তব রূপ হয়। কারণ আগে তো নিশ্চিত হতে হবে যে কী করলে, কীভাবে করলে তা দেশের স্বার্থের পক্ষে যাবে, ‘দেশের স্বার্থ আগে’ হবে! কারণ দেশের স্বার্থে ভালো মনে করে করা কাজ যথেষ্ট না বুঝে যাচাই করে তা করা হয় না বলে তা দেশের বিরুদ্ধের কাজ হয়ে যেতে পারে। ভাল মনে করে করলে সেটাতে দেশের ভাল না হয়ে উলটা খারাপ বা ক্ষতিকর না হয়ে যায় – এটা তা আগে নিশ্চিত হতে হবে।

কোনটা দেশের স্বার্থ সেটা নিশ্চিত হওয়া খুব সহজ কাজ নয়। বিশেষত আনাড়িপনার কাছে। যেমন আমরা বাংলাদেশের মানুষ যা যা ভোগ করি এর সবটাই দেশে উৎপন্ন করতে পারা দেশপ্রেমের কাজ বলে সকলেই মনে করবে। ব্যাপারটাও খুব সহজই মনে হয়। কিন্তু কথাটা কী ঠিক? কারণ চরম অদক্ষপনা আর অযোগ্যতাতে হলেও সব কিছুই নিজ দেশে উৎপন্ন করতে হবে এমন মাথার দিব্বি দেওয়া ঠিক নয়। অর্থাৎ কোনো পণ্য উৎপাদনে আমাদের দক্ষতা না থাকতে পারে, কাঁচামাল টেকনিক্যালিটির সমস্যা থাকতে পারে, নিজেদের বাজার যথেষ্ট বড় না বলে কোনো পণ্যের লাভজনক উৎপাদন আদৌ শুরু করা সম্ভব নাও হতে পারে ইত্যাদি। কাজেই সব কিছুই নিজ দেশে উৎপন্ন করতে হবে  এটা হিতে বিপরীত কথা। এর চেয়ে বরং কেবল যা দেশি-বিদেশি বাজারে আমরা দক্ষতার সঙ্গে সরবরাহ করতে পারি। যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা করে বাজার দখল পেয়েছি অর্থাৎ আমাদের দক্ষতা আন্তর্জাতিক স্বীকৃত, তাই বেশি উৎপাদন করে বিনিময়ে আমাদের অন্যন্য প্রয়োজনীয়  ভোগ্যপণ্য আমদানি করা লাভজনক হতে পারে। একমাত্র সেটাই ‘দেশের স্বার্থ আগে’ করা কাজ বলে কথাটার সত্যিকার অর্থ হতে পারে। ফলে সাধারণভাবে আমদানি করা মানেই খারাপ আর রফতানি করা মানেই ভালো ব্যাপারটা তা নয়; এত সরলও নয়।

নিজ দেশের তৈরি গাড়ির কথাই ধরা যাক। ধরা যাক, আমরা নিজেদের গাড়ির চাহিদা মিটাতে সক্ষম এমন গাড়ি তৈরি করতে সক্ষম। কিন্তু তা তেল বেশি খায়, সার্ভিস ভালো দেয় না, পরিবেশ নষ্ট করে ইত্যাদি। এখন যেহেতু দেশে তৈরি গাড়ি, ফলে তা ব্যবহারে যদি নাগরিককে আইন কানুন চাপিয়ে বাধ্য করা হয় এর পরিণতি কী হবে? এর সহজ পরিণতি হবে নিজ গাড়ি উৎপাদন সেক্টরের অযোগ্যতা-অদক্ষতা, অপচয় (দুর্নীতিও থাকতে পারে) সব কিছুকে প্রশ্রয় দিয়ে পুষে রাখার এক আড়ত হয়ে উঠবে সেটা। ব্যাপারটা অনেকটা নিজ বাসায় আনন্দে ‘নিজ’ গারবেজ তাই, জমা করে রাখার মত। এখানে কারণ একটাই – গারবেজটা দেশি! কিন্তু গারবেজ তো মানুষের ঘরে রাখার জিনিস না, রাখাও যায় না। আর গারবেজ শেষ বিচারে সেটা ময়লা- আবর্জনা, গারবেজই। সুতরাং এতে একটা জিনিসই কেবল নিশ্চিত হয়, তা হলো দেশি ওই গাড়ি কোম্পানি জীবনে আর কখনো দক্ষ হতে পারবে না। এখন এটা কী আমাদের দেশপ্রেম? অথবা ‘সবার আগে দেশের স্বার্থরক্ষা’ ধরনের কাজ?

তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াল এই যে, কী করলে তাতে ঠিক দেশপ্রেম হবে এটাও আগাম নিশ্চিত হয়ে নেওয়ার দরকার আছে। একইভাবে বিদেশি পুঁজি দেশে আসতে দেওয়া প্রসঙ্গটিও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। সাধারণভাবে বিদেশি পুঁজিকে খুব খারাপ জিনিস মনে করা হয়। বিশেষত কমিউনিস্টদের এমন প্রচারণা ও মনে করা আছে তাই। অনেক সময় সস্তা জাতীয়তাবাদী কিংবা দেশপ্রেমিক হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করার জন্য সহজ উপায় হল বিদেশি পুঁজির বিরোধিতা করা। কারণ এটা নাকি শোষণ করে। কিন্তু এতটুকু বুঝতে পারাই কী যথেষ্ট? কোনো সমাজ-অর্থনীতিতে যে নতুন নতুন বিনিয়োগের প্রয়োজন বা চাহিদা দেখা দেয় স্বাভাবিক অবস্থায় তা নিজ অর্থনীতিই যোগাড় করতে বা একুমুলেট করতে পারে। কিন্তু আবার কখনো পারেও না। কখন? যদি লাগাতর ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে বৃটিশ কলোনি শাসনামলের মত উদ্বৃত্ত পাচার হয়ে গিয়ে থাকে। এই বিনিয়োগ ঘাটতি, কলোনি মুক্ত হয়ে গেলেও আর পূরণ করা সম্ভব হয় না। এরপর যতই দিন যায় একদিকে জনসংখ্যা ও বাজার মিলিয়ে বিনিয়োগ চাহিদার পরিমাণ বাড়তে থাকে, অন্যদিকে ছোট হয়ে থাকা নিজ অর্থনীতি থেকে বিনিয়োগের সংগ্রহ চাহিদার তুলনায় পরিমাণে অনেক কম হয়। ফলে প্রশ্নটা আর বিদেশি বিনিয়োগের খারাপ দিকগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না। আরও বিষয় বিবেচনায় আমলে নিতে হয়।  বিনিয়োগ না থাকাটাই প্রকট এবং তুলনায় আরো বড় খারাপ বিষয় বা সমস্যার মূল হিসাবে হাজির হয়ে যায়। ফলে বিকল্প সীমিত ঐ পরিস্থিতিতে সাময়িক বিদেশি বিনিয়োগ নেওয়ার সিদ্ধান্তই সঠিক পথ হয়ে উঠতে পারে। আর তাতে নিজ অর্থনীতিতে প্রাণ সঞ্চার থেকে বাড়তি সঞ্চয় ও পুঞ্জিভবন ঘটলে পরিস্থিতিও বদলে যেতে পারে। অর্থাৎ বিদেশি বিনিয়োগ প্রশ্নটা ভালো অথবা মন্দ এমন সরল ইস্যু নয়, বরং তুলনামূলক কম খারাপ বেছে নেওয়ার ইস্যু হয়ে দাঁড়াতে পারে। ফলে সাধারণভাবে বিদেশি বিনিয়োগ মানেই খারাপ এটা খুব যুক্তিসঙ্গত কথা নয়। সার কথা, কোন সিদ্ধান্তটা ‘দেশ সবার আগে’ এই স্লোগানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ তা বুঝতে হবে। পরীক্ষা নিরিক্ষা করে নিতে হবে। সেটা না বুঝে স্লোগান দিলে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। সম্ভাবনাই বেশি।

ট্রাম্পের সস্তা জাতীয়তাবাদ এমনই জটিলতার মুখোমুখিতে অচল জাতীয়তাবাদ হয়ে হাজির হয়েছে। এমনিতেই আমেরিকা গত সত্তরের দশক থেকেই গোটা দুনিয়াকে গ্লোবালাইজেশনের আওতায় আসতে বাধ্য করেছিল, শর্ত তৈরি করে চাপ সৃষ্টি করেছিল। দুনিয়াকে গ্লোবালাইজড উৎপাদন ও পণ্য বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থায় প্রবেশ করিয়ে ফেলেছিল। অথচ আজ ট্রাম্পের কালে এসে ট্রাম্পের আমেরিকা নিজেই সেই গ্লোবালাইজড দুনিয়া ছেড়ে ‘জাতীয়তাবাদী’ স্লোগান তুলছে। সংরক্ষণবাদী প্রটেকশনিস্ট হতে চেষ্টা করছে। কিন্তু চাইলেই কী তা হওয়া যাবে?

কী-স্টোন পাইপলাইন (Keystone XL pipeline) – কানাডারও উত্তরে আলবার্টা থেকে আমেরিকার নেব্রাসকা পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন করে নিয়ে জ্বালানি তেল আনার এক প্রজেক্টের নাম কীস্টোন পাইপলাইন সিস্টেম। ওবামার আমলে ২০১০ সালে এটা শুরু হলেও কয়েক ফেজ বা পর্যায় শেষ হওয়ার পর মূলত পরিবেশবাদীদের আপত্তি ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই প্রজেক্ট পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। কারণ এই শ্লেট থেকে তেল শুষে বের করার টেকনোলজি ও পদ্ধতিতে পৃথিবীকে অতিরক্ত উত্তপ্ত করার ঘটনা সংশ্লিষ্ট আছে। এ ছাড়া এত লম্বা পাতা পাইপলাইন থেকে তেল ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে পথে কোন সেনসেটিভ জায়গায় পড়ে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটতে পারে। ফলে পরিবেশবাদীদের ভাষায় এটা নোংরা বা ডার্টি তেল প্রজেক্ট। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই সেই পরিত্যক্ত প্রজেক্টকে আবার চালু করেছেন। আজ এখানে লেখার প্রসঙ্গ ঠিক এই পাইপলাইন প্রজেক্টের পরিবেশগত দিক নয়। ফলে এর চেয়ে বেশি পরিবেশ বিষয়ে তথ্যের দিকে আর যাব না। এখানে আলোচ্য বিষয় স্টিলের তৈরি ওই পাইপ লাইন। এতে কোন স্টিল এ পাইপলাইনে ব্যবহার করা হবে? আমেরিকান স্টিল কি না?

কেন এমন প্রশ্ন? কারণ এখানেই এক বিরাট অংশজুড়ে আছে ট্রাম্পের সস্তা বা অচল জাতীয়তাবাদ।

আগেই বলেছি, ট্রাম্প শপথ গ্রহণের বক্তৃতা থেকেই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এ সস্তা জাতীয়তাবাদী স্লোগান, এই দামামা বাজিয়ে চলেছেন তিনি। শপথ গ্রহণের চারদিন পর গত ২৪ জানুয়ারি তিনি এক নির্বাহী আদেশে সই করেন যে, কী-স্টোন পাইপলাইনে আমেরিকার তৈরি স্টিল ব্যবহার বাধ্যতামূলক হবে। নিজ দেশের স্টিল – একালে এসেও এই সস্তা আবেগ। ট্রাম্প এভাবেই তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদ প্রদর্শনের সুযোগ নেন। কিন্তু ক্যাপিটালিজমের অ আ ক খ যে জানে সে বোঝে এমন ব্যাপারগুলোর বিতর্ক বহু আগেই সমাপ্ত হয়েছে। আরও একটা উদাহরণ যেমন ধরা যাক, আমাদের বেক্সিমকোর একটা কম্পিউটার কোম্পানিও আছে। এখন বেক্সিমকো গ্রুপের সব কোম্পানি যেন তাদের কম্পিউটার ও সংশ্লিষ্ট সার্ভিস কেনাকাটা কেবল নিজ কম্পিউটার কোম্পানি থেকেই করে এবং তা বাধ্যতামূলক  – এই মর্মে গ্রুপ ম্যানেজমেন্ট যদি অধীনস্ত কোম্পানিগুলোকে নোটিশ পাঠায় তাহলে কী সেটা সঠিক হবে? এটাই কী গ্রুপ ম্যানেজমেন্টের নিজ কোম্পানিপ্রেম (বেক্সিমকো-বাদ) প্রদর্শনের সবচেয়ে ভালো উপায় বলে গণ্য হবে?

এর সোজা জবাব – না। বরং এই প্রসঙ্গের আসল জবাব হবে ঠিক এর উল্টা। গ্রুপ ম্যানেজমেন্ট বরং নোটিশ পাঠাবে যে তাদের অধীনস্ত যে কোনো কোম্পানি যেন কম্পিউটার সার্ভিস ক্রয়ের জন্য বাজার যাচাই করে কেবল সবচেয়ে ভালো কম্পিউটার কোম্পানি যাকে মনে হবে সেখান থেকেই কেনাকাটা করে। কেন এমন সিদ্ধান্তই সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত ও কোম্পানি-প্রেমি সিদ্ধান্ত হবে? কারণ ‘নিজ কোম্পানি’ বলে আবেগ তুললেই  – এ তথাকথিত কোম্পানিপ্রেমের আওয়াজ তুললে সেক্ষেত্রে নিজ কোম্পানি আর দক্ষ ও যোগ্য প্রতিযোগী কি না সে বিবেচনা করা বা যাচাই করার সুযোগ থাকবে না। আর এতে নিজ কোম্পানির সমস্ত অযোগ্যতা, অদক্ষতা ইত্যাদি পুষে পেলে প্রশ্রয়ে বড় করা হবে। তাতে এক পর্যায়ে এ কোম্পানিও নিজেই ডুবে যাবে হয়তো।

অপরদিকে, নিজের গ্রুপের অন্য কোম্পানি যারা নিজের কম্পিউটার কোম্পানির ক্রেতা হয়ে থাকবে এরা নিজেদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করবে। কম্পিউটার সংশ্লিষ্ট গুডস ও সার্ভিস সঠিক না পেয়েও নিজ কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার জন্য এবং মূল্য পরিশোধের জন্য। আমেরিকার স্টিল ব্যবহার করতেই হবে – ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত তেমনই এক অথর্ব এবং স্লোগানসর্বস্ব ক্ষতিকর সিদ্ধান্ত। বরং কীস্টোন কোম্পানিকে স্বাধীনভাবে স্টিল কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিলে সেটাই হতো আমেরিকান স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত।

ট্রাম্প প্রমাণ করেছেন, তিনি আসলেই একজন সস্তা জাতীয়তাবাদী। এদিকে সবশেষে তিনি আমেরিকান স্টিলই ব্যবহার করতে হবে এমন নির্বাহী সিদ্ধান্ত নিয়ে তা টেকাতে ব্যর্থ হয়েছেন। গত ৩ মার্চ রয়টার্স জানায়, ট্রাম্প নিজের নির্বাহী আদেশ নিজেই এখন শিথিল করেছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র সারাহ স্যান্ডারর্স এক মুখরক্ষা বক্তব্যে বলেন, ‘যেহেতু ওগুলো ইতোমধ্যে তৈরি হয়ে গেছে, স্টিল আক্ষরিকভাবেই বসানো হয়ে গেছে ফলে এখন ফিরে শুরু করা কঠিন। তবে এগুলোর বাইরে যা কিছু থাকবে কেবল সেগুলোর ওপর নির্বাহী আদেশটা কার্যকর থাকবে’।

পথ চলতে চলতে এক দাম্ভিক বুড়ি পা পিছলে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। তো বুড়ি তখন বলেন, ‘মাটিতে এই যখন বসলাম তখন পানটা খেয়েই নেই।’

লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

[এই লেখাটা এর আগে অনলাইন পত্রিকা “পরিবর্তন” এর গত ১৩ মার্চ ২০১৭ সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল। ]

 

ট্রাম্পের পর ভারতও – ‘এক-চীন’ নীতিতেই

ট্রাম্পের পর ভারতও, ‘এক-চীন’ নীতিতেই

গৌতম দাস

২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার

http://wp.me/p1sCvy-2d3

ভারতও এক-চীন নীতি মেনে চলতে চায় বা মেনে চলছে – পরোক্ষে সেকথাই ভারত চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে। একচীন নীতি মানে হল, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এটা স্বীকার করা। ‘এক চীন নীতি’ মেনে নিয়ে গত ০৯ ফেব্রুয়ারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্টের সাথে ফোনালাপ করেছেন, সে খবর জেনে দুনিয়া হাঁফ ছেড়ে একটা বড় নিঃশ্বাস নিয়েছিল। কারণ চীন-আমেরিকার কোন স্বার্থ সংঘাত থেকে কোন সামরিক উত্তেজনা তৈরি করুক সেটার মুখোমুখি হতে দুনিয়ার বেশির ভাগ সংশ্লিষ্ট পক্ষ এখন চায় না।  কিন্তু এ খবর শুনে কেউ কেউ দুঃখে হতাশও হয়েছিল। সম্ভবত তেমন রাষ্ট্র হল ভারত। ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে বিশেষ করে জয় লাভের পরে, আরও শক্ত করে ক্রমাগত চীনবিরোধী ‘রেঠরিক’ তুলে চলছিল। যেমন- আমেরিকায় চীনা পণ্যের প্রবেশের উপর ৪৫ শতাংশ ট্যাক্স বসাব, চীন কারেন্সি ম্যানিপুলেটর (মুদ্রা বিনিময় হারের উপর রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ করা), চীন আমেরিকানদের চাকরি নষ্ট করছে, পরিবেশবাদীদের পরিবেশ ক্ষতির আওয়াজ আসলে চীনা প্রচারণা, এক চীন নীতি মানতে আমরা বাধ্য নই ইত্যাদি আপত্তির বোলচাল হাজির করেছিল। এভাবে এক কথায় বললে ট্রাম্প যেন বিশাল এক ‘চীন-লড়ানি’ দিতে আসতেছেন বক্তব্যের এমন ভাব তৈরি করে ট্রাম্প দুনিয়াকে উদ্বিগ্নতায় অস্থির করে ফেলেছিলেন। বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্পের সেসব তৎপরতা ও বোলচালে সবচেয়ে বেশি আস্থা স্থাপন করেছিল ভারত। ট্রাম্প এভাবে  সামনে খাড়ায় গেলে তাঁকে আড়াল হিসেবে রেখে সে আড়ালকে ব্যবহার করার সুযোগ দেখেছিল ভারত। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে ট্রাম্পের আমেরিকার ওপর ভারতের আস্থা রাখা একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল। মানুষ অন্যের মাথায় কাঁঠাল রেখে খায়, কথা সত্য। কিন্তু বুদ্ধিমানেরা কেবল এই সুবিধার দিকটাই দেখে না, সম্ভাব্য অনুষঙ্গি অসুবিধা বা ক্ষতির দিকেও চোখ রাখে। মনে হচ্ছে, ভারত সেটা রাখতে পারেনি।  দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প ‘পল্টি’ দিয়ে অবস্থান বদল করলে কী হবে, সেটা নিয়ে কমই ভেবেছিল ভারত। তাই ভারত তাইওয়ানের এক সরকারি প্রতিনিধিদলকে (তিনজন এমপিসহ ব্যবসায়ীরা) ভারতে তিন দিনের সফরের আমন্ত্রণ জানিয়ে সফরের আয়োজন করেছিল। ইতোমধ্যে সে সফর সম্পন্নও হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আফটার এফেক্ট বা পরবর্তি-প্রতিক্রিয়া রেখে গেছে।

বিগত ’৭০-এর দশক থেকেই এক চীন নীতি মেনে চলার আমেরিকান প্রতিশ্রুতি অস্বীকার করে ট্রাম্প তা মানতে না চাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন- এই মাসল ফুলানো দেখে ভারত সেটাকে নিজের মাসল মনে করে বসেছিল। ভুলে গিয়েছিল যে ভারতও এক চীন নীতি মেনে এই শর্তেই চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করেছিল ও সে সম্পর্কে আছে। ফলে স্বভাবতই ভারত তাইওয়ানকে স্বাধীন সরকার গণ্য করতে পারে না। অর্থাৎ তাইওয়ানের সাথে ভারতের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। কিন্তু ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে, যেটা চীন সরকারও আপত্তি করে না।
যেমন তাইওয়ানের রাজধানী তাইপেতে ভারতের ‘কার্যত এক অ্যমবেসি’ আছে যেটার আনুষ্ঠানিক নাম হল ইন্ডিয়া-তাইপে সমিতি (ভারত-বাংলাদেশ সমিতির মত)। কারণ কূটনৈতিক স্বীকৃতি সম্পর্ক নেই বলে তাইপে-তে ভারতীয় অ্যামবেসি খোলা সম্ভব নয়। তবে লক্ষ করার বিষয় রাষ্ট্র পরিচয়ে ইন্ডিয়া বলা হলেও এর সমান্তরালে ‘তাইওয়ান’ বলা হয়নি, ধরা হয়নি। তাইওয়ানকে রাষ্ট্র বিবেচনা করা হয়নি। (রাষ্ট্রের নামের জায়গায় রাজধানীর নাম) তাইপে বলা হয়েছে। ফলে দেখা যাচ্ছে এখানে নাম বলার লজিকে মিল নেই, ইচ্ছা করে রাখা হয়নি। কারণ বলতে হত হয় ইন্ডিয়া-তাইওয়ান, না হলে দিল্লি-তাইপে। এর কোনোটাই না হয়ে নাম রাখা হয়েছে ইন্ডিয়া-তাইপে অ্যাসোসিয়েশন (সমিতি)। আর এর বিপরীতে  দিল্লিতে তাইওয়ানের সমিতি অফিসের সমতুল্য হিসাবে তাইপে-তে অফিসটির নাম রাখা হয়েছে – ‘তাইপে অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র’, মাত্র ১৯৯৫ সালে যা প্রতিষ্ঠিত। চীনের সাথে অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক বিনিময়ের শর্ত হলো তাইওয়ান চীনের অংশ, এটা মানতে হবে। ফলে কোন রাষ্ট্র তাইওয়ানের সাথে রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক রাখতে পারবে না। তবে তাইওয়ানের সাথে ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’ সম্পর্ক রাখা যাবে। যেমন, তাইওয়ানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কও ‘অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক’। কোনো কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নেই। আসলে এটাই কোনো রাষ্ট্রের একই সাথে তাইওয়ান ও চীনের সাথে সম্পর্ক রাখার একমাত্র উপায় – এই একটাই উপায়  চীন খুলে রেখেছে। আমেরিকা, ভারত বা বাংলাদেশসহ সবাই তাই এই পথের পথিক।

যেটা বলছিলাম ভারত ট্রাম্পের আড়ালে সুযোগ নিতে চেয়েছিল। তাইওয়ানের সংসদীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে তিন এমপিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এবং গত সপ্তাহে তাদের ভারত সফর সমাপ্ত হয়। এরপরই চীনা কড়া প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। প্রতিশ্রুত এক চীন নীতি থেকে ভারতের সরে যাওয়ার কথা চীন স্মরণ করিয়ে দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘কড়া’ আপত্তি জানায়। কূটনৈতিক ভাষায় এ ধরনের আপত্তি তোলাকে ‘সলেম রিপ্রেজেন্টেশন’ (solemn representation) বলে। অর্থ হল, যথেষ্ট ভাবনা চিন্তা করে শপথ করে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলার জন্য দেখা করা।  দু’টি উৎস থেকে চীনের এই আপত্তির খবর জানা যায়। এক. চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের প্রেস-ব্রিফিংয়ের প্রশ্ন-উত্তরে। আর দুই. চীনের গ্লোবাল টাইমস পত্রিকা থেকে। এটা ‘বিশেষ’ এক সরকারি পত্রিকা। চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয় যেসব কথা, মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া বা মনোভাব যেটা তাদের মনের আসল কথা কিন্তু নানান জটিলতা এড়াতে আনুষ্ঠানিকভাবে তা বাইরে বলতে চায় না অথচ চীনা সরকারি অবস্থান কী, কী ভাবছে তারা এটা দেশে-বিদেশে সবাইকে জানাতে চায়, সেই প্রয়োজন আর এমন সব পাঠকের কথা চিন্তা করে এই পত্রিকা প্রকাশিত হয়ে আসছে। দেশী-বিদেশী মিডিয়া পাঠকেরা তাই এই চোখেই গ্লোবাল টাইমস পাঠ করে থাকে। বিশেষ করে এই পত্রিকার নিয়মিত সম্পাদকীয় এর মাধ্যমে চীনা সরকারি অবস্থান অনানুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়। গ্লোবাল টাইমস ১২ ফেব্রুয়ারিতে লেখা এক সম্পাদকীয়তে তাইওয়ানিজ প্রতিনিধি দলের ভারত সফর সম্পর্কে চীনের বিস্তারিত মনোভাব ও আপত্তির দিক জানিয়েছে। এর শিরোনাম হল – “নয়াদিল্লি তাইওয়ান কার্ড খেললে হারার ক্ষতিতে ভুগবে”। (New Delhi will suffer losses if it plays Taiwan card)।

ইতোমধ্যে চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গেং শুয়াং বলেছেন,  “We hope India would understand and respect China’s core concerns and stick to the One-China principle and prudently deal with Taiwan-related issues and maintain sound and steady development of India-China relations.”। বাংলা করে বললে, “আমরা আশা করি, এক চীন নীতি চীনের মুখ্য স্বার্থ এটা ভারত জানে। ফলে তা ভারতের বোঝা ও সম্মান করা উচিত। অতএব বুদ্ধিমানের মতো করে সে তাইওয়ান সম্পর্কিত ইস্যু নাড়াচাড়া করবে এবং চীন-ভারতের সম্পর্ককে নিস্তরঙ্গে ও ধারাবাহিকতায় বিকশিত করবে”। ওই মুখপাত্র এক চীন নীতিতে তাইওয়ান সম্পর্কিত ভারতের দেয়া প্রতিশ্রুতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “আমরা সব সময় (তাইওয়ানের সাথে) সরকারি যোগাযোগ, কূটনৈতিক সম্পর্ক বা কোনো সরকারি প্রাতিষ্ঠানিকতা গড়ার বিরোধিতা করে এসেছি”। এ বিষয়টা মিডিয়ায় সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে এসেছে ভারতের হিন্দুস্তান টাইমসের বেইজিং প্রতিনিধি- সুতীর্থ পত্রনবীশের এক বিস্তারিত রিপোর্টে। যেটা হিন্দুস্তান টাইমসসহ অন্যান্য বিদেশী পত্রিকাতেও অনুমতি নিয়ে কপি ছাপা হয়েছে।

চীনা গ্লোবাল টাইমসে প্রকাশিত সম্পাদকীয়তে লেখা প্রথম বাক্য হল – এক চীন নীতিতে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টে গেছেন তখন ভারত উসকানিদাতা (‘provocateur’) হতে চাচ্ছে। এ সফর আয়োজনে ভারতের মতলব কী ছিল, সে সম্পর্কে চীন কী মনে করে তা জানা যায় পরের প্যারা থেকে। এখানে তা অনুবাদ করে তুলে আনছি : ‘কিছু ভারতীয় তাইওয়ান প্রশ্নকে চীনের গোড়ালিতে কাঁটা মনে করে। এরা দীর্ঘ দিন ধরে তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর ও দালাই লামা ইস্যুকে চীনের বিরুদ্ধে দরকষাকষিতে ব্যবহার করতে চেয়ে আসছে। সাম্প্রতিককালে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর [এটা প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলারের এক প্রকল্প; পাকিস্তানের গভীর সমুদ্রবন্দর Gwadar Port থেকে দক্ষিণ-উত্তর এভাবে সারা পাকিস্তানের বুক চিরে যে সড়ক চীনের ল্যান্ড লকড পশ্চিমাংশে প্রবেশ করেছে – এই ব্যাখ্যা আর্টিকেল লেখকের] প্রকল্পের অগ্রগতিতে চীনের বিরুদ্ধে ভারতের স্ট্রাটেজিক সন্দেহ বাতিকতা বাড়ছে। ভারত জেনেশুনে গোঁয়ারের মতো চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করছে, যেটা আসলে যেসব রাষ্ট্রের ভেতর দিয়ে যাবে তাদের সবাইকে সুবিধা দেবে- এমনকি ভারতকেও একইভাবে (যদি ভারত চায়)। ওই অর্থনৈতিক করিডোর যেহেতু পাকিস্তান কাশ্মিরের ভেতর দিয়ে কিছু অংশ যাবে (কাশ্মিরের পাকিস্তান অংশ তুলনায় রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল হলেও ভারতের চোখে যেহেতু পুরো কাশ্মিরই বিতর্কিত) ফলে সেটা বিতর্কিত ভারতের কিছু কূটবুদ্ধিদাতা এই যুক্তিতে মোদি সরকারকে তাইওয়ানিজ কার্ড খেলার পরামর্শ দিয়েছেন। উদ্দেশ্য হল, ভারত চীনের এক চীন নীতি মেনে চীনের সাথে সম্পর্ক করেছে তাই এর বিনিময়ে (পুরো কাশ্মির ভারতের এই) ‘এক ভারত’-এর পক্ষে চীন সমর্থন চেয়ে বসুক। কিন্তু তাইওয়ান প্রশ্নে চীনকে চ্যালেঞ্জ করে ভারত আসলে আগুন নিয়ে খেলছে। এই দ্বীপ (তাইওয়ান) ভারতের কোনো কাজে আসবে না, না তাকে ব্যবসা বিনিয়োগের উন্নতিতে, না মেনল্যান্ড চীনকে ঠেকিয়ে দিতে। ওদিকে স্টিল, টেলিকম ও আইটি ব্যবসায় মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচিতে তাইওয়ানিজ বিনিয়োগ বাড়ছে। তবে মেনল্যান্ড-চীন ভারতের এক মেজর ট্রেডিং পার্টনার আর এই সম্পর্কের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধও কিছু পুরনো ঝগড়ার কারণে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সময়ে কঠিন হয়ে যায়”।

এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্প
এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্প

এত দূর বলে সম্পাদকীয় এবার দুটো বাক্যে – একটি সাবধান বাণী আরেকটিতে পরামর্শ রেখেছে। সাবধান বাণী হল, তাইওয়ান ও মেনল্যান্ড চীনের বিবাদে ভারত যেন ব্যবহৃত না হয়ে যায়, তাইওয়ানের এমন উদ্দেশ্য আছে। আর পরামর্শ হল – ‘এক বেল্ট এক রোড’ প্রকল্পে [যেটা এশিয়া (পাকিস্তান) থেকে ইউরোপ পর্যন্ত এক সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা, যার বিভিন্ন স্থানে গভীর সমুদ্রবন্দরের কানেকশন থাকবে] যোগদানের সুবিধা নিয়ে ভারত চীন থেকে প্রচুর বিদেশী বিনিয়োগ আনতে পারে।
এ তো গেল চীনের প্রতিক্রিয়া। কিন্তু ট্রাম্পের পিছু হটার পর এবং ভারতের কেসে চীনের শক্ত আপত্তি তোলার পর ভারতের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? চীনের একটা শক্ত আপত্তির পয়েন্ট ছিল তাইওয়ান-ভারতের সম্পর্ককে কখনোই সরকারি ছাপ দেয়ার চেষ্টা বা সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা অতীতে করা হয়নি। এখন কেন ভারত দাওয়াত দিচ্ছে? এ প্রশ্নে বাস্তবতা কী তা সহজে সবচেয়ে ভালোভাবে আমরা জানতে পারি হিন্দুস্তান টাইমসের পত্রনবীশের লেখা রিপোর্ট থেকে। সবচেয়ে মুল্যবান রিপোর্ট সেটা। তিনি জানাচ্ছেন এই গত বছর মে মাসের কাহিনী, সময়টা ছিল এখনকার তাইওয়ানিজ প্রেসিডেন্টের নির্বাচিত হওয়ার পর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের। তিনি ভারতকে সরকারি পর্যায়ে দাওয়াত দিয়েছিলেন। কিন্তু ভারত সেখানে কোনো প্রতিনিধি পাঠাতে রাজি হয়নি। এই উদ্ধৃতি দেয়ার পর পত্রনবীশ প্রশ্ন তুলে বলছেন, তাই এখন “তাইওয়ানিজ ডেলিগেশনকে দাওয়াত দেয়ার অর্থ ভারত তার নীতি থেকে সরে গেছে, বদল ঘটিয়েছে”। অর্থাৎ পত্রনবীশের চোখেও ভারতের আচরণ অস্বাভাবিক ও বেমিল।
ভারতের দিক থেকে চীনা অভিযোগের জবাবে বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপের সাফাই বক্তব্য আছে। ভারতের লাইভমিন্ট পত্রিকা থেকে নিয়ে তা অনুবাদ করে বললে তা এ রকম : “ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে এমন বেসরকারি (ইনফরমাল) ভারত সফর এর আগেও হয়েছে। আমার জানা মতে তাঁরা এমন সফরে চীনেও যায়। তাই এই সফরের মধ্যে নতুন বা অস্বাভাবিক কিছু নেই। আর এর ভেতরে রাজনৈতিক মানে খোঁজারও কিছু নেই”।

কূটনীতির ভাষা হয় ক্যালকুলেটিভ, আগেভাগে হিসাব-কিতাব করে বলা কথা। বিকাশ স্বরূপ তাই করেছেন। তার বক্তব্যের মূল অর্থ বহনকারী শব্দগুলো হল – ‘ইনফরমাল’, ‘নতুন বা অস্বাভাবিক’, ‘রাজনৈতিক মানে’ ইত্যাদি। তিনি প্রথমেই সব কিছু ঠাণ্ডা করতে এই সফর বা দাওয়াত সরকারি নয়, ‘ইনফরমাল’- এই অস্ত্র চেলে দিয়েছেন। এভাবে সব অভিযোগ নাল ও ভয়েড করে দিয়েছেন তিনি।  যদিও ডেলিগেশনে ‘সংসদীয় প্রতিনিধি কেন’ এই প্রশ্নে তিনি কিছু বলতে না পারায় এটা তাঁর সাফাইকে একটু দুর্বল করেছে। তাই তিনজন ‘সংসদীয় এমপি’ এদের এই পরিচয়টি উহ্য রেখে আড়াল করে তিনি বলতে ছেয়েছেন – ওরা ব্যবসা, ধর্মীয় বা টুরিজমের উদ্দেশ্যে ভারতে আসা লোকজন। এই বলে পরিচয়টি হালকা করতে চেয়েছেন। দ্বিতীয়ত, তাইওয়ানিজরা চীন সফরে যায় এ কথাও সত্য। এমনকি তারা চীনের বিশ্বব্যাংকের সমতুল্য যে নতুন ব্যাংক (AIIB) হয়েছে, তারও আলাদা সদস্য হয়েছে তাইওয়ান। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ এ কথাগুলো সত্ত্বেও একটাই ফারাক যে, এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টতা বা সফরের একটাও চীনের সরকারি পর্যায়ে দেয়া দাওয়াত নয়। চীনা নীতি হল রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক সম্পর্ক বা স্বীকৃতি না হলেই হল। মূলত ব্যবসায়ী যোগাযোগ, এটা করা জায়েজ। বিকাশ স্বরূপ তাই ব্যবসার কথা এনে সবশেষে তাইওয়ানিজদের সাথে এই যোগাযোগের কোনো ‘রাজনৈতিক মানে’ নেই দাবি করছেন। অর্থাৎ এটা রাজনৈতিক যোগাযোগ বা সম্পর্ক নয়, তাই তিনি বলে সাফাই আনতে চাইছেন।

তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ মিডিয়ার অনেকে এটা ভারতের নীতি পরিবর্তন বলে ভারত সরকারকে অভিযোগ করেছে। আবার অনেকে এটাকে – চীনা দাবি ভারতের ‘উড়িয়ে দেয়া’ এমন বিশেষণ লাগিয়ে হাজির করেছেন। স্বভাবতই ‘উড়িয়ে দেয়া’ বিশেষণ এটা জাতীয়তাবাদী ব্যাখ্যা। কিন্তু আসলেই কি এটা বিকাশ স্বরূপের চীনকে ‘উড়িয়ে দেয়া’?
অবশ্যই নয়। প্রথমত, ভারতের বক্তব্যের সারকথা হল, আমরা এক চীন নীতি ভাঙিনি, নীতির বাইরে যাইনি, নতুন কিছু করিনি। এটা আগের মতোই। এবং সর্বপরি, এটা ইনফরমাল” – এই কথাটা গুরুত্বপুর্ণ।  কথার সোজা অর্থ হলো ভারত এক চীন নীতিকে দেয়া প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে চায়, চলেছে এবং মেনে চলা দরকার মনে করে। অমান্য করতে চায় না। ভারতও এক-চীন নীতি মেনে চলতে চায় বা মেনে চলছে – পরোক্ষে সেকথাই ভারত চীনকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে ভারত। ফলে তাইওয়ানের সাথে সরকারি যোগাযোগ ভারত করতে চায় না। অর্থাৎ আমি আইন মানা ভারত- এটাই বলতে চাওয়া। ভারত চীনকে চ্যালেঞ্জও করছে না। ট্রাম্পের মতো উড়িয়ে দেয়া নয় এটা।
অতএব এটা ট্রাম্পের মতো অবস্থান নয়। ভারত বলছে না এক চীন নীতি মানতে হবে কেন? অথবা মানব কি না তা নিয়ে দরকষাকষি করতে চাই; অথবা আমাকে অমুকটা দিলে তাহলে মানব- এমন অবস্থান এটা নয়। তাহলে এটা উড়িয়ে দেয়া হয় কী করে? এটা উড়িয়ে দেয়া নয়।
আরো স্পষ্ট করে বললে ভারত মনে করে, মেনল্যান্ড চীনের সাথে সম্পর্ক ভারতের কাছে তাইওয়ানের চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এ ভাবটাই ভারত প্রকাশ করেছে। ব্যাপারটা বাস্তবেও তাই।
আসলে ব্যাপার হল, চীনের সাথে কোন রাষ্ট্রের এক চীন নীতি মানতে না চাওয়ার মানে হল ওই রাষ্ট্র চীনের সাথে কূটনৈতিক যোগাযোগ সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলতে পরোয়া করে না। ক্ষেপাটে ট্রাম্প চিন্তা-ভাবনা ছাড়া এমন অনেক কথা বলতেই পারেন। কারণ পরিণতি চিন্তা না করে তা বলা একেবারেই সহজ। কিন্তু সম্পর্ক ছিন্নের অর্থ চীনে আমেরিকার যেসব ছোট বা বড় ব্যবসায়ী, ওয়ালস্ট্রিট বিনিয়োগকারীরা সবচেয়ে ভালো বোঝেন। যারা  চীনে ব্যবসা করে টিকে আছেন, এখন তাদের সবাইকে চীনের সাথে সম্পর্কহীন হতে হবে। এটা কি সম্ভব? এটা কেউ কি রাজি হবেন? অর্থাৎ এই এখানে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নেয়ার আসলে কেউই নন। আর ভারতের ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা কম-বেশি এমন নয়? বাস্তবতা হল চীনের বিনিয়োগ, ভারতে শিল্পায়ন, বাণিজ্যিক সম্পর্ক ভারতের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য ভাইটাল। অবশ্যই চীনের কাছেও এই সম্পর্ক কোনোভাবেই তুচ্ছ নয়। ছয় মাস আগে ভারতের প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল চীনা বিনিয়োগ আনতে চীন সফরে গিয়েছিল। চীনের সাথে ভারতের বিনিয়োগ আনার সম্পর্ক এটা রিয়েলিটি। আসলে দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় উদ্বৃত্ত বিনিয়োগ পুঁজি, সক্ষমতা যে কালে যেখানে যে রাষ্ট্রে আছে, বিনিয়োগ সেখান থেকেই আসবে। সেদেশ সবচেয়ে অপছন্দের হলেও। এটাই স্বাভাবিক। তবুও ট্রাম্পের কোলে চড়ে কিছু যদি বাড়তি ভারতের হাতে লেগে যায়- এমন ব্যর্থ প্রচেষ্টার ব্যতিক্রমও আমরা দেখতে পাবো।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

ট্রাম্পের প্রথম আপোষ

ট্রাম্পের প্রথম আ্পোষ

গৌতম দাস

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2cS

 

 

 

হাওয়া কি এত দ্রুত বদলে যাচ্ছে? অনানুষ্ঠানিক আলাপে আমরা কাউকে যেমন পাগলা বলি, ঠিক তেমন আমেরিকান নতুন প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে নিজের নামের আগে আমাদের দেশী ভাষায় এই ‘পাগলা’ বিশেষণ লাগিয়ে ফেলার মত কাজ করেছেন – পাগলা ট্রাম্প। তো সেই ব্যক্তি কি এত তাড়াতাড়ি চীনের ইস্যুতেই ঠাণ্ডা আর থিতু হয়ে গেলেন? কিভাবে? হোয়াইট হাউজের এক বিবৃতি থেকে জানা যাচ্ছে, ৯ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প, চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ফোন করেছিলেন এবং তার সাথে কথা বলেছেন। যে সে কথা নয়; ঐ বিবৃতির ভাষা অনুযায়ী,  “এক ‘দীর্ঘ ফোনালাপ’ [“a lengthy telephone conversation”] করেছেন। বিস্ময়কর তথ্য আরো আছে।

একই বিবৃতির আরো ভাষ্য বা বক্তব্য হল, “The two leaders discussed numerous topics and President Trump agreed, at the request of President Xi, to honor our “one China” policy.  Representatives of the United States and China will engage in discussions and negotiations on various issues of mutual interest”.
বাংলায় অনুবাদ করে বললে, “চীনা প্রেসিডেন্ট শি’র অনুরোধে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘একচীন নীতি’কে সম্মান জানাতে একমত হয়েছেন। … চীন ও আমেরিকা উভয় রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা এখন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা ও দরকষাকষিতে বসবেন”। এ থেকে বোঝা গেল, অন্তত এই একটা ইস্যুতে ট্রাম্পের অপরিপক্ক হম্বিতম্বি এমনভাবে শেষ হল যে,  ট্রাম্পের আমেরিকাকে মেনে নিতে হল যে গত সত্তরের দশক থেকে তাদের পুর্বপুরুষ নেতৃত্ব যে ‘একচীন নীতি’ স্বাক্ষর করেছিলেন, মেনে চলেছিলেন নিজ নিজ প্রশাসনের আমলে তারা গবেট ছিলেন না। আর এটাই ট্রাম্পের প্রথম পিছু হটা এবং আপসরফা। এমন নাকে-খতের পথ তাকে আরও নিতে হবে।

একচীন নীতি মানে হলো, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’- এটা স্বীকার করা। এই পূর্বশর্ত পূরণ করার পরই এর ভিত্তিতে চীন যেকোনো রাষ্ট্রের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক শুরু করে থাকে। আমেরিকার সাথে মাওয়ের চীন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু করেছিল গোপনে অন্তত ১৯৭১ সালের জুলাইয়ে। পরের বছর ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেকালের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের চীন সফর দিয়ে সেটা প্রকাশ্যে ঘটেছিল। আর এসব ঘটনার পরম্পরায় শেষে ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত এক পারস্পরিক চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পারস্পরিক কূটনৈতিক স্বীকৃতি ও সম্পর্ক শুরু করেছিল চীন-আমেরিকা। বলা বাহুল্য, ‘তাইওয়ান চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ’ এই শর্ত মেনেই আমেরিকা তাতে স্বাক্ষর করেছিল। কিন্তু এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ট্রাম্প ১১ ডিসেম্বর ২০১৬ ফক্স নিউজ কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন বয়ান দেয়া শুরু করেছিলেন যে, আমেরিকা কেন সেই ‘পুরনো কমিটমেন্টে আটকে’ থাকবে। প্রশ্নের ভঙ্গিতে তিনি কথাটা তুলেছিলেন। এর আগে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট তাকে স্বাগত জানানোর উছিলায় ফোনকল করেছেন বলে তাতে ট্রাম্প সাড়া দিয়ে কথা বলেছিলেন। এ রকম অন্তত আরো তিনটি ঘটনা আছে যেখানে ‘একচীন নীতি’ ট্রাম্প মানতে চান না অথবা মানবেন না কিংবা দরকার হলে চীনের সাথে ট্রাম্প সংঘাতে যেতে চাইতে পারেন, তা প্রকাশ পেয়েছিল। যেমন ট্রাম্পের সেক্রেটারি অব স্টেট বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেকস টিলারসন তার প্রার্থিতা সিনেটে অনুমোদনের শুনানিতে জবাবে, সাউথ চায়না সি থেকে চীনাদের তাড়ানোর জন্য সামরিক বলপ্রয়োগের কথা বলেছিলেন। জন বোল্টন জুনিয়র বুশের প্রথম টার্মে (২০০১-২০০৫) জাতিসঙ্ঘে আমেরিকার স্থায়ী প্রতিনিধি নিয়োগ পেয়েছিলেন। তাইওয়ানের পক্ষে লবি করার এক বড় প্রবক্তা মনে করা হয় তাকে। কূটনীতিতে বলপ্রয়োগ বা চাপে ফেলে আমেরিকান নীতির পক্ষে অন্য রাষ্ট্রের সমর্থন আদায়ে সিদ্ধহস্ত এই কূটনীতিক। ট্রাম্পের বিজয়ের পর তিনি সরব হয়ে উঠেছিলেন। ধারণা করা হয়েছিল, তিনি ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী (প্রেসিডেন্টের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বা সেক্রেটারি অব স্টেট) হতে যাচ্ছেন হয়ত। কারণ ট্রাম্পের বিজয়ের পরে তিনি ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎও করেছিলেন। এছাড়া, স্টেফান ইয়েটস, বুশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনির ডেপুটি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। তিনিও ট্রাম্পের পরোক্ষ দূত হিসেবে আন-অফিসিয়ালি তাইওয়ান সফরে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফিরেই তিনিই প্রথম তর্ক উঠান যে, ‘একচীন নীতি’তে দেয়া প্রতিশ্রুতিতে আমেরিকাকে আটকে থাকতে হবে কেন?
এই তিন ঘটনা ছাড়াও, চীনের অর্থনীতির উত্থানের কারণে আমেরিকানদের কাজ ও চাকরি নষ্ট হচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। পুরা নির্বাচনী প্রচারণা জুড়ে এটাই ট্রাম্পের বক্তব্য ছিল। ফলে ট্রাম্প আমেরিকার বাজারে চীনা পণ্য প্রবেশের উপর  ৪৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে তা ঠেকাবেন- এজাতীয় সস্তা জাতীয়তাবাদী স্লোগান ছিল নির্বাচনে ভোটের বাক্স ভরতে ট্রাম্পের পপুলার দাবি। এসব মিলিয়ে সত্তরের দশক থেকে ক্রমশ দাঁড়ানো চীন-আমেরিকার গভীর সম্পর্ক ট্রাম্পের আমলে এক বিরাট ধাক্কা খেতে যাচ্ছে মনে করে দুনিয়ার সংশ্লিষ্ট সবাই শঙ্কিত হয়ে উঠছিলেন। টলারশন সামরিক হুমকি দিয়েছেন আর ট্রাম্প চীনের সাথে সংঘাতে যেতে চান এমন ধারণাগুলো প্রচার করা সত্ত্বেও আমেরিকার কোনো ব্যবসায়ী, ওয়াল স্ট্রিট অথবা কোনো করপোরেট গ্রুপ – কেউই ট্রাম্পের সামরিক পথে অবস্থানের ইচ্ছা বা সঙ্ঘাতমূলক পন্থা গ্রহণকে সমর্থন করতে পারেনি, তাতে চীন-আমেরিকান কোন সম্ভাব্য সংঘাতে তাদের অবস্থানের যে দিকেই থাকুক। কিন্তু কেউই নিশ্চিত থাকতে পারছিলেন না যে, এই পাগলা প্রেসিডেন্ট শেষে হঠাৎ না কী করে বসেন। এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে  ট্রাম্প আর শি জিনপিংয়ের ফোনালাপ তাই সবাইকে একধরনের স্বস্তি এনে দিয়েছে।

ব্যাপারটাকে চীনের দিক থেকে দেখলে, এ প্রসঙ্গে চীনা অবস্থান শুরু থেকেই ছিল খুবই পরিপক্ব ও মাপা। ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের তারিখ ছিল ২০ জানুয়ারি। ফলে ওই তারিখের আগে মিডিয়ায় যতই নতুন নতুন উসকানিমূলক খবর নিয়মিত প্রকাশ পাক না কেন, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সব সময় এই প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিল। কেবল বলেছিল,  ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার আগে সব মিডিয়া রিপোর্টই জল্পনাকল্পনামূলক, আনুষ্ঠানিক কিছু নয়। তাই অনুমাননির্ভর বিষয়ে চীন কথা বলবে না। তবে, কেবল ৮ নভেম্বর ২০১৬  ট্রাম্প নির্বাচনে জিতেছিল। তাই এই ফল প্রকাশের পর থেকে চীন-আমেরিকার সম্পর্কের মূলনীতি বিষয়ক একটা কথা চীন বলে এসেছে যে, গ্লোবাল অর্থনীতির দিক থেকে চীন-আমেরিকার ভবিষ্যৎ ভাগ্য এক সুতায় বাঁধা পড়েছে। ফলে একমাত্র পরস্পর ডায়লগ করেই এক সাথে হাঁটতে হবে। চীন এ কথা ক্রমাগত প্রচার করে গেছে। ওদিকে আবার নির্বাচনে বিজয়ের পর ট্রাম্পের একচীন নীতি নিয়েও আবার দরকষাকষি করতে চাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করার পর প্রতিক্রিয়ায় চীন পরিষ্কার করে বলেছে, ‘চীনের একচীন নীতি কোনো দরকষাকষির বিষয়ই নয়’।

তবে ২০ জানুয়ারি ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর থেকে দুটো কারণে চীন প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন হতে শুরু করেছিল।  সাধারণভাবে বললে তখন থেকে, চীন গাজর-লাঠি (হয় গাজর খাও, না হলে লাঠির বাড়ি) নীতিতে চলে যায়। তা হল, আমেরিকান লোকদের কাজ বা চাকরির সমস্যা নিয়ে চীনের সাথে বসে আলোচনায় সমাধান সম্ভব। চীন সেখানে ছাড় দিতেও রাজি। ওবামা আমলে ২০১১ সালে এমন এক আপসরফা হয়েছিল। কিন্তু চাকরির সমস্যাকে উছিলা করে সঙ্ঘাতের রাস্তায় সামরিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনার পথ ধরলে মুখোমুখি মোকাবেলার পথে যাওয়া হবে – এই ছিল চীনের ম্যাসেজ। এটা হলো অনেকটা এক জামাইয়ের বড়লোক শ্বশুরের মেয়ে বিয়ে করার অবস্থা। বিয়ের পর বউ-সন্তান নিয়ে জামাইয়ের দিন-খারাপ কাটছিল না। কিন্তু হঠাৎ করে জামাইয়ের মনে হল, বিয়ের আগের তুলনায় এখন তাঁর সংসার খরচ বেড়ে গেছে। তাই সে বউ তালাক দিতে চায়। এ কথা শুনে শ্বশুর প্রথমে জামাইকে তোষামোদ করে আর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাকে তালাকের সিদ্ধান্ত থেকে সরানোর চেষ্টা করছিলেন। শেষে না পেরে একপর্যায়ে শ্বশুর বললেন, হয় তুমি আলাপ আলোচনায় আস, তাতে সংসার চালানোর অর্থে টান পড়লে ভর্তুকিও দেয়া হতে পারে। কিন্তু তুমি যদি না মানো, তবে তোমাকে লাঠিপেটা করা হবে।’ এই গাজর-লাঠির নীতিতে কাজ হয়েছিল। জামাই আলোচনার টেবিলে বসে সব সমস্যার সমাধান করেছিল। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে,  ট্রাম্প বিরতিহীন গরম কথা বলতে বলতে তাথেকে এই প্রথম অন্তত একটা ইস্যুতে তাঁকে  পিছু হটতেই হল। কারণ ট্রাম্পের এখন সেই জামাইয়ের দশা। ইতোমধ্যে চীন দক্ষিণ চীন সাগর রক্ষা নিয়ে সামরিক মহড়াসহ পালটা প্রস্তুতি হিসাবে অনেক কিছুই তাকে আমরা করতে দেখেছি। তবে সেটা যা-ই করুক আর না করুক, চীনের মূল উদ্বিগ্নতা ছিল আরো ব্যবহারিক। কী সেটা?
কয়েক দিন আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ট্রাম্পের ফোনালাপ মাঝপথে হঠাৎ থেমে যায়। নির্ধারিত সময় অর্ধেক শেষ হওয়ার আগেই ট্রাম্প ফোন রেখে দিয়েছিলেন এবং ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় হঠাৎ থেমে যাওয়া সেই ফোনালাপের ঘটনা কী পরিস্থিতিতে থেমে যায় তা ফাঁস হয়ে যায়। এই ঘটনার কথা চিন্তা করে চীনা সরকার উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছিল। ‘পাগলা’ ট্রাম্পের সাথে চীনা প্রেসিডেন্ট কিভাবে কথা বলবেন – ট্রাম্প যদি সেখানেও অর্ধেক কথা বলেই ফোন রেখে দেন? এরপর যদি একইভাবে সবকিছু মিডিয়ায়  ফাঁস হয়ে যায় তবে তো তিনিও বিব্রত হবেন, এই ভয় পেয়ে বসেছিল শিং জিনপিংকে। ফলে কূটনৈতিক পর্যায়ে চীন-আমেরিকার পররাষ্ট্র বিভাগ বসে আগেই সব কিছু ঠিক করে নেন। প্রেসিডেন্ট-দ্বয় কে কিভাবে কথা বলবেন, কতটুকু কোথায় রাজি হবেন ইত্যাদি নিয়ে আগেই কথা বলে নিয়েছিলে উভয় পক্ষ। অর্থাৎ আগে স্ক্রিপ্ট আর পরে সেই স্ক্রিপ্ট মোতাবেক শুটিং। এই ফরম্যাট মোতাবেক আগের দিন মানে বুধবার ট্রাম্পের অফিস সংবাদমাধ্যমকে জানায় যে, পরের দিন তিনি প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে কথা বলবেন। এরপর তাদের ফোনালাপ শেষে দুই পররাষ্ট্র অফিস থেকে দুটো আলাদা পূর্বনির্ধারিত বিবৃতি যায়। সব কিছু আগেই আলোচনার ভিত্তিতে তৈরি করে নেয়া হয়েছিল। সবই পাগলা ট্রাম্পের মহা কৃতিত্ব।

একটা বাড়তি পাওয়া প্রসঙ্গ আছে – তাইওয়ানের প্রতিক্রিয়া। বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখছে,
“Taiwan’s presidential office spokesman Alex Huang said in a statement that the island’s government and the United States “both maintain close contact and communication so as to keep a ‘zero accident’ approach” to their relationship”.
“হাতছুট কোন দুর্ঘটনা শুণ্যে নামিয়ে রাখা – এই এপ্রোচ নিয়ে  দ্বীপ (তাইওয়ান) সরকার ও আমেরিকা দুই পক্ষ ঘনিষ্ট সংযোগ ও যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে”। কারণ চীন-আমেরিকার কোন উত্তেজনায় প্রথম বোমাটা তাইওয়ানেরই খাবার সম্ভাবনা।

এখন পুরা ঘটনা থেকে অন্তত একটা জিনিস পরিষ্কার হল যে, এখনো ট্রাম্পের প্রশাসনের কিছু লোক আছেন যারা ট্রাম্পকে পরামর্শ শুনতে বাধ্য করতে পারেন। ট্রাম্প কি এখন থেকে থিতু হয়ে কথা বলবেন? যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করে করে কথা বলবেন?

লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]

 

ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

ট্রাম্পের সংরক্ষণবাদ কাজ করবে না

গৌতম দাস

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2cF

 

 

 

বলার অপেক্ষা রাখে না দুনিয়াজুড়ে সবার উপরে এক ট্রাম্প-জ্বর চেপে বসেছে। ট্রাম্প মানে, গেল মাসে শপথ নেয়া আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড জন ট্রাম্প। ট্রাম্পের আগমণের মুল ম্যাসেজ হল, আমেরিকার সাথে সম্পর্কিত দুনিয়াজুড়ে যত ঘটনা আছে তা আর আগের মতো করেই আগের নিয়মে, অভ্যাসে বা আইনে ঘটবে না এটাই আজকে ধরে নিতে হবে, তা ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। তবে এর চেয়ে বড় কথা ‘ট্রাম্প কেন এমন’ গভীরে গিয়ে তা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। যদিও বলা হচ্ছে ট্রাম্প আনপ্রেডিক্টেবল লোক। মানে লোকটা কখন কী করে তা আগে বলা যায় না, এর তালঠিকানা নেই। কিন্তু যে লোক আমেরিকার প্রেসিডেন্ট তার তালঠিকানা নেই এটা বুঝতে হবে, সেটা আবার কেমন কথা? হ্যাঁ, তা ঠিক। ব্যাপারটা হল, আসলে আমরা বলতে চাচ্ছি, কোনো আমেরিকার প্রেসিডেন্টের যেসব কাজ যেভাবে করা্র কথা না বা যেভাবে বলার কথা না বা অথবা যেসব নীতি নেয়া অসম্ভব অথবা হওয়ার কথা নয় বলে আমরা মনে করতাম; ট্রাম্পকে আমরা তেমন কাজ করা ও সিদ্ধান্ত নিতেই  দেখছি। ফলে কাম্য অর্থে আমরা বলছি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের তালঠিকানা নেই। ব্যাপারটা যেন এ রকম যেমন, আমেরিকা এক এম্পায়ার, মানে এক মোড়ল বলে ধরতে পারি। এখন যে লোক মোড়ল তার বাসায় সারা দিন বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের লোকের আসা লেগেই থাকবে। ফলে স্বভাবতই তাদের আপ্যায়নের ব্যবস্থাও মোড়লকে করতে হবে। এই আপ্যায়ন বলতে ন্যূনতম চা-নাশতা আর এর চেয়েও প্রধান বিষয় যথেষ্ট বসার জায়গার ব্যবস্থা করতে হবে। এখন মোড়ল যদি হঠাৎ বলে এখন থেকে আর বসার কোনো ব্যবস্থাই থাকবে না, দাঁড়িয়ে কথা শেষ করতে হবে তাহলে সমাজ বলবে এই মোড়লের তালঠিকানা নেই।

ট্রাম্পের নীতি কেমন এই প্রশ্নে মিডিয়া বলছে সে প্রটেকশনিস্ট, মানে সংরক্ষণবাদী। সংরক্ষণবাদী মানে কী? মানে হল যে নিজ বাজার বিশেষত অন্য অনেক কিছুর সাথে নিজ জনগণের চাকরির বাজার সংরক্ষণ করে আগলে রাখতে চায়। সাধারণ অর্থে এটা দোষের কিছু নয়। সবচেয়ে স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হল কী ভাবে? যেভাবে করতে চাওয়া হচ্ছে তা কী কাজ করবে? অন্য কোন পথ কী নাই?  ট্রাম্প নিজে তার এই নীতির দিকটা ঠিক ‘সংরক্ষণবাদী’ বলে পরিচয় করান না। বলছেন, এটা নাকি ‘আমেরিকা ফার্স্ট’, মানে সবকিছুতে সবার আগে আমেরিকা – এই নীতি। তার শপথ নেয়ার পরবর্তী বক্তৃতার প্রথম প্রসঙ্গ ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রসঙ্গে ট্রাম্পের বয়ান।
আবার অনেকে  বলছেন,  ট্রাম্পের নীতি অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন। সংরক্ষণবাদী মানে এর আর এক অর্থ ‘অ্যান্টি-গ্লোবালাইজেশন’ ত বটেই।  সেই সত্তরের দশক থেকে আমেরিকা এত দিন সবাইকে গ্লোবালাইজেশন যোগ দিয়ে নিজ নিজ বাজার খুলে দিতে প্ররোচিত করত চাপ দিত। আজ, সেই আমেরিকা ট্রাম্পের জমানায় এসে উল্টো দিকে চলা শুরু করেছে। যেমন সে ওবামার আমলে সে চীন বাদে ১২ রাষ্ট্রের বাণিজ্য জোট – টিপিপি করেছিল। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে প্রথম সপ্তাহেই সিদ্ধান্ত নিয়ে আমেরিকাকে ওই বাণিজ্য জোট থেকে বের করে এনেছে।

কিন্তু গ্লোবালাইজেশন আর বাজার এর সম্পর্ক কী – এসম্পর্কে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে।  গ্লোবালাইজেশন মানে অবশ্যই নিজ বাজার খুলে দেওয়া। কিন্তু এটাই এর একমাত্র অর্থ বা দিক বৈশিষ্ট নয়। বাজার খোলা মানে অন্যের বাজার খোলা পাওয়াও বটে। অন্যের বাজার খোলা পেয়েছি বলেই ত গার্মেন্ট বেচে বছরে ৩২-৩৮ বিলিয়ন ডলার কামাতে পারি। যদিও আমেরিকার মাতব্বরি তাই গ্লোবালাইজেশনে এসে কম অথবা অকার্যকরও হয়ে যায় নাই। আমাদের বাজার খুলে দিবার মানে গ্লোবালাইজেশনের অংশ হবার আগেও যেমন আমাদের উপর আমেরিকান দাদাগিরি ছিল এখনও প্রায় তেমন কার্যকর আছে। এমনকি গার্মেন্টস নিয়ে আমেরিকার বাজারে সব পণ্য কোডে ঢুকতে যাতে না পারি সেজন্য কোটার নিয়ন্ত্রণ দেয়া আছে। এতসব কিছুর পরও ব্যাপারটা হল – কিছু কিছু ছিদ্র আছে, শর্ত পরিস্থিতি আছে, ক্যাপিটালিজমের লজিক আছে, স্ববিরোধীতা আছে  যেখানে আমেরিকা মুরুব্বির ক্ষমতা থাকলেও তা প্রয়োগ করতে পারে না। কাজে লাগে না। তাদের আরো বড় ক্ষতি হবে বলে। এদিকে আমাদের নিজ সক্ষমতা আছে, দক্ষতা আছে, নিজ শ্রমের বাজারমুল্য বিদেশের তুলনায়  সস্তা এবং দক্ষ (নুন্যতম মজুরি বাড়িয়ে দিলেও তা সস্তা থাকবে) – এই ধরণের আরও অনেক তুলনামূলক-সুবিধা (কমপিটিটিভ এডভ্যানটেজ) আছে – এগুলো আমেরিকা চাইলেও ঠেকায় রাখতে পারে না। আমাদের এসব সুবিধার দিক গুলো নিয়ে –  লেগে থাকা স্টাডি, আর বুদ্ধি খরচ করে চলতে পারলে আমাদের জন্য বন্ধ বাজার (প্রটেকশনিজম) এর  চেয়ে তুলনায় গ্লোবালাইজেশন এর সুবিধা বেশি। ফলে আজকের যুগের লড়াইটা  – গ্লোবাল বাজারে নিজের শেয়ার বাড়ানোর, এটা ঠিক নিজ বাজার সংরক্ষণের নয়, বা অন্যের প্রবেশ ঠেকানো নয়

চলতি শতকের শুরু থেকেই চীনের অর্থনৈতিক উত্থান স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। ফলে বুশের দ্বিতীয় টার্ম (২০০৫ সাল) থেকে শুরু করে ওবামার দুই টার্ম এই পুরা সময় ধরে আমেরিকা এশিয়ায় চীনা কনটেনমেন্ট নীতি বা ‘চীন ঠেকানোর আমেরিকার নীতি’ চালু রেখেছিল। এই নীতির সার কথা হল – চায়না ঠেকানো ( China Containment)। মানে দুই রাইজিং ইকোনমির (ভারত ও চীন) একটাকে কাছে টেনে ফেবার করে, সুযোগ সুবিধা দিয়ে অন্যটার বিরুদ্ধে লাগা ও লাগানো। ভারতকে কাছে টেনে কিছু বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে, নিজের মোড়লি-শক্তির কিছু ভাগ ভারতকে দিয়ে তাকেও চীন ঠেকানোয় কাজে লাগানো। গত প্রায় ১০-১২ বছর ধরে ভারত-আমেরিকার সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তি এটাই।   কিন্তু এই ব্যাপারে ট্রাম্পের নীতি সম্ভবত ভিন্ন হতে যাচ্ছে, না চাইতেও। যেমন চীন বা ভারতের সাথে ট্রাম্প যে আমেরিকা সাজাতে চাইছে তাতে এই দুই রাষ্ট্রের সাথে আমেরিকার সম্পর্কের ভিত্তি হবে – আমেরিকান কাজের বাজার এই চীন বা ভারত কে কোথায় নষ্ট করছে সেটা দেখা ও ঝগড়া করে ঠেকানো। যে যেখানে আমেরিকান কাজের বাজার নষ্ট করছে সেখানে তার সাথে বিরোধিতা চরমে নেওয়ার নীতি এটা। এজন্য যদিও ট্রাম্প পরিষ্কার করে বলেননি যে চীন ঠেকানোর পুরনো নীতি তার আমলে কী হবে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, আমেরিকান কাজের বাজার কেউ নষ্ট না করুক এটাই ট্রাম্পের ফোকাস। আর সেটাকে বাধা দেয়াকে মুখ্য করে বিদেশ নীতি সাজানো ট্রাম্পের নীতি।

তাহলে সার কথা দাঁড়াল, চীনের বিরোধিতা ওবামারও ছিল। অর্থাৎ  ‘চীন ঠেকানোর’ “এশিয়াতে আমেরিকা পিভোট বা ভারসাম্য আনয়নকারী হয়ে থাকবে” এই নীতি ওবামা চালিয়ে গিয়েছেন। মানে সেটা এশিয়ায় চীনা প্রভাব ঠেকানো অর্থে। এদিকে ট্রাম্পও চীন-বিরোধী তবে সেটা আমেরিকার কাজের বাজার কতটা চীন ধ্বংস করছে সেটা ঠেকানো অর্থে। আর ওদিকে ভারতের বেলায়, ওবামা (এবং তারও আগে বুশও ছিল) ভারত-তোয়াজের পক্ষে, চীন ঠেকানো তত্ত্বের কারণে। কিন্তু ট্রাম্প ইতোমধ্যে ভারত-বিরোধী অবস্থান নিয়েছে, তবে সম্পুর্ণ ভিন্ন ভাবে। কারণ ভারতের আইটি শিল্প এই টেকনোলজি আমেরিকান নাগরিকের চাকরি খাচ্ছে বলে মনে করেন ট্রাম্প। প্রসঙ্গটাকে আমরা ‘H1-B ভিসা কর্মসূচি’ দিয়ে বুঝতে পারি। এটা একটা বিশেষ ক্যাটাগরির ভিসা কর্মসূচির নাম। আমেরিকার আইটি শিল্প বা সফটওয়্যার ব্যবসার বাজারটা মোটামুটি ১২০-১৫০ বিলিয়ন ডলারের। এর প্রায় ৭০ ভাগ বাজার ভারতের দখলে। ভারতীয় মালিকানার তবে আমেরিকায়ও রেজিষ্টার্ড তিন-চারটা কোম্পানী এই বাজার দখল করেছে। আমেরিকায় রেজিস্টার্ড ভারতীয় মালিকানা কোম্পানিগুলো ওই ভিসা ক্যাটাগরিতে ভারত থেকে প্রোগ্রামারদের এনে আমেরিকার প্রোগ্রামারের থেকে কম বেতনে কাজে নিয়োগ করে আসছিল। যদিও ওই ভিসা ক্যাটাগরির পেছনের আইনে বলা ছিল যে এই ক্যাটাগরিতে ভারতীয় বা বিদেশীদের আনতে গেলে তাদের ন্যূনতম বেতন বছরে ৬০ হাজার ডলার বা এর বেশি হতে হবে। শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর সাফাই ছিল যে, যেসব দক্ষ ও মেধাবী শ্রমগুলো (যাদের বেতন ৬০ হাজার ডলার এই মাপকাঠির ) আমেরিকায় যথেষ্ট পাওয়া যায় না আর সেকারণে তারা বিদেশ থেকে আনতে চাইছে। এই কথা আরো পোক্ত করতে বলা হত যে, ভারতীয়দের মাস্টার্সও আছে, আমেরিকানদের বেলায় মাস্টার্স করা চাকরিপ্রার্থী থাকে খুব কম জনের।
ট্রাম্প এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিপক্ষে তবে সেটা সে করতে চায় শর্তগুলোকে আরও কঠিন করে দিয়ে। তবে আরও শর্ত আরোপ করে এই ভিসা ক্যাটাগরিতে শ্রম আমদানির বিরুদ্ধে কেবল ট্রাম্প নয়; এমনকি কংগ্রেসে ও সিনেটে এখন সংখ্যাগরিস্ট রিপাবলিকান – ট্রাম্পের দল শুধু এই রিপাবলিকানরাও নয়, এই দলে অনেক ডেমোক্র্যাটও আছেন। তাই ট্রাম্পের শপথ নেয়ার আগেই গত ৫ জানুয়ারি থেকে কংগ্রেসে ‘হাই-স্কিল্ড ইনটিগ্রিটি অ্যান্ড ফেয়ারনেস অ্যাক্ট, ২০১৭’ নামে বিল আনার তৎপরতা শুরু হয়ে যায়। এই কাজে এখনই চার থেকে পাঁচটা প্রস্তাবিত আইন কংগ্রেসে ঘোরাফেরা করছে। সেগুলোর অন্তত একটা বাই-পার্টিজান মানে ডেমোক্র্যাট-রিপাবলিকান দুই দলের দুই সদস্যের যৌথ প্রস্তাব। শুরুর দিকের প্রস্তাবগুলোতে সংশোধিত  ‘H1-B ভিসা কর্মসূচিতে’ মুখ্য দুই পরিবর্তনের মধ্যে ছিল ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ডলার করা; আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকাকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করা। এমন প্রস্তাবের পেছনে যুক্তি হল, বছরে এক লাখ ডলার মানে মাসে আট হাজার ডলারের বেশি দিয়ে বিদেশী-ভারতীয় লোক আনতে গেলে সেটা আর আমদানিকারক কোম্পানীর কাছে লাভজনক থাকবে না। কারণ ওর চেয়ে কম বেতনে আমেরিকা থেকেই স্থানীয়ভাবে প্রোগ্রামার পাওয়া যাবে। আর মাস্টার্স ডিগ্রি থাকার শর্ত উঠিয়ে দেয়া মানে স্থানীয়ভাবে গ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামাররা ওই চাকরির আবেদন করতে পারবে ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হতে পারবে। এদিকে ট্রাম্পের শপথের পরে আরো যেসব নতুন বিল বা আইনের প্রস্তাব কংগ্রেসে উঠেছে সেগুলোতে ন্যূনতম বেতন বছরে এক লাখ ত্রিশ হাজার রাখা হয়েছে। বলা বাহুল্য ভারতীয়দের মাথায় হাত। ইতোমধ্যে ভারতীয় কোম্পানিগুলোর ভারতে রেজিস্টার্ড অংশে শেয়ার বাজারে দরপতন হয়েছে গড়ে শতকরা ৯ ভাগ। আমেরিকান শেয়ারবাজারের এক অ্যানালিস্ট হিসাব করে বলছেন ভারতীয় তিন শীর্ষ কোম্পানিকে [টিসিএস (টাটা), ইনফোসিস ও উইপ্রো] নতুন হবু আইনে ৬০-৭০ ভাগ বেশি বেতন গুনতে হবে। ফলে আনুপাতিক মুনাফা কমে যাবে। অর্থাৎ অবস্থা খুবই বেগতিক। এসব কোম্পানির এক মালিক সমিতি আছে নাম ন্যাসকম (NASSCOM)। তারা খুবই তৎপর হয়ে লবিং করছে। তাদের কোম্পানীগুলো আমেরিকায় ব্যবসা করে কত ট্যাক্স দেয়, কত নতুন আনুষঙ্গিক কাজ সৃষ্টি করেছে এর এক স্টাডির ফিরিস্তি দিয়ে ট্রাম্পের দলবলের মনগলানোর চেষ্টা করছে। ওদিকে মজার কথা হল, মোদি সরকার নিশ্চুপ, প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। অথচ গত নভেম্বরে ট্রাম্পের বিজয়ের পর থেকে এই বিপদ যে আসছে তা সরকার ও সংশ্লিষ্টরা সবাই জানে। তাহলে? বিষয়টা হল, কৌশল আর এক পুরনো বিশ্বাস। প্রকাশ্যে আপত্তি হইচইয়ের থেকে গোপনে যেভাবে সে আমেরিকার বিশেষ নজরের বিশেষ সুবিধা পেয়ে আসছিল এতদিন, সেটার অপেক্ষায় থাকা আর সে দিকে চেষ্টা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মোদি সরকার। আনন্দবাজার পত্রিকার এমনই এক রিপোর্টের শিরোনাম, ‘ট্রাম্পের শরণার্থী বিতর্ক এড়িয়ে আপন স্বার্থে নজর ভারতের’।  ট্রাম্প বিজয়ী হওয়ার পর মোদি পঞ্চম রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ট্রাম্পকে শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। এরপরে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ শেষে ২৫ জানুয়ারি সরকারপ্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ফোনে কথা বলেছেন। কিন্তু সেখানে কী আলাপ হয়েছে কোন আশার আলো আছে কিনা এসব বিষয়ে তেমন কোনো ব্রিফিং নাই।  ভারতের উদ্বিগ্নতার ইস্যুগুলো নিয়ে কোনো আলাপ হয়েছে কি না তেমন কোন কিছু জানা যায়নি। তবে কয়েকজন আমেরিকান বিশেষজ্ঞের মতামত হল, ভারত আমেরিকানদের চাকরি খেয়েছে – এই জায়গা থেকে কোনো ছাড় দেয়া অথবা সরে আসার কোন সম্ভাবনা তারা দেখেন না।

অনেক পাঠকের মনে হতে পারে যে, ট্রাম্প বা যেকোনো জাতীয়তাবাদী তো এমন সংরক্ষণবাদী অবস্থান নেবেই, ফলে এই সিদ্ধান্ত সঠিক। সরি, আসলে ব্যাপারটা তা নয়, এত সরলও নয়। বরং সস্তা জাতীয়তাবাদ, তাই এটা এযুগে অচল। যদিও আপাতদৃষ্টিতে তা সঠিক মনে হচ্ছে। কেন?
মূল বিতর্ক হল – শ্রম আমদানিকারক কোম্পানিগুলোর যুক্তি হল, যেমন একজন বলছেন –

Mr. Levie said, “When you have incredible talent that wants to work in your organization but you are preventing them from doing so, that is disastrous to innovation and competition.”

বাংলা করলে, ‘এক দিকে বিরাটসংখ্যক ট্যালেন্ট আমাদের সংগঠনের সাথে কাজ করতে চাইছে আর আমরা তাদের আটকে রাখতে চাইছি, এটা উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতার দিক থেকে ধ্বংসাত্মক’। ইমোশনাল না হয়ে দেখলে আসলে, এখানে ট্যালেন্ট বলে ডেকে কোম্পানীগুলোর অবস্থানের পক্ষে এই সাফাই তৈরি করা হয়েছে। যার পিছনের সত্যি কথাটা হল, এই ‘ট্যালেন্টদের’ ভারত থেকে সস্তায় কম বেতনে পাওয়া যায় বলেই তাদেরকে গৌরবান্বিত করে এমন ট্যালেন্ট ডাকা হচ্ছে। কোনো কারণে যদি আমেরিকাতেই তুল্য দক্ষ শ্রম সস্তায় পাওয়া যেত, তবে সেসব আমেরিকানরাই সেক্ষেত্রে আবার ট্যালেন্ট হয়ে যেত। আসল কথা আমাদেরকে ক্যাপিটালিজমের স্বভাব বৈশিষ্ট্য খেয়াল রাখতে হবে। সে অবশ্যই সস্তা শ্রমের পক্ষে সব ধরনের যুক্তি-সাফাই গাইবেই। এখন প্রশ্ন হল, ক্যাপিটালিজমের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যের বিরুদ্ধে আইন বানিয়ে ট্রাম্পের পক্ষে জয়লাভ করতে পারা সম্ভব কি না?

না, পারার কথা নয়। কেন? এই আইন কার্যকর হলে বিদেশী নয় আমেরিকানদের চাকরি হবে। কথা সত্য। কারণ সে ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা কোম্পানীগুলোর ভারতীয়দের চেয়ে স্থানীয়দের নিয়োগ দিলে বেতনের বিবেচনায় লাভজনক হবে। কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ নয়। এটাই একমাত্র বিবেচনার বিষয় নয়, আরও দিক আছে। মূলকথা এই স্থানীয় নিয়োগের বেলার এদের বেতন কিন্তু এখনকার তুলনায় ৬০-৭০ ভাগ বেশি হবে।  যার অর্থ এই সেক্টরের সফটওয়ার প্রডাক্টে ক্রেতাদেরকে  বেশি মূল্যে সফটওয়্যার ও সার্ভিস কিনতে হবে। অর্থাৎ আমেরিকানদের চাকরি দিতে গিয়ে – এই জাতীয়তাবাদ দেখাতে গিয়ে রাষ্টের পুরা সবাইকে  আমেরিকান – জাতিকে বেশি মূল্যে পণ্য কিনতে হবে। কিন্তু সে বাড়তি মূল্য দেয়া অপ্রয়োজনীয়, এই অর্থে কারো ভোগে লাগবে না। পুরোটাই লস। ব্যাপারটা হলো যেন সব আমেরিকান মিলে চাঁদা দিয়ে পকেট থেকে পয়সা গুনে বেকার আমেরিকান আইটি গ্র্যাজুয়েটদের বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াল। এর চেয়ে বেকারভাতা দেয়া কি সহজ ছিল না? এটা কি ন্যাশনাল প্রডাকশন বাড়ল না ন্যাশনাল লস? কোন খাতে ফেলব? প্রশ্নটা কাজ দেওয়ার, নাগরিকের পকেট কাটা নয়।  অতএব বলে দেয়া যায় – এই সস্তা জাতীয়তাবাদ টিকবে না।

এক গোড়ার সত্য বলি। সত্য এক. আমাদের মতো গরিব ছোট অর্থনীতির দেশের শ্রম (দক্ষ বা অদক্ষ দু’টিই) উন্নত বা বড় অর্থনীতির দেশের শ্রমের চেয়ে সস্তা ও প্রতিদ্বন্দ্বী হবেই। এখনো অনেক দিন এটা হবে। আর সত্য দুই. ক্যাপিটালিজমের সাধারণ ঝোঁক হবে এই সস্তা শ্রমের পক্ষ নেয়া, কারণ ওখানে মুনাফা বেশি হবে। এই সত্য অস্বীকার করে কেউ টিকবে না।

বাংলাদেশের গার্মেন্টস আমেরিকা যায় – এর তাৎপর্য হল, এতে আমেরিকার শ্রমের বাজারে শ্রমের ন্যূনতম মূল্য তুলনীয় বিচারে কম রাখা সম্ভব হয়, হবে। কেন? আমেরিকান ঐসব শ্রমজীবিরা আমেরিকান বাজারে তাদের পোশাকের চাহিদা মিটাতে পারবে তুলনামূলক কম পয়সায়, এর ফলে আমেরিকায় ন্যূনতম মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব। আবার অন্যদিকে,  বাংলাদেশের কৃষিতে ভর্তুকি দেয়া মানে বাংলাদেশের গার্মেন্টসে মজুরি তুলনায় কম রাখা সম্ভব করা।

তাহলে সোজা কথাটা হল, অল্প কিছু যেসব পণ্যে আমরা আমেরিকার চেয়ে দামে ও মানে প্রতিদ্বন্দ্বী ও যোগ্য এসবের বাজার আমাদের হাতে আজ অথবা কাল তাদেরকে ছাড়তেই হবে। এ কথা যে যত তাড়াতাড়ি বুঝবে সে ভালো টিকবে। তবে সস্তা জাতীয়তাবাদের সুড়সুড়ি দিয়ে ভোট জোগাড় সেটা হয়ত ফাঁকফোকরে চলতেই থাকবে। রাজনীতিতে মিথ্যা ব্লাফ তো থাকেই।

ঘটনার আরেক মাত্রা আছে। ট্রাম্পের আমলে খুব সম্ভবত আমেরিকার কাছে ভারতের গুরুত্ব ওবামা আমলের মতো আর থাকছে না। কারণ এখন পর্যন্ত ওবামার ‘চীন ঠেকানোর নীতি’ ট্রাম্প চালু রাখবেন কি না, ওবামার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করবেন কি না এর সপক্ষে ট্রাম্পের কোনো অ্যাকশন, নীতি বা কোনো আলামত দেখা যায়নি। বরং এশিয়ায় চীনবিরোধী কোনো জোট গড়ার ওবামার নীতির পথে ট্রাম্প হাঁটছেন না, ইচ্ছাও নাই – তাই স্পষ্ট হচ্ছে। এটাই প্রকাশিত। যেমন যত সহজে ট্রাম্প অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপ ‘গেট লস্ট’ বলে শেষ করলেন সেখানে এর ইঙ্গিত আছে। অথচ ওবামার এই আমলে তার এশিয়া নীতিতে একমাত্র অস্ট্রেলিয়াতেই আমেরিকান মেরিন ঘাঁটি গাড়া হয়েছে। এই অঞ্চলে আমেরিকান নীতি স্ট্রাটেজির সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিল অষ্ট্রেলিয়া।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে নতুন ভার্সান হিসাবে নতুন করে এডিট শেষে ছাপা হল। লেখকের সাথে কেবল জরুরি যোগাযোগের প্রয়োজনে উপরের ই-মেল ব্যবহার করা যাবে। ]