আরএসএসের অনুগ্রহ, এই ক্ষমতায় বাংলাদেশ চলবে না

আরএসএসের অনুগ্রহ, এই ক্ষমতায় বাংলাদেশ চলবে না

গৌতম দাস

 ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Lb

প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এবারের ভারত সফর ছিল চলতি অক্টোবর মাসের ৩ থেকে ৬ তারিখ। প্রধানমন্ত্রী তিন তারিখ সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিলেন। সেই দিনই মানে ভোরে কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র নেতা শাহরিয়ার কবিরের একটা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। ওর শিরোনাম ছিল “Hasina ascent marked Hindu turnaround: Kabir”। মানে “হাসিনার ক্ষমতারোহণ হিন্দুদের ঘুরে দাঁড়ানোর চিহ্ন হয়ে উঠেছেঃ কবির”।

ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ কলকাতার আনন্দবাজার গ্রুপের পত্রিকা। তবে এর টার্গেট পাঠক আনন্দবাজারের মত ঠিক ‘অস্বস্তিকর দেশপ্রেমী’ বা উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা নন। টেলিগ্রাফ রিপোর্টিংয়ের চেয়ে কলাম দিয়ে পাঠক আকর্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে চলে। সম্ভবত এই পত্রিকা এমন কলামের পাঠকের ওপর ভর করে টিকে যেতে পারে বলে তাদের অনুমান। এই সুবাদে একালের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কিছু কলামিস্টদের ভালো কিছু লেখা আমাদের পড়ার সুযোগ ঘটে যায় অবশ্য। এই বিচারে টেলিগ্রাফ একেবারেই মান খারাপ কোন পত্রিকা না হলেও শাহরিয়ার কবিরের কথিত এই সাক্ষাতকারটা বেশ বেমানান তো বটেই। তবে বুঝাই যায় এটা অর্ডারি বা খেপ মারা মাল। ভদ্র ভাষায় যাকে অনেকে পেজ-বিক্রি করা পাওয়া বা ছাপা লেখা বলে থাকে। মানে, এধরণের পাতায় কী ছাপা হয়েছে এর দায়দায়িত্ব সম্পাদকের নাই বলে মনে করা হয়।

একেবারেই সাজানো আর কথিত এক অধ্যাপককে দিয়ে করানো এই সাক্ষাতকারে যেখানে শেষে শাহরিয়ারের নিজ বীরত্বের প্রশংসাটা বাদ দিলে পাঁচটার মত প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু উনি কোথাকার অধ্যাপক, কী বিষয়ের বা আদৌও কোন অধ্যাপক কিনা এমন কোন পরিচয়-ধারণা দেওয়া নাই সেখানে। তাঁর প্রশ্ন শুনে এক গদ্গদ ঘন আবেগী ধরণের কলকাতার এক আম হিন্দু নাগরিক – এর চেয়ে বেশি, যিনি স্থিরভাবে কিছু চিন্তাও করতে পারেন, এমন মনে হয় নাই। বলা বাহুল্য ওখানে প্রশ্নগুলো ফরমায়েশি। যার উদ্দেশ্য হল একটা প্রচারণা চালানো – এই বলে যে বর্তমান আমলে হিন্দুরা বাংলাদেশে আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে – এই কথার পক্ষে ঢাক পিটানো। ভারতের কাছে এই ঢাক পিটিয়ে বাংলাদেশের কোন শাসককে সার্টিফিকেট নিতে হবে কেন, এর কোন সদুত্তর এখানে নাই। তবুও এর উদ্দেশ্যটা আরও বুঝতে হলে চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রিয়া সাহার ট্রাম্পের কাছে তোলা তার অভিযোগগুলোর নাটকটা মনে করে দেখতে পারি। সেখানে হাজির করা প্রিয়া সাহার বক্তব্যেরই পালটা কিছু ঠিক কাটান কথা নয় শ্রেফ দাবিই শাহরিয়ার এখানে জানিয়েছেন।

যেমন, সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার দাবি করেছেন, ২০০৯ সালের পর (সুনির্দিষ্ট করেন নাই) তিন লাখ হিন্দু নাগরিক নাকি বাংলাদেশ থেকে ভারতে দেশান্তরী হয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসন এত ভালো ছিল যে, ওর মধ্যে আড়াই লাখ হিন্দুই আবার ভারত থেকে ফিরে বাংলাদেশে চলে এসেছেন”। [……out of 3 lakh Hindus who had crossed the boundary, two-and-a-half lakh returned to Bangladesh] . মানে হাসিনার আমলেও হিন্দু দেশান্তর আগের মতই ঘটে – তিনি স্বীকার করছেন। তবু হাসিনা বীর এজন্য যে তাঁর আমলে এই তিন লাখের আড়াই লাখই আবার ফিরে আসে, তাই। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে এই দাবি তা অবশ্য জানা যায় না। সেখানে কোনো রেফারেন্স দেয়া নাই। আবার ধরে নেয়া হয়েছে যে তিন না হলেও আড়াই লাখ লোকের এমন যাওয়া আসা কোন ব্যাপারনা। শুধু তাই না। তাদের ছেড়ে যাওয়া বাড়িঘর সম্পত্তি তারা আবার ঠিকটাক ফিরেও পেয়েছে। দাবির এই অংশটাই বেশ ইন্টারেস্টিং।  এ ছাড়া আরো দাবি করা হয়েছে, হিন্দুদের জন্য এখন জব মার্কেট খুলে রাখা আছে […job market was thrown open for the Hindus,]। এটা পড়ে কারও মনে সন্দেহ হলেও কিছুই করার নাই যে আগে কি তাহলে এই ‘জব মার্কেট’ বন্ধ ছিল! এছাড়া আরও দাবি আছে। বলছেন, গত নির্বাচনে (২০১৮) ‘তারা’ ব্যবস্থা করাতে, ব্যবস্থা নেয়াতে ও পাহারা দেয়াতে মোট ৬১ কনস্টিটুয়েন্সিতে হিন্দুরা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছিলেন। এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য না করাই বোধহয় সঠিক। কারণ এবার কেউ ভোট দিতে পেরেছিল কি না সে অভিজ্ঞতা, সেটা সবারই জানা আছে। সারকথায় শাহরিয়ার তার কোন বক্তব্যের স্বপক্ষেই কোন পয়েন্টে কোনও প্রমাণ সাথে দাখিল করেননি। বলা যায় কেবল কিছু স্টেটমেন্ট রেখেছেন।

বাংলাদেশের ‘হিন্দু রাজনীতিতে’ বড় বাঁক বদল
বাংলাদেশের ‘হিন্দু রাজনীতি’ বিশেষত গত তিন বছর ধরে চলা রাজনীতি খুবই বিপজ্জনক স্কেলে ও ডিরেকশনে আগাচ্ছে। বলাই বাহুল্য, এটা ভারতে মোদীর উত্থান এবং তাতে আরএসএসের ততপরতা ও সুবিধা বিতরণ ও উস্কানির মিলিত প্রভাব বা আফটার এফেক্ট। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির শুরু হিন্দু কমিউনিস্ট নেতাদের হাতে, সাতচল্লিশে পাকিস্তানের জন্মের পরে। এটা কোন রাস্তায় যাবে, কিভাবে ফুলে-ফলে বাড়বে সেটিও তাদের হাতেই সূচিত। এভাবে এর কৌশল ও বয়ানগুলোও নির্ধারিত হয়েছিল। এই বাস্তবতা মানলে বলা যায় বাংলাদেশের সেই হিন্দু রাজনীতি একালে এসে এখন আরএসএসের দিকে মোড় নিয়েছে – এটা অকল্পনীয় এবং এটা আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরএসএস যারা এখন সমর্থন করে এদের কাছে অতীত হিন্দু-বুঝের সেকুলারিজম এখন কেমন লাগে? তারা কি এখন আরএসএস করেও সেকুলারিজম অপ্রয়োজনীয় বলে বুঝে তাই বাদ দিয়েছেন? এটা পরিষ্কার করে জানা যায় না। এ ব্যাপারে হ্যাঁ ও না, দু’টি জবাবই পাওয়া যায়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদ কিভাবে গ্রহণীয় হয়ে যেতে পারে, প্রগতিবাদী থেকে হিন্দুত্ববাদে ঝাপিয়ে পড়া এই জার্নি – সেটা দেখতে পাওয়াই আসলে এক বিরাট বিস্ময়। যার অপর বা ৯০ শতাংশ পড়শি নাগরিক হল মুসলমান সে কী ভবিষ্যত বুঝে এই রাজনীতি বেছে নেয় সেটা এক বিষ্ময় বললেও কমই বলা হয়, সেটা বুঝা সত্যিই মুশকিল! এঁদের স্বপ্ন কী এক হিন্দুত্বের বাংলাদেশ? এ’ কেমন স্বপ্ন!  এছাড়া ওদিকে বাংলাদেশের হিন্দুদের হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি বেছে নেওয়া মানে আসলে নিজের জন্য রাজনীতি না করে বরং ভারতের জন্য রাজনীতি করা। বাংলাদেশে যেসব সমস্যা ও সম্ভাবনায় তারা ছিল সেখান থেকে নগদ কিছু লাভের আশায় ভাড়া খাটাই, তবে আরও বড় গহবরে ঢুকে যাওয়া।  অবশ্য সেকালে মস্কোর বৃষ্টির ছাতা বাংলাদেশে তুলে ধরা গেলে এরা আর এখন দোষ করেছে কী? সে সাফাইওও দেয়া যায়। মানুষ তো এমন করেই থাকে, নানান কারণে। যাই হোক, এসব প্রশ্ন আগামীতে নিজেই নিজের জবাব হয়ে উঠে আসবে হয়ত। তবে মনে রাখতে হবে খোদ ভারতেরই ভবিষ্যৎ হিন্দুত্ববাদের ভেতরে নিহিত হবে কি না, সেই প্রশ্নই এখনো পুরাটাই অমীমাংসিত।

আবার এই প্রশ্নটা অনেকটা এরকম যে, ইউরোপে হিটলারিজম ফিরে আসতে পারে কী, এমন ধরনের। ইউরোপে হিটলারের নাম না নিয়ে হলেও “হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট” বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী নামের ধারার সমর্থক বাড়তে দেখা যাচ্ছে। একথা সত্য। তবে এখনো তা বিচ্ছিন্নভাবে ও বিভিন্ন পকেটে। আর ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পই সম্ভবত আমেরিকার শেষ ও ছোট হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হিসেবে থেকে যাবেন। তাতে ওদিকে স্টিভ বেননেরা [STEVE BANON] আবার সুপ্রিমিস্ট চিন্তাকে জাগাতে মটিভেশনাল ক্লাস নেয়া শুরু করেছেন ইতালিতে। সেটাও সত্য।

এদিকে বাংলাদেশে, যারা নিজেদের সুর্যসেন, প্রীতিলতাদের উত্তরসূরি বলে দাবি করেন, দেখা যাচ্ছে তাদের অনেকে আজকাল মোদী-আরএসএসের দিকে ছুটছেন। এখানে স্পষ্ট কথাটা হল, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যাওয়া, এই প্রশ্নে প্রথমবার ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করতে যাওয়া আর তা করতে গিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া পর্যন্ত যারা গিয়েছিলেন – তাদের এটা ছিল এক হিন্দুইজমের রাজনীতিতে ঝাপায় পড়া। এক হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতি, যা বাস্তবত জমিদার স্বার্থের রাজনীতি। পূর্ববঙ্গের কৃষি উদ্বৃত্ত যা ততদিনে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে, যা কলকাতায় জমা হচ্ছিল – এর বদলে সেসময় বাংলা ভাগ হয়ে পুর্ববঙ্গ আলাদা হওয়াতে এবার কৃষি উদ্বৃত্ত ঢাকায় জমা হবে – এটা জমিদার স্বার্থের প্রাণকেন্দ্র ‘কলকাতা’ মেনে নিতে চায়নি। এটাই স্বার্থবিরোধের মূল। অথচ এটা তো সাধারণভাবে জমিদারি উচ্ছেদের মত কোন কিছু ছিল না, তাই তাদের গায়ে কোনো আঁচড় লাগার কথাও নয়। তবু এটুকু পরিবর্তনও তারা সহ্য করতে পারেননি। কারণ পূর্ববঙ্গ আলাদা প্রদেশ হয়ে গেলে তাতে পুর্ববঙ্গে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না বলে তারা কর্তৃত্ব হারাতে হত, একথা ঠিক। এই স্বার্থ হারানো এটা তারা মেনে নিতে চায়নি মূল কারণ এটা আর তা থেকে জমিদারদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান।

কাজেই অনুশীলন বা যুগান্তর নামের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর ওপর অহেতুক বিপ্লবীপনা আরোপ করে কমিউনিস্টদের এদেরকে মহান করে দেখানোর কিছু নাই।  এটা বাংলার বা অন্ততপক্ষে পুর্ববঙ্গের সবার স্বার্থের রাজনীতি ছিল না তা তারা করেও নাই। তাদের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা মানে, জমিদারের স্বার্থে পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বিরোধিতা। এটাই তারা করেছিলেন। এটাকে স্বদেশী আন্দোলন বলে াপনি এতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন কি না, সেটা নির্ভর করে আপনার রাজনীতি হিন্দু জাতীয়তাবাদ নির্ভর কি না। এই হল প্রীতিলতা-প্রীতি যাদের আছে তাদের রাজনীতি। কাজেই প্রীতিলতাদের উত্তরসুরিদের এখন মোদী-আরএসএস এর দিকে যাওয়া এটা তো তাদের ন্যাচারাল  গন্তব্য, নয় কী? কাজেই সুর্যসেনদের অনুশীলন বা যুগান্তর নামের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর রাজনীতি একটা হিন্দুইজমের রাজনীতি, সেকালের জমিদারদের স্বার্থের রাজনীতি। এর মধ্যে প্রগতিশীলতা খুঁজা রঙের আড়াল চড়িয়ে দেয়া অথবা একে কোন অর্থেই প্রগতিশীল বলে দাবি করার কোন সুযোগ নাই।

এবার একালে আসি। আওয়ামি লীগের বোকা হয়ে যাওয়া, মানে না-বুঝে ভুল রাজনীতি করে ফেলার সময়টা হল যখন আওয়ামী লীগে নিজেই আরএসএসের রাজনীতির শাখা হিসাবে বাংলাদেশে ‘হিন্দু মহাজোট’ দল খুলতে দিয়েছিল অথবা নিজেই খুলে বসেছিল। আমরা আরএসএসের আইকন বিনায়ক দামোদর সাভারকারের “কালো টুপিটা” দেখেও চিনতে পারিনি, কারা আরএসএস আর কারা নয়। অথচ মাথায় এই টুপিটা রাখা, এটা আরএসএস প্রধান মোহন ভগত থেকে শুরু করে হিন্দু মহাজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক, এভাবে আরএসএসের সবার চিহ্ন। এই দল ব্যানারে নিজেদের নাম হিন্দিতে কেন লেখে, সে প্রশ্নও আমরা করিনি।  ব্যাপারটা হল, বাঙালি হিন্দু যদি আবার হিন্দির প্রয়োজন বা প্রীতি বোধ করে তা-ও আবার বাংলাদেশে বসে, বুঝতে হবে এটাই রাজনৈতিক ‘হিন্দুত্ব’- হিটলারি উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ এটা- এখানে তা ছেয়ে বসেছে। আমরা আসলে সম্ভবত অবুঝ গর্দভ হয়েছি, অথচ ভাব ধরেছি যে এটা উদারতা উদার। আমাদের উদারতার ঠেলায় আমাদেরই কাপড় খুলে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের হুশ নাই। অন্ততপক্ষে হাত ছেড়ে দিতে ত পারতাম!

বাংলাদেশে ‘হিন্দু মহাজোট দল’ কবে খোলা হয়েছিল এ নিয়ে অনেক মত আছে। কেউ কেউ ২০১৩ সালও বলে থাকে। তবে আওয়ামী লীগ এদের বিরুদ্ধে কিছু ছোট অ্যাকশনে গিয়েছিল সম্ভবত ২০১৬ সালে। কিন্তু যে বুঝ বা অজুহাতে তা করেছিল তাতেই বোঝা যায় এটাই লীগের ভুল রাজনীতি। লীগ ভেবেছিল এমন ‘হিন্দু মহাজোট দল’ কায়েম হলে সেটা নাকি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাঙ্ক কাটবে। কেবল এতটুকুই নাকি আওয়ামী লীগ ক্ষতি, দেশের ক্ষতি! চিন্তার ক্ষেত্রে এমনই দীনতায় আক্রান্ত আওয়ামী লীগ! মানে, দলটি চিনতেই পারেনি বাংলাদেশের আরএসএস তার সামনে হাজির। তাই শুধু ভোটের চিন্তাতেই নিজেকে অস্থির রেখেছিল। আবার অন্যদিকটা যদি  দেখি? আচ্ছা ব্যাপারটা যেন এমন বাংলাদেশে কী ভোট হয় এখন? যেন, বাংলাদেশের মানুষের ভোটই আওয়ামী লীগকে বারবার ক্ষমতায় আনছে! তাই কি?  নিজের সাথে এ’কেমন প্রতারণা!

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরএসএসের নেতা, হিন্দু মহাজোটেরও নেতা এখন গোবিন্দ প্রামাণিক। তার সাথে চট্টগ্রামের অ্যাডভোকেট আরেক হিন্দু নেতা রানা দাসগুপ্তের ব্যক্তিবিরোধের কথা জানা যায়। তাই তারা একই দল হিন্দু মহাজোট করতে পারেন না বলে শুনা যায়। তবু দেখা যায় প্রিয়া সাহা এদের দু’জনেরই লোক, প্রিয়া এদের দুজনের সাথেই সংশ্লিষ্ট।  সেকারণের রানা দাসগুপ্তও দেখিয়েছে যে মোদী পর্যন্ত একসেস তাঁরও আছে আর তা কম না, তবে প্রামাণিকের হাত ধরে তিনি সেখানে যান না।

এই বিচারে শাহরিয়ারের বক্তব্য এই প্রথম প্রিয়া সাহা, প্রামাণিক অথবা সংশ্লিষ্ট হিন্দু নেতা এমন যেকারও অবস্থানের বিরোধিতা করে হাজির করা বক্তব্য ও অবস্থান। তাহলে, শাহরিয়ার কি বুঝাতে চাচ্ছেন এটাই সরকারের নতুন অবস্থান ও লাইন? আওয়ামি লীগ তোবা করতেছে? এমনটা কেউ মনে করতে পারে অথবা করুক – এটাই সম্ভবত শাহরিয়ারের বক্তব্যের উদ্দেশ্য। তবে সেক্ষেত্রে এটা বিয়ের আসর ভেঙ্গে যাওয়ার পর বাজনাদারের বাজাতে আসার মত। প্রামাণিকের মত এসব করিতকর্মা ব্যক্তিত্বরা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ আরএসএসের রাজনীতি এনে দল খুলে বসেছে শুধু তাই না। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হাতের পুতুল হয়েছে। উঠতে বসতে আসামের পত্রিকায় বিবৃতির হুঙ্কার দিচ্ছে। বারবার বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বিবৃতি ঠুকতেছে, আমরা দেখছি।  আসামের এনআরসিতে বাদ পড়া উনিশ লাখ  লোক নাকি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বলে ফতোয়া দিচ্ছে। আর জোর দাবি জানাচ্ছে বাংলাদেশকে এদের ফেরত ও দায়িত্ব নিতে হবে। এই দাবি এখন পর্যন্ত অমিত শাহ অথবা প্রামাণিকের বড় হুজুর, নেতা খোদ মোহন ভগতও বলতে পারেন নাই। মোদীর সরকারও যেখানে নিজের সরকারি ভাষ্য ও অবস্থান হিসাবে এখনও আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করছেন যে এনআরসি ভারতের নিজের আভ্যন্তরীণ সমস্যা ও ইস্যু। সেখানে গোবিন্দ প্রামাণিক ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার কোলে বসে তাদের পুতুল হয়েছে আমাদের ভয় দেখাচ্ছেন, হুঙ্কার দিচ্ছেন। তিনি কোনদিকে এখান থেকেই পরিস্কার।

একটা কথা আছে, মুখে মাটি যাওয়া বা মাটি খেয়ে ফেলা। আওয়ামী লীগের অবস্থাটা হয়েছে তেমন। এটা লীগকে আরো বড় নির্বুদ্ধিতায় ফেলেছিল ২০১৮ সালের নির্বাচনের বছরের শুরুতে। ভারতের আরএসএস বাংলাদেশে নির্বাচনে পঞ্চাশটা আসন হিন্দু প্রার্থীদের পাইয়ে দেয়ার রাজনীতি খেলেছিল। আর এই ফাঁদে পড়েছিল লীগ-বিএনপি দু’দলই। এদের চিন্তাশক্তি ও খুবই উর্বর চিন্তা করার ক্ষমতা, যার প্রশংসা না করে আমাদের উপায় নাই। বিগত নির্বাচনে আরএসএস ভারতের সমর্থন এনে দিবে – এই মুলা ঝুলিয়ে দু’দলকেই বিভ্রান্ত করেছিল আরএসএস। আর অবাক বিষ্ময়ে আমরা দেখেছিলাম দু-দলই বিভ্রান্ত হয়েছিল! বলা হয়ে থাকে, এ কাজে আওয়ামী লীগের সমর্থনে পীষুষ বন্দোপাধ্যায়কে সামনে রেখে ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’ নামে সংগঠন খুলে দেয়া হয়েছিল। ভারতীয় সাংবাদিক চন্দন নন্দীর ভাষ্যমতে, বিএনপির ভিতরের ভারত লবির একটি গ্রুপও আরএসএস সমর্থিত দল বা প্রার্থীকে বিএনপির মনোনয়ন দানের কথা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আরএসএসকে ঘোরতরভাবে এখানকার রাজনীতিতে ডেকে আনা তখন থেকে। অথচ ক্ষমতাসীনদের উচিত ছিল আরএসএসের সাথে কোনো রফায় বা কোনো সুযোগ করে দিতে না যাওয়া। তাতে বিএনপি পালটা যদি হিন্দু মনোনয়ন দিয়ে আরএসএসের কোলে গিয়ে উঠত, সেটা মোকাবেলার অনেক অনেক বিকল্প ও সহজ রাস্তা ছিল। সোজা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এটা বুঝতে পারলে তারাই শায়েস্তা করার জন্য যথেষ্ট হতে পারত। কিন্তু ‘ধর্মের কল বাতাসেও নড়ে’। তাই কিছু দিনের মধ্যে প্রিয়া সাহারা উন্মোচিত হয়ে যায়, ট্রাম্পের কাছে নালিশকাণ্ড থেকেই তাদের রাজনীতিটা স্পষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া বাস্তবতা হল, শাহরিয়ার কথিত ওমন ৬১ টা কনষ্টিটুয়েন্সি যেখানে মেজর কনসেন্ট্রেশন ভোটার হিন্দুরা – এটা বাংলাদেশে বাস্তবত কোথাও নাই। আমাদের কোন কনষ্টিটুয়েন্সি আপনা থেকেই ওমন কোন ধর্মীয় ভাগে বিভক্ত নয়, বরং ভৌগলিকভাবে মানে ইউনিয়ন বা উপজেলা হিসাবে একেকটা  কনষ্টিটুয়েন্সিতে পড়েছে, এভাবে বিভক্ত। আল্লাহ বাঁচাইছে, চাইলেও আমাদের কোন ধর্মীয় ভাগের কনষ্টিটুয়েন্সি নাই। কিন্তু এই সুযোগে আমরা দেখে ফেলেছি, আমাদের দলগুলোই মোদীর সরকারও না খোদ হিন্দুত্ববাদের কেন্দ্র আরএসএসকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোই বাংলাদেশের ভাগ্যবিধাতা বানিয়ে দিতে, মেনে নিতে কীভাবে একপায়ে রাজি এবং বেপরোয়া!

এই অবস্থায় এই কথিত সাক্ষাৎকারের শাহরিয়ার এক সবচেয়ে বড় ভান করেছেন। ওখানে এক প্রশ্ন করানো হয়েছিল, সেটা মূল ইংরাজিটা ছিল এরকম……
Q. The journal South Asia has said that the RSS is working actively in Bangladesh. It has targeted the Hindu minority and is trying to forge a strong Hindu power bloc and a Hindu political party which could act as a power-broker.
প্রশ্নের মূল ভাবটা বাংলায় লিখলে তা হবে এমন যে, – বাংলাদেশে আরএসএস সক্রিয়ভাবে বাড়ছে। তারা স্থানীয় হিন্দুদের সাথে মিলে একটা শক্তিশালী “হিন্দু পাওয়ার ব্লক” নাকি বানিয়েছে?
জবাবে শাহরিয়ার কবির খুব শান্তভাবে বলেন যে, “তাঁর কাছে এমন কোনো তথ্য নেই”। তবে বাংলাদেশে আরএসএস এর রাজনৈতিক উপস্থিতি বা হিন্দু মহাজোট দল বা এদের সহযোগী দল গঠন ইত্যাদিকে সাহায্য করে এবার এসব কিছুকে অস্বীকার করলে আওয়ামি লীগ নিজের বোকামি ঢেকে রাখতে পারবে না। তবে এরপর শাহরিয়ার বাংলাদেশের হিন্দুদের “হিন্দু মৌলবাদী’ দল” না করতে পরামর্শ প্রদান করেছেন। বলেছেন, ” I would strongly advise the Hindu community not to form any fundamentalist outfit”।

তাহলে এবার তামাশাটা দেখেন, শাহরিয়ার আরএসএসকে সেকুলারিজমের মহিমা বুঝাইতে চেয়ে যেন বলছেন, I would like to state candidly that … we speak of a secular, welfare state………। অথবা আবার আরএসএসকে আশ্বস্ত করতে বুঝাইতেছেন যে শাহরিয়াররা বাংলাদেশকে ১৯৭২ সালের আকড় কনষ্টিটিউশনে, সেকুলার কনষ্টিটিউশনে [we are determined to go back to the 1972 Constitution ] নিয়ে যাবেনই। অর্থাৎ তামশাটা লক্ষ্য করেন, শাহরিয়ার এতই বুদ্ধিমান যে আরএসএসের কাছে সেকুলারিজম উপহার নিয়ে গেছেন!

একদিকে তিনারা আরএসএসে কাছে পঞ্চাশ হিন্দু প্রার্থী্র প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভেবেছিলেন সেই আশীর্বাদে বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকবেন। আবার এখন তারাই আবার আরএসএসের কাছে “সেকুলারিজম” উপহার নিয়ে যাচ্ছেন!

ব্যাপারটা হল, সারা ভারত যেখানে উগ্র হিন্দুত্ববাদের জ্বরে ছেয়ে গেছে, জয় শ্রীরাম না বলাতে মুসলমান পিটিয়ে মেরে ফেলছে। আবার, মোদীর সরকারী অবস্থান হল ভারতে কোথাও কোন পাবলিক লিঞ্চিং (পিটিয়ে মেরে ফেলা) নাই, ঘটে নাই তবে কিছু গুজব আছে। আরএসএস প্রধান মোহন ভগত দাবি করেছেন, লিঞ্চিং শব্দটা যেন ব্যবহার না করা হয়। কারণ লিঞ্চিং নাকি একটা “বিদেশি” ও “খ্রীশ্চান” শব্দ আর এসবের আলোকের বাংলাদেশে আরএসএসকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হিন্দুরাও এতে তাদের আকাঙ্খা ও দাবি সাজিয়েছেন। সেইখানে শাহরিয়ারেরা এই আকাঙ্খাকে সেকুলারিজম দিয়ে ঠান্ডা করতে বা আটকানোতে সক্ষম হবেন, এর কোন কারণ নাই। বাংলাদেশে আরএসএসের প্ররোচনায় বাংলাদেশের নেতা হিন্দুদের সেই আকাঙ্খা এখন এক কল্পিত “হিন্দুত্ববাদের বাংলাদেশে” পৌছে গেছে। শাহরিয়ার ও তার বন্ধুরা একদিকে বাংলাদেশে আরএসএস ও তাদের হিন্দুত্ববাদকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতা করবেন আবার তাদের সেকুলারিজম উপহার দিবেন? এটা কোন তামশা? তারা যে তামাশা করতেছেন সেইটা বুঝবার হুশও তারা হারায় ফেলছেন।
আবার দেশে আর একদল লোক ভেসে উঠতে দেখা যাচ্ছে। যারা আরএসএসকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতা, হিন্দু মহাজোট দল খুলে দেওয়া গোবিন্দ প্রমাণিক বা দাসগুপ্ত অথবা ইসকনের ততপরতা ও প্রসাদ খাওয়ানো নিয়ে কথা বললে এরা অভিযোগ করছেন যে এই কথা তোলা নাকি “সাম্প্রদায়িকতা” করা হচ্ছে। সমাজ দুনিয়াদারির খবর না রাখা এরা ঘুম থেকে উঠে আমাদের সাম্প্রদায়িকতার “মহিমা” যে কত অফুরান তাই দেখাচ্ছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা যদি ভারতনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে আরএসএস-পন্থীদের উত্থান ঠেকাবে কে?

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা যদি ভারতনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে আরএসএস-পন্থীদের উত্থান ঠেকাবে কে? অথচ এককথায় বললে, এটা কোনভাবেই বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনীতি হতে পারে না, এটা তাদের স্বার্থে যাবে না। কারণ, অন্যদেশের স্বার্থে বাংলাদেশে তৎপর এক কোটারি হিন্দুগোষ্ঠীর ততপরতা এটা।

সুতরাং, ঐ সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের জন্য কাউন্টার প্রডাকটিভ হবে, হতে বাধ্য। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আরএসএসের প্রভাব বাড়াতেই, ওর কবলে চলে যেতেই এটা ব্যবহৃত হবে। কেন?
বাংলাদেশের কোন ধর্মীয় বা সামাজিক গ্রুপের বিশেষ অভিযোগের প্রেক্ষিত  বাংলাদেশের কোন সরকার ভারতের কাছে জবাবদিহির সম্পর্ক পাতাতে পারে না। তাতে সেটা স্বেচ্ছায় অথবা ক্ষমতায় থাকার ভারতের সমর্থনের লোভ যা কিছুই হোক।
বাংলাদেশের সরকারের এক্ষেত্রে ভারতের ক্ষমতাসীনদের আশ্বস্ত করার কিছুই নেই। এটা তেমন বিষয় হতেই পারে না।

জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের সভায়ও আমাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতা করতে হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই জবাবদিহিতা সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন নয়। কারণ আমরাই স্বেচ্ছায় জাতিসংঘ ও ঐ কাউন্সিলের সদস্য হয়েছি। ওর নিয়মকানুনে আমরা নিজেই সম্মতি দিয়েছি। নিজের সংসদে তা রেটিফিকেশন করেছি। ঐ মানবাধিকার আমরা নিজ নাগরিকের বেলায় রক্ষা করব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এথেকেই এটা আমাদের উপর প্রযোজ্য হতে পেরেছে।
কাজেই অন্য কোন রাষ্ট্রের কাছে আমাদের জবাবহিহিতার কোন সম্পর্ক হতে পারে না। ঠিক যেমন, ভারতে কোন মুসলমান নিপীড়ন হলে কী ভারত আমাদের কাছে জবাবদিহিতা করবে? সেটা কী আমাদের আশা করার ইস্যু হতে পারে?  আমরা কী ভারতের মুসলমান রক্ষাকর্তা সাজতে পারি?

খাড়া কথাটা হল,  বাংলাদেশের হিন্দু নাগরিকের অভিযোগে বাংলাদেশের কোন সরকার ভারতের কাছে জবাবদিহিতা করতে যেতে পারে না। অথচ শাহরিয়ার কবির হাসিনা সরকারের হয়ে এমন তোষামোদি ও জবাবদিহিতার সম্পর্কই স্থাপনই যেন করতে গিয়েছেন। এটা আত্মঘাতি। এটা তিনি করতে পারেন না। ভারতের ক্ষমতাসীনদেরকে এখানে শাহরিয়ারের আশ্বস্ত করার কিছুই নাই। এটা শাহরিয়ারের বোকামি ও অনধিকার।

প্রিয়া সাহারা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের হিন্দুদের “দুঃখ বেচে খাওয়ার লোক” হিসেবে তাদের চেয়ে শাহরিয়ারেরা কত নাদান ও অযোগ্য। কারণ তারা ভারতের আরএসএস এর ক্ষমতা ও এর শ্রীবৃদ্ধির স্বার্থে ততপর হয়ে চলতে জানে।  বাংলাদেশের প্রধান দলগুলো যদি নাদান হতে চায়, যদি বাংলাদেশের দলগুলোকে ক্ষমতায় বসানোর ক্ষেত্রে আরএসএস-কে যদি তারা ক্ষমতার উতস বা দাতা মনে করে এর অর্থ তাদেরকে আরএসএসের অধীনস্ত হয়েই রাজনীতিই করতে হবে। আরএসএসের রঙের রাজনীতিই করতে হবে।  এর বাইরে অন্য কিছু ঘটবে না। আর এরপর সেটা আর বাংলাদেশ থাকে, থাকবে না! এটা তাদের বুঝতে হবে। এমনকি সেটা আর বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বাংলাদেশও থাকবে না!

যেমন বাংলাদেশের কোন হিন্দু নাগরিকের নালিশ করার জায়গা ভারত হতে পারে না, তেমনি তারা বাংলাদেশে আরএসএস বা হিন্দু মহাজোটকে ডেকে আনতে পারে না। তারা অথবা আমাদের কোন সরকার আরএসএস ও হিন্দু মহাজোটকে দোকান খুলতে দিতে পারে না। আবার আমরাও ভারতের কাছে জবাবদিহি করতে যেতে পারি না। তাহলে?

ভারতের কাছে কোন অভিযোগ শুনতে হবে কেন? এর আগেই হিন্দুসহ যেকোন নাগরিককে আমাদের রাষ্ট্রেরই বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ যদি থাকে তার প্রতিকার দিতেই হবে এবং তা দেশেই। অথবা কারও নাগরিক অধিকার হরণ হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবেই – এটাই একমাত্র সঠিক পথ।

এখন খাড়া কথাটা শুনেন ও মনে রাখেন।  ভারতের কাছে কোন অভিযোগ শুনতে হবে কেন? এর আগেই হিন্দুসহ যেকোন নাগরিককে আমাদের রাষ্ট্রেরই বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ যদি থাকে তার প্রতিকার দিতেই হবে এবং তা দেশেই। অথবা কারও নাগরিক অধিকার হরণ হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবেই – এটাই একমাত্র সঠিক পথ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৯ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে আরএসএসের মন জয়ের চেষ্টা!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ ফিরানোর খোয়াব

ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ সাদা শ্রেষ্ঠত্বফিরানোর খোয়াব

গৌতম দাস

১৮ মার্চ ২০১৯, সোমবার ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2yu

The judge ruled images of the suspect in court must blur his face. Photo: Mark Mitchell-Pool/Getty Images,  from this link.

প্রায় লাগোয়া দুইটা দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশ নিউজিল্যান্ড। এর উত্তরের দ্বীপে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী শহর ওয়েলিংটন আর দক্ষিণের দ্বীপের সবচেয়ে বড় শহর ক্রাইস্টচার্চ [Christchurch]। এবার ১৫ মার্চ ২০১৯, সেই ক্রাইস্টচার্চ উঠে আসে বিশ্বজুড়ে মিডিয়া শিরোনামে – “মসজিদে বন্দুকধারীর হামলা”। শহরের মধ্যে গাড়ী চালিয়ে আসতে ১০ মিনিট লাগে এমন দুরত্বে দুটো মসজিদ আছে – আল নুর [Al Noor Mosque] আর লিনউড [Linwood mosque] মসজিদ। সেখানে শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় একের পরে অন্যটায় পরপর, হামলাকারী মারাত্মক ও বড় ধরণের সন্ত্রাসী হামলা চালায়।  মিডিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীর নাম ‘ব্রেনটন ট্যারান্ট’ [Brenton Tarrant]। সে মূলত অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। তবে প্রায়ই পাশের নিউজিল্যান্ডে আসেন। চিন্তার দিক থেকে “খ্রিষ্টান এবং ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট বা সাদা চামড়ার লোকদের কথিত শ্রেষ্ঠত্বে” বিশ্বাসী। অর্থনৈতিক অবস্থার দিক থেকে ব্রেনটনের পরিচয় হল – ২৮ বছর বয়সী এই সাদাচামড়ার পুরুষ স্বল্প আয়ের খেটে খাওয়া পরিবারের [28-year-old white male from a low-income, working-class family]। আর সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলায় বেপরোয়া গুলিবর্ষণে ৪৯ জন ইতোমধ্যেই মৃত, আরো প্রায় ২০ জন হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে লড়ছেন।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরার সামনে মিডিয়ায় বলছেন, ‘এটা খুবই পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা’ [“well-planned terrorist attack”]।

Jacinda Ardern, prime minister of New Zealand, described the shootings as a “well-planned terrorist attack”, and said this is one of the country’s “darkest days”..

অর্থাৎ আমরা দেখলাম তিনি এখানে “মুসলমানেরাই ভিকটিম” বলে এটাকে ‘টেররিজম’ বলবেন কি না এমন দ্বিধা দেখাননি। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রীও এটাকে “সন্ত্রাসী হামলা’ [extremist terrorist attack] বলে নিন্দা জানিয়েছেন। বিভিন্ন রাষ্ট্রের বিবৃতিতে এটাকে “টেররিজম” বলা হয়েছে। এমনকি ভারতের বিদেশমন্ত্রী বা কানাডার সরকারও। কিন্তু নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এটাকে “খুবই পরিকল্পিত” [well-planned] বলছেন কেন? আর একটা বিশেষ দিক হল, এই হামলার পুরো সময় ১৭ থেকে ২০ মিনিটের; যার ১৭ মিনিটেরই লাইভ শো ফেসবুকে অন-লাইনে দেখানো হয়েছে। আর তা এমন ভয়ডর-পরোয়াহীন তাণ্ডব যে, রাইফেলের মাথায় বসানো ক্যামেরা থেকে নেয়া অনলাইন লাইভ ছবি নামাজ পড়তে আসা অসহায় মুসল্লিদের প্রতি গুলি ছোড়ার লাইভ ছবি – সাথে সাথেই ফেসবুকে প্রচারিত হচ্ছিল। এ ছবিগুলো যে লাইভ সম্প্রচার হচ্ছিল তা এএফপি নিজেরা পরীক্ষা করে আমাদের নিশ্চিত করে [AFP determined the video was genuine] এই রিপোর্ট ছেপেছে।

হামলাকারী কে বা কারা? তাদের রাজনৈতিক বা চিন্তাগত পরিচয় কী? পুলিশ বলছে, হামলাকারীরা মোট চারজন, যার তিনজনই সম্ভাব্য সহযোগী। আর চতুর্থজন যে দৃশ্যমান হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্ট তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে হামলার পরই এবং মানুষ হত্যার মামলায় অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। অন্যদের নিয়ে তদন্ত চলছে। গত ২০১১ সালে প্রায় একই ধরনের ঘটনায় নরওয়েতে ৭৭ জন মানুষ হত্যা করেছিল এন্ডার্স ব্রেইভিক [Anders Breivik]। হামলাকারী ব্রেনটনের পছন্দের ব্যক্তিত্ব যারা তাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন বলে জানিয়েছে, এমন দুই ব্যক্তির একজন হলেন এই ব্রেইভিক আর অন্যজন হলেন আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ব্রেনটন এই দুই ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাদের চিন্তা ও কাজের প্রশংসা করেছেন। অনুমান করা যায়, এর মূল কারণ এরা দু’জনই হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট [white supremacist] চিন্তা ধারণ করেন।

White Supremacist কারা?
“দুনিয়ায় সাদাচামড়ার লোকেদের শাসন-কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনতে হবে কারণ সেটা ছিল তাদের শ্রেষ্ঠ যুগ” – এই বক্তব্য বিশ্বাসে চলা পাশ্চাত্বের রাজনৈতিক-সামাজিক গ্রুপ এরা।  মূলত এরা ইনসাফ বা ন্যায়-অন্যায় মুল্যবোধ থেকে বিচার করে পথ চলে না, এমনই মানুষ। “আমি আর এক মানুষের সহায়-সম্পত্তি বা ওর পুরা দেশটাই দখল করে নিব – কারণ আমি সুপার – আমি ক্ষমতাবান, বলশালী” – এই সাফাই বয়ানের উপর দাঁড়ানো এসব হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট। তারা বলতে চায় পশ্চিমের সাদা চামড়ার লোকেরা আমরা এটাই করে এসেছি, কলোনি দখল করেছি, দুনিয়া লুটে শাসন করেছি, দাবড়ায় রেখেছি – কাজেই আমরা শ্রেষ্ট। তাই আবার “সেদিন” ফেরত আনতে হবে। তাদের মুল বক্তব্য এটাই।  এক ধরণের ‘সাদাদের ক্ষমতা’ বা হোয়াইট পাওয়ারের [White Power] পুজারি তাঁরা।
এছাড়া এরা দাবি করে তারা মাইগ্রেন্টবিরোধী। মানে গরিব দেশ থেকে মানুষের (যুদ্ধের শরণার্থী হওয়াসহ) নানা কারণে পশ্চিমের দেশে বসবাস করতে আসাকে (ইকোনমিক মাইগ্রেন্ট) অনুমোদন দেয়ার এরা তীব্র বিরোধী।
কোন তথ্য-উপাত্তে প্রমাণ না থাকলেও এরা প্রচার প্রপাগান্ডা করতে ভালবাসেন যে মাইগ্রেন্টরা “নোংরা”, এরা তাদের শহর নোংরা করে থাকে আর শহরে সব অপরাধের জন্য দায়ী হল এই মাইগ্রেন্টরা। এককথায় যারা তাদের মত নয় এমন “অপর” [other] যেকোন মানুষই নিকৃষ্ট, খারাপ। তাদের আচার আচরণ কালচার সব খারাপ। শুধু তাই না।  এখানে  হোয়াইট-সুপ্রিমিস্টদের পরিচয়ের আর এক অর্থ আছে। তারা বিশ্বাস করে সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠিরা ছাড়া বাকি অন্যেরা বেশি বেশি বাচ্চা পয়দা করে। আর তাতে কোন সাদা চামড়ার দেশে এরা সহজেই তাদের ছাড়িয়ে জনসংখ্যায় বেশি হয়ে যায়। (মুসলমানদের সম্পর্কে ভারতের মোদীর বিজেপি-আরএসএস সংগঠন ও তাদের কর্মীদের বিশ্বাস ও ভাষ্যও প্রায় একই রকম মিল দেখতে পাওয়া যায়।) তাই, সাদা চামড়ার জনগোষ্ঠি ছাড়া এমন “অপর” লোকেদেরকে বুঝাতে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা একটা শব্দ ব্যবহার করে থাকে – “ইনভেডর” [invader] – মানে অনুপ্রবেশকারি-দখলদার। হামলাকারি ব্রেনটন ও তাঁর বন্ধুরা কথিত অনুপ্রবেশকারিদেরকে হত্যা করা তাদের টার্গেট ও একাজ জায়েজ মনে করে থাকে। যদিও এরা সাধারণভাবে “ইনভেডর” বলে ডাকে কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় তারা ইনভেডর বলতে মূলত কেবল মুসলমান জনগোষ্ঠিকেই বুঝিয়েছে। অনেকটা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর  মত। আমরা মনে রাখতে পারি, তিনি ও তাঁর দল বাংলাদেশ থেকে ভারতে কথিত মাইগ্রেন্টদের “মুসলমান” এবং কখনো ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা “তেলাপোকা” ইত্যাদি মানুষের জন্য অমর্যাদাকর শব্দ ব্যবহার করে থাকেন।

হামলাকারি ব্রেনটন সম্পর্কে উপরের এতকিছু তথ্য জানার উপায় বা উতস কী? হামলা ঘটে যাবার পরে ব্রেনটন সম্পর্কে খোঁজ করে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এবং এএফপি [AFP] আমাদের জানাচ্ছে যে, এক মাস ধরে ফেসবুক ও টুইটারে ব্রেন্টন একটা গ্রুপ হিসেবে প্রকাশ্যেই সক্রিয় ছিল। [The Twitter profile had 63 tweets, 218 followers and was created last month.] ‘যে কেউ’ বা এনোনিমাস হিসেবে তারা একটা গ্রুপ চালিয়ে গেছে, যে গ্রুপের নাম ‘8chan’ ফোরাম [Politically Incorrect” forum on 8chan, a online discussion site ]। এই গ্রুপ যে খুলেছে, তার নাম হিসেবে দেখা যাচ্ছে, হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের নাম। একই ‘মালিক’ হিসেবে একই নামে এক টুইটার অ্যাকাউন্টও [@brentontarrant] আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই হামলার পুরো বর্ণনা এখান থেকেই প্রচারে দেয়া হয়েছে। কেন এই হামলা তা বিস্তারে বর্ণনা করতে তাদের ‘ম্যানিফেস্টো’ বলে ৭৪ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট এই সাইট থেকে নামিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ঐ ডকুমেন্টের শিরোনাম হল- ‘The Great Replacement’ বলা হয়েছে, এই ম্যানিফেস্টো লিখতে প্রণোদনাদাতাদের নাম হল ‘হোয়াইট জেনোসাইড’। মানে এরা নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে ডাকছে। সাধারণত ‘হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা’ নিজেদের ‘সাদা গণহত্যাকারী’ বলে থাকে। এ ছাড়া, নিজেদের বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধী এবং সংশ্লিষ্ট আরও কিছু শব্দ ও ধারণা যেমন, ডাইভারসিটি (Diversity বা বহুমুখিতা) বা মাল্টিকালচারিজমের [Multi-culturalism বা সাংস্কৃতিক বহুমুখিতা] এসবের ঘোরতর বিরোধী বলে দাবি করে থাকে।

ডাইভারসিটি বা মাল্টিকালচারিজম ধারণার এখানে সারকথা হলটা – অনেক ধরণের দেশের ভুগোল ও সংস্কৃতির মানুষের একসাথে এক শহরে এই রাষ্ট্রে এসে বসবাস করা – একই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এর ‘বৈষম্যহীন’ এক “নাগরিক সাম্য” বৈশিষ্ঠের কনষ্টিটিউশনের অধীনে।

এনিয়ে ইউরোপের তর্কবিতর্কের উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ব্রিটেন রাষ্ট্রনীতি হিসেবে ‘মাল্টিকালচারিজম’ মেনে চলা তাদের জন্য সঠিক নীতি বলে মনে করে থাকে। কিন্তু ফ্রান্স ঘোষিতভাবেই মাল্টিকালচারিজম অপছন্দ করে থাকে। এর বদলে তাদের পছন্দ হল ‘এসিমিলিয়েশন’[assimilation] নীতি। যার বাংলা ও খুলে বলা অর্থ হল – ইংরেজি assimilate (বাংলায় সব-একই-ধরণ বা এককরণ করা) থেকে এসিমিলিয়েশন। এই এসিমিলিয়েশন শব্দের মূল বিষয়টা হল, ইউরোপের ব্রিটিশ-ফরাসিসহ সব কলোনি-দখলদারেরা আমাদের মত দেশকে এককালে কলোনি বানিয়ে, দখল করে লুটতে গিয়েছিল। পরবর্তিতে সেই সূত্রে আবার সস্তা শ্রম পাওয়ার লোভে তারা আমাদেরকে (কালো চামড়ার নেটিভদেরকে) কালক্রমে নিজ নিজ ইউরোপীয় দেশেও নিয়ে গিয়েছিল। “নেটিভরা” একসময়ে কলোনি মালিকের দেশেই তারা স্থায়ীভাবে পরিবারসহ  নাগরিক হিসাবে বসবাসও শুরু করেছিল। কারণ যেমন কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়াকে কার্যত মূল বৃটিশ ভুমিরই এক্সটেনশন মনে করা হত। কিন্তু একালে এসে ইউরোপের অর্থনীতি ঢলে পড়াতে ব্যবসা বানিজ্যের ভাটায় স্থানীয় বাসিন্দাদের চোখে এই নেটিভরাই তখন চক্ষুশুল হয়ে গেলে যা হয়, তাই। কলোনি মালিকের দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্তরা তাদের দেশে যাওয়া নেটিভদেরকেই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বি গণ্য করছে। এই ব্যাপারটা বৃটিশেরা যেমন সহনীয়ভাবে দেখে ফরাসীরা তেমন নয়। তাই ফরাসি নীতি হল, নেটিভদের সবাইকেই ফরাসি কালচারই অনুসরণ করতে হবে। নেটিভরা নিজ দেশ থেকে আনা সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্তন হতে হবে। তদুপরি, নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্ম পালনও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্তন হয়ে পালন করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই । ফরাসি দেশে বোরকা আইনত নিষিদ্ধ এ ‘যুক্তি’তেই। জবরদস্তিতে সবাইকে ফরাসি হতে,নেটিভেরা নিজ দেশ থেকে আনা শুধু সংস্কৃতিই ফেলে দিতে হবে বা ফরাসি কালচারের অধস্থন হতে হবে তাই না। নিজ (বিশেষত ইসলাম) ধর্মপালনটাও যেনবা ফরাসি কালচারের অধস্থন হয়ে করতে হবে; এমন করতে বাধ্য করাই assimilation নীতি। যেমন ফরাসি দেশে বোরখা পড়া আইনত নিষিদ্ধ, এই যুক্তিতেই। এটাকেই ফরাসি রাষ্ট্র তার “এসিমিলিয়েশন” এর নীতি বলে সাফাই দিয়ে চলে থাকে। এই দুই নীতির তুলনা নিয়ে গত ২০১৫ সালে আমার এক পুরানা লেখা এখানে সময় করে আবার পড়তে পারেন।

হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা হিটলারেরও ভক্ত। যেমন এরা হিটলার বা তার সংগঠন নাৎসি পার্টির নানান চিহ্ন বা প্রতীক ব্যবহার করে থাকে। হিটলারের বাণী নিজেরা পুনর্ব্যবহার করে। হামলাকারী ব্রেনটন ট্যারান্টের রাইফেলের গায়ে এর ওপরে কমপক্ষে ছয়টা নাম ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আঁকা আছে। এর একটি হল, ‘ফরটিন ওয়ার্ডস’ (Fourteen Words) চৌদ্দ শব্দের এক বাণী। আর তা হল – আমাদেরকে অবশ্যই “আমাদের মানুষের” অস্তিত্ব ও আমাদের “সাদা সন্তানদের” ভবিষ্যত সুরক্ষিত করতে হবে। [“We must secure the existence of our people and a future for white children.”]।  এটাকে অনেকে হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের একটা মূল ‘মন্ত্র’ বলে থাকে। এখানে ‘our people’ বা ‘white children’ বলে এরা বর্ণবিদ্বেষ জাগানোর চেষ্টা করে থাকে।

ব্রেন্টনের মত হোয়াইট সুপ্রিমিস্টরা বলতে চায় তারা মাইগ্রেশনবিরোধীকিন্তু আসলেই কি তাই?
আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ড এসব রাষ্ট্রের আদি বাসিন্দা কারা? আর কারা এর অবৈধ দখলদার? অথবা তাঁদের ভাষায় অনুপ্রবেশকারি-দখলদার? নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী [aborigine] হল ‘মাউরি’-রা [Māori]। ইউরোপ থেকে বিশেষত ডাচ বণিক ‘আবেল তাসমান’ [Abel Janszoon Tasman] প্রথম ইউরোপীয়, যিনি মাউরি সভ্যতা ও এর ভূমির সন্ধান পাওয়ায় (১৬৪২) পরবর্তী সময়ে ‘নিউজিল্যান্ড’ নাম দিয়ে দখল করে, কালক্রমে নিউজিল্যান্ড ইংল্যান্ডের কলোনি হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায়। এখানে ইউরোপীয় সাদা চামড়ার লোকজনই কি অনুপ্রবেশকারী-দখলদার নয়? হামলাকারী ব্রেনটন নিজেই (বা তাঁর পূর্বপ্রজন্ম) অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের আসল অনুপ্রবেশকারী-দখলদার। অতএব, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের নিজেকে না বলে (মুসলমানসহ) অন্য কাউকে ‘অনুপ্রবেশকারী’ বলা প্রহসন মাত্র। ক্রাইস্টচার্চের মুসলমানদেরকে “হোয়াইট জেনোসাইডার” ব্রেনটন এর বিদেশি বা তথাকত্থিত “মাইগ্রেশনবিরোধীতার” তামাশা হল এটাই যে খোদ মাইগ্রেন্ট মাইগ্রেশনবিরোধীতার ভান করতে নেমে নির্বিচারে মানুষ খুন করছে।

তবে এখানে আমাদের পরিস্কার থাকতে হবে যে বুশ-ব্লেয়ারের “ওয়ার অন টেরর” আর হোয়াইট বা “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামার” উত্থান  – এদুটো একই ফেনোমেনা নয়। বরং একেবারেই আলাদা। তবে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব হাঙ্গামাকারিরা” ইচ্ছা করে ইনভেডর বা অনুপ্রবেশকারী-দখলদার বলতে কথাটা সংকীর্ণ করে কেবল “মুসলমান” বুঝাচ্ছে – যাতে তারা খ্রীশ্চান-পশ্চিমাবাসীদের দৃষ্টি-আকর্ষণ করা সহজ হয়।

সারকথা : আমাদের যথেষ্ট মাথা তুলে যেটা দেখতে হবে যে, হোয়াইট সুপ্রিমিস্টদের উত্থান কেন এখন দেখা যাচ্ছে? তারা অটোমানদের সাম্রাজ্যের প্রতি ঘৃণা অথবা ইউরোপিয়ান খ্রিশ্চানিটির জেরুসালেম দখল চেষ্টার অতীত লড়াইগুলোকে এখন কেন রেফারেন্সে আনছে?

আমরা গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসকে মোটা দাগে তিনটা পর্বে ভাগ করে বুঝতে পারি। প্রথম পর্ব হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত। যেটাকে “কলোনি অর্থনীতির যুগ” বলা যেতে পারে। দ্বিতীয় পর্ব হল – দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ থেকে গত শতাব্দী (বিশ শতক) পর্যন্ত, যেটা  আমেরিকার নেতৃত্বে “গ্লোবাল অর্থনীতির যুগ”। আর তৃতীয় পর্বকে বলা যায়, চলতি শতকে আমেরিকান নেতাগিরির পতন আর ক্রমেই সেই জায়গা নিতে “চীনের উত্থিত গ্লোবাল নেতৃত্ব”।

পশ্চিমের, বিশেষত ইউরোপের অর্থনীতি ভালো চলছে কি না তা বুঝবার সহজ তরিকা বা নির্ণায়ক হল – মাইগ্রান্ট ইস্যু। অর্থনীতি ভাল চললে দেখা যাবে, তারা সবাই ভুলে যায় যে মাইগ্রান্ট তাদের একটি সমস্যা। কারণ, তখন পশ্চিমের বাড়তি শ্রম দরকার; ফলে মাইগ্রান্ট শ্রমিক খুব দরকারি। আবার অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলেই মাইগ্রান্ট বিষয়টিকে মানে, ওই বাড়তি শ্রমের বিষয়টিকে পাশ্চাত্য এক বিরাট সমস্যা মনে করে থাকে। তারা তাদের মধ্যবিত্তদেরকে মাইগ্রান্টদের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে উঠায়। অথবা যেমন আমরা এখন ফ্রান্সে দেখছি। ফরাসি নেতা মেরিন লি পেনের National Front পার্টির উগ্র ন্যাশনালিস্টরা (হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট) তাদের মধ্যবিত্তকে ক্ষেপিয়ে তুলছেন। কিন্তু এরপরেও তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হেরেছেন। তবে তারা আসলে “কী রাজনীতি” করছেন তা বুঝবার কিছু ইঙ্গিত দেয়া যাক। তার দলের দুই ভাইস-প্রেসিডেন্টের একজন ফিলিপো [Florian Philippot] সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন। যা তিনি বলছেন বাধ্য করা হয়েছে। ফিলিপোর দাবি তাদের দলের আভ্যন্তরীণ বিতর্ক আসলে এখন এক সরে যাওয়া ইস্যু। “আমরা আগে আসলে দাবি করতাম এক অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ। যেটা এখন “মাইগ্রান্ট আর ফরাসি আইডেন্টিটি” – তার এই পুরানা ট্রাডিশনাল অবস্থানকেই মুল রানোইতিক ফোকাস বলে হাজির করেছে। এটা আসলে এক ভয়ঙ্কর পিছনের দিকে পিছলে পড়া”। [Philippot said the debate within the FN about a shift away from his focus on economic nationalism back to its traditional priorities of immigration and French identity were “a terrible backward slide”].
এই বক্তব্য থেকে আমরা “অর্থনৈতিক জাতীবাদ” থেকে মোদীর হিন্দুত্ববাদ কোথায় আলাদা তা বুঝে নিতে পারি।

গ্লোবাল অর্থনীতির ইতিহাসের দ্বিতীয় পর্বে এসে আমেরিকার নেতৃত্বের হাতে ইউরোপ এর আগে নিজেদের কলোনি শাসনের অর্থনীতির সমাপ্তি সমর্পণের ঘোষণা দিতে হয়েছিল
এখন চীনা উত্থানের পর্বে এসে ইউরোপ বিশেষ করে ফ্রান্স আরেক দফা (তবে এবার আমেরিকাসহ) চীনেরও পেছনে থাকতে শুরু করতে যাচ্ছে। এরই প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপে এই  সাদা চামড়ার আইডেনটিটি- ধরনের রাজনীতি দেখা যাচ্ছে। দাবি উঠছে তাদের আগের “কলোনি যুগ” সবচেয়ে ভালো ছিল। কারণ, সেটা ছিল শান-শওকতের যুগ। তাই কলোনি লুণ্ঠনের সেকালে ফিরে যেতে হবে”। ইউরোপের প্রবীণ প্রজন্ম এখন তরুণদের কাছে সাদা চামড়ার সুপ্রিমেসির গল্প শুনিয়ে উসকানি দিচ্ছে।

সময় কখনো পেছনে ফেরে না। যেমন আমরা চাইলেই এখন “দাস-প্রথা” আবার ফিরে দুনিয়াতে চালু করতে পারব না। একইভাবে কলোনি লুণ্ঠন একালে আবার বৈধ বলে দাবি করা, সাদা চামড়ার বর্ণবাদের শ্রেষ্ঠত্ব একালে আবার ন্যায্য বলে সাফাই গাওয়া- এসব অসম্ভব। দুনিয়ার অভিমুখ আর সেটা নয়। এগারো-বারো শতকের জেরুসালেম দখলের জোশ- ক্রুসেডের সেই উসকানি একালে আবার তৈরি করা, সেটাও অসম্ভব। মডার্ন রাষ্ট্র ও শাসন দুনিয়ায় এসে যাওয়ার পরে পুরনো ‘ক্রুসেড’ আর হবে না। যদি তাই হত তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে ব্রিটেন জেরুসালেম দখলের চেষ্টায় বারবার হেরে যাওয়ার শোধ তুলতে আবার ক্রুসেড লড়ে জেরুসালেমের দখল করতে চেষ্টা করত। “কামাল তুনে কামাল কিয়ার” তুরস্ক গড়ার পথে হাঁটত না। বরং আমরা দেখেছি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন সত্ত্বেও ‘মডার্ন রিপাবলিক’ ব্রিটিশ সরকার ‘ক্রুসেড’ শব্দটি মুখেও আনেনি।

আমরা এখন যেমন চাকরি, পড়াশোনা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুবিধা পেতে পশ্চিমমুখী হই। সামনের দিনে ইউরোপীয়দের অন্তত চাকরি বা অধিকতর সুযোগ-সুবিধার জন্য এশিয়ামুখী হয়ে ধাবমান হতে দেখা অসম্ভব নয়। এটাকেই তারা হার মনে করছে। পাশ্চ্যাতের সমাজে “সাদা শ্রেষ্ঠত্ব ফিরিয়ে আনার” নামে অস্থিরতার কারণ এখানেই।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৬ মার্চ ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ক্রাইস্টচার্চে হামলাঃ ‘সাদা শ্রেষ্ঠত্ব’ কি ফিরবে – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]