আরএসএসের অনুগ্রহ, এই ক্ষমতায় বাংলাদেশ চলবে না

আরএসএসের অনুগ্রহ, এই ক্ষমতায় বাংলাদেশ চলবে না

গৌতম দাস

 ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Lb

প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এবারের ভারত সফর ছিল চলতি অক্টোবর মাসের ৩ থেকে ৬ তারিখ। প্রধানমন্ত্রী তিন তারিখ সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছিলেন। সেই দিনই মানে ভোরে কলকাতার টেলিগ্রাফ পত্রিকায় ‘ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি’র নেতা শাহরিয়ার কবিরের একটা সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছিল। ওর শিরোনাম ছিল “Hasina ascent marked Hindu turnaround: Kabir”। মানে “হাসিনার ক্ষমতারোহণ হিন্দুদের ঘুরে দাঁড়ানোর চিহ্ন হয়ে উঠেছেঃ কবির”।

ইংরেজি দৈনিক টেলিগ্রাফ কলকাতার আনন্দবাজার গ্রুপের পত্রিকা। তবে এর টার্গেট পাঠক আনন্দবাজারের মত ঠিক ‘অস্বস্তিকর দেশপ্রেমী’ বা উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা নন। টেলিগ্রাফ রিপোর্টিংয়ের চেয়ে কলাম দিয়ে পাঠক আকর্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে চলে। সম্ভবত এই পত্রিকা এমন কলামের পাঠকের ওপর ভর করে টিকে যেতে পারে বলে তাদের অনুমান। এই সুবাদে একালের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কিছু কলামিস্টদের ভালো কিছু লেখা আমাদের পড়ার সুযোগ ঘটে যায় অবশ্য। এই বিচারে টেলিগ্রাফ একেবারেই মান খারাপ কোন পত্রিকা না হলেও শাহরিয়ার কবিরের কথিত এই সাক্ষাতকারটা বেশ বেমানান তো বটেই। তবে বুঝাই যায় এটা অর্ডারি বা খেপ মারা মাল। ভদ্র ভাষায় যাকে অনেকে পেজ-বিক্রি করা পাওয়া বা ছাপা লেখা বলে থাকে। মানে, এধরণের পাতায় কী ছাপা হয়েছে এর দায়দায়িত্ব সম্পাদকের নাই বলে মনে করা হয়।

একেবারেই সাজানো আর কথিত এক অধ্যাপককে দিয়ে করানো এই সাক্ষাতকারে যেখানে শেষে শাহরিয়ারের নিজ বীরত্বের প্রশংসাটা বাদ দিলে পাঁচটার মত প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু উনি কোথাকার অধ্যাপক, কী বিষয়ের বা আদৌও কোন অধ্যাপক কিনা এমন কোন পরিচয়-ধারণা দেওয়া নাই সেখানে। তাঁর প্রশ্ন শুনে এক গদ্গদ ঘন আবেগী ধরণের কলকাতার এক আম হিন্দু নাগরিক – এর চেয়ে বেশি, যিনি স্থিরভাবে কিছু চিন্তাও করতে পারেন, এমন মনে হয় নাই। বলা বাহুল্য ওখানে প্রশ্নগুলো ফরমায়েশি। যার উদ্দেশ্য হল একটা প্রচারণা চালানো – এই বলে যে বর্তমান আমলে হিন্দুরা বাংলাদেশে আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে – এই কথার পক্ষে ঢাক পিটানো। ভারতের কাছে এই ঢাক পিটিয়ে বাংলাদেশের কোন শাসককে সার্টিফিকেট নিতে হবে কেন, এর কোন সদুত্তর এখানে নাই। তবুও এর উদ্দেশ্যটা আরও বুঝতে হলে চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রিয়া সাহার ট্রাম্পের কাছে তোলা তার অভিযোগগুলোর নাটকটা মনে করে দেখতে পারি। সেখানে হাজির করা প্রিয়া সাহার বক্তব্যেরই পালটা কিছু ঠিক কাটান কথা নয় শ্রেফ দাবিই শাহরিয়ার এখানে জানিয়েছেন।

যেমন, সাক্ষাৎকারে শাহরিয়ার দাবি করেছেন, ২০০৯ সালের পর (সুনির্দিষ্ট করেন নাই) তিন লাখ হিন্দু নাগরিক নাকি বাংলাদেশ থেকে ভারতে দেশান্তরী হয়েছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসন এত ভালো ছিল যে, ওর মধ্যে আড়াই লাখ হিন্দুই আবার ভারত থেকে ফিরে বাংলাদেশে চলে এসেছেন”। [……out of 3 lakh Hindus who had crossed the boundary, two-and-a-half lakh returned to Bangladesh] . মানে হাসিনার আমলেও হিন্দু দেশান্তর আগের মতই ঘটে – তিনি স্বীকার করছেন। তবু হাসিনা বীর এজন্য যে তাঁর আমলে এই তিন লাখের আড়াই লাখই আবার ফিরে আসে, তাই। কিন্তু কিসের ভিত্তিতে এই দাবি তা অবশ্য জানা যায় না। সেখানে কোনো রেফারেন্স দেয়া নাই। আবার ধরে নেয়া হয়েছে যে তিন না হলেও আড়াই লাখ লোকের এমন যাওয়া আসা কোন ব্যাপারনা। শুধু তাই না। তাদের ছেড়ে যাওয়া বাড়িঘর সম্পত্তি তারা আবার ঠিকটাক ফিরেও পেয়েছে। দাবির এই অংশটাই বেশ ইন্টারেস্টিং।  এ ছাড়া আরো দাবি করা হয়েছে, হিন্দুদের জন্য এখন জব মার্কেট খুলে রাখা আছে […job market was thrown open for the Hindus,]। এটা পড়ে কারও মনে সন্দেহ হলেও কিছুই করার নাই যে আগে কি তাহলে এই ‘জব মার্কেট’ বন্ধ ছিল! এছাড়া আরও দাবি আছে। বলছেন, গত নির্বাচনে (২০১৮) ‘তারা’ ব্যবস্থা করাতে, ব্যবস্থা নেয়াতে ও পাহারা দেয়াতে মোট ৬১ কনস্টিটুয়েন্সিতে হিন্দুরা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পেরেছিলেন। এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য না করাই বোধহয় সঠিক। কারণ এবার কেউ ভোট দিতে পেরেছিল কি না সে অভিজ্ঞতা, সেটা সবারই জানা আছে। সারকথায় শাহরিয়ার তার কোন বক্তব্যের স্বপক্ষেই কোন পয়েন্টে কোনও প্রমাণ সাথে দাখিল করেননি। বলা যায় কেবল কিছু স্টেটমেন্ট রেখেছেন।

বাংলাদেশের ‘হিন্দু রাজনীতিতে’ বড় বাঁক বদল
বাংলাদেশের ‘হিন্দু রাজনীতি’ বিশেষত গত তিন বছর ধরে চলা রাজনীতি খুবই বিপজ্জনক স্কেলে ও ডিরেকশনে আগাচ্ছে। বলাই বাহুল্য, এটা ভারতে মোদীর উত্থান এবং তাতে আরএসএসের ততপরতা ও সুবিধা বিতরণ ও উস্কানির মিলিত প্রভাব বা আফটার এফেক্ট। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতির শুরু হিন্দু কমিউনিস্ট নেতাদের হাতে, সাতচল্লিশে পাকিস্তানের জন্মের পরে। এটা কোন রাস্তায় যাবে, কিভাবে ফুলে-ফলে বাড়বে সেটিও তাদের হাতেই সূচিত। এভাবে এর কৌশল ও বয়ানগুলোও নির্ধারিত হয়েছিল। এই বাস্তবতা মানলে বলা যায় বাংলাদেশের সেই হিন্দু রাজনীতি একালে এসে এখন আরএসএসের দিকে মোড় নিয়েছে – এটা অকল্পনীয় এবং এটা আত্মঘাতী হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আরএসএস যারা এখন সমর্থন করে এদের কাছে অতীত হিন্দু-বুঝের সেকুলারিজম এখন কেমন লাগে? তারা কি এখন আরএসএস করেও সেকুলারিজম অপ্রয়োজনীয় বলে বুঝে তাই বাদ দিয়েছেন? এটা পরিষ্কার করে জানা যায় না। এ ব্যাপারে হ্যাঁ ও না, দু’টি জবাবই পাওয়া যায়। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হল বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আরএসএস ও হিন্দুত্ববাদ কিভাবে গ্রহণীয় হয়ে যেতে পারে, প্রগতিবাদী থেকে হিন্দুত্ববাদে ঝাপিয়ে পড়া এই জার্নি – সেটা দেখতে পাওয়াই আসলে এক বিরাট বিস্ময়। যার অপর বা ৯০ শতাংশ পড়শি নাগরিক হল মুসলমান সে কী ভবিষ্যত বুঝে এই রাজনীতি বেছে নেয় সেটা এক বিষ্ময় বললেও কমই বলা হয়, সেটা বুঝা সত্যিই মুশকিল! এঁদের স্বপ্ন কী এক হিন্দুত্বের বাংলাদেশ? এ’ কেমন স্বপ্ন!  এছাড়া ওদিকে বাংলাদেশের হিন্দুদের হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি বেছে নেওয়া মানে আসলে নিজের জন্য রাজনীতি না করে বরং ভারতের জন্য রাজনীতি করা। বাংলাদেশে যেসব সমস্যা ও সম্ভাবনায় তারা ছিল সেখান থেকে নগদ কিছু লাভের আশায় ভাড়া খাটাই, তবে আরও বড় গহবরে ঢুকে যাওয়া।  অবশ্য সেকালে মস্কোর বৃষ্টির ছাতা বাংলাদেশে তুলে ধরা গেলে এরা আর এখন দোষ করেছে কী? সে সাফাইওও দেয়া যায়। মানুষ তো এমন করেই থাকে, নানান কারণে। যাই হোক, এসব প্রশ্ন আগামীতে নিজেই নিজের জবাব হয়ে উঠে আসবে হয়ত। তবে মনে রাখতে হবে খোদ ভারতেরই ভবিষ্যৎ হিন্দুত্ববাদের ভেতরে নিহিত হবে কি না, সেই প্রশ্নই এখনো পুরাটাই অমীমাংসিত।

আবার এই প্রশ্নটা অনেকটা এরকম যে, ইউরোপে হিটলারিজম ফিরে আসতে পারে কী, এমন ধরনের। ইউরোপে হিটলারের নাম না নিয়ে হলেও “হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট” বা সাদা শ্রেষ্ঠত্ববাদী নামের ধারার সমর্থক বাড়তে দেখা যাচ্ছে। একথা সত্য। তবে এখনো তা বিচ্ছিন্নভাবে ও বিভিন্ন পকেটে। আর ওদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পই সম্ভবত আমেরিকার শেষ ও ছোট হোয়াইট সুপ্রিমিস্ট হিসেবে থেকে যাবেন। তাতে ওদিকে স্টিভ বেননেরা [STEVE BANON] আবার সুপ্রিমিস্ট চিন্তাকে জাগাতে মটিভেশনাল ক্লাস নেয়া শুরু করেছেন ইতালিতে। সেটাও সত্য।

এদিকে বাংলাদেশে, যারা নিজেদের সুর্যসেন, প্রীতিলতাদের উত্তরসূরি বলে দাবি করেন, দেখা যাচ্ছে তাদের অনেকে আজকাল মোদী-আরএসএসের দিকে ছুটছেন। এখানে স্পষ্ট কথাটা হল, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যাওয়া, এই প্রশ্নে প্রথমবার ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করতে যাওয়া আর তা করতে গিয়ে হাতে অস্ত্র তুলে নেয়া পর্যন্ত যারা গিয়েছিলেন – তাদের এটা ছিল এক হিন্দুইজমের রাজনীতিতে ঝাপায় পড়া। এক হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাজনীতি, যা বাস্তবত জমিদার স্বার্থের রাজনীতি। পূর্ববঙ্গের কৃষি উদ্বৃত্ত যা ততদিনে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে, যা কলকাতায় জমা হচ্ছিল – এর বদলে সেসময় বাংলা ভাগ হয়ে পুর্ববঙ্গ আলাদা হওয়াতে এবার কৃষি উদ্বৃত্ত ঢাকায় জমা হবে – এটা জমিদার স্বার্থের প্রাণকেন্দ্র ‘কলকাতা’ মেনে নিতে চায়নি। এটাই স্বার্থবিরোধের মূল। অথচ এটা তো সাধারণভাবে জমিদারি উচ্ছেদের মত কোন কিছু ছিল না, তাই তাদের গায়ে কোনো আঁচড় লাগার কথাও নয়। তবু এটুকু পরিবর্তনও তারা সহ্য করতে পারেননি। কারণ পূর্ববঙ্গ আলাদা প্রদেশ হয়ে গেলে তাতে পুর্ববঙ্গে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না বলে তারা কর্তৃত্ব হারাতে হত, একথা ঠিক। এই স্বার্থ হারানো এটা তারা মেনে নিতে চায়নি মূল কারণ এটা আর তা থেকে জমিদারদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান।

কাজেই অনুশীলন বা যুগান্তর নামের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর ওপর অহেতুক বিপ্লবীপনা আরোপ করে কমিউনিস্টদের এদেরকে মহান করে দেখানোর কিছু নাই।  এটা বাংলার বা অন্ততপক্ষে পুর্ববঙ্গের সবার স্বার্থের রাজনীতি ছিল না তা তারা করেও নাই। তাদের বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা মানে, জমিদারের স্বার্থে পূর্ববঙ্গের স্বার্থের বিরোধিতা। এটাই তারা করেছিলেন। এটাকে স্বদেশী আন্দোলন বলে াপনি এতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন কি না, সেটা নির্ভর করে আপনার রাজনীতি হিন্দু জাতীয়তাবাদ নির্ভর কি না। এই হল প্রীতিলতা-প্রীতি যাদের আছে তাদের রাজনীতি। কাজেই প্রীতিলতাদের উত্তরসুরিদের এখন মোদী-আরএসএস এর দিকে যাওয়া এটা তো তাদের ন্যাচারাল  গন্তব্য, নয় কী? কাজেই সুর্যসেনদের অনুশীলন বা যুগান্তর নামের সশস্ত্র গ্রুপগুলোর রাজনীতি একটা হিন্দুইজমের রাজনীতি, সেকালের জমিদারদের স্বার্থের রাজনীতি। এর মধ্যে প্রগতিশীলতা খুঁজা রঙের আড়াল চড়িয়ে দেয়া অথবা একে কোন অর্থেই প্রগতিশীল বলে দাবি করার কোন সুযোগ নাই।

এবার একালে আসি। আওয়ামি লীগের বোকা হয়ে যাওয়া, মানে না-বুঝে ভুল রাজনীতি করে ফেলার সময়টা হল যখন আওয়ামী লীগে নিজেই আরএসএসের রাজনীতির শাখা হিসাবে বাংলাদেশে ‘হিন্দু মহাজোট’ দল খুলতে দিয়েছিল অথবা নিজেই খুলে বসেছিল। আমরা আরএসএসের আইকন বিনায়ক দামোদর সাভারকারের “কালো টুপিটা” দেখেও চিনতে পারিনি, কারা আরএসএস আর কারা নয়। অথচ মাথায় এই টুপিটা রাখা, এটা আরএসএস প্রধান মোহন ভগত থেকে শুরু করে হিন্দু মহাজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক, এভাবে আরএসএসের সবার চিহ্ন। এই দল ব্যানারে নিজেদের নাম হিন্দিতে কেন লেখে, সে প্রশ্নও আমরা করিনি।  ব্যাপারটা হল, বাঙালি হিন্দু যদি আবার হিন্দির প্রয়োজন বা প্রীতি বোধ করে তা-ও আবার বাংলাদেশে বসে, বুঝতে হবে এটাই রাজনৈতিক ‘হিন্দুত্ব’- হিটলারি উগ্র হিন্দু জাতীয়তাবাদ এটা- এখানে তা ছেয়ে বসেছে। আমরা আসলে সম্ভবত অবুঝ গর্দভ হয়েছি, অথচ ভাব ধরেছি যে এটা উদারতা উদার। আমাদের উদারতার ঠেলায় আমাদেরই কাপড় খুলে নিয়ে যাচ্ছে আমাদের হুশ নাই। অন্ততপক্ষে হাত ছেড়ে দিতে ত পারতাম!

বাংলাদেশে ‘হিন্দু মহাজোট দল’ কবে খোলা হয়েছিল এ নিয়ে অনেক মত আছে। কেউ কেউ ২০১৩ সালও বলে থাকে। তবে আওয়ামী লীগ এদের বিরুদ্ধে কিছু ছোট অ্যাকশনে গিয়েছিল সম্ভবত ২০১৬ সালে। কিন্তু যে বুঝ বা অজুহাতে তা করেছিল তাতেই বোঝা যায় এটাই লীগের ভুল রাজনীতি। লীগ ভেবেছিল এমন ‘হিন্দু মহাজোট দল’ কায়েম হলে সেটা নাকি আওয়ামী লীগের ভোট ব্যাঙ্ক কাটবে। কেবল এতটুকুই নাকি আওয়ামী লীগ ক্ষতি, দেশের ক্ষতি! চিন্তার ক্ষেত্রে এমনই দীনতায় আক্রান্ত আওয়ামী লীগ! মানে, দলটি চিনতেই পারেনি বাংলাদেশের আরএসএস তার সামনে হাজির। তাই শুধু ভোটের চিন্তাতেই নিজেকে অস্থির রেখেছিল। আবার অন্যদিকটা যদি  দেখি? আচ্ছা ব্যাপারটা যেন এমন বাংলাদেশে কী ভোট হয় এখন? যেন, বাংলাদেশের মানুষের ভোটই আওয়ামী লীগকে বারবার ক্ষমতায় আনছে! তাই কি?  নিজের সাথে এ’কেমন প্রতারণা!

বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরএসএসের নেতা, হিন্দু মহাজোটেরও নেতা এখন গোবিন্দ প্রামাণিক। তার সাথে চট্টগ্রামের অ্যাডভোকেট আরেক হিন্দু নেতা রানা দাসগুপ্তের ব্যক্তিবিরোধের কথা জানা যায়। তাই তারা একই দল হিন্দু মহাজোট করতে পারেন না বলে শুনা যায়। তবু দেখা যায় প্রিয়া সাহা এদের দু’জনেরই লোক, প্রিয়া এদের দুজনের সাথেই সংশ্লিষ্ট।  সেকারণের রানা দাসগুপ্তও দেখিয়েছে যে মোদী পর্যন্ত একসেস তাঁরও আছে আর তা কম না, তবে প্রামাণিকের হাত ধরে তিনি সেখানে যান না।

এই বিচারে শাহরিয়ারের বক্তব্য এই প্রথম প্রিয়া সাহা, প্রামাণিক অথবা সংশ্লিষ্ট হিন্দু নেতা এমন যেকারও অবস্থানের বিরোধিতা করে হাজির করা বক্তব্য ও অবস্থান। তাহলে, শাহরিয়ার কি বুঝাতে চাচ্ছেন এটাই সরকারের নতুন অবস্থান ও লাইন? আওয়ামি লীগ তোবা করতেছে? এমনটা কেউ মনে করতে পারে অথবা করুক – এটাই সম্ভবত শাহরিয়ারের বক্তব্যের উদ্দেশ্য। তবে সেক্ষেত্রে এটা বিয়ের আসর ভেঙ্গে যাওয়ার পর বাজনাদারের বাজাতে আসার মত। প্রামাণিকের মত এসব করিতকর্মা ব্যক্তিত্বরা ইতোমধ্যেই বাংলাদেশ আরএসএসের রাজনীতি এনে দল খুলে বসেছে শুধু তাই না। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হাতের পুতুল হয়েছে। উঠতে বসতে আসামের পত্রিকায় বিবৃতির হুঙ্কার দিচ্ছে। বারবার বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী বিবৃতি ঠুকতেছে, আমরা দেখছি।  আসামের এনআরসিতে বাদ পড়া উনিশ লাখ  লোক নাকি বাংলাদেশ থেকে যাওয়া বলে ফতোয়া দিচ্ছে। আর জোর দাবি জানাচ্ছে বাংলাদেশকে এদের ফেরত ও দায়িত্ব নিতে হবে। এই দাবি এখন পর্যন্ত অমিত শাহ অথবা প্রামাণিকের বড় হুজুর, নেতা খোদ মোহন ভগতও বলতে পারেন নাই। মোদীর সরকারও যেখানে নিজের সরকারি ভাষ্য ও অবস্থান হিসাবে এখনও আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করছেন যে এনআরসি ভারতের নিজের আভ্যন্তরীণ সমস্যা ও ইস্যু। সেখানে গোবিন্দ প্রামাণিক ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার কোলে বসে তাদের পুতুল হয়েছে আমাদের ভয় দেখাচ্ছেন, হুঙ্কার দিচ্ছেন। তিনি কোনদিকে এখান থেকেই পরিস্কার।

একটা কথা আছে, মুখে মাটি যাওয়া বা মাটি খেয়ে ফেলা। আওয়ামী লীগের অবস্থাটা হয়েছে তেমন। এটা লীগকে আরো বড় নির্বুদ্ধিতায় ফেলেছিল ২০১৮ সালের নির্বাচনের বছরের শুরুতে। ভারতের আরএসএস বাংলাদেশে নির্বাচনে পঞ্চাশটা আসন হিন্দু প্রার্থীদের পাইয়ে দেয়ার রাজনীতি খেলেছিল। আর এই ফাঁদে পড়েছিল লীগ-বিএনপি দু’দলই। এদের চিন্তাশক্তি ও খুবই উর্বর চিন্তা করার ক্ষমতা, যার প্রশংসা না করে আমাদের উপায় নাই। বিগত নির্বাচনে আরএসএস ভারতের সমর্থন এনে দিবে – এই মুলা ঝুলিয়ে দু’দলকেই বিভ্রান্ত করেছিল আরএসএস। আর অবাক বিষ্ময়ে আমরা দেখেছিলাম দু-দলই বিভ্রান্ত হয়েছিল! বলা হয়ে থাকে, এ কাজে আওয়ামী লীগের সমর্থনে পীষুষ বন্দোপাধ্যায়কে সামনে রেখে ‘সম্প্রীতির বাংলাদেশ’ নামে সংগঠন খুলে দেয়া হয়েছিল। ভারতীয় সাংবাদিক চন্দন নন্দীর ভাষ্যমতে, বিএনপির ভিতরের ভারত লবির একটি গ্রুপও আরএসএস সমর্থিত দল বা প্রার্থীকে বিএনপির মনোনয়ন দানের কথা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আরএসএসকে ঘোরতরভাবে এখানকার রাজনীতিতে ডেকে আনা তখন থেকে। অথচ ক্ষমতাসীনদের উচিত ছিল আরএসএসের সাথে কোনো রফায় বা কোনো সুযোগ করে দিতে না যাওয়া। তাতে বিএনপি পালটা যদি হিন্দু মনোনয়ন দিয়ে আরএসএসের কোলে গিয়ে উঠত, সেটা মোকাবেলার অনেক অনেক বিকল্প ও সহজ রাস্তা ছিল। সোজা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এটা বুঝতে পারলে তারাই শায়েস্তা করার জন্য যথেষ্ট হতে পারত। কিন্তু ‘ধর্মের কল বাতাসেও নড়ে’। তাই কিছু দিনের মধ্যে প্রিয়া সাহারা উন্মোচিত হয়ে যায়, ট্রাম্পের কাছে নালিশকাণ্ড থেকেই তাদের রাজনীতিটা স্পষ্ট হয়ে যায়। এছাড়া বাস্তবতা হল, শাহরিয়ার কথিত ওমন ৬১ টা কনষ্টিটুয়েন্সি যেখানে মেজর কনসেন্ট্রেশন ভোটার হিন্দুরা – এটা বাংলাদেশে বাস্তবত কোথাও নাই। আমাদের কোন কনষ্টিটুয়েন্সি আপনা থেকেই ওমন কোন ধর্মীয় ভাগে বিভক্ত নয়, বরং ভৌগলিকভাবে মানে ইউনিয়ন বা উপজেলা হিসাবে একেকটা  কনষ্টিটুয়েন্সিতে পড়েছে, এভাবে বিভক্ত। আল্লাহ বাঁচাইছে, চাইলেও আমাদের কোন ধর্মীয় ভাগের কনষ্টিটুয়েন্সি নাই। কিন্তু এই সুযোগে আমরা দেখে ফেলেছি, আমাদের দলগুলোই মোদীর সরকারও না খোদ হিন্দুত্ববাদের কেন্দ্র আরএসএসকে আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোই বাংলাদেশের ভাগ্যবিধাতা বানিয়ে দিতে, মেনে নিতে কীভাবে একপায়ে রাজি এবং বেপরোয়া!

এই অবস্থায় এই কথিত সাক্ষাৎকারের শাহরিয়ার এক সবচেয়ে বড় ভান করেছেন। ওখানে এক প্রশ্ন করানো হয়েছিল, সেটা মূল ইংরাজিটা ছিল এরকম……
Q. The journal South Asia has said that the RSS is working actively in Bangladesh. It has targeted the Hindu minority and is trying to forge a strong Hindu power bloc and a Hindu political party which could act as a power-broker.
প্রশ্নের মূল ভাবটা বাংলায় লিখলে তা হবে এমন যে, – বাংলাদেশে আরএসএস সক্রিয়ভাবে বাড়ছে। তারা স্থানীয় হিন্দুদের সাথে মিলে একটা শক্তিশালী “হিন্দু পাওয়ার ব্লক” নাকি বানিয়েছে?
জবাবে শাহরিয়ার কবির খুব শান্তভাবে বলেন যে, “তাঁর কাছে এমন কোনো তথ্য নেই”। তবে বাংলাদেশে আরএসএস এর রাজনৈতিক উপস্থিতি বা হিন্দু মহাজোট দল বা এদের সহযোগী দল গঠন ইত্যাদিকে সাহায্য করে এবার এসব কিছুকে অস্বীকার করলে আওয়ামি লীগ নিজের বোকামি ঢেকে রাখতে পারবে না। তবে এরপর শাহরিয়ার বাংলাদেশের হিন্দুদের “হিন্দু মৌলবাদী’ দল” না করতে পরামর্শ প্রদান করেছেন। বলেছেন, ” I would strongly advise the Hindu community not to form any fundamentalist outfit”।

তাহলে এবার তামাশাটা দেখেন, শাহরিয়ার আরএসএসকে সেকুলারিজমের মহিমা বুঝাইতে চেয়ে যেন বলছেন, I would like to state candidly that … we speak of a secular, welfare state………। অথবা আবার আরএসএসকে আশ্বস্ত করতে বুঝাইতেছেন যে শাহরিয়াররা বাংলাদেশকে ১৯৭২ সালের আকড় কনষ্টিটিউশনে, সেকুলার কনষ্টিটিউশনে [we are determined to go back to the 1972 Constitution ] নিয়ে যাবেনই। অর্থাৎ তামশাটা লক্ষ্য করেন, শাহরিয়ার এতই বুদ্ধিমান যে আরএসএসের কাছে সেকুলারিজম উপহার নিয়ে গেছেন!

একদিকে তিনারা আরএসএসে কাছে পঞ্চাশ হিন্দু প্রার্থী্র প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভেবেছিলেন সেই আশীর্বাদে বাংলাদেশে ক্ষমতায় থাকবেন। আবার এখন তারাই আবার আরএসএসের কাছে “সেকুলারিজম” উপহার নিয়ে যাচ্ছেন!

ব্যাপারটা হল, সারা ভারত যেখানে উগ্র হিন্দুত্ববাদের জ্বরে ছেয়ে গেছে, জয় শ্রীরাম না বলাতে মুসলমান পিটিয়ে মেরে ফেলছে। আবার, মোদীর সরকারী অবস্থান হল ভারতে কোথাও কোন পাবলিক লিঞ্চিং (পিটিয়ে মেরে ফেলা) নাই, ঘটে নাই তবে কিছু গুজব আছে। আরএসএস প্রধান মোহন ভগত দাবি করেছেন, লিঞ্চিং শব্দটা যেন ব্যবহার না করা হয়। কারণ লিঞ্চিং নাকি একটা “বিদেশি” ও “খ্রীশ্চান” শব্দ আর এসবের আলোকের বাংলাদেশে আরএসএসকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের হিন্দুরাও এতে তাদের আকাঙ্খা ও দাবি সাজিয়েছেন। সেইখানে শাহরিয়ারেরা এই আকাঙ্খাকে সেকুলারিজম দিয়ে ঠান্ডা করতে বা আটকানোতে সক্ষম হবেন, এর কোন কারণ নাই। বাংলাদেশে আরএসএসের প্ররোচনায় বাংলাদেশের নেতা হিন্দুদের সেই আকাঙ্খা এখন এক কল্পিত “হিন্দুত্ববাদের বাংলাদেশে” পৌছে গেছে। শাহরিয়ার ও তার বন্ধুরা একদিকে বাংলাদেশে আরএসএস ও তাদের হিন্দুত্ববাদকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতা করবেন আবার তাদের সেকুলারিজম উপহার দিবেন? এটা কোন তামশা? তারা যে তামাশা করতেছেন সেইটা বুঝবার হুশও তারা হারায় ফেলছেন।
আবার দেশে আর একদল লোক ভেসে উঠতে দেখা যাচ্ছে। যারা আরএসএসকে ডেকে আনার প্রতিযোগিতা, হিন্দু মহাজোট দল খুলে দেওয়া গোবিন্দ প্রমাণিক বা দাসগুপ্ত অথবা ইসকনের ততপরতা ও প্রসাদ খাওয়ানো নিয়ে কথা বললে এরা অভিযোগ করছেন যে এই কথা তোলা নাকি “সাম্প্রদায়িকতা” করা হচ্ছে। সমাজ দুনিয়াদারির খবর না রাখা এরা ঘুম থেকে উঠে আমাদের সাম্প্রদায়িকতার “মহিমা” যে কত অফুরান তাই দেখাচ্ছেন।

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা যদি ভারতনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে আরএসএস-পন্থীদের উত্থান ঠেকাবে কে?

বাংলাদেশের রাজনীতির প্রধান ধারা যদি ভারতনির্ভর হয়ে যায়, তাহলে বাংলাদেশে আরএসএস-পন্থীদের উত্থান ঠেকাবে কে? অথচ এককথায় বললে, এটা কোনভাবেই বাংলাদেশের হিন্দুদের রাজনীতি হতে পারে না, এটা তাদের স্বার্থে যাবে না। কারণ, অন্যদেশের স্বার্থে বাংলাদেশে তৎপর এক কোটারি হিন্দুগোষ্ঠীর ততপরতা এটা।

সুতরাং, ঐ সাক্ষাৎকার বাংলাদেশের জন্য কাউন্টার প্রডাকটিভ হবে, হতে বাধ্য। বাংলাদেশের হিন্দু রাজনীতিতে আরএসএসের প্রভাব বাড়াতেই, ওর কবলে চলে যেতেই এটা ব্যবহৃত হবে। কেন?
বাংলাদেশের কোন ধর্মীয় বা সামাজিক গ্রুপের বিশেষ অভিযোগের প্রেক্ষিত  বাংলাদেশের কোন সরকার ভারতের কাছে জবাবদিহির সম্পর্ক পাতাতে পারে না। তাতে সেটা স্বেচ্ছায় অথবা ক্ষমতায় থাকার ভারতের সমর্থনের লোভ যা কিছুই হোক।
বাংলাদেশের সরকারের এক্ষেত্রে ভারতের ক্ষমতাসীনদের আশ্বস্ত করার কিছুই নেই। এটা তেমন বিষয় হতেই পারে না।

জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের সভায়ও আমাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের জবাবদিহিতা করতে হয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই জবাবদিহিতা সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন নয়। কারণ আমরাই স্বেচ্ছায় জাতিসংঘ ও ঐ কাউন্সিলের সদস্য হয়েছি। ওর নিয়মকানুনে আমরা নিজেই সম্মতি দিয়েছি। নিজের সংসদে তা রেটিফিকেশন করেছি। ঐ মানবাধিকার আমরা নিজ নাগরিকের বেলায় রক্ষা করব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। এথেকেই এটা আমাদের উপর প্রযোজ্য হতে পেরেছে।
কাজেই অন্য কোন রাষ্ট্রের কাছে আমাদের জবাবহিহিতার কোন সম্পর্ক হতে পারে না। ঠিক যেমন, ভারতে কোন মুসলমান নিপীড়ন হলে কী ভারত আমাদের কাছে জবাবদিহিতা করবে? সেটা কী আমাদের আশা করার ইস্যু হতে পারে?  আমরা কী ভারতের মুসলমান রক্ষাকর্তা সাজতে পারি?

খাড়া কথাটা হল,  বাংলাদেশের হিন্দু নাগরিকের অভিযোগে বাংলাদেশের কোন সরকার ভারতের কাছে জবাবদিহিতা করতে যেতে পারে না। অথচ শাহরিয়ার কবির হাসিনা সরকারের হয়ে এমন তোষামোদি ও জবাবদিহিতার সম্পর্কই স্থাপনই যেন করতে গিয়েছেন। এটা আত্মঘাতি। এটা তিনি করতে পারেন না। ভারতের ক্ষমতাসীনদেরকে এখানে শাহরিয়ারের আশ্বস্ত করার কিছুই নাই। এটা শাহরিয়ারের বোকামি ও অনধিকার।

প্রিয়া সাহারা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলাদেশের হিন্দুদের “দুঃখ বেচে খাওয়ার লোক” হিসেবে তাদের চেয়ে শাহরিয়ারেরা কত নাদান ও অযোগ্য। কারণ তারা ভারতের আরএসএস এর ক্ষমতা ও এর শ্রীবৃদ্ধির স্বার্থে ততপর হয়ে চলতে জানে।  বাংলাদেশের প্রধান দলগুলো যদি নাদান হতে চায়, যদি বাংলাদেশের দলগুলোকে ক্ষমতায় বসানোর ক্ষেত্রে আরএসএস-কে যদি তারা ক্ষমতার উতস বা দাতা মনে করে এর অর্থ তাদেরকে আরএসএসের অধীনস্ত হয়েই রাজনীতিই করতে হবে। আরএসএসের রঙের রাজনীতিই করতে হবে।  এর বাইরে অন্য কিছু ঘটবে না। আর এরপর সেটা আর বাংলাদেশ থাকে, থাকবে না! এটা তাদের বুঝতে হবে। এমনকি সেটা আর বঙ্গবন্ধুর প্রিয় বাংলাদেশও থাকবে না!

যেমন বাংলাদেশের কোন হিন্দু নাগরিকের নালিশ করার জায়গা ভারত হতে পারে না, তেমনি তারা বাংলাদেশে আরএসএস বা হিন্দু মহাজোটকে ডেকে আনতে পারে না। তারা অথবা আমাদের কোন সরকার আরএসএস ও হিন্দু মহাজোটকে দোকান খুলতে দিতে পারে না। আবার আমরাও ভারতের কাছে জবাবদিহি করতে যেতে পারি না। তাহলে?

ভারতের কাছে কোন অভিযোগ শুনতে হবে কেন? এর আগেই হিন্দুসহ যেকোন নাগরিককে আমাদের রাষ্ট্রেরই বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ যদি থাকে তার প্রতিকার দিতেই হবে এবং তা দেশেই। অথবা কারও নাগরিক অধিকার হরণ হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবেই – এটাই একমাত্র সঠিক পথ।

এখন খাড়া কথাটা শুনেন ও মনে রাখেন।  ভারতের কাছে কোন অভিযোগ শুনতে হবে কেন? এর আগেই হিন্দুসহ যেকোন নাগরিককে আমাদের রাষ্ট্রেরই বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ যদি থাকে তার প্রতিকার দিতেই হবে এবং তা দেশেই। অথবা কারও নাগরিক অধিকার হরণ হয়ে থাকলে তা ফিরিয়ে দিতে হবেই – এটাই একমাত্র সঠিক পথ।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ১৯ অক্টোম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে আরএসএসের মন জয়ের চেষ্টা!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

হিন্দুত্বের মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

হিন্দুত্বের  মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

গৌতম দাস

০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Co

 

Protests: Stop making HINDUSTAN into LYNCHISTAN – REUTERS

নির্বাচনে আবার জিতবার পরে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে, গত ৩০ মে ২০১৯। সেই সাথে ভারত এখন হিন্দুত্বের রাজনীতিতে সয়লাব, সরকার আর প্রধান বিরোধী দল এ’দুই দলই এখন হিন্দুত্বের রাজনীতি নিয়ে – কে হিন্দুত্বের বেশি ফয়দা তুলতে পারে – সেই কাড়াকাড়ি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে গেছে। সে হিসাবে হিন্দুত্বই এখন প্রধান রাজনৈতিক ধারা, কংগ্রেস ও বিজেপি যেখানে উভয়েই হাজির।

মানুষের প্রত্যেক সমাজেরই কিছু সামাজিকভাবে নির্ধারিত পালনীয় আচার-আচরণ থাকে। জবরদস্তিতে সেটা অমান্য করা যেমন, কেউ চাইল যে সামাজিক নর্মসের সে বিরুদ্ধে যাবে, সে রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে হাঁটবে – বলাই বাহুল্য এটা এক ধরনের সামাজিক অসভ্যতা, পাবলিক বিড়ম্বনা বা “উপদ্রব ঘটানো” – এ বিষয়টিকেই ইংরেজিতে ‘নুইসেন্স’ [Public Nuisance] বলে। মোদীর প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে হিন্দুত্বের নামে এমন অসংখ্য পাবলিক নুইসেন্স ঘটিয়ে। অথবা বলা যায় এই অর্থে  বিজেপি/আরএসএস হল “অসামাজিক” – এন্টি-সোশ্যাল দল। যারা পাবলিক নুইসেন্স কত রকমভাবে ঘটানো যায় তা করে দেখানোর দল।  আর সেই সাথে এটা এমন একটা দলের সরকার যার কাজ হল, এমন নুইসেন্স যেন বাধাহীনভাবে সমাজে ঘটতে পারে, তাতে সহায়তা করা। তাই মোদীর কাজ ছিল এবং এখন করছে যা এধরণের কাজকে প্ররোচিত করছে আর, প্রশ্রয় দিয়ে আগলে রাখছে। তবে গত পাঁচ বছরে এসব কাণ্ডের শীর্ষে ছিল গরুপূজা-কেন্দ্রিক অথবা ঘর-ওয়াপসি প্রোগ্রাম। মানে হল, মুসলমানসহ অন্য অহিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হিন্দুধর্মে জবরদস্তিতে ফিরতে হবে বলে রাস্তায় দল বেধে জবরদস্তি করা, অপমান, বেইজ্জতি, হয়রানি করা, এজন্য আহত, রক্তাক্ত বা খুনই করে ফেলা বা করার ভয় দেখানো – এভাবে  নুইসেন্স তৈরি করা। আর পরবর্তীকালে গরুপূজা-কেন্দ্রিক “গোরক্ষক আন্দোলন” হয়ে উঠেছিল আরও ভয়ঙ্কর।

গরু নিয়ে চলাচলকারী ব্যবসায়ী, গরু-পালনকারী বা কৃষিজীবীকে আক্রমণ অথবা গরুর গোশত পাওয়া গেছে মাঠে অথবা বাসায় এই অজুহাতে মুসলমান ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আক্রমণ – এই ছিল এর সাধারণ লক্ষণ। এসবকিছুর উপরে আইনি বাধা তৈ করতে একটা আইন পাস করাও হয়েছিল। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের সামনে জবাব্দীহীতায় টিকতে না করে আইনটাই প্রত্যাহার করে নেই মোদী সরকার। তো এই কাজে ‘গোরক্ষক দল’ গঠন করে নজরদারির নামে পাবলিক লাইফে নুইসেন্স তৈরি করতে বিভিন্ন রাস্তা পাহারা দেয়া। আর বিজেপি-আরএসএসের নামে-বেনামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন থেকে লোক নিয়ে গঠিত হত এসব গোরক্ষক দল। এভাবে প্রকাশ্য সরকারি সহায়তায় বাধাহীনভাবে চলত এসব ইসলামবিদ্বেষী হত্যা নিপীড়ন ও পাবলিক নুইসেন্স। এদের তৎপরতায় নৃশংসতা বর্ণনা করতে আর একটা শব্দ আছে “পাবলিক লিঞ্চিং” [Public Lynching]। ইংরেজি এই শব্দের মানে হল, বিজেপি/আরএসএসের কর্মিদের নিয়ে গঠিত গোরক্ষক বা ভিজিলেন্স ধরনের দলের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে পাবলিক উন্মাদনা এই অজুহাত তৈরি করে বা উন্মাদনা বলে চালিয়ে দিতে – এসব নিজ দলের কর্মিদের ইসলামবিদ্বেষী  নিপীড়ন হত্যাকান্ডগুলো। যেন মনে হয় কোন কথিত ইস্যুতে মুসলমান নাগরিককে গণপিটুনিতে আহত রক্তাক্ত বা হত্যা করা হয়েছে। লিঞ্চিং মানে গণ-উন্মাদনার নামে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে কাউকে রক্তাক্ত করা বা মৃত্যু ঘটানো। কিন্তু এককথায় বললে, এগুলো ছিল ধর্মীয় আক্রমণ। কেউ মুসলমান হলেই তাকে রাস্তায় দল বেধে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা বা তাতে মৃত্যু ঘটানো, দলীয় কর্মিরা এমনই বেপরোয়া আর আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার বিজেপি/আরএসএসের প্রকাশ্য দলীয় কর্মসুচি।

মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের নতুন যোগ করে শুরু হয়েছে আরেক অজুহাতে ‘পাবলিক লিঞ্চিং’। অজুহাত বা ঘটনা অনুষঙ্গ মানে কেন কিভাবে ঘটানো হয়, তা হলো কোন বাসে, ট্রেনে বা রাস্তায় মানে পাবলিক স্পেসে প্রকাশ্যে কোন মুসলমান নাগরিককে ধরে তাকে “জয় শ্রীরাম” বলতে বাধ্য হয়। একাজে ধরেই চর-থাপ্পর মেরে জোর করে নির্যাতন করেই চলা হয় যাতে সে প্রাণ বাঁচাতে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য হয়, আর না করলে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হামলায় এর তীব্রতায় সে মারাও যেতে পারে। প্রত্যেক সপ্তাহেই এমন দু-তিনটি ঘটনা ভারতজুড়ে ঘটতে দেখা যাচ্ছে, গত মে মাসে নির্বাচনে মোদির শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরু থেকেই।

এককথায় বললে, কীসের রাষ্ট্র, কীসের আইন, নিয়ম শৃঙ্খলা, – প্রজাতন্ত্র পার্লামেন্ট ইত্যাদি; ভারতে এমন কোন কিছু এখন নাই। ভারতে রাষ্ট্র, সমাজ, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট সব মারা গেছে।  আছে কেবল এক ধর্মীয় রাজত্ম। আপনি হিন্দু ধর্মের লোক, তাই আপনি মেজরিটারিয়ান [Majoritarian]। তাই আপনি মুসলমানদের উপরে যাখুশি করতে পারেন। যা বলবেন তাই হবে! তাতে ভারতের রাষ্ট্রপতি, সরকার, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট আপনাকে কিছুই বলবে না। বরং প্রটেকশন দিবে। এই হল রুল অব দা ডে! এখনকার রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া।

আইনি দিক থেকে পাবলিক নুইসেন্স ঘটানো মানে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা এক ক্রিমিনাল অপরাধ; পেনাল কোড ২৬৩, ২৯০, ২৯১ ধারায় পাবলিক লিঞ্চিং করা অপরাধ। তবে পাবলিক লিঞ্চিং করতে গিয়ে হতে পারে বড় অপরাধ- হত্যা করা, হত্যার উদ্দেশ্যে আহত করা ইত্যাদি; যা মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ। এ ছাড়া পাবলিক অর্ডার নষ্ট করা, গণ-উন্মাদনা তৈরি করা সেসব অপরাধের খতিয়ান তো আছেই।

তবে এ ছাড়াও এখানে সবচেয়ে বড় অপরাধ ঘটায় শাসক সরকার, যেটা আসলে রাজনৈতিক ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা, রাষ্ট্র একটা খামোখা – বানিয়ে ফেলা । মূল কারণ মোদী এন্ড গং আপনি এখানে পরিকল্পিত ভাবে ভারতে হিন্দুদের মেজরিটারিয়ান-ইজম চালু করেছেন। “জয় শ্রীরাম” হল হিন্দুদের মহান শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশকারি শ্লোগান। তাই আপনি মুসলমান, মানে আপনি হিন্দু নন বলেই আপনি আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছেন কিনা  তা পরখ করতেই এই ন্যুইসেন্স মেজরিটারিয়ান-ইজম আপনার উপর করবে। এটা ‘নাগরিক বৈষম্য’ করা হচ্ছে কিনা, তা ঠেকানোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া প্রধানমন্ত্রীর কাজ কিনা সেসব পাশে ফেলায় রাখেন, উদাসীন থাকতে দেন। নির্লিপ্ত থেকে রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা ও পাবলিক অর্ডার ভেঙে পড়া হতে দেন ও সাহায্য করেন। অসুবিধা কী? আমি মোদী আর আমাদের হিন্দুত্ব আছে – আছে আমাদের মেজরিটারিয়ান-ইজম । কমকথায় এই হল এখনকার ভারত, তার মেজরিটারিয়ান-ইজম এর সাফাই।

একটা মডার্ন রিপাবলিক সেসব মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তা রাষ্ট্র বলে নিজেকে দাবি করতে পারে, এর এক নম্বর পয়েন্ট হল নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা বজায় রাখার কর্তব্য পালন করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রই সবাই সমান, সমান অধিকারের এমন হতে হয়। তাতে সে কোন ধর্মের নাগরিক, কোন গায়ের রঙের, পুরুষ না নারী, পাহাড়ি না সমতলী ইত্যাদি বিভেদ নির্বিশেষে সবাই রাষ্ট্রের সমান অধিকারের এমন হতে হয়। আর তা রক্ষা মানে নাগরিকের সম-অধিকার রক্ষা, কোনো নাগরিক যাতে অধিকার বৈষম্যের শিকার না হয়, সেটা রক্ষা ও বজায় রাখা ইত্যাদি হলো সরকারের মুখ্য কাজ। এখানে ব্যর্থ হওয়ারও সুযোগ নেই। হলে এটাই নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। এই ব্যর্থতার অর্থ হলো, রাষ্ট্রের অনস্তিত্ব; রাষ্ট্রের আর থাকা না থাকায় কিছু যায় আসে না বা খামাখা হয়ে যাওয়া। কিন্তু মোদী বলতে চাচ্ছেন এগুলো তত্বকথা ফেলায় রাখেন। মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই শেষ কথা।

নাগরিককে বৈষম্যহীনভাবে সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল সরকার তা পালনে অপারগ বলে জানিয়ে দেয়া বা জেনে যাওয়া। ঝাড়খণ্ডের ঘটনায় তাবরিজ আনসারিকে লিঞ্চিং করে হত্যা করে হয়েছে। হত্যাকারীদের দাবি ছিল তাবরিজকে ভারতে থাকতে হলে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে হবে। এমন শর্ত দেয়ার ক্ষেত্রে তারা কে, এই হত্যাকারীদের কি অধিকার আছে এই দাবি করার- তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এটা যে চরমতম নাগরিক বৈষম্য সৃষ্টির একটা কাজ তা নিয়ে কারো সচেতনতা আছে মনে হয়নি। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে হায়দরাবাদ ও বোম্বাইয়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত মুসলমান এমপি ওয়াসি [Asaduddin Owaisi] তার শপথের অনুষ্ঠানে, সেখানে তাকেও ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে চাপ দিতে বিজেপি এমপিরা জয় শ্রীরাম বলে গগনবিদারী চিৎকার করছিল। অর্থাৎ পার্লামেন্টেও বিজেপি এমপিদের ধারণা তারা অন্য এমপির ওপর এমন বাড়তি ক্ষমতাপ্রাপ্ত যে, তারা ওয়াসিকে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করতে পারে। বিজেপি এমপিরা বাড়তি অধিকারপ্রাপ্ত (মেজরিটারিয়ান) এটাই বলতে চাচ্ছে, মোদির বিজেপি দলের এমপিরা। তাই তাদেরই রুল মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই সবকিছু।

ওই দিকে এসব নিয়ে মোদীর প্রতিক্রিয়া আরো মারাত্মক। পার্লামেন্টে তিনি বিরোধী দলের কথা বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, “ঝাড়খণ্ডকে লিঞ্চিংয়ের কেন্দ্র” বা হাব বলা নাকি খুবই বেইনসাফি হবে [Unfair to call Jharkhand a hub of lynching: Narendra Modi]। কারণ তিনি বলতে চাছেন, লিঞ্চিংয়ে যারা মামলা খেয়েছে তাদের বিচার তো আদালতে হচ্ছেই। মোদীর ইনসাফবোধ এখানে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আসলে কখনো কখনো ক্রিমিনাল অপরাধের চেয়ে বড় আর মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক বা কনস্টিটিউশনাল প্রতিশ্রুতি ভাঙার অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভাঙ্গার অপরাধ। ঐ নাগরিক তাবরিজ আনসারিকে নাগরিক অধিকার বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, এর শপথ নিয়েছিলেন তিনি। অথচ তাবরিজের হত্যায় তিনি নিজের অপরাধ কী তা দেখতেই পাচ্ছেন না। মনে করছেন, লিঞ্চিংকারীরা কেবল একটা কথিত পেটি ক্রিমিনাল অপরাধ। খোদ সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার অপরাধ এগুলো আমল করতেও কিছু যোগ্যতা লাগে মোদীর সেটা নাই।

তামাশার দিকটি হল ভারতের নাগরিকও সচেতন নয়, এক হিন্দুত্বের ছায়া তলে সব হারিয়ে গিয়েছে। হয়ত ভাবছে হিন্দু নাগরিকের জন্য এটা কোন সমস্যাই না। অথচ তারা জানেই না যে নাগরিকদের মধ্যে কোনো নাগরিক অধিকার বৈষম্য না করা প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে গঠন করা হয়েছিল ভারত রাষ্ট্র। রাষ্ট্র-সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার কাজ করে ফেলে – এতে নাগরিক সকলেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। রাষ্ট্র বারবার গড়ার জিনিষ না, চাইলেই নতুন আর একটা গড়া যায় না। আর মৌলিক ভিত্তিমূলক বিষয়গুলোতে নাগরিকদের মধ্যে চিন্তার ঐক্য থাকতে হয়। এর উপর আছে – এক কথায় বলতে রাষ্ট্র কেমনে, কী দেখে চিনতে হয়? প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা এর রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য এসব কথার মানেই বা কী? কী এর মর্ম ও তাতপর্য? তা খায় না মাথায় দেয়? কেমনে তা চেনা যায়?

এ ব্যাপারটা নেহরু থেকে ইন্দিরা হয়ে একাল, এমনকি অমর্ত্য সেন পর্যন্ত এরা নাগরিক বৈষম্য প্রসঙ্গে জানেন, রাষ্ট্র চিনতে পারেন বা এগুলো আমল করেছেন, এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং যেন সবারই ধারণা হল, “প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র” ধারণাটা এক কথার কথা মাত্র। নেহরুর কাছে যেমন এত বড় ভারত রাষ্ট্রকে একসাথে বেঁধে এক করে ধরে রাখা- সেটা পিটিয়ে-পাটিয়ে ধরে রাখা আর হিন্দুত্ব এই আঠা দিয়ে যুক্ত এককরে ধরে রাখা – এটাই প্রজাতন্ত্র। কারণ, নেহরুর আমলের প্রধান ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ ছিল ভারত এক রাখা। তাই হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র খাড়া করা হচ্ছে কি না, এর চেয়েও তার কাছে গুরুত্বের ছিল যে যদি হিন্দুত্বের ভিত্তিতেই জোরজবরদস্তিতে ভারত এক রাখা সহজ হয়, তবে সেটাই তার স্বপ্নের ভারত – এটাই তার প্রজাতন্ত্র-বুঝের ভারত। তাতে তিনি ঐ প্রাপ্তরাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি ঢেকে আড়াল করতে সেকুলার জামা একটা পড়ে নিবেন।

পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে এসে আবিষ্কার করেন সেকুলারিজমই হল প্রজাতন্ত্র, এটাই নাকি এর আসল বৈশিষ্ট্য। কিন্তু খেয়াল করলেন ভারতের কনস্টিটিউশন ১৯৪৯ সালে পাস হলেও তাতে ভারত সেকুলার কি না, তা লেখা নেই। অর্থাৎ “সেকুলার” শব্দটা লেখা না থাকলেও সে রাষ্ট্র বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র [যেটা প্রকৃত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আসল চিহ্ন] হতে পারে কিনা তা তিনিও জানতেন না। বরং ভাবলেন চান্দিতে সেকুলারিজম লিখে রাখলেই সেটা প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র হয়। এমন ভাবনার পিছনে তার যে তাড়া ছিল তা হল, সেসময় মুসলমানদের হবু বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাকে সমর্থন করতে হবে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্টই মুসলমান – এই হবু বাংলাদেশকে তিনি কেমনে সমর্থন করেন? এর সাফাই তিনি খুজে ফিরছিলেন। তাই বাংলাদেশ নিজেকে চান্দিতে সেকুলার লিখে রাখবে এই শর্তে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন বলে সমর্থন দিলেন। কিন্তু মনের খচখচানি তাঁর রয়েই গেল যে কনষ্টিটিউশনে ভারত সেকুলার তা লেখাই নাই। তাই ১৯৭৬ সালে অধিক ক্ষমতার পাওয়ার কালে সে সময়ে সংশোধনী এনে লেখিয়েছিলেন যে ভারত সেকুলার। তার বুঝে, এটাই হল, প্রজাতন্ত্র ভারতের আসল বৈশিষ্ট্য। আর সেই থেকে ভারতের সেকুলারিস্ট বলে প্রজন্ম প্রজাতন্ত্র কী তা বুঝাবুঝির দায়দায়িত্ব ফেলে রেখে আরামে ঘুমাতে যেতে পেরেছিল। কিন্তু একালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর কেবল এক অমর্ত্য সেনকেই দেখা যাচ্ছিল আপত্তি করছেন এই বলে যে – মোদীর  গন্ধ নাকি ঠিক নেই, কারণ তিনি সেকুলার নন। তাহলে এর মানে কী? অমর্ত্য আসলে কী বলতে চান? যে মোদীর ভারত আর প্রজাতান্ত্রিক নয়? তাই কী? কিন্তু সেটাই বা তিনি বুঝেছেন কী দিয়ে? সেটা কারো জানা নেই। যা সকলের জানা, ভারতের কনষ্টিটিউশনে যোগ করা সেই ইন্দিরার সেকুলারিজম – সেটা তো মোদী কনস্টিটিউশন থেকে ফেলে দেননি। তাতে মোদী বা তার দল বিজেপি সেকুলার না হতে পারেন। তাহলে অমর্ত্য সেনের আপত্তিটা ঠিক কী? অথচ মোদী রাষ্ট্রের ফান্ডামেন্টাল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী প্রধানমন্ত্রী।

এ জন্য এবারের পাবলিক নুইসেন্স তৈরি করা বা মেজরিটারিয়ান-ইজমে লক্ষণীয় হল, মোদী বা তার দলের সব নেতা এবার পুরোপুরি নিশ্চুপ। প্রধানমন্ত্রী নিজেও যেন লিঞ্চিংয়ের ঘটনা দেখেননি, জানেনই না, মিডিয়াতেও শোনেননি এমন ঘটনা। এছাড়া আইন তো আছেই যা করার পারবে, করবে। প্রধানমন্ত্রীর কী? মনোভাবটা এ রকম। আর নিজ দলকে বলা এই ফাঁকে যা পারিস অত্যাচার নুইসেন্স করে নে! আমরা আরও বড় মেজরিটারিয়ান-ইজম করতে যাচ্ছি।

আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, এই আদালতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’ [PIL, Public Interest Litigation] অর্থাৎ আদালতে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা হতে পারে, নেয়াও হয়। আইনি ক্যাচকাচালির শব্দটা অর্থ ভেঙ্গে বললে, অধিকার লঙ্ঘনের রীট মামলা করতে গেলে মামলাকারি নিজেই সংক্ষুব্ধ (ক্ষতিগ্রস্থ) তা হতে হয়। তা না হলে আদালত মামলাটাই নিতে চায় না। এই বাধাটা আদালতের তুলে নেয়া উচিত অন্তত সেসব মামলার ক্ষেত্রে যেখানে পাবলিক মানে সবার স্বার্থ জড়িত, তাই আলাদ করে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি খুজে বেড়ানোর দরকার নাই। মানে জনস্বার্থের ঘটনা এটা এজন্য। এই তর্কে আদালত একমত হয়েছিল। তাই “জনস্বার্থের মামলা” এই ক্যাটাগরিটাই আইনি ভাষায় [PIL] মামলা বলা হয়। এতে আদালত নিজেই বা সংক্ষুব্ধ বলে যে কেঊ আদালতে মামলার বাদি হতে পারে। তবে বাংলাদেশে “জনস্বার্থের মামলা” এটা প্রধানত দলবাজিতে চলে থাকে, বিপরীতে ভারতে এটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই চর্চায় প্রতিষ্ঠিত। তাই সরকারি দলের সাথে লিঙ্ক না থাকলেও বাদীর সে মামলা নেয়া হয়। পাবলিক লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধে দিল্লির জামে মসজিদের ইমাম প্রতিবাদ বিবৃতিতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে নীরব দর্শক হয়ে থাকার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন [Centre mute spectator to mob lynching incidents: Jama Masjid’s Shahi Imam]। সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ বিবৃতি এটাই। কারণ তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যে মোদীর সরকার অভিযুক্ত করেছেন দুই কারণে। এক,  নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে অথচ মোদী সরকার নির্বিকার। দুই তিনি নাগরিককে বৈষ্ম্যের হাত থেকে রক্ষা করবেন প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, অথচ সেই প্রতিশ্রুতি তিনি ভেঙ্গেছেন। তাঁর অভিযুক্ত করা বক্তবে কঠিন সত্যিগুলো এরকমঃ  “You gave a promise of treating 125 crore Indians with equality, irrespective of their religion and ethnicity… but unfortunately, the ground reality is not only contrary to this, but is a cause of concern for every civilised Indian citizen,”। এই ইমামের বক্তব্য থেকে মোদী চাইলে শিক্ষা নিতে পারেন।

অথচ আদালত তাও নির্বিকার। যেন তারাও দেখেনি কিছু, জানে না। তাদের কিছু করার নেই। অথচ সোজাসাপ্টা অধিকারে বৈষম্য চলছে। মুসলমান নাগরিক বলে কাউকে দেখলেই এক হিন্দু নাগরিক মনে করছেন, তার নিজ পছন্দের শ্লোগান “জয় শ্রীরাম” বলাতে তিনি ওই মুসলমান নাগরিককে বাধ্য করতে পারেন। কারণ, যে অধিকার বৈষম্য আছে এতে তার অবস্থান তো উপরে; মেজরিটারিয়ান-ইজম তাঁকে উপরে তুলে রেখেছে।

ওদিকে যারা লিটিগেশন মামলার গুরু, সেই প্রশান্ত ভূষণরাও কি তাই ভাবছেন? মেজরিটারিয়ানরা সবাইকে সব ব্যাপারে বাধ্য করতে পারে মনে করছেন? এতে এই যে নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে, এই বৈষম্য করার কারণে ভারত ভেঙে যেতে পারে! এটা কী তারা বুঝতে পারছেন? তারা বুঝতে পারছেন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সবাই নিশ্চুপ। নাকি তারা মনে করছেন,  মেজরিটারিয়ানরা এই বাধ্য করার কাজ, এ কাজটা এতই সঠিক মনে করছে যে প্রশান্ত ভূষণ বা যে কেউ এমন অধিকার বৈষম্য এর বিরুদ্ধে অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে অভিযোগকারী প্রশান্ত ভুষণেরা নিজেরাও লিঞ্চিংয়ের শিকার হতে পারেন? ব্যাপারটা কি এমন ভয়ের? সেটাও জানা যাচ্ছে না।

এমনকি বিচারকেরা? তারাও কি ভয়ে সিটিয়ে গেছেন? নাকি সবাই হিন্দুত্বের মহিমা দেখে আপ্লুত ও বুঁদ হয়ে গেছেন?

মনার্কি [monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে প্রজাতন্ত্র ধারণা – এদুইয়ের মধ্যে এক প্রধান ফারাক হল, ক্ষমতা প্রসঙ্গে। প্রজাতন্ত্রে – এখানে শাসককে শাসন ক্ষমতা কে দিয়েছে, কোথা থেকে আনা হয়েছে এর হদিস লুকানো নয়। নাগরিক নিজেই গণসম্মতিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করে শাসককে শাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছে। শাসকের ক্ষমতার উৎস তাই নাগরিকদের কাছ থেকে ডেলিগেটেড পাওয়া ক্ষমতা। বিপরীতে মনার্কিতে তাঁর ক্ষমতার উতস জানা নাই, বলতে পারবে না; যেটা আসলে গায়ের জোর জবরদস্তি।
এ ছাড়া, প্রজাতন্ত্রের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, তালিকা করে রাখা নাগরিক মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো রক্ষা করতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর, অধিকারগুলো নাগরিককে অবাধে ভোগ করতে দেয়ার নিশ্চতাবিধান আর নাগরিকের মধ্যে কোনো বৈষম্য না করে অথবা আর কাউকে তা করতে না দিয়ে এসব কাজ বাস্তবায়ন করবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই শাসক শাসনক্ষমতা পায়। এটাই মুখ্য শর্ত।

শাসক এর ব্যত্যয় ঘটালে বুঝতে হবে রাষ্ট্র গঠনকালীন দেয়া শর্ত প্রতিশ্রুতি আর নেই, পালন করছে না। রাষ্ট্র ক্রমেই এখন দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়বে।
তাই সেকুলারিজম বলে কোনো আলগা, অবুঝ না-বুঝ কথা নয়, বরং নাগরিক বৈষম্যহীনতা বজায় রাখা, রক্ষা করা, কাউকে করতে না দেয়া এটাই ফান্ডামেন্টাল। তবে ভারতের কনষ্টিটিউশনে যে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা রক্ষার কথা নেই, তা নয়। কিন্তু এর গুরুত্ব রাজনৈতিকভাবে সমাজের রাজনীতিতে তা হাজির নেই, দেখাই যাচ্ছে। তাই বাস্তবত, “খামাখা”  হয়ে আছে শব্দটা। আর হিন্দু কোনো নাগরিক মনে করছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে অন্যের ওপর নাগরিক বৈষম্য করতেই পারে। মুসলমানদের “জয় শ্রীরাম” বলাতেই পারে, বাধ্য করতে পারে। মানে মেজরিটারিয়ান-ইজম!

অথচ রাজনীতিবিদদের হওয়া দরকার ছিল – কেন নাগরিক বৈষম্যহীনতার নীতি অনুসরণ করা নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি হয়- এটা বুঝে নেয়া। আর কেন এটা রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক ভিত্তি, কেন মৌলিক তা-ও নিজে বোঝা ও সব ধরনের নাগরিককেই সেটা বোঝানো। সেই আলোকে, আবার ওদিকে আদালতের উচিত হত নাগরিক অধিকার বাস্তবয়ায়নে বৈষম্যকারীদের সরকার বা কোন দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া। এমনকি নির্বাচন কমিশনের নিজের উচিত হত, দল বিজেপির বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; শর্ত আরোপ করা, যে অবিলম্বে নাগরিক বৈষম্যমূলক রাজনীতির চর্চা বন্ধ না করলে দলের রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ দলের নেতাদের  বিরুদ্ধে আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

অথচ এখানে হচ্ছে পুরো উল্টা। হিন্দুত্বের প্রধানমন্ত্রী নিজেই নাগরিক বৈষম্য ঘটাচ্ছেন। যার রক্ষা করা ছিল দায়িত্ব, তিনিই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী। তিনিই আসলে মেজরিটারিয়ান-ইজম এর মূল নেতা। আর ওদিকে আদালত বা নির্বাচন কমিশন- এরা নিষ্ক্রিয়। এমনকি এক ধরনের হিন্দুত্ববাদী জনগোষ্ঠি তারাও বেপরোয়া। যেমন বিজেপির এক হিন্দু নারীনেত্রী প্রকাশ্যে লিখে মুসলমান নারীদের গণধর্ষণ করার জন্য হিন্দু পুরুষদের আহ্বান রেখেছেন। আর বিজেপি বড়জোর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে দায় শেষ করছে। কোনো ক্রিমিনাল চার্জ আনেনি। কেউ কী কাউকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করার আহবান রাখতে পারে? আর তাতে কোন ক্রিমিনাল মামলা হয় না?

এসব দিকগুলো তুলে ধরে আমরা অনেকবার বলছি, ভারত রাষ্ট্রটা জন্ম থেকেই গড়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে। কংগ্রেস দল জন্ম থেকেই মূলত এই কাণ্ডের হোতা। বিজেপির সাথে তার ফারাক এতটুকুই যে, বিজেপি হিন্দুত্বের ভিত্তির কথা না লুকিয়েই প্রকাশ্যেই বলতে চায়, এটাই তার রাজনীতির ভিত্তি, আর এটাই খোলাখুলি চর্চা করতে চায় সে। আর কংগ্রেস মনে করে হিন্দুত্ব পরিচয়কে সেকুলার নামে জামার নিচে লুকিয়ে রেখে হিন্দুত্ব দিয়ে চলতে হবে।

এই বিষয়টাই এখন একেবারেই উদাম হয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদী এবার ভোট পেতে ভারত-নেপাল সীমান্তে পাহাড়ের উপর তীর্থস্থানে কেদারনাথের মন্দিরে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন। আর তাতে কংগ্রেস মিডিয়াতে এসে বলেছিল, এখানে তাদের নেতা রাহুলই শ্রেষ্ঠ। কারণ মোদি ওই পাহাড়ে গেছেন হেলিকপ্টারে চড়ে আর আমাদের নেতা গেছেন শেষ মাইলখানেক হেঁটে। মানে মোদির সাথে কে কত বড় হিন্দুত্বের জিগির তুলে রাজনীতি করতে পারে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে এখন ‘সেকুলার’ কংগ্রেস। এমনকি গত নির্বাচনী প্রচারণা রাহুল তা শুরুই করেছিলেন মোদির সাথে প্রতিযোগিতা করে অসংখ্য মন্দির দর্শন করেছেন দেখিয়ে। আর কংগ্রেস এখন তো সরাসরি বলছে, তারাও হিন্দুত্বই করছে। তবে মোদিরটা হার্ড হিন্দুত্ব আর তাদেরটা নাকি, সফট হিন্দুত্ব।

সর্বশেষ ঘটনা আরো মারাত্মক। রাহুলের মা কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া আবার দলের হাল ধরেছে্‌ নীতি ঠিক করছেন। তার দলের সংসদীয় (মূলত তাঁর অধস্তন) নেতা এবার বানিয়েছেন পশ্চিম বাংলার বহরমপুরের এমপি অধীর চৌধুরীকে। ্নির্বাচনের পরে সোনিয়ার নতুন নীতি হল, তিনিও এখন থেকে হিন্দুত্বের রাজনীতিই করবেন, বিজেপির থেকে ভাগ দাবি করবেন বা কেড়ে নেবেন। কিভাবে?

একথা এখন সব পক্ষের কাছেই সুপ্রতিষ্ঠিত যে, মুসলমানবিদ্বেষই গত নির্বাচনে এককভাবেই এক মূল উপাদান ছিল। প্রধান প্রভাবশালী নির্বাচনি ইস্যু ছিল। মোদি এটাই ব্যবহার করে সফলভাবে জিতেছেন। মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ, আর তাই পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিতে পারার বোলচাল- ভারতের এই রাজনীতি, আর এর সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাত দেখানো আর সেখানে বিজেপিই একমাত্র হিন্দুস্বার্থের দল সেভাবে নিজেদের তুলে ধরা। বিজেপির সাফল্য এখানেই। তাতে পাকিস্তানের সাথে এখনই ভারতের কোন সঙ্ঘাতের ইস্যু থাক আর না-ই থাক। জলজ্যান্ত এই হিন্দুত্বকে ভারতের মিডিয়াগুলো এ বিষয়টিকে খুবই ভদ্রভাবে প্রলেপ দিয়ে বলছে, ভারতের জনগণের কাছে এটা নাকি “নিরাপত্তা” ইস্যু। মানে এটা ইসলামবিদ্বেষ না। জনগণের নিরাপত্তা বোধ। যা একমাত্র মোদীর বিজেপিই [মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ ঘটিয়ে] নিরাপত্তা বোধে স্বস্তি আনতে পারে। তাই জনগণ, মোদির আমলে চাকরি না পেলেও নিরাপত্তার ভয়ে কাবু হয়ে থাকা মানুষ – মুসলমানদের মাথায় বোমা মেরে আসা মোদিকেই ভোট দিয়েছে।

সোনিয়াও এখন এই বয়ানটাকেই আমল করেছেন, মানে ব্যবহার করতে চান। তাই সোনিয়ার নীতিতে অধীর চৌধুরি পার্লামেন্টে এক জ্বালাময়ী হিন্দুত্ব বক্তৃতা দিয়েছেন। পাঠকের নিশ্চয় পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বোমা ফেলতে গিয়ে সেই ভারতীয় পাইলটের কথা মনে আছে যে নিজের বিমান বিধ্বস্থ হবার পর ধরা পড়েছিল। পরে পাকিস্তান সৌজন্য দেখিয়ে তাকে ভারত ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। “অভিনন্দন” নামের সেই পাইলট যার নিজের বিশাল আকৃতির মোচ আছে, এটাই তাঁর প্রতীক। সেকারণে অধীর ঐ বক্তৃতায় দাবি করেছেন, এখন থেকে ঐ গোঁফকে “জাতীয় গোঁফ” ঘোষণা করতে হবে। [“উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের গোঁফকে ‘জাতীয় গোঁফ’ ঘোষণা করা হোক।” ] আবার এতে তামাশার দিকটা হল, আনন্দবাজার এই ব্যাপারটাকে দেখছে কংগ্রেসের সোনিয়ার জাতীয়তাবাদে ফেরা হিসাবে। তাই আনন্দবাজারের খবর শিরোনাম হল, “সনিয়ার নির্দেশ, জাতীয়তাবাদে ফিরছে কংগ্রেস”। একোন জাতীয়তাবাদ? এটা তো সোজাসাপ্টা হিন্দুত্ব। অথচ সেটা আড়াল করতে এটাকে শুধু জাতীয়তাবাদে ফেরা বলে সাফাই টেনে দিচ্ছে। মানে বিজেপি আর কংগ্রেস দুটোই এখন নিজেরাই স্বীকার করছে যে তারা হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দল।  হিন্দুত্বের রাজনীতি সত্যি বড়ই সুস্বাদু আর তামাশার!

এমনকি ট্রাম্পের আমেরিকার পক্ষেও মোদীর মেজরিটারিয়ান-ইজম! কে সহ্য করা সহ্য হচ্ছে না। সারা দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা কোথায় ব্যহত হয়েছে এর একটা তালিকা প্রতিবছর আমেরিকা বের করে। এখানে বলাই বাহুল্য আমেরিকা ইউরোপের চোখে সেকুলারিজম বুঝে না। আমেরিকা মনে মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকতে হবে। আর তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। তাই এই রিপোর্ট যে কোন রাষ্ট্র এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যার্থ হয়েছে। স্বভাবতই এই তালিকায় ভারত অনেক বড় স্থান জুড়ে আছে। তাই আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট মানে এর মন্ত্রী/ উপদেষ্টা মাইক পম্পেই কঠোরভাবে ভারতে ধর্মপালনের স্বাধীনতা না থাকার অভিযোগ এনেছে। সেটা গা থেকে ছেড়ে ফেলে মোদী বলেছেন এটা ভারতের রাজনীতিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও পক্ষপাতিত্ব।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) হিন্দুত্বের পাবলিক লিঞ্চিং এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]