হিন্দুত্বের মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

হিন্দুত্বের  মেজরিটারিয়ান-ইজম, রুল-রাষ্ট্র বলে কিছু নাই

গৌতম দাস

০৮ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Co

 

Protests: Stop making HINDUSTAN into LYNCHISTAN – REUTERS

নির্বাচনে আবার জিতবার পরে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয়েছে, গত ৩০ মে ২০১৯। সেই সাথে ভারত এখন হিন্দুত্বের রাজনীতিতে সয়লাব, সরকার আর প্রধান বিরোধী দল এ’দুই দলই এখন হিন্দুত্বের রাজনীতি নিয়ে – কে হিন্দুত্বের বেশি ফয়দা তুলতে পারে – সেই কাড়াকাড়ি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমে গেছে। সে হিসাবে হিন্দুত্বই এখন প্রধান রাজনৈতিক ধারা, কংগ্রেস ও বিজেপি যেখানে উভয়েই হাজির।

মানুষের প্রত্যেক সমাজেরই কিছু সামাজিকভাবে নির্ধারিত পালনীয় আচার-আচরণ থাকে। জবরদস্তিতে সেটা অমান্য করা যেমন, কেউ চাইল যে সামাজিক নর্মসের সে বিরুদ্ধে যাবে, সে রাস্তায় উলঙ্গ হয়ে হাঁটবে – বলাই বাহুল্য এটা এক ধরনের সামাজিক অসভ্যতা, পাবলিক বিড়ম্বনা বা “উপদ্রব ঘটানো” – এ বিষয়টিকেই ইংরেজিতে ‘নুইসেন্স’ [Public Nuisance] বলে। মোদীর প্রথম পাঁচ বছর কেটেছে হিন্দুত্বের নামে এমন অসংখ্য পাবলিক নুইসেন্স ঘটিয়ে। অথবা বলা যায় এই অর্থে  বিজেপি/আরএসএস হল “অসামাজিক” – এন্টি-সোশ্যাল দল। যারা পাবলিক নুইসেন্স কত রকমভাবে ঘটানো যায় তা করে দেখানোর দল।  আর সেই সাথে এটা এমন একটা দলের সরকার যার কাজ হল, এমন নুইসেন্স যেন বাধাহীনভাবে সমাজে ঘটতে পারে, তাতে সহায়তা করা। তাই মোদীর কাজ ছিল এবং এখন করছে যা এধরণের কাজকে প্ররোচিত করছে আর, প্রশ্রয় দিয়ে আগলে রাখছে। তবে গত পাঁচ বছরে এসব কাণ্ডের শীর্ষে ছিল গরুপূজা-কেন্দ্রিক অথবা ঘর-ওয়াপসি প্রোগ্রাম। মানে হল, মুসলমানসহ অন্য অহিন্দু ধর্মাবলম্বীদের হিন্দুধর্মে জবরদস্তিতে ফিরতে হবে বলে রাস্তায় দল বেধে জবরদস্তি করা, অপমান, বেইজ্জতি, হয়রানি করা, এজন্য আহত, রক্তাক্ত বা খুনই করে ফেলা বা করার ভয় দেখানো – এভাবে  নুইসেন্স তৈরি করা। আর পরবর্তীকালে গরুপূজা-কেন্দ্রিক “গোরক্ষক আন্দোলন” হয়ে উঠেছিল আরও ভয়ঙ্কর।

গরু নিয়ে চলাচলকারী ব্যবসায়ী, গরু-পালনকারী বা কৃষিজীবীকে আক্রমণ অথবা গরুর গোশত পাওয়া গেছে মাঠে অথবা বাসায় এই অজুহাতে মুসলমান ব্যক্তি বা পরিবারের ওপর আক্রমণ – এই ছিল এর সাধারণ লক্ষণ। এসবকিছুর উপরে আইনি বাধা তৈ করতে একটা আইন পাস করাও হয়েছিল। কিন্তু সুপ্রীম কোর্টের সামনে জবাব্দীহীতায় টিকতে না করে আইনটাই প্রত্যাহার করে নেই মোদী সরকার। তো এই কাজে ‘গোরক্ষক দল’ গঠন করে নজরদারির নামে পাবলিক লাইফে নুইসেন্স তৈরি করতে বিভিন্ন রাস্তা পাহারা দেয়া। আর বিজেপি-আরএসএসের নামে-বেনামের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন থেকে লোক নিয়ে গঠিত হত এসব গোরক্ষক দল। এভাবে প্রকাশ্য সরকারি সহায়তায় বাধাহীনভাবে চলত এসব ইসলামবিদ্বেষী হত্যা নিপীড়ন ও পাবলিক নুইসেন্স। এদের তৎপরতায় নৃশংসতা বর্ণনা করতে আর একটা শব্দ আছে “পাবলিক লিঞ্চিং” [Public Lynching]। ইংরেজি এই শব্দের মানে হল, বিজেপি/আরএসএসের কর্মিদের নিয়ে গঠিত গোরক্ষক বা ভিজিলেন্স ধরনের দলের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে পাবলিক উন্মাদনা এই অজুহাত তৈরি করে বা উন্মাদনা বলে চালিয়ে দিতে – এসব নিজ দলের কর্মিদের ইসলামবিদ্বেষী  নিপীড়ন হত্যাকান্ডগুলো। যেন মনে হয় কোন কথিত ইস্যুতে মুসলমান নাগরিককে গণপিটুনিতে আহত রক্তাক্ত বা হত্যা করা হয়েছে। লিঞ্চিং মানে গণ-উন্মাদনার নামে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে কাউকে রক্তাক্ত করা বা মৃত্যু ঘটানো। কিন্তু এককথায় বললে, এগুলো ছিল ধর্মীয় আক্রমণ। কেউ মুসলমান হলেই তাকে রাস্তায় দল বেধে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা বা তাতে মৃত্যু ঘটানো, দলীয় কর্মিরা এমনই বেপরোয়া আর আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার বিজেপি/আরএসএসের প্রকাশ্য দলীয় কর্মসুচি।

মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের নতুন যোগ করে শুরু হয়েছে আরেক অজুহাতে ‘পাবলিক লিঞ্চিং’। অজুহাত বা ঘটনা অনুষঙ্গ মানে কেন কিভাবে ঘটানো হয়, তা হলো কোন বাসে, ট্রেনে বা রাস্তায় মানে পাবলিক স্পেসে প্রকাশ্যে কোন মুসলমান নাগরিককে ধরে তাকে “জয় শ্রীরাম” বলতে বাধ্য হয়। একাজে ধরেই চর-থাপ্পর মেরে জোর করে নির্যাতন করেই চলা হয় যাতে সে প্রাণ বাঁচাতে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য হয়, আর না করলে খুঁচিয়ে-পিটিয়ে রক্তাক্ত করা হামলায় এর তীব্রতায় সে মারাও যেতে পারে। প্রত্যেক সপ্তাহেই এমন দু-তিনটি ঘটনা ভারতজুড়ে ঘটতে দেখা যাচ্ছে, গত মে মাসে নির্বাচনে মোদির শাসনের দ্বিতীয় পর্যায়ের শুরু থেকেই।

এককথায় বললে, কীসের রাষ্ট্র, কীসের আইন, নিয়ম শৃঙ্খলা, – প্রজাতন্ত্র পার্লামেন্ট ইত্যাদি; ভারতে এমন কোন কিছু এখন নাই। ভারতে রাষ্ট্র, সমাজ, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট সব মারা গেছে।  আছে কেবল এক ধর্মীয় রাজত্ম। আপনি হিন্দু ধর্মের লোক, তাই আপনি মেজরিটারিয়ান [Majoritarian]। তাই আপনি মুসলমানদের উপরে যাখুশি করতে পারেন। যা বলবেন তাই হবে! তাতে ভারতের রাষ্ট্রপতি, সরকার, কনষ্টিটিউশন, আইন, আদালত, নির্বাচন কমিশন, পার্লামেন্ট আপনাকে কিছুই বলবে না। বরং প্রটেকশন দিবে। এই হল রুল অব দা ডে! এখনকার রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া।

আইনি দিক থেকে পাবলিক নুইসেন্স ঘটানো মানে অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা এক ক্রিমিনাল অপরাধ; পেনাল কোড ২৬৩, ২৯০, ২৯১ ধারায় পাবলিক লিঞ্চিং করা অপরাধ। তবে পাবলিক লিঞ্চিং করতে গিয়ে হতে পারে বড় অপরাধ- হত্যা করা, হত্যার উদ্দেশ্যে আহত করা ইত্যাদি; যা মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো অপরাধ। এ ছাড়া পাবলিক অর্ডার নষ্ট করা, গণ-উন্মাদনা তৈরি করা সেসব অপরাধের খতিয়ান তো আছেই।

তবে এ ছাড়াও এখানে সবচেয়ে বড় অপরাধ ঘটায় শাসক সরকার, যেটা আসলে রাজনৈতিক ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলা, রাষ্ট্র একটা খামোখা – বানিয়ে ফেলা । মূল কারণ মোদী এন্ড গং আপনি এখানে পরিকল্পিত ভাবে ভারতে হিন্দুদের মেজরিটারিয়ান-ইজম চালু করেছেন। “জয় শ্রীরাম” হল হিন্দুদের মহান শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশকারি শ্লোগান। তাই আপনি মুসলমান, মানে আপনি হিন্দু নন বলেই আপনি আমার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়েছেন কিনা  তা পরখ করতেই এই ন্যুইসেন্স মেজরিটারিয়ান-ইজম আপনার উপর করবে। এটা ‘নাগরিক বৈষম্য’ করা হচ্ছে কিনা, তা ঠেকানোর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া প্রধানমন্ত্রীর কাজ কিনা সেসব পাশে ফেলায় রাখেন, উদাসীন থাকতে দেন। নির্লিপ্ত থেকে রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা ও পাবলিক অর্ডার ভেঙে পড়া হতে দেন ও সাহায্য করেন। অসুবিধা কী? আমি মোদী আর আমাদের হিন্দুত্ব আছে – আছে আমাদের মেজরিটারিয়ান-ইজম । কমকথায় এই হল এখনকার ভারত, তার মেজরিটারিয়ান-ইজম এর সাফাই।

একটা মডার্ন রিপাবলিক সেসব মৌলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে তা রাষ্ট্র বলে নিজেকে দাবি করতে পারে, এর এক নম্বর পয়েন্ট হল নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা বজায় রাখার কর্তব্য পালন করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রের চোখে নাগরিক মাত্রই সবাই সমান, সমান অধিকারের এমন হতে হয়। তাতে সে কোন ধর্মের নাগরিক, কোন গায়ের রঙের, পুরুষ না নারী, পাহাড়ি না সমতলী ইত্যাদি বিভেদ নির্বিশেষে সবাই রাষ্ট্রের সমান অধিকারের এমন হতে হয়। আর তা রক্ষা মানে নাগরিকের সম-অধিকার রক্ষা, কোনো নাগরিক যাতে অধিকার বৈষম্যের শিকার না হয়, সেটা রক্ষা ও বজায় রাখা ইত্যাদি হলো সরকারের মুখ্য কাজ। এখানে ব্যর্থ হওয়ারও সুযোগ নেই। হলে এটাই নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও কনস্টিটিউশন ভঙ্গের অপরাধ। এই ব্যর্থতার অর্থ হলো, রাষ্ট্রের অনস্তিত্ব; রাষ্ট্রের আর থাকা না থাকায় কিছু যায় আসে না বা খামাখা হয়ে যাওয়া। কিন্তু মোদী বলতে চাচ্ছেন এগুলো তত্বকথা ফেলায় রাখেন। মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই শেষ কথা।

নাগরিককে বৈষম্যহীনভাবে সুরক্ষার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল সরকার তা পালনে অপারগ বলে জানিয়ে দেয়া বা জেনে যাওয়া। ঝাড়খণ্ডের ঘটনায় তাবরিজ আনসারিকে লিঞ্চিং করে হত্যা করে হয়েছে। হত্যাকারীদের দাবি ছিল তাবরিজকে ভারতে থাকতে হলে ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে হবে। এমন শর্ত দেয়ার ক্ষেত্রে তারা কে, এই হত্যাকারীদের কি অধিকার আছে এই দাবি করার- তা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এটা যে চরমতম নাগরিক বৈষম্য সৃষ্টির একটা কাজ তা নিয়ে কারো সচেতনতা আছে মনে হয়নি। এমনকি ভারতের পার্লামেন্টে হায়দরাবাদ ও বোম্বাইয়ের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত মুসলমান এমপি ওয়াসি [Asaduddin Owaisi] তার শপথের অনুষ্ঠানে, সেখানে তাকেও ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে চাপ দিতে বিজেপি এমপিরা জয় শ্রীরাম বলে গগনবিদারী চিৎকার করছিল। অর্থাৎ পার্লামেন্টেও বিজেপি এমপিদের ধারণা তারা অন্য এমপির ওপর এমন বাড়তি ক্ষমতাপ্রাপ্ত যে, তারা ওয়াসিকে জয় শ্রীরাম বলতে বাধ্য করতে পারে। বিজেপি এমপিরা বাড়তি অধিকারপ্রাপ্ত (মেজরিটারিয়ান) এটাই বলতে চাচ্ছে, মোদির বিজেপি দলের এমপিরা। তাই তাদেরই রুল মেজরিটারিয়ান-ইজম – এটাই সবকিছু।

ওই দিকে এসব নিয়ে মোদীর প্রতিক্রিয়া আরো মারাত্মক। পার্লামেন্টে তিনি বিরোধী দলের কথা বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে বলছেন, “ঝাড়খণ্ডকে লিঞ্চিংয়ের কেন্দ্র” বা হাব বলা নাকি খুবই বেইনসাফি হবে [Unfair to call Jharkhand a hub of lynching: Narendra Modi]। কারণ তিনি বলতে চাছেন, লিঞ্চিংয়ে যারা মামলা খেয়েছে তাদের বিচার তো আদালতে হচ্ছেই। মোদীর ইনসাফবোধ এখানে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। আসলে কখনো কখনো ক্রিমিনাল অপরাধের চেয়ে বড় আর মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে রাজনৈতিক বা কনস্টিটিউশনাল প্রতিশ্রুতি ভাঙার অপরাধ। খোদ রাষ্ট্র ভাঙ্গার অপরাধ। ঐ নাগরিক তাবরিজ আনসারিকে নাগরিক অধিকার বৈষম্যের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন, এর শপথ নিয়েছিলেন তিনি। অথচ তাবরিজের হত্যায় তিনি নিজের অপরাধ কী তা দেখতেই পাচ্ছেন না। মনে করছেন, লিঞ্চিংকারীরা কেবল একটা কথিত পেটি ক্রিমিনাল অপরাধ। খোদ সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার অপরাধ এগুলো আমল করতেও কিছু যোগ্যতা লাগে মোদীর সেটা নাই।

তামাশার দিকটি হল ভারতের নাগরিকও সচেতন নয়, এক হিন্দুত্বের ছায়া তলে সব হারিয়ে গিয়েছে। হয়ত ভাবছে হিন্দু নাগরিকের জন্য এটা কোন সমস্যাই না। অথচ তারা জানেই না যে নাগরিকদের মধ্যে কোনো নাগরিক অধিকার বৈষম্য না করা প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে গঠন করা হয়েছিল ভারত রাষ্ট্র। রাষ্ট্র-সরকার প্রধানের অপরাধ ও ব্যর্থতা অথবা রাষ্ট্র ভেঙ্গে ফেলার কাজ করে ফেলে – এতে নাগরিক সকলেই মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হবেন। রাষ্ট্র বারবার গড়ার জিনিষ না, চাইলেই নতুন আর একটা গড়া যায় না। আর মৌলিক ভিত্তিমূলক বিষয়গুলোতে নাগরিকদের মধ্যে চিন্তার ঐক্য থাকতে হয়। এর উপর আছে – এক কথায় বলতে রাষ্ট্র কেমনে, কী দেখে চিনতে হয়? প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র বা এর রিপাবলিক বৈশিষ্ট্য এসব কথার মানেই বা কী? কী এর মর্ম ও তাতপর্য? তা খায় না মাথায় দেয়? কেমনে তা চেনা যায়?

এ ব্যাপারটা নেহরু থেকে ইন্দিরা হয়ে একাল, এমনকি অমর্ত্য সেন পর্যন্ত এরা নাগরিক বৈষম্য প্রসঙ্গে জানেন, রাষ্ট্র চিনতে পারেন বা এগুলো আমল করেছেন, এর প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং যেন সবারই ধারণা হল, “প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র” ধারণাটা এক কথার কথা মাত্র। নেহরুর কাছে যেমন এত বড় ভারত রাষ্ট্রকে একসাথে বেঁধে এক করে ধরে রাখা- সেটা পিটিয়ে-পাটিয়ে ধরে রাখা আর হিন্দুত্ব এই আঠা দিয়ে যুক্ত এককরে ধরে রাখা – এটাই প্রজাতন্ত্র। কারণ, নেহরুর আমলের প্রধান ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ ছিল ভারত এক রাখা। তাই হিন্দুত্বের ভিত্তিতে ভারত রাষ্ট্র খাড়া করা হচ্ছে কি না, এর চেয়েও তার কাছে গুরুত্বের ছিল যে যদি হিন্দুত্বের ভিত্তিতেই জোরজবরদস্তিতে ভারত এক রাখা সহজ হয়, তবে সেটাই তার স্বপ্নের ভারত – এটাই তার প্রজাতন্ত্র-বুঝের ভারত। তাতে তিনি ঐ প্রাপ্তরাষ্ট্রের হিন্দুত্বের ভিত্তি ঢেকে আড়াল করতে সেকুলার জামা একটা পড়ে নিবেন।

পরে ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭১ সালে এসে আবিষ্কার করেন সেকুলারিজমই হল প্রজাতন্ত্র, এটাই নাকি এর আসল বৈশিষ্ট্য। কিন্তু খেয়াল করলেন ভারতের কনস্টিটিউশন ১৯৪৯ সালে পাস হলেও তাতে ভারত সেকুলার কি না, তা লেখা নেই। অর্থাৎ “সেকুলার” শব্দটা লেখা না থাকলেও সে রাষ্ট্র বৈষম্যহীন নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র [যেটা প্রকৃত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আসল চিহ্ন] হতে পারে কিনা তা তিনিও জানতেন না। বরং ভাবলেন চান্দিতে সেকুলারিজম লিখে রাখলেই সেটা প্রজাতন্ত্র রাষ্ট্র হয়। এমন ভাবনার পিছনে তার যে তাড়া ছিল তা হল, সেসময় মুসলমানদের হবু বাংলাদেশের স্বাধীনতা তাকে সমর্থন করতে হবে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্টই মুসলমান – এই হবু বাংলাদেশকে তিনি কেমনে সমর্থন করেন? এর সাফাই তিনি খুজে ফিরছিলেন। তাই বাংলাদেশ নিজেকে চান্দিতে সেকুলার লিখে রাখবে এই শর্তে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন বলে সমর্থন দিলেন। কিন্তু মনের খচখচানি তাঁর রয়েই গেল যে কনষ্টিটিউশনে ভারত সেকুলার তা লেখাই নাই। তাই ১৯৭৬ সালে অধিক ক্ষমতার পাওয়ার কালে সে সময়ে সংশোধনী এনে লেখিয়েছিলেন যে ভারত সেকুলার। তার বুঝে, এটাই হল, প্রজাতন্ত্র ভারতের আসল বৈশিষ্ট্য। আর সেই থেকে ভারতের সেকুলারিস্ট বলে প্রজন্ম প্রজাতন্ত্র কী তা বুঝাবুঝির দায়দায়িত্ব ফেলে রেখে আরামে ঘুমাতে যেতে পেরেছিল। কিন্তু একালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর কেবল এক অমর্ত্য সেনকেই দেখা যাচ্ছিল আপত্তি করছেন এই বলে যে – মোদীর  গন্ধ নাকি ঠিক নেই, কারণ তিনি সেকুলার নন। তাহলে এর মানে কী? অমর্ত্য আসলে কী বলতে চান? যে মোদীর ভারত আর প্রজাতান্ত্রিক নয়? তাই কী? কিন্তু সেটাই বা তিনি বুঝেছেন কী দিয়ে? সেটা কারো জানা নেই। যা সকলের জানা, ভারতের কনষ্টিটিউশনে যোগ করা সেই ইন্দিরার সেকুলারিজম – সেটা তো মোদী কনস্টিটিউশন থেকে ফেলে দেননি। তাতে মোদী বা তার দল বিজেপি সেকুলার না হতে পারেন। তাহলে অমর্ত্য সেনের আপত্তিটা ঠিক কী? অথচ মোদী রাষ্ট্রের ফান্ডামেন্টাল প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী প্রধানমন্ত্রী।

এ জন্য এবারের পাবলিক নুইসেন্স তৈরি করা বা মেজরিটারিয়ান-ইজমে লক্ষণীয় হল, মোদী বা তার দলের সব নেতা এবার পুরোপুরি নিশ্চুপ। প্রধানমন্ত্রী নিজেও যেন লিঞ্চিংয়ের ঘটনা দেখেননি, জানেনই না, মিডিয়াতেও শোনেননি এমন ঘটনা। এছাড়া আইন তো আছেই যা করার পারবে, করবে। প্রধানমন্ত্রীর কী? মনোভাবটা এ রকম। আর নিজ দলকে বলা এই ফাঁকে যা পারিস অত্যাচার নুইসেন্স করে নে! আমরা আরও বড় মেজরিটারিয়ান-ইজম করতে যাচ্ছি।

আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট, এই আদালতে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’ [PIL, Public Interest Litigation] অর্থাৎ আদালতে স্বতঃপ্রণোদিত মামলা হতে পারে, নেয়াও হয়। আইনি ক্যাচকাচালির শব্দটা অর্থ ভেঙ্গে বললে, অধিকার লঙ্ঘনের রীট মামলা করতে গেলে মামলাকারি নিজেই সংক্ষুব্ধ (ক্ষতিগ্রস্থ) তা হতে হয়। তা না হলে আদালত মামলাটাই নিতে চায় না। এই বাধাটা আদালতের তুলে নেয়া উচিত অন্তত সেসব মামলার ক্ষেত্রে যেখানে পাবলিক মানে সবার স্বার্থ জড়িত, তাই আলাদ করে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি খুজে বেড়ানোর দরকার নাই। মানে জনস্বার্থের ঘটনা এটা এজন্য। এই তর্কে আদালত একমত হয়েছিল। তাই “জনস্বার্থের মামলা” এই ক্যাটাগরিটাই আইনি ভাষায় [PIL] মামলা বলা হয়। এতে আদালত নিজেই বা সংক্ষুব্ধ বলে যে কেঊ আদালতে মামলার বাদি হতে পারে। তবে বাংলাদেশে “জনস্বার্থের মামলা” এটা প্রধানত দলবাজিতে চলে থাকে, বিপরীতে ভারতে এটা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই চর্চায় প্রতিষ্ঠিত। তাই সরকারি দলের সাথে লিঙ্ক না থাকলেও বাদীর সে মামলা নেয়া হয়। পাবলিক লিঞ্চিংয়ের বিরুদ্ধে দিল্লির জামে মসজিদের ইমাম প্রতিবাদ বিবৃতিতে তিনি কেন্দ্রীয় সরকারকে নীরব দর্শক হয়ে থাকার দায়ে অভিযুক্ত করেছেন [Centre mute spectator to mob lynching incidents: Jama Masjid’s Shahi Imam]। সবচেয়ে তাতপর্যপুর্ণ বিবৃতি এটাই। কারণ তিনিই একমাত্র ব্যক্তিত্ব যে মোদীর সরকার অভিযুক্ত করেছেন দুই কারণে। এক,  নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে অথচ মোদী সরকার নির্বিকার। দুই তিনি নাগরিককে বৈষ্ম্যের হাত থেকে রক্ষা করবেন প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন, অথচ সেই প্রতিশ্রুতি তিনি ভেঙ্গেছেন। তাঁর অভিযুক্ত করা বক্তবে কঠিন সত্যিগুলো এরকমঃ  “You gave a promise of treating 125 crore Indians with equality, irrespective of their religion and ethnicity… but unfortunately, the ground reality is not only contrary to this, but is a cause of concern for every civilised Indian citizen,”। এই ইমামের বক্তব্য থেকে মোদী চাইলে শিক্ষা নিতে পারেন।

অথচ আদালত তাও নির্বিকার। যেন তারাও দেখেনি কিছু, জানে না। তাদের কিছু করার নেই। অথচ সোজাসাপ্টা অধিকারে বৈষম্য চলছে। মুসলমান নাগরিক বলে কাউকে দেখলেই এক হিন্দু নাগরিক মনে করছেন, তার নিজ পছন্দের শ্লোগান “জয় শ্রীরাম” বলাতে তিনি ওই মুসলমান নাগরিককে বাধ্য করতে পারেন। কারণ, যে অধিকার বৈষম্য আছে এতে তার অবস্থান তো উপরে; মেজরিটারিয়ান-ইজম তাঁকে উপরে তুলে রেখেছে।

ওদিকে যারা লিটিগেশন মামলার গুরু, সেই প্রশান্ত ভূষণরাও কি তাই ভাবছেন? মেজরিটারিয়ানরা সবাইকে সব ব্যাপারে বাধ্য করতে পারে মনে করছেন? এতে এই যে নাগরিক বৈষম্য হচ্ছে, এই বৈষম্য করার কারণে ভারত ভেঙে যেতে পারে! এটা কী তারা বুঝতে পারছেন? তারা বুঝতে পারছেন এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সবাই নিশ্চুপ। নাকি তারা মনে করছেন,  মেজরিটারিয়ানরা এই বাধ্য করার কাজ, এ কাজটা এতই সঠিক মনে করছে যে প্রশান্ত ভূষণ বা যে কেউ এমন অধিকার বৈষম্য এর বিরুদ্ধে অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনলে অভিযোগকারী প্রশান্ত ভুষণেরা নিজেরাও লিঞ্চিংয়ের শিকার হতে পারেন? ব্যাপারটা কি এমন ভয়ের? সেটাও জানা যাচ্ছে না।

এমনকি বিচারকেরা? তারাও কি ভয়ে সিটিয়ে গেছেন? নাকি সবাই হিন্দুত্বের মহিমা দেখে আপ্লুত ও বুঁদ হয়ে গেছেন?

মনার্কি [monarchy] বা রাজতন্ত্রের বিপরীতে প্রজাতন্ত্র ধারণা – এদুইয়ের মধ্যে এক প্রধান ফারাক হল, ক্ষমতা প্রসঙ্গে। প্রজাতন্ত্রে – এখানে শাসককে শাসন ক্ষমতা কে দিয়েছে, কোথা থেকে আনা হয়েছে এর হদিস লুকানো নয়। নাগরিক নিজেই গণসম্মতিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করে শাসককে শাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষমতা দিয়েছে। শাসকের ক্ষমতার উৎস তাই নাগরিকদের কাছ থেকে ডেলিগেটেড পাওয়া ক্ষমতা। বিপরীতে মনার্কিতে তাঁর ক্ষমতার উতস জানা নাই, বলতে পারবে না; যেটা আসলে গায়ের জোর জবরদস্তি।
এ ছাড়া, প্রজাতন্ত্রের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, তালিকা করে রাখা নাগরিক মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো রক্ষা করতে রাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আর, অধিকারগুলো নাগরিককে অবাধে ভোগ করতে দেয়ার নিশ্চতাবিধান আর নাগরিকের মধ্যে কোনো বৈষম্য না করে অথবা আর কাউকে তা করতে না দিয়ে এসব কাজ বাস্তবায়ন করবে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েই শাসক শাসনক্ষমতা পায়। এটাই মুখ্য শর্ত।

শাসক এর ব্যত্যয় ঘটালে বুঝতে হবে রাষ্ট্র গঠনকালীন দেয়া শর্ত প্রতিশ্রুতি আর নেই, পালন করছে না। রাষ্ট্র ক্রমেই এখন দুর্বল হয়ে ভেঙে পড়বে।
তাই সেকুলারিজম বলে কোনো আলগা, অবুঝ না-বুঝ কথা নয়, বরং নাগরিক বৈষম্যহীনতা বজায় রাখা, রক্ষা করা, কাউকে করতে না দেয়া এটাই ফান্ডামেন্টাল। তবে ভারতের কনষ্টিটিউশনে যে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা রক্ষার কথা নেই, তা নয়। কিন্তু এর গুরুত্ব রাজনৈতিকভাবে সমাজের রাজনীতিতে তা হাজির নেই, দেখাই যাচ্ছে। তাই বাস্তবত, “খামাখা”  হয়ে আছে শব্দটা। আর হিন্দু কোনো নাগরিক মনে করছে, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে অন্যের ওপর নাগরিক বৈষম্য করতেই পারে। মুসলমানদের “জয় শ্রীরাম” বলাতেই পারে, বাধ্য করতে পারে। মানে মেজরিটারিয়ান-ইজম!

অথচ রাজনীতিবিদদের হওয়া দরকার ছিল – কেন নাগরিক বৈষম্যহীনতার নীতি অনুসরণ করা নাগরিককে দেয়া রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি হয়- এটা বুঝে নেয়া। আর কেন এটা রাষ্ট্রগঠনের মৌলিক ভিত্তি, কেন মৌলিক তা-ও নিজে বোঝা ও সব ধরনের নাগরিককেই সেটা বোঝানো। সেই আলোকে, আবার ওদিকে আদালতের উচিত হত নাগরিক অধিকার বাস্তবয়ায়নে বৈষম্যকারীদের সরকার বা কোন দল বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া। এমনকি নির্বাচন কমিশনের নিজের উচিত হত, দল বিজেপির বিরুদ্ধে একশনে যাওয়া; শর্ত আরোপ করা, যে অবিলম্বে নাগরিক বৈষম্যমূলক রাজনীতির চর্চা বন্ধ না করলে দলের রেজিস্ট্রেশন বাতিলসহ দলের নেতাদের  বিরুদ্ধে আইনি শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

অথচ এখানে হচ্ছে পুরো উল্টা। হিন্দুত্বের প্রধানমন্ত্রী নিজেই নাগরিক বৈষম্য ঘটাচ্ছেন। যার রক্ষা করা ছিল দায়িত্ব, তিনিই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী। তিনিই আসলে মেজরিটারিয়ান-ইজম এর মূল নেতা। আর ওদিকে আদালত বা নির্বাচন কমিশন- এরা নিষ্ক্রিয়। এমনকি এক ধরনের হিন্দুত্ববাদী জনগোষ্ঠি তারাও বেপরোয়া। যেমন বিজেপির এক হিন্দু নারীনেত্রী প্রকাশ্যে লিখে মুসলমান নারীদের গণধর্ষণ করার জন্য হিন্দু পুরুষদের আহ্বান রেখেছেন। আর বিজেপি বড়জোর তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে দায় শেষ করছে। কোনো ক্রিমিনাল চার্জ আনেনি। কেউ কী কাউকে প্রকাশ্যে ধর্ষণ করার আহবান রাখতে পারে? আর তাতে কোন ক্রিমিনাল মামলা হয় না?

এসব দিকগুলো তুলে ধরে আমরা অনেকবার বলছি, ভারত রাষ্ট্রটা জন্ম থেকেই গড়ে উঠেছে হিন্দুত্ববাদের ভিত্তিতে। কংগ্রেস দল জন্ম থেকেই মূলত এই কাণ্ডের হোতা। বিজেপির সাথে তার ফারাক এতটুকুই যে, বিজেপি হিন্দুত্বের ভিত্তির কথা না লুকিয়েই প্রকাশ্যেই বলতে চায়, এটাই তার রাজনীতির ভিত্তি, আর এটাই খোলাখুলি চর্চা করতে চায় সে। আর কংগ্রেস মনে করে হিন্দুত্ব পরিচয়কে সেকুলার নামে জামার নিচে লুকিয়ে রেখে হিন্দুত্ব দিয়ে চলতে হবে।

এই বিষয়টাই এখন একেবারেই উদাম হয়ে গেছে।
প্রধানমন্ত্রী মোদী এবার ভোট পেতে ভারত-নেপাল সীমান্তে পাহাড়ের উপর তীর্থস্থানে কেদারনাথের মন্দিরে গিয়ে ধ্যানে বসেছিলেন। আর তাতে কংগ্রেস মিডিয়াতে এসে বলেছিল, এখানে তাদের নেতা রাহুলই শ্রেষ্ঠ। কারণ মোদি ওই পাহাড়ে গেছেন হেলিকপ্টারে চড়ে আর আমাদের নেতা গেছেন শেষ মাইলখানেক হেঁটে। মানে মোদির সাথে কে কত বড় হিন্দুত্বের জিগির তুলে রাজনীতি করতে পারে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে এখন ‘সেকুলার’ কংগ্রেস। এমনকি গত নির্বাচনী প্রচারণা রাহুল তা শুরুই করেছিলেন মোদির সাথে প্রতিযোগিতা করে অসংখ্য মন্দির দর্শন করেছেন দেখিয়ে। আর কংগ্রেস এখন তো সরাসরি বলছে, তারাও হিন্দুত্বই করছে। তবে মোদিরটা হার্ড হিন্দুত্ব আর তাদেরটা নাকি, সফট হিন্দুত্ব।

সর্বশেষ ঘটনা আরো মারাত্মক। রাহুলের মা কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া আবার দলের হাল ধরেছে্‌ নীতি ঠিক করছেন। তার দলের সংসদীয় (মূলত তাঁর অধস্তন) নেতা এবার বানিয়েছেন পশ্চিম বাংলার বহরমপুরের এমপি অধীর চৌধুরীকে। ্নির্বাচনের পরে সোনিয়ার নতুন নীতি হল, তিনিও এখন থেকে হিন্দুত্বের রাজনীতিই করবেন, বিজেপির থেকে ভাগ দাবি করবেন বা কেড়ে নেবেন। কিভাবে?

একথা এখন সব পক্ষের কাছেই সুপ্রতিষ্ঠিত যে, মুসলমানবিদ্বেষই গত নির্বাচনে এককভাবেই এক মূল উপাদান ছিল। প্রধান প্রভাবশালী নির্বাচনি ইস্যু ছিল। মোদি এটাই ব্যবহার করে সফলভাবে জিতেছেন। মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ, আর তাই পাকিস্তানকে উচিত শিক্ষা দিতে পারার বোলচাল- ভারতের এই রাজনীতি, আর এর সাথে সীমান্ত সঙ্ঘাত দেখানো আর সেখানে বিজেপিই একমাত্র হিন্দুস্বার্থের দল সেভাবে নিজেদের তুলে ধরা। বিজেপির সাফল্য এখানেই। তাতে পাকিস্তানের সাথে এখনই ভারতের কোন সঙ্ঘাতের ইস্যু থাক আর না-ই থাক। জলজ্যান্ত এই হিন্দুত্বকে ভারতের মিডিয়াগুলো এ বিষয়টিকে খুবই ভদ্রভাবে প্রলেপ দিয়ে বলছে, ভারতের জনগণের কাছে এটা নাকি “নিরাপত্তা” ইস্যু। মানে এটা ইসলামবিদ্বেষ না। জনগণের নিরাপত্তা বোধ। যা একমাত্র মোদীর বিজেপিই [মুসলমানবিদ্বেষ মানে পাকিস্তানবিদ্বেষ ঘটিয়ে] নিরাপত্তা বোধে স্বস্তি আনতে পারে। তাই জনগণ, মোদির আমলে চাকরি না পেলেও নিরাপত্তার ভয়ে কাবু হয়ে থাকা মানুষ – মুসলমানদের মাথায় বোমা মেরে আসা মোদিকেই ভোট দিয়েছে।

সোনিয়াও এখন এই বয়ানটাকেই আমল করেছেন, মানে ব্যবহার করতে চান। তাই সোনিয়ার নীতিতে অধীর চৌধুরি পার্লামেন্টে এক জ্বালাময়ী হিন্দুত্ব বক্তৃতা দিয়েছেন। পাঠকের নিশ্চয় পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বোমা ফেলতে গিয়ে সেই ভারতীয় পাইলটের কথা মনে আছে যে নিজের বিমান বিধ্বস্থ হবার পর ধরা পড়েছিল। পরে পাকিস্তান সৌজন্য দেখিয়ে তাকে ভারত ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছিল। “অভিনন্দন” নামের সেই পাইলট যার নিজের বিশাল আকৃতির মোচ আছে, এটাই তাঁর প্রতীক। সেকারণে অধীর ঐ বক্তৃতায় দাবি করেছেন, এখন থেকে ঐ গোঁফকে “জাতীয় গোঁফ” ঘোষণা করতে হবে। [“উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানের গোঁফকে ‘জাতীয় গোঁফ’ ঘোষণা করা হোক।” ] আবার এতে তামাশার দিকটা হল, আনন্দবাজার এই ব্যাপারটাকে দেখছে কংগ্রেসের সোনিয়ার জাতীয়তাবাদে ফেরা হিসাবে। তাই আনন্দবাজারের খবর শিরোনাম হল, “সনিয়ার নির্দেশ, জাতীয়তাবাদে ফিরছে কংগ্রেস”। একোন জাতীয়তাবাদ? এটা তো সোজাসাপ্টা হিন্দুত্ব। অথচ সেটা আড়াল করতে এটাকে শুধু জাতীয়তাবাদে ফেরা বলে সাফাই টেনে দিচ্ছে। মানে বিজেপি আর কংগ্রেস দুটোই এখন নিজেরাই স্বীকার করছে যে তারা হিন্দুত্ব জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দল।  হিন্দুত্বের রাজনীতি সত্যি বড়ই সুস্বাদু আর তামাশার!

এমনকি ট্রাম্পের আমেরিকার পক্ষেও মোদীর মেজরিটারিয়ান-ইজম! কে সহ্য করা সহ্য হচ্ছে না। সারা দুনিয়াতে বিভিন্ন দেশে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা কোথায় ব্যহত হয়েছে এর একটা তালিকা প্রতিবছর আমেরিকা বের করে। এখানে বলাই বাহুল্য আমেরিকা ইউরোপের চোখে সেকুলারিজম বুঝে না। আমেরিকা মনে মানুষের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা থাকতে হবে। আর তা রক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়ীত্ব। তাই এই রিপোর্ট যে কোন রাষ্ট্র এই অধিকার রক্ষা করতে ব্যার্থ হয়েছে। স্বভাবতই এই তালিকায় ভারত অনেক বড় স্থান জুড়ে আছে। তাই আমেরিকার স্টেট ডিপার্টমেন্ট মানে এর মন্ত্রী/ উপদেষ্টা মাইক পম্পেই কঠোরভাবে ভারতে ধর্মপালনের স্বাধীনতা না থাকার অভিযোগ এনেছে। সেটা গা থেকে ছেড়ে ফেলে মোদী বলেছেন এটা ভারতের রাজনীতিতে আমেরিকার হস্তক্ষেপ ও পক্ষপাতিত্ব।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) হিন্দুত্বের পাবলিক লিঞ্চিং এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

জামাল খাশোগিঃ রাজতন্ত্রের নাগরিক দুর্ভাগ্য

জামাল খাশোগিঃ রাজতন্ত্রের নাগরিক দুর্ভাগ্য

গৌতম দাস

১৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2vK

সৌদি নাগরিক, জার্নালিষ্ট জামাল খাশোগি এ সময়ের বিশ্বে এক আলোচিত নাম। আশির দশকে আর এক ‘খাশোগির’ নাম আমরা তখন শুনেছিলাম, আদনান খাশোগি। ড্রাগ বা অস্ত্রের মতো চরম নিষিদ্ধ বা বেআইনি পণ্যের পেমেন্ট লেনদেনে জড়িত ব্যাংক বিসিসিআইর ডিরেক্টর ছিলেন আদনান। তাই তিনি ‘কুখ্যাত’ আর বিপরীতে জামাল দুনিয়ার সহানুভূতি পাওয়া, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যক্তিত্ব। সেকালের পত্রিকায় লেখা হত, ‘সৌদি ধনকুবের আদনান খাশোগি’। “খাশোগি” নামের সেই বাংলা বানানই বজায় রাখলাম এখানে। আর সেই আদনান খাশোগির ভাতিজা হলেন জামাল খাশোগি।

জামাল খাশোগির দাদা মোহাম্মদ খাশোগি ছিলেন মূলত তুরস্কের নাগরিক, এক ডাক্তার। তিনি সৌদি আরবে এসে সৌদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। এরপর রাজ পরিবারের সাথে স্বভাবতই তাঁর  ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। পরে এক সৌদি নারীকে বিয়ে করে তিনি সৌদি নাগরিক হয়ে যান। তারই নাতি জামাল খাশোগির জন্ম ১৯৫৩ সালে সৌদি আরবে। জামাল রাজ পরিবারের সাথে রক্তের সম্পর্কের কেউ নন। কিন্তু তা না হলেও দাদার সূত্রে, রাজ পরিবারের অনেকের সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার কারণে সৌদি সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হয়ে ওঠেন। তবে সেটা হওয়ার পেছনে আর একটা ফ্যাক্টরও গুরুত্ব ছিল – যখন জামাল পড়ালেখায় আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতায় ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন।

তবে জামালের এরপরের পরিচিতি অঙ্গনটা হয়ে যায় মূলত – মধ্যপ্রাচ্যের মূলত দেশিবিদেশী ইংরাজি মিডিয়ার জগত। চাকরি সূত্রে তিনি ‘সৌদি গেজেট, আরব নিউজ, আল ওয়াতন ইত্যাদির পত্রিকার সাথে জড়িয়ে পড়েন। প্রিন্ট মিডিয়ায় সাধারণ রিপোর্টার থেকে প্রধান সম্পাদক, আর টিভি মিডিয়াতে নিউজ এডিটর থেকে ডিরেক্টর – এভাবে পুরো নব্বইয়ের দশক হল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে জামাল খাশোগির উত্থান কালপর্ব। এ সময়েই এক ফাঁকে ফেলো সিটিজেন ওসামা বিন লাদেনের সাথে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন এবং  সোভিয়েতবিরোধী  মুজাহিদিনদের সেই প্রতিরোধে লড়াইয়ের সময়কাল থেকে কয়েকবার তিনি লাদেনের সাক্ষাৎকার ছেপেছেন। তবে অবশ্যই আমেরিকায় টুইন টাওয়ার হামলার পরে সেই বিন লাদেনের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা ভিন্ন বিষয়।

তবুও অনেকের সাথে সেসব পুরনো পরিচয় আর বিশেষত, মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ ও তার গঠন সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা একদিকে; অন্য দিকে পশ্চিমের চিন্তার সাথেও তাঁর পরিচিতি আর পশ্চিমের ভাষায় তা উপস্থাপনের দক্ষতার জন্য জামাল গুরুত্বপূর্ণ ‘রিসোর্স পারসন’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে ওঠেন। পারিবারিক সূত্রের সুবিধায় রাজপরিবারের নানা প্রজন্মের অনেক সদস্যের সাথে তার স্বাভাবিক পরিচয়ও ছিল। তেমন একজন হলেন এক প্রিন্স, তুর্কি বিন ফয়সল বিন আব্দুল আজিজ। পুরো আফগান মুজাহিদিন লড়াইয়ের সময়কালে তুর্কি ছিলেন সৌদি গোয়েন্দাবাহিনীর প্রধান। তিনি আসলে মুজাহিদিন গ্রুপগুলোর মধ্যে যারা সৌদি ফান্ডের সাথে সম্পর্কিত তাদের অর্থ বিতরণ আর নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও পরিচালনা করতেন। পরে ২০০১ সালের দিকে গোয়েন্দাপ্রধানের কাজ ছেড়ে কিছুদিন তিনি সৌদি আরবে ফিরে গিয়ে সেখানেই ছিলেন। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি লন্ডনে বা আমেরিকায় কাটিয়েছেন, বিশেষ করে পড়ালেখার সূত্রে। পরে ২০০৫ সালে তিনিই ব্রিটেনে সৌদি রাষ্ট্রদূত যুক্ত হন। আর সেই সময় তিনি জামাল খাশোগিকে তার মিডিয়া পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করেন।  আর সর্বশেষ তিনি সৌদি ডিফ্যাক্টো রাজার ক্ষমতায় হাজির থাকা যুবরাজ, মোহাম্মদ বিন সালমন (MBS) এর প্রতিহিংসা স্বীকার হতে পারেন, এই ভয়ে আগেই  আমেরিকার উদ্দেশ্যে দেশ  গিয়েছিলেন। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় কলাম লিখতেন। কিন্তু যুবরাজের ব্যক্তি প্রতিহিংসা থেকে বাঁচতে পারলেন না।

এই জামাল খাশোগি গত ২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে প্রবেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেখান থেকে গুম বা খুন হয়ে যান। আমাদের মূল আলোচনার প্রসঙ্গ এখান থেকে। জামালের দুর্ভাগ্য যে তিনি এক মনার্কি (monarchy) বা রাজতন্ত্রের দেশের নাগরিক। বেড়ে ওঠা ও শিক্ষা লাভের দিক থেকে তিনি পশ্চিমের আলোতে বড় হয়েছেন, ফলে যথেষ্ট আলোকিত বলা যায়। এরপরেও তার দুর্ভাগ্য, তিনি রাজতন্ত্রের জমিদারসুলভ  ফিউড্যাল অহঙ্কারের শিকার হয়ে জীবন দিয়েছেন। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, বাদশার ছেলে নিজের ফিউড্যাল জেদ পূরণ করতে তাঁকে নৃশংসভাবে খুন করেছেন। এখানে ‘নাগরিক’ শব্দটা ব্যবহার করেছি বটে, কিন্তু শব্দটা রাজতান্ত্রিক শাসনের সাথে মানানসই শব্দ নয়। ধার করে আনা।

রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থাকে দুই ধরণে ভাগ করা যায় – অতীত ব্যবস্থা আর চলতি বা মডার্ন ব্যবস্থা। অতীত ব্যবস্থা বলতে আগেকার রাজতন্ত্র বা বাদশা-আমিরিতন্ত্রের ডাইনেস্টি বা বংশীয় শাসন ব্যবস্থা। এরা সবই এক ক্যাটাগরির। আর এদের সবার বিপরীতে ‘রিপাবলিক’। রাজতন্ত্র থেকে রিপাবলিক মানে সব সমাধান পেয়ে যাওয়া নয়। তবে এক মৌলিক বদল আর তা স্বাভাবিক বদল না একেবারে লাফানো বদলের উল্লফন। আবার না, অবশ্যই এটা প্রাচীন “রোমের রিপাবলিক” নয়; তাই ফারাক টানতে অনেক সময় একে ‘আধুনিক প্রজাতন্ত্র’ বা ‘মডার্ন রিপাবলিক’ বলেও উল্লেখ করা হয়। মূলত অষ্টাদশ শতকের ইউরোপে (১৭৮৯) ও স্বাধীন আমেরিকায় (১৭৭৬) এর উত্থান ও সূচনা। এর প্রথম বাস্তব রূপ। তবু ‘মডার্ন’ শব্দটা শুনেই মনে এক অপছন্দের ভাব আসতে সুযোগ দেয়া, নিজের চায়ের কাপ নয় মনে করতে শুরু করা বা, নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়া অথবা এটা আমাদের জন্য নয় – এ ধরনের মনে করাগুলা ভুল হবে।

‘রাষ্ট্র’ কথাটা আগে মানে রাজতন্ত্রের রমরমা যুগেও ছিল মনে করা বা এমন বাক্য লিখে ফেলে বা বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করে ফেলে অনেকে। ব্যাপারটা হল একালে আধুনিক রাষ্ট্রের যুগে দাঁড়িয়ে সেকালের রাজতন্ত্রকে বর্ণনা করতে গিয়ে অনেক সময় অসতর্কে সবকিছুকেই ঢালাওভাবে রাষ্ট্র বলে ফেলেন অনেকে। অথবা একটা যেকোন ‘শাসনব্যবস্থা’ মাত্রই তা রাষ্ট্র এমন বর্ণনামূলক অর্থে এখনো কেউ কেউ ব্যবহার করে বসেন। কিন্তু ‘মডার্ন রিপাবলিক’ ধারণাটা বাস্তবতা হয়ে ওঠার পরে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটা একটা স্তরে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ দুনিয়াতে ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটা উত্থিত হতে হতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অর্ধে এসে এটা একটা স্পষ্ট ধারণার স্তর পার হয়ে বাস্তব হয়েছে মনে করা হয়।

কারণ যেকোন শাসন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় প্রবেশেরও আগের প্রশ্ন, দুনিয়াদারিতে মানুষের তৈরি ব্যবস্থায় মানুষকে শাসন করতে পারে কে? শাসন করার ক্ষমতার উৎস কী? বা শাসনক্ষমতা কোন শাসককে কে দিয়েছে, কোথা থেকে পেয়েছে?  এই প্রশ্নের জবাব রাজতন্ত্রের কাছে নাই। আকার ইঙ্গিতের মানে হল জবরদখল। এই প্রশ্নের সুরাহা হয়েছিল যে মানুষ একমাত্র নিজেই নিজেকে শাসনের অধিকারী। এই স্ব-ক্ষমতাটাই মানুষ দল বেধে জনগোষ্ঠিগতভাবে কাউকে সাময়িক ডেলিগেট করে দিলে, কাউকে সেই ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করতে দিলে তবেই কেউ একজন (সাময়িক) শাসক হতে পারে। আর এই সুরাহার পরেই দুনিয়া থেকে রাজা-সম্রাটের শাসনের মনার্কি ব্যবস্থা লোপাট হতে শুরু করেছিল। আর নতুন ব্যবস্থারই সাধারণ নাম রিপাবলিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র। অনেকে এটা রাজা ধারণার বিপরীত ধারণা বলে আর রাজার বিপরীত শব্দ বলে মনে করা প্রজা ধারণা চালু ছিল বলে রিপাবলিকের বাংলা ‘প্রজাতন্ত্র’ চালু করেছিল। এরই প্রথম নতুন বা মর্ডান রাষ্ট্রব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দিতে। তবে আমেরিকা ও ইউরোপ এরপর থেকে এক রিপাবলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় চলে গেলেও সেই ইউরোপই আবার অন্যদেশে উপনিবেশ গড়া শুরু করেছিল। ইউরোপ সারা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় কলোনি দখল ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। যেটার আবার সমাপ্তি ঘটেছিল কেবল গত শতাব্দির মাঝামাঝি।  “যেকোন জনগোষ্ঠি কার দ্বারা শাসিত হবে সেটা বেছে নিবে একমাত্র নিজেরা – এটাকে ভিত্তি মেনে নিতে গ্লোবালি বা দুনিয়াজুড়ে একমত হতে দেখা দেখা গিয়েছে একমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৪৫) পরেই। এটা হল রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা উত্থান ও বিস্তারের এক সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। রাজতন্ত্র থেকে পুর্ণ উত্তরণ তা যথেষ্ট না হলেও এক লম্বা লাফ অবশ্যই।

সেকারণে একটা ‘লাইন’ টানা হইয়ে যাওয়া যে, আর রাজতন্ত্র নয়, অর্থাৎ অষ্টাদশ শতকের পেছনে আর না যাই। আর ‘রাষ্ট্র’ শব্দ রিপাবলিক শব্দের সাথে সম-উচ্চারিত অর্থে সমার্থক হয়ে যাওয়া। রাষ্ট্র কেবল রিপাবলিকের সাথে ব্যবহার করা হবে এমন শব্দ হয়ে যাওয়া। তবে পরিস্কার থাকতে হবে, একইসাথে ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটা একটা ক্রম বিকাশমান শব্দ ও ধারণা। যার একটা বড় পর্যায় বা স্তর হলো অষ্টাদশ শতক। এটা ক্রমশ আরো বিকশিত ও স্পষ্ট হয়েছে আর নিজেকে শুধরে নিচ্ছে। মূল কথা ফরাসি বা আমেরিকান রিপাবলিকই সবকিছুর মডেল নয়; তা হতেই হবে এমন নয়।

কারণ রাষ্ট্র ধারণাটা একজায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, ‘ক্রমশ খুলছে, স্পষ্ট ফুটে উঠছে’, আইডিয়া আসছে ও পরিষ্কার হচ্ছে। তবে কেবল প্রধান বা মৌলিক বৈশিষ্টের দিকগুলো খেয়াল রাখতে হবে। যেমন অন্তত বাদশা-আমিরিতে ফেরত যাবেন না। আর এমনিতেই ইতোমধ্যে রাষ্ট্র ক্রম চলমান এক উত্থিত ধরনের আইডিয়া হিসেবে এর কত কী বদলে গিয়েছে তার স্টক মিলাতে পারি, সে হিসাব আমল করতে পারি।  যেমন দেখেন, রুশ বিপ্লব (১৯১৭) বা চীন বিপ্লবে (১৯৪৯) প্রাপ্ত রাষ্ট্র, অথবা কলোনি শাসন-মুক্তির মাধ্যমে পাওয়া যেকোনো উত্থিত রাষ্ট্র (১৯৪৫ এর পরে যেমন, পাকিস্তান রাষ্ট্র ১৯৪৭), এমনকি সর্বশেষ ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯)- সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রাপ্ত রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ কথাটা জুড়ে দেয়া আছে। অর্থাৎ বিপ্লব শেষে সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের নামের সাথে নিজেরাই ‘রিপাবলিক’ শব্দ জুড়ে রেখেছেন যদিও এই সবগুলো রাষ্ট্র একই ধরনের নয়। যেমন লেনিনের ‘রুশ বা সোভিয়েত রিপাবলিক’ নিশ্চয়ই ১৭৭৬ সালের ‘আমেরিকান রিপাবলিক’ রাষ্ট্রের মতো নয়, এমনকি মাওয়ের চীনা ‘পিপলস রিপাবলিক’ (১৯৪৯) সেটাও ১৯১৭ সালের রুশ ‘সোভিয়েত রিপাবলিক’ রাষ্ট্রের মত নয়। অর্থাৎ সবখানেই কিছু না কিছু নতুন গড়ন বৈশিষ্টের ছাপ আছে। নতুন আইডিয়া, নতুন প্রয়োজন, নতুন বাস্তবতা ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে। এমনকি,  ঠিক তেমনি ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক (১৯৭৯) আগের দেখা কোনো রিপাবলিকের মত নয়। সেখানেও প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে।

আবার আমাদেরই “পাকিস্তান রিপাবলিক” এর দিকে যদি দেখি, প্রথমত এদিকে তো ভালমত তাকানোই হয় নাই, তাচ্ছিল্যেই কেটে গেছে; অথচ এই রাষ্ট্রেরও মৌলিক দিকটা ছিল যে এটা রিপাবলিক – কোন রাজতন্ত্র নয়, কোন খলিফা-ডায়নেস্টি নয়। তবে এটাও সত্য যে এই রিপাবলিক পরিচয়ের চেয়ে ওটা “ইসলামি” সেই পরিচয়ের কদরই বেশি বেশি হয়েছিল। যা হোক, মূলকথাটা হলো, বস্তুত সব নতুন ‘রিপাবলিক রাষ্ট্রই’ বিশেষ কিছু নতুন বৈশিষ্ট্যের ধারক হয়ে থাকে। তার জন্ম ও গঠনে বহু নতুনত্ব থাকে, এ অর্থে প্রত্যেকটা অনন্য। যার মূল কারণ হল, আগেই হয়ে থাকা  বা যে গিভেন বাস্তবতায় একটা জনগোষ্ঠী নতুন রাষ্ট্র গঠনে প্রবৃত্ত হয় – সেই বাস্তবতা প্রতিটা হবু রিপাবলিক রাষ্ট্রের বেলায় অন্যন্য হবেই।

ওদিকে আমাদের অনুমানেও বড় কিছু গলদ রয়ে গেছে। যেমন একটা শাসক বা শাসন  ব্যবস্থা থাকা যদি আমরা দেখি তাতে আমরা গুলায় ফেলে ভাবি নিশ্চয় ওটাও রাষ্ট্র। যেমন রাজতন্ত্রী দেশগুলোতেও একটা শাসনব্যবস্থা আছে, তাদের শাসকও অবশ্যই, কিন্তু তারা কেউই রাষ্ট্র্র মানে রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। ক্ষমতা কী করে তৈরি হচ্ছে উৎস কী সে সম্পর্কে কাগজপত্রে কনষ্টিটিউশনে জন-উতস হতে হবে। যদিও এরপরে এর লম্বা সময় লাগে, প্রতিশ্রুতি লাগে যাতে সামাজিক-রাজনৈতিক চর্চায় তা বাস্তবে কার্যকর করা যায়।

‘নাগরিক’ শব্দটা রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট। রাষ্ট্র কাদের নিয়ে গঠিত হবে? গঠনের সেই উপাদান বা ‘কন্সটিটিউয়েন্ট’ হল নাগরিক। এ অর্থে নাগরিক, এই মৌল উপাদানে রাষ্ট্র গঠিত। এবং অ-বৈষম্যমূলকভাবে পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকেরা সবাই সমান। আর এই ব্যক্তি নাগরিকের স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবিক অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েই রাষ্ট্র গঠিত হয়। রাজতন্ত্রে এ জিনিসের বালাই থাকে না। এ ছাড়া, রাজতন্ত্রে রাজার ক্ষমতার উৎস কী? তা অন্তত জনগণের ক্ষমতা নয়। ফলে ওসব দেশে একই ‘নাগরিক’ শব্দ ব্যবহার করা হলেও মনে রাখতে হবে স্বয়ং বাদশাহ-ই নাগরিক নন, এর ঊর্ধ্বে। সবার সমান নন তিনি। উনার ইচ্ছা বা খায়েস-ই আইন। অথবা সম্ভবত বাদশাই একমাত্র স্বাধীন নাগরিক!

পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস
রিপাবলিক-নাগরিক খুন হলে আর কেউ অভিযোগকারী বা বাদী হোক না-ই হোক, রাষ্ট্র নিজেই মুখ্য বাদী হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে, আত্মীয়স্বজন কিংবা আর কেউ, অতিরিক্ত অর্থে, বাদী হতে পারেন। আর রাষ্ট্রের তরফে যে অফিস এমন বাদী হয়ে মামলা পরিচালনা করে থাকে সেটাই পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস এবং এর প্রধানকর্তা ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’।  ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’ শব্দটার মানে হল, রাষ্ট্র তাঁকে রাষ্ট্রের হয়ে মামলা পরিচালনা করার ক্ষমতা দেয়, মানে ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দেয়। ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ – মানে হল “অন্যকে আমার হয়ে মামলা পরিচালনের ক্ষমতা” লিখে দেয়া। পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস এর বেলায়  “পাওয়ার অব অ্যাটর্নি”  স্থায়ীভাবে এবং সাধারণভাবে দেয়া হয়ে থাকে এবং তাই ঐ পদের নাম ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’ হয়ে গেছে। আর তাঁর কাজ হল রাষ্ট্র নিজেই বাদী, এই বাদীর হয়ে অভিযোগ দায়ের করা আর এর ভিত্তিতে মামলা পরিচালনা করা, এই অর্থে ‘প্রসিকিউট’ করা। এ অফিস জনগণের হয়ে মামলা পরিচালনা করে, তাই এটা পাবলিক প্রসিকিউটর। তাকে আমরা সংক্ষেপে ‘পিপি’ বলে চিনতে অভ্যস্ত।

কোন কোন রাষ্ট্রের বেলায় দেখা যায় তাদের পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস  ও তাদের কাজের দায় ও পদ্ধতি একটু ভিন্ন। যেমন তারা মামলার তদন্তের ভারও পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের তদারকি ও পরিচালনার অধীনে দিয়ে রেখেছে। ফলে তদন্তও এই অফিসের অধীনে হয়ে থাকে। মানে, আমাদের দেশের মত ‘পুলিশ তদন্ত’ করে ‘পিপি অফিসে পাঠিয়ে’ দেয়ার সম্পর্ক নয়।

সৌদি আরব রাজতন্ত্রী হলেও আধুনিক রাষ্ট্রের আদলে তারাও ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’ নামেই অফিস ও ব্যবস্থা রেখেছে। জামাল খাশোগির গুম ও হত্যা প্রসঙ্গে সরাসরি সৌদি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে দেয়া এক বিবৃতি বা ভাষ্য, তাদেরই এক ওয়েব লিঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে। এই অফিসের সেই পাবলিক পেজ বলছে,  “The Kingdom of Saudi Arabia’s Public Prosecutor stated the following: Preliminary investigations carried out by the Public Prosecution into the disappearance case of the citizen Jamal bin Ahmad Khashoggi revealed that the discussions that took place between him and the persons who met him during his attendance in the Kingdom’s consulate in Istanbul led to a quarrel and a brawl with the citizen /Jamal Khashoggi, resulted in his death.”।
বাংলায় বললে, “সৌদি আরবের পাবলিক প্রসিকিউটর নিচের কথাগুলো বলছেন- নাগরিক জামাল বিন আহমদ খাশোগি গুমের মামলায় পাবলিক প্রসিকিউটর প্রাথমিক তদন্ত পরিচালনা করে তাতে দেখেছেন যে, জামাল এর সাথে যেসব ব্যক্তি দেখা করেছিল ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটে জামালের উপস্থিতির সময়ে তাদের সাথে আলোচনা হয়েছিল, তবে সে সময় ঝগড়া ও হইচইপূর্ণ মারামারিও হয়েছিল, তার ফলেই জামাল খাশোগির মৃত্যু ঘটে”।

প্রথমত, এটা মানা কঠিন যে, এটা ‘আইনি’ ডকুমেন্ট। শুধু তাই না। এটা একটা দায়ীত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য। রাষ্ট্রের একটা সর্বোচ্চ আইনি অফিস যারা পেশাদারভাবে রাষ্ট্রীয় মামলা পরিচালনা করার দায়িত্বে, তারা এ ভাষায় বর্ণনা দিতে পারেন না। দুটা নাদান বালকের ঝগড়ার বর্ণনাও আপনাতেই এর থেকে ভালো আইনি ভিত্তিতে সম্পন্ন হবে। যেমন, এখানে বলা হচ্ছে না যে কাদের সাথে জামাল খাশোগির “আলোচনা” হয়েছিল  – কারা তারা, কী পরিচয়, যাদের সাথে জামালের কথিত এরপরে ‘quarrel and a brawl’ ঘটেছে? এই বিবৃতি বলছে, “যাদের সাথে” জামালের “কথা হয়েছে”। তাদের নাম ঠিকানা কিছুই না দিয়ে এসব কথা বলার অর্থ পিপির অফিস নিজেই অপরাধীর পরিচয় লুকানোর দায়ে অভিযুক্ত হবার কথা।

দ্বিতীয়ত, বলা হচ্ছে জামালের সাথে ঐ ভিলেনদের “আলোচনা হচ্ছিল”। কিন্তু আলোচনা- ঝগড়া- হইচইপূর্ণ মারামারি, এভাবে একটা ঘটনাক্রম কল্পনা করা অসম্ভব। কারণ জামাল সেখানে একেবারেই একা ছিলেন। ফলে একা জামাল পনেরজন প্রতিপক্ষের সাথে ঝগড়া মারামারি করতে কেন যাবে? বরং এটাই স্বাভাবিক  ‘বহুজনের’ সাথে ‘বিশেষ ধরনের আলোচনার’ আর পরিণামে জামালের মৃত্যু হয়েছে – একথা বলার সোজা মনে হলেও ওই “বহুজন” ব্যক্তিবর্গই হত্যাকারী। কিন্তু এই সত্যের দিকে পিপি অফিসের আগ্রহ নেই। রাজপুত্রদের প্রতি বাদশাহী পিপি অফিসের আনুগত্য এতই সীমাহীন।

তৃতীয়ত, দেশের কোনো সরকারি অফিসে কোনো নাগরিক কারও সাথে দেখা করতে গেলে কথাবার্তা থেকে তাতে ঝগড়া বাধবে কেন? আমি চাইলেও সেই কর্তা ঝগড়া করবেন কেন? করতে দিবেন কেন? বড় জোর উনি আমাকে বের করে দিতে পারেন। আর আসলে কিছু করার আগে তিনি আমাকে ওয়ার্নিং দেবেন, এর পরিণতি বলবেন, কেন করবেন, তা ব্যাখ্যা করবেন, কেবল পেশাদার গার্ডদের দিয়ে বের করাবেন এবং তা যতদূর সম্ভব আমাকে স্পর্শ না করেই করবেন। কিন্তু তা না, একটা দূতাবাসের অফিসে একেবারে হইচই করে মারামারি বাধালেন, আর শেষে এমনকি খুন করে ফেললেন? কী সুন্দর! আর এ গল্প বিশ্বাস করল ‘রাষ্ট্রীয় অপরাধ তদন্ত অফিস’?

চতুর্থত, লাশ কই? পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের বিবৃতি থেকে, তাদেরও তা জানার কোনো আগ্রহ আছে বলে দেখা গেল না। অথচ তারা নাকি ‘ক্রিমিনাল অপরাধ তদন্ত’ এর সর্বোচ্চ অফিস!

ঘটনাক্রমে এখানে পাশাপাশি তিনটি রাষ্ট্রের পাবলিক প্রসিকিউটর ও নির্বাহীদের কাজ ও কথার প্রসঙ্গ এসেছে। তারা হলেন, রাজকীয় সৌদি আরব, রিপাবলিক তুরস্ক আর রিপাবলিক আমেরিকা। জামাল সৌদি নাগরিক। কিন্তু নিজ দেশেরই এক কনসুলেটে এসে এমন “আলোচনা” বিপদে পড়ে গেছিলেন যে এর আড়ালে পড়ে করাতে কাটা টুকরায় খুন হয়ে গেলেন। লাশের কথা পিপি বলতে পারছেন না। অথচ এর বিপরীতে, তুরস্ককে দেখুন, বলতে গেলে বিষয়টাকে সিরিয়াস ইস্যু হিসেবে দেখা, তদন্ত আর তথ্য জোগাড়ের কাজ সেটা মূলত তুরস্ক রিপাবলিকই করেছে। অনেকের মনে হতে পারে, তুরস্ক-সৌদি রেষারেষির কারণে এরদোগান অতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তিনি ফায়দা নিতে চান। এমন ভাবনাকারী সবার  এতে যে দিকটা নজর এড়িয়ে গেছে তা হল – রিপাবলিক রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও বাধ্যবাধকতা। প্রজাতন্ত্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রের জনগণের কাছে জবাবদিহিতার দায়; নাগরিকের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই দায় পালনে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

এরদোগানসহ তুরস্ক রাষ্ট্রের নির্বাহী দায়িত্বের সবাই এই উদ্যোগ না নিলে তারা নিজেরাই বরং অপরাধে অভিযুক্ত হতে যেতেন। আমাদের লক্ষ করতে হবে, তুরস্কের মাটিতে গুম ও খুনের মতো ভয়াবহ অপরাধ ঘটেছে। খুনিরা তুরস্কের বা বিদেশী যেই হোক – এর অপরাধীদের আইনিভাবে (জামাল খাশোগিকে ধরে আনার কথিত হুকুম দেওয়ার মত না)  ধরে আনতে হবে। পরে তাদের আইনি হেফাজতে নিয়ে জামাল খাশোগিকে ধরে আনার কথিত হুকুমদাতা ও সহযোগীদের তুরস্কের আদালতে হাজির করতে এরদোগান ও তার পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস আইনগতভাবে বাধ্য। তুরস্ক রাষ্ট্রের আদালত ও জনগণের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা আছে। এর ব্যর্তয় হলে, আর যেকোন সংক্ষুব্ধ তুরস্কের নাগরিক তুরস্কের আদালতে নালিশ দিলে এরদোগানসহ নির্বাহী বিভাগের লোকেরা কর্তব্যে অবহেলায় অভিযুক্ত হয়ে যেতে পারেন।

অপর দিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ আমেরিকার নির্বাহীদের দিকে তাকান। স্পষ্ট করেই ট্রাম্প বলছেন, সৌদির কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির স্বার্থ আছে। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে তাকে বলতে হচ্ছে, এটা ‘খুনি মিথ্যুকের (rogue killers) কাজ’ এবং এর “পরিণতি হবে ভয়াবহ”। সিনেটর বা কংগ্রেস সদস্যরা খোলাখুলি অন ক্যামেরা প্রেসিডেন্টকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান রাখছেন, “নইলে তারাই উদ্যোগ নেবেন” বলতে হচ্ছে। একজন মিথ্যুক ও খুনির সাথে রাষ্ট্রের কোনো নির্বাহী বা জনপ্রতিনিধি বৈঠক করেছেন, যোগাযোগ রেখেছেন – এটা কিছুতেই তারা ঘটতে, গোপনে ঘটাতে বা দেখাতে চান না। আমেরিকা রাষ্ট্রের অপকর্মের শেষ নেই, একথা খুবই ঠিক। এরপরেও তার কিছু মূল্যবোধ আছে, যা লঙ্ঘন করলে কারো কেরিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে। নিজ সমাজে সকলের সাথে এক টেবিলে বসার অপাঙেক্তেয় মানে অনুপযুক্ত হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ সকলে আপনাকে রেখে ঐ ঘর বা টেবিল ত্যাগ করবে। পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকান সমাজে খুব করা আর প্রমাণিত মিথ্যা বলা – এধরণের অমার্জণীয় কৃত অপরাধ।  এগুলো সবই মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল্যবোধ বা সংক্ষেপে মর্ডান মূল্যবোধ ও এর ক্ষমতা।

দেখা যাচ্ছে, রাজতন্ত্রে আসলে শান্তিতে একটু খুন হয়ে যাবেন সেই সুযোগও নেই। কারণ বাদশা ব্যক্তিগত  প্রতিহিংসা পূরণ করতে আপনার আঙুল কেটে নিয়ে যেতে পারে।

সামগ্রিকভাবে না দেখায়, সৌদি ঘটনা তত বড় নয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এটা সৌদি ডায়নেস্টির সমাপ্তিসহ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ম্যাপ, নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারে – আরো বড় বিষয় হবে স্থায়ী অস্থিতিশীলতা।

সর্বশেষ গতকালের ঘটনা –  বিশেষ করে এরদোগানের আমেরিকা, বৃটিশ, ফ্রান্স ও জর্মানির কাছে খুনিদের কথোপকথনের টেপ শুনার জন্য পাঠিয়ে দেয়া – এর প্রতিক্রিয়া হবে মারাত্মক। চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প বিরাট চাপের সম্মুখিন হচ্ছেন। আর সেই চাপ সামলাতে না পেরে তিনি সৌদিয়াওরবের বিরুদ্ধে কঠোর একশনে যাচ্ছেন দেখলে অবাক হবেন না। এই সরকার প্রধানেরা এখন দায়বাধ্য হয়ে গেলেন টেপ হাতে পাওয়া ও শোনার পর আইনি ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা নিতে। কারণ, তারা কেউ বাদশা-আমির বা রাজপুত্র নন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “জামাল খাশোগিঃ একজন নাগরিকের দুর্ভাগ্য  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]