জামাল খাশোগিঃ রাজতন্ত্রের নাগরিক দুর্ভাগ্য

জামাল খাশোগিঃ রাজতন্ত্রের নাগরিক দুর্ভাগ্য

গৌতম দাস

১৩ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2vK

সৌদি নাগরিক, জার্নালিষ্ট জামাল খাশোগি এ সময়ের বিশ্বে এক আলোচিত নাম। আশির দশকে আর এক ‘খাশোগির’ নাম আমরা তখন শুনেছিলাম, আদনান খাশোগি। ড্রাগ বা অস্ত্রের মতো চরম নিষিদ্ধ বা বেআইনি পণ্যের পেমেন্ট লেনদেনে জড়িত ব্যাংক বিসিসিআইর ডিরেক্টর ছিলেন আদনান। তাই তিনি ‘কুখ্যাত’ আর বিপরীতে জামাল দুনিয়ার সহানুভূতি পাওয়া, কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক ব্যক্তিত্ব। সেকালের পত্রিকায় লেখা হত, ‘সৌদি ধনকুবের আদনান খাশোগি’। “খাশোগি” নামের সেই বাংলা বানানই বজায় রাখলাম এখানে। আর সেই আদনান খাশোগির ভাতিজা হলেন জামাল খাশোগি।

জামাল খাশোগির দাদা মোহাম্মদ খাশোগি ছিলেন মূলত তুরস্কের নাগরিক, এক ডাক্তার। তিনি সৌদি আরবে এসে সৌদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আব্দুল আজিজ আল সৌদের ব্যক্তিগত চিকিৎসক নিযুক্ত হয়েছিলেন। এরপর রাজ পরিবারের সাথে স্বভাবতই তাঁর  ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। পরে এক সৌদি নারীকে বিয়ে করে তিনি সৌদি নাগরিক হয়ে যান। তারই নাতি জামাল খাশোগির জন্ম ১৯৫৩ সালে সৌদি আরবে। জামাল রাজ পরিবারের সাথে রক্তের সম্পর্কের কেউ নন। কিন্তু তা না হলেও দাদার সূত্রে, রাজ পরিবারের অনেকের সাথে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতার কারণে সৌদি সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে গণ্য হয়ে ওঠেন। তবে সেটা হওয়ার পেছনে আর একটা ফ্যাক্টরও গুরুত্ব ছিল – যখন জামাল পড়ালেখায় আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতায় ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসেন।

তবে জামালের এরপরের পরিচিতি অঙ্গনটা হয়ে যায় মূলত – মধ্যপ্রাচ্যের মূলত দেশিবিদেশী ইংরাজি মিডিয়ার জগত। চাকরি সূত্রে তিনি ‘সৌদি গেজেট, আরব নিউজ, আল ওয়াতন ইত্যাদির পত্রিকার সাথে জড়িয়ে পড়েন। প্রিন্ট মিডিয়ায় সাধারণ রিপোর্টার থেকে প্রধান সম্পাদক, আর টিভি মিডিয়াতে নিউজ এডিটর থেকে ডিরেক্টর – এভাবে পুরো নব্বইয়ের দশক হল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে জামাল খাশোগির উত্থান কালপর্ব। এ সময়েই এক ফাঁকে ফেলো সিটিজেন ওসামা বিন লাদেনের সাথে তিনি পরিচিত হয়েছিলেন এবং  সোভিয়েতবিরোধী  মুজাহিদিনদের সেই প্রতিরোধে লড়াইয়ের সময়কাল থেকে কয়েকবার তিনি লাদেনের সাক্ষাৎকার ছেপেছেন। তবে অবশ্যই আমেরিকায় টুইন টাওয়ার হামলার পরে সেই বিন লাদেনের গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা ভিন্ন বিষয়।

তবুও অনেকের সাথে সেসব পুরনো পরিচয় আর বিশেষত, মধ্যপ্রাচ্যের সমাজ ও তার গঠন সম্পর্কে তাঁর জানাশোনা একদিকে; অন্য দিকে পশ্চিমের চিন্তার সাথেও তাঁর পরিচিতি আর পশ্চিমের ভাষায় তা উপস্থাপনের দক্ষতার জন্য জামাল গুরুত্বপূর্ণ ‘রিসোর্স পারসন’ হিসেবে বিবেচিত হয়ে ওঠেন। পারিবারিক সূত্রের সুবিধায় রাজপরিবারের নানা প্রজন্মের অনেক সদস্যের সাথে তার স্বাভাবিক পরিচয়ও ছিল। তেমন একজন হলেন এক প্রিন্স, তুর্কি বিন ফয়সল বিন আব্দুল আজিজ। পুরো আফগান মুজাহিদিন লড়াইয়ের সময়কালে তুর্কি ছিলেন সৌদি গোয়েন্দাবাহিনীর প্রধান। তিনি আসলে মুজাহিদিন গ্রুপগুলোর মধ্যে যারা সৌদি ফান্ডের সাথে সম্পর্কিত তাদের অর্থ বিতরণ আর নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোও পরিচালনা করতেন। পরে ২০০১ সালের দিকে গোয়েন্দাপ্রধানের কাজ ছেড়ে কিছুদিন তিনি সৌদি আরবে ফিরে গিয়ে সেখানেই ছিলেন। জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি লন্ডনে বা আমেরিকায় কাটিয়েছেন, বিশেষ করে পড়ালেখার সূত্রে। পরে ২০০৫ সালে তিনিই ব্রিটেনে সৌদি রাষ্ট্রদূত যুক্ত হন। আর সেই সময় তিনি জামাল খাশোগিকে তার মিডিয়া পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ করেন।  আর সর্বশেষ তিনি সৌদি ডিফ্যাক্টো রাজার ক্ষমতায় হাজির থাকা যুবরাজ, মোহাম্মদ বিন সালমন (MBS) এর প্রতিহিংসা স্বীকার হতে পারেন, এই ভয়ে আগেই  আমেরিকার উদ্দেশ্যে দেশ  গিয়েছিলেন। ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় কলাম লিখতেন। কিন্তু যুবরাজের ব্যক্তি প্রতিহিংসা থেকে বাঁচতে পারলেন না।

এই জামাল খাশোগি গত ২ অক্টোবর তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সৌদি দূতাবাসে প্রবেশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেখান থেকে গুম বা খুন হয়ে যান। আমাদের মূল আলোচনার প্রসঙ্গ এখান থেকে। জামালের দুর্ভাগ্য যে তিনি এক মনার্কি (monarchy) বা রাজতন্ত্রের দেশের নাগরিক। বেড়ে ওঠা ও শিক্ষা লাভের দিক থেকে তিনি পশ্চিমের আলোতে বড় হয়েছেন, ফলে যথেষ্ট আলোকিত বলা যায়। এরপরেও তার দুর্ভাগ্য, তিনি রাজতন্ত্রের জমিদারসুলভ  ফিউড্যাল অহঙ্কারের শিকার হয়ে জীবন দিয়েছেন। এমনকি অভিযোগ উঠেছে, বাদশার ছেলে নিজের ফিউড্যাল জেদ পূরণ করতে তাঁকে নৃশংসভাবে খুন করেছেন। এখানে ‘নাগরিক’ শব্দটা ব্যবহার করেছি বটে, কিন্তু শব্দটা রাজতান্ত্রিক শাসনের সাথে মানানসই শব্দ নয়। ধার করে আনা।

রাষ্ট্রশাসন ব্যবস্থাকে দুই ধরণে ভাগ করা যায় – অতীত ব্যবস্থা আর চলতি বা মডার্ন ব্যবস্থা। অতীত ব্যবস্থা বলতে আগেকার রাজতন্ত্র বা বাদশা-আমিরিতন্ত্রের ডাইনেস্টি বা বংশীয় শাসন ব্যবস্থা। এরা সবই এক ক্যাটাগরির। আর এদের সবার বিপরীতে ‘রিপাবলিক’। রাজতন্ত্র থেকে রিপাবলিক মানে সব সমাধান পেয়ে যাওয়া নয়। তবে এক মৌলিক বদল আর তা স্বাভাবিক বদল না একেবারে লাফানো বদলের উল্লফন। আবার না, অবশ্যই এটা প্রাচীন “রোমের রিপাবলিক” নয়; তাই ফারাক টানতে অনেক সময় একে ‘আধুনিক প্রজাতন্ত্র’ বা ‘মডার্ন রিপাবলিক’ বলেও উল্লেখ করা হয়। মূলত অষ্টাদশ শতকের ইউরোপে (১৭৮৯) ও স্বাধীন আমেরিকায় (১৭৭৬) এর উত্থান ও সূচনা। এর প্রথম বাস্তব রূপ। তবু ‘মডার্ন’ শব্দটা শুনেই মনে এক অপছন্দের ভাব আসতে সুযোগ দেয়া, নিজের চায়ের কাপ নয় মনে করতে শুরু করা বা, নিজেকে দূরে সরিয়ে নেয়া অথবা এটা আমাদের জন্য নয় – এ ধরনের মনে করাগুলা ভুল হবে।

‘রাষ্ট্র’ কথাটা আগে মানে রাজতন্ত্রের রমরমা যুগেও ছিল মনে করা বা এমন বাক্য লিখে ফেলে বা বিচ্ছিন্নভাবে ব্যবহার করে ফেলে অনেকে। ব্যাপারটা হল একালে আধুনিক রাষ্ট্রের যুগে দাঁড়িয়ে সেকালের রাজতন্ত্রকে বর্ণনা করতে গিয়ে অনেক সময় অসতর্কে সবকিছুকেই ঢালাওভাবে রাষ্ট্র বলে ফেলেন অনেকে। অথবা একটা যেকোন ‘শাসনব্যবস্থা’ মাত্রই তা রাষ্ট্র এমন বর্ণনামূলক অর্থে এখনো কেউ কেউ ব্যবহার করে বসেন। কিন্তু ‘মডার্ন রিপাবলিক’ ধারণাটা বাস্তবতা হয়ে ওঠার পরে ‘রাষ্ট্র’ শব্দটা একটা স্তরে পরিপূর্ণতা লাভ করেছে বলে মনে করা হয়। অর্থাৎ দুনিয়াতে ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটা উত্থিত হতে হতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ অর্ধে এসে এটা একটা স্পষ্ট ধারণার স্তর পার হয়ে বাস্তব হয়েছে মনে করা হয়।

কারণ যেকোন শাসন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনায় প্রবেশেরও আগের প্রশ্ন, দুনিয়াদারিতে মানুষের তৈরি ব্যবস্থায় মানুষকে শাসন করতে পারে কে? শাসন করার ক্ষমতার উৎস কী? বা শাসনক্ষমতা কোন শাসককে কে দিয়েছে, কোথা থেকে পেয়েছে?  এই প্রশ্নের জবাব রাজতন্ত্রের কাছে নাই। আকার ইঙ্গিতের মানে হল জবরদখল। এই প্রশ্নের সুরাহা হয়েছিল যে মানুষ একমাত্র নিজেই নিজেকে শাসনের অধিকারী। এই স্ব-ক্ষমতাটাই মানুষ দল বেধে জনগোষ্ঠিগতভাবে কাউকে সাময়িক ডেলিগেট করে দিলে, কাউকে সেই ক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করতে দিলে তবেই কেউ একজন (সাময়িক) শাসক হতে পারে। আর এই সুরাহার পরেই দুনিয়া থেকে রাজা-সম্রাটের শাসনের মনার্কি ব্যবস্থা লোপাট হতে শুরু করেছিল। আর নতুন ব্যবস্থারই সাধারণ নাম রিপাবলিক বা রিপাবলিক রাষ্ট্র। অনেকে এটা রাজা ধারণার বিপরীত ধারণা বলে আর রাজার বিপরীত শব্দ বলে মনে করা প্রজা ধারণা চালু ছিল বলে রিপাবলিকের বাংলা ‘প্রজাতন্ত্র’ চালু করেছিল। এরই প্রথম নতুন বা মর্ডান রাষ্ট্রব্যবস্থা বাস্তবায়িত হয়েছিল অষ্টাদশ শতাব্দিতে। তবে আমেরিকা ও ইউরোপ এরপর থেকে এক রিপাবলিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় চলে গেলেও সেই ইউরোপই আবার অন্যদেশে উপনিবেশ গড়া শুরু করেছিল। ইউরোপ সারা এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকায় কলোনি দখল ব্যবস্থা কায়েম করেছিল। যেটার আবার সমাপ্তি ঘটেছিল কেবল গত শতাব্দির মাঝামাঝি।  “যেকোন জনগোষ্ঠি কার দ্বারা শাসিত হবে সেটা বেছে নিবে একমাত্র নিজেরা – এটাকে ভিত্তি মেনে নিতে গ্লোবালি বা দুনিয়াজুড়ে একমত হতে দেখা দেখা গিয়েছে একমাত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের (১৯৪৫) পরেই। এটা হল রিপাবলিক রাষ্ট্র ধারণা উত্থান ও বিস্তারের এক সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। রাজতন্ত্র থেকে পুর্ণ উত্তরণ তা যথেষ্ট না হলেও এক লম্বা লাফ অবশ্যই।

সেকারণে একটা ‘লাইন’ টানা হইয়ে যাওয়া যে, আর রাজতন্ত্র নয়, অর্থাৎ অষ্টাদশ শতকের পেছনে আর না যাই। আর ‘রাষ্ট্র’ শব্দ রিপাবলিক শব্দের সাথে সম-উচ্চারিত অর্থে সমার্থক হয়ে যাওয়া। রাষ্ট্র কেবল রিপাবলিকের সাথে ব্যবহার করা হবে এমন শব্দ হয়ে যাওয়া। তবে পরিস্কার থাকতে হবে, একইসাথে ‘রাষ্ট্র’ ধারণাটা একটা ক্রম বিকাশমান শব্দ ও ধারণা। যার একটা বড় পর্যায় বা স্তর হলো অষ্টাদশ শতক। এটা ক্রমশ আরো বিকশিত ও স্পষ্ট হয়েছে আর নিজেকে শুধরে নিচ্ছে। মূল কথা ফরাসি বা আমেরিকান রিপাবলিকই সবকিছুর মডেল নয়; তা হতেই হবে এমন নয়।

কারণ রাষ্ট্র ধারণাটা একজায়গায় দাঁড়িয়ে নেই, ‘ক্রমশ খুলছে, স্পষ্ট ফুটে উঠছে’, আইডিয়া আসছে ও পরিষ্কার হচ্ছে। তবে কেবল প্রধান বা মৌলিক বৈশিষ্টের দিকগুলো খেয়াল রাখতে হবে। যেমন অন্তত বাদশা-আমিরিতে ফেরত যাবেন না। আর এমনিতেই ইতোমধ্যে রাষ্ট্র ক্রম চলমান এক উত্থিত ধরনের আইডিয়া হিসেবে এর কত কী বদলে গিয়েছে তার স্টক মিলাতে পারি, সে হিসাব আমল করতে পারি।  যেমন দেখেন, রুশ বিপ্লব (১৯১৭) বা চীন বিপ্লবে (১৯৪৯) প্রাপ্ত রাষ্ট্র, অথবা কলোনি শাসন-মুক্তির মাধ্যমে পাওয়া যেকোনো উত্থিত রাষ্ট্র (১৯৪৫ এর পরে যেমন, পাকিস্তান রাষ্ট্র ১৯৪৭), এমনকি সর্বশেষ ইরানি বিপ্লব (১৯৭৯)- সব ক্ষেত্রেই লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, প্রাপ্ত রাষ্ট্রের নামের সাথে ‘রিপাবলিক’ কথাটা জুড়ে দেয়া আছে। অর্থাৎ বিপ্লব শেষে সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের নামের সাথে নিজেরাই ‘রিপাবলিক’ শব্দ জুড়ে রেখেছেন যদিও এই সবগুলো রাষ্ট্র একই ধরনের নয়। যেমন লেনিনের ‘রুশ বা সোভিয়েত রিপাবলিক’ নিশ্চয়ই ১৭৭৬ সালের ‘আমেরিকান রিপাবলিক’ রাষ্ট্রের মতো নয়, এমনকি মাওয়ের চীনা ‘পিপলস রিপাবলিক’ (১৯৪৯) সেটাও ১৯১৭ সালের রুশ ‘সোভিয়েত রিপাবলিক’ রাষ্ট্রের মত নয়। অর্থাৎ সবখানেই কিছু না কিছু নতুন গড়ন বৈশিষ্টের ছাপ আছে। নতুন আইডিয়া, নতুন প্রয়োজন, নতুন বাস্তবতা ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে। এমনকি,  ঠিক তেমনি ইরানের ইসলামিক রিপাবলিক (১৯৭৯) আগের দেখা কোনো রিপাবলিকের মত নয়। সেখানেও প্রচুর পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে।

আবার আমাদেরই “পাকিস্তান রিপাবলিক” এর দিকে যদি দেখি, প্রথমত এদিকে তো ভালমত তাকানোই হয় নাই, তাচ্ছিল্যেই কেটে গেছে; অথচ এই রাষ্ট্রেরও মৌলিক দিকটা ছিল যে এটা রিপাবলিক – কোন রাজতন্ত্র নয়, কোন খলিফা-ডায়নেস্টি নয়। তবে এটাও সত্য যে এই রিপাবলিক পরিচয়ের চেয়ে ওটা “ইসলামি” সেই পরিচয়ের কদরই বেশি বেশি হয়েছিল। যা হোক, মূলকথাটা হলো, বস্তুত সব নতুন ‘রিপাবলিক রাষ্ট্রই’ বিশেষ কিছু নতুন বৈশিষ্ট্যের ধারক হয়ে থাকে। তার জন্ম ও গঠনে বহু নতুনত্ব থাকে, এ অর্থে প্রত্যেকটা অনন্য। যার মূল কারণ হল, আগেই হয়ে থাকা  বা যে গিভেন বাস্তবতায় একটা জনগোষ্ঠী নতুন রাষ্ট্র গঠনে প্রবৃত্ত হয় – সেই বাস্তবতা প্রতিটা হবু রিপাবলিক রাষ্ট্রের বেলায় অন্যন্য হবেই।

ওদিকে আমাদের অনুমানেও বড় কিছু গলদ রয়ে গেছে। যেমন একটা শাসক বা শাসন  ব্যবস্থা থাকা যদি আমরা দেখি তাতে আমরা গুলায় ফেলে ভাবি নিশ্চয় ওটাও রাষ্ট্র। যেমন রাজতন্ত্রী দেশগুলোতেও একটা শাসনব্যবস্থা আছে, তাদের শাসকও অবশ্যই, কিন্তু তারা কেউই রাষ্ট্র্র মানে রিপাবলিক রাষ্ট্র নয়। ক্ষমতা কী করে তৈরি হচ্ছে উৎস কী সে সম্পর্কে কাগজপত্রে কনষ্টিটিউশনে জন-উতস হতে হবে। যদিও এরপরে এর লম্বা সময় লাগে, প্রতিশ্রুতি লাগে যাতে সামাজিক-রাজনৈতিক চর্চায় তা বাস্তবে কার্যকর করা যায়।

‘নাগরিক’ শব্দটা রিপাবলিক রাষ্ট্রব্যবস্থা সংশ্লিষ্ট। রাষ্ট্র কাদের নিয়ে গঠিত হবে? গঠনের সেই উপাদান বা ‘কন্সটিটিউয়েন্ট’ হল নাগরিক। এ অর্থে নাগরিক, এই মৌল উপাদানে রাষ্ট্র গঠিত। এবং অ-বৈষম্যমূলকভাবে পরিচয় নির্বিশেষে নাগরিকেরা সবাই সমান। আর এই ব্যক্তি নাগরিকের স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবিক অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েই রাষ্ট্র গঠিত হয়। রাজতন্ত্রে এ জিনিসের বালাই থাকে না। এ ছাড়া, রাজতন্ত্রে রাজার ক্ষমতার উৎস কী? তা অন্তত জনগণের ক্ষমতা নয়। ফলে ওসব দেশে একই ‘নাগরিক’ শব্দ ব্যবহার করা হলেও মনে রাখতে হবে স্বয়ং বাদশাহ-ই নাগরিক নন, এর ঊর্ধ্বে। সবার সমান নন তিনি। উনার ইচ্ছা বা খায়েস-ই আইন। অথবা সম্ভবত বাদশাই একমাত্র স্বাধীন নাগরিক!

পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস
রিপাবলিক-নাগরিক খুন হলে আর কেউ অভিযোগকারী বা বাদী হোক না-ই হোক, রাষ্ট্র নিজেই মুখ্য বাদী হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে, আত্মীয়স্বজন কিংবা আর কেউ, অতিরিক্ত অর্থে, বাদী হতে পারেন। আর রাষ্ট্রের তরফে যে অফিস এমন বাদী হয়ে মামলা পরিচালনা করে থাকে সেটাই পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস এবং এর প্রধানকর্তা ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’।  ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’ শব্দটার মানে হল, রাষ্ট্র তাঁকে রাষ্ট্রের হয়ে মামলা পরিচালনা করার ক্ষমতা দেয়, মানে ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দেয়। ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ – মানে হল “অন্যকে আমার হয়ে মামলা পরিচালনের ক্ষমতা” লিখে দেয়া। পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস এর বেলায়  “পাওয়ার অব অ্যাটর্নি”  স্থায়ীভাবে এবং সাধারণভাবে দেয়া হয়ে থাকে এবং তাই ঐ পদের নাম ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’ হয়ে গেছে। আর তাঁর কাজ হল রাষ্ট্র নিজেই বাদী, এই বাদীর হয়ে অভিযোগ দায়ের করা আর এর ভিত্তিতে মামলা পরিচালনা করা, এই অর্থে ‘প্রসিকিউট’ করা। এ অফিস জনগণের হয়ে মামলা পরিচালনা করে, তাই এটা পাবলিক প্রসিকিউটর। তাকে আমরা সংক্ষেপে ‘পিপি’ বলে চিনতে অভ্যস্ত।

কোন কোন রাষ্ট্রের বেলায় দেখা যায় তাদের পাবলিক প্রসিকিউটরের অফিস  ও তাদের কাজের দায় ও পদ্ধতি একটু ভিন্ন। যেমন তারা মামলার তদন্তের ভারও পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের তদারকি ও পরিচালনার অধীনে দিয়ে রেখেছে। ফলে তদন্তও এই অফিসের অধীনে হয়ে থাকে। মানে, আমাদের দেশের মত ‘পুলিশ তদন্ত’ করে ‘পিপি অফিসে পাঠিয়ে’ দেয়ার সম্পর্ক নয়।

সৌদি আরব রাজতন্ত্রী হলেও আধুনিক রাষ্ট্রের আদলে তারাও ‘অ্যাটর্নি জেনারেল’ নামেই অফিস ও ব্যবস্থা রেখেছে। জামাল খাশোগির গুম ও হত্যা প্রসঙ্গে সরাসরি সৌদি অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে দেয়া এক বিবৃতি বা ভাষ্য, তাদেরই এক ওয়েব লিঙ্ক ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ায় পাওয়া যাচ্ছে। এই অফিসের সেই পাবলিক পেজ বলছে,  “The Kingdom of Saudi Arabia’s Public Prosecutor stated the following: Preliminary investigations carried out by the Public Prosecution into the disappearance case of the citizen Jamal bin Ahmad Khashoggi revealed that the discussions that took place between him and the persons who met him during his attendance in the Kingdom’s consulate in Istanbul led to a quarrel and a brawl with the citizen /Jamal Khashoggi, resulted in his death.”।
বাংলায় বললে, “সৌদি আরবের পাবলিক প্রসিকিউটর নিচের কথাগুলো বলছেন- নাগরিক জামাল বিন আহমদ খাশোগি গুমের মামলায় পাবলিক প্রসিকিউটর প্রাথমিক তদন্ত পরিচালনা করে তাতে দেখেছেন যে, জামাল এর সাথে যেসব ব্যক্তি দেখা করেছিল ইস্তাম্বুলে সৌদি কনসুলেটে জামালের উপস্থিতির সময়ে তাদের সাথে আলোচনা হয়েছিল, তবে সে সময় ঝগড়া ও হইচইপূর্ণ মারামারিও হয়েছিল, তার ফলেই জামাল খাশোগির মৃত্যু ঘটে”।

প্রথমত, এটা মানা কঠিন যে, এটা ‘আইনি’ ডকুমেন্ট। শুধু তাই না। এটা একটা দায়ীত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য। রাষ্ট্রের একটা সর্বোচ্চ আইনি অফিস যারা পেশাদারভাবে রাষ্ট্রীয় মামলা পরিচালনা করার দায়িত্বে, তারা এ ভাষায় বর্ণনা দিতে পারেন না। দুটা নাদান বালকের ঝগড়ার বর্ণনাও আপনাতেই এর থেকে ভালো আইনি ভিত্তিতে সম্পন্ন হবে। যেমন, এখানে বলা হচ্ছে না যে কাদের সাথে জামাল খাশোগির “আলোচনা” হয়েছিল  – কারা তারা, কী পরিচয়, যাদের সাথে জামালের কথিত এরপরে ‘quarrel and a brawl’ ঘটেছে? এই বিবৃতি বলছে, “যাদের সাথে” জামালের “কথা হয়েছে”। তাদের নাম ঠিকানা কিছুই না দিয়ে এসব কথা বলার অর্থ পিপির অফিস নিজেই অপরাধীর পরিচয় লুকানোর দায়ে অভিযুক্ত হবার কথা।

দ্বিতীয়ত, বলা হচ্ছে জামালের সাথে ঐ ভিলেনদের “আলোচনা হচ্ছিল”। কিন্তু আলোচনা- ঝগড়া- হইচইপূর্ণ মারামারি, এভাবে একটা ঘটনাক্রম কল্পনা করা অসম্ভব। কারণ জামাল সেখানে একেবারেই একা ছিলেন। ফলে একা জামাল পনেরজন প্রতিপক্ষের সাথে ঝগড়া মারামারি করতে কেন যাবে? বরং এটাই স্বাভাবিক  ‘বহুজনের’ সাথে ‘বিশেষ ধরনের আলোচনার’ আর পরিণামে জামালের মৃত্যু হয়েছে – একথা বলার সোজা মনে হলেও ওই “বহুজন” ব্যক্তিবর্গই হত্যাকারী। কিন্তু এই সত্যের দিকে পিপি অফিসের আগ্রহ নেই। রাজপুত্রদের প্রতি বাদশাহী পিপি অফিসের আনুগত্য এতই সীমাহীন।

তৃতীয়ত, দেশের কোনো সরকারি অফিসে কোনো নাগরিক কারও সাথে দেখা করতে গেলে কথাবার্তা থেকে তাতে ঝগড়া বাধবে কেন? আমি চাইলেও সেই কর্তা ঝগড়া করবেন কেন? করতে দিবেন কেন? বড় জোর উনি আমাকে বের করে দিতে পারেন। আর আসলে কিছু করার আগে তিনি আমাকে ওয়ার্নিং দেবেন, এর পরিণতি বলবেন, কেন করবেন, তা ব্যাখ্যা করবেন, কেবল পেশাদার গার্ডদের দিয়ে বের করাবেন এবং তা যতদূর সম্ভব আমাকে স্পর্শ না করেই করবেন। কিন্তু তা না, একটা দূতাবাসের অফিসে একেবারে হইচই করে মারামারি বাধালেন, আর শেষে এমনকি খুন করে ফেললেন? কী সুন্দর! আর এ গল্প বিশ্বাস করল ‘রাষ্ট্রীয় অপরাধ তদন্ত অফিস’?

চতুর্থত, লাশ কই? পাবলিক প্রসিকিউটর অফিসের বিবৃতি থেকে, তাদেরও তা জানার কোনো আগ্রহ আছে বলে দেখা গেল না। অথচ তারা নাকি ‘ক্রিমিনাল অপরাধ তদন্ত’ এর সর্বোচ্চ অফিস!

ঘটনাক্রমে এখানে পাশাপাশি তিনটি রাষ্ট্রের পাবলিক প্রসিকিউটর ও নির্বাহীদের কাজ ও কথার প্রসঙ্গ এসেছে। তারা হলেন, রাজকীয় সৌদি আরব, রিপাবলিক তুরস্ক আর রিপাবলিক আমেরিকা। জামাল সৌদি নাগরিক। কিন্তু নিজ দেশেরই এক কনসুলেটে এসে এমন “আলোচনা” বিপদে পড়ে গেছিলেন যে এর আড়ালে পড়ে করাতে কাটা টুকরায় খুন হয়ে গেলেন। লাশের কথা পিপি বলতে পারছেন না। অথচ এর বিপরীতে, তুরস্ককে দেখুন, বলতে গেলে বিষয়টাকে সিরিয়াস ইস্যু হিসেবে দেখা, তদন্ত আর তথ্য জোগাড়ের কাজ সেটা মূলত তুরস্ক রিপাবলিকই করেছে। অনেকের মনে হতে পারে, তুরস্ক-সৌদি রেষারেষির কারণে এরদোগান অতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তিনি ফায়দা নিতে চান। এমন ভাবনাকারী সবার  এতে যে দিকটা নজর এড়িয়ে গেছে তা হল – রিপাবলিক রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা ও বাধ্যবাধকতা। প্রজাতন্ত্র বা রিপাবলিক রাষ্ট্রের জনগণের কাছে জবাবদিহিতার দায়; নাগরিকের অধিকার রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই দায় পালনে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ।

এরদোগানসহ তুরস্ক রাষ্ট্রের নির্বাহী দায়িত্বের সবাই এই উদ্যোগ না নিলে তারা নিজেরাই বরং অপরাধে অভিযুক্ত হতে যেতেন। আমাদের লক্ষ করতে হবে, তুরস্কের মাটিতে গুম ও খুনের মতো ভয়াবহ অপরাধ ঘটেছে। খুনিরা তুরস্কের বা বিদেশী যেই হোক – এর অপরাধীদের আইনিভাবে (জামাল খাশোগিকে ধরে আনার কথিত হুকুম দেওয়ার মত না)  ধরে আনতে হবে। পরে তাদের আইনি হেফাজতে নিয়ে জামাল খাশোগিকে ধরে আনার কথিত হুকুমদাতা ও সহযোগীদের তুরস্কের আদালতে হাজির করতে এরদোগান ও তার পাবলিক প্রসিকিউটর অফিস আইনগতভাবে বাধ্য। তুরস্ক রাষ্ট্রের আদালত ও জনগণের কাছে তাদের দায়বদ্ধতা আছে। এর ব্যর্তয় হলে, আর যেকোন সংক্ষুব্ধ তুরস্কের নাগরিক তুরস্কের আদালতে নালিশ দিলে এরদোগানসহ নির্বাহী বিভাগের লোকেরা কর্তব্যে অবহেলায় অভিযুক্ত হয়ে যেতে পারেন।

অপর দিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ আমেরিকার নির্বাহীদের দিকে তাকান। স্পষ্ট করেই ট্রাম্প বলছেন, সৌদির কাছে ১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির স্বার্থ আছে। কিন্তু একই নিঃশ্বাসে তাকে বলতে হচ্ছে, এটা ‘খুনি মিথ্যুকের (rogue killers) কাজ’ এবং এর “পরিণতি হবে ভয়াবহ”। সিনেটর বা কংগ্রেস সদস্যরা খোলাখুলি অন ক্যামেরা প্রেসিডেন্টকে পদক্ষেপ নিতে আহ্বান রাখছেন, “নইলে তারাই উদ্যোগ নেবেন” বলতে হচ্ছে। একজন মিথ্যুক ও খুনির সাথে রাষ্ট্রের কোনো নির্বাহী বা জনপ্রতিনিধি বৈঠক করেছেন, যোগাযোগ রেখেছেন – এটা কিছুতেই তারা ঘটতে, গোপনে ঘটাতে বা দেখাতে চান না। আমেরিকা রাষ্ট্রের অপকর্মের শেষ নেই, একথা খুবই ঠিক। এরপরেও তার কিছু মূল্যবোধ আছে, যা লঙ্ঘন করলে কারো কেরিয়ার শেষ হয়ে যেতে পারে। নিজ সমাজে সকলের সাথে এক টেবিলে বসার অপাঙেক্তেয় মানে অনুপযুক্ত হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ সকলে আপনাকে রেখে ঐ ঘর বা টেবিল ত্যাগ করবে। পশ্চিমের বিশেষ করে আমেরিকান সমাজে খুব করা আর প্রমাণিত মিথ্যা বলা – এধরণের অমার্জণীয় কৃত অপরাধ।  এগুলো সবই মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রের মূল্যবোধ বা সংক্ষেপে মর্ডান মূল্যবোধ ও এর ক্ষমতা।

দেখা যাচ্ছে, রাজতন্ত্রে আসলে শান্তিতে একটু খুন হয়ে যাবেন সেই সুযোগও নেই। কারণ বাদশা ব্যক্তিগত  প্রতিহিংসা পূরণ করতে আপনার আঙুল কেটে নিয়ে যেতে পারে।

সামগ্রিকভাবে না দেখায়, সৌদি ঘটনা তত বড় নয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এটা সৌদি ডায়নেস্টির সমাপ্তিসহ মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ম্যাপ, নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি করতে পারে – আরো বড় বিষয় হবে স্থায়ী অস্থিতিশীলতা।

সর্বশেষ গতকালের ঘটনা –  বিশেষ করে এরদোগানের আমেরিকা, বৃটিশ, ফ্রান্স ও জর্মানির কাছে খুনিদের কথোপকথনের টেপ শুনার জন্য পাঠিয়ে দেয়া – এর প্রতিক্রিয়া হবে মারাত্মক। চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প বিরাট চাপের সম্মুখিন হচ্ছেন। আর সেই চাপ সামলাতে না পেরে তিনি সৌদিয়াওরবের বিরুদ্ধে কঠোর একশনে যাচ্ছেন দেখলে অবাক হবেন না। এই সরকার প্রধানেরা এখন দায়বাধ্য হয়ে গেলেন টেপ হাতে পাওয়া ও শোনার পর আইনি ও কূটনৈতিক ব্যবস্থা নিতে। কারণ, তারা কেউ বাদশা-আমির বা রাজপুত্র নন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ১১ নভেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) “জামাল খাশোগিঃ একজন নাগরিকের দুর্ভাগ্য  – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

মধ্যপ্রাচ্য এখন প্রিন্সদের কর্তৃত্বে, রাজতন্ত্রের সমাপ্তি কি আসন্ন

মধ্যপ্রাচ্য এখন প্রিন্সদের কর্তৃত্বে, রাজতন্ত্রের সমাপ্তি কী আসন্ন

গৌতম দাস

০৮ আগষ্ট ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2h3

 

ইউরোপের রাজতন্ত্রের (monarchy) শেষ যুগের দিকের এক ঘটনা হল, প্রিন্সরা ক্ষমতা ও রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল, বিশেষ করে রেনেসাঁস (1350-1700) যুগের প্রিন্সেরা। বলা বাহুল্য রেনেসাঁস পিতার চেয়ে পুত্রকেই বেশি প্রভাবিত করবে। তাই পুত্রের সঙ্গে পিতার প্রায়শ তাদের দৃষ্টিভঙ্গীর ভিন্নতার কারণ  অথবা তাঁরা ‘ভাল বুঝে’ বলে অনেক মুরব্বিরা জায়গা ছেঁড়ে দেয়া – এসব থেকেই তারা নতুন ভিত্তির ক্ষমতা তৈরি করতে শুরু করেছিল। ইউরোপের রাষ্ট্রচিন্তার ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হলঃ বিখ্যাত ‘ওয়েষ্টফেলিয়া চুক্তি ১৬৪৮’;  যা সম্পন্ন হওয়ার ক্ষেত্রে প্রিন্সদের এক বড় ইতিবাচক ভুমিকা ছিল।  যদিও এই চুক্তি পরে রাজতন্ত্রের অবসানেই বেশি ভুমিকা রেখেছিল। আর প্রিন্সরা রেনেসাঁসের সমর্থক হয়েও রাজতন্ত্র টিকাতে পারে নাই, বিলুপ্তই হয়ে গিয়েছিল। আর একালের মধ্যপ্রাচ্য কোন রেনেসাঁসের কাল না হলেও, গুরুত্বপুর্ণ হল তারা পশ্চিমের “ওয়ার অন টেররের” কালে পড়েছে। তাই একালে মধ্যপ্রাচ্যের প্রিন্সরা তাদের সক্ষমতা যার যাই থাকুক রাজনীতি ও ক্ষমতা বিষয়ে তারা এখন খুবই সক্রিয়।  তাদের এই সক্রিয়তা কী শেষ পর্যন্ত আসলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজতন্ত্রের অবসানের ইঙ্গিত বয়ে নিয়ে আসছে? এমনই কিছু বিষয় পরীক্ষা করব এখানে।

সৌদি আরবের বর্তমান বাদশা হলেন সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদ, সংক্ষেপে সালমান। আর গত ২০ জুন ২০১৭ সালের আগে পর্যন্ত তাঁর উত্তরসুরি বাদশা হিসাবে ঘোষিত ক্রাউন প্রিন্স ছিলেন মোহম্মদ বিন নায়েফ। কিন্তু গত ২১ জুন সকালে সৌদি আরবসহ সারা দুনিয়া জানতে পারে যে উত্তরসুরি বাদশা হিসাবে ক্রাউন প্রিন্সের নাম বদল করা হয়েছে।  আগের ঘোষিত ক্রাউন প্রিন্স  মোহম্মদ বিন নায়েফ ছিলেন বাদশা সালমানের ভাইয়ের ছেলে। তার বদলে এখন উত্তরসুরি ক্রাউন প্রিন্স হয়েছেন মাত্র ৩১ বছর বয়সের মোহম্মদ বিল সালমান, (এখন থেকে এখানে সংক্ষেপে মোহম্মদ লিখা হবে), যিনি বর্তমান বাদশা সালমান এর আপন বড় ছেলে। এমনিতেই তিনি আগে (২০১৫ সালে বাদশা সালমান ক্ষমতাসীন হবাব সময় থেকেই) থেকেই ছিলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। এবং একই সঙ্গে তিনি ক্ষমতাবান সৌদি ইকনমিক কাউন্সিলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তা যে সংগঠনের প্রধান কাজ হল অধীনস্থ ‘সৌদি আরামকো’ দেখাশুনা করা। সৌদি আরবের সব তেলের মালিকানা যে রাজকীয় কোম্পানীর অধীনে তার নাম ‘সৌদি আরামকো’। সৌদি ট্রাডিশন অনুসারে চলতি বাদশা জীবিত থাকতেই, তিনি মারা গেলে পরের  বাদশা কে হবেন সেই, উত্তরসুরির নাম আগেই ঘোষিত করা থাকে। তিনিই ‘ক্রাউন প্রিন্স’ নামে ভুষিত হন। সে হিসাবে নায়েফের নাম ক্রাউন প্রিন্স হিসাবে ঘোষিতই ছিল। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে মধ্য টার্মে নতুন উত্তরসুরি হিসাবে বড় ছেলে মোহম্মদ বিন সালমান বা মোহম্মদ এর নাম ঘোষিত হল।

কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে এটা কী একেবারেই স্বাভাবিক ঘটনা, না কী আসলে এটা একটা প্রাসাদ আভ্যন্তরীণ, রক্তপাতহীন ক্যু। কারণ এই ঘটনার সাতদিন পর ২৮ জুন আমেরিকার নিউ ইয়র্ক টাইমস এক রিপোর্ট প্রকাশ করে যে এটা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। সেখানে বলা হয় ঐ ক্রাউন প্রিন্সের নাম বদলের পর থেকেই প্রিন্স নায়েফকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। প্রাসাদ থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না, ভিতরেরও তার নড়াচড়া সীমিত। টাইমসে এই খবরের উৎস হিসাবে বলা হয়েছিল রাজপরিবারের সাথে আগের বা বর্তমান আমেরিকান প্রশাসনের সম্পর্ক বা বন্ধুত্ত্ব আছে এমন চারজন আমেরিকান অফিসার এদের কাছ থেকে তারা পেয়েছেন। এই খবরের তিন সপ্তাহ পরে ১৮ জুলাই, নিউ ইয়র্ক টাইমস আবার আরও বিস্তারিত এবং খোলাখুলি রিপোর্ট করে জানায় যে ওটা আসলে এক রক্তপাতহীন ক্যু ছিল। ঐ খবরের শিরোনাম ছিল, “প্রতিদ্বন্দ্বিকে সরানোর জন্য সৌদি বাদশার ছেলের ষড়যন্ত্রের প্লট”। কীভাবে জোর করে ক্রাউন প্রিন্স নায়েফের (নায়েফ ও মোহম্মদ পরস্পর কাজিন) পদবি কেড়ে নেওয়া মেনে নিতে নাইফকে বাধ্য করা হয়, কেন তিনি চাপের মুখে রাজি হয়েছিলেন সে রাতের দীর্ঘ ও বিস্তারিত বর্ণনাও সেখানে দেয়া হয়।

কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা নিউ ইয়র্ক টাইমসের ঐ রিপোর্টে সিআইএর প্রসঙ্গ প্রথম আসে; পাঠককে জানানো হয় যে,এই পরিবর্তনে সিআইএ ‘খুবই অখুশি’। কেন? এর অনেক কারণ। তবে সেসব ঘটনার মূল প্রসঙ্গ হল ‘সন্ত্রাসবাদ’; অর্থাৎ আমেরিকা সন্ত্রাসবাদ বলতে যা বুঝে তাই। আমেরিকা ও সৌদি আরবের মধ্যে সম্পর্কের শুরু সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকে। তবে সেসময় সম্পর্কের ক্ষেত্র হয়েছিল জ্বালানি তেল (মানে আমেরিকা তেলের ভোক্তা আর সৌদিরা এর সরবরাহকারী), যেটা এখন আর তেমন ইস্যু নয়। কারণ মূলত আমেরিকার নিজেরই বিকল্প তেলের (fracking shale oil) উৎস পাওয়া গেছে প্রচুর। এ ছাড়া, গ্লোবাল ইকোনমিতে তেলের চাহিদা মারাত্মকভাবে পড়ে গেছে এবং দাম কমে গেছে। কিন্তু আমেরিকা ও সৌদি আরবের  সম্পর্কের মধ্যে আগের মতই প্রায় সমান গুরুত্বের জায়গা এখন  নিয়ে আছে, টেররিজম বা সন্ত্রাসবাদ। এই ইস্যুতে বিশেষ করে নাইন-ইলেভেনের পর থেকে, আমেরিকার একাজে খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার করার দরকার হয়ে উঠেছে সৌদি আরবকে। অপসারিত প্রিন্স নায়েফ অবশ্য ছিলেন সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। আর তা থাকলেও, আমেরিকার কাছে তিনি ছিলেন খুব গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু।  মধ্যপ্রাচ্য কাউন্টার-টেররিজমে আমেরিকার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মূল ব্যক্তিত্ব, আমেরিকার ভাষায় মূল ‘কনট্রাক্ট’ ছিলেন তিনি। কাউন্টার-টেররিজম মানে যাকে টেররিজম বলা হচ্ছে, ঠিক তার কায়দায় পাল্টা টেররাইজ বা সন্ত্রাস সৃষ্টি করে সব ভণ্ডুল করে দেয়া।  নায়েফকে আমেরিকা বহুবার কাউন্টার টেররিজম তৎপরতা প্রসঙ্গে নিজ দেশে নিয়ে ট্রেনিং দিয়ে এনেছে। আর শুধু তাই নয়, শুধু সৌদি আরবেও নয়, সারা মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার নানাবিধ কর্ম-পরিকল্পনায় আমেরিকা তাকে অংশীদার করে রেখেছিল, একসাথে কাজ করেছিল। সারকথায়, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কাউন্টার-টেররিজম প্রোগ্রামের মূল ‘কনট্রাক্ট’ ছিলেন তিনি। নায়েফকে আমেরিকা এভাবেই গড়ে তুলেছিল। ফলে সেই নায়েফকে এখন সরিয়ে দেয়াতে সিআইএ মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে কথা তারা হোয়াইট হাউজে রিপোর্ট করে বলেছে বলে নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্ট আমাদের জানিয়েছে। এছাড়া আরও আছে।

টাইমসের বর্ণনা অনুযায়ী নিউ ইয়র্কের একজন আমেরিকান অফিসিয়াল ও সৌদিরাজের একজন পরামর্শকের মতে, কাতারের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বে যে  অবরোধ আরোপ করা হয়েছে, প্রিন্স নায়েফ আসলে  এর বিরোধী ছিলেন। এটাও তাঁকে অপসারণের একটা কারণ। এ ছাড়া সিআইএ’র সংক্ষুব্ধ হওয়ার আর একটা বড় কারণ হল, নায়েফের সাথে তার অনুগত বহু সৌদি সিভিল এবং সামরিক অফিসার যাদের কাউন্টার টেররিজমের ট্রেনিং দিয়ে আমেরিকা একটা ওয়ার্কিং গ্রুপ বানিয়েছিল, নায়েফের অপসারণের সাথে সাথে তাদেরকেও চাকরিচ্যুত বা বন্দী করে রাখা হয়েছে। যেমন, নায়েফের খুবই ঘনিষ্ঠ সামরিক জেনারেল আবদুল আজিজ আলহুয়াইরিনিও বন্দী হয়ে আছেন।

এ তো গেল আমেরিকার তরফে খবর। কোল্ড ওয়ারের আমল থেকে সোভিয়েত ইনটেলিজেন্স সিআইএ এর পালটা দুনিয়ার সব জায়গাতেই ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সাথে সাথে সেই অবকাঠামোর অনেকটাই ভেঙে গিয়েছিল, উত্তরসূরি রাশিয়া এর পরিচালনা খরচ আর জোগাতে না পারার কারণে। কিন্তু পুতিনের আমলে সেগুলো আবার খাড়া করা হয়েছে, আর পুতিন সেগুলোকে নিজের পক্ষে ব্যবহার করেছেন। অথবা অন্যের কাছে নানা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে ইনটেলিজেন্স বিক্রি অথবা অন্য রাষ্ট্রের সাথে শেয়ার করে, অনেক সময় নিজ বহু স্বার্থ উদ্ধার করেছেন। যেমন গত বছর তুরস্কে, ‘গুলেন পার্টি’ আমেরিকায় ও তুরস্কে বসে এরদোগানের বিরুদ্ধে কী কী ষড়যন্ত্র করেছিল, আর আমেরিকারইবা তাতে কী ভূমিকা ছিল সেই সব ইনটেলিজেন্স পুতিন এরদোগানকে জানিয়েছিলেন। এতে করে এরদোগানের আস্থা অর্জন করে পুতিন তুরস্কের সাথে রাশিয়ার আগে ভেঙে থেকে যাওয়া বাণিজ্যিক সম্পর্ক পুনরায় চালু করেছিলেন। তবে পুতিনের রাশিয়ার সংগৃহীত ইনটেলিজেন্স বিক্রি বা শেয়ার বহুভাবেই করা হয়ে থাকে, এমনকি অনেক সময় তা পুতিনের প্রপাগান্ডায়ও ব্যবহার করা হয় ও হয়েছে। আবার অনেক সময় কোন ইস্যুতে এক পাল্টা মিডিয়া রিপোর্ট করে দেয়া হয়, বাজারে ফ্যাক্টস জানিয়ে দেয়ার জন্য। এমন এক ব্রাজিলিয়ান সাংবাদিক, আমেরিকাবিরোধী এবং আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত, কলাম লেখক হলেন পেপ এস্কোবার। তবে তিনি রাশিয়ার দিকে তাকিয়ে অনেক সময় ভাষ্য তৈরি করেন। যদিও এতে আমাদের মত পাঠকের সুবিধা হল, যেহেতু রাশিয়ান ইনটেলিজেন্সে ঘনিষ্ঠতা থাকায় তিনি নিজে সংগৃহীত ইনটেলিজেন্স পেতে বা দেখতে তার একসেস আছে, তিনি জানতে পারেন আর তা তিনি লেখায় শেয়ার করেন, ফলে তার লেখা পাঠ করায় আমরা মেন-স্ট্রিমের বিপরীত বহু তথ্য ও ভাষ্য পেয়ে থাকি।

সৌদি আরবের এ ঘটনায় এস্কোবার দুটো রিপোর্ট লিখেছেন। একটি রাশিয়ান স্পুটনিক পত্রিকা, অন্যটি সিঙ্গাপুর থেকে প্রকাশিত সিরিয়াস পত্রিকা ‘এশিয়া টাইমস’-এ। সৌদি আরবের ইস্যুতে প্রায় একই ধরনের রিপোর্ট তিনি লিখেছেন দুজায়গাতেই;কথিত ‘প্রাসাদ ক্যু’র রদবদলের চার দিনের মাথায় ২৪ জুন স্পুটনিকে। আর ‘এশিয়ান টাইমসে’ লিখেছিলেন প্রায় এক মাস পরে ২০ জুলাই

ওদিকে প্রকাশিত বিদেশি প্রায় সব মিডিয়া ভাষ্যে নতুন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান চিত্রিত হয়েছেন একজন কম বয়সী, বেপরোয়া, দায়িত্বজ্ঞানহীন, উচ্চাভিলাষী, হামবড়াভাবের মানুষ ইত্যাদি হিসেবে। এসবের ভিতর তাদের মূল অভিযোগ হল,  তিনি কাজের গুরুত্ব ও দায়দায়িত্ব না বুঝেই সব কাজে মধ্যমণি থাকতে চান। সেদিকে ইঙ্গিত করে তাই,  গ্লোবাল বিনিয়োগ জগতের গুরুত্বপূর্ণ টিভি ও অনলাইন মিডিয়া ‘ব্লুমবার্গ’(Bloomberg) তার নাম দিয়েছে ‘মি. এভরিথিং’

এস্কোবার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করে দাবি করেছেন যে, সিআইএ নায়েফের অপসারণে প্রচণ্ড অসন্তুষ্ট। কারণ তারা মনে করে নতুন ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ নিজেই ‘টেররিজম স্পন্সর’ করেন। দাবি করা হচ্ছে আল-নুসরা সংগঠনের সাথে তিনি সম্পর্ক রেখেছেন। আর এসব কারণে,গত এপ্রিল ২০১৪ সালে টেররিজম ইস্যুতে আমেরিকার সিআইএ সৌদি আরব ও আমিরাতের (বিশেষ করে আবুধাবির প্রিন্স জায়েদ, তিনি মোহাম্মদের মেন্টর/বড়ভাই বলে কথিত আছে) ক্ষমতাসীনদের ওপর প্রচণ্ড নাখোস হয়ে পড়েছিল। এমনকি তাদের অপসারণের কথা পর্যন্ত ভেবেছিল। পরে এক আপস ফর্মুলায় সাব্যস্ত হয় যে, বাদশা বদল করে নায়েফকে ক্ষমতায় এনে এর সমাপ্তি টানা হবে। এস্কোবার তার ইনটেলিজেন্স সোর্সকে উদ্ধৃত করে দাবি করেছেন, ওই ফর্মুলা সাব্যস্ত হওয়ার আগে আমেরিকা বা সিআইএ একপর্যায়ে সৌদি বাদশাহ’র বিরুদ্ধে নাকি আমেরিকান সৈন্য পাঠানোর কথাও ভেবেছিল। এটা ভাবার কারণ আছে যে, ওই ফর্মুলাটাই প্রিন্স মোহাম্মদ ও তার বাবা বাদশাহ সালমানকে আরো মরিয়া হতে উৎসাহিত করেছিল। ইতোমধ্যে খবর বেরিয়েছে, প্রিন্স মোহাম্মদ ও আবুধাবির প্রিন্স জায়েদ মিলে ভাড়াটে আমেরিকান সৈন্য (ব্ল্যাকওয়াটার) দিয়ে কাতারের তরুণ আমির শেখ তামিম আল থানিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এটা সিআইএ নাকি টের পেয়ে ভণ্ডুল করে দিতে সমর্থ হয়। কিন্তু তাতে ক্ষুব্ধ হয়ে প্রিন্স মোহাম্মদ ও বাদশাহ সালমান সিআইএ ’র পছন্দের হবু বাদশা নায়েফকেই সরিয়ে ফেলে দিতে সক্ষম হলেন। এটাই হল এস্কোবারের ব্যাখ্যা।

এসব ব্যাখ্যা হয়ত সবটা সত্যি নয়,কিন্তু ফেলনাও নয়। নয়। গত ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের দুই তারিখে জার্মান ইন্টেলিজেন্স এর বরাতে লন্ডন টেলিগ্রাফ এক রিপোর্ট ছেপেছিল।  শিরোনাম ছিল ‘সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলছে’। সেখানে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদের নাম ও ছবিসহ উল্লেখ করে, তাকে এক মহা ‘গ্যাম্বলার’, বিপজ্জনক ব্যক্তি ও ব্যক্তিত্ব হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছিল যে, সিরিয়াতে আলকায়েদার সাথে সম্পর্ক রয়েছে তাঁর। সৌদি আরবকে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা আনার জন্য দোষারোপ করা হয়েছিল। এস্কোবার বলছেন, আসলে এই অভিযোগটাই পরে কাতার অবরোধের সময় সৌদি আরব ও অন্যরা কাতারের বিরুদ্ধে তুলেছিল। অথচ  এই অভিযোগের সবটাই আসলে সৌদি বাদশাহ ও বর্তমান ক্রাউন প্রিন্সের বিরুদ্ধে এনেছিল সিআইএ এবং জার্মান ইনটেলিজেন্স।

লেখকঃ রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৬ আগষ্ট ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। এছাড়া আর একটা ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকাতেও ০৭ আগষ্ট ২০১৭ তারিখে ছাপা হয়েছিল।   পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]