ট্রাম্পকে ভারতের একপক্ষীয় প্রেম, ইরানকে বলি

ট্রাম্পকে ভারতের একপক্ষীয় প্রেমে, ইরানকে বলি

গৌতম দাস

১০ জুন ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2AX

 

Strait of Hormuz

ইরানের উপর আমেরিকান অবরোধ [Iran Sanctions] আরোপ করে রাখায় মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক উপসাগরগুলোতে বিশেষ করে চিকন হয়ে আসা ইরানের সমুদ্রসীমায় হরমুজ প্রণালি এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ছে।

বাংলায় ‘খুঁচিয়ে ঘা করার’ একটা প্রবাদ আছে। এর সফল উদাহরণ হল সম্ভবত, ট্রাম্পের আমলে আমেরিকা-ইরানের সম্পর্কের হাল অবস্থা। এমনিতেই ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে জন্ম নেয়া নতুন ইরান, জন্ম থেকেই কঠোরভাবে আমেরিকাবিরোধী। এটা ফ্যাশন বা গতানুগতিক ঘটনা নয়, বরং অনিবার্য।  আমেরিকার স্ব-স্বীকারোক্তির ঘটনা হল সিআইএ এর হস্তক্ষেপে ১৯৫৩ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার  ঘটনা তারা ঘটিয়েছে। আর সেসময় থেকে ইরান আমেরিকানদের দখল কব্জায়, পাপেট শাসনে ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লবের আগে পর্যন্ত। তাই ১৯৭৯ সালে আমেরিকাবিরোধীতা ছিল অনিবার্য। আর সেখানে  এসে এটাই প্রমাণ যে, ইরান তখন সত্যি প্রথম ‘স্বাধীন’ হয়েছিল। ১৯৭৯ সালের বিপ্লব প্রমাণ করেছিল ইরানিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, একমাত্র তারাই নিজেকে শাসন করার বৈধ অধিকারী। বলা যায়, ১৯৫৩ সালের আমেরিকা সিআইএ পাঠিয়ে ইরানে হস্তক্ষেপের পরে এর সফল জবাব ছিল ১৯৭৯ সালের আয়াতুল্লাহ খোমেনির ‘ইসলামি বিপ্লব’।

নাইন-ইলেভেনের পর আমেরিকা আফগানিস্তান ও ইরাকে হামলা ও দখল করে। এতে ক্ষমতাসীন সরকারগুলোকে ক্ষমতাচ্যুত করে পুতুল সরকার বসানোর পরও ইরানের সাথে মার্কিন সম্পর্কে এতে বড় রকমের কোন হেরফের হয়নি। ইতোমধ্যে ২০০৯ সালে ওবামা আমেরিকায় ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ সালের মধ্যে ইরাক থেকে সম্পূর্ণ আর আফগানিস্তান থেকে ১০ হাজার রেখে বাকি সব আমেরিকান সৈন্য ফিরিয়ে আনেন। সেটা আমেরিকার ‘টেররিজমের’ যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জন হয়েছে সেজন্য নয়, বরং যুদ্ধ শেষের কোনো লক্ষণ নেই। এর চেয়ে বড় কথা, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মত অর্থনৈতিক সামর্থ্য আমেরিকা-রাষ্ট্রের আর নেই। পরে আবার আইএস এর সিরিয়ায় ততপরতা তুঙ্গে উঠার আমলে ওরা  সেখান থেকে আবার ফিরে ইরাকে শক্ত অবস্থান নিলে ওবামা সেই বিপদে পড়ে যে করণীয় ঠিক করেছিলেন, সেটাই প্রথম আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের শুরু বলা যায়। ব্যাপারটা ছিল এই যে ইরাকে আইএসের উপস্থিতি ঠেকাতে হলে ওবামাকে আবার ইরাকে আমেরিকান সৈন্য পাঠাতে হত, অথচ ওবামার রাষ্ট্র সেই খরচ যোগাতে পারার অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সামর্থ্য ছিল না। তাই এর বিকল্প হিসেবে আমেরিকান যুদ্ধবিমানের সহায়তা ও সমর্থন নিয়ে নিচে মাঠে আইএস উৎখাতের সে কাজ ইরান করে দিতে পারে। এই শর্তে এবং ইরানের ‘পারমাণবিক বোমা’ বিষয়ক তৎপরতা জাতিসঙ্ঘের নজরদারিতে স্থগিত রাখা হবে, এই শর্তে সে সময় আমেরিকা-ইরান সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি হয়েছিল। জাতিসঙ্ঘ ও ইউরোপীয় নেতা দেশগুলো মিলে (পি৫+১) সবার স্বাক্ষরে তা সম্পন্ন হয়েছিল।

তাতে অবরোধ উঠে যাওয়াতে এই প্রথম ইরান আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মূল ধারায় বিনা বাধায় তৎপর হয়ে যায়। কিন্তু এতে সবচেয়ে অখুশি হয়েছিল ইসরাইল। ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করার পরও ইসরাইলের এই অখুশির মূল কারণ, তেল বিক্রিসহ ইরানের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য লেনদেনের মূল ধারায় ফিরে আসা। আর তাতে ব্যাপক অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করে ফেলা। তাই ওবামার আমলে প্রথম গড়ে ওঠা, আমেরিকা-ইরানের গঠনমূলক সম্পর্ককে মূলত জায়নিস্ট ইসরাইলের স্বার্থে ও আগ্রহে এবং সুনির্দিষ্ট কোন আমেরিকান স্বার্থ ছাড়াই ট্রাম্প তা ভেঙে দেন। এটাই ট্রাম্পের সেই ‘খুঁচিয়ে ঘা করা’। একটা সুস্থ শরীর, ক্ষতশুণ্য। কিন্তু তাকে খুঁচিয়ে রক্তাক্ত ক্ষত তৈরি করে এরপর সেই ক্ষতকে পঁচানোর মত ঘটনা ঘটানো, এটাই ট্রাম্পের কাজ। ভিন্নরাষ্ট্র ইসরাইলের স্বার্থে নিজ রাষ্ট্র আমেরিকাকে বিপদে ফেলা এবং এক আমেরিকান প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের উদাহরণ হিসেবে এটা থেকে যাবে।

গত ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরাইল শেষ যুদ্ধের পর আরবেরা ‘তেল অবরোধ’ [OIL Embargo 1973] করেছিল।  এমনিতেই যুদ্ধে হেরেছিল, ফলে সে যুদ্ধের খরচের ভার তো আছেই। আবার আরবদের প্রায় সব সদস্য রাষ্ট্রই যেখানে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা বলতে তেল বিক্রি বুঝে, এমন অর্থনীতির দেশ। তাই ‘তেল অবরোধ’ মানে, পশ্চিমাদের কাছে তেল বেচব না বললে তা সবার আগে নিজেদেরই সমস্যায় ফেলা হয়ে যায়। পশ্চিমা সভ্যতার অর্থনীতি মাটির নিচে পাওয়া ফসিল জ্বালানির ওপরে দাঁড়ানো, এর চাকা ঘুরছে ঐ জ্বালানি ব্যবহার করে। ঐ তেল অবরোধে পরে তা এই প্রথম প্রবল জোরে এক ঝাঁকুনিসহ ধাক্কা খেয়েছিল।তিন ডলার ব্যরেলের তেল পাঁচ মাসের মধ্যে চারগুণ হয়ে গেছিল। তবুও ওই অবরোধের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল আরো মারাত্মক, যেটা “কিসিঞ্জারের মিডলইস্ট পলিসি ১৯৭৩” বলে খ্যাত। এর মূল দিকটি হল, সৌদিদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বানানো। স্বীয় সংকীর্ণ স্বার্থ রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে আমেরিকান প্রটেকশন পাওয়ার বিনিময়ে তারা আমেরিকানদের তেল পাওয়া নিশ্চিত করবে। ফলে ঐক্যবদ্ধ আরব হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি হল। এরকমই আরেক তৎপরতার নাম হল, ইসরাইলকে আরবের বিরুদ্ধে সক্রিয়তায় খাঁড়া করে ও তৎপর রেখে আরবদের শায়েস্তা করা। এরই আর এক অংশ হল ক্যাম্পডেভিড চুক্তি, যাতে মিসরকে ইসরাইলের সীমান্ত প্রহরীর ভূমিকায় বসানো হয়েছে।

কিন্তু অবস্থা এখন আর সে একই জায়গায় নাই, একালে যখন আমেরিকা নিজেই এখন তেল রফতানিকারক দেশ হয়েছে। মার্কিন [Fracking] অয়েল আর সৌদি ফসিল ফুয়েল তেলবাজারে প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। মার্কিন ফ্রেকিং অয়েলের অসুবিধা হল এর উৎপাদন (কোমল শিলা [Shale] থেকে পিষে তেল বের করার) খরচ বেশি। ফলে তেলের দাম ৫০ ডলারের নিচে চলে গেলে এটা লস প্রজেক্ট। তাই দাম কমিয়ে দিয়ে সৌদিরা ফ্রেকিং পদ্ধতিতে পাওয়া অয়েলকে চাপে ফেলে বাজার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। অতএব, এই যুগে আমেরিকা-সৌদি বন্ধন আর পুরনো ‘কিসিঞ্জারের মিডলইস্ট পলিসি’ দিয়ে আটকানো নয়; বরং সৌদিরাই নিজ স্বার্থে আমেরিকানির্ভর। কাজেই ওবামার তৈরি করা ইরান-আমেরিকা পারমাণবিক সমঝোতা চুক্তি থেকে আমেরিকাকে ট্রাম্পের এককভাবে বের করে আনার পক্ষে একালে আমেরিকার সুনির্দিষ্ট কোনো স্বার্থ নেই, ইসরাইলের স্বার্থ ছাড়া।

আবার ইসরাইল অথবা ইরান একে অপরকে এখনই একেবারে ধ্বংস করে ফেলতে চলেছে এবং ব্যাপারটা একেবারে আসন্ন বাস্তবে এমন কিছুই হাজির নাই। বাস্তবতা এমন না ফলে ইসরায়েলের এমন কোনো স্বার্থ নেই। হ্যাঁ, পারস্পরিক বৈরিতা অবশ্যই আছে, তবে তা রুটিন ধরনের। ফলে শেষ বিচারে ইরানের সাথে চুক্তি ভাঙার পক্ষে ট্রাম্প অথবা তার ইহুদি জামাইয়ের ব্যক্তিগত লাভালাভ ছাড়া আমেরিকার সিদ্ধান্তের পক্ষে আর কোনো যুক্তি নেই।

মজার কথা হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো সদস্য কেউ অথবা জাতিসঙ্ঘের কাছেও – যারা ওই পারমাণবিক চুক্তির স্বাক্ষরকারী একপক্ষ – তাদের কারও কাছেই ট্রাম্প নিজের ইরানের সাথে চুক্তি ভাঙার পক্ষের সাফাই প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।

এছাড়া, ট্রাম্প এবার শুধু আমেরিকাকে চুক্তি থেকে সরিয়ে এনেছেন তাই নয়, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধও আরোপ করেছেন। ট্রাম্পের এই আমলে অবরোধ আরোপ করা হচ্ছে যথেচ্ছাচারে। কাউকে অপছন্দ হলেই অবরোধ। এই অবরোধ কথার ব্যবহারিক অর্থ হল, অবরোধ আরোপ করা হয় যে রাষ্ট্রের উপর, সে রাষ্ট্র আর আমদানি-রপ্তানিতে আমেরিকান ডলারে কোন পণ্য কাউকে বিক্রি বা কারও থেকে কেনা – কোনটাই করতে পারবে না। কেন আমেরিকার পক্ষে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব? কারণ, ইনভয়েসে ডলারে পণ্যমূল্য লেখা থাকলে সেই মূল্য নগদায়ন করতে কোনো-না-কোনো পর্যায়ে যেকোনো এলসি খোলা ব্যাংকের একটা আমেরিকান ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু কোনো আমেরিকান ব্যাংক এখন আর নিজে সে সার্ভিস দিতে চায় না। কারণ, অবরোধ আরোপের পরে কোনো আমেরিকান ব্যাংক তা উপেক্ষা করলে, সেই ব্যাংককে নিকট অতীতে ট্রাম্প প্রশাসন বিলিয়ন ডলারের জরিমানা করে তা আদায় করেছে।

আমেরিকান ডলারকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে লেনদেন বিনিময়ের একমাত্র মুদ্রা হিসেবে অনুমোদন দিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থা, মানে ১৯৪৪ সালের [Bretton Woods System] আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা শুরু করা হয়েছিল। এর মূল কারণ ছিল, সেকালে আর কোনো দেশের মুদ্রা বিকল্প হিসেবে পাওয়া যায় নাই। সবারই মুদ্রামান ছিল ত্রুটিপুর্ণ, ফুলিয়ে ফাপানো মানে অবমুল্যায়িত।  অথবা ওই মুদ্রার রাষ্ট্রের নিজস্ব আয়-ব্যয়ে উদ্বৃত্ত নেই, ঘাটতির; ফলে ভরসা করার মতো মুদ্রা তা আর ছিল না। তাই বাধ্য হয়েই একমাত্র আমেরিকান ডলারকেই একমাত্র আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মুদ্রা বলে গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে কেউই সেকালে চিন্তাও করেনি যে, আমেরিকা পড়তি অর্থনীতির রাষ্ট্র হিসাবে এককালে নিজ সঙ্কীর্ণ স্বার্থে অন্য কোন রাষ্ট্রকে বেকায়দায় ফেলতে ডলার-অবরোধ আরোপ করে অন্যায় সুবিধা নেবে।

আসলে দুনিয়ার সব বাণিজ্যের ৭০ শতাংশ এখনো ডলারে সম্পন্ন হচ্ছে বলে সেটাই আমেরিকার জন্য অবরোধ আরোপের বাস্তব সুবিধা হয়ে হাজির হয়েছে। তুলনায় চীনের ইউয়ান ধেয়ে আসতে থাকলেও এর উঠে আসতে এখনও সময় লাগবে। সে পর্যন্ত আমেরিকা অশুভ অর্থনৈতিক মোড়লিপনার শেষ সুবিধা যা পায় ইচ্ছামত তা  খায়ে নিচ্ছে বলা যায়। তবে এবার অন্য কোনো মুদ্রা গৃহীত হলে তাতে সুনির্দিষ্ট করে শর্ত আরোপ করা থাকতে হবে যে, কোনো মুদ্রা আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে গৃহীত হতে হলে সংশ্লিষ্ট সেই রাষ্ট্র নিজ একক স্বার্থে কারও বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করতে পারবে না।

অন্যদিকে, ইরানের উপর এবারের অবরোধে আরেক বিশেষ ব্যতিক্রম হল, অন্যান্য বার অবরোধে চীন ও ভারত রাইজিং অর্থনীতি ও ব্যাপক জনসংখার দেশ বলে ইরানের তেল কিনতে গিয়ে আমেরিকার বিশেষ ছাড় পেয়ে এসেছে। ভারতের তিনটা তেল শোধনাগার ইরানি অশোধিততেল নির্ভর হয়ে  জ্বালানি তেল উতপাদনে আছে। কিন্তু এবার আমেরিকার ট্রম্প প্রশাসন কঠোরভাবে বলে দিয়েছে ১ মে ২০১৯ এরপর থেকে অবরোধ কার্যকর হবে সব রাষ্ট্রের উপর [US Secretary of State Mike Pompeo’s announcement that Washington would no longer issue exemptions from sanctions ………“We are going to zero,” Pompeo said of the waivers, ]। অর্থাৎ ভারতের বেলায়ও ইরানি তেল কেনায় আর কোন ছাড় কার্যকর নয়। অথবা কথাটা এভাবে বলা যায় যে, আমেরিকা থেকে ছাড় আদায় করে নেয়ার জন্য ভারত দরকষাকষিতে নেই অথবা করতে চায়নি। বরং বিনিময়ে আমেরিকা থেকে ভিন্ন কোন সুবিধা পাওয়ার আশা করছে সম্ভবত। অবশ্য চীন ইরানের তেল কেনার চুক্তি অব্যাহত রেখেছে। যদিও এখানেও কোন কেনাবেচায় কোন অবরোধ-ছাড় কার্যকর নয়। তবে চীন-ইরান তেলক্রয় চুক্তিতে  কেবল নতুন একটা শর্তের ধারা যুক্ত হয়েছে তাতে যে, ইরান নিজস্ব বাহনে [National Iranian Tanker Co (NITC) ] করে চীনে তেল পৌঁছে দেবে। বাস্তবত তা অবরোধ না মানার শামিল। এছাড়া গত ২২ এপ্রিলে প্রতিদিনের রেগুলার প্রেস ব্রিফিংয়ে চিনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে,আমেরিকার একপক্ষীয় অবরোধ আরোপের চীন বিরোধী, ইরানের সাথে সাথে চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক (তেল-পণ্য কেনাবেচাসহ) আইনি ভিত্তির উপর দাঁড়ানো  [ Geng Shuang, a Chinese Foreign Ministry spokesman, said at a daily news briefing in Beijing on Monday that it opposed unilateral US sanctions against Iran and that China’s bilateral cooperation with Iran was in accordance with the law.]

তবে ভারতের এই সিদ্ধান্ত বহু কিছুর ইঙ্গিত এবং প্রকাশ্য রূপও বলা যায়। পুরানা ওবামা আমল (২০০৯-২০১৬) বা এর জেরে পুরা ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক মানে ছিল, আমেরিকার ‘চীন ঠেকানোর’ নীতি পালন করে এর বিনিময়ে ভারত আমেরিকা থেকে পণ্য রপ্তানি বাণিজ্যে বা অস্ত্র ক্রয় বিষয়ে নানা সুবিধা আদায়। কিন্তু ট্রাম্প আসার পর থেকে এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে শুকিয়ে গেছে তো বটেই, ২০১৮ সাল থেকে অবস্থা এমন যে, সব সুবিধাপ্রাপ্তিই বন্ধ। আর উল্টো ভারতীয় পণ্যেও ট্রাম্প বাড়তি ট্যারিফ-শুল্ক আরোপ করেছিল। এমনকি এবারের নির্বাচনে মোদী আবার জয়লাভের পরও আমেরিকার খাতায় ‘উন্নয়নশীল দেশ’ ক্যাটাগরি থেকেও ভারতের নাম কেটে দেয়া হয়েছে। কিন্তু ভারতের মনোভাব এখনো একই রকম – “যদি ট্রাম্প সাহেবের মন আবার বদলায়” – মন পাবার সে আশায় তাকিয়ে থাকা। কিন্তু পরিস্কারভাবে ট্রাম্প যেভাবে একপক্ষীয়ভাবে প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছেন, এতে বোঝা যাচ্ছে ২০২১ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত  পুরো আমলেও ট্রাম্পের অনুসৃত নীতিতে কোনো ছেদ পড়ার সম্ভাবনা নেই। তবুও ভারতের একপক্ষীয় প্রেমের সমাপ্তি নেই। এমনকি এদিকে, সাউথ চায়না সি নিয়ে প্রায় সব পড়শিদের সাথে চীনের সমুদ্রসীমা বিতর্কে আমেরিকা এখন অনেকটা গায়ে পড়ে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। নানান মহড়ায় আয়োজন ও তাতে অংশ নিচ্ছে। এই সমুদ্রসীমা বিতর্কে ভারত সেখানে কোন পক্ষ নয়। মানে ভারতের তেমন কোন স্বার্থ না থাকলেও ভারত যৌথ মহড়ায় অংশ নিয়েছে।

ভারতের আচরণে, এসব দেখেশুনে এবার ইরানেরও ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। এপর্যন্ত অবরোধকালে ইরানি তেল কেনার বিনিময়ে ভারত সব সময় মূল্য ছাড় পেয়ে এসেছে। ইরানও ধৈর্যের সাথে তা দিয়ে এসেছে। কিন্তু এবার [১মে ২০১৯ এর পরে] অবস্থা সম্ভবত ভিন্ন, অব্রোধের উছিলায় ভারত তেল কিনতে চাচ্ছে না। তাই, এ নিয়ে মুখোমুখি হতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারত সফরে এসেছিলেন গত মাসে ১৩ মে ২০১৯। ভারতের মিডিয়ায় লিখেছে সে খবর নিয়ে যে তাদের সম্পর্ক [India-IRAN Relation] এখন কোথায়। সেখানে আমরা জানছি, ভারত আর কী কী সুবিধা নিয়েছে ইরানের কাছ থেকে!
ইরানের চাবাহার সমুদ্র উপকূলে অগভীর বন্দর হলেও এই পোর্টে ভারতের স্ট্র্যাটেজিক সুবিধার দিকটি হল, একে ব্যবহার করে ভারত পাকিস্তানের ভূমি বা বন্দর ব্যবহার না করেই আফগানিস্তান বা মধ্য এশিয়ার দেশে পণ্য আনা-নেয়া করতে পারে। এ কারণে এই বন্দরে অংশত বিনিয়োগ ভারতেরও আছে। তবে ‘প্রচারে ওস্তাদ’ ভারত এটাকে গোয়াদর গভীর বন্দরের সমতুল্য বলে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করে থাকে।

ভারতের এক মিডিয়া লিখেছে, ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবারের সফরে চাবাহার পোর্ট নিয়ে ভারতকে পাল্টা চাপ দিয়েছে। an issue that is likely to dominate the bilateral discussion is Iran’s Chabahar port, ……………Trump’s multiple U-turns and increasingly hawkish stance on Iran turns that assurance somewhat blurry. বিবিসি বাংলা লিখেছে, “এদিন সুষমা স্বরাজের সঙ্গে বৈঠকে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী অবধারিতভাবে চাবাহার তাস ব্যবহার করেছেন”।

ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী সফর এবার শুধু ভারতেই থেমে নাই। মাত্র দশ দিনের মাথায় ২৩ মে ২০১৯, তিনি পাকিস্তান সফরে যান।

ইরান চাবাহার বন্দরকে গোয়াদর বন্দরের সহযোগী করে গড়তে চীন ও পাকিস্তানের সাথে আলাপ শুরু করেছে। এ ছাড়া, পাকিস্তানের কলামিস্টদের লেখায় উঠে এসেছে, এত দিন এটা ইরান চিন্তাও করেনি ভারতের স্বার্থে। ইরানের সরকারি প্রেস এজেন্সি এক খবরে বলছে ইরানি পররাস্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তানকে  “গোয়াদর আর চাবাহার পোর্টকে যুক্ত করে দিতে প্রস্তাব দিয়েছেন” [“We can connect the two seaports and then connect Gwadar to our entire railroad system and from Iran to the North Corridor through Turkmenistan, Kazakhstan and also Azerbaijan, Russia and also to Turkey,” ]। এর সোজা মানে হল, চাবাহার পোর্টকে চীন-পাকিস্তান করিডর প্রকল্পের গভীর পোর্ট গোয়াদরের বিকল্প হিসাবে প্রচার করত তা আর থাকল না। শুধু তাই না চাবাহার পোর্টও  চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে নিবার প্রস্তাব এটা – যেখানে এখনও পর্যন্ত চীনা বেল্ট-রোড প্রকল্প ভারতের চোখে হারাম।

যেখানে ভারতেরই মিডিয়াই মন্তব্য লিখছে যে, টিটকারি দিয়ে বলছে বারবার মত বদলে ঘুরে যাওয়া ট্রাম্প নির্ভরযোগ্য নয়, সে যুদ্ধবাজ [Trump’s multiple U-turns and increasingly hawkish stance on Iran ………] অন্যদিকে তবু ভারতের আমেরিকা বা ট্রাম্পবিষয়ক ‘একপক্ষীয়’ প্রেম সম্ভবত আরো বেশ কিছুদিন থাকবে বুঝা যাচ্ছে। সেটা এতই যে ভারতের শখ ও সুখস্বপ্নের চাবাহার পোর্টকে ট্রাম্পের প্রেমে বলি দিতে ভারতের দ্বিধা নাই।

এসসিও বা সাংহাই করপোরেশন অর্গানাইজেশন মূলত চীন, রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়া- মিলিয়ে একটি সামরিক ও বাণিজ্যিক জোট। গত বছর এতে সদস্য করে নেয়া হয়েছে ভারত ও পাকিস্তানকেও। এ বছরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শেষ হয়েছে গত মাসের শেষে। আর রাষ্ট্রপ্রধান পর্যায়ের বৈঠক হতে যাচ্ছে চলতি মাসের মাঝামাঝি, ১৩-১৪ জুন। ভারতের মিডিয়ায় খবর, ইমরানের সাথে একই সভায় মোদির সাক্ষাৎ হলেও সাইড লবিতে তাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে না। এবারো নির্বাচনে জিতে আসার পেছনে ‘পাকিস্তানে বোমা মেরে আসা বীর’ মোদি এই প্রপাগান্ডা বিরাট কাজ করেছে বলে মনে করা হয়। ক্রমশ সামনে দানব হয়ে উঠা মোদীর এমন অনেক কাজ বাকি। তাই স্বভাবতই ‘বীরের’ ইমেজ মোদী সহসাই হারাতে চাইবেন না। তাই অন্তত প্রকাশ্য নীতিতে মোদী সহসাই কোনো বদল আনছেন না। আমাদের আরও ভুগতে হবে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

 

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০৮ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)ইরান,ভারত ও আমেরিকা এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

 

Advertisements

চীনের দরকার ব্রেটন উডসের চেয়েও বেটার সিস্টেম

চীনের দরকার ব্রেটন উডসের চেয়েও বেটার সিস্টেম

গৌতম দাস

০৭ জুন ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2fX

 

চীন ২০১৪ সাল থেকে এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক গঠনের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছিল। এআইআইবি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য, তবে চীনা নেতৃত্বের অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক। গত ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে চালু হয়ে এটা কর্মতৎপরতা বাড়িয়েই চলেছে। এর সেই প্রস্তুতিকালে আমেরিকা তার প্রভাবাধীন এশিয়ার ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো যেন এই ব্যাংকে যোগ না দেয় তা নিয়ে তৎপরতা চালিয়েছিল। প্রকাশ্য বক্তব্যে যে আপত্তি সে তুলেছিল, তা মনে রাখার মতো। বলেছিল, আমেরিকার নেতৃত্ব বিশ্বব্যবস্থা গড়তে গিয়ে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে যে স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা সংগঠনে জন্ম দিয়েছে, তার সমমানের প্রতিষ্ঠান গড়তে চীন ব্যর্থ হবে বলেই আমেরিকা উদ্বিগ্ন। আর এই ‘কথা’ আমেরিকা তার এশিয়ান পার্টনার ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জানিয়েছিল- যেটাকে আমেরিকার নেতিবাচক প্রচারণা বলা হয়েছিল সে সময়। চীনের এআইআইবি ব্যাংকের উত্থান এই প্রচারণা দিয়ে আটকে দেয়া যায়নি। বরং শুরু থেকেই এই স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার বিষয়টাকে তারা ইতিবাচকভাবে এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। আজ ৭৭ রাষ্ট্রকে সদস্যপদ দান হাসিল করে এআইআইবি নিজ মহিমায় নিজের তৎপরতার বিস্তার ঘটিয়ে চলছে। কিন্তু তাসত্ত্বেও এখানকার মূল প্রসঙ্গ হল – গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি।
গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানেও একই কথা উঠেছিল। এই মেগা অবকাঠামো প্রকল্প ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের, যেখানে ৬৮ রাষ্ট্র সম্পৃক্ত হবে। ঐ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের যৌথ ঘোষণার এক অংশ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল ইউরোপের নেতা রাষ্ট্রগুলো যেমন জর্মান, ফরাসি এরা। তাদের সার কথা হল, অর্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ার কালে ওর মান, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি কী হবে? শেষ মুহূর্তে আমেরিকা প্রতিনিধি পাঠিয়ে এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ- এদের প্রধান নির্বাহী এবং প্রায় ৩০টি সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান এতে যোগ দিয়েছিলেন। ভারত ছাড়া প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির রাষ্ট্র সেখানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।
এখানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার স্ট্যান্ডার্ড কথাটা ভেঙে বললে দাঁড়ায়, বড় অর্থ বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে যে কথা বলছি আমরা, এর মালিক কিন্তু হবে আলাদা আলাদা এক একটা খোদ রাষ্ট্র মানে সে দেশের জনগণ। পাবলিক মানি, পাবলিক এসেট বা সম্পদ। ফলে প্রকল্পের মোট খরচ কত, তা ন্যায্য কিনা, প্রকল্পের খরচ অনুমোদনের পর তা কৌশলে দ্বিগুণ থেকে ছয় গুণ করে নেয়া হয়েছে কিনা, কাজের মান পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আদৌ ছিল কিনা, প্রকল্পে দুর্নীতিরোধের কোনো ‘সেলফ চেক’ ব্যবস্থা ছিল কিনা- এ সংক্রান্ত স্বচ্ছ তথ্য চাওয়ামাত্র তো বটেই, না চাইলেও জনগণের দেখতে দেয়ার ব্যবস্থা ছিল কিনা, ‘পরিবেশ ধ্বংস করা কোনো উপাদান এই প্রকল্পে নাই’, এমন আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড ও দেশী পরিবেশ ছাড়পত্র ছিল কিনা, কাজ প্রদানে সবস্তরে স্বচ্ছ টেন্ডার ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছিল কিনা ইত্যাদি পাবলিক মানি নাড়াচাড়া সংক্রান্ত  গুরুত্বপুর্ণ  সব কিছুকে বুঝানো হয়েছে।

দুইঃ
বিগত প্রায় পাঁচ শ’ বছরের বিশ্ব বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থাকে মোটা দাগে তিনটি স্তর বা পর্যায়ে ভাগ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিকে একটা ল্যান্ড মার্ক ধরে বলা যায়, এর আগের যুগ ছিল প্রথম পর্যায় – কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম। মানে আমাদের মতো দেশগুলোকে উপনিবেশীপন্থায় দখল করে কলোনি মালিক সাম্রাজ্যগুলা এক  গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা কায়েম করে রাখা হয়েছিল যাকে এখানে আমরা ‘কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম’ বলে নামকরণ করছি । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই ব্যবস্থাটাই ভেঙে যায়, আর কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা। আগের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম, সেটাতে কোন কেন্দ্র বা কোন গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতা ছিল না। অর্থাৎ সেটা কোনো গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। যে অর্থে দ্বিতীয় পর্যায়ে আমেরিকার নেতৃত্বের নতুন ব্যবস্থাটা গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অধীন করে সাজানো।
আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ১-২২ জুলাই; টানা ২২ দিন ধরে আমেরিকার হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলে ৭৩০ ডেলিগেটের সভা ও তর্ক-বিতর্ক নিগোশিয়েশনের ভেতর দিয়ে । তাই এদের ব্রেটনউড প্রতিষ্ঠানও বলে অনেকে। এখানে প্রথম পর্যায়ের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের পরের দ্বিতীয় পর্যায়কে ব্রেটনউড সিস্টেমের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বলে চেনাব, সংক্ষেপে ব্রেটনউড সিস্টেম বলব।

তাই বলা যায়, কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এ ধরনের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান ছিল না। এমনকি ‘কলোনি মাস্টার’ যেমন খোদ ব্রিটিশ রাষ্ট্রও খুব নিয়ন্ত্রণ করত না। বরং ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির মতো ট্রেডিং বা মেরিটাইম কোম্পানি, এদের নেতৃত্বে কর্তৃত্ব প্রভাবে  ম্যানুফ্যাকচারিং-সহ বাকি সব কোম্পানির এক সমাহার ছিল; রাষ্ট্র সেখানে ঠিক নিয়ন্ত্রক নয় সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। কথাগুলো বোঝা যাবে, যদি মনে রাখি একালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (রিজার্ভ ব্যাংক) ধারণাটা। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না। ব্রেটনউড সিস্টেমের সাথে আনা হয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণাটা।  ব্রেটনউড সিস্টেমের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। মানে রাষ্ট্র মোটা দাগে আগাম কিছু ষ্টাটুটারি আইনি কাঠামো তৈরি করে দিয়ে থাকে, আর সেগুলোর অধীনে ও সীমার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বশাসিত। সেই আইনি সীমার মধ্যে এই ব্যাংক স্বশাসিতই শুধু নয়, রাষ্ট্রের মধ্যে তৎপর অন্য সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সব কর্মতৎপরতার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সে। ব্যাংক ব্যবসা করার নীতি ঘোষণা করা, মনিটরিং এবং অবশ্য পালনীয় নির্দেশ দেয়ার প্রতিষ্ঠান এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্য দিকে সরকারের মুদ্রানীতি, ফিসক্যাল (অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থা) নীতি হাজির করা ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিষ্ঠানও এটা। মুদ্রা ছাপানোর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে এত কিছুর পরও এগুলো সবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ভূমিকা। এসবের বাইরে আইএমএফের নির্দেশ পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য বলা হয় আইএমএফের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো হয়ে থাকে যেন আইএমএফের ডানা বা এক্সটেন্ডেড উইং। ফলে পুরা দুনিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে আইএমএফ।  কোনো রাষ্ট্রের আইএমএফের সদস্যপদ পাওয়ার পূর্বশর্ত হল, ওই রাষ্ট্রের এর আগে একটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকতে হবে। তাই বেশির ভাগ রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্ম ১৯৪০ এর দশকে। ব্যতিক্রম কোথাও যদি থাকে তবে তা ভিন্ন কারণে। যেমন আমেরিকার ফেড বা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আমেরিকার উদীয়মান ও বিকাশমান সব রাজ্যে আগে আলাদা স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা ছিল। এক রাজ্যের ব্যাংক ভিন রাজ্যে ব্যবসা ততপরতা করতে পারত না। আবার একই রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংকের নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন ছাপা নোট ছিল। পরে (মানে অনুমান করি প্রতিটা রাজ্য নিজের পুঁজির স্ফীতিতে উপচে পড়লে বা স্যাচুরেটেড হয়ে গেলে অথবা বড় বড় প্রকল্পে এক সাথে বিনিয়োগের প্রয়োজনে) সব রাজ্য ব্যবস্থাগুলোর সমন্বয়ে এক অভিন্ন, ফেডারেল ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য (যেমন কমন কারেন্সি চালুর জন্য) ১৯১৩ সালে ফেডের জন্ম হয়েছিল। ওদিকে বৃটেনে তাকাই, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ১৬৯৪ সাল থেকেই ব্যক্তিগত শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন ব্যাংক। কিন্তু এই ব্যাংকই ব্রিটিশ সরকারের আয়-ব্যয়ের অ্যাকাউন্ট ধারণকারী ব্যাংক। একটা বড় করপোরেশনের মতোই ব্রিটিশ সরকার তার একটা ক্লায়েন্ট। আবার সরকারের অনুমতিধারী একমাত্র মুদ্রা ছাপানোর ব্যাংক এটাই। এভাবেই প্রাইভেট ব্যাংক হিসেবে চলার প্রায় তিনশ বছর পর ১৯৪৬ সালে এই ব্যাংকের জাতীয়করণ হয়, আর ব্রিটিশ সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ সম্পর্কে এত বিস্তারে বলছি আগের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এই ব্যাংক ছিল না, ফলে তুলনামূলক বিচার করে বুঝবার জন্য। এখন কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ ছিল না, একথার আর এক অর্থ  হল, মানে রাষ্ট্রের নিজের মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা বলে কিছু ছিল না। এই অর্থে বলা যায়, ওই ক্যাপিটালিজম ব্যবসায়ী এসোসিয়েশনের হাতে নিয়ন্ত্রিত হত। এ ছাড়া অনেকেই জানেন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার – এটাও প্রাইভেট ব্যাংক বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিদিন ঠিক করে দিত। এ কাজের একচেটিয়া কারবারি, ‘রথশিল্ড ব্যাংকিং পরিবারের’ কথা অনেকেই জানেন। আমাদের অনেকের ধারণা, স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা বাস্তবায়নের ব্যাপারটা সরকার ছাড়া হয় না, হবে না। এই ধারণাটা বাস্তব নয়। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগে স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থাটা দাঁড়িয়েছিল বেসরকারিভাবে, ব্যবসায়ীদের সমিতি ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণে এবং একটা স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতার মান নিশ্চিত করে। তবে সেকালে এক বিরাট বাড়তি সুবিধা ছিল। তা হল কোন কাগুজে মুদ্রা মানেই তা ছিল ‘গোল্ড ব্যাকড মানি’। মানে ঐ কাগুজে মুদ্রার সমমানের সোনা ব্যাঙ্কে আগে গচ্ছিত (রিজার্ভ) রেখে তবেই মুদ্রা ছাপানো হয়েছে। ফলে কাগুজে নোট যার হাতে আছে সে ব্যাংকে গিয়ে “চাহিবা মাত্র” ঐ সমতুল্য রক্ষিত সোনা ব্যাংক নোট হোল্ডারকে পরিশোধ করে দিত। এর কারণে প্রতিদিন আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ সহজ ছিল। পরে ১৯৭৩ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন মুদ্রাই আর  ‘গোল্ড ব্যাকড মানি’ নয়।
কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগ শেষে তা ভেঙে কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থা- এই প্রথম এমন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা যেখানে তা এক গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতার (আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের) অধীনে গড়া ও নিয়ন্ত্রিত এক ব্যবস্থা। আগেই বলেছি এটা পরিচালিত হয় সব সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক – আইএমএফের এই ‘ডানা’গুলোর মাধ্যমে। এই অর্থে ‘পড়ে পাওয়া’ সুবিধা হল রাষ্ট্র এরপর থেকে ব্যাংক ব্যবসার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণের যুগের সূচনা করেছিল।

আমেরিকাসহ ইউরোপ আজ স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা তুলছে। তা ব্রেটনউড সিস্টেমের প্রতিষ্ঠানে আসতে সময় লেগেছিল ৫৬ বছর, ২০০১ সালে। অর্থাৎ মাত্র চলতি শতকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে (স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তদারকি নিশ্চিত করতে) শক্তিশালী ও স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ  চালু করা হয়েছে। একজন ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে আলাদা এই বিভাগ সরাসরি কেবল বোর্ডের কাছে রিপোর্ট ও জবাবদিহি করতে বাধ্য। কোনো কান্ট্রি অফিসকে কিছু না জানিয়েই সে তার কাজ করতে পারে। তবে এসব কথা শুনে এই বিভাগ বা বিশ্বব্যাংককে ‘সততার দেবতা’ মনে করার কোনো কারণ নেই, তা ভুল হবে। রক্ত মাংসের ও স্বার্থের এই দুনিয়ায় মানুষ যে মানের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দেখাতে পেরেছে এর এক নমুনা বলা যায় এই বিভাগকে। তবে এরও আগে আর একটা কথা বলা দরকার। বিশ্বব্যাংকের কাজ দেয়ার টেন্ডার পদ্ধতি খারাপ নয়, এটা বলতেই হবে। এই অর্থে যে, কোনো প্রকল্পে বিশ্বব্যাংককে ফান্ডদাতা হয় যে দেশের সরকার; ধরা যাক, একটা প্রকল্পে এর অর্ধেকের বেশি ফান্ড জাপান সরকারের। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই প্রকল্প নির্মাণের কাজ জাপানের কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পায়নি। মানে কেউ ফান্ডদাতা হলে কাজ তাকেই দিতে হবে, এমন কোন কথা নেই। টেন্ডার আলাদা স্বাধীন পদ্ধতি ও ব্যবস্থা আছে। টেন্ডারে ঠিক হবে কে কাজ পাবে। যেমন যমুনা সেতুতে নদীশাসন কাজ পেয়েছিল নেদারল্যান্ড, দুই কানেকটিং রোড আর মূল ব্রিজ নির্মাণকাজ পেয়েছিল দুই কোরিয়ান কোম্পানি, আর কন্সালটেন্সি পেয়েছিল এক ব্রিটিশ কোম্পানি। তবে আবার বলে রাখি, টেন্ডার ব্যবস্থা চালু করতে পারার জন্য অথবা বিশ্বব্যাংকের ভেতরের প্রসেসিংয়ের তুলনামূলক স্বচ্ছ ব্যবস্থার জন্য তারা একেবারে ‘আদর্শের অবতার’, এমন বলা এখানে উদ্দেশ্য নয়। আবার যমুনা সেতু নির্মাণে কোনো দুর্নীতিই ছিল না, এমন অ্যাবসলিউট কোনো কথা বলা হচ্ছে না। তবে অন্তত তুলনামূলক অর্থে ফান্ডদাতা আর কাজ পাওয়াকে আলাদা করে ফেলতে পারা কম অগ্রগতি নয়। আর বিশ্বব্যাংক এটা ২০০১ সালে ইন্টিগ্রিটি বিভাগ খোলার আগেই চালু করতে পেরেছিল। আবার বিশ্বব্যাংকের বদনামের শেষ নাই। ফলে এটাও বলে রাখা ভাল, অর্থের অপচয় আর দুর্নীতির (মানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার অভাব) দিক থেকে সত্তরের দশকের বিশ্বব্যাংক ছিল সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ। সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্রেটনউডস সিস্টেম এতটুকু পেরেছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন হিসাবে খারাপ নয়।

পাঁচ শ’ বছরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়কে  মোটা দাগে চিহ্নিত করে তা চলতি শতক থেকে শুরু তা বলা যায়। আমেরিকার জায়গায় চীনের নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা আজ আর কোন অনুমান করে যা মনে চায় বলা এমন বিষয় নয়। খোদ আমেরিকার সরকারি স্টাডি ও নানা গবেষণাতেও এর স্বীকৃতি আছে। ব্রেটনউডস সিস্টেম বা দ্বিতীয় পর্যায়টা কায়েম হতে, একটা ওলটপালটের ভিতর দিয়ে তা আসতে একটা বিশ্বযুদ্ধের দরকার হয়েছিল। তাই তৃতীয় পর্যায়ে যেতেও একটা বিশ্বযুদ্ধ দরকার, অনেকে অনুমানে এমন কথা বলে থাকেন। কিন্তু এখনো তা স্পষ্ট হয়ে যায়নি। সর্বশেষ আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান; আর হম্বিতম্বিকে চীনের দিক থেকে একে একেবারে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা এবং আমেরিকার জন্য জায়গা (বাজার, কাজে ছাড় দেয়া) করে দেয়া কোন টেনশন বা যুদ্ধের শঙ্কাকে আপাতত নাকচ করেছে।

কিন্তু এই লেখার মূল প্রশ্ন, একালে তৃতীয় পর্যায়ে, চীনের তৈরি গ্লোবাল প্রভাব নিয়ে জন্ম নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- এআইআইবি, ব্রিক ব্যাংক, আরআইবি ইত্যাদির স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান কী হবে? এক কথায় বললে গ্লোবাল ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়ের স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠান হতে গেলে এগুলোকে অবশ্যই ব্রেটন উডস সিস্টেমের চেয়েও ভাল, মানে যেমন বিশ্বব্যাংকের চেয়েও আরও ভাল মান দেখাতেই হবে। তবে এ কথা ঠিক, চীনের উত্থানে রেষারেষি প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের স্বার্থটাকে মাখিয়ে তারা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার কথাটা উপস্থাপন করেছে। তাই আমেরিকা বা ইউরোপের স্ট্যান্ডার্ডের প্রসঙ্গ তুলে চীনকে যে অর্থে খোটা দিচ্ছে, নিজের প্রভাবকে বাড়িয়ে নিবার চেষ্টা করছ এর মধ্যে আমাদের মতো দেশের লাভ নেই। আমাদের স্বার্থ আমাদেরকে ভাবতে হবে। যেমন বাংলাদেশের সাথে চীনের রেল-রোড উদ্যোগসহ সব অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প আমাদের স্বার্থে তা খুবই দরকারি ও নির্ধারক। কিন্তু লক্ষণীয় যে, আমরা এখন টেন্ডার আহ্বানবিহীন সরকার, আর যেকোনো প্রকল্প ব্যয় দুই থেকে ছয় গুণ ব্যয় বাড়ানোর সরকারে পরিণত হয়েছি। এই বিষয়টা  বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বাদ রেখে বললেও এটা চীনের জন্য বিশেষ করে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান- এই বিচারে খুবই খারাপ উদাহরণ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার দিক থেকে এই ব্যবস্থা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এদিকটায় চীনেরও অবশ্যই  মনোযোগ দিতেই হবে। যদিও চীনের হয়ত পাল্টা বলার বিষয় হবে যে, বাংলাদেশের জনগণ যদি একটি অপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে, তাহলে সেটা ভালো না হওয়া পর্যন্ত চীন হাতগুটিয়ে বসে থাকলে এর সুবিধা চীনের প্রতিদ্বন্দ্বীরাই নেবে। তবুও এটা ভালো যুক্তি নয়। কারণ এর চেয়েও দুর্নীতিবাজ সরকারের সাথে গত চল্লিশ বছর ধরে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে কাজ করতে হয়েছে। তার পরও তাদের অর্জন খারাপ নয়। আমাদের মতো দেশে সরকারের কার্যকারিতা যতটুকু, এর দক্ষতা যতটুকু, তা তো আপন কোনো রাজনৈতিক সরকারের কারণে হয়নি, আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক শর্ত দিয়ে তাদের বাধ্য করেছে বলা হয়েছে। যদিও শর্তের খারাপ দিক আছে, তা মেনেও এ কথা বলা যায়। যেমন শেখ মুজিবের আমলের রেশনব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংকের শর্তের কারণে আগের ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন ঠিক রেশন নয়, তবে বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অন্যভাবে কার্যকর আনা আছে। চালের সরকারি মওজুদ আর আগের দরে বাজারে চাল ছেড়ে দিয়ে মুল্য নামানো – এটা খুবই কার্যকর ব্যবস্থা।
মোট কথা, আমরা ব্রেটনউডস সিস্টেমের যুগ পার হয়ে এসেছি- এ কথা চীনকে মনে রেখে আগাতে হবে। আমাদের নতুন আকাঙ্খা পূরণ না করে, আমাদের হতাশ করে চীনের তৃতীয় পর্যায় গড়ে তোলা বা এর নেতা হওয়া অসম্ভব। চীনই ফান্ডদাতা, আবার কোনো টেন্ডার সিস্টেম নেই, কাজ পাবে কেবল চীন– এই ‘জি টু জি’, লোকাল এজেন্টের নামে ঘুষের ব্যবস্থা, প্রকল্পের অর্থ ছয় গুণ বাড়িয়ে নেয়া- এসব অগ্রহণযোগ্য। খুবই খারাপ উদাহরণ। এটাই ‘অপারগ’ চীনের আপাতত স্বার্থ মনে করে চীন নিজ মনকে প্রবোধ দিতে পারে। কিন্তু সাবধান এর মূল্য একদিন চীনকে শোধ করতে হবে। এই একই ফর্মুলায় আমরা বেল্ট-রোড উদ্যোগে যুক্ত হতে না চাইলে না পারলে তা আত্মঘাতী – চীন ও বাংলাদেশের জন্যই।
গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের তৃতীয় পর্যায়ের নেতা হিসেবে চীনকে অবশ্যই স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দিক থেকে উন্নত মানের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হাজির করতে পারতে হবে। এমন কাজের নীতি অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। কোন অজুহাত এখানে অচল এবং আত্মধবংশী।

ভারত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন যোগ দেয় নাই। সেই সিদ্ধান্ত ভারতের স্বার্থে ন্যায্য হয়েছে সেই সাফাই যোগাড়ে মোদি সরকার কাহিল। কারণ এটা ফাঁপা আত্মম্ভরি সিদ্ধান্ত ফলে আত্মঘাতি তা স্পষ্ট। চোরে বাসন নিয়ে গেছে বলে কেউ অভিমানে মাটিতে ভাত রেখে খায় না।  তাই ভারতও এই সুযোগে যেন  ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’ অভাবের কারণে যোগ দেয় নাই, এমন ইঙ্গিত দিয়ে নিজের লাজ ঢাকতে চাইছে। তা সে চাইতেই পারে কারণ কেই বা  বেকুবির লজ্জায় নিজেকে রাঙা দেখাতে চায়। তবে এটা ফ্যাক্টস যে সম্মেলনের আগে ভারতের দেখানো যোগ না দেবার কারণগুলোর মধ্যে ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’ অভাব বলে কোন কারণ তালিকায় ছিল না।  কাজেই ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’  কথা তুলে সে আড়ালে সুযোগ সন্ধানীও কম নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ০৫ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]