চীনের দরকার ব্রেটন উডসের চেয়েও বেটার সিস্টেম

চীনের দরকার ব্রেটন উডসের চেয়েও বেটার সিস্টেম

গৌতম দাস

০৭ জুন ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2fX

 

চীন ২০১৪ সাল থেকে এআইআইবি (AIIB) ব্যাংক গঠনের প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু করেছিল। এআইআইবি ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সমতুল্য, তবে চীনা নেতৃত্বের অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাংক। গত ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে চালু হয়ে এটা কর্মতৎপরতা বাড়িয়েই চলেছে। এর সেই প্রস্তুতিকালে আমেরিকা তার প্রভাবাধীন এশিয়ার ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলো যেন এই ব্যাংকে যোগ না দেয় তা নিয়ে তৎপরতা চালিয়েছিল। প্রকাশ্য বক্তব্যে যে আপত্তি সে তুলেছিল, তা মনে রাখার মতো। বলেছিল, আমেরিকার নেতৃত্ব বিশ্বব্যবস্থা গড়তে গিয়ে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংককে যে স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা সংগঠনে জন্ম দিয়েছে, তার সমমানের প্রতিষ্ঠান গড়তে চীন ব্যর্থ হবে বলেই আমেরিকা উদ্বিগ্ন। আর এই ‘কথা’ আমেরিকা তার এশিয়ান পার্টনার ও ঘনিষ্ঠ মিত্রদের জানিয়েছিল- যেটাকে আমেরিকার নেতিবাচক প্রচারণা বলা হয়েছিল সে সময়। চীনের এআইআইবি ব্যাংকের উত্থান এই প্রচারণা দিয়ে আটকে দেয়া যায়নি। বরং শুরু থেকেই এই স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখার বিষয়টাকে তারা ইতিবাচকভাবে এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল। আজ ৭৭ রাষ্ট্রকে সদস্যপদ দান হাসিল করে এআইআইবি নিজ মহিমায় নিজের তৎপরতার বিস্তার ঘটিয়ে চলছে। কিন্তু তাসত্ত্বেও এখানকার মূল প্রসঙ্গ হল – গ্লোবাল অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানের স্ট্যান্ডার্ড, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি।
গত ১৪-১৫ মে বেইজিংয়ে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। সেখানেও একই কথা উঠেছিল। এই মেগা অবকাঠামো প্রকল্প ট্রিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের, যেখানে ৬৮ রাষ্ট্র সম্পৃক্ত হবে। ঐ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের যৌথ ঘোষণার এক অংশ নিয়ে আপত্তি তুলেছিল ইউরোপের নেতা রাষ্ট্রগুলো যেমন জর্মান, ফরাসি এরা। তাদের সার কথা হল, অর্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গড়ার কালে ওর মান, তার স্বচ্ছতা জবাবদিহিতা ইত্যাদি কী হবে? শেষ মুহূর্তে আমেরিকা প্রতিনিধি পাঠিয়ে এই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিল। আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, জাতিসঙ্ঘ- এদের প্রধান নির্বাহী এবং প্রায় ৩০টি সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধান এতে যোগ দিয়েছিলেন। ভারত ছাড়া প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতির রাষ্ট্র সেখানে প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল।
এখানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার স্ট্যান্ডার্ড কথাটা ভেঙে বললে দাঁড়ায়, বড় অর্থ বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে যে কথা বলছি আমরা, এর মালিক কিন্তু হবে আলাদা আলাদা এক একটা খোদ রাষ্ট্র মানে সে দেশের জনগণ। পাবলিক মানি, পাবলিক এসেট বা সম্পদ। ফলে প্রকল্পের মোট খরচ কত, তা ন্যায্য কিনা, প্রকল্পের খরচ অনুমোদনের পর তা কৌশলে দ্বিগুণ থেকে ছয় গুণ করে নেয়া হয়েছে কিনা, কাজের মান পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা আদৌ ছিল কিনা, প্রকল্পে দুর্নীতিরোধের কোনো ‘সেলফ চেক’ ব্যবস্থা ছিল কিনা- এ সংক্রান্ত স্বচ্ছ তথ্য চাওয়ামাত্র তো বটেই, না চাইলেও জনগণের দেখতে দেয়ার ব্যবস্থা ছিল কিনা, ‘পরিবেশ ধ্বংস করা কোনো উপাদান এই প্রকল্পে নাই’, এমন আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড ও দেশী পরিবেশ ছাড়পত্র ছিল কিনা, কাজ প্রদানে সবস্তরে স্বচ্ছ টেন্ডার ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছিল কিনা ইত্যাদি পাবলিক মানি নাড়াচাড়া সংক্রান্ত  গুরুত্বপুর্ণ  সব কিছুকে বুঝানো হয়েছে।

দুইঃ
বিগত প্রায় পাঁচ শ’ বছরের বিশ্ব বা গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থাকে মোটা দাগে তিনটি স্তর বা পর্যায়ে ভাগ করা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিকে একটা ল্যান্ড মার্ক ধরে বলা যায়, এর আগের যুগ ছিল প্রথম পর্যায় – কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম। মানে আমাদের মতো দেশগুলোকে উপনিবেশীপন্থায় দখল করে কলোনি মালিক সাম্রাজ্যগুলা এক  গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা কায়েম করে রাখা হয়েছিল যাকে এখানে আমরা ‘কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম’ বলে নামকরণ করছি । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই ব্যবস্থাটাই ভেঙে যায়, আর কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে এক নতুন বিশ্বব্যবস্থা। আগের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজম, সেটাতে কোন কেন্দ্র বা কোন গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতা ছিল না। অর্থাৎ সেটা কোনো গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছিল না। যে অর্থে দ্বিতীয় পর্যায়ে আমেরিকার নেতৃত্বের নতুন ব্যবস্থাটা গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের অধীন করে সাজানো।
আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৪ সালের ১-২২ জুলাই; টানা ২২ দিন ধরে আমেরিকার হ্যাম্পশায়ারের ব্রেটনউড শহরের এক হোটেলে ৭৩০ ডেলিগেটের সভা ও তর্ক-বিতর্ক নিগোশিয়েশনের ভেতর দিয়ে । তাই এদের ব্রেটনউড প্রতিষ্ঠানও বলে অনেকে। এখানে প্রথম পর্যায়ের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের পরের দ্বিতীয় পর্যায়কে ব্রেটনউড সিস্টেমের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম বলে চেনাব, সংক্ষেপে ব্রেটনউড সিস্টেম বলব।

তাই বলা যায়, কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এ ধরনের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান ছিল না। এমনকি ‘কলোনি মাস্টার’ যেমন খোদ ব্রিটিশ রাষ্ট্রও খুব নিয়ন্ত্রণ করত না। বরং ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির মতো ট্রেডিং বা মেরিটাইম কোম্পানি, এদের নেতৃত্বে কর্তৃত্ব প্রভাবে  ম্যানুফ্যাকচারিং-সহ বাকি সব কোম্পানির এক সমাহার ছিল; রাষ্ট্র সেখানে ঠিক নিয়ন্ত্রক নয় সমন্বয়ের প্রতিষ্ঠান। কথাগুলো বোঝা যাবে, যদি মনে রাখি একালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (রিজার্ভ ব্যাংক) ধারণাটা। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলে কোন প্রতিষ্ঠান ছিল না। ব্রেটনউড সিস্টেমের সাথে আনা হয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণাটা।  ব্রেটনউড সিস্টেমের মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক স্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। মানে রাষ্ট্র মোটা দাগে আগাম কিছু ষ্টাটুটারি আইনি কাঠামো তৈরি করে দিয়ে থাকে, আর সেগুলোর অধীনে ও সীমার মধ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বশাসিত। সেই আইনি সীমার মধ্যে এই ব্যাংক স্বশাসিতই শুধু নয়, রাষ্ট্রের মধ্যে তৎপর অন্য সব সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের সব কর্মতৎপরতার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান সে। ব্যাংক ব্যবসা করার নীতি ঘোষণা করা, মনিটরিং এবং অবশ্য পালনীয় নির্দেশ দেয়ার প্রতিষ্ঠান এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অন্য দিকে সরকারের মুদ্রানীতি, ফিসক্যাল (অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থা) নীতি হাজির করা ও নিয়ন্ত্রণ করার প্রতিষ্ঠানও এটা। মুদ্রা ছাপানোর কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তবে এত কিছুর পরও এগুলো সবই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ভূমিকা। এসবের বাইরে আইএমএফের নির্দেশ পালনের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এজন্য বলা হয় আইএমএফের বিভিন্ন সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো হয়ে থাকে যেন আইএমএফের ডানা বা এক্সটেন্ডেড উইং। ফলে পুরা দুনিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে আইএমএফ।  কোনো রাষ্ট্রের আইএমএফের সদস্যপদ পাওয়ার পূর্বশর্ত হল, ওই রাষ্ট্রের এর আগে একটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থাকতে হবে। তাই বেশির ভাগ রাষ্ট্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্ম ১৯৪০ এর দশকে। ব্যতিক্রম কোথাও যদি থাকে তবে তা ভিন্ন কারণে। যেমন আমেরিকার ফেড বা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক। আমেরিকার উদীয়মান ও বিকাশমান সব রাজ্যে আগে আলাদা স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা ছিল। এক রাজ্যের ব্যাংক ভিন রাজ্যে ব্যবসা ততপরতা করতে পারত না। আবার একই রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাংকের নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন ছাপা নোট ছিল। পরে (মানে অনুমান করি প্রতিটা রাজ্য নিজের পুঁজির স্ফীতিতে উপচে পড়লে বা স্যাচুরেটেড হয়ে গেলে অথবা বড় বড় প্রকল্পে এক সাথে বিনিয়োগের প্রয়োজনে) সব রাজ্য ব্যবস্থাগুলোর সমন্বয়ে এক অভিন্ন, ফেডারেল ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য (যেমন কমন কারেন্সি চালুর জন্য) ১৯১৩ সালে ফেডের জন্ম হয়েছিল। ওদিকে বৃটেনে তাকাই, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ১৬৯৪ সাল থেকেই ব্যক্তিগত শেয়ারহোল্ডারদের মালিকানাধীন ব্যাংক। কিন্তু এই ব্যাংকই ব্রিটিশ সরকারের আয়-ব্যয়ের অ্যাকাউন্ট ধারণকারী ব্যাংক। একটা বড় করপোরেশনের মতোই ব্রিটিশ সরকার তার একটা ক্লায়েন্ট। আবার সরকারের অনুমতিধারী একমাত্র মুদ্রা ছাপানোর ব্যাংক এটাই। এভাবেই প্রাইভেট ব্যাংক হিসেবে চলার প্রায় তিনশ বছর পর ১৯৪৬ সালে এই ব্যাংকের জাতীয়করণ হয়, আর ব্রিটিশ সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হয়।

‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ সম্পর্কে এত বিস্তারে বলছি আগের কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে এই ব্যাংক ছিল না, ফলে তুলনামূলক বিচার করে বুঝবার জন্য। এখন কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমে ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক’ ছিল না, একথার আর এক অর্থ  হল, মানে রাষ্ট্রের নিজের মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থা বলে কিছু ছিল না। এই অর্থে বলা যায়, ওই ক্যাপিটালিজম ব্যবসায়ী এসোসিয়েশনের হাতে নিয়ন্ত্রিত হত। এ ছাড়া অনেকেই জানেন, আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার – এটাও প্রাইভেট ব্যাংক বিশ্বস্ততার সাথে প্রতিদিন ঠিক করে দিত। এ কাজের একচেটিয়া কারবারি, ‘রথশিল্ড ব্যাংকিং পরিবারের’ কথা অনেকেই জানেন। আমাদের অনেকের ধারণা, স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা বাস্তবায়নের ব্যাপারটা সরকার ছাড়া হয় না, হবে না। এই ধারণাটা বাস্তব নয়। কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগে স্বাধীন মুদ্রা ও অর্থ ব্যবস্থাটা দাঁড়িয়েছিল বেসরকারিভাবে, ব্যবসায়ীদের সমিতি ইত্যাদির নিয়ন্ত্রণে এবং একটা স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতার মান নিশ্চিত করে। তবে সেকালে এক বিরাট বাড়তি সুবিধা ছিল। তা হল কোন কাগুজে মুদ্রা মানেই তা ছিল ‘গোল্ড ব্যাকড মানি’। মানে ঐ কাগুজে মুদ্রার সমমানের সোনা ব্যাঙ্কে আগে গচ্ছিত (রিজার্ভ) রেখে তবেই মুদ্রা ছাপানো হয়েছে। ফলে কাগুজে নোট যার হাতে আছে সে ব্যাংকে গিয়ে “চাহিবা মাত্র” ঐ সমতুল্য রক্ষিত সোনা ব্যাংক নোট হোল্ডারকে পরিশোধ করে দিত। এর কারণে প্রতিদিন আন্তঃরাষ্ট্রীয় মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ সহজ ছিল। পরে ১৯৭৩ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোন মুদ্রাই আর  ‘গোল্ড ব্যাকড মানি’ নয়।
কলোনিয়াল ক্যাপিটালিজমের যুগ শেষে তা ভেঙে কায়েম হয় আমেরিকার নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থা- এই প্রথম এমন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থা যেখানে তা এক গ্লোবাল প্রাতিষ্ঠানিকতার (আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের) অধীনে গড়া ও নিয়ন্ত্রিত এক ব্যবস্থা। আগেই বলেছি এটা পরিচালিত হয় সব সদস্য রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক – আইএমএফের এই ‘ডানা’গুলোর মাধ্যমে। এই অর্থে ‘পড়ে পাওয়া’ সুবিধা হল রাষ্ট্র এরপর থেকে ব্যাংক ব্যবসার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণের যুগের সূচনা করেছিল।

আমেরিকাসহ ইউরোপ আজ স্ট্যান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার কথা তুলছে। তা ব্রেটনউড সিস্টেমের প্রতিষ্ঠানে আসতে সময় লেগেছিল ৫৬ বছর, ২০০১ সালে। অর্থাৎ মাত্র চলতি শতকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে (স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তদারকি নিশ্চিত করতে) শক্তিশালী ও স্বাধীন ইন্টিগ্রিটি বিভাগ  চালু করা হয়েছে। একজন ভাইস প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে আলাদা এই বিভাগ সরাসরি কেবল বোর্ডের কাছে রিপোর্ট ও জবাবদিহি করতে বাধ্য। কোনো কান্ট্রি অফিসকে কিছু না জানিয়েই সে তার কাজ করতে পারে। তবে এসব কথা শুনে এই বিভাগ বা বিশ্বব্যাংককে ‘সততার দেবতা’ মনে করার কোনো কারণ নেই, তা ভুল হবে। রক্ত মাংসের ও স্বার্থের এই দুনিয়ায় মানুষ যে মানের সবচেয়ে ভালো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে দেখাতে পেরেছে এর এক নমুনা বলা যায় এই বিভাগকে। তবে এরও আগে আর একটা কথা বলা দরকার। বিশ্বব্যাংকের কাজ দেয়ার টেন্ডার পদ্ধতি খারাপ নয়, এটা বলতেই হবে। এই অর্থে যে, কোনো প্রকল্পে বিশ্বব্যাংককে ফান্ডদাতা হয় যে দেশের সরকার; ধরা যাক, একটা প্রকল্পে এর অর্ধেকের বেশি ফান্ড জাপান সরকারের। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই প্রকল্প নির্মাণের কাজ জাপানের কোনো সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পায়নি। মানে কেউ ফান্ডদাতা হলে কাজ তাকেই দিতে হবে, এমন কোন কথা নেই। টেন্ডার আলাদা স্বাধীন পদ্ধতি ও ব্যবস্থা আছে। টেন্ডারে ঠিক হবে কে কাজ পাবে। যেমন যমুনা সেতুতে নদীশাসন কাজ পেয়েছিল নেদারল্যান্ড, দুই কানেকটিং রোড আর মূল ব্রিজ নির্মাণকাজ পেয়েছিল দুই কোরিয়ান কোম্পানি, আর কন্সালটেন্সি পেয়েছিল এক ব্রিটিশ কোম্পানি। তবে আবার বলে রাখি, টেন্ডার ব্যবস্থা চালু করতে পারার জন্য অথবা বিশ্বব্যাংকের ভেতরের প্রসেসিংয়ের তুলনামূলক স্বচ্ছ ব্যবস্থার জন্য তারা একেবারে ‘আদর্শের অবতার’, এমন বলা এখানে উদ্দেশ্য নয়। আবার যমুনা সেতু নির্মাণে কোনো দুর্নীতিই ছিল না, এমন অ্যাবসলিউট কোনো কথা বলা হচ্ছে না। তবে অন্তত তুলনামূলক অর্থে ফান্ডদাতা আর কাজ পাওয়াকে আলাদা করে ফেলতে পারা কম অগ্রগতি নয়। আর বিশ্বব্যাংক এটা ২০০১ সালে ইন্টিগ্রিটি বিভাগ খোলার আগেই চালু করতে পেরেছিল। আবার বিশ্বব্যাংকের বদনামের শেষ নাই। ফলে এটাও বলে রাখা ভাল, অর্থের অপচয় আর দুর্নীতির (মানে স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার অভাব) দিক থেকে সত্তরের দশকের বিশ্বব্যাংক ছিল সবচেয়ে খারাপ উদাহরণ। সব মিলিয়ে বলা যায়, ব্রেটনউডস সিস্টেম এতটুকু পেরেছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন হিসাবে খারাপ নয়।

পাঁচ শ’ বছরের গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়কে  মোটা দাগে চিহ্নিত করে তা চলতি শতক থেকে শুরু তা বলা যায়। আমেরিকার জায়গায় চীনের নেতৃত্বে নতুন এক গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয়ার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ব্যাপারটা আজ আর কোন অনুমান করে যা মনে চায় বলা এমন বিষয় নয়। খোদ আমেরিকার সরকারি স্টাডি ও নানা গবেষণাতেও এর স্বীকৃতি আছে। ব্রেটনউডস সিস্টেম বা দ্বিতীয় পর্যায়টা কায়েম হতে, একটা ওলটপালটের ভিতর দিয়ে তা আসতে একটা বিশ্বযুদ্ধের দরকার হয়েছিল। তাই তৃতীয় পর্যায়ে যেতেও একটা বিশ্বযুদ্ধ দরকার, অনেকে অনুমানে এমন কথা বলে থাকেন। কিন্তু এখনো তা স্পষ্ট হয়ে যায়নি। সর্বশেষ আমেরিকার নির্বাচনে ট্রাম্পের আগমন ও উত্থান; আর হম্বিতম্বিকে চীনের দিক থেকে একে একেবারে ঠাণ্ডা মাথায় মোকাবেলা এবং আমেরিকার জন্য জায়গা (বাজার, কাজে ছাড় দেয়া) করে দেয়া কোন টেনশন বা যুদ্ধের শঙ্কাকে আপাতত নাকচ করেছে।

কিন্তু এই লেখার মূল প্রশ্ন, একালে তৃতীয় পর্যায়ে, চীনের তৈরি গ্লোবাল প্রভাব নিয়ে জন্ম নেয়া প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন- এআইআইবি, ব্রিক ব্যাংক, আরআইবি ইত্যাদির স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান কী হবে? এক কথায় বললে গ্লোবাল ব্যবস্থার তৃতীয় পর্যায়ের স্ট্যান্ডার্ড প্রতিষ্ঠান হতে গেলে এগুলোকে অবশ্যই ব্রেটন উডস সিস্টেমের চেয়েও ভাল, মানে যেমন বিশ্বব্যাংকের চেয়েও আরও ভাল মান দেখাতেই হবে। তবে এ কথা ঠিক, চীনের উত্থানে রেষারেষি প্রতিযোগিতায় পশ্চিমের স্বার্থটাকে মাখিয়ে তারা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার কথাটা উপস্থাপন করেছে। তাই আমেরিকা বা ইউরোপের স্ট্যান্ডার্ডের প্রসঙ্গ তুলে চীনকে যে অর্থে খোটা দিচ্ছে, নিজের প্রভাবকে বাড়িয়ে নিবার চেষ্টা করছ এর মধ্যে আমাদের মতো দেশের লাভ নেই। আমাদের স্বার্থ আমাদেরকে ভাবতে হবে। যেমন বাংলাদেশের সাথে চীনের রেল-রোড উদ্যোগসহ সব অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প আমাদের স্বার্থে তা খুবই দরকারি ও নির্ধারক। কিন্তু লক্ষণীয় যে, আমরা এখন টেন্ডার আহ্বানবিহীন সরকার, আর যেকোনো প্রকল্প ব্যয় দুই থেকে ছয় গুণ ব্যয় বাড়ানোর সরকারে পরিণত হয়েছি। এই বিষয়টা  বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বাদ রেখে বললেও এটা চীনের জন্য বিশেষ করে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড বা স্বচ্ছতা জবাবদিহিতার মান- এই বিচারে খুবই খারাপ উদাহরণ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজম ব্যবস্থার দিক থেকে এই ব্যবস্থা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। এদিকটায় চীনেরও অবশ্যই  মনোযোগ দিতেই হবে। যদিও চীনের হয়ত পাল্টা বলার বিষয় হবে যে, বাংলাদেশের জনগণ যদি একটি অপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারব্যবস্থাকেই টিকিয়ে রাখে, তাহলে সেটা ভালো না হওয়া পর্যন্ত চীন হাতগুটিয়ে বসে থাকলে এর সুবিধা চীনের প্রতিদ্বন্দ্বীরাই নেবে। তবুও এটা ভালো যুক্তি নয়। কারণ এর চেয়েও দুর্নীতিবাজ সরকারের সাথে গত চল্লিশ বছর ধরে আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে কাজ করতে হয়েছে। তার পরও তাদের অর্জন খারাপ নয়। আমাদের মতো দেশে সরকারের কার্যকারিতা যতটুকু, এর দক্ষতা যতটুকু, তা তো আপন কোনো রাজনৈতিক সরকারের কারণে হয়নি, আইএমএফ-ওয়ার্ল্ড ব্যাংক শর্ত দিয়ে তাদের বাধ্য করেছে বলা হয়েছে। যদিও শর্তের খারাপ দিক আছে, তা মেনেও এ কথা বলা যায়। যেমন শেখ মুজিবের আমলের রেশনব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংকের শর্তের কারণে আগের ব্যবস্থা তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন ঠিক রেশন নয়, তবে বাজারের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ অন্যভাবে কার্যকর আনা আছে। চালের সরকারি মওজুদ আর আগের দরে বাজারে চাল ছেড়ে দিয়ে মুল্য নামানো – এটা খুবই কার্যকর ব্যবস্থা।
মোট কথা, আমরা ব্রেটনউডস সিস্টেমের যুগ পার হয়ে এসেছি- এ কথা চীনকে মনে রেখে আগাতে হবে। আমাদের নতুন আকাঙ্খা পূরণ না করে, আমাদের হতাশ করে চীনের তৃতীয় পর্যায় গড়ে তোলা বা এর নেতা হওয়া অসম্ভব। চীনই ফান্ডদাতা, আবার কোনো টেন্ডার সিস্টেম নেই, কাজ পাবে কেবল চীন– এই ‘জি টু জি’, লোকাল এজেন্টের নামে ঘুষের ব্যবস্থা, প্রকল্পের অর্থ ছয় গুণ বাড়িয়ে নেয়া- এসব অগ্রহণযোগ্য। খুবই খারাপ উদাহরণ। এটাই ‘অপারগ’ চীনের আপাতত স্বার্থ মনে করে চীন নিজ মনকে প্রবোধ দিতে পারে। কিন্তু সাবধান এর মূল্য একদিন চীনকে শোধ করতে হবে। এই একই ফর্মুলায় আমরা বেল্ট-রোড উদ্যোগে যুক্ত হতে না চাইলে না পারলে তা আত্মঘাতী – চীন ও বাংলাদেশের জন্যই।
গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের তৃতীয় পর্যায়ের নেতা হিসেবে চীনকে অবশ্যই স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দিক থেকে উন্নত মানের গ্লোবাল প্রতিষ্ঠান হাজির করতে পারতে হবে। এমন কাজের নীতি অনুসরণের কোনো বিকল্প নেই। কোন অজুহাত এখানে অচল এবং আত্মধবংশী।

ভারত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরই সম্মেলন যোগ দেয় নাই। সেই সিদ্ধান্ত ভারতের স্বার্থে ন্যায্য হয়েছে সেই সাফাই যোগাড়ে মোদি সরকার কাহিল। কারণ এটা ফাঁপা আত্মম্ভরি সিদ্ধান্ত ফলে আত্মঘাতি তা স্পষ্ট। চোরে বাসন নিয়ে গেছে বলে কেউ অভিমানে মাটিতে ভাত রেখে খায় না।  তাই ভারতও এই সুযোগে যেন  ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’ অভাবের কারণে যোগ দেয় নাই, এমন ইঙ্গিত দিয়ে নিজের লাজ ঢাকতে চাইছে। তা সে চাইতেই পারে কারণ কেই বা  বেকুবির লজ্জায় নিজেকে রাঙা দেখাতে চায়। তবে এটা ফ্যাক্টস যে সম্মেলনের আগে ভারতের দেখানো যোগ না দেবার কারণগুলোর মধ্যে ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’ অভাব বলে কোন কারণ তালিকায় ছিল না।  কাজেই ‘স্টান্ডার্ড, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার’  কথা তুলে সে আড়ালে সুযোগ সন্ধানীও কম নাই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[লেখাটা এর আগে গত ০৫ জুন ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরে দিন) ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে বহু তথ্য আপডেট করে দেয়া হয়েছে। আর নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

মোদির ‘মিত্রোঁ’ ডাক এখন ভয়ঙ্কর আতঙ্ক

মোদির মিত্রোঁ ডাক এখন ভয়ঙ্কর আতঙ্ক

গৌতম দাস

১১ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-2cn

 

রাজনৈতিক নেতাদের বক্তৃতার ভাষা মানে জনগণকে কী বলে ডাকবেন, সেই সম্বোধনের ভাষা একেক নেতার একেক স্টাইলে হয়। যেমন অনেকে ডাকেন- ‘বন্ধুরা আমার’ অথবা ‘বন্ধুরা’। শেখ মুজিবের একান্ত স্টাইলের রূপ ছিল ‘ভায়েরা আমার’ বলা। আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিশেষ স্টাইল হলো- ‘মিত্রোঁ’ বলে ডাকা। হিন্দিতে ‘মিত্রোঁ’ বলে জনগণকে ডাকলে বা সম্ভাষণ করলে এক আন্তরিক ভাব প্রকাশ পায় বলে অনেকের ধারণা। ‘বন্ধু’ বোঝাতে আমরা বাংলায় অনেকে সংস্কৃতঘেঁষা বাংলা শব্দ ‘মিত্র’ ব্যবহার করি। সেই মিত্র থেকে হিন্দিতে ‘মিত্রোঁ’। সম্প্রতি ভারতেই মিডিয়া মনিটর করে পাওয়া রিপোর্ট হচ্ছে, মোদি জনগণের উদ্দেশ্যে ‘মিত্রোঁ’ সম্ভাষণ বন্ধ করে দিয়েছেন। কিভাবে তা বুঝা গেল? আনন্দবাজার পত্রিকা জানাচ্ছে, দিল্লীর এক পানশালার খবর। টিভির দিকে চেয়ে থাকা সেখানকার ম্যানেজার ঘোষণা দিয়েছিলেন মোদী এরপর বক্তৃতায় ‘মিত্রোঁ’ বলে ভারতের কোথাও ভাষণ শুরু করেছেন যদি দেখা যায় তবে যত বার মোদী ‘মিত্রোঁ’ বলবেন, “তত বার বিয়ার বা কোনও পানীয়ের ‘শট’ পাওয়া যাবে মাত্র ৩১ রুপীতে। পর্দায় চোখ ঠিকরে বসে ছিলেন গ্রাহকেরা। কিন্তু ফাঁকি দিয়েছে ‘মিত্রোঁ’”। ম্যানেজার বিজয়ী হয়েছেন। কিন্তু কেন? মোদি তাঁর প্রিয় শব্দ ব্যবহার কেন ত্যাগ করলেন?
একেবারে গোড়ার ঘটনা মানে ঘটনার পিছনের ঘটনা হল, গত ৮ নভেম্বর রাত সোয়া ৮টার সময় মোদি হঠাৎ টিভিতে এসে এক ঘোষণা-বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই ঘোষণা ভারতের প্রত্যেক মানুষকে তো বটেই, বিশেষত গরিব মানুষের কাছে তা ছিল তাদের জীবন উথালপাথাল করে দেয়ার মতো ঘটনা। মোদি ঘোষণা করেছিলেন,  ভারতের ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিল করা হয়েছে আর সে ঘোষণা ঐ রাতের  ১২টা থেকে কার্যকর হবে। কোন সরকারের হয়ে বাজারে কাগুজে নোট চালু করা, বিতরণ করা অথবা বাজার থেকে তুলে নেয়ার কর্তৃপক্ষ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমাদের বাংলাদেশ ব্যাংকের মত ভারতের বেলায় ওর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নাম রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (RBI বা আরবিআই)। চালু যে কোন নোট “এখন থেকে আর রাষ্ট্রস্বীকৃত নোট নয়”, এমন ঘোষণা দিয়ে সেই নোট প্রত্যাহার করে নেয়া আইনসিদ্ধ। আইনি টেকনিক্যাল ভাষায় এটাকে de-monetization বলা হয়। এটা monetization  এর উলটা কাজ। বৈধ মুদ্রা বা নোট হিসাবে অনেক কিছুই চালু থাকতে পারে। যাদুর ছোয়ার মত এক ঘোষণা দিয়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই নোটের মুদ্রা-গুণ কেড়ে নিতে পারে। তখন থেকে সেটা হয়ে যাবে অস্বীকৃত অথবা অবৈধ মুদ্রা। এটাই ডি-মনিটাইজ। মনিটাইজড গুণ কেড়ে নেওয়া। এভাবেই মোদির সরকার ভারতের বাজারে চালু ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট ডিমনিটাইজড বা বাতিল ঘোষণার সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল। অন্যান্য দিনের মত ওই ৮ নভেম্বর ২০১৬ সন্ধ্যায় ‘মিত্রোঁ’ বলে সম্ভাষণের পর মোদি হঠাৎ ঘোষণা করেছিলেন, রাত ১২টার পর থেকে ঘোষণা কার্যকর হবে। ফলে পাবলিকের কাছে এরপর থেকে মোদির মুখে ওই ‘মিত্রোঁ’ সম্বোধন একটা ভয়ঙ্কর আতঙ্ক ও ত্রাস সৃষ্টিকারি শব্দ হয়ে যায়।মোদির কথামাফিক রাত ১২টার পর থেকে নোট বাতিল ঘোষণা কার্যকর হয়ে যায়। অর্থাৎ এরপর থেকে ওই দুই নোটে কোনো লেনদেন ও কেনাবেচা বন্ধ হয়ে যায়। আর সরকার এর মধ্যে নোট বদলে দিবার কিছু অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা নিয়েছেল যার মধ্যে একটা হল, পরের দিন থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে বাতিল নোটগুলো ব্যাংক থেকে বদলে নতুন নোট নেয়া যাবে। কিন্তু প্রতিদিন ৪০০০ রুপির বেশি তোলা যাবে না। না প্রথম দুদিন মানুষ ওই ঘোষণা বাস্তবায়নকে কষ্টকর হলেও গ্রহণ করেছিল। এরপর তারা বুঝে যায় যে  এই সিদ্ধান্তে জীবনযাপন চালিয়ে নেয়া এক মানবেতর দশায় পড়া,  মানূষের নাভিশ্বাস তুলে ফেলা।
ইতোমধ্যে বিষয়টি নিয়ে একটা চুটকি বা কার্টুন প্রকাশিত হয়েছে। যেটা থেকে সাধারণ মানুষের জীবন-মনে ডিমনিটাইজেশন কেমন চোট ফেলেছে আন্দাজ করা যায়। কার্টুনে দেখা যাচ্ছে, মোদি ২০১৬ সালের শেষে রাত ১২টার কিছু আগে টিভিতে এসেছেন। তিনি কিছু একটা ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন, কিন্তু যেই না তিনি স্বভাবসুলভ ভাষায় ‘মিত্রোঁ’ বলে ডেকেছেন; তা শুনেই হাজার হাজার ভারতীয় অজ্ঞান হয়ে গেছেন! কারণ ‘মিত্রোঁ’ বলে ডাকার পর তিনি নোট বাতিলের মতো আবার নতুন কী ভয়ঙ্কর ঘোষণা দেন, তা শোনার আগেই ভয়ে মানুষ অজ্ঞান। অর্থাৎ ‘মিত্রোঁ’ বলে ডাক শোনার পর কী হয়েছে, মোদি আর কী বলেছেন তা কেউ শোনেনি। তার আগেই অজ্ঞান হয়ে গেছে। তবে ওই কার্টুনে শেষে দেখাচ্ছে, মোদি ২০১৬ সাল শেষ হওয়ার কিছু আগে টিভির ওই ঘোষণায় ‘মিত্রোঁ’ বলে ডাকার পরে খুবই স্বাভাবিক এক ঘোষণা ছিল সেটা। তিনি বলেছিলেন, আর কিছুক্ষণ পর ২০১৬ সাল শেষ হয়ে যাবে, আমার সালাম গ্রহণ করুন। যা হোক, এক চুটকি দিয়ে আমরা ‘মিত্রোঁ’ শব্দের ত্রাস সৃষ্টির ক্ষমতা সম্পর্কে জানলাম। সত্যি সত্যিই মোদি এখন তার বক্তৃতায় ‘মিত্রোঁ’ বলা ছেড়ে দিয়েছেন বলে অনেক মিডিয়া দাবি করছে। কিন্তু কেন এই ত্রাসবোধ?
আমরা টের পাই আর না পাই, অর্থনীতিতে মুদ্রার সবচেয়ে বড় ভূমিকা হল- বিনিময়ের ঘটক সে। বিশেষ করে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতিটি লেনদেন-বিনিময় ঘটনায় ঘটক হলো মুদ্রা। সেই স্তরে  ঘটক বা ‘উপায়’ হিসেবে হাজির থাকার মাধ্যমেই যেকোনো কেনাবেচা নগদ বিনিময় সম্পন্ন হয়। হাটে মুরগি বিক্রি করে পাওয়া মুদ্রা দিয়ে আবার লবণ বা কেরোসিন কিনে বাড়ি ফেরার মত ব্যাপার এটা। একটা দেশের অর্থনীতির আকার বাড়াতে, একে খুবই গতিশীল করতে উপযুক্ত নীতি-পলিসি থেকে শুরু করে বহুবিধ কাঠখড় পোড়াতে হয়। কিন্তু উল্টো তাকে শ্লথ করে দিতে চাইলে সবচেয়ে সহজ উপায় হল মুদ্রার সরবরাহ কমিয়ে বা বন্ধ করে দেয়া। ভারতের অর্থনীতি যতই বড় আর গতিশীল হোক, প্রতিটি কারখানায় উৎপাদন এবং বাজারে পণ্যের চাহিদা আগের দিনের মত যতই থাক, তা থাকলেও মুদ্রা সরবরাহের অভাবে সব ধরনের কেনাবেচা-বিনিময় থমকে দাঁড়াবেই। আর স্পষ্ট করে বললে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে যতটুকু (বাতিল নোটের বদলে) নতুন নোটের সরবরাহ সরকার করবে, আগের বাজার সীমিত হয়ে সেটুকুতে সীমাবদ্ধ হয়ে ধুঁকতে থাকবে।
মোদি তাঁর নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ঘোষণার আগে মন্ত্রী সচিবসহ তাঁর কাছের খুব কম লোককে তিনি জানিয়েছিলেন, শেয়ার করেছিলেন। অনেকে বলেন মন্ত্রীরা এবং রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্ণরও আগে থেকে এবং ভাল মত জানতেন না।  বিশেষত বিশেষজ্ঞ বা আমলা সচিবদের সাথেও যথেষ্ট শেয়ার করেননি। বাস্তবায়নের ভালো-মন্দ দিক কৌশল নিয়েও পরামর্শ করেননি এই ভয়ে যে, তাতে সিদ্ধান্ত ফাঁস হয়ে গেলে আগেই নগদ অর্থ ব্যাংকে হস্তান্তর শুরু হয়ে যাবে এবং এতে পরিকল্পনা ব্যর্থ হতে পারে। এই ভয়ে সিদ্ধান্ত আড়ালে রাখতে গিয়ে আগেই পর্যাপ্ত নতুন নোট ছাপানোর কাজ তিনি করেননি। এর ফল হয়েছে মারাত্মক। প্রতিদিন ব্যাঙ্কে জনপ্রতি লোক মাত্র চার হাজার টাকা পর্যন্ত বাতিল নোট বদলাতে পারবেন, এই ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। চাহিদা মেটানোর মতো নতুন নোট রিজার্ভ ব্যাংকের হাতে ছিল না বলেই এমন সিদ্ধান্ত, তা ধরে নেয়া যায়। অর্থাৎ প্রতিদিনের চাহিদার মাফিক নোট সরবরাহ  নয় বরং নোট ছাপানোর টেকনিক্যাল সক্ষমতায় ঠিক করে দিয়েছে প্রতিদিন কী পরিমাণ নোট  বাহারে দেয়া হবে। এভাবে প্রকৃত চাহিদা চেপে রেখে সীমিত করে চাহিদা মেটানোর পরিকল্পনা করতে হয়েছে। এর সোজা মানে, বাজারে নগদ অর্থের চাহিদা-জোগানের সম্পর্ক দিয়ে নয় বাজারে নোট সরবরাহ করা হয় নাই। বরং খুবই সীমিতভাবে রিজার্ভ ব্যাংক যতটা নোট সরবরাহ করেছে, অর্থনীতি বা বাজারের সাইজ নির্ধারিত হয়েছে একমাত্র সেই ভিত্তিতে। একটা চালু বাজার কেনাবেচা-বিনিময় লেনদেনকে টুঁটি চেপে ধরে সঙ্কুচিত করা হয়ে গেছে। এতে পুরো অর্থনীতিই সঙ্কুচিত হয়ে পড়েছে। তবে এটা ভাবা ভুল হবে যে মোদি খোদ অর্থনীতিকে সঙ্কুচিত করে শুকিয়ে মারার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাহলে কী ছিল তার উদ্দেশ্য?

কালো টাকা বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ ছিল মোদির ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য। কিন্তু তিনি তার এ লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগেই অন্য কোথাও চলে গেছেন। টনসিল অপারেশন করতে গিয়ে গলাই কেটে ফেলেছেন। আর সফল হয়ে যেতে পারলে পরবর্তী যেকোন নির্বাচনে তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবেন কল্পনায় এটা দেখে তিনি এতই আপ্লুত হয়ে গেছিলেন  যে, এই সিদ্ধান্ত ফেল করলে কী হবে, যথেষ্ট প্রটেকশন তিনি নিচ্ছেন কি না, এসব চিন্তা করতে তিনি ভুলে গেছেন। সফলতার স্বপ্ন – সফল হয়ে যেতে পারলে তিনি হিরো হবেন এসব ভাবনা তাকে এতই বিভোর করে ফেলেছিল যে বাস্তবায়নের রিস্কগুলোকে যথাযথ গুরুত্ব তিনি দেন নাই।
নোট বাতিল করলে কালো টাকাওয়ালা বা দুর্নীতিবাজেরা তাদের অবৈধ অর্থ পুড়িয়ে ফেলবে, নয়তো নদীতে ভাসিয়ে দেবে। এভাবে নিমেষেই দেশের দুর্নীতি হাওয়ায় মিশে যাবে। এমন কল্পনার লোভ তাঁকে কাবু করে ফেলেছিল। যেমন ধরা যাক, ব্যাপারটা কালো টাকা বা কালোবাজারের টাকা বলা হয় বটে, কিন্তু এভাবে কথা বলার মানে হল ‘অনৈতিক দিক’টাকে মুখ্য করে তুলে ধরা। কিন্তু বাস্তবে অনৈতিকতার বিচার ত সেকেন্ডারি – বিশেষ করে অনৈতিক হলেও তা যদি কাজের সংস্থান করতে পারে।  কালো টাকা কথার সোজা মানে হল ১. কর ফাঁকি দিয়ে পাওয়া টাকা, ২. দুর্নীতি করে জমানো টাকা অথবা ৩. কিছু জাল নোট। এ বৈশিষ্টের দিকগুলো ছাড়া কালো টাকা সব অর্থে অন্য সব টাকার মতোই। এমনকি অর্থনীতিতে এর ভূমিকা সবটুকু নেতিবাচক নয়। কালো টাকাও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ভূমিকা রাখে। অতএব কালো টাকার বিরুদ্ধে অ্যাকশন সতর্কতার সাথে নিতে হবে, যেন তা মূল অর্থনীতির বেচাকেনা-বিনিময় ও কাজ সৃষ্টির ভূমিকাকে আঘাত দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। অর্থনীতিতে ইনফরমাল সেক্টর বলে একটা খাত আছে। সোজা কথায় সরকারের মূল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সমাজের যে যে অংশের মানুষকে কাজ দিতে পারে নাই, স্পর্শ করতে পারে – এমন ঘটনাবলী স্বাক্ষ-প্রমাণ হল “ইনফরমাল সেক্টর” এর উপস্থিতি। কারণ ইনফরমাল মানেই যে কাজের সংস্থান (আসলে কাজ না) সরকারের পরিকল্পনা ব্যার্থতাতে পৌছাতে পারে নাই। কিন্তু তাতে না খেয়ে বসে না থেকে আন্ডারপ্রাইসিংয়ে শ্রম বিক্রি, আধাপেটে খেয়ে হলেও কিছু একটা করে কিছু ভাতের যোগাড় করা। যেমন রাস্তার ধারে বসা অনিয়মিত ফেরিওয়ালা, ছাই বিক্রি করা ফেরিওয়ালা। মিডিয়া ফিল্ড রিপোর্ট বলছে সেই ইনফরমাল সেক্টরকেই সবচেয়ে বড় নাড়া দিয়েছে। এমনিতেই এই সেক্টরকে চালু রাখতে কালো টাকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বড় ভূমিকা থাকে। ফলে গরীব মানুষকে এই নোট বাতিল বড় আঘাত করেছে। দিল্লীর অনলাইন পত্রিকা WIRE এক ফিল্ড রিপোর্ট ছেপেছে।  আমাদের কাওরান বাজারের যেমন এটা হল সেই পাইকারি বাজার খুচরা বিক্রেতা যার ক্রেতা এই অর্থে এটা খুচরা-পাইকারির মিলনমেলা বাজার – দিল্লীর এমনই এক বাজারের সরজেমিন রিপোর্ট। ওই বাজারে মাল উঠানো-নামানো, ওজন করে দেয়া, গোডাউন সাজানোর যেসব শ্রমিক কাজ করে এরাই কাজশুণ্য হয়ে গেছে। কারণ মনে রাখতে হবে  পুরা বাজারটাই আর সবচেয়ে বিপুল পরিমানে যেখানে বেচাকেনা নগদ নোটে চলে। কয়েকদিন তারা কাজশুন্য পেট বাঁচাতে বাতিল নোটেই মজুরি নিয়েছে। এরপর বাকি বেকার সময় দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে নোট বদলিয়েছে। প্রতিদিনের ছয়শত টাকা আয় গড়ে চারশ টাকায় নেমে গেছে। একথা ঠিক এক দিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায় ও আয় বাড়াতে পদক্ষেপ নিতে হবে, নেয়া দরকার। কিন্তু তা করতে গিয়ে যেন অর্থনীতিকে অথবা কাজ সৃষ্টিকে সঙ্কুচিত করা না হয়। এসব বিষয় মাথায় রেখে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হ্ত। মোদি এ দিকটি খেয়াল রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন।

কিছু মৌলিক পরিসংখ্যান জেনে নেয়া যাক, যার বেশির ভাগ ডাটা এখানে সাপ্তাহিক লন্ডন ইকোনমিস্ট থেকে নেয়া)। এবার বাতিল হওয়া দুই ধরনের নোট (৫০০ ও ১০০০ রুপি নোট) ভারতে ছাপানো সব ধরনের নোটের মোট অর্থমূল্যের ৮৫ শতাংশই এরাই বহন-ধারণ করে। অর্থাৎ ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট বাতিল মানে ৮৫ শতাংশ কেনাবেচা-বিনিময় বন্ধ। দ্বিতীয়ত, ছাপানো মোট নোটের সংখ্যা (নোটের অর্থমূল্য নয়) মোটামুটি ২২ বিলিয়ন। আর ছাপাখানার নোট ছাপার ক্ষমতা মাসে তিন বিলিয়ন। অর্থাৎ ছয়-সাত মাসের আগে সব বাতিল নোটের বিকল্প ছাপা সম্ভব নয়। তবে এক হাজারের নোটের বদলে নতুন সব দুই হাজারের নোট হওয়াতে কিছু সুবিধা হয়েছিল। এ দিকে নোট বাতিলের পর ইতোমধ্যে কেবল দুই মাস পার হয়েছে। তৃতীয়ত, ট্রেডার-ব্যবসায়ী কেনাবেচা নয়, শেষ ভোক্তাপর্যায়ে কেনাবেচা-বিনিময়ে ভারতের নগদ টাকায় এই বিনিময় হল মোট বিনিময়ের ৯৮ শতাংশ। (এটা চীনের বেলায় ৯০ শতাংশ) । এখন এই তথ্যের সাথে যদি মিলিয়ে দেখি, নোট বাতিলের পর থেকে মাথাপিছু প্রতিদিন মাত্র চার হাজার টাকার বদল নোট (এটিএমে দুই হাজার টাকা) কেউ পেতে পারে – এই তথ্যকে। তবে বুঝা যায় নোট সরবরাহ সঙ্কোচনের এই সিদ্ধান্তই অর্থনীতিতে সবচেয়ে নেতিকর প্রভাব ফেলেছে। অর্থনীতি সঙ্কোচনের ক্ষেত্রে এটাই মূল ফ্যাক্টর।

মোদির সিদ্ধান্ত কি কাজের হয়েছে, লাভ হয়েছে? নাকি হয়নি?
ভারতের অর্থনীতিতে ছড়ানো ছাপানো নোটের মোট মূল্য ১৪ ট্রিলিয়ন রুপি। ব্যাংক সূত্র বলছে, নোট বাতিলের এক মাসের মধ্যেই বাতিল নোট ফিরে এসেছে ৮.৫ ট্রিলিয়ন রুপি। মোদির সিদ্ধান্তের পক্ষের লোক আর বিরোধীপক্ষ – সবারই কম-বেশি অনুমান হল, আরো ৩ ট্রিলিয়ন রুপি শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে ফিরে আসবে বা এসেছে। এর বাইরে আরো আড়াই ট্রিলিয়ন থেকে যাবে, যা ফিরে আসা-না আসা নিয়ে সন্দেহ বা বিতর্ক আছে। মোদির খুব দেখার ইচ্ছা, এই আড়াই ট্রিলিয়ন বা প্রায় ১৫ শতাংশ বাতিল নোট ফিরে না আসুক। অর্থাৎ ব্যাংকে জমা দিতে না আসুক ফলে বদল চাইবার বা বদলে দিবার দাবি করার কেউ না হাজির হোক। মোদির এই আকাঙ্খার বিপরীতে ওয়ার (WIRE)পত্রিকাসহ অনেক মিডিয়া রিপোর্ট করেছে, মোট ৮৫% নয় বরং ৯৫% বাতিল নোটই সম্ভবত বদলে নতুন নোট ফেরত দিতে হবে (..….over 95% of the invalidated currency may come into the banking system)…। যদিও এখন পর্যন্ত জমা দেয়া বাতিল নোটের প্রকৃত সংখ্যা বা মূল্য কত, তা কোথাও সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি। অতএব ৯৫ শতাংশ বাতিল নোট যদি ফেরত এসে থাকে তবে প্রমাণিত হবে যে, মোদির নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত ব্যর্থ, নইলে নয়। সাধারণ মানুষকে সীমাহীন কষ্ট দেয়া ছাড়া এতে কোন লাভ হয় নাই। কারণ নোট ছাপার পর তা রিজার্ভ ব্যাংকে ফেরত না এলে এই ফেরত না আসা, অর্থাৎ বদল নতুন নোট দাবিকারী না থাকার অর্থ রিজার্ভ (বা নোট ছাপা) ব্যাংকের সমপরিমাণ সম্পদ লাভ ঘটেছে। কিন্তু ৯৫% বাতিল নোটই যদি বদল নেবার দারিদার হাজির থাকে তবে রিজার্ভ ব্যাংক পন্ডশ্রম করেছে। তবে এক অর্থে বললে মোদি ইতোমধ্যেই তাঁর ব্যর্থতা মেনে নিয়েছেন, যদিও তা পরোক্ষে। গরিব মানুষকেও ১০ রুপি দিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে হবে; তবেই সময়ে নানান সরকারি সুবিধা বিতরণ যেমন কৃষককে ভর্তুকি দেয়া,  সে পাবে। এই নীতিতে মোদি ‘জন-ধন’ নামে কর্মসূচি অনেক আগেই চালু করেছিলেন। এখন বলা হচ্ছে, অনেক গরিব মানুষ অর্থের বিনিময়ে অন্যের বাতিল টাকা নিজ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে জমা দিয়েছেন। তাই ফেরত মোট বাতিল নোটের পরিমাণ অযাচিতভাবে বেড়ে গেছে। মোদি এমন ঘটনার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দিয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন। কিন্তু এই সাফাই সাধারণ মানুষ কষ্ট লাগবে কোন ভুমিকা নাই। ফলে কথা সত্য-মিথ্যা যাই হোক, এই সাফাইয়ের ভাত নাই।

মোদি যে হেরে গেছেন এর আর এক স্বীকৃতি হল কালো টাকা সাদা করার প্রস্তাব – এর মধ্যে মোদী নিজেই অফার করেছেন। গত ২৯ নভেম্বর ২০১৬ আনন্দবাজার লিখেছে, কালো টাকায় গরিব কল্যাণ, ফের কালো আয় ঘোষণার জানলা খুলল কেন্দ্র। রাজস্ব সচিব হাসমুখ অধিয়া বলেন,  “……কর, জরিমানা ও সারচার্জ হিসেবে গুনতে হবে ৫০%”, ……… ‘‘আয়ের উৎস জানতে চাওয়া হবে না। সম্পদ কর বা অন্যান্য কর আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। যাঁদের বিরুদ্ধে বিদেশি মুদ্রা পরিচালন আইন, আর্থিক নয়ছয় আইন, ড্রাগ পাচার বা বেনামি সম্পত্তি আইনে মামলা চলছে, তাঁরা অবশ্য ছাড় পাবেন না।’’

 

ঘটনা হল, মোদির নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের ফল-প্রভাব ভালো হচ্ছে – বিজেপি দলের লোক ছাড়া এখন পর্যন্ত অন্য কাউকে এমন দাবি করতে দেখা যায়নি। বরং অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন, বিশ্বব্যাংকের কনসালটেন্ট কৌশিক বসু, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, সাবেক অর্থমন্ত্রী ও বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি- এরা সবাই এ সম্পর্কে খুবই নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন ও যুক্তি তুলে ধরেছেন। সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট বলেছে, এটা ‘দুর্বল বাস্তবায়নের কারণে ব্যর্থ সিদ্ধান্ত।’ (India’s currency reform was botched in execution)। খোদ মোদি অথবা তার অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিও পরোক্ষভাবে তা স্বীকার করে নিয়েছেন। যেমন, অরুণ জেটলি বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে এটা ভালো ফল দেবে। এর অর্থ, স্বল্পমেয়াদে বা বর্তমানে এটা ব্যর্থ। মোদি ভারতে নগদ রুপি ছাড়াই লেনদেনের অর্থনীতি গড়তে চান, এর ঢাক বাজানো শুরু করছেন। মোদি ইঙ্গিতে বলতে চাচ্ছেন যেন নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য এটাই ছিল। অর্থাৎ খেলায় গোল হচ্ছে না, দিতে পারেননি এটা বুঝতে পেরে এখন খোদ গোলপোস্টকেই সরানোর জন্য টানাটানি করছেন। এত সব মিলিয়ে পরিণতি কী হতে যাচ্ছে? সবচেয়ে মারাত্মক দিক হল, ভারতের সম্ভাব্য জিডিপি সাড়ে সাত থেকে দুই শতাংশ কম হবে বলে অর্থনীতিবিদেরা সবাই অনুমান করছেন। অর্থাৎ বিগত কংগ্রেস সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে (২০১০-১১) যে অর্থনৈতিক পতন ঘটেছিল, ভারত সেখানে ফিরে যাচ্ছে। সর্বশেষ গত ৫ জানুয়ারি এইচএসবিসি ব্যাংকের এক রিপোর্টেও বলা হয়েছে, চলতি কোয়ার্টার থেকে জিডিপি নেমে ৫ শতাংশর কাছে যেতে পারে। ব্যবসায়ী মহল হতাশ হয়ে হয়ে পরেছে যে আগামি ছয়মাসের বাজার স্বাভাবিক হবে না।
এসব কিছুর তাৎক্ষণিক ফলাফল হবে পরের ফেব্রুয়ারি মাসের ১১ তারিখ থেকে উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাবসহ পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনে এর বিরাট ছাপ পড়বে। বিজেপি ফলাফল খারাপ করবে। এসবের সামগ্রিক প্রভাব ২০১৯ সালে পরবর্তী কেন্দ্রীয় নির্বাচনে পর্যন্ত গড়িয়ে যেতে পারে। এটা মোদির দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাবনায় ধস আনবে। মোদির এসব ব্যর্থতা নিয়ে সোচ্চার হওয়ার দিক থেকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে এগিয়ে আছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ও তাঁর দল। সময়ে কংগ্রেসের রাহুলের চেয়েও সমালোচক হিসেবে তিনি আগে। কারণ মমতার অ্যাপ্রোচ হল, গরিব মানুষের জায়গা থেকে দেখা ও সরব হওয়া। দৈনিক মজুরিতে কাজ করা লোকেরা এবং গরিব মধ্যবিত্তরা কাজ হারিয়ে সবচেয়ে কষ্টকর জীবনে পড়েছে। কলকাতা থেকে বিরাট এক  স্বর্ণকার পেশার জনগোষ্ঠি বোম্বাই বা গুজরাটের রাজধানী শহরে মাইগ্রেট করে নিজেকেসহ আরও চার-পাঁচকে সহযোগীকে নিয়ে পেশা জমিয়ে বসেছিল, নিয়মিত দেশে ঞ্জের পরিবারকে অর্থ পাঠাতে পারছিল। এই পুরা গোষ্ঠি এখন সবকিছু গুটিয়ে নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে গেছে। WIRE এর ভাষায়, পুরো ‘ইনফরমাল সেক্টর’ এভাবে ডুবে যাচ্ছে। তাই মমতা ব্যানার্জি এদের দিক থেকে দেখে শুরু থেকেই মোদির সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করছেন। “নোট বাতিল” এখন ভারতের রাজনীতির মূল ইস্যু বা কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে গেছে। ২০১৯ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এটা থাকবে অনুমান করছেন অনেকেই। আর এতে মোদির জন্য এটা সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ, ‘মোদির নোট বাতিল’ সাধারণ মানুষের কাছে তামাশার ইস্যু হয়ে গেছে। এর চরম মূল্য মোদিকে চুকাতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

[এই লেখাটা এর আগে ০৯ জানুয়ারি ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইনে (প্রিন্টেও পরের দিন) প্রকাশিত হয়েছিল। এখানে তা আবার নানা সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল।]